Sunday, April 3, 2011

ইউপি নির্বাচন, অকার্যকর উপজেলা ও আরও কিছু কথা by তোফায়েল আহমেদ

তিন বছর বিলম্বে ইউপি নির্বাচনের যে তফসিল ঘোষিত হলো, সে অনুযায়ী ২৯ মার্চ থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে উপকূলীয় ১১টি জেলার ৫৬৮টি ইউনিয়নে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আশা করা যায়, আগামী মে-জুন, ২০১১-এর মধ্যে বাকি ইউনিয়ন পরিষদগুলোর নির্বাচন সমাপ্ত হবে। এবারের ইউপি নির্বাচনে বিশেষত, উপকূলীয় এলাকায় যে বৈশিষ্ট্যসমূহ ফুটে উঠেছে তা নিয়ে একটু আলোচনা করা যায়। প্রথমত, দলীয় মনোনয়নে স্থানীয় নির্বাচন না করার নির্বাচন কমিশনের যে দৃঢ়তা, তাতে দুটি বড় দলের ‘মৌন সম্মতি’ পাওয়া গেছে বলে ধারণা করা যায়। কারণ, দলীয়ভাবে মনোনয়ন দেওয়ার বা না দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি। দ্বিতীয়ত, উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনে সরকারের মধ্যবর্তী সময়ে জনমত যাচাইয়ের একটি সুযোগ হিসেবে নির্বাচনী ফলাফল বিশ্লেষণে রাজনৈতিক মেরুকরণ বিশ্লেষণের প্রবণতা ইউপি নির্বাচনে খুব একটা চোখে পড়ছে না। তৃতীয়ত, মাঠপর্যায়ে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা খুব বেশি চোখে না পড়লেও অস্থিরতা ও সহিংসতা গত উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে। চতুর্থত, মাঠপর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োজিত হওয়ায় নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন ও নির্বাচনী অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। তা ছাড়া উপকূলীয় এলাকার বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য এবং বিগত সিডর ও আইলার কারণে নির্বাচনী প্রচারণায় ত্রাণসামগ্রী ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের হিসাব-নিকাশ বিরাট একটি স্থান অধিকার করেছে।
নির্বাচন অদলীয় হলেও মোটেই অরাজনৈতিকভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে না। রাজনৈতিক দলের সক্রিয় নেতা-কর্মীরাই নির্বাচন করছেন। দল কর্তৃক আনুষ্ঠানিকভাবে মনোনীত না হলেও দলের সাংসদ, দলের কেন্দ্রীয় বা জেলা-উপজেলার কোনো কোনো নেতার নামে অনেকেই নির্বাচনী মাঠে পরিচিত হচ্ছেন। একই দলের একাধিক প্রার্থী কোথাও বিরল নয়। বিশেষত, ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের মধ্যে একই পদে একাধিক প্রার্থী বেশি সংখ্যায় রয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠান গণতন্ত্রের পথে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ সরকার বাস্তবায়ন করছে। এর লক্ষ্য হওয়া উচিত পরিষদকে কার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা ও ব্যবহার করা। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন-পরবর্তী সময়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। এক. নির্বাচনের পর দু-তিন সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচিত চেয়ারম্যান ও সদস্য সবার জন্য উপজেলা ও জেলাভিত্তিক প্রশিক্ষণ আয়োজন করে নতুন ইউনিয়ন পরিষদ আইন, ২০০৯ এবং উপজেলা পরিষদ আইন, ২০০৯ তাঁদের কাছে ব্যাখ্যা করা উচিত। দুই. পরিষদসমূহকে দিনবদলের সনদ বাস্তবায়নের উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় প্রণোদনা দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। বিশেষত, ২০১১-১৫ পর্যন্ত কার্যকালের জন্য দেশের ইউনিয়ন পরিষদসমূহ যাতে নিজ নিজ ইউনিয়নের ভৌত অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, মৎস্য, পশুসম্পদ, পয়োনিষ্কাশন, নিরাপদ পানীয় জল, আবাসন প্রভৃতি খাতে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনা তৈরি করে এগোতে পারে, সে বিষয়ে সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদানের একটি রূপরেখা প্রদান করা যেতে পারে। ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদ আইনে এ নির্দেশনা দেওয়া আছে। তিন. ইউনিয়ন পরিষদে প্রয়োজনীয় জনবল অর্থাৎ সচিবের অতিরিক্ত অন্য একজন কর্মচারী প্রদানের দীর্ঘদিনের অঙ্গীকারটি অবিলম্বে পূরণ করা উচিত। চার. ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের প্রচুর সম্পদ বরাদ্দ করা হয়। তা ছাড়া আরও ১০টি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দও ওই দুটি পর্যায়ে ব্যয়িত হয়। কিন্তু এ সম্পদসমূহ যথাযথভাবে ব্যবহার করে কার্যক্রম বাস্তবায়নের সঙ্গে উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদের পঞ্চবার্ষিক ও বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনার একটি যোগসূত্র স্থাপিত হওয়া প্রয়োজন। পাঁচ. আইনানুযায়ী ইউনিয়ন ও উপজেলা পরিষদে যেসব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হস্তান্তরিত করা হয়েছে, তাঁদের পরিষদের সঙ্গে কাজ করার বিধিবিধান স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রয়োগের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আশা করা যায়, নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে। নির্বাচনের পরপরই একদিকে প্রশিক্ষণ এবং অপর দিকে উপরিউক্ত প্রশাসনিক ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা হলে ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদসমূহ দেশের সুশাসন ও উন্নয়নে যথাযথ অবদান রাখতে সক্ষম হবে।

অকার্যকর উপজেলা পরিষদ: একটি জরিপ
২০০৯ সালের মার্চ মাস থেকে উপজেলা পরিষদসমূহ কাজ শুরু করেছে। ২০১১ সালের মার্চে দুই বছর পূর্ণ হলো। ইতিমধ্যে উপজেলা আইনকে কার্যকর করার লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় থেকে অনেক প্রয়োজনীয় বিধি, সার্কুলার ও নির্দেশিকা জারি হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ে ওই সব বিধিবিধান ও নির্দেশনা কার্যকর হচ্ছে না। জাতীয় সংসদে পাস করা আইন এবং মন্ত্রণালয়ের জারি করা বিধিবিধান মাঠপর্যায়ে কার্যকর না হওয়ার প্রতিকারের কোনো উপযুক্ত ব্যবস্থা কোথাও গৃহীত হচ্ছে না। উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদব্যবস্থা মোটামুটি অকার্যকরই বলা যায়। গত ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের প্রতিটি উপজেলায় পরিষদের কার্যকারিতা সম্পর্কে মতামত গ্রহণের লক্ষ্যে একটি জরিপ পরিচালনা করা হয়। ফেব্রুয়ারির ১৫ থেকে মার্চ ১৫—এ সময় নিয়ে জরিপটি চালানো হয়। জরিপে ডাকযোগে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান (মহিলা ও পুরুষ) এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে ২০টি প্রশ্নসংবলিত একটি প্রশ্নপত্র পাঠানো হয়। একই প্রশ্ন ১৬০ জন চেয়ারম্যান, ১৬১ জন ভাইস চেয়ারম্যান (পুরুষ), ১৬১ জন মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান এবং ১৬০ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবরে পাঠানো হয়। চেয়ারম্যানদের ১১ শতাংশ, পুরুষ ভাইস চেয়ারম্যানদের ২২ শতাংশ এবং মহিলা ভাইস চেয়ারম্যানদের ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রশ্নপত্র উত্তরসহ ফেরত পাঠিয়েছেন। ১৬০ জন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কেউই এ প্রশ্নপত্রের কোনো উত্তর পাঠাননি।
চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের মধ্যে ৪৮১টি (১০০ শতাংশ) প্রশ্নপত্রের মধ্যে ১০৫টি (২২ শতাংশ) উত্তর পাওয়া গেছে, তা থেকে শুধু চারটি বিষয়ের ফলাফল নিম্নে দেওয়া হলো। (১) প্রতিষ্ঠার পর থেকে উপজেলা পরিষদের সভাসমূহ সঠিকভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল না, বেশির ভাগ উপজেলা পরিষদ, পরিষদের নিয়মিত মাসিক সভার পরিবর্তে উপজেলা পরিষদ পূর্বাবস্থার মতো ‘উপজেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি’র সভাই হয়ে আসছিল। এভাবে ২০১০-এর মাঝামাঝি পর্যন্ত উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভাই হয়েছে। সমপ্রতি বিভিন্ন প্রশিক্ষণের পর সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। ৯০ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, উপজেলা পরিষদে অন্তত ২০১০-এর অক্টোবর-নভেম্বরের পর থেকে পরিষদের নিয়মিত সভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। কিন্তু সভাসমূহের আয়োজনের ক্ষেত্রে আইনের কিছু অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিধান অনুসরণ করা হচ্ছে না। যেমন সভার নোটিশ অন্তত সাত দিন আগে ইস্যু করা এবং প্রতিটি সভার জন্য একটি কর্মপত্র প্রণয়ন। (২) উপজেলা পরিষদে প্রতি অর্থবছরে একটি বাজেট প্রণয়ন হওয়ার কথা এবং এ লক্ষ্যে বিধিও জারি করা হয়েছে। কিন্তু ১০৫টি প্রশ্নপত্রের উত্তর বিশ্লেষণে দেখা যায় যে ১০৫টি উপজেলার মধ্যে মাত্র ১০টি উপজেলা (৯ দশমিক ৬১ শতাংশ) ২০০৯-১০ সালে বাজেট প্রণয়ন করেছে এবং ২০১০-১১ সালে বাজেট প্রণয়ন করেছে মাত্র ১৩টি উপজেলা (১২ দশমিক ৩৮ শতাংশ)। বাকি ৯৪টি জেলা ২০০৯-১০ এবং ৯১টি উপজেলা (৮৭ শতাংশ) ২০১০-১১ সালে কোনো বাজেট প্রণয়ন করেনি। (৩) উপজেলা পরিষদ আইন অনুযায়ী প্রতিটি উপজেলায় ১৪টি করে ‘স্থায়ী কমিটি’ গঠনের বিধান রয়েছে। উত্তরদাতা উপজেলাসমূহের মধ্যে শুধু ২৫টি উপজেলায় কোনো না কোনো স্থায়ী কমিটি গঠিত হয়েছে, বাকি ৮০টি উপজেলায় (৭৬ শতাংশ) কোনো স্থায়ী কমিটি গঠিত হয়নি। (৪) উপজেলা পরিষদ আইন ২০০৯-এর বিধান অনুযায়ী, উপজেলা পরিষদের নিজস্ব বার্ষিক ও পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা হওয়ার কথা। ১০৫টির মধ্যে মাত্র ২০টি উপজেলায় পরিকল্পনা প্রণয়নের লক্ষ্যে পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়, পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা এখনো কোথাও হয়নি। জরিপের ফলাফল থেকে বোঝা যায়, উপজেলা পদ্ধতি কীভাবে কাজ করছে।
প্রতি উপজেলায় গত দুই অর্থবছরে সরকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি থেকে বরাদ্দ প্রদান করেছে, যা জনসংখ্যা ও আয়তন অনুসারে ৬০-৯০ লাখ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। তা ছাড়া প্রতিটি উপজেলার কমবেশি রাজস্ব আয় রয়েছে। কোনো কোনো উপজেলা কর্মকর্তাদের বাড়িভাড়া, হাটবাজার তহবিল, অন্যান্য ইজারা, ভূমি উন্নয়ন করের ১ শতাংশ এবং ভূমি হস্তান্তর রাজস্বের ২ শতাংশ মিলে ৩০ লাখ থেকে ৫-১০ কোটি টাকা পর্যন্ত আয় করে থাকে। এসব অর্থ ছাড়াও উপজেলার প্রতিটি দপ্তরের নিজস্ব উন্নয়ন, অনুন্নয়ন, উপকরণ ও সেবা খাতের বরাদ্দ তো রয়েছেই। কোনো রকমের বাজেটই যদি পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত না হলো, তাহলে ওই অর্থসমূহ ব্যয় করা কি নিয়মসিদ্ধ হয়েছে? বিভাগীয় কমিশনাররা, জেলায় ডেপুটি কমিশনাররা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা কি এ বিষয়ে সরকারের কাছে জবাবদিহি করবেন?
উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যানদের উপজেলায় লাগাতার অনুপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেকেই নিজেদের স্বেচ্ছায় উপজেলা থেকে কার্যত প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা সরকার এসব বিষয়ে সম্পূর্ণভাবে নির্বিকার। এ মুহূর্তে জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় থেকে উপজেলা পরিষদকে মাঠপর্যায়ে সহায়তা করা প্রয়োজন। সরকার যদি এ ব্যাপারে কিছু করতে চায় তাহলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও স্থানীয় সরকার সচিবের নেতৃত্বে বিভাগীয় কমিশনার ও ডেপুটি কমিশনারদের মাধ্যমে প্রতিটি জেলার অধীন উপজেলাসমূহের অবস্থা সরেজমিনে নিরীক্ষণ করতে পারে এবং চেয়ারম্যান ও ভাইস-চেয়ারম্যানদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।

