Thursday, April 16, 2015

‘ফেনসিডিল রাখতো সার্কিট হাউজে, বহন করা হতো জেলা প্রশাসনের গাড়িতে’ by ওয়েছ খছরু

ফেনসিডিল রাখা হতো সার্কিট হাউজে। জেলা প্রশাসনের জিপে আনা-নেয়া হতো। এভাবেই মাদক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন সিলেটের জেলা প্রশাসনের গাড়িচালক রুমন মিয়া। প্রশাসনের গাড়ি হওয়ায় র‌্যাব কিংবা পুলিশের ঝক্কি-ঝামেলা ছিল না। আর সার্কিট হাউজে মাদক রাখায় ছিল না কোন অভিযানের ভয়ও। এই সুযোগে সিলেটে মাদক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল রুমন মিয়া। ধীরে ধীরে রুমন হয়ে ওঠে সিলেটের একজন শীর্ষ মাদক বিক্রেতা। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে র‌্যাব তৈরি করে ফাঁদ। অনুসন্ধান চালানো  হয় রুমনের কর্মকাণ্ড নিয়ে। এতে প্রশাসনের কারও হাত আছে কি না তার খোঁজখবর  নেয়া শুরু করে র‌্যাব। এসব বিষয়ে খেলাসা হওয়ার পর চালায় অভিযান। গ্রেপ্তার করা হয় রুমনকে। তার কাছে  থেকে উদ্ধার করা হয় ১৯৩ বোতল ফেনসিডিলসহ ২৭৫ বোতল মাদক। ঘটনাটি সিলেটের। নববর্ষের দিন রাত ৯টায় র‌্যাব কর্মকর্তারা জেলা প্রশাসনের একটি গাড়িসহ চালক রুমনকে গ্রেপ্তার করেন। এরপর রাত সাড়ে ১০টায় তাকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি করেন। গতকাল র‌্যাব-৯ এর পক্ষ থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে রুমনকে মাদক ব্যবসায়ী  উল্লেখ করা হয়। তবে রাত সাড়ে ১০টায় র‌্যাব কার্যালয়ে গ্রেপ্তারকৃত রুমন জানায় সবকিছু। তার মুখ থেকেই জানা গেছে সে জেলা প্রশাসনের গাড়িচালক। তার গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার হরিতলা গ্রামে। পিতা মো. ইব্রাহিম মিয়া। বর্তমান ঠিকানা সিলেটের জেলা প্রশাসকের স্টাফ কোয়ার্টার্স। র‌্যাব-৯ এর পক্ষ থেকে জানানো হয়, পহেলা বৈশাখের নিরাপত্তা জোরদার করতে সন্ধ্যার পর থেকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় টহল জোরদার করা হয়। এ সময় তাদের কাছে খবর আসে সরকারি গাড়িতে করেই আসছে মাদকের চালান। ওই খবরের ভিত্তিতে তারা নগরীর বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসায়। শুরু করে তল্লাশি। নগরীর শিবগঞ্জ এলাকার উত্তর বাজারের আধিত্যপাড়াস্থ শাকিল কমিউনিটি সেন্টারের সামনে র‌্যাব একটি চেকপোস্ট বসায়। জেলা প্রশাসনের ডিসি পুলের পাজেরো জিপ (নং সিলেট-ঘ-১১-০২৫৭) নিয়ে যায় চালক রুমন। র‌্যাব সদস্যরা এ সময় গাড়ি গতিরোধ করে তল্লাশি করেন। একপর্যায় গাড়ির পেছনে রাখা ১৯৩ বোতল ফেনসিডিল ও ১৮২ বোতল জেনোসিডিল উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে র‌্যাব গ্রেপ্তার করে জেলা প্রশাসনের কর্মচারী রুমন মিয়াকে। তাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-৯ এর ইসলামপুরস্থ কার্যালয়ে নেয়া হয়। রাত সাড়ে ১০টায় র‌্যাব সদস্যরা তাকে নিয়ে প্রেস ব্রিফিং করেন। এ সময় রুমন সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলে। রুমন জানায়, সীমান্ত থেকে সড়ক পথে তার কাছে ফেনসিডিল ও জেনোসিডিলের চালান আসে। সেগুলো সিলেট নগরীতেই রিসিভ করা হয়। এরপর সে এগুলো সিলেট সার্কিট হাউজে নিয়ে রাখে। সার্কিট হাউজের পেছনের দিকে ঘাসের ঝোপ রয়েছে। নিরিবিলি এলাকা হওয়ায় ওই জায়গায় কেউ যায় না। রুমন আরও জানায়, গত বছর ধরে সে এভাবে ব্যবসা করছে। জেলা প্রশাসনের ডিসি পুলের যে গাড়ি সে চালাতো সেটি মাদক পাচারে ব্যবহার করেছে। পহেলা বৈশাখে সে ওই গাড়িতে ২৭৫ বোতল ফেনসিডিল ও জেনোসিডিল তুলে। এরপর রুমন ওই গাড়ি নিয়ে সরকারি বিভিন্ন কাজে যাতায়াত করেছে। রাতে সিলেটের জেলা প্রশাসকের স্ত্রীকেও সে ওই গাড়ি দিয়ে বাসায় পৌঁছে দেয়। রুমন জানায়, পাজেরোটি মেরামতের কথা বলে সে প্রায়ই শিবগঞ্জের একটি গ্যারেজে আসতো। এতে করে প্রশাসনের কেউ কোন বাধা দিতেন না। নববর্ষের রাতেও সে গাড়িটি গ্যারেজে নিয়ে যাচ্ছে বলে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জানিয়েছিল। গ্রেপ্তারের পর র‌্যাবের কাছেও রুমন তার মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বলেছে। নগরীর উপশহরসহ বিভিন্ন এলাকায় সে মাদক বিক্রি করতো। প্রশাসনের গাড়ি করে মাদক আনার কারণে কখনোই পুলিশ তার গাড়িতে তল্লাশি চালায়নি। রুমনকে এক নামেই চিনতেন সিলেটের উপশহর ও আশপাশ এলাকায় ফেনসিডিল সেবকরা। ওখানে একটি গাড়ির গ্যারেজকে কেন্দ্র করে মাদকের হাট বসেছিল। ওই গ্যারেজে পুলিশের কয়েকজন কনস্টেবল ও সহকারী সাব ইন্সপেক্টরের চোখে ধরা পড়লেও তারা বিভিন্ন সময় এড়িয়ে গেছেন। এদিকে, র‌্যাব-৯ এর অধিনায়কের পক্ষে এএসপি সহকারী পরিচালক মিডিয়া পংকজ কুমার দে গতকাল এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানান, রুমনকে ও উদ্ধার করা মাদক সিলেটের হজরত শাহপরান (রহ.) থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ব্যাপারে থানায় মামলা হয়েছে। এদিকে, রুমন গ্রেপ্তারের বিষয়টি সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. শহীদুল ইসলামের কাছে পৌঁছালে রাতেই তিনি রুমনকে সাময়িক বরখাস্ত করেন। জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, ‘ওর চাকরি থাকবে না। সে ডিসি পুলের গাড়িতে ফেনসিডিল বহন করেছিল।’ তিনি বলেন, ‘এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। পাশাপাশি আর কেউ এসব ঘটনায় জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
আগেও আটক হয়েছিল রুমন: ফেনসিডিল ও জেনোসিডিলের চালান নিয়ে আটকের আগেও তিনবার আটক হয়েছিল রুমন মিয়া। এমন তথ্য জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসনের কয়েকজন কর্মচারী। জেলা প্রশাসনের গাড়িচালকের চাকরি পাওয়ার আগে তার বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ের কর্মচারীদের সঙ্গে শখ্য ছিল। প্রায় আড়াই বছর আগেও সে মদ নিয়ে আটক হয়েছিল। পরে আরও দুবার সে আটক হয়। ওই সময় তাকে পুলিশ আটক করলেও তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের তদবিরে রক্ষা পায়। রুমন গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তার বেপরোয়া জীবনের নানা কাহিনী খোদ প্রশাসনের কর্মচারীদের মুখে মুখে। রুমন নিজেও প্রায় সময় ‘ড্রাগ এডিক্টেড’ থাকতো বলে জানিয়েছেন অনেকেই।

বর্ষবরণে ছাত্রীদের যৌন নিপীড়ন, ৬ ছাত্রলীগ নেতাকর্মী বহিষ্কার

বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে জগন্নাথ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করায় ছাত্রলীগের ৬ কর্মীকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। বুধবার ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক শেখ রাসেল স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সংগঠনের শৃঙ্খলাবিরোধী কার্যক্রমের জন্য জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ কর্মী নাজমুলকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। মঙ্গলবার বর্ষবরণ অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পথে বাসে ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করে নাজমুল। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নাজমুলসহ ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মী উত্তরণ বাসে ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করছিল। চানখারপুলে এলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা নাজমুলসহ কয়েকজনকে মারধর করে বাস থেকে নামিয়ে দেয়। নাজমুল রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সপ্তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। এদিকে, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী। মঙ্গলবার নববর্ষের অনুষ্ঠান শেষে রাত সাড়ে সাতটার দিকে বিশ^বিদ্যালয়ের চৌরঙ্গীর মোড়ে এক আদিবাসি ছাত্রী এ যৌন নিপীড়নের শিকার হন। অভিযুক্ত ৫ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে এরইমধ্যে সংগঠন থেকে বহিস্কার করা হয়েছে। প্রতক্ষদর্শীরা জানায়,  ৪৩তম ব্যাচের কয়েকজন ছাত্রী নববর্ষের অনুষ্ঠান শেষে হলে ফিরছিলেন। হলে ফেরার পথে চৌরঙ্গীর মোড়ে শহীদ সালাম বরকত হলের ৫ ছাত্রলীগ কর্মী তাদের পথ আটকায়। এ সময় কোন কিছু না বলে ছাত্রলীগ কর্মীরা ওই আদিবাসী ছাত্রীকে ধরে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যায়। তারা ঐ ছাত্রীর শাড়ী ধরে টান দেয় এবং সম্ভ্রমহানির চেষ্টা করে। তার কাছে থাকা ভ্যানিটি ব্যাগ ও মোবাইল কেড়ে নেয়। ওই সময় ছাত্রীদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন জড়ো হলো ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা পালিয়ে যায়। যৌন হয়রানির শিকার ঐ ছাত্রী ও তার সহপাঠী মিলে পাঁচ জন ছাত্রলীগ কর্মীকে সনাক্ত করে প্রক্টর বরাবর একটি অভিযোগ করেন। কিন্তু প্রক্টর তপন কুমার সাহা অভিযোগ আমলে না নিলে তারা  ভিসি বরাবর অরেকটি অভিযোগ করেন।  বহিষ্কৃতরা হলেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কার্যকরী সদস্য নিশাত ইমতিয়াজ বিজয় (জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, ৪২তম ব্যাচ), শহীদ সালাম বরকত হল শাখা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক নাফিজ ইমতিয়াজ (রসায়ন বিভাগ, ৪২তম ব্যাচ), ছাত্রলীগকর্মী আবদুর রহমান ইফতি (নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ৪৩তম ব্যাচ), রাকিব হাসান (ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, ৪৩তম ব্যাচ) ও নুরুল কবীর (নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ৪৩তম ব্যাচ)। এ বিষয়ে যৌন হয়রানির শিকার ওই ছাত্রী বলেন, বর্তমানে আমি এবং আমার সহপাঠীরা আমাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত। আমি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অবিলম্বে এই সন্ত্রাসী ছাত্রদের ছাত্রত্ব বাতিল ও শাস্তির দাবি জানাই। এদিকে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মাহমুদুর রহমান জনি ও সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহমেদ রাসেল সাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে ওই অভিযুক্ত ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের সংগঠন থেকে সাময়িক বহিষ্কারের কথা বলা হয়েছে।
বর্ষবরণে যৌন হয়রানির ঘটনায় হাইকোর্টের রুল
বাংলা বর্ষবরণের দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কয়েকজন নারীকে যৌন হয়রানির ঘটনায় স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। যৌন হয়রানির ঘটনা তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনতে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, রুলে তা জানতে চেয়েছেন আদালত।
পুলিশের আইজি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে হবে।
যৌন হয়রানির ওই ঘটনা নিয়ে সংবাদপত্রে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদন বিবেচনায় নিয়ে বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান আজ বৃহস্পতিবার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এই আদেশ দেন।
আদালত আদেশে বলেন, বাঙালি জাতিসত্ত্বার এত বড় সম্মিলন নববর্ষ উদযাপন, যাতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই উদযাপন করে থাকে।
এমন একটি অনুষ্ঠানে ‘নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থতা ও দায়িত্বে অবহেলার’ দায়ে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হবে না, জারি করা রুলে তাও জানতে চেয়েছেন আদালত।
স্বরাষ্ট্র সচিব, পুলিশের আইজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার, পুলিশের রমনা জোনের ডিসি ও শাহবাগ থানার ওসিকে চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে হবে।
এ আদালতের ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল তাপস কুমার বিশ্বাস সাংবাদিকদের জানান, এ বিষয়ে পরবর্তী আদেশের জন্য ১৭ মে দিন রাখা হয়েছে।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বর্ষবরণের অনুষ্ঠানের মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটে সংঘবদ্ধ একদল যুবক কয়েকজন নারীকে যৌন হয়রানি করে। নারীদের ওপর হামলা ঠেকাতে গিয়ে হাত ভেঙে যায় ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি লিটন নন্দীর। ওই ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে গত দুদিন ধরে মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে নারী অধিকার ও ছাত্র সংগঠনগুলো। তাদের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ ওই ঘটনায় দায় এড়ানোর চেষ্টা করছে।

