Tuesday, September 9, 2025

যৌন নিপীড়ন মামলায় ট্রাম্পের ৮৩ মিলিয়ন ডলারের মানহানি রায় বহাল

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে লেখিকা ই. জ্যাঁ ক্যারোলকে যৌন মানহানি করার দায়ে জুরি বোর্ডের দেয়া ৮৩.৩ মিলিয়ন ডলারের জরিমানার রায় সোমবার বহাল রেখেছে মার্কিন আদালত। ক্যারোলকে প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ট্রাম্প যৌন নিপীড়ন করেন। এই মর্মে আদালতে মামলা হওয়ার পর ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ট্রাম্পকে ৮৩.৩ মিলিয়ন ডলার জরিমানা করা হয়। ওই রায়ে ট্রাম্পকে ৬৫ মিলিয়ন ডলার শাস্তিমূলক ক্ষতিপূরণ, ৭.৩ মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ এবং ক্যারোলের অনলাইন সুনাম ফিরিয়ে আনার জন্য ১১ মিলিয়ন ডলার দিতে বলা হয়েছিল। সেই রায়ই বহাল রেখেছে আদালত। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

এতে আরও বলা হয়, ট্রাম্পকে নিউইয়র্কের আরেকটি ফেডারেল দেওয়ানি মামলায় ক্যারোলকে যৌন নিপীড়নের দায়েও দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। সেই সময় ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ক্যারোল, বিচারক এবং গোটা বিচার প্রক্রিয়াকে আক্রমণ করে অপমানজনক বার্তার বন্যা বইয়ে দেন। বিচারককে তিনি তখন ‘চরম অপব্যবহারকারী ব্যক্তি’ বলে উল্লেখ করেন।

মার্কিন আপিল কোর্টের (সেকেন্ড সার্কিট) রায়ে বলা হয়, জেলা আদালত যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছে তাতে কোনো ত্রুটি নেই এবং মামলার অতিমাত্রায় ভয়াবহ ও নিন্দনীয় পরিস্থিতির আলোকে জুরিদের ক্ষতিপূরণের পরিমাণ সম্পূর্ণ যৌক্তিক। মিস ক্যারোলের বর্তমান বয়স ৮১ বছর। প্রথম ২০১৯ সালে তার ওপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রকাশ্যে আনলে ট্রাম্প তাকে মানহানি করেন বলে অভিযোগ করেন। তখন ট্রাম্প বলেন, তিনি ‘আমার যোগ্য নন।’ জুরিদের সামনে ট্রাম্পের ২০২২ সালের অক্টোবরের জবানবন্দি দেখানো হয়। সেখানে তিনি ক্যারোলের একটি ছবিকে নিজের সাবেক স্ত্রী মারলা ম্যাপলস ভেবেছিলেন। এটি তার দাবি- ক্যারোল তার ধরণের নন, এই বক্তব্যকে দুর্বল করে দেয়। ২০২৩ সালে আরেকটি ফেডারেল জুরি ট্রাম্পকে দোষী সাব্যস্ত করে ক্যারোলকে ১৯৯৬ সালে নিউইয়র্কের একটি ডিপার্টমেন্ট স্টোরের ড্রেসিংরুমে যৌন নিপীড়নের অভিযোগে। এরপর ২০২২ সালে ক্যারোলকে ট্রাম্প ‘পুরোপুরি প্রতারণা’ বলে আখ্যায়িত করে আবারও মানহানি করেন।

আপিল কোর্ট সোমবার রায়ে আরও বলেছে, আমরা জেলা আদালতের সাথে একমত যে ট্রাম্পকে মানহানি করা থেকে বিরত রাখতে জুরিদের অধিকার ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক শাস্তি আরোপ করায়। ট্রাম্পকে এই মামলায় উপস্থিত থাকতে বা সাক্ষ্য দিতে হয়নি। তবে তিনি এই মামলাকে ব্যবহার করেছেন গণমাধ্যমের ব্যাপক কাভারেজ তৈরির জন্য এবং নিজেকে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার বলে প্রচার করে ওই সময়ের আসন্ন নির্বাচনে হোয়াইট হাউসে ফেরার প্রচারণায় কাজে লাগিয়েছেন।

https://mzamin.com/uploads/news/main/179225_Abul-1.webp

ইসরাইল অপরাধের পর অপরাধ করছে: নেতানিয়াহুর হুঙ্কার, গাজায় ধ্বংসযজ্ঞ বিশ্ববিবেককে কাঁপাচ্ছে

গাজা যখন দখল করে নিচ্ছে ইসরাইলের নৃশংস আগ্রাসন, তখন হামাসকে উল্টো আলটিমেটাম দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তার আসকারা পেয়ে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু গাজাবাসীকে ঘরবাড়ি ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দিয়েছেন। তিনি গাজাবাসীকে বলেছেন, ‘এখনই চলে যাও।’ একটি দেশ বিশ্ববাসীর চোখের ভিতর আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিয়ে যখন প্রকাশ্যে এই দখলদারিত্ব চালাচ্ছে তখন দৃশ্যত নীরব বসে আছে মুসলিম নামধারী মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে মুসলিম দেশগুলোর সংগঠন ওআইসি। তাদের কর্মকাণ্ড প্রশ্নবিদ্ধ করে। ইসরাইলের এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বৃটেন, ফ্রান্স সহ বেশ কিছু দেশ পদক্ষেপ নিলেও মুসলিম বিশ্ব সেখানে অনুপস্থিত। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ইসরাইলের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে গণহারে হত্যার এবং জীবনরক্ষাকারী সহায়তা ইচ্ছাকৃতভাবে বাধাগ্রস্ত করার জন্য অভিযোগ করেছেন। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক সোমবার বলেন, ইসরাইল ‘অপরাধের পর অপরাধ’ করে চলেছে। আর গাজার ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা ‘বিশ্বের বিবেককে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) জবাবদিহি করার মতো মামলা রয়েছে। জানুয়ারিতে আদালতের রায় অনুযায়ী তেলআবিবকে গণহত্যা রোধে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়। ভলকার তুর্কের এই গাজায় হত্যাযজ্ঞ বন্ধের আহ্বান এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইসরাইলি বাহিনী গাজার সবচেয়ে বড় নগরী গাজা সিটিকে ধ্বংস করে দিয়ে নগরীটিতে স্থল অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।

ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্স জানায়, রবিবার সকাল থেকে ইসরাইলি হামলায় গাজায় কমপক্ষে ৫০টিরও বেশি ভবন ধ্বংস হয়েছে। ১০০টি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সংস্থার মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেন, বাস্তুচ্যুত পরিবারদের শিবিরের পাশের আবাসিক ভবনগুলোকে টার্গেট করা হয়েছে। ২৪ ঘণ্টায় দুই শতাধিক তাঁবু ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি জানান, তুফফাহ এলাকায় ধ্বংসস্তূপ থেকে মানুষ উদ্ধার করা হচ্ছে। আজ-জারকা জেলায় ভবনগুলো বোমায় মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। মসজিদ ও খেলার মাঠও হামলার শিকার। আল জাজিরার গাজার প্রতিবেদক হানি মাহমুদ বলেন- একটির পর একটি সুউচ্চ টাওয়ার ভেঙে পড়তে দেখা হৃদয়বিদারক। শুধু ভবনই নয়, এগুলোর সঙ্গে জড়িত জরুরি সেবাও ধ্বংস হচ্ছে, যা মানুষের জীবনের জন্য অপরিহার্য, বিশেষত প্রায় দুই বছরের যুদ্ধে টিকে থাকার পর।
স্থানীয় হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শুধু সোমবারই কমপক্ষে ৫২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ৩২ জন নিহত হয়েছেন গাজা সিটিতে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আরও ছয়জন মারা গেছেন ক্ষুধা ও মারাত্মক অপুষ্টিতে। এর মধ্যে দু’জন শিশু। সোমবারের হামলায় নিহতদের মধ্যে ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ওসামা বালুশাও ছিলেন।

কর্মকর্তারা জানান, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত গাজায় প্রায় ২৫০ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। তারা সবাই ফিলিস্তিনি। কারণ ইসরাইল বিদেশি সাংবাদিকদের গাজায় ঢুকতে দেয় না। এটি আধুনিক ইতিহাসে সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংঘাত। ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানায়, উত্তর গাজায় একটি ট্যাঙ্কের নিচে রোডসাইড বোমা বিস্ফোরিত হলে তাদের চার সেনাও নিহত হয়েছে। সোমবার ইসরাইল নতুন উচ্ছেদ হুমকি দেয়। মানচিত্র প্রকাশ করে বলে, গাজার জামাল আবদেল নাসের স্ট্রিটের একটি ভবন ও পাশের তাঁবুগুলো খালি না করলে মৃত্যু নিশ্চিত হবে। বাসিন্দাদের তথাকথিত ‘মানবিক এলাকা’ আল-মাওয়াসিতে যেতে বলা হয়। কিন্তু আল-মাওয়াসি নিজেই বহুবার বোমা হামলার শিকার হয়েছে। বছরের শুরুতে এখানে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার মানুষ অবস্থান করতো। এখন মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, সেখানে ৮ লাখেরও বেশি মানুষ ঠাসাঠাসি করে অস্থায়ী ক্যাম্পে বাস করছে। গাজার জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তারা।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেস জাতিসংঘের সমালোচনার সুরে সুর মিলিয়ে ইসরাইলের বিরুদ্ধে নতুন পদক্ষেপ ঘোষণা করেছেন। তিনি বলেন, ইসরাইলে অস্ত্র বহনকারী জাহাজ ও বিমানকে তাদের বন্দর বা আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেবে না স্পেন। পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের মানবিক সাহায্য বাড়াবে এবং অবৈধ ইসরাইলি বসতিতে তৈরি পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করবে। টেলিভিশনে দেয়া ভাষণে সানচেস বলেন- আমরা আশা করি, এসব পদক্ষেপ নেতানিয়াহু সরকারকে চাপ দেবে, যাতে তারা অন্তত কিছুটা হলেও ফিলিস্তিনি জনগণের ভোগান্তি কমায়। তিনি আরও ঘোষণা দেন, যেকোনো ব্যক্তি, যিনি এই গণহত্যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত, তাকে স্পেনে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হবে।
ওদিকে হামাস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে যুদ্ধবিরতি ও বন্দিমুক্তির প্রস্তাব পাওয়ার পর তারা ‘অবিলম্বে আলোচনায় বসতে’ প্রস্তুত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন, হামাসকে চুক্তি মেনে নেওয়ার জন্য এটি তার ‘শেষ সতর্কবার্তা।’

অনলাইন অ্যাক্সিওস জানিয়েছে, মার্কিন পরিকল্পনায় ধাপে ধাপে ইসরাইলের গাজা থেকে প্রত্যাহার অন্তর্ভুক্ত আছে। তবে শর্ত হলো- গাজার নতুন সরকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হতে হবে। হামাস এটিকে ফাঁদ হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বলেছে, এই শর্ত কার্যত ইসরাইলকে পুরো নিয়ন্ত্রণ দিয়ে দেয় যে, কবে এবং কীভাবে প্রত্যাহার হবে। সোমবার দখলকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি বন্দুকধারীরা একটি অবৈধ বসতির কাছে হামলা চালিয়ে ছয়জনকে হত্যা ও ডজনখানেক মানুষকে আহত করে। হামলাকারীদের গুলি করে হত্যা করে ইসরাইলি সেনা ও এক বেসামরিক ব্যক্তি। এর জবাবে ইসরাইল পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরের মধ্যকার চেকপয়েন্টগুলো বন্ধ করে দেয় এবং কাতানা, বিদ্দু, বেইত ইনান ও বেইত দুকু গ্রামে অভিযান চালায়।
আল জাজিরার হামদা সালহুত আম্মান থেকে জানিয়েছেন, এসব অভিযান আসলে ইসরাইলের ‘সমষ্টিগত শাস্তি’র নীতি। তিনি বলেন- প্রতিবার একই চিত্র দেখা যায়। গ্রামগুলোতে অভিযান চালানো হয়, রাস্তা বন্ধ করে দেয়া হয়, চেকপয়েন্টগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে, পরিবারের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয় এবং শেষ পর্যন্ত পরিবারটির বাড়ি ভেঙে দেয়া হয়। জেনিনে ইসরাইলি অভিযানে দু’টি ১৪ বছরের কিশোর মোহাম্মদ সারি ওমর মাসকালা এবং ইসলাম আবদেল আজিজ নোয়াহ মাজারমাহ নিহত হয়। হাসপাতাল পরিচালক উইসাম বকর জানান, জেরুজালেম হামলার কয়েক ঘণ্টা পর মাসকালা তার আঘাতে মারা যায়।

