Showing posts with label অন্য আলো. Show all posts
Showing posts with label অন্য আলো. Show all posts

Monday, August 24, 2026

ফিলিস্তিনের মানুষের গল্প বাঁচিয়ে রাখতে ‘গাজা পাবলিকেশনস’ by রবিউল কমল

গাজায় যুদ্ধ ও ধ্বংসের মধ্যেও মানুষের গল্প, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা ধরে রাখতে ‘গাজা পাবলিকেশনস’ নামে একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন লেখক হুসাম মারুফ।

১৪ আগস্ট প্রকাশিত এক লেখায় নিজের এই উদ্যোগের কথা জানান তিনি।

যুদ্ধের শুরুর দিকে মারুফ পরিবারের সঙ্গে রাফাহ শহরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। চারপাশে তখন গোলাবর্ষণ চলছিল। প্রতিদিনই তাঁর মনে হতো, যেকোনো সময় মৃত্যু হতে পারে।

তবে শুধু মৃত্যুর ভয়ই তাঁকে ভাবিয়ে তুলছিল না। তাঁর ভয় ছিল, নিজের লেখা পৃথিবীর মানুষের কাছে পৌঁছানোর আগেই যদি তিনি মারা যান, তাহলে তাঁর গল্প, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতাগুলোও হয়তো হারিয়ে যাবে।

মারুফ মনে করেন, একজন মানুষের মৃত্যু আর তাঁর স্মৃতি মুছে যাওয়ার মধ্যে পার্থক্য আছে। একজন মানুষ মারা যেতে পারেন, কিন্তু তাঁর জীবন, ভালোবাসা, ভয়, স্বপ্ন ও অভিজ্ঞতার চিহ্নগুলোও যদি হারিয়ে যায়, তাহলে সেটি আরও বড় ক্ষতি।

গাজায় তখন অনেক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও গ্রন্থাগার ধ্বংস হচ্ছিল। লেখালেখি ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও থেমে যাচ্ছিল। তখনই মারুফের মনে প্রশ্ন আসে, এই সময়ের মানুষের গল্পগুলো কে সংরক্ষণ করবে?

এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় ‘গাজা পাবলিকেশনস’।

গাজার ভেতরে তখন বই ছাপার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। তাই মারুফ সিদ্ধান্ত নেন, বই গাজার বাইরে ছাপা হবে। তবে সম্পাদনা, নকশা ও অন্যান্য কাজ গাজা থেকেই শুরু করা হবে।

তিনি একজন সম্পাদক, প্রুফ রিডার, ডিজাইনার, বিপণনকর্মী এবং মুদ্রণ ও বিতরণের দায়িত্বে থাকা কয়েকজনকে নিয়ে একটি ছোট দল তৈরি করেন। তাঁদের কয়েকজনকে তিনি আগে চিনতেন না। কিন্তু সবাই উদ্যোগটির গুরুত্ব বুঝে স্বেচ্ছায় যুক্ত হন।

শুরুতে খুব অল্প সামর্থ্য নিয়েই কাজ শুরু হয়। তৈরি করা হয় একটি সাধারণ লোগো ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ। এরপর এমন বই খোঁজা শুরু হয়, যেগুলোতে যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনিদের জীবন ও অভিজ্ঞতার কথা আছে।

‘গাজা পাবলিকেশনস’-এর লোগোতে রয়েছে একটি বালুঘড়ি। তবে সেখানে বালু নিচে পড়ে না। মাঝখানে একটি বাধা থাকায় বালু আটকে থাকে। মারুফের কাছে এই বালুঘড়ি গাজার যুদ্ধকালীন জীবনের প্রতীক।

তাঁর মতে, গাজায় তখন সময় যেন থেমে গিয়েছিল। কাজ, পড়ালেখা, সামাজিক জীবন এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনা অনেক কিছুই বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মানুষ কেবল বর্তমান মুহূর্তটি পার করার চেষ্টা করছিল।

প্রকাশনাটির প্রথম বই ছিল আমের আল-মাসরির ‘দ্য ম্যান হু লুকড ব্যাক’। বইটিতে কেবল বোমা হামলার কথা নেই। যুদ্ধের মধ্যে মানুষের ভয়, পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তা এবং নিজের পরিচয় ধরে রাখার চেষ্টার কথাও রয়েছে।

