Showing posts with label মাদক. Show all posts
Showing posts with label মাদক. Show all posts

Wednesday, July 29, 2026

পার্টি ড্রাগে উন্মাতাল ডিজে by শুভ্র দেব

ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। মুখে দামি প্রসাধনীর মেকআপ। পরনে স্লিভলেস ওয়েস্টার্ন পোশাক। পায়ে হাইহিল জুতা। হাতের আঙ্গুলে জ্বলছে সিগারেট। আরেক হাতে মদের গ্লাস। স্টেজে বাজছে ইংরেজি-হিন্দি গান। বিটের তালে তালে কাঁপছে পার্টি রুমের চার দেয়াল। তার সঙ্গে তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী, মধ্যবয়সী নারী-পুরুষদের উন্মাতাল ডিজে। কখনো তারা একে ওপরকে জড়িয়ে ধরছেন। কখনো হাতে হাত রেখে নাচছেন। পেশাদার ডিজেদের একের পর এক গান পরিবেশন আর তাদের সঙ্গে নেচে-গেয়ে বিরামহীন উন্মাতাল রাত কাটিয়ে দিচ্ছেন অতিথিরা। যদিও স্বাভাবিকভাবে কারও পক্ষে এভাবে রাতভর ডিজে করে কাটিয়ে দেয়া অসম্ভব। তাই বিরামহীনভাবে রাতভর ডিজে পার্টির জন্য তারা ব্যবহার করেন হ্যাপি ড্রাগ বা পার্টি ড্রাগ বা এমডিএমএ বা এক্সট্যাসি। দেশে বহুদিন ধরে এই ড্রাগটি ব্যবহার হলেও এ নিয়ে ইয়াবার মতো এতো আলোচনা নাই। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এটি ধরা পড়ছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছে। ধরা পড়ছেন এটির কারবারে যারা জড়িত। বেরিয়ে আসছে নানা তথ্য।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এক্সট্যাসি বা এমডিএমএ মূলত পার্টি ড্রাগ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি একটি কৃত্রিম সাইকোঅ্যাকটিভ ড্রাগ ট্যাবলেট বা ক্যাপসুলে পাওয়া যায়। এটি একইসঙ্গে উত্তেজক ও ভ্রমসৃজনকারী প্রভাব সৃষ্টি করে দ্রুত সেরোটোনিন, ডোপামিন ও নর-অ্যাড্রেনালিন মুক্ত করে ব্যবহারকারীকে ইউফোরিয়া, আত্মবিশ্বাস ও সামাজিক ঘনিষ্ঠতার অনুভূতি দেয়। এ ছাড়া আলোসংগীত সংযোগকে তীব্রভাবে অনুভব করায় পার্টি-ডান্স ক্লাবে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। কর্মকর্তারা বলছেন, মূলত এই পার্টি ড্রাগের কারণে রাতভর পার্টিতে বিভিন্ন বয়সী মানুষেরা ডিজে করতে পারেন। ড্রাগ নেয়ার কারণে তারা পার্টিতে খুব আনন্দে সময় কাটায়। তবে অল্প সময় আনন্দ করতে গিয়ে তারা ধীরে ধীরে পার্টি ড্রাগের কুফলে শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পার্টি ড্রাগ সাময়িক আনন্দ দিলেও এটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রতি পিস পার্টি বা হ্যাপি ড্রাগ বিক্রি হয় ৭ থেকে ১০ হাজার টাকায়। ব্যয়বহুল এই ড্রাগটি মূলত তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী ও মধ্যবয়সীরা ব্যবহার করেন। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে চাকরিজীবী, চিকিৎসক, উচ্চপদস্থ সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীবী, বিদেশফেরত শিক্ষার্থী, অভিনেতা-অভিনেত্রী, শিল্পী, মডেল, পেশাদার ডিজে, ব্যবসায়ীরা। তবে ড্রাগটি ব্যয়বহুল হওয়াতে কেবলমাত্র এলিট শ্রেণি ও অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল ও ডিজে পার্টির প্রতি যাদের আগ্রহ আছে এবং নিয়মিত যারা পার্টিতে যাওয়া-আসা করে তারাই এটি ব্যবহার করেন। ঢাকার গুলশান, বনানী, উত্তরা, বারিধারা এলাকায় যেসব ডিজে পার্টির আয়োজন করা হয় সেখানেই মূলত পার্টি ড্রাগ ব্যবহার করা হয়। এ ছাড়া ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকার কয়েকটি রিসোর্ট হোটেল মোটেলে ডিজে পার্টির আয়োজন করা হয়।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মূলত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ আরও দুয়েকটি দেশ থেকে পার্টি ড্রাগ আনা হয়। পার্টি ড্রাগ মূলত ‘খ’ শ্রেণির মাদক। সম্প্রতি যে চালানটি আনা হয়েছে সেটি যুক্তরাজ্য থেকে পাঠিয়েছে অরণ্য নামের এক ব্যক্তি। তার মাধ্যমেই এটি আনা হতো। ডিএনসি ঢাকা মেট্রো উত্তর সম্প্রতি যে চালান জব্দ করেছে সেটিতে ৩১৭ পিস পার্টি ড্রাগ ছিল। যে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারাই মূলত এটি ঢাকাসহ সারা দেশে ছড়িয়ে দিতো। বিদেশ থেকে এনে তারা উচ্চমূল্য দেশে বিক্রি করতো। এটির চাহিদাও ব্যাপক। দেশে আনার ক্ষেত্রে তারা কুরিয়ার সার্ভিস ও বিমানপথকে বেছে নিতো।

ডিএনসি’র কর্মকর্তারা বলেন, আমাদের কাছে তথ্য ছিল গ্রেপ্তার মো. জুবায়ের (২৮) স্বনামধন্য প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও ইংলিশ মিডিয়ামে পড়ুয়া শিক্ষার্থী, প্রযুক্তি দক্ষ, শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত শ্রেণির আরোও বেশ কয়েকজনের একটি চক্র পার্টি ড্রাগ, কুশ, গাঁজা, কিটামিনসহ অন্যান্য আধুনিক মাদক পার্সেলযোগে উন্নত দেশ থেকে আমদানি করে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মহানগরে বিভিন্ন ডিজে পার্টিতে এবং অভিজাত সোসাইটিতে সরবরাহ করছে। এই তথ্যের ভিত্তিতে পুরাতন ডাক ভবনের বৈদেশিক ডাক শাখা থেকে যুক্তরাজ্য থেকে আগত এয়ার পার্সেল তল্লাশি করা হয়। তল্লাশিতে একটি কাগজের কার্টনের ভেতর বিভিন্ন বিদেশি ব্রান্ডের চকলেটের নিচে লুকানো অবস্থায় একটি পেপারে মোড়ানো স্বচ্ছ পলি প্যাকেটে রক্ষিত লালচে বর্ণের পার্টি ড্রাগ ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। জব্দ করা কাগজপত্র পর্যালোচনা ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় পার্সেলটির রিসিভার মাদক চক্রের অন্যতম হোতা মো. জুবায়েরের অবস্থান শনাক্ত করে ঢাকা উদ্যান এলাকা থেকে আটক করা হয়। পরে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে জানায়, পার্সেলটি যুক্তরাজ্য থেকে তার পূর্বপরিচিত অরণ্য ডাকযোগে অরণ্যের বন্ধু অপূর্ব রায়ের নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নাম্বার ব্যবহার করে পাঠিয়েছে। রিসিভ করে তার আরেক বন্ধু জি এম প্রথিত সামস্‌-এর নিকট পৌঁছে দেয়ার জন্য অনুরোধ করে। এর বিনিময়ে তাকে ৫০ হাজার টাকার প্রস্তাব করা হয়। কাজটি করার জন্য অরণ্যর কথায় প্রথিত সামস তাকে বিকাশের মাধ্যমে তিনবারে ১৫-১৬ হাজার টাকা অগ্রিম দেয়। পরে জুবায়েরের তথ্যমতে প্রথিত সামস (২৫) এর অবস্থান শনাক্ত করে তাকে সেগুনবাগিচা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তার কাছ থেকে যুক্তরাজ্য থেকে আমদানিকৃত পার্টি ড্রাগ, গাঁজা ও কিটামিন নামক মাদকদ্রব্য উদ্ধার করা হয়। জুবায়ের এবং জি এম প্রথিত সামসকে গ্রেপ্তারের পর আসিফ মাহবুব  চৌধুরীর বাসা ঘেরাও করে তাকে হাতেনাতে এমডিএমএ, গাঁজা, কুশ ও নগদ টাকাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। পরে অপূর্ব রায়কে (২৫) গাঁজাসহ গ্রেপ্তার অপূর্বের দেয়া তথ্য মতে সৈয়দ শাইয়ান আহমেদকে (২৪)  গাঁজা ও পার্টি ড্রাগ ও চালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাক্ষ্যপ্রমাণাদি জব্দ করে গ্রেপ্তার করা হয়।

ডিএনসি কর্মকর্তারা বলেছেন, যে চক্রটিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তাদের মধ্যে প্রথিত সামস একজন পেশাদার ডিজে। অভিজাত ঘরের সন্তান সামস দীর্ঘদিন ধরে ডিজে পার্টির সঙ্গে জড়িত।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, পার্টি ড্রাগ সেবন করলে হৃদস্পন্দন ও রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত উত্তাপে ডিহাইড্রেশন বা ইলেক্ট্রোলাইট ভ্রান্তি হতে পারে যা প্রাণঘাতী লিভার ও কিডনির সমস্যা, পেশির টান, খিঁচুনি ও দৃষ্টি ঝাপসা দেখা যেতে পারে। অতিরিক্ত ডোজে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে অঙ্গপ্রতঙ্গ বিকল বা হৃদরোগ স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অতিরিক্ত ব্যবহারে জীবনহানির শঙ্কা থেকে যায়।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকামেট্রো উত্তরের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসান মানবজমিনকে বলেন, এনক্রিপ্টেড অ্যাপ ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন করে তারা এই ব্যবসা করতো। ঢাকায় এলিটদের জন্য যেসব পার্টি আয়োজন করা হতো সেখানে তারা সরবরাহ করতো। আমরা এ সংক্রান্ত অনেক তথ্যপ্রমাণ পেয়েছি। আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ ও তাদের মোবাইলে থাকা অনেক তথ্য সংগ্রহ করেছি। আরও অনেকের সংশ্লিষ্টতা আমরা পেয়েছি। তাদেরকেও আইনের আওতায় আনা হবে। 

https://mzamin.com/uploads/news/main/180908_par.webp

Saturday, December 20, 2025

মিয়ানমারের আফিম চাষ ১০ বছরে সর্বোচ্চ উল্লম্ফন: জাতিসংঘের সতর্কর্তা

মিয়ানমারের চলমান সংঘাত ও অস্থিতিশীলতার মধ্যেই দেশে আফিম চাষ গত দশ বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ সংক্রান্ত দফতর (ইউএনওডিসি)- এর সর্বশেষ জরিপে বলা হয়েছে, গত এক বছরে দেশটিতে আফিম চাষের ক্ষেত্র ১৭ শতাংশ বেড়ে ৫৩ হাজার ১০০ হেক্টরে দাঁড়িয়েছে। যা ২০২৪ সালে ছিল ৪৫ হাজার ২০০ হেক্টর। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা। এতে বলা হয়, বিশ্বের প্রধান অবৈধ আফিম উৎপাদনকারী রাষ্ট্র হিসেবে মিয়ানমারের অবস্থান পুনঃনিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। ইউএনওডিসি এর তথ্যমতে, আফগানিস্তানে চাষ কমে যাওয়ার পর বৈশ্বিক অবৈধ আফিমের মূল উৎস হিসেবে মিয়ানমারের অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে। সংস্থাটির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের প্রতিনিধি ডেলফিন শান্টজ বলেন, আফিম চাষের এই ব্যাপক বৃদ্ধির অর্থ হলো মিয়ানমারের আফিম অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও সম্প্রসারণ ঘটতে পারে।

জরিপে দেখা যায়, ২০২৪-২৫ সালে পপি চাষের জমি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও প্রতি হেক্টরে আফিম উৎপাদনের পরিমাণ কমেছে। ইউএনওডিসি বলছে, তীব্র সংঘাত, অনিরাপত্তা ও বাস্তুচ্যুতির কারণে কৃষকরা ঠিকমতো চাষ করতে পারছেন না। ফলে ফলন কম হচ্ছে। এদিকে মূল্য বৃদ্ধির ফলে কৃষকরা আবার পপি চাষে মনোযোগী হচ্ছেন। ২০১৯ সালে ১ কেজি কাঁচা আফিমের দাম ছিল ১৪৫ ডলার। বর্তমানে যার মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩২৯ ডলারে। অর্থাৎ দ্বিগুণেরও বেশি মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এই বর্ধিত বাজারমূল্য ও জীবিকার সংকটে কৃষকদের বড় অংশ আবার পপি চাষে ঝুঁকছেন।

আন্তর্জাতিক বাজারে মিয়ানমার-উৎপাদিত হেরোইনের প্রবাহ বাড়ছে। ইউএনওডিসি জানিয়েছে, আফগানিস্তান থেকে হেরোইন সরবরাহ কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে মিয়ানমারের হেরোইন দ্রুত প্রবেশ করছে। এমনকি ২০২৪ ও ২০২৫ সালের শুরুতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন-এ বাণিজ্যিক বিমানের যাত্রীদের কাছ থেকে প্রায় ৬০ কেজি মিয়ানমার-উৎপাদিত হেরোইন জব্দ হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই নতুন সরবরাহ অঞ্চল বৈশ্বিক মাদকবাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। বলা হচ্ছে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এই মাদক চাষে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠছেন চাষীরা। ডেলফিন শান্টজ বলেন, নিরবচ্ছিন্ন সংঘাত, বেঁচে থাকার সংগ্রাম এবং মূল্যবৃদ্ধির লোভ- সব মিলিয়ে কৃষকরা পপি চাষে আকৃষ্ট হচ্ছেন। গত বছরের বৃদ্ধি মিয়ানমারের ভবিষ্যতের জন্য গভীর প্রভাব ফেলবে। তিনি আরও বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি শুধু অঞ্চলই নয়, বৈশ্বিক মাদকবাজারকেও প্রভাবিত করবে। এই পরিস্থিতি পরিবর্তনে এখনই জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

mzamin

Tuesday, December 9, 2025

৫০ বছরে ‘ওয়ার অন ড্রাগস’ থেকে কী পেলো যুক্তরাষ্ট্র?

আল জাজিরার বিশ্লেষণঃ পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় আগে, ১৯৭১ সালের গ্রীষ্মে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মাদককে জনগণের প্রধান শত্রু ঘোষণা করে অভিযান শুরু করেছিলেন। যা পরবর্তীতে ‘ওয়ার অন ড্রাগস’ নামে পরিচিতি পায়। তার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে মাদকমুক্ত করা, পাচারচক্র ধ্বংস করা এবং দেশকে নিরাপদ করে তোলা। কিন্তু পাঁচ দশক পর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবতা হয়েছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

যুক্তরাষ্ট্রে এই অভিযান কঠোর পুলিশি ব্যবস্থা ও শাস্তিমূলক আইনকে শক্তিশালী করেছে। ফলে দেশটি আজ বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ কারাবন্দী হারের রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেসের হিসাবে, মাদকবিরোধী যুদ্ধে ব্যয় হয়েছে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি। কিন্তু মাদকের চাহিদা বা প্রাপ্যতার ওপর এর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি। বরং বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র তার ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ওভারডোজ সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। যেখানে ফেন্টানিলের মতো সিন্থেটিক ড্রাগ প্রতি বছর এক লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণ নিচ্ছে।
১৯৬০ এর দশকের শেষ দিকে ভিয়েতনাম ফেরত সৈন্যদের মধ্যে হেরোইন ব্যবহারের বৃদ্ধি, তরুণদের মধ্যে মাদক গ্রহণ এবং সুউচ্চ রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলার সময় নিক্সন কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেন। পরবর্তীতে তার সহকারী জন আর্লিচম্যান স্বীকার করেন, প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে কৃষ্ণাঙ্গ ও যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনকারীদের টার্গেট করতে মাদককে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিল।

নিক্সনের পর রোনাল্ড রিগানের আমলে এই যুদ্ধ আরও তীব্র হয়। ১৯৮০-এর দশকে কঠোর সাজা, বিশেষ করে ‘ক্র্যাক’ বনাম পাউডার কোকেনের সাজার বৈষম্য, কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে কারাবন্দীর হার কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিল ক্লিনটনের ১৯৯৪ সালের অপরাধবিরোধী আইন পরিস্থিতিকে আরও কঠোর করে, থ্রি-স্ট্রাইক নীতি জীবনব্যাপী কারাবাসকে সহজ করে তোলে। ২০১০-এর সময় পর্যন্ত এই নীতি মূলত অপরিবর্তিত থাকে। পরে কানাবিস বৈধকরণ ও ওপিওয়েড সংকট দেখিয়ে দেয় যে কঠোর শাস্তি আসক্তি কমাতে পারে না।

বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন অভ্যন্তরীণ নীতিতে আগের পথেই হাঁটছে, তবে লাতিন আমেরিকার প্রতি আগ্রাসী অবস্থান আরও দৃশ্যমান। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার উপকূলের কাছে ডজনখানেক নৌকায় বোমা মেরেছে। নার্কো-ট্রাফিকিং (মাদক পাচার) বন্ধ করার নামে এসব হামলা চালিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন। যদিও এসব নৌকা মাদক বহন করছিল এমন কোনো প্রকাশ্য প্রমাণ ওয়াশিংটন উপস্থাপন করতে পারেনি। সমালোচকরা বলছেন, এটি মূলত ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সরানোর রাজনৈতিক অজুহাত।
১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে ২০০০-এর দশক পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে বছরে ১.৬ মিলিয়ন পর্যন্ত মাদকসংক্রান্ত গ্রেপ্তার হতো। এর বেশিরভাগই অল্প পরিমাণ মাদক বহনের জন্য। যুক্তরাষ্ট্রের কারাবন্দী সংখ্যা ১৯৭০-এর দশকে ৩ লাখ থেকে চার দশকে বেড়ে ২০ লাখেরও বেশি হয়। এই পদক্ষেপের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর। মার্কিন জনগোষ্ঠীর ১৫ শতাংশের কম হওয়া সত্ত্বেও কৃষ্ণাঙ্গদের এক-চতুর্থাংশের বেশি মাদক মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গরা শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় ৩.৭ গুণ বেশি হারে ক্যানাবিস-বহন সম্পর্কিত গ্রেপ্তারের শিকার হন।