এই বোশেখ সেই বোশেখ by আমিরুল আলম খান

আবেগপ্রবণ বাঙালির আবেগ বন্যায় ভাসে বোশেখে—পয়লা ও পঁচিশে। এমন সব মানুষের অনুষ্ঠান দ্বিতীয়টি নেই বাঙালির। তবে ভেদ আছে কিছুটা, তা এপার আর ওপার বাংলার বাঙালির মধ্যে। এপারে আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি এক স্বাধীন রাষ্ট্র, সশস্ত্র যুদ্ধ করে। আবেগ তাই বেশি আমাদের। নতুন বছর উদ্যাপনে আমরা প্রবল বন্যায় ভাসি, ঘর ছেড়ে আসি পথে, দিনমান। আনন্দ-উল্লাসে, নাচে-গানে ভরিয়ে দিই পুরো দিন। রাত গভীর হয়, আনন্দ থামতে চায় না। পোশাকে, আহারে এবং বিহারেও বটে, আমরা এক রঙিন জীবন উপভোগ করি।
এই বোশেখ এমন উচ্ছ্বাসময় ছিল না মাত্র দশক তিনেক আগেও। দ্বিধা যেন ছিল সবার মনে। ধর্মের গন্ধ খুঁজত। বোশেখ কি বাঙালির উৎসব? বোশেখ কি মুসলমানেরও? এমন বিতর্ক ছিল এই সেদিন পর্যন্ত। বাঙালির হবে কেন বোশেখ? খাজনা আদায়ের ফিকিরে তা চালু করেছে মুসলমান বাদশাহ আকবর। আকবর মোগল, বাঙালি নন। তাই বোশেখ কিছুতেই বাঙালির হচ্ছিল না। আবার বোশেখ কি মুসলমানের? মুসলমানের তো নওরোজ, যেমন তা আছে ইরানে। কিংবা হিজরি, আরবের। মুসলমান কেন বোশেখে আনন্দ করবে? বোশেখের গায়ে কাফিরের গন্ধ!
পণ্ডিতের মাথা ঘামল। বোশেখকে হতে হবে বাঙালির, বোশেখকে হতে হবে মুসলমানেরও। তাবৎ কেতাব ঘেঁটে বের করো যুক্তি। তাতেও সুরাহা মেলে কই? বিবাদ থেকেই গেল। রাজনীতি তার সমাধান দিল, একেবারে আলাদা আদলে।
পাকিস্তানি আমলে নিষেধের বেড়াজালে বেঁধে বাঙালিদের ‘পাকিস্তানি’ বানানোর যুক্তিহীন কোশিশ হলো। ফুঁসে উঠল বাঙালি। নিজের সুলুক সন্ধানে। আইয়ুবি নিষেধের বেড়া টপকাতে ছায়ানট আয়োজন করল বোশেখ। ঢাকায়, রমনার বটমূলে। ষাটের দশকে সেই শুরু। তারপর পদ্মা-যমুনায় গেল কত পানি। ভেঙে গেল পাকিস্তান। বৈষম্যের প্রতিবাদে, ধনে-মানে এবং ভাষার বৈষম্যে। তখনো বোশেখ পুরোপুরি আপন হতে পারেনি সবার। দ্বিধা ছিল তখনো, কারও কারও।
জিয়ার সেনাশাসনের প্রতিবাদে আবার বোশেখের খোঁজ পড়ল। এবার উদীচী। যশোরে। কিন্তু ঠিকমতো মাটি পাচ্ছিল না। এল এরশাদী আমল। এবার শাসনের রং আরও পাকা। এরশাদ শুধু সেনাশাসকই নন, নাকি কবিও। তাঁর পাশে ভিড় জমল কবিদের। সংস্কৃতির একেবারে অন্দরমহলে হানা পড়ল। অবাক সবাই। শঙ্কিতও। ১৩৯৪ সন। চারুপীঠ আর যশোর ইনস্টিটিউট মিলে পৌর পার্কের ঘেরাটোপ থেকে মুক্ত করল বোশেখকে। শহরজুড়ে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’। সামনে মুখোশ পরা যুবক-যুবতী। ঢাক-ঢোল-কাঁসারির বাদ্যি। নাচে-গানে একাকার। কী বলতে চায় এরা? শোভাযাত্রা যত এগোয়, শামিল হয় হাজারো মানুষ। অবাক আয়োজকেরাই।
এবার প্রতিবাদের রূপ গেল বদলে। ঢাকায় চারুকলার আয়োজনে সেই ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নতুন মাত্রা পেল পরের বছর। তারপর ছড়াল সারা দেশে। মাত্র তিন বছরে। বোশেখ নতুন অর্থ খুঁজে পেল। সংস্কৃতির নামাবলি গায়ে দেওয়া এরশাদের বিরুদ্ধে একটা জ্বলন্ত প্রতিবাদ হয়ে উঠল। এবং সবার অলক্ষ্যে সেই আয়োজন হয়ে গেল বিপ্লবাত্মক। অনুষ্ঠানের ধারা গেল বদলে। কবির মুখোশে এরশাদ সংস্কৃতির মাঠ দখল করতে চেয়েছিলেন; বাঙালি তরুণেরা তা ব্যর্থ করে দিল নাচ-গান-বাদ্যি, রঙ্গ-ব্যঙ্গ-কৌতুকে। না যায় দমানো, না যায় মানা। এরশাদ ভেসে গেল সাংস্কৃতিক প্রতিবাদের জোয়ারে। তিন বছরেই গণেশ উল্টোল এরশাদের!
এখন বোশেখ মানে খাজনা শোধ নয়। আবার বোশেখ মানে কৃষকের ঘরে অভাবের হামাগুড়িও নয়। এখন বোশেখে কৃষকের গোলাভরা সোনার ধান। পকেট ভর্তি টাকা। তাই বদলে গেল বোশেখের রং। ফুর্তি করতে পয়সা লাগে। ফেলো কড়ি, মাখো তেল। ইরি-বোরো কৃষকের হাতে সেই নগদ পয়সা দিয়েছে। আগের বোশেখ আর নতুন এই বোশেখ আলাদা হয়ে গেল। কৃষক শামিল এই বোশেখের আনন্দে। মুটে-মজুরও। নারী ও পুরুষে।
বাণিজ্যের পোদ্দাররা বুঝে গেল বদলে গেছে বোশেখ। চাষার হাতে টাকা। বিদেশ-বিভুঁইয়ে রক্ত পানি করে টাকা পাঠাচ্ছে বাঙাল পোলারা। সে টাকা লগ্নি হওয়ার জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না। গার্মেন্টসে রক্ত পানি করে দুই পয়সা কামাচ্ছে মেয়েরাও। ‘ঋণ করে ঘি খাওয়া’ তত্ত্বে দুনিয়া মেতেছে। হাভাতের হাতেও টাকা। তার শখ ‘ফেয়ার অ্যান্ড লাভলী’ মেখে ফরসা হওয়া। মিনি শ্যাম্পুতে চুলে ঝিলিক বাড়ানো। কাজেই ব্যবসা করো বোশেখ নিয়ে। মিঠাই মন্ডা, ইলিশের ব্যবসা আগেই ছিল। এবার যোগ করো ‘কোমল পানীয়’। সঙ্গে জুটে গেল মোবাইল ফোন। মেতে উঠল ফ্যাশন হাউস। পর্যটনওয়ালাও মওকা পেল ব্যবসার। সংগতে মিডিয়া। ষোলোকলা পূর্ণ। বাঙালির প্রাণের উৎসবে মাতাল বোশেখ। দিকে দিকে যেমন সোনালু কাঞ্চন কৃষ্ণচূড়ার বন্যা, তেমনি রঙিন পোশাক, ঢাক-বাদ্যি, মাইকের কানফাটা কুর্দন। সকালে যদিবা
বাংলা গানের আসর, দিন গড়াতে আনন্দের প্রধান অনুষঙ্গ হিন্দির সদম্ভ প্রবেশ। বোশেখ তাই শুধু আনন্দের নয়, বাণিজ্যেরও।
তবু বোশেখে আনন্দ হোক। বাংলার সব ধর্মের মানুষের একটি মাত্র পার্বণ বোশেখ। বোশেখ হলো সব বাঙালির, সব ধর্মের মানুষের উৎসবের দিন।
আর বোশেখি আনন্দ শোভাযাত্রার শুরু যে যশোরে। ওদের দেওয়া নাম ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ আজ সারা বাংলায়। যশোরবাসী বোশেখের নতুন ব্যাখ্যাকার। সে গৌরব তো যশোরবাসীর থাকলই।
মঙ্গল হোক সবার।
আমিরুল আলম খান: শিক্ষাবিদ।

ইউক্রেন ও ইউরোপের শেষ সুযোগ by জর্জ সরোস

ইউরোপীয় ইউনিয়ন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আগামী পাঁচ বছর সে যে পথে হাঁটবে, তা তিন থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে নির্ধারণ হয়ে যাবে।
বছরের পর বছর ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজের সমস্যাগুলো জট পাকিয়ে ফেলেছে, সফলতার সঙ্গেই। কিন্তু এখন তাকে নিজের অস্তিত্বের সংকটের দুটি উৎস মোকাবিলা করতে হবে: গ্রিস ও ইউক্রেন। সেটা আবার অনেক বেশি হয়ে যেতে পারে।
সব পক্ষই গ্রিসের দীর্ঘদিনের সঞ্চিত সমস্যা আনাড়ির মতো মোকাবিলা করেছে। এদিকে এখন আবেগ এত উচ্চগ্রামে উঠেছে যে তালগোল পাকানোই সবচেয়ে গঠনমূলক বিকল্পে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু ইউক্রেনের ব্যাপারটা ভিন্ন। এটা অনেকটা সাদা-কালো ব্যাপার। রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন আগ্রাসন করছেন আর ইউক্রেন নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে গিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মূল্যবোধ ও নীতি রক্ষা করার চেষ্টা করছে।
তার পরও ইউরোপ ইউক্রেনের সঙ্গে গ্রিসের মতো আচরণ করছে। এটা ভুল পথ, এতে যে ফল হবে তাও ভুল। পুতিন ইউক্রেনে নিজের ভিত্তি শক্ত করছেন, আর ওদিকে ইউরোপ গ্রিসকে নিয়েই ব্যতিব্যস্ত।
ইউক্রেনে পুতিন আর্থিক ও রাজনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টির চেষ্টা করছেন, যাতে দেশটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এটাই তাঁর অভীপ্সা। এতে তিনি দায়দায়িত্ব অস্বীকার করতে পারেন। সামরিক আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে তিনি হয়তো ইউক্রেনের একটি অংশ দখল করতে পারেন, কিন্তু তাতে তাঁর দায় থাকবে। ফলে এটাই তিনি ভালো মনে করছেন। দুবার সামরিক জয়ের পরও যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে তিনি সেই নজির স্থাপন করেছেন।
দুটি যুদ্ধবিরতির মধ্যে ইউক্রেনের অবস্থান দুর্বল হয়েছে, এতে পুতিনের সফলতার মাত্রা বোঝা যায়। মিনস্ক-১ স্বাক্ষরিত হয়েছিল গত সেপ্টেম্বরে আর মিনস্ক-২ স্বাক্ষরিত হয়েছিল এই ফেব্রুয়ারিতে। কিন্তু এই সফলতা সাময়িক আর ইউক্রেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক সদস্য। ফলে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাকে ছাড়তেও পারে না।
এটা ইউরোপীয় ইউনিয়নের নীতির মৌলিক গলদ। তা না হলে রাশিয়া কীভাবে ইউক্রেনের মিত্রদের বোকা বানায়, যারা মুক্ত দুনিয়াকে নেতৃত্ব দেয়? সমস্যা হচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউক্রেনকে যেভাবে ফোঁটা ফোঁটা পানি দিয়ে জীবিত রেখেছে, ইউক্রেনকেও সে সেভাবে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করেছে। ফলে ইউক্রেনের অবস্থা তথৈবচ আর পুতিন সেখানে দ্রুত এগোনোর মওকা পেয়ে গেছেন। হাইব্রিড যুদ্ধ ও হাইব্রিড শান্তির মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নেওয়ার সুযোগ তাঁর আছে। ওদিকে ইউক্রেন ও তার মিত্ররা সাড়াই দিতে পারছে না।
ইউক্রেনের অবস্থা খুব দ্রুতই খারাপ হচ্ছে। যে আর্থিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা আমি আগে থেকেই করছিলাম, সেটা এই ফেব্রুয়ারিতে ঘটে গেল। আবার রিভনিয়ার মূল্য কয়েক দিনের মধ্যে ৫০ শতাংশ পড়ে গেলে দেশটির ন্যাশনাল ব্যাংককে ব্যাংকিং খাত টিকিয়ে রাখতে প্রচুর টাকা ঢোকাতে হয়েছে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি তা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে, যেদিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানি নিয়ন্ত্রণ আরোপ ও সুদের হার ৩০ শতাংশে উন্নীত করে।
তারপর প্রেসিডেন্ট পেত্রো পরোশেঙ্কো চাপাচাপি শুরু করলে বিনিময় হার ২০১৫ সালের ইউক্রেনের বাজেটের সময় যে ভিত্তি হার ছিল, তার পর্যায়ে চলে আসে। কিন্তু উন্নতি হলেও তা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।
এই সাময়িক বিপর্যয় গণমানুষের আত্মবিশ্বাস নাড়িয়ে দিয়েছে, আর যেসব কোম্পানির হার্ড কারেন্সি ঋণ রয়েছে, তাদের ব্যালান্সশিটও দুর্বল হয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে যে হিসাবের ভিত্তিতে ইউক্রেনের কর্মসূচি প্রণীত হয়েছে, সেটাকেও দুর্বল করে দিয়েছে এই বিপর্যয়। আইএমএফের এক্সটেনডেড ফান্ড ফ্যাসিলিটি অনুমোদিত হওয়ার আগেই তা অপর্যাপ্ত হয়ে গেছে।
কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য সদস্যরাষ্ট্রগুলো নিজেদের আর্থিক দীনতার সম্মুখীন হয়ে অতিরিক্ত দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা প্রদানের আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ফলে ইউক্রেন এখনো খাদের কিনারে টালমাটালভাবে হাঁটছে।
একই সময়ে ইউক্রেনে এক মৌলিক সংস্কার কর্মসূচি ব্যাপক গতিতে এগিয়ে চলেছে, আর তা ধীরে ধীরে ইউক্রেনের জনগণ ও ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষের কাছে পরিষ্কার হচ্ছে। অবনতিশীল বাহ্যিক পরিস্থিতি ও অভ্যন্তরীণ সংস্কারে চলমান সফলতার মধ্যে যোজন যোজন ব্যবধান রয়েছে। এতে কিয়েভের আকাশ-বাতাসে এক অবাস্তবতার আবহ বিরাজ করছে।
একটি সম্ভাব্য পরিণতি এমন হতে পারে যে পুতিন তাঁর সর্বোচ্চ লক্ষ্য অর্জন করে ফেলল আর ইউক্রেনের প্রতিরোধও ভেঙে পড়ল। তখন ইউরোপ শরণার্থীতে ভরে যাবে, সেই সংখ্যাটা ২০ লাখ হলেও অবাস্তব মনে হবে। অনেকেই মনে করেন, এটা দ্বিতীয় শীতলযুদ্ধের সূচনা করবে। এর পরিণতি এ রকম হতে পারে: ইউরোপে বিজয়ী পুতিনের অনেক বন্ধু জুটতে পারে আর রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাও অকার্যকর হয়ে যাবে।
ইউরোপের ক্ষেত্রে এটা হবে সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার। এতে সে আরও বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। এই মহাদেশটি পুতিনের রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। তখন হয়তো ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্তিত্বই থাকবে না (বিশেষ করে গ্রিস যদি ইউরোজোন ত্যাগ করে)।
সম্ভাব্যতার বিবেচনায় পরিণতি হিসেবে এ রকম হওয়ার আশঙ্কা আরও বেশি: ইউরোপ ফোঁটা ফোঁটা পানি দিয়ে ইউক্রেনকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। ইউক্রেন হয়তো ধ্বংস হবে না, কিন্তু কায়েমি গোষ্ঠীগুলো আবারও নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করতে পারে আর নতুন ইউক্রেন পুরোনো ইউক্রেনের পথ ধরবে। পুতিনের কাছে এটা পূর্ণাঙ্গ পতনের মতোই আনন্দদায়ক হবে। কিন্তু এতে পুতিনের বিজয়ের নিশ্চয়তা হ্রাস পেতে পারে। কারণ, এর ফলে দ্বিতীয় শীতলযুদ্ধ শুরু হতে পারে, যেটাতে রাশিয়া হারবে। যেমন সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথমটিতে হেরেছিল। পুতিনের রাশিয়া চায়, তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারে উঠুক। আর তেলের দাম বিদ্যমান অবস্থায় থাকলে তার মুদ্রার সঞ্চয় আগামী দু–তিন বছরের মধ্যে ফুরিয়ে যাবে।
‘ট্র্যাজেডি অব দ্য ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন’, এই লড়াইয়ের সর্বশেষ অধ্যায়টির নাম আমি এ রকমই দিয়েছি। ইউক্রেন যে নীতি রক্ষার চেষ্টা করছে, সেটা পরিত্যাজ্য হবে। যে নীতির ভিত্তিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পরিচালিত হচ্ছে। আর নিজেকে রক্ষার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নকে অনেক বেশি টাকা খরচ করতে হবে। তবে নতুন ইউক্রেনকে সফল করতে চাইলে এর চেয়ে কম টাকাতেই সে তা করতে পারে।
নতুন ইউক্রেন এখনো জীবিত আছে, সে নিজেকে রক্ষা করতে সংকল্পবদ্ধও বটে। যদিও ইউক্রেনের নিজের শক্তি রাশিয়ার সামনে কিছুই না, তার মিত্ররা চাইলে যা প্রয়োজনীয় তা করতে পারে। সেটা হয়তো মুখোমুখি সামরিক সংঘাত নাও হতে পারে বা মিনস্ক চুক্তির লঙ্ঘনও না হতে পারে। এটা করলে শুধু ইউক্রেনেরই উপকার হবে না, ইউরোপীয় ইউনিয়নও তার হারানো মূল্যবোধ ও নীতি ফিরে পেতে পারে। বলার অপেক্ষা রাখে না, আমি এটাই চাই।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
জর্জ সরোস: সরোস ফান্ড ম্যানেজমেন্টের চেয়ারম্যান।

