Showing posts with label কুড়িগ্রাম. Show all posts
Showing posts with label কুড়িগ্রাম. Show all posts

Monday, December 15, 2025

সুদানে নিহত শান্তিরক্ষী: প্রিয়জনের মৃত্যুর খবরে শোকস্তব্ধ স্বজনেরা

প্রায় দেড় যুগ আগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন মো. মমিনুল ইসলাম (৩৮)। অন্যদিকে সাত বছর আগে যোগ দেন সৈনিক শান্ত মন্ডল (২৬)। কুড়িগ্রামের এই দুজন জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালনের জন্য গত মাসে সুদানে যান। যাওয়ার সময় অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে দ্রুত ফিরে আসার কথা দিয়েছিলেন শান্ত। মমিনুল মাকে চিন্তা না করতে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু গতকাল সন্ত্রাসীদের হামলায় দুজনই শহীদ হয়েছেন। প্রিয়জনের মৃত্যুর খবরে দুজনের বাড়িতেই এখন মাতম চলছে।

সৈনিক শান্ত মন্ডল কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছাট মাধাই গ্রামের মন্ডলপাড়ার বাসিন্দা। তিনি সাবেক সেনাসদস্য নুর ইসলাম মন্ডল ও সাহেরা বেগমের ছোট ছেলে। তাঁর বড় ভাই সোহাগ মন্ডলও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত। অন্যদিকে সৈনিক মমিনুল ইসলামের বাড়ি উলিপুর উপজেলার উত্তর পান্ডুল গ্রামে। মমিনুলের দুই মেয়ে। বড় মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে ও ছোট মেয়ের বয়স পাঁচ বছর।

গতকাল শনিবার সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের আওতাধীন কাদুগলি লজিস্টিক বেসে স্থানীয় সময় আনুমানিক বেলা ৩টা ৪০ মিনিট থেকে ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত ড্রোন হামলা চালায় বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী। ওই হামলায় দায়িত্বরত কুড়িগ্রামের শান্ত ও মমিনুলসহ নাটোর, রাজবাড়ী, কিশোরগঞ্জ ও গাইবান্ধার মোট ছয়জন শান্তিরক্ষী শহীদ হন। আহত হন আরও আটজন।

রোববার বিকেলে কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছাট মাধাই গ্রামের মন্ডলপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, শান্ত মন্ডলের মৃত্যুর খবরে স্বজনেরা আহাজারি করছেন। স্বামীর মৃত্যুর খবরে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন শান্তর পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী দিলরুবা খন্দকার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘শান্ত আমাকে কথা দিয়েছিল দ্রুত ফিরে আসবে। সে কথা ভাঙতে পারে না। আমার শান্তকে এনে দাও।’ বলতে বলতে মূর্ছা যান তিনি।

রাজারহাট ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য বিপ্লব আলী পরিবারকে সান্ত্বনা দিতে শান্তদের বাড়িতে এসেছেন। তিনি বলেন, ‘সুদানে হামলায় শান্ত নিহত হয়েছে। এই সংবাদ রংপুর সেনাক্যাম্প থেকে আমাকে আজ দুপুরে জানায়। এরপর আমি এই বাসায় এসেছি।’

শান্তর বড় ভাই সোহাগ মন্ডল বলেন, ‘শনিবার বিকেলেও ওর সঙ্গে ভিডিও কলে কথা হয়েছে। সবকিছু ঠিকই ছিল। রাতে ড্রোন হামলার খবর শুনে সুদানে থাকা এলাকার অন্য সৈনিকদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হই, আমার ভাই আর নেই।’

অন্যদিকে উলিপুরের উত্তর পান্ডুল গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, নিহত মমিনুলের বাড়িতে আত্মীয়স্বজনের ভিড়। আঙিনায় মাটিতে শুয়ে বিলাপ করছিলেন মমিনুলের বোন কমেলা বেগম। শোবার ঘরে বাক্‌রুদ্ধ স্ত্রী মুন্নী বেগম। পাশেই দুই মেয়ে।

ম‌মিনুলের স্ত্রী মু‌ন্নি বেগম ব‌লেন, ‘দুইটা মাসুম বাচ্চা আমার এতিম হ‌য়ে গে‌ল। এখন এই সন্তান দুটাক নি‌য়ে কী কর‌ব? সন্তা‌ন‌দের কে দেখ‌বে? মেয়েরা বাবা‌কে ছাড়া‌ কীভাবে চলবে?’

