Monday, October 19, 2026
স্ত্রী-সন্তানসহ ছয় স্বজন হারিয়ে নির্বাক নূর আলম
উজিরপুর (বরিশাল) থেকে মাহফুজুর রহমান মাসুম জানান, কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে স্ত্রী, একমাত্র সন্তান, শ্যালক ও তিন শ্যালিকাকে হারিয়েছেন বরিশালের উজিরপুর উপজেলার নূর আলম। অফিসের জরুরি কাজে একদিন আগে কক্সবাজার থেকে চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসায় প্রাণে বেঁচে গেলেও মুহূর্তেই তার জীবনে নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। নূর আলম বরিশালের উজিরপুর উপজেলার বড়কোঠা ইউনিয়নের গাজীরপাড় গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বেসরকারি ওষুধ কোম্পানি ড্রাগ ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ বিপণন কর্মকর্তা হিসেবে চুয়াডাঙ্গায় কর্মরত। চাকরির সুবাদে প্রায় আট বছর ধরে তিনি চুয়াডাঙ্গা শহরের দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ায় স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস করছিলেন।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নূর আলমের স্ত্রী ফারিয়া কবির (৩৩) বেশ কিছুদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। অসুস্থতার মধ্যেও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাতে তারা কক্সবাজারে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। গত ১৪ অক্টোবর স্ত্রী ফারিয়া কবির ও পাঁচ বছর বয়সি একমাত্র ছেলে ফাইজান নূরকে নিয়ে চুয়াডাঙ্গা থেকে ঢাকায় যান নূর আলম। পরদিন বৃহস্পতিবার শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের সঙ্গে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন তারা।
কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর অফিসের জরুরি কাজ থাকায় শুক্রবার নূর আলম একাই চুয়াডাঙ্গায় ফিরে আসেন। কিন্তু পরদিন শনিবার সকালে গণমাধ্যমে কক্সবাজারের ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের খবর দেখে তিনি স্বজনদের খোঁজ নিতে শুরু করেন। এক পর্যায়ে জানতে পারেন, ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে নিহতের মধ্যে ছয়জনই তার পরিবারের সদস্য।
নিহতরা হলেনÑনূর আলমের স্ত্রী ফারিয়া কবির (৩৩), তাদের পাঁচ বছর বয়সি ছেলে ফাইজান নূর, শ্যালক নাসির উদ্দিন (২৫) এবং তিন শ্যালিকা ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭) ও মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩)। এ ঘটনায় আরো কয়েকজন হতাহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে নাফিসতা মীম (২৭) নামের একজনের পরিচয়ও জানা গেছে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, অগ্নিকাণ্ডে মোট ১০ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় ছয়জন দগ্ধ হয়ে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
দগ্ধদের মধ্যে মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন ও তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান, ইসমাইল হোসেন মাসুদ ও তার স্ত্রী মেহেরুন নেছা, মান্নান এবং সামিদা রয়েছেন। ইসমাইল হোসেন ও তার স্ত্রী মেহেরুন নেছা নিহত ফারিয়া কবিরের মামা-মামি। তাদের বাড়ি চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার দক্ষিণ ঠেটালিয়া গ্রামে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে ধারণা করা হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকেও রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ঝুঁকির কথা জানানো হয়েছে এবং এর আগে সতর্ক করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
ছেলে বিয়ে করার পর আর গ্রামে আসেননি
নূর আলমের বাবা মোহাম্মদ আলী রাড়ি জানান, ছেলে বিয়ে করার পর স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে কখনই তাদের উজিরপুরের গ্রামের বাড়িতে আসেননি। নূর আলমের শ্বশুরবাড়ি পটুয়াখালীর তালতলীতে হলেও তার শ্বশুরবাড়ির পরিবারের সদস্যরা ঢাকার বনশ্রী এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। মোহাম্মদ আলী রাড়ি বলেন, পুত্রবধূ, নাতি এবং ছেলের শ্যালক-শ্যালিকাসহ পরিবারের ছয়জনকে হারানোর খবর তাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। লাশ আপাতত ঢাকায় দাফন করার বিষয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি। একসঙ্গে স্ত্রী, একমাত্র সন্তান, শ্যালক ও তিন শ্যালিকাকে হারিয়ে নূর আলম এখন নির্বাক। যে ভ্রমণ ছিল পরিবারের সঙ্গে আনন্দঘন সময় কাটানোর আয়োজন, সেটিই পরিণত হয়েছে জীবনের সবচেয়ে বড় শোকে।
অফিসের জরুরি কাজে এক দিন আগে কক্সবাজার থেকে ফিরে আসায় নূর আলম বেঁচে গেলেও হারিয়েছেন তার সবচেয়ে কাছের ছয়জনকে। স্বজনদের সঙ্গে তোলা ছবিগুলো এখন তার কাছে শুধুই স্মৃতি।
নূর আলমের পরিবারের ছয় সদস্যের এমন মর্মান্তিক মৃত্যুর খবরে বরিশালের উজিরপুরের গাজীরপাড় গ্রামসহ এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া। স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয়রা এই ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছেন।
চুয়াডাঙ্গা থেকে মফিজুর রহমান জোয়ারদার জানান, ইনানী এলাকার একটি রিসোর্টে আগুন কেড়ে নিয়েছে একটি পরিবারের হাসি-খুশি দুই সদস্যের প্রাণ। এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় না ফেরার দেশে চলে গেছেন চুয়াডাঙ্গা শহরের দক্ষিণ হাসপাতালপাড়ার বাসিন্দা ফারিয়া কবীর (৩৩) এবং তার পাঁচ বছরের সন্তান ফাইজান। তাদের চিরবিদায়ে চুয়াডাঙ্গায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।
ফারিয়ার পৈতৃক বাড়ি ছিল বরিশালে। গত ১৪ অক্টোবর পরিবারের সবাই মিলে অবকাশযাপনে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু কে জানত এই আনন্দ ভ্রমণই তাদের জীবনের শেষ ভ্রমণ হয়ে থাকবে।
শনিবার সকালে ইনানীর ওই রিসোর্টটিতে হঠাৎ করেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই আগুন চারদিকে ভয়াবহ রূপ নিলে ভেতরে আটকা পড়েন অনেকে। এই মর্মান্তিক অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান মা ফারিয়া ও ছোট্ট ফাইজান। একই পরিবারের মা ও অবুঝ শিশুর এমন করুণ পরিণতিতে স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং এলাকাবাসীর চোখ আজ অশ্রুসিক্ত। আনন্দময় একটি ছুটি কীভাবে একটি পরিবারের জন্য চিরন্তন কান্নার কারণ হয়ে দাঁড়াল, তা কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না কেউ।
মতলব উত্তর (চাঁদপুর) থেকে শেখ ওমর ফারুক জানান, ঢাকা থেকে কক্সবাজারে পাটুয়ারটেক টুকটুক রিসোর্টে ওঠে মতলব উত্তরের ফতেপুর পূর্ব ইউনিয়নের দক্ষিণ ঠেটালীয়া গ্রামের রুহুল আমিন ঢালীর পরিবার। তারা একই পরিবারের ১০ জন ওই রিসোর্টে ওঠেন। ওই রিসোর্টে ২৮ জন অতিথি ছিলেন। তন্মধ্যে রুহুল আমিন ঢালির পরিবারের সদস্য ছিলেন ১০ জন। শনিবার টুকটুক রিসোর্টে ভয়াবহ আগুনে রুহুল আমিন ঢালির ছয় সদস্য আগুনে পুড়ে মারা যান।
মতলব উত্তর উপজেলার দক্ষিণ ঠেটালীয়া গ্রামের রুহুল আমিন (লিলু) ঢালীর আত্মীয়র পরিবারের ১০ জনের মধ্যে ছয়জন নিহত হন। জীবিত চারজনের মধ্যে আহত রুহুল আমিন (লিলু) ঢালীর ছেলে মাসুদ, রুহুল আমিন লিলুর ছেলের স্ত্রী মেহেরুন নেছা মিলা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নুরে আলম ও আসিক সুস্থ আছেন। শনিবার সকাল ৭টায় টুকটুক রিসোর্টে আগুনে এ দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানান মতলবের রুহুল আমিন (লিলু) ঢালী।
![]() |
| ছবি: বেঁচে যাওয়া নূর আলম এবং আগুনে পুড়ে মুত স্ত্রী-সন্তান |
Monday, October 12, 2026
তাজমিনকে সতর্ক করতে চেয়েছিলেন বাস কাউন্টারের কর্মী আবদুল্লাহ
‘ওদের (তাজমিন ও রাজুর) বুঝা উচিত ছিল, আমি দিনে যাচ্ছি (রওনা হচ্ছি)। একটা মেয়ে রাতে ওইখানে (কুমিল্লায়) পৌঁছাবে। ওরও (তাজমিন) বুঝা উচিত ছিল। আমি বলতে চাইছিলাম ওদের। কিন্তু কাস্টমারের চয়েজ থাকতে পারে, তাই বলা হয়নি।’ কথাগুলো বলছিলেন কক্সবাজার আইকনিক বাস কাউন্টারের কর্মী আবদুল্লাহ।
জান্নাতুল তাজমিন (১৫) কুমিল্লার ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে কক্সবাজার থেকে কুমিল্লা ফেরার বাসের টিকিট কাটতে যায় সে ও তার প্রেমিক রিয়াজ উদ্দিন রাজু ওরফে রাজু চৌধুরী (২০)। পরদিন বুধবার দুপুর ১২টার টিকিট কাটা হয়। বাস ছাড়ে দুপুর একটার দিকে। একা যাত্রা করবে বলে তাজমিনের জন্য সিঙ্গেল সিটের টিকিট কাটেন রাজু।
রাজুর দাবি, তাজমিন যাতে নিরাপদে কুমিল্লার বাসায় পৌঁছাতে পারে, সে জন্য তার সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ ছিল। কিন্তু যোগাযোগ থাকা সত্ত্বেও তাজমিনের শেষ যাত্রার পরিণতি হয় ভয়াবহ।
আটক রাজুর ভাষ্য, একটি হাতঘড়ি নিয়ে মায়ের সঙ্গে ঝগড়ার জেরে তাজমিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে। রাজুকে সে জানিয়েছিল, ওই নারী তার সৎমা এবং তার নিজের মা মারা গেছেন। এরপর সে এক বান্ধবীর বাসায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া যায়। সেখান থেকে কুমিল্লায় ফিরে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় থাকার সময় থেকেই রাজুর সঙ্গে তার যোগাযোগ শুরু হয়। পরে গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে কক্সবাজারে পৌঁছায় তাজমিন।
তবে পরিবারের দাবি, ৪ অক্টোবর তাজমিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। এরপর থেকে সে নিজের ইচ্ছামতো চলাফেরা করছিল। এ সময় বাবা-মায়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ থাকলেও সে কোথায়, কার কাছে ছিল, তা নিশ্চিতভাবে জানতে পারেননি তারা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা হত্যাকাণ্ডের পর তাজমিনের আইফোনের অবস্থান শনাক্ত করে তার ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কক্সবাজারে যাওয়ার তথ্য পান বলে জানা গেছে।
রাজুর দাবি, কক্সবাজারে অবস্থানকালে তাজমিনের বাবা তাকে একাধিকবার ফোন করে অবস্থান জানতে চান এবং বাড়ি ফিরে আসার অনুরোধ করেন। বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলার সময় তাজমিনকে বলতে শুনেছিলেন, সে শিগগিরই বাড়ি ফিরবে। এরপরই মঙ্গলবার রাতে দুজন আইকনিক এক্সপ্রেসের কাউন্টারে গিয়ে পরদিনের টিকিট কাটে।
কিন্তু তাজমিনের বাড়ি ফেরার সেই যাত্রা আর বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছায়নি।
ঘটনার দিন বুধবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে শেষবার কথা হয়েছিল বলে সাংবাদিকদের জানান তাজমিনের মা কেয়া খাতুন। তখন তাজমিন জানিয়েছিল, সে এক বান্ধবীর সঙ্গে আছে। মেয়েকে সেখান থেকে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন মা। কিন্তু বান্ধবীর নাম কিংবা তার মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলেও তাজমিন কিছু জানায়নি।
মেয়ের বন্ধুবান্ধব নিয়ে আগে থেকেই উদ্বিগ্ন ছিলেন কেয়া খাতুন। কোনো অঘটন ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলে যেতে দেননি বলে জানান তিনি। মেয়ের চলাফেরা ও বন্ধুত্বের বিষয়ে খোঁজ রাখতেন, চোখে চোখে রাখার চেষ্টা করতেন। তবু শেষ পর্যন্ত মেয়েকে রক্ষা করতে পারেননি।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাজমিনের মা যে বান্ধবীর কথা বলেছেন, তিনি তাজমিনের চেয়ে বয়সে বড়। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়, তবে তিনি কুমিল্লায় থাকেন। হত্যাকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততার প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। একইভাবে রাজুর সম্পৃক্ততার বিষয়টিও তদন্তে এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ সাংবাদিকদের বলেন, তিনি দীর্ঘদিন তাজমিনকে পড়িয়েছেন। মেয়েটি খুব চঞ্চল স্বভাবের ছিল। মা অসুস্থ হলে দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখভাল করত সে। তার বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন। সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। তবে বাবা তাজমিনকে খুব আদর করতেন।
শিক্ষকের ভাষ্য, বাড়িতে রাগ হলে তাজমিন হুটহাট করে বেরিয়ে যেত।
তাজমিনের বাড়ি ছাড়ার পেছনে পারিবারিক বিরোধ, বন্ধুত্ব ও রাজুর সঙ্গে সম্পর্কের ভূমিকা কতটা ছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বাড়ি ছাড়ার পর কয়েক দিন ধরে তার অবস্থান, চলাফেরা ও যোগাযোগের ধারাবাহিকতা তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
পুলিশের ভাষ্য, তাজমিনকে হত্যা করেছেন একজনই, সিএনজিচালক সুমন মিয়া (৩৫)। শনিবার রাতে তিনি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটিত হয়েছে। তবে মামলার তদন্ত এখনো চলছে।
কক্সবাজারে অবস্থানকালে রাজুর ভূমিকা এবং তাজমিনের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও তদন্তে এখনো তার সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। গত রোববার (১১ অক্টোবর) রাতে কক্সবাজার থেকে রাজুকে আটক করে পুলিশ। ঘটনার বিস্তারিত জানতে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে মনে করছে পুলিশ। তথ্য যাচাই-বাছাই করতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কুমিল্লা থেকে কক্সবাজারে গেছেন।