ফিলিস্তিনি রাজনীতিবিদ মুস্তাফা বারঘুতি বলেন, ইসরাইল এ ধরনের হামলাকে সবসময় অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে। তার ভাষায়- দখলকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি শহর ও গ্রামে হামলার ধারা সবসময়ই আছে, কোনো হামলা থাকুক বা না থাকুক। তারা এমন মুহূর্তকে অজুহাত বানিয়ে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সমষ্টিগত শাস্তিমূলক পদক্ষেপ বাড়ায়। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইসরাইলের চূড়ান্ত লক্ষ্য অপরিবর্তিত রয়েছে। তা হলো পশ্চিম তীর দখল করে নেয়া এবং এর জনসংখ্যাকে উচ্ছেদ ও জাতিগত নিধনের শিকার করা।

mzamin

ছয় বছরের ফিলিস্তিনি শিশুকে হত্যা করেছিল ইসরায়েল, পুরস্কার পেল তাকে নিয়ে তৈরি চলচ্চিত্র

পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকতে চেয়েছিল ছয় বছরের ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রজব। আকুতি জানিয়েছিল সাহায্যের। শেষ মুহূর্তে ফোনে কথা হয়েছিল ফিলিস্তিন রেড ক্রিসেন্টের সদস্যদের সঙ্গে। ঘণ্টাব্যাপী শ্বাসরুদ্ধকর সেই ফোনকল নিয়ে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র ‘ভয়েস অব হিন্দ রজব’। ইতালিতে অনুষ্ঠিত ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে ‘সিলভার লায়ন’ পুরস্কার পেয়েছে সেটি।

ঘটনা ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসের। ইসরায়েলের হামলায় বিধ্বস্ত গাজা নগরী থেকে গাড়িতে করে পালাচ্ছিল হিন্দ রজবের পরিবার। তখন গাড়িটি হামলার শিকার হয়। নিহত হন গাড়িতে থাকা তার চাচা, চাচি, তিন চাচাতো ভাইবোন—সবাই। গাড়িতে আটকা পড়ে ওই ফোনকল করেছিল শিশুটি। পরে তাকেও গুলি চালিয়ে হত্যা করে ইসরায়েলি বাহিনী।

হিন্দ রজবকে সাহায্য করতে ঘটনাস্থলে যাওয়া অ্যাম্বুলেন্সের দুই কর্মীকেও সেদিন ইসরায়েলের সেনারা নৃশংসভাবে হত্যা করেছিলেন। ইসরায়েল যদিও দাবি করেছিল, ঘটনার দিন সেখানে তাদের কোনো সেনা ছিল না। তবে স্যাটেলাইট থেকে ধারণ করা ছবি বিশ্লেষণ করে সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও স্কাই নিউজ জানিয়েছে, ঘটনাস্থলে ইসরায়েলি ট্যাংক উপস্থিত ছিল।

ভয়েস অব হিন্দ রজব চলচ্চিত্রটিতে রেড ক্রিসেন্টের সদস্যদের সঙ্গে হিন্দ রজবের ফোনকলের আসল রেকর্ড ব্যবহার করা হয়েছে। চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন তিউনিসিয়া বংশোদ্ভূত ফরাসি পরিচালক কাউথার বেন হানিয়া। গত বুধবার ভেনিস উৎসবে চলচ্চিত্রটির প্রথম প্রদর্শনী হয়। সেদিন এটি এতটাই প্রশংসিত হয়েছিল যে দর্শকেরা ২৩ মিনিট ধরে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানিয়েছিলেন।

এবারের ৮২তম ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসব শুরু হয় গত ২৭ আগস্ট। শেষ হয়েছে গতকাল শনিবার। এদিনই সিলভার লায়ন পুরস্কার পায় ভয়েস অব হিন্দ রজব। উৎসবের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার এটি। ভয়েস অব হিন্দ রজব পরিবারের পক্ষ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেন পরিচালক বেন হানিয়া। এ সময় তিনি বলেন, চলচ্চিত্রটি শুধু ছয় বছরের মেয়েটির কাহিনি নয়, গণহত্যার শিকার পুরো একটি সম্প্রদায়ের কাহিনি।

চলচ্চিত্র ছোট্ট শিশু রজবকে ফিরিয়ে আনবে না। তার সঙ্গে যে নৃশংসতা ঘটেছে, তা-ও মুছে ফেলা যাবে না—এভাবেই মনের কথাগুলো বলছিলেন হানিয়া। তিনি বলেন, যা চলে গেছে, তা তো আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। তবে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তার (রজব) কণ্ঠস্বর থেকে যাবে। যত দিন পর্যন্ত জবাবদিহি নিশ্চিত না হয়, ন্যায়বিচার না হয়, তার কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে ফিরে আসবে।

ভেনিস উৎসবে প্রথম পুরস্কার ‘গোল্ডেন লায়ন’ পেয়েছে মার্কিন পরিচালক জিম জারমুশের চলচ্চিত্র ফাদার মাদার সিস্টার ব্রাদার। শনিবার পুরস্কার গ্রহণের সময় তাঁর শরীরে ছিল ‘এনাফ’ লেখা একটি ব্যাজ। এর অর্থ করলে দাঁড়ায় ‘যথেষ্ট হয়েছে’। এই ব্যাজের মাধ্যমে গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর চলমান অবরোধ এবং নৃশংস বোমাবর্ষণের বিরোধিতার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।

এদিকে ভেনিস উৎসবের আগেই অস্কারের আন্তর্জাতিক ফিচার ফিল্ম বিভাগে তিউনিসিয়ার পক্ষ থেকে মনোনয়ন পেয়েছে দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব। আগামী ৯৮তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস অনুষ্ঠিত হবে ২০২৬ সালের ১৫ মার্চ, যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসে। এর আগেও বেন হানিয়ার নির্মিত ‘ফোর ডটার্স’ ও ‘দ্য ম্যান হু সোল্ড হিজ স্কিন’—দুটি চলচ্চিত্রই অস্কারে মনোনয়ন পেয়েছিল।

ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রজবের ছবি হাতে পরিচালক কাউথার বেন হানিয়া। গত শনিবার ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে
ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রজবের ছবি হাতে পরিচালক কাউথার বেন হানিয়া। গত শনিবার ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে। ছবি: রয়টার্স

জেন-জি ঝড়ে বিধ্বস্ত নেপাল by সামন হোসেন

বেশ কিছুদিন ধরেই নেপাল সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে আসছে দেশটির তরুণ প্রজন্ম। সমপ্রতি নেপালে ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, এক্সসহ ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সরকারের আদেশে নিষিদ্ধ হওয়ায় সেই বিক্ষোভ আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। গতকাল সকালে রাজধানী কাঠমান্ডুর বাণেশ্বর এলাকায় প্রথম বিক্ষোভ শুরু হয়। যা অল্প সময়ের মধ্যে রাজধানীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের মুখে এক পর্যায়ে সোমবার সন্ধ্যায় সকল সামাজিকমাধ্যম খুলে দিয়েছে সরকার। সকল মন্ত্রীকে নিয়ে জরুরি সভায় বসেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি। নিরাপত্তা ইস্যুতে বাতিল করেন বাংলাদেশ নেপালের মধ্যকার দ্বিতীয় ফুটবল ম্যাচ। বিক্ষোভ দমনে বেশ কঠোর অবস্থানে ছিল দেশটির পুলিশ। তারা বিক্ষোভকারীদের লক্ষ্য করে রাবার বুলেট, টিয়ার গ্যাস এবং জলকামান নিক্ষেপ করে। এতে এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কমপক্ষে ২০ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আর আহত হয়েছেন শতাধিক বিক্ষোভকারী।

আন্দোলনকারী তরুণরা সরকারের বিরুদ্ধে জয়ের ঘোষণা দিয়েছেন। বিক্ষোভে অংশ নেয়া এক বিক্ষোভকারী অন্যদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ভেতর থেকে কিছু স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী জনতার আন্দোলনে উস্কানি দিচ্ছে। তিনি বলেন, আজ আমরা ইতিমধ্যে জয়ী হয়েছি। গত বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কোটাবিরোধী আন্দোলন এক পর্যায়ে রূপ নিয়েছিল সরকার পতনের আন্দোলনে। আন্দোলনকারীদের দমাতে ইন্টারনেট বন্ধের সঙ্গে সকল যোগাযোগমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। বাংলাদেশের মতোই সমপ্রতি নেপালের প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি নেতৃত্বাধীন সরকার জেন-জি’দের দমাতে ফেসবুক, ইউটিউব এবং এক্সসহ ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফরম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। প্রতিবাদে রাজধানী কাঠমান্ডুতে শুরু হওয়া বিক্ষোভ এখন হিমালয়কন্যা খ্যাত দেশটির অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। এর আগে, দেশটির সরকারি এক নোটিশে বলা হয়েছিল, ২৮শে আগস্ট থেকে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে দেশে সচল সব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে নিবন্ধন করতে হবে। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে মেটা (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ), ইউটিউব, এক্স, রেডিট এবং লিংকডইনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর কেউই আবেদন জমা দেয়নি। গত বছর নেপালের সুপ্রিম কোর্টের দেয়া এক নির্দেশনা অনুযায়ী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিবন্ধনের সময়সীমা নির্ধারণ করে দেয় দেশটির সরকার। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোকে দেশটিতে নিজেদের অফিস এবং একজন অভিযোগ নিষ্পত্তি ও কমপ্লায়েন্স কর্মকর্তা নিয়োগ করতে বলা হয়েছিল।

কাঠমান্ডু পোস্ট পত্রিকার সিনিয়র ফটো সাংবাদিক দীপেন শ্রেষ্ঠা বলেন, এটা নতুন কোনো আন্দোলন নয়। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রীর দুর্নীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছিল জেন-জিরা। তারা গতকাল সারা দেশে একযোগে এই বিক্ষোভের ডাক দেয়। সরকারও তাদের পার্লামেন্টের সামনে জায়গা দিয়েছিল বিক্ষোভ করার। বিক্ষোভকারীরা এক পর্যায়ে পার্লামেন্টে প্রবেশ করলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি ছুড়ে। এতেই এত হতাহত হয়। এদিকে সোমবার দুপুর থেকেই কূটনৈতিক পাড়াতে কারফিউ জারি করেছে নেপাল সরকার। সেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কাঠমান্ডুর প্রধান জেলা কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, সোমবার দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কারফিউ কার্যকর থাকবে। প্রথমে কাঠমান্ডুর বাণেশ্বর এলাকার কিছু অংশে কারফিউ জারি করা হয়েছিল। কারণ, আন্দোলনকারীরা সেখানে সুরক্ষিত এলাকায় প্রবেশের চেষ্টা করে। পরে প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন শীতল নিবাস, মহারাজগঞ্জ, ভাইস প্রেসিডেন্টের বাসভবন লায়নচাওর, সিংহ দরবারের চারপাশ, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন বলুয়াটার এবং আশপাশ এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়। কারফিউ চলাকালে উল্লিখিত এলাকায় চলাফেরা, সমাবেশ, বিক্ষোভ বা ঘেরাও সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। কর্তৃপক্ষ বলেছে, বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই কারফিউর আওতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। তবে ট্যুরিস্ট এলাকা বলে পরিচিত থামেলের হোটেল পাড়াতে সেভাবে আন্দোলনের প্রভাব পড়েনি। এখানকার হোটেলগুলোতেই মূল নেপালে আসা ট্যুরিস্টরা অবস্থান করেন।

এদিকে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর এমন বল প্রয়োগে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে নেপালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (এনএইচআরসি)। বিক্ষোভ দমনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে তারা। সংস্থাটিও নিশ্চিত করেছে পুলিশের গুলিতে এক ডজনের বেশি বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন। এক বিবৃতিতে আন্দোলনকারীদেরও সহিংস না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এনএইচআরসি। বলেছে,  নেপালের সংবিধান এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী যেকোনো ব্যক্তির শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের অধিকার রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে বিক্ষোভকারীদের সহিংস হওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অতিরিক্ত বল প্রয়োগ থেকে বিরত থাকতে হবে।

