Saturday, May 3, 2025

গাজায় ভয়াবহ ইসরায়েলি হামলা, নিহত ৪২

ফিলিস্তিনের গাজায় ভোর থেকে বিমান হামলা চালাচ্ছে ইসরায়েল। এতে দুপুর নাগাদ ৪২ জন নিহত হয়েছেন। নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

শুক্রবার (২ মে) আলজাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। বলা হয়, ভোরের দিকে শুরু হওয়া ইসরায়েলের ভয়াবহ হামলা অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন স্থান থেকে নিহতের খবর আসছে।

চিকিৎসা সূত্র আলজাজিরাকে জানিয়েছে, ভোর থেকে উপত্যকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় ৪২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। মধ্য গাজায় ইসরায়েলি হামলায় মৃতের সংখ্যা বেশি।

এ ছাড়া ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে একটি বাড়িতে বোমা হামলা চালিয়েছে। আলজাজিরার সংবাদদাতা জানিয়েছেন, সেখানে মৃতের সংখ্যা বেড়ে আটজনে দাঁড়িয়েছে। নিহতরা সবাই একই পরিবারের।

 পৃথক হামলায় মধ্য ও উত্তর গাজায় ইসরায়েলি হামলায় ৯ জন নিহত হয়েছেন। সেখানে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দুটি পৃথক বাড়িতে বোমা হামলা চালিয়ে শিশু ও নারীসহ বেসামরিক নাগরিক হত্যা করে। একই ঘটনায় বহু আহত হয়ে ধ্বংসস্তূপে পড়ে আছেন।

স্থানীয় সূত্র ওয়াফা সংবাদ সংস্থাকে জানিয়েছে, গাজা শহরের উত্তর-পশ্চিমে শেখ রাদওয়ান পাড়ায় একটি বাড়িতে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানের বোমা হামলায় দুই ফিলিস্তিনি নিহত এবং বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন।

সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, ইসরায়েলি বিমানগুলো মধ্য গাজার বুরেইজ শরণার্থী শিবিরে হামলার পরও সরে যায়নি। সেগুলো কিছুক্ষণ পরপর চক্কর দিচ্ছে। মনে হচ্ছে, আরও হামলা করা হবে।

প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক মহলের চাপে গাজায় সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল ইসরায়েল। তবে হামাসের সঙ্গে মতপার্থক্যের জেরে গত ১৮ মার্চ থেকে ফের ব্যাপক আকারে বিমান হামলা শুরু করে তারা। এর ফলে যুদ্ধবিরতির স্বল্প সময়ের শান্তিও শেষ হয়ে যায়।

জাতিসংঘ বলছে, চলমান আগ্রাসনে গাজার প্রায় ৮৫ শতাংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে পড়েছেন। অঞ্চলটির অধিকাংশ অবকাঠামো আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে।

এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) গাজায় যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।

এ ছাড়া অবরুদ্ধ গাজায় গণহত্যার অভিযোগে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) মামলা চলমান রয়েছে। তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও ইসরায়েলের এই আগ্রাসন বন্ধ হওয়ার কোনো ইঙ্গিত এখনো মেলেনি। 

ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ধোঁয়া উড়ছে। ছবি : সংগৃহীত
ইসরায়েলি হামলায় গাজায় ধোঁয়া উড়ছে। ছবি : সংগৃহীত

রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্য অপরিপক্ব : শফিকুল আলম

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য মানবিক করিডোর নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। এ বিষয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মন্তব্যকে অপরিপক্ব (‘ইম্যাচিউরড’) বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি।

শুক্রবার (২ মে) বিকেলে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

এসময় শফিকুল আলম বলেন, ‘মানবিক করিডোর স্থাপন সংক্রান্ত এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। যদি এটি হয়, তাহলে তা জাতিসংঘের উদ্যোগে এবং তত্ত্বাবধানে হবে। জাতিসংঘ বাংলাদেশ ও মিয়ানমার— দুই দেশের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেবে। পাশাপাশি রাখাইনের অন্যান্য পক্ষের সঙ্গেও কথা বলা হবে।’

শফিকুল আলম বলেন, ‘রাখাইনে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাত চলছে। সেখানে বিভিন্ন গ্রুপ আছে, রোহিঙ্গারা আছে। মানবিক সহায়তার একমাত্র মাধ্যম বাংলাদেশ। আর দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আমরা মনে করি এটা অনেক দূরের বিষয়।’

চট্টগ্রাম বন্দরে বিদেশি অপারেটর নিয়োগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিতে চাইলে বন্দরের কর্মদক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই। আমরা বিশ্বের টপ কোম্পানিগুলোর কাছে বন্দরের দায়িত্ব দিতে চাই, যাদের বিভিন্ন দেশে বড় বড় বন্দর পরিচালনার অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা রয়েছে। যাদের ৭০, ৮০ বা ৯০টা বন্দর পরিচালনার অভিজ্ঞতা আছে, আমরা তাদের সঙ্গে কথা বলছি।’

প্রেস সচিব বলেন, ‘অধ্যাপক ড. ইউনূসের মূল লক্ষ্য চট্টগ্রাম অঞ্চলকে একটি ম্যানুফ্যাকচারিং হাবে রূপান্তর করা, যা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের ৩০-৪০ কোটি মানুষের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ।’

শফিকুল আলম বলেন, ‘বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মুরিং কনটেইনার টার্মিনালে বছরে ১২ লাখ ৭০ হাজার টিইইউএস কনটেইনার হ্যান্ডেল হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে এটি ছয় গুণ বাড়িয়ে ৭৮ লাখ ৬০ হাজার টিইইউএস-এ উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। চুক্তি ওপেন টেন্ডার অথবা রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জিটুজি ভিত্তিতে হতে পারে। তবে কোনো রকম রেপুটেশন ছাড়া কোম্পানিকে দায়িত্ব দেওয়া হবে না।’

তিনি বলেন, ‘বন্দরের ইফিশিয়েন্সি বাড়ালে প্রচুর কর্মসংস্থান তৈরি হবে। রপ্তানি বাড়াতেও এটি অপরিহার্য। পণ্য তৈরি হওয়ার পর দ্রুত রপ্তানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। শুধু বন্দর নয়, ইনল্যান্ড সংযোগ ব্যবস্থাকেও সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনা হবে।’

শফিকুল আলম জানান, শুধু চট্টগ্রাম নয়, কক্সবাজারসহ পুরো উপকূলীয় এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী বিদেশি দক্ষ অপারেটর ও বিনিয়োগকারী নিয়োগ দেওয়া হবে।

আগামী নির্বাচনের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের প্রধান উপদেষ্টা বারবার বলেছেন নির্বাচন ডিসেম্বর থেকে জুনের মধ্যে হবে। সে বিষয়ে আমাদের প্রস্তুতি চলছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আলোচনার মধ্যে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার বলেন, গত কয়েক মাসে এক লাখ ১০ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে— এই তথ্যটি বিভ্রান্তিকর। তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাখাইনে যুদ্ধ শুরু হলে তখন থেকেই অনুপ্রবেশ চলছে। এমনকি সে সময় মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সদস্যরাও বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিল। অনুপ্রবেশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু ওই সংখ্যাটি বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।’

তিনি আরও জানান, ‘প্রথম দফায় প্রত্যাবাসনের জন্য এক লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গার একটি তালিকা মিয়ানমারকে দেওয়া হয়েছে। তবে মিয়ানমার সরকার বলছে, এই তালিকায় কিছু তথ্যগত সমস্যা রয়েছে, যা তারা যাচাই-বাছাই করছে।’

সংবাদ সম্মেলনে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ফরিদা খানম, চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সদস্য সচিব জাহিদুল করিম কচি, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মোহাম্মদ শাহনেওয়াজ এবং সাধারণ সম্পাদক সালেহ নোমান উপস্থিত ছিলেন।

চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। ছবি : কালবেলা
চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। ছবি : কালবেলা



যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে ভারতকে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর

ভারত যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা। ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে হামলা ঘিরে দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনায় শুক্রবার এমন হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।

গত ২২ এপ্রিল পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর হামলায় ২৬ জন নিহত হন। এটি ছিল ২০০০ সালের পর থেকে সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী হামলা। এ হামলার পেছনে পাকিস্তানের যোগসাজশ আছে বলে দাবি করেছে নয়াদিল্লি। তবে ওই দাবি নাকচ করেছে ইসলামাবাদ। একই সঙ্গে তারা নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে।

তখন থেকে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। পাকিস্তান তাদের সেনা তৎপরতা বাড়িয়েছে। আর নিজেদের সশস্ত্র বাহিনীকে ‘অভিযান চালানোর পূর্ণ স্বাধীনতা’ দিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এরই মধ্যে গত বুধবার পাকিস্তানের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগামী ২৪ থেকে ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে ভারত হামলা চালাতে পারে বলে আশঙ্কা করছে তারা।

শুক্রবার পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, এদিন রাওয়ালপিন্ডি শহরে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন কোরের কমান্ডারদের সম্মেলনে (কর্পস কমান্ডারস কনফারেন্স–সিসিসি) বিশেষ অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন সেনাপ্রধান জেনারেল অসিম মুনির। এ সময় সামরিক বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা বিদ্যমান ভূ–কৌশলগত পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তৃত পর্যালোচনা করেন। সেখানে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে চলমান অচলাবস্থা এবং বৃহৎ আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

আইএসপিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সম্মেলনে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির প্রতি পাকিস্তানের প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেন সামরিক বাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা। একই সঙ্গে তাঁরা স্পষ্ট করে বলেন যে যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার যেকোনো চেষ্টার জবাব দেওয়া হবে এবং এই জবাব হবে কঠোর। পাশাপাশি পাকিস্তানের জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতি যেকোনো মূল্যে সম্মান জানানো হবে।

পাকিস্তানের আইএসপিআর জানায়, সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বলেছেন, শান্তি ও উন্নয়নের পথে পাকিস্তানের যাত্রাকে কোনো সন্ত্রাসবাদ, জোরজবদস্তি বা আগ্রাসনের মাধ্যমে থামানো যাবে না। পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে ভারত সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তা দৃঢ় সংকল্পের সঙ্গে মোকাবিলা করা হবে এবং পরাজিত করা হবে।

এদিকে চলমান সংকটের মধ্যে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ বলেছেন, সেনাপ্রধান অসিম মুনিরের নেতৃত্বে পাকিস্তানের সশস্ত্র বাহিনী এবং জনগণের মধ্যে উচ্চ মনোবল রয়েছে। পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম জিও নিউজের ‘নয়া পাকিস্তান’ অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন তিনি। শুক্রবারের সিসিসিতে সেনাপ্রধানের ‘দৃঢ় সংকল্পের’ জন্য তাঁর প্রশংসা করেন প্রতিরক্ষমন্ত্রী।

খাজা আসিফ বলেন, বিগত পাঁচ দিনে যেভাবে তিনি (সেনাপ্রধান) বিভিন্ন সেনানিবাসে ও নিয়ন্ত্রণরেখায় সেনাসদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন, তা সশস্ত্র বাহিনী এবং জনগণের মনোবল বৃদ্ধি করতে সহায়তা করেছে। তিনি বলেন, কাশ্মীর হামলার জন্য পাকিস্তানকে জড়িয়ে ভারত যে অভিযোগ এনেছে, তার কোনো ‘বিশ্বাসযোগ্যতা’ নেই। ভারতীয়রাও নরেন্দ্র মোদির বয়ানের বিরুদ্ধে যাচ্ছেন।

পাকিস্তান–নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের বাসিন্দাদের খাদ্য মজুতের নির্দেশ

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার নিয়ন্ত্রণরেখার নিকটবর্তী পাকিস্তান-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের এলাকার বাসিন্দাদের খাদ্য মজুত করার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে বন্দুকধারীর হামলার পর দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা চলার মধ্যে শুক্রবার এ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ভারতীয় সেনাবাহিনীর দাবি, ইতিমধ্যে নিয়ন্ত্রণরেখায় দুই পক্ষের মধ্যে টানা অষ্টম রাতের মতো গোলাগুলি হয়েছে। উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে দুই দেশ।

আজ স্থানীয় প্রাদেশিক পরিষদে পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী আনোয়ার উল হক বলেন, ‘নিয়ন্ত্রণরেখা–সংলগ্ন ১৩টি নির্বাচনী এলাকার জন্য দুই মাসের খাদ্যসরবরাহ মজুত করার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, আঞ্চলিক সরকার ওই ১৩টি নির্বাচনী এলাকার জন্য ‘খাদ্য, ওষুধ এবং অন্য মৌলিক চাহিদাগুলোর’ সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১০০ কোটি রুপির (৩৫ লাখ মার্কিন ডলার) একটি জরুরি তহবিল গঠন করেছে।

নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর এলাকাগুলোর সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারি ও বেসরকারি মালিকানাধীন যন্ত্রপাতিও মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানান আনোয়ার উল হক।

ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে হামলার পর যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গত মঙ্গলবার তাঁর দেশের সেনাবাহিনীকে হামলার জবাব দেওয়ার সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন।

পেহেলগামের হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছে পাকিস্তান। তারা বলছে, ভারত একটি সামরিক হামলার পরিকল্পনা করছে বলে তাদের কাছে নির্ভরযোগ্য খবর আছে। যেকোনো হামলার জবাবে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।

সামরিক উত্তেজনার আশঙ্কায় গত বৃহস্পতিবার পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের কর্তৃপক্ষ ১০ দিনের জন্য এক হাজারেরও বেশি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে।

ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই কাশ্মীরকে পূর্ণাঙ্গভাবে নিজেদের অংশ বলে দাবি করে থাকে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর থেকে হিমালয়ের অঞ্চলটি নিয়ে একাধিকবার যুদ্ধে জড়িয়েছে দুই দেশ।

পাকিস্তানিদের জন্য ওয়াঘা সীমান্ত খোলা: ইসলামাবাদ

পাকিস্তানি নাগরিকদের জন্য পাকিস্তান ওয়াঘা সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে—ভারতীয় গণমাধ্যমের এমন দাবি নাকচ করে দিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দুই দেশের মধ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে শুক্রবার এমন বক্তব্য জানিয়েছে দেশটি।  

পাকিস্তান ওয়াঘা সীমান্ত খুলে দিতে ‘অস্বীকৃতি’ জানানোয় কয়েকজন পাকিস্তানি নাগরিক আটারি ও ওয়াঘা সীমান্তের মধ্যবর্তী এলাকায় আটকা পড়েছেন উল্লেখ করে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। পাল্টা জবাবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ তথ্য জানিয়েছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, অনেক দুর্বল স্বাস্থ্যের রোগীকে পাকিস্তানে ফিরে আসতে হয়েছে। এ ছাড়া পরিবারগুলোকে আলাদা হয়ে যেতে হয়েছে। এক শিশু তার অভিভাবক থেকে আলাদা হওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, ওয়াঘা-আটারি সীমান্ত ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত চালু ছিল এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষ পারাপারের অনুমতি দিলে পাকিস্তান তার নাগরিকদের গ্রহণ করতে রাজি আছে।

পাকিস্তান আরও জানিয়েছে, পাকিস্তানের নাগরিকদের জন্য ভবিষ্যতেও ওয়াঘা সীমান্ত খোলা থাকবে।

পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসিম মুনিরের সভাপতিত্বে শুক্রবার রাওয়ালপিন্ডিতে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন কোরের কমান্ডারদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়
পাকিস্তানের সেনাপ্রধান অসিম মুনিরের সভাপতিত্বে শুক্রবার রাওয়ালপিন্ডিতে সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন কোরের কমান্ডারদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ছবি: পাকিস্তান আইএসপিআর

গাজার উদ্দেশে ত্রাণ নিয়ে যাত্রা করা জাহাজে বোমা হামলা

মানবিক সহায়তা নিয়ে ফিলিস্তিনের গাজার অভিমুখে থাকা একটি জাহাজে ড্রোন দিয়ে বোমা হামলা চালানো হয়েছে। মাল্টা উপকূলে আন্তর্জাতিক জলসীমায় এ হামলায় জাহাজটি বিকল হয়ে গেছে।

শুক্রবার এক বিবৃতিতে ওই মানবিক সহায়তা আয়োজনকারী সংগঠন ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন (এফএফসি) এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে। হামলার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করে সংগঠনটি বলছে, নিরস্ত্র বেসামরিক জাহাজটির সম্মুখভাগে সশস্ত্র ড্রোন দিয়ে দুইবার হামলা চালানো হয়েছে। এতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং এর কাঠামোয় বড় ধরনের ফাটল দেখা দেয়।

তবে এ বিষয়ে এখনো ইসরায়েল কোনো মন্তব্য করেনি।

ত্রাণবাহী জাহাজটি বর্তমানে মাল্টা উপকূল থেকে ১৪ নটিক্যাল মাইল (২৫ কিলোমিটার) দূরে অবস্থান করছে। জাহাজে গাজাবাসীর জন্য মানবিক সহায়তার পাশাপাশি অধিকারকর্মীরা ছিলেন। তাঁরা জানিয়েছেন, শুক্রবার ভোরে জাহাজের জেনারেটর লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। এতে সেটি বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়ে এবং ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের পোস্ট করা ছবি ও ভিডিওতে দেখা গেছে, জাহাজের ওপর আগুন জ্বলছে ও বিস্ফোরণ ঘটছে।

জাহাজে ১২ জন নাবিক ও ৪ জন বেসামরিক নাগরিক ছিলেন জানিয়ে মাল্টা সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তাঁরা সবাই সুস্থ আছেন। জাহাজটিকে সহায়তা করতে কাছাকাছি থাকা একটি টাগ বোটকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও মাল্টা সরকারের ওই বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন জানিয়েছে, ২১টি দেশের অধিকারকর্মীরা জাহাজটিতে ছিলেন। ইসরায়েলের বেআইনিভাবে গাজা অবরোধ করে সেখানে হত্যাযজ্ঞ চালানোর প্রতিবাদ এবং গাজাবাসীর জীবন রক্ষার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে তাঁরা যাত্রা করেছিলেন।

ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘গাজায় চলমান অবরোধ এবং আন্তর্জাতিক জলসীমায় আমাদের বেসামরিক জাহাজে বোমা হামলাসহ আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের জবাব চাইতে ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূতদের অবশ্যই তলব করতে হবে।’

যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে গাজায় আবার সামরিক অভিযান শুরু করে ইসরায়েল। এরপর দুই মাস ধরে উপত্যকাটি কঠোরভাবে অবরোধ করেছে দেশটি। গাজায় তারা কোনো খাবার, জ্বালানি, ওষুধসহ জীবনরক্ষাকারী অন্যান্য জিনিসপত্রও নিতে দিচ্ছে না।

