Tuesday, November 21, 2017

নয় বছর নীরব থাকার পর মারা গেছেন প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি

দীর্ঘ নয় বছর নীরব থাকার পর গতকাল বেলা সোয়া বারোটায় মারা গিয়েছেন ভারতের সাবেক মন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি। নয়াদিল্লির ইন্দ্রপ্রস্থ অ্যাপোলো হাসপাতালে তার মৃত্যুর সময়ে স্ত্রী দীপা দাশমুন্সি এবং পুত্র মিছিল তার পাশে ছিলেন বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গিয়েছে। বয়স ছিল ৭২ বছর। ১৯৪৫ সালে বর্তমানে বাংলাদেশে তার জন্ম। ২০০৮ সালে মহানবমীর রাতে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন ভারতের তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংসদবিষয়ক মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি। তাকে দ্রুত পশ্চিমবঙ্গের কালিয়াগঞ্জ থেকে নয়াদিল্লির এইমস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রিয়রঞ্জন সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। পরে তাকে এইমস থেকে স্থানান্তর করা হয়েছিল ইন্দ্রপ্রস্থ অ্যাপোলো হাসপাতালে। মাঝে অবশ্য উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে জার্মানিতেও নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অসুস্থ হওয়ার থেকে প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। প্রথম কিছু দিন কোমায় ছিলেন তিনি। পরে চিকিৎসকরা তাকে কোমা থেকে বার করে আনতে পেরেছিলেন। কিন্তু প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির চেতনা আর পুরোপুরি ফেরানো যায়নি। তার জ্ঞান ফিরেছিল ঠিকই। কিন্তু বাকশক্তি বা স্মৃতি আর ফেরেনি। কোনও বিষয়েই কোনও  প্রতিক্রিয়া বা অভিব্যক্তি প্রকাশের শক্তি তার ছিল না। প্রিয়রঞ্চনের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে বার্তা দিয়েছেন ভারতের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী। কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী এক বার্তায় বলেছেন, দীর্ঘ অসুস্থতার জেরে রাজনীতির ময়দানে অনুপস্থিত থাকা সত্ত্বেও প্রিয়রঞ্জন নিজের অনুগামীদের মধ্যে সমান জনপ্রিয় ছিলেন। প্রিয়রঞ্জনের মৃত্যুতে কংগ্রেসের তরফে গভীর শোক  প্রকাশ করে বলা হয়েছে, প্রবীণ কংগ্রেস নেতা এবং  প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সির প্রয়াণে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। তার বিভিন্ন অবদানের জন্য, বিশেষত ভারতীয় ফুটবলে তার অবদানের জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, ১৯৭২ সাল থেকে তিনি বাংলার খুবই জনপ্রিয় নেতা ছিলেন।  প্রায় ৯ বছর ধরে তিনি ছিলেন কোমায়। ২০০৮ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ায় তার রাজনৈতিক জীবন কার্যত থেমে গিয়েছিল। না হলে তিনি তার রাজনৈতিক জীবনে আরও অনেক কিছু করতে পারতেন। তিনি বেঁচেছিলেন। কিন্তু, আজ আর নেই। এটা একটা বড় ক্ষতি। সোমবার রাতেই তার মরদেহ কলকাতায় আনা হযেছে। আজ দুপুরেই তার মরদেহ নিয়ে হেলিকপ্টার উত্তরবঙ্গের রায়গঞ্জে উড়ে যাওয়ার কথা। সেখানেই রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে।

৩৫ লাখ টাকার মোবাইল by রোকনুজ্জামান পিয়াস

চারপাশ স্বর্ণে মোড়ানো। স্ক্রিনটি নীলকান্তমণির। কিপ্যাডে রয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ ক্যারটের রুবি পাথর। পুরো কাঠামো উত্তর ইউরোপের বিশেষ হার্ডকাট চামড়া ও প্ল্যাটিনাম ধাতুর মিশেল। এটি একটি মোবাইল ফোন সেট। দাম প্রায় ৩৫ লাখ টাকা।