ম‌মিনুলের মা মনোয়ারা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘অক্টোবর মাসে ২০ দিনের ছুটিতে বাড়িত আসি সগার কাছত দোয়া নিয়ে ঢাকাত গেইল। নভেম্বর মাসে যাওয়ার সময় আমায় জড়ায় ধরে কয়, “মা কান্না কোরো না। মুই খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসিম।” শনিবার সকালে বাপ মোর ভিডিও কল দিয়ে এলাকার সগারে সাথে কথা কইছে। সকা‌লে মোর বাপ নাশতা খায়া গে‌ছে। কিন্তু মোর বাপটাক বোম ফে‌লে দি‌য়ে মারি ফেলাইছে। মোর বাপটা কা‌রও ক্ষ‌তি করে নাই, তা-ও কে‌ন ওরা মোর বাপক মারি ফেলাইল?’

ভিনদেশে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দুই সৈনিক নিহতের ঘটনায় একদিকে যেমন মাতম চলছে, অন্যদিকে এলাকাবাসী গর্ববোধ করছেন। উলিপুরের উত্তর পান্ডুল গ্রামের বাসিন্দা হবিবর রহমান (৬৫) বলেন, ‘ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই কষ্ট করে পড়ালেখা করেছে। বিশ্বশান্তির জন্য জীবন দিয়েছে। তার এই শহীদি মৃত্যুতে আমরা গর্বিত।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-12-14%2Fl6z09yaz%2FWhatsApp-Image-2025-12-14-at-7.26.22-PM.jpeg?rect=115%2C0%2C1080%2C720&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
নিহত মমিনুল ইসলামের বোন কমেলা বেগম ভাই হারানোর শোকে আহাজারি করছেন। রোববার বিকেলে উলিপুর উপজেলার উত্তর পান্ডুল গ্রামে। ছবি: প্রথম আলো

Wednesday, November 13, 2024

জাকিরের স্ত্রী-স্বজনদের সম্পদের পাহাড়

সাবেক গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনের স্ত্রী-সন্তানসহ স্বজনদের রয়েছে সম্পদের পাহাড়। গত ৫ বছর আগেও ঋণের দায়ে যারা পালিয়ে বেড়াতো আজ তাদের এত সম্পদ জনমনে জন্ম দিয়েছে নানা প্রশ্নের। জাকিরের মন্ত্রিত্ব থাকাকালে তার ছোট ভাই মোস্তাফিজুর রহমান রবিন ছিলেন এলাকার সঘোষিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তার কথায় চলতো থানা ও উপজেলার সকল অফিস আদালত। রবিনের ছোট ভাই মাসুম ছিলেন ব্রহ্মপুত্র থেকে বালু উত্তোলনের হোতা। রৌমারীর ডিসি সড়কসহ সকল স্থাপনায় তিনি ব্রহ্মপুত্রের পাড় কেটে কোটি কোটি ফুট বালু সরবরাহ করতেন। ফলে ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে গ্রামের পর গ্রাম বিলীন হয়ে গেছে। আরেক ছোট ভাই রাশেদ ছিলেন প্রতিমন্ত্রীর এপিএস। তিনি প্রাইমারি সেকশনের সকল বদলি বাণিজ্যে হস্তক্ষেপ করতেন। কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। মন্ত্রীর স্ত্রী সুরাইয়া সুলতানা ছিলেন উপজেলা মহিলা লীগের সভানেত্রী। সে সুবাদে সব বিষয়ে তিনি হস্তক্ষেপ করতেন। যার মাধ্যমে তিনি অপকর্মগুলো করতেন তার নাম আকতার আহসান বাবু। তিনি প্রতিমন্ত্রীর চাচাতো ভাই। এই বাবুও কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। কাবিখা, কাবিটাসহ এমন প্রকল্পগুলো দেখতেন প্রতিমন্ত্রীর আরেক চাচাতো ভাই মশিউর ওরফে ফশিউর। ৫ বছর আগে যাকে বাকিতে খরচ দিতো না দোকানদার আজ তার রয়েছে বহুতল ভবন, গাড়ি ও কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালান্স। প্রতিমন্ত্রীর এক চাচার নাম সুজাউল ইসলাম সুজা। জাকির হোসেন প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর সুজা রৌমারী প্রেস ক্লাব দখল করে সকল সাংবাদিককে তাড়িয়ে দেন। প্রেস ক্লাবের সদস্য বানিয়ে নেন প্রতিমন্ত্রীর আত্মীয়-স্বজনদের। শুরু করেন ঠিকাদারি ব্যবসা। বিভিন্ন রাস্তার কাজ না করেই প্রভাব খাটিয়ে বিল তুলে নেন। ফলে দুর্ভোগে পড়তে হয় এলাকার সাধারণ মানুষকে। এছাড়াও পুত্র সাফায়াত বিন জাকির ওরফে সৌরভ, মেয়ে সঞ্চয়ীর নামে রয়েছে কোটি কোটি টাকার ব্যাংক ব্যালান্স ও ব্যবসার শেয়ার। গত ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগের পর থেকে তারাও লাপাত্তা রয়েছেন।

