Friday, February 14, 2020

গল্প- না by নাগিব মাহফুজ

নুবাদ : কামরুল হাসান।
নতুন হেডমাস্টারের আগমনের খবরটি পুরো স্কুলে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় লাগল না। মহিলা শিক্ষকদের কমনরুমে বসে সেদিনের পাঠে শেষ দৃষ্টি বোলানোর সময়ই খবরটি তার কানে এসেছিল। এখন অন্যান্য শিক্ষকের সঙ্গে যোগ দিয়ে নতুন হেডমাস্টারকে স্বাগত জানাতে হবে, আবার হ্যান্ডশেকও করতে হবে। ভয়ে তার পুরো শরীর কেঁপে উঠল; কিন্তু এটা এড়ানোর কোনো উপায় নেই।

‘সবাই তার দক্ষতার প্রশংসা করে।’ একজন সহকর্মী বলল, ‘আবার তার কঠোরতার কথাও বলে।’

এরকম হতে পারে, সে-সম্ভাবনা সব সময়ই ছিল আর শেষ পর্যন্ত হলোও তাই। তার সুশ্রী মুখম-ল বিবর্ণ হয়ে গেল, টানা কালো চোখে নেমে এলো স্থবির ভাব।

যখন সময় হলো শিক্ষকরা কেতাদুরস্ত হয়ে সারবেঁধে হেডমাস্টারের খোলা রুমে প্রবেশ করল। ডেস্কের পেছনে উঠে দাঁড়িয়ে নারী-পুরুষ সবাইকে তিনি সাদরে গ্রহণ করলেন। তাঁর উচ্চতা মাঝারি, শরীর কিছুটা হৃষ্টপুষ্ট, মুখ গোলগাল, নাক বাঁকানো আর চোখ ফোলা। প্রথম দেখায় তাঁর যে-জিনিসটা চোখে পড়ে তা হলো ফুলে ওঠা ঘন গোঁফ, দেখলে মনে হয় ধনুকের মতো বাঁকানো ফেনাযুক্ত ঢেউ। তাঁর বুকের দিকে দৃষ্টি সমান্তরাল রেখে সে এগিয়ে গেল। চোখের দিকে না তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো। কিছু কি বলার আছে? অন্যরা যা বলেছে তাই কি বলবে? যা-হোক, সে চুপ করে থাকল, একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। শুধু হেডমাস্টারের চোখ কী বলছে তা দেখতে ইচ্ছা হলো। খসখসে হাতে হেডমাস্টার করমর্দন করলেন আর বিষণœ কণ্ঠে বললেন, ‘ধন্যবাদ’। মার্জিতভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে সে চলে এলো।

সারাদিনের কাজের ভিড়ে সব উদ্বেগ ভুলে থাকলেও তাকে দেখে মনে হচ্ছিল সে ভালো নেই। কয়েকজন ছাত্রী তো বলেই ফেলল, ‘মিসের মেজাজ ভালো নেই।’ এরপর কাজ শেষে পিরামিড রোডের শুরুতেই তাদের বাড়িতে ফিরে কাপড় ছেড়ে মায়ের সঙ্গে খেতে বসল। মা মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘সব ঠিক আছে তো?’

‘বদরান বাদাউইকে তোমার মনে আছে? আমাদের হেডমাস্টার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি।’ সংক্ষিপ্তভাবে উত্তর দিলো সে।

‘সত্যি!’

এরপর একমুহূর্ত চুপ থেকে সে বলল, ‘তেমন কোনো ব্যাপার না। সেই কত আগের কথা, প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম।’

খাওয়ার পর কিছু পরীক্ষার খাতা নিয়ে বসার আগে একটু বিশ্রাম নেওয়ার জন্য পড়ার ঘরে গিয়ে ঢুকল সে। লোকটাকে তো প্রায় ভুলেই গিয়েছিল সে। না, ঠিক পুরোপুরি না। কীভাবে এত তাড়াতাড়ি ভুলে যাওয়া যায়? যখন বাদাউই প্রথম তাকে গণিত প্রাইভেট পড়ানোর জন্য এসেছিল, তার নিজের বয়স ছিল মাত্র চোদ্দো। আসলে পুরোপুরি চোদ্দো নয়। বাদাউইর বয়স ছিল পঁচিশ, ঠিক তার বাবার সমান। ‘দেখতে অগোছালো হলেও পড়া বোঝাতে পারে ভালোই’, তার মাকে সে বলেছিল। মা বলেছিল, ‘দেখতে যেমনি হোক, কেমন পড়ায় সেটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

বাদাউই ছিল চমৎকার একজন মানুষ আর জ্ঞান বিতরণের সঙ্গে তাল রেখে তাদের সম্পর্কও ধীরে ধীরে ভালো হলো। তাহলে ব্যাপারটা ঘটল কীভাবে? তার নিজের সরলতার জন্য বাদাউইর আচরণের পরিবর্তনেও সে সাবধান হওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। তারপর একদিন তার বাবাকে ক্লিনিকে যেতে হয়েছিল কোনো এক কারণে আর বাড়িতে তার সঙ্গে ছিল কেবল বাদাউই। বাদাউইর ব্যাপারে তার মনে কোনো সন্দেহ ছিল না, কারণ তাকে সে চাচার সমতুল্য মনে করত। তাহলে কীভাবে ঘটল সেটা? তার পক্ষ থেকে কোনো প্রকার প্রেম বা আকাক্সক্ষা ছাড়াই ব্যাপারটা ঘটে গেল। ঘটনার পর আতঙ্কের সঙ্গে সে জিজ্ঞেস করেছিল আসলে কী হয়ে গেল আর বাদাউই উত্তর দিয়েছিল, ‘ভয় বা দুঃখের কোনো কারণ নেই। ব্যাপারটা নিজের ভেতর রেখো। তোমার যখন বয়স হবে আমি নিজেই প্রস্তাব নিয়ে আসব।’

