Monday, December 19, 2016

জর্ডানে গুলিতে কানাডীয় পর্যটকসহ নিহত ১০

জর্ডানে কয়েকজন বন্দুকধারীর গুলিতে কানাডীয় পর্যটক, পুলিশসহ ১০ জন নিহত হয়েছেন। নিরাপত্তাকর্মীদের গুলিতে চার হামলাকারীও নিহত হয়। স্থানীয় সময় গতকাল রোববার কয়েক ঘণ্টা ধরে জিম্মি নাটক চলে। এএফপির খবরে জানা যায়, দেশটির রাজধানী আম্মান থেকে ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে কারাক এলাকার ঐতিহাসিক একটি দুর্গের ভেতর এ ঘটনা ঘটে। হামলায় প্রাথমিকভাবে কোনো জঙ্গি দলের সংশ্লিষ্টতার খবর পাওয়া যায়নি। জর্ডানের নিরাপত্তা বিভাগ বলছে, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সাতজন পুলিশ সদস্য,
কানাডীয় এক নারী পর্যটক ও জর্ডানের দুজন সাধারণ নাগরিক রয়েছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২৭ জন। তাঁদের মধ্যে পুলিশ ও সাধারণ মানুষ রয়েছেন। তাঁরা স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নিরাপত্তা বাহিনীর একটি সূত্র বলছে, হামলাকারীরা তাদের জিম্মি করে রাখে। কয়েক ঘণ্টা ধরে হামলাকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তাকর্মীদের গুলিবিনিময় চলে। এতে চার হামলাকারী নিহত হয়। কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দেশটির একজন নাগরিক নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে। হামলায় আরেক কানাডীয় আহত হয়েছেন।

আজ মার্কিন প্রেসিডেন্ট বেছে নেবেন নির্বাচকেরা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের বিজয়ী প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য আজ সোমবার এক গুরুত্বপূর্ণ দিন। মার্কিন নির্বাচনের ব্যতিক্রমধর্মী নিয়ম অনুসারে ৫৩৮ জন ইলেকটর বা নির্বাচক ১৯ ডিসেম্বর দেশজুড়ে কংগ্রেস ভবনগুলোয় ভোট দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে থাকেন। দীর্ঘদিন ধরেই ইলেকটোরাল কলেজ বা নির্বাচকমণ্ডলীর ভোট নিছক একটা আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হলেও ৮ নভেম্বরের ভোটে ট্রাম্পের অপ্রত্যাশিত বিজয় এ পদ্ধতিকে আবার আলোচনায় নিয়ে এসেছে। মার্কিন নির্বাচনে রুশ হস্তক্ষেপের অভিযোগ সেই আলোচনাকে করেছে জোরদার। ৮ নভেম্বরের নির্বাচনে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে হিলারি ক্লিনটন বেশ এগিয়ে থাকলেও অধিকাংশ ইলেকটোরাল ভোট জিতে নেওয়ায় ডোনাল্ড ট্রাম্প অপ্রত্যাশিতভাবে জিতে যান।
আজ সেই নির্বাচকেরা ঠিকমতো নিজ নিজ দলের প্রার্থীর পক্ষে ভোট দিলে ট্রাম্প পাবেন ৩০৬ ভোট, যা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে প্রয়োজনীয় ২৭০-এর চেয়ে অনেক বেশি। তবে ট্রাম্পের জন্য শঙ্কার বিষয় হলো, তাঁর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নির্বাচক ‘বিদ্রোহ’ করে বসলে দৃশ্যপট পাল্টে যেতে পারে। পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, তাঁদের বেশ কয়েকজন এ ধরনের ইঙ্গিতও দিয়েছেন। নির্বাচনে রুশ সরকার ট্রাম্পকে জেতাতে কলকাঠি নেড়েছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তত ৬৭ জন নির্বাচক এ বিষয়ে আরও তদন্ত দাবি করেছেন। এবারের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের ১৩ কোটি ৬০ লাখের বেশি ভোটার রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্প ও ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিলারিকে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি দেশজুড়ে অঙ্গরাজ্যগুলোতে দলীয় মনোনয়ন পাওয়া ৫৩৮ জন ইলেকটর বা নির্বাচককে বেছে নিয়েছেন। যে প্রার্থী কোনো অঙ্গরাজ্যের সাধারণ জনগণের ভোট (পপুলার ভোট) বেশি পাবেন, তিনিই ওই অঙ্গরাজ্যের সব ইলেকটোরাল কলেজ বা নির্বাচকদের ভোট পেয়ে যান। হিলারির ঝুলিতে রয়েছে ২৩২টি ইলেকটোরাল ভোট। ট্রাম্পের ইলেকটরদের মধ্যে ৩৮ জন তাঁর বিরুদ্ধে গিয়ে হিলারিকে সমর্থন দিলে জানুয়ারিতে তিনিই যুক্তরাষ্ট্রের ৪৫তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন। এরই মধ্যে ক্রিস্টোফার সাপরান নামে রিপাবলিকান দলের একজন নির্বাচক নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেছেন, তিনি তাঁর দলের প্রার্থী ট্রাম্পকে সমর্থন দেবেন না। আরও কয়েকজন রিপাবলিকান নির্বাচক ট্রাম্পকে ভোট দেবেন না বলে জানিয়েছেন। এ ছাড়া ‘হ্যামিলটন ইলেকটর’ হিসেবে পরিচিত কিছুসংখ্যক রিপাবলিকান নির্বাচকের সঙ্গে জোট বেঁধেছেন ডেমোক্র্যাট নির্বাচকেরা। ‘হ্যামিলটন ইলেকটররা’ ট্রাম্পের পরিবর্তে অন্য কাউকে ভোট দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
আজকের ইলেকটোরাল কলেজ ভোটে তিন ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে। প্রথমত, ট্রাম্প তাঁর কাঙ্ক্ষিত ভোট পেয়ে বিজয়ী হবেন। দ্বিতীয়ত, রিপাবলিকান নির্বাচকদের বেশ কয়েকজন ট্রাম্পের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন, যার ফলে হিলারি জিতে যেতে পারেন। তৃতীয়ত, কোনো প্রার্থীই যদি ন্যূনতম ২৭০টি ভোট নিশ্চিত না করতে পারেন, তাহলে ন্যূনতম ২৬টি অঙ্গরাজ্যে বিজয়ী প্রার্থী হবেন প্রেসিডেন্ট। এ ক্ষেত্রেও বিষয়টা অমীমাংসিত থেকে গেলে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অঙ্গরাজ্যগুলোর কংগ্রেসে ভোট হবে। ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত দফায় দফায় ভোট হওয়ার পরও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা না গেলে নবনির্বাচিত ভাইস প্রেসিডেন্ট ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন। তবে ট্রাম্পের জন্য সুসংবাদ হলো, ইলেকটোরাল ভোট পদ্ধতির সংস্কার চাওয়া সংগঠন ফেয়ারভোটের তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এ পর্যন্ত মাত্র ১৫৭ জন নির্বাচক বিদ্রোহ করেছেন। তাঁদের আবার অর্ধেকই নিজ দলের প্রার্থীর মৃত্যুর পরিপ্রেক্ষিতে অন্য একজনকে ভোট দিয়েছিলেন। ১৮৭২ সালের নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী হোরাস গ্রিলি বিজয়ী হওয়ার পর ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের আগেই মারা যান। সে সময় এই দলের নির্বাচকেরা নিজ দলের অপর একজন প্রার্থীকে ভোট দেন। ৬৭ জন নির্বাচকের দাবি: নির্বাচনে রুশ সরকার ট্রাম্পকে জেতাতে হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে কলকাঠি নেড়েছে বলে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তত ৬৭ জন নির্বাচক আরও তদন্ত দাবি করেছেন। সিআইএর তদন্তের তথ্যমতে, রুশ সরকারের সমর্থনে হ্যাকাররা ডেমোক্রেটিক দলের প্রার্থী হিলারির কয়েকজন নির্বাচনী কর্মকর্তার কম্পিউটার হ্যাক করে তথ্য চুরি করেছিল। তবে এই ৬৭ জন নির্বাচকের একজন বাদে বাকি সবাই ডেমোক্রেটিক দলের।
মাইকেল মুরের আহ্বান: বিকল্পধারার চলচ্চিত্র নির্মাতা মাইকেল মুর ট্রাম্পকে ঠেকাতে দেশজুড়ে বিক্ষোভ, প্রতিরোধ, বিপর্যয় সৃষ্টি এবং গণ-অবরোধের আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন স্যাটেলাইট টেলিভিশন নেটওয়ার্ক এমএসএনবিসির গত শুক্রবারের ‘অল ইন’ অনুষ্ঠানে তিনি এই আহ্বান জানান। এ সময় মুর বলেন, হোয়াইট হাউসে প্রবেশের কোনো অধিকার ট্রাম্পের নেই।