বইটি প্রকাশের দিনই মারুফ জানতে পারেন, তাঁর এক কাজিনের মেয়ে ও সন্তানেরা বোমা হামলায় নিহত হয়েছেন। একই দিনে তাঁকে দুটি বিপরীত অনুভূতি সামলাতে হয়। একদিকে আনন্দ—গাজা থেকে একটি বই বের হয়ে পৃথিবীর পাঠকের কাছে পৌঁছেছে। অন্যদিকে গভীর শোক—একটি পুরো পরিবার হারিয়ে গেছে।

সেদিনই তাঁর কাছে আরও পরিষ্কার হয়ে যায়, বই প্রকাশের কাজটি শুধু সাহিত্য প্রকাশের বিষয় নয়, এটি মানুষের জীবন ও স্মৃতি ধরে রাখারও একটি চেষ্টা।

দ্বিতীয় বই ছিল রেহাম আল-সাবির উপন্যাস ‘আই অ্যাম অ্যাট ইউর ডোর’। এতে যুদ্ধের সময় ফিলিস্তিনি নারীদের জীবনের কথা বলা হয়েছে। বাস্তুচ্যুতি ও ভয় ছাড়াও দৈনন্দিন জীবনের ছোট ছোট সমস্যাগুলোও উঠে এসেছে।

যেমন স্যানিটারি প্যাড, সাবান, ডিটারজেন্ট ও শ্যাম্পুর মতো প্রয়োজনীয় জিনিসের অভাব। স্বাভাবিক সময়ে এসব সাধারণ জিনিস হলেও যুদ্ধের সময় এগুলোর অভাব নারীদের ব্যক্তিগত জীবন, গোপনীয়তা ও মর্যাদায় বড় প্রভাব ফেলে।

তৃতীয় বই ‘দ্য পাওয়ার অব দ্য সি শু’ লিখেছেন ফিলিস্তিনি লেখক বিসান নাতিল। শিশুদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতার ওপর ভিত্তি করে লেখা এই বইয়ে শরণার্থীশিবিরের শিশুদের জীবন উঠে এসেছে। বাড়ি হারানো, বোমা হামলার ভয়, ক্ষুধা, পানির সংকট, খেলতে না পারা—সবকিছুর পাশাপাশি বইটিতে শিশুদের ছোট ছোট অনুভূতির কথাও বলা হয়েছে।

‘গাজা পাবলিকেশনস’-এর কাজ চালাতে গিয়ে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ইন্টারনেট বন্ধ হয়ে যেত, দলের সদস্যদের সঙ্গে দিনের পর দিন যোগাযোগ করা যেত না। একবার দীর্ঘ সময় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর তাঁরা ভেবেছিলেন, মারুফ হয়তো মারা গেছেন। পরে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়, কাজও আবার শুরু হয়।

বইগুলো পোল্যান্ডে ছাপা হয়েছে। এরপর জার্মানি, জর্ডান ও কায়রোর বিভিন্ন বিতরণকেন্দ্রের মাধ্যমে সেগুলো পাঠকদের কাছে পৌঁছেছে। বইগুলো নিয়ে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি আগ্রহ দেখা গেছে বলে জানান মারুফ।

পরে নিজের পুরোনো বাড়ির জায়গায় ফিরে তিনি দেখেন, পুরো বাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের সামনে একটি গাছ এবং তার পাশে ছোট আরেকটি গাছ তখনো দাঁড়িয়ে আছে।

সেই ছোট গাছটির দিকে তাকিয়ে তাঁর মনে হয়, লেখাও অনেকটা এমন। লেখা যুদ্ধ থামাতে পারে না। হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফিরিয়ে আনতে পারে না। কিন্তু চারপাশের সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেলেও মানুষের গল্প, স্মৃতি ও পরিচয় ধরে রাখতে পারে।

মারুফের কাছে ‘গাজা পাবলিকেশনস’ সেই কাজটিই করছে—যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যেও যেন মানুষ কেবল সংখ্যা হয়ে হারিয়ে না যায়, বরং তার গল্প পৃথিবীর কাছে থেকে যায়।

(লিটারেরি হাবে প্রকাশিত হুসাম মারুফের কলাম অবলম্বনে)