জেলা পরিষদ পুনর্গঠন
প্রধানমন্ত্রী জাতীয় সংসদে প্রদত্ত বক্তৃতার একপর্যায়ে জেলা পরিষদ গঠনের প্রস্তুতি বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু বক্তব্য প্রদান করেন। জেলা পরিষদ পুনর্গঠনের এ সিদ্ধান্ত অত্যন্ত ইতিবাচক। তাই জেলা পরিষদ গঠনের এ সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন। বিগত আওয়ামী লীগের সরকার ২০০০ সালে জেলা পরিষদ আইন প্রণয়ন করেছিল। বর্তমানে সে আইনের অধীনে, নাকি ওই আইন সংশোধন করে বা নতুন আইন প্রণয়ন করে জেলা পরিষদ গঠিত হতে যাচ্ছে, সেটি স্বচ্ছ হওয়া প্রয়োজন। আশা করি, জেলা পরিষদ আইন সংসদে পেশ করার আগে বিভিন্ন নাগরিক ফোরামে যথাযথভাবে আলোচিত হবে। যত দ্রুত সম্ভব জেলা পরিষদ আইন চূড়ান্ত করে সংবিধানের স্থানীয় সরকার-সম্পর্কিত বিধানসমূহ চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।

শেষের কথা
স্থানীয় সরকারব্যবস্থার ওপর নতুন আইনকানুন প্রবর্তন না করা হলেও অন্তত প্রচলিত আইনসমূহ কার্যকর করে এ ব্যবস্থাকে ‘দিনবদলে’র লক্ষ্যে কাজে লাগানো যেত। কিন্তু গত দুই বছরে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় স্থানীয় পর্যায়ের উন্নয়ন ও প্রশাসনকে একটি নৈরাজ্যের আঁধারে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। এখানে সরকারি কর্মচারী, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান—কেউই তাদের যোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারেনি। আগামী তিন বছরের জন্য আইন ও নীতি অনুযায়ী যাতে প্রত্যেকে দক্ষতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারে, সে জন্য সরকারের সচেষ্ট হওয়া উচিত। সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা প্রত্যেকের নিজ নিজ ক্ষেত্রে একটি শৃঙ্খলা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠ সম্ভব নয়।
ড. তোফায়েল আহমেদ, সদস্য, অধুনালুপ্ত স্থানীয় সরকার কমিশন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিতর্ক by আসিফ নজরুল

বাংলাদেশের গণপরিষদের বিতর্ক প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৪ সালে। ১৯৭২ সালের গণপরিষদের কার্যক্রমের ওপর প্রকাশিত এই বইটি পড়লে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের আইনপ্রণেতাদের সম্পর্কে শ্রদ্ধা আরও বাড়বে আমাদের। সেটি শুধু তাঁদের অনেকের পাণ্ডিত্যের জন্য নয়, তাঁদের বিনয়, সৌজন্যবোধ এবং সর্বোপরি ভিন্নমত প্রকাশের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের জন্য। বঙ্গবন্ধু, চার জাতীয় নেতাসহ তাঁদের অনেকে পরলোকগমন করেছেন; বেঁচে আছেন ড. কামাল হোসেন, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, সাজেদা চৌধুরীসহ অল্প কয়েকজন।
১৯৭২ সালে গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনের আলোচনার পরই গৃহীত হয় আমাদের আদি সংবিধান। পরিষদে সবচেয়ে সরব ছিলেন বিরোধী দলের সদস্য ন্যাপের সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিন সপ্তাহব্যাপী বিতর্কে তিনি অর্থনৈতিক অধিকারগুলো গুরুত্বহীন করে রাখা, প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা, ৭০ অনুচ্ছেদের দুর্বলতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি এমনকি শেষে ১৫ ডিসেম্বর সংবিধানে স্বাক্ষর প্রদান করা থেকেও বিরত থাকেন। প্রায় ৪০ বছর পর তিনিই আজ সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ সংসদীয় কমিটির কো-চেয়ারম্যাান। ৪০ বছর আগে তিনি খসড়া সংবিধানে যেসব পরিবর্তনের কথা বলতেন, তার অনেক কিছুর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সাম্প্রতিককালে আমরা সচেতন হয়েছি। তিনি এই কমিটির নেতৃত্বে আছেন বলে আমরা আশাবাদী হতে পারি যে সংবিধানে ভবিষ্যতে যে পরিবর্তনগুলো আসবে, তা হবে জনস্বার্থমূলক এবং সুশাসনের উপযোগী। তবে এ ক্ষেত্রে কমিটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার-সম্পর্কিত সংস্কার। আগের অধিকাংশ সংবিধান সংশোধন হয়েছিল ব্যক্তি বা দলের স্বার্থে। এবারও তা হলে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে দেশ।

২.
গণপরিষদ বিতর্ক নিয়ে এ লেখা শুরু হয়েছিল। শুনলে কেউ কেউ অবাক হতে পারেন, ৩৯ বছর আগে সেখানে আলোচিত হয়েছিল কেয়ারটেকার (তত্ত্বাবধায়ক) সরকার প্রসঙ্গও। তখনকার তরুণ আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছেন, কেয়ারটেকার সরকার আসলে পৃথিবীর বহু দেশেই রয়েছে। মেয়াদ শেষে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর মন্ত্রিসভা নতুন নির্বাচনের আগে কেয়ারটেকার সরকার হিসেবেই কাজ করে। ড. কামাল তখনই ব্যাখ্যা করেছেন, সেই কেয়ারটেকার সরকারের মূল দায়িত্ব সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়তা করা, দৈনন্দিন কাজের বাইরে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত তারা নিতে পারে না।
ড. কামালের এই ব্যাখ্যা এখনো প্রাসঙ্গিক। ১৯৯৬ সালে আমরা প্রতিষ্ঠা করেছিলাম বিরল এক কেয়ারটেকার সরকার। দলীয় সরকার সংসদ নির্বাচন চলাকালে তত্ত্বাবধায়কসুলভ নিরপেক্ষতা বজায় রাখে না, বরং বিভিন্নভাবে কারচুপি করে তারা অসৎভাবে নির্বাচিত হতে চায়। তৎকালীন বিএনপি আমলে অতি বিতর্কিত মাগুরা উপনির্বাচনের মধ্য দিয়ে তা আবারও প্রমাণিত হয়েছিল। জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠানের দায়িত্ব তাই আমরা অর্পণ করি নির্দলীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের দ্বারা গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে। বিরোধী দলগুলোর তীব্র দাবির মুখে বিএনপি নিজেই এই সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা-সম্পর্কিত সংশোধনী সংসদে পাস করেছিল।
১৯৯৯ সালে অনির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত বলে এই সরকারব্যবস্থা গণতন্ত্রবিরোধী—মূলত এ অভিযোগে এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয় হাইকোর্টে (এম সালিম উল্লাহ্ বনাম বাংলাদেশ)। ২০০৪ সালে হাইকোর্ট রায় দেন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বৈধ, এটি প্রতিষ্ঠিত হয় সংবিধানের যে ত্রয়োদশ সংশোধনীবলে, তা সংবিধানবিরোধী নয়। ১৯৭২ সালে ড. কামালের ব্যাখ্যার ছায়া আমরা দেখতে পাই এই রায়ের একটি অংশে। সেখানে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আগে দলীয় সরকারের অধীনে যে নির্বাচন হতো, সেটিও এক ধরনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারই ছিল, সংসদ ভেঙে দেওয়ার পর সেই দলীয় সরকারও অনির্বাচিত হয়ে পড়ত এক অর্থে।
আদালতের এই পর্যবেক্ষণ সমর্থনযোগ্য। তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল হলে আগামী সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের অধীনে নতুন সংসদের নির্বাচন হবে। অথচ সংসদ সদস্যপদ চলে যাওয়ার কারণে তিনি এবং তাঁর মন্ত্রিসভা তখন আর নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি থাকবেন না। অনির্বাচিত দলীয় ব্যক্তিরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার হতে পারলে অনির্বাচিত নির্দলীয় ব্যক্তিরা তা হতে পারবেন না কেন? হাইকোর্টে শুনানির সময় আওয়ামী লীগের পক্ষে ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম, রাষ্ট্রপক্ষে বিএনপি সরকারের নিয়োজিত অ্যাটর্নি জেনারেল এবং তখনকার অ্যামিকাস কিউরিরাও (আদালত নিয়োজিত বিশিষ্ট আইনজীবীরা) তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখার পক্ষে মতামত দেন।
এই রায়ের বিরুদ্ধে এখন আপিল বিভাগে শুনানি চলছে। এখনকার অ্যামিকাস কিউরিরাও এই সরকারের বৈধতা রয়েছে বলে বলছেন, সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতন্ত্রের স্বার্থে তত্ত্বাবধায়ক সরকার অব্যাহত রাখতে বলছেন। হাইকোর্টের রায় তাই আপিল বিভাগে উল্টে যাওয়ার আশঙ্কা নেই। তবে এই সরকারব্যবস্থা উন্নতকরণের নির্দেশনা আসতে পারে সেখানে। সেটি হতে হবে সংসদে। আর এ জন্য প্রয়োজন সংবিধান সংশোধনী কমিটির সদিচ্ছা এবং সর্বোচ্চ প্রজ্ঞা।

৩.
হাইকোর্টে এবং এখনো আপিল বিভাগে শুনানিকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারে কারা থাকবেন, তা নিয়ে নানা সুপারিশ করা হচ্ছে। হাইকোর্টে এই সরকারব্যবস্থা অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের সরকারি দায়িত্বে নিয়োগ নিষিদ্ধকরণসংক্রান্ত সংবিধানের ৯৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী বলে দাবি করা হয়েছিল। ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম বিচারপতিদের নিয়োগ না করে অন্যদের নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন বা রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতা সাপেক্ষে নির্বাচনকালে একটি জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব করেন। ব্যারিস্টার রফিক-উল হকও বিচারকদের বাদ দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রস্তাব দেন। এখন আপিল বিভাগেও কয়েকজন বিশিষ্ট আইনজীবী অনুরূপ পরামর্শ দিচ্ছেন।
সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগের বিধানটি অপব্যবহার করার জন্য সরকার তার পছন্দসই কাউকে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করে থাকে বলে একটি ধারণা বিভিন্ন মহলে রয়েছে। দুজন সিনিয়রকে ডিঙিয়ে বর্তমান প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী প্রধান বিচারপতি হিসেবেও তুলনামূলক জুনিয়র একজনকে ভবিষ্যতে নিয়োগ দেওয়া হলে বর্তমান প্রধান বিচারপতি ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে (সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হিসেবে) তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হবেন—এ ধরনের একটি হিসাব সরকারি মহল থেকে করা হচ্ছে বলে কিছু মহল থেকে ইতিমধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে। তিনি বিভিন্নভাবে নিরপেক্ষতা হারিয়েছেন, এ অভিযোগে তাঁকে আগামী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মেনে নেওয়া হবে না—এ ঘোষণাও কেউ কেউ ইতিমধ্যে দিয়েছেন।
তাত্ত্বিকভাবে দেখলে এটি ঠিক যে বর্তমান ব্যবস্থা অব্যাহত থাকলে সরকারি দল আরও জোরালোভাবে চেষ্টা করবে তাদের আস্থাভাজন বিচারকদের বিভিন্ন সময়ে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ করতে। এতে অবাধ নির্বাচনের সম্ভাবনা বিঘ্নিত হয়, একই সঙ্গে রাষ্ট্র বঞ্চিত হয় স্বাধীনচেতা ও যোগ্যতম ব্যক্তিদের প্রধান বিচারপতি পদে পাওয়া থেকে।
তবে তাত্ত্বিকতার বাইরে বাস্তবতাও আমাদের বিবেচনা করতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে অন্য কোনো গ্রহণযোগ্য বিকল্প আসলে আমাদের আছে কি? নির্বাচনের সময় জাতীয় সরকার গঠিত হলে শেখ হাসিনা তাঁর প্রধান হবেন, এটি বর্তমান বাস্তবতায় বিরোধী দলগুলো মেনে নেবে কি? অন্য কোনো ব্যক্তিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে মেনে নিতেও মতৈক্য প্রতিষ্ঠিত হবে কি? এই অনিশ্চয়তা আগামী নির্বাচনের জন্য সৃষ্টি করলে তা গণতন্ত্রের জন্য আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করবে না কি?
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদে বর্তমান বিধান পরিবর্তন করতে হলে সংসদের দলগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট মতৈক্যের ভিত্তিতে তা করতে হবে। সেটি সম্ভব না হলে মন্দের ভালো হিসেবে বর্তমান বিধান অব্যাহত রাখা সঠিক হবে।

