Showing posts with label মুনির হাসান. Show all posts
Showing posts with label মুনির হাসান. Show all posts

Sunday, March 2, 2025

নতুন দলের বার্তা নিয়ে ধোঁয়াশা, কৌশল নির্ধারণে তৎপরতা by মুনির হোসেন

এক প্ল্যাটফরমে নানা মত, নানা পথের মানুষ। ডান, বাম, ধর্মীয় ও জাতিগত ভিন্নতার সঙ্গে আছে বিভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা থেকে পড়ে আসা প্রতিনিধি। ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি- এনসিপি গঠিত হয়েছে সব মানুষকে নিয়ে। সবাইকে নিয়ে মধ্যপন্থি রাজনীতির যে চর্চার কথা বলছে এনসিপি সেটিই দলটির বড় চ্যালেঞ্জ। দলের নেতাকর্মীরা নাহিদকে ইমাম মানলে সেই দলের কেবলা কী- সেই প্রশ্নই এখন জনমনে। ইতিমধ্যে বিএনপিসহ অনেকে নতুন দলের আদর্শ পরিষ্কার নয় বলে আওয়াজ তুলেছে। ভারত ও পাকিস্তানপন্থি রাজনীতির যে ইতি চাইছে এনসিপি তারাই বা কোনপন্থি- প্রশ্ন অনেকের। তবে নতুন দলের নেতারা স্পষ্ট করেছেন এখন থেকে কেবল বাংলাদেশপন্থি রাজনীতি হবে। মধ্যপন্থির এ দল সব মত, সব পথকে গুরুত্ব দেবে। যেটি করতে গেলে রীতিমতো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে বলেও মনে করছেন দলটির নেতারা। দ্রুত গঠনতন্ত্র প্রণয়ন করে এ বিষয়গুলো পরিষ্কার করতে চায় এনসিপি। এ ছাড়াও আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম যে সেকেন্ড রিপাবলিকের কথা বলেছেন, সেটি বলতে কী  বোঝাতে চান নতুন দল? একই মঞ্চে সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেছেন, নতুন সংবিধান ও গণপরিষদ এখন বাস্তবতা। যেটি তারা আরও আগ থেকেই বলে আসছেন। সেটি বাস্তবে রূপ দেয়া নিয়েও কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে নতুন দলকে। সব মিলিয়ে নতুন দলের বার্তা নিয়ে এক ধরনের ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। যেটি নিয়ে অন্য রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে তাদের এক ধরনের মতবিরোধ হতে পারে।

এদিকে আগামী তিন মাসের মধ্যে পুরোপুরি রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে শহর থেকে গ্রামে পৌঁছাতে চায় নতুন দল। একইসঙ্গে মহানগর, জেলা, উপজেলায় কমিটি দিতে চায় তারা। সেক্ষেত্রে জাতীয় নাগরিক কমিটির ঘোষিত কমিটি এনসিপি’র কমিটিতে রূপ পাবে। তবে এক্ষেত্রে কিছু যোগ-বিয়োগ হতে পারে বলে জানা গেছে। গতকাল রাতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে পারেনি দলটি। আত্মপ্রকাশের দিন একটি কমিটি প্রস্তুত করা হলেও সেটি নিয়ে অনেকের আপত্তি থাকায় তাতে সংশোধন আনা হচ্ছে বলে দলটির অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা গেছে। এ ছাড়া রমজানের মধ্যেই দলের প্রতীক চূড়ান্ত করে রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন প্রক্রিয়া শেষ করতে চায় এনসিপি।

গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া ছাত্ররা দল গঠনের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে জাতীয় নাগরিক কমিটি গঠন করে। যেখানে যোগ দেয়, ডান ও বামপন্থি রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্রসংগঠনের নেতারা। এ ছাড়াও এতে বিভিন্ন জাতি ও ধর্মীয় গোষ্ঠীকে যুক্ত করা হয়। তখন থেকেই প্রশ্ন উঠেছে এত মতের মানুষের সংগঠন রাজনৈতিক দলে পরিণত হলে তাদের মতাদর্শগত ঐক্য হবে কিনা। এ ছাড়াও তারা যে মধ্যপন্থি রাজনীতির কথা বার বার বলছেন সেটি  কতোটুকু সম্ভব হবে। গতকাল এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয় দলটির যুগ্ম সদস্য সচিব মোহাম্মদ মিরাজ মিয়ার কাছে। তিনি বলেন, নানা মত ও পথের মানুষকে এক জায়গায় আনা চ্যালেঞ্জ এটা ঠিক। আবার এটি দলকে অনেক বেশি শক্তিশালীও করবে। আমরা বলছি এনসিপি হবে মধ্যপন্থি দল। এ দলে সব মতের মানুষ থাকবে। আমরা এখানে সবাইকে নাগরিক হিসেবে দেখতে চাই। তার মতে, আগামী দিনে এটি পরিষ্কার হবে দলগত কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে সবাইকে ঐকমত্যে আনা যাবে কিনা। তিনি বলেন, আমাদের গঠনতন্ত্র, কর্মসূচি নিয়ে এখনো কাজ হয়নি। এ নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হবে তারা আমাদের মতাদর্শ, দফা, মূলনীতি কী হবে বাকি সব ঠিক করবেন। মূল বিষয় হচ্ছে আমরা মানুষের অধিকার ভিত্তিক আমাদের দফাসমূহ ঠিক করবো।

দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে সেকেন্ড রিপাবলিক, নতুন সংবিধান ও গণপরিষদের কথা বলেছেন। দলের সদস্য সচিব বলেছেন, নতুন সংবিধান এখন বাস্তবতা। নাহিদ তার ঘোষণাপত্রে বলেছেন, জুলাই ২০২৪ গণঅভ্যুত্থান আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার লড়াই সূচনা করেছে। একটি গণতান্ত্রিক নতুন সংবিধান প্রণয়নের মাধ্যমে আমাদের সাংবিধানিক স্বৈরতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সকল সম্ভাবনার অবসান ঘটাতে হবে। আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিক প্রতিষ্ঠার জন্য গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন আমাদের অন্যতম প্রাথমিক লক্ষ্য। আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিকে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষায় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। ভেঙে পড়া রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনরায় গড়ে তোলা ও তাদের গণতান্ত্রিক চরিত্র রক্ষা করা হবে আমাদের রাজনীতির অগ্রাধিকার। এর মধ্যদিয়েই কেবল আমরা একটি পরিপূর্ণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হতে পারবো।

তিনি বলেন, আমরা এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিকাশ চাই যেখানে সমাজে ও রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বিভেদের বদলে ঐক্য, প্রতিশোধের বদলে ন্যায়বিচার এবং পরিবারতন্ত্রের বদলে মেধা ও যোগ্যতার মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হবে। আমাদের রাজনীতিতে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির কোনো স্থান হবে না। নাহিদ বলেন, আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিকে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে মূলধারায় তুলে আনা হবে। আমাদের রিপাবলিকে সাধারণ মানুষ, একমাত্র সাধারণ মানুষই হবে ক্ষমতার সর্বময় উৎস। তাদের সকল ধরনের গণতান্ত্রিক ও মৌলিক অধিকারের শক্তিশালী সুরক্ষাই হবে আমাদের রাজনীতির মূলমন্ত্র। আমরা রাষ্ট্রে বিদ্যমান জাতিগত, সামাজিক, লিঙ্গীয়, ধর্মীয় আর সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ ও বৈচিত্র্য রক্ষার মাধ্যমে একটি বহুত্বপূর্ণ ও সমৃদ্ধ সমাজ বিনির্মাণ করতে চাই। আমাদের রিপাবলিক সকল নাগরিককে দারিদ্র্য, বৈষম্য ও ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে শক্তিশালী সুরক্ষা প্রদান করবে। আমাদের সেকেন্ড রিপাবলিকে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর কোনো অংশকেই অপরায়ন করা হবে না। বরং রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককে সমান গুরুত্ব প্রদান ও সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। মিরাজ মিয়া এ বিষয়ে বলেন, সেকেন্ড রিপাবলিক বলে আমরা কী বোঝাতে চেয়েছি সেটি নাহিদ ইসলামের ঘোষণাপত্রেই পরিষ্কার। তবে আমরা বলছি একটি গণপরিষদ গঠনের কথা। যারা নতুন সংবিধান প্রণয়ন করবে। ওই অনুযায়ী দেশ চলবে। আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ীরাই গণপরিষদের সদস্য হিসেবে ৩ থেকে ৬ মাস দায়িত্ব পালন করবেন। তারা নতুন সংবিধান প্রণয়ন করবেন। তারপর তারা সংসদের সদস্য হিসেবে থেকে যাবেন। গণপরিষদের কথা আমরা এজন্য বলছি যে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা কিন্তু সংবিধানে বড় পরিবর্তন আনতে পারেন না। তারা কেবল কিছু আর্টিকেল চেঞ্জ করেন। যেটি আবার অন্য দল আসলে বাদ দিয়ে দেয়। তাই আমরা চাই গণপরিষদের মাধ্যমে এমন একটি সংবিধান প্রণয়ন করতে যেটি পরবর্তীতে অন্য কেউ চাইলেও আর পরিবর্তন করতে পারবে না।

এদিকে নতুন দলের কর্মকৌশল ঠিক করতে শিগগিরই তিনটি কমিটি গঠন করা হবে বলে জানা গেছে। যারা দলের গঠনতন্ত্র প্রণয়ন, নির্বাচনী প্রস্তুতি ও কেন্দ্রীয়ভাবে দলকে পরিচালনার কাজ করবে। এ বিষয়ে সদস্য সচিব মোহাম্মদ মিরাজ মিয়া বলেন, আমাদের প্রাথমিক কমিটির পর আমরা তিনটি কমিটি করে দেবো। প্রথম কমিটিতে যারা নির্বাচন করবে তারা নির্বাচনী কলাকৌশল ও মাঠ গোছানো নিয়ে কাজ করবেন। দ্বিতীয়টি পার্টি শক্তিশালী করা ও গঠতন্ত্র নিয়ে কাজ করবে। আর তৃতীয়টি ন্যাশনাল পলিটিক্স নিয়ে কাজ করবে।

এদিকে শিগগিরই সব জেলা উপজেলায় কমিটি চূড়ান্ত করতে চায় এনসিপি। দলের যুগ্ম সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল আমিন বলেন, রমজানে আমরা দল গোছানো, কর্মবণ্টন- এসব নিয়ে কাজ করবো। জেলা, থানা কমিটি নিয়ে কাজ করবো। আমাদের সংগঠন গোছানো প্রায় শেষ। সারা দেশে ৪৩০ থানায় নাগরিক কমিটির কমিটি আছে। সেগুলো পর্যায়ক্রমে এনসিপি’র কমিটি হিসেবে রূপ নেবে। আশা করছি মার্চের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি শেষ করতে পারবো।

দলের যুগ্ম মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) আবু সাঈদ লিয়ন বলেন, ফ্যাসিবাদী খুনি হাসিনার বিগতদিনের স্বৈরশাসনের পরও তাকে এদেশের রাজনৈতিক দলগুলো সরাতে পারেনি। রাজনীতিতে সেই ঘাটতি ছিল। যেটি পোষাতেই আমরা নতুন দল নিয়ে এসেছি। আমরা মনে করি এনসিপি সেই কাজটি করতে পারবে। রাজনৈতিক যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে সেটি পূরণ করবে। সম্পূর্ণ বাংলাদেশপন্থি একটি দল হবে এনসিপি। তিনি বলেন, রমজানের মধ্যেই আমরা নিবন্ধন ও প্রতীক চূড়ান্ত করার চেষ্টা করবো। কারণ আমাদের সাংগঠনিক কাঠামো ইতিমধ্যে চূড়ান্ত। তিনি বলেন, আমাদের মূল টার্গেট এদেশের কৃষক, শ্রমিক, প্রবাসী ও প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষ। আমরা মনে করি ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে এরাই ছিল আমাদের অন্যতম শক্তি। তারাই ফ্যাসিবাদকে সরিয়েছে। তাই আগামীদিনের বাংলাদেশও তাদের গুরুত্ব দিয়ে তৈরি হবে। সেই লক্ষ্যেই আমরা আমাদের কর্মসূচিতে তাদের গুরুত্ব দিচ্ছি।

mzamin


Sunday, September 22, 2019

দুই বন্ধুর ‘দোকানে’ শত কোটি ডলারের বেচাকেনা by মুনির হাসান

বিশ্বব্যাপী বেচাকেনার একটা বড় অংশ এখন ইন্টারনেটেই হচ্ছে। বিক্রেতাদের কেউ কেউ নিজেই ফেসবুকে পেজ খুলে বা ওয়েবসাইট বানিয়ে সরাসরি ক্রেতার কাছে পৌঁছে যাচ্ছেন। অথবা কেউ কেউ চলে যাচ্ছেন অনলাইন মার্কেটপ্লেস বা ইন্টারনেটের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। আমাজন, ই-বে, ফ্লিপকার্টের মতো আমাদেরও রয়েছে রকমারি, প্রিয়শপ বা আজকের ডিল। আর এসব ই-কমার্স সাইট বা মার্কেটপ্লেস বানানোর কারিগরি সমাধানে তৎপর তথ্যপ্রযুক্তি উদ্যোক্তারা।

বিশ্বের ওয়েবসাইটগুলোর তিন ভাগের এক ভাগ, তথা ৩৪ শতাংশই সহজে ওয়েবসাইট বানানোর সিস্টেম ওয়ার্ডপ্রেসের ওপর নির্ভরশীল। আর এই ওয়ার্ডপ্রেসের সঙ্গে প্লাগইনস নামে সলিউশন জুড়ে দিয়ে ওয়েবসাইটকে বানিয়ে ফেলা যায় নিউজ পোর্টাল (যেমন ওয়াশিংটন পোস্ট) বা মার্কেটপ্লেস (যেমন প্রিয়শপ)।

