Monday, September 9, 2024

জম্মু-কাশ্মীরের ভোটের মাঠে জামায়াত, জনসমাগম বিস্ময়কর

পুরোপুরি বদলে গেছে জম্মু–কাশ্মীরের ভোট–ছবি। বিশেষ মর্যাদা হারানো এই রাজ্যের ভোট এবার নতুন চমক জাগায় কি না, সেই আগ্রহ জেগে উঠেছে।

১০ বছর পর জম্মু–কাশ্মীর বিধানসভার ভোট হতে চলেছে। শেষবার হয়েছিল ২০১৪ সালে। বিজেপি–পিডিপি মিলে সরকার গড়েছিল, যার পতন ঘটে ২০১৮ সালে। এর পরের ইতিহাস সবার জানা। জম্মু–কাশ্মীর শুধু রাজ্যের মর্যাদাই হারায়নি, হারায় তার বিশেষ চরিত্রও। খারিজ হয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ।

১০ বছর আগের তুলনায় এবারের ভোট–চরিত্র পুরোপুরি আলাদা। কেননা, দীর্ঘ ৩৭ বছর পর এই প্রথম জামায়াতে ইসলামির (জেআই) সাবেক নেতারা বিধানসভার ভোটে নিজেদের ভাগ্য পরীক্ষায় নেমে পড়েছেন। সেই সিদ্ধান্ত জন্ম দিয়েছে বহু অভিযোগ ও প্রশ্নের। উপত্যকার রাজনৈতিক নেতাদের ধারণা, ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে এটা বিজেপির নবতম চাল।

সত্যি বলতে কি, এবারের ভোটের প্রধান আকর্ষণ জামায়াত। জম্মু–কাশ্মীরে জামায়াত শেষবার নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিল ১৯৮৭ সালে। বিধানসভার সেই ভোট এখনো কারচুপির জঘন্যতম নিদর্শন বলে চিহ্নিত। সেই ভোটে জামায়াত লড়েছিল মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্টের (এমইউএফ) ব্যানারে। প্রবল আশা ও প্রচুর উদ্দীপনা সত্ত্বেও সেবার জামায়াতের প্রার্থীরা জিতেছিলেন মাত্র ৪টি আসন, যদিও মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্ট ভোট পেয়েছিল ১৮ দশমিক ৯ শতাংশ। তাদের চেয়ে মাত্র ১ শতাংশ বেশি ভোট পেয়ে কংগ্রেস সেবার জিতেছিল ২৬টি আসন, ন্যাশনাল কনফারেন্স (এনসি) পেয়েছিল ৪০টি আসন। এনসি পেয়েছিল প্রায় ৩৩ শতাংশ ভোটারের সমর্থন।

পরে জামায়াত যোগ দিয়েছিল হুরিয়ত কনফারেন্সের সঙ্গে। ডাক দিয়েছিল ভোট বর্জনের। একসময় নিষিদ্ধও ঘোষিত হয় জামায়াত, এখনো নিষিদ্ধ। সম্প্রতি সেই নিষেধাজ্ঞা বাড়ানো হয়েছে ২০২৯ সাল পর্যন্ত। অথচ সরকারি উৎসাহ, উদ্যোগ ও মদদেই এবার তারা নির্বাচনের শরিক—যদিও নিজেদের সংগঠনের ব্যানারে নয়, স্বতন্ত্র হিসেবে। বিতর্ক সৃষ্টি করেছে সেই সিদ্ধান্তই।

উপত্যকায় এনসি, কংগ্রেস ও পিডিপির কর্তৃত্ব খর্ব করতে কেন্দ্রীয় সরকার জামায়াতের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে চেয়েছিল। শর্ত ছিল, ভারতীয় সংবিধান মেনে নিয়ে তাদের নির্বাচনে দাঁড়াতে হবে। জামায়াত রাজিও হয়েছিল। বেরিয়ে এসেছিল হুরিয়ত কনফারেন্সের ছত্রচ্ছায়া থেকে। কিন্তু আরএসএসের আপত্তিতে কেন্দ্রীয় সরকার তা পারেনি। তাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে তারা নির্বাচনের আসরে নেমেছে। তিন সাবেক নেতা তালাত মজিদ, সায়ার আহমেদ রেশি ও নাজির আহমেদকে তারা প্রথম পর্বের ভোটে মনোনয়ন দিয়েছে। সমর্থন জানিয়েছে আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী আজাজ আহমেদকেও, পিডিপি এবার তাঁকে টিকিট দেয়নি। এই স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়েই উপত্যকার প্রথম পর্বের ভোট সরগরম।

আগ্রহ ও উত্তেজনার আরও এক কারণ পরিচিত কারাবন্দী ইঞ্জিনিয়ার রশিদ। দিল্লির তিহার জেলে বন্দী থেকেও তিনি লোকসভা ভোটে হারিয়ে দেন সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও এনসির সহসভাপতি ওমর আবদুল্লাহকে। ২ লাখের বেশি ভোটে তাঁর জয় উৎসাহিত করেছে জামায়াত ও অন্যদের, যারা প্রথাসিদ্ধ রাজনীতির বিরোধিতা করার কারণে মূলধারার রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন রয়েছে এত বছর।

বিজেপিও উপত্যকার ভোটে এদেরই টেনে আনতে উৎসাহিত হয়েছে, যাতে মুসলমান সমর্থন নানা ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। ইঞ্জিনিয়ার রশিদ গড়ে তুলেছেন নিজের দল আওয়ামি ইত্তেহাদ পার্টি (এআইপি)। তাঁর ভাই খুরশিদ আহমেদ শেখ সরকারি স্কুলের শিক্ষকতার চাকরি ছেড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন।

বিজেপির এই নীতিকেই আক্রমণ করেছেন ওমর আবদুল্লাহ। গত রোববার শ্রীনগরে আবদুল্লাহ পরিবারের ‘খাসতালুক’ বলে পরিচিত গান্দারবাল নির্বাচনী কেন্দ্রে এক জনসভায় বিজেপিকে আক্রমণ করে তিনি বলেন, উপত্যকায় তাঁকে ও তাঁদের মতো জাতীয়তাবাদী দলগুলোকে হারাতে বিজেপি হাত মিলিয়েছে তাদের (জামায়াত) সঙ্গে, যাঁরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে আসরে নেমেছেন। বিজেপি ভাবছে, জম্মুর হিন্দু সমর্থনে ভর দিয়ে ও উপত্যকার এই শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার গড়বে। জম্মু–কাশ্মীরকে উপহার দেবে প্রথম হিন্দু মুখ্যমন্ত্রী।

এটাই এবারের ভোটের চমক। আর এই চমকই হয়ে উঠতে পারে উপত্যকার চিরায়ত রাজনীতির পরিবর্তনের শুরু। দক্ষিণ কাশ্মীরের কুলগাম কেন্দ্রের বোগাম গ্রামে রোববার এক জনসভায় যোগ দেন জামায়াতের স্বতন্ত্র প্রার্থী সায়াদ আহমেদ রেশি। এই কেন্দ্র থেকে বারবার বিধানসভায় জিতে এসেছেন সিপিএম নেতা এম ওয়াই তারিগামি। এবারও তিনিই প্রার্থী। লড়ছেন ‘ইন্ডিয়া’ জোটের প্রার্থী হিসেবে, এনসি–কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে। তারিগামির চ্যালেঞ্জার রেশি। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছেন, এতকালের প্রথামাফিক রাজনীতি একটা গভীর শূন্যতার সৃষ্টি করেছে। সেই শূন্যতা ভরাট করাই তাঁদের লক্ষ্য।

ভোটের ঘোষণার পর জামায়াত এত দিন গ্রামে গ্রামে ঘুরে প্রচার চালাচ্ছিল। গতকাল রোববার বোগাম গ্রামে তারা প্রকাশ্য সমাবেশ করে। সেখানে জনসমাগম ছিল বিস্ময়কর। এই সমর্থনই তাঁদের শক্তি জানিয়ে রেশি বলেন, কিছু মানুষ এখনো তাঁদের দিকে আঙুল তুলবেন। তাঁদের এতকালের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন। কিন্তু তাঁরা বাস্তবতার দিকে তাকিয়েই ভোটে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

জামায়াতের নেতারা জানিয়েছেন, উপত্যকার মানুষের সম্মান প্রতিষ্ঠায় যাঁরা কাজ করবেন, তাঁরা সেই দলকেই সমর্থন করবেন।

প্রশ্ন উঠেছে, যাঁরা এতকাল উপত্যকায় রক্তপাত ঘটিয়েছেন, তাঁদের কী করে কেন্দ্রীয় সরকার মদদ দেয়? কোন লক্ষ্যে? কী উদ্দেশ্যে?

ওমর আবদুল্লাহরাও প্রতিটি জনসভায় এই প্রশ্নই তুলে যাচ্ছেন। বিজেপির উত্তর, অস্ত্র ছেড়ে যাঁরা রাজনীতির মূলধারায় ফিরতে আগ্রহী, তাঁদের সুযোগ দেওয়া উচিত।

পরিবর্তিত জম্মু–কাশ্মীরে এটাই পরিবর্তনের হাওয়া কি না, বোঝা যাবে অক্টোবরে। তিন ধাপে ১৮ সেপ্টেম্বর, ২৫ সেপ্টেম্বর ও ১ অক্টোবর ভোট গ্রহণ শেষে ৪ অক্টোবর ফল ঘোষণা করা হবে।

ভারতের জাতীয় পতাকা

বাংলাদেশে কমছে ভারতের প্রভাব, আঞ্চলিক রাজনীতির নতুন মোড়

ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান শেখ হাসিনা। এরপর থেকে তিনি ভারতেই অবস্থান করছেন। আর শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর বাংলাদেশে ভারতের প্রভাব কমছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

দ্য গার্ডিয়ানে হান্না এলিস-পিটারসনের এক নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে, শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি এবং বিরোধী দল কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্কের কারণে বাংলাদেশ ভারতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ এবং বিশ্বস্ত আঞ্চলিক মিত্র হতে পেরেছিল। অন্য প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খারাপ থাকলেও শেখ হাসিনার কারণে বাংলাদেশ ছিল তাদের বিশ্বস্ত সঙ্গী। পাশাপাশি আঞ্চলিক রাজনীতিতে চীন ব্যাপকভাবে অন্য দেশগুলোতে প্রভাব বিস্তার করলেও বাংলাদেশে তা সম্ভব হয়নি।

এ অবস্থায় গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনে অনেক হিসাব-নিকাশ উল্টে গেছে। এ বিষয়ে India’s Grip on Bangladesh is Slipping: No Longer a Pawn in Regional Politics শিরোনামে ‘শ্রীলঙ্কা গার্ডিয়ানে’ একটি নিবন্ধ লিখেছেন সেন্টার ফর অল্টারনেটিভস, বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ। তিনি মালয়েশিয়ার টেলরস ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং প্রফেসরও।

ওই নিবন্ধে অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ লেখেন— বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। এ অবস্থায় ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে তার সম্পর্ককে কীভাবে নেভিগেট করে তা প্রকাশের জন্য আগামী তিন থেকে ছয় মাস হবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে বাংলাদেশে প্রভাব কমছে ভারতের এবং ঢাকার সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক কোন দিকে যাবে সেই বলও এখন রয়েছে নয়াদিল্লির কোর্টে।

গত বৃহস্পতিবার ভারতের উত্তর প্রদেশের লক্ষ্ণৌতে তিন বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের যৌথ সম্মেলনে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি বলেন, ভারত শান্তিপ্রিয় দেশ। শান্তি রক্ষার জন্য ভারতের সশস্ত্র বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। তিনি বক্তব্যে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে বলতে গিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও হামাস-ইসরায়েল প্রসঙ্গ টেনেছেন। প্রতিবেশী দেশগুলোর পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব সীমান্ত পরিস্থিতির ওপরও নজর রাখতে বলেছেন।

এ বিষয়ে ড. ইমতিয়াজ আহমেদের নিবন্ধে বলা হয়েছে, ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সম্প্রতি যা বলেছেন তার পেছনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সম্ভবত অবদান রেখেছে। প্রথমত, তিনি ঘরোয়া নির্বাচনী এলাকায় ভাষণ দিতে চেয়েছিলেন এবং ভারতীয় জনগণকে আশ্বস্ত করতে চেয়েছিলেন। তিনি তার বক্তব্যে উল্লেখ করেছেন- ‘ভারতকে অপ্রত্যাশিত কিছু মোকাবিলা করতে হবে।’ তার এই ‘অপ্রত্যাশিত’ শব্দটি থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে- তিনি মূলত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক পট-পরিবর্তনকে বোঝাতে চেয়েছেন, যেটাকে ভারতের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। মূলত ভারতের মিডিয়া এবং কিছু নীতিনির্ধারক গত ৫ আগস্টের পর তেমনই ইঙ্গিত দিয়েছে।

নিবন্ধে লেখক আরও বলেছেন, তিনি নিশ্চিত, ভারতের বেশিরভাগ অংশ অবশ্যই এ ঘটনায় পুরোপুরি হতবাক হয়েছে, কারণ গত এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে ভারত বলে আসছিল— বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক সবচেয়ে ভালো। এখন এখানে যে পয়েন্টটি অনুপস্থিত তা হলো : ভারতের সম্পর্ক বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে ছিল না; ছিল একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠীর সঙ্গে। আর সেটাই ব্যর্থ হয়েছে। ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, তিনি নিশ্চিত তারা অর্থাৎ ভারত এখন বুঝতে পেরেছে, কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্ক না করে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা অনেক ভালো।

দ্বিতীয় কারণটি হলো- বহুমুখী বিশ্বে ভারত অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে তার অবস্থান অর্জন করতে চায়। দেশটির অর্থনীতি আয়তনের দিক থেকে ইতোমধ্যেই যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সকে ছাড়িয়ে গেছে।

আর তৃতীয় কারণটি হলো- বাংলাদেশকে স্বাভাবিকভাবে না নেওয়া, যেমনটি ভারত নিয়েছিল আওয়ামী লীগের শাসনামলে। তাই ড. ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন সে বার্তাটি ভারতীয় শ্রেণিবিন্যাস এবং স্টেকহোল্ডারদের কাছে পাঠানো হয়েছে। বিশেষ করে যখন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস তিস্তার পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, সার্ককে পুনরুজ্জীবিত করাসহ আরও বেশ কিছু বিষয়ে ইতোমধ্যেই উল্লেখ করেছেন। এর আগে তিনি অর্থাৎ ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে বিশেষ বক্তব্যও দিয়েছেন। ড. ইমতিয়াজ আহমেদ তার নিবন্ধে আরও বলেছেন- নয়াদিল্লি নিঃসন্দেহে নিশ্চিত যে- বাংলাদেশের বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকার থেকে ভিন্ন। সুতরাং, তাদের সঙ্গে সে অনুযায়ী কাজ করতে হবে।

শেখ হাসিনা সরকারের পতনে পাল্টে গেছে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অনেক সমীকরণ। ছবি : সংগৃহীত

সিরিয়ায় ইসরাইলের বিমান হামলা, নিহত ১৪

সিরিয়ার মধ্যাঞ্চলে বিমান হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। এতে কমপক্ষে ১৪ জন নিহত হয়েছেন। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে উদ্ধৃত করে এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। সানা হাসপাতালের এক কর্মকর্তার বরাতে জানানো হয়েছে রোববার সিরিয়ার হামা প্রদেশের মাসিয়াফের আশপাশে বিমান এ হামলা চালানো হয়। এতে তাৎক্ষণিকভাবে ৪৩ জন আহত হয়েছেন। ইসরাইল সিরিয়ার ওই অঞ্চলে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সামরিক ঘাঁটি এবং স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক একটি মনিটরিং গ্রুপ। যাতে চার সামরিক সদস্য এবং তিন বেসামরিক নিহত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনও মুখ খোলেনি ইসরাইল। সিরিয়াতে অতর্কিত ইসরাইলি হামলা নতুন কিছু নয়। এর আগে সিরিয়াতে বেশ কয়েবার হামলা চালানোর নজির রয়েছে তেল আবিবের।

মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের শক্তি জানান দিতে বার বার ইরান সমর্থিত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করে আসছে তারা। হিজবুল্লাহ সহ লেবানন ও সিরিয়াতে অবস্থিত যেসকল সশস্ত্র গোষ্ঠী রয়েছে তারা হামাসের পক্ষে গত বছরের ৭ অক্টোবরের পর থেকে ইসরাইল সীমান্তে হামলা শুরু করেছে। এর জের ধরে এসব গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে হামলা জোরদার করেছে ইসরাইল। সানা হাসপাতাল সিরিয়ার একটি সামরিক সূত্রকে উদ্ধৃত করে বলেছে যে উত্তর-পশ্চিম লেবাননের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় রোববার দিবাগত রাত প্রায় দেড়টার দিকে বেশ কয়েকটি সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে এ হামলা চালিয়েছে ইসরাইল।

অন্যদিকে তেল আবিবের নিক্ষেপ করা বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহতের দাবি করেছে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো। হামলায় সিরিয়ার মধ্যাঞ্চলের বেশ কয়েকটি প্রধান সড়ক মারত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সিরিয়ায় নিযুক্ত যুক্তরাজ্য ভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কর্মকর্তারা জানিয়েছে, মাসিয়াফের একটি সামরিক গবেষণা কেন্দ্রে কমপক্ষে ১৩টি বোমা বিস্ফোরণ করা হয়েছে। এই সামরিক গবেষণা কেন্দ্রে ইরানপন্থী বেশ কয়েক বিশেষজ্ঞ কাজ করেন বলে জানা গেছে। সংগঠনটি বলছে তেল আবিবের এই হামলায় তিন বেসামরিক নাগরিক এবং চারজন সামরিক সদস্য নিহত হয়েছেন।

mzamin

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ইসলামিক জোটের আহ্বান এরদোয়ানের

 

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মুসলিম দেশগুলোর জোটবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান।

শুক্রবার (০৬ সেপ্টেম্বর) রাজধানী ইস্তাম্বুলে ইসলামিক স্কুল অ্যাসোসিয়েশনের এক অনুষ্ঠানে তিনি এ আহ্বান জানান। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদন এ তথ্য জানানো হয়েছে।

এরদোয়ান বলেন, ইসলামিক দেশগুলোর এক হওয়াই ইসরায়েলি সন্ত্রাসবাদ আটকানোর একমাত্র পথ।

তিনি বলেন, তুরস্ক সম্প্রতি সিরিয়া ও মিসরের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে জোর দিচ্ছে। কারণ ইসরায়েলের ‘ক্রমবর্ধমান সম্প্রসারণবাদের ঝুঁকি’ থামাতে চায় তুরস্ক। ইসরায়েলি সম্প্রসারণবাদ লেবানন ও সিরিয়াকেও হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

গত সপ্তাহে তুরস্ক সফরে আসেন মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল সিসি। এটি গত এক যুগের মধ্যে দেশটির প্রথম কেনো প্রেসিডেন্টের সফর। এ সফরে গাজা যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা করেন তারা।

মিসেরর তৎকালীন সেনাপ্রধান সিসি মুসলিম ব্রাদারহুডের মোহাম্মদ মুরসিকে ক্ষমতাচ্যুত করে ক্ষমতা দখল করেন। ২০১৩ সালে মুরসি সরকার পতনের পর তুরস্ক ও মিসরের মধ্যকার সম্পর্ক ভেঙে পড়ে। মুরসি তুরস্কের মিত্র ও দেশটির গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রথম প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০১২ সালে সবশেষ তুরস্ক সফর করেছিলেন তিনি।

ইউরোপীয় বিশ্লেষকদের ধারণা, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুরস্কের প্রভাব খানিকটা কমে এসেছে। ফলে তা পুনরুদ্ধার করতে ইউরোপ থেকে শুরু করে এশিয়া ও আমেরিকা সফরের সিদ্ধান্ত ‍নিয়েছেন তিনি।

থিঙ্ক ট্যাংক আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষক ওমর ওজকিজিলসিক জানান, আঙ্কারার নীতি নির্ধারকরা তুরস্কের স্বার্থান্বেষী চোখে গোটা বিশ্বকে দেখছেন। তারা তুরস্কের কূটনীতিকে চারদিকে ছড়িয়ে দিতে চান এবং এশিয়ার উদীয়মান কোনো শক্তির সঙ্গেই অংশীদারত্বের সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না।