জাকির হোসেনের স্ত্রী সুরাইয়া সুলতানা রৌমারী উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের এফডব্লিউভি (ফ্যামিলি ওয়েল ফেয়ার ভিজিটর) হিসেবে দাঁতভাঙ্গা কমিউনিটি সেন্টারে কর্মরত ছিলেন। বর্তমানে তিনি উপজেলা কার্যালয়ে রয়েছেন। ২০০৮ সালে জাকির এমপি হওয়ার পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে তিনি কর্মস্থলে হাজির হননি। এমপি’র প্রভাব খাটিয়ে হাজিরা খাতা আপডেট রেখে প্রতিমাসের বেতন উত্তোলন করেছেন তিনি। তার নামে রয়েছে লন্ডন, ঢাকা, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও রৌমারীতে একাধিক বাড়ি। রয়েছে অঢেল অর্থ-সম্পদ ও বিলাসবহুল একাধিক গাড়ি।

জাকিরের চাচাতো ভাই রবিন উপজেলার সকল বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতেন। সে সময় বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ভিজিএফ, ভিজিডি, টিআর, কাবিখা, কাবিটা, যত্ন প্রকল্প, কার্ডের নাম, রাজস্ব উন্নয়ন, ঠিকাদারিতে সিন্ডিকেট, এডিপিসহ যাবতীয় প্রকল্পের ভাগ-বাটোয়ারা করতেন। প্রভাব খাটিয়ে করতেন ঠিকাদারি ব্যবসাও। এতে বাড়ি, গাড়ি  ও অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন তিনি। বর্তমানে উপজেলা মডেল মসজিদ ও কয়েকটি ব্রিজের কাজ অসমাপ্ত রেখেই লাপাত্তা হয়েছেন।
রবিনের ছোট ভাই রাশেদুল ইসলাম রাশেদ ছিলেন প্রতিমন্ত্রীর এপিএস। একটি বেসরকারি ব্যাংকের ফিল্ড অফিসার হিসেবে কাজ করতেন। পরে জাকির প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর রাশেদকে এপিএস হিসেবে যোগদান করান। এরপর থেকে প্রতিমন্ত্রীর দোহাই দিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে অনুদান বরাদ্দ নিয়ে কাজ না করেই কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেন। প্রাইমারি সেক্টরে সকল বদলিবাণিজ্য তিনি পরিচালনা করেন। ঢাকার মিরপুরে তার রয়েছে ২টি ফ্ল্যাট, কোটি টাকার ব্যবসা ও ঠিদাকারি প্রতিষ্ঠান। বর্তমানে ব্রিজের কাজ না করেই লাপাত্তা রয়েছেন তিনি।

রবিনের আরেক ভাইয়ের নাম মোয়াজ্জেম হোসেন মাসুম। প্রতিমন্ত্রীর ভাই এ দাপটে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে কোটি কোটি ফুট বালু উত্তোলন করে ৫ বছর প্রায় সকল ঠিকাদারি স্থাপনায় বিক্রি করেন তিনি। ঢাকা-রৌমারী ২ লেনের রাস্তার কাজে মূল ঠিকাদারের কাছ থেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে ইট, পাথর, বালু ও সিমেন্ট দেয়ার ঠিকাদারি নিয়ে সেখানেও ১ নম্বর ইটের স্থলে দেয়া হতো ২/৩ নম্বর ইট। কালো ও মূল্যমান পাথরের স্থলে দেয়া হতো সাদা কালো মিশ্রিত পাথর। ১ নম্বর মোটা বালুর স্থলে দেয়া হতো ভিটি বালু। যা কাজের জন্য অযোগ্য। এমনিভাবে নয়/ছয় করে কোটি কোটি টাকার পাহাড় গড়েছেন মাসুম।  