এতো দামি উপাদানে তৈরি যেই মোবাইল ফোন সেট, তাতে নেই কোনো ক্যামেরা। মাইক্রো এসডি মেমোরি কার্ড ব্যবহার করে বাড়ানো যায় না ইন্টারনাল স্টোরেজ। নকিয়া ব্র্যান্ডের ‘ভারটু’ নামের এই মোবাইল ফোন সেটটির দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ১২ ইঞ্চি, প্রস্থ ১ দশমিক ৬৫ ইঞ্চি এবং পুরু শূন্য দশমিক ৫১ ইঞ্চি। বিলাসবহুল এই মোবাইল ফোনের বিক্রেতা কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান নয়। বাংলাদেশি ব্যবসায়ীই এর বিক্রেতা। আনা হয়েছে দেশের গ্রাহকের জন্যই। এ মোবাইল ফোন সেটকে ঘিরে চলছে তদন্ত। তদন্ত চালাচ্ছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। গোয়েন্দারা বলছেন, মোবাইলটির আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান গুলশান মার্কেটের ‘ফোন এক্সচেঞ্জ’। প্রতিষ্ঠানটি এ ধরনের একাধিক বিলাসবহুল মোবাইল ফোন সেট বাংলাদেশে নিয়ে এসেছে বলে গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য রয়েছে। মোটা অঙ্কের শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চোরাইপথে আনা এসব মোবাইল নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে মনে করছেন তারা। আগামী বৃহস্পতিবার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটির মালিক সারোয়ার হায়দারকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে তলব করা হয়েছে। এর আগে গত সোমবার রাজধানীর বিভিন্ন মার্কেটে অভিযান চালিয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বিলাসবহুল নকিয়া ব্র্যান্ডের এই ‘ভারটু’সহ প্রায় ২০০ মোবাইল ফোন সেট জব্দ করে। ওই অভিযানে অবৈধভাবে আনা একটি ড্রোনও আটক করা হয়।
শুল্ক ও গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, গত সোমবার শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর একযোগে গুলশান, বসুন্ধরা সিটি মার্কেট ও ধানমন্ডি এলাকায় অবৈধভাবে আমদানিকৃত মোবাইল ফোন সেট আটকে বিশেষ অভিযান চালায়। অভিযানে শুল্ক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা ছাড়াও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ ফোর্স এবং বিটিআরসি কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বসুন্ধরা মার্কেটের ৯টি দোকান, গুলশান এভিনিউর ১টি ও ধানমন্ডির অরচার্ড পয়েন্টে ১টি সহ মোট ১১টি দোকানে এই অভিযান পরিচালিত হয়। অভিযানে চোরাইপথে আনা আইফোন-১০ সহ অন্যান্য বিলাসবহুল ব্র্যান্ডের প্রায় ২ শতাধিক মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। জব্দকৃত এসব ব্র্যান্ডের মধ্যে ছিল আইফোন, স্যামসাং গ্যালাক্সি এস৮, নকিয়া এক্স ৩, ব্ল্যাকবেরি। আটককৃত মোবাইল সেটগুলোর মধ্যে আইফোন ১০-১৫টি, অন্যান্য মডেলের আইফোন ১১৮টি, অ্যাপল আইপ্যাড ৮টি, স্যামসাং ৫৮টি, নকিয়া ২টি, ব্ল্যাকবেরি ২টি এবং নকিয়া ‘ভারটু’ ব্র্যান্ড। যার মোট বাজারমূল্য ১ কোটি টাকারও অধিক। অভিযানকালে গুলশান মার্কেটের ‘ফোন এক্সচেঞ্জ’ প্রতিষ্ঠানের শোরুম থেকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক চোরাই মোবাইল ফোনসেট উদ্ধার করা হয়। গুলশান ও বসুন্ধরা মার্কেটের ফোন এক্সেচেঞ্জের দু’টো শোরুম থেকে মোট ৮৮টি দামি সেট উদ্ধার করা হয়। এছাড়া ‘ফোন এক্সচেঞ্জ’-এর গুলশানের শোরুম থেকে একটি ড্রোনও জব্দ করা হয়। ডিজেআই ব্র্যান্ডের আমদানি নিষিদ্ধ এই ড্রোনটির মডেল জিএল২০০এ।