কুলউড়ায় গৃহবধুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধার : আটক ৩


বাংলাদেশ তার পরিচয় খোঁজার বৃথা চেষ্টা করছে -দ্য স্টেটসম্যানের সম্পাদকীয়

বাংলাদেশ আজ প্রাণঘাতী মৃত্যুর ককটেল আর অনিশ্চিত গণতন্ত্রের
সাক্ষ্য বহন করছে। সংঘাত যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, আওয়ামী লীগ-বিএনপি
উভয়পক্ষের মনোভাবও কঠোর হচ্ছে। উভয় নেত্রী তাদের নিজেদের
স্বার্থ সুরক্ষার জন্য উদ্বিগ্ন।  দুই নেত্রী তাদের লক্ষ্য অর্জন করুন বা না
করুন, বহির্বিশ্বের দৃষ্টিতে তারা বাংলাদেশকে প্রায় ব্যর্থ এক রাষ্ট্র
হিসেবে দাঁড় করিয়েছেন। -দ্য স্টেটসম্যান ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৫
স্বাধীনতা অর্জনের ৪৫ বছর পরও বাংলাদেশ তার পরিচয় খোঁজার বৃথা চেষ্টা করছে। এখনও এ দেশটি দু’ভাগে বিভক্ত। দেশে যে অবস্থা বিরাজমান তা দেশটির অভ্যন্তরীণ বিবাদ। এটা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ের জন্যই ভীতিকর। গত শনিবার রাতে যুদ্ধাপরাধীর সাজা কার্যকর করার মাধ্যমে সরকার খালেদা জিয়া ও তার পাকিস্তানপন্থি মিত্রকে নিষ্ক্রিয় করতে পারবে কিনা তা নির্ভর করে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের ওপর। গতকাল ভারতের দ্য স্টেটসম্যান পত্রিকার এক সম্পাদকীয়তে এসব কথা বলা হয়। ‘ইউফোরিয়া অ্যান্ড ব্যাকল্যাশ’ শীর্ষক ওই সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয়, শনিবার মধ্যরাতের দিকে ঘড়ির কাঁটা যখন এগিয়ে যেতে থাকে তখন ঢাকা প্রত্যক্ষ করেছে একটি মৃত্যুতে উল্লাস করতে। ঐতিহাসিকভাবে নির্মম বিদ্রূপ দক্ষিণ এশিয়ায় নতুন কিছু নয়। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে পাকিস্তানের ‘সহযোগী’ মুহম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে শনিবার রাতে। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কয়েক মিনিটের মধ্যেই ঢাকার প্রাণকেন্দ্র শাহবাগ চত্বরে স্বস্তির অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে। এতে ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা নিশ্চিত হয়ে দেখা দিয়েছে। ‘মিরপুরের কসাই’ খ্যাত আবদুল কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর করার পর কার্যকর করা হলো কামারুজ্জামানের ফাঁসি। এর মাধ্যমে কামারুজ্জামান হলেন জামায়াতে ইসলামীর দ্বিতীয় নেতা, যাকে ফাঁসির মঞ্চে তোলা হলো। ১৯৭১ পরবর্তী প্রজন্ম মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখায় তাদের নৈতিক বিজয় দেখতে পেয়েছে। ট্রাইব্যুনালের রায় ও কার্যক্রমের সুস্থতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সংশয় সন্দেহ প্রকাশ করার পাশাপাশি গত ৪৮ ঘণ্টা ধরে যে ধারা চলছে তাতে জামায়াতের আন্দোলনের হুমকি মোকাবিলা করতে হবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারকে। এটা ধারণা করা যায় যে, ১৯৭১ সালে ‘বিধবা-মেকার’কে ফাঁসি দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও তার মিত্র জামায়াতের সরকারবিরোধী আন্দোলনের গতি ভোঁতা হয়ে যাবে। সোহাগপুরে গণহত্যার ৪০ বছরেরও বেশি সময় পরেও সেই স্মৃতি এখনও জাগরূক। সেখানে কমপক্ষে ১২০ জন মানুষকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। এর মূল হোতা কামারুজ্জামান। যেখানে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তার নামকরণ হয়েছে বিধবাদের পল্লী। শাহবাগ চত্বরের আন্দোলনকারীদের দাবির প্রতি নত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু শনিবার রাতে যে যোগ্য সাজা দেয়া হয়েছে তাতে বেগম খালেদা জিয়া ও তার মিত্রদের নিষ্ক্রিয় করা যাবে কিনা তা নির্ভর করছে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের ওপর। এর প্রতিক্রিয়ায় গত কয়েক সপ্তাহে আতঙ্কজনক কিছু ঘটনা ঘটেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শেখ হাসিনা ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে। তার এ ধারণার সঙ্গে সহমত এমন দুজন ব্লগারকে হত্যা করেছে কট্টরপন্থিরা। স্বাধীনতা যুদ্ধের কঠিন দিনগুলোতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানকে ব্যাপকভাবে বিভক্ত করেছিল, তা এখনও আছে। সেই বিভক্ত ইতিহাসে এখনও বিস্মৃত। একটি সার্বভৌম দেশের জন্য এটা একটি অভ্যন্তরীণ বিবাদ। এটা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ের জন্যই সমান বিপদের কারণ হতে পারে। এ উপমহাদেশের বাকি অংশে যখন একজন জঙ্গির মৃত্যু হয় সেখানে দুজন জঙ্গির জন্ম হয়। সোমবার জামায়াতের যে হরতাল হয়েছে তা শুধু সম্ভাব্য আন্দোলনের একটি পূর্বাভাস। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির কামারুজ্জামানকে দাফন করার আগেই বলেছেন, ফাঁসিই যথেষ্ট নয়। তাকে যারা সৃষ্টি করেছে সেই জামায়াতে ইসলামীর ইতি চাই আমরা। তার বলার এ ভঙ্গির সঙ্গে কম সহমত পোষণ করলেও ‘ধর্মনিরপেক্ষতার আবরণ’ সারা দেশে বিপদজনকভাবে ছড়িয়ে পড়ছে। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরের পর থেকে ধর্মনিরপেক্ষতাই ব্যাপকভাবে আশা করা হয়েছে। আরও সঠিকভাবে বলা যায়, স্বাধীনতা অর্জনের প্রায় ৪৫ বছর পরেও বাংলাদেশ তার নিজস্ব পরিচয় খোঁজার বৃথা চেষ্টা করছে।

কেমন মেয়র চাই? by রোবায়েত ফেরদৌস

শহর কাঁদে; ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে; মেট্রোপলিস থেকে এই ঢাকা ক্রমেই যেন রূপান্তরিত হচ্ছে নেক্রোপলিসে—সিটি অব ডেথ—মৃতের শহরে; জীবন্ত মানুষের ভাগাড়ে; এ শহর যেন এক নোংরা ময়লা রুমাল। এর প্রাণ কোথায়? যেন ইস্পাত-কঙ্কাল; কবি যে বলেছেন, ‘যত বড় রাজধানী, তত বিখ্যাত নয় এ-হৃদয়পুর’।
সপ্তদশ শতকেও ঢাকা ছিল পৃথিবীর প্রধান দশটি শহরের একটি—গুরুত্ব ও সৌন্দর্যের বিচারে। অখণ্ড ঢাকা আজ দ্বিখণ্ডিত। আকাশ ধূমায়িত, মাটি প্রায় অবলুপ্ত। মানুষ এই নগরে থাকে কিন্তু তাদের নেই কোনো নাগরিক মর্যাদা; নেই নাগরিক অধিকার ও সুবিধা। বিভিন্ন জরিপ আর আন্তর্জাতিক সূচকে ঢাকা শহর এখন পৃথিবীর বসবাসের অযোগ্য শহরগুলোর অন্যতম। পৃথিবীর সব শহরেরই নিজস্ব একটি সংস্কৃতি রয়েছে। ইচ্ছা করলেই এক সিটির মতো আরেক সিটি গড়ে তোলা সম্ভব নয়। ঢাকার নিজস্ব সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে বসেছে। ঢাকার সৌন্দর্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের দিকে আছে কি কারও মনোযোগ? এ এক স্থবির শহর। ২০ মিনিটের পথ মানুষকে দুই ঘণ্টায় পাড়ি দিতে হয়। গাড়ি চলে না। মানুষ তাই চলমান, আলোকিত আর গতিশীল ঢাকা চায়। দুর্নীতিমুক্ত আর সংকীর্ণ দলীয় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সিটি প্রশাসন চায়।
দেড় কোটি মানুষের ঢাকা নগর কেবল সমস্যায় জর্জরিত। আমলা প্রশাসক দিয়েই এর পরিচালনা চলেছে। ফলে কোনো জবাবদিহি নেই। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ শোনার জন্যও কেউ নেই, সমাধান তো দূরের কথা। দীর্ঘদিন ধরে অনির্বাচিত প্রশাসক ঢাকার দেখভাল করছেন। জনপ্রতিনিধি হলে অন্তত কিছুটা জবাবদিহি থাকত; কিন্তু সরকার ইচ্ছা করেই দীর্ঘদিন ধরে জনপ্রতিনিধিহীন করে রেখেছে রাজধানীকে। অনেক বছর পর আবার নির্বাচন হতে যাচ্ছে। মানুষের আশা-প্রত্যাশা বেড়ে গেছে। মান্যবর মেয়র প্রার্থীরাও স্বপ্ন দেখাচ্ছেন বিস্তর।
প্রধানতম সমস্যা যানজট থেকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে চায় নগরবাসী। ট্রাফিক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। রাজধানীতে সহজ যাতায়াতের সুব্যবস্থা থাকতে হবে। দ্রুত কম খরচে ঢাকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যাওয়ার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া সব থেকে জরুরি। ঢাকার পরিবেশ দূষিত হয়ে পড়েছে বর্জ্য-আবর্জনায়। এখানে মানুষ নিশ্বাস নিতে কষ্ট পায়। প্রতিদিন কয়েক হাজার টন বর্জ্য রাস্তায় খোলা জায়গায় ফেলা হচ্ছে। পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থা খুবই করুণ। পরিবেশদূষণ ভয়াবহভাবে প্রভাব ফেলছে ঢাকাবাসীকে।
প্রার্থীরা বলছেন, ঢাকাকে মানবিক নগর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। মানুষ নির্বাচিত ব্যক্তির কাছে একটি নিরাপদ ঢাকা চায়। সবাই চায় একটি গ্রিন ঢাকা, চায় ক্লিন ঢাকাও। পরিষ্কার ও বর্জ্যমুক্ত ঢাকা। তরুণেরা রাস্তায় সাইকেল চালাতে চান। বয়স্করা স্বাভাবিকভাবে সড়কে হাঁটতে চান। নারীরা নিরাপদ ট্রান্সপোর্ট চান। ঢাকায় কয়েক লাখ পোশাককর্মী নারী। বাসে উঠতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয় নারীদের। বর্ষা নিয়ে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। সর্বস্তরের মানুষের জন্য বিনোদনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করতে হবে। ঢাকাবাসীর মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। সবাই নির্ভাবনার ঢাকা চায়। নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে খাদ্যনিরাপত্তা একটি অন্যতম বিষয়। কী খাচ্ছি আমরা? সবকিছুই বিষে ভরা। এর কি প্রতিকার হবে?
অনেক জায়গায় গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ নেই। একজন দক্ষ মেয়র এসব সমস্যা সমাধান করতে ভূমিকা রাখতে পারেন। ওয়ার্ডগুলোতে ভিন্ন ভিন্ন রকমের সংকট রয়েছে। খেলার মাঠ কিশোর–কিশোরীদের দাবি; কিন্তু ঢাকা থেকে খেলার মাঠ হারিয়ে যাচ্ছে। কয়েক লাখ লোক কাজের জন্য রাস্তায় নেমে পাবলিক টয়লেট পায় না। প্রাকৃতিক পরিবেশ ঢাকায় হারিয়ে গেছে। এই রুক্ষতা থেকে ঢাকাবাসী মুক্তি চায়। এ থেকে মুক্তি পেতে ঢাকাকে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। সবার জন্য বাসযোগ্য নগর গড়ে তুলতে হলে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার জরুরি। কয়েক লাখ বস্তিবাসীর জন্য কী করা যায়, আলাদা করে ভাবতে হবে তা নিয়েও। মশা-মাছির উপদ্রব থেকে রক্ষা, ধুলোবালুমুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করে সবুজ ঢাকা গড়ারও ইচ্ছার কথাও অনেকে বলছেন।
কোনো কোনো প্রার্থী বলছেন, সেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করলেই ঢাকার উন্নয়ন সম্ভব। ঢাকাকে উন্নত বিশ্বের শহরগুলোর মতো সব শ্রেণি-পেশার মানুষের বাসযোগ্য করে তুলতে সেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে। ঢাকার নাগরিকেরা নিয়মিত কর পরিশোধ করছে। অথচ তারা নাগরিকসেবা সঠিকভাবে পাচ্ছে না। ডিসিসিতে নানা সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এগুলো দূর করতে হবে। ঢাকার উন্নয়নে ভোটারদের প্রতি জনপ্রতিনিধিদের ‘বিশ্বাসযোগ্য ‘কমিটমেন্ট’ থাকতে হবে। ডিসিসির সেবা খাতগুলো জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডের মৌলিক সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আধুনিক নগরায়ণের জন্য দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শকে গুরুত্ব দিতে হবে।
এখনো বিশ্বমানের নগর হিসেবে ঢাকাকে গড়ে তোলা সম্ভব। রাস্তাঘাট, পানিনিষ্কাশন, পয়োনিষ্কাশন, জলাবদ্ধতা, মাদক সমস্যা, জন্ম-মৃত্যুর সনদ, ট্রেড লাইসেন্স, চারিত্রিক সনদ প্রাপ্তির সমাধানসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধানে দ্রুত কাজ করতে হবে। বৃদ্ধদের জন্য ওল্ডহোম গড়ে তোলা দরকার। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। হাতিরঝিলের মতো আরও কয়েকটি দৃষ্টিনন্দিত এলাকা সৃষ্টি করতে হবে। রাজধানীর চারপাশের নদীগুলোকে খনন করে পানিপথে চলাচলের সুযোগ তৈরি করাও জরুরি। পর্যাপ্ত পার্ক নেই। সিনেমা হলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে। বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণে ভাড়াটিয়া আইন কার্যকর করতে পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। সিটির সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আধুনিকায়ন করা দরকার। নগর ভবনে অনিয়মের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স দেখাতে হবে। সিটি করপোরেশনের প্রতিটি শাখায় নাগরিক সেবার জন্য ওয়ানস্টপ সার্ভিস সেন্টার চালু করা যেতে পারে।
রাজধানী বছরের পর বছর অবহেলায়-অযত্নে আছে। রাজউক, ওয়াসা, সিটি করপোরেশন, ডেসকো, ডেসা, তিতাসসহ ঢাকার সেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলোকে সমন্বয় করে কাজ করাতে হবে। এখন টেলিফোন তারের জন্য একবার রাস্তা খোঁড়া হয়। আবার একই রাস্তা বিদ্যুৎ ও গ্যাসের লাইনের জন্য পৃথক পৃথক সময়ে কাটা হচ্ছে।
সেবামূলক কাজগুলোর মধ্যে একটি সমন্বয় থাকা প্রয়োজন। নগর সরকারব্যবস্থা হলে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে একবারে এসব কাজ করা যাবে। দখলবাজদের হাত থেকে যেমন মুক্ত করতে হবে, তেমনি সিটি করপোরেশনকে কেন্দ্রীয় সরকারের আজ্ঞাবহতা ও আমলাতান্ত্রিকতা থেকে মুক্ত করে কার্যকর নগর সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। জননিরাপত্তা, নারী-শিশুর নিরাপত্তা, সন্ত্রাসমুক্ত নগর, শিশুর বিকাশের উপযোগী পরিবেশ, পার্ক, খেলার মাঠ, সবুজায়ন, ফুটপাতে দোকান, অপরিকল্পিত মার্কেট বায়ু-বর্জ্য-শব্দদূষণমুক্ত নগর দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শিক্ষা-স্বাস্থ্য এগুলো নাগরিকের অধিকার। পুনর্বাসন ছাড়া বস্তি, হকার, রিকশা উচ্ছেদ না করা, খাল-জলাশয় দখল ও দূষণমুক্ত করারও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। প্রয়োজনমতো স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল, স্কাই ট্রেন, পাতাল ট্রেন চালু ও কর্মসংস্থান প্রতিষ্ঠা করা দরকার। পার্কগুলো উদ্ধার করা দরকার। বুড়িগঙ্গাকে দূষণমুক্ত করে বিনোদনকেন্দ্রে পরিণত করা দরকার।
নির্বাচিত মেয়রের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত নগরবাসীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। পরিবর্তন সম্ভব, নগরজীবনের তাই পরিবর্তন আনতে হবে। ঢাকাকে সুন্দর ও বসবাসযোগ্য করতে নতুন মেয়রকে নিরলস কাজ করে যেতে হবে। জ্ঞানীর বচনে পাই: ‘ঘোড়ায় চড়ে রাজ্য জয় করা সহজ কিন্তু রাজ্য শাসন করতে হয় ঘোড়া থেকে নেমে, আর এটাই সব থেকে কঠিন কাজ।’ কেউ না কেউ তো নির্বাচিত হয়ে আসবেন, সেটা সহজ, কিন্তু আসল কাজ নির্বাচিত হওয়ার পর। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা গগনচুম্বী। মাননীয় মেয়ররা কি পারবেন পূরণ করতে?
রোবায়েত ফেরদৌস: সহযোগী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
robaet.ferdous@gmail.com