বাদাউই তার কথা রেখেছিল এবং তাকে বিয়ে করার প্রস্তাবও নিয়ে এসেছিল। কিন্তু ইতোমধ্যে তার ভেতরে এক ধরনের পরিপূর্ণতা এসেছিল, যার ফলে নিজের করুণ অবস্থা অনুধাবন করতে তার বেগ পেতে হয়নি। সে দেখতে পেল বাদাউইর জন্য সম্মান বা ভালোবাসা কোনোটাই তার নেই আর একজন আদর্শ ও নীতিবান ব্যক্তি সম্পর্কে যে ধারণা বা স্বপ্ন তার মনে ছিল বাদাউইর অবস্থান তার থেকে অনেক দূরে। তাহলে কী করার ছিল তার? দুবছর আগেই তার বাবা মারা গিয়েছিলেন আর তার মাও বাদাউইর ওরকম সরাসরি প্রস্তাবে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। যা-হোক, তারপরও মেয়েকে তিনি বলেছিলেন, ‘ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি তোমার ঝোঁকের কথা আমি জানি, তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব তোমার ওপরই ছেড়ে দিলাম।’

নিজের এই জটিল পরিস্থিতি সম্পর্কে সেও সচেতন ছিল। হয় তার প্রস্তাব গ্রহণ করতে হবে নয়তো দরজা চিরতরে বন্ধ করে দিতে হবে। পরিস্থিতি এমন যে, তাকে হয়তো নিজের অপছন্দের কিছু একটা বাধ্য হয়ে করতে হবে। সে নিজে যেমন সুন্দরী আর সম্পদশালী, তেমনি চারিত্রিক উৎকর্ষের জন্যও তার একটা খ্যাতি আছে; কিন্তু তাকেই এখন এক শক্ত ফাঁদে আটকা পড়ে অসহায়ের মতো লড়াই করতে হচ্ছে, তাও আবার একজনের লোলুপদৃষ্টির সামনে পড়ে। পবিত্রতা নষ্ট হওয়া এক জিনিস আর নিজের সামর্থ্যরে ওপর নির্ভর করে তাকে টেক্কা দেওয়া আর এক জিনিস। বাদাউই বলল, ‘তোমাকে ভালোবাসি বলেই আমার দেওয়া কথার সম্মান করতে আমি এসেছি। আমি জানি তুমি শিক্ষকতা পছন্দ করো আর সেজন্য বিজ্ঞান কলেজে তোমার পড়াশোনাও তুমি শেষ করতে পারবে।’

এমন রাগ হলো তার যা আগে কখনো হয়নি। কদর্যতার মতো নিগ্রহকেও সে সব সময় প্রত্যাখ্যান করে এসেছে। তাই নিজের বিয়ের চিন্তাকে বিসর্জন দেওয়াটা তার কাছে আসলে কিছুই না। আত্মনির্ভরশীলতাকেই সে সব সময় স্বাগত জানিয়েছে। মূলত একাকিত্ব এবং আত্মসম্মান যখন এক হয় তখন আর সেটা নিঃসঙ্গতার পর্যায়ে থাকে না। তার আরো সন্দেহ হলো যে, বাদাউই তার অর্থসম্পদের  জন্যই বিয়েটা করতে চাচ্ছে। পরে মাকে একদম সরাসরিই না বলে দিলো সে। উত্তরে মা বললেন, ‘আমার অবাক লাগছে তুমি প্রথম থেকে কেন এ সিদ্ধান্ত নাওনি।’

বাইরে বাদাউই তার পথ রোধ করে জিজ্ঞেস করল, ‘কী করে প্রত্যাখ্যান করলে তুমি? এর পরিণতি কী, তুমি জানো না?’ রুক্ষস্বরে সে উত্তর দিলো, ‘আপনাকে বিয়ে করার চেয়ে যে-কোনো পরিণতি মেনে নেওয়া ভালো।’ তার এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ বাদাউইর কাছে ছিল সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত।

পড়াশোনা শেষ করার পর বাড়তি সময় কাটানোর জন্য সে চাইল কিছু একটা করতে। এজন্যই শিক্ষকতা শুরু। এরপর বহুবার তার বিয়ের সুযোগ এসেছে, কিন্তু সবগুলোকেই সে ফিরিয়ে দিয়েছে।

‘কাউকেই কি তোমার ভালো লাগে না?’ মা ভদ্রভাবে জিজ্ঞেস করেছিল।

‘আমি কী করছি তা আমি ভালো করেই জানি’, সেও নম্রভাবে উত্তর দিয়েছিল।

‘কিন্তু সময় যে বয়ে যাচ্ছে।’

‘যদি যায় তবে যেতে দাও, আমার তো কোনো সমস্যা হচ্ছে না।’

ধীরে ধীরে তার বয়স বাড়ল। প্রেম-ভালোবাসাকে সে এড়িয়ে চলে, কারণ তার ভয় হয়। সব শক্তি দিয়ে সে প্রত্যাশা করে জীবনটা সুখের না হলেও, ধীরেসুস্থে পার হয়ে যাবে। সুখ-ভালোবাসা বা  মাতৃত্বে সীমাবদ্ধ নয়, নিজেকে এই বলে সে সান্ত¡না দেয়। নিজের শক্ত মনোভাবের জন্য কখনো তার দুঃখবোধ হয়নি। কে জানে সামনে কী হবে? তার সবচেয়ে বেশি মন খারাপ হলো এই ভেবে যে, সেই একই ব্যক্তি আবার তার জীবনে ফিরে এসেছে। তার সঙ্গেই এখন দিনের পর দিন কাটাতে হবে আর তার মাধ্যমেই অতীত হবে জীবন্ত আর বর্তমান হবে বেদনাদায়ক।

এরপর দুজন যখন একা কথা বলার সুযোগ পেল বাদাউইই প্রথম জিজ্ঞেস করল, ‘কেমন আছো?’

‘ভালো’, শীতলভাবে উত্তর দিলো সে।

কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বাদাউই প্রশ্ন করল, ‘এখনো তুমি … মানে … বিয়ে করেছ?’

