Showing posts with label খালেদা জিয়া. Show all posts
Showing posts with label খালেদা জিয়া. Show all posts

Monday, January 5, 2026

‘ক্রসরোডে’ বাংলাদেশের রাজনীতি

কাঠমান্ডু পোস্টের নিবন্ধঃ ৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু শুধু বিএনপির রাজনীতিতেই নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও একটি বড় শূন্যতা তৈরি করবে। ১৯৯১ সালে নির্বাচিত হয়ে তিনি দেশে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর দলের ভিতর যে বিভক্তি তৈরি হয়, তিনি তা সামলে নিয়ে নেতৃত্ব দেন। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়ার কৃতিত্বও তার। অনলাইন কাঠমান্ডু পোস্টে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ পলিটিক্স অ্যাট এ ক্রসরোডস’ শীর্ষক মন্তব্য প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন নয়া দিল্লির মনোহর পারিকার ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিসের গবেষণা ফেলো স্মৃতি এস পট্টনায়ক। তিনি ওই নিবন্ধে বেগম খালেদা জিয়া, তার রাজনীতি এবং বিএনপিতে পরবর্তী নেতৃত্ব নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি মনে করেন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিএনপির ভেতরে একরকম শূন্যতা তৈরি হবে। তিনি লিখেছেন, বেগম জিয়ার নেতৃত্বেই বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। পরবর্তীতে তার ছেলে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দ্বিতীয় সারির নেতারাও উঠে আসেন। এবার নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াত আলাদাভাবে লড়ছে। দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে কারাবন্দি থাকার সময় তারেক রহমান লন্ডন থেকে অনলাইনে দল পরিচালনা করেন, ভার্চুয়ালি বৈঠক করেন এবং প্রার্থী মনোনয়নে ভূমিকা রাখেন। তবু বেশির ভাগ নেতা দলত্যাগ করেননি। এটা তাদের সংগঠনের প্রতি আনুগত্যেরই প্রমাণ। ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরা তারেক রহমান বিএনপিকে নতুন উদ্দীপনা দিয়েছেন। এবারের নির্বাচন তার নেতৃত্বে প্রথম। অতএব দলের সব সিদ্ধান্তের দায়দায়িত্ব তার কাঁধেই পড়বে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারায় লড়াই মূলত বিএনপিজোট ও জামায়াতজোটের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

স্মৃতি এস পট্টনায়েক আরও লিখেছেন, শেখ হাসিনার পতনের পর উদীয়মান ছাত্রদের দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)’তে বড় পরিবর্তন এসেছে। তারা হঠাৎ জামায়াতের নেতৃত্বাধীন আটদলীয় জোটে যোগ দেয়। শুরু থেকেই যাকে অনেকে ‘জামায়াতের বি-দল’ বলছিলেন, সেই অভিযোগ এবার বাস্তবে রূপ নেয়। দল গঠনের সময় শিবিরপন্থী নেতাদের শীর্ষ পদ না দিয়ে যে আদর্শিক দূরত্ব বজায় রাখা হয়েছিল, তা ভেঙে যায়। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের অন্তত ৩০ জন দল থেকে পদত্যাগ করেন। কিছু নারী নেত্রী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে যাচ্ছেন। অভিযোগ আছে, শেষ মুহূর্তে এ জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্তটি নেয়া হয়, যাতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের বিকল্প ভাবার সুযোগ না থাকে।

এনসিপির অন্যতম নারী নেত্রী তাসনিম জারা নিজ নির্বাচনী এলাকায় এক ভাগ নিবন্ধিত ভোটারের স্বাক্ষর জোগাড় করে স্বতন্ত্রভাবে মনোনয়ন লাভের চেষ্টা করছেন এবং এটা ঘটছে এমন এক সময়ে যখন ইসির সার্ভার বিভ্রাট চলছিল।

দলটি ‘নতুন রাজনীতি’র অঙ্গীকার দিয়েও, জামায়াতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বহু সমর্থককে হতাশ করেছে। এনসিপি ও বিএনপি উভয়েই যুক্তি দিচ্ছে- এটি কৌশলগত জোট, মতাদর্শিক নয়। তবে এনসিপি বড় দল ছাড়া নির্বাচন জেতার সম্ভাবনা না থাকায়- এ জোটকে অনেকেই রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে দেখছেন।

ওই নিবন্ধে আরও বলা হয়, ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হলেও এটাই বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণ করবে। এটি হবে তারেক রহমানের নেতৃত্বের বড় পরীক্ষা। আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত থাকায় বিএনপির রাজনৈতিক বয়ান অনেকাংশে জামায়াতের দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। অতীতের প্রচলিত ‘ইসলাম প্রসঙ্গ’ বা ‘সার্বভৌমত্ব হুমকিতে’ ধরনের স্লোগান- সম্ভবত জামায়াত আবার সামনে আনবে।
ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারেক রহমানকে ‘ভারতের ঘনিষ্ঠ’- এমন প্রচারণা চালানো হচ্ছে, যা তার নেতৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। তবু জুলাইপরবর্তী উত্তাল রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার নেতৃত্বই বিএনপিকে এগিয়ে নিতে পারে- এমন প্রত্যাশা রয়ে গেছে।

https://mzamin.com/uploads/news/main/196786_Abul-1.webp

Sunday, January 4, 2026

খালেদা জিয়া: প্রতিরোধের এক জীবন

আল জাজিরার বিশ্লেষণঃ ডিসেম্বরের শুরুর দিকে বিএনপির তৃণমূল কর্মী ৪৮ বছর বয়সী টিপু সুলতান ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে একটি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সেখানে লেখা ছিল- ‘আমি বেগম খালেদা জিয়াকে আমার কিডনি দান করতে চাই।’

১৭ কোটি মানুষের দেশে, যেখানে ২৩শে নভেম্বর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল, সেখানে টিপুর এই প্ল্যাকার্ডের ভিডিও দ্রুত ভাইরাল হয়ে যায়। এরপর থেকে তিনি হাসপাতালের গেটের বিপরীত পাশে ফুটপাথে দিন কাটাতে থাকেন। অঙ্গীকার করেন সুস্থতার খবর না পাওয়া পর্যন্ত সরে যাবেন না।  আল জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া আমার মায়ের মতো। তিনি গণতন্ত্রের জন্য সবকিছু উৎসর্গ করেছেন। আমার একমাত্র দোয়া- আল্লাহ যেন তাকে আসন্ন নির্বাচন দেখা পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখেন।  কিন্তু তা আর হলো না। ৩০শে ডিসেম্বর ভোরে, ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। ফেসবুকে দেয়া এক বিবৃতিতে বিএনপি বলেছে, আমাদের প্রিয় জাতীয় নেত্রী আর নেই। তিনি আজ সকাল ৬টায় আমাদের ছেড়ে গেছেন।

তার আজীবন প্রতিদ্বন্দ্বী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন ভারতে নির্বাসনে। তখন খালেদার মৃত্যু এক দীর্ঘ তিন দশকব্যাপী অধ্যায়ের সমাপ্তি টানে। এদেশের এই দুই নেত্রীকে ‘বেগম জুটি’ নামে ডাকা হতো এবং তারা বাংলাদেশের রাজনীতিকে শাসন করেছেন। তারা দু’জনই স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে লড়েছেন, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেছেন। যদিও হাসিনার মতো বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমনপীড়নের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে ওঠেনি। তবুও তিনি ছিলেন শক্তিধর এক চরিত্র। সংসদ বর্জন, দীর্ঘ আন্দোলন, আপসহীন ভঙ্গি-  তাকে যেমন অনুগত সমর্থন দিয়েছে। 

উত্থান
বেগম খালেদা জিয়া জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৬ সালের ১৫ই আগস্ট, দিনাজপুরে। তার পিতা ইস্কান্দার মজুমদার মূলত ফেনীর মানুষ। পরবর্তীতে তিনি জলপাইগুড়িতে চা ব্যবসা করার পর পূর্ববঙ্গে চলে আসেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর এদেশ হয় পূর্ব পাকিস্তান। পরে স্বাধীনতা অর্জন করে নাম হয় বাংলাদেশ। খালেদা দিনাজপুরেই শৈশব কাটান, দিনাজপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন, পরে সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ভর্তি হন।
তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনা হয় তার ইচ্ছা থেকে নয়, বরং এক অস্থির পরিস্থিতির কারণে। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে ব্যর্থ সামরিক বিদ্রোহে তার স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান নিহত হন। তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে অস্থিতিশীল করে তোলে এবং প্রতিষ্ঠাতা ছাড়া বিএনপি গভীর সংকটে পড়ে। রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও, বিএনপির শীর্ষ নেতারা মনে করতেন,  কেবল খালেদাই বিভিন্ন পক্ষকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারবেন। এর মধ্যেই ১৯৮২ সালে সেনাপ্রধান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ ক্ষমতা দখল করে মার্শাল ল’ জারি করেন। এই অস্থির সময়েই খালেদার রাজনৈতিক উত্থান শুরু হয়-  একজন বেসামরিক চ্যালেঞ্জার হিসেবে।

তিনি ১৯৮২ সালে বিএনপির সাধারণ সদস্য হিসেবে যোগ দেন। ১৯৮৩ সালে ভাইস চেয়ারম্যান হন এবং ১৯৮৪ সালে চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন। এরপর তিনি তিন দফা নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন। দীর্ঘমেয়াদে শেখ হাসিনার সঙ্গে সমান্তরালে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকেন। তার ব্যক্তিজীবনও ছিল বেদনাময়। বড় ছেলে তারেক রহমান ২০০৮ সালে নির্বাসনে চলে যান। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ২০১৫ সালে মারা যান। ২০১৮ সালে দুর্নীতির মামলায় তিনি কারাবন্দি হন। পরবর্তীতে অসুস্থতা ও নিঃসঙ্গতা তার জীবনকে গ্রাস করে। তারেক অবশেষে ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফেরেন।

রাজনীতিতে প্রবেশের আগের জীবন
যারা তাকে কাছ থেকে চিনতেন, তাঁকে বর্ণনা করেন- ভদ্র, নীরব, সংযত মানুষ হিসেবে। তিনি ১৯৬০ সালে সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমানকে বিয়ে করেন। তখন তার বয়স ছিল প্রায় ১৫। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর জিয়া জাতীয় নেতায় পরিণত হন। ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ পর্যন্ত তারা বসবাস করতেন ঢাকা সেনানিবাসের ৬, মঈনুল রোডের সরকারি বাসায়। তখনকার এডিসি কর্নেল হারুনুর রশীদ খান স্মরণ করেন, তিনি নিজেই অতিথিদের আপ্যায়ন করতেন। পরিবারের সবকিছু দেখতেন। আমি কখনও তাকে উচ্চস্বরে কথা বলতে দেখিনি।
কিন্তু সবকিছু বদলে যায় ১৯৮১ সালের ৩০ মে। স্বামীকে হত্যার খবর শুনে তিনি নিস্তব্ধ হয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়েন। কর্নেল খান বলেন- তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। পরবর্তীতে সরকার ওই বাড়িটি তাকে স্থায়ীভাবে বরাদ্দ দেয়। কিন্তু ২০১০ সালে শেখ হাসিনার সরকার তাকে উচ্ছেদ করে।

প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়া
১৯৮০-এর দশকে খালেদা ও শেখ হাসিনার দল যৌথভাবে এরশাদবিরোধী আন্দোলন চালায়। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বিএনপি তার নেতৃত্বে নির্বাচন বর্জন করে। এর ফলে তিনি আপসহীন নেত্রী হিসেবে জনমনে জায়গা করে নেন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে তার একের পর এক গৃহবন্দি হওয়া তার ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী করে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলেও জামায়াতের সমর্থনে সরকার গঠন করে এবং খালেদা দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

শাসন, সাফল্য ও বিতর্ক
তিনি তিন মেয়াদে দেশ পরিচালনা করেন।  ১৯৯১-১৯৯৬, ১৯৯৬ সালের স্বল্পমেয়াদী সরকার ও ২০০১-২০০৬ মেয়াদে তার সরকার ক্ষমতায় ছিল। তার শাসনামলে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, গার্মেন্টস খাতের বিস্তার, মেয়েশিশুদের শিক্ষায় অগ্রগতি, তুলনামূলক মুক্ত গণমাধ্যম- উল্লেখযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। ২০০৬ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল প্রায় ৭ শতাংশ। সে সময় বিশ্বব্যাংক বলেছিল, ‘বাংলাদেশ এশিয়ার পরবর্তী টাইগার অর্থনীতি’।

‘গণতন্ত্রের প্রতি অঙ্গীকার’
তার সহকর্মীরা বলেন, তিনি কখনও নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসেননি। বিশ্লেষকদের মতে,  তিনি দেশ ছাড়তে পারতেন। কিন্তু তা করেননি, বরং কারাবাস, মামলা, স্বাস্থ্যঝুঁকি- সবকিছু সয়ে গেছেন। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা পতনের পর মুক্তি পেয়ে তিনি প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে বিরত থাকতে কর্মীদের আহ্বান জানান, যা অনেককে বিস্মিত করে। ৭৭ বছর বয়সী নাজিম উদ্দিন বলেন,  দুই নেত্রীই দেশ শাসন করেছেন। তবে আমার মতে খালেদা ভালো করেছেন।

mzamin

Saturday, January 3, 2026

বিদেশি মিডিয়ার রিপোর্ট: ‘লাজুক গৃহিণী’ হলেন কাণ্ডারি

বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। ‘লাজুক গৃহিণী’ থেকে তিনি দেশনেত্রী হয়ে উঠেছেন। দেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। হয়ে উঠেছিলেন বিএনপির কাণ্ডারি। আজ মঙ্গলবার ভোর ৬টায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্না...রাজেউন)। তার মৃত্যুতে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে খবর প্রচার করেছে।

বার্তা সংস্থা এপি লিখেছে, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা গেছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে প্রায় এক প্রজন্ম ধরে দেশের রাজনীতিকে ছায়ার মতো অনুসরণ করেছে। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচিত নারী প্রধানমন্ত্রী। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলাকে তিনি ও তার দল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট তার বিরুদ্ধে থাকা শেষ দুর্নীতির মামলাটিতেও তাকে খালাস দেন। যা তাকে ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথ খুলে দিয়েছে। কিন্তু তার আগেই তিনি চলে গেলেন।

বিএনপি জানায়, ২০২০ সালে অসুস্থতার কারণে কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তার পরিবার তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রশাসনের কাছে কমপক্ষে ১৮ বার বিদেশে চিকিৎসার অনুমতি চেয়েছিল। কিন্তু সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করা হয়। ২০২৪ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর নোবেল শান্তি পুরস্কারপ্রাপ্ত ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শেষ পর্যন্ত তাকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেয়। জানুয়ারিতে তিনি লন্ডনে যান এবং মে মাসে বাংলাদেশে ফিরে আসেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশের প্রথম বছরগুলো কাটে হত্যা, অভ্যুত্থান এবং পাল্টা অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। খালেদা জিয়ার স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে সেনা প্রধান হিসেবে ক্ষমতায় আসেন। এক বছর পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টি (বিএনপি) গঠন করেন। তাকে দেশে গণতন্ত্রের পথ উন্মুক্ত করার কৃতিত্ব দেয়া হয় । তবে ১৯৮১ সালে তিনি এক সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে খালেদা জিয়ার আপসহীন অবস্থান পরবর্তী সেনাশাসনের বিরুদ্ধে এক গণআন্দোলনকে শক্তিশালী করে। এর পরিণতিতে ১৯৯০ সালে সাবেক সেনাপ্রধান ও স্বৈরশাসক এইচ. এম. এরশাদ ক্ষমতাচ্যুত হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে প্রথমবার জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া।  

অনলাইন বিবিসি লিখেছে, খালেদা জিয়ার স্বামী মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম নেতা জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে দেশের প্রেসিডেন্ট হন। সে সময় খালেদা জিয়াকে তাদের দুই ছেলের প্রতি নিবেদিত ‘লাজুক গৃহিণী’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কিন্তু ১৯৮১ সালে স্বামীর হত্যাকাণ্ডের পর তিনি তার বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী পার্টির (বিএনপি) নেতৃত্বে উঠে আসেন এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের কঠোর রাজনীতির অঙ্গনে তিনি দুর্নীতির অভিযোগের মুখে পড়েন। বহু বছর কারাবন্দি থাকতে হয় তাকে। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর সেই অভিযোগগুলো বাতিল করা হয়। ওই অভ্যুত্থানে তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারান।

ভারতের দ্য উইক লিখেছে, বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর মঙ্গলবার ভোরে ঢাকার একটি হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। ডাক্তারদের মতে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে লিভার সিরোসিস, আর্থ্রাইটিস, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ এবং বুকের জটিলতায় ভুগছিলেন। গত ২৩ নভেম্বর তাঁকে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং কয়েক দিন ধরে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। বিএনপি জানায়, ফজরের নামাজের কিছুক্ষণ পরই ভোর ৬টায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

দলের এক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্টে বলা হয়, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। আমরা তার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং সবার কাছে দোয়া প্রার্থনা করছি।’ খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা ছিল, যা তিনি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সুপ্রিম কোর্ট তার বিরুদ্ধে থাকা শেষ দুর্নীতির মামলাটিতেও খালাস দেন। ফলে তিনি আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ পেতেন।

