Monday, December 28, 2009

বাংলাদেশের মূল স্রোতে মিশে যাওয়ার স্বপ্ন -উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী by নূর ইসলাম

বাংলাদেশে বসবাসরত উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর জীবনে ২৯ ডিসেম্বর, ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঐতিহাসিক এক অধ্যায়। এই প্রথমবারের মতো তারা বাংলাদেশের কোনো জাতীয় নির্বাচনে সরাসরি ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেল। এই জনগোষ্ঠীর জন্য এ এক অসামান্য অর্জন। অবশ্য এই প্রাপ্তির পেছনে অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে। কঠোর পরিশ্রম ও সমালোচনার মধ্যে এ জনগোষ্ঠীর একদল অগ্রদূতকে এ কাজ সমাধা করতে হয়েছে। তাদের নিরলস প্রচেষ্টা ও শ্রমের ফলে উর্দুভাষীরা আজ এ দেশের নাগরিক। মহামান্য আদালতের দু-দুটি রায়ে এ কথাই বলা হয়েছে যে, এ জনগোষ্ঠীর সবাই বাংলাদেশের নাগরিক এবং আর সব নাগরিকের মতো এরাও সমান অধিকার পাবে।
এবারই প্রথমবার উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছিল বলে নির্বাচনের আগে তাদের মধ্যে উত্সাহ-উদ্দীপনার কমতি ছিল না। নির্বাচনী প্রচারণায় সরগরম ছিল ক্যাম্পের জীর্ণ গলিগুলো। আর ওই পথ ধরে বাংলাদেশের খ্যাতনামা রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পদচারণে মুখর হয়ে উঠেছিল এই জনবসতিগুলো। নির্বাচনের পুরো সময়ে ক্যাম্পে ব্যতিব্যস্ত সময় কাটান নেতা-কর্মীরা। নির্বাচনী সভা-সমাবেশ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সুযোগ পায় তারা। আর সেই থেকে উন্মেষ ঘটে বাংলাদেশের সুনাগরিক হয়ে ওঠার স্বপ্নের। এই প্রথমবারের মতো নির্বাচনী ফলাফল শোনার জন্য অধীর আগ্রহে কেউ টেলিভিশনের সামনে, কেউ বা রেডিও হাতে পথে-দোকানে-ঘরে একাগ্রচিত্তে মগ্ন থাকে। এ নিয়ে বিবিসিতে একটি প্রামাণ্যচিত্রও প্রচারিত হয়েছে। নির্বাচনের আগে ও পরে উর্দুভাষীদের বিভিন্ন সংগঠন রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতাদের সঙ্গে তাদের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে। রাজনৈতিক দলগুলোও জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের স্বার্থে নানা পরিকল্পনার কথা বলে। সেসব শুনে নিজেদের উন্নয়নার্থে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিপুল সংখ্যায় নির্বাচনে অংশ নেয়।
বাংলাদেশে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর ক্যাম্পের সংখ্যা এবং সেই সঙ্গে সমস্যা কম নয়। ঢাকার বাইরের; বিশেষ করে সৈয়দপুর, রংপুর, ময়মনসিংহ ও আদমজীর ক্যাম্পগুলো নানা সমস্যায় জর্জরিত। এই ক্যাম্পগুলোর আর্থসামাজিক অবস্থাও ঢাকার ক্যাম্পগুলোর তুলনায় সঙ্গিন। মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প ঢাকার উর্দুভাষীদের অন্যতম জনবসতি। এই ক্যাম্পে হাজারো সমস্যার মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হচ্ছে পানি, পয়োনিষ্কাশন ও আবাসন। স্বাস্থ্যসেবার সুযোগও নেই বললেই চলে। চরম ঘনবসতিতে বসবাস করতে হচ্ছে হাজার হাজার মানুষকে। আট ফুট বাই ১০ ফুট ঘরগুলোয় বসবাস করতে হয় আট থেকে ১০ জন, কখনো কখনো তার চেয়েও বেশি মানুষকে। বাংলাদেশের সব ক্যাম্পের চিত্রই কমবেশি এ রকম। ১৯৯০ সালের ‘রাবেতা আল আলামে আল ইসলামী’ ও এসপিজিআরসির জরিপের সময় যেসব পরিবারের সদস্য ছিল ছয়জন, ২০০৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ জনে। ১৯৯০ সালে আট ফুট বাই ১০ ফুট ঘরে বাস করত একটি পরিবার। এখন সেখানে দুই থেকে তিনটি পরিবার, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার চেয়েও বেশি পরিবার একসঙ্গে বসবাস করতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির আনুপাতিক হারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে এ জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যাও। সত্যি বলতে কি, ক্যাম্পগুলো সম্পর্কে সঠিক পরিসংখ্যানের অভাব প্রকট। বিভিন্ন সংখ্যা ও তথ্য-উপাত্ত নিয়েও বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে রয়েছে দ্বিমত। ফলে জেনেভা ক্যাম্পের লোকসংখ্যা এখন কত এবং কতগুলো পরিবার এখানে বসবাস করছে, তা বলা কঠিন।
মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পটি যে সংসদীয় আসনে পড়েছে, গত নির্বাচনে সেখান থেকে জয়ী হয়েছেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী জাহাঙ্গীর কবির নানক। নির্বাচনের আগে তিনি তাঁর এলাকার ক্যাম্পগুলোয় প্রচারণা চালান। সে সময় তিনি বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে দেখেন এবং ক্যাম্পগুলোর সমস্যা সম্পর্কে অবহিত হন। কয়েক মাস আগে জেনেভা ক্যাম্পের বাজারে এক ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। তাতে বহু দোকানঘর একেবারে পুড়ে যায়। জাহাঙ্গীর কবির নানক অগ্নিকাণ্ডের সময়ে সশরীরে উপস্থিত থেকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছিলেন। পরে ক্ষতিগ্রস্ত দোকানদারদের তিনি আর্থিক সাহায্যও দেন।
এসব কার্যক্রম দেখে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী এখন অনেক আশাবাদী। তারা মনে করছে, অদূর ভবিষ্যতে তাদের সমস্যার সমাধান হবে; তাদের সন্তানেরা সুন্দর ভবিষ্যত্ গড়ে তুলতে পারবে। আমরা উপলব্ধি করি, অতীতে এ দেশের মূল স্রোত থেকে এ জনগোষ্ঠীর বিচ্ছিন্ন থাকার প্রবণতাও ধীরে ধীরে মুছে যাবে এবং তারা মূল স্রোতে একীভূত হবে। পূর্ব-অভিজ্ঞতা ও সদ্য লব্ধ নাগরিকতার মধ্য দিয়ে উন্নয়নের সঠিক পথ তাদের বেছে নিতে হবে। উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীকে কেবল সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকলে চলবে না, তাদের নিজেদেরও সচেতন হতে হবে। তাদের নিজেদের মধ্যে সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে, গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে মতৈক্যে পৌঁছাতে হবে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে হবে। তাদের জন্য এখন যা সবচেয়ে জরুরি, তা হলো, নিজেদের উন্নয়ন তথা বাংলাদেশে পুনর্বাসনের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা।
এমন অবস্থায় সরকারের কাছে উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর প্রধান দাবি, মর্যাদার সঙ্গে বাংলাদেশে তাদের পুনর্বাসন। জনগোষ্ঠীর সঠিক পরিসংখ্যান ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এ বিষয়ে একটি গঠনমূলক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকার তিন যুগেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা এ সমস্যার সমাধান করবে বলে তারা আশাবাদী। গত এক বছরে পত্রপত্রিকায় নানা পরিকল্পনার কথা শোনা গেছে। এমনকি প্রয়াত উর্দুভাষী নেতা নাসিম খানের মৃত্যুবার্ষিকীতে জেনেভা ক্যাম্পের এক সভায় স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের উচ্চমহলে বৈঠকের কথা বলেছেন। এটি সরকারের ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করে। সবাই আশা করছে, এ কার্যক্রম আলোর মুখ দেখবে এবং উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী অন্ধকার পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এসে এ দেশের মূল উন্নয়নের ধারায় নিজেদের যুক্ত করতে পারবে। সবার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে তারাও বলতে পারবে—এ মাটি আমার, এ দেশ আমার, আমি এ দেশেরই মানুষ।
নূর ইসলাম: বাংলাদেশের উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর একজন সদস্য।
islam.bp@gmail.com

তথ্য অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতার অভাব রয়েছে -বিশেষ সাক্ষাত্কার by এম আজিজুর রহমান

প্রধান তথ্য কমিশনার এম আজিজুর রহমানের জন্ম ১৯৪৩ সালে ফরিদপুরের মাদারীপুরে। ১৯৬১ সালে তিনি ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। একই বছর তিনি তত্কালীন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন। ১৯৮৫ সালে যুক্তরাজ্যের কুইন ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব ম্যানচেস্টার থেকে জনপ্রশাসন ও পল্লি উন্নয়ন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০১ সালে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে অবসর নেন। তিনি এ বছরের এপ্রিল মাসে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ পাস এবং তারপর তিন সদস্যবিশিষ্ট তথ্য কমিশন গঠিত হলে প্রথম প্রধান তথ্য কমিশনার হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন জুলাই মাসে। আজিজুর রহমান আজিজ নামে কবিতা, গান, গল্প, উপন্যাস ও নাটক লেখেন তিনি।
সাক্ষাত্কার নিয়েছেন মশিউল আলম