তবে আটক এসব মোবাইল পণ্যের মধ্যে সবচেয়ে আলোড়ন তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটির একই শোরুম থেকে জব্দ করা ‘ভারটু’ ব্র্যান্ডের এক্সক্লুসিভ মোবাইল ফোনসেটটি। কৌতূহল সৃষ্টি করা এই মোবাইল সেটটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা যায়, নকিয়ার তৈরি ২৩৮ গ্রাম ওজনের সেটটির পার্শ্বদেহ ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণ দিয়ে মোড়ানো। এর স্ক্রিনটি সলিড স্যাফায়ার বা নীলকান্তমণি ক্রিস্টালের তৈরি। দুনিয়ার সবচেয়ে মূল্যবান ধাতু ডায়মন্ডের পরেই অবস্থান এই স্যাফায়ার ক্রিস্টাল বা নীলকান্তমণির। ফলে এতে কোনো দাগ পড়ে না। এর কিপ্যাডে রয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ ক্যারেটের রুবি পাথর। পুরো ফোনটি উত্তর ইউরোপের বিশেষ হার্ডকাট চামড়া ও প্লাটিনাম ধাতুর মিশেলে তৈরি। বিশেষ শ্রেণির ক্রেতাদের ফরমায়েশের ভিত্তিতে তৈরি হওয়া এই ফোনসেটটি ইংল্যান্ডের সুদক্ষ হস্তশিল্প কারিগর দ্বারা সম্পূর্ণভাবে হাতে তৈরি করা। সেটটির দৈর্ঘ্য ৫ দশমিক ১২ ইঞ্চি, প্রস্থ ১ দশমিক ৬৫ ইঞ্চি এবং শূন্য দশমিক ৫১ ইঞ্চি পুরু। ক্রেতারা চাইলে নিজেদের পছন্দমতো রঙ এবং সেলাইয়ের নকশার ফরমায়েশও করতে পারেন। এই মোবাইল ফোন সেট সম্পর্কে আরো জানা গেছে, একাডেমি অ্যাওয়ার্ড জয়ী সুরশিল্পী দারিও মারিয়ানেলি এই ফোনের জন্য আলাদাভাবে এক্সক্লুসিভ রিংটোন ও অ্যালার্ট টোন সুর করেছেন যা পরে বিখ্যাত লন্ডন সিম্ফনি অর্কেস্ট্রার যন্ত্রশিল্পীদের দ্বারা রেকর্ড করা হয়। তবে আশ্চর্য্যের বিষয় হলো এতো মূল্যবান উপাদান যে সেটে রয়েছে, তাতে নেই কোনো ক্যামেরা এবং ইন্টারনাল স্টোরেজ বাড়ানোর জন্য কোনো মাইক্রো এসডি মেমোরি কার্ড ব্যবহার করার অপশন। শুল্ক গোয়েন্দারা বলছেন, সেটটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে জানা গেছে, এটির মূল্য ২৬ হাজার ইউরো। যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৩৫ লাখ।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আটককৃত এসব পণ্য ক্রয়ে কাগজপত্র দেখাতে না পারায় ধারণা করা হচ্ছে অবৈধপথে এবং শুল্ক না দিয়ে আনা হয়েছে। বিটিআরসি আইএমইআই পরীক্ষায় জানা গেছে, এগুলো নিবন্ধিত নয়। আর এই নিবন্ধন না থাকার কারণে নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। বিটিআরসি’র নিবন্ধন না থাকার কারণে এগুলো কোনো সরকারি সংস্থা আইনগতভাবে ট্র্যাক করতে পারে না। গোয়েন্দাদের ধারণা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়িয়ে এই সেটগুলো ব্যবহার করে যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সংঘটিত হতে পারে। এদিকে বিলাসবহুল ‘ভারটু’ মোবাইল সেটের ব্যাপারে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করতে ‘ফোন এক্সচেঞ্জ’-এর মালিক সরোয়ার হায়দারকে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে তলব করা হয়েছে। সংস্থাটির মহাপরিচালক (ডিজি) ড. মইনুল খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, বিপুল পরিমাণ শুল্ক ফাঁকি দিয়ে এসব পণ্য চোরাই পথে আমদানি করা হয়েছে। মোবাইল এক্সেসরিজের ওপর ২৬ শতাংশ ভ্যাট প্রযোজ্য। সে হিসেবে শুল্ক ফাঁকি হয়েছে প্রায় ৯ লাখ ১০ হাজার টাকার। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয়, এগুলো নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। তাই তদন্তে নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। মইনুল খান জানান, ইতিপূর্বেও প্রতিষ্ঠানটি এ ধরনের একাধিক উচ্চমূল্যের মোবাইল এক্সেসরিজ অবৈধপথে আমদানি করেছেন বলে তারা জানতে পেরেছেন।

কেন সৌদি আরব ও ইরান পরস্পরের প্রতিপক্ষ?

