Thursday, July 10, 2025

শততম জন্মদিন: মাহাথিরের দীর্ঘ ও সফল জীবনের রহস্য by কাজী আলিম-উজ-জামান

শতবর্ষ বয়স পূর্ণ হয়েছে আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার হিসেবে পরিচিত মাহাথির মোহাম্মদের। আজ বৃহস্পতিবার ছিল তাঁর শততম জন্মদিন। দীর্ঘ এ জীবনে সারা বিশ্বের মানুষের কাছে তিনি সাফল্যের এক অনুপ্রেরণা। শততম জন্মদিনেও তাই থামতে নারাজ মালয়েশিয়ার সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, ‘অবসর মানে আপনি কিছুই করছেন না।’ শততম জন্মদিনে অনুপ্রেরণার বাতিঘর মাহাথির মোহাম্মদকে আমাদের স্মরণ।

মানবজীবন দীর্ঘ হতেই পারে। কিন্তু সব দীর্ঘজীবনই মহিমান্বিত হয় না। দীর্ঘ সে জীবন যদি ত্যাগ স্বীকারের হয়, অপরের কল্যাণে হয়, তবে সে জীবন একই সঙ্গে হয় সফল।

দীর্ঘ ও সফল জীবনের এক উদাহরণ ড. মাহাথির মোহাম্মদ। তাঁকে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। আধুনিক মালয়েশিয়ার স্থপতি, যিনি প্রথম দফায় (১৯৮১-২০০৩) দীর্ঘ ২২ বছর সফলভাবে দেশটির নেতৃত্ব দিয়েছেন। মালয়েশিয়াকে করেছেন একটি আধুনিক ও সমৃদ্ধিশালী রাষ্ট্র।

ড. মাহাথির চল্লিশের দশকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা করেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় সিতি হাসমাহর। পরিচয় থেকে অন্তরঙ্গতা, এরপর বিয়ে। সিতি হাসমাহও ওই মেডিকেলেরই শিক্ষার্থী ছিলেন।

দ্বিতীয় দফায় (২০১৮-২০২০) রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসেন ৯৪ বছর বয়সে। তাঁর কর্মস্পৃহা, উদ্যম রীতিমতো তাক লাগিয়ে দেওয়ার মতো। এখন ১০০ বছর বয়সেও প্রায় সুস্থ জীবন যাপন করছেন মাহাথির।

২০২৩ সালে ঢাকার বাংলা একাডেমির সবুজ চত্বরে হয়ে যাওয়া লিট ফেস্টে একটি সেশনে আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন মাহাথিরকন্যা মেরিনা মাহাথির। তিনি একজন সুপরিচিত মানবাধিকারকর্মী ও লেখক। মাহাথিরকে নিয়ে তাঁর লেখা বই ‘দ্য অ্যাপল অ্যান্ড দ্য ট্রি’ নিয়েই মূলত আলোচনা হচ্ছিল। সেখানে মানবাধিকারসহ অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি ছোট্ট করে উঠে এল মাহাথিরের দীর্ঘ জীবনের প্রসঙ্গও।

সেই জায়গা থেকেই এ লেখার অনুপ্রেরণা। আসলেই তো! মাহাথিরের দীর্ঘ ও সফল জীবনের প্রকৃত রহস্যটা কী?

মাহাথিরের রাজনৈতিক জীবন, বিরোধী মত দমন, মানবাধিকার রক্ষা নিয়ে তাঁর সীমিত অঙ্গীকার—এসব নিয়ে কম আলোচনা, তর্কবিতর্ক হয়নি। এখনো হচ্ছে। পাশাপাশি তাঁর জীবনবোধ, একনিষ্ঠতা, নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলাও আলোচনায় এসেছে।

কিন্তু যে মানুষ শত বছর বয়সেও কর্মক্ষম থাকেন, সেই মানুষটি ভিন্ন।

মাহাথিরের জীবনের পাণ্ডুলিপি

মাহাথিরের জীবনের পাণ্ডুলিপিতে চোখ বুলিয়ে আসা যাক। জন্ম মালয়েশিয়ার কেদাহ রাজ্যের প্রধান শহর আলোর সেতারে। তাঁর দাদা ভারতের কেরালা থেকে সেখানে অভিবাসী হন। বিয়ে করেন এক মালয় নারীকে।

ছোটবেলা থেকেই তুখোড় মেধাবী ছিলেন মাহাথির। বাবা মোহাম্মদ ইস্কান্দার, যিনি ছিলেন একটি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের প্রধান শিক্ষক, শৈশবেই ছেলের মধ্যে শৃঙ্খলা ও একাগ্রতার বীজ বপন করে দিয়েছিলেন। পড়াশোনা করতে গিয়ে তাই খেলাধুলায় মনোযোগ দিতে পারেননি মাহাথির।

ড. মাহাথির চল্লিশের দশকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা করেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় সিতি হাসমাহর। পরিচয় থেকে অন্তরঙ্গতা, এরপর বিয়ে। সিতি হাসমাহও ওই মেডিকেলেরই শিক্ষার্থী ছিলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে মেডিকেল কলেজ বন্ধ থাকে। এ সময় মাহাথির কফি, চকলেট বিক্রি করে কিছু উপার্জন করেন।

