Wednesday, December 5, 2018

নারী শিক্ষায় দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের আহ্বান মিশেলের

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফার্স্টলেডি মিশেল ওবামা নারী শিক্ষার উন্নয়নে পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছেন। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তার আত্মজীবনী ‘বিকামিং’। এ বইটি এরই মধ্যে ২০ লাখেরও বেশি বিক্রি হয়ে বেস্ট সেলার তালিকায় উঠে এসেছে। এ নিয়ে তিনি লন্ডনের সাউথব্যাংক সেন্টারে নাইজেরিয়ার ঔপন্যাসিক চিমামান্দা নোজি এডিছি’র সঙ্গে কথা বলছিলেন। এ সময় তিনি ওই আহ্বান জানান। এ সময় মিশেল বলেন, যেসব পুরুষ চিন্তা করেন মেয়েদের স্কুলে পাঠানো শুভ নয়, তাদের মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন। তিনি বলেন, আমার বাবা-মা আমার মধ্যে সম্ভাবনা দেখেছিলেন। একটি মেয়ের মধ্যে সে সম্ভাবনা থাকার অর্থ হল, আপনাকে তার মূল্যায়ন করতে হবে।
বইটির সপ্তদশ অধ্যায় সম্পর্কে মিশেল কথা বলেছেন। সেখানে তিনি তুলে ধরেছেন তার ফার্স্টলেডি হয়ে ওঠার কাহিনী। তিনি বলেন, আত্মজীবনীতে এই চ্যাপ্টারটি লেখা ছিল আমার জন্য সবচেয়ে কঠিন। এখানে সফল কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের সঙ্গে কি ঘটে সে কথা তুলে ধরা হয়েছে। এদেরকে নিয়ে বেশিরভাগ সময়ই ব্যাঙ্গ করা হয়ে থাকে। আমরা রাগী, আমরা উচ্চস্বরে কথা বলি, আমরা সবকিছুতেই অতিরিক্ত, এমনভাবেই আমাদেরকে তুলে ধরা হয়।
আলোচনাকালে সময়ের সাথে সমাজ কিভাবে পরিবর্তিত হয়েছে তা নিয়েও কথা বলেন মিশেল এবং নোজি।
একে অপরকে সমর্থন দেয়া নারীদেরকে উৎসাহ দিয়ে মিশেল ওবামা বলেন, নারী হিসেবে একজন অপরজনকে টেনে নামানোর বিলাসিতা আমাদের নেই। আমাদের অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। আমাদেরকে টেনে নামানোর জন্য অনেক মানুষ প্রস্তুত আছে। তাই আমাদের কাজ হল একে অপরকে উপরে তুলে ধরা। এখন থেকেই আমাদের এই চর্চা শুরু করা উচিত। নারী হিসেবে আমরা যে কাজটি ভালো করতে পারি সেটি হল, আমরা একজন অপরজনের প্রতি যত্নবান হতে পারি।

‘ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটি’ নিয়ে আশাহত সিইসি, প্রো-অ্যাকটিভ হওয়ার নির্দেশ

ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটির কার্যক্রমে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি উল্লেখ করে এ কমিটিকে প্রো-অ্যাকটিভ হয়ে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা। আগারগাঁওস্থ নির্বাচন ভবনের অডিটরিয়ামে আজ সকালে ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটির ব্রিফিংয়ে এসব কথা বলেন তিনি। এতে ২৪৪ জন যুগ্ম  জেলা ও দায়রা জজ এবং সহকারি জজ অংশ নেন।
সিইসি বলেন, যিনি আপনাদের কথা শুনবেন না, প্যানেল কোডের ১৯৩ ধারা মতে তাদের ৭ বছরের জেল হবে। যদি মিথ্যা তথ্য দেয় এবং আপনাদের আদেশ না মানে, তাহলে প্যানেল  কোডের ২২৮ ধারা অনুসারে তাদের বিচার হবে। তার মানে হলো  কোড অব সিভিল প্রসিডিউর এর ১৯০৮ এর সম্পূর্ণ শক্তি নিয়ে আপনারা মাঠে অবস্থান করবেন। এই ক্ষমতা আপনাদের চেম্বারে নয়, মাঠে। সমস্যার মুখোমুখি, প্রার্থীদের মুখোমুখি, আরচণবিধি যারা ভঙ্গ করবে তাদের মুখোমুখি হওয়ার অন্যরকম অভিজ্ঞতা। এই অন্যরকম পরিবেশ বা অন্যরকম দায়িত্ব আপনাদের ওপরে অর্পিত হয়েছে।
এটাকে আপনাদের ভালোভাবে দেখভাল করা দরকার।
তিনি বলেন, আপনাদেরকে ভিজিবল (দৃশ্যমান) হতে হবে। ভিজিবল যখন হবেন, আপনাদের কাজের ওপর যখন আস্থা রাখবে, আপনাদেরকে যখন চিনবে, তখন থেকে আপনাদের ওপরে দায়িত্ব আসবে। তখন আর ঢাকায় নির্বাচন কমিশনে শত শত অভিযোগ আসবে না। আমরা প্রত্যেকদিন শত শত অভিযোগ পাই। কিন্তু অভিযোগগুলো আমাদের কাছে আসার কথা না। কারণ আপনারা সেখানে (মাঠ পর্যায়ে) রয়েছেন। আমরা কি করবো? অভিযোগগুলো আপনাদের কাছে পাঠিয়ে দেবো? অভিযোগগুলো সরাসরি আপনাদের কাছে যাওয়ার প্রয়োজন ছিলো, কিন্তু তা যায় নি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, আপনারা আমাদের অংশীদার। এটা আমাদের জন্য একটা স্বস্তির জায়গা। আপনাদের এ কাজে সংযুক্ত করার উদ্দেশ্যই ছিল, প্রত্যেকটা মানুষ, প্রত্যেকটা সমস্যার কাছাকাছি থাকা। যেনো সহজেই তারা আপনাদের সাহায্য পান। তারা যেনো তাদের সমস্যাগুলো নিয়ে এখানে ওখানে ছুটাছুটি করার প্রয়োজন মনে না করেন। তিনি বলেন, আপনাদেরকে প্রো-অ্যাকটিভ হতে হবে, ভাইব্রেন্ট হতে হবে এবং জানাতে হবে যে, তাদেরকে সাহায্য সহযোগিতা করার জন্য আপনারা আছেন। ৩০০টি আসনের মধ্যে ১২২টি জায়গায় আপনারা তাদের কাছাকাছি আছেন।
সিইসি নুরুল হুদা আরো বলেন, ২৫শে নভেম্বর এই কমিটি গঠন করার পর প্রত্যেকটি কমিটি ১টি করে অন্তত: ১২২টি অভিযোগ তদন্ত করার কথা ছিল। তা না হলে অন্তত: ১০০ টা, ১০০টাও বাদ দিলাম, অন্তত: ২২টি তদন্ত করার প্রত্যাশা ছিল। তা হয়নি। কারণ, এখন পর্যন্ত আপনারা প্রস্তুতি নিয়ে গুছিয়ে উঠতে পারেননি। আজকে থেকে, এখান থেকে, আপনাদের কি করণীয়, দায়িত্ব এবং কিভাবে এই কমিটি পরিচালিত হবে জেনে শুনে, ফিরে গিয়ে তদন্ত করবেন। মানুষের অভিযোগগুলো শুনবেন, আমলে  নেবেন এবং তাদেরকে রিলিফ দেবেন। যাতে তারা এলাকা থেকে ঢাকা পর্যন্ত না এসে আপনাদের কাছে যায়।
ব্রিফিংয়ে চার নির্বাচন কমিশনার, ইসি সচিবসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এখনও থেমে নেই তাদের কান্না