২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তার মৃত্যু আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। ওই আন্দোলনের ফলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। শেখ হাসিনা তখন থেকেই ভারতে নির্বাসিত অবস্থায় আছেন। আর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যুব আন্দোলন সংশ্লিষ্ট মামলায় তার দণ্ড ও মৃত্যুদণ্ডের রায়ের কথা উল্লেখ করে তাকে দেশে প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়ে আসছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স লিখেছে, ১৯৯১ সালে বাংলাদেশে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর মঙ্গলবার মারা গেছেন। এ সময়ে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ক্ষমতার পালাবদল ও তীব্র রাজনৈতিক বিরোধিতার মধ্যে রাজনীতি করেছেন তিনি। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডনে গিয়েছিলেন এবং চার মাস থাকার পর দেশে ফিরে আসেন। ২০০৬ সালের পর থেকে খালেদা জিয়া ক্ষমতার বাইরে থাকলেও এবং কয়েক বছর কারাগার ও গৃহবন্দিত্বে কাটালেও তিনি ও তাঁর  দল বিএনপি এখনো ব্যাপক জনসমর্থন ধরে রেখেছে। ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিকে সম্ভাব্য বিজয়ী হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে গত সপ্তাহে দেশে ফিরেছেন এবং ব্যাপকভাবে সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রীপ্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশ একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে রয়েছে। নিজের প্রথম নামেই বেশি পরিচিত খালেদা জিয়া। তাঁকে লাজুক ও দুই ছেলেকে বড় করা পরিবারমুখী নারী হিসেবে বর্ণনা করা হতো, যতক্ষণ না তাঁর স্বামী, সামরিক নেতা ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টায় নিহত হন। তিন বছর পর তিনি তার স্বামীর প্রতিষ্ঠিত বিএনপির প্রধান হন এবং ‘বাংলাদেশকে দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক পশ্চাৎপদতা থেকে মুক্ত করার’ তাঁর স্বামীর অঙ্গীকার বাস্তবায়নের ঘোষণা দেন।

mzamin

Friday, January 2, 2026

ভিড় ঠেলে জনতার সঙ্গে জানাজায় পাকিস্তানের স্পিকার

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় শরিক হতে বুধবার ঢাকায় এসেছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ ব্লকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা ও সমবেদনা জানিয়ে আমন্ত্রিত বিদেশি অতিথিদের সঙ্গে তাঁর জানাজায় যোগ দেওয়ার কথা ছিল। ভিড়ের কারণে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে বিদেশি অতিথিদের জন্য নির্ধারিত স্থানে গিয়ে তিনি জানাজা পড়তে পারেননি। ভিড়ের মধ্যেই তিনি বাংলাদেশের লোকজনের পাশে দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়ার জানাজা পড়েছেন।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় আসার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা জানাতে জাতীয় সংসদ ভবনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলাদা আলাদাভাবে আলোচনা করেন সার্কভুক্ত দেশের উচ্চপর্যায়ের অতিথিরা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক, ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর, নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বালা নন্দা শর্মা, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডি এন ধুংগিয়েল, মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত ও দেশটির উচ্চশিক্ষামন্ত্রী আলী হায়দার আহমেদ এবং শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিজিতা হেরাথ।

জাতীয় সংসদ ভবনে আলোচনার আনুষ্ঠানিকতা সেরে শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছাড়া বাকি পাঁচ অতিথি একটি বাসে ওঠেন। সার্কভুক্ত পাঁচ দেশের উচ্চপর্যায়ের অতিথিদের বহনকারী বাসটিতে ছিলেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুকসহ কয়েকজন কূটনীতিক ও রাজনীতিবিদ।

জানা গেছে, খালেদা জিয়ার জানাজা রীতিমতো জনসমুদ্রে পরিণত হওয়ায় সার্কভুক্ত পাঁচ দেশের উচ্চপর্যায়ের অতিথিদের বহনকারী বাসটি ভিড়ে আটকে ছিল প্রায় আধা ঘণ্টা। পরে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক আড়ংয়ের লালমাটিয়া শাখার উল্টো দিকে দেশি–বিদেশি অতিথিদের বহনকারী গাড়ি থেকে নেমে পড়েন। গাড়ি থেমে নেমে খানিকটা এগিয়ে তিনি জনতার সঙ্গে জানাজায় শামিল হন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-31%2Fdkm7t6bn%2FCapture.PNG?rect=3%2C0%2C357%2C238&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের স্পিকার সরদার আইয়াজ সাদিক

Thursday, January 1, 2026

খালেদা জিয়ার অভিভাবকত্ব এ মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি ছিল by জাহেদ উর রহমান

বাংলাদেশে নির্বাচন হয়েছে, সে নির্বাচনে নিজ হাতে গড়া দলটি (বিএনপির পত্তন জিয়াউর রহমানের হাতে হলেও এই একটি পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে উঠেছে খালেদা জিয়ার হাত ধরেই) দীর্ঘ সময় পর ক্ষমতায় গেছে এবং সেই সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান উপভোগ করছেন খালেদা জিয়া—এমন একটা দৃশ্য না দেখার আফসোস সম্ভবত থেকে যাবে আমাদের। সত্যি বলতে, এটা দেখে যাওয়ার সবচেয়ে বড় অধিকার ছিল তাঁরই।

শেখ হাসিনাবিরোধী লড়াইয়ে সবচেয়ে বড় নামটি খালেদা জিয়া। প্রথম আলোতে আগে একটি কলামে লিখেছিলাম, শেখ হাসিনা কম্বোডিয়ার প্রধানমন্ত্রী হুন সেনের মতো করে আরও অনেক বেশি সময় ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারেননি কারণ, তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও বিএনপিকে ভেঙে ফেলতে পারেননি (যেটা পেরেছিলেন হুন সেন)।

এ ঘটনা ঘটতে পেরেছে একদিকে বিদেশে থেকেও দলকে চমৎকারভাবে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তারেক রহমান, অপর দিকে দেশে থেকেও কোনো চাপ বা সুবিধাপ্রাপ্তির বিনিময়ে দেশত্যাগ না করা আপসহীন খালেদা জিয়ার লড়াই।

খালেদা জিয়ার রাজনীতি এবং তাঁর ব্যক্তিত্বের নানা দিক নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আলোচনা হচ্ছে। তাঁর চরিত্রের একটি দিক আমাদের দেশের অনাগত সময়ে খুবই জরুরি।

পরিবার ও নিজের গড়া রাজনৈতিক দলের ওপরে তো বটেই, ব্যক্তিগতভাবেও এমন কোনো নিগ্রহ নেই, যেটার শিকার তিনি শেখ হাসিনার দ্বারা হননি। শেখ হাসিনার পতনের পর খালেদা জিয়া যদি শেখ হাসিনার প্রতি তাঁর যৌক্তিক ক্ষোভ প্রকাশ করতেন, সেটাকে মানুষ খুব ভালোভাবেই গ্রহণ করতেন। কিন্তু ইতিহাসে লেখা থাকবে, ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে মৃত্যুর আগপর্যন্ত একটিবারের জন্যও তিনি এমনকি মৃদু ভাষায়ও ক্ষোভ প্রকাশ করেননি।

শুধু এই সময়েই নয়, তিনি জেলে যাওয়ার আগেও শেখ হাসিনার নিজের মুখে এবং তাঁর দলের লোকজনের তাঁর প্রতি অকথ্য মিথ্যা কুৎসার জবাবে কখনোই কিছু বলেননি। পুরো রাজনৈতিক জীবনে তিনি গড়েছিলেন সভ্যতা, ভদ্রতা, মৃদুভাষণের এক অসাধারণ নজির। বেঁচে থাকলে এবং কর্মক্ষম থাকলে তিনি ভবিষ্যতেও নিশ্চিতভাবেই তাঁর এই প্রকাশের ধরন অব্যাহত রাখতেন।

এ কাজটি খালেদা জিয়া (তাঁর সন্তান তারেক রহমানও) এমন সময়ে করছেন, যখন সারা পৃথিবীতে ডানপন্থী জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির জয়জয়কার চলছে। পপুলিস্ট ও ডেমাগগ রাজনৈতিক নেতারা মানুষের রাগ-ক্ষোভ, বিদ্বেষ, বিভেদ ক্রমাগত উসকে দেওয়ার জন্য ক্রুদ্ধ ভাষা ব্যবহার করছেন। বৈশ্বিক এই প্রবণতা এসে হাজির হয়েছে বাংলাদেশেও। তার ওপর দীর্ঘ সময় স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে থেকে আমাদের ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা একেবারে তলানিতে। এ কারণে আমাদের ঝুঁকি অনেক বেশি।

এ যাত্রা বেগম খালেদা জিয়া যখন মারাত্মক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, তখন তাঁর অসুস্থতার যে বিস্তারিত বিবরণ আমাদের সামনে এসেছিল, তাতে তাঁর এবার ফিরে আসা নিয়ে বড় সংশয় ছিল। তখন থেকেই মনে হচ্ছিল, তিনি যদি চলে যান, আমাদের একটা বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। জীবনের পরের দিক থেকে জীবনের শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত কষ্টসংকুল একটি জীবন কাটিয়েছেন তিনি। কিন্তু বিদায় নেওয়ার আগেই তিনি দেখে গিয়েছিলেন, একটি দলের প্রধান হলেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন দলমত–নির্বিশেষে সব মানুষের এক অভিভাবক।

এমনকি খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর শেখ হাসিনা (খালেদা জিয়াকে অন্যায় নিপীড়ন চালিয়েছে তাঁর সরকার) এবং তাঁর পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়ের বার্তা দেখলে বোঝা যায়, তাঁর এই অভিভাবকত্বের বাস্তবতাকে অস্বীকার করতে পারেননি তাঁরাও। খালেদা জিয়ার এই অভিভাবকত্ব আমাদের জন্য এ মুহূর্তে ছিল খুবই জরুরি।

গণ–অভ্যুত্থানের মুখে সরকার পতনের পরও শ্রীলঙ্কা ও নেপালে সবকিছুর দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরে আসা দেখে অনেকে বাংলাদেশ নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেন। বাংলাদেশকে এই দুটি দেশের সঙ্গে তুলনা করা ভুল; কারণ, এই দুটি দেশ দীর্ঘকালীন কোনো স্বৈরাচারের শাসনের ছিল না; গণ–অভ্যুত্থানের মুখে পতন হয়েছিল অবাধ–সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের।

এমন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বেশ ভালোভাবে ক্রিয়াশীল থাকে। কিন্তু দীর্ঘ সময় স্বৈরাচারী শাসনের অধীনে থাকলে কোনো দেশের সব প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়ে। কারণ, স্বৈরাচারী সরকারকে তার ক্ষমতায় থাকা নিশ্চিত করার স্বার্থেই এটা করতে হয়। এমন পটভূমিতে স্বৈরাচার–পরবর্তী দেশে স্থিতিশীলতা আসার প্রশ্নে অনিশ্চয়তা থাকেই। এমনকি এমন কোনো দেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচনের পরও এই ঝুঁকি থেকে যায়। ‘আরব বসন্তের’ পরবর্তী সময়ে এটা দেখা গেছে তিউনিসিয়া ও মিসরে।

একটা নির্বাচনের দিকে এগিয়ে চলেছি আমরা। আশা করা যায়, একটা গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক সরকারটি গঠিত হবে। কিন্তু অপরাপর দেশের অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার দ্বন্দ্ব ও সংঘাত দেখলে এটা মনে হওয়ার যৌক্তিক কারণ আছে, নির্বাচন–পরবর্তী সময়েও বাংলাদেশের সামনে স্থিতিশীলতার চ্যালেঞ্জ থাকবে।

এমন পরিস্থিতিতেই বেগম খালেদা জিয়ার এক ভূমিকা থাকতে পারত অভিভাবক হিসেবে। নির্বাচনের আগে কিংবা নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে যেকোনো কঠোর দ্বন্দ্ব কিংবা সংঘাতময় পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলো এবং শক্তির অন্যান্য ভরকেন্দ্রের ওপরে তাঁর প্রভাব ব্যবহার করে তিনি এসব প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতেন। নিজেদের স্বার্থে এ কারণেই মনে হয়েছিল, তিনি আরও কিছু সময় থাকুন আমাদের সঙ্গে। কিন্তু সেটা হলো না।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁকে যখন সব মানুষ সম্মান জানাচ্ছেন, তাঁর কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার কথা বলছেন, তখন আমরা কামনা করি, বিএনপি ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল তাদের নিজেদের মধ্যকার বিতর্কের ক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়ার মতো অতটা অহিংসার পথ গ্রহণ করতে না পারলেও যেন তারা এমন পর্যায়ে চলে না যায়, যেটা সংঘাত উসকে দিয়ে দেশের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করে।

বেগম খালেদা জিয়াকে মূল্যায়নের জন্য আমরা যত বিশেষণ ব্যবহার করব, এর মধ্যে সবচেয়ে আগে আসবে সম্ভবত উদার, মধ্যপন্থী গণতন্ত্রের জন্য তাঁর আমৃত্যু সংগ্রাম। একটা অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও অগ্রযাত্রার সাক্ষী তিনি হতে পারলেন না, এটা কষ্টের।

কিন্তু রাজনীতির মাঠে তাঁর মতো মার্জিত, ভদ্র আচরণ আমরা যেন করি, যাতে গণতন্ত্রে উত্তরণের ঝুঁকি এড়িয়ে গণতন্ত্রকে সত্যিকার অর্থে বিকশিত করতে পারি আমরা। বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে গণতান্ত্রিকভাবে বিকশিত করতে চাইলে আমাদের অবশ্যই বর্তমান পৃথিবীর প্রবণতা, ডানপন্থী, পরিচয়বাদী, জনতুষ্টিবাদী রাজনীতির (যার প্রভাব বাড়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশেও) বিরুদ্ধে দাঁড়াতেই হবে।

এক অবিশ্বাস্য শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে শারীরিকভাবে বিদায় নিলেন বেগম খালেদা জিয়া; তাঁর জীবন, কর্ম বিদায় নেবে না কখনো। ঘোষিত স্থান ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া লোকে লোকারণ্য জানাজাস্থল (ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নিশ্চয়ই যেতে পারেননি আরও অসংখ্য মানুষ) দেখিয়ে দিয়েছে, মানুষ তাঁদের মনের কোথায় স্থান দিয়েছিলেন এই মানুষটিকে। বেগম খালেদা জিয়ার আদর্শ, শিক্ষা নিজেদের মধ্যে ধারণের মাধ্যমেই আমরা পারব তাঁর প্রতি সত্যিকার শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করতে।

জাহেদ উর রহমান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

খালেদা জিয়ার জানাজায় যোগ দিতে দলমত–নির্বিশেষে জনতার ঢল নামে
খালেদা জিয়ার জানাজায় যোগ দিতে দলমত–নির্বিশেষে জনতার ঢল নামে। ছবি: প্রথম আলো

শোকের জনসমুদ্র, খালেদা জিয়ার জানাজা

এ এক মহাকাব্যিক প্রস্থান। একটি কফিনের পাশে পুরো বাংলাদেশ। বিরল রাষ্ট্রীয় সম্মান। কোটি জনতার হৃদয়নিংড়ানো শ্রদ্ধা-ভালোবাসায় শেষ বিদায়। দেশের আপামর জনতার কান্নাভেজা শ্রদ্ধায় চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। তার শেষ বিদায়ের এই যাত্রায় শরিক হয়েছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের সরকারের প্রতিনিধি, ৩২টি দেশের কূটনীতিক।

দল-মত নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে বেগম জিয়ার জানাজা হয়ে ওঠে স্মরণকালের বৃহৎ সমাগম। শুধু দেশ নয়, মুসলিম বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জানাজায় পরিণত হয় এটি। বিশ্বের কোনো নারী রাজনীতিকের প্রতি মানুষের এমন ভালোবাসার ঘটনাও বিরল। যে মানিক মিয়া এভিনিউতে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি লাখ লাখ মানুষ শ্রদ্ধা জানিয়েছেন, তার জানাজায় অংশ নিয়েছেন সেখানেই ৪৪ বছর আগে তার স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের প্রতি এমন এক শ্রদ্ধা জানানো হয়েছিল। জিয়ার জানাজাও হয়েছিল ঐতিহাসিক সমাগম। রাজনৈতিক বোদ্ধারা বলছেন, জিয়ার জানাজার পর খালেদা জিয়ার জানাজাই দেশের ইতিহাসে বৃহৎ জানাজা। বেগম জিয়ার জানাজায় দেশের সব দল-মত ও পথের মানুষ মিলিত হয় মানিক মিয়া এভিনিউর মোহনায়। জানাজার ব্যাপ্তি জাতীয় সংসদের মাঠ, মানিক মিয়া এভিনিউ ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে। রাস্তা, অলি-গলিতে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের স্রোত।  

পুরো রাজধানী পরিণত হয় শোকের নগরীতে। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর ৪৩ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম আর ত্যাগের প্রতি মানুষের এই সম্মান রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন এক নজির তৈরি করেছে। ইতিহাসের বৃহত্তম জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় সমাহিত করা হয় বেগম খালেদা জিয়াকে।