গাজায় মানবিক সহায়তা প্রদানকারী সংগঠনগুলো বলেছে, তারা এর মধ্যে তাদের মজুদ করা খাদ্যপণ্যের শেষভাগটাও বিতরণ করে ফেলেছে। ইসরায়েলি হামলায় বিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের এই উপত্যকার কর্মকর্তারা শুক্রবার বলেছেন, গাজায় দুর্গতদের খাবার সরবরাহ করা রান্নাঘরগুলো আগামী এক সপ্তাহ বা ১০ দিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যাবে।

গাজা অবরোধ করে রাখার পেছনে যুক্তি হিসেবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলে আসছেন, গাজায় মানবিক সহায়তা পৌঁছালে তা হামাস সদস্যরা চুরি করে নিয়ে তাঁদের যোদ্ধাদের সরবরাহ করেন বা বিক্রি করে দেন। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে গাজায় বড় ধরনের ত্রাণ চুরি হওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এই কাজে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মকর্তারা।

এর আগে ২০১০ সালেও তুরস্ক থেকে ত্রাণ নিয়ে গাজার উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন ফ্রিডম ফ্লোটিলার কর্মীরা। মাভি মারমারা নামের ওই জাহাজে একপর্যায়ে হামলা চালিয়েছিলেন ইসরায়েলি সেনারা। তাতে ১০ জন নিহত এবং ২৮ জন আহত হয়েছিলেন।

গত বছরের অক্টোবরে গাজার শাসকগোষ্ঠী হামাসের সদস্যরা ইসরায়েলি ভূখণ্ডে ঢুকে সশস্ত্র হামলা চালান। এতে প্রায় এক হাজার মানুষ নিহত হন। এরপর ওই দিন থেকে গাজায় নির্বিচার হামলা চালায় ইসরায়েল। মাঝে কিছুদিন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও মার্চের মাঝামাঝিতে আবার হামলা শুরু করে ইসরায়েল। তাদের এই দফার হামলার অন্তত ২ হাজার ৩২৬ জন নিহত হয়েছেন, যাতে গাজায় মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫২ হাজার ৪১৮ জনে পৌঁছেছে।

গাজা ফ্রিডম ফ্লোটিলার জাহাজে আগুন নেভাতে টাগ বোট থেকে পানি দেওয়া হচ্ছে। মাল্টা সরকারের তথ্য দপ্তরের দেওয়া ছবি ২ মে, ২০২৫
গাজা ফ্রিডম ফ্লোটিলার জাহাজে আগুন নেভাতে টাগ বোট থেকে পানি দেওয়া হচ্ছে। মাল্টা সরকারের তথ্য দপ্তরের দেওয়া ছবি ২ মে, ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

পেহেলগামে হামলা: ‘যে সরকারের ভরসায় ঘুরতে গিয়েছিলাম, তারা আমাদের অনাথের মতো ফেলে গেছে’

ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে গত ২২ এপ্রিল ঐশান্যা দ্বিবেদীর চোখের সামনেই তাঁর স্বামীকে হত্যা করা হয়। সেই ঘটনার কথা মনে করে ডুকরে কেঁদে ওঠেন তিনি। কথা বলতে গিয়ে বারবার গলা ধরে আসছিল তাঁর।

বাড়িভর্তি মানুষের মধ্যে এক কোণে চুপচাপ বসে ছিলেন ঐশান্যা। তাঁর মতোই অবস্থা পরিবারের অন্য সদস্যদের। একমাত্র ছেলে শুভম দ্বিবেদীকে হারিয়েছে এই পরিবার। তাঁরা উত্তর প্রদেশের কানপুরের বাসিন্দা।

শুভমের স্ত্রী ২৯ বছর বয়সী ঐশান্যা বিবিসির সঙ্গে আলাপকালে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলছিলেন, ‘আমাদের দেশ, আমাদের সরকার আমাদের ওখানে (পেহেলগামে) অনাথের মতো ছেড়ে দিয়েছিল। যাদের ওপর ভরসা করে আমরা ওখানে ঘুরতে গিয়েছিলাম, তারা সেই সময় ওখানে উপস্থিত ছিল না।’

হামলার সময়কার নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে ঐশান্যা বলেন, ‘কোনো নিরাপত্তারক্ষী ছিল না, কোনো জওয়ান ছিল না। ঘরের ভেতরে বাবা-মা আমাদের রক্ষা করতে পারেন। কিন্তু ঘরের বাইরে আমাদের রক্ষা করার দায়িত্ব সরকারের।’

ধীরে ধীরে লোকে শুভমকে ভুলে যাবে

সেলফের ওপর রাখা প্রয়াত স্বামীর ছবির দিকে তাকিয়ে ঐশান্যার গলা ধরে আসে। তিনি বলছিলেন, ‘আমার নিজের চোখের সামনে আমার ভালোবাসা, আমার স্বামী, আমার পৃথিবীকে শেষ হয়ে যেতে দেখেছি। কাউকে যেন এমন দিন না দেখতে হয়।’

তারপর সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে ঐশান্যা দ্বিবেদী বলেন, ‘এই দেশের ভুলের কারণে, সরকারের ব্যর্থতার জন্য আমার স্বামী শহীদ হয়েছেন। তাই শুভমকে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হোক।’

ঐশান্যা বলতে থাকেন, ‘আর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রথম গুলিটা শুভমের লেগেছিল। তাই সেই সময় উপস্থিত অনেকে ওখান থেকে পালানোর সুযোগ পেয়েছিলেন। যাঁরা সেখান থেকে নিরাপদে নিজেদের বাড়িতে পৌঁছাতে পেরেছেন, যাঁরা বলতে পারছেন আমরা বেঁচে গেছি, সেটা একমাত্র শুভমের জন্যই সম্ভব হয়েছে।’

ঐশান্যা দ্বিবেদীসহ গোটা পরিবার দাবি করেছে, ঘটনার দিন শুভম দ্বিবেদীকেই প্রথমে গুলি করা হয়েছিল।

দেশের সব নাগরিকের কাছে আবেদন জানিয়েছেন ঐশান্যা, যাতে তাঁর প্রয়াত স্বামীকে শহীদের মর্যাদা দেওয়া হয়। তাঁর কথায়, ‘শুভমের জন্য অনেক জীবন রক্ষা পেয়েছে। তাই তাঁকে শহীদের মর্যাদা দেওয়ার এই দাবিতে সবাই যাতে আমাদের পাশে দাঁড়ান, সেই অনুরোধ জানাচ্ছি। শুভম শহীদের মর্যাদা না পেলে ওকে কিছুদিনের মধ্যেই সবাই ভুলে যাবে।’

‘আমার ছেলের বেড়াতে যাওয়ার শখ ছিল’

শুভমের বাবা সঞ্জয় কুমার দ্বিবেদী বিবিসিকে বলেন, ‘আমাদের ছেলে ঘুরতে খুব ভালোবাসত। বিশ্বের বহু দেশ ঘুরেছে। সব জায়গা থেকেই নিরাপদে ঘরে ফিরে এসেছে। এটা তো আমাদের দেশ ছিল। নিজের দেশেই তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো।’

দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে নিরাপত্তার বিষয়ে আবেদন জানিয়েছেন সঞ্জয় কুমার।

শুভম দ্বিবেদীর মা অন্য একটা ঘরে একা বসেছিলেন। কারও সঙ্গে কথা বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না তিনি।

ছেলের মৃত্যুর পর থেকে সঞ্জয় কুমার দ্বিবেদীর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। কারও সঙ্গেই খুব একটা কথা বলেন না তিনি।

তিন–চার বছর আগে বাবার সিমেন্টের ব্যবসার পুরো দায়িত্ব নিয়েছিলেন শুভম। তিনি এমবিএ করেছেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিয়েও করেছিলেন ঐশান্যাকে। মধ্যপ্রদেশের ওরছায় ‘ডেসটিনেশন ওয়েডিং’ করেন তাঁরা।

এই নববিবাহিত যুগলের বিয়ের বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করা হয়েছে। পরিবারের সবাই যে কতটা খুশি ছিলেন, তা ওই সব ছবি ও ভিডিওতে স্পষ্ট।

একটা ম্যাট্রিমোনিয়াল সাইটে শুভমের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল ঐশান্যার। প্রথম দেখা হয়েছিল ২০২৪ সালের ১ অক্টোবর।

সেই দিনের কথা স্মরণ করে ঐশান্যা দ্বিবেদী বলেন, ‘গত ছয়-সাত মাসে শুভম আমাকে অনেক ভালোবাসা দিয়েছে। সেই সব স্মৃতি আঁকড়ে আমি আমার বাকি জীবনটা এই বাড়িতেই কাটিয়ে দেব।’

‘রাগ ছিল সরকারের ওপর, মারা হয়েছে নিরীহ মানুষকে’

ঐশান্যা জানান, শুভম দ্বিবেদীর পছন্দের খাবারের তালিকায় ছিল ‘ইনস্ট্যান্ট নুডলস’।

গত ১৭ এপ্রিল প্রথম পুরো পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর বেড়াতে গিয়েছিলেন তিনি। বাড়ি ফেরার কথা ছিল ২৩ এপ্রিল।

ফিরে আসার আগের দিন, ২২ এপ্রিল পেহেলগামে ঘুরতে যান তাঁরা। যেদিন শুভম দ্বিবেদীকে হত্যা করা হয়, সেদিনই ছিল কাশ্মীরে দ্বিবেদী পরিবারের শেষ দিন।

ভ্রমণের প্রস্তুতির কথা মনে করে তাঁর স্ত্রী বলেছেন, ‘বিয়ের পর শুভম এক বছরে দুটি ফ্যামিলি ট্রিপ (পারিবারিক ভ্রমণের) পরিকল্পনা করেছিল। এটাই ছিল আমাদের প্রথম পারিবারিক ভ্রমণ।’

ঐশান্যা বলেন, ‘কোথায় বেড়াতে যাওয়া হবে, সেটা ঠিক করতে সবার ভোট নেওয়া হয়েছিল। সবাই মিলে কাশ্মীরকে বেছে নিয়েছিলাম। আমরা জানতাম না, কাশ্মীর আমাদের জন্য এতটা ভয়ংকর হয়ে উঠবে।’

নিহত শুভমের স্ত্রী বলেন, ‘সরকার তো বলে কাশ্মীর এখন নিরাপদ। সেখানে ৩৭০ ধারা বিলোপ করা হয়েছে। কোনোরকম দুশ্চিন্তা ছাড়াই আমরা সেখানে গিয়েছিলাম। জানতাম না যে আমাদের পৃথিবী সেখানে শেষ হয়ে যাবে।’

কাশ্মীর সফরে শুভম দ্বিবেদীর স্ত্রী, বাবা-মা, বোন, তাঁর শ্বশুর-শাশুড়ি, ঐশান্যার বাবা-মা, বোনসহ মোট ১১ জন ছিলেন।

যখন ঘটনাটা ঘটে, তখন শুভমের সঙ্গে সেখানে উপস্থিত ছিলেন তাঁর স্ত্রী ঐশান্যা, ঐশান্যার ছোট বোন সম্ভাবী এবং তাঁদের দুজনের বাবা-মাসহ মোট পাঁচজন। পরিবারের বাকি ছয় সদস্য মাঝপথ থেকে বৈসারণ উপত্যকায় ফিরে এসেছিলেন।

শুভমের ছোট বোন আরতির বিয়ে হয়েছিল দুই বছর আগে। তিনি ঘোড়ায় সওয়ার হওয়া নিয়ে কিছুটা উদ্বিগ্ন ছিলেন। তাই আর ওপরে উঠতে চাননি। তিনি যেতে না চাওয়ায় পরিবারের অন্য পাঁচ সদস্যও সেখানে যাননি।

ঐশান্যা বলেন, ‘বিমানবন্দরে এসে পৌঁছানোর পর আমাদের এমন অনেকের সঙ্গে দেখা হয়েছে, যাঁরা অস্ত্রধারীদের বলেছিলেন, আমাদেরও গুলি করো, যেভাবে আমাদের স্বামীকে মেরে ফেলেছ। কিন্তু তারা বলেছে, যাও আর তোমার সরকারকে বলো আমরা তোমার স্বামীর সঙ্গে কী করেছি।’

ঐশান্যা বলেন, ‘সন্ত্রাসীদের ওই কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছিল, তাদের রাগ সরকারের ওপর, কিন্তু মারা হয়েছে নিরীহ মানুষগুলোকে।’

‘আমরা ভেবেছিলাম কেউ মজা করছে’

আপনাকে ওরা (হামলাকারীরা) কিছু বলেছিল?

এই প্রশ্নের উত্তরে ঐশান্যা দ্বিবেদী বলেন, ‘না। কিছু বলার বা শোনারই সময় পাইনি। ওপরে পৌঁছানোর পর মাত্র ১০ মিনিট হয়েছে। আমরা ম্যাগি আর কফির অর্ডার দিই।’

শুভমের স্ত্রী বলছিলেন, ‘তখন ঘড়িতে বেলা ২টা ২৫ মিনিট বাজে। হাওয়ায় গুলি চলেছিল, আমরা সেই শব্দটা শুনেছি। কফি বিক্রেতা চলে যাওয়ার কয়েক সেকেন্ড পরই একজন আমাদের কাছে এসে শুভমকে জিজ্ঞেস করল—হিন্দু না মুসলিম?’

ঐশান্যা বলেন, ‘ভেবেছিলাম কেউ আমাদের সঙ্গে প্র্যাঙ্ক (মশকরা) করছে। আমি হেসে জিজ্ঞাসা করলাম, কী হয়েছে? লোকটা আবার জানতে চাইল—হিন্দু না মুসলিম? আমরা তখনো ভাবছি, কেউ মজা করছে। আমাদের আর শুভমের মুখ থেকে হিন্দু বেরিয়ে এসেছে। আমরা আমাদের বাক্য শেষও করতে পারিনি, (হামলাকারী) শুভমের মাথার বাঁ দিকে গুলি চালিয়ে দিল।’

কথাগুলো বলতে বলতে অঝোরে কেঁদে চলেছিলেন ঐশান্যা। শব্দ হারিয়ে ফেলছিলেন।

শুভম যখন গুলিবিদ্ধ হন, তখন তাঁর শ্বশুর শৌচাগারে গিয়েছিলেন, আর শাশুড়ি দূরে হাঁটাহাঁটি করছিলেন। আর কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিলেন ঐশান্যার বোন সম্ভাবী।

সম্ভাবী বলেন, ‘আমি দিদির কাছ থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে ছিলাম। ওপরে আসার পর মাত্র ১০ মিনিট হয়েছে তখন।’

‘সরকারের উচিত প্রত্যেক ভারতীয়র নিরাপত্তা নিশ্চিত করা’

এই দৃশ্য দেখে বোনের দিকে দ্রুত দৌড়ে যান সম্ভাবী। ততক্ষণে গুলির শব্দ বাড়তে শুরু করেছে।

সম্ভাবী বলেছেন, ‘আমি জোর করে দিদিকে গেটের বাইরে টেনে নিয়ে আসি। বাবা-মাকে খুঁজতে থাকি। বাবা ওয়াশরুমে না গেলে তারও কিছু একটা হতে পারত।’

সম্ভাবী বলছিলেন, ‘সবাইকে টেনে বের করে তাড়াতাড়ি দৌড়াতে বলি, না হলে সবাইকে মেরে ফেলবে। নামার পথ খুব কঠিন ছিল।’

ঐশান্যার বোন বলছিলেন, ‘নামার রাস্তাটা খুব পাথুরে ছিল। ঘোড়ায় চেপে ওপরে আসতে ভয় লাগছিল। পায়ে হেঁটে আসা সম্ভব ছিল না। কিন্তু কেউ আমাদের সাহায্য করেনি।’

যে সময় শুভম দ্বিবেদীর গুলি লাগে, সেই সময়ের ঘটনার কথা বর্ণনা দিয়েছেন সম্ভাবী। তাঁর কথায়, ‘আমার জামাইবাবুর গুলি লাগার সঙ্গে সঙ্গে আশেপাশে থাকা ১০০-১৫০ জন এদিক–ওদিক ছোটাছুটি শুরু করে। প্রথমে অন্য কেউ গুলিবিদ্ধ হলে হয়তো আমরা পালিয়ে বাঁচতে পারতাম।’

শুভম দ্বিবেদীর আদি গ্রাম রুমায়, কানপুর জেলা সদর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে এই গ্রাম। এই মুহূর্তে তাদের বাড়িতে গেলে দরজা দিয়ে ঢুকতেই পরিবারের অনেককে বসে থাকতে দেখা যাবে।

দরজা দিয়ে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে চোখে পড়বে একটা সাদা চাদর বিছানো টেবিল। তার ওপরে রাখা আছে মালা পরানো প্রয়াত শুভম দ্বিবেদীর ছবি।

শুভমের চাচাতো ভাই সৌরভ বিবিসিকে বলছিলেন, ‘সরকারকে সন্ত্রাসবাদকে গোড়া থেকে নির্মূল করতে হবে এবং ভারতের প্রত্যেক নাগরিককে আশ্বস্ত করতে হবে, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী পর্যন্ত যেখানেই থাকুন না কেন, আপনি নিরাপদ।’

শুভম দ্বিবেদীর স্ত্রী ঐশান্যা
শুভম দ্বিবেদীর স্ত্রী ঐশান্যা। ছবি: এএনআই

গাজায় প্রবেশের অপেক্ষায় ৩ হাজার ত্রাণবাহী ট্রাক by রয়টার্স ও আল জাজিরা

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা থামছেই না। দুই মাস ধরে গাজায় কোনো ত্রাণসামগ্রী ঢুকতে দিচ্ছে না তারা। হামলার কারণে গাজায় ত্রাণসামগ্রীর ঘাটতি আরও প্রকট হচ্ছে। ইসরায়েলি বাহিনী যেসব এলাকায় অভিযান চালাচ্ছে, সেখানকার গুদামে সামান্য ত্রাণসামগ্রী থাকলেও তা মানুষের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না। ফলে সেসব খাবারও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা (ইউএনআরডব্লিউএ) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, খাদ্য, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জামবোঝাই তিন হাজার ত্রাণবাহী ট্রাক সীমান্তে আটকা পড়েছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে শিশুরা। গাজার অন্তত ১০ লাখ শিশুর জীবন ত্রাণের ওপর নির্ভরশীল। প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রীর অভাবে তাদের জীবন শঙ্কার মুখে পড়েছে।

গাজা সিটির কাছের শুজাইয়া শহরের ১২ বছর বয়সী কন্যাশিশু রাশাফ তাদের একজন। ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় শিশুটি গুরুতর আহত হয়েছে। এখন সে প্রতিনিয়ত বেঁচে থাকার লড়াই করে যাচ্ছে। সম্প্রতি তার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে উন্নত চিকিৎসার জন্য অন্য কোনো দেশে নিয়ে যাওয়ার আকুতি জানিয়েছে শিশুটি।