স্নায়ুযুদ্ধের পর বিশ্বের সামনে নতুন হুমকি

স্নায়ুযুদ্ধের পর নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিশ্ব। বলা হচ্ছে, স্নায়ুযুদ্ধের পর বিশ্বব্যবস্থা এর আগে কখনও এমন হুমকির মুখে পড়েনি। বিশ্ব রাজনীতিতে কয়েকটি দেশের সমান্তরাল প্রভাব বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গোয়েন্দারা। আর এসব দেশের উত্থানেই না কি হুমকির মুখে পড়েছে বিশ্ব ব্যবস্থা।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর বিশ্বব্যবস্থার ওপর একচেটিয়াভাবে খবরদারি করে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু দেশটিকে টেক্কা দিয়ে ক্রমেই বাড়ছে চীন ও রাশিয়ার প্রভাব। পরিবর্তিত এই বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত নয়। তাই তারা বারবার, বিশ্ব ব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ার মতো বুলি আওড়াচ্ছে।

এমতাবস্থায় বদলে যাওয়া এই বিশ্বব্যবস্থা নিয়ে সতর্ক করে দিয়েছেন পশ্চিমা গোয়েন্দারা। তারা বলছেন, এতে করে নতুন ধরনের সাইবার আক্রমণ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার এবং নতুন ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্বকে একটি অস্বাভাবিক ও অস্থির পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিতে পারে।

চীনের প্রভাব এবং রাশিয়ার সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে বিশ্ব শাসনের মৌলিক কাঠামোকে পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে মত দিয়েছেন গোয়েন্দারা। এমন পরিস্থিতিতে, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে একসঙ্গে কাজ করা বিশ্বব্যাপী স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন তারা।

সম্প্রতি লন্ডনে একটি নিরাপত্তা সম্মেলনে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে কথা বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর প্রধান উইলিয়াম বার্নস ও যুক্তরাজ্যের গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬-এর প্রধান রিচার্ড। তারা বলেন, ইউক্রেনকে সহযোগিতায় একতাবদ্ধ থাকা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই যুদ্ধে রাশিয়া সফল হবে না বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা।

শনিবার ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য ফিন্যান্সিয়াল টাইমসে বার্নস ও মুরের একটি যৌথ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। প্রথমবারের মতো লেখা যৌথ নিবন্ধে বিশ্বব্যবস্থাসহ বিভিন্ন দিক নিয়ে লিখেছেন তারা। নিবন্ধে বার্নস ও মুর লিখেছেন, ইউক্রেনে যে যুদ্ধ আসন্ন সেটা তারা আগেই আঁচ করতে পেরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেছিলেন। এ ছাড়া ইউক্রেনকে সাহায্যে গোপন তথ্যও প্রকাশ করা হয়।

সিআইএ ও এমআই৬ চীনকে চলতি শতকের প্রধান গোয়েন্দা ও ভূরাজনৈতিক হুমকি হিসেবে দেখছে বলে জানিয়েছেন বার্নস ও মুর। দুই গোয়েন্দাপ্রধানের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফেরাতে জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। পাশাপাশি ইউরোপজুড়ে রাশিয়ার বেপরোয়া নাশকতামূলক তৎপরতার লাগাম টেনে ধরতে কাজ করার কথাও জানান দুই গোয়েন্দাপ্রধান। 

চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকার সমন্বয়ে দাবার গুটির গ্রাফিক্স। ছবি : সংগৃহীত

অব্যাহত ধ্বংসযজ্ঞ ইসরাইলের নৃশংসতা

পশ্চিমতীর এবং গাজায় সাধারণ ফিলিস্তিনিদেরকে অকাতরে হত্যা করছে ইসরাইলি সেনারা। সারাবিশ্ব দেখছে। শান্তি আলোচনার নামে যা হচ্ছে, তা একরকম তামাশা। একদিকে আলোচনা, অন্যদিকে মানুষ হত্যা। এর মাধ্যমে সময়ক্ষেপণ করছে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সেই সময়ে তার সেনারা আগ্রাসী হয়ে একের পর এক হামলা চালাচ্ছে ফিলিস্তিনিদের ওপর। প্রতিদিন সেখানে রক্ত ঝরছে। রোববার এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় গাজা জুড়ে কমপক্ষে ৩১ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছে। বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল একটি স্কুলে। সেখানেও হামলা চালিয়েছে নৃশংস ইসরাইলি বাহিনী। সেখানে নিহত হয়েছেন আটজন। ওদিকে হামাসের হাতে জিম্মিদের ফেরত আনার জন্য নেতানিয়াহুর ওপর চাপ বাড়ছেই। কমপক্ষে সাড়ে সাত লাখ মানুষ ইসরাইলের রাজপথে প্রতিবাদ বিক্ষোভ করেছে। বিক্ষোভ প্রতিবাদে রাজপথ জ্বলছে। তবে এই বিক্ষোভে নেতানিয়াহুর সরকারের মনোভাবে কোনো পরিবর্তন আনবে বলে মনে হচ্ছে না। এ সপ্তাহে জনমত জরিপে দেখা গেছে নেতানিয়াহুর জনপ্রিয়তা কমে যাচ্ছে। যদি এখন নির্বাচন হয় তাহলে তার দল লিকুদ পার্টি মাত্র ২২টি আসন পাবে। অন্যদিকে সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী বেনি গান্টজের দল পাবে ২৩ আসন। শনিবার লেবাননের দক্ষিণে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। সেখানে কমপক্ষে তিন প্যারামেডিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। এরপর মানবিক মূল্যবোধ ইসরাইল নগ্নভাবে লঙ্ঘন করছে বলে অভিযোগ করেছেন লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নাজিব মিকাতি। গত বছর ৭ই অক্টোবর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় কমপক্ষে ৪০,৯৩৯ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইল। এ যুদ্ধে আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৯৪,৬১৬ জন ফিলিস্তিনি। ইসরাইলি সেনাবাহিনী যেভাবে নৃশংস হামলা চালাচ্ছে তেমনি ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীরা দখলীকৃত পশ্চিমতীরে নৈরাজ্য চালাচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের অলিভ বা জলপাই বাগান তারা নষ্ট করে দিয়েছে। দিয়ের ইসতিয়া গ্রামে এমন ধ্বংসলীলা চালিয়েছে তারা। ফিলিস্তিনি মুসলেহ ইউসেফ মানসুরের বাগানের গাছগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরাইলি ইয়াকির আউটপোস্টের কাছের বসতি স্থাপনকারীরা। হাজারো বছর ধরে ফিলিস্তিনিরা ওই এলাকায় অলিভ চাষ করে আসছেন। প্রতি বছর সেপ্টেম্বরে ওইসব গাছ থেকে তারা অলিভ সংগ্রহ করেন। তারপর তা থেকে অলিভ অয়েল তৈরি করেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক এজেন্সি বলেছে, ইসরাইলিদের দেয়া ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা এবং অলিভ বাগানে হামলার ফলে গত বছর ১২০০ টন অলিভ অয়েল উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওদিকে গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবির থেকে সাংবাদিক আনাস আল শরিফ বলছেন, জাবালিয়া ক্যাম্পে মোরসি পরিবারের বাড়ি টার্গেট করে সহিংস হামলা করেছে ইসরাইলি বিমান বাহিনী। সেখানে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছিলেন মেডিকেল এবং সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা। পাশাপাশি নিহতদের দেহ উদ্ধার করছিলেন। কামাল আদওয়ান হাসপাতালের কাছে আল আলামি এলাকাকে টার্গেট করে এই হামলা চালানো হয়। এতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ইসরাইলি আর্মি রেডিও থেকে রিপোর্ট করা হচ্ছিল যে, দখলীকৃত পশ্চিমতীরের জেরিকো ঘেরাও করে রেখেছে সেনাবাহিনী। পশ্চিমতীর-জর্ডান ক্রসিংয়ে ভয়াবহ এক হামলার পর এই অভিযান চালাচ্ছে তারা। ওদিকে ইসরাইলের চলমান হামলার মধ্যেই গাজার দক্ষিণাঞ্চলে পোলিও টিকা দেয়া অব্যাহত রেখেছে ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। গত মাসে ২৫ বছরের মধ্যে গাজায় প্রথম পোলিও ধরা পড়ে। ধ্বংসযজ্ঞের ফলে অপরিষ্কার পরিবেশ এবং পয়ঃনিষ্কাশনের অভাবে এই রোগের ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে। 
mzamin

শিক্ষায় নিজস্ব সাম্রাজ্য গড়েছিলেন নওফেল by পিয়াস সরকার

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কম বয়সী হিসেবে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হয়েছিলেন মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল। শিক্ষা উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে বাড়াতে থাকেন প্রভাব। দ্বাদশ সংসদে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর পুরো দেশ জুড়ে শিক্ষাঙ্গনে নিজের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেন তিনি। পছন্দের লোকদের একে একে বসান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে। দুর্নীতির জাল বিছিয়েছিলেন সর্বত্র। শিক্ষার মান নিয়ে কোনো চিন্তা না করে হরিলুটের প্রকল্প নেন একের পর এক। সর্বশেষ ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিরুদ্ধে শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রধানকে কাজে লাগিয়েছেন ন্যক্কারজনকভাবে।

মন্ত্রণালয় সাজান নিজের মতো করে। কয়েকজনকে সরিয়ে দেন দায়িত্ব থেকে। উপমন্ত্রী থাকাকালে বদলি বাণিজ্য শুরু করেন তিনি। একেকটি বদলির সুপারিশের জন্য নিতেন কয়েক লাখ টাকা। বদলি কার্যক্রম পরিচালনা করতেন মো. জুয়েল নামে এক অফিস সহকারীর মাধ্যমে। মহিবুল হাসান চৌধুরী সব সময় কুক্ষিগত করে রাখতে চাইতেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ছাত্রলীগের দু’টি গ্রুপের মধ্যে প্রায়ই সংঘর্ষের খবর পাওয়া যেত। এসব সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে মহিবুল হাসান চৌধুরী ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরের মদতপুষ্ট ছাত্রলীগের দুই পক্ষের বিরুদ্ধে। ছাত্রলীগের সংঘর্ষ নিয়ে বিভিন্ন সরকারি গোয়েন্দা প্রতিবেদনেও উঠে আসে মহিবুল হাসান চৌধুরীর নাম। কিন্তু তাতে কোনো পাত্তাই দিতেন না তিনি।

উপমন্ত্রী থাকাকালে কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন কারিগরি শিক্ষা বোর্ড। ২০১৬ সালে কারিগরি শিক্ষার প্রচার ও প্রসারের জন্য সরকার থেকে থোক বরাদ্দ দেয়া শুরু হয়। যার জন্য প্রতি বছরে ১০০ কোটি টাকার থোক বরাদ্দ ছিল। উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পাবার শেষ পর্যন্ত এই অর্থের প্রায় ৮০ শতাংশ নিজের পকেটে পুরেছেন তিনি। তার মালিকানাধীন বিজয় টিভিতে কারিগরি শিক্ষার প্রচারণা চালাতেন। এই বিজ্ঞাপনের টিআরপি রেট দেখাতেন প্রথম সারির টেলিভিশনের সমান। এর মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।

এ ছাড়াও চট্টগ্রাম বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলেন নিজের হাতে। এই বোর্ডের কেনাকাটার সব কাজ পেতেন তার বলয়ের ঠিকাদাররা। এর একটি নির্ধারিত অংশ কমিশন পেতেন তিনি। শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পাবার পর বিশ্ববিদ্যালয়টিতে নিজের অবস্থান শক্ত করতে বসান বাংলাদেশ মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক আবু তাহেরকে। এর জন্য আবু তাহের চট্টগ্রামের প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে নওফেলকে মালিকানা পাইয়ে দিতে নানা অপতৎপরতা শুরু করেন। এরপর এটির মালিকানা নওফেলের হাতে চলে আসার পুরস্কারস্বরূপ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির দায়িত্ব পান অধ্যাপক আবু তাহের। তিনি নর্দান বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন। আর্থিক অনিয়ম প্রমাণিত হওয়ায় চার বছর মেয়াদ পূর্তির আগেই তাকে বহিষ্কার করে ট্রাস্টি বোর্ড। আওয়ামী লীগের নেতাদের আস্থাভাজন আবু তাহের উল্টো পুরস্কারস্বরূপ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার পদে নিয়োগ পান। এখানেও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়লে তাকে কিছুদিনের মাথায় বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়াও ছিল না তার ভিসি হওয়ার যোগ্যতা। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি’তে দ্বিতীয় বিভাগ ও এইচএসসি পরীক্ষায় তৃতীয় বিভাগ ছিল তার।

প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল ডিভাইস প্রদানের একটি বড় প্রকল্প বাগিয়ে নেয়ার পথেই ছিলেন তিনি। মূলত শিক্ষার উন্নতি নয় তিনি এই দায়িত্বে এসেছিলেন দুর্নীতির জাল পাততে। কিন্তু সময়ের অভাবে পূরণ হয়নি এই দুর্নীতির ছক। দেশে ১০০’র উপরে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে ঝোঁক ছিল তার। বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলাদেশে শাখা খোলার জন্য যোগাযোগ করেছিলেন কয়েকটি দেশে। মূলত এসব বিশ্ববিদ্যালয় দেশে চালু রাখার সনদ দিয়ে বাকি অর্থনৈতিক বিষয়গুলো নিজের কব্জায় রাখার পরিকল্পনা ছিল তার। কাজ করছিলেন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ও বোর্ডগুলোতে নিজস্ব লোক পদায়নের।

২০২৩ সালে পুলিশের সার্জেন্ট নিয়োগে ৬ ছাত্রলীগ নেতা এবং একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছিলেন নওফেল। এই দুটি নিয়োগের জন্য সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির কাছে সুপারিশ করেন তিনি। পরে তারা যোদদানও করেন। ডিও লেটারে ৬ জন ছাত্রলীগ নেতা হলেন- সুজয় বড়ুয়া, (সাবেক সদস্য, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা), আশীষ কুমার দাশ (সহ-সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা), মোহাম্মদ দেলোয়ার হোছাইন (গণশিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক, কুতুবদিয়া উপজেলা ছাত্রলীগ, কক্সবাজার), প্রহল্লাদ কুমার ঘোষ (সাবেক উপ-অর্থ বিষয়ক সম্পাদক বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ), ওমর ফারুক, উপ-ত্রাণ ও দুর্যোগ বিষয়ক বিষয়ক সম্পাদক (বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা) ও কাওসার আহমেদ (সহ-সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা)। রাঙ্গামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ছাত্রলীগ নেতাকে খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি ও পতেঙ্গা থানা ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল হাসান সাব্বিরকে। সে বছরই তারা যোগদান করেন।

কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় খুব বাজে মন্তব্য করেছিলেন যে ক’জন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন তিনি। গত ১৫ই জুলাই নওফেল তার ভেরিফাইড ফেসবুক পোস্টে লিখেছিলেন, “যাদের মুখ থেকে বের হয়, আমি রাজাকার, তারা প্রমাণ করেছে তারা এ-যুগের ‘সাচ্চা’ রাজাকার! যারা প্রকাশ্যে নিজের আত্মপরিচয়, জন্মপরিচয়, ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে, ‘রাজাকার’ স্লোগান দিয়েছে, এরা সবাই এই যুগের রাজাকার। এরা আদালত মানে না, সরকারও মানে না, সুতরাং, এই রাষ্ট্রদ্রোহীদের পক্ষে এই রাষ্ট্রকে মানা সম্ভব না! সঠিক স্লোগানই ধরেছে তারা! বের হয়ে আসুক এ যুগের রাজাকারদের আসল চেহারা!” তিনি লেখেন, রাজাকার আগেও ছিল এবং এর ধারাবাহিকতায় এখনো আছে! ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে প্রায় ২০% শতাংশ ভোট পড়েছিল নেজামে ইসলামী, মুসলিম লীগ ইত্যাদি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী পক্ষ তথা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। এই ২০% এর অর্ধেক ১০% ধরে আজকের ১৬ কোটি মানুষের সঙ্গে মেলালে আসবে ১.৬ কোটি। এর মধ্যে ০.৬ কোটিও যদি সারাদিন নিজের রাজাকারির অরাজকতা প্রকাশ করে, বাকি জনগোষ্ঠীর তুলনায় এরা নগণ্যই থাকবে!

শিক্ষার্থীদের অভিভাবকের দায়িত্ব পাওয়া শিক্ষামন্ত্রী বারবরই ছিলেন শিক্ষার্থীদের আন্দোলনবিরোধী। আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করায় প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে এ এস এম আব্দুল খালেক নামে এক কর্মকর্তাকে গত ২৯শে জুলাই তাকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা, ঢাকা অঞ্চল থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, ঢাকায় বদলি করা হয়। নানা দমনপীড়নের পরও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন থামাতে না পারায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা আসতে থাকে সরকারের পক্ষ থেকে। আন্দোলন দমাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের জন্য ইউজিসিকে নির্দেশ দিতে বলেন তিনি। যা ছিল ইউজিসির এখতিয়ার বহির্ভূত। গত ১৬ই জুলাই ইউজিসি চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীরকে টেলিফোন করে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী জানান, একটা অর্ডার (নির্দেশ) আছে। এখনই করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করতে হবে। কালকে আশুরার ছুটি, আজকেই বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ এবং হল খালি করার নির্দেশ দিতে হবে। আমার সঙ্গে সেতুমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং শিক্ষা সচিব রয়েছেন। আমরা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বলছি। আমাদের কাছে গোয়েন্দা প্রতিবেদন আছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না হলে শত শত লাশ পড়বে।

ছাত্র-জনতা গত ৩রা আগস্ট চট্টগ্রামের নওফেলের বাড়িতে হামলা করে। সেই হামলার প্রতিবাদে পরদিন রাস্তায় নামেন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের কিছু কর্মকর্তা। এর নেতৃত্বে ছিলেন মাউশির সদ্য পদত্যাগ করা মহাপরিচলক অধ্যাপক নেহাল আহমেদ, মাধ্যমিক শাখার পরিচালক সৈয়দ জাফর আলীসহ চারজন পরিচালক। স্লোগান দেয়ার জন্য কর্মকর্তাদের একত্র করেন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর থেকে বদলি হওয়া ২৪তম বিসিএসের কর্মকর্তা ড. এনামুল হক ও আব্দুল্লাহ আল মামুন। সেখানে ডিআইএ, মাউশি ও বিভিন্ন প্রকল্পের ৩০ জন এই মিছিলে অংশ নেন। যারা সবাই গত সরকারের আমলে শিক্ষা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। জানা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনে গিয়ে অবৈধ আর্থিক সুবিধা নেয়ায় ডিআইএ থেকে শরীয়তপুরে বদলি হন এনামুল হক। নতুন সরকারে নওফেল শিক্ষামন্ত্রী হওয়ার পর জাফর আলী মাউশির মাধ্যমিক শাখার পরিচালক হয়ে আসেন। এনামুল বদলির জন্য তদবির চলছিল। পূর্বের দায়িত্বে থাকা শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির সঙ্গে নানা কারণে দ্বন্দ্বের জেরে সৈয়দ জাফর আলীকে সরিয়ে দিয়েছিলেন।

দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলা ডা. দীপু মনিকে শিক্ষা থেকে সরিয়ে দেবার পর হাল ধরেন নওফেল। নোট-গাইড প্রকাশনীর এক মালিক বলেন, দীপু মনিকে আমরা বছরে চারবার চাঁদা দিতাম। কিন্তু নওফেল দায়িত্ব পাবার পর এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে নতুন করে যোগাযোগ শুরু করেন। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই সরে যেতে হয় তাকে। জানা যায়, এই অল্প সময়েই প্রায় ১০ কোটি টাকা নিয়েছেন শুধুমাত্র নোট-গাইড বইদের মালিক ও কোচিং সেন্টারের মালিকদের কাছ থেকে। তার বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে মালিকানাসহ শেয়ার রয়েছে। এ ছাড়াও প্রভাব খাটিয়ে নিজেদের লোক ঢুকানোর পথে হাঁটছিলেন তিনি। এ ছাড়াও কয়েকটি ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে রয়েছে শেয়ারসহ মালিকানা। দীপু মনির দেখানো পথে হেঁটে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় দখলের পরিকল্পনা ছিল তার। বিশেষ করে ইউরোপিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় দিয়ে শুরু করতে চেয়েছিলেন তিনি। এ ছাড়াও আরও অন্তত চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নজর ছিল।

দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কথায় কথায় জামায়াত-শিবির ট্যাগ লাগাতেন তিনি। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও তার আচরণে ছিলেন না খুশি। একগুঁয়েমি আচরণে বিরক্তই ছিলেন। জোড় গলায় কথা বলার পরও কয়েকটি সিদ্ধান্ত বাতিল হয় তার। সরকারি চাকরিতে বয়সের সীমা ৩৫ কারী আন্দোলনরতদের পক্ষে কথা বলে সমালোচনায় পড়েন খোদ মন্ত্রিসভাতেই। এ ছাড়াও দাবদাহের সময় জোরপূর্বক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা রাখার ঘোষণা দেন। কিন্তু একদিন পরই সেই সিদ্ধান্ত বাতিল করে মন্ত্রণালয়। আবার শনিবারের ছুটি বাতিল করেও বেশ বিরাগভাজন হয়েছিলেন তিনি। সর্বস্তর থেকে নতুন শিক্ষাক্রম বাতিল ও সংস্কারের দাবি তোলা হলেও তিনি তাতে পরিচয় দেন একগুঁয়েমির।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরীর ছেলে নওফেল। বাবার রাজনৈতিক পরিচয় কাজে লাগিয়ে নিজে হয়ে উঠেন রাজনীতিক। দুর্নীতি দমন কমিশন তার অবৈধ উপায়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদের খোঁজ করছে। ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে।

mzamin

শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যে খোলা চিঠি by শহীদুল্লাহ ফরায়জী

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আপনি একবার খেয়াল করে দেখুন, শুধু ক্ষমতাকে ধরে রাখার জন্য কতোজনের জীবন শেষ করে দিয়েছেন, কতো মায়ের আহাজারিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছেন, কতো অমিত সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করেছেন, কতোজনকে চিরতরে অন্ধ করেছেন। স্বজন হারানোর ব্যথা সত্যি সত্যিই আপনাকে মর্মপীড়ায় দংশন করলে আপনি লাশের বিনিময়ে ক্ষমতাকে প্রাধান্য দিতেন না। ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হওয়ার সময়ও আপনি কেঁদেছেন। ক্ষমতা আপনার কাছে কান্নার বিকল্প। রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত মনে করেছিলেন। ভেবেছিলেন আপনি রাষ্ট্রের সমকক্ষ....