আন্দোলনের সূত্রপাত যেভাবে: স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, সোমবার সকাল ৯টা থেকে শুরু হয় তরুণদের নজিরবিহীন এই আন্দোলন। রাজধানীর মৈতীঘর মণ্ডলা এলাকায় জমায়েত হন বিক্ষোভকারীরা। এই এলাকাটি কাঠমান্ডুর প্রতীকী স্মৃতিস্তম্ভ এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়কের সংযোগস্থল। মূলত এই স্থান থেকেই ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলনের ঢেউ।  যা এক পর্যায়ে পৌঁছে যায় দেশটির সংসদ ভবনের সামনে নিউ বাণেশ্বর এলাকায়। এই আন্দোলনের মূল কারণ সরকারের ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি, জবাবদিহিতার অভাব এবং তরুণদের রাজনৈতিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ থেকে বঞ্চিত করা। আন্দোলনটি সংগঠিত করে ‘হামি নেপাল’ নামের একটি যুবসংগঠন। যারা ২০১৫ সাল থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আয়ুষ বাস্যাল বলেন, সামপ্রতিক বছরগুলোতে দুর্নীতির যত তদন্ত হয়, তা পার্লামেন্টে আলোচনা হয়, কিন্তু কোনোটিরই সন্তোষজনক সমাধান হয় না। তা নিয়েই ক্ষোভ জন্ম নিয়েছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালের একটি বিমান চুক্তির দুর্নীতির ঘটনা এবং সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের সন্তানদের বিলাসী জীবনযাপনের ছবি যখন টিকটকে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তরুণদের ক্ষোভ চরমে ওঠে। একইসঙ্গে, সরকারের ৪ঠা সেপ্টেম্বর ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তও এই ক্ষোভে ঘি ঢেলেছে। প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলি আন্দোলন শুরু হওয়ার আগেই মন্তব্য করেন, মানুষ নিজেরাই স্বাধীন না, চিন্তাও স্বাধীন না, আবার স্বাধীনতার কথা বলছে। তার এই মন্তব্যকে আন্দোলনকারীরা অপমানজনক ও স্বৈরাচারী মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ বলে আখ্যায়িত করেছেন। পোখারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসা অনুষদের সহকারী অধ্যাপক যোগ রাজ লামিচানে বলেন, এই আন্দোলন শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার প্রতিবাদ নয়, এটি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও তরুণদের মত প্রকাশের অধিকার হরণ করার প্রতিক্রিয়া। তিনি আরও বলেন, তরুণরা সুশাসন, জবাবদিহি ও ন্যায়বিচারের দাবি জানাচ্ছে। তারা আর সহ্য করবে না।

mzamin

কাঠমান্ডু পোস্টের সম্পাদকীয়: হত্যাযজ্ঞের দায় ওলি’র, পদত্যাগ ছাড়া বিকল্প নেই

এটি ছিল গণতান্ত্রিক নেপালের ইতিহাসে সবচেয়ে অন্ধকার দিন। সোমবার কাঠমান্ডু ও দেশজুড়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে কমপক্ষে ১৯ জন নিহত হয়েছেন। এর বেশির ভাগই স্কুল ও কলেজপড়ুয়া তরুণ-তরুণী। তাদের অধিকাংশের মাথা বা বুকে গুলি করা হয়েছে। কাঠমান্ডু পোস্টের সম্পাদকীয়তে এ কথা বলা হয়েছে চলমান উত্তেজনা, সহিংসতা নিয়ে। এতে আরও বলা হয়, জেন-জি প্রজন্মের এই তরুণরা যে সমাজকে নিজেদের ঘর বলে ডাকে, সেই সমাজের অসঙ্গতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদের পূর্ণ অধিকার তাদের আছে। এসব অনুমোদিত বিক্ষোভ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা ছিল রাষ্ট্রের দায়িত্ব। অথচ যখন তরুণরা রাস্তায় নামে, তখন মনে হলো সরকারের কাছে সেই চাপ নিয়ন্ত্রণের একমাত্র উপায় হলো প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ। এমনকি স্কুল-কলেজের ইউনিফর্ম পরা শিক্ষার্থীদের ওপরও।
https://mzamin.com/uploads/news/main/179253_Abul-8.webp
প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি

সোমবারের এই হত্যাযজ্ঞের দায়ভার প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলির কাঁধেই বর্তায়।
না, নেপালি যুবকদের এভাবে গণহত্যা পুলিশি অযোগ্যতা বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রশাসনিক শৃঙ্খলাজনিত সমস্যার অজুহাতে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এ ঘটনার সুনির্দিষ্ট জবাব চাই দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে বসা ব্যক্তির কাছ থেকেই। ওলি সবসময়ই তার তীক্ষ্ণ বাক্য ও জনমতের প্রতি প্রায় সম্পূর্ণ উদাসীনতার জন্য পরিচিত। কয়েকদিনে তার বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট হয় যে, তিনি জেন-জি প্রজন্মকে শোনার মতো যোগ্য মানুষ বলেও মনে করেন না।
অধিকন্তু, সোমবারের দিনে পুলিশের স্বল্প উপস্থিতি থেকেই বোঝা যায়, সরকার একটি বড় জনসমাগম হবে বলে ধারণাই করেনি। অথচ এটি ছিল ভয়াবহ ভুল হিসাব, তরুণদের ক্ষোভের প্রতি সম্পূর্ণ অন্ধত্ব। বিশেষত ২৮ মার্চের রাজতন্ত্রপন্থি সমাবেশে নিরাপত্তা ব্যর্থতার ঘটনা- যেখানে দু’জন নিহত ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়। তারপরও সরকারের এমন গাফিলতি অকল্পনীয়।

এই জবাবদিহির অভাবই সবচেয়ে ক্ষুব্ধ করে তোলে। সোমবার সন্ধ্যায়ও যখন তরুণদের মৃতদেহের সংখ্যা বাড়ছিল, তখনও সরকার দায় চাপাচ্ছিল তথাকথিত ‘অনুপ্রবেশকারীদের’ ওপর। অনুপ্রবেশ ছিল কি না তা হয়তো অন্যদিনের আলোচনার বিষয়। কিন্তু আজ বার বার বলতে হয়- এই ট্র্যাজেডির মূল দায়ভার প্রধানমন্ত্রীর। তিনিই হঠাৎ রাতারাতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে বিক্ষোভের জন্ম দেন। তিনিই জেন-জি প্রজন্মকে বিদ্রুপ করে তাদের উত্তেজিত করেন। আর তার প্রশাসনের অধীনেই পুলিশ নির্দয়ভাবে মানুষ হত্যা করেছে। এবার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। নিরপরাধ নাগরিক হত্যার প্রধান নায়ক হিসেবে তার পদত্যাগ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কেবল তার পদত্যাগের মাধ্যমেই সোমবারের হত্যাযজ্ঞের জন্য প্রকৃত জবাবদিহি শুরু হতে পারে।

মঙ্গলবার সানেপায় শাসকদল নেপালি কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে জেন-জি আন্দোলনকারীরা। এ খবর দিয়েছে অনলাইন কাঠমান্ডু পোস্ট। এতে বলা হয়, সোমবার নিরাপত্তা বাহিনীর দমন অভিযানে ১৯ তরুণ বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার পর থেকেই এ আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার করে বিক্ষোভ দমন করে। এ ঘটনা দেশজুড়ে ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। প্রথমে দুর্নীতি ও কুশাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ সড়ক বিক্ষোভ হিসেবে শুরু হয়েছিল এই আন্দোলন। কিন্তু মঙ্গলবার সকালে তা সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা রাজনৈতিক নেতাদের বাড়ি ও বড় বড় রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। কাঠমান্ডু উপত্যকা ও আশপাশের বিভিন্ন জেলায় পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ। অশান্তি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন এলাকায় কারফিউ জারি করেছে কর্তৃপক্ষ।

চীন অপ্রতিরোধ্য—এই বার্তা কাকে দিলেন সি চিন পিং by সাইমন টিসডাল

বেইজিংয়ে জাঁকালো সামরিক কুচকাওয়াজে চীনের সি চিন পিং, রাশিয়ার ভ্লাদিমির পুতিন ও উত্তর কোরিয়ার কিম জং–উনকে পাশাপাশি হাঁটতে দেখে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম প্রতিক্রিয়াটা যে তার নিজকেন্দ্রিক হবে, সেটি  অনুমেয় ছিল। এই সংহতি ও শক্তিমত্তার প্রদর্শনীকে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে অভিযোগ করেছেন।

ট্রাম্প সামরিক কুচকাওয়াজ পছন্দ করেন, কিন্তু সেটা তাঁর নিজের হতে হবে। ট্রাম্প যখন মঞ্চে ওঠেন, তখন নিজেকে সবার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দেখতে বেশি পছন্দ করেন। নিজেকে তিনি ভাবতে চান বিশ্বের ১ নম্বর নেতা বলে। তাই এ সপ্তাহে বেইজিং থেকে আসা ছবিগুলো তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানায়।

ট্রাম্পের এই অহংবোধ ফুটো হয়ে যাওয়ায় সি চিন পিং নিশ্চয়ই ভীষণ খুশি হয়েছেন।  জানুয়ারি মাস থেকে চীন নিয়ে ট্রাম্পের আচরণ কখনো আক্রমণাত্মক, কখনো প্রতিহিংসাপরায়ণ, আবার কখনো তাচ্ছিল্যপূর্ণ। বিশেষ করে ট্রাম্পের আরোপ করা শাস্তিমূলক বাণিজ্য শুল্ক নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি করেছে।

ট্রাম্প খুব অস্পষ্টভাবে চীনকে সামনাসামনি বৈঠকে বসার প্রস্তাব দিয়েছেন, যেন তিনি খুব বিরল কোনো উপহার দিচ্ছেন। বেইজিংয়ে তিন শাসকের জোটের এই কুচকাওয়াজই ছিল ট্রাম্পের মুখের উপর স্পষ্ট জবাব।

রেড স্কয়ারের মানদণ্ডে হলেও চীনের রাষ্ট্রপতির এই বাড়াবাড়ি রকমের জাঁকালো সামরিক প্রদর্শনীটি ছিল দৃষ্টিনন্দন। জাতীয় সংগীত, নিখুঁত ছন্দে কুচকাওয়াজ, ট্যাঙ্ক, আর্টিলারি এমনকি ৮০ হাজার কবুতর ওড়ানো—সবকিছুই ছিল ওয়াশিংটনের সঙ্গে সামরিক সমতার পথে চীন যে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে, তারই প্রদর্শন।

পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে মোতায়েন করা মার্কিন নৌবাহিনীর জন্য সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হলো, চীনের হাতে এখন সুপারসনিক, পারমাণবিক সক্ষম ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং পানির নিচে চলতে সক্ষম ড্রোন রয়েছে। সি ঘোষণা দিলেন, চীন ‘অপ্রতিরোধ্য’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তিকে স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘মানবজাতিকে আবারও শান্তি অথবা যুদ্ধ, সংলাপ অথবা সংঘর্ষ, দুই পক্ষের জয় অথবা শূন্য ফলাফল—এর মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নেওয়ার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।’
এটি অব্যর্থভাবে ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে ছুড়ে দেওয়া সতর্কবার্তা। তিনি সেটি মেনে নেবেন কি না, সেটি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়।

রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক এই জাঁকালো প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে সি চিন পিং ভবিষ্যৎ বিশ্বে চীন কীভাবে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করবে, সেটি দেখাতে চেয়েছেন। সি চিন পিং এটি নিজের মতো করে কল্পনা ও পরিকল্পনা করেছেন। ২০১২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষে ওঠার পর থেকে সি এই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছেন। মাও সে–তুংয়ের পর যেকোনো নেতার চেয়ে বেশি ক্ষমতা তিনি কেন্দ্রীভূত করেছেন।

অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা, কর্মসংস্থান, সম্পত্তি সংকট ও দুর্নীতি—এসব বিষয়ে সি চিন পিংয়ের নীতির সমালোচনা হয়েছে নানা সময়ে। তাতে করপোরেট প্রতিষ্ঠান, সংবাদমাধ্যম, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ এসেছে। নজরদারি রাষ্ট্র হিসেবে চীন নিঃসন্দেহে বিশ্বের শীর্ষে। সির বিদেশনীতি (বিশেষ করে তাইওয়ান ও দক্ষিণ চীন সাগর অঞ্চল ঘিরে) অত্যন্ত সম্প্রসারণবাদী।

প্রথমে সাংহাই কো–অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) সবচেয়ে বড় সম্মেলন, এরপর বেইজিংয়ে বিভিন্ন দেশের নেতাদের একত্র করে সি চিন পিং এমন একটি বার্তা দিলেন, যা হোয়াইট হাউসের বাইরে অনেক দূর পর্যন্ত প্রভাব ফেলবে। তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, ইরানসহ অনেক দেশ চীনের ক্ষমতার প্রতি সম্মান দেখাল।

ট্রাম্পের শুল্ক নীতির কারণে ক্ষুব্ধ হলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও চীনের সঙ্গে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্ব কমিয়ে অংশ নিলেন। এসসিওর যৌথ ঘোষণা একটি নতুন বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার স্বীকৃতি দিল, যা ১৯৪৫ সালের পরের বিশ্বব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করছে। একুশ শতকে চীন বিশ্বের প্রধান শক্তি হয়ে উঠবে, এই প্রদর্শনী ছিল সি চিন পিংয়ের সেই দৃষ্টিভঙ্গির সর্বশেষ প্রকাশ।

ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হওয়াটা মোটেও অদ্ভুত কোনো বিষয় নয়। ট্রাম্প তাঁর বন্ধু ও শত্রু—দুই পক্ষকেই বোকার মতো ও উসকানিমূলকভাবে বিরক্ত করেছে। তার এই নব্য ঔপনিবেশবাদী দৃষ্টিভঙ্গির রণে অনেক দেশ চীনের পাশে দাঁড়িয়েছে। এ ব্যাপারে কেউই ঘোরতরভাবে দ্বিমত করবেন না। তবে বেইজিংয়ের এই তিন শাসকের জোট দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকবে এবং একটি গঠনমূলক ও শান্তিপূর্ণ সহযোগিতার পথ খুঁজে পাবে, সেটি নিয়ে বড় প্রশ্ন আছে।

এই মুহূর্তে পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার জন্য সি চিন পিংয়ের সহায়তার ওপর নির্ভর করছেন; কিন্তু চীনের সম্প্রসারণবাদের প্রতি বরাবরই চীনের একটি গভীর ভয় রয়েছে। উত্তর কোরিয়ার কিমও চীনের আধিপত্য নিয়ে ভয় করেন। আবার পুতিন ও সি দুজনের বয়স এখন সত্তরের কোঠায়; তাঁরা চিরকাল ক্ষমতায় থাকবেন না। তাঁদের শাসন অত্যন্ত ব্যক্তিকেন্দ্রিক। তাঁদের অনুপস্থিতিতে দুটি দেশেই ক্ষমতার শূন্যতা দেখা দিতে পারে। বর্তমানে দমন করা হলেও ভবিষ্যতে বিক্ষোভ বা অসন্তোষের বিস্ফোরণের আশঙ্কা ব্যাপক।

এই জোট মূলত সুবিধাবাদী। এখানে কোনো আদর্শ বা নৈতিক ভিত্তি নেই। আমেরিকার প্রাধান্য, ডলারের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত পশ্চিমা অর্থনীতি এবং মানবাধিকার–সংক্রান্ত ‘অপ্রীতিকর’ মানদণ্ডের বিরুদ্ধে একত্রিত। তাঁরা স্বৈরাচারী ও গণতন্ত্রবিরোধী।
১৯৪৫ সালে জাতিসংঘ ও বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা গড়ার সময় পশ্চিমা শক্তিগুলো ঠিক করেছিলেন—দুই বিশ্বযুদ্ধের বিপর্যয় পুনরায় ঘটতে দেবেন না।

চীন, রাশিয়া, উত্তর কোরিয়ার শাসকত্রয়ীর মধ্যে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি একেবারেই নেই। এটা সারা বিশ্বের জন্যই চিন্তার বিষয়। সি, পুতিন ও কিমের সঙ্গে বিচ্ছিন্নতাবাদী-মূল্যবোধহীন ট্রাম্পকে দেখলে বাইবেলের সেই প্রলয়–সংক্রান্ত  চার অশ্বারোহী—জয়, যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ ও মৃত্যুর দৃশ্যকল্পই সামনে আসে।

* সাইমন টিসডাল, দ্য গার্ডিয়ান–এর পররাষ্ট্রবিষয়ক বিশ্লেষক
- গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-04%2Fw4myt5hg%2Fputinxiparadereuters.JPG?rect=13%2C0%2C611%2C407&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বেইজিংকে সামরিক মহড়া দেখছেন সি চিন পিং ও ভ্লাদিমির পুতিন। ছবি : রয়টার্স

জেরুজালেমে হাজারো মানুষের বিক্ষোভ, বন্দি মুক্তির চুক্তি দাবি

গাজা যুদ্ধের অবসান এবং অবশিষ্ট বন্দিদের মুক্তির জন্য প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে চুক্তিতে রাজি করাতে ইসরাইলে ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন। যোদ্ধাগোষ্ঠী হামাসের হাতে এখনো যেসব বন্দি আটক আছেন, তাদের পরিবারের সদস্য ও সমর্থকরা জেরুজালেমের প্যারিস স্কোয়ার দখল করে সমাবেশ করেছেন। অন্যদিকে তেল আবিবেও বিক্ষোভ হয়েছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। হামাসের হাতে আটক ৪৮ জন জিম্মির মধ্যে প্রায় ২০ জন জীবিত আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসরাইল এখনো প্রস্তাবিত বন্দিবিনিময় চুক্তিতে আনুষ্ঠানিকভাবে সাড়া দেয়নি। তবে দেশটি সব জিম্মিকে ফেরত আনার দাবি জানিয়েছে। নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, হামাসের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ বিজয়ই বন্দিদের মুক্তির পথ খুলে দেবে। উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর দক্ষিণ ইসরাইলে হামাসের হামলায় প্রায় ১২০০ মানুষ নিহত হয় এবং ২৫১ জনকে গাজায় নিয়ে জিম্মি করে হামাস। এরপর ইসরাইল পাল্টা ব্যাপক সামরিক অভিযান চালায়। তাতে কমপক্ষে ৬৪,৩৬৮ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। জাতিসংঘ এই পরিসংখ্যানকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে। তবে ইসরাইল তা অস্বীকার করছে।

ওদিকে ইসরাইলের ভেতরে প্রতিবাদ এবং আন্তর্জাতিক মহলের যুদ্ধবিরতির দাবি ক্রমশ জোরালো হচ্ছে। তবুও ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) গাজায় আরও আক্রমণ বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। নেতানিয়াহুর সরকার ঘোষণা দিয়েছে, গাজা উপত্যকার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিতে এবং হামাসকে সম্পূর্ণরূপে পরাজিত করতে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। শনিবার রাতে তেল আবিব ও জেরুজালেমে সাম্প্রতিক মাসগুলোর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। নেতানিয়াহুর জেরুজালেমের বাসভবনের কাছেই বক্তারা একের পর এক আহ্বান জানান, অবিলম্বে হামাসের সঙ্গে চুক্তি করে প্রিয়জনদের ফেরত আনতে। মাতান আংগ্রেস্ট নামে গাজায় আটক এক আইডিএফ সেনার মা আনাত আংগ্রেস্ট ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এটি হুমকি নয়, প্রধানমন্ত্রী। আমার সন্তানের কিছু হলে আপনাকে এর জবাব দিতে হবেÑ  এটি এক মায়ের কথা। বিক্ষোভকারীরা বলছেন, যুদ্ধ সম্প্রসারণ বন্দিদের জীবন আরও বিপন্ন করছে। কিন্তু নেতানিয়াহু তা উপেক্ষা করে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। অনেক সাবেক সামরিক নেতা প্রকাশ্যে বলছেন, গাজায় সামরিকভাবে এর বেশি কিছু অর্জন সম্ভব নয়। প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ সম্প্রতি গাজা সিটির বহুতল ভবন ধ্বংসের ভিডিও শেয়ার করেছেন। তিনি বার্তা দিয়েছেন, এটি কেবল শুরু। ওদিকে  রোববারও আইডিএফ একটি বহুতল ভবন ধ্বংস করে দিয়েছে। তারা দাবি করে, সেখানে হামাসের গোয়েন্দা সরঞ্জাম ছিল। অন্যদিকে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা বলছেন, এসব ভবনে সাধারণ মানুষ আশ্রয় নিয়েছিল। আন্তর্জাতিক মহল বারবার ইসরাইলকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাচ্ছে। কিন্তু কোনো কথায় কর্ণপাত করছে না নেতানিয়াহু।

ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স রাসমুসেন জেরুজালেমে গিয়ে বলেন, আমরা গাজার মানবিক বিপর্যয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তাই ইসরাইলকে সামরিক অভিযান বন্ধ করার আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করছি। তবে ইসরাইলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সা’আর সতর্ক করে বলেন, ইউরোপের কিছু দেশ যদি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়, তবে তা গুরুতর পরিণতি ডেকে আনবে। তিনি আরও ইঙ্গিত দেন, পশ্চিম তীর সংযুক্তিকরণের প্রশ্নে শিগগিরই সিদ্ধান্ত হতে পারে। এদিকে ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি বিমান হামলায় কমপক্ষে ৮৭ জন নিহত হয়েছেন বলে গাজার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। একই সময়ে দুর্ভিক্ষ ও অপুষ্টিতে আরও ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে তিনটি শিশু।

mzamin

নেপালে কেন তরুণদের এই বিক্ষোভ, সহিংসতা

দ্য গার্ডিয়ানঃ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও এক্সসহ দুই ডজনের বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে নেপাল সরকার। এর প্রতিবাদে আজ সোমবার রাজধানী কাঠমান্ডুর রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেন তরুণেরা। এই বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত ১৯ জন নিহত এবং অর্ধশতাধিক আহত হয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলির নেতৃত্বাধীন নেপাল সরকার নতুন নিয়মনীতি মেনে চলতে ব্যর্থ হওয়ার কারণ দেখিয়ে ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ও মেসেজিং অ্যাপের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। রেডিট, লিংকডইন, পিনটারেস্ট, সিগন্যালও নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নিয়ম মানায় টিকটকসহ শুধু পাঁচটি প্রতিষ্ঠান বিধিনিষেধের আওতার বাইরে রয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে দেশজুড়ে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এর ফলে ব্যবসা ও পর্যটন খাত মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে। তা ছাড়া প্রবাসে থাকা স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ বন্ধ হয়ে যায় নাগরিকদের।

এ নিয়ে ক্ষোভ–হতাশার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে আজ রাজধানী কাঠমান্ডুর রাজপথে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছেন কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী, যাঁদের বড় অংশই তরুণ।

সোমবারের বিক্ষোভ যেভাবে

নেপালের কাঠমান্ডু পোস্ট লিখেছে, দুর্নীতি এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জেন–জি প্রজন্মের বিক্ষোভ ডিজিটাল স্পেস থেকে রাজপথে চলে এসেছে। বিক্ষোভকারীরা তাঁদের অসন্তোষের কথা তুলে ধরতে আজ সকাল ৯টায় কাঠমান্ডুর মাইতিঘর এলাকায় সমবেত হন। কয়েক দিন ধরে অনলাইনে ‘নেপো কিড’ ও ‘নেপো বেবিজ’ হ্যাশট্যাগ দিয়ে পোস্ট করা হচ্ছিল। সরকার অনিবন্ধিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বন্ধ করে দিলে এটা নতুন করে গতি পায়।

কাঠমান্ডু জেলা প্রশাসন দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ‘হামি নেপাল’ নামের একটি সংগঠন আজ এই সমাবেশের আয়োজন করে। এ জন্য তারা আগেই অনুমোদন চেয়েছিল। এই সংগঠনের চেয়ারপারসন সুধান গুরুং বলেছেন, সরকারের পদক্ষেপ ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁরা এই বিক্ষোভের আয়োজন করেছেন। একই ধরনের সমাবেশ দেশের অন্যান্য জায়গায়ও হয়েছে।

কোন কোন পথ ধরে বিক্ষোভ করা হবে এবং বিক্ষোভকারীরা কী কী ধরনের নিরাপত্তাসতর্কতা মেনে চলবেন, সে বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্য প্রচার করেন আয়োজকেরা। তাঁরা শিক্ষার্থীদের প্রতি ইউনিফর্ম পরে ও বই নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।

বিক্ষোভকারীরা পুলিশের প্রতিবন্ধকতা ভেঙে পার্লামেন্ট ভবনে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করলে সংঘর্ষ শুরু হয়। বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ।

সংঘর্ষে অন্তত ১৯ বিক্ষোভকারী নিহত এবং ৭০ জনের বেশি বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন বলে হাসপাতাল সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে কাঠমান্ডু পোস্ট। সংঘর্ষের পর সোমবার রাত ১০টা পর্যন্ত রাজধানীতে কারফিউ জারি করেছে সরকার। মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনী।

সংকটের শুরু যেভাবে

সম্প্রতি আদালতের একটি আদেশের পর নেপালের যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানিগুলোকে নিবন্ধনের জন্য সাত দিনের সময় বেঁধে দেয়। ওই সময়সীমার মধ্যে নিবন্ধন না করায় ২৬টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, মূলত বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, ভুয়া খবর ও অনলাইন অপরাধ দমনের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর ওপর নতুন নিয়মনীতি কার্যকর করা হয়েছে। তবে এর জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার নিন্দা জানিয়েছে বিভিন্ন নাগরিক অধিকার নিয়ে সোচ্চার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা। বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট সতর্ক করেছে যে এই নিষেধাজ্ঞা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একটি বিপজ্জনক নজির তৈরি করবে।

এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর থেকে সচল থাকা সামাজিক মাধ্যমে টিকটকে সাধারণ নেপালিদের ধুঁকতে থাকা জীবনের বিপরীতে রাজনীতিবিদদের সন্তানদের বিলাসবহুল পণ্যের প্রদর্শন এবং ব্যয়বহুল অবকাশযাপনের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ জানাতে রোববার কয়েক ডজন সাংবাদিক রাজধানীতে সমাবেশ করেন। এ সময় তাঁরা ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বন্ধ নয়, কণ্ঠ রোধ করা যাবে না’, ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আমাদের স্বাধীনতা’ এবং ‘গণতন্ত্র হরণ, কর্তৃত্ববাদের প্রত্যাবর্তন’ ইত্যাদি স্লোগান–সংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখা যায়।

সোমবার বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নেওয়ার আগে সরকারের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনাকারীদের প্রতি অসন্তোস প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা অলি। তিনি বলেন, দেশকে ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা সহ্য করবেন না।

রোববার এক বিবৃতিতে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কিছু ব্যক্তির কাজ হারানোর চেয়ে দেশের স্বাধীনতা বড়। আইনকে উপেক্ষা, সংবিধান অবমাননা এবং জাতীয় মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বকে অসম্মান কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে?’

মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নিয়ে সুনাম ছিল নেপালের। তবে কে পি শর্মা অলির সরকার আমলে এ বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে বলে সমালোচকেরা বলছেন। এর আগে ২০২৩ সালে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও সাইবার অপরাধ প্রতিরোধ নিয়ে দ্বন্দ্ব থেকে ৯ মাস টিকটকের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকে। পরে টিকটক কর্তৃপক্ষ সরকারের নিয়ম মেনে নিবন্ধন নেওয়ার পর তাদের আবার কার্যক্রম চালাতে দেওয়া হয়।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-08%2Fs3rkt3yv%2FNepal-protest-03.jpg?rect=1%2C0%2C3854%2C2569&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার প্রতিবাদে জাতীয় পতাকা হাতে নেপালের পার্লামেন্ট ভবনের বাইরে সমবেত হয়েছেন বিক্ষোভকারীরা। কাঠমান্ডু, নেপাল, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ছবি: এএফপি

শীর্ষ আদালতের রায়: ফিলিস্তিনি বন্দিদের পর্যাপ্ত খাবার দিচ্ছে না ইসরাইল

ইসরাইলের সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে, সেদেশের সরকার ফিলিস্তিনি বন্দিদের পর্যাপ্ত খাবার সরবরাহে ব্যর্থ হয়েছে এবং তাদের পুষ্টি উন্নত করার জন্য পদক্ষেপ নিতে হবে। রবিবার তিন বিচারকের বেঞ্চ বলেছে, রাষ্ট্র আইনি দায়বদ্ধতার অধীনে বন্দিদের ন্যূনতম জীবিকা নিশ্চিতে পর্যাপ্ত পুষ্টি দিতে বাধ্য। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, বছরের পর বছর ধরে হাজার হাজার ফিলিস্তিনি ইসরাইলি কারাগারে বন্দি রয়েছেন। তাদের অনেকের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদের অভিযোগ আছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আরও কয়েক হাজার ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে। যুদ্ধবিরতি আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হলেও রবিবার রাতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হামাসকে ‘শেষ সতর্কবার্তা’ দিয়েছেন।

তাতে ইসরাইলি জিম্মিদের মুক্তির চুক্তি মেনে নিতে আহ্বান জানানো হয়েছে হামাসের প্রতি। ট্রুথ সোশালে এক পোস্টে ট্রাম্প দাবি করেন, ইসরাইল তার শর্ত মেনে নিয়েছে এবং এখন ‘হামাসেরও সময় এসেছে সেগুলো মেনে নেওয়ার’। তিনি লিখেছেন, ‘এটাই আমার শেষ সতর্কবার্তা। এর পর আর কোনো সতর্কবার্তা আসবে না।’ হামাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা ‘অবিলম্বে আলোচনার টেবিলে বসতে প্রস্তুত’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আসা কিছু প্রস্তাব যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে। ট্রাম্প আরও বলেন, খুব শিগগিরই গাজার বিষয়ে একটি চুক্তি হবে এবং তিনি মনে করেন সব জিম্মিকে ফেরত আনা হবে- মৃত বা জীবিত। বর্তমানে গাজায় ৪৮ জন জিম্মি আটক রয়েছে। তার মধ্যে ২০ জন জীবিত থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইসরাইল এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া দেয়নি। তবে অতীতে তারা দাবি করেছে সব জিম্মিকে ফেরত না দিলে কোনো চুক্তি হবে না। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জোর দিয়ে বলেন, হামাসের বিরুদ্ধে ‘সম্পূর্ণ বিজয়’ জিম্মিদের ঘরে ফিরিয়ে আনবে।

mzamin

বদরুদ্দীন উমর: এক রাজনৈতিক কিংবদন্তির বিদায়

লেখক-গবেষক, রাজনীতিক ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি বদরুদ্দীন উমর ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। গতকাল সকালে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সম্পাদক ফয়জুল হাকিম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। বদরুদ্দীন উমরের বয়স হয়েছিল ৯৪ বছর। লেখক শিবির ও জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সঙ্গে যুক্ত মুহাম্মদ কাইউম জানিয়েছেন, বদরুদ্দীন উমরের মরদেহ হাসপাতাল থেকে নিয়ে ফ্রিজিং গাড়িতে রাখা হবে। সোমবার বেলা ১১টার দিকে জাতীয় শহীদ মিনার বা অন্য কোনো স্থানে শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ রাখা হবে। শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য স্থানটি এখনো ঠিক করা হয়নি। দুপুরে জানাজার পর জুরাইনে তার বাবা-মায়ের কবরে বদরুদ্দীন উমরের দাফন সম্পন্ন হবে। এদিকে, প্রথিতযথা এই লেখকের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস। শোকবার্তায় তিনি বলেছেন, বদরুদ্দীন উমরের মৃত্যু জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিন্তাশীল মানুষদের জন্য তার লেখা এবং জীবনদর্শন এক অনন্য পথনির্দেশ হিসেবে কাজ করবে। এ ছাড়াও প্রধান উপদেষ্টা বদরুদ্দীন উমরের শোকসন্তপ্ত পরিবার, সহকর্মী এবং শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। শোক জানিয়েছেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও। শোকবার্তায় তিনি বলেন, বদরুদ্দীন উমর বারবার রাজরোষে পড়া সত্ত্বেও তিনি তার আদর্শ বাস্তবায়নে ছিলেন আপসহীনভাবে স্থির। কোনো ভীতি বা হুমকি তার কর্তব্যকর্ম থেকে তাকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। স্বৈরতন্ত্রকে উপেক্ষা করে তিনি তার স্বাধীন মতামত প্রকাশে কখনোই কুণ্ঠিত হননি। তিনি এদেশে ছিলেন স্বাধীন বিবেকের এক প্রতীক।

তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, বামপন্থি প্রগতিশীল রাজনীতির পথিকৃৎ, লেখক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনীতিবিদ বদরুদ্দীন উমরের জীবনাবসানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও আমি গভীরভাবে মর্মাহত। স্বাধীনচেতা, নির্ভীক কণ্ঠস্বরের এই বুদ্ধিজীবীর এই মুহূর্তে পৃথিবী থেকে চলে যাওয়া জনমনে হতাশার সৃষ্টি করেছে। এদিকে, বদরুদ্দীন উমরের মৃত্যুতে আরও অনেক উপদেষ্টা শোক জানিয়েছেন। এ ছাড়া, বদরুদ্দীন উমরের মৃত্যুতে শোক জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
উল্লেখ্য, ১৯৩১ সালের ২০শে ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় বদরুদ্দীন উমরের জন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যান; যেখানে তিনি দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি (পিপিই) বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। দেশে ফিরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। কিন্তু তিনি কেবল একাডেমিক জীবনেই থেমে থাকেননি। ১৯৬৮ সালে গভর্নর মোনায়েম খানের কর্তৃত্ববাদী কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি শিক্ষকতা থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং পরে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে লেখালেখিতে নিবেদিত করেন। বিশাল কর্মভাণ্ডার থাকা সত্ত্বেও তার বই ও গবেষণা দেশে খুব কম আলোচিত হয়েছে। তবে, কলকাতায় তার লেখালেখি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হয়। কাজী আবদুল ওদুদ, আনন্দশঙ্কর রায়, সমর সেন, অশোক মিত্র প্রমুখ বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা তার বিষয়ে লিখেছেন। কিন্তু বাংলাদেশে তিনি থেকে গেছেন প্রায় অবহেলিত। ১৯৭৪ সাল থেকে তিনি সংস্কৃতি পত্রিকা প্রকাশ করে এসেছেন। এর মাধ্যমে এবং তার অসংখ্য বইয়ে তিনি লিখেছেন ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, সমাজতন্ত্র, বাঙালি মুসলমানের পরিচয়, সংস্কৃতি ও রাজনীতির সংকট নিয়ে।

তিনি যুক্তি দিয়েছেন, সাম্প্রদায়িকতার প্রকৃত ভিত্তি ১৯৪৭ সালের বিভাজনের সঙ্গে শেষ হয়, পরবর্তীতে মূলত জাতীয়তাবাদকে ঘিরেই সংগ্রাম চলেছে। তার চিন্তাধারা সব সময় লোকপ্রিয় হয়নি, কিন্তু ছিল মৌলিক এবং চিন্তাজাগানিয়া। তারুণ্যে বদরুদ্দীন উমর সরাসরি রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, গ্রামে গ্রামে ঘুরেছেন, কৃষক-শ্রমিকদের সঙ্গে কাজ করেছেন। তবে জীবনের শেষ দিকে তিনি অনেকটাই শান্ত জীবনযাপন করেছেন, বিশাল লাইব্রেরির বইয়ের সঙ্গেই কাটতো তার সময়। পড়া আর লেখা ছিল তার নিত্যসঙ্গী। তিনি প্রায়ই আক্ষেপ করতেন যে, বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক গভীরতা ও সংস্কৃতি অধ্যয়ন অনুপস্থিত। বলতেন, এখানে সত্য কথা অবাধে বলা যায় না। তবু তিনি কখনো থেমে থাকেননি। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি নির্ভীকভাবে লিখেছেন। তার চিন্তা বুঝতে সহায়ক বিশেষ করে ‘সাম্প্রদায়িকতা’ (১৯৬৬), ‘সংস্কৃতির সংকট’ (১৯৬৭), ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’ (১৯৬৯) তিনটি বই। এই বই লিখেই তিনি ক্ষান্ত হননি। তিনি শাসকদের অধীনে চাকরি পর্যন্ত করবেন না, এ মনোভাব পোষণ করে চাকরি থেকে ইস্তফা দেন।
বদরুদ্দীন উমর (২০ ডিসেম্বর ১৯৩১–৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫)
বদরুদ্দীন উমর (২০ ডিসেম্বর ১৯৩১–৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫)

দেশে সবাই আমাকে উপেক্ষা করেছে, বিশেষ সাক্ষাৎকারে: বদরুদ্দীন উমর by সোহরাব হাসান ও মনোজ দে

বদরুদ্দীন উমর, লেখক-গবেষক ও বামপন্থী রাজনীতিক। ৯৪ বছর বয়সে ঢাকার একটি হাসপাতালে ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ রোববার তাঁর মৃত্যু হয়। ১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান শহরে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষে যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিপিই ডিগ্রি নেন। দেশে ফিরে এসে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞান বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন। গভর্নর মোনায়েম খানের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের প্রতিবাদে ১৯৬৮ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন। পরবর্তীতে সার্বক্ষণিক লেখালেখিতে আত্মনিয়োগ করেন। তাঁর ৯০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে প্রথম আলোর পক্ষ থেকে এই সাক্ষাৎকারটি নেওয়া হয়। প্রকাশিত হয়েছিল ২০২১ সালের ১৯ ডিসেম্বর। আলোচিত সাক্ষাৎকারটিতে উঠে এসেছে বদরুদ্দীন উমরের সামাজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবনা।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সোহরাব হাসান ও মনোজ দে

প্রথম আলো: আপনাকে ৯০তম জন্মবার্ষিকীর শুভেচ্ছা। আপনার অনুভূতি জানতে চাই।

বদরুদ্দীন উমর: আমি এত দিন যে বাঁচব, ভাবিনি। অনেকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কীভাবে জীবন যাপন করেছেন যে এত দিন বেঁচে আছেন? কিন্তু আমি তো বলতে পারব না কীভাবে জীবন যাপন করার ফলে এত দিন বেঁচে আছি। সবাই তো একই কারণে বাঁচে না। কে, কী কারণে বাঁচে, তা বলা মুশকিল। তবে সুস্থভাবে বাঁচার জন্য সবার একটা জিনিস খুব বেশি করে করা দরকার, সেটা হলো, খাওয়াদাওয়ার হেফাজত। বেহিসাবি খাওয়াদাওয়া করলে কোনো মানুষই বেশি দিন বাঁচে না।
প্রথম আলো: আপনার বেঁচে থাকা তো শুধু নিজের জন্য না, অন্যদের জন্যও বেঁচে থাকা। তাদের কতটা প্রাণিত করতে পেরেছেন?