লোকজন সরাতে গড়িমসিতে ক্ষোভ

সিরিয়ার অবরুদ্ধ জনপদ আল ফুয়া ও কেফরায়া থেকে
অসুস্থ ও আহত লোকজনকে সরিয়ে নিতে যাওয়া দুটি
বাসে আগুন জ্বলছে। পথে ইদলিব প্রদেশে বাসগুলোর
ওপর হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। রয়টার্স
সিরিয়ার যুদ্ধবিধ্বস্ত আলেপ্পো থেকে বিদ্রোহী ও আটকে পড়া বেসামরিক লোকদের বের হতে দেওয়া নিয়ে গড়িমসি চলছেই। এতে অসুস্থ ও নারী-শিশুসহ সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে আটকে পড়া মানুষ। এমন প্রেক্ষাপটে অবরুদ্ধ আলেপ্পোর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতে সেখানে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক দল পাঠানো হবে কি না, সে বিষয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ভোটের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববারই এ ভোট হওয়ার কথা ছিল। সেনাবাহিনী ও বিদ্রোহীদের দুটি সূত্র বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানায়, লোকজনকে সরে আসার সুযোগ করে দিতে দুই পক্ষে শেষ পর্যন্ত একটি চুক্তি হয়েছে। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, লোকজনকে সরিয়ে নিতে অনেক বাস আলেপ্পোর বিভিন্ন এলাকায় ঢুকতে শুরু করেছে। প্রায় ১০০ বাস এ জন্য প্রস্তুত আছে। তবে ফুয়া ও কেফরায়া এলাকায় ঢোকা কিছু বাসে আগুন দেয় বন্দুকধারীরা। এএফপির এক সাংবাদিক জানান, প্রায় ২০টি বাস থেকে চালকদের নামিয়ে দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু সেনাবাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বাসে আগুন দেওয়ার এ ঘটনা লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় অন্তরায় হবে না। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য ফ্রান্স এক প্রস্তাবে বলেছে, আলেপ্পোর লাখো মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে। বিদ্রোহী যোদ্ধা ও বেসামরিক লোক সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ এবং বেসামরিক লোকদের নিরাপত্তার ওপর নজর রাখতে একটি পর্যবেক্ষক দল পাঠানো দরকার।
এ প্রস্তাবের ওপর গতকাল ভোট হওয়ার কথা। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের মিত্রদেশ আরেক স্থায়ী সদস্য রাশিয়া প্রস্তাবটির ব্যাপারে ভেটো দেবে বলে জানিয়ে​ দিয়েছে। ২০১১ সালে সিরিয়া সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে  নিরাপত্তা পরিষদে উত্থাপিত ছয়টি প্রস্তাব মস্কো ভেটো দিয়ে আটকে দিয়েছে। শনিবার আলেপ্পোর বহু লোক গরম কাপড় ছাড়াই খোলা আকাশের নিচে রাত কাটিয়েছে। সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম শুরু করতে দেরি হওয়ায় অনেককেই বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে দেখা যায়। ফ্রান্সের প্রস্তাবের খসড়ায় সিরিয়ায়, বিশেষ করে আলেপ্পোয় চিকিৎসক, হাসপাতাল এবং রোগীবা​হী গাড়ির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়।  গত বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত সিরিয়ার সরকারি বাহিনী হাজার ছয়েক লোককে এত দিন বিদ্রোহীদের দখলে থাকা পূর্ব আলেপ্পো থেকে বের হতে দিয়েছিল। শুক্রবার সকালে পথ আটকে দিয়ে সরকারি বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হয়, বিদ্রোহীরা সন্ধির শর্ত ভেঙে ভারী অস্ত্র ও জিম্মিদের নিয়ে সটকে পড়ার চেষ্টা করায় তারা আবার পথ বন্ধ করে দিয়েছে। সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী আলেপ্পোর পূর্ব অংশ কয়েক বছর ধরে বিদ্রোহীদের দখলে ছিল। সম্প্রতি সরকারি বাহিনী বড় ধরনের অভিযান চালিয়ে নগরের প্রায় পুরোটাই নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

আলেপ্পোতে পুতিনেরই জয় হলো?