প্রথম আলোতথ্য অধিকার আইন পাস হয়েছে, তথ্য কমিশন গঠিত হয়েছে, আপনারা তিনজন কমিশনার নিয়মিত অফিস করছেন। কিন্তু নাগরিকেরা এই আইন কতটা ব্যবহার করছে, সে বিষয়ে তেমন কোনো সাড়া লক্ষ করা যাচ্ছে না। আপনারা কী লক্ষ করছেন?
এম আজিজুর রহমান  আমরা এ লক্ষ্যেই আসলে কাজ করছি। কিন্তু লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে যেসব প্রারম্ভিক কাজ সম্পন্ন করতে হয়, সেগুলো আমরা প্রথম গুছিয়ে নিচ্ছি।
প্রথম আলোযেমন?
এম আজিজুর রহমান  যেমন, এখন আমরা একটি অস্থায়ী অফিসে কাজ করছি। এ অফিসের পরিসর খুবই সামান্য। এই স্বল্প পরিসর অফিসে আমাদের কাজ করতে হচ্ছে ততোধিক স্বল্পসংখ্যক জনবল নিয়ে। অবশ্য ইতিমধ্যে আমরা আরও একটি বৃহত্ পরিসরে অফিস স্থাপনের কাজ হাতে নিয়েছি। সুখের কথা, এ মাসের মধ্যেই আমরা প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তৃতীয় তলায় আট হাজার বর্গফুটের একটি স্থানে এ অফিস স্থানান্তর করতে সক্ষম হব। পাশাপাশি আমরা সরকারের কাছে তথ্য কমিশনের নিজস্ব ভবন নির্মাণের উদ্দেশ্যে এক বিঘা জায়গার জন্য আবেদন করেছি। সরকারের গণপূর্ত মন্ত্রণালয় রাজধানীর আগারগাঁওয়ে একটি সমপরিমাণ প্লট বরাদ্দের আশ্বাস দিয়েছে এবং সে লক্ষ্যে কার্যক্রম চলছে।
প্রথম আলোতথ্য কমিশনের সাংগঠনিক কাঠামোর কী অবস্থা?
এম আজিজুর রহমান  তথ্য কমিশন দায়িত্ব গ্রহণ করার পরই সাংগঠনিক কাঠামো কী হবে, এর কোনো দিকনির্দেশনা না থাকায়, আইনে বা অন্য কোথাও এর উল্লেখ নেই বিধায় আমরা নিজেরাই একটি সাংগঠনিক কাঠামো ও লজিস্টিকসের প্রয়োজনীয় খসড়া তৈরি করেছি। সরকার তা অনুমোদন করেছে। তবে এর জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় রেখে কমিশন কাজ করে যাচ্ছে; বিশেষ করে, তাদের বসার জায়গার অভাব রয়েছে বলে এখনই জনবল নিয়োগ করা হচ্ছে না। নতুন কার্যালয়ে যাওয়ার পর জনবল নিয়োগ করা হবে। ইতিমধ্যে সরকার তথ্য কমিশনের চাহিদা মোতাবেক একজন সচিব, একজন উপসচিব, একজন উপপরিচালক, একজন সহকারী অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং একজন অফিস সুপার কমিশনের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। এর বাইরে প্রধান তথ্য কমিশনারের প্রাধিকারবলে প্রাপ্ত জনবল কমিশনের কাজ করে যাচ্ছে।
প্রথম আলো এ মুহূর্তে তথ্য কমিশনের মোট জনবল কত?
এম আজিজুর রহমান  ৭৭ জন।
প্রথম আলোকমিশনের মূল কাজ শুরু করতে তো একটি বিধিমালা প্রয়োজন। কিছুদিন আগে আপনার কাছেই জেনেছিলাম, বিধিমালা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন কী অবস্থা?
এম আজিজুর রহমান  বিধিমালা অনুমোদিত হয়ে গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু কারিগরি ত্রুটির কারণে এটি এখনো প্রচার করা হয়নি।
প্রথম আলোপ্রবিধান তৈরি করা হয়েছে?
এম আজিজুর রহমান  প্রবিধানমালার চূড়ান্ত খসড়া আজই মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর চেষ্টা চলছে।
প্রথম আলোসরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, পরিদপ্তরসহ সব পর্যায়ের সব কর্তৃপক্ষের তথ্য কর্মকর্তা নিয়োগ করার কথা, যাঁদের কাছে নাগরিকেরা তথ্য চেয়ে আবেদন করবে। তথ্য কর্মকর্তা বা তথ্য দেওয়ার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগের ক্ষেত্রে কতটা অগ্রগতি হলো?
এম আজিজুর রহমান  কৃষি ও তথ্য মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চসংখ্যক তথ্য কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছে এবং কমিশনকে জানিয়েছে। অন্য মন্ত্রণালয়গুলোর তথ্য কর্মকর্তা নিয়োগ এখনো শেষ হয়নি।
প্রথম আলোমানুষ তথ্য চেয়ে বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করছে কি না?
এম আজিজুর রহমান  এই পাঁচ মাসে আমাদের কাছে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি আবেদন এসেছে।
প্রথম আলোআপনাদের কাছে? তথ্য চেয়ে আবেদন করেছে তথ্য কমিশনের কাছে?
এম আজিজুর রহমান  হ্যাঁ। যেসব আবেদন করার কথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তাদের কাছে, কিন্তু কয়েক ব্যক্তি সেগুলো করেছেন আমাদের কাছে।
প্রথম আলোতার মানে, তাঁরা জানেন না তথ্য কমিশনের কাজ কী?
এম আজিজুর রহমান  এ থেকে এটাই প্রতীয়মান হচ্ছে, তথ্য কমিশনের কাজ যে তথ্য দেওয়া নয়, এ বিষয়ে জনসাধারণের মধ্যে সম্যক ধারণার অভাব আছে। এই অভাব দূর করতেই কমিশন ১৪টি জেলা ও উপজেলায় গিয়ে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের সঙ্গে বসে জন-অবহিতকরণ সভার আয়োজন করেছে। সেসব সভায় তথ্য অধিকার আইনের যথাযথ ব্যাখ্যা, জনগণের কী করণীয়, কর্মকর্তাদের কী করণীয় ইত্যাদি বিষয়ে বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অন্যান্য জেলা-উপজেলায়ও এ ধরনের জন-অবহিতকরণ সভার আয়োজন করা হচ্ছে। এটি তথ্য কমিশন কর্মসূচির একটি চলমান প্রক্রিয়া।
প্রথম আলোকমিশনের কি আর্থিক কোনো অসুবিধা আছে?
এম আজিজুর রহমান  না। প্রথম দুই মাসে যদিও কোনো অর্থ বরাদ্দ ছিল না, কিন্তু এর পর থেকেই কমিশন যখন যে পরিমাণ অর্থ চেয়েছে, থোক বরাদ্দ হিসেবে তা পেয়েছে।
প্রথম আলোএ পর্যন্ত আপনারা কত টাকা পেয়েছেন?
এম আজিজুর রহমান  চলতি অর্থবছরের জন্য ১১ কোটি ৭১ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছে, এ পর্যন্ত পাঁচ কোটি পেয়েছি, বাকিটাও সঠিক সময়ে পেয়ে যাব।
প্রথম আলোকী কাজে অর্থ ব্যয় হচ্ছে মূলত?
এম আজিজুর রহমান  কমিশনের ৭৭ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা, যানবাহন, ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি ইত্যাদি ক্রয়...।
প্রথম আলোজন-অবহিতকরণের কাজটি তথ্য কমিশনের একার পক্ষে করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে আর কার কী করার আছে বলে আপনি মনে করেন?
এম আজিজুর রহমান  এটা প্রথমত সরকার করবে। সরকার সে কাজটি শুরু করে দিয়েছে। তথ্য কমিশন দায়িত্ব গ্রহণের আগে থেকেই তথ্য মন্ত্রণালয় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের সম্পর্কে ডেটাবেজ তৈরির কাজ শুরু করেছে এবং জন-অবহিতকরণের কাজটিও তারা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটও তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে প্রশিক্ষণার্থীদের অবহিত করছে, যাঁরা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে গিয়ে এই আইন সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করতে পারেন। এমনকি তথ্য কমিশনের পক্ষ থেকে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত্ করে অনুরোধ করা হয়েছে, স্কুল-কলেজে শিক্ষকেরা ক্লাস শুরুর আগে যেন শিক্ষার্থীদের সামনে তথ্য অধিকার আইন সম্পর্কে বক্তব্য দেন। ভবিষ্যতে তথ্য অধিকার আইনকে সমাজবিজ্ঞানের একটি অংশের অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না, আমরা সে বিষয়েও বিবেচনা করতে বলেছি।
প্রথম আলোতথ্য অধিকার আইনের একটি ধারায় লেখা আছে, কর্তৃপক্ষগুলো নিজ উদ্যোগেও তথ্য প্রকাশের উদ্যোগ নেবে। আপনারা কি জানেন, কর্তৃপক্ষগুলো সেটা করছে কি না?
এম আজিজুর রহমান  হ্যাঁ, অনেক জায়গায় এটা শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে সার্বক্ষণিক তথ্যকেন্দ্র খোলা হয়েছে। তাঁরা অন্যান্য অফিসের সঙ্গেও কম্পিউটারের মাধ্যমে সংযুক্ত। তাঁরা সিটিজেনস চার্টার সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করছেন। পুলিশ সুপারের অফিসগুলোয়ও আমরা তথ্যকেন্দ্র খুলতে বলেছি।
প্রথম আলোভূমি অফিস, আদালত, দুদক—এসব সংস্থা থেকে তথ্য পাওয়ার বিষয়গুলো কি আগের চেয়ে সহজ হয়েছে?
এম আজিজুর রহমান  জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যে তথ্যকেন্দ্র খোলা হয়েছে, তা ভূমি অফিসসহ জেলার সব সরকারি দপ্তরের সঙ্গে সংযুক্ত আছে। একই জায়গা থেকে সব দপ্তরের তথ্য পাওয়া সম্ভব। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে ওয়েবসাইট আছে, ওয়েবসাইটেও অনেক তথ্য পাওয়া যায়। আমরা মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, সব মন্ত্রণালয়সহ অন্যান্য কর্তৃপক্ষকে বলেছি, তারা যেন শিগগিরই নিজ নিজ তথ্য কর্মকর্তা নিয়োগ করে। এ বিষয়ে আমরা তাগিদ দিয়ে চলেছি। সেই সঙ্গে আমরা বলেছি, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে যাঁদের নিয়োগ করা হবে তাঁদের নাম, ঠিকানা, ফোন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা ইত্যাদি তথ্য সম্পর্কে আমাদের অবহিত করার জন্য। অনেকগুলো পেয়েছি, দুদকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম এখনো পাইনি।
প্রথম আলো দুদককে কি আপনারা নিজ উদ্যোগে তথ্য প্রকাশের জন্য বলেছেন?
এম আজিজুর রহমান  আমরা তো দুদককে বলব না, আমরা বলব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে। আমরা সরকারি কর্মকমিশনকে বলব না, বলব সংস্থাপন মন্ত্রণালয়কে। একইভাবে আমরা নির্বাচন কমিশনকে বলব না, বলব প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়কে। অর্থাত্ স্বাধীন কমিশনগুলো সরকারের যে যে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যুক্ত, তাদের বলব।
প্রথম আলোকোনো কর্তৃপক্ষের কাছে কোনো তথ্য চাওয়া হয়নি?
এম আজিজুর রহমান  আমরা অনানুষ্ঠানিকভাবে জানতে পেরেছি, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে নবীনগর থেকে এক ব্যক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে সব দপ্তর-অধিদপ্তরের কে কবে, কখন সিলেকশন গ্রেড পেয়েছেন, পারসোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকে পারসোনাল অফিসার হয়েছেন এবং কারা বাদ পড়েছেন, তা জানতে চেয়েছেন। কিন্তু সেই আবেদনপত্রে প্রেরকের নাম-ঠিকানা নেই।
প্রথম আলোভারতে তথ্য অধিকার আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সে আইন ব্যবহারে ব্যাপক সাড়া পড়েছিল। সে দেশের তথ্য কমিশনে আপিল আবেদনের পাহাড় জমে উঠেছিল তিন মাসের মধ্যে। ভারতীয় প্রধান তথ্য কমিশনার ওজাহাত হাবিবুল্লাহ দায়িত্ব নেওয়ার মাস ছয়েক পর ঢাকা সফরে এলে তাঁর কাছে জানতে পেরেছিলাম, তথ্য কমিশন হাজার হাজার আপিলের শুনানি করতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে তথ্য অধিকার আইন কার্যকর হওয়ার পর পাঁচ মাস পেরিয়ে গেছে। আপনাদের কাছে আপিল আসা পরের কথা, লোকজন তথ্য চেয়ে আবেদন করছে, এমন খবরও তো পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
এম আজিজুর রহমান  ভারতে তথ্য অধিকার আইনের দাবিতে বেশ কয়েক বছর ধরে অনেক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে। বর্তমান তথ্য অধিকার আইনের আগে তারা একটি আইন করেছিল ফ্রিড অব ইনফরমেশন অ্যাক্ট নামে। আইনটিতে অনেক ঘাটতি থাকায় তা বাতিল করে নতুনভাবে তথ্য অধিকার আইন নামে একটি আইনের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। এ নিয়ে ভারতজুড়েই বেশ একটা আলোড়ন চলেছে বেশ কয়েক বছর ধরে। এভাবে এ বিষয়ে জনগণের মধ্যে তথ্য অধিকারের বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা গড়ে উঠেছে। এ ছাড়া ভারতে তথ্য অধিকার আইনের দাবিটা প্রথমে উঠে আসে একদম তৃণমূল পর্যায় থেকে। আমাদের দেশে সে রকম ঘটেনি। এ দেশে তথ্য অধিকারের বিষয়টি সীমাবদ্ধ ছিল মূলত রাজধানীর মধ্যেই। আর এটা নিয়ে বলেছেন প্রধানত শিক্ষিত শহুরে নাগরিক সমাজ: সাংবাদিক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, আইনজীবী, উন্নয়নকর্মীরা। সে কারণেই তথ্য অধিকার আইন বা সামগ্রিকভাবে তথ্য অধিকার সম্পর্কে জনসাধারণের মধ্যে সম্যক ধারণার অভাব রয়েছে। আমাদের সবাইকে কাজ করতে হবে এ অভাব দূর করার লক্ষ্যে। জনগণ যখন জানতে পারবে, ক্ষমতায়িত হওয়ার কী অপূর্ব এক আইনি হাতিয়ার তারা পেয়েছে, তখন তারা অবশ্যই আর বসে থাকবে না। তথ্য অধিকার আইনের ব্যাপক ব্যবহার তখন অবশ্যই শুরু হবে।
প্রথম আলোআমরা শেষ করছি। কোনো প্রসঙ্গ বাকি থেকে গেল কি?
এম আজিজুর রহমান  এটুকু যোগ করতে চাই যে তথ্য কমিশন প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকেই তথ্যমন্ত্রী ও তথ্যসচিব যেভাবে প্রতিষ্ঠানটিকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করছেন, আমাদের সহযোগিতা দিচ্ছেন, তাতে কমিশন বিশ্বাস করে যে ঈপ্সিত সময়ের আগেই কমিশনের কর্মতত্পরতা দেশব্যাপী পরিচালনা করতে সক্ষম হবে। এ ছাড়া কমিশন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাত্কালে তথ্য কমিশনকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠার যে অভিপ্রায় তাঁরা উভয়ে ব্যক্ত করেছেন, তাতে কমিশন আশান্বিত যে দেশ থেকে দুর্নীতি ধীরে ধীরে কমিয়ে আনতে, রাষ্ট্র ও সরকারের সব কাজে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার জন্য আইন অনুযায়ী তথ্য কমিশন পরিচালিত হতে সক্ষম হবে। ফলে দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠিত হবে, সাধারণ নাগরিকদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে গণতন্ত্র সুসংহত হবে।
প্রথম আলো  আপনাকে ধন্যবাদ।
এম আজিজুর রহমান  আপনাকেও ধন্যবাদ। আবার আসবেন। তথ্য কমিশনের দরজা সবার জন্য সব সময় খোলা।

সাংসদকে বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা -ব্যয়ের উত্স খুঁজে বের করা প্রয়োজন

বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে যোগদানের কৃতিত্ব জাহির করতে নিজ নির্বাচনী এলাকায় বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা নিয়েছেন একজন সরকারদলীয় সাংসদ। গত শুক্রবার বরগুনা-২ আসনের সাংসদ গোলাম সবুরকে সংবর্ধনা জানাতে বেতাগী, বামনা, পাথরঘাটায় ব্যাপক ও ব্যয়বহুল আয়োজন করা হয়। তিনি একা নন, তাঁর সঙ্গে সংবর্ধিত হয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী ওয়াহিদুর রহমানও। বরগুনার প্রতিটি উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যানদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে এই সংবর্ধনার আয়োজন চাঁদাবাজি ছাড়া কিছু নয়।
এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী একজন সরকারি কর্মকর্তা। জনগণের করের পয়সায় তাঁর বেতন-ভাতা গুনতে হয়। সে ক্ষেত্রে তাঁকে সংবর্ধনার কী যুক্তি থাকতে পারে? আর এই সংবর্ধনার সঙ্গে যখন উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউপি চেয়ারম্যানদের সঙ্গে ঠিকাদারদের নাম যুক্ত হয়, তখন বুঝতে অসুবিধা হয় না যে অর্থ কোথা থেকে এসেছে, কেনই বা তাঁরা সংবর্ধনা দিতে এত উত্সাহী হয়েছেন। চারদলীয় জোট সরকারের আমলে যখন মন্ত্রী ও সাংসদেরা সাড়ম্বরে সংবর্ধনা নিচ্ছিলেন, কেউ কেউ মাথায় সোনার মুকুট পরেছিলেন, তখন আওয়ামী লীগের নেতারা কঠোর ভাষায় এর সমালোচনা করেন। আজ দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগ দিনবদলের অঙ্গীকার নিয়ে ক্ষমতায় এলেও সাংসদেরা মোটেই বদলাননি।
সাংসদ গোলাম সবুর বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে যোগ দিয়েছিলেন বৈশ্বিক পরিবেশ রক্ষায়। কিন্তু তিনি সংবর্ধনার নামে পথে পথে তোরণ নির্মাণ করিয়ে দেশের; আরও নির্দিষ্ট করে বললে তাঁর নির্বাচনী এলাকার পরিবেশ যে নষ্ট করলেন, এর জবাব কী?
সাংসদের দায়িত্ব এলাকার জনগণের জন্য কাজ করা, স্থানীয় প্রশাসন ঠিকমতো সরকারের কর্মসূচি পালন করছে কি না, তা তদারক করা। যাঁর কাজের তদারক তিনি করবেন, তাঁকে সঙ্গে নিয়েই যদি সংবর্ধনা নেন, তাহলে জবাবদিহি আসবে কীভাবে! সংবর্ধনার সংস্কৃতি থেকে মন্ত্রী-সাংসদদের কাজের সংস্কৃতিতে ফিরে আসতে হবে। অন্যথায় তাঁদের দিন বদলালেও জনগণের ভাগ্য বদল হবে না।

এনজিওর বৈধ-অবৈধ বিস্তার -এই খাত শৃঙ্খলা ও জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না

এনজিও মাত্রই জনসেবায় নিয়োজিত, বেসরকারি সংস্থা মানেই অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, প্রায় চার দশকের অভিজ্ঞতায় এ কথা বলার আর জো নেই। জনস্বার্থে কাজ করার পাশাপাশি এনজিও নামের বিষয়টি অনেক অসাধু উদ্দেশ্যেও ব্যবহূত হতে দেখা গেছে। সে কারণেই বেসরকারি সংস্থা তথা এনজিও প্রতিষ্ঠা, পরিচালনাসহ এর সার্বিক কার্যক্রমের ওপর দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষের নজর থাকার প্রয়োজনের কথা নাগরিক মহল থেকে বারবার উচ্চারিত হয়েছে। এই চাওয়া যে অহেতুক ছিল না, তা বোঝা যায় গত বৃহস্পতিবারের প্রথম আলোর শিরোনামে। সংবাদটি বলছে, দেশে বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট আড়াই হাজার এনজিওর মধ্যে এক হাজার ৩০৯টিই অবৈধভাবে চলছে। এগুলো হয় কখনো নিবন্ধিতই হয়নি, অথবা তাদের নিবন্ধনের মেয়াদ ফুরিয়ে গেলেও নবায়ন করা হয়নি।
যে দেশে অনিবন্ধিত অবস্থায় প্রাথমিক বিদ্যালয় চালানোও কঠিন, সেখানে এত বিপুলসংখ্যক এনজিও কীভাবে নিবন্ধন ছাড়াই দেশময় কাজ চালাতে পারছে, তা বোধগম্য নয়। বিশেষত, যখন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, এমনকি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঢাল হিসেবে অনেক এনজিওকে ব্যবহূত হতে দেখা গেছে। আর্থিক প্রতারণা, দারিদ্র্য ব্যবসা থেকে শুরু করে জঙ্গিবাদী কার্যকলাপের কৌশলী হাতিয়ার হিসেবে এনজিওর ব্যবহার যখন আর অজানা বিষয় নয়, তখন বিষয়টিকে মোটেই খাটো করে দেখার উপায় নেই। ১৯৭৮ সাল থেকে এনজিও রেগুলেশন রুলস নামের একটি আইন বিদ্যমান। জরুরি এই প্রসঙ্গটি উপেক্ষিত থাকা মোটেই ভালো কাজ হয়নি।
তবে ফেডারেশন অব এনজিওস অব বাংলাদেশের (এফএনবি) ভাষ্য হচ্ছে, এনজিওবিষয়ক ব্যুরো নিবন্ধন করার উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ নয়। এখানে নিবন্ধিত না হওয়া অনেক এনজিওই সমাজসেবা অধিদপ্তর কিংবা অন্য কোথাও নিবন্ধিত রয়েছে। তাঁদের মতে, এনজিওবিষয়ক ব্যুরোর কাজ বৈদেশিক অর্থসাহায্য ছাড় করানো। কিন্তু যেহেতু উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও অধিকার প্রশ্নে এনজিও খাতের বিরাট ভূমিকা রয়েছে, সেহেতু একটি বিভাগ থেকেই সামগ্রিক সমন্বয় হওয়া প্রয়োজন; বিশেষ করে, বিদেশি অর্থসাহায্যের ব্যবহার আইনানুগভাবে ঘোষিত উদ্দেশ্যে হচ্ছে কি না, দুর্নীতি হচ্ছে কি না এবং সর্বোপরি দেশবিরোধী কাজে এই অর্থ ব্যবহূত হচ্ছে কি না, এর তদারকির প্রয়োজন রয়েছে।
এই তদারকি কেবল ছোট এনজিওর বেলাতেই নয়, বিরাটাকারের দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় এনজিওর বেলায়ও প্রয়োজন। বিভিন্ন সময় অনেক খ্যাতনামা এনজিওর কাজের সমালোচনা গণমাধ্যমে আসতে দেখা গেছে। তবে নিয়মবদ্ধ বা নিবন্ধিত করার নামে এ ক্ষেত্রে যেন সরকারি খবরদারি চলে না আসে।

রোমের নিয়ন্ত্রণ নিতে সংঘবদ্ধ হচ্ছে ইতালির চারটি মাফিয়া গোষ্ঠী -অপরাধ দমনের প্রতিশ্রুতি প্রধানমন্ত্রীর