সংখ্যালঘু ও আদিবাসী: উচ্ছেদের ঘণ্টাধ্বনি by মিজানুর রহমান খান

গণতন্ত্র ‘রক্ষা’ কিংবা গণতন্ত্র ‘উদ্ধার’ প্রচেষ্টার আড়ালে দেশে সংখ্যালঘুদের মধ্যে যারা সবচেয়ে অনগ্রসর অংশের মানুষ, তারা বাস্তুভিটা হারাচ্ছে। এর সর্বশেষ শিকার বরগুনার ১৪টি দলিত হিন্দু পরিবার। এর আগে খাগড়াছড়ির বাবুছড়ায় ২১টি পাহাড়ি পরিবার উচ্ছেদের শিকার হয়। সেখানে বিজিবির নতুন ব্যাটালিয়ন প্রতিষ্ঠার জন্য পরিচালিত উচ্ছেদ অভিযানটি ছিল অসাংবিধানিক ও বেআইনি।
বাবুছড়ার ২১টি চাকমা পরিবার, দিনাজপুরের পার্বতীপুরের ৬৫টি সাঁওতাল পরিবার ও বরগুনার ১৪টি হিন্দু পরিবার আক্রান্ত হওয়ার একটা অভিন্ন কারণ হলো ভূমি। এখানে আওয়ামী লীগ-বিএনপি ভাই ভাই, উভয়ের প্রতিপক্ষ হলো ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসী। এ বিষয়ে অর্ধডজন সাংসদ নিয়ে গঠিত সংসদীয় ককাসের দুটি প্রতিবেদন আমাকে আশ্বস্ত করেছে।
অন্তত তাদের পর্যবেক্ষণ পুলিশি বা সরকারি সাফাই বক্তব্য থেকে আলাদা। সত্য উদ্ঘাটনের জন্য ককাসকে ধন্যবাদ জানাই।
পার্বতীপুরের সাঁওতাল গ্রাম চিরাকুটায় যেটা লক্ষণীয়, চিরচেনা ভূমিবিরোধ অতি দ্রুত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় রূপান্তরিত হলো। তিরের আঘাতে এক বাঙালি নিহত হলে সুযোগসন্ধানী কিছু বাঙালি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধিয়ে গ্রামটাই পুড়িয়ে খাক করে দিয়েছে। ২৪ জানুয়ারি ২০১৫ চিরাকুটা গ্রামের ৬৫টি সাঁওতাল পরিবারের ভিটেমাটিতে ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে। প্রায় আড়াই মাস পেরোনোর পর জানা গেল আত্মসমর্পণ করা ১৯ আদিবাসী অবিরাম কারাবাস করছেন। শুধু কিশোর এন্টা লুইস টুডু এসএসসি পরীক্ষার্থী হওয়ায় জামিন পেয়েছে। আর বাঙালি লুণ্ঠনকারীর দল কোথায়?
আমাদের দিনাজপুর সংবাদদাতা আসাদুল্লাহ জানালেন, ৭৪ আসামির বিপরীতে গ্রেপ্তার হওয়া ১০ বাঙালির সবাই জামিনে। তার চেয়েও বড় কথা, তারা বড়দল গ্রামে থাকা আদিবাসীদের বিরোধপূর্ণ প্রায় ৪২ একর জমিতে চাষাবাদ চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ ওই এলাকারই সাংসদ ও গণশিক্ষামন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান আদিবাসীদের আশ্বস্ত করেছিলেন যে আদালতে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এই জমি আদিবাসীদের ভোগদখলে থাকবে।
৬ এপ্রিল হাইকোর্টে দেওয়া আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তদন্ত প্রতিবেদন দেখাচ্ছে, বরগুনার চন্দনতলার গ্রামের মানুষের পরিচয় কেবল হিন্দু নয়, ওরা জেলে, ধোপা, কাঠমিস্ত্রি, ওরা ভারতীয় সংবিধানের গুরু ড. আম্বেদকার চিহ্নিত কাস্ট বা দলিত। চন্দনতলার দলিতদের রাষ্ট্র যদি কমিশন বসিয়ে কাগজপত্র দেখে তাদের জমিজমা চিহ্নিত করে না দেয়, তাহলে কিছুদিন বাদে সেখানে একটি পরিবারকেও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
মনে হচ্ছে বাস্তুভিটা থেকে উপড়াতে চন্দনতলায় নারী নিগ্রহকে পদ্ধতিগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তাই বরগুনা প্রশাসনের তরফে নয়টি পরিবারের জন্য নতুন বাড়িঘর তুলে পুনর্বাসন করার খবর আমাদের আশ্বস্ত করে না। গত দুই বছরে সেখানে তিন দফায় ১৪টি দলিত পরিবার নির্যাতনের মুখে বাস্তুচ্যুত হওয়ার সংকটে পড়ে।
আমি বরগুনার ঘটনায় ৬ এপ্রিলে হাইকোর্টের দেওয়া বিচার বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশকে গুরুত্ব দিচ্ছি। কারণ, আসকের আইনজীবী জেড আই খান আদালতে শুনানিকালে (যা তিনি আমাকে বলেছেন) অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে দুটি দলিত মেয়ে তাদের মা-বাবার, এমনকি অর্ধশতাধিক মানুষের সামনে ধর্ষিত হওয়ার যে ভয়ংকর তথ্য তুলে ধরেছেন, তার সত্যাসত্য যাচাই হওয়া দরকার। কিছুদিন আগে চন্দনতলাতেই আরেক দলিত গৃহবধূকে তুলে নিয়ে গণধর্ষণ শেষে ফিরিয়ে দেওয়ার একটি অভিযোগও মিডিয়ায় আসেনি।
সংখ্যালঘুদের নির্যাতিত হওয়ার এ রকম কত খবর চাপা পড়ে থাকে। দেশের ৭৫ লাখ দলিত মানুষের নিপীড়িত হওয়ার ঘটনা খুব কমই নজরে আসে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে নির্বাচিত আদিবাসী প্রতিনিধি বিচিত্রা তিরকিতকে ধর্ষণের যে অভিযোগ, তার পেছনেও কথিত ভূমিদস্যুতা। ধর্ষণ প্রমাণিত হয়নি, এ কথা স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সংসদে উল্লেখ করেও বলেছিলেন, তিনি নির্যাতিত হয়েছিলেন। কিন্তু তাতে লাভ কী?
ককাস সদস্য ফজলে হোসেন বাদশার ভাষায়, ‘আনন্দের কথা হলো আসামিরা জামিনে বেরিয়ে গেছেন।’ খাগড়াছড়ির ২১ পরিবারের ৮৪ জন উদ্বাস্তু প্রায় ১০ মাস ধরে (অনেকে ২২ দিন করে জেল খেটেছেন) একটি পরিত্যক্ত কৃষি অফিসে আছেন। খাগড়াছড়ির ডিসি ওয়াহিদুজ্জামান গত বুধবার জানালেন, অধিগ্রহণ করা ২৯ একর জমির মধ্যে মাত্র দুই একর দুই ব্যক্তির। তাঁরা বরাদ্দ করা টাকা নেবেন না, জমি ফেরত নেবেন। ককাসের প্রতিবেদনে দেখি, ধর্ষণ ও ধ্বংসযজ্ঞের পটভূমিতে তাঁরা শরণার্থী হয়ে ভারতে গিয়েছিলেন, পার্বত্য চুক্তির পরে তাঁরা ফিরে আসেন।
ওই উচ্ছেদের ২৮ বছর ও পার্বত্য চুক্তির ১৭ বছর পরে ‘মাতৃভূমি’ কিংবা ‘বাস্তুভিটা’ থেকে দ্বিতীয় (কাপ্তাই বাঁধের কারণে ১৯৬০ সালের উচ্ছেদ ধরলে তৃতীয়) দফায় এই চাকমারা উচ্ছেদের শিকার হলো।
জিজ্ঞাসার জবাবে খাগড়াছড়ির ডিসি জানান, ককাস প্রতিবেদনের কথা তাঁর জানা নেই। তাঁর কথায়, ‘হাইকোর্টের একটি রুল অকার্যকর হয়ে গেছে। কারণ, সরকার আদালতের আদেশ মেনেই তর্কিত তফসিলের জমি বাদ দিয়ে অধিগ্রহণ করেছে। হাইকোর্টের আরেক আদেশে গাছগাছালি ও বসতবাড়ির ক্ষতিপূরণ বিষয়ে রুল ছিল। কিন্তু তাঁরা সে টাকাও নেবেন না।’
এই রাষ্ট্র পেট্রলবোমায় দগ্ধদের ক্ষত মুছতে মাথাপিছু ১০ লাখ টাকা, আর বাস্তুভিটা থেকে চিরতরে উচ্ছেদের ক্ষত শুকাতে মাথাপিছু ১২ হাজার ৬৯৮ টাকা ধার্য করছে। এটা এই অর্থে যে ৮৪ জনের বিপরীতে জেলা প্রশাসন গাছগাছালি ও বসতবাড়ির ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যোগ্য মনে করেছে মাত্র আটজনকে।
জমিজমার কাগজপত্র না রাখা আদিবাসী ঐতিহ্য। এর সুযোগে খাগড়াছড়ি প্রশাসন মাত্র দুই ব্যক্তির নামে ২ একর ২০ শতাংশ জমির প্রকৃত মালিকানা আবিষ্কার করেছে। বাকি ২৭ একর জমিই নাকি খাস। রাষ্ট্রের হৃদয়হীনতার গল্প এখানেই শেষ নয়। ১ শতক নিকৃষ্ট জমিও সেখানে পাঁচ হাজার টাকার কমে বিকোয় না। অথচ শতকের দাম মাত্র ৬২০ টাকা ধরে দুজনকে দুই একরের দাম ১ লাখ ৩৬ হাজার ৫৬৯ টাকা নিতে সাধছে।
এই গুমর ফাঁস না করে প্রশাসন সংবাদ সম্মেলন করে বলছে, ‘ওরা টাকা নেবে না। জমি নেবে!’ এরপরও দেশ শাসনে ‘সামাজিক সুবিচার’ বলতে কি কিছু থাকে?
ককাস প্রতিবেদনে বাবুছড়া ভাইস চেয়ারম্যানের বরাতে বলা আছে: ‘যে মেয়েগুলোকে ধরে নিয়ে গেছে তাদের একজনের গায়ের কাপড় টেনে ছিঁড়ে ফেলেছে। রাইফেল দিয়ে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয়েছে।’ আর বিজিবির দাবি, তারা ‘৬ বিজিবি ও ১ পুলিশ সদস্যকে আহত করেছে এবং বিজিবির ২টি রাইফেল ভেঙে ফেলেছে’।
অনগ্রসর মানুষ বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাস্তুভিটা থেকে অপসারণে আওয়ামী লীগ-বিএনপি কেউ পিছিয়ে নেই। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে নির্যাতন হয়েছে, তার বিচার আজও আওয়ামী লীগ সরকার করেনি। আমরাও মনে করি, এই ব্যাধি আর শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ দিয়ে সারানোর নয়, কারণ এটা সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। বরগুনার ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া প্রধান পান্ডা রশীদ ২০০১ সালে বিএনপি করতেন, পরে আওয়ামী লীগে নাম লেখান। রশীদের রাহুগ্রাস থেকে বাঁচতে ভুক্তভোগীরা গত বছর শাসকদলীয় সাংসদ ধীরেন্দ্র নাথ শম্ভুর কাছে গিয়েছিলেন। শম্ভু তখন নাকি বলেছিলেন, ‘আমি তো শুনেছি ও (রশীদ) ভালো হয়ে গেছে। মানুষকে ভালো হওয়ার সুযোগ দেওয়া দরকার।’ অতঃপর জামিনে বেরিয়ে রশীদ চন্দনতলায় তাণ্ডব চালান।
জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানের আশঙ্কা: ‘রাষ্ট্র এখনই যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে আগামী ২০ বছরে বাংলাদেশ হিন্দুশূন্য হবে।’ জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উল্লিখিত ১৪, ২১ ও ৬৫ পরিবারের উচ্ছেদের ঘণ্টাধ্বনি কী নির্দেশ করছে? ১৯৫১ সালে থাকা ২৩ দশমিক ৭৮ শতাংশের সংখ্যালঘু হারটা ২০১১ তে ৯ দশমিক ৭ শতাংশে নেমেছে। কেউ কেউ এই সমস্যাকে কেবলই ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক মোড়কে দেখার প্রয়াস পাচ্ছেন। আসলে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক অনুশীলনের ঘাটতি গভীরতর হওয়া এবং সেই সুড়ঙ্গপথে ধেয়ে আসা অজগর ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে সমাজের দুর্বলতরদের গিলতে চাইছে। আর চূড়ান্তভাবে তা আইনের শাসনপ্রত্যাশী সংখ্যাগুরু বাঙালির স্বাভাবিক জীবনেও তার অভিঘাত পড়ছে।
অপরাজনীতির কারণে দেশে এখন প্রায় হিরের চেয়েও দামি হলো জমি, আর সবচেয়ে সস্তা হলো মানুষের প্রাণ। শাসক ও ধনিক গোষ্ঠীর লুটপাটকে বৈধ করার যে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া এখন গণতন্ত্রের নামে চেপে বসেছে, সেটাই জমি ও জীবনের দরদাম ঠিক করছে। ওপরে উল্লেখিত প্রতিটি ঘটনার অভিন্ন বৈশিষ্ট্য হলো সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর দুর্বৃত্ত অংশ দলিতদের জমি লুটে নিচ্ছে। তাহলে দলিত ও অনগ্রসররা কোথায় যাবে?
আমি গত ২৮ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরসি মজুমদার হলে জাতপ্রথা বিলোপবিষয়ক একটি সেমিনারে অংশ নিই। সেখানে আমি দলিত ও আদিবাসীদের বাঁচাতে ভারতীয় সাংবিধানিক ব্যবস্থা অনুসরণের কথা বলেছি। বাহাত্তরের ভুলের পরে পাহাড়িদের যে স্বীকৃতি সম্প্রতি সংবিধানে এসেছে, তা অপ্রতুল।
গান্ধীজির সঙ্গে ১৯৩১ সালে ভারতীয় সংবিধানের মূল রূপকার ও গণপরিষদের সভাপতি ড. আম্বেদকারের প্রথম দেখা। গান্ধীজি বললেন, আপনি কংগ্রেসের প্রতি কেন এত রুষ্ট? আম্বেদকার বললেন, আমি অস্পৃশ্য। আমার তো কোনো মাতৃভূমি নেই। আম্বেদকারের সেই চেতনার মতো বাংলাদেশি সংখ্যালঘু ও দলিতদেরও যেন মাতৃভূমি নেই। সংসদীয় ককাসও আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি চায়। ভারত ও পাকিস্তানের মতো দলিত ও আদিবাসীকে সংসদে অনতে হবে।
আম্বেদকারের পথে স্পষ্ট বিধান করতে হবে: উপজাতি, তফসিলি জাতিসহ অনগ্রসর অংশের জন্য একজন মন্ত্রী থাকবেন। এই রকম রক্ষাকবচ পাকিস্তানে না হলেও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে সুফল দিয়েছে।
আদিবাসীবিষয়ক সংসদীয় ককাসের কোনো সুপারিশের বাস্তবায়ন ঘটেনি বলে ককাস সদস্য সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা নিশ্চিত করেন। তাঁর সঙ্গে কথোপকথনের পর আমার আর সন্দেহ রইল না যে পেশিশক্তিধারী বাঙালি এখন দলিত ও অনগ্রসর শ্রেণির জীবনে ভূমিজঙ্গি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বরগুনার যে এলাকাটিতে তাণ্ডব ঘটল, ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত সেই আসনের সাংসদ হতেন রাখাইনরা। নির্বাচনী রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় রাখাইনদের ধরে রাখলে হয়তো তারা বিলুপ্তির পথে যেত না। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনেও ৩০৯টি আসনের মধ্যে দলিত ও উপজাতির জন্য ৩৭টি আসন সংরক্ষিত ছিল। আমাদের মগজে এসব ঢোকে না। তাই দেখার বিষয়, ধর্মনিরপেক্ষতার বুলিটা রেখে রাষ্ট্রধর্মটা জিইয়ে রাখার আসল বার্তা পাঠে মুসলিম ভূমিজঙ্গিদের কোনো অসুবিধা হয়নি।
ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও আদিবাসী ক্রমেই একাত্তরপূর্ব বাঙালি, আর বাঙালিরা সেই বলদর্পী পাঞ্জাবির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। অথচ দেশটা এ জন্য স্বাধীন হয়নি।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