গাজার প্রকাশনা সংস্থা ‘গাজা পাবলিকেশনস’ থেকে প্রকাশিত বইয়ের প্রচ্ছদ ও হুসাম মারুফের প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো
গাজার প্রকাশনা সংস্থা ‘গাজা পাবলিকেশনস’ থেকে প্রকাশিত বইয়ের প্রচ্ছদ ও হুসাম মারুফের প্রতিকৃতি অবলম্বনে গ্রাফিকস: প্রথম আলো

Saturday, June 28, 2025

বইপত্র- বাংলাদেশি নারীর লাতিন আমেরিকা ভ্রমণবৃত্তান্ত by লোকমান হোসাইন

আজ থেকে ১০০ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গিয়েছিলেন আর্জেন্টিনায়। সেখানে তিনি আতিথেয়তা গ্রহণ করেছিলেন আর্জেন্টাইন কবি ও মানবাধিকারকর্মী ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর। দুজনের মধ্যে গড়ে উঠেছিল হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত সেসব জায়গায় ছুটে গিয়েছেন এক বাংলাদেশি নারী। খুঁজে ফিরেছেন বাঙালি এই কবির স্মৃতিচিহ্ন। কান পেতে যেন শোনার চেষ্টা করেছেন দুই কিংবদন্তির সম্পর্কের আদ্যোপান্ত। বলছিলাম লেখক মহুয়া রউফের ভ্রমণ বই লাতিনের নাটাই–এর ‘প্লাতা সব জানে’ গল্পটির কথা।

মূলত দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার বেশ কয়েকটি দেশে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা স্থান পেয়েছে এই বইয়ে। লেখক জানাচ্ছেন, কিশোর বয়সেই লাতিন আমেরিকান সভ্যতা, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন তিনি। কথোপকথন ও গল্পের ঢঙে লেখা ভ্রমণ গল্পগুলোতে লেখক নিজের দেখা বর্তমানের লাতিন আমেরিকার সমান্তরালে এ অঞ্চলের বিচিত্র ভূগোল, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম, সভ্যতা ও ইতিহাসের নানা বিষয় তুলে এনেছেন। বইয়ের সর্বত্রই স্বদেশকে কেন্দ্রে রেখে এই সব দেশ, সমাজ ও রাজনীতি সম্পর্কে লেখকের একধরনের তুলনামনস্কতা চোখে পড়ে।

বইয়ের ‘ভ্রমণের ভগবান’ গল্পে লেখক আর্জেন্টিনা ছেড়ে পাড়ি দিয়েছেন বলিভিয়ায়। এই ভ্রমণের ভগবান আর কেউ নয়—স্বয়ং চে গুয়েভারা! তিনি ঘুরে ঘুরে চের স্মৃতিধন্য প্রতিটি জায়গা পাঠকদের সামনে তুলে ধরেছেন—কোথায় তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল, কোথায় গোপনে কবর দেওয়া হয়েছিল—সবকিছু। এ জন্য তাঁকে বলিভিয়ার দুর্গম লাইগেরা ভ্রমণ করতে হয়েছিল। একজন নারী, নিজের প্রাণ ও অচেনা পুরুষের ভয়কে তুচ্ছ করে পাহাড়ি বিপৎসংকুল পথে, রাত্রিকালীন, অনিরাপদ যাত্রা করেন অচেনা ড্রাইভারকে সঙ্গী করে লাইগেরার উদ্দেশে। এ যাত্রা তাই নিছক ভ্রমণ নয়, তীর্থযাত্রা।

দক্ষিণ-পশ্চিম বলিভিয়ার আন্দিজ পর্বতমালার কাছে অবস্থিত ‘সালার দে উইউনি’ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে ‘নুনের মতো ভালোবাসি’ গল্পে। এখানে চারদিকে বিস্তীর্ণ ধু ধু লবণের মরুভূমি দেখার দারুণ এক অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছেন লেখক।

বলিভিয়া থেকে লেখকের পরের গন্তব্য চিলি। সেখানকার দুই বিখ্যাত কবি ভিক্তর হারা ও পাবলো নেরুদা। সাম্যবাদী কবি ও সংগীতজ্ঞ ভিক্তর হারা সামরিক স্বৈরশাসকের হাতে নিহত হন। তাঁর স্মৃতিময় জায়গা দেখার অভিজ্ঞতা উঠে এসেছে ‘ভিক্তর হারার শেষ কবিতা—এস্তাদিও চিলি’ অংশে। আর সান্তিয়াগোতে পাবলো নেরুদার বাড়ি পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা হয়েছে ‘নেরুদা, বাড়ি আছ’ অংশটি। লেখক জানাচ্ছেন, নেরুদা বাড়ির নামকরণ করেছেন তৃতীয় স্ত্রীর চুলের নামানুসারে—‘লা চাসকোনা’ যার অর্থ কোঁকড়ানো চুল!