ইতালির প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বারলুসকোনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাঁর সরকার ২০১৩ সালের মধ্যে দেশের সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রকে দমন করবে। গত বৃহস্পতিবার ইতালির জাতীয় বেতার মাধ্যমে এ প্রতিশ্রুতির কথা জানান তিনি। এদিকে রাজধানী রোমের ব্যবসা ও অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নিতে ইতালির মাফিয়া গোষ্ঠীগুলো সংঘবদ্ধ হচ্ছে বলে সতর্কবার্তা জানিয়েছেন বিশ্লেষকেরা। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ইতালির অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর কার্যক্রমের ওপর নজরদারি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান ‘লিবেরা ইনফরমািসওন’ এই সতর্কবার্তা জানায়। খবর ডেইলি টেলিগ্রাফ ও বিবিসির।
বারলুসকোনি বলেন, ‘মাফিয়া একটি রোগের মতো। সরকারের চলতি মেয়াদের মধ্যেই এই অপরাধী চক্রকে চিরকালের জন্য দমন করতে চাই আমরা।’ দেশের ইতিহাসে আর কোনো সরকার এত আন্তরিকতা নিয়ে মাফিয়াদের দমনের জন্য কাজ করেনি বলেও দাবি করেন তিনি। অবশ্য চলতি মাসের শুরুতে মাফিয়াবিষয়ক এক তথ্যদাতা গাসপারে স্পাতুজ্জা অভিযোগ করেন, সিসিলির একজন মাফিয়া নেতার সঙ্গে বারলুসকোনির ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। ওই অভিযোগ অস্বীকার করে বারলুসকোনির একজন মুখপাত্র তখন বলেছিলেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতেই এই অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
এদিকে গবেষণা প্রতিবেদনে লিবেরা ইনফরমািসওনের বিশ্লেষকেরা জানান, অপরাধী চক্রের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ ইতালির চারটি মূল অপরাধী গোষ্ঠী—সিসিলির কোসা নেস্ত্রা, কাম্পানিয়ার কামোরা, কালাব্রিয়ার এনদ্রাঘেতা ও পুগলিয়ার কোরোনা ইউনিতা এখন নিজেদের মধ্যে বিভেদ ভুলে রোমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সংঘবদ্ধ হচ্ছে। এতে বলা হয়, এই অপরাধী গোষ্ঠী অনেক বেশি ব্যবসায়ী মনোভাবাপন্ন। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়ার প্রচলিত প্রথার বাইরে এসে নিজেরাই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করার উদ্যোগ নিয়েছে তারা। এ জন্য মাফিয়ারা উত্তরে এসে ব্যবসা করার নতুন কার্যপদ্ধতিও তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, নতুন উদ্যোগের অংশ হিসেবে এসব অপরাধী চক্র বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান কিনে নিচ্ছে বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। চলতি বছরের শুরুতে রোমের একটি সুপরিচিত রেস্তোরাঁ কাফে ডি প্যারিসে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযোগ ছিল প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনা করছে মাফিয়া গোষ্ঠী এনদ্রাঘেতা।
গবেষক গিতানো লিয়ার্দো বলেন, মাফিয়ারা রোমের রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করছে এবং অপরাধকে ভিন্ন প্রক্রিয়ায় এগিয়ে নিচ্ছে। রোমের উত্তরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ফিউমিচিনো ও সমুদ্রবন্দর সিভিতাভেচ্চিয়া মাদক পাচারের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, দক্ষিণ ইতালির সঙ্গে পাল্লা দিয়েই চলছে রোমের অপরাধ কর্মকাণ্ড। গত শতকের সত্তরের দশকে রোমে মাফিয়াদের উপস্থিতি কম ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অপরাধীদের ক্ষমতা ও প্রতিপত্তি বেড়ে যাওয়ায় তাদের অপরাধের পরিধিও বাড়িয়ে দিয়েছে। পতিতাবৃত্তি, মাদক পাচার, ভোগ্যপণ্যের পাচার ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের ক্ষেত্রে তাদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। আর এসব অবৈধ ব্যবসার প্রসারের ক্ষেত্রে দক্ষিণ ইতালির অপরাধী চক্র এখন রোমের বিদেশি অপরাধীদের সঙ্গেও আঁতাত করছে বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এসব বিদেশি অপরাধী চক্রের মধ্যে রয়েছে রুশ, চীনা, আলবেনিয়া ও রুমানিয়ার সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র।
গত জুলাই মাসে পুলিশ সাতজন মাফিয়া সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তারা বিখ্যাত ফুটবল ক্লাব লািসওকে কেনার চেষ্টা করছিল। রোমের মাফিয়াবিরোধী পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের তদন্তে জানা গেছে, ২০০৫ ও ২০০৬ সালের দিকে উয়েফা কাপ ও ইতালিয়ান কাপ টুর্নামেন্টে লািসওর স্পন্সর হওয়ার জন্য ২০ লাখ ইউরো দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল মাফিয়ারা।
এই সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের অর্থের অভাব নেই জানিয়ে আরেকটি ইতালীয় পরামর্শক সংস্থা ইউরিসপেস জানায়, ২০০৮ সালে সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র ১৩ হাজার কোটি ইউরো আয় করেছে। এই আয়ের অর্ধেকই এসেছে মাদক ব্যবসার মাধ্যমে।

লাদেনের এক মেয়ে এখন তেহরানে সৌদি দূতাবাসে!

আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনের এক মেয়ে তেহরানে সৌদি দূতাবাসে অবস্থান করছেন। ওই দূতাবাসের পক্ষ থেকে তেহরান কর্তৃপক্ষকে এ তথ্য জানানো হয়েছে। সূত্র আরও জানিয়েছে, লাদেনের মেয়ে ইরান ত্যাগ করতে যাচ্ছেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মানুশেহের মোত্তাকির বরাত দিয়ে গতকাল শুক্রবার দেশটির সরকারি সংবাদ সংস্থা এ তথ্য দিয়েছে।
লাদেনের কয়েকজন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ইরানে অজ্ঞাত স্থানে অবস্থান করছেন—টাইমস পত্রিকায় এমন প্রতিবেদন প্রকাশের এক দিন পরই পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওই তথ্য প্রকাশ করলেন। টাইমস জানায়, ইমান (১৭) নামে লাদেনের এক মেয়ে সম্প্রতি তেহরানের সৌদি দূতাবাসে আশ্রয় নিতে যান। ইমান ইরান ত্যাগের অনুমতি চেয়ে এখন দূতাবাসেই অবস্থান করছেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোত্তাকি গত বৃহস্পতিবার ইরানের সরকারি টেলিভিশনকে বলেন, ‘কয়েক দিন আগে সৌদি দূতাবাস আমাদের জানায়, লাদেনের এক মেয়ে তাদের ওখানে রয়েছেন।’ মোত্তাকি আরও বলেন, ‘মেয়েটি কী করে ওই দূতাবাসে ঢুকল আর ইরানেই বা কী করে এল, এ ব্যাপারে আমরা কিছুই জানি না। মেয়েটির সত্যিকারের পরিচয় আমাদের জানা নেই। সত্যিকার পরিচয় পাওয়া গেলে যথাযথ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁর ইরান ত্যাগে কোনো বাধা থাকবে না।’ ইরানে অবস্থানরত লাদেনের অন্য আত্মীয়দের খবরের ব্যাপারে কোনো কথা বলেননি মোত্তাকি।

পিয়ংইয়ং ফের পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালাতে পারে -দ. কোরীয় গবেষণা প্রতিষ্ঠানের ভাষ্য

নিজেদের ক্ষমতা জাহির করতে উত্তর কোরিয়া আগামী বছর আবারও পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালাতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার সরকারি প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বরাত দিয়ে সিউলের একটি সংবাদ সংস্থা গতকাল শুক্রবার এ তথ্য জানায়।
‘দ্য কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স অ্যানালাইসিস’-এর উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদ সংস্থা ইউনহ্যাপের খবরে জানানো হয়, পিয়ংইয়ং পরমাণু শক্তিধর দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি আদায় করতে ওই পরমাণু পরীক্ষা চালাতে পারে। সেই সঙ্গে বেশ কয়েকটি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনাও তাদের রয়েছে। কমিউনিস্ট ওই দেশটি তাদের পরমাণু অস্ত্র লাভের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করবে না।
পিয়ংইয়ং ২০০৬ সালে প্রথমবারের মতো পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। এরপর গত মে মাসেও দ্বিতীয় দফা তারা পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়। প্রতিরক্ষা গবেষণা প্রতিষ্ঠানটির দাবি, দ্বিতীয় পরীক্ষাটি আগেরটির তুলনায় ছিল অন্তত পাঁচ গুণ বেশি শক্তিশালী। দেশটি তৃতীয়বার পরীক্ষায় সফল হলে তা আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে পরমাণু শক্তিধর জাতি হিসেবে উত্তর কোরিয়ার স্বীকৃতি আদায়ের সম্ভাবনাও বাড়াবে।

ইরানে নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপে সিনেটে উদ্যোগ নেবেন হ্যারি রেইড

যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা হ্যারি রেইড গত বৃহস্পতিবার বলেছেন, ইরানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপের ব্যাপারে তিনি অঙ্গীকারবদ্ধ। সিনেটে ভোট দিয়ে একটি আইন পাসের চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি। ওই আইনটি পাস হলে ইরানে পরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানিকারী কোম্পানিগুলোর ওপর প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নিষেধাজ্ঞা জারি করতে পারেন। খবর এএফপির।
ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেটর রেইড বলেন, ‘আমি সবাইকে জানিয়ে রাখতে চাই, জানুয়ারিতে কংগ্রেসে ফিরে আসার পর এই আইন প্রণয়নে ভোটের ব্যবস্থা করা হবে। এ ব্যাপারে দলমত-নির্বিশেষে সমঝোতায় পৌঁছাতে চাই।’ বড়দিনের ছুটিতে কংগ্রেসের অধিবেশন মুলতবির দিন তিনি এসব কথা বলেন।
তেহরান বরাবরই বলে আসছে, তারা দেশটির জ্বালানি চাহিদা মেটাতে শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পরমাণু কর্মসূচি চালিয়ে আসছে। এই কর্মসূচি অব্যাহত রাখার অধিকার তেহরানের রয়েছে। তাই কোনো অবস্থাতেই পরমাণু কর্মসূচি থেকে সরে দাঁড়াবে না ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের দাবি, ইরান পরমাণু বোমা তৈরির উদ্দেশ্যে এই কর্মসূচি চালিয়ে আসছে। দেশটিকে এই বিতর্কিত পরমাণু কর্মসূচি ত্যাগ করতে হবে। তেহরানকে প্রতিহত করতে যুক্তরাষ্ট্র একপক্ষীয় নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে।
সিনেটে ব্যাংকিং কমিটির চেয়ারম্যান সিনেটর ক্রিস্টোফার ডোড রেইডের অঙ্গীকারের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমার প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো, বিল পাসের মধ্য দিয়ে ইরানের পরমাণু অস্ত্র অর্জনের সামর্থ্যকে প্রতিহত করা।’ ব্যাংকিং কমিটি গত অক্টোবরে ওই বিলটি অনুমোদন করে। এটি আইনে পরিণত হলে ইরানের জ্বালানি খাতে বিদেশি কোম্পানিগুলোর দুই কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হবে।
ইরান বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল উত্তোলন করে। কিন্তু দেশটি এই তেল শোধন করতে পারে না। সুইজারল্যান্ডের ভিটোল ও গ্লেনকোর কোম্পানি, ডাচ-সুইস কোম্পানি ট্রাফিগুরা, ফরাসি টোটাল, ব্রিটেনের ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম এবং ভারতের রিলায়েন্স কোম্পানি তেহরানে পরিশোধিত জ্বালানি তেল সরবরাহকারী কোম্পানির শীর্ষস্থানে রয়েছে।
এদিকে সিনেটর জন ক্যারি ইরান সফরে যাবেন—মার্কিন গণমাধ্যমের এই খবর গত বৃহস্পতিবার তাঁর এক মুখপাত্র নাকচ করে দিয়েছেন।

বিচার বিভাগের সঙ্গে বিরোধের কোনো আশঙ্কা নেই: গিলানি

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানি বলেছেন, ন্যাশনাল রিকনসিলিয়েশন অর্ডিন্যান্স (এনআরও) নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া আদেশকে সম্মান করে সরকার। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিচার বিভাগের কোনো ধরনের বিরোধের আশঙ্কা নেই। গত বৃহস্পতিবার সংবাদকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় এ কথা বলেন তিনি। পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ করার আগেই পাকিস্তান পিপলস পার্টির নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের আশঙ্কাও নাকচ করেছেন তিনি।
গত ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের সাবেক সামরিক শাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফের জারি করা এনআরওকে সুপ্রিম কোর্ট ‘অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করার পর সেখানকার রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড় শুরু হয়। ওই রায়ের পর প্রেসিডেন্ট জারদারির বিরুদ্ধে আগের দুর্নীতির মামলাগুলো আবার সচল হওয়ার পথ খুলে যায়। একই ধরনের মামলা রয়েছে পিপিপির অনেক নেতা ও মন্ত্রীর বিরুদ্ধে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারিসহ অন্যান্য মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মামলাগুলো আবার সচল হবে জানার পরও এনআরও বাতিল করার পক্ষেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আদালত ন্যায়বিচার করবে—এমন আস্থা সরকারেরও রয়েছে।
প্রধান বিচারপতিকে পুনর্বহাল করা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে গিলানি জানান, প্রেসিডেন্ট এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কোনো ধরনের বিরোধিতা করেননি। তিনি আরও জানান, জাতিসংঘের একটি দল সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর হত্যার তদন্ত করছে। তদন্তকাজ শেষ করতে তাদের সময় এক মাস বাড়ানো হয়েছে। দ্রুত এ ব্যাপারে তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনীর অভিযান চলছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী গিলানি বলেন, কোনো চাপের মুখে এই অভিযান চালানো হচ্ছে না। দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে অভিযান ভালোভাবে এগোচ্ছে বলেও তিনি জানান।
এদিকে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে গিলানি সামরিক বাহিনীর ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার পক্ষেই কাজ করছে সামরিক বাহিনী। সরকার ও সামরিক বাহিনীর মধ্যে উষ্ণ সম্পর্ক বজায় আছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বড়দিনেও যুক্তরাষ্ট্র তুষার ঝড়ের কবলে, নিহত ১৮

বড়দিনের আনন্দময় মুহূর্তেও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যাঞ্চলে হানা দিয়েছে তুষারঝড়। এর ফলে টেক্সাস থেকে মিনেসোটা পর্যন্ত সড়ক ও বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বাতিল করা হয়েছে ১০০টি ফ্লাইট। অনেক গির্জায় বড়দিনের অনুষ্ঠান বাতিল করে দেওয়া হয়। বরফাচ্ছন্ন রাস্তায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে নিহত হয়েছে কমপক্ষে ১৮ জন।
যুক্তরাষ্ট্রের আবহাওয়া দপ্তর জানায়, তুষারঝড়ের কারণে দেশের দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা অচল হয়ে পড়ে। জনগণকে জরুরি দরকার ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়। আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, বড়দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় সর্বোচ্চ ৬০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বরফ পড়তে পারে। এই বিরূপ পরিস্থিতি কাটতে দুই দিন লেগে যাবে।
ক্যানসাসের আবহাওয়া দপ্তরের আবহাওয়াবিদ স্কট ব্লেয়ার গতকাল জানিয়েছিলেন, ওই অঙ্গরাজ্যে ঘণ্টায় ৬৪ কিলোমিটার বেগে দমকা বাতাস বয়ে যাবে। তখন প্রচণ্ড তুষারপাতের সময় কাছের জিনিসও দেখা যাবে না।
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ব উপকূলে রেকর্ড পরিমাণ তুষারপাত হয়েছে। সেখানে এখনো বরফ সরানোর কাজ চলছে। ধারণা করা হচ্ছে, নতুন করে তুষারপাতের কারণে পূর্বাঞ্চলের মহাসড়কগুলো বরফে ঢাকা পড়ে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে।
বিরূপ আবহাওয়ার কারণে অনেক গির্জায় বড়দিনের অনুষ্ঠান বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি বর্ণনা করে মিনেসোটার মানকাটোর যাজক অ্যান্ডি রিচি স্থানীয় কেইওয়াইসি-টিভিকে বলেন, রাস্তাঘাটের অবস্থা খুবই খারাপ। এ অবস্থায় বাড়ি থেকে বের না হওয়াই ভালো।
বরফে ঢাকা রাস্তায় দুর্ঘটনার কবলে পড়ে প্রাণ হারিয়েছে কমপক্ষে ১৮ জন। এর মধ্যে ক্যানসাসে পাঁচজন, নেব্রাস্কায় ছয়জন, ফনিক্সের কাছে তিনজন, নিউ মেক্সিকোতে তিনজন এবং মিনেসোটায় একজন নিহত হয়েছে।
দক্ষিণ ডাকোটা, টেক্সাস ও ওকলাহোমায় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। আটকে পড়া ভ্রমণকারীদের উদ্ধারের জন্য ন্যাশনাল গার্ডের সেনাদের ডেকে পাঠানো হয়েছে। ওকলাহোমার গভর্নর ব্রাড হেনরি বলেন, ‘তুষারঝড়কে পূর্বসতর্কতা হিসেবে নেওয়ার জন্য ওকলাহোমার সব নাগরিকের প্রতি আমি আহ্বান জানাচ্ছি। ভ্রমণ একেবারেই জরুরি না হলে রাস্তায় না নামার আহ্বান জানাচ্ছি।’

ইংল্যান্ডে ফিরছেন অঁরি?

