Friday, February 18, 2022

দুর্বিনীত কথাসাহিত্যিক ভি এস নাইপল by আন্দালিব রাশদী

৮৬তম জন্মদিনের এক সপ্তাহ আগে প্রয়াত হলেন ইংরেজি ভাষার সবচেয়ে দাপুটে লেখক, নোবেল বিজয়ী ভি এস নাইপল

স্বদেশবিদ্বেষী, পরদেশবিদ্বেষী, নারীবিদ্বেষী, স্ত্রীবিদ্বেষী (অন্তত স্ত্রী প্যাট্রিসিয়ার মৃত্যু তাঁর নির্মমতার প্রমাণ দেয়), কালো মানুষবিদ্বেষী, সাদা মানুষবিদ্বেষী, নিজ আমলের এবং আগের আমলের লেখকবিদ্বেষী, ইসলামবিদ্বেষী, খ্রিষ্টানবিদ্বেষী, হিন্দুবিদ্বেষী, এমন কোনো অঙ্গন নেই, যেখানে নাইপলের বিদ্বেষের বাষ্প লাগেনি।

তারপরও তিনি প্রিয় লেখক। নাইপল ঢাকা এসেছিলেন সাহিত্য-উৎসবে, মাতিয়ে গেছেন। তিনি নিজের পরিচিতি-সংকটের কথা বলেছেন : ‘ইংল্যান্ডে আমি ইংরেজ নই, ভারতে ভারতীয় নই।’ তিনি অবিরাম বৈরিতা সৃষ্টি করে গেছেন, বন্ধুকে শত্রুতে পরিণত করেছেন।

আমি মুগ্ধ হয়ে একসময় ভি এস নাইপল পড়েছি। ১৯৭৬-এ আমার অনুবাদে নাইপলের মিগুয়েল স্ট্রিটের একটি অনুচ্ছেদ ‘ম্যানম্যান’ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশে এবং বাংলা ভাষায় সম্ভবত এটিই প্রথম প্রকাশিত নাইপল।

নাইপলের অনেক সমালোচনা করা হলেও প্রয়াত এই লেখককে শ্রদ্ধা জানাতেই এই নিবন্ধ।

ভি এস নাইপল কে?

ভি এস নাইপল কে তা বোঝার জন্য তাঁর নিজের কিছু কথা উদ্ধৃত করছি :

‘আমি সবসময়ই জানতাম আমি কে। কোথা থেকে এসেছি। আমি নিজের জন্য কখনো অন্যের জমির খোঁজ করিনি।’

‘লেখক হতে হলে তোমাকে পৃথিবীর পথে বেরোতে হবে, পৃথিবীতে ঝুঁকি নিতে হবে, পৃথিবীতে নিজেকে ডুবিয়ে রাখতে হবে, পৃথিবীর খোঁজে বেরোতে হবে। বয়স বেড়ে গেলে কাজটা কঠিন হয়ে পড়ে। বয়স্ক মানুষের বেলায় মানুষের দিনগুলো ছোট, তখন বাইরে যাওয়া ও বাইরের পৃথিবীতে নিজেকে ডুবিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।’

‘পৃথিবীর ব্যাপারে বিষাদময় বিষয়টি হচ্ছে এটি শুধু আহাম্মকে পরিপূর্ণ। আর আহাম্মকজন ও সাধারণজনের লাভের জন্য পৃথিবী পরিচালিত হয়ে থাকে।’

পাঠক-পছন্দ লেখক হলেও ঔদ্ধত্য, দুর্বিনীত আচরণ এবং কখনো কখনো একপেশে মন্তব্যের জন্য সমালোচকের অনুগ্রহ তিনি তেমন পাননি। মূলত ফিকশন লেখক হিসেবে আত্মপ্রকাশ। এবং প্রতিষ্ঠিত। বুকার ও নোবেল পুরস্কার লাভ করলেও বেশি আলোচিত হয়েছে তাঁর নন-ফিকশন।

বিভিন্ন রূঢ় মন্তব্যের কারণে বরাবরই আলোচনায় ছিলেন। এমনকি মৃত্যুর পরও লেখা হয়েছে ‘নাইপল কাউকেই ছাড় দেননি – ঔপনিবেশিক শাসককেও না, উপনিবেশে শাসিত প্রজাদেরও না।’

নয়/এগারো-পরবর্তী রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা নোবেল কমিটিকে সম্ভবত খুব স্পর্শ করেনি। নতুবা ফিলিপ হেনশার যা বলেছেন তার মানে, ইসলাম-নিন্দার অ্যামাং দ্য বিলিভার্সের লেখকের ব্যাপারে তাঁদের সতর্ক হওয়ারই কথা ছিল। ২০০১ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী বিদিয়াধর সুরজপ্রসাদ নাইপল ১৭ আগস্ট, ১৯৩২ গ্রামীণ ত্রিনিদাদের চাগুয়ানাস গ্রামে একটি দরিদ্র হিন্দু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা পেরসাদ নাইপল, মা দ্রোয়াপতি; পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান। ১৮৮০-র দশকে তাঁর পিতামহ-পিতামহী ভারত থেকে ত্রিনিদাদের আখক্ষেতের ঠিকা শ্রমিক হিসেবে দেশান্তরি হন; তখন দাসপ্রথা অবলুপ্ত হতে চলেছে; আখচাষের জন্য

সস্তা শ্রমিক আনা সে-সময় অনিবার্য হয়ে পড়েছিল। নাইপলের বাবা পেরসাদ সাংবাদিকতা করতেন, তাঁর খানিকটা সাহিত্যের উচ্চাশাও ছিল। ১৯২৯-এ তিনি ত্রিনিদাদ গার্ডিয়ান পত্রিকায় লেখা প্রকাশ করতে শুরু করেন। তিনি চাগুয়ানাস প্রতিনিধির দায়িত্বও পান। নাইপলের পিতামহ, তাঁর দাবি অনুযায়ী, ব্রাহ্মণ পণ্ডিত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর পরিবারে ধর্মানুরাগ অন্তর্হিত হয়, এমনকি তাঁরা ধীরে ধীরে ভারতীয় ভাষা থেকেও সরে যান। শেষদিকে নাইপলের মায়ের ব্যবহৃত একমাত্র ভারতীয় শব্দ ছিল ‘বেটা’। সবাই স্থানীয় ইংরেজিতে ধাতস্থ হয়ে ওঠেন। নাইপল যখন সাত, পরিবারটি চাগুয়ানাসের গ্রাম ছেড়ে ত্রিনিদাদের রাজধানী পোর্ট অব স্পেনে চলে আসে, নাইপল সেখানকার ব্রিটিশ মডেলে স্থাপিত কুইন্স রয়াল কলেজ থেকে পাশ করেন এবং তিনি ঔপনিবেশিক এই স্বপ্নহীন পরিবেশ থেকে মুক্তির জন্য অস্থির হয়ে ওঠেন এবং সরকারি বৃত্তি নিয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে চলে যান।

১৯৫৫ সালের গ্রীষ্মের এক অপরাহ্ণে নাইপল লিখে ফেললেন ‘বোগার্ট’ – মিগুয়েল স্ট্রিটের প্রথম এপিসোড। সতেরোটি এপিসোডের সমন্বয়ে মিগুয়েল স্ট্রিট। তখনই প্রকাশ করতে সম্মত হলেন না প্রকাশক। তাঁর আশংকা – অপরিচিত ক্যারিবিয়ান লেখকের বই যদি বিক্রি না হয়। প্রকাশক তাঁকে উপন্যাস লিখতে বললেন। ১৯৫৫-র শরতে তিনি লিখলেন দ্য মিস্টিক ম্যাসিওর – এর মানে হতে পারে অতীন্দ্রিয় অঙ্গমর্দনকারী। ৮ ডিসেম্বর, ১৯৫৫ প্রকাশক উপন্যাস প্রকাশের জন্য গ্রহণ করলেন, নাইপল পেলেন একশ পঁচিশ পাউন্ড। নাইপল দশ-এগারো বছর বয়স থেকেই জানতেন তিনি লেখকই হবেন।

তিনি লেখকই হয়েছেন। উপনিবেশ থেকে শাসকের রাজ্যে উঠে এসে দাপটের সঙ্গে রাজত্ব করেছেন, নোবেল প্রাইজ জিতেছেন, নাইটহুড পেয়েছেন; বহু মানুষের অপছন্দের লেখক হওয়ার পরও ঈর্ষণীয় পাঠক-ভাগ্য তাঁর।

কিন্তু তিনি বলেছেন, ‘আমার বই কে পড়বে আর কে পড়বে না এই সমস্যা নিয়ে আমি কখনো ভাবিনি। যদি ভাবতাম তাহলে সম্ভবত  লেখালেখি ছেড়ে দিতাম। আমি ব্যাপারটাকে এভাবে কখনো দেখিনি, আমি সাহিত্যের বিশুদ্ধতায় বিশ্বাস করেছি। আমি বিশ্বাস করেছি কেউ যদি লেখেন এবং তা যদি ভালো লেখা হয় তাহলে তার পাঠক থাকবেই।’

লেখকদের চোখে নাইপল

ভি এস নাইপল কেমন লেখক?

একদা প্রিয় বন্ধু পল থুরো নাইপলের সঙ্গে বন্ধুত্বে চিড় ধরার আগে লিখেছেন : তিনিই সম্ভবত একমাত্র লেখক যার ওপর প্রভাবের কোনো প্রতিধ্বনি নেই।

এ-সম্পর্কে নাইপলের নিজের কথা, ‘আমি একটি ছোট সমাজ থেকে এসেছি; আমি সচেতন ছিলাম যে, আমার ওপর এই পৃথিবীতে কোনো প্রভাব নেই। আমি প্রভাব থেকে দূরে। আর আমার অবস্থান একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সঙ্গে, আমি সেখান থেকে সরে যাই, হয়ে যাই বিদেশি, লেখক হয়ে যাই – সরাসরি সম্পর্কিত থাকা থেকে আমি কতটা প্রত্যাহৃত দেখতেই পাচ্ছেন।’

এডওয়ার্ড সায়ীদ নাইপলকে অভিযুক্ত করেছেন কারণ তিনি অযৌক্তিক ব্যাখ্যায় প্রাচ্যের সংস্কৃতিকে আদিম, বর্বর এবং অশিক্ষিত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন; আফ্রিকা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ জেনে আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব করার ভান করেছেন, প্রাচ্যের মূল্যায়ন করেছেন।

এভলিন ওয়াফ একবার বলেছিলেন, ‘নাইপলের গদ্য তাঁর সমকালীন ব্রিটিশদের লজ্জা দেয়।’ এভলিনের মতো কাঠখোট্টা লেখক-সমালোচকের মুখে এটি একটি অসাধারণ প্রশংসা।

ভারতীয় খুশবন্ত সিং লিখেছেন, ‘নাইপল তাঁর অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস গ্রন্থে সুরুজকু-ের মনোহরণ দৃশ্য মাত্র চারটি শব্দে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু ময়লার আস্তরণে ঢাকা শিশুদের নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন। তিনি কাশ্মিরের জাফরান জমিন নিয়ে একই কাজ করেছেন। শরতে প্রস্ফুটিত ফুলের একটু কেবল উল্লেখ করে বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন কাশ্মির-নারীরা কেমন করে তাদের পিরহান উঠিয়ে মলত্যাগ করতে বসে। মনে হয় নাইপল নোংরা-আবর্জনা ঘাঁটাঘাঁটির বাতিকগ্রস্ত।’ নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কবি ডেরেক ওয়ালকট যতটা না ক্রোধে তার চেয়ে বেশি দুঃখে নাইপলের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন।

সালমান রুশদি মনে করেন, সাহিত্য বা রাজনীতি কোনো বিষয়ে তিনি ভি এস নাইপলের সঙ্গে একমত হতে পারেননি।

এদিকে এডওয়ার্ড সায়ীদ যতটা না দুঃখে তার চেয়ে বেশি ক্রোধে তাঁকে নব্য বুদ্ধিবৃত্তিক উপনিবেশবাদ প্রচারের দায়ে অভিযুক্ত করেছেন।

ডেরেক ওয়ালকট বলেছেন, ‘নাইপল নিগ্রোদের পছন্দ করেন না।’ এই রেশ ধরে এডওয়ার্ড সায়ীদ নাইপলের উৎস ও

পিতৃপুরুষের সীমাবদ্ধতার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। গাঙ্গেয় উপত্যকা থেকে শ্রমিক হিসেবেই নব্য দাস্যবৃত্তিতে সেখানকার অনেকেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নাটাল থেকে ফিজি, কেনিয়া, গায়ানা, মালয় এবং ত্রিনিদাদে চলে এসেছে। ত্রিনিদাদে ভারতীয় এবং আফ্রিকানদের মধ্যে সার্বক্ষণিক দ্বন্দ্ব ও ঘৃণা বর্ষণের প্রতিযোগিতা লেগেই ছিল। একপক্ষ গালি দিত ‘নিগার’ অন্যপক্ষ বলত ‘কুলি’ – পিতৃপুরুষের এই ঔপনিবেশিক ব্যাধিতে সংক্রমিত হয়েছেন এবং বেড়ে উঠেছেন নাইপল, লেখকজীবনেও তা ছাড়তে পারেননি।

নাইপলের ত্রিনিদাদ

ব্রিটিশরা ওয়েস্ট ইন্ডিজের গায়ানা ও ত্রিনিদাদ দেড়শো বছরের অধিককাল উপনিবেশ হিসেবে শাসন করেছে। বর্ণবাদের বিভিন্ন ধরনের প্রকাশ ঘটেছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে। যারা ‘নন-হোয়াইট’ তারা যে সাদাদের চেয়ে নিম্নমানের তা স্পষ্ট করে তুলতে তারা কোন স্কুলে পড়বে, কোন ধরনের চাকরি পাবে, তাদের ওপর কোন ধরনের শাস্তি বলবৎ হবে ‘হোয়াইট মাস্টারগণ’ তা নির্ধারণ করে দিত। এই দাস্যবৃত্তি তাদের অনুকরণপ্রিয়ও করে তোলে। সাদা প্রভুরা যা করে অপেক্ষাকৃত সচ্ছল, অ-সাদারা স্বজাতির অপেক্ষাকৃত দুর্বলদের ওপর তা-ই প্রয়োগ করতে থাকে। তাদের নির্যাতনের শিকার হয় নারী ও শিশু। শিশুর অপরাধের জন্য শিশুর বাবা-মাও নির্যাতনের শিকার হয়।

অ-সাদাদের দুটি ভাগ : ইন্ডিয়ান এবং আফ্রিকান। ইন্ডিয়ান পরিবারগুলো দেশ ছেড়ে ব্রিটিশ গায়ানা ও ত্রিনিদাদে আসার সময় তাদের প্রথা, সংস্কার, সংস্কৃতি ও ধর্মাচার সঙ্গে নিয়ে আসে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার প্রাধান্য পরম্পরাও অটুট রাখে। এখানে সবাই আসে কৃষিশ্রমিক হিসেবে আখক্ষেতের মজুর হয়ে। এরকম একটি পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষিত উত্তরসূরি আর্নল্ড গিরিধারী ভিএস নাইপলের হাতে চিত্রিত মূলোৎপাটিত ভারতীয় ত্রিনিদাদবাসীর জীবনাচরণের একটি বর্ণনা দেন : ‘শুক্রবার সন্ধ্যায় মজুরি পাওয়ার পর শ্রমিকদের কেউ কেউ নিকটস্থ শুঁড়িখানা ‘রামশপে’ গিয়ে অত্যধিক পান করে চুর হয়ে কাটিয়ে দেয় সপ্তাহান্ত। কঠোর পরিশ্রমের কামাই এভাবেই ফতুর করে দেয়। স্বামীরা স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের গালাগাল দেয়। আশ মিটিয়ে পেটায়। জিন্দেগির এই ফাঁদে পড়ে এভাবেই জীবন কাটিয়ে দেয়। গায়ানা ও ত্রিনিদাদের বিনোদন বাজারে ঢোকে ব্রিটেন ও আমেরিকার সিনেমা। চল্লিশ ও পঞ্চাশের  দশকের সিনেমার পুরুষ আধিপত্য শ্রমজীবী এই মানুষগুলোকেও প্রভাবিত করে। প্রায় একই ধারার ভারতীয় সিনেমাও মুক্তি পায় এখানকার সিনেমা হলে। নিজের পিতৃপুরুষের সংস্কৃতি থেকে ভিন্ন বাস্তবতাবর্জিত এক সাংস্কৃতিক রুচি তাদের গড়ে উঠতে থাকে।’

ত্রিনিদাদের ভারতীয় সমাজের ফাঁপা অবয়বটি নাইপলকে সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট ও বিচলিত করে।