বছর পাঁচেক আগে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে নিঁখোজ হন আব্দুল কাদের মাছুম। তার মা আয়েশা আলীর দাবি তাকে ‘র‌্যাব’তুলে নিয়ে গেছে। তিনি বলেন, ‘আমার একটি মাত্রই সন্তান। তাকে গুম করা হয়েছে।  ২০১৪ সালে সে প্রথম ভোটার হয়েছিল। কি অপরাধ ছিল তার? পাঁচ বছর যাবৎ বলে আসছি, আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দিন। প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই, আমাদের সন্তানদের কেন ফিরিয়ে দিচ্ছেন না। আমরা তাদের মুখে হাসি দেখতে চাই। তাদের নিয়ে বাঁচতে চাই। আপনি নিজেও তো স্বজনহারা। তারপরও কি আপনি সন্তানের কষ্টগুলো বোঝেন না। কি করে বলবো আর আপনাকে। আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো, আমাদের সন্তানদের ফিরিয়ে দিন।’
এ রকম আকুতি শুধু একজন সন্তানের মায়ের নয়- সন্তানহারা পিতা, ভাইহারা বোন ও বাবাহারা ছেলে-মেয়ের কান্নায় ভারি হয়েছিল জাতীয় প্রেস ক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জ। গুম হওয়া পরিবারদের সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ -এর আয়োজনে মঙ্গলবার (৪ ডিসেম্বর) একত্রিত হয়েছিলেন তারা।
গুম হওয়া এ এম আদনান চৌধুরীর বাবা এরশাদ আলী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “আমার ছেলের অপরাধ সে বিএনপি করতো। আমার ছেলে কখনও মারামারি করতো না।  ২০১৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর ‘প্রশাসনের’ লোক আমার ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়। আল্লাহ যারা আমার কোল খালি করেছে আপনার কাছে তাদের বিচার চাই।”
পাঁচ বছরের ছোট্ট শিশু আফরা। বাবার সন্ধানে এখানে এসেছে। ভাঙা কণ্ঠে সে বলে, ‘আমার বাবাকে ছাড়া কিছু ভালো লাগে না। আমার কোনো কিছুতে মন বসে না। আমি স্কুলে ভর্তি হবো, আমি আমার বাবার কোলে করে স্কুলে যেতে চাই। আপনারা আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিন’
পরিবারের সঙ্গে এসেছে ১৫ বছর বয়সী হাফসা ইসলাম। ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে তার বাবা বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনকে বসুন্ধরা এলাকা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। বেদনা ভরা কণ্ঠে হাফসা বলে, ‘আমি আমার সহপাঠীদের মতো আমার বাবার সঙ্গে ঘুরতে যেতে চাই। আমরা কি আমাদের বাবাকে ফিরে পাবো না? আমি সরকারকে বলতে চাই- আপনারা আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিন। আপনাদের কাছে আর কোনও চাওয়া নেই।’

জলবায়ু পরিবর্তনে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশ

প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঝুঁকির মধ্যে থাকা শীর্ষ ১৫টি দেশের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের নামও।
অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সবচেয়ে কম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে কাতার।
নতুন একটি জরিপে দাবি করা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের ১৫টি দেশ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সর্বোচ্চ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
এরমধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে নবম স্থানে। এছাড়া, ১৫টি দেশের মধ্যে ৯টি বিভিন্ন দ্বীপদেশ।
২০১৮ বিশ্ব ঝুঁকি প্রতিবেদনে ১৭২ টি দেশের ভূমিকম্প, সুনামি, হারিকেন এবং বন্যার ঝুঁকি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এসব দুর্যোগ মোকাবিলা করার মতো সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সক্ষমতা যাচাই করা হয়েছে।
জার্মানির রুহর বিশ্ববিদ্যালয় বোখাম এবং ডেভেলপমেন্ট হেল্প অ্যালায়েন্স নামে একটি জার্মান বেসরকারি মানবিক সংস্থা যৌথভাবে এই গবেষণা পরিচালনা করে।ঝুঁকিপূর্ণ ১৫ দেশের তালিকা:
এই জরিপে, গবেষকরা মূলত প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শিশুদের দুর্দশার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন।
তাদের তথ্য অনুসারে বিশ্বব্যাপী প্রতি চারটি শিশুর মধ্যে একটি দুর্যোগ-প্রবণ এলাকায় বসবাস করে।
এছাড়াও, জাতিসংঘের পরিসংখ্যানেও দেখা যায় যে, গত বছর সংঘাত-সংঘর্ষ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাস্তুচ্যুত হওয়া অর্ধেকেরও বেশি মানুষের বয়স ১৮ বছরের নীচে।জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের স্তর বেড়ে যাওয়াসহ আরা নানা কারণে তালিকার শীর্ষে রয়েছে বেশিরভাগ দ্বীপদেশের নাম।
এরমধ্যে দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় ভানুয়াতু দ্বীপটি বিশ্বের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল, তারপরেই রয়েছে প্রতিবেশী দেশ টোঙ্গা।
তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে আরেক দ্বীপদেশ ফিলিপিন্স। যার মোট লোকসংখ্যা প্রায় সাড়ে ১০ কোটি। তবে জার্মান গবেষকরা মনে করেন ওশেনিয়া সার্বিকভাবে সবচেয়ে ঝুঁকি-প্রবণ অঞ্চল।
তাদের মতে আফ্রিকার দেশগুলো প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত হিসেবে শীর্ষ ৫০টি দেশের তালিকায় যেমন স্থান পেয়েছে। তেমনি সামাজিক বিপর্যয়ের তালিকাভুক্ত ১৫টি দেশের মধ্যে ১৩টি আফ্রিকা-ভুক্ত। ঝুঁকি পরিমাপ করা হয় কিভাবে, ঠেকানোর উপায় কি?
এমন পরিস্থিতিকে গবেষকরা এমন চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।
এজন্য তারা উদাহরণ হিসেবে টানেন ইউরোপকে।
সম্প্রতি ইউরোপের দেশগুলোতে বসন্ত ও গ্রীষ্মকালে তীব্র দাবদাহ আঘাত হানে।
অনেক স্থানে খরা দেখা দেয়ায় সেখানকার কৃষিখাত সরাসরি ক্ষতির শিকার হয়েছিল।
তবে ইউরোপের দেশগুলো সে সময় এই তাপদাহ মোকাবিলায় যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে সেগুলোকে ইতিবাচক উদাহরণ হিসাবে নেয়ার কথা বলছেন গবেষকরা।তবে ঝুঁকির এই সূচকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কার পাশাপাশি সেই দুর্যোগ মোকাবিলায় সেই দেশ কতোটুকু প্রস্তুত সেটাও বিবেচনায় নেয়া হয়।
সেক্ষেত্রে হিসাব করা সেই দেশগুলোয় নির্মিত ভবনগুলোর পরিস্থিতি বা বিল্ডিং কোড, দারিদ্রসীমার মাত্রা এবং দুর্যোগ পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেয়ার পরিকল্পনা।
এ কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ-প্রবণ হওয়া সত্ত্বেও অনেক দেশের নাম ঝুঁকির তালিকায় নেই। যেমন প্রতিনিয়ত ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা জাপান এবং চিলি। এই দুই দেশের নাম শীর্ষ ২০ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের বাইরে রয়েছে।
এছাড়া হল্যান্ড যারা কিনা শত শত বছর ধরে সমুদ্রের স্তর বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। অথচ ঝুঁকির তালিকায় তাদের অবস্থান ৬৫টিতে। এদিকে মিসরের মতো অন্যান্য দেশগুলোর প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হওয়ার আশঙ্কা কম।
ঝুঁকির তালিকায় দেশটির অবস্থান ১৬৬টিতে হলেও দুর্যোগ মোকাবিলা ও বিপর্যয়ের সূচকে তারা জাপানের চাইতেও খারাপ অবস্থানে রয়েছে। কারণ দেশটি সামাজিকভাবে বিপর্যস্ত।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে ২০১৮ সালকে একটি সচেতনতার বছর বলে আখ্যা দিয়েছেন গবেষকরা। মানুষের মধ্যে এবারই এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে চরম প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকাটা কতো জরুরি।
সূত্রঃ বিবিসি

নির্বাচনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে দেয়া যাবে না -নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার

নির্বাচন কর্মকর্তারা ব্যর্থ হলে নির্বাচন ব্যর্থ হবে বলে মন্তব্য করেছেন নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদার। আইনসিদ্ধ না হলে নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হবে উল্লেখ করে নির্বাচন কর্মকর্তাদের তিনি বলেছেন, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন করে আমরা নিজেদের প্রশ্নবিদ্ধ করতে চাই না। আপনাদের কেউ কলঙ্কের ভাগিদার হতে চাইবেন না জানি। ভোটকেন্দ্রের সকল অনিময় রোধ, শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা আপনাদের দেয়া হয়েছে। এই সর্বোচ্চ শক্তি আপনাদের কতটুকু, তা আপনাদের প্রশিক্ষকদের কাছ থেকে জেনে নেবেন। আপনাদের দায়িত্ব পালনে শিথিলতা কখনো বরদাশত করা হবে না। যুদ্ধক্ষেত্রে সম্মুখ সমরে সাফল্যের কোনো বিকল্প নেই।
গতকাল আগারগাঁও নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের উদ্বোধন করে তিনি বলেন, আপনারা নির্ভয়ে, সাহসিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করবেন।
আপনারা ব্যর্থ হলে নির্বাচন ব্যর্থ হবে। অন্যদিকে আপনাদের সাফল্যে উদ্ভাসিত হবে সমগ্র জাতি।
তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে কখনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে, কখনো সেনা সমর্থিত সরকারের অধীনে, আবার কখনো দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে। ফলে নির্বাচনী সংস্কৃতিতে কোনো ধারাবাহিকতা গড়ে ওঠেনি। এবার পূর্ণাঙ্গ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ধারাবাহিকতার ঐতিহ্য সৃষ্টি করতে যাচ্ছি। এই জন্য নির্বাচনকে আমরা ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে দিতে পারি না। সেই লক্ষ্য পূরণে নির্বাচন কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
মাহবুব তালুকদার বলেন, নির্বাচন সম্পর্কে জনমনে আস্থার ক্ষেত্র তৈরি করবেন। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল প্রার্থী যেন আপনাদের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে। নির্বাচনী কর্মকর্তাদের কাছে দেশের মানুষের প্রত্যাশা অতি সামান্য। তারা শুধু চান, ভোটের দিন যেন কেন্দ্রে গিয়ে নির্বিঘ্নে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন। তাদের এই সামান্য চাওয়াই রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিশাল কর্মযজ্ঞে রূপান্তরিত হয়েছে ভোটের মাঠে।
তিনি বলেন, নির্বাচনের পূর্বশর্ত হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষতা। এই পূর্বশর্ত পালনে আইনানুগভাবে কর্তব্য পালনে আপনারা দৃঢ় ভূমিকা রাখবেন। একটা কথা মনে রাখতে হবে, আইন যদি নিজস্ব গতিতে না চলে তাহলে কোনো কার্যক্রমই আইনানুগ হতে পারে না। সবার জন্য সমভাবে আইনের প্রয়োগ করা না হলে সেই আইন আইন নয়, আইনের অপলাপ মাত্র।
মাহবুব তালুকদার বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র ২৬ দিন বাকি। নির্বাচনের মূল দায়িত্বপালন করেন প্রিজাইডিং অফিসার। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে একজন করে প্রিজাইডিং অফিসার থাকেন। সার্বিক বিবেচনায় তিনিই সঞ্চালক। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আরো নতুন সঞ্চালক তৈরির আপনারা কারিগর। সব অনিয়ম রোধ, শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের ক্ষমতা আপনাদেরকে দেয়া হয়েছে। এই সর্বোচ্চ শক্তি সেটা কোনো পুলিশ কর্মকর্তা বা সামরিক কর্মকর্তার থেকে কম নয়।
তিনি বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনের কমিশনার হিসেবে সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়েছি। আপনারা আমাদের শপথ গ্রহণের মূল অংশীদার। আপনাদের মাধ্যমেই আমরা নির্বাচন সম্পন্ন করি। এক্ষেত্রে আমাদের শপথ আপনাদের মধ্যে সঞ্চারিত হয় এবং আপনাদের দায়িত্ব পালনের ওপর বর্তায়। আপনারাও মনে মনে শপথগ্রহণ করুন দেশ ও জাতির স্বার্থে নির্বাচনের এই দায়িত্ব পালনে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন। সব মিলিয়ে ১০ থেকে ১২ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যুক্ত রয়েছেন জানিয়ে মাহবুব তালুকদার বলেন, আগামী ৩০শে ডিসেম্বর বাংলাদেশের মানুষ ইতিহাসের এক সোনালি অধ্যায় রচনা করবে। সেই সোনালি অধ্যায়ের রূপকার আপনারা। জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে আমরা শুধু দেশবাসী নয়, বিশ্ববাসীর নজরদারির সামনে। আমাদের কার্যকলাপ, প্রতিটি পদক্ষেপ সবাই প্রত্যক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। সেদিক থেকে এই নির্বাচন আমাদের আত্মমর্যাদা সমুন্নত রাখার নির্বাচন।
নির্বাচন সামনে রেখে সারা দেশের ২ হাজার ২৬ জন নির্বাচন কর্মকর্তাকে কয়েক ধাপে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে নির্বাচন কমিশন। এর অংশ হিসেবে গতকাল সোমবার ও আজ মঙ্গলবার নয় জেলার মোট ৪০৮ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে। অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব মোখলেসুর রহমান ও নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক মোস্তফা ফারুক উপস্থিত ছিলেন।

নির্বাচনের পরিবেশ কেমন, জানতে চেয়েছে এনডিআই-ইইউ: ড. কামালের সঙ্গে বৈঠক

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা গণফোরাম সভাপতি   ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন মার্কিন পর্যবেক্ষক সংস্থা ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইন্সটিটিউট (এনডিআই) প্রতিনিধিদল। গুলশানের হোটেল আমারিতে গতকাল তারা প্রাতঃরাশ বৈঠকে মিলিত হন। রুদ্ধদ্বার বৈঠকটি দেড় ঘণ্টার বেশি সময় স্থায়ী হয়।
বৈঠকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিস্থিতি, নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের ভূমিকা, রাজনৈতিক অস্থিরতা বিষয়ে এনডিআই প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন।
বৈঠক শেষে ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, নির্বাচন  ও নির্বাচনের পরিবেশ প্রভৃতি বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচনের কেমন পরিবেশ আছে তা তারা জানতে চেয়েছেন। আমরা তথ্য-উপাত্ত দিয়ে আমাদের কথা বলেছি। আমরা মনে করি নির্বাচন কমিশন কারও আজ্ঞাবহ থাকতে পারে না। উল্লেখ্য, এনডিআইয়ের ৫ সদস্যের প্রতিনিধি দলে সিনিয়র এসোসিয়েট ও এশিয়া বিভাগের পরিচালক পিটার এম মানিকাস, প্রতিষ্ঠানের বোর্ড মেম্বার ও সাউথ এশিয়ার সাবেক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রিক ইন্ডার ফার্দ, ম্যানেজার ফর গ্লোবাল ইলেকশন মাইকেল ম্যাগনালটি, এনডিআইয়ের এশিয়া রিজিওনাল প্রোগ্রাম ম্যানেজার এডাম নেলসন ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ফারানাজ ইস্পাহানী অংশ নেন।
এর আগে সোমবার একই জায়গায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদলও ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে বৈঠক করে। সেখানেও তিনি নির্বাচনের পরিবেশ এবং ঐক্যফ্রন্টের অবস্থান তথ্য-উপাত্ত তাদের ইউরোপীয় ইউনিয়নকে অবহিত করেন।
ইসিতে এনডিআই: একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে বৈঠক করেছে নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ইনস্টিটিউট (এনডিআই)। গতকাল নির্বাচন ভবনে ওই বৈঠক হয়। বৈঠকে জাতীয় নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে কমিশনের অবস্থান জানতে চেয়েছে এনডিআই প্রতিনিধিদল। সেই সঙ্গে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষণ সম্পর্কেও ইসি থেকে অবগত হয়েছে নির্বাচন পর্যবেক্ষক এ সংস্থাটি।  ইসি সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। সূত্র মতে, গতকাল বিকালে নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে বৈঠক করে এনডিআই দল। বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নুরুল হুদার নেতৃত্বে, কমিশনার মাহবুব তালুকদার, মো. রফিকুল ইসলাম এবং ব্রিগেডিয়ার (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন।
এ ছাড়া এনডিআইয়ের ৭ সদস্যের প্রতিনিধি দলে এশিয়া বিষয়ক প্রোগ্রাম অফিসার মেইভি হিলান-হুউস্ট, সিনিয়র ইলেকশন অ্যাডভাইজার নিল নেভিটি, ডিরেক্টর অব পলিটিক্যাল পার্টি প্রোগ্রাম আইভান ডোহেরথি, ডেন্ডার ওমেন অ্যান্ড ডেমোক্রেসি বিষয়ক ডিরেক্টর স্যানড্রা পিপিরাসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন। সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে সব দল অংশগ্রহণ না করায় বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেনি এনডিআই। এবার যুক্তরাষ্ট্রের তরফে এনডিআই ১২টি দলে ভাগ হয়ে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পর্যবেক্ষণ করবে। গতকালের বৈঠকে সংসদ নির্বাচন পর্যবেক্ষণ নিয়ে এনডিআইয়ের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে ইসির প্রথম আলোচনা হলো। বৈঠকে মূলত এনডিআইয়ের প্রতিনিধিরা দেশীয় পর্যবেক্ষক কিভাবে পর্যবেক্ষণ করবেন, বিদেশিরা কি করবে, ইভিএম পদ্ধতির বিষয়ে কমিশনের অবস্থান কী এসব বিষয়ে জানতে চান।
নির্বাচন কমিশন এ সময়ে প্রতিনিধি দলটিকে বিষয়গুলোর বিস্তারিত অবহিত করে। কমিশন জানিয়েছে, শুরুতে ৪৮টি আসনে ইভিএম ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকলেও বিভিন্ন কারণে এটি ৬টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। ইভিএম ব্যবহারের ক্ষেত্রে শহরাঞ্চলের আসনগুলোকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। প্রসঙ্গত, ভোট পূর্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতি দেখতে গত ৫-১১ই অক্টোবর এনডিআইয়ের পৃথক প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে। সেই সফরের তারা প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের কর্মকর্তা, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, নির্বাচন কমিশন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, নির্বাচনী পর্যবেক্ষক নেতৃবৃন্দ, গণমাধ্যম প্রতিনিধি, সাবেক সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়িক নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন কূটনৈতিক ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই সফরে তার মূল্যায়ন ছিল উচ্চমাত্রার উত্তেজনা ও সংকোচিত রাজনৈতিক পরিবেশে বাংলাদেশের একাদশ সংসদ নির্বাচন হচ্ছে। তবে ওই নির্বাচনকে বিশ্বাসযোগ্য করতে বাংলাদেশে দীর্ঘ ঐতিহ্যগত রাজনৈতিক মতবাদ, সক্রিয় গণমাধ্যম এবং ক্রমবর্ধমান তরুণ সক্রিয়তাবাদসহ এবং নাগরিক সমাজের মতো বেশ কিছু মৌলিক উপাদানও রয়েছে।
এনডিআই মনে করে- উচ্চমাত্রার রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্য দিয়ে হবে আগামী নির্বাচন। সেখানে ইভিএম নিয়ে উদ্বেগ থাকার বিষয়টিও স্থান পেয়েছিল। ফলে বেশ কিছু সুপারিশ ছিল এনডিআই’র। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- সরকারকে জনসম্মুখে অঙ্গীকার করতে হবে যে নির্বাচন কমিশনের কাজ কর্মে কোনো রকম হস্তক্ষেপ করবে না। রাজনৈতিক কর্মী, সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের কোনো ধরনের ভয় দেখানো চলবে না। এ নিয়ে সরকারের তরফে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি পরিষ্কার বার্তা দিতে হবে। নারীর অংশগ্রহণ বাধাগুলো দূর করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে। সার্বিক নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় তারণ্যের আরো বেশি সম্পৃক্ততার সুপারিশ ছিল পূর্বের দেয়া এনডিআই’র মূল্যায়নে।

