Thursday, June 30, 2016

‘সিলেটের মানুষ দেয় বেশি, পায় কম’

সিলেট শহরে যেতেই দেখা যাবে অসংখ্য মার্কেট–হোটেল। বড় বড় ভবন। কিন্তু কোনো শিল্পকারখানা চোখে পড়বে না। প্রশ্ন জাগবে, তাহলে সিলেটবাসী কি শিল্প স্থাপনে অনাগ্রহী? তাঁরা কি শুধুই ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা লন্ডনযাত্রায় উৎসাহী? সিলেট তিন-তিনজন ‘সফল’ অর্থমন্ত্রী উপহার দেওয়া সত্ত্বেও শিল্পায়নে এলাকাটি পিছিয়ে আছে। কেন? এসব প্রশ্নের উত্তর জানতেই সোমবার সন্ধ্যায় স্থানীয় এক হোটেলে সিলেটের শিল্পোদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপ করি। সেদিন ছিল একটি ব্যবসায়ী সংগঠনের ইফতার পার্টি। এ কারণে প্রায় সব শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাকে সেখানে পেয়ে যাই। আলোচনায় ছিলেন সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সহসভাপতি মাসুদ আহমেদ চৌধুরী, সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক মো. লায়েছ উদ্দিন, মুকির হোসেন চৌধুরী, এমদাদ হোসেন, এ টি এম শোয়েব, বশিরুল হক, সিলেট সিএনজি পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমিরুজ্জামান চৌধুরী দুলু, তৌফিক মজিদ লায়েক প্রমুখ। প্রশ্নের জবাবে ব্যবসায়ী নেতারা বললেন, সিলেটের ব্যবসায়ীরা শিল্পকারখানা করতে চান না, এ কথা ঠিক নয়।
শিল্প প্রতিষ্ঠায় তাঁদের যথেষ্ট আগ্রহ আছে। কিন্তু একটি অঞ্চলকে শিল্পায়িত করতে যে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন, তার কিছুই এখানে নেই। জানতে চাই, কী রকম? তাঁরা বললেন, সিলেট দেশের এক প্রান্তে অবস্থিত। রাজধানী ও সমুদ্রবন্দর থেকে অনেক দূরে। তদুপরি যোগাযোগব্যবস্থা নাজুক।  পাল্টা প্রশ্ন করি, সিলেট ও ঢাকার মধ্যে বাস ও ট্রেন সার্ভিস আছে। আছে বিমান সার্ভিসও। এই সুবিধা তো অনেক স্থানে নেই। একজন ব্যবসায়ী নেতা জানান, বর্তমানে ঢাকা-সিলেট সড়কটি খুবই বেহাল। যানজট লেগে থাকে। সড়কটি অপ্রশস্ত হওয়ায় প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে। এ কারণেই আমরা ঢাকা-সিলেট সড়কটি চার লেন করার দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার সেটি দুই লেনের বেশি করতে রাজি হলো না। অন্যদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়ক চার লেন করা হলো। অথচ সড়কপথে সিলেট অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি পর্যটক আসেন। আমরা কী দোষ করলাম? আমি বলি, অবশ্যই আপনারা কোনো দোষ করেননি। ভবিষ্যতে হয়তো সিলেট-ঢাকা সড়ক চার লেন হবে। তাঁরা বললেন, যখন সেটি হবে তখন আর চার লেনে কাজ হবে না। ছয় লেন দরকার হবে।
অন্যান্য অঞ্চলের মতো সিলেটের ব্যবসায়ীরাও মনে করেন, সরকারের কর্তাব্যক্তিদের সব মনোযোগ ঢাকায়। বিভাগীয় ও জেলা শহরগুলো কীভাবে চলছে; দেখার কেউ নেই। একজন ব্যবসায়ী নেতা বললেন, সিলেট-চট্টগ্রাম সড়কটি সোজাসুজি নয়। অনেক ঘুরে আসতে হয়। সিলেট-চট্টগ্রাম হাইওয়ে ও সরাসরি ট্রেন সার্ভিস হওয়া প্রয়োজন। তাঁর কথায় যুক্তি আছে। শিল্পের কাঁচামাল কিংবা উৎপাদিত পণ্যটি সহজে আনা–নেওয়া করতে না পারলে উদ্যোক্তারা সেখানে শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠা করবেন কেন? ব্যবসায়ীদের মতে, কেবল ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গেই সিলেটের যোগাযোগব্যবস্থা ভঙ্গুর নয়। সিলেটের সঙ্গে এ অঞ্চলের অন্যান্য জেলা যথাক্রমে মৌলভীবাজার, সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জের সড়কগুলো আরও শোচনীয়। অনেক সড়কই ভাঙাচোরা ও খানাখন্দে ভরা। একজন জানালেন, সিলেট–ভোলাগঞ্জ–কোম্পানীগঞ্জ সড়ক দিয়ে দেশের ৯০ শতাংশ পাথর পরিবহন করা হয়। সেই সড়কটির অবস্থা এতই শোচনীয় যে ৩০ কিলোমিটার যেতে ১০–১৫ ঘণ্টা লেগে যায়। ব্যবসায়ী নেতারা শিল্পের জন্য জমিসংকটের কথাও বললেন।