আকতার আহসান বাবু প্রতিমন্ত্রীর আরেক চাচাতো ভাই। জাকিরের স্ত্রী সুরাইয়া সুলতানার পরিচয়ে শিক্ষক নিয়োগ, সরকারি ঘরের নাম, টিনের নাম, ভিজিডি’র কার্ড, যত্ন প্রকপ্লের শিশু বাচ্চাদের নামের কার্ড, সোলার সুবিধা, বয়স্ক বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতা, প্রত্যন্ত এলাকার সাধারণ মানুষের কাছ থেকে ধোঁকা দিয়ে অসহায় মানুষজনকে সুবিধা দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। এ বিষয়ে সুবিধাভোগীরা জেলা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন। এমনকি আদালতে মামলাও করেছেন। কিন্তু পাওনা টাকা আদায় করতে পারেননি। নিজ বাড়ির পাশে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী স্কুল খুলে ১৩জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দিয়ে প্রায় ৬০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কাস্টমস অফিসে গরু নিলাম ও দুর্নীতিকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক সংবাদ প্রকাশ করায় এক সাংবাদিককে তুলে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। ময়মনসিংহের ত্রিশাল এলাকায় শ্বশুরের মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক পদে চাকরি দেয়ার নামেও প্রায় সোয়া কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। নিজ গ্রাম মণ্ডলপাড়ায় বাড়ি ও শ্বশুরবাড়িতে বিলাসবহুল বাড়ি  ও অঢেল অর্থ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন এই বাবু।

মশিউর ওরফে ফশিউর জাকিরের আরেক জ্যাঠাতো ভাই। গত ৩ বছর আগেও তার বাড়ি বলতে একটি ভাঙা টিনের ঘর ছাড়া কিছুই ছিল না। এখন তিনি ৩তলা ভবনের মালিক। জাকির প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর তার কপাল খুলে যায়। টিআর, কাবিখা, কাবিটা প্রকল্পের বরাদ্দ বণ্টনের দায়িত্ব দেয়া হয় তাকে। প্রকল্প সভাপতিকে প্রকল্প তৈরি করে দেয়া ও ২০% পার্সেনটেজ কেটে নিয়ে অর্থ দেয়াসহ অফিস থেকে নিজে বিল করে নিয়ে এ অর্থ ছাড় দিতেন মশিউর। এছাড়াও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে খাজনা খারিজ, বন্দোবস্তসহ নানা বিষয়ের উপর তহশিলদার ও উপজেলা ভূমি অফিসের সার্ভেয়ার, নাজিরের সঙ্গে সখ্য রেখে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতেন। এভাবেই বহুতল ভবন ও কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যান তিনি। প্রতিমন্ত্রী জাকির ধরা খাওয়ার পর তিনিও পালিয়ে রয়েছেন।

জাকিরের এক চাচার নাম সুজাউল ইসলাম সুজা। ইউপি মেম্বার থেকে তিনি বনে যান সাংবাদিক। জাকির প্রতিমন্ত্রী হওয়ার পর যেন তারও কপাল খুলে যায়। প্রথমে তিনি রৌমারী প্রেস ক্লাব দখল করে সকল সাংবাদিককে তাড়িয়ে দেন। পরে প্রতিমন্ত্রীর আত্মীয়-স্বজনদের সেখানকার সদস্য বানিয়ে শুরু করেন দুর্নীতি। অফিস-আদালতে চাঁদাবাজি, দুর্নীতিবাজ ও চোরাকারবারিদের কাছ থেকে মাসোহারা আদায়, মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করে বাণিজ্য, বিচার সালিশের নামে অর্থ আদায়সহ হেন কোনো অনিয়ম নেই তিনি করেননি। পরে শেয়ারে শুরু করেন ঠিকাদারি ব্যবসা। সেখানেও শেয়ার পার্টনারকে ঠকিয়ে মেরে দেন লাখ লাখ টাকা। কয়েকটি রাস্তার কাজ না করেই তুলে নেন বিল। তিনিও এখন কোটিপতি। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর প্রতিমন্ত্রীর গোটা পরিবার ও তার অনুসারীরাও গা-ঢাকা দিয়েছেন। তাদের ব্যবহৃত মুঠো ফোন নম্বর বন্ধ। একাধিকবার তাদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলেও কথা বলা সম্ভব হয়নি।