বাশার আল-আসাদের হাতকে শক্তিশালী করতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন গত বছর সিরিয়ায় যখন ক্রেমলিনের সমরাভিযানের সূচনা করেন, তখন বাশার ছিলেন চরম কোণঠাসা। আইএস, পশ্চিমা সমর্থনপুষ্ট বিদ্রোহী, কুর্দি বাহিনী—এ রকমের বিভিন্ন শক্তি চারদিক থেকে প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের অনুগতদের ঘিরে ফেলছিল। বাশারের পতন আসন্ন মনে করে পশ্চিমা শক্তিগুলো সিরিয়ার পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হবেন, নতুন সরকারে কোন পক্ষের কতটুকু অংশীদারি সে ভাগ-বাঁটোয়ারাও প্রায় ঠিকঠাক করে ফেলেছিল। কিন্তু বাশারবিরোধীদের আশার আগুনে জল ঢেলে দৃশ্যপটে হাজির হন পুতিন। তাঁর নির্দেশে লাগাতার বিমান হামলা চলতে থাকায় একের পর এক এলাকার নিয়ন্ত্রণ হারাতে থাকে বিদ্রোহীরা। এখন বিদ্রোহীদের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি পূর্ব আলেপ্পোর পতনের আনন্দ উদ্‌যাপন করছে দামেস্ক। পাঁচ বছর আগে এই এলাকার দখল নেওয়া বাশারবিরোধীরা প্রাণ বাঁচানোর জন্য মরিয়া। আলেপ্পো পুনর্দখলের এই বিষয়টিকে বাশার আল-আসাদ গৃহযুদ্ধ অবসানের একটি ‘বৃহৎ পর্যায়’ বলে অভিহিত করেছেন। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, প্রকৃত অর্থে এই জয় যতখানি না বাশারের, তার চেয়ে অনেক বেশি পুতিনের। মস্কোর কার্নেগির সেন্টারের বিশ্লেষক আলেক্সি মালাশেঙ্কো বলেন, ‘রাশিয়ার সহায়তা ছাড়া আলেপ্পোতে কোনো অগ্রগতি অর্জন সম্ভব ছিল না। আলেপ্পোর ওপরই সব পক্ষের দৃষ্টি ছিল।’ মস্কো বরাবরই বলে এসেছে তারা সেখানে পদাতিক সেনা পাঠায়নি। তবে প্রেসিডেন্ট বাশারের অনুগত পদাতিক বাহিনীকে তারা সামরিক পরামর্শ ও বিমান অভিযানে সহায়তা দিয়েছে। তবে মালাশেঙ্কো মনে করেন, বাশার বাহিনীকে রাশিয়া পরামর্শের চেয়েও বেশি কিছু দিয়েছে।
বিশেষত, আলেপ্পোতে একজন রুশ ট্যাংক কমান্ডারের নিহত হওয়ার খবর সে রকমই আভাস দেয়। এই বিশ্লেষক মনে করেন, আলেপ্পোতে রাশিয়ার সামরিক উপস্থিতি বাশার আল-আসাদকে এ বিষয়টি মোটামুটি নিশ্চিত করতে পেরেছিল যে সেখানে পশ্চিমা বাহিনীর প্রত্যক্ষ উপস্থিতি থাকবে না। রাশিয়া পর্যায়ক্রমে সেখানে বিমান হামলা তীব্র করেছে এবং সর্বশেষ সেখানে একটি রণতরীও পাঠিয়েছে। পুতিনের এই আলেপ্পো অভিযান তাঁর ১৯৯৯-২০০০ সালের চেচনিয়ার রাজধানী গ্রোজনিতে চালানো রক্তক্ষয়ী অভিযানের কথা মনে করিয়ে দেয়। আলেপ্পো জয়কে রাশিয়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের জন্য এক বড় জয় বলে মনে করতেই পারে। ওয়াশিংটন ও অন্য পশ্চিমাদের সমর্থনপুষ্ট বিদ্রোহীদের পরাজিত করার মূল অনুঘটক হিসেবে কাজ করায় মস্কোর সঙ্গে যে পশ্চিমাদের সম্পর্কের অবনতি হবে, তা নিশ্চিত। কিন্তু এর বিপরীতে পুতিন পেয়েছেনও অনেক। এ মুহূর্তে তিনি সিরিয়ার একচ্ছত্র ‘কিং মেকার’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। পুরো মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতির মাঠেও তিনি অন্যতম খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন। আলেপ্পো নিয়ে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে সরাসরি আলাপ-আলোচনা করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপকে তিনি পাশ কাটিয়ে গেছেন। এ কারণে পশ্চিমারা পুতিনের ওপর প্রথম থেকেই নাখোশ। রাশিয়ার সামরিক বিশেষজ্ঞ আলেকসান্দার গোল্টস বলেছেন, রাশিয়ার সিরিয়া অভিযানের প্রধান লক্ষ্য হলো পশ্চিমাদের পুতিনের সঙ্গে কথা বলতে বাধ্য করা। তিনি মনে করেন, আলেপ্পো জয়ের ফলস্বরূপ রাশিয়া এখন সিরিয়া ইস্যুতে পশ্চিমাদের থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এ অবস্থা সামাল দেওয়াই এখন পুতিনের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