কান্না থামবে কবে?

কতদিন বাবাকে দেখি না। বাবার আদর পাই না। আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিন। আমি বাবার সঙ্গে স্কুলে যেতে চাই। বাবার সঙ্গে খেলতে চাই। বাবাকে ফিরিয়ে দিন। বাবা ছাড়া কিছু ভালো লাগে না। কাঁদতে কাঁদতে কথাগুলো বলছিল ২০১৩ সালে গুম হওয়া সাজেদুল ইসলাম সুমনের মেয়ে আফসানা ইসলাম রাইদা।
গতকাল ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে ‘গুম হওয়ার পাঁচ বছর শেষ, আর অপেক্ষা কতদিন’ শীর্ষক এক আলোচনা সভার আয়োজন করে ‘মায়ের ডাক’ নামের সংগঠন। গুম হওয়া ব্যক্তিদের কথা বলতে গিয়ে স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। এদের কেউ মা, কেউ মেয়ে, কেউ বোন, আবার কেউ স্ত্রী। এ সময় সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
২০১৩ সালে গুম হওয়া স্বজনদের নিয়ে এ আলোচনা সভায় লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নিখোঁজ সুমনের বড় বোন মারুফা ইসলাম ফেরদৌসী। তিনি বলেন, প্রতিবছর আমরা আপনাদের কাছে ছুটে আসি এবং আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসী জানতে পারে আমরা আমাদের স্বজনদের হারিয়ে কত কষ্টে জীবনযাপন করছি। দেখতে দেখতে পাঁচটি বছর পেরিয়ে গেছে। সামনে চলে এলো একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে বর্তমান সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে। আমাদের ‘মায়ের ডাকের’ পক্ষ থেকে সব রাজনৈতিক দলের প্রতি একটি দাবি তা হলো, দলীয় ইশতেহারে গুম হওয়ার বিষয়ে প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের স্পষ্ট বক্তব্য থাকতে হবে। মারুফা বলেন, গত পাঁচ বছরে গুম হওয়া কেউ ফিরে আসেনি। কিন্তু গুম হওয়া পরিবারের অনেকেই কাঁদতে কাঁদতে না ফেরার দেশে চলে গেছেন। মুন্নুর বাবা এই প্রেস ক্লাবে এসে সন্তানের ফিরে আসার দাবি জানিয়েছিলেন, এখন তিনি চিরদিনের জন্য আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। পারভেজ  হোসেনের বাবা ও শ্বশুর না ফেরার দেশে চলে গেছেন। তার মেয়ে হৃদি এখন কাউকে দাদু-নানু ডাকতে পারে না। সাইফুর রহমান সজীবের মা রেনু মারা গেছেন।
ঝন্টুর বাবাও মৃত্যুবরণ করেছেন। সুমনের মেয়ে আফসানা ইসলাম রাইদা যখন তার বাবাকে ফিরে পাওয়ার আকুতি জানাচ্ছিল তখন তার দু’চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছিল। উচ্চস্বরে কাঁদতে কাঁদতে রাইদা বলছিল, আমি আমার বাবাকে দেখতে চাই। আমার বাবা কোথায়? আমার বাবা কেমন আছে, আমি কিছু জানি না। আমার বাবাকে ফিরিয়ে দিন। আমাকে আমার পরিবার বলে সাবধানে চলতে। আমি সাবধানে চলে কী করবো? আমাকে নিয়ে যাবে, আমাকে নিয়ে যেতে দিন, গুম করে দিন। তাহলে আমি আমার বাবাকে দেখতে পারবো। আমি কেমন সন্তান যে, আমার বাবাকে পাঁচ বছর ধরে দেখতে পাই না, কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিল রাইদা। চিৎকার করে বলেন, বাবাকে খুঁজতে সব জায়গায় গেছি, কিন্তু কোথাও পাইনি। এ কেমন দেশ? যুবদল নেতা পারভেজ হোসেনের চার বছর বয়সী মেয়ে হৃদি ‘বাবা’, ‘বাবা’ আর কান্না ছাড়া মুখ দিয়ে কোনো কথা বলতে পারেনি।
গুম হওয়া মারুফের বোন রত্না বলেন, পাঁচ বছর হয়ে গেল আমার ভাইকে দেখতে পাই না। সে  কোথায় আছে, কেমন আছে, আমরা কিছুই জানি না। আমাদের কিছু চাওয়ার নেই, শুধু আমার ভাইকে ফেরত চাই। গুম হওয়া আবদুল কাদের মিয়া মাসুমের মা আয়শা আলী বলেন, আমি আমার ছেলেকে সব জায়গায় খুঁজে বেড়াই। কিন্তু কোথাও পাই না। আজ কতদিন হয়ে গেল মা ডাক শুনতে পাই না। আমার একটাই সন্তান। পাঁচ বছর ধরে সরকারের কাছে একটাই দাবি জানাচ্ছি, আমার সন্তানকে ফিরিয়ে দিন। প্রধানমন্ত্রীও তো স্বজনহারা। তিনি কি স্বজন হারানোর ব্যথা বুঝেন না? আমি চাই আগামী ভোটের আগেই আমার সন্তানকে আমার কোলে ফিরিয়ে দিন। পুরান ঢাকার বংশালের নিখোঁজ আদনানের বাবা এরশাদ আলী, সেলিম রেজা পিন্টুর বোন রেহেনা বেগমও স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আকুতি জানান। সিলেটে আহত ছাত্রদলের একজন কর্মী পুলিশের নির্যাতনের বর্ণনা দেন এই অনুষ্ঠানে।
অনুষ্ঠানে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না গুম ও হত্যাকাণ্ডের জন্য সরকারকে দায়ী করেন। সরকারকে রাক্ষসের সঙ্গে তুলনা করে স্বজনদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, কেঁদে কী করবেন? যারা ক্ষমতায় আছে, যারা কিছু করতে পারে আপনাদের জন্য, ওরা সবাই দায়িত্বজ্ঞানহীন, ওদের মানুষের জন্য কোনো দয়া নাই, দরদ নাই। ওরা রাক্ষসের মতো। রাক্ষস যেমন মানুষ খায়, এই সরকার.. মানুষ খেয়ে ফেলছে। মান্না বলেন, আমি আগেও এই অনুষ্ঠানে এসেছি। দেখেছি স্বজনদের জন্য পুরো হল কান্নায় ভেঙে পড়েছে।
যতজনের নিখোঁজের কথা বলা হচ্ছে, তারা সবাই কি বেঁচে আছে? কারা বেঁচে আছে, আর কারা বেঁচে নেই, এই কথা এরা (সরকার) বলবে না। এরা যতদিন ক্ষমতায় আছে, ততদিন আপনাদের কোনো প্রশ্নের জবাব পাবেন না। তিনি বলেন, অতএব লড়াই একটাই, সেটা হচ্ছে এদের কবল থেকে মুক্তি চাই। তারপর আমাদের স্বজনদের ফিরে পাবার পালা। অতএব চোখের পানিকে বারুদে পরিণত করুন। ভোটের মাধ্যমে এদের পরাজিত করতে চাই, তাছাড়া পারবেন না। যেরকম ?বুকের মধ্যে ছবি নিয়েছেন, এভাবে বুকে ছবি নেন, ব্যানার নেন, প্ল্যাকার্ড নেন। নিজের এলাকায় যান, বন্ধু-বান্ধব আত্মীয়-স্বজন যাকে পান, তাকেই বলেন, সামনে নির্বাচন এদের জবাব দিতে চাই। আপনি যদি গুম খুনের জবাব চান তাহলে ভোটের লড়াই করতে হবে। সামনে ভোট, এখন একমাত্র ভোটের লড়াই করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক আসিফ নজরুল বলেন, গুম হচ্ছে সব থেকে জঘন্য অপরাধ। এটা খুনের থেকেও জঘন্য। পৃথিবীর বিভিন্ন আইনে যে সংজ্ঞা দেয়া আছে, সেখানেও এটাকে চরম জঘন্য অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা আছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইনে বলা হয়েছে গুম বা খুন যখন পরিকল্পিত এবং ব্যাপক সংখ্যায় হয়, তখন সেটাকে আমরা মানবতাবিরোধী হিসেবে বলতে পারি। যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ হয়। আসিফ নজরুল বলে, আমাদের দেশে যতগুলো গুমের ঘটনা ঘটেছে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিকার হয়েছেন সরকারবিরোধী যারা রাজনীতি করেন। কাজেই আমাদের ভাবার কারণ রয়েছে গুম হয়েছে পরিকল্পিতভাবে এবং সংখ্যার দিক থেকেও এটা ব্যাপক সংখ্যায় হয়েছে। কাজেই আমি মনে করি, গুমের শিকার হওয়া যেসব পরিবার আছেন আপনারা যদি দেশে বিচার না পান, আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে এর বিচার পাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে চেষ্টা করবেন।
৫ বছর আগে গুম হওয়া সুমনের মা হাজেরা খাতুনের সভাপতিত্বে এই অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য রাখেন বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হাকিম লালা, গণসংহতি আন্দোলনের নেতা জোনায়েদ সাকি, বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল, মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন অধিকারের পরিচালক নাসির উদ্দিন এলএম প্রমুখ।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নয়া মার্কিন দূত: শুনলেন নিপীড়নের করুণ কাহিনী by সরওয়ার আলম শাহীন