বর্ষবরণে টিএসসিতে বখাটেদের থাবা- তরুণীদের আর্তচিৎকার বাঁচাও বাঁচাও

সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, টিএসসি ও শাহবাগ জুড়ে বর্ষবরণ উৎসব। হাজার হাজার তরুণ-তরুণী যোগ দেন এতে। এরই মধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসংলগ্ন টিএসসিতে প্রকাশ্যে একদল বখাটের অশ্লীল আক্রমণের শিকার হন নারীরা। কিশোরী থেকে মধ্যবয়সী কেউই রেহাই পাননি এদের হাত থেকে। দেড় ঘণ্টাব্যাপী চলে বখাটেদের নগ্ন উল্লাস। এ সময় আক্রমনের শিকার তরুণীরা বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করলেও কেউ এগিয়ে আসেনি তাদের সাহায্যে। অথচ পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ছিলেন নিষ্ক্রিয়। তারা কেউ এগিয়ে যাননি। এমনকি পাঁচ বখাটেকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার পরও ছেড়ে দেয়া হয়। তাৎক্ষণিক বিষয়টি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরকে জানানো হলেও তিনি কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ। নির্যাতিতাদের উদ্ধার করতে গিয়ে গুরুতর আহত হয়েছেন ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতিসহ কয়েকজন।
মঙ্গলবার বাংলা নতুন বছরকে বরণ উৎসব উপলক্ষে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না টিএসসি, সোহরওয়ার্দী উদ্যানসহ আশপাশের এলাকায়। এ সুযোগে রাজু ভাস্কর্যের উত্তরদিকে সোহরওয়ার্দী উদ্যানের ফটকের পাশে একের পর এক বস্ত্র হরণের প্রতিযোগিতা শুরু করে বখাটেরা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তিনটি গ্রুপে বিভক্ত ছিল তারা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নির্দেশে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ওই ফটকটি ভেতর থেকে বাইরে আসার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল। বখাটেদের তিনটি গ্রুপই ওই ফটকের পাশে অবস্থান নিয়ে অসভ্যতায় মেতে ওঠে। নির্যাতিতাদের উদ্ধার করতে গিয়ে গুরুতর আহত ছাত্র ইউনিয়নের ঢাবির সভাপতি লিটন নন্দী জানান, তিনি ও সংগঠনের মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক সুজন সেনগুপ্ত ও রমনা থানার সাধারণ সম্পাদক অমিত দে শাহবাগ থেকে টিএসসিতে যাচ্ছিলেন। ওই সময় নারী কণ্ঠের চিৎকার শুনে তারা ঘটনাস্থলে যান। সেখানে এক তরুণীকে ঘিরে উল্লাস করছিল এক দল বখাটে। ইতিমধ্যে ওই তরুণীর শাড়ি-ব্লাউজসহ পরনের সব পোশাক টেনে ছিঁড়ে খুলে ফেলে বখাটেরা। যৌন লালসা পূরণের জন্য বিবস্ত্র তরুণীকে নির্যাতন করতে থাকে তারা। লিটন নন্দী বলেন, মনে হচ্ছিল মানুষ না। যেন হায়েনারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে নারীদের ওপর। তিনি জানান, ওই বিবস্ত্র তরুণীর সঙ্গী যুবক তাকে জড়িয়ে ধরে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন। এতে ওই যুবকের প্রতি ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে মারধর করতে থাকে তারা। যুবক ও ওই তরুণী ‘বাঁচাও বাঁচাও’ বলে চিৎকার করছিলেন। এর মধ্যেই ভিড় ঠেলে বিবস্ত্র তরুণীকে উদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা করেন ছাত্র ইউনিয়নের তিন নেতা। পরনের পাঞ্জাবি খুলে বিবস্ত্র তরুণীকে পরিয়ে দেন লিটন নন্দী। তরুণীকে উদ্ধার করে নিয়ে আসতে গেলে প্রতিবন্ধকতা শুরু করে বখাটেরা। ওই তরুণীকে নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে টানাটানি শুরু হয়। একপর্যায়ে ওই তরুণী ও তার সঙ্গী যুবককে উদ্ধার করে রিকশায় তোলে দেন লিটন ও তার সঙ্গীরা। রিকশাটি ধানমন্ডির শঙ্কর এলাকায় তাদের পৌঁছে দেয়।
নির্যাতিতাদের উদ্ধার করতে গিয়ে গুরুতর আহত অমিত দে জানান, শুধু তরুণী না। তারা কাউকেই রেহায় দেয়নি। কিশোরী থেকে শুরু করে সব বয়সের নারীই তাদের হয়রানির শিকার হয়েছেন। ওই তরুণীকে উদ্ধার করার পরপরই আরও একাধিক নারীর চিৎকার শুনতে পান তারা। কাছে গিয়ে দেখতে পান এক নারী দুই হাত জোর করে বখাটেদের অনুনয় করছেন, আমার বাচ্চাকে ফেরত দাও। বাবা, আমাকে কিছু করো না। আমার বাচ্চা ফেরত দাও। ছয় বছর বয়সী মেয়েকে নিয়ে ভাইয়ের সঙ্গে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান দেখতে এসেছিলেন ওই নারী। উদ্যানের ওই ফটক দিয়ে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই বখাটেরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছিনিয়ে নিয়ে যায় তার শিশুসন্তানকে। শিশুটি তখন ফুটপাথে পড়ে কান্নাকাটি করছিল। প্রতিবাদ করলে মারধর করা হয় ওই নারীর ভাইকে। এর মধ্যেই লিটন, অমিত, সুজনসহ কয়েকজন তাদের উদ্ধার করার চেষ্টা করেন। বখাটেদের সঙ্গে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে তাদের। ততক্ষণে বখাটেরা টেনে খুলে নেয় ওই নারীর শাড়ি। পরে ওই নারী ও তার ভাই এবং সন্তানকে উদ্ধার করেন তারা। বখাটেদের আক্রমনের শিকার এক কিশোরী আর্তনাদ করছিল। ওই কিশোরীকে উদ্ধার করতে গেলে বখাটেরা মারধর করে তাদের। বখাটেদের নির্যাতনে ঘটনাস্থলেই জ্ঞান হারায় ওই কিশোরী।
নির্যাতিতাদের উদ্ধার করতে গিয়ে হাত ভেঙে যায় লিটন ও অমিতের। লিটন নন্দী বলেন, প্রথমে টের পাইনি। প্রথম বিবস্ত্র তরুণীকে উদ্ধারের পরে দেখি হাতটা ফুলে গেছে। তখন পুলিশকে হাতজোড় করে বলেছি, প্লিজ এই নারীদের রক্ষা করুন। কিন্তু তারা কোন ভূমিকা পালন করেনি। নীরব দর্শকের মতোই তারা এই অসভ্য তাণ্ডব দেখেছে। এমনকি ঢাবি প্রক্টর অধ্যাপক এ এম আমজাদকে ফোনে বিষয়টি জানিয়ে সাহায্য চেয়েছিলেন লিটন নন্দী। কিন্তু প্রক্টর তাকে হতাশ করে বলেছেন, আমার কি করার আছে। পুলিশ তো আমার কথা শুনে না। লিটন নন্দী জানান, তারা পাঁচজন বখাটেকে আটক করে ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছিলেন। কিন্তু ঘটনার পর খোঁজ নিলে পুলিশ জানায়, তাদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মেহেদি হাসান উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক আশরাফুল ইসলামসহ টিএসসি এলাকায় তিনটি স্থানে অবস্থান করছিল পুলিশ। তবে এ বিষয়ে তারা কোন মন্তব্য করেনি। জানতে চাইলে শাহবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সিরাজুল ইসলামও মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে তিনি বলেন, অভিযোগ পেয়েছি। পুলিশের কাছে সোপর্দের পর বখাটেদের ছেড়ে দেয়া হয়েছে। এ ঘটনায় পুলিশ দায়ী হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান তিনি। বখাটে ও নির্যাতনের শিকার কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ঘটনাস্থলের পাশে সিসি ক্যামেরা ছিল। যৌন হয়রানির ঘটনাটি সিসি ক্যামেরায় ধারণ হয়েছে কিনা তা এখনও জানা যায়নি। এ ঘটনায় পুলিশকে দায়ী করেছেন ঢাবির প্রক্টর ড. এ এম আমজাদ। তিনি বলেন, ১লা বৈশাখ উপলক্ষে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বৈঠকে যেসব সিদ্ধান্ত হয়েছিল তা পালন করলে হয়তো এ ঘটনা ঘটতো না। ওই ঘটনা সম্পর্কে তিনি জানান, ফোনে বিষয়টি জানার পর তিনি তা শাহবাগ থানার ওসিকে জানিয়েছেন। পরে ওসি ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করেন।
এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় নারীদের যৌন হয়রানিতে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার দাবি করে গতকাল ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছে কয়েকটি ছাত্র সংগঠন। পুলিশের নাকের ডগায় এ ঘটনা ঘটলেও পুলিশকে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি অভিযোগ করে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন সংগঠনগুলোর নেতারা। দুপুরে ঢাবির মধুর ক্যান্টিনে সংবাদ সম্মেলন করে ছাত্র ইউনিয়ন। এতে অভিযোগ করে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক জি এম জিলানী বলেন, মঙ্গলবারের যৌন হয়রানির ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নির্লিপ্ত রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ও মিলন চত্বরে পুলিশের অবস্থানের কাছাকাছি জায়গায় এ ঘটনা ঘটেছে। যেখানে পুলিশ কন্ট্রোল রুম ও সিসি ক্যামেরা ছিল। তার পরেও পুলিশ যথাযথ পদক্ষেপ নিতে টালবাহানা করছে। তারা অবিলম্বে এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি জানান। তিনি বলেন, জাতি যখন নববর্ষকে বরণ করে নিচ্ছে তখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে টিএসসিমুখী গেটে ১৫-২০ জন নারীর ওপর বর্বর হামলা হয়। এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও পুলিশ দায়সারা বক্তব্য দিয়ে একে অপরের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ১লা বৈশাখে দুপুরের পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তাগুলো দিয়ে অবাধে গাড়ি চলতে ও ফুটপাথে দোকানপাট বসতে দেয়া হয়। এর ফলে ক্যাম্পাসের পরিবেশ জনসাধারণের চলাচলের অনুপোযোগী হয়ে পড়ে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হাসান তারেক, সহসভাপতি মারুফ বিল্লাহ তন্ময়, দপ্তর সম্পাদক আল আমিন, ঢাকা মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক সুমন সেন গুপ্ত ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক তুহিন কান্তি দাশসহ অন্য নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। এ বিষয়ে ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হাসান তারেক মানবজমিনকে বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থ গ্রহণ না করলে আমরা কঠোর আন্দোলনের ডাক দেবো।

বাংলাদেশকে কিছু সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে -মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের রিপোর্ট

বাংলাদেশে চলমান যুদ্ধাপরাধীর বিচারের বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, বাংলাদেশকে কিছু সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে। ওয়াশিংটনে মঙ্গলবার দেশটির পররাষ্ট্র দফতরের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে ভারপ্রাপ্ত মুখপাত্র মেরি হার্ফ বলেন, ‘আমরা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির কথা জানাতে পারি। কিন্তু সেটা থেকে তার চেয়ে খুব বেশি কোনো বিশ্লেষণ আমি করব না।’ বার্তা সংস্থা ইউএনবি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত রোববার রাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে কামারুজ্জামানকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিবৃতি পাওয়ার পরও বাংলাদেশ অগ্রসর হয়েছে এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসি কার্যকর করেছে, এ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন মেরি হার্ফ। তিনি আরো বলেন, ‘আমরা কিভাবে এই পুরো প্রক্রিয়াকে দেখি তা আমরা আগের বিবৃতিতেই বলেছি। এখন ওই বিবৃতির ব্যাপারে আমার বেশি কিছু বলার নেই। যারা ১৯৭১ সালে নৃশংসতা চালিয়েছে, তাদের বিচারের মুখোমুখি করাকে অবশ্যই আমরা সমর্থন করি। আমরা বুঝি যে, বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া।’
মেরি হার্ফ বলেন, তারা বিশ্বাস করেন যে এই বিচার অবশ্যই সুষ্ঠু-স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন হতে হবে এবং বাংলাদেশও তাতে সম্মত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা এই প্রক্রিয়ার মধ্যে অগ্রগতি ল করেছি, আমি মনে করি, একটা ভালো ব্যাপার হয়েছে।’
মুখপাত্র বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে, ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের অগ্রগতি সব ধরনের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা পূরণ করবে। হার্ফ যোগ করেন, ‘আর এটাই বাংলাদেশ সম্পর্কে আমরা বলতে পারি, যা হয়েছে সে বিষয়ে এর চেয়ে বেশি বিশ্লেষণ করা ঠিক হবে না।’
মৃত্যুদণ্ডের ফলাফল সম্পর্কিত আরেকটি প্রশ্নের জবাবে মেরি হার্ফ বলেন, ‘আমরা মনে করি যে, এটা একটা জটিল বিষয় এবং আমি মনে করি, বাংলাদেশের সাথে এ বিষয়ে আমরা আলোচনা চালিয়ে যাবো।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আমাদের মতামত পরিষ্কার করেছি। বিভিন্ন দেশ যারা মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে তাদের সাথে আমি এবং যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে মার্কিন অ্যাম্বাসেডর অ্যাট লার্জ স্টিফেন জে র‌্যাপ দুজনই কথা বলেছি যেন তারা তা বন্ধ করে।’
ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পর্কে জানতে চাইলে মেরি হার্ফ বলেন, এ বিষয়ে তিনি তেমন কিছু জানেন না। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি, নির্বাচনের এখনো কয়েক (দুই) সপ্তাহ বাকি আছে। তাই আমি খুশি যে, আমার দলকে নিয়ে সেখানে পর্যবেণ করতে পারব এবং কিছু বিশ্লেষণও করতে পারব।’ বাংলাদেশে কয়েক মাস ধরে চলা অস্থিতিশীল অবস্থা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বলেও জানান তিনি। এখন সেখানে নির্বাচন হচ্ছে দেখে তিনি আনন্দ প্রকাশ করেন এবং বলেন, এ বিষয়ে আরো কিছু জানানোর হলে সময়মতো তা জানানো হবে।
একই দিনে জাতিসঙ্ঘ সদর দফতরে এক নিয়মিত ব্রিফিংয়ে জাতিসঙ্ঘ মহাসচিবের মুখপাত্র স্টিফান ডুজারিক বলেন, ‘নীতিগতভাবে বাংলাদেশের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে মহাসচিব ও জাতিসঙ্ঘ অবস্থান নেবে।’