পুলিশ জানায়, বুধবার (৭ অক্টোবর) রাত সাড়ে ১২টার দিকে বাস থেকে নেমে কুমিল্লা শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করে তাজমিন। পরদিন বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
![]() |
| স্কুল শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন। ছবি: সংগৃহীত |
Friday, August 21, 2026
টেকনাফে জেলেদের জালে ধরা পড়ল ১৬৬ কেজির বোল মাছ
ট্রলারের মালিক সাইফুল ইসলাম (৪৫) বলেন, প্রতিদিনের মতো বৃহস্পতিবার দুপুরে ছয় জেলে নৌকা নিয়ে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরতে নামেন। বিকেলে জালে অন্যান্য সামুদ্রিক মাছের সঙ্গে বিশাল বোল মাছটিও ধরা পড়ে। অতিরিক্ত ওজনের কারণে মাছটি নৌকায় তুলতে জেলেদের বেগ পেতে হয়।
সাইফুল ইসলাম বলেন, এত বড় মাছ জীবনে কখনো দেখা হয়নি। বড় মাছ ধরতে পেরে জেলেরা খুশি। আড়তে মাছটি ওজন মেপে পাওয়া গেছে ১৬৬ কেজি। গত পাঁচ বছরে টেকনাফ সমুদ্র উপকূলে এত বড় বোল মাছ কোনো ট্রলারে ধরা পড়েনি। তবে মাঝেমধ্যে বড় বোল মাছ ধরা পড়েছে সেন্ট মার্টিনের ছেঁড়াদিয়ায়।
ট্রলারের জেলেরা জানান, বোল মাছটির বিক্রির জন্য ২ লাখ টাকা চাওয়া হয়েছিল। ১২ জন মাছ ব্যবসায়ী বোল মাছটি কেনার আগ্রহ দেখান। শেষ পর্যন্ত ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় বোল মাছটি কিনে নেন বাহারছড়ার মাছ ব্যবসায়ী মোহাম্মদ করিম সওদাগর।
ক্রেতা করিম সওদাগর জানান, বোল মাছটি বিক্রির জন্য রাতেই ঢাকায় পাঠানো হবে। এ জন্য বরফ দিয়ে মাছটি সংরক্ষণের প্রস্তুতি চলছে। ঢাকায় এই মাছ দুই লাখ টাকার বেশি দামে বিক্রি করা হবে।
১৬৬ কেজি ওজনের বোল মাছ ধরা পড়ার সত্যতা প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেন উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন। বিরল প্রজাতির বড় এই বোল মাছ সব সময় জালে ধরা পড়ে না। সেন্ট মার্টিনের প্রবাল পাথরের স্তূপে এবং আশপাশে পাথর এলাকায় বোল মাছের বিচরণ বেশি থাকে। বোল মাছ ওজনে ৯-১০ মণও হয়ে থাকে। বোল মাছটি দেখতে স্থানীয় অনেকে আড়তে ভিড় জমিয়েছিলেন।
সেন্ট মার্টিন বোট মালিক সমিতির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম বলেন, ছেঁড়াদিয়ার চারপাশে পাথরস্তূপ ও প্রবাল আস্তরে বোল মাছের বিচরণ বেশি দেখা যায়। কিন্তু পাথরের জন্য সেখানে জাল ফেলা যায় না। দ্বীপের ২০-২৫টি নৌকা ছেঁড়াদিয়াতে নৌকা নিয়ে গিয়ে বড়শি ফেলে বোল মাছ ধরা হয়। ৩০ কেজি থেকে সর্বোচ্চ পাঁচ মণ ওজনের বোল ধরা পড়ার রেকর্ড রয়েছে। মাছটির স্বাদে অতুলনীয়।
![]() |
| কক্সবাজারের টেকনাফের বাহারছড়ার জেলেদের জালে ধরা পড়েছে ১৬৬ কেজি ওজনের বোল মাছটি। ছবি: প্রথম আলো |
Thursday, February 5, 2026
মহেশখালীর মাতারবাড়ী: সিঙ্গাপুর বানানোর স্বপ্নের আড়ালে ভিন্ন গল্প by আবুল কালাম আজাদ
মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের শুরুতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের বড় বড় রাজনৈতিক নেতা বিরাট বিরাট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কেউ বলেছেন, মাতারবাড়ী হবে সিঙ্গাপুর, কেউ বলেছেন মালয়েশিয়া, কেউ বলেছেন সুইজারল্যান্ড। বিশেষ করে সিঙ্গাপুরের স্বপ্ন দেখানোর বিষয়টি বেশ উচ্চারিত হয়েছে। বলা হয়েছে, মাতারাবাড়ীর সবাই কাজ পাবেন, ভালো বেতনে কাজ পাবেন। আর লবণ চাষ করতে হবে না, চিংড়ি–কাঁকড়ার চাষ করতে হবে না, নদী-সাগরে মাছ ধরতে হবে না। ২১ ধরনের ক্ষতিপূরণের আওতায় সবাই ক্ষতিপূরণ পাবেন। মাতারবাড়ীতে গরিব থাকবে না।
এরপর মাতারবাড়ীর পশ্চিম উপকূলে গোল সূর্য বঙ্গোপসাগরের নীল জলে অপার সৌন্দর্য ছড়িয়ে বহুবার অস্তমিত হয়েছে। আর অন্ধকার গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে নেমে এসেছে মাতারবাড়ীর ঘরে ঘরে।
মাতারবাড়ী সত্যিই সিঙ্গাপুর হয়ে গেছে! মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পের চার লেনের মসৃণ সংযোগ সড়ক দিয়ে নতুন ব্রিজ পার হয়ে সেলফি পয়েন্টে দাঁড়িয়ে কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের চিমনি থেকে বের হওয়া ধোঁয়া পেছনে রেখে সেলফি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে একটা সিঙ্গাপুরসুলভ অনুভূতি পাওয়া যায়।
কোহেলিয়া নদী ভরাট করে চার লেনের চকচকে সড়কে এক-দেড় শ মাইল গতিতে গাড়ি চালিয়ে সুইজারল্যান্ডের অনুভূতি লাভ করা যায়। কয়লা জেটির পাশের কোনো দোকানে বসে চা–কফিতে চুমুক দিতে দিতে কয়লা খালাসকারী জাহাজ বা ক্রেন দেখে হয়তো কারও কারও মনে মালয়েশিয়ার অনুভূতি খেলা করতে পারে। কিন্তু মাতারবাড়ীর এক লাখ অধিবাসীর জীবনে এগুলো অভিশাপের মতো। কারণ, উন্নয়ন প্রকল্পের কারণেই তাঁদের জীবনে বস্তি নেমে এসেছে, দুনিয়ার নিকৃষ্টতম বস্তি। কাজ নেই, খাবার নেই, সম্মান নেই, জীবনের নিরাপত্তা নেই।
ডিসেম্বর মাস, লবণ চাষের ভরা মৌসুমে মাতারবাড়ীর মানুষের কোনো কাজ নেই। শুকনা মুখে অবসরের ক্লান্তি। অথচ দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের লবণ উৎপাদনকারী জনগোষ্ঠী এখন ভীষণ ব্যস্ত। লবণমাঠ প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে নিয়মিত পরিচর্যা, লবণ জমিতে সাগরের পানি তোলা, এক প্লট থেকে আরেক প্লটে পানি সরবরাহ, লবণ স্তূপ করা, ওজন করা, বহন করে নৌকায় বা গোডাউনে নিয়ে যাওয়া, নৌকায় করে মোকামে নেওয়াসহ হাজার রকম কাজ। নারীদেরও এ সময় অবসর থাকে না—লবণমাঠের চাষির জন্য খাবার প্রস্তুত করা, মাঠে পৌঁছে দেওয়া, চাষের উপকরণ তৈরি করা ও মেরামত করা, লবণ বহনের ঝুড়ি বোনাসহ অনেক অনেক ব্যস্ততা।
অথচ লবণের মৌসুমে একসময় বাইরে থেকে শ্রমিক আসত মাতারবাড়ীতে কাজ করার জন্য। মাতারবাড়ী হিন্দুপাড়ার রমা দাসের (ছদ্ম নাম) স্বামী বছরখানেক আগে কক্সবাজারে একটি আবাসিক হোটেলে কাজ নিয়েছেন। কারণ, এখানে কোনো কাজ নেই। রমা দাস জানালেন, তাঁদের পরিবারের কোনো সদস্য এই প্রথম মাতারবাড়ীর বাইরে কাজের জন্য গিয়েছেন। বলতে বলতে লজ্জায় মুখ ঢাকলেন!
মাতারবাড়ী থেকে অভিবাসী হওয়া মানুষের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কেউ সাময়িক কাজের সন্ধানে যাচ্ছেন, কেউ স্থায়ীভাবে মাতারবাড়ী ছেড়ে শহরের বস্তি, দূরের পাহাড় বা অন্য কোনো এলাকায় গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন, কপর্দকশূন্য শ্রম বিক্রি করতে।
কক্সবাজার জেলার অপার সুন্দর পাহাড়ি দ্বীপ মহেশখালী উপজেলার একটি ছোট্ট দ্বীপ মাতারবাড়ী। অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ এই দ্বীপের লক্ষাধিক অধিবাসী বঙ্গোপসাগর ও পার্শ্ববর্তী কোহেলিয়া নদীতে মৎস্য আহরণ, শুকনা মৌসুমে লবণ উৎপাদন, বর্ষাকালে চিংড়ি, কাঁকড়া ও মাছ চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। পাশাপাশি দ্বীপের ভেতরে ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসলের চাষ তো হতোই। আর সব দ্বীপের মতোই এখানেও প্রচুর গবাদিপশু হতো। ফলে মাতারবাড়ী ছিল অর্থনৈতিকভাবে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দ্বীপ এবং এখানকার অধিবাসীরা ছিলেন তুলনামূলকভাবে সচ্ছল।
মাতারবাড়ী দ্বীপ ইতিমধ্যেই দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে, মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র ও বাস্তবায়নাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কারণে। তৎকালীন সরকার মাতারবাড়ী দ্বীপটিকে একটি পাওয়ার (বিদ্যুৎ) হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। মূলত কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়ে এই হাব গড়ে তোলা হবে। এরই অংশ হিসেবে ১২০০X২=২৪০০ মেগাওয়াট মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র ও ১৩২০ মেগাওয়াট কোহেলিয়া কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের নামে দুটি বৃহৎ কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করে।
এই প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন করার জন্য প্রায় তিন হাজার একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। পাশাপাশি এই দ্বীপে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর ও একটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার জন্যও বিপুল পরিমাণ ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়। অবশ্য যে প্রক্রিয়ায় এসব জমি অধিগ্রহণ করা হয়, তাকে অধিগ্রহণ না বলে জবরদখল বলাই উত্তম। এসব জমি ছিল মাতারবাড়ীর মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস। লবণ, চিংড়ি ও কাঁকড়া চাষের জমি। পার্শ্ববর্তী কোহেলিয়া নদী ছিল মাছের আধার, জীবন-জীবিকার আরেক উৎস এবং ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। পাশাপাশি অবারিত সাগরে মৎস্য আহরণ চলত ১২ মাস।
২০২১ সালে সরকার কোহেলিয়া কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রটি বাতিল করে দেশের আরও ১০টি পরিকল্পনাধীন কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে। কিন্তু মাতারবাড়ী ২৪০০ মেগাওয়াটের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের ১২০০ মেগাওয়াটের নির্মাণকাজ চলতে থাকে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ছিল জাপানি আর্থিক প্রতিষ্ঠান জাইকা। নির্মাণকাজে জড়িত ছিল আরেক জাপানি প্রতিষ্ঠান সুমিটোমো করপোরেশন।
প্রকল্পটির মালিকানায় কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র সম্প্রসারণের লক্ষ্যে গঠিত, কোল পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল)। ২০২২ সালে দ্বীতিয় পর্যায়ের ১২০০ মেগাওয়াট প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করতে অপারগতা প্রকাশ করে জাইকা। একই সঙ্গে সুমিটোমো করপোরেশন দরপত্রে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত থাকে। ফলে এ প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের ১২০০ মেগাওয়াট আর আলোর মুখ দেখেনি। কিন্তু এই প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা প্রায় ১ হাজার ৫০০ একর ভূমি পুরোটাই ব্যবহার করছে ১২০০ মেগাওয়াটের মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্রটি।
২০১৪ সালে মাতারবাড়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন ও প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের আগে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে যথাযথভাবে পরামর্শ করা হয়নি এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির বিষয়গুলোও তুলে ধরা হয়নি। সে সময় স্থানীয় মানুষ জমি অধিগ্রহণের বিরোধিতা করেছেন, আন্দোলন করেছেন। নারীরা ঝাড়ু হাতে মিছিল করেছেন, ভূমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে।
প্রকল্পের মাটি ভরাটের কাজ শুরু হলে এই দ্বীপের পানি ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত সব কটি (১১টি) স্লুইচগেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর ফলে দ্বীপের ভেতরের প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের সব ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়ে। ২০১৭ সালের বর্ষাকাল থেকেই দ্বীপে জলাবদ্ধতা শুরু হয়। ২০১৮ সালে জলাবদ্ধতা চরম রূপ নেয়। সে সময় ১০ হাজারের বেশি পরিবার প্রত্যক্ষভাবে এবং পুরো দ্বীপের জনগোষ্ঠী পরোক্ষভাবে জলাবদ্ধতার কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হন।
মাতারবাড়ী মূল সড়কটি পানির নিচে চলে যাওয়ার কারণে, মাতারবাড়ীবাসী একরকম বন্দিদশায় পর্যবসিত হন। স্থানীয় লোকজনের দাবির মুখে রাঙ্গাখালী খাল—যেটা কোহেলিয়া নদীর সঙ্গে দ্বীপের মূল পানিপ্রবাহের পথ—তার মুখে পাইপ বসিয়ে সাময়িক জলাবদ্ধতা নিরসনের ব্যবস্থা করা হয়। সুবিশাল কোহেলিয়া নদী এখন একটি বদ্ধ জলাশয়ে পরিণত হয়েছে।
মাতারবাড়ী প্রকল্পের নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকেই কোহেলিয়া নদীতে মৎস্য আহরণ এবং ওই পথে সাগরে যাওয়ার ওপর বাধা প্রদান করতে শুরু করে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। নির্মাণকাজের বর্জ্যে নদী ভরাট হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে নদীর ওপর দিয়ে নির্মাণ করা হয় প্রকল্পের সংযোগ সড়ক।
কোহেলিয়া নদীর ওপর নির্ভরশীল কয়েক হাজার জেলে পরিবার এখন বেকার, অস্তিত্বের সংকটে জীবন্মৃত। পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক মানুষের সব কার্যক্রম বন্ধ হয়ে গেছে। এই প্রক্রিয়ায় প্রথমেই মাতারবাড়ী দ্বীপের শক্তিশালী ও স্বতন্ত্র পানি ব্যবস্থাপনা ভেঙে দেওয়া হয়। যা মাতারবাড়ীর মতো দ্বীপের মানুষ ও প্রকৃতির টিকে থাকার প্রধান শর্ত। মাতারবাড়ীতে ভূগর্ভস্থ মিঠাপানির কোনো সংকট ছিল না। স্থানীয় মানুষ বলছেন, কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়ার পর পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে।
