Thursday, June 11, 2026

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হিজবুল্লাহর ঘুরে দাঁড়ানোর ভেতরের গল্প by হাদি মাসুমি জারে

গত সপ্তাহে ইসরায়েল ও লেবানন সরকার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনে একটি চুক্তির ঘোষণা দেয়, যার লক্ষ্য ছিল বিদ্যমান ‘যুদ্ধবিরতি’ নবায়ন করা এবং একটি ‘সমন্বিত’ সমাধানের পথে এগোনো। তবে দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত বোমাবর্ষণ ও সামরিক অভিযান চলতে থাকলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী শুধু হিজবুল্লাহকেই তাদের হামলা বন্ধ করতে হবে। লেবাননের প্রতিরোধ সংগঠনটি দ্রুতই এ আলোচনাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং একে ‘অযৌক্তিক, অপমানজনক ও অবমাননাকর’ বলে আখ্যা দেয়।

১০ সপ্তাহের বেশি সময় ধরে হিজবুল্লাহ দক্ষিণে ইসরায়েলের নতুন আক্রমণের বিরুদ্ধে তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত কিন্তু কার্যকর ক্ষয়যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এ যুদ্ধে তারা ড্রোন ও ছোট বিশেষায়িত ইউনিটের ওপর নির্ভর করে ইসরায়েলি বাহিনীকে ক্রমাগত ক্ষয় করছে, একই সঙ্গে নিজেদের সাংগঠনিক কাঠামোও অক্ষুণ্ন রাখছে।

২০২৬ সালের মার্চে শুরু হওয়া সর্বশেষ সংঘাতের প্রায় ৭০ দিন পর এখন সতর্কতার সঙ্গে হলেও বলা যায়, বর্তমান হিজবুল্লাহ ২০২৪ সালে যুদ্ধ করা হিজবুল্লাহ থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন। অন্তত তাদের সামরিক সংগঠন, যুদ্ধক্ষেত্রের প্রস্তুতি এবং অভিযানের নমনীয়তার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন স্পষ্ট।

এই মূল্যায়ন বর্তমান যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি ও সংগঠনটির পারফরম্যান্স, ২০২৩ সালের ‘সমর্থন যুদ্ধ’ (হারব আল-ইসনাদ) এবং ২০২৪ সালের ৬৬ দিনের যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা, পাশাপাশি মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণ এবং হিজবুল্লাহর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, কমান্ডার ও যোদ্ধাদের সঙ্গে কথোপকথনের ভিত্তিতে করা হয়েছে। এই পরিবর্তন শুধু অস্ত্র, সরঞ্জাম বা যুদ্ধকৌশলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি কমান্ড কাঠামো, যুদ্ধনীতি, বাহিনী মোতায়েনের ধরন এবং এমনকি যুদ্ধের বিজয় ও পরাজয়ের সংজ্ঞা নিয়েও গভীর পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দেয়।

বর্তমানে দক্ষিণ লেবাননে যা ঘটছে, তা অনেকটা ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের ২ মার্চ পর্যন্ত টানা ৩০ মাসের ব্যয়বহুল ও ক্লান্তিকর অভিজ্ঞতার পর ধীরে ধীরে পুনর্গঠন ও সাংগঠনিক অভিযোজনের একটি প্রক্রিয়া। তবে লেবাননের রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন এমন একটি চুক্তিতে স্বাক্ষর করছে, যা প্রতিরোধশক্তিকে নিরস্ত্র করতে চায়, কিন্তু দখলদার শক্তির কাছ থেকে কোনো ছাড় দাবি করছে না, তখন হিজবুল্লাহর টিকে থাকা যুদ্ধক্ষেত্রের চেয়ে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় ভঙ্গুরতার ওপরই বেশি নির্ভরশীল হয়ে উঠতে পারে।

পুনর্গঠিত একটি বাহিনী

সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ঘটেছে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায়। ৬৬ দিনের যুদ্ধে হিজবুল্লাহর অন্যতম প্রধান দুর্বলতা ছিল তাদের যোগাযোগব্যবস্থার ভঙ্গুরতা এবং কেন্দ্রীয় কমান্ড ও মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোর মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করার জটিলতা। যুদ্ধের কিছু পর্যায়ে এর ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিঘ্ন, প্রতিক্রিয়ায় বিলম্ব এবং যুদ্ধক্ষমতার ক্ষয় দেখা দিয়েছিল।

কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধে একই সময়ে একাধিক ফ্রন্টে অভিযান অব্যাহত রয়েছে, ইউনিটগুলোর কার্যকারিতা দীর্ঘ সময়ের জন্য ব্যাহত হয়নি এবং যুদ্ধক্ষেত্র ও সদর দপ্তরের মধ্যে যোগাযোগও বজায় রাখা সম্ভব হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, হিজবুল্লাহ তাদের যোগাযোগ ও কমান্ড ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে পুনর্গঠন করতে সক্ষম হয়েছে।

তীব্র চাপ ও ভারী হামলার মধ্যেও—যেমন ২০২৬ সালের ৮ এপ্রিলের হামলার সময়—তাদের সামরিক কাঠামো ভেঙে পড়েনি এবং কমান্ড চেইন তার সংহতি ধরে রাখতে পেরেছে। এই রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো কার্যকর ফায়ার কন্ট্রোল, নিয়মিত বাহিনী রদবদল, সামনের সারিতে অস্ত্র সরবরাহ এবং এমনকি অফলাইনে যুদ্ধক্ষেত্রের ভিডিও সংগ্রহ ও নিয়মিত প্রকাশ।

পূর্ববর্তী সময়ে যুদ্ধের চাপে সেনা চলাচল প্রায়ই বিঘ্নিত হতো। এখন এসব কার্যক্রম পূর্বনির্ধারিত সময়সূচি ও পরিকল্পনা অনুযায়ী পরিচালিত হচ্ছে বলে মনে হয়। নতুন মডেলে মূল লক্ষ্য যুদ্ধক্ষেত্রে বিপুলসংখ্যক যোদ্ধা মোতায়েন করা নয়; বরং নির্দিষ্ট মাত্রার যুদ্ধক্ষমতা বজায় রাখা এবং কার্যকর বাহিনীর ক্ষয় কমিয়ে আনা।

এই পরিবর্তনের পেছনে অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে নতুন নেতৃত্বের অধিক কেন্দ্রীয়কৃত সামরিক কমান্ডনীতি। এতে বহুস্তরীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ কমানো হয়েছে, অপেক্ষাকৃত তরুণ ও উদ্যমী কমান্ডারদের ক্ষমতায়ন করা হয়েছে এবং তাদের কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে।

এ ছাড়া বিভিন্ন ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে ‘সমর্থন যুদ্ধ’ ও ৬৬ দিনের যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে হিজবুল্লাহ তাদের সামরিক সংগঠনের কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন এনেছে। আগে প্রত্যেক কমান্ডারের নির্দিষ্ট মাত্রার স্বাধীনতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ ছিল। এর কিছু সুবিধা থাকলেও সংকটময় মুহূর্তে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এটি বাধা হয়ে দাঁড়াত। এখন সংগঠনটি একটি ঐক্যবদ্ধ কমান্ড কাঠামোর অধীনে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছে, যা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দ্রুত নিতে এবং কমান্ডের সংহতি বজায় রাখতে সাহায্য করে।

একই সময়ে, আপাতদৃষ্টে এর বিপরীতধর্মী হলেও হিজবুল্লাহ মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোর কেন্দ্রীয় সদর দপ্তরের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে এবং মধ্যম পর্যায়ের কমান্ডারদের আরও বেশি অপারেশনাল স্বাধীনতা দিয়েছে, যাতে তারা যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। এটি শুধু একটি কৌশলগত সমন্বয় নয়; বরং সমকালীন যুদ্ধ সম্পর্কে একটি নতুন উপলব্ধির প্রতিফলন।

সংখ্যার চেয়ে গুণগত মানকে অগ্রাধিকার

যে যুদ্ধে প্রতিপক্ষের আকাশসীমায় পূর্ণ আধিপত্য রয়েছে এবং যেখানে বাহিনী ও অবকাঠামো সব সময় হামলার লক্ষ্যবস্তু, সেখানে সফল সংগঠন হলো সেই সংগঠন, যা কেন্দ্রীয় কমান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হলেও নিজের যুদ্ধক্ষমতা বজায় রাখতে এবং আক্রমণ চালিয়ে যেতে পারে।

বর্তমান হিজবুল্লাহ এমন একটি মডেলের দিকে এগোচ্ছে বলে মনে হয়, যেখানে নমনীয়তা, টিকে থাকার সক্ষমতা এবং অভিযানের ধারাবাহিকতা কঠোর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায়। এটি এমন একটি কাঠামো, যেখানে সংগঠনগত কাঠামোর চেয়ে মিশন বা দায়িত্ব পালনের বিষয়টি অগ্রাধিকার পায়। ফলে কিছু ইউনিট সরাসরি নির্দেশের জন্য অপেক্ষা না করে, পূর্বনির্ধারিত নীতিমালার মধ্যে থেকেই তীব্র চাপের মধ্যেও অভিযান চালিয়ে যেতে ও হামলা অব্যাহত রাখতে সক্ষম হচ্ছে।

পূর্ববর্তী যুদ্ধ থেকে হিজবুল্লাহর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাগুলোর একটি হলো জনবল ও অস্ত্র ব্যবহারের পদ্ধতি পুনর্মূল্যায়ন। প্রতিরোধ আন্দোলনটি সম্ভবত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে বিপুলসংখ্যক যোদ্ধা সমাবেশ, বিস্তৃত যুদ্ধক্ষেত্রজুড়ে উপস্থিতি বজায় রাখা এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ব্যাপক অগ্নিশক্তি প্রয়োগের কৌশল শুধু অকার্যকরই নয়, বরং প্রাণহানির দিক থেকে অত্যন্ত ব্যয়বহুলও হতে পারে। ফলে এখন তারা সংখ্যার পরিবর্তে গুণগত মানকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে অর্থাৎ সীমিত কিন্তু বিশেষায়িত বাহিনী, যাদের হাতে রয়েছে নির্ভুল ও কার্যকর অস্ত্র।

এই যুক্তিতে প্রস্তুতি ও সক্ষমতা সংখ্যার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা, প্রশিক্ষণ, সহনশীলতা ও অপারেশনাল কার্যকারিতা এখন নিছক সংখ্যাগত শক্তির চেয়ে বেশি মূল্য পাচ্ছে। এ কারণেই বর্তমান যুদ্ধে প্রধান দায়িত্ব বহন করছে ড্রোন ইউনিট, ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনী, অ্যান্টি-আর্মার ইউনিট এবং দ্রুত বিকাশমান ফার্স্ট-পারসন-ভিউ (এফপিভি) ড্রোন ইউনিটগুলো।

আগের মতো এখন আর হিজবুল্লাহ বৃহৎ পরিসরে যোদ্ধা মোতায়েনকে অগ্রাধিকার দেয় না। বরং তারা তাদের অধিকাংশ বাহিনী—বিশেষ করে পদাতিক ও অ-বিশেষায়িত ইউনিটগুলোকে—রিজার্ভ হিসেবে ধরে রাখতে পছন্দ করে। এর মাধ্যমে একদিকে নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়, অন্যদিকে শত্রুর গভীর অভ্যন্তরে আরও কার্যকর আঘাত হানার সুযোগ তৈরি হয়।

