Monday, February 18, 2019

মেয়েটা আমার সঙ্গে হাঁটে by ইমদাদুল হক মিলন

এই যে শুনুন।
মিলি শুনতে পেল না। যেমন হাঁটছিল, হাঁটতে লাগল।
ভদ্রমহিলা দ্রুতই হাঁটছিলেন। পরনে বেগুনি প্রিন্টের কামিজ আর সাদা সালোয়ার। পায়ে আরামদায়ক জুতো। অক্টোবরের শেষদিক। বিকেলবেলার পার্কে শীতলভাব। তারপরও তিনি বেশ ঘেমেছেন। মিলি শুনতে পায়নি দেখে দৌড়ে এসে তাকে ধরলেন। শুনুন।
মিলি যেন অন্য জগৎ থেকে ফিরল। ডাগর চোখে আত্মমগ্ন দৃষ্টি। বলুন।
আপনি মিলি না? সজলের ছোটবোন?
জি। কিন্তু আপনাকে চিনতে পারলাম না।
না পারারই কথা। দেখা হলো বহুবছর পর। আমারও তোমাকে চিনতে কয়েক দিন সময় লাগল। তুমি তেমন বদলাওনি। আগে স্বাস্থ্য একটু ভালো ছিল। এখন স্লিম, সুন্দর। তবে মুখটা ঠিক আছে। আমি শান্তি। তোমাদের সেগুনবাগিচার বাড়িতে ভাড়া থাকতাম।
মিলি তীক্ষ্ণ চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, আপনি শান্তি আপা? কী আশ্চর্য! আপনাকে চেনাই যায় না।
শান্তি হাসলেন। চেনা যাবে কী করে? বুড়ো হয়ে যাচ্ছি না? আমরা যখন তোমাদের বাড়ি ছেড়ে আসি, তখন তুমি ফোর–ফাইভে পড়ো। আমি অনার্স পড়ছি ইডেনে। বিয়ে হয়ে গেল। স্বামীর সঙ্গে চলে গেলাম লিবিয়ায়। তোমার দুলাভাই মারা গেলেন দু–বছর আগে। দুটোই ছেলে। ওরা সিডনিতে। বছরে ছয় মাস আমি গিয়ে ওদের সঙ্গে থাকি। বিদেশে থাকতে ভালো লাগে না। ইস্কাটনে ছোট একটা ফ্ল্যাট কিনেছিলেন তোমার দুলাভাই। তাঁর কত স্মৃতি সেখানে। ছয় মাস ওই ফ্ল্যাটে থাকি। বাকি সময় ফ্ল্যাটটা বন্ধ থাকে। আমার ছোট ভাই হারুন দেখাশোনা করে। ডায়াবেটিসে ধরেছে সাত–আট বছর হলো। সিডনিতে থাকলে তো হাঁটিই। দেশে থাকলে রমনা পার্কে আসি।
মিলি বুঝল শান্তি আপা বেশি কথা বলা মানুষ। বারো–তেরো বছর বয়সের পর তাঁর সঙ্গে আর দেখা হয়েছে কী, না মনে নেই। তখনো বেশি কথা বলতেন কি না, কে জানে। কিন্তু শান্তি আপার সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগছিল না তার। নিজের জগৎ থেকে ফেরার কারণে একটু বুঝি বিরক্ত।
শান্তি আপা বললেন, চলো, হাঁটি।
না থাক। দাঁড়িয়েই কথা বলি।
তোমার হাঁটা শেষ? কখন হাঁটতে আসো? কতক্ষণ হাঁটো। ডায়াবেটিস হয়নি তো?
না তা হয়নি। বিকেলেই আসি। যতক্ষণ ইচ্ছা হাঁটি। সময় মনে রাখি না।
শান্তি আপা অবাক। সময় মনে রাখো না?
না। এক–দু ঘণ্টা, কখনো কখনো তিন–চার ঘণ্টাও থাকি পার্কে। কখনো হাঁটি, কখনো বসে থাকি।
এতটা সময় পার্কে কাটাচ্ছ, তোমার ফ্যামিলি, হাজব্যান্ড বাচ্চাকাচ্চা? হাজব্যান্ড কী করে? ছেলেমেয়েরা কত বড় হলো? থাকো কোথায়?
বেইলি রোডে ফ্ল্যাট। ও বিজনেস করে। আচ্ছা যাই।
মিলি হাঁটতে শুরু করল।
শান্তি আপা অবাক। আরে দাঁড়াও, দাঁড়াও। না ঠিক আছে, চলো হাঁটতে হাঁটতেই কথা বলি। এত দিন পর দেখা। আমার কথা তো বলেই ফেললাম। তোমার কথা তেমন শোনা হলো না। বাচ্চাকাচ্চাদের ব্যাপারে তো কিছু বললে না।
হাঁটার সময় কথা বলতে ভালো লাগে না।
তাহলে চলো কোথাও বসি।
না থাক। আমি একটু লেকের দিকটায় যাই।
চলো আমিও যাই। তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে ভালোই হলো। একা একা হাঁটতে ভালো লাগে না। আমিও তো বিকেলেই আসি। দুজন একসঙ্গে হাঁটা যাবে।
মিলি দাঁড়াল। আই অ্যাম সরি। আমি আপনার সঙ্গে হাঁটতে পারব না। আমি অন্য একজনের সঙ্গে হাঁটি।
মিলি হন হন করে হেঁটে লেকের দিকে চলে গেল। শান্তি আপা খুবই অবাক। মিলি দেখি একদম বদলে গেছে! কিশোরী বয়সে অতি উচ্ছল প্রাণবন্ত মেয়ে ছিল। তার ছুটোছুটি হইহল্লা আর হাসির শব্দে মুখর থাকত বাড়ি। বয়স কত হবে এখন? চল্লিশ–বিয়াল্লিশ। দেখে আরও কমবয়সী মনে হয়। চেহারা–ফিগার সুন্দর। হাইট ভালো। নীল টাউজার্স আর সাদা ফুলস্লিভ শার্ট পরে হাঁটছে। পায়ের কেডসটাও বেশ দামি। স্বামী যে অবস্থাপন্ন বোঝা যায়। কিন্তু সমস্যা কী মেয়েটার? কার সঙ্গে হাঁটে সে? তিন–চার দিন ধরে মিলিকে ফলো করার পর নিশ্চিত হয়েই তো তার সঙ্গে আজ কথা বললেন শান্তি! কই এ কদিন তো কাউকে তার সঙ্গে হাঁটতে দেখেননি? একা একাই তো হাঁটছে। মাঝে মাঝে একা একা বিড়বিড় করে। মুখটা হাসি হাসি হয় কখনো, কখনো স্নিগ্ধ মায়াবি। যেন নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলছে বা ডুবে আছে কোনো মধুর স্মৃতিতে, এ রকম একটা ভাব হয় মুখের। একটু দূর থেকে নিবিড়ভাবেই মিলিকে খেয়াল করেছেন শান্তি।
কোনো মানসিক সমস্যা হয়নি তো মিলির? কথা বলে তেমন মনে হলো না। খুবই স্বাভাবিক সুন্দর ভঙ্গিতে কথা বলল। শান্তি যা যা জানতে চাইলেন সংক্ষেপে জবাব দিল। শুধু বাচ্চাকাচ্চার প্রসঙ্গে কিছু বলল না। দিনে দিনে কত যে বদলায় মানুষ!
শান্তি অন্যদিকে হাঁটতে লাগলেন।
পরদিনও মিলিকে তিনি দেখলেন। দূর থেকে হাত তুললেন। মিলি তাঁর দিকে ফিরেও তাকাল না। নিজের মতোই পা চালিয়ে হাঁটছে। স্নিদ্ধ মুখখানা হাসি হাসি। মাঝে মাঝে একটু যেন বিড়বিড় করছে। কখনো কখনো একটু থেমে এক পাশে তাকাচ্ছে। যেন কাউকে দেখছে। যেন পাশে কেউ আছে। তার সঙ্গে যেন বিড়বিড় করে কথাও বলছে।
সেদিনের পর থেকেই কৌতূহল হয়েছিল শান্তির। মিলি বলেছে সে একজনের সঙ্গে হাঁটে। তার হাঁটার সঙ্গীটা কে? হাজব্যান্ড যে না তা বোঝা গেছে। হাজব্যান্ড হলে সঙ্গে সঙ্গেই বলে দিত। তাহলে কি কোনও বন্ধু? বন্ধুটা কি মেয়ে না পুরুষ? নাকি পরকীয়া করছে মিলি? আজকাল ওদের বয়সী মহিলারা অনেকেই জড়িয়েছে পরকীয়ায়। স্বামী তার জগৎ নিয়ে ব্যস্ত। বাচ্চাকাচ্চারা বড় হয়ে গেছে। স্ত্রীটির সময় কাটে না। এ জন্য অনেক মহিলাই নাকি ওসব করছে। ফেসবুকের কারণেও ঘটছে এসব...
কিন্তু বেশ কয়েক দিন ফলো করেও মিলির সঙ্গে কাউকে দেখতে পেলেন না শান্তি। মিলি তার মতো একা একা হাঁটে। বিড়বিড় করে, পাশে তাকায়। নির্জন কোনো বেঞ্চে একা বসেও বিড়বিড় করে। যেন পাশে কেউ বসে আছে। কারও সঙ্গে যেন কথা বলছে। সূক্ষ্মভাবে খেয়াল না করলে ব্যাপারটা বোঝাও যায় না। সমস্যা কী মিলির?
দিন কয়েক পর এক বিকেলে মিলিকে ধরলেন শান্তি। বকুলতলার ওদিককার একটা বেঞ্চে বসে আছে। শান্তি এসে পাশে বসলেন। কেমন আছ, মিলি?
ভালো আছি। আপনি?
চলে যাচ্ছে। মাসখানেক পর ছেলেদের কাছে যাব।
খুব ভালো।
আজ মিলিকে সেদিনের তুলনায় আন্তরিক মনে হচ্ছে। শান্তি খুশি হলেন। তাহলে কথা বের করতে সুবিধা হবে। ব্যাপারটা জানার খুবই কৌতূহল শান্তির। বললেন, সেদিন বললে তুমি আমার সঙ্গে হাঁটবে না, কারণ তুমি আরেকজনের সঙ্গে হাঁটো...
তারপর আপনি আমাকে ফলো করলেন এবং দেখলেন আমি একা একাই হাঁটছি, এই তো?
তাই দেখলাম।
ও রকমই দেখবে সবাই। আসলে আমি একা হাঁটি না, আমার সঙ্গে আরেকজন হাঁটে।
কে হাঁটে তোমার সঙ্গে?