ওয়ার্ডপ্রেসভিত্তিক বহু বিক্রেতার মার্কেটপ্লেসের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় সক্রিয় ও কার্যকরীটির নাম ‘দোকান’। দোকান সলিউশন দিয়ে সহজে আমাজন, ই-বে, শপিফাই, প্রিয়শপের মতো মার্কেটপ্লেস তৈরি করা যায়। আর এই মুহূর্তে বিশ্বের ২০ হাজারের বেশি ওয়ার্ডপ্রেসনির্ভর মার্কেটপ্লেস চলছে ‘দোকান’ দিয়ে। এর মধ্যে রয়েছে বুটস্ট্র্যাপ, ম্যাশ ডট আইয়ের মতো অনলাইন প্রোডাক্ট বিক্রেতা, মাই মুসলিম মল, ডিজাইন বুমের মতো ই-কমার্স বিক্রেতা, প্লে দ্য মুভির মতো আর্ট কালচারের মার্কেটপ্লেস, কোরাল কমিউনিটির মতো প্রশান্ত মহাসাগরের প্রবাল বিক্রেতাদের দোকান কিংবা ইংল্যান্ডের হউক অ্যান্ড পেডলের মতো মার্কেটপ্লেস। সহজবোধ্যতা, ঝামেলাহীন ব্যবস্থা, সার্বক্ষণিক সাপোর্ট ছাড়াও হউক অ্যান্ড পেডলের সহপ্রতিষ্ঠাতার ভাষায়, ‘মার্কেটপ্লেসকে বড় করার সবই এক জায়গায়’ আছে দেখে দোকান এত জনপ্রিয়। আর এই ২০ হাজার দোকানের মার্কেটপ্লেসে বছরে শতকোটি ডলারের ওপর বেচাকেনা হয়।

দোকান নামের এই ই-কমার্স সলিউশনটি তৈরিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন ও মোহাম্মদ তারেক হাসান নামের দুই বন্ধু। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়ার সময় থেকে ফ্রিল্যান্সিং করলেও পরে নিজেদের প্রোডাক্ট বানানোতে নেমে পড়েন দুজন। তাঁদের বানানো ওয়ার্ডপ্রেসভিত্তিক কয়েকটি প্লাগইন বিক্রি হতে শুরু করার পর তাঁদের আর পেছনে ফেরে তাকাতে হয়নি। ২০১৩ সালে পাস করে ঢাকায় এসে প্রতিষ্ঠা করেন উইডেভস ডটকম (www.wedevs.com)।

মিরপুরের উইডেভসের অফিসে ঢোকার পর কৃত্রিম ঘাসের প্লে-জোনে টেবিল টেনিস খেলারত কিংবা ঘাসে শুয়ে শুয়ে ল্যাপটপে কাজ করার দৃশ্য দেখে আপনার মনে হতে পারে ভুল জায়গায় এসে পড়েছেন। কিন্তু সাড়ে চার হাজার বর্গফুটের অফিসে ভালোমতো নজর বোলালে আপনি এর ৬০ জন কর্মীকে এবং তাঁদের দুই মধ্যমণি তারেক ও নিজামকে খুঁজে নিতে পারবেন।

উইডেভসের প্রধান নির্বাহী নিজাম উদ্দিন জানালেন, তাঁদের বেশির ভাগ সলিউশনেরই একটি বিনা মূল্যের ভার্সন রয়েছে, যা যে কেউ ব্যবহার করতে পারেন। এমনকি এই প্রোডাক্ট যেকোনো ভাষায় অনুবাদও হতে পারে। এ ছাড়া থাকে নগদ মূল্যের প্রিমিয়াম ভার্সন। দোকানের চারটি প্রিমিয়াম ভার্সন—নতুনদের জন্য (বছরের ১৪৯ ডলার), পেশাদার (২৪৯ ডলার), ব্যবসা (৪৯৯ ডলার) এবং এন্টারপ্রাইজ (৯৯৯ ডলার)। অন্য প্রোডাক্টগুলোও তাই।

দোকান ছাড়াও তারেক-নিজামের রয়েছে আরও কয়েকটি জনপ্রিয় ওয়ার্ডপ্রেসভিত্তিক ই-সলিউশন। মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনা, গ্রাহক ব্যবস্থাপনা, পে-রোল, অ্যাকাউন্টিং, তথা ২২টি মডিউলের একটি ইআরপি সলিউশন আছে, যেটি বিশ্বের ১০ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান তাদের নিত্যদিনের কাজে ব্যবহার করছে। আছে ওয়ার্ডপ্রেসভিত্তিক প্রজেক্ট ম্যানেজার (৫ হাজার ব্যবহারকারী), উইডক্স , ইউজার ফ্রন্টঅ্যান্ডের মতো প্রোডাক্ট। এর মধ্যে দোকান ৩২টি ও ইআরপি ২২টি ভাষায় অনুবাদ হয়েছে।

তারেক-নিজামের ভাষ্যে, তাঁদের কর্মীরাই তাঁদের আসল সম্পদ। এ জন্য স্টার্টআপ হলেও কর্মীদের জন্য প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির ব্যবস্থা যেমন আছে, তেমনি আছে মুনাফা শেয়ারেরও ব্যবস্থা। গেল বছর কর্মীদের বিশাল বহর নিয়ে বেড়িয়ে এসেছেন দার্জিলিং থেকে।

আগামী দিনে বাংলাদেশে থেকে বিশ্বমানের সফটওয়্যার বানানোর ধারা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নতুন নতুন ক্ষেত্রে, যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, বিগডেটা নিয়েও কাজ করতে চান বলে জানালেন তারেক। পাশাপাশি কিছু বাস্তব সমস্যার সমাধানভিত্তিক সফটওয়্যার তৈরি করে নিজেদের কোম্পানি বিশ্বের ১ নম্বর সুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়তে চান নিজাম।

সাড়ে তিন বছরের কন্যা মারিয়াম ও স্ত্রী মুর্শেদাকে নিয়ে নিজাম উদ্দিনের পারিবারিক জগৎ। আর তানজিনা নাসরিনের সঙ্গে সম্প্রতি সংসারজীবন শুরু করেছেন তারেক হাসান।

তারেক-নিজামের উইডেভস আমাদের তরুণদের পথচলার পাথেয় হয়ে উঠুক।
‘দোকানের’ কর্মী ৬০ জনের মতো। তাদের কয়েক জনকে কাজ বুঝিয়ে দিচ্ছেন উদ্যোক্তাদের একজন। ছবি: এবং বাণিজ্য

Monday, July 27, 2015

৮৫ বছর পর অধরা কণার খোঁজঃ ভাইল ফার্মিয়নের সন্ধান পেলেন জাহিদ হাসান by মুনির হাসান

যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ গবেষণাগারে
পদার্থবিজ্ঞানী জাহিদ হাসান l ছবি: সংগৃহীত
পঁচাশি বছরের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর অবশেষে খুঁজে পাওয়া গেল বহুল প্রতীক্ষিত অধরা কণা ফার্মিয়ন, ভাইল ফার্মিয়ন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী জাহিদ হাসানের নেতৃত্বে একদল গবেষক পরীক্ষাগারে এই কণা খুঁজে পেয়েছেন।
এই আবিষ্কার এখনকার মুঠোফোন, কম্পিউটারের মতো ইলেকট্রনিক সামগ্রীর গতি বাড়াবে, হবে শক্তিসাশ্রয়ী। গত বৃহস্পতিবার বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্স-এ ভাইল ফার্মিয়নের পরীক্ষামূলক প্রমাণের বিষয়টি বিস্তারিত ছাপা হয়েছে।
গতকাল সোমবার জাহিদ হাসানের সঙ্গে এই আবিষ্কারের গুরুত্ব নিয়ে কথা হয়। টেলিফোনে প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ভাইল ফার্মিয়নের অস্তিত্ব প্রমাণের মাধ্যমে দ্রুতগতির এবং অধিকতর দক্ষ নতুন যুগের ইলেকট্রনিকসের সূচনা হবে।
কেমন হবে সেই নতুন যুগের ইলেকট্রনিক সামগ্রী—জাহিদ হাসান বিষয়টির ব্যাখ্যা দিলেন এভাবে, ‘উদাহরণ দিয়ে বলা যায়, এই আবিষ্কার কাজে লাগিয়ে তৈরি নতুন প্রযুক্তির মুঠোফোন ব্যবহারের সময় সহজে গরম হবে না। কারণ, এই কণার ভর নেই। এটি ইলেকট্রনের মতো পথ চলতে গিয়ে ছড়িয়ে পড়ে না।’
গ্রহ-নক্ষত্র, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা, গাছপালা, ফুল কিংবা মানুষ—সবই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার পিণ্ড। দুনিয়ার এসব বস্তুকণাকে বিজ্ঞানীরা দুই দলে ভাগ করেন। এসব কণার একটি ফার্মিয়ন, যার একটি উপদল হলো ভাইল ফার্মিয়ন। ১৯২৯ সালে হারম্যান ভাইল এই কণার অস্তিত্বের কথা প্রথম জানিয়েছিলেন। সম্প্রতি তাঁরই পরীক্ষামূলক প্রমাণ হাজির করলেন জাহিদ হাসান। আরেক জাতের কণা হলো ‘বোসন’, যার নামের সঙ্গেই জড়িয়ে আছেন বাঙালি পদার্থবিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। তাঁর আবিষ্কারের ৯১ বছর পর ভাইল ফার্মিয়নের অস্তিত্ব খুঁজে পেয়ে পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে যুক্ত হলেন আরেক বাঙালি জাহিদ হাসান।
জাহিদ হাসান জানালেন, মোট তিন ধরনের ফার্মিয়নের মধ্যে ডিরাক ও মায়োরানা নামের বাকি দুই উপদলের ফার্মিয়ন বেশ আগেই আবিষ্কৃত হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা ভেবেছেন, নিউট্রিনোই সম্ভবত ভাইল ফার্মিয়ন। কিন্তু ১৯৯৮ সালে নিউট্রিনোর ভরের ব্যাপারটা নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে আবার ভাইল ফার্মিয়নের খোঁজ শুরু হয়।
দীর্ঘদিন ধরে ফার্মিয়ন নিয়ে কাজ করছেন কানাডার ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানী আন্তন ভার্খব। আন্তর্জাতিক জার্নাল আইইইই স্পেকট্রামকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে উচ্ছ্বসিত ভার্খব বলেন, তত্ত্বীয় জগতের জিনিসপত্র বাস্তব জগতে খুঁজে পাওয়ার মতো আনন্দের বিষয় আর কিছুই নেই।
জাহিদ হাসানের গবেষক দল এই কণাকে খুঁজে পেয়েছেন একটি যৌগিক কেলাসের (ক্রিস্টাল) মধ্যে এবং কেলাসেই কেবল এটি পাওয়া যায়। অবশ্য জাহিদ হাসানের ধারণা, নতুন যুগের সেই ইলেকট্রনিকসের জন্য হয়তো আরও ১০ থেকে ২০ বছর অপেক্ষা করতে হবে। জাহিদ হাসানের নেতৃত্বে গবেষক দলের অন্য সদ্যসরা হলেন ইলিয়া বেলোপোলস্কি, ড্যানিয়েল সানচেজ, গুয়াং বিয়ান ও হাও শ্যাং।
ইতিমধ্যে নতুন যুগের ইলেকট্রনিকসের অন্যতম উপকরণ হিসেবে গ্রাফিন পরিচিতি পেয়েছে। বেশ কিছুদিন হলো এই গ্রাফিন দিয়ে ট্রানজিস্টর, অপটিক্যাল ফটো সেন্সর, ন্যানো সেন্সর বানানোর কাজ চলছে। কিন্তু গ্রাফিন তৈরির কাজটি বেশ কঠিন। অবশ্য গ্রাফিন আবিষ্কারের জন্য ২০১০ সালে বিজ্ঞানী আন্দ্রে জেইম ও কনস্টানটিন নভোসেলভ পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্ত্বীয় পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আরশাদ মোমেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘গ্রাফিন আবিষ্কার করার পর তা দিয়ে যে ধরনের ব্যবহারের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছিল এবং এখনো হচ্ছে, ভাইল সেমি-মেটালের (অর্ধ ধাতু) ব্যবহারও একই ক্ষেত্রে হতে পারে। তবে গ্রাফিন দ্বিমাত্রিক কাঠামোবিশিষ্ট হওয়ায় তা তৈরি করা কঠিন। এর তুলনায় ভাইল সেমি-মেটাল ত্রিমাত্রিক হওয়ায় তা তৈরি ও পরিবর্তন করা অনেক সহজ। কিন্তু প্রায়োগিক দিকের চেয়ে ভাইল ফার্মিয়নের অস্তিত্বের প্রমাণ আমার কাছে বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়। আইনস্টাইনের প্রতিধ্বনি করলে বলতে হবে, বিধাতা একটি চমৎকার গাণিতিক ধারণা প্রকৃতিতে ব্যবহার করতে পিছপা হননি।’
আইনজীবী রহমত আলী ও গৃহিণী নাদিরা বেগমের দুই ছেলে এবং এক মেয়ের মধ্যে সবার বড় জাহিদ হাসান। তিনি ধানমন্ডি সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধাতালিকায় স্থান করে নেন। বিজ্ঞানের নানান বিষয় পড়তে পড়তে জাহিদের মনে আইনস্টাইনের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার ইচ্ছা তৈরি হয়। তবে, শেষ পর্যন্ত তা না হলেও তিনি পড়েন অস্টিনের টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে কাজ করেছেন নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী স্টিভেন ভাইনবার্গের সঙ্গে। তাঁর আগ্রহেই জাহিদ পরীক্ষানির্ভর পদার্থবিজ্ঞানে কাজ করতে শুরু করেন। পরে, প্রথম সুযোগেই জাহিদ হাসান আইনস্টাইনের বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে খ্যাত প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন শিক্ষক হিসেবে। বর্তমানে তিনি সেখানে পদার্থবিজ্ঞানে অধ্যাপনা করছেন।
গত বছর টপোলজিক্যাল ইনসুলেটর নামের এক বিশেষ ধরনের অন্তরক পদার্থ আবিষ্কার করে নতুন বস্তু তৈরির জগতে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন বাঙালি এই পদার্থবিজ্ঞানী। তাঁর গবেষণা নিয়ে