আলোচনা অতিদ্রুত শেষ করতে ইচ্ছুক এরকম স্বরে সে উত্তর দিলো, ‘আপনাকে তো আগেই বলেছি আমি ঠিক আছি।’

ভেলরির বিয়ে এবং... by আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

আমি হতাশ হওয়ার বান্দা নই। কিন্তু একটু আগে ভেলরি টেইলরের কথা শুনতে শুনতে আমার মধ্যে হতাশা এসে গেছে। দেখলাম উনি সেই সুদূর ইংল্যান্ড থেকে বাংলাদেশের অচেনা অজানা অপরিচিত জায়গায় এসে যে মহান অবদান রেখেছেন আমরা এখানে বাস করে, তাঁর চেয়ে অনেক বেশি পরিচিতি ও প্রভাব নিয়েও তাঁর তুলনায় কিছুই করতে পারিনি। উনি অন্তত আমার চেয়ে এই সমাজকে বেশি দিয়েছেন। সেইজন্য আমি তাঁকে অভিনন্দন জানাই।

আমাদের দেশে মানুষের মধ্যে আজ বিরাট হতাশা। আমি যখন দেশের বিভিন্ন জায়গায় বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের শাখা খুলতে যাই তখন প্রায়ই লোকেরা বলে: ‘আর জায়গা পেলেন না ভাই, এখানে এসেছেন! শাখা খুলবেন কোনখানে। সব তো এখানে জন্তু-জানোয়ার।’ আমি কিন্তু তাঁদের সাবধানবাণী শুনি না। শাখা খুলে ফেলি।
বছর-পাঁচেক পর সে-শাখা যখন ফুল পাতায় ঝলমলিয়ে ওঠে তখন তাঁদের কাছে গিয়ে বলি: ‘আপনারা তো ‘জানোয়ার’ ‘জানোয়ার’ করেছিলেন কিন্তু দেখুন কত মানুষ আছে এখানে। কেউ খোঁজেননি বলে তাদের পাননি। যারা এদেশে আজ এই জাতির শক্তি ও বিবেককে ধারণ করে আছে, খুঁজলে ঠিকই তাদের পাওয়া যাবে। না-খুঁজলে কী করে পাব?’

আমাদের চারপাশে যে-অসংখ্য অবহেলিত পঙ্গু মানুষেরা অসহায় হয়ে, তিলে তিলে ধুঁকে মরছে, ভালোবেসে তাদের না খুঁজলে কোনোদিন তাদের আমরা দেখতে পাব না। যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের জন্য আমাদের ভেতরে ভালোবাসা না জাগবে ততক্ষণ আমরা কেবল ওদের ঐ কুশ্রী চেহারাতেই দেখব। ফরাসি রূপকথায় ‘বিউটি এ্যান্ড দি বিস্ট’ নামে একটা অপূর্ব গল্প আছে। গল্পটাতে আছে: দানবের মতো দেখতে একটা জন্তু বিউটিকে তার প্রাসাদে ধরে নিয়ে যায়। বিউটি খুবই রূপসী। জন্তুটা বিউটিকে খুবই ভালোবাসে, তার জন্য একা ডুকরে ডুকরে কাঁদে, তাকে বিয়ে করতে চায়। কিন্তু বিউটির মনে তার জন্য প্রেম জাগে না। ‘ও একটা জানোয়ার। ওকে কী করে ভালোবাসব’, মনে হয় বিউটির। ভালোবাসার যন্ত্রণায়, কষ্টে জন্তুটা ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ে। তার মৃত্যুদিন ঘনিয়ে আসে। একদিন প্রাসাদের ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ বিউটি ঐ মৃত্যুযন্ত্রণাক্লিষ্ট জানোয়ারটার গোঙানি শুনতে পায়। কাছে গিয়ে দেখে কষ্টে বেদনায় সে শেষ হয়ে এসেছে। জন্তুটার কষ্ট দেখে বিউটির চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা পানি মাটিতে গড়িয়ে পড়ে। তার অমনি ঘটে এক আশ্চর্য ঘটনা। জানোয়ারটা সুদর্শন রাজপুত্র হয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে যায়। (আসলে জন্তুটা ছিল একজন অভিশপ্ত রাজপুত্র। যার শাপে সে জন্তু হয়েছিল, সে শর্ত দিয়েছিল, তার দুঃখে ব্যথিত হয়ে কেউ যদি কোনোদিন চোখের পানি ফেলে তবে সে আবার তার রাজপুত্রের চেহারা ফিরে পাবে।) গল্পটার ভেতরের মূল কথাটা কি? কথাটা হল: আমাদের চারপাশের দুঃখী পৃথিবীটা অমনি এক সুদর্শন রাজপুত্রের মতো। অপ্রেমের অভিশাপে সে জন্তুর মতো কদাকার হয়ে আছে। যতক্ষণ আমরা তাকে ভালো না বাসি ততক্ষণ সে তার অভিশপ্ত চেহারা নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকে। আমরা সেই রাজপুত্রকে পাই তখনই যখন তার জন্য আমাদের চোখের পানি মাটিতে ঝরে।

পৃথিবীর কুশ্রীতম নিঃস্বতম মানুষের মধ্যেও আছে এই রাজপুত্র। আমাদের প্রেম দিয়ে, বেদনা দিয়ে, অশ্রু দিয়ে ভালোবাসা দিয়ে সেই রাজপুত্রকে পেতে হয়। ভেলরি টেইলর তাদের পেয়েছেন। তিনি বাংলাদেশকে ভালো বেসেছেন, এখানকার দুঃখী মানুষের জন্য চোখের পানি ফেলেছেন। তাই সুন্দর রাজপুত্রের মতো এই বাংলাদেশ তাঁর চারপাশে আজ দাঁড়িয়ে আছে।

