Sunday, August 9, 2026

লাশই যাদের নিত্যসঙ্গী, কবরই যাদের কর্মস্থল by এমরানা আহমেদ

শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা নেই, নেই ঝড়-তুফান কিংবা প্রতিকূল আবহাওয়ার ভয়, যখনই কোনো লাশ আসে, তখনই শুরু হয়ে যায় তাদের কর্মব্যস্ততা। দিন হোক বা রাত, আপন-পরের ভেদাভেদ উপেক্ষা করে নিঃস্বার্থভাবে শুরু করেন কবর খননের কাজ। কবর খননের পর সিই কবরে মৃত ব্যক্তিকে নিজ হাতে শুইয়ে দেওয়ার পর দোয়ায় অংশ নিয়ে বাড়ি ফেরেন।

এভাবে দীর্ঘ ২০ বছরে অন্তত ৩০ হাজার মৃত ব্যক্তির জন্য কবর খনন করেছেন ৫০ বছর বয়সি গোরখোদক মিঞা হোসেন। বিভিন্ন রকমের মানুষকে কবরস্থ করেছেন তিনি। ছেলে-মেয়ে, বুড়ো-বুড়ি, কিশোর-তরুণসহ সব বয়সি মানুষ তার হাতে মাটির অন্দরে চলে গেছেন। বাবা সোহরাব মিঞা প্রথম তার হাতে কোদাল তুলে দিয়েছিলেন। সেই থেকে শুরু। এখন কবর না খুঁড়লে বোধহয় পেটের ভাতই হজম হয় না। এমন অনুভূতিই আমার দেশকে জানালেন মিঞা হোসেন।

৩৫ বছরের ইকবালের আর কোনো আয়ের পথ নেই। সারা দিনে তিন-চারটি কবর খোঁড়েন তিনি। এ কাজে দিনে ৩০০ টাকা থেকে হাজার টাকাও আয় হয়। কবরস্থ করতে আসা মৃতের স্বজনেরা খুশি হয়ে যা দেন, তাই নেন। কোনো দাবি করেন না। কারো কাছে জোরও করেন না তারা। গরিব মৃত ব্যক্তির স্বজনদের কাছ থেকে তারা কোনো টাকা নেন না। ভালোবেসেই তাদের কাজটি করে দেন।

তবে এমনও ব্যক্তি আসেন, যারা স্বজনদের কবরস্থ করে কোনো টাকা-পয়সা না দিয়েই চলে যান। মানবতার খাতিরে তারা তা মেনে নেন। শুধু কবর খোঁড়া নয়, কবরের দেখভালও করেন তারা। স্বজনেরা খুশি হয়ে মাসিক একটা টাকা দেন। এ টাকাটা তাদের বাড়তি আয়। প্রতিদিনকার আয় আর বাড়তি এ আয়ের টাকায় কোনো রকমে চলে তাদের সংসার।

গোরখোদকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তারা প্রতিদিন এ কাজ করেন নিজ দায়িত্বে। বেশির ভাগ মানুষের দেহের মাপ সাড়ে তিন হাত ধরেই তারা প্রতিটি কবর কাটেন। কবরস্থ করতে তারা শুধু কবর খুঁড়ে দেন। বাকি বাঁশ, চাটাই সরবরাহ করা হয় দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারদের পক্ষ থেকে।

কবরস্থান কর্তৃপক্ষের অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে গড়ে ৩০-৩৫টি লাশ আসে। প্রতিটি লাশ দাফনের জন্য সরকারি ফি ৫০০ টাকা। ছোট বাচ্চাদের লাশের জন্য চাটাই, কবর খোদাই, বাঁশের জন্য ৪৪৮ টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিতে হয়। ছোট থেকে বয়স্ক লাশের দাফনের জন্য ১ হাজার ১০৫ টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিতে হয়।

পৃথিবীতে বিচিত্র পেশার মানুষের বসবাস। তেমনি মৃত মানুষের কবর খুঁড়ে সংসারের চাকা ঘোরে এমন কিছু মানুষ রয়েছেন রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিভিন্ন গোরস্থানে। কেউ ডাকুক আর না-ই ডাকুক, তারা নিজ থেকে কাজটি করে যাচ্ছেন বছরের পর বছর। তাদের নির্দিষ্ট কোনো বেতন নেই, নেই মাসিক ভাতাও। কবর খুঁড়ে যা বকশিস পান, তাতেই চলে তাদের সংসারের চাকা।

শুধু ইকবাল, নাজমুল হাসান নন, তার মতো ৪২ জন আজিমপুর কবরস্থানে কবর খোঁড়ার কাজ করে সংসার চালান। তাদের দিনভর একটাই কাজ—কবর খোঁড়া এবং মৃত ব্যক্তিকে দাফনে সহায়তা করা। দুটি গ্রুপ মিলে কবর খোঁড়াখুঁড়ির কাজটি করেন তারা। সকাল ৬টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত একটি গ্রুপ। দ্বিতীয় গ্রুপটি কাজ করেন বিকাল সাড়ে ৩টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত। কিন্তু লাশ চলে এলে রাত ১টা, ২টা পর্যন্তও খননের কাজ করতে হয়। তবুও কোনো অভিযোগ বা দুঃখ নেই তাদের। সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে পুরস্কার, প্রতিদানের আশা আর মনের প্রশান্তি থেকে কাজটি করেন তারা।

আজিমপুর কবরস্থানে গোরখোদকদের একজন দলনেতা আছেন। তাদের প্রতিদিনের আয়ের টাকা এ দলনেতার কাছে জমা হয়। পরে ওই টাকা সবার মধ্যে ভাগ করে দেন দলনেতা। এ নিয়ে তাদের মধ্যে কোনো ঝামেলা বা বিরোধ নেই। শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই এ ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানান তারা।

ধানমন্ডির এক বাসিন্দা মদিনা জানান, প্রায় দুবছর আগে তার শ্বশুর মারা গিয়েছেন। এ আজিমপুর গোরস্থানেই তাকে কবরস্থ করা হয়। তার কবরটি দেখভালের জন্য যাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তিনি ভালোভাবেই তার দায়িত্ব পালন করছেন। তার তদারকিতে আমরা সন্তুষ্ট। তবে বিরূপ অভিজ্ঞতাও রয়েছে এ গোরখোদকদের নিয়ে। কামরাঙ্গীরচরের বাসিন্দা মোস্তাফা তার স্ত্রীর কবরটি দেখভালের দায়িত্ব দিয়েছিলেন এমনি একজন গোরখোদকের ওপর। তিনি অভিযোগ করেন, নিয়মিত নির্ধারিত মাসিক অর্থ গ্রহণ করেও কবরের কোনো যত্ন নেননি সে গোরখোদক। প্রথমদিকে ঠিকমতো চললেও কয়েক মাস পর গিয়ে দেখা যায়, কবরের নামফলক নেই। যত্নও নেওয়া হচ্ছে না। ফোনেও পাওয়া যায় না তাকে। পরে অফিসে জানালে কর্তৃপক্ষ তাকে ডেকে তিরস্কার ও সতর্ক করে দেয়।

২৮ জুলাই দুপুর ১২টা। সাইকেলে করে এলেন আরেক গোরখোদক সাইফুল। গত সোমবার রাতে দুটি কবর খোঁড়ার কাজ করেছেন। এখন এসেছেন দাফনের কাজে সহায়তা করতে।

কবরের অপর এক পরিচর্যাকারী রাইসুল বলেন, এসব কবরের ফুলগাছ, ঘাসের যত্ন নেওয়া লাগে। সঙ্গে মাটি ঠিকঠাক রাখা, কবর গর্ত হলে মাটি ভরাট করা এসব কাজ করতে হয়। শুরুর দিকে আলগা ঘাস লাগানো হয়। এ ঘাস জন্ম না নেওয়া পর্যন্ত পানি দিতে হয়। তিনি আরো বলেন, এসব কাজের জন্য তাদের কোনো বেতন দেওয়া হয় না। স্বজনরাই খুশি হয়ে কিছু টাকা দেন। সে টাকায়ই আমাদের পেটে ভাত জোটে ।

গোরখোদক ইসমাইল, নিশাদ, রহিম, আলমগীর এ কাজের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে আমার দেশের সঙ্গে আলাপচারিতায় জানালেন, প্রথমদিকে তাদের কবর খোঁড়ার কাজটি করতে ভয় লাগত। কবরস্থান নিয়ে যে ভীতি তা বদলে গেছে কাজ করতে করতে। কিন্তু এখন কিছুই মনে হয় না। তাদের মতে, কবরস্থান পবিত্র জায়গা, কবরস্থানে খারাপ কিছুর দেখা মেলে না। তাদের সঙ্গেও কখনো আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু ঘটেনি। তারা জানান, এ কবরস্থানেই সারাদিন কাটে তাদের। এখানে ঢুকলে মনে প্রশান্তি আসে, মৃত্যুর কথা স্মরণ হয়। খারাপ কাজ করার কথা কখনো মাথায়ই আসে না।

গোরখোদক ইবরাহিম বলেন, আমার বাবা কবর খোঁড়ার কাজ করতেন। তার মৃত্যুর পর আমি কবর খোঁড়ার কাজ শুরু করি। যখন আমার বয়স ১৫ বছর, তখন থেকে আমি কবর খোঁড়ার কাজ করি। এ পর্যন্ত বহু কবর খুঁড়েছি। বাবার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য আমি এ কাজ করি। এমনও আছে, একদিনে পাঁচ-ছয়টি কবর খুঁড়েছি। অনেক সময় কবর তৈরি করতে গিয়ে পুরোনো কঙ্কাল পেলে ওই কবরেই জায়গা করে গুঁজে রাখি।