ত্রিনিদাদ, নিজের মাতৃভূমি সম্পর্কে বলেছেন : ‘আনইম্পর্ট্যান্ট, আনক্রিয়েটিভ, সিনিক্যাল, এ ডট অন দ্য ম্যাপ।’ দেশবাসী সম্পর্কে আপত্তিকর ভাষায় বলেছেন : ‘একটি বানরও দেখতে পাইনি যে আমার বই পড়ে। কেবল শারীরিক যে জীবন সেই জীবনই তারা যাপন করে; আমার কাছে তা ঘৃণ্যজীবন। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসব শিক্ষার্থী বর্বরদের সম্পর্কে পড়াশোনা করছে ত্রিনিদাদের লোক তাদের জন্য কৌতূহলের বিষয় হতে পারে।’

রিচার্ড সুডান লিখছেন : ‘ক্যারিবিয়ান দ্বীপ ত্রিনিদাদে জন্ম বিশিষ্ট ব্যক্তির ঘাটতি নেই – বিশিষ্ট চিন্তাবিদ এবং প্রথম প্রধানমন্ত্রী এরিক উইলিয়ামস, সমাজতাত্ত্বিক সিএলআর জেমস, পৌরাণিক খ্যাতির ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব অলিম্পিক স্বর্ণপদক বিজয়ী হ্যাজলি ক্রফোর্ড, ক্রিকেটার ব্রায়ান লারা, স্প্রিন্টার অটো বোলডোন। এখানকার বিচিত্র সাংস্কৃতিক অবয়ব উঠে এসেছে ঔপনিবেশিক অতীত থেকে, সেখানকার অধিকাংশ মানুষ ইন্ডিয়ান ও আফ্রিকান বংশোদ্ভূত। সবচেয়ে বড় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত ত্রিনিদাদের সন্তান নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী লেখক ভি এস নাইপল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর শ্রেষ্ঠ ব্রিটিশ লেখকদের অন্যতম প্রধান তিনি। ১৯৮৯ সালে তিনি নাইটহুড লাভ করেন, ২০০১ সালে নোবেল পুরস্কার। ত্রিনিদাদে বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে উঠে এসেছে তাঁর উপন্যাস। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে তাঁর আধিপত্য, পড়তে বাধ্য করা গদ্য ও বিবরণের জোর সাফাই গেয়েছেন শ্বেতত্বক ইংলিশ লেখকরাই – কিন্তু তাঁর গদ্যের গভীরে অন্ধকার গুপ্তস্রোতে লুকিয়ে আছে বর্ণবাদ – তাঁর নিজের দেশের জনগণের বিরুদ্ধে এবং তা খোলামেলাভাবেই।’

নাইপল যেভাবে বর্ণনা করেছেন বাস্তবের ত্রিনিদাদ তার চেয়ে বেশ খানিকটা ভিন্ন, তাঁর বিবরণীর চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ। নাইপল যেসব মানুষের স্থবিরতা নিয়ে ঠাট্টা করেছেন তারাই পুরনো রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা ভেঙে পিপলস ন্যাশনাল মুভমেন্টকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে পাশ্চাত্যের গণতান্ত্রিক মডেলে ভোট দিয়ে পিপলস পার্টিসিপেশনকে জয়ী করেছেন এবং দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী কমলা পেরসাদ বিশ্বেশ্বরকে ক্ষমতায় বসিয়েছেন। নাইপলের কথা সত্য হলে এত বড় পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হতো না। তারপরও বর্ণবাদী যে-রেশ রয়ে গেছে তা দাসত্বের কাল এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনকালের। হীনমন্যতার বীজ তো জন্মের পরপরই ড্রাম পিটিয়ে শিশুর কানে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় – নাইপলের উপন্যাস মিগুয়েল স্ট্রিট এবং অ্যা হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস এ কাজটি করেছে। নাইপল উপনিবেশবাদী সংস্কৃতি নিয়ে জীবনযাপনের তিক্ত চিত্র তুলে ধরেছেন, উপনিবেশ স্থাপনকারীদের সম্মান নাইটহুড সানন্দে গ্রহণ করেছেন। নব্য উপনিবেশবাদের পক্ষেই প্রকারান্তরে লিখে গেছেন।

রিচার্ড সুডান মনে করেন, ‘ব্রিটিশ উপনিবেশবাদী শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার যে উৎসব, যে কার্নিভাল ভিএস নাইপল উদযাপনকারী ত্রিনিদাদবাসীর নাড়ির স্পন্দন বুঝতে পারেননি। তিনি ত্রিনিদাদিয়ান যে-অহংকার তা অনুধাবন করেননি।’

ত্রিনিদাদ সম্পর্কে ভিএস নাইপলের নিজের কী মূল্যায়ন? তিনি লিখেছেন : ‘ত্রিনিদাদকে জটিল মনে হতে পারে। কিন্তু যাঁরা ত্রিনিদাদকে জানেন তাঁরা বেশ ভালোই জানেন এই সরল, ঔপনিবেশিক একটি অসভ্য সমাজ।’

ত্রিনিদাদ নিয়ে তাঁর আরো কথা : ‘আমি এক ক্ষুদ্র জায়গায় বেড়ে উঠি এবং যখন তরুণ তখনই সেই জায়গাটা ছেড়ে যাই এবং বৃহত্তর পৃথিবীতে প্রবেশ করি।’

তিনি আরো লিখেছেন, ‘ত্রিনিদাদে কিছুই তৈরি হয়নি।’ এখানে এটাও বলা আবশ্যক, নাইপলের ইংল্যান্ড স্তুতিও নিষ্কলুষ নয়। তিনি বলেছেন, ‘ইংল্যান্ডের মানুষ নিজেদের আহাম্মক হওয়া নিয়ে বেশ গর্ব করে থাকে।’

নাইপলের ভারত

২০০১ সালে চেলটেনহাম সাহিত্য-উৎসবে তাঁর সূচনা-বক্তব্যে নাইপল বলেন, ‘আমার মতো মানুষ যদি সমাজ নিয়ে লিখে যে-সমাজের কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন নেই, মানুষ ক্ষুব্ধ হয়। তারা যদি বইটা পড়ে – অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা বই পড়ে না – কিন্তু তারা অনুমোদন চায়। … এখন ভারতের উন্নতি হয়েছে, বইগুলো গৃহীত হয়েছে (বইগুলো মানে তিনটি ভারতবিষয়ক বই : অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস, এ ওন্ডেড সিভিলাইজেশন এবং ইন্ডিয়া : এ মিলিয়ন মিউটিনিজ নাউ)।

‘চল্লিশ বছর আগে ভারতের মানুষ ধর্মীয় প্রথাবৃত্তে বন্দি ছিল, অন্যান্য দিকের মধ্যে এদিক দিয়েও আমি ভারতকে সাহায্য করেছি।’

ভারত নিয়ে লেখা অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস-এ তাঁর হতাশা প্রতিফলিত কি না এক কথোপকথনে খুশবন্ত সিং তাঁকে জিজ্ঞেস করলে নাইপল জবাব দেন : ‘এটা হতাশা নয়, আমি আহত হয়েছিলাম। এটা আমার জন্য বড় ধরনের ক্ষত। আপনাকে মনে রাখতে হবে আমরা ত্রিনিদাদের খুব হতাশ একটি সম্প্রদায়। ভারত নিয়ে আমাদের কাছে কোনো গল্প ছিল না। আমরা ধরে নিয়েছিলাম, ত্রিনিদাদে আসার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষরা ভয়ানক কোনো জায়গা ছেড়ে এসেছেন। আমাদের ভারত-ধারণা বড় নির্মম। এদেশটা আসলে কেমন, আমাদের কাছে কখনো বর্ণনা করা হয়নি। কাজেই ভারত কখনো আমাদের কাছে সত্য হয়ে ওঠেনি, আমি যখন প্রথম এখানে আসি ভারত নিয়ে লেখার পূর্ণ প্রস্তুতি আমার ছিল না।’

তিনি মনে করেন, ‘বাবর যে ভারতে বাবরি মসজিদ তৈরি করেছিলেন তা ছিল ঘৃণার ফসল। তিনি মোটেও ভারতপ্রেমিক ছিলেন না। … খ্রিষ্টবাদী ও ইসলামপন্থি উভয়ই পরস্পরের প্রতি অসহিষ্ণু। তাদের ইতিহাস অসহিষ্ণুতার ইতিহাস। অন্ধকার ইতিহাস খ্রিষ্টানদেরও। ‘কালো বুদ্ধিবৃত্তি’ দিয়ে ভারতে নির্মমভাবে খ্রিষ্টধর্মের প্রবেশ ঘটেছে।’

নাইপল আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে ভারতে এলেন। রাজীব গান্ধী তখন প্রধানমন্ত্রী। ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে তিনি জ্যেষ্ঠ কোনো রাজনীতিবিদের সঙ্গে আলাপ করতে চাইলেন। খুশবন্ত সিং মনে করলেন, মন্ত্রিসভার দু-একজন ছাড়া অন্যরা হয়তো নাইপলের নামই শোনেননি। এমন কারোর সঙ্গে সাক্ষাৎ দুপক্ষের জন্য বিব্রতকর হবে। তিনি রামনিবাস মির্ধার সঙ্গে সাক্ষাৎ করালেন। নাইপল বিস্মিত হলেন যে, এই মন্ত্রী তাঁর সব লেখাই পড়েছেন। তিনি প্রশ্ন করলেন, ‘অতুলনীয়’, ‘সভ্য’ – এ-মানুষটি এখানে (রাজনীতিতে) কী করেন?

নাইপল লেখেন : ‘আমার পিতৃপুরুষের দেশের প্রতি আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসা থেকে প্রথম ভারতে আসি। ভারত সম্পর্কে আমি যাই লিখি তার জন্য আমার প্রকাশক কিছু আগাম টাকাও দিলেন। টাকার অংক ছোট কিন্তু পেয়ে আমি স্বস্তিবোধ করি। কেমন করে ভারতে এগোব আমার জানা ছিল না। শেষ পর্যন্ত আমাকে পথ খুঁজে নিতে হয়েছে। আমি ভারতে গিয়েছিলাম। গেরিলা কর্মকা-ের সঙ্গে জড়িত কিছু মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি, মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা – ফাঁপা এবং বোকা। তাদের মধ্যে কোনো বিপ্লবী মহিমা ছিল না, একেবারেই না।’ এটি তাঁর পরবর্তী অনুধাবন। তিনি দেখেছেন, বিপ্লবও সাময়িক স্বার্থের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

নাইপলের আফ্রিকা

‘আফ্রিকা কোনো মজার জায়গা নয়। মজার জায়গা হয় সেটি, যা আত্মাকে উদ্বুদ্ধ করে, অনুভূতিকে সস্নেহে লালন করে। আমি

যে-আফ্রিকা সফর করেছি তার সম্পর্কে এ-কথা বলা যায় না।’ ভয়ংকর বর্ণবাদী তাঁর উচ্চারণ : ‘আফ্রিকানরা লাথি চায়, এটাই একমাত্র জিনিস, যা তারা বোঝে।’

কালো মানুষ নিজের কথা লিখতে পারার শিক্ষা ও সাহস পেয়েছে অনেক পরে। সাদা মানুষ তাদের দেখেছে নিজেদের বোঝা হিসেবে – ‘হোয়াইট ম্যান’স বার্ডেন’। নাইপল আফ্রিকার যে-দিকটাতে আলোকসম্পাত করেছেন, সাদা মানুষ সে-পথে কখনো এগোয়নি। অরবিন্দ আদিগা বলেছেন, ‘নাইপলের আফ্রিকানরা ‘মিমিক ম্যান’ (১৯৬৭-তে প্রকাশিত নাইপলের উপন্যাস মিমিক ম্যান থেকে নামটি নেওয়া) তারা পশ্চিমের প্রতিষ্ঠানসমূহ – সরকার, আইন, পুলিশ ইত্যাদি তাদের জন্য কতটা লাগসই তা না ভেবেই অনুকরণ করে বলেছে, অসংগতিপূর্ণ প্রতিষ্ঠান তাদের সমাজ ভেঙে খানখান করে দিচ্ছে এবং কৃষ্ণ মহাদেশ – ডার্ক কন্টিনেন্টের যে বহুল চর্চিত ধারণা তাকে আরো শক্তিশালী করে তুলছে।

নাইপলের ব্যক্তিত্ব ও রুচি তাঁর দ্য মাস্ক অব আফ্রিকার সারাৎসার অপহরণ করে নিয়েছে। তিনি যখন জানলেন আইভরি কোস্টের মানুষ জীবন্ত বিড়াল সেদ্ধ করে খায় (নাইপল নিজে ক্যাট পারসন – বিড়ালপ্রিয় মানুষ), তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেলেন যে, গোটা দেশটাই বাজে, অপদার্থ। রান্নাঘরে বিড়াল নিয়ে এই নির্মমতার কারণে আইভরি কোস্টের সবই তাঁর কাছে গুরুত্বহীন হয়ে উঠল। অরবিন্দ আদিগা আরো লিখেছেন : ‘পরবর্তী সময়ে তিনি জেনেছেন দক্ষিণ আফ্রিকায় ধর্মাচার ও জাদুটোনার জন্য বিভিন্ন জন্তুর নাড়িভুঁড়ি বের করে ফেলা হয়; এতে তাঁর কাছে পুরো অঞ্চলটিই অমানুষের অঞ্চল হয়ে উঠল।’ নাইপল লিখলেন, ‘আমি মনে করেছি এটা ভয়ংকর ব্যাপার, এটা ভীষণ হতাশার ব্যাপার। দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষকে অনেক বড় সংগ্রাম করতে হয়েছে। আমি আশা করেছিলাম বড় সংগ্রাম তাদের বড় মানুষে পরিণত করবে।’

আফ্রিকা তাঁর কাছে বিড়াল সেদ্ধ করার আর গরুর নাড়িভুঁড়ি বের করার মহাদেশ হয়ে রইল।  ‘আমার শৈশবে আমার মনে আছে ‘কালো’ – ব্ল্যাক ছিল একটি অপমানজনক শব্দ। বরং লোকজন কালোর বদলে ‘কালার্ড’ শুনতে পছন্দ করত; ‘আফ্রিকান’ বলাটা ছিল অপমানজনক : পরিস্থিতি গায়ানাতে একটু ভিন্ন ছিল, সেখানে ‘আফ্রিকান’ ব্যবহৃত হতো, কিন্তু নিগ্রো ছিল অপমানজনক শব্দ। আর এখন কালো খুব জনপ্রিয় এবং কবুল করে নেওয়া শব্দ।’

কিন্তু সেই কালো আফ্রিকার ভবিষ্যৎ কি?

নাইপল চাঁছা জবাব দিলেন, ‘আফ্রিকার কোনো ভবিষ্যৎ নেই।’

আর্জেন্টাইন টেরর : নির্জনতার আতংক

রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নাইপলের দৃষ্টি এড়ায়নি। ১৯৭৭-এ বুয়েনেস আইরেস ঘুরে এসে লিখলেন :

আর্জেন্টিনায় ঘাতক গাড়ি – যে-গাড়িতে দাফতরিক বন্দুকধারীরা তাদের কাজে বেরোয় তার নাম ফোর্ড ফ্যালকনস। আর্জেন্টিনাতেই তৈরি হয় ফ্যালকন, শক্ত ছোট গাড়ি, গাড়ির চেহারার তেমন কোনো বৈশিষ্ট্য নেই – হাজার হাজার গাড়ি রাস্তায়। কিন্তু ঘাতক ফ্যালকন দেখলেই চেনা যায়। এসব গাড়িতে কোনো লাইসেন্স প্লেট থাকে না। এসব গাড়ি সাদাসিধে কাপড়ে পরা মানুষ পরিবহন করে – এ গাড়ির উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে হয়, মানুষ কখনো কখনো দাঁড়ায় দেখে। কয়েক সপ্তাহ আগে তারা টুকুম্যান উত্তরাঞ্চল শহরের প্রধান চত্বরে দাঁড়িয়েছিল এবং দেখছিল সরকারি সদর দফতরের সামনে অর্ধবৃত্তাকার ড্রাইভওয়েতে ফ্যালকনগুলো পার্ক করা; ভবনটি উনিশ শতকের ইউরোপিয়ান কান্ট্রি হাউজের মতো সাজানো পাথরে গড়, বারান্দায় এবং সযতেœ লালিত অনেকটা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় বাগানে মেশিনগান হাতে ইন্ডিয়ান সৈন্য – সেখান থেকে একঝলক ইউনিফর্ম, হ্যান্ডশেক, স্যালুট দেখা যায় – যতক্ষণ না সাদা পোশাকের মানুষগুলো অভিজাত শিকারদলের সদস্যের মতো নেমে এসে লুকোনো মেশিন নিয়ে প্রশস্ত পদক্ষেপে ছোট ফ্যালকনে আরোহণ করে, গতি না বাড়িয়ে, সাইরেন না বাজিয়ে গাড়ি চলতে থাকে। এই নীরবতার কী নাটকীয় পরিণতি কর্তৃপক্ষ তা দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে – এটা সন্ত্রাসের একটি অংশ, যে-সন্ত্রাসের অনুভব সর্বত্র।

… আগের দিনগুলোতে যুদ্ধটা ছিল গেরিলা বনাম একদিকে সেনাবাহিনীর একাংশ, অন্যদিকে পুলিশ। এখন যুদ্ধ সবাইকে স্পর্শ করেছে। গণমঞ্চে এখন গণসন্ত্রাস।

নাইপল যে-চিত্র এঁকেছেন তা কেবল আর্জেন্টিনার নয়, আমাদেরও।

হেনরি জেমস : পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে লেখক!