উত্তর চিলিতে অবস্থিত পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক মরুভূমি আতাকামা। আতাকামা দেখতে গিয়ে লেখক বৈরী আবহাওয়ার সম্মুখীন হন। সেই প্রতিকূলতার বর্ণনা রয়েছে ‘আটকা পড়েছি আতাকামায়’ ভ্রমণগল্পে ‘সেনোরিতা’ ও ‘সভ্যতায় বেঁধেছি প্রাণ’ গল্প দুটি পেরুর ইনকাদের সমৃদ্ধ সভ্যতার গল্প। ৫০০ বছর আগে ইনকা সভ্যতা গড়ে উঠেছিল পেরুর আন্দিজ পর্বতকে কেন্দ্র করে। লেখক ইনকাদের বয়নশিল্পের রঙিন ইতিহাস, তাদের বিস্ময়কর স্থাপত্যশৈলী, অনন্য কৃষিপ্রযুক্তির নানা বিষয় জানিয়েছেন এখানে।

‘কৃষ্ণ গেছেন রিও’ গল্পটি ব্রাজিলের কর্কোভাডো পর্বতে প্রসারিত বাহুতে সফেদ যিশুখ্রিষ্টের মূর্তি দেখার অভিজ্ঞতা নিয়ে। আবার মেক্সিকোর চিচেন ইতজায় ভ্রমণের বৃত্তান্ত স্থান পেয়েছে ‘চিচেন ইতজা: বিস্ময় এক’ গল্পে। এখানে মায়াসভ্যতার বিস্ময়কর নিদর্শন পিরামিড ও তাঁদের আবিষ্কৃত বর্ষপঞ্জি দেখার অভিজ্ঞতা যেমন উঠে এসেছে, তেমনি এই সভ্যতার পৈশাচিকতার নিদর্শন ‘বল কোর্টে’র বর্বরতার কাহিনিও তুলে ধরেছেন লেখক। ক্যারিবিয়ান সাগরের তীরবর্তী মধ্য আমেরিকার দেশ নিকারাগুয়া ভ্রমণের বর্ণনা আছে ‘ওলা নিকারাগুয়া’, ‘দূরদেশের বড়দিন’, ‘আগুন পাহাড়’—এই তিন গল্পজুড়ে। এসব গল্পে আছে হ্রদ ও আগ্নেয়গিরির দেশ নিকারাগুয়ার বৃষ্টিবন, জলপ্রপাত, মুগ্ধতা ছড়ানো ফুলের শহর মাসায়ার শরৎ কার্নিভ্যাল আর সেরো নেগ্রো’ সামিটে গিয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতির অভিজ্ঞতার কথা।

এক বাংলাদেশি লেখকের লাতিন আমেরিকা ভ্রমণের বৃত্তান্ত জানার সমান্তরালে এই ভ্রমণ বইয়ের ঝরঝরে গদ্য ও ছবি পাঠককে নিয়ে যাবে এই অঞ্চলের ইতিহাস–ঐতিহ্যের কাছে, তা সহজেই বলা যায়।

লাতিনের নাটাই

মহুয়া রউফ

প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন

প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল

মূল্য: ৩৪০ টাকা; পৃষ্ঠা: ১৬০

প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৫

বাংলাদেশি নারীর লাতিন আমেরিকা ভ্রমণবৃত্তান্ত

Friday, April 18, 2025

গল্প- মুখোমুখি হব দুঃখগুলোর by সায়ন্তনী ত্বিষা

২৬ মার্চ ২০২৫, ভোরবেলা উঠেই দৌড়াতে হলো পিজি হাসপাতালে নানুকে (সন্‌জীদা খাতুন) গোসল করানোর জন্য। অনেক বছর আগে নানু বলে গেছিল তার মৃত্যুর পর যেন আমি আর তিন্নি (নানুর সবচেয়ে বড় বোনের নাতনি) তাকে গোসল করাই। বিষয়টাকে আমি বিশেষ গুরুত্ব দিইনি। কারণ, নানুর মৃত্যু যে আসতে পারে, সেই চিন্তাটাই আমার ছোট, দুর্বল মস্তিষ্ক কখনো ধারণ করতে পারেনি। কিন্তু দিনটি এল এবং পুরোটা সময় আমি হতবিহ্বল হয়ে থাকলাম।