রিগানের কঠোর সাজা আইন পাস হওয়ার পর হত্যাকাণ্ডের হার বেড়েছিল, যা ১৯৯১ পর্যন্ত বাড়তে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয় অব কানসাসের ইতিহাসবিদ ডেভিড ফারবার বলেন, ওয়ার অন ড্রাগস আসলে আমেরিকার গরিবদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হয়ে উঠেছিল, সমাধান নয়।
মাদকবিরোধী যুদ্ধ কীভাবে লাতিন আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ল
মাদকবিরোধী যুদ্ধ শুধু যুক্তরাষ্ট্র ও তার সীমান্তেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ১৯৮০-এর দশকে, ওয়াশিংটন মাদক পাচারকে উৎসমুখেই দমন করার জন্য লাতিন আমেরিকা জুড়ে সামরিক বাহিনী ও পুলিশ বাহিনীকে অর্থায়ন এবং প্রশিক্ষণ দিয়েছিল।

ল্যাটিন আমেরিকা ওয়ার্কিং গ্রুপের মতে, ২০০০ সাল থেকে ‘প্ল্যান কলম্বিয়া’ নামে পরিচিত কর্মসূচির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র কলম্বিয়ায় কমপক্ষে ১০ বিলিয়ন বিনিয়োগ করেছিল, যার বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনী এবং কোকেইনের ক্ষেত ধ্বংস করার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।  কলম্বিয়ান মানবাধিকার সংস্থা এবং দেশটির সত্য কমিশনের মতে, যদিও রাষ্ট্র কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠীকে দুর্বল করতে সফল হয়েছিল, কিন্তু কোকেইন চাষ শেষ পর্যন্ত রেকর্ড স্তরে ফিরে এসেছিল এবং সাধারণ নাগরিকদেরকে এর চড়া মূল্য দিতে হয়েছিল। এই সংঘাতের ফলে ১৯৮৫ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে আনুমানিক ৪ লাখ ৫০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল।

মেক্সিকোতে ২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র মাদক নির্মুল অভিযান চালায়। ফলে স্থানীয়ভাবে ব্যাপক হাঙ্গামা হয়। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস অনুসারে, তখন থেকে ৪ লাখ ৬০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং আরও হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ হয়েছে। স্থানীয় ছোট ছোট দলগুলো চাঁদাবাজি, জ্বালানি চুরি এবং মানব পাচারের মতো কাজে জড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে পুলিশ বাহিনী এবং স্থানীয় সরকারগুলোর মধ্যে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে।

জাতিসংঘ মাদক ও অপরাধ সংক্রান্ত কার্যালয়ের (ইউএনওডিসি) মতে, এই অভিযানগুলো মাদক পাচারের পথ অন্য দিকে সরিয়ে দেয়। যার প্রধান পথ হয়ে ওঠে মধ্য আমেরিকার দেশগুলো।
এখনও যুক্তরাষ্ট্র কথিত পাচারকারীদের লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে ক্যারিবিয়ান সাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরে কথিত মাদক পাচারের জাহাজে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পরিচালিত ২১টি সামরিক হামলায় ৮৩ জনেরও বেশি লোক নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে।

(সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত)

mzamin

অপরাধের অভয়ারণ্য জেনেভা ক্যাম্প by সুদীপ অধিকারী

আলোচনায় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ‘জেনেভা ক্যাম্প’। মাদক ব্যবসা ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ক্যাম্পের ভেতর ঘটছে একের পর এক সংঘর্ষ, খুন। যৌথ বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানেও দমানো যাচ্ছে না সন্ত্রাসীদের। এতে আতঙ্ক বিরাজ করছে পুরো মোহাম্মদপুরে। ঢাকা উত্তর সিটির মোহাম্মদপুর থানার ৩২ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত এই জেনেভা ক্যাম্প মূলত মুক্তিযুদ্ধের পর বাংলাদেশে আটকে পড়া বিহারিদের আবাসস্থল। ১৯৭১ সালে বাস্তুহারা বিহারিরা যারা মোহাম্মদপুরের রাস্তা, মসজিদ, স্কুলে অবস্থানরত ছিল তাদের জন্য ’৭২ সালে লিয়াকত হাউজিং সোসাইটির সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে অস্থায়ী ভিত্তিতে মোহাম্মদপুর কলেজগেটের অদূরে গজনবী রোড ও বাবর রোডের মাঝের ১৭ একর জায়গা নিয়ে ক্যাম্প তৈরি করা হয়। সেখানেই বছরের পর বছর ধরে বসবাস করে আসছেন এই উর্দুভাষিরা। বর্তমানে নয়টি ব্লকে ভাগ হওয়া এই ক্যাম্পে প্রায় ৩৫ হাজার বিহারির বসবাস। ছোট্ট ছোট্ট খুপরি ঘরে ১৫-২০ জন করে থাকেন। দিনে-রাতে পালা করে ঘুমাতে হয় তাদের। মূলত রাজধানীর বিভিন্ন সেলুনে নরসুন্দরের কাজই তাদের প্রধান পেশা। তবে এই সরু গলির ঘরগুলোকে অনেকেই আবার মাদকের অভয়ারণ্য হিসেবে গড়ে তুলেছে। বছরের পর বছর হেরোইন, ইয়াবা, ফেনসিডিল, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকের কারবার চলছে এই ক্যাম্পে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই মাদকের ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতেই গত বছরের ৫ই আগস্টের পর থেকে মরিয়া হয়ে উঠে বুনিয়া সোহেল, চুয়া সেলিম, পিচ্চি রাজা, বোবা বিরানি, শাহ আলম, তারিক, পারমনু ওরফে গাল কাটা মনু, চেম্বার রাজ, ঠোঁট গোলাবি, ফারুক, ইমতিয়াজ, আরমান, পলু কসাই, সৈয়দপুরিয়া, ছটু মাসুদ, চারকুসহ একাধিক গ্রুপ। এদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন ভূঁইয়া সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেল। তার হয়ে কাজ করেন তার ভাই টুনটুন, রানা, রাজন, কলিম জাম্বু, মোহাম্মদ আলী, আহম্মদ আলী, বানর আরিফ আরও অনেকে। আর চুয়া সেলিমের পক্ষে আছে পিচ্চি রাজা, আরমান, আকরাম, মোল্লা আরশাদ, পেলু, কোপ মনু, পিস্তল নাঈম, শাহজাদা গেইল হীরা, সালাম, শান্ত, ফাট্টা আবিদ। এদিকে সৈয়দপুরিয়া গ্রুপে আছে তিল্লি শাহিদ, কামাল বিরিয়ানি, ইরফান বিরিয়ানি, মোল্লা জাহিদ, সাজ্জাদ, আমজাদ আলী বাবু। এদের মধ্যে বুনিয়া সোহেল, চুয়া সেলিম, সৈয়দপুরিয়া গ্রুপের বাবু ওরফে আমজাদ আলী বাবু, আসলাম ওরফে মেন্টাল আসলাম ও শেখ গোলাম জিলানি মূলত পারিবারিকভাবে ইয়াবা ও হেরোইনের কারবারে জড়িত। আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগসাজশের কারণে বিগত বছরগুলোতে ক্যাম্পে শক্ত অবস্থান ছিল বুনিয়া সোহেলের। আর আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিরোধীদের সাপোর্টে রাজত্ব করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন চুয়া সেলিম চক্র। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, চুয়া সেলিমের বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক, অস্ত্র লুটসহ ৩৫টি মামলা রয়েছে। অপরদিকে বুনিয়া সোহেলের বিরুদ্ধেও একাধিক হত্যা ও মাদক মামলা রয়েছে। তবে আগে এসব দ্বন্দ্বে লাঠি, চাকু, দা, বঁটি, ছুরি ব্যবহার হলেও এখন যোগ হয়েছে আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রাণঘাতী কাস্টোমাইজড ককটেল।

বুধবার রাত ৩টার দিকে মাদক ব্যবসা নিয়ে ক্যাম্পের ৪ নম্বর গলিতে এমনই এক সংঘর্ষে জড়ায় বুনিয়া সোহেল গ্রুপ ও চুয়া সেলিম-পিচ্চি রাজা গ্রুপ। এসময় গোলাগুলি ও ককটেল বিস্ফোরণে মো. জাহিদ (২০) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। জাহিদ জেনেভা ক্যাম্পের বাসিন্দা মৃত মো. ইমরানের সন্তান। কিন্তু গত ২০শে অক্টোবর রাতেও জেনেভা ক্যাম্পে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে ৩২টি তাজা ককটেলসহ বিস্ফোরক তৈরির সরঞ্জাম, দেশীয় অস্ত্রসহ ৪ জনকে আটক করে। পরদিন থেকে আবারো উত্তাল হয়ে ওঠে বিহারি ক্যাম্প। এরপরেই বৃহস্পতিবার দিনব্যাপী জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে ২০ জনকে আটক করেছে পুলিশ। এরপরই মধ্যরাত থেকে শুক্রবার ভোর পর্যন্ত জেনেভা ক্যাম্পে সেনাবাহিনী ও র‍্যাব যৌথ অভিযান চালায়। ওই অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদকসহ চারজনকে আটক করা হয়। এর আগেও গত ২৮শে সেপ্টেম্বর রাত ৮টা থেকে রাত ১০টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৩০০ গ্রাম হেরোইন, ২৫০ গ্রাম গাঁজা, ১টি চাপাতি,  ২টি তলোয়ার, ১০টি গুলতি, ২ হাজার পিস মার্বেল, ২০টি হেলমেট, ১২টি লাইফ জ্যাকেট, ৫টি লোহার রডসহ ২১ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। গত ২২শে সেপ্টেম্বরও ১২০ জন পুলিশ সদস্য নিয়ে জেনেভা ক্যাম্পে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে ৪০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিএমপি। ওই সময় তাদের কাছ থেকে ৮টি ককটেল, ২টি পেট্রোল বোমা, ৬টি সামুরাই, ৫টি হেলমেট, ৩টি ছুরি, ১১টি চোরাই মোবাইল ফোন এবং ৫০০ গ্রাম হেরোইন জব্দ করা হয়। এমন একের পর এক অভিযান চলছেই।

গত ১১ই আগস্ট মাদক বিক্রি নিয়ে জেনেভা ক্যাম্পের পিচ্চি রাজা ও বুনিয়া সোহেল গ্রুপের দ্বন্দ্বে ক্যাম্পের ৭ নম্বর সেক্টর এলাকায় শাহ আলম (২০) নামের এক তরুণ নিহত হন। এর আগের দিনও ওই দুই গ্রুপের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া, ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ককটেল বিস্ফোরণে এক নারীও আহত হয়েছেন। এর আগে ক্যাম্পের ৮ নম্বর সেক্টর হয়ে যাওয়ার সময় চুয়া সেলিম ও বুনিয়া সোহেল গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে সাজ্জেন ওরফে রহমত নামে ১৩ বছরের এক কিশোরের মৃত্যু হয়। তার আগে ১৬ই অক্টোবর মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্বে নিহত হন ক্যাম্পের ৮ নম্বর ব্লকের বাসিন্দা শাহনেওয়াজ কাল্লু (৩৮)। গত ১লা মে বিকালে মাহতাব হোসেন (৩২) নামে এক মাছ ব্যবসায়ীকে বুনিয়া সোহেলের আস্তানায় তুলে নিয়ে গিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে হত্যা ও আগুনে পুড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে এলাকাবাসী তাকে উদ্ধার করে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি  করে। এ ছাড়াও একইভাবে গত বছরের ৪ঠা সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৮টার দিকে প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হন ক্যাম্পের বাবুল হোসেনের ছেলে অটোরিকশাচালক সানু। মাদক ব্যবসা নিয়ে তর্কাতর্কির জেরে প্রতিপক্ষের গুলিতে খুন হন সনু। এসময় বেল্লাল, শাহ আলম, শুভ, জানে আলম, শাওন নামে আরও বেশ কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন। একইদিনে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন শাহেন শাহ নামের আরও একজন। মাদক নিয়ে দ্বন্দ্বে ক্যাম্পের মো. ইসমাইল হোসেনের ছেলে মো. সাগর নামে আরও একজন মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও শান্ত হচ্ছে না জেনেভা ক্যাম্প। মাদক কারবারের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রায়ই চলছে বিভিন্ন গ্রুপের দৌরাত্ম্য। তারা বলেন, জেনেভা ক্যাম্পের সবচেয়ে বেশি মাদক কারবার চলে ক্যাম্পের ৭ নম্বর ও ৪ নম্বর গলিতে। এর সঙ্গে চোয়া সেলিম, শাহ আলম, তারিক, পারমনু ওরফে গাল কাটা মনু, চেম্বার রাজ, পিচ্চি রাজা, ঠোঁট গোলাবি, ফারুক এবং ইমতিয়াজসহ বেশ কয়েকজন জড়িত। এদের কাছে মোহাম্মদপুর ও আদাবর থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র রয়েছে। এ ছাড়াও সরকার পতনের আগে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের দেয়া অবৈধ অস্ত্রেরও বিশাল মজুত রয়েছে তাদের কাছে। এরা কেউ ক্যাম্পে থাকে না। ক্যাম্পের বাইরে ভাড়া বাসায় থেকে সোর্সের মাধ্যমে তারা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণ করে। এদের অস্ত্র ও মাদকও ক্যাম্পের বাইরে থাকে। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালালেও তারা থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ-ডিএমপি’র তেজগাঁও জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. ইবনে মিজান বলেন, জেনেভা ক্যাম্পের অপরাধ ও মাদকের বিস্তার রোধে আমরা নিয়মিতভাবে  বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে আসছি। অভিযানে আমরা মাদক কারবারি, মাদক বিক্রেতা, অস্ত্রের জোগানদাতা, ককটেল সংরক্ষণকারীসহ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করি। বিশেষ করে গত বছরের ৩১শে অক্টোবর সিলেটে অভিযান চালিয়ে বুনিয়া সোহেলকে এবং এ বছরের ৮ই জানুয়ারি ধানমণ্ডির ল্যাব এইড হাসপাতাল থেকে চুয়া সেলিমকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর কিছুদিন পরেই তারা জেল থেকে বেরিয়ে আবারো অপকর্মে জড়ায়। এরা অনেক আধুনিক। তারা ওয়াইফাই ব্যবহার করে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। মোবাইল ফোনে সিম থাকে না। আবার ক্যাম্প ঘিঞ্জি এলাকা হওয়ায় কোথায় মাদক ও অস্ত্র রেখে দেয় তাও পাওয়া যায় না। আর তাদের লোক ক্যাম্পের চারপাশে ছড়ানো থাকে। আমরা ঢোকার আগেই তারা খবর পেয়ে পালিয়ে যায়। তাই আমরাও এখন আমাদের অভিযানের ধরন পাল্টাচ্ছি। যত চালাকই হোক না কেন তাদের সকলকেই আইনের আওতায় আনা হবে।

বিষয়টি নিয়ে ডিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশন) নজরুল ইসলাম, মাদক বিক্রেতার চেয়ে মূল নিয়ন্ত্রককে ধরা না গেলে ক্যাম্পের পরিবেশ পুরোপুরি শান্ত করা সম্ভব নয়। মাদকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গডফাদারদের গ্রেপ্তারে অভিযান চালানো হবে বলেও জানান পুলিশের এই কর্মকর্তা।

Wednesday, November 19, 2025

‘ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট কোকেইন আসক্ত’, ভাই-বোনের দ্বন্দ্ব

ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মারকোস জুনিয়রের বোন সিনেটর আইমি মারকোস। ভাই ফার্দিনান্দের সঙ্গে তার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন। বোন অভিযোগ করেছেন যে, প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মারকোস বহুদিনের মাদকাসক্ত এবং কোকেইনের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে নেতৃত্বে দুর্বলতা ও দুর্নীতি তৈরি হয়েছে। তার এ দাবিকে প্রেসিডেন্ট ফার্দিনান্দ মারকোস প্রত্যাখ্যান করেছেন।

প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র জানিয়েছেন, এসব দাবি ভিত্তিহীন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন গার্ডিয়ান। কমিউনিকেশনস আন্ডারসেক্রেটারি ক্লেয়ার ক্যাস্ত্রো বলেন, সিনেটর আইমি মারকোসের মন্তব্যগুলো ভিত্তিহীন এবং হয়তো সিনেটে তার মিত্রদের জড়িত করে চলমান দুর্নীতি কেলেঙ্কারির তদন্ত থেকে মনোযোগ সরানোর হতাশাজনিত চেষ্টা। তিনি বলেন, সিনেটর আইমি, আমি আশা করি আপনি দেশপ্রেম দেখাবেন এবং যে তদন্ত প্রেসিডেন্ট নিজেই করছেন তাতে সহযোগিতা করবেন এবং সব দুর্নীতিবাজের নিন্দা করবেন। তাদের পক্ষ নেবেন না, তাদের আড়াল করবেন না। প্রেসিডেন্ট মারকোসকে দুর্নীতি বন্ধ করতে কাজ করতে দিন।
মারকোস গঠিত একটি স্বাধীন অনুসন্ধান কমিশন, একটি সিনেট কমিটি এবং সরকারি সংস্থাগুলো তদন্ত করছে যে প্রভাবশালী সংসদ সদস্য ও সিনেটররা বন্যা নিয়ন্ত্রণ প্রকল্পে দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্মাণ কোম্পানিগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ ঘুষ নিয়েছেন কি না। এসব প্রকল্প ছিল নিম্নমানের, অসম্পূর্ণ বা আদৌ নির্মিত হয়নি- যা বন্যা ও টাইফুনপ্রবণ দেশে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।

সোমবার রাতে ম্যানিলার একটি পার্কে ধর্মীয় গোষ্ঠীর বড় সমাবেশে ভাষণ দেয়ার সময় আইমি মারকোস দাবি করেন, তার ভাইয়ের মাদকাসক্তি তাদের বাবার (বর্তমান প্রেসিডেন্টের নামেরই জনক) ক্ষমতার সময় থেকেই শুরু, এবং এখনো চলছে। তিনি বলেন, এটি প্রেসিডেন্টের স্বাস্থ্যে ও শাসনক্ষমতায় প্রভাব ফেলছে।
ভাই-বোন দু’জনই সাবেক একনায়ক ফার্দিনান্দ মারকোস সিনিয়রের সন্তান। তাকে ১৯৮৬ সালে গণঅভ্যুত্থানে উৎখাত করা হয়। আইমি আরও অভিযোগ করেন যে, বর্তমান প্রেসিডেন্টের স্ত্রী ও সন্তানরাও মাদক ব্যবহার করেন। ২০২২ সালে ভাই প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর তাদের মধ্যে প্রায় আর কোনো কথা হয় না। প্রেসিডেন্টের স্ত্রী লিজা মারকোস ও সন্তানরা, যাদের একজন সংসদেরও সদস্য এই বিষয়ে কিছু বলেননি।

mzamin

Saturday, October 18, 2025

ছিনতাই ও মাদক মামলায় জামিন: আইনের শাসন ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকি

ঢাকা মহানগরীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ কোনোভাবেই কাটছে না। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাকে এই উদ্বেগ না কাটার অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এর মধ্যে একটি ছিনতাইসংক্রান্ত এবং অন্যটি মাদকসংক্রান্ত।

প্রথম আলোর একটি প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ছিনতাইয়ের অভিযোগে যাঁরা আটক হয়েছিলেন, গত তিন মাসে তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ১০৮ জন আসামি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একজন মাদক পাচারকারীকে আটকের পর মাত্র ৩১ ঘণ্টার মধ্যে তিনি জামিন পেয়েছেন। এ দুটি ঘটনাই আমাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা স্পষ্ট করে দিয়েছে।

ছিনতাই রাজধানীবাসীর জন্য একটি অব্যাহত ভয়ের নাম। বাসে, রাস্তায়, এমনকি বাড়ির আশপাশেও মানুষ এখন নিরাপদ বোধ করে না। পুলিশ প্রায় প্রতিদিনই এসব অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের খবর দেয়।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, আদালতের দরজা পেরোতেই অভিযুক্ত ব্যক্তিরা খুব সহজে জামিনে বেরিয়ে আসছেন। ফলে গ্রেপ্তার হওয়া ও দ্রুত জামিনে মুক্তি পাওয়ার এক অদ্ভুত চক্র তৈরি হয়েছে। এই চক্র আইনের শাসন ও জননিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি।

অপর দিকে মাদক দেশের সামাজিক কাঠামোকে নষ্ট করে দিচ্ছে। সমাজের তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে এই অভিশাপে। অথচ একজন মাদক পাচারকারী গ্রেপ্তারের মাত্র ৩১ ঘণ্টার মাথায় জামিন পেলেন—এ খবর জনমনে নানা রকম প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। মাদক মামলায় জামিন এত দ্রুত মঞ্জুর হওয়া কি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, নাকি এর পেছনে কোনো বিশেষ মহলের প্রভাব রয়েছে—এই প্রশ্ন এড়ানো যায় না।

বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনি অধিকার রক্ষা করা নিশ্চয়ই জরুরি বিষয়। তবে একই সঙ্গে জননিরাপত্তা ও অপরাধ দমনের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিচারপ্রক্রিয়ায় যদি অপরাধীদের প্রতি নমনীয়তা প্রদর্শন করা হয়, তবে তাঁরা আবারও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়াবেন—এমন আশঙ্কা অমূলক নয়।

এ রকম বহু উদাহরণ আছে, যেখানে জামিনে মুক্ত আসামিরা আবারও একই অপরাধে ধরা পড়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারব্যবস্থা যদি অপরাধীদের প্রতি এমন নমনীয়তা প্রদর্শন করে, তবে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হবেন। এর মানে জনগণকে অরক্ষিত অবস্থায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে আর অপরাধীরা পাচ্ছেন পুনরায় অপরাধ করার সুযোগ।

এই পরিস্থিতিতে সরকার, আদালত ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। জামিন প্রক্রিয়ায় আরও কড়াকড়ি আরোপ করা জরুরি, বিশেষ করে ছিনতাই ও মাদক মামলার মতো গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে। নিয়মিত মনিটরিং, জামিনপ্রাপ্ত আসামিদের কার্যকলাপের ওপর নজরদারি এবং প্রয়োজনে জামিন বাতিলের প্রক্রিয়া দ্রুত কার্যকর করতে হবে।

এ ছাড়া বিচারপ্রক্রিয়ার গতি বাড়াতে হবে, যাতে মামলার দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের কোনো রকম সুবিধা না দেয়। মামলার তদন্ত দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করা হলে বিচারপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বাড়বে এবং আদালতের সিদ্ধান্তে আস্থা তৈরি হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজর দেওয়া জরুরি।

ঢাকার মতো জনবহুল শহরে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। কিন্তু অপরাধীরা যদি গ্রেপ্তারের পরপরই মুক্তি পেতে থাকেন, তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাবে। এসব ঘটনা শুধু রাজধানীর নিরাপত্তাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং সমগ্র বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাকে নষ্ট করছে।

এখন সময় এসেছে বিচারব্যবস্থার ফাঁকফোকর চিহ্নিত করে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার। তা না হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থা এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থাহীনতা ভয়াবহ সংকটে রূপ নেবে। এ সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, আদালত ও অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে।

Saturday, September 6, 2025

যুক্তরাষ্ট্র-ভেনেজুয়েলা: আরও একটি যুদ্ধ আসন্ন!

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজুয়েলায় মাদক কার্টেলগুলোকে টার্গেট কএে সামরিক হামলার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এ জন্য ওয়াশিংটনের নির্দেশে ১০টি অত্যাধুনিক এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান পুয়ের্তো রিকোর একটি বিমান ঘাঁটিতে মোতায়েন করা হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লাতিন আমেরিকার মাদক চক্রগুলোকে ওয়াশিংটন ‘নারকো-টেররিস্ট সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ কারণে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে। সিএনএন একাধিক সূত্রকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার ভেতরে এই কার্টেলগুলোতে আঘাত হানার বিষয়টি হোয়াইট হাউসে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর অভিযোগ তার দেশে শাসন পরিবর্তনের পরিকল্পনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন।

তিনি শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভেনেজুয়েলাসহ লাতিন আমেরিকায় শাসন পরিবর্তনের সহিংস পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সার্বভৌমত্ব, শান্তি ও স্বাধীনতার অধিকারকে সম্মান করুক। তিনি আরও সতর্ক করে বলেন, ভেনেজুয়েলা আক্রান্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে ‘সশস্ত্র সংগ্রামের’ সূচনা হবে। বর্তমানে দেশটির সেনাবাহিনীতে প্রায় ৩,৪০,০০০ সদস্য এবং রিজার্ভ ও মিলিশিয়া সদস্যসহ মাদুরোর দাবি অনুযায়ী ৮০ লাখেরও বেশি যোদ্ধা রয়েছে।

ক্যারিবীয় সাগরে ইতিমধ্যে কমপক্ষে ৭টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ, ৪৫০০ মেরিন ও নাবিক, এবং একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন মোতায়েন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার ভেনেজুয়েলার দুটি এফ-১৬ যুদ্ধবিমান মার্কিন ডেস্ট্রয়ার ইউএসএস জ্যাসন ডানহ্যামের কাছাকাছি উড়ে যায়, যা ওয়াশিংটন ‘উসকানিমূলক পদক্ষেপ’ বলে অভিযোগ করেছে। ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি তারা আমাদের বিপজ্জনক অবস্থায় ফেলে, তবে গুলি করে নামানো হবে।

মঙ্গলবার মার্কিন বাহিনী ক্যারিবীয় সাগরে একটি স্পিডবোট উড়িয়ে দেয়, যা ট্রাম্পের দাবি অনুযায়ী ভেনেজুয়েলার অপরাধী সংগঠন ট্রেন দে আরাগুয়া-এর ছিল। এ ঘটনায় ১১ জন নিহত হয়। ভেনেজুয়েলা একে ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড’ বলে নিন্দা জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরাও হামলার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মেক্সিকো সফরে সাংবাদিকদের বলেন, যখন কেউ কোকেইন বা ফেন্টানিল ভর্তি নৌকায় যুক্তরাষ্ট্রের দিকে আসবে, তখনই তারা আমাদের জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি। আর এদের থামানোর উপায় হচ্ছে—ওদের উড়িয়ে দেওয়া।

https://mzamin.com/uploads/news/main/178869_Untitled-1.jpg

Monday, May 5, 2025

ওয়াসিম আকরামের কোকেন আসক্তি ও প্রথম স্ত্রী’র হারিয়ে যাওয়ার গল্প

ক্রীড়াঙ্গনে তারকাখ্যাতি অনেক বড় জিনিস। খেলোয়াড়রা বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত হন নানা ধরনের মানুষের কাছে। এমনকি তাদের জীবনধারাও প্রভাব ফেলে ভক্তদের ওপর। তবে আলোকসজ্জার এই দুনিয়ার বাইরেও তাদের অনেকের একটি অন্ধকার জগৎ থাকে, যার ব্যাপারে অবগত থাকে না বাইরের কেউই। পাকিস্তানের কিংবদন্তি ওয়াসিম আকরামকে বলা হয় ‘সুলতান অব সুই’। ১৯৯২তে বিশ্বকাপ জেতা এই পেসার ওয়ানডে আর টেস্ট মিলিয়ে নিয়েছেন ৯০০টিরও বেশি উইকেট। ২০২২-এ সাংবাদিক গিডিওন হেইগের সঙ্গে যৌথভাবে নিজের আত্মজীবনী ‘সুলতান: আ মেমোয়ার’ প্রকাশ করেন আকরাম। বইয়ের ‘ব্যাটলিং মাই ডিমনস’ অংশে নিজের সেই অন্ধকার জীবনের কথা তুলে ধরেন ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই ফাস্ট বোলার।

খেলোয়াড়ি জীবনের পর ভয়াবহ মাদকদ্রব্য কোকেনের নেশায় জড়িয়ে যান ওয়াসিম আকরাম। এসবের শুরুটা হয়েছিল ইংল্যান্ডের এক পার্টিতে। সেবারই প্রথম, তবে অল্প অল্প করে আসক্তি বাড়তে থাকে।  এক সময় ব্যাপারটা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছায় যে তার স্বাভাবিকভাবে চলাফেরার জন্যও এটির দরকার পড়তো বলে মনে করতেন তিনি। আকরাম যখন পুরোপুরিভাবে কোকেনের ওপর নির্ভরশীল, তখন হুমা মুফতি (প্রয়াত স্ত্রী) ম্যানচেস্টার ও লাহোরে প্রায়শই একা থাকতেন। হুমার ক্রিকেট নিয়ে বা মাঠের বাইরের খ্যাতি নিয়ে কখনোই আগ্রহ ছিল না। আকরামের সন্দেহ হতো, স্বামীর ওপর ক্রিকেটের প্রভাব দেখেই হয়তো তাদের দুই সন্তান তাহমুর ও আকবরকে সবসময় খেলা থেকে দূরে রাখতেন হুমা।

একপর্যায়ে আকরামকে ধরে ফেলেন হুমা, স্বামীর ওয়ালেটে থাকা কোকেনের একটি প্যাকেট খুঁজে পান তিনি। সে সময় হুমা বলেন, ‘আমি জানি তুমি মাদক নিচ্ছো, তোমার সাহায্যের দরকার।’ খোদ আকরামও রাজি ছিলেন, কেননা কোকেনের পরিমাণ বাড়তে বাড়তে ততদিনে দুই গ্রামে পৌঁছে গিয়েছিল। তখন একটি পুনর্বাসন প্রোগ্রামে ভর্তি হতে রাজি হন আকরাম। তবে লাহোরের সেই রিহ্যাবটি খুব একটা জাতের ছিল না। ডাক্তারাও খুব সুবিধার ছিল না। প্রতি সপ্তাহে চার্জ করা হতো প্রায় ২ লাখ রুপি। সেখানে এক মাস থাকাকালীন স্ত্রী-সন্তানদের একবারের জন্যও দেখতে পাননি আকরাম। একপর্যায়ে তারা দেখা করতে এলে রাগের সুরেই সেখান থেকে বের হওয়ার কথা জানান তিনি। তবে ডাক্তার নিজের খেলাটা খেলেন, হুমাকে বলেন, ‘আমি তো আগেই বলেছিলাম যে, সে এমনই করবে।’ এর আরও সাত সপ্তাহ পর যখন হুমা বুঝতে পারলেন যে, আকরামই ঠিক ছিলেন- তখন বের করে নিয়ে আসেন তার স্বামীকে। একপর্যায়ে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লীগ (আইপিএল) থেকে কলকাতা নাইট রাইডার্সের পক্ষ থেকে আকর্ষণীয় এক চাকরির প্রস্তাব পান আকরাম। তবে তখনো কোকেনের মোহ থেকে সম্পূর্ণভাবে বের হতে পারেননি তিনি। একপর্যায়ে বিবাহবিচ্ছেদের কথাও ভাবেন। শেষমেশ ২০০৯-এ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে গিয়ে হুমার নজরদারির বাইরে গিয়ে ফের কোকেন নেয়া শুরু করেন আকরাম। অন্যদিকে তাকে ভালো করে তুলতে গিয়ে একপর্যায়ে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েন হুমা। সংক্রামক এন্ডোকার্ডাইটিসে আক্রান্ত হয়ে ইহলোক ত্যাগ করেন তিনি। এর কয়েক বছর পর দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন ওয়াসিম আকরাম। অস্ট্রেলিয়ার শানিয়ারা থম্পসনের সেই ঘরে একটি কন্যাসন্তানও আছে।

mzamin

Sunday, May 4, 2025

সিলেটের শাপলা: নেশায় বুঁদ তরুণীদের নিয়ে নানা ভাই’র ফাঁদ by ওয়েছ খছরু

সিলেটে নেশায় বুঁদ থাকা তরুণীদের দিয়ে ফাঁদ পাততো নানা ভাই ফয়জুল খান আলম। অশ্লীল ছবি ও ভিডিও ধারণ করে করতো ব্ল্যাকমেইল। একবার তার ফাঁদে কেউ পা দিলে মাসে মাসে দিতে হতো বড় অঙ্কের চাঁদা। টাকা না দিলে ভিডিও ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছেড়ে দেয়ার হুমকি দেয়া হতো। সিলেটের শাপলা হলিডে হোমে এভাবেই ব্ল্যাকমেইলের ফাঁদ পেতে রাখে আলম। সবাই তাকে নানা ভাই বলে চিনেন। আর এই নানা ভাই বলার কারণও আছে। শাপলায় যাওয়া তরুণীরাই তাকে নানা ভাই বলে ডাকেন। এজন্য অনেকের কাছে সে এখন নানা ভাই। পাওনা টাকা নিয়ে গোলাপগঞ্জের কায়স্থগ্রামের মুহিনুর রহমান ও তার বন্ধু ব্যবসায়ী আসাদের ওপর হামলার ঘটনায় শাপলার কুকীর্তির নানা ঘটনা বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। হামলার ঘটনায় মামলা দায়েরের পর থেকে পলাতক রয়েছে আলম। তার তরুণী সিন্ডিকেটরাও গা-ঢাকা দিয়েছে। শাপলার কুকীর্তি প্রকাশ হওয়ার পর পুলিশও সক্রিয় হয়েছে। ইতিমধ্যে কয়েক দফা অভিযান চালানো হয়েছে এ হলিডে হোমে। তবে আলম কিংবা তার সিন্ডিকেটের কাউকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। পুলিশ বলছে, আলম ও তার সহযোগীদের ধরতে অভিযান চালানো হচ্ছে। আলমের মূল বাড়ি জগন্নাথপুর উপজেলার দত্তরাই গ্রামে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ৫-৬ বছর আগে শাপলার মূল মালিক লন্ডন প্রবাসীর কাছ থেকে বিল্ডিং ভাড়া নেয়। প্রথম তিনতলাকে সে রিসোর্ট হিসেবে ব্যবহার করে। আর উপরের দুইতলায় ফ্ল্যাট বাড়ি ভাড়া দিয়েছে। আর দুইতলা পরিবার সহ ফ্ল্যাটবাড়ি ভাড়া দিয়ে সে নিচের তিনতলাকে অপকর্মের হেডকোয়ার্টার হিসেবে গড়ে তোলে। প্রথমে বিষয়টি বড়শালা এলাকার মানুষ বুঝতে পারেননি। পরে ধীরে ধীরে তাদের কাছে সব পরিষ্কার হয়। বড়শালা এলাকার কয়েকজন স্থায়ী বাসিন্দা জানিয়েছেন, শাপলায় নানা কীর্তি হয়। অনেক বড় বড় ভিআইপি রাত-বিরাতে সেখানে ছুটে আসায় বিষয়টি ধরা পড়ে। আসে সুন্দর সুন্দর রমণীরা। বিশেষ করে থার্টিফার্স্ট নাইট, পহেলা বৈশাখে শাপলায় জমকালো আয়োজন হয়েছে। রাতভর সেখানে নাচ-গানের আসর ছিল। এলাকার লোকজন সব বুঝলেও মুখ বুঝে সহে গেছেন। কী হতো শাপলায় এমন প্রশ্নের জবাবে আলমের ব্ল্যাকমেইলের শিকার হওয়া কয়েকজন ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, শাপলা হচ্ছে অসামাজিক কাজের হেডকোয়ার্টার। যা চাইবেন সেখানে সব পাবেন। আলমই সব ব্যবস্থা করে দেয়। তার কাছে নগরের ১০ থেকে ১২ জন তরুণীর ফোন নম্বর রয়েছে। এসব তরুণীদের বেশির ভাগেরই বাড়ি সিলেটের বাইরে। তারা কলেজ ভার্সিটির পড়ার সুবাদে সিলেটে বসবাস করে। নানা ভাইয়ের ফোন পেলেই তারা ছুটে আসে। এরপর অসামাজিক কাজে লিপ্ত হয়। আর চতুর আলম হোটেলে আসা লোকজন ও তরুণীদের ভিডিও ও ছবি ধারণ করে রাখে। পরে এসব ভিডিও ছবি দিয়ে ওই হোটেলে আসা লোকজনকে ব্ল্যাকমেইল করে। চায় টাকা। আলমের মোবাইল ফোনে এ ধরনের অনেক ভিডিও ও ছবি রয়েছে। গত ১৫ই এপ্রিল শাপলা হলিডে হোমে হামলার শিকার হওয়া মুহিনুর রহমান জানিয়েছেন, যখন তাকে রিসোর্টে একটি রুমে নিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছিল তখন ওই সব ছবি তাকে দেখায় আলম ও তার ভাই তাজুল। ওই সময় তারা জানিয়েছিল, সবাই তার কাছে জিম্মি। তাদের উপর লেবেলে হাত রয়েছে। তাকে কেউ ছুঁতে পারবে না। মুহিন জানান, আলম নিজেই নেশাগ্রস্ত। সে তার রিসোর্টে নিয়ে তরুণীদের ইয়াবা ও মদ সেবন করায়। এরপর তাদের নেশায় আসক্ত করে তাদের ছবি ধারণ করে রাখে। এ ছাড়া অশ্লীল ছবিও রাখে। পরে ওই ছবি দিয়ে তরুণীদেরও সে ব্ল্যাকমেইল করে। কয়েকজন তরুণী তার কাছে এভাবে ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। আলমের ডাকে না গেলে তাদেরও দেয়া হয় হুমকি। এতে করে তরুণীরাও বিপর্যস্ত। তাদের নেশায় আসক্ত করে সে রিসোর্টে আসা লোকজনের কাছে তাদের পাঠায়। তিনি জানান, তরুণীদের নিয়ে আলমের নেশা করা, অসামাজিক কাজে ব্যবসা করার অনেক ভিডিও ও ছবি বিভিন্নজনের কাছে রয়েছে। লোকজনের মোবাইল ফোনে সে এসব পাঠিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে। ঘটনার পর বিভিন্ন তরফ থেকে আলমের আক্রোশের শিকার হওয়া অনেকেই তার সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। ব্ল্যাকমেইলে শিকার হওয়া এক ব্যবসায়ী জানান, আলম তথা নানা ভাইয়ের ডেরায় মাদক ছিল ওপেন সিক্রেট। নগরের জান্নাত, বৃষ্টি, তানিয়া ও ইমা সহ বিভিন্ন নামের তরুণীরা নিয়মিত আসতো। এর বাইরে ঢাকা থেকে কলগার্ল আনা হতো। ঢাকার নাটক ও চলচ্চিত্র পাড়ার অনেক নায়িকাও তার ডাকে সাড়া দিয়ে আসতো। ফলে সিলেটের ভিআইপি অনেকেই তার কাছে ছুটে যেতেন। হাই অফিসিয়ালরা যেতেন। এ ছাড়া জাফলং, ভোলাগঞ্জ, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বড় বড় ব্যবসায়ীরা নিয়মিত যাতায়াত করতেন। তার ছোট ভাই ও স্বেচ্ছাসেবকলীগ ক্যাডার তাজুলকে দিয়ে সন্ত্রাসী বাহিনী গড়ে তুলে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে রাখে। তাজুল হচ্ছে সিলেটের আলোচিত ক্যাডার পীযূষের সহযোগী। এয়ারপোর্ট রুটের পর্যটন মোটেলে ঢোকার পথেই শাপলা হলিডে হোম। উল্টো দিকে পর্যটনের বার। ওই বারের নিচে তাজুল ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী দিনে ও রাতে বসে আড্ডা দিতো। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মুহিনের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা দায়েরের পর থেকে নিয়মিত পুলিশ আসতো রিসোর্টে। তল্লাশি করছে। এ কারণে পালিয়ে বেড়াচ্ছে নানা ভাই আলম। ক’দিন ধরে এলাকা ছাড়া রয়েছে তাজুল ও সন্ত্রাসী বাহিনী। এতে করে এলাকায় স্বস্তি ফিরেছে। তারা জানান, শাপলা হলিডে হোমের নানা কর্মকাণ্ড প্রকাশ পাওয়ার পর ফ্ল্যাট বাড়িতে পরিবার নিয়ে বসবাসকারীরাও ছেড়ে যাচ্ছেন। আলমের কর্মকাণ্ডে তাদের মধ্যে ভয় ঢোকার কারণে তারা অন্যত্র চলে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
mzamin