Saturday, July 25, 2015

গণিত অলিম্পিয়াডের তারকারা কে কোথায়? by মুনির হাসান

আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে দেশের পক্ষে
প্রথম ব্রোঞ্জজয়ী দল। ছবি: প্রথম আলো
২০০৫ সালে মেক্সিকোর মেরিদায় প্রথম বাংলাদেশ দল নিয়ে যাই আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড (আইএমও) অংশ নিতে। কায়কোবাদ স্যারের (অধ্যাপক মোহাম্মদ কায়কোবাদ) হিসেবে প্রথম হলেও সেটি একটি অত্যন্ত ভালো দল। সম্ভাব্য ২৪২ নম্বরের মধ্যে আমাদের অর্জন হলো মাত্র তিন নম্বর, ছয়জন মিলে! কারণ খুব সহজ। বাড়ি ফেরার সময় আমাদের সেই দলের দলনেতা মুনিবুর রহমান স্যারকে (অধ্যাপক মুনিবুর রহমান চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) জিজ্ঞেস করেছিলাম প্রশ্নগুলো কেমন। স্যার একবাক্যে বলেছিলেন, ‘আমাদের মাস্টার্সের শিক্ষার্থীদের জন্যও কঠিন!’ আমাদের দলীয় অবস্থান ছিল ৯১টি দেশের ৮৬তম। আর ১১ তম বারে অংশ নিয়ে এবার আমাদের দলীয় অবস্থান ৩৩ তম। এবং সেটি দক্ষিণ এশিয়ার বড় শক্তি ভারতের ওপরে। ভারতের অবস্থান ৩৭। পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা আমাদের অনেক পেছনে।
বলছিলাম ২০০৫ সালের দলের কথা। সেই দলের ছয় সদস্যের বর্তমান অবস্থান দেখলেই আমরা বুঝতে পারব দলটি কেমন ছিল। মাহবুবুল হাসান বুয়েটে পড়ে সেখানকার শিক্ষক হয়ে এখন গুগলের জেনেভা অফিসে কাজ করছেন। শাহরিয়ার রউফ গুগলের আমেরিকা অফিসে আছেন। তাহমিদ রাফি বুয়েট থেকে ডিগ্রি করে গড়ে তুলেছেন দ্বিমিক কম্পিউটিং স্কুল নামে একটি প্রতিষ্ঠান। সেটির প্রধান নির্বাহী তিনি। সৈয়দ মোস্তফা তাহসিন চুয়েটের ডিগ্রি করে এখন চাকরি করছেন। দলের দুই মেয়ের একজন রাফাতুল ফারিয়া বুয়েট থেকে পাশ করে প্রথম শিক্ষকতা করেছেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে। এখন পিএইচডি করার জন্য রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পার্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে। আর সাবরিনা তাবাসসুম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা প্রশাসন থেকে এমবিএ করে এখন উচ্চশিক্ষার জন্য গেছেন অস্ট্রেলিয়ায়।
২০০৫ সালে যখন আমরা গণিত ক্যাম্প করি তখন আমাদের সঙ্গে যুক্ত হন ড. মাহবুব মজুমদার। মাহবুব স্ট্যানফোর্ডের গ্র্যাজুয়েট, এমআইটির মাস্টার্স এবং কেমব্রিজের পিএইচডি। মাহবুব আমাকে বললেন, আইএমওর পাশাপাশি আমাদের শিক্ষার্থীদের বিদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া দরকার। আমার একটা ধারণা ছিল, স্নাতক পর্যায়ে এমআইটি-হার্ভার্ডে বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের পাঠানো অসম্ভব একটা কাজ। কিন্তু মাহবুব বললেন, ওদের যে মেধা, তাতে রাস্তা দেখিয়ে দিলেই হবে। এবং কেবল আইওমও দলের সদস্যরা নয়, যারা গণিত ক্যাম্প পর্যন্ত আসতে পারে তারা সবাই আসলে যোগ্য।
এরপর থেকে আমাদের আইওমও দলের সদস্যরা বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বিদেশের প্রথম শ্রেণির বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে শুরু করেছে। এরই মধ্য ২০০৬ সালে স্লোভেনিয়া থেকে দেশের জন্য প্রথম সম্মানজনক স্বীকৃতি বয়ে আনা সৌমেন দাশ টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করে এখন আমেরিকায় পিএইচডি করছেন। তাঁর সঙ্গে আছেন তাঁর সহপাঠী তানভীর আহমেদ ভূঞা। তানভীর আছেন ক্যালটেকে। সৌমেনের সঙ্গে সম্মানজনক স্বীকৃতি পাওয়া শহিদুল ইসলাম বুয়েটের শিক্ষক হয়ে এখন পিএইচডি করছেন। আমাদের প্রথম ব্রোঞ্জ পদক (২০০৯, ব্রেমেন) জয়ী সামিন রিয়াসাত কেমব্রিজ থেকে গণিতে স্নাতক হয়ে দেশে ফিরে এক বছর শিক্ষকতা করেছেন এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়। এখন যোগ দিয়েছেন কানাডার ওয়াটারলু বিশ্ববিদ্যালয়ে। উদ্দেশ্য পিএইচডি। আমরা যখন থাইল্যান্ডের চিয়ানমাই শহরে এবারের আইওমওর খাতা দেখা নিয়ে ব্যস্ত তখন সামিন ছিলেন আমেরিকার গণিত ক্যাম্পে। সেখানকার গণিত সমিতি তাঁকে দাওয়াত দিয়েছে আমেরিকার আগামী দিনের গণিত দলের সঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের। সামিনের সঙ্গে ব্রোঞ্জ জয়ী নাজিয়া চৌধুরী এমআইটি থেকে ডিগ্রি নিয়ে দেশে কিছুদিন কাটিয়েছেন। আগামী ২১ জুলাই তিনি চলে যাবেন সিঙ্গাপুরে মেডিসিনে উচ্চতর ডিগ্রির অন্বেষণে। পরের বছর কাজাখস্তানে ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছিলেন তারিক আদনান। এবার হার্ভার্ড থেকে পড়া শেষ করে এখন ই-বে তে কাজ করছেন। কিছুদিন আগে তৈরি করছেন স্বল্পমূল্যের কম্পিউটিং ডিভাইস বাংলা পাই কম্পিউটার। সেই দলের অন্যতম সদস্য হক মোহাম্মদ ইশফাক স্ট্যানফোর্ড থেকে ডিগ্রি শেষ করে সেখানেই পিএইচডি করবেন বলে ঠিক করেছেন। দেশে তারিকের পড়ালেখা কুষ্টিয়ায় আর ইশফাকের ময়মনসিংহে। ২০১১-তে ব্রোঞ্জ এবং ২০১২তে দেশের জন্য প্রথম রূপার পদক নিয়ে আসা ধনঞ্জয় বিশ্বাস এখন পড়ছেন সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁর সহপাঠী হাসান জুবায়ের পড়ছে বুয়েটে। পড়ালেখার পাশাপাশি তারা দুজনই এখন সিলিকনভ্যালীর কোম্পানি ব্যাকপেকে হ্যাকার হিসেবে কাজ করছে। বুয়েটেই পড়ছে নাফিজা আঞ্জুম ও প্রাণন রহমান খান। ২০১১ সাল থেকে আমরা মেয়েদের জন্য আলাদা গণিত ক্যাম্পের আয়োজন করি। প্রথম লীলাবতী ক্যাম্পে এসেছিলেন শিঞ্জিনি সাহা। তিনি এখন পড়ছেন এমআইটিতে। সেখানে আরও পড়ছেন তামান্না ইসলাম উর্মি, সৌরভ দাশ (দুইটি ব্রোঞ্জ পদক), বৃষ্টি শিকদার। এ বছর সেখানে যোগ দেবে আর এক রূপাজয়ী নূর মোহাম্মদ শফিউল্লাহ।
২০১১-তে ব্রোঞ্জ এবং ২০১২-তে দেশের জন্য প্রথম রুপার
পদক নিয়ে আসা ধনঞ্জয় বিশ্বাস এখন পড়ছেন সিলেটের
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছবি: প্রথম আলো
গণিত ক্যাম্পের ক্যাম্পারদের অনেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে সেখানকার শিক্ষক হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে হাসনাইন হেইকেল এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিএসই বিভাগের শিক্ষক। অভীক রায় বুয়েটের শিক্ষকতার পাঠ চুকিয়ে পিএইচডি করতে রওনা দিচ্ছেন।
অনেকেই লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে যোগ দিয়েছেন কর্মক্ষেত্রে। কিন্তু মনের গভীরে লালন করে যাচ্ছে গণিত অলিম্পিয়াডকে। কারণ তাঁরা সবাই নাজিয়া চৌধুরীর মতো বিশ্বাস করে, “আমার আজকের ‘আমি’র মধ্যে বিশাল একটা অংশ জুড়ে আছে বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড। এই গণিত অলিম্পিয়াড আমাকে গণিতের পাশাপাশি শিখিয়েছে স্বপ্ন দেখতে, স্বপ্নটা পাওয়ার জন্য লড়তে, ভালোবাসতে, বড় আশা রাখতে, ধৈর্য ধরতে। গণিত অলিম্পিয়াডের সঙ্গেই আমার এই ছোট জীবনের খুশির মুহূর্ত যেমন এসেছে, তেমনি এসেছে ব্যর্থতার মুহূর্তও। ব্যর্থ যখন হয়েছি, পরীক্ষায় যখন শূন্য পেয়েছি, তখন মনে হয়েছে পুরা আকাশটা যেন মাথায় ভেঙে পড়ল। কিন্তু গণিত অলিম্পিয়াডের স্বপ্নালু মানুষগুলো আমাকে বারবার করে বলেছেন, লেগে থাক, লেগে থাক। এটাই এখন আমার জীবনে চলার মন্ত্র-লেগে থাক। এই মন্ত্রটা শেখানোর জন্য, এই ‘আমি’টাকে গড়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের কাছে আমি ঋণী।”