এর আগে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের আইসিউতে ৩৭ দিন লড়াই করে ৩০শে ডিসেম্বর মঙ্গলবার ভোর ৬টায় না ফেরার দেশে চলে যান বেগম খালেদা জিয়া। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যুর খবর আলোর গতিতে ৫৬ হাজার বর্গমাইল ছাপিয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোটা দুনিয়ায়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা প্রকাশ করেন শোক। ফেসবুকের পাতা ভরে শোকের বার্তা। শোকে মুহ্যমান হয়ে পড়ে পুরো দেশ। রাতে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মরদেহ এভারকেয়ারের হিমঘরে রাখা হয়। সেখান থেকে সকাল সোয়া ৯টায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও কঠোর নিরাপত্তায় লাল-সবুজের পতাকার আদলের এম্বুলেন্সে করে আনা হয় গুলশানের বাসভবনে। স্বজনদের কান্নায় সেখানে এক শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়। মায়ের কফিনবাহী এম্বুলেন্সের পাশে বসে কোরআন তেলাওয়াত করেন বড় ছেলে তারেক রহমান। পাশে তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমান এবং ভ্রাতৃবধূ সৈয়দা শর্মিলা রহমান সিঁথি দোয়া-দরুদ পড়েন।

স্বজনদের দেখার জন্য দীর্ঘ দুই ঘণ্টা খালেদা জিয়ার মরদেহবাহী এম্বুলেন্স রাখা হয় গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসভবনের সামনে। বেলা ১১টার দিকে চোখে জলে বাসভবন থেকে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে শেষ বিদায় দেন পরিবারের সদস্যরা। সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব ও পুলিশের যৌথ বাহিনীর কয়েক স্তরের কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে খালেদা জিয়ার কফিনবাহী এম্বুলেন্স রওনা হয় মানিক মিয়া এভিনিউমুখী। এম্বুলেন্সের সামনে সিটে বসেন খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেএড এম জাহিদ হোসেন। কফিনবাহী এম্বুলেন্সের সঙ্গে বুলেট প্রুফ বিশেষ বাসে করে রওনা হন বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমান, স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে খালেদা জিয়ার কফিনবাহী এম্বুলেন্স পৌঁছে সংসদ ভবন এলাকায়। ততক্ষণে লোকারণ্য হয়ে পড়ে সংসদ ভবন, মানিক মিয়া এভিনিউ এলাকা। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্রোত বাড়তে থাকে। আশপাশের কয়েক কিলোমিটার মূল সড়কের দুই পাশে মানুষ, ফুটওভার ব্রিজে মানুষ, রাস্তার পাশের বিভিন্ন ভবনের ছাদে মানুষ, অলিগলি, ফুটওভার ব্রিজ, ফ্লাইওভার, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে জুড়ে শোকাহত মানুষ। কেউ স্লোগান দিচ্ছেন না, কেউ নির্দেশনা দিচ্ছেন না, তবু সবাই একইদিকে যাচ্ছে। এক নীরব শৃঙ্খলা। সুশৃঙ্খলা এসব মানুষের কারও হাতে শোকের কালো পতাকা, কারও বুকে কালো ব্যাজ ধারণ করেন। কফিন পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকাকালীন যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, সেসব বক্তব্য জানাজাস্থলে প্রচার করা হয়। সংসদ ভবন এলাকার ভেতরে নারীদের জন্য আলাদা জানাজার জায়গার ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে খালেদা জিয়ার পরিবারের নারী সদস্যরা অংশ নেন। বেলা ২টায় জানাজা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও মানুষের ভিড়ের কারণে মরদেহবাহী এম্বুলেন্স সংসদ ভবনের দক্ষিণপ্লাজায় আনতে এক ঘণ্টা সময় লেগে যায়। বেলা তিনটার কিছু আগে জানাজার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। জানাজার আগে খালেদা জিয়ার সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। এরপর তার বড় সন্তান ও বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে মায়ের জন্য দেশবাসীর কাছে দোয়া চান এবং ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। বুধবার বিকাল ৩টা ৩ মিনিটে শুরু হয় জানাজা। জানাজার নামাজ পড়ান জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি মোহাম্মদ আবদুল মালেক। জানাজায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বামপাশে দাঁড়ান বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ডানপাশে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, এরপর জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান এবং তারপরে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান দাঁড়ান। প্রধান উপদেষ্টার পাশাপাশি তার সরকারের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন, আসিফ নজরুল, আদিলুর রহমান, ফাওজুল কবির খান, আ ফ ম খালিদ হোসেন, আলী ইমাম মজুমদার, সি আর আবরার, কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহার, সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদার, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, সাবেক মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক প্রমুখ। জানাজা শেষে খালেদা জিয়ার কফিন বহন করে যারা এম্বুলেন্সে তুলেন তাদের মধ্যে মাওলানা মামুনুল হক ও মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারি, শায়খ আহমদুল্লাহকেও দেখা যায়।  

গুলশানের বাসভবন থেকে অশ্রুসিক্ত শেষ বিদায়: রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের হিমঘর থেকে বিএনপি’র চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মরদেহ নেয়া হয় গুলশানের বাসভবনে। সকাল ৯টা ১৫ মিনিটে লাল-সবুজের পতাকার রংয়ে মোড়ানো এম্বুলেন্সে করে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর মরদেহ আনা হয়। এম্বুলেন্স ঘিরে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কয়েক স্তরের নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেন। খালেদা জিয়াকে শেষবারের মতো দেখানোর জন্য স্বজনরা আগে থেকেই গুলশানের ১৯৬ নম্বর বাসভবনে জড়ো হন। লাশবাহী এম্বুলেন্সটি প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গেই অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। অনেকে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেনি। কেউ কেউ দু’হাত তুলে মোনাজাত করেন। আবার কোরআন তেলাওয়াত করেন। স্বজন, আর নেতাকর্মীদের চোখের পানিতে গুলশানের ১৯৬ বাড়ির আশপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন- বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সিনিয়র নেতৃবৃন্দ।

সবাই যখন নীরবে চোখের পানি ফেলে দেশের আপসহীন নেত্রীকে বিদায় জানাচ্ছেন, ঠিক তখনই এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য চোখে পড়ে। অশ্রুসিক্ত শেষ বিদায়ের মুহূর্তে মায়ের কফিনের এক পাশে বসে একাগ্রচিত্তে কোরআন তেলাওয়াত করতে থাকেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পুরো সময় জুড়ে তারেক রহমান ছিলেন, ধীর স্থির।  এ সময়  তারেক রহমানের পাশে মেয়ে জাইমা রহমান, স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানকে দেখা যায়। তারেক রহমানের এই নীরব প্রার্থনা অনেকের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। দলীয় নেতাকর্মী, আত্মীয়স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীরা নীরবে দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানান দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে।  বেলা ১১টা ৫ মিনিটে বাসভবন থেকে জানাজার উদ্দেশ্যে মানিক মিয়া এভিনিউয়ের পথে রওনা হয় লাশবাহী গাড়িটি। গাড়ির পেছনে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ লেখা সম্বলিত বাসে ওঠেন তারেক রহমান, তার স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, কন্যা জাইমা রহমানসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। শোক, ভালোবাসা আর স্মৃতির ভার বুকে নিয়ে এগিয়ে চলে শেষ যাত্রা এক অধ্যায়ের সমাপ্তি আর ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে।
কফিন বহন করলেন তিন আলেমেদ্বীন: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কফিন বহন করেছেন আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ, আলোচিত ইসলামী বক্তা মাওলানা মিজানুর রহমান আজহারী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক। গতকাল রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে জানাজা শেষে বেগম জিয়ার স্বজনদের সঙ্গে এই তিন আলেম তার কফিন বহন করেন।
এদিকে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল অংশগ্রহণ করে।

অংশগ্রহণকারী অন্য সদস্যরা হলেন- দলটির নায়েবে আমীর মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এটিএম মা’ছুম, মাওলানা আবদুল হালিম ও এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমীর নূরুল ইসলাম বুলবুল, ঢাকা মহানগর উত্তরের আমীর মো. সেলিম উদ্দিন, ঢাকা মহানগর উত্তরের নায়েবে আমীর আবদুর রহমান মুসা, দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ঢাকা মহানগর উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি ডা. ফখরুদ্দিন মানিক, দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেন প্রমুখ।  

স্মরণকালের বৃহত্তম জানাজা: বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা বাংলাদেশের ইতিহাসে স্মরণকালের বৃহত্তম জানাজায় পরিণত হয়। সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর জানাজায় মানুষের সমাগম হবে আগেই ধারণা করা হয়েছিল। জানাজার স্থল থেকে আশপাশের কয়েক কিলোমিটার সড়ক, অলিগলিতে মানুষের ঢল ছড়িয়ে পড়ে। লোকসমাগম মানিক মিয়া এভিনিউ ছাপিয়ে দক্ষিণে ফার্মগেট, কাওরান বাজার পার হয়ে বাংলামোটর, শাহবাগ, ওদিকে ধানমণ্ডির ২৭ নম্বর, কলাবাগান পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। উত্তরে চীনমৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র পার হয়ে আগারগাঁও, শেওড়াপাড়া, পশ্চিমে আসাদগেট, লালমাটিয়া পার হয়ে কল্যাণপুর পর্যন্ত লোকারণ্য হয়ে পড়ে। পূর্বদিকে বিজয় সরণি ফ্লাইওভার, জাহাঙ্গীরগেট, তেজগাঁও রেলগেট পর্যন্ত অবস্থান নেয় মানুষ। জায়গা না পেয়ে মেট্রোরেল স্টেশন, ফ্লাইওভার, আশপাশের বাসা-বাড়ির ছাদ, বারান্দা, অলিগলি থেকেও জানাজায় অংশ নিতে দেখা যায় অনেককে। কোথাও তিল ধারণের জায়গা ছিল না। সরজমিন দেখা যায়, খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ভোর থেকেই বানের স্রোতের মতো মানুষ মানিক মিয়া এভিনিউমুখী আসতে থাকে। চারপাশের প্রধান সড়ক ও অলিগলি দিয়ে শোকের মিছিল শুরু হয়। জানাজার জন্য মানিক মিয়া এভিনিউর চারপাশের প্রধান সড়কে যান চলাচল আগে থেকেই বন্ধ করে দেয়ায় দীর্ঘপথ পায়ে হেঁটে মানুষ উপস্থিত হন।  বেলা ১২টার দিকেই মানিক মিয়া এভিনিউ সড়ক কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। পরে আশপাশের আসাদগেট, ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর, ধানমণ্ডি ৩২, মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড, লালমাটিয়া,  সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল রোড, শিশুমেলা, আগারগাঁও সড়ক ও শ্যামলী পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য হয়। গণভনের প্রধান ফটক থেকে শিশুমেলা হয়ে কল্যাণপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত রাস্তার দুপাশে লাখ লাখ মানুষ বেগম জিয়ার জানাজায় অংশ নেয়। এ ছাড়া আড়ং থেকে মিনাবাজার হয়ে ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর বাংলাদেশ চক্ষু হাসপাতাল পর্যন্ত সড়কে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে জানাজা নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। মানিক মিয়া এভিনিউ সড়কের শেষ মাথায় আড়ংয়ের পেছন পাশে লালমাটিয়ার অলিগলিতে হাজার হাজার মানুষ দাঁড়িয়ে খালেদা জিয়ার জানাজা আদায় করেন। জানাজায় উপস্থিত শোকাহত লোকজন খালেদা জিয়ার ত্যাগ নিয়ে নানা মন্তব্য করেন। তারা বলেন, দেশের মানুষের অধিকারের জন্য গণতন্ত্রের জন্য জীবনে প্রায় সব রকম মানবিক কষ্টই ভোগ করে গেছেন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হাতে দুই শিশু সন্তানসহ বন্দি হন,  ১৯৭৫ সালে স্বামীর সঙ্গে গৃহবন্দি হন, ১৯৮১ সালে তরুণী বয়সে হারান স্বামী জিয়াউর রহমানকে,  এরপর দীর্ঘ ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনে ৩০  বছর দুই দু’টি স্বৈরাচারের নির্যাতন-নিপীড়ন, শেষ ১৮ বছর পরিবারহীন নিঃসঙ্গতা, গুলশান কার্যালয়ে গৃহবন্দি অবস্থায় ছোট সন্তানকে হারানোর বেদনা, বড় সন্তানকে পঙ্গু করে লন্ডনে নির্বাসনে পাঠানোর যন্ত্রণা, বিনা অপরাধে পরিত্যক্ত কারাগারে দুই বছর কাটানোর যন্ত্রণা হাসিমুখে সহ্য করেন। সহজ পথ এড়িয়ে তিনি স্বেচ্ছায় এই কঠিন পথ বেছে নিয়েছিলেন শুধু দেশবাসীর মুক্তির জন্য।

স্মরণকালের অন্যতম বৃহৎ জানাজা শেষে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বিকাল সাড়ে ৪টায় স্বামীর কবরের পূর্বপাশে তাকে সমাহিত করা হয়। এ সময় তার বড় ছেলে ও বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্য, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। দাফন শেষে খালেদা জিয়ার কবরে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তিন বাহিনীর সদস্যরা। এরপর বড় ছেলে তারেক রহমানও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এরপর বুলেটপ্রুফ বাসে করে  তারেক রহমানসহ পরিবারের সদস্যরা গুলশানের বাসভবনে ফিরেন।

বিভিন্ন দেশে ও জেলায় গায়েবানা জানাজা: এদিকে ঢাকার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় বেগম খালেদা জিয়ার গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিরাও সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর গায়েবানা জানাজা পড়েন। এদিকে চীনের শেনজেন শহরের কেন্দ্রীয় মসজিদে বুধবার রাতে খালেদা জিয়ার গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহত্তর চায়না বিএনপি’র আয়োজনে স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীসহ দলমত নির্বিশেষে চীন প্রবাসী বাংলাদেশিরা এতে অংশগ্রহণ করে। ওদিকে বুধবার বাদ আসর মালদ্বীপের মালে শহরে খালেদা জিয়ার গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রবাসী বাংলাদেশিরা অংশ নেন।

জানাজায় অসুস্থ হয়ে একজনের মৃত্যু:
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেয়া একজন হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। বুধবার দুপুরে রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউয়ে খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশগ্রহণের পরপরই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এরপর তাকে ধরাধরি করে হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। নিহতের নাম মো. নীরব হোসেন (৫৬)। পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার ডালিমিয়া এলাকার মতিউর রহমানের ছেলে তিনি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ- ডিএমপি’র শেরেবাংলা নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, নীরব নামের ওই ব্যক্তি বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশগ্রহণ করেন। তিনি মানিক মিয়া এভিনিউয়ের পশ্চিম পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রচুর ভিড়ে ও মানুষের চাপে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। এরপর তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়। ওসি বলেন, আমরা চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছি- গরম ও হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

Wednesday, December 31, 2025

ভারতনীতি: সর্বদা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন খালেদা জিয়া

এনডিটিভির রিপোর্টঃ ভারত নীতি নিয়ে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং  শেখ হাসিনার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। হাসিনা ভারতকে বন্ধুসুলভ হিসেবে দেখেন। খালেদা জিয়া তার প্রাথমিক বছরগুলোতে মোটামুটি সতর্ক। কখনো কখনো বিরোধী অবস্থান বজায় রাখেন। সর্বদা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এর উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় ভারতের সঙ্গে স্থলপথ সংযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থার প্রতি তার বিরোধিতা। তিনি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলনেতা হিসেবে ১৯৯৬ থেকে ২০১৪ পর্যন্ত দুইবার এই বিরোধিতা প্রকাশ করেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া ভারতের জন্য উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোতে বাংলাদেশী ভূখণ্ড ব্যবহার করার অনুমতি দিতে অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন এটি দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন। তিনি ভারতের ট্রাকগুলোর বাংলাদেশের সড়ক ব্যবহারকে ‘দাসত্বের’ সমতুল্য বলে উল্লেখ করেন। তিনি ১৯৭২ সালের ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব চুক্তির নবায়নের বিরোধিতা করেন। অনেকেই এই চুক্তিকে সামরিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তবে তিনি বলেন, তার দেশকে এই চুক্তি করতে ‘বাধ্য করা হয়েছে’। খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পর এক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছে অনলাইন এনডিটিভি। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ অসুস্থতার পর মঙ্গলবার ভোরে মৃত্যুবরণ করেছেন। তিনি ৮০ বছর বয়সে হৃদরোগ ও ফুসফুস সংক্রান্ত সংক্রমণ, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ছিলেন। তাকে কৃতিত্ব দেয়া হয় দেশের প্রেসিডেন্সিয়াল ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের জন্য। গত তিন দশকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা, এই দুই নারী প্রধান ভূমিকা পালন করেছেন।

