Monday, April 14, 2025

পেটে গুলিবিদ্ধ ছেলেকে রাস্তায় ফেলে পালাতে বাধ্য হন মা

গাজায় বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছেন। যে যার মতো শেষ সম্বল হাতে নিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীকে পেছনে ফেলার চেষ্টায় মরিয়া। হেঁটে চলা এ কাফেলায় আছেন শিশু থেকে বৃদ্ধ, তরুণ থেকে যুবক, এমনকি অন্তঃসত্ত্বা নারী। বুকভরা আর্তনাদ থাকলেও সবাই নিশ্চুপ। অজানা ভয়ে পেছনে তাকানোও যেন মানা।

কিন্তু মধ্য বয়স্ক এক নারী অঝোরে কাঁদছেন এবং বারবার পেছন ঘুরে ফেলে আসা পথে তাকাচ্ছেন। একপর্যায়ে তিনি মাঝ রাস্তায় থমকে দাঁড়ান। বাস্তুচ্যুতদের ভিড় তাকে এড়িয়ে সামনে এগোচ্ছে। যেন কেউ কারও নয়। কারণ, কে কাকে সান্ত্বনা দেবে? গোটা গাজাবাসীই যে কান্নারত।

যাই হোক, ক্যামেরা হাতে থাকা কোনো এক ব্যক্তি ওই নারীকে এড়াতে পারেননি। তিনি একা দাঁড়িয়ে থাকা নারীর দিকে এগিয়ে গেলেন। এ সময় ওই নারীর বুকে জমা সব আর্তনাদ যেন জলোচ্ছ্বাস হয়ে বাধা ভেঙে বেরিয়ে আসে। সেই চাপ সামলে নিতে না পেরে নারীর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। তিনি হয়তো ভাবছিলেন, কাফেলার সঙ্গে আর এগোতে পারবেন না।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিওটি প্রচারিত হলে আবেগাপ্লুত হন বহু ব্যবহারকারী। মিডল ইস্ট আই ভিডিওটি পোস্ট করে লিখেছে, ‘যুদ্ধবিরতির সময় স্বস্তির আশায় থাকা ফিলিস্তিনিরা ফের শোকাহত প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাচ্ছে এবং তাদের দুর্দশার কথা লিখছে।’ সেসবের মধ্যে এটি একটি ভিডিও। যেখানে ওই নারী বলেন, ‘আমরা ব্যারাকে আমার ছেলেকে পেয়েছি। তার পেটে গুলি করা হয়েছে।’ কাঁদতে থাকেন নারী।

কোনো মতে শ্বাস নিয়ে নারী বলেন, ‘সে শহীদ হয়ে গেছে, এখন মৃত। আমি তাকে নিয়ে আসতে পারিনি। আমার সঙ্গে বহন করে আনতে পারিনি। ট্যাঙ্কগুলো আমার সামনে ছিল। আমার প্রিয়, আমার ছেলে, আমি তোমাকে রাস্তায় একা রেখে এসেছি।’

এ মায়ের আরও দুঃখের বিষয় হলো, তার ছেলে মায়ের কষ্ট কমাতে গিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে পড়ে। পরিবারের জিনিসপত্র বহনে সাহায্য করার জন্য একটি ঠেলাগাড়ি খুঁজে আনতে চেয়েছিল সে। তাতে জিনিসপত্র রেখে ঠেলে নিরাপদ স্থানের দিকে যাবে। মা খালি হাতে থাকায় হাঁটার কষ্ট কমবে। কিন্তু তা আর হলো কই। ছেলেকেই ফেলে আসতে হলো। কিন্তু জিনিসপত্র ঠিকই সঙ্গে আনছেন ওই নারী। দুটি বড় আবর্জনার ব্যাগে তা ভরে অজানা স্থানে বহন করে নিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

গত ১৮ মার্চ যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করে গাজায় নতুন আক্রমণ শুরু করে ইসরায়েলি বাহিনী। এতে কমপক্ষে ১৫৬০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

তবে নিহতের সংখ্যা আরও বেশি। কারণ, অনেকের মরদেহ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে। অনেককে ওই ছেলের মতো মা-বাবা রাস্তায় আহত বা নিহত অবস্থায় ফেলে এসেছেন। 

গাজার শুজাইয়া এলাকা থেকে পালাচ্ছেন বাসিন্দারা। ছবি : সংগৃহীত
গাজার শুজাইয়া এলাকা থেকে পালাচ্ছেন বাসিন্দারা। ছবি : সংগৃহীত

ইসরায়েল-তুরস্ক কি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে? by পাপলু রহমান

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যে ঘটে চলা রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এসেছে—ইসরায়েল ও তুরস্ক কি সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে? ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে আলাদা অবস্থানে থাকা এ দুই রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন ইস্যুতে মুখোমুখি থাকলেও সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর নজির নেই। সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেও দুই দেশ কখনোই যুদ্ধ বেছে নেয়নি। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে সিরিয়ায় নতুন সরকার গঠনের পর পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে। দুদেশের মধ্যে এ উত্তেজনা কি যুদ্ধে রূপ নেবে? নাকি কূটনৈতিক সমঝোতার দিকেই অগ্রসর হবে তুরস্ক ও ইসরায়েল?

কৌশলগত অবস্থান ও সামরিক শক্তির ভারসাম্য

তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সামরিক শক্তি। তাদের সামরিক সক্ষমতা, ভূরাজনৈতিক অবস্থান ও কৌশলগত মনোভাব একে এ অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে। অপরদিকে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে প্রযুক্তিগত দিক থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী। তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, গোয়েন্দা সক্ষমতা ও আক্রমণের কৌশল একে ভয়ংকর অবস্থায় নিয়ে গেছে।

বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, এ দুটি শক্তিধর দেশের মধ্যে যদি কোনো সামরিক সংঘর্ষ ঘটে, তা শুধু এই দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যেই অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়বে। তাই উভয় দেশ আপাতত সংঘাত নয়, বরং কূটনৈতিক আলোচনার পথেই অগ্রসর হচ্ছে।

সিরিয়ার ভূরাজনীতিতে দুদেশের অবস্থান

সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতনের পর নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। এ পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে সিরিয়ায় নতুন করে সামরিক উত্তেজনা শুরু হয়েছে। ইসরায়েল অভিযোগ করছে, সিরিয়ায় ইরানপন্থী গোষ্ঠী এবং অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠন গোপনে শক্তি সংগ্রহ করছে, যা তাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।

ইসরায়েলের একটি গবেষণা কমিটি সতর্ক করেছে, সুন্নি মুসলিমশাসিত সিরিয়া ইরানের চেয়েও বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।

অপরদিকে তুরস্ক সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই সামরিকভাবে সক্রিয়। তারা একদিকে কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে, অপরদিকে সিরিয়ার নতুন সরকারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতেও সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। তাদের অভিপ্রায় হলো একটি গণতান্ত্রিক, বেসামরিক ও এককেন্দ্রিক সিরিয়া প্রতিষ্ঠা, যেখানে পিকেকে বা কুর্দি স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠীগুলো ছোট ছোট রাষ্ট্র গঠন করতে না পারে। এ প্রেক্ষাপটে ইসরায়েল-তুরস্কের সংঘর্ষের সম্ভাবনা দেখা দিলেও দুদেশেরই কৌশলগত অবস্থান থেকে এ সংঘর্ষ এড়িয়ে চলার পক্ষে।

কূটনৈতিক সংযোগ ও গোপন আলোচনা

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আজারবাইজানে গোপনে আলোচনায় বসেছে ইসরায়েল ও তুরস্কের প্রতিনিধিরা। তাদের লক্ষ্য—সিরিয়ার মাটিতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা সংঘর্ষ যেন না ঘটে, সে ব্যাপারে একটি চ্যানেল খোলা রাখা। দুই দেশের মধ্যে এই ধরনের সরাসরি যোগাযোগের চ্যানেল স্থাপন প্রমাণ করে যে উভয় পক্ষই কৌশলগতভাবে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথেই এগোতে চায়।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানও এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্টভাবে বলেছেন, তারা সিরিয়ায় কোনো সংঘর্ষ চান না। বরং তারা একটি স্থিতিশীল সিরিয়া দেখতে চান, যেখানে কেউ কারও জন্য হুমকি হয়ে উঠবে না। একইসঙ্গে তিনি ইসরায়েলকে সতর্ক করেছেন সিরিয়ায় বারবার হামলা চালানো বন্ধ করতে।