তিনি আরো জানান, বৈশ্বিক মহামারি করোনার সময় করোনা আক্রান্ত পরিবারের লোকজন বা আত্মীয়স্বজন মারা গেলে পাশে আসেনি কেউ। ওই সময় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গোসল দাফন-কাফন, কবর খোঁড়াসহ সবকিছু একাই করে মৃত ব্যক্তিকে কবরস্থ করেছি।

প্রতি ঈদ বা লম্বা সরকারি ছুটির আগে আগাম কিছু কবর খুঁড়ে রাখেন তারা। আর এসব কবর ছয় মাস অবধি খুঁড়ে রাখা যায়। ঈদে একটা টিম গ্রামে যায়। তারা ফিরলে বাকিরা যান।

লাশই যাদের নিত্যসঙ্গী, কবরই যাদের কর্মস্থল

গাজায় যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে টিনের কৌটায় প্রাণ পেল মানবিকতার গল্প

যুদ্ধবিধ্বস্ত ধ্বংসস্তূপে নিমজ্জিত গাজায় যেখানে নিজেদেরই থাকার কোন আশ্রয় নেই, সেখানে প্রাণীদের জন্য আশ্রয়ের কথা চিন্তাটা অনেকটা অলীক কল্পনা। তবে এই ধ্বংসস্তূপের মাঝেই এটি বাস্তবায়ন করেছেন গাজার এক মানবিক হৃদয়ের সৃজনশীল ব্যক্তি। ঘরবাড়িতে ব্যবহারের পর ফেলে দেওয়া খালি টিনের কৌটা ব্যবহার করে, তিনি তৈরি করেছেন কুকুর ও তার ছানাদের জন্য সাময়িক নিরাপদ ও আরামদায়ক একটি আশ্রয়।

রোববার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার একটি ভিডিও প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রথমে নির্দিষ্ট একটি জায়গা পরিষ্কার করে ঘরটির ভিত্তি তৈরি করা হয়। এরপর সারিবদ্ধভাবে খালি টিনের কৌটা সাজিয়ে তৈরি করা হয় দেয়াল। ঘরের কাঠামো স্থায়ী করার পর বসানো হয় ছাদ।

প্রখর রোদ থেকে কুকুদের সুরক্ষা দিতে ছাদের ওপর ব্যবহার করা হয়েছে ঝাড়ু ও বিশেষ আচ্ছাদন। এতে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা তুলনামূলক কম থাকবে এবং বিড়ালগুলো স্বস্তিতে থাকতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ঘরটি তৈরির পর সেখানে আশ্রয় নেয় একটি মা কুকুর ও তার ছানারা। নতুন আশ্রয়ে তাদের স্বাচ্ছন্দ্যে প্রবেশের দৃশ্যটি নির্মাতার জন্য হয়ে ওঠে আনন্দ ও তৃপ্তির এক অনন্য মুহূর্ত।

ফেলে দেওয়া বর্জ্যকে পুনর্ব্যবহার করে প্রাণীদের জন্য এমন মানবিক ও সৃজনশীল উদ্যোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা কুড়িয়েছে। পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি অসহায় প্রাণীদের প্রতি দায়িত্ববোধের এমন দৃষ্টান্ত অন্যদেরও অনুপ্রাণিত করবে বলে মনে করছেন অনেকে।

গাজায় যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে টিনের কৌটায় প্রাণ পেল মানবিকতার গল্প
ভিডিও থেকে ছবি সংগৃহীত।

দুই বছর পর প্রকাশ্যে শামীম ওসমান, করলেন কর্মীসভা by আবু সাউদ মাসুদ

নারায়ণগঞ্জে ‘খেলা হবে’ স্লোগান দিয়ে রাজনৈতিক মাঠ গরম রাখা সেই শামীম ওসমানকে প্রায় দুই বছর পর আবার প্রকাশ্যে দেখা গেছে। তবে এবার নারায়ণগঞ্জের কোনো মিছিল-মিটিংয়ে নয়, হাজার মাইল দূরে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে আওয়ামী লীগের এক কর্মীসভায়।

প্রতিপক্ষের উদ্দেশে আক্রমণাত্মক বিভিন্ন মন্তব্য ছুড়ে দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এই সাবেক সংসদ সদস্যকে নিউইয়র্কের ওই সভায় বক্তব্য দিতে দেখা যায়।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রকাশ্যে তার অবস্থান নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। দুই বছর পরে অবশেষে তাকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দেখা গেল।

সভায় নিজের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে অনেকটা আত্মসমালোচনার সুরেই কথা বলেন শামীম ওসমান। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যর্থ।’ একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

শামীম ওসমানের বক্তব্যে অবশ্য পুরোনো রাজনৈতিক ‘খেলার’ প্রসঙ্গও ফিরে আসে। তিনি বলেন, কে বড় নেতা আর কে ছোট নেতা—এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; এখন প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, অনেক আগেই তিনি দেশে কী হতে যাচ্ছে তা বুঝতে পেরেছিলেন। তার দাবি, তিনি ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখতেন। বিএনপিকে নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি।

নিউইয়র্কের সভায় শামীম ওসমান দাবি করেন, তার রাজনৈতিক মনোযোগের মূল লক্ষ্য ছিল এমন গোষ্ঠী, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মানে না। এ প্রসঙ্গে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা গোলাম আজমের নিষিদ্ধ হওয়ার প্রসঙ্গও টেনে আনেন। নিজের কার্যালয়ে দেশের বড় বোমা হামলার ঘটনাও স্মরণ করেন তিনি।

এরপর আসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের উত্তাল সময়ের প্রসঙ্গ। শামীম ওসমানের ভাষ্য অনুযায়ী, ২ আগস্ট রাতে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তখন তিনি সেনাবাহিনীকে মাঠ থেকে সরিয়ে নেওয়া, কারফিউ প্রত্যাহার এবং নারায়ণগঞ্জে বড় ধরনের জনসমাবেশ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

শামীম ওসমান বলেন, নারায়ণগঞ্জে তার দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ জড়ো করার সক্ষমতা ছিল। আশপাশের এলাকাতেও খবর পাঠানোর কথা বলেছিলেন তিনি। তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগের শক্তির উৎস ছিল জনগণ। তবে সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধের আশঙ্কায় শেখ হাসিনা রক্তপাত এড়াতে চেয়েছিলেন।

১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনায় শামীম ওসমানসহ ওসমান পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। ওই সময় সংঘর্ষ ও গুলিতে শিশু রিয়া গোপসহ বেশ কয়েকজন নিহত ও আহত হন। এসব ঘটনায় শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগও ওঠে।

৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির আলোচিত-সমালোচিত এই নেতাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এরপর তিনি দেশ ছাড়েন এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সময়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শামীম ওসমানসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে বিচার চলমান রয়েছে।

তবে নিউইয়র্কের কর্মীসভায় শামীম ওসমানের উপস্থিতি নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে, দীর্ঘদিন পর তাকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে দেখা যাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয়েছে নানা প্রতিক্রিয়া।

দুই বছর পর প্রকাশ্যে শামীম ওসমান, করলেন কর্মীসভা

পুলিশের গুলিতে পচন ধরে কেটে ফেলতে হয় শিবির নেতার পা

ট্রাইব্যুনালে ভুক্তভোগীর জবানবন্দিঃ যশোর সরকারি এমএম কলেজের শিক্ষার্থী ও শিবির নেতা রুহুল আমিন ও ইসরাফিল হোসেনকে ২০১৬ সালে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। থানায় অবর্ণনীয় নির্যাতনের পর গভীর রাতে নির্জন স্থানে নিয়ে বন্দুক যুদ্ধের নাটক সাজিয়ে হাঁটুতে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করে পুলিশ। এরপর ক্ষতস্থানে বালি ঢুকিয়ে বেধে দেয় তারা। চিকিৎসা না দিয়ে ফেলে রাখলে পচন ধরে গেলে পা কেটে ফেলতে হয়।

রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ ভুক্তভোগী রুহুল আমিনের জাবানবন্দিতে এসব তথ্য ওঠে আসে। এ ঘটনায় যশোরের তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমানসহ আটজনের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।

জবানবন্দিতে রুহুল আমিন বলেন, বর্তমান বয়স আনুমানিক ২৯ বছর। বর্তমানে যশোরের ইবনে সিনা হাসপাতালে কম্পিউটার অপারেটর পদে কর্মরত আছি। ২০১৬ সালে আমি যশোর সরকারি এমএম কলেজে ব্যবস্থাপনা বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র থাকাকালে আমি চৌগাছা উপজেলার ছাত্রশিবিরের সাহিত্য সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছিলাম। আমার বন্ধু ইসরাফিল হোসেন তখন একই কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র এবং চৌগাছা উপজেলার ছাত্র শিবিরের সেক্রেটারি ছিলেন। ২০১৬ সালের ৩ আগস্ট দুপুরে পর আমি এবং ইসরাফিলকে মোটরসাইকেল করে গ্রামের বাড়ি নারায়ণপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা পথে ওৎ পেতে থাকা চৌগাছা থানা পুলিশ আমাদের গতিরোধ করে থানায় নিয়ে যায়।

