Sunday, June 1, 2014

সর্বজনের শিক্ষা কি সম্ভব? by আনু মুহাম্মদ

প্রশ্নপত্র ফাঁস এখন একটি নিয়মিত খবর৷ স্কুল-কলেজের পরীক্ষা ছাড়াও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনী পরীক্ষা, এমনকি বিসিএস পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রশ্ন আগাম সরবরাহে লাখ লাখ টাকার বাণিজ্যের খবর পাওয়া যায়৷ খবরাখবর বেশি প্রচারিত হলে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়৷ সেই তদন্ত কমিটি যথারীতি কাজ করার সময় পায় না অথবা কিছুই খুঁজে পায় না৷ অপরাধ অব্যাহত থাকে৷ এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে মুহম্মদ জাফর ইকবাল গত কিছুদিনে চারটি লেখা লিখেছেন৷ তাঁর সেই লেখাগুলো একসঙ্গে ৮-১০টি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে৷ তিনি তাঁর লেখাগুলোয় তথ্য–প্রমাণসহ দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রশ্নপত্রের শতভাগ আগেই ফাঁস হয়েছে৷ তার পরও শিক্ষামন্ত্রী পরিস্থিতির ভয়াবহতায় পুরোপুরি সায় দেননি৷ একটা কথা স্বীকার করেছেন, পরীক্ষা বাতিল হয়েছে, তদন্ত কমিটি হয়েছে৷ অন্যগুলোর বিষয়ে তিনি এর আগে যারা ‘ফাঁসের গুজব ছড়াচ্ছে, তাদের পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার’ কথা বলেছিলেন৷ এক শিক্ষার্থী উপায়ান্তর না দেখে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করতে গিয়েছিল থানায়৷ পাশাপাশি নিয়োগ-বাণিজ্য বা টাকার বিনিময়ে বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষক নিয়োগ এখন সবার জানা গোপন বিষয়৷ ভর্তিও৷
শিক্ষামন্ত্রী কয়েক বছর ধরেই শিক্ষােক্ষত্রে সরকারের সাফল্যের দাবি করে আসছেন৷ সাফল্যের দাবির দুটি দিক প্রধান: ১. পাসের হার এবং ২. জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান সংখ্যা৷ এটি ঠিক যে পাসের হার এবং জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে উল্লেখযোগ্য হারে৷ বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যথাযথ শিক্ষার পরিবেশ পেলে নিজ যোগ্যতায় যে অনেক দূর যেতে পারে, তার প্রমাণ বহুভাবেই পাই৷ এই দেশের অভিভাবকেরা, এমনকি যাঁদের সহায়সম্বল নেই, তাঁরাও নিজ সন্তানের শিক্ষার জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত৷ কিন্তু বর্তমান সাফল্য যতটা সংখ্যা বৃদ্ধি, ততটা কি টেকসই বা মানসম্মত?

এ প্রশ্নের পেছনের কারণ সবাই জানেন৷ স্কুল-কলেজ মানে এখন ক্লাসরুমে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী নয়, অধিক প্রভাব বিস্তার করে শিক্ষার সকল পর্যায় এখন ঘেরাও করে আছে প্রাইভেট টিউশনি, কোচিং সেন্টার ও গাইড বই৷ এই জগতে প্রতিযোগিতাও অনেক৷ যে তার ক্লায়েন্টদের ভালো ফল নিশ্চিত করতে পারবে, তার বাণিজ্যের সম্ভাবনা তত বেশি৷ তাদের তাই পর্দার পেছনে হাঁটার, নানা যোগাযোগ ও লেনদেনের রাস্তায় চলতে হয়৷
গত কয়েক বছরে স্কুলের শিক্ষার্থীদের পাবলিক পরীক্ষা দুটি বেড়েছে৷ কয়েক বছর আগে পর্যন্ত ছিল শুধু এসএসসি পরীক্ষা৷ এর সঙ্গে যোগ হলো পঞ্চম শ্রেণি (পিএসসি) ও অষ্টম শ্রেণি (জেএসসি)৷ এগুলো চালুর সময় শুনেছিলাম, এসএসসি উঠে যাবে৷ দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে তারপর একেবারে পরীক্ষা৷ তা হলো না৷ এসএসসিও থাকল৷ তার মানে চারটি পাবলিক পরীক্ষা৷ ক্লাসেও এখন পরীক্ষার সংখ্যা বেড়েছে৷ শুধু তা-ই নয়, গত এক দশকে বইয়ের ভারও বেড়েছে অনেক বেশি৷ তারপর যোগ হলো সৃজনশীল পরীক্ষার ব্যবস্থা৷ এতগুলো পরীক্ষা যোগ হলো, এত জ্ঞানের বিষয় যোগ হলো, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল হওয়ার জন্য বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হলো৷ সেই অনুযায়ী ক্লাসরুম, শিক্ষক, আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি, নিয়মিত প্রশিক্ষণ—এগুলোর কেমন উন্নতি হলো?
সরকারি প্রাথমিক স্কুলে স্থানসংকুলান হয় না৷ শিক্ষকের অভাব৷ মাধ্যমিক স্কুলের সংখ্যা আরও কম৷ এই চাহিদা পূরণে পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গ্রামে গড়ে উঠেছে কিন্ডারগার্টেন, ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল, মাদ্রাসা, ক্যাডেট মাদ্রাসা৷ শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীদের বই দেখি৷ একদিকে নতুন নতুন কঠিন বিষয়, অন্যদিকে ভুলে ভরা তথ্য, বাংলা-ইংরেজি৷ তাদের প্রতিদিনের রুটিন দেখলে ক্লান্ত লাগে, বিষণ্ন হই৷ ভারী ব্যাগ নিয়ে স্কুল, প্রাইভেট টিউটর, কোচিং সেন্টার৷ হৃদয়ে ধারণ করার উপায় নেই৷ মুখস্থ এবং নির্মম প্রতিযোগিতার শিকার তারা৷
স্বাধীনতার পর থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা কত বেড়েছে? ১৯৭২ সালে সরকারি ও বেসরকারি মিলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৩৬ হাজার ৫৪৭৷ ১৯৯০ সাল নাগাদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৩৮ হাজার৷ সে সময় বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল নয় হাজার৷ এর পর থেকে বেসরকারি স্কুলের সংখ্যা বাড়ল উল্লেখযোগ্য মাত্রায়৷ ১৯৯৫ সালের হিসাবে দেখা যায়, সরকারি প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা একই আছে, কিন্তু বেসরকারি সংখ্যা নয় হাজার থেকে বেড়ে হয়েছে ২২ হাজার৷ ব্যানবেইসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী (২০১২) সারা দেশে সরকারি প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা এখন ৩৭ হাজার ৬৭২৷ তার মানে ১৯৯০ সালের তুলনায় সরকারি প্রাথমিক স্কুলের সংখ্যা কমেছে৷ আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫০ হাজার, যার বেশির ভাগই বাণিজ্যিক৷
সংবাদপত্রে প্রায়ই প্রাথমিক স্কুলের দুর্গতির খবর পাওয়া যায়৷ বেঞ্চ নেই, স্থানসংকুলান হয় না, শিক্ষক নেই! যে কজন শিক্ষক আছেন, তাঁদের আবার অনেককে সরকারি নানা দায়িত্বে এদিক-সেদিক যেতে হয়৷ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও চাহিদা অনুযায়ী বাড়েনি৷ সরকারি প্রাথমিক স্কুল থেকে শুরু করে কলেজ পর্যন্ত সব জায়গাতেই শিক্ষক পদ অনেক খালি৷ ল্যাবরেটরি নেই শতকরা প্রায় ৫০ ভাগ স্কুলে, লাইব্রেরি নেই, বিজ্ঞান ও অঙ্ক শিক্ষক নেই৷ তবে ডিজিটাল কর্মসূচির অধীনে কম্পিউটার গেছে৷ শিক্ষকদের মধ্যে আনুমানিক শতকরা মাত্র ৪০ ভাগ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত৷ এক দশকের আগের হিসাব, প্রায় এক লাখ শিক্ষকের কোনো প্রশিক্ষণ নেই৷
একদিকে পরীক্ষা ও বইয়ের চাপ বৃদ্ধি, অন্যদিকে স্কুল, শিক্ষক ও প্রশিক্ষণের সংকট৷ তাহলে এর মধ্যে থেকে শিক্ষার্থীরা কী করবে? এই ফাঁক থেকেই সম্প্রসারিত হয়েছে প্রাইভেট টিউশনি, কোচিং ও গাইড বইয়ের তৎপরতা৷ প্রশ্নপত্র ফাঁস—শিক্ষাকে নিয়ে এসব বাণিজ্যিক উন্মাদনারই ফলাফল৷
‘সকল নাগরিকের জন্য অভিন্ন উন্নতমানের শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব’—এই অবস্থান থেকে বাংলাদেশ সরে গেছে অনেক আগে৷ এর বদলে তার বর্তমান নীতি দাঁড়িয়েছে, ‘মেধা নয়, আর্থিক সামর্থ্য অনুযায়ী শিক্ষা গ্রহণ করো৷ টাকা থাকলে শিক্ষা কেনো, স্কুলে বা বাইরে’৷ শিক্ষা নয়, ডিগ্রি কেনাবেচার বাণিজ্য সম্প্রসারিত হয়৷ তার ফলে গত দুই দশকে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিপুল বিকাশ হয়েছে৷
বাংলাদেশে প্রাথমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সকল পর্যায়ের শিক্ষকদের বেতন পৃথিবীর মধ্যে নিম্নতম কয়েকটি দেশের সারিতে৷ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের শিক্ষকদের বেতনের তুলনায় বাংলাদেশের শিক্ষকদের বেতন শতকরা ৩০ থেকে ৫০ ভাগ৷ একদিকে বেতন এত কম, অন্যদিকে অর্থ উপার্জনের নানা বাণিজ্যিক পথের সম্প্রসারণ সকল পর্যায়ে শিক্ষকদের বড় অংশকে অস্থির করে রেখেছে৷ পাবলিক বা সর্বজনের প্রতিষ্ঠানগুলোয় ঘটেছে একধরনের অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যিকীকরণ আর অন্যদিকে নিজের পেশাগত পরিচয় ব্যবহার করে নানা বাণিজ্যিক তৎপরতায় যুক্ত হওয়া৷
এর বিপরীতে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত একটি দৃশ্যপট চিন্তা করি: প্রতিটি গ্রাম, পাড়া ও মহল্লায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে৷ সেখানে আছেন একদল শিক্ষক, যাঁরা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত৷ শিক্ষক অনুপাতে শিক্ষার্থী ৩০ জনের বেশি হচ্ছে না৷ প্রতিটি স্কুলে যথেষ্টসংখ্যক ক্লাসরুম, বেঞ্চ, কম্পিউটর, মাল্টিমিডিয়া আছে৷ সারা দেশে যথেষ্টসংখ্যক উন্নত মানের মাধ্যমিক স্কুল আছে৷ সবগুলোয় ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি আছে৷ অঙ্ক, বিজ্ঞান, সাহিত্য, সমাজসহ সব বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক, যথেষ্ট সরঞ্জাম আছে৷ সকল পর্যায়ের স্কুলগুলোয় খেলার মাঠ আছে, গাছপালা আছে, যেখানে সম্ভব সেখানে পুকুর আছে, সাঁতার হয়, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক তৎপরতার সব ব্যবস্থা আছে৷ শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল তৎপরতার জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া হচ্ছে৷ ক্লাস, গবেষণাগার, গ্রন্থাগার, মাঠ, গাছপালা, পুকুর সব জায়গাতেই শিক্ষা, সবখানেই আনন্দ৷ শিক্ষকেরা ভালো বেতন পাচ্ছেন, শিক্ষকতা তাঁদেরও আনন্দের কাজ, তাঁদের পুরো মনোযোগ প্রতিষ্ঠান ঘিরেই৷ স্কুলেই সব পড়াশোনা হচ্ছে বলে কোচিং সেন্টার, প্রাইভেট টিউশনি, গাইড বই—সব উঠে গেছে৷ এসব কাজে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা অনেকেই এখন শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছেন৷ শিক্ষকসংখ্যা অনেক বেড়েছে৷ শিক্ষকতা অনেক আগ্রহের পেশা৷ আর ছেলেমেয়েরা? তাদের ঘাড়ে-মাথায়-বুকে বই, টিচার আর মা-বাবার ভীিতকর চাপ নেই৷ মেধা আর সৃজনশীলতা নিয়ে তারা এখন জগতের কাছে উন্মুক্ত৷
বাংলাদেশে আমাদের সন্তানদের জন্য এ রকম শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করা কি অসম্ভব? না, খুবই সম্ভব৷ এর জন্য অনেক টাকা দরকার? না, যে টাকা দরকার, তা বাংলাদেশের অর্থনীতির তুলনায় কিছুই না৷ সরকার এই প্রসঙ্গে সব সময়ই বলে এসেছে, এখনো বলবে, আমাদের অর্থ কোথায়? দেশের জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয়ে দাবি তুললেই সরকারের এই যুক্তি শোনা যায়৷ জাতীয় আয়ে শিক্ষা খাতে ব্যয়ের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ন্যূনতম অনুপাত আছে, এটা হলো শতকরা ৬ ভাগ৷ পৃথিবীতে বহু দেশ এর দ্বিগুণের বেশি ব্যয় করে৷ বাংলাদেশ এই আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের অংশীদার হলেও তার শিক্ষা খাতে বরাদ্দ এখনো জাতীয় আয়ের শতকরা ২ ভাগ৷ অর্থাৎ, শিক্ষা বাজেট ন্যূনতম বাজেট তিন গুণ বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ৷ কিন্তু এ বছরও
শিক্ষা বাজেট আগের বছরের তুলনায় আরও কমছে বলে শোনা যাচ্ছে৷ এই খাতে আগের বছরে স্কুলঘর নির্মাণ ও মেরামতে যতটা বরাদ্দ ছিল, সেটাও উদ্যোগের অভাবে খরচ হতে পারেনি৷ শতকরা ৬ ভাগ ম ানে তো অনুপাত, যত জাতীয় আয় তার শতকরা ৬ ভাগ৷ অন্য বহু দেশ এর থেকে বেশি ব্যয় করতে পারলে আমাদের অসুবিধা কী? অসুবিধা শিক্ষাকে বাণিজ্য বানানোর নীতি ও দুর্নীতিতে৷ সরকার চাইলে আমরা টাকার উৎস হাতে-কলমে দেখিয়ে দিতে পারি৷ কিন্তু এটাও জানি, কিছু লোকের বাদশাহি শানশওকত আর সর্বজনের সম্পদ চুরি-ডাকাতির নীতি অব্যাহত থাকলে কোটি কোটি মানুষের সর্বজনের শিক্ষার জন্য টাকার অভাব কখনোই মিটবে না৷
আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