ক্যারিয়ারের সবচেয়ে সুবর্ণ সময় তিনি কাটিয়েছেন ইংলিশ ফুটবলেই। খবর সত্যি হলে সেই ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে আবার দেখা যাবে থিয়েরি অঁরিকে। অবশ্য আর্সেনাল নয়, এবার ফরাসি স্ট্রাইকারকে কিনতে চায় ম্যানচেস্টার সিটি। আর্সেনাল থেকে বার্সেলোনায় চলে যাওয়া অঁরির জন্য ১ পাউন্ড দাম হাঁকিয়েছে আরব শেখের ক্লাবটি।
মার্ক হিউজকে ছাঁটাই করার পর ম্যানসিটির অনেক খেলোয়াড়ই নাকি অনিশ্চয়তায় ভুগছে। নতুন কোচ রবার্তো মানচিনির অধীনে সেরা একাদশে নিজেদের জায়গা থাকবে কি না, এ নিয়ে একটা সংশয় আছে তাঁদের। কারণ হিউজের ছাঁটাইয়ের তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন ওই খেলোয়াড়েরা। মানচিনি অবশ্য দলে কোনো রকমের বিভেদের খবর উড়িয়ে দিয়েছেন। যদিও শোনা যাচ্ছে, শিগগিরই ক্লাব ছাড়তে চলেছেন বেশ কজন।
অঁরির প্রতি ম্যানসিটির নতুন করে আবার আগ্রহ তৈরি হওয়ার সঙ্গে এই খবরের যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে হ্যান্ডবল-কাণ্ডের পর বিতর্কিত অঁরিকে বিক্রি করে দেওয়ার পক্ষেই বার্সা।

ইয়েমেনকে উড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ

প্ররথম দুই রাউন্ডে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার কাছে হার। কলকাতায় অনুষ্ঠানরত এবারের এশিয়ান দলগত দাবার শুরুটা ভালো হয়নি বাংলাদেশের। তিন গ্র্যান্ড মাস্টার রিফাত বিন সাত্তার, আবদুল্লাহ আল রাকিব ও এনামুল হোসেনকে ছাড়া বাংলাদেশ দলটা খুব শক্তিশালী নয়, এটা সবার জানা। তবে ফল একেবারে হতাশাজনক নয়। তৃতীয় রাউন্ডে বৃহত্তম জয়ই পেয়েছে নিয়াজ-জিয়ার বাংলাদেশ। দুই ফিদে মাস্টারের দল ইয়েমেনকে এই রাউন্ডে সহজেই ৪-০ পয়েন্টে হারিয়েছে বাংলাদেশ।
গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়াজ মোরশেদ ফিদে মাস্টার ফোওয়াদ মোফলেহকে, জিয়াউর রহমান ফিদে মাস্টার আবদুল্লাহ সোবুলকে, ফিদে মাস্টার আবদুল মালেক ফিদে মাস্টার ফারাজ ইয়াহিয়াকে ও মাহতাবউদ্দীন আহমেদ হারিয়েছেন আল আকরাবী সালেহকে।
এ রাউন্ডে বাংলাদেশের মহিলা দল জয় না পেলেও খারাপ করেনি। ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে ড্র করেছে ২-২ পয়েন্টে। ইন্দোনেশিয়ার মহিলা গ্র্যান্ডমাস্টার আইরিন খারিশমা সুকান্দারকে হারিয়ে দিয়েছেন নাজরানা খান। সাদা নিয়ে কুইন ওপেনিং পদ্ধতিতে খেলে নাজরানা জয় তুলে নেন ৫৭ চালে। আন্তর্জাতিক মহিলা মাস্টার রানী হামিদ মেডিনা ওয়ার্দা উলিয়া ও জাকিয়া সুলতানা ড্র করেছেন বাইক ভিনার সঙ্গে। মহিলা ফিদে মাস্টার দেওয়ি আ সিতরার কাছে হেরেছেন মাসুদা বেগম।
তৃতীয় রাউন্ড শেষে বাংলাদেশের দুটি দলেরই ম্যাচ পয়েন্ট ২।

অস্ট্রেলীয়রা ছিঁচকাঁদুনে!

ক্রিস গেইল রীতিমতো অস্ট্রেলীয়দের অহংয়ে আঘাত করেছেন। বলেছেন, রিকি পন্টিংয়ের দল নাকি ‘ছিঁচকাঁদুনে’! ওরা স্লেজিং করে হম্বিতম্বি করলে ঠিক আছে। কিন্তু যেই আপনি পাল্টা আঘাত করে স্লেজিং শুরু করবেন, অমনি নাকি অস্ট্রেলীয়রা অভিযোগ করে বসে।
‘ওরা যখন স্লেজ করে, আপনি পাল্টা কিছু বললে ওরা অনেক অভিযোগ করা শুরু করে। ওরা আসলে এটা সামলাতে পারে না’—অস্ট্রেলিয়ার সিডনি মর্নিং হেরাল্ডকে বলেছেন গেইল। ওয়েস্ট ইন্ডিজ অধিনায়কের কথার সূত্র আসলে শেন ওয়াটসনের ওই বাড়াবাড়ি রকমের উল্লাস। গেইলকে আউট করার পর ওমন তেড়েফুঁড়ে উল্লাস দেখাতে গিয়ে ম্যাচ ফির ১৫ শতাংশ জরিমানাও গুনতে হয়েছে অস্ট্রেলীয় অলরাউন্ডারকে।
‘শেনকে ক্ষমা করে দিয়েছি’—এর আগে গেইলের এমন মন্তব্যকে হয়তো খোঁচা হিসেবেই নিয়েছেন ওয়াটসন। এবার গেইল জানালেন, কী হয়েছিল সেদিন, “আমি নন-স্ট্রাইকার প্রান্তে ছিলাম, ও দেখি শুধু আমার দিকে তাকাচ্ছে। আমি বললাম, ‘সমস্যাটা কী তোমার?’ ও বলল, ‘যখন (বল হাতে) আসব, তোমাকে উড়িয়ে দেব।’ এরপর ও আমাকে আউট করে আমার মুখের ওপর চেঁচাতে শুরু করল। সত্যি বলতে কি, এটা খেলাটার চেতনাবিরোধী। তবে ও ছেলেটাই এমন। ওর বলে কেউ চার মারলেই ব্যাটসম্যানদের ও গালি দেয়। কিন্তু আপনি উল্টো ওকে কিছু বললে সে সেটা মানতে পারে না।’

আফ্রিদিকে নিয়ে কাড়াকাড়ি

দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে চুক্তি হয়ে গেছে, অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি ‘বিগ ব্যাশ’ টুর্নামেন্টে খেলবেন। দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া টি-টোয়েন্টিতেও খেলবেন নশুয়া ডলফিনসের হয়ে। প্রথমে নাম না থাকলেও এখন শোনা যাচ্ছে তৃতীয় আইপিএলের নিলামেও নাম থাকছে তাঁর। এবার তাঁকে পাওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে তিন-তিনটি কাউন্টি ক্লাব।
এই ‘হট কেকে’র নাম শহিদ আফ্রিদি। পাকিস্তানের টি-টোয়েন্টি অধিনায়ককে আগামী মৌসুমের ফ্রেন্ডস প্রভিডেন্ট টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টের জন্য পেতে চায় তিনটি কাউন্টি। কাউন্টি তিনটির নাম এখনো জানা যায়নি, তবে জানুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহেই নিশ্চিত হবে চুক্তি। টুর্নামেন্টটি হবে আগামী জুন-জুলাইয়ে। ওই সময়ে এশিয়া কাপও অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে এশিয়া কাপের সূচি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এশিয়া কাপ না হলে আফ্রিদি খেলতে পারবেন পুরো টুর্নামেন্টেই।
আফ্রিদিকে নিয়ে এই কাড়াকাড়ির মূল কারণ টি-টোয়েন্টিতে দুর্দান্ত ধারাবাহিকতা। ২৬টি টি-টোয়েন্টিতে ৪৬৭ রান করেছেন ১৪৬.৮৫ স্ট্রাইক রেটে। ওভার-প্রতি মাত্র ৫.৭৭ রান দিয়ে নিয়েছেন ৩৭ উইকেট। প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে হয়েছিলেন টুর্নামেন্টসেরা, আর দ্বিতীয়টিতে সেমিফাইনাল ও ফাইনালের ম্যাচসেরা। সনাত্ জয়াসুরিয়ার সঙ্গে টি-টোয়েন্টিতে সর্বোচ্চ ছয়বার ম্যাচসেরার রেকর্ডও তাঁর।

বাংলাদেশে আসছেন না টেন্ডুলকার

বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য যথেষ্টই মন খারাপ করার মতো খবর। জানুয়ারির ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলতে বাংলাদেশে আসছেন না শচীন টেন্ডুলকার। বিশ্রাম নেওয়ার জন্য নিজে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এই টর্নামেন্ট থেকে সরে দাঁড়ানোর। তাঁর বদলে দলে ফিরেছেন রোহিত শর্মা। স্বাগতিক বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ও শ্রীলঙ্কাকে নিয়ে টুর্নামেন্টটি শুরু হচ্ছে ৪ জানুয়ারি।
টেন্ডুলকার না থাকলেও আঙুলের ইনজুরিতে শ্রীলঙ্কা সিরিজের চার ম্যাচ না খেলা যুবরাজ সিং আছেন ১৬ সদস্যের দলে। অনুমিতভাবেই দল থেকে বাদ পড়েছেন ইশান্ত শর্মা। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে শেষ দুই ম্যাচে ১৪ ওভারে ১৩০ রান দেওয়া এই পেসারের জায়গায় সুযোগ পেয়েছেন বাংলার পেসার অশোক দিন্দা। এ মাসের শুরুতে ভারতের হয়ে টি-টোয়েন্টি অভিষেক হয়েছে দিন্দার। প্রজ্ঞান ওঝার জায়গায় দলের দ্বিতীয় স্পিনার হিসেবে ঢুকেছেন দিল্লির লেগ স্পিনার অমিত মিশ্র। সোয়াইন ফ্লু কাটিয়ে ফিরেছেন শ্রীশান্থ। আর কোনো ম্যাচ না খেলেও জায়গা ধরে রেখেছেন সুদীপ তিয়াগি।
ত্রিদেশীয় সিরিজের ভারতীয় দল: মহেন্দ্র সিং ধোনি (অধিনায়ক), বীরেন্দর শেবাগ, গৌতম গম্ভীর, বিরাট কোহলি, সুরেশ রায়না, রোহিত শর্মা, রবীন্দ্র জাদেজা, হরভজন সিং, জহির খান, যুবরাজ সিং, আশীষ নেহরা, সুদীপ তিয়াগি, দিনেশ কার্তিক, শ্রীশান্থ, অশোক দিন্দা, অমিত মিশ্র।

আওয়ামী লীগ-বিএনপির দ্বন্দ্ব নিরসন নাকি নতুন বিকল্প by শফিকুল ইসলাম

এই শিরোনামে ৫ ডিসেম্বর দৈনিক প্রথম আলোয় একটি লেখা ছাপা হয়েছে। লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এম এম আকাশ। শিক্ষকতার এই পরিচয়ের পাশাপাশি আকাশের অন্য পরিচিতিও আছে। ছাত্রজীবনে তিনি প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম সারির নেতা ছিলেন। এখন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতা তিনি। লেখাটির বিষয়বস্তু সময়োপযোগী এবং এতে আকাশের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও মতামত ভাবনার উদ্রেককারী।
দেশের রাজনীতি বলতে এখন আওয়ামী লীগ ও বিএনপিদলীয় রাজনীতিকেই বুঝে থাকে জনগণ। অপরাপর ছোটখাটো দল-গোষ্ঠীর উপস্থিতি অত্যন্ত ক্ষীণ। এবং এদের অস্তিত্ব মূলতই ওই দুটি দলের প্রভাব-বলয়াধীন। এমনকি বামপন্থীদের ক্ষুদ্র অপভ্রংশগুলোর রাজনীতিও সময়োত্তীর্ণ নয়—গতানুগতিকই। কাজেই দেশের রাজনৈতিক চরিত্র বা সংস্কৃতি মানেই কেবল বৃহত্ দুটি দলের আচার-আচরণ ভিন্ন অন্য কিছু নয়।
এ দুই দলের আচরণে জনগণ অতিষ্ঠ, দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতি স্তিমিত-ম্রিয়মাণ। প্রায় দুই দশক ধরে পালাক্রমে এ দুটি দল রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। তাদের কাছে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়াই প্রথম ও শেষ কথা। ‘ক্ষমতা-দখল’ রাজনীতির একটা বিষয় হতেই পারে। কিন্তু এ দুটি দল রাজনীতির নামে, ক্ষমতার প্রশ্নে যা করছে, তার সঙ্গে জনস্বার্থের কিংবা জাতীয় কল্যাণের লক্ষ্যে কোনো আদর্শ বা কর্মসূচি বাস্তবায়নের সংযোগ-সম্পর্ক নেই। দলীয় স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর লালন-পালন ও আখের গোছানোই তাদের এই ক্ষমতা দখলের একমাত্র উদ্দেশ্য। দলের মধ্যে আদর্শ বা গণতন্ত্রচর্চার মাধ্যমে স্থিতিশীল-কার্যকর রাষ্ট্রগঠন ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যত্ বিনির্মাণে তাদের কোনো দায়-দায়িত্ব আছে বলে জনমনে একটুও প্রতিভাত হয় না। তাদের ক্ষমতা দখলের এ রকম লড়াই চর দখলের লাঠিয়ালি বিবাদের শামিল। যেখানে জনগণ নয়, অস্ত্র-পেশিশক্তি এবং সেই সঙ্গে বিদেশি শক্তিধরদের আনুকূল্য লাভই মূল কথা। এ রকম দাঙ্গাটে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নিমজ্জমান আমরা ভুলতেই বসেছি, এ জাতির গৌরব করার মতো একটি সংগ্রামী ঐতিহ্য ও আদর্শ আছে। এই আদর্শে বলীয়ান হয়েই একাত্তরে সশস্ত্র যুদ্ধে জয়ী হয়ে দেশ স্বাধীন করেছি। কিন্তু স্বাধীনতার অব্যবহিত পরের বঙ্গবন্ধুর সরকার সেই আদর্শের ভিত্তিতে দেশ গঠনে ব্যর্থ হয়। রণাঙ্গনে শত্রুপক্ষকে পর্যুদস্ত করা আর বিজিতপক্ষের আদর্শের মূলোচ্ছেদ করে ফেলা যে এক কথা নয়, সেই বাস্তব সত্যটি বুঝতে সক্ষম হলেন না বঙ্গবন্ধু নিজে, তাঁর দল ও সরকার। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্যেই বিজয়ের সবটুকু অর্জন করে ফেলার মানসিকতা দেখানো হলো, যা ছিল চরম ভুল।
এম এম আকাশ ঠিকই বলেছেন, পাকিস্তান রাষ্ট্র এ জাতির আবহমানকালের ধারার আদর্শের পরিপূরক হলে দ্বি-জাতিতত্ত্বভিত্তিক পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রয়োজন হতো না। দ্বি-জাতিতত্ত্বের কৃত্রিম ঘোর কাটতে ও এই তত্ত্বের অসারতা প্রমাণে নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধই যথেষ্ট ছিল না, প্রয়োজন ছিল নিরবচ্ছিন্ন আদর্শিক সংগ্রামের। আর এটি ছিল সমগ্র জাতির ইস্পাতকঠিন ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম। কিন্তু শাসকদল সেই আদর্শগত সংগ্রামের বদলে জাতির ঐক্যহননের পথে পা দেয়। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অপরাপর দল-গোষ্ঠী এমনকি আওয়ামী লীগেরই ভেতরকার শুভবুদ্ধি ও ধী-শক্তিসম্পন্ন নেতৃত্বকে দূরে ঠেলে দেওয়া হলো। করা হলো চরমভাবে তাদের অবমূল্যায়ন-বিতাড়ন। ফলে যে জাতি একাত্তরে ছিল ইস্পাতকঠিন ঐক্যবদ্ধ, শেখ মুজিব বলতে যে জাতি ছিল অন্ধ, যাঁর অঙ্গুলি হেলনে জাতি চরম সংগ্রামে মেতে উঠেছিল, যাঁর মুখ আর জাতির বুক হয়ে গিয়েছিল একাকার—সেই শেখ মুজিব, সেই বঙ্গবন্ধুর ওপর থেকে সব আস্থা-বিশ্বাস হারিয়ে ফেলল সেই জাতি। খণ্ড-বিখণ্ড হলো ঐক্য, অবিশ্বাস আর ষড়যন্ত্রের চারণভূমিতে পরিণত হলো প্রিয় আমাদের এই স্বদেশ, বাংলাদেশ। অন্যদিকে পরাজিত শক্তি স্বাভাবিকভাবেই বসে থাকল না। সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহার করে আওয়ামী লীগেরই একাংশের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ৭৫-এর ১৫ আগস্টের মর্মান্তিক ঘটনা ঘটানো হলো। তাঁদের অপরিণামদর্শিতার কারণে দলগতভাবে আওয়ামী লীগও ক্ষতিগ্রস্ত হলো। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলো এই দেশ, এই জাতি, পিছিয়ে গেল অগ্রগতির ধারা—যার করুণ পরিণতি গোনার দিন শেষ হয়নি আজও।
বিএনপি নামক রাজনৈতিক দলটি আজ আওয়ামী লীগের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে লিপ্ত। অথচ দলটির জন্ম হওয়ারই কথা ছিল না। বিএনপির জন্ম, বিকাশ এবং এক যুগেরও বেশি ধরে রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনার সুযোগ আসলে করে দিয়েছে আওয়ামী লীগই। এখানে দায়ভার নিতে হবে বামপন্থার দলগুলোকেও। নতুন দেশের উপযোগী নতুন রাজনীতির ধারা প্রবর্তনে তারাও ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বাম নামধারী কিছু দলের ভূমিকাও এখানে সমানভাবে দায়ী। এম এম আকাশের বিবেচনায় এ দিকটিকে যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া দরকার ছিল।
এখন অবস্থা এমন, রাজনীতির প্রতি কারও কোনো বিশ্বাস নেই। দলগুলোর মধ্যে আদর্শ বা গণতন্ত্রের বিন্দুমাত্র চর্চা হয় না। নেতৃত্বের গুণাবলি সুস্থ প্রতিযোগিতার বদলে শীর্ষ নেতৃত্বকে তোয়াজ আর মোসাহেবিই এখানে মূল কথা। যে যার মতো করে আত্মরক্ষা আর সম্পদ অর্জনের চেষ্টা করছে। এরূপ তমসাচ্ছন্ন বিশৃঙ্খল রাজনৈতিক অবস্থা যে কী রকম দুর্বিপাক ডেকে আনতে পারে, তা ভাবা যায় কি? কাজেই এ রাজনীতির বদল হওয়া জরুরি, প্রয়োজন নতুন ধারার রাজনীতির প্রবর্তন।
এম এম আকাশ সংকট-উত্তরণে সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী শক্তিগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে জনগণ-নির্ভর দুটো পরস্পর প্রতিযোগী বুর্জোয়া দলের সম্ভাবনার পাশাপাশি ক্রমবিলীয়মান বিএনপির স্থলে অপেক্ষাকৃত রেডিক্যাল বামদের নিয়ে একটি রাজনৈতিক দলের অভ্যুদয়ের কথা বলেছেন। আমরা আশা করি, এই প্রস্তাবনার ওপর বিস্তর আলোচনা হবে এবং এর মধ্য দিয়ে ভালো কিছু বেরিয়ে আসবে।
আমরা নতুন ধারার রাজনীতির পক্ষপাতী। বিদ্যমান দলগুলোর মধ্যে নতুন সমীকরণ খোঁজার বদলে জোর দিতে চাই রাজনীতিকে বদলে দেওয়ার ওপর। বলতে চাই একেবারে খোলনলচে বদলে দেওয়ার কথা। এ কথা আশা করি আমরা সবাই স্বীকার করব, জাতির সামনে কোনো আলোকবর্তিকা নেই, নেই কোনো আস্থা ও ভরসাস্থল। জনগণ রাজনীতিকে নিজের ভালো-মন্দের কোনো কাজ বলে মনে করে না, মনে করে রাজনীতি কিছু লোকের ব্যবসার ধান্ধা। কাজেই জাতির আস্থা সৃষ্টিতে সক্ষম এমন একটি কর্মসূচি দরকার সবার আগে। তা না হলে কোনো উদ্যোগই সাফল্যের মুখ দেখবে না। অতীতে পুরোনো ধারায় দল গঠনের সব উদ্যোগ-আয়োজন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। আব্দুর রাজ্জাক সাহেবের বাকশাল হলো না, কাদের সিদ্দিকীর জনতা লীগও দাঁড়াল না, ড. কামাল হোসেন বা ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী বা কর্নেল অলি-ফেরদৌস কোরেশীরাও সফল হননি। জনগণের আস্থা অর্জনে তাঁদের এই ব্যর্থতার প্রধানতম কারণ, এসবের মধ্যে জনগণ নতুন কিছু দেখেনি। তাই গতানুগতিক এসব উদ্যোগে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না জনগণ। সুতরাং সাবেকি, সনাতনী কোনো পন্থায় জনগণকে জাগানো সম্ভব হবে না। সে কারণেই ভাবতে হবে নতুনভাবে-নতুন ধারায়। এ উদ্যোগ হিসেবে জাতির সামনে একগুচ্ছ নেতাকে হাজির করলেই চলবে না। নতুন এই উদ্যোগের ব্যাপারে জাতির ভাবনার ঐক্য তৈরি করতে হবে এবং জাতির সামনে সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি দিতে হবে। আমাদের ধারণা, বিশ্বাসযোগ্য এমন কোনো জায়গা তৈরি হলে জনগণ সাড়া দেবেই।
শফিকুল ইসলাম: সাবেক সাংসদ।

