Friday, January 3, 2014

কুতুবদিয়ায় চুরির উপদ্রপ আশঙ্কাজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে

কুতুবদিয়ায় চুরির উপদ্রপ আশঙ্কাজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিগত এক সপ্তার মধ্যে উপজেলা সদর বড়ঘোপে ৪/৫টি ঘর-দোকান চুরির অভিযোগ পাওয়া গেছে। হাতেনাতে চোর ধৃত করে জেলে দিলেও চুরির মাত্রা কিছুতেই কমছেনা।
শুক্রবার গভীর রাতে একদল চোর শিঙ্গগর্ত করে বড়ঘোপের রোমাই পাড়ার আজিজুল হক’র পুত্র আবদুল মালেক’র ঘরে হানা দিয়ে নগদ ৯০ হাজার টাকা, সাড়ে ৫ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও ফিশিংবোটের মিশিনারী যন্ত্রপাতি নিয়ে গেছে। আশপাশের লোকজন টের পেয়ে স্থানীয় দিদারুল ইসলাম নামের এক চোরকে হাতেনাতে ধৃত করলে পুলিশ গিয়ে তাকে থানায় নিয়ে যায় দাবী করে দু’সপ্তাহ আগেও একই বাড়ীতে চুরি সংঘটিত হয় বলে গৃহকর্তা আবদুল মালেক জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে পশ্চিম আমজাখালীর মৃত ছালামত খান’র বসতঘরে দুর্ধর্ষ চুরি সংঘটিত হয়েছে। চোরের দল ঘরের জানালার গ্রিল কেটে আলমিরায় রক্ষিত ৮ভরি স্বর্ণ, ২শ’ তোলা রুপা ও একটি মোবাইল সেট নিয়ে যায়। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৬লাখ টাকা বলে জানান, সত্তরঊর্ধ গৃহকর্তা বৃদ্ধ মাজেদা বেগম। জানালার গ্রিল কাটা, তালা ভাঙ্গা আলমিরা এবং কাপড়-চোপড় ছিটানো-ছটানোর চিত্র সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে। এক সপ্তাহ আগেও একই এলাকার প্রতিবেশী বদিউল আলম মাঝির বসতঘর ও বড়ঘোপ বাজারের মেসার্স আলহাজ্ব আল-বেলা ক্লথ ষ্টোরে চুরি সংঘটিত হয়। এ সময় সোহেল নামের এক চোরকে হাতেনাতে ধৃত করে শ্রীঘরে প্রেরণ করা হয় বলে জানা গেছে। এ নিয়ে মামলা ও জিড়ি হয়েছে বলে থানা সূত্রে জানা গেছে। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন স্থানীয় চেয়ারম্যান আলহাজ্ব শাকের উল্লাহ, মেম্বার নাছির উদ্দিন ও মুহম্মদ হোছাইন প্রকাশ বাদশাহ্ বহদ্দার।

সরল গরল- দশম সংসদ বৈধতা পাবে না by মিজানুর রহমান খান

বৈধতার প্রশ্ন উঠেছে এবং ৫ জানুয়ারির পরে কেবল রাজনৈতিক বৈধতা নয়, সাংবিধানিক বৈধতার প্রশ্নও উঠবে। ইতিমধ্যে দিল্লিতে গত ৩১ ডিসেম্বর ভারতীয় সাংবাদিকেরা তাঁদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্রের কাছে বৈধতার প্রশ্ন তুলেছেন।
প্রশ্নটি সরল, কিন্তু উত্তর গরল। তাই মুখপাত্র এর উত্তর দেননি। তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ‘জনাব, ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশে নির্বাচন হচ্ছে। এখন এটা স্পষ্ট যে বিরোধী দল অংশ নিচ্ছে না। এই নির্বাচনের বৈধতার প্রশ্নে আমাদের কি কোনো মন্তব্য রয়েছে?’ মুখপাত্রটি প্রবাদের ‘গরু রচনা’ মুখস্থ বলেছেন। জবরদস্তি গরু টেনে নদীতে ফেলেছেন। বলেছেন, ‘এতে বিস্ময়ের কিছু নেই যে, দুই দেশের ভালোমন্দে পরস্পরের বৈধ স্বার্থ রয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে আবারও বলেন, ‘সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণেই নির্বাচন হচ্ছে। সরে যাওয়ার উপায় নেই।’
জেনারেল ক্লজেজ অ্যাক্ট দিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পর ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল করা হয়েছিল। এবারও তা করা সম্ভব। অনেকে বলছেন, ঘড়ির কাঁটা ৫ জানুয়ারি পেরোলেই কেল্লা ফতে। বিএনপি বা অন্য কেউ নির্বাচন বাতিলের কথা মুখে আনতে পারবে না। কিন্তু আমরা যদি বাংলাদেশের সাংবিধানিক চেতনা বিবেচনায় নিই, যদি মনে রাখি বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ছাড়াও দেশে বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ বিচারপতি ছিলেন এবং আছেন, তাঁদের লেখা রায়গুলোও প্রজাতন্ত্রের প্রচলিত আইন, তাহলে অন্তত আর যা-ই হোক, আমাদের সংবিধান দেখানো হবে না। আমাদের ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়ের ভয় দেখানো হবে না।
১ জানুয়ারি সজীব ওয়াজেদ জয় বৈশাখী টিভির এক প্রশ্নের উত্তরে বললেন, ‘এই নির্বাচন সংবিধানের চেতনার বিরুদ্ধে যায় না।’ এটা সর্বৈব অসত্য। এর আগেও নির্দিষ্টভাবে বলেছি, দরকার হলে আরও অনেক রায় দিয়ে প্রমাণ করতে পারি, এই নির্বাচন সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে ধ্বংস করছে। এমনকি নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির সপক্ষে ফেনা তোলা রায়গুলোরও পরিপন্থী।
জয় বলেছেন, বিএনপির জন্য সংবিধান সংশোধন কমিটি দুই বছর নাকি বসে ছিল। ধরে নিলাম সত্য। চাইলে ২৪ জানুয়ারির মধ্যে সংবিধানের নতুন সংশোধনী আনা যাবে। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন করে ফেললেও এতে কোনো বাধা সৃষ্টি হবে না। সংবিধানে আরও ঘাপলা আছে। সংবিধান রক্ষা নিয়ে ফেনা তুলছে অথচ তারা একটি সংশোধনী আনতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। নবনির্বাচিতদের শপথ পড়ানো নিয়ে সংবিধানে সংঘাতপূর্ণ বিধান আছে। ৫ জানুয়ারির পরে তারা চাইলে একটা সংশোধনী আনতে পারে। অন্যথায় বশংবদ ইসির আনুকূল্যে নবনির্বাচিতরা সংঘাত মাড়িয়ে শপথ পড়বেন।
‘সংবিধান অনুযায়ী’ কথাটা যদি প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মিত্রদের শর্ত ছাড়াও যুক্তিসংগত ও গ্রহণযোগ্য বলে ধরে নেওয়া যায়, তাহলে মানতে হবে নির্বাচন কমিশন ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পরও গোটা নির্বাচন বাতিল করার এখতিয়ার রাখে। এর আগে দেখিয়েছি, কী করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল করে আগামী এপ্রিলের মধ্যে নির্বাচন করা যায়। ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন ১ জানুয়ারি চ্যানেল আইয়ে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনের জটিলতার কথা বলেছেন। কিন্তু এটাকে এখন জটিল বলা যাবে না। উতরানো সম্ভব।
যাক এবার বলি, ৫ জানুয়ারির পর কী হবে? নির্বাচন কমিশন ওই দিন বা তার পর যেকোনো দিন নির্বাচন বাতিল করতে পারবে। আমরা এটাও মনে রাখব, তারাও নির্দিষ্টভাবে বেআইনি কাজ করেছে। বর্তমান তফসিল সেই বিচারে অবৈধ। ঋণখেলাপিদের টাকা জমা দেওয়া ও তাঁদের মনোনয়নপত্র দাখিলের মধ্যে সাত দিন সময় রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু তারা তা খেয়াল করেনি। নির্বাচন কমিশনের সবারই এটা জানা। কিন্তু চুপচাপ আছে।
২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত দশম সংসদের কাউকেই সংসদ সদস্য বলা যাবে না। ২৫ জানুয়ারির আগে তাঁরা কেউ কার্যভার গ্রহণ করতে পারবেন না। এটা নির্দিষ্টভাবে বলা আছে। তাই এই বিধান অমান্য করা যাবে না। তাই প্রধানমন্ত্রীকে দশম সংসদের নেতা হতে হলে ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে।
এটা পরিহাস যে, সামরিক শাসকদের দ্বারা ডকট্রিন অব নেসেসিটি দিয়ে এ দেশ চলেছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট বলে দিলেন, এই মতবাদটা কেবল সামরিক শাসকের নয়, এটা বেসামরিক শাসকেরাও ব্যবহার করতে পারেন।
আমরা আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে লিখেছি, ‘আমরা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ’। দশম সংসদ নির্বাচনের সদস্যরা চক্ষুলজ্জা ঝেড়ে বড় গলায় কি ওইভাবে বলতে পারবেন যে, আমরা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ?
দশম সংসদের নির্বাচিতদের ম্যান্ডেট কী? তাঁরা পাঁচ বছর কোন নৈতিকতা ও কর্তৃত্বে দেশ চালাবেন? আমরা জানি না। জেনারেল ইয়াহিয়াও কার্যত বলেছিলেন, একসঙ্গে দুটি দিতে পারব না। একটি নিতে হবে। পশ্চিম পাকিস্তানি নাগরিকদের একটি বড় অংশ নিশ্চয় মুজিবকে ঠকিয়ে নিজেদের বড় বুদ্ধিমান ও দূরদর্শী ভেবেছিল। তারা আসলে গণতন্ত্র বিসর্জন দিয়ে ‘স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব’কে অর্জন ভেবেছিল। তারা ভাবতেও পারেনি গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এটা পৃথক করা যায় না। পানি দুই ভাগ করা যায় না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কোনো খণ্ডন, রদ, স্থগিত কিংবা সাহাম (ন্যায্য অংশ) চলে না।
ক্ষমতাসীনেরা বলছেন, দশম সংসদ নিয়ে আর সংলাপ চলে না। একাদশ সংসদ নিয়ে সংলাপ হতে পারে। শাসকগোষ্ঠী এক মুখে ‘সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার’ কথা বলছে। অন্য মুখে আবার আগাম বা মধ্যবর্তী নির্বাচনের কথা বলছে। কতক্ষণ বলছে, এখন আর সংসদ ভেঙে ৯০ দিন সময়ের সুযোগ গ্রহণ করা যায় না। কারণ, সংবিধান তা সমর্থন করে না। তাই এখন আর সমঝোতার জন্য কান্নাকাটি বৃথা। সমঝোতা নয়, সংবিধান বড়।
সম্প্রতি কারাবরণকারী বিএনপির একজন নেতা আমাকে বলেছিলেন, তাঁর সঙ্গে ভারতীয়দের কথা হয়েছে। তিনি ১৯৯৬-এর মডেলে সমাধানের আভাস দিয়েছেন। এরপর খালেদা জিয়াকেও সেই আভাস দিতে শুনলাম। তিনি নিয়মরক্ষার নির্বাচন হিসেবে মেনে নেওয়ার স্পষ্ট আভাস দিয়েছেন।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী পাঁচ কোটির বেশি ভোটারের এই অধিকার অগ্রাহ্য করে ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচনকেই বড় করে তুলেছেন।
পিপলস ইউনিয়ন ফর লিবার্টিস মামলায় ভারতীয় বিচারপতি ধর্মাধিকারী বলেছেন, ‘কোনো নির্বাচনে একজন নাগরিকের অংশগ্রহণ এবং তার পছন্দের প্রার্থীকে বাছাই করা এমন একটি অধিকার, যা গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে দেওয়া তার ভোট দেওয়ার অধিকার থেকে ভিন্ন।’ অথচ ৫ জানুয়ারি সংবিধান চুলোয় দিয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ নিয়ে তাঁরা ঝাঁপিয়ে পড়ছেন।
কুলদীপ নায়ারের মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছিলেন, ‘বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে সংসদ সদস্যদের কেবল প্রত্যক্ষ ভোটেই বেছে নেওয়া হয়।’ অন্তত স্বীকার করুন দেশটা গণতান্ত্রিক নয়। তার পরে নির্বাচন করুন।
ভারতের প্রধান বিচারপতি পি সত্যশীবম, বিচারপতি রঞ্জন প্রকাশ দেশাই, বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ গত ২৭ সেপ্টেম্বর অভিমত দেন যে, ‘গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে এটা অপরিহার্য যে দেশের যথাযথ শাসনের জন্য সবচেয়ে সম্ভাব্য ভালো লোককেই জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে হবে।’
বিএনপি-জামায়াতের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীনদের আনা অভিযোগের বিরোধিতা না করেও এটা মানতে হবে যে ক্ষমতাসীন দল ও ইসি ভালো লোককে বাছাই করার রক্ষাকবচ দিতে পারেনি। তাই সংবিধানের গান গাওয়া আর গণতন্ত্রকে বাঁচানো এক নয়।
সংসদের বৈধতার প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত একটি দূরদর্শী উক্তি করেছিলেন। সংবিধান সংশোধন কমিটির সভায় শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে ২০১১ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি বলেছিলেন, ‘আমি দুটি সংসদ অবৈধ ঘোষণার সুপারিশ করি। কারণ, ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে ৫ শতাংশ লোকও ভোট দেয়নি। এ দুটি বাতিল করলে ওই সংসদের করা সব সংশোধনী অটোমেটিক্যালি বাতিল হবে।’ অর্থাৎ, এটা মানলে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল হতো। আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে যা করা হলো, তার তুলনায় এটা ছিল উত্তম সুপারিশ। তিনি এটা কেবল সভাতেই বলেননি, ২০১০ সালের ৮ আগস্ট চিঠি লিখেও কমিটিকে জানিয়েছিলেন।
এটা অগ্রাহ্য করা হয়েছে, কারণ শাসকের শঠতাপূর্ণ আঁতাত দুই নেত্রী টলাতে চান না। তাই মুহিত-ফর্মুলা উপেক্ষিত হয়েছিল। সে কারণেই বিএনপির নেত্রী অত সহজে দশম সংসদকে ‘নিয়মরক্ষার’ নির্বাচন হিসেবে মেনে নেওয়ার উপায় বাতলাতে পারেন। তাই তারা ক্ষমতায় গেলে দশম সংসদকে অবৈধ ঘোষণা করবে না। কিন্তু গণতন্ত্রের শিকড় গভীরে নিতে হলে সত্যিকারের নির্বাচিত সংসদকেই কোনো না কোনো দিন উপযুক্ত পরিবেশে এটা করতে হবে। আমরা ১৯৮৮ ও ১৯৯৬-এর সংসদকে অবশ্যই অবৈধ মনে করি। ৫ জানুয়ারির সংসদও বৈধতা পাবে না।

মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক।
mrkhanbd@gmail.com

বিশ্বসেরা সাহিত্য সাময়িকী by অর্পিতা নুজহাত

সাহিত্য পত্রিকা বা সাময়িকী বৃহত্তর অর্থে সাহিত্যের পর্যায়ক্রমিক বা ধারাবাহিক একটি প্রকাশনা। সাহিত্য সমালোচনা, বই পর্যালোচনা, লেখকের জীবনী, সাক্ষাৎকার, গদ্য, ছোট গল্প, কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশসহ শিল্পকলা, সাহিত্য, দর্শন, রাজনীতি, সমাজচিন্তা ও নিরীক্ষামূলক লেখালেখি প্রকাশ করা হয় সাহিত্য পত্রিকা বা সাময়িকীতে। সাহিত্য পত্রিকা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অলাভজনক, কিন্তু এর পরিবর্তে বিভিন্ন ধরনের বড় ও বাণিজ্যিক পত্রিকার সঙ্গে একটি বৈপরীত্য রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই অপ্রাতিষ্ঠানিক। দীর্ঘ সময় ধরে প্রকাশ হচ্ছে এমন কয়েকটি বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্য পত্রিকা নিয়ে আজকের আয়োজন। এমন আরও অনেক সাহিত্য পত্রিকা বা সাময়িকী রয়েছে, যেগুলো নিয়ে স্বল্প পরিসরে আলোচনা সম্ভব নয়।
দ্য প্যারিস রিভিউwww.theparisreview.org
দ্য প্যারিস রিভিউ। বিশ্বজুড়ে খ্যাতি রয়েছে ত্রৈমাসিক এ ম্যাগাজিনটির। শিল্প-সাহিত্যের সব শাখাতেই বিচরণ এর। এটি প্রথম প্রকাশ হয় ১৯৫৩ সাল থেকে। ইংরেজি ভাষার এ পত্রিকাটি নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত হচ্ছে। ওয়েবসাইট www.theparisreview.org। বর্তমানে এর সম্পাদক হচ্ছেন লরিন স্টেইন। বিশ্বের অন্যতম সেরা এ সাময়িকীটিতে লিখেছেন বিশ্বের বেশিরভাগ সেরা লেখক। কালে কালে প্যারিস রিভিউ নিজেকে বিশ্বের সেরা সাহিত্য ম্যাগাজিনগুলোর অন্যতম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
জ্যাক কেরুয়াক। ফিলিপ লারকিন, ভিএস নাইপল, ফিলিপ রথ, আদ্রিয়ানো রিচ, ইতালো ক্যালভিনো, স্যামুয়েল বেকেট, নর্ডিন গর্ডিমার, জাঁ জ্যানেট রবার্ট ব্লাই থেকে শুরু করে বিশ্বের হালের উঠতি লেখকরা! কে লেখেননি এতে_ প্যারিস রিভিউর ধারাবাহিক পর্যালোচনাগুলো বিশ্বের বোদ্ধা ও পাঠক মহলে অত্যন্ত গুরুত্ব পেয়ে আসছে। এ ছাড়াও 'রাইটার্স অ্যাট ওয়ার্ক' সিরিজে এজরা পাউন্ড আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, ট্রুম্যান ক্যাপোটি, জোয়ান ডিডিওন, টিএস ইলিয়ট, রালফ এলিসন, উইলিয়াম ফকনার, আরউইন শ, এলিজাবেথ বিশপ এবং ভ্লাদিমির নভোকভসহ বিশ্বের সেরা কবি-লেখকরা এ সিরিজে লিখেছেন। এই রিভিউ বিশ্বের সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ ইতিহাসে একক সবচেয়ে ধারাবাহিক ও উল্লেখযোগ্য হিসেবে ধরা হয়।
প্যারিস রিভিউ প্রথম প্রকাশের সময় এক ঘোষণায় বলা হয়, প্যারিস রিভিউ সৃজনশীল কর্ম কথাসাহিত্য এবং কবিতার ওপর জোর দিয়ে থাকবে, তবে অবশ্যই সমালোচনা বাদ দিয়ে নয়। নিছক সমালোচনার জন্য সমালোচনা নয়। একটি ছোট্ট রুমে প্রথম পত্রিকাটির কাজ শুরু হয়। মজার বিষয় হচ্ছে, এর কর্মীদের কাউকে অফিসের চাবি দেওয়া হয়নি। তাই কেউ যদি দেরি করে আসতেন তবে তাকে কয়েক ধাপ দেয়াল বেয়ে উঠে জানালা দিয়ে প্রবেশ করতে হতো।
এর প্রথম প্রকাশক ছিলেন প্রিন্স সদরুদ্দিন আগা খান। রিভিউর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিউমস মাতিসিঁ। অর্থ সংকটে ভাড়া বকেয়ার কারণে প্রায়ই অফিস পরিবর্তন করতে হতো তাদের। এ ছাড়া পানি, বিদ্যুৎ, টেলিফোনসহ বিভিন্ন সেবা বন্ধ করে দেওয়া তো ছিল প্রায় নিত্যঘটনা। প্যারিস থেকে এটি প্রথম যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর করা হয় ১৯৭৩ সালে। নিউইয়র্ক সিটির প্লিম্পটনের ৭২ স্ট্রিট অ্যাপার্টমেন্টের বেসমেন্ট ও প্রথম তলা তারা স্থায়ী প্রধান অফিস হিসেবে নেয়। ২০০৭ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে এক নিবন্ধে দাবি করা হয় মাতিসি ছিলেন সিআইএর চর।
টাইম ম্যাগাজিন একে ইতিহাসের সেরা লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে উল্লেখ করে। বুকার জয়ী লেখক মার্গারেট অ্যাটউড বলেন, ২০ শতকে সত্যিকারের হাতেগোনা কয়েকটি সাহিত্য পত্রিকার একটি দ্য প্যারিস রিভিউ। আর ২১ শতকে তো বটেই।
প্রথমদিকে যেসব কবি-লেখকের সাক্ষাৎকার ছাপে তারা, তার মধ্যে আছেন ডবি্লউএইচ অডেন, জন ব্যারিম্যান, সৌল নর্দন, হোর্হে লুইস বোরহেস, উইলিয়াম এস বারোজ, ট্রুম্যান ক্যাপোটি, জন শিভার, আইজাক ডিনেসেন, টিএস এলিয়ট, রবার্ট ফ্রস্ট, অ্যালেন গিন্সবার্গ, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, জ্যাক কেরুয়াক, হেনরি মিলার, ডরোথি পার্কার, হ্যারল্ড পিন্টার, এজরা পাউন্ড, আরউইনশ, জন আপডাইক, কার্ট ভনগার্ট উইলিয়াম, কার্লোস উইলিয়ামসসহ অনেকে।
সাম্প্রতিক সময়ে উডি অ্যালেন, মায়া অ্যাঞ্জেলু, জেমস বল্ডউইন এলিজাবেথ বিশপ, রে ব্রাডবুরি, জোসেফ ব্রডস্কি, রেমন্ড কার্ভার সিমাস হিনি, মিলান কুন্ডেরা, মারিও ভার্গাস য়োসা, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, আর্থার মিলার, হারুকি মুরাকামি, ফিলিপ রথ, সালমান রুশদী, লিডিয়া ডেভিস উল্লেখযোগ্য।
হারপারস ম্যাগাজিনwww.harpers.org
শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক বিশ্বের অন্যতম মাসিক পত্রিকা হারপারস ম্যাগাজিন। এর সম্পাদক এলেন রোজেনবার্গ। ১৮৫০ সালে নিউইয়র্ক থেকে এটি যাত্রা শুরু করে। হারপার ম্যাগাজিন ফাউন্ডেশন থেকে এটি প্রকাশ করা হয়। হারপার বাজার হারপার কলিন্সেরসহ প্রতিষ্ঠান। এটি বর্তমানে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়ে আসছে বিশ্বের এমন পত্রিকাগুলোর মধ্যে এটি দ্বিতীয় প্রাচীনতম। প্রথম সংখ্যায় এটি ছাপা হয় সাড়ে সাত হাজার কপি, যার সবই বিক্রি হয়ে যায়। ৬ মাসের মধ্যেই এর প্রচার সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। হারপারের লেখকরা হচ্ছেন_ চার্লস বাউডেন, নোয়াম চমস্কি, উইনস্টন চার্চিল, স্টিফেন এ ডগলাস, রবার্ট ফ্রস্ট, শেইমুর হার্স, হেনরি জেমস, নাওমি ক্লেইন, জ্যাক লন্ডন, স্ট্যানলি মিলগ্র্যাম, জন স্টুয়ার্ট মিল, জন মুর, সিলভিয়া প্লাথ, থিওডোর রুজভেল্ট, জে ডি সালিঙ্গার, জেন স্মাইলি, জেডি স্মিথ, জন স্টেইনব্যাক, হেনরি এল খাজা, আলফ্রেড টমাস, সুসান স্ট্রেইট, সারা টিসডেল, হান্টার এস থম্পসন, মার্ক টোয়েন, রেবেকা কার্টিস, জন আপডাইক. কার্ট ভনগার্ট, ডেভিড ফস্টার ওয়ালেস, ই বি হোয়াইট, উড্রো উইলসন প্রমুখ।
নিউইয়র্কার ম্যাগাজিনww.newyorker.com/magazine
বিশ্বব্যাপী বহুল আলোচিত ম্যাগাজিন নিউইয়র্কার। বলা হয়ে থাকে, এটি বিশ্বের প্রথম সফল সাহিত্য ম্যাগাজিন। এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হ্যারল্ড রস এবং জেইন গ্রান্টা দম্পতি। ১৯২৫ সাল থেকে প্রকাশিত এই সাহিত্য জার্নালটি পাঠকদের দিয়ে আসছে ভিন্ন স্বাদ। গত ৮ দশকে এই ম্যাগাজিনটিতে লিখেছেন ইবি হোয়াইট, ডরোথি পার্কার, উইলিয়াম বাটলার, ইয়েটস, জন শিভার, ভ্লাদিমির নভোকভের মতো বিখ্যাত লেখক। কার্টুন ছেপে বিশ্বব্যাপী বেশ কয়েকবার আলোড়ন সৃষ্টি করেছে নিউইয়র্কার। বর্তমানে পত্রিকাটির সম্পাদক রেমনিক। এর প্রচার সংখ্যা ১০ লাখের বেশি। সাহিত্যের সব শাখা ছোটগল্প, কবিতা, উপন্যাস, স্যাটায়ার, কার্টুনসহ সব ধরনের লেখা প্রকাশ করে নিউইয়র্কার। যদিও এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিল লেখকদের ভিন্ন স্বাদের হাস্যরসাত্মক লেখার মাধ্যমে সাহিত্য পাঠে আগ্রহী করে তোলা।
টিনহাউস ম্যাগাজিনwww.tinhouse.com
১৯৯৯ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় ত্রৈমাসিক এই সাহিত্য পত্রিকাটি। বর্তমানে এর সম্পাদক জয় ম্যাককরমিক। টিন হাউস কথাসাহিত্য এবং কবিতা উভয় প্রকাশ করলেও বিখ্যাত লেখকদের অপ্রকাশিত লেখা প্রকাশে সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ একটি সাহিত্য পত্রিকা হিসেবে চিহ্নিত। এ ছাড়াও ব্যতিক্রমী ও উপেক্ষিত লেখকদের লেখা প্রকাশ করে পত্রিকাটি। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে এটি।
গ্রান্টাwww.granta.com
যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা গ্রান্টা। ১৮৮৯ সাল থেকে এটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করে আসছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। এখান থেকেই টেড হিউজেস, সিলভিয়া প্লাথ, স্টিভ স্মিথের মতো কবি-লেখক উঠে এসেছেন। ১৯৭০ সালে অর্থ সংকটের কারণে এটি বন্ধ হয়ে গেলেও আবার প্রকাশ শুরু হয় ১৯৭৯ সালে। ২০০৪ সালে এর প্রচার সংখ্যা ৪৭ হাজার ছাড়িয়ে যায়। গ্রান্টা তরুণ সাহিত্য পুরস্কার অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। রমেশ গুনসেকারা, বেল্গক মরিসন, অরুন্ধতী রায় এবং জেডি স্মিথ, হানিফ কুরেইশি, বেন ওকরিসহ অনেকেই এ পুরস্কার পেয়েছেন। এই ম্যাগাজিনটিতে লিখেছেন সালমান রুশদি, জুলিয়ান বার্নাস, মিলান কুন্দেরা, গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, এডমন্ড হোয়াইট, রেমন্ড কার্ভার, জর্জ স্টেনারসহ হালের বিখ্যাত লেখক।
দ্য আটলান্টিকwww.theatlantic.com/magazine
আমেরিকার বোস্টন থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা দ্য আটলান্টিক। মাসিক পত্রিকাটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮৫৭ সালে। গত দেড়শ' বছর ধরে সুনামের সঙ্গে কাজ করে আসছে আটলান্টিক। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি। বর্তমানে এর সম্পাদক জন বেনেট। আটলান্টিকের নিবন্ধনকৃত নিয়মিত ৪ লাখ পাঠক রয়েছে। এটিতে প্রকাশিত হয়েছে উইলিয়াম পার্কার, চার্লস চেসনাট, এমিলি ডিকেনসনের মতো লেখকদের লেখা। এ ছাড়া পত্রিকাটি ২০০১ সাল পর্যন্ত মার্ক টোয়েনের বিভিন্ন লেখা প্রকাশ করেছে। মার্টিন লুথার কিংয়ের আলোচিত 'সিভিল ডিজওবিডিয়েন্স' এবং 'লটার ফ্রম বার্মিংহাম জেল' প্রকাশ করেছে।
কিয়েটো জার্নাল www.kyotojournal.org
জাপানভিত্তিক এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ সাহিত্য ম্যাগাজিন এটি। ত্রৈমাসিক এই পত্রিকাটি সর্বপ্রথম ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হয়। এটির স্লোগান হচ্ছে, 'লোকাল ভয়েস ফ্রম অল ওভার এশিয়া'। এতে মূলত এশিয়ার লেখদের লেখা প্রকাশিত হয়। ইংরেজি ভাষায় প্রকাশিত কিয়েটো জার্নালের বর্তমান সম্পাদক কেন রজার্স।
ন্যারেটিভ ম্যাগাজিনwww.narrativemagazine.com
২০০৩ সালে এটি প্রকাশ করেন ক্যারল এদগারিন। মূলত তরুণ অখ্যাত লেখকদের সুযোগ করে দিতেই এ ম্যাগাজিনটি বের করার পরিকল্পনা করেন তিনি। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এটি জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ন্যারেটিভ পুরোপুরি সাহিত্য পত্রিকা। প্রতি বছর সেরা ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক এবং কবিতার ওপর পুরস্কার দিয়ে থাকে ন্যারেটিভ ম্যাগাজিন। মূলত তরুণদের লেখালেখিতেই বেশি আগ্রহ ম্যাগাজিনটির। বছরে তিনবার প্রকাশিত হয় ন্যারেটিভ। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি আলোচিত গল্প ছেপেছে এ ম্যাগাজিনটি।
কনজাংশনwww.conjunctions.com
যুক্তরাষ্ট্রের বার্ড কলেজ থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা কনজাংশন। ১৯৮১ সাল থেকে এটি বছরে দু'বার প্রকাশিত হয়ে আসছে। এটি মূলত আমেরিকান সাহিত্যভিত্তিক পত্রিকা। এটিতে ফিকশন, উপন্যাস, ছোট গল্প, কবিতা, সমালোচনা প্রকাশিত হয়। বর্তমানে এর সম্পাদক ব্রাডফোর্ড মরো। এই ম্যাগাজিনটির তালিকাভুক্ত এক হাজার লেখক রয়েছেন, যার অধিকাংশ তরুণ। এটিতে লিখেছেন লিডিয়া ডেভিস, পল হুভার, জ্যাকব অ্যাপেল, ব্রেইন এভানসন, ডেভিড ফস্টার প্রমুখ বিখ্যাত লেখক।
এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য সাহিত্য পত্রিকাগুলোর মধ্যে রয়েছে নিউ হ্যাম্পশায়ার থেকে প্রকাশিত নিউ ইংল্যান্ড রিভিউ। এটি ১৯৭৮ সাল থেকে প্রকাশিত হয়ে আসছে। আরও আছে জর্জিয়া রিভিউ, কেনিয়ন রিভিউ, ফাইভপয়েন্টস, থ্রিপেনি রিভিউ, ভার্জিনিয়া কোয়র্টালি রিভিউ, সাউদার্ন রিভিউ, গেটিসবার্গ রিভিউ, ইয়েল রিভিউ, সাউদার্ন রিভিউ, হাডসন রিভিউ, শিকাগো রিভিউ, আমেরিকান পোয়েট্রি রিভিউ, ম্যাসাচুসেটস রিভিউ। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয় সাহিত্য পত্রিকা 'অগি্ন'। এ ছাড়া রয়েছে আলাস্কা রিভিউ। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত হয় হার্ভার্ড রিভিউ, অক্সফোর্ড থেকে অক্সফোর্ড রিভিউসহ বিশ্বখ্যাত বেশ কিছু সাহিত্য পত্রিকা।

মুখোশমুখর by শুভাশিস সিনহা

বাংলার মুখ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ/খুঁজিতে যাই না আর... _জীবনানন্দ দাশ
ভাবনা ছিল মুখোশ নিয়ে, কথায় আগে আগে চলে এলো 'মুখ'। এর মানে দাঁড়াল মুখোশের আগে মুখই আসে, যদিও বাহ্যত মুখোশের নিচেই থাকে মুখ। কেমন জানি ডিপ্লোম্যাটিক ব্যাপার হয়ে গেল। মুখ আগে না মুখোশ আগে, তার ফয়সালা হওয়ার আগে এটুকু নিশ্চিত হওয়া গেছে যে, মুখ আর মুখোশ পরস্পর যুক্ত। মুখোশটা তো মুখের ওপরই পরতে হয়। সুতরাং মুখ না থাকলে মুখোশও থাকতে পারে না। কিন্তু অনেকদিন ধরে মুখোশ লাগানো থাকলে মুখ যে আছে, তা-ই হয়তো একসময় ভুলে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। বাংলার মুখ দেখে দেখে জীবনানন্দ তৃপ্ত না-কি ক্লান্ত-আজ সেটা ভাবার বিষয়। লাইন দুটির মধ্যে একটা ডিকশনাল কন্ট্রোভার্সি আছে। প্রথমবার 'মুখ' বলে দ্বিতীয়বার বলেছেন 'রূপ'। কেন 'পৃথিবীর মুখ' হলো না বা কেন 'বাংলার রূপ' হলো না। যদি হতো 'বাংলার রূপ আমি দেখিয়াছি, তাই আমি পৃথিবীর রূপ খুঁজিতে যাই না আর', তাহলে কোনো ধাঁধা থাকত না। এখানে মুখের সঙ্গে রূপের সমার্থকতা বোঝাচ্ছেন। অর্থাৎ বিষয়টা এভাবে ভাবা যায়, বাংলার মুখ এত ব্যাপ্ত, এত বিচিত্র, পৃথিবীর মহা মহাব্যাপার ধারণ করা বিশাল রূপটা আর না দেখলেও ক্ষতি নেই। আর জীবনানন্দ বাংলার প্রকৃতির, লোকজীবনের ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে খুঁজে পেয়েছিলেন অনন্য সৌন্দর্য, বৈচিত্র্য, রূপমাধুরী। আজ এ কবিতা আমাদের কাছে বোধহয় স্বতই প্যারোডি হয়ে এসেছে। আজকের বাংলাদেশ তার যে অবিশ্বাস্য নিয়ত করুণ নিষ্ঠুর বীভৎস মুখ নিয়ে হাজির হচ্ছে তাতে পৃথিবীর অন্য দেশগুলোর বিষয়ে আর নজর না দিলেও ক্ষতি নেই; দেশ আর রাষ্ট্রের বিস্ময়কর রূপ চিনে নিতে সমস্যা হবে না।
সেজন্যই মুখোশের লেখায় মুখের কথার কোট করলাম। এটা ধরে নিতে চেয়েছি যে, বাংলার ওই মুখের মধ্যে মুখোশের কথা আপনা-আপনিই ছিল, হয়তো বা ভবিষ্যপাঠে শ্লেষ হিসেবে বোঝার সম্ভাবনায়।
অর্থাৎ বাংলা যে মুখ নিয়ে আছে, তার ওপর এত এত অবিশ্বাস্য (কু) রূপ খেলা করে, পৃথিবীর রূপ আর বিশেষ কিছুই নয় তার কাছে! এই বাংলা তো আমাদেরই দেশ, বিমূর্ত কোনো জিনিস নয়। আমাদেরই নির্মাণ করা রাষ্ট্র। জীবনানন্দ আজকের বাংলাদেশে বেঁচে থাকলে হয়তো কবিতাটিকে শ্লেষাত্মক করেই হাজির করতেন। ঐতিহ্য ও গ্রামীণতার সৌন্দর্য খুঁজে ফেরা সেই অন্তর্মুখী কবি আজ নিশ্চয় দারুণভাবে প্রকাশবাদী হয়ে উঠতেন। মুখ নয়, বাংলা-ভরে কেবল মুখোশ দেখে ফিরতেন।
ভিনগাঁয়ের কবি অস্কারওয়াইল্ড তো লক্ষ কদম আগে বাড়লেন। শাদা দেশের কবি বলছেন, 'অ সধংশ ঃবষষং ঁং সড়ৎব ঃযধহ ধ ভধপব' সোজা কথায়, মুখের চেয়ে মুখোশ বড়। সেজন্যই বোধহয় ওনাদের দুনিয়ায় মুখোশের কায়কারবার শুরু হয়েছিল অনেক আগে। পালা, অপেরা, থিয়েটারে কারণে-অকারণে মুখোশ নিয়ে ঢোকার অভ্যাস তো দেখতেই পাই। উদ্ভট কিছু বোঝাতে হলে কিংবা মানুষের ভেতরকার স্বভাব-চরিত্র একেবারে চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে এই কাজগুলো করতেন তারা, এখনও করেন। তাদের চেহারা-সুরত খুব ফর্সা, বাইরে দেখলে বোঝার উপায় খুব কম_ এত সুন্দর বর্ণে-গাত্রে লোকগুলো পিশাচ হতে পারে ক্যামনে? সাদা দিলে তাদের এত কাদা! সুযোগ পেলেই অভাগার গাই-বাছুর পর্যন্ত তুলে নিয়ে যেতে ফিরে ফিরে হানা দিয়েছে আমাদের দেশে। তাই তাদের জন্য মনে হয় মুখোশ না পরে ভেতরকার স্বভাব বোঝানো শিল্পকলার ছলাকলাতেও একটু কঠিন।
আমাদের তা লাগে না। আমরা মুখ দেখেই বুঝতে পারি তার ভেতরটা কেমন। আমাদের নাটকে তাই মুখোশ নেই। রবীন্দ্রনাথ গাইছেন, 'এসেছিলে তবু আস নাই জানায়ে গেলে ...' একেবারে ক্রিয়ার বিপ্রতীপ প্রতিক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন। মুখের ভাব-ভঙ্গির প্রশ্নের আরও ওপরে। যে আসে সে কি এসেছে_ এটাই সন্দেহ। সে কি আসলেই সে? আবার পরক্ষণে প্রশ্ন তুলছেন 'তোমার সে উদাসীনতা সত্য কিনা ...' উদাসীন হয়েও লাভ নেই। সেই উদাসীনতার ভেতর একেবারে চরম কৌতূহলের চোখ পিটপিট করছে কি-না, রহস্য।
তারপরও মুখোশ বললে আমরা সেই হৃদয়ের উল্টার্থক বিষয়-আশয় বুঝি না। খারাপ কিছুই ভাবি। এখন আমাদের অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আমরা রাস্তাঘাটে মুখের চাইতে মুখোশই বেশি দেখি। দ্যাশ দ্যাশ বলে গলা ফাটাই বিয়ালি্লশ বছর ধরে। সেই দ্যাশের ভেতর দ্যাশ-বিরোধী মুখগুলো কী আনন্দে বেঁচে-বর্তে ছিল, টের পেয়েও পাইনি। সুতরাং মুখোশ না পরলেও আমাদের প্রাচ্যে মুখ খুব সহজে আড়াল করে রাখা যায়। এমনই আড়াল যে খোদ কোটি কোটি লোক, রাষ্ট্র, সমাজ কিচ্ছু তাকে ধরতে পারে না। তাই আমাদের দেশে আজ প্রকৃতিও মুখ বদলিয়ে রাখতে পারে। শীতকালেও অঝোরে নেমে পড়ে বৃষ্টি। বর্ষাকালে বৃষ্টি থাকে না, শরতে প্রায়ই নেমে আসে সাইক্লোন।
শোনা যায়, নয় হাজার বছর আগে প্রথম জেরুজালেমের ইসরায়েল মিউজিয়ামে মুখোশ পাওয়া গিয়েছিল। আদিকালের বুনো মানুষ জন্তু-জানোয়ারকে ফাঁদে ফেলার জন্য তাদেরই বেশ ধরত; জন্তুরা স্বজাতি মনে করে কাছে ভিড়লে চড়াও হতো দা-বল্লম নিয়ে। মুখোশের ধারণাটা এভাবেই নাকি সমাজে এসেছিল। আজকেও সে ধারণার বদল হয়নি, বরং প্রগাঢ়তর হয়েছে। শিকারকে ফাঁদে ফেলার জন্য মুখোশ কিংবা ছদ্মবেশের ব্যবহার আজ আরও ব্যাপক। তফাৎ একটাই, এখন মানুষের উদ্দিষ্ট শিকার আর সেই জন্তু-জানোয়ার নয়, খোদ মানুষই।
ইংরেজি মাস্ক শব্দটা নাকি ১৫৩০ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রচলন হয়। অর্থাৎ ষোড়শ শতকের শিল্প বিপ্লবের সঙ্গে শব্দটার জন্মের একটা সম্পর্ক পাওয়া যাচ্ছে। শিল্প আর পণ্যসভ্যতাই মানুষের ভেতর ঠগবাজি, জোচ্চুরি, 'বাইরে এক ভিতরে আরেক' নিয়ে চলার সামাজিক শর্ত তৈরি করে দিয়েছিল। মহাত্মা রবীন্দ্রনাথও ইংরেজদের মুখোশকে মুখ বলে ভেবে নিয়েছিলেন। একটা কাল পর্যন্ত সেই মুখশ্রীতে মুগ্ধ থাকলেও জীবন-অন্তিমে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সেই মুখ আসলে একটা মুখোশ। সে মুখোশের আড়ালে বের হয়ে পড়ে ইংরেজের আসল কদর্য, সাম্রাজ্যবাদী মুখ। তিনি আবিষ্কার করলেন, 'সমস্ত য়ূরোপে বর্বরতা কীরকম নখদন্ত বিকাশ করে বিভীষিকা বিস্তার করতে উদ্যত। এই মানবপীড়নের মহামারী পাশ্চাত্য সভ্যতার মজ্জার ভেতর থেকে জাগ্রত হয়ে উঠে আজ মানবাত্মার সামনে দিগন্ত থেকে দিগন্ত পর্যন্ত বাতাস কলুষিত করে দিয়েছে।'
বাহ্যত প্রায়শ রূপবাদী সেজে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁর সব সাহিত্যে রূপসর্বস্বতাবিরোধী। কবিতাকে অনেকেই বলে থাকেন 'কবির মুখোশ'। কবি নিজেকে আড়াল করেন কবিতা দিয়ে। কিন্তু গদ্যকার বা কথাশিল্পী নিজেকে উন্মোচিত করেন তার গদ্য দিয়েই। রবীন্দ্রনাথের কাছে তা হয়তো সত্য নয়। তিনি পৌত্তলিকতাকে কবিতা বলতে নারাজ। যে পৌত্তলিকতা দূরার্থে মুখোশেরই নামান্তর। তিনি বলেছেন, 'কেহ কেহ পৌত্তলিকতাকে কবিতা হিসেবে দেখেন। তাঁহারা বলেন, কবিতাই পৌত্তলিকতা, পৌত্তলিকতাই কবিতা। আমাদের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি অনুসারে আমরা ভাবমাত্রাকে আকার দিতে চাই। ভাবের সেই সাকার বাহ্যস্ফূর্তিকে কবিতা বলিতে পার বা পৌত্তলিকতা বলিতে পার। এইরূপ ভাবের বাহ্য প্রকাশ চেষ্টাকেই ভাবাভিনয়ন বলে।' তিনি জোরগলায় আপত্তি করছেন, 'কবিতা পৌত্তলিকতা নহে।'
এরপর নানান-বিনান যুক্তি-পরামর্শ দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন কবিতা অলঙ্কারশাস্ত্রের শাসনে গড়া কোনো আঙ্গিক নয়। কট্টর রূপবাদীরা সেটাকে অস্বীকার করেন। তারা কবিতাকে কবির মুখোশ প্রমাণ করেই ছাড়বেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ একাই লড়েছেন তার 'গীতাঞ্জলি'তে। জীবনের সহজ দার্শনিক ভাবনাকে অকপটে প্রকাশ করেছেন। ফল্গুধারার মতো ঝরে পড়েছে সেই বাণীনিচয়। রবীন্দ্রনাথের সব সাহিত্যই মানুষের মুখ খুঁজে বেড়িয়েছে। 'রাজা ও রানী'তে রানী যে যোদ্ধা-সৈনিকের ছদ্মবেশ নিয়ে রাজার সামনে দাঁড়ান, তা কিন্তু নিজের প্রকৃত মুখটি রাজার কাছে উন্মোচনের আকাঙ্ক্ষাতেই। 'চিত্রাঙ্গদা'র পুরুষরূপের ভেতরকার নারীসুলভ আকাঙ্ক্ষা আর তার উন্মোচন রবীন্দ্রনাথ লিঙ্গীয় মুক্তির মধ্য দিয়ে খোঁজেননি। খুঁজেছেন আরও গভীরে। সব জৈবিক পরিচয়ের ঊধর্ে্ব মানবিক সত্যতার সন্ধান করেছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথ মুখোশ কিংবা ছদ্মবেশ, সোজা কথায় ছলনাকে অস্বীকার করতে চেয়েছেন সবসময়। 'গীতাঞ্জলি' যা কি-না সেই আইরনিক পাশ্চাত্যের কাছে পরম আদরের জিনিস হয়ে উঠল, তার মর্মে নিজের ভেতরের সত্যকে উন্মোচন করে পরম সত্তার সঙ্গে সহজে মিশে যাওয়ার আনন্দের কথাই বলা হয়েছে। এমনই সহজ, নিরাভরণ, প্রকৃত অন্তঃসত্তার খঁূজে বেড়িয়েছিলেন তিনি; মুখোশ তো দূরের কথা নিজের নামটাকে, শব্দের বর্মটাকেই তার প্রধান প্রতিবন্ধক ভাবতে শুরু করেছিলেন। নামটাই যেন তাঁর কাছে হয়ে উঠল মুখোশ। লিখলেন_
'আমার/নামটা দিয়ে ঢেকে রাখি যারে/মরছে সে এই নামের কারাগারে।/সকল ভুলে যতই দিবারাতি/নামটারে ওই আকাশ-পানে গাঁথি/ততই আমার নামের অন্ধকারে/হারাই আমার সত্য আপনারে।'
আমাদের নিশ্চয় চমকে উঠতে হয়। বিংশ শতকের এক কবি, যার চারপাশে শব্দ কিংবা ভাষাই হয়ে উঠছিল জনগণকে ঠুলি-পরাবার একটা উপচার (ষরঃবৎধৎু ফরংমঁরংব) এবং বিশ্বব্যাপী যখন সাহিত্যিক, বৌদ্ধিক অপরাধও ঘটতে শুরু করেছিল, তিনি তখন ব্যক্তি-মানুষের আপন স্বত্বকে ভুলে রিক্ত হয়ে নিজের আবিষ্কারের কথা বলেছেন। এই স্বত্বের জন্যই আগ্রাসন, সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতা। অথচ কত সহজেই তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন সবকিছুর বিরুদ্ধে; খুলে ফেলতে চাইলেন খোদ-নামের মুখোশ। একেবারে স্বত্বহীন হয়ে গিয়ে মিলতে চাইলেন সেই 'সর্বস্বত্বময়'-এর সঙ্গে। বললেন,
'নামটা যেদিন ঘুচাবে নাথ/বাঁচব সেদিন মুক্ত হয়ে/আপন-গড়া স্বপন হতে/তোমার মধ্যে জনম লয়ে।'
'বিনা নামের পরিচয়ে'ই তিনি বিশ্বমিলনে ধাইলেন। তিনি 'রূপ-সাগরে' ডুব দেন 'অরূপ-রতন' আশা করে। অর্থাৎ রূপের ভেতর থেকে প্রকৃত সত্যটির সন্ধান পাওয়ার জন্য। কিন্তু আমরা সেই সন্ধানের দিকে যাইনি। সেই সত্যের মুখ দেখা আজ যেন হয়ে উঠছে যোজন যোজন দূরযাত্রা। আমরা বারবার মুখোশকেই মুখ বলে ভুল করি। আর আমরা নিজেরাও এক একটা মুখোশ পরে থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। কখনও চরম ক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে নির্লিপ্ততার মুখোশ, শোষিতের যন্ত্রণার পাশে নিখাদ ভদ্রলোকের নির্বিকার মুখোশ, ভেতরে অন্ধকারের আখড়া বানিয়ে রেখে মুখে আলোকিত মুখোশ, মনে অধর্মের নরক পুষে চরম ধার্মিকের মুখোশ। আমাদের কহতব্যও তাই নিজের স্বর ভুলে শ্রুতি আর বাখানের বাজারে অন্য কোনো আকর্ষক স্বর কিনে তার ভেতর দিয়ে নিজেকে প্রকাশ করে।
রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতার অমিত বলেছিল, 'ফ্যাশানটা হলো মুখোশ, স্টাইলটা হলো মুখশ্রী।' ওর মতে, 'যারা সাহিত্যের ওমরাও-দলের, যারা নিজের মন রেখে চলে, স্টাইল তাদেরই। আর যারা আমলা-দলের, দশের মন রাখা যাদের ব্যবসা, ফ্যাশান তাদেরই।' এখন মুখশ্রী নয়, মুখোশেরই জয়জয়কার। তাই স্টাইল নয়, ফ্যাশন নিয়ে প্রতিযোগিতা হয়, ফ্যাশন-হাউসে ভরে যায় আমাদের পণ্যশহর, কিন্তু স্টাইল কেউ চর্চা করে না। এখন ব্যক্তিত্বের সেই দীপ্তি আর সহজে কারও চোখে অনুপম অনুভূতি সৃষ্টি করে না। আমাদের সাহিত্যের অনেকাংশে যে হাল, আমাদের জীবনেও ঠিক তা-ই।
আমরা আধুনিকেরা কবিতাকে তৈরি করেছি মুখোশের মতো। আমাদের প্রকৃত মুখ থেকে নানা রঙে-রূপে-রেখায় সে ভিন্ন হয়। কবির নিজের মুখ, তার প্রকৃত দেশ, ভূমি, তার অনুভূতি, অভিব্যক্তি বোঝার নিজস্ব ধরনকে আমাদের ঔপনিবেশিক মন সবসময় ঠকাতে চেষ্টা করেছে। আমরা ভেবেছি এভাবে বললে হবে না। কবির আপন-মুখের ওপর চেপে বসেছে কবিতার পর-মুখোশ। কিন্তু এই ভাবের ছদ্মবেশ পরা মুখোশ পরাকেও পাশ্চাত্য অন্যভাবে দেখেছে। তার জীবনের বিপর্যাস তাকে ভাবতে বাধ্য করেছে অন্যভাবে। যেমন উইলিয়াম কনগ্রিভ তার কবিতাতেই বলছেন, 'মুখোশ কোনো সত্যকেই প্রকাশ করতে পারে না, পারে না কোনো মিথ্যাকে আড়াল করতে, বরং নগ্নতাই হচ্ছে আসল মুখোশ, প্রকৃত আড়াল।'
রবীন্দ্রনাথে যে অবগুণ্ঠন সরানোর কথা বারবার এসেছে, পাশ্চাত্যের কবিরা সেই অবগুণ্ঠনের মধ্যেই মুক্তির পথ খুঁজেছেন। এমনকি নগ্নতাও সেখানে প্রধান অবগুণ্ঠন!
ইয়েটস বললেন, 'শয়তান আমাদের কল্পনায় আসে, সকল ধর্মের মুখোশ পরে।' আমাদের চারপাশের যে ধর্মোন্মাদ মানুষের রূপ দেখছি, তাতে করে এ কথাকে কে ফেলে দিতে পারবে। মনে পড়ে কাফ্কার 'দ্য ট্রায়াল' উপন্যাসের কথা, যার নায়কের কাছে পুরো রাষ্ট্রটাকেই মনে হয়েছিল আইনের মুখোশ পরা একটা কয়েদখানা। সে আর সেখান থেকে বেরোবার কোনো পথ খুঁজে পায় না। ঠিক তেমনই 'স্যাটানিক ভার্সেস'-এ সালমান রুশদি আমাদের এই সভ্যতার ভয়ঙ্কর সংকটকে এভাবে পেশ করতে চেয়েছিলেন, 'আমাদের প্রত্যেকের মুখোশের নিচে একটা মুখোশ, তার নিচে আরও একটা মুখোশ, তারও নিচে আরেকটা... এভাবেই একটার পর একটা মুখোশ নিয়ে আমরা আবৃত থাকি, যতক্ষণ পর্যন্ত না হঠাৎ সেই রক্তহীন নগ্ন করোটি প্রকাশ পায়।' অর্থাৎ এতসব মুখোশের নিচে আর সেই মুখের চিহ্ন নেই। সেই অচল, জড় করোটিই রয়েছে। এমন এক ভয়াবহ অস্তিত্বের-সংকট, পরিচয়ের-ডিলেমা তৈরি করে রেখেছি আমরা দুনিয়ায়।
সিসেরোর সেই কথামৃত_ 'মুখ হচ্ছে আমাদের মনের প্রতিচ্ছবি, আর চোখ তার ব্যাখ্যাকারী'_ আজ একেবারে যেন ব্যর্থ, অসার বচন। কারও মুখ দেখে মনের কথা আজ আর কেউ বুঝতে পারে না, আর চোখ বাখান করতে পারে না সত্য কোনো কিছু। মনে পড়ে ঈশপের সেই কথা, 'একজন সন্দেহজনক বন্ধুর চাইতে একজন নিশ্চিত শত্রুই শ্রেয়। মানুষকে যে কোনো একটা রূপে চিনতে দাও। তারপর আমরা তার সাক্ষাৎ করব।' কিন্তু কই! চোখের সামনেই কত খুনি ঘুরে বেড়াচ্ছে। তাদের সঙ্গেই তো রাস্তাঘাটে প্রতিদিন আমার দেখা হচ্ছে। তাদের অনেকেই কি 'বন্ধু' ছিল না আমার? আমাদের? কই, আমি তো চিনতে পারিনি। এত খুনি লুকানোর অন্ধকার আমাদের এই দেশে থাকার কথা নয়। নিশ্চয় তাদের মুখের ওপর রয়েছে নিজেকে লুকানোর এক একটা ম্যাজিক-মুখোশ।
অ-দৃশ্যতার মুখোশ পরে থাকা স্বতঃদৃশ্যমান 'রাজা'কে আলোয় পাওয়ার জন্য আর আমাদের রানী (সুদর্শনা)-সুলভ কোনো আকুতি নেই। কারণ, আলোর মুখোশপরা অন্ধকার-রাজার শাসনেই পৃথিবী চলছে আজ।
মানুষ আজকে তাই মুখ নয়, মুখোশমুখর।