বদরুদ্দীন উমর: সেটা তো বুঝতে পারি না। আমার বেঁচে থাকা মানুষকে অনুপ্রাণিত করলে, বাস্তবে তো দেখতাম। আমি বলব, আমি একধরনের উপেক্ষিত। আমি যে এত কাজ করেছি, আমাকে নিয়ে কোনো জায়গায় কোনো লেখা পাবেন না। এখানে এত লোকের ওপর লেখা হয়, কিন্তু আমার লেখা নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না। এমনকি আমার ভাষা আন্দোলনের বইয়ের ওপরও কোনো আলোচনা নেই। কলকাতায় আমার বই ও লেখার ওপরে অনেক আলোচনা হয়েছে। অনেক কৃতবিদ্য মানুষ আমার ওপরে লিখেছেন। সেটা বাংলাদেশে চিন্তাও করা যায় না। কাজী আবদুল ওদুদ, মৈত্রেয়ী দেবী, নারায়ণ চৌধুরী, অন্নদাশঙ্কর রায়, বিষ্ণু দে, সমর সেন, বিনয় ঘোষ, অশোক মিত্র—এঁরা আমার কাজ নিয়ে লিখেছেন, আলোচনা করেছেন। এঁরা বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে উঁচু স্তরের মানুষ। দলনির্বিশেষে তাঁরা আমার ওপরে লিখেছেন। কিন্তু এখানে দলনির্বিশেষ উপেক্ষা করা হয়েছে।

প্রথম আলো: উপেক্ষা করার পেছনে কারণ কী? ভয়ও পায় বোধ হয়?

বদরুদ্দীন উমর: আমি যে একজন কমিউনিস্ট, সেটাই এখানকার লোকে জানে না। তারা আমাকে বুদ্ধিজীবী বলে। ভয় পায় এ কারণে যে আমি লোকের ভণ্ডামি, নির্বুদ্ধিতা, মূর্খতা, এসব প্রকাশ করি। আমি ঘটনা বিশ্লেষণ করি, ভুলত্রুটি নির্দেশ করি এবং অনেকের মুখোশ খুলে দিই। এটাই হচ্ছে আমার ওপর তাদের রাগের কারণ।

প্রথম আলো: উপমহাদেশের রাজনীতির বড় ক্ষতটা তৈরি করেছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ। সেটা কি এড়ানো যেত না?

বদরুদ্দীন উমর: ইতিহাসে যেটা ঘটে গেছে, সেটা এড়ানো যেত কি না, বলে লাভ নেই। একটা বিষয় বলা যেতে পারে, কী কারণে ভারত ভাগ ও বাংলা ভাগ হলো। ভারত ভাগ জিন্নাহ করেননি। ভারত ভাগ করেছে কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা। ভারতের সব গ্রহণযোগ্য ইতিহাস এটা এখন স্বীকার করে। দ্বিজাতিতত্ত্ব এসেছে উনিশ শতকে, হিন্দু মেলার মাধ্যমে। নবকুমার মিত্র, রাজ নারায়ণ রায় এর প্রবক্তা। মুসলমানরা পিছিয়ে, এখন তাঁরা যদি হিন্দুদের ধরে ফেলে—সেই চিন্তা থেকেই এই দ্বিজাতিতত্ত্ব। আমি সম্প্রতি একটা লেখায় লিখেছি, হিন্দুদের দ্বিজাতিতত্ত্ব ছিল অফেনসিভ। আর মুসলমানদের যে দ্বিজাতিতত্ত্ব, সেটা ডিফেন্সিভ। গান্ধী, নেহরু, প্যাটেল দ্বিজাতিতত্ত্বের ধারক। সে কারণেই ভারত ভাগের পর মাউন্টব্যাটেনকে ভারতের গভর্নর জেনারেল করা হয়েছিল। এর থেকে বড় কেলেঙ্কারি কি হতে পারে।
প্রথম আলো: হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম সাহেব যে যুক্ত বাংলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন, তা সফল হলো না কেন?

বদরুদ্দীন উমর: এর উত্তর এককথায় কি বলা যায়? সাধারণ হিন্দুরা দেশভাগ চায়নি। কংগ্রেসের অনেক নেতাও দেশভাগ চাননি। যুক্ত বাংলার পক্ষে আন্দোলন হলে, সেটা সফল হতো। কিন্তু সেই সময়টা ইংরেজরা দেয়নি। ১৯৪৭-এর ফেব্রুয়ারি মাসে এলেন মাউন্টব্যাটেন। আর ৩ জুনের মধ্যে সবকিছু ঠিক হয়ে গেল। কাউকে তো চিন্তা করার সময় দেওয়া হলো না। হুড়মুড় করে সব হয়ে গেল। মিছিল–আন্দোলনের সুযোগ থাকলে দেশভাগ হতো না।
প্রথম আলো: এ ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা কী ছিল?

বদরুদ্দীন উমর: কমিউনিস্ট পার্টি কখনোই মনে করেনি যে তারা ক্ষমতা দখল করতে পারবে। কমিউনিস্ট পার্টি মনে করত, কংগ্রেস তাদের প্যারেন্টস সংগঠন। ১৯৪৪ সালে যখন কংগ্রেস মুসলিম লীগ আলোচনা হচ্ছে, তখন কমিউনিস্ট পার্টি আওয়াজ তুলল, ‘কংগ্রেস লীগ এক হও হাতে হাত বেঁধে নাও।’ তখন আমরা কিশোর বাহিনী করতাম। এই স্লোগান দিতাম। এই হচ্ছে কমিউনিস্ট পার্টির অবস্থান। তারা বিপ্লব করার চিন্তা করত না; নিজেদের সহযোগী হিসেবে চিন্তা করত। বড় বড় আন্দোলন করেছে। কৃষক আন্দোলন, শ্রমিক আন্দোলন করেছে। কিন্তু সেগুলো কংগ্রেসের গোলায় তুলে দিয়েছে। এখানে যেমন কমিউনিস্টরা সবকিছু মাওলানা ভাসানীর হাতে তুলে দিয়েছে। দেশভাগের আগে তার থেকেও বেশি খারাপ অবস্থা ছিল কমিউনিস্টদের। মাওলানা ভাসানী জনদরদি নেতা ছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস নেতৃত্বে অনেক দুষ্ট লোক ছিলেন।

প্রথম আলো: দেশ বিভাগের পর আড়াই বছর তো বর্ধমানেই ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাটা কি বলবেন?

বদরুদ্দীন উমর: বর্ধমানে আমাদের একটা ভালো অবস্থান ছিল। ৪৭-এর পর খুব একটা বড় পরিবর্তন হয়েছে—এ রকম কিছু বোধ করিনি। তারপর হঠাৎ করে ১৯৫০ সালে একটা দাঙ্গা হলো। তবে বর্ধমানেও একটা-দুইটা ঘটনা ঘটেছিল। কিছু লোক আমাদের বাড়িতে আগুন দিয়েছিল। এ ঘটনায় আব্বা (আবুল হাশিম) খুব ভেঙে পড়লেন। তারপর উনি আর ওখানে থাকতে চাইলেন না। কিন্তু এমনিতে আমাদের কোনো অসুবিধা ছিল না।

প্রথম আলো: সার্বিকভাবে ভারতে মুসলমানদের অবস্থা কেমন ছিল?

বদরুদ্দীন উমর: সার্বিকভাবে মুসলমানদের অবস্থা ইংরেজ আমলে যেমনটা ছিল, সাতচল্লিশের পর কংগ্রেসের পাল্লায় পড়ে খারাপ হলো। ভারতে জনসংখ্যার ১৪-১৫ শতাংশ মুসলমান। কিন্তু চাকরিতে তাদের অনুপাতে ২ শতাংশের বেশি নয়। পশ্চিম বাংলার অবস্থা আরও খারাপ। সেখানে ৩০ শতাংশের ওপরে মুসলমান। কিন্তু চাকরির হিস্যা ২ শতাংশ। কংগ্রেসের পর ৩৪ বছর ধরে পশ্চিম বাংলার ক্ষমতায় মার্ক্সিস্ট বলে যাঁরা ছিলেন, তাঁরাও এর থেকে বের হতে পারেননি। এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বড় বড় কথা বলেন। কিন্তু মুসলমানদের শিক্ষার জন্য বেশি ব্যয় করেছেন মাদ্রাসায়। সেই পড়াশোনায় চাকরি–বাকরি কিছু হবে না।
প্রথম আলো: বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার পরিস্থিতি নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?

বদরুদ্দীন উমর: সাম্প্রদায়িকতা বলে এখানে আসলে কিছু নেই। এখানে সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিভূমির যে শর্ত, সেটা সাতচল্লিশে শেষ হয়ে গেছে। কারণ, এর সামাজিক ভিত্তি নেই। সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তি ছিল হিন্দু–মুসলমানের দ্বন্দ্ব। হিন্দুরা শক্তিশালী ছিল, অর্থশালী ছিল, বিদ্যাশালী ছিল। মুসলমানদের অবস্থান তার থেকে নাজুক ছিল। সাতচল্লিশ সালের পর মুসলমানরা প্রাধান্যে চলে আসায় এই দ্বন্দ্বটা চলে গেল। এরপর ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে জাতীয় উন্মেষের চিন্তা সামনে চলে এল। ভিত্তিভূমিটা পরিবর্তন হয়ে গেল। তখন নতুন দ্বন্দ্ব বাঙালি-অবাঙালি, পূর্ব পাকিস্তান-পশ্চিম পাকিস্তান। ৭১-এর পর সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিভূমি ছিল না। এখানে এখন যেটা আছে, সেটা হলো, রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার। এই যে এখন যে সাম্প্রদায়িকতার কথা বলা হচ্ছে, বিভিন্ন জায়গায় হামলা হচ্ছে, সেগুলো করছে কারা? শাসকশ্রেণির লোকেদের মধ্যে কেউ কেউ অন্যের সম্পত্তি দখল করছে। মুসলমানদের সম্পত্তিও দখল করছে তারা।
প্রথম আলো: আপনি বলছেন ভাষা আন্দোলনের পর নতুন দ্বন্দ্ব এল। সেই দ্বন্দ্বে কমিউনিস্টরা কি যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারলেন?

বদরুদ্দীন উমর: কমিউনিস্টরা শুরু থেকেই সাম্প্রদায়িকতার বিরোধী ছিল। কিন্তু সে সময় এখানে কমিউনিস্ট নেতৃত্বে বেশির ভাগই হিন্দুরা থাকলেন। মুসলমান নেতৃত্ব খুব কমই ছিল। ফলে এ নেতৃত্ব মুসলমানদের মধ্যে সেভাবে যাওয়া, তাদের সংগঠিত করার কাজ—সেগুলো যথাযথভাবে করতে পারলেন না।

প্রথম আলো: মাওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি কি সেই দ্বন্দ্বটা বুঝতে পেরেছিল?

বদরুদ্দীন উমর: এখানে দুটো বিষয় ছিল। শ্রেণিসংগ্রাম ও জাতীয় দ্বন্দ্ব। কমিউনিস্টরা না বুঝেছিল শ্রেণি সংগ্রাম, না বুঝেছিল জাতীয় সংগ্রাম। শ্রেণি সংগ্রামের আওয়াজ তুলেছিল তারা, কিন্তু শ্রমিকের মধ্যে, কৃষকের মধ্যে কতখানি কাজ তাদের ছিল? সাতচল্লিশের পর তারা আন্ডারগ্রাউন্ডে চলে গেল। তারা জনগণের মধ্যে কতটা যেতে পেরেছিল? তারা যেটুকু সংগ্রাম গড়ে তুলেছিল, সেটা আদিবাসীদের এলাকায়। সাধারণ হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে তাদের তেমন আন্দোলন ছিল না। এই আন্দোলনের পরে, এখানে জাতীয় দ্বন্দ্ব যেটা তৈরি হচ্ছিল, সেটা আসলে শ্রেণিদ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ। এ দুটোর মধ্যে একটা মিল আছে। কিন্তু মিলের জায়গাটা কমিউনিস্টরা ধরতে পারেননি। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের কৃতিত্ব ছিল জাতীয় সংগ্রামের বিকাশ তথা পাকিস্তানিদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব যে প্রধান বিষয়, সেটা ভালোভাবে ধরতে পেরেছিলেন। মাওলানা ভাসানী, এ কে ফজলুল হক, শেখ মুজিবুর রহমানদের কাণ্ডজ্ঞান কমিউনিস্ট নেতাদের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। এই কাণ্ডজ্ঞানের মধ্য দিয়ে তাঁরা বুঝেছিলেন, এখন জাতীয় সংগ্রামের বিকাশ ঘটানো দরকার।

প্রথম আলো: কমিউনিস্ট আন্দোলনে আপনার যুক্ততা কীভাবে হলো?