গোসলের পর নানুকে পরানো হলো একটা লাল পাড়ের সাদা শাড়ি, কপালে লাল টিপ। এরপর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হলো ছায়ানটে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য। পালিয়ে পালিয়ে থাকার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু প্রকৃতি (নানুর আরেক নাতনি, পার্থ তানভীরের মেয়ে) টেনেটুনে সামনে নিয়ে গেল। তারপর লিসা (নানুর পুত্রবধূ) ঠেলে দিল একেবারে নানুর কাছে; কারণ, আমার সঙ্গে আছে তুলা, যে তুলা দিয়ে একটু পরপর নানুর মুখ মুছে দিতে হবে আর তাড়াতে হবে মাছি। আমার সারা শরীর ভেঙে কান্না আসছিল, কিন্তু শত শত মানুষের ভিড়ে মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদতেও পারছিলাম না। এর মধ্যে একের পর এক গান হয়েই যাচ্ছে, ‘এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়’, ‘আকাশ ভরা সূর্য তারা…’। ‘আগুনের পরশমণি’ যখন শুরু হলো, তখন আর কান্না চেপে রাখতে পারলাম না। চেষ্টা করলাম মাথা নিচু করে যতটুকু মানুষের চোখ এড়িয়ে কাঁদা যায়। এরপরই জাতীয় সংগীত। মনে হচ্ছিল আমার সুন্দর করে সাজানো–গোছানো পৃথিবীটা কেউ হাতুড়ি ঠুকে ঠুকে ভেঙে দিচ্ছে। এত দুঃখ কেন আসে জীবনে?

আমি নানু বা মায়ের মতো শক্ত মনের মানুষ নই। কেউ একটু চোখ রাঙিয়ে তাকালেই বুক ভেঙে কান্না পায়। যখনই মন খারাপ হতো, তখনই চলে যেতাম নানুর কাছে নালিশ করতে। নানু সব সময় উৎসাহ দিত আমাকে, যেন মনের কথাগুলো লিখে ফেলি। লিখে ফেললে মনটা হালকা লাগবে। এই কৌশল যে কতবার আমার জীবনে কাজে এসেছে, তা গুণে শেষ করতে পারব না।

জীবনের চাপে, সমাজের চাপে, মানুষের চাপে অনেকবারই মন ভেঙে গেছে। যখনই ভগ্ন হৃদয়ে নানুর কাছে যেতাম, নানু বলত গান করতে। অবশ্যই আমি নানুর কথা শুনতাম না। সুতরাং আমাকে ধরেবেঁধে নতুন গান শেখাতে শুরু করত নানু।
এভাবেই জীবনের বড় দুটো দুঃসময়ে নানুর কাছে শিখেছিলাম ‘বেলা গেল তোমার
পথ চেয়ে/ শূন্য ঘাটে একা আমি, পার ক’রে লও খেয়ার নেয়ে’ আর ‘মধুর মধুর
ধ্বনি বাজে হৃদয়কমলবনমাঝে’—এই দুটি গান।

যেহেতু আমি নাচ শিখেছি জীবনের বড় একটা সময়, নাচটা ভালোই দখলে ছিল। নানু ছোটবেলা থেকেই বলত নাচতে। নিজের মতো করে নিজের জন্য নাচতে। আমি বুঝেই পেতাম না কেন আমি নিজের জন্য নাচব! নাচ তো একটা পারফর্মিং আর্ট। এর মানেই হলো নাচতে হবে মানুষকে দেখানোর জন্য, মানুষের সামনে পারফর্ম করার জন্য। একা একা কেউ নাচে নাকি? নানু বলেছিল, নাচ এমন একটা জিনিস, যেটা সুদিনে মন আরও ভালো করে দেয় আর দুর্দিনে মনের ভার কমায়। ছোটবেলায় বেশি পাত্তা দিইনি কথাগুলো। তবে যত বড় হয়েছি, যত জীবনের ভারে জর্জরিত হয়েছি, ততই বুঝতে পেরেছি নানু আসলে কী বোঝাতে চেয়েছিল। মন খারাপ থাকলে বিছানা থেকেও উঠতে ইচ্ছা করে না। কিন্তু একটু কষ্ট করে বিছানা থেকে উঠে আধা ঘণ্টা নেচে ফেলতে পারলে মনে যে প্রশান্তি আসে, তা অতুলনীয়।