যুদ্ধের কৌশল

তবে হিজবুল্লাহর সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন সম্ভবত তাদের যুদ্ধনীতিতেই ঘটেছে। ২০২৪ সালের যুদ্ধে মূলনীতি ছিল যেকোনো মূল্যে ভূখণ্ড রক্ষা করা এবং শত্রুর অগ্রযাত্রা ঠেকানো, এমনকি এর জন্য ব্যাপক প্রাণহানিও মেনে নেওয়া। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন লক্ষণ থেকে বোঝা যায়, হিজবুল্লাহ ভিন্ন এক কৌশলের দিকে ঝুঁকেছে—যার লক্ষ্য হলো সম্ভাব্য সব উপায়ে শত্রুর ওপর ধারাবাহিক ক্ষয়ক্ষতি চাপিয়ে দেওয়া।

ক্রমাগত ক্ষয় সৃষ্টি এবং শত্রুপক্ষের হতাহতের সংখ্যা বাড়ানোর ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই কৌশল যুদ্ধক্ষেত্রে বিজয় ও পরাজয়ের ধারণাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করছে। এখন শত্রুকে কোনো এলাকায় স্থায়ীভাবে অবস্থান গড়ে তুলতে না দেওয়াই বেশি গুরুত্বপূর্ণ; সাময়িকভাবে কোনো ভূখণ্ড দখল ঠেকানো নয়।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে হিজবুল্লাহ মনে করে, কোনো এলাকার কিছু অংশ হারানো মানেই পরাজয় বা অপমান নয়। বরং গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শত্রু যেন সেখানে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে এবং তাকে যেন অব্যাহত ক্ষয়ক্ষতির মুখে থাকতে হয়। এই যুক্তি অনুসারে, লিতানি নদীর দক্ষিণের পুরো অঞ্চল হারিয়ে গেলেও তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে চূড়ান্ত কৌশলগত পরাজয় হিসেবে গণ্য হবে না।

নিঃসন্দেহে এমন পরিস্থিতি হিজবুল্লাহর জন্য মানসিক ও রাজনৈতিকভাবে বেদনাদায়ক এবং ব্যয়বহুল হবে। কিন্তু ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকের অভিজ্ঞতার মতোই, এটি একই সঙ্গে দখলবিরোধী প্রতিরোধের সামাজিক বৈধতা বাড়াতে পারে, সংগঠনের ওপর অভ্যন্তরীণ চাপ কমাতে পারে এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যয়বহুল যুদ্ধের ভিত্তি তৈরি করতে পারে, যা গড়ে উঠবে এফপিভি ড্রোনভিত্তিক মডেলের ওপর। এ ধরনের যুদ্ধনীতিতে এফপিভি ড্রোনগুলো সেই ভূমিকা পালন করবে, যা ১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে আত্মোৎসর্গমূলক (শহীদি) অভিযানগুলো করত।

এই কাঠামোগত পরিবর্তনের পাশাপাশি চলমান যুদ্ধ মাঠপর্যায়ের যোদ্ধা এবং প্রতিরোধ আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তির মনোবলেও দৃশ্যমান ও গুরুত্বপূর্ণ পুনরুদ্ধার ঘটিয়েছে। ৬৬ দিনের যুদ্ধ এবং বর্তমান সংঘাতের মধ্যবর্তী সময়ে হিজবুল্লাহর যোদ্ধা ও তাদের সমর্থকগোষ্ঠী নানা ধরনের মানসিক ও সুনামগত চাপের মুখে পড়ে। এর মধ্যে ছিল ‘সমর্থন যুদ্ধে’ ব্যর্থতার অনুভূতি, ৬৬ দিনের যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি, ১৫ মাসের যুদ্ধবিরতির সময় শত শত হিজবুল্লাহ সদস্যের নিহত হওয়া এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের পর সৃষ্ট ক্ষোভ ও হতাশা।

তবে এসব ঘটনাই এখন হিজবুল্লাহর সমর্থক ও কর্মীদের জন্য নতুন প্রেরণার উৎসে পরিণত হয়েছে বলে মনে হয়। একই সঙ্গে এগুলো নেতৃত্বের ওপর নিচু স্তর থেকে চাপ সৃষ্টি করেছে, যাতে সংগঠনটি আবারও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়। অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে সামরিক সংগঠনের পুনর্গঠনের দৃশ্যমান ফলাফল—বিশেষত হিজবুল্লাহ প্রকাশিত এফপিভি ড্রোনের ভিডিও চিত্র—সংগঠনের আত্মবিশ্বাস পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রেখেছে এবং তাদের সামাজিক ভিত্তি ও সাংগঠনিক কাঠামোর মনোবল ও স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি করেছে।

তবে এসব সাফল্য সত্ত্বেও বর্তমানে হিজবুল্লাহর সামনে সবচেয়ে বড় হুমকি যুদ্ধক্ষেত্র নয়; বরং লেবাননের ভঙ্গুর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি। শরণার্থী সংকট এবং এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব, পাশাপাশি বর্তমান লেবানন সরকারসহ কিছু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক শক্তির সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা উসকে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিজবুল্লাহর যুদ্ধক্ষেত্রের কার্যকারিতা এবং সফল যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিতে পারে।

অতএব যুদ্ধক্ষেত্রে হিজবুল্লাহর অভিযোজন ও পুনর্গঠনের লক্ষণগুলো স্পষ্ট হলেও এ পরিস্থিতি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে, তা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে লেবাননের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশের গতিশীলতার ওপর; এটা এমন একটি পরিবেশ, যা শেষ পর্যন্ত যুদ্ধফ্রন্টের চেয়েও বেশি নির্ধারক ভূমিকা পালন করতে পারে।

* হাদি মাসুমি জারে, একজন ইরানি গবেষক ও লেখক। তিনি ইরান, ইরাক ও লেভান্ত অঞ্চলের রাজনীতি, ইসলামপন্থী আন্দোলন এবং ইরানের আঞ্চলিক সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ।
- মিডলইস্ট আই থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ

হিজবুল্লাহ বলেছে, তারা শত্রুর বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা প্রতিহত করতে প্রস্তুত
হিজবুল্লাহ বলেছে, তারা শত্রুর বিশ্বাসঘাতকতা ও প্রতারণা প্রতিহত করতে প্রস্তুত ফাইল। ছবি: রয়টার্স

তিসি-তিল-কুমড়ার মতো বীজজাতীয় খাবার কারা খাবেন, কারা খাবেন না by লিনা আকতার

স্বাস্থ্যসচেতন মানুষের খাদ্যতালিকায় আজকাল বিভিন্ন ধরনের বীজ থাকে। যেমন তিসির বীজ, সূর্যমুখীর বীজ, চিয়ার বীজ, তোকমার বীজ, তিলের বীজ ও কুমড়ার বীজ। এসব বীজ গ্রহণে অনেকের উপকার হলেও অনেকের আবার না–ও হতে পারে। জেনে নেওয়া যাক কোন বীজে কী পুষ্টি উপাদান আছে।

বীজ হলো উদ্ভিজ্জ ফ্যাট, ফাইবার ও খনিজ পদার্থের উৎস। বীজে রয়েছে প্রোটিন, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস, জিংক, ফলিক অ্যাসিডসহ নানা খনিজ উপাদান। বীজে থাকা পুষ্টি উপাদান আমাদের অন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। পাকস্থলী দীর্ঘ সময় ভরিয়ে রাখতেও বীজ সাহায্য করে।

তবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ গ্রাম বীজ খেতে পারেন—এর বেশি নয়। বীজ যেকোনো খাবারের সঙ্গে খাওয়া যেতে পারে। যেমন দই, স্যুপ, স্টু, রুটি, কেক, সালাদ ইত্যাদি। এতে খাবারের ফাইবারের পরিমাণের সঙ্গে পুষ্টিমানও উন্নত হয়।

কাদের জন্য ভালো

তিসির বীজ: তিসির বীজে প্রোটিন ও ফাইবার রয়েছে, যা ওজন কমাতে সাহায্য করে। এই বীজে আলফা-লিনোলেনিক অ্যাসিড ও ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। তিসির বীজ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে এবং হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। এই বীজে থাকা ফাইবার কোষ্ঠকাঠিন্য কমায়। এ ছাড়া তিসির বীজে লিগানন নামের একধরনের পলিফেনল রয়েছে, যা একটি অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট। এই বীজে অন্যান্য বীজের চেয়ে ৭৫ থেকে ৮০০ গুণ বেশি লিগানন থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, লিগাননের প্রদাহবিরোধী বৈশিষ্ট্য হৃদ্‌রোগ ও ক্যানসার প্রতিরোধ করে। প্রজননস্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী।

চিয়ার বীজ: চিয়ার বীজ ওমেগা–থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিড বা আলফা লিনোলেনিক অ্যাসিডের একটি চমৎকার উৎস। এতে পানিতে দ্রবণীয় ফাইবার রয়েছে। তাই পানি যোগ করলে তা ১০ গুণ পর্যন্ত শোষণ করতে পারে। এই তরল শোষণের ক্ষমতা এবং উচ্চ ফাইবারের কারণে এই বীজ দীর্ঘক্ষণ পেট ভরে রাখতে সাহায্য করে। ফলে এটি ওজন কমাতে, কোলেস্টেরল কমাতে এবং পেট ভালো রাখতে কাজে আসে।

কুমড়ার বীজ: কুমড়ার বীজে পটাশিয়াম, জিংক ও ক্যালসিয়াম রয়েছে, যা হাড়ের ক্ষয়রোধে সাহায্য করে। এতে রয়েছে ট্রিপটোফ্যান নামের অ্যামাইনো অ্যাসিড। এই অ্যাসিড অক্সিটোসিন হরমোন ক্ষরণে সহায়তা করে। একই সঙ্গে মেলাটোনিন ও সেরোটোনিন নিঃসৃত হতে সহায়তা করে, যা অবসাদ কাটিয়ে শরীর–মন তরতাজা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, কুমড়ার বীজ খারাপ কোলেস্টেরল কমায় এবং পেশির দুর্বলতা কাটতে সাহায্য করে।

সূর্যমুখীর বীজ: ভিটামিন–ই, ফাইবার ও স্বাস্থ্যকর ফ্যাট–সমৃদ্ধ এই বীজ ওজন কমাতে সাহায্য করে। পলিআনস্যাচুরেটেড ও মনোআনস্যাচুরেটেড ফ্যাটের অন্যতম উৎস কুমড়ার বীজ। এই ফ্যাটগুলো খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমাতে সাহায্য করে এবং হৃদ্‌যন্ত্র ভালো রাখে। তা ছাড়া এ বীজে রয়েছে সেলেনিয়াম, যা বিভিন্ন ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।

তিলের বীজ: বিভিন্ন খনিজ ও ফাইবারের পাশাপাশি তিলের বীজে রয়েছে সেলেনিয়াম নামের অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট। এটি দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে।

কারা খাবেন না

যাঁদের অতিরিক্ত প্রোটিন গ্রহণ নিষেধ বা লিভার ও কিডনি রোগ আছে, তাঁদের বীজজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। বীজ ইউরিক অ্যাসিড বাড়াতে পারে। এ ছাড়া যাঁদের আইবিএস ও বীজে অ্যালার্জি আছে, তাঁদেরও এড়িয়ে চলতে হবে। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে বীজ গ্রহণ করতে হবে।

* লিনা আকতার, পুষ্টিবিদ, রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর

একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ গ্রাম বীজ খেতে পারেন
একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ গ্রাম বীজ খেতে পারেন। ছবি: পেক্সেলস

চুলে তেল দিলে কারও মাথা গরম আর কারও মাথা ঠান্ডা হয় কেন by রাফিয়া আলম

চুলে তেল মালিশ করলে কারও মাথা গরম আর কারও মাথা ঠান্ডা হয়ে যায়। কেন মাথায় তেল দিলে একেকজনের একেক রকম অনুভূতি হয়?