mzamin


Sunday, August 25, 2024

জাকিরের ঘুষের হাট by পিয়াস সরকার

এলাকার নেতা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষার দায়িত্বে। ২০২০ সালের কথা, টাইম স্কেল উন্নীত করার স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠেন কুড়িগ্রাম জেলাসহ আশপাশের এলাকার মানুষ। এভাবেই বলছিলেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার অবসরপ্রাপ্ত একজন প্রধান শিক্ষক। তিনি বলেন, অবসরে যাওয়ার আগে পেন্ডিং টাইমস্কেল পাওয়ার আশা করছিলাম। যদিও এটা আমার অধিকার কিন্তু মিলছিল আর কই। এরপর প্রতিমন্ত্রীর আস্থাভাজন সহযোগী কল্লোলের কাছে শিক্ষক নেতাদের মাধ্যমে সবাই মিলে প্রায় তিন লাখ টাকা দেই। কিন্তু মন্ত্রীর দায়িত্ব চলে যাবার পর কোনো লাভ হয়নি। মন্ত্রীর বাড়িতে টাকা চাওয়ায় পেটানোর খবর শোনার পর টাকা চাওয়ার সাহসটাও করেনি কেউ। শেরপুর জেলার এক শিক্ষক নেতা বলেন, আমাদের এই আন্দোলন তো ২০১৪ সাল থেকেই চলছে। নতুন প্রতিমন্ত্রী আসার পর আমরা যোগাযোগ করি। জাকির হোসেন শুধুমাত্র দাবি উত্থাপনের জন্য আমাদের কাছে টাকা দাবি করে বসেন। এরপর আমরা প্রতিটি স্কুল থেকে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা তুলি। যেটা প্রায় পাঁচ কোটি টাকা হয়। আমরা এই টাকা তুলে প্রতিমন্ত্রীর হাতে দেই শুধুমাত্র সংসদে ও সংশ্লিষ্ট মহলে আমাদের দাবি তুলে ধরার জন্য।

অনেকটা অপ্রত্যাশীতভাবেই ২০১৮ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান জাকির হোসেন। প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়ে যেন আলাদীনের চেরাগে ঘষা লাগে হাত। হয়ে ওঠেন দুর্নীতিতে সিদ্ধহস্ত। গড়েছেন অর্থসম্পদের হাজার কোটি টাকার পাহাড়। এতটাই বেপরোয়া ছিলেন যে মিন্টো রোডের বাড়িতে গেলেই কাজ হয়ে যেত। আর শিক্ষার দায়িত্ব পালন করলেও এতটাই অজ্ঞ ছিলেন যে সচিব ছাড়া কোনো কথা কিংবা সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না। দায়িত্ব হারানোর পর ঘুষের টাকা চাইতে গেলে নিজে হাতে পিটিয়েছেন। জানাজানি হবার পর ঘুষের টাকা ফেরতও দিয়েছেন। ৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পর দুর্বৃত্তরা হামলা করে জাকির হোসেনের বাড়িতে। সাবেক প্রতিমন্ত্রীর স্বজনরা দাবি করেন শুধু বাড়ি থেকেই খোঁয়া গেছে নগদ ২৫ কোটি টাকা ও কয়েকশ’ ভরি স্বর্ণ।

২০১৫ সাল থেকে কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জাকির হোসেন ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-৪ আসন থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একই আসন থেকে দ্বিতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সেইসঙ্গে পান গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। এটিই ছিল অত্র এলাকার প্রথম মন্ত্রী।

২০১৮ সালে প্রতিমন্ত্রীর চেয়ারে বসেই গড়েন সিন্ডিকেট। তার দায়িত্বকালে অনলাইনের বাইরে বদলি কার্যক্রম বন্ধ ছিল। কিন্তু টাকা হলেই বদলি হওয়া যায়। এরজন্য ২০২০ সালের পূর্বের কোনো তারিখ দেখিয়ে আদেশ জারি করতেন। একেকটি বদলির জন্য তিনি নিতেন ১ থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। রাজধানী বা বড় শহরে বদলির জন্য ৫ থেকে ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিতেন তিনি। এমনকি এসব বদলি কার্যক্রমের আপডেট অনলাইনে দেবার নিয়ম থাকলেও মানতেন না তা। সাজিদুল হাকিম নামে এক শিক্ষক বলেন, আমি রংপুর জেলার মিঠাপুকুর থেকে পীরগঞ্জ জেলায় যাবার জন্য আবেদন করি। অনলাইনে ফাঁকা দেখালেও পরে জানতে পারি ইতিমধ্যে এই স্থানে অন্য আরেকজন শিক্ষক যোগ দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, এই উপজেলার আরেকটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে চাইলে শিমুল নামে একজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তিনি জানান এটা প্রতিমন্ত্রী নিজে করে দেবেন এজন্য ৩ লাখ টাকা লাগবে।
তিনি জানান, এই শিমুল শিক্ষা মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। এর বেশি কোনো তথ্য বা মোবাইল নম্বর দিতে পারেননি তিনি। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে তৎকালীন সচিব ফরিদ আহাম্মদ অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে একটি গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, এসব বদলির আদেশ সংশোধিত বদলির নির্দেশিকা জারির আগেই অনুমোদন করানো ছিল। পরে বদলির আদেশ জারি হয়েছে।