আশ্চর্য দ্বীপ জেজু by সাজ্জাদ শরিফ

জেজু দ্বীপ যেন অপেক্ষা করছিল আমাদের চমকে দেওয়ারই জন্য৷ উড়োজাহাজের আবদ্ধ পেট থেকে নেমে তার আকস্মিক সৌন্দর্যের ঝাপটায় ভাষা হারিয়ে গেল৷ এ দ্বীপের জন্ম ২০ লাখ বছর আগে, আগ্নেয়গিরির লাভা জমে জমে৷ মৃত সেই আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ এখন চেনা যায় না৷ ঘন সবুজ গাছের কোমলতায় সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত৷ জেজু দ্বীপের চারপাশে যে জলরাশি, তা কেবল নামেই দক্ষিণ সাগর৷ দ্বীপটি আসলে প্রশান্ত মহাসাগর ভেদ করেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে৷ গাঢ় সবুজ দ্বীপ৷ গাছগাছালির ফাঁকে ফাঁকে ঐতিহ্যবাহী ভাস্কর্য৷ এই সমতল, তো এই পাহাড়ি খাড়াই-উতরাই৷ দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক বিস্ফোরণের প্রাচুর্য এই দ্বীপটির আদিম নিসর্গ অনেকটা নমনীয় করে এনেছে৷