Sunday, April 27, 2025

৫৭৯ জনকে দেয়া হবে অস্ত্র: গুলির ক্ষমতা পাচ্ছে নারকটিস by শুভ্র দেব

অভিযানে গিয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা বিভিন্ন সময় অপ্রীতিকর অবস্থায় পড়েন। মাদক ব্যবসায়ীদের হামলায় কর্মকর্তারা আহত হওয়ার ঘটনা অহরহ। মাদক ব্যবসায়ীদের আগ্নেয়াস্ত্রের দাপটে অনেক সময় অভিযান শেষ না করেই ফিরতে হয় কর্মকর্তাদের। এতে করে পার পেয়ে যেতেন মাদক  ব্যবসায়ীরা। কর্মকর্তাদের হাতছাড়া হতো মাদকের চালান।  তাই দীর্ঘদিন ধরে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দাবি ছিল অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি। কিন্তু নানা প্রতিবন্ধকতায় সেটি আর হয়নি। যদিও তারা দাবি অব্যাহত রেখেছিলেন। অবশেষে পেশাগত কাজে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি পেলেন ডিএনসি কর্মকর্তারা। অভিযান পরিচালনাকারী কর্মকর্তারা এখন থেকে ৯ এমএম আধা-স্বয়ংক্রিয় পিস্তল ব্যবহার করবেন। এ নিয়ে মন্ত্রণালয় অস্ত্র সংগ্রহ ও ব্যবহারের নীতিমালা অনুমোদন করে গেজেট প্রকাশ করেছে। গত ২১শে এপ্রিল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের অস্ত্র সংগ্রহ ও ব্যবহারের সংশোধিত নীতিমালা অনুমোদন করে গেজেট আকারে প্রকাশ করেছে।

অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের মাদক-১ শাখার নীতিমালায় বলা হয়েছে, অধিদপ্তরের মোট জনবল ৩ হাজার ৫৯ জন। এর মধ্যে ৫৭৯ জন অস্ত্র ব্যবহার করবেন। অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক থেকে সাব-ইন্সপেক্টর পর্যন্ত ৫৭৯ জন কর্মকর্তাকে অস্ত্র ব্যবহারের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে উপ-পরিচালক ৯০ জন, সহকারী পরিচালক ৯৩ জন, পরিদর্শক ১৮৬ জন ও ২১০ জন উপ-পরিদর্শক অস্ত্র পাবেন। তারা ৯ এমএম আধা-স্বয়ংক্রিয় পিস্তল বহন করবেন। এই অস্ত্র তুলনামূলক কম দামের হলেও কিছুটা আধুনিক। পুলিশ, আনসার, বিজিবি বা অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য, ন্যূনতম ক্ষয়ক্ষতি ও উদ্দেশ্য সাধনের দিকে দৃষ্টি রেখে প্রস্তাব করা হয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে- একমাত্র সর্বশেষ পন্থা হিসেবে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা যাবে। তবে আদেশ প্রদানকারীকে অধিদপ্তর বা নির্বাহী তদন্তে গুলি করার যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে হবে। গুলি করার আদেশ দেয়ার আগে লাঠিপেটা ও অস্ত্রের বাট দিয়ে আঘাত করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করতে হবে। কোনো অবস্থাতেই অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করা যাবে না। যতো দূর সম্ভব ন্যূনতম বলপ্রয়োগে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে হবে। তাতে কাজ না হলে দু-একটি গুলি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে। কোনোভাবেই প্রথমে দু’টি ফাঁকা ও সরাসরি একটির বেশি গুলি চালানো যাবে না। সুরক্ষিত অস্ত্রাগার না হওয়া পর্যন্ত অস্ত্র সংরক্ষণ করতে হবে জেলা প্রশাসকের ট্রেজারি রুম অথবা জেলা পুলিশ লাইন্স বা সংশ্লিষ্ট থানার অস্ত্রাগারে। এক্ষেত্রে অবশ্যই রেজিস্ট্রার সংরক্ষণ করতে হবে। অস্ত্র সংরক্ষণের জন্য প্রধান কার্যালয়সহ অধিদপ্তরের নিজস্ব সকল অফিস ভবনে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও যথাযথ প্রশিক্ষণ প্রদানের মাধ্যমে প্রশিক্ষিত জনবল নিশ্চিত করে নিজস্ব আরমারি বা অস্ত্রাগার নির্মাণ করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

ডিএনসি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রশিক্ষণের বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বা বিজিবি বা আনসার বা পুলিশ বিভাগের সহযোগিতায় সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণ একাডেমিতে অধিদপ্তরের অগ্রাধিকারভুক্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পরে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্য থেকে দক্ষ প্রশিক্ষক তৈরি করে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ দিতে হবে। গুলি করার প্রয়োজন হলে প্রথমে কারও দিকে তাক না করে আকাশের দিকে ফাঁকা গুলি ছুড়তে হবে। পাশাপাশি হ্যান্ড মাইকে ঘোষণা দিতে হবে। প্রথমে ন্যূনতম বল প্রয়োগ করে লাঠিচার্জ ও অস্ত্রের বাট দিয়ে আঘাতের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এক থেকে দু’টি গুলি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে এর বেশি গুলি করা যাবে না। ফাঁকা গুলির মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে একজন মাদক কারবারির কোমরের নিচে, হাঁটু অথবা পায়ে একটি গুলি করা যাবে। যেকোনো একজনের দিকে তাক করার সময় খেয়াল রাখতে হবে বর্ষিত গুলি যেন কোনোক্রমেই পেছনে অন্য কাউকে আঘাত না করে।

ঘনবসতি অথবা আবাসিক এলাকায় অথবা সমবেত উচ্ছৃৃঙ্খল জনতার ওপর গুলিবর্ষণের সময় খেয়াল রাখতে হবে নিরপরাধ জনগণ যেন আঘাত না পায়। গুলি করার পর গুলির খোসা অবশ্যই সংগ্রহের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সদস্যরা যেন কিংকর্তব্যবিমূঢ় বা ভয় পেয়ে এলোপাতাড়ি গুলি না করে। প্রতিটি ক্ষেত্রে গুলির আদেশ প্রদানকারী ব্যক্তি গুলিবর্ষণের আদেশ দেয়ার যৌক্তিকতা পরবর্তীতে যুক্তিযুক্তভাবে উপস্থাপনের জন্য দায়ী থাকবেন। গুলির ঘটনা ঘটলে তা তাৎক্ষণিকভাবে অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় বা মেট্রো বা জেলা বা বিভাগীয় গোয়েন্দা বা বিশেষ জোন কার্যালয়ের নিয়ন্ত্রণকারী কর্মকর্তা মহাপরিচালককে অবহিত করবেন। অভিযানকারী দলের দলনেতা যতো শিগগির সম্ভব মৃত দেহগুলোকে পুলিশ না আসা পর্যন্ত পাহারা দেয়ার ব্যবস্থা করবেন এবং আহতদের হাসপাতালে প্রেরণ করবেন। তিনি গুলির খোসা সংগ্রহ করে ইস্যুকৃত রাউন্ড সংখ্যার সঙ্গে মিলিয়ে দেখবেন। প্রতি ক্ষেত্রেই গুলিবর্ষণের পর যথা শিগগির সংশ্লিষ্ট থানায় এজাহার বা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করতে হবে। তবে মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা, আসামি গ্রেপ্তার ও আলামত উদ্ধার, আত্মরক্ষা এবং সরকারি সম্পত্তি- অস্ত্রশস্ত্র, গোলাবারুদ, স্থাপনা, যানবাহন উদ্ধার, উদ্ধারকৃত আলামত, আসামি, জব্দকৃত আলামত, সম্পদ রক্ষা করার আইনানুগ অধিকার রক্ষার্থে শক্তি প্রয়োগ তথা অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করা যাবে। তবে যেকোনো অবস্থাতেই অতিরিক্ত বল প্রয়োগ করা যাবে না এবং ঘটনার পর যুক্তিযুক্ত ও গ্রহণযোগ্যভাবে বল প্রয়োগ বা গুলিবর্ষণের প্রমাণ দেখাতে হবে।  

ডিএনসি কর্মকর্তারা বলেছেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ মাদক ব্যবসায়ীরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে। অভিযানে গেলে তারা কর্মকর্তার উপরে হামলা ও গুলি করে। তাই অভিযান পরিচালনা করতে হলে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নিতে হয়। অনেক সময় জরুরি অবস্থায় সময়ের কারণে অন্যান্য বাহিনীর সহযোগিতা পাওয়া যায় না। এ সময় ঝুঁকি নিয়ে নিরস্ত্র অবস্থায় ডিএনসি কর্মকর্তাদের অভিযান চালাতে হয়। তাই এসব দিক বিবেচনা করে কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল- অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি। ২০০৮ সাল থেকে অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাদকবিরোধী অভিযানে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি চাইলেও নানা জটিলতা ও বিভিন্ন পক্ষের আপত্তিতে বিষয়টি ঝুলে যায়। এই সময়ে নিরস্ত্র অধিদপ্তরের সদস্যরা মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনাকালে অবৈধ মাদকদ্রব্য উদ্ধারের পাশাপাশি ৭৮টি পিস্তল, ৭টি শর্টগান, ২৭টি ম্যাগাজিন, ১৭টি রিভলবার, একটি এয়ারগান, ১ হাজার ১ রাউন্ড গুলি উদ্ধার ও জব্দ করে। মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে বিগত ১০ বছরে অভিযান পরিচালনাকালে অধিদপ্তরের ১২৫ জন সদস্য গুরুতর আহত হন। দু’জন প্রাণও হারান।

নাটোর জেলার উপ-পরিচালক মেহেদী হাসান মানবজমিনকে বলেন, মাদকের অভিযান পরিচালনা অনেক সময় ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়। নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয়। এখন সঙ্গে অস্ত্র থাকায় আমাদের মনোবল অনেক বেড়ে যাবে। ঝুঁকিপূর্ণ হলেও পিছপা হতে হবে না। এতে করে অধিদপ্তরের কাজে আরও বেশি গতি আসবে। উদ্ধারও বাড়বে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ঢাকা মেট্রো উত্তরের উপ-পরিচালক শামীম আহমেদ বলেন, সার্বিকভাবে সকল কাজকর্মে আমাদের মনোবল বৃদ্ধি পাবে। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করি কিন্তু নিরস্ত্র থাকার কারণে নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রাখতে হতো। মাদক ব্যবসায়ীরা মানসিকভাবে চাঙ্গা থাকতো। কারণ তারা ভাবতো আমাদের কাছে অস্ত্র নাই। আমরা আর কী করতে পারবো। এখন তারাও মনে করবে কর্মকর্তাদের হাতে অস্ত্র থাকবে। আমরা আক্রমণ করলে তারাও নিজেদের আত্মরক্ষার্থে আক্রমণ করতে পারবে।

mzamin

Monday, March 10, 2025

ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড!

এক কিলোগ্রাম মাদক দ্রব্য (৩, ৪ মিথালেনিডাই অক্সিমেথামফেটামিন) এমডিএমএ সরবরাহ দেয়ার অভিযোগে মৃত্যুর ঝুঁকিতে এক বৃটিশ। তিনি পেশায় একজন ইলেকট্রিশিয়ান। যদি আদালতে অভিযুক্ত প্রমাণিত হন তাহলে তাকে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দেশ আসতে পারে। ওই বৃটিশ ইলেকট্রিশিয়ানের নাম টমাস পার্কার (৩২)। তার বাড়ি কামব্রিয়াতে। ওয়াকিংটনের কাছে সিয়াটন গ্রামে তার বসত। এ বছর জানুয়ারিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে মাদক সরবরাহ দেয়ার অভিযোগে। এরপর বিশ্ব মিডিয়ার সামনে তাকে হাজির করা হয় কমলা রঙের জাম্পস্যুট পরিহিত অবস্থায়। পুলিশ বলেছে, তিনি ‘এ শ্রেণির’ মাদক ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছিলেন। ওই মাদক ডাকে আসা একটি প্যাকেজে পাওয়া গেছে। যদি অভিযুক্ত প্রমাণ করা যায় তাহলে ফায়ারিং স্কোয়াডে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে পারে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন ডেইলি মেইল। পার্কারের একজন সদস্য বলেছেন, টমাস পার্কার এখন যে করুণ অবস্থায় আছেন সে সম্পর্কে তাদের বলার কিছু নেই।  কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি নীরব কামব্রিয়ান গ্রামটিতে। স্থানীয় একজন ব্যক্তি বললেন, সিয়াটন একটি ছোট্ট ভালোবাসাময় গ্রাম। সেখানকার অনুগত একজন মানুষ পার্কার। টমাস পার্কারের বিষয়ে আসলে কী হয়েছে সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। ওই ব্যক্তি পরিবারটির জন্য বেদনা বোধ করেন। বলেন, তাদের এমন প্রাপ্য হওয়ার কথা ছিল না। কি এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার!