অর্থনীতির নোবেল পুরস্কার ২০০৯ -সামাজিক মূলধন, প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও উত্পাদন দক্ষতা by ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ

উনিশ শ আশির দশকের শেষ দিকে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের নেতৃত্বে উন্নয়নশীল বিশ্বে বাজারমুখী সংস্কার প্রবর্তন করা হয়। যে উন্নয়নদর্শন এর পেছনে কাজ করেছে, পরবর্তী দুই দশকের অভিজ্ঞতার আলোকে তাতে অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। দেখা গেছে, বাজারমুখী সংস্কারের কার্যকরতা অনেকখানি নির্ভর করে একটি দেশের সামাজিক রীতিনীতি, আচার-আচরণ ও আর্থসামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বৈশিষ্ট্যের ওপর—উন্নয়ন অর্থনীতির তত্ত্বে এককথায় যাকে এখন বলা হয় সামাজিক মূলধন (social capital)। এ সামাজিক মূলধনকে বিবেচনায় না নিলে, শুধু দাতাগোষ্ঠীর চাপিয়ে দেওয়া সংস্কার বা প্রকল্প হিতে বিপরীত হতে পারে।
নেপালের কৃষিতে সেচব্যবস্থার ওপর গবেষণা করতে গিয়ে এমন সিদ্ধান্তেই পৌঁছেছিলেন ২০০৯ সালের অর্থনীতির অন্যতম নোবেল বিজয়ী এলিনর অস্ট্রম।
সনাতন ও আধুনিক পদ্ধতির সেচব্যবস্থার দক্ষতা তুলনা করতে গিয়ে তিনি একটি ধাঁধায় পড়েন। সনাতন পদ্ধতিতে কৃষকেরা পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে আসা পানির প্রবাহে মাটির বাঁধ দিয়ে এবং নালা খুঁড়ে জমিতে সেচ দেন। বলা বাহুল্য, এটি কোনো দক্ষ সেচব্যবস্থা নয়। অন্যদিকে যখন সরকারি ব্যয়ে সিমেন্ট-কংক্রিট দিয়ে বাঁধ ও সেচের নালা নির্মাণ করে আধুনিক পদ্ধতির সেচব্যবস্থা করা হলো, এর ফলাফল ভালো না হয়ে আরও খারাপ হলো। দেখা গেল, প্রকল্পের দায়িত্বে নিযুক্ত সরকারি কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে সেচের নালাগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচিরেই অকার্যকর হয়ে পড়ে। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, সনাতন পদ্ধতির সেচব্যবস্থাতেই যদি কেবল সেচের নালাগুলো ইট-সিমেন্ট দিয়ে বাঁধিয়ে কিছুটা উন্নতমানের করে দেওয়া যায়, তাহলেই কৃষির উত্পাদনে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়।
এলিনর অস্ট্রম এর ব্যাখ্যা খুঁজে পেলেন এভাবে—সনাতন পদ্ধতিতে কৃষকদের মধ্যে বাঁধ নির্মাণ ও সেচের নালার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একটা অলিখিত চুক্তি কাজ করে। বাঁধের কাছাকাছি সেচের নালার মুখের দিকে সহজেই পানি আসে; কিন্তু সেখানকার কৃষকেরা যদি তাঁদের জমির ওপর দিয়ে যাওয়া নালার রক্ষণাবেক্ষণ না করেন, তাহলে দূরবর্তী জমিতে পানি যাবে না। তাঁরা যাতে এ কাজটি করেন, তার বিনিময়ে দূরবর্তী জমির মালিকেরা নিজেদের শ্রমে বাঁধটি তৈরি করে দেন (নিয়মটি হলো, যাঁর জমি যত দূরে, তিনি তত বেশি শ্রম দেবেন)। সরকারি খরচে বাঁধ তৈরি করার ফলে কৃষকদের স্বেচ্ছাশ্রমের আর প্রয়োজন হয় না, কাজেই সেচের নালার রক্ষণাবেক্ষণের অলিখিত চুক্তিটিও আর কার্যকর থাকে না। কিন্তু যেখানে কৃষকেরা নিজেরাই বাঁধটি তৈরি করেন এবং শুধু সেচের নালা বাঁধাই করে দেওয়া হয়, সেখানে একদিকে যেমন সেচের দক্ষতা কিছুটা বাড়ে, অন্যদিকে আবার সনাতন পদ্ধতির রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থাটিও বজায় থাকে। এটিই ধাঁধার উত্তর।
নেপালের এ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষণীয় বিষয় কী? কৃষকদের বহুদিনের অভিজ্ঞতালব্ধ প্রযুক্তি বনাম আধুনিক প্রযুক্তির উপযোগিতা নিয়ে সচরাচর যে বিতর্ক হয়, তার জন্য এটি জুতসই উদাহরণ নয়। এখানে মূল বিষয় হলো, বিদ্যমান সামাজিক মূলধনকে অগ্রাহ্য করে আধুনিক প্রযুক্তি বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বাইরে থেকে চাপিয়ে দিলে সুফল না পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণ, বিশেষত উপকারভোগীদের অংশগ্রহণের বিষয়টি কেন এত জরুরি, সেটাও এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়।
উনিশ শ নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অনেক প্রকল্প পুনর্বাসনের সম্ভাব্যতা যাচাই করতে বিশ্বব্যাংক একটি সমীক্ষা করেছিল। প্রকল্প এলাকার ৮০ শতাংশ মানুষের মতে, প্রকল্পগুলোর মূল উদ্দেশ্য ভালোই ছিল, কিন্তু এগুলোর পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এর ফলে ত্রুটিপূর্ণ নকশার কারণে ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রকল্পগুলো স্থানীয় অর্থনীতির জন্য তেমন কোনো সুফল বয়ে আনতে পারেনি। বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে ৩৫টি প্রকল্পের মধ্যে মাত্র একটিকে সফলভাবে পুনর্বাসন করা সম্ভব হয়েছিল। স্থানীয় সরকারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে এ সমস্যার একটা সমাধান খুঁজে বের করার হয়তো সুযোগ আছে।
দারিদ্র্য নিরসনে ক্ষুদ্রঋণের ভূমিকা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে, কিন্তু সামাজিক মূলধন তৈরিতে এর ভূমিকা নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না। আমাদের ব্যাংকিং খাতের ঋণখেলাপির সংস্কৃতির বিপরীতে ক্ষুদ্রঋণের ক্ষেত্রে যে এক ধরনের ঋণ পরিশোধের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে—এটাও এক ধরনের সামাজিক পুঁজি। প্রচলিত ব্যাংকব্যবস্থায় ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের বিষয়টি গোপনীয় বলে বিবেচনা করা হয়। আর সমিতিভিত্তিক ক্ষুদ্রঋণের বৈশিষ্ট্যই হলো একটি উন্মুক্ত সামাজিক পদ্ধতির মাধ্যমে ঋণ-কার্যক্রম পরিচালনা করা। লক্ষণীয়, এনজিওদের সম্বন্ধে দুর্নীতির অভিযোগ থাকলেও ক্ষুদ্রঋণের বিতরণ ও আদায়ের ক্ষেত্রে প্রতি সপ্তাহে যে কোটি কোটিবার অর্থের লেনদেন হয়, তা নিয়ে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির কথা শোনা যায় না। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের উদ্যোগে কৃষিব্যাংকের ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রেও ক্ষুদ্রঋণের আদলে একটি উন্মুক্ত সামাজিক পদ্ধতি গ্রহণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সামাজিক পুঁজি একবার তৈরি হলে সেটাকে যে নানাভাবে ব্যবহার করা যায়, এটি তার একটি উদাহরণ।
এ বছরের অর্থনীতিতে অপর নোবেল বিজয়ী অলিভার উইলিয়ামসনও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দক্ষতা নিয়ে কাজ করেছেন। তাঁর তত্ত্ব অনুযায়ী ক্ষেত্রবিশেষে উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো বাজারব্যবস্থার দক্ষতার বিকল্প হতে পারে। এ তত্ত্বের বাস্তব প্রয়োগ আমাদের কৃষিতেও দেখা যায়। আমাদের দেশে কোনো কোনো কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষেত্রে আজকাল চুক্তিভিত্তিক কৃষি উত্পাদনব্যবস্থা বা contract farming-এর প্রচলন হচ্ছে। এর ফলে একদিকে যেমন কৃষকেরা উত্পাদিত পণ্যের বাজার দামের ওঠা-নামার ঝুঁকি এড়াতে পারেন, অন্যদিকে ক্রেতা-প্রতিষ্ঠানের জন্যও পণ্যের মান ও প্রয়োজনীয় পরিমাণের সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। উইলিয়ামসন অবশ্য তাঁর তত্ত্ব দিয়ে দেখিয়েছিলেন, বড় আকারের শিল্প-কারখানার উত্পাদিত পণ্যের যন্ত্রাংশ বাজার থেকে না কিনে নিজেদের কারখানায় উত্পাদন করাই বেশি লাভজনক হতে পারে। এ তত্ত্বের ভিত্তিতে তিনি বিশাল আকৃতির শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উত্থান এবং এদের মধ্যে অধিগ্রহণ ও একীভূত (takeover এবং merger) হওয়ার প্রবণতার যে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন, পরবর্তীকালে তা বাস্তবে সত্য প্রমাণিত হয়েছে।
আমাদের দেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে শিল্প-বাণিজ্যের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর বিবেচনা তেমন গুরুত্ব পায়নি। অথচ পুঁজিবাজার ও ব্যাংকিং খাতের সংস্কার থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি যৌথ উদ্যোগে বিনিয়োগ—এ সব ক্ষেত্রেই বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কোম্পানিগুলো যত দিন কার্যত পারিবারিক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হবে, পুঁজিবাজার তত দিন সত্যিকার সুসংগঠিত হবে না। আবার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর যে বড় ধরনের পার্থক্য আছে, তা বিবেচনায় না নিয়ে এ খাতের জন্য কার্যকর সংস্কার কর্মসূচি তৈরি করা সম্ভব নয়।
একসময় আমাদের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ও বেসরকারি ব্যাংক উভয়ের ক্ষেত্রেই খেলাপি ঋণের সমস্যা সমানভাবে প্রকট ছিল। এখন অবশ্য বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোর অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দুর্বলতার প্রধান উত্স হিসেবে বহুদিন ধরেই যে বিষয়গুলো চিহ্নিত হয়ে আসছে, এগুলো হলো ঋণ কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব, কর্মকর্তাদের অদক্ষতা ও দায়িত্ব পালনে প্রণোদনার অভাব, এবং পরিচালনা পর্ষদের নিষ্ক্রিয়তা ও সরকারের প্রতি মুখাপেক্ষিতা। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ব্যাংক খোলার অনুমতি দেওয়ার পেছনে প্রধান যুক্তি ছিল, উদ্যোক্তা-পরিচালকেরা নিজেদের বিনিয়োগ থেকে মুনাফা লাভের তাগিদেই ব্যাংক পরিচালনার দক্ষতার বিষয়ে যত্নবান হবেন। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, আর্থিক খাতের আইনকানুনের শিথিলতার সুযোগে নিজেদের ব্যাংক থেকে অবৈধ আর্থিক সুবিধা গ্রহণই উদ্যোক্তা-পরিচালকদের জন্য বেশি লাভজনক হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এসব অন্যায় কার্যকলাপ রোধে নানা বিধিনিষেধ আরোপ ও সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তা-পরিচালকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের ফলেই বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের অবস্থার উন্নতি হয়েছে। সেই সঙ্গে এ খাতে সত্যিকার উদ্যোক্তাসুলভ আচরণের সংস্কৃতি কমবেশি গড়ে উঠলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরোপিত বিধিনিষেধ ক্রমে শিথিল করা সম্ভব হবে।
বেসরকারি খাতে ব্যাংক স্থাপনের আরেকটি যুক্তি ছিল, প্রতিযোগিতার ফলে এ খাতের দক্ষতা বাড়বে এবং আমানত ও ঋণের সুদের হারের ব্যবধান কমে আসবে। বাস্তবে এ লক্ষ্য ততটা অর্জিত হয়নি। এ বিষয়ে বিশদ আলোচনায় না গিয়ে ব্যাংকিং খাতের নিয়ন্ত্রণ-কাঠামোর (regulatory framework) সম্ভাব্য ইতিবাচক ভূমিকা সম্বন্ধে একটি উদাহরণ দিতে চাই। লক্ষ করা যায় যে, বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সুরম্য দালান-কোঠা ও অতিরিক্ত সাজসজ্জার পেছনে খরচ করার একটা প্রতিযোগিতা চলে। গ্রাহকদের আস্থা অর্জনের জন্য বিশ্বব্যাপী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর এটি একটি বহুল প্রচলিত কৌশল। বলা বাহুল্য, এ ধরনের প্রতিযোগিতায় ব্যয় সাশ্রয়ের বদলে বরং অর্থের অপচয় হয়। এর বিকল্প হিসেবে যদি ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র গ্রাহকদের কাছে বোধগম্যভাবে তাদের প্রতিটি শাখায় বাধ্যতামূলক প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে দক্ষতা অর্জনের একটা সুস্থ প্রতিযোগিতা হতে পারে। নব্বইয়ের দশকে গঠিত ব্যাংক-সংস্কার কমিটির পক্ষ থেকে এ রকম একটি সুপারিশ করা হয়েছিল। কমিটির অনেক সুপারিশ বাস্তবায়িত হলেও, এটি হয়নি।
বর্তমান সরকার সরকারি-বেসরকারি অংশীদারে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। এটি একটি ভালো উদ্যোগ, কিন্তু অংশীদারির ধরন কী হবে, সে সম্বন্ধে চিন্তাভাবনা প্রয়োজন। যদি প্রস্তাবিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থের সমন্বয়হীনতা (অর্থনীতির ভাষায়, incentive incompatibility) থাকে, তাহলে ব্যবস্থাপনার দক্ষতা অর্জন সম্ভব নয়। এর একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ হলো বিদেশি বিনিয়োগকারী ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ মালিকানায় স্থাপিত কর্ণফুলী সার কারখানা—সংক্ষেপে ‘কাফকো’।
কাফকোর ব্যর্থতার প্রধান কারণ হলো, এর মালিকানার যারা বিদেশি অংশীদার—যন্ত্রপাতি সরবরাহ ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও তাদের; তার ওপর প্রতিষ্ঠানটির একচেটিয়া ব্যবসারও সুযোগ আছে। আবার সরকার এ কারখানার সার উত্পাদনের মূল উপকরণ প্রাকৃতিক গ্যাসেরও একমাত্র জোগানদার। এ রকম জটিল অংশীদারির কাঠামোয় স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা প্রায় অবশ্যম্ভাবী।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির আরও কিছু অভিজ্ঞতা আমাদের আছে। বিশ্বব্যাংকের ঋণের শর্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিদেশি পরামর্শক কোম্পানির সঙ্গে সরকার চুক্তি করেছিল। এর ফলাফল নিয়ে সন্দেহ আছে। প্রাকৃতিক গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য বিদেশি তেল কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে যেসব চুক্তি করা হয়েছিল, সেগুলোর ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে বিচার-বিশ্লেষণের ঘাটতি ছিল কি না, তা দেখা দরকার। বর্তমান সরকার অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর চিন্তাভাবনা করছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এসব ক্ষেত্রে কী ধরনের চুক্তি থেকে বেশি সুফল আসবে, তা অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে; যেমন, উত্পাদিত সেবা বা পণ্যের বৈশিষ্ট্য, বাজারে প্রতিযোগিতার মাত্রা, পুঁজির উত্স, ব্যবস্থাপনার ধরন, যন্ত্রপাতি ও স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের গুরুত্ব, পরিবেশ দূষণ ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি, সরকারের নজরদারির ক্ষমতা ইত্যাদি। এ ধরনের প্রকল্পের প্রস্তাব মূল্যায়নের সময় এর কারিগরি দিকগুলো সংগত কারণেই প্রাধান্য পেয়ে থাকে। আর্থিক লাভ-ক্ষতির হিসাবও করা হয়। কিন্তু প্রস্তাবিত প্রকল্পের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় বিভিন্ন পক্ষের স্বার্থ ও প্রণোদনা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, এ বিষয়টি নিয়ে তেমন চিন্তাভাবনা করা হয় না। বড় ভুলটি হয় এখানেই। আর এ বছরের নোবেল বিজয়ী দুজন অর্থনীতিবিদের তত্ত্ব থেকে শেখার বিষয়টিও এ জায়গাতেই।
ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ: অর্থনীতিবিদ, চেয়ারম্যান, ইকোনমিক রিসার্চ গ্রুপ।