কিন্তু কেবল নিসর্গের মাত্রাতেই তো নয়, দ্বীপটি চমকপ্রদ হয়ে উঠেছে এর প্রশাসনিক অনন্যতার কারণেও৷ জেজু আগে ছিল দক্ষিণ কোরিয়ার নয় প্রদেশের একটি৷ গণভোটে রায় দিয়ে এ দ্বীপের বাসিন্দারা একে একটি বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ হিসেবে চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়৷ ২০০৬ সালের ১ জুলাই থেকে এটি কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি শাসন থেকে নিজেদের মুক্ত করে৷ জেজু একদিন ধীরে ধীরে একটি ‘মুক্ত আন্তর্জাতিক নগর’ হয়ে উঠবে, সেটিই এই দ্বীপবাসীর স্বপ্ন৷ কোরিয়া ফাউন্ডেশনের সহযাত্রী জানালেন, কোনো ভিসা ছাড়াই এখানে এসে দিব্যি একটি মাস সময় কাটিয়ে দেওয়া যায়৷ নতুন এই ব্যবস্থাপনার পর জেজুর মতো চোখধাঁধানো দ্বীপে পর্যটকের স্রোত যে কয়েক গুণ বেড়ে গেছে, তা আর আশ্চর্যের কী!
আমরা ১৮টি দেশের ২৩ জন সংবাদকর্মী এই দ্বীপে এসেছি, কোরিয়া ফাউন্ডেশনের তদারকিতে৷ নিছকই বেড়াতে নিয়ে আসা নয়, আমাদের ২৮ মে নবম জেজু ফোরামের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আঁচ অনুভব করানো তাদের আসল উদ্দেশ্য৷ এ ফোরামের অন্যতম উদ্যোক্তা জেজুর বিশেষ আত্মনির্ভর সরকার৷ এশিয়াতে শান্তি ও সমৃদ্ধির বিভিন্ন উপায় খুঁজে বের করা এ ফোরামের মূল উদ্দেশ্য৷ এবারে তিন দিন ধরে যেসব আলোচনা হলো, তার কেন্দ্রীয় ভাবনা ‘নতুন এশিয়ার রূপায়ণ’৷
ভাবনা এশিয়াকে নিয়ে, কিন্তু আয়োজকেরা যুক্ত করছেন এর বাইরের মানুষদেরও৷ এই ফোরামকে তাঁরা বহুপক্ষীয় মতামত ও সহযোগিতার একটি কেন্দ্রভূমি হিসেবে গড়ে তুলতে চান৷ আলোচনায় অংশ নিতে তাই এসেছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী জুলিয়া গিলার্ড, চীনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী লি ঝাওজিং ও ফিলিস্তিনে স্বল্পকালের জন্য প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া সালাম ফাইয়াদ৷ আরও এসেছেন বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা৷
অনুষ্ঠানের উদ্বোধন উপলক্ষে অতিথিদের নৈশভোজে আপ্যায়ন করল কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়৷ বিপুল লোকের এক এলাহি আপ্যায়নপর্ব৷ নৈশভোজ-পূর্ব বক্তব্য রাখলেন এ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ইয়ুন বিউং-সে৷ বুঝতে অসুবিধা হয় না, এশিয়া বলতে তাঁরা পূর্ব এশিয়াই বোঝান৷
মন্ত্রীর বক্তব্য ছোট, কিন্তু সুচিন্তিত৷ তাতে আকাঙ্ক্ষার ইশারাটি সুস্পষ্ট৷ বললেন, প্রতিটি দেশের বাণিজ্যের প্রসার এখন বিভিন্ন দেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল৷ সহযোগিতার হাত যাঁরা গুটিয়ে রাখবেন, তাঁরা শুধু অন্যের নন, নিজেদেরও বিরাট ক্ষতি করবেন৷ নানা দেশের সম্পর্ক তাই নতুন নতুন মাত্রায় জোরালো করতে হবে৷ পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের আঞ্চলিক উন্নয়নের জন্য এ যুগে বিশ্বসমাজেরও ঐক্য প্রয়োজন৷
জল-স্থল-আকাশের যোগাযোগব্যবস্থার নিরাপত্তা এবং সাইবার-নিরাপত্তার জন্য সব দেশের একসঙ্গে কাজ করার ওপর তিনি অসম্ভব জোর দিলেন৷ বাণিজ্যের যে বিপুল সম্প্রসার ভবিষ্যতে অপেক্ষা করছে, সাইবার-নিরাপত্তার জন্য বিশ্ব সম্মিলিতভাবে কাজ না করলে তিনি তার বড় অংশই হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কা জানালেন৷
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, এ তো সত্য কথা যে ইতিহাসের অমীমাংসিত প্রসঙ্গ, জাতিবাদের উত্থান, জাতীয় স্বার্থের টানাপোড়েন—এসব কারণে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে রেষারেষি হবে৷ আঞ্চলিক আবহাওয়া তাতে তপ্ত হয়ে পড়বে৷ কোরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, ‘আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর প্রতিনিধিদের সমবায়ে সংকট মোকাবিলার জন্য ছোট্ট কিন্তু কার্যকর একটি ফোরাম এখন আমাদের দ্রুত গঠন করা দরকার৷’
কোরীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষণের পরে হাততালির যে স্রোত বয়ে গেল, সহজে কি আর তা থামে! বোঝা গেল, এ হাততালি কেবল সৌজন্যের নয়, অনেকের অন্তরেরও৷
দক্ষিণ কোরিয়া থেকে
সাজ্জাদ শরিফ: কবি, সাংবাদিক৷

ডিসি সাহেবের গোসসা এবং সিডিএর উন্নয়ন by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) ওপর প্রচণ্ড খেপেছেন জেলা প্রশাসক মেজবাহ উদ্দিন। তাঁর আবাসস্থলকে ঘিরে যে পাহাড় ও পার্ক, তাঁকে না জানিয়ে তার উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়ার ঘটনাটি ইগোতে (অহং) লেগেছে তাঁর। তিনি এর বিরুদ্ধে নোটিশ দিয়েছেন, এমনকি মামলা করার হুমকিও দিয়েছেন। ডিসি হিল পার্কের উন্নয়ন ও সংস্কারের নির্দেশ দিয়েছিলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন। তিনি নিজে সরেজমিনে এই পাহাড় ও পার্ক পরিদর্শন করে এর উন্নয়নের দায়িত্ব দিয়েছিলেন সিডিএকে। সে অনুযায়ী সিডিএ এই পার্কের জন্য ছয় কোটি ৬৫ লাখ টাকার একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব পাঠায় মন্ত্রণালয়ে এবং স্থানীয় দৈনিকে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে।

জেলা প্রশাসকের হুমকিতে কাজ হয়েছে। সিডিএ দরপত্র বিজ্ঞপ্তি স্থগিত করেছে। খোদ মন্ত্রী মহোদয় এ ঘটনাকে ভুল-বোঝাবুঝি বলে অভিহিত করে জানিয়েছেন, ‘আমরা জেলা প্রশাসকের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে কাজ করব। আমাদের মূল পরিকল্পনা জানলে আশা করি তিনি অমত করবেন না।’ এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই সিডিএর উন্নয়ন-উদ্যোগ এবং দরপত্র আহ্বানের মধ্যে পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল। তবে যে কথাটি মন্ত্রী, জেলা প্রশাসক বা সিডিএ আদৌ উল্লেখ করার প্রয়োজন আছে বলে মনে করছে না, তা হলো, চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী এই পাহাড় ও পার্কটি উন্নয়নের ব্যাপারে সবার আগে মতামত নেওয়া দরকার ছিল সাংস্কৃতিক কর্মী ও নাগরিক সমাজের।
ঐতিহ্যবাহী ডিসি হিল পার্ক বাংলা নববর্ষ বরণসহ নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। ভোরে ও সন্ধ্যায় এখানে প্রাতর্ভ্রমণ করতে আসেন শত শত নারী-পুরুষ। শহরের কেন্দ্রস্থলে বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও মুক্তবায়ু সেবনের জন্য এমন বিস্তৃত মনোরম পাহাড়ি অঞ্চল আর নেই। সুতরাং এর উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে পরামর্শ করার বিকল্প নেই। নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, প্রকৌশলীসহ সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে নিয়ে গড়ে ওঠা ‘পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরাম’-এর (এফপিসি) মতো সংগঠনকেও এই পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করা যেত। কিন্তু এসব কিছুই না করে সিডিএ নিজেরাই এমন একটি প্রকল্প তৈরি করেছে, যার মধ্যে রয়েছে ফুডকোট, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণসহ অপ্রয়োজনীয় এবং বাণিজ্যমুখী কিছু পরিকল্পনা।
অন্যদিকে, জেলা প্রশাসক পাহাড়ের চূড়ায় তাঁর বাসভবনের সীমানা সংরক্ষণ নিয়ে সোচ্চার। তিনি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মতো ‘কোলাহল’ নিয়ে বিরক্ত এবং প্রাতর্ভ্রমণকারীদের অবাধ চলাফেরার ফলে তাঁর ‘প্রাইভেসি’ ক্ষুণ্ন² হওয়ায় রীতিমতো ক্ষুব্ধ। এর আগেও ডিসি হিলে ভ্রমণকারীদের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণের জন্য দেয়াল তুলে, গেট স্থাপন করে নানা রকম প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছেন তিনি। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত সাউন্ড সিস্টেমের আওয়াজে তাঁর ঘুমের ব্যাঘাত হয়, সন্ধ্যার পর এখানে অসামাজিক কার্যকলাপ হয় ইত্যাদি নানা অভিযোগও তুলেছেন জেলা প্রশাসক। এ যেন অনেকটা মাথাব্যথার জন্য মাথা কেটে ফেলার ব্যবস্থা। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সময়সীমা নির্ধারণ বা শব্দযন্ত্র ব্যবহার নিয়ে নিয়মনীতি অনুসরণ করা যেতে পারে, অসামাজিক কার্যকলাপ বন্ধের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদারকির ব্যবস্থাও করতে পারে প্রশাসন। কিন্তু এসব অসুবিধার জন্য ডিসি হিল পার্ককে ঘিরে গড়ে ওঠা মুক্ত সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিবেশকে রুদ্ধ করা কেন?
আগেই বলেছি, জেলা প্রশাসকের সঙ্গে বিরোধের কারণে স্থগিত করতে হয়েছে সিডিএর প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প। এই সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে বা সিডিএকে একহাত দেখিয়ে দেওয়ার মানসিকতা থেকে কি না জানি না, জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের বাসভবনকে ঘিরে তিন কোটি টাকার অন্য একটি উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে জেলা প্রশাসন। প্রস্তাবিত প্রকল্পে জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের বাসভবনে ওঠানামার রাস্তার পাশে এসএস রেলিংসহ সাইড ওয়াল নির্মাণ, জেলা প্রশাসকের বাসভবনের পেছনে গোলঘর ও ওয়াকওয়ে এবং বিভাগীয় কমিশনারের বাসভবনের সামনে একটি ফোয়ারা নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। অর্থাৎ ডিসি হিল পার্কের উন্নয়নের জন্য যে দীর্ঘদিনের দাবি চট্টগ্রামবাসীর, তাকে রূপান্তর করা হলো জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের বাসভবনের সৌন্দর্যবৃদ্ধির প্রকল্পে। এরই নাম হয়তো আমলাতন্ত্র!
এসব উদ্যোগ-আয়োজন দেখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতাটির কথা মনে পড়ে যায়। রাজার পায়ে ধুলাবালু লাগে, তাই রাজ্যের পথঘাট ঢেকে দেওয়ার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন তাঁর মন্ত্রীরা। কিন্তু রাজার পা মুড়ে দিলেই সমস্যাটির সমাধান হয়ে যায়, এই সাধারণ বুদ্ধিটা আসেনি তাঁদের মাথায়। জেলা প্রশাসক পত্রিকান্তরে বলেছেন, পার্ক করার মতো অনেক স্থান আছে, প্রয়োজনে তিনি সে রকম একটি স্থান নির্বাচন করবেন এবং বরাদ্দ দেবেন। কিন্তু এই সমাধানটি তাঁর মাথায় এল না যে নগরের বিভিন্ন স্থানে সরকারি যে ভবনগুলো আছে, সেখানে উপসচিব পর্যায়ের একজন সরকারি কর্মকর্তার বাসভবন স্থানান্তর কত সহজ ও বাস্তবসম্মত।
জেলা প্রশাসন ও সিডিএর উদ্যোগের বিরোধিতা করে মানববন্ধন হয়েছে। প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেছেন সাংস্কৃতিক কর্মীসহ চট্টগ্রামের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। ডিসি হিলকে ঘিরে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স নির্মাণের দাবি তুলেছেন তাঁরা। জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনারের বাসভবন অন্যত্র স্থানান্তর করার দাবিও উঠেছে। এসব দাবি উপেক্ষা করে জেলা প্রশাসক তাঁর অহং প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তে অবিচল থাকলে তার ফল ভালো হবে বলে মনে হয় না।
ডিসি হিল পার্ক নিয়ে সিডিএর উন্নয়ন পরিকল্পনার সাম্প্রতিক ব্যর্থতার সূত্রে এই সংস্থাটির কিছু কার্যক্রম সম্পর্কে বলতে চাই। এ কথা সত্য, সাম্প্রতিক সময়ে সিডিএ নামের সংস্থাটি যত সক্রিয় তার নজির বিরল। এবং এ কথাও সত্য, এ সংস্থার শীর্ষ ব্যক্তি আবদুচ ছালামের বিরুদ্ধে মোটাদাগে কোনো অসততা বা দুর্নীতির অভিযোগও ওঠেনি। তাঁর সদিচ্ছা নিয়েও প্রশ্ন নেই, প্রশ্ন দূরদর্শিতা নিয়ে, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে।
চট্টগ্রাম শহরে সিডিএর তত্ত্বাবধানে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড রীতিমতো দৃশ্যমান। কিন্তু এসব উন্নয়ন আদৌ কতটা সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার ফল, তা নিয়ে সংশয় তৈরি করার জন্য ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত উড়ালসড়কটিই তো যথেষ্ট। এই উড়ালসড়ক দিয়ে চলাচল করা সীমিতসংখ্যক যানবাহনের দিকে তাকিয়ে আজ স্বীকার করতেই হবে, এফপিসি বা বিশেষজ্ঞরা যে আপত্তি তুলেছিলেন, তা কতটা যুক্তিসংগত। অথচ এই উদাহরণ সামনে রেখেও আরও কয়েকটি ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সিডিএ। ৪৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে মুরাদপুর থেকে লালখান বাজার পর্যন্ত ৫ দশমিক ২ কিলোমিটার একটি উড়ালসড়কের দরপত্র চূড়ান্ত হয়েছে। অবিলম্বে এর কাজ শুরু হবে। বিমানবন্দর থেকে শাহ আমানত সেতু পর্যন্ত একটি উড়ালসড়ক নির্মাণও পরিকল্পনাধীন।
সম্প্রতি এফপিসির এক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরে উড়ালসড়ক নির্মাণকে ‘চমক’ ও ‘অপচয়’ বলে অভিহিত করে বলা হয়, এসব প্রকল্পে যে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে, তার সিকি ভাগও যদি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় ব্যয় করা হয়, তাহলে নগরের যানজট সমস্যার সম্পূর্ণ নিরসন হবে। নগরের সড়ক প্রশস্ত করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছে এফপিসি। এ কথা ঠিক, সিডিএ নিকট অতীতে বেশ কিছু সড়ক সম্প্রসারণের কাজ সমাধা করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সম্প্রসারিত সড়কের অধিকাংশই ইতিমধ্যে হকার, দোকানি ও ব্যবসায়ীরা দখল করে নিয়েছেন। সড়ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা ও দখলমুক্ত রাখার উদ্যোগ না নিলে এই বিরাট কর্মযজ্ঞ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে বাধ্য।
গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী মোশাররফ হোসেন নিজে প্রকৌশলী। তিনি বহদ্দারহাট উড়ালসেতু সরেজমিনে পরিদর্শন করে এফপিসির বক্তব্যের যথার্থতা খঁুজে পেয়েছেন। পত্রিকান্তরে এক প্রশ্নের কৌশলী উত্তর দিয়েছেন তিনি, বলেছেন, ‘ফ্লাইওভার নির্মাণের বিরোধিতা করে যাঁরা সংবাদ সম্মেলন করেছেন, আমি তাঁদের বিরোধিতা করছি না। এই ফ্লাইওভার চট্টগ্রামবাসীর আদৌ কোনো উন্নয়নে আসবে কি না, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন।’
এই ভেবে দেখার কথাটিই বলতে চাই আমরা। সিডিএ তার উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা বা পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের মতো সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময়ের আয়োজন করলে, আলোচনা-সমালোচনার পর একটি সঠিক পথের দিশা পেতে পারে। মনে রাখতে হবে, সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, এর সঙ্গে দক্ষতা-যোগ্যতাও থাকতে হবে। দক্ষতা-যোগ্যতার অভাব ঘটলে উন্নয়নের নামে বহদ্দারহাট উড়ালসড়কের মতো চমক তৈরি করা যাবে, প্রকৃত উন্নয়ন রয়ে যাবে অধরা।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।