লেখক যদি বৈরিতা সৃষ্টি করতে না পারেন তিনি মৃত – এটি নাইপলের কথা। এ-কারণেই তিনি ক্রমাগত বৈরিতা সৃষ্টি করে চলেছেন। তিনি হেনরি জেমসকে বলেছেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বাজে লেখক।’

হেনরি জেমসের দ্য পোর্ট্রটে অব অ্যা লেডি, দ্য উইংস অব দ্য ডাভ, দ্য অ্যাম্বাসাডর্স বিখ্যাত উপন্যাস।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের মতো বিশ্ববরেণ্য কথাশিল্পী সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি জানতেন না কোথায় আছেন, তিনি আমেরিকান হওয়া নিয়েই বড় ব্যস্ত ছিলেন।’ তাঁর এই মন্তব্য বিপুলসংখ্যক সাহিত্যামোদীকে ক্ষুব্ধ করেছে।

১৯৮৬-র নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী ওলে সোয়েঙ্কা সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি কিছু লিখেছেন নাকি?’ তাঁকে নোবেল পুরস্কার দেওয়াটা নোবেল কমিটির ‘অনেক উঁচু স্থান থেকে সাহিত্যের ওপর মূত্রপাত করার মতো ব্যাপার।’

ই এম ফস্টারকে যৌন-দানব বানিয়েছেন। বলেছেন, ‘ভারতে অবশ্যই ফস্টারের নিজের ধান্ধা ছিল। তিনি ছিলেন সমকামী আর ভারতে তাঁর হাতে সময়ও ছিল। তিনি চিনতেন রাজভবন, কিছু মধ্যবিত্ত, আর মোহিত করবেন এমন কিছু বাগানবালক।’

নাইপল টমাস হার্ডি সম্পর্কে বলেছেন, ‘তিনি একজন অসহ্য লেখক, তিনি লিখতে জানেন না, একটা প্যারাগ্রাফ কীভাবে তৈরি করতে হয়, তাও জানেন না। তাঁর লেখা রোমান্টিক মেয়েলি কাহিনির মতো।’

এমনকি জেইন অস্টিনও নয়

বিতর্ক সৃষ্টিতে ভি এস নাইপলের সমকক্ষ কোনো লেখকের দেখা গত তিন দশকে মেলেনি।

রয়াল জিওগ্রাফিক সোসাইটিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, নারী লেখকদের মধ্যে কেউই তাঁর সমকক্ষ নন। জেইন অস্টিন তো ননই। তিনি জেইন অস্টিনের ‘আবেগময় উচ্চাকাক্সক্ষা’ এবং ‘পৃথিবী সম্পর্কে আবেগময় অনুভূতি’র অংশীদার হতে রাজি নন। তিনি মনে করেন, নারী লেখকরা ভিন্ন ধরনের – ‘আমি যখন কোনো লেখা পড়ি – এক দুই অনুচ্ছেদ পড়ার পরই আমি বুঝতে পারি তা নারীর লেখা না পুরুষের।’

তিনি মনে করেন, নারীর আবেগময় সংকীর্ণ দৃষ্টি তাঁকে গৃহের প্রভুতে পরিণত করতে পারে না – সেটা তাঁর লেখাতেও প্রতিভাত হয়। ‘আমার প্রকাশক ভদ্রমহিলা চমৎকার রুচিশীল সম্পাদক ছিলেন কিন্তু তিনি যখন লেখক হলেন দেখুন মেয়েলি কী সব যাচ্ছেতাই লিখছেন।’ ভারতীয় মহিলা লেখকদের সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘তাঁরা মামুলি বিষয় নিয়ে লিখে থাকেন।’

ব্রিটেনের লেখক সাংবাদিক অ্যালেক্স ক্লার্ক বললেন, ‘তিনি কি এটাই বলতে চান যে, হিলারি ম্যানটেল, এ এস বাইয়াত, আইরিস মারডক আবেগপ্রবণ মেয়েলি লেখা লিখছেন?’

সাহিত্য-সমালোচক হেলেন ব্রাউন তাঁকে উড়িয়ে দিয়ে বললেন, এসব তাঁর ‘উদ্ধত দৃষ্টি আকর্ষণী’ আচরণ।

নাইপলের ইসলামফোবিয়া

নাইপল বলছেন, ‘উৎস বিবেচনায় ইসলাম একটি আরব ধর্ম। যারা আরব নন, এমন মুসলমানরা সবাই ধর্মান্তরিত মুসলমান। ইসলাম ধর্মের চাহিদাটা বেশি। ধর্মান্তরিত একজন মুসলমানকে পৃথিবী সম্পর্কে তার ধারণা পালটে ফেলতে হয়। তার পবিত্র স্থানগুলো অন্য দেশে, তার পবিত্র ভাষা আরবি। তাকে তার নিজের ইতিহাস প্রত্যাখ্যান করতে হয়। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিতে হয়। গভীরভাবে দেখতে গেলে ধর্মান্তরিত মুসলমানদের ঔপনিবেশিক মানুষ মনে হবে।’

খুশবন্ত সিং তাঁর কাছে ইসলাম নিয়ে মোহভঙ্গের ব্যাখ্যা শুনতে চাইলে নাইপল বললেন : ‘আমাকে ভুল ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এটা মোহভঙ্গের বিষয় নয়। আমি বস্তুনিষ্ঠ হতে চেষ্টা করেছি। আমি ভেতরে ঢুকে ইসলামকে বুঝতে চেষ্টা করেছি। অমুসলমান পূর্বকালের (মুসলমান হওয়ার আগের সময়কার) স্মৃতি থেকে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মৌলবাদীরা মুক্তি চায়। ইরানের বেলাতেও এ-কথা সত্য। পারস্য বিশাল দেশ ছিল। রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে। ইরান ধ্রুপদ গ্রিসকেও চ্যালেঞ্জ করেছে। এখন তারা বলছে ইসলাম কবুল করার আগের সময়টা গুরুত্বপূর্ণ নয়। আয়াতুল্লাহ খোমেনির সময়ের বিচারক আয়াতুল্লাহ খালখালি পার্সেপোলিসের ধ্বংসাবশেষ এবং আড়াই হাজার বছর আগেকার সাইরাস প্রাসাদের অবশিষ্টাংশ ধ্বংস করে ফেলতে চেয়েছেন। এটা পাগলামি। কিন্তু ধর্মান্ধতার এ নির্দেশনা জনসাধারণ গ্রহণ করবে।’

হিন্দু মৌলবাদ নিয়ে নাইপল বলছেন – ‘শিল্পী মকবুল ফিদা হুসেনের বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপের কথা বলা যায়। তিনি হিন্দু দেবদেবীর নগ্ন ছবি এঁকেছিলেন। তারা তাঁর ছবি নষ্ট করেছে, ঘরবাড়ি তছনছ করেছে। আমি খুব নিশ্চিত, তিনি যদি হিন্দু হতেন তাহলে এ নির্বিচার ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হতো না।’ নাইপল মনে করেন, কাজের মধ্য দিয়ে হিন্দু ও মুসলমান মৌলবাদীরা পরস্পরকে শক্তি জোগায়। ‘আমি ইসলামিক প্রশ্নাবলি নিয়ে খুব কৌতূহলী হয়েছিলাম এবং ভেবেছিলাম মূল থেকে তা বুঝতে চেষ্টা করব। সহজ প্রশ্ন জিজ্ঞেস করব এবং সে আবিষ্কারের একটি বর্ণনামূলক লেখা লিখব।’ কিন্তু জার্নি অ্যামাং দ্য বিলিভার্স গ্রন্থে ধর্মভিত্তিক সমাজের অসারতার কথাই বলেছেন।

সাধারণভাবে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতদের কথা বলেছেন, ‘ধর্মান্তরিত মানুষের ওপর ধর্মান্তকরণের ভয়ংকর প্রভাব পড়ে। এই ধর্মে ধর্মান্তরিত হলে তোমাকে তোমার অতীত ধ্বংস করতে হবে, ইতিহাস ধ্বংস করতে হবে। এই খত সই করে তোমাকে বলতে হবে, আমার পিতৃপুরুষের সংস্কৃতি বিরাজ করে না, আর তাতে কিছুই আসে-যায় না।’ নাইপল মনে করেন, অখণ্ড ভারত রাষ্ট্রের ভেতর একটি মুসলিম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটাতে গিয়ে লাখ লাখ মানুষকে নিহত হতে হয়েছে, লাখ লাখ মানুষকে মূলোৎপাটিত হতে হয়েছে। রাষ্ট্র নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও ধর্মের অবস্থান সুরক্ষিত ও শক্তিশালীই রয়েছে। রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়েছে তার মানে এই নয়, রাষ্ট্রের জন্য যে-স্বপ্ন তাতে ভেজাল ছিল কিংবা ধর্মের যে-বিশ্বাস তা দূষিত ছিল। এটা ঘটার কারণ মানুষই ধর্মের বিশ্বাসকে ব্যর্থ করে দিয়েছে। নাইপল মনে করেন, পাকিস্তান লাভ ধর্মীয় অর্জন না হয়ে রাজনৈতিক অর্জন হওয়াটাই গৌরবের বিষয় হতো।

ডোয়াইট গার্নার ইসলাম সম্পর্কে নাইপলের জ্ঞানকে দেখছেন পর্বত-প্রমাণ অজ্ঞতা হিসেবে, আর এই অজ্ঞতাকে যৌক্তিকীকরণ করেছেন এই বলে : ‘আমি  সারাজীবন ধরে মুসলমানদের চিনে আসছি কিন্তু তাদের ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান সামান্যই। ইসলামের ডকট্রিন (আমি একে ডকট্রিন হিসেবেই দেখি) আমাকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। এটা গবেষণার উপযুক্ত কোনো বিষয় বলে আমার মনে হয়নি। বছরের পর বছর ধরে সফরের পরও ত্রিনিদাদে বালক বয়সে ইসলাম সম্পর্কে যে জ্ঞান ছিল তার সঙ্গে তেমন কিছু যোগ করতে পারিনি। ধর্মের গৌরব অতীতের ব্যাপার। এটা রেনেসাঁসের মতো কিছু সৃষ্টি করতে পারেনি। মুসলিম দেশগুলো তো উপনিবেশ ছিল না। সেখানে ছিল স্বৈরাচার আর তেল পাওয়ার আগে তাদের সব দেশই ছিল দরিদ্র।’ (অ্যামাং দ্য বিলিভার্স থেকে উদ্ধৃত) নাইপল ইসলামকে বরাবরই বৈশ্বিক হুমকি মনে করে এসেছেন।

লেখালেখি নিয়ে নাইপল

* আপনি যদি কেবল উপন্যাসই লেখেন, আপনি লিখতে বসে কিছু বর্ণনাও বয়ন করেন। এটা ঠিকই আছে কিন্তু এর কোনো গুরুত্ব নেই।

* আপনি যদি সিরিয়াস বই লিখতে চান, আপনাকে ফর্ম ভাঙার জন্য তৈরি থাকতে হবে; ফর্ম ভাঙতে হবে।

* মনে করা হয় আমি একজন কঠিন লেখক, কিন্তু আমি সত্যিই কোমল।

* আমি হচ্ছি সে ধরনের লেখক, যার সম্পর্কে ভাবে অন্যরা আমার লেখা পড়ছে।

* আমি অনেক কিছু পড়ি। পৃথিবী সম্পর্কে আমার জ্ঞানের অসম্পূর্ণতা পূরণ করতে আমি পড়ি।

* আমি যখন আমার নিজের লেখা একটি বাক্য পড়ি এবং দেখি এটার টিকে থাকার গুণাগুণ আছে, আমি ভাবি এটা বিস্ময়কর।

* লেখকের জীবনী এবং এমনকি আত্মজীবনী সবসময়ই অসম্পূর্ণতার দোষে দুষ্ট। তবে আমার সম্পর্কে মূল্যবান যা কিছু সব আমার বইগুলোতেই আছে।

* তুমি কী কাজটি করেছ তা দেখার জন্য একজন মানুষ দরকার, সে এটা পড়বে, বুঝবে এবং এর ভেতর কী আছে তার মূল্যায়ন করতে চেষ্টা করবে।

* পরিস্থিতিগত সত্যটা অবশ্য বুঝতে চেষ্টা করতে হবে – এতেই বিষয়টি বৈশ্বিক হয়ে উঠতে পারে।

* সাহিত্য নিয়ে কথা বলার মতো আমার কোনো ছাত্রবন্ধু ছিল না। কিন্তু আমার শিক্ষক ছিলেন চমৎকার মানুষ, আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব, কিন্তু তাঁর কোনো সাহিত্য বিচার-ক্ষমতা ছিল না।

* জীবনী ইতিহাস এবং শিল্পকলা নিয়ে মহৎ গ্রন্থ রচনা করা যায়।

* লেখক যদি বসে বসে কেবল শোষণ আর নিপীড়নের কথাই বলেন তাদের পক্ষে বেশি কিছু লেখা হয়ে ওঠে না। লেখকদের উচিত ‘অসম্মতি’কে প্ররোচিত করা।

* আত্মজীবনী কাহিনিকে বিকৃত করতে পারে, ঘটনাকে নতুন করে বিন্যাস করতে পারে, কিন্তু ফিকশন কখনো মিথ্যে বলে না, লেখককে সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরে।

* আমি যখন কোনো লেখা পড়ি, দু-এক প্যারাগ্রাফের মধ্যেই বুঝতে পারি এটা নারীর লেখা না পুরুষের।

* শিশু হিসেবে বলতে গেলে আমি কিছুই জানতাম না, আমার দিদিমার বাড়ি থেকে যা কিছু তুলে এনেছি তার বাইরে কিছুই নয়। আমি মনে করি, সব শিশু এভাবেই পৃথিবীতে এসেছে, তারা কে তা না জেনেই।

* কথা বলার দুটি ধরন রয়েছে – একটি সহজ ধরন, যেখানে হালকাভাবে কথা বলা হয় আর একটি হচ্ছে বিবেচিত ধরন। বিবেচিত ধরনের পাশেই আমি আমার নামটি লিখেছি।

* একজন লেখক বরাবরই নিঃসঙ্গ।

* বদরাগী মানুষের যে-খ্যাতি আমার খ্যাতির ধরনটা সে-রকম। (প্রায় বাইশ বছর উপন্যাস প্রকাশিত না হওয়ার পর) আমি কখনো উপন্যাস পরিত্যাগ করিনি।

* যখনই আমি ফিকশন লিখতে গিয়েছি, আমাকে সবসময়ই একটি চরিত্র আবিষ্কার করতে হয়েছে, যার প্রেক্ষাপট অনেকটা আমারই মতো।

* জীবনের সমস্ত কিছুর বিস্তারিত বর্ণনা, অভ্যাস, বন্ধুত্ব সব আমাদের জন্য বিছিয়ে দেওয়া যেতে পারে কিন্তু লেখালেখির রহস্য রয়েই যাবে। যত চিত্তাকর্ষকই হোক কোনো দলিল-দস্তাবেজ আমাদের সেখানে নিয়ে যেতে পারবে না।

* আমার দুঃখ হচ্ছে প্রকাশনার জগৎ আর বই লেখার জগৎটা ভয়ংকর বাজে, নোংরা এবং রদ্দি।

* একজন নাস্তিকের আবার কেমন করে ভাবাদর্শ থাকে? নাস্তিক হওয়ার মানেই তো বিশ্বাসের কিছু অঞ্চল থেকে মুক্ত হয়ে আসা। সেটা কেমন করে ভাবাদর্শ হয়, আমি তার কারণ খুঁজে পাই না।

* আমার বয়স যতই বাড়ছে আমি ততই নিজেকে বোঝাতে সমর্থ হয়েছি মানুষকে যে সর্বোত্তম স্বীকৃতি আমরা দিতে পারি তা হচ্ছে তারা কেবল অস্তিত্বে বিরাজমানই নন, তারা নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বিরাজ করছেন এবং তাদের নির্দিষ্ট বাস্তবতা রয়েছে।

* কিছু লেখক কেবল শৈশবের অভিজ্ঞতা নিয়েই লেখালেখি করেন, কারণ সে-অভিজ্ঞতা সম্পূর্ণ। অন্য ধরনের লেখকের বেলায় জীবন বয়ে যায় এবং তিনি সেই জীবনকে প্রক্রিয়াকরণ করে লিখে থাকেন।

* আপনি যদি অন্য একটি দেশে অভিবাসন নিয়ে সে-দেশের আইন মেনে বসবাস শুরু করেন, তাতে আপনি সেই সংস্কৃতির আত্মার প্রতি অসম্মান জ্ঞাপন করেন না। এটা এক ধরনের আগ্রাসন।