নারী অধিকার -পাহাড়ি নারীরা সম্পত্তিতে অধিকার পাবে কবে by ইলিরা দেওয়ান

সম্পত্তির ওপর নারীর উত্তরাধিকারের বিষয়টি বাংলাদেশে বরাবরই উপেক্ষিত ইস্যু হিসেবে দেখা হয়েছে। পার্বত্যাঞ্চলেও এ অবস্থার ব্যতিক্রম নয়। অথচ সংবিধানের ২৮(১) ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, নারী-পুরুষের মধ্যে কোনো প্রকার বৈষম্য প্রদর্শন করা হবে না। নারী-পুরুষের এ সাম্যের বার্তা বাস্তবে প্রতিফলিত হয়নি। সম্পত্তির ওপর নারীর বৈষম্যমূলক উত্তরাধিকারই প্রমাণ করে যে নারী তার সংবিধানসম্মত অধিকার থেকে বঞ্চিত আছে। দেশে খ্রিষ্টান ও মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী নারীরা কিছু অংশ ভাগ পেলেও হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বী নারীরা সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। বেশির ভাগ আদিবাসী পাহাড়ি নারী সম্পত্তিতে কোনো অধিকার পায় না।
পার্বত্য চট্টগ্রামের নৃ-গোষ্ঠীসমূহের সমাজব্যবস্থায় নারীরা এখনো ক্ষমতা থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। ১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার পর প্রশাসনিকভাবে সীমিত সুযোগ/আসন নারীদের জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে। কিন্তু আমরা মনে করি, শুধু আসন বরাদ্দের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এ জন্য দরকার কাজের ক্ষেত্রকে প্রসারিত করে দেওয়া, যাতে নারী তার যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ পায়।
পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ি নারীরা তিনভাবে নিপীড়ন ও বৈষম্যের শিকার হয়। ১. জাতিগত, ২. সামাজিক ও ৩. লিঙ্গীয়ভাবে। জাতিগত বৈষম্যের কারণে পাহাড়ি নারীরা অনেক ক্ষেত্রে শারীরিক বা মানসিকভাবে নিপীড়িত হয়ে থাকে। এ জাতিগত বৈষম্য দূর করতে সরকারকেই উদারভাবে এগিয়ে আসতে হবে এবং পার্বত্য অধিবাসীদের আস্থার ক্ষেত্রটি তৈরি করে দিতে হবে।
তুলনামূলক বিচারে পাহাড়ি সমাজব্যবস্থা অন্যান্য সমাজ থেকে উদার, অর্থাত্ এখানে লিঙ্গীয় বৈষম্য তুলনামূলকভাবে কম। তবে সম্পত্তির ওপর নারীর উত্তরাধিকার প্রশ্নে পাহাড়ি সমাজকাঠামো একই রকম রক্ষণশীল। পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোয় পুরুষেরা সম্পত্তির একচ্ছত্র অধিপতি হওয়ায় পুরুষের ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর এখানে সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকার নিয়ন্ত্রিত হয়। এখানকার প্রথাগত সামাজিক আইন নারীকে কোণঠাসা করে রেখেছে। পাহাড়ি সমাজব্যবস্থায় নারীরা সবচেয়ে বেশি উত্পাদনশীল কাজে নিয়োজিত থাকে বটে, কিন্তু সম্পত্তির ওপর তাদের কোনো অধিকার থাকে না। অনুরূপভাবে সন্তান ধারণ ও লালন করলেও সন্তানের অভিভাবকত্ব তাঁরা পান না। আগের বারের শেখ হাসিনার সরকার (১৯৯৮) বাবার নামের পাশাপাশি মায়ের নাম লেখার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে নারীদের দীর্ঘদিনের অপূর্ণ অধিকার প্রতিষ্ঠিত করে যথেষ্ট উদারতার পরিচয় দিয়েছিল। আমরা আশা করছি, এ স্বীকৃতির সুফল দেশের অপরাপর জাতিগোষ্ঠীগুলোর প্রথাগত আইনেও বিশেষ প্রভাব ফেলবে। সরকার যদি অভিন্ন উত্তরাধিকার আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করে, তাহলে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথাগত প্রশাসনিক পদসমূহে যোগ্যতার ভিত্তিতে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদেরও সুযোগ দেওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হবে। যেমন, রাজা, হেডম্যান বা কার্বারির পদে ছেলেসন্তানের পাশাপাশি মেয়েসন্তানকেও উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচন করা সহজ হবে। বর্তমানে সারা পার্বত্য চট্টগ্রামে মাত্র দুজন নারী হেডম্যান আছেন, যাঁরা প্রথাগত আইন ভেঙে দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি নৃ-গোষ্ঠীগুলো চাকমা, মং ও বোমাং—এ তিনটি সার্কেলের অধীন। এ তিন সার্কেলের মধ্যে শুধু বোমাং সার্কেলের অধীন মারমা সমাজের নারীরা সম্পত্তির ওপর এক-চতুর্থাংশের উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু চাকমা ও মং সার্কেলাধীন নারীরা, এমনকি এ সার্কেলের অধীন মারমা নারীরাও প্রথাগত আইনের কারণে সম্পত্তির উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন (সূত্র: মারমা ব্যক্তিগত ও পারিবারিক আইন, কপো সেবা সংঘ, ২০০৭)।
নারী অধিকারের সঙ্গে সম্পত্তির বিষয়টি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে নারীর অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতাই তার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। কাজেই সম্পত্তির ওপর সমানাধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে নারী তার আত্মবিশ্বাসও অনেকখানি ফিরে পাবে।
সমাজ ও রাষ্ট্রের অর্ধেক অংশই নারী। তাদের পেছনে ফেলে রেখে সমাজ কিংবা রাষ্ট্র কখনো প্রগতিশীলতার পথে এগোতে পারবে না। আমরা বহির্বিশ্বের দিকে তাকালে দেখি, পার্শ্ববর্তী অনেক দেশেই সম্পত্তির ওপর নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। যেমন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের কিছু অঞ্চল (মহারাষ্ট্র, অন্ধ্র প্রদেশ ইত্যাদি), শ্রীলঙ্কা, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামে অভিন্ন উত্তরাধিকার আইন চালু রয়েছে। তাই গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের দেশেও নারী অধিকার নিশ্চিত করে একটা অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত তৈরি করা যেতে পারে।
একবিংশ শতকে এসে আমরা সাম্য, সভ্যতা, প্রগতিশীলতার কথা বলছি, আর অন্যদিকে নারীর প্রতি অন্যায় বৈষম্যগুলো জিইয়ে রেখেছি, তা তো হতে পারে না। এখন পরিবর্তনের সময় হয়েছে। বর্তমানে যে বিষয়টির দিকে বেশি গুরুত্ব আরোপ করতে হবে তা হলো, বাংলাদেশে সব জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে একটি অভিন্ন উত্তরাধিকার আইন প্রতিষ্ঠা করা, যাতে নারী অধিকারের বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকবে।
যদি একটি অভিন্ন উত্তরাধিকার আইন প্রণয়ন করা যায়, তাহলে দেশের অপরাপর নৃ-গোষ্ঠীগুলোর ওপরও এর প্রভাব পড়তে বাধ্য। কেননা আমরা মাতৃতান্ত্রিক ও মাতৃসূত্রীয় সমাজব্যবস্থাগুলোর (গারো, মারমা, খাসি) দিকে তাকালে দেখি, প্রথাগতভাবে তারা সম্পত্তির ওপর উত্তরাধিকারী হলেও রাষ্ট্রের মূল স্রোতোধারা পুরুষতান্ত্রিক হওয়ায় তারাও সমাজের মূলধারায় আসতে পারছে না। কাজেই সবার আগে রাষ্ট্রের মূলধারায় পরিবর্তন আনা জরুরি। এতে সমাজে প্রচলিত ভিন্ন ধারাগুলোর মধ্যে পরিবর্তন আনা অনেক সহজ হবে।
আমরা আশাবাদী যে বর্তমান সরকার নারী অধিকারের বিষয়ে বেশ কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে বাবার সমান্তরালে মায়ের অভিভাবকত্বের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। রোকেয়া পদক বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ১৯৯৭ সালের জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু এ নীতিতে পাহাড়ি নারীদের কোনো কথা নেই। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, মহাজোট সরকার যেন নারী উন্নয়ন নীতিতে দেশের সব জাতি-ধর্মের নারীদের বিষয়ে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনার ব্যবস্থা রাখে।
ইলিরা দেওয়ান: মানবাধিকারকর্মী, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক।
iliradewan@yahoo.com

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা: কিছু বিবেচনা by মনজুর আহমদ