বৈষম্যের দুনিয়ায় আয় বৃদ্ধি! by কামাল আহমেদ

‘ইনক্লুসিভ ক্যাপিটালিজম’-এর জুতসই কোনো বাংলা আমার মাথায় আসছে না৷ কী বলা যায় একে? অন্তর্ভুক্তিমূলক পুঁজিবাদ? ভাগাভাগির পুঁজিবাদ? নাকি শুদ্ধ পুঁজিবাদ? বিষয়টা নাহয় ভাষাবিশারদ অর্থনীতিবিদেরাই ঠিক করুন৷ কিন্তু যে কারণে এ বিষয়ের অবতারণা, তা হলো গত ২৭ মে লন্ডনে অনুষ্ঠিত এক আয়োজন, যার নাম ছিল ‘কনফারেন্স অন ইনক্লুসিভ ক্যাপিটালিজম: বিল্ডিং ভ্যালু অ্যান্ড রিনিউয়িং ট্রাস্ট’৷ অনেকটা ডাভোসের বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মতো৷ পুঁজিবাদী দুনিয়ার বুদ্ধিবৃত্তিক নেতাদের দিনভর পুঁজিবাদের সমূহ বিপদ সম্পর্কে আলাপ-আলোচনার পর সংকটাপন্ন পুঁজিবাদকে মানবিক রূপ দিয়ে টিকিয়ে রাখার জন্য সম্ভাব্য কী কী উদ্যোগ নেওয়া যায়, তা ঠিক করতেই এ সম্মেলন৷
লাল দোতলা বাসের সঙ্গে লন্ডনের একটা ঐতিহাসিক সম্পর্ক আছে৷ যে কারণে বিশ্বের বহু প্রান্তেই মানুষ এ ধরনের বাসকে ব্রিটেনের একটি স্মারক হিসেবে বিবেচনা করে থাকে৷ এ বাসে ওপরে-নিচে মিলিয়ে ৮০ থেকে ৯০ জন যাত্রী বসতে পারে৷ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) প্রধান ক্রিস্টিন লাগার্ড ওই আয়োজনে বলেছেন যে বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ৮৫ জনকে আটানোর জন্য লন্ডনের একটি দোতলা বাসই যেখানে যথেষ্ট, সেখানে তাঁদের নিয়ন্ত্রণে থাকা মোট সম্পদের পরিমাণ বিশ্বের ৩৫০ কোটি দরিদ্র মানুষের সম্পদের সমান৷ তিনি বলতে বাধ্য হয়েছেন, বৈষম্য যত বাড়বে, পুঁজিবাদ ততটাই কম অংশীদারমূলক হবে৷

অঙ্কের হিসাবে ওই ৮৫ জনের সম্পদের পরিমাণ তুলে ধরা সম্ভব হলেও তা বোঝানো প্রায় অসম্ভব৷ ক্রিস্টিন লাগার্ডের আগে এ কথাগুলো বলেছিল বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, অক্সফাম৷ গত ১৯ জানুয়ারি তাদের এক প্রকাশনায় তারা এই ৮৫ জনের মোট সম্পদের পরিমাণ অর্থমূল্যে ১ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার বলে উল্লেখ করে৷ বিশ্বব্যাপী ধনী ও গরিবের মধ্যে যে অবিশ্বাস্য গতিতে এ সম্পদ বাড়ছে, তাতে পুঁজিবাদী বিশ্বের মোড়লেরাই সবচেয়ে বেশি চিন্তিত বিশ্বব্যাপী সমাজতন্ত্রীরা প্রায় বিলুপ্ত এক প্রজাতিতে রূপান্তরিত হওয়ার পরও এসব পুঁজিবাদীর উৎকণ্ঠার শেষ নেই৷ এ উৎকণ্ঠা তাঁদের অর্জিত সম্পদ রক্ষা করার উদ্বেগ থেকে উৎসারিত৷