এনডিটিভি আরও লিখেছে, বিএনপিকে ‘বাংলাদেশের স্বার্থের রক্ষক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে খালেদা তার নীতিগুলোকে ‘ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষা’ হিসেবে সাজিয়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৮ সালে ঢাকায় এক সভায়, যখন হাসিনা প্রধানমন্ত্রী এবং খালেদা বিরোধী দলনেতা ছিলেন, তখন তিনি ভারতের জন্য শুল্কমুক্ত সংযোগ প্রদানের কারণে হাসিনাকে কঠোরভাবে সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশকে ভারতের রাজ্য বানানোর চেষ্টা প্রতিরোধ করব।’ তবে খালেদার লক্ষ্য কেবল সংযোগের অধিকার প্রত্যাখ্যান করা ছিল না, বরং তার দেশের জন্য বাস্তব লাভ নিশ্চিত করা ছিল। ২০১৪ সালে ঢাকার একটি পত্রিকা তাকে উদ্ধৃত করে বলেছে যে, সংযোগ অনুমতি অবশ্যই তিস্তা জল চুক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
ফারাক্কা ব্যারেজ নিয়ে তিনি সমালোচনা করেছেন। ১৯৭৫ থেকে কার্যকর এই চুক্তি। গঙ্গা থেকে হুগলির দিকে পানি প্রবাহের জন্য ব্যবহৃত হয় এই চুক্তি। সমালোচনায় তিনি বলেন, এটি বাংলাদেশকে গঙ্গার পানি থেকে বঞ্চিত করছে। ২০০৭ সালে তিনি ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন যে তারা বাঁধ খুলে দিয়ে দেশের বন্যা পরিস্থিতি খারাপ করেছে। সংযোগ ও অবকাঠামোর বাইরে প্রতিকূল অবস্থান ছিল তার কৌশলগত নীতির অংশ। ২০০২ সালে তিনি চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি সম্পন্ন করেন এবং ভারতের প্রতি উদাসীনতা দেখান। চীনের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ঢাকার প্রধান সরবরাহকারী হয় ট্যাঙ্ক, ফ্রিগেট এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম।
ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল সরাসরি কৌশলগত। বিশেষ করে চীনের সঙ্গে অস্ত্র চুক্তি এবং দিল্লি কূটনৈতিক চাপ বৃদ্ধি করে, বিএনপি সরকারের উপর বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গি সংগঠন আশ্রয় দেয়ার অভিযোগ আনে ভারত। খালেদার ভারতবিরোধী অবস্থান ছিল বাস্তবমুখী। উদাহরণ হিসেবে ১৯৯২ সালের তিন বিঘা করিডোর লিজের কথা বলা যায়।  এর ফলে ঢাকাকে দহগ্রাম-আঙরপোতা এলাকায় স্থায়ী অ্যাক্সেস দেয়, যা ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে ২০০ মিটার গভীরে অবস্থিত। ২০০৬ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভারতের সঙ্গে ব্যবসায়িক চুক্তি এবং নতুন মাদক তস্কর বিরোধী চুক্তি স্বাক্ষরও তার বাস্তবমুখী নীতি প্রমাণ করে। ২০১২ সালের দিল্লি সফরের পর ভারত সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয়। তিনি ভারত থেকে বাংলাদেশে জঙ্গি সংগঠন বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দেন। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ঢাকায় সফরে এসে খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
যাইহোক, চাপ পুরোপুরি শেষ হয়নি। ২০১৬-২০২৪ সালের মধ্যে তার ভারতবিরোধী ভাষণ, সীমান্ত হত্যা এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সমালোচনা, খালেদার অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। আগস্ট ২০২৪-এর পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়, যখন শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন এবং বিএনপি সমান ও সম্মানজনক সম্পর্কের জন্য ইঙ্গিত দেয়। যখন তার স্বাস্থ্য অবনতি হয়, তখন প্রধানমন্ত্রী মোদী টুইটে লিখেছেন, ‘বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের খবর জেনে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।’ তার মৃত্যুর পর তিনি লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক সবসময় স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমি ২০১৫ সালে ঢাকায় তার সঙ্গে আমার উষ্ণ সাক্ষাৎ স্মরণ করি।’

mzamin

লড়াকু এক যোদ্ধার বিদায়

না ফেরার দেশে গণতন্ত্রকামী মানুষের আশার বাতিঘর বেগম খালেদা জিয়া। থেমে গেল দীর্ঘ ৪৩ বছরের আপসহীন, সংগ্রামী, লড়াকু এক রাজনৈতিক জীবন। জাতি হারালো রাজনীতির এক নির্ভরযোগ্য অভিভাবক। মানুষ আর গণতন্ত্রের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে বেগম খালেদা জিয়া হয়ে উঠেছিলেন গণমানুষের এক বিশ্বস্ত ঠিকানা। হয়ে উঠেছিলেন গণমুখী রাজনীতির উজ্জ্বল এক নক্ষত্র, গণতন্ত্র ও অধিকার রক্ষায় এক লড়াকু সৈনিক। লাজুক গৃহবধূ থেকে রাজনীতির ময়দানে পা রাখা বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের প্রশ্নে জীবনে একদিনের জন্যও আপস করেননি। ফ্যাসিবাদ, স্বৈরশাসনের সামনে এক মুহূর্তের জন্য হার মানেননি। প্রতিটি গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে তিনি ছিলেন সামনের সারির লড়াকু এক যোদ্ধা। নির্বাচনী লড়াইয়ে যার কোনো পরাজয় নেই। প্রতিপক্ষের হিংসা, নির্যাতন, রাজনৈতিক আঘাতের জবাব তিনি দিয়েছেন শালীন ও রাজনীতির ভাষায়। হিংসার জবাব দিয়েছেন শান্তির বলিষ্ঠ বার্তায়।

দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে তিনি মুখ উজ্জ্বল করেছিলেন দেশের নারী সমাজের। নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করে হয়ে উঠেছিলেন বিশ্বের রোলমডেল এক সরকার প্রধান। ৩০শে ডিসেম্বর শীতের কনকনে ভোরে দেশবাসীকে কাঁদিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া পাড়ি জমিয়েছেন অনন্তের পথে। তার এই মহা প্রয়াণে দেশ হারিয়েছে এক মহীয়সী নক্ষত্র, যার আলোয় আলোকিত ছিল গণতন্ত্রকামী এক প্রজন্ম। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে দেশি-বিদেশি চিকিৎসক-কর্মীদের ৩৭ দিনের টানা চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে মঙ্গলবার ভোর ৬টায় বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন। (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। বেগম খালেদা জিয়ার অন্তিম মুহূর্তে তার বড় ছেলে তারেক রহমান, পুত্রবধূ জুবাইদা রহমান, নাতনি জাইমা রহমান, খালেদা জিয়ার আরেক পুত্রবধূ সৈয়দা শর্মিলা রহমানসহ স্বজনরা এভারকেয়ার হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন।

রাজনীতির এই অভিভাবককে হারিয়ে শোকে মুহ্যমান দেশ। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বিশ্বনেতারা। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের পক্ষ থেকে গভীর শোক প্রকাশ করা হয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। আজ বুধবার ঘোষণা করা হয়েছে সাধারণ ছুটি।

মহিয়সী এই নারীর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন প্রেসিডেন্ট মো. সাহাবুদ্দিন। শোক প্রকাশ করে দেশবাসীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

বেগম খালেদা জিয়ার দাফন প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হবে রাষ্ট্রীয় সম্মানে। বেলা দুইটায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া এভিনিউতে বিএনপি চেয়ারপারসনের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এরপর রাষ্ট্রীয় সম্মানে সংসদ ভবনের উত্তর পাশের জিয়া উদ্যানে প্রয়াত স্বামী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে সমাহিত হবেন জাতীয় এই অভিভাবক। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকেই তার জানাজায় অংশ নিতে সাধারণ মানুষ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসতে শুরু করেন। জানাজা ও শেষ বিদায়ে অংশ নিতে ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ বিভিন্ন দেশের সরকারি প্রতিনিধিরা আসছেন বলে গতকালই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। দলীয় চেয়ারপারসনের মৃত্যুতে সাত দিনের শোক ঘোষণা করেছে বিএনপি। দলের গুলশানের কার্যালয়ে খোলা হয়েছে শোক বই। গতকালই শোক বইতে সই করেছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। শোক বইতে সই করেন ২৮টি দেশের কূটনীতিক। আজ এবং আগামীকালও এই শোক বইতে স্বাক্ষর করা যাবে।

বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দল। দরদি এই রাজনীতিকের প্রয়াণে শোকে মুহ্যমান দেশের সব শ্রেণি-পেশা, ধর্ম-বর্ণের মানুষ। শোকগ্রস্ত নেতাকর্মীরা প্রিয় নেত্রীর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকেই ছুটে যান এভারকেয়ার হাসপাতালে, দলের গুলশান ও নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে।

দলের সমর্থক, সাধারণ মানুষের ভিড়ে এই তিনটি স্থান পরিণত হয় শোক, নীরবতা এবং আবেগের এক প্রাঙ্গণে। কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে, কেউ চোখ মুছছেন, কেউ আবার দুই হাত তুলে দোয়া, মোনাজাত করেছেন আপসহীন নেত্রীর মাগফেরাত কামনায়।

গতকাল সকালে এভারকেয়ার হাসপাতালে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, এই সংবাদটি নিয়ে আপনাদের সামনে দাঁড়াতে হবে, এটা আমরা কখনো ভাবিনি। আমরা এবারো আশা করছিলাম, ঠিক আগের মতোই আবারো তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। আমরা ভারাক্রান্ত, ইতিমধ্যে আপনারা শুনেছেন মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদার ঘোষণা করেন মঙ্গলবার ভোর ৬টায় আমাদের গণতন্ত্রের মা, আমাদের জাতির অভিভাবক আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছেন। এই শোক, এই ক্ষতি- এটা অস্বাভাবিক, অপূরণীয়। এই জাতি কোনোদিন পূরণ করতে পারবে না।

মির্জা ফখরুল বলেন, যে নেত্রী তার সারাটা জীবন জনগণের অধিকারের জন্য, কল্যাণের জন্য, তার সমগ্র জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন, সেই নেত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া আমাদের মাঝে নেই। এটা আমরা যারা তার সহকর্মী এবং রাজনৈতিক কর্মী, আমরা এটা ভাবতে পারি না। বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হলো। শুধু তাই নয়, গণতান্ত্রিক পৃথিবীর এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও একটা বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হলো।

এরআগে খালেদা জিয়ার জন্য গঠিত মেডিকেল বোর্ডের প্রধান অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদার আনুষ্ঠানিকভাবে খালেদা জিয়া ভোর ৬টায় আইসিইউতে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বলে জানান। ব্রিফিংয়ের সময়ে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস, অধ্যাপক এজেডএম জাহিদ হোসেনসহ মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা ছিলেন। বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর পাওয়ার পরই উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠক ডাকেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বৈঠকে বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। বৈঠকে ৩ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ও ১ দিনের সাধারণ ছুটির সিদ্ধান্ত হয়। সরকারি এই সিদ্ধান্ত জানাতে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন প্রধান উপদেষ্টা। পরে দুপুরে বিএনপি’র জাতীয় স্থায়ী কমিটি বৈঠকে বসে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ও দাফন এবং দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে।

এভারকেয়ার থেকে ফিরোজায় যাবে খালেদা জিয়ার মরদেহ: গত রাতে এভারকেয়ার হাসপাতালেই ছিল বিএনপি চেয়ারপারসনের মরদেহ। আজ হাসপাতাল থেকে মরদেহ গুলশানের বাসা ফিরোজায় নেয়া হবে। গতকাল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বেগম খালেদা জিয়ার নামাজে জানাজা আজ বাদ জোহর জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতাল থেকে লাশবাহী গাড়ি এভারকেয়ার হাসপাতাল-৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে-কুড়িল ফ্লাইওভার-নৌ সদর দপ্তর হয়ে বাসভবন ফিরোজা, গুলশান-২-কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ-এয়ারপোর্ট রোড-মহাখালী ফ্লাইওভার-জাহাঙ্গীর গেট-বিজয় সরণি-উড়োজাহাজ ক্রসিং হয়ে বামে মোড় নিয়ে জাতীয় সংসদ ভবনের ৬ নম্বর গেট দিয়ে দক্ষিণ প্লাজায় যাবে।

চোখে অশ্রু, হাসপাতালের ফটকে ভিড়: বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর খবর পেয়ে হাসপাতালে ছুটে যান হাজারো নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের চোখেমুখে ছিল গভীর শোকের ছায়া। কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে, কেউ চোখ মুছছিলেন, কেউ আবার দুই হাত তুলে করছিলেন দোয়া ও মোনাজাত। ভিড়ের মধ্যে কোথাও কান্নার শব্দ, কোথাও দীর্ঘশ্বাস-সব মিলিয়ে এক  শোকাবহ পরিবেশ তৈরি হয়।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতাল চত্বর ও সংলগ্ন সড়কে মানুষের চাপ বাড়তে থাকে। ভিড় সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হিমশিম খেতে হয়। ভিড়ের ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক কর্মী স্মৃতি চারণা করছিলেন। কেউ আন্দোলনের দিনের কথা বলছিলেন, কেউ কারাবন্দি অবস্থায় খালেদা জিয়ার দৃঢ় অবস্থানের কথা স্মরণ করছিলেন।

শোকে আচ্ছন্ন বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়: খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোকে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন গুলশানে তার কার্যালয়ের কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তার মৃত্যুর সংবাদ আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণার পরপরই দলীয় পতাকা অর্ধনমিত এবং কালো পতাকা উত্তোলন করা হয় কার্যালয়ে। সেখানে ভিড় করেন দলের নেতাকর্মীরা। চেয়ারপারসনের মৃত্যুর খবরে কার্যালয়ের সামনে জড়ো হওয়া বিএনপি’র নেতাকর্মীদের মধ্যে অনেকেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন।

কান্নার রোল নয়াপল্টনে, কোরআন খতম: খালেদা জিয়ার মৃত্যুর সংবাদে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জড়ো হতে দেখা গেছে নেতাকর্মীদের। প্রিয় নেত্রীর মৃত্যুতে কান্নার রোল পড়ে তাদের মধ্যে। অনেককে হাউমাউ করে কাঁদতে দেখা গেছে। কার্যালয়ে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলালসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

ওদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে গেলে কোনো ব্যাগ বা ভারী সামগ্রী সঙ্গে নেয়া যাবে না বলে জানানো হয়েছে। জানাজা ও দাফনের সময়সূচি জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের এক বার্তায় এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়, আজ দুপুর ২টায় জাতীয় সংসদ ভবন মাঠ ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে খালেদা জিয়ার জানাজা হবে। এরপর আনুমানিক বেলা সাড়ে ৩টায় শেরেবাংলা নগরে  জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হবে। জানাজার সময় কোনো ব্যাগ বা ভারী সামগ্রী বহন করা যাবে না। দাফনের কার্যক্রম রাষ্ট্রীয়ভাবে হবে বলে সেখানে সাধারণ জনগণের প্রবেশাধিকার থাকবে না।

অন্যদিকে গতকাল দুপুর সাড়ে ১২টায় গুলশানের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এতে স্থায়ী কমিটির সদস্যরা অংশ নেন। দুই ঘণ্টাব্যাপী স্থায়ী কমিটির এ বৈঠক হয়। বৈঠক শেষে কার্যালয়ে সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, খালেদা জিয়ার জানাজা বুধবার বেলা ২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজা ও মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে তাকে তার স্বামী সাবেক  প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরের পাশে দাফন করা হবে। তিনি জানান, খালেদা জিয়ার জানাজা পড়াবেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব। পুরো জানাজা কার্যক্রমের সঞ্চালনা করবেন বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। সবাই অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে জানাজায় অংশগ্রহণ করবেন। তার দাফনে অংশ নেবেন।

গুলশান কার্যালয়ে শোকবই খোলা হয়েছে:
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে গুলশানের চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে শোকবই খোলা হয়েছে। গতকাল বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত শোকবইতে স্বাক্ষর করা হয়।  এ ছাড়া আজ বিকাল ৪টা থেকে রাত ৯টা এবং আগামীকাল সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শোকবইতে স্বাক্ষর করা যাবে। শোকবইয়ে প্রথম স্বাক্ষর করেন চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। এ ছাড়া ভারত, পাকিস্তান, জার্মান, ইরান, ওমান, আলজেরিয়া, কাতার, ফ্রান্স, নরওয়ে, সুইডেন, ব্রুনাই, প্যালেস্টাইন, স্পেন, মরক্কো, ভুটান, ব্রাজিলসহ ২৮টি দেশের কূটনৈতিক শোকবইয়ে স্বাক্ষর করেন। এ ছাড়াও আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান, সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সারওয়ার ফারুকী, জামায়াতের নাযেবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, গণসংহতি আন্দোলন প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি, মেজর জেনারেল অব. মনিরুজ্জামান, মেজর জেনারেল অব. এ টি এম ওয়াহাব, কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহারসহ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও বিশিষ্টজনরা বইয়ে স্বাক্ষর করেন।