অধিগ্রহণ করা জমির ক্ষতিপূরণের অর্থ পেতে ভূমিমালিকদের কয়েক বছর লেগে গিয়েছিল। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে ক্ষতিপূরণের টাকা তোলার জন্য মাতারবাড়ী থেকে কক্সবাজার ভূমি অফিসে যাওয়া-আসা, রাতে থাকা, ফাইল এগোনোর জন্য নিয়মিত ঘুষ দিতে গিয়ে তাঁদের প্রাপ্ত ক্ষতিপূরণের অর্থের ৩০ শতাংশই অপচয় হয়েছে। আপত্তি মামলা থাকায়, এখনো কিছু ভূমিমালিক তাঁদের ক্ষতিপূরণের অর্থ পাননি।
প্রকল্প এলাকা থেকে উচ্ছেদ হওয়া ৪০–৫০টি পরিবার তাদের পুনর্বাসনের বাড়ী পেয়েছেন উচ্ছেদ হওয়ার ছয়–সাত বছর পরে। এই পরিবারগুলোকে প্রকল্পে স্থায়ী কাজ দেওয়ার কথা থাকলেও কেউ তেমন কোনো কাজ পাননি। মাতারবাড়ীর মাত্র ১ হাজার ১০০ শ্রমিককে চিহ্নিত করে তাঁদের সামান্য কিছু ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। সে টাকাও তাঁরা পেয়েছিলেন প্রকল্প শুরুর পাঁচ–ছয় বছর পর।
প্রকল্পের নির্মাণকাজ চলার সময়, বাইরের শ্রমিকের পাশাপাশি মাতারবাড়ীর লোকজনও এখানে শ্রমিক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু সেটা চাহিদার তুলনায় ছিল নগণ্য। তার চেয়ে বড় কথা, প্রকল্পে যে ধরনের কাজে তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়, সে ধরনের কাজে তাঁদের অভিজ্ঞতা ছিল না। প্রকল্পের নির্মাণকাজ শেষে, আবার তাঁরা বেকার হয়ে পড়েছেন। ভূমি ও কাজ হারানো মাতারবাড়ীর হাজার হাজার মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
মাতারবাড়ীর মানুষ তাঁদের জীবন–জীবিকার মূল উৎস ভূমি হারিয়েছেন কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্পে। মাথাগোঁজার ঠাঁই অবশিষ্ট জমিও এখন আর নিরাপদ নয়, বড় বড় কোম্পানি নানান ছলচাতুরী করে তা–ও কুক্ষিগত করছে।
মাতারবাড়ীর মানুষ ভয়ংকর বিপদে পড়েছেন। তাঁদের কোনো কাজ নেই। জীবিকার জমি হারিয়েছেন। কোহেলিয়ায় মাছ নেই, সাগরে মাছ ধরতে যেতে পারেন না, কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র ও বন্দর কর্তৃপক্ষের বাধার কারণে। অনেক ঘুরে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার মতো বড় নৌকা তাঁদের নেই।
মাতারবাড়ী কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র ২০২৪ সাল থেকে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছে। চিমনি দিয়ে অবিরাম কয়লা পোড়া ধোঁয়া নির্গত হয়। চিমনির নিচে লক্ষাধিক মানুষের জীবন অনিরাপদ রেখে, তাদের পুনর্বাসনের কোনো ব্যবস্থা না করে পৃথিবীর আর কোথাও এমন ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ রকম কয়লাবিদ্যুৎকেন্দ্র পাওয়া যাবে না।
পৃথিবীব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির কারণে, জ্বালানি হিসেবে কয়লার যুগ শেষ হতে চলেছে। সম্পূর্ণরূপে আমদানিনির্ভর কয়লায় চালিত মাতারবাড়ী প্রকল্পও হয়তো, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বন্ধ হয়ে যাবে। প্রকল্পটি ইতিমধ্যে কয়লা সরবরাহ না থাকায় ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে একাধিকবার বন্ধ থেকেছে। চূড়ান্তভাবে পরিত্যক্ত হওয়ার আগে এই প্রকল্প মাতারবাড়ী প্রাণ-প্রকৃতি, জীবন–জীবিকা ও জাতীয় অর্থনীতির যা ক্ষতি করার, তা করে যাবে।
পরিহাস্যকর ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে জীবাশ্ম জ্বালানির কোনো মজুত না থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি খাত গড়ে তোলা হয়েছে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক। অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎস থাকা সত্ত্বেও সেদিকে সরকারের তেমন নজর নেই।
মাতারবাড়ীর বাতাস এখন ভারী হয়ে উঠছে, অনিরাপদ হয়ে উঠছে খাওয়ার পানি, মিশে যাচ্ছে কয়লা পোড়া ছাই, সিসার মতো প্রাণঘাতী ভারী ধাতু। কোহেলিয়া পাড়ের বৃদ্ধ জেলে মোহাম্মদ আলী (ছদ্ম নাম) বলেন, ‘আমরা আর বেশি দিন এই দ্বীপে থাকতে পারবে না। বাপ-মা, দাদা-দাদির স্মৃতি ফেলে রেখে অচিরেই অজানার উদ্দেশ্যে পালাতে হবে।
* আবুল কালাম আজাদ, পরিবেশ ও উন্নয়নকর্মী
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| কক্সবাজারের মহেশখালীর মাতারবাড়ি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের এই সড়কটি সাজানো হয়েছে নান্দনিকভাবে। যদিও এ সড়কের অতিরিক্ত নির্মাণব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। ছবি: প্রথম আলো |
Tuesday, November 25, 2025
কুতুবদিয়াবাসী কবে অবহেলা ও বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে রক্ষা পাবে by আবদুল্লাহ নাজিম আল মামুন
কক্সবাজার জেলার অন্তর্গত কুতুবদিয়া উপজেলাকে বলা হয় বাতিঘরের দ্বীপ। এখানে বসবাস করে দেড় লক্ষাধিক মানুষ। এই দ্বীপের বর্তমান আয়তন ১৮ মাইলের কম। একসময় এর আয়তন ছিল ১০০ বর্গমাইলের বেশি। বর্ষায় বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসে নদীভাঙনের কারণে দ্বীপটি এখন অস্তিত্বসংকটের মুখে পতিত হয়েছে। হয়নি কোনো উন্নয়ন।
৩৪ বছরেও কোনো টেকসই বেড়িবাঁধ পায়নি দ্বীপটি। যুগের পর যুগ জিও ব্যাগ দিয়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করে বন্যা ও জলোচ্ছ্বাস ঠেকানো হয়েছে। কিন্তু এই জিও ব্যাগ সমুদ্রের বিশাল ঢেউ আর জোয়ারের ফলে ভেঙে গিয়ে কুতুবদিয়া দ্বীপ প্লাবিত হয়। যাতায়াতের মাধ্যমে কোনো নিরাপত্তা নেই। নেই ফেরি কিংবা যাত্রীবাহী লঞ্চ। মেডিকেলে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। রাস্তাঘাটের অবস্থা বেহাল।
অন্যদিকে পাশেই রয়েছে মাতারবাড়ী ও মহেশখালী। মাতারবাড়ীতে রয়েছে গভীর সমুদ্রবন্দর ও কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র। মহেশখালীর সঙ্গে কক্সবাজারে যাতায়াতের জন্য রয়েছে ফেরি। কিন্তু বিপুল খনিজ সম্পদের দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়াকে সব সময় অবহেলার চোখে দেখেছেন সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো।
কুতুবদিয়ায় রয়েছে প্রাকৃতিক গ্যাস, যা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। রয়েছে গন্ধক ও চুনাপাথর, যা কুতুবদিয়ার ভূপৃষ্ঠের একটি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান। এ ছাড়া কুতুবদিয়ায় কালোবালির মতো খনিজ সম্পদ পাওয়া যায়। দ্বীপটি তেল, গ্যাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদের উৎস হিসেবে পরিচিত, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া কুতুবদিয়া উপজেলা পর্যটনের অপার সম্ভাবনাময় একটি দ্বীপ। দ্বীপের পশ্চিমে ‘মায়া দ্বীপ’ নামের আরও একটি চর জেগে উঠছে। এই চরটিকে পর্যটনের জন্য পরিকল্পনা করা যেতে পারে। আর এখানে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী বাতিঘর ও বাংলাদেশের প্রথম বায়ুবিদ্যুৎকেন্দ্র। রয়েছে বিশাল এলাকাজুড়ে সমুদ্রসৈকত, যা উত্তর-দক্ষিণে ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রায়।
যদি সরকার ও দেশি-বিদেশি ভ্রমণ-সংস্থাগুলো এগিয়ে আসে, তাহলে বাংলাদেশ পর্যটনশিল্পের জন্য দ্বীপটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আর এখানকার মানুষের প্রধান পেশা সাগর থেকে মাছ আহরণ ও লবণ উৎপাদন করা। এখানকার লবণচাষিরা প্রতিবছর ৫৯০ একর জমিতে ২ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টনের অধিক লবণ উৎপাদন করে থাকেন, যা দেশে লবণশিল্পের জন্য বিশাল অবদান।
এত কিছু থাকার পরও কুতুবদিয়া নিয়ে কোনো মহাপরিকল্পনা নেই। দ্বীপবাসীরা পায়নি কোনো টেকসই বেড়িবাঁধ। প্রতিবছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের মধ্য দিয়ে নানা ভোগান্তিতে বসবাস করতে হচ্ছে কুতুবদিয়াবাসীকে।
কোনো ইমার্জেন্সি রোগীকে মেডিকেলে নিয়ে গেলে সেখানেও উন্নত চিকিৎসা পাওয়া যায় না। মেডিকেলের কর্মকর্তারা চট্টগ্রাম মেডিকেলে ইমার্জেন্সি রোগীকে রেফার করে দেন। এরপর রোগীকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার সময় আরেক সিন্ডিকেটের মুখে পড়তে হয়। কুতুবদিয়া-মগনামা চ্যানেলে কোনো ফেরি না থাকায় ডেনিসবোটের মালিকেরা ভাড়া বাড়িয়ে নেন। এভাবেই নানা ভোগান্তি ও সিন্ডিকেটের মধ্য দিয়ে কুতুবদিয়াবাসীকে পারাপার হতে হয় নিত্যদিন।
অন্তর্বর্তী সরকারকে এই দ্বীপ নিয়ে মহাপরিকল্পনা করতে হবে। এই দ্বীপের দেড় লক্ষাধিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য টেকসই বেড়িবাঁধ প্রকল্পের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। কুতুবদিয়া-মগনামা চ্যানেলে ফেরি চালুর মধ্য দিয়ে যাতায়াতব্যবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
এ ছাড়া উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে কুতুবদিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অক্সিজেন, অ্যাম্বুলেন্সসহ প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম দিতে হবে। রাস্তাঘাট সংস্কার করতে হবে। তবেই কুতুবদিয়াবাসী অবহেলা ও বৈষম্যমূলক আচরণ থেকে রক্ষা পাবে।
* আবদুল্লাহ নাজিম আল মামুন
- কুতুবদিয়া দ্বীপ, কক্সবাজার
![]() |
| কক্সবাজারের কুতুবদিয়া উপজেলার আলী আকবরডেইল ইউনিয়নের পশ্চিম পাশে শত কোটি টাকা খরচ করে ২০২৪ সালে নির্মাণ হয়েছিল ছয় কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। এখন বাঁধের নড়বড়ে অবস্থা। ছবি: প্রথম আলো |
Wednesday, October 1, 2025
সেন্ট মার্টিন দ্বীপ: ‘২৮ বছরেও কেউ আমাদের খোঁজ নেয়নি, কীভাবে বেঁচে আছি জানতে চায়নি’ by আব্দুল কুদ্দুস
কক্সবাজারের টেকনাফের সেন্ট মার্টিন দ্বীপের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২ নম্বর শেডের একটি ঘরের সামনে বসে কথাগুলো বলছিলেন হাবিবুর রহমান। ১৯৯৭ সালের ১৫ জুন সেন্ট মার্টিনের এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের উদ্বোধন হয়। দেশের প্রথম আশ্রয়ণ প্রকল্প ছিল এটি। সে সময় ঝড়ে ঘর হারানো হাবিবুর রহমানসহ ৫০টি পরিবারের স্থান হয়েছিল এই প্রকল্পে।
সেন্ট মার্টিন ইউনিয়নের সাবেক দুই চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান ও ফিরোজ আহমদ খান বলেন, নির্মাণের পর দ্বীপের মধ্যভাগে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মাঝের পাড়ায় গড়ে তোলা দেশের প্রথম এই আশ্রয়ণ প্রকল্প প্রতিষ্ঠার পর আর কেউ খোঁজখবর রাখেনি। সংস্কার হয়নি ঘরগুলোর। এখানকার বাসিন্দারা একরকম মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
বেহাল আশ্রয়ণ প্রকল্প
দ্বীপের কয়েকজনের দান করা ৮০ শতক (দুই কানি) জমির ওপর টিনের ছাউনি ও বাঁশের বেড়া দিয়ে নির্মিত হয়েছিল আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাঁচটি লম্বা শেড। সেখানেই মাথা গোঁজার ঠাঁই হয়েছিল ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলোর। স্থাপন করা হয়েছিল তিনটি নলকূপ ও তিনটি স্যানিটারি ল্যাট্রিন। নিরাপত্তার জন্য দেওয়া হয় কাঁটাতারের সীমানা বেড়াও।
ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দীর্ঘ ২৮ বছরে ঘরগুলোর কোনো সংস্কার হয়নি। টিনের ছাউনি ও বাঁশের বেড়া নষ্ট হয়ে গেছে। বাসিন্দাদের অবস্থাও নাজুক।
মুজিবুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৯ জুন কক্সবাজার জেলাকে ভূমিহীন ও গৃহহীনমুক্ত জেলা ঘোষণা করা হয়েছিল। তখন পর্যন্ত জেলার টেকনাফ, উখিয়া, সদর, চকরিয়া, পেকুয়া, রামু, ঈদগাঁও, মহেশখালী ও কুতুবদিয়া উপজেলাতে দুই কক্ষবিশিষ্ট ৪ হাজার ৬৬৪টি পাকা ঘর হস্তান্তরের মাধ্যমে ১ হাজারের বেশি দরিদ্র পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। কিন্তু সেন্ট মার্টিনবাসীর কপালে জোটেনি একটিও ঘর। কারণ, ঘর তৈরির জন্য দ্বীপের কোথাও খাসজমি ছিল না। নানা অজুহাতে দেশের প্রথম আশ্রয়ণ প্রকল্পটি সংস্কারও করা হয়নি।
৬ সেপ্টেম্বর আশ্রয়ণ প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে ৮০টি পরিবারের ৪০০ জনের বেশি বাসিন্দা থাকছেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোতে। লোক বাড়লেও বাড়েনি ঘরের সংখ্যা। জীর্ণ ঘরগুলোতে কোনোরকমে বসবাস করছেন বাসিন্দারা। নির্মাণের পর থেকে কোনো সংস্কার হয়নি বলে জানান আশ্রয়ণ প্রকল্পের লোকজন। দীর্ঘ ২৮ বছরে কেবল খাওয়ার পানি সরবরাহব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।
মাঝের পাড়ার বাসিন্দা ও ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আল নোমান প্রথম আলোকে বলেন, অধিকাংশ ঘর বহু আগেই ভেঙে পড়েছে। পলিথিনের বেড়া ও ছাউনির ঝুপড়িতে অমানবিক জীবন কাটাচ্ছেন বাসিন্দারা। চারদিকঘেরা বেড়া নেই, নেই বিদ্যুৎ। ল্যাট্রিন নষ্ট হওয়ায় খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করতে হচ্ছে। নলকূপগুলো কয়েক বছর অচল ছিল। সম্প্রতি একটি বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) পাইপলাইন টেনে বাসিন্দাদের খাওয়ার পানির ব্যবস্থা করে দিয়েছে। আয়রোজগারের কোনো সুযোগ না থাকায় জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছে। সাগরে মাছ ধরা না পড়লে দুঃখ-কষ্ট বেড়ে যায়।
৫ নম্বর শেডের আরেকটি কক্ষে থাকেন জুলেখা বেগম। সঙ্গে তাঁর অসুস্থ স্বামী, ছেলে, ছেলের বউ-নাতিসহ ১০ জন। স্থানসংকুলান না হওয়ায় পলিথিনের বেড়া ও ছাউনি দিয়ে আরেকটি পৃথক কক্ষ তৈরি করতে হয়েছে।
জুলেখা বেগম (৫০) প্রথম আলোকে বলেন, ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে যখন দ্বীপে পর্যটক আসে। তখন ছেলে ইজিবাইক (টমটম) চালিয়ে কিছু আয় করে। অন্য সময় বেকার থাকতে হয়।