নতুন সেনাপ্রধান নিয়ে ভারতে বিতর্ক

ভারতের নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিরোধী দল কংগ্রেস ও বামফ্রন্ট দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে উপপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল বিপিন রাওয়াতকে সেনাপ্রধান করার ক্ষেত্রে সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। কংগ্রেসের মুখপাত্র মনীশ তিওয়ারি বলেছেন, তাঁদের দল লে. জে. রাওয়াতের সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছে না। তবে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে তালিকার চার নম্বরে থাকা কর্মকর্তাকে সেনাপ্রধান করা হলে প্রশ্ন ওঠেই। তিওয়ারি প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘তাহলে কি যাঁদের ডিঙিয়ে যাওয়া হয়েছে, তাঁরা যথেষ্ট সক্ষম নন, নাকি পছন্দের ভিত্তিতে কাউকে বেছে নেওয়া হয়েছে?’ তিওয়ারি বলেন, এ ধরনের ঘটনা এবারই প্রথম নয়। এ প্রসঙ্গে তিনি চিফ ভিজিল্যান্স অফিসার (সিভিসি) নিয়োগ, দুর্নীতির ওপর নজরদারি করা প্রতিষ্ঠান ইডির পূর্ণকালীন পরিচালক ‘নিয়োগ না করা’র কথা উল্লেখ করেন। সিপিআই নেতা ডি রাজা বলেন,
সেনাবাহিনী এবং সিভিসিসহ বিভিন্ন শীর্ষ সরকারি পদে নিয়োগ বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। এটা খুব দুর্ভাগ্যজনক। ডি রাজা আরও বলেন, সেনাবাহিনী গোটা দেশের। কীভাবে এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সরকারকে সে প্রশ্নের জবাব দেওয়া উচিত। জ্যেষ্ঠ এ বাম নেতা আরও বলেন, দেশবাসীকে এ বিষয়ে সন্তুষ্ট করতে হবে। ক্ষমতাসীন বিজেপি এ সমালোচনার পাল্টা জবাব দিয়ে বলেছে, নতুন সেনাপ্রধান নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রশ্ন তোলা দেশপ্রেমের পরিচায়ক নয়। দলটির মুখপাত্র জি ভি এল নরসীমা রাও বলেন, ‘এ ধরনের মন্তব্য সশস্ত্রবাহিনীর নৈতিক মনোবলকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আমরা সশস্ত্রবাহিনীকে রাজনীতিতে টেনে আনার চেষ্টার নিন্দা জানাই।’ সরকারি সূত্র বলেছে, ভারতের চলমান চ্যালেঞ্জ, যেমন: আন্তসীমান্ত সন্ত্রাস, পশ্চিম সীমান্তের ‘ছায়াযুদ্ধ’ ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পরিস্থিতি মাথায় রেখে বিপিন রাওয়াতকে নিয়োগ করা হয়েছে। কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখা, চীন সীমান্তসহ বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে তাঁর তিন দশক কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।

ক্যামেরায় ধরা পড়ল ‘ভুতুড়ে’ হাঙর

নামটা গ্রিক পুরাণের সেই ‘কাইমেরা’র সঙ্গে মিলে যায়। মানে ভুতুড়ে হাঙর। অদ্ভুত বৈশিষ্ট্যের বিরল এই জলজ প্রাণী নিয়ে অনেক রহস্য আছে। সাগরের অনেক গভীরে এদের বাস। চোখ জোড়া ভাবলেশহীন, যেন মৃত। দাঁতগুলো যেখানে থাকার কথা, সেখানে নেই। মাথার গঠনও অন্য রকম। যেন পুরোনো ভোঁতা কোনো সুচের অবশেষ। পুরুষ কাইমেরার জননাঙ্গ থাকে কপালে! যুক্তরাষ্ট্রের একদল বিজ্ঞানী দাবি করছেন, তাঁরা এই প্রথম কাইমেরার একটি পূর্ণাঙ্গ ভিডিও চিত্র ধারণ করেছেন। এটা ২০০৯ সালের। মনটেরি বে অ্যাক্যুরিয়াম রিসার্চ ইনস্টিটিউট সম্প্রতি তা প্রকাশ করেছে। প্রকাশ করা হয়েছে একটা গবেষণাপত্রও। প্রাণিবিজ্ঞানী লোনি লান্ডস্টেন ও তাঁর সহযোগীরা এটি লিখেছেন।
ছয় বছর আগে গবেষকেরা দূরনিয়ন্ত্রিত একটি যানের সাহায্যে ক্যালিফোর্নিয়া ও হাওয়াইয়ের মাঝামাঝি প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর থেকে প্রাণীটির ছবি তোলেন। সাগর ওই জায়গায় প্রায় ৬ হাজার ৭০০ ফুট গভীর। গবেষকেরা আশ্চর্য হয়ে দেখতে পান, ভিডিওর ছবিটি এক অদ্ভুতুড়ে হাঙরের। কেবল প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ-পশ্চিমেই একে দেখা গিয়েছিল। তবে প্রাণীটা আসলেই কাইমেরা কি না, সে বিষয়ে তখনো প্রাণিবিজ্ঞানী লান্ডস্টেন ও তাঁর সহযোগীরা শতভাগ নিশ্চিত হতে পারছিলেন না। কারণ, সে জন্য প্রাণীটিকে ধরে ডাঙায় আনতে হবে। গবেষকেরা বলছেন, কাজটা করা হবে খুব কঠিন। কারণ এই হাঙর অনেক বড় আকারের এবং দ্রুতগামী। সরু নাকওয়ালা নীল কাইমেরা ২০০২ সালে প্রথম ধরা পড়েছিল। অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও নিউ ক্যালিডোনিয়ার কাছাকাছি সাগরের গভীর থেকে গবেষক দমিনিক দিদিয়ের দাজি এটি আবিষ্কার করেছিরেন। আজব সামুদ্রিক প্রাণী কাইমেরাকে র্যা টফিশ, র্যা বিটফিশ, স্পুকফিশ ইত্যাদি নামেও ডাকা হয়।

বিমান দুর্ঘটনায় ১৩ জন নিহত

ইন্দোনেশিয়ার পূর্বাঞ্চলে একটি সি-১৩০ সামরিক বিমান বিধ্বস্ত হয়ে গতকাল রোববার ১৩ জন নিহত হয়েছেন। উড়োজাহাজটি পাপুয়া প্রদেশের তিমিকা শহর থেকে ১৩ জন বিমানসেনা ও একজন যাত্রী নিয়ে যাওয়ার পথে একটি প্রত্যন্ত পার্বত্য এলাকায় বিধ্বস্ত হয়।
এতে তিনজন পাইলট, আটজন প্রকৌশলকর্মী, একজন দিকনির্দেশক ও একজন সেনা কর্মকর্তা ছিলেন। এ ছাড়া পণ্য হিসেবে কিছু খাদ্যসামগ্রী ও সিমেন্ট ছিল। ১৩ জনের লাশই উদ্ধার করা হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ জানতে তদন্ত চলছে। বোর্নিও দ্বীপ এলাকায় গত নভেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার একটি সামরিক হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় তিন আরোহী নিহত হন।

বাংলাদেশ সীমান্তে নতুন আরাকানি জঙ্গিগোষ্ঠী!