পুঁজিবাদী অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির দিকনির্দেশনা দেওয়ার কথা যে প্রতিষ্ঠানের, সেই আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টিন লাগার্ড এ হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন যে সম্পদের অধিকতর কেন্দ্রীকরণ ঠেকানো না গেলে গণতন্ত্র ও মেধাতন্ত্রের নীতিকে উপেক্ষা করা হবে; এমনকি তা ১৯৪৮ সালে গৃহীত সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার সম-অধিকারনীতির পরিপন্থী হবে৷ পুঁজিবাদীদের অন্যতম মন্ত্র ‘সুযোগের ক্ষেত্রে সমতা’ (ইকুয়ালিটি অব অপরচুনিটি) নিশ্চিত করার নীতি অর্থহীন বলে স্বীকার করে নিয়ে তিনি বলেছেন, যেহেতু উন্নত মানের শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসুবিধা সব সময় টাকা দিয়ে কেনা যায়, সেহেতু সুযোগের ক্ষেত্রে আর কোনো সমতা থাকে না৷
পুঁজিবাদের বেসামাল বিকাশ এবং গুটি কয়ের হাতে পুঁজি কেন্দ্রীভূত হওয়ার কারণে তার নিজের মধ্যেই এর ধ্বংসের বীজ নিহিত আছে বলে কার্ল মার্ক্সের ভবিষ্যদ্বাণীকে উদ্ধৃত করতে তাই আইএমএফ-প্রধান একটুও লজ্জিত হন না৷ সমৃদ্ধি ভাগাভাগি করে নেওয়ার পথ অনুসন্ধানের তাগিদ দেন তিনি৷ (সূত্র: ২৭ মে প্রকাশিত বক্তৃতা, আইএমএফ ওয়েবসাইট)৷ ওই একই সভায় ইংল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মার্ক কার্নি বলেছেন, নৈতিকতা উবে গেলে পুঁজিবাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার৷ তিনি আরও বলেছেন, পুঁজিবাজারে বৃহৎ পুঁজির অধিকারী লোকজনের সর্বগ্রাসী আচরণ সামাজিক বন্ধন ভেঙে ফেলার ঝুঁকি তৈরি করছে৷ তিনি ব্যাংকারদের এ সর্বগ্রাসী আচরণ বলতে বুঝিয়েছেন যে ফাটকাবাজিতে লিপ্তরা জুয়ায় জিতলেও যেমন তাদের লাভ, হারলেও লাভ৷
২০০৮ সালের বৈশ্বিক মন্দার পর থেকে গত পাঁচ বছরে বিশ্বে বৈষম্য আরও বেড়েছে এবং ধনীরা যতটা দ্রুত হারে আরও ধনী হয়েছেন, দরিদ্ররা দারিদ্র্য থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ঠিক ততটাই পিছিয়ে পড়েছেন৷ ক্রিস্টিন লাগার্ড অন্য আরেক বক্তৃতায় (রিচার্ড ডিম্বলবি বক্তৃতা, ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৪) জানান, ২০০৯ সালের পর বিশ্বের মোট আয় বৃদ্ধির শতকরা ৯৫ ভাগই গেছে সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষের দখলে৷ ওই হিসাব অনুযায়ী নিচের দিকের ৯০ শতাংশ মানুষ আরও গরিব হয়েছেন৷ যার অর্থ দাঁড়াচ্ছে, ৯ শতাংশের মতো মানুষের কপালে ছিটেফোঁটা কিছুটা জুটেছে৷ বৈশ্বিক এ হিসাবের পাশাপাশি ক্রিস্টিন লাগার্ড ভারতেরও একটা হিসাব তুলে ধরেছেন, যাতে দেখা যায়, ভারতীয় শতকোটিপতিদের সম্পদ গত ১৫ বছরে বেড়েছে ১২ গুণ৷ ওই সময়ে ভারতীয় শতকোটিপতিদের সম্পদ যে পরিমাণে বেড়েছে, তাঁর হিসাবে তা দিয়ে দেশটির চরম দারিদ্র্যে থাকা জনগোষ্ঠীকে দারিদ্র্য থেকে দুবার বের করে আনা সম্ভব৷
বাংলাদেশের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তিদের সম্পদের হিসাব নিয়ে এ ধরনের কোনো নির্ভরযোগ্য ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার কথা শোনা যায় না৷ অনুমাননির্ভর কিছু কথা অবশ্য মাঝেমধ্যেই শোনা যায়৷ তবে সেগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও ধনী-দরিদ্রের বৈষম্যের চিত্রটা বাংলাদেশেও যে ভিন্ন কিছু নয়, সেটা নিশ্চিন্তেই বলা যায়; বিশেষ করে শহরাঞ্চলের সঙ্গে গ্রামাঞ্চলের এবং শহরের বহুতল ভবনের বাসিন্দাদের সঙ্গে বস্তিবাসীর জীবন–মানের বৈষম্য৷ আগামী অর্থবছরের বাজেট দেওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে অঙ্ক কষতে গিয়ে আমাদের মন্ত্রী ও আমলারা সম্প্রতি হিসাব পেয়েছেন যে মাথাপ্রতি জাতীয় আয় বেড়ে এখন এক হাজার ১৯০ ডলারে দাঁড়িয়েছে৷ কিন্তু বাংলাদেশ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে, গত অর্থবছর অর্থাৎ ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে দুই কোটি টাকার বেশি সম্পদের অধিকারী লোকের সংখ্যা মাত্র সাড়ে পাঁচ হাজার (প্রথম আলো, ২২ মে, ২০১৪)৷ এ তথ্যটুকু থেকেই তো আলামত মেলে যে বাংলাদেশেও সব সমৃদ্ধি ও সম্পদ বৃদ্ধির সিংহভাগ গুটি কয় ধনী লোকের হাতে কেন্দ্রীভূত রয়েছে৷

সরকারি পরিসংখ্যানে অবশ্য বলা হয়, দেশে দারিদ্র্যের হার কমছে, বিশেষ করে চরম দারিদ্র্য৷ কিন্তু দারিদ্র্য কমার হার কি ধনীদের আরও দ্রুত ধনবান হওয়ার হারের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে? রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্ট গুটি কয় পরিবার ও গোষ্ঠী কুইক রেন্টালের ভর্তুকি, শেয়ারবাজারে উচ্চ মুনাফার মূল্য দেখিয়ে বিনিয়োগকারীদের সঞ্চয় লুণ্ঠন, ব্যাংক-বিমার লাইসেন্স নিয়ে রাতারাতি শতকোটিপতি হওয়া, এমএলএম কোম্পানির নামে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের মাধ্যমে যেভাবে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে, তার প্রকৃত চিত্র সম্ভবত কখনোই জানা যাবে না৷

রাজনীতিকদের একটা বড় অংশও যে এই সম্পদ অর্জনের প্রতিযোগিতায় লিপ্ত, তার প্রমাণও আমরা দেখেছি ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত ভোটারবিহীন নির্বাচনের প্রার্থীদের হলফনামায়৷ তাঁদের কারও কারও সম্পদ নাকি পাঁচ বছরে শতগুণের বেশি বেড়েছে৷ এমনকি একদা শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্র কায়েমের রাজনৈতিক মন্ত্রে দীক্ষা নেওয়া কতিপয় বামপন্থী নেতার পরিবারের সদস্যদের নামে একাধিক সরকারি জমি বরাদ্দ নিয়ে রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার তথ্যও এখন সবাই জানেন৷ আবার ঘোষিত সম্পদই যে সবার একমাত্র উপার্জন, সে কথাও কেউ জোর দিয়ে বলতে পারবেন না৷
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০১১ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির ২৪ শতাংশই কালোটাকার দখলে৷ ‘শ্যাডো ইকোনমি অব বাংলাদেশ: সাইজ এস্টিমেশন অ্যান্ড পলিসি অ্যাপ্লিকেশন’ শীর্ষক ওই গবেষণায় ব্যবহৃত তথ্য-উপাত্ত ২০০৮ সালের আগের৷ সুতরাং, সাম্প্রতিক কালে তার আকার আরও কতটা স্ফীত হয়েছে অনুমান করা কঠিন৷ ফি-বছর কালোটাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়ায় অভ্যস্ত অর্থমন্ত্রী অবশ্য আবারও বলেছেন যে সেই সুযোগ আর দেওয়া হবে না৷ কিন্তু সেই কালোটাকার বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর পদেক্ষেপ নেওয়ার কোনো অঙ্গীকার তাঁর কাছ থেকে শোনা যায়নি৷
ইউরোপের অনেক দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্র গত এক বছরে কর ফাঁকি দেওয়া এবং বিদেশে পাচার হওয়া কালোটাকা উদ্ধারে উদ্যোগী হয়ে বেশ ভালো সাফল্য দেখিয়েছে৷ সুইজারল্যান্ডের কাছ থেকেও এখন তারা সম্পদ গোপনকারীদের বিষয়ে তথ্য আদায় করে নিচ্ছে৷ বাংলাদেশে একমাত্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ছাড়া আর কারও ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়৷ অথচ এ বিপুল বৈষম্যের ছায়াতেই আমরা জাতীয় আয় বৃদ্ধি উদযাপন করছি৷ সেখানে বৈষম্য নিয়ে কারও না আছে উদ্বেগ, না আছে ক্ষোভ৷

কামাল আহমেদ: প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি, লন্ডন৷

আইনজীবীকে হত্যায় অনুতপ্ত র‌্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তা by আসিফ হোসেন

নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলায় রিমান্ডে থাকা র‌্যাব ১১-এর সাবেক তিন কর্মকর্তা ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন৷ একই সঙ্গে তাঁরা আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়িচালককে হত্যার ঘটনায় অনুতপ্ত৷ এ কথা তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র থেকে জানা গেছে৷ রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে এই তিন কর্মকর্তা বলেছেন, চন্দন সরকারকে তুলে নেওয়ার কোনো পরিকল্পনা তাঁদের ছিল না৷ তিনি ও তাঁর গািড়চালক পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন৷ তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণ অনুযায়ী, কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম ও তাঁর সঙ্গীদের অপহরণ ও হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী পলাতক আসামি নূর হোসেন৷ তাঁর কাছ থেকে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে র‌্যাব-১১-এর সদস্যরা এ ঘটনা ঘটিয়েছেন৷ যদিও রিমান্ডে তিন কর্মকর্তা নূর হোসেন থেকে টাকা নেওয়ার কথা এখন পর্যন্ত স্বীকার করেননি৷ এ ছাড়া কাউন্সিলর নজরুলের প্রতি ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের সাংসদ শামীম ওসমানও এই হত্যা পরিকল্পনা আগে থেকেই জানতেন বলে তদন্তে তথ্য মিলেছে৷ তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা ইতিমধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানানো হয়েছে৷ সবুজসংকেত পাওয়া গেলে মামলার অভিযোগপত্র প্রস্তুত করার কাজ শুরু করা হবে৷

সাত খুনের ঘটনায় এ পর্যন্ত ২৮ জনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। এঁদের মধ্যে র্যাবের সাবেক তিন কর্মকতা লে. কর্নেল (অব.) তারেক মোহাম্মাদ সাঈদ, মেজর (অব.) আরিফ হোসেন ও লে. কমান্ডার এম এম রানাসহ ১৪ জনকে সুনির্দিষ্টভাবে হত্যা মামলায়, বািকদের ফৌজদাির কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এর বাইরে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা ও কাউন্সিলর নূর হোসেনের কথিত বান্ধবী কাউন্সিলর জান্নাতুল ফেরদৌসকে অপর একটি হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, সাতজনকে অপহরণের পরপরই র্যাব-১১-এর তৎকালীন কর্মকর্তা মেজর আরিফ হোসেনের সঙ্গে নূর হোসেনের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ ছিল। ২৭ এপ্রিল দুপুরে অপহরণের কিছুক্ষণ পরেই নূর হোসেন নারায়ণগঞ্জের রাইফেল ক্লাবে এসে সাংসদ শামীম ওসমানের সঙ্গে অবস্থান করেন৷ শামীম ওসমানের পাশে বসেই তিনি মুঠোফোনে মেজর আরিফের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। মেজর আরিফ ও নূর হোসেনের মুঠোফোনের কথোপকথনের রেকর্ড পুলিশ ইতিমধ্যে সংগ্রহ করেছে৷
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে র৵াবের সাবেক তিন কর্মকর্তা আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর গািড়চালককে খুনের ঘটনায় অনুতপ্ত বলে জানিয়েছেন৷ লে. কর্নেল (অব.) তারেক সাঈদ জানিয়েছেন, সিদ্ধিরগঞ্জের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির লক্ষ্যে নজরুল ও তাঁর অনুসারীদের তুলে আনা হয়েছিল৷ ওই দিন তাঁকে জানানো হয়েছিল, নজরুলসহ সাতজনকে তুলে আনা হয়েছে৷ কিন্তু তাঁদের মধ্যে কোনো আইনজীবী ছিলেন, সেটা তাঁকে বলা হয়নি৷ আর লে. কমান্ডার (অব.) এম এম রানা জিজ্ঞাসাবাদে দািব করেন, তিনি আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর গািড়চালককে হত্যা না করতে মেজর আরিফকে বলেছিলেন।
নূর হোসেনের কাছ থেকে ছয় কোটি টাকার বিনিময়ে র্যাব এই সাতজনকে খুন করেছে বলে নিহত নজরুলের শ্বশুর শহীদুল ইসলাম যে অভিযোগ করেছেন, জিজ্ঞাসাবাদে র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তা তা স্বীকার করেননি৷ তবে মেজর আরিফ এর আগে বিভিন্ন সময়ে নূর হোসেনের কাছ থেকে বিপুল অঙ্কের আর্থিক সুবিধা নিয়েছিলেন, এমন তথ্য পুলিশ পেয়েছে৷
তদন্তসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, নূর হোসেনকে গ্রেপ্তার করে র্যাবের সাবেক তিন কর্মকর্তাকে মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে প্রাপ্ত তথ্য যাচাই-বাছাই করাটা আরও সহজ হতো। নজরুল ও নূর হোসেনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আগে থেকেই দ্বন্দ্ব ছিল৷ কিন্তু দুজনই শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠ ছিলেন৷ এর মধ্যে নজরুলের সঙ্গে শামীম ওসমানের একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল বলে তদন্তে পুলিশ তথ্য পেয়েছে৷ নজরুল বছর খানেক ধরে শামীম ওসমানের সভা-সমাবেশে আসতেন না। ২০১২ সালে বিজয় দিবসের শোভাযাত্রা করেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন। শোভাযাত্রায় মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী যোগ দেন। সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে মিছিল নিয়ে এসে ওই শোভাযাত্রায় যোগ দেন নজরুলও৷ এতে তাঁর ওপর বেশ ক্ষুব্ধ হন শামীম ওসমান৷ গত ১৮ এপ্রিল শামীম ওসমান যে সমাবেশ করেন, তাতে নূর হোসেন দলবল নিয়ে যোগ দিলেও নজরুল আসেননি৷
তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, নজরুলের ওয়ার্ডে রাস্তা প্রশস্ত করার জন্য একটি দোকানের সামনের অংশ ভাঙা নিয়ে বিবাদের জের হিসেবে নূর হোসেনের ক্যাডাররা গত ২ জানুয়াির ওই এলাকায় হামলা চালিয়েছিল৷ সেদিনই নজরুলকে হত্যার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু নজরুল একটি বািড়তে আত্মগোপন করে প্রাণে বেঁচে যান। এ ঘটনায় নূর হোসেন তাঁর অনুগত এক ব্যক্তিকে দিয়ে নজরুল ও তাঁর সহযোগীদের আসািম করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা করান। ওই মামলা করার ক্ষেত্রেও শামীম ওসমানের ভূমিকা ছিল বলে তদন্তে তথ্য মিলেছে৷
ওই মামলায় নজরুল ও তাঁর সহযোগীরা হাইকোর্টের নির্দেশনা মোতাবেক নারায়ণগঞ্জ আদালতে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে অপহৃত ও খুন হন। এমনকি পরে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রেও নূর হোসেনকে সহায়তা করেছেন সাংসদ শামীম ওসমান৷ ২৯ এপ্রিল শামীম ওসমানের সঙ্গে নূর হোসেনের মুঠোফোনের কথোপকথনের পুরোটা পর্যালোচনা করেছেন তদন্তকারীরা৷ তাতে স্পষ্ট হয়েছে যে শামীম ওসমান নূর হোসেনকে আদালতে যেতে বলেননি। যে গৌড়দার সঙ্গে নূর হোসেনকে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন, তাঁকেও চিহ্নিত করেছে পুলিশ। ওই গৌড়দার আশ্রয়ে নূর হোসেন এখন ভারতে রয়েছেন।
সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত সংস্থা (সিআইডি) এ মামলার তদন্তে জেলা পুলিশকে নানাভাবে সহায়তা করছে৷
জানতে চাইলে এ মামলা তদন্ত-তদারককারী কর্মকর্তা জেলা পুলিশ সুপার খন্দকার মহিদ উদ্দিন গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, তদন্তে যথেষ্ট অগ্রগতি আছে। পুলিশ সম্পূর্ণ পেশাগত দক্ষতা, যোগ্যতা দিয়ে তদন্তকাজ করছে। তবে তিনি তদন্তের প্রাপ্ত তথ্য সম্পর্কে কিছু বলতে রাজি হননি৷

নূর হোসেনের ভুল বানান by ইফতেখার মাহমুদ

দিনের প্রতিবেদন লেখার কাজ শেষ করে সন্ধ্যায় কী মনে করে কবি শামসুর রাহমান ও প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের লেখা শহীদ নূর হোসেন বইটি নাড়াচাড়া করছিলাম। বইয়ের ফাঁক গলে কম্পিউটারে খোলা প্রথম আলো অনলাইনে চোখ গেল। দেখি, সদ্য সংবাদে ‘এরশাদের আমলে কোনো খুন-গুম হয়নি’ লেখা। গত ১০ মে রাজধানীর কাকরাইলের ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে জাতীয় পার্টির সহযোগী সংগঠন জাতীয় যুব সংহতির এক সভায় এই সাবেক স্বৈরশাসক বলেছেন, ‘আমার আমলে একটাও গুম-খুন হয়নি।’
কাকরাইলের যে ভবনটিতে বসে এরশাদের এই ‘অমর বাণীটি’ রচিত হলো তার এক কিলোমিটারে নূর হোসেন চত্বরটি। ওই শনিবার সকালেই সংবাদ সংগ্রহের কাজে গুলিস্তান যাওয়া হয়েছিল। দুপুরে খাঁ খাঁ রোদে লাল ইটের নূর হোসেন চত্বরটির সামনে যেতেই এর লালচে ইটের গায়ে কতগুলো ছেঁড়া পোস্টার সাঁটানো দেখা গেল। নব্বইয়ের আগে জিরো পয়েন্ট নামে পরিচিত ছিল স্থানটি। নব্বইয়ের ৬ ডিসেম্বর স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের পর বলা হলো আমাদের গণতন্ত্র আবারও শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করল। জিরো পয়েন্টের নাম বদলে বাংলাদেশি গণতন্ত্রের আবারও শূন্য থেকে যাত্রার প্রতীক নূর হোসেনের নামে রাখা হলো ‘নূর হোসেন চত্বর’।