উনি বাংলাদেশের প্রেমে পড়েছেন। আমার ধারণা কেবল প্রেমে পড়েননি, এদেশের সঙ্গে তিনি বিবাহিতও হয়েছেন। না হলে শুধু প্রেমের জন্য এতদিন, দীর্ঘ তিরিশটা বছর কি তিনি কাটাতে পারতেন? প্রেম এত দীর্ঘজীবী নয়। আমি নিশ্চিত এই জাতির সঙ্গে এক অচ্ছেদ্য বন্ধনে তিনি বাঁধা। কিন্তু কিসের সঙ্গে বাঁধা পড়েছেন? না, এর সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বা ভোগলিপ্সার সঙ্গে নয়, আখের গোছানোর সঙ্গে নয়, বাঁধা পড়েছেন তিনি এ জাতির অসহায়তার সঙ্গে, নিঃস্বতার সঙ্গে। এর দুঃখ আর অশ্রুর সঙ্গে। উনি অনুভব করেছেন এই বেদনাগুলো ইউরোপেও আছে, কিন্তু অত স্পষ্ট করে তাদের দেখা যায় না। গেলেও সেই বেদনায় শুশ্রƒষা দেবার মানুষ সেখানে আছে। কিন্তু এখানে কেউ নেই। তাই এই বেদনা এবং দায়িত্ব তিনি নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। আমাদের জাতির এই দুঃখের সঙ্গেই তিনি সত্যিকারভাবে বিবাহিত হয়েছেন।

কিন্তু তাই বলে এই প্রাপ্তিটুকুর জন্য একটা গোটা জীবন দিয়ে দেওয়া এ কি এতই সহজ? আমাদের হতাশা-যন্ত্রণা, দুঃখ-কষ্ট আজ এতটাই দুঃসহ যে বেঁচে থাকার সমস্ত আশা আর আনন্দ মানুষ হারিয়ে ফেলেছে। কিন্তু মনে রাখতে হবে এই বাংলাদেশের তলা থেকে আজ জেগে উঠছে আরেকটা বাংলাদেশ, যে বাংলাদেশকে আমরা আজো ঠিকমতো দেখিনি, কিন্তু অচিরেই দেখব। সে সুখে আশায় ভরা এক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ। আজ সে নেই, কিন্তু সংগ্রাম ও দুঃখের মধ্যদিয়ে তাকে বহু মানুষ তিল তিল করে জন্ম দিয়ে চলেছে। আমাদের সংগ্রাম সেই বাংলাদেশকে গড়ে তোলার জন্য।
হুবহু এক কাজ না করলেও আমাদের সঙ্গে গভীর মিল আছে তাঁর। উনি একধরনের প্রতিবন্ধী শুধু শারীরিক হয় না, মানসিকও হয়Ñআত্মাও হয়। প্রমথ চৌধুরী লিখেছেন: ‘দেহের মৃত্যুর রেজিস্ট্রি রাখা হয় প্রতিবন্ধিত্বের মতো স্পর্শগ্রাহ্য নয় বলে তা আমাদের চোখে পড়ে না। যদি আত্মার মৃত্যুর রেজিস্ট্রি রাখা হত তাহলে হয়তো দেখা যেত আমাদের তেরো কোটি লোকের মধ্যে ১২ কোটি ৯০ লক্ষ লোক অনেক আগেই মারা গেছে। আমরা সেই মানসিক প্রতিবন্ধিত্বকে সারিয়ে তোলার জন্য অল্পস্বল্প কাজ করছি। কিন্তু শুধু শারীরিক বা মানসিকÑএর যে-কোনো একটিকে আরোগ্য করলেই চলবে না। দুটোকেই আমাদের সারিয়ে তুলতে হবে। আমরা এই দুই প্রতিষ্ঠান থেকে দুই ধরনের প্রতিবন্ধীদের সারিয়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছি। এদিক থেকে আমরা পরিপূরক।

এতক্ষণ ভেলরি টেইলরের কাছ থেকে যে-গল্প আমরা শুনলাম এ কি ব্যর্থতার গল্প? এই-যে অসহায়, আশ্বাস-হারিয়ে-ফেলা পঙ্গু হওয়া মানুষদের নিষ্ফল জীবন থেকে টেনে তুলে আলো-আশায় ভরা একটা স্বনির্ভর জীবনের মধ্যে তিনি বাঁচিয়ে তুলছেন, সম্মান আর মর্যাদায় পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করছেন, এ কি সোজা কাজ? আলোকিত মানুষের জন্য আন্দোলন কি শুধু আমরাই করি? এটাও কি আলোকিত মানুষেরই আন্দোলন নয়? তাঁর মমতার স্পর্শ পেয়ে পঙ্গু বিকলাঙ্গ মানুষেরা এই যে পৃথিবীকে আবার দেখছে, এখানে নিঃশ্বাস নিচ্ছে কী অসাধারণ কাজ এ? কী আলোকবর্তিকারই প্রজ্বলন নয়? একটা মাত্র জীবনই তো আমরা পাই পৃথিবীতে। সেই জীবন হারিয়ে ফেলার চাইতে যন্ত্রণাময় অন্ধকারময় আর কী হতে পারে? সেই জীবন আবার ফুটে উঠল, একটা নিভে যাওয়া প্রদীপ আবার আলোকিত হলÑএটা যে কতবড় অপার্থিব আনন্দ, এ যে পেয়েছে সে-ই জানে। এমনি হাজার হাজার প্রদীপ জ্বালাতে পেরেছেন বলেই এদেশে তিনি থেকে গেছেন, এখানকার মানুষকে ভালোবেসেছেন বলেই জীবনটা তাদের জন্য দিতে পারছেন।

উনি যখন কথা বলছিলেন আমি তখন তার পবিত্রতামাখা মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। নিজেকে অন্যের জন্য বিলিয়ে দেওয়ার মধ্যে পরিতৃপ্তি আর প্রসন্নতায় জ্বলজ্বল করছিল তাঁর মুখ। তাঁর মুখের দীপ্তির মধ্যেই তাঁর ভালোবাসা আমি দেখছিলাম। আমরা অক্ষম। একেকবার একেক ইচ্ছার চাবুক ক্ষতবিক্ষত হই। একবার এটা করি, একবার সেটা। কোনোকিছুতে একাগ্র হতে পারি না। আমার নিজের কথাই বলি। একবার টেলিভিশনে যাই তো একবার করি ডেঙ্গু আন্দোলন। একবার সমাজ, একবার শিল্প; একবার শিক্ষা, একবার সাহিত্য, একবার পরিবেশÑকী এসব! জীবনের সর্বোচ্চকে স্পর্শ করতে চাইলে একটা জায়গায় নতজানু হতে হয়, সেজদা দিয়ে তার ভেতর বিলীন হতে হয়। আমাদের মতো বিশৃঙ্খল, অস্থির, অস্বস্ত মানুষরা এটা পারে না। তাঁকে আমি কৃতজ্ঞতা জানাই এজন্য যে, নিমগ্ন আত্মদানের তিনি এক অনন্য উদাহরণ।