অপহৃত কিশোরীকে বিয়ে করেছিলেন সেই এসি by নুরুজ্জামান লাবু

অপহরণের শিকার হওয়া সেই কিশোরীকে বিয়ে করেছিলেন পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) শেখ রাজীবুল হাসান। নিজের স্ত্রী-সন্তানের কথা গোপন রেখে মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে কিশোরীকে বিয়ে করেন তিনি। রেখেছিলেন লালমাটিয়া এলাকায় নিজের ভাড়া করা একটি বাসায়। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর কিশোরীকে গত ৫ই এপ্রিল নিজ বাড়িতে ফেরতও পাঠিয়ে দিয়েছেন। এখন কিশোরীর পরিবারকে চাপ দিচ্ছেন মীমাংসা করার জন্য। এসি রাজীবের বড় বোন ও খালা মীমাংসার জন্য চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। তাদের একজন ম্যাজিস্ট্রেট ও অন্যজন আইনজীবী। তবে নিজের স্ত্রী-সন্তানের কথা গোপন রেখে ও মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে কিশোরীকে অপহরণের পর বিয়ে করার বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না পরিবারের সদস্যরা। তারা এসি রাজীবের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেছেন। এ বিষয়ে তারা আইনি পদক্ষেপ নেয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। গত ২রা এপ্রিল পুলিশ কমিশনারের নির্দেশে এসি রাজীবকে মোহাম্মদপুর জোন থেকে ক্লোজ করে তেজগাঁওয়ের ডিসি কার্যালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। গত ১লা ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টা থেকে রাজধানীর কাফরুলের বাসিন্দা ১৭ বছর বয়সী সুমাইয়া আক্তার মৌ নিখোঁজ হয়। ওই দিনই সুমাইয়ার বড় ভাই আব্দুল বাছেত বাদী হয়ে কাফরুল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি নং ৫৬) দায়ের করেন। একদিন পর আব্দুল বাছেত র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক বরাবর তার বোনকে কতিপয় দুষ্কৃতকারী অপহরণ করেছে বলে একটি লিখিত অভিযোগ (নম্বর ৪২) করেন। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনুসন্ধান করে জানা যায়, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের এসি রাজীবের সঙ্গে কিশোরী মেয়েটির নিয়মিত ফোনালাপ হতো। অপহৃত হওয়ার আগের ১৫ দিনে এসি রাজীবের সরকারি মোবাইল নম্বরে ৫২ বার ও অপহৃত হওয়ার পর ২ বার কথোপকথনের রেকর্ড রয়েছে। এছাড়া, এসি রাজীবের একটি ব্যক্তিগত নম্বর দিয়ে ওই কিশোরীর সঙ্গে অসংখ্যবার ফোনালাপের তথ্য পাওয়া গেছে। পরিবারের সদস্যরা কিশোরীকে ফেরত পেতে একাধিকবার এসি রাজীবের কাছে গেলেও তিনি বিষয়টি অস্বীকার করেন।
সুমাইয়ার বড় ভাই বাছেত জানান, গত ৫ই এপ্রিল তার বোন বাসায় ফেরত আসে। এসময় তারা বোনকে কোথায় ছিল জিজ্ঞাসা করলে সে লালমাটিয়ার একটি হোস্টেলে অবস্থান করেছে বলে স্বীকার করে। কিন্তু বাসায় অবস্থানের দু’দিনের মাথায় একটি ফোনকল আসার পর কিশোরী অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে। একাধিকবার সে আত্মহত্যারও চেষ্টা করেছিল। পরিবারের সদস্যরা তাকে বুঝিয়ে কারণ জানতে চাইলে কিশোরী তার স্বজনদের কাছে সবকিছু খুলে বলে। কিশোরী তার পরিবারের সদস্যদের জানায়, এসি রাজীবের সঙ্গে তার দুই বছরের প্রেম চলছিল। এই দুই বছরে তারা অসংখ্যবার মেলামেশা করেছে। পরিবার থেকে বিয়ে দেয়ার প্রস্তুতি নেয়ার কথা জানতে পেরে গত ১লা ফেব্রুয়ারি রাজীবের ডাকেই সে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। রাজীব তাকে লালমাটিয়ার নিবেদিকা হোস্টেলে রাখে। এরপর গত ৫ই মার্চ মোহাম্মদপুরের ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাজী আনিছুর রহমানের মাধ্যমে বিয়ে করেন তাকে। এসি রাজীবের বিয়ের নিকাহনামার একটি সত্যায়িত প্রতিলিপি এই প্রতিবেদকের হাতে রয়েছে। নিকাহনামা ঘেঁটে দেখা যায়, মেয়ের বয়স সেখানে ২১ বছর দেখানো হয়েছে। বিয়েতে এক লাখ এক টাকা দেনমোহর ধার্য করা হয়। নিকাহনামায় এসি রাজীব তার আগের স্ত্রী ও সন্তানের কথা সুকৌশলে এড়িয়ে গেছেন। বিয়েতে মৌলভী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নূরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি। আর বিয়ের সাক্ষী হিসেবে কেরানীগঞ্জের আটিবাজারের আটিকুটি এলাকার শমসের আলীর ছেলে মতিন, শ্যামলাপুর ঘাটারচরের মৃত বাবুল হোসেনের ছেলে ফারুক ও তার স্ত্রী শাহিনুর বেগমকে সাক্ষী করা হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিবাহ রেজিস্ট্রির একদিন আগে প্রথম শ্রেণীর একজন ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে শেখ রাজীবুল হাসান ওই কিশোরীকে সঙ্গে নিয়ে বিবাহের হলফনামা বা কোর্ট ম্যারিজ করেন। সেখানেও দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক বলে মেয়ের বয়স ২১ বছর দেখানো হয়। সূত্র জানায়, গত দুই বছর ধরে এসি রাজীব ওই কিশোরীর সঙ্গে পরকীয়া প্রেম করে আসছিলেন। কিশোরীকে নিয়ে রাজীব নিয়মিত ফার্মগেটের হোটেল গিভেন্সীতে স্বামী-স্ত্রী পরিচয় দিয়ে অবস্থান করতেন। ১লা ফেব্রুয়ারি রাজীবের ডাকে কিশোরী বাসা থেকে বেড়িয়ে যায়। স্বজনরা জানান, রাজীব কৌশলের আশ্রয় হিসেবেই কিশোরীকে বিয়ে করেছে। যাতে বিয়ের পর আইনিভাবে ওই কিশোরীকে তালাক দিতে পারে। এরই মধ্যে রাজীব ওই কিশোরীকে জানিয়ে দিয়েছে, তোমাকে স্ত্রীর মর্যাদা দেব না। তুমি চাইলে যা ইচ্ছা করতে পারো। এরপরই কিশোরী পুরো ঘটনা তার পরিবারের সদস্যদের জানিয়ে দেয়। এর আগেই কৌশলে রাজীব ওই কিশোরীকে ভুল বুঝিয়ে পরিবারের সদস্যদের দিয়ে থানা থেকে জিডি ও র‌্যাব কার্যালয় থেকে অপহরণের অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয়। কিশোরীর ভাই জানান, আগে বুঝতে পারলে তারা এসব অভিযোগ প্রত্যাহার করতেন না। কিশোরীর বরাত দিয়ে তার ভাই জানান, তার বোনকে ভয় দেখিয়েছে রাজীব। তা না হলে পরিবারের সদস্যদের ক্ষতি হবে বলেও জানিয়েছে। একারণে সুমাইয়া তাদের কাছে সবকিছু আড়াল করে রেখেছিল। এখন সুমাইয়া তার ভুল বুঝতে পেরেছে। তাদের বলেছে, ‘তোমরা রাজীবকে ছেড়ো না। তার শাস্তি আমি দেখতে চাই। আমার সঙ্গে ও প্রতারণা করেছে। আমার জীবন নষ্ট করে দিয়েছে।
বাছেত জানান, ইতিমধ্যে তার বোন কয়েকবার আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেছে। ব্লেড দিয়ে নিজের হাত কেটেছে। বোনের কিছু হলে এর দায়ভার নিতে হবে রাজীবকে। তারা বিষয়টি নিয়ে আইনি পদক্ষেপ নেয়ার চিন্তা করছেন। কিন্তু তারা হুমকি পাচ্ছেন। বিভিন্নভাবে এসি রাজীব বিষয়টি নিয়ে তাদের বাড়াবাড়ি না করার হুমকি দিচ্ছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে এসি রাজীবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বারবার তার মোবাইলফোন বন্ধ পাওয়া যায়। তেজগাঁওয়ের ডিসি বিপ্লব কুমার সরকার জানান, কমিশনারের নির্দেশে তাকে মোহাম্মদপুর থেকে ক্লোজ করে ডিসি অফিসে সংযুক্ত করা রয়েছে।

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের জন্য অপেক্ষা by কাফি কামাল

সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ এবং আনুষ্ঠানিক প্রচারণা চলছে সপ্তাহ ধরে। অনানুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে আরও আগেই। ভোটের আগে প্রচারণার সুযোগ আছে আর মাত্র ১১ দিন। কিন্তু এখন পর্যন্ত গণসংযোগ, মিছিল-মিটিংয়ের মতো প্রচারণায় সক্রিয় হতে পারছেন না বিরোধী জোট সমর্থিত প্রার্থীরা। তাদের বেশির ভাগই মামলার আসামি। ২০ দলের আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত নানা নৈরাজ্যকর ঘটনায় তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা হয়েছে রাজধানীর প্রতিটি থানায়। গ্রেপ্তার এড়াতে দীর্ঘদিন ধরেই তারা রয়েছেন আত্মগোপনে। সিটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর বিএনপি, জাতীয়তাবাদী ঘরানার বিশিষ্ট নাগরিক ও পেশাজীবীদের পক্ষ থেকে একাধিক প্রতিনিধি দল গেছেন নির্বাচন কমিশনে। সেখানে তারা পরামর্শ ও দাবি জানানোর ক্ষেত্রে একটি বিষয়েই সর্বাধিক জোর দিয়েছিলেন। তা হলো, সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরির স্বার্থে নির্বাচনী কর্মকাণ্ড পরিচালনার সময় যাতে বিরোধী জোটের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার ও হয়রানি করা না হয়। প্রথমদিকে নির্বাচন কমিশন বিষয়টি এড়িয়ে গেলেও এক পর্যায়ে এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়ার কথা জানায়। কিন্তু বাস্তবে তার তেমন কোন প্রতিফলন নেই। প্রার্থী ও বিরোধী নেতারা নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য আগাম জামিনের আবেদন করেছেন আদালতে। জামিনের অপেক্ষায় আছেন তারা। যাদের ওপর মামলার চাপ কম তারাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রচারণায় অংশ নিতে পারছেন না। তাদের পক্ষে দলের নেতাকর্মী, অনুসারী ও স্বজনরা প্রচারণার চেষ্টা করলেও পদে পদে বাধার মুখে পড়ছেন। প্রতিদিনই বিরোধী প্রার্থীদের প্রচারণা চলাকালে দু’চারজন করে কর্মীকে আটক করছে পুলিশ। ছিনিয়ে নেয়া হচ্ছে লিফলেট। অভিযান চালানো হচ্ছে প্রার্থীসহ বিরোধী নেতাকর্মীদের বাসা-বাড়িতে। পরিবারের সদস্যদেরও নানাভাবে শাসানো হচ্ছে। এমনকি ক্রসফায়ারের হুমকি দেয়া হচ্ছে বলে অনেক প্রার্থীর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে আদর্শ ঢাকা আন্দোলন-এর কার্যালয়ে। তার ওপর সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা বিভিন্ন জায়গায় দেখাচ্ছেন ভয়-ভীতি। ফলে গ্রেপ্তার আতঙ্ক, নতুন মামলায় জড়ানো, হামলার আশঙ্কা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হয়রানির ভয়ে সক্রিয় হতে পারছেন না বিরোধী প্রার্থী এবং তাদের লোকজন। মিছিল, মিটিং পরের কথা ডিসিসি’র অনেক ওয়ার্ডে পোস্টারই সাঁটতে পারেননি তারা। উল্টো প্রতিনিয়ত পুলিশের তাড়া খেয়ে তাদের পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে। গোপনে যাতে কেউ বাসায়ও যাতায়াত করতে না পারেন সেজন্য প্রার্থীর বাড়ির সামনে ও আশপাশে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত টহল দিচ্ছেন। সিটি নির্বাচনে বিরোধী জোট সমর্থিত প্রার্থীরা অংশ নিচ্ছেন জাতীয়তাবাদী ঘরানার বিশিষ্ট নাগরিক ও পেশাজীবীদের সংগঠন ‘আদর্শ ঢাকা আন্দোলন’-এর ব্যানারে। দুইবার উদ্যোগ নিয়েও প্রার্থীরা জামিন না পাওয়ার কারণে তাদের প্রার্থী পরিচয় অনুষ্ঠান বাতিল করেছে সংগঠনটি। ফলে প্রচারণায় পিছিয়ে পড়ছেন বিরোধী জোট সমর্থিত প্রার্থীরা। প্রতিদিনই এমন অভিযোগ করছেন বিএনপি, ২০দলীয় জোট, আদর্শ ঢাকা আন্দোলন ও প্রার্থীরা। এদিকে ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে বিএনপির সমর্থন পেয়েছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। প্রতীক বরাদ্দের পর তিনি উচ্চ আদালতে হাজির হয়ে জামিন আবেদন করেছেন। গতকাল ছিল এ ব্যাপারে রায় ঘোষণার দিন। সেদিন তাকে গ্রেপ্তার বা হয়রানি না করতে পুলিশের প্রতি নির্দেশনার পাশাপাশি তাকে প্রচারণায় অংশ না নিতে নির্দেশনা দিয়েছিল আদালত। গতকাল রায় এসেছে বিভক্ত। ফলে তিনি এখনও প্রচারণার মাঠে নামতে পারেননি। এমনকি এ ব্যাপারে গণমাধ্যমেও কোন বক্তব্য দিতে পারছেন না। এদিকে জামিনের ব্যাপারে উচ্চ আদালত থেকে সিদ্ধান্ত না পেলেও গ্রেপ্তার না করার নির্দেশনার ওপর আস্থা রেখে বাসায় ফিরেছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মির্জা আব্বাস। তবে আদালতের নির্দেশনার কারণে মুখ বন্ধ রেখেছেন। গণমাধ্যম কর্মীদের তার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিনি আদালতের নির্দেশনার প্রতি সম্মান রেখে চলতে চান।
ওদিকে মির্জা আব্বাসের সহধর্মিণী আফরোজা আব্বাস প্রশাসনের প্রতি অভিযোগ করে বলেছেন, নির্বাচনী গণসংযোগ ও প্রচারণায় সব প্রার্থীর সমান অধিকার রয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত হতাশার সঙ্গে লক্ষ্য করছি, প্রতিদিন আমাদের গণসংযোগকালে লিফলেট বিতরণকালে পুলিশ কখনও লিফলেট বিতরণকারীদের ধাওয়া করছে, কখনও লিফলেট ছিনিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এটা কোন ধরনের আচরণ আমি জানতে চাই। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করাতো দূরের কথা এখন আমরা গণসংযোগ ও নির্বাচনী প্রচারণায় প্রশাসন কর্তৃক হয়রানির শিকার হচ্ছি। ঢাকা উত্তরে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী তাবিথ আউয়াল প্রচারণার মাঠে রয়েছেন। কিন্তু তিনিও অভিযোগ করে বলেছেন, আমরা এখনও লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পাচ্ছি না। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে জানানো হয়েছে। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অপেক্ষায় রয়েছি। তিনি বলেছেন, জনগণের ভালোবাসা পেতে নয় বরং তার সামনে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মানুষ ভোট দিতে পারবে কিনা সেটা। এদিকে গত শুক্রবার বিকাল ৩টায় কামরাঙ্গীরচরের ঝাউচর এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় নামেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী শহিদুল হক। এলাকার বাসিন্দারা তার প্রচারণায় অংশ নেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে ছুটে যায় পুলিশের একটি দল। গ্রেপ্তার আতঙ্কে মুহূর্তেই প্রচারণা থেকে সরে পড়ে সবাই। একই দিন সন্ধ্যা ৭টায় কামরাঙ্গীরচরের করিমাবাদ এলাকায় ৫৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী রাশেদ আলম খোকন প্রচারণা চালানোর সময় পুলিশ গেলে গ্রেপ্তার এড়াতে খোকনসহ অন্যরা নৌকায় বুড়িগঙ্গা নদী পার হয়ে কেরানীগঞ্জে চলে যান। এ ব্যাপারে আদর্শ ঢাকা আন্দোলনের সদস্য সচিব শওকত মাহমুদ বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টিতে নির্বাচন কমিশন দুঃখজনকভাবেই নির্লিপ্ত রয়েছে। বিরোধী জোট সমর্থিত প্রার্থীরা প্রচার-প্রচারণা চালাতে পারছেন না। সবখানে বাধা দিচ্ছে পুলিশ। লিফলেট ছিনিয়ে নিচ্ছে, মিছিল করতে গেলে ধাওয়া দিচ্ছে, আটক করা হচ্ছে। প্রার্থী ও তাদের পক্ষে যারা কাজ করছেন তাদের বাসা-বাড়িতে গিয়ে হয়রানি করছে পুলিশ। পাড়ায়-মহল্লায় গিয়ে প্রতিনিয়ত তাদের খোঁজখবর নিচ্ছে। ফলে গ্রেপ্তার আতঙ্ক, নতুন মামলায় জড়িয়ে দেয়া এবং শারীরিক হামলার আশঙ্কায় রয়েছেন বিরোধী প্রার্থী ও তাদের লোকজন। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন কোন কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছে না। তিনি বলেন, নির্বাচনে যেখানে উৎসবমুখর পরিবেশ থাকার কথা সেখানে এখন বিরাজ করছে ভীতিকর পরিবেশ। ফলে আদর্শ ঢাকা আন্দোলন সমর্থিত প্রার্থীরা প্রচারণায় পিছিয়ে পড়ছে। এদিকে যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল গতকাল এক বিবৃতিতে বলেছেন, সরকার ও নির্বাচন কমিশন কেউই চাচ্ছে না সিটি করপোরেশন নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হোক। কারণ সরকার এখনও সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরি করতে পারেনি। মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাস সহ অনেক কাউন্সিলর প্রার্থী ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের হয়রানি করা হচ্ছে। নতুন নতুন মামলার ফাঁদে জড়ানো হচ্ছে।
ওদিকে অভিযান, খোঁজখবর নেয়া এবং বাসাবাড়ির সামনে পুলিশের অবস্থানের কারণে প্রচারণায় মাঠে নামার সাহস পাচ্ছেন না কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রায় সবাই। দু-চারজন প্রচারণার মাঠে নামলেও তারা মেয়র সমর্থকদের প্রচারণার সঙ্গে সমন্বয় করে জনসংযোগে অংশ নিচ্ছেন। ঢাকা উত্তরের ২৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী আবুল মেছেরের বাড়ির সামনে ও আশপাশে পুলিশ নিয়মিত টহল দিচ্ছে। আবুল মেছের জানান, রাজনৈতিক মামলার জালে আটকে তিনি এখনও প্রকাশ্যে প্রচারণায় নামতে পারেননি। ঢাকা উত্তরের ২২ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী ফয়েজ আহমেদ রাজনৈতিক মামলায় আত্মগোপনে থাকায় স্ত্রী আলপনা আহমেদ নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নামলেও কর্মীরা তার সঙ্গে প্রচারণায় অংশ নিতে সাহস পাচ্ছেন না। একই পরিস্থিতি ঢাকা দক্ষিণ ১৬ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী সিরাজুল ইসলামের। তার অনুপস্থিতিতে সীমিত পরিসরে প্রচারণা চালাচ্ছেন তার স্ত্রী। ৫৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী শহিদুল হকের পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রতিদিন এক-দুবার পুলিশ এসে খোঁজখবর নিচ্ছে। বিএনপির সমর্থন না পেলেও বিএনপি নেতা হিসেবে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫৬ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কামরাঙ্গীরচর থানা বিএনপির সদস্য সচিব মো. নাঈম। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েও তিনি পুলিশি হয়রানি থেকে রেহাই পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। বাড্ডা থানার বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা উত্তরের ২১ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী এ জি এম শামসুল হকের বাসায় প্রতিদিন একাধিকবার টহল দিচ্ছে পুলিশ। ৮ মামলার আসামি শামসুল হক বর্তমানে ৩ মামলায় জামিনের অপেক্ষা করছেন আত্মগোপনে থেকেই। একই পরিস্থিতি ঢাকা দক্ষিণের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী ১২ মামলার আসামি গোলাম হোসেন, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ১৬ মামলার আসামি শামসুল হুদা কাজল, ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী ২১ মামলার আসামি আরিফুল ইসলাম, ৫৩ নম্বর ওয়ার্ডের বিএনপি সমর্থক কাউন্সিলর প্রার্থী ৬ মামলার আসামি মীর হোসেন মীরুসহ বেশির ভাগের। এদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী এম এ সাহেদ মন্টু বর্তমানে কারাগারে। তার পক্ষে মাঠে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন তার স্ত্রী নাসিমা বানু।