গাইনোকোলজিতে এমবিবিএস শেষ করে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন মাহাথির। পাশাপাশি নিজ অঞ্চল কেদাহর আলোর সেতারে ফিরে চিকিৎসাসেবা শুরু করেন। সে সময় আলোর সেতারে একমাত্র চেম্বারটি ছিল মাহাথিরের। একসময় তাঁর মধ্যে ধারণা আসে, ডাক্তারি পেশা দিয়ে সীমিতসংখ্যক মানুষের উপকারে আসা সম্ভব। কিন্তু বিপুল মানুষের সেবা করতে হলে রাজনীতির বিকল্প নেই। সেই চিন্তা থেকে রাজনীতির ময়দানে পা ফেলেন ১৯৬৪ সালে, তখন তাঁর বয়স ৪০-এর কাছাকাছি।

মাহাথির-সিতি দম্পতির এক মেয়ে, চার ছেলে। মেরিনা পরিবারের বড় সন্তান। পরে অবশ্য তাঁরা আরও দুটি সন্তান দত্তক নেন।

১৯৮১ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার আগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তর সামলেছেন মাহাথির। নির্ধারিত সময়ের আগেই নিজ দপ্তরে পৌঁছে যান তিনি। এক মিনিট দেরির রেকর্ড তাঁর নেই। এ নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত আছে।

নিজেকে নিয়ন্ত্রণ জরুরি

ছাত্রজীবন থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা মানুষ মাহাথির। তাঁর একটি প্রিয় কথা হলো, ‘আমাদের বাঁচার জন্য খাওয়া উচিত। খাওয়ার জন্য বাঁচা উচিত নয়। যেটুকু প্রয়োজন, এর বেশি খাওয়া একেবারেই উচিত নয়।’

তাঁর পরামর্শ, স্থূলতা স্বাস্থ্যের পক্ষে ভালো নয়। কেউ বেশি দিন যদি বাঁচার আশা করেন, তবে তাঁকে শরীর থেকে বাড়তি মেদ ঝরিয়ে ফেলতে হবে।

শরীরের চাহিদার চেয়ে খাবার বেশি গ্রহণ করা হচ্ছে কি না, সেটা একজন মানুষ কীভাবে বুঝবে? এ বিষয়ে মাহাথির বলেছেন, কারও কোমরের চারপাশে যদি ফ্যাট বা চর্বি জমে যায়, তবে বুঝবেন, তিনি প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ করছেন। তখন তাঁকে প্লেটের খাবার চার ভাগের এক ভাগে বা তিন ভাগের এক ভাগে নামিয়ে আনতে হবে।

নিউ স্ট্রেইট টাইমস পত্রিকায় এক কলামে মাহাথির লিখেছেন, শর্করা (ভাত) ও চর্বিজাতীয় খাবার এড়িয়ে চলতে হবে। তাহলে কোমরের চারপাশের চর্বি কমতে শুরু করবে।

খাদ্যনিয়ন্ত্রণের মাধ্যমেই মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী তাঁর ওজন ৩৫ বছর ধরে ৬২ থেকে ৬৪-এর মধ্যে বেঁধে রাখতে পেরেছেন।

এমনিতে মালয়েশিয়া স্থূল মানুষের দেশ হিসেবে এশিয়ায় পরিচিত। দেশটির অর্ধেক মানুষের ওজন বেশি অথবা স্থূল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, গত দুই দশকে এ প্রবণতা আরও বেড়েছে।

নারকেলের তেল দিয়ে ব্যঞ্জন সেখানে খুব জনপ্রিয়। আর ফাস্ট ফুডের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। মাহাথিরের কথায়, খাবার যখন স্বাদের হয়, তখন খাওয়া বেশি হয়। এতে পাকস্থলী দিন দিন স্ফীত হতে থাকে। তখন একে বশে রাখতে আরও খাবারের চাহিদা তৈরি হয়। অতিরিক্ত খাবারের কারণে ধীরে ধীরে লিভার, কিডনি, প্যানক্রিয়াসের ওপর চাপ পড়ে। উচ্চ রক্তচাপ ও হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি তৈরি হয়।

২০০৭ সালে মাহাথিরের নিজেরও দুবার হার্ট অ্যাটাক হয়। ওই বছর ১০ মাসের মধ্যে দুবার হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হন তিনি। তাঁর বাইপাস সার্জারি হয়। তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেন।

গ্রিল করা মহিষের মাংস তেঁতুলের সস দিয়ে খেতে খুব পছন্দ করেন মাহাথির। এ ছাড়া মুরগির মাংস দিয়ে চ্যাপটা রুটি (রোটি চেনাই) তাঁর আরেকটি প্রিয় খাবার। মাছ খেতে তেমন একটা পছন্দ করেন না।