আমার মেয়ে। ওর বয়স এখন সতেরো বছর।
কই ওকে তো এক দিনও দেখলাম না!
আমি ছাড়া কেউ ওকে দেখতে পাবে না।
মানে কী? চোখের সামনে তোমাকে হাঁটতে দেখছি একা, তুমি বলছ তোমার সতেরো বছরের মেয়েও তোমার সঙ্গে হাঁটছে...তুমি ছাড়া কেউ কেন তাকে দেখতে পাবে না?
না পাবে না। ওকে শুধু আমিই দেখতে পাই। আমার সঙ্গে হাঁটে, কথা বলে, এ রকম বেঞ্চে আমরা মা–মেয়ে বসে থাকি। কত গল্প করি!
শান্তি তীক্ষ্ণ চোখে মিলির দিকে তাকালেন। তোমাকে একটা প্রশ্ন করি?
জানি কী প্রশ্ন করবেন? আমার কোনো মানসিক সমস্যা হয়েছে কি না, এই তো? আমি পাগল কি না? হ্যাঁ, এই প্রশ্ন আপনি করতে পারেন। যে কেউ এমন কথা শুনলে এই প্রশ্নটাই করবে। হতে পারে এটা আমার মানসিক সমস্যা। কিন্তু এই সমস্যার কথা আমি কখনো কাউকে বলি না। আমি একটা কলেজে পড়াই, ফ্ল্যাটে কাজের লোকজন আর হাজব্যান্ডকে নিয়ে ব্যস্ত থাকি। ভাইবোনদের বাড়ি যাচ্ছি–আসছি। ভদ্রলোক বিজনেসের পাশাপাশি পলিটিক্স করেন। আমার ফ্ল্যাটে অনেক লোক আসে রোজ। ভাইয়ের ছেলেমেয়েরা, বোনদের ছেলেমেয়েরা আসে, ছাত্রছাত্রীরা আসে, আমি সব নিয়ে খুবই ব্যস্ত থাকি। আমার নিজস্ব সময় এই বিকেলবেলাটা। যত ব্যস্তই থাকি বিকেলে পার্কে আমি আসবই। কারণ, মেয়ের সঙ্গে পার্কেই আমার দেখা হয়। সে আমার জন্য অপেক্ষা করে। আমি না এলে কাঁদে, মন খারাপ করে। কোনো কারণে পার্কে না আসতে পারলে আমারও হয় একই অবস্থা। এসব কথা আমি কখনো কাউকে বলি না।
তাহলে আমাকে বলছ কেন?
জানি না। বলতে ইচ্ছা করছে। আমার এখন একচল্লিশ বছর বয়স। বিয়ে হয়েছে আটাশ বছর বয়সে। ওই একটাই মেয়ে আমার। আর কোনো বাচ্চাকাচ্চা হয়নি। তাও মেয়েটা আমার স্বামীর না।
ছোটখাটো একটা ধাক্কা খেলেন শান্তি। এমনিতেই পুরো ব্যাপারটা তাঁর কাছে রহস্যময়। অন্যে দেখতে পায় না এমন মেয়ের সঙ্গে পার্কে হাঁটে মিলি, কথা বলে, হাসে। তার ওপর বলছে সেই মেয়ে আবার ওর স্বামীর না। পুরোটাই রহস্যময়। মিলিকে মনে হচ্ছে সূক্ষ্ম জটিল মানসিক রোগী।
মিলি বলল, ঘটনাটা শুনুন। একুশ বছর বয়সে সাজিদ নামের একটা ছেলের সঙ্গে আমার প্রেম হয়েছিল। গভীর প্রেম। দুজন দুজনার জন্য পাগল। সাজিদ ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ে আর আমি পড়ছি ভিকারুন নিসায়। ওদের পরিবারটা ভালো। মা স্কুল টিচার, বাবা উপসচিব। দুটো মাত্র ভাই। সাজিদ বড়। দেখতে যেমন ভালো, মানুষ হিসেবেও তেমন। আমাদের বাড়ির সবাই ওকে পছন্দ করত। ওর সঙ্গে বিয়েতে আমাদের পরিবারের কারও আপত্তি ছিল না। ওর মা আমাকে একটু কম পছন্দ করতেন, কিন্তু বাবা আর ভাইয়ের খুবই পছন্দ আমাকে। কথা হলো, আমার মাস্টার্স শেষ হলেই বিয়ে। সাজিদ পাস করে বেরোল। ভালো একটা চাকরি পেল। অফিসের কাজে প্রায়ই বাইরে যেতে হয় তাকে। আমরা অবাধ মেলামেশা করছি। রংপুর থেকে রাতেরবেলা অফিসের গাড়ি নিয়ে ফিরছিল সাজিদ। ট্রাকের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষ। স্পটেই মারা গেল। আমি গেলাম পাগল হয়ে। তখন আমার চব্বিশ বছর বয়স। কয়েক দিন পর শুরু করলাম বমি...
তার মানে তুমি কনসিভ করেছ?
হ্যাঁ। প্রথমে বুঝতে পারিনি। বাড়ির লোকজন বুঝে গেল। প্র্যাগনেন্সি টেস্ট করা হলো। কী কেলেঙ্কারি! এ মেয়ের কী হবে এখন? বিয়ে হবে কী করে? শেষ পর্যন্ত যা হয় আর কী! ওয়াশ করানো হলো। মুক্ত হয়ে গেলাম আমি। কিন্তু...
একটু থামলো মিলি। উদাস হলো, বিষণ্ন হলো। হেমন্তকালের শেষ হয়ে আসা বিকেলের আকাশে তাকিয়ে বলল, যখন সবাই বলাবলি করছিল আমি কনসিভ করেছি, আমি টের পাচ্ছি শরীরের ভেতরে কী যেন একটা ঘটে গেছে, আমি মা হব, ঠিক তখন থেকেই মনে হতে লাগল ফুটফুটে একটা মেয়ে হবে আমার। ভারি সুন্দর, ফর্সা গোলগাল পুতুলের মতো মেয়ে...। আমি কিছুতেই ডাক্তারের কাছে যেতে চাইনি, ওয়াশ করাতে চাইনি। কিন্তু মা–বাবা, ভাইবোন, সমাজ! বিয়ে হতে হবে মেয়ের। কাউকে বুঝতে দেওয়া যাবে না এই ঘটনা ঘটেছে মেয়ের জীবনে...। যেদিন কাজটা হয়ে গেল, মনে হলো আমার আত্মার শেষ অংশটাও চলে গেল। প্রথমে গেল সাজিদ তারপর তার চিহ্ন। আমি একা হয়ে গেলাম। তারও চার বছর পর আমার বিয়ে হলো। আশ্চর্য ব্যাপার, আমি আর কনসিভ করি না। ঢাকা–কলকাতা–ব্যাংকক, কত হাসপাতাল, কত বড় বড় ডাক্তার। কত চিকিৎসা, কত ওষুধ, কিছুই হলো না। এই নিয়ে একটু কষ্টও পেতাম। সেই কষ্ট শেষ হয়ে গেল এক বিকেলে। কলেজ, সংসার, লোকজন—সব নিয়ে এত ব্যস্ত থাকি, নিজের সময় বলতে গেলে নেইই। নিজের একটু সময় দরকার। একটু একা থাকা দরকার। এই কারণে পার্কে আসতে লাগলাম। হাঁটাও হলো, একা থাকাও হলো। হাঁটতে এসে দেখি পুরোনো দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ে। সাজিদের কথা মনে পড়ে, যে মেয়ের স্বপ্ন দেখতাম সেই মেয়ের কথা মনে পড়ে। একদমই চলে যাই সেই সময়ে, সেই কল্পনায়। পার্কে সকাল–বিকেল অনেক লোক থাকে আজকাল। পুরুষ–মহিলা অনেক। আমি একটু নির্জন জায়গা বেছে হাঁটি। একা একা। একদিন হঠাৎ শুনি কে আমাকে কাতরকণ্ঠে ডাকল, মা, ওমা। এদিক–ওদিক তাকিয়ে দেখি, কই কোথাও কেউ নেই তো! কে ডাকল তাহলে? আমি যে পরিষ্কার শুনলাম! ভাবলাম মনের ভুল। মেয়েটির কথা ভাবছিলাম বলে এমন হয়েছে। আবার হাঁটতে লাগলাম। কিছুক্ষণ আবার সেই ডাক। মা, ওমা। এই ঘটনা ঘটল তিন–চার দিন। তারপর সেই কণ্ঠ এক বিকেলে বলল, আমাকে তুমি চিনতে পারছ না, মা? আমি তোমার সেই মেয়ে, যাকে ভ্রূণেই হত্যা করেছিলে। কিন্তু আমি মারা যাইনি। আমি তোমার আত্মার অংশ হয়ে আছি। তোমার সঙ্গেই আছি। দিনে দিনে বড় হচ্ছি। আমার এখন সতেরো বছর বয়স। মাগো, তুমি আমাকে হত্যা করেছিলে কেন? মানুষ কি তার আত্মার অংশকে হত্যা করে?
মিলি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর থেকে ধীরে ধীরে মেয়ের সঙ্গে আমি জড়িয়ে গেলাম, আপা। বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর থেকে পরদিন বিকেলের জন্য শুরু হয় আমার অপেক্ষা। কখন পার্কে যাব, কখন মেয়ের সঙ্গে আমার দেখা হবে। কখন সে মা ডাকে আমাকে ভরিয়ে দেবে। কখন গাল ফুলাবে, আবদার করবে, হাসবে, আমাকে জড়িয়ে ধরবে। রাগ করবে, অভিমান করবে, কাঁদবে...। আর কী যে সুন্দর হয়েছে আমার মেয়ে। যেমন আমি কল্পনা করেছিলাম ঠিক তেমন। আমি তার সঙ্গে হাঁটি আপা, তার সঙ্গে কথা বলি। মা–মেয়ে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে একজন তাকাই আরেকজনের মুখের দিকে। আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময় পার্কের বিকেলগুলো। আমার মেয়ে...। মেয়ের কথা কখনো কাউকে বলি না। আপনাকে বললাম। কেন, তা–ও জানি না।
শান্তি ফ্যাল ফ্যাল করে মিলির মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