বৃটেনের জাতীয় নির্বাচনে লড়ছেন ১২ বাংলাদেশী by তানজির আহমেদ রাসেল

এ বিজয়ে বিলেতে বাংলাদেশীদের কয়েক দশকের আশা-আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন হয়েছিল।
এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। আগামী ৭ই মে অনুষ্ঠেয় যুক্তরাজ্যের সাধারণ নির্বাচনে দেশটির প্রধান তিনটি রাজনৈতিক দলের পক্ষে ১২ বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত প্রার্থী এমপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে লেবার দল থেকে আটজন, কনজারভেটিভ দল  থেকে একজন ও লিবারেল ডেমোক্রেট দল থেকে তিনজন মনোনয়ন পেয়েছেন। ২০১০ সালে পার্লামেন্টে প্রথম বাংলাদেশী এমপির অভিষেকের পর এবার একাধিক এমপি বৃটিশ পার্লামেন্টে নিজেদের স্থান করে নিবেন বলে আশা করেছেন বৃটিশ বাংলাদেশীরা।
১.  রুশনারা আলী এমপি
বৃটিশ পার্লামেন্টের প্রথম বাংলাদেশী এমপি রুশনারা আলী। ২০১০ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত বৃটেনের জাতীয়  নির্বাচনে  বেথনালগ্রীন ও বো আসন থেকে এক ঐতিহাসিক বিজয়ের মাধ্যমে ইতিহাস গড়েন। প্রথম বৃটিশ বাংলাদেশী এমপি হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেন অক্সফোর্ডের ডিগ্রিধারী সিলেটের বিশ্বনাথ উপজেলার বুরকী গ্রামের মেয়ে রুশনারা। এবারও রুশনারা বেথনালগ্রীন ও বো আসন থেকে লেবার দলের প্রার্থী হয়েছেন। প্রতিশ্রুতিশীল ও মেধাবী হওয়ার কারণে প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হয়েই লেবার রাজনীতির সামনের কাতারে চলে আসেন। দায়িত্ব পান শ্যাডো ডিএফআইডি মিনিস্টার ও লেবার পার্টির সাউথ এশিয়াবিষয়ক মুখপাত্রের। কিছুদিন পর দপ্তর পরিবর্তন করে তাকে করা হয় শ্যাডো এডুকেশন মিনিস্টার। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে হাউস অব কমন্সে ‘ইরাকে দ্বিতীয় দফা বোমা হামলা বিলে’র পক্ষে সই না দিয়ে শ্যাডো মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন রুশনারা আলী। পরে তিনি লেবার পার্টির প্রতিনিধি হিসেবে হাউস অব কমন্সের ১৩ সদস্যবিশিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ট্রেজারি সিলেক্ট কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। এই কমিটি গ্রেট বৃটেনের অর্থ সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয়াদি তদারকি করে থাকে। ১৯৭৫ সালের ১৪ই মার্চ সিলেটের বিশ্বনাথে জন্ম নেয়া রুশনারা  মাত্র ৭ বছর বয়সে তার পরিবারের সঙ্গে বিলেতে আসেন এবং পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটসে বসবাস শুরু করেন। বিখ্যাত মালবারী গার্লস স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে টাওয়ার হ্যামলেটস কলেজে ভর্তি হন রুশনারা। এরপর বিশ্বখ্যাত ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি থেকে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতির উপর ডিগ্রি নেন তিনি। লেবার পার্টির রাজনীতিবিদ হাউস অব লর্ডসের সাবেক সদস্য মাইকেল ইয়াং-এর রিসার্চ এসিস্ট্যান্ট হিসেবে রুশনারা আলী তার কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি বেথনালগ্রীন ও বো আসনের সাবেক এমপি ওনা কিং-এর পার্লামেন্টারি এসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করেছেন। ২০০০ থেকে ২০০১  সাল পর্যন্ত মানবাধিকার ইস্যু নিয়ে ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসে ও  ১৯৯৯ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত রিচার্স ফেলো হিসেবে ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি রিচার্সে সুনামের সঙ্গে কাজ করেছেন রুশনারা।  হোম অফিসের কমিউনিটিজ বিভাগেও  ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত কাজ করেছেন তিনি।
  ২. টিউলিপ সিদ্দিক
লন্ডনের শ্বেতাঙ্গ-অশ্বেতাঙ্গ অধ্যুষিত হ্যাম্পট্যাড অ্যান্ড কিলবার্ন আসন থেকে  লেবার পার্টির হয়ে এমপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাতনি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাগ্নি টিউলিপ রেজওয়ানা সিদ্দিক। লেবারদলীয় এমপি ও সাবেক অভিনেত্রী গ্লেন্ডা জ্যাকসন বার্ধক্যজনিত কারণে অবসর নেয়ার ঘোষণা দিলে শফিক সিদ্দিক-শেখ রেহানা দম্পতির মেয়ে  টিউলিপ সিদ্দিক লেবার পার্টির প্রায় ৯শ’ সদস্যের সরাসরি ভোটে প্রতিদ্বন্দ্বী কাউন্সিলর স্যালি গিমসন ও হ্যাকনি কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়র সোফি লিন্ডেনকে পরাজিত করে মনোনয়ন লাভ করেন। টিউলিপ রিজওয়ানা সিদ্দিক দক্ষিণ-পশ্চিম লন্ডনের মেরটন কাউন্সিলের মিচাম এলাকায় ১৯৮২ সালের ১৬ই সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশ, ব্রুনেই, ভারত, সিঙ্গাপুর, স্পেনে বাল্যকাল কাটিয়েছেন। পশ্চিম লন্ডন থেকে ১৯৮৮ সালে তিনি উত্তর লন্ডনে চলে আসেন এবং এ-লেভেল সম্পন্ন করেন। টিউলিপ ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডন থেকে ইংরেজি সাহিত্যের উপর আন্ডারগ্রাজুয়েট ডিগ্রি এবং কিংস কলেজ অব লন্ডন থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১১ সালে তিনি পলিটিক্স, পলিসি অ্যান্ড গর্ভমেন্টের উপর দ্বিতীয়বারের মতো মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন।
টিউলিপ সিদ্দিক ২০১০ সালের মে মাসে ক্যামডেন রিজেন্ট পার্ক ওয়ার্ডের প্রথম বাঙালি মহিলা কাউন্সিলর নির্বাচিত হন। তিনি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, ফিলিপ গ্লাউড এসোসিয়েটস, সেভ দ্যা চিলড্রেন,  বেথনালগ্রীন অ্যান্ড বো আসনের সাবেক লেবার এমপি ওনা কিং, টুটিং এলাকার লেবার এমপি ও সাবেক মন্ত্রী সাদেক খান, লেইটন ওয়ানস্টেড এলাকার সাবেক লেবার এমপি হেরী কোহেনের সঙ্গে কাজ করেছেন। ক্যামডেন ও ইজলিংটন এনএইচএস ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের গভর্নর, কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশন ইউকের সদস্য টিউলিপ সিদ্দিকের লেবার লিডার এড মিলিব্যান্ডের ক্যাম্পেইন ও এমপি টিসা জোয়েলের পলিসি এডভাইজার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। সাবেক বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউনের সঙ্গেও কাজ করেছেন টিউলিপ।
৩. ড. রূপা হক
ড. রূপা হক লন্ডনের কিংস্টন ইউনিভার্সিটির সিনিয়র লেকচারার।  পিএইচডি করেছেন কালচারাল স্টাডিজের উপর।  ক্যামব্রিজ গ্র্যাজুয়েট ড. রূপা হক  লেবার পার্টির হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন লন্ডনের ইলিং সেন্ট্রাল অ্যান্ড অ্যাকটন আসন থেকে। রূপার বাবা-মা ১৯৬০ সালে বৃটেনে আসেন। ১৯৭২ সালে লন্ডনের হেমারস্মিথে জন্ম নেয়া রূপা ১৯৯১ সালে লেবার পার্টির সদস্য হন। তিনি একাধারে লেখক, কলামিস্ট, মিউজিক ডিজে। বৃটেনের শীর্ষস্থানীয়  দৈনিক গার্ডিয়ান, সানডে অবজারভার পত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখেন তিনি। ২০১০ সালে তিনি লন্ডনের ইলিং কাউন্সিলের ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ সালের নভেম্বরে তিনি লেবার পার্টির স্থানীয় সদস্যদের ভোটে পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়ন পান। রূপা হকের ছোট বোন কনি হক বিখ্যাত বিবিসি প্রোগ্রাম ব্লু পিটারের একজন জনপ্রিয় উপস্থাপিকা। তার আদি বাড়ি পাবনায়।
৪. মেরিনা আহমেদ
লন্ডনের বেকেনহাম আসনে লেবার পার্টি  থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জের  মেয়ে ব্যারিস্টার মেরিনা আহমেদ। মাত্র ৬ মাস বয়সে বাবা-মা’র সঙ্গে বৃটেনে আসেন মেরিনা। ওয়েস্ট সাসেক্সের ক্রাউলিতে ছোট চার ভাইয়ের সঙ্গে বেড়ে উঠেন। ইউনিভার্সিটি অব সারে থেকে ইংরেজি এবং ইতিহাসে স্নাতক মেরিনা আহমেদ সিটি ইউনিভার্সিটি থেকে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা করেন। পরবর্তীতে ইউনিভার্সিটি অব বাথ থেকে  ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের ওপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন ডিপ্লোমা করেন তিনি।  মেরিনার স্বামী ডা. মো. ইমরুল কয়েস পূর্ব লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল আলবিয়ন জিপি সার্জারিতে কাজ করছেন। দুই সন্তানের জননী মেরিনা আহমেদ দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে লেবার পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কেবিনেট অফিসে কাজ করার পাশাপাশি ক্রাউন প্রসিকিউশন টিমেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। নিজ আসনে বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডে তিনি যুক্ত।
৫. ব্যারিস্টার আনোয়ার বাবুল মিয়া
বৃটেনের নর্থহ্যামটন শহরে বেড়ে ওঠা ব্যারিস্টার আনোয়ার বাবুল মিয়া লন্ডনের ওয়েলউইন অ্যান্ড হার্টফিল্ড আসন থেকে   লেবার দলীয় প্রার্থী। তিনি লড়বেন কনজারভেটিভ দলের চেয়ারম্যান ও মন্ত্রী গ্র্যান্ট শ্যাপের সঙ্গে। ১৯৭২ সালে  সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার মিরপুর গ্রামে জন্ম নেয়া ব্যারিস্টার আনোয়ার বাবুল মিয়ার চেম্বার লন্ডনের বিখ্যাত চ্যান্সেরি লেইনে। তিনি ইউকে-বাংলাদেশ ক্যাটালিস্ট অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ইউকেবিসিসিআই)’র একজন পরিচালক।
৬. সুমন হক
স্কটল্যান্ডে জন্ম নেয়া সুমন হক স্কটল্যান্ডের এভারডিনশায়ারের বেনফ অ্যান্ড বুখান আসন থেকে লেবার দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। এভারডিন ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক সুমন প্রথম বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত প্রার্থী, যিনি স্কটল্যান্ডের আসন থেকে মনোনয়ন  পেলেন। দীর্ঘ ১০ বছর ধরে স্কটিশ  লেবার পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সুমন হকের দেশের বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতকে।
৭. আখলাকুল ইসলাম
লুটন শহরের বাসিন্দা ৩৮ বছর বয়সী আখলাকুল ইসলাম লুটনের রিগেইট অ্যান্ড  বেনস্ট্যাড আসনে চারজন প্রতিযোগীকে পরাজিত করে লেবার দলের প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছেন। তরুণ রাজনীতিবিদ আখলাকুল ইসলাম ১৯৬০ সালে পরিবারের সঙ্গে বৃটেনে আসেন। তিনি বৃটিশ রেডক্রস ও অন্যান্য স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশে তাদের বাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জে।
৮. এমরান হোসাইন
বৃটেনের নর্থ ইস্ট হ্যাম্পশায়ার আসন থেকে লেবার পার্টির প্রার্থী হয়েছেন এমরান হোসাইন। বৃটিশ আর্মির রিজার্ভ সদস্য ও ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এর ন্যাশনাল ডেলিভারি অফিসার এমরান হোসেন প্রায় ১০ বছর থেকে লেবার পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। চিকিৎসা শাস্ত্র নিয়ে অক্সফোর্ডে পড়াশুনা শেষে এখন রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়েও পড়াশুনা করছেন। এমরানের আদিনিবাস সিলেটের গোলাপগঞ্জে।
কনজারভেটিভ দলের এক প্রার্থী
৯. মিনা রহমান
কনজারভেটিভ দল থেকে লন্ডনের বার্কিং অ্যান্ড ডাগেনহাম আসনে মনোনয়ন  পেয়েছেন সিলেটের ছাতকে জন্ম নেয়া  মিনা রহমান। তিনি দলটির একমাত্র বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত প্রার্থী। মাত্র ২১ দিন বয়সে বাবা-মায়ের সঙ্গে বৃটেনে আসেন মিনা। বিখ্যাত মালবারী গার্লস স্কুলে শিক্ষা শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি  নেন তিনি। বর্তমানে পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস কমিউনিটি হাউজিং
 কোম্পানির ম্যানেজারের দায়িত্বে আছেন। দুই কন্যা ও দুই পুত্র সন্তানের জননী মিনা রহমান বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত।
১০. আশুক আহমদ এমবিই
লুটন সাউথ আসনে ডেমোক্রেট দলের প্রার্থী হয়েছেন আশুক আহমদ এমবিই। লুটন শহরের বাসিন্দা আশুক আহমদ ১৯৭৬ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পদে কাজ করা আশুক আহমদ ২০ বছরের বেশি সময় ধরে লিবারেল ডেমোক্রেট দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত আছেন। ২০০৯ সালে বৃটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ কর্তৃক সম্মানজনক ‘মেম্বার অব দ্যা অর্ডার অব দ্যা বৃটিশ অ্যাম্পায়ার’ (এমবিই) খেতাবে ভূষিত হন তিনি। আশুক আহমদের জন্ম সিলেটের বিয়ানীবাজারে।
১১. প্রিন্স সাদিক চৌধুরী
মাত্র দুই মাস বয়সে মা-বাবার সঙ্গে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান প্রিন্স সাদিক  চৌধুরী। এবার তিনি নর্থহ্যাম্পটন সাউথ আসনে লিবারেল ডেমোক্রেট দলের হয়ে বৃটিশ পার্লামেন্ট নির্বাচনে এমপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ২০০৭ সালে নর্থহ্যাম্পটনশায়ার কাউন্সিল নির্বাচনে প্রথম কোন বাংলাদেশী হিসেবে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন তিনি। ১৯৭৩ সালে সিলেটে জন্ম নেয়া প্রিন্স সাদিক পেশায় একজন ব্যবসায়ী। ব্যবসার পাশাপাশি কমিউনিটি অ্যাক্টিভিস্ট প্রিন্স সাদিক ওয়েস্ট নর্থহ্যামটন শায়ার  ডেভেলপমেন্ট করপোরেশনের কমিটি  মেম্বার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। প্রিন্স সাদিক চৌধুরীর বাড়ি সুনামগঞ্জের ছাতকে।
১২.  মোহাম্মদ সুলতান
সিলেটের দক্ষিণ সুরমায় জন্ম মোহাম্মদ সুলতানের। তরুণ বয়সে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। স্থানীয় বেনগোর সিটি কাউন্সিলের কাউন্সিলর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এবারের জাতীয় নির্বাচনে তিনি ওয়েলসের আরফন আসন থেকে লিবারেল ডেমোক্রেট দলের প্রার্থী হয়েছেন। পেশায় তিনি একজন সফল  রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী।