কবে হবে নতুন ঘর
জনপ্রতিনিধিরা জানান, ২০২২ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার কামরুল হাসান সেন্ট মার্টিন আশ্রয়ণ প্রকল্প পরিদর্শন করেছিলেন। বাসিন্দাদের দুরবস্থা, দুঃখ-কষ্ট দেখে দ্রুত সময়ের মধ্যে ঘরগুলো সংস্কার করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি। তবে সেই প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়িত হয়নি।
ইউপি সদস্য আল নোমান বলেন, পুরোনো ঘরগুলো সরিয়ে সেখানে পাঁচটি নতুন শেড ঘর নির্মাণের জন্য এক দশক ধরে বিভিন্ন দপ্তরে লেখালেখি করা হচ্ছে, কিন্তু কাজ হচ্ছে না।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক মো. সালাহউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের মেয়াদ বা কাজ গত জুন মাসে শেষ হয়েছে। এখন নতুন করে দেশের কোথাও আশ্রয়ণ প্রকল্প হচ্ছে না। সেন্ট মার্টিন আশ্রয়ণ প্রকল্পের বিষয়টি ভূমি মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে সংস্কার করা হবে। আপাতত সেখানকার বাসিন্দাদের জন্য খাদ্যসহায়তা পাঠানো হচ্ছে।
![]() |
| জীর্ণ হয়ে পড়েছে সেন্ট মার্টিনে দেশের প্রথম আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর। কষ্টে দিন কাটে বাসিন্দাদের। ছবি: প্রথম আলো |
Wednesday, August 6, 2025
জুলাই অভ্যুত্থানের বার্ষিকীর দিনে কক্সবাজারে সারজিস, হাসনাতসহ এনসিপির পাঁচ নেতা, নানা গুঞ্জন
কক্সবাজার বিমানবন্দর সূত্র জানায়, আজ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকা থেকে বাংলাদেশ বিমানের একটি ফ্লাইটে এই পাঁচ নেতা কক্সবাজার বিমানবন্দরে অবতরণ করেন।
তাঁরা হলেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা। সঙ্গে তাসনিম জারার স্বামী খালেদ সাইফুল্লাহও রয়েছেন। তিনি এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক।
এনসিপির পাঁচ নেতার হঠাৎ কক্সবাজার আগমন রাজনৈতিক মহলে নানা গুঞ্জন ও আলোচনা তৈরি করেছে।
বিমানবন্দর ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাংলাদেশ বিমান থেকে অন্যান্য যাত্রীদের সঙ্গে নেমে এনসিপির পাঁচ নেতা প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে উখিয়ার ইনানী সৈকতের পাঁচ তারকা হোটেল সি পার্ল বিচ রিসোর্ট অ্যান্ড স্পা-তে (আগের নাম রয়েল টিউলিপ) যান। হোটেলের মাইক্রোবাসে তাঁদের বিমানবন্দর থেকে নেওয়া হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এনসিপির পাঁচ নেতার হঠাৎ কক্সবাজার আগমনের বিষয়টি প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অবগত করা হয়নি।
রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক বাংলাদেশস্থ রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠক করতে কক্সবাজারে গিয়েছেন এই পাঁচ নেতা।
কক্সবাজার জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান বর্ষপূর্তির বিশেষ দিনে হঠাৎ করে এনসিপির শীর্ষ পাঁচ নেতার কক্সবাজার আগমন এবং শহর থেকে ১৫-২০ কিলোমিটার দূরের পাঁচ তারকা হোটেলে অবস্থানের ঘটনা সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। মানুষের মধ্যে নানা কৌতূহলের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে তাঁদের সঙ্গে পিটার হাসের বৈঠকের কথা শুনে লোকজনের মধ্যে সন্দেহ আরও বাড়ছে। তবে পিটার হাসের উপস্থিতির বিষয় নিয়ে তিনি সন্দিহান। এ বিষয়ে তিনি খোঁজখবর নিচ্ছেন।
পিটার হাস বর্তমানে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) রপ্তানিতে যুক্ত মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির কৌশলগত উপদেষ্টা হিসেবে কর্মরত। এর আগে তিনি ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের ১৭তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রদূত ছিলেন।
বেলা সোয়া তিনটায় এই প্রতিবেদন লেখার সময়, সি পার্লের বাইরে গণমাধ্যমকর্মীরা অবস্থান করছিলেন। বিএনপির কিছু কর্মী-সমর্থককেও সেখানে দেখা গেছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে ফোন করা হলে তিনি হাসনাত আবদুল্লাহকে কথা বলতে দেন। হাসনাত ফোনটি দেন সি পার্লের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা কামরুজ্জামানকে।
কামরুজ্জামান পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি প্রথম আলোকে বলেন, পিটার হাস বা এ রকম কেউ তাঁদের হোটেলে আসেননি।
বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এখন টিভিকে এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, তাঁরা ঘুরতে কক্সবাজার গিয়েছেন। পিটার হাসের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি গুজব ও অপপ্রচার।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তির দিনে ঢাকায় নানা অনুষ্ঠান হচ্ছে। রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ‘৩৬ জুলাই উদ্যাপন’ শীর্ষক অনুষ্ঠান শুরু হয়েছে সকালে। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে ঐতিহাসিক জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করা হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বিকেল পাঁচটায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ করবেন।
এমন দিনে এনসিপির পাঁচ নেতার কক্সবাজারে যাওয়া নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। ফেসবুকে জাহাঙ্গীর আলম নামের একজন ব্যক্তি লিখেছেন, আজ এত বড় দিনে তাঁরা কক্সবাজার কেন?
![]() |
| (বাঁ থেকে) এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) সারজিস আলম, মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা এবং তাসনিম জারার স্বামী ও এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক খালেদ সাইফুল্লাহ। ফাইল ছবি |
Thursday, June 12, 2025
কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত: আর কত পর্যটকের মৃত্যু দেখতে হবে
বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকত বলা হলেও কক্সবাজারে পর্যটকদের জন্য নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্ভবত সবচেয়ে করুণই বলতে হবে। ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সৈকতের মাত্র পাঁচ কিলোমিটারে কিছু লাইফগার্ড ও বিচকর্মী থাকেন, বাকি সৈকত এলাকা একেবারেই অরক্ষিত। বিশেষ করে টেকনাফ, হিমছড়ি, ইনানী, দরিয়ানগর—সব জায়গায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকলেও নেই কোনো সমন্বিত উদ্ধারব্যবস্থা। পর্যটকেরা গুপ্তখালের হুমকি বুঝে ওঠার আগেই মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছেন।
সরকার, হোটেল-মোটেলের মালিক, বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি—সবাই এই বিশাল পর্যটনশিল্প থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আয় করছে। কিন্তু সেই আয়ের ন্যূনতম অংশও পর্যটকের জীবনের নিরাপত্তায় বিনিয়োগ করা হচ্ছে না। এই অবহেলা অমার্জনীয়। প্রশ্ন হচ্ছে, বছরে কয়েক শ কোটি টাকা আয়ের বিনিময়ে কি একটি সি-নেটিং ব্যবস্থা, আধুনিক লাইফগার্ড ইউনিট বা পর্যাপ্ত মনিটরিং টাওয়ার তৈরি করা যায় না?
বিশ্বের উন্নত সমুদ্রসৈকতগুলোতে নির্দিষ্ট সুইমিং জোন থাকে, যেখানে নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়। বাংলাদেশেও এক যুগ আগে এমন এক উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা কয়েক মাসেই ঢেউয়ের ধাক্কায় ধ্বংস হয় এবং তারপর আর কেউ ফিরে তাকায়নি। অথচ ভাঙনরোধ ও নিরাপদ গোসলের জন্য প্রযুক্তিগত ও পরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব।
শুধু প্রশাসন নয়, হোটেল ব্যবসায়ী ও স্থানীয় পর্যটন ব্যবস্থাপনার প্রতিটি অংশীদারও দায় এড়াতে পারেন না। পর্যটকেরা শুধু নিজেরা সচেতন থাকাই যথেষ্ট নয়, তাঁদের সচেতন করাও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত লাইফগার্ড, বিচকর্মী ও মনিটরিং ক্যামেরা এখানে যুক্ত করা উচিত। টানা কয়েক দিনের ছুটিতে অতিরিক্ত স্বেচ্ছাসেবী বা খণ্ডকালীন লাইফগার্ড বা বিচকর্মী নিযুক্ত করা যেতে পারে।
যদি পর্যটক সৈকতে গিয়ে প্রাণ হারান, তাহলে সেটির দায় কেবল ‘নিজ দোষে দুর্ঘটনা’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না। পর্যটক মৃত্যুর ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ, উদ্ধার এবং সেবার জন্য জরুরি তহবিল গঠন করা হোক। হোটেলমালিকদের নিয়েও একটি সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তোলা হোক, যাতে তাঁরা নিরাপদ পর্যটনে অংশ নেন। মানুষ আনন্দ করতে পরিবার–স্বজন–বন্ধু নিয়ে ঘুরতে গিয়ে এভাবে লাশ হয়ে ফিরবে, তা মানা যায় না। আমরা কক্সবাজারে আর কোনো পর্যটকের মৃত্যু দেখতে চাই না।
Friday, April 25, 2025
সিলেটের ২ কিশোরীকে কক্সবাজারে পাচার, অনৈতিক কাজ করানোর অভিযোগ
বর্তমানে দুই কিশোরীকে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী কিশোরীরা কালবেলাকে বলেন, নাটক দেখার সুবাদে শাহনাজ বেগম নামে এক প্রতিবেশীর বাসায় প্রায়ই যাতায়াত ছিল তাদের। গত ৮ এপ্রিল শাহনাজ বেগম নামের ওই প্রতিবেশী নারী তাদের দুজনকে পোশাক কারখানায় চাকরির কথা বলে সিলেট থেকে কক্সবাজারে তার ছেলে কাছে পাঠায়। এরপর সে তাদেরকে কৌশলে চেতনানাশক দ্রব্য খাইয়ে অজ্ঞান করে।
তারা আরও বলেন, পরদিন জ্ঞান ফিরলে ওই দুই তরুণী নিজেদেরকে আবাসিক হোটেলে রুমে দেখতে পায়। এরপর কয়েকটি আবাসিক হোটেল নিয়ে অনৈতিক কাজ করাতো শাহনাজ বেগমের ছেলে ইমন আহমদ। গত ৯ এপ্রিল রাত থেকে শুরু করে ২৩ এপ্রিল রাত পর্যন্ত তাদের দুজনকে এসব কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে সিলেটের শাহপরান থানায় এসেছি।
ভুক্তভোগী এক কিশোরীর মা রোবেনা আক্তার কালবেলাকে জানান, শাহনাজ বেগম আমার প্রতিবেশী। স্বামী না থাকায় আমি কাজের উদ্দেশ্যে বাইরে গেলে আমার মেয়ে রিয়া ও প্রতিবেশী সানা উল্লার মেয়ে মীম দুজনেই টিভি দেখতে পাশের বাসার শাহনাজ বেগমের বাসায় যেতো। ওই মহিলা তাদের দুজনকে খুব আদর-স্নেহ করতো, সেকারণে আমিও কখনো ওই বাসায় যেতে বারণ করিনি। কিন্তু দুই মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে শাহনাজ বেগমের আচার-ব্যবহারে অনেক পরিবর্তন লক্ষ্য করি। সে প্রায়শই আমাদের মেয়েদের নিয়ে নানা রকম আজগুবি কথাবার্তা শোনাত। আমাদেরকে দোষারোপ ও গালিগালাজ করতো। এখন দীর্ঘ ১৫ দিন পর মেয়ে দুটো ফিরে এসে যে বর্ণনা দিচ্ছে তাতে তো ওই মহিলার ভয়ংকর রূপ আমাদের কাছে ফুটে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, আমার মেয়েসহ দুই কিশোরীর জীবন নষ্ট করে দিয়েছে শাহনাজ বেগম। প্রায় ১৪ দিন ছোট্ট দুটি মেয়ের শরীরের উপর অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। আমাদের মেয়েদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করেছে ওই নারী। বর্তমানে আমার মেয়ে ওসমানী হাসপাতালের ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি রয়েছে। এ বিষয়ে আমরা আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করব।
ভুক্তভোগী অপর কিশোরীর বাবা সানাউল্লা বলেন, আমাদের মেয়েদের সঙ্গে যে অন্যায় হয়েছে আমরা তার যথাযথ বিচার দাবি করছি। বিশেষ করে শাহনাজ বেগম ও তার ছেলে ইমন আহমদ। তারা দুজনে মিলে আমাদের মেয়েদের মান-মর্যাদা ও ভবিষ্যৎ অন্ধকার করে দিয়েছে। আমরা তাদের দুজনের সর্বোচ্চ শাস্তি কামনা করছি।
শাহপরাণ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সোহেল চন্দ্র সরকার বলেন, দুই কিশোরীর মা-বাবা তাদেরকে নির্যাতন করতো, ঘরে আটকে রাখতো। তাই অভিমান করে পূর্ব পরিচিত ওই নারীর ফাঁদে পা দেয়। কাজের জন্য তাদেরকে সেখানে নেওয়া হয়েছিল কিনা বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে সেখানে তাদেরকে আটকে পাশবিক নির্যাতনের ব্যাপারে বলেন, একটি বাসায় তাদেরকে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছিল। বৃহস্পতিবার সকালে তারা সেখান থেকে মুক্ত হয়ে সিলেটে আসেন।
শাহপরাণ থানার ওসি মো. মনির হোসেন কালবেলাকে বলেন, পরিবারের লোকজনের সঙ্গে অভিমান করে দুই বান্ধবী কক্সবাজার পালিয়ে যায়। এরপর তারা দুজনে বৃহস্পতিবার সিলেটে ফিরে আসে। এ ঘটনায় দুজনের পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা মিসিং ডায়েরি পেয়েছিলাম। সে কারণে আমাদের তদন্ত কর্মকর্তা মোবাইল ফোনে তাদেরকে বুঝিয়ে ফেরত আসতে বলে এবং তারা ফিরে আসে। দুজনকেই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
হোটেলে নিয়ে অনৈতিক কাজে বাধ্য করার বিষয়ে তিনি বলেন, এরকম কোনো কথা তারা আমাদের কাছে বলেনি। এ ছাড়া এমন ঘটনার কোনো অভিযোগও আমরা পাইনি। আমরা যতটুকু জানি, পরিবারের নির্যাতনের শিকার হয়ে দুই বান্ধবী পালিয়েছিল।
তাহলে দুই কিশোরী ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি কেন এমন প্রশ্নে ওসি বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।

৩৪ বছর পর কক্সবাজারে, জাফর ইকবালকে কেন মনে পড়ছে রোজিনার by নাজমুল হক