ব্রাসেলসভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ আইসিজির সদ্য প্রকাশিত ৩৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনটি আমাদের জন্য গভীর শঙ্কা বয়ে এনেছে। কায়মনোবাক্যে প্রার্থনা করি, সামনের দিনগুলোতে যেন হারাকা আল-ইয়াকিন ধরনের কোনো জঙ্গিগোষ্ঠীর নাম আমাদের গণমাধ্যমের শিরোনামে পরিণত না হয়। এই নামে আমাদের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে এই প্রথমবারের মতো পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সঙ্গে যোগাযোগ থাকা একটি ইসলামি গোষ্ঠীর সক্রিয় থাকার কথা প্রকাশ পেয়েছে। গত ৯ অক্টোবর ও পরে নভেম্বরে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর ওপর ওই গোষ্ঠী জঙ্গি হামলা চালায় বলেই আইসিজির দাবি। যদি ভৌগোলিকভাবে দেখি তাহলে ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারি হামলার পরে কাছাকাছি কোনো দূরত্বে এটাই কোনো ইসলামি গোষ্ঠীর বড় হামলা। দুইয়ের মধ্যে একটা মিল হলো, হলি আর্টিজানের পরে আমরা যখন আইএস থেকে বেঁচে কিছুটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলছিলাম, তখন রোহিঙ্গা স্রোত আমাদের বিচলিত করল। ভারতের সঙ্গে মিলে আমরা নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতি করেছিলাম। এবারের অন্যতম সমস্যা হলো ভারতের মতো মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে আমাদের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সম্পর্ক ও বোঝাপড়া শক্তিশালী নয়। আইসিজির রিপোর্ট স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে যে আল-ইয়াকিনের সঙ্গে আইএস বা আল-কায়েদার একটা যোগসূত্র ঘটে যেতে পারে।
আপাতত এই রিপোর্ট মিয়ানমার সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বলে কিছুটা সহায়ক হতে পারে বলে প্রতীয়মান হয়। অং সান সু চি এর আগে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে দোষারোপ করেছিলেন। সু চির যুক্তি ছিল অনেকটা এ রকম, ৯ অক্টোবর ৯ পুলিশ নিহত হয়েছে। ১২ নভেম্বর এক জ্যেষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। সুতরাং এরপর সেখানে যা ঘটেছে সেটা হলো সু চির কথায় ‘আইনের শাসন’। ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠার কারণে ২৭ হাজার রোহিঙ্গা কেবল বাংলাদেশেই পালিয়ে এসেছে। কতজন নিহত হয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। সবকিছুর মূলে ৯ অক্টোবরের তথাকথিত ‘আল-ইয়াকিন’ পরিচালিত হামলা। নোবেলজয়ী সু চির দেশের নেতারা হয়তো হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছেন। কারণ, নয়া বিশ্বনেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর মিত্ররা হয়তো আগের চেয়ে একটু ভালোভাবেই উপলব্ধি করবেন যে হেলিকপ্টার থেকে হামলা, মানুষ হত্যা ও গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করার ঘটনা হলো সু চি বর্ণিত ‘আইনের শাসনের’ নমুনা। আইসিজি একটি মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান। বিশ্ব সুশীল সমাজের একটি নির্ভরযোগ্য সংস্থা হিসেবে তার একটি পরিচিতি আছে। গণহত্যা শব্দটি তারা কীভাবে ব্যবহার করেছে, সেটা খুব খেয়াল করে লক্ষ করলাম। ৭ নোবেলজয়ী আরেক নোবেলজয়ীর দেশে ‘পদ্ধতিগত গণহত্যার’ কথা উল্লেখ করেছিলেন গত বছর। অথচ আইসিজি তার রিপোর্টে একটিবার ‘গণহত্যা’ শব্দটি ব্যবহার করেছে। সেটাও মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বরাতে। আর ইয়াঙ্গুন ও ব্রাসেলস থেকে একই সঙ্গে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি যে ঘটনা নিয়ে এতটা তুলকালাম, সেই ৯ অক্টোবরের ঘটনার পুরো বিবরণ শুধু সরকারি ভাষ্যের বরাতে ব্যবহার করেছে।
এমনকি ওই ভাষ্যের সত্যতা নিরূপণের বা তৃতীয় কোনো সূত্রে যাচাই করার উদ্যোগ তারা নিয়েছে বলে রিপোর্টে অন্তত উল্লেখ পাই না। আইসিজি খুবই সতর্কতা ও বিনয়ের সঙ্গে বলেছে, সামরিক বাহিনী যে শক্তি (ব্রিটিশ ইনডিপেনডেন্ট যদিও বলেছে, হেলিকপ্টার থেকে নির্বিচারে গুলি করে গণহত্যা হয়েছে) প্রয়োগ করেছে তা ‘ডিসপ্রপোরশনেট’ (মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ অর্থে)। আইসিজির মতে, সামরিক বাহিনী জঙ্গি ও নিরীহ মানুষের ফারাক করতে পারেনি! এর আগের লেখায় আমরা যে সংশয় প্রকাশ করেছিলাম, আইসিজি সেটা নিশ্চিত করেছে। তারা বলেছে, অং সান সু চির কিছুটা প্রভাব থাকলেও সামরিক বাহিনীর ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তার মানে দাঁড়াচ্ছে, আমাদের ঘরের কাছে একটি সামরিক বাহিনী থেকে যাবে, যার ওপর আগের মতোই কোনো কার্যকর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। একটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠা জঙ্গিবাদ তারাই মোকাবিলা করবে, যার ওপর পেশাদার রাজনীতিবিদদের কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। আইসিজি বলেছে, ২০১৫ সালের আগে ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গাদের সঙ্গে জাতীয় রাজনীতির শেষ সম্পর্কটা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। গ্লোবাল নিউ লাইট অব মিয়ানমার (জিএনএলএম) মিয়ানমার সরকারের মুখপত্র। আইসিজির ৩৪ পৃষ্ঠার রিপোর্টে জিএনএলএম শব্দটির ২৬ বার উল্লেখ আছে। এই পত্রিকার মতে, ৯ অক্টোবরের পরে ৮৬ রোহিঙ্গা মরেছে। আইসিজির ওয়েবসাইট প্রধান শিরোনাম করেছে, রাখাইনে নতুন মুসলিম ইনসারজেন্সি। আইসিজি তার ওয়েবসাইটে যে এক্সিকিউটিভ সামারি বড় হরফে প্রদর্শন করেছে, সেখানে তারা কিন্তু মিয়ানমারের সরকারি বিবরণী নিজেদের বক্তব্য হিসেবে প্রচার করেছে। আমরা অবশ্যই মানব যে বাস্তবে এই ভাষ্যই যথার্থ হতে পারে। কিন্তু যেহেতু আমরা জানি যে কোনো স্বাধীন আন্তর্জাতিক সংস্থা বা বিদেশি নাগরিকদের রাখাইনে প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না,