রোহিঙ্গা ক্যাম্প পারিদর্শন করলেন বাংলাদেশে নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত আল রবার্ট মিলার। ৫ সদস্যের সফরসঙ্গী নিয়ে গতকাল বেলা সাড়ে ১২টার  দিকে নাইক্ষ্যংছড়ির ঘুমধুম সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডে কোনার পাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন তিনি। এ সময় রাষ্ট্রদূত বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমি বাংলাদেশে নতুন এসেছি, তাই আপনাদের দেখার জন্য এসেছি। জানতে চাই আপনাদের সুখ দুঃখের কথা। মার্কিন রাষ্ট্রদূত বাস্তুচ্যুতদের বলেন, বাংলাদেশ সরকার আপনাদের নিরাপদে স্বদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে নিয়ে জাতিসংঘের মাধ্যমে চাপ প্রয়োগ করে আসছে। যে কারণে মিয়ানমার এখন ফেরত নেয়ার কথা বলছে। যদি রাখাইনে বাড়ি ঘরসহ যাবতীয় সুযোগ সুবিধা দেয়া হয় তাহলে আপনারা রাখাইনে ফিরে যাবেন কিনা? জবাবে এক রোহিঙ্গা নেতা বলেন, আমাদের এখানে এক মুহূর্তও থাকতে ইচ্ছে করছে না। আমরা যেকোনো সময়ে স্বদেশে ফিরে যেতে রাজি আছি।
তবে মিয়ানমারে অবস্থানরত অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মতো আমাদেরকেও সম্পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। তাও জাতিসংঘের সার্বিক নিরাপত্তার অধীনে। নো-ম্যান্স ল্যান্ড থেকে ফিরে মার্কিন দূত দুপুর দেড়টার দিকে বালুখালী টিভি টাওয়ার সংলগ্ন ঘুমধুম ইউএনএইচসিআর নির্মিত ট্রানজিট ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। ক্যাম্পে সদ্য মিয়ানমার থেকে আসা ৯ সদস্যের দুই পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানতে চান, তারা কেন এসেছেন? এসময় মিয়ানমারের বুচিদং নাইক্ষ্যংপাড়া থেকে আসা আমান উল্লাহ (৫৫) জানান, সেখানে মিয়ানমার সেনা ও রাখাইন, উগ্রবাদী জনগোষ্ঠী পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে এনভিসি কার্ড নেয়ার জন্য চাপ দিচ্ছে। বাড়ি থেকে বের হতে দিচ্ছে না। যে কারণে তারা বাধ্য হয়ে এপারে চলে এসেছে। তাদের সঙ্গে কথা বলার পর মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিলার বালুখালী ময়নারঘোনা ক্যাম্প পরিদর্শন করেন। এ সময় রাষ্ট্রদূত রোহিঙ্গাদের বেশ কয়েকটি থাকার ঘরও ঘুরে দেখেন। পরে ময়নারঘোনা ক্যাম্প ও ব্লকের ৫০ জন মাঝি ও ব্লক প্রতিনিধিদের সঙ্গে  কথা বলেন তিনি। নয়া রাষ্টদূত জানতে চান, তারা এখানে কেমন আছেন, জবাবে মাঝিরা বলেন তারা এখানে খুব ভালো আছেন।
নিয়মিত ত্রাণ সামগ্রী পাচ্ছেন। চিকিৎসা সেবা ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় দিন পার করলেও তারা মিয়ানমার ফিরতে আগ্রহী। সেখানে রাষ্ট্রদূতের উদ্দেশ্যে আবু তাহের মাঝি বলেন, কয়েকটি এনজিও সংস্থার দ্বিমুখী আচরণের কারণে ১৫ই নভেম্বর রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন হয়নি। এজন্য তারা দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, সরাসরি জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে তাদের সহায় সম্পদ ফেরত দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হলেই তারা ফিরবেন। কেউ রোহিঙ্গাদের এখানে রাখতে পারবে না। তাহের মাঝি যা বলেন, তার মোদ্দা কথা ছিল এমন ‘স্বদেশের মায়া সবার আছে।’ এ সময় রাষ্ট্রদূত তাদের সম্মানের সঙ্গে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র সব সময় বাংলাদেশের সহায়তায় পাশে আছে বলে জানান। এর আগে সকাল ১১টার দিকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত উখিয়ার রাজাপালং ইউনিয়নের দরগাহবিল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মার্কিন অর্থায়নে নির্মিত সাইক্লোন সেন্টার কাম স্কুল ভবন পরিদর্শন করেন। দিনভর ক্যাম্প এলাকায় ব্যস্ত কর্মসূচিতে কাটিয়ে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে মিলার কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা করেন।
সচিবের সঙ্গে প্রথম বৈঠকেই বার্নিকাটের ওপর হামলার অগ্রগতি জানতে চাইলেন মিলার: এদিকে আমাদের কূটনৈতিক রিপোর্টার জানান, গত বৃহস্পতিবার বিকালে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করে নয়া মার্কিন দূতের ঢাকায় অভিষেক হওয়ার পর রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনই হচ্ছে প্রথম পাবলিক ফাংশন। কূটনৈতিক সূত্রে আগেই খবর বেরিয়েছে, ক্যাম্প পরিদর্শনের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ মিশন শুরু করতে চেয়েছেন আর্ল রবার্ট মিলার। কার্যত তা-ই করেছেন। তবে ঢাকায় আগের দুদিনেও কিছু কর্মসূচি ছিল তার। গুরুত্বপূর্ণ ছিল পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হকের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতের বিষয়টি। সোমবার সকালে সচিবের সঙ্গে তার পরিচিতিমূলক তবে আনুষ্ঠানিক বৈঠকটি হয়। সেখানে একটি অবাধ সুষ্ঠু এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে ওয়াশিংটনের আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি পুনর্ব্যক্ত করেন মিলার। একই সঙ্গে তিনি কেমন বাংলাদেশ দেখতে চান? সেটিও ব্যক্ত করেন। আলোচনায় আসে রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গও। তবে সচিবের সঙ্গে প্রথম বৈঠকেই মার্কিন দূত তার পূর্বসূরি (সদ্য বিদয়ী রাষ্ট্রদূত) মার্শা বার্নিকাটের গাড়ি বহরে হামলার তদন্তের অগ্রগতি চানতে চান। নয়া দূত এ-ও বলেন, এ হামলার ঘটনায় ওয়াশিংটন খুবই মর্মাহত। অপরাধীদের দ্রুত বিচার দেখতে চান তারা।
জবাবে ঢাকার তরফে ওই ঘটনাটিকে ‘দুঃখজনক’ এবং ‘অনাকাঙ্ক্ষিত’ উল্লেখ করে হামলার তদন্ত পুলিশ করছে জানিয়ে বলা হয়- স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে তদন্তকাজ এগিয়ে চলেছে। ঢাকার ওই বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত সন্তুষ্ট কি-না? জানতে চাইলে দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তার মন্তব্য ছিল এমন- ‘মুখে তো কিছু বলেনি, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখেও বোঝা যায়নি। তবে প্রথম বৈঠকে ইস্যুটি তোলায় মনে হয়েছে তারা সিরিয়াস। দেখি সামনে কী হয়।’ উল্লেখ্য, গতকাল রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন কর্মসূচি শেষ হলেও নতুন মার্কিন দূত ঢাকায় ফিরেননি। আজ কক্সবাজারে জেলা প্রশাসকসহ স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে তার বৈঠক রয়েছে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থার প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গেও মতবিনিময় করছেন তিনি।