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আপনি এক মাসের অধিক দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। অবশ্য বাইরে থাকাটাকে আপনিই স্বেচ্ছায় বরণ করে নিয়েছেন। আপনি যখন বুঝতে পেরেছেন-সর্বগ্রাসী ক্ষমতা আপনার জীবনকে আর সুরক্ষা দিতে পারছে না, তখন দেশ, জনগণ এবং আওয়ামী লীগকে রেখে, বাংলার মাটিকে রক্তরঞ্জিত করে দেশান্তরিত হয়েছেন। আপনি এখনো উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, পিতার দেশ রেখে, আওয়ামী লীগকে রেখে মাতৃভূমি পরিত্যাগ করা কতো মর্মান্তিক এবং লজ্জাজনক, এতে আপনার নৈতিক শক্তির সামর্থ্য শেষ হয়ে গিয়েছে। আপনার বিবেচনাহীন অহংবোধ ও দাম্ভিকতা আপনাকে এই পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে।

আপনি বুঝতেও পারেননি, বারবার ভোটবিহীন ক্ষমতা ধরে রাখতে গিয়ে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ ও প্রতিরক্ষা শক্তিকে দুর্বল করতে গিয়ে-রাষ্ট্রকে কী ভয়ঙ্কর সর্বনাশে ফেলে দিয়ে গেছেন। রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে কতোটা ঝুঁকিপূর্ণ করে গেছেন। আপনি ভেবেছিলেন- জনগণ নয়, রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে এবং বাইরের শক্তির সমর্থনে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করা যায় কিন্তু আপনি একবারও ভাবেননি, ১৯০০ সালে যে বৃটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য অস্ত যেতো না, ১১ বিলিয়ন স্কয়ার মাইল ভূমি এবং ৩৯০ মিলিয়ন মানুষ যে সাম্রাজ্যের অধীনস্থ ছিল, সে  সাম্রাজ্যও প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়েছে, এমনকি বাস্তিল দুর্গেরও পতন হয়েছে। ক্ষমতার উদ্ভব, উত্থান এবং পতন নিয়ে বিপুল আয়তনের জ্ঞানগর্ভ আলোচনা রয়েছে কিন্তু সে সব বিবেচনা করার ন্যূনতম প্রয়োজনও আপনি বোধ করেননি।
আপনি প্রায়ই বলতেন- ভোট চুরি করলে বাংলার জনগণ ক্ষমতায় থাকতে দেয় না। সত্যি, আপনি ক্ষমতা হারিয়েছেন এবং জনগণ আপনাকে ক্ষমতায় থাকতে দেয়নি। শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরকে আপনি রুদ্ধ করেছিলেন, ফলে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আপনাকে উৎখাত করাই ছিল একমাত্র গণতান্ত্রিক এবং সাংবিধানিক পথ। আপনি ক্ষমতা ধরে রাখতে গিয়ে প্রচণ্ড রক্তপাতের আশ্রয় নিয়েছেন, রাষ্ট্রকে যুদ্ধাবস্থায় নিয়ে গেছেন, জনগণের প্রতি শত্রুভাবাপন্ন হয়ে গণমানুষের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। ফলে ছাত্র-জনতাসহ প্রজাতন্ত্রের সেনাবাহিনীর ঐতিহাসিক ভূমিকা আপনার পতনকে অনিবার্য করে তোলে। ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এর কোনো বিকল্প ছিল না। কারণ, রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হলেও আপনার ‘ক্ষমতা তৃষ্ণা’ নিবৃত হতো না, তা জনগণ যেমন জানে তেমনি আপনার দলও জানে।

আপনি এখন নিশ্চয়ই অবসর পেয়েছেন অনেক। কিন্তু দেশের রাজনীতি নিয়ে মাঝে মধ্যে মন্তব্য করছেন, বিবৃতি দিচ্ছেন, ইন্টারভিউ দিচ্ছেন। দেশ এবং জনগণ তো দূরের কথা, আওয়ামী লীগের করণীয় নিয়েও আপনার রাজনীতির পরিসমাপ্তি ঘটে গেছে। কারণ, আওয়ামী লীগকেও আপনি নিজ হাতে শেষ করেছেন। পালিয়ে নিজ জীবন বাঁচাতে গিয়ে দলসহ সবকিছু ‘পরিত্যাগ’ এবং ‘পরিত্যক্ত’ করে চলে গেছেন। যেহেতু জানতেন দেশ ত্যাগ করছেন, কিন্তু দলীয় নেতাকর্মীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে একটি শব্দও উচ্চারণ করেননি। বরং আওয়ামী লীগের মতো ঐতিহ্যবাহী একটি রাজনৈতিক দলকে গণহত্যায় অভিযুক্ত করে পরিচয় সংকটে ফেলেছেন। আপনার ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থা থেকে সরে এসে, রাষ্ট্র কীভাবে নির্মিত হবে, তা এদেশের জনগণ, দলীয় এবং অদলীয় শক্তিসমূহ নির্ধারণ করছে। দেশত্যাগ করে দিল্লিতে অবস্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রের প্রতি বা দলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করার কোনো নৈতিক অবস্থান আপনার নেই।

জীবনের বাকি দিনগুলো ‘চুপ’ এবং শুধুমাত্র ’চুপ’ থাকাটাই আপনার একমাত্র কর্তব্য। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, নোবেলজয়ী বিশ্ববরেণ্য ড. ইউনূস আপনাকে সেই উপদেশই দিয়েছেন। রাষ্ট্র ক্ষমতায় থেকে কীভাবে ন্যায়পরায়ণতা ধ্বংস করেছেন, কীভাবে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছেন, কারাগারে পাঠানোর নামে রাজনীতিবিদদের প্রতি কী নির্মম আচরণ করেছেন, বিচারের নামে কী ভয়ঙ্কর অবিচার করেছেন, মিথ্যাকে কীভাবে গৌরবের অংশীদার করেছেন-এসব নিয়ে অনুশোচনা করাই হবে আপনার একমাত্র ধ্যানজ্ঞান। অতীতকে অস্বীকার বা তুচ্ছ করার সাধ্য কারও নেই। বাংলাদেশ আছে, আপনার নাগরিকত্বও আছে অথচ প্রতিবেশী দেশে আপনি উদ্বাস্তু এবং গৃহহীন। আপনি এখন তাদের অতিথি নন বরং গলার কাঁটা। এটাই ভাগ্যের লিখন, এটাই মেনে নিতে হবে, কারণ সবকিছুই সুনির্দিষ্ট ও সুনির্ধারিত এবং তা অবশ্যই লঙ্ঘনের অযোগ্য।

আমি বিশ্বাস করি, আপনি গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত হয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজের কৃতকর্মের দায় স্বীকার করবেন। রাষ্ট্র এবং রাজকোষ পরিচালনায় আপনার অযোগ্যতা ও স্বজন তোষণনীতি স্বীকার করে, নিজের দায় বহন করার সত্য উন্মোচিত করবেন। অহেতুক কালক্ষেপণ না করে রাষ্ট্র এবং আদালতকে সহযোগিতা করবেন। তাহলে যদি মর্যাদাহীন ও হীনমন্যতাবোধের (অপ্রকাশিত) পীড়া থেকে কিছুটা রেহাই মিলে! অন্যের ছত্রচ্ছায়ায় এবং অন্তরালে বসে, রাষ্ট্রের ক্ষতি হতে পারে এমন যেকোনো প্রচেষ্টা থেকে আপনার বিরত থাকা উচিত। পলায়নপর নিজেকে অন্য কোনো রাজশক্তির হাতের খেলনা করে দেশের ধ্বংস ডেকে আনবেন না। আপনি আর কখনোই রাজনৈতিক মশাল প্রজ্জ্বলিত করতে পারবেন না, আপনি যতই চেষ্টা করবেন ততই নির্বাপিত হবে। আপনার রাজনীতি ও বয়ান দেশের জনগণ খারিজ করে দিয়েছে। আপনার সীমা অতিক্রমের কারণে পরাজয় নিশ্চিত হয়েছে এবং দেশে নতুন রাজনৈতিক শক্তির উদ্ভব ঘটেছে। তারা অগণিত আত্মত্যাগের নির্যাস উপলব্ধি করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। সকলে সমানভাবে স্বাধিকার (LibertY) ভোগ করবে, পরস্পর মানবিক মর্যাদা সুরক্ষা করবে এবং সকলের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে। তারা সংবিধান সংশোধন করে-সম্পূর্ণ ন্যায্যসমাজ নির্মাণের অপরিহার্য দর্শনের অনুসন্ধান করবে।

জীবনের শেষ প্রান্তে এসে আপনি একবার খেয়াল করে দেখুন, শুধু ক্ষমতাকে ধরে রাখার জন্য কতোজনের জীবন শেষ করে দিয়েছেন, কতো মায়ের আহাজারিকে দীর্ঘস্থায়ী করেছেন, কতো অমিত সম্ভাবনাকে ধূলিসাৎ করেছেন, কতোজনকে চিরতরে অন্ধ করেছেন। স্বজন হারানোর ব্যথা সত্যি সত্যিই আপনাকে মর্মপীড়ায় দংশন করলে আপনি লাশের বিনিময়ে ক্ষমতাকে প্রাধান্য দিতেন না। ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হওয়ার সময়ও আপনি কেঁদেছেন। ক্ষমতা আপনার কাছে কান্নার বিকল্প। রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত মনে করেছিলেন। ভেবেছিলেন আপনি রাষ্ট্রের সমকক্ষ। আরও ভেবেছিলেন রাষ্ট্রের আয়ু আর আপনার আয়ু সমান। এখন আপনি ছাড়াও রাষ্ট্র আছে, বিকল্পও আছে। আমরা না থাকলেও রাষ্ট্র থাকবে। রাষ্ট্রের আয়ুষ্কাল আর ব্যক্তির আয়ুষ্কাল এক হতে পারে না।

বঙ্গবন্ধু আপনার পিতা অথচ কয়েকশ’ ছাত্র-জনতা হত্যার পর আপনি স্থাপনার জন্য অশ্রু বিসর্জন দিয়েছেন। আপনার অশ্রুপাতের সেই মেট্রোরেল চালু হয়েছে ও বিটিভি চালু হয়েছে- কিন্তু ‘আবু সাঈদ’, ‘মুগ্ধ’সহ আমাদের অগণিত সন্তানতো না ফেরার দেশ থেকে আর ফেরত আসবে না। মা-বাবা’র আর্তনাদ জমিন থেকে কোনোদিন উবে যাবে না। পৃথিবীর এমন কোনো শাসক কী আছে, মাটির উপরে লাশ রেখে নির্জীব স্থাপনাকে শ্রদ্ধা করতে যায়! মানুষের মানবিক মর্যাদাকে এইভাবে বিপন্ন করা যায়! মানুষের জীবন সুরক্ষা রাষ্ট্রের সর্বোত্তম কর্তব্য, অথচ আপনি ক্রমাগত ও বিরামহীনভাবে তা উপেক্ষা করেছেন।

আপনি এবং আপনার পিতা ক্ষমতা বুঝেছেন কিন্তু ক্ষমতার খেসারত বুঝতে ব্যর্থ হয়েছেন। এক দেশ এক নেতা, এক নেতার পেছনে সমগ্র জাতি, সমগ্র ইতিহাস এইসব বয়ান জাতির অভিপ্রায়ের সঙ্গে যায় না। ভিন্ন মত-পথ ও অধিকারকে খর্ব করা বা বিলুপ্ত করার প্রচেষ্টাকে রাজনীতি বলে না। কন্যা হয়ে পিতাকে ক্রমাগত বলি দিয়েছেন, সভানেত্রী হয়ে দলকে গণহত্যায় সম্পৃক্ত করেছেন, সমাজ চৈতন্যকে রক্তাক্ত করেছেন, সরকার আর নাগরিকের মাঝে শিকারি ও শিকারের  সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। এখন বিবেকের আয়নায় নিজেকে দেখে-দেখে চিরস্থায়ী প্রত্যাবর্তনের দিকে যাবার প্রস্তুতি নিন। মহান আল্লাহ আপনার গন্তব্য এবং পরিণতি নির্ধারণ করে রেখেছেন। এই রহস্য অনুধাবন করতে সচেষ্ট হন। দেশ ও দেশের রাজনীতি নিয়ে আপনার একটি কথাও মুখে না আনা ভালো। বিশ্বজয়ী সাহিত্যিক বরিস পাসতেরনাক বলেছিলেন-কথা যদি ‘রৌপ্য’ হয়, তাহলে নীরবতা হলো ‘সোনা’-এ চিরকালের সত্য। আপনি যা-ই ভাবুন তা-ই অন্তরালে রাখুন, কথা বললেই রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আপনার রেখে যাওয়া রাষ্ট্র অনেক বদলে গেছে, যাকে মানুষ দ্বিতীয় স্বাধীনতা হিসেবে বিবেচনা করছে। ছাত্র-জনতা দেশকে গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারছে, এইখানেই তাদের অসাধারণত্ব। সমাজকে পুরোপুরি ঢেলে সাজানো হচ্ছে। সকলের প্রতি ‘ন্যায্যতা’-এটাই হবে রাজনৈতিক বন্দোবস্তের ভিত্তি। জাতি এখন ঘৃণা এবং বিদ্বেষের অনুশাসন থেকে মুক্ত। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত হবে ‘সাম্য’, ‘মানবিক মর্যাদা’ ও ‘সামাজিক সুবিচার’ দিয়ে। মনুষ্যত্বহীন রাজনীতির আখ্যান ছাত্ররা প্রত্যাখ্যান করেছে। এই প্রজন্মের রাজনীতি শুধু বেঁচে থাকা নয়, মানুষ হয়ে ওঠাও।

ক্ষমতা কারও জন্য চিরস্থায়ী নয়, আপনাকে ‘ক্ষমতা’ এবং ‘রাজনীতি’ পরিত্যাগ করেছে। সময় তার আপন গতিতে ফিরে গেছে-এই ধ্রুবসত্য মেনে নেয়াই হবে ন্যায়সঙ্গত। আমাদের সকলকেই ‘ন্যায্যতা উপলব্ধির সামর্থ্য’ এবং ‘শুভ চিন্তার সামর্থ্য’ অর্জন করতে হবে।
আপনার বিষয়ে বলাও সহজ নয় আবার চুপ থাকাও অসম্ভব। আপনার সঙ্গে যদি কোনোদিন কোনোকালে কোথাও দেখা হয়, আমি জুলাই গণহত্যায় শহীদ মুগ্ধের কণ্ঠে বলবো’- পানি লাগবে, পানি!’