ট্রাম্পের ভূমিকা: মধ্যস্থতায় প্রস্তুতি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, ইসরায়েলের সঙ্গে তুরস্কের যদি কোনো সমস্যা হয়, তাহলে তিনি তা সমাধানে মধ্যস্থতা করতে প্রস্তুত। ট্রাম্পের মতে, এরদোয়ান একজন শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান নেতা, যিনি মধ্যপ্রাচ্যে ভারসাম্য রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারেন। এ বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, যুক্তরাষ্ট্র—যা উভয় দেশেরই প্রধান মিত্র—তারা এই অঞ্চলে কোনো সামরিক সংঘর্ষ চায় না। বরং মধ্যস্থতার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সমাধানেই আগ্রহী।

গাজায় গণহত্যা এবং তুরস্কের অবস্থান

২০২৩ সালে গাজায় ইসরায়েলের হামলার পর থেকে তুরস্ক কড়া অবস্থান নিয়েছে। তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা করেছে, সব ধরনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থগিত করেছে এবং নিজেদের জনগণের সামনে কড়া ভাষায় ইসরায়েলের সমালোচনা করেছে।

এরপরও বাস্তবতা হলো, তুরস্ক এখনো সরাসরি সংঘাতের পথ বেছে নেয়নি। জনতুষ্টিমূলক বক্তব্য দিলেও সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে তারা অনেক বেশি পরিপক্ব অবস্থান নিয়েছে। কারণ তারা জানে, একটি যুদ্ধ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে তাদের জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

ইসরায়েলের দৃষ্টিকোণ

ইসরায়েল মনে করে, একটি খণ্ড বিখণ্ড সিরিয়া তাদের জন্য উপকারী। তারা চায় না, একটি শক্তিশালী, ঐক্যবদ্ধ ও গণতান্ত্রিক সিরিয়া আবার মধ্যপ্রাচ্যে মাথা তুলে দাঁড়াক। সেই জন্য তারা সম্ভাব্য প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে রাখতেই হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদে তাদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। কারণ বিভক্ত সিরিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীর জন্য আদর্শ প্রজননভূমি হয়ে উঠবে, যা পরে ইসরায়েলসহ গোটা অঞ্চলের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।

ভারসাম্য রক্ষায় তুরস্ক

তুরস্ক বর্তমানে সিরিয়ার রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে চাচ্ছে। তারা সিরিয়ার সঙ্গে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে যোগাযোগ রাখছে। একদিকে সিরিয়ার সরকারকে সহযোগিতা করছে, অন্যদিকে এইচটিএসের মতো গোষ্ঠীকে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘর্ষ না করার পরামর্শ দিচ্ছে। একইসঙ্গে দুই দেশের গোয়েন্দা সংস্থা নিয়মিত যোগাযোগে রয়েছে, যাতে কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনা না ঘটে।

তুরস্কের পররাষ্ট্রনীতি এখন অনেক বেশি বাস্তববাদী ও অঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষার পক্ষে। তারা নিজেরা বুঝে গেছে, সিরিয়ায় স্থিতিশীলতা তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য অপরিহার্য। একদিকে সিরিয়ার পুনর্গঠন, অন্যদিকে নিজ দেশের অভ্যন্তরে থাকা লাখ লাখ সিরিয়ান শরণার্থীর চাপ—এই দুই দিক সামলাতে হলে ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘর্ষ না হওয়াই ভালো।

শেষ কথা

সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি ও তাতে উভয় দেশের সম্পৃক্ততা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা এখনও সীমিত পর্যায়েই রয়েছে। যদিও রাজনৈতিক বক্তব্যে উত্তেজনা ছড়ানো হয়, বাস্তবে তারা অনেক বেশি হিসেব-নিকেশ করে চলছে। কিন্তু কূটনৈতিক উদ্যোগ ব্যর্থ হলে, সংঘাতের ঝুঁকি অস্বীকার করা যায় না। সেজন্য প্রয়োজন আরও দৃঢ়, বাস্তববাদী ও আন্তরিক আলোচনার।

ইসরায়েল ও তুরস্ক যদি সত্যিই আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা চায়, তাহলে সংঘর্ষ এড়িয়ে কূটনীতি ও সহযোগিতার পথেই তাদের অগ্রসর হওয়া উচিত। 

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি : আলজাজিরা
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ছবি : আলজাজিরা

‘বাংলাদেশি বন্ধুদের নিয়ে একদিন মুক্ত-স্বাধীন ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়াব’

অনেক ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীই উচ্চশিক্ষার জন্য আসেন বাংলাদেশে। বিশেষ করে এ দেশের মেডিকেল কলেজের পড়ালেখার প্রতিই তাঁদের আগ্রহ বেশি। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের এমনই এক ছাত্রের সঙ্গে কথা বলে অনুলিখন করেছেন জাওয়াদুল আলম। ফিলিস্তিনি এই শিক্ষার্থীর অনুরোধে তাঁর নাম অপ্রকাশিত থাকল।

এক মাস পরই চূড়ান্ত বর্ষের পরীক্ষা। আমার এখন পড়াশোনায় মগ্ন থাকার কথা। আপ্রাণ সেই চেষ্টাই করে যাচ্ছি। কিন্তু আমার মন তো পড়ে আছে গাজায়। চাইলেও তাই পড়ার টেবিলে মন বসাতে পারছি না। গাজায় আমাদের বাড়ি উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের স্বজনদেরও কারও বাড়ির অস্তিত্ব নেই। প্রায় ছয় মাস ধরে ক্যাম্পে অবস্থান করছে আমার পরিবার। মা-বাবা আর পরিবারের সদস্যদের জন্য সব সময় দুশ্চিন্তা হয়। প্রতিদিন কথা বলারও সুযোগ হয় না। এর মধ্যেই খবর পেয়েছি, গত সপ্তাহে আমার পরিবার যে ক্যাম্পে অবস্থান করছিল, সেখানে কামান দিয়ে গোলা ছুড়েছে ইসরায়েলিরা। আমার পরিবারের সদস্যরা প্রাণে বেঁচে গেলেও চারজন আহত হয়েছেন। তাঁরা এখন অনেকটা সুস্থ। হামলার পর অন্য আরেকটা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন তাঁরা।

গাজায় প্রায় সব পরিবারের গল্পই এখন এ রকম। আমার বন্ধু কিংবা আত্মীয়স্বজন সবার বাড়িই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকে তো পরিবারের সদস্য হারিয়েছেন। আল্লাহর রহমতে আমার পরিবারের সবাই নিরাপদে আছেন, এটাই এখন মন্দের ভালো খবর। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজে প্রায় ২০ জন ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন। সবাই এখন পরিবারের লোকজনের কথা ভেবে চিন্তিত। গাজায় তো দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে। তাই আমরা যেন দুঃসংবাদের সঙ্গে অনেকটা মানিয়ে নিয়েছি। তবে গেল কয়েক দিনের অবস্থা বর্ণনা করার মতো নয়। এত খারাপ অবস্থা আগে হয়নি, এতটুকু বলতে পারি।

ফেসবুক বা যেকোনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঢুকলেই আমার ভাইবোনদের করুণ পরিস্থিতি দেখতে হচ্ছে। মৃত্যুর খবর সামনে চলে আসছে। এসব থেকে দূরে থাকতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও কম ব্যবহার করছি। আমাদের যেহেতু সামনে পরীক্ষা, তাই পড়াশোনার মধ্যে নিজেদের ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করছি।

তবে ফিলিস্তিনে পরিস্থিতির অবনতির পর থেকেই আমাদের বাংলাদেশি বন্ধু, সহপাঠী, শিক্ষকেরা সবাই নিয়মিত আমাদের খোঁজখবর নিচ্ছেন। ক্লাসে গেলেই আমাদের বাড়ির খবর জানতে চায় বন্ধুরা। আমাদের শিক্ষকেরা সব সময় দেশি-বিদেশি সব শিক্ষার্থীকেই সমান চোখে দেখেন। এখন তাঁরা যেন এটি আরও বেশি করে চর্চা করছেন। যেন আমরা মাথা থেকে দুশ্চিন্তা সরিয়ে অন্য সবার মতো পড়াশোনায় মনোযোগ দিতে পারি। আমরাও যথাসম্ভব পড়াশোনায় ব্যস্ত থেকে নিজেদের স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি।

আমার মেডিকেল কলেজের সহপাঠীসহ বাংলাদেশের সবাইকে ধন্যবাদ জানাতে চাই। আমি জানি, এ দেশের সব মানুষ ফিলিস্তিনের পক্ষে। ৬ এপ্রিল ‘গ্লোবাল স্ট্রাইক ফর গাজা’ কর্মসূচিতে সাড়া দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা ব্যানার, প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। আমার মেডিকেল কলেজের ফিলিস্তিনি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও ওই দিন প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, ইসরায়েলিদের বর্বরতার প্রতিবাদ করেছেন। আমি বিশ্বাস করি, ফিলিস্তিন একদিন মুক্ত হবে। বাংলাদেশি বন্ধুদের নিয়ে একদিন মুক্ত-স্বাধীন ফিলিস্তিনের পতাকা ওড়াব।