মাহাথিরের পরামর্শ

যাঁদের বয়স ৬০ পেরিয়েছে বা যাঁরা অবসরজীবন যাপন করছেন, তাঁদের জন্য মাহাথিরের পরামর্শ হলো, সব সময় সক্রিয় থাকার চেষ্টা করতে হবে। হাঁটতে হবে, শরীরচর্চা করতে হবে। বয়স্কদের দীর্ঘ সময় ঘুমিয়ে থাকার পক্ষে নন মাহাথির, বিশেষ করে দিনের বেলায়। তিনি যেমন এই বয়সেও সকালে কাজ শুরু করে শেষ করেন রাত ১০টা বা ১১টায়।

সব মিলে প্রতিদিন সাত ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করেন মাহাথির। তাঁর মতে, এর বেশি ঘুমালে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। একটু কম ঘুমের পাশাপাশি যদি শরীরচর্চা করা যায়, তবে মাংসপেশি ও হাড় শক্তিশালী থাকে। এতে ব্রেনও সক্রিয় থাকে।

মাহাথিরের পরামর্শ, ব্রেনকে যদি কাজে লাগানো না হয়, তবে সে-ও হাল ছেড়ে দেবে, নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে। ব্রেনের পতন ঠেকাতে সক্রিয় থাকতে হবে, কথা বলতে হবে, বই পড়তে হবে, লিখতে হবে, সমস্যার সমাধান করতে হবে, যুক্তি দিতে হবে, বিতর্ক করতে হবে। যাঁরা এ কাজগুলো করেন না, তাঁরা ব্রেনের প্রধান প্রধান কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখেন। মাহাথির বলেন, তাঁর এ অভিমত কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণার আলোকে নয়, কেবলই তাঁর নিজস্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে।

মাহাথির মনে করেন, সংবাদ বা খবরের মধ্যে থাকা মানসিক মনোবল বৃদ্ধির একটা উপায়। তাঁর মতে, প্রতিদিন সংবাদপত্র পাঠ মনকে সক্রিয় রাখতে সহায়তা করে। একজন বয়স্ক মানুষ সাধারণত বর্তমানের চেয়ে অতীতে স্মৃতিচারণায় বেশি আগ্রহী হন। সংবাদপত্র ও বই পাঠ করা এবং কথা বলার মধ্য দিয়ে এ ক্ষেত্রে তাঁদের উন্নতি হয়।

মাহাথিরের মতে, ব্রেনকে সক্রিয় ও সুস্থ রাখার আরেকটি উপায় হলো লেখালেখি করা। মালয়েশিয়ার চতুর্থ ও সপ্তম এই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘লেখালেখি আপনার ব্রেনকে সব সময় সক্রিয় রাখতে সাহায্য করবে। সাধারণত আপনি এমন কিছু লিখতে চান, যা পাঠযোগ্য, অন্যরা পছন্দ করবে। এমন কিছু লিখতে গেলে আপনাকে কথা বলতে হবে, চিন্তা করতে হবে, তর্ক করতে হবে এবং নিজের সঙ্গে প্রয়োজনে ঝগড়াও করতে হবে।’

মাহাথির নিজেও লেখালেখি করতে পছন্দ করেন। মেডিকেলের ছাত্র থাকার সময় থেকেই লেখালেখি করছেন। তাঁর একটি ছদ্মনাম রয়েছে—‘ছেদেত’। ছাত্রজীবন থেকেই এই ছদ্মনামে সংবাদপত্রে কলাম লিখছেন তিনি। এই নামে তাঁর একটি ব্লগও রয়েছে। মালয় ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই সেখানে লেখালেখি করেন মাহাথির। ওই সাইটের ভিউর সংখ্যা তিন কোটির ওপরে, যা কেবল বাড়ছেই।

ধূমপান ও অ্যালকোহল থেকে ১০০ হাত দূরে থাকেন ইসলাম ধর্মের একনিষ্ঠ অনুসারী মাহাথির। কখনো তিনি কুঁজো হয়ে বা বাঁকা হয়ে দাঁড়ান না, বসেন না, একজন সামরিক অফিসারের মতো সোজা হয়ে বসেন, সোজা হয়ে দাঁড়ান।

সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য মাহাথির বিশেষ কোনো ডায়েট চার্ট দিতে চান না। তাঁর মতে, শর্করা (ভাত, রুটি) কম খেতে হবে। শাকসবজি, মৌসুমি ফলমূল বেশি খেতে হবে। এটুকু মানলেই যথেষ্ট।

মাহাথিরের মতে, দীর্ঘদিন বাঁচা একটা বিষয়। আর দীর্ঘদিন সুস্থভাবে বাঁচা আরেকটা বিষয়। তিনি বলেন, ‘সবকিছু আমাদের হাতের মধ্যে নেই, কিন্তু যেটুকু আছে, সেটুকু মেনে চললে বুড়ো বয়সেও সুস্থ থাকা যায়।’

সূত্র: এশিয়া টাইমস, বারনামাসহ একাধিক গণমাধ্যম।
কাজী আলিম-উজ-জামান, প্রথম আলোর উপবার্তা সম্পাদক
alim.zaman@prothomalo.com