মা মারা যাওয়ার পর কিছুই ভালো লাগত না, খেতে পারতাম না, ঘুমাতে পারতাম না, হাসতে পারতাম না। জগৎ–সংসারের সবকিছুর ওপর জেগে উঠেছিল পরম অভিমান আর চরম রাগ। নানু তখন কোথা থেকে যেন ৩৬ হাজার টাকার অল-ইনক্লুসিভ ট্রাভেল প্যাকেজ জোগাড় করল ভুটান যাওয়ার জন্য। একরকম নিমরাজি হয়েই নানুর সঙ্গে রওনা দিলাম ভুটানের উদ্দেশে। অনেক বছর লেগেছিল বুঝতে যে সেটা কোনো আনন্দভ্রমণ ছিল না, সেটা ছিল বিষাদভ্রমণ।

ভুটানের রাজধানী থিম্পু হিমালয়ে ঘেরা একটা উপত্যকা, আর হিমালয়ের পারো নদীর তীরে পারো শহর—এই দুই জায়গায় আমরা ঘুরেছিলাম সেবার। হিমালয়ের বিশালতার মধ্যে বারবার নিজেকে হারিয়ে ফেলছিলাম আবার খুঁজেও পাচ্ছিলাম অন্য এক আমাকে। সেখান থেকেই মায়ের মৃত্যুর শোক পরিক্রম করার প্রক্রিয়া শুরু হয় আমার। তখন থেকেই জানি, মন খারাপ হলেই চলে যেতে হয় দূর কোন পাহাড়ে বা হ্রদের ধারে। পৃথিবীর বিশালতার কাছে উজাড় করে দিতে হয় মনের যত দুঃখ, আর সেখান থেকেই শুরু হয় বিষাদ থেকে উত্তরণের পথযাত্রা।

নানু আর আমি ছিলাম বিপরীত মেরুর দুটি মানুষ। আমার সঙ্গে তার এমন বন্ধুত্ব হওয়াটা খুবই রহস্যজনক। একেই কি বলে ‘বিপরীত মেরুর প্রতি আকর্ষণ’?

নানুর প্রায় কোনো গুণই পাইনি আমি। কিন্তু যা পেয়েছি তা হলো, স্বাধীনভাবে নিজের মতো করে বাঁচার অসীম স্পৃহা, নির্ভয়ে অকপটে নিজের মতটা প্রকাশ করতে পারার, আর ভিন্ন মতটা যৌক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠভাবে শোনার চেষ্টা এবং মানুষকে গভীরভাবে ভালোবাসার শক্তি।

নানু ছিল আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, নিরাপদ আশ্রয়। এই আশ্রয় ছাড়া বেঁচে থাকাই মুশকিল হয়ে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু এখন বুঝতে পারি, নানু আসলে জীবনের কঠিন মুহূর্তগুলোর জন্যই সারা জীবন ধরে আমাকে প্রস্তুত করেছে। নানুর মৃত্যু আমার জন্য ছিল কঠিনতম পরীক্ষা এবং এ পরীক্ষা পার হওয়ার পথও সে-ই দেখিয়ে দিয়ে গেছে।

যত্ন করে তুলে রাখলাম দুঃখগুলো। কোনো একদিন চলে যাব কোনো এক পাহাড়চূড়ায়, সেখানে একলা বসে নানুর শেখানো গানগুলো গুনগুন করব, একটু হয়তো নাচব বা লেখার চেষ্টা করব নানুকে না বলা কথাগুলো আর মুখোমুখি হব দুঃখগুলোর।

সন্‌জীদা খাতুনের (মাঝে) সঙ্গে তাঁর তিন সন্তান—রুচিরা তাবাসসুম নভেদ্‌, পার্থ তানভীর নভেদ্ ও অপালা ফরহত নবেদ
সন্‌জীদা খাতুনের (মাঝে) সঙ্গে তাঁর তিন সন্তান—রুচিরা তাবাসসুম নভেদ্‌, পার্থ তানভীর নভেদ্ ও অপালা ফরহত নবেদ। ছবি: সন্‌জীদা খাতুনের অ্যালবাম থেকে