গাজায় প্রায় সব পরিবারের গল্পই এখন এ রকম
গাজায় প্রায় সব পরিবারের গল্পই এখন এ রকম। ছবি: এএফপি

গাজার হাসপাতালে ইসরাইলি হামলা: গা শিউরে ওঠার মতো বর্ণনা রোগীদের মুখে

গাজার আল-আহলি আরব হাসপাতালের একটি তাঁবু ওয়ার্ডে ইউসুফ আবু সাকরান তার আহত সন্তান এবং স্ত্রী ইমানের পাশে ঘুমাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই লোকজনের দৌড়াদৌড়ি এবং চিৎকারের শব্দ। ঘুম ভেঙে যায় তার। রোববার ভোর হওয়ার অনেক আগেই তিনি হাসপাতালের প্রাঙ্গণে পা রেখে জিজ্ঞাসা করলেন- কী হচ্ছে? কিন্তু কোনও স্পষ্ট উত্তর তিনি পাননি। কেবল অস্পষ্ট খবর ছিল যে- ইসরাইলি সেনাবাহিনী হাসপাতালের আশপাশে বসবাসকারী লোকদের কাছে ফোন করে চিকিৎসা কেন্দ্রের সকলকে সরে যেতে বলেছে। ২৯ বছর বয়সী পিতা সাকরান তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিক্রিয়া জানালেন। তিনি তার পাঁচ বছর বয়সী ছেলে মোহাম্মদকে কোলে তুলে নিলেন। তিনি এবং তার স্ত্রী ইমান গেটের দিকে দৌড়ে গেলেন। ইউসুফের ছেলে মোহাম্মদকে নিয়ে সামিল হয়েছেন তিনি। তার ছেলে মোহাম্মদের সারা শরীরে গুরুতর আঘাত। তার পিঠ এবং পায়ে তৃতীয়-ডিগ্রি পোড়া। ইউসুফকে তাকে কোলে নিয়ে দৌড়াতে হচ্ছে। তিনি বলেন, আমার ছেলেকে কোলে নিয়ে দৌড়াচ্ছিলাম। তার শরীর পুড়ে গেছে। সে প্রচণ্ড চিৎকার করছিল। তার পিঠ থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। তার ক্ষত থেকে প্রচণ্ড রক্তক্ষরণ হচ্ছিল। সে যন্ত্রণায় চিৎকার করছিল। আকস্মিক এভাবে দৌড়াদৌড়িতে অনেক মানুষের ক্ষত আবার কাঁচা হয়ে উঠল। আমি মেরুদণ্ডের আঘাতে আক্রান্ত একটি মেয়ের পরিবারকে তার বিছানা টেনে তোলার চেষ্টা করতে দেখলাম। কিন্তু বিছানাটি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে আটকে ছিল। আমরা হাসপাতাল  থেকে বের হওয়ার কয়েক সেকেন্ড পরেই দুটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। তা পুরো জায়গাটিকে কাঁপিয়ে তোলে। আমার স্ত্রীকে বললাম- ভাবো, আমরা যদি এক মিনিট পরে বের হতাম তাহলে আমরা মারা যেতাম।

আহত ছেলেকে নিয়ে কোথায় যাব?
ইউসুফ এবং তার স্ত্রী হাসপাতালের অন্য সকলের সঙ্গে রাস্তায় অবস্থান নিয়েছেন। রোববার রাতে তিনি বলেন, রাত প্রায় ২টা বাজে। আমার আহত ছেলেকে কোথায় নিয়ে যাব বুঝতে পারছি না। ছেলে ব্যথায় কাতরাচ্ছে। তার রক্তক্ষরণ হচ্ছে। কোনও ক্লিনিক বা হাসপাতাল নেই। আমরা যে তাঁবুতে থাকি তা অনেক দূরে। ছেলের এই ক্ষতের চিকিৎসা দেয়ার জন্য সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত সেটা।

উল্লেখ্য, গাজার শুজাইয়া পাড়ায় ইসরাইলি বিমান হামলায় ইউসুফের ছেলে মোহাম্মদ আহত হন। সেখানে ২০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং কয়েক ডজন আহত হয়েছেন। হাসপাতালটিতে বোমা হামলার এক ঘন্টা পর ইউসুফ এবং তার স্ত্রী সিদ্ধান্ত নেন যে- মোহাম্মদকে আল-আহলিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া ছাড়া তাদের করার কিছুই নেই। ইউসুফ বলেন, জায়গাটা ছিল ঘন কালো। বারুদ আর ধুলোর গন্ধ বের হচ্ছিল। আমি হাসপাতালের শেষ প্রান্তে অবস্থিত সার্জারি ভবনে গিয়েছি একজন নার্সকে পেয়েছিলাম। তিনি মোহাম্মদের অবস্থার দেখে করুণা দেখান। তার ক্ষতের চিকিৎসা করেন। তাকে ভর্তি করে নেন। ইউসুফ আরও বলেন, এভাবে একটি হাসপাতালে বোমা হামলা মানবতার বিবেকের উপর কলঙ্ক। তারা আমাদের মাথার উপর দিয়ে বাড়িঘরে বোমা মারছে। তারপর রোগী এবং আহতদের ভেতরে থাকা অবস্থায় হাসপাতালগুলিতে বোমা মারছে। আমরা কোথায় যাব?
বিপদ থেকে নিজেকে বের করে আনা
২০ বছর বয়সী সুহাইব হামেদ ওই হাসপাতালের জরুরি ভবনের ঠিক পাশেই আরেকটি তাঁবু ওয়ার্ডে ঘুমাচ্ছিলেন। সেখানেও জায়নবাদীরা আঘাত হানে। ২৯শে ফেব্রুয়ারি ২০২৪ তারিখে হামেদ তার ক্ষুধার্ত পরিবারের জন্য আটা আনতে গিয়ে আহত হন। এই দিনটি ‘ময়দা গণহত্যা’ নামে পরিচিত। এদিন খাদ্য সাহায্যের জন্য অপেক্ষা করার সময় ইসরাইল ১০৯ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করে এবং কয়েক ডজনকে আহত করে। ইসরাইলি ট্যাঙ্ক থেকে ছোড়া গুলি তার পায়ে বিদ্ধ হয়। ফলে তার হাড় এবং টিস্যু এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত হয় যে, তাতে ধাতব দণ্ডের প্রতিস্থাপন করার প্রয়োজন হয়। তখন থেকেই তিনি অর্থোপেডিক বিভাগে চিকিৎসাধীন। সুহাইব তার পায়ের ক্ষত পরিষ্কার করার পর সার্জারি বিভাগ থেকে বেরিয়ে আসার সময় আল জাজিরাকে বলেন, আমার ভাই, যে সাধারণত আমার সাথেই থাকে, ইসরাইলের গুলির সময় সেখানে ছিল না। আমি জানি না কীভাবে আমি আমার আহত পায়ের উপর দাঁড়িয়ে, ক্রাচ ধরে পালিয়ে যেতে পেরেছি। চারপাশে যা দেখলাম তাতে আমার যন্ত্রণা ভুলে গেলাম। সবাই আতঙ্কে আর ভয়ে চিৎকার করছিল। শুধু বেঁচে থাকার চেষ্টা করছিল।
দুটি ইসরাইলি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানার কয়েক মিনিট আগে সুহাইব হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। তিনি বলেন, আমার পা আর সহ্য করতে পারছিল না। আমার ক্ষত আবার কাঁচা হয়ে গেল। আবার রক্তপাত শুরু হল। ফলে তিনি আর হাঁটতে পারছিলেন না। তাই তিনি থামলেন। তার ভাইকে ডাকলেন। তার ভাই এসে তাকে জেইতুন পাড়ায় তাদের বাড়িতে নিয়ে গেলেন।
পায়ের ব্যথা সুহাইবকে জাগিয়ে তুলছিল। তিনি বলেন, আমার অবস্থার কারণে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে হাসপাতালে আছি। সুহাইবকে চিকিৎসার জন্য গাজার বাইরে ভ্রমণের জন্য রেফার করা হয়েছে। কিন্তু এক বছর ধরে তিনি দেশের বাইরে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন। বলেন, আমাদের ভ্রমণ বন্ধ করে দেওয়া এবং নিষেধাজ্ঞা কি যথেষ্ট নয়? এমনকি ইসরাইল সেই হাসপাতালকেও টার্গেট করে, যেখানে এখনও যা আছে তা দিয়ে আমাদের চিকিৎসা করা হচ্ছে।
বিপর্যয়কর পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তোলা
আল-আহলির উপর ইসরাইলি হামলা গাজার স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার জন্য ইতিমধ্যেই বিপর্যয়কর পরিস্থিতিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ইসরাইলি বোমাবর্ষণ এবং ওষুধ, চিকিৎসা সরবরাহ এবং জ্বালানির উপর অবরোধ অব্যাহত থাকায় সেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। আল-আহলির পরিচালক ফাদেল নাঈম আল জাজিরাকে বলেন, ইসরাইল হাসপাতাল কর্মীদের রোগীদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য ন্যূনতম সময়ও দেয়নি। এ কারণে যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে, তাতে অক্সিজেনের অভাবে একটি শিশু মারা গেছে। ডাক্তার আরও বলেন, ইসরাইল গুরুত্বপূর্ণ জরুরি বিভাগ, রেডিওলজি, ল্যাবরেটরি এবং কেন্দ্রীয় ফার্মেসি বিভাগ ধ্বংস করেছে। আমাদের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করতে সপ্তাহ বা মাস লেগে যাবে। এই হাসপাতালটি পরিষেবার একটি কেন্দ্র এবং এখানে সমস্ত প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এর মধ্যে গাজার একমাত্র সিটি স্ক্যান মেশিনও রয়েছে। রোগী এবং আহতদের ভাগ্য এখন অজানা। আমাদের এগুলি অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হবে। কিন্তু কোনও হাসপাতালই পূর্ণাঙ্গ পরিষেবা দেয়ার জন্য প্রস্তুত নয়।