পর্যটন এলাকা বলে যত্রতত্র শিল্পকারখানা করা যায় না। সে জন্য সরকারের উচিত পর্যটন কেন্দ্রগুলো রক্ষা করে শিল্পের জন্য জমির বন্দোবস্ত করা। সরকার হবিগঞ্জের বাহুবলে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণা করেছে। কিন্তু সেখানে শিল্প করার অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা এখনো নেই। সেটি কবে হবে, সে বিষয়েও নিশ্চিত নন ব্যবসায়ীরা। সিলেটকে ঘিরে যে পর্যটনবলয় গড়ে উঠেছে তাতে পর্যটকদের আকর্ষণ করার উপায় কী? জবাবে পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত একজন বললেন, সাম্প্রতিক কালে অনেকগুলো পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। আছে মনোমুগ্ধকর বেশ কিছু রিসোর্ট বা অবকাশ কেন্দ্র। এখন অনেকে কক্সবাজার-রাঙামাটি না গিয়ে সিলেটে আসেন। কিন্তু সমস্যা হলো যোগাযোগ। রাস্তায় নামলেই তাঁরা দুর্ভোগে পড়েন। এ ছাড়া পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। ফলে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজির ঘটনা ঘটে। এ অবস্থায় একজন পর্যটক এত সব ঝক্কি-ঝামেলা করে কেন আসবেন? আমি জিজ্ঞেস করি, অভিযোগ আছে সিলেটের মানুষ কারখানা না বানিয়ে ভবন বানান।
প্রত্যুত্তরে সিলেট চেম্বারের এক পরিচালক বললেন, ভবন বানানোর কারণ আছে। এতে কোনো ঝুঁকি নেই। জমি ও ভবনের দাম কমে না। কিন্তু শিল্প করতে গেলে পদে পদে বাধা। গ্যাস–সংকটের কারণে সিলেট অঞ্চলে বহু ছোট ও মাঝারি কারখানা উৎপাদনে যেতে পারছে না। সরকার ২০০৯ সালে গ্যাস–সংযোগ দেওয়া বন্ধ করে দেয়। পরে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সংযোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক–ই–ইলাহীর নেতৃত্বে কমিটি করলেও সেটি খুব কাজে আসেনি। জ্বালানি মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এই কমিটি সারা দেশে এক হাজার প্রতিষ্ঠানকে গ্যাস–সংযোগ দেওয়ার সুপারিশ করলেও কর্যকর হয়েছে খুবই কম।
সিলেটের ব্যবসায়ীদের দাবি, সরকার অবকাঠামোগত সমস্যা দূর করলে, গ্যাস-বিদ্যুতের সরবরাহ নিশ্চিত করলে নতুন শিল্পকারখানা গড়ে উঠবেই। তাঁদের আক্ষেপ হলো, সিলেটে বিপুল পরিমাণ গ্যাস উৎপাদিত হলেও বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হয়নি। বিদ্যুৎ থাকলেও সঞ্চালন লাইন খারাপ। দিনে অন্তত দু–তিন ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে। সিলেটে দুটো ওষুধ কারখানা আছে। আলাপ প্রসঙ্গে একটি কারখানার স্বত্বাধিকারী তাঁর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বললেন, এখানে কারখানা চালানোর দক্ষ লোক পাওয়া যায় না। ঢাকা ছেড়ে অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মীরা আসতে চান না। কারখানার একটি যন্ত্র নষ্ট হলেও ঢাকায় নিয়ে যেতে হয়। এখানে মেরামতের সুযোগ নেই।