Friday, November 29, 2013

আমি স্বপ্নের জাল বুনি by পার্থ প্রতিম মজুমদার

ষাট যখন দরজায় ধাক্কা দেওয়ার জন্য উন্মুখ তখন ‘অ্যাকশন’ বলার সঙ্গে সঙ্গে যেমন একজন অভিনেতা সুন্দর করে অ্যাঙ্গেল দিয়ে তাকায়, আমি আজকাল রাস্তায় যেতে যেতে নিজেই নিজেকে ‘অ্যাকশন’ বলি আর ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাই, গুনগুন করি ‘মুছে যাওয়া দিনগুলি আমায় যে পিছু ডাকে...’।

Friday, November 22, 2013

লোরকার স্মৃতিময় বাড়িতে by সাজ্জাদ শরিফ

হোটেলের আজকের রিসেপশনিস্টটি দিব্যি হাসিখুশি। আগের কয়টা দিন যে ডিউটিতে ছিল, তার মতো রোবট নয়। ওর মুখে হাসি বলতে তো কিছু ছিলই না, অভিব্যক্তি পর্যন্ত না।

Friday, September 27, 2013

রাশেদ চৌধুরী- হাওয়াই দ্বীপে কীর্তিমান বাংলাদেশি by ইফতেখার মাহমুদ

যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জবাসীর কাছে বাংলাদেশের ছেলে রাশেদ চৌধুরীর নাম অতটা পরিচিত নয়।

Friday, July 19, 2013

অন্য দুনিয়া প্রতীকের জগৎ

চিত্রকর্মে আঁকা থাকে কত শত জিনিস। শিল্পী ও শিল্পসমালোচকদের মতে, একটি চিত্রকর্মের প্রতিটি উপাদানেরই আছে ভিন্ন ভিন্ন মানে। একেকটি উপাদান একেক বিষয়ের ইঙ্গিত বহন করে।

কীভাবে এল ভিজিটিং কার্ড

একটা জায়গায় চাকরি করেন আর আপনার পকেটে কোনো ভিজিটিং কার্ড নেই, ব্যাপারটা একটু বিব্রতকরই। কথায় কথায় কেউ ভিজিটিং কার্ড চেয়ে বসার পর তা দেখাতে না পারলে বেশ লজ্জার মধ্যেই পড়ে যেতে হয়।

প্রিয় চলচ্চিত্র প্রথম বাংলা সিনেমা দেখেছি লুকিয়ে! by শাহদীন মালিক

চোখে সমস্যা হওয়ার পর থেকে সিনেমা দেখার নেশাটা কমে গেছে। আসলে কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছি। কলেজজীবনের অনেক কম পয়সায় সিনেমা দেখতে পারতাম। আক্ষরিক অর্থেই পয়সা। কারণ, শিক্ষার্থীরা পরিচয়পত্র দেখালেই অর্ধেক টাকায় টিকিট কাটা যেত।

শুভ জন্মদিন, গ্যাংনাম স্টাইল! by রাজীব হাসান

বিশ্বটাকে জয় করতে নাকি ১১ বছর সময় লেগেছিল মহাবীর আলেকজান্ডারের। পুরো বিশ্ব ঘুরে আসতে ৮০ দিন সময় নিয়েছিলেন ফিলিয়াস ফগ। সাইয়ের সময় লেগেছে চার মিনিট ১৩ সেকেন্ড!

সপ্তাহের নায়ক জুলেখা বেগম, বেসরকারি প্রসবকর্মী

দুই বছরের চুক্তিতে বিনা বেতনে মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী উপজেলার ভোগতেরা কমিউনিটি ক্লিনিকে কাজ করছেন জুলেখা। ‘নিরাপদ মাতৃত্ব দিবস-২০১৩’ উপলক্ষে ২০ জুন ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জুলেখাকে পুরস্কৃত করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

Friday, July 12, 2013

অন্য দিগন্ত সপ্তসিন্ধু

মহসিন হামিদ-এর নতুন উপন্যাস
রিলাকট্যান্ট ফান্ডামেন্টালিস্ট উপন্যাসটি লিখে নাম কুড়িয়েছেন পাকিস্তানি লেখক মহসিন হামিদ (জন্ম ১৯৭১) বছর ছয়েক আগে।