এর বাইরে জাকির হোসেনের ছিল সরকারি চাকরিতে সুপারিশ ও ডিও লেটার পাঠানোর বাণিজ্য। তিনি এলাকাভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্পে ও চাকরির জন্য সুপারিশ করতেন। অনেকেরই চাকরি হতো। প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন ২০২৪ সালের নির্বাচনে নমিনেশন না পাওয়ার পর বিক্ষোভ করেন ৪৮ জন চাকরিপ্রত্যাশী। তারা জানান তাদের কাছ থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ দেবার জন্য প্রায় ৬ কোটি টাকা ঘুষ নিয়েছিলেন। এই অর্থ ফেরত চাওয়ায় জাকির হোসেন সরকারি বাসভবনে নির্মম মারধরের শিকার হয়েছেন পুলিশ সদস্যসহ তিন ব্যক্তি। এ ঘটনার পর উল্টো থানায় লিখিতভাবে প্রতিমন্ত্রীর বাসায় চাঁদাবাজির অভিযোগ করা হয়। হামলার শিকার একজন আবু সুফিয়ান বিশ্বাস বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সন্তান সংসদের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও খুলনা জেলা শাখার আহ্বায়ক। তিনি বলেন, অগ্রিম টাকা দেয়ার পরও চাকরি না হওয়ায় প্রতিমন্ত্রীর বাসায় গিয়ে দেখা করি। এ সময় প্রতিমন্ত্রী তাদের টাকা ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। তবে প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও টাকা ফেরত মেলেনি। এরপর আমরা ৪৮ জনের পক্ষে প্রধানমন্ত্রী বরাবর লিখিত অভিযোগ করি। এরপর ৭ই ডিসেম্বর ২০২৩ সালে তার মিন্টো রোডের বাসায় ডাকেন।

তিনি বলেন, প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী কল্লোলের কক্ষে ঢোকার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেখানে আসেন জাকির হোসেন। এ সময় কর্মচারী ও বাসার নিরাপত্তায় থাকা সাত-আটজন ওই কক্ষে প্রবেশ করে দরজা আটকে তিনজনকে পেটাতে শুরু করেন। একপর্যায়ে সঙ্গে থাকা নাছির ও জাহিদ প্রধান ফটক দিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। আমি পাশের দেয়াল টপকে ডিবি কার্যালয়ে ঢুকে পড়ি।

তিনি এতটাই বেপরোয়া ছিলেন যে এরপর অফিস সহায়ক মো. মমিনকে দিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ করেন। এরপর এই ঘটনা জানাজানি হলে ঘুষের টাকা ফেরতও দেন তিনি। ঘুষের টাকা ফেরত দেবার মাধ্যমে অবৈধ লেনদেনের প্রমাণ মেলার পরও ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গিয়েছিলেন। শুধু তাই নয়, প্রতিমন্ত্রীর আত্মীয়রাও নিয়োগের জন্য টাকা হাতিয়ে নিতেন। তার এক আত্মীয় ছিলেন নাম লিটন। উনি নিয়োগের কথা বলে অনেক মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন। রংপুর জেলার ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এক নেতার আত্মীয় আবু সায়েম। তিনি বলেন, আমার চাচাতো ভাই ছাত্রলীগের নেতা। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের সার্কুলার বের হবার পর আমার ভাই লিটনের কাছে নিয়ে যায় কুড়িগ্রাম জেলায়। আমাদের রাত ৯টার দিকে তার বাড়িতে আসতে বলেন। সেখানে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য আরও চার থেকে পাঁচজন প্রার্থী ছিলেন। এরপর আমাদের ডেকে নেয়া হয় তার ব্যক্তিগত কক্ষে। যাবার সময় ফোন বাইরে রেখে যেতে হয়। তিনি বলেন, সবার কাছে ৬ লাখ করে টাকা নিচ্ছি। তোমার ভাইয়ের জন্য ১ লাখ টাকা ছাড় দিলাম। এখন ১ লাখ। পরীক্ষার আগে ১ লাখ আর চাকরি হবার পর বাকি ৩ লাখ দিতে হবে। আমি তার কথামতো ২ লাখ টাকা দেই।