ইতি-
শহীদুল্লাহ ফরায়জী,
৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৪, ঢাকা।
(লেখক: গীতিকবি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক) (faraizees@gmail.com)

হাসিনার স্বৈরশাসন হটাতে তাদের অবদান অসামান্য

অবরুদ্ধ সময়। বন্দি গণতন্ত্র। শেখ হাসিনার একনায়কতন্ত্রে পিষ্ট দেশ। মত প্রকাশে বাধা। আইনি-বেআইনি হুমকি। খুন-গুম। মিডিয়ার বড় অংশ স্বৈরাচারের তোষণে ব্যস্ত। কেউ আবার লড়াই করেছেন অসীম সাহসিকতায়। তবুও অসহায় মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে বিদেশ থেকে একদল বাংলাদেশি সাংবাদিক অকুতোভয়ে লড়ে গেছেন নিজ দেশের মানুষের জন্য, গণতন্ত্রের মুুক্তির জন্য।

শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের অবসানে তাদের অবদান অবিস্মরণীয়। তারা প্রতিনিয়ত বিগত সরকারের দুঃশাসনের নানাচিত্র বিশ্ববাসীর সামনে হাজির করেছেন। দুনিয়ার নানা ফোরামে তুলে ধরেছেন নিপীড়িত বাংলাদেশিদের কথা। যেসব সাংবাদিক, ব্যক্তি বিদেশ থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বড় অবদান রেখেছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন- মুশফিকুল ফজল আনসারী, পিনাকী ভট্টাচার্য, তাসনীম খলিল, ড. কনক সারোয়ার, জুলকারনাইন সায়ের খান সামি, ফাহাম আব্দুস সালাম, ইলিয়াস হোসেন, মনির হায়দার, শাহেদ আলম, আব্দুর রব ভুট্টো, নাজমুস সাকিব, জাওয়াদ নির্ঝর, ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব সহ অনেকে।

জাতিসংঘের সদর দপ্তর থেকে স্টেট ডিপার্টমেন্ট। গেল কয়েক বছরে অন্যতম আলোচিত মুখ সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল আনসারী। বাংলাদেশের পরিস্থিতি দিনের পর দিন উপস্থাপন করে গেছেন তিনি। জানতে চেয়েছেন জাতিসংঘ কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান। জবাবদিহির আওতায় আনতে চেয়েছেন ক্ষমতাবানদের। দৈনিক ইত্তেফাকের কূটনৈতিক রিপোর্টার ছিলেন মুশফিকুল ফজল আনসারী। ছিলেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার সহকারী প্রেস সচিব। দায়িত্ব পালন করছেন জাস্ট নিউজের সম্পাদক হিসেবে। শুধু প্রশ্ন করেই নিজের কাজ শেষ করেননি আনসারী। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবসময় সরব থেকেছেন। অনুপ্রাণিত করেছেন কোটি কোটি গণতন্ত্রকামী মানুষকে। একইসঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নানা সেমিনার আয়োজনেও যুক্ত ছিলেন এই সাংবাদিক।

খ্যাতিমান সাংবাদিক তাসনীম খলিল। সুইডেনভিত্তিক নেত্র নিউজের প্রধান সম্পাদক। গত কয়েক বছরে একের পর এক অনুসন্ধানী সংবাদ প্রকাশ করে সরকারের এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মুখোশ উন্মোচন করেছেন। কুখ্যাত আয়নাঘরের বিষয়টি নেত্র নিউজই প্রথম সামনে নিয়ে আসে। গুম, ক্রসফায়ার নিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশ করে তোলপাড় তৈরি করে সারা দুনিয়ায়।

পেশায় চিকিৎসক, ফ্রান্সে থাকা মানবাধিকারকর্মী পিনাকী ভট্টাচার্য। তীক্ষ্ণ ও ক্ষুরধার বক্তব্যের কারণে সাধারণ জনগণের মধ্যে তিনি তুমুল জনপ্রিয়। তার লাখ লাখ অনুরাগী রয়েছেন। মুক্তিকামী মানুষের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে একের পর এক ভিডিও বক্তব্য হাজির করেছেন জনগণের সামনে। সরকারের নানা অপকর্মের তীব্র সমালোচনা করেছেন।

সাংবাদিক ড. কনক সারোয়ার ইউটিউব টকশোতে সরকারের মুখোশ উন্মোচন করে গেছেন। এজন্য তার পরিবারের ওপর অনেক নির্যাতন হয়েছে। কিন্তু তিনি পিছু হটেননি। সরকারের দুর্নীতি আর অনিয়মের ঘটনা বারবারই সামনে নিয়ে এসেছেন। আল জাজিরার অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে প্রথম আলোচনায় আসেন জুলকারনাইন সায়ের খান সামি। শেখ হাসিনার সমর্থনে জেনারেল আজিজ আহমেদ পরিবার কীভাবে দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলে তা আলোয় আসে ওই রিপোর্টে। এরপর একের পর এক নানা অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেছেন সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রকাশ করেছেন ভয়ঙ্কর সব তথ্য। প্রকাশ করেছেন বহু গোপন নথি-যা সরকারকে বিপাকে ফেলে।

সাংবাদিক ইলিয়াস হোসেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিপুল জনপ্রিয়। অনুসন্ধানী এই সাংবাদিক শুরু থেকেই সরকারের সমালোচনায় মুখর ছিলেন। দুর্নীতি আর অনিয়মের তথ্য প্রকাশ করেছেন সাহসিকতার সঙ্গে। সাংবাদিক মনির হায়দার ও শাহেদ আলম আমেরিকা থেকে নানা বিশ্লেষণাত্মক ভিডিও প্রকাশ করেছেন। সরকারের সমালোচনায় মুখর ছিলেন তারা। সাংবাদিক জাওয়াদ নির্ঝরও পুরোটা সময় সরব ছিলেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি- পেশার মানুষের একাধিক দুর্নীতির রিপোর্ট প্রকাশ করেছেন। ইউটিউব চ্যানেল নাগরিক টিভির নাজমুস সাকিবও সরব ছিলেন দুর্নীতির বিরুদ্ধে। প্রকাশ করেছেন দুর্নীতির বিভিন্ন রিপোর্ট। সাংবাদিক আব্দুর রব ভুট্টো ভিডিওসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে সরকারের অপকর্ম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখেন। এ কারণে তার পরিবারকেও হয়রানির মুখে পড়তে হয়। বিজ্ঞানী ফাহাম আব্দুস সালামের ভিডিও বেশ সাড়া ফেলে। আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে তার বক্তব্য বিপুল আবেদন তৈরি করে।

mzamin

যে কাজ শুরু করেছো তা শেষ করতে হবে -শিক্ষার্থীদের প্রধান উপদেষ্টা

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষার যে স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার কাজ শুরু হয়েছে, তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমরা এর থেকে বেরিয়ে যেও না।

রোববার তেজগাঁও অবস্থিত প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে ছাত্র সংগঠক এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান উপদেষ্টা এ কথা বলেন। এ সভায় বিভিন্ন পর্যায়ের ১৫০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। সভার শুরুতে প্রধান উপদেষ্টা ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শহীদ ও আহত শিক্ষার্থীদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন। এ সময় হতাহতদের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ড. ইউনূস। কাঁদতেও দেখা যায় তাকে। অধ্যাপক ইউনূস গত ১৫ বছরের অপশাসনের কথা স্মরণ করে শিক্ষার্থীদের বলেন, এতদিন তারা চুপচাপ শুয়ে শুয়ে স্বপ্নের মধ্যে ছিল এবং আনন্দ সহকারে লুটপাট করে যাচ্ছিল। এরা কী এখন চুপচুপ বসে থাকবে। না, তারা খুব চেষ্টা করবে আবার তোমাদেরকে দুঃস্বপ্নের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়ার। চেষ্টার কোনো ত্রুটি রাখবে না। কাজেই যে কাজ শুরু করেছো, তা সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত এর থেকে বেরিয়ে যেও না।

দেশের সফল অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়ায় শিক্ষার্থীদের অভিনন্দন জানিয়ে নোবেল বিজয়ী ইউনূস বলেন, বাংলাদেশের জন্ম থেকে আজ পর্যন্ত এই সুযোগ আসেনি।

তবে সুযোগ যেন হাতছাড়া না হয়। এই সুযোগ হাতছাড়া হলে বাংলাদেশের আর কোনো ভবিষ্যত থাকবে না। রাষ্ট্র আর থাকবে না। কাজেই এটা শুধু রাষ্ট্র নয়, পৃথিবীর সম্মানিত রাষ্ট্র হিসেবে যেন প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটা করতে হবে। তরুণরা কোন যাদুমন্ত্রে বাংলাদেশে বিপ্লব সংগঠিত করেছে, তা দেখতে সারা দুনিয়ার মানুষ এদেশে আসবে। তোমাদের কাছ থেকে শিখতে আসবে। তোমাদের কাছে জানতে চাইবে- কোন মন্ত্র দিয়ে এই বিপ্লব করেছো। এই মন্ত্র তারা শিখতে চাইবে।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, তোমাদের মন্ত্র কী, সেটা হয়তো তোমরা বুঝতে পারছো না। এটা একটা বড় মন্ত্র। এই মন্ত্র ধরে রাখো। মন্ত্র যদি শিথিল হয়ে যায়, আমাদের কপালে অশেষ দুঃখ আছে। সেই দুঃখ যেন আমাদেরকে দেখতে না হয়। অভ্যুত্থান পরবর্তীতে তরুণরা দেশের হাল ধরেছে। তারা অনন্য এক বাংলাদেশ তৈরি করে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ চিন্তায় অনড় থাকতে হবে। তোমাদের চিন্তা স্বচ্ছ ও সঠিক। কেউ যদি স্বপ্ন পূরণের চিন্তা থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দেয়, সেটা গ্রহণ করো না। দেখছি আর ভাবছি কী একটা স্বপ্ন আমাদের সবার সামনে, জাতির সামনে তোমরা নিয়ে এসেছো। যারা শহীদ হয়েছে, তাদের স্মরণ করি। যারা শহীদ হয়েছে, তারা চলে গেছে। তোমাদের দিকে তাকাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম তোমরাও শহীদ হয়ে যেতে পারতে। শহীদরা আজ আমাদের সঙ্গে বসতে পারতো, সেই সুযোগ তাদের দেয়া হয়নি।

আহতদের হাসপাতালে দেখতে যাওয়ার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে ড. ইউনূস বলেন, যখন হাসপাতালে শিক্ষার্থীদের দেখার জন্য যাই, তাদের দিকে তাকাতে কষ্ট হয়। একটা ছেলে, একটা মেয়ে এই রকমভাবে কীভাবে ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এই দিকে পা চলে গেছে, ওই দিকে মাথা। একজন তাজা তরুণ রংপুরে আমাকে বললো, ফুটফুটে একটা ছেলে, স্যার আমি সারাজীবন ক্রিকেট খেলতে চেয়েছিলাম। ক্রিকেটার হতে চেয়েছিলাম। এখন দেখেন আমার পা কেটে ফেলেছে। সে আমাকে জিজ্ঞেস করেছে স্যার ক্রিকেট খলেবো কী করে? ক্রিকেট তার মাথা থেকে যাচ্ছে না।

তিনি বলেন, আহতদের যতবার দেখি ততবার মনে প্রশ্ন জাগে, কী বাংলাদেশ আমরা বানিয়েছি যে এতগুলো তাজাপ্রাণ, তাদেরকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হলো। আমরা যারা আজকে এখানে বসে কথা বলছি, তাদের একমাত্র দায়িত্ব তাদের এই ত্যাগ, এই জীবনের মূল্যের স্বপ্ন পূরণ করা। নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে আহতদের দেখতে যাওয়ার কথা স্মরণ করে ড. ইউনূস বলেন, একটা হাসপাতালে গেলাম আবার সেই দৃশ্য কচি কচি প্রাণ, মাথার খুলি উড়ে গেছে। মাথার অর্ধেক নাই, গুলি মাথার ভেতর রয়ে গেছে। রংপুরের হাসপাতালের দৃশ্য, এক্স-রে’তে দেখা যাচ্ছে ওখানে দাগ ছোট ছোট ফুটো করা, আমি বুঝতে পারলাম না আমাকে কী দেখাচ্ছে, আমি জিজ্ঞেস করলাম। এগুলো কী? এতগুলো গুলি তার শরীরে রয়ে গেছে, সে বেঁচে আছে রাবার বুলেট, যতবার দেখি যতবার শুনি আবার নতুন করে প্রতিজ্ঞা করতে হয় যে স্বপ্নের জন্য তারা প্রাণ দিয়েছে সেই স্বপ্নকে আমরা বাস্তবায়ন করবো।

তিনি বলেন, আমাদের যোগ্যতা না থাকতে পারে, ক্ষমতা না থাকতে পারে, কিন্তু আমাদের প্রতিজ্ঞা রইলো, আমরা স্বপ্ন পূরণ করবো। হাসপাতালের দৃশ্য এবং আন্দোলনের প্রতিদিনের ঘটনা মানুষকে জানাতে হবে বোঝাতে হবে এর পেছনে কী ছিল।

সভায় উপস্থিত ছিলেন- আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. আসিফ নজরুল, বন, পরিবেশ ও জলবায়ু উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম এবং যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। এই মতবিনিময় সভার বিষয়ে জানাতে বিকালে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে।

সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম জানান, প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে সম্মান ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সভায় এমনটা বলেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, সরকারের এক মাস পূরণের অংশ হিসেবে এই আলোচনা। এখানে আবেগ অনুভূতি ব্যক্ত করেছেন সবাই। এ ছাড়াও আলোচনা হয়েছে কীভাবে কোন কোন সেক্টরে সংস্কার প্রয়োজন তা নিয়ে।

তিনি আরও বলেন, ক্যাম্পাসে কী ধরনের রাজনীতি হবে তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।  কোনো অন্যায়ের বিচারের ভার জনগণের নয়, আইনের তা উল্লেখ করা হয়। ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি হোক এটা তারা চান না। রাজনৈতিক কোনো ট্যাগ শিক্ষাঙ্গণে চান না।

আহত-নিহতের তালিকা তৈরির বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম বলেন, ১৮ হাজার মানুষ আহত হয়েছে। আমরা সবার ঠিকানা নিচ্ছি। একজন সাধারণ মানুষ ভেবেছে আমার স্বামী তো মারা গেছে আমি কেন ময়নাতদন্তের জন্য নিয়ে যাবো। পুলিশি হয়রানির ভয়ে। অনেকে মারা যাওয়ার পর তালিকাভুক্ত হয়নি। কাজটা কঠিন তবে অসম্ভব গতিতে হচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিব আজাদ মজুমদার অপূর্ব জাহাঙ্গীর। 

mzamin

ভারতীয় বাহিনীকে কেন বাংলাদেশের ওপর নজর রাখতে বলা হলো?

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর পাল্টে গেছে অনেক হিসাব-নিকাশ। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সম্পর্কটা বিবেচনা করা হচ্ছে নতুন আঙ্গিকে। সম্প্রতি দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং তাদের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ স্থানীয় কমান্ডারদের বাংলাদেশে চলমান পরিস্থিতির দিকে নজর রাখতে বলেছেন।

ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর এ নিয়ে বাংলাদেশেও এক ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে ‘ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীকে কেন বাংলাদেশের ওপর নজর রাখতে বলছেন মন্ত্রী রাজনাথ সিং?’ এই শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি বাংলা।

ভারতের সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি রাজনাথ সিং সশস্ত্র বাহিনীকে ভবিষ্যৎ যুদ্ধ মোকাবিলার জন্যও প্রস্তুত থাকতে বলেছেন। প্রতিবেশী দেশটির গুরুত্বপূর্ণ একজন মন্ত্রীর এমন বক্তব্যকে স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছেন না বাংলাদেশের কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এই ধরনের বক্তব্য বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, গেল বৃহস্পতিবার ভারতের উত্তর প্রদেশের লক্ষ্ণৌতে তিন বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের যৌথ সম্মেলনে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং বক্তব্য দেন। সেখানে তিনি বলেন, ভারত শান্তিপ্রিয় দেশ। শান্তি রক্ষার জন্য ভারতের সশস্ত্র বাহিনীকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

রাজনাথ সিং তার বক্তব্যে, গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে বলতে গিয়ে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও হামাস-ইসরায়েল প্রসঙ্গ টেনেছেন। প্রতিবেশী দেশগুলোর পাশাপাশি উত্তর-পূর্ব সীমান্ত পরিস্থিতির ওপরও নজর রাখতে বলেছেন। এ নিয়েই আপত্তি বাংলাদেশের কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের।

এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক মুনীরুজ্জামান বলেন, ওই সভায় ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীসহ তিন বাহিনীর প্রধান, সিনিয়র কমান্ডার ও প্রতিরক্ষা সচিব উপস্থিত ছিলেন। এত গুরুত্বপূর্ণ স্থান থেকে এ ধরনের উক্তিকে স্বাভাবিকভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ভারতের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যবসা বাণিজ্যিক থেকে শুরু করে সম্পর্কও বেড়েছে বহুগুণ। তবে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতবিরোধিতা বাড়ছে সাম্প্রতিক বছরগুলোয়। বিশেষত, গেল দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এটি আরও প্রবল হতে শুরু করেছে বলে দাবি করেছে বিবিসি বাংলা। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সাধারণ মানুষদের অনেকেই মনে করেন গত ৩টি মেয়াদে বাংলাদেশে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে আওয়ামী লীগ। আর প্রতিবারই তা পেরেছে ভারতের প্রচ্ছন্ন সমর্থনের কারণে।

এদিকে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বিজিবি সদস্যদের বলেছেন, সীমান্তে পিঠ দেখাবেন না। নিজেদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে হবে। বিজিবির মূল দায়িত্ব সীমান্ত সুরক্ষা করা। 
ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সেদেশের সশস্ত্র বাহিনীকে ভবিষ্যৎ যুদ্ধ মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতে বলেছেন। ছবি : সংগৃহীত

এক কমেন্টেই শিক্ষা জীবন শেষ নোবিপ্রবি শিক্ষার্থীর

সাময়িক বহিষ্কার করে পাঁচদিনের কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়ে দীর্ঘ চার বছর ক্লাসে ফেরার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ তুলেছেন নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) আইন বিভাগের ২০১৮-১৯ সেশনের শিক্ষার্থী ফয়েজ আমহেদ।

রোববার (৮ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিকভবনের সামনে সাংবাদিক সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি। এদিন দুপুরে নিজ পরিবারসহ সাংবাদিক সম্মেলনে ফয়েজ আহমেদ নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া দুর্বিষহ কাহিনী তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ১৪ অক্টোবর ২০২০ সালে মুহম্মদ মুমিন আদদ্বীন নামক একটি আইডি থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় সংসদ নামক একটি গ্রুপে নোবিপ্রবির বঙ্গবন্ধুর ম্যুরালে ভিপি নুরের ছবি এডিট করে পোস্ট করেন। সেই পোস্টটি সমালোচনা করে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় প্রেসক্লাবের সেক্রেটারি শাহরিয়ার নাসের আবার পোস্ট করে। সেখানে আমি কমেন্ট করে বলি এখানে দুঃসাহসের কিছু তো দেখছি না। এই একটি কমেন্টের কারণে আমাকে জেল জুলুম খাটিয়েও বেআইনিভাবে ক্লাস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে।

ফয়েজ জানায়, পরে কোনো তদন্ত না করে ঐদিনই বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ ও প্রকাশনা দপ্তর সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আমাকে সাময়িক বহিষ্কার দিয়ে পাঁচদিনের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে এই ঘটনায় শিক্ষা বিভাগের চেয়ারম্যান বিপ্লব মল্লিককে আহ্বায়ক করে ছয় সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

যেখানে সদস্য হিসেবে ছিলেন তৎকালীন প্রক্টর নেওয়াজ মোহাম্মদ বাহাদুর, মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. ফিরোজ আহমেদ, ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা বিভাগের পরিচালক আফসানা মৌসুমী, ভাষা শহীদ আব্দুস সালাম হলের প্রভোস্ট আনিসুজ্জামান রিমন এবং সদস্য সচিব হিসেবে ছিলেন, নোবিপ্রবি বিএনসিসির পিইউও এ কিউ এম সালাউদ্দিন পাঠান।

১৬ অক্টোবর নোবিপ্রবি ফার্মেসি বিভাগের শিক্ষার্থী ছাত্রলীগ নেতা প্রিতম আহমেদ বাদী হয়ে আমার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুকে অবমাননার মামলা দায়ের করে। যেখানে সাক্ষী হিসেবে ছিল তৎকালীন প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক শাহরিয়ার নাসের, শিক্ষা প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী সজিব এবং বিএমএস বিভাগের শিক্ষার্থী ও পরবর্তীতে ছাত্রলীগ নেতা সাব্বির। দীর্ঘ চার মাস আমি কারাগারে থেকে পরবর্তীতে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে জামিন পেয়ে বের হয়ে আসি।

ফয়েজ অভিযোগ করে বলেন, আমি কারাগারে থাকা অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আমাকে কোনো সাহায্য সহযোগিতাতো করেনি বরং আমার পরিবারকেও নানাভাবে হেনস্তা করেছে। কারাগারে থাকা অবস্থায় ১৯ অক্টোবর ২০২০ তারিখে আমার পরিবারের পক্ষ থেকে আমার বড় ভাই রাজু আহম্মদ বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার চেয়ে রেজিস্ট্রার বরাবর আবেদন করে। কিন্তু সেই প্রত্যাহার আবেদনটি রেজিস্ট্রার বরাবর ফরওয়ার্ডিং করতে বাধা দেয় আইন বিভাগের চেয়ারম্যান বাদশা মিয়া।

পরে প্রায় প্রতিদিনই আমার পরিবার বহিষ্কার আদেশ প্রত্যাহার চেয়ে আবেদন করত কিন্তু আমার নিজ বিভাগের চেয়ারম্যান ফরওয়ার্ডিং না দিয়ে উল্টো আমার পরিবারকে হেনস্তা করেছিল।

তিনি বলেন, আমি যখন কারাগার থেকে বের হই, ক্লাস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করার জন্য আমি এবং আমার পরিবার প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে যেতাম। তারা বলত, তোমার বিভাগের চেয়ারম্যান অনুমতি দিলে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। আবার যখন চেয়ারম্যানের কাছে যেতাম তখন তিনি বলতেন আমার হাতে কিছু নেই। বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগের বিষয়ে কোনো আপস আমি করতে পারব না।

ফয়েজ বলেন, এভাবে দীর্ঘ চার বছর নানাভাবে চেষ্টা করেও আজ পর্যন্ত ক্লাস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারিনি আমি। আমার সহপাঠীরা যখন ক্লাস করত তখন আমি চেয়ারম্যানের অফিসে বসে বসে চোখের পানি ফেলতাম। আমার বাবা একজন আলেম মানুষ, আমার ভাই শিক্ষক। তারা আমার পরিবারকে দিনের পর দিন লাঞ্চিত করত। আইন বিভাগের চেয়ারম্যান বাদশা মিয়া আমার পরিবারকে নানাভাবে হেনস্তা করত। আজকে পড়ালেখা করার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। মিথ্যা মামলা এবং হয়রানির কারণে ঋণে জর্জরিত হয়ে আমার পরিবার আজ নিঃস্ব হয়ে গেছে।

ফয়েজ তার সঙ্গে করা অন্যায়ের বিচার চেয়ে বলেন, আমি এর বিচার চাই। নোবিপ্রবি প্রশাসন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে আমার সঙ্গে এবং আমার পরিবারের সঙ্গে ঘটা অন্যায়ের বিচার চাই।

অভিযোগের বিষয়ে আইন বিভাগের চেয়ারম্যান বাদশা মিয়া বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা। প্রথমত বহিষ্কার করা এবং ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা বোর্ড এবং একাডেমিক কাউন্সিলের হাতে। সেখানে চেয়ারম্যান হিসেবে তার ছাত্রত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি তুলেছি আমি। কিন্তু মামলা চলায় অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল তা আমলে নেয়নি।

তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক শিক্ষা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক বিপ্লব মল্লিক বলেন, এতদিন আগের ঘটনা এখন মনে পড়ছে না। এর বাইরে কোনো কথা বলতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।

সংবাদ সম্মেলনে কান্নায় ভেঙে পরেন নোবিপ্রবি শিক্ষার্থী। ছবি : কালবেলা

সরকারের অবস্থান পরিষ্কার, ‘মব জাস্টিস’ করা যাবে না: প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম

‘মব জাস্টিস’–এর (উচ্ছৃঙ্খল জনতার হাতে বিচার) বিষয়ে সরকারের অবস্থান খুবই পরিষ্কার। এটা কোনোভাবেই হতে দেওয়া যাবে না। যাঁরা এর সঙ্গে জড়িত এবং হামলা করছেন, তাঁদের ব্যাপারে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সরকারের এই অবস্থানের কথা জানিয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশেষ সহকারী মো. মাহফুজ আলম।

আজ রোববার বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মাহফুজ আলম সরকারের এই অবস্থান তুলে ধরেন।

এর আগে আজ সকালে তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে ছাত্রসংগঠক এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এই সভার বিষয় নিয়েও প্রেস ব্রিফিংয়ে বক্তব্য দেন মাহফুজ আলম। প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেসসচিব শফিকুল আলমও বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।

প্রেস ব্রিফিংয়ে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, তাঁরা জেনেছেন, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে তিনটি সুপারিশ এসেছে। এর মধ্যে একটি হলো, তাঁরা (শিক্ষার্থী) চান না দেশে ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি হোক। আরেকটি হলো, শিক্ষাঙ্গনের ভেতরে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকতে পারবেন না। আরেকটি হলো, মব জাস্টিস হচ্ছে। ইতিমধ্যে এ ধরনের কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। এগুলো বন্ধের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে সুপারিশ এসেছে। এই তিন বিষয়ে সরকার ও প্রধান উপদেষ্টার অবস্থান কী?