সিলেটের ব্যবসায়ীরা মনে করেন, নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ছে। ওখানে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা আছে। কিন্তু বাংলাদেশের অংশে সড়কগুলো এত খারাপ যে পণ্য আনা-নেওয়া কঠিন। নাজুক যোগাযোগব্যবস্থা ও অপ্রতুল অবকাঠামোর কারণে অনেক স্থলবন্দর অকেজো পড়ে আছে। স্থলবন্দরে ওয়েব হাউস না থাকায় রোদ ও বৃষ্টিতে পণ্য নষ্ট হয়। এর বাইরে যেসব সমস্যার কথা তাঁরা বললেন, তার মধ্যে রয়েছে ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদের হার। এখনো ১২-১৪ শতাংশ হারে ঋণ নিতে হয়। তাঁদের মতে, সুদের হার একক ​িডজিটে আনা জরুরি। এটি অবশ্য সারা দেশেরই সমস্যা। ব্যবসায়ী নেতারা কিছুটা ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘সিলেটের মানুষ দেয় বেশি, পায় কম।’ কীভাবে? তাঁরা বললেন, সিলেট অঞ্চলের মানুষই সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স পাঠান। তাঁরা কর-ভ্যাট বেশি দেন। কিন্তু সেই তুলনায় সরকারের উন্নয়নকাজ তেমন হচ্ছে না। বললাম, অর্থমন্ত্রী সিলেটের সন্তান। তাঁকে সমস্যাগুলো জানিয়েছেন কি না? তাঁরা বললেন, ‘হ্যাঁ, জানিয়েছি। একাধিকবার তাঁর সঙ্গে বসেছি। তিনিও সমস্যাগুলো জানেন। কিছু কিছু সমাধানের চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু আমলাতন্ত্র সহজে নড়ে না।’
সিলেটে ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার তথা শিল্পায়নের জন্য সরকার কী করতে পারে? তাঁরা বললেন, ‘আমরা পুঁজি চাই না। চাই নীতি-সহায়তা। অবকাঠামোর উন্নয়ন ও গ্যাস-বিদ্যুতের নিশ্চয়তা।’ তাঁদের দাবি, অবিলম্বে ঢাকা-সিলেট সড়ক চার লেন করতে হবে। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে সত্যিকার অর্থে আন্তর্জাতিক রূপ দিতে হবে। এখন মাত্র একটি বিমান বাইরে থেকে সরাসরি সিলেটে আসে। কিন্তু এখান থেকে কোনো আন্তর্জাতিক ফ্লাইট যায় না; ঢাকা হয়ে যায়। ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, সিলেট-চট্টগ্রাম সরাসরি রেল সার্ভিস চালু করতে হবে। যেমনটি হয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যে। চট্টগ্রাম-সিলেট বিমান সার্ভিস চালু করা দরকার। একই সঙ্গে তাঁরা সিলেট-গুয়াহাটি বিমান সার্ভিস চালুর দাবিও জানান। তাঁদের মতে, এটি চালু হলে কেবল সিলেটবাসী নন, সীমান্তবর্তী ভারতের নাগরিকেরাও লাভবান হবেন। গুয়াহাটি অনেক দূরের বলে তাঁরা সিলেট বিমানবন্দর ব্যবহার করতে আগ্রহী।
আলোচনায় আসে ঢাকা-সিলেট-গুয়াহাটি বাস সার্ভিসও। তাঁরা জানান, বর্তমানে সপ্তাহে এক দিন বাস চালু আছে। রাস্তাঘাটের বেহাল দশার কারণে মানুষ যেতে ভয় পায়। কয়েক বছর আগেও তামাবিল-শিলং কিংবা শিলং-গুয়াহাটি সড়কটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কিন্তু এখন দুটো সড়কই মসৃণ ও প্রশস্ত। ভারত অসমতল পাহাড়ি এলাকায় যদি এ রকম রাস্তা করতে পারে, বাংলাদেশ পারবে না কেন? ব্যবসায়ী নেতারা সিলেটে শিল্পায়নের যোগাযোগ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি প্রবাসীদের জন্য বিশেষ প্রণোদনা দাবি করেন। তাঁরা মনে করেন, ট্রানজিট-ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা সত্ত্বেও সীমান্তবর্তী এলাকায় শিল্পকারখানা গড়ে উঠলে উত্তর-পূর্ব ভারতে রপ্তানি অনেক বাড়বে। কেননা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পণ্য নিলেও তার পরিবহন ব্যয় যা বাড়বে, এখানে উৎপাদিত পণ্য তার চেয়ে কম পড়বে। প্রাণ-আরএফএল সেই নজির স্থাপন করেছে। অন্যরা পারবে না কেন?