mzamin

কাতারের ঘুষ কেলেঙ্কারিই কি নেতানিয়াহুকে ডোবাবে by কনস্টানটি গেবার্ট

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী কি দেশের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানকে বরখাস্ত করতে পারেন? এ প্রশ্নে ৮ এপ্রিল ইসরায়েলের সর্বোচ্চ আদালত শুনানি করে।

প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা ‘শিন বেত’-এর প্রধান রোনেন বারকে বরখাস্ত করেন। তবে সুপ্রিম কোর্ট সেই সিদ্ধান্ত ২০ এপ্রিল পর্যন্ত স্থগিত রেখেছেন।

আদালত বলেছেন, এ সময়ের মধ্যে সরকারকে দেশের স্বাধীন অ্যাটর্নি জেনারেলের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে। অ্যাটর্নি জেনারেল বারকে বরখাস্তের বিরোধিতা করেছেন। কারণ, তিনি মনে করেন, এই বরখাস্তের ঘটনার সঙ্গে নেতানিয়াহুর স্বার্থের সংঘাত আছে।

এটা সাধারণত একধরনের সাংবিধানিক সংকট তৈরি করতে পারে। কারণ, নেতানিয়াহু ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন, আদালতের বিরূপ রায় হলেও তিনি তা মানবেন না। তবে পরিস্থিতি একটু জটিল। কারণ, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা সম্পর্কে শিন বেত আগে থেকে কোনো সতর্কতা দিতে না পারায় বারকে বরখাস্ত করার যৌক্তিকতা আছে। বার নিজেও তাঁর ব্যর্থতা স্বীকার করেছেন এবং পুরো ঘটনায় তদন্তের জন্য একটি রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি তুলেছেন। কিন্তু নেতানিয়াহু নিজে যাতে দায়ী না হন, সে জন্য তিনি এই তদন্ত কমিশনের বিরোধিতা করছেন।

তার ওপর, বার অভিযোগ করেছেন, নেতানিয়াহু (যাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জালিয়াতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মামলা চলছে) তাঁকে চাপ দিয়েছিলেন যেন আদালত তাঁর (নেতানিয়াহুর) সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ পিছিয়ে দেন।

তাই একদিকে যেমন বারকে বরখাস্ত করার কিছু যৌক্তিক কারণ আছে, অন্যদিকে আছে স্বার্থের সংঘাতের প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় ও বিতর্কিত বিষয় হলো ‘কাতারগেট’ নামের একটি দুর্নীতির ঘটনা, যেটির তদন্ত করছিলেন রোনেন বার। এ মামলায় নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ কিছু সহযোগীর বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়া ও গোপন তথ্য ফাঁস করার অভিযোগ আছে। আর এই তদন্ত শুরুর পরপরই নেতানিয়াহু বারকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেন।

সংক্ষেপে কাতারগেট মামলার মূল বিষয় হলো, নেতানিয়াহুর দুই ব্যক্তিগত সহযোগী—ইয়োনাতান উরিখ ও এলি ফেল্ডস্টেইন—কাতারের কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। তাঁরা নাকি ইসরায়েলি মিডিয়ায় এমন কিছু বিবৃতি ফাঁস করতেন, যা কাতারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করে। আরেক সহযোগী, যিনি এখন সার্বিয়ায় চলে গেছেন, তাঁকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য খোঁজা হচ্ছে। জেরুজালেম পোস্টের প্রধান সম্পাদক এই মামলায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সন্দেহভাজন। এ ছাড়া এক ব্যবসায়ী স্বীকার করেছেন, তিনি আমেরিকার একজন কাতারি লবিস্টের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ফেল্ডস্টেইনের হাতে দিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে যেসব তথ্য ফাঁস হয়, অনেক সময়ই তা নেতানিয়াহুর পক্ষ থেকেই ফাঁস হয় বলে ধারণা করা হয়। কারণ, অতীতেও তিনি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ক্ষতিগ্রস্ত করতে গোপন তথ্য ফাঁস করেছেন। যদিও এই কাতারগেট বিষয়ে নেতানিয়াহু সরাসরি জড়িত ছিলেন, এমন প্রমাণ নেই। তবে তিনি স্বীকার করেছেন, তার নির্দেশেই উরিখের মাধ্যমে কিছু তথ্য ফাঁস হয়েছিল।

ধারণা করা হচ্ছে, কাতার ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু লোককে ঘুষ দিয়েছে, যেন তারা গাজায় ইসরায়েলি জিম্মিদের ভাগ্য নিয়ে চলমান পরোক্ষ আলোচনা প্রসঙ্গে কাতারকে একটি বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করে। কাতার অন্য জায়গাতেও তার স্বার্থ রক্ষায় ঘুষ দেওয়ার কৌশল ব্যবহার করেছে। যেমন ২০২২ সালে ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের কয়েকজন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। সেই গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তাঁরা কাতারের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন।

তবে ইসরায়েলে কাতারের টাকার অর্থ ভিন্ন। ২০১৮ সাল থেকে নেতানিয়াহু সরকারের স্পষ্ট অনুমোদনে কাতার সরকার গাজার হামাস শাসনকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রতি মাসে ৩০ মিলিয়ন ডলার পাঠাত। এই অর্থ স্যুটকেসে করে আনা হতো, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়া যায়। এসব টাকা সরকারি কর্মচারীদের বেতন ও সামাজিক কল্যাণভাতা দিতে ব্যবহৃত হতো। ফলে হামাস তাদের অন্যান্য তহবিল সন্ত্রাসবাদে ব্যবহার করতে পারত।

ইসলামপন্থীদের প্রতি কাতারের সমর্থন তাকে আরব বিশ্বের চোখে প্রায়ই একঘরে করে তুলেছে। নেতানিয়াহুর যুক্তি ছিল, গাজায় হামাসের শাসন ইসরায়েলের স্বার্থে কাজ করছে। গাজায় সন্ত্রাসীরা ও রামাল্লায় দুর্নীতিপরায়ণ ও অদক্ষ ফাতাহ আমলারা থাকায় ইসরায়েল ফিলিস্তিনি ইস্যুতে আলোচনায় না যাওয়ার একটি সুবিধাজনক অজুহাত পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রোনেন বার যে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সেটি হলে এই চিত্র প্রকাশ পেয়ে যেত।

যদিও অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আইনজীবীরা এসব অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি, তবে তাঁরা জোর দিয়ে বলেছেন, কাতার কোনো ‘শত্রুরাষ্ট্র’ নয়, অর্থাৎ এতে বিশ্বাসঘাতকতার কোনো প্রশ্ন আসে না। তাঁরা এটাও উল্লেখ করেন, ইসরায়েলের আইনে শুধু সরকারি কর্মচারীরাই ঘুষ নেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হতে পারেন। আর প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর ব্যক্তিগত সহযোগীরা আইনত সরকারি কর্মচারী নন। তাঁরা এটাও যুক্তি হিসেবে আনতে পারেন, ইসরায়েলি গণমাধ্যমও এই গোপন তথ্যগুলো নির্দ্বিধায় ছাপিয়ে সমানভাবে দায়ী।

তবে ইসরায়েলের রাজনীতিতে পেছন থেকে আঘাত দেওয়া বা গোপন তথ্য ফাঁস করাই যেন নিয়ম। সাংবাদিকেরাও এই ফাঁস হওয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করেন, রাজনীতিকেরাও তা–ই করেন। ফেল্ডস্টেইনকে আগেও আরেকটি গোপন তথ্য ফাঁসের ঘটনায় গ্রেপ্তার করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি তখনো চাকরি হারাননি।

এখন দুই পক্ষ স্পষ্টভাবে মুখোমুখি। বিচারমন্ত্রী ইয়ারিভ লেভিন বলেছেন, নেতানিয়াহুর সরকার ‘মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষের অধিকার রক্ষা করছে, যাদের গণতান্ত্রিকভাবে ব্যালট বাক্সে দেওয়া সিদ্ধান্ত কিছু অহংকারী ও বাস্তবতাবিচ্ছিন্ন বিচারকেরা কেড়ে নিতে চাইছেন’। অথচ জনমত জরিপ বলছে, ৬৩ শতাংশ ইসরায়েলি দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং তারা সুপ্রিম কোর্ট, অ্যাটর্নি জেনারেল ও শিন বেতকে নেতানিয়াহুর সরকারের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি বিশ্বাস করে।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

কনস্তান্তি গেবার্ট একজন পোলিশ সাংবাদিক। তিনি একসময় কমিউনবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। পোল্যান্ড, ইহুদি জনগোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে তিনি ১৪টি বই লিখেছেন।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আলে সানি
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং কাতারের আমির তামিম বিন হামাদ আলে সানি। ছবি: রয়টার্স

ওয়াক্ফ আইন ঘিরে উত্তাল মুর্শিদাবাদ

ওয়াক্‌ফ (সংশোধনী) আইন বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে ভারতের মুর্শিদাবাদ জেলার ধূলিয়ান, সুতি, জঙ্গিপুরসহ একাধিক এলাকা। ইতিমধ্যে সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত তিনজন, গুলিবিদ্ধ হয়েছেন আরও তিনজন। গতকাল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কলকাতা হাইকোর্টের নির্দেশে জেলাজুড়ে নামানো হয়েছে কেন্দ্রীয় আধা সামরিক বাহিনী। দুর্ঘটনাস্থলে তারা টহল বা রুট মার্চ শুরু করেছে।

নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সমসেরগঞ্জে হর গোবিন্দ দাস (৭২), তাঁর ছেলে চন্দন দাস (৪০) এবং সুতির এজাজ আহমেদ সেখ (১৭)। হর গোবিন্দ দাস ও চন্দন দাসকে বাড়ি থেকে টেনে বের করে নৃশংসভাবে কুপিয়ে খুন করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। সুতির এজাজ আহমেদ সেখ (১৭) বিক্ষোভে অংশ নিয়ে পুলিশের গুলিতে আহত হন এবং পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

আজ সকাল থেকে মুর্শিদাবাদের সমসেরগঞ্জ, সুতি, ধূলিয়ানে আধা সামরিক বাহিনীর টহলদারি শুরু হয়েছে। পুরুলিয়ার বিজেপি সংসদ সদস্য জ্যোতির্ময় সিং মাহাত এ ঘটনায় সেনাবাহিনীর বিশেষ ক্ষমতা আইন (এএফএসপিএ) প্রয়োগ এবং মুর্শিদাবাদকে উপদ্রুত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছেন। তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে চিঠি দিয়ে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন। মুর্শিদাবাদে বন্ধ রয়েছে ইন্টারনেট পরিষেবা।

এসব ঘটনার জেরে বিক্ষোভের মুখে পড়েন তৃণমূলের ফারাক্কা আসনের বিধায়ক মনিরুল ইসলাম ও জঙ্গিপুরের সংসদ সদস্য খলিলুর রহমান। এ সময় তাঁদের বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। রাজ্যের বিরোধীদলীয় নেতা শুভেন্দু অধিকারী এই সহিংসতার জন্য জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলাকে দায়ী করেন। তিনি এ রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির দাবিও তোলেন। তিনি আরও বলেন, মুর্শিদাবাদের এই হামলায় ৩৫টি পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ হয়েছে। পুড়েছে সরকারি বাস থেকে বেসরকারি বহু যানবাহন।

ধূলিয়ান ও সুতিতে একের পর এক বাড়িঘর, দোকানপাটে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট হয়েছে। ভাঙচুর করা হয়েছে একটি আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা কেন্দ্রে। রেহাই পায়নি শপিং মলও। বিভিন্ন বাড়িঘরের ছাদ থেকে বিএসএফ মজুত করা পাথর উদ্ধার করেছে।

অন্যদিকে তৃণমূল সংসদ সদস্য ও দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, বাংলাকে অশান্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

রাজ্য পুলিশের আইজি রাজীব কুমার শান্ত থাকার আবেদন জানিয়ে বলেছেন, কোনো গুন্ডাবাজিকে বরদাশত করা হবে না।

এ বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের সব পক্ষকে সংযত থাকার বার্তা দিয়েছেন।

মুর্শিদাবাদে কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহল
মুর্শিদাবাদে কেন্দ্রীয় বাহিনীর টহল। ছবি: প্রথম আলো

সালিসে না আসায় বাড়িতে গিয়ে বাবা-ছেলেকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় চুরির অভিযোগে ডাকা সালিসে না আসায় বাবা-ছেলেকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটেছে। আজ রোববার বেলা একটার দিকে উপজেলার নাওগাঁও পশ্চিম পাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ নিহত বাবা–ছেলের মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে তিনজনকে আটক করেছে।

নিহত দুজন হলেন নাওগাঁও পশ্চিম পাড়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুল গফুর (৫০) ও তাঁর ছেলে মেহেদী হাসান (১৫)। জমি নিয়ে প্রতিবেশীদের সঙ্গে বিরোধ ও পূর্বশত্রুতার জের ধরে চুরির অপবাদ দিয়ে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে পরিবার।

পুলিশ জানায়, আবদুল গফুরের প্রতিবেশী প্রবাসী রাশেদ কিছুদিন আগে দেশে আসেন। দুই দিন আগে তাঁর ঘর থেকে কিছু কাগজ ও একটি মুঠোফোন চুরি হয়। এ ঘটনায় আবদুল গফুরের ছেলে মেহেদী হাসানকে অভিযুক্ত করে আজ বেলা ১১টার দিকে সালিস বসানো হয়। রাশেদের বাড়ির সামনে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য মঞ্জুরুল হকের নেতৃত্বে সালিসটি বসে। কিন্তু চুরির সঙ্গে মেহেদী জড়িত নয় দাবি করে সালিসে যাননি বাবা-ছেলে।

স্থানীয় লোকজনের বরাত দিয়ে পুলিশ বলছে, সালিস বসার পর সেখান থেকে লোকজন গিয়ে আবদুল গফুরকে তাঁর ছেলেকে নিয়ে হাজির হতে বলেন। কিন্তু সালিসের ডাকে হাজির না হওয়ায় সেখানে থাকা লোকজন আবদুল গফুরের বাড়িতে বেলা একটার দিকে গেলে বাগ্‌বিতণ্ডা শুরু হয়। এর জেরে আবদুল গফুরের বাড়িতে ভাঙচুর চালানো শুরু করেন সালিসের লোকজন। এ সময় আবদুল গফুর ও তাঁর ছেলেকে রড দিয়ে পিটিয়ে ও কুপিয়ে ঘটনাস্থলেই হত্যা করা হয়। খবর পেয়ে ফুলবাড়িয়া থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। সেখান থেকে বাবা-ছেলের মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নেওয়া হয়।

এ ঘটনায় তিনজনকে আটক করা হয়েছে। বাকিদের ধরতে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। আটক ব্যক্তিরা হলেন পলাশীহাটা গ্রামের মো. রিপন (৩২), নাওগাঁও গ্রামের মৃত সাবান আলীর ছেলে মো. মোজাম্মেল হক (৬৫) ও এক কিশোর (১৩)।

ফুলবাড়িয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. রোকনুজ্জামান বলেন, নিহত বাবা–ছেলের সঙ্গে প্রতিবেশীর জমি নিয়েও বিরোধ ছিল। জমি নিয়ে বিরোধ ও পূর্বশত্রুতার জেরে চুরির অপবাদ দিয়ে হত্যাকাণ্ডটি ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মরদেহ থানায় রয়েছে। ময়নাতদন্তের জন্য সোমবার ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হবে।