শেষ কয়েকদিন খালেদা জিয়াকে যে চিকিৎসা করা হয়েছে: ছেলে তারেক রহমানের দেশে ফেরার খবরে অনেকটা স্বস্তিবোধ করেছিলেন অসুস্থ খালেদা জিয়া। তারেক রহমানের দেশে ফেরার খবরটি বিএনপি চেয়ারপারসনকে জানান তার পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান ও ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন। ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) থেকেই ছেলের দেশের ফেরার খবর পান খালেদা জিয়া। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি সিসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ সময়ে তার শরীরে গুরুতর ইনফেকশনের কারণে উন্নত অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিফাঙ্গাল চিকিৎসা দেয়া হয়েছে।

বিএনপি’র ৭ দিনের শোক কর্মসূচি: বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ৭ দিনব্যাপী শোক ঘোষণা করেছে বিএনপি। গতকাল বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তি দেয়া এ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। এতে বলা হয়, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে ৩০শে ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে আগামী ১লা জানুয়ারি ২০২৬ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। ঘোষিত রাষ্ট্রীয় শোকের এই ৩ দিন দেশব্যাপী সকল দলীয় কার্যালয়ে জাতীয় ও দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ এবং কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে। কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশের সকল দলীয় কার্যালয়ে ৭ দিনব্যাপী কালো পতাকা উত্তোলন এবং দলীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ। দলের সকল স্তরের নেতাকর্মীরা কালোব্যাজ ধারণ করবে। প্রতিটি দলীয় কার্যালয়ে খালেদা জিয়ার জন্য ৭ দিনব্যাপী কোরআন খতম ও দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। কেন্দ্রীয়ভাবে গুলশানস্থ বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে ও নয়াপল্টনস্থ বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এবং জেলা পর্যায়ে দলীয় কার্যালয়ে শোকবই খোলা হবে।

সোমবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে খালেদা জিয়াকে দেখতে হাসপাতালে যান বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সকাল, বিকাল এবং রাতে হাসপাতালে যান তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান। এ ছাড়াও হাসপাতালে যান খালেদা জিয়ার বড় বোন সেলিনা ইসলাম, ছোট ভাই শামীম এস্কান্দার, তারেক রহমানের মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান, আরাফাত রহমান কোকোর মেয়ে জাহিয়া রহমান এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাত ২টায় হাসপাতাল থেকে বের হন তারেক রহমান। কিছু সময়ের বিরতি দিয়ে তিনি আবার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে হাসপাতালে যান। বেগম খালেদা জিয়ার অন্তিম সময়ে তারা হাসপাতালেই ছিলেন। 

mzamin

Tuesday, December 30, 2025

শেখ হাসিনার আক্রোশে খালেদা জিয়া: বাড়ি থেকে উচ্ছেদ, বালুর ট্রাকের বেষ্টনী, কারাবন্দী

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার প্রতি শেখ হাসিনার আচরণ রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকে অনেকটাই ব্যক্তিগত আক্রোশে রূপ নিয়েছিল, যার জেরে সেনানিবাসের বাড়িছাড়া হতে হয় খালেদা জিয়াকে, বালুর ট্রাকে অবরুদ্ধ থাকতে হয় বাড়িতে, শেষে কারাগারেও যেতে হয়।
২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর গুলশানে নিজের বাসা ফিরোজায় অবরুদ্ধ করা হয়েছিল খালেদা জিয়াকে
২০১৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর গুলশানে নিজের বাসা ফিরোজায় অবরুদ্ধ করা হয়েছিল খালেদা জিয়াকে। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

বিদায় খালেদা জিয়া: সব চেষ্টা ব্যর্থ, চলে গেলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী

প্রথম আলোঃ বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আর নেই (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ আজ মঙ্গলবার সকাল সোয়া ৭টার দিকে প্রথম আলোকে জানান, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁকে জানিয়েছেন,  ‘আম্মা আর নেই।’

এর আগে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন প্রথম আলোকে জানান, খালেদা জিয়া সকাল সাড়ে ৬টার সময় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন। তাঁর পাশে তারেক রহমান ও পরিবারের অন্য সদস্যরা ছিলেন।  

খালেদা জিয়ার জানাজা আগামীকাল বুধবার রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে হতে পারে বলে জানিয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে খালেদা জিয়া  ‘আপসহীন নেত্রী’ উপাধি পেয়েছিলেন । চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে জীবনের পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

রাজনীতিকদের জীবনে উত্থান-পতন থাকে। মামলা–মোকদ্দমা, গ্রেপ্তার, কারাবাস, নির্যাতন, প্রতিপক্ষের আক্রমণ—এসবও তাঁদের জীবনে অভাবনীয় নয়। খালেদা জিয়াও চরম পর্যায়ের এমন নির্যাতন সহ্য করেছেন। সহ্য করেছেন স্বামী–সন্তান হারানোর গভীর শোকসন্তাপ, আর দীর্ঘ রোগযন্ত্রণা।

রাজনৈতিক জীবনে মতাদর্শিক দ্বন্দ্ব–সংঘাত ছাড়াও প্রতিপক্ষের ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ, লাঞ্ছনা ও নিষ্ঠুরতার শিকার হয়েছেন খালেদা জিয়া।

শৈশব

খালেদা জিয়ার জন্ম ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট, দিনাজপুরে ( তবে এই তারিখ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে মতপার্থক্য রয়েছে)। তাঁর বাবা ইস্কান্দার মজুমদারের বাড়ি ফেনী জেলার পরশুরামের শ্রীপুর গ্রামে। মা তৈয়বা বেগমের জন্ম পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ীতে। তাঁদের তিন মেয়ে ও দুই ছেলের মধ্যে খালেদা জিয়া তৃতীয়। জন্মের পর তাঁর নাম রাখা হয়েছিল ‘খালেদা খানম’। অত্যন্ত সুন্দর ছিলেন বলে বাড়ির লোকেরা তাঁকে ‘পুতুল’ বলে ডাকতেন। সেটিই তাঁর ডাকনাম হয়ে যায়। প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন সেন্ট যোসেফ কনভেন্টে। পরে দিনাজপুর সরকারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন ও দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েটে (উচ্চমাধ্যমিক) উত্তীর্ণ হন।

ইস্কান্দার মজুমদার ধার্মিক ও উদার মানসিকতাসম্পন্ন ছিলেন। তাঁর বাড়িতে সংস্কৃতিচর্চার পরিবেশও ছিল। বড় মেয়ে খুরশিদ জাহান হক গান এবং খালেদা খানম নৃত্যের চর্চা করতেন। বাড়িতে আরবি শিক্ষকের পাশাপাশি সংগীত-নৃত্যের শিক্ষকও ছিলেন। শৈশবে দিনাজপুরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, এমনকি দিনাজপুরের বাইরেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনি নৃত্য পরিবেশন করে সমাদৃত হয়েছেন। মা তৈয়বা বেগমের রান্নার হাত ছিল চমৎকার। মেয়েদের তিনি রান্না শিখিয়েছেন। মায়ের কাছ থেকে খালেদা খানমই তিন বোনের মধ্যে রান্নার গুণ ভালোভাবে রপ্ত করেছিলেন।

খালেদা খানমের বিভিন্ন জীবনী গ্রন্থে বলা হয়েছে, শৈশব থেকেই তিনি পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকতে পছন্দ করতেন। ফুলের প্রতি নিবিড় অনুরাগ ছিল তাঁর। নিজের ঘর পরিচ্ছন্ন করে ফুল দিয়ে সাজিয়ে রাখতেন। পরবর্তী জীবনেও তিনি ফুলের প্রতি এই অনুরাগ, পরিচ্ছন্নতা ও পরিপাটি থাকার অভ্যাস বজায় রেখেছিলেন।

বিবাহ

সেনাবাহিনীর তরুণ ও চৌকস কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট দিনাজপুরের মুদিপাড়ার পৈতৃক বাড়িতে খালেদা খানমের বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিয়ের প্রসঙ্গে তাঁর এক জীবনীকার লিখেছেন (প্রাগুক্ত) ঘটক জিয়াউর রহমানকে বলেছিলেন,  ‘“আপনি যদি তাঁকে বিয়ে করতে রাজি হন, তাহলে আপনার বাড়িতে বিজলিবাতির দরকার হবে না। পাত্রী এত রূপসী যে তাঁর রূপের ছটায় সব অন্ধকার দূর হয়ে যাবে।” জিয়া হাসলেন ও বিয়ে করতে সম্মত হলেন।’ বিয়ের পর থেকে তিনি ‘বেগম খালেদা জিয়া’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন।

জিয়া-খালেদা দম্পতির দুই ছেলে। জ্যেষ্ঠ তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর। কনিষ্ঠ আরাফাত রহমান কোকোর জন্ম ১৯৭০ সালের ১২ আগস্ট। কোকো ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালে দেশের রাষ্ট্রপতি হন এবং ১৯৮১ সালের ৩০মার্চ এক ব্যর্থ সেনা অভ্যুত্থানে শহীদ হন। মাত্র ২১ বছরের দাম্পত্য জীবন কাটিয়ে ৩৬ বৎসর বয়সে খালেদা জিয়া অকালবৈধব্য বরণ করেন।

পরিমিত আহার করতেন বেগম খালেদা জিয়া। ফল খেতে পছন্দ করতেন। বিশেষ করে নিয়মিত পেঁপের রস পান করতেন। প্রিয় খাবার ছিল সাদা ভাত, সবজি, মসুর ডাল ও মাছ। মাংস খেতেন, তবে তেমন পছন্দের ছিল না। শ্রোতা হিসেবে তিনি বেশ ভালো ছিলেন। অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। জীবনীকারেরা বলেছেন, ‘প্রশাসনের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ধীরে ধীরে বিচক্ষণ হয়ে ওঠেন’ (বেগম খালেদা জিয়া: জীবন ও সংগ্রাম, মাহফুজ উল্লাহ)।

রাজনৈতিক জীবন

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন শুরু। জিয়াউর রহমানের প্রয়াণের পরে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ১৯৮২ সালের ৪ জানুয়ারি তিনি বিএনপির সদস্যপদ গ্রহণ করেন। শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবন।

খালেদা জিয়া রাজনৈতিক জীবনের প্রথম থেকেই দলীয় শৃঙ্খলা ও নেতৃত্ব সমুন্নত রাখার পাশাপাশি এইচ এম এরশাদের স্বৈরশাসনবিরোধী গণ-আন্দোলনের ভেতর দিয়ে তাঁর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। প্রথমেই তিনি দলের শীর্ষপদ পাননি। রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে ভাইস চেয়ারপারসন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের পর ১৯৮৪ সালে তিনি দলের চেয়ারপারসনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি নিজের ৪৩ বছরের রাজনৈতিক জীবনের ৪১ বছর দেশের একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

এল সাফল্য

স্বৈরাচারী এরশাদবিরোধী আন্দোলনে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ১৯৮৩ সালে গঠিত হয়েছিল ৭–দলীয় ঐক্যজোট। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতির কাছে দেওয়া অঙ্গীকার পূরণ করে জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় ‘আপসহীন নেত্রী’  হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৯৮৭ সাল থেকে তিনি ‘এরশাদ হটাও’ শীর্ষক এক দফা আন্দোলন শুরু করেন। তাঁর নেতৃত্বে দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলন ও সংগ্রামের চড়াই-উতরাইয়ের পথ পেরিয়ে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিজয়ী হয়। এই নির্বাচনে অনেকেরই পূর্বানুমান ছিল তাঁর বিরোধী পক্ষই বিজয়ী হবে; কিন্তু সেসব অনুমান মিথ্যায় পর্যবসিত করে দীর্ঘ আট বছরের অবিরাম, নিরলস ও আপসহীন সংগ্রামের পর বিএনপির বিজয় তাঁর নেতৃত্বকে প্রশ্নহীন করে তোলে। দেশের প্রথম ও বেনজির ভুট্টোর পর মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের কাছে শপথ গ্রহণ করেন। তিনি ১৯৯৬ সালে দ্বিতীয় এবং ২০০১ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। এ ছাড়া ১৯৯৬ ও ২০০৯ সালে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।

খালেদা জিয়া ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মোট ২৩টি সংসদীয় আসনে নির্বাচন করেছেন। কোনোটিতেই তিনি পরাজিত হননি। তাঁর এক জীবনীকার বলেছেন, ‘দেশের সব জায়গায় তিনি গেছেন। তিনি পরিশ্রমসাধ্য দীর্ঘ সফর করতে পারঙ্গম ছিলেন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচনের ১৪ দিন আগে তিনি সারা দেশে প্রায় ১৪ হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করেছিলেন।’(প্রাগুক্ত : মাহফুজ উল্লাহ)

খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনে অনেক সাফল্য থাকলেও কিছু সমালোচনাও রয়েছে। বিশেষত দুর্নীতি দমনে তিনি সফল হননি বলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রবল অভিযোগ তোলা হয়েছে বিরোধী পক্ষ থেকে। কথিত ‘হাওয়া ভবন’ ও দুর্নীতির ধারণা সূচক অনুসারে (২০০১-২০০৫) টানা পাঁচ বছর বিশ্বের সবচেয়ে ‘দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ’ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তাঁর প্রশাসনের সুনাম ক্ষুণ্ন করেছে।

কারাবাস

খালেদা জিয়া জীবনের নানা পর্যায়ে বেশ অনেকটা সময় বন্দিত্বের নির্যাতনের ভেতর দিয়ে অতিবাহিত করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ২ জুলাই থেকে যুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত সেনানিবাসে বন্দী ছিলেন। জিয়াউর রহমান শহীদ হওয়ার পর ১৯৮১ সালে সেনানিবাসের বাড়িতে তাঁকে কিছুদিন গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল। ‘ওয়ান-ইলেভেন’ নামে আলোচিত কালপর্বে ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর তাঁকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে ঢাকা সেনানিবাসের শহীদ মঈনুল সড়কের বাড়িতে গৃহবন্দী করা হয়। পরে সেখান থেকে সংসদ ভবনের একটি বাড়িতে সাবজেল ঘোষণা করে এক বছর সাত দিন তাঁকে বন্দী রাখা হয়।

 পুরান ঢাকার কাজী আলাউদ্দিন রোডের পরিত্যক্ত পুরোনো কারাগারে বন্দিত্বের কঠিন সময় কেটেছে খালেদা জিয়ার জীবনে। তাঁর বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে ‘ জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা’ করা হয়। গ্রেপ্তার করে এই নির্জন স্থাপনাটিতে বিশেষ কারাগার ঘোষণা করে তাঁকে বন্দী রাখা হয়। এ মামলায় তাঁকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁকে স্লো পয়জনিংয়ের অভিযোগ ওঠে। উন্নত চিকিৎসার জন্য বারবার বিদেশে চিকিৎসার আবেদন করেও অনুমতি পাননি। মানবিক কারণে ২০২০ সালে তাঁকে রাজনীতিতে যুক্ত না থাকার শর্তে কারাগার থেকে গৃহবন্দী অবস্থায় থাকার অনুমতি দেওয়া হয়। গত বছর ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রপতির নির্বাহী আদেশে তাঁর দণ্ড মওকুফ করে মুক্তি দেওয়া হয়।

চিকিৎসা

মুক্তি পাওয়ার পর চলতি বছর ৭ জানুয়ারি লন্ডনে খালেদা জিয়াকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। তাঁর স্বাস্থ্যের অনেকটা উন্নতি হয়েছিল। তবে নানা রোগে জটিলতা ও শরীর–মনে ধকল সহ্য করে তিনি দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। বয়সও ছিল প্রতিকূল। প্রায়ই গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তেন। হাসপাতালে ভর্তি করানো হতো। গত ২৩ নভেম্বর এমনই পর্যায়ে তাঁকে শেষবারের মতো রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। এক মাসের কিছু বেশি সময় তিনি সেখানেই চিকিৎসাধীন। এবার তিনি আর চিকিৎসায় সাড়া দিতে পারলেন না। ‘দেশনেত্রী’ উপাধিতে ভূষিত খালেদা জিয়া চিরবিদায় নিলেন তাঁর প্রিয় দেশবাসীর কাছ থেকে।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি

Thursday, December 11, 2025

চিকিৎসায় ‘সাড়া দিচ্ছেন’ খালেদা জিয়া

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চিকিৎসকদের দেওয়া চিকিৎসা গ্রহণ করার পাশাপাশি ‘রেসপন্স’ (সাড়া দেওয়া) করতে পারছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বলেছেন, চিকিৎসকেরা যে চিকিৎসা দিচ্ছেন, সেটি উনি (খালেদা জিয়া) গ্রহণ করতে পারছেন এবং সেটি নিয়ে উনি সত্যিকার অর্থে সাড়া দিচ্ছেন।

আজ বুধবার সন্ধ্যায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে এক ব্রিফিংয়ে খালেদা জিয়ার চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয়ে সাংবাদিকদের জানান চিকিৎসক জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘মনে রাখতে হবে, উনি (খালেদা জিয়া) একজন রোগী।...ইচ্ছা করলেই আমি চিকিৎসক হিসেবে সকল কিছুই আপনাদের কাছে আমি প্রকাশ্যে বলে দেওয়া...এটি মেডিকেল সায়েন্সে কোনো অবস্থাতেই পারমিট করে না।’

বিএনপির চেয়ারপারসনের স্বাস্থ্যের বিষয়ে কোনো গুজবে কান না দেওয়ার আহ্বান জানান জাহিদ হোসেন।

চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে নিতে না পারার কারণ হিসেবে জাহিদ হোসেন বলেন, ‘একদিকে মেডিকেল অ্যাম্বুলেন্সের (এয়ার অ্যাম্বুলেন্স) কারিগরি ত্রুটি, অন্যদিকে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের অবস্থা ওই সময়ের জন্য ফ্লাই করার উপযুক্ত না থাকার কারণে সেই সময় আমরা উনাকে (খালেদা জিয়া) দেশের বাইরে স্থানান্তর করতে পারিনি।’

জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আইসিইউতে উনি (খালেদা জিয়া) চিকিৎসাধীন আছেন। একটি সংকটাপন্ন মানুষের জন্য যেটি প্রয়োজন, সেই চিকিৎসার মধ্যেই উনি আছেন।’

দেশ-বিদেশের চিকিৎসকদের পরামর্শে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা অব্যাহত রয়েছে উল্লেখ করে জাহিদ হোসেন আরও বলেন, ‘আমরা খুবই আশাবাদী, মেডিকেল বোর্ডের সম্মানিত সদস্যরাও আশাবাদী যে উনার (খালেদা জিয়া) সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা যাবে এবং পরবর্তী সময়ে হয়তো উনাকে যেকোনো সময়ে প্রয়োজনে দেশের বাইরেও নিয়ে যাওয়া হতে পারে। এখনো এই জিনিসটি এই পর্যায়েই আপনাদের মাধ্যমে বলার সময় আসে নাই।’

বিএনপির চেয়ারপারসনের সুস্থতা কামনায় দোয়া করার আহ্বান জানিয়ে জাহিদ হোসেন বলেন, ‘যে শারীরিক সংকটময় অবস্থা উনি অতিক্রম করছেন, সেটি যাতে উনি সফলভাবে আল্লাহর রহমতে অতিক্রম করতে পারেন, সে জন্য আমরা সবার কাছে সহযোগিতা চাই।’

খালেদা জিয়া ১৭ দিন ধরে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। তাঁর সংকটাপন্ন শারীরিক অবস্থা নিয়ে দেশের মানুষের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।

অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের অধীন খালেদা জিয়ার চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে। তাঁর নানা শারীরিক জটিলতার মধ্যে ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসের সমস্যা ওঠানামা করছে বলে মেডিকেল বোর্ডের একটি সূত্র জানিয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, কিডনির সমস্যার কারণে খালেদা জিয়ার শরীরে হিমোগ্লোবিন কমে গিয়েছিল, সেটি বেড়েছে। কিডনির কার্যকারিতা সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে, ফুসফুসেরও উন্নতি আছে। তবে তিনি এখনো আশঙ্কামুক্ত নন। এ ছাড়া নিয়মিত চিকিৎসার অংশ হিসেবে তাঁর কিছু শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়মিত করা হচ্ছে। খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের এমন পরিস্থিতিতে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার তারিখ পেছানো হয়।

শাশুড়ি খালেদা জিয়াকে দেখতে লন্ডন থেকে ঢাকায় পৌঁছানোর পর এভারকেয়ার হাসপাতালে প্রতিদিনই যাচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান। বর্তমানে জুবাইদা রহমান খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সঙ্গে চিকিৎসার বিষয়টিতে যুক্ত রয়েছেন।

রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন তাঁর চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য এ জেড এম জাহিদ হোসেন
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন তাঁর চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য এ জেড এম জাহিদ হোসেন। ছবি: প্রথম আলো

Tuesday, December 9, 2025

খালেদা জিয়ার ‘জেন্টল পাওয়ার’ by ফয়সল মাহমুদ

বাংলাদেশে খুব কম ব্যক্তিত্ব আছেন যাঁদের উপস্থিতি জনমতকে আলোড়িত করতে পারে। খালেদা জিয়া তাঁদের অন্যতম। ঢাকার একটি হাসপাতালে সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকা সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে বিগত কয়েকদিন ধরে যে দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, তা এই অশীতিপর রাষ্ট্রনেত্রীকে ঘিরে জনমানসে থাকা গভীর আবেগেরই প্রকাশ।

সমাজের প্রায় সব স্তরের মানুষ ফুটপাত, আঙিনা এবং সামনের সড়কগুলোতে জড়ো হয়েছেন- কারও হাত প্রার্থনায় রত, কারও কণ্ঠে নীরব উচ্চারণ- এক নারীর প্রতি শ্রদ্ধা। তিনি বহু দশক ধরে এই দেশের উত্তাল রাজনৈতিক ইতিহাসের কেন্দ্রে।

রাজনৈতিক অবস্থান যা-ই হোক, জনমনে যে আবেগ উথলে উঠেছে তা আরও গভীর কিছু নির্দেশ করে: বাংলাদেশের বহু মানুষের কাছে খালেদা জিয়া আজও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার জীবন্ত প্রতীক। তাঁদের ভালোবাসা স্মৃতিতে নিবদ্ধ।
অনেকে ভুলে যান যে, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়ার আগেও খালেদা জিয়া ছিলেন ব্যক্তিগতভাবে সাধারণ জীবনযাপনকারী একজন নাগরিক। তার স্বামী প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড তাঁকে এমন এক ইতিহাসের পথে ঠেলে দেয়, যে পথে যাওয়ার কোনো প্রস্তুতিই তাঁর ছিল না।
তবু পরবর্তী বছরগুলোতে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। গ্রেপ্তার, নজরদারি, ভয়ভীতি- সবই সহ্য করেছেন। হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি হয়ে ওঠেন গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের এক অপ্রত্যাশিত প্রতীক।

তিনি আন্দোলন নেতৃত্ব দেন। তাকে বারবার আটক করা হয়। নিঃসঙ্গতায় দিন কাটান। তবু স্বৈরশাসনের কাছে মাথা নত করেননি। ১৯৯০ সালে সামরিক সরকার পতনের পেছনে তাঁর সংগঠিত গণআন্দোলন এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৯১ সালে তাঁর প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়া চিহ্নিত করে সামরিক প্রভাবাধীন দীর্ঘ যুগের পর সংসদীয় গণতন্ত্রের পুনরুত্থান।

তাঁর শাসনে অগ্রাধিকার পেয়েছিল সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতা। তার মধ্যে ছিল শিক্ষার জন্য খাদ্য, গ্রামীণ সেবামূলক কর্মসূচি, কর্মসংস্থান, কাঠামোগত সংস্কার। এগুলো বাংলাদেশকে ধীরে ধীরে আরও উদার অর্থনীতির দিকে নিয়ে গেছে।

সমালোচকরা তাঁকে কখনও সতর্ক রাজনীতিক বলেছেন। অনুরাগীরা বলেছেন স্থির-হাতে পরিচালনাকারী। কিন্তু নিঃসন্দেহে তিনি এক গভীরভাবে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে নেতৃত্বের নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি করেন।
দক্ষিণ এশীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর স্থান অনন্য। তিনি মুসলিম বিশ্বের প্রথম দিকের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নারী নেতাদের একজন। তিনি এমন এক নেতৃত্ব শৈলী গড়ে তুলেছেন যেখানে ব্যক্তিপূজা ছিল না। তিনি রাজবংশীয় উত্তরাধিকারী নন, নন কোনও কঠোর সম্রাজ্ঞী।

যদি তাঁর আজীবন প্রতিদ্বন্দ্বী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব শৈলীকে কেউ কেউ মনে করেন ক্ষমতা-কেন্দ্রীকরণ ও রাজনৈতিক পরিসর দখলের রাজনীতি, তবে খালেদার শৈলী সম্পূর্ণ আলাদা- নীরব, ভারসাম্যপূর্ণ, সংযত। এ কারণে অনেকে তাঁকে অকপটে ‘জেন্টল লেডি’ বলেন। এর মানে দুর্বলতা নয়, ভদ্রতা ও শালীনতা। তাঁর উত্তরাধিকার একাধারে রাজনৈতিক স্মৃতি এবং আবেগময় সম্পদ। ’৮০ ও ’৯০ দশকের গণতান্ত্রিক উত্তরণের দিনগুলো স্মরণ করলে খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব মানুষের মনে ভেসে ওঠে। এক সময় যখন বাংলাদেশ দীর্ঘ শ্বাস নিতে পেরেছিল, তখন গণতন্ত্র শুধু আকাঙ্ক্ষা ছিল না, বাস্তব অনুভূতি ছিল। তিনি এমন এক সময় দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন, সে সময়ে তার নেতৃত্ব আজকের তুলনায় অনেক বেশি উন্মুক্ত, বহুমাত্রিক এবং সহনশীল ছিল বলে অনেকের মনে গেঁথে আছে, যদিও তা ছিল অসম্পূর্ণ।

এ কারণেই হাসপাতালে তাঁর শয্যার পাশে মানুষের ভিড় শুধু একজন অসুস্থ রাজনৈতিক নেত্রীকে নিয়ে উদ্বেগ নয়- এটি প্রতিফলন করছে এক বৃহত্তর আকাঙ্ক্ষার: প্রতিহিংসাহীন, কম দমনমূলক, কম অসহিষ্ণু এক রাজনীতির প্রতি আকুলতা।

খালেদা জিয়ার অসুস্থতাকে ঘিরে মানুষের প্রতিক্রিয়া একটি নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি- তাঁর অবদান স্মরণ করা এবং হয়তো সেই শালীন রাজনীতির জন্য গভীর আকুলতা।
অনেকে যারা তাঁকে ভোট দেননি, তাঁরা পর্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে কথা বলেন। যাঁরা একসময় বিরোধিতা করেছেন, তাঁরাও আজ আরোগ্য কামনা করেন। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেটি বহু সময় আড়াল করে রাখে- এই পরিস্থিতি তা আবারও প্রকাশ করেছে: নেতারা কখনও কখনও জাতির সমষ্টিগত স্মৃতির ধারক হয়ে ওঠেন- এমনকি তাঁদের বিরোধীদের কাছেও।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো এই যে, সমর্থনের এসব প্রকাশে বিষাক্ততা নেই। বাংলাদেশ বহু বছর ধরে গভীর রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে বাস করছে- হাসিনা-খালেদা দ্বন্দ্বে দুই শিবিরে দেশ বিভক্ত হয়ে থেকেছে।

কিন্তু তাঁর অসুস্থতা সেই কঠোর বিভাজনকে সাময়িকভাবে নরম করেছে। মনে করিয়ে দিয়েছে- প্রসিকিউটরের মামলায় অভিযুক্ত হওয়ার বা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের দ্বারা অবমানিত হওয়ার অনেক আগেই তিনি এমন এক নারী- যিনি ব্যক্তিগত ক্ষতি, রাজনৈতিক ঝড়-তুফান, জনসমালোচনা- সব সহ্য করেছেন শান্তভাবে।

তাঁর মানবিকতাই তাঁর রাজনৈতিক ছাপকে বিশেষ করে তুলেছে। তিনি কখনও কঠোর স্বৈরশাসক ছিলেন না। ছিলেন না জ্বালাময়ী বক্তা। মঞ্চকে তিনি নাট্যমঞ্চে পরিণত করেননি। তিনি শাসন করেছেন এক মাতৃসুলভ শান্ত মর্যাদায়- যা সাধারণ মানুষের হৃদয়ে সাড়া জাগিয়েছে।

হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষমাণ মানুষ মতাদর্শ নিয়ে কথা বলেন না। তাঁরা কথা বলেন মর্যাদা নিয়ে। শিষ্টাচার নিয়ে কথা বলেন। তাঁরা তাঁকে মনে করেন এমন একজন, যিনি রাজনীতির অমানবিক পরিমণ্ডলেও মানবিকতার প্রতীক হয়ে আছেন।

তিনি এই সংকট থেকে বেঁচে ফিরুন বা না ফিরুন, তাঁর প্রভাব নিঃশেষ হবে না। বাংলাদেশ তাঁকে শুধু একজন রাজনৈতিক কৌশলী হিসেবে মনে রাখবে না- মনে রাখবে নাগরিক আকাঙ্ক্ষার ধারক হিসেবে- যাঁর নেতৃত্ব ছিল বিনয়ে আবৃত।
অনেকের কাছে তাঁর উপস্থিতি এক ভিন্ন নেতৃত্বধারণার প্রতীক- যেটি কম প্রতিশোধপরায়ণ, কম হিসাবি। তাই আজও, দুর্বল শরীর নিয়েও তিনি মানুষের হৃদয়ে শ্রদ্ধার আসনে।

সম্ভবত এটাই এক রাজনৈতিক জীবনের শেষ মূল্যায়ন- কত পদ পেয়েছেন তা নয়, কতদিন ক্ষমতায় থেকেছেন তাও নয়, বরং তিনি জাতির স্মৃতিতে কত গভীর আবেগ রেখে আছেন সেটাই তার মূল্যায়ন।

* ফয়সল মাহমুদ, নয়া দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস মিনিস্টার। অনলাইন এশিয়া টাইমসে প্রকাশিত তার লেখার অনুবাদ

mzamin

Sunday, December 7, 2025

ডা. জুবাইদার আগমন: ভিউয়ের প্রতিযোগিতা ও সাংবাদিকতার নৈতিক সংকট by ইয়াসির সিলমী

সাংবাদিকদের বলা হয় ‘জাতির বিবেক’আর সাংবাদিকতাকে বলে ‘ফোর্থ পিলার অব স্টেট’। সমাজ ও রাষ্ট্রের দর্পণ হিসেবে কাজ করাই যার মূল লক্ষ্য; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের একটি অংশের আচরণ সাধারণ মানুষের মনে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

নিউজের চেয়েও ভিউজের দিকে মনোযোগ বাড়াতে গিয়ে সাংবাদিকতাকে হাসির খোরাক বানিয়েছে কিছু অত্যুৎসাহী সংবাদমাধ্যম। অবাক করা বিষয় হলো এই তালিকায় শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমও রয়েছে।

যার সর্বশেষ উদাহরণ পাওয়া গেল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমানের বাংলাদেশে আগমনে। তাঁর লন্ডন থেকে ঢাকায় আগমন এবং তৎপরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে কেন্দ্র করে কিছু সংবাদমাধ্যম যে অতি উৎসাহ ও অপরিণামদর্শী আচরণ প্রদর্শন করেছে, তা সাংবাদিকতার নীতিনৈতিকতার সংজ্ঞাকেই প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

কৌতূহল মেটানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা

ডা. জুবাইদা রহমান তাঁর অসুস্থ শাশুড়ি, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে দেখতে গত শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) দেশে ফিরেছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় এই মুহুর্তের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ। ফলে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং জিয়া পরিবারের সদস্য হিসেবে তাঁর দেশে ফেরা সাধারণ মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে; কিন্তু সমস্যাটা সংবাদ প্রকাশে নয়, সংবাদ পরিবেশনের ধরন ও বাড়াবাড়ি নিয়ে। কিছু সংবাদমাধ্যম এটি করেছে, যা নিয়ে সচেতন নাগরিক সমাজেও সমালোচনা তৈরি হয়েছে।

ডা. জুবাইদার লন্ডনে বিমানে ওঠা থেকে শুরু করে ঢাকার বিমানবন্দরে অবতরণ, ইমিগ্রেশন পার হওয়া, ভিআইপি গেট দিয়ে বের হওয়া, কোন গাড়িতে উঠলেন, কোন পথ দিয়ে হাসপাতালে গেলেন, কোন ফ্লাইওভার ব্যবহার করলেন, কখন এভারকেয়ার হাসপাতালে পৌঁছালেন—প্রতিটি মুহূর্তের এমন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ কি আসলেই জনগুরুত্বপূর্ণ সংবাদ? নাকি এটি নিছকই কৌতূহল মেটানোর এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা?

একটি গাড়ি কোন ফ্লাইওভার দিয়ে যাচ্ছে, তা জানা জাতির জন্য কতটা জরুরি, তা গবেষণার বিষয়। এই ধরনের লাইভ ট্র্যাকিং বা ‘ধাওয়া করা সাংবাদিকতা’ কেবল হাস্যকরই নয়; বরং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিরাপত্তার জন্যও হুমকিস্বরূপ। সাংবাদিকতা যখন ‘গোয়েন্দাগিরি বা ‘পাপারাজ্জি’ সংস্কৃতির স্তরে নেমে আসে, তখন তথ্যের চেয়ে সস্তা বিনোদনই মুখ্য হয়ে ওঠে।

ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ

ঘটনার এখানেই শেষ নয়, বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বিদেশযাত্রার সম্ভাব্য সফরসঙ্গীদের তালিকা প্রকাশের নামে কিছু সংবাদমাধ্যম নজিরবিহীন দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খালেদা জিয়ার সফরসঙ্গীদের নাম, পাসপোর্টের নম্বর এবং মুঠোফোনের নম্বরের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ্যে চলে এসেছে। এর জন্য বিএনপির দায়িত্বশীল মহল দায় এড়াতে পারে না। এ তথ্যগুলো ব্যবহার করে যে কেউ সাইবার অপরাধ বা জালিয়াতির আশ্রয় নিতে পারে। কিন্তু খবরের জৌলুশ বাড়াতে গিয়ে এমন সংবদেনশীল ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করেছে কিছু সংবাদমাধ্যম।

সাংবাদিকতার নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট না হলে কারও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। কারও পাসপোর্ট নম্বর বা ব্যক্তিগত মুঠোফোন নম্বর প্রকাশ করা কি জনস্বার্থের অন্তর্ভুক্ত? এটি সরাসরি ডেটা প্রাইভেসি বা ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসা সব খবর বা তথ্যই কি প্রকাশ করা পেশাদারির মধ্যে পড়ে?