একদিন আমার আমন্ত্রণে ঢাকার স্কুলগুলোর বেশ কিছু হেডমাস্টার এই ঘরে এসেছিলেন। সভা শুরু হলে দেখলাম কয়েকজন ফাদার রয়েছেন তাঁদের মধ্যে। তাঁদের দেখে মনে হল, যে-জ্যাম, জেলি, রুটি, মাখনের জন্য আমাদের মানুষেরা পাগলের মতো দেশ ছেড়ে যায় যায় ইয়োরোপ আমেরিকায়, এঁরা সেসব দেশের সেই সব মোহ ছেড়েই গারো পাহাড়, আসাম আর সুমাত্রার জঙ্গলের মধ্যে জীবন শেষ করে চলেছেন। ভাবলাম, আমরাও কি এই আদর্শের উদাহরণ হতে পারি না? এই ফাদারদের দেখলেও তো বোঝা যায়, কীভাবে মানুষ নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে। আহরণের ভেতর দিয়ে মানুষ টিকে থাকে, কিন্তু বড় হয় দিতে পারার মধ্য দিয়ে। ছোটজীবনকে উৎসর্গ করেই বড়জীবনকে পেতে হয়; পৃথিবীকে উৎসর্গ করে স্বর্গকে। তাহলেই কেবল জীবন ওরকম আনন্দ-জ্যোতিতে ভরে ওঠে। তিনি ঠিক এই কাজটিই করছেন। তিনি এই নিঃস্ব হতশ্রী দেশে এসে আহত আশাহীন মানুষের সেবায় জীবন শেষ করছেন। তাই তাঁর মুখে এই স্বর্গীয় বিভা, এই অবিশ্বাস্য দীপ্তি।

রাশফুকোর বইয়ে আছে: ‘বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চেহারার খুঁতগুলোর সাথে মনের খুঁতগুলোও ধরা পড়ে।’ কিন্তু এটা সবার জন্য সত্য নয়। যে মনে বা চেহারায় খুঁত নেই বয়স সে খুঁত খুঁজে পাবে কী করে? এমন জীবন কি বয়সের সঙ্গে আরও সুন্দর হয়ে উঠবে না? চল্লিশ বছরের রবীন্দ্রনাথের চাইতে আশি বছরের রবীন্দ্রনাথ অনেক বেশি সুন্দর। কেন? ‘ঐতরেয় ব্রাহ্মণ’ নামে একটা পর্ব আছে উপনিষদের মধ্যে। সেখানে একটা জায়গায় বলা হয়েছে: ‘চলতে চলতে যে মানুষের বদন শ্রান্ত, সেই শ্রান্ত বদনের চাইতে সুন্দরতর শোভা তুমি কোথায় দেখতে পাবে?’ শ্রমের মধ্যে দিয়ে, আত্মোৎসর্গের মধ্য দিয়ে, যে-মানুষের মুখমন্ডল শ্রান্ত হয়েছে সেই শ্রান্ত মুখমন্ডলের চাইতে সুন্দর আর কিছুই হতে পারে না। তাই তাঁর মুখ অমন জ্যোতিতে ভরা। ঐ বইয়ে এমনি আরও অনেক অনবদ্য কথা আছে। তার একটা বলেই কথা শেষ করব।

একটু ভূমিকা দিয়ে কথাটা বলি। আপনারা জানেন, হিন্দুশাস্ত্রে আছে পৃথিবীতে যুগ চারটি। প্রথমে ছিল সত্য যুগ। তখন মিথ্যা, পাপ, অন্যায়Ñএসব কিছুই ছিল না, গরুর দুধ ছিল একদম খাঁটি। তারপর এল দ্বাপর, তারপর এসেছে ত্রেতা। আর আমরা বাস করছি কলির যুগে। কলির যুগে মানে মিথ্যা পাপ আর অনাচারে ভরা পৃথিবীতে। ঋষি বলছেন এই যুগবিভাগ সঠিক নয়। অন্যভাবে একে দেখতে হবে। আসলে: ‘আমরা যখন ঘুমিয়ে থাকি তখনই কলিকাল, যখন জাগি তখন ত্রেতা, যখন উঠে দাঁড়াই তখন দ্বাপর এবং যখন চলতে শুরু করি তখনই সত্যযুগ।’ সুতরাং ‘চল চল।’ যতক্ষণ চলছি ততক্ষণই সত্যযুগ। তাঁকে দেখলেই বোঝা যায় উনি রয়েছেন সত্যযুগে, কারণ তিনি কেবলই চলছেন। তাই তিনি এমন স্নিগ্ধ আর উজ্জ্বল। আমার হৃদয়ের সমস্ত অভিনন্দন তাঁর জন্য। আমরা আশা করি আদর্শ, আবেগ, অনুভূতি বা স্বপ্নগতভাবে আমরা ভবিষ্যতেও একসঙ্গে থাকব।

>>>বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে পক্ষাঘাতগ্রস্তদের পুনর্বাসনে ভেলরি টেইলর-এর ভূমিকা শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রদত্ত বক্তৃতা: ২০০১

কাশ্মীর নিয়ে ভারত আর পাকিস্তানের লড়াইয়ের কারণ কি?