আল-জাজিরার ফ্যাক্ট-চেকিং ইউনিট ওই ভিডিও যাচাই করেছে। এতে জানা যায়, শিশুটির নাম রাশাফ। অপুষ্টির সঙ্গে নিজের লড়াইয়ের বিবরণ দেওয়ার সময় তাকে খুবই দুর্বল দেখাচ্ছিল। সে বলে, ‘আমি যদি আগের মতো হতে পারতাম! আমি চাই, আমার চুল আবার আগের মতো লম্বা হোক, যেন আঁচড়াতে পারি। আমি দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে চাই। কিন্তু এখন বসে নামাজ পড়তে হয়।’ কথাগুলো বলেই কান্নায় ভেঙে পড়ে সে।

অবরুদ্ধ গাজায় ইসরায়েলের হামলায় দুই দিনে আরও ৫৩ জন নিহত হয়েছেন। এঁদের মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার নিহত হয়েছেন ১৮ জন। বুধবার প্রাণ গেছে ৩৫ জনের। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন শতাধিক ব্যক্তি। এর মধ্য দিয়ে অবরুদ্ধ উপত্যকাটিতে নিহতের মোট সংখ্যা ৫২ হাজার ছাড়িয়েছে।

গাজার হামাসনিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ১৮ মার্চ যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের পর থেকে গাজায় ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৩০৮ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন অন্তত ৫ হাজার ৯৭৩ জন।

আজ সকালে গাজার উত্তর ও দক্ষিণের বেসামরিক এলাকাগুলো ইসরায়েলের বিমান হামলায় কেঁপে ওঠে। এতে বেইত লাহিয়ার একটি আবাসিক এলাকায় তিনজন নিহত হয়েছেন। হামলায় গুরুতর আহতদের পার্শ্ববর্তী ইন্দোনেশিয়ান হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

খান ইউনিসের পূর্বাঞ্চলে ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় তিনজন কৃষক নিহত হয়েছেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ওই কৃষকেরা খামারে যাওয়ার সময় ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন। গাজা উপত্যকাজুড়ে তীব্র খাদ্যসংকট মোকাবিলায় চাষাবাদ করে প্রয়োজনীয় খাদ্যশস্য উৎপাদনের চেষ্টা করছিলেন তাঁরা।

বিভিন্ন ত্রাণ সংস্থার কর্মকর্তারা বলেছেন, গাজা উপত্যকায় খাবারের দোকান ও সাহায্যকারী সংস্থার রান্নাঘরে লুটপাটের ঘটনা বাড়ছে। এটি সেখানকার মানুষের ক্রমবর্ধমান হতাশা ও ক্ষুধার চিত্র তুলে ধরেছে।

ফিলিস্তিনের বাসিন্দা ও ত্রাণ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গতকাল বুধবার গাজার বিভিন্ন স্থানে অন্তত পাঁচটি লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। এগুলোর মধ্যে সাহায্য সংস্থার রান্নাঘর, ব্যবসায়ীদের দোকান এবং গাজায় জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থার কমপ্লেক্স রয়েছে।

গাজার একটি বেসরকারি সংস্থার পরিচালক আমজাদ আল-শাওয়া বলেন, ‘গাজা উপত্যকার পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠেছে, লুটপাটের ঘটনা তার একটি ইঙ্গিত। তীব্র খাদ্যসংকট, মনোবল হারিয়ে ফেলা, চরম হতাশা এবং আইনের শাসনের অনুপস্থিতির প্রতিফলন এসব ঘটনা।’

বুধবার গভীর রাতে কয়েক হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ গাজা সিটিতে জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থার কমপ্লেক্সে ঢুকে সেখানকার ফার্মেসি থেকে ওষুধ চুরি করে ও যানবাহনে ভাঙচুর চালায় বলে জানিয়েছেন জর্ডানে অবস্থানরত সংস্থাটির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা লুইস ওয়াটারিজ।

গাজায় হামাস-নিয়ন্ত্রিত সরকারের গণসংযোগ বিভাগের পরিচালক ইসমাইল আল-থাওয়াবতা লুটপাটের ঘটনাগুলোকে ‘বিচ্ছিন্ন’ ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, এসব ঘটনা ‘আমাদের ফিলিস্তিনি জনগণের মূল্যবোধ ও নৈতিকতার প্রতিফলন নয়।’ এ ধরনের ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

ইসরায়েলি হামলায় আহত ফিলিস্তিনি শিশু খাদ্যের অভাবে অপুষ্টিতে ভুগছে। বৃহস্পতিবার দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের একটি হাসপাতালে
ইসরায়েলি হামলায় আহত ফিলিস্তিনি শিশু খাদ্যের অভাবে অপুষ্টিতে ভুগছে। বৃহস্পতিবার দক্ষিণ গাজার খান ইউনিসের একটি হাসপাতালে। ছবি: রয়টার্স

ট্রাম্প কেন ঠান্ডা মাথায় মার্কিন প্রতিরক্ষা দুর্বল করছেন by জিল ক্যাস্টনার ও উইলিয়াম সি উলফোর্থ

১৯৩৩ সালে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি জোসেফ স্তালিনকে স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, মস্কোকে প্রথমেই যুক্তরাষ্ট্রে চালানো গোপন ষড়যন্ত্রমূলক কার্যকলাপ বন্ধ করতে হবে।

ঠিক তেমনি ১৯৮০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান যখন স্নায়ুযুদ্ধকালীন উত্তেজনা কমাতে চেয়েছিলেন, তখন তাঁর পররাষ্ট্রমন্ত্রী জর্জ শুলৎজ সোভিয়েত নেতা মিখাইল গর্বাচেভকে জানিয়েছিলেন, রুশ গোয়েন্দারা যেন মিথ্যা প্রচারণা বন্ধ করেন (যেমন এইডস নাকি যুক্তরাষ্ট্রের জীবাণু গবেষণার ফল!)।

এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে চাইছেন বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু আগের প্রেসিডেন্টদের মতো শর্ত দেওয়ার বদলে ট্রাম্প বরং নিজেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছেন। তিনি একতরফাভাবে ছাড় দিচ্ছেন, বিনিময়ে কিছু না চেয়ে।

ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকে ট্রাম্প প্রশাসন এমন বহু সংস্থা দুর্বল করেছে, যারা যুক্তরাষ্ট্রকে বিদেশি হস্তক্ষেপ থেকে রক্ষা করত।

উদাহরণস্বরূপ এফবিআই থেকে ট্রাম্প প্রশাসন সেই কর্মকর্তাদের বরখাস্ত করেছে, যাঁরা তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এতে সংস্থাটি বহু অভিজ্ঞ এজেন্ট হারিয়েছে। এমনকি এফবিআইয়ের জাতীয় নিরাপত্তা ইউনিট ও গোয়েন্দা বিভাগ থেকেও শীর্ষ কর্মকর্তাদের অপসারণ বা অন্যত্র বদলি করা হয়েছে।

সাইবার নিরাপত্তা ও অবকাঠামো সুরক্ষা সংস্থা (সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার সিকিউরিটি এজেন্সি) থেকে অন্তত ১৭ জন কর্মীকে বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁদের দায়িত্ব ছিল নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভুল তথ্য বা গুজবের বিরুদ্ধে কাজ করা। অথচ বরখাস্তের কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সংস্থাটিকে আবার ‘প্রকৃত অবকাঠামো রক্ষা’য় ফিরিয়ে আনা হচ্ছে (যদিও নির্বাচনব্যবস্থাও সেই অবকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত)।

অর্থাৎ ট্রাম্প রাশিয়ার মতো দেশের ষড়যন্ত্র বন্ধ করার দাবি তোলার বদলে বরং এমন সংস্থাগুলোকেই দুর্বল করে দিচ্ছেন, যেগুলো এসব ষড়যন্ত্র মোকাবিলায় নিয়োজিত।

একই রকম বাজেট কাটা হয়েছে সিআইএ এবং এনএসএ থেকেও। এনএসএর পরিচালক ও উপপরিচালককে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। মনে করা হচ্ছে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে লরা লুমার নামের একজন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচারক ছিলেন।

এসবের সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প সম্প্রতি একটি নির্বাহী আদেশে সই করেছেন, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল মিডিয়া এজেন্সির তহবিল কমিয়ে দেওয়া হয়। এই সংস্থাই মূলত রেডিও ফ্রি ইউরোপ/রেডিও লিবার্টি, রেডিও ফ্রি এশিয়া এবং ভয়েস অব আমেরিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমগুলোকে চালায়।

এ ধরনের বাজেট কাটছাঁটের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখন বিদেশি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে। এফবিআই দুর্বল হয়ে যাওয়ায় তারা বিদেশি ষড়যন্ত্র বা হস্তক্ষেপ তদন্ত করতে পারছে না। আর যাঁরা মার্কিন নির্বাচনের নিরাপত্তা রক্ষায় কাজ করতেন, তাঁদের বরখাস্ত করার ফলে এখন যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের সামনে সুযোগ তৈরি হয়েছে। শত্রুরা নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব ছড়িয়ে দিতে পারছে। এর ফলে নির্বাচনের ফলাফল নিয়েও মানুষ সন্দেহ করতে শুরু করেছে।

আমরা ইতিমধ্যেই এ ধরনের খারাপ প্রভাব দেখেছি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে। এখন এই সমস্যা আরও খারাপ হবে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোয় যেভাবে হঠাৎ করে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, তার ফলে অনেক দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েছেন এবং তাঁরা অসন্তুষ্ট বোধ করছেন।

এ অবস্থায় তাঁরা বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সহজ লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারেন। এখনই দেখা যাচ্ছে, রাশিয়া ও চীন সক্রিয়ভাবে সাবেক মার্কিন কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতে চাইছে। তাঁদের নিয়োগ দিতে চাইছে এমন কিছু রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির মাধ্যমে, যেগুলো তাঁদের প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখছে।

আরেকটি বড় ক্ষতি হচ্ছে রেডিও ফ্রি ইউরোপ বা ভয়েস অব আমেরিকার মতো যেসব বিদেশে সম্প্রচারিত গণমাধ্যম যুক্তরাষ্ট্রের কোমল শক্তি (সফট পাওয়ার) হিসেবে কাজ করত, সেগুলো বন্ধ করে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সেই কূটনৈতিক প্রভাব হারাচ্ছে। অথচ এখন রাশিয়া ও চীন নিজেদের ‘সফট পাওয়ার’ বা কৌশলগত প্রচার কার্যক্রম আরও বাড়াচ্ছে। এ সময় এই প্রতিষ্ঠানগুলোকে বন্ধ করে দেওয়ার কোনো অর্থ হয় না।

‘আ মেজার শর্ট অব ওয়ার: আ ব্রিফ হিস্ট্রি অব গ্রেট পাওয়ার সাবভার্সন’ শিরোনামে আমরা সম্প্রতি একটি বই লিখেছি। এ বইয়ে বিশ্বের ইতিহাসজুড়ে ‘চুপিসারে শত্রু দুর্বল করার কৌশল’ নিয়ে আলোচনা করেছি। সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, ট্রাম্প প্রশাসনের আচরণ সত্যিই অস্বাভাবিক।

আমরা প্রাচীন যুগ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত বহু উদাহরণ বিশ্লেষণ করেছি, যেখানে বড় শক্তিগুলো অন্য দেশের হস্তক্ষেপ ঠেকাতে বা মোকাবিলা করতে নানা ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু এমন একটি ঘটনাও দেখিনি, যেখানে কোনো দেশ নিজের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নিজে থেকেই ভেঙে দিয়েছে। তাহলে ট্রাম্প প্রশাসন আসলে কী করছে?

বিশ্বরাজনীতিতে অন্য দেশের নীতিকে দুর্বল বা পরিবর্তন করার চেষ্টা নতুন কিছু নয়। এটা রাষ্ট্র পরিচালনার শুরু থেকেই হয়ে আসছে। অবশ্যই প্রতিটি মার্কিন প্রশাসনের আইনের আওতায় থেকে নিজের আমলাতন্ত্র (ব্যুরোক্রেসি) গুছিয়ে নেওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু ট্রাম্প যেভাবে অপরিকল্পিতভাবে সবকিছু ছাঁটাই করছেন, তা গত দুই হাজার বছরের ইতিহাসে দেখা বড় শক্তিগুলোর প্রতিরক্ষা, প্রতিরোধ আর কূটনৈতিক ভারসাম্যের সব নীতি লঙ্ঘন করছে।

একটি দেশ বিদেশি হস্তক্ষেপ ঠেকায় কীভাবে

প্রথমত, দেশের মানুষকে সচেতন করে এবং নিজেকে শক্তিশালী করে (যেমন স্থানীয় নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া)।

দ্বিতীয়ত, শত্রুদের ভয় দেখিয়ে তাদের নিরুৎসাহিত করে (যেমন যদি তারা খুব বাড়াবাড়ি করে, তাহলে পাল্টা কড়া জবাব দেওয়া হবে—এমন বার্তা দেওয়া বা শত্রুদেশের ভেতরে সত্য কথা প্রচার করে জনগণকে সচেতন করা)।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০১৮ সালের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের সময় ইউএস সাইবার কমান্ড রাশিয়ার ‘ইন্টারনেট রিসার্চ এজেন্সি’ নামের একটি প্রচারণা ইউনিটকে সরাসরি বন্ধ করে দেয়।

তৃতীয়ত, কূটনৈতিক চাপ ও সুবিধা দিয়ে শত্রুকে নিয়ন্ত্রণে রাখার নিয়ম আছে। যেমন যদি শত্রু কিছু ক্ষতিকর কাজ কমায়, তাহলে আমরাও কিছু ছাড় দিই।

কিন্তু এই পদ্ধতি তখনই কাজ করে, যদি দুপক্ষের মধ্যে ‘তুমি কিছু দিলে আমি কিছু দেব’—এই লেনদেন বজায় থাকে।

‘কিছু দিলাম, কিছু চাইলাম না’—এভাবে চললে তা কৌশলগতভাবে ভুল হবে।

এখন প্রশ্ন হলো, ট্রাম্প প্রশাসন কি গোপনে রাশিয়ার সঙ্গে কোনো সমঝোতার চেষ্টা করছে?

যদি না করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের এই একতরফা দুর্বলতা সত্যিই নজিরবিহীন।

শত্রুরা যখন চুপিসারে যুক্তরাষ্ট্রকে দুর্বল করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তখন তাদের সঙ্গে কড়া খেলায় না গিয়ে বরং নিজের প্রতিরক্ষা ভেঙে ফেলা—এটা কৌশলগতভাবে একেবারেই অযৌক্তিক।

ভোটে হস্তক্ষেপ, ভুল তথ্য ছড়ানো এবং এ রকম অন্যান্য শত্রুতামূলক কার্যকলাপ ঠেকানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের যেসব সুরক্ষাব্যবস্থা আছে, সেগুলোকে একতরফাভাবে তুলে নেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।

প্রশ্ন হলো, এসব ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার পেছনে কি কোনো গোপন কৌশলগত যুক্তি আছে, যা আমরা বুঝতে পারছি না? নাকি ট্রাম্প শুধু রাশিয়ার সঙ্গে নিজের প্রথম মেয়াদের সম্পর্ক নিয়ে তদন্তের রাগ থেকেই এসব করছেন?

যেভাবেই হোক, যেহেতু ট্রাম্প প্রশাসন এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, যা নিজ দেশেরই ক্ষতি করছে বলে মনে হচ্ছে, তাই সাধারণ আমেরিকানদের এ প্রশ্নের উত্তর জানার অধিকার আছে।

হ্যাঁ, কিছু কৌশল হয়তো গোপন রাখা লাগতে পারে, কিন্তু সামগ্রিক কৌশল ও লক্ষ্য নিয়ে জনগণের কাছে স্বচ্ছ থাকা উচিত। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র একটি গণতান্ত্রিক দেশ।

প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ও রোনাল্ড রিগ্যানের সময় এ ধরনের বিষয়গুলো প্রকাশ্যে আলোচনা হতো। রুজভেল্টের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র শর্ত দিয়েছিল—যেমন সোভিয়েতরা যেন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে গোপনে কোনো ষড়যন্ত্র চালাতে না পারে।

রিগ্যানের আমলে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অ্যাকটিভ মেজার্স ওয়ার্কিং গ্রুপ নামে একটি দল গঠিত হয়েছিল। দলটি বিশ্বের নানা দেশের সাংবাদিক ও কূটনীতিকদের সঙ্গে একযোগে কাজ করেছিল, যাতে সোভিয়েত ইউনিয়নের ছড়ানো মিথ্যা প্রচারণা বিশ্ববাসীর সামনে উন্মোচন করা যায়।

কিন্তু আজকের দিনে ট্রাম্প প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তাতে শত্রুরা আরও সহজে আঘাত হানতে পারবে।

যদি ট্রাম্প সত্যিই যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে চান, তাহলে তাঁকে জনগণকে বিশ্বাসযোগ্যভাবে বোঝাতে হবে যে দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে তিনি দুর্বল করছেন না। তাঁকে দেখাতে হবে, কেন তিনি এসব সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

জিল ক্যাস্টনার লন্ডনের কিংস কলেজের ওয়ার স্টাডিজ বিভাগের ভিজিটিং রিসার্চ ফেলো এবং উইলিয়াম সি উলফোর্থ ডার্টমাউথ কলেজে গভর্নমেন্ট বিভাগের অধ্যাপক।

ডোনাল্ড ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি : এএফপি

গাজা যুদ্ধের বিরুদ্ধে মুখ খুলছেন ইসরায়েলি সেনারা, নেতানিয়াহুর ওপর চাপ বাড়ছে

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই। সেই সঙ্গে এ যুদ্ধের বিরোধিতাও অব্যাহতভাবে বাড়ছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সব শাখার হাজারো সংরক্ষিত সেনা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু সরকারের কাছে যুদ্ধ বন্ধের দাবি জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন। যুদ্ধের পরিবর্তে হামাসের কাছে জিম্মি বাকি ৫৯ জনকে মুক্ত করার জন্য একটি চুক্তি করার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।

১৮ মাস আগেও খুব কম ইসরায়েলির মধ্যেই ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসকে পরাজিত করে জিম্মিদের মুক্ত করার জন্য তুলে ধরা এ যুদ্ধের যৌক্তিকতা নিয়ে সন্দেহ ছিল।

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে গত জানুয়ারিতে হওয়া যুদ্ধবিরতি এবং ৩০ জনের বেশি জিম্মিকে মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি অনেকের মধ্যে আশা জাগিয়েছিল যে খুব শিগগিরই এ যুদ্ধের অবসান ঘটতে পারে।

কিন্তু গত মার্চের মাঝামাঝি ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি ভেঙে গাজায় আবার ভয়াবহ হামলা শুরু করার পর সে আশা ভেঙে গেছে।

ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক প্রধান ড্যানি ইয়াতম বলেন, ‘আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে ইসরায়েল খুব খারাপ অবস্থার দিকে এগোচ্ছে। আমরা বুঝতে পারছি, নেতানিয়াহু মূলত নিজের স্বার্থ নিয়েই বেশি ভাবছেন। তাঁর অগ্রাধিকারের তালিকায় জিম্মিরা নন; বরং নিজের ও তাঁর সরকারকে স্থিতিশীল রাখার স্বার্থ।’

সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের কাছে পাঠানো চিঠিতে ইয়াতমের মতো যাঁরা স্বাক্ষর করেছেন, তাঁদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে নেতানিয়াহুর সমালোচনা করে আসছেন। কেউ কেউ আবার ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেন।

ড্যানি ইয়াতম বলেন, ‘আমি চিঠিতে সই করেছি এবং আমি এই প্রতিবাদে অংশ নিচ্ছি রাজনৈতিক কারণে নয়; জাতীয় স্বার্থের কারণে। আমি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন যে আমার দেশ পথ হারাতে যাচ্ছে।’

এপ্রিলের প্রথম দিকে প্রকাশিত ইসরায়েলি সরকারের কাছে পাঠানো প্রথম খোলাচিঠিতে বিমানবাহিনীর এক হাজার সংরক্ষিত সেনা ও অবসরপ্রাপ্ত সদস্য স্বাক্ষর করেছিলেন।

চিঠিতে এই সেনারা লিখেছেন, ‘যুদ্ধ জারি রাখার বিষয়টি সরকারঘোষিত লক্ষ্যগুলোর কোনোটি বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখছে না; বরং এটি জিম্মিদের মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে।’

চিঠিতে স্বাক্ষরকারীরা তাঁদের অনুসরণ করতে অন্যান্য ইসরায়েলির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ, গাজায় এখনো বেঁচে থাকা ২৪ জন জিম্মির জীবনরক্ষার সময় ফুরিয়ে আসছে। তাঁরা বলেন, ‘প্রতিটি নতুন দিন তাঁদের জীবনকে নতুন করে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এ অবস্থায় দ্বিধাগ্রস্ত প্রতিটি মুহূর্ত আমাদের জন্য অপমানজনক।’

পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে প্রায় প্রতিটি শাখার সেনারা—এমনকি বিশেষ বাহিনী ও গোয়েন্দা শাখাও খোলাচিঠি দিয়েছে। সব মিলিয়ে চিঠিতে স্বাক্ষরকারীর সংখ্যা ১২ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর হাজারো ইসরায়েলি সংরক্ষিত সেনা নেতানিয়াহু সরকারের ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। কিন্তু এখন এর চেয়ে বেশি সেনা এ ডাক প্রত্যাখ্যান করছেন।

বিভিন্ন খবরে বলা হয়েছে, ইসরায়েলের সংরক্ষিত সেনার সংখ্যা ৫০-৬০ শতাংশে নেমে গেছে। আর এটি দেশটির সেনাবাহিনীর জন্য এক বড় সংকট হতে চলেছে। কারণ, কোনো যুদ্ধে সেনাবাহিনীকে সংরক্ষিত সেনাদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করতে হয়। ১৯৮২ সালে ইসরায়েলের প্রথম লেবানন যুদ্ধের পর আর কখনো এমন সংকট দেখা যায়নি।

ইয়োভ (ছদ্মনাম) নামে পদাতিক দলের একজন সংরক্ষিত সেনা গত গ্রীষ্মে গাজা যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি আর সেখানে যাবেন না বলে জানিয়েছেন।

ইয়োভ বলেন, ‘আমার মনে হয়েছিল, আমি আমার ভাই–বোনদের সাহায্য করতে যাচ্ছি। আমি বিশ্বাস করতাম, কিছু ভালো কাজ করছি—কঠিন হলেও ভালো। অথচ এখন আমি বিষয়টিকে সেভাবে দেখি না।’

ইয়োভ বলেন, গাজায় সুড়ঙ্গের ভেতরে জিম্মিদের মৃত্যুঝুঁকির মুখে রেখে হামাসের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প সরকারকে ভুল পথে পরিচালিত করছে। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা খুব শক্তিশালী ও হামাসকে পরাজিত করতে পারি। কিন্তু বিষয়টি হামাসকে পরাজিত করা নিয়ে নয়, বিষয়টি হলো—আমরা আমাদের দেশকে হারাচ্ছি।’

ইয়োভ বলেন, গাজায় যুদ্ধ করার সময় তিনি চেষ্টা করেছিলেন নৈতিকতাসম্পন্ন একজন সৈনিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে।

কিন্তু ইসরায়েলের সমালোচকেরা বলছেন, যুদ্ধ যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ইসরায়েলের জন্য এ দাবি করা তত কঠিন হয়ে পড়ছে যে তাদের সেনাবাহিনী বিশ্বের সবচেয়ে নৈতিক সেনাবাহিনী।

সম্প্রতি উদার বামপন্থী সংবাদপত্র হারেৎজে প্রকাশিত এক কলামে অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল আমিরাম লেভিন বলেন, এখন উচ্চপদস্থ কমান্ডারসহ সেনাদের আদেশ অমান্য করার কথা ভাবার সময় এসেছে।

আমিরাম লেভিন লিখেছেন, ‘যুদ্ধাপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী ও আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের ওপর যে আঘাত আসছে, তাতে চুপ করে বসে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

তবে ইসরায়েল এ সীমা এরই মধ্যে অতিক্রম করে ফেলেছে বলে দাবি করেছেন কিছু সমালোচক, যাঁরা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দেশটির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

এদিকে নেতানিয়াহু এসব সমালোচককে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। তাঁদের উদ্বেগকে উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেছেন, এগুলো ‘অপপ্রচারমূলক মিথ্যা’। তিনি আরও বলেন, বিশৃঙ্খল ও বিচ্ছিন্ন কিছু পেনশনভোগী গোষ্ঠী এসব কথা ছড়াচ্ছে। এদের (সংরক্ষিত সেনা) অধিকাংশই বহু বছর ধরে সেনাবাহিনীতে নেই।

তবে জনমত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, ওই চিঠিগুলো ক্রমবর্ধমান জনমতেরই প্রতিফলন। ইসরায়েলের অধিকাংশ মানুষ বিশ্বাস করেন যে অবশিষ্ট জিম্মিদের মুক্ত করাই এখন সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

তেল আবিবে এক বছরের বেশি সময় ধরে যুদ্ধবিরোধী বিক্ষোভ চলছে। সেখানে বিক্ষোভকারীরা জিম্মিদের ছবির পাশাপাশি যুদ্ধে নিহত ফিলিস্তিনি শিশুদের ছবি প্রদর্শন করে প্রতিবাদ করছেন।

খোলাচিঠিগুলো ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কের মধ্যে এমন আবেগঘন প্রতিবাদ ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।

ইসরায়েলের তেল আবিবে গাজায় জিম্মিদের মুক্তির দাবিতে ও সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেন হাজারো মানুষ
ইসরায়েলের তেল আবিবে গাজায় জিম্মিদের মুক্তির দাবিতে ও সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশ নেন হাজারো মানুষ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

১৭ বছর পর শাশুড়ির সঙ্গে দেশে ফিরছেন জুবাইদা রহমান by সাইদুল ইসলাম

স্বামী তারেক রহমানের সঙ্গে লন্ডনের উদ্দেশে ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ছেড়েছিলেন ডা. জুবাইদা রহমান। এরপর একে একে ১৭টি বছর কেটে গেলেও দেশে ফিরতে পারেননি তিনি। স্বামী তারেক রহমান ও একমাত্র সন্তান জায়মা রহমানকে নিয়ে লন্ডনে ছিলেন। অবশেষে শাশুড়ি বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেশে ফিরছেন জুবাইদা রহমান।

৪ মে রোববার বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে দেশের উদ্দেশে যাত্রা করবেন খালেদা জিয়া ও তাঁর সফরসঙ্গীরা। খালেদা জিয়াকে বহনকারী উড়োজাহাজটি পরদিন ৫ মে সোমবার সকালে ঢাকায় পৌঁছাবে। উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ৮ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে আসেন খালেদা জিয়া। টানা ১৭ দিন দ্য লন্ডন ক্লিনিকে চিকিৎসা শেষে ২৫ ফেব্রুয়ারি লন্ডনে বড় ছেলে তারেক রহমানের বাসায় থেকে চিকিৎসা নেন। চার মাসের চিকিৎসা শেষে ৫ মে সোমবার দেশে পৌঁছাবেন তিনি।

জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ২০০৮ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তারেক রহমান, তাঁর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান ও জুবাইদা রহমানের মা ইকবাল মান্দ বানুর বিরুদ্ধে কাফরুল থানায় একটি মামলা করে দুদক। এই মামলায় জুবাইদা রহমানকে ৩ বছরের কারাদণ্ড ও ৩৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেন ঢাকার একটি আদালত। গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জুবাইদা রহমানের বিরুদ্ধে বিচারিক আদালতের ওই সাজা স্থগিত হয়।

জুবাইদা রহমান ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। পরে লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজ থেকে মেডিসিনে এমএসসি করেন। তিনি চিকিৎসকদের সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষায় প্রথম হয়ে ১৯৯৫ সালে চিকিৎসক হিসেবে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন। তবে ২০০৮ সালে শিক্ষা ছুটি নিয়ে লন্ডনে যাওয়ার পর দ্বিতীয় মেয়াদে ছুটি বাড়ানোর পরেও ফেরত এসে চাকরিতে যোগ না দেওয়ায় তাঁকে বরখাস্ত করেছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

জুবাইদা রহমানের জন্ম বাংলাদেশের সিলেট জেলায়। তিনি প্রয়াত রিয়ার অ্যাডমিরাল মাহবুব আলীর মেয়ে। মাহবুব আলী সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে বাংলাদেশের নৌবাহিনীর প্রধান ছিলেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সরকারের সময়েও তিনি যোগাযোগ ও কৃষিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল এম এ জি ওসমানী জুবাইদা রহমানের চাচা।

১৯৯৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমানের সঙ্গে জুবাইদা রহমানের বিয়ে হয়। ১৯৯৫ সালে বিসিএস স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন তিনি। ২০০৮ সালে শিক্ষা ছুটি নিয়ে তিনি স্বামী তারেক রহমানের চিকিৎসার জন্য লন্ডনে আসেন।

চার মাস চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরবেন খালেদা জিয়া। লন্ডনে পৌঁছানোর পরের ছবি।
চার মাস চিকিৎসা শেষে দেশে ফিরবেন খালেদা জিয়া। লন্ডনে পৌঁছানোর পরের ছবি। ফাইল ছবি: বাসস

গাজায় তীব্র হচ্ছে ইসরাইলের হামলা, নতুন করে ৪২৩,০০০ ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত: গাজামুখী ত্রাণবাহী জাহাজে সশস্ত্র ড্রোনের হামলা

সামরিক হামলার মাত্রা তীব্র করেছে ইসরাইল, যার ফলে গাজার মানবিক সহায়তা কার্যক্রম চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটি জানিয়েছে, ইসরাইল নতুন করে হামলা শুরুর পর থেকে ৪ লাখ ২৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যাদের কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই। এ খবর দিয়েছে তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু।

জাতিসংঘের মুখপাত্র স্টিফেন ডুজারিক এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, গাজায় সংস্থাটির মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) সতর্ক করেছে, ইসরাইলি হামলা তীব্র হওয়ায় এবং উপত্যকায় আভ্যন্তরীণ চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয়ায় মানবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তেল আবিবের হামলা ত্রাণকর্মী ও তাদের স্থাপনার নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে।

ইসরাইল বর্তমানে মানুষের বসতবাড়ি লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে, বিশেষ করে যেসব স্থানে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা আশ্রয় নিয়েছে, সেগুলোকে হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। এতে গাজায় মানবিক সংকট তীব্র হয়েছে, বিশেষ করে রাফা এবং গাজার পূর্বাঞ্চলীয় শহরগুলোতে এর তীব্রতা বেড়েছে। ডুজারিক বলেছেন, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত গাজায় নতুন করে ৪ লাখ ২৩ হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যাদের কোনো নিরাপদ আশ্রয় নেই। গাজায় এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যেরও অভাব দেখা দিয়েছে। ত্রাণকর্মীদের লক্ষ্য করে হামলার ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে, জানান ডুজারিক।

তিনি আরও বলেন, এদিকে আমাদের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা এখনো জীবনরক্ষাকারী জরুরি জ্বালানির মজুদ উদ্ধার করতে পারছেন না, কারণ এসব এলাকায় ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া প্রবেশ নিষিদ্ধ। তিনি উল্লেখ করেন, মধ্য এপ্রিল থেকে এ পর্যন্ত আমরা নয়বার চেষ্টা করেছি, যার মধ্যে আটবারই ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বাধা পেয়েছি।

গাজার শিশুদের ওপর চলমান সহিংসতার ভয়াবহ প্রভাব নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন জাতিসংঘের মুখপাত্র। তিনি বলেন, শিশুদের নিয়ে কাজ করা আমাদের সহযোগী সংস্থাগুলো সতর্ক করেছে যে, গাজার মোট জনসংখ্যার অর্ধেকই শিশু। যারা দিন দিন ট্রমাটাইজ হয়ে যাচ্ছে। ক্রমবর্ধমান সহিংসতা এবং প্রতিনিয়ত অবহেলার ফলে শিশুদের এই অবস্থা হচ্ছে।

দখলকৃত পশ্চিম তীর প্রসঙ্গে ডুজারিক বলেন, আজ পশ্চিম তীরে ইসরাইলি হামলা শুরুর ১০০তম দিন। এই অভিযানের ফলে সেখানে হতাহত, ধ্বংস এবং গণবিচ্ছিন্নতার তীব্রতা বেড়েছে। তিনি আরও বলেন, এখনও চার লাখ বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি রাস্তায় দিন কাটাচ্ছে, যাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়ে গেছে।

গাজামুখী ত্রাণবাহী জাহাজে সশস্ত্র ড্রোনের হামলা
মানবিক সহায়তা বোঝাই গাজা অভিমুখী একটি জাহাজে সশস্ত্র ড্রোন দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে। এতে জাহাজটি বিকল হয়ে গেছে। মাল্টা উপকূলে আন্তর্জাতিক জলসীমায় এ হামলা চালানো হয়েছে বলে জানিয়েছে অনলাইন দ্য গার্ডিয়ান। এতে বলা হয়, শুক্রবার এক বিবৃতিতে ওই হামলার জন্য ইসরাইলকে দায়ী করেছে মানবিক সহায়তা আয়োজনকারী সংগঠন ফ্রিডম ফ্লোটিলা কোয়ালিশন (এফএফসি)। বলেছে, নিরস্ত্র বেসামরিক জাহাজটির সম্মুখভাগে সশস্ত্র ড্রোন দিয়ে দুইবার হামলা চালানো হয়েছে। এতে জাহাজটিতে আগুন ধরে যায় এবং এর কাঠামোয় বড় ধরনের ফাটল দেখা দেয়। যদিও এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি ইসরাইল।

শুক্রবার ভোরে জাহাজের জেনারেটর লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। গাজাবাসীর জন্য মানবিক সহায়তা নিয়ে গাজার দিকে যাওয়ার পথে মাল্টা উপকূল থেকে ১৪ নটিক্যাল মাইল (২৫ কিলোমিটার) দূরে হামলার শিকার হয় জাহাজটি। জেনারেটর লক্ষ্য করে হামলা চালানোয় জাহাজটি পুরোপুরি বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। মাল্টা সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জাহাজে ১২ জন নাবিক ও ৪ জন বেসামরিক নাগরিক ছিলেন। তারা সবাই সুস্থ আছেন বলে জানানো হয়েছে। অন্যদিকে এফএফসি জানিয়েছে, জাহাজটিতে মোট ২১টি দেশের অধিকারকর্মীরা ছিলেন। ইসরাইলের অবৈধভাবে গাজা অবরোধ করে সেখানে হত্যাযজ্ঞ চালানোর প্রতিবাদ এবং গাজাবাসীর জীবন রক্ষার জন্য জরুরি প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেয়ার লক্ষ্যে যাত্রা করেছিলেন তারা। প্রসঙ্গত, মার্চের মাঝামাঝিতে একতরফাভাবে যুদ্ধবিরতির চুক্তি ভঙ্গ করে গাজায় হামলা শুরু করেছে ইসরাইল। এই দফার হামলায় অন্তত ২ হাজার ৩২৬ জন নিহত হয়েছেন। এতে গাজায় মোট নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫২ হাজার ৪১৮ জনে পৌঁছেছে।

mzamin

পেহেলগাম ইস্যু: কাশ্মীরের দু’প্রান্তেই চলছে উত্তেজনা

কাশ্মীরের উভয় প্রান্তেই চলছে উত্তেজনা। নিজ নিজ জায়গা থেকে শক্তির জানান দিচ্ছে ভারত ও পাকিস্তান। বিশ্ব শক্তিও নড়েচড়ে বসেছে। সবার দৃষ্টি এখন ওইদিকেই। যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে সাবধান করে দিয়ে বলেছে, পেহেলগাম ইস্যুতে যেন আঞ্চলিক সংঘাত শুরু না হয়। পাকিস্তানকেও এ বিষয়ে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। এ বিষয়ে বৃহস্পতিবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্সও একই বিষয়ে জোর দিয়েছেন। বলেছেন, তিনি আশা করেন ভারত বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকবেন। পাশাপাশি পাকিস্তানও এ বিষয়ে সন্ত্রাসীদের খুঁজে পেতে সহায়তা করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ভান্স। এদিকে বৃহস্পতিবার ভারতের সঙ্গে সীমান্তবর্তী লাইন অব কন্ট্রোলের কাছে পূর্ণমাত্রার সামরিক মহড়া চালিয়েছে পাকিস্তান। ওইদিন তারা  ট্যাংক, কামান, গোলা নিয়ে এই মহড়া দেয়। সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়, সেনাবাহিনীর সূত্র জানিয়েছে, এই মহড়া শত্রুপক্ষের যেকোনো আগ্রাসনকে কঠোর জবাব দিতে সাজানো হয়েছে। বুধবার ভারতীয় সেনারা বিনা উস্কানিতে এলওসির কিয়ানি ও মণ্ডল সেক্টর দিয়ে ছোট অস্ত্র দিয়ে গুলি ছুড়ে। জবাবে পাক সেনারা ভারতীয় সেনাদের কয়েকটি চেকপোস্ট ধ্বংস করে দেয়। আর এই গোলাগুলি ও চেকপোস্ট ধ্বংস করার পরই সীমান্তে সামরিক মহড়ার আয়োজন করা হয়। গত ২২শে এপিল ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু-কাশ্মিরের পেহেলগামে ২৬ জনকে গুলি করে হত্যা করে বন্দুকধারীরা। এতে পাকিস্তান পরোক্ষভাবে জড়িত এমন অভিযোগ তুলে ভারত। এরপর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হয়। এই প্রেক্ষিতে ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে সিন্ধু নদ চুক্তি বাতিল ও সীমান্ত বন্ধসহ নানান পদক্ষেপ নেয়। জবাবে পাকিস্তানও ভারতের সঙ্গে সীমান্ত বন্ধ এবং সিমলা চুক্তি স্থগিত করে।