জবানবন্দিতে তিনি বলেন, ওইদিন রাতে ওসির রুমে নিয়ে আমাদেরকে প্রচণ্ড মারধর করা হয়। এক পর্যায়ে আমরা জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফিরলে ওসি ভিডিওকলে আমাদেরকে এসপি আনিসুর রহমানকে দেখায়। তখন এসপি সাহেব বলেন, তাদের আগামীকালকে আমার এখানে পাঠিয়ে দাও; তারপর আমার নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ করবে। ওসির রুমে থাকা পুলিশ সদস্যরা আমাদের কাছে সরকারের বিরুদ্ধে কে কে আন্দোলন করছে তাদের নাম ও পরিচয় জানতে চায়। তখন এসআই আকিকুল ইসলাম, ওসি মশিউর রহমানকে বলেন, স্যার এদের ব্রেইন ওয়াশ করা হয়েছে, এরা কিছুতেই কোনো নাম বলছে না, এদেরকে গুলি করে দেই।

জবানবন্দিতে ভুক্তভোগী রুহুল বলেন, পরদিন আমাদের যশোর ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একজন ডিবি কর্মকর্তা আমাদের জানায়, তোদের আজকে গুলি করা হবে, এমন আদেশ আছে। ওদিন রাতে চৌগাছা থানার উদ্দেশে গাড়িতে করে আমাদের নিয়ে রওয়ানা করে পুলিশ। কিছুদূর যাওয়ার পর গাড়িটি থামিয়ে আমাদের চোখ বেঁধে পিছ মোড়া করে হ্যান্ডকাফ লাগানো হয়। এরপর বুন্দলীতলা মাঠের দিকে নিয়ে যায়। আরো কিছুদূর যাওয়ার পর আমাদের গাড়ি থেকে নামায়। তখন আমরা গুলির শব্দ শুনতে পাই। পুলিশ সদস্যরা চিৎকার চেঁচামেচি করে ওই স্থানে ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে। এসময় ওসি মশিউর রহমান বলেন, সাজ্জাদ, জহুরুল ফায়ার। এরপর আমার ডান পায়ের হাটুতে বন্দুক ঠেকিয়ে গুলি করা হয়। এ পর্যায়ে সাক্ষী কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। এর পরপরই আরেকটি গুলির শব্দ শুনতে পাই। তখন আমার বন্ধু ইসরাফিলের কান্নাকাটির শব্দ শুনতে পাই। আমাদের চোখের গামছা খুলে, ক্ষতস্থানে বালু ভরে ওই গামছা দিয়ে ক্ষতস্থান বেঁধে দেওয়া হয়। এরপর পুলিশের গাড়ির আলোতে ওসি মশিউর রহমান, এসআই আকিকুল ইসলাম, কনেস্টেবল সাজ্জাদ ও জহিরুলসহ আরো অনেক পুলিশ সদস্যদের দেখতে পাই।

জবানবব্দিতে এই সাক্ষী বলেন, এরপর আমাদের চৌগাছা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর আমাদের পুলিশি প্রহরায় এ্যাম্বুলেন্সে করে যশোর সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে দুইদিন বিনা চিকিৎসায় রাখার পর আমাদের ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে রেফার্ড করে। পঙ্গু হাসপাতালে সপ্তাহখানেক চিকিৎসার পর হাঁটুতে পচন ধরার কারণে আমার এবং আমার বন্ধুর পা কেটে ফেলা হয়। এরপর আমাদের নামে পুলিশ দুটি মামলা দিয়েছিলো। ৪২ দিন কারাগারে থাকার পর জামিনে মুক্তি পাই। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত এসপি আনিসুর রহমান, ওসি মশিউর রহমান, এসআই আকিকুল ইসলাম, কনেস্টেবল সাজ্জাদ ও জহুরুলসহ সবার বিচার চাই।

পুলিশের গুলিতে পচন ধরে কেটে ফেলতে হয় শিবির নেতার পা
পুলিশের গুলিতে পচন ধরে কেটে ফেলতে হয় শিবির নেতার পা। ছবি: সংগৃহীত

হুমকি-ধমকিতে ওস্তাদ ইসরাইল, নেতৃত্ব দেওয়ার মুরোদ নেই

আঞ্চলিক রাজনীতিতে ইসরাইলের সামরিক আধিপত্য স্পষ্ট হলেও, সেই শক্তি প্রতিবেশীদের সম্মতি, আস্থা ও সহযোগিতায় রূপান্তর করতে পারছে না। বরং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক সমালোচনা এবং যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতার কারণে দেশটির আঞ্চলিক আধিপত্যের ভিত্তি দুর্বল হচ্ছে।

দার্শনিক আন্তোনিও গ্রামশির ধারণায় ‘ডমিনেশন’ বা আধিপত্য হলো শক্তি প্রয়োগ করে অন্যকে বাধ্য করার সক্ষমতা। বিপরীতে ‘হেজিমনি’ হলো এমন নেতৃত্ব, যা জনগণ ও রাষ্ট্রগুলোর সম্মতির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় যেখানে কোনো শক্তিকে মেনে নেওয়া কেবল বাধ্যবাধকতা নয়, বরং স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়।

এই পার্থক্যকে সামনে রেখে ইসরাইলের বর্তমান অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সামরিক সক্ষমতায় দেশটি হয়তো সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে; কিন্তু সেই সামরিক সাফল্য আঞ্চলিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বরং দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও সংঘাত ইসরাইলের বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতার জায়গাটিকে আরো দুর্বল করেছে।

সামরিক সাফল্য, কিন্তু নেতৃত্বের ঘাটতি

২০২৩ সাল থেকে চলমান যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় ইসরাইল হামাসের সামরিক অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস করেছে, হিজবুল্লাহর শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করেছে এবং গাজা, লেবানন ও সিরিয়ার কিছু এলাকায় সামরিক উপস্থিতি প্রতিষ্ঠা করেছে। একই সঙ্গে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচিতে বড় ধরনের আঘাত হানার পাশাপাশি দেশটির সর্বোচ্চ নেতাকেও হত্যা করেছে।

কৌশলগত এসব সাফল্য ইসরাইলের সামরিক শক্তির ব্যাপকতা তুলে ধরলেও, এগুলো আঞ্চলিক ‘হেজিমনি’ প্রতিষ্ঠার প্রমাণ নয়। বরং এর বিপরীত চিত্রও দেখা যাচ্ছে—ইসরাইলের শক্তি মূলত বাধ্য করার সক্ষমতা হিসেবে কাজ করছে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোকে স্বেচ্ছায় তার নেতৃত্বের অধীনে সংগঠিত করার ক্ষমতা হিসেবে নয়।

প্রযুক্তিতে সাফল্য, কিন্তু গভীর মার্কিন নির্ভরতা

ইসরাইলের উচ্চপ্রযুক্তি খাত দেশটির অর্থনীতির প্রায় ১৭ শতাংশের সমান। গত বছরের প্রথম চার মাসে দেশটির মোট রপ্তানির ৫৭ শতাংশ পর্যন্ত এসেছে এই খাত থেকে। জিডিপির তুলনায় বেসামরিক গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) ব্যয়ের ক্ষেত্রেও ইসরাইল বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটি।

তবে কোনো খাতের আকার বড় হওয়া আর সেই খাতের মাধ্যমে বৈশ্বিক নিয়ম নির্ধারণ করা এক বিষয় নয়। ইসরাইল প্রযুক্তিতে অত্যন্ত দক্ষ হলেও বৃহত্তর বৈশ্বিক প্রযুক্তি ব্যবস্থার নিয়মকাঠামো মূলত অন্য শক্তিগুলোই নির্ধারণ করে।

সাইবার নিরাপত্তা খাতে অবশ্য ইসরাইলের প্রভাব ব্যতিক্রমী। বিশ্বের শীর্ষ ১০ সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাতটির গবেষণা ও উন্নয়ন কেন্দ্র ইসরাইলে রয়েছে। ইসরাইলি ক্লাউড সিকিউরিটি প্রতিষ্ঠান উইজকে গুগল ৩২ বিলিয়ন ডলারে অধিগ্রহণ করেছে। একইভাবে পালো অল্টো নেটওয়ার্কস ইসরাইলি তথ্য নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সাইবারআর্ককে ২৫ বিলিয়ন ডলারে কেনার ঘোষণা দিয়েছে।

তবে এসব বড় চুক্তিই আবার ইসরাইলের প্রযুক্তিগত অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য সামনে আনে। দেশটির সবচেয়ে সফল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো শেষ পর্যন্ত বৃহত্তর মার্কিন প্রযুক্তি ও পুঁজিবাজার ব্যবস্থার অংশ হয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ ইসরাইল সেই ব্যবস্থায় অসাধারণ দক্ষ একটি কেন্দ্র হলেও পুরো ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক নয়।

শেকেল বৈশ্বিক রিজার্ভ মুদ্রা নয়, তেল আবিব স্টক এক্সচেঞ্জও নাসডাকের মতো মার্কিন বাজারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। একই সঙ্গে ১৯৪৮ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইসরাইল ১৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা পেয়েছে।

ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধও এই নির্ভরতার বিষয়টি সামনে এনেছে। যুদ্ধের সময় বেন গুরিয়ন বিমানবন্দর প্রায় ৪০ দিন বন্ধ থাকলেও আর্থিক বাজার তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। এমনকি সক্রিয় আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যেই গুগল-উইজ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা তাই পুরোপুরি স্বনির্ভরতার প্রতিফলন নয়; বরং গভীর আন্তর্জাতিক সংযুক্তির ফল হিসেবেও দেখা যায়।