পুলওয়ামার আক্রমণ নতুন করে ভারত পাকিস্তান উত্তেজনা বাড়িয়ে দিয়েছে
কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে ভারত আর পাকিস্তানের মধ্যে দু'বার যুদ্ধ হয়েছে। এখন উভয়েই পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হয়েছে, এবং পুলওয়ামার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও তারা যুদ্ধংদেহি অবস্থানে।
কিন্তু কাশ্মীর নিয়ে ভারত আর পাকিস্তানের এই সংঘাতের কারণ কি?
ইতিহাস বলছে, ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে পাকিস্তান আর ভারত স্বাধীনতা পাবার আগে থেকেই কাশ্মীর নিয়ে বিতর্কের সূচনা হয়েছিল।
'ইন্ডিয়ান ইনডিপেন্ডেন্স এ্যাক্ট' নামে ব্রিটিশ ভারত বিভক্তির যে পরিকল্পনা তৈরি হয়েছিল তাতে বলা হয়েছিল, কাশ্মীর তার ইচ্ছে অনুযায়ী ভারত অথবা পাকিস্তান - যে কোন রাষ্ট্রেই যোগ দিতে পারবে।
কাশ্মীরের তৎকালীন হিন্দু মহারাজা হরি সিং চাইছিলেন স্বাধীন থাকতে অথবা ভারতের সাথে যোগ দিতে। অন্যদিকে পশ্চিম জম্মু এবং গিলগিট-বালতিস্তানের মুসলিমরা চাইছিলেন পাকিস্তানের সাথে যোগ দিতে।
পুলওয়ামাতে সবশেষ আক্রমণে ৪০ জন আধাসামরিক সেনা নিহত হন
১৯৪৭ সালের অক্টোবরে পাকিস্তানের পাশতুন উপজাতীয় বাহিনীগুলোর আক্রমণের মুখে হরি সিং ভারতে যোগ দেবার চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন, এবং ভারতের সামরিক সহায়তা পান। পরিণামে ১৯৪৭ সালেই শুরু হয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ - যা চলেছিল প্রায় দু'বছর ধরে।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ১৯৪৮ সালে ভারত কাশ্মীর প্রসঙ্গ উত্থাপন করে।
জাতিসংঘের ৪৭ নম্বর প্রস্তাবে কাশ্মীরে গণভোট, পাকিস্তানের সেনা প্রত্যাহার, এবং ভারতের সামরিক উপস্থিতি ন্যূনতম পর্যায়ে কমিয়ে আনতে আহ্বান জানানো হয়।
কাশ্মীর বিভক্ত ভারত-পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ রেখা বা এল ও সি দিয়ে
কাশ্মীরে যুদ্ধবিরতি বলবৎ হয় ১৯৪৮ সালে, তবে পাকিস্তান সেনা প্রত্যাহার করতে অস্বীকার করে। তখন থেকেই কাশ্মীর কার্যত পাকিস্তান ও ভারত নিয়ন্ত্রিত দুই অংশে ভাগ হয়ে যায়।
অন্যদিকে ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে চীন কাশ্মীরের আকসাই-চিন অংশটির নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে, আর তার পরের বছর পাকিস্তান - কাশ্মীরের ট্রান্স-কারাকোরাম অঞ্চলটি চীনের হাতে ছেড়ে দেয়।
সেই থেকে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণ পাকিস্তান, ভারত ও চীন - এই তিন দেশের মধ্যে ভাগ হয়ে আছে।
দ্বিতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয় ১৯৬৫ সালে, এর পর আরেকটি যুদ্ধবিরতি চু্ক্তি হয় । এর পর ১৯৭১-এর তৃতীয় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এবং ১৯৭২-এর সিমলা চুক্তির মধ্যে দিয়ে বর্তমানের 'লাইন অব কন্ট্রোল' বা নিয়ন্ত্রণ রেখা চূড়ান্ত রূপ পায়। ১৯৮৪ সালে ভারত সিয়াচেন হিমবাহ এলাকার নিয়ন্ত্রণ দখল করে - যা নিয়ন্ত্রণরেখা দিয়ে চিহ্নিত নয়।
তা ছাড়া ১৯৯৯ সালে ভারতীয় বাহিনী আরেকটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু তিক্ত লড়াইয়ে জড়ায় পাকিস্তান-সমর্থিত বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে। ১৯৯৯-এর সেই 'কারগিল সংকটের' আগেই দু দেশ পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হয়।

ভারত-শাসিত কাশ্মীরে এত সংঘাত-সহিংসতা কেন?

কাশ্মীরের এ অংশের অনেকেই চায় না যে এলাকাটি ভারতের শাসনে থাকুক। তারা চায় - হয় পূর্ণ স্বাধীনতা, অথবা পাকিস্তানের সাথে সংযুক্তি।
কাশ্মীরের বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছে পাকিস্তান, ভারত ও চীন
ভারত-শাসিত জম্মু ও কাশ্মীরের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশেরও বেশি মুসলিম। এটিই হচ্ছে ভারতের একমাত্র রাজ্য যেখানে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ।
এখানে বেকারত্বের হার অত্যন্ত উঁচু, তা ছাড়া রাস্তায় বিক্ষোভ এবং বিদ্রোহীদের দমনের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নীতি পরিস্থিতিকে আরো খারাপ করেছে।
কাশ্মীরে বিদ্রোহী তৎপরতা বড় আকারে শুরু হয় ১৯৮৭ সালে বিতর্কিত স্থানীয় নির্বাচনের পর জেকেএলএফ নামে সংগঠনের উত্থানের মধ্যে দিয়ে।
ভারত অভিযোগ করে, পাকিস্তান সীমান্তের ওপার থেকে যোদ্ধাদের পাঠাচ্ছে - তবে পাকিস্তান তা অস্বীকার করে।
এই রাজ্যে ১৯৮৯ সালের পর থেকে সহিংস বিদ্রোহ নানা উত্থান-পতনের মধ্যে দিয়ে গেছে।
তবে ২০১৬ সালের জুলাই মাসে ২২ বছর বয়স্ক জঙ্গী নেতা বুরহান ওয়ানি নিরাপত্তা বাহিনীর সাথে এক লড়াইয়ে নিহত হবার পর থেকে পুরো উপত্যকায় ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
আক্রান্ত হলে ভারতের বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ হবে: বলছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান
বুরহান ওয়ানি সামাজিক মাধ্যমে সক্রিয় ছিলেন এবং এতে তার প্রকাশ করা বিভিন্ন ভিডিও তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় ছিল। মনে করা হয়, এ অঞ্চলে জঙ্গী তৎপরতা পুনরুজ্জীবিত করা এবং তাকে একটা 'ন্যায়সঙ্গত ইমেজ' দেয়ার ক্ষেত্রে তার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
রাজধানী শ্রীনগরের ২৫ মাইল দূরের ট্রাল শহরে বুরহান ওয়ানির শেষকৃত্যে সমাগম হয়েছিল হাজার হাজার লোকের। জানাজার পর শুরু হয় সৈন্যদের সাথে সংঘর্ষ, কয়েকদিনব্যাপী সহিংসতায় নিহত হয় ৩০ জনেরও বেশি বেসামরিক লোক।
এর পর থেকেই রাজ্যটিতে বিক্ষিপ্ত সহিংসতা চলছে। ২০১৮ সালে বেসামরিক লোক, নিরাপত্তা বাহিনী এবং জঙ্গী মিলে মোট নিহত হয় ৫০০ জনেরও বেশি - যা গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি।
কাশ্মীর বিখ্যাত তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য