Thursday, July 16, 2015

ভারতে ব্যান্ডউইডথ রপ্তানি ও চাতক পাখির ব্রডব্যান্ড by মুনির হাসান

বাংলাদেশে এখন অনেক কিছুই উদ্বৃত্ত। এই তালিকার সর্বশেষ সংযোজন ইন্টারনেট ব্যান্ডউইডথ। গত ৭ জুন ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ত্রিপুরায় ব্যান্ডউইডথ রপ্তানির একটি চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষর হয়েছে। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মনোয়ার হোসেন এবং ভারতের ভারত সঞ্চর নিগম লিমিটেডের (ভিএসএলএন) চেয়ারম্যান অনুপম শ্রীবাস্তব এই চুক্তি স্বাক্ষর করেন (ডেইলি স্টার, ৭ জুন ২০১৫)। সংবাদে বলা হয়েছে, এই ব্যান্ডউইডথের দাম সেকেন্ডে প্রতি মেগাবিটের (এমবিপিএস) জন্য ১০ ডলার (কমবেশি ৭৯০ টাকা) এবং প্রতি তিন মাসের টাকা ভারতীয় সংস্থা অগ্রিম হিসাবে দিয়ে দেবে। প্রতিবছর সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি ৯ দশমিক ৬ কোটি টাকা আয় করবে এই খাতে। ভবিষ্যতে এর পরিমাণ প্রতি সেকেন্ডে ৪০ গিগাবাইট পর্যন্ত হতে পারে।
সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানির বর্তমানে মোট ক্ষমতা প্রতি সেকেন্ডে ২০০ গিগাবাইট (জিবিপিএস), যার মধ্যে ৩৩ জিবিপিএস দেশে ব্যবহৃত হয়। অবশ্য এই ৩৩ গিগাবাইটের মধ্যে মাত্র ১৫ গিগাবাইট ব্যবহৃত হয় ইন্টারনেটের জন্য, বাকিটা ভয়েস ও অন্যান্য কাজে। আগামী ১৫ বছরের মধ্যে এই কেবলের আয়ু শেষ হয়ে যাবে, তাই পড়ে থাকা এই বিশাল ব্যান্ডউইডথ রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পড়ে থাকা কোনো কিছু রপ্তানি করে যদি কিছু আয়-বরকত হয়, তাহলে সেটা নিয়ে কারও আপত্তি থাকার কোনো কারণ নেই। আমারও নেই। তবে প্রশ্ন উঠেছে রপ্তানিমূল্য নিয়ে।
বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে ইন্টারনেট যুক্ত হয় ২০০৫ সালে। সে সময় এতে খরচ হয়েছিল ৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার, যা সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি পরের তিন বছরে আয় করে ফেলে। কাজেই তারপর থেকে এই খাতে তার আয়ের বড় অংশই মুনাফা। তারপরও সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি তার ব্যান্ডউইডথের দাম বেশি কমিয়েছে এটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। যদি আমরা পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে তুলনা করি। ২০০৫ সালে প্রতি এমবিপিএস ব্যান্ডউইডথের বিক্রয়মূল্য ছিল ৭৫ হাজার টাকা। গত ১১ বছরে এই মূল্য কমে হয়েছে ১ হাজার ৯৬৯ টাকা। (সূত্র: সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানির ওয়েবসাইট)।
সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি দুই ধরনের গ্রাহকের কাছে তাদের ব্যান্ডউইডথ বিক্রি করে। ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে বা আইআইজি যারা কিনা আবার ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (আইএসপি) কাছে ব্যান্ডউইডথ বিক্রি করে। আর আইএসপিগুলো সাধারণ গ্রাহকদের কাছে তার বা তারবিহীন পদ্ধতিতে ব্যান্ডউইডথ পৌঁছে দেয়। সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি আইআইজির কাছে প্রতি মেগাবিট ব্যান্ডউইডথ বিক্রি করে ১ হাজার ৩৩৬ টাকা হিসাবে এবং আইএসপিদের কাছে বিক্রি করে ১ হাজার ৯৬৯ টাকা করে। আইএসপিরা এই টাকায় ব্যান্ডউইডথ কিনতে পারে ঢাকার তেজগাঁও থেকে। এখন তেজগাঁও থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত এই ব্যান্ডউইডথ নিতে হলে এনটিটিএন লাইসেন্স আছে এমন কোনো সংস্থাকে মেগাবিট-প্রতি দিতে হয় কমবেশি ৩৫০ টাকা। অর্থাৎ ঢাকার বাইরে প্রতি মেগাবিটের ক্রয়মূল্য দাঁড়াচ্ছে ২ হাজার ৩১৯ টাকা। ঢাকা থেকে ব্যান্ডউইডথ টেনে নিয়ে যাওয়ার এই খরচ কেবল বেশি ব্যান্ডউইডথের বেলায় প্রযোজ্য। এমনিতে ঢাকা থেকে ঢাকার বাইরে ব্যান্ডউইডথ টেনে নিয়ে যাওয়ার জন্য কখনো কখনো প্রতি মেগাবিটের ছয় হাজার টাকাও গুনতে হয় স্থানীয় আইএসপিদের।
অথচ ত্রিপুরাকে সেটি দেওয়া হচ্ছে মাত্র ৭৯০ টাকায়। শুধু তাই নয়, সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি নিজের খরচে ঢাকা থেকে সেই ব্যান্ডউইডথ পৌঁছে দেবে ত্রিপুরা সীমান্তে। অর্থাৎ ওই সীমান্তের কাছে বাংলাদেশি কোনো আইএসপি যে ব্যান্ডউইডথ কিনত ২ হাজার ৩১৯ টাকায়, সেটা সীমান্তের ওপারের সংস্থাটি পেয়ে যাচ্ছে ৭৯০ টাকায়।
এর একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে, সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি ৮০০ টাকায় ব্যান্ডউইডথ বিক্রি করলেও তার প্রাপ্য মুনাফা ঠিক থাকে। যদি তাই-ই হবে, তাহলে আমার একটাই দাবি সেটি হলো, সারা দেশে দেশীয় সব কোম্পানির জন্য এই ব্যান্ডউইডথের দাম ৭৯০ টাকা করে দেওয়া হোক। সে ক্ষেত্রে দ্রুত কিন্তু আমাদের ব্যান্ডউইডথের চাহিদা বাড়বে।
দেশে বর্তমানে ব্যান্ডউইডথের চাহিদা সেকেন্ডে ১১৫ গিগাবাইটের বেশি। এর মাত্র ১৫ জিবিপিএস সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি দেয়। বাকি ১০০ জিবিপিএস ব্যান্ডউইডথ সরবরাহ করে ছয়টি আইটিসি (ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল কেব্ল) কোম্পানি, যারা কিনা ওই ব্যান্ডউইডথ আমদানি করে আনে ভারতের মুম্বাই থেকে। এই আমদানি করা ব্যান্ডউইডথের পর লাভ এবং রাজস্ব শেয়ারিংয়ের পর তার বিক্রয়মূল্য হয় সেকেন্ডে প্রতি মেগাবিট ৭০০-৮০০ টাকা! এ কারণে আইএসপিগুলো আইটিসির কাছ থেকে ব্যান্ডউইডথ কিনছে বেশি, সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানিকে বাদ দিয়ে।
এখন দেখা যাচ্ছে সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানিও একই দামে ব্যান্ডউইডথ বিক্রি করতে পারে। যদি তাই-ই করে, তাহলে ব্রডব্যান্ডের প্রসার আরও বাড়বে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমার নিজের ধারণা, এই দাম কমানোর ফলে রাতারাতি ব্রডব্যান্ডের ব্যবহার দুই থেকে তিন গুণ বেড়ে যাবে। কারণ, আইএসপিগুলো তখন তাদের বর্তমান বাজেটেই এখনকার চেয়ে তিন গুণ বেশি ব্যান্ডউইডথ পাবে।
এর পাশাপাশি দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের প্রসার ঘটানোর জন্য আরও অনেক উদ্যোগ দরকার। কারণ, ঢাকার বাইরে বাংলাদেশ আসলে একটি ব্রডব্যান্ড গ্রাম। কোথাও নিরবচ্ছিন্ন উচ্চগতির ইন্টারনেট সেবা পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে সরকারকেই একটি বড় উদ্যোগ নিতে হবে। একটি দুই বছর মেয়াদি উদ্যোগ হতে পারে, দেশের সব জেলা ও উপজেলা সদরে ৫০০ থেকে ৬০০ বিনা তারেরও বিনা মূল্যের ব্রডব্যান্ড সেবা চালু করা। সরকারের কাজ হবে এই সেবাগুলো চালু করে সেখানে দুই বছরের জন্য ব্যান্ডউইডথ ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ দেওয়া। তবে এই সেবাগুলো নামকাওয়াস্তে চালু করলে হবে না। কমপক্ষে সেকেন্ডে ১০ মেগাবিট ব্যান্ডউইডথের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই এই সেবা চালু রাখার জন্য তা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। পরবর্তী সময়ে তারাই এটি চালু রাখবে। অন্যদিকে, এই কার্যক্রমের ফলে প্রতিটি স্থানে ব্রডব্যান্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। ফলে ইন্টারনেট সেবাদানকারী সংস্থাও বাণিজ্যিকভাবে সেবা দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কার্যক্রম সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য সরকারকে কোনো দাতা সংস্থার কাছে হাত পাততে হবে না। দেশের মোবাইল ফোন সেবা প্রদানকারী অপারেটররা সোশ্যাল অবলিগেটরি সার্ভিস ফান্ডে প্রতিদিন প্রায় কোটি টাকার মতো জমা দেন। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) এই টাকা নিয়ে বসে আছে। গত কয়েক বছরে এই খাতে কমপক্ষে কয়েক শ কোটি টাকা জমা হয়েছে, কিন্তু কোনো টাকা খরচ হয়নি। এই টাকা থেকেই সারা দেশের এই হট স্পটগুলো তৈরি করে ফেলা সম্ভব। পাবলিক স্পটের পাশাপাশি সব বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় কলেজগুলোতেও এই বিনা মূল্যের ব্রডব্যান্ড সেবা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
কাজেই রপ্তানিযোগ্য হলে রপ্তানি করা হোক, তবে তার পাশাপাশি দেশের সবখানে সাধারণের নাগাল মূল্যে ব্রডব্যান্ড ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগটাও আমরা দেখতে চাই।
নতুবা নতুন প্রজন্মের ব্রডব্যান্ডের জন্য কেবল চাতক পাখির মতো অপেক্ষা অপেক্ষাই থেকে যাবে।
মুনির হাসান: যুব কর্মসূচি সমন্বয়ক, প্রথম আলো।

Tuesday, July 14, 2015

‘তোমাদের টিম দ. আফ্রিকাকেও হারিয়ে দিল’ by মুনির হাসান

‘কনগ্র্যাচুলেশন, মুনির’।
অবাক হয়ে পেছনে তাকালাম। আমাদের কোনো খাতাই এখনো দেখা হয়নি। এর মধ্য অভিনন্দনের ব্যাপার আসছে কীভাবে?
হাসি মুখে আয়ারল্যান্ডের উপ-দলনেতা গর্ডন লাসলি বললেন, ‘তোমাদের ক্রিকেট টিম। দক্ষিণ আফ্রিকাকেও হারিয়ে দিল।’
গতকাল রোববার ঢাকার মিরপুরে তিন ম্যাচের দ্বিতীয় ওয়ানডেতে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৭ উইকেটে হারিয়েছে বাংলাদেশ। এর আগে জুন মাসে ভারতের সঙ্গে ২-১ সিরিজ জয় করেছে মাশরাফিরা। পাকিস্তানকে ৩-০তে ধবল ধোলাই করেছে বাংলাদেশ। বিশ্বকাপের পর থেকেই ভালো ক্রিকেট খেলছে সাকিব-মুশফিকরা। মাশরাফি বিন মুর্তজাদের এমন সাফল্য আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের (আইএমও) ময়দানেও আমাদের গর্বিত করেছে। গর্ডন লাসলি প্রথম দেখাতে ক্রিকেটের প্রসঙ্গ এনে বাংলাদেশ দলের প্রশংসা করেছেন। গর্ডনের সঙ্গে ভারতের দুজন পর্যবেক্ষকও যোগ দিলেন। কথা একটাই। গত কিছুদিনে আমাদের ক্রিকেট টিম যথেষ্ট উন্নতি করেছে। খাতা নিয়ে সমন্বয় কক্ষে ঢোকার সময় গর্ডন বলল, ‘ক্রিকেটের মতো এখানেও তোমাদের সাফল্য আসুক।’
আজ সোমবার সকাল থেকে আমি আর দলনেতা মাহবুবের খুবই ব্যস্ত সময় কেটেছে। আমরা পাঁচটি সমস্যার সমন্বয়ের কাজ শেষ করেছি। গতকালের পর আজকেও একদফা মতৈক্যে পৌঁছাতে না পারায় ৪ নম্বর সমস্যা আমরা কালকের জন্য মুলতবি রেখেছি। পাঁচ নম্বর বাদে বাকি পাঁচটির মধ্যে একমাত্র ৬ নম্বর তা সবচেয়ে কঠিন সমস্যাটিতে আমাদের প্রতিযোগীরা কোনো নম্বর পায়নি। তবে, বাকি সবগুলো থেকেই তারা কিছু না কিছু পেয়েছে। ফলে একটি সমস্যার প্রাপ্ত নম্বর ছাড়াই আমরা গতবারের মোট নম্বরকে ছাপিয়ে গেছি। এই পর্যন্ত আমাদের প্রতিযোগীদের প্রাপ্ত মোট নম্বর পঁচাশি, গতবারের চেয়ে এক বেশি। আমাদের বিশ্বাস, আমরা আরও ১০-১২ নম্বর পেতে পারি। শুধু তাই নয়, এই প্রথমবার আমাদের প্রতিযোগীদের সবাই একটি সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান করে পূর্ণ নম্বর পেয়েছে। ৪ নম্বর সমস্যাটি সবাই সমাধান করায় ওইটাতে আমরা পেয়েছি ৪২। ফলে কাউকেই খালি হাতে ফিরতে হবে না।
আজ সোমবার বিকেল পর্যন্ত যে আলোচনা এবং নম্বরের গতি প্রকৃতি তাতে কত নম্বরের জন্য কোনো মেডেল হবে তা আঁচ করা যাচ্ছে না। এশিয়া দেশগুলোর দলনেতাদের মতে এবারে কম নম্বরেই মেডেল পাওয়া যেতে পারে। তাদের যুক্তি হলো ২ এবং নম্বর সমস্যা গতবারের চেয়ে কঠিন। কাজে গতবারের চেয়ে কম নম্বরে ব্রোঞ্জ পাওয়া যেতে পারে। উল্লেখ্য গতবার ১৬ নম্বরেই ব্রোঞ্জ পদক হয়েছে। তবে, বেশির ভাগ দলনেতা এখনো মন্তব্য করতে রাজি হচ্ছে না। কারণ সব দেশের ৪ নম্বর সমস্যার সমন্বয় হলে পরে আন্দাজ করাটা সহজ হবে।
আমরা যখন উত্তরপত্র আর মেডেলের হিসাব নিকাশ নিয়ে ব্যস্ত তখন প্রতিযোগীরা গিয়েছে হাতির ক্যাম্প দেখতে। হাতির প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে মাহুতদের সঙ্গে হাতিদের বিরাট সখ্য গড়ে উঠে। গোল পোস্টে বল মারা, বাস্কেট বল খেলা ছাড়াও হাতিরা ছবি আঁকাও শেখে এখানে।
বিকেলে আমি আর মাহবুব গিয়েছিলাম আশপাশে ঘুরে দেখতে। আগে বলেছি একটা ময়লা নদীর পাড়ে এই শহর হলেও দোকানপাটের অভাব নেই। বছরের মাঝখানে মূল্যছাড়ের উৎসব চলছে সর্বত্র। কোন কোন দোকানে দেখলাম ৮০ শতাংশ মূল্যহ্রাসের কাগজ লিখে রেখেছে।
অফিস সময় ছাড়া রাস্তাঘাটে তেমন ভিড় দেখা যায় না। লাল রঙ্গের হিউম্যান হলার হল এখানকার প্রধান পাবলিক ট্রান্সপোর্ট। আর আছে আমাদের সিএনজিচালিত অটোরিকশার মত “টুকটুক”। পর্যটন শহর হওয়ায়, শহর নিরাপদ। গত রাতেও আমি আর মাহবুব ছাত্রদের সঙ্গে তাদের সমাধান বিষয়ক আলাপ আলোচনা করে গভীর রাতে নিজেদের রুমে ফিরেছি।
কাল মঙ্গলবার সকালে মূল্যায়ন পর্ব শেষে আমাদের বেড়াতে যাওয়ার কথা রয়েছে। আর প্রতিযোগীরা বিভিন্ন ক্রীড়া প্রতিযোগিতা শেষ করবে। কাল রাতে বিচারকদের চূড়ান্ত সভায় মেডেলের হিসাব নিকাশ চূড়ান্ত হবে। আর আমাদের শেষ করতে হবে খাতা দেখার কাজ।
৪ জুলাই থেকে থাইল্যান্ডের চিয়াংমাই শহরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ৫৬ তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড। ১১৪টি দেশের প্রতিযোগীর সঙ্গে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশের ছয়জন প্রতিযোগী। ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি দেশজুড়ে গণিত উৎসবের মাধ্যমে এই ছয়জনকে নির্বাচিত করেছে।