এমন পরিস্থিতি উভয়পক্ষকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে কথা ফোনে কথা বলেছেন। উভয়পক্ষকেই উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ভারতের প্রতি আঞ্চলিক সংঘাত এড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভান্স। রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখার লক্ষ্যে কূটনৈতিক সংযম ও পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর জোর দিয়েছেন ভান্স। তিনি মনে করেন, চরমপন্থা মোকাবিলায় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য। পেহেলগাম হামলার সময় মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট তার পরিবারের সঙ্গে ভারত সফরে ছিলেন। ২০১৯ সালে পুলওয়ামায় হামলার পর ভারতের মাটিতে এটিই সবচেয়ে বড় প্রাণঘাতী হামলা। ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে তিনি আরও বলেন, স্পষ্টভাবে বললে, আমরা আশা করি পাকিস্তান যদি  আংশিকভাবেও ওই হামলার জন্য দায়ী থাকে- তাহলে তাদের উচিত ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা করা, যাতে পাকিস্তানের ভূখণ্ডে যেসব সন্ত্রাসী মাঝে-মধ্যে কার্যক্রম চালায়, তাদের খুঁজে বের করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয়া যায়। পেহেলগাম হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্টের এই মন্তব্য রাজনৈতিকভাবে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। হামলার পরপরই এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছিলেন তিনি। সন্ত্রাসীরা একটি মনোরম তৃণভূমিতে আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিল যেখানে ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর জন্য হাইকিং বা পোনি পরিষেবা ব্যবহার করতে হয়। দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রধারী এই দেশ দু’টির মধ্যে উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, সীমান্তে সংঘাতে জড়াতে পারে তারা। ভারতীয় সেনাবাহিনীকে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এরপর দুই দেশের উত্তেজনার পারদ আরও তুঙ্গে উঠেছে। অবশ্য জাতিসংঘ এবং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও উভয় দেশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং সর্বোচ্চ সংযম দেখানোর আহ্বান জানিয়েছেন। বুধবার রুবিও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাদের উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

অমিত শাহের হুঁশিয়ারি: গত বৃহস্পতিবার পেহেলগাম ইস্যুতে প্রথম হুঁশিয়ারি বাক্য উচ্চরণ করেছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি দিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে বলেছেন- হামলাকারীদের প্রতিজনকে খুঁজে বের করবে ভারত। তিনি হামলাকারীদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ভয়াবহতা এখনো আসেনি। পেহেলগামে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা যারা করেছে তাদের কোনো রক্ষা নেই। আমরা তাদের প্রতিজন এবং তাদের প্রতিটি মদতদাতাকে খুঁজে বের করবো। মনে করবেন না যে, ২৬ জনকে হত্যা করে আপনারা জিতে গেছেন। আপনাদের প্রত্যেককে জবাব দিতে হবে। আসামের বোরো সম্প্রদায়ের নেতা উপেন্দ্র নাথ ব্রহ্ম’র একটি মূর্তি উন্মোচনকালে তিনি এসব কথা বলেন।

পেহেলগামের ঘটনা ফের আন্তর্জাতিকভাবে তদন্তের আহ্বান:
পেহেলগামে ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী হামলায় ভারতের প্রতি ফের আন্তর্জাতিক তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ ওই হামলার বিষয়ে নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তের জন্য পাকিস্তানের আগের দাবিই পুনর্ব্যক্ত করেছেন। একটি বেসরকারি টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দেয়ার সময় আসিফ বলেন, যেকোনো নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য পাকিস্তান উন্মুক্ত। সেটি জাতিসংঘের কমিশন হোক কিংবা ভারত ও পাকিস্তানের যৌথ তদন্ত দলই হোক। আসিফ বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্তের প্রস্তাব এখনো বহাল আছে। তিনি বলেন, এটি জাতিসংঘের নেতৃত্বে হোক বা প্রাসঙ্গিক দক্ষতা সম্পন্ন অন্য যেকোনো পক্ষের দ্বারা, আমরা প্রস্তুত। ভারত যদি কিছু গোপন না করে, তবে তারা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত বলেও জোর দেন আসিফ। তিনি অভিযোগ করেন, ভারতের স্বাধীন তদন্তে অনুমতি না দেয়ার পেছনে উদ্বেগের কারণ হলো, এর মাধ্যমে তাদের জন্য অস্বস্তিকর তথ্য উঠে আসতে পারে। আসিফ আরও বলেন, ভারতের দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে তাদের নিজ দেশে সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে। কোনো আন্তর্জাতিক ফোরাম তাদের বক্তব্য সমর্থন করেনি, বরং তারাও পাল্টা প্রশ্ন তুলছে। পাকিস্তান-ভারত সীমান্ত উত্তেজনা সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তরে আসিফ বলেন, নয়াদিল্লি স্পষ্টভাবে হতাশা প্রকাশ করছে। তিনি দাবি করেন, মোদির কর্মকাণ্ড পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, যা হিন্দুত্ববাদী আদর্শ দ্বারা প্রভাবিত। যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি গুরুতর হুমকি।

পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরের বাসিন্দাদের খাদ্য মজুতের নির্দেশ: ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার নিয়ন্ত্রণরেখার নিকটবর্তী পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরের বাসিন্দাদের খাদ্য মজুত করার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। শুক্রবার এ নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর দাবি, ইতিমধ্যে নিয়ন্ত্রণরেখায় দুই পক্ষের মধ্যে টানা অষ্টম রাতের মতো গোলাগুলি হয়েছে। উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে দুই দেশ। স্থানীয় প্রাদেশিক পরিষদে পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী চৌধুরী আনোয়ার উল হক বলেন, নিয়ন্ত্রণরেখা-সংলগ্ন ১৩টি নির্বাচনী এলাকার জন্য দুই মাসের খাদ্য সরবরাহ মজুত করার নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আঞ্চলিক সরকার ওই ১৩টি নির্বাচনী এলাকার জন্য খাদ্য, ওষুধ এবং অন্য মৌলিক চাহিদাগুলোর সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১০০ কোটি রুপির (৩৫ লাখ মার্কিন ডলার) একটি জরুরি তহবিল গঠন করেছে। নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর এলাকাগুলোর সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরকারি ও বেসরকারি মালিকানাধীন যন্ত্রপাতিও মোতায়েন করা হয়েছে বলে জানান আনোয়ার উল হক। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে হামলার পর যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে, তা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বড় ধরনের সংঘাতের আশঙ্কা বাড়িয়ে দিয়েছে।

mzamin
ভারতের সঙ্গে সীমান্তবর্তী লাইন অব কন্ট্রোলের কাছে পূর্ণমাত্রার সামরিক মহড়া চালিয়েছে পাকিস্তানের সেনারা। বৃহস্পতিবার  ট্যাংক, কামান, গোলা ও গুলি নিয়ে এই মহড়া দেয় তারা। সংবাদমাধ্যম এক্সপ্রেস ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে বলা হয়,  সেনাবাহিনীর সূত্র জানিয়েছে, এই মহড়া শত্রুপক্ষের যে কোনো আগ্রাসনকে কঠোর জবাব দিতে সাজানো হয়েছে। বুধবার ভারতীয় সেনারা বিনা উস্কানিতে এলওসির কিয়ানি ও মন্ডল সেক্টর দিয়ে ছোট অস্ত্র দিয়ে গুলি ছুড়ে। জবাবে পাক সেনারা ভারতীয় সেনাদের কয়েকটি চেকপোস্ট ধ্বংস করে দেয়। আর এই গোলাগুলি ও চেকপোস্ট ধ্বংস করার পরই সীমান্তে সামরিক মহড়ার আয়োজন করা হয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়ন্ত্রণহীন বিশৃঙ্খলা by সুদীপ অধিকারী

নিজেদের মধ্যে একের পর এক সংঘর্ষ-মারামারিতে জড়াচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের বেপরোয়া আচরণে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সর্বত্র বিশৃঙ্খল ও নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা। পান থেকে চুন খসলেই শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে জড়াচ্ছেন। প্রতিষ্ঠান প্রধান বা প্রশাসনকে জিম্মি করে দাবি আদায়ের চেষ্টা করছেন। বিভিন্ন দাবি আদায়ের আন্দোলনে স্থবির হয়ে পড়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রম। বিশিষ্টজনরা বলছেন- সমাজের মধ্যকার অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ শিক্ষার্থীদের মধ্যে চলা এই অস্থিরতা। এর পেছনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও ব্যর্থতা রয়েছে।

সম্প্রতি রাজধানীর বনানীতে হাসাহাসির মতো তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রাইম এশিয়া বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ষষ্ঠ সেমিস্টারের শিক্ষার্থী জাহিদুল ইসলাম পারভেজকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেছে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। ওই ঘটনাতেও দেখা যায়, শিঙাড়া খাওয়ার সময় দুই বহিরাগত নারী শিক্ষার্থীকে দেখে পারভেজ হাসাহাসি করেছে বলে অভিযোগ তোলা হয়। এরপর তাকে প্রক্টরের রুমে তলব করা হয়। পারভেজ তাদের কাছে ক্ষমাও চান। এরপর বহিরাগতদের ডেকে এনে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে অস্ত্রের মহড়া দেয়া হয়। সেই মহড়া থেকেই দৌড়ে গিয়ে পারভেজকে জাপটে ধরে মারধর করে বুকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়। আর এসব কিছুই হয় বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে প্রকাশ্যে। সেখানে নিরাপত্তাকর্মীরা উপস্থিত থাকলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেননি। উল্টো গেট বন্ধ করে দেন। এই হত্যাকাণ্ডের মামলার প্রধান আসামি, বনানী থানার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করে রিমান্ডেও নিয়েছে পুলিশ। বিশ্ববিদ্যালয়টির পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

এদিকে কয়েকদিন পরপরই সায়েন্সল্যাব এলাকায় ঢাকা সিটি কলেজ ও ঢাকা কলেজ এবং আইডিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। ওই সংঘর্ষে কখনো ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা আইডিয়াল কলেজের সাইনবোর্ড খুলে আনছে, কখনো আবার সিটি কলেজে গিয়ে হামলা করে কলেজের নামফলক ভেঙে নিয়ে আসছে। সিটি কলেজের শিক্ষার্থীরা আবার ঢাকা কলেজ, আইডিয়াল কলেজের ড্রেস পরা যাকে পাচ্ছে তাকেই বেধড়ক পেটাচ্ছেন। আবার সিটি কলেজে হামলা করার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গ্রুপ খুলে আগে থেকে ঘোষণা দিচ্ছে আইডিয়ালের শিক্ষার্থীরা। চলন্ত বাসের মধ্যে উঠে মারধর করা হচ্ছে। ভাঙচুর করা হচ্ছে যাত্রীবাহী বাস। শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষে আতঙ্কের পাশাপাশি পুরো এলাকাতে সৃষ্টি হয় তীব্র যানজট। কলেজ ড্রেস পরে সায়েন্সল্যাব এলাকায় নিত্যদিনের সাপে-নেউলে এই লড়াইয়ে যেন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে এলাকাটি দিয়ে চলাচল করা সাধারণ মানুষ। গত ২২শে এপ্রিলও দেখা যায়, ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা সিটি কলেজে হামলা করে তাদের কলেজের নামফলক-লোগো তুলে নিয়ে যাচ্ছে। এ সময় যাত্রীবাহী বাসও ভাঙচুর করা হয়। পুরো এলাকায় দিনভর আতঙ্ক বিরাজ করে। পরে পুলিশ টিয়ারশেল ও লাঠিচার্জ করে উভয়পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। তখন ঘটনাস্থল থেকে একাধিক শিক্ষার্থীর কাছে সংঘর্ষের কারণ জিজ্ঞাসা করলে তারা বলতে পারেননি। তারা শুধু অপর পক্ষকে দোষারোপ করে বলেন- ওরা আমাদের কলেজের ছাত্রকে মেরেছে।

অন্যদিকে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকাসহ সারা দেশেই চলছে পলিটেকনিক শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কর্মসূচি। চাকরি, পদোন্নতি ও উচ্চশিক্ষার নিশ্চয়তাসহ ৬ দফা দাবি আদায়ে রাজপথে নেমেছেন তারা। ইতিমধ্যে তারা জেলা, বিভাগীয় এবং ঢাকায় মহাসমাবেশেরও কর্মসূচি পালন করেছেন। গতকাল সকালেও রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল বের করেন তারা। পরে তাদের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সচিবালয়ে বৈঠকও হয়েছে। গত ২২শে এপ্রিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সভা করেন কারিগরি ছাত্র আন্দোলনের নেতারা। তবে দাবি আদায় না হওয়ায় তারা আবারো কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

একই সময়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ভিসির পদত্যাগের একদফা দাবি ওঠে। যেই আন্দোলনের ঢেউ ঢাকাতেও দেখা যায়। কুয়েট ভিসি’র পদত্যাগের দাবিতে ঢাকায় এসে শাহবাগে জমায়েত হয়ে বিক্ষোভ করেছেন শিক্ষার্থীরা। কুয়েটের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে আন্দোলনে নামে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে ভিসিসহ কর্মকর্তাদের পদত্যাগ করতে হয়। পিএসপি সংস্কারের দাবিতেও সরগরম বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের অনশন ও বিক্ষোভ মিছিলের পাশাপাশি রাজধাশাহীতেও ট্রেন চলাচল বন্ধ করে দেয় রাবি’র শিক্ষার্থীরা। অপরদিকে গত শনিবার শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে অবশেষে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আবুল কাশেম মিয়া। তার সঙ্গে বেসরকারি এই বিশ্ববিদ্যালয়টির সকল অনুষদের ডিন, বিভাগীয় প্রধান ও ইনস্টিটিউটের পরিচালকও পদত্যাগ করেছেন। এরপরও শনিবার রাতে ভিসিসহ অন্তত ২৫ জন শিক্ষক-কর্মকর্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এরকম একের পর এক ঘটনা ঘটেই চলেছে।

ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যাপক পারভীন সুলতানা হায়দার মানবজমিন’কে বলেন, এটা সত্য যে আগের তুলনায় আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিছু না হতেই তারা সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। তবে এসব দ্বন্দ্ব শুরু হয় হাতেগোনা ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। পরে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ হয়ে সকল শিক্ষার্থী এতে যোগ দেয়। এভাবেই ধীরে ধীরে সংঘর্ষ বড় হয়। অনেক সময় দেখা যায় শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই জানেন না তারা কেন অন্য কলেজের সঙ্গে বিবাদ করছে। আমরা এসব ঘটনা জানার সঙ্গে সঙ্গে তাদের নিভৃত করার চেষ্টা করি। কিন্তু সব সময় তা হয়ে ওঠে না। ইতিমধ্যে আমরা গত ২৩শে এপ্রিল রমনা জোনের ডিসি মাসুদ আলমকে নিয়ে ঢাকা সিটি কলেজ, আইডয়াল কলেজসহ আশেপাশের ৫টি কলেজের পক্ষ থেকে ধানমণ্ডি থানায় বৈঠক করে একটি চুক্তি করেছি। এ ছাড়াও আমরা চেষ্টায় আছি যেন শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই সংঘর্ষের ঘটনা আর না ঘটে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মানবজমিন’কে বলেন, আগে আমরা দেখেছি স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো ঝামেলা হলে তা চড়, কিল, ঘুসি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকতো। পরে আবার সবাই মিল হয়ে যেতো। কিন্তু এখন দেখা যায় কোনো কিছু হলেই মব সৃষ্টি করে হামলা করা হচ্ছে। এসব হামলায় শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষার্থীদের জীবন পর্যন্ত চলে যাচ্ছে। কিন্তু এরপরও সমাধান হচ্ছে না। দ্বন্দ্ব থামছে না। বেপরোয়া হয়ে উঠেছে আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। তাদের এই বেপরোয়া আচরণের জন্যই একের পর এক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেই চলেছে।

শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরার বলেছেন, সারা দেশের শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা বিরাজ করছে। বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গনে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। এ সংকট মোকাবিলার জন্য কাজ করছে সরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের চলমান অস্থিরতার ব্যাপারে আমরা যথেষ্ট পরিমাণে উদ্বিগ্ন এবং এটা যেন আর না ঘটে তার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করার পরিকল্পনা আমাদের রয়েছে। তিনি বলেন, আগে দাবি-দাওয়া উত্থাপন করার মতো সুযোগ-সুবিধা ছিল না। যখনই কেউ কোনো দাবি উত্থাপন করতো তখন রাষ্ট্র তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তো। এখন সেই অবস্থা নেই। আমরা সমস্যা সমাধানে চেষ্টা করে যাচ্ছি।

mzamin

দুরবস্থায় ৬০০ বিজ্ঞানী by পিয়াস সরকার

ক’দিন ধরেই উত্তাল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন (বাপশক)। দু’মাস ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না কর্মকর্তা-কর্মচারী-বিজ্ঞানীরা। ১১ দফা দাবিতে টানা কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন তারা। প্রায় ৬০০ বিজ্ঞানী ও ২৫০০ কর্মকর্তার অভিযোগ তাদের নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে খুব বাজেভাবে। করতে দেয়া হচ্ছে না স্বাধীন বিজ্ঞান চর্চা। ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ মেলার পরও মিলছে না অনুমতি। সভা-সেমিনারগুলোতে যাচ্ছেন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। আমলে নেয়া হচ্ছে না নিউক্লীয় তথ্যের সুরক্ষা ও গোপনীয়তা। যে সফটওয়্যারে তাদের তথ্য দিতে বলা হচ্ছে তা ভারতীয় একটি সফটওয়্যার। নিয়ন্ত্রণ করা হয় চেন্নাই থেকে।