জবাবে মাহফুজ আলম বলেন, মব জাস্টিসের বিষয়ে সরকারের অবস্থান খুবই পরিষ্কার, এটা কোনোভাবেই হতে দেওয়া যাবে না। যাঁরা এর সঙ্গে জড়িত—বিভিন্নভাবে মাজারে হামলা, মন্দিরে হামলা ও আক্রোশের কারণে কোনো ব্যক্তির ওপর হামলা—সব হামলার ব্যাপারে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, কেউ যদি স্বৈরাচার অথবা ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর অথবা দালাল হিসেবে কাজ করে থাকেন, তাঁদের বিচার জনগণ করবেন না, ‘মব’ তাঁদের বিচার করবে না। তাঁদের আইনের হাতে সোপর্দ করতে হবে। আইন নিজস্ব গতিতে তাঁদের বিচার করবে। তিনি আরও বলেন, জনগণ শুধু খেয়াল রাখবেন, যাতে কোনো আপস না হয়, যাঁরা শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন, তাঁদের সঙ্গে যেন বেইমানি না হয়। এ বিষয়ে সরকার যথেষ্ট কঠোরহস্ত। এ বিষয়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, যাতে আইন অনুযায়ী বিচার করা যায়। কিন্তু জনগণ যেন এ বিষয়ে ‘মব জাস্টিস’–এর আশ্রয় না নেন।

ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতির বিষয়ে মাহফুজ আলম বলেন, ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করার বিষয়ে একজন শিক্ষার্থী বক্তব্য দিয়েছিলেন। ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বিষয়ে ওই শিক্ষার্থী কোনো কথা বলেননি। বলেছেন, ধর্মকে ব্যবহার করে যে ধরনের রাজনীতি হয়, সেই রাজনীতি নিয়ে। এ বিষয়ে সতর্ক থাকার জন্য তাঁরা (শিক্ষার্থী) সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন। বিষয়টি যেহেতু বাংলাদেশের সংবিধান এবং অন্যান্য অনেক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত, তাই এ সম্পর্কে সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।

শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র-শিক্ষকদের রাজনীতি বন্ধের সুপারিশের বিষয়ে মাহফুজ আলম বলেন, মোটাদাগে দেশের সব ক্যাম্পাসে একধরনের আলোচনা চলছে যে কোনোভাবেই আওয়ামী লীগের শিক্ষক ও ছাত্রলীগের মতো রাজনীতি যাতে ফেরত না আসে। এটি শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে বক্তব্য, রাষ্ট্র বা সরকারের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশমালা বলা হয়নি। কিন্তু ইতিমধ্যে ক্যাম্পাসে সবাই এ বিষয়ে শক্ত অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। ছাত্ররাজনীতি যদি না থাকে, তাহলে কোন পদ্ধতিতে রাজনীতি হবে, তা নিয়ে একধরনের বিতর্ক ও সংলাপ সব জায়গায় চলছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গত সপ্তাহে এ নিয়ে আলোচনার আয়োজন হয়েছে। অন্যান্য জায়গাতেও আলোচনা হচ্ছে।

মাহফুজ আলম বলেন, ‘আমরা চাই, সমাজের বিভিন্ন অংশের ভেতরে, ক্যাম্পাস ও ক্যাম্পাসের বাইরে এই আলোচনাগুলো হোক। এই বিতর্ক ও সংলাপের মধ্য দিয়ে যে ধারণা তৈরি হবে, তার ভিত্তিতে সরকার তার অবস্থান ব্যক্ত করবে।’

একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, নানা ধরনের গণহারে মামলা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর জবাবে মাহফুজ আলম বলেন, এটিও মব জাস্টিসের মতোই ঘটনা। এভাবে ঢালাও মামলা, এক মামলায় অনেককে নিয়ে আসা এবং ব্যক্তিগত কারণে কারও বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া—এগুলো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম (বাঁ থেকে দ্বিতীয়) সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। আজ রোববার বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে: প্রধান উপদেষ্টা

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক দরকার। কিন্তু সেই সম্পর্ক হবে ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে।’

অন্তর্বর্তী সরকারের এক মাস পূর্তি উপলক্ষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নেওয়া ১৫০ জন ছাত্র প্রতিনিধি আজ রোববার সরকারপ্রধানের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেখানেই প্রধান উপদেষ্টা এ কথা বলেন। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে অবস্থিত প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে এই মতবিনিময় অনুষ্ঠিত হয়।

পরে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মাহফুজ আলম সাংবাদিকদের জানান, শিক্ষার্থীদের এক প্রশ্নের উত্তরে ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বিষয়ে বর্তমান সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

প্রধান উপদেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে সার্ক পুনরুজ্জীবিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেছেন, এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার কাজ করতে আগ্রহী।

উল্লেখ্য, ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান। ৮ আগস্ট শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ গ্রহণ করে। আজ সরকারের এক মাস পূর্তি উপলক্ষে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ছাত্র সংগঠক, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের ছাত্র প্রতিনিধিদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় প্রধান উপদেষ্টা এ কথা বলেন।

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস তেজগাঁওয়ে তাঁর কার্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। ৮ সেপ্টেম্বর

পশ্চিম তীর-জর্ডান সীমান্তে তিন ইসরায়েলিকে গুলি করে হত্যা

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও জর্ডান সীমান্তের একটি ক্রসিংয়ে বন্দুকধারীর গুলিতে তিন ইসরায়েলি নিহত হয়েছেন। রোববার এ ঘটনা ঘটে।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) এক বিবৃতিতে জানায়, হামলাকারী জর্ডানের আল-কারামেহ শহর থেকে একটি ট্রাক করে রোববার সকালে অ্যালেনবি সেতু ক্রসিংয়ে আসেন। এরপর সীমান্ত প্রহরীদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ করেন তিনি।

বিবৃতিতে বলা হয়, ইসরায়েলের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বন্দুকধারীকে গুলি করে হত্যা করেছেন। ট্রাকটিতে কোনো বিস্ফোরক ছিল কি না, তা তাঁরা খতিয়ে দেখেছেন।

জর্ডান জানায়, তারা ঘটনাটি তদন্ত করছে। ইসরায়েল নিয়ন্ত্রিত এমন একটি জায়গায় ঘটনাটি ঘটেছে, যেখানে জর্ডানের ট্রাকগুলো মালামাল খালাস করে। এই ঘটনার পর দুই দিক থেকেই ক্রসিংটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।


ইসরায়েলের এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা এএফপিকে জানান, নিহত তিনজনই ইসরায়েলের নিরাপত্তা প্রহরী। তবে তাঁরা ইসরায়েলের সেনাবাহিনী বা পুলিশের সদস্য নয়।

জর্ডানের এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, ঘটনার সময় মালামাল খালাসের জায়গা থেকে জর্ডানের অন্তত দুই ডজন ট্রাকচালককে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে।

ঘটনার পর জর্ডানের সঙ্গে ইসরায়েলের সব সীমান্ত ক্রসিং বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরায়েলি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

অ্যালেনবি সেতু ক্রসিং বাদশা হোসেইন সেতু নামেও পরিচিত। এটা পশ্চিম তীর ও জর্ডানের মধ্যে বৈধ পারাপারের একমাত্র পথ। তা ছাড়া জর্ডান থেকে থেকে পশ্চিম তীরে ঢোকার এটিই একমাত্র পথ, যেটি ইসরায়েলের ভেতর দিয়ে যায়নি।

এই ঘটনার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু একে ইসরায়েলের জন্য ‘একটি কঠিন দিন’ আখ্যায়িত করেছেন। মন্ত্রিসভার বৈঠকের শুরুতে তিনি ভুক্তভোগীদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।

হামাস এই হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে এটিকে গাজা যুদ্ধের ‘প্রাকৃতিক জবাব’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।

ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর থেকে পশ্চিম তীরে এখন পর্যন্ত ৬০০ এর বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছে।

একই সময়ে সেখানে সহিংসতায় অন্তত ১৮ জন ইসরায়েলি নাগরিক প্রাণ হারিয়েছে বলে জাতিসংঘের তথ্য। তবে এই পরিসংখ্যানে গত ১১ আগস্টের পর থেকে নিহতদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।

গত সপ্তাহে পশ্চিম তীরে বৃহত্তম উদ্বাস্তু শিবির জেনিন শহর থেকে নয় দিনের অভিযান শেষে সেনা প্রত্যাহার করে ইসরায়েল। এই এলাকাটি ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর শক্তিশালী ঘাঁটি রয়েছে। এখানে প্রায় ৬০ হাজার মানুষ বসবাস করে।
পশ্চিম তীর ও জর্ডান সীমান্তের অ্যালেনবি ক্রসিংয়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা। অধিকৃত পশ্চিম তীরে, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৪

মিয়ানমারের মংডুতে তীব্র হচ্ছে সংঘাত, বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছেন রোহিঙ্গারা by আব্দুল কুদ্দুস ও গিয়াস উদ্দিন

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংডু টাউনশিপ এলাকায় সরকারি বাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির সংঘাত আরও তীব্র হয়েছে। গতকাল শুক্রবার রাত থেকে মংডুর বিভিন্ন এলাকা থেকে থেমে থেমে মর্টার শেল, গ্রেনেড-বোমার বিস্ফোরণের শব্দ ভেসে আসছে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের টেকনাফের বিভিন্ন এলাকায়। আজ শনিবার বেলা ১১টা পর্যন্ত বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। এতে টেকনাফের বাসিন্দারাও আতঙ্কে রয়েছেন।

রাখাইনে চলমান সংঘাতের মধ্যে সীমান্তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়লেও রোহিঙ্গাদের অনেকেই পালিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছেন। সীমান্তের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, গত দুই সপ্তাহে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছেন প্রায় ১২ হাজার রোহিঙ্গা। সীমান্তের ওপারে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার চেষ্টায় রয়েছেন আরও প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা। ছয় মাস ধরে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংঘাত চলছে। এখন সংঘাত সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে।

টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর আরাফা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘ওপারে মর্টার শেল ও শক্তিশালী গ্রেনেড-বোমার বিস্ফোরণে এপারের ঘরবাড়ি কাঁপছে। বিস্ফোরণের শব্দ শুনে মনে হয় বসতঘরের চালার ওপর বোমা এসে পড়ছে। রাতে বিকট শব্দে বিস্ফোরণে ঘুম ভেঙে শিশুরা কান্নাকাটি শুরু করে দিচ্ছে।’

উখিয়া উপজেলার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, বিজিবি ও কোস্টগার্ড বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে এরই মধ্যে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছেন। বাংলাদেশে ঢুকে পড়ার জন্য রাখাইন রাজ্যের বিভিন্ন পয়েন্টে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা জড়ো হয়ে রয়েছেন।

রাখাইনের মংডু টাউনশিপের বিপরীতে (পশ্চিমে) চার কিলোমিটার প্রস্থের নাফ নদী পেরোলেই বাংলাদেশের টেকনাফ উপজেলা। টেকনাফের জনপ্রতিনিধিরা জানান, রাতের অন্ধকারে মংডু টাউনশিপের সুদাপাড়া, ফয়েজীপাড়া, সিকদারপাড়া ও নুরুল্লাপাড়া গ্রাম থেকে রোহিঙ্গারা নৌকা নিয়ে নাফ নদী অতিক্রম করে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ছেন। বেশির ভাগ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকছেন জাদিমোরা, দমদমিয়া, কেরুনতলি, বরইতলি, নাইট্যংপাড়া, জালিয়াপাড়া, নাজিরপাড়া, মৌলভীপাড়া, নয়াপাড়া, শাহপরীর দ্বীপ, জালিয়াপাড়া, মিস্ত্রিপাড়া, ঘোলারচর, খুরেরমুখ, আলীর ডেইল, মহেষখালীয়াপাড়া, লম্বরী, তুলাতলি, রাজারছড়া, বাহারছড়া উপকূল দিয়ে। গতকাল শুক্রবার রাতেই কেবল বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছেন চার শতাধিক রোহিঙ্গা। মংডুর উত্তরের প্যারাংপুরু ও দক্ষিণের ফাদংচা এলাকায় প্রায় ৫০ হাজার রোহিঙ্গা জড়ো হয়ে বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টায় রয়েছেন। রাখাইনের চলমান সংঘাতে সম্প্রতি তাঁরা ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হয়েছেন।

দালালের মাধ্যমে রোহিঙ্গারা ঢুকছেন জানিয়ে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নজির আহমদ বলেন, গত কয়েক দিনে কেবল কেরনতলি সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের সময় এলাকাবাসীর সহযোগিতায় তিনি শতাধিক রোহিঙ্গাকে আটক করে বিজিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিজিবি এসব রোহিঙ্গাকে পুনরায় মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে।

গতকাল রাতে নাফ নদী পেরিয়ে টেকনাফের কেরনতলির এক বাসিন্দার বাড়িতে আশ্রয় নেন ১৫ শিশু ও ৯ নারীসহ চারটি পরিবারের ৩০ জন রোহিঙ্গা। তাঁদের বাড়ি মংডু টাউনশিপের পাশের গ্রাম সুদাপাড়াতে। তাঁদের দুজন জাহেদা বেগম (৩৫) ও নুর জাহান (৪০) বলেন, সাত-আট দিন ধরে মংডুতে সরকারি বাহিনীর সঙ্গে আরাকান আর্মির প্রচণ্ড যুদ্ধ চলছে। যুদ্ধে উভয় পক্ষ শক্তিশালী গ্রেনেড-বোমা, মর্টার শেলের পাশাপাশি ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। যুদ্ধবিমান থেকেও বোমা নিক্ষেপ করা হচ্ছে। তাতে অনেক মানুষ হতাহত হচ্ছেন।

তাঁরা বলেন, যুদ্ধের মধ্যে অনেক রোহিঙ্গা বসতি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাণ বাঁচাতে তাই রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টায় রয়েছেন। তবে নৌকার অভাবে বাংলাদেশে ঢুকতে সমস্যা হচ্ছে।

দলের আরেক সদস্য সাব্বির আহমদ বলেন, নাফ নদী অতিক্রম করে টেকনাফে ঢুকতে তাঁদের (রোহিঙ্গাদের) কাছ থেকে মাথাপিছু ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়েছেন দালালেরা।

টেকনাফে আশ্রয়শিবিরের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ১৬ আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) সহকারী পুলিশ সুপার মাইন উদ্দিন বলেন, ‘কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে ঢুকে পড়েছে। তাদের নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। নতুন করে কোনো রোহিঙ্গা যেন ঢুকতে না পারে, সে ব্যাপারে আশ্রয়শিবিরে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’

জানতে চাইলে টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আদনান চৌধুরী বলেন, সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে। অনুপ্রবেশের সময় বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গাকে নাফ নদী থেকে পুনরায় মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হচ্ছে। অনুপ্রবেশ ঠেকাতে নাফ নদী ও সীমান্তে টহল জোরদার করা হয়েছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) কার্যালয়ের অতিরিক্ত কমিশনার মোহাম্মদ সামছু-দ্দৌজা বলেন, বিভিন্ন আশ্রয়শিবিরে নতুন করে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিচ্ছেন। তবে এ পর্যন্ত কত রোহিঙ্গা ঢুকেছে তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই।

নাফনদী অতিক্রম করে টেকনাফে আসে চার রোহিঙ্গা পরিবার
নাফনদী অতিক্রম করে টেকনাফে আসে চার রোহিঙ্গা পরিবার। ছবি-প্রথম আলো

বাংলাদেশের পর্যটক না আসায় ধুঁকছে কলকাতার যেসব অঞ্চল

মাস দুয়েক আগেও কলকাতার নিউ মার্কেট, মার্কুইজ স্ট্রিট গিজ গিজ করত বাংলাদেশের মানুষে। তবে জুলাই মাস থেকে সেদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন, ব্যাপক সহিংসতা, কারফিউ, শেষে শেখ হাসিনার দেশ ছেড়ে পলায়ন – সব মিলিয়ে কলকাতায় এখন বাংলাদেশি পর্যটক প্রায় নেই বললেই চলে।

এর একটা বড় কারণ ভারতীয় হাইকমিশন বাংলাদেশে ভিসা দেওয়ার ব্যবস্থা সম্পূর্ণ চালু করে নি। তাই আগে থেকে যারা ভিসা নিয়েছিলেন এবং জরুরি চিকিৎসা করাতে হলেই ভারতে আসার অনুমতি পাচ্ছেন বাংলাদেশিরা।

কলকাতার নিউ মার্কেট, মার্কুইস স্ট্রিট বা মুকুন্দপুর অঞ্চলের বেসরকারি হাসপাতালগুলোতেই মূলত বাংলাদেশি পর্যটকরা থাকেন, কেনাকাটা করেন। ওইসব এলাকায় বাংলাদেশি পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে বছরভর।

“বাংলাদেশ থেকে প্রায় কেউই আসছেন না মাসখানেকের বেশি সময় হয়ে গেল,” বলছিলেন ঐতিহ্যবাহী নিউমার্কেটের ‘শপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক অশোক গুপ্তা।