দালালরা আমারে বেইচা দিছে by রেজাউল প্রধান

‘দালালরা আমারে বিদেশে বেইচা দিছে। তুমি আমারে দেশে ফিরাই নিয়া যাও। ওরা আমাকে ঘরে আটকে রাখে, যখন তখন আমার ওপর নির্যাতন করে। তুমি আমারে দেশে ফিরাই না নিয়া গেলে আমি বিদেশে মইরা যাবো।’ এমনি ভাবে আকুতি করে স্বামী সামিরুল ইসলামকে সৌদি আরবের রিয়াদ থেকে মোবাইলফোনে কথাগুলো বলে তার স্ত্রী তানজিলা আক্তার। তার বাড়ি ঠাকুরগাঁও জেলার পীরগঞ্জ উপজেলার ৭ নং হাজীপুর ইউনিয়নের দেহানগর (রাজশাহী পাড়া) গ্রামে। স্ত্রীকে উদ্ধারের জন্য পীরগঞ্জ থানায় এজেন্সির দালাল সম্রাট ও স্থানীয় দালাল  শাহাজান ও তার স্ত্রী অলেদা বেগমকে আসামি করে একটি এজাহার দায়ের করেছেন সামিরুল।
এজাহারে বলা হয়, স্থানীয় দালালদ্বয় ঘটনার ২/৩ মাস আগে তানজিলার স্বামী সামিরুলকে বলতো যে, তোমার স্ত্রীকে দেশে রেখে কি হবে- সৌদি আরবে পাঠাও, সেখানে মোটা অঙ্কের টাকা বেতন পাবে। তোমার সংসার সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে চলবে বলে বিভিন্ন প্রলোভন দিয়ে আসে। সে তাদের কথায় রাজি হয়ে বহুকষ্টে ২০ হাজার টাকা দিয়ে স্ত্রীর নামে পাসপোর্ট ও ভিসা করে দেয়।
যা পাসপোর্ট নং-ইজ০৪৭৮৯১১, তাং-১১/০৬/২০১৮ ইং। পরবর্তীতে ঐ দালালরা তানজিলাকে ঢাকায় শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মহিলা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রশিক্ষণ দেয়। গত ২৮/০৩/২০১৮ইং তারিখে মেসার্স তানিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, বাড়ি ৩৫/ডি, রোড নং-০৭, ব্লক-জি, বনানী, ঢাকা-১২১৩, লাইসেন্স নং-আর এল ৪৩৬ এজেন্সি’র দালাল সম্রাটের মাধ্যমে (ভিসা নং-ঝঅ-ও-২০১৮-০১৭৬৪২৮) সৌদি আরবের রিয়াদে পাঠায়। তানজিলা বিদেশ যাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে স্বামী সামিরুলকে মোবাইলফোনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলে, ‘আদম ব্যাপারী আমাকে বিদেশে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে বিক্রি করে দিয়েছে।
তারা একটি ঘরে আমাকে তালা  মেরে রাখে। আমাকে যখন তখন মারপিট, শারীরিক, মানসিক ও নির্যাতন করে। তারা আমাকে মেরে ফেলবে। তুমি আমারে দেশে ফিরাই নিয়ে যাও।’ সে আরো বলে যে, আমি অর্ধাহারে-অনাহারে বহু কষ্টে দিনযাপন করছি। এ কথা শোনার পর আমি স্থানীয় দালালদের বাড়িতে যাই, তাদের স্ত্রী তানজিলার ওপর নির্যাতনের বিষয়গুলো জানালে তারা আমাকেই উল্টাপাল্টা কথা বলে এবং আমাকে প্রাণনাশের হুমকি দেয়। তারপরও আমি শাজাহানকে নিয়ে ঢাকায়  দালাল সম্রাটকে ঘটনার বিষয়ে অবগত করি এবং আমার স্ত্রীকে ফেরত আনার কথা বলি। কিন্তু সম্রাট আমাকে বলে যে, তোমার স্ত্রীকে ৮০ হাজার টাকা দিয়ে সৌদি আরবের রিয়াদে পাচার করেছি। তোমার স্ত্রীকে আর  কোনোদিনও ফেরত পাবে না। পীরগঞ্জ থানার ওসি বজলুর রশীদ এজাহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এস আই আবুল বাসার বলেন, সরজমিন তদন্ত করে সামিরুলের স্ত্রী তানজিলা সৌদি আরবে রিয়াদে যাওয়ার ব্যাপারে সত্যতা পেয়েছি। মেসার্স তানিয়া ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল-এর দালাল সম্রাট মুঠোফোনে মানবজমিনকে বলেন, সামিরুলের স্ত্রী তানজিলা সৌদি আরবের রিয়াদে ভালোই আছে। মূলত সামিরুল অকর্মা ও অলস হওয়ায় তার স্ত্রী’র টাকায় বসে বসে খেতো। স্ত্রী আর টাকা না পাঠানোর কারণে সে আমাদের বিরুদ্ধে পীরগঞ্জ থানায় মিথ্যা অভিযোগ করেছেন। এ ব্যাপারে সামিরুল ইসলাম বলেন, আমি একজন গরিব অসহায়, আমার ভিটেমাটিটুকুও নাই, তাই স্ত্রীকে বিদেশ থেকে দেশে ফেরত নিয়ে আসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

ঢাকায় যত বাগ by হাফিজ মুহাম্মদ

নাম বিচিত্রের শহর ঢাকা। ‘বায়ান্ন বাজার তেপ্পান্ন গলি’র শহর এ ঢাকায় নামের বাহারে বাগের আধিক্য বেশি। এ বাগের সঙ্গে বাগানের একটা অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রয়েছে। নামের শুরুটা হয় মুঘল আমলে। যদিও তখন নামের শেষে বাগিচা এবং বাগান ছিল। পরবর্তীতে  তা সংক্ষেপ ‘বাগ’ সংবলিত রূপ ধারণ করে। ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুনের ‘ঢাকা স্মৃতি-বিস্মৃতির নগরী’ বইয়েও এসব কিছু কিছু স্থানের নামের ইতিহাস উল্লেখ রয়েছে।
রাজধানীর সব থেকে পরিচিত জায়গা শাহবাগ। এই জায়গাটার অবস্থান খুব গুরুত্বপূর্ণ ও মাজাদার।
পুরনো ঢাকা ও নতুন ঢাকার সংযোগস্থল হচ্ছে এই শাহবাগ। এই জায়গার পত্তন হয় ১৭ শতকে মুঘল আমলে। ওই সময় এখানে কেবল মানুষ বসবাস করতে শুরু করে। শাহবাগের নাম ছিল তখন বাগ-ই-বাদশাহী। আর পুরনো ঢাকা ছিল সুবা বাংলার রাজধানী এবং মসলিন বাণিজ্যের কেন্দ্র। বাগ-ই-বাদশাহী ছিল ফার্সি নাম। এর অর্থ দাঁড়ায় রাজার বাগান বা বাদশাহর বাগান। মুঘলদের শাসনামলে ভারতের রাজভাষা ছিল ফার্সি। শাহবাগের নামও ফার্সি থেকেই এসেছে। মুঘল এবং মুসলিম শাসনামল পর্যন্ত তাই ছিল। শুধু শাহবাগ না তখন বেশিরভাগ নামই ছিল ফার্সি ভাষায়। পরে এই নামটি সংক্ষেপ রূপ নেয়। বাগ-ই-বাদশাহী থেকে নাম হয় শাহবাগ। ছোট নাম শাহবাগের নামটির অংশ দুটিও ফার্সি ভাষায়। ‘শাহ’ অর্থ রাজা এবং ‘বাগ’ অর্থ বাগান। এই দুটি শব্দের মিশ্রণে হয়েছে আজকের শাহবাগ। শাহবাগে ছিল বিশাল এক বাগান। আর সে বাগান থেকেই বর্তমান শাহবাগ। যদিও আজকের শাহবাগে কোনো বাগানের অস্তিত্ব নেই। শাহবাগে এখন বাগানের অস্তিত্ব না থাকলেও দোকানে সাজানো হরেক প্রজাতির ফুল চোখে পড়ে। এসব ছেঁড়া ফুলের ভিড়ে শাহবাগের ইতিহাস জানেন না অনেকেই।
শাহবাগের পাশের একটি স্থানের নাম পরীবাগ। একপাশে হাতিরপুল অন্যদিকে রমনার পিছনের পাশ ঘিরেই পরীবাগ এলাকার অবস্থান। পরীবাগ এলাকার নাম নিয়ে কয়েকটি মতবাদ প্রচলিত আছে। পরীবাগ এলাকার নামকরণ হয়েছে নবাব খান বাহাদুর আহসান উল্লাহর মেয়ে পরীবানুর নামে। পরীবানু ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহর সৎ বোন। আর এই জায়গাটি ছিল ঢাকার নবাবদের বাগানবাড়ি। তার পূর্বে পরীবাগ এলাকায় ছিল হিন্দু জমিদারদের বসবাস। নবাব সলিমুল্লাহ হিন্দু জমিদারদের কাছ থেকে এলাকাটি ক্রয় করেন। পরীবানুর আবাসস্থল হিসেবে বাগানবাড়িটি পরীবাগ নামে পরিচিতি লাভ করে।
আরেকটি তথ্য মতে নবাব সলিমুল্লাহ তার পিতাকে না জানিয়ে পাটনা বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে পরী বেগমকে বিয়ে করেছিলেন তিনি। পরী বেগম পরীবাগেই বসবাস করতো বলে এলাকাটির নাম পরীবাগ হয়েছে। অনেকে আবার বলেন, পরীবানু নামে নবাব আহসান উল্লাহর এক মেয়ে ছিল। সে অনুযায়ী পরীবানুর নামে এখানে একটি বিশাল বাগান করেছিলেন আহসান উল্লাহ। সে বাগান থেকেই আজকের পরীবাগের অবস্থান। তবে বর্তমানে পরীবাগ এলাকায় বাসিন্দাদের অনেকেই জানেন না এই স্থানের ইতিহাস। তাদের অনেকেই পরীবাগ নামকরণের পরেই বাস করা শুরু করেছেন বলে জানান।
ঢাকার আজকের মালিবাগ হয়তো সবাই চিনেন। ব্যস্ত এবং জনবহুল একটি এলাকা। কিন্তু মালিবাগ নামের শুরুটা কীভাবে হয়েছে তা অনেকে জানেন না। এক সময় ছিল ঢাকা বাগানের শহর। ওই সময় বাগানের মালিদের ছিল বিশেষ কদর। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই ছিল বাগান। আর বিত্তশালীরা সৌন্দর্য বর্ধনের জন্যও বড় বড় ফুলের বাগান করতেন। মালিবাগে তখন শুধু মালিরা তাদের পরিবার নিয়ে বসবাস করতেন। মালিবাগের পাশেই ছিল নবাব রশিদ খাঁর বাগিচা, বাগে হোসেন উদ্দিন ও নবাব বাগিচা। মালিবাগের এই বাগিচাগুলোতে মুসলিম মালিরা ফুল পরিচর্যার কাজ করতেন এবং চকবাজারসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তারা ফুল সরবরাহ করতেন। এখনকার ঢাকায় যেসব স্থানের নামের শেষে ‘বাগ’ শব্দ এগুলো সেই বাগান-বাগিচার চিহ্ন বহন করে। মালিবাগের পত্তন না হয় মালিদের থেকে হয়েছে। কিন্তু স্বামীবাগ নামের শুরুর ইতিহাস ভিন্ন। সায়েদাবাদ বাস স্ট্যান্ডের পাশেই অবস্থান স্বামীবাগের। এই নামটির শুরু এখানে ত্রিপুরালিংগ স্বামী নামে এক ধনী এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি বাস করতেন। তিনি সবার কাছে স্বামীজি নামেই পরিচিত ছিলেন। তার নামে এলাকার লোকজন স্বামীবাগ নামকরণ করেন।
রাজধানী ঢাকার গোপীবাগ এখন ঘনবসতি এলাকার মধ্যে অন্যতম একটি। গোপীবাগ ভিন্ন ভিন্ন লেনে বিভক্ত। গোপীবাগের পূর্বে গোলাপবাগ, পশ্চিমে টিকাটুলি, দক্ষিণে স্বামীবাগ আর উত্তরে কমলাপুর এলাকার অবস্থান। গোপীবাগে কোনো বাগিচার উল্লেখ পাওয়া না গেলেও এখানে গোপীনাথ সাহা নামে একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ছিলেন। এলাকাটি তার নিজস্ব সম্পত্তি ছিল। তিনি স্থাপন করেছিলেন ‘গোপীনাথ জিউর মন্দির’। তার নাম অনুসারে ওই সময় থেকে এলাকার নাম হয় গোপীবাগ। ভারতের বেলুড়ে অবস্থিত রামকৃষ্ণ মিশনের একটি শাখা এখানে ১৮৯৯ সালে স্থাপিত হয়।
গোপীবাগের পাশের এলাকাটিই আজকের গোলাপবাগ। ঢাকার এক সময়ের বিখ্যাত রোজগার্ডেনকে কেন্দ্র করেই গোলাপবাগ নামের শুরু। মিউনিসিপ্যালিটি ঢাকার চেয়ারম্যান কাজী বশিরের স্থাপত্যশৈলী বাড়িটি রোজগার্ডেন বা গোলাপবাগ নামে পরিচিত ছিল। রোজগার্ডেনের পেছনে জনবসতি গড়ে উঠলে এলাকাটি গোলাপবাগ নামে পরিচিত হয়। তখন ওই বাড়িটিতে অনেক গোলাপ গাছ ছিল। যদিও এখন আর অস্তিত্ব নেই। তবে গোলাপের নামটির আজও পরিচিতি রয়েছে। সমপ্রতি সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ রোজগার্ডেনকে পুরাকীর্তির আওতায় এনেছে।
বর্তমান ধানমণ্ডির সোবহানবাগ এলাকাটি বৃটিশ আমলে ছিল ধানক্ষেতে পরিপূর্ণ। পুরনো ঢাকার ইসলামিয়া লাইব্রেরির প্রতিষ্ঠাতা এবং ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক ডেপুটি প্রশাসক জাহাঙ্গীর মোহাম্মদ আদিলের পিতামহ মাওলানা আবদুস সোবহান এলাকাটি কিনে একটি বাগান প্রতিষ্ঠা করেন। তার নামেই এলাকাটির নামকরণ করা হয় সোবহানবাগ। বর্তমানের সোবহানবাগ মসজিদটি শুরুতে ছোট করে আবদুস সোবহান নিজ খরচেই নির্মাণ করেছিলেন। যদিও এখন মসজিটির অবস্থান অনেক বড় ও পরিচিত। তখন মসজিদের পাশে একটি পুকুরও খনন করা হয়েছিল। বর্তমানে তার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায় না। ১৯৪০ সালে মাওলানা আবদুস সোবহান মারা গেলেও তার নামটি রয়ে গেছে আজও।
লালবাগ নামকরণে ইতিহাস খুঁজলে চলে আসে লালবাগ কেল্লার নাম। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব তার তৃতীয় পুত্রের নামে আজম শাহ সুবেদার থাকালীন দুর্গটির কাজ শুরু করেন। এটি আওরঙ্গাবাদ দুর্গ নামেও পরিচিত। পুরাতন ঢাকা নগরীর দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে দুর্গটির অবস্থান। এই লালবাগ দুর্গকে ঘিরেই লালবাগ নামকরণ হয়েছে। এছাড়া ঢাকায় আরো একাধিক স্থানের নামের শেষে ‘বাগ’ রয়েছে। তারমধ্যে উল্লেখযোগ্য ও জনপ্রিয় এলাকাগুলো হচ্ছে- ইসলামবাগ, আরামবাগ, রায়েরবাগ, মধুবাগ, রাজারবাগ, গুলবাগ, শান্তিবাগ, টোলারবাগ, পীরেরবাগ, মীরহাজীরবাগ, মোমেনবাগ, কাঁঠালবাগসহ আরো অনেক ‘বাগ’ রয়েছে।