কেউ বলেন, মাথায় তেল মালিশ না করলে স্বস্তি পান না। তাই বছরজুড়েই তাঁদের নিয়ম করে মাথায় তেল মালিশ করা চাই। কেউ আবার বলেন, গরমের সময় মাথায় তেল মালিশ করলে গরম লাগে আরও বেশি। তাই গরমের সময় তেল এড়িয়ে চলেন তাঁরা। তেল মালিশের অভিজ্ঞতা এমন আলাদা হয় কেন, সেই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছিলাম।
গরম বা ঠান্ডার অনুভূতি ব্যক্তিভেদে কিছুটা আলাদা হয়ে থাকে। তা ছাড়া মাথায় তেল মালিশ করলে কতটা গরম লাগবে বা কতটা আরাম লাগবে, তা আরও কিছু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। তবে গরমে অস্বস্তি লাগলেও যে সবারই মাথায় তেল মালিশ করতে হবে, তা কিন্তু না। এমনটাই জানালেন ঢাকার হলি ফ্যামিলি মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চর্মরোগ বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক ডা. সৈয়দ আফজালুল করিম। চলুন এই বিশেষজ্ঞের কাছ থেকেই জেনে নেওয়া যাক, মাথার ত্বকে তেল মালিশে স্বস্তি, অস্বস্তি এবং তেল মালিশের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বিস্তারিত।

মাথার ত্বক এবং চুলের ধরন

যাঁদের মাথার ত্বক শুষ্ক এবং যাঁদের চুল একটু রুক্ষ বা খসখসে, তাঁরা মাথার ত্বকে এবং চুলে তেল মালিশ করলে উপকার পাবেন। প্রচণ্ড গরমে শুষ্কতাজনিত সমস্যাগুলো বাড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই এই মৌসুমে তেল মালিশ করলে আরাম পান তাঁরা। আর এই অভ্যাস তাঁদের চুলের জন্যও ভালো।
অন্যদিকে যাঁদের মাথার ত্বক তৈলাক্ত, তাঁদের চুল সুস্থ রাখতে তেল দেওয়ার তেমন প্রয়োজন পড়ে না। আর গরমের সময় তেল মালিশ করলে বেশ অস্বস্তি হতে পারে তাঁদের। মনে হতে পারে, তেল দেওয়ার পর বেশি গরম লাগছে।

তেলের ধরন

তেল মালিশ করতে চাইলে বুঝেশুনে তেল বেছে নিতে হবে। এমন তেল বেছে নিন, যা খুব বেশি ভারী ধরনের নয়। আঠালো বা চিটচিটেও নয়। বরং হালকা ধরনের তেল দিয়ে মাথার ত্বকে মালিশ করতে পারেন। নারকেল তেল, কাঠবাদাম তেল, জোজোবা তেল ব্যবহারে অস্বস্তির ঝুঁকি কম।

সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ

কড়া রোদের সময় তেল মালিশ করলে কিংবা লম্বা সময় মাথায় তেল থাকলে গরমের অনুভূতি হতে পারে। আবার যখন আপনার মাথার ত্বক ঘেমে আছে, তখন তেল মালিশ করলেও গরম লাগতে পারে। তার চেয়ে বরং গরমকালে তেল দিতে পারেন খুব সকালে, পড়ন্ত বিকেলে, সন্ধ্যায় বা রাতে।
আধা ঘণ্টার মধ্যে শ্যাম্পু করে ফেললে স্বস্তি পাবেন। তেল ভালোভাবে ধুয়ে না ফেললে মাথার ত্বক চিটচিটে হয়ে পরে অস্বস্তি বাড়তে পারে।

মালিশের রকমফের

মাথার ত্বকে তেল মালিশের সময় হাতের নখ দিয়ে চাপ দিলে কিংবা খুব দ্রুত মালিশ করলে অস্বস্তি হতে পারে। আরামদায়ক অনুভূতির জন্য মালিশের সময় হাতের আঙুলের সামনের দিককার নরম অংশ কাজে লাগান। মালিশ করুন ধীরে ধীরে।
সুন্দরভাবে মালিশ করা হলে মাথার ত্বকের রক্তনালিগুলোর রক্তসঞ্চালন বাড়বে। অবসন্ন ভাব কেটে যাবে। সতেজ লাগবে।
তেল মালিশ করতে চাইলে অল্প পরিমাণে তেল ব্যবহার করুন। রোজ তেল মালিশ করার প্রয়োজন নেই। তেল মালিশে বেশি অস্বস্তি হলে রুক্ষতা দূর করার জন্য বিকল্প খুঁজতে পারেন। ভালো মানের কন্ডিশনার বা সিরাম ব্যবহার করলে রুক্ষ চুল কোমল থাকবে।

গরমে কেউ চুলে তেল দিলে আরাম পান
গরমে কেউ চুলে তেল দিলে আরাম পান। ছবি: প্রথম আলো

হঠাৎ করেই অস্বাভাবিক চুল পড়ছে? এটি হতে পারে গোপন কোনো সংকেত

আবহাওয়ার পরিবর্তন হলে, শ্যাম্পু বদলালে বা দুশ্চিন্তায় থাকলে অনেক সময় স্বাভাবিকের তুলনায় চুল বেশি পড়ে। আবার এসব কারণ ছাড়াও হুট করে বেশি বেশি চুল পড়তে পারে। হঠাৎ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চুল পড়ার সাধারণ কারণগুলো কী হতে পারে, চলুন জেনে নিই।

চুল পড়া যখন স্বাভাবিক সীমা ছাড়িয়ে যায়

প্রতিদিন কিছু চুল পড়া স্বাভাবিক। কিন্তু যদি হঠাৎ করে চুল পড়ার পরিমাণ বেড়ে যায়—বালিশে, গোসলের সময়, মাথার ব্যান্ডে বা চিরুনিতে অতিরিক্ত চুল দেখা যায়, তাহলে সেটিকে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
অনেক সময় শরীরের ভেতরে থাকা কিছু পুষ্টির ঘাটতিই চুল পড়ার আসল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আর দুঃখজনক বিষয় হলো, এসব সংকেত আমরা প্রায়ই উপেক্ষা করি। এটি হতে পারে শরীরের ভেতরের কোনো সমস্যার প্রথম লক্ষণ।

হঠাৎ চুল পড়ার মূল কারণ কী?

আমাদের চুল স্বাভাবিকভাবে একটি চক্রের মধ্যে থাকে—বাড়ে, স্থির থাকে, তারপর পড়ে যায়। কিন্তু শরীরে কোনো বড় পরিবর্তন হলে অনেক চুল একসঙ্গে ‘রেস্টিং ফেজ’-এ চলে যায়। কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর হঠাৎ ঝরতে শুরু করে। একেই বলা হয় ‘টেলোজেন ইফলুভিয়াম’।

সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত কারণ আয়রনের ঘাটতি

চিকিৎসকদের মতে, চুল পড়ার অন্যতম ও অবহেলিত কারণ হলো আয়রনের ঘাটতি। শরীরে আয়রন কমে গেলে রক্তে অক্সিজেন বহনের ক্ষমতা কমে যায়, ফলে চুলের গোড়া পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না। ফলে চুল দুর্বল হয়ে পড়ে এবং ঝরতে শুরু করে।

আর কোন কোন কারণে হঠাৎ চুল পড়তে পারে?

১. পুষ্টির ঘাটতি
আয়রনের পাশাপাশি ভিটামিন ডি, বি ১২ বা প্রোটিনের অভাব হলেও চুল দুর্বল হয়ে পড়ে।
২. হঠাৎ ওজন কমানো বা ডায়েট কন্ট্রোল করলে
ক্র্যাশ ডায়েট বা হঠাৎ করে খাবার খাওয়া কমিয়ে দিলে শরীর প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায় না। ফলে চুল বেশি বেশি পড়তে শুরু করে।
৩. অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা অসুস্থতা
বড় ধরনের স্ট্রেস, জ্বর, অপারেশন–পরবর্তী সময়ে বা দীর্ঘ অসুস্থতার পর স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি চুল পড়তে পারে।
৪. থাইরয়েড সমস্যা
থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে চুল পাতলা হয়ে যায় এবং ঝরে পড়ে।
৫. পিসিওএস
মেয়েদের ক্ষেত্রে হরমোনের অসামঞ্জস্য (বিশেষ করে অ্যান্ড্রোজেন বেশি হলে) চুল পড়ার কারণ হতে পারে।
৬. ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া
কিছু ওষুধ, যেমন অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট, ব্লাড থিনার বা হরমোনাল পিল চুল পড়া বাড়াতে পারে।
৭. কোভিড বা বড় ইনফেকশনের পর
অনেকেই কোভিড-১৯ বা অন্য বড় অসুখের পর কয়েক মাস ধরে চুল পড়ার সমস্যায় ভোগেন।

কেন শরীর চুলকে অগ্রাধিকার দেয় না

শরীর যখন প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতিতে ভোগে, তখন সে প্রথমে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো—যেমন হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ককে আগে পূর্ণ ‘সাপোর্ট’দেয়। চুল তখন শরীরের কাছে ‘অগ্রাধিকারহীন’হয়ে পড়ে। ফলে চুলের বৃদ্ধি কমে যায় এবং ঝরতে শুরু করে। 

সন্তান জন্মের পর কেন চুল পড়ে?

গর্ভাবস্থায় হরমোন, বিশেষ করে এস্ট্রোজেন বেশি থাকায় চুল কম পড়ে, ঘন দেখায়। তাই গর্ভাবস্থায় চুল সুন্দর হয়ে যায়। কিন্তু সন্তান জন্মের পর এই হরমোন দ্রুত কমে যায়। ফলে একসঙ্গে অনেক চুল পড়তে শুরু করে; এটাকে বলে ‘পোস্টপার্টাম হেয়ার লস’।
এটি সাধারণত সন্তান জন্মের ২ থেকে ৪ মাস পর শুরু হয়। ১২ মাসের মধ্যে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। এটি খুবই সাধারণ ও সাময়িক একটা ব্যাপার।

চুল পড়ার সঙ্গে সঙ্গে কি এসব লক্ষণ আছে?

* অস্বাভাবিক ক্লান্তি

* দুর্বলতা

* ত্বক ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া

* মাথা ঘোরা বা শ্বাসকষ্ট

* নখ ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া

* অনিয়মিত পিরিয়ড

কখন চিন্তার বিষয়?