“নিউ মার্কেটের জামাকাপড়ের দোকান বলুন বা অন্যান্য সামগ্রী – এসবের একটা বড় ক্রেতা বাংলাদেশের মানুষ। ভারতীয় ভিসা ব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি চালু হয় নি তাই তারা প্রায় কেউই আসতে পারছেন না। আমাদের বিক্রি প্রায় ৬০ শতাংশ কমে গেছে গত এক মাসে,” বলছিলেন মি. গুপ্তা।

তবে নিউ মার্কেটের ব্যবসা কমে যাওয়ার আরও একটা কারণ আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা।

মি. গুপ্তার কথায়, “ওই ঘটনা মানুষকে এতটাই নাড়া দিয়েছে যে বহু মানুষেরই কেনাকাটা করার, উৎসবে মাতার মতো মন নেই। এছাড়া রোজই মিছিল প্রতিবাদ হচ্ছে। তাই মানুষ এখন এদিকে আসা কমিয়ে দিয়েছে।“

একই অবস্থা বাংলাদেশিরা মূলত যে এলাকার হোটেলগুলোতে থাকেন, সেই মার্কুইস স্ট্রিটেও।

হোটেল-খাবারের দোকান বা অন্যান্য পরিষেবা – এই রাস্তার সব কিছুই বাংলাদেশি পর্যটক-কেন্দ্রিক।

করোনার সময়ে যেমন বাংলাদেশি পর্যটক আসা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, গত একমাসে বাংলাদেশে অশান্তির জেরে আবারও প্রায় সেই অবস্থাতেই পৌছিয়েছে। আবার বহু মানুষ বাংলাদেশ থেকে চিকিৎসা করাতে আসেন কলকাতায়।

একটি বেসরকারি হাসপাতাল গোষ্ঠী জানাচ্ছে এক মাস আগের তুলনায় এখন বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা এক-তৃতীয়াংশ কমে গেছে।

হোটেলের ঘর প্রায় ফাঁকা
মার্কুইস স্ট্রিট এলাকাটি বহু বাংলাদেশি মানুষের কাছে অতি পরিচিত এলাকা। কলকাতার কেন্দ্রস্থলের এই এলাকায় বহু হোটেল রেস্তোরাঁ আছে, যারা মূলত বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপরে নির্ভর করেই ব্যবসা করে থাকে।

এছাড়াও ওই অঞ্চলে মানিএক্সচেঞ্জ, বাসের কাউন্টার সহ বাংলাদেশি পর্যটকদের প্রায় সব ধরনের পরিসেবাই পাওয়া যায়।

ওই এলাকায় গেলে মনেই হবে না যে এটা ঢাকার বাইরে অন্য কোনও শহরের রাস্তা।

তবে জুলাই মাস থেকে বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে ভারতে বাংলাদেশিদের আসা কমে গিয়েছিল। আর অগাস্ট থেকে তা একরকম বন্ধই হয়ে গেছে।

“এখন শুধু মাত্র মেডিক্যাল ভিসা নিয়ে মানুষ আসতে পারছেন, অথবা আগে থেকে যাদের ভিসা নেওয়া ছিল, তারা আসছেন,” বলছিলেন মার্কুইস স্ট্রিটের হোটেল মালিকদের সংগঠনের নেতা মনোতোষ সরকার।

“কয়েক মাস আগেও আমাদের হোটেলগুলির ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ অকুপেন্সি রেট ছিল। এখন সেটা নেমে এসেছে মাত্র ৩০ শতাংশে,” জানাচ্ছিলেন মি. সরকার।

রুম অকুপেন্সি রেট হল হোটেল ব্যবসার একটি শব্দ, যা হোটেলের মোট ঘরের সংখ্যার কত শতাংশে মানুষ থাকছেন, তার হিসাব।

অর্থাৎ হোটেলগুলিতে ১০০টি ঘর থাকলে এখন মাত্র ৩০টি ঘরে পর্যটক থাকছেন।

মি. সরকার বলছিলেন, “মার্কুইস স্ট্রিটে তো শুধু হোটেল নয়, বাংলাদেশি পর্যটকদের আরও বহু পরিসেবা প্রদানকারী সংস্থা আছে। তাদেরও মূল ক্রেতা ওদেশের পর্যটকরাই। তারা এখন এতটাই কম সংখ্যায় আসছেন, যে সব ব্যবসায়ীরাই মার খাচ্ছে। বাস আসছে বাংলাদেশি পর্যটক নিয়ে, কিন্তু সেখানেও দেখা যাচ্ছে ওই ৩০ শতাংশ মতোই আসন ভর্তি হচ্ছে, বাকিটা ফাঁকা থাকছে।“

কতদিন এই অবস্থা চলবে, তা অনিশ্চিত। তাই অন্য কোনও অঞ্চলের ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা যায় কী না, সে ব্যাপারে ভাবনা চিন্তা শুরু করছেন মার্কুইস স্ট্রিটের হোটেল ব্যবসায়ীরা।

নিউ মার্কেট
এসএস হগ মার্কেট, যা নিউ মার্কেট বলে পরিচিত, অথবা তার আশপাশের বিপণী বিতানগুলিতে সারা বছরই বাংলাদেশি পর্যটকদের ভিড় লেগে থাকে। বেড়াতে এসে হোক অথবা চিকিৎসা করানো জন্য, বেশিরভাগ বাংলাদেশি পর্যটকই কলকাতায় এলে নিউ মার্কেটে কেনা কাটা করতে গিয়ে থাকেন। বিশেষত পোশাকের দোকানগুলিতে বাংলাদেশি ক্রেতাদেরই ভিড় দেখা যেত।

“কিন্তু এক মাস হয়ে গেল, তারা এখন আর ভারতে আসছেন না প্রায় কেউই। আমাদের দোকানগুলোর ৬০ শতাংশ বিক্রি কমে গেছে এই এক মাসে,” জানাচ্ছিলেন নিউ মার্কেটের দোকান মালিকদের সংগঠনের প্রধান অশোক গুপ্তা।

পোষাক, সাজগোজের জিনিষ অথবা জুতো সহ সব ব্যবসায়ীই ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন বলে জানিয়েছেন মি. গুপ্তা।

“মাস খানেকের মধ্যেই দুর্গাপুজো। পুজো আর ঈদের আগে আমাদের ব্যবসার বড় সিজন। পুজোর সময়ে শুধু যে হিন্দুরা কেনাকাটা করেন না নয়। এই সময়ে অনেক নতুন ডিজাইনের পোষাক বাজারে আসে, তাই মুসলমান এবং অবশ্যই বাংলাদেশিরা এই সময়ে কেনাকাটা করতে আসতেন। আবার পাইকারি বাজার থেকে পোষাক কিনে বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়ার জন্য সেদেশ থেকে ব্যবসায়ীরাও আসতেন।

“তবে এ বছর কেউই প্রায় আসছেন না। বাংলাদেশের পরিস্থিতি তো একটা কারণ। আবার কলকাতায় এখন বহু মানুষ আরজি করের ঘটনা নিয়ে এতটাই মন খারাপ করে আছেন যে তারাও কেনাকাটা করতে উৎসাহ পাচ্ছেন না। কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে তা বোঝা যাচ্ছে না। তাই আগামী পাঁচ-ছয় দিন সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ,” বলছিলেন অশোক গুপ্তা।

তার কথায়, “এই সময়ের মধ্যে বাজারের পরিস্থিতি যদি কিছুটা উন্নতি হল তা হলে ভাল। না হলে এবারের কেনাকাটার মরসুমটা পুরোই লস আমাদের।“

নিউ মার্কেটের কাছাকাছি আরও যে কয়টি বড় শপিং মল বা বড় বড় দোকান আছে, সেখানেও একই পরিস্থিতি বলে জানা যাচ্ছে।

হাসপাতালেও রোগী কমেছে
বাংলাদেশ থেকে যারা ভারতে আসেন, তাদের একটা বড় অংশ স্বাস্থ্য পরিসেবার জন্য আসেন। কলকাতা হোক বা ভেলোর, চেন্নাই,বেঙ্গালুরু অথবা দিল্লি-মুম্বাই – বহু বেসরকারি হাসপাতালে বাংলাদেশের মানুষের ভিড় লেগে থাকে।

এই সব হাসপাতালগুলিতে বাংলা কথা বলা কর্মকর্তারা যেমন থাকেন, তেমনই বাংলাদেশিদের জন্য থাকে পৃথক পরিসেবা-ডেস্কও।

কলকাতার যেসব বেসরকারি হাসপাতালে বাংলাদেশি রোগীরা বেশী সংখ্যায় আসেন, ওই হাসপাতালগুলি বলছে গত একমাসে খুব কম রোগী সেদেশ থেকে এসেছেন।

যদিও ভারতের হাইকমিশনগুলি মেডিক্যাল ভিসা দিচ্ছে, তা সত্ত্বেও আগের তুলনায় কম সংখ্যক রোগীর দেখা পাওয়া যাচ্ছে কলকাতার হাসপাতালগুলিতে।

মনিপাল হসপিটালস্ গোষ্ঠী কলকাতার বেশ কয়েকটি হাসপাতাল অধিগ্রহণ করেছে কয়েক মাস আগে। তাদের অধীন হাসপাতালগুলিতে গড়ে ২১০০ জন বাংলাদেশি রোগী আসেন প্রতি মাসে। সেই সংখ্যাটা প্রায় এক তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।

তবে মনিপাল হসপিটালস্ গোষ্ঠীর পূর্বাঞ্চলের জন্য আঞ্চলিক চিফ অপারেটিং অফিসার অয়নাভ দেবগুপ্ত বলছেন, “এই মুহূর্তে বাংলাদেশ থেকে মনিপাল হসপিটালসে আসা রোগীর সংখ্যা সামান্য হলেও বেড়েছে। কিন্তু দু মাস আগে যত রোগী আসতেন এই সংখ্যাটা তার থেকে অনেক কম। ঢাকায় ভারতীয় দূতাবাস এখনও ভিসা ব্যবস্থাপনা পুরোপুরি স্বাভাবিক করে নি, তাই যখন যেমন ভিসা পাচ্ছেন রোগীরা, তখন আসছেন এখানে।“

কলকাতার ইস্টার্ন বাইপাস সংলগ্ন এলাকার হাসপাতালগুলিতেই বাংলাদেশি রোগীদের ভিড় সবথেকে বেশি দেখা যায়।

ওখানে হাসপাতালগুলিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এক বিরাট পরিসেবা শিল্প। খাওয়ার বা থাকার হোটেল, ওষুধের দোকান – সব মিলিয়ে প্রায় লাখ খানেক মানুষের রোজগার চলে ওই হাসপাতালগুলিকে কেন্দ্র করে।

কলকাতার রোগীদের ভিড় সেখানে স্বাভাবিক থাকলেও এদের একটা বড় অংশ নির্ভর করে বাংলাদেশি রোগীদের ওপরে।

তাই বাংলাদেশ থেকে পর্যটক বা রোগী আসা যতক্ষণ না স্বাভাবিক হচ্ছে, ততদিন এই বিরাট সংখ্যক মানুষের অনিশ্চয়তা কাটছে না।

mzamin

মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন কার্যালয়: নিয়োগে দুর্নীতি কোটি টাকার বাণিজ্য, তোলপাড় by ইমাদ উদ দীন

একটি নিয়োগ পরীক্ষার রেজাল্ট শিট। নয়ছয় নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব। এটা পুকুর চুরি নয়, অনেকটা সাগর চুরি। এমনটি মন্তব্য সুশীল সমাজ ও ক্ষতিগ্রস্তদের। অভিযোগ উঠেছে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে ৭টি ক্যাটাগরিতে নিয়োগে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট করে কয়েক কোটি টাকা বাণিজ্য করেছে একটি চক্র। সাম্প্রতিক সময়ে এমন ঘটনা স্যোশাল মিডিয়ায় চাউর হলে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জেলাবাসীর। নিয়োগ বঞ্চিত ও সচেতন মহল নিয়োগকৃতদের চাকরি বাতিলের জোর দাবি জানাচ্ছেন। ওই নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে নিয়োগ কমিটির সদস্য, পরীক্ষক ছাড়াও ২ জন এমপি ও ১ জন মন্ত্রীসহ সিভিল সার্জন অফিসের ৪ জন কর্মচারী ও ২৫০ শয্যা সদর হাসপাতালের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। স্যোশাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি রেজাল্ট শিটে দেখা যায় পরিসংখ্যানবিদ, স্টোরকিপার, গাড়িচালক, ক্লোড চেইন টেকনিশিয়ান, ল্যাবরেটরি এটেনডেন্ট ও অফিস সহকারী কাম মুদ্রাক্ষরিক ৬টি পদে ১২ জন নিয়োগ পেয়েছেন। ১২ জনই সনাতন ধর্মাবলম্বী। এর কারণ অনুসন্ধানে জানা যায় সিভিল সার্জন অফিসের যারা নিয়োগ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারা ৫ জনই সনাতন ধর্মাবলম্বী। ওই সময়ের স্রোত ও আর্থিক দুর্নীতির বিষয়টি ধামাচাপ সহজ হবে বলে ওদেরকে নিয়োগ পাইয়ে দেন। ফলাফলের দিক থেকে ১ম হয়ে কমলগঞ্জের রুবেল আহমেদ নিয়োগ বঞ্চিত হলেও ৩য় হওয়ার পরও শুধু টাকা ও সনাতন ধর্মের লোক বলে গাড়িচালক হিসেবে নিয়োগ পান শুভচন্দ্র পাল। এ ছাড়া স্বাস্থ্য সহকারী পদে ৭১টি পদের মধ্যে (৯টি স্থগিত/বাতিল) নিয়োগ পেয়েছেন ৫৫ জন সনাতন ধর্মাবলম্বী। ৭৪টি পদের মধ্যে ৬৭ জনই সনাতন ধর্মাবলম্বী অধিক গুরুত্বে নিয়োগ পান। আর ৪টি কোটায় নিয়োগ পান ২০ জন। অভিযোগ রয়েছে ভুয়া তথ্য দিয়েও অনেকেই টাকার জোরে নিয়োগ পান। জানা যায় ৭টি ক্যাটাগরিতে ২০১৮ ও ২০২৩ সালে দু’টি পৃথক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। এতে ৯৫টি পদের জন্য ২০ হাজার ৮শ’ ৬৯ জন আবেদন করেন। এরমধ্যে  লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন ৮ হাজার ১৫৪ জন। উত্তীর্ণ হন ৫৯৭ জন। মৌখিক পরীক্ষা শেষে চলতি বছরের ১৬ই জুলাই ৯৩ জনের নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয় (আইনগত জটিলতায় স্বাস্থ্য সহকারী ৩টি পদ স্থগিত থাকে)। নিয়োগ প্রক্রিয়া, পরীক্ষাসহ সকল আনুষ্ঠানিকতা ঠিকটাক দেখালেও যারা চাহিদামতো বড় অংকের টাকার যোগান দিয়েছেন কেবল তারাই নয় ছয়ের মাধ্যমে যোগ্য বলে নিয়োগ পান। এমন অভিযোগ চাকরি বঞ্চিতদের। ভালো পরীক্ষা দেয়ার পরও অকৃতকার্য হওয়ায় প্রার্থী ও তাদের স্বজনদের সন্দেহ হয়। তখনই নিয়োগে অনিয়ম দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ তোলেন। চাকরি বঞ্চিতরা বলছেন যারা নিয়োগ পেয়েছেন তাদের ওই প্রশ্নে আবারো পরীক্ষা নিলে নির্ঘাত অকৃতকার্য হবেন। অভিযোগ উঠেছে সরাসরি এই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন সিভিল সার্জন অফিসের প্রধান সহকারী অসিত চক্রবর্তী, হেড এসিস্টেণ্ট কাম ক্যাশিয়ার রঞ্জনা দেবী, পরিসংখ্যানবিদ অহিজিৎ দাস রিংকু, স্টোরকিপার অলকচন্দ্র পাল ও ২৫০ শয্যা সদর জেনারেল হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সিতাংশ আচার্য্যসহ অন্যরা। এরা দীর্ঘদিন থেকে একই অফিসে কর্মস্থল হওয়ায় দাপটের সঙ্গে দুর্নীতি, ঘুষ ও নিয়োগ বাণিজ্যসহ সকল অপকর্মের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। তাদের দাপটের কারণে সিভিল সার্জন অফিসের কোনো কর্মকর্তা কর্মচারী তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পান না। ওই ঘটনার নেপথ্যে আর্থিক বাণিজ্যে জড়িত ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া) আসনের সাবেক এমপি শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, মৌলভীবাজার-৩ (সদর ও রাজনগর) সাবেক এমপি ও অলিলা গ্রুপের কর্ণধার মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান, মৌলভীবাজার-৪ (কমলগঞ্জ ও শ্রীমঙ্গল) সাবেক এমপি ও কৃষিমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা উপাধ্যক্ষ ড. আব্দুস শহীদ, বিএম এর মৌলভীবাজার জেলা সভাপতি ডা. সাব্বির আহমদ খান। ওই নিয়োগ কমিটিতে আহ্বায়ক ছিলেন বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) সিলেট, ডা. মো. আনিসুর রহমান, সদস্য ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের (স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ) উপ-সচিব মনিরা পারভীন, পিএসসির  উপ-পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম, মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. আব্দুস সালাম, সদস্য সচিব ছিলেন জেলা সিভিল সার্জন ডা. চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ। অভিযোগ উঠেছে ওই নিয়োগ বাণিজ্যের যাবতীয় কলকাঠি নেড়েছেন সিভিল সার্জন অফিসের ৪ জন, সদর জেনারেল ২৫০ শয্যা হাসপাতালের-১ জন, বিএমএ’র ১ জন ও নিয়োগ বোর্ডের ৩ জন। আর তাদেরকে প্রশ্রয় দিয়ে প্রভাবিত করেন স্থানীয় ২ জন এমপি, ১জন মন্ত্রী ও বিএমএ’র নেতারা। এ ক্ষেত্রে তারা দালালের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা সংগ্রহ করেন। তারা নিয়োগ কমিটিসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সদস্যদের ম্যানেজ করে চাকরি দেয়ার শর্তে অন্তত ৫০-৬০ জন প্রার্থীর কাছ থেকে ৫-৬ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন। নিয়োগের পরও আরেক দফা পোস্টিং বাণিজ্য করেন সিভিল সার্জন অফিসের সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া ২০২৩ সালেও আউট সোর্সিং নিয়োগেও অনুরূপ দুর্নীতি হয়েছিল বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। ওই নিয়োগেও জড়িত ছিলেন সিভিল সার্জন অফিসের কর্মকর্তা, কর্মচারী ও বিএমএর নেতারা। এ বিষয়ে নিয়োগ কমিটির সদস্য উপ-সচিব (স্বাস্থ্য-৬ শাখা) স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় মনিরা পারভীন ও সদস্য সচিব মৌলভীবাজার সিভিল সার্জন ডা. জালাল উদ্দিন মুর্শেদ মুঠোফোনে মানবজমিনকে জানান নিয়োগ পরীক্ষায় কোনো দুর্নীতি হয়নি। সরকারের সকল নিয়ম কানুন মেনেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

ইসরায়েলের এত অস্ত্র এলো কোথা থেকে?