জামায়াতের গন্তব্য কোথায়? রাজনীতি থেকে সরে যাওয়া নিয়ে আলোচনা by নূর মোহাম্মদ

ইতিহাসের তাড়া। বিতর্ক। শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুদণ্ড। মামলা, আদালত। অস্থিরতা। পদত্যাগ। বহিষ্কার। নতুন দল গঠনের উদ্যোগ।
কোন দিকে যাচ্ছে  জামায়াত? কী করছে দলটি। নানা আলোচনা। জামায়াত কি প্রচলিত রাজনীতি থেকে সরে যাচ্ছে? দলটির ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র বলছে, এ নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা চলছে। জামায়াতের পরামর্শকদের অনেকের মত হচ্ছে, প্রচলিত রাজনীতির কারণে দলটির নেতাকর্মীদের অনেক বিপর্যয়ের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। কিন্তু এতে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে না। এ অবস্থায় সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম ত্যাগ করে সামাজিক সংগঠন হিসেবে কাজ করার বিষয়টি জামায়াতের ভেতরে আলোচিত হচ্ছে।
তবে দলের অন্যতম শীর্ষ নেতা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগ এবং শিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জুকে বহিষ্কারের পর এখন ঘোলাটে অবস্থা তৈরি হয়েছে। আপাত পরিস্থিতি সামাল দেয়া নিয়ে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে দলটি। এরই মধ্যে দলের বিভিন্ন পর্যায়ে দৃষ্টি আকর্ষণী চিঠি দেয়া হয়েছে। নতুন সংগঠন গড়া নিয়ে দলের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে কমিটি গঠনের তথ্যও দেয়া হয়েছে মূলত পরিস্থিতিগত কারণে। এ কমিটিতে গোলাম পরওয়ার ও ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহেরও রয়েছেন।
এ কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে মিয়া গোলাম পরওয়ার মানবজমিনকে বলেন, দল পরিচালনা করতে গিয়ে নানা ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কর্মীদের নানা নির্দেশনা দিতে হয়। এরকমই একটি নির্দেশনা। এটা কোনো চিঠি না। দলের ভেতরে কোনো সমস্যা নাই দাবি করেন তিনি বলেন, যা আছে, দলের বাইরে এবং মিডিয়াতে।
জানা গেছে, জামায়াতের গঠনতন্ত্রের ৬ নাম্বার ধারার ৪নং উপধারা ‘গণতান্ত্রিক পন্থায় সরকার পরিবর্তন এবং সমাজের সর্বস্তরে- সৎ ও চরিত্রবান লোকের নেতৃত্ব কায়েমের চেষ্টা করা’ ধারাটি নিয়েও দলের ভেতরে আলোচনা রয়েছে। এ ধারাটি আপাত কার্যকর না করার পক্ষে দলের ভেতরে অনেকের মত রয়েছে। বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও দেশের সামগ্রিক রাজনীতির প্রয়োজনে সরাসরি রাজনীতির পরিবর্তে অন্য কৌশলে যাওয়া জামায়াতের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মনে করেন দলটির মতাদর্শের চিন্তাবিদ ও সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নান। জামায়াতের ভবিষৎ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে মানবজমিনকে তিনি বলেন, নতুন করে একটি দল আসতে পারে যারা সরাসরি ইসলামের কথা বলবে না, কিন্তু ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কাজ করবে। তার মতে, জামায়াত এখন রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাবে এবং তারা ইসলামী প্রচার কাজ ও সমাজসেবায় নিজেদের নিয়োজিত করবে। অন্য একটি দল হয়তো তারা করবে, যে দলটির লক্ষ্য হবে ইসলামী কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। তার মতে, আজকে যে জামায়াত তারা ইসলামের কথা সরাসরি খুব বেশি বলেছে। পরবর্তী যে জামায়াত আসবে তারা হয়তো সরাসরি এত ইসলামের কথা বলবে না। কিন্তু সব কাজ হবে ইসলামের পক্ষে।
জামায়াতের একটি গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে দলে সংস্কার দাবি করে আসছিল। বিশেষ করে দলের তরুণ অংশটি সব সময়ই সংস্কারের পক্ষে ছিল। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, মীর কাসেম আলী এবং সদ্য পদত্যাগ করা ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক সবসময়ই দলে সংস্কার চেয়ে এসেছেন। তাদের সমর্থন দিয়ে আসছিলেন শিবির থেকে আসা একটি বড় অংশ। জামায়াতের একটি অংশ মনে করে, ১৯৭১ সালের মুুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য দলটির ক্ষমা চাওয়া উচিত। তবে ক্ষমা চাইলেই বির্তক মুক্ত হবে না দল। কারণে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি অনেকটা কঠিন অবস্থার মধ্যে আছে পুরো বিশ্বে। এ অবস্থায় দলকে সরাসরি রাজনীতি থেকে সরে সামাজিক কার্যক্রমের মধ্যে দিয়ে জনমত গড়ে তুলতে হবে। একপর্যায়ে সে সংগঠনকে রাজনৈতিক দলে পরিণত করতে হবে। তুরস্কের বর্তমান ক্ষমতাসীন একে পার্টি, মিশরের মুসলিম ব্রাদারহুড, তিউনিনেশিয়া এবং মালয়শিয়ার বর্তমান ক্ষমতাসীন আনোয়ার ইব্রাহিমের দল ইউনাইটেড মালয় ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন বা ইউএমএনও একই প্রক্রিয়ার সামাজিক কার্যক্রম করে পরবর্তীতে রাজনীতিতে এসেছে।
দলের সংস্কারপন্থিদের অন্যতম ও দল থেকে সদ্য বহিষ্কৃত শিবিরের সাবেক সভাপতি মজিবুর রহমান মঞ্জু ফেসবুকে এ ব্যাপারে একই কথা বলেছেন। ফেসবুকের তিনি লেখেছেন, আমার দৃষ্টিতে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা এবং বাস্তবায়নে আমরা যে তত্ত্বগত, দার্শনিক ও বাস্তবায়নগত কর্মপন্থা নিয়েছি তা আদর্শগত ভুল। ফলে জামায়াতে ইসলামী কী একটি ইসলামী আন্দোলন? না রাজনৈতিক দল? তা নিয়ে দোটানায় থাকতে হয়। ইসলামী আন্দোলন হিসেবে আমাদের কে মানতে পারেন না বৃহৎ অংশের আলেম ওলামারা। আবার সুশীল-মধ্যবিত্ত আর পাশ্চাত্যপন্থিদের সমালোচনা হলো জামায়াত গোঁড়া-মৌলবাদী। প্রচলিত ভোট এবং জোটের রাজনীতির সঙ্গে তাল মিলাতে গিয়ে আমাদেরকে প্রতিনিয়ত জায়েজ-নাজায়েজ, হালাল-হারাম ইত্যাদি বিতর্কে নাকাল হতে হয়। একটি রাজনৈতিক দল নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনা হবে, সমলোচনা হবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু জামায়াতে এটার সুযোগ কম। গঠনতন্ত্রে সদস্যদের প্রকাশ্য মত প্রকাশের ক্ষেত্রে বেরিয়ার আছে। ফোরাম ছাড়া অন্য কোথাও ভিন্নমত নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ নেই। যদি এরকম তৎপরতা পরিলক্ষিত হয়, তাহলে সেটা শৃঙ্খলা ভঙ্গ, গ্রুপিং হিসেবে চিহ্নিত হয়।