সবচেয়ে বড় ঝুঁকি মানবসম্পদে

ইসরাইলের প্রযুক্তি খাতের জন্য আরো বড় উদ্বেগ হয়ে উঠছে মানবসম্পদ। ২০২৫ সালে প্রায় ৯০ হাজার ইসরাইলি টানা তিন মাস বা তার বেশি সময়ের জন্য দেশ ছেড়ে বাইরে অবস্থান করেছেন বলে তথ্যটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ইসরাইলি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও ক্রমবর্ধমান হারে বিদেশে কর্মী নিয়োগ করছে।

এ প্রবণতা শুরু হয় ২০২৩ সালের অভ্যন্তরীণ বিচারব্যবস্থা সংস্কারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকটের সময়—গাজা যুদ্ধ শুরুর আগেই। ফলে দেশের সবচেয়ে দক্ষ ও উৎপাদনশীল পেশাজীবীদের একটি অংশের বিদেশমুখী হওয়ার বিষয়টি ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত শক্তির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ কারণে ইসরাইলকে একদিকে যেমন আর আগের মতো নিঃশর্ত ‘স্টার্টআপ নেশন’ বলা যাচ্ছে না, অন্যদিকে অর্থনৈতিক পতনের দিকেও দেশটি এগিয়ে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। বরং দেশটি এমন একটি গভীরভাবে সংযুক্ত, কিন্তু তুলনামূলকভাবে নির্ভরশীল অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছে, যার বিশেষায়িত সক্ষমতার ভিত্তি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

সামরিক শক্তির সঙ্গে কমছে বৈধতা

আঞ্চলিক নেতৃত্বের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো বৈধতা—অন্যরা আপনার শক্তিকে কেবল ভয় থেকে নয়, গ্রহণযোগ্য হিসেবেও মেনে নিচ্ছে কি না। ইসরাইলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্বও পুরোপুরি নিজস্ব শক্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইসরাইলের প্রতিরক্ষায় মার্কিন বাহিনী শত শত ইন্টারসেপ্টর ব্যবহার করেছে এবং পেন্টাগনের থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মজুদের প্রায় অর্ধেক পর্যন্ত কমে যায়। একই সময়ে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ইসরাইলের নিজস্ব অ্যারো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার প্রায় ৮০ শতাংশ মজুত ব্যবহৃত হয়েছে বলে তথ্যটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

অর্থাৎ ইসরাইল অত্যন্ত শক্তিশালী সামরিক প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করেছে, কিন্তু সেটি একটি ব্যয়বহুল মার্কিন নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে কাজ করছে। স্বনির্ভর ও অপ্রতিরোধ্য সামরিক শক্তি হিসেবে এর ধারণা তাই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বৈধতার ক্ষেত্রেও ইসরাইলের অবস্থান চাপে রয়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার মামলা, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের তদন্ত—সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক ও সমালোচনা বেড়েছে।

এদিকে ১৫৭টি দেশ ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে বলে তথ্যটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্ব জনমতেও পরিবর্তন

ইসরাইলের বৈধতার সংকট শুধু কূটনৈতিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; জনমতেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। ২০২৫ সালের পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২৪ দেশের জরিপে ৬২ শতাংশ উত্তরদাতা ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মত দিয়েছেন, যেখানে ইতিবাচক মত দিয়েছেন মাত্র ২৯ শতাংশ। এমনকি ইসরাইলের প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্রেও প্রায় ৬০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্কের দেশটির প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়েছে বলে তথ্যটিতে বলা হয়েছে।

আরব বিশ্বে ইসরাইলের স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা আরো প্রবল। সেখানে ৮৭ শতাংশ মানুষ ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিরোধিতা করেন এবং এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ ইসরাইলকে অঞ্চলের সবচেয়ে বড় হুমকি হিসেবে দেখেন। ফলে সামরিক শক্তি যতই বাড়ুক, সেই শক্তি আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতায় রূপান্তরিত হচ্ছে না।

আঞ্চলিক নিয়ম কে নির্ধারণ করছে?

ইসরাইলের নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে আঞ্চলিক কূটনীতিতে। সৌদি আরব এখনো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি অপরিবর্তনীয় পথ ছাড়া ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে রাজি নয়। গাজা যুদ্ধবিরতিও ইসরাইল নিজের শর্তে তৈরি করেনি; বরং তা ইসরাইলের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। একই সময়ে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক সমঝোতা নিয়ে আলোচনাও ইসরাইলকে পাশ কাটিয়েই এগোচ্ছে।

আঞ্চলিক কূটনীতিতে মিসর, কাতার, জর্ডান, ওমান, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব দেশের কেউই নিজেদের পররাষ্ট্রনীতি ইসরাইলের ওপর নির্ভরশীল করে গড়ে তোলেনি।

ফলে ইসরাইলের হাতে আঞ্চলিক প্রক্রিয়া থামিয়ে দেওয়ার বা বাধা দেওয়ার ক্ষমতা থাকলেও, নিজের পছন্দের আঞ্চলিক কাঠামো চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা সীমিত।

আঞ্চলিক নেটওয়ার্কেও ইসরাইলের সীমাবদ্ধতা

ইরান যুদ্ধের সময় আঞ্চলিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হাজার হাজার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর মাধ্যমে এক ধরনের আঞ্চলিক সমন্বয়ের চিত্র তুলে ধরেছিল। কিন্তু এই সমন্বয়ের কেন্দ্র ছিল যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল নয়।

আরব দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতা করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের সঙ্গে সহযোগিতা করেছে। ফলে পুরো কাঠামোর সংযোগকারী সেতুটি ওয়াশিংটন—তেল আবিব নয়।

জ্বালানি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যায়। মিসরে ইসরাইলি গ্যাস রপ্তানিকে দেশটির আঞ্চলিক গুরুত্বের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের সময় ইসরাইলের সবচেয়ে বড় গ্যাসক্ষেত্র প্রায় ৩৩ দিন বন্ধ থাকায় মিসরে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দেয় এবং দেশটিকে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানি করতে হয়।

অন্যদিকে প্রস্তাবিত ইন্ডিয়া-মিডল ইস্ট-ইউরোপ ইকোনমিক করিডোরে হাইফাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী বন্দরগুলোর তুলনায় হাইফার সক্ষমতা সীমিত। পাশাপাশি ইসরাইলকে এড়িয়ে বিকল্প বাণিজ্যপথও বাড়ছে।

আধিপত্য আছে, হেজেমনি নেই

অর্থনীতি, বৈধতা ও আঞ্চলিক নেটওয়ার্ক—তিনটি ক্ষেত্রেই একই চিত্র দেখা যায়। ইসরাইলের শক্তি আছে, কিন্তু সেই শক্তির সঙ্গে বৈধতার সামঞ্জস্য নেই। দেশটির আঞ্চলিক উপস্থিতি আছে, কিন্তু প্রতিবেশীদের সঙ্গে এমন স্বতঃস্ফূর্ত সংযুক্তি নেই, যার মাধ্যমে তারা নিজেদের স্বার্থ ইসরাইলকে কেন্দ্র করে সাজাতে আগ্রহী হবে।

বরং ইসরাইলের চারপাশে নতুন আঞ্চলিক নেটওয়ার্কগুলো যতটা সম্ভব দেশটিকে এড়িয়ে গড়ে ওঠার চেষ্টা করছে। উপসাগরীয় দেশ, ইউরোপ, ভারত, তুরস্ক ও মিসরের মতো শক্তিগুলো ভবিষ্যতে এমন কিছু ভূমিকা নিতে পারে, যা আগে ইসরাইলকে ঘিরে অপরিহার্য বলে মনে করা হতো।

তবে এর অর্থ এই নয় যে ইসরাইলের পতন অবশ্যম্ভাবী বা তা খুব শিগগিরই ঘটবে। সামরিক আধিপত্য থাকলেও আঞ্চলিক হেজেমনি না থাকা—এমন ব্যবস্থা কয়েক দশকও টিকে থাকতে পারে। বৈধতার সংকট পতনের জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু একাই তা পতন ঘটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। যতদিন শক্তিশালী কোনো পৃষ্ঠপোষক সেই আধিপত্যের ব্যয় বহন করতে প্রস্তুত থাকবে, ততদিন এই কাঠামো টিকে থাকতে পারে।

শেষ পর্যন্ত ইসরাইলের ভবিষ্যৎ শুধু তার সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করবে না; বরং নির্ভর করবে প্রতিবেশী দেশগুলো কতটা সমন্বিতভাবে নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারে তার ওপর।

কারণ সামরিক আধিপত্য ইসরাইলকে শক্তিশালী করেছে, কিন্তু সেই শক্তি এখনো তাকে আঞ্চলিক নেতা বানাতে পারেনি। বরং সামরিক বিজয়ের সঙ্গে সঙ্গে বৈধতার ক্ষয়ও বাড়ছে।

ইসরাইলের সামরিক আধিপত্য এখনো প্রবল; কিন্তু আঞ্চলিক হেজেমনি বা নেতৃত্বের সঙ্গে সেই আধিপত্যের দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। ভবিষ্যতে মার্কিন নিরাপত্তা ছাতার প্রভাব কমলে এই ব্যবধান আরও স্পষ্ট হতে পারে—তখন হয়তো দেখা যাবে, মধ্যপ্রাচ্য ইসরাইলকে কেন্দ্র করে সংগঠিত হয়নি; বরং ইসরাইলকে পাশ কাটিয়েই নিজেদের নতুন কাঠামো তৈরি করেছে।