কয়েক দিন বেশি চুল পড়লে এত ভাবার কিছু নেই। তবে সেটি যদি তিন মাসের বেশি সময় ধরে চলে, চুল পাতলা হয়ে মাথার ত্বক দেখা যায়, সঙ্গে ওপরের একাধিক লক্ষণ থাকে, তাহলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা করে আয়রন ও ভিটামিনের মাত্রা জেনে নিন। পুষ্টিকর খাবার খান। কোনো অবস্থাতেই নিজে নিজে অনুমান করে চিকিৎসা শুরু করবেন না।
তবে...
হঠাৎ চুল পড়া ভয় পাওয়ার মতো কিছু হলেও, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এটি সাময়িক এবং শরীরের ভেতরের পরিবর্তনের একটি প্রতিক্রিয়া। বিশেষ করে গর্ভাবস্থা বা সন্তান জন্মের পর এটি একেবারেই স্বাভাবিক। কারণ বুঝে সঠিক সময়ে ব্যবস্থা নিলে সমস্যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

সূত্র: মেডিক্যাল নিউজ টুডে

শরীরের ভেতরে থাকা কিছু পুষ্টির ঘাটতিই চুল পড়ার আসল কারণ হয়ে দাঁড়ায়
শরীরের ভেতরে থাকা কিছু পুষ্টির ঘাটতিই চুল পড়ার আসল কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ছবি: প্রথম আলো

পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত ও আটককেন্দ্রে দুর্দশাগ্রস্ত কথিত ৪৭১ বাংলাদেশি

ভারতে এখন চরম বিপদের মুখে পড়েছেন কথিত বহু বাংলাদেশি নাগরিক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁদের ধরে নিয়ে বিভিন্ন ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বা আটককেন্দ্রে রাখছে। আবার কাউকে আটকে থাকতে হচ্ছে ভারত-বাংলাদেশের সীমান্তের মধ্যবর্তী অঞ্চল, অর্থাৎ ‘নো ম্যানস ল্যান্ডে’।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, উত্তর চব্বিশ পরগনার বসিরহাট সীমান্তবর্তী এলাকায় কথিত অনুপ্রবেশকারীদের ভিড় বাড়ছে। প্রশাসনিক কর্তারা জানিয়েছেন, বসিরহাটের বিথারী-হাকিমপুর পঞ্চায়েত এলাকার হাকিমপুর চেকপোস্টে মঙ্গলবার পর্যন্ত ৮২ জন কথিত বাংলাদেশি নাগরিক সে দেশে ঠেলে পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে। বাদুড়িয়া ও স্বরূপনগর এলাকার তিনটি ‘হোল্ডিং সেন্টারে’ সব মিলিয়ে ৪৭১ জন কথিত বাংলাদেশি নাগরিককে আটকে রাখা হয়েছে।

আটক এই মানুষদের সিংহভাগই অত্যন্ত সাধারণ শ্রমজীবী শ্রেণির। ভারতের সংবাদমাধ্যমের দাবি, অভাবের তাড়নায় বা ভালো কাজের লোভে তাঁরা বিভিন্ন সময়ে পশ্চিমবঙ্গের নানা সীমান্ত এলাকা দিয়ে দালালদের মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। অনুপ্রবেশের পর তাঁরা কেবল পশ্চিমবঙ্গেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, কাজের খোঁজে ছড়িয়ে পড়েছিলেন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যেও।

বর্তমানে বাদুড়িয়া ও স্বরূপনগরের ওই তিনটি আটককেন্দ্রে থাকা ৪৭১ জনের সঠিক নাম, পরিচয় ও নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করার কাজ চলছে। ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) আধিকারিকেরা আটক ব্যক্তিদের আঙুলের ছাপ (ফিঙ্গারপ্রিন্ট) থেকে শুরু করে যাবতীয় বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহের কাজ করছেন।

বিএসএফ সূত্রকে উদ্ধৃত করে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের পরিচয় সম্পর্কে সম্পূর্ণ সঠিক ও নিশ্চিত তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত কাউকেই বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে না।

পশ্চিমবঙ্গের সংবাদমাধ্যমের খবরে দাবি করা হয়, আটককেন্দ্রের বন্দিদশা স্বস্তির না হলেও সেখানে থাকা শিশু, নারী ও পুরুষদের মানবিক দিকটি বিবেচনা করছে প্রশাসন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে তাঁদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরিষেবা, নিয়মিত খাওয়াদাওয়া ও নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করা হচ্ছে, যাতে নিজ দেশে ফেরার আগে তাঁদের বড় ধরনের কোনো শারীরিক বা মানসিক অসুবিধা না হয়। পাশাপাশি অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে আটককেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।

কেন্দ্রীয় স্তরে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিজেপি সরকার দেশের সীমান্তগুলোতে কথিত অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বাড়তি নজর দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর কথিত অনুপ্রবেশ নিয়ে আরও বেশি শোরগোল শুরু করেছে এবং কথিত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা বলে অনেক মানুষকে ধরপাকড় করছে, যাঁদের বেশির ভাগই মুসলিম। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের ২ হাজার ২০০ কিলোমিটারের সীমান্ত রয়েছে।

সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার কাজ দ্রুত শেষ করতে বিএসএফের হাতে জমি তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরু করেছে পশ্চিমবঙ্গের নবনির্বাচিত হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার। এই সামগ্রিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে রাজ্যের প্রশাসনিক বৈঠকেও কথিত অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে নিজের কঠোর ও আপসহীন অবস্থানের কথা বারবার বলছেন উগ্রপন্থী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার কাছে যাচাই–বাছাইয়ের জন্য নথিপত্রহীন এক কথিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে আটকে রাখা হয়। ২৮ মে ২০২৬, হাকিমপুর
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কলকাতার কাছে যাচাই–বাছাইয়ের জন্য নথিপত্রহীন এক কথিত বাংলাদেশি অভিবাসীকে আটকে রাখা হয়। ২৮ মে ২০২৬, হাকিমপুর। ছবি: এএফপি

তিসিবীজ কি চুলের জন্য সত্যিই এতটা উপকারী by ফারদীন–ই–হাসান ফুয়াদ

ছোট্ট তিসিবীজে থাকে প্রোটিন, ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, আঁশ ও অ্যান্টি–অক্সিডেন্ট। অনেকেই একে পুষ্টির ভান্ডার বলেন। শতাব্দী ধরে স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে এটি স্বীকৃত। আবার চুলের যত্নেও তিসিবীজ বেশ আলোচিত।

দুই ভাবে তিসিবীজ ব্যবহার করা যায়। তিসির তেল সরাসরি চুলে দিতে পারেন। আবার গুঁড়া করা তিসিবীজ খাবারের পদেও রাখা যায়। খাবার হোক বা বাহ্যিক ব্যবহার—অনেকের বিশ্বাস, এতে চুল লম্বা আর মজবুত হয়।

ঘন ও ঝলমলে চুল পেতে তিসিবীজের তেল, জেল কিংবা মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দেন অনেকেই। তিসিবীজ কি চুলের জন্য সত্যিই এতটা উপকারী?

উপকারিতা

উদ্ভিজ্জ তেলগুলো চুলের কিউটিকেলকে সিল (আবরণ) করতে সাহায্য করে। এসব চুলের রুক্ষতা এবং ভেঙে যাওয়া রোধ করে চুলের বৃদ্ধিতে সাহায্য করে। সামগ্রিক পুষ্টিগুণের কারণে অন্যান্য উদ্ভিজ্জ তেলের তুলনায় তিসির তেল বেশি উপকারী।

ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিড: তিসিবীজে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিডের সঙ্গে মাছে পাওয়া ফ্যাটি অ্যাসিডের মিল আছে। তিসিবীজে থাকে আলফা–লিনোলেনিক অ্যাসিড (এএলএ); আর মাছে থাকে ডকোসাহেক্সায়েনোইক অ্যাসিড (ডিএইচএ) ও আইকোসাপেন্টায়েনোইক অ্যাসিড (ইপিএ)। উদ্ভিজ্জ এএলএ হৃদ্‌যন্ত্রের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। এটি শরীরের প্রদাহ কমায়। রোগ প্রতিরোধ এবং চুলের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

ভিটামিন বি: তিসিবীজ ভিটামিন বি–এর নির্ভরযোগ্য উৎস। ভিটামিন বি চুল মজবুত করে এবং স্বাস্থ্যকর বৃদ্ধিতে সাহায়ক।

ভিটামিন ই: এই অ্যান্টি–অক্সিডেন্টটি বাদাম ও উদ্ভিজ্জ তেলে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়। ভিটামিন ই মাথার ত্বকে ফ্রি র‍্যাডিকেলের (অক্সিজেন বিপাকক্রিয়ায় সৃষ্ট বিষাক্ত উপজাত) প্রভাব কমায়। এতে চুলের বৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। পর্যাপ্ত পরিমাণে ভিটামিন ই চুলের গোড়া মজবুত করে।

কীভাবে ব্যবহার করবেন

চুলের পরিচর্যায় নানা উপায়ে তিসিবীজ ব্যবহার করা যায়। তবে আস্ত বা গুঁড়া করা বীজ সরাসরি ব্যবহার করা উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে তিসির তেল ব্যবহার করতে হবে। মুদিদোকানগুলোয় তিসির তেল পাওয়া যায়।

চুলের মাস্ক হিসেবে তিসির তেল ব্যবহার করা যায়। এ জন্য হাতে অল্প পরিমাণ তেল নিয়ে চুলে মালিশ করতে হবে। এরপর ১৫ মিনিট অপেক্ষা করে শ্যাম্পু দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

শ্যাম্পু করার পর কন্ডিশনার ব্যবহারের আগে এটি ব্যবহার করা যায়। এ জন্য চুলে তিসির তেল লাগিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিতে হবে। কন্ডিশনার ব্যবহারের ঠিক আগে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।

তিসিবীজ দিয়ে জেলও তৈরি করা যায়। এই জেল শ্যাম্পু করার আগপর্যন্ত সারা দিন চুলে রেখে দিতে হবে।

পুষ্টিকর সাপ্লিমেন্ট হিসেবে তিসির তেলের ক্যাপসুল পাওয়া যায়। তবে ক্যাপসুলের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে। এ জন্য অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।

তিসিবীজ গুঁড়া করে খাওয়া যায়। ওটমিল, সালাদ এবং অন্যান্য দানাদার খাবারের সঙ্গে এটি খেতে পারেন।

তিসিবীজে থাকা ফ্যাটি অ্যাসিড এবং অ্যান্টি–অক্সিডেন্টের কারণে চুল ধীরে ধীরে মজবুত ও মসৃণ হয়। অন্যান্য সুপারফুডের মতো তিসিবীজও সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

সতর্কতা

তিসির তেল প্রাকৃতিক হলেও এর কিছু ঝুঁকি বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে—

* পেটফাঁপা, গ্যাস, ডায়রিয়া ও কোষ্ঠকাঠিন্যর মতো হজমের সমস্যা দেখা দিতে পারে।

* অপরিপক্ব বা আস্ত বীজ খেলে বিষক্রিয়া হতে পারে।

* রক্তচাপ কমে যেতে পারে।

* প্রোস্টেট ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়।

* শরীরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে। গর্ভবস্থায় ভ্রূণের ক্ষতি করে।

* রক্ত পাতলা করার ওষুধ, কোলেস্টেরলের ওষুধ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ইনসুলিনের কার্যকারিতায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

* সরাসরি ত্বকে ব্যবহারে প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।

তিসির তেল ওমেগা–৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের ভালো উৎস। তবে তিসিবীজ থেকে পাওয়া ওমেগা–৩ শরীর সরাসরি শোষণ করতে পারে না। প্রথমে এটি ডিএইচএ এবং ইপিএতে রূপান্তরিত হয়। রূপান্তরের পর ওমেগা–৩–এর একটি ক্ষুদ্র অংশ শরীরে শোষিত হয়।

খাদ্যতালিকায় ওমেগা–৩–এর পরিমাণ বাড়াতে চাইলে চর্বিযুক্ত মাছ খেতে হবে। শরীরে ওমেগা–৩ এর চাহিদা পূরণে কেবল তিসির তেলের ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।

শেষ কথা

তিসিবীজ ও তিসির তেল—দুটিই স্বাস্থ্যকর উদ্ভিজ্জ উপাদান। এটি প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় যোগ করা যেতে পারে। তবে কারও কারও ক্ষেত্রে এটি সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই নিয়মিত গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