তাই আইসিজি কীভাবে তথ্য পেল তা জানানোটা দরকার ছিল। আইসিজি কি আমাদের বা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চোখ খুলে দিল? আমরা তো এই ধারণা করছিলাম যে ‘বাঙালি’ বলে মিয়ানমার যাদের তাড়াতে চেয়েছিল, তাদের ওপর তাদের ধারাবাহিক হামলার একটা পর্যায়ে ৯ অক্টোবরের ঘটনা ঘটে থাকবে। আরাকান রূপান্তরিত রাখাইন থেকে রোহিঙ্গারা বিশ্বের দেশে দেশে পালিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে। আইসিজি বলছে, সাম্প্রতিক যে সহিংসতা ঘটে গেল, সেটা গত কয়েক দশক থেকে ‘কোয়ালিটিভলি ডিফারেন্ট’ (গুণগতভাবে আলাদা)। তার মানে কী দাঁড়ায়? এটা আলাদা হলো মুসলিম জঙ্গিগোষ্ঠীর জড়িত হওয়ার কারণেই? নাকি সামরিক বাহিনীর কোনো অংশের জাতিগত নির্মূল অভিযান বেপরোয়া হওয়ার কারণেই? নিশ্চয় উভয়ের মিশ্রণ হতে পারে। এটুকু বুঝলাম, বাংলাদেশের উচিত হবে রোহিঙ্গা বিষয়টিকে আর কেবলই মানবিক কিংবা ১৯৭৮ বা ১৯৯১-৯২ সালের পর্বের মতো করে না দেখা। জাতীয় প্রতিরক্ষার দিক থেকে খুব গভীরভাবে খতিয়ে দেখা। ওই জঙ্গি গ্রুপ নাকি ‘ওয়েল ফান্ডেড’। এবং তারা ‘গেম চেঞ্জার’ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। বিশ্বরাজনীতিতে ‘গেম চেঞ্জার’ কথাটি খুব নিরীহ নয়। তা নিয়ে আমাদের খুব সতর্ক হওয়ার দরকার আছে। আল-ইয়াকিন সম্পর্কে যে তথ্য মিয়ানমারের বিশ্বকে নির্দিষ্টভাবে জানানোর কথা, সেটা আইসিজি জানাল। দারফুরের সংঘাত সম্পর্কে তারাই প্রথম বিপদ-ঘণ্টা বাজিয়েছিল। সে কারণে কলিন পাওয়েল তাদের প্রশংসা করেছিল। আইসিজির বিবরণ এ রকম: ‘গত ৯ অক্টোবর রোহিঙ্গাদের একটি গ্রুপ কথিতমতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে হামলা চালিয়ে ৯ পুলিশকে হত্যা করেছিল। এখন জানা গেছে হামলাকারীরা সৌদি আরব ও পাকিস্তানি জঙ্গিগোষ্ঠীর সঙ্গে জড়িত। হারাকা আল-ইয়াকিন নামের একটি গোষ্ঠী এক ভিডিও বার্তায় বর্মি পুলিশের ওপর হামলার দায় স্বীকার করেছে।’ আমরা মনে রাখব যে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক পাল্টা হামলা চালাতে বিক্ষুব্ধ মানুষের কোনো ঘাটতি থাকার কথা নয়। সুতরাং প্রতিকারটি হলো মুসলিম জঙ্গি ও রাষ্ট্রের জঙ্গিত্ব একসঙ্গে বন্ধ করা। এই দিকটিকে এখন থেকেই কি বড় করে দেখা হবে? নাকি ‘গেম চেঞ্জাররা’ তা হতে দেবে না! আইসিজি প্রতিবেদন বলেছে, ‘২০১২ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ১০০-এর বেশি নিহত এবং প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুত হওয়ার পরে হারাকা আল-ইয়াকিন গঠিত হয়। অনলাইনে প্রচারিত নয়টি ভিডিওতে এই গ্রুপটির নেতা হিসেবে যাকে দেখা যায়, তার নাম আতা উল্লাহ। পাকিস্তানের করাচিতে জন্মের পরে শৈশবেই তিনি সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন।
তাঁর বাবা ছিলেন এক অভিবাসী রোহিঙ্গা। আইসিজি নিশ্চিত হতে না পারলেও ইঙ্গিত দিয়েছে যে আতা উল্লাহ পাকিস্তানসহ “অন্যত্র” সফর করেছিলেন। আর সেখানে তিনি আধুনিক গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নেন। তিনি রাখাইনের হামলায় সৌদি আরব থেকে অংশ নেওয়া ২০ জন রোহিঙ্গার একটি গোষ্ঠীর অন্যতম কুশীলব। এ ছাড়া ২০ জন জ্যেষ্ঠ রোহিঙ্গার একটি পৃথক গ্রুপ ওই গোষ্ঠীর তদারক করে থাকে। তাদের সদর দপ্তর মক্কায় অবস্থিত।’ এ ছাড়া সৌদিতে বেড়ে ওঠা ও ফতোয়া জারির ক্ষমতাসম্পন্ন সেখানকার এক রোহিঙ্গা বংশোদ্ভূত মুফতির নাম জানা গেল। তিনি জিয়াবুর রহমান। টাইম সাময়িকীতে আইসিজির এই প্রতিবেদন বিষয়ে ১৩ ডিসেম্বরে একটি রিপোর্ট ছাপা হয়। সেখানে লক্ষণীয়ভাবে এই তথ্য উল্লিখিত হয়েছে, ‘বাংলাদেশ থেকে কয়েক শ রোহিঙ্গা ইয়াকিনে যোগ দিতে আরাকান গেছে।’ আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে এর আগে ছোটখাটো সশস্ত্র গ্রুপ কাজ করেছে। কিন্তু তারা সেভাবে র্যা ডিকালাইজড ছিল না। তার মানে আমরা এখন নিরীহ রোহিঙ্গাই পাচ্ছি না। পাচ্ছি তেমন রোহিঙ্গাও, যারা ইতিমধ্যে র্যা ডিকালাইজ হতে পারে। আর আমাদের সমাজের র্যা ডিকালিস্টদের সঙ্গে তাদের নৈকট্য স্বাভাবিক। ফলে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়কে কোনো আশা–ভরসা দেখাতে না পারলে পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নিতে পারে বলে আইসিজির আশঙ্কার সঙ্গে একমত হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। মূল সমাধান অং সান সু চির নেতৃত্বে মিয়ানমারের রাজনৈতিক উত্তরণ। দেশটির সামরিক বাহিনীর ওপর পূর্ণ ও কার্যকর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। আর বাংলাদেশের উচিত বিশেষ করে চীন ও ভারতকে অনুরোধ করা, যাতে তারা এই ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

এত দিন কোথায় ছিলেন?

প্রায় পাঁচ বছর ধরে সরকারবিরোধীদের নিয়ন্ত্রণে থাকার পর সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেপ্পো এখন আবার সরকারি বাহিনীর দখলে এসেছে। পশ্চিমের বিভিন্ন দেশের সমর্থন পাওয়া সরকারবিরোধী জোটের এখন লেজ গুটিয়ে পিছু হটা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা নেই। তাদের অধিকাংশ সেই পথটাই বেছে নিয়ে সরকারের সরবরাহ করা সবুজ বাসের আরোহী হয়ে আলেপ্পো ছেড়ে চলে গেছে। তবে পেছনে রেখে গেছে বিধ্বস্ত এক শহর আর অবরুদ্ধ নগরবাসীকে, যাদের জীবন এখন সম্ভবত গত পাঁচ বছরের ‘মুক্ত’ জীবনের চেয়েও আরও বেশি অনিশ্চিত। ধারণা করা যায়, নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়া সেখানে আবারও ধীরে শুরু হবে এবং গৃহযুদ্ধ-পূর্ব স্বাভাবিকতায় ফিরে যেতে কয়েক দশক লেগে যাবে। তবে সেই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই আলেপ্পোর পতন নিয়ে হাহাকার আর কান্নার রোল এখন বিশ্বজুড়ে প্রতিধ্বনিত হতে শোনা যাচ্ছে। সেই হাহাকার আবার বেশ কিছু প্রশ্নেরও জন্ম দিচ্ছে, সেই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়ার তাড়না থেকে এই লেখার অবতারণা। আলেপ্পোতে গত পাঁচ বছরে আসলে কী হচ্ছিল? শহরটিতে তথাকথিত ‘আরব বসন্তের’ হাওয়া এসে লেগেছিল উত্তর আফ্রিকায় সেই প্রক্রিয়ার সূচনার অল্প কিছুদিন পর। আরব বসন্তকে তথাকথিত এ কারণে উল্লেখ করতে হয় যে বসন্তকালটা আরব বিশ্বের দেশগুলোর জন্য উর্বরা কিংবা সুসময়ের আগমন বার্তা বয়ে আনা সময় হিসেবে বিবেচিত নয়, যেভাবে বসন্তকালকে দেখা হয় পশ্চিমের দেশগুলোতে। ফলে আরব বিশ্বে সূচনা হওয়া আন্দোলনের নামকরণ পশ্চিম করে নিয়েছিল নিজের পছন্দমাফিক, বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে যার ছিল না তেমন কোনো সম্পর্ক। আরব বিশ্বে পরিবর্তনের বার্তাবাহক হাওয়া বয়ে যাওয়ার সেই প্রক্রিয়ার সূত্র ধরে সিরিয়ায়ও একসময় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দাবি সোচ্চার হয়ে ওঠে।
পশ্চিম যেন সেই অপেক্ষাতেই ছিল। আর তাই দেখা যায়, সিরিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর আলেপ্পোর রাজপথে নেমে আসা তরুণদের পেছনে সব রকম মদদ জোগাতে সক্রিয়ভাবে যাঁরা এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁরা হচ্ছেন পশ্চিমের সেই সব দেশের নেতারা—লিবিয়ায় যাঁরা আগুন ধরিয়ে দিয়ে দেশটিকে লন্ডভন্ড করে দিয়েছেন, ইরাকের ভবিষ্যৎকে গণতন্ত্রের দোহাই দিয়ে যাঁরা করে তুলেছেন অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং আফগানিস্তানে যাঁদের আগমনে কপাল পুড়ছে দেশের মানুষের। বিশ্বের পরাক্রমশালী সেই সব নেতা আলেপ্পোর প্রতিবাদ–বিক্ষোভ এবং সেই বিক্ষোভ দমনে নেওয়া সরকারের কঠোর পদক্ষেপকে মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব আরও বিস্তৃত করার সুযোগ হিসেবে গণ্য করে অস্ত্র আর যোদ্ধার ঢালাও চালান দিয়ে সেখানে তৈরি করে দেন গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি। আর পশ্চিমের সে রকম মদদে উৎসাহিত হয়ে বিশ্বের নানা প্রান্তের ধর্মান্ধ উন্মাদেরাও ধর্মযুদ্ধের আগমন বার্তায় অনুপ্রাণিত হয়ে আড্ডা গেড়েছিল জিহাদের সেই অভয়ারণ্যে। ফলে একসময় দেশের সেই অংশটি সিরিয়ার সরকারের হাতছাড়া হয়ে যায় এবং সেখানে গড়ে ওঠে নিজস্ব এক উদ্ভট প্রশাসন, শত্রু বধের সব রকম শিক্ষা যে প্রশাসন অবরুদ্ধ নগরবাসীকে দিতে শুরু করে। সে রকম ধর্মযুদ্ধের বহমান সেই বাতাসে আন্দোলিত হতে থাকা আলেপ্পো এবং বিদ্রোহীকবলিত সিরিয়ার অন্য কয়েকটি শহরে গত পাঁচ বছরে শত্রু নিধনের নামে চালানো হয়েছে নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, যে হত্যাযজ্ঞে শামিল হতে শিশুদেরও বিদ্রোহীরা অনুপ্রাণিত করেছিল, যার পরিণতিতে ভিডিও ফুটেজে রাইফেলধারী অপ্রাপ্তবয়স্কদের দেখা গেছে হাত আর চোখ বাঁধা শত্রুপক্ষের সৈনিকদের তাক করে গুলি ছুড়তে, দেখা গেছে জিহাদি জন নামের এক উন্মাদকে ছুরি হাতে জীবন্ত মানুষের কল্লা কেটে নিয়ে উল্লাসে ফেটে পড়তে, দেখেছি আমরা ধর্মীয় উন্মাদনায় নেশাগ্রস্ত এক পাগলকে সিরিয়ার নিহত সৈনিকের কলজে ছিঁড়ে নিয়ে তা চিবিয়ে খেতে। আরও দেখা গেছে প্রাচীন সভ্যতার অমূল্য সব নিদর্শন বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে, অন্য ধর্মের মানুষকে মানুষ হিসেবে গণ্য না করতে। আর এই সবকিছুর মধ্যেও জাতিসংঘে মার্কিন রাষ্ট্রদূত সামান্থা পাওয়ারের মতো স্বঘোষিত মানবাধিকারের সন্তদের আমরা দেখেছি নিশ্চুপ বসে থেকে জাবর কেটে যেতে, যেন নিজের সাঙাতেরা ভুল কিছু করছে না বরং সব নষ্টের গোড়া হচ্ছেন আসাদ আর তাঁর মিত্ররা। তবে দাবার ঘুঁটি উল্টে যেতেই এখন কেবল আড়মোড়া ভেঙেই