মাটির ঘরে কবি

রাহ্মণবাড়িয়ার মাটিতেই বেড়ে উঠেছিলেন আল মাহমুদ। শৈশব-কৈশোরের অনেক স্মৃতি জমা এখানে। ‘যেভাবে বেড়ি উঠি’-আত্ম জৈবনিক স্মৃতিচারণমূলক গ্রন্থে তার রয়েছে বিশদ বর্ণনা। নানা স্মৃতির সেই ক্যানভাসে শনিবার রাতে নিথর দেহ ফিরলেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি আল মাহমুদের। আর গতকাল রোববার জোহর নামাজের পর অন্তিম শয়ানে শায়িত হন পিতা-মাতা আর ভাইয়ের কবরের পাশে দক্ষিণ মেড়াইলের পারিবারিক গোরস্থানে। দুপুর পৌনে ৩টার দিকে তাকে সেখানে সমাহিত করা হয়। দাফনের সময় পরিবারের লোকজন ও কবির ভক্ত অনুরাগীরা উপস্থিত ছিলেন। এর আগে জেলা শহরের নিয়াজ মুহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে কবি আল মাহমুদের তৃতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জানাজার  নামাজ পরিচালনা করেন কবির মামাতো ভাই মাওলানা আশেক উল্লাহ ভূঁইয়া। জানাজায় অংশগ্রহণ করেন বিভিন্ন স্তরের হাজারো  মানুষ। এ সময় বক্তব্য রাখেন কবির ঘনিষ্ঠ বন্ধু প্রবীণ সাংবাদিক মুহম্মদ মুসা, জেলা বিএনপির সভাপতি হাফিজুর রহমান মোল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেস ক্লাব সভাপতি খ আ ম রশিদুল ইসলাম, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জহিরুল  খোকন, কবির ছেলে মীর মাহমুদ মনির, ভাগিনা অবসরপ্রাপ্ত লে. কর্নেল শাকিল ও কবি আল মাহমুদের একান্ত সচিব আবিদ আজম। এ সময় কবির ছেলে মীর মাহমুদ মনির বলেন, আমার বাবা শুধু একজন কবি নন, একজন মুক্তিযোদ্ধাও। তিনি নদ, নদী ও প্রকৃতি নিয়ে লেখার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধ, নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.), ইসলাম, ক্ষুদিরাম, তিতুমীরসহ অনেক বিষয় নিয়ে কবিতা লিখেছেন। আমার বাবার ভালো গুণ ছিল, তিনি অল্পতেই সন্তুষ্ট হতেন। পরে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা প্রিয় কবিকে শেষবারের মতো ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। এসব সংগঠনের মধ্যে রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আইনজীবী সমিতি, নিয়াজ মুহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয়, জেলা উন্নয়ন পরিষদ, জেলা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠন, মোড়াইলবাসী, প্রথম আলো বন্ধুসভা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনেস্কো ক্লাব, সমতট বার্তা পরিবার। এর আগে সকাল সোয়া ১১টার দিকে কবির মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় নিয়াজ মুহম্মদ উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে। এই স্কুলেও পড়াশুনা করেছেন কবি মাহমুদ।
এ সময়  প্রভাষক মহিবুর রহিমের সঞ্চালনায় কবির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে বক্তব্য রাখেন দৈনিক সমতট বার্তার সম্পাদক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মঞ্জুরুল আলম, ঢাকা থেকে আসা কবি মো. কামরুজ্জামান, ফরিদ ভূঁইয়া, আবিদ আজম, সাদমান শাহিদ, কবি ইব্রাহীম বাহারী প্রমুখ। শনিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে কবির মরদেহ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পৌঁছে। লাশ দেখতে ভিড় জমান স্বজন ও ভক্তরা। গতকাল সকালে বৃষ্টি উপেক্ষা করে একে একে আসতে থাকেন কবির ভক্ত-অনুরাগীরা। পরিবার সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার দিবাগত রাত ১১টা ৫ মিনিটে ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান ‘সোনালি কাবিন’র কবি আল মাহমুদ। আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ই জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মোড়াইলে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর আসল নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তবে তিনি পিয়ারু নামে পরিচিত ছিলেন বাড়ির লোকজনের কাছে। তাঁর বাবা মীর আবদুর রব ও মা রওশন আরা মীর। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার বড়। পাঁচ ছেলে ও তিন কন্যা সন্তান এবং নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে চির নিদ্রায় শায়িত হয়েছেন কবি আল মাহমুদ। আল মাহমুদ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে মাঝেমধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসতেন। অসুস্থতাজনিত কারণে গত কয়েক বছর তিনি একেবারেই আসেননি। বাড়িতে এলে ভক্ত ও ঘনিষ্ঠরা ভিড় জমাতেন তাকে ঘিরে। তাদের সঙ্গে গল্প করেই সময় কাটিয়ে দিতেন। দিনের বেশির ভাগ সময় বসে থাকতেন বাড়ির সামনের পুকুর ঘাটে। বড়শি দিয়ে মাছও শিকার করতেন তিনি।

যেভাবে নাসায় ডাক পেলেন পাঁচ তরুণ by আরাফ আহমদ

একের পর এক সম্মাননা অর্জন করছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। এবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের তকমা লাগালো শাবিপ্রবি’র একদল শিক্ষার্থীর ললাটে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাকাশ সংস্থা (নাসা) কর্তৃক আয়োজিত ‘নাসা স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ-২০১৮’ এতে ‘বেস্ট ডেটা ইউটিলাইজেশন’ ক্যাটাগরিতে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হয়েছে শাবিপ্রবি থেকে অংশগ্রহণকারী দল ‘সাস্ট অলিক’।
বিশ্বে প্রথম হওয়ায় নাসা’র  সদর দপ্তরে যাওয়ার ডাক পেয়েছে ‘সাস্ট অলিক’ এর সদস্যবৃন্দ। শনিবার দুপুরে ‘সাস্ট অলিক’র প্রথম স্থান অধিকার এবং নাসায় যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ‘সাস্ট অলিকের’ মেন্টর ও শাবিপ্রবি’র কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের সহকারী অধ্যাপক বিশ্বপ্রিয় চক্রবর্তী।
তিনি জানান, শুক্রবার রাতে মেইলের মাধ্যমে প্রথম হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে নাসা। সাস্ট অলিকের সদস্যবৃন্দ হলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী এস এম রাফি আদনান, ভূগোল ও পরিবেশ বিদ্যা বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী কাজী মাইনুল ইসলাম ও আবু সাবিক মেহেদী ও একই বিভাগের ২০১৫-১৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সাব্বির হাসান।
বিশ্বপ্রিয় চক্রবর্তী জানান, ‘নাসায় প্রদত্ত তথ্য থেকে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি এপ্লিকেশন ‘লুনার ভিআর’ তেরি করে বেস্ট ডেটা ইউটিলাইজেশন ক্যাটাগরিতে বিশ্বে সেরা হয় তারা। বাংলাদেশি হিসেবে এটিই নাসা’য় প্রথম কোনো অর্জন।
এই অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে চাঁদের পরিবেশ, তাপমাত্রা, বিভিন্ন জায়গার অবস্থা, চাঁদে যা আছে যেসব এর আগে কেউ কখনো দেখেনি, চাঁদ থেকে সূর্যের ছবি কেমন হয় ইত্যাদি বিষয়গুলো দেখা যাবে।
তিনি জানান, অলিকের সদস্যদের কেউই সিএসই বিভাগের শিক্ষার্থী নয়। শুধুমাত্র নিজেদের আগ্রহের কারণে তারা আজ এ পর্যন্ত যেতে পেরেছে যা প্রশংসার দাবিদার। তাদের মধ্যে কাজী মাইনুল ইসলাম ও আবু সাবিক মেহেদী ‘সেকেন্ড মেজর’ হিসেবে সিএসই বিভাগের পড়াশোনা করছে।
তিনি বলেন, কবে যাওয়া হবে তা এখনো জানানো হয়নি, তবে খুব শিগগিরই জানানো হবে। নাসা’য় যাওয়ার ক্ষেত্রে আর্থিক কিছু সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন তারা। কারণ যাওয়া-আসার ক্ষেত্রে নাসার পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা করা হবে না। যাওয়ায় আসায় বিশাল একটি পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন যা শিক্ষার্থীদের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ সরকার এবং যেকোন প্রতিষ্ঠানকে স্পন্সর হিসেবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
সাস্ট অলিকের সদস্য কাজী মাইনুল ইসলাম ও আবু সাবিক মেহেদী বলেন, বাংলাদেশি এবং শাবিপ্রবি’র প্রতিনিধি হিসেবে প্রথম নাসাতে আমন্ত্রণ পেয়ে আমরা আনন্দিত। বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকার প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমরা গর্ববোধ করছি।
এদিকে শাবিপ্রবি’র শিক্ষার্থীরা বিশ্বসেরা হওয়ায় এবং নাসা’র দপ্তরে আমন্ত্রণ পাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাদের আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মেধার স্বাক্ষর রাখছে এবং অনেক সম্মান বয়ে নিয়ে আসছে। তারা শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয় সারা বাংলাদেশের গর্ব। তাদের যেকোনো ধরনের সহায়তা লাগলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহায়তা করা হবে। সাম্প্রতিককালে পর্তুগাল একটি টিম আন্তর্জাতিক একটি প্রতিযোগিতায় যাচ্ছে। আমরা তাদের আর্থিক এবং অন্যান্য সহায়তা করেছি। ভবিষ্যতেও আমরা এ ধরনের প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা করবো।
প্রসঙ্গত, গতবছরের শেষের দিকে নাসা কর্তৃক আয়োজিত ‘স্পেস অ্যাপস চ্যালেঞ্জ-২০১৮ এ ‘সাস্ট অলিক’ অংশগ্রহণ করেছিল। সেখানে বিশ্বের ৭৯টি দেশের বাছাইকৃত ২৭২৯টি টিমকে পেছনে ফেলে শীর্ষ চারে অবস্থান করে নিয়েছিল ‘সাস্ট অলিক’।

সানাইয়ের ভুল স্বীকার by রুদ্র মিজান

সানাই মাহবুব সুপ্রভা। এক আলোচিত নাম। একের পর এক ফেসবুক লাইভ, টিকটকে উপস্থিতির মাধ্যমে আলোচনায় আসেন তিনি। এর নেপথ্যে কোনো মিউজিক ভিডিও বা ফিল্ম না। বেস্ট ইমপ্লান্ট। প্রতিটি লাইভের আলোচনার বিষয়ও তা। তেমনি লাইভের নামে অঙ্গভঙ্গি, বেস্ট ইমপ্লান্ট নিয়ে অনভিপ্রেত আলোচনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব নানা অভিযোগের প্রেক্ষিতেই সানাই মাহবুবকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ।
রোববার দুপুরে তাকে ডিএমপির  সাইবার নিরাপত্তা ও অপরাধ দমন বিভাগে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পরবর্তীতে মুচলেকা দিয়ে সেখানে থেকে ফিরেন সানাই।
ডিএমপিতে থাকাকালে ফেসবুক লাইভে গিয়ে নিজের কৃতকর্মের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন সানাই। লাইভে তিনি বলেন, এই দুপুর বেলা আমি সবাইকে একটি বিশেষ মেসেজ দিতে এসেছি। আমার সমালোচিত কন্টেন্টগুলো আমি কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য বা কোনো আর্থিক লাভের আশায় করি নাই। সাইবার ক্রাইম ইউনিটে এসে আমার বিশেষভাবে অনুধাবন হয়েছে যে কোনো শ্রেণির লোক বিশেষ করে শিশুরা যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তার ‘অশালীন’ ভিডিওগুলো সম্পর্কে লাইভে সানাই বলেন, অতএব এটা নিশ্চিতভাবেই আমার ভুল ছিল। আমি এদেশের একজন নাগরিক হিসেবে এদেশের সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশে এদেশের আইন মেনে চলে একজন ভালো শিল্পী হতে চাই। ইতিপূর্বে আমার ব্যক্তিগত বা যৌথভাবে করা বিব্রতকর ছবি বা ভিডিও’র জন্য দুঃখিত। আমি ভবিষ্যতে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকব। আমার নিয়ন্ত্রণে থাকা সবধরনের প্রোফাইল থেকে এ ধরনের কন্টেন্টগুলো মুছে ফেলব এবং অন্য কন্টেন্টগুলোর বিষয়ে সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সহায়তা চাচ্ছি। সেইসঙ্গে ইন্টারনেটকে নিরাপদ রাখতে সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা দেশের ইন্টারনেটকে নিরাপদ রাখবো এবং সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ স্লোগানকে এগিয়ে নিয়ে যাবো।
ডিএমপির সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) নাজমুল ইসলাম জানান, ভিডিও গুলোর জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন সানাই। এসব ভিডিও মুছে ফেলতে সম্মত হয়েছেন তিনি। মুচলেকা দিয়েছেন আর কখনো এ ধরনের ভিডিও ছড়াবেন না। সাইবার নিরাপত্তা ও অপরাধ দমন বিভাগ তার এসব কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখবে। সেইসঙ্গে অন্যদের ক্ষেত্রেও পুলিশের এই তৎপরতা অব্যাহত থাকবে বলে জানান তিনি। এডিসি নাজমুল জানান, নিরাপদ ইন্টারনেট ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে সানাইকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিএমপির সাইবার নিরাপত্তা ও অপরাধ দমন বিভাগে নিয়ে যাওয়া হয়।
এ বিষয়ে সানাই মাহবুব মানবজমিনকে বলেন, আমাকে আটক করা হয়নি। বিভিন্ন লাইভ ও ভিডিও নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। আমি বুঝতে পেরেছি, এই ভিডিওগুলো দেখে অপ্রাপ্ত বয়স্করা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আমি এটি পজেটিভভাবে নিয়েছি।
সানাই হঠাৎ করেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনার সৃষ্টি করেন। বিভিন্ন লাইভে তিনি নিজেই প্রকাশ করেন বেস্ট ইমপ্লান্ট করে সৌন্দর্য বর্ধন করেছেন তিনি। এজন্য দেশের বাইরে গিয়ে বিপুল টাকা ব্যয় করে সার্জারি করাতে হয়েছে তাকে। প্রায় প্রতিটি লাইভে আলোচনায় ও দৃশ্যায়নে ছিল তার বেস্ট ইমপ্লান্ট। তারপর ডাক পড়ে বেশ কয়েক টিভি চ্যানেলেও। সেখানে একই বিষয়ে কথা বলেন সানাই। জনপ্রিয় উপস্থাপক শাহরিয়ার নাজিম জয়ের সঙ্গে একটি টকশোতে অংশ নেন, ওই টকশোটি ভাইরাল হয়ে যায় ইউটিউবে। এতে তিনি নিজেকে সবচেয়ে জনপ্রিয় সেলিব্রেটি দাবি করেন। শাহরিয়ার নাজিম জয়ের এক প্রশ্নের জবাবে সানাই জানান, সাম্প্রতিক সময়ে সবেচেয়ে বেশি পপুলারেটি তার। এখন যারা নায়িকা-গায়িকা তাদেরকে যোগ্য মনে করেন না সানাই। বলেন, ক্যাটরিনা কাইফ নিশ্চয়ই আমাকে নিয়ে আলোচনা করবে না। কারণ তার অবস্থান আমার চেয়ে ভালো। কিন্তু তাদের দেশের নায়িকাদের আলোচনার বিষয় সানাই। এতেই বুঝা যায় তাদের চেয়ে আমার পপুলারেটি অনেক অনেক বেশি।
ওই অনুষ্ঠানে নিজেকে ভার্জিন দাবি করা সানাই দেশের শীর্ষস্থানীয় দুটি ব্যবসায়ী গ্রুপের নাম উল্লেখ করে জানান, বিয়ে করলে তাদের মতো শিল্পপতিদের কাউকে করবেন। এ ছাড়া মিডিয়ার কাউকে বিয়ে করলে সংগীতশিল্পী হাবিব ওয়াহিদকে বিয়ে করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন তিনি। সানাই বলেন, তারকাদের মধ্যে বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী হাবিব ওয়াহিদকে বিয়ে করতে চাই। যেহেতু সে বর্তমানে সিঙ্গেল তাই সে আমার ব্যাপারে ভেবে দেখতে পারে। কারণ সেই ক্লাস সিক্স-সেভেন থেকেই আমি তাকে ভীষণ পছন্দ করি। এ সময় তিনি জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে এমপি হতে চান বলে জানান। প্রায় ১৯টি মিউজিক ভিডিওতে কাজ করেছেন সানাই। নায়িকা হিসেবে ‘ময়নার ইতিকথা’ নামে একটি ফিল্মে কাজ করছেন তিনি। এটি এপ্রিলে মুক্তি পেতে পারে।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবিএ’তে অধ্যয়নরত সানাই মাহবুব সুপ্রভা। তার বাবা সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা। দুই বোনের মধ্যে তিনি বড়। গ্রামের বাড়ি রংপুরে। মা-বাবার সঙ্গে থাকছেন ঢাকার গুলশানে।