বাপশক-এর কর্মকর্তা-কর্মচারী ও বিজ্ঞানীরা জানান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে ভারতীয় একটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি সফটওয়্যারের মাধ্যমে বেতন-ভাতা প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়। এতে বিজ্ঞানী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নামের তালিকার পাশাপাশি প্রত্যেকের পরিবারের জীবন বৃত্তান্ত, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আয়-ব্যয়, আমদানি-রপ্তানি, বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তি সব কিছু এই সফটওয়্যারে দিতে হয়। এই সফটওয়্যারটি নিয়ন্ত্রণ হয়ে থাকে ভারতের চেন্নাই থেকে। বিজ্ঞানীদের অভিযোগ, এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার রীতিনীতি মেনে পরমাণু প্রযুক্তি সংক্রান্ত বিশেষায়িত গবেষণা ও সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করলে কোনো গোপনীয়তাই থাকবে না।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন চেয়ারম্যান ও ৪ জন সদস্যের সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হওয়ার কথা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই শীর্ষ পদগুলো শূন্য। বর্তমানে চেয়ারম্যান ও মাত্র একজন সদস্য দায়িত্বে রয়েছেন। তারা বলছেন, দীর্ঘ ১৬ বছর পর ফ্যাসিস্ট সরকার বিতাড়িত হলেও এখনো মন্ত্রণালয় ফ্যাসিস্টের দোসরমুক্ত হয়নি। পূর্ণ স্কলারশিপ থাকা সত্ত্বেও বিজ্ঞানীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষা/প্রশিক্ষণের জন্য গভর্নমেন্ট অর্ডার (জিও) প্রদান করা হচ্ছে না। অভিযোগ গত কয়েক মাসে মন্ত্রণালয়ের প্রায় ১২ জন কর্মকর্তা পরমাণু প্রযুক্তি বিষয়ক বৈদেশিক প্রশিক্ষণে মনোনয়ন নিয়েছেন। এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র দেখছেন বিজ্ঞানীরা। তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত নিউক্লিয়ার সিকিউরিটির ওপর একটি ইন্টারন্যাশনাল ট্রেনিং কোর্সে কোনো বিজ্ঞানীকে না পাঠিয়ে পাঠানো হয় মন্ত্রণালয়ের এডিশনাল সেক্রেটারি মো. মইনুল ইসলাম তিতাসকে। ইন্টারন্যাশনাল নেটওয়ার্ক ফর নিউক্লিয়ার সিকিউরিটির ওপর ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত প্রোগ্রামে যান ডেপুটি সেক্রেটারি মোহাম্মদ আশরাফুল আফসার, অস্ট্রিয়ায় ইনসাইডার থ্রেট ইউজিং দি শাপারস থ্রিডি মডেলের ওপর কর্মশালায় যান সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ফারজানা, সিডনিতে অনুষ্ঠিত সেইফ ট্রান্সপোর্ট অব রেডিওকেটিভ মেটেরিয়াল প্রোগ্রামে যান সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি মো. সানোয়ার হোসেন।

ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান। তিনি ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ পেয়েও যেতে পারেননি দেশের বাইরে। তিনি বলেন, ১৯৮৫ সালের নির্দিষ্ট একটা কমিশন আইন আছে। যার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত একটি স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান। এখানে কমিশন কীভাবে চলবে সব বলা আছে। এখানে উচ্চশিক্ষাকে ট্রেনিং হিসেবে দেখানো হয়েছে। এটা ২০১০-এর আগে অনেক সহজ ছিল। আমি আমেরিকায় ফুল ব্রাইট ভিজিটিং স্কলার্স প্রোগ্রামে স্কলারশিপ পাই, যা সারা বিশ্বের মধ্যে সেরা। রূপপুরে যে বর্জ্যগুলো উৎপন্ন হবে বা আমাদের এখানেও কিছু মেডিকেল নিউক্লিয়ার বর্জ্য বের হয়, এটার ডিসপোজালের জন্য বেশ কিছু পরিকল্পনা প্রয়োজন। কমিশন থেকে খুবই উৎসাহ দেয়া হলো। দেশের একমাত্র ব্যক্তি হিসেবে এই স্কলারশিপটা আমি পেয়েছিলাম। ২০২৪ সালের কথা, কমিশন থেকে মন্ত্রণালয়ে জিও’র জন্য চিঠি পাঠালো। আমার পাসপোর্টে জে ওয়ান ভিসা লেগে গেছে, আমি কোথায় থাকবো, কার আওতায় কাজ করবো সেটাও ঠিক করা হয়েছে। জানুয়ারির ১ তারিখ থেকে ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটিতে এই প্রোগ্রামটা ছিল। ডিসেম্বরের ১০ তারিখ আমার জিও (গভর্নমেন্ট অর্ডার) নামঞ্জুর করা হলো।

তিনি বলেন, আমি সচিবের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি বললেন সিদ্ধান্ত হয়েছে ওটা কিছু করা যাবে না। এরপর ফের পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করার পরও হলো না। জে ওয়ান ভিসা ছয় মাসের জন্য দেয়া হয়। আমাকে ছয় মাস পর অবশ্যই ফেরত আসতে হতো। সচিব বললেন, এত পড়াশুনা করে কী হবে? এই বিজ্ঞানী বলেন, দুইজন উপদেষ্টা ফোন করেছিলেন। বলেছিলেন, দেখেন এটা প্রেস্টিজিয়াস একটা প্রোগ্রাম। দুই দেশের সম্পর্কেরও বিষয়। তাও জিও দেয়া হয় নাই। ফুল ব্রাইট স্কলারশিপে চান্স পেয়ে যাননি- এমন ইতিহাস বাংলাদেশে নাই। সরকারের এক টাকাও খরচ দিতে হতো না বরং রেমিট্যান্স নিয়ে আসতে পারতাম। আমি গত ফেব্রুয়ারির ৯ তারিখ রিট করেছিলাম। হাইকোর্টের রায় আমার পক্ষে আসলো। একটা রুলিং দেয়া হলো, কেন জিও দেয়া হবে না এবং ৭ দিনের মধ্যে জিও দেয়ার জন্য নির্দেশনা দেয়া হলো। এরপর এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। এটা চিফ জাস্টিজ পর্যন্ত গিয়েছিল। চিফ জাস্টিজ বলেন, রুলিংয়ের উপর হেয়ারিং করে রায় দেয়ার জন্য। এরপর আবারো আমি আপিল করতে পারতাম কিন্তু করি নাই। কারণ সময় শেষ। যখন হাইকোর্টে ডিরেকশন দেয়া হয় তখন হাইকোর্ট থেকে মন্ত্রণালয়ে ফোন করা হয়েছিল। তারা তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে। এ বিষয়ে শোকজও করা হয়েছিল। সেটা আমার রায়েও লেখা আছে।

তিনি বলেন, আমরা কমিশনে আসি দেশকে সেবা দিতে। দেশি-বিদেশি একটা চক্র আছে যারা চায় না বাংলাদেশ বিজ্ঞানে এগিয়ে যাক। রূপপুরে আমাদেরকে কোনো কাজে লাগানো হয় নাই। রাশিয়ানদের, ভারতের কাজে লাগানো হচ্ছে। আমি নিউক্লিয়ার ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্টের জন্য সক্ষম। প্রয়োজনে তারা আমার মেধা যাচাই করুক। সেখানে যারা বাংলাদেশি কাজ করছে যারা তারা সব স্টাফ টাইপের লোক। মনে রাখতে হবে, রূপপুর কিন্তু চারটা পদ্মা সেতুর সমান টাকা। প্রশ্ন তো ওঠেই, রূপপুরে যে প্রকল্প করা হয়েছে এর থেকে ভারত-পাকিস্তান অর্ধেক টাকায় কীভাবে করলো?

ড. মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, ৫ই আগস্টের পর আমরা আশাবাদী ছিলাম পরিস্থিতির পরিবর্তন আসবে। কিন্তু উল্টো হয়েছে বরং সচিবালয়ের লোকদের মাধ্যমে জঘন্য আকার ধারণ করেছে। তারা চান আমরা যাতে ভারতের উপর নির্ভরশীল হয়ে থাকি। রূপপুর কিন্তু ১০০ বছরের প্রজেক্ট। এখানে নিজস্ব লোকবল না থাকলে, প্রযুক্তি না থাকলে অন্য স্থান থেকে নিয়ে আসতে হবে। ভারত এটাই চায়। রূপপুরে অনেক দুর্নীতি হয়েছে। বর্তমান মন্ত্রণালয় ত্রাণকর্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আরেক ভুক্তভোগী ড. মো. সাইফুর রহমান বলেন, আমি ফুল ফান্ডেড জাপান সোসাইটি ফর দ্য প্রমোশন অব সায়েন্স (জেএসপিএস) ফেলোশিপ পাই। আমি বাংলাদেশে হাড় ও মাথার স্কাল (খুলি) নিয়ে কাজ করি। জাপানে আমার কাজ ছিল মানুষের দেহের একটা কোষ থেকে মাথার খুলির বিভিন্ন অংশ তৈরি করা। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি বাংলাদেশ বিভিন্ন দেশ থেকে কিনে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করবে। আমার প্রোগ্রাম ছিল ২ বছরের। এরমধ্যে মেডিসিনের যারা নোবেল লরিয়েট ছিলেন তাদের সঙ্গে বৈঠকও ছিল।
তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ে জিও’র জন্য ’২৪ সালের অক্টোবরে আবেদন করি। এরপর ডিসেম্বরে আবেদন করলেও দেয়া হয়নি। পোস্ট ডক্টরেট শুধু ডিগ্রি নয়। মন্ত্রণালয়ের লোকজনভাবে এটা বেনজির টাইপ ডিগ্রি। এটা একটা প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানীদের উন্নতি হয়। বিশ্বব্যাপী কাজকে দেখানো যায়। ২০২২/২৩ সালে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথে বাচ্চাদের মাথার খুলি ডেভেলপের বিষয়ে একটা সুযোগ ছিল পোস্ট ডক্টরেট করার। তখনো আমাকে যেতে দেয় নাই। তখন রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বলা হয়েছিল লাইফ ক্রাশ করে দেবে, গোয়েন্দাদের দিয়ে ফ্যামিলিকে তুলে নেবো ইত্যাদি। হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটিতে ফুল ফান্ডেড স্কলারশিপ পাওয়ার পরও যেতে পারি নাই। তখন চেয়ারম্যান ছিলেন ড. অশোক কুমার পাল। তিনি বলেন, হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়ে কী হবে?
এই বিজ্ঞানী বলেন, মন্ত্রণালয় বলে ডক্টরেট করেছেন নামের আগে ড. লেখার জন্য আমাদের অনুমতি নিতে হবে। এগুলো কিন্তু দেশের টাকার ফেলোশিপ না বা বঙ্গবন্ধু ফেলোশিপ না যে, দেশের টাকায় বিদেশে গিয়ে  মোজ মাস্তি করবো। বিগত সময়ে এক সচিব শুধু বলতেন, ব্লিডিং বানাও-যন্ত্রপাতি কেনো। মানে তার কথা শুধু রাজমিস্ত্রি হও। সব সময় বলছি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগাবো, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবো। কিন্তু কোনো অর্থ ব্যয় করা হয় নাই, কোনো লক্ষ্য নিয়ে কাজও করা হয় নাই। পলিসিও নাই। এদের লক্ষ্য ছিল যন্ত্রপাতি কেনো। এটা কীভাবে চালায় এটা শেখার জন্য বিদেশে গিয়ে ঘুরে আসো।

সাইফুর রহমান বলেন, জাপানের স্কলারশিপ যখন দিল না তখন আমি মন্ত্রণালয়ে একজন এডিশনাল সেক্রেটারির কাছে গেলাম। অনেক কথার পর তিনি বলেন, আমরা রাজা, আপনারা প্রজা এটা মেনে নেন। এটা মেনে নিলেই সমস্যা শেষ। ৫ই আগস্টের আগে তো এসোসিয়েশনের নির্বাচনও করতে দেয়া হয় নাই। বলে, তোমরা এসোসিয়েশন করলে পিটায়া পিঠের ছাল উঠায়া দেবো। যাই হোক, সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে আবেদন না করে দেয়া হলো। কমিশন চেয়ারম্যান স্যার আবেদন করতে বললেন। এরমধ্যেই জাপানের ভিসা পেলাম, যে বাসায় থাকবো সেটা ঠিক হলো, ল্যাবের ফান্ডও প্রস্তুত হয়ে গেলো। কিন্তু পুনর্বিবেচনাতেও না করে দেয়া হলো। জাপান অ্যাম্বাসি থেকে ফোন দেয়া হলো স্কলারশিপ নেবো কিনা? আমি বারবার সময় বাড়ালাম কিন্তু যেতে পারলাম না। হাইকোর্টে গেলাম গত মার্চে। রিট করলাম। হাইকোর্ট আদেশ দিলেন, সাতদিনের মধ্যে জিও দিতে। এরপর মন্ত্রণালয় থেকে আপিল করা হলো। এই প্রোগ্রাম শুরু হওয়ার কথা ছিল নভেম্বরে। এখনো প্রফেসরের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছি। আমার সুযোগ এখনো রয়েছে।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের (বাপশক) কার্যালয় আগারগাঁওয়ে। প্রবেশ পথেই চোখে পড়ে একটি পোস্টার। যাতে লেখা- ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্র সিনিয়র সচিব খুনি হাসিনার সুরক্ষা সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত মোকাব্বির হোসেনের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় থেকে অপসারণ চাই।’ এসব অভিযোগ ও দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোকাব্বির হোসেন বলেন, তথ্য পাচারের কোনো বিষয় না। তাদের মূল দাবি তারা আইবাসে যুক্ত হতে চান না। এটা সরকারের ইস্যু। অর্থ বিভাগ যখন দুই বছর ধরে সময় দিচ্ছে তারা অক্টোবরে না করেন। তারা সময় বাড়িয়ে জানুয়ারি পর্যন্ত সময় দিলেন। আমরা দেখলাম ১৩ শতাংশের জন্য সমস্যা হবে। আমরা বললাম, এটা কেস টু কেস সমাধান করে দেবো কিন্তু তারা রাজি হলেন না। ওনাদের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে আইবাসে বেতন না নেয়া। তাদের কিছু লোকবল নিয়োগ আছে তারা অনুমোদনবিহীন। আইবাসে ঢুকতে গেলে ওনারা আটকে যাবেন।

উচ্চশিক্ষার বিষয়ে তিনি বলেন, ড. মুনিরুজ্জামান পোস্ট ডক্টরেট স্কলারশিপ পেয়েছেন। উচ্চশিক্ষা হচ্ছে পিএইচডি পর্যন্ত। এটা কোনো উচ্চশিক্ষা নয়, এটা চাকরি। এটা কোনো সেমিনার না ওয়ার্কশপও না। ফলে ওনারটা নামঞ্জুর করা হয়েছে। উনি আদালতে গিয়েছিলেন। মহামান্য আদালত ফুল বেঞ্চে এটা না করে দিয়েছেন।
তিনি বলেন, ওনারা স্বায়ত্তশাসন চান। ২০১৭ সালের আইন অনুযায়ী ওনারা সংবিধিবদ্ধ সংস্থা। স্বায়ত্তশাসন দেয়া আমাদের এখতিয়ার না।

রূপপুর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টের বিষয়ে বলেন, রাশিয়ান টেকনোলজি ও নির্দেশনায় প্রত্যেকটি কাজ হচ্ছে। কোথায় কোন লোক কী করবে, সব রাশিয়া নিয়ন্ত্রণ করছে। মন্ত্রণালয়ের এখানে কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই। আমরা ১৯০০’র বেশি লোক নিয়োগ দিয়েছি। ওনাদের একদল ফেস বাই ফেস কাজ করেছে। এখানে গবেষণার কোনো সুযোগ নাই। পাওয়ার প্লান্টে যে নিয়োগ, সেটা গত সাত বছরে হয়েছে। ওনাদের দাবি বায়ারদের বাদ দিয়ে ওনারা বিদ্যুৎ বিক্রির চুক্তি করবেন পিডিবি’র সঙ্গে। নিউক্লিয়ার পাওয়ারের আইন বলা হয়েছে, রূপপুরের প্রথম পিডি হবেন কোম্পানির এমডি। তাহলে পাওয়ার বিক্রির চুক্তি করবে কীভাবে? কোম্পানি আইনেই তো রেজিস্ট্রার্ড হয়েছে। কোম্পানি করাই হয়েছে ব্যবসার জন্য। সেই অনুযায়ী কোম্পানিকে বলা হয়েছে তোমরা পিডিবি’র সঙ্গে সেল পারসেস এগ্রিমেন্ট করো।

কমিশনের বিষয়ে বলেন, এখানে কমিশনের মেম্বার পদ খালি। তাদের মধ্যে কিছু জটিলতা ছিল। ওনারা গুছিয়ে দেয়ার পরই এসএসবি’তে পাঠাই। এটা তো এসএসবি’র এখতিয়ার, আমার না। আমরা ১৮২ জন নিয়োগ দেয়ার কথা বলেছি। ওনারা নিয়োগ করেন নাই। সময় বৃদ্ধির জন্য আবেদন করেছেন। আমাদের ২২টি ইনমাস (ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস) পরে রয়েছে। এখানে যে জনবল সৃজন হয়েছে, একজন লোকও নিয়োগ দেন নাই। আমি বারবার চিঠি দিয়েছি, মানুষ সেবাবঞ্চিত হচ্ছেন, কোটি কোটি টাকার যন্ত্র পড়ে আছে। এটার কারণ হচ্ছে নিয়োগ যদি আগে হয়ে যায় ওনারা জুনিয়র হয়ে যাবেন।
অস্থায়ী পদ স্থায়ীকরণের বিষয়ে সিনিয়র সচিব বলেন, ওনাদের তো প্রস্তাব দিতে হবে। এক প্রশ্নের জবাবে মো. মোকাব্বির হোসেন বলেন, ওনারা তো রিসার্চ প্রজেক্ট নেন। উদাহরণ হিসেবে বলেন, চিটাগংয়ে ১ কোটি ২ লাখ টাকার ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করবেন। ওনারা ওয়ার্ক অর্ডার দেয়ার পর দুই কিস্তিতে কাজ হওয়ার প্রেক্ষিতে ৭৬ লাখ টাকা দেয়া হয়। ওনারা বলেন, এটা বাদ দিয়ে অন্য একটা করবো। অডিটে আসছে ওনারা একটা কাজও করেন নাই। যেখানে প্রায় ৮০ শতাংশ কাজ হয়ে গেছে, এই টাকা দিয়ে ভিন্ন কাজের সুযোগ তো দিতে পারি না।

বিভিন্ন সেমিনারে মন্ত্রণালয়ের লোকজন যায়। এই বিষয়ে বলেন, আইইএফ (ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি ফোরাম) যে সেমিনার ডাকে কিছু সেমিনার হয় বিজ্ঞানীদের জন্য, কিছু ম্যানেজমেন্টের জন্য। তারা তিনটি বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন- আইন, লেজিসলেটিভ ও পলিসি রিলেটেড। এটা বিজ্ঞানীদের ট্রেনিং না। আমরা আগে নিউক্লিয়ার ইউজার কান্ট্রি ছিলাম না। আমি আগস্টে যোগদানের পর ১৬৮টি জিও দেয়ার প্রস্তাব পেয়েছি। কিছু বাদে সব দিয়ে দিয়েছি। দাবির বিষয়ে বলেন, সরকারের সঙ্গে কথা বলবো আমরা এটা পুরোই ছেড়েই দিতে চাই। সরকার স্বায়ত্তশাসন দিতে চাইলে আমার কোনো সমস্যা নাই। তারা অনেক জ্ঞানী মানুষ, দেশের অগ্রগতির জন্য তাদের প্রয়োজন রয়েছে।

mzamin

এনসিপি’র সমাবেশ: যদি কিন্তু ছাড়া আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে হবে

