Wednesday, June 27, 2018

১০ই জানুয়ারি জেনারেল মইনের ফোন পাই -১/১১ নিয়ে ড. ইউনূসের ব্যাখ্যা

২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর গঠিত তত্ত্বাধায়ক সরকারের প্রধানের দায়িত্ব নেয়ার প্রস্তাব পাওয়া ও তা প্রত্যাখ্যান করার বিষয়ে একটি গণমাধ্যমে আসা বক্তব্যের বিষয়ে বিবৃতি দিয়েছেন শান্তিতে নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিবৃতিতে তিনি বলেছেন, মহিউদ্দিন আহমদ লিখিত “১/১১” প্রবন্ধে জেনারেল মইন ও ব্রিগেডিয়ার বারীর দু’টি সাক্ষাৎকারে তাঁরা উভয়েই সেনাবাহিনী সমর্থিত নুতন কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান হতে সেনাবাহিনীর প্রস্তাবে আমি কেন রাজী হইনি এ বিষয়ে অভিন্ন কথা বলেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁরা উভয়েই তাঁদের সাক্ষাৎকারে বলেছেন যে, কেয়ারটেকার সরকার দু’বছরের মেয়াদে সীমাবদ্ধ থাকায় আমি তার দায়িত্ব গ্রহণে অনীহা প্রকাশ করি। যেহেতু দুই বছরের কাঠামোর মধ্যে এই শীর্ষ পদটি নিতে আমি অস্বীকৃতি জানিয়েছিলাম, তাই তাঁদেরকে অন্য কাউকে বেছে নিতে হয়েছিল।
সেনাবাহিনীর প্রস্তাবে আমি কেন রাজী হইনি এ বিষয়ে তাঁরা যে কারণের উল্লেখ করছেন তা একেবারেই কল্পনাপ্রসূত। একেবারে হদ্দ বোকা না-হলে একজন অরাজনৈতিক বেসামরিক ব্যক্তি সেনাবাহিনীর নিকট তাঁকে দীর্ঘমেয়াদের জন্য একটি সরকারের প্রধানের পদে রাখার এরকম আবদার করার কথা কখনো চিন্তা করতে পারবে না।
ড. ফখরুদ্দীন আহমদের কেয়ারটেকার সরকার গঠনের পূর্বে আমার সঙ্গে কী আলাপ হয়েছিল তা নিচে তুলে ধরলাম।
শুরু করছি জানুয়ারী ১০, ২০০৭ দিয়ে। ঐ দিন বিকেল ৫-৩০টা নাগাদ আমি সেনাপ্রধানের নিকট থেকে একটি টেলিফোন পাই। আমি সে সময়ে আমার অফিসে গ্রামীণ ব্যাংকের দু’জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে আলাপ করছিলাম। সেনাপ্রধানের সাথে আমার কোনো পূর্ব পরিচয় ছিল না। তিনি তাঁর পরিচয় দিয়ে সরাসরি কাজের কথায় চলে এলেন। তিনি বললেন, দেশকে এই বিশৃংখল অবস্থা থেকে রক্ষা করতে দেশ পরিচালনার জন্য সেনাবাহিনী একটি নতুন কেয়ারটেকার সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তাঁরা আমাকে এই সরকারের প্রধান করতে চান। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতাগুলো সম্পন্ন করার জন্য তিনি আমাকে প্রস্তুত থাকতে বলেন। আমি তাঁর সদয় প্রস্তাবের জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানাই, তবে একই সাথে একথাও বলি যে, তাঁরা এজন্য অন্য কাউকে খুঁজে নিলে ভাল করবেন, কেননা আমি এ প্রস্তাবে সম্মত নই। বোধহয় তিনি এমন একটি জবাবের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না, বরং এমনটি আশা করছিলেন যে, আমি অত্যন্ত আগ্রহের সাথে তাঁর প্রস্তাবে রাজী হয়ে যাবে। তিনি তাঁর প্রস্তাবটি আবারো ঘুরিয়ে করলেন; সম্ভবত এমনটা ভেবে যে, আমি বোধহয় তাঁর প্রস্তাবটি বুঝতে পারিনি। আমি আবারো প্রস্তাবটা নাকচ করে দিলাম এবং বললাম যে, তাঁরা তাঁদের দ্বিতীয় পছন্দের ব্যক্তিকে নিয়ে অগ্রসর হতে পারেন। তিনি বললেন যে, তাঁদের কোনো দ্বিতীয় পছন্দের ব্যক্তি নেই এবং তাঁদের পুরো পরিকল্পনাটিই আমাকে সরকার প্রধান হিসেবে নিয়ে তৈরি করা। আমি তাঁকে নিরাশ করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলাম, তবে এটা সুস্পষ্ট করলাম যে, কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান হবার কোনো অভিপ্রায় আমার নেই। তিনি বোধহয় বুঝতে পারলেন যে, আমার মত পরিবর্তন করানোটা সহজ হবে না; তাই তিনি বললেন যে, তিনি পুরো বিষয়টা আমার কাছে পরিষ্কারভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য তাঁর সহকর্মীদেরকে আমার কাছে পাঠাবেন। আমি বললাম যে, আমি তাঁদের সাথে কথা বললে খুশী হবো, কিন্তু আমার সিদ্ধান্তের কোনো পরিবর্তন হবে না।
আমাদের কথাবার্তা সেখানেই শেষ হলো। এটা বুঝে উঠতে আমার কয়েক মিনিট লেগে গেল যে, সেনাবাহিনী প্রধান সত্যি সত্যি আমাকে ফোন করে দেশের সরকার প্রধান হতে প্রস্তাব দিচ্ছেন! ঘটনার আকস্মিকতা ও তাৎক্ষণিক হতবিহবলতা কাটিয়ে আমি আমার সহকর্মীদের কাছে, যারা পুরো আলোচনার সময়ে আমার সামনেই বসেছিলেন এবং আমার পুরো ফোনালাপ শুনছিলেন, বিষয়টা বললাম। সেনাপ্রধান আমাকে কী বলেছেন তা আমি পুরোটা তাদের কাছে বর্ণনা করলাম। তাঁরা হতভম্ব হয়ে গেলেন। তাঁরা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না যে, আমি এমন একটা প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছি যা কিনা অন্য যে-কেউ হলে তাৎক্ষণিকভাবে লুফে নিতো। আমি আমার সহকর্মীদের বললাম যে, আমি একেবারে সঠিক কাজটিই করেছি। কিন্তু তাঁরা আমার জবাবে খুবই বিস্মিত ও হতাশ হলেন।
কিছুক্ষণ পর আমি আরেকটি টেলিফোন পেলাম। আমি তখনো অফিসে। জেনারেল মাসুদ বললেন যে, তিনি আমার সাথে দেখা করতে আমার বাসায় আসতে চান। যেহেতু সাক্ষাৎ করতে “না” করার কোনো উপায় ছিল না, আমি তাঁকে ৮টায় আসতে বললাম।
জেনারেল মাসুদ ব্রিগেডিয়ার আমিন ও পাঁচ-ছয়জন জওয়ানসহ গ্রামীণ ব্যাংক কমপ্লেক্সে আমার বাসভবনে এলেন। আমি তাঁদের স্বাগত জানালাম এবং একটি ছোট কক্ষে নিয়ে গেলাম। তাঁরা নিজেদের পরিচয় দিলেন এবং অত্যন্ত বিনীতভাবে তাঁদের আসার উদ্দেশ্য জানালেন। আমি আমার অপারগতার কথা যতবারই বলতে থাকলাম, তাঁরাও তত বেশি বিনয়ী ও নাছোড়বান্দা হতে থাকলেন। তাঁরা তাঁদের পুরো পরিকল্পনা আমার কাছে তুলে ধরলেন। মত পাল্টাতে পারি এমন কোনো ধারণার যাতে সৃষ্টি না-হয় সেটা বজায় রেখে তাঁরা কিভাবে তাঁদের পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হতে চান তা বোঝার জন্য আমি বিভিন্ন প্রশ্ন করতে থাকলাম। আমি আশা করছিলাম, তাঁরা একবার বুঝে গেলে যে আমি আমার মত পরিবর্তন করবো না, তাহলে তাঁরা চলে যাবেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে যাবার কোনো লক্ষণই দেখা যাচ্ছিল না। তাঁরা বললেন যে, তাঁদের আসার উদ্দেশ্যই হলো আমাকে পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করা এবং তাঁদের প্রস্তাব গ্রহণ করে তাঁদেরকে সহায়তা করতে আমাকে রাজি করানো। তাঁরা সংশ্লিষ্ট সকল বিষয় এবং এগুলোর সমাধানে তাঁদের পরিকল্পনাগুলো আমাকে জানান। আমি বার বার বলতে থাকি যে, আমি তাঁদের যুক্তিগুলো পরিস্কার বুঝতে পারছি, কিন্তু তাঁদেরকে আমাকে ছাড়াই অগ্রসর হতে হবে। তাঁরা অনেকবার বোঝার চেষ্টা করলেন সেনাবাহিনীর পূর্ণ সমর্থনপুষ্ট এবং নতুন উদ্যোগের নেতৃত্ব দিতে আমার রাজি হতে বাধা কোথায়। তাঁরা বললেন যে, সরকারের বাইরে থেকে দরিদ্র মানুষদের জন্য আমি যা করতে চাইছি তা বাস্তবায়নে এটা বরং আমার জন্য একটা চমৎকার সুযোগ; আমি একবার রাজি হলে সরকারের বিশাল ক্ষমতা ব্যবহার করে এই লক্ষ্যে আমি সবকিছুই করতে পারবো।
আমার পক্ষ থেকে আমি বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে, “আপনাদের প্রস্তাবে রাজি হওয়ার গুরুত্ব আপনারা ভালভাবেই আমার কাছে তুলে ধরেছেন। কিন্তু আমি তো রাজি হতে পারছি না।” আমি আরো বলি যে, আমার জন্য তাঁদের অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই, কেননা দেশে অনেক যোগ্য ও নিবেদিতপ্রাণ লোক আছেন যাঁরা হয়তো তাঁদের সাথে কাজ করতে পারলে খুশি হবেন। তাঁরা আমার কাছে এমন কয়েকজনের নাম জানতে চান। আমি আমার কিছু বন্ধু এবং পরিচিত কয়েকজনের নাম বলি। এর মধ্যে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ড. ফখরুদ্দীনের নামও ছিল।
তাঁরা প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে আমার মত পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। শেষমেষ তাঁরা এই বলে উঠে পড়েন যে, “আমরা সকালে আবার আসবো। প্লিজ, আমরা যা আলোচনা করলাম তা সবদিক থেকে ভালভাবে ভেবে দেখুন এবং আপনার সহকর্মী ও বন্ধুদের সাথেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করুন। আশা করি কাল সকালে আপনার কাছ থেকে আমরা একটা সুসংবাদ পাবো।” আমি বললাম যে, আমি নিশ্চয়ই বিষয়টা গুরুত্বের সাথে ভাববো, কিন্তু তাঁদের আর সময় নষ্ট করে আসার প্রয়োজন নেই। কেননা আমার জবাব একই হবে। তাঁরা বরং তাঁদের পরবর্তী পছন্দকে নিয়ে অগ্রসর হলেই ভাল করবেন। তাঁরা আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে খুব বিমর্ষ চিত্তে বিদায় নিলেন।
পরদিন ১১ই জানুয়ারি আমি যথারীতি অফিসে যাই। আমি খুশি ছিলাম যে, তাঁরা সকালে আর আমাকে ফোন করেননি। সকাল প্রায় ১০টার দিকে আমার সহকর্মীরা আমাকে উত্তেজিতভাবে জানান যে, তাঁরা এইমাত্র শুনতে পেয়েছেন যে আমার বন্ধু ড. ফখরুদ্দীন আহমদ নতুন কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন। আমি স্বস্তি পেলাম।
জনাব মহিউদ্দিনের প্রবন্ধে বলা হয়েছে যে, আমি তত্ত্বাবধায়ক সরকারে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। তা মোটেই সঠিক নয়। এই অনুষ্ঠানে আমাকে আমন্ত্রণ করা হয়নি এবং আমি উপস্থিত ছিলাম না। আমাকে আমন্ত্রণ করা হবে এরকম কোনো ধারণাও আমার মনে আসেনি। আমি বরং খুশি হয়ে পড়েছিলাম এই ভেবে যে, আমার উপর হঠাৎ যে প্রচ- চাপ এসেছিল এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে তার অবসান হয়ে গেল।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান পুনর্নির্বাচিত, সংসদেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা

নির্বাচনে বিজয়ের পর ইস্তাম্বুলে রজব তাইয়্যেব এরদোগান
এ কে পার্টির নেতা রজব তাইয়্যেব এরদোগান তুরস্কের ১৩তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি পেয়েছেন প্রায় ৫৩ শতাংশ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধী দল সিএইচপির প্রার্থী মুহাররম ইনজে পেয়েছেন ৩১ শতাংশ ভোট।
দেশটির কেন্দ্রীয় নির্বাচন কাউন্সিলের প্রধান সাদি গুভেনে বলেছেন, ‘প্রেসিডেন্ট এরদোগান সব বৈধ ভোটে নিশ্চিতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছেন।’ তবে আর কোনো বিস্তারিত কিছু বলেননি তিনি।
তুরস্কের ডেইলি সাবাহ জানিয়েছে, ৯৯.২ শতাংশ ভোট গণনার পর দেখা গেছে, এরদোগান পেয়েছেন ৫২.৫ শতাংশ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী মুহাররেম ইনজে পেয়েছেন ৩০.৭ শতাংশ ভোট।
বিরোধী দল এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পরাজয় মেনে নেয়নি। তারা বলেছে, ফলাফল যা-ই হোক না কেন,তারা গণতন্ত্রের জন্য লড়াই চালিয়ে যাবে। এর আগে তারা বলেছিল, নির্বাচনের প্রথম রাউন্ডেই জয় পাবেন না এরদোগান।
মুহাররেম ইনজে
এদিকে, রাত ৩টার পর ইস্তাম্বুলে একে পার্টির সদরদপ্তরের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেয়ার সময় রজব তাইয়্যেব এরদোগান বলেন 'নির্বাচনের বেসরকারি ফলাফলে এটা স্পষ্ট যে, প্রেসিডেন্ট হিসেবে আমি জনগণের আস্থা অর্জন করতে পেরেছি।'
সমর্থকদের উদ্দেশে দেয়া ভাষণে এরদোগান বলেন, “আগামীকাল থেকে শুরু করছি, আমাদের জনগণকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছি তা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করব আমরা।”
তিনি বলেন, “প্রায় ৯০ শতাংশ ভোটার উপস্থিতির মাধ্যমে তুরস্ক দুনিয়াকে গণতন্ত্রের শিক্ষা দিয়েছে। এ নির্বাচনে তুরস্কের জনগণ, এ অঞ্চল এবং দুনিয়ার সব নিপীড়িত মানুষের বিজয় অর্জিত হয়েছে।”
এরদোগান বলেন, “শাসক নয়, বরং সবসময় জনগণের সেবক হওয়ার চেষ্টা করেছি। আমার দেশের জনগণ এ ব্যাপারে অনেক সজাগ।”
তুরস্কের কর্তৃপক্ষ আরও কঠোরভাবে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করবে বলেও ঘোষণা দেন তিনি।
এর আগে, তুর্কি সরকারের মুখপাত্র বেকির বোজদাগও এক টুইটার বার্তায় এরদোগানের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার দাবি করেছেন। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রদত্ত ভোটের ৯৪ শতাংশ গণনা শেষে তিনি ওই টুইট করেন।
নির্বাচিত হওয়ার পর ভাষণ দেন এরদোগান
তুরস্কের এবারের নির্বাচনে ৮৭.৫ শতাংশ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। তুরস্কের দৈনিক সাবাহ জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ৯৯.২ শতাংশ ভোট গণনায় এরদোগান পেয়েছেন ৫২.৫ শতাংশ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি সিএইচপি প্রার্থী মোহারেম ইনসে পেয়েছেন ৩০.৭ শতাংশ ভোট।
এছাড়া, এইচডিপির সালাদিন ডেমিরেটাস পেয়েছেন ৮.৪ শতাংশ, গুড পার্টির মেরেল আকসেনার পেয়েছেন ৭.৩ শতাংশ এবং সাদাত পার্টির টেমেল কারামোলাগ্লু পেয়েছেন ০.৯ শতাংশ ভোট।
এদিকে, সংসদ নির্বাচনে ৯৬ শতাংশ ভোট গণনায় শাসক পিপলস জোটের একে পার্টি পেয়েছে ৪২.৫ শতাংশ (আসন ২৯৩), এমএইচপি পেয়েছে ১১.১ (আসন ৫০) শতাংশ। পিপলস জোটের পেয়েছে ৫৩.৬ ভাগ (৩৪৩ আসন)।
অন্যদিকে, বিরোধী নেশন জোটের সিএইচপি পেয়েছে ২২. শতাংশ (আসন ১৪৬), গুড পার্টি পেয়েছে ১০ শতাংশ (আসন ৪৪) এবং সাদাত পার্টি পেয়েছে ১.৪ শতাংশ ভোট। নেশন এলায়েন্স জোটের প্রার্থীরা মোট ভোট পেয়েছে ৩শতাংশ (আসন ১৯০)। জোট বহির্ভুত কুর্দি দল এইচডিপি পেয়েছে ১১. শতাংশ ভোট (আসন ৬)
ভোট দিচ্ছেন এরদোগান
তুর্কি পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার জন্য মোট আসন ৬০০ আসনের মধ্যে ৩০১ আসন দরকার হয়। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার চেয়ে বেশি আসন পেয়েছে সরকারি জোট।
তুরস্কের সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিড্টে নির্বাচনে প্রার্থীদের কেউ ন্যূনতম পঞ্চাশ শতাংশ ভোট না পেলে নির্বাচন গড়াবে দ্বিতীয় দফায়। সর্বোচ্চ ভোট পাওয়া দুই প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বীতা করবেন দ্বিতীয় দফায়। প্রথম দফা নির্বাচনের পনের দিন পর অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় দফা নির্বাচন। যদিও ইতোমধ্যেই পঞ্চাশ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে গেছেন এরদোগান। তাই দ্বিতীয় দফায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো প্রয়োজন হবে না।
আঙ্কারায় একে পার্টির সমর্থকদের বিজয়োল্লাস
এরদোগান ২০০৩ সাল থেকে তুরস্কের ক্ষমতায় আছেন। তিনি টানা ১১ বছর প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন শেষে তিনি ২০১৪ সালের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিজয়ী হন। ২০১৬ সালের এক ব্যর্থ গণঅভ্যুত্থানের পর ২০১৭ সালে এক গণভোটে সামান্য ব্যবধানে জয়লাভ করেন এরদোগান। এতে তিনি দেশটিকে সংসদীয় ব্যবস্থা থেকে প্রেসিডেন্টশাসিত ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাওয়ার জনরায় পান। এরদোগানএবারের নির্বাচনে জয়লাভ করায় দেশটির প্রধানমন্ত্রীর পদ বিলুপ্ত হবে। প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি সরকারি কর্মকর্তা,ভাইস প্রেসিডেন্ট,মন্ত্রীদের নিয়োগ দেবেন এবং যেকোনো সময় সংসদ ভেঙে দিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করতে পারবেন।