ডাকসু নির্বাচন: বৃহত্তর ঐক্যে বাম জোট ভোট পেছানোর দাবিতে ছাত্রদল, নির্বাচনমুখী ছাত্রলীগ by মুনির হোসেন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সরগরম ছাত্র রাজনীতির আঁতুড় ঘর বলে পরিচিত মধুর ক্যান্টিন। ছাত্রলীগ, ছাত্রদলসহ ক্রিয়াশীল সব ছাত্র সংগঠনের সক্রিয় উপস্থিতিতে স্বরূপে ফিরেছে ঐতিহাসিক রেস্তরাঁটি। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল, শ্রেণিকক্ষ, ক্যান্টিন, চায়ের আড্ডায় গুরুত্ব পাচ্ছে ডাকসু নির্বাচন। চাঙ্গাভাব ছাত্র সংগঠনগুলোর সম্ভাব্য প্রার্থী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে।
দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচনে অংশ নিতে পেরে প্রফুল্ল সকলে। এদিকে দুপুরে নির্বাচনকে সামনে রেখে গতকাল পৃথক পৃথকভাবে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়েছেন ছাত্রলীগ, ছাত্রদল। সংবাদ সম্মেলন করেছে- বাম সমর্থিত ছাত্র জোট, মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ড, জাসদ ছাত্রলীগ। বিকেলে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বসেছে বাম জোট। তবে আলোচনা শুরুর পরই বহিরাগতদের সভায় রাখা হয়েছে দাবি করে বাম জোটের সঙ্গে আলোচনা থেকে ওয়াক আউট করেছে টিএসসির সংগঠনগুলো।
দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে বামজোট ডাকসু নির্বাচন সামনে রেখে ১১ দফা উত্থাপন করে। এসময় জোটের পক্ষ হতে বলা হয়, যে সমস্ত সংগঠন উত্থাপিত ১১ দফার সঙ্গে একমত হবে তাদের নিয়ে বৃহত্তর ঐক্য করে প্যানেল দিতে চায় বাম জোট। এছাড়া সংবাদ সম্মেলন থেকে বাম জোট ভোটকেন্দ্র হলের বাইরে এনে একাডেমিক ভবনে করা ও ক্লাসে প্রচারণা চালানোর দাবিসহ আগের দাবিগুলো উত্থাপন করে। একই সময়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে ছাত্রদল আবারো নির্বাচন পেছানোর দাবি করে। তাদের দাবি, ক্যাম্পাসে সহাবস্থানের যে পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা এখনো হলগুলোয় তৈরি হয়নি। তাই পুরোপুরি সহাবস্থানের পরিবেশ নিশ্চিত করে ডাকসু নির্বাচনের দাবি করছে সংগঠনটি। এছাড়া ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান বলেন, ‘আমরা চাচ্ছি একটা আস্থাশীল সহাবস্থানের পরিবেশ। আমরাও চাই, ডাকসু যত দ্রুত কার্যকর হোক। কেবল ডাকসু নির্বাচনকে হালাল করতেই যদি সহাবস্থানের নামে নাটক মঞ্চস্থ করা হয়, সেটা হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে তামাশা।
আস্থাশীল সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরির জন্যই আমরা নির্বাচন পেছানোর দাবিটি জানাচ্ছি।’ এরপরই মধুর ক্যান্টিন থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় ছাত্রলীগের সভাপতি বলেন, ‘ছাত্রদল নিজেদের অযোগ্যতা ঢাকতেই ছাত্রলীগ ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ওপর দোষ চাপাচ্ছে।’ এসময় ছাত্রলীগ নির্বাচন নিয়ে নিজ সংগঠনের প্যানেলের বিষয়েও গণমাধ্যমের কাছে উল্লেখ করেন। ছাত্রলীগ নেতারা বলেন, আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেই ছাত্রলীগের প্যানেল চূড়ান্ত হবে। এছাড়া তারা প্যানেল নিয়ে নেত্রীর গড়ে দেয়া কমিটির সঙ্গে কাজ করছেন।
বৃহত্তর ঐক্য করতে চায় বামজোট: গতকাল মধুর ক্যান্টিনে এক সংবাদ সম্মেলনে ডাকসু ও হল সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে বামপন্থি ছাত্রসংগঠনগুলোর মোর্চা প্রগতিশীল ছাত্রজোট ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্য। এই সময় তারা নির্বাচনে বৃহত্তর ঐক্য করতে নিজেদের আগ্রহের কথা গণমাধ্যমের কাছে উপস্থাপন করে। সংবাদ সম্মেলনে ঐক্যের ভিত্তি হিসেবে ১১ দফা ঘোষণাপত্র তুলে ধরে তারা। এই দফাগুলোর সঙ্গে একমত সবাইকে নিয়ে তাদের প্যানেল সাজানো হবে বলে জানিয়েছে বামজোট। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান প্রগতিশীল ছাত্রজোটের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর কেন্দ্রীয় সভাপতি ইকবাল কবীর। তিনি বলেন, ‘ডাকসু নির্বাচন নিয়ে এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কর্মকাণ্ড একদিকে আমাদের মধ্যে আশাবাদের সঞ্চার করেছে, অন্যদিকে আশঙ্কার মাত্রাও বাড়িয়েছে। ইতিমধ্যে আমাদের দাবিগুলো প্রশাসনের কাছে নানাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু প্রশাসন সেগুলো উপেক্ষা করেছে।’ সংবাদ সম্মেলনে আবারো হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র করার দাবি করেন তিনি। এসময় ইকবাল কবীর ১১ দফা ষোঘণাপত্র উত্থাপন করেন। দফাগুলোর মধ্যে রয়েছে সন্ত্রাস, দখলদারি ও প্রশাসনিক স্বৈরতন্ত্রমুক্ত গণতান্ত্রিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে প্রথম বর্ষ থেকে বৈধ সিটের ব্যবস্থা, গেস্টরুম ও গণরুমে ছাত্র নির্যাতন বন্ধ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও ছাত্রসংগঠনগুলোর সহাবস্থান নিশ্চিত, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বাণিজ্যিক কোর্স বন্ধ, শিক্ষা-গবেষণা ও ছাত্র অধিকার সংশ্লিষ্ট খাতে বরাদ্দ বাড়ানো, ইউজিসির কৌশলপত্র বাতিল, ধর্মভিত্তিক, সাম্প্রদায়িক, জাতিগত ও লৈঙ্গিক বৈষম্য সৃষ্টিকারী অপতৎপরতা নিষিদ্ধ, ’৭৩-এর অধ্যাদেশের অসম্পূর্ণতা দূর করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত, উচ্চশিক্ষা কমিশনের অপতৎপরতা প্রতিরোধ, শিক্ষা-চিকিৎসাসহ মৌলিক অধিকার নিয়ে ব্যবসা বন্ধ, শিক্ষার সব স্তরে বেসরকারীকরণ, বাণিজ্যিকীকরণ ও সাম্প্রদায়িকীকরণ বন্ধ করে সর্বজনীন বিজ্ঞানভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক একই পদ্ধতির শিক্ষানীতি, শিক্ষা শেষে কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা, তা না হলে বেকার ভাতার ব্যবস্থা, গণমানুষের ন্যায্য আন্দোলনে সংহতি জ্ঞাপন, শাসকশ্রেণির নয়, শ্রমিক-কৃষক-জনগণের মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষায় সমতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও শোষণমুক্ত সমাজ বিনির্মাণ। সংবাদ সম্মেলনে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ছাত্র ঐক্যের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ছাত্র-যুব আন্দোলনের সভাপতি আতিফ অনীক, ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লিটন নন্দী, ছাত্র ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি গোলাম মোস্তফা প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে ডাকসু নির্বাচনে বৃহত্তর ঐক্য গড়ার লক্ষ্যে গতকাল বিকালে টিএসসির মুনীর চৌধুরী অডিটোরিয়ামে টিএসসির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে বসে বাম জোট। কিন্তু সভায় বাম জোটের মহানগর ও বিভিন্ন ইউনিটের সদস্য যারা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নয়, আছে দাবি করে সভা থেকে বের হয়ে যায় সংগঠনগুলো।
‘আস্থাশীল সহাবস্থানের’ জন্যই নির্বাচন পেছানোর দাবি ছাত্রদলের: এদিকে গত কয়েক দিনের ধারাবাহিকতায় গতকালও মধুর ক্যান্টিনে নিজেদের অবস্থান জানান দিয়েছে ছাত্রদল। দুপুর ১২টায় ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি আল মেহেদী তালুকদার ও সাধারণ সম্পাদক বাশার সিদ্দিকী নেতাকর্মীদের নিয়ে মধুর ক্যান্টিনে প্রবেশ করেন। এর কিছুক্ষণ পর সেখানে আসেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান। এসময় গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ। আবারো নির্বাচন পেছানোর দাবি তুলেন সংগঠনটির নেতারা। ছাত্রদলের নেতারা বলছেন, আস্থাশীল সহাবস্থানের জন্যই ডাকসু নির্বাচন পেছানোর দাবি জানিয়েছেন তারা। গণমাধ্যমকে আকরামুল হাসান বলেন, ‘আমরা চাচ্ছি একটা আস্থাশীল সহাবস্থানের পরিবেশ। আমরাও চাই, ডাকসু যত দ্রুত কার্যকর হোক। কেবল ডাকসু নির্বাচনকে হালাল করতেই যদি সহাবস্থানের নামে নাটক মঞ্চস্থ করা হয়, সেটা হবে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক চেতনার সঙ্গে তামাশা।
আস্থাশীল সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরির জন্যই আমরা নির্বাচন পেছানোর দাবিটি জানাচ্ছি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা স্থিতিশীল সহাবস্থান চাই। মধুর ক্যানটিনে অবস্থানের পাশাপাশি আমাদের যেসব কর্মীর হলে থাকার অধিকার আছে, তাদের হলে ওঠার ব্যবস্থা করতে হবে। সহাবস্থানের সঙ্গে হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র ও নির্বাচন ঘিরে গঠিত কমিটিগুলো পুনর্গঠন করে নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য শিক্ষকদের সেখানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’ দাবি আদায় না হলে নির্বাচনে থাকবেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে আকরামুল হাসান বলেন, ‘আমরা ডাকসু নির্বাচনের ব্যাপারে ইতিবাচক থাকতে চাই। সর্বশেষ যে ডাকসু নির্বাচন হয়েছে সেটাতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল দ্বিগুণ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিল। যদি একটি নিরপেক্ষ এবং অবাধ নির্বাচনের ব্যবস্থা হয় তাহলে ছাত্ররা আবারও জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ওপর আস্থা রাখবে।’
প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলে ছাত্রলীগের চূড়ান্ত প্যানেল: এদিকে নির্বাচনকে সামনে রেখে যখন ছাত্রদল ও বামজোট বিভিন্ন দাবিতে অনড় রয়েছে, ঠিক তখন নির্বাচনমুখী ছাত্রলীগ। ইতিমধ্যে হলগুলোতে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে বিভিন্ন কাজ করছে সংগঠনটি। মিছিল সমাবেশের মাধ্যমেও হলে ও ক্যাম্পাসের নিজেদের জানান দিচ্ছে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠনটি। গতকাল মধুর ক্যান্টিন থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় সংগঠনটির শীর্ষ নেতারা জানান, তারা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে কাজ করছেন। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফিরলে তাদের প্যানেল চূড়ান্ত হবে। সে লক্ষ্যেই কাজ করছে ছাত্রলীগ। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর করে দেয়া কমিটির সঙ্গেও নির্বাচন নিয়ে কাজ চলছে ছাত্রলীগের। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘আমরা যারা আছি, আমরা অলরেডি একটা দায়িত্বশীল গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রয়েছি। এখানে কেন্দ্রীয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বশীল নেতারা রয়েছেন। আমরা বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, আমাদের নেত্রী দেশরত্ম শেখ হাসিনা, আমরা তার প্রতি আস্থা রাখছি। আপা জার্মানিতে আছেন। ফিরলে আপার সঙ্গে আলোচনা করে আমরা প্যানেল ঠিক করবো।’
এদিকে ছাত্রলীগকে সুবিধা দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসু নির্বাচনের ভোটকেন্দ্র হলে রেখেছে বলে যে অভিযোগ করছে ছাত্রদল ও অন্যান্য সংগঠনগুলো তার প্রতিক্রিয়ায় ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন বলেছেন, নিজেদের অযোগ্যতা ঢাকতেই প্রশাসন ও ছাত্রলীগের ওপর দোষ চাপাচ্ছে ছাত্রদল। তিনি বলেন, ‘ভোটকেন্দ্র কোথায় হবে তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যাপার। ছাত্রদল এ কথাগুলো বলছে, কারণ তারা নিশ্চিত তারা প্যানেল দিয়ে বিজয়ী হতে পারবে না। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক আছে তাদের বয়স ৪০-এর কোঠায়। তারা নির্বাচন করতে পারবে না, তাদের ছাত্রত্বও নেই।’ তিনি বলেন, ‘এই জন্যই বিষয়গুলো গড়িমসি করছে। আমরা আগেও তাদের আহ্বান জানিয়েছি, আপনারা সাধারণ ছাত্রদের হাতে নেতৃত্ব দেন, আমরা একসঙ্গে ছাত্ররাজনীতি করি। সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে তাদের অবস্থানই নেই। এজন্যই তারা ভয় পেয়ে ভিন্ন পথ অবলম্বন করছে। দোষটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে দিচ্ছে, আমাদেরকে দিচ্ছে।’ হলে ভোটকেন্দ্র রাখার যৌক্তিকতা তুলে ধরে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩টি ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের মধ্যে ৭টিই কিন্তু ইতিমধ্যে বলেছে তারা ভোটকেন্দ্র হলেই চান এবং টিএসসিভিত্তিক ২২টি সংগঠন একসঙ্গে মধুর ক্যান্টিনে এসে বলেছে তারাও ভোটকেন্দ্র হলেই চান।
একটি বিশেষ দল যে মেজরিটি শিক্ষার্থীরা হলে থাকেন তাদের নৈতিক অধিকারকে অবমাননা করছে।’ ১৯৯৪ সালে প্রশাসন ডাকসু নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলে সেসময় বিরোধী ছাত্রসংগঠনের ভূমিকায় থাকা ছাত্রলীগ হলের বাইরে ভোটকেন্দ্র করার দাবি জানায়। ক্ষমতাসীন ছাত্রদলের দাবি ছিল ভোটকেন্দ্র হলে রাখার। প্রশাসন ভোটকেন্দ্র হলেই রাখে। সে বিষয়টি তুলে ধরে ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘একটা কথা আপনারা (গণমাধ্যম) ও তারাও বলে থাকে, ছাত্রলীগও ৯৪ সালে ভোটকেন্দ্র হলের বাইরে দাবি করেছিল। হ্যাঁ, ওই সময়ের প্রেক্ষাপট আর বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন। ছাত্রদলকে আমরা পহেলা ফাগুনে ফুল দিয়ে বরণ করি, তাদের আমরা চা খাওয়াই, ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ক্যাম্পাস দেখাই। আর ওই সময়ে (১৯৯৪ সালে) ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ঢুকতে পারে নাই। তারপরও কিন্তু প্রশাসন ছাত্রলীগের ওই দাবিকে অযৌক্তিক মনে করে বাতিল করে দিয়েছিল। বর্তমানে ছাত্রদল যে দাবি করছে তাকেও প্রশাসন অযৌক্তিক মনে করেই বাতিল করেছে।’