এত বছর পর কক্সবাজারে গিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত রোজিনা। তবে পুরোনো জায়গাগুলো না পেয়ে মন কিছুটা ভার। সব মিলিয়ে সাগরসৈকতে প্রথম বিকেলটা বেশ ভালোই কেটেছে তাঁর। প্রথম আলোকে বলেন, ‘কোনো জায়গা তো ঠিকমতো চিনছি না। এত হোটেল-রিসোর্ট, অবকাঠামো! পরিবর্তন হবে ধারণা ছিল, তাই বলে এতটা হবে, চিন্তায় ছিল না। তবে একটু কষ্টও পাচ্ছি, প্রিয় জায়গাগুলোতে এত স্মৃতি, কিছুই যেন নেই।’
আকাশপথে না গিয়ে ট্রেন জার্নি বেছে নিয়েছেন রোজিনা। এরও আছে একটা বিশেষ কারণ। তাঁর কথায়, ‘বাসার (উত্তরা) পাশে স্টেশন, কখনো আসা হয়নি তেমন। এবার চিন্তা করলাম ট্রেনে যাব। ভোরে এসে কিছু ছবিও তুলে নিলাম। এসি কামরা বেশ আরামদায়ক। আমাদের দেশে এত নদী-হাওর-খাল–বিল, জার্নিতে ট্রেনের জানালা দিয়ে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থেকেছি। কত মানুষ ছবি তুলেছেন, আমার পুরোনো ছবির প্রসঙ্গে স্মৃতিচারণা করেছেন। সব মিলিয়ে বেশ ভালো একটা জার্নি হয়েছে। বিকেলে কক্সবাজার স্টেশনে নেমে ভ্রমণক্লান্তি একদম কেটে গেল। স্টেশনটা বেশ সুন্দর করে সাজানো হয়েছে।’
নব্বইয়ের দশকে প্রতিবছরই কোনো না কোনো শুটিংয়ে কক্সবাজারে যেতে হয়েছে রোজিনাকে। ক্যারিয়ারের অনেক ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রের শুটিংও হয়েছে সেখানে। তাই শহরটার প্রতি ভীষণ মায়া আছে এই চিত্রনায়িকার। রোজিনা বললেন, ‘তখন সেপ্টেম্বর-অক্টোবরেই কক্সবাজারে যাওয়া হতো কোনো না কোনো শুটিংয়ে। কত দিন–রাত কেটেছে শুটিংয়ে। কত আড্ডা-গল্প। সঙ্গে চলচ্চিত্রের সোনালি দিনগুলো মনে পড়ছে।’
অনেক মধুর স্মৃতির সঙ্গে কক্সবাজারের সঙ্গে জীবনের কষ্টের স্মৃতিও জড়িয়ে আছে রোজিনার। ১৯৯১ সালে সর্বশেষ কক্সবাজারে শুটিং করেছিলেন তিনি। যেখানে তাঁর বিপরীতে অভিনয় করেন জাফর ইকবাল। কক্সবাজারে চিত্রধারণ শেষে ঢাকায় আসার সপ্তাহ দু–এক পর মারা যান এই চিত্রনায়ক। কষ্টের সে স্মৃতি স্মরণ করে আপ্লুত রোজিনা বলেন, ‘সুস্থ মানুষটা ঢাকায় এসে মারা গেল! একসঙ্গে শুটিং করলাম, আমার সপ্তাহখানেক আগে ঢাকায় এলেন। এরপর শুনলাম অসুস্থ, হাসপাতালে ভর্তি। শেষ কাজের কত স্মৃতি।’
১৯৯৬ সালে সব ছেড়ে দেশের বাইরে চলে গিয়েছিলেন রোজিনা। এরপর যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায় চলচ্চিত্রের সঙ্গে। ১০ বছর পর ফেরদৌসের বিপরীতে ‘রাক্ষুসী’ ছবিতে অভিনয় করেন তিনি। ক্যারিয়ারের সুসময়ে কেন চলচ্চিত্র ছেড়েছিলেন, এ প্রশ্নে রোজিনা বলেন, ‘কাজ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। ’৯১–এ সবাইকে জানিয়ে দিই, নতুন কাজ আর করব না। যেগুলোর শুটিং বাকি, সেসব শেষ করব। এরপর লন্ডনে চলে যাই। সবার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।’
‘রাক্ষুসী’ সিনেমার ১৭ বছর পর ২০২৩ সালে আবার পর্দায় ফেরেন রোজিনা। প্রথমবারের মতো ‘ফিরে দেখা’ শিরোনামের চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন তিনি। পরিকল্পনা আছে নির্মাণ ও প্রযোজনায় আরও সময় দেওয়ার। তাঁর কথায়, ‘আমি তো চলচ্চিত্রের মানুষ। এখানেই থাকতে চাই। নির্মাণ ও প্রযোজনা নিয়ে অনেক পরিকল্পনা আছে। সবকিছু ঠিক থাকলে শিগগিরই সবাইকে জানাব।’
ঈদুল ফিতরে ঢাকাই চলচ্চিত্রের সফলতায় দারুণ খুশি রোজিনা। তবে তিনি মনে করেন, বছরে এক–দুটি ছবি দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি ঘুরবে না। রোজিনা বলেন, ‘বছরে পাঁচ থেকে সাতটি ব্যবসাসফল সিনেমা প্রয়োজন। এক–দুটি দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি চলতে পারে না।’
![]() |
| জাফর ইকবাল ও রোজিনা। ছবি: কোলাজ |
Thursday, April 3, 2025
ঈদের ছুটিতে কক্সবাজার সৈকতে পর্যটকের ঢল
পর্যটন-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২রা এপ্রিল থেকে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও গেস্ট হাউসগুলোর কক্ষ বুকিং ছিল। তবে এবার রোজা ২৯টি হওয়ায় ঈদ একদিন আগে চলে এসেছে। এতে অনেকেই মঙ্গলবার থেকে কক্সবাজার ছুটে এসেছেন। কক্সবাজার শহরের ডায়াবেটিস পয়েন্ট, লাবণী পয়েন্ট, সুগন্ধা পয়েন্ট ও কলাতলী পয়েন্ট সৈকতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লাখো পর্যটক ও স্থানীয়রা সমুদ্র স্নানে মেতে ওঠেন। পর্যটকরা সমুদ্র স্নানের পাশাপাশি বিচ বাইক, ঘোড়া ও ওয়াটার বাইকে চড়ে আনন্দ উপভোগ করছেন।
পাশাপাশি সৈকতের এই পয়েন্টগুলো ছাড়াও মেরিন ড্রাইভ ধরে দরিয়ানগর, হিমছড়ি, ইনানী, পাটুয়ারটেক, টেকনাফ সমুদ্রসৈকত, রামু বৌদ্ধপল্লী, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, সোনাদিয়া, চকরিয়ার ডুলাহাজারা সাফারি পার্কসহ বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
বিপুল সংখ্যক পর্যটকের নিরাপত্তা ও সেবা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, লাইফ গার্ড ও বিচকর্মীদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা গেছে। সিলেট থেকে সপরিবারে বেড়াতে এসেছেন ব্যাংকার আরিয়ান শাহ। তিনি বলেন, এবারের লম্বা ছুটি কাটাতে কক্সবাজারকে বেছে নিয়েছেন তারা। সৈকতে বিপুল মানুষের উপস্থিতি দেখে তিনি অভিভূত বলে জানান। বাচ্চারাও বেশ উপভোগ করছে। কক্সবাজার শৈবাল ট্যুরিজমের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সাইফুল আলম বলেন, কক্সবাজার শহর ও আশপাশের পাঁচ শতাধিক হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও গেস্ট হাউজে ৮০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়েছে। পর্যটকদের বাড়তি চাপে কেউ যাতে হয়রানির শিকার না হয় সে ব্যাপারে সতর্ক রয়েছে হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতি। পর্যটন ব্যবসায়ী নেতা রাসেদুল ইসলাম ডালিম বলেন, পর্যটকদের থাকা-খাওয়ায় অতিরিক্ত আদায় করতে না পারে তার জন্য তদারকি করা হচ্ছে। হোটেল-মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাসেম সিকদার বলেন, ছুটি বা বিশেষ দিনে কক্সবাজারে বরাবরই চাপ থাকে। এজন্য ভ্রমণে আসা পর্যটকদের অনলাইন বা ফোনে কক্ষ বুকিং দিয়ে আসার পরামর্শ দেন তিনি। কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার নিহাদ আদনান তাইয়ান বলেন, পর্যটকরা অবকাশে এসে যাতে স্বস্তির ভ্রমণ করতে পারেন তার জন্য সজাগ রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। এ ছাড়া পর্যটকদের নিরাপত্তায় বাড়তি টহল বাড়ানো হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বলেন, পর্যটকদের ভ্রমণ নির্বিঘ্ন করতে পুলিশের পাশাপাশি র্যাব, বিজিবি ও সেনাবাহিনী রয়েছে। এ ছাড়া যেকোনো ধরনের হয়রানি রোধে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে জেলা প্রশাসনের একাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত মাঠে রয়েছে।

Friday, January 17, 2025
অপহরণের পর গর্তে পুঁতে মুক্তিপণ: দুই লাখ টাকায় ছাড়া পেলো সেই শিশুটি
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৫ সেকেন্ডের এই ভিডিও ১০ই জানুয়ারি কক্সবাজারের উখিয়ার অজ্ঞাত স্থানে ধারণ করা। ভিডিও’র শিশুটির নাম মোহাম্মদ আরাকান (৬)। সে থাইংখালী-১৯ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের সি ১৫ ব্লকের বাসিন্দা আবদুর রহমান ও আনোয়ারা বেগমের ছেলে। ৮ই জানুয়ারি আরাকান ক্যাম্পের খেলার মাঠ থেকে নিখোঁজ হয় সে। এরপর ১০ই জানুয়ারি তার মা-বাবা এই ভিডিও বার্তা পান।
নিখোঁজ আরাকানের সন্ধানে এর আগেই তার মা-বাবা থানায় জিডি করেছিলেন। ভিডিও বার্তা পাওয়ার পর তারা নিশ্চিত হন, তাদের ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে। অপহরণকারীরা আরাকানের মুক্তির বিনিময়ে ৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। অপহরণকারীদের কথা অনুযায়ী দেখিয়ে দেয়া স্থানে প্রথমে ৫০ হাজার টাকা দিয়ে আসেন আরাকানের স্বজনরা। এতেও আরাকানকে না ছাড়ায় ধারদেনা করে আরও ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দেন তারা। ১৪ই জানুয়ারি রাত সাড়ে ১১টার দিকে কুতুপালং এলাকার এমএসএফ হল্যান্ড হাসপাতালের সামনে শিশুটিকে হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ফেলে দিয়ে চলে যায় সন্ত্রাসীরা।
শিশুটির বাবা আবদুর রহমান বলেন, ৮ই জানুয়ারি বেলা ২টার দিকে এপিবিএন অফিসসংলগ্ন খেলার মাঠে খেলতে গিয়ে আর ফেরেনি আরাকান। দুইদিন ধরে আরাকানের সন্ধানে তারা বিভিন্ন ক্যাম্পে ঘুরেছেন। পুলিশের কাছেও গেছেন। এপিবিএনের কাছে সাহায্য চেয়েছেন। এরপর ১০ই জানুয়ারি দু’টি মুঠোফোন নম্বর থেকে কল দিয়ে বলা হয়, তার ছেলেকে অপহরণ করা হয়েছে। ছাড়িয়ে নিতে হলে ৭ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে হবে। টাকা না পেলে ছেলেকে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকিও দেন তারা। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলেও উখিয়া থানার ওসি মো. আরিফ হোসেন বলেন, শিশুর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল। পুলিশ প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চালাচ্ছে।

Thursday, December 12, 2024
তুলে নিয়ে যাওয়া হয় ৮ বছর আগে, কী ঘটেছে ৩ তরুণের ভাগ্যে by আব্দুল কুদ্দুস ও গিয়াস উদ্দিন
নিখোঁজ তিন তরুণ হলেন মো. আবদুল্লাহ (২৬), মো. জয়নাল (২৫) ও জাহেদ হোসেন ওরফে জাকু (২৬)। আবদুল্লাহ ও জাহেদের বাড়ি টেকনাফ সদরের জাহালিয়া পাড়ায়, জয়নালের বাড়ি সেন্ট মার্টিন দ্বীপে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারি সকালে দুই বন্ধু আবদুল্লাহ ও জয়নাল পোলট্রি খামারের জন্য মুরগির খাদ্য কিনতে ৯৪ কিলোমিটার দূরের কক্সবাজার শহরতলির লিংকরোড এলাকায় গিয়েছিলেন। সেখানে একটি দোকানের সামনে পৌঁছামাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে সাদাপোশাকের কয়েকজন ব্যক্তি দুজনকে একটি গাড়িতে তুলে নেন। পরদিন ১৪ জানুয়ারি রাতে শহরের কলাতলী এলাকার একটি হোটেল থেকে একইভাবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাঁদের বন্ধু জাহেদ হোসেনকেও তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর থেকে তিনজনের আর খোঁজ মেলেনি।
টেকনাফ পৌরসভার বাসস্টেশন থেকে পশ্চিম দিকে পাঁচ কিলোমিটার গেলে জাহালিয়া পাড়া। ওই গ্রামেই নিখোঁজ আবদুল্লাহর বাড়ি। সম্প্রতি বাড়িতে গিয়ে কথা হয় আবদুল্লাহর মা রহিমা খাতুনের (৫৮) সঙ্গে। ছেলের কথা বলতেই কান্না যেন থামে না রহিমার। হাতে ছেলের বাঁধাই করা ছবি নিয়ে বলেন, ‘তোমরা আমার ছেলে রে এনে দাও। আমার ছেলে কোনো অপরাধ করেনি। তবু তাকে গুম করেছে। ছেলেকে ছাড়া আমি বাঁচব না।’
কিছুক্ষণ পর ঘরে আসেন আবদুল্লাহর বাবা সামশু মিয়া (৭৮)। তিনি বলেন, ছয় সন্তানের মধ্যে চতুর্থ আবদুল্লাহ। তিনি কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। থানাতেও মামলা নেই। গ্রামে পোলট্রি খামার ছিল আবদুল্লাহর।
ছেলেকে তুলে নেওয়ার পরদিন কক্সবাজার থানায় গিয়ে খোঁজ নিয়েছিলেন জানিয়ে সামশু মিয়া বলেন, থানা থেকে বলা হয় আবদুল্লাহকে তাঁরা আটক করেননি। অন্য কোথাও গিয়ে খোঁজ নিতে বলা হয়। এরপর দেশের নানা জায়গায় গিয়ে আবদুল্লাহর খোঁজ নেওয়া হয়েছে, যদিও সন্ধান মেলেনি।
সামশু মিয়া বলেন, ‘গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে টেকনাফে ক্রসফায়ারে অনেক মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। গুমের শিকারও অনেকে হয়েছেন। গুমের ঘটনা তদন্তে কমিশন গঠন করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আশা করছি, কমিশনের তদন্তের তিন তরুণের খোঁজ মিলবে।’
আবদুল্লাহর বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে জাহেদ হোসেনের বাড়ি। ওই বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। ঘরের বাইরে একটি দোকানের সামনে পাওয়া যায় জাহেদের বড় ভাই নজির আহমদকে। তিনি দীর্ঘদিন মালয়েশিয়ায় ছিলেন। দুই বছর আগে দেশে ফেরেন।
নজির আহমদ (৪৬) বলেন, বাবার অবর্তমানে সংসারের হাল ধরেন তাঁদের মা সখিনা খাতুন। জাহেদ নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে মা শুধু কান্নাকাটি করতেন। খাওয়াদাওয়াও ঠিকমতো করতেন না। জাহেদের জন্য কান্নাকাটি করতে করতে অসুস্থ হয়ে পড়েন তাঁদের মা। ২০২০ সালের জুলাই মাসে মায়ের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগমুহূর্তেও জাহেদকে একনজর দেখার জন্য ছটফট করেছেন মা।
জাহেদ বিবাহিত, সংসারে দুই মেয়ে। স্বামীর অনুপস্থিতিতে দুই শিশুকন্যাকে নিয়ে সারাক্ষণ উৎকণ্ঠায় থাকেন তাঁর স্ত্রী হাসিনা বেগম। হাসিনা জানান, স্বামী ফিরে আসবেন, এমন আশায় দিন গুনছেন তিনি।
নিখোঁজ জয়নালের বাড়ি সেন্ট মার্টিন দ্বীপের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিক্রয় প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাশাপাশি পল্লিচিকিৎসকের প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন কক্সবাজার শহরে।
জয়নালের বাড়িতে গিয়ে ফিরোজা খাতুনের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, দ্বীপে মানুষ চিকিৎসা নিয়ে অনেক ভোগান্তিতে রয়েছেন। তাই মানুষের সেবায় পল্লিচিকিৎসক হিসেবে প্রশিক্ষণ নিতে কক্সবাজারে গিয়েছিলেন জয়নাল।
ফিরোজা বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো অপরাধ করলে দেশের প্রচলিত আইনে বিচার হতে পারত, কিন্তু গুম করা হলো কেন?’