সূত্র: মিডলইস্ট আই

হুমকি-ধমকিতে ওস্তাদ ইসরাইল, নেতৃত্ব দেওয়ার মুরোদ নেই
ইয়েমেনের সানায় একটি বিক্ষোভ চলাকালে (২২ জুলাই, ২০২৬) একজন হুথি যোদ্ধা ইসরাইলি ও মার্কিন পতাকার চিত্রের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। ছবি: এএফপি

‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ ইরানকে লক্ষ্য করে নয়—তুরস্কের আশ্বাস, সৌদিকে সতর্ক করল তেহরান

আল–জাজিরাঃ সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে নতুন ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি ইরানকে লক্ষ্য করে করা হয়নি বলে জোর দিয়ে বলেছেন তুরস্কের নেতারা।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান গতকাল শনিবার বলেছেন, চুক্তিতে ইরান কিংবা অন্য কোনো দেশকে অভিন্ন হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি।

গত শুক্রবার ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’তে সই করেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ।

চুক্তিতে বলা হয়েছে, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলা হলে সেটিকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে হাকান ফিদান বলেন, ‘আমরা লিখিতভাবে কোনো অভিন্ন হুমকির কথা উল্লেখ করিনি।’ তাঁর বক্তব্য, চুক্তিতে সই করা দেশগুলোর কোনো একটির ওপর হামলা না করা কোনো দেশকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করা হবে না।

আর্টিকেল ৫-এর আদলে অঙ্গীকার

ফিদানের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি ‘কারিগরিভাবে’ ন্যাটোর আর্টিকেল ৫-এর সঙ্গে তুলনীয়। ন্যাটোর এ যৌথ প্রতিরক্ষা ধারায় কোনো একটি সদস্য দেশের ওপর হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

তবে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সই হওয়া চুক্তি অনুযায়ী, এ ধরনের হামলার জবাব কেমন হবে, তা নির্ভর করবে পরিস্থিতির ওপর।

চুক্তি অনুযায়ী, কোনো দেশ আক্রান্ত হলে প্রথমে তাকে সহায়তার অনুরোধ জানাতে হবে। একই সঙ্গে কী ধরনের সহায়তা প্রয়োজন, সেটিও নির্দিষ্ট করতে হবে। সেই সহায়তার পরিধি গোয়েন্দা তথ্য ও রসদ সরবরাহ থেকে শুরু করে গোলাবারুদ কিংবা সামরিক ইউনিট মোতায়েন পর্যন্ত হতে পারে।

নতুন জোটের আওতায় রাজনৈতিক ও সামরিক কমিটিও গঠিত হবে। এসব কমিটিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক বাহিনীর প্রধানেরা থাকবেন। সৌদি আরবে থাকবে একটি সচিবালয়।

তিন দেশ যৌথ প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, রসদ সরবরাহ, হুমকি মূল্যায়ন ও সামরিক সক্ষমতার পারস্পরিক সমন্বয় নিয়ে কাজ করবে বলে জানান ফিদান।

প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতাও চুক্তিটির গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক। মক্কায় তিন নেতার আলোচনায় বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। এর মধ্যে ছিল, একে অপরের সামরিক প্রযুক্তি থেকে কীভাবে দেশগুলো সুবিধা নিতে পারে, সেই প্রশ্নও।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, চুক্তিটির প্রস্তুতি চলছিল প্রায় দুই বছর আট মাস ধরে। অর্থাৎ ইরানকে ঘিরে বর্তমান উত্তেজনার জেরে হঠাৎ করে চুক্তিটি তৈরি করা হয়নি, ফিদানের বক্তব্যে এমন ইঙ্গিতই পাওয়া যায়।

ইরানের আপত্তি

তুরস্কের আশ্বাসের পরও ইরানের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা এই চুক্তির সমালোচনা করেছেন। সেই সঙ্গে নিরাপত্তার জন্য নতুন মিত্রদের ওপর নির্ভর না করতে সৌদি আরবকে সতর্ক করেছেন তাঁরা।

ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা ও পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক কমিটির সদস্য মাহমুদ নাবাবিয়ান বলেন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সহযোগিতা সৌদি আরবের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেবে না। সৌদি নেতাদের বিষয়টি বুঝতে হবে।

একই কমিটির আরেক সদস্য ইব্রাহিম রেজায়িও এ চুক্তিকে অবাস্তব বা শুধুই ‘কাগুজে চুক্তি’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।

শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সরাসরি এ চুক্তির কথা উল্লেখ করেননি। তবে তিনি আঞ্চলিক দেশগুলোকে নিজেদের ওপর নির্ভর করার আহ্বান জানিয়েছেন। একে তিনি ‘প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব’ বলে বর্ণনা করেন।

একই সঙ্গে ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর শক্তি ও প্রস্তুতির কথা জোরালোভাবে তুলে ধরেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

জোটের পরের সদস্য হতে পারে মিসর

ফিদানের বক্তব্যে চুক্তিটিকে আঞ্চলিক দেশগুলোর নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদের হাতে নেওয়ার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

আনাদোলুকে ফিদান বলেন, ‘বাইরের কোনো শক্তি এ অঞ্চলে এসে আধিপত্য বিস্তার করলে সমস্যার সমাধান হয় না; বরং তা আরও জটিল হয়ে ওঠে।’

ফিদান তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানকে এ উদ্যোগের ‘মূল দেশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছেন, আঙ্কারা এ ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত করতে চায়।

ফিদান বলেন, ‘আমাদের প্রেসিডেন্টের ভাবনা অনুযায়ী, আমাদের তিনটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। আমাদের পরিধি বাড়াতে হবে এবং প্রয়োজনে সব দেশকে এ ছাতার নিচে আনতে হবে।’

ফিদানের ভাষ্য, ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি দেশ এ উদ্যোগে আগ্রহ দেখিয়েছে। তাঁর আশা, ‘স্বাভাবিক অংশীদার’ হিসেবে বর্ণনা করা মিসরও যোগ দেবে। তবে তার আগে কিছু কারিগরি বিষয়ের নিষ্পত্তি করতে হবে।

এ মুহূর্তে চুক্তির বাস্তব প্রয়োগের অনেক বিষয়ই চূড়ান্ত নয়। সংকটকালে তিন দেশের সামরিক বাহিনী কীভাবে সমন্বয় করবে, সেটিও এর মধ্যে রয়েছে।

তবে চুক্তিতে পরিকল্পিত কমিটি, স্থায়ী সচিবালয় এবং সামরিক সক্ষমতার পারস্পরিক সমন্বয় ও প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব—সব মিলিয়ে এ ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে, এটি শুধু পারস্পরিক প্রতিরক্ষার ঘোষণায় সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা নেই।

তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের নেতারা সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে ত্রিপক্ষীয় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সইয়ের পর কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছবি তোলেন। ৭ আগস্ট, ২০২৬
তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের নেতারা সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে ত্রিপক্ষীয় যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সইয়ের পর কর্মকর্তাদের সঙ্গে ছবি তোলেন। ৭ আগস্ট, ২০২৬ ছবি: তুরস্কের প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের প্রেস অফিস/এএফপি

গাজায় একটি ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে ১৯ মরদেহ উদ্ধার, অধিকাংশই নারী ও শিশু

ইসরায়েলের হামলায় গাজা নগরের ধসে পড়া একটি আবাসিক ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ১৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তাঁদের অধিকাংশই নারী ও শিশু বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে গাজার সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ।

গতকাল শনিবার ভবনটিতে শেষ হওয়া উদ্ধার অভিযানটি গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা মৃত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার দীর্ঘ ও ধীরগতির প্রচেষ্টার সর্বশেষ উদাহরণ। সেখানে লোকজন হাতে হাতে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছেন। অথচ ভেঙে পড়া কংক্রিট সরিয়ে এ ধরনের উদ্ধারকাজ চালানোর জন্য ভারী যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয়। ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে গাজায় উদ্ধার প্রচেষ্টা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

উদ্ধার কার্যক্রমের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ আবু দান জানান, গাজা নগরের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ‘কারাম’ ভবনে টানা চার দিন অনুসন্ধান চালানোর পর উদ্ধারকাজ সমাপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে।

আবু দান বলেন, বিশেষায়িত চিকিৎসাকর্মী ও সিভিল ডিফেন্সের উদ্ধারকারী দল এখন গাজা নগরের অন্য একটি স্থানে যাবে এবং সেখানে অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান শুরু করবে।

গাজার সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা বারবার জানিয়েছেন, ইসরায়েলি হামলায় ধসে পড়া ভবনের বিশাল কংক্রিটের স্তূপ সরানোর উপযোগী ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে উদ্ধারকর্মীদের সাধারণ সরঞ্জাম ও কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, উপত্যকাজুড়ে এখনো ৮ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ। তাঁরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন বলে ধারণা করা হয়।

মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত বছরের ১১ অক্টোবর ইসরায়েলের সঙ্গে ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে গাজায় দেশটির হামলায় অন্তত ১ হাজার ২৫৪ জন নিহত, ৪ হাজার ১২১ জন আহত হয়েছেন। একই সময় ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৮০৪ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া সংঘাতের পর গাজায় মোট ৭৩ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ নিহত এবং ১ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন।