আমিরাতের প্রতিরক্ষা প্রদর্শনীতে যোগ দিলেন প্রধানমন্ত্রী

জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে বিশ্বকে রক্ষায় ধনী দেশগুলোর প্রতি  আহ্বান জানিয়ে জার্মানি সফর শেষ করে এখন আবুধাবিতে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জার্মান সফরকালে মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্স ছাড়াও আন্তর্জাতিক সংস্থা-সংগঠন এবং শিল্পোদ্যোক্তাদের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে তার। তবে দেশটির চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেলের সঙ্গে বৈঠকে ঢাকার চেষ্টা এবং প্রত্যাশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত  বৈঠকটি হয়নি। ৩ দিনের আবুধাবি সফরের প্রথম দিনে রোববার সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকার আয়োজিত আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা প্রদর্শনী (আইডিইএক্স) পরিদর্শন করেছেন তিনি। আমিরাতের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রী এবং দুবাই-এর শাসক শেখ  মোহাম্মেদ বিন রাশিদ আল মাকতুম’র আমন্ত্রণে বাংলাদেশের সরকার প্রধান ওই প্রদর্শনীতে যোগ দেন। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস জানিয়েছে- আবুধাবির ন্যাশনাল এক্সিবিশন  সেন্টারে ৫ দিনব্যাপী এই প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে সামরিক কর্মকর্তা এবং সরকারি সংস্থার জন্য সামরিক কাজে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ এবং সামগ্রী প্রদর্শিত হচ্ছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রদর্শনী কেন্দ্রে  পৌঁছালে তাকে আবুধাবির যুবরাজ  শেখ মোহাম্মেদ বিন সুলতান আল-নাহিয়ান অভ্যর্থনা জানান।
আইডিইএক্স হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার দেশসমূহের জন্য একমাত্র প্রতিরক্ষা প্রদর্শনী এবং সম্মেলন।
যেখানে প্রতিরক্ষা খাতের স্থল, নৌ এবং আকাশ পথের নবতর প্রযুক্তির প্রদর্শনী করা হয়। ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতি দুই বছর অন্তর সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রপতি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়কের পৃষ্ঠপোষকতায় এই প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। যার মূল উদ্দেশ্য এই অঞ্চলের দেশগুলোতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে শক্তিশালী করা। গত মাসে টানা তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণের পর তার প্রথম বিদেশ সফরের দ্বিতীয় পর্যায়ে শেখ হাসিনা রোববার সকালে আবুধাবি  পৌঁছান। সফরকালে শেখ হাসিনা সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে বৈঠক করবেন এবং এখানে প্রবাসী বাংলাদেশি আয়োজিত এক সংবর্ধনায় অংশগ্রহণ করবেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রায় ৭ লাখ বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। আইডিইএক্স প্রদর্শনীতে ১৩শ’র অধিক প্রতিরক্ষা ফার্ম এবং সংস্থাগুলো অংশগ্রহণ করছে। এই অঞ্চলের বৃহত্তম বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা প্রদর্শনী আইডিইএক্স এ বছর তার রজত জয়ন্তী উদ্‌যাপন করছে এবং এতে ৬০টির অধিক দেশের প্রতিনিধিগণ অংশগ্রহণ করছেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব  মোকাবিলায় ধনী দেশগুলোকে ‘সদিচ্ছা’ প্রদর্শনের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর: এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব থেকে বিশ্বকে রক্ষায় ‘সদিচ্ছা’ নিয়ে কাজ করার জন্য ধনী  দেশগুলোর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আমাদের যথেষ্ট বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, উদ্ভাবনা এবং অর্থায়ন রয়েছে। আমাদের এখন  কেবল প্রয়োজন সমাজের সর্বত্র ধনিক  শ্রেণির সদিচ্ছা, আগ্রহ ও প্রচেষ্টা।’ শনিবার রাতে মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের ফাঁকে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ এজ এ সিকিউরিটি থ্রেট’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী একথা বলেন। আলোচনা অনুষ্ঠানে পোস্টডাম ইনস্টিটিউট ফর ক্লাইমেট পরিচালক হানস জোয়াসিম সভাপতিত্ব করেন। ক্যাবিনেট সেক্রেটারি ফর ফরেন অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড অব কেনিয়া মনিকা জুমা, নরওয়ের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইনি ইরিকসন সরিডি, ইউএস সিনেটর সেলডন, হোয়াইট হাউস অ্যান্ড কো-এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর অব গ্রিনপিস ইন্টারন্যাশনাল বুন্নি ম্যাকডিয়ারমিড প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন। ডয়েচে ভেলের চিফ পলিটিক্যাল করসপন্ডেন্ট বার্লিন ম্যালিন্ডা ক্রেনি রোর্স অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। শেখ হাসিনা বলেন,  বৈশ্বিক অব্যাহত উষ্ণতা বৃদ্ধিসহ জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের জন্য সত্যিকার এক হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশে সাইক্লোন, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস এবং মৌসুমী বন্যা মানুষের জীবন জীবিকার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি এ বিষয়ে কারো  কোনো সন্দেহ থাকে, তাদেরকে আমি বাংলাদেশে এসে প্রকৃত অবস্থা দেখে যাওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি।
২০১২ সালে ইউএনজিএ সিদ্ধান্তের বিষয় পুনরুল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব  মোকাবিলায় সমষ্টিগত প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।  শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের প্রমাণ পাওয়া যায় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের আরো অনেক হুমকির কারণে লাখ লাখ মানুষ পৈতৃক ভূমি ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে, নদী ভাঙন, লবণাক্ত পানি এবং ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের মিশ্রণের কারণে এসব ঘটছে। তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরে পানিতে অ্যাসিডিটি বাড়ছে, সমুদ্রের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের এক তৃতীয়াংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, বিগত এক দশক ধরে তিনি  কোপেন হেগেন, নিউ ইয়র্ক, কিউবা ও ইসা-শিমার বৈশ্বিক আলোচনায় তিনি বিশ্ব নেতৃবৃন্দের কাছে বারবার জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম  বৈশ্বিক ব্যবসা ও শিল্পক্ষেত্রে জলবায়ু পরিবর্তনকে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে এবং খুঁজে  পেয়েছে যে, অভিযোজন ও প্রশমনে ব্যর্থতা, পানি সংকট ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবসা ও শিল্পক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বৃটিশ আবহাওয়া অফিস ২০১৪ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত এক দশককে ১৫০ বছরের মধ্যে উষ্ণতম দশক বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে। অতএব অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা ও মানবীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিপর্যয়ের মূলে যে পরিবেশ সংকট প্রধান ও একমাত্র কারণ হয়ে দাঁড়াবে, তা প্রশ্নাতীত। তিনি জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলার জন্য জীবনযাত্রা, আচরণ, পদ্ধতি ও অর্থনীতিতে পরিবর্তনের আহ্বান জানান।