নূর হোসেন চত্বরের সামনে দাঁড়িয়ে এক হকার পত্রিকা বিক্রি করছিলেন। পত্রিকাগুলোর প্রথম পাতায় অন্য এক নূর হোসেনের ছবিসহ প্রতিবেদন। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের হোতা আওয়ামী লীগ নেতা নূর হোসেনকে নিয়ে লেখা ওই প্রতিবেদনগুলোর দিকে তাকিয়ে আমার বেদনার্ত মনে সেই গণতন্ত্রের শহীদ নূর হোসেনের ছবিটি ভেসে ওঠে। পুরান ঢাকার নবাবপুরের মহাজনপুর লেনে বেড়ে ওঠার সুবাদে পাশের মহল্লা বনগ্রামের যুবক নূর হোসেনকে কিছুটা চেনার সুযোগ হয়েছিল। ওয়ারীতে যে কিন্ডারগার্টেন স্কুলে পড়তাম সেখানকার আমার এক প্রিয় শিক্ষিকাকে নূর হোসেন পছন্দ করতেন বলে স্কুলের ইঁচড়ে পাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রচার ছিল। স্কুলের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা নূর হোসেনকে দেখে ওই ছাত্ররা কানাঘুষা করত। তবে বনগ্রাম ও নবাবপুরের সবাই নূর হোসেনকে এরশাদ সরকারের পতনের আন্দোলনের মিছিলের নিয়মিত মুখ হিসেবেই চিনত। পাড়ার ছেলেদের এরশাদশাহির পতনের আন্দোলনে আনতে বাড়ি বাড়ি প্রচার চালাতেও নূর হোসেনকে দেখা যেত।
নূর হোসেনের মৃত্যুর পর পুরান ঢাকার নবাবপুর, ওয়ারী, মালিটোলা, সিদ্দিকবাজার থেকে মিছিলে যাওয়া যুবকের সংখ্যা বেড়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াইয়ের অসমাপ্ত বেদনার কাব্য ২৪ বছরের ওই তরুণের মৃত্যু যে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য হয়েছিল, তা ওই ছোট্ট বয়সে বুঝে উঠতে পারিনি। শামসুর রাহমান ও মতিউর রহমানের লেখা নিয়ে শহীদ নূর হোসেন বইটি(প্রথমা প্রকাশন, ২০১৩) পড়তে পড়তে ১৯৮৭ সালের সেই দিনটিতে যেন ফিরে যাচ্ছিলাম।
বইটির ভূমিকায় মতিউর রহমান লিখেছেন, ‘নূর হোসেনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তঁার বুকে–পিঠের স্লোগানে বানান ভুল থাকা সত্ত্বেও তা অবিকৃত রাখা হলো।’ হ্যঁা, নূর হোসেনের বুকে ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লেখায় গণতন্ত্র বানানটিতে ভুল ছিল। মূর্ধন্য-ণ-এর স্থলে লেখা হয়েছিল দন্ত্য–ন। ভুলটা অবশ্য পুরান ঢাকার বনগ্রামের ছেলে নূর হোসেনের ছিল না। বুকে-পিঠে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার ওই ‘এপিটাফটি’ লেখার দায়িত্ব নিয়েছিলেন পুরান ঢাকার টিকাটুলীর আর্ট হ্যাভেন দোকানের এক চিত্রশিল্পী।
কিন্তু আর্ট হ্যাভেনের ওই শিল্পী সে সময়ে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের অনেক পোস্টার-ব্যানার লিখতেন। তিনি িক সত্যি সত্যি ভুলবশত গণতন্ত্র বানানটিই ভুল করে লিখেছিলেন? সেই প্রশ্নের উত্তর নূর হোসেন বেঁচে থাকলে হয়তো দিতে পারতেন। নব্বইয়ের পর যাঁরা আমাদের ভাঙা গণতন্ত্রের হাল ধরেছিলেন, তাঁদের কাছেও উত্তর খোঁজা যেতে পারে।
শহীদ নূর হোসেন বইটিতে ভূমিকার পরেই শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী একটি ছোট্ট লেখা লিখেছেন। তাতে এই চিত্রশিল্পী লিখেছেন ‘ফরাসি বিপ্লবের ওপরে আঁকা ইউজিন দেলাক্রোয়ারের ছবি “জনগণের নেতৃত্বে স্বাধীনতা”তে স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে নারী জাতির একজনকে বেছে নিয়েছিলেন।’ নূর হোসেনের প্রতি অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য দেলাক্রোয়ার মতো অমর তুলিকা হস্তে কেউ িক এগিয়ে আসবেন?
শহীদ নূর হোসেন বইটির ভূমিকায় মতিউর রহমানের লেখনীতেও একই আকুতি ঝরে পড়ে। তিনি লিখেছেন, ‘নতুন করে প্রকাশিত শহীদ নূর হোসেন গ্রন্থটি যদি এই সময়ের তরুণ প্রজন্মকে কিছুটা হলেও উদ্বুদ্ধ করে, তাহলে সার্থক মনে হবে আমাদের প্রচেষ্টা। আর যদি কোনো তরুণ লেখক বা নাট্যকার নূর হোসেনকে নিয়ে কিছু ভাবেন, তাহলে কৃতজ্ঞ হব। আমরা পাশে থাকব।’
নব্বইয়ের ফেব্রুয়ারিতে শহীদ নূর হোসেন বইটির প্রথম প্রকাশ হয়েছিল। ২০১৩-এর ১০ নভেম্বর হলো দ্বিতীয় মুদ্রণ। এ দুই যুগে আমাদের রাজনীতিবিদেরা গণতন্ত্রের অনেক চেহারাই দেখিয়েছেন। শহীদ নূর হোসেনের মিছিলের সঙ্গী-সাথিরা রাষ্ট্রটিকে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের হোতা নূর হোসেনদের হাতে তুলে দিতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। এসব কথা অবশ্য একদিন রাজনৈতিক ইতিহাসের বিষয় হবে। নূর হোসেনের খুনি এরশাদ ও তঁার সরকারের লোকেরা কীভাবে নূর হোসেনের বন্ধুদের মিত্র হলেন, সেই রহস্য নিয়ে একদিন হয়তো গবেষণাও হবে।
নূর হোসেনের লাশ ভয়ে গুম করেছিল এরশাদের সরকারি গুন্ডা বাহিনী। সেই লাশ আর তোলা হয়নি। নূর হোসেনের লাশের মতোই আমাদের গণতন্ত্রও যে গুম হয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্র ছাপিয়ে সবকিছুর ঊর্ধ্বে উঠে যাবে দলতন্ত্র। সেই অলীক গণতন্ত্রের মুকুটের পালক হয়ে আছেন এরশাদ। হয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত। এসব কথা হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি নূর হোসেন ও তাঁর বাবা বৃদ্ধ মজিবুর রহমান। নূর হোসেন হয়তো ভাবতেই পারেননি তাঁর রেখে যাওয়া বাংলাদেশে এখনো গণতন্ত্রের বানান ভুলই থেকে যাবে। সংসদ সবাক হয়ে উঠবে না। মেরুদণ্ড সোজা করে নির্বাচন কমিশন দাঁড়াতে পারবে না। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) পক্ষপাতহীনভাবে কাজ করবে না। প্রশাসনযন্ত্র দলনিরপেক্ষ হবে না। আর জনগণের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠা বিরোধী দল গড়ে উঠবে না।
হয়তো এসব কিছু ভেবেই নূর হোসেনের বুকে লেখা গণতন্ত্রের বানানটি ভুলভাবেই লেখা হয়েছিল। গণতন্ত্রকে সঠিক বানানে আনার দায়িত্ব যাঁদের ছিল, তাঁরা সেই ‘ভুলের’ ওপরেই বাংলাদেশের গণতন্ত্রের আজকের চেহারা রচনা করছেন। যেখানে গণতন্ত্র নিজেই গুম হয়ে যাচ্ছে। আর সেই ‘গণতন্ত্রের সৈনিক’ এরশাদ সগর্বে দাঁড়িয়ে বলবেন, ‘আমার আমলে একটাও গুম-খুন হয়নি।’
গণতন্ত্র, নূর হোসেন আর এরশাদকে নিয়ে এসব কথা ভাবতে ভাবতেই শহীদ নূর হোসেন বইটিতে প্রকাশিত শামসুর রাহমানের ‘একজন শহীদের মা বলছেন’ কবিতাটির কথা মনে ভাসল। নূর হোসেনের মৃত্যুর ৩৬ দিন পর সাপ্তাহিক দেশবন্ধুতে প্রকাশিত ওই কবিতায় কবি গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ টের পেয়ে কি না, কে জানে লিখে রেখে গেছেন।
‘হয়তো ভবিষ্যতে অনেকেই/ তার কথা বলে দিব্যি মাতাবে শ্রোতার ভিড় আর/ করবে এমন কেউ কেউ উচ্চারণ/ ওর নাম, হোমরা-চোমরা তারা, যারা/ তার কথা বলছে শুনলে সে আবার অকস্মাৎ/ জিন্দা হয়ে পতাকার মতো হাত তুলে/জনসভা পণ্ড করে জানাবে তুমুল প্রতিবাদ,/ ওদের মুখোশ-আটা ভণ্ড মুখে দেবে ছুড়ে থুথু, শুধু থুথু৷’