দেশব্যাপী প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার ফল নিয়ে সংগতভাবেই উত্তেজনা দেখা যাচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন ও শিশুর স্বার্থ রক্ষায় এ পদক্ষেপ যেন বাধা না হয়, সে বিষয়ে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
প্রথম আলোর প্রতিবেদক শরিফুজ্জামান তাঁর বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে (প্রথম আলো, ২৩ ডিসেম্বর) সমাপনী পরীক্ষার কিছু দিক তুলে ধরেছেন। পরীক্ষায় অকৃতকার্য ১১ শতাংশ এবং নাম লিখিয়েও পরীক্ষায় না আসা ৮ শতাংশ মিলে প্রতি পাঁচজন শিশুর মধ্যে একজন অকৃতকার্যের স্তরে পড়ছে। মনে রাখতে হবে, পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পৌঁছানোর আগে প্রায় অর্ধেকসংখ্যক শিশু ঝরে পড়ে।
পরীক্ষার মাধ্যমে কৃতকার্য শিশুদের প্রথম থেকে তৃতীয়—এই তিন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছে। ২০ শতাংশ কৃতকার্য শিশু তৃতীয় শ্রেণীভুক্ত হয়েছে। শিক্ষাবিদ ও মূল্যায়ন বিষয়ে ওয়াকিবহাল অনেকে এ ব্যাপারে আপত্তি করেছিলেন। সারা জীবনের জন্য বিপুলসংখ্যক শিশুকে তৃতীয় শ্রেণীর মার্কা লাগিয়ে দেওয়ার কোনো যুক্তি বা প্রয়োজনীয়তা আছে কি? এ শিশুদের পরীক্ষার ফল প্রধানত শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা ও সমস্যার নির্দশন। এ ছাড়া ধরে নেওয়া হচ্ছে, সমাপনী পরীক্ষাটি শিশুর দক্ষতা ও জ্ঞান নির্ণয়ে এমনই অব্যর্থ যে নির্দ্বিধায় শিশুদের বিভিন্ন দক্ষতা ও যোগ্যতার স্তরে ফেলে দেওয়া যায়। যথেষ্ট সুযোগ ও সহায়তা পেলে তৃতীয় শ্রেণীভুক্ত অনেকেই সাফল্য দেখাতে পারবে। কিন্তু ব্যর্থতার ছাপ অতি অল্প বয়সে লাগিয়ে দিলে সেই সম্ভাবনা দুরূহ। অগ্রসর শিক্ষাব্যবস্থাসম্পন্ন কোনো দেশে প্রাথমিক শিক্ষা পর্যায়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এ রকম শ্রেণীবিভাগ করা হয় না।
সমাপনী পরীক্ষা নিয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এটি প্রাথমিক শিক্ষায় অর্জিত দক্ষতা ও যোগ্যতা কতখানি করতে পারে। এ ব্যাপারে শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে ২০০৬ ও ২০০৮ সালে নমুনা জরিপ করা হয়েছিল। ২০০৮ সালে বিভিন্ন বিষয়ে পঞ্চম শ্রেণীর শিশুদের মধ্যে নির্ধারিত দক্ষতা (শিক্ষাক্রম অনুযায়ী) অর্জনের হার ছিল বাংলা ১৪ শতাংশ, ইংরেজি ২, গণিত ৩, সমাজপাঠ ২ ও বিজ্ঞান ২ শতাংশ। নির্ধারিত দক্ষতা পরিমাপক পরীক্ষাটির বিষয়, পরিমাপের মানদণ্ড ও প্রক্রিয়া ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন থাকতেই পারে। কিন্তু শিক্ষা অধিদপ্তরের নিজস্ব জরিপ ও সমাপনী পরীক্ষার ফলের মধ্যে বিরাট ব্যবধান প্রণিধানযোগ্য।
সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্নগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এগুলো অতিমাত্রায় পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তুনির্ভর। অর্থাত্ পাঠ্যপুস্তকে যা লেখা আছে এবং অনুশীলনী হিসেবে যে প্রশ্ন আছে, সেগুলোই পরীক্ষার প্রশ্নে স্থান পেয়েছে। ছাত্রদের পাঠ্যপুস্তকের কিছু নির্বাচিত অংশ মুখস্থ করে সেই ভাষায় উত্তর দিতে উত্সাহিত করা হচ্ছে। প্রকৃত যোগ্যতা ও দক্ষতার যাচাই বা পরিমাপ এভাবে হতে পারে না।
সমাপনী পরীক্ষাকে শিক্ষার্থীর প্রকৃত জ্ঞান ও দক্ষতা নির্ণয় এবং বিদ্যালয় ও শিক্ষকসহ শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকরতা নিরূপণের উপায় হিসেবে কাজে লাগাতে হলে নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করা দরকার।
১. পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক বার্ষিক পরীক্ষার আদল থেকে সরে গিয়ে এ পরীক্ষাকে প্রকৃত যোগ্যতা ও দক্ষতাভিত্তিক মূল্যায়নে রূপান্তর করা দরকার। এ কারণে প্রতি বিষয়ের জন্য দুই ঘণ্টা ধরে ছয়টি পরীক্ষা না নিয়ে বাংলা, গণিত এবং সমাজ ও পরিবেশ বিষয়ে তিনটি দুই ঘণ্টার পরীক্ষাই যথেষ্ট। মাতৃভাষা ও গণিতের দক্ষতার ভিত্তি তৈরি করা প্রাথমিক পর্যায়ের প্রধান দায়িত্ব। ন্যূনতম এ লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা সমগ্র প্রাথমিক শিক্ষার ব্যর্থতা।
২. দক্ষতাভিত্তিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি ও উত্তর মূল্যায়ন প্রক্রিয়া যথার্থ হতে হবে; এটি প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ব্যাপার নয়। এ জন্য একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে একটি বিশেষজ্ঞ দলকে সার্বক্ষণিক কাজ করতে হবে। প্রশ্নপত্রের ধরন, কাঠামো ও উত্তর যাচাইয়ের যথার্থতা নিশ্চিত করতে এগুলো নিয়ে ক্রমাগত পরীক্ষামূলক কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
. কৃতকার্য শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্ত করা থেকে বিরত থাকতে হবে। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষার সনদে শ্রেণীর উল্লেখ থাকা মোটেই সংগত নয়।
৪. ক্রমাগত পরীক্ষার যথার্থতা ও নির্ভরযোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য এটির প্রমিতকরণ নিয়ে কাজ করতে হবে। বিভিন্ন যোগ্যতার ক্ষেত্রে ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষাক্রম, বিদ্যালয়, শিক্ষক ও শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকরতা সম্পর্কে ফলাফলের তাত্পর্য নিয়ে অব্যাহতভাবে বিশ্লেষণ ও গবেষণা করতে হবে। এ জন্য একটি একাডেমিক প্রতিষ্ঠানভিত্তিক বিশেষজ্ঞ দলকে স্থায়ীভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
সমাপনী পরীক্ষাকে সুযোগের সমতাসহ মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা গড়ে তোলার উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া না হলে এ পরীক্ষা নতুন সমস্যার জন্ম দেবে।
ড. মনজুর আহমদ: ব্র্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা।

অস্তিত্বহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান -প্রতিষ্ঠার আগেই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি

যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অস্তিত্বই নেই, তা বোর্ডের অনুমোদন ও স্বীকৃতি পায় কীভাবে? অথচ এই অবিশ্বাস্য কাণ্ডটি ঘটিয়েছেন কথিত আক্কেলপুর মডেল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের উদ্যোক্তারা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, এমনকি সাইনবোর্ড টাঙানোর আগেই পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছাপিয়ে শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দিয়েছেন এর স্বঘোষিত উদ্যোক্তারা। ঘটনাটি ঘটেছে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলায়। কল্পিত ইনস্টিটিউটের সভাপতি হিসেবে যাঁর নাম ও টেলিফোন নম্বর দেওয়া হয়েছে, তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। রহস্যটি এখানেই। সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে একশ্রেণীর লোক ক্ষমতাসীনদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে যে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধিতে লিপ্ত হয়, আক্কেলপুরের ঘটনাই এর প্রমাণ।
এ ধরনের ভুঁইফোড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে উদ্যোক্তারা সাধারণত চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে যেমন মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করেন, তেমনি লোভনীয় বিজ্ঞাপন দিয়ে শিক্ষার্থীদের টানতে সচেষ্ট হন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ‘বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখবেন’ বলে দায়িত্ব শেষ করতে পারেন না। তাঁর উপজেলায় এ রকম অস্তিত্বহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে যাতে কেউ বাণিজ্য করতে না পারে, তা দেখার দায়িত্ব তাঁরই।
বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে পত্রিকায় প্রায়ই এ ধরনের চটকদার বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হওয়ার পর প্রথম আলোর আক্কেলপুর প্রতিনিধি সরেজমিনে খোঁজখবর নিয়ে দেখতে পেয়েছেন, সেখানে আক্কেলপুর মডেল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউট নামে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। এ রকম ঘটনা শুধু আক্কেলপুরে ঘটেছে, তা ভাবার কারণ নেই। সারা দেশেই অনুমোদিত ও অননুমোদিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নামে শিক্ষাবাণিজ্য চলে আসছে। এগুলো তদারক করার দায়িত্ব যাঁদের, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তাঁরা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে থাকেন।
যেকোনো নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা অধিদপ্তরের কিছু নিয়মকানুন ও শর্ত পূরণ করতে হয়। সেসব পূরণ না করে ন্যূনতম অবকাঠামো তৈরি করার আগেই কীভাবে আক্কেলপুর মডেল টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের নামে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হলো, তা তদন্তপূর্বক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। শিক্ষাক্ষেত্রে অস্তিত্বহীনদের যে দৌরাত্ম্য চলছে, তা বন্ধ করতে না পারলে শিক্ষাব্যবস্থার অস্তিত্বই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

সংসদে ফিরে যাওয়ার বিকল্প নেই -বিরোধী দলের আহ্বান

বিএনপির মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনসহ কয়েকজন নেতা জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা করার জন্য সরকারের প্রতি যে আহ্বান জানিয়েছেন, তা ভালো। তবে এতে কতটা আন্তরিকতা রয়েছে আর কতটা রয়েছে রাজনীতি, তা বলা কঠিন। কারণ জাতীয় সংসদের ফটকগুলো খোলা রয়েছে, প্রধান বিরোধী দল যদি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পর্কে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরাকে জরুরি কর্তব্য মনে করে, তবে তারা সংসদে গিয়েই তা করতে পারে। মাঠে-ময়দানে সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সরকারের প্রতি আহ্বান জানানোর কিছু নেই।
প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নবম জাতীয় সংসদের শুধু প্রথম অধিবেশনে যোগ দিয়েছিল। তারপর বাজেট অধিবেশনের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনসহ দুটি অধিবেশনে দলটি এক দিনের জন্যও অংশ নেয়নি। আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে চতুর্থ অধিবেশন শুরু হতে যাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে, বিএনপি সে অধিবেশনেও যোগ দেবে না বলে আভাস-ইঙ্গিত দিয়েছে। সংসদ বর্জনের যুক্তি হিসেবে তারা বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর সরকার ও সরকারি দলের নির্যাতন-হয়রানির অভিযোগ করছে। তারা বলে চলেছে, বিরোধী দল সংসদে যেতে চায়, কিন্তু যাওয়ার পরিবেশ নেই; সরকার সে ধরনের পরিবেশ সৃষ্টির ব্যাপারে আগ্রহী নয়, ইত্যাদি।
বিরোধী দলগুলোর সংসদ বর্জনের এসব অজুহাত পুরোনো হয়ে গেছে। সব সংসদের আমলে সব বিরোধী দলের মুখে একই ধরনের কথাবার্তা দেশবাসী শুনে আসছে। বাস্তবিক অর্থে এই কথাগুলো সংসদ বর্জনের অজুহাত ছাড়া কিছু নয়। সংসদ বর্জনকে ব্যবহার করা হয় রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে; বর্জনকারী বিরোধী দল মনে করে, এটা করে তারা রাজনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। কিন্তু সত্যিকার অর্থে তাদের লাভ হয় না। কারণ জনগণ প্রত্যাশা করে, বিরোধী দল সংসদে অংশগ্রহণ করুক। অধিবেশনের পর অধিবেশন তারা বর্জনকৌশল চালিয়ে গেলে জনগণ বিরক্ত হয়। আরও বীতশ্রদ্ধ হয়, যখন দেখতে পায় সংসদে যোগ না দিয়েই নির্ধারিত বেতন-ভাতাসহ সব সুযোগ-সুবিধা সাংসদেরা ভোগ করে চলেছেন।
জনগণ সংসদ সদস্যদের নির্বাচিত করেছে সংসদে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে। নির্বাচনের সময় সাংসদদের কোনো শর্ত থাকে না যে কী ধরনের ‘পরিবেশ’ পেলে তাঁরা সংসদে যোগ দেবেন, আর কী ‘পরিবেশে’ দেবেন না। তাঁদের সংসদে যোগদান একটি নিঃশর্ত বিষয়, এর জন্য প্রত্যেক সাংসদ ও তাঁর দল দায়বদ্ধ সংশ্লিষ্ট ভোটারমণ্ডলী ও সামগ্রিকভাবে গোটা জাতির কাছে। সরকার বা সরকারি দলের কোনো আচরণের ওপরই বিরোধী দলের সাংসদদের সংসদে যোগ দেওয়া বা না দেওয়া নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। বিরোধী দলের ওপর সরকারপক্ষের অত্যাচার-নির্যাতন-হয়রানি থাকলে তা অবশ্যই অন্যায়; কিন্তু এর সঙ্গে সংসদে যোগদান করা বা না করার কোনো সম্পর্ক থাকা বাঞ্ছনীয় নয়। বরং উল্টো, কোনো বাধাবিপত্তি থাকলে তা অগ্রাহ্য করেই বিরোধী দলের সংসদে যোগদান করা উচিত। খুব ভালো হয়, যদি বিএনপি সামনের মাসে চতুর্থ অধিবেশনে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে স্থায়ীভাবে সংসদে ফিরে যায়। আরও ভালো হয়, যদি প্রবল তর্কে-বিতর্কে সংসদ প্রাণবন্ত, কখনো কখনো উত্তপ্তও হয়ে ওঠে।

চারদিক -স্মৃতিময় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিঘর by বিশ্বজ্যোতি চৌধুরী

১৯৭১ সালের ঘটনা। দেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের ৪২৫ বর্গকিলোমিটার আয়তনের শ্রীমঙ্গল উপজেলার অগ্নিঝরা দিনগুলোর কিছু টুকরোচিত্র। নয় মাসে জীবন, সম্ভ্রম, সম্পদ—সবকিছু হারানো ইতিহাসের খণ্ডিত কিছু আলোকচিত্র। দুঃসাহসী কিছু মুক্তিপাগল যুবকের দীপ্ত অঙ্গীকারনামা। নিরপরাধ নর-নারীর কঙ্কালের অংশ। পাঁচ-সাতটি বধ্যভূমির পবিত্র মাটি। যে মাটির বুকে শুয়ে আছে লাখো তাজা প্রাণ। যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহূত কিছু সামগ্রী। কয়েকটি শহীদ পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের হাল-হকিকত। সবই রয়েছে এখানে। টুকরো টুকরো ইতিহাসের প্রতিচ্ছবির মালা গেঁথে এভাবেই সাজানো হয়েছে তিনটি কক্ষের দেয়াল ও মেঝে। এ যেন নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধের আদ্যোপান্ত।
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে চন্দ্রনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আয়োজিত ‘স্মৃতিময় মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিঘর’ প্রদর্শনীর কথা বলছিলাম। বিজয়ের মাস ডিসেম্বরের প্রথম দিন থেকে শুরু হওয়া এ প্রদর্শনী চলবে মাসব্যাপী। চিফ হুইপ মো. আব্দুস শহীদ এর উদ্বোধন করেন। মহতী এ আয়োজনের উদ্যোক্তা শ্রীমঙ্গলের তরুণ সাংবাদিক বিকুল চক্রবর্তী।
প্রতিদিন সকাল নয়টায় প্রদর্শনীটি সবার জন্য খুলে দেওয়া হয়। নানা শ্রেণী-পেশার বিভিন্ন বয়সী দর্শনার্থীর ভিড়ে মুক্তিযুদ্ধের প্রতি মানুষের আগ্রহ, ভালোবাসা, বিনম্র শ্রদ্ধার কথাই মনে করিয়ে দেয়। অন্যদিকে মনে করিয়ে দেয় পাকিস্তানি হানাদারের দোসর রাজাকার, আলবদর, আল-শামস বাহিনীর পৈশাচিকতা-নৃশংসতার প্রতি মানুষের ঘৃণা ও ধিক্কার।
প্রদর্শনীর শুরু থেকেই শিশুদের ভিড় লক্ষণীয়। বিদ্যালয় ছুটির পর কিংবা পরীক্ষা শেষে শিশুরা দলবেঁধে প্রদর্শনীটি দেখছে। এ রকম একটি আয়োজনে শিশুদের আগমন ঘটছে দলে দলে। ভাবতে ভালোই লাগে। কেননা, ওদের জন্যই তো এ আয়োজন। এসব শিশুকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে দিলে তারা বুঝতে পারবে, কী অপরিসীম মূল্যে কেনা আমাদের এই পবিত্র মাতৃভূমি—বাংলাদেশ। আরও ভালো লাগল এই ভেবে—এই প্রজন্মের এক তরুণ দায়িত্ববোধে কী সমৃদ্ধ! চেতনায় কী উদ্দীপ্ত!
প্রদর্শনীতে মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধাদের ব্যবহূত কয়েকটি স্মৃতিময় স্থানের ছবি রয়েছে। রয়েছে সেসব স্থানের পরিচিতি। এতে রয়েছে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাল দিন, বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ থেকে ষোলই ডিসেম্বরে তত্কালীন রেসকোর্স ময়দানে পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ পর্যন্ত বিভিন্ন প্রেক্ষাপটের প্রায় ২০০ আলোকচিত্র।
এখানে রয়েছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা মুকিত লস্করের ব্যবহূত একটি পাঞ্জাবি, যিনি ১৯৭১ সালে মৌলভীবাজারের শেরপুর ও সিলেটের সাদিপুরে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধজয়ের একজন অগ্রসেনানী। নায়েক সুবেদার আবদুল হাশেমের নেতৃত্বে সিলেটের জেল ভেঙে বন্দীদের মুক্ত করার অপারেশনে যাওয়ার পথে জেলসংলগ্ন কৃষি অফিসের সামনে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন তিনি। নির্যাতন শেষে তাঁকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়।
এখানে রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা আলী আকবরের ব্যবহূত বেল্ট ও টুপি। এগুলো দেখে প্রদর্শনীতে আসা সহযোদ্ধাদের অনেকেই যুদ্ধদিনের বিভীষিকাময় মুহূর্তকে আলিঙ্গনে বাধ্য হন। ফিরে যান তাঁদের জীবনে ঘটে যাওয়া সেসব দিনের কোনো এক ঘটনায়। স্মৃতির সমুদ্রস্নানে অবগাহন করে তাঁদেরই একজন তুলে আনেন কিছু শারীরিক যন্ত্রণা কিংবা মানসিক কষ্টের কথা। কেউ বা তুলে আনেন বীরত্বগাথা, কেউ বা বিরহের কোনো কাহিনি, হানাদার নিধনের গল্প। এসব সত্য কাহিনি, যন্ত্রণা, বীরত্বগাথা আর মানসিক কষ্টের যোগফলই তো আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের অহংকার।
বিকুল চক্রবর্তী জানালেন, গত নভেম্বরে ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের উদ্যোগে আয়োজিত ‘মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক রিপোর্টিং’ কর্মশালায় অংশ নিয়ে তিনি এ রকম একটি প্রদর্শনীর আয়োজনে অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। নিজের এলাকার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আগামী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতেই তাঁর এ উদ্যোগ। এলাকার প্রতিটি শহীদ পরিবার, এই অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক তাঁর এই আয়োজনে সহযোগিতা করেছেন। তাঁর বিশ্বাস, আয়োজন ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা ও দেশমাতৃকার সঙ্গে প্রদর্শনীতে আসা শিশু-কিশোরদের সেতুবন্ধ শক্ত ভিতের ওপর রচিত হবে।
ষোলই ডিসেম্বর বিজয়ের দিনে স্মৃতিময় মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিঘরের তিনটি কক্ষ ঘুরে দেখছিলাম। নিজেকে সামলে নিতে বড়ই কষ্ট হচ্ছিল। কী এক অজানা শিহরণে মনটা আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ল। অথচ সেই ১৯৭১ সালে আমি চন্দ্রনাথ বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী ছিলাম। সেসব দিনের স্মৃতি বলতে আমার কাছে কিছু মিছিল, শরণার্থী হয়ে ভারতে যাওয়া, ত্রিপুরার নিলামবাজারে এক দাদুর বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া, রেডিওতে (স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র) পরিবারের অন্যদের সঙ্গে ‘ঠেটামালেক্যা-বিচ্চু’ কাহিনী (এম. আর. আখতার মুকুলের চরমপত্র) শোনা ছাড়া আর কিছুই মনে নেই।
কক্ষগুলো ঘুরে বারান্দায় বেরোতেই ছোট্ট শিশু পাপ্পু ও ইয়ামিন দুটি খাতা আমার সামনে মেলে ধরল। একটিতে দেখলাম, এ পর্যন্ত ১৫ হাজার ২১৬ জনের স্বাক্ষর রয়েছে। অন্য খাতাটিও ভরে গেছে বিশিষ্টজনদের মন্তব্যে।
মন্তব্যের খাতা হাতে নিয়ে লিখতে শুরু করলাম, ‘কলমসৈনিক, তোমার বিশ্বাস আরও শাণিত হোক। আয়োজন সার্থক হোক। তোমার এই মহান উদ্যোগের পাশে আরও ১০ জনের কৃতজ্ঞতাবোধ শামিল হোক। তোমার এই সাহসী উদ্যোগকে আমার সালাম।’