তিসির তেল চুলকে তাৎক্ষণিকভাবে মসৃণ ও কোমল করে। তবে চুলের যত্নে কেবল তিসির তেলের ওপর নির্ভর করা যাবে না।

সূত্র: হেলথলাইন
তিসির তেল সরাসরি চুলে দিতে পারেন। আবার গুঁড়া করা তিসিবীজ খাবারের পদেও রাখা যায়
তিসির তেল সরাসরি চুলে দিতে পারেন। আবার গুঁড়া করা তিসিবীজ খাবারের পদেও রাখা যায়। ছবি: পেক্সেলস

হালালা সেন্টার: যৌনতার ফাঁদ নাকি ধর্মীয় সমাজের ল্যাবরেটরি টেস্ট by মনযূরুল হক

ভার্চ্যুয়াল জগৎ মাঝেমধ্যে আমাদের চেনা সমাজের ওপর এমন এক ল্যাবরেটরি টেস্ট চালায়, যার ফলাফল দেখে শিউরে উঠতে হয়। সম্প্রতি ফেসবুকে ঘটে যাওয়া ‘হালালা সেন্টার’ নামক একটি কাল্পনিক প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন এবং তা ঘিরে তৈরি হওয়া উন্মাদনা আমাদের তেমন এক নগ্ন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।

একটি ভুয়া আইডি থেকে তালাকপ্রাপ্ত নারীদের পুনরায় আগের স্বামীর সংসারে ফিরিয়ে দেওয়ার ‘সুবিধার্থে’ ‘হিল্লা’ বিয়ে করার জন্য পুরুষদের কাছ থেকে জীবনবৃত্তান্ত আহ্বান করা হয়। পরবর্তী পোস্টে জানা যায়, এ ‘প্রস্তাবে’ সাড়া দিয়ে দেশ-বিদেশের হাজার পুরুষ ই-মেইলে নিজেদের সিভি পাঠিয়েছেন। বিতর্ক তুঙ্গে উঠলে কারও অভিযোগের ভিত্তিতে ‘পুলিশ ডেকেছে’—এমন ক্ষোভ থেকে ‘গোপন রাখার শর্তে’ পাঠানো সিভিগুলোর মধ্য থেকে ৮০টি ই–মেইলের স্ক্রিনশট ও ব্যক্তিগত তথ্য অনলাইনে ফাঁস করে দেওয়া হয়।

এ তালিকায় যেমন আছেন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, প্রবাসী; তেমনই আছেন হাফেজ, আলেম, ইমাম, মুয়াজ্জিন, মাদ্রাসাশিক্ষক, মাদ্রাসা পরিচালক। দুঃখের কথা হলো, প্রকাশিত ছবিগুলোর বড় অংশ ধর্মীয় লেবাসের মানুষ। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর আইডি পরিচালনাকারী স্বীকার করেন, ‘পুরো প্রতিষ্ঠানটি ছিল কাল্পনিক, তবে ফাঁস হওয়া সিভির একটিও ভুয়া ছিল না।’

যাঁদের তথ্য ফাঁস হয়েছে, তাঁদের অনেকে দাবি করছেন যে তাঁদের জিমেইল হ্যাকড হয়েছে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে ‘মজার ছলে’ দুষ্টামি করতে গিয়ে তাঁরা এই ফাঁদে পড়েছেন। এটি সত্যি হলে, তা আরও ভয়াবহ বিপদের কথা বলে। সাইবার অপরাধের এই যুগে যে কারও ছবি বা জীবনবৃত্তান্ত ব্যবহার করে তাঁকে এভাবে ব্ল্যাকমেল বা সামাজিক ফাঁদে ফেলা সম্ভব। তবে যাঁরা জেনেশুনে, সজ্ঞানে এমন ‘কুৎসিত’ উদ্দেশ্যে নিজেদের তথ্য পাঠিয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে এই সামাজিক লজ্জাকে বলা যায় তাঁদের নিজেদের কর্মের ফল।

কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থনের আড়ালে যে সত্য ঢাকা পড়ে যায়, তা হলো একজন নারীকে সাময়িকভাবে বিয়ে করে ‘উপভোগের পর মর্জিমতো ছেড়ে দেওয়া বৈধ অধিকার’ রয়েছে—এমন একটি কদর্য সুযোগ লুফে নিতে সমাজের বিভিন্ন স্তরের, বিশেষ করে ধর্মীয় ভাবধারার মানুষের ব্যাপক উৎসাহ দেখা গেছে এখানে। সুস্থ সামাজিক কাঠামোর জন্য এটি বড় ধরনের সংকেত। বিয়ের মতো একটি পবিত্র ও সামাজিক বন্ধনকে যারা চুক্তির পণ্যে পরিণত করতে উদ্‌গ্রীব, তারা আমাদের চারপাশের চেনা মানুষই।

এ ঘটনাকে সমাজতাত্ত্বিক বিচারে দেখলে ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখেইমের ‘অ্যানোমি’ বা আদর্শহীনতার তত্ত্বটি মনে পড়ে। তিনি দেখিয়েছেন, সমাজে যখন দ্রুত কাঠামোগত পরিবর্তন হয় কিন্তু মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না, তখন একধরনের নিয়মহীনতা বা শূন্যতা তৈরি হয়। সেখানে তখন মানুষ যেকোনো উপায়ে নিজের আদিম প্রবৃত্তিকে চরিতার্থ করার সুযোগ খোঁজে। তা ছাড়া এখানে নারীকে অবলীলায় প্রথম স্বামীর কাছে ফেরার ‘উপায়’ হিসেবেও মানুষকে ব্যবহার করার মানসিকতা দেখা যাচ্ছে। জার্মান দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট বলেছেন, মানুষকে কখনো অন্য কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের ‘উপায়’ বা মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়; প্রত্যেক মানুষ নিজেই একেকটি লক্ষ্য।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন সমাজে কেন এমন একটি গরল দেখা গেল? যে সমাজে প্রতিনিয়ত ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটছে, ধর্মীয় আলোচনা হচ্ছে, সেই সমাজের আলেম, হাফেজ বা ইমামদের একটা অংশ কীভাবে এমন একটি জঘন্য ফাঁদে পা দিতে পারে?

উত্তরে অনেকে বলবেন, এর প্রধান কারণ ধর্মীয় শিক্ষার আত্মিক দিকটিকে বাদ দিয়ে কেবল ‘আইনি চতুরতা’র মানসিকতা। কেউ আরও গভীরে দর্শন দেবেন, ধর্ম যখন মানুষের ভেতরের নৈতিকতাকে পরিশুদ্ধ না করে শুধু বাহ্যিক লেবাস আর আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন এ ধরনের সুবিধাবাদী চরিত্রের জন্ম হয়। ধর্ম তখন হয় কিছু অন্তঃসারশূন্য বিধিনিষেধের যোগফল। ফলে একজন মানুষ একই সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ও বহন করতে পারে আবার ‘উপভোগ করে ছেড়ে দেওয়ার’ লোভে সিভিও পাঠাতে পারে। এটি ধর্মের ত্রুটি নয়; বরং ধর্মকে আপন স্বার্থে ব্যবহার করার বিকৃত মনস্তত্ত্ব।

আমার কাছে কারণটি অন্য রকম। আমাদের এই চেনা ধর্মীয় সমাজের অবয়ব বা আয়তন দিন দিন বাড়ছে, তারা সামাজিকভাবে ক্ষমতায়িতও হচ্ছে, কিন্তু তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ধর্মীয় সুশাসন পরিচালনার কোনো একক ‘অথরিটি’ বা অভিভাবকত্ব তৈরি হয়নি অথবা বলতে হয় অভিভাবকত্বের ছড়াছড়ি। দেশের ধর্মীয় শ্রেণিই ধর্মের যুক্তিকে কেন্দ্র করে এত বেশি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, যা আগে কখনো দেখা যায়নি।

এ অঞ্চলে আত্মশুদ্ধি শেখার অন্যতম বড় একটি মিশনারি সংগঠন হলো তাবলিগ, অথচ আজ তাদের মধ্যেও তীব্র বিভাজন। রাজনৈতিক পরিসরে ইসলামপন্থীদের বিভাজিত দলের সংখ্যা অনেকের মতে শতাধিক। শিক্ষাধারায়ও ঢুকে পড়েছে হাজারো বিভক্তি; দেশে নামে-বেনামে গড়ে উঠেছে হাজারো ‘প্রাইভেট’ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান। এত বিপুল সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভক্তির সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে সামগ্রিক ধর্মীয় ব্যাখ্যায়। পরিবর্তিত সমাজব্যবস্থার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে একেকটি গ্রুপ এখন অন্ধের মতো যে যার সুবিধামতো ব্যাখ্যা দাঁড় করাচ্ছে আর একশ্রেণি নিজেদের অন্যায় স্বার্থে তা লুফেও নিচ্ছে।

আরেকটি রূঢ় বাস্তবতা হলো ধর্মীয় সমাজের একাংশের তীব্র আর্থিক দৈন্য। বিশেষ করে লাখো মাদ্রাসাপড়ুয়া তরুণ উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবে চরম সংকটে পড়েছেন, তেমনি সাধারণ শিক্ষিত বেকারশ্রেণিও দিশাহারা। এই বিপুল কর্মহীন পুরুষের একটি বড় অংশ ধর্মের মোড়কে তৈরি হওয়া নানা ফন্দিফিকিরে পা দিচ্ছেন। কারণ, ইদানীং আমরা প্রায়ই ধর্মকে উপজীব্য করে গড়ে ওঠা চটকদার ‘ব্যবসায়িক প্রকল্প’ বা উদ্যোগের উদ্বোধন দেখতে পাচ্ছি।

দেখা যায়, কাল্পনিক হালালা সেন্টারে যাঁরা সিভি পাঠিয়েছেন, তাঁদের অনেকে ই-মেইলে সরাসরি আর্থিক বিষয়টি সামনে এনেছেন। কেউ অবলীলায় লিখেছেন, তিনি তালাকপ্রাপ্ত নারীকে বিয়ে করতে প্রস্তুত, তবে তিনি নিজে গরিব; তাই তাঁর ‘আর্থিক সুবিধার’ বিষয়টি খেয়াল রাখা হয়! আবার কেউ কেউ প্রবাসী বা বড় ব্যবসায়ী, তাঁরা এই পাতানো বিয়ের বিনিময়ে প্রয়োজনে বড় অঙ্কের অর্থ খরচ করতে রাজি।

তালাকপ্রাপ্ত নারীদের ঢাল বানিয়ে ‘হালালা সেন্টার’ খোলা, ‘দ্বীনে ফেরা’ মডেল কর্তৃক ম্যারেজ মিডিয়ার মতো অদ্ভুত উদ্যোগ নেওয়া কিংবা ‘মাসনা কলোনি’ নামক বহুবিবাহের আবাসিক ভবনের ঘোষণা দেওয়া—এসবই হলো সমাজে কোনো একক ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ না থাকার এবং যথেচ্ছ ব্যাখ্যার সংকট।

অথচ ইসলামে স্ত্রীর সঙ্গে পুরোপুরি বিচ্ছেদের পর ‘হালালা’ পন্থা অবলম্বন করে তাঁকে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা সম্পূর্ণ অবৈধ। সাজানো বিয়ের মাধ্যমে কোনো নারী তাঁর স্বামীর জন্য আইনি বা ধর্মীয়ভাবে ‘হালাল’ হন না; বরং প্রথম স্বামীর ঘরে ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে পাতানো বিয়ের চুক্তি যে করে, হাদিসে তাকে বলা হয়েছে ‘ধার করা ষাঁড়’।