বদরুদ্দীন উমর: কমিউনিস্টদের সঙ্গে পরিচয় ছোটবেলা থেকেই। বর্ধমানে আমাদের আত্মীয়স্বজনের মধ্যে কমিউনিস্টে ভর্তি ছিল। ছেলেবেলা থেকেই তাঁদের দেখেছি। এখানে আসার পর সক্রিয়ভাবে কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হয়েছি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছাড়ার পর।
প্রথম আলো: আপনার এই রূপান্তর কী অক্সফোর্ডে অধ্যয়নের কারণে?

বদরুদ্দীন উমর: আমার মধ্যে দুটো চিন্তা বরাবরই ছিল। আমার বাবার রাজনীতি ও কমিউনিস্ট আদর্শের রাজনীতি। প্রথম দিকে বাবার রাজনীতির প্রভাব একটা ছিল। তবে সেটাকে আদর্শ বলে মনে করতাম না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সেই প্রভাবটা ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন ছাড়ি, তখন এ প্রভাবটা আমার চলে গিয়েছিল। এরপর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা পর্যন্ত সময়টাকে অন্তর্বর্তীকাল বলা চলে। এই সময়টা বেশ দীর্ঘ। এর পর থেকে কমিউনিস্ট চিন্তাধারাতেই আমি চলেছি। আমার সাম্প্রদায়িকতা বইটি মার্ক্সবাদী ধারাতেই লেখা।
প্রথম আলো: আপনি তো মোনায়েম খানের স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের প্রতিবাদে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়েছিলেন?

বদরুদ্দীন উমর: আমি চাকরি ছেড়ে দেব, রাজনীতি করব, সেটা অনেক আগে থেকেই চিন্তা করে রেখেছিলাম। পরে মোনায়েম খানের কর্মকাণ্ডে আমি চাকরি ছেড়ে দিলাম। আমাকে তারা তাড়াতে কিংবা বরখাস্ত করতে পারত না, কিন্তু নানা রকম হয়রানি করছিল। চাকরি ছেড়ে গেলাম রাজনীতি করতে। মাওলানা ভাসানী বললেন, তুমি কৃষক সভার সম্পাদক হও। আমি বললাম, কি বলছেন আপনি? আমি বাংলাদেশের গ্রাম কিছুই জানি না। কৃষক কিছুই জানি না। কৃষক সভার সম্পাদক কী করে হব? তারপর উনি বললেন, তুমি ন্যাপের সম্পাদক হও। আমি তখন বললাম, আমি ন্যাপ করব না। আমি চাকরি ছেড়ে ন্যাপ করতে আসিনি। আমি কমিউনিস্ট পার্টি করতে এসেছি। অন্য কোনো পার্টি করব না।

কমিউনিস্ট পার্টি তখন নানা ভাগে বিভক্ত। আমি সুখেন্দু দস্তিদার-আবদুল হকদের দলে যোগ দিলাম। অন্য যে পার্টিগুলো ছিল, সেগুলোর কোনোটাকেই কমিউনিস্ট পার্টি বলা যাবে না। নেতাদের কারও লেখাপড়া ছিল না। কমিউনিস্ট নেতাদের মধ্যে আবদুল হকই মার্ক্সের ডাস ক্যাপিটাল পড়েছিলেন। কিন্তু তিনি ‘পাঠ’ করেছেন, গভীরে যাননি। গণশক্তি পত্রিকায় তিনি যেসব লেখা লিখেছেন, সেগুলোও ছিল সুপারভিসিয়াল। শরতের মেঘের মতো দেখতে সুন্দর, ভেতরে প্রাণ নেই, জীবন নেই। সে কারণে একাত্তর সালের ডিসেম্বর মাসে আমি পার্টি ছেড়ে দিলাম। এটা যেমন ঠিক, আবার এটাও ঠিক, এখন যদি আমাকে কেউ জিজ্ঞেস করে, আবার যদি সুযোগ হয় তুমি কোন পার্টিতে যোগ দেবে? আমি বলব, সুখেন্দু দস্তিদারের ওই পার্টিতেই যোগ দেব।
প্রথম আলো: একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় কমিউনিস্ট আন্দোলন তো সংকটে পড়ল?

বদরুদ্দীন উমর: এই সংকট তো তাঁরা নিজেরাই তৈরি করেছেন। তাঁরা আওয়ামী লীগ ও ইয়াহিয়া খানকে একই পাল্লায় মাপলেন। এটি কখনো হয় নাকি? যেখানে দেশের মানুষ লড়াই করছে, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করছে, সেখানে তাঁরা বলে দিলেন ‘দুই কুকুরের লড়াই।’ এর চেয়ে সর্বনাশা কিছু হতে পারে না। তাঁদের উচিত ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গে একত্রে মুক্তিযুদ্ধ করা। এপ্রিলের শুরুতে একটি বৈঠক হয়েছিল, যাতে সুখেন্দু দস্তিদার, আবদুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহার সঙ্গে আমিও ছিলাম। সেখানে মাওলানা ভাসানীর একটি চিঠিও দেখানো হলো। ঠিক হলো কমিউনিস্টরাও একসঙ্গে লড়াই করবে। কিন্তু এপ্রিলের ১৩ বা ১৪ তারিখে আমি যশোরে ছিলাম। চৌ এন লাইয়ের বিবৃতি দেখানো হলো, যেখানে তিনি পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার কথা বলেছেন। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। আমাদের সঙ্গে সৈয়দ জাফর নামের এক কর্মী ছিলেন, তাড়াতাড়ি তাঁকে নিয়ে ঢাকায় চলে আসি। এরপর তাঁরা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ও শ্রেণিশত্রু খতমের লাইন নিলেন। যেখানে জাতীয় সংগ্রাম চলছে, সেখানে তাঁরা শ্রেণিশত্রু খতম করতে গেলেন। আপনি যখন একটি মানুষকে হত্যা করবেন, তখন তাঁর আত্মীয়স্বজন, পরিবার, প্রতিবেশী সবাই বিরুদ্ধে চলে যাবে। সেটাই হয়েছে। ফলে জনগণ তাঁদের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করল এবং ৭১-এর আগস্টে পালিয়ে আসতে বাধ্য হলেন। নিজের বোকামি ও মূর্খতার কারণেই তাঁদের এই অবস্থা হয়েছে।
প্রথম আলো: ষাটের দশকে আপনিই লিখেছিলেন, বাঙালি মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন। সেই প্রত্যাবর্তনটা কেমন ছিল?

বদরুদ্দীন উমর: দেশভাগের আগে এখানে একশ্রেণির মুসলমান নিজেদের আরবি ফারসি সংস্কৃতির ধারক-বাহক ভাবতেন। কিন্তু পাকিস্তান হওয়ার পর সেই ভাবনার লোক আর দেখা গেল না। বিশেষ করে ভাষা আন্দোলনের পর সেই প্রচারণা সমাজে ভিত্তি পেল না। তরুণ প্রজন্ম নিজেদের পরিচয় খুঁজতে লাগল। ধীরে ধীরে বাঙালির মধ্যে জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটল। এই প্রেক্ষাপটেই আমি বাঙালি মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন লিখলাম।
প্রথম আলো: আপনি যে সংস্কৃতির সংকটের কথা লিখেছিলেন পাকিস্তান আমলে, সেই সংকট তো এখনো আছে?

বদরুদ্দীন উমর: সংকট তো আছেই। আবার সেই সংকটকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ যে অসাম্প্রদায়িকতার কথা বলে, তার উদ্দেশ্য হলো লুটপাট করা ও ভারতের তোয়াজ করা। তারা নরেন্দ্র মোদিকে অসাম্প্রদায়িকতার প্রতিমূর্তি হিসেবে দাঁড় করার চেষ্টা করছে। সেখানকার লেখক ইতিহাসবিদেরা কিন্তু তাঁর ও অমিত শাহর কঠোর সমালোচনা করছেন। তাঁরা ভারতের সব মুসলমান নাম মুছে দিচ্ছে। এর জবাবে ইরফান হাবিব বলেছেন, অন্যদের নাম মোছার আগে অমিত শাহর উচিত নিজের নাম থেকে শাহ বাতিল করা। কেননা শাহ শব্দটি এসেছে ইরান থেকে।
প্রথম আলো: আপনি বহু বছর থেকে সংস্কৃতি পত্রিকা বের করছেন। সমাজে কতটা প্রভাব রাখতে পারছে?

বদরুদ্দীন উমর: সংস্কৃতি পত্রিকা আমি ১৯৭৪ সাল থেকে বের করছি। সমাজে প্রভাব ফেলবে কী, আপনারাই তো পড়েন না। তারপরও সীমিতসংখ্যক মানুষের কাছে পত্রিকাটি পৌঁছেছে। নভেম্বর সংখ্যায় আমি লিখেছি, কংগ্রেস থেকে ভারতীয় জনতা পার্টি। এর আগের সংখ্যায় ছিল ভারতের ইতিহাসচর্চা নিয়ে। এ দেশের লোকজন তো পড়াশোনা তেমন করেন না। আমার লেখালেখি নিয়ে যা আলোচনা ভারতেই হয়েছে। আমি একটি কথা বলি, এই বাঙালি মুসলমানের মধ্যে মননশীলতা বলে কিছু নেই। ফাঁপা জিনিস নিয়ে লাফালাফি হচ্ছে। মননশীলতা নেই। সে রকম লেখকও নেই।
প্রথম আলো: রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা—এর কোনটিকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

বদরুদ্দীন উমর: একসময় আমি গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষকে সংগঠিত করেছি। কিন্তু এই নব্বই বছর বয়সে তো সেটি সম্ভব নয়। এখন তো ঘরের বাইরে যেতে পারি না। এখন লেখালেখিও কম করি। সংস্কৃতি ও কলকাতার দু–একটি পত্রিকায় লিখি। তবে পড়ি বেশি। চারতলায় আমার পাঠাগারটি পড়ার মতো অনেক বই আছে। আবার অনলাইনে কিনেও অনেক বই সংগ্রহ করি।
প্রথম আলো: তা বাঙালি মুসলমানের মধ্যে মননশীলতা তৈরি হলো না কেন?

বদরুদ্দীন উমর: শরীরে ইনজেকশন দিয়ে তো মননশীলতা তৈরি করা যায় না। রক্তের গ্রুপ পরীক্ষা করেও এটি পাওয়া যাবে না। এর জন্য চর্চা দরকার। আজ বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে দেখুন, জ্ঞানের চর্চা বলে কিছু নেই। কিন্তু ভারতে মোদি সরকার যতই দুর্বৃত্তায়ন চালাক না কেন, সেখানে প্রগতিশীলেরা, কমিউনিস্টরা ইতিহাসচর্চা করছেন। রোমিলা থাপার, ইরফান হাবিব, অমিয় কুমার বাগচীর মতো অনেক ইতিহাসবিদ আছেন। আর আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাকান, কোনো ইতিহাসবিদ নেই। এমনকি সৃজনশীল সাহিত্যেও তো আখতারুজ্জামান, হাসান আজিজুল হকের পর উল্লেখ করার মতো কাউকে দেখছি না। এই যে সাতচল্লিশ সাল থেকে এত সংগ্রাম করে এখন যে অবস্থা দাঁড়াল, তা খুবই হতাশাজনক। অর্থনীতির দিকে তাকালেও দেখব একদিকে মেট্রোরেল হচ্ছে, টানেল, পাতাল রেল হচ্ছে, অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে রাস্তাঘাট নেই, সেতু নেই। মানুষের কষ্টের শেষ নেই। ঢাকা থেকে দু-ঘণ্টায় চট্টগ্রামে যাওয়ার জন্য বুলেট ট্রেনের পরিকল্পনা আছে। কিন্তু আমাদের দেশ তো জাপান নয়। এই অর্থ স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় করা যেত। স্বাস্থ্যসেবা খাতের অবস্থা খুবই শোচনীয়। উন্নয়নের সুফল তো ১ বা ২ শতাংশ মানুষের কাছে যাচ্ছে। জিনিসের দাম অস্বাভাবিক হারে বাড়ছে। মানুষ না খেয়ে মারা যাচ্ছে না ঠিক, তারা অপুষ্টিতে ভুগছে। বৈষম্য সর্বত্র।
প্রথম আলো: আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। বর্তমানে শিক্ষার হাল কী?