বাংলার হাতির পিঠে মার্কিন সার্কাসের যাত্রা শুরু by মাহবুব আলম

কয়েক বছর হলো ব্রিটেনের কাছ থেকে আমেরিকা স্বাধীন হয়েছে। নতুন বিশ্বের নতুন স্বাধীন দেশ গড়ার প্রেরণায় মার্কিন জনগণ ও উদ্যোক্তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নতুন শিল্পোদ্যোগ নিয়ে তাঁদের অনেকেই এগিয়ে এসেছেন।

‘দারুণ অগ্নিবাণে রে হূদয় তৃষ্ণায় হানে রে’ by এম এ মোমেন

রবীন্দ্রনাথের প্রকৃতি-পর্বের এই গানটির পরের দুটি পঙিক্ত: রজনী নিদ্রাহীন, দীর্ঘ দগ্ধ দিন/ আরাম নাহি যে জানে রে। এই ঘটনাও দীর্ঘ দগ্ধ দিনের, রবীন্দ্রনাথ সে বছরই সাফল্য ও স্বীকৃতির স্বর্ণশিখরে, ১৯১৩তে।

প্রায়ান্ধ চোখ মেলে by আল মাহমুদ

১৯৩৬ সালে আমার জন্ম। কৈশোরকালেই আমার মনে এ আকাঙ্ক্ষা অঙ্কুরিত হয়েছিল যে আমি কবি হব। আশ্চর্য, বাংলাদেশের মানুষ এখন আমার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে, এই তো কবি! এর চেয়ে বেশি কিছু পাওয়ার ইচ্ছা আমার কখনো ছিল না।

সপ্তাহের নায়ক আয়েশা সিদ্দিকা, সহকারী পুলিশ কমিশনার, ঢাকা মহানগর

সিলেটের জালালাবাদ সেনানিবাসের ‘স্কুল অব ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকটিস’-এ প্রশিক্ষণ নিয়েছে আয়েশা সিদ্দিকাসহ ২০ জনের একটি দল। ৪ জুলাই শেষ হয়েছে তাদের প্রশিক্ষণ। তিনি সফলভাবে একাধিকবার দড়ি বেয়ে নেমে এসেছেন হেলিকপ্টার থেকে।

Friday, July 5, 2013

অন্য দিগন্ত সপ্তসিন্ধু

নগুগির স্মৃতিকথার দ্বিতীয় কিস্তি
শুধু নিজের কৈশোরের কথাই নয়, তার সঙ্গে রয়েছে ঔপনিবেশিক সময়কালের কথাও।

জানি তোমার প্রেমের যোগ্য আমি তো নই by আন্দালিব রাশদী

এই তো সেদিনই না গুনগুন করে মান্না দের মতো দরদ মিশিয়ে গলা কাঁপিয়ে হূদয়ের সব আবেগ ঢেলে ভালোবাসার মেয়েটিকে বললেন, ‘জানি তোমার প্রেমের যোগ্য আমি তো নই/ পাছে ভালোবেসে ফেলো তাই দূরে দূরে রই’, তারপর যায় যখন

বর্বরদের প্রতীক্ষায় by মাসরুর আরেফিন

বিশ্বসাহিত্যের বিচিত্র, বিশাল জগতে, এর গল্প-কবিতা-উপন্যাসে, এত এত থিম নিয়ে কাজ হয়েছে যে ভাবলে মাথা ঘুরে যায়। একদিকে প্রেম, মৃত্যু, বিশ্বাসঘাতক ও দেশপ্রেমের মতো চিরায়ত থিম।

১০ জুলাই শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা। রথের অতীত, বর্তমান উঠে এসেছে এই লেখায় রথের কথকতা by ইকবাল মতিন

রথযাত্রা আর্যজাতির একটি প্রাচীন ধর্মোৎসব। কিন্তু এখন রথযাত্রা বললে সাধারণত জগন্নাথদেবের রথযাত্রাকেই বোঝায়। কিন্তু একসময় ভারতবর্ষে সৌর, শক্তি, শৈব, বৈষ্ণব, জৈন, বৌদ্ধ সব ধর্ম-সম্প্র্রদায়ের মধ্যে স্ব স্ব উপাস্যদেবের উৎসববিশেষে রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হতো।