এই হিল্লা সম্পাদনকারী ব্যক্তি এবং যার জন্য এই পাতানো বিয়ের আয়োজন করা হচ্ছে (অর্থাৎ প্রথম স্বামী)—উভয়ে চরমভাবে অভিশপ্ত। মহানবী (সা.) স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে হালাল বিষয়সমূহের মধ্যে সবচেয়ে অপছন্দনীয় হলো তালাক’ (সুনানে আবু দাউদ: ২১৭৮)। আর ‘যে ব্যক্তি হালালা করে এবং যার জন্য হালালা করা হয়—উভয়ের ওপর আল্লাহর লানত’ (সুনানে তিরমিজি: ১১১৯)। এক হাদিসে তিনি সাহাবিদের জিজ্ঞেস করেন, ‘আমি কি তোমাদের ধার করা ষাঁড় সম্পর্কে জানাব না?’ সাহাবিগণ বললেন, ‘অবশ্যই, হে আল্লাহর রাসুল।’ তিনি বললেন, ‘সে হলো হালালাকারী ব্যক্তি।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৯৩৬)

শুদ্ধ জীবনব্যবস্থার মূল কথা হলো, বিয়ে কোনো চুক্তিবদ্ধ ব্যবসা নয়। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় আইনেও এ ধরনের জোরপূর্বক বা সামাজিক চাপের মুখে দেওয়া ‘হিল্লা বিয়ে’র কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। দেশের উচ্চ আদালতও বিভিন্ন রায়ে সামাজিক সালিসের নামে নারীদের হিল্লা বিয়েতে বাধ্য করাকে অবৈধ, নারী নির্যাতন এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করেছেন।

ডিজিটাল দুনিয়ার এই কথিত হালালা সেন্টারের ঘটনাটি আমাদের জন্য একটি বড় ধরনের সতর্কবার্তা। এটি প্রমাণ করে যে নৈতিক শিক্ষার অভাব থাকলে প্রযুক্তির আলো মানুষকে আলোকিত করার পরিবর্তে আরও বেশি অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

ধর্মীয় সমাজের এই যে বিভক্তি ও বিচ্ছিন্নতা এবং অনিয়ন্ত্রিত নানামুখী ব্যাখ্যা—এর নানা সমাধান অনেকে খুঁজেছেন বা খুঁজছেন। অনেকে মনে করেন, ধর্মীয় সুশাসনের (রিলিজিয়াস গভর্নেন্স) ব্যবস্থা করা। মিসর, সৌদি আরব, তুরস্ক, মালয়েশিয়ার মতো অনেক মুসলিম দেশে একটি প্রশাসনিক কাঠামো থাকে, যার মাধ্যমে কোনো স্বীকৃত সর্বোচ্চ কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ দেশের ধর্মীয় কর্মকাণ্ড, আচার-অনুষ্ঠান, উপাসনালয়, ধর্মীয় শিক্ষা এবং ফতোয়া বা ধর্মীয় ব্যাখ্যা প্রদানের প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ ও তদারক করে। ধর্মের নামে যে কেউ যেন যথেচ্ছ ব্যাখ্যা দিয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা থাকে এবং সমাজে একটি সুশৃঙ্খল ধর্মীয় পরিবেশ বজায় থাকে।

এখন আমাদের সমাজে যে ধরনের ধর্মীয় মতাদর্শিক বিভাজন, তাতে এমন প্রশাসনিক কাঠামো কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই অনেকে মনে করতে পারেন রাষ্ট্র এখানে তার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। তা ছাড়া রাষ্ট্র ও সরকারব্যবস্থাও এমন সুসংহত হয়ে উঠতে পারেনি, যা ধর্মীয় সমাজের মধ্যে সুশৃঙ্খলা তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। এ ক্ষেত্রে শুরুতে ধর্মীয় সমাজগুলোর বিভিন্ন কর্তৃপক্ষ বা প্রতিষ্ঠানকেই এগিয়ে আসতে হবে হালালা সেন্টারের মতো উদ্ভূত সংকট ঠেকাতে।

ইন্টারনেট বা ই-মেইলের মতো আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে মানুষ যখন এমন এক কুপ্রথার অংশ হতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে, তখন বুঝতে হবে, শিক্ষার আলো আমাদের মনকে স্পর্শ করতে পারছে না, ধর্মের নীতিকথাও প্রাণে লাগছে না। এ ধরনের অপব্যাখ্যা ও লালসার বাজার বন্ধ করতে হলে আমাদের ধর্মীয় পণ্ডিত ও সমাজের নেতাদের প্রাতিষ্ঠানিক ও নৈতিক বিশৃঙ্খলার মূলে হাত দিতে হবে।

* মনযূরুল হক, প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
- ই–মেইল: manzurul.haque267@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

ফেসবুকে হালালা সেন্টারের বিজ্ঞাপন
ফেসবুকে হালালা সেন্টারের বিজ্ঞাপন

ট্রাম্প-নেতানিয়াহু চক্র নিজেদের মতো বদলাতে গিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে কি স্থায়ী সংকটে ঠেলে দিলেন

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে তাঁদের বিজয় নিশ্চিত হলে মধ্যপ্রাচ্যকে তাঁরা নতুনভাবে গড়ে তুলতে পারবেন।

কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, অঞ্চলটি বদলাচ্ছে ঠিকই, তবে তাঁরা যেমনটা ভেবেছিলেন, সেভাবে নয়। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানকে পরাজিত করা যায়নি। উল্টো এখন এক দীর্ঘস্থায়ী সংকটের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সেখানে হয়তো থেমে থেমে সংঘাত চলতে থাকবে।

ইরানের শাসকগোষ্ঠী নিজেদের ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর ধারণার চেয়েও অনেক বেশি কঠিন প্রতিপক্ষ হিসেবে প্রমাণ করেছে। ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর মূল্যায়ন ভুল ছিল। তাঁরা এখন পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছেন।

এর মধ্যেই ইরান একটি মার্কিন অ্যাপাচি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করেছে। এটি আবারও মনে করিয়ে দিচ্ছে, ইরানের শাসকগোষ্ঠী এখনো যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি করতে সক্ষম। তারা এই যুদ্ধে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে না। তাদের কাছে ‘বিজয়’ মানে টিকে থাকা এবং আরও শক্তিশালী প্রতিরোধ তৈরি করা। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণের স্বীকৃতি পাওয়া, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথ।

ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি হওয়ার আশা করেছিলেন। ভেবেছিলেন, এ চুক্তির মাধ্যমে ইরান আবার হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে এবং বড় বড় বিষয় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি আলোচনার ভিত্তি তৈরি হবে। আর আলোচনায় প্রাধান্য পাবে ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত এবং তাদের পারমাণবিক পরিকল্পনার মতো বিষয়গুলো।

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলের যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একটি পুরোনো শিক্ষা থেকে শিখছেন। তা হলো—যুদ্ধ শুরু করা যতটা সহজ, স্পষ্ট বিজয়ের মাধ্যমে তা শেষ করা ততটাই কঠিন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তাঁরা যখন ইরানে আগ্রাসন শুরু করেন, তখন দুজনই আলাদা করে ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন। দুজনের কথাতেই বোঝা যাচ্ছিল, তাঁরা ইতিহাসে এক বড় পরিবর্তনের মুহূর্ত আসছে বলে ভেবেছিলেন। ১৯৭৯ সালে শাহকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর থেকে ইরান যে শাসনব্যবস্থায় পরিচালিত হচ্ছে, সেটি শেষ হয়ে যাবে।

ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে ধারণ করা সে ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প জানুয়ারিতে দেওয়া একটি প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন। জানুয়ারিতে ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলার সময় তিনি বিক্ষোভকারীদের সে প্রতিশ্রুতিটি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন—‘সহায়তা আসছে।’

আর ফেব্রুয়ারিতে দেওয়া ভিডিও বার্তায় ট্রাম্প বলেন, ‘আজ রাতে আমি ইরানের গর্বিত জনগণকে বলছি, আপনাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে। নিরাপদ আশ্রয়ে থাকুন। ঘর থেকে বের হবেন না। বাইরের পরিস্থিতি খুব বিপজ্জনক। চারদিকে বোমা পড়ছে। আমরা শেষ করার পর আপনারা আপনাদের শাসনক্ষমতা দখল করবেন। সেটি আপনাদেরই হবে। এটা সম্ভবত বহু প্রজন্মের মধ্যে আপনাদের পাওয়া একমাত্র সুযোগ।’

পরদিন সকালে নেতানিয়াহু তেল আবিবের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উঁচু ভবনের ছাদে দাঁড়িয়ে তাঁর বক্তব্য রেকর্ড করেন। ট্রাম্পের মতো তিনিও এমনভাবে কথা বলছিলেন, যেন বিজয় নিশ্চিত।

নেতানিয়াহু বলেন, ‘এই জোটবদ্ধ শক্তি আমাদের সেই কাজটি করার সুযোগ দিয়েছে, যা আমি ৪০ বছর ধরে করতে চেয়েছি। তা হলো—সন্ত্রাসী শাসনব্যবস্থাকে কঠোরভাবে আঘাত করা। এটাই আমি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, আর এটাই আমরা করব।’

নিজের পুরো রাজনৈতিক জীবনে নেতানিয়াহু বলে এসেছেন, ফিলিস্তিনিরা বা দেশটির আরব প্রতিবেশীরা ইসরায়েলের জন্য প্রকৃত হুমকি নয়; বরং ইরানই তাদের জন্য আসল হুমকি। উগ্র ইহুদিবাদী নেতানিয়াহু এর আগে একাধিক মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপে যুক্ত করার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হননি। কিন্তু ট্রাম্প তাঁর ফাঁদে পড়ে গেলেন।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর দুই বছরের বেশি সময় ধরে নেতানিয়াহু ইসরায়েলিদের বলে আসছিলেন, তাঁদের সামরিক শক্তি শত্রুদের পরাজিত করবে এবং দেশকে আরও সমৃদ্ধ ও নিরাপদ ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাবে। যুদ্ধবাজ নেতানিয়াহু কূটনীতিকে নয়, সামরিক শক্তি প্রয়োগকেই সমাধানের পথ বলে বিবেচনা করেছিলেন।

নেতানিয়াহুর মধ্যে তখন এমন আত্মবিশ্বাস দেখা যাচ্ছিল, যেন তাঁর বহু প্রতীক্ষিত মুহূর্ত এসে গেছে। কিন্তু গত সোমবার ট্রাম্প তাঁকে বৈরুতে হামলার পরিকল্পনা বাতিল করতে বলায় নেতানিয়াহুকে আর তেমন দেখাচ্ছিল না। ইসরায়েলের খ্যাতনামা কলাম লেখক বেন ক্যাসপিটের দৃষ্টিতে ওই সময় ক্যামেরার সামনে আসা নেতানিয়াহুকে দেখতে ‘চুপসে যাওয়া বেলুনের’ মতো লাগছিল।

ট্রাম্প ইরানে দ্রুত বিজয়ের আশা করেছিলেন। কারণ, ভেনেজুয়েলায় সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পেরে তিনি খোশমেজাজে ছিলেন। ভেনেজুয়েলায় মার্কিন বাহিনী দেশটির প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতাচ্যুত করে গ্রেপ্তার করেছে, তাঁকে ও তাঁর স্ত্রীকে নিউইয়র্কে তুলে নিয়ে গেছে এবং রাজধানী কারাকাসে যুক্তরাষ্ট্রপন্থী নতুন নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।