Saturday, July 11, 2015

শুরু হলো গণিতের মহারণ by মুনির হাসান

যথাযথ রাজকীয় ভাবগাম্ভীর্য ধরে রেখে গত বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো ৫৬তম আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিল পুরোপুরি আনুষ্ঠানিক ও রাজকীয়। কারণ অনুষ্ঠানে ছিলেন থাইল্যান্ডের রাজকুমারী মহা ছাকরি সিরিনধর্ন।
৬০ বছর বয়সী রাজকুমারী চিয়াং মাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মেলন কেন্দ্রে ১১৪টি দেশের গণিতবিদ, প্রতিযোগী ও দলনেতাদের বিশ্বের নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের প্রতিকার বের করার আহ্বান জানান। এরপর তিনি আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করে অলিম্পিয়াডের সূচনা ঘোষণা করেন। অনুষ্ঠানে থাইল্যান্ডের উপ-শিক্ষামন্ত্রী কৃষ্ণাপং কীর্তিকারা প্রতিযোগী ও অন্যদের ভ্রাতৃত্বের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনা উন্মোচনের জন্য অনুরোধ করেন।
রাজকুমারীর উপস্থিতির কারণে আইএমওর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সবচেয়ে আকর্ষণীয় পর্ব প্রতিযোগীদের প্যারেডকে সংক্ষিপ্ত করে ফেলা হয়। এমনকি ছিল না কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও। হোটেল থেকে প্রতিটি দলকে পুলিশি পাহারায় অনুষ্ঠানস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। নিরাপত্তা-তল্লাশিও করা হয়েছে। প্রতিবছরই প্রতিযোগীরা মঞ্চে নিজেদের ঐতিহ্যগত কিছু না কিছু পরিবেশনের চেষ্টা করলেও এবার তা করা যায়নি। ভিন্ন ভিন্ন দেশের আলাদা প্যারেডের পরিবর্তে একসঙ্গে পাঁচটি দেশের প্রতিযোগীরা উপ-দলনেতাদের সঙ্গে মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্যারেড শেষ করে। আইএমওর উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতি জিওফ স্মিথ প্রতিযোগীদের শপথবাক্য পড়ে শোনান।
এবারের প্রতিযোগীদের মধ্যে মেয়েদের সংখ্যা আগের বছরের চেয়ে বেশি। আফ্রিকার বেশির ভাগ দেশের প্রতিযোগীদের মধ্যে কমপক্ষে একজন মেয়ে রয়েছে। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব দলেও মেয়ে রয়েছে। বাংলাদেশ দলে কোনো মেয়ে নেই।
আজ শুক্রবার প্রথম দিনের পরীক্ষায় প্রতিযোগীদের তিনটি গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে দেওয়া হবে। এ জন্য তারা সময় পাবে সাড়ে চার ঘণ্টা। পাঁচ শতাধিক প্রতিযোগীর সঙ্গে অলিম্পিয়াডে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশের ছয়জন প্রতিযোগী।
ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি দেশজুড়ে গণিত উৎসবের মাধ্যমে এই ছয়জনকে নির্বাচিত করেছে।

Sunday, June 21, 2015

উপেক্ষিত যুব সম্প্রদায় by মুনির হাসান

বাংলাদেশের তরুণদের নতুন একটি ছবি ইদানীং বিশ্বব্যাপী আলোচিত। এটি হলো ভাগ্যান্বেষণে আমাদের যুবাদের সমুদ্রে ভেসে থাকা কিংবা ত্রাণশিবিরে আহাজারি করার চিত্র। যে সময়ে এমন অনেক ছবি বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়া প্রকাশ করেছে, ঠিক তখনই জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট পেশ করেছেন আমাদের অর্থমন্ত্রী। বড় আকারের, উচ্চাভিলাষী ও বিশাল আশ্বাসের বাজেট। সামগ্রিকভাবে বাজেটে অনেক আশার কথা আছে, আছে উন্নয়নের ফিরিস্তিও। তবে সামগ্রিক বাজেটের ভালো-মন্দ বিবেচনা এই লেখার বিষয় নয়। কর্মসূত্রে ও প্যাশনসূত্রে আমাকে তরুণ-যুবাদের সঙ্গে প্রচুর সময় কাটাতে হয়। তাদের অনেক স্বপ্ন আর স্বপ্নভঙ্গের অংশীদারও হতে হয়। তাই আমি খোঁজার চেষ্টা করেছি অর্থমন্ত্রী আমাদের যুবাদের জন্য এই বাজেটে কী রেখেছেন।
ধরা যাক শিক্ষার কথা। একুশ শতকের জ্ঞানভিত্তিক সমাজের জন্য নিজেকে তৈরি করার কোনো বিকল্প নেই। এটি আমাদের নতুন প্রজন্মের মনের গভীরে স্থায়ী আসন নিয়েছে বলেই আমার বিশ্বাস। নিয়েছে বলে তারা রাস্তায় নেমে শিক্ষার অধিকার আদায়ে মিছিল-মিটিংয়ের পরিবর্তে নিজেরাই নিজেদের গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। রাষ্ট্র যেহেতু তাদের জন্য পর্যাপ্তসংখ্যক সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি করতে পারছে না, তারা তাই রাষ্ট্রকে এ কাজ থেকে অব্যাহতি দিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। ফলে, দুই দশক আগে যে পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছিল, সেগুলোর পরিপ্রেক্ষিত কিন্তু অনেকখানি বদলে গেছে। একসময় ধরা হতো কেবল ধনীর দুলালই সেখানকার শিক্ষার্থী।
এখন কিন্তু তা নয়। বরং ছবিটা উল্টো। প্রধানত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রতিযোগিতা এত তীব্র যে গরিব, বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে সেখানে সুযোগ পাওয়া এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। যারা এখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছে, তাদের অনেককেই বিশাল অঙ্কের টাকা খরচ করে ভর্তি পরীক্ষার কোচিংয়ে ভর্তি হতে হয় এবং কোচিং না করলে ভর্তি হওয়া কঠিন। এমনকি এইচএসসি পরীক্ষার অন্তত চার-ছয় মাস আগে থেকে কোচিং সেন্টারে আগাম টাকা দিয়ে ভর্তি হতে হয়! যারা কোচিংয়ের সুবিধা পাচ্ছে না এবং যারা প্রান্তিক অঞ্চল থেকে আসছে, তাদের পক্ষে তাই কম টাকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অধরাই থেকে যাচ্ছে। বাবা-ভাইয়ের কষ্টের টাকা দিয়ে তাকে এসে ভর্তি হতে হচ্ছে বেশি খরচের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হচ্ছে বেশির ভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন-সুবিধা নেই। ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতো শায়েস্তা খাঁর আমলের খরচে সে থাকার সুবিধাও পাচ্ছে না। অথচ অর্থমন্ত্রী এবার তার পড়ালেখার খরচ বাড়িয়ে দিয়েছেন শতকরা ১০ ভাগ!
অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন, ২০০৯ সাল থেকে প্রতিবছর নতুন ১৩ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ হচ্ছে। কিন্তু তিনি প্রতিবছর কতজন কর্মপ্রত্যাশী কর্মবাজারে যোগ দিচ্ছে, সেই সংখ্যাটি বলেননি। প্রতিবছর আমাদের দেশে প্রায় ২২ লাখ ছেলেমেয়ে কর্মবাজারে প্রবেশ করছে এবং এটি ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। পাশাপাশি বৈদেশিক কর্মসংস্থানের সুযোগও কমে যাচ্ছে। ২০০৮ সালে যেখানে বিএমইটির হিসাবে বিদেশে চাকরি নিয়ে গেছে ৮ লাখ ৭৫ হাজার জন, সেখানে ২০১৪ সালে একই উদ্দেশ্যে গিয়েছে মাত্র ৪ লাখ ২৫ হাজার। অথচ বাংলাদেশে বিদেশিদের কর্মসংস্থান বাড়ছে ভয়াবহভাবে। দুই বছর আগে দেশে কর্মরত বিদেশিরা ৩১৬ কোটি ডলার রেমিট্যান্স তাদের দেশে পাঠিয়েছে। আর বাজেট বক্তৃতার কয়েক দিন আগে অর্থমন্ত্রী নিজেই সেটি ৪০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে বলে জানিয়েছেন। এদের একটি বড় অংশ কাজ করছে গার্মেন্টস এবং কয়েকটি বিশেষায়িত সেক্টরে। বলা হয়, দক্ষতার অভাবে আমাদের কর্মীরা এগিয়ে যেতে পারছে না। তাই যদি হবে, আমাদের কর্মীদের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য চলতি বাজেটে দক্ষতা উন্নয়নের জন্য কেন আলাদা করে মাত্র ১০০ কোটি টাকাও রাখা হলো না!
আমাদের যুবারা তাদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য অধিক হারে ইন্টারনেটের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অথচ ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটকে সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার কোনো সুখবর এই বাজেটে দেখা যায়নি। প্রায় গণদাবিতে পরিণত হওয়া দাবিকে কলা দেখিয়ে ইন্টারনেটের ওপর সকল পর্যায়ে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট বহাল রাখা হয়েছে। ভ্যাটের মূল ধারণাই হলো উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত সব মিলিয়ে ভ্যাটের পরিমাণ হবে ১৫ শতাংশ। কিন্তু ইন্টারনেটের বেলায় সেটি হচ্ছে না। বাংলাদেশ ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির কাছ থেকে আমি যে হিসাবটি পেয়েছি, সেটি খুবই ভয়াবহ।
একটি সহজ হিসাব দেখা যাক। সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি বা অনুরূপ কোম্পানিগুলো নিজেদের ১০ শতাংশ লাভ ধরে ১০০ টাকার ব্যান্ডউইডথ বিক্রি করতে পারে ১১০ টাকায়। তার ওপর তাকে ১ শতাংশ রাজস্ব সরকারকে দিতে হয়। বাড়তি ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের ফলে সেটির বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় ১২৭ দশমিক ৭৭ টাকা। এই টাকায় ব্যান্ডউইডথ কিনতে পারে কেব্ল ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে বা আইআইজি। এখানে ১০ শতাংশ লাভে তাদের মূল্য দাঁড়ায় ১৪০ দশমিক ৫৫ টাকা। আইআইজিকে রাজস্বের ১০ শতাংশ সরকারকে দিয়ে দিতে হয়। সেটি এবং এর সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট যোগ করে ওই ১০০ টাকার ব্যান্ডউইডথের বিক্রয়মূল্য দাঁড়ায় ১৭৭ দশমিক ৮১ টাকা। এই টাকায় ব্যান্ডউইডথ কেনে ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডাররা (আইএসপি), যারা আপনার-আমার কাছে ইন্টারনেটকে নিয়ে যাচ্ছে। আইএসপি-ওয়ালারাও যদি ১০ শতাংশ লাভ আর ১৫ শতাংশ ভ্যাট যোগ করে, তাহলে ভোক্তা পর্যায়ে ১০০ টাকার ব্যান্ডউইডথের দাম পড়ে যাচ্ছে মাত্র ২২৪ দশমিক ৯৪! অবশ্য আইআইজি এবং আইএসপিগুলো তাদের ভ্যাটের রিবেট পায়, যা একুনে ৩৪ দশমিক ৬৯ টাকা। এই রিবেট বাদ দিলে ২২৪ দশমিক ৯৪ টাকার মধ্যে সরকারের হিস্যা দাঁড়াচ্ছে মোট ৭৬ দশমিক ৩৬ টাকা, যা কিনা ৩৪ শতাংশ। অন্য কথায় বলা যায়, আমাদের যুবাটি ইন্টারনেটের জন্য অহেতুক দ্বিগুণ দামে ইন্টারনেট কিনছে। ১০০০ টাকার ইন্টারনেট বিলের ৩৪০ টাকাই সরকার নিয়ে যাচ্ছে। এবার অর্থমন্ত্রী এই খরচ আরও ৫ শতাংশ বাড়িয়ে দিয়েছেন। মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের ৯০ শতাংশই মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ইন্টারনেটের সুবিধার আওতায় আছে। মোবাইল-সেবার ওপর ৫ শতাংশ অতিরিক্ত এরই মধ্যে আরোপ হতে শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে একদল যুবা নিজেরাই একটা কিছু করার চেষ্টা করছে। ফেসবুকে নিজের নেটওয়ার্ক তৈরি করছে ‘চাকরি খুঁজব না চাকরি দেব’ নামে, চেষ্টা করছে আত্মকর্মসংস্থানের। কয়েক বছরে এদেরই বিরাট একটা অংশ দেশে চালু করেছে ই-কমার্স ব্যবসা। ফলে চট্টগ্রামে বসে এখন খুব সহজে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম খাওয়া যাচ্ছে, ঢাকায় বসে পাওয়া যাচ্ছে মংলার গলদা চিংড়ি। কষ্ট করে কেবল একটি ফোন বা একটা ক্লিক করতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট-বাণিজ্যের প্রসারের জন্য সেই খাতে প্রচুর প্রণোদনা দেওয়া হয়। কিন্তু এবারের বাজেটে ই-কমার্সের সব সেবার ওপর ৪ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। এখন আপনি যদি বাটার কোনো দোকান থেকে এক জোড়া জুতা কেনেন, তাহলে যত টাকায় সেটা কিনতে পারবেন, ই-কমার্স স্টোর থেকে কিনলে দাম দিতে হবে বেশি!
এই তালিকা আর বাড়াতে চাই না। আমার মনে হয়েছে, আমরা কথায় কথায় আমাদের যুব সম্প্রদায়কে যেভাবে আগামী দিনের মূল চালিকাশক্তি, ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের অগ্রসৈনিক বলি, আদতে সেটা মোটেই বিশ্বাস করি না।
না হলে কথায় আর কাজে এত অমিল কেমনে থাকে?
মুনির হাসান : যুব কর্মসূচি সমন্বয়ক, প্রথম আলো।