৪.
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদ সুনির্দিষ্ট করার প্রস্তাব নিয়ে ভাবছে সংসদীয় কমিটি। এটি সঠিক চিন্তা এবং এতে বিরোধী দলগুলোর আপত্তি করার কোনো কারণ নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মেয়াদকালে প্রধান উপদেষ্টার পরামর্শ অনুসারে কাজ করার বাধ্যবাধকতা রাষ্ট্রপতির ওপর আরোপ করার প্রস্তাবটিও সবাই ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করতে পারেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রপতির নিয়ন্ত্রণাধীন থাকে বলে কেউ কেউ আপত্তি করছেন। রাষ্ট্রপতির ওপর তখন প্রধান উপদেষ্টা বা উপদেষ্টামণ্ডলীর পরামর্শ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা আরোপ করলে এ বিতর্কও অনেকাংশে দূর হবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনীর ক্ষেত্রে জটিল দিকগুলো হচ্ছে এই সরকারের ক্ষমতা ও কার্যাবলি নির্ধারণ। সংবিধানে আছে, এই সরকার নির্বাচন অনুষ্ঠান-সম্পর্কিত বিষয় বাদে কোনো নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না। অতীতে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে এ ধরনের সিদ্ধান্ত বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নিতে হয়েছিল। আবার বিধানটির অস্পষ্টতার কারণে গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে দুর্নীতি দমনসংক্রান্ত আইনগুলোও সুষ্ঠু নির্বাচনের সঙ্গে সম্পর্কিত হিসেবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়েছিল।
আমাদের এটিও মনে রাখতে হবে যে অতীতে তত্ত্বাবধায়ক আমলগুলোতে আমরা এমন অনেক ভালো আইনও পেয়েছি, যা নির্বাচনী আইনকে সমৃদ্ধ করেছে, বিভিন্ন কমিশন (যেমন—মানবাধিকার ও তথ্য কমিশন) প্রতিষ্ঠা করেছে এবং স্থানীয় শাসনকে শক্তিশালী করতে চেয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যাবলি বেশি সীমাবদ্ধ করে দিলে এমন সুযোগ থেকে আমরা বঞ্চিত হব। আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জরুরি অবস্থা জারি করার ক্ষমতা পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে মহাবিপর্যয়কালীন (যেমন—যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ভূমিকম্প বা অন্য কোনো দুর্যোগ) আমরা গভীর সংকটে পড়ব।

৫.
মূল কথা হচ্ছে, আমাদের গভীর চিন্তাভাবনা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী করতে হবে। শুধু গত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিলে আমরা ভুল করব। ২০০৭ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মূলত রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা ও প্রাণঘাতী সংঘাতের কারণে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসন তখন প্রলম্বিত হয়েছিল শুদ্ধ ভোটার তালিকা প্রণয়নে বিএনপি সরকারের ব্যর্থতা এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রতি প্রথমেই আওয়ামী লীগের শর্তহীন সমর্থনের কারণে। কাজেই অন্যকে দোষ না দিয়ে এই দুটি দল যদি আত্মসমালোচনামূলকভাবে সংস্কার ভাবনায় মন দেয়, তাহলেই শ্রেয়তর একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমরা পেতে পারি ভবিষ্যতে।
সংসদে সব দলকে তাই খোলা মনে আলোচনা করতে হবে, সব অতীত অভিজ্ঞতা বিবেচনায় রাখতে হবে, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাগুলো মাথায় রাখতে হবে। পর্যাপ্ত আলোচনা সংসদে করতে হবে, প্রয়োজনে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত গ্রহণ করতে হবে এবং অবশ্যই মতৈক্যের ভিত্তিতে পরিবর্তন আনতে হবে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের নিরন্তর প্রচেষ্টায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে (এবং নির্বাচন কমিশনকে) আরও নিরপেক্ষ ও কার্যকর করার চিন্তা আমাদের সততার সঙ্গে করতে হবে।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট, ২০১১ -রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে

সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট, ২০১১ বা জনপ্রশাসনের জন্য আইন চূড়ান্ত হওয়ার ঘটনাটি একই সঙ্গে ইতিবাচক ও নেতিবাচক। ইতিবাচক এ কারণে যে গত ৩৯ বছরে যা হয়নি তা হলো। সংবিধানে বেসামরিক প্রশাসন আইনের দ্বারা পরিচালিত হওয়ার কথা থাকলেও আইন ও এর প্রয়োগ উভয়ই ছিল অসংগতিপূর্ণ। আর নেতিবাচক হলো, নতুন পদ্ধতিতে বেশুমার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সুযোগ থাকা এবং পদে পদে পরীক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থার মাধ্যমে তার যথেচ্ছ ব্যবহারেরও অবকাশ থেকে যাচ্ছে। তাই বিষয়টির পুনঃপর্যালোচনা প্রয়োজন।
সরকারের জনপ্রশাসনে নিয়োগ ও পরিচালনার বেলায় জনপ্রশাসনের জটিল ও গভীর সমস্যাগুলো আগে চিহ্নিত করা উচিত। প্রশাসনে দুর্নীতির কথা সুবিদিত, পাশাপাশি অদক্ষতা ও রাজনৈতিক পক্ষপাতও স্পষ্ট। যেখানে অদক্ষতা, দুর্নীতি ও রাজনৈতিক পক্ষপাত সহাবস্থান করে, সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে জনপ্রশাসনে অক্টোপাসের মতো জড়িয়ে থাকা এসব উপসর্গ ঝেঁটিয়ে বিদায় করা যায়। কিন্তু অবসর নেওয়া বা দেওয়ার বিষয়ে সরকারের একচেটিয়া অধিকার কিছুটা খর্ব করা হলেও অন্য ক্ষেত্রে তা পুষিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই আইনে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবাধ সুযোগ রাখায় প্রশ্ন উঠেছে যে এর মাধ্যমে একদিকে যেমন সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছাপূরণের সুযোগ থাকে, তেমনি নিয়মিত প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্তদের সংঘাতেরও ঝুঁকি বেড়ে যায়। কেননা, এভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা নিয়মিত চাকরিজীবী না হওয়ায় চাকরির বিধিবিধানও মানেন না। নিয়োগকর্তাকে খুশি করতেই তাঁরা সব সময় ব্যস্ত থাকেন। নিয়োগকর্তাও তাঁদের রাজনৈতিক অভিলাষ পূরণের কাজে লাগাতে সচেষ্ট থাকেন। এতে যেমন জনপ্রশাসনেরর কর্মকর্তাদের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়, তেমনি শৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে বাধ্য। নিয়মিত সরকারি কর্মচারীরা কাঙ্ক্ষিত পদোন্নতি থেকেও বঞ্চিত হন। চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ আসলে রাষ্ট্রপতির পছন্দের নিয়োগ, যা মোট নিয়োগের ১০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এবং এ ক্ষেত্রে যোগ্যতা-দক্ষতার চাইতে বড় হয়ে ওঠে দলীয় পরিচয়। একই সঙ্গে সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার বিধান বহাল থাকায় কর্মচারীদের সর্বদাই ওপরমহল বা রাজনৈতিক কর্তাদের সন্তোষের ওপর চলতে হয়।
নিশ্চয়ই নতুন সার্ভিস অ্যাক্টে ভালো অনেক কিছুই রয়েছে। কিন্তু অবাধ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ও সুরক্ষা, পদোন্নতি ও অবসরের বিধানগুলোর কারণে এই অ্যাক্টকে সর্বাঙ্গীণ সুন্দর বলার উপায় নেই। প্রস্তাবিত আইনের খসড়াটি ওয়েবসাইটে দেওয়ায় সবাই মতামত জানানোর সুযোগ পাবেন। তদুপরি বিশেষজ্ঞ ও জনপ্রশাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মহলেরও পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে।
সর্বোপরি এটি জাতীয় সংসদে উত্থাপিত হবে। সেখানে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে একটি যুগোপযোগী ও পক্ষপাতমুক্ত সিভিল সার্ভিস অ্যাক্ট চূড়ান্ত করা হবে—এটাই সবাই আশা করে। সব ভালো তার, শেষ ভালো যার।