মুখোশের স্বীকারোক্তি by ফরিদ কবির

একটা কুকুর কুকুর হিসেবেই জন্ম নেয়। মারাও যায় কুকুর হিসেবেই। একটা বাঘ বা একটা বেড়ালের বেলায়ও তাই। এমনকি কোনো সাপও জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি সাপই। অন্য কিছু নয়। একটা সাপ 'সাপ' ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। কিন্তু জন্ম নেবার পর মানুষ 'মানুষ' থাকবে কি না তা বলা মুশকিল! মৃত্যুর সময়েও সে মানুষ হিসেবেই মৃত্যুবরণ করবে কি-না তা কেউ বলতে পারে না! আমি যখন বেশ ছোট তখন গুরুজনরা বলতেন_ বাবা, মানুষ হও। শুনে আমি অবাক হতাম! তাহলে কি আমি মানুষ নই? আমি তাহলে কী?
অনেকে হয়তো আরও অনেক আগেই বুঝতে পারেন, কিন্তু মানুষ হবার বিষয়টি বুঝতে আমার অনেক সময় লেগেছে! কাজেই মানুষ হয়ে উঠবার প্রক্রিয়াটিও আমার মধ্যে শুরু হয়েছে কিছুটা দেরিতেই! মানুষের আসলে সুবিধা অনেক। সে ইচ্ছে করলেই অন্য কিছু একটা হয়ে উঠতে পারে! একটা কুকুর বা বেড়ালের সে সুযোগ বা ক্ষমতা নেই! একটা কুকুর ইচ্ছে করলেই হাতি হতে পারে না! একটা বেড়াল চাইলেই বাঘ হতে পারে না। মানুষ তার মুখের আদল অবিকৃত রেখেও তার স্বভাববশে হয়ে উঠতে পারে অন্য কিছু! এর জন্য তার মুখোশ পরার দরকার পড়ে না। মুখোশ পরার প্রয়োজন তার নেই বলেই মানুষকে ঠিক চেনা যায় না। ভয়টা সেখানেই।
মুখোশের উৎপত্তি কীভাবে হয়েছিলো আমার জানা নেই। তবে উইকিপিডিয়া বলছে, আদিকালে মানুষ বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মুখোশ পরতো। এ ছাড়া, কোনো কারণে নিজেকে রক্ষার জন্য বা পরিচয় গোপন করতে মানুষ মুখোশ পরতো বা ছদ্মবেশ ধারণ করতো।
আদিকালের মানুষ এক অর্থে বোকাই ছিলো! ছদ্মবেশ ধরতে বা পরিচয় গোপন করতে তার মুখোশের দরকার হতো। বর্তমানকালের মানুষ যথেষ্ট বুদ্ধিমান। ছদ্মবেশ ধরতে বা পরিচয় গোপন করতে তার মুখোশের দরকার হয় না।
দেশপ্রেমিকের পোশাকে অনেক দেশদ্রোহী, অনেক রাজাকার আমরা দেখেছি। প্রেমিক বা প্রেমিকার পরিচয়ে প্রতারণার ঘটনা কার জীবনে ঘটেনি! যাকে বন্ধু হিসেবে জানি, সে বন্ধুর ছদ্মবেশে প্রতারক বা ঘাতক কি-না তা জানার উপায় নেই। বাঘ বা সাপ থেকে বাঁচার জন্য মানুষ নানা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। কিন্তু ভাই বা বন্ধুর ছদ্মাবরণে যে শত্রু বা ঘাতক মানুষের পাশেই ছোবল মারার জন্য ওঁৎ পেতে আছে, তার থেকে নিজেকে মানুষ বাঁচাবে কীভাবে?
একটা-দুটো ঘটনা বলি। এতে মুখ ও মুখোশের তফাত হয়তো কিছুটা স্পষ্ট হতে পারে।
১৯৮৩ সালের ঘটনা। শ্রীলংকা যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি সেখানে একটা ইউথ কনফারেন্সে যোগ দিতে। শুনে আমার এক বন্ধু বললো, 'আমিও ইনভাইটেশন পেয়েছি। কী পরিমাণ টাকা লাগবে বল তো? '
আমি বললাম, 'পনেরো-কুড়ি হাজার হলেই চলবে।'
বন্ধু বললো, 'তুই এতো টাকা কোত্থেকে জোগাড় করলি?'
বললাম, 'টুকটাক ব্যবসা করার জন্য আমার মার কাছ থেকে আমি হাজার ত্রিশেক টাকা নিয়েছি। আপাতত সেখান থেকেই খরচ করবো।'
আসলে টাকাটা আমি জোগাড় করেছি অন্যভাবে। আমার বাবা সামান্য চাকরি করেন। তার আয় খুবই সীমিত। বিদেশ ঘোরার জন্য আমাকে পনেরো হাজার টাকা দেয়ার সঙ্গতি তার নেই।
আমি গোপনে আলমারি থেকে আমার মায়ের কিছু গহনা সরালাম! সেগুলি তাঁতিবাজারে নিয়ে বিক্রি করে ২৭ হাজার টাকা পেলাম। সে সময়ে আমি শ্রীলংকা যাওয়ার জন্য এমনই অন্ধ হয়ে পড়েছিলাম, আমি যে মারাত্মক অন্যায় করছি_ তা বুঝতে পারছিলাম না।
এ গয়নাগুলো আমার মা সারাজীবন ধরে তিল তিল করে তৈরি করেছেন। তিনি যখন এটা জানতে পারবেন তখন কতোটা দুঃখ পাবেন তা আমি আন্দাজ করতে পারিনি।
কিন্তু তখন এসব কিছুই মাথায় আসেনি।
বন্ধুকে বললাম, 'আপাতত ব্যবসার টাকা থেকে হাজার বিশেক টাকা নিয়ে রওনা দেবো।'
'তাহলে তো তোর প্রবেল্গম সলভ্ড। আমার কিছু জমানো টাকা আছে। দশ-বারো হাজার হবে। দেখি বাকি টাকা জোগাড় করতে পারি কি-না। পারলে তোকে জানাবো।'
'ঠিক আছে। তাহলে তো খুব ভালো হয়। আমার পরিচিত আরও কেউ কেউ যাবে শুনেছি। তুই গেলে দু'জনে আগেই চলে যাবো। দু'একদিন এদিক সেদিক বেড়ানো যাবে।'
কয়েক দিন পর বন্ধু আমার বাড়িতে হাজির। 'দোস্ত, টাকা জোগাড় হয়ে গেছে। পাসপোর্টও করে ফেলেছি। তুই ভিসার জন্য কবে যাবি?'
'আজকালের মধ্যেই চল। সময় তো বেশি নেই।'
আমরা কম খরচে যাওয়ার জন্য কলকাতা-মাদ্রাজ হয়ে শ্রীলংকা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। সে অনুযায়ী ভারতের ট্রানজিট ভিসা নিলাম। কলকাতা যাবো বিমানে। সেখান থেকে ট্রেনে মাদ্রাজ (বর্তমান চেন্নাই)। মাদ্রাজ থেকে ট্রেনে রামেস্বরম। রামেস্বরম থেকে জাহাজে শ্রীলংকা।
একদিন বন্ধুর টেলিফোন, 'দোস্ত, তুই যখন বিমানের টিকিট কাটবি, আমার জন্যও একটা নিয়ে নিস। আমি তোকে টাকা দিয়ে দেবো। তুই ভাবিস না। আমি বিশ হাজার টাকা জোগাড় করেছি। পুরো টাকাটাই তোর হাতে দিয়ে দেবো। তুই খরচ করিস। যা খরচ হবে, পরে আমরা আধাআধি ভাগ করে নেবো।'
কলকাতা রওনা হবার আগ পর্যন্ত বন্ধুটি টেলিফোনেই যোগাযোগ রাখছিলো। বললো, 'এয়ারপোর্টে তো দেখা হচ্ছেই। এয়ারপোর্টেই টাকাটা আমি দিয়ে দেবো।'
এয়ারপোর্টে দেখা হলো। কিন্তু তখন কাস্টমস-ইমেগ্রেশন নিয়ে আমরা ব্যস্ত। আমি ভাবলাম, অসুবিধার তো কিছু নেই। কলকাতা গিয়েই ডলার আর বিমান ভাড়ার টাকাটা নিয়ে নেবো। আমরা লাউঞ্জে বসে আছি। কী মনে করে আমি বন্ধুটিকে বললাম, 'দোস্ত টাকাটা এবার দিয়ে দে।'
বন্ধু ইতিউতি তাকিয়ে বললো, 'এখনি দিতে হবে?'
'এখন দিতে সমস্যা কী? ২০০ ডলার আর বিমানের টিকিট বাবদ ১২ হাজার ৩০০ টাকা দিবি।'
বন্ধুটি ইতস্তত করতে লাগলো, 'কলকাতা গিয়ে দেই?'
'কেন, এখন কী সমস্যা?' আমি বললাম।
'না, মানে...।' বন্ধুটি তোতলাতে শুরু করলো। 'মানে, টাকাটা ঠিক জোগাড় হয়নি। কলকাতা গিয়ে দিতে পারবো।'
আমি তখন রেগে গেলাম, 'কলকাতা তোর কে আছে? কে ওখানে টাকা নিয়ে বসে আছে, বল?'
বন্ধু মোচড়াতে শুরু করলো, 'আসলে আমি আমার বড় ভাইয়ের কাছে ১৫ হাজার টাকা চেয়েছিলাম। উনি তো ব্যবসা করেন। কলকাতার এক লোকের কাছে উনি অনেক টাকা পান। তো তার সঙ্গে উনি কথা বলে রেখেছেন। ওখানে গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করলে উনি ১৫ হাজার টাকা আমাকে দেবেন।'
আমি বিশ্বাস করলাম।
কলকাতা গিয়ে আমি কলকাতা-মাদ্রাজের দুটো টিকিট কিনলাম। আমি হোটেলে ফিরলাম। আমার বন্ধু টাকার খোঁজে গেলো! অন্তত আমাকে সে রকমই বলে গেলো।
ফিরলো দুখী একটা চেহারা নিয়ে।
'কী হলো? টাকা পাসনি?'
বন্ধু বললো, 'না। উনি বললেন, সাত-আটদিন পর টাকা দিতে পারবেন। আমরা তো কলকাতা হয়েই ফিরবো। তখন তোকে আমি টাকাটা দিতে পারবো।'
আমি বিশ্বাস করলাম।
শ্রীলংকা থেকে কলকাতা এবং কলকাতা থেকে ঢাকায় আমরা ফিরে এসেছিলাম। কিন্তু সেই টাকা আমি পাইনি। আজও পাইনি।
তিনি একজন তরুণ কবি। কোনো এক অনুষ্ঠানেই আরেক তরুণ কবির মাধ্যমে আলাপ। বয়সে আমার বছর দু'তিনেকের বড়। অল্প ক'দিনের আলাপেই আমার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা বেড়ে গেলো। তরুণ কবির থাকার জায়গা নেই। আজ এখানে তো কাল সেখানে তার দিন কাটছে। হলে জায়গা পাচ্ছেন না। শুনে আমার মন খারাপ হয়ে গেলো।
আমি একদিন বললাম, 'আপনার খুব অসুবিধা হলে আমার বাসায় থাকতে পারেন। যদিও এক বিছানায় তিনজনকে কষ্ট করে থাকতে হবে।'
তিনি আবেগে প্রায় কেঁদে ফেললেন। জড়িয়ে ধরলেন আমাকে।
বললেন, 'ফরিদ, ঢাকায় প্রকৃত মানুষ খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। তুমি একজন খাঁটি মানুষ! আমার সত্যিকারের বন্ধু।'
তিনি আমাদের বাসায় উঠলেন। আমি আর আমার অনুজ তখন এক বিছানায় ঘুমোতাম। তিনিও সেখানে যুক্ত হলেন। অবসর সময়ে আমরা একসঙ্গেই ঘুরতাম। একে অপরের কবিতারও ছিলাম প্রায় প্রথম পাঠক! বছর দেড়েক পরে তিনি সরকারি ডরমিটরিতে উঠে গেলেন। কিন্তু আমাদের বন্ধুত্ব অটুট থাকলো।
১৯৮৫ সালে আমি নিজের একটা কবিতার বই বের করার উদ্যোগ নিলাম। তখন আমি পড়াশোনার পাশাপাশি একটা ছোট অ্যাড ফার্ম দিয়েছি। ছোটখাট প্রিন্টিংয়ের কাজও করি। ভালোই আয় হয়। আমার বই বেরোচ্ছে শুনে কবিবন্ধু বললেন, ' চার ফর্মার একটা বই করতে কী রকম টাকা লাগবে?'
আমি বললাম, টাকার অংকটা একটু বেশিই। কারণ আমার প্রথম বইয়ে থাকছে চার রঙা প্রচ্ছদ। ছাপতে দিয়েছি ঢাকা ফাইন আর্ট প্রেসের মতো অভিজাত প্রেসে। আমার বইয়ের প্রচ্ছদ করে দিয়েছেন পূর্ণেন্দু পত্রী।
সে সময় ঢাকায় চার রঙা অফসেটে প্রচ্ছদ ছাপার কথা কেউ কল্পনাও করতে পারতেন না। আমি কল্পনা করলাম। এবং সে অনুযায়ী বই ছাপার উদ্যোগও নিলাম।
কবিবন্ধু আমার পেছনে সেঁটে রইলেন।
দ্রুত স্ক্রিপ্ট তৈরি করে আমার হাতে দিয়ে বললেন, 'তোমার বই বেরোবে, আর আমার বেরোবে না_ তা কী করে হয়! তুমি ব্যবস্থা করো। টাকা যা লাগবে আমি দেবো।'
আমি তার বইও ছাপার জন্য প্রেসে দিলাম।
আমাদের বই যথাসময়ে বের হলো। বই বের করতে গিয়ে আমার ব্যবসার সমস্ত নগদ টাকা লগি্ন করতে হয়েছিলো। কবিবন্ধুকে বললাম, 'এবার আপনার বইয়ের টাকাটা দিলে ভালো হয়।' বন্ধু বললেন, 'দেশের বাড়িতে আমাদের কিছু জমি বিক্রির চেষ্টা চলছে। বিক্রি হয়ে গেলেই আমার হাতে টাকা এসে যাবে। তখন দিতে পারবো। এখন তো অতো টাকা আমি দিতে পারবো না।'
শুনে ঘাবড়ে গেলাম!
তিনি বললেন, 'ঘাবড়ানোর কিছু নেই। আগামী মাস নাগাদ হয়ে যাবে।'
আমি প্রতি মাসে তার কাছে ধরনা দেই। তিনি জানান, 'জমি এখনো বিক্রি হয়নি।'
আমি প্রচণ্ড বিপদে পড়লাম। নগদ টাকার অভাবে অ্যাড ফার্মে কোনো কাজ করতে পারছিলাম না। আমি ভাবলাম, ঠিক আছে, একটা মাসই তো। আগামী মাসে টাকা পেলে পুরোদমে কাজ শুরু করবো।
কবিবন্ধুর কাছে প্রতি মাসেই একবার যাই।
তিনি বলেন, 'আগামী মাসে দেখা করো। একটা কিছু এবার হবেই।'
মাসের পর মাস যেতে থাকে। আমার ফার্মে কাজকর্ম বন্ধ। আমি ঘর ভাড়া দিতে পারি না। কর্মচারীদের বেতন দিতে পারি না। টেলিফোন বিল দিতে পারি না। এগুলো জমতে জমতে পাহাড় হয়ে গেলো। আমি কয়েকজন বন্ধুর কাছ থেকে ধার করে কিছু ভাড়া বাবদ দিলাম। কিছু কর্মচারীদের দিলাম। কিছু নিজে খরচ করলাম। মাস যায় আর আমার ঋণ বাড়তে থাকে। আমি এক অবিশ্বাস্য খারাপ পরিস্থিতিতে পড়লাম। ঋণে আমি আমুণ্ডু ডুবে গেলাম।
যাদের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছি তাদের টাকাও ফেরত দিতে পারছি না। একদিন তাদেরই একজন আমার বাড়িতে এসে হাজির। 'টাকা দে। আজ রক্ত বিক্রি করে হলেও টাকা দিতে হবে।'
আমি বললাম, 'ভাই রে, আমার বিষ কেনারও টাকা নেই।'
তিনি বললেন, 'এসব বলে লাভ নেই। আমাকে আজ এক্ষুণি টাকা দিতে হবে। টাকা না নিয়ে আমি যাচ্ছি না। আমার সঙ্গে চল, রক্ত বিক্রি করে হলেও টাকা আমাকে আজ দিতে হবে।'
আমি ওর সঙ্গে বেরোলাম। শাহবাগ এসে ঋণদাতা আমাকে বললো, 'ঠিক আছে, আমি আজ গেলাম। কিন্তু আগামী রোববার আমি আবার আসবো। টাকা রেডি রাখিস।'
অপমানে আমার শরীর কাঁপছিলো। আমি বুঝলাম, আমি এমন এক কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছি, যেখান থেকে মৃত্যুই হতে পারে উদ্ধার পাওয়ার একমাত্র উপায়। শাহবাগের দুই ফার্মেসি থেকে দুই পাতা ঘুমে বড়ি কিনলাম এবং একটা হোটেলে ঢুকে তার সবটা খেয়ে ফেললাম।
সেখানে কবিবন্ধুদের অনেকেই আড্ডা দিতে আসতেন। সেদিনও অনেকেই ছিলেন। ছিলেন সেই কবিবন্ধুটিও, যিনি আমার বাসায় কাটিয়েছেন এক বছরেরও বেশি সময়। যার বইয়ের পেছনে লগি্ন করা টাকা আমি ফেরত তখনো পাইনি। আড্ডা দিতে আসা দু'একজন কবির সঙ্গে আমার শুভেচ্ছা বিনিময়ও হয়েছিলো। তারা ঘুণাক্ষরেও বুঝতে পারেননি কী ঘটতে যাচ্ছে! আমিও তো মানুষই। মুখ দেখে মানুষকে বোঝার সাধ্য কার আছে!
এক সময় আমি ঢলে পড়লাম।
মুখোশের ভিড়ে কিছু মুখও হয়তো থাকে। সেদিন সত্তরের দশকের অপর এক কবিবন্ধু আমাকে আরেকজনের সহায়তায় হাসপাতালে নিয়ে যান। সে যাত্রায় আমি মরতে গিয়েও বেঁচে যাই।
গয়না চুরির ঘটনায় আমার মা নিদারুণ দুঃখ পেয়েছিলেন। তার ছেলে হয়ে আমি এ রকম একটা কাজ করতে পারি_ সেটা তার জন্য ছিলো অবিশ্বাস্য।
আমাদের চারপাশে কারটা মুখ আর, কারটা মুখের আদলে আসলে মুখোশ, তা বোঝা বেশ শক্ত। চারপাশে সত্যিকারের কোনো মুখ কস্ফচিৎ চোখে পড়ে। ডাক্তার, ডাক্তার কি-না, সাংবাদিক সাংবাদিক কি-না, মুক্তিযোদ্ধা প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা কি-না_ কে বলতে পারে! মানুষ এখন প্রকৃতই মানুষ আছে কিনা তাই বা কে বলতে পারে! মানুষ হয়ে উঠেছে হিংস্র যে কোনো প্রাণীর চাইতেও ভয়ঙ্কর!
লেখালেখি, সাংবাদিকতা আর কর্মসূত্রে কতো লোকের সঙ্গেই না মিশেছি। কিন্তু সব জায়গাতেই মুখোশের ভিড়। সেই ভিড়ে আমার নিজের মুখও আসলে দেখা যাচ্ছে না। আবছা যে মুখটা আমার দেখা যাচ্ছে, সেটাও হয়তো কোনো মুখোশই, যদিও দেখতে হুবহু মুখের মতোই!