উল্লেখ্য, স্টেনিবার্ন স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন টমাস পার্কার। পরে তিনি লিভিহলে লেকস কলেজে পড়াশোনা করেন। তারপর একজন ইলেকট্রিশিয়ান হিসেবে প্রশিক্ষণ নেন। অস্ট্রেলিয়াতে অভিবাসী হন। উল্লেখ্য, পার্টিতে উত্তেজনা সৃষ্টিকারী মাদক হিসেবে এমডিএমএ প্রধান উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। জানুয়ারিতে একটি বাসার বাইরে থেকে গ্রেপ্তার করা হয় টমাস পার্কারকে। কিন্তু বিষয়টি এতদিন কেউ জানতে পারেনি। এ সপ্তাহে সংবাদ সম্মেলনে মাত্র পার্কারকে হাজির করা হয়। এ সময় তার মুখ ছিল সেভ করা। হাতে ছিল হ্যান্ডকাফ পরানো। এ সপ্তাহে বৃটেনের ফরেন, কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের এক মুখপাত্র বলেছেন, বালিতে একজন বৃটিশকে আটক করা হয়েছে। তাকে আমরা সাপোর্ট দিচ্ছি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ রাখছি আমরা।

কর্তৃপক্ষ বলছে, টমাস পার্কারকে সন্দেহজনক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকার বিষয়টি নজরে আসে কর্মকর্তাদের। ২১শে জানুয়ারি একজন মোটরসাইকেল ট্যাক্সিচালকের কাছ থেকে তিনি একটি প্যাকেজ সংগ্রহ করেন। এরপর তার আচরণ সন্দেহজনক দেখা যায়। এরপরই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার আগে পার্কারের দিকে অগ্রসর হয় পুলিশ। কিন্তু ওই প্যাকেজটি ফেলে ভয়ে ঘটনাস্থল থেকে পালাতে থাকেন পার্কার। পরে তাকে নর্থ কুতা’য় ‘৭ সিস ভিলায়’ শনাক্ত করা হয়। পুলিশ দেখতে পায়, ফেলে যাওয়া প্যাকেজটি পার্কারের। আটকের পর তিনি স্বীকার করেন এই প্যাকেজ তারই ছিল। পুলিশ বলেছে, তারা ওই প্যাকেজটি খুলে তার ভেতর হালকা বাদামি পাউডার দেখতে পায়। পরে সেটা এমডিএমএ হিসেবে শনাক্ত হয়। টমাস পার্কারকে জানুয়ারিতে রিমান্ডে নেয়া হয়।

বর্তমানে অভিযোগ, তিনি মাদক আমদানি করেন। পাচার করেন। মাদক রাখেন। এসব অভিযোগে অভিযুক্ত হলে পার্কারের মৃত্যুদণ্ড হতে পারে ইন্দোনেশিয়ার আইনে। তার বিরুদ্ধে মাদকের বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। ওদিকে টমাস পার্কারের ফোন ও অন্য জিনিসপত্র একটি প্লাস্টিকের সিল করা ব্যাগে রাখা হয়েছে। প্রমাণ হিসেবে এসব উপস্থাপন করার কথা। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল রুডি বলেন, অনুসন্ধান ও গ্রেপ্তার অভিযানের পর টমাস পার্কার ও তার সঙ্গে তথ্যপ্রমাণ আরও তদন্তের জন্য নিয়ে যাওয়া হয়েছে বালি প্রভেন্স ন্যাশনাল নারকোটিকস এজেন্সির অফিসে। এই এজেন্সির প্রধান বলেছেন, আন্তর্জাতিক মাদকের ডিলারদের অন্যতম সদস্য পার্কার। এই সংগঠনটি হাঙ্গেরিভিত্তিক। টমাস পার্কার বলেছেন, তার বস তাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, থাইল্যান্ড থেকে একটি প্যাকেজ যাবে বালিতে। তা যেন তিনি সংগ্রহ করেন।

কর্তৃপক্ষ বলছে, যে পার্সেল গ্রহণ করেছেন পার্কার তাতে আছে এমডিএমএ। এ জিনিসটি ইন্দোনেশিয়ায় বেআইনি এবং শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। পার্কারকে রিমান্ডে নিরাপদ হেফাজতে রাখা হয়েছে। তদন্ত চলাকালে সেখানেই থাকতে হবে তাকে। এর মধ্যে ওই প্যাকেজটি কে পাঠিয়েছিল, তা জানার চেষ্টা করে বালি কর্তৃপক্ষ। এ জন্য তারা পার্কারকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করবে। যদি জিজ্ঞাসাবাদে তিনি সহযোগিতা করেন, তাহলে তার শাস্তি লঘু হতে পারে।

mzamin

Friday, February 21, 2025

ভারতে উৎপাদিত মাদকে মৃত্যুর ঝুঁকিতে পশ্চিম আফ্রিকার লাখো যুবক -বিবিসি

অবৈধভাবে নিষিদ্ধ ওপিওয়েড মাদক তৈরি করছে ভারতের একটি ওষুধ কোম্পানি। যা ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে। মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হওয়ায় বিশ্বব্যাপী ওই ওপিওয়েড মাদক নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর উৎপাদন এবং আমদানি-রপ্তানিতে রয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। তবে বৃটিশ গণমাধ্যম বিবিসির এক অনুসন্ধানে জানা গেছে, ট্যাপেনটাডল ও ক্যারিসোপ্রোডলের মতো মানবদেহের জন্য ভয়াবহ রকমের ক্ষতিকর ওপিওয়েড মাদক উৎপাদন করছে মুম্বাই-ভিত্তিক অ্যাভিও ফার্মাসিউটিক্যালস নামের একটি ওষুধ কোম্পানি। বিশ্বের কোথাও এই মাদক উৎপাদনের অনুমতি নেই। কিন্তু অ্যাভিও এসব মাদক উৎপাদন করে তা পশ্চিম আফ্রিকার দেশ ঘানা, নাইজেরিয়া এবং আইভরি কোস্টের মতো দেশগুলোতে ছড়িয়ে দিচ্ছে। যার ফলে মৃত্যুর ঝুঁকিতে পড়েছে এসব দেশের লাখ লাখ যুবক।

এ বিষয়ে বিশদ তদন্ত করেছে বিবিসি’র আই ইনভেস্টিগেশন ইউনিট। তারা দেখতে পেয়েছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে পাওয়া ওই ওপিওয়েড মাদকগুলোর উৎপাদন হচ্ছে ভারতে। যা তৈরি হচ্ছে মুম্বাই-ভিত্তিক ওষুধ কোম্পানি অ্যাভিওর কারখানায়। অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে এই অনুসন্ধান চালিয়েছে বিবিসির ওই বিশেষ ইউনিট। তারা অ্যাভিওর অন্যতম পরিচালক বিনোদ শর্মার ভিডিও ধারণ করেছে। যেখানে বিনোদ স্বীকার করেছেন যে, ভয়াবহ ওই মাদক ওষুধের নামে বাজারজাত করছে তার কোম্পানি। এর ভয়াবহতা জানা সত্ত্বেও তিনি এই বিষয়টিকে শুধুমাত্র ব্যাবসায়িক উদ্দেশ্য বলে উল্লেখ করেছেন। বিনোদ জানিয়েছেন, ওপিওয়েডের বড়িগুলো বেশ সস্তায় বিক্রি করা হচ্ছে। বিশেষ করে কিশোর, তরুণদের লক্ষ্য করে ভয়াবহ ওই মাদক আফ্রিকার পশ্চিমাঞ্চলের দেশগুলোতে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। যার ফলে সেখানে তরুণ এবং কিশোরদের মৃত্যুর ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে আছে ঘানার তামালেতে নামক অঞ্চল। সেখানের প্রায় প্রতিটি যুবকই এই ওপিওয়েডের প্রতি আসক্ত। চোরাকারবারিদের ওপর অভিযান চালিয়ে এই মাদকের বিলোপ সাধন করতে একটি স্বেচ্ছাসেবী টাস্ক ফোর্স গঠন করেছিলেন অঞ্চলটির এক নেতা। যার নাম আলহাসান মাহাম। তবে তিনি জানিয়েছেন, তার গঠিত টাস্ক ফোর্সটি কার্যকর কোনো ভূমিকা পালন করতে পারেনি। কেননা প্রতিনিয়ত ওপিওয়েড বন্যার পানির মতো সমস্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ঘানার পাশাপাশি নাইজেরিয়া এবং আইভরি কোস্টেও একই মাদক পাওয়া যাচ্ছে। যেখানে কিছু ব্যবহারকারীরা এনার্জি ড্রিংকের সঙ্গে মিশিয়ে ওপিওয়েড সেবন করছে।
এই ওপিওয়েড উৎপাদনে ভারতের অ্যাভিও ফার্মাসিউটিক্যালসের সহযোগী হিসেবে কাজ করছে ওয়েস্টফিন ইন্টারন্যাশনাল নামের আরেক কোম্পানি। মূলত এই কোম্পানিটির মাধ্যমেই পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোতে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে নিষিদ্ধ ওই ড্রাগ। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, শুধুমাত্র নাইজেরিয়াতেই এই মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা ৪০ লাখের ওপরে। তবে এই মাদক মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছে নাইজেরিয়ার সরকার।

ইতিমধ্যেই ভয়াবহ এ মাদকের বিষয়ে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, ট্যাপেন্টাডল ও ক্যারিসোপ্রোডলের সংমিশ্রণ ট্রামাডলের চেয়েও আরও বেশি ভয়াবহ। মানবদেহের জন্য এই মাদক অত্যন্ত ক্ষতিকর। এর ফলে একজন সেবনকারী দ্রুতই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে পারে। এই মাদক গ্রহণের ফলে ব্যবহারকারীর ঘুম, শ্বাসকষ্ট এবং মৃত্যুও হতে পারে। এসব নেতিবাচক প্রভাবের ফলে ইউরোপের দেশগুলোতে এই মাদক নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

মাদকের এই চোরাচালানের বিষয়ে অবহিত রয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। দেশটির সেন্ট্রাল ড্রাগস স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন (সিডিএসসিও) দাবি করেছে যে, তারা যেকোনো অনিয়ম মোকাবিলায় রপ্তানি পর্যবেক্ষণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, আফ্রিকাতে নিষিদ্ধ ওই মাদক রপ্তানির জন্য ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দুর্বল নজরদারিই দায়ী। যার ফলে ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়েছে পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলোর জনস্বাস্থ্য।

mzamin

Wednesday, October 30, 2024

দুতের্তে ডেথ স্কোয়াড গড়েছিলেন গ্যাংস্টারদের নিয়ে

স্বীকার করলেন ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রড্রিগো দুতের্তে। স্বীকার করলেন দেশটির সবচেয়ে বড় শহরগুলোর একটির মেয়র থাকার সময়ে অপরাধ দমনে তার ছিল ‘ডেথ স্কোয়াড’। মাদকের বিরুদ্ধে তার কথিত যুদ্ধের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরুর আগেই প্রথম সাক্ষ্যে তিনি বিষয়টি স্বীকার করে নেন। ৭৯ বছর বয়সী এই নেতা বলেন, গ্যাংস্টারদের নিয়ে তিনি গঠন করেছিলেন ওই স্কোয়াড। তাদেরকে তিনি নির্দেশ দিয়েছিলেন ওইসব ব্যক্তিকে হত্যা করতে। যদি তারা সেটা না করতো তাহলে তিনি ওই সদস্যকে হত্যা করবেন। এমন হুমকি দেয়ায় তার স্কোয়াড অপরাধী সন্দেহে, মাদকের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনদের হত্যা করিয়েছেন। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

২০১৬ সালের নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়ে তিনি ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট হন। তবে তার আগে প্রতিশ্রুতি দেন, ডাভাও শহরে তিনি যেভাবে অপরাধবিরোধী অভিযান চালিয়েছেন, একইভাবে জাতীয় পর্যায়ে অভিযান চালাবেন।  প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে তিনি সেই কাজ শুরু করেন। হত্যা করা হয় কয়েক হাজার সন্দেহভাজনকে। মাদকের বিরুদ্ধে দেশ জুড়ে যুদ্ধে তিনি পুলিশের বিতর্কিত অভিযানে এসব মানুষকে হত্যা করান। এখন বিষয়টি তদন্ত করছে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি)। সোমবার সিনেটে শুনানিকালে দুতের্তে বলেন, তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের উৎসাহিত করেছিলেন সন্দেহভাজনদের হত্যা করতে। যাতে তারা এই হত্যার ন্যায্যতা দিতে পারেন। বক্তব্যে দুতের্তে বলেন, আমার পলিসি নিয়ে প্রশ্ন করবেন না। কারণ, আমি ক্ষমাও চাইবো না। কোনো অজুহাতও দাঁড় করাবো না। যা করা উচিত ছিল, আমি তাই করেছি। আপনি বিশ্বাস করুন বা না করুন, যা করেছি তা আমার দেশের জন্য। আমি মাদককে ঘৃণা করি। তাই এ বিষয়ে কোনো ভুল করিনি। সন্দেহভাজনদেরকে হত্যা করতে পুলিশ প্রধানদের অনুমতি দেয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন তিনি। তবে স্বীকার করেন, পুলিশ সদস্যদের দিয়ে নয়, ডেথ স্কোয়াড গঠন করা হয়েছিল গ্যাংস্টারদের নিয়ে। বলেন, আপনারা যদি চান তাহলে আমি এখনই স্বীকারোক্তি দিতে পারি। আমার ছিল সাত সদস্যের একটি ডেথ স্কোয়াড। তারা পুলিশ নয়। নিজের নির্দেশের পক্ষে অবিচল থেকে দুতের্তে বলেন, বহু অপরাধী তাদের বেআইনি কর্মকাণ্ড শুরু করেছে তিনি প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে যাওয়ার পর। তার ভাষায়, যদি আমাকে আরেকবার সুযোগ দেয়া হয়, তাহলে তাদের সবার শিকড় উপড়ে ফেলবো।

২০২২ সালে তার ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু মাদকের বিরুদ্ধে যে অভিযান চালিয়েছেন এবং মানুষ হত্যা করেছেন তার তদন্তে প্রথমবার সোমবার তিনি উপস্থিত হন সিনেটে। তার বিরুদ্ধে যাদের অভিযোগ, তাদের কয়েকজনের সরাসরি মুখোমুখি দাঁড়ান এদিন দুতের্তে। ওইসব অভিযোগকারীর মধ্যে আছেন মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা। সাবেক সিনেটর লেইলা ডি লিমা। তিনি দুতের্তের কঠোর সমালোচক। মাদক বিষয়ক অভিযোগে তাকে সাত বছর জেলে কাটাতে হয়েছে। পরে সেই অভিযোগ প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফিলিপাইন সরকারের হিসাবে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হত্যা করা হয়েছে কমপক্ষে ৬ হাজার ২৫২ মানুষকে। অধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো বলেছে, এর প্রকৃতসংখ্যা হতে পারে কয়েক লাখ। মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘের হাইকমিশনারের এক রিপোর্টে দেখা গেছে, দুতের্তে মাদকের বিরুদ্ধে দমনপীড়ন চালাতে পুলিশ কর্মকর্তাদের যে নির্দেশ দিয়েছেন তা তাদেরকে হত্যা করার অনুমোদন হিসেবে দেখা যেতে পারে। পুলিশ বলেছে, আত্মরক্ষা করতে গিয়ে বন্দুকযুদ্ধে তাদের কিছু সদস্যও নিহত হয়েছেন।

mzamin

Friday, September 10, 2021

ইয়াবা, ফেনসিডিল, হেরোইন খেলে কী হয় by মিজানুর রহমান খান

ইয়াবা ট্যাবলেট- বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয়
বাংলাদেশে বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও আলোচিত মাদক ইয়াবা। বলা হচ্ছে, দেশে ইয়াবাসেবীর সংখ্যা ৭০ লাখের উপরে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণা সাময়িকীতে সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মাদকাসক্তদের ৫৮ শতাংশ ইয়াবাসেবী। ২৮ শতাংশ আসক্ত ফেনসিডিল এবং হেরোইনে।
গবেষকরা বলছেন, অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের কাছে ইয়াবা জনপ্রিয় হতে শুরু করে ২০০০ সালের পর থেকে যখন টেকনাফ বর্ডার দিয়ে মিয়ানমার থেকে এই ট্যাবলেট আসতে শুরু করে। তারপর এটি খুব দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ে। তার আগে নব্বই এর দশকে জনপ্রিয় ড্রাগ ছিল হেরোইন।
তারও আগে আশির দশকে ফেনসিডিল, সেটি নব্বই এর দশকেও ছিল।
ঢাকায় মুক্তি নামের একটি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে বেডের সংখ্যা ১০০। এই কেন্দ্রের কর্মকর্তারা বলছেন, চিকিৎসার জন্যে তাদের কাছে যতো রোগী আসেন তার ৮০ শতাংশই এখন ইয়াবাসেবী। হেরোইন ও ফেনসিডিলের চল এখনও আছে, কিন্তু সীমিত পর্যায়ে।
ইয়াবার জনপ্রিয়তার পেছনে দুটো কারণকে উল্লেখ করছেন চিকিৎসকরা।
  • একটি কারণ শরীরের উপর এর তাৎক্ষণিক প্রভাব
  • আর অন্যটি সহজলভ্যতা।
মুক্তির প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রধান কনসালটেন্ট ড. আলী আসকার কোরেশী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "ইয়াবা গ্রহণ করলে সেটি শুরুতেই মানুষকে চাঙ্গা করে তোলে। আর সব মানুষই নিজেকে চাঙ্গা দেখতে ভালোবাসে। একারণে তারা ইয়াবার দিকে ঝুঁকে পড়ে।"
"এটি অত্যন্ত ছোট্ট একটি ট্যাবলেট। ওয়ালেটে এবং নারীদের ভ্যানিটি ব্যাগেও এটি সহজে বহন করা যায়। অনলাইনে অর্ডার দিলে পৌঁছে যায় বাড়িতে। মোবাইল ফোনের বিভিন্ন যোগাযোগ অ্যাপের মাধ্যমে অর্ডার দেওয়া যায়। কিন্তু ফেনসিডিলের জন্যে বড় বোতল লাগে। সেটা বহন করা, খাওয়ার পর ফেলা অনেকের জন্যেই ঝামেলার। এছাড়াও এটি অনেক বেশি পরিমাণে খেতে হয়," বলেন মনোবিজ্ঞানী ড. মোহিত কামাল, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ মেনটাল হেলথের সাইকোথেরাপির অধ্যাপক তিনি।
গবেষকরা বলছেন, মাদকাসক্তদের মধ্যে নারীর সংখ্যা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ। তবে তাদের প্রকৃত সংখ্যা কতো সেটা বলা কঠিন।
"মনে রাখতে হবে ছেলেরা যতো সংখ্যায় চিকিৎসা নিতে আসে, মেয়েরা কিন্তু অতোটা আসে না। সামাজিক কারণেই তাদের নেশা সংক্রান্ত সমস্যা পরিবার থেকে গোপন রাখা হয়। ফলে এটা বোঝা একটু কঠিন যে মেয়েরা কি পরিমাণে আসক্ত," বলেন মি. কোরেশী।
মনোবিজ্ঞানী ড. কামাল জানিয়েছেন, মেয়েদের ইয়াবার নেশা শুরু হয় ঘুমের বড়ি থেকে। নানা ধরনের মানসিক যন্ত্রণার কারণে তারা যখন রাতে ঘুমাতে পারে না তখন তারা ঘুমের বড়ির আশ্রয় নেয়। তারপর ধীরে ধীরে ইয়াবার মতো অন্যান্য মাদকেও আসক্ত হয়ে যায়।
কর্মকর্তারা বলছেন, বাংলাদেশের আইন অনুসারে হেরোইন হচ্ছে 'ক শ্রেণি'র মাদক আর ফেনসিডিল ও ইয়াবা 'খ শ্রেণি'র।

কোন ধরনের মাদক?