শুধু তাই নয়, জাকির হোসেনকে ভাগ দিয়েই কাজ করতে হতো ঠিকাদারদের। তারা অভিযোগ করেন এসব কাজের জন্য কাজের ধরন ও পরিমাণভেদে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ভাগ দিতে হতো। আর যেকোনো কাজের জন্য তার ভাগ ছিল ৫ শতাংশ। আবার শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলামসহ বেশ কয়েকজনকে খুশি করে বেশ কয়েকটি কাজ কাগজে কলমে দেখিয়েও বাগিয়ে নিতেন টাকা।
বেশ কয়েকবার কয়েকটি বিষয়ে ভাইরালও হয়েছিলেন জাকির হোসেন। ২০১৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষক সমাবেশে রাজীবপুরে সোনার নৌকা উপহার নেন। এই নৌকা দিতে প্রধান শিক্ষকদের দিতে হয় ১ হাজার ও সহকারী শিক্ষকদের ৫০০ টাকা করে। আবার তার পুত্র সাফায়াত বিন জাকিরের (সৌরভ) বৌভাতের দাওয়াত পালনের জন্য রৌমারী, রাজীবপুর ও চিলমারী উপজেলার ২৬৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেন। এবারও শিক্ষকদের উপহার দিতে ৫০০ টাকা করে চাঁদা দিতে হয়। শিক্ষকদের প্রায় ৬ লাখ টাকা চাঁদায় বর-বধূকে উপহার দেয়া হয়। কুড়িগ্রাম জেলায় প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (পিটিআই) থাকার পরও নিজ উপজেলা রৌমারীতে আরেকটি পিটিআই করতে উদ্যোগ নেন। যেখানে জমি দেন তার আত্মীয়স্বজনরা। চার একর জমির উপর হওয়া এই প্রকল্পের মূল্য ধরা হয় ৪৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এই প্রকল্প নিজ উপজেলায় হওয়ায় সকল কার্যক্রম নিজে দেখাশোনা করতেন। তৎকালীন সময়ে ঠিকাদাররা বলেছিলেন এই প্রকল্পের মূল্য ২৫ থেকে ২৮ কোটি টাকার বেশি হবার কথা নয়।

মানবজমিন কুড়িগ্রাম জেলার রৌমারী প্রতিনিধি জানান, জাকির হোসেন রৌমারী, রাজিবপুর ও চিলমারী এলাকায় অবৈধ বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডারবাজি, জমি দখল, হাটবাজার ইজারা নিয়ন্ত্রণ, নিয়োগ বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, মাদক বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ, থানায় মামলা নিয়ন্ত্রণ এবং সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করতেন। নামে- বেনামে তার ঢাকায় একাধিক বাড়ি, রংপুরে বাড়ি, কুড়িগ্রাম জেলা শহরে বহুতল বাড়ি, রৌমারীতে দুটি বাড়ি এবং রাজিবপুর উপজেলায়ও রয়েছে একটি বাড়ি। চারটি মার্কেট, সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি দখল করে ৫টি স্থানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছেন। মিল, চাতাল, খামারবাড়ি-সবই আছে তার। যার মূল্য কয়েক শ কোটি টাকা।
এখানেই শেষ নয়, সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর সব বরাদ্দে মন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট সিন্ডিকেটকে কমিশন না দিলে মেলে না সুবিধা। ভিজিডি, ভিজিএফ, সরকারের ঘর বরাদ্দ, টিআর, কাবিখা, কাবিটাসহ সব কর্মসূচির বখরা যায় নেতাদের পকেটে।
স্থানীয়রা বলছেন, আওয়ামী লীগের সরকারের আগের মেয়াদে মন্ত্রীর এবং পরিবারের নামে ও বেনামে গড়ে উঠেছে হাজার কোটি টাকার সম্পদ। মন্ত্রীর বাড়ি রৌমারীর মণ্ডলপাড়া রূপ নিয়েছে মন্ত্রীপাড়ায়। তার আশীর্বাদপুষ্ট সিন্ডিকেটের অন্তত ১১ জনের বহুতল বাড়ি রয়েছে।

এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীরা জানান, ২০১৮ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি ও তার আশীর্বাদপুষ্টরা অনেক ভূমি ও সম্পদ দখলের ঘটনায় জড়িয়েছেন। রৌমারী সদর ইউনিয়নের তুরা রোডে সড়ক ও জনপথের (সওজ) ৭০ শতাংশসহ ব্যক্তিমালিকানার কিছু জমি অবৈধভাবে দখল করে ‘শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ’ নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড টাঙানো হয়। ২০২২ সালের এপ্রিলে এই দখলের কয়েক মাস পর রাতের আঁধারে সেই সাইনবোর্ড উধাও হয়ে যায়।