Wednesday, October 29, 2014

বঞ্চিত আনন্দময় শিক্ষা ও শৈশব by মুনির হাসান

চট্টগ্রামের একটি বিখ্যাত স্কুলের সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর ইংরেজিতে লেখা চিঠি। তাদের স্কুলে পঞ্চম, অষ্টম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ছুটির পর বাধ্যতামূলক কোচিং কিংবা অতিরিক্ত ক্লাস করতেই হয়। সে নিজে এতে আগ্রহী নয়। সে নিজের মতো করেই প্রস্তুতি নিতে চায় এবং বিকেলটা নষ্ট করতে চায় না। কিন্তু যেহেতু তার স্কুল তাকে বাধ্য করবে আগামী বছর, তাই সে আমাদের কাছে অনুরোধ করেছে এই বাধ্যতামূলক কোচিং বন্ধে যেন আমরা কোনো উদ্যোগ নিই। আগে কিছু স্কুলে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বাড়তি চাপ দেওয়া হতো। কিন্তু এখন ১২ বছরের শিক্ষাজীবনে সব শিক্ষার্থীকে চারটি পাবলিক পরীক্ষা দিতে হয়। ফলে, তারা তাদের জীবনের সুন্দর সময়গুলো মুখস্থ করার পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে। কেবল কি শিক্ষার্থী? এক অনুষ্ঠানে দেখা এক চিকিৎসকের সঙ্গে। জানলাম, গত কয়েক মাসে কোনো আন্তর্জাতিক সেমিনার, গুরুত্বপূর্ণ সভা, এমনকি অনেক সামাজিক অনুষ্ঠানেও তিনি যোগ দিতে পারেননি। কেন? ‘আমার ছেলেটি এবার প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা দেবে। এই ছোট্ট শিশুটিকে একটি পাবলিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত করতে আমি হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। তাই আর অন্য কিছু করা হচ্ছে না।’
এই এখন বাংলাদেশের শিক্ষাচিত্র। পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণির তথাকথিত মেধা যাচাইয়ের কবলে পড়ে শিক্ষার্থীদের শৈশব যেমন শেষ, তেমনি মায়েদেরও জীবন বরবাদ। শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষাগুলোর মূল লক্ষ্যই হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীদের মুখস্থ ক্ষমতা যাচাই করা। ‘মিনি কী করে’—এই প্রশ্নের উত্তরে এক শিক্ষার্থী লিখেছে: মিনি মুখে করে বাবার জুতা ড্রয়িং রুম থেকে বারান্দায় নিয়ে যায়। এই উত্তরে শিক্ষার্থীর পর্যবেক্ষণ এবং তা প্রকাশের চমৎকার নিদর্শন পাওয়া গেলেও শিক্ষক তার খাতায় শূন্য দিয়ে লিখে দিয়েছেন: মিনি রান্নাঘরে মাছের কড়াইয়ে মুখ দিয়ে মাছ চুরি করে। বেচারা শিক্ষার্থী তাদের বাড়ির বিড়ালটিকে কখনো এই কাজটি করতে দেখেনি, যা দেখেছে তা লিখেছে কিন্তু তাতে তাকে ভর্ৎসনাই করা হলো। ঠিক এভাবে আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতার বারোটা বাজাই। সমকোণী ত্রিভুজ-সংক্রান্ত পিথাগোরাসের বিখ্যাত জ্যামিতিক উপপাদ্যটি প্রায় শ দুয়েক পদ্ধতিতে প্রমাণ করা যায়। কিন্তু কী আশ্চর্য, আমাদের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার হলে ‘পিথাগোরাসের উপপাদ্য ইউক্লিডের পদ্ধতিতেই প্রমাণ করতে হয়।’ বলাবাহুল্য ইউক্লিডের প্রমাণটা আমার কাছে সবচেয়ে বেশি জটিল মনে হয়।
অথচ সামান্য চেষ্টা করলেই এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা যায়। বেশ কদিন আগে ঢাকার অদূরে আশুলিয়ায় ড্যাফোডিল আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসে দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে জগদীশ চন্দ্র বসু বিজ্ঞান ক্যাম্প। সারা দেশের নির্বাচিত জনা পঞ্চাশেক শিক্ষার্থী সেখানে ছিল। তাদের মধ্যে একজন ছিল প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
‘বাচ্চারা পড়তে চায় না। তাদের ধরে বেঁধে পড়ার টেবিলে নিতে হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরে হয় টিভি বা কম্পিউটারের সামনে তাদের পাওয়া যায়। অথচ এখানে তারা নিজেরাই হাজির হয়ে যাচ্ছে ক্লাসে! অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থেকে কী জানি সব কাজ করছে। অথচ ঠিক ভোর সাড়ে ছয়টায় উঠে হাজির হয়ে যাচ্ছে পতাকার সামনে। বাসায় কত কষ্ট করে না তাদের ঘুম থেকে তুলতে হয়!’ ঠিক এভাবে ক্যাম্পে দিনাজপুরের এক মা তাঁর অভিজ্ঞতা বললেন। তাঁর অবাক হওয়ার কারণ শিক্ষার্থীদের জন্য ওই ক্যাম্পটা তো আসলে পড়ালেখারই। কিন্তু তারা কেউ ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছে না। গণিত ক্যাম্প শুরু করার সময় এটা আমরা জানতাম। আর বিজ্ঞান ক্যাম্পে তো বাড়তি মজা হলো প্রকৃতির সঙ্গে থাকা। নো ইন্টারনেট, নো ফেসবুক এবং নো টেলিভিশন। কিন্তু কী আশ্চর্য, আনন্দের কোনো কমতি নেই। বিষয়গুলো কিন্তু সহজ নয়, পর্যায় সারণি, জীবকোষ, বিজ্ঞানভিত্তিক পোস্টার বানানো, মাঠে মাঠে ঘুরে গাছের তালিকা তৈরি করা কিংবা দূর মহাকাশের খোঁজ নেওয়া। পুরো চারটা দিন তাদের কেটেছে আনন্দের সঙ্গে বিজ্ঞানচর্চা করে। সে কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। এ দেশে কিছু লোক শিক্ষাকে বানিয়ে ফেলেছে নিরানন্দ, সৃজনশীল মুখস্থ পদ্ধতি। ‘নিজের ভাষায় লেখো’—এমন প্রশ্নের উত্তর পত্রিকার পাতায় ছাপা হয়। শিক্ষার্থী সেটা মুখস্থ করে উগের দিয়ে আসে পরীক্ষার খাতায়। বেচারা কখনো সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে দেখে না, সেটা ঘড়ির কাঁটার দিকে না উল্টা দিকে ঘোরে, গোধূলিবেলায় মেঘের ওপর মেঘ করে কি না, গুঁড়ির কাঁঠাল বেশি মিষ্টি নাকি কাণ্ডের, পিঁপড়া কি সাঁতার কাটতে পারে? সে এসব প্রশ্ন করলে তাকে থামিয়ে দেওয়া হয়। বলা হয়, এসব কি তোমার পরীক্ষায় আসবে?
আমাদের স্কুলগুলো পরীক্ষা আর জিপিএ–৫–এর পেছনে দৌড়ানোর জন্য শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। কারণ, তাদের নিজেদের মূল্যায়নও সরকার ওই জিপিএ–৫ দিয়েই করে। সরকার কিংবা স্কুলের কথা শুনলে মনে হয় জিপিএ–৫–ই জীবনের সব। আইনস্টাইন যদি না বুঝে মুখস্থ করতেন, তাহলে কি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত হতো? সে জন্যই দরকার পড়ালেখার মধ্যে আনন্দ খোঁজা, শিক্ষার্থীকে তার ছোঁয়া দেওয়া। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের স্কুলগুলো এই কাজটা করে না। স্কুলগুলো আনন্দের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ দিতে পারত, যদি তাদের ওপর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী কিংবা জেএসসির মতো অহেতুক পাবলিক পরীক্ষা চাপিয়ে দেওয়া না হতো। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের আনন্দের শৈশবও নষ্ট হতো না। স্কুলগুলো আনন্দের আয়োজন করে না বলে আমাদের এই কাজগুলো করতে হয়। আমাদের স্বপ্নগুলো বড়, কিন্তু সামর্থ্য তো কম। তাই আমরা আশায় থাকি একদিন আমাদের স্কুলগুলোও হয়ে উঠবে আনন্দময়। স্কুলে যেতে না পারলে বাচ্চারা কান্নাকাটি করবে আর তাদের হাতে তৈরি হবে এক আশ্চর্য পৃথিবী!
মুনির হাসান: যুব কর্মসূচি সমন্বয়ক, প্রথম আলো। সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।

Wednesday, September 3, 2014

খেসারত ৩০ হাজার কোটি টাকা মাত্র by মুনির হাসান

দেশের কর্মবাজারের হাল-হকিকত জানার জন্য গিয়েছিলাম এক মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞের কাছে। তাঁর কাছে জানলাম, কেবল আড়াআড়িভাবে নয়, ওপর-নিচেও বড় হচ্ছে দেশের কর্মবাজার। তবে, তিনি জানালেন মধ্য ও উচ্চপর্যায়ের ব্যবস্থাপক বা কর্মকর্তা তৈরিতে আমরা ব্যাপকভাবে পিছিয়ে পড়ছি। জানালেন ওই মুহূর্তে তাঁর কাছে ৪০টি পদের জন্য চাহিদা আছে, কিন্তু সঠিক ব্যক্তিকে বের করতে বেশ কষ্ট হচ্ছে তাঁর। তিনি হিসাব করে দেখালেন, আগামী ১০ বছরে শুধু যদি এই ব্যাপারে আমরা জোর না দিই, তাহলেই একটা বড় শূন্যতা তৈরি হতে পারে।
আমাদের দেশে ২০২৩ সাল নাগাদ বছরে কমপক্ষে এক লাখ মধ্য ও উচ্চপর্যায়ের কর্মীর প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ডজন খানেক বহুজাতিক ও দেশীয় বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান মিলে সে সময় হয়তো বা হাজার বিশেক মধ্যপর্যায়ের কর্মী তৈরির সক্ষমতা তৈরি হবে। বাকি ৮০ হাজার!
আমার মনে পড়ল বছর খানেক আগে ভারতের বেঙ্গালুরু থেকে প্রকাশিত সিলিকন ইন্ডিয়া নামের একটি পত্রিকার একটি ছোট্ট খবর। ওই খবরে বলা হয়েছে, দেশটির বাংলাদেশ প্রবাসীরা ২০১২ সালে ভারতে মাত্র ৩০ হাজার কোটি টাকা রেমিট্যান্স হিসেবে পাঠিয়েছেন! একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয়, আসাম, ত্রিপুরা ও অন্যান্য অঞ্চলের প্রায় পাঁচ লাখ কর্মী সেই সময়ে বাংলাদেশে অবস্থান করেছেন এবং তাঁদের বেশির ভাগের কর্মক্ষেত্র গার্মেন্টস, টেক্সটাইল ও এনজিও। ভবিষ্যতে এই আয়
আরও বাড়বে বলে প্রতিবেদনে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। (<http://www.siliconindia.com/ news/business/15-Nations-Sending-Highest-Remittances-to-India-nid-147515-cid-3.html>) বেশ কিছুদিন আগে আমাকে এক গার্মেন্টস কর্মকর্তা বলেছিলেন যে কম-বেশি প্রায় ৩০ থেকে ৩২ হাজার শ্রীলঙ্কান কর্মী কাজ করছেন আমাদের গার্মেন্টস সেক্টরে। তাঁর কথার সত্যতা পাওয়া যায়, যখন দেখি ঢাকা-কলম্বো নিয়মিত বিমান যোগাযোগ এখন আগের চেয়ে পাঁচ গুণ বেড়েছে!
বৈশ্বিক গ্রামে দক্ষ কর্মীরা সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বেন, এটাই স্বাভাবিক এবং সেখানে জোর করে বাধা দেওয়ারও কিছু নেই। কিন্তু এসব পরিসংখ্যান থেকে আমাদের শেখা দরকার, কেন আমাদের দক্ষতার ঘাটতি হচ্ছে। যে দেশে প্রতিবছর প্রায় ২১ লাখ তরুণ-তরুণী কর্মবাজারে প্রবেশ করেন, সেখানে কেন হরেদরে কর্মীরা বিদেশ থেকে আসবেন। বিদেশি বিশেষজ্ঞ থাকবেন, নতুন প্রযুক্তি কর্মী থাকবেন কিন্তু ম্যানেজার কিংবা ফ্লোর ম্যানেজার কেন বিদেশ থেকে আসবেন!
এই বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাঁধে দোষ চাপানোর সুযোগ নেই। কারণ, বিশ্ববিদ্যালয় উত্তীর্ণ সদ্য স্নাতক শিক্ষার্থীদের বিষয় এটি নয়। মধ্য ও উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মী প্রকৃতপক্ষে ‘গাইতে গাইতে গায়েন’ হয়ে ওঠেন। কাজে প্রথমত তাঁকে উচ্চতর পদে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে, যেন তাঁর দক্ষতা প্রমাণ করতে পারেন। এর জন্য তাঁকে নিয়োগকর্তার আস্থাও অর্জন করতে হবে। ঠিক এই জায়গাতেই আমরা হয়তো ঠিকমতো কাজ করতে পারছি না। অনেকে আশঙ্কা প্রকাশ করেন, কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষতা বাড়ালে তাঁরা অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাবেন। যদি অনেক অনেক কর্মীর দক্ষতা বাড়ানো না যায়, তাহলে সংখ্যাস্বল্পতার সুযোগে এই বাজারে কর্মীদের চড়া মূল্য দিয়েই কিনতে হবে নিয়োগকর্তাকে। যেমনটি ঘটছে আমাদের গার্মেন্টস বা বস্ত্রশিল্পে। যদি এই দুই খাতে কর্মীদের মানোন্নয়নের জন্য বছরে মাত্র তিন হাজার কোটি টাকা খরচ করা হয়, তাহলে সেটি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে বছরে কমপক্ষে ১৫ হাজার কোটি টাকার সাশ্রয় করবে।
বিশ্বব্যাপী এটি সুবিদিত যে বড় কোম্পানির জন্য দক্ষ কর্মী সরবরাহের কাজটি করবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের প্রেসিডেন্টও তাঁর প্রতিবছরের বাজেটে এই খাতে বিশেষ বরাদ্দ রাখেন এবং এই খাতের উদ্যোক্তাদের নানা রকম সুবিধা নেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পাশে তেমন কাউকে দাঁড়াতে দেখা যায় না। যদিও অত্যন্ত চমৎকার বাক্যসংবলিত নীতিমালা এবং অ্যাকশন প্ল্যানের কোনো অভাব নেই। কিন্তু একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তাঁর উদ্যোগ সম্প্রসারণের জন্য প্রশিক্ষণ, পুঁজি কিংবা বাজার সহায়তার কোনোটিই সময়মতো পান না। একইভাবে যাঁরা নতুন উদ্যোক্তা হতে চান, তাঁদের সহায়তা করার জন্য তেমন কোনো সংগঠিত উদ্যোগ নেই। অথচ প্রায় ৩০০ কোটি টাকার তহবিল নিয়ে বসে থাকা এসএমই ফাউন্ডেশন ইচ্ছা করলেই প্রথমে ঢাকায় এবং পরে অন্যান্য স্থানে এসএমই পরিচর্যাকেন্দ্র (এসএমই ইনকিউবেশন) প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আগ্রহী হবু উদ্যোক্তারা এসব কেন্দ্রে সর্বোচ্চ ছয় মাস ন্যূনতম খরচে অবস্থান করতে পারবেন। এখানে থাকবে সবার জন্য দরকারি সেবা। থাকবে আইনি ও ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে সংযোগ। একজন উদ্যোক্তা তাঁর উদ্যোগ শুরু করে ছয় মাসের মধ্য গুছিয়ে এখান থেকে চলে যাবেন। তখন নতুন একজন উদ্যোক্তা ওই জায়গাটা ব্যবহার করতে পারবেন। আর যেহেতু এই ধরনের ইনকিউবেশনের উদ্যোগ বিশ্বব্যাপী রয়েছে, কাজেই এটি চালু করার জন্য কোনো নতুন গবেষণা বা বিদেশ সফরেরও প্রয়োজন নেই।
দেশের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা এসবের বাইরে নিজেদের নানা প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। এমন একটি ফেসবুক-ভিত্তিক গ্রুপ ‘চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব https://www.facebook.com/ groups/uddokta/’-এ বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজারেরও বেশি সদস্য রয়েছেন। তাঁরা পরস্পরকে নানাভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকেন। তাঁদের স্লোগানটি বর্তমানে এতই জোরালো হয়ে উঠেছে যে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স কিংবা নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদও এখন এই স্লোগানের মতো করে তরুণদের উৎসাহিত করতে নেমে পড়েছেন। এসব উদ্যমী তরুণের ‘পথে নেমে পথ চেনা’ সফল হবে, যদি আমরা তাঁদের পাশে ঠিকমতো দাঁড়াতে পারি। তখনই কেবল বছর বছর দক্ষতা ঘাটতির পরিমাণ দেখে আমাদের আঁতকে উঠতে হবে না।