সৌদি আরব ও ইরান - এই দুই শক্তিশালী প্রতিবেশী দেশ দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক আধিপত্যের দ্বন্দ্বে লিপ্ত। কয়েক দশক পুরোনো এই বৈরীতা দেশ দু’টির ধর্মীয় বৈপরীত্যের কারণে আরও বেশি তীব্র হয়েছে। সৌদি আরব যেখানে নিজেদেরকে সুন্নি নেতা মনে করে, ইরান সেখানে শিয়া মতাদর্শী। এই ধর্মীয় পার্থক্যের ছাপ মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্রে সুস্পষ্ট।
ঐতিহাসিকভাবেই সৌদি আরব নিজেকে মুসলিম বিশ্বের নেতা মনে করতো। কারণ, এটিই ইসলাম ধর্মের জন্মস্থান।
কিন্তু সৌদি আরবের একচ্ছত্র নেতৃত্বে প্রথম চ্যালেঞ্জ আসে ১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর। এরপরই মধ্যপ্রাচ্যে ইরান নতুন ধরণের রাষ্ট্র হয়ে উঠে। অনেকটা যেন ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র। তখন থেকেই নিজেদের এই ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের মডেল নিজ সীমানা ছাড়িয়ে অন্যত্রও প্রসার ঘটানোর চিন্তা শুরু করে ইরানের নেতৃবৃন্দ। এই হলো দুই দেশের বৈরিতার সাধারণ কারন।
কিন্তু ১৫ বছর ধরে সৌদি আরব ও ইরানের মতপার্থক্য তীব্র হয়েছে বিশেষ কিছু ঘটনার প্রেক্ষাপটে। ২০০৩ সালে আমেরিকার ইরাক আক্রমনের পর ক্ষমতাচ্যুত হন ইরাকের নেতা সাদ্দাম হোসেন। শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ ইরাকে সুন্নি আরব সাদ্দাম হোসেন ছিলেন ইরানের বড় শত্রু। সাদ্দামের পতনের ফলে স্বাভাবিকভাবেই ইরাকে ইরানের প্রভাব সাঁই সাঁই করে বাড়তে থাকে।
এরপর ২০১১ সালে আরব বিশ্বে ছড়াতে থাকে এক নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থান - - আরব বসন্ত। দেশে দেশে দেখা দেয় অস্থিতিশীলতা। ইরান ও সৌদি আরব এই সুযোগে নিজেদের প্রভাব বাড়াতে সচেষ্ট হয়ে উঠে। আর তখনই বাধে সংঘাত। সিরিয়া, বাহরাইন ও ইয়েমেন হয়ে উঠে দেশ দু’টির লড়াইয়ের ক্ষেত্র। ইরানের সমালোচকরা বলেন, মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নিজেকে ও নিজের প্রক্সি সংগঠনগুলোকে প্রতিষ্ঠিত করতে এবং নিজ সীমান্ত থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত স্থল করিডর পেতে দেশটি চরম পথে এগোচ্ছে।
কিন্তু কেন হঠাৎ পরিস্থিতি এত উত্তপ্ত?
দুই দেশের কৌশলগত দ্বন্দ্ব এখন বেশ উত্তপ্ত রূপ ধারণ করেছে, কারণ ইরান অনেক দিক থেকেই লড়াইয়ে জিতে চলেছে। সিরিয়ায় প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের প্রতি ইরানের (ও রাশিয়ার) সমর্থনের কারণেই সৌদি আরবের সমর্থনপুষ্ট বিদ্রোহী গোষ্ঠিগুলো পিছু হটেছে।
ইরানের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকাতে সৌদি আরব মরিয়া হয়ে উঠছে। সৌদির অল্পবয়সী যুবরাজ (কার্যত দেশের শাসক) মোহাম্মদ বিন সালমানের সামরিক হঠকারিতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। মোহাম্মদ বিন সালমান তার প্রতিবেশী ইয়েমেনে শিয়া বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছেন। তার উদ্দেশ্য ছিল ঘরের কাছে ইরানের উপস্থিতি ঠেকানো। কিন্তু প্রায় তিন বছর হয়ে গেল, ইয়েমেনে যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষনই নেই। বরং, দিনে দিনে যুদ্ধ পরিচালনায় রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিপুল অংক ব্যায় হচ্ছে সৌদির।
এদিকে লেবাননে সৌদি আরবের চাপে দেশটির প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন। অনেকের ধারণা, মূলত লেবাননকে অস্থিতিশীল করতেই এই চাল চেলেছে সৌদি আরব। লেবাননে ইরানের মিত্র শিয়া মিলিশিয়া গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী একটি জোটের নেতা। পাশাপাশি, হিজবুল্লাহর অধীনে আছে একটি বিশাল ভারি অস্ত্রেসস্ত্রে সজ্জিত বাহিনী।
বহিঃশক্তিও আছে এই খেলায়। আমেরিকার ডনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থন পেয়ে সৌদি আরব বেশ শক্তিশালী বোধ করছে। অপরদিকে শক্তিশালী দেশ ইসরাইল মনে করছে, ইরান তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি। এ কারণেই ইরানকে ঠেকানোর জন্য সৌদি উদ্যোগে সায় আছে ইসরাইলেরও। সিরিয়ায় ইরানপন্থী যোদ্ধারা ক্রমেই ইসরাইলি সীমান্তের দিকে ধেয়ে আসছে। এ বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগে আছে ইসরাইল।
২০১৫ সালে ইরানের পারমাণবিক প্রকল্প সীমিত করার বিনিময়ে বৈশ্বিক অবরোধ থেকে মুক্তি দেওয়ার যে চুক্তি করে মার্কিন প্রশাসন ও ৫ শক্তিশালী রাষ্ট্র, তার সবচেয়ে বড় বিরোধীতা এসেছিল ইসরাইল ও সৌদি আরব থেকে। দেশ দু’টির বক্তব্য ছিল, ওই চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনা চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যায়নি। বরং, চুক্তির মেয়াদ শেষ হলেই ইরান ফের পারমাণবিক প্রকল্প শুরু করতে পারবে।
কারা কার পক্ষে?