আগামীকাল: সিলেটে রাজনীতি আছে, রাজনীতি নেই
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabhassan55@gmail.com

‘না ভোট’ বেড়েছে যে কারণে

এমনটা আগে ছিল না ভারতবর্ষ কিংবা পশ্চিমবঙ্গে। যেকোনো নির্বাচনে প্রার্থী পছন্দ না হলে ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতেন না বা ভোট বর্জন করতেন। ফলে জানাও যেত না ওই সব প্রার্থীর প্রতি ভোটারদের সমর্থন কতটুকু বা অনীহা কতটুকু। কত শতাংশ ভোট ওই প্রার্থী পেলেন বা কত শতাংশ ভোটার ওই প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোট দিলেন বা ভোট দিতে অনীহা প্রকাশ করলেন। তাই কারা প্রার্থীকে পছন্দ করছেন না তা জানার জন্য ভোটবাক্সে ‘না ভোট’ দেওয়ার একটি বিধান চালু করার জন্য ভারতে বহু দেনদরবার হয়েছে। দাবি উঠেছে অন্তত ভোট বাক্স বা ভোটযন্ত্রে ‘না ভোট’ দেওয়ার একটি বোতাম রাখা হোক। ভোটাররা জানাক কোন প্রার্থী তাদের পছন্দ বা অপছন্দের। অথবা কোনো প্রার্থীই তাদের পছন্দ নয়। অবশেষে ভারতের সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রিম কোর্ট ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নির্বাচন কমিশনকে এক নির্দেশে জানিয়ে দেন ইলেকট্রনিক ভোটযন্ত্রে (ইভিএম) চালু করা হোক ‘না ভোট’ দেওয়ার একটি বোতাম।
সুপ্রিম কোর্টের এই নির্দেশের পর নির্বাচন কমিশন ভোটযন্ত্রে এরপর চালু করে ‘না ভোট’ দেওয়ার একটি বোতাম। ভোটযন্ত্রে প্রার্থী তালিকার একেবারে শেষ প্রান্তে রাখা হয় ‘না ভোট’ বা নোটায় (None Of The Above) ভোট দেওয়ার বোতাম। এই নির্দেশের পর প্রথম ‘না ভোট’ দেওয়ার বিধান চালু করা হয় ২০১৪ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে। ওই নির্বাচনে ‘না ভোট’ পড়ে ৫৯ লাখ ৯৭ হাজার ৫৪টি। ২০১৪ সালের সর্বশেষ এই লোকসভা নির্বাচনে ‘না ভোট’ বেশি পড়ে তামিলনাড়ুতে। এই সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৮২ হাজার ৬২টি। দ্বিতীয় স্থানে ছিল পশ্চিমবঙ্গ। সেখানে ৫ লাখ ৬৮ হাজার ২৭৬টি ‘না ভোট’ পড়ে। আর এবার বিধানসভা নির্বাচনে তামিলনাড়ুতে ৫ লাখ ৬০ হাজার ৫৩৩টি, আসামে ১ লাখ ৮৯ হাজার ৬৬টি, কেরালায় ১ লাখ ৭ হাজার ২৩৯টি ও পদুচেরিতে মাত্র ১৩ হাজার ২৪০টি ‘না ভোট’ পড়ে। পশ্চিমবঙ্গের এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ‘না ভোট’ পড়ে ৮ লাখ ৩১ হাজার ৮৪৫টি।
ভোটের ফলাফল বের হওয়ার পর নির্বাচন কমিশন সূত্রে বলা হয়েছে, ২৯৪টি বিধানসভার আসনে এবার কমবেশি ‘না ভোট’ পড়েছে। বাঁকুড়া জেলার ছাতনা আসনে সবচেয়ে বেশি ‘না ভোট’ পড়েছে। এই সংখ্যা ৭ হাজার ৭০৯। আর সব থেকে কম ‘না ভোট’ পড়েছে হাওড়ার উত্তর আসনে। ১ হাজার ৭০টি। মুখ্যমন্ত্রী মমতার কলকাতার ভবানীপুর আসনেও ‘না ভোট’ পড়েছে ২ হাজার ৪৬১টি। এই কেন্দ্রে মমতার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন কংগ্রেস নেত্রী দীপা দাসমুন্সি। আবার এই ‘না ভোট’ ভাগ্য ফিরিয়ে দিয়েছে অন্তত ২৫ জন প্রার্থীর। কারণ, ওই সব আসনে জয়ী ও পরাজিত প্রার্থীদের ভোটের ব্যবধান ‘না ভোটে’র চেয়ে কম ছিল। ফলে রায়দিঘির তৃণমূল প্রার্থী অভিনেত্রী দেবশ্রী রায় এবং চন্দননগরের তৃণমূল প্রার্থী সংগীতশিল্পী ইন্দ্রনীল সেন জয়ী হতে পেরেছেন। ঠিক তেমনি জয়ী হয়েছেন বালুঘাটের বাম কংগ্রেস জোট প্রার্থী বিশ্বনাথ চৌধুরী এবং কুশমন্ডীর বাম কংগ্রেস জোট প্রার্থী নর্মদা রায়। আবার বাঁকুড়ার বড় জোড়ার পরাজিত তৃণমূল প্রার্থী অভিনেতা সোহম চক্রবর্তী এবং পান্ডুয়ার তৃণমূল প্রার্থী ফুটবলার রহিম নবীও হেরেছেন। এখানে ‘না ভোটে’র যদি একটা অংশ তাঁরা পেতেন তবে জিততে পারতেন এবার তাঁরা। এভাবে এবার রাজ্যের অন্তত ২৫টি আসনে ফলাফল নির্ধারিত হয়েছে। অথচ এই ‘না ভোট’ দাতারা যদি জয়ী বা পরাজিত প্রার্থীর দিকে ঝুঁকতেন, তবে ফলাফল অন্য রকম হতো। পরাজিত প্রার্থীরা জিততে পারতেন। জয়ী প্রার্থীর ব্যবধান বাড়ত।
তাই এবারের ভোট থেকে একটি বিষয় নিশ্চিত হওয়া গেছে, মানুষের মধ্যে ‘না ভোট’ দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। কেন এই প্রবণতা বাড়ছে তা নিয়ে কথা হয় বেশ কজন ভোটারের সঙ্গে। তাঁরা বলেছেন, এখন ভোটের রাজনীতিতে অর্থের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। প্রার্থী মনোনয়নে দল এখন বিত্তবান প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। রাজনৈতিক যোগ্যতা না থাকলেও আর্থিক যোগ্যতা প্রার্থিতা নির্বাচনে তাঁদের যোগ্যতার মাপকাঠি হিসেবে দাঁড়িয়েছে। ফলে যোগ্য ও ত্যাগী প্রার্থীরা আর ঠাঁই পাচ্ছেন না এখন ভোটের বাজারে। ঠাঁই পাচ্ছেন বিত্তশালী আর এলাকার ‘মাসলম্যানরা’। ফলে যোগ্য প্রার্থীদের যেমন ঠাঁই দিচ্ছেন না রাজনৈতিক দলের নেতারা, তেমনি অনেক মানুষও মনোনীত প্রার্থীদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। ফলে বাড়ছে ‘না ভোট’ দেওয়ার প্রবণতা। অথচ এমনটা ছিল না এই রাজ্যের রাজনীতিতে। বিভিন্ন দল ঠাঁই দিত যোগ্য ও রাজনীতি নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করা ত্যাগী, দেশপ্রেমী ও নিঃস্বার্থ প্রার্থীদের। সমীক্ষায়ও দেখা গেছে, ভোটাররা চাইছেন ভালো মানুষ। যাঁরা দেশ ও সমাজের কাজ করেন। দেশ নিয়ে ভাবেন। উন্নয়নের জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন। ধ্যানধারণা আবর্তিত হয় দেশপ্রেম নিয়ে। অর্থের প্রতি যাঁর মোহ কম, মোহ বেশি দেশপ্রেম আর দেশসেবার প্রতি। সেই সব প্রার্থী এলে হয়তো ‘না ভোট’ দেওয়ার প্রবণতা কমবে। বাড়বে রাজনীতির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়ার প্রবণতা।
অমর সাহা: প্রথম আলোর কলকাতা প্রতিনিধি।

তুরস্কের সীমান্তের সংঘাত দেশের ভেতর ছড়াচ্ছে

তুরস্কের ইস্তাম্বুলের আতাতুর্ক আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে
গত মঙ্গলবার রাতে জোড়া বিস্ফোরণ ও নির্বিচারে
গুলির ঘটনার পর সেখানে পুলিশের সতর্ক প্রহরা। এএফপি