১০০তম জন্মদিনের অনুষ্ঠানে মাহাথির মোহাম্মদ। পুত্রজায়ার পেরদানা লিডারশিপ ফাউন্ডেশনে একটি বিশেষ আয়োজনে, ১০ জুলাই ২০২৫

‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ তৈরির পশ্চিমা চেষ্টা এবারও কেন ব্যর্থ by আবেদ আবু শাহাদেহ

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকোয়ামা নজিরবিহীন দম্ভের সঙ্গে ‘ইতিহাসের অবসান’ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের বিজয়ই তিনি ঘোষণা করেছিলেন, তা নয়; বরং উদার গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদী অর্থনীতিরও বিজয় ঘোষণা করেছিলেন।

এরপর যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে পুনর্বিন্যস্ত করেছিল। নিজেদের শক্তি পুনর্গঠন করতে রাশিয়ার দুই দশক লেগে গিয়েছিল। এরপর দেশটি জর্জিয়া ও ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। একই সময়ে আমরা এক আত্মবিশ্বাসী চীনের উত্থান প্রত্যক্ষ করছি।

আজকের বিশ্বব্যবস্থা দেখিয়ে দিয়েছে, ইতিহাসের সমাপ্তি হয়নি। উদার গণতন্ত্র এখন পিছু হাঁটছে, নিজের পরিচয় বাঁচাতে সংগ্রাম করছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই বিশ্বব্যবস্থার জন্ম হয়েছিল।

সম্প্রতি ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের পর আবারও এমন দাবি সামনে এসেছে যে এটি একটি ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্যের’ জন্ম দিতে পারে। কেননা ইরানের প্রতিরোধ অক্ষ দুর্বল হয়ে গেছে। সিরিয়া, লেবানন ও গাজায় তাদের প্রভাব কমে গেছে। এই দাবি গত শতকের প্রতি দশকেই বারবার শোনা গেছে।

ওসমানীয় সাম্রাজ্যের পতন ও পশ্চিমা স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্য বিভক্ত হওয়ার পর থেকেই একই কথা বারবার শোনা যাচ্ছে। প্রতিটি যুদ্ধের পর একটি নতুন যুগের সূচনা হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে সমৃদ্ধি আসবে। কিন্তু প্রতিটি সামরিক অভিযান কেবল পরবর্তী সংঘাতের বীজই রোপণ করেছে।

১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের কথাটি বিবেচনা করুন। ইসরায়েল তিনটি আরব সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেছিল এবং সিনাই উপদ্বীপ, গোলান মালভূমি ও ঐতিহাসিক ফিলিস্তিনের অবশিষ্টাংশ দখল করেছিল। কিন্তু এই বিজয় থেকেই ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জের উদ্ভব হয়েছিল এবং প্যালেস্টাইন মুক্তি সংস্থার (পিএলও) জন্ম ও উত্থান হয়েছিল।

তখন থেকে পিএলও মূলত আরব শাসকদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত ছিল। কিন্তু সেই শাসকদের পরাজয়ের পর ফিলিস্তিনিরা নিজেরাই নিজেদের সংগঠনগুলোর মাধ্যমে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য অবস্থান ঘোষণা করেছিল। আরব শাসকদের রাজনৈতিক হাতিয়ার না হয়ে ফিলিস্তিনিদের নিজস্ব স্বার্থের রক্ষক হয়ে উঠেছিল।

একইভাবে ১৯৮২ সালে লেবাননে ইসরায়েলের আগ্রাসন একটি অসাধারণ সামরিক সাফল্য অর্জন করেছিল। ইসরায়েলের সেনাবাহিনী দ্রুত বৈরুত পৌঁছায় এবং লেবাননের দক্ষিণ অংশ দখল করে নেয়। কিন্তু এই বিজয় থেকে হিজবুল্লাহর জন্ম হয়। গত চার দশকে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের সরাসরি ও ধারাবাহিক হুমকি হয়ে উঠেছে।

আরব শাসকেরা প্রায়ই নিজেদের শক্তির জায়গাকে স্বীকৃতি দিতে কিংবা ব্যবহার করতে ব্যর্থ হন। কিন্তু আরব দেশগুলোর এই সুপ্ত সম্ভাবনাকে ইসরায়েল ভালোভাবেই বুঝতে পারে।

আরব বসন্তকালে, তিউনিসিয়ার নেতা জেন এল আবিদিন বেন আলীর পতনের পর এবং মিসরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সূচনাকালে ইসরায়েল দ্রুত সেই গণতান্ত্রিক ঢেউকে দুর্বল করার কাজ শুরু করেছিল। বিশেষ করে মিসরের ওপর ইসরায়েল মনোযোগ দিয়েছিল।

কারণটি পরিষ্কার। ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি ও ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ব্যাপারে মিসরের বেশির ভাগ মানুষই ব্যাপকভাবে বিরোধী ছিল। সে কারণে ২০১৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর ইসরায়েল ওয়াশিংটনে তার প্রভাব ব্যবহার করে প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির শাসনব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়ায় কেউ বিস্মিত হয়নি।

‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ নিয়ে ইসরায়েলের মনগড়া কল্পনাটি শুধু অবাস্তব নয়; বরং এটি এমন দাবির ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে, যেটা কোনো আরব শাসকের পক্ষে গ্রহণ করা সম্ভব নয়। এমনকি আরব শাসকেরা যখন আরও বেশি সমঝোতার কথা চিন্তা করেন, ইসরায়েল তখন আরও বেশি দাবি নিয়ে হাজির হয়।

যেমন ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে, সৌদি আরব আব্রাহাম চুক্তিতে যোগ দেওয়ার জন্য প্রস্তুত বলে খবর এসেছিল। সৌদি আরব আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষর করলে ফিলিস্তিনি স্বার্থের বিষয়টি কার্যকরভাবে পরিত্যক্ত হয়ে যেত। এর বিনিময়ে সৌদি আরবের কেবল ওয়াশিংটনের সঙ্গে লবিং করার ক্ষমতা বাড়ত।

গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলি হামলার দুই বছরের মাথায় ইরানের ওপর ইসরায়েলের অপ্রত্যাশিত হামলা আসে। পশ্চিমা বিশ্ব আবারও নিজেদের এমন একটি পরিষ্কার অবৈধ অভিযানকে সমর্থন দিতে দেখল, যেটা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে এবং লাখ লাখ মানুষের জীবনকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনার ওপর হামলা চালায়। এই হামলা বেশ কয়েকটি দেশের জন্য বিধ্বংসী তেজস্ক্রিয় বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি করেছিল। আর এই হামলা করা হয়েছিল গোয়েন্দা তথ্যের সম্পূর্ণ বিপরীতে গিয়ে। এ ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হলো, আন্তর্জাতিক আইন কেবল তখনই প্রযোজ্য, যখন তা পশ্চিমাদের স্বার্থরক্ষা করে।

পশ্চিমা নেতারা ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ মন্ত্র জপ করে চলেছেন। যেন এটি কোনো ধর্মীয় বিধান। অথচ বাস্তবে শব্দবন্ধটি একটি কল্পিত নির্মাণ। মধ্যপ্রাচ্য সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র অঞ্চল, যেটি প্রতি দশকেই নতুনভাবে নিজেকে আবিষ্কার করেছে।

ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘটিত সাম্প্রতিক যুদ্ধ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শিক্ষা তুলে ধরা যেতে পারে। এখানে কোনো চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়নি, তবে উভয় পক্ষই তাদের উন্নত সামরিক ও গোয়েন্দা সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।একই সঙ্গে তাদের দুর্বলতাগুলোও উন্মোচিত হয়েছে।

যখন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর নিজের দেশে শক্তিশালী হচ্ছেন এবং আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শাসন টিকে আছে, তখন ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যে যে উত্তেজনা ও সংঘাত অব্যাহত থাকবে, সেই আশঙ্কাটাই বেশি।

দ্বিতীয়ত, আরব রাষ্ট্রগুলো প্রমাণ করে দিল যে তারা অরক্ষিত ও সামরিকভাবে তাৎপর্যহীন। ড্রোন যখন জর্ডানে বিধ্বস্ত হলো ও ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার হুমকি দিল, তখন উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষা কেবল ইসরায়েলের সঙ্গে জোট বেঁধে এবং মার্কিন ঘাঁটির ওপর নির্ভর করেই নিশ্চিত করতে পেরেছে। স্পষ্টত তারা নিজেদের ভূমিকা দৃঢ়ভাবে তুলে ধরতে পারেনি।

এ সংঘাত আরব দেশগুলোকে দুটি বিশাল হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। ইরাক, লেবানন ও সিরিয়াজুড়ে ইরান তার ‘সফট পাওয়ার’ পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর একমাত্র সক্ষম শক্তি হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করবে।

অন্যদিকে ইসরায়েল তার সরকারের ভেতরকার ধর্মীয় কট্টরপন্থীদের প্রভাবে গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনিদের জোর করে উচ্ছেদ করতে পারে। আর এর খেসারত দিতে হবে আরব দেশগুলোকে।

আরব দেশগুলোর সামনে সম্ভবত একটি সত্যিকারের ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ গড়ে তোলার সময় এসেছে। এমন একটি মধ্যপ্রাচ্য যেটি আরবদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেবে এবং আরবদের দিয়েই গঠিত হবে। পশ্চিমা বা প্রাচ্যের শক্তি মধ্যপ্রাচ্যকে নিয়ন্ত্রণ করবে না।

* আবেদ আবু শাহাদেহ, জাফার একজন রাজনৈতিক কর্মী
- মিডল ইস্ট আই থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর মুখে হঠাৎ অবসরের কথা

ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ অবসর গ্রহণের পর বেদ, উপনিষদ অধ্যয়ন ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ করে সময় কাটাবেন। গতকাল বুধবার তিনি নিজেই এ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানান।

অমিত শাহর বয়স মাত্র ৬০। তা ছাড়া এ দেশের রাজনীতিবিদেরা সচরাচর অবসর গ্রহণ করেন না। তার ওপর তাঁর মতো দোর্দণ্ডপ্রতাপশালী যদি কেউ হন, দিনে ১৮ ঘণ্টা যাঁর রাজনীতিতেই কেটে যায়, এমন অমিত শক্তিধর অমিত শাহ হুট করে অবসরের কথা কেন বলতে গেলেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে জল্পনা। নানান প্রশ্ন ঘুরছে।