কী মর্মান্তিক! চট্টগ্রামে বস্তিতে আগুনে প্রাণ গেল ৮ জনের by ইব্রাহিম খলিল

চট্টগ্রামে বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে জীবন্ত পুড়ে মৃত্যু হয়েছে দুই পরিবারের ৮ নারী-পুরুষ ও শিশুর। এরমধ্যে একজনের লাশ এখনো শনাক্ত হয়নি। পুড়ে ছাই হয়ে গেছে দুই শতাধিক ঘর ও দোকানপাট। নিখোঁজ রয়েছেন আরেকজন।
তাদের মৃত্যুর কাল হলো ‘দরজায় লাগানো তালা’। চোরের ভয়ে দরজায় তালা লাগিয়ে ঘুমাতেন বস্তিবাসীরা। আগুনের ধোঁয়ায় দিশাহারা হয়ে চাবি না পেয়ে তালা খুলতে পারেনি তারা। ভাঙতেও পারেনি।
শেষে জ্বলন্ত আগুনে পুড়ে মরলো তারা।
এরমধ্যে মা-দুই বোন ও এক ভাইসহ ৪ জনকে হারিয়ে নির্বাক ১০ বছরের শিশু নারগিস। নারগিস বলে, রাতে আমরা একসঙ্গেই ঘুমিয়ে ছিলাম। এরপর আগুন..., ঘর থেকে  কীভাবে বের হলাম কিছুই মনে পড়ছে না।
আগুনে জীবন্ত পুড়ে নিহতরা হলেন-নারগিসের মা রহিমা আক্তার (৫০), বোন নাজমা (১৪), ভাই জাকির হোসেন (৯) এবং আরেক বোন নাসরিন (৪)।
নারগিসদের পাশেই থাকেন সাত্তার কলোনির বাসিন্দা সালমা আক্তার (৬০)। তিনি বলেন, কলোনিতে রাতে চোরের উৎপাত বেশি। সেজন্য আমরা দরজার ভেতর থেকে তালা লাগিয়ে ঘুমাই। প্রথমে খালের পাশে বস্তিঘরে আগুন লাগে। আমি আগুন দেখার পর চিৎকার করতে থাকি। তালা খুলতে গিয়ে দেখি চাবি পাচ্ছি না। তখন দা দিয়ে তালা ভেঙে ফেলি। তারপর বেরিয়ে আসি।
আর পাশের রহিমাদের ঘরেও তালা ছিল। তারা তালা ভাঙতে না পারায় বেরুতে পারেনি। সবাই পুড়ে মরেছে। নারগিসের সৎভাই মো. রফিক এসে পেছনের দরজা ভেঙে ফেলায় নারগিস কোনোমতে প্রাণে বেঁচেছেন।
সালমা আক্তার জানান, বস্তির প্রবেশমুখের প্রথম বসতি সাত্তার কলোনিতে একটি মুদির দোকান করতেন স্থানীয় সুরুজ আলীর স্ত্রী রহিমা। দোকান সংলগ্ন সেমিপাকা ঘরে চার সন্তান নিয়ে থাকতেন রহিমা। সুরুজ আলী আরেক স্ত্রী নিয়ে কাছেই আরেকটি কলোনিতে থাকেন। সৎভাই রফিক সৎমায়ের পাশাপাশি থাকতেন। আগুন লাগার পর ঘুম থেকে উঠে আসে রফিক।
রফিক বলেন, গভীর রাতে যখন ঘুম ভাঙে তখন দেখি আগুন আমার খুব কাছাকাছি। নিরাপত্তার জন্য ঘরের ভেতর থেকে তালাবদ্ধ ছিল। অন্ধকারে চাবি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। পরে বাইরে থেকে লোকজন লাথি মেরে দরজা ভেঙে দিলে আমি, আমার স্ত্রী আর নার্গিস ঘর থেকে বের হয়ে প্রাণে বাঁচি। অন্য ঘরে আমার সৎ মা রহিমা বেগম, দুই বোন ও এক ভাই আগুনে জীবন্ত পুড়ে মারা যায়। পাশাপাশি তাদের ঘরের প্রায় দুই লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
আগুনে সাত্তারের কলোনির আরো এক পরিবারের দুজন মারা গেছেন। এরা হলেন-আয়শা আক্তার (৩৭) ও তার ভাগ্নে সোহাগ (১৮)। এ ছাড়া আয়শার ১১ বছর বয়সী মেয়ে ঋতু আক্তারের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানান আয়শার ভাই স্থানীয় তেলের দোকানের কর্মচারী মনির হোসেন।
মনির হোসেন জানান, চোরের ভয়ে তাদের ঘরের দরজায়ও ভেতর থেকে তালা লাগানো ছিল। আগুনের কুণ্ডলীর ধোঁয়ায় দিশাহারা হয়ে চাবি খুঁজে না পেয়ে তালা খুলতে পারেনি তারা। ভাঙার চেষ্টা করেও ভাঙতে পারেনি। ফলে আগুনে জীবন্ত পুড়ে মারা গেছে বোন ও সোহাগ। 
মনির হোসেন আরো জানান, সোহাগ চা-দোকানে কাজ করতো। খালার বাসায় থাকতো সে। বোন আয়শার স্বামীও মারা গেছেন।
আগুনে পুড়ে মারা গেছেন একই কলোনির বাসিন্দা চটের বস্তার দোকানের কর্মচারী সামশু মিয়ার স্ত্রী হাসিনা আক্তার (৩৭)ও। এ ছাড়া উদ্ধার হওয়া ৮ মরদেহের মধ্যে একজনের পরিচয় মেলেনি।
নগরীর বাকলিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) প্রণব চৌধুরী বলেন, আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া ৮ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এরমধ্যে এক শিশুর মৃতদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তবে এই শিশু নিহত আয়শা আক্তারের নিখোঁজ মেয়ে ঋতুর কিনা তা নিশ্চিত হতে তার ডিএনএ টেস্ট করা হবে।
ওসি বলেন, ঘুমন্ত অবস্থায়ই পুড়ে তারা মারা গেছে। চোরের ভয়ে ঘরের দরজায় তালা লাগিয়ে ঘুমানোর বিষয়টি আগে থেকে আমার জানা ছিল না।
এদিকে পুড়ে মারা যাওয়ার ঘটনায় আগুনকে না যত দায়ী করছেন বস্তিবাসীরা তারা চেয়ে বেশি দায়ী করছেন চোরের ভয়ে দরজায় লাগানো তালাকে। আর দোষ দিচ্ছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। বস্তিবাসীর মতে, চোরদের বিরুদ্ধে আগে থেকে ব্যবস্থা নেয়া হলে দরজায় তালা লাগিয়ে তাদের ঘুমাতে হতো না।
এভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করেন সাত্তার কলোনির বাসিন্দা মধ্যবয়সী রুমা আক্তার। তিনি বলেন, চোরের ভয়ে কলোনির সবাই দরজার ভেতরে তালা দিয়ে ঘুমায়। ৭ বছর বয়স থেকে আমি এই এলাকায় আছি। কে চোর, কে ডাকাত, কে ছিনতাইকারী সব আমি চিনি। পুলিশও এদের চিনে। কিন্তু পুলিশ তাদের ধরে না।
চট্টগ্রামের ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক জসিম উদ্দিন জানান, ভোররাত ৩টা ৩২ মিনিটের দিকে তারা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে অগ্নিকাণ্ডের সংবাদ পান। ফায়ার সার্ভিসের চন্দনপুরা, লামারবাজার, নন্দনকানন ও আগ্রাবাদ স্টেশনের ১০টি গাড়ি ঘটনাস্থলে গিয়ে ভোর সোয়া ৪টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। মাত্র ৪৫ মিনিটের আগুনে দুই শতাধিক ঘর পুড়ে গেছে। মারা গেছে ৮ জন। সব লাশ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে রাখা হয়েছে।
জসিম উদ্দিন বলেন, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের টিম এসেছে। পুলিশের টিমও ছিল। পুলিশ রাস্তায় বেষ্টনী দিয়ে সাধারণ লোকজনের প্রবেশ বন্ধ করে দেয়। এতে আগুন নেভাতে তেমন বেগ পেতে হয়নি। বস্তি সংলগ্ন এলাকায় বেশ কয়েকটি মার্কেট, দোকানপাট ও পোশাক কারখানা রয়েছে। দ্রুত আগুন নিয়ন্ত্রণে আসায় সেগুলো রক্ষা পেয়েছে।
এদিকে আগুন লাগার খবর পেয়ে রোববার ভোরেই ঘটনাস্থলে আসেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন। আগুনে পুুড়ে মৃতদের স্বজনদের সঙ্গে তিনি কথা বলেন ও আহতদের খোঁজখবর নেন। নিহতদের প্রত্যেকের দাফনসহ আনুষঙ্গিক কাজের জন্য ২০ হাজার টাকা করে দেয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক।
জেলা প্রশাসক সাংবাদিকদের বলেন, অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনো আমরা জানি না। এটা বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট কিংবা রান্নার চুলা থেকে হতে পারে। অথবা অন্য কোনো উৎস থেকেও হতে পারে। আমরা এটা তদন্তের জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি কমিটি করেছি। তারা তদন্ত করে দেখবে।