গণ-অভ্যুত্থানের ৯ মাস পর এসেও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে রাস্তায় নামতে হচ্ছে, এটা আমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতা। কোনো ধরনের যদি কিন্তু ছাড়া আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে হবে। বাতিল করতে হবে দলটির নিবন্ধন। আওয়ামী লীগের বিচার ও সংস্কারের আগে এদেশে কোনো নির্বাচন হবে না। গতকাল রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবিতে জাতীয় নাগরিক পার্টি- এনসিপি আয়োজিত বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তারা এসব কথা বলেন। বক্তারা বলেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে টালবাহানা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হবে, এই সিদ্ধান্ত জনগণ গত বছরের ৫ই আগস্টই দিয়েছে। এরপরও কেউ আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা করলে জুলাই যোদ্ধারা তাদের প্রতিহত করবে। এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, জুলাই আন্দোলনের ৯ মাস পরে এসেও আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ও দলটির নিবন্ধন বাতিলের দাবিতে রাস্তায় নেমে আসতে হচ্ছে। এটা আমাদের সামগ্রিক ব্যর্থতা। অন্তর্বর্তী সরকারে দায়িত্ব নেয়ার সময় আমাদের দাবি ছিল বিচার ও সংস্কার। ইতিহাসে বাংলাদেশের মানুষ বারবার রাস্তায় নেমে এসেছে গণতন্ত্রের জন্য। ৪৭ থেকে ৭১ এরপর আমাদের সবকিছু মুজিববাদের হাতে বেহাত হয়ে গিয়েছিল।

মুজিববাদী সংবিধানে বিভিন্ন ভাষাগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। গণতন্ত্রের নামে বাকশাল কায়েম করতে চেয়েছিল। দীর্ঘ ১৬ বছর আওয়ামী ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তির জন্য ছাত্র-জনতার আন্দোলনে মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছিল। পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরে আলেমদের নির্যাতন, কোটাসংস্কার আন্দোলনসহ সর্বশেষ জুলাই মাসের আন্দোলন এদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে দমন করতে চেয়েছিল। আওয়ামী লীগ খুনির দলে পরিণত হয়েছে। তাদের নিবন্ধন ও রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। ভুলে গেলে চলবে না, জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন গঠিত হয়েছে। শেখ হাসিনার নির্দেশে আওয়ামী লীগের নির্দেশনায় হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে। নৌকা মার্কাকে বাংলাদেশ থেকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে হবে। বিচার চলাকালীন সময় পর্যন্ত আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। তিনি বলেন, জুলাই ঘোষণাপত্র দিতে বলেছিলাম আমরা। আজকের যারা বর্তমান সরকারে আছেন দায়িত্বে জুলাই আন্দোলনের ফলে। মৌলিক সংস্কারের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই ঘোষণাপত্র দিতে হবে। আইনসভা এবং গণপরিষদ নির্বাচন দিতে হবে। আহত, নিহতদের পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্রকে। আগামীতে জনগণ এনসিপি’র ওপরই তাকিয়ে আছে। প্রতিটি ঘরে ঘরে এনসিপি’র বার্তা পৌঁছে দিতে হবে।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করতে পাড়ায় পাড়ায় ফ্যাসিবাদবিরোধী মঞ্চ তৈরি করুন। দ্রুত সময়ের মধ্যে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধদের জন্য পাড়া মহল্লায় জনতার আদালত গড়ে তুলুন।  সরকার বিচার করতে ব্যর্থ হলে আমরা জনতার আদালতে বিচার করবো। এনসিপি’র দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূস শহীদদের রক্তের ওপর দিয়ে আমরা আপনাকে ক্ষমতায় বসিয়েছি। আমরা কোনো অনুরোধ করছি না, কোনো দাবি করছি না। আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিচ্ছি আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করতে হবে। কোনো যদি কিন্তু অথবা নেই। আওয়ামী লীগকে অনতিবিলম্বে নিষিদ্ধ করতে হবে। গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ কর?তে হবে। উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, আমরা মুষ্টিবদ্ধ হাতে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছি। যারা বিডিআর হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের অভিযান ও জুলাইয়ের হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তাদের রাজনীতি করার কোনো অধিকার নেই। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ না করা পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে। সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, যে দল গণহত্যা চালিয়েছে, সেই দলকে রাজনীতি করার অধিকার দেয়া যায় না। আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। আপনারা সুশীল সরকার নয় আপনারা গণ-অভ্যুত্থানের প্রতিনিধি।

৫ই আগস্ট জনগণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মুজিববাদ এই দেশে টিকে থাকতে পারবে না। আওয়ামী লীগকে নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধন তালিকা থেকে বাদ দিয়ে সন্ত্রাসী দল হিসেবে ঘোষণা করতে হবে। যারা তাদের পুনর্বাসনের চেষ্টা করছে, তাদের হুঁশিয়ার করে দিতে চাই, ছাত্র ও জনতা তাদের বিরুদ্ধে দুর্গ গড়ে তুলবে। এনসিপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক তাজনূভা জাবীন বলেন, খুনি হাসিনাকে আমরা বিদায় করেছি। এই বিজয় আমাদের ধরে রাখতে হবে। আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে। কিন্তু এই বাংলার মাটিতে আওয়ামী লীগ আর কখনো রাজনীতি করতে পারবে না, ইনশাআল্লাহ। দলটির যুগ্ম আহ্বায়ক আশরাফ উদ্দীন মাহাদী বলেন, খুনি হাসিনাকে বাংলাদেশে এনে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলাতে হবে। এ ছাড়া মৌলিক সংস্কার ছাড়া আবারো একটি নির্বাচনের দিকে যাওয়া হলে শহীদদের রক্তের সঙ্গে গাদ্দারি করা হবে।

এনসিপি’র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক তারিকুল ইসলাম বলেন, গণহত্যাকারী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আমরা টালবাহানা দেখতে পাচ্ছি, এটা লজ্জাজনক। আমাদের হাইকোর্ট দেখাবেন না। হাইকোর্ট দেখে জুলাই বিপ্লব হয়নি। আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক আতিক মুজাহিদ বলেছে, আমাদের রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের জন্য আওয়ামী লীগ ও হাসিনার দোসররা হুমকি। এরা বাংলাদেশে থাকতে পারে না। এনসিপি’র যুগ্ম সদস্য সচিব হুমায়রা নূর বলেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১৫ বছর দেশের মানুষকে শোষণ করেছে। দেশের মানুষকে তারা ভোট দিতে দেয়নি। সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয়, তার জন্য অবশ্যই দুর্নীতিপরায়ণ, খুনি-গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে হবে। যুগ্ম সদস্য সচিব মাহিন সরকার বলেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা নিয়ে ন্যূনতম টালবাহানা করবেন না। মৌলিক সংস্কারের আগে কোনো নির্বাচন নয়।

mzamin

রাশিয়ান হেফাজতে থাকা ইউক্রেনীয় সাংবাদিককে অকথ্য নির্যাতন: দেহ দেখে শিউরে উঠেছেন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা

ইউক্রেনীয় সাংবাদিক ভিক্টোরিয়া রোশচিনার মর্মান্তিক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে শোরগোল পড়ে গেছে। ২০২৩ সালে জাপোরিঝিয়া অঞ্চলে ইউক্রেনীয়দের অবৈধ আটক ও নির্যাতনের বিষয়ে রিপোর্ট করার সময় রাশিয়ান বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন তিনি। ইউক্রেনীয় প্রসিকিউটর জেনারেলের অফিসের যুদ্ধাপরাধ ইউনিটের প্রধান ইউরি বেলোসভের বর্ণনা অনুযায়ী, রাশিয়ান হেফাজতে থাকাকালীন ২৭ বছর বয়সী রোশচিনা ব্যাপক নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন। যার মধ্যে রয়েছে শরীরের বিভিন্ন অংশে রক্তক্ষরণ, পাঁজরের ভাঙা অংশ, ঘাড়ে আঘাত এবং পায়ে সম্ভাব্য বৈদ্যুতিক শকের চিহ্ন।

বেলোসভ আরও উল্লেখ করেছেন যে, রোশচিনার দেহ ইউক্রেনে ফেরত পাঠানোর আগে তার শরীরে কিছু অঙ্গ অনুপস্থিত ছিল। বেলোসভ বলেন, নিখোঁজ অঙ্গগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, রাশিয়া মৃত্যুর কারণ লুকানোর চেষ্টা করেছিল। সম্ভবত এটি গোপন করার জন্য যে, তারা যুদ্ধাপরাধ করেছে। তদন্ত দলের সদস্যদের বরাত দিয়ে ইউক্রেনস্কা প্রাভদায় রোশচিনার সহকর্মীরা জানিয়েছেন যে, তার শরীরে মস্তিষ্ক, চোখের মণি, শ্বাসনালী অনুপস্থিত ছিল। রোশচিনার মৃত্যু ব্যাপক নিন্দার জন্ম দিয়েছে, ইউক্রেনস্কা প্রাভদার সম্পাদক সেভগিল মুসাইয়েভা তাকে একজন নিবেদিতপ্রাণ সাংবাদিক হিসেবে বর্ণনা করেছেন যিনি রাশিয়ান-অধিকৃত অঞ্চল থেকে রিপোর্টিংকে একটি মিশন হিসেবে দেখেছিলেন।

ইউক্রেনীয় সংবাদমাধ্যম হ্রোমাডস্কেতে তার এক সহকর্মী বলেছেন, ‘তার কাছে সাংবাদিকতার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই ছিল না। ভিকা সর্বদা দেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো কাভার করতেন। কিন্তু রাশিয়ানরা তাকে হত্যা করেছে।’

কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টসও রোশচিনার মৃত্যুর নিন্দা জানিয়ে রাশিয়াকে দায়ী করেছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা হাজার হাজার নাগরিককে অভিযোগ ছাড়াই বা আইনি পরামর্শের সুযোগ ছাড়াই রাশিয়ার হেফাজতে আটকে রাখার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

এদিকে, ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার সংঘাত ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। রাশিয়া খারকিভ এবং ডিনিপ্রো শহরে ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে, যার ফলে কমপক্ষে একজন নিহত এবং ৪৬ জন আহত হয়েছে।  

সূত্র : এনডিটিভি

mzamin

আফসোস, এসবও দেখতে হয় by শামীমুল হক

প্রিয় হাসু আপা, আপনি সফল। দূরদেশ থেকে আপনার দেয়া নির্দেশনা অনুযায়ী নেতাকর্মীরা ঝটিকা মিছিল করছেন। আপনি যে আওয়ামী লীগকে খাদে ফেলে পালিয়েছিলেন তারা সেই আওয়ামী লীগকে খাদ থেকে তুলে আনার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ফ্যাসিস্ট ট্যাগ লাগানো থাকায় একটু কষ্ট হচ্ছে। পাঁচ-সাত মিনিটের বেশি রাস্তায় থাকতে ভয় পাচ্ছে। আবার সকাল কিংবা গভীর রাতকে বেছে নেয়া হয়েছে এই ঝটিকা মিছিলের সময়কে। তারপরও বলতে হয়, আপনি সফল। আপনি আপনিই। আপনি যেভাবে এদেশে জামায়াতকে গর্তে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন! আর ওই গর্ত থেকে মাঝে মাঝে তারা সূর্যের আলো দেখতো। সেই পাঁচ-সাত মিনিটের জন্য। তেমনটাই এখন আপনার নেতাকর্মীরা করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে-এভাবে কতোদিন। আপনি তো প্রায় ষোল বছর তাদের ঝাপটে রাখতে পেরেছিলেন। এখন? হ্যাঁ এখন তো সব দল এককাতারে। আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রে সবার এক কথা। বিচার হতে হবেই। আপনি নিজেই তো বলেছেন দুই শতাধিক হত্যা মামলা আপনার বিরুদ্ধে। আচ্ছা আপা, বলুন তো এসব মামলা কী মিথ্যা। দেশের মানুষ বলছে- সব মামলাই সত্যি। আপনার নির্দেশে গণহত্যা হয়েছে। আপনার নির্দেশে পুলিশ গুলি চালিয়েছে। আপনার নির্দেশে আপনার ছাত্রলীগ-যুবলীগ অস্ত্র হাতে নিরস্ত্র মানুষের বুকে বুলেট ছুড়েছে। এতসব করে, এত সহজে কি রাজনীতিতে আপনার দল দাঁড়াতে পারবে? আপনি কী মনে করেন? আপনি মাঝে মাঝে বলেন, আমি দেশে ফিরবো। আমার কথা হলো দেশে ফিরছেন না কেন? কে আপনাকে বাধা দিয়েছে? আপনি দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করলে প্রয়োজনে দিল্লিতে বাংলাদেশ বিমানের স্পেশাল ফ্লাইট পাঠাতেও রাজি সরকার। কারণ আপনি বাংলাদেশের মাটিতে এলে আপনার স্থান হবে কারাগারে। আর বিশেষ আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে আপনার বিচারও হবে দ্রুত। আপনি এত কাঁচা কাজ করেছেন- আপনার প্রতিটি কুকর্মের সাক্ষী রেখে গেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা ভাইরাল। এমনও কনভারসেশন শোনা গেছে আপনি বলছেন গুলি করতে। এসব প্রমাণ যখন হাজির করা হবে তখন আদালত কী রায় দেবে? এ ছাড়া জাতিসংঘ তদন্ত রিপোর্টেও আপনার অপরাধের কাহিনী সবিস্তারে তুলে ধরা হয়েছে। আপনি কী পার পাবেন? আপনার নেতাকর্মীরা বলাবলি করছেন আপনি মুখে দেশে ফেরার কথা বললেও অন্তরে আপনার অন্যকথা। ওদিকে আপনাকে দেশে ফেরানোর জন্য সরকার কতো চেষ্টাই না করছে। ভারত কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠকেও আপনাকে ফেরত চাওয়া হয়েছে। সর্বশেষ ইন্টারপোলের সাহায্য চেয়ে চিঠি দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তারপরও আপনি আসছেন না। এমনকি আপনি ভারতের কোথায় লুকিয়ে আছেন তাও অত্যন্ত গোপন রাখা হয়েছে। আন্দাজে অনেকে অনেক জায়গার কথা বলছে। কিন্তু ভারত সরকার এ ব্যাপারে একেবারেই নীরব। আপনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বলেছিলেন ভারতকে যা দিয়েছেন সারা জীবন মনে রাখবে। নিশ্চয় মনে রেখেছে বলেই আপনার মতো নিষ্ঠুরতম স্বৈরাচারকে তারা মেহমান হিসেবে রাখছে। সত্যিই আপনি বড় ভাগ্যবান। ক্ষমতার লোভ এত আপনার? মুখে বলতেন আমার চাওয়া পাওয়ার কিছু নেই। এ দেশের জন্য জীবন দিতেও প্রস্তুত। এ জন্যই ৫ই আগস্ট জীবন বাঁচাতে দেশ ছেড়ে অন্যদেশে পালিয়ে গেছেন? এতে কী প্রমাণ হয়? আপনি মুখে যা বলেন তা বলার জন্য বলা। আর অন্তরে আপনার অন্য কথা। এর বহু প্রমাণ এ দেশের মানুষ পেয়েছে। এখনো পাচ্ছে। তাই বলি এখনো সময় আছে সত্যের পথে হাঁটুন। এ কথা বলতে গিয়ে মনে পড়ে গেল- কামারের দোকানে কোরআন পড়ার কথা বলছি না তো? আবার মনে পড়ে সেই কথা- চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী।

যাই হোক, হাসু আপা আপনি কিন্তু এ দেশের অনেক উন্নয়ন করেছেন। তবে এসব উন্নয়ন পাশের দেশকে সুবিধা দেয়ার বিষয়টি মাথায় রেখেছেন। পদ্মা সেতু করেছেন দেশের উপকার হয়েছে। দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু এ সেতু ভারতকে খুব কাছে এনে দিয়েছে। এই সেতু ব্যবহার করে ভারত তার সেভেন সিস্টার্সখ্যাত সাত রাজ্যে মালামাল দ্রুত পাঠাতে পারবে। আবার সেদিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখলাম ঢাকা-চট্টগ্রাম বুলেট ট্রেন প্রকল্প আপনি হতে দেননি। বারবার আপনার সামনে ফাইল গেলেও তা ফিরিয়ে দিয়েছেন। এখানেও নাকি আপনার ভারতপ্রীতি কাজ করেছে। বুলেট ট্রেন হলে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে সময় লাগতো মাত্র ৫৫ মিনিট। চীনের সহায়তায় এ প্রকল্প হবে বলেই আপনার সামনে ছিল বিশাল বাধা। সত্যি মিথ্যা আপনি জানেন। কিন্তু এসব শোনে মানুষের আপনার প্রতি আরও ঘৃণা বাড়ছে। এতদিন বিভিন্ন মাধ্যমে আপনি এবং আপনার পালিয়ে যাওয়া মন্ত্রিসভার সদস্য, আওয়ামী লীগ নেতাদের বিলাসী জীবনের কথা শুনেছি। কিন্তু একটি রিপোর্ট ও ছবি দেখে এ কথার সত্যতা পাওয়া গেছে। মানুষ বলাবলি করছে কোনো মানুষ কী পারে তাদের নেত্রীর বিপদের সময় এমন আনন্দ উৎসব করতে? কিন্তু আপনার নেতাকর্মীরা পেরেছে। ওরা আরও বড় কিছু করতে পারবে- এটাই বিশ্বাস এদেশের মানুষের। কিন্তু সেই উৎসব, আনন্দ? একবার চোখ বুলিয়ে নেই রিপোর্টটির দিকে।

রিপোর্টে বলা হয়েছে- দামি গাড়িতে করে একে একে নামছিলেন স্যুট পরা ব্যক্তিরা। স্থানটিও ছিল অনেক দামি। সন্ধ্যার আলো ঝলমলে সাজানো লন্ডনের ওটু এরিনার প্রেস্টিজিয়াস ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের হলরুমে ঢুকছিলেন অতিথিরা। অতিথিদের লাইনেই ছিল ছবি তোলার হিড়িক। মনে হচ্ছিলো কেউ একজন বা কয়েকজন ভিআইপি অতিথি আছেন। এভাবেই একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের পলাতক সাবেক মন্ত্রী ও এমপিরা। সূত্র মতে, যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাজিদুর রহমানের ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন বাংলাদেশ থেকে নানা দুর্নীতির অভিযোগে পলাতক মন্ত্রী ও এমপিরা। লন্ডনের ওটু এরিনার প্রেস্টিজিয়াস ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে বিয়ের অনুষ্ঠানে ২০শে এপ্রিল সন্ধ্যায় যোগ দেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রহমান, সাবেক প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী শফিকুর রহমান চৌধুরী, সাবেক নৌ পরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সিলেট-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব। বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেয়া মন্ত্রীরা বেশ হাসি-খুশি ছিলেন। অনেকের সঙ্গে ছবিও তুলেছেন। পালিয়ে আসা মন্ত্রী-এমপিদের এমন আনন্দঘন পরিবেশে দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীরা। তাদের প্রশ্ন, লাখ লাখ নেতাকর্মীকে বিপদের মুখে ফেলে পালিয়ে এসে তারা কীভাবে এসব অনুষ্ঠানে অংশ নেন? এত আনন্দই বা কীভাবে তাদের মনে আসে?