বিজেপিতে যেদিন থেকে ‘মোদি যুগ’ শুরু, সেদিন থেকেই মোদি–শাহ নাম এক নিশ্বাসে উচ্চারিত হয়ে আসছে। গুজরাটি রাজনীতিতে যা শুরু, জাতীয় রাজনীতিতেও সেই যুগলবন্দী অব্যাহত। নরেন্দ্র মোদির সবচেয়ে কাছের, সবচেয়ে বিশ্বস্ত দোসর বলে পরিচিত অমিত শাহ। এমন ধারণাও আছে যে শাহ–ই হবেন মোদির উত্তরসূরি।

হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিতে এই জুটির পরেই যে নামটি প্রভূত আলোচিত, তিনি উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ। এ দুজনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন নিয়েও অনেক আলোচনা রয়েছে। অমিত শাহর মুখে হঠাৎ অবসরের কথা তাই নতুন জল্পনা উসকে দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি ৬০ বছর বয়সেই বিজেপির ‘নাম্বার টু’ পিছু হটছেন? তিনি কি ভাবছেন, মোদির ছেড়ে যাওয়া আসন দখল করা তাঁর পক্ষে কঠিন? মোদিহীন বিজেপিতে থেকে তাই রাজনীতিই না করার সিদ্ধান্ত?

ক্ষমতা লাভের পর নরেন্দ্র মোদি নিজেই দলীয় নেতাদের অবসর গ্রহণের সীমা একরকম নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন। ৭৫ বছর বয়স ছিল সেই সীমা। সেই যুক্তিতে তিনি একে একে অবসরে পাঠিয়েছেন অটল বিহারি বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদভানি, মুরলী মনোহর যোশী, যশোবন্ত সিং, যশবন্ত সিনহাদের মতো প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিকদের।

তাঁদের ভূমিকা হয় ‘মার্গদর্শকের’। মার্গদর্শক হলেন বিজেপির পথপ্রদর্শক কমিটির সদস্য। নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতায় আসার পর প্রবীণ নেতাদের সমন্বয়ে এ কমিটি করা হয়। নিজের তৈরি নিয়ম মানলে নরেন্দ্র মোদিরও অবসর নেওয়া উচিত আগামী বছর। চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর তিনিও পঁচাত্তরে পদার্পণ করবেন। সেই নিয়ম যাতে এ ক্ষেত্রে পালিত না হয়, সে জন্য মোদির ভক্তকুল ইতিমধ্যে বলতে শুরু করেছে, লোকসভার পরবর্তী নির্বাচনও বিজেপি মোদিকে সামনে রেখে লড়বে। তাহলে কেন মোদির ‘ম্যান ফ্রাইডে’ অমিত শাহর মুখে অবসর যাপনের কথা? তা কি স্রেফ কথার কথা, নাকি অর্থবহ? তাহলে কি ধরে নিতে হবে মোদি অবসর নিলে বিজেপিতে শাহর রাজনীতি করা কঠিন হবে? মোদির আশীর্বাদের হাত তাঁর মাথায় না থাকলে তিনি কি একঘরে হয়ে পড়বেন? রাজনৈতিক মহল এ নিয়েই আলোড়িত।

অমিত শাহ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের পাশাপাশি সমবায় মন্ত্রণালয়ও চালান। গত বুধবার গুজরাট, রাজস্থান ও মধ্যপ্রদেশের সমবায় আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত নারীদের এক অনুষ্ঠানে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। গুজরাটের আহমেদাবাদে অনুষ্ঠিত সেই সভায় নারীদের সঙ্গে কথাবার্তার সময় হুট করে তিনি নিজের অবসর জীবনের পরিকল্পনা ফাঁস করেন। তিনি বলেন, ‘আমি ঠিক করেছি, অবসর গ্রহণের পর আমি বাকি জীবন বেদ ও উপনিষদ পড়ে কাটাব এবং প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের জন্য খরচ করব।’

কেন শুধু বেদ ও উপনিষদ পড়বেন, সে ব্যাখ্যা না দিলেও অমিত শাহ প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের প্রয়োজনীয়তা ও উপযোগিতা নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। বলেন, নিজের কৃষিজমিতে তিনি প্রাকৃতিক চাষ (অর্গানিক ফার্মিং) করেন। কোনো রাসায়নিক সার দেন না। তাতে জমির উর্বরতা শক্তি বাড়ে। ফসল উৎপাদিত হয় দেড় গুণের বেশি। রোগও কম হয়।

অমিত শাহ গমের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘রাসায়নিক সার দিয়ে যে গম উৎপাদিত হয়, তা খেলে অনেক রকমের অসুখ হয়। ক্যানসার হয়, রক্তচাপ বেড়ে যায়, থাইরয়েডের সমস্যাও দেখা দেয়। এসব কথা আগে আমরা জানতাম না। এখন জানা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে, প্রাকৃতিক উপায়ে উৎপাদিত ফসল খেলে কাউকে ওষুধ খেতে হচ্ছে না।’ তিনি বলেন, প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ ফসলের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি জমির উর্বরতা শক্তিও বাড়িয়ে দেয়।