ট্রাম্পের কাছে ভেনেজুয়েলার ঘটনা ছিল সরকার পরিবর্তনের এক আদর্শ উদাহরণ। তিনি মনে করেছিলেন, এটি ইরাক ও আফগানিস্তানে তাঁর পূর্বসূরিদের চালানো দীর্ঘ যুদ্ধের চেয়ে অনেক ভালো পথ। তাঁর ধারণা ছিল, ভেনেজুয়েলার পর ইরানের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি হবে।

কিন্তু এখন ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু দুজনেই হয়তো ভাবছেন, তাঁদের হিসাব–নিকাশে ভুলটা কোথায় হলো? যুক্তরাষ্ট্রের আছে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। আর মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক শক্তি হলো ইসরায়েল।

ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু হয়তো মনে করেছিলেন, তেহরানের সরকার দুর্বল হয়ে পড়েছে। কারণ, নিষেধাজ্ঞা, কথিত দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে দেশটি গভীর অর্থনৈতিক সংকটে ছিল। গাজায় ইরানের মিত্র হামাস এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর হামলা চালাচ্ছিল ইসরায়েল। তেহরানের আরেক গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে পরিচিত সিরিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদও ক্ষমতাচ্যুত হয়ে মস্কোতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। গত জানুয়ারিতে ইরান সরকারকে তাদের নিজেদের বিরুদ্ধে হওয়া বিশাল বিক্ষোভ কঠোরভাবে দমন করতে হয়েছে।

তবে ট্রাম্প ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আইসিসির পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু ইরানের শাসকগোষ্ঠীর টিকে থাকার শক্তি ও কৌশলকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে পারেননি। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের খুন করলে শাসনব্যবস্থা ভেতর থেকেই ভেঙে পড়বে।

তাঁরা এমন একটি দেশের বিরুদ্ধে নিজেদের সামরিক শক্তির সক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন, যেটি প্রায় ৫০ বছর ধরে বারবার হুমকির মুখে থেকেও টিকে আছে। এ দেশটি হামলা সহ্য করার মতো করে নিজেকে গড়ে তুলেছে এবং ধর্মীয় ও আদর্শিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে জাতীয় নিরাপত্তার একটি সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি করেছে।

যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মিত্র হিসেবে পরিচিত উপসাগরীয় তেলসমৃদ্ধ দেশগুলোও বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে। এসব দেশ উপসাগরীয় অঞ্চলে স্থিতিশীলতার এক ‘অভয়ারণ্য‘ এবং শত শত কোটি ডলারের ব্যবসার কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিল। কিন্তু যুদ্ধের কারণে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের চোখে সেই স্বপ্ন এখন মরীচিকায় পরিণত হচ্ছে।

ইরানে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত পুরোনো নেতৃত্বের জায়গা নিয়েছে বর্তমান নেতৃত্ব। তাঁরা তাঁদের পূর্বসূরিদের মতোই মতাদর্শিক, কিন্তু তাঁদের চেয়ে অনেক বেশি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত। তাঁরা মনে করেন, এটি অস্তিত্বের লড়াই, যেখানে শুধু কথার মাধ্যমে ভবিষ্যতের হামলা থামানো যাবে না। বরং তাঁরা দেখাতে চান, ইরানের ওপর আবার হামলা হলে তার মূল্য হবে খুবই চড়া।

এসব নেতার কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো লেবাননের যুদ্ধকে উপসাগরীয় অঞ্চলের সংঘাতের সঙ্গে যুক্ত করা। তাঁদের বার্তা হলো—লেবাননে ইসরায়েলের হামলা ও হিজবুল্লাহকে ধ্বংস করার চেষ্টা চলতে থাকলে কোনো ধরনের চুক্তি সম্ভব নয়। হিজবুল্লাহ হলো সে সশস্ত্র গোষ্ঠী, যেটিকে ইরান ১৯৮০-এর দশক থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিজেদের অগ্রবর্তী প্রতিরক্ষাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছে।

যুদ্ধবাজ ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আইসিসির পরোয়ানাভুক্ত নেতানিয়াহু দুই ঘটনার মধ্যে সংযোগকে মানতে রাজি নন। গত সোমবার নেতানিয়াহু একে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে উল্লেখ করেছেন।

কিন্তু ট্রাম্প যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার বদলে দ্রুত শেষ করতে চান এবং নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। এটা নেতানিয়াহুর ইচ্ছার বিপরীত। কারণ, তিনি চান তেহরানের ইসলামি শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে ঘোষণা দিতে না পারা পর্যন্ত যুদ্ধ চলতে থাকুক।

নেতানিয়াহু বৈরুতে হামলা চালানোর পরিকল্পনা বাতিল করেছেন ঠিকই। তবে ইসরায়েলের নৃশংস সেনাবাহিনী (আইডিএফ) লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে বেপরোয়া হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

গত মার্চে হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার পর সতর্ক করে বলা হয়েছিল, জুনের মধ্যে এটি না খুললে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে। কিন্তু জুন মাসে এসেও হরমুজ প্রণালি বন্ধই আছে। বড় কোনো কূটনৈতিক অগ্রগতি ছাড়া এটি শিগগিরই খুলে যাবে—এমন সম্ভাবনাও খুব কম বলে মনে হচ্ছে। -বিবিসির বিশ্লেষণ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি: রয়টার্স ফাইল ছবি

যুদ্ধক্ষেত্র পালানো নারীর ডায়েরি: ‘প্রার্থনা করেছিলাম, পেটের সন্তান যেন এই পৃথিবীতে না আসে’

বিবিসিঃ আমিরা (ছদ্মনাম) সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এ অবস্থায় অজানা এক যাত্রা শুরু করেছিলেন সুদানের এই নারী। চারপাশে যুদ্ধ। শহরে অবশিষ্ট নেই কোনো হাসপাতাল, ওষুধের দোকান। আছে শুধু গুলির শব্দে আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা।

সুদানের আধা সামরিক বাহিনী র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) দখল করে নিয়েছে আমিরাদের শহর পশ্চিম কোরদোফান রাজ্যের এন নাহুদ। তাঁর সামনে একমাত্র পথ—শহর ছেড়ে পালানো। এ পরিস্থিতিতে অন্তঃসত্ত্বা হয়েও আমিরা প্রার্থনা করেছিলেন, ‘এই সময় যেন আমার সন্তান পৃথিবীতে না আসে।’

গত মে মাসে আমিরা সুদানের অন্যতম সক্রিয় যুদ্ধক্ষেত্র পেরোনোর সময় এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছিলেন। সেই কথা রেকর্ড করা অডিও ডায়েরিতে বলেছেন তিনি।

ওই সময় আরএসএফ এন নাহুদ দখল করে নেওয়ায় শহরটি থেকে বেরোনোর রাস্তা ছিল বিপৎসংকুল। তবু নিজে বাঁচতে, অনাগত সন্তানকে বাঁচাতে তাঁর আর কোনো উপায় ছিল না। সুদানের সেনাবাহিনী ও আরএসএফের যুদ্ধ দুই বছরের বেশি সময় ধরে সাধারণ নাগরিকদের ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এখন কোরদোফানের দক্ষিণাঞ্চল হয়ে উঠেছে সম্মুখসমর। সেই পথ দিয়েই পালিয়ে যান আমিরা।

পালানোর সময় আমিরা একটি অডিও ডায়েরি রেকর্ড করেন। এই ডায়েরি গ্লোবাল ক্যাম্পেইন গ্রুপ আভাজ (এভিএএজেড) বিবিসির কাছে সরবরাহ করেছে। পরে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় ফোনে তাঁর সঙ্গে বিবিসির কথা হয়। সেখানে সন্তান জন্ম দেওয়ার অপেক্ষায় আছেন তিনি।

পালানোর পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে আমিরা বলেন, ‘শহরে আর কোনো হাসপাতাল নেই, নেই কোনো ফার্মেসি। আমার ভয় হচ্ছিল, যদি আরও দেরি করি, তাহলে হয়তো কোনো গাড়ি পাওয়া যাবে না। যানবাহন চলাচল তখন প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। যেটুকু ছিল, তা–ও অবিশ্বাস্য রকম কঠিন আর ভীষণ ব্যয়বহুল।’

বন্দুকের মুখে যাত্রা শুরু

যাত্রার শুরু থেকেই ঝামেলা হচ্ছিল আমিরার। বলেন, যাতায়াতের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছিল আরএসএফ ও তাদের সহযোগীরা।

এন নাহুদ থেকে পালানোর জন্য আমিরার স্বামী কোনো রকমে একটি ট্রাক ভাড়া করেছিলেন। সেই ট্রাকে চড়তেই বিপত্তি শুরু। চালক ছিলেন আরএসএফের সদস্য। তিনি ট্রাকটি আরেক তরুণের কাছে একই সময়ে ভাড়া দিয়েছিলেন। এ নিয়ে চালক ও ওই তরুণের মধ্যে ঝগড়া বেধে যায়।

আমিরা বলেন, ‘চালক সঙ্গে সঙ্গে বন্দুক বের করে ওই তরুণকে গুলি করার হুমকি দিলেন। সবাই তাঁকে থামানোর চেষ্টা করছিলেন, এমনকি তাঁর সঙ্গে থাকা আরএসএফের সঙ্গীও। তরুণের দাদি আর মা কাঁদতে কাঁদতে চালকের পা ধরে গুলি না করার অনুরোধ করেছিলেন। আমরা যাত্রীরা ভয়ে হিম হয়ে গিয়েছিলাম।’

আমিরা আরও বলেন, ‘মনে হচ্ছিল, যদি তিনি গুলি চালান তবে একজনকে নয়, অনেককেই মেরে ফেলবেন। কারণ, তিনি গাঁজা খাচ্ছিলেন, মাতাল ছিলেন।’

শেষমেষ চালক বন্দুক সরিয়ে রাখলেও ওই তরুণকে পরিবারসহ এন নাহুদেই নামিয়ে দেন। তাঁদের রেখেই আমিরাদের যাত্রা শুরু হলো। এরপরও যাত্রা ছিল শঙ্কায় পূর্ণ। খানাখন্দে ভরা রাস্তা, ট্রাকভর্তি লাগেজ আর গাদাগাদি করা ৭০ থেকে ৮০ জন, বারবার ছোট ছোট ঝিরি পেরোনোর ঝক্কি আর মাথার ওপর প্রখর রোদ্র—সব মিলিয়ে অস্থির যাত্রা। মায়েরা এক হাতে আঁকড়ে ধরছেন গাড়ি, আরেক হাতে আগলে রাখছেন সন্তান।

আমিরা বলেন, ‘যাত্রার পুরোটা সময় ভয়ে ছিলাম। প্রার্থনা করছিলাম, যেন পেটের সন্তান এ সময় পৃথিবীতে না আসে। শুধু চেয়েছিলাম, সব ঠিকঠাক হয়ে যাক।’

ভয়ের শেষ নেই

অবশেষে আমিরারা পশ্চিম কোরদোফানের রাজধানী এল-ফুলায় গিয়ে পৌঁছান। কিন্তু এ শহরেও ঢুকে পড়ছেন সেনারা। এ কারণে আমিরা সেখানে বেশিক্ষণ থাকতে চাননি।

অডিও ডায়েরিতে আমিরা রেকর্ড করেছিলেন, ‘সেনারা এল-ফুলায় ঢুকলে কী হবে, আমি জানতাম না। কারণ, সেনারা, বিশেষ করে বাগারা, রিজেইগাতসহ কিছু নির্দিষ্ট জাতিগত গোষ্ঠীর লোকদের নিশানা বানানো শুরু করেছেন। সেনাদের ধারণা ছিল, এই জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরা আরএসএফের সঙ্গে যুক্ত।’