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় প্রায় এক বছর ধরে অনবরত হামলা চালিয়ে আসছে ইসরায়েল। যেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে দুনিয়ার অত্যাধুনিক সব অস্ত্র। আর এসব অস্ত্রের আঘাতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে গাজা উপত্যকা। গত ৭ অক্টোবর থেকে চালানো হামলায় এখন পর্যন্ত ৪০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১ লাখেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

ইসরায়েল যেসব অস্ত্র দিয়ে গাজার নিরপরাধ মানুষের ওপর গণহত্যা চালাচ্ছে তার অধিকাংশই ইসরায়েলে তৈরি নয়। বরং এসব অস্ত্রের জোগান দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বেশকিছু দেশ। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গোষ্ঠী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখেও তেলআবিবকে অস্ত্র দেওয়া বন্ধ করেনি তারা।

ইসরাইল বিশ্বের একটি বড় অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ। তবে আকাশপথে হামলা চালানোর ক্ষেত্রে তাদের সামরিক বাহিনী আমদানি করা যুদ্ধবিমান, গাইডেড বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। গাজায় ইসরাইল আকাশপথে যে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে, বিশেষজ্ঞরা তাকে সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম তীব্র ও ধ্বংসযজ্ঞ বলে উল্লেখ করেছেন।

বিভিন্ন অধিকার গোষ্ঠী ও ইসরাইলের পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোর কিছু রাজনীতিবিদ বলেছেন, দেশটির কাছে অস্ত্র রপ্তানি স্থগিত করা উচিত। কারণ, ইসরাইল বেসামরিক নাগরিকদের জীবন রক্ষাসহ তাদের কাছে পর্যাপ্ত মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর বিষয়টি নিশ্চিতে বাধা দিচ্ছে।

জানা গেছে, গাজায় ইসরায়েলের হামলায় ব্যবহৃত বেশিরভাগ অস্ত্রের জোগানদাতা যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইতালি ও যুক্তরাজ্য। তবে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র সরবরাহকারী দেশ। প্রযুক্তিগতভাবে বিশ্বের অন্যতম অত্যাধুনিক সামরিক বাহিনী গড়ে তুলতে ইসরায়েলকে আগাগোড়াই সাহায্য করে আসছে ওয়াশিংটন।

স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) তথ্য অনুসারে, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ইসরাইলের প্রধান প্রচলিত অস্ত্র আমদানির ৬৯ শতাংশই এসেছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।

যুক্তরাষ্ট্র ১০ বছর মেয়াদি একটি চুক্তির আওতায় ইসরাইলকে ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বার্ষিক সামরিক সহায়তা দিয়ে থাকে। এর উদ্দেশ্য ইসরাইলকে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে গুণগত সামরিক শক্তিতে এগিয়ে রাখা।

মার্কিন গণমাধ্যম গত মার্চে জানায়, গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকে তখন পর্যন্ত বাইডেন প্রশাসন চুপিসারে ইসরাইলের কাছে ১০০টির বেশি ধাপে সামরিক সরঞ্জাম বিক্রি করেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর মূল্য ডলারের হিসেবে এমন পরিমাণ ছিল, যে ক্ষেত্রে কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর দরকার হয় না।

এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের পর ইসরায়েলে বেশি অস্ত্র রপ্তানি করে জার্মানি। এসআইপিআরআইয়ের তথ্য মতে, ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ইসরায়েল যে অস্ত্র আমদানি করেছে, তার ৩০ শতাংশ জার্মানির। আর এ তালিকায় ৩য় অবস্থানে আছে ইতালি। তবে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ইসরায়েল যত অস্ত্র আমদানি করেছে, তার মাত্র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ ইতালির বলে জানা গেছে।

তালিকায় ৪র্থ অবস্থানে যুক্তরাজ্যের নাম। দেশটি ইসরায়েলকে যেসব সামরিক সরঞ্জামের জোগান দিচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে সামরিক বিমান, সামরিক যান ও যুদ্ধ নৌযানের উপাদান। তবে চলতি সেপ্টেম্বরে যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডেভিড ল্যামি গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত হয়—এমন সামগ্রীর জন্য দেওয়া প্রায় ৩০টি রপ্তানি লাইসেন্স অবিলম্বে স্থগিত করার ঘোষণা দেন।

পশ্চিমা দেশগুলোর নিয়মিত অস্ত্রের জোগান ছাড়াও ইসরাইলে অবস্থিত মার্কিন অস্ত্র ভাণ্ডার থেকে অস্ত্র পেয়েছে ইসরায়েল। গাজা যুদ্ধ শুরুর পর একই ভাণ্ডার থেকে ইসরাইলকে অস্ত্র সরবরাহ করা হয় বলে জানা গেছে।

১৯৮৪ সালে ইসরাইলে মার্কিন অস্ত্রের একটি বড় ভাণ্ডার স্থাপন করে যুক্তরাষ্ট্র। আঞ্চলিক সংঘাতের সময় যাতে সংশ্লিষ্ট এলাকায় অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের দ্রুত এখান থেকে অস্ত্র সরবরাহ করা যায়, সে জন্যই ভাণ্ডারটি স্থাপন করা হয়। পাশাপাশি জরুরি পরিস্থিতিতে ইসরাইলকে দ্রুত অস্ত্র দেওয়াটাও এই ভাণ্ডার স্থাপনের একটি উদ্দেশ্য।

অত্যাধুনিক সামরিক বাহিনী গড়ে তুলতে ইসরায়েলকে আগাগোড়াই সাহায্য করে আসছে ওয়াশিংটন। ছবি : সংগৃহীত
অত্যাধুনিক সামরিক বাহিনী গড়ে তুলতে ইসরায়েলকে আগাগোড়াই সাহায্য করে আসছে ওয়াশিংটন। ছবি : সংগৃহীত



বৈষম্যের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিলেন নতুন পররাষ্ট্র সচিব by মিজানুর রহমান

দায়িত্ব নিয়েই মন্ত্রণালয় ও বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনসমূহে বিদ্যমান বৈষম্য নিরসনের স্পষ্ট বার্তা দিলেন নবনিযুক্ত পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিন। অধস্তনদের খোলাসা করে বললেন, আমি আমার অবস্থান থেকে দীর্ঘ দিনের পুঞ্জীভূত ওই সমস্যার সমাধানে কাজ করতে চাই। আমাদের পটেনশিয়াল আছে। আমরা   এটাকে কাজে লাগাবো। আমি পররাষ্ট্র সচিবের পদ আঁকড়ে ধরে রাখবো না। আমি এটা বলতে পারি-  চাকরির পূর্ব নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যেই আমি আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাসম্ভব সম্পন্ন করে সম্মানের সঙ্গে বিদায় নেয়ার চেষ্টা করবো। উত্তরসূরির হাতে নিজেই দায়িত্ব হস্তান্তর করতে চান জানিয়ে মিস্টার উদ্দীন বলেন, আমি বিশ্বাস করি এমন হট সিটে দীর্ঘদিন থাকলে কর্মক্ষমতা হ্রাস পায়। স্মরণ করা যায়, ২০২৬ সালের ১২ই ডিসেম্বর দেশের ২৭তম পররাষ্ট্র সচিব মো. জসীম উদ্দিনের অবসর উত্তর ছুটি শুরুর কথা। বিসিএস ১৩তম ব্যাচের পররাষ্ট্র ক্যাডারের কর্মকর্তা মো. জসীম উদ্দিন ১৯৯৪ সালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগদান করেন। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী ওই কূটনীতিককে পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে সম্প্রতি নিয়োগ দেয় সরকার।

রোববার দিনের শুরুতে তিনি তার দায়িত্ব বুঝে নেন। দুপুর ১২টায় তিনি মন্ত্রণালয়ে সব কর্মকর্তাদের সঙ্গে টাউন হল মিটিং। তারপর ডিজিদের কাছ থেকে উইংওয়ারি ইনপুট নেন রাত ৮টা পর্যন্ত। মধ্যখানে তিনি পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে অত্যাসন্ন জাতিসংঘ অধিবেশন নিয়ে কিছু ইনপুটও দেন। পররাষ্ট্র সচিব হিসেবে নিয়োগের আগে চীনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন জসীম উদ্দিন। সমদূরবর্তী রাষ্ট্রদূত হিসেবে তিনি মঙ্গোলিয়ারও দায়িত্বে ছিলেন। ২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত কাতারে এবং ২০১৫ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত গ্রিসে রাষ্ট্রদূত হিসেবে সফলতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন জসীম উদ্দিন। ২০১২ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনে ডেপুটি হাইকমিশনার ছিলেন তিনি। তার আগে ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ছিলেন ওয়াশিংটন ডিসিতে। বাংলাদেশ দূতাবাসে মিনিস্টার ও ডেপুটি চিফ অব মিশনের দায়িত্ব সামলেছেন। ২০০৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসে কাউন্সেলর হিসেবে এবং ২০০০ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনে প্রথম সচিব ও কাউন্সেলর ছিলেন। এরমধ্যে তিনি দেশেও বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৩ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত হেডকোয়ার্টারে তিনি দক্ষিণ এশিয়া এবং পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অনুবিভাগের প্রধান ছিলেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী রাষ্ট্রদূত মো. জসীম উদ্দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর দুটোই করেছেন। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মডার্ন ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজে এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ঢাকার ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজে বছরব্যাপী কোর্সে অংশ নেন। সদ্যবিদায়ী পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও গত ১লা সেপ্টেম্বর তাকে বিদায় জানানো হয়। জসীম উদ্দিন পররাষ্ট্র সচিবের শূন্য পদেই নিয়োগ পেলেন। স্মরণ করা যায়, ২০১৯ সাল থেকে পররাষ্ট্র  সচিবের চেয়ারে থাকা মাসুদ বিন মোমেনের চাকরির মেয়াদ ২০২২ সালের ৫ই ডিসেম্বর শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তাকে আরও ২ বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ প্রদান করে রেখে দেয় শেখ হাসিনা সরকার।

খারাপ পোস্টিং বা ভালো পোস্টিং বলে কোনোকিছু রাখতে চাই না: যোগদানের প্রথম দিনেই পররাষ্ট্র সচিব জসীম উদ্দীন নিয়োগ ও পদায়ন নিয়ে সেগুনবাগিচায় চলমান অন্যরকম অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে নিজের পরিকল্পনার কথা জানান। সহকারী সচিব থেকে ঊর্ধ্বতন সব কর্মকর্তার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিনি বলেন, খারাপ পোস্টিং বা ভালো পোস্টিং বলে যে কথাটি চালু হয়েছে এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক। আমরা এটা রাখবো না। এখানে যোগ্যতা এবং কর্ম বিবেচনায় সব কিছু হবে। যথা সম্ভব ন্যয্য আচরণের চেষ্টা করবো আমি। গত ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত বিপ্লবের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পলায়নের পর থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বঞ্চিত কর্মকর্তারা ঘুরে দাঁড়ান। তারা নানাভাবে তাদের বঞ্চনা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ফরেন সার্ভিস এসোসিয়েশনের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে এ নিয়ে রীতিমতো ঝড় ওঠে। দাবি উঠে ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের সুবিধাভোগীদের কবল থেকে ফরেন সার্ভিসকে মুক্ত করার। বিশেষত ছাত্র-জনতার সর্বাত্মক আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে ‘জামায়াত-বিএনপির যড়যন্ত্র’ বলে ট্যাগ দেয়া, গণহত্যার পক্ষে সাফাই এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলির বিষয়টি অস্বীকার করে যারা মানবতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নগ্নভাবে বিদায়ী সরকারকে রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন সেইসব অতি উৎসাহীদের এখনই বিদায় এবং আইনের আওতায় আনার দাবিতে সোচ্চার হন পেশাদাররা। তারা ট্রান্সফার-পোস্টিং নিয়েও কথা বলেন। পেশাদারিত্বের বদলে চাটুকারিতা, পদস্থ ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের পদলেহন, প্রভাবশালী দুষ্টুচক্রের অন্যায়-অনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক আনুগত্য বিবেচনায় যেসব পোস্টিং হয়েছে তা বাতিলের দাবি জানান। তাদের দাবির প্রেক্ষিতেই আগের পররাষ্ট্র সচিবের বিদায় এবং নতুন পররাষ্ট্র  সচিবের নিয়োগ হয়।

রনি বলছিলেন আমি কী আর বাঁচবো? by ফাহিমা আক্তার সুমি

ভাই আমার কী কিছু হবে? আমি কী আর বাঁচবো? চোখে সব অন্ধকার দেখতে পাচ্ছি। এভাবে আধো আধো বুলিতে কথাগুলো বলেছিলেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ শিক্ষার্থী সাব্বির হোসেন রনি। পাশে থাকা বন্ধুদের কাছে জানিয়েছিলেন বাঁচার আকুতি। বন্ধুর অবস্থা গুরুতর বুঝে রনির কানের কাছে গিয়ে কলেমা পড়েন। গত ৫ই আগস্ট বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে মিরপুর-২ নম্বর শপিং সেন্টারের সামনে গুলিবিদ্ধ হন রনি। তাকে উদ্ধার করে পাশের কয়েকটি হাসপাতালে নেয়া হলেও চিকিৎসা পাননি। পরে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিলে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণা করেন। রনি ২০২৩ সালে হারুন মোল্লা ডিগ্রি কলেজ থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। বিদেশে পড়াশোনার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না তার পরিবারের।

রনির বাবা মো. মহিউদ্দিন মানবজমিনকে বলেন, আমার সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পথে তার বন্ধুদের কাছে বাঁচার আকুতি জানিয়েছিল।

তার বন্ধুরা কয়েকটি হাসপাতালে নিয়ে গেলে সেখান থেকে তাকে চিকিৎসা দেয়া হয়নি। গত ৫ই আগস্ট বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে রনির শরীরে গুলি লাগে। তার ঠিক পনেরো মিনিট আগে ভিডিও কলে কথা হয় ওর বোনের সঙ্গে। বোনকে বিজয় মিছিল দেখায়। মিরপুর-২ নম্বর শপিং সেন্টারের সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে রাস্তায় পড়ে যায়। একটা গুলি গলায় আর দুইটা বুকে লেগেছিল। শরীরের অন্যান্য স্থানেও ছররা গুলিতে ঝাঁঝরা ছিল। একটা বন্ধুক থেকে ৩টা গুলি কি একসঙ্গে বের হয়? একটা মানুষকে মারার জন্য ৩টা গুলি কি প্রয়োজন আছে? আমার সন্তানের শরীর দেখে মনে হয়েছে তারা কতোটা বর্বর ছিল। দুই সন্তানের জন্মই ঢাকাতে। আমাদের গ্রামের বাড়ি ভোলায়। বর্তমানে ঢাকার মিরপুর-১২তে থাকি।

তিনি বলেন, প্রথমে শিয়ালবাড়ির ইবনে সিনা হাসপাতালে নিয়ে যায় রনিকে। সেখানে কোনো ডাক্তার পাইনি চিকিৎসাও হয়নি তার। পরে মিরপুরে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নেয়া হয়, সেখানেও কোনো চিকিৎসা পায়নি। এরপর নিয়ে যায় কুর্মিটোলা হাসপাতালে সেখানে নেয়ার পরে আর প্রাণ ছিল না রনির। এভাবে একঘণ্টার বেশি কয়েকটি হাসপাতালে ছুটতে থাকে তারা। হাসপাতালে নেয়ার পথে গাড়ির মধ্যেও কথা বলেছিল রনি। আমার সন্তানের অবস্থা খারাপ দেখে সঙ্গে থাকা ওই শিক্ষার্থীরা কানে কানে কলেমা পড়ায়। তারা বুঝেছিল রনি বেঁচে থাকলে তো আল্লাহর কাছে আর কিছু চাওয়ার নেই, আর মারা গেলেও যেন একজন মুসলিম হিসেবে কলেমা পড়া শুনে যেতে পারে। আমাদের না বলে আন্দোলনে চলে যেতো। আন্দোলনে গিয়ে চার তারিখেও বোনের মোবাইলে ভিডিও করে পাঠায়। অনার্সে ভর্তির জন্য কাগজপত্র রেডি করছিল। পরিবারকে সাপোর্ট দেয়ার জন্য গুলশানে একটি শপিংমলে চাকরি করতো। আমি এক সময় অ্যাকশন এইডে চাকরি করতাম। এরপর সেটি ছেড়ে একটি বেকারিতে কাজ নেই। রনির মা অসুস্থ। মাসে দশ-পনেরো হাজার টাকার মতো ওষুধ লাগে।

ঘরে থাকা রনির ব্যবহার করা জিনিসপত্র দেখিয়ে স্মৃতিচারণ করছিলেন তার বাবা। এ সময় তিনি বলেন, ওইদিন সকাল সাড়ে দশটার দিকে ঘুম থেকে ওঠে রনি। তখন আমি চুলার কাছে রুটি গরম করতে যাই। এ সময় ও দেখে বলে বাবা আমিও নাস্তা খাবো। আমি ৭ পিস রুটি গরম করি, রনির আম্মু ওর জন্য একটা ডিম ভাজে। বাসায় এই খাওয়াই ওর শেষ, আমাদের দুইজনের হাতের খাবার একসঙ্গেই খেয়েছে।

তিনি বলেন, আমার একমাত্র ছেলে সন্তান ছিল রনি। মেয়েটা সে তার শ্বশুরবাড়ি থাকে। আামি মারা গেলে আমার সন্তান মাটি দিতো। আমার বাবারে অনেক কষ্ট দিয়ে মারছে। মৃত্যুর সময় আমার সন্তানের কোনো কথা শুনতে পারিনি। ওর আম্মু সারাদিন কান্নাকাটি করে। না খেয়ে থাকলেও আমার সন্তান সব সময় চোখের সামনে ঘুরতো। আমার ছেলে শহীদ হয়েছে সে যেন শহীদি মর্যাদাটা পায়। যারা এমন বর্বরতা করেছে তারাও তো মানুষ, তাদের ঘরেও তো সন্তান রয়েছে। আমার এই শূন্যতা কখনো যাবে না। আমি ঘরে হাঁটলে, বসলে সব সময় দেখি আমার রনি চারিদিকে ঘুরছে। মনে হচ্ছে ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে খাচ্ছে। ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মোবাইল দেখছে। আমি কীভাবে শান্ত্বনা নিয়ে থাকবো আমার বাবাকে হারিয়ে। সবাই একদিন ভুলে যাবে কিন্তু আমরা বাবা-মা কী নিয়ে থাকবো। যারা এভাবে খুন করেছে তাদের যেন জাতিসংঘের মাধ্যমে বিচারের আওতায় আনা হয়। এতটুকু দেখে যেন আমরা শান্তি পাই।

রনির বোন তাহমিনা আক্তার বলেন, ওর স্বপ্ন ছিল বিদেশ গিয়ে পড়াশোনা করবে, চাকরি করবে। অনেক টাকা আয় করে বাবা-মায়ের অভাব পূরণ করবে, গাড়ি করবে, বাড়ি করবে কিন্তু সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল। আমরাও রনির খুশিতে খুশি ছিলাম। গত ৫ই আগস্ট আমাকে ভিডিও কল দেয় সেনাপ্রধানের ভাষণের আগে যখন নেট ছেড়ে দেয়। ৪টার পরে ভিডিও কলে রনি আমাকে বলে, এই দেখো বিজয় মিছিলে এসেছি। তখন তাকে আমার স্বামী বলে দ্রুত বাসায় চলে যেও। আমি তখন গণভবনের দিকে যেতে নিষেধ করেছি। তখন ও বলে যাবো না ওদিকে অনেক ভিড়। তখন এক-দুই মিনিটের মতো কথা হয়। এরপর আর রনির সঙ্গে কথা হয়নি। তিনি বলেন, যখন প্রথমে হাসপাতালে নেয়া হয় তখনো আমার ভাইয়ের প্রাণ ছিল। ঠিকমতো চিকিৎসা পেলে আমার ভাইকে বাঁচানো যেতো।

mzamin

‘আগে আওয়ামী লীগ খেয়েছে, এখন আমরা খাবো’ by প্রতীক ওমর

সাফ কথা। দীর্ঘদিন না খেয়ে ছিলাম। আওয়ামী লীগ সবকিছু লুটেপুটে খেয়েছে। এখন আমাদের সময় এসেছে খাওয়ার। এখন থেকে যেসব টেন্ডার হবে সব বিএনপি’র লোকজন নেবে। ৫ টাকার জিনিস ১ টাকায় নেবে। আমাদের দিকে নজর দিলে পরিণাম ভয়াবহ হবে। এভাবেই এই প্রতিবেদককে জানান গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব শহিদুল ইসলাম বাদল।

ঘটনার সূত্রপাত অন্যখানে। সাঘাটার ঘড়িদহ ইউনিয়নের বটতলা বাজারে অবস্থিত কমলপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চারটি গাছের টেন্ডার নিয়ে। ২ লাখ টাকার গাছ মাত্র ২৮ হাজার ১০০ টাকায় কায়দা করে কিনেছেন স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা শহিদুল ইসলাম বাদল।

বিষয়টি নিয়ে খোঁজ করতে প্রথমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইসাহাক আলীর সঙ্গে কথা হয়, তিনি টেন্ডার কমিটির সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও সাফ জানিয়ে দিলেন এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। সব বন বিভাগ জানে। পরে বন বিভাগের কর্মকর্তা আব্দুল মান্নান বলেন, আমি শুধু দাম নির্ধারণ করেছি। অন্য কিছু জানি না। ধারাবাহিক খোঁজ নেয়ার জন্য সর্বোচ্চ দরপত্রদাতা হিসেবে বাদলের কাছে টেন্ডার প্রক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওপেন টেন্ডারে ২৮ হাজার ১০০ টাকায় আমি গাছগুলো পেয়েছি। এরপর কোনো কথা ছাড়াই উত্তেজিত হয়ে তিনি বলেন, রিপন এমপি’র দুর্নীতি নিয়ে তো কোনো দিন কথা বলেননি, আমরা ছোট ছোট জায়গায় সবে মাত্র হাত দিয়েছি সেখানেই আপনাদের চোখ পড়েছে। আওয়ামী লীগ সবকিছু লুটেপুটে খেয়েছে। এখন আমাদের সময় এসেছে খাওয়ার। এখন থেকে যেসব টেন্ডার হবে সব বিএনপি’র লোকজন নেবে। ৫ টাকার জিনিস ১ টাকায় নেবে। আমাদের দিকে নজর দিলে পরিণাম ভয়াবহ হবে। তিনি এ সময় বোনারপাড়ায় গেলে দেখে নেয়ার হুমকিও দেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক বিএনপি এবং অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, বাদল আওয়ামী লীগের পতনের সঙ্গে সঙ্গেই উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়ে। সবকিছু নিয়ন্ত্রণের জন্য সে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে সাঘাটা উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক সেলিম আহম্মেদ তুলিপ মানবজমিনকে বলেন, উচ্ছৃঙ্খলা এড়াতে আমরা সাংগঠনিকভাবে ওয়ার্ড পর্যায়ে বৈঠক করে কর্মীদের সতর্ক করেছি। তারপরও আমাদের কাছে অনেক অভিযোগ আসছে। স্বেচ্ছাসেবক দলের জেলা কমিটি না থাকায় উপজেলা কমিটির সদস্য সচিব শহিদুল ইসলাম বাদল অনেকটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। সে আমাদের কারও কথা শোনে না। তবে বকে যাওয়া কিছু নেতার কথায় সে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তার ব্যাপারে আমরা ঊর্ধ্বতন নেতাদের সঙ্গে কথা বলে সাংগঠনিকভাবে সিদ্ধান্ত নেবো।

mzamin

গণহত্যার বিচারের ক্ষেত্রে দুই চ্যালেঞ্জ: কাউকে ছাড়ও নয়, কারও প্রতি জুলুম করা হবে না

দুটো বিষয়কে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নবনিযুক্ত চিফ প্রসিকিউটর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী তাজুল ইসলাম। গণহত্যার এভিডেন্স কালেক্ট ও দোষীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা। তিনি বলেন, কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। আবার কারও প্রতি জুলুমও করা হবে না। এটা হবে এমন একটা বিচার যে বিচারের পরে শহীদ পরিবার, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, বাদীপক্ষসহ আসামিপক্ষও মনে করবে তাদের প্রতি ন্যায়বিচার করা হয়েছে। এই অবস্থায় দ্রুত সৎ, দক্ষ ও সাহসী বিচারক নিয়োগ দিয়ে দ্রুত ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে বিচারিক কার্যক্রম শুরুর আহ্বান জানান নতুন এই চিফ প্রসিকিউটর। দুই চ্যালেঞ্জ প্রসঙ্গে তাজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের ৫৬ হাজার বর্গমাইলে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছে। প্রত্যেকটা জায়গায় একটা কমন ইনস্ট্রাকশন ছিল গুলি করে সব মেরে ফেলা। এ অপরাধের যে আলামতগুলো সেগুলো সংগ্রহ করা, কম্পাইল করা এটা একটা চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে আসামিরা এখনো পলাতক, বিশেষ করে প্রধান আসামি দেশত্যাগ করেছেন। অনেকে এখনো দেশত্যাগের চেষ্টায় আছেন। তাদের আইনের আওতায় নিয়ে আসাটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

গণহত্যা চালানোর অভিযোগের প্রধান আসামি সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কীভাবে বিচারের সম্মুখীন করবেন- এমন প্রশ্নে আইনজীবী তাজুল বলেন, আইনগতভাবেই শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করা সম্ভব। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য আইনি প্রক্রিয়া সেটা আমরা শুরু করবো। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের অপরাধী প্রত্যর্পণ চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে ২০১৩ সালে। শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে এ চুক্তিটি হয়েছিল। এই বন্দি বিনিময় চুক্তির মাধ্যমেই তাকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। যেহেতু অধিকাংশ মামলায় তাকে গণহত্যার প্রধান আসামি করা হয়েছে। সুতরাং এ প্রক্রিয়া শুরুর মাধ্যমে তাকে আইনগতভাবে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার চেষ্টা করবো।
গণহত্যার সাক্ষ্য প্রমাণ সংরক্ষণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেই গণহত্যা হয়েছে এর প্রমাণ বিভিন্নভাবে ধ্বংস করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটিকে সংরক্ষণ করে আইনি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে এসে মামলাগুলো প্রমাণের যেই কাজ সেটি এখন আমাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রথম প্রায়োরিটি হচ্ছে, যেহেতু ঘটনাগুলো তাজা, এ মামলায় যারা আসামি হবেন তারা এখনো বাংলাদেশে আছেন। অনেকে দায়িত্বেও আছেন। তারা এ আলামতগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করবেন। তাই আমাদের প্রধান দায়িত্ব এ আলামতগুলো দ্রুত সংরক্ষণ করা, দ্রুততম সময়ের মধ্যে করা। প্রসিকিউশন ও তদন্ত সংস্থার হাতে নিয়ে আসা। যেন এ আলামতগুলো আদালতের সামনে উপস্থাপন করতে পারি। তিনি সব ধরনের আলামত তদন্ত সংস্থা বা প্রসিকিউশনের কাছে পৌঁছানোর জন্য ছাত্র-জনতাসহ ভুক্তভোগীদের প্রতি আহ্বান জানান।
তদন্তকালে আসামিদের গ্রেপ্তার প্রসঙ্গে এই আইনজীবী বলেন, অপরাধগুলোর মাত্রা এতটাই ভয়াবহ যে, তদন্তকালে আসামিদের গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন হবে। নিশ্চয়ই আমরা অপরাধীদের গ্রেপ্তার চাইবো। আমাদের প্রথম চেষ্টা থাকবে যারা সম্ভাব্য অপরাধী তারা যাতে আদালতের জুরিসডিকশনে বাইরে চলে যেতে না পারেন। সেটা ঠেকানোর চেষ্টা থাকবে।
আইন সংশোধনের বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, আমরা মাত্র দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। আমরা সরকারের সঙ্গে বসে এগুলো নিয়ে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিবো। তদন্ত সংস্থায় বেশকিছু সাংবাদিককে গণহত্যার অভিযোগে আসামি করে অভিযোগ করা হয়েছে- এ প্রসঙ্গে তাজুল ইসলাম বলেন, অভিযোগগুলো এখনো আমার কাছে আসেনি। বিষয়গুলো দেখে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গণহত্যার পর যখন একটি স্বৈরশাসকের পতন হয় তখন শহীদ ও নির্যাতিত পরিবার প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠে। আর এই প্রতিশোধ পরায়ণতার আগুন নেভানোর উত্তম পন্থা হচ্ছে একটা ন্যায়বিচার প্রদান করা। যারাই অন্যায় করেছে তাদের যদি বিচারের আওতায় এনে ন্যায়বিচার প্রদান করা যায়, তাদের যদি সাজা দেয়া হয় তখন তারা প্রতিশোধ পরায়ণতার পথ থেকে ফিরে আসবে। আর যারা ঠাণ্ডা মাথায় আমাদের সন্তানদের খুন করেছে দ্রুততম সময়ে তাদের বিচার করা আমাদের প্রায়োরিটি ওয়ার্ক।  
এদিকে, গতকাল দুপুরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিয়োগ পাওয়া চিফ প্রসিকিউটর এডভোকেট তাজুল ইসলামসহ চার প্রসিকিউটর যোগদান করেন। এরা হলেন- প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম, গাজী মোনাওয়ার হুসাইন তামিম, বি এম সুলতান মাহমুদ ও আবদুল্লাহ আল নোমান।
সূত্র জানায়, গত ৫ই জুলাই থেকে ৫ই আগস্ট পর্যন্ত কোটা সংস্কার ও সরকার পতনের আন্দোলনে সারা দেশে গণহত্যা চালানোর অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত ১৩টি অভিযোগ কমপ্লেইন রেজিস্ট্রিভুক্ত করেছে তদন্ত সংস্থা। অভিযোগগুলোর নথি-দালিলিক পর্যালোচনার কাজ চলছে বলে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন সংস্থার উপ-পরিচালক মো. আতাউর রহমান।

আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনে বাবুলের লুটপাট by জাবেদ রহিম বিজন

নিলামের দরপত্রে অংশগ্রহণ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হলে শতকোটি টাকা পেতো সরকার। কিন্তু আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেডের পুরোনো দুই ইউনিটের নিলাম কব্জা করা হয় নামমাত্র ৩৭ কোটি টাকায়। নিলাম ডাকের হোতারা সরকার পরিবর্তনের পর আত্মগোপনে। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী ছফিউল্লাহ মিয়াকে সামনে রেখে ইউনিট দুটির নিলাম হাতিয়ে নেয়ার ছক করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য মো. বাবুল আহমেদ। আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রভাবশালী এবং মুরুব্বি বয়সী হওয়ায় তার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস পেতো না কেউ। সে কারণে বাবুল বিদ্যুৎ স্টেশনের সব কাজেই তাকে সামনে রেখেছেন। নিলামে কয়েকজনের সিন্ডিকেটের সঙ্গে যোগসাজশ ছিল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের। পুরোনো ওই দুই ইউনিটের মূল্যমান সাড়ে ১৭ কোটি টাকা সাব্যস্ত করেছিলেন কোম্পানি কর্তৃপক্ষ। ৬১ কোটি টাকায় ইউনিট দুটি কিনে নেয়ার জন্যে দরপত্র জমা হলেও তা কৌশলে বাদ দেয়া হয়। এ ঘটনায় জড়িত কর্মকর্তারা আছেন বহাল তবিয়তে।

নিলামে অংশ নিতে শতাধিক ঠিকাদার দরপত্র ক্রয় করলেও তাদের কেউ দরপত্র জমা দিতে পারেননি। দরপত্র পাওয়ার পর পুঁজিদাতারা লাভের ৪০ ভাগ নেবেন আর বাকি ৬০ ভাগ সব ঠিকাদারদের মধ্যে ভাগ করে  দেয়া হবে বলে তাদের ম্যানেজ করা হয়। কিন্তু নিলাম পাওয়ার পর ওইসব ঠিকাদারদের কাছে ঘেঁষতে দেয়া হয়নি। নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়। ২৫ হাজার টাকা করে দিয়ে বিদায় করা হয় তাদের। দরপত্র ক্রয়কারী ঠিকাদাররা জানান, ৩৭ কোটি টাকায় নিলাম পেয়ে একশ’ কোটি টাকার বেশিতে পুরোনো ইউনিট দুটি বিক্রি করেছেন। নিলামের দরপত্র ক্রেতাদের একজন নূরুল ইসলাম বলেন, তার শিডিউল ছিল। কিন্তু  নেগোসিয়েশনের নামে তা জমা করতে দেয়নি। পরে টাকাও দেয়নি। সে সময় এনিয়ে কথা বলার সাহস ছিল না কারও। পরিবেশও ছিল না। দরপত্রের আরেক ক্রেতা তাইফুর রহমান বলেন, আমরা যারা শিডিউল কিনেছিলাম তাদের প্রত্যেককে ৪ লাখ টাকা করে দেয়ার কথা ছিল। সেই টাকা মেরে দিয়েছে। জুয়েল সিকদার জানান, ওরা ১০/১৫ কোটি টাকা করে ভাগ করে নিয়েছে। আমাদের ২৫ হাজার টাকা দিয়েছে। এদিকে এই নিলাম ডাকে ছফিউল্লাহ মিয়ার এক গুপ্ত পার্টনার তার পাওনা ৫ কোটি টাকার জন্যে আদালতে মামলা করেছেন।

নিলামের নামে লুটের আয়োজন: আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড (এপিএসসিএল)’র ৬৪ মেগাওয়াটের পুরাতন দুটি ইউনিট ১ ও ২ এর পরিত্যক্ত ও আনুষঙ্গিক স্ক্র্যাপ বিক্রয়ে ২০২২ সালের ১লা ডিসেম্বর নিলাম দরপত্র বিজ্ঞপ্তি দেয়া হয়। যাতে ২০২৩ সালের ৮ই জানুয়ারি দরপত্র দলিল বিক্রয়ের সর্বশেষ তারিখ এবং ৯ই জানুয়ারি দরপত্র দাখিলের সর্বশেষ তারিখ উল্লেখ করা হয় এবং দরপত্র দাখিলের স্থান হিসেবে আশুগঞ্জে কোম্পানির ব্যবস্থাপকের (প্রকিউরমেন্ট) কার্যালয় এবং ঢাকার কাকরাইলে কোম্পানির কর্পোরেট অফিসে কোম্পানি সচিবের দপ্তরের কথা বলা হয়। কিন্তু আশুগঞ্জে কাউকে নিলাম দরপত্র দাখিল করতে দেয়া হয়নি। মোট ৬টি দরপত্র জমা হলেও আশুগঞ্জে একমাত্র উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হাজী মো. ছফিউল্লাহ’র মালিকানাধীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সফিউল্লাহ’র দরপত্র দাখিল হয়। জমা হওয়া ৬টি দরপত্রের মধ্যে আশুগঞ্জের মেসার্স ছফিউল্লাহ ট্রেডার্স ৩৭ কোটি ৪০ লাখ টাকা, ঢাকার মীরা স্টিল করপোরেশন ৩৮ কোটি ২৪ লাখ ৬২ হাজার ৫’শ টাকা, ভৈরবের মেসার্স নাবিল এন্টারপ্রাইজ ৬১ কোটি  ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা, ঢাকার চন্দ্রপুরী এন্টারপ্রাইজ ৩২ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ত্রিরত্ন  ট্রেডিং এন্টারপ্রাইজ ৩৬ কোটি ২৭ লাখ টাকা দর দেয়। মেসার্স মায়াবি ইন্টারন্যাশনাল নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠান অংশ নিলেও তারা কোনো মূল্য উল্লেখ করেনি এবং পে-অর্ডার দেয়নি। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে দরপত্রের উদ্ধৃত দরের সঙ্গে শর্তানুযায়ী জামানতের টাকা দিতে না পারায় আনফিট ঘোষণা করা হয়। এ নিয়ে ভৈরবের মেসার্স নাবিল এন্টারপ্রাইজ আদালতে একটি মামলাও করেছিলেন। ২০২৩ সালের ৯ই জানুয়ারি দরপত্র উন্মুক্ত করার প্রায় ৬ মাস পর ২২শে জুন ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেয়া হয়। এই সময়ে নিলাম নিয়ে নানা রকম খেলা চলে। পুনরায় নিলাম দরপত্র আহ্বান করা হবে, নাকি মনোনীত ঠিকাদারকে কার্যাদেশ দেয়া হবে, সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সময় ক্ষেপণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত কোম্পানির ব্যবস্থাপক (প্রকিউরমেন্ট) মো. রফিকুদ্দৌলার স্বাক্ষরে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সফিউল্লাহর অনুকূলেই লেটার অব ইনটেন্ট জারি করা হয়। এরপরই ওই বছরের ২৩শে জুলাই যশোরের নওয়াপাড়ার জাফরপুরের মো. নাজিম উদ্দিন রাজার সঙ্গে মেসার্স ছফিউল্লাহর নিলামে প্রাপ্ত পুরাতন ইউনিট দুটির মালামাল ৬৫ কোটি টাকায় বিক্রির চুক্তি হয়। তবে আলোচনা ছড়িয়েছে মোট ১২৫ কোটি টাকায় পুরাতন ইউনিট দুটির মালামাল বিক্রি হয়েছে। আশুগঞ্জ আওয়ামী লীগ সভাপতি হাজী মো. ছফিউল্লাহর নামীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে যৌথভাবে এই নিলাম দরপত্র কব্জা করেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সদস্য বাবুল আহমেদ, মনির সিকদার ও সদর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সালাউদ্দিন। তাদের মধ্যে বাবুল আহমেদ আশুগঞ্জে সবকিছু সমন্বয় করেন। আর ঢাকার বাধাবিঘ্ন দূর করে নিলামটি পেতে কেন্দ্রীয় যুবলীগের প্রভাবশালী এক নেতাকে পার্টনার করা হয়। এই ৫ জনের মধ্যে সিক্সটি-ফোরটি ভাগাভাগি হয়। এরমধ্যে সিক্সটি পার্সেন্টের ভাগিদার ৪ জনের অংশের মালামাল ৬৫ কোটি টাকাতে বিক্রি করা হয়। গত বছরের ১৩ই সেপ্টেম্বর দৈনিক মানবজমিনে ‘বিদ্যুৎকেন্দ্রের পুরোনো ইউনিট নিলামে, শতকোটি টাকার বাণিজ্য আওয়ামী লীগ নেতাদের’ শিরোনামে একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়। আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি লিমিটেড (এপিএসসিএল)’র ৬৪ মেগাওয়াটের পুরাতন দুটি ইউনিট ১ ও ২ এর আয়ুষ্কাল ২০০৫ সালে শেষ হয়। ফলে ২০১৪ সনে ইউনিট-১ এবং ২০১৮ ইউনিট-২ অবসরে যায়। দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা পূরণে ইউনিট দুটির স্থলে নতুন অধিক ক্ষমতাসম্পন্ন ইউনিট স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। সে অনুসারে ইউনিট দুটি নিলামে বিক্রয় ও অপসারণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এরপরই অ্যাসেট ভ্যালু নির্ধারণে কনসালটেন্ট ফার্ম নিয়োগ করা হয়। মেসার্স খান ওয়াহাব শফিক রহমান অ্যান্ড কোম্পানি (চার্টাড অ্যাকাউন্ট) নামীয় একটি প্রতিষ্ঠান এই সম্পত্তির মূল্য ১৭ কোটি ৫০ লাখ ৪৪ হাজার ৪৬৬ টাকা মূল্যায়ন করে।

আগের রিপোর্টে মানবজমিনের কাছে দেয়া বক্তব্যে বাবুল আহমেদ ১০৫ কোটি টাকায় মালামাল বিক্রির বিষয়টি মিথ্যা দাবি করেন। মালের পরিমাণ ১ হাজার টন বলে জানান। ৮১ পার্সেন্ট ঊর্ধ্বমূল্যে নিলাম নেয়ার কথা জানিয়ে আরও বলেন- ৬১ কোটি টাকা দর যে দিয়েছে সে প্রোপার কোনো কিছুই  দেয়নি। ছফিউল্লাহর নামে আমরা নিয়েছি ঐক্যবদ্ধ থাকার জন্যে। ঢাকায় ড্রপ না করলে আমরা ২২ কোটি টাকায় নিতে পারতাম। উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি হাজী ছফিউল্লাহ মিয়া তার প্রভাবে কোনো অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেন। বলেন সবকিছু নিয়মের মধ্যেই হয়েছে।  কোম্পানির  ব্যবস্থাপক (প্রকিউরমেন্ট) মো. রফিকুদ্দৌলা এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। কোম্পানির তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এএমএম সাজ্জাদুর রহমানের বক্তব্য ছিল, ‘৫টা পার্টি নিলামে অংশ নিয়েছে, এটা অনেক। প্রশ্ন উঠতে পারে বলে আমরা ঢাকাতেও দরপত্র জমা নিয়েছি। স্বচ্ছভাবেই সবকিছু হয়েছে। আমরা যে ভ্যালুয়েশন করেছি এর চেয়ে বেশি করা সম্ভব না। আপনি পিডিবিতে খবর নেন। একই জিনিস আরও কম টাকায় হয়েছে। আমরা অ্যাকাউন্টিব্যালির সঙ্গেই করেছি।’