কাশ্মীরে শান্তির আশা দেখা দিয়েও মিলিয়ে গেছে বার বার

কাশ্মীর এখন বিভক্ত লাইন অব কন্ট্রোল (ভারত-পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণ রেখা) বরাবর। এ ছাড়াও আকসাই-চিন এবং সিয়াচেন হিমবাহের উত্তরের আরেকটি অংশ নিয়ন্ত্রণ করে চীন।
নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বহু রক্তপাতের পর ২০০৩ সালে দু দেশ একটি যু্দ্ধবিরতি চুক্তি করেছিল।
পাকিস্তান পরে কাশ্মীরের বিদ্রোহীদের অর্থায়ন বন্ধ করার অঙ্গীকার করে, আর ভারত প্রস্তাব করে - বিদ্রোহীরা জঙ্গী তৎপরতা বন্ধ করলে তাদের ক্ষমাও করে দেয়া হবে।
এর পর ২০১৪ সালে হিন্দু জাতীয়তাবাদী নরেন্দ্র মোদির সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর তারা পাকিস্তানের ব্যাপারে কঠোর নীতি নেবার অঙ্গীকার করে, তবে শান্তি আলোচনার ব্যাপারেও আগ্রহ দেখায়।
পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ দিল্লিতে নরেন্দ্র মোদির শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানেও গিয়েছিলেন অতিথি হিসেবে।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সাথে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি
কিন্ত এর এক বছর পরই পাঞ্জাবের পাঠানকোটে ভারতীয় বিমান ঘাঁটিতে আক্রমণ হয় - যার জন্য পাকিস্তান-ভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোকে দায়ী করে ভারত। মি. মোদি ইসলামাবাদে তার নির্ধারিত সফর বাতিল করে দেন। এর পর থেকে দু'দেশের মধ্যে আলোচনায় আর কোন অগ্রগতি হয় নি।

তাহলে কাশ্মীর কি আগের অবস্থাতেই ফিরে গেল?

২০১৮ সালে ভারতশাসিত কাশ্মীর রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টির নেতৃত্বে কোয়ালিশন সরকার - যাতে বিজেপিও অংশীদার ছিল। কিন্তু জুন মাসে বিজেপি জোট থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়, এবং তার পর থেকেই রাজ্যটি দিল্লির প্রত্যক্ষ শাসনের অধীনে। এতে সেখানে ক্ষোভ আরো বেড়েছে।
ভারতশাসিত কাশ্মীরে ২০১৬ সাল থেকে এ পর্যন্ত একাধিক সামরিক ঘাঁটির ওপর হামলা হয়েছে।
সবশেষ পুলওয়ামায় গত সপ্তাহে এক জঙ্গী আক্রমণে ৪০ জনেরও বেশি আধাসামরিক পুলিশ সদস্য নিহত হবার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে আবারও তৈরি হয়েছে তীব্র উত্তেজনা।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, ভারত যদি পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ নেয় - তাহলে পাকিস্তানও পাল্টা ব্যবস্থা নেবে।
ভারত বলছে, পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন করতে সব চেষ্টাই তারা করবে।
মনে হচ্ছে, দু দেশের সম্পর্ক উন্নত হবার যেটুকু আশা অবশিষ্ট ছিল - পুলওয়ামার আক্রমণের মধ্যে দিয়ে সেটাও হয়তো শেষ হয়ে গেছে।
কাশ্মীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত ডাল লেক