অসমে এনআরসি থেকে ৩০ লাখ বাঙালি হিন্দুর নাম বাদ গেছে: শতাব্দী রায়

ভারতের অসমে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) থেকে ত্রিশ লাখ হিন্দু বাঙালির নাম বাদ গেছে বলে মন্তব্য করেছেন পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল এমপি শতাব্দী রায়। মঙ্গলবার প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় তিনি ওই মন্তব্য করেন। 
শতাব্দী রায় বলেন, ‘অসমে নাগরিকপঞ্জি থেকে যে আটত্রিশ লাখ বাঙালির নাম বাদ গেছে, ভাবলে অবাক লাগে তার মধ্যে ত্রিশ লাখ হচ্ছে হিন্দু। যে বত্রিশজন এ পর্যন্ত আত্মহত্যা করেছেন তাঁর মধ্যে ছাব্বিশজন হচ্ছে হিন্দু। এরপরেও বাঙালিদের কাছ থেকে হিন্দুদের কাছ থেকে বিজেপি ভোট চায় কী করে?’
তিনি বলেন, ‘আমার ধারণা বিজেপি সরকার কেবলমাত্র আমাদের কিছু ধনী ব্যবসায়ী ছাড়া কাউকে হিন্দু ভাবছে না, কাউকে এদেশের নাগরিক ভাবছে না! কিছুদিন আগে যখন নাগরিক পঞ্জি বেরোলো তখন আমাদের দলের এমপিরা অসমে গিয়েছিলেন, কিন্তু তাদেরকে বিমানবন্দর থেকে বাইরে বেরোতে দেয়া হয়নি, হেনস্থা করা হয়েছে। যে পাঁচজন নিরীহ মানুষ সম্প্রতি নিহত হলেন, তাঁদের কাছে গিয়ে আমাদের দলের পক্ষ থেকে তাদেরকে এক লাখ টাকা করে ওদেরকে দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেখানকার বিজেপি সরকার ওঁদের জন্য কিছুই করেনি। আমি ওখানে পঞ্চায়েত নির্বাচনে দলীয় প্রচারে গিয়েছিলাম। সেখানে প্রচুর মানুষের উচ্ছ্বাস দেখে আমার মনে হয়েছে তৃণমূলের প্রার্থীরা জিতবেন।’
শতাব্দী রায় বলেন, ‘বিজেপি সরকার অসমের মানুষদের ভয় দেখিয়ে রেখেছে, হুমকি দেয় কিন্তু ওঁরা ভরসা পেয়েছেন তৃণমূল ওঁদের পাশে আছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ওঁদের সঙ্গে আছেন। সেই বিশ্বাস আমরা তাদেরকে দিয়ে এসেছি। যে উন্নয়ন পশ্চিমবঙ্গে হয়েছে সেই উন্নয়ন অসমে হবে সেটা জানিয়ে এসেছি। এজন্য শুধু ওই রাজ্যে পরিবর্তন দরকার।’
তিনি বলেন, ‘অসমের প্রত্যেক হিন্দু ও বাঙালির জানা উচিত হিন্দুত্বের দাবি করে মানুষের উপরে যে অত্যাচার করা হচ্ছে সেখান থেকে তাঁদের প্রতিবাদের একটাই ভাষা ও জায়গা হচ্ছে ভোটবাক্স। তৃণমূলের প্রার্থীরা জয়ী হলে তাঁরা সেখানকার মানুষের পাশে থাকবেন এটাই একমাত্র শপথ ও মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের অঙ্গীকার’ বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
অসমের পঞ্চায়েত নির্বাচনে জেলা পরিষদের ১৭৯টি আসনে তৃণমূল প্রার্থী দিয়েছে। গত (রোববার) সেখানে শতাব্দী রায় এমপিসহ তৃণমূলের এক প্রতিনিধিদল নির্বাচনি প্রচারে গিয়েছিলেন। রাজ্যটিতে ১৬ জেলায় ৫ ডিসেম্বর ও ৯ ডিসেম্বর পঞ্চায়েত ভোট হবে। ফলপ্রকাশ হবে ১২ ডিসেম্বর।

এরশাদ কী চেয়েছিলেন

হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। স্বৈরশাসক। পতনের পরও মঞ্চে ফিরেছেন। যেটা তামাম দুনিয়ার ইতিহাসেই ব্যতিক্রম। তিনি কোনো স্বাধীন রাজনীতিবিদ নন। একথা তিনি বারবার বলে গেছেন। এবং এটা কবুল করতে আসলে কখনোই কারও আপত্তি ছিল না। রাজনীতিতে তিনি বার বার রহস্য তৈরি করেছেন।
কখনো আবার শিকার হয়েছেন অপার রহস্যের। যখন তার নিজের কিছু করার ছিল না। বঙ্গভবন, সাব-জেল, হাসপাতাল সবই তার বড় চেনা।
সামনে নির্বাচন। আবারো এরশাদকে নিয়ে রহস্য তৈরি হয়েছে। প্রতিদিনই পাওয়া যাচ্ছে নতুন নতুন খবর। কোন্‌টা সত্য, কোন্‌টা মিথ্যা বলা মুশকিল। এরশাদ সর্বশেষ প্রকাশ্যে এসেছিলেন গত ২০শে নভেম্বর। সেদিন দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রেখেছিলেন। বলেছিলেন, কোন জোটে যাবেন সে সিদ্ধান্ত তিনি নিজেই নেবেন। সে সিদ্ধান্ত নেয়ার সুযোগ কী তিনি পেয়েছেন? কী সিদ্ধান্ত নিতে চেয়েছিলেন এরশাদ। গত দুই সপ্তায় এরশাদকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এরই মধ্যে তার দলের মহাসচিব বদলে গেছে। রুহুল আমিন হাওলাদার জানিয়েছিলেন, সহসাই এরশাদ প্রকাশ্যে আসবেন। কিন্তু এরপর অনেকটা আচমকাই বাতিল হয়ে যায় হাওলাদারের মনোনয়ন। মহাসচিব পদ থেকেও সরিয়ে দেয়া হয়েছে তাকে। এ ব্যাপারে এরশাদের সরাসরি কোনো বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
নতুন মহাসচিব ও মন্ত্রিসভার সদস্য মশিউর রহমান রাঙ্গাই যা বলার বলছেন, এরশাদ ও হাওলাদার দুইজনই নীরব। রাঙ্গা অবশ্য ঠিক কী বলতে চাচ্ছেন তা পরিষ্কার নয়। একবার বলছেন, এরশাদ ভালো আছেন। আবার বলছেন, এরশাদ চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাবেন। সর্বশেষ জানিয়েছেন, এরশাদ অসুস্থ অবস্থায় বাসায় একা থাকতে ‘ভয়’ পান বলেই মাঝেমধ্যে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে যান। গতকাল বনানীতে পার্টি চেয়ারম্যানের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে রাঙ্গা বলেন, ঘুমের ডিস্টার্ব হলেও এরশাদ সিএমএইচে যান। বাসায় একা থাকেন বলে তার একলা লাগে, ভয় করে। তাছাড়া ইনফেকশনের ভয়ও আছে। রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে যাওয়ার পর শারীরিক অবস্থা নিয়ে এরশাদ ভয়ে থাকেন বলে তথ্য দেন তিনি। সোমবার রুহুল আমিন হাওলাদারকে সরিয়ে দেয়ার কথা বলা হলেও রাঙ্গা এদিন নতুন তথ্য দেন যে, হাওলাদার নিজেই পদত্যাগ করেছেন।
এই অবস্থায় এই প্রশ্ন আরো বড় হচ্ছে যে, প্রেসিডেন্ট পার্কে কী অবস্থায় আছেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তিনি কি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। না কি নানামুখী চাপের কারণে দলের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। এমনিতে মনোনয়ন নিয়ে দলের ভেতরে প্রচণ্ড চাপে ছিলেন এরশাদ। রুহুল আমিন হাওলাদারের পাশাপাশি তার বিরুদ্ধেও অনেক মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রশ্ন তুলেছিলেন। দুই/তিন বছর থেকেই তিনি বলে আসছিলেন, জাতীয় পার্টি তিনশ’ আসনেই প্রার্থী দেবে। ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্নও দেখিয়েছিলেন তিনি। এসব কী ছিল তবে বাৎ কী বাৎ। প্রতিটি নির্বাচনের আগেই সিদ্ধান্ত নিতে এরশাদ নানা নাটকীয়তা তৈরি করেন। বিশেষ করে জোট রাজনীতির যুগে তিনি বারবার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। চারদলীয় জোট গঠনের সময় তিনি ঐক্যের কাবিননামায় সই করেছিলেন। কিন্তু পরে সেখান থেকে বেরিয়ে যান।
২০০৬ সালে যখন তার বিএনপি জোটে যাওয়া প্রায় নিশ্চিত মনে হচ্ছিলো তখন তিনি আকস্মিকভাবে আওয়ামী লীগের সমাবেশে যোগ দেন। ঘোষণা দেন, আমি সৈনিক। মৃত্যুকে পরোয়া করি না। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন ঘিরেও এরশাদ আকস্মিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। হঠাৎ করেই নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। কিন্তু নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে চেয়েও তিনি সরতে পারেন নি। তাকে এমপি ঘোষণা করা হয়। পরে অবশ্য তিনি সবই মেনে নেন।
তবে ওই নির্বাচনের পর থেকে দৃশ্যত জাতীয় পার্টির নিয়ন্ত্রণ চলে যায় রওশন এরশাদের হাতে। যে নিয়ন্ত্রণ এখন পর্যন্ত আর আলগা হয়নি। এরশাদ কখনো কখনো চেষ্টা করেছেন। তবে তাতে ফল আসে নি। এরশাদ কোনো ফল চেয়েছিলেন কি-না তা নিয়েও বিতর্ক আছে। কোনো কোনো সূত্র দাবি করছে, একাদশ সংসদ নির্বাচন ঘিরেও নাটকীয় পরিস্থিতির অবতারণা করতে চেয়েছিলেন এরশাদ। তার সিঙ্গাপুর সংযোগকেও দেখা হয়েছিল সন্দেহের চোখে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এরশাদ যেন কোনো আকস্মিক পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারেন তা নিশ্চিত করা হয়েছে সুকৌশলে। মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষদিন পর্যন্ত হয়তো এটা নিশ্চিতই থাকবে। একসময়কার প্রচণ্ড প্রতাপশালী শাসক এরশাদ। সম্ভবত, জীবনের অন্য অধ্যায়টা এখন ভালোভাবেই টের পাচ্ছেন তিনি।