এলাকাবাসী আরও জানান, দায়িত্বে থাকাবস্থায় সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপনের নামে রৌমারীর চরশৌলমারী ইউনিয়নের ঈদগাহ মাঠ নামক স্থানে প্রায় আড়াই একর জায়গা অধিগ্রহণের জন্য নেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে সেই জায়গা দখল করে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত স্থাপনা নির্মাণ করা হয়। সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্টের প্রায় ২ কোটি টাকার জায়গা এখন মন্ত্রীর দখলে। একইভাবে তুরা রোডের গুচ্ছগ্রামে ১৫ শতাংশ, পাশে ২১ শতাংশ ও অপর একস্থানে ৫০ শতাংশসহ প্রায় ২ একর জায়গা দখল করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন।

সদর ইউনিয়নের জন্তিরকান্দা নামক স্থানে সরকারি এক একর জায়গা দখল করে প্রতিমন্ত্রী ‘শিরি অটোরাইস মিল’ নামে শিল্পকারখানা নির্মাণ করেন। এ জমির মূল্য ৩ কোটি টাকা। কর্তিমারী বাজারের সোনালী ব্যাংক সংলগ্ন ১নং খাস খতিয়ানের ৪ কোটি টাকা মূল্যের ৩২ শতক জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে মার্কেট। রাজিবপুর উপজেলার শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম সংলগ্ন ২ কোটি টাকার সরকারি পুকুরের ২০ শতাংশ জমি দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে দোকানঘর।

এ ছাড়াও বন্দবেড় ইউনিয়নের কুটিরচরে এক একর, দইখাওয়া এলাকায় ৫ একর, উপজেলার দাঁতভাঙ্গা বাজার এলাকায় ১ একর সরকারি জায়গা দখল এবং সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ভরাট করে ‘আরব আলী বাবার মাজার’ নির্মাণ করেন বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। ইছাকুড়ি মহিলা মাদ্রাসা নামের একটি প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোসহ জায়গা দখল করে মন্ত্রী গড়ে তোলেন ‘জাকির হোসেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ’।

ঠিকাদারদের অভিযোগ, নিজ নির্বাচনী এলাকার প্রাথমিক বিদ্যালয় সংস্কার, মাটিভরাটসহ বিভিন্ন কাজের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের ৩০ শতাংশ হারে ভাগ নিতেন প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন। সবমিলে গত ৫ বছরে জাকির হোসেন অবৈধ ভূমি দখলসহ কামিয়েছেন কয়েক হাজার কোটি টাকা।

তার বিরুদ্ধে রয়েছে পুরো এলাকার মাদক নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ। এ ছাড়াও ২০২০ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক মাইক্রোবাসে ইয়াবা নিয়ে যাওয়ার সময় ইয়াবাসহ গাড়িচালক রফিকুল ইসলামকে আটক করে র‌্যাব-১৪’র একটি দল। জাকির হোসেনের সঙ্গী সেকেন্দার বাবলুও গাঁজাসহ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এদিকে আওয়ামী লীগ সকারের পতনের পর উত্তেজিত জনতা কর্তৃক ভাঙচুরের ঘটনায় রৌমারী জাকির হোসেনের বাড়িতে বিপুল অর্থ ও ত্রাণ উদ্ধার হয়। বাড়ি থেকে প্রায় ২৫ কোটি নগদ টাকা ও কয়েক’শ ভরি স্বর্ণের গহনা লুট হওয়ার খবর জানিয়েছে মন্ত্রীর স্বজনরা। এ ছাড়াও আসবাবপত্র, ডজনখানেক টিভি-ফ্রিজ, ৮টি মোটরসাইকেল, ৩টি ট্রাক, ৮ কোটি টাকা মূল্যের ১টি ল্যান্ডক্রুজার জেটএক্স গাড়ি ও ১টি মাইক্রোবাসে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। অপরদিকে মেলে সরকারি ত্রাণের কম্বল, ত্রাণের কয়েক’শ বান্ডেল ঢেউটিন, করোনার স্যানিটাইজার সামগ্রী ফুটবলসহ খেলার উপকরণ ও মাস্ক।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন ও তার সহযোগী কল্লোলের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। এদিকে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের ৪১ জন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। তার মধ্যে রয়েছে জাকির হোসেনের নাম।