Tuesday, June 26, 2018

রূপান্তরিত মারণাস্ত্রে জীবনের আর্তি

শিল্পী মাজদি আবু তাক্কিয়েহ`র শিল্পকর্ম
সময়টা নব্বই দশক। ফিলিস্তিনি জাতিসত্তার আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার দাবিতে প্রথম ইন্তিফাদা চলমান। সেই সময় থেকেই ইসরায়েলি মারণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ সংগ্রহ করে যাচ্ছেন পৃথিবীর বৃহত্তম উন্মুক্ত কারাগারখ্যাত অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় বেড়ে ওঠা শিল্পী মাজদি আবু তাক্কিয়েহ। উদ্দেশ্য, দখলদার বাহিনীর অমানবিক কর্মকাণ্ডের ঐতিহাসিক স্মৃতি ধরে রাখা। ব্যবহৃত গুলির খোসা, ফিলিস্তিনিদের শরীর ভেদ করে যাওয়া গুলির অবশেষ কিংবা টিয়ারশেলের কৌটা; তাক্কিয়েহ যেখানেই ইসরায়েলি নৃশংসতার আলামত পেতেন, সেখান থেকেই তা কুড়িয়ে নিতেন। সংগ্রহে রাখতেন নৃশংসতার ঐতিহাসিক আলামত হিসেবে। সম্প্রতি ফিলিস্তিনিদের ভূমি দিবসের কর্মসূচি গ্রেট রিটার্ন মার্চ-এ ইসরায়েলি নৃশংসতার আধিক্য তার মনোজগতে প্রতিরোধ জোরালো করার তাগিদ সৃষ্টি করে। প্রতিবাদের অংশ হিসেবে মারণাস্ত্রের অবশেষকে তিনি রূপান্তর করতে শুরু করেন ক্ষুদ্রাকৃতির মূর্তি/ভাস্কর্যে। তাক্কিয়েহ’র কাছে এটা প্রতিবাদেরই এক ভিন্ন পথ। এর মধ্য দিয়ে তিনি ফিলিস্তিনিদের অহিংস প্রতিরোধকে প্রতীকায়িত করতে চান। ছড়িয়ে দিতে চান জীবনের প্রতি ফিলিস্তিনিদের ভালোবাসার বার্তা। ছড়িয়ে দিতে চান জীবনের আহ্বান।
গাজা-ইসরায়েল সীমান্তে প্রায় প্রতিদিনই ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত গুলির অবশেষ সংগ্রহ করে ফেরেন মাজদি। বুলেটের ধ্বংসাবশেষ, টিয়ারগ্যাসের খালি কৌটা এমনকি হাসপাতাল থেকে ফিলিস্তিনিদের গায়ে লাগা ইসরায়েলের গুলির অবশেষও স্মারক হিসেবে সংগ্রহ করেন তিনি। ১৯৯১ সালে ফিলিস্তিনের প্রথম জাতিমুক্তি আন্দোলন প্রথম ইন্তিফাদা থেকেই এই অভ্যাস গড়ে তুলেছেন তিনি। তবে সদ্য সমাপ্ত গ্রেট মার্চ অব রিটার্ন কর্মসূচীতে ইসরায়েলের আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহারের আধিক্যের পর আবু তাক্কিয়েহ তার স্মারককে শিল্পে পরিণত করেছেন তিনি। ছোট ছোট মূর্তি বা ক্ষুদ্রাক্রিতির (মিনিয়েচার) স্থাপনা শিল্পে পরিণত করার কাজ করেন তিনি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিষয়ক সংবাদ মাধ্যম মিডলইস্ট আই এই শিল্পীর খবর সামনে এনেছে।
জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ৩০ মার্চ ভূমি দিবসের বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১২০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। আহত হয়েছে কয়েক হাজার ফিলিস্তিনি। সেই আহত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে ছিলেন শিল্পী  তাক্কিয়েহ’র ছোট ভাইও। ইসরায়েলি স্নাইপারের অব্যর্থ নিশানা বিদ্ধ করে তার দুই পা। ইসরায়েলি সীমান্তবেড়ার ৭০০ মিটার দূরে গুলিবিদ্ধ হন তাক্কিয়েহ’র ১৯ বছর বয়সী সহোদর। তার ডান পায়ের স্নায়ুগুলো সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। সেখানে থেকে গেছে গুলির অবশেষ। চিকিৎসা চলতে থাকা ছোট ভাইটি এখনও হাঁটতে পারে না। তার চিকিৎসকদের কাছ থেকে ভাইয়ের পায়ে বিদ্ধ হওয়া একটি গুলি নিজের সংগ্রহে নিয়ে আবু তাক্কিয়েহ তাকে রুপান্তর করেন একটি কনানীয় (জর্ডান নদীর পশ্চিম তীরে প্রাচীন ফিলিস্তিনি বাসিন্দা) মিনিয়েচার সৈনার। তার ভাষ্য, ‘কনানীয়রা আমাদের পূর্বপ্রজন্ম। তারাই প্রথম ফিলিস্তিনে এসেছিলেন।’ তাক্কিয়েহ জানান, গুলিকে কনানীয় সৈন্যে রুপান্তরের মধ্য দিয়ে তিনি বাস্তবত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে নিজেদের বসবাসের অধিকারকে প্রতীকায়িত করার চেষ্টা করেছেন।
শিল্পী মাজদি আবু তাক্কিয়েহ`র শিল্পকর্ম
শিল্পী মাজদি আবু তাক্কিয়েহ`র শিল্পকর্ম
কনানীয়রা ভূমধ্যসাগরের পূর্বপ্রান্তের আদিবাসী, কয়েক হাজার বছর আগে প্রাচীন ফিলিস্তিন যার অংশ ছিল। আদি বাইবেলের ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েলিরা তাদের সেখান থেকে বিতাড়িত করে। মানববিদ্যার সাম্প্রতিক এক গবেষণা অবশ্য বলছে, প্রাচীন কনানীয়দের বংশধরেরা এখনও অস্তিত্বশীল, যারা আধুনিক লেবাননে বসবাস করছেন। আবু তাক্কিয়েহ বলেন, ‘এইসব সহিংস অস্ত্রকে আমি হাতে তৈরি শান্তিপূর্ণ মূর্তি আর মিনিয়েচার শিল্পে পরিণত করেছি।’ তিনি জানান, ইসরায়েলি দখলদারিত্ব আর অবরোধের বিরুদ্ধে এটিই তার প্রতিবাদ।
তিন সন্তানের পিতা ৩৮ বছর বয়স্ক আবু তাক্কিয়েহ একজন সাবেক নৌসেনা। বর্তমানে অবসর যাপনকারী এই ফিলিস্তিনি ১৩ বছর বয়সে কয়লা দিয়ে প্রথম ছবি আঁকা শুরু করেন। ১৫ বছর বয়সে কাঠ খোদাই শুরু করেন তিনি। তার একটি ভাস্কর্যে ফিলিস্তিনি মানচিত্রের সঙ্গে টেম্পল মাউন্টের স্বর্ণ-গম্বুজের দেখা মেলে। সঙ্গে পাওয়া যায়, ইসরায়েলি সীমান্তের কাঁটাতারে খোদিত এক চাবি। ৪৮ ঘণ্টায় নির্মিত আবু তাক্কিয়েহর ওই শিল্পকর্মটি ইসরায়েলের দখলদারিত্বের প্রতীক।  তিনি জানান, একটি কাজ শুরুর পর শেষ না করে বিশ্রাম নিতে পারেন না তিনি। তিনি বিশ্বাস করেন একদিন তার শিল্পকর্মের প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে মূর্ত হবে ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামের বাস্তবতা। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের জন্য এটি ‘ফিলিস্তিনিদের জীবনের প্রতি ভালোবাসা’র বার্তা।
শিল্পী মাজদি আবু তাক্কিয়েহ
শিল্পী মাজদি আবু তাক্কিয়েহ
‘গ্রেট রিটার্ন মার্চ’ নামের সাম্প্রতিক কর্মসূচিকে শিল্পকর্মে ধরে রাখতে আবু তাক্কিয়েহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করেছেন। দুই রাত নির্ঘুম কাটিয়ে নির্মিত ওই শিল্পকর্মে বুলেট আর টিয়ার গ্যাসের খালি কৌটার মতো অস্ত্র-সরঞ্জামকে ব্যবহার করে কর্মসূচির ঐতিহাসিক স্মৃতি ধরে রাখতে চেয়েছেন তিনি। ওই কর্মসূচি নিয়ে নির্মিত নিজের শিল্পকর্মে আবু তাক্কিয়েহ বিক্ষোভকারীদের অবস্থান করার তাঁবু ও বিক্ষোভকারীদের আহত হওয়ার দুঃসহ অভিজ্ঞতার চিহ্নও ধরে রেখেছেন। কর্মসূচিতে সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু বানানোর স্মারক হিসেবে একটি স্ট্রেচার, একটি হেলমেট ও প্রেস লেখা একটি ভেস্টও রয়েছে তার শিল্পকর্মের তালিকায়। সাংবাদিকদের সুরক্ষায় কাজ করা প্যারিসভিত্তিক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টের তথ্য অনুযায়ী এবছরের গ্রেট রিটার্ন অব মার্চ কর্মসূচিতে এ পর্যন্ত ইসরায়েলের ছোঁড়া গুলিতে আহত হয়েছেন ১৫ সাংবাদিক। এর মধ্যে ইয়াসির মুর্তজা ও আহমেদ আবু হুসেইন নামে দুইজন পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিহত হন। আবু তাক্কিয়েহের শিল্পকর্মটিতে রয়েছে দুই পায়ে গুলিবিদ্ধ এক কিশোরও। ফিলিস্তিনি পতাকার রংয়ে বানানো একটি ঘুড়ি সীমান্ত এলাকায় ওড়ানোর সময়ে গুলিবিদ্ধ হয় সে।
গ্রেট রিটার্ন মার্চ কর্মসূচিকে শিল্পে রুপ দিয়েছেন শিল্পী মাজদি আবু তাক্কিয়েহ
গ্রেট রিটার্ন মার্চ কর্মসূচিকে শিল্পে রুপ দিয়েছেন শিল্পী মাজদি আবু তাক্কিয়েহ
তাক্কিয়েহের কাজের পদ্ধতি বেশ শ্রমসাধ্য। তার প্রতিটি শিল্পকর্মই স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। প্রথমে তিনি একটি স্টোভের ওপর রেখে মারণাস্ত্রের অবশেষে তাপ প্রয়োগ করেন। এতে নরম হয়ে যাওয়া বস্তুটি বাঁকানো সহজ হয়ে যায় তার জন্য। পর্যাপ্ত গরম হওয়া বস্তুকে হাতুড়ি দিয়ে চ্যাপ্টা করে নেন তিনি। পর্যায়ক্রমে ধারালো ফাইল আর ব্লেড ব্যবহার করে সেটিকে স্থাপত্যের সুনির্দিষ্ট আকৃতি দেন তিনি। সবশেষে তেল রং ব্যবহার করে শিল্পকর্মকে পূর্ণাঙ্গ করেন তিনি। ৩০ বছর বয়সী স্ত্রী ওয়ালা বিভিন্ন ধারণা দিয়ে আর শিল্পকর্মে রং লাগিয়ে তাক্কিয়েহকে সহযোগিতা করেন। এছাড়া আবু তাক্কিয়েহ তাকে স্থাপত্যের ওপরে ধারালো ফাইল আর ব্লেড ব্যবহার শেখান। ওয়ালা বলেন, স্বামীর প্রতিটি শিল্পকর্ম তাকে গর্বিত করে। কারণ তিনি তার জীবনের একটা বড় অংশ ব্যয় করছেন ফিলিস্তিনিদের শান্তির আহাজারি বিশ্বব্যপী ছড়িয়ে দেওয়ার কাজে।
স্ত্রী ওয়ালার সঙ্গে শিল্পী মাজদি আবু তাক্কিয়েহ
স্ত্রী ওয়ালার সঙ্গে শিল্পী মাজদি আবু তাক্কিয়েহ
শিল্প আর কষ্ট-বেদনার সম্পর্ক পারস্পরিক বলেই কিনা, গ্রেট রিটার্ন মার্চ সংক্রান্ত শিল্পকর্মটি নির্মাণ করতে গিয়ে তাক্কিয়েহেকে যেতে হয়েছে কঠোর বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। কর্মসূচি চলাকালীন গাজা উপত্যকা থেকে সংগ্রহ করা একটি বুলেট গরম করার সময়ে তা আবু তাক্কিয়েহের হাতেই বিস্ফোরিত হয়। আঙুলে আঘাত পেয়ে আহত হন তিনি।
২০১৭ সালে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের জোর করে অবসরে পাঠানো ৬ হাজার সরকারি কর্মচারির একজন আবু তাক্কিয়েহ। তিনি জানান, খুব কষ্ট করে পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় বাড়িভাড়া আর নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারেন। প্রতিবাদী শিল্পকর্মের মাধ্যমে তিনি অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার পরিস্থিতিকে মূর্ত করতে সক্ষম হন। তবে শিল্পকর্মে প্রতিবাদ শাণিত করতে তার আরও কিছু সরঞ্জাম কেনা দরকার।  দরকার মাইক্রো ফায়ারস্টিল, সিরামিক মাটি আর উন্নতমানের রং। অবরুদ্ধ গাজার বিপর্যস্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতির শিকার এই তরুণের হাতে সেসব কেনার মতো টাকা নেই। তবে তার প্রতিবাদী শিল্পকর্মকে মুনাফাবাজির উপজীব্য করতে চান না তাক্কিয়েহ। বিক্রির পরিবর্তে গাজা পরিদর্শনে আসা মানুষদের মধ্যে সুভ্যেন্যুর হিসেবে এসব বিতরণ করেন তাক্কিয়েহ।
কাজ হাতে শিল্পী মাজদি আবু তাক্কিয়েহ
কাজ হাতে শিল্পী মাজদি আবু তাক্কিয়েহ
একটি শিল্পকর্মে তাক্কিয়েহ গুলির ভেতর থেকে বের হতে চাওয়া পায়রাকে প্রতীকায়িত করেছেন। এর মধ্য দিয়ে শান্তির সপক্ষে ফিলিস্তিনিদের অব্যাহত লড়াইকেই সামনে আনতে চেয়েছেন তিনি। মিডল ইস্ট আই-এর কাছে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ইসরায়েলি সীমান্তবেড়ার কাছাকাছি যেই যাক না কেন, তাকেই মারণাস্ত্রের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়। তিনি বলেন, ‘সীমান্তে যখন গুলি সংগ্রহ করি তখন আমার জীবনও বিপন্ন হতে পারে।’ তবে মৃত্যৃর ভয়ে ভীত নন জীবনবাদী এই শিল্পী। তিনি মনে করেন, যার কাছে বিশ্বকে দেওয়ার মতো অপরিহার্য বার্তা থাকে, তা ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাকে জীবন উৎসর্গও করতে হতে পারে। ‘একজন সাংবাদিক কিংবা শিল্পী কিংবা চিত্রকর; প্রত্যেকেরই নিজ নিজ বার্তা থাকে।’ এই ফিলিস্তিনি শিল্পীর ভাষ্য, ‘আমি জীবনের ওপারে গেলেও আমার বার্তা থেকে যাবে এই পৃথিবীতে। গ্রেট মার্চ রিটার্নের গল্প প্রজন্ম ছড়িয়ে পড়বে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। কখনও তার মৃত্যু হবে না’। 

Sunday, June 24, 2018

আমি বারে বারে ইনসিস্ট করলাম, তারপর সেনাপ্রধানকে নক করলাম by মহিউদ্দিন আহমদকে সাক্ষাতকারে ব্রিগেডিয়ার বারী

এক-এগারোর ঘটনাটি যখন ঘটে, ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক মে. জেনারেল সাদেক হাসান রুমি দেশে ছিলেন না। তাঁর অনুপস্থিতিতে পরিচালকদের একজন ব্রি. জে. চৌধুরী ফজলুল বারী ডিজিএফআইয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। সেদিন তিনিও বঙ্গভবনে সেনাপ্রধান মইনের সঙ্গে গিয়েছিলেন। ওই দিনের ক্ষমতার পালাবদলে তাঁর ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। লেখককে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি খোলামেলাভাবে অনেক কথা বলেন। তাঁর অনেক কথা সেনাপ্রধানের কথার সঙ্গে মিলে যায়।
লেখক-গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর ১/১১ শীর্ষক লেখায় এসব কথা লিখেছেন। প্রথম আলোর ঈদ সংখ্যায় লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে।
লেখকের সঙ্গে তাঁর (চৌধুরী ফজলুল বারী) কথোপকথন এখানে তুলে ধারা হলো:
মহিউদ্দিন আহমদ: এক-এগারোর সময় এবং তার পরের দিনগুলোতে আপনার নাম অনেকবার শোনা গেছে। কোন পটভূমিতে এই পালাবাদল ঘটল? কী ছিল আপনার ভূমিকা? আপনি অনেক দিন ধরে জন-আলোচনায় আছেন। একটু ব্যাখ্যা করবেন কি?
চৌধুরী ফজলুল বারী: এক কথায়, দেশটা অস্থিতিশীল হয়ে গেছে। ইলেকশন হলেও অস্থিতিশীল, না হলেও অস্থিতিশীল। এখন কী করণীয়? আমি কারও বিরুদ্ধে কথা বলতে চাই না। নরমাল ইয়ের বাইরে আর্মি কেন আসবে? সবাই ঠিকমতো বেতন-ভাতা পাইতেছে! দেশ গোল্লায় যাক, নিজের বাচ্চা ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে পড়তেছে। আর কী লাগে? আমি বারে বারে ইনসিস্ট করলাম। তারপর সেনাপ্রধানকে নক করলাম। নক করলাম জেনারেল মাসুদকে। জেনারেল মাসুদকে কেন নক করলাম? কারণ, উনি বেগম জিয়ার আত্মীয়। দেখি ওনার মনোভাবটা কী।
মহি: উনি সাঈদ এস্কান্দারের ভায়রা।
বারী: লেট আস কাম ব্যাক টু দ্য ইমার্জেন্সি। সিচুয়েশন তো ভোলাটাইল হয়ে গেছে। ইমার্জেন্সি হয়ে গেছে। ইমার্জেন্সি দেওয়ার জন্য আমি জেনারেল মাসুদকে জিজ্ঞেস করলাম। বলে, আসলেই তো, দেশের যে অবস্থা হয়েছে, কিছু একটা করা দরকার। আমি বললাম, মইনের কাছে একটু খোঁজখবর নেন। আমি জানি না উনি খোঁজখবর নিয়েছেন কি না। আমি আর জিজ্ঞেস করিনি। জিজ্ঞেস করা দরকার ছিল।
ওনাকে কয়েক দিন পরপরই আমি বলি, স্যার, চিফের কাছে যান, আলাপ-টালাপ করেন। এভাবে তো একটা দেশ চলতে পারে না। বলেন, হ্যাঁ, চিফের কাছে গেছিলাম, একটু হালকা উঠাইছি, উনি তো এদিকে যায় না। মানে ডরায়, কথা বলতে চায় না। মাসুদ হইল বেগম জিয়ার আত্মীয়। এ জন্য উনি হয়তো শেয়ার করেন না কিছু।
তারপর আমি চিফের ভাইকে নক করলাম। আমি যখন র‌্যাবে ছিলাম, উনি একবার আমার কাছে গিয়েছিলেন। টিপু ভাই। ওনাকে বললাম, ভাই, এই অবস্থা। ওনাদের বলেন। প্রেসিডেন্টের কাছে গিয়ে কিছুদিনের জন্য ইমার্জেন্সি দিলে সবারই মুখরক্ষা হবে। আর বিএনপি যদি ইলেকশন করে-আমি এভাবেই বলেছিলামÑদেশে একটা কালো তিলক পড়বে, এ রকম জোর করে একটা ইলেকশন করালে। এর আগে ১৫ ফেব্রুয়ারিতে (১৯৯৬) একটা হয়েছে না? আরও একটা হবে? এগুলো বলে-টলে আমি ওনারে রিকোয়েস্ট করে পাঠালাম। উনি বললেন যে, না, সময় হয় নাই এখনো। এত তাড়াতাড়ি এগুলো করা ঠিক না। বুঝলাম, ওনার ইচ্ছা আছে, কিন্তু টাইম হ্যাজ বিকাম আ ফ্যাক্টর।
কিছুদিন পরে আমার ডিজি গেলেন ইউকে। সিচুয়েশন একদম পিকে। আমি অ্যাকটিং ডিজি। আমি গিয়া ওনাকে সিচুয়েশন ন্যারেট করলাম। তারপর উনি নিজে থেকেই বললেন যে, দেশের কী অবস্থা? বললাম, স্যার, দেশের অবস্থা এখন তো আর লুকানো নাই।
মহি: এটা চিফকে বললেন?
বারী: চিফকে, চিফের অফিসে। দেশের অবস্থা তো লুকানো নাই। মিডিয়া তো সব পাবলিশ করে। কোনো কিছু তো গোপন থাকে না। দেখছেন তো আপনি, প্রতিদিন কি হচ্ছে না হচ্ছে।
তোমার কী অভিমত?
এটা থেকে নরমালসি আনতে হলে প্রেসিডেন্টকে ইমার্জেন্সির জন্য বলতে হবে।
অন্যরা কী বলে? আর্মির অ্যাটিচ্যুড কী?
আর্মির অ্যাটিচ্যুড হলো, সেনাপ্রদান যা করবে, তারা তো তার বাইরে থাকবে না। সেনাপ্রধানের চিন্তাটা তো আসবে ওখান থেকেই, দেশের সাধারণ মানুষের অবস্থা থেকে।
তুমি আর্মির কাছে গিয়ে খোঁজ নাও।
আই টকড টু অল কমান্ডারস, জিওসিস, দু-একজন ছাড়া যাদের সঙ্গে আমার ভালো ইয়ে নাই। কারণ, এগুলি তো সাংঘাতিক কঠিন প্রশ্ন। আমি কথা বললাম। সবাই ওপিনিয়ন দিলেন যে, কিছু একটা করা উচিত। বাট নো মার্শাল ল। চিফও বলেছেন, আই অ্যাম দ্য লাস্ট ম্যান টু ডিক্লেয়ার মার্শাল ল।
ঠিক আছে। তাহলে হু উইল বি দ্য কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট? কেয়ারটেকার চিফ হওয়ার জন্য আমরা ড. ইউনূসকে বললাম। উনি বললেন যে, না।
মহি: কে কে গিয়েছিলেন তাঁর কাছে?
বারী: জেনারেল মাসুদ আর আমি। না না, তার আগে তো ইমার্জেন্সি দেওয়া হলো। এর মধ্যে আমি অনেকগুলো গ্রাউন্ডওয়ার্ক করেছি। ইমার্জেন্সি প্রক্লেমেশনের জন্য যে একটা গেজেট বের করতে হবে, গেজেটে কী লেখা থাকবে? আমি দেখলাম বঙ্গবন্ধুর আমলে ইমার্জেন্সির গেজেট আছে, এরশাদ সাহেবের আমলের একটা গেজেট আছে। দুইটা এনে দেখলামÑএকটা মডারেট ভার্সন তৈরি করলাম। আমার উদ্দেশ্য ছিল, দেশে নরমালসি আসবে। তারপর ছোটখাটো কিছু ডিজনিস আছেÑবড় আঙ্গিকের ছোটখাটো জিনিস, দলীয়করণ-টরন বাদ দিয়ে মেধাবী লোকজনকে বসানোÑএটা বোধ হয় এভাবেই করা হয়েছিল। আমি জানি না, বিচার করবেন আপনারা। কেয়ারটেকার গভর্নমেন্টের যে সদস্যরা ছিলেন, অ্যাডভাইজাররা ছিলেন, এটা আপনারা বিচার করবেন, এরা ভালো ছিল না খারাপ ছিল। হিউম্যান এরর তো থাকবেই।
ইমার্জেন্সি হলো ১১ তারিখ। ১০ তারিখ রাতে চিফের সঙ্গে আমার কথাবার্তা হয়। চিফ ১০ তারিখ রাতে আমাকে ফোন করলেন যে, বারী, একটা জিনিস তো পাওয়া গেছেÑইমার্জেন্সি ডিক্লেয়ার করার পক্ষে একটা শক্ত ডকুমেন্টÑইউএন মিশনে বাংলাদেশ থেকে সৈনিকদের আর নিবে না। এটা তো একটা বড় প্লি আমাদের জন্য। এইমটা তো ইমার্জেন্সি না, এইম হলো পিস রি-এস্টাবলিশ করা। এটা করতে গেলে, আমরা মনে করি যে, ইমার্জেন্সিক দিতে হবে। ইমার্জেন্সি করতে গেলে এটারও তো একটা সাপোর্টিং ইয়ে লাগবে। এটা আমি দেখিও নাই কোনো দিন। উনি বলছেন। আর্মিতে তো ওরাল অর্ডার বলে একটা কথা আছে। মৌখিক অর্ডার। এটা আইনসম্মত।
এটা সিওর যে উনি আমাকে রাতে ফোন করেছিলেন। আমি জেনারেল মাসুদকে বললাম, স্যার, চিফ তো বলছেন, স্যার আপনি তাড়াতাড়ি আসেন। উনি তখন সাভারে।
উনি রওনা করলেন। আসলেন আমার অফিসে। এটা ঐতিহাসিক একটা ঘটনা। বললেন, আমিনকে (ডিজিএফআইয়ের আরেকজন পরিচালক ব্রি. জে. এ টি এম আমিন) ডাকো। আমিন-এর মধ্যে ছিল না। দেশের মধ্যে একটা মোড় নিয়া নিল আমিনকে ডাইকা। এই সব লোকÑআমিন, মইন-সাধারণ মানুষের সঙ্গে এদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। এরা পড়াশোনা করছে আইসোলেটেড স্কুলে। আমিনের ফাদার সম্ভবত ফরেন মিনিস্ট্রতে ছিল, বিদেশ ঘুইরা বেড়াইছে। সাধারণ ছেলেদের সঙ্গে বসে যে ক্লাস করা, পালস বোঝা, গ্রামে কাদার মধ্যে লুঙ্গি উঠায়া আসাÑএ রকম তো দেখে নাই। এদের কাছে চিত্র এক রকম। আমাদের কাছে চিত্র এক রকম। যার ফলে তারা ফুটপাতে বাড়ি দিয়া উঠায়া দাও, মার্শাল ল কইরা ফেল, ভাইঙ্গা ফেলÑএই টাইপের অ্যাটিচ্যুড। টক শো বন্ধ কইরা দাও। আমি বললাম, আরে নরমালসি আনতে চাই আমরা। যখন ইমার্জেন্সি ডিক্লেয়ার হলো, সব টক শো বন্ধ। আমাকে তৃতীয় মাত্রার জিল্লুর সাহেব ফোন করলেন, ভাই আমি কি আপনার সঙ্গে একটু দেখা করব? আমি তখনো বঙ্গভবনে। আমি সঙ্গে সঙ্গে সেনাপ্রধানকে ফোন করলাম। স্যার, এগুলা বন্ধ করবেন না। মানুষকে কথা বলতে দিতে হবে। আমরা যদি খারাপ করি, বলুক। আমাদের বক্তব্য আমরা দিব। ভালো করলে সেটা বলবে। মানুষ তো খারাপ বলে নাই প্রথম দিকে।
যা হোক, আমিনকে আনল জেনারেল মাসুদ। তার সঙ্গে নাইন ডিভে কাজ করেছে, নাইন ডিভের আর্টিলারি কমান্ডার ছিল আমিন। আরও আগে থেকেই হয়তো পরিচয়-টরিচয় আছে। আমিনরে লাগানো হলো। আমি আমার কাজ করতে থাকলাম।
পরের দিন ১১ তারিখ মিটিং। প্রেসিডেন্টের সবাপতিত্বে আইনশৃঙ্খলা কমিটির মিটিং, ইলেকশন উপলক্ষে। ইলেকশন তো ২২ জানুয়ারি। মিটিং শুরু হলো। মিটিংয়ের মধ্যে চিফ আমাকে ফোন করে বললেন, আমি আসতেছি। তুমি থাইকো। প্রেসিডেন্টকে সব কিছু বুঝায়া বলব। সিচুয়েশন রিপোর্টটা তুমি বলবা, ফ্রম ইন্সেলিজেন্স পয়েন্ট অব ভিউ।
এর মধ্যে গোছগাছ করে আমি রেডি হয়ে গেলাম। চিফ আসরেন, বাহিনী প্রধানরা আসলেন। রাষ্ট্রপতির কাছে সময় নেওয়া হলো। উনি সময় দিলেন, লাঞ্চের পরে। তারপর ওনারা ওনাদের বক্তব্য দিলেন। সেনাপ্রধান তার বক্তব্য দিলেন। রাষ্ট্রপতি বললেন, কী করা? উনি বললেন, ইমার্জেন্সি দেওয়া।
আচ্ছা ঠিক আছে আমি একটু আলাপ-আলোচনা করে দেখি।
কেয়ারটেকার গভর্নমেন্টকে পদত্যাগ করতে হবে।
আমাকে পদত্যাগ করতে হবে নাকি?
না, আপনাকে প্রেসিডেন্টশিপ থেকে পদত্যাগ করতে হবে না। বাট অ্যাজ কেয়ারটেকার চিফ ইউ হ্যাভ টু রিজাইন।
তো মেকানিজম যা করার করা হইল। জেনারেল মাসুদ ওই দিকে থাকলেন, নাইন ডিভ নিয়া। ওনাকে রেডি রাখা হইল। এটা স্বাভাবিক। এখানে তো পিজিআর আছে, এসএসএফ আছে। তবে কেউ ইয়া করে নাই। সিচুয়েশন যা হইছিল, এ ছাড়া বিকল্প ছিল না। পলিটিশিয়ানস হ্যাভ ফেইলড। আই ডু নট হ্যাভ ডিসরেসপেক্ট।
তারা যেভাবে আগাইতেছিলেন-দেশের মানুষের দুই দিন পরে পরে পাছার মধ্যে লাথি দিয়া, সরি মহিউদ্দিন ভাই, আমি এ রকম দু-একটা শব্দ অতি ঘৃণার সঙ্গে উচ্চারণ করছি। দেশের মানুষের কী হলো না হলো এটা নয়, হিটলারের মতো কমান্ড পোস্ট বানাইয়া ওনারা কমান্ড দিতে থাকলেন আর মানুষ মরতে থাকল। ৬৮ জন মারা গেছে। হু রিমেম্বারস দেম? হুইচ পলিটিশিয়ান ইজ রিমেম্বারিং দেম?
ইমার্জেন্সি ডিক্লেয়ার হইল। বক্তৃতা আমরাই লেখায়া দিলাম। উনি কিছু কাটছাঁট করলেন। কট্টরপন্থী কোনো কিছু করা হয় নাইÑরাষ্ট্রপতি, আপনাকে এটা করতে হবে, ওটা করতে হবে। বাইরে তো নানান ধরনের গুজব, সেনাপ্রধান প্রেসিডেন্টের ইয়েকে চড় মারছেন, মুখলেছ সাহেবকে। অল বানোয়াট, বাখোয়াজ। উনিও দেখলাম লেখলেন বিশাল বড় এক পত্রিকার মধ্যে যে, আমি ট্রাক-ট্রুক নিয়া রেডি হইয়া আছি। আমি ট্রাক কই পাব? আমার ঢাল-তলোয়ার নাই, নিধিরাম সর্দার, আমি অ্যাকটিং ডিজি-জিজিএফআই। আমি এখানে আছি সেনাপ্রধানের সঙ্গে, প্রেসিডেন্টর সঙ্গে, কী হচ্ছে না হচ্ছে এগুলো নিয়ে।
যা হোক, ওনাদেরও পদত্যাগ করানো হলো। পদত্যাগ করানোর সঙ্গে সঙ্গেÑহু উইল বি দ্য কেয়ারটেকার চিফ? নাম আসল ড. ইউনূসের। তখন জেনারেল মাসুদকে বলা হলো, আমিনকে নিয়ে উনি গেলেন ওনার কাছে। ওনার প্রথম কথা হলো টাইম ফ্রেম কত দিনের জন্য?
তা তো আমরা বলতে পারি না?
কেউই বলতে পারে না মইনুদ্দিনও জানে না, কত দিন।
উনি বললেন, কম সময় যদি হয়, কোনো পরিবর্তন আনা আমার দ্বারা সম্ভব হবে না।
তারপর কাকে করা যায়? আমি সার্চ লাগাইলাম। আমার অপিসাররা বলল, স্যার, আরেকজন আছে, ফখরুদ্দীন সাহেব। আমি কল দিলাম ফখরুদ্দীন সাহেবকে।
মহি: ফখরুদ্দীন সাহেবের নাম কি ড. ইউনূস সাজেস্ট করেছিলেন, না-কি এটা আপনার চয়েস?
বারী: এটা একদম আমাদের সার্চ। আমরা তো দীর্ঘদিন ধরেই কেয়ারটেকার গভর্নমেন্টের নামধাম চর্চা করতেছি। আমি তখন ওনাকে ফোন করলাম। দেখেন, আগে থেকে কিন্তু আমাদের পরিকল্পনা নাই। এগুলি ইনস্টেন্টলি আসতেছে, একটার পর একটা।
যদি ক্যু করার চিন্তা, ক্ষমতার চিন্তা থাকত, তাহলে তো জেনারেল এরশাদের মতো ছক কইরা ফেলতাম, দুই বছর কী করব, তিন বছর কী করব, চার বছর কী করব? এক্সপার্ট লাগাইতাম। এগুলো তো আমরা নিজেরা নিজেররাÑনরমালসি আনার জন্য, সবই বহাল থাকবে, সবাই যার যার জায়গায় থাকবে।
ফখরুদ্দীনের বাসায় ফোন করলাম। ড. ইউনূসের বাসা থেকেই তারা সোজা চলে গেলেন। উনি বললেন, আমাকে একটু সময় দেন। উনি ওনার ওয়াইফের সঙ্গে কথা বললেন। তারপর বললেন, ঠিক আছে।
মহি: একটা গসিপ শুনেছি, আপনারা যখন প্রফেসর ইউনূসকে অ্যাপ্রোচ করলেন, উনি টাইম ফ্রেমের ব্যাপারে অ্যাগ্রি না করায় উনি নাকি ফখরুদ্দীন সাহেবের নাম প্রস্তাব করেছেন?
বারী: না। আমার নোটবইটা আনতে পারলে দেখাইতে পারতাম, এখন পর্যন্ত নামটা লেখা আছে। ফরিদ আর মশিউর সাহেব ছিল আবার অফিসার। ফরিদ ছিল জি-ওয়ান, আর মশিউর ছিল সিভিল। এদেরকে বললাম, নাম বাইর কর। ওরা ওনার নাম প্রপোজ করল।
মহি: ফরিদ কি আর্মির লোক?
বারী: আর্মির, মশিউর সিভিলিয়ান। আমাকে কোনো কাজ দিলে আমি তো ভিশনটা এদের দিয়া দিইÑআমার এই এই দরকার, এটা বাইর কর।
মহি: ফরিদের পুরো নাম কী।
বারী: ফরিদুল ইসলাম বোধ হয়।
মহি: উনি কি ওই সময় মেজর ছিলেন?
বারী: না, লে. কর্নেল। তো এরা বাইর করল ওনার নাম। ফোন নম্বর ছিল। ওই নম্বরেই যোগাযোগ করি।
মহি: তাহলে বলছেন, এটা আপনার ইনিশিয়েটিভে হয়েছে?
বারী: কোনটা?
মহি: ফখরুদ্দীন সাহেবেরটা।
বারী: না। এরপর যখন প্যানেল করা হইল, প্যানেলের মধ্যে আমরা ২০-২৫ জনের নাম নিয়া আসছি। তারপর চিফের কাছে গিয়া সবাই মিলে আলোচনা কইরা-ওনাকে দেখ, ওনাকে নক কর।
ইভেন আমি শাইখ সিরাজকে-আমি চাইছি একটা ইয়ং অ্যাডভাইজার গ্রুপ, ডাইনামিক, পরীক্ষিত কাজের লোক। চিন্তাধারা-মতাদর্শ যা-ই হোক। হোসেন জিল্লুর রহমান-এগুলি এন্টায়ারলি আমি করছি। ইভেন আনিসুল হকের কথা আমি বলছিলাম।
মহি: ইফতেখারুজ্জামানের কথা কি আপনি বলেছিলেন?
বারী: হ্যাঁ, ইফতেখারুজ্জামান আমার লিস্টে ছিলেন। নন-মুসলিম হিসেবে নাম দরকার ছিল। তারপর তপন বাবুর নাম ছিল। তারপর আরও একজন ‘হিন্দু’ ছিল। নামটা ভুলে গেছি। মহিলা ছিলেন একজন, সিলেটের। উনি তখন ইন্ডিয়ায় ছিলেন। ইন্ডিয়ায় আমি ফোন করছি। ফোন কইরা বলছি, আপনি চইলা আসেন তাড়াতাড়ি।
মহি: এ রকম কেউ ছিল লিস্টে, আপনি চাচ্ছিলেন কিন্তু উনি রিফিউজ করেছে?
বারী: শাইখ সিরাজ।
মহি: ইফতেখারুজ্জামানও আসেন নাই।
বারী: উনি আসেন নাই বা কেউ একজন চায় নাই-এই দুইটার একটা হবে।
মহি: মইনুল হোসেনকে পরে বাদ দেওয়া হলো কেন?
বারী: ওনার কথাবার্তা একটু...। মানুষ তো হান্ড্রেড পার্সেন্ট পারফেক্ট পাওয়া মুশকিল। ওনার মতো স্ট্রেচারের লোক দরকার ছিল।
মহি: ফাইনাল সিলেকশন তো চিফ করেছেন?
বারী: চিফই করেছেন, তবে অন্যদের সঙ্গে কনসাল্ট করে। আমরা লিস্ট দিছি।
মহি: একাডেমিক কাউকে পান নাই? ঢাকা ইউনিভার্সিটির?
বারী: একজনের নাম ছিল, জেনারেল মাসুদের ভায়রা। এ কারণেই ওনাকে আর করা হয় নাই। যেহেতু হি ইজ আ রিলেটিভ অব দ্য সিনিয়র মিলিটারি অফিসার।
মহি: ওই ক্যাবিনেটে ফখরুদ্দীন সাহেবের তো দুই জন রিলেটিভ ছিল?
বারী: কিন্তু এরাতো নিজস্ব গুনে এসেছিল। ফখরুদ্দীনের আত্মীয় বলেতো বাদ দিয়ে দেয়া যায় না। ফখরুদ্দীনের নিজের আত্মীয় না, ওনার ওয়াইফের দিক দিয়া আত্মীয়।
মহি: এখানে ফখরুদ্দীন সাহেবের কোন চয়েস ছিল না?
বারী: না। ফখরুদ্দীন সাহেব তো নিজেই পিকড আপ। হি নেভার নিউ অ্যাবাউট দ্য ইমার্জেন্সি।

লঞ্চে ধারণ ক্ষমতার ৩ গুণ যাত্রী by মোরশেদ আলম

ঈদের সাতদিন পরেও প্রতিটি লঞ্চ ধারণ ক্ষমতার চাইতে ৩ গুণ বেশি যাত্রী নিয়ে চাঁদপুর লঞ্চঘাট ত্যাগ করছে। পরিবারের সঙ্গে পবিত্র ঈদুল ফিতর উদযাপন শেষে কর্মমুখী মানুষ তাদের কাজে যোগ দিতে গন্তব্যস্থলে যাওয়ার জন্য শরীয়তপুর জেলার চরাঞ্চল, রায়পুর, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, ফেনী জেলাসহ আশপাশের জেলার লোকজন যাতায়াতের সহজ পথ নৌ-পথ হওয়ায় বেশিরভাগ মানুষই লঞ্চে যাতায়াত করে। এই সুযোগে লঞ্চ কর্তৃপক্ষ তাদের ইচ্ছেমতো যাত্রী নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা করে যাচ্ছে। চাঁদপুর-ঢাকার মধ্যে চলাচলকারী যাত্রীবাহী লঞ্চগুলো ঈদ শেষে কর্মস্থলের অভিমুখে যাওয়া যাত্রীদের জীবনের দিক বিবেচনা না করে ধারণ ক্ষমতার বাইরে ২/৩ গুনেরও বেশি যাত্রী নিয়ে চাঁদপুর ত্যাগ করেছে। যাত্রীরা গন্তব্যে যাওয়ার জন্য জীবনের দিক বিবেচনা না করেই হুড়োহুড়ি করেই রাতে ও দিনের বেলায়ও লঞ্চে উঠছে। বৃহস্পতিবার রাতে ও শুক্রবার দিনের বেলায় চাঁদপুর লঞ্চঘাটের এমন চিত্রই লক্ষ্য করা গেছে। এতে করে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে। লঞ্চগুলোতে উপচে পড়া ভিড়ে যেমন দুর্ঘটনার ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিশু ও নারীসহ যাত্রীদের। এ অতিরিক্ত যাত্রী বহন না করার জন্য জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড ও ঈদ উপলক্ষে দায়িত্বরত স্কাউট বাহিনীর সদস্যরা দেখেও না দেখার ভান করছে। তারা তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন না করায় লঞ্চগুলো অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ঢাকা অভিমুখে পাড়ি জমাচ্ছে। তবে অতিরিক্ত যাত্রীর কথা স্বীকার করেননি বন্দর ও পরিবহন কর্তৃপক্ষ।
বৃহম্পতিবার রাতে চাঁদপুর নৌ-টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, হাজার হাজার যাত্রী নৌ-টার্মিনালে অবস্থান করছে। লঞ্চগুলো টার্মিনালে ভিড়ার সঙ্গে সঙ্গেই যাত্রীরা হুড়োহুড়ি করে লঞ্চে উঠছে বসার জায়গা দখল করার জন্য। যাত্রীরা প্রথম- দ্বিতীয়- তৃতীয় শ্রেণির আসন ও সংরক্ষিত কেবিন না পেয়ে কর্মস্থলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে লঞ্চের নিচের ডেকে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার ফ্লোরে চাদর বিছিয়ে ও কেবিনের সামনে করিডোরে হাঁটার রাস্তায় আসন দখল করতে দেখা যাচ্ছে। এতে করে লঞ্চের ভিেতরে তিল ধারণের জায়গা পর্যন্ত নেই। কোনো যাত্রীকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে হলে বসা যাত্রীদের পায়ে মাড়িয়ে যেতে হয়। প্রতিটি লঞ্চের ধারণ ক্ষমতা ১ হাজার বা তার নিচে হলেও লঞ্চগুলো প্রায় ৩ গুনেরও বেশি যাত্রী নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করছে। চাঁদপুর লঞ্চঘাট থেকে গতকাল রাতে এমভি মিতালী-৪, এমভি ইমাম হাসান-১ ও ২, এমভি জমজম-১, তাকওয়া, এমভি ময়ুর-২ ও ৭, সোনার তরীসহ ৮-১০টি লঞ্চকে উপচে পড়া যাত্রী নিয়ে রাতের আঁধারে চাঁদপুর নৌ-টার্মিনাল ত্যাগ করতে দেখা যায়। যাত্রীদের হুড়োহুড়ি করে উঠতে দেখে মনে হচ্ছে তারা যেন এ লঞ্চটিতে না উঠলে তাদের জন্য কোনো লঞ্চই আর নৌ-টার্মিনালে আসবে না। তাই তারা জীবনের দিক বিবেচনা না করে জীবনবাজি রেখে লঞ্চে উঠছে। শুক্রবার সরজমিন লঞ্চঘাট গিয়ে দেখা গেছে, নির্ধারিত সময়ের আগে লঞ্চগুলোর স্বাভাবিক নিয়মানুযায়ী যাত্রী হলেও ছাড়ছে না। নির্দিষ্ট সময়ে প্রায় ২ থেকে আড়াই হাজার যাত্রী নিয়ে ছাড়ছে লঞ্চগুলো। সকাল থেকে এমভি সোনার তরী, এমভি রফ রফ, এমভি ঈগল অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে চাঁদপুর ঘাট ছেড়েছে। রামপুর থেকে আসা যাত্রী রাসেল মন্তব্য করেন বলেন, কর্মমুখী মানুষ ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে যাবেন- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে যেন দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে না পড়েন সে বিষয়ে লঞ্চ মালিক ও বিআইডব্লিউটিএর দায়িত্বরতদের আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। ওই যাত্রী আরো জানান, দিনের চাইতে রাতের বেলা যাত্রীবাহী লঞ্চগুলোতে উপচেপড়া ভিড় পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রতিটি লঞ্চ ধারণ ক্ষমতার চাইতে ২-৩ গুন বেশি যাত্রী নিয়ে রাতের অন্ধকারে চাঁদপুর নৌ-সীমানা থেকে পাড়ি দিয়ে পদ্মা-মেঘনা, ধলশ্বরী ও বুড়িগঙ্গা নদী দিয়ে ঢাকা অভিমুখে যাচ্ছে। দিনের বেলা লঞ্চগুলো কর্মমুখী অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে পারাপারের সময় দুর্ঘটনা ঘটলে যাত্রীরা দিনের আলোতে সাঁতরিয়ে নদী পাড়ি দিয়ে বা অন্য কোনো মাধ্যমে জীবন বাঁচানো সম্ভব হলেও রাতের আঁধারে দুর্ঘটনায় পড়লে জীবন বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়বে।
লঞ্চ মালিক প্রতিনিধি রুহুল আমিন জানান, চাঁদপুর-ঢাকা-চাঁদপুর নৌরুটে ভ্রমণ আরামদায়ক হওয়ার কারণে যাত্রীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে এ রুটে ২২টি বিলাসবহুল লঞ্চ যাতায়াত করে। চাঁদপুর জেলাসহ পার্শ্ববর্তী জেলা নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও শরীয়তপুর জেলার আংশিক মানুষ এখন এ রুটে যাতায়াত করেন। ঈদুল ফিতরের ছুটি শেষে এখন কর্মমুখী মানুষগুলো নিজ গন্তব্যে ফেরার জন্য লঞ্চেই যাওয়া শুরু করেছেন। তিনি আরো জানান, ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী লঞ্চে না উঠার জন্য বললেও যাত্রীরা তা শুনছে না। বাধ্য হয়ে লঞ্চগুলো অতিরিক্ত যাত্রীর কারণে নির্ধারিত সময়ের ২০-৩০ মিনিট পূর্বে ঘাট ত্যাগ করতে হচ্ছে।
লঞ্চ মালিক প্রতিনিধি বিপ্লব সরকার জানায়, ঈদের পরে তেমন ভিড় ছিল না। হঠাৎ যাত্রী সংখ্যা বেড়ে গেছে। যাত্রীদের না ওঠার জন্য নিষেধ করলেও তারা জোরপূর্বক লঞ্চে উঠছে। এই কারণে নির্দিষ্ট যাত্রীর চাইতে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে লঞ্চগুলো চাঁদপুর থেকে ছেড়ে যাচ্ছে। যাত্রীর চাপ থাকায় যাত্রী পারাপারের জন্য ২টি ম্পেশাল লঞ্চ দেয়া হয়েছে। দুপুর ১২টায় এমভি-মিতালী-৭ ও দুপুর ১টা ১৫ মিনিটে এমভি নিউ আল বোরাক-চাঁদপুর থেকে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে চাঁদপুর থেকে ঢাকা গিয়েছে। শুক্র ও শনিবার এ দুদিন যাত্রী চাপ বেশি থাকবে।
ঈগল, ময়ুর, বোগদাদীয়া, ইমাম হাসান সহ কয়েকটি লঞ্চের চাঁদপুর ঘাটের দায়িত্বরত মালিক প্রতিনিধি আলী আজগর সরকার জানান, যাত্রীরা ইচ্ছে করেই ঈদের পরে না গিয়ে হঠাৎ করে এখন ঢাকা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেছে। লঞ্চে না উঠার জন্য বারণ করলেও তাদের থামিয়ে রাখা যায় না। তারা জোড় করে লঞ্চে উঠে। যার ফলে লঞ্চগুলো নির্ধারিত সময়ের আগেই ঘাট ত্যাগ করছে।
চাঁদপুর বন্দর ও পরিবহন কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক জানান, স্বাভাবিকের চাইতে বেশি যাত্রী যাচ্ছে। ওভারলোডিংও হচ্ছে। সেটি সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। সিডিউল মোতাবেক লঞ্চ না আসায় সীমিত লঞ্চ হওয়ায় আমরা অতিরিক্ত যাত্রী বহনের সুযোগ দিচ্ছি। বর্তমান সময়ে ঈদুল ফিতরের পর অতিরিক্ত যাত্রী বহন অপরাধ হলেও লঞ্চ সীমিত হওয়ায় জরিমানা করা হচ্ছে না।

দেশে হৃদরোগে মৃত্যুর ৩০ শতাংশের কারণ ধূমপান by তাসকিনা ইয়াসমিন

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডাব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, সারাবিশ্বে প্রতিবছর ২০ লাখ মানুষ তামাক ব্যবহারের কারণে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। বাংলাদেশে প্রতিবছর হৃদরোগে আক্রান্ত মৃত্যুর ৩০ শতাংশের জন্য দায়ী ধূমপান। এ ছাড়া ক্যানসারজনিত মৃত্যুর ৩৮ শতাংশ, ফুসফুসে যক্ষ্মার কারণে মৃত্যুর ৩৫ শতাংশ এবং অন্যান্য শ্বাসতন্ত্রজনিত রোগে মৃত্যুর ২৪ শতাংশের পেছনে রয়েছে ধূমপান। অর্থাৎ দেশে শুধু তামাকের কারণে প্রতিবছর ১ লাখ মানুষ মারা যায়। ৩ লাখ ৮২ হাজার মানুষ পঙ্গু হয় এবং ১২ লাখ মানুষ তামাকজনিত বিভিন্ন রোগে ভোগে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা এ অবস্থাকে ‘মহামারী’ আখ্যা দিয়ে বলছেন, তামাকজাত পণ্যবিরোধী সচেতনতা তৈরি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, বিশেষ করে যুবকদের মধ্যে তামাকবিরোধী সচেতনতা তৈরি করতে পারলে আগামীতে হৃদরোগের মতো অসংক্রামক রোগে মৃত্যুহার কমে আসবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, মৃত্যুর একক কারণ হিসেবে কার্ডিওভাস্কুলার ডিজিজ বা হৃদরোগের অবস্থান শীর্ষে। বিশ্বব্যাপী মোট মৃত্যুর প্রায় ৩১ শতাংশই হৃদরোগজনিত কারণে ঘটে। এর এক-তৃতীয়াংশ ঘটে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হৃদরোগজনিত মৃত্যুর প্রায় ১২ শতাংশের জন্য দায়ী তামাক ব্যবহার এবং পরোক্ষ ধূমপান। ২০০৫-২০১৬ সময়ে বাংলাদেশে অকাল মৃত্যুর কারণ হিসেবে হৃদরোগ সপ্তম স্থান থেকে প্রথম স্থানে উঠে এসেছে। এবং এই পরিবর্তনের হার ৫২ দশমিক ৭ শতাংশ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি তামাক ব্যবহারকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এদেশে ৪ কোটি ৬০ লাখ বা ৪৩ ভাগ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সিগারেট, বিড়ি ও ধোঁয়াবিহীন তামাক সেবন করেন। ৫৮ ভাগ পুরুষ এবং ২৯ ভাগ নারী ধোঁয়াযুক্ত অথবা ধোঁয়াবিহীন তামাক সেবন করেন।
২০১০ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা যায়, ৯৮ দশমিক ৭ ভাগ মানুষের মধ্যে অন্তত একটি অসংক্রামক রোগের (হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, ডায়বেটিস) ঝুঁকি, ৭৭ দশমিক ৪ ভাগ মানুষের মধ্যে অন্তত দুটি ঝুঁকি এবং ২৮ দশমিক ৩ ভাগ মানুষের মধ্যে অন্তত তিনটি ঝুঁকি রয়েছে।
তামাক ব্যবহারকে অসংক্রামক রোগের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে প্রকাশিত ২০১৭ সালের বুলেটিন অনুযায়ী, ২০০৯-২০১৬ সালে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা বেড়েছে ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) হৃদরোগ বিভাগের অধ্যাপক মো. হারিসুল হক বলেন, ‘কেউ নেয় ধোঁয়া হিসেবে, কেউ নেয় গুল, জর্দা পাতা বা সাদা পাতা হিসেবে নেয়। কেউ কেউ তামাককে অন্যভাবে নেওয়ার চেষ্টা করে। তিনি বলেন, ‘মূলত তামাকের নিকোটিন ক্ষতিকর। এই নিকোটিন চামড়ার উপরে ব্যবহার করা যায়। যারা বহুদিন ধরে ধূমপান করে, ছাড়তে পারছে না তখন আমরা তাকে চামড়ার উপর নিকোডার্ম লাগাতে বলি। এতে করে চামড়ার উপর নিকোডার্মটা চলে যায়। তখন সে অনুভব করে যে সে সিগারেট খায়। তখন যদি এভাবে দুই-তিন মাস কেউ এভাবে চালাতে পারে তারপর আর সে সিগারেট খায় না।’
মো. হারিসুল হক বলেন, ‘যারা ধূমপান করেন তাদের প্রথমত দুইটা রোগ বেশি হয়— ১. ফুসফুস ও ২. মূত্রথলির ক্যানসার। হৃদরোগ, স্ট্রোক— এসব রোগের সঙ্গে ধূমপানের সম্পর্ক আছে। রক্তনালী সরু হয়ে পচন হতে পারে (বার্জাস ডিজিজ)। এটা চাষীদের মধ্যে বেশি হয়। ইদানিং কিছু স্টাডিতে দেখা যাচ্ছে, যারা সাদা পাতার গুল খান তাদের মাড়ি এবং চোয়ালের ক্যানসার হচ্ছে। যারা স্মোকার তাদের ৮০ ভাগেরই চোখের রেটিনার রোগ হয়। হার্ট ও রক্তনালীর সঙ্গে পায়ের শিরার মধ্যে ব্লক হলে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। আবার ঘাড়ের শিরার মধ্যে ব্লক হলে স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। যারা নিকোটিন খায় ঠিক তাদের রেটিনার অসুখ হবেই। মূত্রথলির ক্যান্সার যাদের হয় তাদের প্রত্যেকেই নারী হলে জর্দা খায়, পুরুষ হলে সিগারেট খায়। তামাক খেলে নিকোটিন রক্ত নালীকে গিয়ে সংকোচন বাড়িয়ে দেয়। ঘন ঘন সংকোচন হলে ঠিকমতো রক্ত যেতে পারে না বুক ধড়ফড় করে। এসময় অক্সিজেন পায় আর তখনই হার্ট অ্যাটাক হয়।’
তামাক বিশ্লেষকরা বলছেন, যদি বাংলাদেশ সরকার বর্তমান তামাকের কর ব্যবস্থাকে সংশোধন করে তাহলে এটি প্রায় ৬ দশমিক ৪২ মিলিয়ন বর্তমান প্রাপ্তবয়স্ক ধূমপায়ীদের ধূমপান ছাড়তে উৎসাহিত করবে (৩ দশমিক শূন্য ৭ মিলিয়ন সিগারেট ধূমপায়ী এবং ৩ দশমিক ৩৫ মিলিয়ন বিড়ি ধূমপায়ী), সিগারেট সেবনের প্রবণতা ২ দশমিক ৭ ভাগ এবং বিড়ি সেবনের প্রবণতা ২ দশমিক ৯ ভাগে কমিয়ে আনবে, দীর্ঘমেয়াদে বর্তমান ধূমপায়ীদের মধ্যে অকাল মৃত্যু ২ দশমিক শূন্য ১ মিলিয়নে কমিয়ে আনবে (১ দশমিক শূন্য ৮ মিলিয়ন সিগারেট এবং ৯ লাখ ৩৮ হাজার ৬৫০ বিড়ি ধূমপায়ী) এবং অতিরিক্ত রাজস্ব ৭৫ থেকে ১০০ বিলিয়ন টাকা বৃদ্ধি পাবে (জিডিপি’র শূন্য দশমিক ৪ ভাগ)। এই অতিরিক্ত রাজস্ব তামাক ব্যবহারজনিত ক্ষতি হ্রাস এবং স্বাস্থ্যকর জীবনধারার বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে নতুন বা বিদ্যমান কর্মসূচির তহবিল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।
আইনজীবী ও তামাক বিশ্লেষক সৈয়দ মাহবুবুল আলম তাহিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা সচেতনতার মাধ্যমে তামাকের কারণে হওয়া হৃদরোগ থেকে মানুষ দূরে রাখতে পারি। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ধূমপানের কারণে কীভাবে হৃদরোগ হয় সে সম্পর্কে ব্যাপক সচেতনতা তৈরি করা, হার্টের সুস্থতা এবং সব ধরনের তামাকপণ্য থেকে মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সচেতনতা সৃষ্টিতে আমরা কাজ করতে পারি। পাশাপাশি তামাক পণ্যের ওপর কর বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে তামাক গ্রহণে নিরুৎসাহিত করার মাধ্যমে আমরা হৃদরোগসহ অন্যান্য রোগের ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে পারি।’

Saturday, June 23, 2018

এক বোতল ফেনসিডিলের বিচার শেষ হয়নি সাড়ে ৮ বছরেও! by আমানুর রহমান রনি

রাজধানীর বিমানবন্দর থানার এক বোতল ফেনসিডিল মামলার বিচার গত সাড়ে আট বছরেও শেষ হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তা মামলার অভিযোগপত্র দিলেও আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামি পক্ষের আইনজীবী নিয়মিত আবেদনের মাধ্যমে গত আট বছর ধরে কালক্ষেপণ করছেন। সাক্ষীর তালিকায় থাকা পুলিশের বিরুদ্ধে একাধিকবার সমনের পর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়। কিন্তু পরে আর তাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাই সাক্ষী না থাকায় ২০১০ সালের জানুয়ারিতে দায়ের করা ওই মামলার বিচারকাজ চলছে এখনও। এভাবেই সাক্ষীর অভাবে মাদক সংশ্লিষ্ট মোট মামলার ৬২ শতাংশ আসামিই খালাস পেয়ে যায়।
২০১০ সালের ১৪ জানুয়ারি বিমানবন্দর থানার সিভিল অ্যাভিয়েশন কোয়ার্টারের দক্ষিণ পাশে রাত ১২টার দিকে এক তরুণ ওই থানার টহল পুলিশের সামনে থেকে সন্দেহজনকভাবে পালানোর চেষ্টা করেছিল। এমন সময় টহলরত পুলিশ তাকে গতিরোধ করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। ওই টহল পুলিশ দলের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন বিমানবন্দর থানার সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আব্দুল আওয়াল। তার সঙ্গে ছিলেন একজন কনস্টেবল ও দুই আনসার সদস্য।
সন্দেহভাজন তরুণকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এএসআই। সে তার নাম জানায় জহিরুল ইসলাম রানা খান (২৯)। পুলিশ তাকে তল্লাশি করে। একসময় পুলিশের জেরার মুখে রানা খান তার প্যান্টের ডান পকেট থেকে একবোতল ফেনসিডিল বের করে দেয়। এরপর তাকে আটক করা হয়। এই ঘটনায় এএসআই আব্দুল আওয়াল বাদী হয়ে বিমানবন্দর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ওইদিন রাতেই একটি মামলা করেন। মামলা নম্বর ৪৫। পরদিন আদালতে পাঠানো হয় রানাকে। মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, গাজীপুরের বোর্ডবাজারে শাহিন ও দেলোয়ার নামে দুই ব্যক্তির কাছ থেকে ৫০০ টাকা দিয়ে নিষিদ্ধ ফেনসিডিল কিনেছিলেন তিনি।
মামলার প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন তৎকালীন বিমানবন্দর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আহসান হাবীব। এরপর তদন্ত কর্মকর্তা হন একই থানার আরেক এসআই অংশু কুমার দেব। ২০১০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি চার্জশিট দাখিল করেন তিনি। তবে যাদের কাছ থেকে রানা ফেনসিডিল বোতল কিনেছিলেন বলে পুলিশকে তথ্য দেন, তাদেরকে চার্জশিট থেকে বাদ দিয়েছে পুলিশ। এর কারণ হিসেবে এজাহারে উল্লেখ করা হয়, তাদের সঠিক নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়নি।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই অংশু কুমার দেব ২০১০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মুখ্য মহানরগর হাকিমের (সিএমএম) কোর্টে চার্জশিট দাখিল করেন। সেটি গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে পাঠান সিএমএম কোর্ট। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালত অভিযোগ আমলে নিয়ে মামলাটি বিচারের জন্য একই বছরের ২১ মার্চ ঢাকার ৮ নম্বর বিচারিক আদালতে পাঠান। এই সময়ে কারাগারেই ছিলেন রানা। ওই বছরের জুনে জামিন পান তিনি।
নথি থেকে জানা যায়, ২০১০ সালের আগস্ট ও অক্টোবরে পৃথক দুটি মামলার ধার্য তারিখ ছিল। তবে আদালত অন্য মামলা নিয়ে ব্যস্ত থাকায় এর কার্যক্রম হয়নি। একই বছরের ৩০ নভেম্বর আদালতে মামলার নির্ধারিত তারিখ ছিল। ওইদিনও আদালতে সময় চেয়ে আবেদন করেন রাষ্ট্রপক্ষ।
২০১১ সালের ৮ মার্চ রানার বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করেন আদালত। তবে মামলার বাদী উপস্থিত না থাকায় এর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়। এরপর রাষ্ট্রপক্ষ ফের সময় আবেদন করেন। বাদীর জবানবন্দি নেওয়ার জন্য পুনরায় সময়ের আবেদন করা হয়। মামলাটির বিচারিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ২০১১ সালের মার্চ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপক্ষ ৩৭ বার সময় আবেদন করেছেন। কখনও সাক্ষী উপস্থিত করতে না পারা, কখনও প্রস্তুতি না থাকা; এমন কিছু কারণ দেখানো হয়েছে আবেদনে। এতকিছুর পরও সাক্ষীদের হাজির করা যায়নি। সাক্ষীর তালিকায় যেসব পুলিশ সদস্যের নাম রয়েছে, তাদের কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা কেউ এখন আর বিমানবন্দর থানায় নেই। কে কোথায় আছেন তাও জানেন না কেউ।
২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল আদালত বাদী এএসআই আব্দুল আউয়ালকে কোর্টে সাক্ষী দেওয়ার জন্য পরোয়ানা জারি করেছিল। তাও তিনি হাজির হননি। এরপর ৩১ মে মামলার তারিখের দিন রাষ্ট্রপক্ষ আবার সময় আবেদন করেন। ২০১২ সালে এভাবে প্রতিটি তারিখে সাক্ষীর জন্য কালক্ষেপণ হয়েছে। তবে আসামি রানা হাজির ছিলেন নিয়মিত। কোর্টে হাজির হতে না পেরে ২০১৩ সালের এপ্রিলে একটি সময় চেয়ে আবেদন করেন তিনি।
প্রায় আড়াই বছর পর ২০১৩ সালের ২৯ মে মামলার বাদী আদালতে হাজির হলেও তার প্রস্তুতি না থাকায় সাক্ষী দিতে পারেননি। উপায় না পেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ আবার সময়ের আবেদন করেন। একই বছরের জুলাই আর অক্টোবরেও সময় আবেদন করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের ক্রমাগত এমন সময় আবেদন দেখে ২০১৪ সালের আগস্টে আদালত মামলার তিন সাক্ষীর বিরুদ্ধে সমন জারি করেন। তারা হলেন এক কনস্টেবল ও দুই আনসার সদস্য। যারা ঘটনার সময় টহল পুলিশ দলের সদস্য ছিলেন। কিন্তু তারপরও সেই তিন সাক্ষী হাজির হননি। ২০১৪, ২০১৫ ও ২০১৬ এভাবেই আসামিদের আসার অপেক্ষায় সময় আবেদন করেছেন রাষ্ট্রপক্ষ।
২০১৭ সালের জানুয়ারি মামলার সব সাক্ষীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। এই পরোয়ানা বিমানবন্দর থানায় পাঠিয়ে সেখানকার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই পরোয়ানার পর পুলিশ আদালতে একটি প্রতিবেদন দাখিল করে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়— এএসআই আব্দুল আউয়াল, কনস্টেবল আব্দুল মোমিন, এএসআই শফিকুল ইসলাম, এসআই আহসান হাবীব ও এসআই অংশু কুমার দেবের খোঁজ মিলছে না। কেউ এখন বিমানবন্দর থানায় নেই। তারা কেউ সেখানে বেশিদিন কর্মরত ছিলেন না বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়। এভাবে শেষ হয়েছে ২০১৭ সাল।
২০১৮ সালের এপ্রিলে মামলার নির্ধারিত তারিখ ছিল। ওইদিন বিশেষ জজ আদালত ৮-এর বিচারক শামীম আহমেদ রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের সমালোচনা করেন। এ সময় সাক্ষী হাজির করতে না পারায় অপরাগতা প্রকাশ করেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী। আগামী জুলাইয়ে মামলাটির পুনরায় তারিখ ধার্য করা হয়।
মামলার বাদী আব্দুল আউয়াল বর্তমানে লালবাগ থানায় কর্মরত আছেন। এই আট বছরে পদোন্নতি পেয়েছেন তিনি। বর্তমানে লালবাগ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) আব্দুল আউয়াল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আট থেকে নয় বছর আগের ঘটনা, আমার সব মনে নেই। তবে আসামিকে গ্রেফতারের পর মামলা দিয়ে এসেছিলাম। পরদিন তাকে কোর্টে চালান করা হয়। আসামি রানা ফেনসিডিল বোতল কাউকে দেওয়ার জন্য নিয়ে যাচ্ছিল। সে স্বীকার করেছে। তবে কাকে দেবে তা বলেনি, যার কাছ থেকে কিনেছিল তার ঠিকানাও পাইনি।’
বিচার প্রক্রিয়া এত বিলম্বের বিষয়টি জানেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমরা পুলিশ অপরাধীদের গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করেছি, বিচারের বিষয় আদালত বলতে পারবে। আমার সাক্ষী দিয়ে এসেছি। অন্য সাক্ষীরা কে কোথায় আছে তা বলতে পারবো না। যেদিন সাক্ষী দিয়েছি, সেদিন আদালত জানতে চেয়েছিলেন— আর কোনও কাজ পাওনি, এক বোতল ফেনসিডিলের মামলা ধরাইয়া দিয়ে আসছো?’
মামলার বিচার কাজ এতদিনেও শেষ না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বিশেষ জজ আদালত ৮-এর সরকারি কৌঁসুলী আমির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরাও চাচ্ছি ২০১০ সালের মামলা দ্রুত শেষ করতে কিন্তু সাক্ষী আসে না। আমরা সাক্ষীর বিরুদ্ধে সমন, গ্রেফতারি পরোয়ানা, পুলিশ সদর দফতর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পর্যন্ত লিখেছি, তাও আসে না। সাক্ষী না এলে মামলা শেষ করবো কীভাবে?’
এরকম শত শত মামলা আছে বলেও জানান আইনজীবী আমির হোসেন। তিনি বলেন, ‘পুলিশ না এলে কী করবো? তারা আসে, কখনও দূরে থাকে। আমি বিভিন্ন সময় তাদের ফোন করি, তাও আসে না। আদালত চেষ্টা করছেন, তবে মামলার কাজ শেষ হচ্ছে না।’
আসামি পক্ষের আইনজীবী মো. আবদুল মতিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক তথ্য অনুযায়ী— ২০১৬ সালে র‌্যাব, পুলিশ, কোস্টগার্ড, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দায়ের করা মামলার সংখ্যা ছিল ৬৯ হাজার ৭৩৯টি। এসব মামলায় আসামি ৮৭ হাজার ১৪ জন।
২০১৭ সালে সারাদেশে মাদক মামলা হয় ১ লাখ ৬ হাজার ৫৩৬টি। এর মধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ১১ হাজার ৬১২টি মামলা করে। তবে সেই তুলনায় ২০১৭ সালে আদালতে মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে খুবই কম— মাত্র ২ হাজার ৫৩৯টি। নিষ্পত্তি হওয়া বেশিরভাগ মামলাই ৭-৮ বছর আগের পুরনো। এসব মামলায় মোট আসামি ছিল ২ হাজার ৬৮০ জন। তাদের মধ্যে সাজা হয়েছে ১ হাজার ৬৫ জনের ও খালাস পেয়েছে ১ হাজার ৬১৫ জন। মূলত মাদক বহনকারীরাই বেশি শাস্তি পেয়েছে। মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়েছে ৬২ শতাংশ।