ইয়াবা হচ্ছে এমফিটামিন জাতীয় ড্রাগ- মেথাএমফিটামিন।
অনেকের মধ্যেই এটি সম্পর্কে ভুল ধারণা আছে। তারা মনে করেন, ইয়াবা ট্যাবলেটের মতো গিলে খাওয়া হয়। আসলে কিন্তু তা নয়।
হেরোইনের মতো করেই খেতে হয় ইয়াবা। এলোমুনিয়ামের ফয়েলের উপর ইয়াবা ট্যাবলেট রেখে নিচ থেকে তাপ দিয়ে ওটাকে গলাতে হয়। তখন সেখান থেকে যে ধোঁয়া বের হয় সেটা একটা নলের মাধ্যমে মুখ দিয়ে গ্রহণ করা হয়। তখন সেটা মুহূর্তের মধ্যেই সরাসরি স্নায়ুতন্ত্রে গিয়ে প্রভাব ফেলতে শুরু করে।
ইয়াবাকে বলা হয় 'আপার ড্রাগ' কারণ এটি গ্রহণ করলে শুরুতে সে শারীরিক ও মানসিকভাবে চাঙ্গা হয়ে ওঠে।
হেরোইন ও ফেনসিডিল হচ্ছে ইয়াবার বিপরীতধর্মী ড্রাগ। এগুলো নারকোটিক এনালজেসিক। অর্থাৎ ব্যথানাশক ওষুধ। এটিকে বলা হয় 'ডাউনার ড্রাগ' কারণ এটি খেলে সে ঝিম মেরে থাকে।
চিকিৎসকরা বলছেন, এই দুটো একই ধরনের মাদক। হেরোইন হচ্ছে ওপিয়ামের একটি প্রাকৃতিক ডেরিভেটিভ আর ফেনসিডিল সিনথেটিকের। এই দুটো ড্রাগের মধ্যে যে রাসায়নিকটি থাকে সেটি হচ্ছে কোডিন ফসফেট। হেরোইনের মধ্যে এটি একটু বেশি পরিমাণে থাকে।
কোডিন ফসফেট খেলে মানুষ স্বপ্নের রাজ্যে বিচরণ করে। নিজেকে রাজা বাদশাহ ভাবতেও অসুবিধা হয় না।

শরীরের উপর প্রভাব

মুক্তির চিকিৎসক আলী আসকার কোরেশী বলেন, " ইয়াবা খেলে শরীরে উত্তেজনা আসে। ফলে ঠিকমতো ঘুম হয় না। এক নাগাড়ে দুই তিনদিনও না ঘুমিয়ে জেগে থাকতে পারে। মনে করে যে সে ভীষণ কাজ কর্ম করবে কিন্তু আসলে কোন কাজই হয় না। কেউ হয়তো মনে করে যে আমি আজকে রাতে পড়ে কাল পরীক্ষা দেব, কিন্তু সে সারা রাত ধরে একটা পাতাও উল্টাতে পারে না, এক পাতাতেই বসে থাকে।"
আবার যখন ঘুমিয়ে পড়ে তখন আবার এক নাগাড়ে দুই তিনদিন ঘুমাতে থাকে।
অন্যদিকে, ফেনসিডিল ও হেরোইন খেলে শরীরে ঘুম ঘুম ভাব আসে। তন্দ্রার মতো হয়। "একটা জায়গায় বসে তারা ঝিমুতে থাকে। সিগারেটের পর সিগারেট, চায়ের পর চা খেতে থাকে। এবং তখন সে কল্পনার রাজ্যে বিচরণ করে।"
মোহিত কামাল বলছেন, "যতো মাদক আছে সেগুলোর সবই মানুষের 'মস্তিষ্কের পুরষ্কারতন্ত্রের' মাধ্যমে কাজ করে। কারণ উদ্দীপ্ত হলে মানুষ একই কাজ বারবার করতে বাধ্য হয়। ব্রেনের ভেতরে ডোপামিন নিঃসরণ ঘটে। সেটা শরীরের ভেতরে একটা উত্তেজনা তৈরি করে। সব মাদকের বেলাতেই মোটা-দাগে প্রভাবটা এরকম।"
"যখন নেয় তখন শরীরে একটু ফুরফুরা ভাব কাজ করে। কিন্তু যখন নেয় না তখন শরীরে ব্যথা করে। মাংসপেশিতে ব্যথা হয়। হাড়ের ভেতরে শিরশির করতে থাকে। এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে তারা আবারও মাদক নিতে বাধ্য হয়," বলেন তিনি।
  • ইয়াবায় শরীর চাঙা হয়
  • রাতের পর রাত জেগে থাকা যায়
  • যৌন উদ্দীপনা বেড়ে যায়
  • হেরোইন ও ফেনসিডিল খেলে শরীর ঝিম মেরে থাকে
  • তখন বিচরণ করে কল্পনার রাজ্যে
তিনি বলেন, "যেখানে যাকে যেভাবে মোটিভেশন করা দরকার তার কাছে সেভাবেই ইয়াবা তুলে দেওয়া হচ্ছে। যেমন শিক্ষার্থীদেরকে বলছে যে, এটা খেলে তুমি রাত জেগে পড়তে পারবে। কেউ মোটা হলে তাকে বলা হচ্ছে শরীর শুকিয়ে যাবে। গানের শিল্পীকে বলছে, ইয়াবা খেলে গলার কাজ ভালো হবে।"
চিকিৎসকরা বলছেন, ইয়াবার কারণে পুরোপুরি বদলে যায় মানুষের জীবন ধারা। এই পরিবর্তনটা হয় খুব দ্রুত গতিতে। "দিনে সে ঘুমাচ্ছে, রাতে জেগে থাকছে। পরপর কয়েকদিন সে ঘুমাচ্ছে না কিন্তু আবার একটানা ঘুমাচ্ছে। ফলে মেজাজ অত্যন্ত চরমে উঠে যাচ্ছে," বলেন মি. কোরেশী।
তিনি বলছেন, কয়েকদিন পর দেখা যায় পরিবারের সবার সাথে তার ঝগড়াবিবাদ গণ্ডগোল লেগে যায়। আশেপাশের আত্মীয় স্বজন বন্ধুবান্ধবদের সাথেও তার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যেতে শুরু করে। তার মনে হয় সবাই খারাপ। তিনি একাই শুধু ভালো।
"কিছুদিন পর দেখা যায় যে প্যারানয়েড হয়ে গেছে। সে ভাবতে থাকে যে সবাই তার শত্রু বা সবাই তার পেছনে লেগেছে। সে সন্দেহ করতে শুরু করে যে তাকে কেউ মেরে ফেলবে, বিষ খাওয়াবে। তারপর ধীরে ধীরে সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।"
মোহিত কামাল বলেন, "ইয়াবা খেয়ে শিক্ষার্থীরা রাতে বেশিক্ষণ জেগে থাকলেও কোন লাভ হয় না। কারণ পড়ালেখায় তার মনোযোগ থাকে না। মোটা মানুষকে ইয়াবা চিকনও করে না। এটা খেলে তার খিদে কমে যায়। তখন সে কম খায়। তার পেশীকে ক্ষয় করে ফেলে। মাংসপেশি শুকিয়ে গেলে একটু শুকনা মনে হয়, গাল ভেঙে যায়। কিন্তু চিকন হওয়ার তথ্য পুরোপুরি ভুল।"

স্বাস্থ্য ঝুঁকি

অনেকে ইয়াবা গ্রহণ করে যৌন উদ্দীপক হিসেবে। প্রথম দিকে সেটা কাজ করে যেহেতু এটা খেলে শারীরিক উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে তার যৌন ক্ষমতা একেবারেই ধ্বংস হয়ে যায়। শুক্রাণু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে সন্তান উৎপাদন ক্ষমতাও কমে যায়। মেয়েদের মাসিকেও সমস্যা হয়।
চিকিৎসকরা বলছেন, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস, লিভার, কিডনি থেকে শুরু করে শরীরে যেসব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ রয়েছে সেগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। ইয়াবা খেলে উচ্চ রক্তচাপ হয়। লিভার সিরোসিস থেকে সেটা লিভার ক্যান্সারেও পরিণত হতে পারে।
  • যৌন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়
  • ফুসফুসে পানি জমে
  • কিডনি নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়
  • লিভার সিরোসিস থেকে ক্যন্সারও হতে পারে
  • মেজাজ চড়ে যায়, রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, নিষ্ঠুর হয়ে যায়
  • রক্তচাপ বেড়ে যায়
  • সন্তান উৎপাদন ক্ষমতা ধ্বংস হয়ে যায়
  • মানসিক বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়
মোহিত কামাল বলেন, "ইয়াবা খেলে মস্তিষ্কের সরু রক্তনালী ছিঁড়ে যেতে পারে। মস্তিষ্কে রক্তপাতও হওয়ার ঘটনাও আমরা পেয়েছি। ব্রেইন ম্যাটার সঙ্কুচিত হয়ে যায়। সেটা যদি ১৫০০ গ্রাম থাকে সেটা শুকিয়ে এক হাজার গ্রামের নিচে নেমে যেতে পারে। জেনেটিক মলিকিউলকেও নষ্ট করে দিতে পারে। ফলে পরবর্তী প্রজন্মও স্বাস্থ্য-ঝুঁকিতে থাকে।"
চিকিৎসকরা বলছেন, ইয়াবা খেলে শরীরে একটা তাপ তৈরি হয় যা কিডনিরও ক্ষতি করতে পারে। যেহেতু এটিকে ধোঁয়া হিসেবে নেওয়া হচ্ছে তাই ফুসফুসে পানিও জমে যেতে পারে।
"রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। নিষ্ঠুর নির্মম হয়ে যায়। আমাদের ব্রেনের ফ্রন্টাল একটি লোপে যেখানে বিচার বিবেচনার বোধ তৈরি হয়, যেখানে আমরা সিদ্ধান্ত নেই, পরিকল্পনা করি সে জায়গাটা কাজ করতে পারে না। ফলে মানুষ পাষণ্ড হয়ে যায়, হিংস্র হয়ে যায়। মায়ের গলায় ছুরি ধরে টাকার জন্যে। মা বাবার বুকে বসে ছুরি চালাতে তার বুকও কাঁপে না," বলেন ড. কামাল।
  • স্বাস্থ্যের অবনতি হয়
  • ভিটামিনের অভাব দেখা দেয় শরীরে
  • যৌন ক্ষমতা হারিয়ে যায়
  • ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যায় শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ
চিকিৎসকরা বলছেন, ফেনসিডিল ও হেরোইনের বেলাতেও দ্রুত গতিতে স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। কারণ তারা ঠিকমতো খাওয়া দাওয়া করতে পারে না। তাদের খাওয়ার প্রয়োজনও খুব একটা পড়ে না। কারণ হেরোইন কিম্বা ফেনসিডিল খেলে ক্ষুধা কেটে যায়। ফলে তাদের সাধারণ পুষ্টি চাহিদাও পূরণ হয় না। যার কারণে তাদের শরীরে সব ধরনের ভিটামিনের অভাব দেখা দিতে শুরু করে।
হেরোইন ও ফেনসিডিলের ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যা তৈরি হতে অনেক সময় লাগে। কিন্তু ইয়াবার ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যা তৈরি হতে সময় লাগে না। "ইয়াবা হচ্ছে অনেক বেশি মানসিক অবস্থার উপর নির্ভরশীল ড্রাগ যেখানে হেরোইন আর ফেনসিডিল শারীরিকভাবে নির্ভরশীল," বলেন ড. কোরেশী।
হেরোইন ও ফেনসিডিল গ্রহণ করলেও শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যেতে থাকে। ড. কোরেশী বলেন, "এদুটো নেশাও প্রাথমিকভাবে যৌন উদ্দীপনা হিসেবে কাজ করে কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে এসবও যৌন ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। একজন ৩০ বছরের যুবক পরিণত হয় ৮০ বছরের বৃদ্ধ মানুষে।"
  • *কেউ হয়তো মনে করে যে আমি আজকে রাতে পড়ে কাল পরীক্ষা দেব, কিন্তু সে সারা রাত ধরে একটা পাতাও উল্টাতে পারে না, এক পাতাতেই বসে থাকে।" -ড. আলী আসকার কোরেশী, মুক্তি।


ইয়াবাসেবী এক নারীর কথা
"আমার দ্বিতীয় স্বামীর মাধ্যমে ইয়াবার সাথে আমার পরিচয় হয়। তিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা। সে আমাকে অনেক ভালোবাসতো। একদিন সে অনেকগুলো ইয়াবা নিয়ে আসে। সে বলে, এটা খুব ভালো জিনিস। এখন এটা সবাই খায়, মেয়েরাও খায়। আর তুমি তো আমার স্ত্রী। সুতরাং তুমিও আমার সাথে খাবে। আমি মনে করলাম, যদি তার সাথে বসে না খাই তাহলে হয়তো সে বাইরের মেয়েদের সাথে গিয়ে খাবে।
কয়েক মাস ধরে খেলাম। তিন মাস পর আমি খুব অসুস্থ হয়ে পড়ি। এতো শুকিয়ে যাই আমাকে ৮০ বছরের বৃদ্ধ মহিলার মতো দেখাতো। শরীর পুরোটা কালো হয়ে গিয়েছিল। আমার শরীরে অর্ধেক কাপড় থাকতো, অর্ধেক থাকতো না। আমি সারাক্ষণ মাথা আঁচড়াতাম। মনে হতো মাথায় শুধু উকুন। যে-ই দেখবে সে-ই আমাকে পাগল মনে করতো।
মা যখন আসতো তখন আমি তার সাথে খুব খারাপ আচরণ করতে শুরু করি। আমি চোখে অনেক কিছু দেখতে থাকি। মুরগির মাংস দেখলে মনে হতো তার ভেতরে অনেক কেঁচো। মাথার চামড়াকে মনে হতো লাল রক্ত। খেতে পারতাম না।
আমার মা একদিন ভাত মেখে খাওয়াতে যাবে তখন আমার মনে হলো আমাকে তিনি কেঁচো খাওয়াচ্ছেন। কিছুক্ষণ পর আমি বমি করতে শুরু করি। তখন তারা আমাকে আমার মায়ের বাসায় নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়। স্বামীকে না জানিয়েও আমার চিকিৎসা চলতে থাকে।
মায়ের বাসায় তিন বছরের মতো ছিলাম। তারপর নিজের বাসায় চলে যাই। তখন আবার স্বামী প্রত্যেকদিন ইয়াবা নিয়ে আসতে শুরু করে। প্রতিদিন রাতে সে ইয়াবা খেত। প্রত্যেক রাতে ২০টা করে খেতো। সে নিজে নষ্ট, এবং তার নোংরামির শিকার আমিও হয়েছি। তারপর আমি আবারও ইয়াবাতে আসক্ত হয়ে পড়ি।"

  • **ফলে মানুষ পাষণ্ড হয়ে যায়, হিংস্র হয়ে যায়। মায়ের গলায় ছুরি ধরে টাকার জন্যে। মা বাবার বুকে বসে ছুরি চালাতে তার বুকও কাঁপে না। -ড. মোহিত কামাল, মনোবিজ্ঞানী।
ভারতে তৈরি কফ সিরাপ 'ফেনসিডিল' বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে নেশার দ্রব্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
বাংলাদেশে হেরোইন জনপ্রিয় ছিল নব্বই-এর দশকে

Thursday, July 23, 2020

প্রতিদিন অতিরিক্ত মদ্যপানে আয়ু কমতে পারে, বলছে এক গবেষণা

প্রতিদিন মদ্যপানে আয়ু কমতে পারে
ছয় লক্ষ মানুষের উপর করা এক গবেষণা করে দেখা গেছে প্রতি সপ্তাহে ১০ থেকে ১৫ বার 'অ্যালকোহলিক' পানীয় পান করলে একজন মানুষের জীবনের এক থেকে দুই বছরের আয়ু কমে যেতে পারে।
তারা আরো সতর্ক করে বলছে, যারা সপ্তাহে ১৮ বারের বেশি মদ্যপান করেন তাদের আয়ু চার থেকে পাঁচ বছর কমে যেতে পারে।
২০১৬ সালে ইউকে গাইডলাইন অনুযায়ী এক সপ্তাহে ১৪ ইউনিটের বেশি মদ্যপান করা উচিত না - যা ছয়টি ছোট আকারের ক্যানের বিয়ার অথবা সাত গ্লাস ওয়াইনের সমান।
ল্যানসেট এর করা সেই গবেষণা বলছে, যারা হালকা মদ্যপান করেন তাদের মৃত্যুর ঝুঁকির মাত্রা বাড়ার কোন আশঙ্কা তারা দেখেন নি।
গাইডলাইন অনুযায়ী হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ার কথা বলা হয়েছে।
এছাড়া প্রতি ১২,৫ ইউনিট অ্যালকোহল সেবন করলে নিম্নোক্ত রোগগুলোর ঝুঁকি বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
১. স্ট্রোক ১৪%
২. মারাত্মক উচ্চ রক্তচাপ জনিত রোগ ২৪%
৩. হৃদযন্ত্র বিকল হওয়া ৯%
৪. মারাত্মক অ্যারোটিক এনিইউরিয়াস ১৫%
মারাত্মক হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর সাথে অ্যালকোহল সেবন করাকে এক সময় সম্পর্কিত বলে মনে করা হতো।
কিন্তু এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, এতে অন্যান্য ধরণের রোগ বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
আগের এক গবেষণায় বলা হয়েছিল, রেড ওয়াইন হার্টের জন্য ভালো - কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই ধারণাকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে।
অন্য একটি ড্যানিশ গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, সপ্তাহে তিন থেকে চার বার মদ্যপান করলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার স্বল্প মাত্রায় ঝুঁকি রয়েছে।
এক গবেষণায় বলা হয়েছিল রেড ওয়াইন হার্টের জন্য ভালো কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন এই ধারণাকে অতিরঞ্জিত করা হয়েছে