গাজা নগরে গত মঙ্গলবার আবু শারিয়া ও আল-হাসাইনা পরিবারের ১১২ সদস্যের গণজানাজা হয়। তাঁদের মরদেহ সাবরা এলাকার একটি আবাসিক ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয়েছিল। ভবনটি ২০২৩ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়। এ গণজানাজার পর আরেকটি ভবনে উদ্ধার অভিযানে উদ্ধার করা হয় ওই ১৯ মরদেহ।

ইসরায়েলি হামলায় নিহত একজনের মরদেহ উদ্ধার করছে লোকজন
ইসরায়েলি হামলায় নিহত একজনের মরদেহ উদ্ধার করছে লোকজন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

রুনা লায়লার ‘মাস্ত কালান্দার’-এর পেছনের গল্প জানেন কি

প্রকাশ ২০ নভেম্বর ২০২৫ঃ কোক স্টুডিও বাংলার নতুন গান ‘মাস্ত কালান্দার’-এ মাতোয়ারা সারা দেশ। রুনা লায়লার জন্মদিন উপলক্ষে আসা গানটি যেন তাঁর ভক্তদের জন্য এক ‘মিউজিক্যাল ট্রিট’। প্রকাশের পর তিন দিনে গানের ভিউ ছাড়িয়েছে ১৫ লাখ। আলোচিত গানটির নেপথ্যের গল্প শোনাচ্ছেন পৃথা পারমিতা নাগ

‘মাস্ত কালান্দার’ মূলত সুফিগান। রুনা লায়লা গানটি গাওয়ার সময় যখন হাত কপালে ঠেকিয়ে সালাম করছিলেন, তখনই বোঝা যায় এ গানের আধ্যাত্মিক মাহাত্ম্য। কাওয়ালি ঘরানার গানটি ভারতের পাঞ্জাব, পাকিস্তানের সিন্ধ আর ইরানেও অত্যন্ত জনপ্রিয়। পাকিস্তানের সিন্ধের সুফিসাধক সৈয়দ উসমান মারভান্দির (১১৭৭-১২৭৪) প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে গানটি গাওয়া হয়েছে।

কে এই কালান্দার
সব ধর্ম ও শ্রেণির লোকের কাছেই জনপ্রিয় ও শ্রদ্ধেয় গুরু ছিলেন সৈয়দ উসমান মারভান্দি। ভক্তরাই তাঁর নাম দেন ‘লাল শাহবাজ কালান্দার’, যার প্রতিটি অংশের আলাদা আলাদা অর্থ রয়েছে। তিনি লাল বা গেরুয়া রঙের পোশাক পরতেন। আবার প্রিয়জন বোঝাতেও ব্যবহার করা হয় ‘লাল’ শব্দ। সুফিবাদে লাল রং ভক্তি, প্রেম ও আধ্যাত্মিক শক্তির প্রতীক। ‘লাল’ শব্দটি তাই লাল শাহবাজ কালান্দারের যৌবন, তাঁর কিংবদন্তি রক্তিম আভা কিংবা তাঁর লাল পোশাক—সবকিছুর দিকেই ইঙ্গিত করে। শাহ অর্থ রাজা, বাজ বলতে বাজপাখি। সাধক হিসেবে তাঁর উচ্চমন আর আধ্যাত্মিকতাকে বোঝাতে তাঁকে শাহবাজ বলা হয়। কালান্দার ভ্রাম্যমাণ সুফিসাধক। দুনিয়ার মোহ থেকে মুক্ত বোঝাতেও বলা হয়ে থাকে। তাই ‘লাল শাহবাজ কালান্দার’ নামের মধ্যেই তাঁর প্রতি ভক্তদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা লুকিয়ে আছে।

লাল শাহবাজ কালান্দার ইরানের মারভান্দ অঞ্চলে আনুমানিক ১১৭৭ সালের দিকে জন্মগ্রহণ করেন। তরুণ বয়সে আধ্যাত্মিক সাধনা ও জ্ঞানার্জনের জন্য তিনি মধ্যপ্রাচ্য ও উপমহাদেশের বিভিন্ন জায়গা ভ্রমণ করেন। অবশেষে পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের সেহওয়ান শরিফে এসে স্থায়ী হন। এখানেই তিনি মানুষের মধ্যে আধ্যাত্মিক জ্ঞান প্রচার করেন। ১২৭৪ সালে তিনি সেহওয়ান শরিফে মৃত্যুবরণ করেন। সেহওয়ান শরিফে তাঁর দরগাহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সুফি তীর্থস্থান।

‘মাস্ত কালান্দার’ গান
‘দামা দাম মাস্ত কালান্দার’-এর প্রতিটি শব্দ ভক্তি, প্রেম, আধ্যাত্মিক উচ্ছ্বাস এবং আনন্দ প্রকাশ করে। পাঞ্জাবি ভাষায় রচিত গানটির কয়েকটি লাইনের অর্থ জানা যাক, ‘ও লাল মেরি, পাট রাখিওবালা, ঝুলেলালান/ সিন্দরি দা, সেহওয়ান দা, সাখি শাহবাজ কালান্দার। দামা দাম মাস্ত কালান্দার/ আলী দা পেহলা নাম্বার’। এর অর্থ হলো ‘হে আমার লাল, আমাকে সর্বদা রক্ষা করো, ঝুলেলাল। সিন্ধ ও সেহওয়ানের বন্ধু, প্রিয়জন শাহবাজ কালান্দার। প্রতি শ্বাসে, প্রতি মুহূর্তে—কালান্দার মহান। সবার আগে আলী (রা.)।’ এ ছাড়া গানে আছে ‘হার দম পীড়া তেরে খের হোভে/ নাম-এ-আলী বেদা পার লাগা ঝুলে লালান’, যার অর্থ ‘হে পীর, তোমার নাম সর্বদা কল্যাণে ভরা থাকুক। আলী (রা.)-এর নামে, আমার নৌকাকে তীরে পৌঁছে দাও, প্রিয় ঝুলেলাল।’

গানটি হিন্দু-মুসলমান ঐক্যেরও সংগীত। মুসলমানদের কাছে তিনি ছিলেন হজরত শাহবাজ কালান্দার; হিন্দুদের কাছে ঝুলেলাল। সিন্ধি হিন্দুরা তাঁকে স্নেহভরে ‘ঝুলেলাল’ নামেও ডাকত। কারণ, তারা বিশ্বাস করত, সমুদ্র বা পানির দেবতা ‘ঝুলেলাল’ তাঁর মধ্যে পুনর্জন্ম লাভ করেছে। সিন্ধিরা যেহেতু সমুদ্রগামী মানুষ আর ঝুলেলাল হলেন সমুদ্রের রক্ষাকর্তা, তাই এখানে একটি বিনম্র প্রার্থনা লুকিয়ে আছে। সিন্ধি জনগোষ্ঠীর কাছে ঝুলেলাল অত্যন্ত পূজ্যসাধক। স্থানীয় হিন্দুরা তাঁকে জলদেবতা বরুণের অবতার মনে করেন। মুসলিমরাও তাঁকে শ্রদ্ধা করেন। সিন্ধি জনগোষ্ঠীর জীবন ও সংস্কৃতি যেহেতু সিন্ধু নদকেন্দ্রিক, তাই নদের রক্ষক হিসেবে ঝুলেলাল পুরো অঞ্চলের এক সমষ্টিগত আধ্যাত্মিক প্রতীকে পরিণত হন। এমনকি ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক বৈরিতা থাকলেও কাঁটাতার অতিক্রম করে দুই দেশেই জনপ্রিয়তা পায় গানটি।

হিন্দু ও মুসলমান—উভয় ভাবধারার মূল্যবোধ একই বাক্যের মধ্যে মিলিত হয়েছে। গানটি সাধক ও ভক্তদের মধ্যে এক আধ্যাত্মিক যোগ তৈরি করে। ভক্তিমূলক গানটির সৌন্দর্য হলো এটি ধর্মীয় পার্থক্যকে অতিক্রম করে যায়। তাই তো উপমহাদেশে ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে সব মানুষের মধ্যে এটি জনপ্রিয়।

যাঁরা গেয়েছেন
লাল শাহবাজ কালান্দারের দরগাহ ঘিরে প্রচলিত কিংবদন্তি, তেরো শতকে মূল গানটি রচনা করেন সুফি কবি আমির খসরু। পরে আঠরো শতকে আরেক পাঞ্জাবি কবি ও বিপ্লবী বুল্লে শাহ এটি পরিমার্জন করেন। সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার অনেক আগে থেকেই শাহবাজ কালান্দারের দরগাহে এই গান গাওয়া হতো। ১৯৫৬ সালে কিছু কথা বদল করে পাকিস্তানি ছবি ‘জাবরু’র জন্য গানটির একটি ‘ধামাল’ (একধরনের সুফি নৃত্যানুষ্ঠান) সংস্করণ তৈরি করেন সুরকার আশিক হুসাইন। এটিতে কণ্ঠ দেন ইনায়েত হোসেন ভাট্টি, ফজল হুসেন এবং এ আর বিসমিল। পরে ১৯৬৯ সালে ‘দিল্লান দে সৌদে’ ছবির জন্য এটিতে আরও কিছুটা পরিবর্তন আনেন নাজির আলী। নূরজাহানের কণ্ঠে ব্যাপক পরিচিতি পায় এই সংস্করণ।

পরে নানা সময়ে বহু শিল্পী ও সুরকার এই সুফিগান করেছেন। পাকিস্তানে এই গান গেয়েছেন নুসরাত ফতেহ আলী খান, আজিজ মিয়াঁ, আবিদা পারভীন, শাজিয়া খুশক, সাবরি ব্রাদার্স, রেশমা, কোমল রিজভি, জুনুন।