বিজেপিদলীয় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ
বিজেপিদলীয় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ফাইল ছবি: এএনআই

স্বর্ণমন্দিরে অভিযান: থ্যাচারের ছক নিয়ে হামলা করেছিলেন ইন্দিরা? by কুলদীপ নায়ার

ভারতের অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে চালানো ‘অপারেশন ব্লু স্টার’-সংশ্লিষ্ট সব ধরনের কাগজপত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করতে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি শিখ সম্প্রদায় যে দাবি তুলেছে, ব্রিটিশ সরকার তা নাকচ করে দিয়েছে। ১৯৮৪ সালের ১ থেকে ৮ জুন স্বর্ণমন্দিরের হারমন্দির সাহেব কমপ্লেক্স থেকে ধর্মীয় জঙ্গিনেতা জারনাইল সিং ভিন্দ্রানওয়ালে ও তাঁর অনুসারীদের উৎখাত করতে এক রক্তক্ষয়ী সেনা অভিযান চালানো হয়েছিল। খবর পাওয়া যাচ্ছে, ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে এই অভিযান পরিকল্পনায় তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার সহায়তা করেছিলেন।

এখন জানা যাচ্ছে, ওই সময় একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তা স্বর্ণমন্দির রেকি করেছিলেন এবং তিনিই ভারতীয় সেনাবাহিনীকে স্বর্ণমন্দিরের গোপন কুঠুরিতে লুকিয়ে থাকা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কায়দা-কানুন বাতলে দিয়েছিলেন। এখন বোঝা যাচ্ছে, সেখানে এভাবে সামরিক অভিযানের কোনো দরকার ছিল না এবং অন্য কোনো উপায় অবলম্বন করেও ‘আকাল তখত্’ থেকে ভিন্দ্রানওয়ালেকে উৎখাত করা যেত।

তবে ৩৪ বছর পরও ভারতের জনগণ জানতে পারেনি, ঠিক কোন কারণে সেখানে এমন রক্তক্ষয়ী অভিযান চালানো হয়েছিল। এটা সত্যি যে ভিন্দ্রানওয়ালে ‘আকাল তখত্’সহ পুরো স্বর্ণমন্দির কমপ্লেক্সকে ঘিরে ফেলে সেটিকে রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র বানিয়ে ফেলেছিলেন। নিজেকে তিনি শিখ সম্প্রদায়ের একচ্ছত্র অধিপতি ঘোষণা করেছিলেন এবং গোটা সম্প্রদায় তাঁর আদেশে চলত। সেখানে অভিযান শুরুর একপর্যায়ে সেনাবাহিনী ট্যাংক ব্যবহার করে। আমার মনে আছে, সেনাবাহিনীর প্রথম দলটি পরিকল্পিত অভিযান শুরু করার পর মধ্যরাতে ইন্দিরা গান্ধীকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তোলা হয়েছিল। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল পাল্টাপাল্টি গোলাগুলি হচ্ছিল।

এমনকি এখনো হারমন্দির সাহেবের দেয়ালে গুলির চিহ্ন দেখা যায়। শিখ সম্প্রদায় স্বর্ণমন্দিরকে তাদের ‘ভ্যাটিকান’ মনে করে। ফলে এখানে অভিযান পরিচালনা তাদের আহত করে। ব্রিটিশ সরকারের হাতে থাকা তথ্য প্রকাশ না করার কারণে এটা বোঝা শক্ত যে কেন বিকল্প কোনো উদ্যোগ না নিয়ে প্রথমেই হারমন্দির সাহেবে সেনা অভিযান চালানো হয়েছিল।

এই সেনা অভিযানের পর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শিখরা ব্যাপক বিক্ষোভ করে এবং এর কিছুদিন পর ভারতে শিখদের ওপর হামলার ঘটনায় তাদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। এ ঘটনার পর ভারতীয় সেনাবাহিনীতে থাকা বহু শিখ বিদ্রোহ করেন। সামরিক বাহিনী ও বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তার পদ থেকে বহু শিখ পদত্যাগ করেন। এর প্রতিবাদে অনেক শিখ সরকারের কাছ থেকে পাওয়া পুরস্কার ও সম্মাননা ফিরিয়ে দিয়েছেন।

শিখ সম্প্রদায় যে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখাবে, সেটি শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী বুঝতে পেরেছিলেন। ভুবনেশ্বরে এক জনসভায় তিনি বলেছিলেন, তাঁর মনে হচ্ছে তাঁকে হত্যা করা হবে। এর চার মাসের মাথায় নিজের শিখ দেহরক্ষীর গুলিতে তিনি মারা যান। প্রতিশোধ হিসেবেই তাঁকে হত্যা করা হয় বলে মনে করা হয়। এখানেই ঘটনা থেমে থাকেনি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইন্দিরা হত্যার পর শিখবিরোধী দাঙ্গায় শুধু দিল্লিতেই তিন হাজারের বেশি শিখ নাগরিককে হত্যা করা হয়।