ফুলবাড়িয়া থানায় অবস্থান করা নিহত আবদুল গফুরের স্ত্রী শিল্পী বেগম আজ রাতে মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর স্বামীর চাচাতো ভাই আবদুল মোতালেবের কাছে সাড়ে ৪৫ শতক জমি পাঁচ বছর আগে বন্ধক দিয়েছিলেন। দুই লাখ টাকা জমি বন্ধক দিলেও তার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং টাকার প্রয়োজন হওয়ায় আরও পাঁচ বছরের জন্য এক লাখ টাকা চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু টাকা ও জমি কিছুই দিতে চাইছিলেন না আবদুল মোতালেব। পরে তাঁর স্বামী অন্য জায়গায় জমি বন্ধক দিতে চাইলে তাতেও বাধা দেন। ওই অবস্থায় স্থানীয়ভাবে সালিসে বসে তিন মাস আগে এক লাখ টাকা দিলেও দেখে নেওয়ার হুমকি দিয়েছিল মোতালেব।

শিল্পী বেগম বলেন, ‘মেহেদী আমার স্বামীর প্রথম পক্ষের ছেলে। সে একটু বখাটেপনা করত। চার-পাঁচ দিন আগে আবদুল মোতালেবের ফিশারি থেকে দুটি তেলাপিয়া মাছ ধরায় ক্ষুব্ধ হয়ে বকাঝকা করে এলাকা ছাড়া করার হুমকি দেয়। এর মধ্যে প্রতিবেশী বিদেশফেরত একজনের কিছু কাগজ ও মুঠোফোন চুরি হওয়ায় এর অপবাদ দেয় মেহেদীকে। এ নিয়ে সালিস বসালে আমার স্বামী ছেলেকে নিয়ে যায়নি। সে কারণে বাড়িতে এসে হামলা করে হত্যা করে।’

শিল্পী বেগম বলেন, ‘আক্রমণ দেখে আমি পাশের এক ভাশুরের বাড়িতে লুকিয়ে ছিলাম। আমি থাকলে আমাকেও তারা মেরে ফেলত।’

আবদুল গফুর
আবদুল গফুর। ছবি: সংগৃহীত

গাজার হাসপাতালে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল: হামাস

গাজার হাসপাতালে ইসরাইল হামলা চালিয়েছে বলে জানিয়েছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। উপত্যকাটির আল আহলি ব্যাপটিস্ট হাসপাতালে বোমা বর্ষণ করেছে ইসরাইল। এতে হাসপাতালটির নিবিড় পরিচর্যা ও সার্জারি বিভাগ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। এ সংক্রান্ত একটি ভিডিও অনলাইনে পোস্ট করেছে হামাস। সেখানে দেখা যায়, হাসপাতালটিকে লক্ষ্য করে বোমা নিক্ষেপের পর সেখানে আগুন জ্বলে ওঠে। এ সময় হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে থাকা রোগীসহ আশপাশের মানুষদের ঘটনাস্থল থেকে ছুটে বেরিয়ে আসতে দেখা যায়। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, স্থানীয় এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, হাসপাতালের এক চিকিৎসককে ফোন করে সেখান থেকে রোগী সরিয়ে নিতে হুমকি দেয় ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী আইডিএফ-এর এক কর্মকর্তা। ইসরাইলের এই হামলাকে ‘ভয়ঙ্কর অপরাধ’ বলে অভিহিত করেছে হামাস। এই হামলায় এখন পর্যন্ত কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে এ বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে হামাস।

স্থানীয় ওই সাংবাদিক জানিয়েছেন, ইসরাইলি সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তা হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসকের কাছে ফোন করে হুমকি দিয়ে বলেন, সব রোগী এবং বাস্তুচ্যুত মানুষকে অবশ্যই নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হবে। আপনাদের হাতে আছে মাত্র ২০ মিনিট। সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, গভীর অন্ধকারের মধ্যেই হাসপাতালে আশ্রয় নেয়া ব্যক্তি এবং স্টাফরা ছুটে বেরিয়ে আসছে। তাদের মধ্যে কয়েক ডজন নারী ও শিশুও ছিল। হামলার শুরু থেকেই হাসপাতালগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে আসছে ইসরাইল। এর আগে তারা গাজার সবচেয়ে বড় হাসপাতাল আল শিফাকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দেয় তারা। এতে উপত্যকাটির চিকিৎসা পরিষেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

mzamin

এখনও মুক্তি নিশ্চিত না হওয়ায় ইসরাইলি সরকারের সমালোচনা করলেন আটক জিম্মি

এখনও মুক্তি নিশ্চিত না হওয়ায় ইসরাইলি সরকারের সমালোচনা করেছেন আটক এক জিম্মি। শনিবার একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের সশস্ত্র শাখা। সেখানে ওই জিম্মিকে জীবিত দেখানো হয়েছে। জিম্মিদের মুক্তির বিষয়ে সরব ইসরাইলি সংস্থা হোস্টেজেস অ্যান্ড মিসিং ফ্যামিলিজ ফোরাম ওই জিম্মিকে এডান আলেকজান্ডার হিসেবে শনাক্ত করেছে। তারা জানিয়েছে এডান ইসরাইল বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর তাকে জিম্মি হিসেবে আটক করে হামাস। তবে ভিডিওটি কখন ধারণ করা হয়েছিল সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

হামাসের সশস্ত্র শাখা ইজ্জেদিন আল কাসসাম ব্রিগেড তিন মিনিটের একটি ভিডিও প্রকাশ করেছে। যেখানে ওই জিম্মিকে একটি আঁটসাঁট স্থানে বসে থাকতে দেখা গেছে। ছুটির দিনগুলো উদযাপন করতে দেশে ফেরার কথা জানিয়েছেন এডান আলেকজান্ডার। ইসরাইলে বর্তমানে পাসওভারের ছুটি চলছে। মিশরের দাসত্ব থেকে ইহুদিদে বাইবেল মুক্তির স্মরণে এই ছুটি উদযাপন করেন ইসরাইলিরা। ২১ বছর বয়সী আলেকজান্ডার তেল আবিবে জন্মগ্রহণ করেন। তবে বেড়ে ওঠেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে। সেখানে উচ্চ মাধ্যমিক পড়াশুনা শেষে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে ইসরাইলে ফিরে আসেন তিনি।

শনিবারের শুরুতে পৃথক এক বিবৃতিতে হামাস বলেছে, ইসরাইলের হামলায় কেবল ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদেরই নয়, অবশিষ্ট জিম্মিদের জীবনও বিপন্ন করে তুলেছে।

৭ অক্টোবর মোট ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে আসে হামাস। যাদের অনেককেই মুক্তি দেয়া হয়েছে। আর এখনও আটক আছে মোট ৫৮জন জিম্মি। ইসরাইলি সেনাবাহিনীর দাবি ৩৪ জন জিম্মিকে হত্যা করেছে হামাস। ১৮ মার্চ গাজায় ইসরায়েলের বিমান হামলা পুনরায় শুরু হওয়ার আগে সাম্প্রতিক যুদ্ধবিরতি চলাকালীন, হামাস ৩৩ জন জিম্মিকে মুক্তি দিয়েছে। যার মধ্যে আটজনের মৃতদেহও রয়েছে।

mzamin

পুনেতে বাংলাদেশি বালিকাকে বিক্রি করা হয় ৩ লাখ রুপিতে

বাংলাদেশের ১৬ বছর বয়সী একটি বালিকাকে চার নারীর কাছে বিক্রি করে দেয়ার অভিযোগে শনিবার ভারতের পুনের বুদ্ধওয়ার পেথ এলাকায় চার নারীকে গ্রেপ্তার করেছে ভারতীয় পুলিশ। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে আছে একজন বাংলাদেশিও। টাইমস অব ইন্ডিয়ার রিপোর্টে বলা হয়েছে, আটক নারীরা বেআইনিভাবে মেয়েদের আটকে রেখে দেহব্যবসায় বাধ্য করায়। আটক নারীদের মধ্যে বেআইনি ‘পতিতালয়ের’ এক মালিক আছে। অভিযোগ আছে, বাংলাদেশি ওই বালিকাকে তিন লাখ রুপিতে বিক্রি করে দেহব্যবসায় বাধ্য করা হয়েছিল। আটক চার নারীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে ফরাশখানা পুলিশ।