হাসপাতালের পরিবেশ বিঘ্ন

ডা. জুবাইদা রহমান যখন এভারকেয়ার হাসপাতালে পৌঁছান, তখন সেখানকার দৃশ্য ছিল আরও করুণ। শত শত ক্যামেরা, ইউটিউবার ও মূলধারার মিডিয়াকর্মীদের ভিড় হাসপাতালের প্রবেশপথকে কার্যত এক জনসভায় পরিণত করেছিল। হাসপাতালের মতো স্পর্শকাতর জায়গা, যেখানে নীরবতা ও শৃঙ্খলা কাম্য, সেখানে সংবাদমাধ্যমের এই হুলুস্থুল আচরণ হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স, স্টাফ, অন্যান্য রোগী ও তাঁদের স্বজনদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়েছে।

হাসপাতালের সামনে অ্যাম্বুলেন্সের পথ আটকে, অন্যান্য রোগীর স্বজনদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে ডা. জুবাইদার গাড়ির পেছনে দৌড়ানোর দৃশ্য দেখে মনে হয়েছে, এটি কোনো সংবাদ সংগ্রহ নয় বরং কোনো অ্যাকশন সিনেমার শুটিং চলছে। যেসব সাংবাদিক এমনটা করছেন তাঁরা কি ভুলে গেছেন, হাসপাতালে মুমূর্ষু রোগীরা থাকেন? তাঁদের এই হট্টগোল মুমূর্ষু রোগী ও হাসপাতালের স্বাভাবিক কাজকর্মে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে? ‘ব্রেকিং নিউজ’ দেওয়ার নেশায় মানবিক বোধটুকু বিসর্জন দেওয়া কোন ধরণের সাংবাদিকতা!

ডা. জুবাইদার ঘটনাই একমাত্র উদাহরণ নয়, ভিউয়ের নেশায় মত্ত হয়ে আমাদের অনেক সংবাদমাধ্যম এমন অত্যুৎসাহী লাইভ, ব্রেকিং ও এক্সক্লুসিভ দেওয়াকে রুটিনে পরিণত করেছে।

কেন এমন আচরণ

প্রশ্ন হলো, অনেক সাংবাদিক কেন এমন আচরণ করছেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে বর্তমান সময়ের সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘রিচ বাড়ানো’ বা ভিউ–বাণিজ্যের মধ্যে। এখন খবরের মান যাচাই করা হয় সত্যতা বা গভীরতা দিয়ে নয়; বরং কত দ্রুত সেটি ফেসবুকে ভাইরাল হলো এবং কত বেশি ভিউ পেল, তার ওপর ভিত্তি করে।

অনলাইন পোর্টাল এবং কিছু টেলিভিশন চ্যানেল টিআরপি ও ভিউ বাড়ানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। মানুষের আবেগ, কৌতূহল এবং ব্যক্তিগত বিষয়কে পুঁজি করে তারা চটকদার শিরোনাম তৈরি করছে। জুবাইদা রহমানের গাড়ির পেছনে দৌড়ানোর ভিডিও হয়তো ইউটিউবে লাখ লাখ ভিউ এনে দিচ্ছে, বিজ্ঞাপন থেকে আয় বাড়াচ্ছে; কিন্তু এতে সাংবাদিকতার মর্যাদা ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যখন সাংবাদিকতা বাণিজ্যের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে, তখন পেশার নীতি–নৈতিকতার বালাই থাকে না। সাংবাদিকেরা তখন আর ‘ওয়াচডগ’ থাকেন না, হয়ে ওঠেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর।

দেশে কি সংবাদের সত্যিই অভাব? উত্তর হলো ‘না’। জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনীতি, ডেঙ্গু পরিস্থিতি, পরীক্ষা বন্ধ রেখে শিক্ষকদের আন্দোলন, অর্থনৈতিক সংকট, ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষার মতো অসংখ্য জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় যখন মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে, তখন মিডিয়ার একটি বড় অংশ ব্যস্ত একজন ব্যক্তির গাড়ির রুটম্যাপ তৈরিতে। এটি কি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মূল সমস্যা থেকে জনগণের দৃষ্টি সরানোর কৌশল? নাকি এটি কেবলই মেধা ও মননশীলতার সংকট?

মিডিয়া যখন জনগণের কথা না বলে চটকদার বিষয় নিয়ে মেতে থাকে, তখন তারা জনগণের বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। ডা. জুবাইদা রহমানের আগমন অবশ্যই একটি ঘটনা; কিন্তু সেটিই একমাত্র বা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু হতে পারে না। তাই এখনই সময় এই অপসাংবাদিকতার লাগাম টেনে ধরার। ‘জাতির বিবেক’খ্যাত সাংবাদিকদের আয়নায় নিজেদের চেহারা দেখা প্রয়োজন। মাইক্রোফোন বা ক্যামেরা হাতে নিলেই যা খুশি তা করা যায় না, এই বোধোদয় জরুরি। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন পক্ষের কিছু করণীয় রয়েছে।

প্রথমত, সাংবাদিকদেরই বুঝতে হবে পাপারাজ্জি আর সাংবাদিকতা এক নয়। সাংবাদিকতা মানে দায়িত্বশীলতা। সংবাদমাধ্যমগুলোকে তাদের কর্মীদের নিয়মিত নীতিনৈতিকতা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তাবিষয়ক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সম্পাদক ও বার্তাকক্ষের নীতিনির্ধারকদের আরও কঠোর হতে হবে। ভিউ বাড়ানোর জন্য যেকোনো সংবাদ প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করার আগে সম্পাদকীয় নীতি অনুসারে যাচাইপ্রক্রিয়া জোরদার করতে হবে।

এ ছাড়া সরকারের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইনের কথা সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিতে হবে, প্রয়োজনে ক্যাম্পেইন করা যেতে পারে। তবে এ আইন যেন গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ না করে বরং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষায় ঢাল হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি হাসপাতাল বা স্পর্শকাতর এলাকায় মিডিয়ার আচরণের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন।

গণমাধ্যমকর্মী ও সরকারের পাশাপাশি পাঠকদেরও দায়িত্ব রয়েছে। চটকদার ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘনকারী সংবাদ বর্জন করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। ভিউ না পেলে তখন মিডিয়াও তাদের পলিসি বদলাতে বাধ্য হবে।

ডা. জুবাইদা রহমানের দেশে ফেরাকে কেন্দ্র করে আমাদের কিছু সংবাদমাধ্যমের যে আচরণ দেখা গেল, তা আমাদের সাংবাদিকতার রুগ্‌ণ দশাটিই প্রকট করে তুলেছে। সংবাদমাধ্যমগুলো যদি এখনই নিজেদের সংশোধন না করে, তবে তারা কেবল হাসির খোরাকই হবে না; বরং সমাজের চোখে অবিশ্বাস আর বিরক্তির প্রতীক হয়ে উঠবে। আমরা চাই আমাদের সাংবাদিকেরা এভাবে গাড়ির পেছনে নয়, সত্যের পেছনে দৌড়াক। তাঁরা যেন তথ্যের ফেরিওয়ালা হন, গুজবের নয়। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতাই পারে এই পেশার হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে।

* ইয়াসির সিলমী, সভাপতি, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। ই-মেইল: silmybd@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে দেখে ফিরছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান
রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে দেখে ফিরছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান। ছবি: শুভ্র কান্তি দাশ

এখনো বিদেশে নেওয়ার মতো অবস্থায় নেই খালেদা জিয়া

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা এখনো স্থিতিশীল নয়। এ কারণে তাঁকে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডনে নেওয়ার বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তে আসা যায়নি। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাঁকে লন্ডনে নেওয়ার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত আছে। তবে বিদেশে চিকিৎসার বিষয়টি নির্ভর করছে তাঁর শারীরিক অবস্থার অর্থাৎ দীর্ঘ যাত্রার ধকল নিতে শারীরিকভাবে উপযোগী কি না, সেটার ওপর।

খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্যদের ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র গতকাল শনিবার রাতে প্রথম আলোকে জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার নানা শারীরিক জটিলতাগুলোর মধ্যে ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদ্যন্ত্র ও ফুসফুসের সমস্যা ওঠানামা করছে। এর কিছু কিছু কখনো নিয়ন্ত্রিত, আবার হঠাৎ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, কিডনির সমস্যার কারণে খালেদা জিয়ার শরীরে হিমোগ্লোবিন কমে গিয়েছিল, সেটি বেড়েছে। কিডনির কার্যকারিতা সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে, ফুসফুসেরও উন্নতি আছে। তবে তিনি এখনো আশঙ্কা মুক্ত নন।

এমন পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ নেওয়ার তারিখ পেছানো হয়। তাঁকে বিদেশ নেওয়ার বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে প্রথমে বলা হয়েছিল শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) ভোরে নেওয়া হবে। এর পর শুক্রবার সকালে বিএনপির পক্ষ থেকে নতুন তারিখ বলা হয়েছিল ৭ ডিসেম্বর। পরে রাতে জানা গেছে, সেটা পিছিয়ে সম্ভাব্য যাত্রার তারিখ ঠিক করা হয়েছে ৯ ডিসেম্বর। এখন পর্যন্ত এই তারিখে যাওয়াও নিশ্চিত নয়।

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা ও বিদেশ পাঠানোর বিষয়ে অবগত একটি সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে তাঁকে বিদেশ পাঠানোর পরিকল্পনা আরও দু দিন পিছিয়ে ৯ ডিসেম্বর করা হয়েছে। তবে যাত্রার বিষয়টি নির্ভর করছে তাঁর শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসকদের সিদ্ধান্তের ওপর। তবে গতকাল সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে তাঁর শারীরিক অবস্থা অনেকটা অপরিবর্তিত রয়েছে।

এ বিষয়ে গতকাল বিকেলে এভারকেয়ার হাসপাতালের বাইরে এক ব্রিফিঙে মেডিকেল বোর্ডের সদস্য ও বিএনপির নেতা এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, বিমান ভ্রমণে শারীরিকভাবে সক্ষম না হওয়ার কারণেই খালেদা জিয়াকে লন্ডনে নিতে বিলম্বিত হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বিদেশে যাওয়ার ব্যাপারে আমাদের সর্বোচ্চ প্রস্তুতি রয়েছে।

যখনই উনাকে বিদেশ নেওয়ার জন্য মেডিকেল বোর্ড যথোপযুক্তভাবে তৈরি মনে করবেন, শারীরিকভাবে মনে হবে যে, উনাকে সেফলি ট্রান্সফার করা যাবে—তখনই ফ্লাই করবেন।’

জাহিদ হোসেন আরও বলেন, ওই সময়ে (শুক্রবার) এয়ার অ্যাম্বুলেন্স কারিগরি সমস্যার কারণে আসতে পারেনি, এটাও যেমন সত্য—আবার ওই সময়ে জরুরিভাবে মেডিকেল বোর্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, ওই মুহূর্তে তাঁর বিমানযাত্রা সঠিক হবে না। সে জন্য তাঁকে বিদেশ নেওয়ার বিষয়টি কিছুটা বিলম্বিত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হয়তো শারীরিক অবস্থাই বলে দেবে তাঁকে কখন বিদেশে চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া যাবে।

এ সময় জাহিদ হোসেন দীর্ঘদিন ধরে খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় নিয়োজিত দেশি-বিদেশি চিকিৎসকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও (শেখ হাসিনার সরকারের সময়) মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা বিগত ৬ বছর যাবৎ তাঁকে (খালেদা জিয়া) সেবা দিয়ে আসছেন।

বিএনপির কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ও চিকিৎসক রফিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) এর আগে আরও খারাপ অবস্থা থেকে সুস্থ হয়ে ফিরেছেন। তাই আমরা আশাবাদী তিনি এবারও সুস্থ হয়ে ফিরবেন ইনশা আল্লাহ।’

এয়ার অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত

বাসস জানায়, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এনামুল হক চৌধুরী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মেডিকেল বোর্ড সবুজসংকেত দিলেই খালেদা জিয়াকে নেওয়ার জন্য এয়ার অ্যাম্বুলেন্স ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবে।

এনামুল হক বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য এবং দলের পক্ষ থেকে কাতার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তিনি বলেন, কাতার কর্তৃপক্ষই জার্মানি থেকে একটি অত্যাধুনিক এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।

খালেদা জিয়াকে দেখতে এভারকেয়ার হাসপাতালে প্রতিদিনই যাচ্ছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গতকাল রাতেও তিনি খালেদা জিয়াকে দেখতে যান।

শাশুড়ি খালেদা জিয়াকে দেখতে লন্ডন থেকে ঢাকায় পৌঁছার পর এভারকেয়ার হাসপাতালে প্রতিদিনই যাচ্ছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্ত্রী জুবাইদা রহমান। গতকাল বিকেল তিনটা ২০ মিনিটের দিকে হাসপাতালের ফটক দিয়ে জুবাইদা রহমানের গাড়ি ঢুকতে দেখা যায়। জুবাইদা গত শুক্রবার লন্ডন থেকে ঢাকায় এসে পৌঁছান।

গত ২৩ নভেম্বর রাতে শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে খালেদা জিয়াকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে মেডিকেল বোর্ডের অধীন চিকিৎসাধীন।

গুজবে কান না দেওয়ার অনুরোধ

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে নানা গুজব চলছে। এতে কান না দিতে দেশবাসীর প্রতি আবারও আহ্বান জানিয়েছে বিএনপি।

গতকাল ব্রিফিংয়ে এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, খালেদা জিয়ার চিকিৎসার ব্যাপারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো কোনো সময় অনেক গুজব শোনা যায়। তিনি বলেন, ‘আমি সবাইকে বিনীতভাবে অনুরোধ করব, দয়া করে দেশনেত্রীর প্রতি যদি আপনাদের শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ আপনারা দয়া করে যে ফ্যাক্ট-সেটার বাইরে গুজব ছড়িয়ে কাউকে বিভ্রান্ত করবেন না।’
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি

Wednesday, December 3, 2025

কাদের ‘ভিভিআইপি’ ঘোষণা করা হয়, তাঁরা কী কী সুবিধা পান

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (ভিভিআইপি) ঘোষণা করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। এরপর কাউকে ‘ভিভিআইপি’ ঘোষণা করলে কী হয়, তিনি কী কী সুবিধা পান, তা নিয়ে অনেকের মধ্যে কৌতূহল দেখা দিয়েছে।

বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স) (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী বা ক্ষেত্রমত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা যেখানেই অবস্থান করুন না কেন, তাঁদের দৈহিক নিরাপত্তা দেওয়া এ বাহিনীর প্রধান দায়িত্ব হবে। এ ছাড়া বাহিনী বাংলাদেশে অবস্থানরত অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকেও নিরাপত্তা দেবে।

সরকার চইলে কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করতে পারে। বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তারা ক্ষেত্রমতে তল্লাশি, গ্রেপ্তার ও আটকের ক্ষেত্রে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) ক্ষমতা ভোগ করেন। আইনে বলা আছে, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হলে তিনি সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’র নিরাপত্তার প্রয়োজনে গুলিবর্ষণ করা দরকার হলে তা করতে পারবেন।

সাধারণত বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান বা অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি বাংলাদেশ সফরে এলেও এ ধরনের নিরাপত্তা দেওয়া হয়। যেমন গত মার্চে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশে আসার পর তাঁকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে ঘোষণা করেছিল সরকার। তখন তাঁর নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিল এসএসএফ। সর্বশেষ গত মাসে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে ঢাকা সফর করেন। এ সময় তাঁকে নিরাপত্তা দেওয়া হয় এসএসএফের মাধ্যমে।

এর আগে ২০০৮ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি শেখ হাসিনাকে কিছু সময়ের জন্য ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ ঘোষণা করা হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘জাতির পিতার পরিবার-সদস্যগণের নিরাপত্তা আইন, ২০০৯’ জারি করা হয়েছিল। অবশ্য ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মাধ্যমে দায়িত্ব নেওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকার জাতির পিতার পরিবার-সদস্যগণের নিরাপত্তা (রহিতকরণ) অধ্যাদেশ, ২০২৪ জারি করে। এর ফলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পরিবারের সদস্যরা বিশেষ নিরাপত্তার সুবিধা পাবেন না।

খালেদা জিয়াকে যে কারণে ভিভিআইপি ঘোষণা

আজ মঙ্গলবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে খালেদা জিয়াকে ভিভিআইপি ঘোষণার সিদ্ধান্ত হয়। পরে যমুনার সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্ত জানান পরিকল্পনা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ।

এরপর রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়াকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স (এসএসএফ) নিরাপত্তা দেওয়া শুরু করে। বেলা ২টা ২০ মিনিটের দিকে এসএসএফ সদস্যরা খালেদা জিয়াকে নিরাপত্তা দেওয়া শুরু করেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেন বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান।