একটি পাঞ্জাবি গ্রুপ স্বর্ণমন্দিরে সেনা অভিযান চালানোর বিষয়ে তদন্ত করতে জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা, এয়ার মার্শাল অর্জুন সিং এবং ইন্দর গুজরালের (যিনি পরে প্রধানমন্ত্রী হন) নেতৃত্বে একটি কমিটি করেছিল। আমি সেই কমিটির একটি অংশে ছিলাম। আমাদের তদন্ত প্রতিবেদনে এই সিদ্ধান্ত দিয়েছিলাম, স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযানের দরকার ছিল না এবং অন্য কোনোভাবেও ভিন্দ্রানওয়ালেকে সামাল দেওয়া যেত। তখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন পি ভি নরসিমা রাও।

আমরা সরকারের পদক্ষেপ সম্পর্কে খোঁজখবর করতে গেলে তিনি আমাদের বিষয়ে সন্দিগ্ধ হয়ে পড়েন। সরকারের লোকজন ছাড়া ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরাসহ বাকি সবাই আমাদের বলেছিলেন, সরকার স্পষ্টতই বাড়াবাড়ি করেছিল।

ইন্দিরা হত্যার পর দিল্লিতে বেধে যাওয়া দাঙ্গা সহজেই দমন করা যেত। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী ইচ্ছা করে পুলিশ কিংবা সেনাবাহিনীকে সেখানে হস্তক্ষেপ করতে দেননি। তিনি ওই দাঙ্গাকে মানুষের ‘স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া’ আখ্যায়িত করে বলেছিলেন, বিশাল বৃক্ষ মাটিতে পড়লে ভূমি কেঁপে উঠতে বাধ্য।

স্বর্ণমন্দিরে সামরিক অভিযানের তিন দশক পর প্রকাশ করা ব্রিটিশ নথিপত্র থেকে এখন জানা যাচ্ছে, যুক্তরাজ্য সরকার শিখদের উপাসনালয়ে অভিযান চালাতে ভারতকে পরামর্শ দিয়েছিল। নতুন এই তথ্য লন্ডন ও দিল্লিতে রাজনৈতিক ঝড় তুলেছে। ব্রিটেন সরকার এ বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে এবং বিজেপি এর ব্যাখ্যা দাবি করেছে।

তবে পাঞ্জাবে উগ্রপন্থী শিখদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এবং অপারেশন ব্লু স্টারে অংশ নেওয়া সেনা কর্মকর্তারা কোনো ব্রিটিশ পরিকল্পনার সহায়তা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁরা বলেছেন, তাঁদের জানামতে, এই অভিযান ভারতীয় সেনাবাহিনীর পরিকল্পনা ও পরিচালনায় হয়েছে। এখানে ব্রিটিশদের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না।

যুক্তরাজ্যের আইন অনুযায়ী, দেশটির জাতীয় মহাফেজখানা থেকে ৩০ বছর পর গোপন নথি প্রকাশ করা হয়। সম্প্রতি প্রকাশ করা ১৯৮৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারির একটি নথির শিরোনাম ‘শিখ সম্প্রদায়’। ওই নথিতে দেখা গেছে, ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা সে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একজন একান্ত সচিবকে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিতে বলা হয়, ‘অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির থেকে উগ্রপন্থী শিখদের উৎখাত করতে সম্প্রতি ভারত সরকার ব্রিটিশ সরকারের পরামর্শ চেয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারতের আবেদনে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নিয়ে একজন এসএএস অফিসার ইতিমধ্যে ভারত পরিদর্শন করেছেন এবং একটি পরিকল্পনা জমা দিয়েছেন, যেটি ভারতের প্রধানমন্ত্রী অনুমোদনও করেছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিশ্বাস করেন, ভারত খুব শিগগির এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে।’

ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, যদি ব্রিটিশ সরকারের পরিকল্পনা সরবরাহের কথা ফাঁস হয়, তাহলে ব্রিটেনে বসবাসরত ভারতীয়দের মধ্যে উত্তেজনা বাড়বে। তবে শেষ পর্যন্ত বি৶টিশদের সরবরাহ করা পরিকল্পনা মাফিকই স্বর্ণমন্দির অভিযান হয়েছিল কি না, সেটি নিশ্চিত করার মতো আর কোনো নথিপত্র এখনো পাওয়া যায়নি।

আমি মনে করি, অপারেশন ব্লু স্টার-সংশ্লিষ্ট যাবতীয় নথিপত্র প্রকাশ করা উচিত। কারণ, যতই দিন যাচ্ছে, ততই জনমনে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে যে ওই অভিযান চালানো ঠিক হয়নি।

- আপডেট: ২২ মার্চ ২০১৮
- ইংরেজি থেকে অনূদিত।
* কুলদীপ নায়ার, ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক ও কলামিস্ট

অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির। ছবি: রয়টার্স
অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির। ছবি: রয়টার্স