তুরস্কের ইস্তাম্বুলের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত মঙ্গলবার মধ্যরাতের আত্মঘাতী বোমা হামলা এ বছরে দেশটিতে সংঘটিত হামলাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ। তবে নিশ্চিতভাবেই এ ধরনের হামলা দেশটিতে প্রথম নয়। গণমাধ্যমে তুরস্কের পুলিশের দেওয়া ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) সঙ্গে সম্পৃক্ত। সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্কের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশের অভ্যন্তরে এবং এর সীমান্ত এলাকাগুলোয় আইএসের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে ব্যাপকসংখ্যক লোকজনকে গ্রেপ্তার করেছে। এসব গ্রেপ্তারের সময় দেশটির শীর্ষস্থানীয় নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলেছিলেন, আইএস এর প্রতিশোধ নিতে পারে। সাম্প্রতিকতম এ হামলার আগে ইস্তাম্বুলে এ বছরেই তিন-তিনটি সন্ত্রাসী হামলা হয়। আর এ কারণেই শহরটিতে উচ্চমাত্রার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। আগের তিন হামলার সঙ্গে আইএস ছাড়াও কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) সশস্ত্র শাখা কুর্দিস্তান ফ্রিডম হোয়াকসের (টিএকে) সম্পৃক্ততা ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এক মাসেরও কম সময় আগে আত্মঘাতী গাড়ি বোমা হামলায় ইস্তাম্বুলে ১২ জন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়।
ওই হামলার দায়ও স্বীকার করে টিএকে। সংগঠনটি তাদের ওয়েবসাইটে তুরস্কে আসতে চাওয়া পর্যটকদের উদ্দেশ্যে সাবধানবাণী প্রকাশ করে, ‘আপনাদের জন্য তুরস্ক আর নিরাপদ নয়।’ ওই হামলার কারণ প্রসঙ্গে টিএকে বলে, কুর্দি অধ্যুষিত দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে তুরস্কের নিরাপত্তা বাহিনীর চলমান অভিযানের প্রতিশোধ নিতেই তারা এ হামলা চালিয়েছে। গত এপ্রিল মাসে আঙ্কারায় দুটি প্রথম বোমা হামলারও দায় স্বীকার করে সংগঠনটি। ওই দুই হামলায় ২৯ জন নিহত হয়। গত বছরের অক্টোবরে আঙ্কারায় কুর্দি এবং বামপন্থী সংগঠনগুলোর সম্মিলিত এক শান্তি মিছিলে দুটো আত্মঘাতী হামলা হয়। ভয়াবহ ওই হামলায় নিহত হয় ১০৩ জন। আড়াই শতাধিক মানুষ এতে আহত হয়। এখন পর্যন্ত কোনো সংগঠন ওই হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে বোমা হামলাকারী একজন মুসলিম জঙ্গি ছিল বলে তদন্তকারীরা শনাক্ত করেন। ইস্তাম্বুলে এবারের হামলায় আইএসকে দায়ী করার পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্কের মানুষের মধ্যে এখন যে শঙ্কাটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হলো, সীমান্তে বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠনের সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘাত এখন দেশের ভেতরে ছড়িয়ে পড়ছে।