মোটাদাগে বললে শিয়া ও সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠতাই এ ক্ষেত্রে নির্ণায়ক। সৌদি-পন্থী শিবিরে আছে অন্যান্য বৃহৎ উপসাগরীয় সুন্নি রাষ্ট্র, যেমন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও বাহরাইন। আছে মিশর ও জর্দান।
ইরানের শিবিরে আছে সিরিয়া সরকার। শিয়া-প্রভাবিত ইরাক সরকারও এখন ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র। তবে মজার ব্যাপার হলো, এই সরকার আবার ওয়াশিংটনের সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। আইএস জঙ্গিদের বিতাড়িত করতে আমেরিকা নিবিড়ভাবে ইরাক সরকারের সঙ্গে কাজ করেছে।
সম্প্রতি সৌদি আরব প্রতিবেশী ধন্যাঢ্য রাষ্ট্র কাতারের সঙ্গে বিরোধ বাধিয়েছে। এ কারণে কাতার পুরোপুরি ইরানের অক্ষে না ঢুকলেও, আগের মতো কাতার সমর্থন দেবে না সৌদিকে, এটি প্রায় নিশ্চিত। তুরস্কেরও একই অবস্থা। বছর কয়েক আগে এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের নেপথ্যে পশ্চিমাদের হাত আছে, টের পেয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান পুরোপুরি ইরানের মিত্র রাশিয়ার দিকে চলে গেছেন। কাতার সংকটেও তুরস্ক কাতারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। তাই শক্তিশালী তুরস্ক সুন্নি সংখ্যাগুরু হলেও, সৌদি আরব দেশটির সমর্থন পাবে না।
সৌদি-ইরান লড়াই কীভাবে হচ্ছে?
এক দিক থেকে চিন্তা করলে, এখন যা চলছে তা অনেকটা মধ্যপ্রাচ্যের ‘শীতল যুদ্ধে’র মতো। ইরান ও সৌদি আরব সরাসরি লড়ছে না একে অপরের বিরুদ্ধে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বহু প্রক্সি সংগঠনের মাধ্যমে দেশ দু’টো লড়ছে। সিরিয়া এক্ষেত্রে একটি বড় উদাহরণ। এছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে ইয়েমেনের শিয়া হুতি বিদ্রোহীদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে সৌদি আরব। সম্প্রতি, হুতিদের একটি ক্ষেপণাস্ত্র সৌদি রাজধানী রিয়াদের আকাশে বিধ্বস্ত হয়। ওই ঘটনার পর ইরান ও সৌদি নেতাদের বাগযুদ্ধ তীব্র হয়ে উঠেছে।
কিন্তু সিরিয়ায় রীতিমত পরাজয় বরণ ও ইয়েমেনে নিশ্চল হয়ে যাওয়ার পর, সৌদি আরব দৃশ্যত লেবাননকে নিজেদের পরবর্তী প্রক্সি যুদ্ধের ক্ষেত্র হিসেবে টার্গেট করেছে। যদি সত্যিই তা-ই হয়, তবে লেবাননেরও সিরিয়ার মতো অস্থিতিশীল হয়ে উঠার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু খুব কম বিশ্লেষকই মনে করেন, এই অস্থিতিশীলতা থেকে লাভ ঘরে তুলবে সৌদি আরব।
তবে লেবাননে সংঘাত বাধলে খুব সহজেই ইসরাইল জড়িয়ে পড়বে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে। আর তাতে তৃতীয় ইসরাইল-লেবানন যুদ্ধটি হতে পারে আগের দু’টির চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ। অনেক সংশয়বাদীই প্রশ্ন তুলেছেন, সৌদি যুবরাজ কি তবে ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধ লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করতে চান?
ইরান ও সৌদি আরবের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ হবে?