Sunday, February 16, 2020

ইয়াবা ট্যাবলেট যে রোগের ওষুধ! by ডা. মো. সাঈদ এনাম

চেম্বারে অশান্ত সজিব। এটা টান দেয় তো ওটা ধরে। কখনো স্টেথোস্কোপ কখনোও বা কলম। টেবিলের উপর থেকে পেপার ওয়েটটা হাতে নিলো। চোখমুখে রাজ্যের বিস্ময়। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেটা দেখে আবার ঠাস করে রেখে দিল। সঙ্গে আসা মা ভাবলেন, টেবিলের গ্লাসটা বোধহয় ভেঙ্গেই ফেললো এবার!
‘স্যার সরি’ বলে, না পেরে অনেকটা জোর করে ধরেই তাকে চেয়ার বসিয়ে দেবার চেষ্টা করলেন। কখন কী করে বসে, এই ভেবে।
সজীব নার্সারিতে পড়ে। অসম্ভব দুষ্টুমি করে। অশান্ত চঞ্চল সারাক্ষণ। মিস, স্যার কারো কথাই শোনে না। পড়ায় কোনও মন নেই। জোর করে সামনে বই মেলে ধরলে দুই এক মিনিট পড়ে কি পড়ে না। অন্য কিছুতে ব্যস্ত হয়ে যায়।
ক্লাসে একে চিমটি দেয় তো ওর খাতা ছিঁড়ে ফেলে। বাধা দিলে, রেগে গিয়ে মারামারি শুরু করে। সমসাময়িক বাচ্চাদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি করা, ফেলে দেয়া ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। প্রতিদিন তার নামে অভিযোগ আসে অভিভাবকদের কাছ থেকে, এটা করেছে, ওটা করেছে। একে মেরেছে তো ওকে ধরেছে। মা বাবা যারপরনাই অপমানিত, বিরক্ত।
সেদিন স্কুলের মিস ডেকে বললেন, ‘আপা আপনার বাচ্চাকে আমরা একেবারে সামাল দিতে পারছি না। ক্লাসে বসিয়ে রাখাই দায়। বলা নেই কওয়া নেই হুট করে দৌঁড়ে ক্লাস থেকে বের হয়ে যায় যখন তখন। একেবারেই মনযোগ নেই ক্লাসে। বলে কয়ে আদর করে মনযোগী করলেও মনযোগ ধরে রাখে না। সারক্ষণ চঞ্চলতা।’
আরো জানালেন, শুধু সহপাঠী নয়; মিস ও স্যারদের সঙ্গে অনেক সময় দুর্ব্যবহার করে, তাদের নাম ধরে ডাকে।
প্রতিদিন স্কুলে গিয়ে এটা ওটা হারিয়ে আসবে। কোথায় রাখে কাকে দেয় মনে খেয়াল নেই। এজন্যে প্রতিদিন তাকে নতুন কলম, বই, পেন্সিল কিনে দিতে হয়। কেবল স্কুল বা ক্লাসেই যে এরকম করছে তা না। ঘরেও একই ব্যাপার। সেদিন সিঁড়ি থেকে এক লাফ দিয়ে পড়েছে নিচে। হাত পা ছুলেছে, কেটেছে। কিন্তু ওতে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। রক্ত ঝরলেও সে ব্যথা পেলো কী পেল না, বুঝাই গেল না। উঠে আবার ভুঁ দৌড়। বলা নেই কওয়া নেই, কারনে অকারনে ছোট বোনটিকে হঠাৎ মেরে বসে। চেয়ার থেকে ফেলে দেয়। তার দুষ্টুমিতে এখন সবাই তটস্থ, বিরক্ত।
কারো কথা শোনে না। যা নিষেধ করা হয় সেটাই দেখা যায়, বেশি করে করে। বাসায় প্রায়ই গ্যাসের চুলার আগুন বাড়িয়ে দিয়ে কাছে দাঁড়িয়ে থাকে!
এটা ওটা আগুনে দিয়ে দেয়। ভয় বিপদ বুঝে না। সেদিন নাকি প্রতিবেশীর এক পোষা ময়না পাখিকে খাঁচা থেকে বের করে এক আছাড়েই মেরে ফেললো। তাছাড়া স্কুলে যেতে আসতে এটা ওটা দিয়ে রাস্তার কুকুর বিড়ালদের ছুড়ে মারা আঘাত করা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
এতক্ষন ধরে সজিবের আম্মা অভিযোগগুলো বলতে বলতে প্রায় হাঁফিয়ে গেলেন। অভিযোগ কোনটা বলবেন কোনটা না এমন অবস্থা। সজীব তাদের একমাত্র ছেলে। বিয়ের অনেক বছর পর, অনেক সাধনার পর আল্লাহ তার কোল জোড়ে দিয়েছেন, যেন এক ফালি চাঁদের টুকরা। কিন্তু তাঁর এমন আচরনে তিনি আর পারছেন না।
এবার অনেকটা কেঁদে কেঁদে বললেন, স্যার দুষ্টামিতে বিরক্ত হয়ে দুদিন আগে আমি ছেলেটিকে খুব মেরেছি। মারার পর খুব খারাপ লেগেছিল আমার যাদুর টুকরা, সোনা বাবুটার হাউমাউ কান্না দেখে।’
মার খেয়ে কেঁদে কেঁদে বললো, মা তুমি আমাকে মারলে, আমি তোমার সঙ্গে আর থাকবো না।
স্যার, আমি সারা রাত ঘুমাতে পারিনি, ছটফট করেছি। কেনো মারতে গেলাম ভেবে। কিন্তু আমি আর পারছি না যে। বাচ্চারা দুষ্টুমি করে কিন্তু তার এটা কী ধরনের দুষ্টুমি। সেদিন তার দাদুভাইয়ের হাত থেকে তাসবীহ কেড়ে নিয়ে জানালা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। যে দাদুর কলিজার টুকরা সে কিনা…”,
তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না। চোখের পানি মুছলেন। সজীবের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। মায়ের কান্না দেখে এবার সে একটু চুপচাপ বসে থাকার চেষ্টা করলো।
...দুই...
মীনা চৌধুরী দম্পতির (ছদ্মনাম) একমাত্র সন্তান সজিব। বিয়ের পর দীর্ঘদিন তাদের সন্তান হয়নি। স্বামী পেশায় আর্কিটেক্ট। কারোরই কোন শারীরিক সমস্যা ছিলোনা। যখন তারা আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলেন, তখনই হঠাৎ একদিন মিনা তার গর্ভে সজিবের অস্তিত্ব টের পান।
প্রথমে শাশুড়ি কে কথাটি পাড়েন। শাশুড়ি পাত্তা দিলেন না। কারন বিয়ের পর থেকে এভাবে অনেকবার তার এরকম হালকা পাতলা লক্ষন দেখা দিয়েছে, কিন্তু না। প্রতিবার তাদের স্বপ্ন ভংগ হয়েছে।
তারপর ও শাশুড়ি কথাটি শুনে সঙ্গে সঙ্গে কোরান খতমের নিয়ত করলেন, নফল নামাজে দাঁড়িয়ে গেলেন। আল্লাহ যদি মরার আগে একবার নাতি নাতনীর মুখ দেখান। নোটন চৌধুরী (ছদ্মনাম) বড় আদরের ছেলে তার। নোটনের বাবা মারা গিয়েছেন তার নোটনের বিয়ের পরপর। জীবিত থাকতে তিনি নোটন কে ডেকে সুন্দর সুন্দর ক’টা নাম দিয়ে বলতেন, যদি কখনো নাতী, নাতনী আসে, তাহলে সেই নাম গুলো রাখতে।
কিন্তু বিয়ের পর বেশ ক’বছর যখর তাদের কোন সন্তান হচ্ছিলোনা তখন বেশ ভেংগেই পড়ছিলো নোটন। কেবল ই মায়ের পাশে বসে বলতো, “আম্মু তুমি দোয়া করো। শুনেছি মায়ের দোয়া বিফলে যায়না, বাবার দেয়া নাম গুলো যেনো বিফলে না যায়..”।
তিনি প্রতিবার ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেন, বাবা ধৈর্য ধর। আমি দোয়া করছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ তোকে সন্তানের মুখ দেখাবেন। তোর বাবার দোয়া আছে। দেখিস তার দেয়া নাম গুলো বিফলে যাবে না।
যাইহোক বউমা মীনা যখন বললো, মা আমার শরীরটা কেমন জানি লাগছে, তিনি তখন কিছু না বলে, এবারও তিনি জায়নামাজ নিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে গেলেন। পরদিন তারা স্বামী-স্ত্রী ক্লিনিকে গেলেন। খুব একটা আশাভরসা নিয়ে না। তবুও গেলেন।
সেখানে মীনার এক বাল্যবান্ধবী ডা. তনুশ্রী সাহা গাইনি বিভাগের ডাক্তার। তাকে কথাটি পাড়লেন মীনা। তনুশ্রী গুরুত্ব দিয়ে ভালোভাবে দেখলেন তাকে। খটকা লাগলো। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কিছু না বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে বান্ধবীকে মীনাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, মীনা তোর স্বপ্ন মনে হয় এবার সত্যি হচ্ছে…।
মীনা আর নোটন চৌধুরী ক্লিনিক থেকে বাসায় এসে সোজা পড়লেন শাশুড়ির পায়ে। বললেন, আম্মা, আপনার দোয়া আল্লাহ শুনেছেন। তিনি তখনও মানত করা নফল নামাজে। সালাম ফিরিয়েই বললেন, কী বলছিস তুই মীনা?
শাশুড়ি মাঝেমধ্যে তাকে তুই বলে সম্বোধন করতেন। তবে খুব আবেগের কিছু হলে তখন তিনি এমনটি করেন। শাশুড়ির মুখে তুই শুনলে মীনার খুব ভালো লাগে। তার মা-বাবা তাকে তুই বলতেন। তাই শাশুড়ির এমন ডাকে তার ভালো লাগে।
শাশুড়ি বললেন, জানিস কাল রাতে আমি স্বপ্নে দেখেছি, একটা হলুদ-লাল জামা পড়ে একটা ফুটফুটে বাচ্চা মেয়ে আমার সঙ্গে দুষ্টুমি করছে।
মীনার কোল জোড়ে এসেছে সজিব। তারা ভেবেছিলেন তাদের মেয়ে হবে যেহেতু শাশুড়ি স্বপ্নে দেখেছিলেন একটা মেয়ে শিশু তার সঙ্গে খেলছে। যাহোক, সজীবের জন্মের পর তারা সবাই হজ করেন। অনেক আশা আকাঙ্ক্ষার ধন, তাকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন তাদের।
...তিন...
ইদানীং সজীবের এমন দুষ্টুমি আর চঞ্চলতায় তারা ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন। কী করবেন, কোথায় যাবেন ভেবে পাচ্ছেন না। গত আট ন’মাস মাস যাবৎ সজিবের এই আচরন। প্রথম প্রথম অতি চঞ্চলতা ভেবে এটা তেমন পাত্তা দেননি। কিন্তু এখন তা একেবারে অসহনীয় হয়ে পড়েছে তাদের জন্যে। একটা চাকরি করতেন মীনা। সজীবের এসব অতি দুষ্টুমি আর অমনোযোগী স্বভাবের ভয়ে চাকরি ছেড়ে দিয়ে সারাক্ষণ তাকে দেখাশুনা করছেন। না জানি ছেলেটা কখন কী করে বসে?
শিশু ডাক্তারদের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। তারা প্রায়ই ঘুমের ওষুধ দেন। এসব খেয়ে ক’দিন মরার মতো ঘুমায়। কিন্তু পরে যেই সেই। কোন উন্নতি নাই। একজন মিস বললেন, আপা সাইকিয়াট্রিস্ট দেখান। তিনি চমকে গেলেন। তার ছেলে কি পাগল?
তার মন মানলো না। তাদের স্বামী-স্ত্রী কারো বংশেই কোন মানসিক রোগী নেই। তবে সজীবের দাদার মেজাজ একটু চড়া ছিল। প্রচণ্ড রাগী মানুষ ছিলেন। এর বিশেষ কিছুই না। সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানোর কথা শোনে তিনি কিছুটা চিন্তিত ছিলেন। তিনি শুনেছেন, শিশুদেরও মানসিক সমস্যা হয়। ক’দিন থেকে তাই দিনরাত নেট ঘাঁটছিলেন। আসলেই কী হয়েছে তার ছেলের, সে কেন এমন করে। ইন্টারনেট খুঁজতে খুঁজতে একটা আর্টিকেলে তার চোখ আটকে যায়। মনে হলো তিনি যেনো কিছু একটা পেয়েছেন। বাচ্চার সকল উপসর্গই মিলে গেছে আর্টিকেলের রোগটির সঙ্গে। আর্টিকেলে রোগটির নাম এ.ডি.এইচ.ডি (ADHD)। ইংরেজীতে এটেনশন ডিফিসিট হাইপার এক্টিভিটি ডিসওর্ডার বলে।
তিনি বললেন, স্যার আমার বাচ্চাটি কি তবে এ.ডি.এইচ.ডি’র (ADHD) রোগী। যদিও লন্ডন প্রবাসী তার বড়বোন বলেছেন সিমটমটা নাকি কিছুটা অটিজমের মতো। কিন্তু অটিজমের শিশুরা ডাকলে বুঝে না যে তাকে কেউ ডাকছেন বা তাকে কেউ কিছু বলতে চাইছেন। সজীবতো সবই বুঝে। শুধু বুঝে বললে ভুল হবে, বেশি বুঝে…”
আমি মীনাকে বললাম, আপনি ঠিক ধরতে পেরেছেন। আপনার বাচ্চার এ.ডি.এইচ.ডি’র ADHD সিমটম রয়েছে। একেবারে টিপিক্যাল সিমটম। তবে আপনার ভয় বা মন খারাপ করার কোনো কারন নেই। এ রোগের খুব ভালো ভালো কার্যকরী চিকিৎসা রয়েছে। ওকে কোন ধরনের শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করবে না করে বরং ধৈর্য ধরে আদর যত্ন ভালোবাসা দিয়ে তাকে বার বার বুঝানোর চেষ্টা করতে হবে। ধৈর্যহারা হলে চলবে না। একে বিহেভিয়ার থেরাপি বলে। বয়স কম বলে আপাতত তাকে মেডিসিন দেয়ার দরকান নেই।
...চার...
বাচ্চাদের ADHD এ.ডি.এইচ.ডি রোগ আমাদের দেশে বেশ পাওয়া যায়। সচেতন অভিভাবকরা কিংবা স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকারা খুব সহজেই ক্লাসে শিশু সন্তানের মধ্যে এ রোগের লক্ষণটি শনাক্ত করতে পারেন।
দেশে শতকরা কতজন শিশু এ রোগে আক্রান্ত তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান না থাকলেও আমেরিকায় কয়েকটি স্টাডিতে দেখা গেছে, তাদের দেশে শতকরা পাঁচ থেকে দশজন শিশুদের মধ্যে এই এডিএইচডি (ADHD) রোগের লক্ষণ পাওয়া যায় । মেয়ে শিশুদের চেয়ে ছেলেদের মধ্যে এ রোগটি বেশি দেখা দেয়। পরিণত বয়সেও এ রোগের দেখা মেলে।
এডিএইচডি রোগটি হয় মূলত ব্রেইনের ডোপামিন ও এপিনেফ্রিন নিউরোট্রান্সমিটার তৈরি নিঃসরণ ও সরবরাহের মধ্যে কিছুটা গোলযোগ থাকায়। ব্রেইনের ফ্রন্টাল কর্টেক্স (FRONTAL CORTEX), ব্যাসাল গ্যাংগলিয়া (BASAL GANGLIA), লিমবিক সিস্টেম (LIMBIC SYSTEM) , রেটিকুলার একটিভেটিং সিস্টেম (RETICULAR ACTIVATING SYSTEM) ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ এরিয়াতে ডোপামিন ও এপিনেফ্রিন নিউরোট্রান্সমিটার পর্যাপ্ত পরিমানে না থাকায় শিশু বা বয়স্কদের মধ্যে এই ADHD এডিএইচডি রোগের লক্ষণ দেখা দেয়।
এডিএইচডি রোগের চিকিৎসা:
ব্রেইনের গুরুত্বপূর্ণ এরিয়া যা একাগ্রতা, মনোযোগ, কর্মচঞ্চলতা, আচার ব্যবহার, বিবেক বিবেচনা নিয়ন্ত্রণ করে সে এরিয়া গুলোতে ডোপামিন ও এপিনেফ্রিন নিউরোট্রান্সমিটার নিঃসরণ বা সরবরাহ ওষুধ দিয়ে বাড়িয়ে দেয়া বা ব্রেইনকে স্টিমুলেট করাই হলো এ রোগের প্রধান চিকিৎসা। মিথাইলফেনিডেট ও মিথামফেটামিন জাতীয় ঔষধ ব্রেইনে ডোপামিন ও এপিনেফ্রিন নিউরোট্রান্সমিটারের নিঃসরণ বাড়ায়। এগুলোকে ব্রেইন স্টিমুলেটিং ড্রাগ বলে। তাছাড়া নন স্টিমুলেট হিসেবে এটোমোক্সিটিন নামের একটি মেডিসিন রয়েছে। তবে সাধারণত ছয় বছরের নিচে এডিএইচডি (ADHD) রোগের চিকিৎসায় স্টিমুলেটিং বা ননস্টিমুলেটিং কোন ড্রাগ ই ব্যবহার হয় না। এর পরিবর্তে বিহেভিয়ার থেরাপি বা এমিট্রিপটাইলিন জাতীয় ওষুধের বেশি জোর দেয়া হয়।
এডিএইচডি’র চিকিৎসায় মিথামফিটামি সম্পর্কে তথ্য
এডিএইচডি’র চিকিৎসায় মিথামফিটামি উপযোগী হলেও তা শরীরের জন্য বিষাক্ত এবং তীব্র আসক্তি তৈরি করে বিধায় এর ব্যবহার কম। আমাদের বর্তমান সমাজে কিশোর-কিশোরী ও যুবসমাজ মাদক হিসেবে যে ইয়াবা ট্যাবলেট নিচ্ছে তা হলো মূলতঃ এই মিথামফেটামিন।
মাত্রাতিরিক্ত, অনিয়ন্ত্রিতভাবে মিথামফিটামিন ট্যাবলেট ব্যবহারে দেহে হিরোইন, মরফিন, কোকেনের মতো একধরনের পাগলামি ভাব আসে। মারাত্মক আসক্তি তৈরি হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে যায় এবং দেহে তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া তৈরি করে বলে মিথামফেটামিন ড্রাগটি সাইকিয়াট্রিস্টরা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে প্রেসক্রাইব করেন।
ইতিহাসে মিথামফেটামিন
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধরত সৈনিকদের ডিপ্রেশন কাটাতে মানসিকভাবে চাঙ্গা করতে, ভয় কমাতে ও তাদেরকে দিবাস্বপ্নে বিভোর রাখতে এই কেমিক্যালের বহুল ব্যবহার হয়েছিল। তবে তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আর ক্ষতিকারক পরিণামের জন্যে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়।
বর্তমানে মিয়ানমার হচ্ছে এই মিথামফেটিমিন মাদক বা ইয়াবা ট্যাবলেটের পৃথিবীর শীর্ষ উৎপাদনকারী দেশ। বাংলাদেশের পাশে অবস্থিত হওয়ায় দুই দেশের চোরা কারবারীরা এই কেমিক্যালের অপব্যবহার করে এ দেশের কিশোর কিশোরী ও যুব সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
লেখক: ডা. মো. সাঈদ এনাম
সাইকিয়াট্রিস্ট, স্বাস্থ্য গবেষক ও লেখক।
>>>রূপকেয়ার

Wednesday, January 22, 2020

বাংলাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে কি যথেষ্ট সচেতনতা তৈরি হয়েছে by সায়েদুল ইসলাম