জানতে চাইলে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিন বলেন, ঘটনাটি পুরোনো হলেও এ পর্যন্ত অভিযোগ নিয়ে কেউ থানায় আসেনি। বাদীপক্ষ আদালত মামলা করতে পারে। এ ক্ষেত্রে পুলিশ তাদের সহযোগিতা করবে।
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডারস ফোরামের কক্সবাজারের সভাপতি আইনজীবী আব্দুস শুক্কুর প্রথম আলোকে বলেন, এ পর্যন্ত তাঁরা কক্সবাজারে চারজন গুমের খবর পেয়েছেন। এর মধ্যে টেকনাফের তিন তরুণের নাম রয়েছে। সরকারের গুম অনুসন্ধান কমিটির কাছে এই চারজনের তালিকা পাঠানো হয়েছে।
![]() |
| নিখোঁজ মো. আবদুল্লাহর ছবি হাতে মা রহিমা খাতুন। সম্প্রতি কক্সবাজারের টেকনাফ সদরের জাহালিয়াপাড়ায়। ছবি: প্রথম আলো |
![]() |
| নিখোঁজ মো. জয়নালের ছবি হাতে মা ফিরোজা খাতুন ছবি: প্রথম আলো |
Friday, September 27, 2024
জৌলুস হারাচ্ছে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত by ওয়াহিদুর রহমান রুবেল
এদিকে বড় কোনো আয়োজন না থাকলেও আজ শুক্রবার র্যালি, আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে কক্সবাজারে পালিত হবে বিশ্ব পর্যটন দিবস। পর্যটক না আসায় হোটেল-মোটেলগুলোতেও আয়োজন করা হয়নি কোনো অনুষ্ঠান।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আতাউল গনি ওসমানী বলেন, পর্যটন দিবস সামনে রেখে গতকাল বৃহস্পতিবার রচনা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে শিশু একাডেমি। সৈকতে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম করে পৌরসভা। আজ শুক্রবার সকাল ৯টায় সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হবে। এটি লাবনী পয়েন্টে গিয়ে সংক্ষিপ্ত সমাবেশের মধ্য দিয়ে শেষ হবে। সন্ধ্যায় স্থানীয় শিল্পীদের নিয়ে লাবনী পয়েন্টের ওপেন মঞ্চে সাংস্কৃতিক সন্ধ্যার আয়োজন রয়েছে। অক্টোবরের শেষের দিকে প্রতি বছরের মতো এবারও কার্নিভালের আয়োজন করা হবে।
তথ্য বলছে, কক্সবাজারে ঘুরে বেড়ানোর প্রধান স্পট সমুদ্রসৈকত। দেখার জন্য রয়েছে রাখাইন সম্প্রদায়ের বৌদ্ধ মন্দির ও প্যাগোডা, ধাতু ও ব্রোঞ্জের তৈরি বুদ্ধমূর্তি, ছোট-বড় ১৩টি বুদ্ধমূর্তি নিয়ে লাল সিং ও পাশে সাদা সিং নামের বৌদ্ধবিহার, বৈচিত্র্যময় জীবনধারা, ডুলাহাজারার বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক, মহেশখালীর আদিনাথ মন্দির, সোনাদিয়া দ্বীপ, কুতুবদিয়া দ্বীপ, চকরিয়া ডুলাহাজারা সাফারি পার্ক, হিমছড়ি ঝরনা। রয়েছে দেশের একমাত্র ফিশ অ্যাকুয়ারিয়াম।
অভিযোগ রয়েছে, এসব পর্যটন স্পট সুরক্ষায় কিংবা সৌন্দর্য বৃদ্ধি করতে সংশ্লিষ্টদের কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। সরকার বিভিন্ন সময় নানামুখী পদক্ষেপের কথা বললেও কার্যত তার কিছুই হয়নি। উল্টো কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের সুগন্ধা, কলাতলী, লাবনী পয়েন্টসহ বিভিন্ন স্থানের বালুকাবেলা দখল হয়েছে অসাধু চক্রের হাতে। আর বালিয়াড়ি দখল করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে লাইসেন্সও দেওয়া হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন সময় পর্যটকরা বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। আবার অনেক সময় ছিনতাইকারী ও টমটম চালকদের হাতে হেনস্তার শিকার হয়েছেন অনেক পর্যটক। রয়েছে ভাতের হোটেল ও আবাসিক হোটেলগুলোতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও।
সরেজমিন কক্সবাজার সুগন্ধা পয়েন্ট ও কলাতলী পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, বর্ষার পানির তীব্র স্রোতে বিভক্ত হয়ে পড়েছে সমুদ্রসৈকত। গর্ত হয়ে পানি জমে থাকায় ঝুঁকি তৈরি করছে পর্যটকদের জন্য। রয়েছে জেলা প্রশাসনের দেওয়া টোকেন দিয়ে তৈরি করা ঝুপড়ি দোকান। এতে সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে পড়ছে। দরিয়ানগর ও হিমছড়ির অবস্থাও একই। জোয়ারের আঘাতে ভেঙে গেছে সৈকতের পাড়। তলিয়ে গেছে কয়েকশ ঝাউগাছ। প্রতিনিয়ত সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট হলেও তা রক্ষায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটি। পর্যটক হয়রানি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজার পর্যটন শিল্পের ভবিষ্যৎ বাধা হতে পারে সুপেয় পানির সংকট। এ ছাড়া পর্যটকদের বিনোদনের জন্য নেই কোনো জাতীয় উদ্যান, থিম পার্ক, হেরিটেজ পার্ক, মেরিন মিউজিয়াম, নেই কোনো আন্তর্জাতিক মানের কনফারেন্স সেন্টার। অতিরিক্ত গাড়ি ভাড়া, হোটেল ভাড়া, খাবার বিল, নিত্য পর্যটক হয়রানি, ছিনতাই, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকায় যেখানে সেখানে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া সৈকতে ঝুপড়িগুলো সৌন্দর্য নষ্ট করছে। রাতদিন ভিক্ষুকদের দৌরাত্ম্য ও বখাটের উৎপাত পর্যটন শিল্প বিকাশের পথে বাধা। এ ছাড়া সাগরে নেই নেটিং ব্যবস্থা। ফলে পানিতে ভেসে গিয়ে ঘটছে মৃত্যুর মতো দুর্ঘটনা। এসব বাধার পাশাপাশি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গা শিশু-কিশোর এখন পর্যটন এলাকায় ছিনতাই ও ভিক্ষুকের কাজ করছে।
কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটক রহিম উল্লাহ বলেন, কয়েক মাস আগে বন্ধুদের নিয়ে কক্সবাজার এসেছিলাম। সে সময় সৈকতের যে পরিবেশ ছিল, এখন তা নেই। পুরো সৈকতের বেহাল অবস্থা। কলাতলী ও সুগন্ধা পয়েন্টে বালিয়াড়ি বিভক্ত হয়ে গেছে।
সাইফুল করিম নামে আরেক পর্যটক বলেন, বউ-বাচ্চা নিয়ে হিমছড়ি গিয়েছি। ওখানে টমটম চালকের টানাহেঁচড়া চরম অসহ্য। আর হিমছড়িতে যে পরিমাণ দোকান নির্মাণ করা হয়েছে, হাঁটাচলাও করা মুশকিল।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সভাপতি এইচএম এরশাদ কালবেলাকে বলেন, অবৈধ পাহাড় কাটা, বনাঞ্চল নিধন, সরকারি খাসভূমি দখল, অপরিকল্পিত ইমারত তৈরির ফলে নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ। ব্যবসার নামে যত্রতত্র নির্মাণ করা হচ্ছে ইট-পাথরের স্থাপনা। সৈকতে গড়ে তোলা হয়েছে ঝুপড়ি দোকান। এতে সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট করছে। এ ছাড়া পর্যটন করপোরেশনের কোনো কর্মকাণ্ডও আমাদের চোখে পড়ে না।
আমরা কক্সবাজারবাসী সংগঠনের সমন্বয়ক মো. কলিম উল্লাহ বলেন, এখন পর্যটন শিল্পের অন্যতম সমস্যা রোহিঙ্গা ও মাদক। আর যেভাবে পাহাড় ও পরিবেশ ধ্বংস করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে মরুভূমি হবে কক্সবাজার। তাই এসব অনিয়ম বন্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
কক্সবাজার সিটি কলেজের প্রভাষক ও ট্যুরিজম এবং হসপিটালিটি বিভাগের বিভাগীয়প্রধান মঈনুল হাসান পলাশ কালবেলাকে বলেন, পর্যটন শিল্পের বিকাশে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদের এগিয়ে আসতে হবে। এজন্য নিতে হবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।
পর্যটন করপোরেশন কক্সবাজারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও হোটেল শৈবালের ব্যবস্থাপক রায়হান উদ্দিন আহমেদ বলেন, আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের কাজ করা হচ্ছে। আর পর্যটন বোর্ড পর্যটন শিল্প সংশ্লিষ্টদের নিয়ে কাজ করছে। আশা করছি ভালো কিছু হবে।
রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম ডালিম বলেন, বিভিন্ন সময় দেশে নানা সমস্যার কারণে ব্যবসা অত্যন্ত মন্দা গেছে। অনেকে তো রেস্তোরাঁ বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তা করেছিল। তবে এখন কিছুটা পরিবর্তন হচ্ছে। আস্তে আস্তে বন্ধ থাকা রেস্তোরাঁও খুলছে। তবে আগের মতো সে অবস্থা নেই। তারপরও আমরা আশাবাদী ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারব।
কক্সবাজার হোটেল মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম নেওয়াজ বলেন, সৈকতের সৌন্দর্য রক্ষায় বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটিতে বারবার দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। মাঝে মাঝে পর্যটক হেনস্তার ঘটনায়ও এ শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলে ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে আমাদের।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজারের সহকারী পুলিশ সুপার আবুল কালাম কালবেলাকে বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তায় সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ সালাউদ্দিন কালবেলাকে বলেন, আমি সবেমাত্র দায়িত্ব নিয়েছি। ইতোমধ্যে পর্যটন নগরীকে কীভাবে সাজানো যায়, সেটা নিয়ে হোমওয়ার্ক শুরু করেছি। পর্যটন এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে কউক, সড়ক ও জনপথ, কক্সবাজার পৌরসভা, পর্যটন করপোরেশনের শৈবাল-প্রবাল, বিমানবাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে নিয়ে বৈঠক করে ছয়টি করণীয়ও নির্ধারণ করেছি। নাগরিকদের নিয়ে একটি সুপারভিশন কমিটি গঠন করা হয়েছে। এক কথায় কক্সবাজার ঘিরে আমাদের সামগ্রিক প্ল্যান রয়েছে। তবে সবার সমন্বিত উদ্যোগ ও সহযোগিতা কামনা করেছেন তিনি।

Friday, September 13, 2024
ভারী বর্ষণে ডুবেছে শহর: কক্সবাজারে হোটেলে আটকা ২৫ হাজার পর্যটক by আব্দুল কুদ্দুস
গত ৫০ বছরে শহরজুড়ে এমন জলাবদ্ধতা দেখেননি জানিয়ে কক্সবাজার হোটেল গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার প্রথম আলোকে বলেন, অপরিকল্পিত সড়ক উন্নয়ন, ঠিকমতো নালা পরিষ্কার না করা এবং শহরের পাহাড় নিধন বন্ধ না হওয়ায় এমন জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
হোটেলমালিক, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ব্যবসায়ীরা জানান, গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় বৃষ্টিপাত শুরু হলেও ভারী বর্ষণ শুরু হয় দুপুর সাড়ে ১২টায়। এরপর রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত টানা ১২ ঘণ্টার ভারী বর্ষণে পুরো শহরের ৮ লাখ মানুষের জীবন অনেকটা থেমে যায়।
আজ সকাল ১০টায় আবার ভারী বর্ষণ শুরু হয়, সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। বেলা সাড়ে তিনটা পর্যন্ত আরও কয়েক ঘণ্টার ভারী বর্ষণে শহরের প্রধান সড়ক, কলাতলী সৈকত সড়কসহ অন্তত ৩৫টি উপসড়ক ডুবে গেছে। বন্ধ রয়েছে যানবাহন চলাচল।
কক্সবাজার আবহাওয়া কার্যালয়ের সহকারী আবহাওয়াবিদ এ বি হান্নান বলেন, গতকাল বেলা ৩টা থেকে আজ বেলা ৩টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় কক্সবাজারে ৫০১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। চলমান মৌসুমে এটি এক দিনে সর্বোচ্চ বৃষ্টির রেকর্ড। ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। বাতাসের তীব্রতাও বেশি থাকবে, যা দমকা ও ঝোড়ো হাওয়া আকারে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৬০ কিলোমিটার বেগে বৃদ্ধি পেতে পারে।
হোটেলে আটকা পর্যটকেরা
আজ বেলা সাড়ে ১১টা। কলাতলী সৈকতের একটি গেস্টহাউস থেকে নারী-পুরুষের পাঁচজনের একটি দল সড়কে নেমে সমুদ্রসৈকতের দিকে রওনা দেয়। কিছু দূর হাঁটার পর সামনে পড়ে চার লেনের কলাতলী সৈকতসড়ক। পুরো সড়ক তখন বৃষ্টির পানিতে ডুবে আছে। যানবাহনের চলাচল নেই। চলছে ঝোড়ো হাওয়াসহ ভারী বৃষ্টি। সবাই আশ্রয় নেন একটি দোকানের ভেতর।
দলের একজন সোহেল আহমদ (৩৪) বলেন, গতকাল সকালে তাঁরা ঢাকা থেকে কক্সবাজার ভ্রমণে আসেন। তাঁরা গাড়ি থেকে নামার পর বৃষ্টির শুরু হয়। এরপর হোটেলে উঠে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করে বিকেল পাঁচটার দিকে সুগন্ধা সৈকতে নামেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে গোসল করা হয়নি কারও। আজকের অবস্থা আরও ভয়াবহ। বৃষ্টির থামাথামি নেই।
আরেক পর্যটক সাইফুর রহিম বলেন, পর্যটন শহরের এমন জলাবদ্ধতা কল্পনা করা যায় না। বৃষ্টির পানি নামার কোনো পথই নেই। সড়কের পাশের নালাগুলো ময়লা-আবর্জনায় ভরা। যে কারণে বৃষ্টির পানি সড়কের ওপর জমে আছে। যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় পর্যটকদের চরম দুর্ভোগ যাচ্ছে।
দেখা গেছে, সকাল সাতটা থেকে হোটেল–মোটেল জোনের পাঁচ শতাধিক হোটেল, গেস্টহাউস, কটেজ-রিসোর্ট বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে। কলাতলী সড়ক, সুগন্ধা সড়ক, সিগাল সড়ক পানিতে সয়লাব। এই তিন সড়কের দুই পাশসহ ঝিনুক মার্কেটের তিন হাজার দোকানপাট পানিতে নিমজ্জিত। ভারী বর্ষণে টিকতে না পেরে সৈকতে থাকা ৩৫টির বেশি ঘোড়া এদিক-সেদিক ছুটছে। কিছু ঘোড়া দোকানপাট ও রেস্তোরাঁয় আশ্রয় নিয়েছে।
জলাবদ্ধতার কারণে হোটেল–মোটেল জোনের ১৮টি সড়ক ডুবে গেছে জানিয়ে কক্সবাজার হোটেল রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান প্রথম আলোকে বলেন, আজ ৫ শতাধিক হোটেলে অন্তত ২৫ হাজার পর্যটক অলস বসে থেকে সময় কাটাচ্ছেন। ভারী বর্ষণের কারণে তাঁরা হোটেল থেকে কোথাও যেতে পারছেন না। অনেকে হোটেল বুকিং বাতিল করে গন্তব্যে ফিরে যাচ্ছেন। নানা কারণে তিন মাস ধরে পর্যটকের আগমন কমেছে, এ কারণে হোটেল ব্যবসাও জমছে না।
গেস্টহাউস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সেলিম নেওয়াজ বলেন, ভারী বর্ষণ হলেই হোটেল–মোটেল জোনে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। তখন পর্যটকদের ওপর দুর্ভোগ নেমে আসে। ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব দেখা দেয়। গত জুলাই মাসেও কয়েক দফায় শহরজুড়ে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছিল জানিয়ে সেলিম নেওয়াজ বলেন, তখন পৌরসভার মেয়র-কাউন্সিলররা জরুরি ভিত্তিতে নালা পরিষ্কার ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে জলাবদ্ধতা নিরসনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে মেয়রসহ বেশির ভাগ কাউন্সিলর আত্মগোপন করেন। এখন জলাবদ্ধতা নিরসনের তেমন উদ্যোগ চোখে পড়ছে না।