অডিও ডায়েরিতে আমিরা বলেন, তাঁর স্বামী এমন সম্প্রদায়ের একজন। যদিও আরএসএফের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি সরকারি চাকরি করেন, আইন পড়েছেন। কিন্তু এখন কিছুই আর বিবেচনা করা হচ্ছে না। শুধু জাতিগত কারণেই মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।

জাতিসংঘ বলেছে, সুদানের সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে বন্দী বেসামরিক লোকদের বিচারবহির্ভূত হত্যা করার মতো অভিযোগগুলো বিশ্বাসযোগ্য। সেনাবাহিনী এসবকে কিছু সদস্যের ‘ব্যক্তিগত’ অপরাধ বলে দায় এড়ায়। চলতি বছরের শুরুর দিকে সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে একটি কমিটি গঠন করেছেন।

চেকপোস্ট, ঘুষ আর ভাঙা গাড়ি

তিনটি রাজ্য নিয়ে গঠিত কোরদোফান এখন প্রধান যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। সুদানের যুদ্ধের জন্য এ অঞ্চল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি গুরুত্বপূর্ণ তেলক্ষেত্র ও প্রধান পরিবহন রুটের এক কৌশলগত কেন্দ্র।

আরএসএফের পাশাপাশি অন্যান্য মিলিশিয়াদের সম্পৃক্ততা, বিশেষ করে শক্তিশালী এসপিএলএম-এন সহিংসতাকে তীব্র করে তুলেছে। এতে গুরুতর মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে সহায়তাদানকারী গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে ত্রাণ সরবরাহ করাও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

এল-ফুলা থেকে দক্ষিণ সুদান সীমান্তে পৌঁছাতে আমিরার তিন দিন লেগেছিল। এ সময়ে তাঁদের একাধিকবার গাড়ি পাল্টাতে হয়েছে। আর পথে পথে ছিল বাধা।

আমিরা বলেন, ‘আরএসএফের চালকেরা নিজের ইচ্ছেমতো ঠিক করতেন কে যাবেন, কোথায় বসবেন, কত ভাড়া দেবেন। কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম ছিল না। আর তাঁরা সবাই ছিলেন সশস্ত্র।’

আমিরা বলেন, পথে প্রতি ২০ মিনিট পরপর তল্লাশিচৌকি। প্রতি চৌকিতে বাধ্যতামূলক ঘুষ দিতে হতো। অথচ তাঁরা আগে থেকেই আরএসএফের সদস্যদের অর্থ দিয়ে সঙ্গী হিসেবে নিয়েছিলেন।

সেখানে খাবারের দাম ছিল অনেক বেশি। ছিল পানির সংকট। এল-হুজাইরতা নামের একটি গ্রামে তাঁরা আরএসএফের স্টারলিংক ডিভাইস ব্যবহার করে ইন্টারনেটে সংযুক্ত হতে পেরেছিলেন, কিন্তু তা ছিল বেশ ঝুঁকিপূর্ণ।

আমিরা বলেছেন, ‘অনলাইনে ফিরলেই সতর্ক থাকতে হয়। যদি আরএসএফের সদস্যরা শুনতে পান আপনি সেনাবাহিনীর কোনো ভিডিও দেখছেন, কোনো গান বাজাচ্ছেন, এমনকি শুধু কথায় আরএসএফকে উল্লেখ করেছেন, তাহলেই আপনাকে গ্রেপ্তার করা হবে।’

আমিরাদের যাত্রাপথের রাস্তাঘাট ছিল ভাঙাচোরা। গাড়ি বারবার বিকল হয়ে যাচ্ছিল। যাত্রাপথে মোট তিনবার গাড়ি বিকল হয়ে যায়। একবার জঙ্গলের ভেতর গাড়ির চাকা ফেটে যায়। সে সময় সবচেয়ে ভয়ানক অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। এমনিতেই পানি নেই। এর ওপর আশপাশের কেউ সাহায্য করতেও রাজি নন।

আমিরা বলেন, ‘আমি সত্যিই ভেবেছিলাম, আর কোনো দিন কোথাও পৌঁছাতে পারব না। এখানেই মরে যাব। হাল ছেড়ে দিলাম। শুধু একটা কম্বল ছিল, সেটি মাটিতে বিছিয়ে শুয়ে পড়লাম। সেদিন সত্যিই মনে হয়েছিল, এটাই আমার শেষ।’

কিন্তু শেষ হয়নি। একটি সবজিবোঝাই পিকআপে চড়ে অবশেষে সামনে এগোতে থাকেন আমিরা ও তাঁর স্বামী।

সীমান্ত পেরোনোর সংগ্রাম

অবশেষে পরদিন আমিরারা পৌঁছালেন দক্ষিণ সুদানের সীমান্ত আবেইতে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে কাদায় ভরে গেছে পথ। তাঁরা তখন তেলের ব্যারেলবোঝাই গাড়িতে। গাড়ি বারবার কাদায় ডুবে যাচ্ছিল।

বৃষ্টি আর কাদায় যাত্রা থমকে যায় বারবার। ব্যারেলবোঝাই গাড়ি কাদায় আটকে যায়। জামাকাপড় ভিজে একাকার। ব্যাগ ধুলো আর গরমে আগেই নষ্ট হয়ে গিয়েছিল, এবার পুরো ভিজে গেছে। ঠান্ডায় কাঁপছিলেন আমিরারা। প্রার্থনা করেছিলেন, যেন নিরাপদে পৌঁছাতে পারেন।

শেষমেশ আমিরা ও তাঁর স্বামী এন নাহুদ থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কিলোমিটার দূরে দক্ষিণ সুদানের রাজধানী জুবায় পৌঁছালেন। সেখান থেকে বাসে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালা। হাজার মাইলের দুঃসহ যাত্রা শেষে সাময়িক আশ্রয় পান তাঁরা।

আশ্রয় উগান্ডায়, মন সুদানে

আমিরার স্বজনেরা এখনো সুদানে। সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে তাঁর। পাশাপাশি তিনি প্রথমবার মা হওয়ার ভয়ে উদ্বিগ্ন।

আমিরা বলেন, ‘সন্তান জন্ম দেওয়ার বিষয়টা নিয়ে আমি খুব ভয় পাচ্ছি। কারণ, এটাই প্রথমবার, আর আমার মা পাশে থাকবেন না। শুধু স্বামী আর এক বান্ধবী থাকবে। সবকিছু এত অগোছালো, এত বিশৃঙ্খল—আমি সামলাতে পারছি না।’

আমিরা একজন নারী অধিকারকর্মী ও গণতন্ত্রপন্থী কর্মী। যুদ্ধের সময় তিনি জরুরি সহায়তা দলের সঙ্গে কাজ করেছেন। সেনারা তাঁদের সন্দেহের চোখে দেখতেন, কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।

আমিরা বলেন, ‘সেনাদের ভয় পেতাম। কারণ, তাঁরা তরুণদের ধরে নিয়ে যেতেন। আরএসএফ এসেও পরিস্থিতি ভালো হয়নি। তারা লুট করে, ধর্ষণ করে। সেনারা যা করে, এরাও কম কিছু নয়। দুই পক্ষই একই রকম।’

আরএসএফ অবশ্য বলেছে, তারা সাধারণ মানুষকে টার্গেট করে না। জাতিগত নিধনের অভিযোগ তারা অস্বীকার করে বলেছে, এগুলো গোষ্ঠীগত সংঘাতমাত্র। দুই পক্ষই (সরকারি সেনা ও আরএসএফ) যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

আমিরার জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আর আনন্দ হলো—মা হওয়া। কিন্তু তিনি কি সন্তানকে নিয়ে আবার কখনো সুদানে ফিরতে পারবেন?

আমিরা বলেন, ‘আশা করি, একদিন সুদানের যুদ্ধ থামবে, পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তবে আগের মতো সব হবে না। কিন্তু অন্তত এভাবে মানুষ অকাতরে মরবে না।’
আমিরাদের যাত্রাপথের রাস্তাঘাট ছিল ভাঙাচোরা। যাত্রাপথে মোট তিনবার গাড়ি বিকল হয়
আমিরাদের যাত্রাপথের রাস্তাঘাট ছিল ভাঙাচোরা। যাত্রাপথে মোট তিনবার গাড়ি বিকল হয়। ছবি: বিবিসি থেকে নেওয়া স্ক্রিনশট

ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধে রোগ ছড়ানোর মূল সূত্র খুঁজে পেলেন বিজ্ঞানীরা

বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন কিভাবে ব্রেস্ট ক্যান্সার শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে, যা রোগটির প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসার ধরন পাল্টে দিতে পারে। স্কটল্যান্ডের গবেষকরা দেখতে পান, ক্যান্সার বিশেষ কিছু ইমিউন কোষের মেটাবলিজম (শক্তি উৎপাদন ও ব্যবহার প্রক্রিয়া) বদলে দেয়। এ সময় এসব কোষ ইউরাসিল নামের একধরনের প্রোটিন নিঃসরণ করে, যা ক্যান্সার কোষের জন্য অন্য অঙ্গে বৃদ্ধির একপ্রকার ‘স্ক্যাফোল্ড’ হিসেবে কাজ করে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডেইলি মেইল।

বিজ্ঞানীরা এ জন্য ইদুরের ওপর পরীক্ষা চালিয়েছেন। সে সময় তারা ইউরাসিল-নির্ভর স্ক্যাফোল্ড তৈরি ঠেকাতে সক্ষম হন। ফলে ইমিউন সিস্টেম আবার সক্রিয় হয়ে সেকেন্ডারি ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে পারে এবং ক্যান্সার ছড়ানো বন্ধ হয়। গবেষকরা ইউরিডিন ফসফরাইলেজ-১ (ইউপিপি১) নামের একটি এনজাইম ব্লক করে এই প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেছেন। তাদের আশা, রক্তে ইউরাসিল শনাক্ত করে ক্যান্সার ছড়ানোর প্রাথমিক ইঙ্গিত ধরা সম্ভব হবে এবং ইউপিপি১ ব্লকার ওষুধের মাধ্যমে রোগের বিস্তার রোধ করা যাবে। এই আবিষ্কারের ফলাফল এমবো রিপোর্টস জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষণার প্রধান লেখক ডা. ক্যাসি ক্লার্ক বলেন, ক্যান্সার ছড়ানো ঠেকাতে আমরা নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছি। প্রাথমিক পর্যায়েই মেটাবলিক পরিবর্তন টার্গেট করে অসংখ্য প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। ক্যান্সার রিসার্চ ইউকের গবেষণা পরিচালক ডা. ক্যাথেরিন এলিয়ট বলেন, মেটাস্টেসিস (ক্যান্সারের বিস্তার) ব্রেস্ট ক্যান্সারকে মারাত্মক করে তোলে। এই আবিষ্কার আমাদের নতুন আশা দিচ্ছে রোগ ছড়ানো রোধে। গবেষকরা এখন এই প্রক্রিয়াকে লক্ষ্য করে নতুন ওষুধ পরীক্ষা করছেন, যা ব্রেস্ট ক্যান্সার ছাড়াও অন্যান্য ক্যান্সারের বিস্তার ঠেকাতে কাজে লাগতে পারে।

উল্লেখ্য, বৃটেনে প্রতি বছর প্রায় ১১,৫০০ নারী এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৪২,০০০ মানুষ ব্রেস্ট ক্যান্সারে মারা যান। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে বৃটেনে এ মৃত্যুহার ৪০ ভাগ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।

mzamin