ঢাকায় নেশাখোরদের এক আড্ডা
কলেজে পড়ার সময় ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের মাধ্যমে ইয়াবায় আসক্ত হয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের বিশ বছরের এক তরুণী।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, "প্রথম প্রথম ওরা ফ্রি ইয়াবা দিতো, খাওয়ার ব্যবস্থাও বন্ধুরাই করে দিতো। তখন আমি বুঝতেও পারছিলাম না, আমার কোন ধারণাও ছিল না যে, কী ভয়াবহ বিপদে জড়িয়ে পড়ছি!"
তিনি বলছেন, ইয়াবা খেলে কী হয়, এর ক্ষতির দিকগুলো কী - এ সম্পর্কে তাকে কেউ কখনো সচেতন করেনি।
তবে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার পর যখন পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি বুঝতে পারেন, তখন তারা তাকে ভালো করার অনেক চেষ্টা করেন। নানা ভাবে বোঝান। রিহ্যাবে ভর্তি করেন।
কয়েক দফা রিহ্যাবে চিকিৎসার পর তিনি এখন সুস্থ হয়েছেন। বিয়ে হয়েছে, একটি সন্তানও রয়েছে।
কিন্তু এই তরুণীর মতো বাংলাদেশের আরো অনেক তরুণ-তরুণী বলছেন, তারা যখন মাদকে আসক্ত হন, তখন এর অপকারিতা বা ক্ষতির দিক সম্পর্কে তারা জানতেন না। নিছক আগ্রহ বা বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে তারা এর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
গবেষণায় কী আছে
বাংলাদেশের নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক অধ্যাপক এমদাদুল হক ২০১৮ সালে একটি গবেষণায় বলেছেন, দেশটিতে প্রায় ৭০ লক্ষ মাদকাসক্ত রয়েছে, যাদের অধিকাংশই ইয়াবাসেবী।
এছাড়া আছে ফেন্সিডিল, হেরোইন এবং অন্যান্য মাদক।
তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, এতদিন এ বিষয়টা খোলামেলা ভাবে আলোচিত হয় নি, কিন্তু পরিস্থিতি সত্যি ভয়াবহ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাদকাসক্তদের নিয়ে পারিবারিক বা সামাজিকভাবে লুকোছাপার কারণে একদিকে যেমন আসক্তদের চিকিৎসা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি মাদকাসক্তি ঠেকাতেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
সচেতনতা তৈরি হয়েছে কতটা
মুক্তি ক্লিনিক নামের একটি নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক ড. আলী আশকার কোরেশী বিবিসি বাংলাকে বলছেন, এটা ঠিক যে, মাদক নিয়ে পারিবারিক, সামাজিকভাবে সচেতনতার ব্যাপারে একটা ঘাটতি আছে।
"মাদক দ্রব্যের ভয়াবহতা নিয়ে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করা হচ্ছে, তবে তা এখনো অনেক অপ্রতুল বলা যায়। কারণ শহর এলাকা ছাড়িয়ে মাদক এখন তৃণমূল পর্যায়ে ছড়িয়ে গেছে এবং তরুণরা ব্যবহার করছে"।
"যতটুকু প্রতিরোধমূলক কর্মকাণ্ড হচ্ছে, তাও হচ্ছে বড় শহর এলাকায়, তৃণমূল পর্যায়ে আসলে সেরকম প্রচারণা নেই। কিন্তু গ্রামে-গঞ্জে মাদক পাওয়া যাচ্ছে এবং অনেক তরুণ-তরুণী আসক্ত হয়ে পড়ছে" - বলছেন মি. কোরেশী।
"শিক্ষা কার্যক্রমে ইদানীং কিছু কিছু প্রচারণা বা সচেতনতার উদ্যোগ শুরু হয়েছে, কিন্তু তাও পর্যাপ্ত নয়। কারণ প্রতিটি স্কুল-কলেজে এ ব্যাপারে সচেতনতার উদ্যোগ থাকা দরকার" বলছিলেন তিনি।
তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছেন, "যখন আমরা মাদকাসক্ত রোগীর চিকিৎসা করতে যাই, তখন দেখি তাদের অভিভাবকদেরই এ সম্পর্কে কোন ধারণা নেই। এমনকি সন্তান মাদকে আসক্ত জানার পরেও তাদের মনোভাব থাকে, দেখি না কী হয়। এভাবে কয়েক বছর পার হয়ে যায়, আর তাদের সন্তান মাদকে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে"।
"শুধু মাদকে আসক্ত নয়, তাদের পরিবার, পিতামাতার আগে সচেতন হওয়ার দরকার। যখনি কেউ সন্তানের মধ্যে আচার-আচরণের পরিবর্তন দেখতে পাবেন, তখনই তার উচিত হবে একজন বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া" তিনি বলেন।
মাদক নিরাময় কেন্দ্রের পরিচালক ড. আলী আশকার কোরেশী বলছেন, মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান বা সচেতনতা শুরু করতে হবে পরিবার থেকে। সামাজিকভাবে এর বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করতে হবে, না হলে শুধু সরকার বা এনজিওর ওপর নির্ভর করে মাদকের এই বিপুল বিস্তৃতি ঠেকানো যাবে না।
মাদকবিরোধী অভিযানে কি কাজ হচ্ছে?
বাংলাদেশের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১১ সালে মাদক সংক্রান্ত মামলা হয়েছিল ৩৭ হাজার ৩৯৫টি, আসামি ছিল ৪৭ হাজার ৪০৩ জন। ২০১৭ সালে মামলার সংখ্যা ১ লাখ ছয় হাজার ৫৩৬ জন, আসামি এক লাখ ৩২ হাজার ৮৮৩ জন।
তারা বলছেন, ইয়াবা পরিবহনে সুবিধাজনক, দামও কম আর মিয়ানমার থেকে প্রচুর যোগান আসছে, এসব কারণে এই মাদকটি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
অভিযোগ রয়েছে, মাদক ব্যবসায় রোহিঙ্গা থেকে শুরু করে নানা পেশাজীবী, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ব্যবসায়ী, ছাত্র-ছাত্রীরা জড়িয়ে পড়েছে। সরকারের মাদক বিরোধী অভিযানে অনেক সন্দেহভাজন মাদক ব্যবসায়ী নিহত বা গ্রেপ্তার হয়েছে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মসমর্পণ বা অভিযান অব্যাহত রাখার ঘটনার পরও ইয়াবাসহ অবৈধ মাদক পাচার বা এর ব্যবসার প্রত্যাশা অনুযায়ী কমেনি।
এর কারণ হিসাবে তারা বলছেন, মাদক বিরোধী অভিযান চললেও, এখনো মাদকে আসক্ত তরুণদের এ থেকে পুরোপুরি সরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। ফলে এর ব্যবসাও বন্ধ হচ্ছে না।
তবে বাংলাদেশের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোঃ জামাল উদ্দীন আহমেদ বলছেন, মাদকের ক্ষতি ও অপব্যবহার নিয়ে তাদের প্রচারণামূলক কর্মকাণ্ডে একসময় ঘাটতি থাকলেও, এখন তারা সেসব কর্মকাণ্ড অনেক বাড়িয়েছেন।
"এটা ঠিক যে, এসব কার্যক্রম সম্প্রতি বিস্তৃত করা হয়েছে। এটা স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, মাদক নিয়ে এতো কথা বা চর্চা অতীতে কখনো হয়নি। মাদক একটি অবহেলিত বিষয় ছিল, ভেতরে ভেতরে মাদক যে আগ্রাসন চালাচ্ছে, আমাদের ক্ষতিগ্রস্ত করছে, সেই সচেতনতা আমাদের ছিল না" - বলছিলেন মি. আহমেদ।
তিনি আরো বলছিলেন "অভিযান চালানোর পাশাপাশি আমরা মাদকের চাহিদা হ্রাস করার নানা কর্মসূচী নিয়েছি। সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় ব্যানার ফেস্টুন ঝুলিয়ে, বিতর্ক কর্মসূচী, র‍্যালি, নানা ধরণের কর্মসূচীর মাধ্যমে মাধ্যমের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করছি। গত বছরে সারাদেশে আমরা ছোটবড় মিলিয়ে মাদকের বিরুদ্ধে প্রায় ৯ হাজার সমাবেশ করেছি"।
''বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায় থেকে সামাজিকভাবে এর বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরির একটি চেষ্টা আমরা করছি।''
এর মধ্যে ২৮ হাজারের বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদক বিরোধী একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে জানান তিনি। সেখানে মাদকের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে সচেতনতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।
মহাপরিচালক মোঃ জামাল উদ্দীন আহমেদ বলছেন "এখনো এটা সত্যি যে, সমাজের সবাই যে সমানভাবে জাগ্রত হয়েছে তা নয়। তবে তাদের জাগিয়ে তোলার কাজটা শুরু হয়েছে"।
নেশার কবলে ঝড়ে পড়ছে অনেক সুস্থ প্রাণ।

Wednesday, November 27, 2019

‘আট বছর বয়সী রোগিও পাই আমরা’: কাশ্মীরের মাদক সমস্যা by আইজাজ নাজির

শ্রীনগর থেকে ৩৬ মাইল দূরের একটি গ্রামে এক রেস্তোরাঁর সিঁড়ির নিচে লুকিয়ে হেরোইন নিচ্ছিল রিয়াজ*। দশ রুপির একটা নোট রোল করে নিঃশ্বাসের সাথে হেরোইন টেনে নিচ্ছিলো সে।

আল জাজিরাকে সে বললো, “এই ডোজ নেয়ার জন্য আমি পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। একটা জায়গা খুঁজছিলাম কোথায় এটা নিতে পারবো। কয়েক ঘন্টা ভালো থাকবো এটা নেয়ার পর, এরপর আবার চাহিদা বাড়বে, আমার অস্বস্তি লাগতে শুরু হবে এবং আমি জ্বর জ্বর এবং ঠাণ্ডা অনুভব করবো”।

বন্ধু বান্ধবদের পাল্লায় পড়ে দুই বছর আগ থেকে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছে ২৪ বছর বয়সী রিয়াজ।

এই নেশার জন্য দিনে প্রায় ৩৭ ডলার খরচ করে সে।

“আমার কখনও মাদক খুঁজে পেতে সমস্যা হয়নি, যখন থেকে আমি এটা নেয়া শুরু করেছি। টাকা থাকলেই সব সময় এটা পাবেন আপনি”।

কাশ্মীরে এখন তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি প্রতিদিনই বাড়ছে।

এখনও স্পষ্ট নয় যে মাদকাসক্তের সংখ্যা ঠিক কতো। তবে ডাক্তার আর বিশেষজ্ঞদের হিসেবে এই সংখ্যাটা কয়েক শ’তো হবেই।

শ্রীনগরের রাষ্ট্রিয় অর্থায়নে পরিচালিত শ্রী মহারাজা হারি সিং হাসপাতালের পুনর্বাসন কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী এই সঙ্কটের মাত্রা ক্রমেই বাড়ছে।

গত বছর, এই কেন্দ্রে ছয় শতাধিক মাদকাসক্তের চিকিৎসা করা হয়েছে। অধিকাংশ রোগীর বয়স ১৫ থেকে ৩০ এর ভেতরে আর এদের ৮০ শতাংশই হেরোইনে আসক্ত।

কাশ্মীরে আরও তিনটি মাদক পুনর্বাসন কেন্দ্র রয়েছে।

শ্রী মহারাজা হারি সিং সেন্টারে কাজ করেন কাশ্মীরের মানসিক স্বাস্থ্য ও স্নায়ুবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আরশাদ হোসেন। তিনি বলেন, “আমাদের কেন্দ্রে আমরা আট বছর বয়সী মাদকাসক্তও পেয়েছি”।

“মাদক সমস্যার বহু কারণ রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে সচেতনতার অভাব, সহজলভ্য, বন্ধুদের চাপ এবং সঙ্ঘাতপূর্ণ এলাকায় বসবাস”।

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, কাশ্মীরীদের প্রতিনিয়ন যে অনিশ্চয়তা, মানসিক আঘাত, উদ্বেগের মধ্যে বাস করতে হয়, সেটার মধ্যে টিকে থাকতে অনেকে মাদক ব্যবহার করে।
কাশ্মিরে প্রতিবছরই পপির উৎপাদন বাড়ছে, ছবি: সামির মুশতাক
ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত মরফিন এবং কোডেইন বা বেঞ্জোডিয়াজেপাইন নব্বই দশকের শেষের দিকে প্রথম মাদক হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে। পরে গাঁজার ব্যবহার বেড়ে যায় এবং এমনকি সামাজিকভাবেও গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে যায়।

কিন্তু বিগত কয়েক বছর হেরোইন ও কোকেনের মতো উচ্চমাত্রার মাদক – যেগুলোর স্বাস্থ্য ও আর্থিক ঝুঁকি অনেক বেশি – এগুলোর ব্যবহার বেড়ে গেছে।

গত ১২ জুন সরকারের নিয়োগকৃত একদল কর্মকর্তা দক্ষিণ কাশ্মীরের কিছু পপি ক্ষেতে অভিযান চালিয়ে সেগুলো ধ্বংস করে। এই পপি থেকেই আফিম তৈরি হয়। এই ধরনের অভিযান আগেও চালানো হয়েছে।

আনন্তনাগ গ্রামে পপি ধ্বংস করতে করতে এক সরকারি কর্মকর্তা জানালেন, “এ বছর প্রচুর পপি চাষ করেছে মানুষ”।

স্থানীয়রা পপি ও গাঁজার চাষ বাড়িয়ে দিয়েছে এবং এগুলো অবৈধভাবে বিক্রি করছে।

চলতি বসন্তে জম্মু ও কাশ্মির এক্সাইজ ডিপার্টমেন্ট ৫০০ একর পপি ক্ষেত ধ্বংস করেছে, এর মধ্যে ২৩৩ একরই হলো দক্ষিণ কাশ্মীরে।

এই অঞ্চলে মাদক উৎপাদনে সবচেয়ে শীর্ষে আছে অস্থির পুলওয়ামা জেলা। কর্মকর্তারা এই জেলায় ১২২ একর জমির পপি ধ্বংস করেছে।

সরকারি বিভাগের এক মুখপাত্র আল জাজিরাকে বলেন, “অন্যান্য বিভাগ থেকে আমরা পপি ও গাঁজা চাষের তথ্য সংগ্রহ করি এবং এরপর সেগুলো ধ্বংসের জন্য পুরোদমে অভিযান চালাই। অনেক সময় এইসব চাষের সাথে জড়িতদের ক্ষোভের শিকার হতে হয় আমাদের, কিন্তু এ রকম পরিস্থিতিতে আমরা পুলিশের সহায়তা নেই”।

এই মাদকগুলো শুধু স্থানীয়রাই সেবন করছে না বরং, এগুলো ভারতের অন্যান্য রাজ্যেও পাচার করা হচ্ছে।

মাদকের অবৈধ বাণিজ্য, পাচার বন্ধে সরকারের প্রচেষ্টা থাকলেও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে এড়িয়ে যাওয়া পথ খুঁজে বের করে পাচারকারীরা।

জুন মাসে জম্মু অঞ্চলের একটি চেকপয়েন্ট থেকে দুজন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়। ২৬০ গ্রাম হেরোইনসহ ধরা পড়ে তারা।

পুলিশ বলছে, জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে যে, এই পাচারকারীরা একটা চক্রের সাথে জড়িত, যাদের সশস্ত্র গ্রুপ হিজবুল মুজাহিদিনের সাথে যোগ রয়েছে।

জম্মু পুলিশের জেনারেল ইন্সপেক্টর এম কে সিনহা বলেন: “হিজবুল মুজাহিদীন তাদের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জায়গায় মাদক পাচার করছে”।

তবে, হিজবের মুখপাত্র সেলিম হাশমি এই দাবি নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, তার সংগঠন “ইসলামের জন্য এবং কাশ্মীরের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করছে। আমাদের সংগঠনের সাথে মাদকের দূরতম সম্পর্কও নেই”।

বিশেষজ্ঞ, প্রচারণাকারী ও স্থানীয় নেতারা মাদকের ব্যপারে সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়টিকে সমর্থন করেছেন।

গত ১০ জুলাই, এক দল মুসলিম স্কলার, নাগরিক অধিকার কর্মী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতারা শ্রীনগরে এই মাদক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন।
অতিরিক্ত মাদক সেবনে দুই ব্যক্তির মৃত্যুর প্রতিবাদে গত ১১ জুলাই কাশ্মিরের অনন্তনাগে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, ছবি: সামির মুশতাক
বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতা মিরওয়াইজ উমর ফারুক স্বীকার করেন যে, পুরো উপত্যকা জুড়েই নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যেই মাদক ব্যবহারের মাত্রা বেড়ে গেছে।

তিনি বলেন, “এটার সহজলভ্যতার বিষয়টির সুরাহা করতে হবে যাতে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে রক্ষা করা যায়”।

রাজনীতিবিদরাও এটা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া জম্মুর নেতা মোহাম্মদ ইউসুফ তারিগামি গত ১২ জুলাই সামগ্রিকভাবে সমাজের উদ্দেশ্য আবেদন জানান যাতে সবাই “এই সমস্যার সমাধানে সজাগ হয়, যেটা আমাদের তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছে”।

অন্যদিকে, বেশকিছু শহর ও গ্রামে তরুণদের উপর নজরদারির চেষ্টা করা হচ্ছে।

অনন্তনাগের কুলার গ্রামের অধিবাসী ইশাক বেগ বললেন, “আমরা স্থানীয়দের নিয়ে একটা গ্রুপ তৈলি করেছি যারা তরুণদের উপর নজর রাখছে যে কেউ মাদকাসক্ত হয়ে পড়লো কি না। মাদক সমস্যার সমাধানে আমরা একসাথে কাজ করছি”।

কিন্তু ফায়েজের* মতে পুনর্বাসন কেন্দ্রে প্রশিক্ষিত পেশাদার লোকের প্রয়োজন খুবই বেশি। এক বছর আগে পুনর্বাসন কেন্দ্রে ৪৫ দিন কাটিয়ে এসেছে সে।

ফায়েজ এখন একটি দোকান চালায়। সে আল জাজিরাকে জানালো, “শুরুতেই আমার ধূমপানের অভ্যাস ছিল। পরে কলেজে আমি গাঁজায় আসক্ত হয়ে পড়ি। কিভাবে এটা গাঁজা থেকে কোডেইনের দিকে এবং এরপর হেরোইনের দিকে গড়ালো, বলতে পারবো না”।

“অসংলগ্ন আচরণের কারণে আমার পরিবারের লোকেরা আমাদের সন্দেহ করেছিল। আমাকে ডাক্তারের কাছে নেয়া হযেছিল এবং সেখান থেকে আমাকে পরে মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে নেয়া হয়।

“এমনকি এখনও যখন আমার অতীতের কথা মনে পড়ে, আমার চোখে পানি চলে আসে”।

(*পরিচয় প্রকাশ না করার স্বার্থে নাম পরিবর্তন করা হয়েছে)