এ রিপোর্টে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে বাংলাদেশে। সোহাগ নামে একজন তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন এভাবে- ছবিতে যে মানুষগুলো পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে ছবি তুলছে, এমন নির্লজ্জ মানুষ এখনো পৃথিবীতে আছে? সত্যিই সেলুকাস। আর বাজ চৌধুরী নামে একজন লিখেছেন- নির্লজ্জ, অমানবিক এবং নির্দয়-এই শব্দগুলোই যথেষ্ট নয় তাদের বর্ণনা করার জন্য। যারা আজ লন্ডনের বিলাসবহুল হোটেলে আনন্দ-উৎসবে মেতে উঠেছে, তারাই একসময় দেশের মাটিতে হাজারো নিরীহ মানুষকে গুম, খুন ও নির্যাতনের মধ্যদিয়ে দমন করেছে। ২০০০’রও বেশি মানুষের রক্ত যাদের হাতে লেগে আছে, আর ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষকে যারা চিরতরে আহত ও নিঃস্ব করেছে, তাদের মুখে হাসি আর বিলাসবহুল কফির আড্ডা জাতির প্রতি এক ধরনের নিষ্ঠুর উপহাস। এই পলাতক ফ্যাসিস্ট মন্ত্রী-এমপিরা আজ প্রবাসে নিরাপদ আশ্রয়ে আনন্দে গা ভাসালেও, দেশের মাটিতে আজও মায়েরা সন্তান হারানোর আহাজারি করছে, পরিবারগুলো খুঁজছে তাদের প্রিয়জনদের। যারা জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে ক্ষমতা কুক্ষিগত করেছে, আজ তারা আবারো দেখিয়ে দিলো-তারা কেবল দুর্নীতিবাজ নয়, বরং অমানবিকতা ও নিষ্ঠুরতার প্রতিমূর্তি। বাংলার মানুষ এই দুঃশাসনের হিসাব অবশ্যই একদিন চেয়ে নেবে। ইতিহাস কখনো ক্ষমা করে না। যারা রক্তে হাত রাঙিয়েছে, তারা কোনো উৎসবের আলোয় নিজেদের অপরাধ ঢাকা দিতে পারবে না। শুধু প্রতিরোধ নয়, এই অন্যায়ের বিচার হোক, এটাই এখন সময়ের দাবি।

সুপ্রিয় আপা, বুঝলেন তো মানুষ কী ভাবছে? এবার বলুন এইসব নেতারা কি আপনার দুঃসহ পরিস্থিতির কথা ভাবেন? অথচ তাদেরই মন্ত্রী, এমপি বানিয়েছেন। দুঃখ হয় না আপা। হাসু আপা, এ লেখা যখন লিখছি তখন খবর এলো আপনিসহ আপনার পরিবারের ১০ জনের এনআইডি স্থগিত করা হয়েছে। আফসোস আপনার বাড়াবাড়ির জন্য আরও কতো কিছু না দেখতে হয়।

সূত্র- জনতার চোখ

mzamin


বাংলাদেশ-ভারত পাল্টাপাল্টি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা, ক্ষতির শঙ্কায় ব্যবসায়ীরা: বিবিসি’র প্রতিবেদন

বেশ কয়েক মাস ধরে চলা বাকযুদ্ধের পর সম্প্রতি পাল্টাপাল্টি বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞার পথে প্রতিবেশী ভারত ও বাংলাদেশ। এতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সম্ভাব্য প্রভাবের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। স্থানীয় শিল্পগুলোকে সস্তা আমদানি থেকে রক্ষা করতে ভারত থেকে সুতার আমদানি সীমিত করেছে বাংলাদেশ। ভারত তার বন্দর এবং বিমানবন্দর দিয়ে তৃতীয় কোনো দেশে পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশকে যে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দিয়ে আসছিল তা বন্ধ করে দেয়ার পর এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে ঢাকা। গত বছরের আগস্টে তীব্র বিক্ষোভের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরপর থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে অবনতি হতে থাকে। ক্ষমতা হারিয়ে ভারতে পালিয়ে যান হাসিনা। আর বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে আছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস।

মানবতাবিরোধী অপরাধ, অর্থ পাচার এবং দুর্নীতির দায়ে ভারতের কাছে তাকে প্রত্যর্পণের দাবি করে আসছে বাংলাদেশ। যদিও হাসিনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। এছাড়া দিল্লিও এখন পর্যন্ত ঢাকার ডাকে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি। উল্টো বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা করা হচ্ছে বলে সমালোচনা করছে ভারত। সম্প্রতি একজন হিন্দু  নেতার কথিত ‘হত্যাকাণ্ড’ নিয়েও অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচনা করেছে তারা। তবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ সংখ্যালঘুদের নিশানা করার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। বলেছে, বেশির ভাগ ঘটনা রাজনৈতিকভাবে করা হয়েছে। বাংলাদেশে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে হিন্দু সমপ্রদায়ের অনুসারী ১০ শতাংশের কম। দুইদেশের এমন বিবাদে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের ক্ষতির হিসাব করছে।
বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য সুতা অত্যাবশ্যকীয় একটি পণ্য। যা এখনও সমুদ্র ও আকাশপথে আমদানি করা যায়, তবে এটি সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। ভারত ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারের সুতা রপ্তানি করে। যার এক-তৃতীয়াংশই স্থলবন্দর দিয়ে করা হয়েছে। বর্তমানে বন্ধ থাকা ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা চালু থাকলে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরা উচ্চমানের তৈরি পোশাক সড়কপথে ভারতে পাঠাতে পারতেন, যেখান থেকে সেগুলো ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে চলে যেত। এটি বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য একটি ধাক্কা বলে মনে করেন এমজিএইচ গ্রুপের প্রধান আনিস আহমেদ। তিনি বলেন, ভারতীয় পথ ব্যবহার করে মালামাল এক সপ্তাহে পশ্চিমা দেশগুলোতে পৌঁছাত। সমুদ্রপথে তা আট সপ্তাহ পর্যন্ত সময় নেয়।

পোশাক রপ্তানিতে বিশ্বে চীনের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। গত বছর দেশটি ৩৮ বিলিয়ন (৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা) ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর মধ্যে ১ বিলিয়ন ডলারের বেশি ভারতের স্থল ও বিমানপথ ব্যবহার করে রপ্তানি করা হয়েছে। আনিস আহমেদ এ বিষয়টিকে বেশ কার্যকর বলে উল্লেখ করেছেন। সীমিত বিমান পরিবহন ক্ষমতা এবং স্বল্প সরঞ্জামের কারণে বাংলাদেশের বিমানবন্দরগুলো সরাসরি রপ্তানিতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি চীন সফরকালে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ভারত বাংলাদেশের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা স্থগিত করেছে বলে ধারণা করছে অনেকে। ওই সফরে ভারতের স্থলবেষ্টিত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জন্য বাংলাদেশকে সমুদ্রের একমাত্র অভিভাবক বলে অভিহিত করেছিলেন ড. ইউনূস। ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ‘চীনা অর্থনীতি সমপ্রসারণের ক্ষেত্র’ হয়ে উঠতে পারে এই অঞ্চল।

তার এই বক্তব্যের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দিয়েছিলেন ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নেতারা। বলেছিলেন, এটা ‘আক্রমাণত্মক’। ড. ইউনূসের মন্তব্য, চীনের কাছে ওই অঞ্চলে ভারতের কৌশলগত দুর্বলতার কথা তুলে ধরেছে, যা দিল্লির মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল তার মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে মাত্র ২০ কিলোমিটার প্রশস্ত শিলিগুড়ি করিডোর (‘চিকেনস নেক’) নামে পরিচিত যা নেপাল ও বাংলাদেশবেষ্টিত এবং তিব্বতের চুম্বি উপত্যকার সন্নিকটে অবস্থিত।

বেইজিং-নয়াদিল্লি সীমান্ত উত্তেজনার ইতিহাস ও ১৯৬২ সালের যুদ্ধে ভারতের পরাজয়ের কারণে দেশটির প্রতিরক্ষা খাতের পরিকল্পনাকারীদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত বাধলে উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ভারতের বাকি অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চীন ওই করিডোরকে নিশানা বানাতে পারে। বাংলাদেশি বিশ্লেষকরা বলছেন, অধ্যাপক ইউনূসের বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং ওই বক্তব্যের উদ্দেশ্য ছিল, আঞ্চলিক যোগাযোগের উন্নয়ন।

এছাড়া ভারতীয় ভিসা নীতি কঠোর করায়ও বাংলাদেশে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভিসা দেয়া সীমিত করেছে ভারত। আগে পর্যটন, ব্যবসা, শিক্ষা এবং চিকিৎসার জন্য প্রতি বছর ২০ লাখ বাংলাদেশি ভারত যেতেন। যা গত কয়েক মাসে কমেছে প্রায় ৮০ শতাংশ। আবার, হাসিনার ভারতে থাকা এবং প্রত্যর্পণের দাবি এখনও একটি অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব শ্যাম বলেছেন, তাদের বুঝতে হবে যে হাসিনাকে তাদের হাতে তুলে দেয়ার কোনো উপায় নেই। আমরা জানি যদি তাকে তুলে দেয়া হয় তাহলে তার কী হবে। আমার ধারণা ভারতের জনমতও বিষয়টি মেনে নেবে না। উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে ভারতের পোশাক প্রস্তুতকারীদের সংগঠন বাংলাদেশের পোশাক আমদানির ওপর স্থলপথে নিষেধাজ্ঞা চেয়েছে। বাংলাদেশি বিশ্লেষকেরা বলছেন, আরও বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা আত্মঘাতী হতে পারে।

mzamin

ডেঙ্গু বাড়ার শঙ্কা by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

রাজধানীতে বর্ষা আসার আগেই বেড়েছে মশার উপদ্রব। ফলে বাড়ছে ডেঙ্গুর শঙ্কাও। নগরবাসীর অভিযোগ, কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছেন তারা। তবে সিটি করপোরেশন বলছে, এরইমধ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ এডিশ মশা ঠেকাতে নানা উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। বৈশাখ মাসেই হঠাৎ বৃষ্টি চোখ রাঙাচ্ছে ডেঙ্গু প্রকোপের। সাধারণত জুন  থেকে ডেঙ্গু মৌসুম ধরা হলেও গত দু-এক বছরে কোনো নিয়ম মানছে না ডেঙ্গু। গত ২৪ ঘণ্টায় ২৫ জন ডেঙ্গু  রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগেই ২০ জন। চলতি বছরে গতকাল পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত  হয়েছেন ২ হাজার ৬১১ জন রোগী এবং মৃতের সংখ্যা ২০ জন। আক্রান্তদের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বরিশাল বিভাগে ৭২৭ জন, চট্টগ্রামে ৪৯২ জন, ঢাকা বিভাগে (মহানগর ছাড়া) ৩৮৬ জন,  ঢাকা  দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৪৪৫ জন, উত্তর সিটিতে ২৯২ জন, খুলনা বিভাগে ১২৭ জন, ময়মনসিংহে ৬৪ জন, রাজশাহীতে ৬৪ জন, রংপুর বিভাগে ৭ জন ও সিলেটে ৭ জন রোগী রয়েছেন। জানুয়ারিতে মৃত্যু ১০ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৩ জন এবং এপ্রিলে ৭ জন।

এদিকে, ডেঙ্গু রোগ প্রতিরোধে সরকার এবার বিজ্ঞানভিত্তিক ও যৌথ উদ্যোগে নতুন পরিকল্পনায় এগুচ্ছে। জানা গেছে, পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে ওলবাচিয়া ও সেরোলজিক্যাল জরিপে জোর দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়। গত সপ্তাহে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত হয় ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় কানাডাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান মেরিট ইন-করপোরেশন দুটি প্রস্তাব উপস্থাপন করে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধি ডা. কাজী জামিল প্রস্তাব দুটি তুলে ধরেন। সভা শেষে প্রস্তাব দুটি গৃহীত হয়। প্রথম প্রস্তাবে বলা হয়, সেরোলজিক্যাল জরিপ পরিচালনার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ডেঙ্গু রোগে সংক্রমণের হার ও অ্যান্টিবডির উপস্থিতি নিরূপণ করা হবে। রক্তের নমুনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা যাবে, কারা পূর্বে আক্রান্ত হয়েছেন এবং কোন এলাকায় ঝুঁকি বেশি। দ্বিতীয় প্রস্তাব অনুযায়ী, ‘ওলবাচিয়া’ পদ্ধতি প্রয়োগ করে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেয়া হবে। এই পদ্ধতিতে মশার দেহে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া প্রবেশ করানো হয়, যা ডেঙ্গু ভাইরাস বহনে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে মশা কামড়ালেও ভাইরাস ছড়ায় না। সভায় জানানো হয়, যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয় সেরোলজিক্যাল জরিপে এবং অস্ট্রেলিয়ার একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা ওলবাচিয়া প্রযুক্তির প্রয়োগে কারিগরি সহায়তা দেবে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, কীটতত্ত্ববিদ ড. কবিরুল বাশার এ ব্যাপারে বলেন, এডিস মশার ঘনত্ব নিয়ে যে কাজটা করি, গবেষণা করি সেখানে দেখছি ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে সঙ্গে বেশ কয়েকটি জেলায় এডিস মশার ঘনত্ব বেশি পাচ্ছি। নিশ্চিতভাবে বলতে পারি এসব এলাকায় এবার ডেঙ্গু বাড়বে। এখনই যদি আমরা এডিস মশার প্রজনন, নিয়ন্ত্রণ, ব্রিডিং সোর্স ম্যানেজম্যান্ট এবং ডেঙ্গু রোগী ম্যানেজম্যান্ট সঠিকভাবে শুরু করতে না পারি তাহলে এ বছর পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার ঝুঁকি আছে। তিনি আরও বলেন,  ডেঙ্গুতে মৃত রোগীর হার অনেক বেশি। মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা করলে সমস্যাগুলো শনাক্ত করা যাবে। সমাধানে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার তাগিদ দেন এই বিশেষজ্ঞ। হাসপাতাল থেকে ক্রস ট্রান্সমিশন হচ্ছে। হাসপাতালে রোগী দেখতে এসে অনেকে আক্রান্ত হচ্ছেন বলে জানান ড. কবিরুল বাশার।

মশার বিস্তার রোধে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতায় জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। আক্রান্ত হলেও মৃত্যুর হার কমানোর দিকে বিশেষ নজর দেয়ার পরামর্শ তাদের। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, মশার উপদ্রব বন্ধ করার জন্য একটা কাজ হচ্ছে চিকিৎসার কাজ বিকেন্দ্রীকরণ। গতানুগতিক কাজ করলে মশার উৎপাদন কমবে না।

এদিকে, ঢাকায় ডেঙ্গু রোগের জীবাণুবাহী এইডিস মশা নিয়ন্ত্রণে সেনাবাহিনী কাজ করবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। ২২শে এপ্রিল ডিএনসিসি নগর ভবনে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রস্তুতি ও করণীয় সম্পর্কে বিভিন্ন হাসপাতালের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন ডিএনসিসি প্রশাসক। ঘরবাড়ি পরিষ্কার রাখতে নাগরিকদের সচেতন করতে ডিএনসিসি কার্যক্রম চালাবে তুলে ধরে ডিএনসিসি প্রশাসক বলেন, বাড়িঘর পরিষ্কার না পেলে বাড়ি মালিকদের জরিমানা করা হবে। তিনি বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্তদের চিকিৎসায় ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গু কর্নার করা হবে। তিনি আরও বলেন, ডিএনসিসি এলাকায় মশার ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রম ঠিকাদারকে দিয়ে করানো হচ্ছে। সে অবস্থান থেকে সরে এসেছে ডিএনসিসি। এখন থেকে সেনাবাহিনী মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করবে। যে থার্ড পার্টি দিয়ে আমরা মশার ওষুধ ছিটাতাম, সিদ্ধান্ত নিয়েছি তাদের দিয়ে এই কাজ আমরা আর করাবো না। এইবার আমরা বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরিকে দিয়ে এই কাজটি করাবো। বাধ্য হয়ে আমাদের এই সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। কারণ পাবলিক হেলথ নিয়ে আমরা কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চাই না, কোনো ধরনের ত্রুটি চাই না। ডিএনসিসি প্রশাসক এজাজ বলে, বৃষ্টির মৌসুম শুরু হওয়ায় ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়ার আশঙ্কা আছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশা নিয়ন্ত্রণ জরুরি, কিন্তু বাড়িঘরে মশা নিধন কঠিন। আমরা ঘুরলে ৯০ শতাংশ বাড়ির পাশে ময়লা পাওয়া যাবে, বাড়ি মালিকরা ঠিকমতো পরিষ্কার করেন না। লার্ভা মারার জন্য যে ওষুধ দিতে হচ্ছে, নিরাপত্তার কথা বলে আমাদের লোকজনকে ঢুকতে দেন না। বাড়িঘর পরিচ্ছন্ন রাখতে ভাড়াটিয়ারা বাড়ি মালিকের ওপর চাপ তৈরি করবেন। তিনি বলেন, ডিএনসিসি প্রতিটি হাসপাতালে একটি করে ডেঙ্গু কর্নার করতে চায়। এ বিষয়ে প্রয়োজনে ডিএনসিসি সব ধরনের সহায়তা করবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুর সঙ্গে ২০০০ সাল থেকে লড়ছে বাংলাদেশ। ২০১৯ ও ২০২৩ সাল ছিল এ লড়াইয়ের টার্নিং পয়েন্ট। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর রেকর্ডে ২০২৩ সাল ছিল মশার বিরুদ্ধ পরাজয়ের বড় মাইলফলক। ২০২৪ সালে এসে সংক্রমণ ও মৃত্যু তুলনামূলক কমলেও তা ছিল দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানায়, ২০১৯ সালে এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন, ২০২০ সালে এক হাজার ৪০৫ জন, ২০২১ সালে ২৮ হাজার ৪২৯ জন এবং ২০২২ সালে ৬২ হাজার ৩৮২ জন এবং ২০২৩ সালে মোট তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ২০২৪ সালে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এক লাখ এক হাজার ২১৪ জন। এর মধ্যে ৬৩ দশমিক ১০ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৬ দশমিক ৯০ শতাংশ নারী।

mzamin