* একজন মানুষ যখন তিরিশ বছর বয়সে লিখতে শুরু করেন, তার বয়স যখন পঞ্চাশ বা ষাট হয় তখন তার অধিকাংশ লেখা হয়েই যায়। আশি হতে হতে তার আর তেমন কিছুই থাকে না।

* আমি যখন অক্সফোর্ড (বিশ্ববিদ্যালয়) ছেড়ে যাই আমি সত্যিই লেখালেখির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না। তারপর আমি লিখতে বসি। শিল্পের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান আমার বরাবরই ছিল। আমি সবসময় অনুভব করেছি লেখালেখি একটা কাজ।

* অনেক লেখক জীবনের শেষপর্যায়ে এসে তাঁর বইগুলোর সারাংশ লিখতে শুরু করেন।

* চলচ্চিত্রের প্রথম পঞ্চাশ বছর ছিল সত্যিকারের মহান কীর্তির সময়। মৌলিক মানস তখন গল্প বলার একটি পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করতে চেষ্টা করেছে। আর এখন যা ঘটছে তা হচ্ছে অনুকরণ, মহৎ সৃষ্টিকারীরা যা করেছেন কেবল তারই নকল।

* আমি সবসময়ই আমার প্রজ্ঞা দিয়ে চালিত হয়েছি। সাহিত্যের হোক কিংবা রাজনীতির – আমার কোনো পদ্ধতি নেই। আমাকে পরিচালিত করার কোনো রাজনৈতিক ভাবাদর্শও নেই।

* যে-সভ্যতা বিশ্বকে ভয়ে করে নিয়েছে তাকে মরণাপন্ন বলার কারণ নেই।

* স্কুলে আমার গুণমুগ্ধ ছিল, আমার কোনো বন্ধু ছিল না।

নতুন লেখকের জন্য নাইপলের সাত টিপস

১. লম্বা বাক্য লিখবেন না।

(একটি বাক্যে দশ-বারোটির বেশি শব্দ থাকবে না)

২. প্রতিটি বাক্যে স্পষ্ট বিবৃতি থাকতে হবে।

(আগের বাক্যের বিবৃতির সঙ্গে এটি যুক্ত হবে এবং সংগতিপূর্ণ হবে। একটি ভালো অনুচ্ছেদ হচ্ছে কতগুলো স্পষ্ট ও সম্পর্কিত বাক্য।)

৩. বড় শব্দ লিখবেন না।

(কম্পিউটার যদি বলে গড়পড়তা শব্দে পাঁচটির বেশি অক্ষর রয়েছে তাহলে বুঝতে হবে কোথাও সমস্যা রয়েছে। ছোট শব্দের ব্যবহার লেখককে চিন্তা করতে বাধ্য করে তিনি কী লিখছেন। এমনকি কঠিন ভাবনাকেও ছোট শব্দে ভেঙে নেওয়া যায়।)

৪. যে-শব্দের মানে সম্পর্কে আপনি নিশ্চিত নন, তা লিখবেন না।

(এই আইন যদি ভঙ্গ করেন তাহলে লেখালেখি ছেড়ে অন্য কাজ দেখুন)

৫. রং, আকার, সংখ্যা – এসব ছাড়া নতুন লেখককে বিশেষণ ব্যবহার এড়াতে হবে।

(বিশেষণের বিশেষণ অ্যাডভার্বও যত কম সম্ভব ব্যবহার করবেন)

৬. বিমূর্ত বর্ণনা এড়িয়ে যাবেন।

(সবসময় সঠিক বস্তুটি লেখায় উঠিয়ে আনবেন, বিমূর্ত কিছু নয়)

৭. প্রতিদিন অন্তত ছয় মাস এভাবে লেখালেখির চর্চা করুন।

(আপনি কেবল তখনই এই লেখালেখির বিধান ভাঙবেন যখন এগুলো পুরোপুরি আপনার রপ্ত হয়েছে এবং দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারছেন)।

নাইপল : টাইমলাইন

১৯৩২ : ১৭ আগস্ট জন্ম, ত্রিনিদাদের চাগুয়ানাস গ্রামে। বিদিয়াধর সূরজপ্রসাদ নাইপল (বাংলায় সম্ভবত বিদ্যাধর সূর্যপ্রসাদ নাইপল। নাম অনূদিত না হওয়াই ভালো। লেখক যেভাবে সংবর্ধিত হতে চান সেটাই উৎস। আমরা ঢাকায় তাঁর স্ত্রীকে শুনেছি বিদিয়া বলে ডাকতে) তাঁর পিতা সি প্রসাদ নাইপল, মা দ্রোয়াপাতি নাইপল।

১৯৩৯ : পরিবার ত্রিনিদাদের রাজধানী পোর্ট অব স্পেনে স্থানান্তর।

১৯৪০ : ত্রিনিদাদের সবচেয়ে আধুনিক ব্রিটিশ স্টাইল স্কুল কুইন্’স রয়াল কলেজে ভর্তি।

১৯৫০ : পড়াশোনার জন্য অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি কলেজে বৃত্তিলাভ।

১৯৫২ : খেলার মাঠে পরবর্তীকালের প্রণয়িনী ও স্ত্রী প্যাট্রিসিয়া হেইলের সঙ্গে সাক্ষাৎ।

স্পেন ভ্রমণ এবং বেপরোয়া ব্যয়।

১৯৫৩ : নাইপল এবং প্যাট্রিসিয়া অক্সফোর্ডের গ্র্যাজুয়েট হলেন।

নাইপলের পিতার মৃত্যু।

১৯৫৪ : টুকরো কাজ, প্যাট্রিসিয়ার অর্থের ওপর নির্ভরশীল। বিবিসি রেডিওর ক্যারিবিয়ান ভয়েসে উপস্থাপকের চাকরি (তিন মাস পরপর নবায়নযোগ্য) পান।

১৯৫৫ : দুপক্ষের পরিবারের অজান্তে নাইপল ও প্যাট্রিসিয়া বিয়ে করেন। প্যাট্রিসিয়ার কর্মস্থল বার্মিংহাম, লন্ডনে উইকএন্ড কাটান নাইপলের সঙ্গে। পুরনো ল্যাঙ্গহাম হোটেলে বিবিসির ফ্রি ল্যান্সারদের রুমে গ্রীষ্মের এক অপরাহ্ণে মিগুয়েল স্ট্রিটের প্রথম গল্প ‘বোগার্ট’ লেখেন।

প্রকাশক প্রথম উপন্যাস দ্য মিস্টিক ম্যাসিওর গ্রহণ করেন।

১৯৫৭ : প্রথম উপন্যাস প্রকাশ এবং পুরস্কার লাভ।

১৯৫৮ : দ্বিতীয় উপন্যাস দ্য সাফ্রেজ অব এলভিরা প্রকাশিত।

১৯৫৯ : প্রথম লেখা বই মিগুয়েল স্ট্রিট গ্রন্থাকারে প্রকাশ। প্রথম নন-ইউরোপিয়ান লেখক হিসেবে সমারসেট মম অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন এই বইটির জন্য এবং লেখক সমারসেট মম নিজে তা অনুমোদন করেন।

১৯৬১ : নাইপলের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস অ্যা হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস-প্রকাশিত।

১৯৬২ : দ্য মিডল প্যাসেজ নন-ফিকশনপ্রকাশিত।

১৯৬৩ : ব্রিটেনের প্রেক্ষাপটে প্রথম উপন্যাস মিস্টার স্টোন অ্যান্ড দ্য নাইটস কোম্প্যানিয়ন-প্রকাশিত।

১৯৬৪ : অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস : অ্যান এক্সপেরিয়েন্স অব ইন্ডিয়া-প্রকাশিত।

১৯৬৬ : রাইটার-ইন-রেসিডেন্স হিসেবে উগান্ডার কাম্পালায় ম্যাকারেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছর অবস্থান।

১৯৬৬ : দ্য মিমিক ম্যান প্রকাশিত, ডব্লিউএইচ স্মিথ পুরস্কার লাভ।

১৯৭১ : ইন অ্যা ফ্রি স্টেট প্রকাশিত, বুকার প্রাইজ লাভ।

১৯৮১ : অ্যামাং দ্য বিলিভার্স : অ্যান ইসলামিক জার্নি প্রকাশিত।

১৯৯১ : নাইটহুড প্রাপ্তি।

১৯৯৬ : স্ত্রী প্যাট্রিসিয়ার মৃত্যু।

পাকিস্তানি সাংবাদিক নাদিরা খানম আলভিকে বিয়ে করেন।

২০০১ : নোবেল সাহিত্য পুরস্কার লাভ।

২০১৬ : বাংলাদেশে ঢাকা লিট ফেস্টে আগমন।

২০১৮ : ১২ আগস্ট লন্ডনে মৃত্যুবরণ।



নাইপলের সাহিত্যকর্ম

ফিকশন

*             দ্য মিস্টিক ম্যাসিওর (১৯৫৭)

*             দ্য সাফ্রেজ অব এলভিরা (১৯৫৮)

*             মিগুয়েল স্ট্রিট (১৯৫৯)

*             অ্যা হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস (১৯৬১)

*             মিস্টার স্টোন অ্যান্ড দ্য নাইটস কোম্প্যানিয়ন (১৯৬৩)

*             দ্য মিমিক ম্যান (১৯৬৭)

*             অ্যা ফ্ল্যাগ অব দ্য আইল্যান্ড ((১৯৬৭)

*             ইন অ্যা ফ্রি স্টেট (১৯৭১)

*             গেরিলাস (১৯৭৫)

*             অ্যা বেন্ড ইন দ্য রিভার (১৯৭৯)

*             দ্য এনিগমা অব অ্যারাইভাল (১৯৮৭)

*             অ্যা ওয়ে ইন দ্য ওয়ার্ল্ড (১৯৯৪)

*             হাফ অ্যা লাইফ (২০০১)

* দ্য নাইটওয়াচম্যানস অকারেন্স বুক : অ্যান্ড আদার কমিক ইনভেনশন্স (২০০২)

*             ম্যাজিক সিডস (২০০৪)

নন-ফিকশন

*             দ্য মিডল প্যাসেজ : ইমপ্রেশনস অব ফাইভ সোসাইটিজ-ব্রিটিশ, ফ্রেঞ্চ, অ্যান্ড ডাচ ইন দ্য ওয়েস্ট ইন্ডিজ অ্যান্ড সাউথ আমেরিকা (১৯৬২)

*             অ্যান এরিয়া অব ডার্কনেস (১৯৬৪)

*             দ্য লস অব এলডোরাডো (১৯৬৯)

*             দ্য ওভারক্রাউডেড বারাকুন অ্যান্ড আদার আর্টিকেলস (১৯৭২)

*             ইন্ডিয়া : অ্যা ওন্ডেড সিভিলাইজেশন (১৯৭৭)

*             অ্যা কঙ্গো ডায়েরি (১৯৮০)

*             দ্য রিটার্ন অব এভা পেরন অ্যান্ড কিলিংস ইন ত্রিনিদাদ (১৯৮০)

*             অ্যামাং দ্য বিলিভার্স : অ্যান ইসলামিক জার্নি (১৯৮১)

*             ফাইন্ডিং দ্য সেন্টার : টু ন্যারেটিভস (১৯৮৪)

*             অ্যা টার্ন অব দ্য সাউথ (১৯৮৯)

*             ইন্ডিয়া : অ্যা মিলিয়ন মিউটিনিজ নাউ (১৯৯০)

*             বেয়ন্ড বিলিফ : ইসলামিক এক্সকার্সনস অ্যামাং দ্য কনভার্টেড পিপলস (১৯৯৮)

*             বিটউইন ফাদার অ্যান্ড সান : ফ্যামিলি লেটার্স (১৯৯৯, গিলন অ্যাটকেন-সম্পাদিত)

*             দ্য মাস্ক অব আফ্রিকা (২০১০)

গল্প- সাক্ষাৎকার by হাসান আজিজুল হক

লোকটা গত শতাব্দীর কায়দামাফিক সূর্যাস্ত দেখছিল। তার চোখে ফুটে উঠেছিল তন্ময় কল্পনা : বাঁদিকে চওড়া নদী, সেখানে সূর্যের প্রতিবিম্ব ডুবে যাচ্ছে, খানিকটা স্রোত সিঁদুরের মতো হিঙুল, স্রোত পেরিয়ে বালির চড়া, ধূসর হতে হতে আস্তে মিলিয়ে যায়; লোকটার ডানদিকে বিরাট মাঠ, মাঠ উঁচু-নিচু, মধ্যে মধ্যে টিলা আছে। এতক্ষণ লাল রং মাখানো ছিল, এখন মিলিয়ে যাচ্ছে।
সূর্যাস্তের আগে এবং পরে অনেক কিছু দেখার থাক। সূর্যাস্তের পরে খানিকক্ষণের মধ্যে সব কিছু আঁধারে ডুবে গেলেও। তখন পাকা রাস্তার উপরে গরাদ আর ইস্পাতের পাত দিয়ে ঘেরা কামরা পিঠে বয়ে নিয়ে একটা গাড়ি এসে দাঁড়ালে তার টের পাবার কথা নয়। রাস্তার উপরে বুটজুতোর আওয়াজ সে খেয়াল করেনি। বুটজুতোগুলি চষা জমির উপরে নেমে ধপধপ শব্দ তোলে তাও তার খেয়ালে আসে না। কিন্তু যখন সে মোলায়েম মৃদু গলার কথা শুনতে পায় তার কানের কাছেই ‘আসুন’ তখন আর তার সচেতন না হয়ে উপায় থাকে না। সে পিছনে ঘাড় ফেরাতেই আবার মৃদু গলায় আহ্বান শুনতে পায়, আসুন। সঙ্গে সঙ্গে সে ফিরে আসে। তীরের অগ্রভাগের মতো সূক্ষ্ম তীক্ষ্ণ বর্তমানের মুহূর্ত তাকে আগাগোড়া গেঁথে ফেলে।
যারা ডাকে তাদের সংখ্যা দুই কিন্তু তাদের ভালো দেখা যায় না। লোকটা শুধু টের পায়, তার ঘাড়ের নিচে থেকে শিরদাঁড়া বেয়ে কোমর পর্যন্ত একটা হিম স্রোত নেমে গেল। একজন এগিয়ে এসে তার কনুইয়ের কাছে ধরলো। বরফের মতো ঠাণ্ডা স্পর্শ। লোকটা উল্টোদিকে ঝুঁকে পড়ে। বুটজুতোঅলারা তার ঘাড়ের কাছে খিমচে ধরে তাকে টেনে তোলে। তখন লোকটা তাদের অনুসরণ করে মাতালের মতো টলতে টলতে পাকা রাস্তায় এসে ওঠে। এতোক্ষণে সে হুমদো গাড়িটাকে দেখতে পায়। সেখান থেকে একজন আরো মোলায়েম গলায় বলে, এই যে এদিকে। বেশ কষ্ট করে গাড়িটার পিছন দিক দিয়ে সে খাঁচায় ঢুকলো। সিঁড়ি নেই, থাকলে ভালো হতো। ভিতরে ঢুকতেই ঘাড়ে ধাক্কা দিলো কেউ। লোকটা বোধ হয় হাঁ করে ছিল ধাক্কার চোটে ঠোঁটের উপর দাঁত পড়ে গিয়ে একটু কেটে গেল। রক্তের নোনতা স্বাদটা ভালো না লাগায় সে লোহার গরাদের ওপর জিব ছোঁয়ালো। কেমন ধোঁয়াটে আলুনি স্বাদ। তার জিব গুটিয়ে গলার কাছে চলে যায়।
এর মধ্যে গাড়ি সূর্যাস্তের নদী আর মাঠ পিছনে ফেলে হু হু করে ছুটতে থাকে। ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে, তবু লোকটার কপালে ঘাম জমে। হাওয়ায় শুকিয়ে গেলেও আবার লোমকূপের গোড়ায় জমে। সে তার ঠাণ্ডা সাপের মতো কিলবিলে আঙুল দিয়ে মুছে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু আবার বিন বিন করে কপালের উপর ঘাম জমে যায়।
একটা বড়ো ফটকের কাছে গাড়ি দাঁড়াতে সে গরাদের ফাঁক দিয়ে দেখার চেষ্টা করে। এখানে সেখানে বিদ্যুতের আলোই জ্বলছে বটে কিন্তু ফটকের ওধারে বিরাট উঠোনটা অন্ধকার। সেই অন্ধকারের মধ্যেই ঝন্‌ঝন্‌ করে ফটক খুলে গেলে গাড়িটা গর্জন করে ভিতরে ঢোকে, অন্ধকার উঠোন পার হয় টালমাটাল করতে করতে। শেষে দাঁড়িয়ে যায়।
গাড়ির পিছনের দরজা খুলে গেলে আবার ধাক্কার চোটেই লাফ দিয়ে লোকটা নেমে পড়ে। চওড়া চওড়া অনেকগুলো সিঁড়ি বেয়ে উঠলে তবে বিরাট বারান্দা। সেখানে একটা লাল বাল্ব জ্বলছে। হুশ করে সামনের দরজা খুলে যায়। বিরাট একটা ঘর, লাল মিটমিটে বাল্ব জ্বলছে। কেউ নেই। ঘর পেরিয়ে ওপাশের দেয়ালের দিকে যেতেই বাঁদিকে আবার দরজা খোলার শব্দ। আর একটা ঘর। কেউ নেই। টেবিল-চেয়ার নেই। চুন আর বার্নিশের গন্ধ। ঠাণ্ডা কিন্তু আটকানো বাতাসের গুমোটও আছে। হাওয়া উঠেছে, পিছনে একটা খোলা দরজা ক্যাঁচ শব্দ করে বন্ধ হয়েও ককাতে থাকে ক্যাঁ-এ্যা, কিঁচ।
আবার ঘর। ফাঁকা—মাত্র একটি টেবিল। কোনো আলো নেই। দুমদাম করে সবকটি দরজা বন্ধ হয়ে গেল। লোকটা আঁধারের মধ্যে ডুবে গিয়ে চুপ করে একা দাঁড়িয়ে থাকে। এখন সমস্ত শরীরে ঘাম। অন্ধকারের ভিতর থেকে পথ দেখানোর মতো গলায় আওয়াজ আসে, এই যে এদিকে আসুন।
কিন্তু কোন্‌দিকে যাবে লোকটা ঠিক করতে পারে না। একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে এলোমেলো এগোতে গিয়ে গুবড়ে পোকার মতো শুকনো শক্ত দেয়ালে ধাক্কা খায়। একই গলায় যেন শূন্য থেকে আহ্বান আসে, আসুন, এই যে! গলা অনেক দূরে চলে যায়, হাল্‌কা মৃদু শিস দেবার মতো ডাকে, কই আসুন।
লোকটা দেয়াল ধরে হাতড়াতে হাতড়াতে খানিকটা যেতেই একটা বন্ধ দরজা পেয়ে যায়। মনে হলো হাত লাগার আগেই দরজাটা খুলে গেল। কোনো লাভ নেই। একই রকমের অন্ধকার। ঘরে ঢুকে দেয়াল ধরে এগোতে থাকে। এখন কেউ আর ডাকছে না। কান পেতেও সে আর কোনো শব্দ শুনতে পেল না। দেয়াল ধরে লম্বালম্বি পেরিয়ে গেল সে। তারপর আড়াআড়ি দেয়ালটার মাঝামাঝি আসতেই ফের একটা দরজা। কিন্তু দরজাটা এবারে সে টানাটানি করেও খুলতে পারে না। খানিকটা করে খোলে আবার ঢক্‌ করে বন্ধ হয়ে যায। প্রাণপণ শক্তিতে লোকটা দুহাতে দরজার একটা কড়া ধরে টানে। তখন আচমকা হুশ করে দরজাটা খুলে যেতেই তীব্র শাদা আলোর বন্যায় লোকটা একেবারে অন্ধ হয়ে যায়। আলোর ধাক্কায় হাঁটু ভেঙে দুমড়ে-মুচড়ে সে মেঝের ওপর বসে পড়ে দুহাতে চোখ দুটি চেপে ধরে। অনেকক্ষণ পরে আস্তে আস্তে চোখ থেকে হাত সরিয়ে সে উঠে দাঁড়িয়ে দেখতে পায় একটা বড়ো ন্যাংটো কালো প্লেন টেবিলের পিছনে তিনজন লোক বসে আছে। তাকে দাঁড়াতে দেখে তিনজন সমস্বরে টেনে টেনে বলে, আসুন, আসুন।
চারদিক থেকে টানা টানা কাঁপা কাঁপা প্রতিধ্বনি ওঠে, সুন সুন—হৌ হৌ।
লোকটা একটু ভালো করে চেয়ে দেখে ঘরে আছে চুনকাম করা শাদা দেয়াল—৪; বড়ো টেবিল—৩; টেবিলের পিছনে তিন চেয়ারে মানুষ—৩; টেবিলের সামনে ফাঁকা হাতলহীন কালো চেয়ার—১।
মাঝখানের লোকটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়। সে রোগা লিকলিকে, শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, চামড়ার উপর দিয়ে হাতের গিঁটটা ফুটে উঠেছে। বোঝা যায় সে খুবই সঙ্গমদক্ষ। তার চোখ একটুও নড়ছিল না। উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলটাকে ঘুরে এগিয়ে এসে লোকটার দিকে হাত বাড়িয়ে বলে, ধন্যবাদ, এসেছেন বলে আপনার কাছে আমরা বড়োই কৃতজ্ঞ—একটু হেঁট হয়ে সে বলে, দয়া করে আমাদের কৃতজ্ঞতা গ্রহণ করুন।
প্রতিধ্বনি ওঠে, উনন্‌ন্‌ হৌ হৌ।
এই কথা বলে সে লোকটার হাত ধরে তাকে ফাঁকা হাতল-ছাড়া চেয়ারটার উপর বসিয়ে দেয়। কাঠিখোঁচার উপর জামা-কাপড় চাপিয়ে কাক-তাড়ুয়া বানালে যেমন দেখতে হয়, তাকে ঠিক তেমনি দেখাচ্ছিল। লোকটা সবসময় তার গা থেকে মেয়েমানুষের মাংসের গন্ধ পেতে লাগল। সূর্যাস্ত প্রেমিকটিকে চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে টেবিল ঘুরে সে তার নিজের চেয়ারে ফিরে গেল। অন্য দুজন চুপচাপ বসে আছে। চেয়ারে বসে টেবিলের উপর শুকনো কনুই দুটো রেখে সে চিন্তিতভাবে মোটা চাপা গলায় বললো, তারপর, কেমন আছেন রহমান সাহেব?
অন্য দুজন মৃদুকণ্ঠে সায় দিলো, হ্যাঁ, তারপর কেমন আছেন রহমান সাহেব?
লোকটা অবাক-হওয়া গলায় খানিকট ঠেকে ঠেকে উত্তর দিলো, আমার নাম তো রহমান নয়। দেয়াল-টেয়াল চারিদিক থেকে পরিষ্কার শোনা গেল, নাম তো রহমান নয়। অয় অয় অয়।
মেয়েমানুষের গন্ধঅলা সঙ্গমদক্ষের মুখে মৃদু হাসি ফুটলো আর শিকারী বেড়ালের মতো তার গোঁফ একটু নড়ে উঠলো, রহমান নয় নাকি? তাহলে নামটা কি শুনতে পাই?
লোকটা তিনবার ঢোক গিলে বললো, আমার নাম হুমায়ুন কাদির।
তাই নাকি? তা রহমান সাহেব, কবে থেকে হুমায়ুন কাদির নামটা চলছে?
আমার নাম তো বরাবরই হুমায়ুন কাদির।
বরাবরই হুমায়ুন কাদির? বা বা বা—আপনার নাম বরাবরই হুমায়ুন কাদির! শাবাশ, বেড়ে বলেছেন রহমান সাহেব, থুড়ি হুমায়ুন কাদির সাহেব। বেড়ে বলেছেন।
বেড়ে বলেছেন ইত্যাদি ইত্যাদি।
সামনের লোকটা তখন ভয়ানক গম্ভীরভাবে বললো, ইয়ে, রহমান সাহেব, ওসব কথা থাক। আমাদের একটা খবর দিতে হবে। আপনাদের এক-একটা নাম কতদিন চলে? আর মোট কটি করে নাম আপনাদের এক-একজনের আছে? আর মোট কজন আপনারা আছেন? আমাদের মাত্র একটি নাম—আমার নাম গোলাম কবির, এর নাম গোলাম রব্বানী, এর নাম গোলাম নবী।
এক নিশ্বাসে এতগুলো কথা বলে লোকটা চুপ করে।
বাঁদিকের লোকটি, সে বড়ো চমৎকার দেখতে, তাকে সঙ্গমপ্রিয় বলা যায়, বললো, গোলাম রব্বানী আমার নাম।
ডানদিকের টেকো মোটা লোকটা, পুরনো ময়লা টাকার গন্ধ বেরুচ্ছে তার গা থেকে, বললো, আমার নাম গোলাম নবী।
কিছুক্ষণ সব চুপচাপ। তারপর গোলাম কবির খুব ধীরে ধীরে, গোপনে গালাগালি দেবার মতো করে দাঁতের ফাঁকে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, ঠিক আছে রহমান সাহেব, বাজে কথায় সময় নষ্ট করার দরকার কি? আপনি শুধু বলুন শেষ কবে আপনার নামটা বদলিয়েছেন? হুমায়ুন কাদির নামটা কবে নিলেন? আপনাকে সময় দেওয়া যাচ্ছে। বলে ডান হাতটা সে উঁচু করে ধরে। সঙ্গে সঙ্গে বাকি দুজনও ডান হাত তোলে।
লোকটা, হুমায়ুন কাদির, একটু কেঁপে কেঁপে উঠে বলে, আমি জানি না।
জানেন না, না? আচ্ছা মনে করে দেখুন তো দুমাস আগে মঙ্গলবার দিন সন্ধে সাতটা ঊনত্রিশ মিনিটে চার নম্বর মোড়ের দোকান থেকে পান খেয়েছিলেন। পান মুখে সিগারেট ধরিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়াতেই একটা সাইকেল আপনার গায়ের উপরে পড়ে, সাইকেলঅলা আপনাকে বলে, এখানে কি? অবিশ্যি তা আপনার শুনতে পাবার কথা নয়। আপনার নামটা কি সেদিনই রাখা হয়নি? বেশ করে ভেবে দেখুন, মনে পড়ে কি না?
হুমায়ুন কাদির চুপ করে বসে থাকে।
বুঝতে পারছি আপনি কিছুই স্বীকার করতে চান না। তাতে কিছু এসে যায় না অবিশ্যি। কারণ আমরা সবই জানি কাজেই আর কিছু জানার নেই। কারণ আমরা কিছুই জানি না অতএব আর কিছুই জানার নেই। ঠিক আছে, বলুন আজ সন্ধেয় কোথায় গিয়েছিলেন? গোলাম কবির একটু গলা তুলে বলে, কোথায়?
বাকি দুজন বলে, কোথায়?
আয়, আয়, আয়, আয়—শব্দ উঠলো।
সূর্যাস্ত দেখতে গিয়েছিলাম।
কোথায় গিয়েছিলেন বললেন? সূর্যাস্ত দেখতে গিয়েছিলাম? হ্যাঁ, দেখবার মতোই জিনিস বটে। চমৎকার ধাপ্পা। আমাদের বন্ধু সূর্যাস্ত দেখতে গিয়েছিলেন—বলে গোলাম কবির গোঁফের তলায় মৃদু মৃদু হাসতে শুরু করে।
হুমায়ুন কাদির বিস্ফারিত চোখে চেয়ে দেখে মৃদু হাসিটা তার অল্পে অল্পে উঁচুতে উঠছে, হাসির মধ্যে বহু কষ্টে একবার বলে, সূর্যাস্ত, বাঃ সুন্দর কথা, সূর্যাস্ত—বলতে বলতে হো হো করে হাসতে শুরু করে সে, দমকে দমকে হাসি উঠে আসতে থাকে তার নাভি থেকে—হাঃ হাঃ হাঃ বলে কিনা সূর্যাস্ত, হাঃ হাঃ হাঃ বলে কিনা সূর্যাস্ত। চারদিক থেকে প্রকাণ্ড প্রতিধ্বনি হুড়মুড় করে ছুটে আসে, আস্ত আস্ত আস্ত—হাসির দমকে ছাদ ফেটে যাবার দশা। গোলাম কবির একটানা হেসে যায়, খানিকক্ষণের মধ্যে তার দুচোখে পানি জমে যায় টলটলে হয়ে, মুখ টকটকে লাল হয়ে যায়। কপাল ছেড়ে চোখ দুটো ঠিকরে বাইরে চলে আসার উপক্রম হয়। একনাগাড়ে বলতে থাকে, সূর্যাস্ত বললেন তাই না? তা কেমন দেখতে জিনিসটা? কি রং, কি মাপ—কত ফিট বাই কত ফিট, ওপরটা কেমন, ভেতরটা কেমন—মানে অভ্যন্তর ভাগ? আপনার বউয়ের ইয়ের মতো নাকি? এইখানে সূর্যাস্ত দেখাতে এসেছেন? বলেই হাসি একেবারে বন্ধ করে দিয়ে ভয়ানক গম্ভীর হয়ে গোলাম কবির বললো, আসলে কথাটা বলুন, কতজন ছিলেন?
আর তো কেউ ছিলো না।
পাঁচজন তো ছিলোই। আপনাকে ভালো কথায় বলছি। পাঁচজন নিশ্চয়ই ছিলো। কোথায় বসেছিলেন আপনারা? আর কার কার আসার কথা ছিলো? তাদের নাম-ধাম বলুন। আমাদের কাছে নিশ্চিত খবর আছে, দুদিন আগে বেলা দুটোর সময় আপনারা বলেছিলেন, ভেবে দেখতে হবে। কি ভেবে দেখতে চেয়েছিলেন আপনি? অতো ভাবাভাবির কি আছে? তারও আগে একদিন সন্ধেবেলায় একজন যখন আপনাকে জিগগেস করে, এ বিষয়ে আপনার মত কি? সঙ্গে সঙ্গে জবাব না দিয়ে আপনি কিনা তাকে বললেন, চিন্তা করে দেখতে হবে। একবার ভেবে দেখবেন, একবার ভাবনাচিন্তা করে দেখবেন—ওসব বেয়াদবি আপনাকে কে করতে বলেছে? জানেন না সব ভাবনাচিন্তা আপনার অনেক আগেই করা হয়ে গেছে? কি? জানেন না নাকি? চুপ করে রইলেন যে!
হুমায়ুন কাদির অসহায়ভাবে বললো, আমি একটুও ভাবনাচিন্তা করতে চাই না। আপনাআপনি এসে যায়। গোলাম কবির ভেংচি কেটে বললো, আপনাআপনি এসে যায়। আচ্ছা গেল। এরও আগে একদিন শনিবার বিকেলবেলায় আপনি কান উঁচু করে—আপনি জানতেন না আপনার পাছাও উঁচু হয়ে গিয়েছিল—বলে একটু চোখ মেরে গোলাম কবির কথাটা শেষ করলো, আপনি কান উঁচু করে বলেছিলেন, একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
গোলাম রব্বানী, গোলাম নবী একসঙ্গে একটা একটা করে বলে, আপনি কান উঁচু করে বলেছিলেন, একটা শব্দ শুনতে পাচ্ছি।
প্রতিধ্বনি শোনা গেল, ছি—ছি—ছি—।
গোলাম কবির একটু দেরি করে বলে, একথা কেন বলছিলেন?
হুমায়ুন কাদির খুবই বিব্রত, এলোমেলো; হাবার মতো বলে, আমরা শিক্ষিত লোক।
মুখের কথা কেড়ে নিয়ে গোলাম কবির বলে, হ্যাঁ, শিক্ষিত লোকের কান গাধার মতো লম্বা হয়ে গেছে। যাকগে, যাকগে—এইভাবে দেখা যাচ্ছে আপনি বলেছেন, গন্ধ পাওয়া যায় কিংবা গরম লাগছে বা বিস্বাদ মনে হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, এসব কথা আপনি একবার নয়, বার বার বলেছেন। খেতে বসে বলেছেন, দিনকাল খারাপ। বলে বাঁ হাত মাটিতে ঠুকেছেন, তাতে আপনার বাঁ হাতের কড়ে আঙুলে আঘাত লাগে, একটা বিড়েল আহত হয়। অথচ আপনি ভালো করেই জানেন—বলে গোলাম কবির ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ায়, একবার বাঁদিকে ফিরে চোখ সামান্য কাঁপায়, তারপর ডানদিকে ফিরে একইভাবে চোখ কাঁপায়, তাতে গোলাম রব্বানী ও গোলাম নবী অনিচ্ছার সঙ্গে ক্লান্তভাবে উঠে দাঁড়ায়। তারা স্থির হয়ে দাঁড়ালে গোলাম কবির তাদের দিকে একটু ঘাড় ঝুঁকিয়ে শুরু করে, অথচ আপনি ভালো করেই জানেন যে বচনে বা রটনায় বা ইঙ্গিতে বা ব্যবহারে—
বাকি দুজন মাটির দিকে চেয়ে ধীরে ধীরে আবৃত্তি করে যায়, বচনে বা রটনায়, ইঙ্গিতে বা ব্যবহারে—
এই হলো এক নম্বর।
এই হলো এক নম্বর।
নিদ্রায় বা স্বপনে বা জাগরণে—গোলাম কবির আবার শুরু করে।
নিদ্রায় বা স্বপনে বা জাগরণে—অন্য দুজন প্যানপেনে গলায় বলে।
এই হলো দুনম্বর।
এই হলো দুনম্বর।
খেতে, শুতে, উঠতে, বসতে, রাজদ্বারে, শ্মশানে, গোরস্তানে, আহারে, বিহারে বা নারী সহবাসে—অন্য দুজন একইভাবে বলে যায়, খেতে, শুতে, উঠতে, বসতে, রাজদ্বারে, শ্মশানে, গোরস্তানে, আহারে, বিহারে বা নারী সহবাসে—
ইত্যাদি—
ইত্যাদি—
এবম্প্রকার, উল্টোসিধে কোনো প্রকার
এবম্প্রকার, উল্টোসিধে কোনো প্রকার
নিষেধ।
নিষেধ।
এই হলো তিন নম্বর।
এই হলো তিন নম্বর।
গোলাম কবির দুহাত দুদিকে বাড়িয়ে ইশারা করলে গোলাম রব্বানী এবং গোলাম নবী অসন্তুষ্ট মুখে বসে পড়ে।
গোলাম কবির কিন্তু স্থির হয়ে দাঁড়িয়েই থাকে। আস্তে আস্তে সে তার রোগা বুকটা চিতিয়ে দেয়, হাতা-গোটানো বাঁদুরে হাত দিয়ে জামার কলার ঠিকঠাক করে, দুবার কাশে, দুবার গলা ঝাড়ে—একবার নাক ঝাড়ে, তিনটে বল্টু খুলে যাবার ঘটাং ঘটাং শব্দ হয়—ঘ্‌র্‌রর করে বুকের মধ্যে একটা চাকা চালু হবার আওয়াজ আসে। তারপর অতি দ্রুত সে তার গলার ভিতর থেকে বাজ ফেলতে থাকে। ঘনঘন বাজ পড়ার আওয়াজে আর বিকট প্রতিধ্বনিতে হুমায়ুন কাদিরের কানে তালা লেগে যায়। কোনো রকমে সে শুনতে পায়, আমরা নিজেরা নিজেরা একতা আইন-শৃঙ্খলা দাঁড়িয়ে বসে বা মাটিতে শুয়ে যদি তা কোনদিন দেখিয়ে দিতে পারি একসঙ্গে একসঙ্গে যে যেখানে আছে ঠিকঠাক পরিকল্পনা
বেশ। তাহলে এই আপনার শেষ কথা? তাহলে এই হচ্ছে আপনার সর্বশেষ মারাত্মক জঘন্য—
অন্য দুজন একটু নড়েচড়ে বললো, আপনার সর্বশেষ মারাত্মক জঘন্য—
গোলাম কবির ভয়াবহ চিৎকার করে উঠলো। তার রগের দুপাশে শিরা উঁচু হয়ে উঠে চোখে রক্ত দেখা দিলো। লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে দুহাতে পাঁজর চেপে ধরে বিরাট একটা দম নিয়ে সে ফেটে পড়লো, বলুন।
চারটে শাদা দেয়াল একসঙ্গে দুলতে থাকে। আলো কমে আসে। আবছা আলোর মধ্যে হুমায়ুন কাদির দেখতে পায় তিনজন একসঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বড়ো বড়ো শাদা দাঁত বের করে বোমার মতো ফেটে পড়লো, বলুন। তিনজনে একসঙ্গে তার দিকে আঙুল উঁচিয়ে রাগে কিশকিশ করতে করতে বললো, এই শেষ তাহলে।
বলেই গোলাম কবির লাফ দিয়ে টেবিল ছেড়ে মেঝেয় দাঁড়িয়ে বললো, তাহলে শুরু করা যাক। বাঁশ দুটো কোথায়!
গোলাম নবী মুহূর্তে উধাও হয়ে গিয়ে একজোড়া হাত চারেক লম্বা বাঁশ নিয়ে ফিরে আসে। তখন গোলাম কবির হুমায়ুন কাদিরের কাছে এসে বললো, জামাটা খুলুন।
সে জামা খোলে।
গেঞ্জিটাও খুলুন।
গেঞ্জি খোলা হলে সে বলে, জুতো-মোজা খুলে ফেলুন। হ্যাঁ, এইবার মেঝেয় হাঁটু গেড়ে বসুন।
হুমায়ুন কাদির হাঁটু গেড়ে বসলো।
খুবই সহানুভূতির সঙ্গে তার হাত দুটো উপরের দিকে তুলতে তুলতে গোলাম কবির বলে, হাত দুটো এই রকম করে তুলুন।
সে হাঁটু গেড়ে খালি গায়ে হাত তুলে বসলে গোলাম কবির বলে, রব্বানী তোমার সেই দামেস্কের ছুরিটা কই?
বিরাট শাদা একটা ছুরি বের করে গোলাম রব্বানী বললো, এই যে।
গোলাম কবির নির্দেশ দেয়, এদিকে এগিয়ে এসো, এর ঠিক পিঠের কাছে দাঁড়াও। মাত্র একবার চান্স পাবে। হ্যাঁ ঠিক আছে। এইভাবে দাঁড়িয়ে থাকো। এসো গোলাম নবী। বাঁশ দুটো গলার দুদিকে ঘাড়ের উপর একটা, গলার দিকে একটা লাগাও। এই আমি এদিকটা ধরছি—ওদিকটা তুমি। মাত্র একবার চাপ দেবে, মনে আছে? আচ্ছা রহমান সাহেব, দুমিনিট ইচ্ছে হলে কিছু ভেবে নিন।

[অনেককাল আগে একবার সবুজ ঘাসের মধ্যে শুইয়া আকাশের দিকে চাহিয়াছিলাম। উহার এক প্রান্ত হইতে আর এক প্রান্ত দেখা গিয়াছিল, উহা হালকা নীল ছিলো। পরে উহা চুম্বনের দাগের মতো মিলাইয়া যায়। ইহার পর মানুষের জগতে ফিরিয়া আসি—তাহাতে নোনা টক গন্ধ আছে এবং আক্রোশ ও ঘৃণা রহিয়াছে এবং ভালোবাসা ও মমতা রহিয়াছে। মানুষের জীবনে কোথায় অন্ধকার তাহার সন্ধান করিতে গিয়ে আমি ঘন নীল একটি ট্যাবলেটের সন্ধান পাই—মানুষ যে সামাজিক, সে নিজের ইতিহাস জানিতে চাহিয়াছে, তাহাতে সর্বদাই অন্ধকার নর্তনকুর্দন করিতেছে। তবু আমি মানুষেরই কাছে প্রার্থনা জানাইব—কারণ মানুষেই মানুষের গা ঘেঁসিয়া বসিয়া থাকে—যদিও ঐ দাগ দেখা যায় না। অসংখ্যবার সঙ্গম করিয়াও যেমন আমি নারীতে ঐ দাগ কখনো দেখি নাই। কোথাও কিছু পাই নাই বলিয়াই বাধ্য হইয়া আমি শেষ পর্যন্ত মানুষের কাছেই প্রার্থনা ও আবেদন জানাইব। ইতিমধ্যে সব কিছু চমৎকার ঘটিয়াছে। অবশ্য অনেক কিছু্ই বাকিও রহিয়া গেল কারণ কিছুই শেষ হইবার নহে।]

Monday, February 14, 2022

দক্ষিণ এশিয়ার দুঃখ কাশ্মির? by মো. জাকির হোসেন

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় সাত হাজার ফুট ওপরে সবুজ উপত্যকা আর শান্ত হ্রদে ঘেরা কাশ্মির। পাইন, ফার, বার্চ গাছের সারি, নীল আকাশে মাথা গুঁজে থাকা পর্বতজুড়ে মেঘের খেলা। গভীর গিরিখাদের নিচে উন্মত্ত পাহাড়ি নদী। কাশ্মিরের সৌন্দর্যসুধা পান করতে পর্যটকেরা আর হামলে পড়েন না। কবি-সাহিত্যিকরা কাশ্মিরের নেশায় বুঁদ হয়ে আজকাল আর কবিতা-সাহিত্য-গল্প-উপন্যাস রচনা করেন না। যে কাশ্মির হতে পারতো দক্ষিণ এশিয়ার অহংকার, সেই কাশ্মির আজ  পরিণত হয়েছে দক্ষিণ-এশিয়ার অভিশাপে। এশিয়ার এ অঞ্চলের নিরন্তর দুঃখ এখন কাশ্মির। পৃথিবীর স্বর্গ খ্যাতি পাওয়া কাশ্মিরের ঝিলম নদীর তীরে, ডাল লেকের শিকারায় (ডিঙ্গি নৌকা) কাশ্মিরের প্রিয় বাদ্যযন্ত্র সন্তুরের আওয়াজ থেমে গেছে অনেক দিন আগেই। তার বদলে এখন পুরোদস্তুর মর্টার-গ্রেনেড বা পেলেট গান (ভয়ঙ্কর মারণাস্ত্র)-এর আওয়াজে প্রকম্পিত কাশ্মির। কাশ্মিরকে ঘিরে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে পরমাণু যুদ্ধের চোখ-রাঙানি এখন মাঝে-মধ্যেই আতঙ্কিত করে পৃথিবীর জনগোষ্ঠীর চার ভাগের এক ভাগ অধ্যুষিত দক্ষিণ এশিয়ার মানুষদের।
পাকিস্তান-ভারত দ্বন্দ্ব, উত্তেজনা আর অস্ত্র প্রতিযোগিতা এ অঞ্চলের উন্নয়নের পথে অন্যতম অন্তরায়। সামরিক খাতে ব্যয়ের দিক থেকে সারা বিশ্বে ভারতের অবস্থান পঞ্চম আর এশিয়ায় দ্বিতীয়। তাদের সামরিক ব্যয়ের অংক ৫ হাজার ৬০০ কোটি ডলার। স্টকহোম পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এসআইপিআরআই)-এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১৮ সালে বিদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি অস্ত্র আমদানি করেছে ভারত। এর জেরে বিশ্বে এখন অস্ত্র আমদানিতে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে দেশটি। বিশ্বে মোট অস্ত্রের ৯.৫ শতাংশই এখন ভারতের হাতে। আর মোট আমদানিকৃত অস্ত্রের ১৩ শতাংশই ভারতের। পাকিস্তানের অর্থনীতি এতটাই চাপের মধ্যে পড়েছে যে প্রায় দেউলিয়া হওয়ার উপক্রম হয়েছে। পাকিস্তানের অর্থনীতিকে বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানকে অন্য রাষ্ট্রের কাছে হাত পাততে হচ্ছে। এরই মাঝে  প্রতিরক্ষা খাতে পাকিস্তান ২০১৮-১৯ অর্থবছরে মোট বরাদ্দ দিয়েছে ১১০০ বিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি (৯৬০ কোটি ডলার)। এবারই প্রথম দেশটির সামরিক বাজেট ট্রিলিয়ন রুপির কোটা ছাড়িয়ে গেছে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে সামরিক খাতে পাকিস্তানের বরাদ্দ ছিল ৬০০ বিলিয়ন ডলার। সে তুলনায় গত পাঁচ বছর পর এবার শতকরা ৮৪ ভাগ বরাদ্দ বেড়েছে। ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস ) সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, ১৪ লাখ সেনা সদস্যের জন্য ২০১৮ সালে ভারত সামরিক খাতে বরাদ্দ করেছিল চার ট্রিলিয়ন রুপি (৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। এই পরিমাণ অর্থ দেশটির জিডিপির ২ দশমিক ১ শতাংশ।
অন্যদিকে পাকিস্তান তার ৬ লাখ ৫৩ হাজার ৮০০ সেনা সদস্যের জন্য গত বছর ১ দশমিক ২৬ ট্রিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি (১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার) বাজেট বরাদ্দ করেছিল, যা দেশটির জিডিপির প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এছাড়া ২০১৮ সালে ইসলামাবাদ ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিদেশি সামরিক সহায়তা পেয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, দুই দেশের মধ্যে একটি যুদ্ধ বেঁধে গেলে তা পরবর্তী দীর্ঘ সময় অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হয়ে উঠবে। যুদ্ধে শুধু ভারতের ক্ষতি প্রতিদিন পাঁচ হাজার কোটি রুপি ছাড়িয়ে যাবে। এমনকি যুদ্ধ যদি দুই সপ্তাহ দীর্ঘ হয় তবে ভারতের ক্ষতি হবে কমপক্ষে দুই লাখ ৫০ হাজার কোটি রুপি। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে ভারতের রাজস্ব ঘাটতি ৫০ শতাংশ বেড়ে হবে প্রায় আট লাখ কোটি রুপি। যুদ্ধের একটি বড় ধরনের প্রভাব পড়বে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং পর্যটনে। ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপির ব্যাপক দরপতন হবে। পুলওয়ামার হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নিতে ভারত পাকিস্তানের বালাকোটে যে বিমান হামলা চালিয়েছে, কেবল তাতেই ৬ হাজার ৩০০ কোটি রুপি ব্যয় হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ভারত তার প্রতিরক্ষার জন্য বছরে খরচ করে মাথাপিছু ১০ ডলার আর পাকিস্তান করে ২৬ ডলার। স্বাস্থ্য ও শিক্ষাখাতে ভারত খরচ করে মাথাপিছু ১৪ ডলার আর পাকিস্তান খরচ করে ১০ ডলার। পাকিস্তান ও ভারত যে পরিমাণ অর্থ সামরিক খাতে ব্যয় করে, তা দিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আনা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, একটি ট্যাংকের যে দাম, তা দিয়ে ৪০ লাখ শিশুকে প্রাণঘাতী অসুখের প্রতিষেধক টিকা দেওয়া সম্ভব। একটি ট্যাংকের দাম ৪০ লাখ মার্কিন ডলার। আর একটি শিশুকে প্রাণঘাতী ছয় রোগের বিরুদ্ধে টিকা দিতে খরচ হয় মাত্র এক ডলার। ভারতীয় বিমানবাহিনীতে সংযুক্ত একটি মিরেজ-২০০০ যুদ্ধবিমানের দাম ৯ কোটি মার্কিন ডলার। আর একটি শিশুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক বছর পড়ালেখার জন্য গড় খরচ হয় ৩০ ডলার। মিরেজ-২০০০ যুদ্ধবিমান কেনা না হলে ওই অর্থে ৩০ লাখ শিশুর প্রাথমিক শিক্ষার খরচ মেটানো সম্ভব। উভয় দেশের রয়েছে কয়েক ডজন অত্যাধুনিক সাবমেরিন। আনুষঙ্গিক সাজসজ্জাসহ আধুনিক একটি সাবমেরিনের দাম ৩০ কোটি মার্কিন ডলার। অন্যদিকে একজনকে এক বছরের জন্য সুপেয় পানি সরবরাহ করতে ব্যয় হয় পাঁচ ডলার। অর্থাৎ একটি সাবমেরিন কেনা মানে ছয় কোটি লোককে সুপেয় পানি থেকে বঞ্চিত করা। এসআইপিআরআইয়ের তথ্য অনুসারে, পাকিস্তানের ১৪০ থেকে ১৫০টি পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র আছে। অন্যদিকে ভারতের আছে ১৩০ থেকে ১৪০টি। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ যদি পারমাণবিক হয় তবে তার ক্ষতি হবে বহুমুখী। নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী ইন্টারন্যাশনাল ফিজিশিয়ানস ফর দ্য প্রিভেনশন অব নিউক্লিয়ার ওয়ার এবং ফিজিশিয়ানস ফর সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি এই দুটি সংগঠনের গবেষণামূলক এক প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে, কোনও কারণে শেষ পর্যন্ত ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে পারমাণবিক যুদ্ধ বাঁধলে অন্তত ২০০ কোটি মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এতে প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে মানবসভ্যতা। দুই দেশের মধ্যে সীমিত পর্যায়ে পারমাণবিক অস্ত্রের লড়াই হলেও বিশ্বের আবহাওয়া মণ্ডলের ব্যাপক ক্ষতি ও শস্যক্ষেত্র ধ্বংস হবে। পরিণামে খাদ্যপণ্যের বিশ্ববাজারে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। বিশ্বে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে। খাদ্য জোগানে দেখা দেবে বিশৃঙ্খলা।
চির বৈরী পাকিস্তান ও  ভারতের মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা কোনও ভালো খবর নয়। দেশ দুটি সামরিক খাতে ব্যয় বরাদ্দ বাড়িয়েই চলেছে। ভারত ও পাকিস্তানে সামরিক খাতে ব্যাপক অগ্রগতি হলেও সামাজিক খাতে অগ্রগতি হয়েছে অতি সামান্যই। ভারত ও পাকিস্তানে ব্যাপক দারিদ্র্য রয়েছে। শিশুরা অপুষ্টির শিকার হচ্ছে। মায়েরা সন্তান জন্ম দেওয়ার সময় মারা যাচ্ছেন। ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশ মিলিয়ে ৭০ কোটির বেশি মানুষ অনাহারে, চূড়ান্ত কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বিরাট সংখ্যক মানুষের কাজের সংস্থান নেই। কৃষক, শ্রমিক, কর্মহীন অসংখ্য মানুষ ঋণের ভারে বিপর্যস্ত। এই ভয়ঙ্কর ব্যবস্থায় বেঁচে থাকতে না পেরে তাদের কেউ কেউ আত্মহত্যা করছেন। কেউবা বাঁচার চেষ্টায় নিজের সন্তানকে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন, কেউবা নিজের অঙ্গ বিক্রি করে বেঁচে থাকার সংগ্রাম করছেন। বিশ্বের ১১৯টি দেশকে নিয়ে সম্প্রতি প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক-২০১৮ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছরের তুলনায় তিন ধাপ পিছিয়েছে ভারত; গত বছর ভারতের অবস্থান ছিল ১০০ নম্বরে, এবার ১০৩ নম্বরে। ভারতের চেয়েও তিন ধাপ পেছনে ১০৬ নম্বরে রয়েছে পাকিস্তান। ভারত-পাকিস্তানের মধ্যকার বিবাদের কারণে বছরে দু’দেশে বাণিজ্যিক ক্ষতি হচ্ছে ৩৫ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দু’দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ২ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৩৭ বিলিয়ন ডলার হতে পারে যদি দিল্লি ও ইসলামাবাদ সব ধরনের বিরোধ মিটিয়ে নেয়। দেশ থেকে দ্রারিদ্য দূর করতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে বাণিজ্যের বিস্তার করতেই হবে।
ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যে কয়টি সীমিত পরিসরে যুদ্ধ হয়েছে তার একটি বাদে সব ক’টিই কাশ্মিরকে ঘিরে। কাশ্মিরকে ঘিরে কেন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে এ সর্বনাশা বৈরিতা? ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা যখন বিদায় নেয় তখন ভারত উপমহাদেশে প্রিন্সলি স্টেট নামে পরিচিত ছোট-বড় ৫৬২টি স্বাধীন অঞ্চল ছিল। এরা ব্রিটিশ উপনিবেশের আওতামুক্ত ছিল এবং এ দেশীয় রাজন্যবর্গরা এ অঞ্চলগুলো শাসন করতো। উপমহাদেশের বিভক্তির সময় এ স্বাধীন অঞ্চলগুলোকে ভারত কিংবা পাকিস্তান রাষ্ট্রে যোগ দেওয়া বা স্বাধীন থাকার মধ্যে একটি বেছে নেওয়ার কথা বলা হয়। সীমানা চিহ্নিত হওয়ার পর ভারতের স্টেটগুলো ভারতে এবং পাকিস্তানেরগুলো পাকিস্তানে যোগ দেয়। কিন্তু ৩টি স্টেট স্বাধীন থাকতে চেয়েছিলো। হায়দ্রাবাদ, জুনাগড় এবং জম্মু ও কাশ্মির। এদের মধ্যে হায়দ্রাবাদ এবং জুনাগড় ছিল হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু তাদের রাজা ছিল মুসলিম। জুনাগড়ের জনগণ বিক্ষোভ করে ভারতে যোগদান করার জন্য, ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনী অ্যাকশনে যায় এবং দখল করে নেয়। আর চারদিকে ভারতবেষ্টিত হায়দ্রাবাদের শাসক ছিলেন নিজাম উসমান আলি খান। নিজাম স্বাধীন থাকার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি একটি ফরমানের মাধ্যমে ঘোষণা করেন হায়দ্রাবাদ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে থাকবে এবং ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দেবে না। তবে ভারত সরকার তার এই ফরমান প্রত্যাখ্যান করে এবং এর আইনত বৈধতা নেই বলে দাবি করে। ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনী হায়দ্রাবাদে প্রবেশ করে। নিজাম উসমান আলি খান ভারতকে প্রতিহত করতে সক্ষম ছিলেন না তাই আত্মসমর্পণে বাধ্য হন। হায়দ্রাবাদ পরাজিত হয় এবং ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ে। অপরদিকে জম্মু এবং কাশ্মিরের জনসংখ্যা ছিল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কিন্তু রাজা ছিল হিন্দু হরি সিং। হরি সিং চাইছিলেন স্বাধীন থাকতে অথবা ভারতের সঙ্গে যোগ দিতে। অন্যদিকে পশ্চিম জম্মু এবং গিলগিট-বালতিস্তানের মুসলিমরা চাইছিলেন পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দিতে। ১৯৪৭ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের মদতে পাশতুন উপজাতীয় বাহিনীগুলো কাশ্মির আক্রমণ করে মুজাফফরাবাদ দখল করে শ্রীনগর অভিমুখে রওনা করে। আক্রমণের মুখে হরি সিং ভারতের সামরিক সহায়তা চাইলে ভারত সহায়তার বিনিময়ে কাশ্মিরকে ভারতে যোগ দেওয়ার শর্ত জুড়ে দেয়। হরি সিং কাশ্মিরের ভারতে অন্তর্ভুক্তির চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন এবং ভারতের সামরিক সহায়তা পান। পরিণামে ১৯৪৭ সালেই শুরু হয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ– যা চলেছিল প্রায় দু’বছর ধরে। ১৯৪৮ সালে ভারত জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে কাশ্মির প্রসঙ্গ উত্থাপন করে। জাতিসংঘের ৪৭ নম্বর প্রস্তাবে কাশ্মিরে গণভোট, পাকিস্তানের সেনা প্রত্যাহার এবং ভারতের সামরিক উপস্থিতি ন্যূনতম পর্যায়ে কমিয়ে আনতে আহ্বান জানানো হয়। কাশ্মিরে যুদ্ধবিরতি বলবৎ হয় ১৯৪৮ সালে। তবে পাকিস্তান সেনা প্রত্যাহার করতে অস্বীকার করে। তখন থেকেই কাশ্মির কার্যত পাকিস্তান ও ভারত নিয়ন্ত্রিত দুই অংশে ভাগ হয়ে যায়। অন্যদিকে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে চীন কাশ্মিরের আকসাই-চীন অংশটিতে নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে। তার পরের বছর পাকিস্তান কাশ্মিরের ট্রান্স-কারাকোরাম অঞ্চলটি চীনকে উপহার হিসাবে দেয়। সেই থেকে কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তান, ভারত ও চীন– এই তিন দেশের মধ্যে ভাগ হয়ে আছে। এক হিসাব মতে,কাশ্মিরের ৬০ ভাগ ভারতের (শ্রীনগর, জম্মু ও কাশ্মির, লাদাখ), ৩০ ভাগ পাকিস্তানের (আজাদ কাশ্মির) এবং ১০ ভাগ চীনের (আকসাই-চীন, সিয়াচেন) অধীনস্থ হয়েছে।
কাশ্মির সমস্যার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভারতীয় ইতিহাসবিদ ড. কিংশুক চ্যাটার্জি বলছেন, ‘ইনস্ট্রুমেন্ট অব অ্যাক্সেশনের (অন্তর্ভুক্তি চুক্তি) মাধ্যমে কাশ্মির ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু যে শর্তে হয়েছিল কালক্রমে ভারত তা থেকে অনেকটা সরে এসেছে। পাকিস্তানও জোর করেই এই অ্যারেঞ্জমেন্টের মধ্যে প্রবেশ করেছে। ফলে সাতচল্লিশে এই সমস্যার শুরু হলেও এখন সেই সমস্যা অনেক বেশি জটিল আকার নিয়েছে।’ অনেকটা এই কথার সুরেই  কাশ্মিরের হিন্দু রাজাদের বংশধর ড. করন সিং সম্প্রতি ভারতের পার্লামেন্টেও বলেছেন, যে শর্তে তার বাবা নিজের রাজ্যকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন, দিল্লি তার মর্যাদা দিতে পারেনি। ড. সিং বলেছেন, ‘যেদিন আমার বাবা সেই চুক্তিতে সই করেন সেদিন থেকেই জম্মু ও কাশ্মির ভারতের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ তাতে কোনও সন্দেহ নেই। ২৭ অক্টোবর তারিখে সেদিন আমি নিজেও ওই ঘরে উপস্থিত ছিলাম।’ ‘কিন্তু মনে রাখতে হবে, মহারাজা হরি সিং কিন্তু প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ও বৈদেশিক সম্পর্ক- শুধু এই তিনটি ক্ষেত্রে ভারতভুক্তি স্বীকার করেছিলেন, নিজের রাজ্যকে ভারতের সঙ্গে পুরোপুরি মিশিয়ে দেননি। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জম্মু ও কাশ্মিরকে যে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে সেটা অস্বীকার করার উপায় নেই’।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, কাশ্মির বিশেষ স্বাধীন মর্যাদার এমন এক রাজ্য, যার নিজের আলাদা সংবিধান, পতাকা ইত্যাদি আছে। আর এই বিশেষ মর্যাদার কথাগুলোর স্বীকৃতি আছে ৩৭০ অনুচ্ছেদে। সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ একটা অস্থায়ী প্রভিশন যা এখন অকার্যকর– এই দাবিতে করা একটি রিট মামলা ভারতের সুপ্রিম কোর্ট গত ৩ এপ্রিল ২০১৮ নাকচ করে দিয়েছে। উল্লেখ্য, কাশ্মিরের  অন্তর্ভুক্তির পর  প্রথমদিকে কোনও ভারতীয় নাগরিককে কাশ্মির যেতে হলে সীমান্ত অতিক্রম করার জন্য পারমিট নিতে হতো। পরবর্তী সময়ে পারমিট প্রথা প্রত্যাহার করা হয়।
কাশ্মির সমস্যা শিকড়-বাকড় ছড়িয়ে জটিল রূপ ধারণ করেছে। কাশ্মিরের জনগণের চাওয়া এখন একাধিক ধারায় বিভক্ত। কাশ্মিরের প্রয়াত নেতা ন্যাশনাল কনফারেন্সের শেখ আবদুল্লাহর সেক্যুলার স্বায়ত্তশাসনের দাবি ইসলামিকরণ হয়ে আজাদির দাবিতে পরিণত হয়েছে, যা ভারত সরকারের পক্ষে গ্রহণ করা কঠিন।কাশ্মিরিরা তাদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের দাবি থেকে সরে আসবেন না। আর এ ক্ষেত্রে পাকিস্তানও তাদের মদত দিতেই থাকবে। কারণ, এছাড়া পাকিস্তানেরও গতি নেই। কাশ্মিরিদের সাহায্য, সহযোগিতা, সমর্থন না দিয়ে পাকিস্তানে কোনও সরকারই টিকে থাকতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী কর্তৃক সরকার উৎখাতের সম্ভাবনাই বেশি। এদিকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হুরিয়ত কনফারেন্স খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়ে গেছে। সৈয়দ শাহ জিলানির নেতৃত্বাধীন অংশটি চায় পাকিস্তানে ‘যোগ’ দিতে। ইয়াসিন মালিকের নেতৃত্বাধীন অংশটি আজাদি চায়। অন্যদিকে রাজ্যের দুটি অংশ আজাদির বিপক্ষে। হিন্দু-অধ্যুষিত জম্মু ভারতের সঙ্গে যোগ দিতে চায় আর বৌদ্ধ-অধ্যুষিত লাদাখ ভারতের ইউনিয়ন টেরিটরি হিসেবে থাকতে চায়। ফলে আজাদির দাবিটি মূলত সেই উপত্যকার, যেখানকার ৯৮ শতাংশ মানুষ মুসলমান। ভারত বা পাকিস্তান কেউই জিতবে না বা হারবে না, কাশ্মিরের জনগণের সম্মানহানিও হবে না কাশ্মির সমস্যার এমন একটি বাস্তবসম্মত সমাধান নিয়ে শেখ আবদুল্লাহ পাকিস্তানের সাথে আলোচনা চালানোর সময় নেহরুর মৃত্যু হয়। হাতছাড়া হয়ে যায় সমস্যা সমাধানের সুবর্ণ সুযোগ।
বিশ্বের আয়তনের মাত্র ৩ ভাগ ভূমি সার্ক অঞ্চলভুক্ত হলেও বিশ্বের অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকের বাস দক্ষিণ এশিয়ার সার্কভুক্ত দেশগুলোতে। প্রায় এক-চতুর্থাংশ জনসংখ্যা নিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে সার্কভুক্ত দেশগুলোর অবদান মাত্র ৯.১২ ভাগ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে বিদ্যমান দারিদ্র্য, অশিক্ষা, বৈষম্য নিরসন করে সম্মিলিত উদ্যোগ ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে মানুষের জীবন মান উন্নয়ন ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ও আস্থার পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে যে আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা সার্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো তা আজ পুরোপুরি অকেজো।

ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ কেবল এ দু’দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং পুরো দক্ষিণ এশিয়া এর দ্বারা নানাভাবে প্রভাবিত হয়। বিশেষ করে সার্কভূক্ত অন্যান্য রাষ্ট্রগুলোর অর্থনীতি, বাণিজ্য ও বাজারে যে ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে তার ফলশ্রুতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এ অঞ্চলের দরিদ্র মানুষেরা। পৃথিবীর স্বর্গ যে কাশ্মির দক্ষিণ এশিয়ার গর্ব ছিলো, তা-ই আজ দক্ষিণ এশিয়ার দুঃখ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে পাকিস্তান-ভারত দুই দেশের অবিমৃশ্যকারিতার জেরে।
লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

Monday, February 7, 2022

প্রিয় অবন্তিকা... by নীলাস্পর্শী নীলিমা

-'এই অলক্ষী মেয়েকে বাসা থেকে বের করবে কিনা বলো?'

-'ছিঃ!!! নিজের সন্তান, মেয়েকে কেউ অলক্ষী বলে?'

-'নিজের সন্তান?!!! মেয়ে?!!!! হাহ্।আগে যদি জানতাম তাহলে ওকে এই দুনিয়াতেই আসতে দিতাম না।ভুল করেছি ওর জন্মের পর যদি ওকে মেরে ফেলতাম তাহলে এখন ওকে দু'চোখে দেখতে হতো না আর আমিও শান্তিতে থাকতে পারতাম। ভেবেছিলাম ছেলে হবে। মেয়ে হলেও মেনে নিতাম। কিন্তু এমন একটা অপয়া, অলক্ষী মেয়ে আমার ঘরে আসবে তা কি জানতাম?'

-'তুমি কি মানুষ নাকি অন্য কিছু? আজ আমার মা, বাবা, শ্বশুর, শাশুরি বেঁচে থাকলে হয়ত আমাকে, অবন্তিকাকে সাপোর্ট করত। তোমার আমাদের সাথে থাকতে ভালো না লাগলে আরেকটা বিয়ে করো। কিন্তু আমি আমার সন্তানকে কোথাও পাঠাব না। কারণ আমি যে ওর মা। মেয়েটার জন্মের পর থেকেই তুমি ওর সাথে খারাপ ব্যবহার করে আসছ। জানি না আল্লাহ্‌ তোমাকে কবে হেদায়েত করবে।'

-'হ্যাঁ হয়েছে তোমার বকবক থামাও অসহ্য লাগে। অফিসে গেলাম।'

-'খেয়ে যাও।'

-'তোমার খাওয়া তুমি-ই খাও।এই এখানে কি হা?'
সর এখান থেকে।"

অবন্তিকাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে অফিসে চলে গেল ওর বাবা।

এতক্ষণ কথা হচ্ছিল ইলিয়াস আর নীরার মধ্যে। কথা না, একপ্রকার ঝগড়াই হচ্ছিল তাদের মধ্যে।আর এই ঝগড়া তাদের প্রতিদিনই হয়।তার মূল কারণ তাদের একমাত্র মেয়ে অবন্তিকা। অবন্তিকা জন্মের পর থেকেই কানে শোনে না। কথা বলতে পারে না। অনেক ডাক্তার দেখিয়েছে। চিকিৎসা করিয়েছে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।

ইলিয়াস তাই অবন্তিকাকে সহ্য করতে পারে না। প্রতিনিয়ত অবহেলা করে। অবন্তিকা তার মা, বাবার ঝগড়া প্রতিদিন দেখে। কানে শুনতে না পারলেও বুঝতে পারে তাকে নিয়ে অশান্তি হয়। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে দেখে আর চোখের পানি গড়িয়ে পড়ে অবন্তিকার।

কিন্তু অবন্তিকার মা অর্থাৎ নীরা অবন্তিকাকে খুব ভালোবাসে। সবসময় অবন্তিকাকে সাপোর্ট করে। এই নিষ্ঠুর পৃথিবীতে একমাত্র নীরাই অবন্তিকার সবকিছু।

অবন্তিকার বয়স এখন সাত। নীরা অবসর সময় অবন্তিকাকে হাতের লেখা শেখায় কারণ অবন্তিকার ইশারা কেউ না বুঝলেও ও যেন ওর মনের কথা লিখে সবাইকে বোঝাতে পারে।

একদিন অবন্তিকার বাবার খুব জ্বর আসে।অফিসে যেতে পারেনি। অবন্তিকার মা ওর বাবার মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে। সাথে অবন্তিকাও আছে।তারপরও জর কমছেনা।
"ঘরে কোনো ওষুধ-ও নেই।এখন কি করা যায়? ফার্মেসিতে যেতে হবে। কিন্তু অবন্তিকাকে একা রেখে কিভাবে যাব? আর বাইরেও বৃষ্টি। ওকে নিয়ে তো যাওয়া সম্ভব না। পাশের বাসার ভাবীও গ্রামে গেছে। এখন যে কি করি?" মনে মনে ভাবতে থাকে নীরা।

অবশেষে অবন্তিকাকে বুঝিয়ে বাইরের দরজায় তালা দিয়ে ফার্মেসিতে গেল নীরা।

ওষুধ কিনে বাসায় ঢুকেই নীরা অবাক।অবন্তিকা তার বাবার মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে আর কাঁদছে। মাঝে মাঝে মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। এসব দেখে নীরার চোখে পানি চলে আসে। যে বাবা তার সন্তানকে দু'চোখে দেখতে পারে না, সে আজ তার বাবার জন্য কাঁদছে বাবা অসুস্থ দেখে।

ইলিয়াস জ্বরে অজ্ঞানের মতো পড়েছিল। জ্ঞান ফিরে আসার পর নীরা রাতের খাবার খাইয়ে ওষুধ খাইয়ে দেয়। ইলিয়াসের জ্ঞান আসার পর অবন্তিকা অন্য ঘরে চলে যায়। কারণ তার বাবা যে তাকে ভালোবাসে না তা সে খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারে।

- 'তোমার শরীর এখন কেমন?'

-'আগের চেয়ে একটু ভালো।কিন্তু এখনও শরীরে ব্যথা আছে।'

-'মাত্র ওষুধ খেলেতো, তাই সুস্থ হতে একটু সময় লাগবে। তোমাকে কিছু বলার ছিল আমার।'

-'হুম বল কি বলবে?'

-'আমি যখন ফার্মেসিতে যাই তোমার জন্য ওষুধ কিনতে, এসে দেখি অবন্তিকা তোমার মাথায় জলপট্টি দিচ্ছিল আর কাঁদছিল। তোমার মাথায় হাত বুলিয়েও দিচ্ছিল।'

ইলিয়াস অবাক হয়ে,
-'বলো কী?তুমি কি সত্যি বলছ?'

-'একদম সত্যি বলছিগো।দেখ,আমি তুমি ছাড়া অবন্তিকার আর কে আছে বলো?ওতো আমাদেরই সন্তান তাইনা?প্রতিবন্ধী বলে কি ওর ভালোবাসা পাওয়ার কোনো অধিকার নেই? তুমিতো ওকে আদর-ভালোবাসা দেয়াতো দূরের কথা, ওকে দেখলেই কুকুরের মতো দূর দূর করে তাড়িয়ে দাও।কিন্তু আমিতো পারি না গো।আমি যে ওর মা।'

আমার ছোট্ট সোনামণিকে যদি আমরা একটু আদর করি, ভালোবাসি, সাপোর্ট করি তাহলে ও অন্য সুস্থ বাচ্চাদের মতো জীবনে অনেককিছু করতে পারবে।ও না হয় শারীরিক প্রতিবন্ধী, মানসিক তো নয়। মানসিক প্রতিবন্ধী তো তুমি। তোমার চোখ থাকতেও অন্ধ, মন থাকতেও অবুঝ তুমি। আমি মা হয়ে যদি ওকে ভালোবাসতে পারি, তাহলে তুমি বাবা হয়ে কেন পারবে না বল?আর কত পাষাণ হয়ে থাকবে তুমি? বলো তুমি বলো?"

বলতে গিয়ে নীরা হু হু করে কেঁদে উঠে। ইলিয়াসও বাকরুদ্ধ হয়ে যায়।নিজের ভুল বুঝতে পারে। চোখ দিয়ে অঝোর ধারায় অশ্রু ঝরতে থাকে। নীরার হাত দুটো ধরে বলে,
-'আমি এত দিন আমার মেয়ের সাথে অনেক অন্যায় করেছি গো।আর করব না।এখন থেকে ওকে শুধু ভালোবাসব। ওকে স্কুলে পাঠাব।সবরকম সহযোগিতা করব। আমাদের ভালোবাসা আর সহযোগিতায় দেখ ও একদিন ঠিকই সবার 'প্রিয় অবন্তিকা' হয়ে উঠবে। ও এখন কোথায়?নিয়ে এসো ওকে।'

নীরা খুশিতে চোখের পানি মুছতে মুছতে যায় অবন্তিকার ঘরে।নিয়ে আসে ওর বাবার কাছে কিন্তু অবন্তিকা খুব ভয় পায় যদি আবার বকা দেয় এই ভয়ে।

ইলিয়াস অবন্তিকাকে জড়িয়ে ধরে অনেক কাঁদতে থাকে।
-"মা আমাকে ক্ষমা করে দিস মা। তোকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। অবহেলা করেছি।আর দিব না মা।আর দিব না।"

অবন্তিকা অবাক হয়ে যায়।কিছুই বুঝতে পারে না। মাকে ইশারা করে বোঝায়, 'বাবা কাঁদছে কেন আর আমাকে জড়িয়ে ধরল কেন?'

নীরাও ইশারা করে বোঝায়, 'তোমার বাবা তোমাকে খুব ভালোবাসে তাই।'

অবন্তিকা খুশিতে কেঁদে উঠে। দৌড়ে তার রুমে চলে যায়। নীরা আর ইলিয়াস অবাক হয়ে যায়।কিছুই বুঝতে পারে না।

তার কিছুক্ষণ পর অবন্তিকা একটি বড় পেজে লিখে নিয়ে আসে 'I LOVE YOU বাবা' আর সাথে অবন্তিকা আর ওর মা, বাবা তিনজনের কার্টুন ছবি এঁকে ওর মনের ভালোবাসা প্রকাশ করে।

আমাদের সমাজে অনেক প্রতিবন্ধী আছে।যাদের মধ্যে কেউ শারীরিক প্রতিবন্ধী আবার কেউ মানসিক প্রতিবন্ধী।তাদের দরকার একটু ভালবাসা আর সহযোগিতা।তাহলেই তাদের মনে ঘুমন্ত সুপ্ত প্রতিভা জাগ্রত হবে।

প্রতিবন্ধীরা আমাদের দেশের বোঝা নয়,সম্পদ।
তাদেরও অধিকার আছে সমাজে মাথা উঁচু করে বাঁচার।
আসুন, আমরা সবাই এগিয়ে আসি তাদের সাহায্য করার জন্য।

ধন্যবাদ।

Saturday, February 5, 2022

এক সিলেটির হাসির (?) গল্প by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

‘অন্য আলো’ থেকে আমাকে বলা হয়েছে আমার জীবনের ঘটে যাওয়া একটি মজার গল্প নিয়ে লিখতে। আমি একটি নয়, তিনটি নিয়ে লিখব, যেহেতু ঈদের মৌসুম চলছে। মেয়াদ শেষ হওয়া খেজুরের প্যাকেট যে রকম একটি কিনলে এখন অনেক দোকানি র​্যাবের ভয়ে দুটি ফ্রি গছিয়ে দেয়, অনেকটা সে রকম। কে হায় গুদাম খুঁড়ে র​্যাবকে জাগাতে ভালোবাসে!

আপনার যদি মনে হয় গল্পগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, র​্যাবকে খবর দিন। তবে এগুলো ভেজাল নয়, এ-ই রক্ষা।

প্রথম দুটি গল্প স্কুল-কলেজে পড়ার সময়। আমি দেখেছি, এই সময়টাতেই কেন জানি জীবনের মজার গল্পগুলো সব ঘটে যায়। হয়তো এ সময়টা অপাপবিদ্ধতার, মন খুলে হাসতে পারার, এ জন্য। বয়সটা আপনি পেয়ে গেলে (অর্থাৎ ‘প্রাপ্ত’বয়স্ক হলে) বালসুলভ অনুভূতিগুলো সব উবে যায়, জগতের পাপ আপনার ‘মতি’কে কঠোর করে ফেলে (আপনি আর কোমলমতি থাকেন না, পাপ-তোবয়স্ক হয়ে যান), তখন হাসাটাও মানা হয়ে যায়। সে যা–ই হোক, স্কুলের দশম শ্রেণিতে যখন পড়ি, পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ শুরু হলো। রেডিওতে ঘন ঘন এলান দেওয়া হতো, ভারতীয় চর থেকে সাবধান! চর বলে কাউকে সন্দেহ হলে পুলিশে খবর দিন। আমার এক বন্ধু, সাইফুলের মামা লন্ডন থেকে সিলেট এলেন (সিলেটিদের কাছে লন্ডন-সিলেটের দূরত্বটা বরাবর ঢাকা-আশুলিয়ার মতো)। তিনি পরদিন যাবেন তাহিরপুর, তাঁর বাড়ি। একটা হোটেলে জিনিসপত্র রেখে তিনি বেরোলেন বোনের বাড়ির খোঁজে। কিন্তু খুঁজবেন যে, ঠিকানাটা গেছেন ভুলে। তাঁর ধারণা ছিল মানুষজনকে জিজ্ঞেস করে বাড়ি পেয়ে যাবেন। ভুল! তিনি আধা ঘণ্টা শুধু শুধু ঘুরে বিভ্রান্ত হয়ে আমাদের পাড়ার কাকুর চায়ের দোকানে ঢুকে চায়ের অর্ডার দিলেন। আমার অভিজ্ঞতা বলে, মানুষের ওপর নির্ভর করে হাতিরপুলের কোনো ঠিকানা খুঁজতে গেলেও একসময় আপনি হয়তো গাবতলি পৌঁছে যাবেন। সাইফুলের মামার হাতে একটা প্যাকেট। তাতে লন্ডনের কোনো দোকান থেকে বোন ও তাঁর পরিবারের জন্য কেনা কিছু গিফট ছিল। প্যাকেটে ‘ইন্ডিয়া’ কথাটা ছিল। বড় করে লেখা দোকানটার নামে। এক খদ্দের তা দেখল। অল্প বিদ্যা সব সময় ভয়ংকরী।

সে লোক কাকুর দোকান থেকে বেরিয়ে যাকে সামনে পেল, বলতে লাগল, ‘স্ফাই’, অর্থাৎ স্পাই। সাইফুলের মামা উঁচু-লম্বা মানুষ, চোখে সোনার রিমের চশমা। পরনে ভালো কাপড়চোপড়। তিনি কিছু বোঝার আগেই দোকানের সামনে ভিড় জমে গেল। আমরা মাঠে ছিলাম। স্ফাই পাওয়া গেছে শুনে আমরাও দৌড় লাগালাম। ততক্ষণে মামা দোকান থেকে বেরিয়েছেন এবং বলছেন, ‘আমি স্ফাই নায়।’ কিন্তু তাঁর কথা কে শোনে। কয়েকজন থানায় দৌড়াল। পুলিশকে খবর দিতে হবে। তীব্র উত্তেজনা। একসময় তিনি গলা চড়িয়ে, কাতর কণ্ঠেই বললেন, তিনি লন্ডনি; এবং সাইফুলের বাবার নামটা বলে জানালেন, তিনি তাঁর বাড়িতে যাওয়ার জন্য এসেছেন।

সাইফুল একটু দূরে দাঁড়িয়েছিল। সে দৌড়ে এল, ‘মনা মামা নি!’ সে চিৎকার করে বলল, ‘আফনে স্ফাই নি’!

সৌম্যদর্শন মনা মামা রেগে গিয়ে সাইফুলের কানটা ডলে দিলেন, ‘তরে কইছে। আয়, দেখাই দিমু আমি কিতা,’ তিনি বললেন এবং দুহাতে মানুষ ঠেলে সাইফুলের বাড়ির দিকে হাঁটা দিলেন।

ভয়ে আমরা সেদিন সাইফুলের বাড়ির দিকে যাইনি।

দ্বিতীয় গল্পটি কলেজে প্রথম বর্ষের। আমরা কয়েক বন্ধু মিলে মাঝেমধ্যে ট্রেনে এদিক-সেদিক বেড়াতে যেতাম। সাইকেলে চেপে জাফলংয়েও যেতাম। একবার তিন বন্ধু গিয়েছি ছাতক। আমাদের এক বন্ধুর মামা ছাতক সিমেন্ট ফ্যাক্টরির বড় কর্তা। আমাদের দুটি উদ্দেশ্য, ফ্যাক্টরিটা দেখা এবং সম্ভব হলে ছাতক-ভোলাগঞ্জ রেলওয়েতে চড়া। রেলওয়েটা তখন প্রায় শেষ। আমরা ফ্যাক্টরির গেটে পৌঁছে গেটটা খোলা পেয়ে ঢুকে পড়লাম। দুই উর্দি পরা লোক হইহই করে আমাদের ওপর হামলে পড়ল। উদুর্ভাষী সান্ত্রী। তারা উদুর্তেই চিৎকার করতে শুরু করল। উর্দুর কারণে কিনা আমাদের রাগটা জাগল, কিন্তু সিলেটিতে—বাংলায়—ইংরেজিতে আমরা যা–ই বলি, দুই সান্ত্রী চোটপাটের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। একসময় আমাদের ঠেলে গেটের বাইরে বের করে দিল। গায়ে হাত দেওয়ায় আমাদের মেজাজের পারদ উঠল। একটা মারামারির অবস্থা। এক লোক কমলার একটা ঝুড়ি নিয়ে ঢুকছিল। সে এগিয়ে এসে গন্ডগোলে শামিল হলো। লোকটা বাঙালি। তাকে বললাম, আমরা ভেতরে যাব, আমরা বেড়াতে এসেছি। আমাদের কথা শুনে সে-ও চোটপাটে নাম লিখল। এক সান্ত্রী পুলিশ আনতে গেল। একসময় বাঙালি লোকটিকে আমার বন্ধু তার মামার নাম বলল। মামার নাম শুনে লোকটার চোখমুখ সাদা হয়ে গেল। হাতের ঝুড়ি দেখিয়ে সে তোতলাতে তোতলাতে বলল, উনি আমার স্যার, আপনাদের জন্যই কমলা কিনতে পাঠিয়েছিলেন।

মামা বদমেজাজি মানুষ। সেই লোক এবং দুই সান্ত্রীর এরপর কী হয়েছিল, তা না বলাই ভালো। তবে কমলাগুলো ছিল স্বর্গীয়। ছাতকের কমলা বলে কথা।

শেষ গল্পটা লন্ডনের, ১৯৭৬ সালের। আমি তখন প্রাপ্তবয়স্ক শুধু না, বিবাহিত। পিএইচডি করার জন্য কানাডা যাওয়ার পথে দুদিন সাউদাম্পটন থেকে লন্ডনে ফিরেছি। সন্ধ্যায় গেছি আমার এক আত্মীয়ের রেস্টুরেন্টে, তিনি আমাকে ডিনার খাওয়াবেন। রেস্টুরেন্টের শেফ মঝর মিয়া, বয়স ষাটের মতো, হাসিখুশি, দয়ালু। বাড়ি মৌলভীবাজার। আমার নানাবাড়ি কমলগঞ্জ শুনে তিনি অশেষ প্রীত হলেন। বললেন, ‘ঠাকুর, হুনছি তুমি বিয়া করছ।’

‘জি’, আমি বললাম।

‘বউমা আইছইননা নি?’

‘জি না, ও তিনমাস পর আসবে।’

‘বালা। তা ঠাকুর, বউর বাড়ি কই? ছিলটর কুনখানো?’

আমি চুপ করে রইলাম। কী করে বলি আমি ছিলটি বিয়ে করিনি, করেছি বেঙ্গলি!

‘ও বুঝছি’, তিনি বললেন, ‘অবিগঞ্জ।’

‘জি না, হবিগঞ্জ না।’

‘তে কুনখানো? ভাটিত নি?’

ভাটিতে মানে অষ্টগ্রামে, মিটামইনে।

‘জি না।’

‘বাম্মনবারিয়া?’ তার গলা বিমর্ষ।

আমি চুপ করে রইলাম। মঝর মিয়া এবার যেন একটা কিনারা পেয়েছেন। হেসে বললেন, ‘ঢাকাত নি?’

‘জি না’, আমি বললাম।

তিনি হাল ছেড়ে দিলেন। বললেন, ‘কছাইন ঠাকুর, বউমার বাড়ি ঠিক কুনখানো?’

‘মালদা’, আমি বললাম এবং ভুগোলটা বুঝিয়ে দিলাম।

মালদা যেতে কত দিন লাগে, আমাকে জিজ্ঞেস করলেন।

আমি বললাম, তা প্রায় দু-তিন দিন।

এবার হতাশ মনে হলো মঝর মিয়াকে। তিনি দুহাত তুলে বললেন, ‘ঠাকুর, তুমি তো লন্ডন বিয়া করলেই ফারতায়। আইতে যাইতে দশ ঘণ্টা লাগে।’

মাত্র তিন মাস আগে বিয়ে করেছি। কিন্তু মঝর মিয়ার মুখ দেখে মনে হলো, একজন মানুষকে বিয়েটা অনেক কষ্ট দিয়েছে।

কী আর করা, ঠাকুর।
তিন সাহিত্যিকের তিনটি মজার ঘটনার অলংকরণ করেছেন সব্যসাচী মিস্ত্রী