এখন পর্যন্ত প্রক্সির মাধ্যমেই লড়াই করেছে দুই দেশ। কোনো দেশই একে অপরের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে না। কিন্তু ইয়েমেন থেকে সৌদি রাজধানীতে রকেট নিক্ষেপকে বেশ গুরুতরভাবে নিয়েছে সৌদি আরব।
একটি জায়গায় দুই দেশ সরাসরি সংঘাতে লিপ্ত হতে পারে। সেটি হলো উপসাগরীয় অঞ্চলের জলপথ। এখানে লড়াই হলেও পুরো অঞ্চলজুড়ে তা ছড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র সহ পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর জন্য উপসাগরীয় জলপথে চলাচলের স্বাধীনতা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এই জলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও তেল পরিবহনের প্রাণভোমরা। তাই ইরান ও সৌদি আরবের যুদ্ধের কারণে যদি এই পথ বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়, তাহলে আমেরিকার নৌ ও বিমান বাহিনীও সংঘাতে জড়িয়ে যাবে।
দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও দেশটির মিত্ররা ইরানকে মধ্যপ্রাচ্যের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। সৌদি আরব ক্রমেই ইরানকে নিজের অস্তিত্বের জন্য হুমকি ভাবছে। তাই সৌদি যুবরাজকে প্রয়োজন পড়লে যেকোনো পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু বিপদ হলো, সৌদি আরবের এই নতুন তৎপরতা খুব দ্রুতই পুরো অঞ্চলকে অস্থির করে তোলার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছে।
(বিবিসি অবলম্বনে)

রোহিঙ্গারা জাতিবিদ্বেষী আচরণের শিকার- অ্যামনেস্টি

রাষ্ট্রীয় মদতপুষ্ট জাতিবিদ্বেষ, প্রাতিষ্ঠানিকীকৃত বৈষম্যের জালে আটকে পড়েছে মিয়ানমারের রোহিঙ্গারা। একে বর্ণবাদী প্রথা হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। সেখানে রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুদের আলাদা করছে কর্তপক্ষ। এটা করা হচ্ছে বর্ণবাদী অমানবিক এক ব্যবস্থায়। সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিনিয়ত রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। তারা নিষ্পেষিত হচ্ছেন।
ক্রমাগত এ নির্যাতন বৃদ্ধি পাচ্ছে। দু’বছর রাখাইনের চলমান পরিস্থিতি তদন্ত করে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। তাতেই এসব কথা বলা হয়েছে। ‘কেজড উইথআউট এ রুফ’ শীর্ষক রিপোর্টে বলা হয়েছে, ‘উন্মুক্ত কারাগারে’ নির্যাতন করা হয় রোহিঙ্গাদের। এ তদন্তে রাখাইনে বর্তমানের রোহিঙ্গা সঙ্কটের মূল কারণ উদঘাটিত হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, সেখানে পর্যায়ক্রমিকভাবে যে মাত্রার বৈষম্য চালানো হয় তা মানবতার বিরুদ্ধে বর্ণবাদী অপরাধ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তার নিজস্ব ওয়েব সাইটে এ বিষয়ে দীর্ঘ একটি প্রতিবেদন দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক নৃশংসতায় রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালিয়েছে নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা। তারা আগুনে পুড়িয়ে দিয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। নির্বিচারে করেছে ধর্ষণ। এসব নৃশংসতার কারণে জীবন বাঁচাতে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে পাড়ি জমিয়েছে কমপক্ষে ৬ লাখ রোহিঙ্গা। ওই রিপোর্টে বলা হয়েছে, কিভাবে কর্তৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের সমস্ত রকম অধিকার কঠোরভাবে সীমিত করে দিয়েছে, তাদেরকে কার্যত অবরুদ্ধে করে রেখেছে, তারা স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এমনকি গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার অনুমতি পায় নাÑ এসবই ফুটে উঠেছে তদন্তে। সেখানে বর্তমানে যে পরিস্থিতি বিরাজমান তার প্রতিটিই মানবতার বিরুদ্ধে বর্ণবাদী বা জাতিবিদ্বেষী অপরাধ। অ্যামনেস্টির গবেষণা বিষয়ক সিনিয়র পরিচালক আনা নেইস্টাট বলেন, পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে রোহিঙ্গাদের নিরাশ করে তোলা এবং যতটা সম্ভব মানবাধিকার কেড়ে নেয়ার জন্য সব কিছু সাজানো হয়েছে। নিরাপত্তা রক্ষাকারীরা গত তিন মাসে জাতি নিধনে নৃশসংতা চালিয়েছে। এটা তাদের আরেকটি আতঙ্কজনক উদাহরণ। সাম্প্রতিক সময়ে যেসব ইস্যুতে সংবাদ শিরোনাম হয়েছে তাতে এসব অধিকার লঙ্ঘনের সবটাই হয়তো দৃশ্যমান নয়। এ অপরাধগুলো শুধুই ভয়াবহ এমনটাই বলা যায়। এই নির্যাতন বন্ধ করতে এবং রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরা নিশ্চিত করতে পরিবেশ সৃষ্টির জন্য বর্তমান সঙ্কটের শিকড়ে হাত দিতে হবে।