ওই ‘পতিতালয়’ থেকে বাংলাদেশের বগুড়ার অপ্রাপ্তবয়স্ক ওই বালিকা পালিয়ে যান ২রা এপ্রিল। ফরাশখানা পুলিশের তথ্যমতে, ৮ই এপ্রিল ওই বালিকা হাদাপসার পুলিশ স্টেশনে পৌঁছেন। এ পর্যন্ত পথচারীদের কাছ থেকে অর্থ ভিক্ষা করে বেঁচেছিলেন ওই মেয়েটি। পুলিশ স্টেশনে পৌঁছে তিনি তার ওপর চালানো নৃশংসতার বর্ণনা করেন। তার বক্তব্য রেকর্ড করে পুলিশ। এরপর তারা মানবপাচার, একজন কম বয়সী মেয়েকে কোনবেচা এবং যৌন ব্যবসায় বাধ্য করার অভিযোগে মামলা নিবন্ধিত করে। ফরাশখানা পুলিশের সিনিয়র ইন্সপেক্টর প্রশান্ত ভাসমি বলেছেন, হাদাপসার পুলিশ ওই বালিকাটিকে উদ্ধার করে একটি রেসক্যু সেন্টারে স্থানান্তর করে মামলা নিবন্ধিত করেছে। সেই মামলা শুক্রবার ফরাশখানা পুলিশ স্টেশনে অধিক তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক বালিকাকে জোরপূর্বক যৌনব্যবসায় নিয়োজিত করার অপরাধে আমরা ‘পতিতালয়ের’ মালিককে গ্রেপ্তার করেছি।

 বাংলাদেশি একজন নারীকে খুঁজছি আমরা। আমরা নিশ্চিত হতে চাইছি যে, তিনি পুনেতেই আছেন নাকি মহারাষ্ট্রের অন্য কোথাও বা ভারতের অন্য কোথাও আছেন। তিনি আরও বলেন, ওই বালিকার পুরো বক্তব্য আমরা রেকর্ড করেছি। তিনি আমাদেরকে বলেছেন তার পিতা পরিবারকে ফেলে চলে যায়। এ অবস্থার মা ও বড় ভাইয়ের সঙ্গে একসঙ্গে থাকতেন ওই বালিকা। স্ট্যান্ডার্ড অষ্টম শ্রেণির পড়া শেষ করেছেন তিনি। তার মা একজন সুইপার। পুলিশের মতে, অভিযুক্ত বাংলাদেশি নারীর বাড়িও বগুড়ায়। সে বেআইনিভাবে ভারতে এসেছে। বসবাস করছিল ভোসারি-দিঘি এলাকায়। প্রায় ৫ মাস আগে সে বগুড়া যায় এবং ওই বালিকাকে পুনেতে ভাল বেতনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রলুব্ধ করে। এরপর তাকে নিয়ে সে বেআইনিভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে এবং ট্রেনে করে পুনেতে চলে আসে। ডিসেম্বরে ওই বালিকাকে নিয়ে তুলশিবাগ এলাকায় যায় বাংলাদেশি ওই নারী। সেখানে ওই পতিতালয়ের মালিক ও অন্যদের সামনে উপস্থাপন করে অপ্রাপ্তবয়স্ক ওই মেয়েকে। পতিতালয়টির মালিক এই বালিকাকে তিন লাখ রুপির বিনিময়ে কেনে। এরপর তাকে পতিতালয়ে নিয়ে যায়। বাধ্য করে দেহব্যবসায় নিযুক্ত হতে। পুলিশ বলেছে, উদ্ধার হওয়া বালিকাকে রেসক্যু সেন্টারে স্থানান্তরের আগে চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালে নেয়া হয়। 

mzamin
প্রতীকী ছবি



‘গঠনমূলক’ আলোচনার মধ্য দিয়ে শেষ হলো ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ধাপের আলোচনা

পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওমানে বৈঠক করেছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। স্থানীয় সময় শনিবার ওমানে প্রথম ধাপের আলোচনা শেষ করেছে দুই দেশ। ২০১৮ সালের পর তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে এটাই সর্বোচ্চ পর্যায়ের কোনো বৈঠক। উভয় দেশই এই আলোচনাকে ‘গঠনমূলক’ বলে বর্ণনা করেছে। নিশ্চিত করেছে যে, আগামী সপ্তাহে পরমাণু ইস্যুতে দ্বিতীয় ধাপের বৈঠকে বসবে তারা। এক্ষেত্রে সরাসরি আলোচনাকে প্রাধান্য দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। যার মাধ্যমে তারা পারমাণু নিয়ে একটি সম্ভাব্য চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

এতে বলা হয়, ২০১৮ সালে বিশ্বের পরাশক্তি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে করা ইরানের পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। এরপর থেকে নতুন করে তেহরানের সঙ্গে ‘আরও ভালো’ চুক্তির ওপর জোর দিয়ে আসছেন তিনি। প্রথম ধাপের এই আলোচনা সম্ভাব্য চুক্তির জন্য বেশ ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। আড়াই ঘন্টাব্যাপী বৈঠকের প্রথম ধাপ ছিল সংক্ষিপ্ত। জানা গেছে, উভয় পক্ষই একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিল এবং তারা আগামী সপ্তাহে দ্বিতীয় দফায় বসতে সম্মত হয়েছে।

পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচী অনুযায়ী শনিবার ওমানের মাসকাটে পারমাণবিক ইস্যুতে আলোচনায় বসে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের প্রস্তাব ছিল তেহরানের সঙ্গে তারা সরাসরি বৈঠক করবে। তবে তাতে রাজি হয়নি ইরান। তারা ওমানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে প্রস্তাব করে। ফলত পরমাণু ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যস্থতায় ছিল ওমানের উচ্চ পর্যায়ের কূটনীতিকরা।

প্রথম মেয়াদে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের পরমাণু চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেয়ার পর এটি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। আলোচনায় ইরানের প্রতিনিধিত্ব করেছে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। তিনি বৈঠক সম্পর্কে ইতিবাচক রায় দিয়েছেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভি চ্যানেলকে বলেছেন, প্রথম বৈঠক হিসেবে এটি বেশ গঠনমূলক ছিল যা খুবই শান্তিপূর্ণ এবং সম্মানজনক পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে কোনো অসঙ্গত ভাষা ব্যবহার করা হয়নি। আরাগচির কূটনৈতিক সুর থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, ট্রাম্পের হুমকিমূলক কোনো বাক্য ব্যবহার করেননি তার দূত স্টিভ উইটকফ। ট্রাম্প বলেছিলেন, এই সংলাপ সফল না হলে ইরানকে ‘বড় বিপদের’ সম্মুখিন হতে হবে। তেহরানকে লক্ষ্য করে বারবার সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। বৈঠকটি পৃথক কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে। উভয় পক্ষের মধ্যে বার্তা প্রেরক হিসেবে ছিলেন ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল বুসাইদি।

mzamin


আঁকতে যাই পাখি, হয়ে যায় মাছ

কাল পয়লা বৈশাখ, বাংলা নববর্ষ। বর্ষবরণকে সামনে রেখে ‘স্বপ্ন নিয়ে’র পাঠককে মনে করিয়ে দিতে চাই এমন এক শিল্পীর কথা, যাঁর তুলির টানে টানে ফুটে উঠত বাংলার নকশা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য। তিনি পটুয়া কামরুল হাসান (২ ডিসেম্বর ১৯২১-২ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৮)। কীভাবে তাঁর মধ্যে গড়ে উঠেছিল শিল্পসত্ত্বা? ‘আপন কথা’ নিবন্ধে সে কথা নিজেই লিখে গেছেন তিনি। ১৯৮৬ সালে লেখাটি ছাপা হয়েছিল মুস্তাফা নূরউল ইসলাম সম্পাদিত সুন্দরম পত্রিকায় (সংখ্যা ভাদ্র-কার্তিক ১৩৯৩)। পড়ুন নির্বাচিত অংশ।