মুক্তিযুদ্ধের বিজয় ও জীবনযুদ্ধের পরাজয় by আবুল মোমেন

ডিসেম্বর আমাদের বিজয়ের মাস। বিজয়ের সূত্রে আসে উত্সব। ডিসেম্বর উত্সবের মাস। যে বিপুল ত্যাগের বিনিময়ে আমাদের এ অর্জন, তাকে ছাপিয়ে ওঠে যুদ্ধজয়ের আনন্দ। এ নিয়ে মানুষের ভাবাবেগ ও উচ্ছ্বাসের যে বাঁধভাঙা জোয়ার প্রতিবছর দেখি, তাকে স্বাভাবিক বলে মেনেও মনের একটু খটকা যেন তাড়াতে পারি না।
ভাবতে থাকি বিজয়ের তাত্পর্য। স্বাধীনতার ভাবার্থ। দখলদার বাহিনীকে পরাজিত করে আমরা যে বিজয় অর্জন করেছি, স্বাধীন মাতৃভূমিকে শত্রুমুক্ত করেছি, তা কি কেবল উদ্যাপনের বিষয়? ভাবাবেগ আর উচ্ছ্বাসের সঙ্গে উদ্যাপনের উপলক্ষ?
আমরা যে এর উত্তর জানি না, তা নয়। কিন্তু উত্তর মানি না। মানতে চাই না। স্বাধীন বাংলা বেতারের গান ও মুক্তির গানগুলোকে আমরা যে ভুলিনি, বিস্মৃত হতে দিইনি, গানগুলো আজও আবেগাপ্লুত হয়ে গেয়ে থাকি, তাতে স্বাধীনতার চেতনা জাগরূক থাকে আমাদের মধ্যে। একইভাবে শিহরণজাগানো ভাবাবেগে, চোখের জলে আমরা বারবার শুনি বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ, শুনি ‘আমার সোনার বাংলা’, কিংবা গণসংগীত ‘নোঙ্গর তোল তোল’। এমন আরও কত গান। এ সবই যে আমাদের ইতিবাচক বৈশিষ্ট্য, তাতে সন্দেহ নেই।
৩৮ বছর এভাবে চলেনি। জিয়া ও এরশাদের আমলে এই আবেগ ও চেতনা ভুলিয়ে দেওয়ার কাজ চলেছে। তা ছিল প্রতিক্রিয়ার প্রত্যাঘাত, পেছনে চলার অপচেষ্টা। সেটি ছিল জাতীয় দুর্যোগের দুঃসময়। বাঙালি এবং জাতিগত সব সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী, সবারই জীবন তখন যেন থেমে গিয়েছিল। অর্থনৈতিক বিকাশ ও উন্নতিও তখন সম্ভব হয়নি। সেই ধারাটা বিএনপি তার রাজনৈতিক চেতনা ও সংস্কৃতির শাঁস হিসেবে নিয়েছে। ফলে একটু তলিয়ে দেখলে বিএনপির মধ্যে কবর দিয়ে দেওয়া মুসলিম লীগ আর প্রত্যাখ্যাত পাকিস্তানি ভাবধারার ছায়া দেখা যায়। এরশাদ করেছেন সুবিধাবাদের রাজনীতি, যা থেকে ফায়দা অর্জন বিএনপির ছায়া অনুসরণ করেই সম্ভব ছিল।
এবার বিএনপি তথা বিএনপি ঘরানার রাজনীতির ভরাডুবি ঘটিয়েই ক্ষমতায় এসেছে আওয়ামী লীগ। তাদের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে এরশাদ থাকলেও তাঁর সুবিধাবাদ ও আপসের রাজনীতি আপাতত বিএনপি থেকে তাঁকে দূরে সরিয়ে রাখবে।
আওয়ামী লীগের আমলে বিজয়ের আনন্দে মানুষ বিভোর হবে বেশি, সেটাই যেন স্বাভাবিক। এবার সারা দেশে বিজয় মেলা ডিসেম্বর জুড়েই যেন চলছে। এই আনন্দ-উচ্ছ্বাসে দেশের সব মানুষ যোগ দিতে পারছে, এমন কথা বলা যাবে না। আদর্শের কারণে বিমুখ থাকা মানুষের সংখ্যা কম বলেই মনে হয়। কিন্তু নিতান্ত অর্থনৈতিক কারণে ইচ্ছাকে দমন করে যোগ দিতে অপারগ মানুষের সংখ্যা অনেক।
বিজয়ের ৩৮ বছর পর দেখি, দেশে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা অনেক, হতদরিদ্র প্রচুর, শিক্ষাবঞ্চিত জনসংখ্যা বিপুল। যে শিক্ষা মিলছে, তার মান আশানুরূপ নয়। দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। স্বার্থপরভোগী মানসিকতা বেড়েছে। অধিকাংশ মানুষ অসুখে সঠিক স্বাস্থ্যসেবা পায় না। প্রশাসনিক অব্যবস্থা ও অদক্ষতা বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি চলছে। যুবসমাজের অবক্ষয় অব্যাহত আছে। নারী নির্যাতন বেড়েছে। এভাবে দেশের এক হতাশাজনক চিত্রই আমরা দেখতে পাব। অথচ এ পর্যন্ত ৩৯ বার আমরা বিজয় দিবস উদ্যাপন করলাম। তার মানে দেশ শত্রুমুক্ত হয়েছে ৩৮ বছর। এত বছরেও স্বাধীনতার সুফল মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হলো না।
দেশের অধিকাংশ মানুষ যখন দারিদ্র্যের কাছে পরাভূত থাকে, যখন প্রশাসনিক অব্যবস্থা-অদক্ষতায় পরাধীনতার শৃঙ্খলে নির্যাতিত হয় অধিকাংশ মানুষ, যখন অপরাধ ও দুর্নীতির কাছে সমাজ ও সরকার বারবার পরাস্ত হতে থাকে, তখন কি মনে হয় না আমাদের বিজয় কতটা অন্তঃসারশূন্য, অর্থহীন হয়ে আছে?
আনন্দ-উত্সবের বিরুদ্ধে নই আমি। এ রকম আয়োজন আমিও করে থাকি। কিন্তু পুরো জাতি যদি কেবল এর মধ্যেই বিজয় ও স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করে আত্মকেন্দ্রিক সুবিধাভোগী মানসিকতা নিয়ে চলতে থাকে, তাহলে কীভাবে বিজয় ও স্বাধীনতা অর্থবহ হবে জাতীয় জীবনে? সবার জন্য?
এসব আনন্দ-আয়োজন কি তখন দেশের বিপুল অভাগা-অভাজনের জন্য উপহাস হয়ে দাঁড়ায় না? কিন্তু হায়! এ উপহাস আমরা নিরন্তর করে চলেছি। আমার মনে হয়, অন্তত এখন একটু থেমে ভাবা দরকার; সবটা ভেবে, মূল্যায়ন করে সঠিক পথে এগোনো উচিত।
সবার জন্য শিক্ষা, সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষা, সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা, সবার জন্য সুপেয় পানি, সবার জন্য স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা, সবার জন্য আবাসন, সবার জন্য দুবেলা দুমুঠো খাবার ও পুষ্টি অর্থহীন স্লোগানে পরিণত হয়েছে। বারবার আমরা লক্ষ্য অর্জনের টার্গেট পিছিয়ে দিই। এমনকি আগের অর্জন পরে আর ধরে রাখতে পারিনি, যা ঘটেছে জন্মনিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে। সবার জন্য শিক্ষা বা সবার জন্য মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষার টার্গেট বহুবার পিছিয়ে এখন সম্ভবত ২০১৫। সবাই জানি, ১৯৯০ থেকে যা অধরা রয়েছে, তা এখনো অধরাই থাকবে। এবারের প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার ফলাফলে কিছুটা আশার সঞ্চার হলেও আমরা ভুলতে পারি না, সাম্প্রতিক এক জরিপে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যে চিত্র পাওয়া গেছে, তা। তাতে দেখা যাচ্ছে, শতকরা ৭০ ভাগ ছাত্রই ন্যূনতম অর্জনলক্ষ্য পূরণ করে না। ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় দুর্বলতা থাকার কারণে পরবর্তী উচ্চতর সব ধাপেই শিক্ষার মান খারাপ হয়ে পড়ছে। দুর্বল বুনিয়াদ নিয়ে উন্নত শিক্ষা অবাস্তব ব্যাপার বৈকি।
এই আবেগপ্রবণ হুজুগে জাতিকে কীভাবে উত্সব আর মেলার সংস্কৃতি থেকে বা তার পাশাপাশি কাজের সংস্কৃতিতে টানা যাবে, তা ভাবতে হবে। জাতি গঠনের ও জাতীয় উন্নয়নের কাজগুলো চিহ্নিত করে তাতে যোগ্য ব্যক্তিদের অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
এখন বিজয় দিবসে ও স্বাধীনতা দিবসে যেভাবে ইতিহাসচর্চার নামে ফি বছর কিছু মানুষের একাত্তরের স্মৃতিচারণা আর রাজনৈতিক দলীয় বক্তৃতা-বুলি কপচানোর ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়, তাতে না ইতিহাস বোঝা যায়, না ইতিহাসের সঠিক চর্চা সম্ভব।
একইভাবে টিভিতে টক শোর নামে চলছে কথার ফুলঝুরি। শিক্ষিত, যোগাযোগসম্পন্ন বাকপটু মানুষজন যে যেভাবে পারছেন, যেন মঞ্চ ও টিভিতে কথামালা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। এসব দেখে মাঝেমধ্যে মনে সংশয় জাগে, এত সব মানুষ কি ভাবছেন, কথা বলে বলেই জাতিকে জ্ঞান-বুদ্ধিতে সমৃদ্ধ করা যায়? তার সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব?
অতি ব্যবহারে বুদ্ধিও চালাকিতে পরিণত হয়। আর বারবার একই আবেগে মজতে চাইলে তারও পরিণতি করুণ। একই গান বাজাতে বাজাতে তার আবেদন যায় কমে। সেই যে একাত্তরে অসংখ্য অসাধারণ সব দেশাত্মবোধক গান তৈরি হয়েছে, তারপর আর কই? হয়নি; কারণ আমাদের আবেগের শুদ্ধতা হারিয়ে গেছে, আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থবুদ্ধি মাথাচাড়া দিয়ে ভোগসর্বস্বতার অনলে সৃজনী ক্ষমতাকে বিনষ্ট করেছে। আজ আমরা নানাভাবে যেকোনো সুযোগকে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীগত লাভালাভের স্বার্থেই বিচার করি, ব্যবহার করি।
বিজয়, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু—সবই সমগ্র জাতির অর্জন ও উত্তরাধিকার হিসেবে সবার হয়ে উঠতে পারেনি। নানা জন নিজস্ব ও ক্ষুদ্র স্বার্থে এ সবই ব্যবহার করেছে। তাই বিজয় মেলা ছিনতাই হয়, দখল হয়। মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে পড়েন। ফলে বিজয়কে নানা কাজের মধ্য দিয়ে আপামর জনগণের জীবনে বাস্তব করে তোলা ও সত্য প্রমাণ করার মতো বড় কাজ আজও আরাধ্য রয়ে গেছে। তবেই সবার জীবনে বিজয়ের ছোঁয়া লাগবে।
এত আয়োজন-উত্সব-উচ্ছ্বাসের ঢক্কানিনাদ আর এত কিছু অর্জনের বুলিবিস্তার সত্ত্বেও সত্য হলো, বহু মুক্তিযোদ্ধা জীবনযুদ্ধে পরাজিত। দেশের সিংহভাগ মানুষের জীবন দারিদ্র্য ও বেকারত্বের কারণে পরাজয়ের গ্লানিতে ম্লান।
তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে, আমরা কেমন বিজয় দিবস চাই? কীভাবে বিজয়ের আনন্দকে উপভোগ করতে চাই? দরিদ্রের জন্য কিছু করা কেবল সরকারের কাজ নয়, সবার জন্য মানসম্পন্ন শিক্ষার ব্যবস্থা এককভাবে সরকার করতে পারবে না। কর্মসংস্থান সৃষ্টির দায় একা সরকারের নয়। এভাবে সব বিষয়েই বলা যাবে।
বিজয় দিবসে আমরা যদি সাধারণ মানুষকে প্রতিদিনের পরাজয়ের গ্লানি ও গ্লানিময় বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখাতে পারি, তাহলে তা-ই হবে সবচেয়ে ভালো কাজ। কাজের কাজটি না করে কেবল ইতিহাস শুনিয়ে আর ভাবাবেগ ছড়িয়ে তাকে ক্ষণকালের জন্য ভুলিয়ে রাখতে পারব মাত্র। কিন্তু ঘোর কাটলেই ব্যর্থতা ও পরাজয়ের ক্ষোভ-দুঃখই তাকে গ্রাস করবে। বরং সাধারণের জীবনে ইতিহাস-চেতনা যাথার্থ্যভাবে গেঁথে দিতে হলে তাকে প্রতিদিনের পরাজয়ের ফলে সৃষ্ট দিনযাপনের গ্লানি থেকে উদ্ধার করতে হবে। বর্তমানে যেভাবে চলছে তাতে ভয় হয়, বিজয় ও স্বাধীনতার আবেগ না আমাদের হাতে আফিমের মতো ব্যবহূত হয়। বেঁচে থাকার ব্যবস্থাই হবে তাদের জন্য আদর্শিক প্রেরণা—তা সবাইকে জীবন গড়ে তোলার উদ্দীপনা দেবে।
বিজয় এক প্রেরণাদায়ী শব্দ, যা থেকে আশা, স্বপ্ন, সদিচ্ছা, উত্সাহ, উদ্দীপনার মতো ইতিবাচকতার আলোকরশ্মি বিচ্ছুরিত হতে থাকে। কিন্তু আমাদের কিছু মানুষের মজ্জাগত অসচেতন আত্মকেন্দ্রিক তত্পরতার ফলে এই অসাধারণ জাদুকরী সম্ভাবনাময় শব্দটি তার সব জৌলুশ হারিয়ে বসেছে। দেশের অধিকাংশ মানুষের জীবনে ‘বিজয়’ শব্দটি যখন কোনো দ্যোতনা দেবে না, ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে না, যখন এ শব্দটি দ্যোতনা-প্রেরণাবিহীন মূক-বন্ধ্যা শব্দে পরিণত হয়, তখন তো বুঝতে হবে, বাইরের এসব জৌলুশ ও হইচই অন্তরের দীনতা ঢাকতে পারছে না। বরং এসবই বিদ্রূপের মতো মনে হবে। বস্তুত কখন আমাদের অজান্তে বিজয় ও পরাজয়ে ভাবগত তাত্পর্য ঘুচে যায়, আমরা বুঝতেই পারি না।
কিন্তু আমাদের তো ভাগ্যহত মানবতার জন্য বিজয়ের কথা ভাবতে হবে।
আবুল মোমেন: কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক।