Saturday, September 14, 2013

হ্যাঁ হাসিনা, না হাসিনা by সোহরাব হাসান

বিরোধী দল যত উচ্চ স্বরে বলছে, সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছাড়া তারা কোনো নির্বাচনে যাবে না, সরকারি দল তার চেয়ে কয়েক গুণ জোরালো কণ্ঠে দাবি করছে, বিরোধী দল অবশ্যই নির্বাচনে আসবে। এই আসা না-আসার মধ্যে পেন্ডুলামের মতো দুলছে দেশ। নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কাজিয়া চলে আসছে দুই দশক ধরে। এর শেষ কোথায় আমরা জানি না। আগামী নির্বাচন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের পরস্পরবিরোধী অবস্থান দেশের মানুষ তো বটেই, বিদেশি বন্ধু-শুভার্থীদেরও উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।

যুক্তরাষ্ট্র কেন পিছু হটল by আসিফ রশীদ

সিরিয়া সংকট নিরসনের কলকাঠি এখন রাশিয়ার হাতে। এ সংকট নিরসনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে চার ধাপের রুশ পরিকল্পনা অনুযায়ী। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘যুদ্ধ’ হুমকি কোনো কাজে আসেনি। প্রেসিডেন্ট ওবামা বলেছেন, আপাতত সামরিক হামলা নয়। তিনি এখন কূটনৈতিক পন্থায় এ সংকট সমাধানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ওবামা যা-ই বলুন না কেন, রাশিয়ার কঠোর অবস্থানের কারণেই যে যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় হামলার সিদ্ধান্ত থেকে পিছু হটেছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের লেখা এক নিবন্ধেও সিরিয়ায় সম্ভাব্য হামলার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে হুশিয়ার করে দেয়া রয়েছে। রাশিয়ার মধ্যস্থতায় সিরিয়া তার রাসায়নিক অস্ত্র আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণাধীনে দিতে রাজি হয়েছে বলেই নয়, সিরিয়ায় হামলার বিরুদ্ধে মস্কোর কঠোর মনোভাব দেখেই ওয়াশিংটনের সুর নরম হয়েছে। এটা নিশ্চিত, রাশিয়া যদি ইরাকের ক্ষেত্রেও একই অবস্থান নিত, সে ক্ষেত্রে দেশটি আজকের বিশৃংখল পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেত। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আইন ও বিশ্ব জনমতকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সেদিন ইরাকে হামলা চালিয়েছিল। আজ সিরিয়ার বিরুদ্ধে আস্ফালন, যুদ্ধোউন্মাদনার ক্ষেত্রেও আইন, জাতিসংঘ, জনমত হয়েছে উপেক্ষিত। কাজ করেছে শুধু রাশিয়ার হুশিয়ারি। বিশ্ব রাজনীতিতে আজ স্নায়ুযুদ্ধকালীন বাস্তবতা এবং ন্যাটোর বিপরীতে মস্কোর নেতৃত্বে সামরিক জোট ‘ওয়ারশ প্যাক্ট’ নেই সত্য- তবে সামরিক শক্তি, জনসংখ্যা, আয়তন, সম্পদ, সর্বোপরি বিশ্বে প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতার দিক থেকে একমাত্র রাশিয়াই পারে যুক্তরাষ্ট্রকে যে-কোনো জবরদখল তথা আন্তর্জাতিক আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ড থেকে নিবৃত্ত করতে। চীনও ক্রমে এ ধরনের সক্ষমতা অর্জন করছে বটে, তবে এখনও তারা যুক্তরাষ্ট্রকে রুখে দেয়ার পর্যায়ে পৌঁছেনি।
স্নায়ুযুদ্ধকালীন বিশ্ব ছিল দ্বিমেরুকেন্দ্রিক। সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সমান শক্তিধর প্রতিদ্বন্দ্বী। শক্তির ভারসাম্যপূর্ণ সেই পরিস্থিতিতে আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ায় মার্কিন দখলবাজির মতো ঘটনা ছিল অসম্ভব ব্যাপার। কিন্তু আজকের একমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় মার্কিন স্বার্থরক্ষার বলি হতে পারে যে-কোনো দুর্বল রাষ্ট্র। এ বাস্তবতা যে কোনো অজুহাতে মার্কিন হামলা বা খবরদারি থেকে বিশ্বের দেশগুলোকে বাঁচাতে আবারও একটি দ্বিমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাই তুলে ধরে। শক্তির এক অদ্ভুত স্বভাব হল, যখন কেউ এর অধিকারী হয়, তখন তা প্রকাশ না করা তার জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে তাকে চ্যালেঞ্জ করার কেউ যখন থাকে না, একে নিয়ন্ত্রণ করা তখন আরও অসম্ভব হয়ে পড়ে। নব্বই দশকের শুরুতে দ্বিমেরুকেন্দ্রিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর ওই রাষ্ট্রটি গড়ে উঠেছিল, তা ভেঙে পড়ার পর তার উত্তরাধিকারী রাশিয়ার পক্ষে চটজলদি ধকল সামলে ওঠা সম্ভব ছিল না। কিন্তু এতদিনে তারা ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে, বিশ্বের জন্য এটা এক ধরনের আশার কথা। ইতিহাস বলে, পৃথিবীর বৃহত্তম (আয়তনে) এ দেশটি সব সময়ই বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের প্রভাব রেখে এসেছে, তা সে যুদ্ধবিগ্রহেই হোক কিংবা শিল্প-সাহিত্য ক্ষেত্রে হোক। কাজেই বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্য যে আর খুব বেশি দিন থাকছে না এটা প্রায় নিশ্চিত।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার আগ্রাসী সাম্রাজ্যবাদী নীতির কারণে এখন সারা বিশ্বে যুদ্ধবাজ হিসেবে পরিচিত। কিন্তু একটা সময় ছিল যখন দেশটির বৈদেশিক নীতি ছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯১৯ থেকে ১৯২২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থাকার নীতি গ্রহণ করেছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার পর যুক্তরাষ্ট্র তার সেই নীতি শুধু ত্যাগই করেনি, বরং অন্য দেশের ওপর হস্তক্ষেপ ক্রমে তার জাতীয় নীতিরই অংশে পরিণত হয়। ওই যুদ্ধের শেষ লগ্নে জাপানের দুটি শহরের ওপর যুক্তরাষ্ট্র আণবিক বোমা ফেলে যে ধ্বংসলীলা চালায়, সেই ঘটনার পেছনেও ছিল তার সাম্রাজ্যবাদী অভিলাষ। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্য ছিল জাপানের যুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশগ্রহণ প্রতিরোধ করা। এ প্রসঙ্গে নোবেল বিজয়ী ব্রিটিশ পদার্থবিদ অধ্যাপক পিএমএস ব্ল্যাকেট বলেছেন, ‘আণবিক বোমা নিক্ষেপের ঘটনা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ সামরিক প্রক্রিয়া নয়, বরং তা রাশিয়ার সঙ্গে কূটনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার প্রথম প্রক্রিয়া।’ আসলে যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর বিশ্বে তার সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে। কিন্তু এর মাত্র চার বছরের মাথায় সোভিয়েত ইউনিয়ন তার প্রথম পারমাণবিক বোমার পরীক্ষা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেই ইচ্ছায় বাদ সাধে।
স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর যুক্তরাষ্ট্র আশা করেছিল, বিশ্ব তার নির্দেশিত মুক্তবাজার ও উদার গণতন্ত্র বরণ করে নেবে। কিন্তু এটি উপলব্ধি করেনি যে, নিজ স্বার্থরক্ষায় ক্ষমতার প্রয়োগ অন্যদের মাঝে ক্ষোভের জন্ম দেবে। আসলে যুদ্ধ একটি সেকেলে ধারণা। প্রাগৈতিহাসিক কালে মানুষ খাদ্য ও আশ্রয়ের জন্য যুদ্ধ করেছে। মধ্যযুগে হালাকু খান-চেঙ্গিস খান আর রাজা-রাজড়ারা যুদ্ধ করেছে সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য। এরপর ব্রিটিশ, ফরাসি, পর্তুগিজ, ওলন্দাজ প্রভৃতি শক্তি বিভিন্ন দেশে উপনিবেশ স্থাপন করে শাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। ব্রিটিশরা এ উপমহাদেশে বণিকের বেশে এসে দু’শ বছর শাসন করেছে। তবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এসব শক্তির দখলমুক্ত হয়ে অধিকাংশ দেশ একে একে স্বাধীন হয়ে যায়। কাজেই বল প্রয়োগের সেই বাস্তবতা আজ আর নেই। সামরিক সম্ভারের বদলে গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও প্রযুক্তিই বর্তমানে শক্তির প্রকৃত মানদণ্ড।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের চিন্তা-চেতনায় এখনও শক্তি প্রয়োগের সেকেলে ধারণাই প্রাধান্য পাচ্ছে। সভ্যতা ও মানবকল্যাণে বিশ্বের এত অগ্রগতি সত্ত্বেও মানব ইতিহাসের প্রাথমিক যুগের সেই ‘জোর যার মুল্লুক তার’-এর ধারণাই আবার ফিরিয়ে আনা হচ্ছে যুদ্ধের উন্মাদনা দিয়ে- এটি সত্যিই লজ্জাজনক। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠার পেছনে মূল ভাবনা ছিল আগ্রাসী ও শক্তিধর দেশগুলোর কাছ থেকে দুর্বল দেশগুলোকে রক্ষা করা। সেই বিশ্ব সংস্থাকে সরাসরি অগ্রাহ্য করে যুক্তরাষ্ট্র ইরাকে হামলা চালিয়েছিল এবং এরপর সিরিয়ায় হামলা চালাতে উদ্যত হয়েছিল। দেখা যাচ্ছে জাতিসংঘ নয়, অপর একটি শক্তিই (রাশিয়া) যুক্তরাষ্ট্রকে সিরিয়ায় হামলা থেকে নিবৃত্ত করতে পেরেছে। অর্থাৎ নিরাপত্তার স্নায়ুযুদ্ধকালীন ডেটারেন্ট বা নিবৃত্তমূলক ধারণাই এখনও কাজ করছে। এর অর্থ হল, আমার কাছে পারমাণবিক অস্ত্র আছে, আমি শক্তিধর- তাই তুমি আমার ওপর হামলা চালাতে সাহস পাবে না কিংবা আমি কোনো হুমকি দিলে তুমি তাতে ভয় পেয়ে হুমকিকে আমলে নেবে। জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক আইন, বিশ্ব জনমত- এসব কিছুই নয়!
এর বিপজ্জনক দিকটি হল, এ ধারণা বিশ্বে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতার জন্ম দেবে। আসলে আঞ্চলিক পর্যায়ে এর কার্যকারিতা এখনও রয়েছে- যেমন দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত ও পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইল ও ইরানের মধ্যে এক ধরনের ডেটারেন্ট কাজ করে আসছে। তবে বৈশ্বিক পর্যায়ে রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আবার অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু হলে পারমাণবিক যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়বে। উন্নয়ন ও সামাজিক খাতে ব্যয় কমে যাবে। তবে এক্ষেত্রে ‘মন্দের ভালো’ দিকটি হল, বিশ্বে আবার শক্তির ভারসাম্য ফিরে এলে মার্কিন খবরদারি থেকে বিশ্ব কিছুটা হলেও রেহাই পাবে। আফগানিস্তান, ইরাক ও লিবিয়ার মতো ঘটনা সহসা আর ঘটবে না। অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশগুলোর নিরাপত্তাহীনতার ভাবনা কমে আসবে অনেকটাই।
আসিফ রশীদ : সাংবাদিক ও লেখক

পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূমি বিরোধ সমস্যা ও সম্ভাবনা

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ সরোয়ার হোসেন
জনসংখ্যার ক্রমবর্ধমান চাপ এবং বিগত বছরগুলোর অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও প্রবাসীদের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা ও গার্মেন্ট শিল্পে নিয়োজিত লাখ লাখ শ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রম বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। এই বিপুল জনসংখ্যার মৌলিক চাহিদা পূরণ করা রাষ্ট্রের একটি অন্যতম দায়িত্ব। এটা অনস্বীকার্য যে, এই বিশাল জনসংখ্যার খাদ্য ও আবাসনসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয়তা মেটাতে প্রতিনিয়তই আমাদের আবাদি জমির পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। তাই সার্বিক কল্যাণের জন্য আমাদের প্রাপ্ত সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা একান্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বদিকে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ এক অপার সম্ভাবনাময় অঞ্চল। দুর্ভাগ্যবশত, ভ্রাতৃঘাতী সশস্ত্র সংঘাত আর বিরাজমান ভূমি সমস্যার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম জাতীয় অর্থনীতিতে আশানুরূপ অবদান রাখতে পারছে না। ভূমি সমস্যার সমাধান বিলম্বিত হওয়ায় প্রত্যাশিত উন্নয়নও ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি ভূমি সমস্যা সমাধানে দীর্ঘসূত্রতা শান্তি চুক্তির মতো ঐতিহাসিক অর্জনকে খানিকটা ম্লান করেছে।
গত কয়েকশ’ বছর ধরে বিভিন্ন উপজাতি ও তাদের পূর্বপুরুষরা সীমান্ত অতিক্রম করে পার্বত্য এলাকায় প্রবেশ করে এবং বিশেষ বিধানের আওতায় এ অঞ্চলে বসবাস শুরু করে। ‘ঞযব ঈযরঃঃধমড়হম ঐরষষ ঞৎধপঃং জবমঁষধঃরড়হ, ১৯০০’ অনুযায়ী এ এলাকার জমির প্রকৃত মালিক জেলা প্রশাসক তথা সরকার। জমির ওপর উপজাতীয় জনগণের অধিকারের ভিত্তি বা যুক্তি যাই হোক না কেন এটা সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায়, উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর এই সনাতনী চিন্তা-ভাবনা এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা রক্ষায় প্রভাব বিস্তার করবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয়রা আজ থেকে কয়েকশ’ বছর আগে মূলত তৎকালীন বার্মা ও আরাকান বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে সীমান্ত অতিক্রম করে এ অঞ্চলে আগমন করে। একই সময়ে অর্থাৎ ১৬৬০ দশকের দিকে মোগলরাও এ এলাকায় আসে এবং বাণিজ্যিক প্রয়োজনে চট্টগ্রামের সমতল ভূমি থেকে বাঙালিদের এনে বসবাসের সুযোগ করে দেয়। মোগল ও ব্রিটিশদের পর পাকিস্তান সরকার পাহাড়িদের জমি ও আবাসস্থল থেকে উচ্ছেদ করে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করে। উচ্ছেদ-পরবর্তী সময়ে প্রদত্ত ক্ষতিপূরণের টাকা না পেয়ে উপজাতীয় জনগোষ্ঠী প্রচণ্ডভাবে সংক্ষুব্ধ হয়। এরই ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে পার্বত্য এলাকায় সশস্ত্র বিদ্রোহের কারণে বাংলাদেশ সবচেয়ে দীর্ঘ অভ্যন্তরীণ সমস্যায় জড়িয়ে পড়ে। যাই হোক, সার্বিক প্রেক্ষাপটে বিরাজমান ভূমি সমস্যাই এখন গুরুত্বপূর্ণ সংকট হিসেবে দেখা দিয়েছে। ভূমি ব্যবস্থাপনার সঠিক নিয়মনীতির অভাব, এ বিষয়ে সনাতনী চিন্তা-চেতনা, একাধিক নিয়ন্ত্রণ সংস্থা এবং সবশেষে সমতল ভূমি থেকে বাঙালিদের এনে পাহাড়ে পুনর্বাসনের সিদ্ধান্ত এ সমস্যাকে আরও প্রকট করে তোলে।
ভূমি সমস্যা নিরসনকল্পে বাংলাদেশ সরকার এরই মধ্যে একটি আইন পাস করেছে এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে প্রধান করে ভূমি কমিশন গঠন করেছে। পরপর চারটি কমিশন গঠিত হলেও অদ্যাবধি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধিত হয়নি। সম্প্রতি জনসংহতি সমিতি ‘ঈঐঞ খধহফ উরংঢ়ঁঃব ঝবঃঃষবসবহঃ ঈড়সসরংংরড়হ অপঃ ২০০১’ সংশোধনের কিছু প্রস্তাবনা দিয়েছে যা সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। অতি সম্প্রতি সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা মন্ত্রিপরিষদে অনুমোদনের মাধ্যমে ভূমি সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তদুপরি, ভূমি সমস্যা সংশ্লিষ্ট অন্তরায়গুলো সবার প্রজ্ঞা, সহনশীলতা ও সর্বোপরি দেশপ্রেম ছাড়া সমাধান করা কঠিন হতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের এক অনন্য সাধারণ ভূ-প্রাকৃতিক অঞ্চল, যেখানে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী ও বিভিন্ন শ্রেণী-গোত্রের মানুষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আর পাহাড়-লেক বেষ্টিত বৈচিত্র্যময় ভূমির অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটেছে। জনসংখ্যার জীবনযাত্রার মান পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত কয়েক বছরে এ অঞ্চল আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করেছে। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী পার্বত্য এলাকার মোট জনসংখ্যা ১৫ লাখ ৯৮ হাজার ২৯১ জন। বাঙালি ছাড়াও এখানে বিভিন্ন ধরনের ১৩টি উপজাতি বসবাস করে। এরা হচ্ছে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, মুরং, তঞ্চঙ্গ্যা, বোম, পাংখোয়া, খুমি, চাক, লুসাই, উসাই, বনযোগী ও খিয়াং। মোট জনসংখ্যার ৪৭ শতাংশ বাঙালি, ২৬ শতাংশ চাকমা, ১২ শতাংশ মারমা এবং ১৫ শতাংশ অন্যান্য উপজাতি। সব উপজাতির মধ্যে চাকমা উপজাতি শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধন-সম্পদে যথেষ্ট এগিয়ে আছে। ভূমি সমস্যা সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা লাভের জন্য এ অঞ্চলে উপজাতি জনগণের আগমন, ধারাবাহিক প্রসার আর ঐতিহাসিক বিবর্তন সম্বন্ধে জানা প্রয়োজন, যার কিছুটা এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগিজরা যখন বঙ্গোপসাগর এলাকায় আসেন, তখন আরাকান সাম্রাজ্য তাদের সহজ শর্তে চট্টগ্রাম অঞ্চলে অবস্থান করে ব্যবসা পরিচালনার অনুমতি দেয়। এর মাধ্যমে রেভেনিউ সংগ্রহ ছাড়াও আরাকান রাজা পরবর্তী সময়ে শক্তিশালী মোগলদের বিরুদ্ধে সমর বিদ্যায় পারদর্শী পর্তুগিজ বাহিনীকে কাজে লাগায়। ১৬০০ সালের শুরুর দিকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে কিছু ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী খাগড়াছড়ি এলাকায় আসে এবং সেখানে জুম চাষের মাধ্যমে জীবনযাপন শুরু করে। চাকমাদের আগমনের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকলেও কিছু কল্পকথা প্রচলিত রয়েছে, যার ব্যাপারে অনেক গবেষক একমত পোষণ করেন। ধারণা করা হয়, চাকমারা আরাকানের চম্পকনগর এলাকা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আসে। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে, ভারতবর্ষের বিহার থেকে আরাকান পর্যন্ত বেশ কয়েকটি চম্পকনগর রয়েছে। এমনকি রাঙ্গামাটিতেও চম্পকনগর নামক একটি জায়গা রয়েছে। মোগলদের আগমনের পূর্ব-অবধি চাকমা জাতির ইতিহাস কল্পনাপ্রসূত হলেও তা যুগ যুগ ধরে প্রচলিত। পৌরাণিক সূত্র মোতাবেক, বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রাজপুত্র বিজয়গিরী রাজ্য জয়ের জন্য একদা বিশাল সেনাবাহিনী নিয়ে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে পূর্বদিকে রওনা দেন। তিনি মেঘনা নদী অতিক্রম করে আরাকান রাজ্য জয় করে সেখানে চাকমা বসতি গড়ে তোলেন। তখন এ অঞ্চলটি ভারতের উত্তর ও পূর্বাঞ্চল থেকে প্রভাবশালী হিন্দু ও শক্তিশালী মুসলিম সভ্যতার প্রভাবে নিষ্পেষিত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের আশ্রয়স্থল হিসেবেই ব্যবহৃত হতো। এছাড়া বিভিন্ন পর্তুগিজ কলোনি যেমন- গোয়া, সেলন, কোচিন, মালাক্কা ও অন্যান্য জায়গার ফেরারি আসামিদের জন্যও এটি ছিল স্বর্গরাজ্য। যাই হোক, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আগমনের পর বিভিন্ন রেকর্ড, দলিল-দস্তাবেজ, মুদ্রা, ছবি ও কাগজপত্র থেকে এ জাতির ইতিহাস আরও গ্রহণযোগ্যতা ও স্বাতন্ত্র্য লাভ করে। এ এলাকার প্রথম ব্রিটিশ জেলা প্রশাসক Captain T.H. Lewin রচিত ‘The Hill Tracts of Chittagong and the Dwellers Therein’-এ লিপিবদ্ধ তথ্যাদি সে অর্থে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। ১৬৬০ সালের শুরুর দিকে বার্মা ও আরাকান বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত যুদ্ধ-বিগ্রহের জন্য চাকমারা নাফ নদীর অপর পাড়ে চট্টগ্রামের দক্ষিণে অবস্থিত রামু পুলিশ স্টেশনের কাছে আশ্রয় গ্রহণ করে। ১৬৫৭ সালে যখন ভারতবর্ষের সম্রাট শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন সিংহাসন দখলের জন্য তার চার পুত্র ভ্রাতৃঘাতী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৬৫৮ সালে শাহজাহান পুত্র বাংলার সুবেদার শাহ সুজা তার বড় ভাই আওরঙ্গজেবের কাছে ভারতের উত্তর প্রদেশের ‘খাওজা যুদ্ধে’ পরাজিত হয়ে চট্টগ্রামে পালিয়ে আসেন। তখনও চট্টগ্রাম তৎকালীন আরাকান রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী হিসেবে পরিচিত ছিল। আওরঙ্গজেবের প্রধান সেনাপতি মীর জুমলা সুজাকে হত্যার জন্য পিছু নেন। সুজার সঙ্গে তার অনুসারী সেনাবাহিনীর ১৮ জন সেনাপতি এবং লক্ষাধিক সৈন্য চট্টগ্রামের আনোয়ারায় অবস্থান নেয়। মীর জুমলা ঢাকা পৌঁছানোর পর সুজাকে আত্মসমর্পণের জন্য সংবাদ পাঠান। শাহ সুজা তার পরিবার ও অল্প কয়েকজন সৈন্য-সামন্ত নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে আরাকানের মোরোহংয়ে আশ্রয় গ্রহণ করাকেই বেশি নিরাপদ মনে করেন। মোগল বাহিনীর অন্য সহযোগীরা তখন রামুতে অবস্থান নিয়ে দিনাতিপাত শুরু করে। রমণী বিবর্জিত মোগল সৈন্যবাহিনীর সদস্যরা ধীরে ধীরে চাকমা রমণীদের সঙ্গে মিলেমিশে সংসার জীবন শুরু করে। তখন থেকে চাকমারা মোগল সেনাপতিদের রাজা হিসেবে গ্রহণ করে।
এদিকে আরাকানের বৌদ্ধ রাজা সান্ডা থুডাম্মা সুজার সুন্দরী মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে সুজা ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হন। এ নিয়ে আরাকান সীমান্তে পরিস্থিতির যথেষ্ট অবনতি ঘটে। বিয়ে নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার কারণে বৌদ্ধ রাজা সুজাকে সপরিবারে হত্যা করে। ফলে মোগল সৈন্য এবং আরাকান সৈন্যদের মধ্যে বহু খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ সংঘটিত হয়। মোগল সৈন্যরা তখন কৌশলগত কারণে রামু ছেড়ে আলীকদমের গহিন অরণ্যে আবাসস্থল গড়ে তোলে এবং চাকমারাও তাদের সঙ্গে এই এলাকায় এসে বসবাস শুরু করে। মোগল সৈন্যরা হজরত আলীর (রা.) অনুসারী ছিল। তারই নামানুসারে এই জায়গার নাম রাখা হয় আলীকদম, যা এখনও প্রচলিত। (চলবে)
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ সরোয়ার হোসেন, এইচডিএমসি, পিএসসি : পার্বত্য এলাকায় ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে কর্মরত

রাজনৈতিক অচলাবস্থায় সংলাপ বিতর্ক by ড. মিহির কুমার রায়

সংলাপ একটি কার্যকর মাধ্যম, যেখানে অনেক জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হতে পারে এবং একটি গ্রহণযোগ্য সমাধানেও উপনীত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। দেশের সুশীল সমাজ, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ, সমাজ সংস্কারক ও বুদ্ধিজীবীরা মনে করেন, সংলাপের বিষয়টি চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে অত্যন্ত জরুরি। বর্তমান মহাজোট সরকারের মেয়াদ আগামী অক্টোবরের শেষের দিকে সমাপ্ত হবে এবং সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হওয়ার কথা, যা জানুয়ারি ২০১৪-এর মধ্যে হতে হবে। তাহলে প্রশ্ন আসে, এ মধ্যবর্তী সময়ে কে বা কারা সরকার পরিচালনা করবে- রাষ্ট্রপতির আওতায় তার পছন্দমতো সর্বদলীয় নেতা-নেত্রীদের নিয়ে মাত্র তিন মাসের জন্য কোনো কেয়ারটেকার সরকার থাকবে নাকি আগের তিনটি সাধারণ নির্বাচনের মতো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত দেশ পরিচালিত হবে? এই জটিল সমস্যাটির এখন পর্যন্ত কোনো সমাধানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, বরং সরকারের মেয়াদ যতই শেষ হয়ে আসছে, ততই তারা কঠোর অবস্থানের দিকে যাচ্ছেন বলে প্রতীয়মান হয়।
সরকারের বক্তব্য হল, কোনো অসাংবিধানিক ব্যক্তি বা প্রক্রিয়ার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার কোনো ভিত্তি নেই এবং পরবর্তী সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি ছোট সরকার অন্তর্বর্তী সময়ের জন্য রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার সব ব্যবস্থাই সংবিধানে আছে এবং এ ব্যবস্থা আইনসঙ্গত ও বিশ্ব দরবারে গ্রহণযোগ্য। এ ব্যাপারে যদি বিরোধী দলের কোনো বক্তব্য থাকে, তবে সংসদে এসে তা উপস্থাপন করারও সুযোগ রয়েছে। এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন জনসভায় বলেছেন, ২৪ জানুয়ারির আগেই জাতীয় নির্বাচন বর্তমান কাঠামোতেই অনুষ্ঠিত হবে এবং তৃণমূল নেতাকর্মীদের সেভাবেই প্রস্তুতি নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন তিনি। এখন এ প্রক্রিয়ায় বিরোধী দল নির্বাচনে যাবে কি-না কিংবা বিরোধী দলবিহীন নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে কি-না অথবা সংলাপের মাধ্যমে বিরোধী দলকে নির্বাচনে রাজি করানো যাবে কি-না- এ বিষয়গুলো নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের ভাবনা কী, তা বোঝার কোনো উপায় নেই।
বিরোধী দলের মুখপাত্র বিএনপির মহাসচিব তার দলীয় কার্যালয়ে প্রায়ই বলছেন, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবেন না এবং চলতি সংসদ অধিবেশনে যদি এ ব্যাপারে কোনো বিল উত্থাপিত না হয় (সম্ভবত এটি এ সংসদের শেষ অধিবেশন) তাহলে সহিংসতার জন্য সরকার দায়ী থাকবে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বলছেন, বিরোধী দলের এই আন্দোলনের আইনগত কোনো ভিত্তি নেই। তাহলে সমস্যা সমস্যাতেই রয়ে গেল এবং এ ধারাবাহিকতায় নির্বাচন আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি-না, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে নানা সংশয় রয়ে গেছে। আর নির্বাচন এলেই দেশের ১৫ শতাংশ সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নানা আতংকের মাঝে দিন কাটায় অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে। এ পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনও সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন এবং সংলাপের মাধ্যমে সমস্যা নিরসনের আহবান জানিয়েছেন। মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্রায়ই বিভিন্ন ফোরামে দেশের রাজনীতি, গ্রামীণ ব্যংক পরিস্থিতি এবং আগামী নির্বাচন নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা বলে থাকেন। এতে করে দেশের ভাবমূর্তি বিদেশীদের কাছে ক্ষুণœ হচ্ছে এবং গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকে শংকিত। দুনেত্রীর বাক্যচয়নে প্রায়ই যে অশালীনতা লক্ষ্য করা যায় তা মূলত ব্যক্তিকেন্দ্রিক এবং দেশের মানুষকে তাদের রুচিবোধ নিয়ে প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়। যাই হোক, আমাদের রাজনীতিতে নেতৃত্বের যে মান, তা নিয়েই চলতে হবে এবং এর মধ্যেই সমাধান খুঁজতে হবে। বর্তমানে সংলাপই সমাধানের একমাত্র পথ। বিরোধী দল বলছে, সরকার সংলাপের পথে একমাত্র অন্তরায় এবং সংলাপের পরিবেশ তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে। তারা একদিকে সংলাপের কথা বলবে, অপরদিকে মামলা-হামলা করে বিরোধী দলকে পদদলিত করবে- একসঙ্গে এ দুটি কাজ চলতে পারে না। অপরদিকে সরকারি দল বলছে, সংলাপে বসতে হলে বিএনপিকে যুদ্ধাপরাধীদের পরিত্যাগ করতে হবে। এই যে পরস্পর বিপরীতমুখী বক্তব্য, তা একের প্রতি অন্যের আস্থাহীনতারই প্রকাশমাত্র।
ঈদের পর বিএনপি আর আন্দোলনে যায়নি। বিএনপির নীতিনির্ধারকদের ধারণা, তাদের জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে, বিশেষত পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনে তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের জয়ের পর তাদের এ ধারণা হয়েছে। সাধারণভাবে যদি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়, তাহলে তাদের জয়ের সম্ভাবনা অনেক বেশি। দেশের প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হক বলেছেন, বিএনপি এমনিতেই নির্বাচনে জয়লাভ করবে, যদি তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। তবে তাদের যে দাবি তার সমালোচনায় তিনি বলেছেন, বিএনপি কী ধরনের তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চায়, এখন পর্যন্ত তার কোনো রূপরেখা দিতে পারেনি। দফতরবিহীন মন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত বলেছেন, বিরোধী দলের আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই এবং শেষ মুহূর্তে তারা রাজি হয়ে যাবেন।
এই যে কথা চালাচালি চলছে, তা স্ব স্ব দলের রাজনৈতিক কৌশলমাত্র এবং এসব পথ পরিহার করে সরকারেরই উচিত সংলাপ আয়োজনে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করা। সেক্ষেত্রে এগোনোর রাস্তাটি কী হবে? তৃতীয় কোনো পক্ষের মধ্যস্থতার প্রয়োজন হলে পক্ষটি কে তা নির্ধারিত হয়েছে কি? যদি না হয়ে থাকে, তবে কোনো চেষ্টা চালানো হচ্ছে কি? এ প্রশ্নগুলোর জবাব খুঁজলে নিরাশ হতে হয়, যখন কোনো সমাধানের পথ খুঁজে না পাই। ক্ষমতার রাজনীতি এখানে খুবই প্রবল এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে নেতা-নেত্রীদের যে অঙ্গীকার, তা একবারে নেই বললেই চলে। সরকারের প্রতি কিছু পরামর্শ থাকবে। প্রথমত, সরকার হল দেশের ষোল কোটি মানুষের সরকার, এককভাবে কোনো দল বা গোষ্ঠীর সরকার নয়। এ কথাটি মনে রেখে সরকারকে সবার প্রতি সমান আচরণ করতে হবে। দেশের সুনাম কিংবা দুর্নাম প্রথমেই সরকারের ওপর আসে। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়টিতে সবসময়ই উদাসীন এবং আচরণে মনে হয়, তিনি শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে যারা বেশি সহনশীল, তাদের থেকে কয়েকজনকে নির্বাচিত করে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতার কৌশল নির্ধারণের দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে এবং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব এ কৌশল বাস্তবে রূপান্তরিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বিরোধী দলের মূল দাবিগুলো কী তা অনুধাবন করে কিভাবে আলোচনার সূচিতে সেগুলোকে আনা যায়, সে অনুশীলন করতে হবে। চতুর্থত, লাভ-লোকসানের সমীকরণ না করে সেগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়ে আগামী নির্বাচন সংক্রান্ত জনমনে যে সন্দেহের মেঘ সৃষ্টি হয়েছে, তা অবশ্যই কাটাতে হবে।
বিরোধী দলের প্রতিও কিছু পরামর্শ রাখতে চাই। প্রথমত, দেশের গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই- এ কথাটি স্মরণে রেখে তাদের এগোতে হবে। ১৮ দলের সর্ববৃহৎ শরিক দল বিএনপি তিনবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় ছিল এবং জাতির প্রতি তাদের দায়বদ্ধতা আছে বিধায় এ সুযোগটি হাতছাড়া করা ঠিক হবে না। কারণ সম্প্রতি স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের জয় সংসদ নির্বাচনে তাদের বিজয়ের সম্ভাবনাকে উজ্জ্বল করেছে। দ্বিতীয়ত, সংসদের চলতি অধিবেশনে বিরোধী দল আগামী নির্বাচনের রূপরেখার ওপর বিস্তারিত প্রতিবেদন উপস্থাপন করবে, যা একটি ভালো লক্ষণ। এরই মধ্যে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি দুনেত্রীকে সংলাপে বসার পরামর্শ দিয়েছেন। এখন সরকারি দল বিষয়টিকে কিভাবে নেবে তা দেখার বিষয়। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে সব দলকে এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
ড.মিহির কুমার রায় : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক

পাকা ফল বাদুড়ে খায় by ফরহাদ মজহার

সমাজে অর্থনীতিতে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে কী রাজনীতিতে যেসব সম্পর্ক আমাদের জাপটে ধরে রাখে, মুক্ত হতে দেয় না, আমি তা উপড়ে ফেলার পক্ষপাতী। কেবল তখনই নতুন কিছুর নির্মাণ সম্ভব। সে নতুনের রূপ কেমন হবে সেটা বর্তমানের ভেতরে থেকেই অনুমান ও চিহ্নিত করা সম্ভব। বর্তমানের মধ্যে কাজ করেই তাকে ‘বর্তমান’ করে তোলা যায়, বাস্তবায়নও সম্ভব। একসময় মনে করা হতো ইতিহাস সরলরেখার মতো। পেছনের যা কিছু সবই বাতিল করে দিয়ে আমরা শুধু সামনের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছি। সামনে এগিয়ে যাওয়া মানেই ‘আধুনিক’ হওয়া, প্রগতির অর্থও তাই। ইতিহাসের গতি রৈখিক, অর্থাৎ সরলরেখার মতো শুধু সামনে দিকে- এই চিন্তা ক্ষয়ে যাচ্ছে দ্রুত। ‘আধুনিক’ হওয়ার মধ্যে বিশেষ কোনো মহত্ত্ব নাই, ইতিহাস যদি সরলরেখা না হয়, তাহলে ‘প্রগতি’ কথাটাও অন্তঃসারশূন্য হয়ে ওঠে। তাগিদ বোধ করলে জনগণ তাদের অতীত ঐতিহ্য থেকেও নতুন কিছু করার তাগিদ বোধ করতে পারে।
সমাজে যখন নতুন সম্ভাবনা জেগে ওঠে, তাকে বিকশিত করতে না দিলে সে সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। এই পরিবর্তন আপসেআপ বা প্রাকৃতিকভাবে ঘটে না। সজ্ঞানে বা সচেতনভাবে সেই পরিবর্তন ঘটাতে হয়। বাংলাদেশে আমরা এ ধরনের একটি মুহূর্তের মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছি। বর্তমানের মধ্যে যে সম্ভাবনা রয়েছে তাকে শনাক্ত করা এবং তাকে ‘বর্তমান’ করে তোলার একটা কর্তব্য হাজির হয়েছে আমাদের সবার জন্য। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাবার জন্যই যা কিছু আমাদের জাপটে ধরে রেখেছে, সেই সব শৃংখল ভেঙে বেরিয়ে আসার ওপর আমি জোর দিয়ে থাকি।
ঐতিহাসিক পরিবর্তন একটি সচেতন কাজ। মানুষই সেই কাজটা করে। হতে পারে সেটা প্রাকৃতিক ইতিহাসের বিধিবিধানের অধীনতা মেনে। কারণ মানুষ প্রকৃতির অংশ, প্রকৃতির বাইরের কিছু নয়। ফলে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কেরও প্রাকৃতিক চরিত্র আছে। তাকে খেতে হয়, তার প্রয়োজনীয় উপকরণাদি তাকে প্রকৃতি থেকেই সংগ্রহ করতে হয়, কিংবা প্রকৃতিকে কখনও উৎপাদনের উপায়, কিংবা কখনও কাঁচামালের উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। করতে হয় ভোগের দ্রব্যাদি উৎপাদনের প্রয়োজনে। কিন্তু এ কাজকেও বিশুদ্ধ প্রাকৃতিক ব্যাপার বলা যায় না, তাই একে বলা হয় সমাজের মধ্যে থেকে সামাজিক উৎপাদন। ভোগ, উৎপাদন, বিতরণ ও বিনিময় সমাজের মধ্যেই ঘটে। মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্কই এই সামাজিক রূপ পরিগ্রহ করে। এই সম্পর্কই অর্থশাস্ত্রের বিষয়। এ শাস্ত্রের কাজ মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক বিচার। এই সম্পর্ককে যিনি সবার আগে সবচেয়ে সুনির্দিষ্টভাবে শনাক্ত করেছিলেন, তিনি কার্ল মার্কস। তিনি পথ দেখিয়েছিলেন কিভাবে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক বিচার করতে হবে যাতে এই সম্পর্কের বাধ্যবাধকতার অধীনে থেকেও মানুষ বর্তমানের সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে ইতিহাসের কর্তাশক্তি হতে পারে। আর, ইতিহাস অর্থ মানুষ ও প্রকৃতি উভয়েরই যুগপৎ ইতিহাস হয়ে ওঠা।
মার্কসের অর্থশাস্ত্রকে যে কারণে আসলে অর্থশাস্ত্র না বলে বলা যায় সম্পর্কশাস্ত্র : মানুষ ও প্রকৃতির সম্পর্ক বিচার। এ সম্পর্ককে শুধু উৎপাদনী বা অর্থনৈতিক সম্পর্ক হিসেবে নয় বরং অপরাপর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, আইনি, রাজনৈতিক ইত্যাদি নানা সম্পর্কের সামগ্রিকতা দিয়ে বোঝাটা রেওয়াজ। এই বিদ্যা আত্মস্থ করা গেলে কী ধরনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক একটি জনগোষ্ঠীর শক্তি ও সম্ভাবনাকে দাবিয়ে রেখেছে, কিভাবে তাকে উপড়ে ফেলতে হবে, পুরাতন সম্পর্কের জায়গায় নতুন কী ধরনের সম্পর্ক কায়েম দরকার, সেই লক্ষ্যে বাস্তবোচিত পদক্ষেপ কী হবে তার হদিস পাওয়া সম্ভব।
সাবেক সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর পতন ঘটেছে অনেক আগে; চীন সমাজতান্ত্রিক পথে নয়, এগিয়ে যাচ্ছে পুঁজিতান্ত্রিক পথে; ইউরোপীয় ‘আধুনিকতা’র বিপ্লবী প্রকল্পের সম্প্র্রসারণ হিসেবে যে ‘কমিউনিজমে’র সঙ্গে আমরা পরিচিত, ইউরোকেন্দ্রিকতার কারণে তার মতাদর্শিক ক্ষয়ও ঘটেছে। সেই ক্ষয় কাটিয়ে উঠতে হলে ইউরোপের বাইরে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে হবে। বাঁধাবুলি আউড়িয়ে কিংবা পুরনো কাসুন্দি ঘেঁটে এখনকার সংকটের সমাধান করা যাবে না। আমাদের নতুনভাবে ভাবতে শিখতে হবে। কিন্তু তারপরও কার্ল মার্কস আছেন দাপটের সঙ্গে। কারণ তাকে ছাড়া ইতিহাস বোঝা এবং ইতিহাসের অধিবাসী ঐতিহাসিক মানুষের কর্তব্য নির্ধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা সম্পর্কের জঞ্জাল থেকে মুক্তিও কঠিন হয়।
কেউ চাক বা না চাক ধর্ম রাজনীতিতে ফিরে আসছে শক্তিশালীভাবে। এই ফিরে আসার মোকাবেলায় ধর্মের বিরুদ্ধে ‘আধুনিকতা’, ‘প্রগতি’, ‘সভ্যতা’ ইত্যাদির পুরনো মতাদর্শিক বয়ান খাড়া করে করা যাবে না। যা আসলে পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক ও মতাদর্শিক আধিপত্যকেই নিশ্চিত করে। তারপরও ভাঙন ঠেকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। বিশ্বসভ্যতার ‘কেন্দ্র ’ হয়ে যে ‘আলোকিত ইউরোপ’ এতকাল মতাদর্শিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য বজায় রাখতে পেরেছিল, সেই কেন্দ্র থেকে ইউরোপের চ্যুতি ঘটা শুরু হয়েছে অনেক আগেই। এ বাস্তবতাকে হিসাবে নিতে হবে। ‘আলোকিত ইউরোপ’ এতদিন যা কিছু দাবিয়ে রেখেছিল তারা ফিরে আসছে আবার, কারণ তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা ফুরিয়ে যায়নি। বর্তমানে কী সেই ভূমিকা, সেটা শনাক্ত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
দুই
কথাগুলো তত্ত্ব আকারে বলা যত সহজ, কাজের পরিকল্পনা বা কর্তব্য আকারে হাজির করা কঠিন। কিন্তু আসলে কি তাই? বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতার কথাই বলা যাক। এটা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের জন্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনীতি চরম ক্ষতির কারণ হয়ে রয়েছে। যদি খুবই উদার রাজনীতির লক্ষ্যের দিক থেকে বিচার করি, তাহলে বাগাড়ম্বর বাদ দিয়ে বাংলাদেশের জন্য দরকারি কাজগুলো ভাবা ও সংখ্যাগরিষ্ঠ মত তৈরির চেষ্টা করা দরকার। বিশাল ও বকোয়াজিতে ভরপুর রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচির মতো নয়, বরং খুবই সংক্ষিপ্ত একটি তালিকা করা যাতে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে এবং দলীয় আনুগত্য নির্বিশেষে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ তা সমর্থন করে। রাষ্ট্র গঠনের পর্যায়ে ও রাজনীতিতে যেসব আবর্জনা জমেছে তাকে সাফ করতে হলে আমাদের ভাবতে হবে আমাদের আশু কর্তব্যগুলো কী।
এক. রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে অখণ্ডতা ও ঐক্য রক্ষা করা।
সারার্থ : বাংলাদেশ ছোট দেশ, অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল। যদি আন্তর্জাতিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় আমরা টিকে থাকতে চাই, তাহলে অভ্যন্তরীণ হানাহানি দ্বন্দ্ব^-সংঘাত বন্ধ করতে হবে। এর জন্য এক পক্ষের উগ্র বাঙালিত্ব আর অপর পক্ষের তার প্রতিক্রিয়ায় উগ্র মুসলমান হওয়ার পথ পরিহার করা ছাড়া অন্য কোনো পথ নেই। বাংলাদেশে শুধু বাঙালি বা মুসলমান নাই, অন্যান্য জাতিসত্তা ও অন্যান্য ধর্মের মানুষও বাস করে। এই দেশ তাদেরও মাতৃভূমি। যদি আমরা তা চাই তাহলে আমাদের বুঝতে হবে রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কিত পরিচয়টা হচ্ছে নাগরিকতার পরিচয়। এই পরিচয় অনুযায়ী বাংলাদেশ রাষ্ট্রে আমরা প্রত্যেকেই নাগরিক। এখানেই রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে আমরা এক ও অখণ্ড। বাঙালি বা মুসলমান হিসেবে নয়। বাঙালি হিসেবে আমার যা অধিকার, একজন সাঁওতাল, ম্রং কিংবা অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠীর মানুষেরও একই অধিকার। বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ বলে রাষ্ট্র তার প্রতি কোনো পক্ষপাত দেখাবে না। দেখানো ভুল নীতি। এতে রাজনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্য ক্ষুণœ হয়। ঠিক তেমনি মুসলমান এ দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও শুধু মুসলমানদের প্রতি রাষ্ট্রের পক্ষপাত রাষ্ট্রকে দুর্বল করবে। তারা যেমন রাষ্ট্রের নাগরিক, ঠিক তেমনি অন্য ধর্মাবলম্বীরাও। যারা ইসলামপন্থী রাজনীতি করেন, তাদের সচেতনতা ও সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে ইসলামী রাজনীতির উদ্দেশ্য কি ‘আধুনিক’ ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করা? এই তর্ক ইসলামপন্থী রাজনীতির খুবই সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ তর্ক। কিন্তু এ তর্কের মীমাংসা ছাড়া রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে বাংলাদেশ নিজের অখণ্ডতা ও ঐক্য রক্ষা করতে পারবে কি-না আমি সন্দেহ করি।
কিন্তু অখণ্ডতা ও ঐক্য রক্ষার জন্য শুধু চিন্তা-চেতনার দিক থেকে উগ্র বাঙালিবাদ বা উগ্র মুসলমানি পরিচয় পরিহারই যথেষ্ট নয়, নাগরিক ও মানবিক অধিকারের অলঙ্ঘনীয়তা কায়েম করা ছাড়া বাংলাদেশ টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। অর্থাৎ এমন একটি রাষ্ট্র আমাদের দরকার যে রাষ্ট্রের জাতীয় সংসদ, বিচার বিভাগ কিংবা নির্বাহী বিভাগের কারুরই কোনো ব্যক্তির নাগরিক ও মানবিক অধিকার হরণ ও লঙ্ঘন করার কোনো ক্ষমতা থাকবে না।
সামাজিক ক্ষেত্রে আমাদের নানা পরিচয় থাকতে পারে ও আছে। আমরা মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, নাস্তিক কিংবা অন্য যে কোনো পরিচয়ের অধিকারী হতে পারি। ধর্ম এ ক্ষেত্রে অবশ্যই সামাজিক, নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আরও বহুবিধ ভূমিকা পালন করতেই পারে। নতুন রাজনৈতিক মতাদর্শের পরিগঠনে ধর্ম দার্শনিক ও নীতিগত ভূমিকা রাখতেই পারে। কোনো অসুবিধা নাই। ‘ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার’ এই সে­াগানের মধ্যে ধর্মের সামাজিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ভূমিকা অস্বীকার করার নিয়ত নিহিত রয়েছে। ধর্মকে তার ভূমিকা পালন করতে দিতে হবে, এর অর্থ এই নয় যে, আমাদের ধর্মরাষ্ট্র কায়েম করতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজের পার্থক্য অস্পষ্ট থাকলে নানা বিভ্রান্তি ও বিভ্রান্ত সে­াগান তৈরি হয়। সমাজে ধর্ম পালনের এবং ধর্ম প্রচারের অধিকার থাকবে প্রত্যেকেরই। রাষ্ট্রকে তা নিশ্চিত করতে হবে। মূল যে বিষয়ে সিদ্ধান্ত স্পষ্ট থাকলে আমরা ঐক্য ও অখণ্ডতা রক্ষা করতে পারব সেটা হচ্ছে নাগরিকতা এবং নাগরিক ও মানবিক অধিকারের অলঙ্ঘনীয়তা। অন্য কিছু নয়।
দুই. সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফ কায়েম
সারার্থ : স্বাধীনতা ঘোষিত হয়েছিল ১০ এপ্রিল তারিখে। অধ্যাপক ইউসুফ আলী স্বাক্ষরিত ঘোষণায় পরিষ্কার উল্লেখ করা হয়েছে, ‘সাম্য মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণার্থে, সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্র রূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা করিলাম’। মনে রাখতে হবে, এ ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতেই মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল এবং এর জন্যই তিরিশ লাখ মানুষ প্রাণ দিয়েছে। এই ঘোষণার মধ্যে কোনো বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতা নাই। এমনকি শেখ মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে আসার পর যে সাময়িক সংবিধান দেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ১১ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে নিজের স্বাক্ষরে জারি করেন, তার মধ্যেও স্বাধীনতার এই ঘোষণাকেই স্বীকার করে নিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে সংবিধানকে দলীয় কর্মসূচিতে পরিণত করার চেষ্টা ও পাল্টা চেষ্টার মধ্য দিয়ে আমরা রক্তক্ষয়ী ৪২ বছর অতিক্রম করে এসেছি। এখন আমাদের হুঁশ হওয়া উচিত।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্রনৈতিক চিন্তার মধ্যে যে ঐক্য ও সংহতির বীজ রয়েছে, আমাদের সেই মুহূর্তগুলোর গুরুত্ব ও তাৎপর্য উপলব্ধি করতে হবে। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে নতুনভাবে গঠন করার সূত্র এখানে নিহিত রয়েছে। অর্থাৎ আমাদের দরকার নতুন একটি রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্রের ভিত্তি হচ্ছে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার বা ইনসাফ। এই কাজটিই এখন জরুরি।
তিন. পুঁজিতান্ত্রিক গোলোকায়ন মোকাবেলার জন্য শক্তিশালী শ্রমনীতি, কৃষিনীতি ও অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন
সারার্থ : এর মানে প্রথমত বাংলাদেশে পুঁজিতান্ত্রিক সম্পর্কের যে বিস্তার কাঠামোগত সংস্কার এবং দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের জবরদস্তিতে হয়েছে তার প্রতিরোধ করা। একে অনেক সময় নব্য উদারনীতিবাদ বলা হয়। নীতির বিরোধিতা করার অর্থ বাজার ব্যবস্থার বিরোধিতা করা নয়, কিংবা এখনই পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থা উৎখাত করে ‘সমাজতন্ত্র’ কায়েমও নয়, বরং সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশকে লুণ্ঠন ও মুনাফা কামাবার স্বর্গরাজ্যে পরিণত না করে প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বি^তামূলক বাজার ব্যবস্থাকে কাজ করতে দেয়া, যাতে বিনিয়োগ ও কাজের সুযোগ বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাগে বাংলাদেশের স্থান শক্তিশালী হয়।
দ্বিতীয়ত, কারখানা মালিকদের স্বার্থ রক্ষার মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ নিহিত- এই অবস্থান থেকে বেরিয়ে আসা। শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের স্বার্থ রক্ষার মধ্য দিয়েই সু®ু¤ বাজার ব্যবস্থার বিকাশ এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিস্তার সম্ভব। সব ধরনের কারখানা ও কাজের ক্ষেত্রে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার নিশ্চিত করা অবিলম্বে দরকার। পোশাক তৈরি কারখানায় পুড়িয়ে বা ধসে পড়া ছাদের তলে শ্রমিক হত্যা করার পরিস্থিতি বদলাতে হবে।
চার : প্রাণের সুরক্ষা এবং পরিবেশ, প্রাণবৈচিত্র্য ও প্রাণের ব্যবস্থাপনা মজবুত করা।
সারার্থ : অর্থনৈতিক বিকাশকে টেকসই করতে হলে তাকে পরিবেশসম্মত হতে হবে। বাংলাদেশ প্রাণবৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ দেশ। প্রাণ ও পরিবেশের সুরক্ষা অর্থনৈতিক বিকাশের জন্যও দরকার। সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা রক্ষার সঙ্গে পরিবেশ রক্ষার প্রশ্ন জড়িত। এ দিকগুলোর প্রতি গুরুত্ব কম দেয়া হয় বলে পরিবেশ দূষিত হয়ে চলেছে। যদি আমরা বেঁচেই থাকতে না পারি তাহলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিংবা রাষ্ট্রের রূপান্তরের কী আর মানে থাকতে পারে?
পাঁচ. জাতীয় প্রতিরক্ষার অংশ হিসেবে শক্তিশালী গণপ্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
সারার্থ : বাংলাদেশ অরক্ষিত। বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে অবশ্যই শক্তিশালী জাতীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের নাগরিকদের কুকুর-বেড়ালের মতো হত্যা করার যে চর্চা আমরা ভারতীয় বিএসএফের মধ্যে দেখি তাকে মোকাবেলার পথ এটাই। ফেলানীকে নিয়ে আমরা বিস্তর কাব্য রচনা ও ক্ষোভের প্রকাশ ঘটাতে পারি, কিন্তু ফেলানীরা মরবে যদি বাংলাদেশ নিজের সীমান্ত নিজে রক্ষা করতে অক্ষম হয়। মিয়ানমারও বাংলাদেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি। এ কারণে বাংলাদেশের সব নাগরিকের বাধ্যতামূলক সামরিক শিক্ষা একটি জরুরি দাবি।
এই পাঁচটি দাবি, কর্মসূচি নয়, কিন্তু এ মুহূর্তের দরকারি বিষয়। এ বিষয় নিয়ে আমরা ভাবতে পারি। এই কাজগুলো বাস্তবায়ন করতে হলে কী ধরনের আবর্জনা আমাদের সাফ করতে হবে সে সম্পর্কেও কিছু আগাম ধারণা করা দরকার।
বাংলাদেশের রাজনীতির যে অবস্থা তাতে নিশ্চিত বলতে পারি, এই দাবিগুলো পেকে গিয়েছে। অর্থাৎ এগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব। গ্রাম দেশে কিলিয়ে কাঁঠাল পাকানো নিয়ে মশকরা বাক্য ব্যবহারের রীতি আছে। আমি পাকা কাঁঠাল গাছ থেকে পাকাই পেতে চাই, অকালে গাছ থেকে কেটে এনে কিলিয়ে পাকাতে চাই না। সাধারণ মানুষের প্রজ্ঞা শুধু কিলিয়ে পাকানোর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নাই, গাছে পাকা ফেলে রাখলে কী ফল হয় সে সম্পর্কে তাদের নিরীক্ষণ চমৎকার। সে ক্ষেত্রে প্রবাদ হচ্ছে- পাকা ফল বাদুড়ে খায়। তার মানে ফল যদি পেকে গিয়ে থাকে, তাহলে তাকে গাছে রেখে দেয়া নিরাপদ নয়। পেড়ে ফেলতে হয়। নইলে বাদুড়ে খাবে। গাছে ফল পেকেছে, কিন্তু বাদুড়ে খেয়ে নেবে সেটা হয় না।
কথাটা বলছি এ কারণে যে, বাংলাদেশের এখনকার যে পরিস্থিতি তাতে তা যে কোনো দিকেই গড়াতে পারে। সেই দিক থেকে একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ মত তৈরির চেষ্টা আমাদের করা উচিত। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটি শক্তিশালী অংশ দীর্ঘদিন ধরে ‘তৃতীয় শক্তি’র উত্থান চাইছে। আওয়ামী লীগ বা বিএনপিকে মতাদর্শিক বা রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলার কোনো হিম্মত এদের নাই। এরা রাজনৈতিক দলও করে না। না করাটা দোষের নয়। তার পরও তারা ইতিবাচক রাজনীতির সহায়ক নানা সামাজিক ভূমিকা পালন করতে কিংবা বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান রাখতে পারে যাতে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার গুণগত রূপান্তরের বুদ্ধিবৃত্তিক শর্ত তৈরি হয়। কিন্তু সেই সব গঠনমূলক কাজের চেয়ে তাদের কাজ হচ্ছে রাজনীতির বিদ্যমান উদারনৈতিক বয়ানের মধ্যে ভাসা ভাসা কথাবার্তা বলা। এই অভ্যাস পরিহার করে উচিত কাজ হচ্ছে কী সম্ভব আর কী সম্ভব নয় তার একটি বাস্তবোচিত মূল্যায়ন। তারা জানে শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে এবং ‘তৃতীয় শক্তি’র আবির্ভাবের সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেয়া যায় না। পাশ্চাত্য দেশগুলোর সহায়তা ছাড়া সেটা সম্ভবও নয়। জাতিসংঘের ভূমিকা আরও গণ নজরদারির মধ্যে রাখা দরকার।
কিন্তু অনেক কিছুই পেকে গেছে, পেড়ে ফেলা দরকার। পাকা ফল যেন বাদুড়ে নিয়ে না যায়, সে ব্যাপারে যারা দেশের মানুষের জন্য কাজ করেন সেই দিকে নজর রাখবেন আশা করি।
সর্বোপরি দরকার নিজদের ঐক্য ও অখণ্ডতা রক্ষার জন্য চেষ্টা করা। এই আকুতিই হয়তো আমাদের সঠিক পথ দেখাবে।