আব্বা, মা, এবং আমরা দুটি ভাই—এই নিয়ে আমাদের সংসার। এক ছুটির দিন, সকলেই বাড়িতে, আমি বোধ হয় একটু দুষ্টমি করছিলাম। তাই আমাকে শান্ত করবার জন্যে আব্বা আমাকে আদর করে কাছে ডেকে পাশে বসিয়ে বড় ভাইয়ের স্লেট পেনসিল সামনে ধরে বললেন, ‘আয় তোকে একটা মজার খেলা শেখাই।’ বড় ভাইয়ের স্লেটের ওপর আমার ছোট্ট ডান হাতের পাতা উপুড় করে বসিয়ে পাঁচ আঙুলের চারপাশে পেনসিলের দাগ বসিয়ে হাতের পাতাটি স্লেট থেকে ওপরে তুলে ধরতেই চোখে পড়ল স্লেটের ওপরে আমার ছোট হাতের পাঁচটি আঙুলের সুন্দর একখানি ছবি। নিজেই আমার হাতটা পেতে দিয়ে শিশু ভাষায় জানালাম আবার আমার হাত এঁকে দিতে। আগের ছবিটি মুছে দিয়ে আব্বা আমার হাত আবার আঁকলেন—এইভাবে বারবার আঁকা চলতে থাকল। অবসর এবং ভাইয়ার স্লেট পেনসিল হাতের নাগালে পেলেই আব্বার কাছে নিয়ে উপস্থিত হতাম। তিনিও বুঝতেন এবং স্লেটের পিঠে আমার হাতের ছবি ভেসে উঠতে থাকত বারংবার। এটা আমার নিত্যদিনের খেলা হয়ে দাঁড়াল। শেষে একদিন দেখা গেল আমি নিজেই নিজের হাত বসিয়ে আঁকছি স্লেটের ওপরে। এইভাবে খেলা করতে করতে বয়স কিছুটা বেড়ে গেল। তখন কথাও বলতে পারি। এদিকে ভাইয়ার স্লেটে নিজেই নিজের হাত আঁকা আমার নেশায় দাঁড়িয়ে গেছে। শুধু আঁকাতেই শেষ নয়, তা নিয়ে আব্বাকে দেখাই, অন্য সব আত্মীয়স্বজন—মামা-চাচাদেরও দেখাই। বাহবা নিই।

এভাবেই খেলার ছলে কখন আমার মনের কোণে ছবি আঁকার একটি লতাগুল্ম অঙ্কুরিত হয়েছিল, বলতে পারি না। তারপর বয়স একটু বাড়তেই স্কুলে ভর্তি হওয়ার সময় এসে গেল। আব্বা বড় ভাইকে যে স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিলেন, সেই মডেল এম-ই স্কুলে আমাকেও ভর্তি করিয়ে দিলেন। ইনফ্যান্ট টু-তে। কলকাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ স্কুল। সাধারণ পড়াশোনার সঙ্গে ড্রইং আর মডেলিং ক্লাসের চমৎকার আয়োজন ছিল। আমি যেন এক নতুন আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়াতে লাগলাম মনের আনন্দে। ছবি আর ছবি। আজ দেখতে পাচ্ছি আমার সেই শিশুকালটাকে। নতুন দৃষ্টি মেলে। মাত্র ডিম ফেটে বের হয়েছি, চোখ ফুটেছে কিন্তু ডানা ভালো করে মেলতে পারি না, তাই উড়তে গিয়ে বারবার পড়ে যাই। হ্যাঁ, ছবি আঁকতে যাই পাখির, হয়ে যায় মাছ। এমনিভাবে ডানা ঝাপটাতে ঝাপটাতে ছবির আকাশে সেই যে উড়তে আরম্ভ করেছিলাম সে ওড়ার এখনো বিরাম নাই।

সেই বয়ঃসন্ধির কাল থেকে কানে আসতে লাগল যে ছবি আঁকলে আর্টিস্ট হওয়া যায় এবং আর্টিস্ট হলে খুব নাম হয়। লোকে আঙুল দেখিয়ে বলে ওই লোকটা খব বড় আর্টিস্ট। পয়সাও নাকি উপায় করা যায়। তবে ওটা বড়লোকদের পেশা, আর্টিস্ট হতে হলে বেশ পয়সাকড়ি খরচ করতে হয়। আবার এ-ও কানে এল যে আর্টিস্টরা খেয়ালি হয়, খাবার পয়সা জোটে না তাদের। তবুও ছবিই আঁকব, আর্টিস্ট হতেই হবে। সেই বয়সেই অর্থাৎ ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম, সাধারণ পড়াশোনা আর করব না। তখনকার দিনে কলকাতা সরকারি আর্ট স্কুলে পড়তে হলে ম্যাট্রিক না পাস করলেও চলত। এ সংবাদটিও সংগ্রহ করে ফেলেছিলাম। কলকাতা শহরে থাকতাম বলেই এসব খবরাখবর জোগাড় করা সম্ভব হয়েছিল। তা ছাড়া মনটা আমার সেই বয়সেই যেন শিল্পের রসে জারিত হয়ে গিয়েছিল। তবুও মাইনর স্কুল শেষ করে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র হিসেবে ক্যালকাটা মাদ্রাসায় ঢুকতে হয়েছিল। মাদ্রাসার সঙ্গেই ছিল ইংরেজির মাধ্যমে সাধারণ বিদ্যাশিক্ষার ব্যবস্থা। সেখানে গিয়ে ড্রইং ক্লাস পেয়েছিলাম এবং আজিজার রহমান নামে একজন তরুণ ড্রইং টিচার। তাঁর কাছ থেকেও উৎসাহ এবং উসকানি দুটোই পেয়েছিলাম। যার ফলে সপ্তম শ্রেণি অতিক্রম করে আর অষ্টম শ্রেণিতে যেতে পারিনি বা যেতে চাইনি বলা যায়।

অতএব ১৯৩৮ সালের জুন মাসে কলকাতার চৌরঙ্গীতে গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টে গিয়ে টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে এলাম। ফলাফল প্রথম বিভাগেই ছিল। যে ধর্মপ্রাণ পিতা শিশুকালে খেলার ছলে বড় ভাইয়ের স্লেটে আমার হাত আঁকা শিখিয়েছিলেন, সেই নিরীহ মানুষটিকে বাধ্য করেছিলাম আমাকে নিয়ে আর্ট স্কুলের প্রিন্সিপালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে। তখন এইটাই নিয়ম ছিল। আব্বা বিরোধিতাও করেননি, আবার উষ্ণতার উত্তাপ দিয়ে সমর্থনও করেননি।

১৯৩৮ সালের জুলাই মাস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ছবি আঁকার অনুশীলন আরম্ভ হয়ে গেল। প্রথম দিকে মনে মনে নিজেকে বিরাট কী ভাবতাম এবং সেইভাবেই চলাফেরা করতাম। রেমব্রান্ট, মিকেলেঞ্জেলো, রাফায়েল—সব নখের ডগায়। তারপর যত দিন যেতে লাগল, ততই ঘোর কাটতে লাগল। পাঁচ বছরের মধ্যেই কামরুল নামে নতুন এক শিশু হিসেবেই যেন আবার জন্ম নিলাম। এবং সেই থেকে নিউটনের মতোই সমুদ্রতীরের নুড়িপাথর সংগ্রহ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আজ অবধি সেই পাথর স্পর্শ করা তো দূরের কথা, তার আলোর ছটা এখনো দৃষ্টিগোচর হলো না। তবুও হাল ছাড়িনি। ছাড়বই বা কোন সাহসে, পেটে তো আর বিদ্যা নেই। আমার পিতা প্রায়ই আমার ছবি আঁকাকে সমর্থন করার জন্যে যুক্তি দিয়ে বলতেন, ‘ছবি আঁকাও তো হুনুরে কাজ, পেট চলেই যাবে ওর।’ সত্যিই, পেট তো চলেই যাচ্ছে। তাহলে কি পেট চালাবার জন্যে ছবি আঁকছি? এ প্রশ্নের উত্তর কি দেব? না, ছবি আঁকবার জন্যেই ছবি আঁকতে আরম্ভ করেছিলাম বটে, পরে সময় যত যেতে লাগল, ততই মনে নানান প্রশ্নের তাগিদ অনুভব করতে লাগলাম। নিজের ভালো লাগা সেই সঙ্গে অন্যদেরও ভালো লাগানো। এটাতেও যেন প্রশ্নের সঠিক উত্তর পেলাম না। বয়স বাড়ার সাথে কিছু কিছু রাজনৈতিক চিন্তার আঘাত পড়ল মনের দরজায়। তার মধ্যে মানুষের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। মানুষের বেঁচে থাকার আকুতি। সে মানুষ সর্ব সমাজের, বিশেষ করে শোষিত সাধারণ শ্রেণির, নিচের তলার মানুষের আর্তনাদ যেন অধিকতর। কিন্তু শিল্পকলা তো শুনেছি চিত্তবিনোদনের জন্যে! হ্যাঁ তার মধ্যে দিয়েই নতুন বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। আমার ছবির মধ্য দিয়ে ওই কাজটি করতে হবে।

পটুয়া কামরুল হাসানের তুলির টানে টানে ফুটে উঠত বাংলার নকশা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য
পটুয়া কামরুল হাসানের তুলির টানে টানে ফুটে উঠত বাংলার নকশা, কৃষ্টি, ঐতিহ্য। ছবি: সংগৃহীত