দীর্ঘ ৫৩ দিন পর ১০ সেপ্টেম্বর থেকে সৈকতে পর্যটকের সমাগম ঘটছে। আজ অন্তত এক লাখ সমাগমের আশা ছিল জানিয়ে হোটেলমালিকেরা জানান, বৈরী পরিবেশে অধিকাংশ পর্যটক বুকিং বাতিল করেন।
![]() |
| ভারী বর্ষণে ডুবেছে কক্সবাজার শহর। কলাতলী হোটেল–মোটেল জোন সড়ক ডুবে থাকায় দুর্ভোগে পড়েন পর্যটকেরা। আজ দুপুরেছবি: প্রথম আলো |
![]() |
| ডুবে আছে কক্সবাজার শহরের কলাতলীর হোটেল- মোটেল জোন। আজ বিকেলেছবি: প্রথম আলো |
বঙ্গোপসাগর হয়ে মেরিন ড্রাইভ দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে রোহিঙ্গারা: ৫০ কিলোমিটার উপকূলীয় সীমান্ত অরক্ষিত
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নেই। উপকূলেও দৃশ্যমান টহল নেই। ফলে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের খুরের মুখ থেকে শিলখালী পর্যন্ত ৩০ কিলোমিটার এলাকার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ অব্যাহত রয়েছে। সম্প্রতি নৌ পুলিশ, থানা পুলিশ মাঠে নিস্ক্রিয় হওয়ায় সক্রিয় হয়ে উঠছে স্থানীয় দালালরা।
সীমান্তে দায়িত্বে থাকা বিজিবির এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, এত বড় সীমান্ত আসলে পুঙ্খানুপুঙ্খ টহল দেয়া কঠিন। তার ওপর টাকার বিনিময়ে স্থানীয় দালালরা রোহিঙ্গাদের নিয়ে আসছে। বর্তমানে একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি যাচ্ছে। তবে আমরা সীমান্তে টহল বৃদ্ধি করেছি।
বিজিবির টেকনাফ-২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো: মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমরা দালালদের তালিকা তৈরি করে তাদের ধরছি। গত মঙ্গলবারেও ১০ জন দালাল আটক করা হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা নাফ নদে টহলে কড়াকড়ি করেছি। উপকূল এলাকায়ও টহল জোরদার করব।
সীমান্তের বাসিন্দারা জানান, বিজিবি-কোস্টগার্ডসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর টহল অপ্রতুল। তাই সুযোগ বুঝে স্থল ও জলপথ দিয়ে রোহিঙ্গারা অনুপ্রবেশ করছে। রাতের আঁধারে সাঁতরেও তারা বাংলাদেশে আসছে। তবে এটাও সত্য যে, বেশির ভাগই দালালদের মাধ্যমে এপারে ঢুকছে।
সীমান্ত এলাকার বাসিন্দা জয়নাল বলেন, দালালরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে নৌকায় রোহিঙ্গাদের এপারে জলসীমায় নিয়ে এসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর টহল নেই এমন জায়গায় তাদের নামিয়ে দেয়। এর পর তীরে ঝাউবনে লুকিয়ে রাখে। সেখান থেকে গন্তব্যে পাঠিয়ে দেয়। দালালদের সাথে কিছু মাছ ধরার নৌকাও জড়িত রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দালালরা ২০ হাজার থেকে লাখ টাকার বিনিময়ে উখিয়া-টেকনাফের সীমান্ত দিয়ে রাতের আঁধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে রোহিঙ্গাদের এ দেশে নিয়ে আসে। এ কাজে যুক্ত রোহিঙ্গাসহ বেশ কিছু দালাল সক্রিয় রয়েছে।
হ্নীলা সীমান্তের মাওলানা কলিম উল্লাহ জানান, সীমান্তে বিজিবির পাশাপাশি স্থানীয়রাও রোহিঙ্গা ঠেকাতে সোচ্ছার হতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি হওয়ায় তারা খুব সহজেই ঢুকে পড়ছে।
তিনি বলেন, টেকনাফে স্থানীয়দের চেয়ে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বহু গুণ। ফলে স্থানীয় মানুষের বেকারত্ব বাড়ছে। অনেকেই নিরুপায় হয়ে মাননব পাচার, মাদক ও অস্ত্র বহনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
টেকনাফের ব্যবসায়ী জানে আলম বলেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত অনেকটা অরক্ষিত হওয়ার কারণে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না। তার ওপর দেশের কথা চিন্তা না করে অর্থের লোভে রোহিঙ্গা ঢোকাচ্ছে। ফলে স্থানীয়দের মাঝে সচেতনতা বাড়ানো দরকার।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আদনান চৌধুরী বলেন, বিজিবি-কোস্টগার্ডের পাশাপাশি রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে স্থানীয়দের উৎসাহিত করা হচ্ছে। এছাড়া রোহিঙ্গা পারাপারে জড়িত দালালদের ধরতে অভিযান চলছে। নাফ নদের পাশাপাশি উপকূলেও টহল জোরদার করা হবে।

Wednesday, September 11, 2024
ওপারে গোলাগুলি, ফের ঢুকছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা
সোমবার (১০ই সেপ্টেম্বর) স্থানীয় ও রোহিঙ্গা ক্যাম্প (নং ২৬ ও ২৭) সরজমিন ঘুরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন টেকনাফ সীমান্তে মিয়ানমার থেকে আসা বিকট আওয়াজে এদেশের বাড়িঘরগুলো থর থর করে কেঁপে ওঠে। মুহুর্মুহু এ শব্দে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে সীমান্তবাসীর মধ্যে। রাখাইনের মংডুতে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে দেশটির সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির চলমান সংঘাত দিন দিন আরও তীব্র থেকে তীব্রতর হয়েছে। এ সংঘর্ষকে ঘিরে সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে দালালদের মাধ্যমে বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে এদেশে অনুপ্রবেশ করছে শত শত রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নতুনভাবে ঘর নির্মাণ করে বসবাস করছে নতুন আসা রোহিঙ্গারা। আবারো রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ফলে সীমান্তে বসবাসরত এদেশের বাসিন্দাদের মাঝে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
কয়েকজন নতুন আসা ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, সেনা ও আরাকান আর্মির মধ্যে দুই পক্ষের গোলাগুলিতে অনেক রোহিঙ্গা মারা যাচ্ছে। মংডু টাউন দখলে নিয়েছে আরাকান আর্মি। মংডু টাউনসহ আশপাশের গ্রামের মানুষ অন্য এলাকায় চলে গেছে। হঠাৎ করে গোলাগুলি ও বোমার আঘাতে অনেকে মৃত্যুবরণ করেছে। এখন জনশূন্য মংডু। যে এলাকায় লোকজন চলে গিয়ে আশ্রয় নেয়, সেই এলাকায় নতুন করে শুরু হয় গোলাগুলি ও বোমা নিক্ষেপ। ফলে প্রাণ হারায় অনেকে। তাই প্রাণ বাঁচাতে পাশের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ছাড়া তাদের যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। দালালদের মাথাপিছু ২০-২৫ হাজার টাকা দিয়ে এপারে পরিবার নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে এসেছে বলেও জানান ওই রোহিঙ্গারা।
অনেক পরিবার এপারে চলে আসলেও নৌকার জন্য ওপারে অপেক্ষা করছে শত শত রোহিঙ্গা পরিবার। বর্তমানে সেখানে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবনযাপন করছে। দেখা দিয়েছে খাদ্যের তীব্র সংকট। যেকোনো সময় তারা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে অপেক্ষায় রয়েছেন বলেও জানান।
সীমান্তের বাসিন্দা আরেফ আহমেদ বলেন, রাতভর মিয়ানমারে বিকট আওয়াজে আমরা সীমান্তের মানুষ ঘুমাতে পারেনি। অনেকে ঘরের বাইরে রাত কেটেছে। একটু পরপরই বিকট গুলির শব্দে সীমান্ত কেঁপে ওঠে। এ পরিস্থিতিতে যেকোনো মুহূর্তে সীমান্তে আবারো অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে।
টেকনাফ সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা আরও জানান, গত নভেম্বর থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহী আরাকান আর্মির সংঘাত তীব্র হয়েছে। প্রায় প্রতিদিন ওপার থেকে গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসছে।
চলমান সংঘাতের মধ্যে সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে, নাফ নদ পার হয়ে প্রতিদিন বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছেন রোহিঙ্গারা। পরে তারা চলে যাচ্ছেন উখিয়া-টেকনাফের বিভিন্ন রোহিঙ্গা শিবিরে। এ ছাড়া মিয়ানমারের মংডু, মগনিপাড়া, সিকদারপাড়া, ফয়েজিপাড়া, নুরুল্লাহপাড়া, সুদাপাড়া ও আইরপাড়া এলাকায় অন্তত ৩০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থানীয়রা বলছেন, গত এক মাসে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে।
বিজিবি ও কোস্টগার্ড সদা সীমান্ত পাহারা এবং নাফ নদে টহল জোরদার করলেও রাতের আঁধারে তাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে একশ্রেণির দালাল রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ করাচ্ছে। তাদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিচ্ছে মোটা অর্থ ও স্বর্ণালংকার। বিশেষ করে টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের জালিয়াপাড়া, মিস্ত্রি পাড়া, সাবরাং, টেকনাফের কেরুনতলী, হাবিরছড়া, রাজারছড়া, হ্নীলার, নাইট্যংপাড়া, দমদমিয়া, জাদিমুড়া, মোছনী, নয়াপাড়া, মোছনী, লেদার কয়েকটি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে এসব রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করছে। এসময় বিজিবি ও কোস্টগার্ডের হাতে আটক হয়েছে অনেকে। পরে তাদেরকে পুশব্যাক করা হয়েছে। এব্যাপারে জানতে চাইলে টেকনাফ ২ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল মো. মহিউদ্দীন আহমেদ বলেন, বিচ্ছিন্ন ভাবে কিছু রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। তবে বিজিবি অনুপ্রবেশ প্রতিনিয়ত প্রতিহত করে যাচ্ছে। সোমবারও বিজিবি এবং কোস্টগার্ড সমন্বয়ে যৌথ টহল দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও অনুপ্রবেশ প্রতিহত করতে টহল জোরদার করা হয়েছে। কিছু দেশীয় দালাল মিয়ানমারের দালালদের সঙ্গে মিলে রোহিঙ্গা নিয়ে আসার চেষ্টা করছে। তাদের ব্যাপারেও আমরা আইনগত কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি।

Tuesday, September 10, 2024
১৪ হাজার নতুন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ, অপেক্ষায় আরো ৭০ হাজার
বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নোম্যানসল্যান্ডে আরো কমপক্ষে ৭০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশের অপেক্ষায় আছেন বলে জানা গেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশ যদি পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারে, তাহলে এই দফায় আরো এক লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের আশঙ্কা আছে।
৩ সেপ্টেম্বর পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো: তৌহিদ হোসেন সম্প্রতি দেশে নতুন করে আট হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের কথা জানান। তিনি জানান, ‘এটা কিভাবে ঠেকানো যায়, সেটা আমাদের চেষ্টা করতে হবে।’
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘নীতিগতভাবে আমরা কোনো রোহিঙ্গাকে নতুন করে আশ্রয় দেবো না, যদিও দুঃখ লাগে কথাটা বলতে, কিন্তু আমাদের জন্য সাধ্যের অতীত, আর পারবে না তাদের আশ্রয় দিতে।’
সীমান্তের একাধিক সূত্র জানায়, গত আট-নয় দিনে কমপক্ষে ১৩ থেকে ১৪ হাজার নতুন রোহিঙ্গা টেকনাফ ও উখিয়ার বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে ঠাঁই নিয়েছে। বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের জন্য মংডু সীমান্তে জড়ো হয়েছে আরো ৬০ থেকে ৭০ হাজার রোহিঙ্গা। নাফ নদী ও সীমান্তে বিজিবি ও কোস্টগার্ড বাহিনীর কড়া নজরদারির মধ্যেও নানা কৌশলে তারা বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছে। এক শ্রেণীর দালালও তাদের অর্থের বিমিয়ে ঢুকতে সহায়তা করছে।
উখিয়া ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা ইউনুস আরমান বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি যে রাখাইন রাজ্যের মংডুতে চলমান যুদ্ধ তীব্র হচ্ছে। মংডু টাউনে থাকা সেনা ও বিজিপির দুটি ব্যারাক (ব্যাটালিয়ন) দখলের জন্য মরিয়া আরাকান আর্মি। গোলাগুলির পাশাপাশি দু’পক্ষ থেকে ছোঁড়া হচ্ছে মর্টারশেল, গ্রেনেড-বোমা। মাঝেমধ্যে ড্রোন হামলাও চালানো হচ্ছে।’
রোহিঙ্গাদের ৯ নম্বর ক্যাম্পের ১ নম্বর ব্লকের হেড মাঝি মোহাম্মদ হোসেন বলেন, ‘প্রতিদিনই রোহিঙ্গারা আসছেন। তারা নাফ নদীর পাশাপাশি অন্য সীমান্ত থেকেও আসছেন। স্থানীয় কিছু লোকজন তাদের বাংলাদেশে প্রবেশে সহায়তা করছে। তারা যে সবাই ক্যাম্পে আসছেন, তা নয়। ক্যাম্পের বাইরেও তারা অবস্থান করছেন।’
তার কথায়, ‘মংডুতে এখন যে তীব্র সংঘাত হচ্ছে, তাতে রোহিঙ্গারা আর সেখানে টিকতে পারছেন না। তারা মিয়ানমারের সামরিক জাস্তা এবং আরাকান আর্মি উভয়ের হামলা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।’
টেকনাফের সাবেক কাউন্সিলর নুরুল বাসার বলেন, ‘৫ আগস্ট সরকার পতনের পর কয়েক দিন সীমান্ত থেকে রোহিঙ্গারা ব্যাপকভাবে ঢুকেছে। এখনো বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ঢুকছে। এরকম কমপক্ষে ৩০টি পয়েন্ট থেকে তাদের অনুপ্রবেশ অব্যাহত আছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘দালালরা তাদের ঢুকতে সহায়তা করছে। যারা ঢুকছে, তারা প্রথমে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছে। এরপর যাদের ক্যাম্পে আগে আসা আত্মীয়-স্বজন আছে, তাদের মাধ্যমে ক্যাম্পে আশ্রয় নিচ্ছে।’
তার কথায়, ‘নতুন করে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে আমরা আতঙ্কে আছি। এমনিতেই আমরা এখন বাংলাদেশীরা এখানে সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছি, এরকম চলতে থাকলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।’
কক্সবাজারে অতিরিক্ত শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা নয়ন বলেন, ‘প্রতিদিনই ক্যাম্পে নতুন রোহিঙ্গা দেখা যাচ্ছে। এটা স্পষ্ট যে সীমান্ত থেকে নতুন করে রোহিঙ্গারা ঢুকছে। তবে আমরা তাদের কোনো তালিকা করা এখনো শুরু করিনি। সরকারের কাছ থেকে আমরা এখনো এ ব্যাপারে কোনো নির্দেশনা পাইনি।’