গত বছর পিকেকের সঙ্গে সরকারের যুদ্ধবিরতির চুক্তি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে কুর্দি-অধ্যুষিত দক্ষিণ-পূর্ব তুরস্কে একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা ঘটতে শুরু করে।তুরস্কের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের অনেকের মধ্যেই ক্ষোভ বাড়ছে। আগের হামলাগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে তুরস্কের পর্যটনশিল্প বেশ ধাক্কা খেয়েছে। পর্যটন তুরস্কের অর্থনীতির একটি বড় ভিত্তি। টুইটারে তুরস্কের নাগরিক সেদা জেন বলেছেন, ‘যেকোনো জনবহুল এলাকায় বোমা হামলা হতে পারে এমন আশঙ্কা মানুষের মধ্যে জেঁকে বসেছে। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থা এ বিষয়ে মোটেও তৎপর বলে মনে হয় না। মানুষের ভীতির বিষয়েও তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। দেশে এই প্রথমবারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্থানগুলো প্রায় পর্যটকশূন্য।’ টুইটারে মন্তব্যকারীদের অনেকেই তুরস্কের অভ্যন্তরে এসব হামলায় বাইরের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে মনে করেন। তেভিক ওকুতান নামে একজন টুইট করেছেন, ‘আমাদের শত্রুরা চায় না দেশে পর্যটক আসুক। আমাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার এখনই সময়।’

অস্ত্রের জবাব অস্ত্রে: ট্রাম্প

ডোনাল্ড ট্রাম্প
যুক্তরাষ্ট্রের আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প জঙ্গিবাদ মোকাবিলা এবং আইএস দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, ‘অস্ত্রের জবাব অস্ত্র দিয়ে দিতে হবে।’ মঙ্গলবার ওহাইও বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক হাজার সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় এ কথা বলেন ট্রাম্প। ট্রাম্প বলেন, জঙ্গিদের ‘ওয়াটার বোর্ডিং’ কায়দায় জিজ্ঞাসাবাদের পন্থাটি যথেষ্ট ছিল না। যারা মানুষের শিরশ্ছেদ করছে, তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য এটি একটি সামান্য ব্যাপার। ‘ওয়াটার বোর্ডিং’ পদ্ধতিতে বন্দীর চোখ ও নাকের ওপর কাপড় দিয়ে পানি ঢালা হয়।
এতে তাঁর মধ্যে পানিতে ডুবে মরার আতঙ্ক তৈরি হয়। আফগানিস্তান দখলের পর গুয়ানতানামো বন্দিশিবিরে আটক বন্দীদের পানিতে চুবিয়ে নির্যাতন করার অপবাদ যুক্তরাষ্ট্রকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘প্রতিহিংসাপরায়ণ নিষ্ঠুর জঙ্গিদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে একই আচরণ করতে হবে। অস্ত্রের জবাব অস্ত্র দিয়ে দিতে হবে। ওয়াটার বোর্ডিং পদ্ধতিতে জিজ্ঞাসাবাদ কোনো ভালো ব্যাপার নয়। কিন্তু শত্রু যখন শিরশ্ছেদ করছে, তখন এটা মামুলি ব্যাপার।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিজেরাই জানি না কি করছি, আমাদের কোনো নেতৃত্ব নেই।’ এসব কথা বলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জঙ্গিবাদ দমনে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার অবস্থানকে দুর্বল বলে সমালোচনা করেন।