Friday, June 22, 2018

নিপীড়ন আর হত্যাযজ্ঞ কেন ‘দুই পক্ষের সংঘাত’ আখ্যা পায়? by ড. রামজি বারুদ

গ্রেট রিটার্ন মার্চ কর্মসূচি চলাকালে গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি স্নাইপারের গুলিতে আহত বিক্ষোভকারীকে উদ্ধার করে নিয়ে যাচ্ছেন সহযোদ্ধারা। মার্কিন বার্তা সংস্থা এপির পক্ষে ছবিটি তুলেছেন সাংবাদিক আদেল হানা।
ড. রামজি বারুদ মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে লিখছেন ২০ বছর ধরে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব এক্সিটার-এ ফিলিস্তিন অধ্যয়ন বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন তিনি। ফিলিস্তিনে জন্ম নেওয়া আরব বংশোদ্ভূত এই আমেরিকান বেড়ে উঠেছেন পৃথিবীর বৃহত্তম উন্মুক্ত কারাগারখ্যাত গাজা উপত্যকার শরণার্থী শিবিরে। তার বাবা জীবনভর লড়েছেন ফিলিস্তিনি স্বাধীনতার দাবিতে। বারুদ নিজেও ফিলিস্তিনি স্বাধীনতার পক্ষে একজন সোচ্চার কণ্ঠস্বর। বেশকিছু আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। বিদ্বান হিসেবে খ্যাতি কুড়িয়েছেন বিশ্বজুড়ে। বারুদ ২০টিরও বেশি দেশে বক্তৃতা করেছেন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি নিয়ে। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন অতিথি-প্রভাষক হিসেবে। স্বনামধন্য এই আন্তর্জাতিক সাংবাদিক, লেখক ও কলামিস্টের সাড়া জাগানো বই ‘পৃথিবীর প্রান্তে: একটি ফিলিস্তিনি আখ্যান’ (দ্য লাস্ট আর্থ, অ্যা প্যালেস্টানিয়ান স্টোরি)। সার্চিং জেনিন, দ্য সেকেন্ড প্যালেস্টাইনিয়ান ইন্তিফাদা, মাই ফাদার ওয়াজ অ্যা ফ্রিডম ফাইটার : গাজাস আনটোল্ড স্টোরি নামেও বই লিখেছেন তিনি।
১৯৯৯ সাল থেকে প্যালেস্টাইন ক্রনিক্যাল সম্পাদনা করছেন বারুদ। ২০১৪ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দুই বছর দায়িত্ব পালন করেছেন লন্ডনভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আইয়ের উপ-ব্যবস্থাপনা সম্পাদক হিসেবে। কাতারভিত্তিক আল জাজিরার হয়েও একই ধরনের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। আলজাজিরা-ইংলিশের গবেষণা ও অধ্যয়ন বিভাগের শীর্ষ ব্যক্তির পদেও ছিলেন তিনি। ফরাসি, তুর্কি, আরবি ও কোরিয়ানসহ নানা ভাষায় তার বইয়ের অনুবাদ প্রকাশিত হয়।
১৯৮৭ সালের প্রথম ইন্তিফাদার সময় বারুদ ১৫ বছরের কিশোর। কাতারভিত্তিক আলজাজিরায় গত বছর (২০১৭) ডিসেম্বরে লেখা তার এক নিবন্ধ (চিলড্রেন অব স্টোনস: দ্য ডে প্যালেস্টাইন ওয়াজ রিবর্ন) থেকে জানা যায়,  মুক্তির লড়াইয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় যুক্ত ছিলেন তিনি। ওই বছরেই ইসরায়েলি দখলদারিত্ব আর হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদের সূচনা করেছিল ফিলিস্তিনিরা। পরিচয় আর মর্যাদা রক্ষায় ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ভারি মারণাস্ত্রের বিরুদ্ধে তাদের মুক্তিকামী প্রতিরোধ শুরু হয়েছিল পাথরকে অস্ত্র বানিয়ে। বারুদ মনে করেন, তার নিজের পাশাপাশি প্রত্যেক ফিলিস্তিনির পুনর্জন্ম প্রথম ইন্তিফাদার মধ্য দিয়ে, তারা প্রত্যেকেই ‘পাথরের সন্তান’।
প্যালেস্টাইন ক্রনিক্যাল ও মিডল ইস্ট মনিটরে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক নিবন্ধে বারুদ ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যকার সংকটকে ‘সংঘাত’ নামে ডাকার ভয়াবহতা উন্মোচন করার চেষ্টা করেছেন। সংকটের নেপথ্যের মার্কিন ও ইসরায়েলি নীতির রাজনৈতিকতাকে সামনে এনে তিনি ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষার অপরিহার্যতা তুলে ধরেছেন। যারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রতি নতজানু নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সেই অংশকে তিনি ফিলিস্তিনিদের পক্ষে দাঁড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন। ‘দ্য ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটি শুড নট স্ট্যান্ড বাই এজ ইসরায়েল অ্যাবিউজ প্যালেস্টানিয়ানস’ শিরোনামে লেখা বারুদের সেই নিবন্ধের পূর্ণাঙ্গ ভাষ্য তুলে ধরা হচ্ছে বাংলা ট্রিবিউনের পাঠকের জন্য। ভাষান্তর করেছেন, ফাহমিদা উর্ণি।
ফিলিস্তিনে যা ঘটছে তাকে ঠিক ‘সংঘাত’ বলা যায় না। আমরা শব্দটি ব্যবহার করি ঠিকই, তবে ‘সংঘাত’ শব্দ দিয়ে আসলে সেখানকার পরিস্থিতি বোঝানো যায় না। ‘সংঘাত’ বললে মনে হয়, যেন জাতিসংঘের অগণিত প্রস্তাব লঙ্ঘনকারী সামরিক শক্তি ইসরায়েল আর অবদমনের শিকার ফিলিস্তিন একই কাজ করছে। ‘সংঘাত’ এমন এক অস্পষ্ট পরিভাষা যা ব্যবহার করে জাতিসংঘের মার্কিন দূত নিকি হ্যালি ইসরায়েলের ‘নিজের সুরক্ষা নিশ্চিতের অধিকার’ থাকার কথা বলতে পারেন। তার কথায় মনে হয়, যেন সামরিক দখলদারিত্বে উপনিবেশিত থাকা ফিলিস্তিনিরাই তাদের দখলদার আর নিপীড়ক ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। আসলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে কুয়েত উত্থাপিত এক খসড়া প্রস্তাবের বিরোধিতা করতে গিয়ে হ্যালি ইসরায়েলের সুরক্ষার প্রশ্নটি সামনে এনেছিলেন। নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত ওই খসড়া প্রস্তাবটিতে ফিলিস্তিনিদের জন্য ন্যুনতম পর্যায়ের সুরক্ষা চাওয়া হয়েছিল। হ্যালি ওই প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছিলেন। যার মানে, ফিলিস্তিনিদের দুর্দশাকে উপেক্ষা করে ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের ধারাবাহিকতা রক্ষা। এতে বিস্ময়ের কিছু নেই। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র যে এ পর্যন্ত ৮০টি প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছে, তার বেশিরভাগই ইসরায়েলকে সুরক্ষার জন্য। ইসরায়েলের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র প্রথম কোনও প্রস্তাবে ভেটো দিয়েছিলো ১৯৭২ সালে। আর সর্বশেষ হ্যালি নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো দিলেন গত ১ জুন।
ভোটাভুটির আগে খসড়া প্রস্তাবটিকে নমনীয় করতে তিনবার পর্যালোচনা করা হয়েছে। প্রথমে খসড়া প্রস্তাবটিতে ইসরায়েলি আগ্রাসন থেকে সব ফিলিস্তিনির সুরক্ষা নিশ্চিতের আহ্বান জানানো হয়েছিল। তবে চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তাবে শুধু ‘গাজা উপত্যকাসহ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের বেসামরিক নাগরিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পদক্ষপ’ নেওয়ার কথা বলা হয়। তারপরও হ্যালির কাছে একে ‘প্রচণ্ডরকমের একপেশে’ বলে মনে হলো। ঐকমত্য অর্জনের দ্বারপ্রান্তে থাকা কুয়েতের খসড়া প্রস্তাবটি হ্যালির নিজস্ব একটি প্রস্তাবের কারণে পুরোপুরি বাতিল হয়ে যায়। হ্যালির ওই খসড়া প্রস্তাবে দাবি করা হয়, ফিলিস্তিনি গ্রুপগুলো গাজায় ‘সব ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড’ চালাচ্ছে। ‘উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড’ বলতে গাজা উপত্যকায় বসবাসরত লাখো ফিলিস্তিনির কয়েক সপ্তাহের গণ-আন্দোলনকে ইঙ্গিত করেছেন হ্যালি। কয়েক সপ্তাহ ধরে [ভূমি দিবসের কর্মসূচির অংশ হিসেবে ‘গ্রেট রিটার্ন মার্চ’ নামে] শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ করছিলেন ফিলিস্তিনিরা। তাদের আশা ছিল, এ বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে গাজায় ইসরায়েলি দখলদারিত্বের বিষয়টিকে জাতিসংঘের আলোচ্যসূচিতে ফিরিয়ে নেওয়া যাবে।
ভূমি দিবসের কর্মসূচি 'গ্রেট রিটার্ন মার্চ'
নিজেদের পাল্টা প্রস্তাবের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র কেবল একটি ভোটই পেতে সমর্থ হয়েছে, সেটি তাদের নিজের ভোট। তবে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ ধরনের দৈন্যকে যুক্তরাষ্ট্র পাত্তা দেয় না। যেনতেনভাবে ইসরায়েলকে সুরক্ষা দিতে নিজের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও পররাষ্ট্র নীতিকে ঝুঁকিতে ফেলতেও ভ্রুক্ষেপ করছে না দেশটি। এমনকি যে নিরস্ত্র পর্যবেক্ষকেরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কেবল প্রতিবেদন তৈরি করেন; তাদের হাত থেকেও ইসরায়েলকে সুরক্ষা দেওয়ার তাগিদ বোধ করে যুক্তরাষ্ট্র। যেমনটা ঘটেছিল টেম্পরারি ইন্টারন্যাশনাল প্রেজেন্স ইন হেবরন (টিআইপিএইচ) নামের পর্যবেক্ষক দলের ক্ষেত্রে। ১৯৯৬ সালের মে মাসে টিআইপিএইচ প্রতিষ্ঠিত হয়। অধিকৃত ফিলিস্তিনি শহরের পরিস্থিতি নিয়ে বেশকিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তারা। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রতিবেদনটি ছিল ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দ্বারা সুরক্ষিত এলাকা এইচ-টু এর পরিস্থিতি নিয়ে। কিছু সহিংস অবৈধ ইহুদি বসতি স্থাপনকারীকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ওই অঞ্চলটি ইসরায়েলি বাহিনী নিয়ন্ত্রণাধীন রাখত। নরওয়েজিয়ান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল জ্যান ক্রিস্টেনসেন টিআইপিএইচ-এর নেতৃত্ব দিতেন। প্রথমে এর সদস্য সংস্খ্যা ৬০ থাকলেও তা বাড়িয়ে পরে ৯০ করা হয়। ২০০৪ সালে হেবরনে এক বছরের মিশন পরিচালনা শেষে তিনি বলেছিলেন: ‘হেবরনের এইচ-টু এলাকায় সেনাবাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীরা মিলে  অভাবনীয় পরিস্থিতি তৈরি করছে। এক অর্থে সেখানে নিধনযজ্ঞ চলছে। অন্য অর্থে, এ পরিস্থিতি যদি আরও কয়েক বছর ধরে চলতে থাকে, তবে আর কোনও ফিলিস্তিনি সেখানে থাকবে না।’
তখন থেকে হেবরনে কী পরিস্থিতি চলছে, কারও পক্ষে সেটা কেবল কল্পনাই করা সম্ভব। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা এতোটাই বেপরোয়া হয়ে ওঠে যে তারা ফিলিস্তিনিদের ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করতে শুরু করে। এর জন্য তাদের কোনও পরিণামও ভোগ করতে হয় না। একবার ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল ঠাণ্ডা মাথায় খুনের এক ঘটনা। ২০১৫ সালের ২৪ মার্চ ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে এক ইসরায়েলি সেনা প্রতিবন্ধী এক ফিলিস্তিনির মাথায় গুলি চালায়। নিহত ব্যক্তির নাম আব্দ আল-ফাত্তাহ আল শরিফ। তার বয়ষ ছিল ২১। হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যটি ভিডিও করেন ইমাদ আবু শামসিয়া নামের এক ব্যক্তি। ইন্টারনেটে ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি ইসরায়েলকে চরম লজ্জার মুখে ফেলে দেয়। আল শরিফের হত্যাকারীর বিরুদ্ধে বিচার শুরু করতে বাধ্য হয় তারা। বিচার শেষে হত্যাকারীকে লঘু দণ্ড দেওয়া হয়। আর কারামুক্তির সময় তাকে দেওয়া হয় নায়কোচিত সংবর্ধনা। উল্টোদিকে ওই হত্যাকাণ্ডের ভিডিও ধারণকারী আবু শামসিয়া ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও পুলিশের হয়রানির শিকার হন। অসংখ্যবার হত্যার হুমকি দেওয়া হয় তাকে।
ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে আহত এক ফিলিস্তিনি শিশু
ইসরায়েলি বাহিনীর গুলিতে আহত এক ফিলিস্তিনি শিশু
খবরদাতাকে শাস্তি দেওয়ার ঘটনা ইসরায়েলে নতুন নয়। ইসরায়েলি সেনাদের সঙ্গে তার কিশোরী মেয়ের সংঘর্ষের ভিডিও ধারণ করায় আহেদ তামিমির মা নারিমানকে আটক করে সাজা দেওয়া হয়েছিল। ইসরাযেলি সেনাদের অত্যাচারের শিকার ফিলিস্তিনি যদি নিজেই সে ঘটনা রেকর্ড করেন তবে তার জন্যও শাস্তি পেতে হয়। একইসময়ে সেনাদেরকে তাদের খেয়াল-খুশিমতো চলার ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। প্রতিদিনের এ বাস্তবতাকে আইনে পরিণত করার জন্য এখন প্রক্রিয়া চলছে। মে মাসের শেষ দিকে ইসরায়েলি পার্লামেন্টে (নেসেট) একটি প্রস্তাব আনা হয়। ওই প্রস্তাবের আওতায় ‘ইসরায়েলি সেনাদের দখলদারিত্বের ছবি ও ভিডিও’ ধারণ নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়। বলা হয়, যারা দায়িত্ব পালনরত সেনাদের ছবি তুলবে ও ভিডিও ধারণ করবে তাদেরকে অপরাধী হিসেবে বিবেচিত হবে। এই ধারারর ‘অপরাধী’দেরকে ৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়ার সুপারিশ করা হয় ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগদর লিবারম্যান সমর্থিত প্রস্তাবটিতে। প্রায়োগিক অর্থে যার মানে হলো ইসরায়েলি সেনাদের ওপর যেকোনও ধরনের নজরদারিই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বলে বিবেচিত হবে। একে অব্যাহত যুদ্ধাপরাধের অপরিহার্যতা প্রতিষ্ঠা ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে?
মায়ের সঙ্গে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের প্রতীকে রূপান্তরিত আহেদ তামিমি
দ্বিতীয় একটি প্রস্তাবে সামরিক অভিযানে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য সন্দেহভাজন বলে বিবেচিত সেনাদের দায়মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। ইসরায়েলের উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী এলি বেন দাহানের উদ্যোগে বিলটি উপস্থাপন করা হচ্ছে এবং ইসরায়েলি নেসেটে তা সমর্থন কুড়াচ্ছে। ইসরায়েলি +৯৭২ ওয়েবসাইটে ওরি নয় লিখেছেন: ‘সত্যি কথা হলো, দাহানের বিলটি একেবারেই অপ্রয়োজনীয়।’ ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন ইয়েশ দিনের সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনকে উদ্ধৃত করেছেন ওরি নয়। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অধিকৃত ভূখণ্ডে যেসব সেনা ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটনের জন্য দায়ী বলে অভিযোগ করা হচ্ছে তাদের জন্য প্রায় পূর্ণাঙ্গ দায়মুক্তি নিশ্চিত করা হচ্ছে।’ এখন ফিলিস্তিনিরা আগের চেয়ে অনেক বেশি অসহায়। আর যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা নিয়ে ইসরায়েল এখন আগের চেয়ে আরও বেশি নিষ্ঠুর। এ ট্র্যাজেডি দিনের পর দিন চলতে পারে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং সুশীল সমাজের সংগঠনগুলো-যারা কিনা যুক্তরাষ্ট্র সরকার ও তাদের লজ্জাজনক ভেটো থেকে স্বাধীন; তাদেরকে ইসরায়েলি কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণের নৈতিক দায়িত্ব নিতে হবে। ফিলিস্তিনিদের জন্য নিশ্চিত করতে হবে কার্যকর সুরক্ষা।
ইসরায়েল মুক্তভাবে ফিলিস্তিনিদের ওপর নিপীড়ন চালিয়ে যেতে পারে না।  আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়েরও নিরন্তর উন্মোচিত হতে থাকা এসব রক্তক্ষয়ী দৃশ্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখা উচিত নয়।

একটি অসম প্রেম বিয়ে, অতঃপর...

ভালোবেসে নিজের ঘর ছেড়েছেন, দেশ ছেড়েছেন ডায়ানা ডি জয়সা (৬০)। পাড়ি জমিয়েছেন শ্রীলঙ্কায়। সেখানে গিয়ে বিয়ে করেছেন ২৬ বছর বয়সী হোটেলবয় প্রিয়ঞ্জনা ডি জয়সাকে (২৬)। এক ছুটির দিনে তাদের জানাশোনা হয়। তারপর তা প্রেমে গড়ায়। তাদের মধ্যে এমন অসম প্রেম গড়ে উঠলেও সব কিছু চলছিল ঠিকঠাক। তাতে ছন্দপতন ঘটে গত বছর। ওই সময় তার স্বামী প্রিয়ঞ্জনাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। সেই থেকে হাজার হাজার পাউন্ডের ঋণে আটকা পড়ে আছেন ডায়ানা। তার কাছে এখন শ্রীলঙ্কার জীবন এক বন্দিশিবিরের মতো। ওই ঋণ তিনি শোধও করতে পারছেন না। ফিরে যেতেও পারছেন না নিজের দেশ বৃটেনের এডিনবার্গে। তাই তার কাছে মনে হচ্ছে তিনি আটকা পড়েছেন শ্রীলঙ্কায়। তার ধারণা সেখানেই তাকে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হবে। তিনি বলেছেন, স্বামী প্রিয়ঞ্জনা ডি জয়সাকে সব মিলিয়ে এক লাখ পাউন্ডের মতো দিয়েছেন গত বছর সে মারা যাওয়ার আগে। ডায়ানার বিশ্বাস ওই অর্থের খবর পেয়ে কুচক্রীমহল তার কাছে ঘুষ বা উৎকোচ দাবি করেছিল। তা না পেয়ে তারা হত্যা করেছে তার স্বামীকে। এখন তার হাতে বৃটেনে ফিরে যাওয়ার মতো অর্থ নেই। অথচ শ্রীলঙ্কায় এসে হোটেল কাজ করা তার স্বামীর সঙ্গে বসবাস করতে তিনি স্কটল্যান্ডের রাজধানীতে নিজের বাড়ি পর্যন্ত বিক্রি করে দিয়েছেন। শ্রীলঙ্কা থেকে ডায়ানা ডেইলি রেকর্ডকে বলেছেন, আমি শ্রীলঙ্কায় আটকা পড়েছি। এখানেই আমাকে মরতে হবে। শ্রীলঙ্কা ছাড়তে হলে আমাকে দেশে বাদবাকি যা আছে তা বিক্রি করতে হবে। তারপর আমি বিমানের টিকিট কেটে ফিরতে পারবো দেশে। হয়তো সেখানে গিয়ে একটি ফ্লাট নিয়ে নিতেও পারবো। কিন্তু শ্রীলঙ্কায় গত এক বছরে তেমন পরিবর্তন দেখিনি। শুধু আমিই প্রচুর পরিমাণে ঋণে ডুবে গিয়েছি। ডায়ানা বলেছেন, তিনি যে বাড়িটি কিনতে ৬০ হাজার পাউন্ড দিয়েছিলেন তা এখন বিক্রি করে দিতে চান। কিন্তু এতে বাকি আত্মীয়-স্বজন তাকে প্রত্যাখ্যান করছেন। এখানেই শেষ নয়। একটি মিনিবাস কিনতে নিজের স্বামীকে ৩১ হাজার পাউন্ড দিয়েছিলেন ডায়ানা, যাতে সে একজন চালক হয়ে উঠতে পারে। ডায়ানা বলেন, প্রিয়ঞ্জনার এক বন্ধু আমাকে বলেছেন, তারা তাকে নিয়ে ঈর্ষান্বিত ছিল। কারণ, প্রিয়ঞ্জনা অর্থশালী হয়ে উঠেছিল। সে একটি চমৎকার বাড়ি কিনেছিল। একটি মিনিবাস ও একটি টুক-টুক কিনেছিল। ওইসব বন্ধু তাকে ব্লাকমেইল করেছিল। তাই প্রিয়ঞ্জনা তাদের কিছু অর্থ দিয়েছিল। তারা তার কাছে আরো অর্থ দাবি করছিল। কিন্তু সে তাদেরকে বাড়তি অর্থ দেয়নি। এ জন্য তারা তাকে গুলি করে।
একনজরে ডায়ানা ও প্রিয়ঞ্জনা: ২০১১ সালের নভেম্বরে শ্রীলঙ্কায় এক ছুটি কাটাতে এসেছিলেন ডায়ানা। সেখানে হোটেলের এক কর্মচারী তখন প্রিয়ঞ্জনা। সেখানেই তাদের সাক্ষাৎ হয়। গড়ে ওঠে আন্তরিকতা। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১২ সালের জুনে ডায়ানা আবার প্রিয়ঞ্জনাকে দেখতে ফিরে আসেন শ্রীলঙ্কা। এবার প্রেমে বাঁধা পড়েন তিনি। সেই বাঁধন তিনি ছিঁড়তে পারেননি। এর শেষ পরিণতি ঘটে তাদের বিয়ের মধ্য দিয়ে। বিয়ের পর ডায়ানা ফিরে যান দেশে। ওই বছরের নভেম্বরে তিনি তার এই স্বামীকে দেখতে আবার ফেরেন শ্রীলঙ্কায়। এ সময়েই তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিক ছবি ধারণ করে তা প্রকাশ করা হয়। ২০১২ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে নিয়মিতভাবে নিজের দেশ স্কটল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কায় আসা-যাওয়া করতে থাকেন ডায়ানা। তিনি ছিলেন এডিনবার্গ কাউন্সিলের একজন ওয়ার্কার। ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি এডিনবার্গে নিজের বাড়িটি বিক্রি করে দিয়ে চলে আসেন শ্রীলঙ্কায়। প্রিয়ঞ্জনা শ্রীলঙ্কায় ভিন্ন একটি শহরে কাজ পাওয়ায় ওই বছরের জুনে তিনি অল্প সময়ের জন্য ফিরে যান স্কটল্যান্ডে। আবার সেপ্টেম্বরে তিনি ফিরে আসেন। কারণ, তিনি স্বামী প্রিয়ঞ্জনা থেকে আলাদা থাকতে চাননি। ২০১৭ সালের মে মাসে প্রিয়ঞ্জনাকে গুলি করা হয়। অভিযোগ করা হয় একদল মানুষ তার কাছে উৎকোচ দাবি করছিল। তা না পেয়ে তারা তাকে গুলি করে। আর এ বছরের জুনে ডায়ানা বললেন, তিনি যুক্তরাজ্যে ফিরে যেতে পারছেন না। কারণ, তিনি অনেক ঋণে ডুবে আছেন। তিনি আরো বলেছেন, জমানো অর্থ খরচ করে নিজেকে এবং প্রয়াত স্বামীর পরিবারকে চালিয়ে নিচ্ছেন। তার নিজেরও চিকিৎসা প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।