নয়, বরং মাজা খাঁড়া করে দাঁড়িয়ে আবারও তাঁরা গাইতে শুরু করেছেন মানবাধিকার রসাতলে যাওয়ার হাহাকার তুলে গাওয়া বুক চাপড়ানো গান। সিরিয়া নিয়ে অন্তঃপ্রাণ এই সন্তদের কিন্তু বিশ্বের নানা প্রান্তে আরও যেসব মারাত্মক মানবাধিকার লঙ্ঘন চলছে, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র উচ্চবাচ্য করতে শোনা যায় না। যেন কিছুই হচ্ছে না এঁদেরই কল্যাণে মগের মুলুকে পরিণত হওয়া দেশ লিবিয়ায়; ইয়েমেনে সৌদি আরবের নির্বিচার বোমাবর্ষণ করে যাওয়া যেন হচ্ছে দেশটির জন্মগত অধিকার; চৌদ্দপুরুষের বসবাসের ভূমি থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করে চারদিকটা কাঁটাতারের বেড়ায় ঘিরে ফেলে ‘মালিকের প্রবেশ নিষেধ’ নোটিশ সেখানে সেঁটে দেওয়া যেন ইহুদিদের জন্য হচ্ছে স্বয়ং ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া এমন এক গ্যারান্টি, যা নিয়ে কথা বলতে নেই। অন্যদিকে সিরিয়া নিজের শিবিরের কিংবা নিজেদের দখলে নিয়ে আসতে ব্যর্থ হওয়া একটি দেশ বলেই সিরিয়ার মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে এত উৎকণ্ঠা, এত মায়াকান্না এদের। এবার দেখা যাক চোখের জল ফেলা সেই সব ‘মানবাধিকার রক্ষাকারী’দের নিজেদের ঠিক করে নেওয়া আইনের চোখে কীভাবে দেখা যায় আলেপ্পোকে। ইরাক কিংবা ইয়েমেনের মতো ধর্মীয় বিভাজনের বড় দাগে ভাগ করে নিয়ে সিরিয়ার দিকে আলোকপাত করার সুযোগ খুব একটা নেই।
ধর্ম সিরিয়ার রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেনি, যেমনটা তা করে আসছে ইরাক, বাহরাইন এমনকি সৌদি আরবে। দেশের সংখ্যালঘু আলাভি সম্প্রদায়, শিয়াদের দূরসম্পর্কীয় জ্ঞাতি ভাই হিসেবে যাদের ধরে নেওয়া যায়, গত চার দশকের বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা মূলত এদের হাতে কেন্দ্রীভূত থাকলেও শিয়া ও সুন্নিদের উল্লেখযোগ্য একটি অংশও এদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে চলায় প্রথমে হাফেজ আল-আসাদ এবং তাঁর মৃত্যুতে পুত্র বাশার আল-আসাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে শক্ত হাতে দেশ শাসন করে যাওয়া। মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা আরব বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো সেখানেও নিয়মিত ঘটে চললেও বন্দীদের উলঙ্গ করে নিয়ে সেলফিতে তাদের ছবি তুলে সেই সব ছবি বন্ধুদের মধ্যে বিতরণ করার মতো জংলি তৃপ্তি ভোগের খবর অবশ্য সিরিয়া থেকে পাওয়া যায়নি, যেমনটা আমরা পেয়েছিলাম ইরাকের আবু গারাইব বন্দিশালা মার্কিনদের কবজায় আসার পর। এসব কিছুর বাইরে আরও যা বলতে হয় তা হলো, আলেপ্পো হচ্ছে সিরিয়ারই একটি শহর, যে শহরের ওপর রয়েছে দেশটির সরকারের সব রকম অধিকার। শহরটির কিছু মানুষের রাজপথে নেমে এসে বিক্ষোভ প্রদর্শন কোনো অবস্থাতেই এ রকম বোঝায় না যে তাদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এদের লেলিয়ে দেওয়ার অধিকার অন্য কোনো দেশ কিংবা গোষ্ঠীকে সেই পদক্ষেপ দিচ্ছে। সে রকম উদ্ভট অধিকারের স্বীকৃতি দেওয়া হলে ঠিক এমনটাও বোঝাতে পারে যে যুক্তরাষ্ট্রের যেসব শহরে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট দায়িত্ব গ্রহণের আগেই তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভ-শোভাযাত্রা হতে দেখা যাচ্ছে, সেই সব শহরের ভিন্নমত পোষণকারীদের হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে মার্কিন সরকারের বিরুদ্ধে এদের লেলিয়ে দেওয়ার অধিকারও বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের আছে। যুদ্ধ, যুদ্ধের পরিণতিতে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় চালানো খুনখারাবি সব দেশেই সাধারণ মানুষের জীবন সংকটাপন্ন করে তোলে। সে রকম সংকট কাটিয়ে উঠতে হলে শুরুতেই যা প্রয়োজন তা হলো ঘৃণার মোড়ক থেকে মানুষকে বের করে নিয়ে আসা। যুদ্ধের বদলে যুদ্ধের হুংকার তুলে যাওয়ায় সমস্যার সমাধান নেই। সমাধান নেই পক্ষপাতমূলকভাবে চোখের জল ফেলে যাওয়ার মধ্যেও। লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়া—এরা সবাই সেই প্রমাণ আমাদের সামনে রেখে গেলেও আমাদের জীবন যেন বাধা পড়ে আছে সেই একই চক্রে, যেখানে আমরা সবাই পরে আছি রং-চশমা এবং জগৎকে দেখছি সেই রং-চশমার রঙের ফাঁক দিয়ে। ফলে দেখেও না দেখার ভান করে মটকা মেরে পড়ে থেকেছি নিজের দলের একদল মানুষকে তরতরিয়ে মানবতার সিঁড়ির ধাপ পার হয়ে নিচে নেমে যেতে দেখেও। আর এদেরই পরাজয়ে এখন আমাদের কারও চোখে আসছে জল, কেউ করছি হাহাকার। অবাক হয়ে তাই ভাবতে হয়, এত দিন কোথায় ছিল মানবতার জন্য কান্না, কিংবা মানুষের অবমাননায় আকাশ বিদীর্ণ করে তোলা আর্তনাদ?
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।