এই দিন দিন নয়, আরও দিন আছে by আফজাল হোসেন

মুখে আমরা যত কথাই বলি, মনে মনে কতটুকু চেয়েছিলাম, সবাই তা জানি। আশার স্বভাব, বসতে দিলে শুতে চায়। তেমনি আমরাও আশার সঙ্গে চেয়েছিলাম আরও বেশি, তাই যা হওয়ার হলো। বেদনায় ভালো রকম আহত হয়েছি, দুঃখে কেউ নিঃশেষ হয়ে যাইনি—সে প্রমাণ কড়ায়-গন্ডায় পাওয়া হলো বাংলাদেশে বিশ্বকাপের শেষ দিনে।
মিরপুর স্টেডিয়ামে নিজেদের স্বার্থ ছাড়া সেদিন প্রায় ২২ হাজার দর্শক হাজির হয়েছিল কেন? কোন দায় থেকে, কোন কর্তব্যে, কিসের তাগিদে? খেলা ছিল নিউজিল্যান্ড আর দক্ষিণ আফ্রিকার, তাতে আমাদের চাওয়া-পাওয়ার কিছুই ছিল না, তবু হাজির ছিল বোধ হয় ‘সব ভালো যার শেষ ভালো’ কথাটা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ইচ্ছায়। শেষ পর্যন্ত বিশ্ববাসীকে দেখানো সম্ভব হলো, যে চোখ দিয়ে আমাদের দেখার অভ্যাস, সেটা বদলাতে হবে তাদের। অনুমান, মনগড়া ধারণা অনুযায়ী এই দেশ ও মানুষকে দেখা যথেষ্ট হয়েছে, আর নয়।
সব দোষ তাদের দৃষ্টিভঙ্গির নয়, আমরাও অনেক কিছু করি, করেছি, করে থাকি। নিজেদের মন্দ দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ করে দিয়েছি আবার সেই আমরাই দেখালাম, সুযোগ পেলে আমরাও পারি। প্রমাণ করা হলো, মন্দের চেয়ে আমাদের মধ্যে ভালোর পরিমাণই বেশি। আমাদের দরকার যথার্থ উপলক্ষ।
অবাক হতে হয়, এই সেই মানুষ, যাদের মনে হারানোর শোক এখনো দগদগে ঘায়ের মতো থেকে যাওয়ার কথা! দেখা গেল বর্তমানকে ভুলে আগামীর স্বপ্ন নিয়ে ভালো আছে সবাই। একই স্টেডিয়ামে সামান্য কদিন আগে যে দুঃখের কাহিনি রচিত হয়েছিল, তার কোনো চিহ্ন চোখে পড়েনি।
পাওয়ার ধরন কত রকমের হয়। খেলায় হেরে দুঃখ পাই সবাই, কেউ একজন শুধু দুঃখের যাতনায় ঢিল ছুড়ে বসে বিদেশি খেলোয়াড়দের গাড়িতে। এই এক তিল অসংযত আচরণে দুঃখ-ভারক্রান্ত কোটি মানুষের মনপ্রাণ লজ্জায় নুয়ে যায়। পরদিন মাত্র কজন যুবক দেশের মানুষের লজ্জা কাটাতে, বিদেশি খেলোয়াড়েরা যে হোটেলে থাকে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। সবার হাতে প্ল্যাকার্ড, সেই প্ল্যাকার্ডে লেখা ‘আমরা দুঃখিত’।
মাত্র কজনের এই সভ্য, অতি সুন্দর আচরণ আমাদের হেঁট হওয়া মাথা আবার খানিকটা উঁচু করে দেয়। প্ল্যাকার্ডধারীরা সংখ্যায় বেশি ছিল না কিন্তু তাদের অসাধারণ ভূমিকায় পুরো জাতির অর্জন কম হয়নি। আমাদের জানা হয়, সবার মাথা একসঙ্গে হেঁট করে দিতে মাত্র একজনে পারে, আবার মুষ্টিমেয়র ইচ্ছায়, আগ্রহে, দায়িত্বশীল আচরণে, লজ্জা কাটিয়ে গৌরব পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়।
হেরে যাওয়া দল দুঃখ পায়, সে বেদনায় সব শেষ হয়ে গেছে, অনুভব জাগে না। পরাজয় নতুন করে জয়ের আগ্রহ, আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তোলে মনে। খেলায় পরাজয় মানে খেলায়ই পরাজয়, ব্যক্তি বা সমষ্টির পরাজয় নয়। পরাজয় মানে বিষাদ, খণ্ডকালীন অস্বস্তি। পরাজয়ে গৌরব ভেসে যায় না, হতাশা ঠেসে ধরে না।
খেলায় অহংকারের জায়গা নেই বলে জয়ের অহংকারে ফুলে-ফেঁপে ওঠা বা পরাজয়ে অহংকার ধুলোয় লুটিয়ে পড়বে, এমন আশঙ্কা নেই। খেলায় জয়ী হলে কেউ ভাবে না আমি বা আমরা শ্রেষ্ঠ। পরাজিতরা ভাবে না চক্রান্ত করে তাদের হারানো হয়েছে। পরাজয়ে দেশীয় বা বিদেশি শক্তির কালো হাত রয়েছে, খেলায় এমন ভাবার মনোবৃত্তি বা সুযোগ নেই। খেলায় জিততে প্রতিদিন বিশেষ যোগ্যতার প্রয়োজন। কোনো এক সময়ের যোগ্যতায় সারাজীবন জয়ের প্রত্যাশা করা যায় না। খেলায় চাই নিষ্ঠা, প্রত্যয়, মনোবল। গলার জোর, গায়ের জোর দিয়ে খেলা হয় না, কৌশলের প্রয়োজন হয়, কুটপনা নয়।
খেলা মানে সংযম, ধৈর্য, জয়ের জন্য দুর্বার আকাঙ্ক্ষা। জয়ের জন্য যা খুশি তাই নয়। খেলা মানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। প্রতিদ্বন্দ্বী শত্রু নয়, অপর পক্ষ। খেলা অপর পক্ষকে অসম্মান করতে শেখায় না। প্রতিহিংসায় জ্বলে উঠতে বলে না।
খেলা মানে সভ্যতা, সৌজন্যবোধ, সহিষ্ণুতা। ভাষায়, আচরণে, ব্যবহারে সতর্কতার সঙ্গে সৌর্ন্দযকে রক্ষা। খেলা মানে সন্দেহপ্রবণতা নয়, অন্যের শক্তিকে ধুলোজ্ঞান নয়; নিজের সামর্থ্যের ওপর আস্থা, ভরসা, অন্যের প্রতি সমীহ। মান-অপমান নয়, ছোট বা বড় প্রমাণের জন্য নয়, মানবজাতির শ্রেষ্ঠত্ব চর্চার জন্যই খেলা।
খেলায় মিথ্যার কোনো জায়গা নেই, শঠতার কোনো প্রশ্রয় নেই। মনে এক, মুখে আরেক—এমন অসুস্থতা খেলার মাঠে অচল। উত্তেজনা প্রশমনের জন্য খেলায় চিৎকার চলে, হুংকার অচল। খেলায় জিততে মিটিং, মিছিল, ভাষণ ইত্যাদির প্রয়োজন পড়ে না। মানুষকে আচরণে-বিচরণে সন্ত্রস্ত করার কায়দা-কানুন খেলায় অচল। অস্ত্রশস্ত্র বা হিংসার যাবতীয় উপকরণ খেলার মাঠে অপদার্থ বিশেষ। অপদার্থ শ্রেণীর মানুষ খেলার মাঠে অপদার্থই। মেধা, যোগ্যতা ছাড়া কারও দয়াদাক্ষিণ্যে খেলোয়াড় পরিচিতি গড়ে ওঠে না।
নিজ স্বার্থে, ক্ষমতার প্রতাপে অক্ষম মানুষকে ক্ষমতায় বসিয়ে দেওয়া যায় কিন্তু কোনো ক্ষমতাবান একজন অক্ষমকে সফল খেলোয়াড় বানাতে পারে না। পেশিশক্তিতে সামাজিক জীবনে এক ধরনের প্রতিষ্ঠা পাওয়া সম্ভব, খোলার মাঠে নয়।
টাকার বিনিময়ে অদরকারি মানুষকে দরকারিতে পরিণত করা যায়, টাকা দরকারি খেলোয়াড় বানাতে অক্ষম। তোষামোদকারী, চাটুকার শ্রেণীর মানুষও খেলার মাঠে অচল। অচলদের সচল হওয়ার সুযোগ থাকলেও তা নেপথ্যে।
খেলোয়াড়েরা মাঠে আসে খেলতে, দর্শক যায় দেখতে। তোষামোদকারীরা ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে’ প্রবাদটার মতো। যখন সবাই খেলার আনন্দে মেতে থাকে, ওই চরিত্রেরা খেলার বদলে মাথায় অন্য কিছুর অঙ্ক সাজায়। খেলার বদলে অপ্রয়োজনীয় বিষয়কে প্রয়োজনীয় করে তোলে।
বিশ্বকাপ ক্রিকেট অশুভর লেজে পা দেয়নি, মানুষের অন্তরের সব শুভকে জাগিয়ে দিয়েছে। বিচ্ছিন্ন মানুষেরা একসঙ্গে হয়েছে, বিষণ্ন মানুষেরা একত্র হয়েছে। বিপন্ন মন আনন্দের খোরাক পেয়ে গেছে। হতাশাগ্রস্ত মানুষ পেয়েছে আশার আলোর সন্ধান।
মানুষ তিক্ততা ভুলেছে। এখন পরস্পরকে ঘনিষ্ঠ মনে হয় তাদের। একসঙ্গে মানুষ উল্লাস প্রকাশ করে, বেদনার্ত হয়। দলেবলে মিলে আনন্দে উজ্জ্বল, শোকে মুহ্যমান হয়। বিশ্বকাপে ক্রিকেটের উত্তেজনায় ‘এক জাতি এক দেশ’—এ পুরোনো পরিচয় আবার ফেরত পাওয়া হয়েছে। সংকীর্ণতা সরেছে, সংকোচ ঘুচেছে। ক্রিকেট আমাদের নত মাথা উঁচু করে দিয়েছে। দরিদ্র দেশের ক্রিকেটকে এখন দরিদ্র বলতে বাধবে।
বনেদিরা ক্রিকেটকে সমীহ করে, এখন ক্রিকেট এবং বাংলাদেশ—এই দুইকে সমীহ না দেখিয়ে উপায় নেই। উষ্ণ আতিথেয়তা, সম্ভাবনাময় ক্রিকেট দিয়ে এবার বিশ্ব বাংলাদেশকে চিনেছে। দুর্যোগের বাংলাদেশ, কলঙ্কিত বাংলাদেশ, জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙার দেশকে পেছনে ফেলে দিয়েছে ক্রিকেট। আমরা জানি, বহু দিনে বহু মানুষের ত্যাগ-তিতিক্ষায় এমনটা সম্ভব হয়েছে। আমরা জানি, নিষ্ঠা ও একাগ্রতা ছাড়া ক্রিকেটের শির এতটা উন্নত হতো না।
আমাদের অনেক ক্ষুদ্রতা কেটেছে, প্রচলিত অনেক স্বভাবের বদল ঘটেছে কিন্তু একাংশের ক্ষুদ্রতা অব্যয়, অক্ষয় থাকবে। চেনা স্বভাবের সামান্য অংশ বদলাবে না।
পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল... হ্যাঁ, আমরা টের পাচ্ছি ভোরের আলো ফুটেছে। শুনতে পাচ্ছি পাখিদের কলকাকলি। এক অনির্বচনীয় সুখের অনুভূতি মানুষের মনে। অসাধারণ এক সুগন্ধ তাদের প্রাণে বহমান। সবার অনুভব, ‘কাননে কুসুম কলি কত যে ফুটিল’।
নিশ্চয় ফুটেছে কুসুম, তাই জগৎজুড়ে সৌরভ, কলকাকলিতে মুখর সোনার বাংলার সোনার মানুষদের মন। এই তরুণ সৌরভ কি অটুট থাকবে? এই মুখরতা ভবিষ্যতে কি নিষ্প্রাণ হয়ে যাবে?
পুরোনো কাণ্ডে, শাখা-প্রশাখায় নতুন রঙের পাতা, স্বভাবে চির পুরোনো। অচল মানুষের সচল তোষামোদি, নানা ভ্রষ্টাচার আপাতত পেছনে গিয়ে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছে। এই অসহায়ত্ব তো বেশি দিন থাকবে না। সে তো মনে মনে গাইছে ‘এই দিন তো দিন নয়, আরও দিন আছে ... ’
ক্রিকেট নিয়ে মানুষে, দেশে এত বড় বদল ঘটে গেল, বিশ্বকাপের বছর গড়িয়ে যাবে, উৎসবের আমেজ হয়ে যাবে আনন্দময় স্মৃতি। আমাদের ঘরে ঘরে শিয়রে বা বিছানার পাশের টেবিলে টেবিলে তেতো স্বাদের লাল সিরাপটা কি অনড় থাকবে? আমাদের রেহাই দেবে না? চোখ রাঙিয়ে তাকিয়ে থাকবে, শাসাবে, শাসিয়েই যাবে, আমাকে ছাড়া চলবে না তোমাদের?
বিশ্বকাপের জয় সর্বত্র, সব মানুষের মনে। পরাজয় একখানে, যেখানে তার কোনো হাত নেই।
আফজাল হোসেন: অভিনেতা ও বিজ্ঞাপনচিত্র নির্মাতা।

তুরস্কে ছয় জঙ্গি নিহত

তুরস্কের নিরাপত্তা বাহিনী সাত কুর্দি জঙ্গিকে গতকাল শুক্রবার সকালে হত্যা করেছে। সিরিয়া থেকে সীমান্ত দিয়ে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টির (পিকেকে) এই জঙ্গিরা তুরস্কে প্রবেশের পর এ ঘটনা ঘটে।
পিকেকে জানায়, গত গ্রীষ্মের পর বন্দুকযুদ্ধে এবারই এত জঙ্গি মারা গেল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সামরিক কর্মকর্তারা বলেন, হাতাই প্রদেশের হাসা শহরের সহিংসতাকবলিত এলাকায় সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

ইরানি তিন কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছে কুয়েত

গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে ইরানের তিনজন কূটনীতিককে বহিষ্কার করেছে কুয়েত। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ আল-সাবাহ গত বৃহস্পতিবার এ কথা জানিয়েছেন।
মোহাম্মদ আল-সাবাহ সাংবাদিকদের জানান, তেহরানের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করছে, এ ধরনের একটি চক্রের সঙ্গে যোগসাজশ থাকায় ওই কূটনীতিকদের বহিষ্কার করা হয়। ধারণা করা হচ্ছে, চক্রটি ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের সময় থেকে গুপ্তচরবৃত্তি করে আসছে। তবে কুয়েতের ওই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে তেহরান।

ভারতে পরমাণু প্রকল্প বন্ধের আহ্বান শীর্ষ বিজ্ঞানীর

ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী পি. বালারাম দেশটির ভবিষ্যৎ সব পরমাণু প্রকল্প বন্ধ করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। জাপানের পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এ আহ্বান জানালেন। পি. বালারাম ভারতের বিজ্ঞান পরিষদের পরিচালক ও প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বিজ্ঞানবিষয়ক উপদেষ্টা পরিষদের অন্যতম সদস্য। তিনি সরকারের কাছে লেখা এক খোলা চিঠিতে এ আহ্বান জানান।
ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোতে গতকাল শুক্রবার এ চিঠির সারাংশ প্রকাশিত হয়েছে। চিঠিতে জাপানের ঘটনাকে ভারতের জন্য সতর্কবাণী উল্লেখ করে দেশটির বর্তমান পরমাণুনীতি গভীরভাবে পুনর্মূল্যায়ন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এ মূল্যায়ন না হওয়া পর্যন্ত সব পরমাণু প্রকল্প বন্ধ এবং সম্প্রতি যেসব পরমাণু প্রকল্পকে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, তা বাতিলের আহ্বান জানানো হয়েছে। চিঠিতে ভারতের পরমাণু স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তার বিষয়ে স্বতন্ত্র ও স্বচ্ছ নিরীক্ষা চালানোর জন্যও সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

দ্বিতীয় জীবন পেলে গানে সুর বাঁধবেন সু চি

গৃহবন্দি ছিলেন প্রায় দুই দশক। একটি দেশের গণ-আন্দোলন গড়ে উঠছে এবং তা তাঁকেই কেন্দ্র করে। দ্বিতীয় একটি জীবন পেলে এমন মানুষ কী চাইতে পারেন?
এমনই এক প্রশ্নের জবাবে মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চি একটুও না থেমে বললেন, ‘কম্পোজার! আমি কম্পোজার হতে চাই।’ কারণ, গৃহবন্দি থাকার সময় অনেকবারই তাঁর মনে হয়েছে, যদি তৈরি করতে পারতেন সুর, সুর দিতে পারতেন গানে!
সব ধরনের গানই শোনেন সু চি, তবে বিশেষ পছন্দ পশ্চিমা ধ্রুপদি সংগীত। ‘ভারতীয় রাগের খুঁটিনাটি বুঝি না, তবে ভাল লাগে। কিন্তু সুরের ব্যাপারে নিজে কিছুই করতে পারি না। কোনো ক্ষমতাই নেই। মিউজিক্যালি আই অ্যাম নট গিফটেড। তাই মনে হয়, দ্বিতীয় একটা জীবন পেলে কম্পোজার হতাম।’
গত বছরের ১৩ নভেম্বর মিয়ানমারের সামরিক জান্তা তাঁকে মুক্তি দেয়। তারপর চার মাস ধরে দেশে গণ-আন্দোলন সংগঠনে মন দিয়েছেন ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসির (এনএলডি) নেত্রী সু চি। আর এসবের মাঝেই গান শুনছেন, পড়ছেন কবিতা। কার? হাফিজের? ‘পারস্যের এই কবি তো আশাবাদের কবি।’
গৃহবন্দি থাকার সময় রেডিও ছিল বহির্জগতের সঙ্গে সু চির যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। এখন মুক্তি পাওয়ার পরও টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রাখেননি তিনি। তিনি বলেন, ‘আমার তো ডিশ-সংযোগ নেই। তাই টিভি অন করলে শুধু দেশের চ্যানেলগুলোই আসে। তাতে তো শুধুই সরকারের প্রচার। তাই আর টিভি দেখতে ইচ্ছে করে না।’

ইয়েমেনে প্রেসিডেন্ট সালেহর পক্ষে-বিপক্ষে বিশাল বিক্ষোভ

ইয়েমেনের রাজধানী সানায় গতকাল শুক্রবার প্রেসিডেন্ট আলি-আবদুল্লাহ সালেহর পক্ষে-বিপক্ষে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। এ সময় দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ রোধে রাস্তায় সেনা ও ট্যাংক মোতায়েন করা হয়। এদিকে ইয়েমেনের একজন প্রভাবশালী বিরোধী রাজনীতিক বলেছেন, প্রেসিডেন্ট সালেহকে পদত্যাগ করলেই চলবে না, তাঁকে দেশও ত্যাগ করতে হবে।
গতকাল জুমার নামাজের আগ থেকেই সানা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রেসিডেন্ট সালেহবিরোধী হাজার হাজার বিক্ষোভকারী জড়ো হতে থাকে। তারা সরকারবিরোধী স্লোগান দেয় এবং এবং প্রেসিডেন্ট সালেহর ৩২ বছরের শাসনের অবসান দাবি করে। বিক্ষোভকারীরা প্রেসিডেন্ট সালেহকে প্রতারক ও বিশ্বাসঘাতক হিসেবে বর্ণনা করে। তারা ইয়েমেনের জনতা জেগেছে, পুলিশ-সৈন্য সবাই অত্যাচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ ইত্যাদি স্লোগান দেয়।
সানা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিক আড়াই মাইল দূরে সাবিয়িন স্কয়ারের কাছে জমায়েত হয় প্রেসিডেন্ট সালেহর সমর্থকেরা। তারা ইয়েমেনের পতাকা, প্রেসিডেন্ট সালেহর ছবি এবং তাঁর সমর্থনে লেখা ব্যানার বহন করে।
এ সময় দুপক্ষকে সংযত রাখতে রাস্তায় শত শত সৈন্য ও ট্যাংক মোতায়েন করা হয়। বিভিন্ন জায়গায় বসানো হয় তল্লাশি চৌকি।
ইয়েমেনের প্রভাবশালী বিরোধী ইসলামিস্ট ইসলাহ দলের নেতা হামিদ আল-আহমার বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, প্রেসিডেন্ট সালেহকে অনতিবিলম্বে পদত্যাগ করলেই চলবে না, নিজেদের ও পরিবারের নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁকে দেশও ত্যাগ করতে হবে।

লিবিয়া-সংকটের সামরিক সমাধান সম্ভব নয়: জার্মানি

চীনে সফররত জার্মানির পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদু ওয়েস্টা ভেলে গতকাল শুক্রবার বেইজিংয়ে বলেছেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত লিবিয়া পরিস্থিতির সামরিক সমাধান সম্ভব নয়। তিনি তেলসমৃদ্ধ এই দেশের রাজনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানান। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়াংজাইচির সঙ্গে বেইজিংয়ে বৈঠকের পর গুইডো ওয়েস্টার এ কথা বলেন।
গিদু ওয়েস্টা লিবিয়ায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানান। বেইজিংয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘লিবিয়া সমস্যার সমাধান কেবল রাজনৈতিকভাবেই হতে পারে। আমাদের অবশ্যই এই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে হবে।’ তিনি বলেন, শান্তি প্রক্রিয়া শুরু করতে অবশ্যই গাদ্দাফিকে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হতে হবে।

জাপানে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে ভূগর্ভস্থ পানিতেও

জাপানের ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লি থেকে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়েছে ভূগর্ভস্থ পানিতেও। কেন্দ্রের পরিচালনা প্রতিষ্ঠান টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি (টেপকো) গত বৃহস্পতিবার এ কথা জানিয়েছে। তবে ভূগর্ভস্থ পানি এখনো পানের অনুপযোগী হয়ে পড়েনি বলে জানায় টেপকো।
টেপকোর মুখপাত্র নাউয়োকি মাতসুমো জানান, কেন্দ্রের নিচে ভূগর্ভস্থ পানিতে তেজস্ক্রিয়তা নিরাপদ মাত্রার চেয়ে এক হাজার গুণ বেড়ে গেছে। একটি চুল্লির নিচে মাটির ৫০ ফুট গভীরের তেজস্ক্রিয় উপাদান আয়োডিন-১৩১ পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, এই তেজস্ক্রিয়তা এই মুহূর্তে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে দুভাবে তা মানুষের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে। চুল্লির নিচের ওই বিষাক্ত পানি যদি চুইয়ে চুইয়ে আশপাশের নলকূপের নাগালে চলে যায় এবং লোকজন সে পানি পান করে। বর্তমানে সেই হুমকি নেই, কেননা কেন্দ্রের আশপাশের ২০ কিলোমিটার এলাকার লোকজনকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে বাড়িঘরের খোঁজখবর নিতে কিছু মানুষ চুরি করে এলাকায় ঢুকছে। এতে বিপদ হতে পারে।
এ ছাড়া ভূগর্ভস্থ পানিতে তেজস্ক্রিয়তা যেভাবে হুমকি হয়ে উঠতে পারে, তা হলো ওই পানি যদি চুইয়ে চুইয়ে আশপাশের নদী ও অন্য কোনো জলাধারে চলে যায় এবং মানুষ যদি তা পান করে।
তোহোকু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞানের অধ্যাপক সেইকি কাওয়াগোয়ি বলেন, ভূগর্ভস্থ পানি সমুদ্রের পানির মতো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এ কারণে তেজস্ক্রিয়তা আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা খুবই বেশি।
এর আগে ওই কেন্দ্রের আশপাশের মাটি ও সমুদ্রের পানিতে উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয়তা শনাক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া সবজি, দুধ ও ট্যাপের পানিতেও তেজস্ক্রিয়তা পাওয়া গেছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী নাওতো কান গতকাল শুক্রবার বলেছেন, মানুষ যতক্ষণ সরকারের দেওয়া পরামর্শ মেনে চলবে, ততক্ষণ তেজস্ক্রিয়তা মানুষের জন্য ক্ষতির কারণ হবে না।
কান আরও বলেন, ‘আমাদের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে পরামর্শ করেই ২০ কিলোমিটার এলাকার লোকজনকে সরিয়ে নিয়েছি। এর বাইরের লোকজনকে সরানোর দরকার নেই। আমরা লোকজনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি, তারা যেন সরকারের পরামর্শ মেনে চলে, তাহলে তাদের স্বাস্থ্যের জন্য কোনো হুমকি হবে না।’
তবে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ) গত বৃহস্পতিবার জানায়, ফুকুশিমা কেন্দ্রের ৪০ কিলোমিটার দূরে বিপজ্জনক মাত্রার তেজস্ক্রিয়তা পাওয়া গেছে। ফলে জাপান সরকারের উচিত, আরও বেশি এলাকার লোকজনকে সরিয়ে নেওয়ার কথা বিবেচনা করা।

বাহরাইন ইস্যুতে কুয়েতের মন্ত্রিসভার পদত্যাগ

কুয়েতের আমির শেখ সাবাহ আল-আহমেদ আল-জাবের আল-সাবাহ গতকাল শুক্রবার মন্ত্রিসভার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন। তবে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন না হওয়া পর্যন্ত তিনি একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে এই মন্ত্রিপরিষদকেই কাজ চালিয়ে যেতে অনুরোধ করেছেন।
সরকারি ফরমান অনুসারে প্রধানমন্ত্রী শেখ নাসের আল-মোহাম্মদ আল-সাবাহ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে কাজ চালিয়ে যাবেন।
প্রতিবেশী দেশ বাহরাইনের আন্দোলনকে ঘিরে গত বৃহস্পতিবার কুয়েতের মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে।
মন্ত্রিসভার পদত্যাগের ব্যাপারে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন শাসক আল-সাবাহ পরিবারের তিনজন মন্ত্রী। প্রতিবেশী বাহরাইনের সরকারকে সাহায্য করতে কুয়েত কেন সেখানে সৈন্য পাঠাল না—বিতর্কিত এই প্রশ্নের জবাব এড়াতে মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করেছে বলে কুয়েতের গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে।
শাসকগোষ্ঠীর পত্রিকা আল ওয়াতান-এর খবরে বলা হয়, পরারষ্ট্রমন্ত্রী এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়েছেন, যার উত্তর দেশে সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিতে পারে। তবে প্রধানমন্ত্রী দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের এবং প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কায় বাহরাইন পরিস্থিতি নিয়ে কোনো রূপ মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা আট আসনে অন্যদের সমর্থন দেবে

কলকাতার পশ্চিমবঙ্গের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা এবার আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে দার্জিলিং, শিলিগুড়ি ও ডুয়ার্সের ১২টি আসনের মধ্যে আটটি আসনে অন্যদের সমর্থন দেবে। গত বৃহস্পতিবার দার্জিলিংয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সুপ্রীমো বিমল গুরুং এ কথা জানান।
সুপ্রীমো বিমল গুরুং বলেন, দার্জিলিং, শিলিগুড়ি ও ডুয়ার্সের বিধানসভার ১২টি আসনের মধ্যে দার্জিলিংয়ের চারটি আসনে তাঁদের প্রার্থীরা লড়বেন। আর বাকি আটটি আসনের মধ্যে ছয়টি আসনে তাঁরা কংগ্রেস-তৃণমূল জোট প্রার্থীদের সমর্থন দেবেন। এ ছাড়া বিজেপি ও আদিবাসী বিকাশ পরিষদের প্রার্থীকে একটি করে আসনে সমর্থন দেবেন।
তৃণমূল-কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক মুকুল রায় গতকাল শুক্রবার বলেন, এটা অনভিপ্রেত। তাঁরা জনমুক্তি মোর্চার সমর্থন চাননি।
বামফ্রন্ট বলেছে, গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার এই ভূমিকা প্রমাণ করে, মমতার সঙ্গে তাদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

বিচারের মুখোমুখি হচ্ছেন মুসা কুসা

লিবিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুসা কুসা যুক্তরাজ্য ও আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা থেকে রেহাই পাবেন না। ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম হেগ এ কথা জানিয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার দেশটির পররাষ্ট্র দপ্তরে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা জানান। উইলিয়াম হেগ বলেছেন, ‘কুসাকে যুক্তরাজ্য সরকার বা আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থা থেকে রেহাই দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়নি।’ ১৯৮৮ সালে লকারবির আকাশে বিমান হামলার বিষয়ে কুসাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
হেগ আরও বলেন, ‘মুয়াম্মার গাদ্দাফির শাসন অচিরেই ভেঙে পড়বে।’ ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী গাদ্দাফির অনুগতদের মুসা কুসার পথ অনুসরণ করারও আহ্বান জানান।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, ব্রিটিশ কর্মকর্তারা কুসাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন।
এদিকে স্কটল্যান্ডের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, লকারবি বিমান হামলার বিষয়ে তাঁরা আনুষ্ঠানিকভাবে কুসাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। ওই সময় কুসা গাদ্দাফির গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। এই বিমান হামলায় তাঁর হাত রয়েছে বলে অভিযোগ আছে।
মুসা কুসা গত বুধবার রাতে গাদ্দাফিকে ত্যাগ করে যুক্তরাজ্যে যান। তিনি ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের জানান, তিনি আর লিবিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নন। মুসা কুসা গাদ্দাফির বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবেই সবার কাছে পরিচিত ছিলেন।

আবিদজানের দখল নিয়ে বাগবো ও ওয়াতারা বাহিনীর তুমুল লড়াই

আইভরি কোস্টের প্রধান শহর আবিদজানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট লরা বাগবো ও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আলাসেন ওয়াতারার অনুগত বাহিনীর মধ্যে তুমুল লড়াই চলছে। প্রত্যক্ষদর্শী লোকজন গতকাল শুক্রবার জানিয়েছেন, আবিদজানে বাগবোর বাসভবনের কাছে ব্যাপক গোলাগুলির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।
ওয়াতারার মুখপাত্র প্যাট্রিক অ্যাচি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন, ‘আবিদজানে বাগবোর বাসভবনে আমাদের বাহিনী হামলা চালিয়েছে। বাগবো বাসভবনের ভেতরে অবস্থান করছেন। তিনি কোথাও বের হতে পারছেন না। এ ব্যাপারে বিস্তারিত পরে জানানো হবে।’ অ্যাচি আরও জানান, গতকাল রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে ওয়াতারা বাহিনী। আবিদজানের বাসিন্দারা জানিয়েছে, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সম্প্রচার গতকাল বন্ধ হয়ে গেছে।
ওয়াতারার অনুগত বাহিনী গত বৃহস্পতিবার আবিদজানে প্রবেশ করে। এরপর আবিদজানের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থানে দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল লড়াই হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাগবোর একজন সামরিক মুখপাত্র হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তবে ওই মুখপাত্র জানান, বাগবো বাহিনী এখনো রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ভবনে প্রতিরোধ বজায় রেখেছে।
গত নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের পর দেশটিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা দেখা দেয়।

যুক্তরাজ্যে সাবেক এমপির ১৬ মাসের কারাদণ্ড

যুক্তরাজ্যের লেবার পার্টির সাবেক এমপি জিম ডিভাইনকে (৫৭) ব্যয়ের ভুয়া হিসাব দাখিলের দায়ে ১৬ মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্টের বিচারক জন সনডার্স এ রায় দেন। যুক্তরাজ্যে ব্যয় নিয়ে কেলেঙ্কারির মামলায় সাবেক রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে আদালতের দণ্ডাদেশের তৃতীয় ঘটনা এটি। ব্যয়ের ভুয়া হিসাব দেখানোর ঘটনায় ডিভাইনের কঠোর সমালোচনা করেন আদালত।
বিচারক জন সনডার্স বলেন, ডিভাইন তাঁর পরিকল্পনা মতো ব্যয়ের ভুয়া হিসাব দাখিল করেন। এই কেলেঙ্কারি ফাঁস হওয়ার পর এবং তাঁর দেওয়া হিসাব খতিয়ে দেখার সময়ও তিনি ব্যয়ের ব্যাপারে অর্থ দাবি করতে থাকেন।
গত মাসে জিম ডিভাইনের এই অপরাধ ধরা পড়ে। সে সময় তিনি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ছাপার ব্যয় বাবদ আট হাজার ৩৮৫ ইউরোর ভুয়া হিসাব জমা দেন।
বিচারক বলেন, এ অপরাধের ফলে আস্থাভাজন ব্যক্তি হিসেবে এমপির মর্যাদা চূড়ান্তভাবে ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এই অমর্যাদা শুধু তাঁকেই নয়, অন্যান্য এমপির ভাবমূর্তিতেও আঘাত হেনেছে। এতে পার্লামেন্টের সুনামের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

বাথ পার্টির শাসন অবসানের দাবিতে উত্তাল সিরিয়া

সিরিয়ার ক্ষমতাসীন বাথ পার্টির শাসন অবসানের দাবিতে গতকাল শুক্রবার জুমার নামাজের পর দেশটির রাজধানী দামেস্কসহ অন্তত তিনটি শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ জাতির উদ্দেশে ভাষণে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে বিদেশি ষড়যন্ত্র হিসেবে আখ্যায়িত করার ঠিক দুই দিনের মাথায় এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হলো।
গতকাল জুমার নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই হাজার হাজার বিক্ষোভকারী দামেস্কের রাজপথে নেমে আসে। এ সময় দামেস্কের উপকণ্ঠে দুমা শহরে নিরাপত্তা বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে ও গুলি চালায়। এতে চার বিক্ষোভকারী নিহত ও বহু আহত হয়। এ ছাড়া উপকূলীয় শহর লাতাকিয়া ও বানিয়াতেও সরকারবিরোধী বিক্ষোভ হয়। রাজনৈতিক সংস্কার ও জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার-সম্পর্কিত প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে একজন বিক্ষোভকারী বলেন, ‘কয়েক দশক ধরে আমরা এ ধরনের কথা শুনে আসছি। আসল কথা হলো, আমরা ৪০ বছর ধরে নির্যাতনের শিকার।’ এর আগে গতকাল অনলাইনে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় সিরিয়ার মানবাধিকার কর্মী ও বিশিষ্ট আইনজীবী হায়তাম মালেহ দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য বিক্ষোভকারীদের প্রতি আহ্বান জানান। সিরিয়া রেভল্যুশন ২০১১ নামে একটি গ্রুপ ফেসবুকে জুমার নামাজের পর প্রতিটি মসজিদ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করার আহ্বান জানায়।
সিরিয়ায় সরকারবিরোধী বিক্ষোভ চলাকালে সেনাদের গুলিতে এ পর্যন্ত ১৬০ জন নিহত হয়েছে। এদের অধিকাংশ প্রাণ হারিয়েছে জর্ডান সীমান্ত-সংলগ্ন দেরা ও উপকূলীয় শহর লাতাকিয়ায়। সরকারি কর্মকর্তারা অবশ্য মৃতের সংখ্যা ৩০ বলে জানিয়েছেন। তাঁরা দাবি করেন, এরা সেনাদের গুলিতে নয়, বরং মুসলিম চরমপন্থীদের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ গত বুধবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। ওই ভাষণে তিনি দেশে ৫০ বছর ধরে চলা জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। সিরিয়ায় ১৯৬৩ সালে বাথ পার্টি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জরুরি অবস্থা বলবৎ রয়েছে। প্রেসিডেন্ট বাশার তাঁর ১১ বছরের শাসনকালে বর্তমানে সবচেয়ে চাপের মুখে আছেন।
সিরিয়া ভ্রমণ না করার পরামর্শ: যুক্তরাষ্ট্র গত বৃহস্পতিবার সে দেশের নাগরিকদের প্রয়োজন ছাড়া সিরিয়া ভ্রমণ না করতে এবং সেখানে অবস্থানরত মার্কিনদের দেশটি ত্যাগ করার পরামর্শ দিয়েছে। দেশটিতে বিক্ষোভ ও সহিংস ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
গত ২৪ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র মার্কিন নাগরিকদেরকে সিরিয়ার অস্থির এলাকাগুলোয় ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছিল। এসব এলাকায় নিরাপত্তাকর্মী ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সিরিয়ার সঙ্গে অনেক দিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধপূর্ণ সম্পর্ক চলছে। সিরিয়া হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো জঙ্গি দলগুলোকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে বলে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে আসছে। জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আসাদ দেশটি থেকে জরুরি আইন প্রত্যাহারের ঘোষণা না দেওয়ায় বিক্ষোভ ও সহিংসতা আরও বেড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

গাদ্দাফির বিপদ, গাদ্দাফির ভরসা

রাজধানী ত্রিপোলির দিকে ধাবমান বিদ্রোহীরা লিবিয়ার নেতা গাদ্দাফির জন্য যতটা না হুমকি, এর চেয়ে এখন তাঁর বড় বিপদ, এই দুঃসময়ে সহযোগীদের একে একে দূরে সরে যাওয়া।
বিদ্রোহ শুরুর পরপরই বিপদের আঁচ পেয়ে দেরি না করে কিছু মন্ত্রী, আমলা ও কূটনীতিক গাদ্দাফির পক্ষ ত্যাগ করে ভিড়ে গিয়েছেন বিদ্রোহী শিবিরে। এর পরও গাদ্দাফি শক্ত হাতে পরিস্থিতি মোকাবিলা করে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে গত বুধবার তাঁর ওপর বড় আঘাতটা হেনেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মুসা কুসা। পদত্যাগ করে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে উঠেছেন।
ঘোরতর এই বিপদের দিনে যে গুটিকয়েক লোকের ওপর গাদ্দাফি নির্ভর করতেন, মুসা কুসা ছিলেন সেই দলে। তিনি গাদ্দাফিকে ছেড়ে যাওয়ায় এখন অন্যরাও দ্রুত সটকে পড়ার চেষ্টা করবেন বলে আশা করছেন বিদ্রোহীরা।
এখন গাদ্দাফির বড় সহায় তাঁর আত্মীয়স্বজন এবং তাঁর নিজের আদিবাসী গাদ্দাফা গোষ্ঠী। লিবিয়ার প্রায় ১৪০টি আদিবাসী গোষ্ঠীর মধ্যে গাদ্দাফা একটি এবং এদের সংখ্যাও বেশ কম। কাজেই এখন অন্য গোষ্ঠীগুলোর সমর্থন গাদ্দাফির দরকার, যাদের অনেককে তিনি চার দশকের শাসনামলে হাত করেছিলেন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর বড় বড় পদগুলো দিয়ে।
গাদ্দাফির জন্য গুরুত্বপূর্ণ দুটি মিত্র আদিবাসী গোষ্ঠী হলো ওয়ারফাল্লা ও মাগারাহ। এ দুটি দেশের অন্যতম বড় দুটি আদিবাসী গোষ্ঠী, প্রতিটির সদস্যসংখ্যা প্রায় ১০ লাখ করে। এই দুই গোষ্ঠীর লোকজন অসীন আছেন নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনী ও সরকারি বড় বড় পদগুলোতে। গাদ্দাফির অন্যতম ডানহাত বলে পরিচিত সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান আবদুল্লাহ সেনেউসি মাগারাহ গোষ্ঠীর সদস্য। এ ছাড়া তিনি গাদ্দাফির আত্মীয়।
গাদ্দাফির ছেলেদের মধ্যে তিনজন খামিস, মুতাচ্ছিম ও আল-সাদির গঠিত রক্ষীবাহিনীর অধিকাংশ সদস্য ওয়ারফাল্লা ও মাগারাহ গোষ্ঠীর। বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে গাদ্দাফির লড়াইয়ের অন্যতম ভরসা এই বাহিনী।
তবে গত ফেব্রুয়ারিতে বিদ্রোহ শুরুর পর ওই দুই গোষ্ঠীর কিছু নেতা বিদ্রোহীদের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করেছেন এবং তাঁদের গোষ্ঠীর অনেকে বিদ্রোহী বাহিনীতে যোগ দিয়েছেন। বিদ্রোহীদের পূর্বাঞ্চলীয় নেতা মাহমুদ জিবরিল জাতিতে একজন ওয়ারফাল্লা।
তবে ওয়ারফাল্লা গোষ্ঠীর বেশির ভাগ মানুষ এখনো গাদ্দাফির প্রতি অনুগত। এর কারণ হতে পারে তারা আশা করছে, গাদ্দাফি ক্ষমতায় টিকে গেলে তারা এই আনুগত্যের পুরস্কার পাবে।
লিবিয়ার ইতিহাস এবং আদিবাসীদের বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ফারাজ নাজিম জানিয়েছেন, ওয়ারফাল্লা গোষ্ঠীর মধ্যে যাঁরা গাদ্দাফির ঘনিষ্ঠ যেমন, অবকাঠামোমন্ত্রী মাতৌক মাতৌক, তাঁরা সম্প্রতি নিজেদের গোষ্ঠীর লোকজনকে গাদ্দাফির অনুগত থাকার জন্য শাসিয়ে দিয়েছেন।
ফারাজ নাজিম বলেন, ‘তাঁরা লোকজনকে হুমকি দিয়ে বলেছেন, কেউ গাদ্দাফির বিরুদ্ধে অবস্থান নিলে তাঁকে এর পরিণতি ভোগ করতে হবে। এভাবেই লোকজনকে জোর করে বশে রাখা হচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কিন্তু একসময় এটা আর সম্ভব হবে না। পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে তাঁরাও গাদ্দাফিকে ডুবাতে পারেন, সেটা হয় সরাসরি গাদ্দাফির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে, নতুবা তাঁর পক্ষ ত্যাগ করে চুপচাপ থেকে।’
একা হয়ে পড়ছেন গাদ্দাফি: দিন দিন একা হয়ে পড়ছেন লিবীয় নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি। তাঁকে ছেড়ে ইতিমধ্যে অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা চলে গেছেন। চলে যাওয়ার অপেক্ষায় আছেন আরও অনেকে। কিন্তু নিরাপত্তা ও দেশ ত্যাগে সমস্যা হওয়ার কারণে তাঁরা সে কথা প্রকাশ করতে পারছেন না।
আরবের বিভিন্ন পত্রপত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, গাদ্দাফিকে ছেড়ে যাওয়ার দলে নতুন করে শামিল হয়েছেন লিবীয় পার্লামেন্টের সমকক্ষ পপুলার কমিটির প্রধান মোহাম্মদ আবু আল-কাশিম জাওয়ি এবং শীর্ষ তেল কর্মকর্তা শুকরি ঘানেম। ঘানেম অবশ্য স্বপক্ষ ত্যাগের কথা অস্বীকার করেছেন।
তিউনিসিয়ায় অবস্থানরত আল-জাজিরার সাংবাদিক নাজনিন মুশহিরি বলেছেন, লিবিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী আবু জায়েদ দোরদাও গাদ্দাফির সঙ্গ ত্যাগ করেছেন। তিনি ১৯৯০ থেকে ৯৪ সাল পর্যন্ত লিবিয়ার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবু আবদেস সালাস ত্রেকি বর্তমানে কায়রোতে অবস্থান করছেন। তাঁকে গাদ্দাফি জাতিসংঘে লিবিয়ার দূত হিসেবে নিয়োগ দিলেও তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, গাদ্দাফির হয়ে তিনি কাজ করতে রাজি নন।
লিবিয়ায় গত ১৫ ফেব্রুয়ারি গাদ্দাফির বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত অনেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আবদেল ফাত্তাহ ইউনিস এবং বিচারমন্ত্রী মুস্তফা মোহাম্মদ আল-জলিল। পদস্থ সরকারি বিভিন্ন কর্মকর্তা স্বপক্ষ ত্যাগের চেষ্টা করছেন। কিন্তু কঠোর সরকারি নজরদারিতে থাকার কারণে এবং দেশ ত্যাগ করতে না পারায় তাঁরা তা করতে পারছেন না।

ফুলে বরণ আফ্রিদিদের

ঝরল পুষ্পবৃষ্টি। মুখে ছিল প্রশংসা। পাকিস্তান শহীদ আফ্রিদিদের বরণ করে নিল এভাবেই। পাকিস্তান বুঝি বিশ্বজয় করে ফিরেছে—করাচি বা লাহোরের বিমানবন্দরে কাল ভিনদেশিদের এমন বিভ্রান্তিতেই পড়ে যাওয়াই ছিল স্বাভাবিক!
বিশ্বজয় নয়, পাকিস্তান বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল হেরে ফিরেছে। হারটা তাও চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ভারতের কাছে। তবু তাদের জন্য এমন বরণডালা! বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, এই কি সেই পাকিস্তান? ব্যর্থ হয়ে ফিরলে যে পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের ভাগ্যে জুটত শুধুই কাঁটার আঘাত!
পাকিস্তানের মানুষের এবার বদলে যাওয়ার কারণ আছে।
বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আগে পাকিস্তান দল তাদের কাঁধে বয়ে নিয়ে গিয়েছিল বিতর্কের বোঝা। স্পট ফিক্সিং, দলের শৃঙ্খলাজনিত সমস্যা; মোটামুটি কথা, ক্রিকেট দল ছিল সমালোচনাবিক্ষত। এ অবস্থায় আফ্রিদিরা সেমিফাইনালে উঠেছেন, এতেই খুশি পাকিস্তানের মানুষ।
পাকিস্তান দলকে স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে ছুটে গিয়েছিল সাধারণ মানুষ, ছুটে গিয়েছিলেন রাজনৈতিক নেতারা। পাকিস্তানের কয়েকজন মন্ত্রী পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের নেতৃত্বে গিয়েছিলেন বিমানবন্দরে। বিষয়টি খুবই ভালো লেগেছে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি ইজাজ বাটের, ‘আমাদের ক্রিকেটের ইতিহাসে এটা অভূতপূর্ব এক নিদর্শন। মুখ্যমন্ত্রী নিজে এসে খেলোয়াড়দের স্বাগত জানানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।’ ৫ এপ্রিল পাকিস্তানের খেলোয়াড়দের আরও সমারোহে অভ্যর্থনা জানানো হবে, বলেছেন শাহবাজ।
করাচি বিমানবন্দর থেকে আফ্রিদির বাড়ি ফেরার পথে প্রায় ১০ কিলোমিটার জুড়ে দাঁড়িয়ে ছিল মানুষ। হাত নেড়ে তারা পাকিস্তান অধিনায়ককে জানিয়েছে শুভেচ্ছা। আফ্রিদিও খুশি। তার পরও তাঁর অস্বস্তির কাঁটার বিঁধছিল সেমিফাইনালের আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেহমান মালিকের কথা। সেই যে মন্ত্রী বলেছিলেন, ‘তোমরা ম্যাচ গড়াপেটা কোরো না।’ আফ্রিদি বলেছেন ওই কথা বলার সময় ওটা ছিল না। বিশ্বকাপের মাঝপথে শোয়েব আখতারের অবসর ঘোষণাও দলে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন অধিনায়ক।
বিশ্বকাপ শেষ, এবার নতুন মিশনে নামবে পাকিস্তান। ১৮ এপ্রিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফর দিয়েই তা শুরু। এই সফরে বিশ্রাম চান আফ্রিদি।

সেদিনের সেই বলবয়

১৯৮৭ সালের ৫ নভেম্বর। মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনাল। মুখোমুখি ভারত-ইংল্যান্ড। ইংলিশ ওপেনার গ্রাহাম গুচ একের পর এক সুইপ করে বল আছড়ে ফেলছিলেন সীমানার বাইরে। আর সীমানা পেরোনো বল কুড়িয়ে ভারতীয় ফিল্ডারদের হাতে তুলে দিচ্ছিলেন ১৪ বছরের এক কিশোর। সঙ্গে ছিল প্রিয় বন্ধু বিনোদ কাম্বলি। কিশোরের হতাশা আরও বেড়ে যায় ম্যাচ শেষে। তার হূদয়ে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা জাগিয়ে ভারতকে হারিয়ে ইংল্যান্ড উঠে যায় ফাইনালে।
২৪ বছর পেরিয়ে আজ আবার বিশ্ব ক্রিকেট তাকিয়ে মুম্বাইয়ের সেই ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের দিকে। ওয়াংখেড়েতে আজ বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলছে ভারত-শ্রীলঙ্কা। বিস্ময়করভাবে ওয়াংখেড়ে আজও দৃশ্যপটে সেই কিশোর।
সেদিনের সেই বলবয়ই আজকের শচীন রমেশ টেন্ডুলকার। ক্রিকেটীয় সব পাহাড়-পর্বত ডিঙিয়ে আজ যিনি অমরত্বের আসনে। সব প্রাপ্তির আড়ালে ক্রিকেটের বিস্ময় টেন্ডুলকারের অতৃপ্তি একটাই, বিশ্বকাপ ট্রফিটা একবার হাতে তুলে উচিয়ে ধরা। আজ তাঁর এই অতৃপ্তি মেটানোর দিন।
২৪ বছর আগে ভারতের পরাজয় দেখে চোখের জল ফেলা ছাড়া করার কিছু ছিল না। সময়ের স্রোতে আজ ভারতের বিশ্বকাপ-ভাগ্যের অনেকটাই তাঁর হাতে। ওয়াংখেড়েতে এদিন তিনিই কেন্দ্রীয় চরিত্র। সেদিনের বলবয় টেন্ডুলকারের হাতেই শোভা পেতে পারে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নের স্মারক, বিশ্বকাপ ট্রফি। ক্রিকেট-বিধাতার মহিমা সত্যিই বোঝা দায়।

ভারতকেই এগিয়ে রাখছেন দ্রাবিড়

১৯৮৩ নাকি ১৯৯৬? কোন স্মৃতি ফিরবে আজ মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে? খেলা মাঠে গড়ানোর আগ পর্যন্ত অবসান হবে না এই জল্পনা কল্পনা, অনুমানের। আজ দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে ভারত ও শ্রীলঙ্কা। এবারের বিশ্বকাপের দুই আয়োজক দেশের এ লড়াইয়ে অনেকেই স্বাগতিক হিসেবে কিছুটা এগিয়ে রাখছে ভারতকে। এ তালিকার বাইরে যাননি রাহুল দ্রাবিড়ও। ঘরের মাঠে খেলা এবং কোয়ার্টার ও সেমিফাইনালে কঠিন দুটি দেশের বিপক্ষে জয় পাওয়াটা ভারতীয় ক্রিকেটারদের অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী করে তুলেছে বলেই মনে করেন দ্রাবিড়।
গতকাল ভারতের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘ভারত বিশ্বকাপ শুরুই করেছিল ফেবারিট হিসেবে। তাদেরকে পুরো সময়ই খুব ভারসাম্যপূর্ণ একটা দল মনে হয়েছে। শ্রীলঙ্কাও নিশ্চিতভাবে খুব ভালো দল। তবে এ মুহূর্তে আমি ভারতকেই কিছুটা এগিয়ে রাখব। তা ছাড়া ঘরের মাঠে খেলার একটা বাড়তি সুবিধা তো ভারত পাবেই। প্রায় ৩০ হাজার সমর্থক তাদের পেছনে থাকবে। এটাও একটা বড় ঘটনা।’
কোয়ার্টার ফাইনালে টানা তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়া ও সেমিফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিপক্ষে জয়টা ধোনি-টেন্ডুলকারদের অনেক আত্মবিশ্বাসী করেছে বলেই মনে করছেন দ্রাবিড়। ওই ম্যাচগুলোর মতো চাপ সামলে খেলতে পারলেই তাঁরা শেষ হাসিটা হাসতে পারবেন বলে মন্তব্য করেছেন ভারতীয় মিডল অর্ডারের অন্যতম নির্ভরযোগ্য এই ব্যাটসম্যান।
ফাইনালে শচীন টেন্ডুলকার, যুবরাজ সিং, হরভজন সিং ও জহির খানকে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে বলে মনে করেন দ্রাবিড়। আর টেন্ডুলকারের ব্যাটের দিকে তো গোটা ক্রিকেট বিশ্বই তাকিয়ে থাকবে। লিটল মাস্টারের সেঞ্চুরির সেঞ্চুরি উদযাপন প্রসঙ্গে দ্রাবিড় বলেছেন, ‘সেমিফাইনালে সে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটার অনেক কাছাকাছি চলে গিয়েছিল। এবার যদি সে তার ঘরের মাঠে শততম সেঞ্চুরিটা পায়, তাহলে ভারত জিতবেই।

ফাইনালে খেলতে পারেন শ্রীশান্ত

বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচটাতেই শুধু খেলার সৌভাগ্য হয়েছিল ভারতীয় পেসার শ্রীশান্তের। বাংলাদেশের বিপক্ষে সেই ম্যাচে ভারত বড় ব্যবধানের জয় পেলেও শ্রীশান্তের জন্য সেটা একরকম দুঃস্বপ্ন হয়েই থেকে গেছে। ইমরুল কায়েস, তামিম ইকবাল, জুনায়েদ সিদ্দিকীদের তোপের মুখে পড়ে মাত্র ৫ ওভার বল করে তিনি দিয়েছিলেন ৫৩ রান। এরপর বিশ্বকাপের বাকি ম্যাচগুলো মাঠের বাইরে থেকেই দেখতে হয়েছে শ্রীশান্তকে। তবে আশিস নেহরার ইনজুরির কারণে ভাগ্য খুলতে পারে এ ডানহাতি পেসারের। ভারত যদি তিনজন পেসার নিয়ে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে হয়তো বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলার বিরল সৌভাগ্য হতে পারে শ্রীশান্তের।
মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামের উইকেটে বেশ ভালো বাউন্স পাওয়া যাবে এবং এখান থেকে পেসাররা অনেক সহায়তা পাবেন বলে অনুমান করছেন অনেকে। সে ক্ষেত্রে সেমিফাইনালের মতো তিনজন পেসার নিয়ে বোলিং রণকৌশল সাজাতে পারেন ভারতীয় অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি। তিনি বলেছেন, ‘মুম্বাইয়ের উইকেটটাতে শুরুর দিকে বেশ ভালো পেস ও বাউন্স পাওয়া যেতে পারে। আর যদি কিছুটা রিভার্স সুইংও পাওয়া যায়, তাহলে তৃতীয় পেসার খেলায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবেন। অশ্বিনের ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে। সে যে কয়টা ম্যাচে সুযোগ পেয়েছে, সেখানেই নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। কিন্তু আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি যে তিনজন পেসার নিয়ে খেলব, নাকি দুজন নিয়ে।’
শ্রীশান্তকে খেলানোর প্রসঙ্গ এলে অবধারিতভাবেই তাঁর উদ্ধত আচরণ ও উত্তেজক মানসিকতার কথা চলে আসে। সে প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে ধোনি বলেছেন, ‘শ্রীশান্তকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে শুধু শ্রীশান্ত নিজে। এটা আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বড় ম্যাচগুলোতে সে সব সময়ই একটু বেশি উত্তেজিত হয়ে যায়। তবে আমি আশা করছি, সে শান্ত থাকতে পারবে। সে মাত্র একটা ম্যাচেই খেলার সুযোগ পেয়েছে। তাকে আবার সুযোগ দিতে পারলে আমার ভালোই লাগবে।

রাজকীয় বিদায়ের প্রতীক্ষায়

‘ঘূর্ণি যাদুকর’ হিসেবেই সবাই তাঁকে চেনে। পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই উইকেটের বন্য বইয়ে দিয়েছেন মুরালিধরন। ইনজুরিতে পড়েছেন, চাকিং বিতর্কে হয়েছেন জর্জরিত। কিন্তু কোনোকিছুই তাঁর ক্যারিয়ারের জয়যাত্রাকে রুখতে পারেনি। টেস্ট ক্রিকেটে ৮০০ আর ওয়ানডেতে ৫৩৪ উইকেট যাঁর সাফল্য মুকুটে তিনি তো খেলাটির এক মহান প্রতিনিধিই। ডন ব্র্যাডম্যান কিংবা জিম লেকারের কীর্তি গাঁথা লিখতে লিখতে হয়রান ক্রিকেট ইতিহাসবিদদের অনন্তকালের চমত্কার এক রসদই হয়ে রইবেন মুত্তিয়া মুরালিধরন।
সেই মুরালির জন্য আজকের বিশ্বকাপ ফাইনাল এক আবেগের লড়াই হয়েই অবতীর্ণ হয়েছে। জীবনের শেষ ম্যাচ বিশ্বকাপ ফাইনাল। এর আগে ইমরান খান ছাড়া আর কে খেলেছিলেন-তা ইতিহাসবিদদের গবেষণার বিষয় হতে পারে। জীবনে এর আগে একবার বিশ্বকাপ জিতলেও জীবনের শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ জিতে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ সাফল্যের ভাগীদার হওয়ার সুযোগ তিনি কেন ছাড়তে চাইবেন। তিনি যেমন এই সাফল্য হাতছানিতে মুখিয়ে রয়েছেন, ঠিক তেমনি তাঁর সতীর্থরা উন্মুখ মুরালিকে দারুণ এক বিদায় জানাতে। তাঁদের ভাষায়, বিশ্বকাপ জয়ই হতে পারে মুরালির মতো গ্রেট ক্রিকেটারকে বিদায় জানানোর সর্বোত্কৃষ্ট পন্থা।
আজ যদি শ্রীলঙ্কা কাপ জেতে তাহলে দলপতি কুমার সাঙ্গাকারা নিজেকে নিয়ে যাবেন অর্জুনা রানাতুঙ্গার সারিতে। তিনি হবেন বিশ্ববিজয়ী দ্বিতীয় শ্রীলঙ্কান বীর। কিন্তু, নিজের এত বড় সম্মান তাঁর কাছেও গৌন মনে হচ্ছে। তাঁরও একমাত্র চিন্তা মুরালিকে বিশ্বকাপ উপহার দেওয়ার। যেন, মুরালিই সব। তাঁর মতে, ‘মুরলির উপস্থিতি দলের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। তিনি একজন বড় ম্যাচের সৈনিক। তাঁর জন্যই আমাদের বিশ্বকাপটি জিততে হবে।’
ইনজুরি সমস্যা মুরালিধরনের ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচে এক অনিশ্চয়তার পর্দা টেনে দিয়েছে। ইনজুরি সমস্যা তাঁর নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালেও ছিল। কিন্তু, তিনি সব অনিশ্চয়তার পর্দা সরিয়ে সেমিফাইনাল খেলেছেন ও দলকে ফাইনালে তুলতে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তাই সাঙ্গাকারার আশা ও বিশ্বাস, তিনি আজ ফাইনালে খেলবেন, আর নিজের ক্যারিয়ারের ইতি টানবেন দারুণ এক স্টাইলে।
মুরালিকে দারুণ সম্ভাষণে বিদায় জানাতে প্রস্তুত পুরো উপমহাদেশই!

মুম্বাইয়ে ইতিহাসের হাতছানি

মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাদেই মুম্বাইয়ের ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে আরেকটি ইতিহাস গড়ার নাটক মঞ্চস্থ হবে। ভারত ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার এই লড়াই আবেগে উত্তেজনায় উন্মাতাল করে দেবে গোটা উপমহাদেশকে। উত্তেজনা নিহিত থাকবে বিশ্বসেরা ক্রিকেট দল হওয়ার যুদ্ধে। আর সবাইকে আবেগ ছুঁয়ে যাবে ক্রিকেট ইতিহাসের দুই গ্রেটের ‘শেষ লড়াই’। মুত্তিয়া মুরালিধরন আর শচীন টেন্ডুলকার যে আজই শেষবারের মতো শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে যাচ্ছেন। ক্রিকেট রোমান্টিকদের জন্য এর চেয়ে আবেগের উপলক্ষ আর কীই-বা হতে পারে!
গত দুই বছর ভারত আর শ্রীলঙ্কা বেশ কয়েকবার পরস্পরের মুখোমুখি হয়েছে। অন্য সময় হলে আরেকটি ভারত-শ্রীলঙ্কা লড়াই নিশ্চিতভাবেই ক্রিকেটামোদীদের বিরক্তির উদ্রেক করত। কিন্তু মুম্বাইয়ের আজকের লড়াই যে সব লড়াইয়ের ব্যতিক্রম। এ যে বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনাল। এ লড়াই যে বিশ্ব শ্রেষ্ঠ হওয়ার লড়াই। ক্রিকেট ইতিহাস এর চেয়ে বড় ভারত-শ্রীলঙ্কা লড়াই দেখেছে কি না সন্দেহ !
১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে ভারত ছিল সন্দেহাতীত ফেবারিট। শ্রীলঙ্কার শরীর থেকে তখনো ছোট দলের লেবেলটা মুছে যায়নি। দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলায় গ্রুপ পর্বের ম্যাচে এই দুই দল যখন মুখোমুখি হয়েছিল, তখন বাজিকরদের বাজির পাল্লা ভারতের দিকেই ঝুঁকে ছিল। প্রথমে ব্যাট করে ভারত যখন ২৭০ রানের বেশি স্কোর বোর্ডে তুলে ফেলল, তখন শ্রীলঙ্কার জয় নিয়ে বলতে গেলে কেউ ভাবেইনি। কিন্তু শ্রীনাথ, প্রসাদ, প্রভাকরদের তুলোধুনো করে রমেশ কালুভিতারানা ও জয়সুরিয়া সেদিন ক্রিকেটের ব্যাকরণগুলো নতুন করেই লিখলেন। বিশ ওভার যেতে না যেতেই ২৭০ রান করা ভারত নিজেদের অসহায় পরিস্থিতিতে আবিষ্কার করল। মনোজ প্রভাকরের ক্যারিয়ারই শেষ হয়ে গেল এ একটি ম্যাচেই। তত্কালীন ভারতীয় উদ্বোধনী বোলার প্রভাকর ‘ইজ্জত বাঁচাতে’ সেদিন অফ স্পিন করেছিলেন। ক্রিকেট ইতিহাসেও এ ঘটনা স্মরণীয় হয়ে রয়েছে। ভারতের বিপক্ষে সেদিন এক সহজ জয়, শ্রীলঙ্কাকে তুলে এনেছিল মর্যাদার আসনে। সেবার সেমিতে কলকাতার ইডেন গার্ডেনে আবার শ্রীলঙ্কার কাছে ভারতের পরাজয় শ্রীলঙ্কাকে সত্যিই পরিণত করেছিল ফেবারিটে। পেছনের সারি থেকে ছুটে এসে বিশ্বকাপ জিতে সেবার শ্রীলঙ্কারও শুরু হয়েছিল নতুন এক অগ্রযাত্রা।
১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে দুবার পরাজয়ের স্বাদ পেলেও তার পরের দুই বিশ্বকাপে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ভারত নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধার করেছিল। ’৯৯ সালে সৌরভ গাঙ্গুলির অনবদ্য ১৮৩ রানের ইনিংসের ওপর ভর করে ভারতের সহজ জয় ’৯৬-এর ক্ষততে কিছুটা হলেও আরাম অনুভূত হয়েছিল। ২০০৩ সালে দারুণ পেশাদার ভারতীয় দল পেয়েছিল আরেকটি সহজ জয়। কেবল ২০০৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজে গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের কাছে পরাজয়ের পর এ শ্রীলঙ্কার কাছে হেরেই সুপার এইটে আর ওঠা হয়নি ভারতের। ভারতীয় ক্রিকেটেও সেটি এক দগদগে ক্ষত হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে রয়েছে।
’৯৬-এর বিশ্বকাপের পর শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। অনেকেই তাদের সেবারের সাফল্যকে ‘ফ্লুক’ হিসেবে আখ্যা দিলেও শ্রীলঙ্কার অদম্য ক্রিকেট সৈনিকেরা পরের বছরগুলোতে নিজেদের প্রমাণ করেই মর্যাদার বলয়ে নিজেদের স্থান করে নিয়েছিল। এবার নিয়ে সর্বশেষ পাঁচটি বিশ্বকাপের তিনটি আসরে ফাইনালে খেলার সুযোগ করে নিয়ে শ্রীলঙ্কাও নিজেদের তৈরি করেছে বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম সেরা দল হিসেবে।
বিশ্বকাপে এ দুই দলের মুখোমুখি লড়াইয়ে পরিসংখ্যানটা শ্রীলঙ্কার দিকেই ঝুঁকে আছে। ১৯৭৯ সালে প্রথম মোকাবিলাতেই ভারতকে হারিয়ে দিয়েছিল তত্কালীন অ-টেস্ট খেলুড়ে দেশ শ্রীলঙ্কা। এরপর ’৯৬-এ দুবার হারের পর ভারত ১৯৯৯ ও ২০০৩ সালে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়েছিল। ২০০৭ সালে এসে আবার শ্রীলঙ্কার কাছে পরাজয়ের স্বাদ নিতে হয় ভারতকে। মোট ছয়টি খেলায় শ্রীলঙ্কা জিতেছে চারবার আর ভারত দুবার। তবে, পরিসংখ্যান যা-ই থাকুক না কেন, বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনালে প্রথমবারের মতো এ দুই দলের মোকাবিলাটা অন্য আর সব লড়াইয়ের চেয়ে আলাদা হবে—তা বলাই বাহুল্য।
২০০৩ সালে সর্বশেষ ভারত যখন বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ফাইনালে খেলেছিল, তখন ফাইনালে খেলার অনভিজ্ঞতাই শেষ করে দিয়েছিল ভারতীয় দলকে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেবারের ফাইনালটি ম্যাচের প্রথমার্ধেই শেষ করে দিয়েছিলেন রিকি পন্টিং। কিন্তু সাত বছর বাদে এবারের ভারতীয় দল অনেক বেশি পরিণত, অনেক বেশি অভিজ্ঞ। তারা বিশ্বাস করছে, এবারের বিশ্বকাপ যেন অপেক্ষাই করছে তাদের জন্য।
’৯৬ সালে প্রথমবারের মতো ফাইনালে উঠেই অস্ট্রেলিয়াকে সহজে কুপোকাত করেছিল শ্রীলঙ্কা। অরবিন্দ ডি সিলভা, আসাঙ্কা গুরুসিংহে আর অর্জুনা রানাতুঙ্গা সেবার লঙ্কান সাফল্যে রেখেছিলেন বিরাট ভূমিকা। ২০০৭ সালে বৃষ্টি আইনের মারপ্যাঁচে পরে সাফল্য-বঞ্চিত শ্রীলঙ্কা এবার তাই বড় বেশি বুভুক্ষু। এবার তাদের দলে হয়তো, অরবিন্দ ডি সিলভার মতো তারকা নেই, কিন্তু দিলশান, সাঙ্গাকারার মতো তারকারাও শ্রীলঙ্কাকে বিশ্ব জয়ের সম্মান এনে দেওয়ায় পারদর্শী। যার প্রমাণ তাঁরা রাখতে চাইবেন ওয়াংখেড়ের সবুজ উদ্যানে।
ওয়াংখেড়ের ফাইনাল আজ সম্মানিত হবে এবারের বিশ্বকাপে এ দুই সেরা দলের মোকাবিলায়। পরিসংখ্যানই বলছে, এক চমত্কার লড়াইই অপেক্ষমাণ ক্রিকেটামোদীদের জন্য। কোনো দলের পক্ষে না গিয়ে নিরপেক্ষ থেকে ফাইনাল যুদ্ধ উপভোগই মনে হয় সর্বোত্কৃষ্ট পন্থা। কারণ, সাফল্য যারই আসুক, আজকের ম্যাচে শেষ অবধি ক্রিকেটেরই জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা যে সবচেয়ে বেশি।
আচ্ছা, এমন যদি হতো, দুই গ্রেট শচীন টেন্ডুলকার আর মুত্তিয়া মুরালিধরন একই সঙ্গে জিতলেন, তাহলে কত ভালোই না হতো! ক্রিকেটের এত ঋণ যে দুজনের কাছে, তাঁরা আজ একজন হাসবেন, একজন কাঁদবেন—এটা কি এক নিদারুণ নিষ্ঠুরতা নয়!

ফাইনালের আগে ‘টস-বিতর্ক’



মুম্বাইয়ে বিশ্বকাপের ফাইনাল এগিয়ে চলেছে। কিন্তু, অনেকেই জানেন না একটি অনাহূত বিতর্ক ফাইনাল শুরুর আগমুহূর্তে যথেষ্ট আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঘটনাটি ঘটেছে টসের সময়। দুই অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি ও কুমার সাঙ্গাকারা টস করতে নামার পরই এই বিতর্ক দানা বাঁধে। ম্যাচ রেফারি জেফ ক্রোর উপস্থিতিতে কয়েন শূন্যে ছোড়েন ধোনি। এ সময় ম্যাচ রেফারি টস আবার করতে বলেন, কারণ হিসেবে তিনি জানান, সাঙ্গাকারার ‘কল’ তিনি শুনতে পাননি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আইনানুযায়ী সফরকারী দলের অধিনায়কেরই টসের সময় প্রথমে কল করার কথা। অর্থাত্, এই ম্যাচে সাঙ্গাকারারই প্রথমে ‘হেড’ অথবা ‘টেইল’ বেছে নেওয়ার কথা ছিল।
টস অনুষ্ঠান টেলিভিশনে সম্প্রচারের দায়িত্বে থাকা ধারাভাষ্যকার রবি শাস্ত্রী অবশ্য বলেছেন, ধোনি কয়েন ছুড়ে মারার পরপরই শ্রীলঙ্কার অধিনায়ক সাঙ্গাকারা ‘টেইল’ কল করেছিলেন। সে সময় ‘হেড’ পড়েছিল। অর্থাত্, ধোনি টসে জিতেছিলেন। কিন্তু, ম্যাচ রেফারি সাঙ্গাকারার কল শুনতে পাননি বলে আবার টস করার নির্দেশ দেন।
ম্যাচ রেফারির নির্দেশে ধোনি পুনরায় কয়েন শূন্যে ছোড়েন। এবার অবশ্য সাঙ্গাকারা আবার ‘হেড’ কল করেন এবং টসে ‘হেড’ই ওঠে। টসে জিতে আগে ব্যাট করার সিদ্ধান্ত দ্রুতই নিয়ে নেন কুমার সাঙ্গাকারা।
এদিকে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক খবরে বলা হয়েছে, বাতিল হয়ে যাওয়া টসের সময় সম্প্রচারকারী সংস্থা ইএসপিএনের সম্প্রচারে পরিষ্কার শোনা গেছে কুমার সাঙ্গাকারা নাকি প্রথমে ‘টেইল’ কল করেছিলেন। এ নিয়ে বিভিন্ন ইন্টারনেট ওয়েবসাইট, ফেসবুক ও ব্লগ স্পটে বিতর্ক দানা বেঁধে উঠেছে।
ধারাভাষ্যকার রবি শাস্ত্রীও সাঙ্গাকারার প্রথমে ‘টেইল’ কল করার কথা বললেও তিনি জানিয়েছেন, তাঁর অফিসিয়াল কোনো ভূমিকা না থাকার কারণে, ম্যাচ রেফারির সিদ্ধান্তই এ ক্ষেত্রে শিরোধার্য। ম্যাচ রেফারি জেফ ক্রো বলেছেন, প্রথমে সাঙ্গাকারার কল তিনি শোনেননি বলেই পুনরায় টস করার সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচে টস নিয়ে এ ধরনের বিতর্ক একেবারেই নতুন ঘটনা।
গত বিশ্বকাপের ফাইনালেও ম্যাচ রেফারি জেফ ক্রো নিজেকে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। বারবাডোজে অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার বৃষ্টি বিঘ্নিত ফাইনালে তাঁর ভুলেই নানা রকম বিতর্ক দেখা দিয়েছিল। তাঁর ভুলেই দীর্ঘ সময় অন্ধকারের মধ্যে খেলতে হয়েছিল দুই দলকে।