নারী নির্যাতন মামলায় কম সাজার নেপথ্যে by মরিয়ম চম্পা

নারী নির্যাতন মামলা হয়। কখনো কখনো আসামিরা জেলও খাটে। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শেষ পরিণতি হয় মীমাংসা। সামাজিক মর্যাদা, সম্মানহানি, কখনো কখনো আসামি পক্ষের সঙ্গে সমঝোতায় মাঝপথে থেমে যায় মামলার গতি। এমন অনেক ঘটনার মধ্যে মোহনার কাহিনীও একটি। আবেগ আর ভাবাবেগে ভেসে বেড়িয়েছে সুমন ও মোহনা। দীর্ঘ সময় প্রেমের হাওয়ায় দুলে তারা সিদ্ধান্ত  নেয় বিয়ে করার। বিয়েও করে। বছর দুয়েক ভালোই চলছিল তাদের সংসার। এ সময়ের মধ্যে মোহনার কোলজুড়ে আসে এক পুত্র সন্তান। হঠাৎ ঠুনকো এক বিষয় নিয়ে শুরু হয় দাম্পত্য কলহ। অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, মোহনা তার স্বামী সুমনকে ছেড়ে আসতে বাধ্য হয়। উঠেন বাবার বাড়ি। রাগে-ক্ষোভে মোহনাকে নিয়ে তার পিতা রহিম মাতব্বর ছুটেন আদালতে। আইনজীবীর পরামর্শে  মোহনাকে ভর্তি করা হয় স্থানীয় স্বাস্থ্য কেন্দ্রে। একদিন পর ফিজিক্যাল এ্যাসাল্ট সনদ নেয়া হয়। কাজী অফিস থেকে কাবিননামার কপি সংগ্রহ করে ফের ছুটে যান আইনজীবীর কাছে। এরপর দেয়া হয় নারী নির্যাতন মামলা। মোহনা বাদী হয়ে স্বামী, বৃদ্ধ শ্বশুর ও শাশুড়িকে আসামি করে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল’ আদালতে মামলা করেন। বিজ্ঞ বিচারক মোহনার জবানবন্দি শুনে মামলাটি আমলে নিয়ে সংশ্লিষ্ট থানার অফিসার ইনচার্জকে মামলা এজাহার হিসেবে গণ্য করে নিয়মিত মামলা রুজু করার নির্দেশ দেন। ওসি মামলাটি এজাহার হিসেবে রুজু করে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে প্রেরণ করেন। চার্জশিট দাখিলের আগ পর্যন্ত স্বামী সুমন ও তার বৃদ্ধ মা-বাবা ওই মামলায় গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে চলে যায়। প্রথমত জামিন অযোগ্য ধারার অপরাধ, দ্বিতীয়ত এ মামলায় জামিন দেয়ার এখতিয়ার সাধারণত নিম্ন আদালতের নেই। মামলা থেকে বাঁচতে আসামিরা বাদী মোহনার সঙ্গে আপোষের চেষ্টা চালায়। মোহনাও নিজ সন্তান ও ভবিষ্যতের কথা ভেবে আপোষে রাজি হন। কিন্তু এরই মধ্যে স্বামী সুমন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়। মোহনা ছুটে যায় থানায়। ওসি ও তদন্তকারী কর্মকর্তাকে আপোষের কথা খুলে বলেন এবং তার স্বামীকে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু এখানে রয়েছে আইনের মারপ্যাঁচ। ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে থানা থেকে ছেড়ে দেয়ার সুযোগ নেই। বাদী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে যান আদালতে। সুমনের আইনজীবী জামিনের আবেদন করেন, বাদী মোহনা ও তার আইনজীবী আদালতে দাঁড়িয়ে ‘আসামির সঙ্গে আপোষ-মীমাংসা হয়ে সুখে দাম্পত্য কাটানোর কথা বলে আসামির জামিনে অনাপত্তির আবেদন জানায়। মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে বিচার্যযোগ্য হওয়ায় এবং ম্যাজিস্ট্রেটের জামিন দেয়ার এখতিয়ার না থাকায় ম্যাজিস্ট্রেট জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। সুমনের জায়গা হয় জেল হাজতে। নিম্ন আদালতের নথি তলব, জামিন শুনানির পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ শেষে প্রায় দেড় মাস পর সুমন জামিনে মুক্তি পায়।
আরেক ঘটনা। রাজধানীর শ্যামলীতে ১৩ বছরের পিংকীকে উত্ত্যক্ত করতো এলাকার দুই যুবক। ২০১০ সালের ১৯শে জানুয়ারি পাড়ার ওষুধের দোকানে অপেক্ষারত দুই যুবক মেয়েটির হাত ধরে টানাহেঁচড়া করে, চড়-থাপ্পড় মারে। রাগে ক্ষোভে ও অপমানে ঘরে ফিরে পিংকী আত্মহত্যা করে। মারা যাওয়ার আগে আত্মহত্যার কারণ চিরকুটে লিখে যায়। অভিযুক্ত দুজন গ্রেপ্তার হয়ে বছর না ঘুরতেই জামিনে বেরিয়ে আসেন। গত সাড়ে সাত বছর ধরে এ ঘটনার আদালতে বিচার চলছে। এ পর্যন্ত সাক্ষ্য দিয়েছেন তিনজন আত্মীয়। ২০০৭ সালে ঢাকায় আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফিরছিল ১৩ বছরের এক মেয়ে। পূর্বপরিচিত দুজন তরুণ তাকে ডেকে নিয়ে সারা রাত আটকে রেখে ধর্ষণ করে। পরে ধর্ষিতার মা মামলা করেন। ডাক্তারি পরীক্ষায় ধর্ষণের আলামত পেয়েছিলেন ডাক্তার। কিন্তু পুলিশ এক আসামির হদিস বের করতে না পারায় তিনি অব্যাহতি পান। অন্যজন প্রায় আট বছর বিচার চলার পর সাক্ষীর অভাবে খালাস পান। মেয়েটির পরিবার বলছে, দুজনই এখনও এলাকায় আছেন।
ঢাকা জেলার একাধিক ট্রাইব্যুনালে আসা ট্রাইব্যুনালগুলোর বিচারিক নিবন্ধন থেকে ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, যৌতুকের জন্য হত্যা, আত্মহত্যায় প্ররোচনা আর যৌন পীড়নের মতো গুরুতর অপরাধে ২০০২ থেকে ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত আসা ৭ হাজার ৮৬৪টি মামলার প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করেছে একটি গণমাধ্যম। তখন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছিল ৪ হাজার ২৭৭টি মামলা। সাজা হয়েছিল মাত্র ১১০টি মামলায়। অর্থাৎ সাজা হয়েছিল ৩ শতাংশের কম ক্ষেত্রে। বাকি ৯৭ শতাংশ মামলার আসামি হয় বিচার শুরুর আগেই অব্যাহতি পেয়েছে, নয়তো পরে খালাস হয়ে গেছে। মামলাগুলো বেশির ভাগ থানায় করা। কয়েক শ’ মামলা হয়েছে সরাসরি ট্রাইব্যুনালে। সবক’টিরই তদন্তের ভার পুলিশের। তদন্তে অবহেলা, গাফিলতি ও অদক্ষতাও দেখা গেছে। আদালতে সাক্ষী আনা আর সাক্ষ্য-প্রমাণ উপস্থাপনে পুলিশ আর পিপিদের অযত্ন ও গাফিলতি থাকে। অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। কখনো আদালতের বাইরে আপোষ হয়। অভিযোগকারীদের বড় একটি অংশ দরিদ্র। এসব অভিযোগকারীরা স্বল্প আয়ের পোশাককর্মী, গৃহকর্মী, বস্তিবাসী বা ছিন্নমূল নারী ও শিশু। তারা থানা আর আদালতে ঘুরে ঘুরে খরচপত্র করে একটা সময় গিয়ে আর মামলা টানতে পারেন না।
সাবেক আইনমন্ত্রী ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ মানবজমিনকে বলেন, নারী নির্যাতনের মামলায় নির্যাতিত নারীর দায়িত্ব হচ্ছে সঠিক সাক্ষ্য প্রমাণ হাজির করা। আর যে মামলায় সঠিক সাক্ষ্য প্রমাণ না থাকবে উক্ত মামলা তো খারিজ হয়ে যাবে এবং আসামিও খালাস পেয়ে যাবে। কাজেই এই জাতীয় মামলায় বাদীকে অবশ্যই সঠিক সাক্ষ্যপ্রমাণ হাজির করতে হবে। দ্বিতীয়ত হচ্ছে মামলার আইনজীবীকে নির্দিষ্ট তারিখ বা কর্মদিবস সম্পর্কে সচেতন ও দায়িত্ববান হতে হবে। এক্ষেত্রে অনেক সময় দেখা যায় যে, বাদীপক্ষের আইনজীবী মামলার শুনানির তারিখে অন্য কোনো কাজে ব্যস্ত থাকে। একইভাবে কখনো কখনো বাদী পক্ষের সাক্ষী নির্দিষ্ট তারিখে হাজির হতে পারে না। ফলে মামলা দীর্ঘমেয়াদি হয় এবং বাদীপক্ষ আগ্রহ বা উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। কাজেই মামলার আইনজীবী, বাদী ও সাক্ষীর কনটিনিউটি ঠিক থাকলে মামলা তাড়াতাড়ি অর্থাৎ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। এতে করে বাদীপক্ষ যেমন আগ্রহ হারাবে না একই ভাবে আসামিরও খালাস পাওয়ারও সুযোগ থাকে না। 
মানবাধিকার আইনজীবী সালমা আলী বলেন, প্রাথমিকভাবে এই জাতীয় মামলা সিরিয়াস হলেও পরবর্তী কিছু দিন পরে আসামি কোনো না কোনোভাবে জামিন নিয়ে বেরিয়ে যায়। এরপর নির্যাতিতাকে ভয় দেখানো, মামলা তুলে নেয়ার চাপ দেয়া থেকে শুরু করে বিভিন্নভাবে হ্যারাস করতে থাকে। এই ধরনের মামলায় আসামির বেল পাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে একটা নির্দিষ্ট সময় শেষে আসামি কোনো না কোনো ভাবে জামিন পেয়ে যায়। প্রথমত অধিকাংশ বাদীই মামলা করার কিছুদিন পর উক্ত মামলার প্রতি উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। যার জন্য মামলার ধীরগতিই দায়ী। তাই এই জাতীয় মামলা নির্দিষ্ট কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে। ১৫ দিনের মধ্যে পুলিশের চার্জশিট প্রদানসহ যাবতীয় কার্যক্রম নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। এছাড়া মামলার নিয়মিত নজরদারি ও একইসঙ্গে আইনের যথাযথ প্রয়োগ থাকতে হবে। মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পুলিশ, ডাক্তার, ভিকটিম, সাক্ষী, আইনজীবী ও বিচারক সকলকেই হেল্পফুল ও পজেটিভ হতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এ বিষয়ে সরকারকে সবচেয়ে বেশি আন্তরিক হতে হবে। 
সুপ্রিম কোর্টের সাবেক রেজিস্ট্রার এবং সাবেক জেলা জজ ইকতেদার আহমেদ বলেন, নারী ও শিশু আইনের অধিকাংশই হচ্ছে মিথ্যা মামলা। কাজেই মামলা মিথ্যা হলে সেটা তো আর প্রমাণ হবে না। এই জাতীয় মামলার বেশির ভাগই সঠিক তদন্ত ও সঠিকভাবে পরিচালনার অভাব রয়েছে। কাজেই যেকোনো মামলার সুষ্ঠু তদন্তের অভাবে বা তদন্তের গাফিলতি থাকায় সে মামলা সঠিক ভাবে পরিচালিত হয় না। এছাড়া মামলা পরিচালনা করেন যে পাবলিক প্রসিকিউটর তাদের অধিকাংশেরই অদক্ষতা এর সঙ্গে জড়িত। একই সঙ্গে কিছু কিছু বিচারকের কারণে নারী ও শিশু নির্যাতন মামলায় ৯৫% আসামি খালাস পেয়ে যায়। লিগ্যাল এইড সার্ভিস (ব্লাস্ট)’র আইনজীবী শারমিন আক্তার বলেন, এ ধরনের মামলার ক্ষেত্রে নির্যাতিত অধিকাংশ নারীই যে ভুলটি করে সেটা হচ্ছে তারা মামলার এজাহারে শুধুমাত্র যৌতুকের জন্য স্বামী মারধর করেছে কথাটি লিখে। একই সঙ্গে তাকে তালাকও দিতে চায় এ কথাটি না লিখে শুরুতেই মামলাটি হালকা করে ফেলে। অথচ প্রাথমিকভাবে তালাকের কথা উল্লেখ করলে আসামির খালাস পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। এছাড়া সরাসরি আদালতে পিটিশন মামলার ক্ষেত্রে ইনভেস্টিগেশনে যদি না আসে যে বাদিনী থানায় মামলা করতে গেলে স্থানীয় থানা মামলা না নেয়ায় বাধ্য হয়ে আদালতে মামলা করেছে তাহলে আসামি খুব সহজেই খালাস পেতে পারে। অর্থাৎ অধিকাংশ ঘটনাই সত্য হওয়ার পরেও আইনের মারপ্যাঁচে বেশির ভাগ আসামি খালাস পেয়ে যায়। এক্ষেত্রে আইনজীবীরা যদি মামলাটিকে প্রপারলি পরিচালনা করে এবং বিচারকরা একটু কেয়ারফুল হলে আসামিদের খালাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে না।

৯০ বছরেও জোটেনি বয়স্ক ভাতার কার্ড by ‌মো. নজরুল ইসলাম টিটু

ক্রই হ্লা মারমা
বয়সের ভারে ন্যুব্জ ক্রই হ্লা মারমা। লাঠিতে ভর দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটেন। স্বামী নেই। নেই সন্তানও। তার ভরণপোষণ বহনের নেই কেউ-ই। ৯০ বছরেও জোটেনি বয়স্ক ভাতার কার্ড। তিনি আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘কতজনকেই দেখলাম, বয়স্ক ভাতার কার্ড পেতে। খালি আমারই জুটলো না। স্বামীকে হারিয়েছি অনেক আগে। অথচ, বিধবা ভাতাও পাইনি কখনও।’
বান্দরবানের থান‌চি সদর উপ‌জেলার সদর ইউনিয়‌নের ২নং ওয়ার্ড ছান্দাক পাড়ার বৌদ্ধ বিহা‌রে থাকেন ক্রই হ্লা মারমা। তিনি জানান, অনেক আগে তার স্বামী মারা গেছেন। এক সন্তান ছিল, সেও ছোটকালে মারা গেছে। আপন বলতে আর কেউ নেই তার। কাজ করার শক্তি হারানোর পর থেকে আশ্রয় নিয়েছেন বৌদ্ধ বিহা‌রে।
ক্রই হ্লা মারমা বলেন, ‘যারা বিধবা ও বয়স্ক ভাতা পায়। এ টাকা দিয়েই তাদের ভালোই চলে যায়। এসব ভাতা পাওয়া দূরের কথা, এ নিয়ে কেউ কখনও আমার কোনও খোঁজখবরই নেয়নি।’
তি‌নি ব‌লেন, ‘আমি এখন অনেক দুর্বল। এ বয়‌সে একটু‌ আরামের জন্য আমার এক‌টি বিছানা, বালিশ, পরিধানের কাপড় (থামি), স্যান্ডেল, তরল খাদ্য (হরলিকস, বার্লি, সাগু) ও ওষুধ প্রয়োজন। কিন্তু এসবের ব্যবস্থা করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বৌদ্ধ বিহার আমার জন্য আর কত কর‌বে? তা‌দের কা‌ছে আর কত চাইবো? তা‌দের কার‌ণে তো‌ আমি এখনও বেঁচে আছি।’
চহ্লা মারমা নামে থান‌চির এক বা‌সিন্দা ব‌লেন, ‘আমি এই বৃদ্ধা‌কে বয়স্ক ভাতার কার্ড পাইয়ে দিতে অনেক‌দিন ধ‌রেই চেষ্টা চালি‌য়ে যা‌চ্ছি। কিন্তু এখনও সফল হতে পারিনি।’
এ ব্যাপারে উপ‌জেলার সদর ইউনিয়‌নের ১, ২ ও ৩নং ওয়ার্ডের নারী সদস্য চ‌লি চং মারমা ব‌লেন, ‘আমি অনেক দিন ধ‌রেই বৃদ্ধাকে চি‌নি। তি‌নি সরকারি কোনও সহ‌যো‌গিতা পাননি। আমি তা‌কে অনেকবার সহ‌যো‌গিতা দেওয়ার জন্য ভোটার আইডি‌ কার্ড চে‌য়ে‌ছি। কিন্তু তি‌নি আমা‌কে ব‌লে‌ছেন, এসব সহ‌যো‌গিতা আমার লাগ‌বে না; আমি ‌তো বৌদ্ধ বিহা‌রেই থা‌কি, খাই।
তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি তার ভোটার আইডি কার্ড সংগ্রহ ক‌রে থান‌চি উপ‌জেলা সমাজ সেবা অফি‌‌সে জমা দি‌য়ে‌ছি। আশা কর‌ছি, শিগগিরই তি‌নি বিধবা ভাতা ও বয়স্ক ভাতা পা‌বেন।’ ভোটার আইডি কার্ড অনুযায়ী‌ ক্রই হ্লা মারমার বর্তমান বয়স ৯০ বছর বলেও জানান তিনি।
এ ব্যাপারে বান্দরবান সমাজ‌সেবা অধি-দফত‌রের উপ-প‌রিচালক মিল্টন মুহুরী ব‌লেন, ‘আমি এ বৃদ্ধার বিষ‌য়ে আগে কখ‌নো শু‌নি‌নি। এখন জান‌তে পারলাম। আমি খবর নি‌য়ে  এই বৃদ্ধার জন্য যা যা কর‌তে হয়, করব।’

Thursday, June 21, 2018

ঢাকায় কিভাবে কাটে তরুণীদের অবসর সময়?