মিয়ানমারে বাংলাদেশের সাবেক সামরিক অ্যাটাশে ও সাবেক রাষ্ট্রদূত মো: শহীদুল হক বলেন, ‘রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে না পারলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। এমনিতেই তারা নানা সঙ্কট তৈরি করছে ক্যাম্পে। সেখানে মাদক, অস্ত্র ব্যবসা হচ্ছে। নানা সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আশ্রয় নিচ্ছে।’
তার কথায়, ‘এখনই এই সমস্যা সমাধানের হাইটাইম। সরকারের উচিত কূটনৈতিক তৎপরতা আরো জোরদার করা। আমরা আর কোনোভাবেই নতুন রোহিঙ্গা নিতে পারব না।’
আরেক সাবেক কূটনীতিক ও কসোভোতে সাবেক ইউএন আঞ্চলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেটর এস এম রাশেদ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের আসন্ন অধিবেশনে আশা করি, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস রোহিঙ্গা ইস্যুটি শক্তভাবে তুলে ধরবেন। তার একটি গ্রহণযোগ্যতা আছে। আশা করি, তার প্রচেষ্টায় কাজ হবে।’
তার কথায়, ‘আসলে এখনই সময় কূটনেতিক প্রচেষ্টা জোরদার করে এই সমস্যা সমাধানের। রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবসনই একমাত্র সমাধান। আর কোনো সমাধান নেই। প্রয়োজনে আমাদের আরাকান আর্মির সাথে ভিন্ন চ্যানেলে কথা বলতে হবে।’
মো: শহীদুল হক আরো বলেন, ‘আমাদের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার সাথে দৃশ্যমান শক্তি দেখাতে হবে। একটি দেশে সীমান্তের ওপার তো নন-স্টেট অ্যাক্টরদের দখলে থাকতে পারে না।’
সূত্র : ডয়চে ভেলে

Monday, September 9, 2024
মিয়ানমারের মংডুতে তীব্র হচ্ছে সংঘাত, বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছেন রোহিঙ্গারা by আব্দুল কুদ্দুস ও গিয়াস উদ্দিন
রাখাইনে চলমান সংঘাতের মধ্যে সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়লেও রোহিঙ্গাদের অনেকেই পালিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছেন। সীমান্তের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছেন প্রায় ১২ হাজার রোহিঙ্গা। সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার চেষ্টায় রয়েছেন আরও প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা। ছয় মাস ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাত চলছে। এখন সংঘাত সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে।
টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর আরাফা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওপারে মর্টার শেল ও শক্তিশালী গ্রেনেড-বোমার বিস্ফোরণে এপারের ঘরবাড়ি কাঁপছে। বিস্ফোরণের শব্দ শুনে মনে হয় বসতঘরের চালার ওপর বোমা এসে পড়ছে। রাতে বিকট শব্দে বিস্ফোরণে ঘুম ভেঙে শিশুরা কান্নাকাটি শুরু করে দিচ্ছে।’
উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বিজিবি ও কোস্টগার্ড বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এরই মধ্যে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছেন। বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার জন্য রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন পয়েন্টে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা জড়ো হয়ে রয়েছেন।
রাখাইনের মংডু টাউনশিপের বিপরীতে (পশ্চিমে) চার কিলোমিটার প্রস্থের নাফ নদী পেরোলেই বাংলাদেশের টেকনাফ উপজেলা। টেকনাফের জনপ্রতিনিধিরা জানান, রাতের অন্ধকারে মংডু টাউনশিপের সুদাপাড়া, ফয়েজীপাড়া, সিকদারপাড়া ও নুরুল্লাপাড়া গ্রাম থেকে রোহিঙ্গারা নৌকা নিয়ে নাফ নদী অতিক্রম করে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছেন। বেশির ভাগ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকছেন জাদিমোরা, দমদমিয়া, কেরুনতলি, বরইতলি, নাইট্যংপাড়া, জালিয়াপাড়া, নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, নয়াপাড়া, শাহপরীর দ্বীপ, জালিয়াপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, ঘোলারচর, খুরেরমুখ, আলীর ডেইল, মহেষখালীয়াপাড়া, লম্বরী, তুলাতলি, রাজারছড়া, বাহারছড়া উপকূল দিয়ে। গতকাল শুক্রবার রাতেই কেবল বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছেন চার শতাধিক রোহিঙ্গা। মংডুর উত্তরের প্যারাংপুরু ও দক্ষিণের ফাদংচা এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা জড়ো হয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টায় রয়েছেন। রাখাইনের চলমান সংঘাতে সম্প্রতি তাঁরা ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন।
দালালের মাধ্যমে রোহিঙ্গারা ঢুকছেন জানিয়ে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নজির আহমদ বলেন, গত কয়েক দিনে কেবল কেরনতলি সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় এলাকাবাসীর সহযোগিতায় তিনি শতাধিক রোহিঙ্গাকে আটক করে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিজিবি এসব রোহিঙ্গাকে পুনরায় মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে।
গতকাল রাতে নাফ নদী পেরিয়ে টেকনাফের কেরনতলির এক বাসিন্দার বাড়িতে আশ্রয় নেন ১৫ শিশু ও ৯ নারীসহ চারটি পরিবারের ৩০ জন রোহিঙ্গা। তাঁদের বাড়ি মংডু টাউনশিপের পাশের গ্রাম সুদাপাড়াতে। তাঁদের দুজন জাহেদা বেগম (৩৫) ও নুর জাহান (৪০) বলেন, সাত-আট দিন ধরে মংডুতে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধে উভয় পক্ষ শক্তিশালী গ্রেনেড-বোমা, মর্টার শেলের পাশাপাশি ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। যুদ্ধবিমান থেকেও বোমা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। তাতে অনেক মানুষ হতাহত হচ্ছেন।
তাঁরা বলেন, যুদ্ধের মধ্যে অনেক রোহিঙ্গা বসতি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে তাই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টায় রয়েছেন। তবে নৌকার অভাবে বাংলাদেশে ঢুকতে সমস্যা হচ্ছে।
দলের আরেক সদস্য সাব্বির আহমদ বলেন, নাফ নদী অতিক্রম করে টেকনাফে ঢুকতে তাঁদের (রোহিঙ্গাদের) কাছ থেকে মাথাপিছু ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়েছেন দালালেরা।
টেকনাফে আশ্রয়শিবিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সহকারী পুলিশ সুপার মাইন উদ্দিন বলেন, ‘কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ঢুকে পড়েছে। তাদের নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। নতুন করে কোনো রোহিঙ্গা যেন ঢুকতে না পারে, সে ব্যাপারে আশ্রয়শিবিরে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’
জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আদনান চৌধুরী বলেন, সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে। অনুপ্রবেশের সময় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে নাফ নদী থেকে পুনরায় মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদী ও সীমান্তে টহল জোরদার করা হয়েছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা বলেন, বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে নতুন করে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিচ্ছেন। তবে এ পর্যন্ত কত রোহিঙ্গা ঢুকেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই।
![]() |
| নাফনদী অতিক্রম করে টেকনাফে আসে চার রোহিঙ্গা পরিবার। ছবি-প্রথম আলো |
Friday, October 4, 2019
দুইবারের উপজেলা চেয়ারম্যান জীবিকা নির্বাহ করছেন বাইক চালিয়ে: এ এক অন্যরকম রাজনীতিবিদ by ইব্রাহিম খলিল

এই তিনিই রাজনীতিতে সততার উদাহরণ এখন সবার কাছে। তিনি আর কেউ নন। চট্টগ্রামের কক্সবাজার জেলার পেকুয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শাফায়েত আজিজ রাজু। পেকুয়া বিএনপি নেতা। শুধু তাই নয়, তার পিতা মাহামুদুল করিম চৌধুরীও ছিলেন বিএনপির টিকেটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য। পিতা সংসদ সদস্য ও নিজে উপজেলা চেয়ারম্যান থাকলেও এখন তিনি সংসার চালাতে বেছে নিয়েছেন অ্যাপ ভিত্তিক রাইড শেয়ারকে। অথচ তারা রাজনীতি করেছেন, কিন্তু পারেননি সম্পদের পাহাড় গড়তে। তাইতো দেখা যায়, তার বাড়িতে শুধুমাত্র একটি সেমিপাকা বাড়ি। পেকুয়া উপজেলার মগনামা ইউনিয়নে তাদের বাড়ি।
এক সময় যিনি উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসাবে গোটা উপজেলার উন্নয়ন বাস্তবায়ন করেছেন। পিতা এমপি হওয়ার সুবাদেও উপজেলার উন্নয়নের খোঁজ রেখেছেন। এখন তার একমাত্র সম্বল একটি মোটরবাইক। বাইকটি রাইড শেয়ার প্রতিষ্ঠান সহজ ও পাঠাও অ্যাপসে নিবন্ধন করে সংসারের খরচ জোগাচ্ছেন তিনি। পেকুয়ায় রাজু চেয়ারম্যান হিসাবে ব্যাপক পরিচিত শাফায়েত আজিজ রাজুর এই রাইড শেয়ার নিয়ে গোটা কক্সবাজারে এখন আলোচনা। কিন্তু এতে রাজুর কোনও দুঃখবোধ নেই। তিনি মানবজমিনকে বলেন, বাইক নিয়ে আমি রাইড শেয়ার করছি। তাতে আমার কোনো দুঃখ নেই। বরং ঘুষ-দুর্নীতিসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত কেউ শান্তিতে নেই। সেদিক থেকে আল্লাহ আমাকে শান্তিতে রেখেছেন- এটাই আমার সুখ। গতকাল মানবজমিন অনলাইনে রাজুকে নিয়ে রিপোর্ট হলে গোটা দেশে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মানবজমিন অনলাইনে এমন একটি প্রতিবেদন হবে এটা আমি বিশ্বাস করতে পারিনি। এ প্রতিবেদনের পর আমার শুভাকাঙ্ক্ষীরা অনেকে আমার সঙ্গে ফোনে ও ফেসবুকে যোগাযোগ করেছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে আমার খোঁজ নেয়া হয়েছে।
বিবিসি’র সাংবাদিক আমার একটি ফটোশ্যুট করেছেন। ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমের সাংবাদিকরা আমার সঙ্গে কথা বলেছেন। এটা আমার জন্য গর্বের। এটাই স্বস্তির। এ জন্য মানবজমিনের কাছে আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ।
তিনি বলেন, সবার কাছে আমার চাওয়া, আমি যেন কোনোরকম লোভের বশবর্তী হয়ে আমার সততার অবস্থান থেকে সরে না পড়ি। এ জন্য দোয়া করবেন।
তিনি বলেন, ২০০৯ সালে আমি পেকুয়া উপজেলা পরিষদের প্রথম নির্বাচিত প্রতিষ্ঠাতা উপজেলা চেয়ারম্যান। তখন আমি বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে সাড়ে চার হাজার ভোটের ব্যবধানে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারাই।
২০১৪ সালেও শেষ মুহূর্তে এসে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী হিসেবে ২২ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়লাভ করি। শেষ নির্বাচনে তো মানুষ ভোটই দিতে পারেনি। তবে ওই নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নেয়ায় আমি নির্বাচনে লড়িনি। এরপর আমি ব্যবসায় মনোযোগী হই। কিন্তু বিএনপির রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকার কারণে আমি ও আমার হাজারো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে ৫টি মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়। ফলে ব্যবসায় সময় দিতে না পেরে লোকসানের সম্মুখীন হই। পুঁজি হারিয়ে প্রায় ৪ মাস বেকার সময় কাটাই।
এমতাবস্থায়, শেষমেশ চট্টগ্রাম শহরে রাইডারদের দেখে মাথায় আসে আমার তো এখনো শেষ সম্বল হিসেবে একখানা মোটরসাইকেল আছে। তাই গত ১৫ দিন আগে প্রথমে পাঠাও, পরে সহজ অ্যাপসে নিবন্ধন করি। তাদের মাধ্যমে রাইড করে দিনে ৯০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করছি। যা দিয়ে আমার সংসারের খরচ জোগানোর চেষ্টা করছি।
তিনি আরো বলেন, চট্টগ্রাম শহরে আমি মা-ভাই, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকছি। এতে আমার অন্তত ৫০ হাজার টাকারও বেশি খরচ যাবে। এ ছাড়া ৫টি মামলায় জামিনে থাকলেও আদালতে হাজির হতে হচ্ছে। খরচ হচ্ছে সেখানেও। সুতরাং যে আয় হচ্ছে তাতে হয়তো খরচ মিটবে না। তবে আশায় আছি সবে তো শুরু, ক্রমেই আয় বাড়বে।
চট্টগ্রামের শেয়ার রাইডারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ওরা আমাক বেঁচে থাকার পথ দেখিয়েছে। আমিও কাজটাকে ছোট করে দেখিনি। বরং একজন উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে শেয়ার রাইডিং করছি, তা দেখে আমার মতো শত শত বেকার তরুণ শিখবে। কাজটাকে ছোট করে না দেখে বেঁচে থাকার পথ খুঁজে নেবে। এটাই আশা করছি আমি।
রাজু চেয়ারম্যান আরো বলেন, আমার বাবা একজন বিএনপির মনোনীত সংসদ সদস্য ছিলেন। বাবাকেও দুর্নীতি ও অনিয়ম এতটুকু স্পর্শ করতে পারেনি। বাবা লবণের ব্যবসা করতেন। বাবার তৈরি সেমিপাকা ঘরই এখনো আমাদের মাথাগোঁজার একমাত্র সম্বল।
স্থানীয় লোকজনের মতে, সংসদ সদস্য হিসেবে মাহামুদুল করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে কোনো দুর্নাম নেই। বরং নিজের ঘরের খাবার দরিদ্রদের বিলিয়ে খাওয়াতেন তিনি। সৎজন হিসেবে তিনি বেশ পরিচিত। সেই বাবার যোগ্য উত্তরসূরি রাজু চেয়ারম্যান। ফলে দু’বার উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি। কিন্তু নিজের জন্য এতটুকু সম্পদ গড়েনি ।
পেকুয়া উপজেলা সদরের বাসিন্দা নজির আহমদ (৪৬) বলেন, ঘুষ-দুর্নীতি, লুটপাট-দখলবাজি, মাদক-জুয়া-ক্যাসিনোসহ নানা অনিয়ম ও অপকর্মে যখন সারা দেশ ছেয়ে গেছে তখনও এরমধ্যে রাজু চেয়ারম্যান সততার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। চট্টগ্রাম শহরে মোটরসাইকেল ভাড়া চালিয়ে টাকা কামাই করতে হচ্ছে তার। এ ঘটনা পেকুয়া উপজেলাবাসীর মুখে মুখে বলে জানান তিনি।
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2388)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...