নতুন ইতিহাসের পথে হিলারি

দীর্ঘদিনের জমে থাকা জল্পনার অবসান হলো। দৃপ্তকণ্ঠে হিলারি রডহ্যাম ক্লিনটন ঘোষণা দিলেন- আমি আরও অনেক কিছু করার জন্য প্রস্তুত। আমি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করতে চাই। তার এই এক ঘোষণায় বিশ্বজুড়ে মিডিয়ায় যেন ঝড় বয়ে গেল। কে কার আগে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে এটা উপস্থাপন করতে পারে তা নিয়ে যেন প্রতিযোগিতা। হিলারির সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যে যেন প্রাণচঞ্চল হয়ে ওঠে। গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী পত্রিকা নিউ ইয়র্ক টাইমস লিখেছে, নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার প্রচণ্ড সুযোগ রয়েছে হিলারির। হিলারি ক্লিনটন বললেন, প্রতিদিনই আমেরিকানদের জন্য প্রয়োজন একজন চ্যাম্পিয়নের। আমি হতে চাই সেই চ্যাম্পিয়ন। মাসের পর মাস বলা যায় বারাক ওবামা প্রথম দফায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সময় থেকেই জোর গুঞ্জন শুরু হয় যে, হিলারি ক্লিনটন ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হবেন। সেই দীর্ঘ প্রতিক্ষার অবসান ঘটালেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় রোববার বিকাল ৩টায় তার ওই ঘোষণা সংবলিত ২ মিনিট ১৮ সেকেন্ডের ভিডিও বার্তা প্রকাশ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নতুন এক সমীকরণ এসে ভর করেছে। যদি তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন তাহলে সেটা হবে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের জন্য এক নতুন মাইলফলক। কারণ, তিনিই হবেন দীর্ঘ ইতিহাসের আমেরিকার প্রথম কোন নারী প্রেসিডেন্ট। স্বামী ও সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনকে নিয়ে পুরনো স্ক্যান্ডাল রয়েছে, নিজে পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকা অবস্থায় ই-মেইল নিয়ে কথিত কেলেঙ্কারি থাকলেও হিলারির রয়েছে অন্য রকম এক জনপ্রিয়তা। নারী প্রার্থী হিসেবে দলমত নির্বিশেষে তার প্রতি সহানুভূতি রয়েছে সর্বমহলের। তবু হিসেবি হিলারি। তিনি কোন পক্ষকে খেপাননি। সবার জন্যই বক্তব্য রেখেছেন। তার স্বামী ১৯৯১ সালে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি আমেরিকানদের স্বপ্নকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন। বিশেষ করে যে মধ্যবিত্তের কথা সবাই ভুলে থাকে তাদের কাছে তার ওই প্রতিশ্রুতি ছিল জোরালো। অনেক ভোটারের ধারণা রয়েছে যে, মধ্যবিত্তের হওয়ায় তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। সেই ধারণাকে পাল্টে দিতে চান হিলারি। প্রত্যাশা করা হচ্ছে তিনি নিজের সেরাটা দিয়ে সেই ধারণা পাল্টে দেবেন। তিনি মধ্যবিত্ত শব্দটি ব্যবহার না করে তার পরিবর্তে ব্যবহার করছেন ‘প্রতিটি দিন আমেরিকানদের’। হিলারি তার নির্বাচনী প্রচারণার ওয়েবসাইটটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করেন রোববার। ওই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা সংবলিত ভিডিও-বার্তা। তাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার লক্ষ্যে প্রার্থী হওয়ার লড়াইয়ে নিজের নাম ঘোষণা করেন। ২০০৮ সালে ডেমোক্রেট দলের প্রেসিডেন্ট মনোনয়নের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শীর্ষপর্যায়ের রাজনীতিতে খুব অচেনা মুখ বারাক ওবামার কাছে হেরে বিদায় নেন তিনি। কিন্তু, হিলারির যোগ্যতা নিয়ে কোন প্রশ্ন ছিল না মার্কিনিদের মধ্যে। সফলভাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের কারণে তার জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। তাই তিনি নতুন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থিতা ঘোষণা করবেন, এমনটাই প্রত্যাশা করছিলেন হিলারি সমর্থকরা। অবশেষে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে তিনি ঘোষণা দিয়ে ভিডিও-বার্তাটি পোস্ট করেন। ওই ভিডিওতে কয়েকজন মার্কিনিকে তাদের আশা ও আকাঙ্ক্ষার কথা বলতে দেখা গেছে। হিলারি সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার সফল বাস্তবায়ন ঘটানোর প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। ভিডিওটির শেষ দিকে হিলারি বলেন, তাই আমি আপনাদের ভোট অর্জনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামছি। কারণ, এটা আপনাদের সময় এবং আমি আশা করি আপনারা আমার এ যাত্রায় যোগ দেবেন। এ সপ্তাহে আইওয়া থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করবেন হিলারি। এদিকে এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাও হিলারি ক্লিনটনের প্রার্থিতায় তার পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করেছেন। ওদিকে আগামী মাসে আরও আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে হিলারি তার প্রচারণা শুরু করবেন।

চালকবিহীন ট্রেন এবং by সাজেদুল হক

আনোয়ার হোসেনকে অভিনন্দন। তার বুদ্ধিমত্তা আর প্রচেষ্টার ফলে রক্ষা পেয়েছে ফরিদপুর এক্সপ্রেস। চালকবিহীন ট্রেনটি ২৬ কিলোমিটার উল্টোপথে চলার পর তা থামাতে সক্ষম হন তিনি। একদিকে চালক ও তার সহকারীর খামখেয়ালিপনা। অন্যদিকে, টিকিট পরীক্ষক আনোয়ার হোসেনের সাহস ও বুদ্ধিমত্তা। একশ’র মতো যাত্রীর বেঁচে যাওয়া।
এ নিয়ে আলোচনা চলছে সর্বত্র। বিস্মিত সবাই। চালক ছাড়া কিভাবে উল্টোদিকে চলতে পারে ট্রেন? এর চেয়েও বড় প্রশ্ন আলোচিত হচ্ছে বাংলাদেশে এখন আর কী কী জিনিস এমন চালক ছাড়া উল্টোপথে চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির  রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রীয়াজ যেমনটা লিখেছেন, ‘একটি ট্রেন চালকবিহীন অবস্থায় রাজবাড়ী থেকে ফরিদপুরের দিকে না গিয়ে পেছনের দিকে কুষ্টিয়ার দিকে যাত্রা শুরু করলে ২৬ কিলোমিটার পথ যাবার পর ট্রেনটিকে থামানো গেছে। আর কী কী জিনিস চালকবিহীন অবস্থায় উল্টোপথে যাচ্ছে কে জানে। যাত্রীরা টের পাচ্ছেন কিনা তাই বা বুঝি কী করে?’
বাংলাদেশে কী কী জিনিস এমন উল্টো দিকে চলেছে, চলছে তার ফর্দ তৈরি করা কঠিন। বিশ্লেষকরা একটি ব্যাপারে একমত মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশে গত চার দশকে কোন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেনি। এসব প্রতিষ্ঠান ক্রমশ উল্টোদিকেই যাত্রা করেছে। আর প্রতিষ্ঠানহীনতার কারণেই রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে অবিশ্বাস আর হিংসা। দুই দশক আগে সংসদীয় গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছিল দেশ। সে যাত্রা মসৃণ ছিল না। কিন্তু গণতন্ত্র হয়তো উল্টোপথের যাত্রীও ছিল না। এখনকার অবস্থা অবশ্য বলা সম্ভব নয়। কিন্তু উল্টোপথের ট্রেন থামানোর জন্য আনোয়ার হোসেনের মতো কেউ কি আছেন? নাকি ট্রেনটি কিলোমিটারের পর কিলোমিটার উল্টোপথেই চলতে থাকবে?
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এখানে আনোয়ার হোসেনের মতো কেউ নেই। বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে বসে উইলিয়াম বি মাইলামও বুঝতে পারছেন, বাংলাদেশ ক্রমশ একটি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। আর গত তিন মাসে বাংলাদেশে বিরোধী শক্তির আরও দুর্বল হয়ে পড়ার চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে। বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০দলীয় জোটেও টানাপড়েন বেড়েছে। পর্দার আড়ালে বিএনপির সঙ্গে দূরত্ব বাড়ছে জামায়াতের। বিএনপির নেয়া সর্বশেষ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলোতে জামায়াতের কোন অংশীদারিত্ব নেই বলে দলটির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। পশ্চিমা দুনিয়ার একটি অংশ এরআগে বিএনপিকে জামায়াত ত্যাগের পরামর্শ দিয়েছিল। সরকারও জামায়াত ত্যাগ করার জন্য নানাভাবে বিএনপির ওপর চাপ প্রয়োগ করে আসছে। এ অবস্থায় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া বারবার বলে আসছিলেন, জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির কোন আদর্শিক মিল নেই। এটি একটি নির্বাচনী জোট। জামায়াতের সঙ্গে সরকারের ভেতরে ভেতরে সমঝোতা নিয়েও এরআগে একাধিকবার বিএনপির পক্ষ থেকে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল। সর্বশেষ সরকারবিরোধী আন্দোলনে জামায়াত পুরো শক্তি নিয়ে রাস্তায় ছিল না বলেও মনে করেন বিএনপির কেউ কেউ। তবে এখন জামায়াতের অনেকে মনে করেন, সরকারের সঙ্গে বিএনপির এক ধরনের সমঝোতা হয়েছে। যেখানে জামায়াতকে পুরোপুরি অন্ধকারে রাখা হয়েছে। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রার্থী নিয়েও দল দু’টির মধ্যে কোন ধরনের আলোচনা হয়নি।
সর্বশেষ মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর জামায়াতের অভ্যন্তরেও নতুন করে নানা আলোচনা চলছে। কামারুজ্জামান একাধিকবার সংস্কারের জন্য জামায়াতকে পরামর্শ দিলেও দলটি সে পরামর্শ গ্রহণ করেনি। অনেকে তার বিরুদ্ধে দলভাঙার চেষ্টার অভিযোগও এনেছিলেন। কিন্তু জামায়াতের তরুণ নেতৃত্বের ওপর কামারুজ্জামানের একধরনের প্রভাব রয়েছে। দলটির ওই অংশ এখন মনে করে, বিএনপির সঙ্গে জোট করে জামায়াতের আদতে কোন লাভ হচ্ছে না। এমনকি জাতিসংঘ থেকেও জামায়াতের ব্যাপারে বিএনপি নীরব ভূমিকা পালন করছে। সব কুল রক্ষা করতে গিয়ে জামায়াত কোন কুলই রক্ষা করতে পারছে না বলে মনে করেন ওই অংশের নেতারা। এ অবস্থায় সামনের দিনগুলোতে জামায়াতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং বিএনপির সঙ্গে দলটির সম্পর্ক আরও জটিল হবে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা।
সাজেদুল হক
১৩ই এপ্রিল ২০১৫
ঢাকা

মুসলিমদের পরিবারগুলোকে ছোট করতেই হবে : শিবসেনা

শিবসেনা নেতা উদ্ধব ঠাকরে
ভারতে মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের পরিবার পরিকল্পনা করার পরামর্শ দিয়ে আবার নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে মহারাষ্ট্রের হিন্দুত্ববাদী দল শিবসেনা। দলের মুখপত্র সামনায় তারা বলেছে, ‘মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা হিন্দুদের জন্য একটা বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছে’।
মাত্র দুদিন আগেই এই সামনা-তে শিবসেনার সিনিয়র নেতা সঞ্জয় রাউত লিখেছিলেন ভারতে মুসলিমদের নিয়ে ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি বন্ধ করতে হলে মুসলিমদের ভোটাধিকারই কেড়ে নেয়া উচিত।
তার সেই মন্তব্য নিয়ে তুমুল প্রতিবাদ ও সমালোচনা শুরু হওয়ার পর মি রাউত অবশ্য কিছুটা পিছু হঠে তখন বলতে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁর মন্তব্যকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
তবে আজকের সামনা-র সম্পাদকীয়তে যে প্রস্তাব করা হয়েছে তাতে ভুলবোঝাবুঝির অবকাশ কম। শিবসেনা নেতৃত্ব সেখানে পরিষ্কার বলেছে মুসলিম পরিবারগুলোকে যদি ‘সুখী ও স্বাস্থ্যবান’ হতে হয় তাহলে সেগুলোর আকার ছোট করতেই হবে।
মুসলিমদের জোর করে ‘নাসবন্দী’ (নির্বীজকরণ) করানো উচিত বলে সম্প্রতি কট্টর দক্ষিণপন্থী সংগঠন হিন্দু মহাসভার নেত্রী সাধ্বী দেবা ঠাকুর যে মন্তব্য করেছেন শিবসেনার সম্পাদকীয়তে টেনে আনা হয়েছে সে প্রসঙ্গও।
শিবসেনা বলেছে, ‘তার নাসবন্দী কথাটা ব্যবহার করা উচিত হয়নি – বলা উচিত ছিল পরিবার পরিকল্পনা। তবে পরিবার পরিকল্পনা আর জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ আসলে একই জিনিস, যেটা অবিলম্বে এদেশের মুসলিম ও খ্রীষ্টানদের চালু করা দরকার।’
‘তবে জোর করে রাস্তার কুকুরদেরও কিন্তু নির্বীজকরণ করা যায় না – মানেকা গান্ধী তখন তাদের হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েন। পরে সেই কুকুরই কিন্তু মানুষকে কামড়ায়’, বলা হয়েছে ওই সম্পাদকীয়তে।
দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বার্থেই তাদের পরিবার পরিকল্পনার উপর জোর দেয়া উচিত, এই পরামর্শ দিয়ে শিবসেনা ভারতের মুসলিমদের উদ্দেশে বলেছে ‘পরিবার ছোট হলে তারা নিজেদের ছেলেমেয়েকে ঠিকমতো খাওয়াতে ও পড়াশুনো করাতে পারবে – তাদের জীবনের মানও হবে উন্নততর’।