ভারতের হংসরাজ হংস, ওয়াদালি ব্রাদার্স, হর্ষদীপ কৌর, নুরান সিস্টারস, আলিশা চিনাই, অমিত কুমার, বাবা সেহগল ও অলকা ইয়াগনিক, রেখা ভরদ্বাজ, রাশি সলিল হারমালকররাও এটি গেয়েছেন।
বাংলাদেশ থেকে এটি গেয়েছেন রুনা লায়লা, দুই দফা। প্রথমবার কবে গেয়েছিলেন, সেটা তাঁর এখন আর মনে নেই। তবে প্রথম অ্যালবামের জন্য রেকর্ড করেছিলেন ১৯৭০ সালে, নিসার বাজমির সংগীতায়োজনে আর কোক স্টুডিও বাংলার জন্য সায়ান চৌধুরী অর্ণব ও অদিত রহমানের প্রযোজনায় গাইলেন সম্প্রতি।

তবে অনেকে গাইলেও নূরজাহান, আবিদা পারভীন, শাজিয়া খুশক ও রুনা লায়লার কণ্ঠেই গানটি পরিচিতি পেয়েছে বেশি।
‘দামা দাম মাস্ত কালান্দার’ শুধু একটি গান নয়; এটি প্রতিষ্ঠিত শক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, ধর্মীয় সহিষ্ণুতা ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের প্রতীক। গানটি যেন এই উপমহাদেশের মানুষের প্রতি বার্তা—প্রেম, সংগীত আর নৃত্য কখনো বিভাজনের কাছে হার মানে না।

ডন, ডেকান ক্রনিকল অবলম্বনে

সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা
সংগীতশিল্পী রুনা লায়লা। কোক স্টুডিও বাংলার সৌজন্যে

শুধু বিমান হামলা চালিয়ে ইরানকে হারানো যাবে না: যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ জেনারেল

ইরানের যুদ্ধ ছয় মাসে পড়েছে। এখন এ যুদ্ধ থেকে বের হওয়ার পথ খোঁজার কথা বলছেন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের প্রধান জেনারেল ড্যান কেইন। তাঁর মতে, যুদ্ধ আরও জোরদার করতে যেসব সামরিক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র বিবেচনায় রেখেছে, সেগুলো উল্টো ফল দিতে পারে। আর শুধু বিমান বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে এ যুদ্ধে লক্ষ্য অর্জনের সম্ভাবনা কম।

বিষয়টি সম্পর্কে জানাশোনা আছে—এমন তিনটি সূত্র সিএনএনকে এ তথ্য জানিয়েছে। যদিও ড্যান কেইনের এ ভাষ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বয়ানের ভিন্ন। কয়েক দিন আগেও ট্রাম্প হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালি নিয়ে চুক্তি না করলে ইরানে আবার কঠোর হামলা চালানো হবে। তবে এ কথাও ঠিক, নানামুখী চাপের কারণে তিনিও এ যুদ্ধ শেষ করতে চাইছেন।

সূত্র জানিয়েছে, যুদ্ধ শেষ করতে হামলা চালানোর বাইরে বিকল্প পথ খুঁজতে কয়েক সপ্তাহ ধরেই তৎপরতা চালাচ্ছেন কেইন। এরই মধ্যে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর পরিচালক জন র্যাটক্লিফ।

কেইনের সঙ্গে তাঁদের আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল যুদ্ধ নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের আগে নিজেদের মধ্যে একটি ঐকমত্যে পৌঁছানো। এর মাধ্যমে ইরানে যেসব সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে, এর সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকিগুলো স্পষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। কেইনসহ ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা এখন মনে করেন, বিমান হামলা চালিয়ে ইরানকে পরাস্ত করার সম্ভাবনা কম।

এ নিয়ে কেইনের মুখপাত্র জোসেফ হলস্টেডের কাছে জানতে চেয়েছিল সিএনএন। তাঁর ভাষ্য, কেইনের সঙ্গে ব্যক্তিগত আলোচনার বিষয়ে কথা বলবেন না তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও সিআইএ–ও এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হয়নি। তবে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা প্রশংসা করে বলেছেন, কেইন সব সময় ট্রাম্পকে সঠিক ও নিরপেক্ষ তথ্য দেন। যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তায় তিনি একটি ‘সম্পদ’।

‘বিমান হামলার সক্ষমতা সীমিত’

গত মাসের শেষের দিকে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের কেইন বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলা চালানোর সক্ষমতা সীমিত হয়ে এসেছে। এখন ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দলের অনেক কর্মকর্তাও তা বিশ্বাস করছেন। এ কারণেই গত মাসের শেষ দিকে ইরানে হামলার বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন ছিলেন। কারণ, সংঘাত বাড়লে এর নেতিবাচক প্রভাব উল্টো যুক্তরাষ্ট্রের ওপর পড়তে পারে।

সিএনএনকে ওই সূত্র জানিয়েছে, জুলাইয়ের শেষ দিকে ওই হামলার পরিকল্পনার পক্ষে ছিল একমাত্র মার্কিন বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) কিছু অংশ। ইসরায়েলও ওই পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের মিত্রদেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা শেষে ট্রাম্প পিছিয়ে যান। দেশগুলো বলেছিল, ইরানে হামলা হলে পাল্টা হামলায় আক্রান্ত হতে পারে তাদের জ্বালানি অবকাঠামোগুলো।

যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়াও ট্রাম্পের পিছিয়ে আসার একটি কারণ হতে পারে বলে জানিয়েছে ওই সূত্র। বিষয়টি নিয়ে শুধু ড্যান কেইনই উদ্বেগ প্রকাশ করেননি। উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তারা মার্কিন প্রশাসনকে জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ প্রতিরক্ষা–সংক্রান্ত ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ায় ইরান হামলা চালালে তা ঠেকানোর সক্ষমতা কমে যেতে পারে তাঁদের।

ট্রাম্পের বারবার ইরানের বেসামরিক জ্বালানি অবকাঠামো ও সেতুতে হামলার হুমকিও দিয়ে আসছেন। তবে সূত্রের ভাষ্য হলো, এমন হামলার জেরে ইরান আত্মসমর্পণ করবে—এমন সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন কেইন। বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলা চালানো হলে ইরানের জনগণ উল্টো সরকারের প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে উঠতে পারে। এতে যুদ্ধের লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রেরই ক্ষতি হবে।

ট্রাম্পকে সামলানো

যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা নিয়ে নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলেও ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক রাখার বিষয়েও সচেতন ড্যান কেইন। সূত্র জানিয়েছে, গত মাসে ট্রাম্প ও অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে হামলা বাড়ানোর নেতিবাচক দিক এবং গোলাবারুদ কমে যাওয়া কথা বলেছিলন তিনি। এ–ও বলেছিলেন, ট্রাম্প যদি হামলা চালিয়ে যেতে চান, তাহলে ইরানকে ‘পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া যেতে পারে’।

তবে জেডি ভ্যান্স, মার্কো রুবিও ও জন র্যাটক্লিফের সঙ্গে বৈঠকের সময় কেইন আরও স্পষ্টভাবে উদ্বেগের কথাগুলো তুলে ধরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যুদ্ধের এই পর্যায়ে শুধু বোমা হামলা চালিয়ে ট্রাম্পের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। এমন পরিস্থিতিতে কেউ কেউ মনে করছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে কেইন যথেষ্ট দৃঢ়তার সঙ্গে কথা বলছেন না। তাঁর সামনে গিয়ে অনেক কিছু চেপে যাচ্ছেন।

বিকল্প নিয়ে চিন্তা

ইরান যুদ্ধ থেকে বের হতে সম্প্রতি বিকল্প কৌশল মূল্যায়ন শুরু করে পেন্টাগন ও সেন্টকম। সূত্র জানিয়েছে, ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা জন্য প্রচলিত পদক্ষেপের বাইরে কৌশল ঠিক করতে একটি ই–মেইল পাঠিয়েছেন সেন্টকমের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। যুদ্ধে পাঁচ মাস পর এসে নতুন উপায় খোঁজা আসলে পরিস্থিতি ভালো যাচ্ছে না—এটিরই একটি নীরব স্বীকারোক্তি।

জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের প্রধান হিসেবে ইরানে হামলা চালানোর সামরিক বিকল্প তৈরি করার দায়িত্ব কেইনের। আর এত পরে বিকল্পের বিষয়টি সামনে আসায় ইরান যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষেত্রে তাঁর কম অভিজ্ঞতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কেইন কীভাবে পরিস্থিতি সামলাচ্ছেন, তা নিয়ে একটি সূত্র বলেছে, এ বিষয়ে তিনি সামর্থ্যের চেয়ে অনেক বড় এক পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গেছেন।

সূত্র বলছে, ইরানের হামলা বাড়ানোর নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরার পাশাপাশি কেইন ও অন্য কর্মকর্তারা যুদ্ধ থেকে ‘বের হওয়ার এমন একটি পথ’ খুঁজছেন, যাতে অন্তত ট্রাম্প একটি ‘প্রতীকী বিজয়’ দেখাতে পারেন। এর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট  জনগণের কাছে নিজের সাফল্য হিসেবে তুলে ধরতে পারবেন, আবার সম্ভাব্য কূটনৈতিক সমঝোতার পথও বন্ধ হবে না। এর শুরু হতে পারে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়ার একটি চুক্তির মাধ্যমে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের প্রধান জেনারেল ড্যান কেইন
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের প্রধান জেনারেল ড্যান কেইন। ফাইল ছবি: রয়টার্স