মুখোশ-আঁটা ভণ্ডদের মুখে থুতু দিয়ে এই সময়ের নূর হোসেনরা যেদিন জেগে উঠবে, সেই দিনই হয়তো শামসুর রাহমান, কাইয়ুম চৌধুরী আর মতিউর রহমানের স্বপ্ন পূরণ হবে। কোনো এক দেলাক্রোয়ার তুলির আঁচড়ে আমাদের মৃতপ্রায় গণতন্ত্র প্রাণ পাবে। তখনই হয়তো কোনো এক নুরলদিন উচ্চকণ্ঠে বলে উঠবেন, ‘জাগো বাহে কোনঠে সবাই।’
ইফতেখার মাহমুদ: সাংবাদিক।
বই: শহীদ নূর হোসেন৷ লেখক: শামসুর রাহমান, মতিউর রহমান৷ প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন ২০১৩৷ মূল্য: ১৩০ টাকা৷

পুরোনো ধাঁচের কর্মপন্থা দেখতে চান না মোদি

নরেন্দ্র মোদি
দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারের কর্মপন্থা ঠিক করে নিতে একটুও সময় নষ্ট করছেন না ভারতের নতুন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি৷ সুপ্রশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা মোদির সরকারের ১০ দফা অগ্রাধিকার তালিকা আগেই পাওয়া গেছে৷ এবার জানা গেল, আগের সরকারের চালু করা প্রকল্পগুলোর নাম পরিবর্তন করা যাবে না বলে মোদি তাঁর মন্ত্রীদের সোজাসাপ্টা জানিয়ে দিয়েছেন৷ কারণ, তিনি ‘পুরোনো ধাঁচের কর্মপন্থা’ দেখতে চান না৷ খবর এনডিটিভির৷ এ ছাড়া টেলিভিশনে সরাসরি জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার বিষয়টিও জনগণের সঙ্গে ভাববিনিময়ের প্রথাগত পন্থা হিসেবে বিবেচনা করেন মোদি৷ তাই তিনি এভাবে ভাষণ দেবেন, নাকি বিকল্প কোনো উপায় বেঁছে নেবেন, তা নিয়েও ভাবনা-চিন্তা করছেন৷ সামাজিক যোগাযাগ মাধ্যমগুলোর একনিষ্ঠ ভক্ত মোদি প্রতিদিনই তাঁর চিন্তাভাবনাগুলো টুইটারে লিখে সবাইকে জানিয়ে দিয়ে থাকেন৷ তিনি তাঁর শীর্ষ অগ্রাধিকারগুলোও সবাইকে জানিয়ে দিতে পার্লামেন্টকেই বেছে নিতে পারেন৷
আগামী ৪ জুন বসছে পার্লামেন্টের প্রথম অধিবেশন৷ প্রধানমন্ত্রী মোদি গত বৃহস্পতিবার মন্ত্রিসভার দ্বিতীয় বৈঠকেই তাঁর সরকারের ১০ দফা অগ্রাধিকার তালিকা প্রকাশ করেন৷ পাশাপাশি তিনি প্রত্যেক মন্ত্রীকে নির্দেশ দেন, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে কী কী কাজ শেষ করা সম্ভব, তার তালিকা করতে৷ যথা সময়ে কাজ শেষ এবং চলমান প্রকল্পগুলোর নাম পরিবর্তন করা নিয়ে অযথা সময়ক্ষেপণ না করে কাজের মান বাড়াতে বলেছেন৷ মোদ্দা কথা, তিনি সদ্য বিদায় নেওয়া কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল মোর্চা (ইউপিএ) সরকারের পদাঙ্ক অনুসরণ করতে চান না৷ অতীতে কেন্দ্রের পাশাপাশি রাজ্যগুলোতেও দেখা গেছে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলের আগের সরকারের প্রকল্পগুলোর নাম পরিবর্তন নিয়েই লম্বা সময় ব্যয় করা হয়েছে৷ সরকারি বাসভবনে মোদি: বার্তা সংস্থা পিটিআইয়ের খবরে বলা হয়, শপথ নেওয়ার পাঁচ দিন পর গতকাল শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে উঠেছেন নরেন্দ্র মোদি৷ অবশ্য আগের প্রধানমন্ত্রীরা নয়াদিল্লির রেসকোর্স সড়কে ৭ নম্বর বাংলোতে বাস করলেও মোদি উঠেছেন একই সড়কের ৫ নম্বর বাংলোতেই৷ গতকালের আগ পর্যন্ত তিনি অস্থায়ীভাবে পাশের গুজরাট ভবনে ছিলেন৷

ভারতে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হলেন দোবাল

অজিত কুমার দোবাল
ভারতের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক অজিত কুমার দোবালকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে৷ ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) একটি সূত্র হিন্দুস্তান টাইমসকে এ সিদ্ধান্তের কথা জানায়৷ ১৯৬৮ সালে পুলিশে যোগদানের পর কর্মজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন দোবাল৷ মিয়ানমারের আরাকানে মিজো বিদ্রোহীদের তাণ্ডব যখন চরমে পেঁৗছেছিল, দোবাল তখন মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের ক্যাম্পে ঢুকে পড়ে বিদ্রোহীদের নেতা লালদেঙ্গার সঙ্গে সাক্ষৎ করেন৷ পরে একটি পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে লালদেঙ্গা বলেন,
‘আমার অধীনে সাতজন সামরিক কমান্ডার ছিলেন৷ দোবাল চলে যাওয়ার সময় ছয়জনকেই নিয়ে গেলেন৷ তারপর আমার শান্তিচুক্তি করা ছাড়া উপায় ছিল না৷’ ১৯৮৮ সালে অমৃতসরে শিখদের পবিত্র স্বর্ণমন্দির থেকে বিদ্রোহীদের সরিয়ে দিতে ‘ব্ল্যাক থান্ডার-২’ নামে বিশেষ অভিযান চালানো হয়৷ সেই অভিযানের সময় পাকিস্তানি এজেন্ট হিসেবে ঢুকে পড়েন ছোটখাটো একজন মানুষ৷ তিনি খালিস্তানি বিদ্রোহী নেতাদের সঙ্গে দেখা করে মুহূর্তের মধ্যেই কেটে পড়েন৷ পের জানা যায়, সেই ব্যক্তিটি ছিলেন দোবাল৷ ওই অভিযানের পর দুঃসাহসিকতার পুরস্কার হিসেবে তাঁকে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ‘কীর্তি চক্র’ শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়৷ রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইংয়ের (র) সাবেক প্রধান এবং গোয়েন্দা সংস্থায় দোবালের জ্যেষ্ঠ সহকর্মী এ এস দুলত বলেন, ঝুঁকি নিতে দোবাল কখনোই কার্পণ্য করতেন না৷ এই সাহসিকতাই তাঁকে অসাধারণ প্রতিভাসম্পন্ন কর্মকর্তা হয়ে উঠতে সাহায্য করেছে৷

ক্ষমতার চেয়ারে সাদা তোয়ালে!

রাজনাথ সিং, অরুণ জেটলি, মানেকা গান্ধী
ভারতের মন্ত্রী, সাংসদ কিংবা অন্য যেকোনো রাজনৈতিক প্রভাবশালীর কার্যালয়ে গেলে একটা অভিন্ন ব্যাপার চোখে পড়বেই৷ তা হলো, প্রায় সবার চেয়ার সাদা তোয়ালে দিয়ে ঢাকা৷ শুধু কার্যালয় নয়, তঁাদের গাড়িগুলোতেও একই দৃশ্য৷ নেতাদের নির্দিষ্ট আসনটি সাদা তোয়ালেতে ঢাকা থাকে৷ খবর হিন্দুস্তান টাইমসের৷ কেন এই তোয়ালে সংস্কৃতি? ধারণা করা হয়, ভারতের ক্ষমতার রাজনীতিতে ক্ষমতাসীনদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক হচ্ছে এই সাদা তোয়ালে৷ নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে৷
এরই মধ্যে নিজ নিজ দপ্তর বুঝে নিয়েছেন মন্ত্রীরা৷ দপ্তরগুলো ভিন্ন হলেও এ জায়গায় তাঁদের মিল যথারীতি৷ সবার চেয়ারের ওপর আছে সেই সাদা তোয়ালে৷ অর্থ, প্রতিরক্ষা ও করপোরেট-বিষয়ক মন্ত্রী অরুণ জেটলি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং, পানিসম্পদমন্ত্রী উমা ভারতী, নারী ও শিশু উন্নয়ন মন্ত্রী মানেকা গান্ধী, রেলওয়েমন্ত্রী সদানন্দ গৌড়—এ রকম সবার দপ্তরের চেয়ারই সাদা তোয়ালে দিয়ে আবৃত৷ অনেকে বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে ক্ষমতাসীনদের সাদা তোয়ালে ব্যবহারের সংস্কৃতির শুরু৷ তখন ব্রিটিশ ও মার্কিন সেনারা তাঁদের গাড়িতে সাদা তোয়ালে ব্যবহার করতেন৷ আবার কেউ কেউ বলছেন, এটা নব্য সাম্রাজ্যবাদের কৌশল৷ তবে এর আরেকটা ব্যাখ্যা মনে হয় সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য৷ সাদা তোয়ালে দিয়ে শাসক ও শোষিতের মধ্যে একটা অদৃশ্য বিভাজন সৃষ্টি করা হয়, যা ভারতের ক্ষমতার রাজনীতিতে নতুন সংস্কৃতি৷