ঢাকায় সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কয়েক লাখ তরুণী চাকরি করেন। তাদের অনেকে ঢাকায় যেমন পরিবারের সঙ্গে থাকেন, আবার অনেকে একাই বসবাস করছেন।
কিন্তু নিয়মিত চাকরির বাইরে কেমন তাদের অবসর জীবন? এত বড় একটি শহরে তাদের বিনোদনের কতটা সুযোগ রয়েছে?
ঢাকায় নানা সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে কয়েক লাখ তরুণী চাকরি করছেন। কিন্তু অফিস আর বাসার নিয়মিত রুটিনের বাইরে তারা কি করেন?
ঢাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন আমেনা আখতার। তিনি ভালো আয় করেন, কিন্তু বলছেন, নিজের বিনোদনের কথা চিন্তা করার সময় তাকে পারিবারিক অনুশাসন আর সমাজের কথাও চিন্তা করতে হয়।
তিনি বলছেন, ''আমার একজন স্বাধীনতা মতো, নিজের ইচ্ছামতো নিরাপদে ঘুরবো ফিরবো সেটা এখানে সম্ভব না। যেমন হয়তো অফিসের পর বন্ধুদের সাথে ঘুরলাম, এরপর রাত ৯টা বা ১০টায় বাসায় ফিরে বিশ্রাম নিলাম, যাতে আমার রিফ্রেশমেন্টও হল, ঘোরাফেরাও হল আবার কাজও হল, কিন্তু এই ঢাকাতে সম্ভব না।''
এর কারণ হিসাবে তিনি বলেন ''আমি যে সোসাইটিতে থাকি, সেখানে রাত ১০টার সময় যদি কোন মেয়ে বাসায় যায়, তখন অনেক কথা উঠবে। এজন্য সেটা সম্ভব হচ্ছে না। তাই মেয়েদের স্বাধীনতার জন্য সমাজেরও পরিবর্তন দরকার।'' ঢাকার তরুণী চাকরিজীবীরা বলছেন, ঢাকায় চলাচলের সমস্যা, যানজট আর নিরাপত্তা অভাবের কারণে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের ঘরে সামাজিক মাধ্যমে বা টেলিভিশন দেখে সময় বেশি কাটে। তার বিবাহিত তরুণীদের অফিসের বাইরে সংসার সামলাতে অনেক সময় কেটে যায়।
তাহেরা সুলতানা নামের একজন তরুণী বলছেন, ''একজন ছেলের মতো আমরা ইচ্ছা করলেই বাইরে যেতে বা ঘুরাফিরা করতে পারছি না। এ কারণেই সামাজিক মাধ্যম গুলোতেই আমাদের বেশি সময় কাটছে। এর মাধ্যমে বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করেই বেশিরভাগ সময় কাটে।''
অনেকে শপিং মলে ঘুরে বেড়াতে বা কেনাকাটা করতে পছন্দ করেন। এর বাইরে তাদের কাটানোর আরেকটি উপায় কোন উপলক্ষ ধরে রেস্তোরায় খাওয়া দাওয়া করা।
আমেনা আখতার যেমন বলছেন, ''অনেক সময় পরিবার বা বন্ধুদের কেউ বলে, ভালো লাগছে না, চলো কোথাও থেকে ঘুরে আসি। কিন্তু কোথায় ঘুরতে যাবো? পার্কের যে অবস্থা, সেখানে তো যাওয়া যায় না। নিরাপত্তার অভাব। তখন চিন্তা করি, একটা ভালো রেস্তোরায় গিয়ে আজ একজন খাওয়াচ্ছে, কাল আরেকজন। এটাই যেন এখন আমাদের সবচেয়ে বড় বিনোদন হয়ে দাঁড়িয়েছে।''
তবে একটি বেসরকারি সংস্থার কর্মী কানিজ ফাতেমা বলছেন, মেয়েদের জন্য ঢাকার মতো একটি মহানগরীতে আরো কিছু সুযোগ সুবিধা থাকা উচিত।
তিনি বলছেন, ''এরকম যদি কোন জায়গা বা সংস্থা থাকতো, যেখানে গিয়ে মেয়েরা ছেলেদের মতো সময় কাটাতে পারবে, যেমন টেনিস, ব্যাডমিন্টন বা গলফ খেলতে পারবে, তাহলে খুব ভালো হতো। ঢাকায় যে দুই একটি ক্লাব রয়েছে, সেখানে সবাই যেতে পারে না বা অনেকগুলো মেয়েদের জন্য নিরাপদও না। তাই সবার জন্য এরকম জায়গা হলে অনেকে যেতে পারতো।''
এসব ক্ষেত্রে সমাজের মনোভাবেরও পরিবর্তন দরকার বলে তিনি মনে করেন। সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, গত দুই দশকের তুলনায় বাংলাদেশের মেয়েদের সামাজিক অবস্থানের যেমন অনেক পরিবর্তন হয়েছে, তেমনি তাদের অবসর বা সময় কাটানোর ধরনেরও অনেক পরিবর্তন এসেছে।
সমাজবিজ্ঞানী সামিনা লুৎফা বলছেন, এক সময় বই পড়া বা সপ্তাহে একদিন সিনেমা দেখার মধ্যে যে বিনোদন সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন গণ্ডি পেরিয়ে দেশের ভেতরে বাইরে ভ্রমণেও রূপান্তরিত হচ্ছে।
সামিনা লুৎফা বলছেন, ''গত দুই দশকে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্ত নারীরা অনেক বাইরে এসেছে। অবসর নিয়ে তাদের ধারণাও অনেক পাল্টে গেছে। অনেকে হয়তো কর্পোরেট চাকরি শেষে, যানজট ঠেলে আসা যাওয়ার পর বিনোদনের ইচ্ছাটাও থাকে না। আবার নিরাপত্তারও অনেক অভাব আছে। তারপরেও নিজের বিনোদন নিয়ে নারীদের মনোভাবের অনেক পরিবর্তন হয়েছে।''
''হয়তো আমাদের দেশে ক্লাব, পাব এগুলো সে অর্থে নেই বা যা আছে, তাও হাতেগোনা উচ্চবিত্তদের গণ্ডির মধ্যে। কিন্তু সেটাই তো একমাত্র বিনোদন নয়।''
সামিনা লুৎফা বলছেন, ''আগে যেমন শুধু সিনেমা দেখতে যাওয়া ছাড়া বা বই পড়া ছাড়া নারীদের তেমন কিছু করার ছিল না। কিন্তু এখন তারা সামাজিক মাধ্যমে অনেক সময় কাটাচ্ছেন। পাশাপাশি দল বেধে ঘুরতে যাচ্ছেন। আর্থিক স্বাবলম্বী হওয়ার কারণে তার নিজের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা বেড়েছে। এখন তারা একা বা দল বেধে ঘুরতে যেতে পারেন। এগুলো কিন্তু দুই দশক আগেও ছিল না।''
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, একটি মহানগরী হিসাবে ঢাকার বাসিন্দাদের বিনোদনের যেসব সুযোগসুবিধা থাকা উচিত তার অনেক কিছুই হয়তো এখনো পর্যাপ্ত নয়, আর মেয়েদের জন্য তা আরো অপ্রতুল। তবে তাদের মতে, ধীরে হলেও সেই অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে।
সূত্রঃ বিবিসি

Wednesday, June 20, 2018

ইতিহাস কি ছিল, কি দেখি আমরা… by তাজবীর তন্ময়

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইন্টার চার্চিল
নতুন প্রজন্ম জানে না পূর্বে কি ঘটেছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন কিংবা ইতিহাসের ভয়াবহ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কেমন ছিল তা নিজ চোখে দেখা সম্ভব ছিল না এ প্রজন্মের। ইতিহাসের উপর লেখা বই, প্রবীণদের মুখে শোনা ইতিহাস কিংবা সেলুলয়েড পর্দায় দেখা সিনেমাই তাদের একমাত্র সম্বল। ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে স্বল্প সময়ে দ্রুত পৌঁছে দিতে সিনেমা কিংবা ফিল্মের চেয়ে উৎকৃষ্ট উপায় আর নেই। আর এ জন্যই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা, হিটলারের উন্মাদনা, মিত্র বাহিনীর সাহসিকতা, তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের বীরত্বের উপর মুভি, সিরিজ, ডকুমেন্টারি বানানো হয়েছে ভুরি ভুরি। এ প্রজন্ম সেগুলো দেখেই শিখছে ইতিহাসকে, নিজে শিখে আরেকজনকেও শিখাচ্ছে।
কিন্তু প্রশ্ন হল, যা দেখছি এই ফিল্ম, সিরিজে তাই কি পুরো ইতিহাস? কিছু গোপন করা হচ্ছে না তো? দর্শকদের সামনে কি পুরো সত্যটাই তুলে ধরা হচ্ছে?
কয়েকদিন আগেই রিলিজ হল যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ডানকার্ক থেকে সাড়ে তিন লাখ ব্রিটিশ সৈন্যকে উদ্ধার কাজে চার্চিলের অসামান্য অবদান নিয়ে মুভি ‘দা ডার্কেস্ট আওয়ার’। উইনস্টন চার্চিল চরিত্রে অভিনয় করা গ্যারি ওল্ডম্যান জিতেও গেলেন সেরা অভিনেতার অ্যাকাডেমি পুরষ্কার। শুধু ‘দা ডার্কেস্ট আওয়ার’ নয়, চার্চিলের দূরদর্শিতা, সাহসিকতার ছোঁয়া পাওয়া যাবে ‘ডানকার্ক’, ‘চার্চিল’, ‘ইনটু দা স্ট্রোম’, ‘দা ফাইনেস্ট আওয়ার’ ইত্যাদি মুভি এবং ‘দা ক্রাউন’ সিরিজেও। এ শতকের সেরা ব্যাক্তিত্বদের একজন ধরা হয় চার্চিলকে। কিন্তু আমরা কি জানি যুদ্ধকালীন সময়ে ১৯৪৩ সালে ভারতবর্ষে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ কিংবা ৪.৩ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যুর (তৎকালীন মোট জনসংখ্যার দশ ভাগের এক ভাগ) জন্য চার্চিল সরাসরি দায়ী? জেনেশুনেও তিনি ভারতীয়দের জন্য যে কোন সাহায্যের ব্যবস্থা করেন নি, এ জন্য যে তাঁকে অনেক ঐতিহাসিকগণ এ শতাব্দীর কুখ্যাত একনায়ক হিটলার, স্টালিন কিংবা মাও সে তুংয়ের সাথে দায়ী করে এই সত্যও থেকে যায় আমাদের অগোচরে।

চার্চিলকে ‘গণহত্যাকারী একনায়ক’ বলে আখ্যায়িত করেন এমনই একজন লেখক, ডক্টর শশী থারুর। তিনি তাঁর লেখা ‘ইনগ্লোরিয়াস এম্পায়ার’ বইতে তুলে ধরেছেন যুদ্ধকালীন সেরা নেতার বর্ণবাদী আদর্শের।
মেলবোর্ন লেখক সম্মেলনে তিনি বলেন, চার্চিল ভারতবর্ষে মজুতকৃত শস্য যুদ্ধরত সৈন্য এবং গ্রিকদের সাহায্যের জন্য মজুত রাখেন যখন ভারতবর্ষে দুর্ভিক্ষে চার মিলিয়ন মানুষ মারা যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি চার্চিলের বলা বিবৃতি সরাসরি তুলে ধরেন। চার্চিল বলেছিলেন,
  • *“আমি এই ব্লাডি ভারতীয়দের প্রচণ্ড ঘৃণা করি। দুর্ভিক্ষ হোক বা না হোক এরা ইঁদুরের ন্যায় বংশবিস্তার করতে থাকবে। ভারতবর্ষ বন্য ধর্মের অনুসারী একদল বন্য মানুষে পরিপূর্ণ”।
১৯৪২ সালের শেষদিকে ভয়াবহ সাইক্লোন হানা দেয় ভারতবর্ষে এবং সাইক্লোন পরবর্তী সময়ে ফাঙ্গাসের আক্রমণে কয়েক মণ শস্য নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু তারপরেও চার মিলিয়ন মানুষকে বাঁচানো সম্ভব ছিল যদি অন্য কোথাও থেকে সাহায্য পাঠানো হতো। ২০১১ সালে প্রখ্যাত সাংবাদিক মাধুশ্রী মুখার্জী দাবী করেন, “চালকের আসনে থাকা প্রধানমন্ত্রী চার্চিল সাহেবই সাহায্য করার ব্যাপারে উৎসাহী ছিলেন না। দুর্ভিক্ষ আসন্ন এমন পূর্বাভাস থাকার পরও চার্চিলের নির্দেশে ভারতবর্ষ থেকে ৭০,০০০ টন ধান (৪০০,০০০ মানুষের একবছরের খাবার) ব্রিটেনে মজুদ করা হয়, যেখানে ব্রিটেনের তৎকালীন জনসংখ্যা ছিল ভারতবর্ষ থেকে ১৫ মিলিয়ন কম। তিনি যে শুধু ভারতবর্ষের মজুত শস্য দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়েছেন এমন নয়; অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্র ভারতবর্ষের জন্য ত্রাণ এবং খাবার সাহায্য পাঠাতে চাইলেও তিনি বাধা দেন। কানাডিয়ান, অস্ট্রেলিয়ান জাহাজ ত্রাণ নিয়ে ভারতবর্ষ ঘেঁষে ইউরোপে প্রবেশ করলেও চার্চিল ভারতে প্রবেশ করতে নিষেধ করেন। এমনকি নাৎসী মিত্র জাপান বার্মা দখল করে নিলে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর এক বিরাট বহর ভারতবর্ষে এসে উপস্থিত হয়। তারা ১৮০,০০০ কৃষককে তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ করে তাদের ১৭৫,০০০ একর আবাদি জমি মিলিটারি ক্যাম্পের জন্য দখল করে। এমনকি বাংলার খাদ্যশস্য সর্বদা জলযানে করে আনা নেওয়া করা হয় জানা সত্ত্বেও সকল নৌযান মিলিটারির নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। উপরন্তু, এসময় চার্চিল ভারতবর্ষের উপর “স্কর্চড আর্থ পদ্ধতি প্রয়োগ করে সকল শস্যক্ষেত পুড়িয়ে দেন যাতে করে জাপান আর্মি আক্রমণ করেও বেশি কিছু অর্জন করতে না পারে”।

দুর্ভিক্ষ ছিল ভয়াবহ। মানুষ ক্ষুধার জ্বালায় ঘাস, লতাপাতা খাওয়া শুরু করেছিলো। মৃতপ্রায়রা আগে থেকেই কবরস্থান কিংবা নদীর পাড়ে চলে যেতো কারণ মৃত লাশ বহন করার মতো শক্তিসামর্থ্য জীবিতদের ছিল না। মা-বাবা মৃতপ্রায় সন্তানদের নদীতে কিংবা পুকুরের পানিতে ফেলে দিত মৃত্যুযন্ত্রণা থেকে রক্ষা দিতে। মরা লাশের গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে ছিল, খাওয়ার মতো পানি ছিল না। এ দুর্ভিক্ষে তারাই কোনমতে বেঁচে ছিল যারা কলকাতায় কোনমতে চাকরি জোগাড় করতে পেরেছিল কিংবা বেশ্যাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিলো।
ব্রিটেনের মানুষজন যাতে দুর্ভিক্ষের সংবাদ না পায় তা নিয়ে কড়াকড়ি নির্দেশ ছিল চার্চিল সরকারের। এমনকি দুর্ভিক্ষ নিয়ে লেখা, চিত্রকর্ম এবং একটি বই সরাসরি ব্যান করা হয়েছিলো। স্যার আর্চিবাল্ড ওয়াভেল এবং তৎকালীন সেক্রেটারি অফ ষ্টেট অফ ইন্ডিয়া, লিওপড এ্যমিরী বারংবার সাহায্যের জন্য নিবেদন করলেও চার্চিল আগ্রহ দেখাননি। তিনি ভারতবাসীদের সাহায্য করার চেয়ে গ্রীসে ত্রাণ পাঠাতে অধিক আগ্রহী ছিলেন। এমনকি তিনি এও বলেন,
  • *“এতো দুর্ভিক্ষ হলে অর্ধনগ্ন সাধু বাবা গান্ধী মরে না কেন?”
২.৫ মিলিয়নের অধিক ভারতীয় সেনা যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর পক্ষে শরিক হয়েছিলেন। ভারতবর্ষের সেনাবাহিনী কিংবা সম্পদ উভয়ই যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে, এই সত্য অস্বীকার করেনি কোন ঐতিহাসিকই। কিন্তু তারপরও ভারতবর্ষের প্রতি এতো অনীহা ছিল কেন চার্চিলের?
সুদূর ইউরোপে হওয়া দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হাওয়া লেগেছিলো এই বাংলা পর্যন্ত! আর পাশের দুই প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগলে সে আগুনের আঁচ কি আমাদের গায়ে লাগবে না? এরপরেও কি আসন্ন যুদ্ধের কথা ভেবে আপনার মনে পুলক জাগছে?

মাধুশ্রী মুখার্জীর মতে, ৪০’র দশকের শুরুতেই ব্রিটিশরা বুঝতে পারে তাদের পক্ষে আর বেশীদিন ভারতবর্ষ শাসন করা সম্ভব নয়। সাম্রাজ্যের অধীনে থাকবে না এমন রাজ্যকে সাহায্য করতে চার্চিলের ইচ্ছা ছিল না। এমনকি চার্চিল প্রচণ্ড বর্ণবাদী ছিলেন, উপমহাদেশের মানুষকে দেখতে পারতেন না এমন তথ্য উঠে এসেছে তাঁর নিকট বন্ধু, আত্মীয়বর্গের কাছ থেকেই।
চার্চিলের পরিবার এবং সমর্থকরা দাবী করেন, চার্চিল দায়ী ছিলেন না এই গণমৃত্যুর জন্য। ইউরোপের ভালোর জন্য তিনি যথাযথ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, মূলত ভারত সরকারই দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী। অনেক ঐতিহাসিকের দাবী, সময়ের তাগিদে, যুদ্ধের প্রয়োজনেই অনেক নিরীহ মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে।
কিন্তু সত্যিই কি এই দুর্ভিক্ষপীড়িত ৪ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু প্রয়োজন ছিল নাকি শাসকদের অবহেলায় এ গণমৃত্যুর ঘটনা ঘটলো এইটাই বিচারের বিষয়।