কাগজের রাজকন্যে by উম্মে মুসলিমা

মাটির পুতুল, কাঠের পুতুল বা কলের পুতুল নয়, ক্লাস সিক্সে উঠে আমার পুতুলরা কাগজের পুতুল হয়ে সংসার শুরু করল। সাদা কাগজ ভাঁজ করে কলম দিয়ে চোখ, ভ্রূ, নাক, ঠোঁট, চুল এঁকে শাড়ি পরিয়ে পেছনের বারান্দায় পরিত্যক্ত টেবিলের ওপর ওদের জন্য তৈরি ঘরের মধ্যে বসিয়ে দিতাম। বড় বোনের ফেলে দেওয়া খাতার শক্ত কভার ছিঁড়ে ওদের টেবিল, খাট, চেয়ার বানাতাম। বড়াপার স্কুলে দেয়াশলাই, ফোম আর ছিটকাপড় দিয়ে ওদের গার্হস্থ্য ক্লাসে সোফা বানাতে শিখিয়েছিল। সেরকম এক সেট সোফা ছিল আমার পুতুলদের সবচেয়ে দামি আসবাব। ওদের নাম ছিল রানু, লাইজু, ডলি, বুলু আর গৃহপরিচারিকা রোমেছা। ওদের একটাই ভাই ছিল_ নাম আদিল। আদিল নামেই ছিল। তার কোনো কাগজিক উপস্থিতি ছিল না। পেছনের বারান্দাতে কেউ সচরাচর যেত না। বারান্দার সামনেই ছিল একটা সজিনা গাছ। বারান্দার ধুলোয় সজিনা ফুল পড়ে শুকিয়ে যেত, কেউ ঝাঁট দিত না। আমি সকালে উঠেই বারান্দায় উঁকি দিতাম সজিনা ফুলগুলো যথারীতি আছে কি-না তা দেখাতে। কারণ ফুল থাকলেই আমার রানু-লাইজুরা থাকবে। একবার এক নতুন গৃহপরিচারিকা ফুলসমেত আমার পুতুলের সংসার ঝাঁট দিয়ে ময়লার গাদায় ফেলে এসেছিল। কেবল আমার বিধবা বড় খালা এলে ওখানে বসে সারা দুপুর নকশিকাঁথা সেলাই করত আর হুলিয়ানামা পড়ত। হুলিয়ানামা হলো আমাদের নবী করিমের (সা.) গুণগান। খালা কেমন কান্নার সুরে ছন্দোবদ্ধ সেই হুলিয়ানামা মুখস্থ পড়ে যেত আর কাঁথার বুকে সুচে ঢেউ তুলত। ভাবতাম খালা তার দুঃখের জীবন কান্নার সুরে আওড়াচ্ছে। আমি পুতুলের শাড়ি পাল্টে দিতে দিতে খালার দুঃখে কাঁদতাম। এখনও ক'টা লাইন মনে আছে _
'আল্লা আল্লা বল বান্দা নবী কর সার
মোহাম্মদের দ্বিন বিনা রাহা নাহি আর
মোহাম্মদের চারি ইয়ার নাম তাহা শোন
আবুবকর ওমর ওসমান আলী চারিজন'
বড় খালার করুণ সুরের হুলিয়ায় আমি অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। আর কান্না পেত না। আমি আপন মনে ঠ্যাং বের করে খালার উল্টো দিকে বসে পুতুলদের কাপড় খুলতাম, পরাতাম আর ওদের একে অন্যের সংলাপ নিজে নিজে বলতাম। একবার বড় খালা শুধু বলেছিল_
'এত ছোট ফ্রক আর পরো না টিকলি। তুমি বড় হচ্ছো। হাঁটু অব্দি বড় ফ্রক বানাতে বলব তোমার মাকে।'
'কিন্তু ওবাড়ির ডলি-বুলুরা তো আমার চেয়ে বড়। ওদেরকেও তো ছোট ফ্রক পরে বাগানে খেলতে দেখেছি'
'ওদের কথা বাদ দাও'।
আমিও ওদের কথা বাদই দিই। ওরা আর আমরা তো সমান নই। তবুও ওদের নিয়েই আমার সংসার।
ওটা ছিল একান্তই আমার রাজত্ব। সেবার আমার ছোটমামা বড় খালাকে নিতে এলে আমার সাজানো সংসার তছনছ করে দেয়। বারান্দায় গিয়ে লুকিয়ে সিগারেট টানতে টানতে ছোট মামা আমাকে ডাক দিল_
'এই টিকলি, এগুলো কী রে?'
'ছোটমামা, খবরদার ওগুলোতে হাত দেবে না কিন্তু'_ আমি হা হা করে ছুটে আসলাম। ততক্ষণে ছোট মামা মুখের মধ্যে সিগারেটের ধোঁয়া ভরে আমার ডলি-বুলুর সাজানো ঘরের ওপর জোরে ফুঁ দিতে দিতে বলল_
'দেখ দেখ কেমন ঘূর্ণিঝড়। সব উড়ে যাচ্ছে।'
আমি আঁচড়ে কামড়ে ছোট মামার ওপর প্রতিশোধ নিতে গিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললাম_
'তুমি যে এখানে লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট খাও আমি বাবাকে বলে দেব'।
ছোট মামা সেগুলো আবার কুড়িয়ে আমার হাতে পাঁচ টাকার কয়েন ধরিয়ে দিয়ে ভয়ে ভয়ে বলল_
'আচ্ছা নে ধর, বলে দিলে আমিও কিন্তু তোকে মিলিটারিদের ক্যাম্পে নিয়ে যাব'।
আমাদের মফস্বল শহরে পাকিস্তানি মিলিটারিরা ক্যাম্প করেছে। স্কুল-কলেজ সব বন্ধ। রাস্তার এপাশে আমাদের ছোটখাটো একতলা বাড়ি। ওপাশে জান মোহম্মদের বিশাল তিনতলা 'জাহান মঞ্জিল'। জান মোহম্মদদের মায়ের নামে নাম। ও বাড়ির প্রায় অসূর্যম্পশ্যা মেয়েদের নিয়েই আমার যত কল্পনাবিলাস। ওদের নামেই আমার পুতুলদের নাম। রানু প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়ে বাসায় থাকে, কেক পেস্ট্রি বানানো শেখে, এমব্রয়ডারির কাজ হাতে নিয়ে কখনও ছাদে আসে। আর না হলে সেলাই মেশিনে বসে নিজের আর ছোট বোনের সালোয়ার-কামিজ সেলাই করে। লাইজু আমার বড় বোনের সঙ্গে ক্লাস এইটে গার্লস স্কুলে পড়ে। স্কুলে খুব একটা যায়টায় না। একমাত্র আমার বড়াপাই ওদের বাড়িতে ঢোকার অনুমতি পায়। ওদের গৃহপরিচারিকা রোমেছা এসে মাঝেমধ্যেই দুপুরে বড়াপাকে ডেকে নিয়ে যেত। ওর ফিরতে ফিরতে বিকেল। আসার পর আমি রাজ্যের কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করি_
'ওরা কী খায়রে বড়াপা? পোলাও, কোপ্তা, কাবাব, বিরিয়ানি?'
'খায়ই তো'।
'তোকে ডাকলেই তুই যাস কেন? ওরা কি আমাদের বাসায় আসে?'
'ডাকে কি খামোখা? লাইজুকে পড়া দেখিয়ে দিতে হয় না? আর যাব না ভাবছি। লাইজুর প্রাইভেট টিচার আসবে সামনের সপ্তাহ থেকে'।
লাইজু দেখতে সাদামাটা। তবে একবার ঢাকা থেকে ওদের বড় বোনের মেয়ে ডলি আর বুলু এসেছিল। ওরা বাগানে খেলছিল। বয়সে আমার চেয়ে একটু বড়ই। ওদের দেখে মনে হচ্ছিল, ওরা যেন জুলেখা, বাদশাহর মেয়ে। ভারি অহঙ্কার! সুন্দরী যাকে বলে সে রানুপা। দু'একবার দু'এক ঝলক দেখেছি। আমার পুতুলদের জন্য ওদের দালানের উঁচু জানালার নিচে টুকরো ছিটকাপড় কুড়াতে যেতাম। রানুপার সালোয়ার-কামিজের কাপড়। খুব ইচ্ছে হতো জানালায় উঁকি দিয়ে দেখতে। একদিন কাপড় কুড়িয়ে ফিরছি। রানুপা জানালায় এসে বসল। মনে হচ্ছিল তুষারকন্যা। গুনগুন করে গান গাচ্ছিল 'একটা গান লিখো আমার জন্য ...'। আমি হাঁ করে তাকিয়ে আছি, এমন সময় ভেতর থেকে ভারি গলায় 'রানুউউউ' ডাক শুনেই জানালা বন্ধ হয়ে গেল। রানুর মা নাকি ইয়া মোটা, অনেক বয়স, সবসময় ধবধবে সাদা শাড়ি পরে নামাজ পড়ে। সে সময় রোমেছাকে হাতপাখা দিয়ে অবিরাম বাতাস করতে হয়। বড়াপা ওদের বাড়ি থেকে এলেই খুব জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হতো আচ্ছা, রানুপা কি সোনার পালঙ্কে শুয়ে চুল শুকায়? ওদের কি সুখপাখি আছে? বড়াপা বলত_
'রানুপা ভালো তবে খুব অহঙ্কারী। লাইজুকে সারাক্ষণ বকে। লাইজু বলে, দাঁড়া না ক'দিন বাদে যখন বিয়ে হয়ে যাবে ওর, তখন আমিই এ বাড়ির সব। আমার হুকুমে সবাই চলবে।'
সে সময় আমাদের মফস্বল শহরে কারও ব্যক্তিগত গাড়ি ছিল না। রানুর বড় ভাই জান মোহম্মদ জেলা শহর থেকে সপ্তাহে একদিন মা-বোনদের দেখতে আসত গাড়ি করে। জান মোহম্মদের গাড়ি আমাদের শহরে ঢুকলেই সবাই কেমন সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ত। তখন দেশে যুদ্ধের ডামাডোল। রানুদের বাড়ি থেকে খানিক দূরে পাকিস্তানি মিলিটারিদের ক্যাম্প। জান মোহম্মদের গাড়ি অনেকেই ওদিকে যেতে দেখত। আমার বাবা বড়াপাকে আর রানুপাদের বাসায় যেতে দিত না। আমি জিজ্ঞেস করি_
'কেন রে বড়াপা?'
'ওরা মুসলিম লীগার যে'_ বড়াপার শঙ্কিত উত্তর। মুসলিম লীগার কেন খারাপ তা আমাকে কেউ বুঝিয়ে বলেনি। কিন্তু আমি আমার পুতুলদের পুরনো নামেই ডাকতাম। রানুপার আর একটা ভাই ঢাকায় পড়ত, নাম আদিল। সে এলেই বাড়ির সামনের মাঠে ফ্লাড লাইট জ্বালিয়ে ব্যাডমিন্টন খেলত। শ্যামলা, লম্বা, ফ্যাশনদুরস্ত আদিলকে দেখতে পাড়ার মেয়েরা অকারণে প্রধান সড়ক বাদ দিয়ে জাহান মঞ্জিলের পাশের সরু গলি দিয়ে থেমে থেমে হাঁটত। বড়াপাকেও লুকিয়ে দেখতে দেখেছি। একদিন আদিল শূন্যে উঁচু হয়ে কর্কে বাড়ি দিতে গিয়ে ধপাস করে মাটিতে পড়ে গিয়েছিল। আমি খিলখিল করে হেসে উঠতে আদিল এমন কটমটিয়ে আমার দিকে তাকিয়েছিল যে আমি সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির ভেতর দে দৌড়। এই আদিল আমার একমাত্র পুরুষ পুতুল। তাও নেপথ্যের।
একদিন সকালের দিকে রোমেছাকে নিয়ে লাইজু হাজির। আমি খুব কাছ থেকে রূপকথার রাজবাড়ির মেয়েকে দেখলাম। লাইজুকে আমাদেরই মতো মনে হচ্ছিল। মা ওদের ঝাল-পেঁয়াজ দিয়ে মুড়ি মাখিয়ে দিল, শেষ দানাটিও সে খুঁটে খেল। লাইজুকে বেশ উদ্বিগ্ন মনে হচ্ছিল। ও আস্তে আস্তে ওর প্রাইভেট টিচার সম্পর্কে যা বলছিল তা এরকম_
'মুকুল স্যার যে গেরিলা তা যদি মিয়াভাই জানতে পারে তাহলে...'
'জানবে কী করে? গেরিলারা গোপনে কাজ করে।'
'কিন্তু মুকুল স্যার তো মনে হচ্ছে রানুপার প্রেমে পাগল।'
'আর রানুপা?'
'জানি না, সামনের মাসে পাকিস্তানি এক ক্যাপ্টেনের সঙ্গে ওর এনগেজমেন্ট। খুব রূপচর্চা চলছে।'
'মুকুল স্যার জানে?'
'জানলেই কী? পোস্টাপিসের কেরানির ছেলে যতই ইন্টারে স্ট্যান্ড করুক, তার ওপরে গেরিলা। মিয়াভাই জানলে...'
রোমেছা তাড়া দিচ্ছিল। বাইরের রাস্তায় মুক্তি ছেলেরা গাছ কেটে ফেলে রেখে গেছে। রোমেছা নাকি মুকুল স্যারকে দেখেছে ছেলেদের সঙ্গে ওখানে। লাইজু রোমেছাকে এসব কথা বাড়িতে বলতে নিষেধ করে দ্রুত পেছনের ধানকলের দেয়াল ঘেঁষে ওদের খিড়কির দরজা দিয়ে ঢুকে গেল।
এর পনের দিন বাদে জাহান মঞ্জিলের সামনে বেশ কিছু আর্মির গাড়ি। জমকালো শেরওয়ানি আর জিন্নাহ টুপি পরে উকিল জান মোহম্মদ হাত বাড়িয়ে বিনয়ের সঙ্গে গাড়ি থেকে নেমে আসা আর্মি অফিসারদের হাত ধরে বাড়ির মধ্যে নিয়ে যাচ্ছে। আদিলকেও ভাইয়ের মতো আচরণই অনুসরণ করতে হচ্ছে। রান্নার সুগন্ধে বাতাসে বারুদের গন্ধও ম্লান। রানুপার এনগেজমেন্ট। নিজস্ব আত্মীয় ছাড়া বাইরের কেউ আমন্ত্রিত নয়। লাইজু বড়াপাকেও ডাকতে পারেনি। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে রানুপার এনগেজমেন্ট শেষ হলো। শোনা গেল, ওই ক্যাপ্টেন নাকি জেনারেল টিক্কা খাঁর বোনের ছেলে। যুদ্ধে বাঙালিদের পর্যুদস্ত করে পাকিস্তান সমুন্নত রাখার পর বিয়ে। বিয়ের পর রানুকে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যাবে ক্যাপ্টেন।
সেপ্টেম্বর ১৯৭১। আমাদের ধূলিধূসর পেছনের বারান্দা। আমার পুতুলদের ঘর অগোছালো। রানুপার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে, তাও আবার আমাদের দেশের শত্রু পাকিস্তানি ক্যাপ্টেনের সঙ্গে। একবার মনে হলো পুতুলের নামটা পাল্টে দিই। রানুপা চলে যাবে পশ্চিম পাকিস্তানে। উর্দু ভাষায় কথা বলবে। বাঙালিদের বলবে নেমকহারামের জাত। কিন্তু রানুপা যে আমার রূপকথার রাজকন্যে। রানুপুতুল বলে_
'রোমেছা, মেন্দি বাট। হাতে লাগাব। জানিস না আমার বিয়ে'
'মেন্দিগাছ উপড়ে ফেলেছে মুক্তিরা, আপামনি'_ রোমেছা পুতুল মিনমিন করে জবাব দেয়।
'কোন মুক্তি?'
'মুকুল মুক্তি'
'মুকুল কাঁহা, মুকুলকো মার ডালো'।
খুব ভোরে বাইরে বাতাসের তাণ্ডব। জাহান মঞ্জিলের সামনে লোকে লোকারণ্য। রানুপার জানাজা। রাত ১২টা ২০ মিনিটে জান মোহম্মদ তার পিস্তল হাতে অন্ধকার সিঁড়িঘরের দিকে যেতে যেতে নাকি বলে, 'মুকুল কাঁহা, মুকুলকো মার ডালো'। আদিল টর্চের আলো ফেলে। দেখে দু'হাত প্রসারিত করে আজানুলম্বিত চুল ছড়িয়ে দিয়ে রানু দেবীর মতো দাঁড়িয়ে আছে মুকুলকে আড়াল করে। জান মোহম্মদ গুলি চালায়। রানু তার বিছানো চুলের ওপর ঢলে পড়ে। মুকুলকে পাকিস্তানি আর্মিদের ক্যাম্পে দিয়ে আসা হয়।
ওইদিনই তাড়াহুড়ো করে বাবা আমাদের নিয়ে গ্রামে রওনা দেয়। প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নেওয়ার সময় মা-বাবা নিচু স্বরে রানুপা আর মুকুল স্যারকে নিয়ে যা বলছিল আমি তার সবটুকুই বুঝতে পেরেছিলাম। যাওয়ার আগে আমি এক দৌড়ে পেছনের বারান্দায় গিয়ে আমার কাগজের পুতুলের সংসার ফ্রকের কোচড়ে ওঠাতে থাকি। তক্ষুনি এক দমকা বাতাসের ধাক্কায় ফ্রক থেকে আমার কাগজের পলকা পুতুল আর আসবাব অনেক দূরে ইতস্তত উড়ে যায়। আমার ছোট্ট ফ্রক পতপত করে আমার নাকে এসে বাড়ি খায়। আমি দু'হাত দিয়ে জোর করে ফ্রক নামিয়ে আমার উন্মুক্ত উরু ঢাকতে থাকি।

শতবর্ষের জয়নুল by শুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলাদেশের শিল্পজগতের দুয়ার খুলতেই জ্বলজ্বল করে ওঠে যার নাম, তিনি জয়নুল আবেদীন। তিনিই আমাদের চিত্রকলা ও লোকশিল্পের বর্ণাঢ্য ইতিহাসের রূপকার। আমাদের শিল্পাচার্য। গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর দিনটি ছিল তাঁর শততম জন্মদিন। শিল্পাচার্যের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে সারাদেশেই নানা রকম আয়োজন চলছে। তার মধ্যে সম্প্রতি শিল্পাচার্যের জন্মশতবর্ষ উদযাপনে বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের বছরব্যাপী অনুষ্ঠানের শুরু হলো। এর অংশ হিসেবে গত শনিবার ধানমণ্ডির বেঙ্গল গ্যালারিতে জয়নুল আবেদিন ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের আঁকা ছবি নিয়ে 'শিল্পাচার্যের প্রসারিত শিল্পাঙ্গন' শিরোনামে পক্ষকালব্যাপী শুরু হয়েছে বিশেষ চিত্রকলা প্রদর্শনী।
জয়নুল আবেদিনের বিখ্যাত কিছু চিত্রকর্মের সঙ্গে গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে শফিকুল আমিন, জুনাবুল ইসলাম, আবদুুর রাজ্জাক, নজরুল ইসলাম, মিজানুর রহিম, ময়নুল আবেদীন, সামিনা নাফিস, মোহাম্মদ আফজালুর রহিম, আরিফ আহমেদ তনু, মাসুদ মিজান এবং মানিজে আবেদিনের কাজ। তারা সবাই কোনো না কোনোভাবে জয়নুল আবেদিনের আত্মীয়। শিল্পাচার্যের সঙ্গে পারিবারিকভাবে সম্পর্কিত দেশের এই শিল্পীদের কাজ তাঁর কাজের সঙ্গে এক গ্যালারিতে উপস্থাপনের এ আয়োজন যেন এই মহান শিল্পীর পারিবারিক শিল্প-চেতনাকে উন্মোচিত করেছে। বাংলাদেশের আধুনিক শিল্পকলা আন্দোলনের পথিকৃৎ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন। শিল্পকলায় অবদানের জন্য তাঁর জীবদ্দশায় তিনি পেয়েছেন 'শিল্পাচার্য' খেতাব। মাত্র ১৬ বছর বয়সে বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি বন্ধুদের সঙ্গে কলকাতায় গিয়েছিলেন শুধু কলকাতা গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টস দেখার জন্য। এ আর্ট স্কুল দেখে আসার পর সাধারণ পড়াশোনায় জয়নুল আবেদিনের মন বসছিল না। তাই ১৯৩৩ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষার আগেই স্কুলের পড়ালেখা বাদ দিয়ে কলকাতায় চলে যান এবং মায়ের অনুপ্রেরণায় তিনি গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্টসে ভর্তি হন। জয়নুল আবেদিনের আগ্রহ দেখে তাঁর মা নিজের গলার হার বিক্রি করে ছেলেকে আর্ট স্কুলে ভর্তি করান। পরে ছেলে জয়নুল আবেদিন মায়ের সেই ভালোবাসার ঋণ শোধ করেছেন দেশের স্বনামধন্য শিল্পী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে।
জয়নুল আবেদিন ছিলেন এদেশের চিত্রশিল্প আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি শুধু দুর্ভিক্ষের ছবি নয়, গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক দৃশ্য, মা-মাটি এবং মানুষের জীবনের নানান বাস্তবতা তুলে ধরেছেন তাঁর ছবির মাধ্যমে। তাঁর আঁকা জলচিত্রগুলোও পেয়েছে এক অসাধারণ ভিন্নমাত্রা। তাঁর প্রচেষ্টায়ই বাংলাদেশে শিল্প আন্দোলনের জয়যাত্রা শুরু।
'৪৭-এ উপমহাদেশে দুটো স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হলে তিনি পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকায় চলে আসেন। কলকাতা আর্ট স্কুলে তাঁর চাকরিটি ছেড়ে ঢাকার আরমানিটোলায় একটি স্কুলে আর্ট শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। তাঁর শিল্পী খ্যাতি, অসাধারণ সাংগঠনিক মেধা; তৎকালীন শিল্পী, সহকর্মী ও বন্ধুদের সহযোগিতা এবং শিল্পাগ্রহী কিছু বাঙালি সরকারি কর্মকর্তার সহযোগিতা_ সব মিলিয়ে তিনি ১৯৪৮ সালে এদেশের প্রথম আর্ট স্কুল 'গভর্নমেন্ট ইনস্টিটিউট অব আর্টস' প্রতিষ্ঠা করেন। ৮ বছরের মাথায় মাত্র দুই কক্ষের সেই প্রতিষ্ঠানটিকে ১৯৫৬ সালে তিনি একটি আধুনিক শিল্পকলা প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরিত করেন। পরে এটি পূর্ব পাকিস্তান 'চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ 'চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়'-এ রূপান্তরিত হয়। তারপর মহাবিদ্যালয়টি সরকারি নিয়ন্ত্রণ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হস্তান্তরিত হয় এবং বর্তমানে এটি 'চারুকলা অনুষদ' নামে পরিচিতি লাভ করে।
তাঁর আঁকা দুর্ভিক্ষের চিত্রমালা পৃথিবীবিখ্যাত চিত্রকর্মের সিরিজ। সেই দুর্ভিক্ষ বা মন্ব্বন্তর ঘটেছিল ১৯৪৩ সালে অবিভক্ত বাংলায়। বর্তমান বাংলাদেশ ও ভারতের বেঙ্গল প্রদেশে যা 'তেতালি্লশের মন্বন্তর' নামেও পরিচিত। শিল্পাচার্যের দুর্ভিক্ষ সিরিজের সেই কালজয়ী চিত্রকর্ম বেঙ্গল গ্যালারির আয়োজনে স্থান পেয়েছে, যা দর্শকদের জয়নুল আবেদিনের অসামান্য শিল্প-সাধনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয় আরেকবার।
সেই তেতালি্লশের মন্বন্তর সম্পর্কে জয়নুল আবেদিন একবার বলেছিলেন, '১৯৪৩-এর দুর্ভিক্ষ ছিলো মনুষ্যসৃষ্ট। একটি পরাধীন দেশে একটি বিদেশি শক্তির চক্রান্ত। তার একটা স্বতন্ত্র আবেদন ছিলো; তাই অন্তর থেকে ছবি আঁকার দুর্বার প্রেরণা ছিলো। সত্তরের ঘূর্ণিঝড় ও ধ্বংসলীলা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এতে কারো হাত নেই তেমন। এতে দুঃখ হয় কিন্তু আবেদন ক্ষণস্থায়ী, তাই অধিকসংখ্যক উল্লেখযোগ্য ছবি হয়নি। আর এখন? এখন তো চারিদিকে রুচির দুর্ভিক্ষ! একটি স্বাধীন দেশে সুচিন্তা আর সুরুচির দুর্ভিক্ষ! এই দুর্ভিক্ষের ছবি হয় না!'
জয়নুল আবেদিন ছিলেন আমাদের সেই প্রকৃত আলোকবর্তিকা, যিনি শুধু পথ প্রদর্শনই নয়, পথকে নিজ হাতে গড়ে দিয়ে গেছেন আমাদের জন্য; এই বাংলাদেশের জন্য। তিনি দিলি্ল বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত ডিলিট প্রাপ্তির ভাষণে বলেছিলেন, 'আমার সমস্ত জীবন ও কর্ম নিবেদিত ছিলো একজন সম্পূর্ণ মানুষ হওয়ার পথে।'
শিল্প ও চেতনার স্ফুরণে জয়নুল আবেদিন আমাদের মননজগৎকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন অনবরত। তিনি আমাদের সেই বাতিঘর, যেখান থেকে আমরা দেখি গণমানুষের হাজার বছরের আর্তিকে। অফুরান সেই আলো।

আয়না-পড়া by ময়ুখ চৌধুরী

১. সামনে দাঁড়াতেই আয়নাটা হাঁটতে আরম্ভ করলো। ভয়ে পিছুতে গিয়ে ঠোক্কর খেল খাটে। ওখানেই বসে পড়লো নির্মল আচার্য। না, নেশা করেনি। করলেও বা কতো দিন নেশা করে ফিরেছে; কিন্তু এই অদ্ভুত ঘটনা আজই প্রথম।
বেশ কয়েকদিন ধরে চাই-পি-এসটা কাজ করছে না। অফিস ছুটির পর ডিলারের দোকানে গিয়েছিল। ওখানে রতনের দেখা। দেখেই বোঝা যায় বেশ ফুর্তিতে আছে। কিন্তু রতন তো এমনটা ছিল না! রাশভারি না হলেও, কখনো তার মধ্যে আবেগ-উচ্ছ্বাস দেখা যায়নি। নির্মল যেন এই প্রথম অন্য এক রতনকে দেখছে। রতনও তা বুঝতে পারছে।
_'নে।' সিগারেট বাড়িয়ে দিল নির্মলের দিকে। _'ডিউটি ফ্রি। মামির কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছি।'
_'তোকে বেশ খুশি খুশি লাগছে।'
মাথা দোলাতে দোলাতে লম্বা একটা টান লাগালো রতন। _'আহ্, স্বাধীনতা সত্যিই কী আনন্দের।' এরপর ফুকফুক করে কয়েকটা টান, মাথা দোলানো চালিয়ে যাচ্ছে। নির্মল তাকিয়েই আছে। রতন খপ করে তার কব্জি চেপে ধরে বললো_
'বুঝলি, খেদিটা বিদায় হয়েছে।'
_'মানে'!
_'মানে আবার কী, যার বেসুরো গান শুনেও তোরা তালি দিতি_ জুলি, জুলি। জুরি না ঠুলি, মাথামুণ্ডু। আপদ গেছে।'
_'বলিস কী, ভালোবেসেই তো বিয়ে করেছি ছিল!'
_'রাখ বিয়ে ভালোবাসা।_ সে তো একবার। রোজকার প্যান প্যান ঘ্যান ঘ্যান কে সহ্য করবে!'
অথচ এই রতনই সব সময় আগলে রাখতো বউকে। টেবিলে ট্রে নামিয়ে রাখতে গেলে উপুড় হতে হয় বলে বউয়ের হাত থেকে ট্রে নিয়ে নিত।
_'তারপর, তোর কেমন চলছে? বউবাচ্চা ভালো?'
_'ভালো।' সংক্ষেপেই উত্তর দিল_ ডিটেলসে গেল না। আটদিন হয়েছে। বাপের বাড়িতে গেছে শান্তা। বিকেলে অফিস থেকে ফোন করেছিল, ধরেছে তিনি্ন।
_নির্মলের মেয়ে।
_'মা কোথায়?'
_'ড্রইংরুমে। গানের মাস্টার বেড়াতে এসেছে।' কী ভেবে ফোনটা রেখে দিয়েছে নির্মল।
রতনের সঙ্গে হোটেলে খেয়ে নিল নির্মল। একই খাবার, দু'রকমের বাধ্যবাধকতা। রতন যেটাকে স্বাধীনতার আনন্দ বলেছে, সেটা কি সত্যি তার ভেতরের কথা? নির্মল ভাবছে আর হাঁটছে। ঢাকায় বাসের আগে হেঁটে যাওয়া যায়। সাড়ে দশটাও হয়নি। এখন সে বাসায়। সারাপথেই সে ব্যস্ত ছিল রতন, রতনের বউ, গানের মাস্টার, শান্তা_ এইসব নিয়ে।
কিন্তু আয়নার অদ্ভুত আচরণের পর, হতভম্ব হয়ে বসে আছে খাটের ওপর। এমন সময় কারেন্ট চলে গেল। মোবাইল অন করে মোমবাতি বের করলো নির্মল। পায়ে পায়ে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই আয়নাটা আবার সরে যেতে লাগলো।
_'আরে যাচ্ছ কোথায়, দাঁড়াবে তো!'
_'কেন দাঁড়াবো?'
_'এ কী! তুমি কথা বলতে পারো!'
_'পারি তোমরা শুনতে পাও না। প্রাচীনকালে আমাদের পূর্বপুরুষরা আয়না-সুন্দরীকে দেখাতে পারতো। এখন আমরা আরও অনেক কিছু পারি।... আমাকে যেতে দাও, এখানে ভালো লাগছে না।'
_'দাঁড়াও। সকালে দাড়ি কামাতে গিয়ে কোন জায়গাটা কেটেছিল,_ দেখি।' কাটা দাগ দেখতে গিয়ে নির্মল নিজেকেও দেখলো না। আয়না দেখতে গিয়ে আয়নাকেই দেখছে। বেশ কিছুক্ষণ।
_'কী দেখলে? ... কিছুই দ্যাখেনি।' আয়না আবার কথা বলতে লাগলো_ 'এতদিন আমার সামনে দাঁড়িয়ে যাকে দেখতে চেয়েছ, সে তুমি নও। তুমি দেখেছো তোমার প্রচ্ছদ, তোমার খোলস, তোমার মুখোশ মাত্র। তুমি পারফিউম মাখো_ তোমার প্রচ্ছদে, তুমি সাবান মাখো_ তোমার খোলসে, তুমি ক্রিম মাখো_ তোমার মুখেশ দাড়ি কাটতে গিয়ে সামান্য আঁচড় লেগেছে_ তাও মুখোশে।'
_'চুপ করো। চুপ করো। এই_ এই আমি, এই রকম। হুবহু ফেসবুকের মতো। আইডি কার্ডও আছে।' নির্মলের কথাগুলো নিজের কাছেই প্রলাপের মতো লাগছে। ঘোরের মধ্যেই সে শুনতে পাচ্ছে_ আয়না বলছে_ 'তুমি আসলে এই রকম নও, অন্য রকম। নর্দমার থিকথিকে কালো দইয়ের মতো, যার ওপর দিয়ে সাবানের ফেনা গড়িয়ে যায় দাঁড়ায় না; তলায় নানা রকম পোকা।'
নির্মল ক্ষেপে যাচ্ছে_ 'দ্যাখো, আর একটা কথা বললে, তোমাকে এক্ষুনি টুকরো টুকরো করে ফেলবো।'
_'কতো টুকরো করবে শুনি? আমরা প্রত্যেকটা টুকরোতে তুমি ধরা আছো।... ফুলদানিটা ওখানেই রেখে দাও।'
_'তুমি যাও, যাও। আমি দেখতে চাই না তোমাকে।'
_'কিন্তু, আমি তো চোখ সরাতে পারবো না,_সরে যাবো। দৃশ্য আমার খাদ্য।'

২.
নির্মল শেলফের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসে আছে। বইগুলোও তেমনি, খুব ভোরে চলন্ত ট্রেনের জানলা দিয়ে যে-রকমটা দেখা। বলতে গেলে পড়াই হয় না। এক সময় পড়তো, হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াতো বই। স্কুল জীবনের কিরীটি রায়ের খুব ভক্ত ছিল। মনে আছে, নীহাররঞ্জনের 'চক্র' নামে একটা বই কিনেছিল ফুটপাত থেকে। অনেকদূর পড়া হয়ে গেছে, কৃষ্ণা-সুব্রত দূরে থাক, খোদ কিরীটি রায়েরই দেখা নেই! চক্রের সমাধান মিলল একদিন বাদে, পাড়াতো দাদা সুধাকান্তের কাছ থেকে। বইটা নীহাররঞ্জনের 'চক্র' নয়, _সুবোধ ঘোষের 'বাসবদত্তা'। বাজারে যাচ্ছিল না বলে, বাঁধাই না করা বইগুলোর ওপরে নীহাররঞ্জনের লেবেল মুড়ে দেওয়া হয়েছে। সুধাকান্তদা বইটা ফেরত দিয়ে বললো_ 'দু'নম্বরী কিনতে গিয়ে এক নম্বরী কিনে ফেলেছ।'
এতো বছর পরে পুরনো একটা প্রশ্ন মোচড় দিয়ে উঠলো_ এক নম্বরী জিনিস চালাতে গিয়ে দু'নম্বরী মলাট কেন লাগাতে হয়েছে?

৩.
_'কী ভাবছো?' আয়না আবার কথা বলে উঠলো।
নির্মলের রাগ তখনও পড়েনি। গোঁ গোঁ করে বললো_ 'ফুলদানি কিন্তু বেশি দূরে নয়।'
_'শোনো জেন্টেলম্যান, বেশি মেজাজ দেখিও না। আমি সব দেখেছি। সব দৃশ্য জমা আছে ভেতরে_ সব। আমি তোমার ল্যাপটপ নই যে, রিসাইকেল বিন থেকে ওগুলো গায়ের করে দেবে।'
নির্মল ঘামতে শুরু করেছে। অল্প অল্প হাঁপাচ্ছে।
_'সারাদিন অফিসে মুনুমুনু পুষুপুষু। রাত হলে জন্তুর মতো হামাগুড়ি দিয়ে বউয়ের ওপার হামলে পড়ো। একঘেয়ে দৃশ্যগুলো সব জমা আছে। জানো, মাঝে মধ্যে না আমার বমি বমি লাগে। নাড়িভুড়ি মোচড় দেয়। মনে হয় সব উগড়ে আসবে। নীল বমি দেখে, তোমার ছেলেমেয়েরা তাদের বাবাকে চিনতে পারবে না। ভাববে_ অপরিচিত একটা জন্তু তাদের মায়ের ওপর হামলে পড়েছে। ওরা চিৎকার করে উঠবে_ বাবা, বাবা, মাকে বাঁচাও_ রাক্ষসটা খেয়ে ফেলবে মাকে। আপাতত রাক্ষসটাকে আমি লুকিয়ে রেখেছি। আমি ভেঙে গেলে ওটাকে বের করে দেবো।'
_ 'না, তুমি তা করতে পারো না।' নির্মল ভয় পেয়ে গেছে_ 'আমি তোমাকে বাসায় এনেছি। তোমাকে ঝকঝকে তকতকে করে রাখা হয় ...।'
_ 'ধুলো জমলেই ভালো ছিল; ঝাপসা দেখতাম। এই যে তুমি, ঘরে তুমি ছাড়া যখন কেউ থাকে না, ন্যাংটো হয়ে এ ঘরে ও ঘরে হাঁটাহাঁটি করো, আমার সামনে দাঁড়িয়ে আদিমকালের মানুষ সাজো, গুহা খোঁজ_ কয়েকরকম গুহা গেলবার বউবাচ্চা যখন ছিল না_ তুমি একা; তখন দরজা খুলে কাকে ঘরে ঢুকিয়েছিলে_ যার নাম পর্যন্ত জানো না! তোমার বউয়ের সামনে ওই দৃশ্যটা যদি বমি করে দিই!'
নির্মল একটা চিৎকার দিয়েছিল, তারপর আর কিছু মনে নেই। সকালে দেখলো আয়নার একটা কেন্দ্র থেকে কয়েকা ফাটল নানা দিকে চলে যাচ্ছে। যে কোনো মুহূর্তে খসে পড়তে পারে। সেখানে সেঁটে আছে একাধিক নির্মল আচার্য। ভাঙা ভাঙা নির্মল আচার্য। অথচ, ছোটবেলায় সেলুনের মুখোমুখি আয়নায় অনেকগুলো নির্মল ছিল, কিন্তু এ রকম ছিল না।

৪.
পাউরুটি খেলে বমি বমি লাগে। অফিসের বেসিনে একবার চেষ্টাও করেছে, কিন্তু হয়নি। ডিমের সাদা তুলতুলে মাংস_ মানে তৃতীয় মুখোশ_ থিকথিকে কালো দইয়ের সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে। থাক। ওসব বেরিয়ে না আসাই ভালো। বারবার আয়নার কথা মনে পড়ছে। অফিসের কাজে মন বসাতে পারছে না। আয়নায় ফাটল দিয়েছে, জন্তুটা বেরিয়ে আসতে পারে। কিন্তু আয়নাটা ফাটলো কী করে, নির্মল এখনও বুঝে উঠতে পারছে না।
এরই মধ্যে, অন্যমনস্কভাবে, একটা ইনভাইটেশন কার্ডের উল্টো পিঠে অনেকগুলো মুখ এঁকে ফেলেছে। লাইন অ্যান্ড সেড নিয়ে খেললো কিছুক্ষণ। বাথরুম হয়ে এসে আবার যখন দেখল, ততক্ষণে সব মুখোশ হেয় গেছে। ঠিক আফ্রিকার আদিম নৃ-গোষ্ঠীর মুখোশের মতো।
ঠিক তাও হয়নি। আদিমকালের মুখোশে এক ধরনের খাঁটিত্ব ছিল, গোষ্ঠীগত ঐক্য ছিল, তাৎপর্যবাহী বিশ্বাসযোগ্যতা ছিল। সবচেয়ে বড় কথা_ সরল অভিপ্রায় ছিল। তাদের ভেতরে যে বিশ্বাস ছিল, সেই বিশ্বাসকে ফুটিয়ে তোলার জন্যেই তারা মুখোশ পরত। অথচ, ধুলো থেকে চোখকে বাঁচাবার জন্যে আমরা যে সানগ্গ্নাস পরি, সেটা অন্যের চোখে ধুলো দেওয়ার কাজেই বেশি আসে। একটা মুখের ওপর একই সঙ্গে অনেক চেহারা আমরা সাজিয়ে রাখতে পারি।
নির্মাল আচার্যও পেরেছে। সিঁড়ি ডিঙানোর ইতিহাসটুকু কার্পেট দিয়ে ঢেকে রাখতে। তা না হলে কি আর এতো অল্প সময়ের মধ্যে এতো বড় অ্যাড-ফার্মের চিফ ডিজাইনার! বড় হতে গিয়ে পদে পদে ছোটমনের কতো পরিচয় সে পেছনে ফেলে এসেছে! শুধু, বড় সাহেবের শ্যালকের সঙ্গে কৃত্রিম ঘনিষ্ঠতার রশিটুকু কিছুতেই খুলতে পারছে না। নির্মলের সব দুর্বলতা তার জানা। এই জন্যেই, তার মেয়েকে বিশ্রীভাবে আদর করার পরও এমন ভাব করেছে, যেন দ্যাখেনি।
৫.
ফাইল হাতে ঢুকলো টুম্পা_ নির্মলের জুনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট। বসের কথামতো টেবিলের কোণা ঘেঁষে দাঁড়াবে। নির্মলের হাতের মুঠো অভ্যাসবশত চলে যাবে ঐ স্পর্শকাতর জায়গায়। টুম্পা টেবিলে উপুড় হয়ে ফাইল খুলবে। বালুচরের মতো উপচে উঠবে অনাবৃত অংশ,_ চোখ দিয়ে চেটে খাওয়ার জন্যে। কেউ ঢোকা মাত্র আঁচলে ঢাকা পড়বে প্রাত্যহিক উপচার। অনাবশ্যকভাবে টুম্পার মুখে ধ্বনিত হবে_ 'আঙ্কেল'।
'আঙ্কেল' হয়েও নির্মল ছুটির পরে আটকে রাখে টুম্পাকে। সুযোগ বুঝে বড় সাহেবের রুমে পাঠায়। মেয়েটাও বুঝে না বোঝার ভান করে। যে মেয়ে মামুলি একটা চাকরির জন্যে বাবার বন্ধুর সঙ্গে বান্দরবানে রাত কাটাতে পারে, তার জন্যে বড় সাহেবের রুম তো দার্জিলিং, আর সে নিজে কাঞ্চনজঙ্ঘা।
বড় সাহেবের টেবিলের ওপর ফ্রেমেবন্দি সুখী পরিবার। ঘরের সেই পাগলা আয়নাটা বলেছিল_ 'ব্যস, নির্মল আচার্য, তোমার দৌড় এই পর্যন্ত। তুমি দ্যাখোনি, পেছনের লাগোয়া রেস্টরুমে প্রমাণ সাইজের আয়না_ আমার আত্মীয়। তার মুখে শুনেছি বুড়োর অক্ষম আগ্রাসনের কথা। বুড়োর ব্যর্থতায় মেয়েটার করুণা জাগে। বেচারা। 'ব্যস্ততা'র অজুহাতে স্ত্রী না ঘুমানো পর্যন্ত বাড়িতে ফেরে না। তোমাদের মুখ ও মুখোশের খেলা এভাবেই চলে আসছে, চলবে।
৬.
তোমার একার দোষ দিয়ে লাভ কী! এই ধরো, তুমি যখন ছোট, খুব ছোট, কাঁথার পর কাঁথা মুতে ভাসিয়ে দিচ্ছ, তখন সারাদেশ ভেসে যাচ্ছিল বন্যায়।_ তোমার জানার কথা নয়। প্রলয়ঙ্করী বন্যা বলতে যা বোঝায়, ঐ মাপের সতেরটা বন্যা হয়েছিল এ দেশে। পর পর তিন বছরে তিনটা বন্যা হলো_ ৫৪.৫৫.৫৬-তে। মজলুম জননেতা ভাসানী কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পঞ্চাশ কোটি টাকা সাহায্য দানের দাবিতে অনশন শুরু করেছিলেন।
মজার ব্যাপার কী জানো? ঠিক ঐ সময়ে বাঙালি মধ্যবিত্তের বিনোদনের জন্য কলকাতা-বোম্বাই-মাদ্রাজ-লাহোরের দেখাদেখি ঢাকাতেও সিনেমা-বানানোর পুঁজি নিশপিশ করছিল। ৫৪-এর বন্যাবর্ষে (৬ আগস্ট) ছবির শুভমহরত অনুষ্ঠান হলো। মুক্তি পেল ৩ আগস্ট ১৯৫৬_ তাও বন্যাবর্ষ। সিনেমার নাম 'মুখ ও মুখোশ'। কাকতালীয় ব্যাপার_ তাই না?
আমাদের সারা দেহজুড়ে চোখ, আমরা দেখেছি_ ঐ বছরটা শুধু বন্যার বছর নয়, দুর্ভিক্ষেরও বটে। দেশে যখন দুর্ভিক্ষ চলছে, তখন ঢাকা-চট্টগ্রাম-নারায়ণগঞ্জে 'একযোগে চলিতেছে' 'মুখ ও মুখোশ'! একদিকে মানুষ মরছে, অন্যদিকে সিনেমা হলে হাততালি।
তোমাদের বিনোদনশিল্প আর পুঁজির বিকাশ এভাবেই শুরু হয়েছিল। এটাই ঐতিহাসিক সত্য। এ রকম এক বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে আজ তুমি, তোমাদের সভ্যতা, তোমাদের সংস্কৃতি, তোমাদের অন্তর্জগৎ।
তোমরা সভ্যতার জনক, সেহেতু বাস্তবতারও জনক। তোমরা অনেক কিছু বানাতে পরো, বিক্রি করতে পারো। তোমরা সত্যকেও বিক্রি করতে পারো, কিনতে পারো। তোমাদের যা যা আছে সবই পণ্য, যা কিছু নেই তাও।
এই যে, বিজ্ঞাপনের জন্যে যখন মডেল খোঁজ, তখন কী কী দ্যাখো? কার শরীরের কোন কোন অংশে চুম্বক আছে_ সেগুলোই তো? ভিন্ন চাকরির জন্যে ইন্টারভিউ দিতে আসা বন্ধুর মেয়েটি যখন তোমাকে পায়ে ছুঁয়ে প্রণাম করছিল, তোমার পঁয়তালি্লশ ডিগ্রি দৃষ্টিভঙ্গির গন্তব্য কী ছিল? শুনতে হয়তো তোমার খারাপ লাগছে, কিন্তু করার বেলার তোমাদের খারাপ লাগে না।
সত্যিই তোমরা সভ্য। কী সুন্দরভাবে পোশাক-আসাকের গুহায় নিজেদের পশুত্বকে লুকিয়ে রাখতে পেরেছ!
তুমিই বা কী করতে পারো। চাকরি করতে হয়, গোলামি করতে হয়, চোখকান বন্ধ রাখতে হয়। আরও যা যা আছে। এস্টাবলিস্টমেন্টের বিরুদ্ধে দাঁড়াবার সাহস তোমার নেই। যে গাছের ডালে চড়ে বসেছ, তার গোড়ায় করাত চালাবার মতো বোকা তুমি নও। তাই, সমাজের মধ্যে থেকেও ঘুণপোকার মতো কাজ করে যাচ্ছ তুমি। সমাজের দোহাই পেড়ে বাদবাকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বড় করে তুলেছ। এইসব ধাপ্পাবাজি তোমরা ঠিকই বোঝ। তোমাদের ভয়_ কর্পোরেট সিস্টেম থেকে ছিটকে পড়া মানেই উল্কার ছাই।
অথচ দ্যাখো, একটা সময় ছিল যখন সমাজের পাল্লা ছিল ভারী। নিত্যনতুন প্রতিষ্ঠান এসে সমাজকে গিলে ফেলেছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই কমবেশি সমাজের মুখোশ মাত্র। এমনকি রাষ্ট্রও। সমাজের মুখ কিন্তু অন্য রকম। তোমাদের মতো মাল ডেলিভারি দেওয়া আর্টিস্টের পক্ষে তা আঁকা সম্ভব নয়।
৮.
বড় সাহেব নেই, টুম্পা নেই, কাজও তেমন নেই। অফিস পাহারা দেওয়ার কোনো মানে হয় না। ঝোলাটা কাঁধে নিয়ে আস্তে আস্তে রাস্তায় নেমে পড়লো নির্মল আচার্য। উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটছে, আর এদিকে ওদিকে তাকাচ্ছে। নানা রকম বিলবোর্ড। দেশপ্রেমিকের পোস্টারের পাশেই এক হাজার গুণ বড় বিদেশী নায়িকা। তাকে উন্মোচিত করলেই গোলাপি রঙের পেলব সাবান। সাবানও মুখোশ পরে! কেউ বলে মোড়ক।
পান্থপথে ভালোই জ্যাম। উঁকি দেওয়ার জন্যে জানলা খুলতেই দৌড়ে গেল ফুলওয়ালি। অমনি কাচটা বন্ধ হয়ে গেল। গাড়িতে বসা ভদ্রমহিলা হয়তো নারী উন্নয়ন সংস্থার কিছু একটা হবেন। পেছনের গাড়ির জানলার কাচ নেমে গেল। টাকমাথাওয়ালা ভদ্রলোক প্রয়োজনের বেশি কথা বললেন এবং প্রয়োজনহীনভাবে দুটো মালা মেয়েটার কাছ থেকে কিনলেন। কালো ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে একটা বাস মস্তানের মতো বেলাইনে ঢুকে পড়লো। মুখোশপরা ট্রাফিক পুলিশ ওটাকেই আগে ছাড় দিল। জনগণের সেবায় নিবেদিতপ্রাণ নেতার গাড়ি ক্রস করে যাবার পর, জ্যাম ছুটলো। রিকশা থেকে হাত নাড়লো ছাত্রনেতা হাসিল, পাশে ম্যাডাম।
বাঁ দিকে মোড় কাটলেই পার্লার। ওখান থেকে বেরিয়ে আসছে ডিসটেম্পার করা কয়েকটা মুখ। আর একটু সামনে অন্ধ লাইটপোস্ট। তিন চারজন মহিলা। দু'জনের মুখে নেকাব। একজনের হাতে ধরা একটা বাচ্চা। গৃহিণী গৃহিণী ভাব ফুটিয়ে তোলার উপকরণ।
মুখোশের পর মুখোশ দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে নির্মল। অথচ বাসাতেও ফিরতে ইচ্ছে করছে না। ভয়ে। পাগলা আয়না আবার না কী শুরু করে। বাসায় ফিরে সম্পূর্ণ ন্যাংটো হয়ে সে জামাকাপড় পাল্টাবে। কিন্তু ড্রইংরুমে।
বাসায় ফিরে সে রীতিমতো তাজ্জব। আয়নার ফাটল-টাটল সব গায়েব। দুই হাতে হালকা একটা ঝাঁকুনি দিল। _ 'কী? এবার কোন মতলব এঁটেছ?' কোনো জবাব না পেয়ে নির্মলের সাহস বেড়ে গেল। কর্কশকণ্ঠে বললো_ 'মজা আমিও দেখাতে পারি। কালকেই বিক্রি করে দেব তোকে। বউ জিগ্যেস করলে বলবো ফেটে গেছে। তারপর যা হবার হবে। দৃশ্যগুলো দিয়ে বায়োস্কোপ বানা, এক্সিবিশন কর, জাহান্নামে যা।'
আয়না নিশ্চুপ। নির্মল উঠে গিয়ে, পা দিয়ে আয়নার বুকে ঠেলা মারলো। সাড়া নেই। সম্ভবত মরে গেছে। মরে গেলেই ভালো। নির্মলের বেঁচে থাকতে অসুবিধা হবে না।

এসো পড়া শিখি by বুলবুল চৌধুরী

প্যাকেজ নাটক প্রচলনের কয়েক বছর আগে বিটিভিতে জমা দেওয়ার লক্ষ্যে আমি 'চন্দ্রবরণ' নামে একটি নাটক লিখলেও শেষাবধি ওদিকে যাইনি। কেননা, ভেবেছিলাম, নিজেই এটির নির্দেশক হয়ে ভিডিও ক্যামেরায় চিত্রগ্রহণ সম্পন্ন করি না কেন। অতীতে চিত্রজগৎ ঘুরে চিত্রপরিচালনা-বিষয়ক কিছু শিক্ষা অবশ্য নিতে পেরেছিলাম। আজ ওই জ্ঞান দিয়ে সামনে এগুবার সাহস ধরলেও নাটক নির্মাণের প্রয়োজনে খরচপাতির হিসাবটা সর্বাগ্রে এসে যায়। তবে ওই খেয়ালে বন্ধুবর সালেহ আহমেদ টাকা ঢালতে রাজি হওয়ায় সমস্যা মেটানো গিয়েছিল। পরের ধাপে 'চন্দ্রবরণে'র নায়ক সুন্দর আলী গায়েনের চরিত্র রূপায়িত করার প্রস্তাব নিয়ে হুমায়ুন ফরীদির মুখোমুখি হয়েছিলাম। সব শুনে আমার আবেগে সাঁতার-ভাসা হয়ে তিনি জবাব দিয়েছিলেন, যান, আমি সুন্দর আলী গায়েন হয়ে গেলাম।
ইতিমধ্যে ঢাকা থিয়েটারের মঞ্চে এবং বিটিভির পর্দায় অভিনয় পারঙ্গমতা দিয়ে হুমায়ুন ফরীদি দর্শকের বিপুল সাড়া কুড়িয়েছেন। আমার নাটকে তার ঝোঁক পড়ায় ভারি আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠেছিলাম এই ভেবে যে, নিশ্চয় আমি 'চন্দ্রবরণে'র নাট্যরূপে উৎকর্ষের ছাপ টানতে পেরেছি। সেই উত্তেজনা নিয়ে নাটকটির আগুন মিস্ত্রির চরিত্রে আবুল খায়ের এবং চেয়ারম্যান চরিত্রে আলী যাকেরকে পেতে ছুট লাগিয়েছিলাম। তারা 'চন্দ্রবরণে' নিজেকে যুক্ত করবার আগ্রহ দেখালেন। অভিনেত্রী পান্নাও ভিড়লেন দলে। আর 'চন্দ্রবরণে'র নায়িকা চন্দ্রবানুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হলেন ঢাকার বিভিন্ন মঞ্চে অভিনয় দিয়ে চলা মেয়ে রানী। মেকআপম্যান ধীরেন কর্মকারের বদৌলতে পুরান ঢাকার নাট্যদল 'মহানগর-৭৭'-এর ক'জন অভিনেতা-অভিনেত্রী কাছে পাওয়া গেল। কিন্তু শুটিংয়ে যাত্রা করার দু'দিন আগে হুমায়ুন ফরীদি বললেন, বুলবুল ভাই, আমি যে থাকতে পারছি না।
কারণ দর্শাতে গিয়ে তিনি জানালেন, সংসারে সবে আসা স্ত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার ডাকে তাকে কলকাতা যেতে হচ্ছে। তবে আমার উদ্যোগে আন্তরিকতার প্রমাণ রাখতে তার জায়গায় ঢাকা থিয়েটারের অন্যতম অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিমকে সুন্দর আলী গায়েনের চরিত্র রূপায়িত করার আদেশ দিয়েছেন।
স্বীকার করতেই হয়, ফরীদির আলাপে আমার রা অনেকখানি কমে এসেছিল। তবে সবাইকে নিয়ে গাজীপুরের বালিগাঁও গ্রামের পৈতৃক ভিটায় নাটকটির চিত্রায়ন শুরু হওয়ার ভেতর দিয়ে আমার কথা ফিরে এসেছিল। সেই সঙ্গে বলি, চরিত্র ফুটিয়ে তুলবার ক্ষেত্রে কুশীলবদের অসামান্য কিছু অভিব্যক্তি ধারণ করতে পারার আনন্দ আমাকে আপাদমস্তক মুড়ে নিয়েছিল। কিন্তু কাজ শেষে ঢাকায় ফিরে এডিটিং টেবিলে বসে হিসাব মেলাতে গিয়ে দেখি, রেকর্ডকৃত একটি ক্যাসেট খোয়া গেছে। এতে হতাশার ঘেরেই পুরোপুরি বন্দি হলাম আমি। এরই মাঝে বুঝলাম, 'চন্দ্রবরণে'র ঠিক ঠিক সমাপ্তি আনা গেলেও কোনো হল ভাড়া নিয়ে সেটি বড় পর্দায় প্রদর্শন করা যেত। তাতে দর্শক জোটাতে গিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া ছাড়াও চেনা মানুষদের কাছে টিকিট বিক্রির ব্যাপারটাও যে জড়িত আছে। এসবের বাইরেও নানা বাস্তবতা নজরে এনে নাটকটির অসমাপ্তিকেই আমি সমাপ্তি মেনে নিয়েছিলাম। আর সেই ব্যর্থতায় অনেকখানি আড়ালে সেঁধিয়েই গিয়েছিলাম বুঝি।
তারপর আসা যাক প্যাকেজ নাটক নির্মাণ শুরু হওয়ার শুরুতে আমার দ্বিতীয় প্রয়াস 'তিয়াস' প্রসঙ্গে। এটি আমি লিখেছিলাম গ্রাম থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবীর হিমুর অনুপ্রেরণায়। সেই খবর পেয়ে এতে প্রয়োজনীয় টাকা দিতে রাজি হলেন আমার মুদ্রণ ব্যবসার অংশীদার মানিক চৌধুরী। সঙ্গে সঙ্গেই হিমু ভাইকে নিয়ে নেমে পড়েছিলাম পাত্র-পাত্রী নির্বাচনের কাজে। এক পর্যায়ে ক'জন অভিনেতা-অভিনেত্রীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল 'তিয়াস' নাটকটির ফটোস্ট্যাট কপি। তাদের মধ্যে ছিল ঢাকা থিয়েটারের অভিনেতা পাখির নাম। তার কাছে থাকা 'তিয়াস' নাটকের ফটোস্ট্যাট কপি কে জানে, কী ভেবে সুবর্ণা মুস্তাফা পড়তে বসে গিয়েছিলেন। সেই সূত্র ধরে হিমু ভাইকে দিয়ে আমাকে নেওয়া হলো তার বাসায়। তিনি বললেন, বুলবুল ভাই, আপনার এই নাটকটা আমি পরিচালনা করতে চাই।
তা শুনে ভেবেছি, এমনটাই যেন হয় ঈশ্বর। পাশে পাশে প্রশ্ন করেছিলাম, আপনাকে নির্দেশনার জন্য কী সম্মানী দেব ম্যাডাম।
তার উত্তর ছিল, এক কানাকড়িও নয়।
কেন?
তিনি স্মিত হেসে জবাব দিয়েছিলেন, এটি আমার প্রথম পরিচালনা। তা দিয়ে আমি বড় সম্মানী মিলিয়ে নেব।
হুমায়ুন ফরীদি প্রবেশ করলেন দৃশ্যে। তিনি বললেন, 'চন্দ্রবরণে' না পারলেও আপনার 'তিয়াস' নাটকে আমি থাকব বুলবুল ভাই।
সুবর্ণা মুস্তাফার পরিচালনায় মাসখানেকের মাথায় নাটকটির চিত্রগ্রহণ সম্পন্ন করেছিলেন শফিকুল ইসলাম স্বপন। 'তিয়াসে'র নায়ক হলেন পাখি এবং নায়িকা হলেন মেঘনা। হুমায়ুন ফরীদি মাহি ভাইয়ের চরিত্র রূপায়িত করেছিলেন। অন্যান্য প্রয়োজনে সুবর্ণা মুস্তাফা ঢাকা থিয়েটারের অনেককেই সামনে এনেছিলেন। কিন্তু তার নির্মিত 'তিয়াস' নাটকটি নিয়ে পাঁচ বছর বিভিন্ন দুয়ার চষে বেড়ানো শেষে চ্যানেল আইয়ের স্বত্বাধিকারী ফরিদুর রেজা সাগরের বদান্যতায় মুক্তি পেয়েছিল। সে বছরই চ্যানেল আই এবং সাপ্তাহিক ২০০০ পত্রিকার বিবেচনায় এতে অভিনয় দিয়ে শ্রেষ্ঠ চরিত্রাভিনেতার স্বীকৃতি পেয়েছিলেন হুমায়ুন ফরীদি। নিজের দৌড় আজও কতটুকুই বা মাপতে পারছি! তবে প্রশ্ন জাগে, এ দেশে সুবর্ণা মুস্তাফার মতো গুণী অভিনেত্রী পরিচালিত নাটকটি চিহ্নিত করতে দেরি হওয়ার কীবা কারণ।
চিত্রসাংবাদিক হয়ে চিত্রজগৎ মাড়িয়ে যাওয়ার দিনগুলোয় কুশীলবদের নানা রকম-সকম জ্ঞাতে এসেছে। টিভি উপযোগী নাটক করতে গিয়েও যথেষ্ট জানলাম, শিখলাম। মাঝে বিটিভির প্রযোজক ভাগ্নে নূর মোহাম্মদ খানের ডাকে 'এসো পড়া শিখি' অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েও আমি এ-বিষয়ক অধিকতর শিক্ষা নিতে পেরেছিলাম। প্রতি সপ্তাহে একবার প্রচারিত অনুষ্ঠানটি তৈরি হতো গ্রামবাংলার অভাবী-সহজ অথচ কম শিক্ষিত এবং নিরক্ষর মানুষদের চিন্তা সামনে রেখে। কবি রফিক আজাদের স্ত্রী দিলারা হাফিজ তাতে শিক্ষিকা হয়ে বল্গ্যাক বোর্ডে বর্ণমালা লিখে শেখাতেন উপস্থিত নিরক্ষর কিছু বয়স্ক নারী-পুরুষকে। আর আমি লিখতাম দশ মিনিটের শিক্ষামূলক একখানা নাটিকা। এতে ভিড় জমাত অনেক অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী। এ ক্ষেত্রে বিটিভির নিয়মাবলি জানাতে গিয়ে প্রযোজক নূর মোহাম্মদ খান আমাকে আগেই সাবধান করেছিল, মামা, নাটকে কিন্তু দশের বেশি চরিত্র আনা যাবে না।
বুঝতে পারি, বেশি চরিত্র যুক্ত হলে সম্মানীর টাকা অনুষ্ঠানটির বাজেট ছাড়িয়ে যাওয়ার চিন্তাতেই কর্তৃপক্ষ এ নির্দেশ জারি করেছে। ফলে সেই ছক স্মরণে রেখে কাজটা সারতে হয়। লক্ষ্য করি, তাতে কুশীলবদের অনুরোধ সামলাবার ক্ষেত্রে বেশ খানিকটা ধকল যায় প্রযোজকের ওপর দিয়ে। কারণ হচ্ছে, ওই নাটিকাটির মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করতে অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রী প্রযোজকের সামনে জড়ো হতেন। অনেকে আবার প্রথম অভিনয়ে ঢুকবার আশায় ঘুরঘুর করতেন। প্রযোজকের মামা হওয়ায় দলের সবাই আমাকে মামা ডাকে কাছে টেনে নিয়েছিল। তারা সময়ে সময়ে আমাকেও ধরে বসত। প্রশ্ন করত, মামা, তোমার নাটকে কি আমার একটু জায়গা হবে না।
নিয়ম অনুযায়ী এখানে অডিশন দিয়ে উত্তীর্ণ হওয়া শিল্পীরাই শুধু নাটিকায় অংশ নিতে পারত। তবে তাদের বাইরেও অভিনয়ে পিপাসা মেটাতে আসা নানা মুখের আনাগোনা পরিলক্ষিত ছিল। বিটিভির নিয়ম ভেঙে আমি কিংবা প্রযোজক ওই দলের কাউকে অভিনয়ে জায়গা করে দিলে নিশ্চয়ই জবাবদিহিতার তল হতে হতো। তবে কি-না আমি এবং প্রযোজক তাদের অনেকের অনুরোধে সায় দিতে পেরেছিলাম। এই ক্ষেত্রে দু'জনের সম্মতিতে বিশেষ কৌশল প্রয়োগ করা হয়েছিল। সেটি এরকম : নাটিকার চরিত্র সংখ্যা আমরা দশ পেছনে ফেলে ষোলোর ঘরে নিয়ে ঠেকিয়েছিলাম। ওই সুযোগে নতুনদের ডেকে নেওয়ার পাশাপাশি বলে দিতাম, অভিনয় বাবদ সম্মানী কিন্তু মিলবে না।
আমাদের এরকম ব্যবস্থায় কর্তৃপক্ষের ঠিক চোখ ফেলবার ছিল না। কেননা, তাদের হিসাব মেলানোটাই হলো একমাত্র ব্যাপার-স্যাপার। তবে মাঝে ওইটুকু প্রাপ্তিতে নতুনদের মুখাবয়বে ঢলঢলে উদ্ভাস ছড়িয়ে পড়ত। আপন অনুভবও তাতে ক্ষণে ক্ষণে মাত্রা নিয়েছে।
'এসো পড়া শিখি' দলটির সঙ্গে আউটডোর শুটিং করতে দূর দূর গ্রামে হাজির হয়েছি। তাদের মামা ডাকে বড় আবেশও জন্মেছে। কিন্তু বছর দেড়েক বাদে বিটিভি ছাড়বার ঘটনায় দলটির সানি্নধ্য হারাই। কেননা, এ সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিপরীতমুখী অবস্থানের শিকার হতে হয়েছিল নূর মোহাম্মদ খানকে। পরিণতিতে 'এসো পড়া শিখি' অনুষ্ঠানটি প্রযোজনা তার হাত থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
তারপর মনে পড়ে, 'এসো পড়া শিখি'র নাটিকায় একবার অভিনয় করতে পারা মেয়ে মীরানার মুখ। বিটিভি ছেড়ে আসার বছরখানেক পর মালিবাগ মোড়ে ওর দেখা পেয়েছিলাম আমি। ডাকল, মামা, চলো, ওই তো সামনেই আমার বাসা।
মীরানার আহ্বানে দিয়েছিলাম সমর্পণ। একটা ফ্ল্যাটের দোতলায় থাকে ও। তালা খুলবার পর মেয়েটির ঘরে ঢুকতেই বিশেষ ধন্ধে নিপতিত হই। একি কাণ্ড ! ড্রইংরুমের সোফায় এক কিশোরী যে ঘুমে বিভোর। জিজ্ঞেস করি, কে রে!
আমার আত্মীয়।
খুব গরিব তো। তাই নিজের কাছে নিয়ে এসেছি।
ওকে তালা আটকে রাখিস বুঝি?
জবাব আসে, ওমা, তুমি কী বোকা মামা! যা দিনকাল_ কেউ এসে কলিংবেল টিপলে সেই আওয়াজে ও যদি দরজা খুলে দেয়!
আমাদের সাড়া পেয়ে কিশোরীটির ঘুম ভাঙে। ওকে চা বানাতে রান্নাঘরে পাঠিয়ে দিয়ে মীরানা বলেছিল, মামা, আমি কিন্তু বোম্বের ড্যান্স শিখেছি।
তাই নাকি?
হ্যাঁ, নায়িকা হতে যাচ্ছি তো।
চমকে তাকাই ওর দিকে। নায়িকার আসন পেতে চাইলে শরীরের গঠন, চেহারা, আচরণ এবং উচ্চারণে যেমন পরিশীলন থাকা দরকার, ঠিক তেমনটা নয় মীরানা। তাও বলি, খুবই খুশির খবর তো। আচ্ছা, কী নাম ছবির? কে-ইবা পরিচালক?
সেই জিজ্ঞাসার উত্তরে জেনেছিলাম মীরানার এক আপন ফুফা ছবি প্রযোজনায় নেমেছেন। তারই টাকায় কেনা হয়েছে ঘরের আসবাবপত্র। মাস অন্তে ফ্ল্যাট ভাড়ার টাকা পরিশোধ করা এবং খাওয়ার খরচ তিনিই জোগান দিয়ে আসছেন।
এ নিয়ে ওকে পরামর্শ দেওয়ার কী-ইবা ছিল আমার। তাই নীরব থেকেছি।
আপ্যায়ন পর্বে চায়ের কাপ মুখে তুলে নিতেই বাইরে দাঁড়ানো কেউ কলিংবেলে টিপ লাগিয়েছিল। মীরানা উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই দীর্ঘদেহী যেমন, তেমন মোটা এক প্রৌঢ় ভেতরে ঢুকে টানটান চোখে আমাকে দেখে নিয়েই অদৃশ্য হলেন ওপাশের বেডরুমে। ও ডাকল, মামা।
সঙ্গে সঙ্গেই প্রশ্ন করেছিলাম, কে রে মা।
উত্তরে জানা গেল, তিনি হচ্ছেন মীরানার সেই প্রযোজক ফুফা। এ সময় তার আসবার কথা ছিল না। তাও এসে পড়ায় এমন বিড়ম্বনা হলো। বিদায় বেলায় ও বলেছিল, মামা, বাসা তো চিনলে। আবার এসো কিন্তু।
আহ্বান সত্ত্বেও মীরানার দেখা পেতে আগ্রহী হইনি। তবে স্মরণের পর্দায় ওর হঠাৎ উঁকিঝুঁকি পরিদৃষ্ট থাকল। ওরকম চেয়ে চেয়ে বেড়ানোর ফলেই বুঝি সেদিন নিজের বইয়ের কাজে প্রকাশক তোফাজ্জল হোসেনের পুরানা পল্টনের অফিসে ঢুকবার মুখে মীরানার দেখা পেয়েছিলাম। বলল, মামা, তোমাকে যে কত মনে করি!
ওর আন্তরিকতায় মিশে যাওয়ার ইচ্ছায় জবাব দিয়েছিলাম, মারে, আমিও কি তোকে ভুলতে পারলাম? আয় আমার সঙ্গে। কিছু মুখে দিয়ে তবেই যেতে পারবি।
প্রকাশকের অফিসে বসাই মীরানাকে। জিজ্ঞেস করি, কেমন আছিস তুই।
উত্তরে জানতে পারি, কোনো ছবি প্রযোজনায় নামবার আগেই ওর ফুফা মারা যাওয়ার পর ও সংসার নিয়েছে। স্বামীর ঔরসে এক ছেলেও এসেছে কোলে।
প্রশ্ন তুলেছিলাম, এখনও কি অভিনয় করিস!
না মামা। তবে গান গেয়ে বেড়াই। লালনগীতি। শোনাই তোমাকে?
শোনা।
ও গেয়ে ওঠে, 'আমি কী তাই জানলে সাধন সিদ্ধি হয়/আমি শব্দ অর্থ ভারি/আমি তো আর আমি নয়...।'
গান ফুরোতেই বলি, সুর আছে রে মা তোর গলায়। দরদটাও ঢালতে পারিস। কই, আগে তো টের পাইনি!
মামা।
কী?
একদিন আসো না আমার বাসায়।
কোথায় থাকিস তুই?
সাভারে।
সেখানে যাবার ইচ্ছায় মীরানার ফোন নাম্বার টুকে নিয়েছি আমার মোবাইল সেটে। তবে এখন অবধি ওদিকে পা বাড়াতে না পারলেও মেয়েটিকে ঘিরে আমার দেখার সীমানা ব্যাপ্তই হলো আসলে। এতে ভাবতে পারি, আমরা বর্ণমালা দিয়েই 'এসো পড়া শিখি'র সূচনা করি। আবার জীবনের উত্তরণ ঘটানোর চর্চাও যে 'এসো পড়া শিখি'র মতো অন্যতর এক অধ্যায়।

পাঠক ভুবন

যে প্রশ্নটির উত্তর মেলে না
ঘড়িতে বিষণ্ন গোধূলি। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি গায়ে মেখে উড়ছে উত্তরের ভেজা হাওয়া। ভীষণ-ঠাণ্ডা। ফুলার রোডের মলিন আকাশে অগণিত কাকের কা, কা, আহাজারি, মাতম। এর মধ্যে আমি। আমার মধ্যে মেঘ। ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে বেরিয়েছি। রিমিকে অনেক অনুরোধ করার পরও আসেনি। অপেক্ষায় থাকি, সে আসবে। হ্যাঁ, রিমি এসেছিল। তাকে দেখে আমার হৃৎপিণ্ড কয়েক মুহূর্ত থমকে গিয়েছিল! পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর দৃশ্যের মুখোমুখি আমি। তার কোমরে অচেনা যুবকের হাত। না, এ নিছক অভিনয়। আমার রিমি এমনটি করতেই পারে না। ।
সমস্ত আবেগ দিয়ে, সবটুকু অনুভূতি নিংড়ে পরানের গহীন ভেতর থেকে ওকে বোঝানোর চেষ্টা করি, ভালোবাসার কথা। হাতটি বাড়িয়ে দেই ওর দিকে। আমি জানতাম, বাড়িয়ে দেওয়া এ হাত রিমি কখনো এড়িয়ে যেতে পারবে না। না, রিমির স্পর্শ আমি পাই না। প্রসারিত শূন্য হাতটি পড়ে থাকে। অর্থহীনভাবে নিষ্প্রাণ খালি হাতের দিকে তাকিয়ে থাকি। চোখের আকাশে শরতের মেঘ জমে। মেঘ ফেটে বৃষ্টি হতে চায়। আধো ভেজা চোখ তুলে তাকাই ওর মুখে ওর চোখে_ আরো গভীরে। না, রিমির পৃথিবীতে ব্যথিত মানুষের ছবি নেই। চেষ্টা করি সেই আগের মতো হাসার। যে হাসিতে ও বিহ্বল হতো। কিন্তু পারি না। বিপন্ন হাসিতে ওকে বিদায় জানাই। ও গুটি পায়ে এগিয়ে ছেলেটির হাত ধরে। ওরা ঘনিষ্ঠ হয়ে ধীর পায়ে হারিয়ে যেতে থাকে। আমার চোখের ফোঁটা ফোঁটা জল ওদের দুজনকে ঝাঁপসা করে দেয়। একটা ভঙ্গুর, বিধ্বস্ত, অসহায় হৃদয়ের বোঝা বুকে নিয়ে আবছা আলো-আঁধারে আমি দাঁড়িয়ে থাকি। ঠিক কতক্ষণ, জানি না।
২. রোদেলা দুপুর শুয়ে থাকে পিচঢালা রাজপথে, খোলা মাঠে ঘাসের বুকে। সবুজ আঁচল বিছিয়ে জেগে থাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সেগুন আর পাম গাছগুলি। সেই আঁচলে লুকিয়ে থাকে প্রিয় কষ্টের ছায়া। জোড়া জোড়া হৃদয়ের উষ্ণতা মিশে যায় রোদের মিছিলে। সন্ধ্যায় সোডিয়াম বাল্ব মুছে দেয় দুপুরের পদচিহ্ন। রোকেয়া হল, শামসুন্নাহার হল, গোটা টিএসসিতে হৃদয়ের নিঃশব্দ নিবিড় আলিঙ্গন। রিমি হয়তো সেখানে এখনও থাকে কিংবা থাকে না। যদি থাকে, তবে তার পেলব হাত আর মটরশুঁটির ডগার মতো আঙ্গুলগুলি নিশ্চয়ই লুকোচুরি খেলে। হয়ত তখন আমার আঙ্গুল সিগরেটের ধোঁয়া ওড়ায়। অজানা ভয় আর শঙ্কায় আমি ওই দিকে যায় না। এক সময় রিমিকে ছেড়ে যেতে চাইলে সে অনায়াসে নির্মেলেন্দুতে আশ্রয় নিতো। 'যাত্রাভঙ্গ' থেকে বলতো_ 'তুই কেমন করে যাবি?/পা বাড়ালেই পায়ের ছাঁয়া/আমাকে তুই পাবি।' আমি ঠিকই যে তোর পায়ের ছাঁয়া পাই। কেবল তুই পাসনারে গাধা মেয়ে (গাধাই বলতাম,গাধি না)। যদি আমায় না পায়, আমি যদি হারিয়ে যাই সেই শঙ্কায় বুকের পাঁজরে মুখ লুকিয়ে এখন কি তার একটুও শ্রাবণ হতে ইচ্ছে করে না_ ছোট্ট এ প্রশ্নটি আমাকে এলোমেলো করে দেয়। অথচ উত্তর মেলে না।
নিলয় নিলু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
চোখ খুললাম_ হাত ভর্তি বকুল নেই
১. হাত ভর্তি বকুল। হয়তো কারো জন্যে তুলেছে। নয়তো বা নিজের জন্যই মালা গাঁথবে। আমি বকুল ফুল চাইলাম। সে মাথা নেড়ে বললো, দেবে না। ফুলগুলো নিয়ে এক দৌড়ে সে চলে গেল। মনটা খারাপ হয়ে গেল। একটা বকুল যদি পেতাম, আহা!
২. ভীষণ ভিড়। পা ফেলবার জো নেই ভেতরে ম্যাজিক চলছে। ইয়া লম্বা গোঁফওয়ালা ম্যাজিশিয়ান। ভেনট্রিলোকুইজম দেখাচ্ছে। এ ম্যাজিক আমি বেশ ক'বার দেখেছি। কিন্তু যিনি দেখাচ্ছেন সেটার ভেতর মাদকতা আছে। পরপর বেশ ক'টা ম্যাজিক হলো। ভিড় ঠেলে একেবারে সামনে দাঁড়ালাম। প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা ম্যজিকের সাহায্যে ভালোবাসা আনা যায় না?
ম্যাজিশিয়ানটা থমকে গিয়ে ফ্যাল ফ্যাল করে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।
৩. গ্রিনরুম থেকে দীপা এসে বললো, আজ তো যেতে পারব না। সুদিপ দুটোয় একটা শো আছে; তুই চলে যা।
একটা তো মাত্র দিন। আয় না কোথাও যাই। না দীপা এলো না।
দুপুরের সূর্য মাথার উপর উঠে গেছে। হাঁটছি একা। পার্ক ভর্তি জুটি। আজ বসন্তদিন। হঠাৎ দেখিএকটা পাগল হাসছে। সামনে দাড়াল। দশটা টাকা দে? বলে হাতটা বাড়ালো পাগলটা; বললাম, কেন? দশ টাহার ভালবাসা দিমু তরে।
৪. গা-গুলানো ভাবটা যাচ্ছে না। নোংরামি। ঝুপঝাপ সন্ধ্যে নামতেই ঝোপের পাশে জাপটা জাপটি। এর নাম ভালোবাসা। প্রেম নাকি স্বর্গীয়। এ যে সাক্ষাৎ নরকপুরী। রাস্তার সোডিয়াম লাইটগুলো জ্বলে উঠতে শুরু করেছে। ঘরে ফিরব। আলোতে অন্ধকার দূর হচ্ছে কিন্তু নোংরামিতে ভালোবাসা ঢেকে যাচ্ছে!
৫. সন্ধ্যে তারাটা ডুবে যাচ্ছে। ঘরের দরজা খুলতে যাবো দেখি দুয়ারে এক জোড়া বকুল ফুলের মালা। দুয়ারে ভালোবাসা রেখে হন্যে হয়ে খুঁজেছি সারাদিন। আমার হাত ভর্তি বকুল। গন্ধ ছড়াচ্ছে । চোখ বন্ধ করলাম। মাতাল হচ্ছি ক্রমশ! চোখ খুললাম_ হাত ভর্তি বকুল নেই!
সকাল রায়, সুসং নগর, facebook.com/sokal.roy
আমরাই পারবো
সেই ছোটবেলা থেকেই টের পেতাম চার পাশের মানুষগুলো সুযোগ পেলেই বিদেশে পাড়ি জমাতে চেষ্টা করছে।
বিদেশে গেলেই নাকি জীবনটা অন্যরকম হয়ে যায়। কথাটা কিন্তু খুবই সত্যি। অচিন দেশ, অচিন মানুষ। পরিচিত মানুষজন নেই। ব্যস্ত জীবনে কার এত ফুরসত সেখানে আপনার জন্য সময় বের করার! বেঁচে থাকতে হলে সেখানে আপনাকে নিরন্তর শ্রম দিতে হবে। আচ্ছা, বিদেশে গিয়ে এত পরিশ্রম যখন করবেনই, সেটা নিজের দেশে কেন নয়? এই প্রশ্নটা কি একবারও নিজেকে করেছেন? কিসের অভাব বাংলাদেশের? কী নেই? আসল অভাব উদ্যোগের। আপনিই নিন না একটু ছোট্ট উদ্যোগ। দেখবেন আপনার ছোট্ট উদ্দ্যেগেই দাঁড়িয়ে যাচ্ছে দেশ। বাংলাদেশের মত অমিত সম্ভাবনার এই দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য-শিল্প-সাহিত্য সৃজনশীলতার এমন কোনো শাখা নাই যেখানে আমার, আপনার, আমাদের সবার কাজের সুযোগ নাই। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োজন শুধু একটু উদ্যোগ। অনেক সুযোগ নিজেকে মেলে ধরার। আমাদের দেশের অর্থনীতির গতি কি শুধু দেশি ও প্রবাসী শ্রমিকেরাই ধরে রাখবে? আমাদের মতো লাখ লাখ শিক্ষিত যুবকও পারি এই অর্থনীতির গতিধারাকে বেগবান করার চ্যালেঞ্জ নিতে। আসুন, আমরা নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখি। নিজের দেশে নিজের পায়ে দাঁড়াই।
মাসুক রহমান, মগবাজার, ঢাকা
প্রিয় পাঠক , আপনিও লিখুন
পাঠক ভুবনে লিখুন। ২৫০ শব্দের মধ্যে লিখুন। নিজের কোনো গল্প, ভাবনা বা চিন্তা। উস্কে দিতে পারেন কোনো বিতর্ক_ আমরা যত্ন করে ছাপবো। _বি.স.

জাতীয়করণের মাশুল কতদিন!

নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জাতীয়করণ সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক আশা ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল সন্দেহ নেই; কিন্তু গত চার মাস ধরে বেতন না পাওয়ায় তা কতখানি মিইয়ে গেছে বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট। বিপুলসংখ্যক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের লক্ষাধিক শিক্ষকের জাতীয়করণ সংক্রান্ত নথিপত্র প্রস্তুতে কিছুটা সময় লাগবে অস্বীকার করা যায় না। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাও এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিতে হবে। জাতীয়করণের পর বেতন চালু প্রক্রিয়ায় চার মাসের দীর্ঘসূত্রতা কোনোভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এই বিড়ম্বনার সবচেয়ে অমানবিক দিক হচ্ছে, তারা এমপিওভুক্ত শিক্ষক হিসেবে যে বেতন-ভাতা পেতেন, তাও বন্ধ হয়ে গেছে। এর মধ্যে ঈদুল আজহা এবং দুর্গাপূজার সময় সবাই যখন উৎসব পালন করেছে, এই শিক্ষকদের পরিবারচিত্র ছিল অশেষ কষ্টের। প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির সভাপতি সমকালকে যথার্থই বলেছেন যে, প্রাথমিক শিক্ষকদের যে বেতনক্রম তাতে নুন আনতে পান্তা ফুরানোই স্বাভাবিক। তার ওপর যদি চার মাস বেতন না থাকে, তাহলে কী অস্বাভাবিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় সহজেই অনুমেয়। আমরা মনে করি, মানুষ গড়ার সম্মানিত কারিগরদের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব দায়সারাভাবে বলেছেন, 'সরকারি হওয়া এ শিক্ষকদের বেতন না পাওয়ার কোনো কারণ নেই।' জাতীয়করণের সাড়ম্বর ঘোষণার পর লক্ষাধিক শিক্ষক বেতন-ভাতা না পাওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে তিনি ওয়াকিবহালই নন! বিপুলসংখ্যক প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণের ঘোষণা নিঃসন্দেহে সরকারের সদিচ্ছার প্রমাণ। কিন্তু নীতিনির্ধারকের আন্তরিকতা যে কারিগরি পর্যায়ে ঠিকমতো প্রতিফলিত হচ্ছে না, লক্ষাধিক শিক্ষকের মানবেতর পরিস্থিতি তার প্রমাণ। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন ছাড়াও এই পদক্ষেপের পেছনে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী হিসাব-নিকাশ রয়েছে, ধারণা করা যায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত যদি বেতন-ভাতার প্রশ্নেই স্থবিরতা থাকে, তাহলে এ ধরনের ঘোষণার কাঙ্ক্ষিত ফল না-ও আসতে পারে। আমরা চাই, অবিলম্বে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হোক। তারও আগে সম্পন্ন করতে হবে বেতন-ভাতা সংক্রান্ত প্রক্রিয়াদি। জাতীয়করণের মাশুল শিক্ষকরা ইতিমধ্যে চার মাস দিয়েছেন। এই দুর্ভোগ আর প্রলম্বিত করা উচিত নয়।

দুর্ভোগে সাধারণ মানুষ

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে অনেক সূচক উৎসাহব্যঞ্জক_ এমন খবরে সাধারণ মানুষ বা আম জনতার তেমন কিছু আসে যায় না। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কতটা বেড়েছে, আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের চিত্র কেমন, রেমিট্যান্স প্রবাহ কী দাঁড়িয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি কেমন_ এসব খবর সব শ্রেণী ও পেশার মানুষের জীবনকেই প্রভাবিত করতে পারে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে রেকর্ড কিংবা শেয়ারবাজারে নতুন করে বিপর্যয়রোধে দৈনন্দিন লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ব্রোকারদের আগের মতো ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রাখা হবে না_ এসব খবরকেও তাদের জন্য গুরুত্বহীন বলা যাবে না। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে বেশিরভাগ মানুষের কাছে প্রাধান্য পায় বাজারদর এবং নিত্যদিনের জীবনকে প্রভাবিত করার মতো অর্থনৈতিক বিষয়াদি। খ্রিস্টীয় বছর ২০১৪ সালের শুরুর দিনে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ বা ক্যাব জানিয়েছে_ বিদায়ী বছরে রাজধানীতে পণ্যমূল্য বেড়েছে ১২ দশমিক ১৭ শতাংশ। এর প্রভাব প্রতিটি মানুষের জীবনে পড়তে বাধ্য। তাদের রিপোর্টে দেশের অন্যান্য স্থানের তথ্য না থাকলেও বলা যায়, সর্বত্রই কিন্তু জিনিসপত্রের দাম কমবেশি এ হারে বেড়েছে। আলোচিত বছরের আরেকটি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি দিলে দেখা যাবে, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির যে হার তার চেয়েও বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ বিশেষ করে জনগোষ্ঠীর ওপরে এর বিরূপ প্রভাব অনুভূত হয়েছে অনেক বেশি। ২০১৩ সালে প্রায় বছরজুড়েই দেশে বিরাজ করেছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। হরতাল-অবরোধে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড দারুণভাবে বিপর্যস্ত। কৃষকরা ধান-গম-সবজিসহ অন্যান্য পণ্য উৎপাদন করেছেন। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা বিঘি্নত হওয়ার কারণে ঠিকভাবে বাজারে পেঁৗছাতে পারেনি। ফলে তারা অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অন্যদিকে সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘি্নত হওয়ার কারণে ভোক্তারাও বেশি দাম দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে বাধ্য হয়েছে। রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে বিপুলসংখ্যক শ্রমজীবী মানুষ তাদের উপার্জনের অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। ফলে তাদের ক্রয়ক্ষমতা দারুণভাবে কমে গেছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে উৎপাদক এবং পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের ওপর। বিনিয়োগ কার্যক্রমেও আগ্রহ দেখা যায়নি উদ্যোক্তাদের। এ পথে চলা মানেই চরম ঝুঁকি, সেটা বুঝতে অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ হওয়ার দরকার নেই। নতুন বছরে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে, এমন আশা অন্তত এ মুহূর্তে করা যাচ্ছে না। বছরটি শুরু হয়েছে বিরোধীদের ডাকা টানা অবরোধ কর্মসূচিতে। এ কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের দিক থেকে তেমন সাড়া পরিলক্ষিত হচ্ছে না বটে, কিন্তু জনজীবন যে যথেষ্টই বিপর্যস্ত সেটা কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা বারবার রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে সমঝোতার আহ্বান জানাচ্ছেন। হরতাল-অবরোধের মতো কর্মনাশা কর্মসূচি না দিতে অনুরোধ করে চলেছেন। তারা সাদা পতাকা হাতে রাজপথে নেমেছেন। সভা-সমাবেশ করছেন। সংবাদপত্র-টেলিভিশনে আকুতি জানাচ্ছেন। কিন্তু তাতে সাড়া মিলছে না। আগামী রোববার দশম জাতীয় সংসদের নির্বাচন। অতীতে নির্বাচন শেষ হলেই সার্বিক আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে স্বস্তি নেমে আসতে দেখা গেছে। কিন্তু এবারে তেমনটি ঘটবে, সে আশাবাদ পোষণ করার মতো মানুষ খুব বেশি মিলবে না। বরং সবার মনেই শঙ্কা_ কী জানি কী হতে চলেছে। এভাবে চলতে থাকলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বিঘি্নত হতে থাকবে এবং এর প্রভাবে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকবে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জীবন। বাংলাদেশ দ্রুত মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে চলেছে_ দেশ-বিদেশের অর্থনীতির পণ্ডিতদের এমন সুন্দর কথা তাদের কাছে কোনোভাবেই অর্থবহ হবে না।

ছয় স্থানে ৬ জন খুন

পৃথক ঘটনায় দেশের বিভিন্ন স্থানে ৬ জন খুন হয়েছেন। প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :
মুক্তাগাছা (ময়মনসিংহ) :সরকারি হাসপাতাল চত্বর থেকে বৃহস্পতিবার সাবিনা খাতুন (১২) নামে এক শিশুকন্যার লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সে উপজেলার তারাটি পূর্বপাড়া গ্রামের মৃত বিল্লাল হোসেনের মেয়ে। এলাকাবাসীর ধারণা, সাবিনাকে ধর্ষণের পর গলাটিপে হত্যা করে কে বা কারা হাসপাতাল চত্বরের ড্রেনের ভেতর ফেলে দেয়।
সাতক্ষীরা :শ্যামনগর উপজেলার গোডাউন মোড়ের একটি পুকুর থেকে এক মাদ্রাসা ছাত্রের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মাদ্রাসা ছাত্রের নাম মোজাহিদুর রহমান লিটন। বুধবার সন্ধ্যায় পুলিশ তার লাশ উদ্ধার করে।
সিরাজগঞ্জ/উল্লাপাড়া:উল্লাপাড়ায় গাছের ঝরাপাতা কুড়ানোকে কেন্দ্র করে দু'পক্ষের সংঘর্ষে মামুন নামে এক যুবক নিহত হয়েছেন। নিহত মামুন উল্লাপাড়া পৌরসভার কাওয়াক মহল্লার আবদুস সালামের ছেলে। এ ঘটনায় পুলিশ ৩ জনকে আটক করেছে। তারা হলো_ ফারুক, আবদুল আলিম ও আবদুল জলিল।
ঈশ্বরদী :সদর উপজেলার দাশুড়িয়া ইউনিয়নের ভবানীপুর গুচ্ছগ্রামে আবুল প্রামাণিক ওরফে আবু নামে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যা করেছে প্রতিপক্ষের লোকজন। বৃহস্পতিবার ভবানীপুর গুচ্ছগ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত আবু ওই গ্রামের জামিল প্রামাণিকের ছেলে। ঈশ্বরদী থানার ওসি বিমান কুমার দাশ জানান, লাশ ময়নাতদন্তের জন্য পাবনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় ঈশ্বরদী থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়েছে।
সাদুল্যাপুর (গাইবান্ধা): উপজেলার খামারবাগচি গ্রাম থেকে পুলিশ বুধবার মোমেনা বেগম নামে এক গৃহবধূর লাশ উদ্ধার করেছে। দুই সন্তানের জননী মোমেনা বেগম ওই গ্রামের জাহাঙ্গীর আলমের স্ত্রী। পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে মোমেনা বিষপান করে মারা গেছে।
সিরাজগঞ্জ :সদর উপজেলার কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নের চুনিয়াহাটি এলাকার একটি বেতক্ষেতের মধ্য থেকে অজ্ঞাতপরিচয় এক নারীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। গলায় ওড়না পেঁচানো অবস্থায় বৃহস্পতিবার লাশটি উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

শিক্ষা সংবাদ

হাতের সুন্দর লেখা প্রশিক্ষণ কর্মশালা ও প্রতিযোগিতা
শিক্ষার্থীদের হাতের লেখা সুন্দর করার লক্ষ্যে ২৮, ২৯ ও ৩০ ডিসেম্বর লিবার্টি স্কুল, বনশ্রী আয়োজিত তিন দিনের হাতের সুন্দর লেখা প্রশিক্ষণ কর্মশালা ও প্রতিযোগিতা শেষ হয়েছে। কর্মশালায় ৩টি গ্রুপে ঢাকা শহরের অনেক প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করে। ৩টি গ্রুপে প্রথম স্থান অধিকার করে যথাক্রমে ফিলিপা, নাফিজ জাওয়াদ, শারমিন আহসান লাবণ্য। পরে বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার ও সার্টিফিকেট বিতরণ করেন প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের মিঞা। আরও উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ আশরাফুল আযম খান এবং অভিভাবকবৃন্দ ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন ৬৮০ ধরনের হাতের সুন্দর লেখায় আলোড়ন সৃষ্টিকারী, ৩৫ বছরের গবেষক শিশু একাডেমি হাতের লেখা বিভাগের সাবেক প্রতিষ্ঠা প্রধান প্রশিক্ষক ও থ্রি ফিংগারস হ্যান্ড রাইটিং ডেভেলপমেন্ট একাডেমির অধ্যক্ষ এইচএম জারীফ।
ক্যামব্রিয়ান স্কুলের শতভাগ সাফল্য অর্জন
২০১৩ সালের জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট পরীক্ষায় ৪৪৯ পরীক্ষার্থীর সবাই কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়েছে।
ফল প্রকাশের পর উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের আনন্দ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান লায়ন এমকে বাশার ক্যামব্রিয়ানের ক্রমাগত এই সাফল্য সম্পর্কে বলেন, ক্যামব্রিয়ান কলেজের অভ্যন্তরীণ শিক্ষা ব্যবস্থায় আমাদের শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত আন্তরিক। এ ছাড়াও অভিভাবকদের সচেতনতা ও সহযোগিতা, ক্যামব্রিয়ান স্কুলের অনুসরণীয় কার্যক্রম স্কুলের ওপর প্রতিফলিত হওয়াতে এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। আমাদের এ সাফল্যের জন্য ক্যামব্রিয়ান স্কুলের সব শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবককে অভিনন্দন জানাচ্ছি। এ ছাড়াও বিএসবি ফাউন্ডেশন পরিচালিত মেট্রোপলিটন স্কুল ও উইনসাম স্কুলের শিক্ষার্থীরা জেএসসি পরীক্ষায় শতভাগ সাফল্য অর্জন করে।
পুরস্কৃত হলেন সেরা কর্মকর্তা
প্রতি বছরের মতো এবারও সেরা কর্মকর্তাকে পুরস্কৃৃত করল দেশের শিক্ষা ও ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট কনসালটেন্সি ফার্ম শা অ্যাসোসিয়েটস। ২৪ ডিসেম্বর রাজধানীর একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে আয়োজিত পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে শা অ্যাসোসিয়েটসের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ বছর বেস্ট এমপ্লয়ির শ্রেষ্ঠ পুরস্কার অর্জন করেন প্রতিষ্ঠানটির গুলশান শাখার কর্মকর্তা মো. খালিদ হাসান। এ ছাড়া মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ শেখ মো. হানিফ বেস্ট পারফর্মার অব দ্য ইয়ার মনোনীত হন। পুরস্কারের অর্থ, হোটেল ওয়েস্টিনে এক রাত যাপনের কুপণ এবং ক্রেস্ট তুলে দেন শা অ্যাসোসিয়েটসের চিফ এক্সিকিউটিভ সুপ্রিয় কুমার চক্রবর্তী। সিইও তার বক্তব্যে উপস্থিত সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ১৯৯৮ সালে পাল তোলা এই প্রতিষ্ঠানটির একমাত্র শক্তি হচ্ছে কাজের প্রতি সততা ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দায়বদ্ধতা, নিষ্ঠা এবং আন্তরিকতার ফলে শা অ্যাসোসিয়েটস দেশের একটি স্বনামধন্য শিক্ষা ও ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট কনসালটেন্সি ফার্মে উপনীত হয়েছে বলে মনে করেন সিইও সুপ্রিয় কুমার চক্রবর্তী।
গ্রন্থনা :তারিক হাসান

নতুন বইয়ে দাবি

নতুন প্রকাশিত এক বইয়ে দুই ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ দাবি করছেন, দেশটির রাজনীতিকরাও সমাজ সচেতনভাবেই ভুলেছে ব্লাক পাওয়ার মুভমেন্টের ইতিহাস। এ দুই লেখকের দাবি, কৃষ্ণাঙ্গদের এই আন্দোলনকে সচেতনভাবেই ব্রিটিশ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের বিবরণে জায়গা দেয়া হচ্ছে না। কারণ, একে জায়গা দিলে ব্রিটেনের এক দুর্বলতার কথা জানান দেয়া হবে। একে ইতিহাসের বাইরে রেখেই শুধু এই ‘কল্পনা’ প্রমাণ করা সম্ভব যে বর্তমানে ব্রিটেন তার রাজনীতি ও সমাজে হচ্ছে সভ্যতার পরিপালন করে। ব্রিটেনের ব্লাক পাওয়ার আন্দোলন নিয়ে এই প্রথম বিস্তারিত কোনো বই লেখা হল। লেখক রবিন বান্স ও পল ফিল্ড। আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ডার্কাস হোয়ের জীবনী ধরে বইটি রচনা করা হয়েছে। ডার্কাস হোয়ে : এ পলিটিকাল বায়োগ্রাফি নামের বইটি প্রকাশ করেছে ব্লুমবারি। বইয়ে দুই লেখক বলছেন, ব্লাক পাওয়ার আন্দোলনের বড় ঘটনাগুলো যেমন ম্যানগ্রোফ নাইন বলে খ্যাত আন্দোলনকারীদের ১৯৭০ সালের বিচার এবং ১৯৮১ সালের ব্লাক পিপল মার্চের মতো ঘটনাও ভুলতে বসেছে ব্রিটেন। বইয়ে বলা হয়, তখনকার আমেরিকার যুক্তরাষ্ট্রের ঘটনাবলির সূত্র ধরেই ব্রিটেনে কৃষ্ণাঙ্গ লোকদের আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশ ব্ল্যাক প্যানথার মুভমেন্ট শুরু হয়। আন্দোলনের মূল কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো লন্ডনের নাটিং হিলের দি ম্যানগ্রোভ রেস্টুরেন্টটি। সরকারের চোখে ওই রেস্টুরেন্টটি ছিল সন্ত্রাসের কেন্দ্র। পরে আন্দোলনের তুখোড় অবস্থায় ডার্কাস হোয়েসহ নয়জনকে বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করায় সরকার। আদালতে সব জুরি কৃষ্ণাঙ্গ না হলে তারা কৃষ্ণাঙ্গদের প্রতি বৈষম্যের ধরন বুঝতে পারবেন না বলে যুক্তি দেন হোয়ে। জুরিদের রায়ে মামলায় জিতেও যান। পরে ১৯৮১ সালে ব্লাক পিপল মার্চ আয়োজন করা হয় হোয়ের নেতৃত্বে।
নতুন বইয়ে লেখকরা বলছেন, এসব ঘটনাই ভুলতে বসেছে ব্রিটেন। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গদের আন্দোলন নিয়ে পাঠ্যবইয়ে অনেক লেখা থাকলেও ব্রিটিশ ব্লাক পাওয়ার আন্দোলন সেখানে অনুপস্থিত। অন্যান্য কোনো ধরনের লেখা বা সাংস্কৃতিক পরিবেশনায়ও এর কোনো হদিস খুঁজে পাওয়া যায় না।

কেউ কিছু বলতে পারে না by নুরুল করিম নাসিম

তিনি পালিয়ে যাচ্ছেন। নিজ বাসভূমি নড়িয়া ছেড়ে ঢাকা শহরে আত্মগোপন করার জন্য পালিয়ে যাচ্ছেন। গতরাতে তিনি ঘুমোতে পারেননি। দলের নির্দেশ পালন করতে হলে এলাকাবাসীর বিরাগভাজন হতে হয়, ক্ষমতাসীন দলের প্রশাসন উষ্মা প্রকাশ করে। তিনি কি করবেন? তার দল ক্ষমতায় নেই। দেশে এখন সামরিক শাসন। ফিল্ডমার্শাল আইয়ুব খান এখন দেশের সর্বময় কর্তা। গত বছর তিনি এস্কান্দার মির্জার গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছেন। তিনি এখন বিরোধী দলে। দলের নির্দেশ সবকিছু অচল করে দিতে হবে। সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে হবে। ঢাকার বাইরে সব যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থগিত করে ফেলতে হবে। সড়কপথ, জলপথ, সবরকম যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে দিতে হবে।
তার এক ছেলে ঢাকায় থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে। তার তিন মেয়ে এলাকার স্কুল-কলেজে পড়ছে। হরতাল কিংবা অবরোধে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার অনেক ক্ষতি হয়ে যায়। তিনি সবকিছু বোঝেন, সবকিছু উপলব্ধি করেন, কিন্তু বলতে পারেন না। পার্টির ভেতরে থেকে এসব কথা বলা যায় না। পার্টি এসব পছন্দ করে না। পার্টি চায় নিরংকুশ নিবেদন। কাল সারা রাত তিনি ঘুমোতে পারেননি। বার বার ঘুম ভেঙে গেছে। তার মনে হয়েছে কে যেন দরজায় নক করছে। তিনি হঠাৎ হঠাৎ জেগে উঠেছেন। দরজা খুলে দেখেন কেউ নেই, কোনো পুলিশ আসেনি। রাত ৩টায় বিল্লাল টেলিফোন করে বলল, লিংকন ও আফাজ উদ্দিনকে সাদা পোশাকের পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। কোথায় নিয়ে গেছে, কেউ বলতে পারে না। এরা দুজন দলের ওপর সারির নেতা। খুবই কর্মঠ, খুবই আত্মত্যাগী। পার্টির জন্মলগ্ন থেকে এরা খুব গভীরভাবে দলের সঙ্গে জড়িত। বিল্লাল দলের নীতিনির্ধারক। এলাকায় থাকেন। দলের ওপর প্রভাব আছে।
রাতে অনেক চেষ্টা করেও তিনি ঘুমাতে পারেননি। মনে হয়েছে, দরজায় পুলিশ কড়া নাড়ছে। সাদা পোশাকের পুলিশ তাকে অ্যারেস্ট করতে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে পুলিশের বড়কর্তার সঙ্গে তার ভালো হৃদ্যতা। পুলিশ বলেছেন, ঘরে থাকবেন না, ঢাকায় চলে যান। তিনি চলে যাচ্ছেন। সুরেশ্বর থেকে সকাল ৮টায় লঞ্চে উঠেছেন। তার স্ত্রী কন্যারা এলাকাতে রয়ে গেছেন। শুধু তিনি চলে যাচ্ছেন। স্ত্রীর টেলিফোন এলো সকাল ৯টায়। তখন তিনি পদ্মার বুকে। লঞ্চ ঢাকার সদরঘাটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। স্ত্রী বললেন, তার ভয় লাগে। কাছেই বাবা-মার বাড়ি। ছেলেমেয়ে নিয়ে দিনকয় সেখানে বেড়িয়ে এলে কেমন হয়? তিনি সম্মতি দিলেন।
শীতকাল। লঞ্চ এগোচ্ছে। পদ্মা অতটা উন্মত্ত নয়। তার সব আক্রোশ ভেতরে ভেতরে। দেশের রাজনীতির সঙ্গে, তার দলের রাজনীতির সঙ্গে কোথায় যেন মিল আছে এ পদ্মার। তার স্ত্রী হয়তো ভয় পেয়েছে। এলাকায় কিছু হবে না। পুলিশ তার বাসায় কখনও রেইড করবে না। তবুও তার স্ত্রী ভয় পান। এখন দেশে সামরিক শাসন। কি হবে, কেউ কিছু বলতে পারে না। তিনিও বাসায় থাকতে পারছেন না, পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তার স্ত্রীও তিন মেয়ে, এক ছেলেকে নিয়ে বাপের বাড়িতে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তার ব্যবসা-বাণিজ্য নেই। এ সামরিক সরকারের আমলে কোনো কাজ পাবেন বলে মনে হয় না। কিভাবে জীবন চলবে কিছুই বুঝতে পারছেন না।
অনেক বার ভেবেছেন রাজনীতি ছেড়ে দেবেন। দেশে যা কিছু জমিজমা আছে বর্গা দেবেন, তাতেই চলে যাবে। কিন্তু এটা এমন এক নেশা, ড্রাগের চেয়েও মারাত্মক, কিছুতেই ছাড়াতে পারেন না। আর রাজনীতিও এমন এক দৈত্য, তার কাঁধে সেই যে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে চেপে বসেছে, আর তাকে পরিত্যাগ করছে না। এ রাজনীতির জন্য তার প্রেম মরে গেল। তার ভালোবাসার মানুষ তাকে পরিত্যাগ করে চলে গেল। তার বড় মেয়ে অনেকবার তাকে বারণ করেছে। তার স্ত্রীরও রাজনীতি পছন্দ নয়। তিনিও অনেকবার ভেবেছেন, রাজনীতি ত্যাগ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন। কেন্দ্র থেকে নির্দেশ এসেছে, যানবাহন প্রতিরোধ করার ব্যাপারে সব ধরনের পদক্ষেপ নেয়া হোক। নদীপথ অবরোধ করা হোক। তিনি লঞ্চে করে পালিয়ে যাচ্ছেন। সারেংয়ের পাশে বসে যেতে যেতে তার অনেক কথা, অনেক স্মৃতি মনে উঁকি দিয়ে যায়।
এত দিনের কথা খুব গেঁথে আছে। তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষবর্ষের ছাত্র। কমিউনিস্টদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন। তার প্রিয় শিক্ষকের প্ররোচনায় ও অনুপ্রেরণায় মাক্সবাদে দীক্ষা নিলেন। শ্রেণী-সংগ্রামে আÍনিয়োগ করলেন। সমাজের এক দল মানুষ অন্য মানুষদের কেন শোষণ করছে, সারা দুনিয়ার মজুররা একই পতাকা তলে কেন একত্রিত হচ্ছে, লাতিন আমেরিকার চেগুয়েভারা ও ফিদেল ক্যাস্ট্রো কেন আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ছেন, এসব ঘটনা প্রতিদিন তার প্রিয় শিক্ষক তাকে বলেছেন। গ্র“প স্টাডি নিয়মিত হচ্ছে। তিনি অংশগ্রহণ করছেন। অনুপ্রেরণায় পুরানা পল্টনের একটি বাড়িতে মিটিং হতো। গ্র“প স্টাডি হতো। স্বৈরাচারী ফিল্ডমার্শাল আইয়ুব খান ক্ষমতার খুঁটি ক্রমশ শক্ত করেছেন। জনগণ ফুঁসে উঠেছে। যে কোনো সময় বিস্ফোরণ হতে পারে। রক্তহীন বিপ্লবের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার এস্কান্দার মির্জাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছেন।
সর্বত্র ভয় বিরাজ করছে। বিশিষ্ট নেতাদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়েছে। আপামর জনসাধারণের প্রিয় নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দী বইরুতে চিকিৎসা করতে গেছেন। রবীন্দ্র সঙ্গীত আর মেয়েদের কপালে লাল টিপের ওপর এক অলিখিত নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। তিনি সেদিন পুরান ঢাকার এক বাসায় গোপন মিটিং করছেন তার প্রিয় শিক্ষকের সঙ্গে। হঠাৎ পুলিশ রেইড করল তখন রাত ২টা। পেছনের দেয়াল দিয়ে তিনি লাফিয়ে পালিয়ে গেলেন। একটা রাত জাগা কুকুর ডেকে উঠল। কোথায় যেন পাহারাদার হুইসেল বাজাল। একটি অ্যাম্বুলেন্স করুণ আর্তনাদ তুলে কোথায় যেন দ্রুত বেগে চলে গেল।
কী ছিল সেসব দুর্ধর্ষ দিনরাত্রি! কী ছিল সেই যৌবনের তেজ ও দীপ্তি আর স্বপ্ন। তিনি সমাজটাকে বদলাতে চেয়েছিলেন। সেদিন তার প্রিয় শিক্ষক, এদেশের বাম আন্দোলনের এক বিশিষ্ট তাত্ত্বিক পালাতে পারেননি। পুলিশের হাতে ধরা পড়েছিলেন। তাকে কারাজীবন বরণ করে নিতে হয়। তার প্রিয় শিক্ষক কারাগারে ধুঁকে ধুঁকে মারা গিয়েছিলেন। সামরিক শাসন প্রচণ্ডভাবে দেশের সর্বত্র তখন বিরাজ করছে। ১৯৬৭-এর উন্মাতাল আন্দোলনে মুখর দেশ। নেতা ঢাকা শহর অভিমুখে পালিয়ে যাচ্ছেন। তার নড়িয়ার বাড়িতে সবাই তাকে চেনে। ঢাকা শহরে কেউ তাকে চেনে না। নেতা শহরে আত্মগোপন করে থাকবেন।
তিনি এখন দিনরাত্রির অধিকাংশ সময় ঘরে থাকেন। স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি। তার প্রিয় শিক্ষককে পুলিশের হাতে ফেলে একদা পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেসব স্মৃতি এখন তাকে ঠুকরে ঠুকরে খায়। এক ধরনের অনুশোচনা তাকে বিহ্বল করে তোলে। তার প্রিয় শিক্ষক কি তবে তাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন? এজন্য কি তার এ অসহায় অবস্থা? এভাবেই সময় বয়ে যায়। মুখমণ্ডল ক্রমান্বয়ে দাড়িতে ঢেকে যাচ্ছে। তিনি নিজেকে আর চিনতে পারেন না। তিনি চিরদিনের মতো নিজের ভেতর আত্মগোপন করে রইলেন।