অরিত্রীর আত্মহত্যার জের: বিক্ষোভে অচল ভিকারুননিসা

বাবা-মা’কে অপমান করার জেরে নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রী অধিকারীর আত্মহননে ফুঁসে উঠেছে রাজধানীর ভিকারুননিসা স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা। অরিত্রীর আত্মহননের জন্য দায়ীদের বিচার চেয়ে গতকাল দিনভর বেইলি রোডের ক্যাম্পাস ছিল উত্তপ্ত। ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করে সকাল থেকে খণ্ড খণ্ড মিছিল ও রাস্তা বন্ধ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। স্কুল ক্যাম্পাসে গিয়ে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের তোপের মুখে পড়েন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এদিকে স্কুলের অধ্যক্ষ, প্রভাতী শাখার প্রধান এবং গভর্নিং কমিটির পদত্যাগ ও স্থায়ী বহিষ্কারের দাবিতে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে শিক্ষার্থীরা। গতকাল বিকালে অধ্যক্ষ ও শাখা প্রধানের পদত্যাগ, গভর্নিং কমিটি বাতিল এবং অরিত্রী হত্যার প্রচলিত আইনে সুষ্ঠু বিচার চেয়ে তিন দফা দাবি জানান শিক্ষার্থীরা। দাবি না মানা পর্যন্ত এ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয় তারা। আজ সকাল ১০টায় স্কুলের সামনে দ্বিতীয় দিনের মতো অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে তারা।
শিক্ষার্থীরা জানান, শিক্ষামন্ত্রীর দেয়া তিনদিনের মধ্যে সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত না হলে এ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
এদিকে গতকাল বিকালে প্রভাতী শাখার প্রধান জিন্নাত আরাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তিনি (জিন্নাত আরা) যোগদান করতে পারবেন না। আর ঘটনা তদন্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও স্কুল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দুইটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। দুটি কমিটি তিনদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক প্রফেসর মো. ইউসুফকে আহ্বায়ক করে করা তিন সদস্যের কমিটিতে ঢাকা জেলা শিক্ষা অফিসার বেনজির আহমেদ ও মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ঢাকা অঞ্চলের উপ-পরিচালক শাখাওয়াত হোসেন বিশ্বাস। আর স্কুল কর্তৃপক্ষ গঠিত অপর কমিটির সদস্যরা হলেন- ভিকারুননিসার পরিচালনা পর্ষদের সদস্য মো. আতাউর রহমান (অভিভাবক প্রতিনিধি), তিন্না খুরশীদ জাহান (অভিভাবক প্রতিনিধি, সংরক্ষিত মহিলা) এবং ভিকারুননিসার শিক্ষক ফেরদৌসী বেগম। তিনদিনের মধ্যেই অরিত্রী অধিকারীর আত্মহত্যার ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। এদিকে ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করে ১ মাসের মধ্যে রিপোর্ট দিতে বলেছে হাইকোর্ট। এ ধরনের ঘটনা রোধে একটি জাতীয় নীতিমালা তৈরিরও নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শিক্ষামন্ত্রী ভিকারুননিসা নূন স্কুলে গেটে যাওয়ার পর বিক্ষোভে ফেটে পড়ে শিক্ষার্থীরা। তারা শিক্ষামন্ত্রীর সামনে বিচার চাই, বিচার চাই স্লোগান দিয়ে তার গাড়ি আটকে দেয়। একপর্যায়ে মন্ত্রী গাড়ি থেকে নেমে এ ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, একজন শিক্ষার্থী কতটা অপমানিত হলে, কতটা কষ্ট পেলে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নেন। এ ঘটনায় আমরা শোকাহত। সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলেছি এবং দোষীদের খোঁজে বের করতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তিনদিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলেছি। শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য তিনি বলেন, তোমরা নিশ্চিত থাকো এ ঘটনার বিচার পাবে। ঘটনার পেছনে বা ঘটনার সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এরপর শিক্ষামন্ত্রী স্কুলের অধ্যক্ষ, উপস্থিত শিক্ষক, অভিভাবক ও ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি শ্রেণিকক্ষ ও পরীক্ষার হল পরিদর্শন করেন। পরে শিক্ষামন্ত্রী কলেজ প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের বলেন, অরিত্রীর অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু বেদনাদায়ক ও মর্মান্তিক। তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি সমবেদনা জানান। মন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীকে মানসিক বা শারীরিক নির্যাতন করা অপরাধ। এ কাজ যারা করেছে তাদের অবশ্যই বিচার হবে। তবে এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করা এবং ধৈর্য্য ধারণের আহ্বান জানান।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আজ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের হাতে তদন্ত প্রতিবেদন আনুষ্ঠানিক হস্তান্তরের পর কিছু নির্দেশনা দেয়া হবে। সেখানে সারা দেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়া হবে। এ ব্যাপারে মাউশির পরিচালক (মাধ্যমিক) অধ্যাপক আবদুল মান্নান মানবজমিনকে বলেন, এ ঘটনায় আমরাও সংক্ষুব্ধ। পুরো ঘটনাটির জন্য স্কুল কর্তৃপক্ষ দায় এড়াতে পারেন না। তদন্ত কমিটি হয়েছে। এরপর চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে এবার কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না এটি নিশ্চিত করে বলতে পারি। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শারীরিক নির্যাতন এবং অভিভাবকদের মানসিক নির্যাতন বন্ধে বেশ কিছু নির্দেশনা দেয়া হবে। এটি নিয়ে মন্ত্রণালয় একটি কমিটি কাজ করছে। 
শিক্ষার্থী আত্মহত্যার ঘটনায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক মো. ইউসুফ জানান, ঘটনা একসঙ্গে ঘটেনি। এর শুরু থেকে তদন্ত করা হবে। সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলা হবে। দোষী সাব্যস্ত হলে বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। তিনি বলেন, আমরা ঘটনার শুরু থেকে তদন্ত করবো। এর সঙ্গে জড়িত, পাশাপাশি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যে পরিবারে হয়েছে তাদের সঙ্গেও কথা বলবো। কোনো ঘটনা একসঙ্গে হয় না। আমরা পারিপার্শ্বিক বিষয় বিবেচনায় আনার চেষ্টা করবো। মন্ত্রণালয় ও স্কুল থেকে গঠিত কমিটির তদন্ত একসঙ্গে দেয়া হবে। সেটি দেখে বোর্ড সিদ্ধান্ত নেবে।
পদত্যাগ করার যে দাবি শিক্ষার্থীরা করছে এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস বলেন, তদন্ত কমিটির রিপোর্টে দোষী সাব্যস্ত হলে আমি পদত্যাগও করবো, প্রয়োজনে আদালতের কাঠগড়ায়ও দাঁড়াবো।
অভিযোগের পাহাড়: নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রীর আত্মহত্যার পর স্কুলটির শিক্ষিকাদের দুর্ব্যবহারের ব্যাপারে অভিভাবকরা মুখ খুলতে শুরু করেছেন। তারা জানান, অভিভাবকদের ডেকে নিয়ে দুর্ব্যবহার, অপমান করা, টিসি ধরিয়ে দেয়া এ স্কুলে রীতিমত প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে। বিষয়টি স্কুল কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানিয়েও প্রতিকার তো দূরের কথা উল্টো হয়রানির শিকার হতে হয়েছে। এ সময় সাংবাদিকদের কাছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অপমান করার অভিযোগ করেন একাধিক অভিভাবক। তারা বলেন, শিক্ষকরা আমাদের মানুষই মনে করেন না। আমাদের সন্তানরা প্রায় বিচার দেয়, তারা নানা কটূক্তি করে। কথায় কথায় বহিষ্কার, পরীক্ষা দিতে না দেয়া, টিসি দিয়ে দেয়ার হুমকি দেন। আর কোচিং করানো বাধ্যতামূলক এটি ভিকারুননিসায় প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। এ ব্যাপারে অভিভাবক অ্যাডভোকেট কামারুজ্জামান কাজল মানবজমিনের কাছে অভিযোগ করে বলেন, আমার মেয়েকে কোচিং করাতে বাধ্য করা হয়। না হয় ক্লাসে মানসিক নির্যাতন, পরীক্ষার খাতা ও ব্যবহারিক পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে দেয়া হয়। এজন্য আমার মেয়ে কোচিংয়ে না গিয়েও শিক্ষকদের টাকা দিতে হচ্ছে। ৬ষ্ঠ শ্রেণির পর থেকে টানা তিন বছর এভাবে কোচিং না করেও টাকা দিচ্ছি। প্রতিকার চেয়ে একাধিকবার আবেদন করেও প্রতিকার পাইনি। তিনি বলেন, এর সঙ্গে স্কুলের সবাই জড়িত। এ সিন্ডিকেট না ভাঙা পর্যন্ত এ ধরনের ঘটনা ঘটতে থাকবে।
একজন অভিভাবক অধ্যক্ষের কাছে অভিযোগ করে বলেছেন, ক্লাসে অমনোযোগী হয়ে নোট তুলতে না পারায় ৭ম শ্রেণির ছাত্রীকে উদ্দেশ্য করে গণিতের এক শিক্ষক বলেন, তোর মা বাবাকে গিয়ে বলবে, কাল থেকে তোর স্কুলে আসা বন্ধ। এ কথা বলে তাকে ক্লাস থেকে বের করে দেন। পরেরদিন বাবা মাকে নিয়ে এসেও তোপের মুখে পড়েন ওই ছাত্রী। পরে শিফট ইনচার্জের কাছে মুচলেকা দিয়ে ছাড় পায়। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ওই অভিভাবক কান্নাকাটি জুড়ে দেন। তিনি বলেন, আমার খুব শখ মেয়েকে ভিকারুননিসা নূন স্কুলে পড়াবো। পড়াশোনা নামে অহেতুক চাপ ও কিছু কিছু শিক্ষিকার দুর্ব্যবহারের কারণে এখন ছেড়ে দে মা, কেঁদে বাঁচি অবস্থা’।
সেখানে উপস্থিত একাধিক অভিভাবক অভিযোগ করেন, পরীক্ষার প্রশ্ন যে পদ্ধতিতে আসে সে পদ্ধতিতে শ্রেণিকক্ষে পড়ানো হয় না। সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে প্রশ্ন করা হয়। ফেলের নামে জরিমানা বাণিজ্য ও কোচিং করতে বাধ্য করতেই এসব করা হয় বলে অভিযোগ তাদের। এ রকম শত শত অভিযোগ করা যাবে বলেও জানান তারা। অপমান সইতে না পেরে স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী অরিত্রীর আত্মহত্যার পর স্কুলটির শিক্ষিকাদের দুর্ব্যবহারের ব্যাপারে অভিভাবকদের অনেকে মুখ খুলতে শুরু করেছেন। রিকশা দিয়ে যাওয়ার সময় ব্যাংকার শামীম জোরে জোরে বলছিলেন, এ স্কুলে বড় মেয়েকে পড়াতে গিয়ে পড়াশোনা কাকে বলে হাড়েহাড়ে টের পেয়েছি। তাই সুযোগ থাকলেও ছোট মেয়েকে এই স্কুলে ভর্তি করাইনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ নাজনীন ফেরদৌস সাংবাদিকদের বলেন, শিক্ষার্থীরা জিজ্ঞেস করলে শিক্ষক উত্তর না দিয়ে তাকে থামিয়ে দেবে-এমন কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে নেই। আমাদের শিক্ষকরা ঠিকমতোই ক্লাস নেন। কোচিং প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কোচিংয়ে উৎসাহী করার প্রশ্নই ওঠে না। অধ্যক্ষের দাবি, ভিকারুননিসার শতকরা পাঁচভাগ শিক্ষকও কোচিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তবে এ ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।
গত সোমবার দুপুরে রাজধানীর শান্তিনগরে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে অরিত্রী অধিকারী (১৫)। সে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির প্রভাতী শাখার নবম শ্রেণির ছাত্রী ছিল।
অরিত্রীর বাবা দিলীপ অধিকারীর অভিযোগ, অরিত্রীর স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা চলছিল। গত রোববার পরীক্ষা দেয়ার সময় তার কাছ থেকে একটি মোবাইল ফোন উদ্ধার করে স্কুল কর্তৃপক্ষ। এ ঘটনার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ অভিভাবকদের স্কুলে যেতে বলে। স্কুলে যাওয়ার পর কর্তৃপক্ষ জানায়, অরিত্রী পরীক্ষার হলে মোবাইলের মাধ্যমে নকল করছিল। তাই তাকে টিসি দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ খবর শোনার পর স্কুল থেকে অরিত্রী বাসায় ফিরে ফ্যানের সঙ্গে ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দেয়। পরে মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে দ্রুত উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে গতকাল নাজনীন ফেরদৌসের কাছে সাংবাদিকরা অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, পরীক্ষার হলে ওই ছাত্রীর সঙ্গে এমন কোনো ব্যবহার করা হয়নি যাতে সে আত্মহত্যা করবে। শাখা প্রধান (প্রভাতী শাখার প্রধান জিন্নাত আরা) আমাকে বলেছেন, অন্য শিক্ষার্থীর বেলায় যে নিয়ম তার বেলায়ও একই নিয়ম প্রয়োগ করা হয়েছে।’ নিয়মটা কী? প্রশ্ন করা হলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বলেন, ‘আসলে নিয়মটা আমার জানা নেই। পরীক্ষায় কেউ নকল করলে তার শাস্তি কী হওয়া উচিত এটা আমার জানা নেই। তবে আমরা অভিভাবককে ডেকে তার সামনে এ বিষয়ে কথা বলি। ওই দিনের পরীক্ষা বন্ধ রাখা হয়।’ নাজনীন ফেরদৌস বলেন, ‘শাখা প্রধান আমাকে বলেছেন, নকল পাওয়া গেলে কোনো পরীক্ষা নেয়া হয় না। এর বেশি আমার জানা নেই। এটা প্রচলিত নিয়ম।’
একই প্রশ্ন করা হলে প্রায় সমান উত্তর দেন ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান গোলাম আশরাফ তালুকদার। তিনি বলেন, ‘নিয়মটা আমার জানা নেই। তবে পাবলিক পরীক্ষার বিষয়টা আমার জানা আছে। পরীক্ষায় শাস্তি কী, সে নীতিমালার ব্যাপারটিতে আমি স্পষ্ট নই। তবে কেউ নকল করলে তার ওই দিনের পরীক্ষা নেয়া হবে না। পরের দিন পরীক্ষা দিতে পারবে।’ মেয়েটিকে পরের দিনও পরীক্ষা দিতে দেয়া হয়নি। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে গোলাম আশরাফ বিষয়টি এড়িয়ে যান। তিনি বলেন, ‘সেদিন সময় ছিল না। ...এটা শিক্ষকরা জানেন।’ তিনি বলেন, ‘আমরা তদন্ত কমিটি করেছি, অধ্যক্ষ বা অন্য কেউ দোষী হলে সাতদিনের মধ্য তার বিরুদ্ধে শাস্তি ঘোষণা হবে। তাৎক্ষণিকভাবে আমরা শাখা প্রধানকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছি। একইসঙ্গে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছি।’