গুরুতর অসুস্থ হয়ে গত ২৩ নভেম্বর থেকে হাসপাতালে শয্যাশায়ী খালেদা জিয়া। তাঁর শারীরিক অবস্থার হঠাৎ অবনতি হওয়ায় তাঁকে আইসিইউতে স্থানান্তর করে চিকিৎসা দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।

সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেন, উপদেষ্টা পরিষদের সভায় তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, সাবেক রাষ্ট্রপতির স্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আশু রোগমুক্তি কামনা করে দোয়া ও প্রার্থনা করা হয়। জাতির কাছে তাঁর জন্য দোয়া ও প্রার্থনার আহ্বান জানানো হয়।

পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, সভায় খালেদা জিয়ার বর্তমান শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় হাসপাতালে তাঁর নির্বিঘ্ন চিকিৎসা, প্রয়োজনে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা, তাঁর নিরাপত্তা ও যাতায়াতের সুবিধা এবং উচ্চ মর্যাদা বিবেচনায় তাঁকে রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (ভিভিআইপি) ঘোষণা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকরের জন্য সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এই বিষয়ে খালেদা জিয়ার পরিবার ও দল অবগত রয়েছে বলে জানান পরিকল্পনা উপদেষ্টা।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-02%2F3d0sh1yz%2FEver-Care-Khaleda-Zia.jpg?rect=0%2C0%2C1280%2C853&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ভিভিআইপি ঘোষণার পর তাঁর নিরাপত্তায় রাজধানীর এই হাসপাতালে এসএসএফ ও পিজিআর সদস্যদের মোতায়েন করা হয়। ছবি: দীপু মালাকার

Tuesday, December 2, 2025

খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও তারেকের ফেরা নিয়ে বিতর্ক by জাহেদ উর রহমান

বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি অসুস্থ, কিন্তু এবারের অসুস্থতা যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। বর্তমানে তাঁর শারীরিক অবস্থা খুব সংকটাপন্ন। দীর্ঘদিন তাঁর অসুস্থতার কারণে তাঁর পুত্র তারেক রহমান কার্যত দলের প্রধান হলেও তিনি এখনো দলের চেয়ারপারসন। খালেদা জিয়ার বর্তমান অসুস্থতা এক অসাধারণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির নজির তৈরি করেছে।

শেখ হাসিনার পতনের পর তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করা রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে বিতর্কে নেমেছে। বর্তমান পটভূমিতে সবাই চায় তার রাজনৈতিক বয়ান যতটা সম্ভব প্রতিষ্ঠিত করতে। দীর্ঘদিন একটা স্বৈরতান্ত্রিক সরকারের অধীন থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা–কর্মীদের মধ্যেও একধরনের স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা দেখা গেছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দলগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক বিতর্ক গণতান্ত্রিক পরিবেশের সীমা ছাড়িয়ে রীতিমতো কলহে রূপ নিয়েছে। একে অপরের প্রতি প্রতিদ্বন্দ্বীর মতো আচরণ না করে ক্ষেত্রবিশেষে শত্রুর মতো আচরণ করছে।

কিন্তু এমন রাজনৈতিক পটভূমিতেও প্রতিটি রাজনৈতিক দল বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি তাদের সম্মান দ্ব্যর্থহীনভাবে দেখিয়েছে। একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান হওয়ার পরও এমন জাতীয় অভিভাবকত্বের জায়গা অর্জন করতে পারা বাংলাদেশের মতো দেশে এক অভাবনীয় ঘটনা। সেটি হওয়ারই কথা।

শেখ হাসিনার প্রতিষ্ঠিত স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর লড়াই করেছে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন দলটি। এর মাশুল দলের অসংখ্য নেতা–কর্মীর মতো দিয়েছেন খালেদা জিয়া স্বয়ং। অত্যন্ত খারাপ শারীরিক অবস্থায়ও দীর্ঘদিন তিনি অন্যায়ভাবে জেলে আটক ছিলেন। যে অসুস্থতার কারণে তিনি আজ মৃত্যুর মুখোমুখি, সেটি বেড়ে যাওয়ার পেছনে হাসিনা সরকারের ষড়যন্ত্র ক্রিয়াশীল ছিল—এ অভিযোগও আছে।

অথচ সরকারের সঙ্গে কিছু সমঝোতা মেনে নিলে অনেক আগেই বিদেশে গিয়ে সুচিকিৎসা নিয়ে জীবিত একমাত্র সন্তানের সঙ্গে বাকি জীবন সুন্দরভাবে কাটাতে পারতেন। কিন্তু সেই পথে না গিয়ে ব্যক্তিগত জীবনে ভয়ংকর মাশুল দিয়েছেন তিনি, কিন্তু বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর এ আপসহীনতা এখন গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে নিয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতার পটভূমিতে আলোচনায় এসেছে তাঁর বেঁচে থাকা একমাত্র সন্তান তারেক রহমান কেন দেশে ফিরছেন না। একটি রাষ্ট্রে, সমাজে ঘটে চলা প্রতিটি বিষয়ই রাজনৈতিক। আর সেটি যদি হয় দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল, যে দলটি একটি সুষ্ঠু নির্বাচনে আগামী নির্বাচনে বিজয় লাভ করবে বলেই ধারণা করা হয়, সেই দলটির প্রধান নেতৃত্বের অসুস্থতাকে কেন্দ্র করে তাঁর সন্তানের ফিরে আসা নিয়ে প্রশ্ন ঘিরে, রাজনীতি হওয়াটা স্বাভাবিক।

কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এ ইস্যুকে কেন্দ্র করে অনেকের বক্তব্য ‘হেইট স্পিচের’ (ঘৃণা সৃষ্টিকারী বক্তব্য) পর্যায়ে চলে যাচ্ছে, যা আমাদের দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের জন্য অনিবার্যভাবেই ক্ষতিকর হবে।

কেন তারেক রহমান দেশে আসছেন না? কবে তিনি দেশে আসবেন?— চব্বিশের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময় থেকে প্রশ্নগুলো দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ক্রমাগত আলোচিত হয়েছে। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান দিয়ে মানুষ এটা ধারণা করেছিল, দীর্ঘকাল দেশের বাইরে থাকা মানুষটির জন্য এবার অনুকূল সময়ে এসেছে, তাই তিনি দেশে এসে দলের হাল ধরবেন। তাই তারেক রহমান দেশে ফেরা নিয়ে মানুষের কৌতূহল খুব স্বাভাবিক।

কিন্তু মায়ের সাংঘাতিক অসুস্থতার সময়েও দেশে ফিরে না আসাকে কেন্দ্র করে রীতিমতো তারেক রহমানের মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও কর্তব্যপরায়ণতাকেই প্রশ্ন করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটি নিয়ে এতটাই হইচই তৈরি হয়েছে যে এ মুহুর্তে নিজের দেশে না ফেরার কারণ নিয়ে তারেক রহমানকে কিছু কথা বলতে হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন,“...কিন্তু অন্য আর সকলের মতো এটা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আমার একক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। স্পর্শকাতর এই বিষয়টি বিস্তারিত বর্ণনার অবকাশও সীমিত। রাজনৈতিক বাস্তবতার এই পরিস্থিতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে উপনীত হওয়ামাত্রই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে আমার সুদীর্ঘ উদ্বিগ্ন প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে বলেই আমাদের পরিবার আশাবাদী।”

এর আগে তারেক রহমান নানা সময়ে ‘দ্রুতই দেশে ফিরবেন’ ধরনের বক্তব্য দিলেও এই প্রথম কিছুটা স্পষ্ট করলেন, তিনি কেন দেশে ফিরে আসছেন না। বলা বাহুল্য তাঁর এ বক্তব্যেও বেশ অস্পষ্টতা আছে এবং এটি আরও নতুন কিছু প্রশ্ন তৈরি করেছে। মানুষ খোঁজার চেষ্টা করছে, ‘অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়’ এমন একটা সিদ্ধান্তের পেছনে আসলে কে আছে।

প্রশ্ন এসেছে, তাঁর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের ‘অপর নিয়ন্ত্রক’ কারা? তারা কি দেশি, নাকি বিদেশি? যদিও সরকারের পক্ষ থেকে এর মধ্যেই প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব জানিয়েছেন, সরকারের দিক থেকে তারেক রহমানের ফেরার পথে কোনো বাধা নেই। তাহলে এ ক্ষেত্রে কি বিদেশি কোনো শক্তি ক্রিয়াশীল, যারা তাকে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে কোনো দর–কষাকষি করছে?

নির্বাচন সামনে রেখে দেশে ফেরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝার মতো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিশ্চয়ই আছে তারেক রহমানের। তাঁর দেশে না ফেরা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন তাঁকে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, এটিও তাঁর না বোঝার কারণ নেই। এসব বিতর্ক–সমালোচনার পরও তাঁর ফিরে না আসা প্রমাণ করে, সমস্যা সমাধান করা ছাড়া তাঁর ফেরাটা বিপজ্জনক হতে পারে।

তারেক রহমানের দেশে ফেরার প্রশ্নে তাঁর নিরাপত্তার ইস্যু দীর্ঘদিন থেকে আলোচিত হচ্ছে। এটা সত্যি, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভালো নয়। তিনি দেশে ফিরলে একটি দলের প্রধান হিসেবে যে নিরাপত্তা পাবেন, সরকারের পক্ষ থেকে সেটি কি যথেষ্ট হবে? দেশে ও দেশের বাইরে অনেকেই আছে, যারা তাঁর নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, বাংলাদেশের মতো দেশে নিরাপত্তাঝুঁকি থাকবেই। এ দেশে রাজনীতি করতে হলে এ ঝুঁকি মাথায় নিয়েই করতে হবে। এই সরলীকরণের বাইরে গিয়ে আমরা এটা বলতে পারি, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তিশালী হয়ে ওঠার বিপরীতে একটা মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক দল হিসেবে বিএনপির অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। সেই দলের প্রধান যদি এমন কোনো পরিস্থিতিতে বড় নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়েন, সেটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনার ওপরে বড় আঘাত তৈরি করবে। এমনকি বাংলাদেশ খুবই দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতার মধ্যে প্রবেশ করবে—এ শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। তাই এমন শঙ্কা যদি সত্যিই থেকে থাকে, সেটি বিবেচনায় নেওয়া ভুল হবে না।

দেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার প্রশ্নে বিএনপি যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, সেখানে খালেদা জিয়ার বড় গুরুত্ব আছে শুধু দলের প্রধান হিসেবেই নয়, দলের ঊর্ধ্বে উঠেও। আমাদের এই গণতান্ত্রিক উত্তরণের পথে (নির্বাচনের আগে কিংবা পরে) যদি কোথাও কোনো শঙ্কা তৈরি হয়, কোথাও যদি সরকার, রাজনৈতিক দল কিংবা শক্তির অন্যান্য ভরকেন্দ্রের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়, সে ক্ষেত্রে জাতির অভিভাবকে পরিণত হওয়া খালেদা জিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবেন; সমঝোতার জন্য মধ্যস্থতা করতে পারবেন।

রাজনৈতিক জীবনে কিংবা সরকার পরিচালনার ক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার ছোট-বড় ভুল আছে। কিন্তু শেষ বিচারে তিনি আমাদের গণতন্ত্রের লড়াইয়ের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। তাঁর আরও বেশ কিছুদিন বেঁচে থাকা এই জাতি এবং রাষ্ট্রের স্বার্থেই জরুরি। আমি নিশ্চিত, এই জাতির প্রার্থনা তাঁর সঙ্গে আছে।

* জাহেদ উর রহমান, শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- মতামত লেখকের নিজস্ব

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদায় জানান বড় ছেলে তারেক রহমান। লন্ডন, ৫ মে
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে বিদায় জানান বড় ছেলে তারেক রহমান। লন্ডন, ৫ মে। ছবি: বিএনপির ফেসবুক পেজ থেকে নেওয়া

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার হঠাৎ অবনতি

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার হঠাৎ অবনতি হয়েছে। রোববার দিবাগত রাতে ভোরের দিকে তাঁকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয় বলে জানা গেছে। সেখানে চিকিৎসকেরা খালেদা জিয়াকে ভেন্টিলেশনে রেখে চিকিৎসা দিচ্ছেন।

সোমবার সন্ধ্যায় এভারকেয়ার হাসপাতালে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নিতে গিয়ে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলেছেন, এমন একজন নেতা প্রথম আলোকে বলেন, ‘তাঁর অবস্থা সংকটজনক। তবে তিনি ভেন্টিলেশনে আছেন। লাইফ সাপোর্টে আছেন, এটা ঠিক নয়।’

এর আগে সোমবার বেলা পৌনে দুইটার দিকে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আজম খান সাংবাদিকদের বলেন, খালেদা জিয়া ‘খুব ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে’ চলে গেছেন। গত রোববার রাত থেকে তিনি এ অবস্থায় গেছেন বলে আহমেদ আজম জানান।

আহমেদ আজম খান এভারকেয়ার হাসপাতালে খালেদা জিয়াকে দেখতে গিয়েছিলেন, তবে দেখার সুযোগ পাননি। বাইরে এসে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘বর্তমানে খালেদা জিয়া ভেন্টিলেশন সাপোর্টে আছেন। সিসিইউ থেকে আইসিইউ, এরপরে ভেন্টিলেশন বা লাইফ সাপোর্ট, যা-ই বলেন। আমি এগুলোর বাইরে বলব যে ম্যাডাম খুব ক্রিটিক্যাল কন্ডিশনে আছেন। ফাইট করছেন আমাদের মাঝে ফিরে আসার জন্য। বলার মতো কোনো কন্ডিশনে এখনো তিনি আসেননি।’

গুরুতর অসুস্থ বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গত বুধবার থেকে প্রায় সাড়াহীন ছিলেন। তিন দিন পর গত শনিবার তিনি সামান্য কথা বলেন। তবে সেদিনও সামগ্রিক সংকট কাটেনি। সেদিন চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ ছিল, আগামী কয়েকটি দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিডনি কার্যক্ষমতায় স্থিতিশীলতা ছাড়া তাঁর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থায় স্থায়ী উন্নতি আসা কঠিন।

চীনা চিকিৎসক দল

খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সহায়তায় চীন থেকে আসা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের একটি দল এভারকেয়ার হাসপাতালে গেছে। তারা সন্ধ্যা সাতটার দিকে খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের কয়েকজন সদস্যের সঙ্গে মিলিত হয়।

খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক আল মামুন সাংবাদিকদের বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সহায়তার জন্য চীনের পাঁচ সদস্যের একটি চিকিৎসক দল এভারকেয়ার হাসপাতালে পৌঁছেছে। মূল চিকিৎসক দল মঙ্গলবার (আজ) পৌঁছাবে।
দেশের একদল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আমেরিকার জনস হপকিনস হাসপাতালের চিকিৎসক এবং লন্ডন ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের অধীন খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছে। এতে সহায়তা দিতে চীনের চিকিৎসকেরাও যুক্ত হয়েছেন।

গুরুতর অসুস্থ হয়ে গত ২৩ নভেম্বর থেকে হাসপাতালে শয্যাশায়ী খালেদা জিয়া। তাঁর লিভারজনিত সংকট, কিডনির কর্মক্ষমতা হ্রাস, শ্বাসকষ্ট, ডায়াবেটিসসহ একাধিক শারীরিক জটিলতা একসঙ্গে দেখা দেওয়ায় তাঁর চিকিৎসা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত কয়েক দিনে অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাঁকে আইসিইউ সমমানের হাইডিপেনডেন্সি ইউনিটে (এইচডিইউ) রাখা হয়েছিল। রোববার ভোরে এইচডিইউ থেকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র আইসিইউতে নেওয়া হয়।

বিভ্রান্ত না হওয়ার অনুরোধ

খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত খবর নিয়ে নানা রকম বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ করেছেন বিএনপির নেতারা। এ পরিস্থিতিতে দলটি খালেদা জিয়ার চিকিৎসার সংবাদ তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক এ জেড এম জাহিদ হোসেনের বক্তব্য ছাড়া অন্য কোনো সূত্র বা কারও বক্তব্য ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছে।

সোমবার বিএনপির মিডিয়া সেল থেকে পাঠানো এক বার্তায় এ তথ্য জানানো হয়। মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান গণমাধ্যমে এ তথ্য পাঠান।

বিকেলে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিভিন্ন গণমাধ্যমকে বলেছেন, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল, চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে তাঁর চিকিৎসা চলছে।

মির্জা ফখরুল আরও বলেন, ‘বিভিন্ন গণমাধ্যমে ম্যাডামকে নিয়ে সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে, এটা সঠিক নয়। কেউ এতে, বিভ্রান্ত হবেন না।’

খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতা এবং দীর্ঘায়ু কামনায় সোমবারও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠনের আয়োজনে দোয়া ও বিশেষ মোনাজাত হয়েছে। রোগ মুক্তি কামনায় ছাদকায়ে জারিয়া হিসেবে কেউ কেউ পশু জবাই করে গরিব দুস্থদের মধ্যে দান করেন।

দুপুরে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে দলের কেন্দ্রীয় নেতা মাহবুব ইসলামের বাসভবনে এক দোয়ার অনুষ্ঠানে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, সিসিইউতে আগের মতোই বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছে। তিনি কারও বক্তব্যে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া
বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ফাইল ছবি