'স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস': সেদিন যা ঘটেছিল

১৪ই ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন'স ডে হিসাবে সারা বিশ্বে পরিচিত হলেও, বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ১৯৮৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি। অনেকে এই দিনটিকে পালন করেন 'স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস' হিসাবে।
এই দিনেই সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন, কালক্রমে যেটি গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছিল।
তখন জেনারেল এরশাদের সামরিক সরকারের বিতর্কিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
তখনকার শিক্ষামন্ত্রী ড. মজিদ খান ১৯৮২ সালের ২৩শে সেপ্টেম্বর একটি নতুন শিক্ষানীতির প্রস্তাব করেন। সেখানে প্রথম শ্রেণী থেকেই আরবি ও দ্বিতীয় শ্রেণী থেকে ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য মাপকাঠি করা হয় মেধা অথবা পঞ্চাশ শতাংশ ব্যয়ভার বহনের ক্ষমতা।
এই নীতি ঘোষণার পর থেকেই আন্দোলন শুরু করে শিক্ষার্থীরা।
সে বছর ১৭ সেপ্টেম্বর ওই শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের বিষয়ে একমত হয় ছাত্র সংগঠনগুলো।
এরই ধারাবাহিকতায় ১৪ই ফেব্রুয়ারিতে স্মারকলিপি দিতে শিক্ষার্থীরা মিছিল করে সচিবালয়ের দিকে যাবার সময় পুলিশ গুলি চালায়। এতে জয়নাল ও দীপালি সাহা সহ নিহত হন অন্তত ১০জন।
সেদিনের সেই মিছিলে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সে সময়ের সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের কর্মী তসলিমা রানা নীলা।
বর্তমানে লন্ডনের বাসিন্দা মিজ. নীলা বলছিলেন, ৩৫ বছর আগের ঘটনা হলেও সেই দিনটি এখনো তার পরিষ্কার মনে আছে।
পুলিশের ব্যারিকেডের দিকে এগিয়ে চলছে মিছিল। ছবি: তৎকালীন পত্রপত্রিকা থেকে নেয়া
''তখন ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস হিসাবে এখনকার মতো পালন করা হতো না। ১৯৮৩ সালের সেই দিনটি ছিল এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে একটি চরম মুহূর্ত।''
ছাত্রসমাজের দাবি ছিল একটি অবৈতনিক বৈষম্যহীন শিক্ষানীতি। কিন্তু শিক্ষামন্ত্রী ড. মজিদ খান যে নীতি ঘোষণা করেন, সেখানে বাণিজ্যিকীকরণ আর ধর্মীয় প্রতিফলন ঘটেছে বলে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন। তাই শুরু থেকেই ওই নীতির বিরোধিতা করতে শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
তসলিমা রানা নীলা বলছেন, ''সেদিন সকাল ১০টায় বটতলায় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ছাত্রদের জমায়েত হবার কথা। সেখান থেকে শিক্ষানীতি প্রত্যাহারের দাবিতে স্মারকলিপি নিয়ে শিক্ষা ভবনে যাওয়া হবে।''
''সকাল ১০টায় বটতলা থেকে মিছিল নিয়ে আমরা শিক্ষাভবনের দিকে যাচ্ছি। যখন আমরা কার্জন হল আর শিশু একাডেমীর মাঝখানের রাস্তাটায় এলাম, তখন আমরা প্রথম আওয়াজ শব্দ শুনি। ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়, সেখানে বেশ কিছু ঘটনা ঘটে। তখন রীতিমত গোলাগুলি হচ্ছে।''
সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সে সময়ের কর্মী তসলিমা রানা নীলা বলছেন, ''আমরা দৌড়ে কার্জন হলে ঢুকে গেলাম। ওখানে বেশ কয়েক ঘণ্টা থাকলাম। তারপর বিকালের দিকে যখন অবস্থাটা একটু স্বাভাবিক হল, তখন আমরা আমার বটতলায় চলে এলাম।''
তিনি বলছেন, ''তখন শহরের অবস্থা ছিল খুবই থমথমে। আমরা বটতলায় জমায়েত হওয়ার পর জয়নালের মৃতদেহ ট্রাকে করে সেখানে আনা হলো। তৎকালীন ডাকসুর ভিপি আখতারুজ্জামান বক্তৃতা দিচ্ছেন, এমন সময় আমরা হঠাৎ শুনতে পেলাম নতুন আনা রায়ট কারের শব্দ। সেটি রঙ্গিন পানি ছিটাচ্ছে, যাতে ছাত্রদের পরবর্তীতে সহজেই চিহ্নিত করা যায় আর গ্রেপ্তার করতে তাদের সুবিধা হয়।''
''আবার ছাত্ররা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কলাভবনের পেছন দিক দিয়ে আরো অনেকের মতো আমিও দৌড়ে যাচ্ছিলাম, এমন সময় পেছনের ধাক্কায় আমি পড়ে যাই। আমার উপর দিয়ে অনেক ছাত্ররা চলে যায়, আমিও অনেক ব্যথা পাই। একটা সময় অর্ধ চেতন অবস্থায় আমি নিজেকে আবিষ্কার করি, আমাকে ধরে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।'' বলছেন তসলিমা রানা নীলা।
সাবেক ছাত্রনেতা ও ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক মোশতাক হোসেন একটি সাক্ষাৎকারে বিবিসিকে বলেছেন, ''আমরা দেখেছি অনেক মৃতদেহ পুলিশ ট্রাকে করে নিয়ে যাচ্ছে। শুধু জয়নাল নামের একজন ছাত্রকে আমরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারি। কিন্তু চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে সেই মৃতদেহ বটতলায় নিয়ে এসে আমরা বিক্ষোভ করি।''
বিবিসিকে বলছিলেন, ''সেদিন পুলিশের গুলিতে অন্তত ৫০জন নিহত হয়েছিল বলে আমরা ধারণা করি। কিন্তু দুজনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বাকি মৃতদেহগুলো গুম করে ফেলে। তাদের স্বজনরা অনেক খোঁজাখুঁজি করে স্বজনদের কোন খোঁজ আর পাননি।''
তবে হতাহতের এই সংখ্যার বিষয়ে তখন সরকারিভাবে কোন বক্তব্য দেয়া হয়নি।
''সেদিন থেকে এই দিনটিকে স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসাবে বলা হয়'', বলছেন মি. হোসেন।
বিকালে এবং পরের দিনও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলে বলে তিনি জানান। পুলিশ অনেক ছাত্র-ছাত্রীকে গ্রেপ্তার করে নির্যাতন করা হয়। মোশতাক হোসেনকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
তিনি জানান, জয়নাল ছাড়া পরে মোজাম্মেল আইয়ুব নামের আরেকজনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। জাফর, কাঞ্চন, দীপালি সাহা নামের একটি ছোট বাচ্চাসহ অনেকে নিখোঁজ হয়ে যায়, যাদের পরে আর কোন খোঁজ মেলেনি।
এর কিছুদিন পরে সরকার একটি ঘোষণা দিয়ে শিক্ষানীতিটি স্থগিত করে।
সচিবালয় অভিমূখে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মিছিল। ছবিটি তৎকালীন পত্রপত্রিকা থেকে নেয়া