ফিলিস্তিনপন্থি মার্কিনিদের ইসরায়েলে প্রবেশের অনুমতি বাতিল

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা ও তাদের সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রতিবাদে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া কয়েকজন মার্কিন ইহুদি অধিকারকর্মীর ইসরায়েলে প্রবেশের অনুমতি বাতিল করা হয়েছে। শুক্রবার মার্কিন ইহুদি সংবাদমাধ্যম দ্য ফরওয়ার্ডের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন অধিকারকর্মী স্যাম শেরম্যান অধিকৃত পশ্চিম তীরের মাসাফের ইয়াত্তা এলাকায় সাত সপ্তাহের একটি স্বেচ্ছাসেবী কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছিলেন। সেখানে তিনি ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় কাজ করছিলেন। ওই সময় ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তার ভ্রমণ অনুমতি বাতিলের একটি ই-মেইল পান তিনি।

শেরম্যান জানান, একই সময়ে তার দলের আরও কয়েকজন কর্মীও একই ধরনের ই-মেইল পেয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ইসরায়েলি সেনা, পুলিশ ও সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীরা তার পাসপোর্টের ছবি তুলেছিলেন।

তিনি বলেন, তারা মূলত স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলেন এবং তাদের সহায়তা করছিলেন। কিন্তু তাদের সঙ্গে এমন আচরণ করা হয়েছে, যেন সেখানে উপস্থিত থাকাই প্রায় অপরাধ।

শেরম্যান আরও জানান, অভিজ্ঞ কয়েকজন ইহুদি অধিকারকর্মী তাকে বলেছেন, স্থায়ীভাবে ইসরায়েলে অভিবাসন না করলে ভবিষ্যতে তাকে দেশটিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া নাও হতে পারে।

তবে মার্কিন ইহুদি কর্মীদের ভ্রমণ অনুমতি বাতিলের বিষয়ে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ কোনো কারণ প্রকাশ করেনি।

এদিকে, ফিলিস্তিনি কর্মকর্তাদের অভিযোগ, অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিনি সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ফিলিস্তিনি নাগরিক ও তাদের সম্পত্তির বিরুদ্ধে ৩ হাজার ৪৮৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

এসব ঘটনার মধ্যে ব্যক্তিদের ওপর হামলা, সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি, নতুন অবৈধ বসতি স্থাপনের ফাঁড়ি তৈরি এবং ফিলিস্তিনি কৃষকদের নিজ জমিতে প্রবেশে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। 

ইসরায়েলের একটি চেকপোস্টে তল্লাশি। ছবি: সংগৃহীত

ভারতে স্ত্রীকে প্রেমিকের সঙ্গে বিয়ে দিলেন স্বামী, উপস্থিত ছিলেন ৫ সন্তান

ভারতের উত্তর প্রদেশে ব্যতিক্রমী এক ঘটনা ঘটেছে। প্রদেশটির সন্ত কবির নগর জেলায় পাঁচ সন্তানের জননী স্ত্রীকে তার প্রেমিকের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছেন স্বামী। স্থানীয় একটি শিবমন্দিরে এই বিয়ের আয়োজন করেন তিনি নিজেই। খবর এনডিটিভির।

স্থানীয় পরিবার ও গ্রামপ্রধানের বরাতে জানা গেছে, দেবরি গ্রামের ৪৫ বছর বয়সী বুদ্ধিরাম নিশাদ ও ৩৭ বছর বয়সী ফুলমতীর বিয়ে হয়েছিল প্রায় ২১ বছর আগে। তাদের সংসারে পাঁচ সন্তান রয়েছে। সন্তানদের মধ্যে একজনের বয়স ১৮ বছর।

কয়েক মাস আগে ফুলমতীর সঙ্গে ২৬ বছর বয়সী আওধেশের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দাম্পত্য কলহ শুরু হয়। প্রায় দুই মাস আগে ফুলমতি আওধেশের সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে চলে গেলেও পরে পরিবারের সদস্যদের অনুরোধে ফিরে আসেন। তবে এরপরও সংসারে অশান্তি অব্যাহত ছিল।

পরিস্থিতি বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত স্ত্রীকে তার পছন্দের মানুষের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বুদ্ধিরাম।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) আসরফপুর গ্রামের একটি শিবমন্দিরে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। সেখানে স্থানীয় গ্রামবাসীরাও উপস্থিত ছিলেন। বুদ্ধিরাম নিজেও বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেন এবং প্রচলিত রীতিতে স্ত্রীর বিদায়ের সময় উপস্থিত ছিলেন।

সাংবাদিকদের বুদ্ধিরাম বলেন, ২১ বছর আগে তিনি ফুলমতীকে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু এখন ফুলমতী আর তার সঙ্গে থাকতে চান না।

তিনি বলেন, প্রতিদিনের দাম্পত্য কলহের মধ্যে তিনি আর থাকতে চান না। তাই স্ত্রী যার সঙ্গে থাকতে চান, তার সঙ্গেই বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

এদিকে, পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনাটি নিয়ে এখন পর্যন্ত তাদের কাছে কোনো অভিযোগ জমা পড়েনি।

সূত্র: এনডিটিভি 

প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

ঠিক কোন বয়সে অভিনয়ে আসা উচিত, জানালেন তমা

চিত্রনায়িকা তমা মির্জার ক্যারিয়ারের বয়স ১৫ বছর। কিশোরী বয়সেই অভিনয় করে পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। সেই অভিনেত্রী নতুনভাবে বারবার ফিরছেন সিনেমায়। পাচ্ছেন দর্শকদের প্রশংসা। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে সুসময় পার করছেন তমা। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে এই অভিনেত্রী জানালেন, এখন তিনি পরিণত। নিজেকে ভিন্ন আঙ্গিকে তুলে ধরার এখনই সময়।

তমা মনে করেন, একটা নির্দিষ্ট সময় পার করে পেশাগত জীবন শুরু করা উচিত। সেখানে কোনো কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিনি সিনেমায় নাম লেখান। সেই সময়ে সবে এসএসসির গণ্ডি পেরিয়েছিলেন।

এই অভিনেত্রীর ভাষ্যে, ‘সবকিছুরই একটা সময় থাকে। আমি এখন পরিণত, আমি এখন যতটা বুঝি, শুরুতে ততটা বোঝার সুযোগ ছিল না। একটি সিনেমা করলে কী হবে, সেটা ভেবেই পর্দায় আসা। পরে বড় পর্দায় নিজেকে দেখে মনে হয়েছে, আরেকটা সিনেমা করি।’

এভাবেই ১৮ পেরোনোর আগে বেশ কিছু সিনেমায় নাম লেখান তমা। দর্শকদের কাছেও পরিচিত হয়ে ওঠেন। পরে একসময় তাঁকে সিনেমায় কম দেখা যায়। তিনি বলেন, ‘এখন যেটা বুঝি, এটাই আমার সিনেমার জন্য প্রপার টাইম। অনেকে বলে, ২০২০ সাল থেকে আমি ক্যারিয়ারের সেকেন্ড ইনিংস শুরু করেছি। পাঁচ বছর হলো। এই সময়ে আমি গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে আসছি। কেউ যদি অভিনয়ে আসতে চান, তাঁরা ইন্টারমিডিয়েট পড়াশোনা শেষ করে, বিশ্ববিদ্যালয়ে অন্তত দুই বছর পড়াশোনা করে তবেই অভিনয়ে আসা উচিত।’

তমা মনে করেন, যেকোনো পেশায় আসার আগে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন। তাহলে ক্যারিয়ার শুরুর আগে এটা যে কাউকে ম্যাচিউর করে তুলবে। ‘বলা হয়, সবকিছুর একটা সময় থাকে। ওইটা আমার সময় ছিল না। যদিও আমি তো ওই সময়ে কিছু ভালো কাজ করেছি। এটা নিয়ে রিগ্রেট করছি না। কিন্তু যেসব তরুণ অভিনয়ে আসতে চান, তাঁদের উদ্দেশে অভিজ্ঞতা থেকে বলব, একটা সময়ের পর প্রস্তুতি নিয়ে আসা উচিত।’

তমা মির্জা ‘বলো না তুমি আমার’ সিনেমা দিয়ে ঢালিউডে পা রাখেন। সিনেমায় তাঁর সহশিল্পী ছিলেন শাকিব খান। ‘নদীজন’ সিনেমা দিয়ে তিনি পার্শ্বচরিত্রে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। কিন্তু তখনো বড় পরিসরে নিজেকে মেলে ধরার চেষ্টায় ছিলেন।

২০২০ সালের দিকে সেই চেষ্টা সফল হয়। তমা নাম লেখান ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকির ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’ ওয়েব ফিল্মে। রায়হান রাফীর এই সিনেমা দিয়েই তিনি আলোচিত হন। পরে ‘৭ নম্বর ফ্লোর’, ‘ক্যাফে ডিজায়ার’, ‘ফ্রাইডে’, ‘সুড়ঙ্গ’ ও সর্বশেষ ঈদুল ফিতরে ‘দাগি’ সিনেমায় অভিনয় করে প্রশংসিত হচ্ছেন।

তমা মির্জা। ছবি: ফেসবুক
তমা মির্জা। ছবি: ফেসবুক