প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ ও নিয়োগ প্রসঙ্গে by বিচারপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিকী

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি করেছে তা হলো প্রধান বিচারপতির পদত্যাগ এবং প্রধান বিচারপতির শূন্য পদে নিয়োগ। ইতিপূর্বে বাংলাদেশে  কোনো প্রধান বিচারপতি পদত্যাগ করেননি। সে ক্ষেত্রে বিচারপতি এস কে সিনহা উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন বলা যায়। বিচারপতি এস কে সিনহা প্রধান বিচারপতির পদ থেকে  শুধু পদত্যাগই করেননি, প্রকৃতপক্ষে বিদেশ থেকে তিনি মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দেন। সেই দিক বিবেচনায়ও বিষয়টি অভিনব। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা ১ মাস ১০ দিনের ছুটি নিয়ে বিদেশে চলে যান।
তার পরে তিনি আর দেশে ফিরে আসেননি। সিঙ্গাপুর থেকে তিনি পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। এই নিয়ে দেশে প্রচুর আলোচনা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো যে, প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা প্রথম প্রধান বিচারপতি যিনি তার কার্যকাল শেষ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করলেন এবং বিদেশ থেকে পদত্যাগপত্র পাঠালেন।
বিচারপতি সিনহা গত ১১ই নভেম্বর ২০১৭ইং প্রধান বিচারপতির পদ হতে পদত্যাগ করেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি পরবর্তীতে উক্ত পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন। সুতরাং বলা যায় যে, ১১ই নভেম্বর ২০১৭ইং থেকে বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির পদটি শূন্য আছে। এই পদে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করছেন। এখন মহামান্য রাষ্ট্রপতির উপরে সাংবিধানিক যে দায়িত্ব পড়েছে তাহলো প্রধান বিচারপতির শূন্য পদে একজন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করা। আইনমন্ত্রী বলেছেন সংবিধানের অনুশাসন হিসেবে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিজস্ব এখতিয়ার। তিনি আরো বলেছেন, সংবিধানে প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হবার কত দিনের মধ্যে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রদান করতে হবে, সে বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৫ (১) অনুচ্ছেদ প্রণিধানযোগ্য:
৯৫(১) ‘প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিযুক্ত হইবেন এবং প্রধান বিচারপতির সহিত পরামর্শ করিয়া রাষ্ট্রপতি অন্যান্য বিচারককে নিয়োগ দান করিবেন।’
এই বিষয়ে কোনো অনিশ্চয়তা নেই যে,  প্রধান বিচারপতির শূন্য পদে নিয়োগের এখতিয়ার শুধু রাষ্ট্রপতির। সংবিধানের ৪৮ (৩) অনুচ্ছেদ অনুসারে শুধু প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ব্যতীত রাষ্ট্রপতি তার অন্য সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কার্য সম্পাদন করবেন। সেই বিবেচনায় মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিজস্ব এখতিয়ার হলো প্রধান বিচারপতির শূন্য পদে নিয়োগ প্রদান।
রাষ্ট্রের তিনটি স্তম্ভ বা বিভাগের মধ্যে বিচার বিভাগের প্রধান হলেন প্রধান বিচারপতি। সেই হিসেবে সাংবিধানিক এই গুরুত্বপূর্ণ পদটি অনির্দিষ্টকালের জন্য পূরণ না করা সঠিক হবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের ইতিহাসে অবশ্য ইতিপূর্বে একবার ১৩ দিন দেরিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রদান করার নজির আছে। সেই সময় রাষ্ট্রপতি ছিলেন লে: জে: অব: হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি সম্ভবত তখনকার আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহ্‌মেদ কে প্রধান বিচারপতি নিয়োগে অনীহা প্রকাশ করেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বার রাষ্ট্রপতির এই অভিলাস কে ভালো চোখে দেখেনি। সেই সময় বারে দুর্বার আন্দোলন গড়ে উঠে। সংশ্লিষ্ট সময়ে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল ছিলেন ব্যারিস্টার রফিক-উল হক এবং আইনমন্ত্রী ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহ্‌মেদ। তারা সুপ্রিম কোর্ট বার এবং রাষ্ট্রপতির সঙ্গে একটি সমঝোতায় আসতে প্রচেষ্টা চালান এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি এরশাদ বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহ্‌মেদ কে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ প্রদানে সম্মত হন। কিন্তু ইতিমধ্যে ১৩টি দিন অতিবাহিত হয়ে যায়। রাষ্ট্রপতি এরশাদের সময়ে বাংলাদেশে প্রধান বিচারপতির পদ শূন্য হওয়ার ১৩ দিন পরে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ প্রদান করা হয়। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহ্‌মেদ এর অব্যবহিত পূর্বে প্রধান বিচারপতি ছিলেন বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী। তিনি ১লা জানুয়ারি ১৯৯০ সালে অবসরে যান। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহ্‌মেদ প্রধান বিচারপতি হিসেবে শপথ নেন ১৪ই জানুয়ারি ১৯৯০ সালে।
বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহ্‌মেদের শপথ গ্রহণের সময় একটি অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে। বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহ্‌মেদের শপথ গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপতি এরশাদ বঙ্গভবনে আমন্ত্রণ করেন। এবং সন্ধ্যা ৭টায় শপথ গ্রহণের অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারণ করেন। সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগের মাননীয় বিচারপতিগণ, আইনমন্ত্রী, আইন সচিব, অ্যাটর্নি জেনারেল, সুপ্রীম কোর্টের রেজিস্ট্রার এবং রাষ্ট্রপতির মিলিটারি সেক্রেটারিসহ অনেকেই সে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। যে অভূতপূর্ব  ঘটনাটি ঘটে তা হলো শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ গ্রহণের বাক্য সম্পর্কিত কাগজ স্বাক্ষরের জন্য উপস্থাপন করা হলে আশ্চর্যজনক ভাবে রাষ্ট্রপতি এরশাদ যখন স্বাক্ষর করা শুরু করেন তখন তার কলমে দাগ পড়েনি। এবং তিনি বিরক্ত হয়ে কলমটি মেঝেতে ছুড়ে ফেলে দেন। তখন এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মহামান্য রাষ্ট্রপতি নিজেই শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে শপথবাক্য পাঠ করাচ্ছেন এবং প্রধান বিচারপতি শপথ গ্রহণ করছেন। এই রকম একটি অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতির কলমে কালি থাকবে না অথবা তার কলমে দাগ পড়বেনা তা বিশ্বাস করা যায় না। তবুও ঘটনাটি ঘটেছিল। আমি নিজে সে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। আমি পরিস্থিতি সামলে নিয়ে সাহস করে রাষ্ট্রপতি এরশাদ কে ইংরেজিতে বলি ‘আপনি অনুগ্রহ করে আমার কলম দিয়ে স্বাক্ষর করতে চেষ্টা করবেন কী?’। তিনি রাজি হন এবং অবশেষে এই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির অবসান হয়। এই ঘটনার রাজ স্বাক্ষী হিসেবে আজও আমি বেঁচে আছি। তখনকার মহামান্য রাষ্ট্রপতির মিলিটারী সেক্রেটারি নিশ্চয়ই এখনো বেঁচে আছেন। তিনিও ঘটনাটি ভুলেননি বলে আমার বিশ্বাস। সুপ্রীম কোর্টের রেজিস্ট্রার ছিলেন তখন জনাব হামিদুল হক। পরবর্তীতে তিনি আপিল বিভাগের বিচারপতি হয়েছিলেন। আইন সচিব ছিলেন বিচারপতি আব্দুল কুদ্দুস চৈাধুরী। তিনি ইতিমধ্যে বেহেস্তবাসী হয়েছেন। রাষ্ট্রপতি এরশাদ এখনো বেঁচে আছেন। তিনি এই লেখাটি পড়বেন কিনা জানি না। তবে আমার বিশ্বাস ঘটনাটি তার মনে আছে। এই কথাগুলো বললাম এই কারণে যে, রাষ্ট্রপতি এরশাদ ১৩ দিন পরে বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহ্‌মেদকে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ প্রদান করেন। এবং তিনি বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহ্‌মেদ কে প্রধান বিচারপতি পদে নিয়োগ প্রদানে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহর কী ইশারা! এই বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহ্‌মেদই পরবর্তীতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন এবং তার আদেশেই রাষ্ট্রপতি এরশাদ কে আটক করা হয়। ভবিতব্যের কাছে আমরা কত অসহায়! রাষ্ট্রপতি এরশাদের ভবিষ্যৎ সম্ভবত প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহ্‌মেদের শপথ গ্রহণের দিনেই নির্ধারণ হয়ে গিয়েছিল। যার ফলে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে এমন একটি অশুভ ঘটনা ঘটে।
(লেখক বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি)