Tuesday, November 10, 2015

মিয়ানমারে ঐতিহাসিক নির্বাচন: জয়ের পথে সু চির এনএলডি

মিয়ানমারের ঐতিহাসিক নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে গণতন্ত্রপন্থী অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)। বহুপ্রত্যাশিত নির্বাচন ঘিরে পাহাড়সমান প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে মানুষের মধ্যে। তবে নির্বাচনে বিজয়ের পরও মানুষের মন থেকে সংশয় দূর হয়নি। শেষ পর্যন্ত এ গণরায় দেশটির মহাশক্তিধর সেনাবাহিনী মেনে নেবে কি না, তা নিয়েই সংশয়। আবার নির্বাচনের পর নতুন সরকারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক কেমন হবে, তা নিয়েও রয়েছে সংশয়। খবর ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও ওয়াশিংটন পোস্টের।
গতকাল যখন এনএলডির বিজয় বার্তা এসে পৌঁছাচ্ছিল, তখন রাস্তার এক ফেরিওয়ালা মা খাইন বার্তা সংস্থা এপিকে বলছিলেন, ‘আমাদের মা সু চি নির্বাচনে জিতুন তাই চাই। দেশকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা তাঁর আছে। আমি তাঁকে খুব শ্রদ্ধা করি। তাঁকে ভালোবাসি। দেশকে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাবেন তিনি।’
ইয়াংগুনের বাসিন্দা ৭১ বছর বয়সী খিন মং থে সু চির ভাষণ শুনছিলেন টেলিভিশনে। খিন মং বলছিলেন, ‘আমি নির্বাচনের ফলাফলে খুব খুশি। শুধু আমি না, পুরো দেশই আজ খুশি। আমাদের দেশের জন্য সু চি সত্যিকারের যোগ্য নেত্রী।’
নির্বাচনে বিজয়ের উৎসব উদ্যাপনে রাজধানী ইয়াংগুনে এনএলডির কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়েছিলেন হাজারের বেশি সমর্থক। এঁদের অনেকেরই গায়ে দলীয় লাল রংয়ের টি-শার্ট। সেগুলোর পেছনে লেখা ‘আমাদের জিততেই হবে’।
তবে বিজয়ই তো সব শেষ না। ফলাফল যা-ই হোক একটি পূর্ণ গণতান্ত্রিক মিয়ানমারের স্বপ্ন এখনো অনেক দূরে। প্রায় আধা শতকের সেনাশাসনের পর ২০১১ সালে সামরিক সরকার ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলেও আধাসামরিক সরকার মিয়ানমারের ক্ষমতায় থাকে। মিয়ানমারের সংবিধান পার্লামেন্টে ২৫ শতাংশ আসন সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত রেখেছে। আবার সু চিকে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে দূরে রাখতে ব্যবস্থাও করে রেখেছে। সংবিধান অনুযায়ী, মিয়ানমারের যে নাগরিকের স্বামী/স্ত্রী বা সন্তান বিদেশি নাগরিক, তিনি দেশের প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। সু চির প্রয়াত স্বামী এবং দুই সন্তান ব্রিটিশ নাগরিক।
যদিও নির্বাচনের আগে এক সংবাদ সম্মেলনে সু চি সরাসরি বলেন, এনএলডি যদি নির্বাচনে জেতে, তবে ক্ষমতার মূল সুতা তাঁর হাতেই থাকবে। তিনি প্রেসিডেন্টের ওপরে থাকবেন।
নির্বাচনের ফলাফল চূড়ান্ত হওয়ার পর পার্লামেন্টের সদস্য এবং সামরিক বাহিনীর নিয়োগ করা পার্লামেন্ট সদস্যরা তিনটি নাম প্রস্তাব করবেন। এঁদের মধ্যে একজন প্রেসিডেন্ট এবং দুজন ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হবেন।
নির্বাচনের পরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগ পর্যন্ত মিয়ানমারের রাজনৈতিক অবস্থা বেশ উত্তেজনাপূর্ণ থাকবে বলেই ধারণা করা যায়। বিশ্লেষক রিচার্ড হোরসে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন, ‘অং সান সু চি দেশ চালাবেন, এটি সেনাবাহিনীর পক্ষে মেনে নেওয়া শক্ত। তাঁকে ক্ষমতার বাইরে রাখতেই তারা সংবিধানে বিশেষ সংশোধনী এনেছে।’
সু চি একাধিকবার বলেছেন, জাতীয় ঐক্যের খাতিরে তিনি সেনাবাহিনী এবং জাতিগোষ্ঠীভিত্তিক দলগুলোর সঙ্গে একত্রে কাজ করতে প্রস্তুত। তবে তাঁর সেই ইচ্ছের বাস্তবায়ন কতটা সুচারুভাবে সম্পন্ন হতে পারবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

কোহিনূর ফেরত চেয়ে মামলা করবে ভারত

কোহিনূর
হীরার নাম কোহিনূর। ব্রিটেনের রাজমুকুটের অংশ এটি। বিশ্বের সবচেয়ে বিখ্যাত রত্নগুলোর একটি। দাম ১৫ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে এই হীরা ফেরত চায় ভারতীয়দের একটি সংগঠন। খবর ইনডিপেনডেন্টের।
বলিউডের কয়েকজন তারকা অভিনয়শিল্পী ও ভারতীয় ব্যবসায়ীরা ‘মাউন্টেন অব লাইট’ নামের একটি সংগঠন গড়ে কোহিনূর ফেরত চেয়েছেন। এ দাবিতে লন্ডন হাইকোর্টে মামলা করার জন্য আইনজীবী নিয়োগ করবেন। তাঁদের অভিযোগ, ১০৫ ক্যারেটের হীরাটি ভারত থেকে চুরি করে যুক্তরাজ্যে নেওয়া হয়েছে। ১৯৩৭ সালে রাজা ষষ্ঠ জর্জের অভিষেকের সময় তাঁর স্ত্রী কোহিনূরখচিত মুকুট পরেছিলেন। ১৯৫৩ সালে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের রাজ্যাভিষেক হয়। তখন তাঁর মুকুটেও শোভা পায় একই রত্ন। কোহিনূর ফেরত দেওয়ার দাবি যুক্তরাজ্য সরকার বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছে। তাদের যুক্তি, ব্রিটেন যখন পাঞ্জাব দখল করে নেয়, তখন শিখদের শেষ শাসক মহারাজা দুলিপ সিং রানিকে কোহিনূর উপহার দিয়েছিলেন।

অনলাইন পত্রিকার জন্য নিবন্ধন লাগবে

অপসাংবাদিকতা রোধে অনলাইন পত্রিকার নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। এখন থেকে নতুন কোনো অনলাইন পত্রিকা চালু করতে হলে সরকারের কাছ থেকে নিবন্ধন নিতে হবে।
বর্তমানে চালু আছে—এমন অনলাইন পত্রিকাগুলোকে নিবন্ধিত হতে হবে। আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্ধারিত ফরমে আবেদন করে এ নিবন্ধন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হবে। আজ সোমবার তথ্য অধিদপ্তরের এক তথ্য বিবরণীতে এসব বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
তথ্য বিবরণীতে বলা হয়, দেশের অনলাইন পত্রিকার প্রকাশকদের পত্রিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা ও অপসাংবাদিকতা রোধ করার লক্ষ্যে সরকার অনলাইন পত্রিকা নিবন্ধন কার্যক্রম চালু করেছে।
এ লক্ষ্যে নির্ধারিত নিবন্ধন ফরম ও একটি প্রত্যয়নপত্র বা হলফনামা পূরণ করে তথ্য অধিদপ্তরে জমা দিতে হবে। ফরম ও প্রত্যয়নপত্রের নমুনা তথ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে (www. pressinform.portal.gov.bd) পাওয়া যাবে। নিবন্ধনের জন্য ফরম ও প্রত্যয়নপত্রের নমুনা সাময়িকভাবে তথ্য অধিদপ্তরের প্রটোকল শাখা থেকে সংগ্রহ করা যাবে। জমা দেওয়া তথ্য যাচাই-বাছাই করে তথ্য অধিদপ্তর অনলাইন পত্রিকাটির নিবন্ধন করবে।
এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শের জন্য তথ্য অধিদপ্তরের প্রটোকল শাখায় (ফোন নম্বর: ৯৫১৪০৬৫ অথবা ০১৭১৫২৫৫৭৬৫ নম্বরে) যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
তথ্য সচিব মরতুজা আহমদ প্রথম আলোকে বলেন, দেশের পত্রিকাগুলোর অনলাইন সংস্করণের জন্য নিবন্ধন করতে হবে।

সু চির অভাবিত জ​য়- পরাজয় মেনে নিয়েছে ক্ষমতাসীন দল by সোহরাব হাসান

অং সান সু চি: ইয়াঙ্গুনে গতকাল দলের
প্রধান কার্যালয়ের সামনে l রয়টার্স
মিয়ানমারের সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) বিপুল ভোটে বিজয়ী হওয়ার পথে। গত রোববার ভোট গ্রহণের পর গতকাল সোমবার রাত ১০টা পর্যন্ত যে হিসাব পাওয়া গেছে, তা এমনই আভাস দেয়।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানায়, নিম্নকক্ষের যে ৩৩০টি আসনে নির্বাচন হয়েছে, তার মধ্যে ৫৪টির ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে এনএলডি পেয়েছে ৪৯টি।
দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে প্রতীক্ষার এই নির্বাচনে সু চি জয়ী হলেও ক্ষমতার সমীকরণটি নির্ভর করছে সেনাবাহিনীর সঙ্গে তাঁর কী ধরনের সমঝোতা হয়, তার ওপর। জানুয়ারিতে নতুন পার্লামেন্ট প্রেসিডেন্ট ও ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবে। সে পর্যন্ত বর্তমান প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন ও সেনানিয়ন্ত্রিত ইউনাইটেড সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টিই (ইউএসডিপি) ক্ষমতায় থাকছে।
মিয়ানমারে গণতন্ত্রায়ণের পথে যে তিনটি চ্যালেঞ্জ ছিল, এই নির্বাচনের মাধ্যমে তার দুটিতে দেশটি জয়ী হয়েছে। এক. নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে। দুই. সেনানিয়ন্ত্রিত সরকারও ফলাফল মেনে নিয়েছে। প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন অনেকটা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুরে বলেছেন, ‘আমরা ঐতিহাসিক নির্বাচনের ফলকে সম্মান জানাব।’ তিন. বিজয়ী দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর।
মিয়ানমারের পার্লামেন্টের ৪৪০ আসনের নিম্নকক্ষের মধ্যে ৩৩০ এবং ২২৪ আসনের উচ্চকক্ষের মধ্যে ১৬৮টিতে ভোট হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী উভয় পরিষদে বাকি আসনগুলো পূরণ করবেন সেনাবাহিনীর সদস্যরা। তাঁদের মনোনয়ন দেবেন সেনাবাহিনী প্রধান। সে ক্ষেত্রে এনএলডিকে সরকার গঠন করতে হলে দুই পরিষদ মিলে ৩৩০টি আসন পেতে হবে, যার চেয়ে অনেক বেশি আসন তারা পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দেশটির সংবিধানের ৬৯ ধারায় আছে, কেউ বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করলে কিংবা তাঁর সন্তান অন্য কোনো দেশের নাগরিক হলে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। সে ক্ষেত্রে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট পদে সু চি প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করতে পারছেন না।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন তিনজন। নিম্নকক্ষের একজন, উচ্চকক্ষের একজন এবং সেনাবাহিনীর মনোনীত একজন প্রতিনিধির মধ্য থেকে পার্লামেন্ট একজনকে প্রেসিডেন্ট এবং বাকি দুজনকে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত করবে।
নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীন দল ইউএসডিপি প্রচার চালিয়েছিল যে এনএলডিকে ভোট দিলে কোনো লাভ হবে না। সু চি প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। জবাবে সু চি নির্বাচনের দুই দিন আগে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করেছেন যে প্রেসিডেন্ট হতে না পারলেও তাঁর অবস্থান প্রেসিডেন্টের ওপরে থাকবে। একই সঙ্গে জয়ী হলে সমঝোতার সরকার গঠন করার কথাও বলেছেন তিনি।
মিয়ানমারের রাজনীতি পর্যবেক্ষণ করেন এমন একাধিক কূটনীতিক বলেছেন, সেনাবাহিনীর সঙ্গে কী ধরনের সমঝোতা বা আপসরফা হয়, তার ওপরই সু চি ও তাঁর দলের ভাগ্য নির্ভর করছে। তাঁদের মতে, উভয় পক্ষকে কিছুটা ছাড় দিতে হবে। না হলে অচলাবস্থা দেখা দিতে পারে।
সেনাবাহিনীর সম্মতি ছাড়া সংবিধান সংশোধন করে সু চির জন্য নতুন কোনো পদও সৃষ্টি করা যাবে না। তবে সু চি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের প্রধান হিসেবে অনায়াসে সংসদের নেতার পদ অলংকৃত করতে পারবেন।
এই নির্বাচনে ১০ হাজার পর্যবেক্ষক ছিলেন, যাঁদের মধ্যে ১ হাজার বিদেশি। তাঁদের অনেকে বিভিন্ন গণমাধ্যমকে বলেছেন, চমৎকার নির্বাচন হয়েছে। ভারতের সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কোরেশি সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য মিয়ানমারের নির্বাচন কমিশনকে অভিনন্দন জানিয়েছেন।
মিয়ানমারের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন—এমন একজন বাংলাদেশি কূটনীতিক গতকাল রাতে প্রথম আলোকে জানিয়েছেন, সেখানে উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে। তবে বাংলাদেশের মতো হইহুল্লোড় ছিল না। নির্বাচনের পর কোনো পক্ষ মিছিল বের করেনি। কেবল এনএলডির সদর দপ্তরের সামনে কয়েক হাজার লোক সমবেত হয়েছে সু চিকে অভিনন্দন জানাতে। এনএলডি নেত্রী সমর্থকদের উল্লাস করতে না করেছেন এই যুক্তিতে যে তাতে পরাজিত পক্ষ মনে কষ্ট পেতে পারে। তিনি ক্ষমতাসীনদের সাহসিকতার সঙ্গে পরাজয় মেনে নিতে এবং এনএলডিকে নমনীয়তার সঙ্গে বিজয়কে বরণ করতে বলেছেন।
সারা দেশে শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হলেও পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য আরাকানের পরিবেশ ছিল ভিন্ন। সেখানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ভোট দেওয়ার সুযোগই ছিল না। তারা ছিল কার্যত গৃহবন্দী।
মিয়ানমারে দায়িত্বরত একাধিক কূটনীতিক বলেছেন, গণতন্ত্রায়ণের পথে এই নির্বাচন সূচনা মাত্র। কীভাবে পূর্ণতা আসবে, তা নির্ভর করছে রাজনৈতিক পক্ষগুলোর মধ্যে এবং তাদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর কী ধরনের সমঝোতা হয়, তার ওপর। সু চির দল দুই কক্ষ মিলে ৩৩০টি আসন পেলেই সরকার গঠন করতে পারবে। কিন্তু সেনাবাহিনী যদি মনে করে তাদের কর্তৃত্ব অনেকখানি খর্ব হবে, তাহলে তারা সমঝোতায় না-ও আসতে পারে। অবশ্য তাঁরা এও মনে করেন, নব্বইয়ের মতো নির্বাচনের ফলাফল পুরোপুরি নাকচ করা সেনাবাহিনীর পক্ষে সম্ভব হবে না। কেননা, তখন মিয়ানমার বহির্বিশ্ব থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন ছিল। খোলা দরজা ফের বন্ধ করা কঠিন হবে।
একজন বাংলাদেশি কূটনীতিক আশা করছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে রোহিঙ্গাদের নিয়ে মিয়ানমারের যে সমস্যা আছে, সু চির দল ক্ষমতায় গেলে তা নিয়ে নতুন করে কথাবার্তা শুরু করা যাবে। তাঁর মতে, সু চি সবার মানবিক ও মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দিয়েছেন।
মিয়ানমারে যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার অ্যান্ড্রু পেট্রিক এশিয়ান নিউজকে বলেন, মিয়ানমার সরকার এবারের নির্বাচনে যে বিদেশি পর্যবেক্ষকদের স্বাগত জানিয়েছে, সেটি ছিল ব্যতিক্রমী ঘটনা। বার্মা ক্যাম্পেইন, ইউকের পরিচালক মার্ক ফারমানার মনে করেন, সেনাবাহিনী এনএলডিকে সরকার গঠনে অনুমতি দেবে, কিন্তু সেই সরকারের ক্ষমতা হবে সীমিত। সেটি সেনাবাহিনীর জন্য মোটেই হুমকি হবে না।
২০১২ সালে নজিরবিহীনভাবে ক্ষমতাসীন দলের ছেড়ে দেওয়া ৪৫টি আসনে উপনির্বাচনে এনএলডি ৪৩টিতে জয়ী হয়। পার্লামেন্টে সু চি বিরোধী দলের নেত্রী হন। সেটি ছিল সমঝোতার সূচনা। শেষটা দেখার জন্য হয়তো আগামী জানুয়ারি বা মার্চ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
সু চিকে প্রধানমন্ত্রীর অভিনন্দন: মিয়ানমারের নির্বাচনে এনএলডির বিজয়ে দলটির নেত্রী অং সান সু চিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল রাতে এক অভিনন্দন বার্তায় শেখ হাসিনা বলেন, ‘এনএলডির নিরঙ্কুশ বিজয়ে আমি আপনাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি। এ বিজয়ের মধ্য দিয়ে আপনার প্রতি মিয়ানমারের জনগণের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আস্থার প্রতিফলন ঘটেছে। আপনার অনুপ্রাণিত নেতা-কর্মীদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ সফল হয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এই সুযোগে আমরা আমাদের ঐতিহাসিক বন্ধন ও একে অপরের দেশের জনগণের ও সংস্কৃতির বন্ধন পারস্পরিক স্বার্থে জোরদার করতে চাই।’

এরদোগান, সিসি এবং পশ্চিমা কপটতা by সুমাইয়া ঘানুশি

তুরস্কে পার্লামেন্ট নির্বাচনের ফল ঘোষণার সাথে সাথে পশ্চিমা রাজধানীগুলোতে যেন শেষকৃত্যের শোকাবহ পরিবেশ নেমে এলো। ইউরোপ-আমেরিকার গণমাধ্যমে এই ফলকে চিত্রিত করা হয়েছে ‘বড় ধরনের ধাক্কা’ বা ‘তুরস্কের জন্য একটি কালো দিন’ হিসেবে। প্রতিবেদন, সম্পাদকীয় বা উপসম্পাদকীয়গুলোতে দেশটির বিবর্ণ এক চিত্র উঠে এসেছে। যেখানে তুরস্কে ‘স্বৈরতন্ত্র ফেরা’ এবং ‘গণতন্ত্র টেকার’ আশঙ্কা প্রবল।
তবে এই ধরনের ম্লান বিশ্লেষণগুলোতে একটি সত্য অনুপস্থিত। তা হলো গত জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়েছিলেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান। সে দফায় পার্লামেন্টে তার দলের প্রতিনিধিত্ব কমে গিয়েছিল। যে কারণে ঐক্যের সরকার গঠনের প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। এই প্রস্তাব বিরোধী দলগুলো কঠোরভাবে নাকচ করে দেয়। তুরস্কের সংবিধান অনুসারে আগাম নির্বাচনের ডাক দেন এরদোগান।
তবে এরদোগানকে নব্য ‘ওসমানীয় সুলতান’ অভিহিত করা পশ্চিমা গণমাধ্যম তার চার পাশের জর্ডান, উপসাগরীয় রাজতন্ত্রের দেশগুলো এবং ইরাক বা সিরিয়ার মতো দেশগুলোর প্রসঙ্গ তোলেনি। যেখানে স্বৈরাচার-দুরাচার এখনো মাথা উঁচু করে টিকে আছে।
তবে একটু দূরের প্রতিবেশীকে বিবেচনা করতে গেলেই আমরা দেখতে পাবো এক সামরিক জেনারেলের শাসন। মাত্র দুই বছর আগে এক রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তিনি ক্ষমতায় এসেছেন। দেশের একমাত্র গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে অপহরণ করে কারাগারে পাঠিয়ে, শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভকারীদের ট্যাংকে পিষে মেরে তার ক্ষমতায় আরোহণ। সমসাময়িক ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস ঘটনা এটি।
তবে এই শাসক পশ্চিমাদের অতি পছন্দনীয়। পশ্চিমা দেশগুলোর রাজধানীতে তার সম্মানে লাল কার্পেট বিছিয়ে দেয়া হয়। ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে আজ (লেখাটি ৫ নভেম্বর প্রকাশিত) তাকে সম্মান জানাচ্ছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন।
এই অঞ্চলের মানুষের কাছে পশ্চিমারা যে বার্তা পাঠিয়েছেন তা বেশ স্পষ্ট এবং জোরালো হয়। এমন একটি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা কর যা আমাদের প্রয়োজন ও পছন্দের সাথে সামাঞ্জস্যপূর্ণ অথবা স্বৈরাচারীই থাকুক। সে ক্ষেত্রে তাদের ভাড়া করা ‘বিশেষজ্ঞ’, ‘মন্তব্যকারী’ ও ‘বিশ্লেষকেরা’ হাজির হয়ে যাবে। বোঝানো হবে, এটাই সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবস্থা। অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং রাজনৈতিক সংস্কারেরও বহু চিত্র আঁকা হবে। আর তাতে যদি না কুলায় তা হলে ‘কিসিঞ্জার-অলব্রাইট’-এর দ্বারস্থ হলেই চলবে।
এবার তুরস্কের নির্বাচনে ৮৫ শতাংশ ভোটার অংশ নিয়েছেন। মিসরের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোটার অনুপস্থিতির হারও একই। ফিল্ড মার্শাল এবং তার ওয়াশিংটন ও লন্ডনের সমর্থনকারীদের প্রত্যাখ্যান করার এই একটি মাত্র পথই খোলা ছিল তাদের সামনে। তবে তাতে দেশটিতে স্বৈরশাসন প্রতিষ্ঠায় কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়নি।
এরদোগান যতই বৈধ হন না কেন, লাল কার্পেট গড়িয়ে দেয়া হবে (মিসরের প্রেসিডেন্ট) সিসির জন্যই। তবে কারো কারো জন্য মিসরই গণতন্ত্রের পথে রয়েছে। দেশটিতে পাঁচটি সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে বা কয়েক দশক ধরে সামরিক শাসন চলছে- তাতে কী এসে যায়?
পশ্চিমা গণমাধ্যমের দৃষ্টিতে তুরস্কের নির্বাচনে যারা একে পার্টিকে (এরদোগনের দল) ভোট দিয়েছে তারা অসহিষ্ণু ও বিচার বিবেচনাহীন জনতা। এরদোগানের ‘নিরপেক্ষ বাণিজ্য’ বা ‘জাতীয়তাবাদী প্রচারে’ তারা বিভ্রান্ত হয়েছেন। যদিও বারবারই বলা হচ্ছে, তুরস্কে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বা নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কা অনেক আগেই দূর করে দিয়েছেন এরদোগান।
ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন বা লিবিয়ার কারণে সীমান্তগুলো অশান্ত হয়ে উঠলেও তুর্কিদের অর্থনৈতিক বা নিরাপত্তা শঙ্কা নেই। এর মধ্যেও তারা ২০ লাখ সিরীয় উদ্বাস্তুকে আশ্রয় দিয়েছে। যাদের এক-চতুর্থাংশকেও ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করতে পারেনি।
তুরস্কের নির্বাচনে লাখ লাখ লোক অংশ নিয়েছে। ভোট তাকেই দিয়েছে যে তাদের দৃষ্টিতে তাদের স্বার্থ ও আশঙ্কার ব্যাপারে সবচেয়ে ইতিবাচকভাবে সাড়া দেবে। (সারা বিশ্বের গণতন্ত্রেই ভোটাররা এই কাজটিই করেন)।
মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে পশ্চিমা সাংবাদিক ও বিশ্লেষকেরা যে প্রতিবেদন তৈরি করেন সেগুলো কখনোই তাদের বেঁধে দেয়া সীমাকে অতিক্রম করে বাস্তবতাকে ছোঁয় না। সাধারণ নারী-পুরুষের উদ্দেশ্য, তাদের তৎপরতাকেও সাংস্কৃতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে তারা বুঝতে পারেন না। ঔপনিবেশিক সময়ে মিশনারি, ভ্রমণকারী বা ঔপনিবেশ ধরে রাখার জন্য যারা এসেছেন তাদের ওই সময়ের দৃষ্টিভঙ্গিই আজো ধরে রেখেছেন বিশেষজ্ঞ, মন্তব্যকারী বা সাংবাদিকেরা। অতীতে সাঙ্কেতিক ভাষায় যে বার্তা পাঠানো হতো আজ সেটাই খবরের কাঠামোতে প্রকাশ করা হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের খুব কম মানুষই এখন পশ্চিমাদের এই বাচালতাকে গুরুত্ব দেয়। এর আগে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইরাকে দখলদারিত্ব কায়েম করে দেশটিকে ধ্বংস করে দেয় তারা। এখন জাতিগোষ্ঠীগত হানাহানিতে দেশটি বিপর্যস্ত। বাগদাদে মুক্তির মিষ্টি সুবাস নেই। বরং মৃত্যুর শোক আর গৃহযুদ্ধ ও সন্ত্রাসের ধোঁয়া উড়ছে। এখন আর ওবামা (যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট) বিপ্লবের গান ধরেন না। বা তাহরির স্কয়ারের (মিসরের) বিদ্রোহী হওয়ার সাধও তার নেই।
বিপ্লবীরা আজ জেলের অন্ধকারে পচে মরছে। আর তাদের বন্দিকারীরা পশ্চিমা শহরগুলোতে ফুর্তি করে বেড়াচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যেও সত্যিকারের স্বৈরাচারের দিকে আঙ্গুল তোলা বা তাদের ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার চেষ্টার পরিবর্তে এই অঞ্চলের একমাত্র গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের সমালোচনা করা হচ্ছে। পশ্চিমা রাজনীতিক, মন্তব্যকারীদের বাহিনী আর বিশেষজ্ঞদের উদ্দেশে ছোট্ট একটি উপদেশ; বিশ্বাস করুন, এই অঞ্চলের গণতন্ত্রের প্রশ্নে নীরবতাই সর্বোৎকৃষ্ট।
সুমাইয়া ঘানুশি ব্রিটিশ-তিউনেসীয় লেখক এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ। ব্যক্তিগত জীবনে তিউনেসিয়ার আন নাহদা প্রধান ড. রশিদ ঘানুশির কন্যা তিনি। গত ৫ নভেম্বর হাফিংটন পোস্ট-এ প্রকাশিত এই লেখাটির অনুবাদ করেছেন তানজিলা কাওকাব।

মিয়ানমারে ফৌজি শাসনের ৫৪ বছর

প্রায় ৫৪টি বছর গণতন্ত্রহীনতায় কেটেছে মিয়ানমারের। ১৯৬২ সালের ২রা মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা যায় সেনাবাহিনীর হাতে। তারপর থেকে ২০১৫ সাল। এই দীর্ঘ সময় দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল সেনাবাহিনী না হয় তারা পশ্চাতে থেকে মদত যুগিয়েছে। অন্যদিকে গণতন্ত্রের ডাক দেয়া বিরোধীদলীয় নেত্রী অং সান সু চিকে তারা নিক্ষেপ করেছে কারাগারে। দীর্ঘ ১৫টি বছর তাকে গৃহবন্দি হয়ে কাটাতে হয়েছে। এর মাঝে ১৯৯০ সালের সাধারণ নির্বাচনে গণতন্ত্র মুক্তি পাওয়ার একটি সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। মিয়ানমারের নাগরিকরা গণতন্ত্রের পক্ষে তাদের রায় দিয়ে দিয়েছিলেন। অং সান সু চির দল নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল সেই নির্বাচনে। কিন্তু জনগণকে বোকা বানিয়ে সেই নির্বাচনকে বাতিল করে সেনাবাহিনী। উল্টো তারা জেঁকে বসে ক্ষমতায়। নাফ, ইরাবতী নদীতে অনেক পানি গড়িয়ে গেছে। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে রয়ে গেছে গণতন্ত্রের জন্য দেশবাসীর ত্যাগের নজির। জেনারেল নি উইনের নেতৃত্বে ১৯৬২ সালের ২রা নভেম্বর এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনাবাহিনী ক্ষমতায় গিয়েই চালু করে কর্তৃত্ববাদী শাসন। সেই থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত মিয়ানমারকে শাসন করে জেনারেলদের নের্তৃত্বে রেভুলুশনারি কাউন্সিল দিয়ে। বার্মিজ ওয়ে টু সোসিয়ালিজমের অধীনে প্রায় সব ব্যবসা, মিডিয়া, কলকারখানা সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেয়া হয়। ১৯৭৪ সালে সোসিয়ালিস্ট রিপাবলিক অব দ্য ইউনিয়ন অব বার্মা’র নতুন সংবিধান গৃহীত হয়। ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত হয় মিয়ানমার। তখন জেনারেল ও অন্য সামরিক কর্মকর্তারা পদত্যাগ করেন। ফলে মিয়ানমার শাসন করে বার্মা সোশালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টি। এ সময়কালে মিয়ানমার বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র দেশে পরিণত হয়। জেনারেল নি উইনের শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়। এর মধ্যে বেশির ভাগই হয়েছিল সহিংস। বিক্ষুব্ধদের সব সময়ই সহিংসতার মাধ্যমে দমন করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৯৬২ সালের ৭ই জুলাইয়ের কথা কেউ ভোলেন নি। ওই দিন রেঙ্গুন ইউনিভার্সিটিতে প্রতিবাদ বিক্ষোভে হামলা করে সরকার। এতে কমপক্ষে ১৫ জন ছাত্র নিহত হন। সরকারবিরোধী একটি বিক্ষোভ সেনাবাহিনী সহিংস উপায়ে দমন করে ১৯৭৪ সালে। একই ঘটনা ঘটে ১৯৭৫, ১৯৭৬ ও ১৯৭৭ সালে। ১৯৮৮ সালে সরকারের অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক দমনপীড়নের প্রতিবাদে এবং গণতন্ত্রের দাবিতে সারা দেশে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। এই আন্দোলন ৮৮৮৮ আপরাইজিং নামে পরিচিত। তখন নিরাপত্তা রক্ষীরা কয়েক হাজার বিক্ষোভকারীকে হত্যা করে। জেনারেল শ মুয়াং সামরিক অভ্যুত্থান ঘটান। ঘোষণা করেন স্টেট ল অ্যান্ড অর্ডার রিস্টোরেশন কাউন্সিল (এসএলওআরসি)। ১৯৮৯ সালে দেখা দেয় আবার ব্যাপক বিক্ষোভ। তখন এসএলওআরসি ঘোষণা করে সামরিক আইন। অবশেষে ১৯৮৯ সালের ৩১শে মে সেনা সরকার পিপলস এসেম্বলি নির্বাচনের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এ বছরই দেশের ইংরেজি নাম পাল্টে ফেলে এসএলওআরসি। এর আগে মিয়ানমারের ইংরেজি নাম ছিল সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক অব দ্য ইউনিয়ন অব বার্মা। তা পরিবর্তন করে করা হয় ‘ইউনিয়ন অব মিয়ানমার’। প্রায় ৩০ বছর পরে দেশে গণতন্ত্রের সূর্য উদয়ের একটি সম্ভাবনা দেখা দেয় ১৯৯০ সালে। এ বছরের মে মাসে সরকার অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দেয়। তাতে তখনকার পার্লামেন্টের ৪৯২টি আসনের মধ্যে ৩৯২টি আসনে জয় পায় অং সান সু চির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)। কিন্তু সামরিক জান্তা ক্ষমতা ছাড়তে অস্বীকৃতি জানায়। একই সঙ্গে এসএলওআরসি-এর মাধ্যমে তারা দেশ শাসন অব্যাহত রাখে। এ অবস্থা চলতে থাকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত। এরপর সেনাবাহিনী গঠন করে স্টেট পিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল (এসপিডিসি)। অবশেষে ২০১১ সালের মার্চে তাও বিলুপ্ত হয়। এর মধ্যে ঘটে যায় অনেক ঘটনা। ১৯৯৭ সালের ২৩শে জুন মিয়ানমারকে এসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস (আসিয়ান)-এ অঙ্গীভূত করা হয়। ২০০৬ সালের ২৭শে মার্চ সামরিক জান্তা ইয়াঙ্গুন থেকে রাজধানী সরিয়ে নেয় ন্যাপিড’তে। ন্যাপিড শব্দের অর্থ হলো ‘রাজাদের শহর’। ২০০৭ সালে ডিজেল ও পেট্রলের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা স্যাফ্রোন রেভ্যুলুশন করেন। তবে তাদের আন্দোলনেরও কড়া জবাব দেয় সরকার। ২০০৭ সালের ২৬শে সেপ্টেম্বর তাদের ওপর দমনপীড়ন চালায় সরকার। এ অভিযান ছিল রুক্ষ্ম, কড়া। এ সময় অনেক ভিক্ষুকে হত্যা করা হয়। নিরস্ত্রদের ওপর সরকারের এমন আচরণে আন্তর্জাতিক পর্যায় থেকে নিন্দা জানানো হয়। তারই সূত্র ধরে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে দেয়া হয় অর্থনৈতিক অবরোধ। ২০০৮ সালে ঘূর্ণিঝড় নার্গিসের আঘাতে ব্যাপক ক্ষতি হয়। বিশেষ করে ইরাবতী বিভাগে অববাহিকা এলাকায় ধানের মারাত্মক ক্ষতি হয়। মারা যান প্রায় দুই লাখ নাগরিক। ক্ষতি হয় এক হাজার কোটি ডলারেরও বেশি। ১০ লাখ মানুষ বাড়িঘর ছেড়ে যান। এটি মিয়ানমারের সবচেয়ে ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয় জাতিসংঘ। কিন্তু মিয়ানমার সরকার তাদের কাছে তথ্য গোপন করায় সে কাজ অনেকটা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশ্বের বিভিন্ন স্থান থেকে সহায়তার প্রস্তাব দেয়া হয়। কিন্তু সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা উপস্থিতির কারণে জাতিসংঘের সামরিক বিমানের প্রবেশ বিঘ্নিত হয়। বিঘ্নিত হয় ওষুধ, খাদ্য ও অন্যান্য পণ্য সরবরাহ। ২০০৯ সালে কোকাং নামে একটি সংঘাত দেখা দেয় উত্তর মিয়ানমারের শান রাজ্যে। কয়েক সপ্তাহ ধরে সেখানে হ্যান চাইনিজসহ সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয় সেনাবাহিনী। এই সংঘাতের প্রথম দিনগুলোতে ৮ থেকে ১২ই আগস্ট পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার সাধারণ নাগরিক পালিয়ে আশ্রয় নেন প্রতিবেশী দেশ চীনের ইউনান প্রদেশে।
মিয়ানমারে গণতন্ত্রের বাতাস একটু একটু করে প্রবেশ করতে শুরু করে ২০০৮ সালে। তখন সংবিধান নিয়ে গণভোটে হয় ১০ই মে। ওই গণভোটের রায় অনুযায়ী দেশের নাম ‘ইউনিয়ন অব মিয়ানমার’ থেকে পাল্টে করা হয় রিপাবলিক অব দ্য ইউনিয়ন অব মিয়ানমার’। নতুন সংবিধানের অধীনে ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত হয় সাধারণ নির্বাচন। ওই নির্বাচনে সু চির দল অংশ নিলেও তারা তেমন সফলতা দেখাতে পারে নি। পর্যবেক্ষকরা এ নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তবে কোন কোন ভোটকেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ ছিল। জাতিসংঘ ও পশ্চিমা কিছু দেশ নির্বাচনকে জালিয়াতির নির্বাচন আখ্যা দিয়ে নিন্দা জানায়। এ নির্বাচনে সেনা সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টিকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়। বলা হয় তারা শতকরা ৮০ ভাগ ভোট পেয়েছে। কিন্তু তাদের এ দাবির বিরোধিতা করে বেশির ভাগ গণতন্ত্রপন্থি বিরোধী দল। ২০১১ সালের ৩০শে মে সামরিক জান্তা আস্তে আস্তে ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে সরে যায়। গণতন্ত্র বিকশিত হতে থাকে। এতে সুচির নেতৃত্ব সবচেয়ে বেশি। তিনি নিজেকে কারাগারে এক নাগারে বছরের পর বছর ধরে রেখে, ধৈর্যের পরীক্ষা দিয়ে অন্যরকম এক লড়াই চালিয়েছেন সামরিক জান্তাদের বিরুদ্ধে। অবশেষে জয়টা তারই।

এ দেশে এখন কে নিরাপদ? by আনিসুল হক

এ দেশে এখন কে নিরাপদ? নিরাপত্তা মানে নিরাপত্তার বোধ, মনের ভেতরে এই প্রত্যয় থাকতে হবে যে আমি নিরাপদ, তা এখন আছে কার মনে? কার চিত্ত এখন ভয়শূন্য? কে ভাবছেন যে তাঁর কিছু হবে না! মরতে তো হবেই, আজ হোক আর কাল হোক, মরলে মরব—এই ভাবে ভাবা সাহসের লক্ষণ, সান্ত্বনার পরিচয়—কিন্তু এটাকে নিরাপত্তার বোধ বলে না।
এই দেশে এখন অনেকেই নিজেকে নিরাপদ ভাবেন না। নিজের শয়নকক্ষেও নয়। কারণ, নিরাপত্তারক্ষীরা কিংবা প্রশাসন কারও বেডরুম পাহারা দিতে পারবে না। পথে নয়, সড়কে নয়, এই দেশে বছরে হাজার আঠারো মানুষ মারা যায় শুধু সড়ক দুর্ঘটনায়, লঞ্চ আর নৌকাডুবিতে লোক মরে, বাসে-ট্রেনে পেট্রলবোমা নিক্ষিপ্ত হয়। এই দেশে প্রকাশ্য জনবহুল এলাকায় মানুষ খুন হয়, বইমেলার প্রবেশপথে জনাকীর্ণ রাস্তায়। দিনের বেলা চারতলা ভবনের অফিস কক্ষ যখন জমজমাট, সেখানে ঢুকে পড়ে আততায়ীরা, গুলি হয়, চিৎকার-চেঁচামেচি ও আর্তনাদও নিশ্চয়ই হয়, তারপর মোটরসাইকেলে চড়ে চলে যায় ঘাতকেরা। ভিড়াক্রান্ত মার্কেটের অফিস কক্ষে ঘটে হত্যাকাণ্ড। ফ্ল্যাটভবনের ভেতরে হত্যাকাণ্ড ঘটে, নারী খুন হয়, পুরুষ খুন হয়, লেখক মরেন, প্রকাশক মরেন, স্কুলের ছাত্রী মরে, গৃহবধূ মরেন। কেউ বাড়ি থেকে বেরোনোর পর মারা যান, কেউ বাড়ি ফিরতে গিয়ে মারা পড়েন। কেউ নিজের অফিস কক্ষে মারা যান, কেউ-বা মারা যান রেললাইনের ধারে। পীর মারা যান, মাজারের খাদেম মারা যান। আক্রান্ত হন যাজক, আক্রান্ত হন পথচারী। চেকপোস্টে পুলিশ সদস্য মারা যান ছুরিকাঘাতে। ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মারা যান ব্যাংকের ভেতরে,
সঙ্গে মারা যান নিরীহ গ্রাহক। ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে মারা যান সচিবালয়ের কর্মকর্তা। গুম হয়ে যান মানুষ—ক্রসফায়ারে মারা যান, এনকাউন্টারে মারা যান। নদীতে লাশ ভাসে। খুন হয় মেধাবী কিশোর ত্বকী। মারা যান বিদেশিরা, শুধু একজন-দুজন বিদেশিকে মরতে হবে—এই দৈবচয়ন পদ্ধতির শিকার হয়ে!
মানুষ সারা পৃথিবীতে মারা যায়, খুন হয়, অপঘাতে মরে, সন্ত্রাসী হামলাতেও মরে। গত এক বছরে পৃথিবীতে মাথায় নারকেল পড়ে মারা গেছে ১৫০ জন, আমেরিকায় বিছানা থেকে পড়ে মারা যায় প্রতিবছর ৪৫০ জন। কিন্তু সেটা মানুষকে আতঙ্কিত করে না। চিত্তের স্বাধীনতাই হলো আসল স্বাধীনতা। আজ এই বাংলাদেশে কে আছেন, যিনি ভাবছেন যে তিনি নিরাপদ? যিনি ভাবছেন যে আমার বা আমার স্বজনদের কোনো বিপদ নেই। তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু বলেছেন, গোপন অতর্কিত হামলা থেকে কেউ নিরাপদ নয়, আমিও নই। মন্ত্রী যদি নিরাপদ বোধ না করেন, তাহলে কে নিরাপদ বোধ করবে? কিন্তু বাস্তবতা হলো, মন্ত্রীরাও কেউ নিজেকে নিরাপদ ভাবতে পারবেন বলে মনে হচ্ছে না। সরকারি দলের নেতা-কর্মীরাও আতঙ্কে ভোগেন। তার একটা প্রমাণ হলো, জনসভাতেও তাঁরা নিয়ে আসেন অস্ত্র, এবং নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে মাঝেমধ্যে ধরাও পড়েন।
বিরোধী দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা নিরাপদ নন, তাঁরা আছেন দৌড়ের ওপরে; সরকারি দলের কর্মীরা তাঁদের তাড়া করেন, পুলিশ তাঁদের পিছু নেয়। এই দেশে যিনি সংস্কৃতিচর্চা করেন, তিনি ভাবেন, তাঁর অবস্থা নাজুক, যিনি ধর্মচর্চা করেন, তিনিও ভাবেন তিনি সহজেই আক্রমণযোগ্য। এই দেশে পিতামাতা ভাবেন, আমার সন্তানের কিছু হবে না তো! সন্তানেরা ভাবে, বাবা কিংবা মা বাড়ি থেকে বেরিয়ে আবার ফিরে আসতে পারবেন তো! এই দেশে সংখ্যালঘুরা ভাবে, দেশটা তাদের জন্য নিরাপদ নয়, আর এটা বাসযোগ্য রইল না। কিন্তু বিস্ময়কর হলো, প্রত্যেকেই আজ সংখ্যালঘুর মনস্তত্ত্বে ভুগছে।
খেলোয়াড় ভাবেন, আমি আক্রমণযোগ্য; শিল্পী ভাবেন, আমি অসহায় গোষ্ঠীর; সম্পদশালী ভাবেন, আমার সম্পদই আমার প্রধান সমস্যা; বিত্তহীন ভাবেন, এই দেশে বিত্তহীনের পক্ষেÿ তো কিছুই নয়, কেউই নেই; ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা ভাবে, নিরাপত্তা নেই, নিরাপত্তা নেই তার জীবনের, পরিবার-পরিজনের, সহায়-সম্পত্তির। নৃতাত্ত্বিক সংখ্যালঘুরা ভাবে, এই দেশে আমার উপযুক্ত মর্যাদা আর স্থান কই, জমিজিরেতের ওপরেই-বা আমার আইনগত অধিকার কই। বিএনপি সমর্থক ভাবে, এই সময়টা আমার জন্য অনুকূল নয়। আওয়ামী লীগ সমর্থক ভাবে, যেকোনো সময় আক্রমণের শিকার হতে পারি, পরিস্থিতি তো ভালো নয়! পুলিশ ভাবে, যেকোনো সময় আক্রমণ হতে পারে আমার ওপরে। অবস্থা এমন যে সহকর্মীর ওপরে আক্রমণ হতে দেখে নিজের জীবন নিয়ে পালিয়ে বাঁচার চেষ্টা করেছেন তিনজন পুলিশ সদস্য।
চোর ভাবে, আমাকে নেওয়া হতে পারে ক্রসফায়ারে কিংবা বানানো হতে পারে জজ মিয়া। লেখক ভাবেন, আমি বাংলা ভাষায় লিখি, এইটাই তো কারও কারও চোখে হতে পারে সবচেয়ে বড় অপরাধ। শিল্পী ভাবেন, আমি গান করি, নাটক করি, সেইটাই বা ওরা সহ্য করবে কেন? পরহেজগার ভাবেন, আমাকে কি ওরা সন্দেহের চোখে দেখছে না। নারী, যেকোনো বয়সের—পথে নেমে বারবার ঘাড় ঘুরে তাকান, কোথাও থেকে কোনো আক্রমণ আসছে না তো! শিশুরা এই দেশে আক্রমণের শিকার হচ্ছে—নিষ্ঠুর সব নির্যাতনের। ফলে এই দেশে কোনো মতের, কোনো দলের, কোনো পেশার, কোনো শ্রেণির মানুষ কি পাওয়া যাবে, যিনি ভাবছেন যে তিনি নিরাপদ?
এই দেশে এমন কোনো স্থান কি আছে, যেখানে আপনি ভাবতে পারেন, এখানে কিছুই হবে না আপনার? ভবন ভেঙে যেতে পারে, ফুটপাতে গাড়ি উঠে পড়তে পারে—তারও চেয়ে বড় কথা, আততায়ীরা হামলা করতে পারে যেকোনো খানে, পথে-ঘাটে, হাটে-বাজারে, ঘরে-বাইরে, অফিসে-উঠানে। আপনি এ পক্ষের মার খেতে পারেন, ও ও পক্ষের মার খেতে পারেন; আপনি হরতালকারীদের আক্রমণের শিকার হতে পারেন, হরতালবিরোধীদের ছুরিকাঘাতে মারা যেতে পারেন। আপনি গুম হয়ে যেতে পারেন, গুমের ঘটনা দুর্ভাগ্যক্রমে দেখে ফেলার অপরাধেও মরতে পারেন। আপনি টার্গেটেড হয়ে মারা পড়তে পারেন, আর হয়তো একজনকে টার্গেট করতে গিয়ে ভুলে আততায়ীরা মেরে ফেলতে পারে আপনাকেও। অতীতে আমরা দেখেছি, নামের মিলের কারণে ক্রসফায়ারে মারা গেছে ভুল মানুষ, এমনকি পরনের কাপড়ের রং মিলে যাওয়ায় হাঁটুতে গুলি খেয়েছে ভুল যুবক।
আগেই বলেছি, অপঘাতে সারা পৃথিবীতে মানুষ মারা যায়। বড় বড় সন্ত্রাসী হামলা বাইরের দেশগুলোতে অনেক হয়, আমেরিকা-ইউরোপে বদ্ধ উন্মাদেরা বন্দুক নিয়ে ঢুকে পড়ে বাচ্চাদের ইশকুলে, এটা ফি বছরই ঘটে থাকে। কিন্তু অসহায়তার অনুভূতি নিরাপত্তাহীনতার বোধ সব শ্রেণি-পেশা, ধর্ম-বর্ণ, সংস্কৃতি-আচারের মানুষের মধ্যে এত প্রবলভাবে আর কখনো বাংলাদেশে চেপে বসেছে কি না সন্দেহ। মার্কনি রেডিও আবিষ্কার করার পর বিজ্ঞানীরা কিছুদিন বলতেন, পৃথিবীটা পূর্ণ ইথার নামের একটা জিনিসে, পরে অবশ্য ওই তত্ত্ব ভুল বলে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু এখন বাংলাদেশের আকাশ-বাতাস পূর্ণ হয়ে আছে ভয় নামের একটা পদার্থে, যে ভয় কাল্পনিক নয়, বাস্তব; যে ভয় অমূলক নয়, যার মূল দেশের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির বাস্তবতার মধ্যে প্রোথিত।
ভয় থেকে বাঁচার জন্য মানুষ তাই পালাতে চাইছে। দেশ ছাড়ার কথা ভাবছে। আচ্ছা, আমি নাহয় মরলাম, আমার সন্তানেরা যেন নিরাপদ থাকে—তাই বাইরে কোথাও একটা...এমন কথা শোনা যায় আজ অনেকেরই মুখ থেকে। ওমা তোমার চরণ দুটি বক্ষে আমার ধরি, আমার এই মাটিতে জন্ম যেন এই মাটিতে মরি—এ কথা জোর গলায় বলার লোক এখন কমে যাচ্ছে। যাঁরা বলছেন, তাঁদের উপায় নেই বলে বলছেন, নিজেকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলছেন।
একটা সময় এর চেয়ে খারাপ আর কী হতে পারে! একটা দেশের পরিস্থিতিকে কখন আমরা বলব এর চেয়েও হতাশাব্যঞ্জক। মানুষের মন থেকে ভয় দূর করতে হবে, দিতে হবে সাহস। দিতে হবে আশ্বাস। শুধু কথায় চিড়া ভেজে না, কিন্তু মুশকিল হলো, সাহস আর সান্ত্বনার বাণী যাঁরা শোনাতে পারতেন, তাঁরা নিজেরাই বলে চলেছেন ভয়াবহ সব উক্তি, বেফাঁস সব কথা! তাঁদের কথা শুনে মানুষ আশ্বাস পাচ্ছে না, পাচ্ছে কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা।
অপরাধীদের ধরতে হবে, বিচার করতে হবে, তা করতে হবে দ্রুততার সঙ্গে আর তা হতে হবে, দৃষ্টান্তমূলক—এটা তো একেবারেই প্রথম কাজ, প্রথম ও অপরিহার্য কর্তব্য। ফয়সলের বাবা যতই বলুন না কেন, তিনি বিচার চান না, আসলে বিচার করতেই হবে, করতে পারতেই হবে। সে জন্য দরকার হবে প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা, প্রশিক্ষণ, রসদ, যন্ত্র, জনবল, অর্থ এবং স্ট্র্যাটেজি। দরকার হবে দূরদৃষ্টি, পরিকল্পনা ও জোরদার নির্দেশনা। কিন্তু অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের পরের কথাটাও গুরুত্বপূর্ণ। ভিন্ন মতের, ভিন্ন পথের, ভিন্ন ধর্মের, ভিন্ন বিশ্বাসের, ভিন্ন সংস্কৃতির, ভিন্ন বর্ণের মানুষের শান্তিপূর্ণ, আস্থাপূর্ণ, মর্যাদাপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে পারতে হবে। সেটা করতে হলে দরকার হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। দরকার হবে গণতান্ত্রিক পরিসর। বিরোধীদের বিরোধিতা প্রকাশের অবাধ পরিবেশ। কারও মনে ক্ষোভ সৃষ্টি হলে তার প্রকাশের জানালা। মিছিল-সভা-সমাবেশ করবার আইনানুগ অধিকার। বিরোধী মত প্রকাশের মাধ্যমগুলোর অনাক্রান্ত অবস্থান। এবং শিক্ষা। শিক্ষা মানে সুশিক্ষা। এবং সংস্কৃতি। আর সংস্কৃতি মানে সুন্দরভাবে বাঁচা, বিচিত্রভাবে বাঁচা।
এই দেশে আমরা একদা গান গাইতাম—ভায়ের মায়ের এত স্নেহ কোথায় গেলে পাবে কেহ। এখন আমাদের মনে গান নেই, তার বদলে আছে শঙ্কা, ভায়ের মায়ের মনে এত ভয়, আর কোথাও পাবার নয়। এটা কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ নয়, এটা কোনো সুন্দর শাসনের প্রতিচ্ছবি নয়, এখন একটা কথাই বলা যায়, এখন দুঃসময়। ১৯৭১ সালে আমাদের মনে ভয় ছিল, কিন্তু আশাও ছিল। কারণ আমরা জানতাম, আমরা মারা যেতে পারি, কিন্তু তার বিনিময়ে পাব স্বাধীনতা! এখন মানুষের মনে ভয়, যে কেউ যেকোনো সময় মারা যেতে পারেন, কিন্তু তার বিনিময়ে তিনি পাবেন একরাশ বর্জ্য-বচন।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

পাশের বাড়িতে গণতন্ত্র

বাড়ির পাশের গণতন্ত্র উৎসবে অন্তর থেকে অংশ নিয়েছে মিয়ানমারের প্রতিবেশীরা। বাংলাদেশের দুই নিকট প্রতিবেশীর মধ্যে মিয়ানমার অন্যতম। বর্মী গণতন্ত্র কন্যা অং সান সু চির প্রতি বাংলাদেশের মানুষের অনুরাগ বহু পুরনো। বর্মী জাতির পিতা এবং স্বাধীনতার স্থপতি অং সানের প্রতিও রয়েছে বাংলাদেশের রাজনীতিক ও জনগণের অপরিসীম শ্রদ্ধা। অনেকেরই ধারণা দেশটির সঙ্গে বুঝি বহুকাল আগ থেকেই এদেশের সঙ্গে বিরোধ-বিসংবাদের সম্পর্ক। এই ধারণার জন্য অবশ্য রোহিঙ্গা ইস্যু অন্যতম বড় কারণ। কিন্তু গত কয়েকশ’ বছরের ইতিহাসে দেখা যায়, বার্মা নামের দেশটির রাজাদের সঙ্গে বাংলার শাসনকর্তাদের মধুর সম্পর্কও গড়ে উঠেছিল। বিভিন্ন সময়ে তারা পরস্পরের মধ্যে অত্যন্ত মূল্যবান উপহার সামগ্রী বিনিময় করেছে।
গতকালের নির্বাচনের ফলাফলের দিকে বাংলাদেশীরা অনেক দিন ধরেই নিবিড়ভাবে নজর রেখে চলছিলেন। এর একটি বড় কারণ হচ্ছে মিয়ানমারের সঙ্গে সমুদ্রসীমা ও স্থলসীমা নির্ধারণ সাফল্যের সঙ্গে নিষ্পত্তি হওয়ার পরেও জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক আগের মতোই সীমিত রয়ে গেছে। যদিও চীনের প্রস্তাবের ভিত্তিতে সিল্করুট পুনরুজ্জীবনে মিয়ানমার আগ্রহ দেখিয়ে চলেছে। মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে চীন সীমান্ত পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ করা হলে সেই পথে বাংলাদেশের মানুষ চীনের মুসলিম অধ্যুষিত ইয়ানানে দ্রুততম সময়ে পৌঁছাতে পারবে। সুতরাং জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক ও ব্যবসাবাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধি করার মনোভাব থেকেও বাংলাদেশের জনগণ মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার দিকে লক্ষ্য রেখে চলছেন।
বাংলাদেশ একটি দীর্ঘ সময় সামরিক জান্তাশাসিত ছিল। জেনারেল এরশাদের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এখনও মানুষের স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে আছে। মিয়ানমারসহ বিশ্বের অধিকাংশ সামরিক জান্তা ও একনায়করা সবচেয়ে বড় ভয় পায় ব্যালটকে। তারা নানা ছলেবলে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করে। মানুষের ভোটের অধিকার তারা দিতেই চায় না। দেশটির প্রতিষ্ঠাতা ও জাতির জনকের কন্যা হিসেবে অং সান সু চি কিভাবে তার দলকে নেতৃত্ব দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে এতটা পথ পাড়ি দিয়ে আসছেন তা বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বের কাছে বিশেষ করে যেসব সমাজে গণতন্ত্রের ঘাটতি চলছে তাদের কাছে বিরাট একটা শিক্ষণীয় বিষয়। অং সান সূ চি গতকাল তার দলের এগিয়ে থাকার মুহূর্তেও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, পরাজিত প্রার্থীদের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল আচরণ প্রদর্শন করার জন্য। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে,  পরাজিত প্রার্থীও একই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার শ্রদ্ধাভাজন অংশীদার। যারা বিরোধী দলে বসবে তারাও অভিন্ন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
সারাবিশ্বের শীর্ষস্থানীয় মিডিয়া মিয়ানমারের নির্বাচনকে স্বাগত জানিয়েছে। কারণ মিয়ানমার বহুকাল অবশিষ্ট বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। একসময় ধরেই নিয়েছিল অনেকে যে দেশটি বুঝি ভোট ও ব্যালটের শক্তিকে অস্বীকার করে কেবল উন্নয়ন দিয়ে গদিতে টিকতে পারবে। সামরিক জান্তা সব চেষ্টাই করেছে। ক্ষমতা ধরে রাখতে এমন ফন্দিফিকির নেই যে, সেটা তারা প্রয়োগ না করার চিন্তা করেনি। কিন্তু শেষ হাসি স্বৈরশাসকের নয়, সম্ভবত শেষ হাসিটা গণতন্ত্রের নেত্রী অং সান সু চির মুখেই দেখা যাবে। অনেকে বলছেন, শেষ হাসিটা আসলে গণতন্ত্রের। ২৫ বছর আগে তারা একটি লোকদেখানো নির্বাচন করেছিল। নির্বাচনে হার হবে জেনে তারা আর সাধারণ নির্বাচন দিতেই রাজি হয়নি।
কিন্তু গতকাল বর্মী জনগণ নতুন করে ইতিহাস লিখেছে। সারা বিশ্ব অবাক চোখে দেখেছে, বিস্ময়াভূত হয়ে শুনেছেন, স্বৈরশাসকরা যারা ক্ষমতায় থেকে দল করেছিল, আর ভেবেছিল তারা উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির গল্প শুনিয়ে জনগণকে অনির্দিষ্টকাল ধরে ঘুম পাড়াতে পারবেন, যারা ভেবেছিলেন, আমরা তো আন্দোলন দাবিয়ে রেখেছি। আমরা তো সভা-মিছিল করতে দেই না। আমরা তো ধর্মঘট চিরকালের জন্য নিষিদ্ধ করে রেখেছি। কাউকে কোথাও সরকারবিরোধী আলোচনা করতে দেই না। কাউকে কোন গণতন্ত্র অনুশীলন করতে দেই না। আমাদের সরকারি পেটোয়া বাহিনীকে সবাই ভয় করে। আমরা ভোট দেবই না। ভোটের নামে মাঝেমধ্যে প্রহসন করব। মাঝেমধ্যে ভোট ভোট খেলবো। কিন্তু ক্ষমতা ছাড়বো না। বলবো ভোট চেয়ো না গো, উন্নয়ন নাও। আজ ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে বার্মায় কোন জা্বলাও পোড়াও আন্দোলন হয়নি। অং সান সু চিকে অনেক আগে মুক্তি দেয়া হয়। কিন্তু তারপরেও সু চি শান্তিপূর্ণ ও নীরব আন্দোলনের প্রতি আস্থাশীল ছিলেন। অত্যন্ত ধীরগতিতে অত্যন্ত অসহিংস উপায়ে একনায়কের সঙ্গে বোঝাপড়া করেছেন। গতকাল তিনি তার ফল পেয়েছেন। ২৫ বছর পরে হলেও মিয়ানমারে প্রথম অবাধ সাধারণ নির্বাচনে কার্যত ধরাশায়ী হয়েছে শাসক দল ‘ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি’ বা ইউএসডিপি। হার স্বীকার করে নিয়ে শাসক দলের নেতা হতে উ সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘‘ভাবিনি, এই ভাবে আমরা হেরে যাবো। আমরা মানুষের জন্য অনেক কিছু করেছিলাম। তবে জনগণের রায় আমরা মেনে নিচ্ছি। পরাজয়ের কারণ এখন আমাদের ভাল করে খতিয়ে দেখতে হবে।’’
উল্লেখ্য, নির্বাচন পার্লামেন্টের ৭৫ শতাংশ আসনের প্রতিনিধি চূড়ান্ত করবে। বাকি ২৫ শতাংশ আসন অনির্বাচিত সামরিক প্রতিনিধিদের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য এনএলডিকে ৬৭ শতাংশ আসনে জয়ী হতে হবে। তবে ঢাকায় একজন জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেছেন, সব হিসাব পাল্টে যেতে পারে। সু চি যদি ভূমিধস বিজয়ের দিকে যান তাহলে সামরিক বাহিনীর সঙ্গে একনায়কের গোপন সমঝোতা ভেস্তে যেতে পারে। এমনকি সু চিকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পথে সংবিধান যে বাধা তৈরি করেছে তাও তাসের ঘরের মতো ভেঙে যেতে পারে। কারণ জনস্রোত তৈরি হলে জেনারেলরা জননেত্রীর সঙ্গেই শামিল হবেন। সংবিধানে পরিবর্তন আনা কঠিন হবে না। নির্বাচনের আগেই বর্তমান প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন বলেছেন, ফলাফল যা-ই হোক না কেন, সরকার ও সেনাবাহিনী তা মেনে নেবে।
দেশটির বর্তমান প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হতে উ ইতিমধ্যে বলেছেন, ‘কোন ধরনের আপত্তি ছাড়াই আমরা ফলাফল মেনে নেব। আমরা এখনও চূড়ান্ত ফল জানি না।’
এটা লক্ষণীয় যে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিসহ অনেকেই বলছেন, এবারের নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি-না, তা নিয়ে সংশয় আগে থেকেই ছিল। এমনকি কাঠামোগত অনেক ত্রুটি রয়ে গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি বর্মী অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। নেতাদের অভিনন্দন জানিয়েছেন।
জন কেরি নির্দিষ্টভাবে রোহিঙ্গাদের ভোটের বাইরে রাখার কথাও গতকাল তার বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন।
রোহিঙ্গা মুসলিম সমপ্রদায় সহ লাখো মানুষ ভোট দিতে পারেনি। সংখ্যালঘু কারেন জনগোষ্ঠীর একজন ভোট দিতে না পেরে নিজের আঙুল কেটে ফেলে প্রতিবাদ জানিয়েছেন। বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের দাপট আর সংখ্যালঘু মুসলিম সমপ্রদায়ের প্রতি হুমকি-ধামকির কারণেও নির্বাচন নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। তবে সেনাপ্রধান মিন অং লাইং রাজধানী নেপিডো’য় গতকাল বলেন, এবার ১৯৯০ সালের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি হবে না। জনগণ এনএলডিকে পছন্দ করলে সেনাবাহিনীর সেটা মেনে না নেয়ার কোন কারণ নেই।
১৯৯০ সালের নির্বাচন অবাধ হয়েছিল এবং সু চি বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু সেনাবাহিনী সেই ফলাফল উপেক্ষা করেছিল। পরবর্তী ২০ বছরের বেশির ভাগ সময় গৃহবন্দি রাখা হয় সু চিকে। ২০১০ সালে তিনি মুক্তি পান। ইউএসডিপি সামরিক বাহিনীর সমর্থন নিয়ে ২০১১ সালে ক্ষমতায় এসে মিয়ানমারে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার কাজ শুরু করে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষে এনএলডি সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারে। তবে উচ্চকক্ষের নিয়ন্ত্রণ তারা পাবে না। নির্বাচনে জয়ী হলে সু চিকে একটি শক্তিশালী জোট গড়ার জন্য সঙ্গী খুঁজতে হবে। এ ক্ষেত্রে মিয়ানমারের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। মিয়ানমারে অন্তত ১০০টি জাতিগোষ্ঠী রয়েছে, যারা দেশটির জনগণের প্রায় ৩০ শতাংশ। এসব রাজনৈতিক দল কোন জোটে যোগ দিয়ে নিজ নিজ সমপ্রদায়ের সুবিধা পেতে চাইবে।
সার্বিক বিচারে বাড়ির পাশের ভোট উৎসব যেখানে সব দল অংশ নিয়েছিল এবং বড় ধরনের কোন জাল-জালিয়াতি ও মাস্তানির খবর পাওয়া যায়নি। পুলিশের মদতে কোথাও সরকার সমর্থকরা কেন্দ্র দখল করারও খবর মেলেনি। বাংলাদেশের মানুষ তাই অব্যাহতভাবে টিভি পর্দার দিকে নজর রাখছে। তাদের চোখ যেন সরছেই না।
পরাজয় মেনে নিলেন স্পিকার
পার্লামেন্টের বর্তমান স্পিকার ও ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ইউ শ মান নিজ আসনে পরাজয় মেনে নিয়েছেন। ফেসবুকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে পরাজয় মেনে নেয়ার ঘোষণা দেন। অং সান সু চি’র দল এনএলডির প্রার্থী ইউ থান নিউন্তের কাছে তিনি পরাজয় বরণ করেন। ফেসবুকে দেয়া বার্তায় তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। মিয়ানমারের বাগো এলাকার ফিউ আসনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছিলেন। 
সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের হতাশা নেই
দ্য মিয়ানমার টাইমস বলেছে, মিয়ানমারের সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে কোন হতাশা নেই। তারা বলেছেন, অভিনন্দন জানিয়ে ফল মেনে নেবেন। এ কথা প্রতিধ্বনিত হয়েছে কমান্ডার ইন চিফ সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লায়িং-এর কণ্ঠে। তিনি নিশ্চয়তা দিয়েছেন তারা নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করবেন না। ১৯৯০ সালের নির্বাচনে এনএলডি ভূমিধস বিজয়ের পরে তখনকার সেনাবাহিনী তাতমাদাও ওই ফল প্রত্যাখ্যান করেছিল। রাজধানী শহরের ছয়টি এলাকায় ইউএসডিপি, এনএলডি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফোর্স পার্টি, ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টি ও স্বতন্ত্র ৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এসব আসনে কি ঘটবে তার পূর্বাভাস দেয়া কঠিন। তবে ভোটকেন্দ্রগুলো থেকে প্রাথমিক যে ফল পাওয়া যাচ্ছে তাতে এগিয়ে রয়েছে এনএলডি। দেক্ষিণাথিরির ১৫টি ভোট কেন্দ্রে ১০টিতে জিতেছে এনএলডি, তিনটিতে হেরেছে। বাকিগুলোতে গণনা চলছিল। সেনা কর্মকর্তা জেনারেল মিন অং হ্লায়িংকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, যদি এনএলডি বিজয়ী হয় তাহলে তিনি তা মেনে নেবেন কিনা। জবাবে তিনি বলেন, মেনে না নেয়ার তো কোন কারণ নেই। জনগণের পছন্দ আমরা মেনে নেব।
লালে লাল চারদিক
আনন্দ ধরছে না সু চির শিবিরে। লাল ব্যানার, লাল শার্ট পরে রাজপথে নেমে পড়েছেন তার সমর্থকরা। যেখানেই জায়ান্ট স্ক্রিনে নির্বাচনের ফল দেখানো হচ্ছে সেখানেই এই লালের সমুদ্র। তাতে যোগ দেয় ৩৬ বছর বয়সী কো সি থু। তিনি বলেন, সরকারি কোন কর্মকর্তা নয়। বিজয়ী হবেন এনএলডির প্রার্থী। তাদের বিজয় শতভাগ নিশ্চিত। যখনই কোন আসনের ফল ঘোষণা হচ্ছে তখনই সেই জনস্রোত সাগরের ঢেউয়ের মতো নেচে উঠছিল। এনএলডির ৩০ বছর বয়সী সমর্থক কো মিন থু। তিনি বলেন, কোন সংশয় নেই। আমরা সব সময়ই জানি বিজয় আমাদের। ঘুমহীন কাটছে তাদের সময়। কেউ বা ফেসবুক খুলে তাতে দৃষ্টি ছুড়ে বসে আছেন।

দক্ষিণ চীন সাগরে যুদ্ধের দামামা by রিচার্ড জাভেদ হেইডেরিয়ান

বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্র এশিয়ার জলসীমায় রাজত্ব করেছে, তার বিশাল নৌবহর এমনভাবে এখানকার জলসীমা দাপিয়ে বেড়িয়েছে যে মনে হতো, তার রাশ টানার মতো কেউ নেই। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের প্রতি একই সঙ্গে সহৃদয় ও উদ্ধত ছিল। তারা এই মহাদেশের সশস্ত্র অভ্যুত্থানে সমর্থন দিয়েছে। এশিয়ার সামরিক ঘাঁটিগুলোতেও তার অবাধ যাতায়াত ছিল। আবার তারা রাষ্ট্রীয় ও অ-রাষ্ট্রীয় দুই ধরনের আক্রমণকারীদের হাত থেকে সমুদ্রপথের ব্যবসা-বাণিজ্য রক্ষা করেছে।
বৈশ্বিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশই হয় সমুদ্রপথে। ফলে সব দেশই চায়, আন্তর্জাতিক জলসীমায় তাদের চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত হোক। হ্যাঁ, বহুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কার্যত সমুদ্রপথে বৈশ্বিক যোগাযোগের পাহারাদারের কাজ করছে। একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন নৌ-শ্রেষ্ঠত্বকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তাতে তারা সফল হয়নি।
নতুন এক নৌশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন এই আন্তর্জাতিক সমুদ্রব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে উল্টে দিচ্ছে। চীন তার মহাদেশীয় প্রতিবেশীদের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী, তার নৌশক্তিও ক্রমেই বাড়ছে, আবার তার হাতে বিপুল পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র রয়েছে—এই বলে বলীয়ান হয়ে চীন পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ জলপথে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি সংকুচিত করেছে। হলুদ সমুদ্র থেকে পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনী তার আশপাশের সমুদ্রসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌশক্তির উপস্থিতিকে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
দক্ষিণ চীন সাগরে চীন কৃত্রিম দ্বীপ বানিয়ে সামরিক স্থাপনার এক ছড়ানো-ছিটানো নেটওয়ার্ক ও বিমানঘাঁটি গড়ে তুলেছে। চীন পরবর্তীকালে এই ঘাঁটিকে সামরিক আক্রমণ শুরু করার ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরের একটি অংশ সামরিক শক্তি প্রয়োগের পক্ষপাতী, এমনকি ওবামার মিত্ররাও এ ব্যাপারে সোচ্চার। তাদের চাপে পড়ে ওবামা প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বেইজিংয়ের নৌশক্তি প্রদর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে তারা আরও আগ্রাসী অবস্থান নেবে। কিন্তু তারা যে চীনের সৃষ্ট কৃত্রিম দ্বীপের কাছাকাছি নজরদারি করার জন্য জাহাজ পাঠিয়েছে, তাতে দ্বন্দ্ব-সংঘাত আরও বাড়তে পারে।
আলফ্রেড থায়ার মাহান ১৮৯৭ সালে দ্য ইন্টারেস্ট অব আমেরিকা ইন সি পাওয়ার শিরোনামে একটি বই লিখেছিলেন। তিনি ছিলেন ১৯ শতকের একজন অন্যতম নৌকৌশলবিদ। তিনি সেই বইয়ে বলেছেন, সমুদ্র-বাণিজ্য বা নৌশক্তি যেভাবেই হোক না কেন, সমুদ্রের নিয়ন্ত্রণ হাতে থাকলে ‘পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। কারণ, স্থলভূমিতে যত সম্পদই থাকুক না কেন, সমুদ্রপথে সম্পদ বিনিময় বা বাণিজ্য যত সহজ, অন্য পথে তা অত সহজ নয়।’
মাহান বলেন, একটি দেশ যদি দুনিয়াতে পরাশক্তি হতে চায়, তাহলে তাকে আশপাশের জলসীমায় প্রভুত্ব করতে হবে। এর মধ্য দিয়ে তাকে এমন এক অঞ্চল তৈরি করতে হবে, যাতে অন্যরা তাকে সমীহ করে এবং বহিঃশক্তিকে তার আশপাশ থেকে দূরে রাখা যায়। আজ চীন মাহানের নীতি অনুসরণ করছে, সে নিজের আশপাশের জলসীমায় প্রভাব বিস্তার করতে চায়।
গত কয়েক বছরে চীন কী করেছে তার একটা ফিরিস্তি দিই। সে দক্ষিণ কোরিয়ার দাবির বিরুদ্ধে হলুদ সাগরের ওপর নিজের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে, একইভাবে সে জাপানের বিরুদ্ধে পূর্ব চীন সাগর এবং ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও ব্রুনেইয়ের বিরুদ্ধে দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর নিজের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
আবার সে বারবার যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-উপস্থিতিকে সীমিত করার চেষ্টা করেছে, সাগরে তাদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য জানার জন্য অভিযান চালিয়েছে। এর ফলে ২০১১ সালে দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা জেট ফাইটার বিমান ও যুক্তরাষ্ট্রের ইউএস ইপি-৩ সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স বিমানের মধ্যে সংঘর্ষ হয়।
যুক্তরাষ্ট্র কতটা আগ্রাসীভাবে চীনের সার্বভৌমত্বের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে, তার ওপরই এখন অনেক কিছু নির্ভর করবে আরও সম্প্রতি চীনা ফাইটার জেট ও আধা সামরিক বাহিনী ওই এলাকায় যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও জাহাজকে হয়রানি করেছে। পূর্ব চীন সাগরে চীন জাপানের সঙ্গে সেনকাকু ও দিয়াও দ্বীপ নিয়ে এক তিক্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। বেইজিং সেখানে এক ‘এয়ার ডিফেন্স আইডেনটিফিকেশন জোন’ তৈরি করেছে, ফলে এখন অন্য দেশকে সেখান দিয়ে যেতে হলে তাদের অনুমতি নিতে হয়।
ওদিকে দক্ষিণ চীন সাগরে গত দুই বছরে চীন ১৭ হাজার হেক্টর কৃত্রিম ভূমি পুনরুদ্ধার করেছে। সেই জমি হয়তো জোয়ারের সময় ডুবে যেত। এই ভূমির মধ্যে আরও আছে প্রবাল প্রাচীর ও পাথর, যেগুলোকে তারা পূর্ণাঙ্গ দ্বীপে পরিণত করেছে।
না, চীনের কার্যক্রম শুধু আন্তর্জাতিক আইনেরই লঙ্ঘন নয়, তাদের কর্মকাণ্ডের ফলে অন্য দাবিদাররাও বিরাট হুমকির মুখে পড়েছে। এমনকি সেখানে জাহাজ চালানোর স্বাধীনতাও হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে চীন এই বিতর্ককে সামরিকায়ন করে আরও অধিক হারে সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
এ ব্যাপারে চীন অতীতের নৌশক্তিগুলোকে ছাড়িয়ে গেছে। অতীতে নেদারল্যান্ডস ও সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মতো চীন শুধু তার আশপাশের জলসীমায় প্রভুত্ব বিস্তার করতে চায় না, সে এটাকে তার ভূমির সম্প্রসারণ হিসেবে গণ্য করছে, ‘নীল জমি’।
জাতিসংঘের কনভেনশন অন দ্য ল অব দ্য সির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন করে চীন তার কুখ্যাত ‘নাইন-ড্যাশ লাইন’ মতবাদের আলোকে দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর তার ‘অন্তর্নিহিতি’ ও ‘তর্কাতীত’ দাবি রয়েছে বলে ঘোষণা করেছে। কিন্তু ওই কনভেনশন বলে, উপকূলীয় রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক জলসীমায় নিজের অধিকার দাবি করতে পারে না। নিজের নৌ-কর্তৃত্ব বজায় রাখতে ও সেখানে চীনা ‘হ্রদ’ সৃষ্টি ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র তার এশীয় মিত্রদের সঙ্গে নিরাপত্তা বন্ধন দৃঢ় করেছে। যুক্তরাষ্ট্র সেখানে আরও বেশি হারে প্রবেশের ব্যাপারে আলোচনা করেছে, চীনকে পাহারা দেওয়ার জন্য অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের সহায়তা পেয়েছে।
এই অক্টোবরের মধ্যভাগে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী অ্যাশ কার্টার অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র ওই এলাকায় চীনের সার্বভৌমত্বের দাবি চ্যালেঞ্জ করতে চীনের কৃত্রিম দ্বীপের ১২ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে ‘ফ্রিডম অব নেভিগেশন’ অভিযান পরিচালনা করবে। অক্টোবরের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্র ইউএসএস লাসেন (মিসাইল নিয়ন্ত্রিত ধ্বংসকারী) মোতায়েন করেছে।
ওয়াশিংটন ও তার মিত্রদের যুক্তি হচ্ছে, চীনের এই ভূমির বেশির ভাগই জোয়ারের সময় ডুবে যায়, সে কারণে জাতিসংঘের রীতি অনুসারে তার ওপর চীনের দাবি থাকতে পারে না। চীন আবার হুংকার দিয়েছে, ‘চীনা সীমানায় সমুদ্র ও আকাশপথে বিধি লঙ্ঘন করে কেউ ঢুকে পড়লে তার নিস্তার নেই।’ ফলে ওই এলাকায় সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বেড়ে গেল।
যুক্তরাষ্ট্র কতটা আগ্রাসীভাবে চীনের সার্বভৌমত্বের দাবিকে চ্যালেঞ্জ করে, তার ওপরই এখন অনেক কিছু নির্ভর করবে। বৈশ্বিক গণমাধ্যম আসন্ন যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বৈরথের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করছে। তবে চীনের জাতীয়তাবাদী নেতারাও ব্যাপক চাপের মুখে আছেন, তাঁদের সংকল্প ও প্রতিরোধ দেখাতে হবে। এশিয়া এক গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উপনীত হয়েছে।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন
আল-জাজিরা থেকে নেওয়া
রিচার্ড জাভেদ হেইডেরিয়ান: এশীয় ভূরাজনীতি বিশেষজ্ঞ।

নূর হোসেন যেন আমাদের দেখছেন by মঈনুল শাওন

গুলিতে নিহত হওয়ার আগে শহীদ নূর হোসেনের
ইতিহাস সৃষ্টিকারী প্রতিবাদ। ছবি: পাভেল রহমান
আশির দশক। বাংলার রাজনীতির আকাশে তখন অযাচিত মেঘ। ১৯৭৫-এ জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর নানা সামরিক ক্যুর ধারাবাহিকতায় ১৯৮১ সালে জেনারেল জিয়াকে হত্যার সুবাদে লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের রাজনীতির পাদপ্রদীপে আগমন। ১৯৮২ থেকে ১৯৯০, প্রায় এক দশক, সামরিক শাসনের জাঁতাকলে মানুষের জীবনে ওঠে নাভিশ্বাস। শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, শ্রমিক আন্দোলনে সুবিধাবাদ, কৃষকের ভূমি লুট, দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, প্রশাসনের সামরিকায়ন, সর্বোপরি রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন—অপশাসনের একটি দিক। অন্যদিকে এর বিপরীতে দানা বেঁধে ওঠা গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে বারবার নির্মমভাবে দমনের চেষ্টা করে সামরিক জান্তা। কিন্তু এই চরম স্বৈরতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে বাংলার জনগণ বরাবরই ছিল সোচ্চার।
বেড়ে ওঠো দাউ দাউ অগ্নির পালক
স্বৈরশাসনের করাল থাবায় অর্থনীতির দৈন্য বুঝতে, পুরান ঢাকার বনগ্রামের অন্ধকার গলিতে এক দরিদ্র তরুণ নূর হোসেনের বেড়ে ওঠার বয়ান উপযোগী। মাত্র দুই কামরার ছোট একটি ঘরে প্রায় আট-নয়জনের পরিবারের বেঁচে থাকা কতটা দুঃসহনীয়, স্বচক্ষে না দেখলে তা বিশ্বাস করা দায়। দিনব্যাপী বাড়ির কর্তা মজিবুর রহমানের ট্যাক্সি চালানোর আয়ে এতগুলো মুখের অন্নের জোগান। এর মধ্যেই শিশুদের পড়াশোনার প্রচেষ্টা অব্যাহত। বনগ্রাম প্রাইমারি স্কুল থেকে প্রাথমিক পাস করে সদরঘাট নাইট স্কুলে ভর্তি হওয়া। একান্নবর্তী ঘরের ক্ষুদ্র গণ্ডিতে ক্রমশ বেড়ে ওঠা নূর হোসেনের ব্যক্তিগত স্থানের ভীষণ অভাব। আলাদা একটা পড়ার কক্ষ দরকার। অভাবের চৌকাঠে একটু উন্নত পরিধান বা ভালোমন্দ খাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও উঁকি দেয় প্রায়শ। মায়ের কাছে এ নিয়ে প্রায়ই নানা অনুযোগ।
বড় কিছুর স্বপ্ন দেখেন, নতুন জীবনের জাল বোনেন নূর হোসেন। দেশের অগণিত গরিবের মতো ভাবেন, দারিদ্র্যের এই গরাদ ভেঙে বেরিয়ে পড়তে হবে একদিন। বেরিয়ে পড়েছিলেনও তিনি। কিন্তু খুব দূরে নয়, বনগ্রাম থেকে মতিঝিল। মুক্তির পথে যেন দুই কদম আগানো। কাজ, একটা কাজ ভীষণ দরকার। মুক্তির পথ গড়ার উপায়, মরা শ্রমকে উৎপাদনের হাতিয়ারে পরিণত করা। না, কারখানায় মজুরির চাকরি নেননি তিনি। বরং ড্রাইভিং লাইসেন্স নিলেন বন্ধু-বড় ভাইয়ের পরামর্শে। পরিণত হলেন পরিবহনশ্রমিকে। পণ্য পরিবহনের কাজ দিয়ে শুরু। এরপর দাপ্তরিক গাড়ির চালক। কিন্তু এর মাঝে মতিঝিল বা পল্টনের স্লোগান কানে আসে নূর হোসেনের। পিতা মজিবুর রহমানের সুবাদে পূর্বেই জেনেছেন জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের নাম। দেখতে দেখতে আন্দোলনের প্রতি তাঁর ভক্তি গেল বেড়ে। মিছিল তাঁকে টানে। স্থানীয় সভা-সমাবেশ নূর হোসেনের নাম জানে। ভোরে পত্রিকা পড়া হতো। বাংলার বাণী ছিল তাঁর প্রিয় খবরের বাহক। এখন নূর হোসেন অনেক পরিণত। তিনি জানেন, সমস্ত অবিচার আর‌ দেশব্যাপী অশান্তির মূলে স্বৈরাচার আর বুর্জোয়া শাসক এরশাদ। তাকে যেকোনো মূল্যে হঠাতে হবে। মুক্তির পথে এখন সে–ই একমাত্র বাধা।
ডেটলাইন ১০ নভেম্বর
এই দিন তৎকালীন বিরোধী তিন জোটের আহ্বানে ‘ঢাকা অবরোধ’ কর্মসূচি মোকাবিলায় ব্যাপক প্রস্তুতি নেয় স্বৈরাচারী সরকার। রাজধানীর চারদিকে বিভিন্ন ব্যারিকেড ও বাধা সৃষ্টি করে আটকে দেওয়া হয় ঢাকাভিমুখী লাখো মানুষের গতিপথ। এরপরও ঢাকার অভ্যন্তরে আট দল, সাত দল আর পাঁচদলীয় জোটের সমন্বয়ে গঠিত সম্মিলিত বিরোধী আন্দোলন ধারণ করে জঙ্গিতম রূপ। মূলত সচিবালয়কে কেন্দ্রে রেখে আন্দোলনকারীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন অব্যাহত রাখে। সরকারের সশস্ত্র পুলিশ এবং অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে দফায় দফায় সংঘর্ষের পুরোভাগে একটি রৌদ্রদীপ্ত মুখ, উদোম গায়ে অঙ্কিত একটি শাণিত স্লোগান সেদিন দৃষ্টি কাড়ে মানুষের। শোষণমুক্তির আকাঙ্ক্ষায় বুকে-পিঠে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ স্লোগান এঁকে জিরো পয়েন্টে লড়াইয়ের কেন্দ্রে দীপ্ত শপথে উজ্জীবিত বনগ্রামের নূর হোসেন। অনেকেই সেদিন তাঁকে কোমরে বাঁধা লাল শার্ট পরিধানের অনুরোধ করেন, যাতে তাঁর দেহে অঙ্কিত স্লোগান হন্তারক রাষ্ট্রীয় বাহিনীর চোখ এড়িয়ে যায়। কিন্তু কোনো কিছুর পরোয়া নূর হোসেন করেননি, স্বৈরাচার এরশাদের পতন ছাড়া বাড়ি না ফেরার দৃঢ়প্রতিজ্ঞা তাঁর। ফেরা আর কখনো হয়নি। এর কয় মুহূর্ত পর স্বৈরাচারের পেটোয়া বাহিনীর লক্ষ্যভেদী বুলেটে শহীদ হন দুপুরের খররোদে আন্দোলনরত এই সর্বহারা শ্রমিক। তাঁর মৃত্যু সেদিন দ্রোহের দাবানলের আগুনকে দ্বিগুণ করে।
গণতন্ত্রের গুহামানব
এরশাদবিরোধী আন্দোলন বা আমাদের এই জনপদের গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে অন্য অনেকের মাঝে নূর হোসেনের অবস্থান যেন কিছুটা ভিন্ন। তাঁর আত্মত্যাগের আঙ্গিকে যেন রয়েছে শৈল্পিক আবহ। আর এই আবহ বা আদলের মর্ম বুঝতে হলে আমাদের যেতে হবে আধুনিক দর্শনের গোড়ায়। ফরাসি দার্শনিক জাক রাঁচিয়ের (Jacques Ranciere) বলেছেন, রাজনীতির যেমন একটা নিজস্ব নন্দনতত্ত্ব আছে, নন্দনতত্ত্বেরও আছে অনুরূপ নিজস্ব রাজনীতি। সেদিক থেকে দেখতে গেলে নূর হোসেনের রাজনৈতিক আদর্শের প্রকাশ কিন্তু শিল্পের ভঙ্গিমায়। দেহকে বানিয়েছেন ক্যানভাস। কাঁচা রং দিয়ে মুদ্রিত করেছেন প্রাণের চিৎকার। আবার তার শৈল্পিক জীবনবোধের সন্ধান তিনি খুঁজেছেন রাজনীতির কাছে। দেশমাতৃকার মুক্তির লক্ষ্যে নূর হোসেনের অভিনব রাজনৈতিক আত্মত্যাগ তাই সমকালীন রাজনৈতিক দর্শনের একটা জ্বলজ্বলে ব্যবহারিক উদাহরণ। প্রায় দুই দশক পূর্বে রচিত তার বিয়োগান্ত জীবনগাথা বা মৃত্যুঞ্জয়ী সংগ্রাম দোল খায় আধুনিক দর্শনের শক্ত পাটাতনে।
অন্যদিকে, বরেণ্য চিত্রশিল্পী রফিকুন্নবী বলেছেন, মানুষের শরীরে যখন কিছু আঁকা হয়, সে অঙ্কন শরীরের মাংসপেশিগুলোর সঙ্গে আন্দোলিত হয়ে একটি ত্রিমাত্রিক আবহ নেয়। যদিও মানবদেহে প্রাচীনকাল থেকেই অঙ্কনের একটি সাপোর্ট হিসেবে স্বীকৃত, তথাপি দেহের জমিনে দাবি আদায়ের জন্য আঁকা স্লোগান তাকে করে তোলে অনন্য; বিশেষ করে যখন শরীরে অঙ্কিত সেই দাবি পরিণত হয় অত্যাচারী শাসকের সুনিপুণ নিশানায়। সেই অর্থে বলা যায়, শিল্পের কাজ যদি হয় প্রগতির লড়াই অথবা স্থাণু বর্তমানকে ভেঙে মুক্ত আগামীর বিনির্মাণ, তখন রাজপথের এই রাজনৈতিক শিল্পী অনেক প্রথিতযশা শিল্পীর চেয়েও ব্যবহারিক অর্থে অনেক বেশি বেগবান।
এই ব্যতিক্রমী আত্মত্যাগ আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেছে যেমন সাধারণ মানুষকে, তেমনি দেশের শ্রেষ্ঠ কবিরা তাঁকে নিয়ে রচনা করেছেন অনবদ্য সব কবিতা, শিল্পীরা গেয়েছেন গান, করেছেন নাটক। মনে পড়ে, কবি শামসুর রাহমানের সেই অনবদ্য কবিতা ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’ অথবা কবি নির্মলেন্দু গ‌ুণের ‘নূর হোসেন’ কবিতা অথবা নাট্যজন শংকর সাঁওজালের রাজপথের নির্মাণ ‘জাগে লক্ষ নূর হোসেন’ অথবা তৎকালীন সাপ্তাহিক একতার সম্পাদক (প্রথম আলোর সম্পাদক) মতিউর রহমানের সেই সময় প্রকাশিত বেশ কিছু আবেগাপ্লুত লেখা নূর হোসেন এবং তাঁর পিতা মজিবুর রহমানকে ঘিরে। অগ্রজদের এসব নির্মাণ কিছুকাল আগে এই লেখককেও উদ্বুদ্ধ করেছিল এই বীরকে ঘিরে একটি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র বিনির্মাণের। কালের পরিক্রমায় নূর হোসেন এখন আমাদের জাতীয় মুক্তি ও প্রেরণার প্রতীক।
মৃত্যুর আদর্শ বনাম আদর্শের মৃত্যু
অথচ আশ্চর্য রকম সত্য, ইতিহাসের এই অমর নায়কের স্বপ্ন এখনো অধরা। পুনরাবৃত্তির উপাখ্যান চারদিকে। ছাত্র-কৃষক-শ্রমিকসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রাণের দাবিগুলোর অপূর্ণতা, সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরাচারের পৌনঃপুনিকতা, লাগামহীন দুর্নীতি-সামাজিক অবিচার আর রাষ্ট্রীয় শোষণ প্রশ্নবিদ্ধ করে গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি। অন্যদিকে নয়া রাজনৈতিক বাস্তবতায় পতিত স্বৈরাচার বনে যান গণতন্ত্রের বিশেষ দূত। চিন্তার ধারহীন এই মেকি উন্নয়নের তথাকথিত গণতান্ত্রিক অবয়বের তলায় নীরবে সুসংগঠিত হয় অশুভ ধারালো ছায়া। সাম্যের লড়াই ব্যাহত হয় মুক্তচিন্তার অস্তিত্ব রক্ষার আতঙ্কে।
এই আপাত জটিল প্রেক্ষাপটে দূর থেকে দাঁড়িয়ে নূর হোসেন যেন আমাদের দেখছেন, দৃষ্টিতে অবিশ্বাস নিয়ে। আরও একজন অথবা বহু মহানায়কের আবির্ভাবই ঘোচাতে পারে ঘনিয়ে আসা এই অন্ধকার। আরেক ফরাসি দার্শনিক এলা বাদিউর (Alain Badiou) দ্বারস্থ হই। তিনি বলেছেন, ‘আমরা যেন বিপ্লবের খোয়াবের এতিম’। মানে রাজনীতি ও আদর্শের এই আকালে শুধু বিপ্লব সশরীরে অনুপস্থিত নয়, বিপ্লবের স্বপ্ন দেখাও ভুলে গেছে মানুষ। এই বিস্মৃতির বিপরীতে যে কজন তাঁদের কর্ম ও ত্যাগ দিয়ে আমাদের স্মৃতি আর বর্তমানকে নিয়ত উসকানি দিতে থাকেন, নূর হোসেন তাঁদের একজন। কারণ, তাঁর স্বপ্নের শোষণহীন সমাজ এখনো অধরা। যে দারিদ্র্য থেকে মুক্তির পথ নূর হোসেন খুঁজেছেন, তা নির্মাণের ব্যবস্থা নিয়ত বহাল রেখে, ব্যক্তি স্বৈরাচারের পতনে কখনো মিলবে না কাঙ্ক্ষিত প্রকৃত গণতন্ত্র। তাহলে মুক্তির পথ কী এবং কোথায়? এটুকুই শুধু বলি, ‘লড়াইয়ের মাঠ ছাড়া গরিবের আর কোনো পথ নাই, সূর্যের তীক্ষ্ণ রেখায় জ্বলে তার গাঢ় সম্ভাবনাই...’ শূন্যের মাঝে নূর হোসেন আমাদের সেই আগুন সম্ভাবনা।
সূত্র: ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’ (চলচ্চিত্র) ২০১২, পরিচালক: মঈনুল শাওন ও হাছান আবিদুর রেজা জুয়েল। ‘শহীদ নূর হোসেন’ মতিউর রহমান এবং শামসুর রাহমান, ২০১৩ (১৯৯০), প্রথমা প্রকাশন। Badiou, A. 2013. Cinema, Susan Spitzer (trans.), Cambridge, Polity। Ranciere, J. 2004 (2000). The Politics of Aesthetics, Gabriel Rockhill (trans.), New York, Continuum.
মঈনুল শাওন: চলচ্চিত্রকার ও চলচ্চিত্র গবেষক।

একনায়কতন্ত্র থেকে গণতন্ত্র by সাজেদুল হক

ঐতিহাসিক কথাটি আজকাল খুব বেশি শোনা যায়। অধিক ব্যবহার হয়তো শব্দটির গুরুত্বও খানিকটা কমিয়ে দিয়েছে। তবে এই  যুদ্ধপীড়িত ঝড়-ঝঞ্ঝার দুনিয়াতেও এমন ঘটনা ঘটে যা সত্যিকার অর্থেই ঐতিহাসিক। বাড়ির পাশের দেশ মিয়ানমারে যা ঘটে গেল তাকে একবাক্যেই ঐতিহাসিক বলা যায়। ৮ই নভেম্বর ছিল মিয়ানমারের জনগণের জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিন। ইংরেজিতে যাকে বলে ডিসিশনস ডে। না, সিদ্ধান্ত নিতে মিয়ানমারের জনগণ কোন ভুল করেননি। পৃথিবীর কোন দেশের জনগণই আসলে সুযোগ পেলে ভুল করেন না।
মিয়ানমার নামটিই অবশ্য ফৌজি শাসকদের আবিষ্কার। পূর্বে এ দেশটির নাম ছিল বর্মা বা বার্মা। ১৩ হাজার বছর পূর্বে পিউ নামের উপজাতিরা এ অঞ্চলে বসবাস শুরু করেন। ইতিহাসের পরিক্রমায় এ দেশটি এক সময় বৃটিশ সাম্রাজের অংশে পরিণত হয়। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর শুরুর দিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই জারি ছিল বার্মায়। তবে ১৯৬২ সালে নেমে আসে অন্ধকার। দেশটির সশস্ত্রবাহিনী এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। ১৯৮৯ সালে সামরিক জান্তারা দেশটির নতুন নাম দেয় মিয়ানমার। মিয়ানমারে ফৌজি শাসন দীর্ঘায়িত হওয়ার পেছনে প্রধানতম ভূমিকা পালন করে চীন। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে দেশটি সব সময়ই মিয়ানমারের সামরিক শাসকদের সমর্থন দিয়ে গেছে। তবে বিপরীত দিক থেকে গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘ লড়াই করে গেছেন অং সান সু চি। দীর্ঘ ১৫ বছর গৃহবন্দিতে কাটাতে হয়েছে তাকে। ১৯৯০ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়েও ক্ষমতায় বসতে পারেননি তিনি। তবে নোবেল শান্তি পুরস্কার হয়তো তার সংগ্রামে সান্ত্বনা জুগিয়েছে।
প্রাচীন গ্রিসে জন্ম নেয়া গণতন্ত্রকে নানা সময়ে নানা দেশে নানা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। গণতন্ত্র একটি জীবন দর্শন। এ জীবন দর্শনের নানা সমালোচনাও রয়েছে। বিশেষ করে যেখানে শিক্ষার খুব বেশি অগ্রগতি হয়নি সেখানে গণতন্ত্রকে বারবারই মুখ থুবড়ে পড়তে দেখা গেছে। তবে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা সব সময়ই একমত পোষণ করেছেন, গণতন্ত্রের বহু সমালোচনা সত্ত্বেও এর থেকে ভালো কোন শাসন ব্যবস্থা এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি। গণতন্ত্র অন্তত একদিনের জন্য হলেও দেশের প্রেসিডেন্ট এবং একজন সাধারণ নাগরিককে একই কাতারে নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। ভোটের দিন প্রেসিডেন্ট যেমন একটি ভোট দেয়ার সুযোগ পান, তেমনি সাধারণ একজন নাগরিকও একটি ভোট দেয়ার সুযোগ পান। গণতন্ত্র হয়তো চূড়ান্ত অর্থে মানুষে মানুষে সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। তবে মানুষকে সমতার কাছাকাছি নিয়ে আসতে গণতন্ত্র প্রধান ভূমিকা রেখে থাকে। আইনের শাসন ও মুক্ত গণমাধ্যম জনসাধারণকে অনেক বিপদ থেকেই রক্ষা করে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ প্রফেসর অমর্ত্য সেন দেখিয়েছেন, মুক্ত গণমাধ্যম কিভাবে মানুষকে দুর্ভিক্ষসহ নানা বিপদ থেকে রক্ষা করে। আমাদের মহান মুক্তিসংগ্রামের প্রধান আকাঙ্ক্ষাও ছিল গণতন্ত্র।
বছরের পর বছর মিয়ানমারের জনগণ বঞ্চিত হয়েছে সামাজিক আর আইনি অধিকার থেকে। ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর দীক্ষাই পায়নি প্রজন্মের পর প্রজন্ম। রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠী নির্যাতনের শিকার হয়েছে সবচেয়ে বেশি। মিয়ানমারের কোন দলই তাদের পক্ষে শক্ত ভূমিকা রাখেনি। তারপরও অবশ্য রোহিঙ্গা মুসলিমরা নির্বাচনে অং সান সু চিকেই সমর্থন দিয়েছেন।
পাঁচ দশক খাঁচায় বন্দি থাকার পর গণতন্ত্র ফিরে এসেছে মিয়ানমারে। একদিনের বাদশারা তাদের ভোটাধিকার ফিরে পেয়েছেন। গণতন্ত্র এখন তাদের জীবনে কোন ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসে কিনা, তা-ই দেখার বিষয়।

পুষ্টি পরিস্থিতি খারাপ ‘বাংলাদেশ ধাঁধা’ by শিশির মোড়ল

স্বাস্থ্যের কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এই সাফল্যের তথ্য জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রকাশনায় উদ্ধৃত হচ্ছে। একই সঙ্গে এটাও বলা হচ্ছে যে স্বাস্থ্যে সাফল্য অর্জন করলেও পুষ্টিতে বাংলাদেশ বেশ পিছিয়ে আছে। এই পিছিয়ে থাকাটাও বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো। কারণ, আফ্রিকার ক্ষুধাপীড়িত কয়েকটি দেশের চেয়েও বাংলাদেশের পুষ্টি পরিস্থিতি খারাপ। উদাহরণ দিয়ে বলা হচ্ছে, খর্বকায় শিশুর হার আফ্রিকার সাব সাহারা এলাকার চেয়ে বাংলাদেশে বেশি। আবার গর্ভবতী নারীর ওজন আফ্রিকায় গড়ে ১০ কেজি বৃদ্ধি পায়, বাংলাদেশে পাঁচ কেজি। খর্বাকৃতি ও গর্ভবতী নারীর ওজন বৃদ্ধি পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
স্বাস্থ্যের উন্নতি হচ্ছে অথচ পুষ্টিতে পিছিয়ে থাকার এই পরিস্থিতিকে পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘বাংলাদেশ এনিগমা’ বা ‘বাংলাদেশ ধাঁধা’। পুষ্টিবিজ্ঞানীরা এই পরিস্থিতির কারণ বিশ্লেষণ ও এখান থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছেন এক দশকের বেশি সময় ধরে। পৃথিবীর অন্য অঞ্চলের আরও কিছু দেশে এই ‘ধাঁধা’ আছে। এটা প্রথম ধরা পড়ে ভারতের অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সের তৎকালীন পরিচালক ভুলিমিরি রামলিঙ্গস্বামীর গবেষণায় ১৯৯৬ সালে। এরপর থেকে জনস্বাস্থ্যবিজ্ঞানী ও পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছেন অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটলেও কেন সমানতালে স্বাস্থ্যের উন্নতি হয় না। কেন পুষ্টির উন্নতি স্বাস্থ্যের উন্নতির সমান্তরাল হয় না।
পুষ্টিতে পিছিয়ে আছে—এ রকম ৫৭টি দেশ চিহ্নিত করেছে জাতিসংঘ। দেশগুলোর পুষ্টি পরিস্থিতির উন্নতি করতে জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে একটি আন্দোলন শুরু হয়েছে ২০১০ সালে, নাম ‘সান মুভমেন্ট’ বা ‘স্কেলিং আপ নিউট্রিশন’। বিশ্বের ২৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তি এই আন্দোলনের নেতৃত্বে আছেন। তালিকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদের নাম আছে।
২০ থেকে ২২ অক্টোবর ইতালির মিলান শহরে সানের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ৫৭টি দেশের সাংসদ, সরকারি, বেসরকারি, একাডেমিক, সাংবাদিক প্রতিনিধি এতে অংশ নেন। এর বাইরে জাতিসংঘের বিভিন্ন অঙ্গ সংস্থা ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা এতে উপস্থিত ছিলেন। নিজ নিজ দেশের এবং বিশ্বের পুষ্টি পরিস্থিতিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন দেশের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় করা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তৈরির উদ্দেশ্যে প্রতিনিধিরা মিলানে জড়ো হয়েছিলেন। মূল সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যে ছিল পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর সরকারগুলোকে পুষ্টি কর্মসূচিতে নেতৃত্ব জোরদার করার পাশাপাশি জবাবদিহি বাড়াতে হবে, পুষ্টি কর্মকাণ্ডে দাতানির্ভরতা কমাতে হবে এবং পুষ্টির যাবতীয় কর্মকাণ্ডে রাজনীতিক, গণমাধ্যমসহ নাগরিক সমাজের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পুষ্টিকে প্রকল্পের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না, দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মকাণ্ডে পরিণত করতে হবে।
স্বাস্থ্যের উন্নতি হচ্ছে অথচ পুষ্টিতে পিছিয়ে থাকার এই পরিস্থিতিকে পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘বাংলাদেশ এনিগমা’ বা ‘বাংলাদেশ ধাঁধা’। পুষ্টিবিজ্ঞানীরা এই পরিস্থিতির কারণ বিশ্লেষণ ও এখান থেকে উত্তরণের পথ খুঁজছেন এক দশকের বেশি সময় ধরে তিন দিনের সম্মেলনে একটি অধিবেশন ছিল পুষ্টি ইস্যুতে গণমাধ্যমের সম্পৃক্ততা নিয়ে। এই অধিবেশনে সাংবাদিকেরা বলেন, পাঠকের আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কম বলে সংবাদপত্রের মালিক ও ব্যবস্থাপকদের কাছে পুষ্টি তেমন গুরুত্ব পায় না। তা ছাড়া, পুষ্টি নিয়ে নাগরিক সমাজে ও রাজনীতিবিদদের মধ্যে আলোচনা বিতর্ক কম হয়। রাজনীতি, অর্থনীতি, অপরাধ, দুর্নীতি, কূটনীতি, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, পরিবেশ নিয়ে নির্দিষ্টভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত রিপোর্টার থাকলেও পুষ্টির ক্ষেত্রে থাকে না।
২০১০ সালে শুরু হলেও বাংলাদেশে ‘সান’ আন্দোলন সাড়া ফেলতে পারেনি। এই আন্দোলন এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল মূলত এনজিওগুলো। কিন্তু এনজিওগুলো বিভক্ত হয়ে পড়ে নেতৃত্ব নিয়ে। কেউ কেউ আদর্শিক কারণে এই আন্দোলনে যুক্ত হয়নি। সম্মেলনে যোগ দেওয়া একাধিক বিদেশি প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপের সময় জানা গেল, বাংলাদেশের এই দ্বন্দ্বের খবরটি তাঁরাও জানেন। সরকারের জাতীয় পুষ্টি প্রতিষ্ঠানে যোগ্য লোক না থাকার কারণে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনাগ্রহের কারণে সরকারও এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হয়নি বা হতে পারেনি।
সম্মেলনের মূল সুর ছিল, বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে একক কোনো প্রকল্প (প্রজেক্ট), কর্মকাণ্ড (অ্যাকটিভিটি) বা কর্মসূচি (প্রোগ্রাম) পুষ্টির উন্নতি করতে পারে না, কোথাও পারেনি। পুষ্টিকে এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ওপর ছেড়ে দিলে ভুল হবে। দায়িত্ব যদি শুধু খাদ্য মন্ত্রণালয় নেয় তাহলেও পুষ্টির উন্নতি হবে না। এ কাজ কৃষি মন্ত্রণালয়ের না হলেও তারও দায়িত্ব আছে। পুষ্টিকে এগিয়ে নিতে বহু খাতভিত্তিক উদ্যোগ (মাল্টি স্টেকহোল্ডার অ্যাপ্রোচ) প্রয়োজন। এর অর্থ এই উদ্যোগের সঙ্গে স্বাস্থ্য, খাদ্য, কৃষি, পানি, শিক্ষা, তথ্য, অর্থ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে যুক্ত করতে হবে। পাশাপাশি নাগরিক সমাজকে সচেতন ও পুষ্টির পক্ষে সক্রিয় করতে হবে। ধারণা, তাহলেই ধাঁধা দূর হবে।
শিশির মোড়ল: সাংবাদিক।

বাংলাদেশ সম্পূর্ণ পালটে গেছে by জ্যাশন বার্ক

বিশৃঙ্খল রাজধানী ঢাকার কেন্দ্র থেকে মাত্র ৩০ মাইল দূরে জীবনের গতি কিছুটা শান্ত। আশুলিয়া শিল্প এলাকার কাছে বরইপাড়া চেক পয়েন্টে কিছু দোকানে চা ও স্ন্যাক্স খেতে পারে স্থানীয় শ্রমিক ও পাসের সরকারি পার্কটির দর্শনার্থীরা। ৪ঠা নভেম্বর সকাল সাড়ে সাতটায় চেক পয়েন্টে ৫ পুলিশ সদস্যকে নামিয়ে দেয়া হয় সারা দিনের জন্য। তারা চা পান করতে বসে গেলেন বিশাল লম্বা শাল গাছের নিচের কয়েকটি বেঞ্চে। হামলাটি এত অকস্মাৎ ছিল, তারা তেমন প্রতিরোধই দেখাতে পারলেন না। তাদের হামলাকারীরা মোটরবাইকে চড়ে আবির্ভূত হয়, এরপর চাপাতি দিয়ে কোপাতে থাকে। তৎক্ষণাৎ দুই পুলিশ সদস্য গুরুতরভাবে আহত হন। ধূলোমাখা রাস্তার পাশে কাতরাতে কাতরাতে মৃত্যু হয় একজনের।
বরইপাড়ায় আর চা বিক্রি হয় না এখন। একটি চা দোকানের মালিক শামসুল আলম বলেন, আমরা ভয়ে দোকান বন্ধ করে দিয়েছি। আমি এখনও শঙ্কিত। যদি পুলিশকেই খুন করা যায়, তাহলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কি হবে, কে জানে? আলম একা নন। বরইপাড়া হত্যাকাণ্ড ঘটেছে দুই বিদেশীকে হত্যার পর। এদের একজন ইতালির, অপরজন জাপানের নাগরিক। উভয় হত্যার দায় নিয়েছে ইসলামিক স্টেট (আইএস), যে সংগঠনটি গত সপ্তাহান্তেই মিশরে রাশিয়ার যাত্রীবাহী বিমানে বোমা হামলার দায়ে সন্দেহভাজন। এছাড়াও ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী, ব্লগার ও প্রকাশকরাও খুন হয়েছে বাংলাদেশে। গত বছর থেকে এখন পর্যন্ত ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আল কায়দা ইন দ্য ইন্ডিয়ান সাব-কন্টিনেন্টের (একিউআইএস) স্থানীয় শাখা এসব হত্যার দায় স্বীকার করেছে।
১৬ কোটি মানুষেরও বেশি জনসংখ্যা-বিশিষ্ট মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশের অনেকেই এখন শঙ্কিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও এক্টিভিস্ট শান্তনু মজুমদার বলেন, আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করি। আমার সব বন্ধুই রীতিমতো আতঙ্কিত। কেউই জানে না কি ঘটবে, কখন ঘটবে। বাংলাদেশ সমপূর্ণ পাল্টে গেছে। এটা আমাদের সাধারণ, গতানুগতিক জীবন নয়। গৃহযুদ্ধ বাঁধানোর মতো যথেষ্ট শক্তিশালী হয়তো নয় চরমপন্থিরা, কিন্তু হত্যাযজ্ঞ অব্যাহত রাখার মতো যথেষ্ট সামর্থ্য তাদের আছে।
এ নিয়ে কোন সন্দেহই নেই, এ ধরনের উদ্বেগ বাস্তব ও যৌক্তিক। আল কায়দা ও আইএস এভাবেই সব জঙ্গি সংগঠনের যে সাধারণ লক্ষ্য থাকে, তা অর্জনে সফল হয়েছে। সেটি হলো, শত্রুকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে দেয়া, সমর্থকদের কাজে লাগানো এবং সমাজের বিভিন্ন সমপ্রদায়ের মধ্যে মেরুকরণ সৃষ্টি করা যাতে চরমপন্থার অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশে এ দুই জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রবেশ তুলনামূলকভাবে সামপ্রতিক। কিন্তু তাদের ভয়ানক সহিংস ত্রাসের ভিত্তি প্রস্তুত হয়ে আসছে ঐতিহাসিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনেক প্রভাবকের দ্বারা, কম করে হলেও ৫০ বছর আগ থেকে।
বর্তমান বাংলাদেশের সীমান্ত নির্ধারিত হয় ১৯৪৭ সালে, যখন বৃটিশরা তাদের দক্ষিণ এশিয়ান সাম্রাজ্য বিভাজিত করে দেয়। বেশিরভাগ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল পাকিস্তানের অংশে পরিণত হয়। ওই পাকিস্তান নিজেই বিভাজিত ছিল পূর্ব ও পশ্চিমে। ১৯৭১ সালে যারা স্বাধীনতা চেয়েছিলেন, তারা স্থানীয় বাংলা ভাষায় কথা বলতেন। তারা চেয়েছিলেন সমাজতান্ত্রিক ঘরানায় অর্থনৈতিক নীতি কায়েম করতে। তারা নিজেদের নতুন দেশের জন্য চেয়েছিলেন উদারপন্থি ও ধর্মনিরপেক্ষ পরিকাঠামো। কিন্তু যারা স্বাধীনতা চায়নি, বরং পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত থাকতে চেয়েছিল, তাদের বেশিরভাগই ছিল ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে রক্ষণশীল।
এ দুপক্ষের মধ্যে সংঘটিত সংঘাত ছিল নির্মম। যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত হন। সবচেয়ে নৃশংস কিছু ঘটনা ঘটায় পাকিস্তানি বাহিনীর নিয়োগ দেয়া মিলিশিয়ারা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেশটি স্বাধীন হয়। প্রতিষ্ঠিত হয় ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধান। তবুও ক্ষত কখনই পুরোপুরি উপশম হয়নি। বরং, স্থায়ী রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভাজনে রূপ নেয়। এ বিভাজনই বাংলাদেশের সামপ্রতিক ইতিহাসের প্রতিটি দিককে প্রভাবিত করেছে।
বর্তমান সরকার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত। তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। শেখ মুজিব সবচেয়ে প্রখ্যাত স্বাধীনতাপন্থি নেতা। তাকে ১৯৭৫ সালে হত্যা করা হয়। বর্তমানে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। দলটির প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এ দলটি কিছুটা রক্ষণশীল শক্তির প্রতিনিধিত্ব করে। এর নেতৃত্বে রয়েছেন খালেদা জিয়া। খালেদা জিয়া এক সামরিক শাসকের স্ত্রী। ওই সামরিক শাসক শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুর কিছুকাল পরে ক্ষমতায় আসেন। তাকেও ১৯৮১ সালে হত্যা করা হয়। এ দুই নারী (শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া) নিজেদের মধ্যকার ঘৃণা লুকানোর তেমন একটা চেষ্টা করেননি। এরপর আছে জামায়াতে ইসলামী। ইসলামী এ রাজনৈতিক দলটি স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপক্ষে লড়াই করেছিল। এমনকি সে সময়কার সবচেয়ে নৃশংস কিছু ঘটনায় দলটি জড়িত। সবগুলো দল গত কয়েক বছরে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়েছে ব্যালট বাক্সে, রাজনৈতিক মহড়ায়, রাস্তায় কিংবা স্বল্প মেয়াদে জোট গঠনের মাধ্যমে। কিন্তু ইতিহাস যদি একটি ঝঞ্ঝাটময় উত্তরাধিকার ফেলে যায়, অর্থনৈতিক পরিবর্তনও একই কাজ করে।
প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি সেতু থেকে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর দিকে তাকালে যেন অনেক কিছু বোঝা যায়। নদীর পানি ভীষণ কালো। মারাত্মকভাবে দূষিত। এরও দূরে অবস্থিত কামরাঙ্গীর চর। বিশাল এ বস্তির জ্বলন্ত আবর্জনার ঝাঁঝালো ধোঁয়ার মেঘ সেখানকার ক্ষীণকায় পুরুষ, উদ্বিগ্ন নারী ও অনবরত কাশতে থাকা শিশুদের বসতিগুলোকে আড়াল করে রেখেছে। কিন্তু কামরাঙ্গীর চর একটি উঠতি সমপ্রদায়, অনানুষ্ঠানিকভাবে একটি অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র। ঢাকা ও আশেপাশের এ ধরনের বস্তিগুলোতে প্রতি বছর লাখো মানুষ আশ্রয় নেয়। এদের বেশিরভাগই জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বন্যা, অতি-আবাদ ও বেকারত্বে জর্জরিত গ্রাম্য এলাকা থেকে বস্তিতে পাড়ি জমিয়েছেন। এ বস্তিগুলো অথবা সাধারণ অর্থে বাংলাদেশের কোলাহলপূর্ণ ও ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলো ওই মানুষদের জন্য অধিকতর ভালো জীবনের একটি প্লাটফরম। এ জীবন হয়তো প্রত্যন্ত গ্রামে তারা কখনই যাপন করতে পারতেন না।
সামপ্রতিক বছরে বাংলাদেশ অব্যাহত অর্থনৈতিক অগ্রগতি প্রত্যক্ষ করেছে। আয় ও স্বাক্ষরতার হার বেড়েছে। শিশু অপুষ্টি ও মাতৃমৃত্যু কমেছে। বড় নিয়ামক হলো, ২৫০০ কোটি ডলারের গার্মেন্ট শিল্প। এ শিল্পেই পশ্চিমা দেশগুলোর জন্য সস্তা দামে পোশাক উৎপাদিত হয়। এ খাতে জড়িত প্রায় ৪০ লাখ মানুষ। ২০১৩ সালে একটি গার্মেন্ট কারখানা ধসে পড়ায় ১ হাজার মানুষের মৃত্যুর ঘটনা এ খাতের দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও কর্মপরিবেশের বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছিল। কিন্তু বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলার দিন অনেক আগেই শেষ। কিন্তু অন্য ইসলামিক দেশের মতো, বাংলাদেশেও উন্নয়ন উগ্রপন্থার হুমকি ঠেকাতে পারেনি। বরং, অনেকের ধারণা, উন্নয়নের ফলে উগ্রপন্থার বিস্তার আরও বৃদ্ধি পেয়েছে!
এ অঞ্চলে কাজ করেন, এমন একজন পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তার মতে, বাংলাদেশের অপেক্ষাকৃত অগ্রগতিতে যারা তেমন তাল মেলাতে পারছেন না, এদের অনেকেই তরুণ। যাদের জন্ম প্রত্যন্ত অঞ্চলে হলেও, বেড়ে ওঠা বড় শহরে। দুর্বল শিক্ষা এবং দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের অভাব চাকরি, অর্থ, মর্যাদা ও বিয়ের সঙ্গিনী পাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতায় তাদের বড় সীমাবদ্ধতা। ওই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশে প্রচুর লোককে সংগ্রহ করছে জঙ্গিরা। আরও বড় পরিসরে কাজটি হচ্ছে ইসলামী বিশ্বে। এটি কিন্তু কাকতালীয় বিষয় নয়।
অবশ্য অনেকে এ সংযোগ অস্বীকার করেন। ঢাকাভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর বলেন, সামগ্রিকভাবে অগ্রগতি থেকে সবাই উপকৃত হন। এটা বিস্তৃত একটি বিষয়। সামপ্রতিক বছরগুলোতে কোন ইসলামী দেশই উগ্রপন্থার হাত থেকে রেহাই পায়নি।
অন্য দেশগুলোর মতো, বাংলাদেশের নব্য বৈশ্বিক বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সংযোগও এখন একটি নিয়ামক। কাতার, সৌদি আরবের মতো অনেক দেশে লাখো বাংলাদেশী অভিবাসী কর্মী কাজ করেন। সেখানে ইসলামের যে অবস্থান, তা বাংলাদেশের ঐতিহ্যগত মাতৃভূমি-প্রেমের সংস্কৃতির চেয়ে পৃথক। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে ধর্মীয় বিভিন্ন সেমিনার আয়োজনে ও স্থাপনা নির্মাণে উপসাগরীয় দেশ থেকে নগদ অর্থ প্রবাহিত হয়েছে। কামরাঙ্গীর চরের এমন একটি মাদরাসার শিক্ষক ২ বছর আগে দ্য গার্ডিয়ানকে বলেছিলেন যে, তাদের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে বাংলাদেশে ভিনদেশী (পশ্চিমা) সংস্কৃতির প্রবেশ বন্ধ করা। সামপ্রতিক জঙ্গি হামলার দায়ে যাদের আটক করা হয়েছে, তাদের অনেকেই এ ধরনের ছাত্র। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দ্বারা ইসলামী বিশ্বে প্রায় ১৫ বছর ধরে চলা সংঘর্ষ, দখলদারিত্বেরও একটা প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। কলামনিস্ট শুপ্রভা তাসনিমের মতে, এ বিষয়টি বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতার পশ্চিমা মতবাদের প্রতি ক্রমবর্ধমান অবিশ্বাস জন্ম নেয়ার জন্য দায়ী। এখানে ধারণা করা হয়, ধর্মনিরপেক্ষতা এমন এক আদর্শ, যা শুধু রাষ্ট্রীয় বিষয়-আশয়ের সঙ্গে ধর্মের সংযোগই বিচ্ছিন্ন করে না, একই সঙ্গে এটি ব্যক্তিগত জীবনেও ধর্মের প্রভাব বিনষ্টের একটি প্রচেষ্টা।
উদীয়মান উগ্রপন্থার লক্ষণ অনেক আগ থেকেই দেখা যাচ্ছিল। খ্রিষ্টান ও হিন্দুদের ওপর হামলা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত মাসে, বাংলাদেশের সংখ্যায় অল্প শিয়া সমপ্রদায়, যাদের উপসাগরীয় দেশে ধর্মদ্রোহী ভাবা হয়, তাদের ওপর ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বোমা হামলা হয়েছে। এর দায় স্বীকার করে নিয়েছে আইএস। যারা সহিংসতা বন্ধ করতে চান বলে দাবি করেন, নতুন করে এ সহিংসতার মূলে তারাই থাকতে পারেন।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় আরোহণের কিছুকাল পরই নতুন আওয়ামী লীগ সরকার ১৯৭১ সালে নৃশংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের লক্ষ্যে একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। দলটি বলে আসছে, বিচারের মাধ্যমে সব গুছিয়ে আনছে তারা। সবাই না হলেও এ ট্রাইব্যুনালে যাদের বিচার হচ্ছে, তাদের বেশিরভাগই জ্যেষ্ঠ ইসলামিক রাজনীতিক। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এ বিচারের তীব্র সমালোচক। এ আদালতের দেয়া অনেকগুলো রায়ের কারণে পক্ষের ও বিপক্ষের লোকদের ব্যাপক বিক্ষোভ, প্রতি-বিক্ষোভের জন্ম নেয়। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী শান্তনু মজুমদার বলেন, যুদ্ধাপরাধের বিচারই এর মূল কারণ। এর পর থেকেই যত সমস্যার সৃষ্টি।
২০১৪ সালের জানুয়ারিতে, বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত নির্বাচন, যেটি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছিল, তা বর্জন করে  বিএনপি ও বিরোধী দলগুলো। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতেছে। কিন্তু ওই নির্বাচনের ফলে মারাত্মক সহিংসতার জন্ম নেয়। বিরোধী দল সরকার উৎখাতের চেষ্টা চালায়, শত শত মানুষ পেট্রলবোমা ও দাঙ্গায় নিহত বা আহত হয়। বিরোধী দলের বহু নেতা আটক হয় কিংবা লোকচক্ষুর আড়ালে চলে যান। রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিএনপিকে প্রায় ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে। একই হাল ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীরও। ফলাফল দাঁড়াল, কোন বিশ্বাসযোগ্য বিরোধী দল নেই, নেই বিরোধিতা প্রকাশের কোন গণতান্ত্রিক পন্থা। ওয়াশিংটন ডিসির উইড্রো উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, ওই ধরপাকড় এতটা কঠিন ছিল, এটি চরমপন্থার ভবিষ্যদ্বাণীকে বাস্তবে পরিণত করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আইএসের উপস্থিতি অস্বীকার করেছেন। চরমপন্থার বিস্তৃত সমস্যা ও সামপ্রতিক হত্যাযজ্ঞ- উভয়ের জন্যই তিনি বিরোধী দলকে দায়ী করেছেন। কুগেলম্যান বলেন, এ বক্তব্য এক ধরনের আত্মপ্রসাদের ইঙ্গিত দেয়, যা ছিল হিতে-বিপরীত।
কেউ কেউ বিশ্বাস করেন বাংলাদেশে আইএস বা আল কায়দার বলিষ্ঠ উপস্থিতি রয়েছে। বাংলাদেশের খুব ক্ষুদ্র অংশকে আকর্ষণ করার পরিবর্তে এদের উভয়েরই দৃশ্যত বহু অনুসারী আছে। এর ফলে এরা উভয়েই চলমান সহিংস কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে কিংবা বৃদ্ধি করবে।
বুধবার হামলায় নিহত পুলিশ সদস্যের নাম মুকুল হোসেন। বগুড়ায় নিজ গ্রামের বাড়িতে তাকে সমাহিত করা হয়েছে। তার একজন সহকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে কিছু কথা বলেন। তার কথাগুলোতে বর্তমান পরিস্থিতির তীব্রতা কিছুটা খর্ব করা হয়েছে বটে, কিন্তু দেশের বেশিরভাগ মানুষের মনের কথা এটিই। তিনি বলেন, আমাদের দেশ সব সময় শান্তিপূর্ণই ছিল। কিন্তু সমপ্রতি এ দেশটি কিছুটা সংকটাপন্ন হয়ে উঠছে।
(দ্যা গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রতিবেদনের অনুবাদ। অনুবাদ করেছেন নাজমুল আহসান)

লড়াইয়ের তিন দশক

প্রায় তিন দশক গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করেছেন অং সান সু চি। সেই ১৯৮৮ সালের এপ্রিলে শুরু তারপর কেটে গেছে প্রায় ২৮টি বছর। এ সময়ে দেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য তিনি বছরের পর বছর জেল খেটেছেন। উর্দিধারীদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে তিনি গণতন্ত্রের জন্য লড়াই করে গেছেন। নানা মাত্রায় তার ওপর চাপ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু কিছুতেই পিছপা হন নি সু চি। তার হাত ধরে মিয়ানমারের মানুষ ফিরে পেলো ভোটের অধিকার। সে জন্যই রোববার ভোররাতে ভোটাররা ভিড় করেছিলেন ভোটকেন্দ্রে। বিদেশী মিডিয়ার খবর এসবের সাক্ষী। জীবনে প্রথমবার ভোট দিতে পেরে আনন্দে কেঁদেছেন অনেকে। তাদের কাছে অং সান সু চি গণতন্ত্রের প্রতীক। আজকের এই সু চি হয়ে ওঠা খুব সহজ ছিল না। ১৯৮৮ সালের এপ্রিলে তিনি স্বামী-সন্তানদের বৃটেনে রেখে অসুস্থ মাকে দেখার জন্য দেশে ফিরেছিলেন। এ সময়েই দেশে সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে গণতন্ত্রপন্থি আন্দোলন দানা বেঁধে ওঠে। এ বছরের শেষের দিকে মারা যান তার মা। ৮ই আগস্ট থেকে ১১ই আগস্ট পর্যন্ত মিয়ানমারজুড়ে ব্যাপক গণআন্দোলন শুরু হয়। নিরাপত্তারক্ষীরা প্রকাশ্যে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালায়। এতে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী মারা যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়ে। এ সময়েই মিয়ানমারের স্বাধীনতার নায়ক অং সানের কন্যা সু চির আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে অভিষেক ঘটে। তিনি রেঙ্গুনের শোয়েডাগন প্যাগোডার সামনে প্রথম রাজনৈতিক বক্তব্য রাখেন। এতে যোগ দেন প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ। এ বছরের সেপ্টেম্বরে সেনাবাহিনী স্টেট ল’ অ্যান্ড অর্ডার রিস্টোরেশন কাউন্সিল সৃষ্টি করে তার দায়িত্ব গ্রহণ করে। সু চি গঠন করেন বিরোধী দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি। ১৯৮৯ সালের জুনে সরকার দেশের নাম দেয় মিয়ানমার। ইয়াঙ্গুনকে ঘোষণা করে রাজধানী। সামরিক জান্তার তীব্র সমালোচনা করার কারণে অং সান সু চি ও তার উপ- প্রধান টিন ও’কে গৃহবন্দি করা হয়। এরপর ১১৯০ সালে সাধারণ নির্বাচন ঘোষণা করে সামরিক সরকার। নির্বাচনে অংশ নিয়ে সু চির এনএলডি ভূমিধস বিজয় অর্জন করে। কিন্তু ক্ষমতা হাতবদলে অস্বীকৃতি জানায় সামরিক জান্তা। ১৯৯১ সালের অক্টোবরে সু চিকে  সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ লড়াই করার কারণে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। ১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে তিনি গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি পান। কিন্তু তাকে থাকতে হয় মিয়ানমারেই। সামরিক জান্তাদের ভয় ছিল, তাকে একবার দেশের বাইরে যেতে দিলে তিনি আর না-ও ফিরতে পারেন। ১৯৯৯ সালের মার্চে সু চির জীবনে বড় এক আঘাত আসে। এ বছরই ক্যান্সারে আক্রান্ত তার স্বামী অরিস ইংল্যান্ডে মারা যান। ১৯৯৫ সালের পর সু চির সঙ্গে তার আর দেখা হয় নি। কারণ, মিয়ানমারের সামরিক জান্তা তাকে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে একটি রাজনৈতিক সভায় যোগ দেয়ার কথা ছিল সু চির। ওই সভায় বের হওয়ার পরই তাকে আবার গৃহবন্দি করা হয়। ২০০২ সালের মে মাসে তিনি আবার গৃহবন্দি অবস্থা থেকে মুক্তি পান। ২০০৩ সালের মে মাসে আবার তাকে গৃহবন্দি করা হয়। তাকে এবার নিয়ে যাওয়া হয় ‘প্রতিরোধযোগ্য হেফাজতে’। সরকার সমর্থিত একদল দাঙ্গাবাজের কবলে সু চির গাড়িবহর পড়ার পর এ ব্যবস্থা নেয়া হয়। ২০০৭ সালের আগস্টে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদ শুরু হয়। তা ক্রমশ ব্যাপক আকার ধারণ করে। ১৯৮৮ সালের পর এবারই প্রথম তা গণতন্ত্রের দাবিতে রূপ নেয়। দিনের পর দিন তার বিস্তৃতি ঘটতে থাকে। বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। এ জন্য এ আন্দোলন ‘স্যাফ্রোন রেভ্যুলুশন’ নামে পরিচিত। ২০০৯ সালের ১১ই আগস্ট সু চির আটকাদেশ বাড়ানো হয় ১৮ মাস। এ সময় আমেরিকার এক আগন্তুককে তিনি আশ্রয় দেয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত হন। ২০১০ সালের ৭ই নভেম্বর ২০ বছর পরে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় মিয়ানমারে। এতে ভূমিধস বিজয় অর্জন করে সামরিক জান্তাপন্থি দল। ২০১০ সালের ১৩ই নভেম্বর সু চির আটকাদেশের মেয়াদ শেষ হয়। তিনি মুক্ত হন। ২০১২ সালের ১৮ই জানুয়ারি তিনি নিবন্ধিত হন। এরপর ১লা এপ্রিল উপ- নির্বাচনে বিজয়ী হন। এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৬৬৪ আসনের পার্লামেন্টের ৪৫ আসনে। এর মাধ্যমে দীর্ঘ সময় লড়াই করে প্রথমবার তিনি পার্লামেন্টে নির্বাচিত প্রতিনিধি হন। তারপর এবারের নির্বাচন।

বরের গাড়ি থেকে ছিনিয়ে নেয়া নববধূ যেভাবে উদ্ধার by বিল্লাল হোসেন রবিন

আড়াইহাজারে বরের গাড়ি থেকে ছিনিয়ে নেয়া নববধূ সুবর্ণা আক্তারকে ৫২ ঘণ্টা পর উদ্ধার করেছে র‌্যাব। এ সময় মূলহোতা আওয়ামী লীগ নেতার ছেলে মোফাজ্জল হোসেন ও তার ২ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। রোববার রাত পৌনে ১০টার দিকে গাজীপুরের কালীগঞ্জের জামালপুর মীরপাড়া এলাকা থেকে নববধূকে উদ্ধার ও তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গতকাল দুপুরে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজীতে অবস্থিত র‌্যাব-১১ এর সদর দপ্তরে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে র‌্যাব-১১ এর অধিনায়ক (সিও) লে. কর্নেল আনোয়ার লতিফ খান সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
র‌্যাব জানায়, আড়াইহাজার উপজেলার সাতগ্রাম ইউনিয়নের রসুলপুর গ্রাম থেকে শুক্রবার রাতে বরের গাড়ি গতিরোধ করে সন্ত্রাসীরা বরের কাছ থেকে নববধূ সুবর্ণা আক্তারকে ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এরপর র‌্যাব-১১ বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নববধূকে উদ্ধার ও সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তারের গোয়েন্দা নজরদারি শুরু করে। র‌্যাব-১১ এর সিপিএসসির সহকারী পুলিশ সুপার মো. আলমগীর হোসেনের নেতৃত্বে একটি দল নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার, রূপগঞ্জ, নরসিংদীর পলাশ, গাজীপুরের কালিগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালায়।
র‌্যাব আরও জানায়, নববধূ সুবর্ণার বড় ভাই নাদিম মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঘটনার মূল নায়ক মোফাজ্জল হোসেনের মোবাইল ফোনে কৌশলে যোগাযোগ রক্ষা করে তার বোনকে এক নজর দেখার জন্য অনুরোধ জানায়। তখন  মোফাজ্জল হোসেন সুবর্ণার বড় ভাই নাদিমকে নরসিংদী জেলার পলাশ থানাধীন বাসস্ট্যান্ডে যেতে বলেন। সেখানে নাদিমকে নিয়ে র‌্যাব ওত পেতে থাকে। কিন্তু আসামিরা বার বার তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে থাকে।  একপর্যায়ে আসামিরা নাদিমকে নরসিংদীর পলাশ থানাধীন জামালপুর গুদারাঘাটে যাওয়ার জন্য বলে। সেখানে আগে থেকে অবস্থান নেয়া র‌্যাব সদস্যরা মোফাজ্জলের সহযোগী সুজনকে প্রথমে গ্রেপ্তার করে। সুজন র‌্যাবকে জানায়, তার এক ধর্ম নানীর বাড়িতে রয়েছে মোফাজ্জল ও নববধূ। কিন্তু গুদারাঘাট পার হয়ে ওই এলাকায় যাওয়া সম্ভব না হওয়ায় এবং এলাকাটি র‌্যাব-১ এর এরিয়া। তাই র‌্যাব-১১এর টিম ঘোড়াশাল ঘুরে ওই এলাকায় যায় এবং র‌্যাব-১ এর অনুমতি নিয়ে রোববার রাতে গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ থানাধীন জামালপুর মীরপাড়ার জনৈক সামছুল হকের বাড়িতে অভিযান চালায়। সেখানে দোচালা একটি মাটির ঘর থেকে নববধূকে উদ্ধার এবং মূল হোতা মোফাজ্জল হোসেন ও তার সহযোগী রুবেলকে গ্রেপ্তার করা হয়। ঘটনার পর থেকে গ্রেপ্তার এড়াতে তারা স্থান পরিবর্তন করে। রোববার দুপুর ১২টার দিকে ওই বাড়িতে আশ্রয় নেয়। তাদের কাছ থেকে নববধূর গলার স্বর্ণের হার, কানের দুল, টিকলি, হাতের চুড়ি ও নাকের নোলক উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়াও অপহরণের ঘটনায় ব্যবহৃত ৪টি মোবাইল ফোন, নগদ ১৫ হাজার ৫৩৪ টাকা উদ্ধার করে।
র‌্যাব কর্মকর্তা আনোয়ার লতিফ খান জানান, মোফাজ্জাল হোসেন বিভিন্ন সময় তাকে উত্ত্যক্ত করতো। তার অতীত ভালো না। এ নিয়ে এলাকায় একাধিকবার সালিশ-বৈঠক হয়েছে। মোফাজ্জলের বিরুদ্ধে আড়াইহাজার থানায় গত মাসের ৫ই অক্টোবর একটি মামলা হয়। মামলা নং-৩। শুক্রবার বরের গাড়ি থেকে মোফাজ্জল হোসেন ও তার সহযোগীরা তাকে জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়ে যায়। তিনি আরও জানান, নববধূকে ছিনিয়ে নেয়ার পরপর তার নাকে কিছু একটা  দিয়ে দেয় আসামিরা। এতে নববধূর স্বাভাবিক জ্ঞান ছিল না। গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের সংশ্লিষ্ট থানায় আইনি প্রক্রিয়ার জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে বলে তিনি জানান।
এদিকে ঘটনার মূলহোতা মোফাজ্জল হোসেন জানায়, তার সঙ্গে সুবর্ণার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। তবে নববধূ জানায়, তার সঙ্গে মোফাজ্জলের কোন সম্পর্ক ছিল না। মোফাজ্জল হোসেন উপজেলার সাতগ্রাম ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাতেম আলীর ছেলে।
ওদিকে একমাত্র মেয়েকে ফিরে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন নববধূর বাবা আবদুল লতিফ। র‌্যাব কার্যালয়ে তিনি সাংবাদিকদের জানান, গত ঈদুল আজহার দিন নামাজ পড়া নিয়ে মোফাজ্জল গংদের নিকট আত্মীয়দের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়। এ নিয়ে তার ছেলে আশিক (১৭) ও বন্ধু কাউসারকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে আহত করা হয়। খবর পেয়ে ছেলেকে রক্ষা করতে গেলে সন্ত্রাসীরা তাকেও কুপিয়ে আহত করে।  এ সময় জামা খুলে  তিনি তার শরীরে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন সাংবাদিকদের দেখান। এ ঘটনায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত ৪-৫ জনের বিরুদ্ধে  মামলা করেন আবদুল লতিফ। মামলা দায়েরের পর থেকেই সন্ত্রাসীরা মামলা তুলে নেয়ার জন্য তাকে হুমকি দিয়ে আসছিল।
আড়াইহাজার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাখাওয়াত হোসেন জানান, উদ্ধার হওয়া নববধূর ডাক্তারি পরীক্ষা করানো হবে। এবং গ্রেপ্তারকৃত ৩ আসামিকে মঙ্গলবার আদালতে পাঠিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রয়োজনে রিমান্ড আবেদন করা হবে।
উল্লেখ্য, আড়াইহাজার উপজেলার সাতগ্রাম ইউনিয়নের নোয়াগাঁও চৌধুরী বাড়ির আ. লতিফের মেয়ে সুবর্ণা আক্তারের সঙ্গে গত ৯ই অক্টোবর রূপগঞ্জ উপজেলার দাউদপুর পুটিয়া গ্রামের জহিরুল হকের ছেলে নাদিমের কাবিন হয়। ৬ই নভেম্বর শুক্রবার ছিল বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা। সন্ধ্যায় বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে নববধূ সুবর্ণাকে নিয়ে প্রাইভেটকার যোগে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয় বর নাদিম ও তার স্বজনরা। বর-কনেকে বহনকারী প্রাইভেটকারটি  উপজেলার রসুলপুর নামক স্থানে গেলে দুইটি সিএনজি অটোরিকশা দিয়ে বরের গাড়ি গতিরোধ করে মোফাজ্জল গংরা। বরযাত্রীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বর নাদিমসহ তার সহযাত্রীদের পিটিয়ে নববধূ সুবর্ণাকে জোর করে সিএনজিতে তুলে মাধবদীর দিকে চলে যায় সন্ত্রাসীরা।