মুনির হাসান: যুব কর্মসূচি সমন্বয়কারী, প্রথম আলো এবং সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।

Thursday, August 28, 2014

চৌকস হওয়ার অনেক উপায় আছে by মুনির হাসান

সম্প্রতি ইংল্যান্ডের ব্যারোফোর্ড প্রাইমারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাঁর বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছে পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে একটি চিঠিও পাঠিয়েছেন। তাঁর সেই চিঠি বিবিসি প্রকাশ করার পর থেকে তা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোয় ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। চিঠিতে প্রধান শিক্ষক কেবল লিখিত পরীক্ষাই যে জীবনের সব নয়, সে কথাটি তাঁর শিক্ষার্থীদের মনে করিয়ে দিয়েছেন। সেই চিঠিতে তিনি যা লিখেছেন, তার ভাবার্থ হলো—
প্রিয় চার্লি ওয়েন,
‘আনন্দের সঙ্গে আমি তোমার পরীক্ষার ফলাফল এর সঙ্গে পাঠাচ্ছি। তোমাকে নিয়ে আমরা অত্যন্ত গর্বিত, কারণ এই কৌশলী সপ্তাহে তুমি তোমার প্রতিশ্রুতি রক্ষার্থে অনেক পরিশ্রম করেছ।
‘কিন্তু আমরা এও জানি, এই পরীক্ষাগুলো তোমাদের বিশেষত্ব বা এককত্বকে কখনো সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারে না। এগুলো যারা তৈরি করেছে এবং মূল্যায়ন করে তোমাকে নম্বর দিয়েছে, তারা তোমাদের প্রত্যেককে চেনে না, যেমনটি তোমাদের শিক্ষকেরা চেনেন বা তোমাদের পরিবার জানে। তারা জানে না যে তোমাদের মধ্যে অনেকেই দুটো ভাষা জানো। তুমি যে একটা বাদ্যযন্ত্র বাজাতে পারো, পারিবারিক অনুষ্ঠানে গান গাও কিংবা চমৎকার ছবি আঁকতে পারো, তার খবর তারা রাখেই না। তারা তো জানে না, তোমার হাসি কেমন করে একটি দিনকে রাঙিয়ে তুলতে পারে, খেলার মাঠে তোমার বন্ধুরা তোমার জন্য কেন অপেক্ষার প্রহর গোনে। তোমার কবিতা, গান লেখার খবর যেমন তারা রাখে না, তেমনি স্কুল ছুটির পর তুমি যে তোমার ছোট ভাই বা বোনকে পরম মমতায় আগলে রাখো, সেটাও কিন্তু তারা জানে না। ভবিষ্যৎ নিয়ে তোমার ভাবনা, পৃথিবীর সুন্দর সুন্দর দেশ ঘুরে বেড়ানোর তোমার অভিজ্ঞতা—এগুলোও কী তারা জানে? জানে না। তুমি যে চমৎকার গল্প করতে পারো, নিকটজনের সঙ্গে সময় কাটাতে ভালোবাসো—এগুলোর খবরও তারা পরোয়া করে না। কাজে তারা জানে না যে তুমি একজন বিশ্বস্ত, চিন্তাশীল এবং প্রতিদিনই তুমি ক্রমাগত ভালো করার চেষ্টা করছ। পরীক্ষার নম্বরগুলো তোমাকে কিছু বিষয় জানাবে বটে, তবে তা কখনো সবকিছু নয়।
‘কাজেই তোমার পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে গর্ব করো, সেটিকে উপভোগ করো। কিন্তু মনে রাখবে, জীবনে চৌকস হওয়ার অনেক উপায় আছে।’
চিঠিটি আমি যতবারই পড়ি, আমার চোখের সামনে আমার বন্ধুর মুখ ভেসে ওঠে। তার মেয়েটি এবার সপ্তম শ্রেণিতে উঠেছে। প্রতিটি পরীক্ষার শেষে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়, স্কুল তাকে ছাড়পত্র দিয়ে দেবে যদি না সে পরীক্ষায় আরও ভালো করে। মেয়েটি ভালো ছবি আঁকে, কয়েকটি বিষয়ে ভালোও করে। কিন্তু তার মুখস্থের ক্ষমতা কম। ফলে সে সব বিষয়ে জিপিএ-৫ পায় না। স্কুল তাকে নিয়ে চিন্তিত, কারণ তার জন্য জেএসসি পরীক্ষার ফলাফলে স্কুলের পারফরম্যান্স ক্ষতিগ্রস্ত হবে। স্কুলের র্যাঙ্কিং নিচে নেমে যাবে!
প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর থেকে এমন অনেক অভিভাবকের সঙ্গে আমার নিয়ত দেখা হয়। তাঁরা ঠিক বুঝতে পারেন না, কেন তাঁদের ছেলেমেয়েকে এত তাড়াতাড়ি দু-দুটি পাবলিক পরীক্ষা দিতে হবে, যেখানে কিনা কেবল কিছু প্রশ্নের লিখিত উত্তর দিতে হয়! শিক্ষার উদ্দেশ্য কি কেবলই লিখতে পারা? আর সবারই বা কেন জিপিএ-৫ পেতে হবে?
অভিভাবকদের কোনো সদুত্তর দিতে পারি না। কারণ, মনে হচ্ছে, আমাদের শিক্ষার সব উদ্দেশ্য পাসের মধ্যে গিয়ে ঠেকেছে। অনেক ভালো উদ্যোগও কিন্তু ওই পাস-ফেলের মধ্যে আটকে যাচ্ছে। স্বাস্থ্যসচেতনতার কথাই ধরা যাক। এখন আলাদা করে প্রতিটি ক্লাসে এই বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু যখনই কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবেন, দেখবেন ছোট ছোট ছেলেমেয়ে ভালো করে হাত না ধুয়েই খাবার টেবিলে বসে পড়ছে। খাওয়া শেষে সাবান দিয়ে হাত ধুতে সবারই কিন্তু আগ্রহ আছে! তাদের অনেকেই কিন্তু জানে, ‘খাওয়ার আগে ভালোমতো হাত পরিষ্কার করতে হয়’। শুধু যে জানে তা নয়, বরং খবর নিলে দেখা যাবে, সেগুলো পরীক্ষার খাতায় লিখে রীতিমতো শতভাগ নম্বর পাচ্ছে। কিন্তু ওই নম্বর দিয়ে ওর কী লাভ হচ্ছে? ও কি আদতেই স্বাস্থ্যসচেতন হতে পারছে?
১১ আগস্ট প্রথম আলোয় ‘শিক্ষার্থীরা পড়ছে না কেন?’ শিরোনামের আমার একটি নিবন্ধ প্রকাশ হয়েছে। সেটি পড়ে একজন আমাকে লিখেছেন, ‘আপনার এই লেখাটি পড়ে আমি অনেক কষ্ট পাচ্ছি এই সময়ের স্টুডেন্টদের জন্য। আমার ছোট ভাইও এবার পিএসসি পরীক্ষা দেবে, অথচ তার পাঠ্যবই পড়ার কোনো রকম আগ্রহ নেই, গল্পের বই পড়ার তো প্রশ্নই আসে না। আগে আমি যখন বছরের শুরুতে নতুন বই হাতে পেতাম, অনেক আগ্রহের সঙ্গে নতুন বইগুলো পড়তাম, কিন্তু আমার ভাই কারণ ছাড়া বইগুলো হাতেও নেয় না। ওর স্কুল থেকে বলে দিয়েছে, ওই গাইডটা কিনতে। এরপর ওই গাইড কিনে এনে সে পরীক্ষার প্রশ্নগুলো মুখস্থ করছে। এভাবে পড়ে যদি সে এ-প্লাসও পায়, তাহলেই বা কী?’
শিক্ষার উদ্দেশ্য কিন্তু কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করা নয়; বরং শিক্ষা তখনই সফল হয়, যখন কিনা একজন শিক্ষার্থী প্রশ্ন করতে শেখে, জানা বিষয়গুলো প্রয়োগ করতে পারে, আশপাশের প্রকৃতিকে যথাযথভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে, সতীর্থদের সঙ্গে যেমন আনন্দের সঙ্গে কাটাতে পারে, তেমনি বড়দের সম্মান আর ছোটদের স্নেহ করতে শেখে। কিছু প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করিয়ে আর যাই হোক, শিক্ষার্থীর নানান দিক কোনোভাবেই জানা সম্ভব হয় না। আধুনিক শিশুশিক্ষার অন্যতম সূচনাকারী মন্টেসরি তো আনুষ্ঠানিক পরীক্ষার চেয়ে সার্বক্ষণিক মূল্যায়নে জোর দিয়েছেন। শিক্ষার্থীরা কি পরস্পরকে সহযোগিতা করছে, ক্লাসের শৃঙ্খলা মেনে চলছে—এসবও কিন্তু একজন শিক্ষার্থীর বেড়ে ওঠার ব্যাপারটা প্রভাবিত করে। আমাদের পাবলিক পরীক্ষাগুলোয় এসব মূল্যায়নের সুযোগ কই? কেবল মুখস্থ ক্ষমতার দৌড় দেখা ছাড়া?
আমাদের শিক্ষাকর্তাদের কাছে আমার আবেদন থাকবে, অনুগ্রহ করে প্রাথমিক সমাপনী ও জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষার প্রভাব এবং এগুলো আদৌ কোনো উপকার করছে কি না, তা ঠিকমতো জেনে এ ব্যাপারে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিন। আমাদের ছেলেমেয়েরা জানুক, চৌকস হওয়ার অনেক উপায় আছে এবং তাদের শৈশব আনন্দময় হোক।
মুনির হাসান: যুব কর্মসূচি সমন্বয়ক, প্রথম আলো এবং সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি

Monday, July 21, 2014

ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট - আমারি বধুয়া আঁন বাড়ি যায় by মুনির হাসান

বাংলাদেশ থেকে ভারতে ব্যান্ডউইথ রপ্তানির প্রায় সব আনুষ্ঠানিকতা নাকি সম্পন্ন হয়েছে। আগস্ট মাস থেকেই সেটি কার্যকর হবে বলে জানা গেছে। পত্রিকান্তরে জানা গেছে, বর্তমানে বাংলাদেশের ব্যান্ডউইথের পরিমাণ ২৫০ গিগাবাইট। এর মধ্যে বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিসিএল) রয়েছে ২০০ গিগাবাইট। আর ইন্টারন্যাশনাল টেরিস্ট্রিয়াল কেব্ল (আইটিসি) অপারেটরসহ অন্যদের রয়েছে ৫০ গিগাবাইট।মোট ২৫০ গিগাবাইটের মধ্যে এখন পর্যন্ত দেশে ব্যবহৃত হয় মাত্র ৪২ গিগাবাইট। বাকি ২০৮ গিগাবাইট পুরোটাই অব্যবহৃত থেকে যায়।অনেকের ধারণা, আগামী কয়েক বছরে এই পুরো ২৫০ গিগাবাইট দেশের মধ্যে ব্যবহার করা সম্ভব হবে না। কাজেই রপ্তানি করাটা দোষের নয়।
তবে মুশকিল হচ্ছে, আমাদের চাহিদা আসলে কতটুকু, সেটা কি আমরা জানি? আমরা কি মোবাইলের বিকাশের ব্যাপারটি কোনো গণনায় পেয়েছিলাম? কিন্তু সাধারণের নাগালে আসার পরপরই দেশে মোবাইলের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। কাজেই ব্রডব্যান্ড সাধারণ মানুষের নাগালে চলে এলে সেটির ব্যবহার যে দ্রুত বাড়বে না, সেটা কি কেউ হলফ করে বলতে পারে?

ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট এখন বিশ্বজুড়ে মৌলিক অধিকারের পর্যায়ে চলে গেছে। এর অন্যতম কারণ হলো এর বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও দিন বদলের শক্তি। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি হাজার নতুন সংযোগের ফলে আটটি নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে কর্মসংস্থান বাড়ে এবং মানুষের জীবনমানও বাড়ে। আবার তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেটের প্রভাবে শিক্ষাক্ষেত্রেও একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে।এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুক্ত দর্শনের বিকাশ।ফলে বাংলাদেশের একজন শিক্ষার্থী ইচ্ছে করলেই (এবং ব্র্যডব্যান্ডে প্রবেশাধিকার থাকলে) বিশ্বের বিখ্যাত সব বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্সে অংশ নিতে পারে। এমআইটি, স্ট্যানফোর্ডের মতো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের শিক্ষা কার্যক্রমকে ইন্টারনেটে উন্মুক্ত করছে।
অন্যদিকে, ইন্টারনেটের কারণে উন্নত বিশ্বের অনেক কাজ এখন আমাদের মতো দেশের তরুণ-তরুণীরা ঘরে বসেই করতে পারে। একটি বড় পারিবারিক করপোরেট প্রতিষ্ঠান বিগত ৫০-৬০ বছরে প্রায় ৫০ হাজার পরিবারের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে। অথচ ইন্টারনেটে স্বাধীন ব্যবসার মাধ্যমে মাত্র পাঁচ বছরেই প্রায় ৩০ হাজার ছেলেমেয়ে নিজেদের আয়-রোজগারের ব্যবস্থা করতে পেরেছে। এর বাইরেও গড়ে উঠছে তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক শিল্প, যা গত বছর ১০ কোটি ডলারের রপ্তানি করেছে বলে দেশের সফটওয়্যার ব্যবসায়ীদের সংগঠন জানিয়েছে। শুধু তা-ই নয়, ১৯৯৮ সালে মোবাইল ফোনের একচেটিয়া কার্যক্রম ভেঙে দেওয়ার পর থেকে দেশের প্রবৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে মোবাইল ফোনের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পটি জ্ঞানভিত্তিক কার্যক্রম বলে এর প্রকৃত মূল্যায়ন করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। স্বাধীনতার পর ২০ বিলিয়ন ডলারের একটা রিজার্ভ গড়ে তুলতে আমাদের প্রায় ৪২ বছর লেগেছে। অথচ কয়েক দিন আগে হোয়াটস আপ নামে একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ১৯ বিলিয়ন ডলারে বেচাকেনা হয়েছে। ‘অ্যাংরি বার্ড’ নামের একটি গেমস বিক্রি হয়েছে মাত্র ৮০ মিলিয়ন ডলারে! তার মানে হলো, তথ্যপ্রযুক্তির সঠিক ও উদ্ভাবনী ব্যবহার বাড়াতে পারলে জাতীয় আয় বৃদ্ধির যে স্বপ্ন আমরা দেখি, তার পথে এগোনোর একটা সুরাহা হয়।
আর এ কারণেই দরকার সারা দেশে ব্রডব্যান্ডকে ছড়িয়ে দেওয়া। আমরা আগে শুনেছিলাম, ব্যান্ডউইথের উচ্চমূল্যের কারণে এটি সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু সরকারের নানা চেষ্টায় ২০০৬ সালে যে ব্যান্ডউইথের দাম ছিল ৮৪ হাজার টাকা, সেটি এখন নেমে এসেছে মাত্র দুই-তিন হাজার টাকায়। অথচ তার পরও রাজধানীর বাইরে বলতে গেলে ব্র্যডব্যান্ড সেবার কোনো প্রসার নেই। সম্বল বলতে মোবাইল অপারেটরদের উচ্চমূল্যের দুর্বল সেবা এবং কোথাও কোথাও ওয়াইম্যাক্সের সেবা। সত্যিকারের ব্রডব্যান্ড বিকাশের জন্য দরকার ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্কের বিস্তৃতি। আশ্চর্য হলেও সত্য যে বাংলাদেশের প্রায় সবখানেই এখন ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক পৌঁছে গেছে। কেবল ‘শেষ মাইল সংযোগ’ বা ব্যবহারকারীর কাছে সংযোগ পৌঁছানোর সমাধান করতে পারলেই সবখানে ব্রডব্যান্ডকে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হতো।
যেসব বাণিজ্যিক সংস্থা ব্রডব্যান্ডকে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য কাজ করছে, তাদের বক্তব্য হলো, অবকাঠামোগত সুবিধা তৈরি করে একটি জেলা বা উপজেলা শহরে ব্রডব্যান্ড সেবা চালু করে সেটি বাণিজ্যকভাবে লাভজনক করার মতো পর্যাপ্ত গ্রাহক সেখানে নেই। গ্রাহক তৈরি হলেই কেবল এই সেবা সম্প্রসারণ করা সম্ভব। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতে দেখা যায়, দেশের আনাচে–কানাচে তরুণ-তরুণীরা ব্রডব্যান্ডের আশায় চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করছে।
এ ক্ষেত্রে সরকারকেই একটি বড় উদ্যোগ নিতে হবে। একটি দুই বছর মেয়াদি উদ্যোগ হতে পারে, দেশের সব জেলা ও উপজেলা সদরে অন্তত ৫০০ থেকে ৬০০ বিনা তারের ও বিনা মূল্যের ব্রডব্যান্ড সেবা চালু করা। সরকারের কাজ হবে এই সেবাগুলো চালু করে সেখানে দুই বছরের জন্য ব্যান্ডউইথ ও রক্ষণাবেক্ষণের খরচ দেওয়া। তবে এই সেবাগুলো নামকাওয়াস্তে চালু করলে হবে না। কমপক্ষে সেকেন্ডে ১০ মেগাবিট ব্যান্ডউইথের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রকল্প শেষ হওয়ার আগেই এই সেবা চালু রাখার জন্য তা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের হাতে ছেড়ে দিতে হবে। পরবর্তী সময়ে তারাই এটি চালু রাখবে। অন্যদিকে, এই কার্যক্রমের ফলে প্রতিটি স্থানে ব্রডব্যান্ড ব্যবহারকারীর সংখ্যা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। ফলে ইন্টারনেট সেবাদানকারী সংস্থাও বাণিজ্যিকভাবে সেবা দেওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই কার্যক্রম সম্পন্ন করার প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য সরকারকে কোনো দাতা সংস্থার কাছে হাত পাততে হবে না।
দেশের মোবাইল ফোন সেবা প্রদানকারী অপারেটররা ইউনিভার্সাল সার্ভিস অবলিগেটরি ফান্ডে প্রতিদিন প্রায় কোটি টাকার মতো জমা দেন। বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) এই টাকা নিয়ে বসে আছে। গত দুই বছরের এই
খাতে কমপক্ষে কয়েক শ কোটি টাকা জমা হয়েছে, কিন্তু কোনো টাকা খরচ হয়নি। এই টাকা থেকেই সারা দেশের এই হট স্পটগুলো তৈরি করে ফেলা সম্ভব। পাবলিক স্পটের পাশাপাশি সব বিশ্ববিদ্যালয় ও বড় কলেজগুলোতেও এই বিনা মূল্যের ব্রডব্যান্ড সেবা সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন।
কাজেই রপ্তানিযোগ্য হলে রপ্তানি করা হোক, তবে তার আগে দেশের সবখানে সাধারণের নাগালমূল্যে ব্রডব্যান্ড ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগটা আমরা দেখতে চাই।

মুনির হাসান: যুব কর্মসূচি সমন্বয়কারী, প্রথম আলো ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি।

Saturday, November 23, 2013

বিশ্ব উদ্যোক্তা সপ্তাহ ২০১৩- ‘চাকরি খুঁজব না, চাকরি দেব’ by মুনির হাসান

‘তুমি কেরানির চেয়ে বড়ো, ডেপুটি-মুন্সেফের চেয়ে বড়ো, তুমি যাহা শিক্ষা করিতেছ তাহা হাউইয়ের মতো কোনোক্রমে ইস্কুলমাস্টারি পর্যন্ত উড়িয়া তাহার পর পেন্সনভোগী জরাজীর্ণতার মধ্যে ছাই হইয়া মাটিতে আসিয়া পড়িবার জন্য নহে, এই মন্ত্রটি জপ করিতে দেওয়ার শিক্ষাই আমাদের দেশে সকলের চেয়ে প্রয়োজনীয় শিক্ষা, এই কথাটা আমাদের নিশিদিন মনে রাখিতে হইবে।

Friday, September 20, 2013

প্রাথমিক শিক্ষা- প্রাথমিক শিক্ষকদের মর্যাদা কে দেবেন by মুনির হাসান

শিক্ষার্থীদের দেখে বোঝা যাচ্ছে, তারা স্কুলেই আছে। তবে শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক নেই। খেলাধুলা আর আনন্দে মেতে উঠেছে শিক্ষার্থীরা।

Wednesday, December 19, 2012

বিশ্ব অভিবাসী দিবস- প্রিয় অভিবাসী, আপনাকে অভিবাদন by মুনির হাসান

২০০০ সাল থেকে প্রতিবছর ১৮ ডিসেম্বর বিশ্ব অভিবাসী দিবস হিসেবে পালিত হয়। এ বছরও হয়েছে। এ উপলক্ষে শোভাযাত্রা, আলোচনা, টেলিভিশন টক শোর ব্যবস্থা হয়েছে। আমাদের দেশেও হয়েছে। অন্য অনেক দেশের চেয়ে আমাদের দেশে এই দিবসের তাৎপর্য ভিন্ন হওয়াটা স্বাভাবিক।

Sunday, December 2, 2012

শ্রদ্ধাঞ্জলি: জহুরুল হক ও আবদুল্লাহ আলমুতী- তরুণদের নিয়ত পথ দেখাবেন by মুনির হাসান

দেশে বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করার জন্য এখন নানা উদ্যোগ-আয়োজন রয়েছে। উন্নত বিশ্বের মতো এ দেশেও হালে জনপ্রিয় বিজ্ঞান বা পপুলার সায়েন্সের কিছুটা কদর বেড়েছে। দেশের অধিকাংশ জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞানসংক্রান্ত আলাদা সাপ্তাহিক আয়োজন, এমনকি কম্পিউটার সংক্রান্ত প্রতিদিনকার আয়োজনও থাকে।

Sunday, July 22, 2012

নলিনী বাবু, শ্রডিঞ্জারের বিড়াল এবং সমান্তরাল মহাবিশ্ব by মুনির হাসান

এই মহাবিশ্বের সবচেয়ে অবোধ্য বিষয় কী? আইনস্টাইন বলতেন ‘এটি বোধগম্য’! পদার্থবিজ্ঞানের মাজেজাই এমন যে জানা দুনিয়ার সর্বত্র এর নিয়মকানুনগুলো একই। দুনিয়াজুড়ে প্রোটনের ভর একই, হাইড্রোজেনের কেন্দ্রে একটি প্রোটন আর তাকে ঘিরে ঘুরছে একটি ইলেকট্রন।

Monday, July 16, 2012

প্রথম রুপা পেল বাংলাদেশ by মুনির হাসান

আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে (আইএমও) প্রথমবারের মতো রুপার পদক পেল বাংলাদেশ। দেশের তরুণ গণিতবিদেরা জিতেছে দুটি ব্রোঞ্জ পদকও। প্রতিযোগিতাটিতে এ পর্যন্ত সেরা সাফল্য দিয়েই এবারের অলিম্পিয়াড শেষ করল বাংলাদেশ।

Sunday, July 15, 2012

প্রথম রুপার জন্য অপেক্ষা by মুনির হাসান

২৫ নম্বর অর্জন করে আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে (আইএমও) বাংলাদেশের পক্ষে প্রথম রুপার পদক অর্জনের দাবিদার হয়েছে ধনঞ্জয় বিশ্বাস। সব উত্তরপত্র মূল্যায়ন শেষে পদকের ঘোষণা দেওয়া হবে আজ রোববার সকালে। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে প্রতিযোগীরা ২৩ নম্বর পেয়ে রুপার পদক পাওয়ায় ধনঞ্জয় এবার নিশ্চিতভাবেই এ পদক পাচ্ছে বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে।

Tuesday, July 10, 2012

শুরু হলো ৫৩তম মেধার লড়াই by মুনির হাসান

১০০টি দেশের পাঁচ শতাধিক গণিতবিদের অংশগ্রহণে শুরু হলো বিশ্বের প্রাক-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় মেধার লড়াই্ল—আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াড (আইএমও)। এটি অলিম্পিয়াডের ৫৩তম আসর। গতকাল সোমবার আর্জেন্টিনার মার ডেল প্লাটা শহরে কুচকাওয়াজের মধ্য দিয়ে শুরু হয় অলিম্পিয়াডের আনুষ্ঠানিকতা।