বদরুদ্দীন উমর: শিক্ষাব্যবস্থার কথা কী বলব? নতুন প্রজন্মের কেউ তো এখন বাংলা পড়ে না। আমার আত্মীয়স্বজনের ছেলেমেয়েরাও বাংলা জানে না। ইতিহাস জানে না। বাংলাদেশই এমন একটি দেশ, যেখানে ইতিহাস পাঠ্য থেকে তুলে দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষার ভিত শক্ত না হলে উচ্চশিক্ষা কী করে হবে? এর অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশে মেধাবী ছাত্র নেই। বাইরে যারা চলে যায়, তারা ভালো করছে বিভিন্ন ক্ষেত্রে। এখানে পারছে না। এখানে চর্চা-গবেষণার সুযোগ নেই।
প্রথম আলো: যে বাংলাদেশ ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য আপনারা লড়াই করেছেন, মননশীলচর্চায় রত আছেন, তা বাস্তবে রূপ পেল না কেন?

বদরুদ্দীন উমর: একটা চালু কথা হলো, সমাজতন্ত্র শেষ হয়ে গেছে। আমাকে অনেকেই বলেন, আপনি তো অনেক দিন ধরে চেষ্টা করলেন। কিছুই হলো না। ম্যাগনেট যেভাবে লোহাকে আকর্ষণ করে, সেভাবে পারেননি। আমি বলি, এটি দুই তরফা। ম্যাগনেট লোহাকে আকর্ষণ করে, কাঠকে নয়। বিপ্লবের পর রাশিয়ায় ও চীনে মানুষকে রাজনীতিতে দীক্ষিত করে তাদের জীবনমান উন্নয়ন করা হয়েছিল। কিন্তু এখানে কোনো রাজনৈতিক অরিয়ন্টেশনই ছিল না। হঠাৎ করে একটি লুটেরা শ্রেণি গড়ে উঠল। এখন পত্রিকায় দেখি, সরকারি অফিসের পিয়ন-দারোয়ানও অবৈধভাবে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। দেশ ও জনগণের কথা চিন্তা করার কেউ নেই। সবাই ‘ইয়া নফসি ইয়া নফসি’ করছেন। এখানে কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলন নেই, কমিউনিস্ট আন্দোলন নেই। সে কারণেই ফ্যাসিবাদ জেঁকে বসেছে, যা ইচ্ছে তা–ই করছে। কিন্তু পরিবর্তন হবেই।
প্রথম আলো: সমাজতন্ত্র নিয়ে আপনার এখনকার ভাবনা কী?

বদরুদ্দীন উমর: চীন বা সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে, এর অর্থ এই নয় যে এর ভবিষ্যৎ নেই। সমাজতন্ত্র মানব ইতিহাসের সংগ্রামে অবিচ্ছেদ্য অংশ। সমাজতন্ত্র দেখিয়ে দিয়েছে, তারা কী দিতে পারে। অনেকে জিজ্ঞেস করেন, সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী? আমি বলি, পুঁজিবাদের ভবিষ্যৎ কী? যুক্তরাষ্ট্র একবার ভিয়েতনাম থেকে কমিউনিস্টদের হাতে মার খেয়ে পাততাড়ি গুটিয়েছিল। সর্বশেষ মৌলবাদী তালেবানদের হাতে মার খেয়ে আফগানিস্তান ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। এটাই পুঁজিবাদের পতনের ঘণ্টাধ্বনি। পুঁজিবাদের বর্তমান অবস্থাও একদিনে আসেনি। যাঁরা সমাজতন্ত্রের দিন শেষ হয়েছে বলেন, তাঁরা এক হাতের বেশি দূরত্বে দেখতে পারেন না। বর্তমানই শেষ কথা নয়; শত শত বছরের ইতিহাস পরিক্রমায় একটি মুহূর্ত। আমরা থাকব না। পরের প্রজন্ম লড়বে, লড়তেই হবে। মানবজাতি বেঁচে থাকলে পরিবর্তন হবেই; যদি পুঁজিবাদী বিশ্ব গোটা বিশ্বকে ধ্বংস করে না দেয়। তারা কেবল শ্রমিককে ধ্বংস করছে না। মানুষ ও পরিবেশকেও ধ্বংস করছে।
প্রথম আলো: বাংলাদেশে বামেরা এত বিভক্ত কেন?

বদরুদ্দীন উমর: বামেরা বিভক্ত কারণ, তাদের চিন্তা নেই। বুদ্ধি নেই, লড়াই করার মানসিকতা নেই। মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে লড়ে না, লড়াই করতে করতে ঐক্য হয়। মুশকিল হলো, এখানে সত্যি কথা বলার উপায় নেই। সত্যি কথা বললে গুম হয়ে যেতে হয়।
প্রথম আলো: আপনি এত কড়া কড়া লিখেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত জেলে যেতে হয়নি।

বদরুদ্দীন উমর: পশ্চিমবঙ্গের সুনীতি ঘোষও কথাটি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি বাংলাদেশের অনেককে নাকি জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেন ওনার বিরুদ্ধে কিছু হচ্ছে না। তারা বলছেন, রিঅ্যাকশনটা বেশি হবে।
প্রথম আলো: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাককে ঘিরে আপনাদের একটি বৃদ্ধিবৃত্তিক সার্কেল গড়ে উঠেছিল। সে সম্পর্কে যদি কিছু বলেন।

বদরুদ্দীন উমর: তিনি ছিলেন সক্রেটিসের মতো। তিনি লিখেননি। কিন্তু অনেক পড়েছেন। যেকোনো বিষয়ের ওপর বলতে পারতেন। বইয়ের খোঁজখবর দিতেন। তাঁর নিজের সংগ্রহ ছিল বিশাল।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।

বদরুদ্দীন উমর: আপনাকেও ধন্যবাদ।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2024-12-20%2F558rak71%2F251A1970035605.JPG?rect=0%2C0%2C6720%2C4480&w=300&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বদরুদ্দীন উমর

ট্রাম্পের শুল্কে ভারতের অর্থনীতি কতটা ঝুঁকিতে by অজয় শাহ

ট্রাম্পের শুল্কনীতি ভারতের অর্থনীতি ও কৌশলগত ভবিষ্যতের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের বিভিন্ন পণ্যের ওপর নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, রাশিয়া থেকে ভারত তেল কিনছে বলেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

ট্রাম্পের এ ঘোষণা বৈশ্বিক বাণিজ্যব্যবস্থার জন্য আরেকটি বড় ধাক্কা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ভালো সম্পর্ক থেকেও সরে আসার ইঙ্গিত। ভারতের অর্থনীতি এত দিন বিশ্ববাজারের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত থেকে যে সুবিধা ভোগ করে এসেছে, নতুন শুল্কের কারণে তা কিছুটা চাপের মুখে পড়তে পারে। এর চেয়েও বড় ঝুঁকি হলো, ভারতের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনায় এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা আছে।

তবে ভারতের জন্য আশার কথা, এমন কিছু কারণ আছে, যা এই নতুন শুল্কের তাৎক্ষণিক প্রভাব কমিয়ে আনবে। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হলেও ভৌগোলিকভাবে দেশটি অনেক দূরে অবস্থিত। উচ্চ পরিবহন খরচের কারণে ভারত অনেক আগে থেকেই বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৈচিত্র্যময় করার কৌশল নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারও কখনো একই রকম থাকে না। ট্রাম্পের এই বৈশ্বিক শুল্কযুদ্ধ নতুন করে বাণিজ্যের ধারা পরিবর্তন করবে এবং সরবরাহব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস ঘটাবে। ভারতীয় রপ্তানিকারকেরা অন্যান্য দেশের ব্যবসায়ীদের মতোই বিকল্প বাজার খুঁজে নেবেন; যদিও এই পরিবর্তনের খরচ বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ট্রাম্প যে শুল্ক বসিয়েছেন, তা ভারতের মোট রপ্তানির একটি ছোট অংশকে প্রভাবিত করবে। গত অর্থবছরে ভারত প্রায় ৪৪১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য বিদেশে বিক্রি করেছে। এর মধ্যে প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য নতুন শুল্কের আওতায় পড়ছে। অর্থাৎ মোট রপ্তানির ১৫ শতাংশের কম প্রভাবিত হবে। তাই এই শুল্ক ভারতের জন্য অবশ্যই একধরনের সমস্যা তৈরি করবে, কিন্তু সেটা এত বড় আঘাত নয় যে ভারতের পুরো রপ্তানি ব্যবসা বা অর্থনীতি ভেঙে পড়বে।

শুধু পণ্যের দিকে তাকালে ভারতের বাণিজ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী খাতটি আড়ালে থেকে যায়। সেটি হলো সেবা খাত। বর্তমানে ভারতের সেবা রপ্তানি বছরে ৩৮০ বিলিয়ন ডলারের বেশি এবং তা দ্রুত বাড়ছে। এ খাতই ভারতের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অগ্রগতির আসল চালিকা শক্তি। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সেবা রপ্তানির মধ্যে তথ্যপ্রযুক্তি সেবা, আর্থিক সেবা, ব্যবসায়িক প্রক্রিয়ার আউটসোর্সিং, গবেষণা ও উন্নয়ন ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত, যেগুলোর ওপর কোনো শুল্ক আরোপ করা হয় না।

ট্রাম্পের শুল্কনীতি থেকে সৃষ্ট নীতিগত অনিশ্চয়তা ভারতকে একটি অপ্রত্যাশিত সুবিধাও দিতে পারে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসা যুক্তরাষ্ট্র থেকে সরিয়ে অন্য দেশে বৈচিত্র্য আনতে চাইবে। এই পরিবর্তন থেকে ভারত বড় লাভবান হতে পারে। বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, ভারতের পণ্য ও সেবা রপ্তানিকারকেরা ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র বাদে অন্যান্য ওইসিডি দেশের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে।

তবে এ ঘটনার প্রভাব কেবল বাণিজ্য অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি ভারতের আন্তর্জাতিক অবস্থান সম্পর্কেও একটি বড় প্রশ্ন তোলে। দীর্ঘদিন ধরে ভারতে দুটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। প্রথম দৃষ্টিভঙ্গি হলো ভারতকে একটি আত্মবিশ্বাসী এবং উন্মুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে তোলা, যা পশ্চিমাদের প্রযুক্তি, অর্থ ও বাজারের সহায়তা নিয়ে বিশ্বায়নের মাধ্যমে উন্নতি অর্জন করতে চায়। ভারতের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়ন করতে হলে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও গভীর সংযোগ স্থাপন জরুরি।

এ ভাবনা বা দৃষ্টিভঙ্গি বলছে, ভারতের উন্নতি অনেকটাই পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ফল। ১৯৯১ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ভারতের অর্থনৈতিক সাফল্যের বড় কারণ ছিল পশ্চিমা দেশগুলোর প্রযুক্তি, ব্যবসায়িক সংযোগ ও বিনিয়োগ। এ সময় পশ্চিমা দেশগুলোয় ভারতীয় প্রবাসীদের সংখ্যা বেড়েছে, আর তাদের প্রভাবও অনেক বেশি হয়েছে। ভারতও পশ্চিমাদের প্রযুক্তি আর ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে। যদিও মাঝেমধ্যে রাশিয়া বা চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর কথা বলা হয়, বাস্তবে ভারতের ধনী বা প্রভাবশালী পরিবারের সন্তানদের ওই দেশগুলোয় পড়াশোনা করতে পাঠানোর ঘটনা প্রায় নেই।

দ্বিতীয় দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক সংযোগকে সুযোগ নয়, বরং দুর্বলতা হিসেবে দেখে। এই মনোভাব এসেছে ঔপনিবেশিক আমল থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া পশ্চিমাদের প্রতি অবিশ্বাস থেকে। এতে আত্মনির্ভরশীলতার ওপর এত বেশি জোর দেওয়া হয় যে তা প্রায়ই অর্থনৈতিক দক্ষতা ও প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে।

ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি ভারতের মধ্যে যে রক্ষণশীল বা সুরক্ষাবাদী ভাবনা আগে থেকেই ছিল, সেটাকে আরও শক্তিশালী করেছে। এখন অনেকেই মনে করতে শুরু করেছে যে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিশ্বাসযোগ্য নয়, আর পশ্চিমাদের সঙ্গে বেশি ঘনিষ্ঠ হলে সেটা ভারতের নিরাপত্তা ও স্বার্থের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।

যদি ভারতের নেতারা এই ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেন, তাহলে দেশটি হয়তো সুরক্ষাবাদী নীতি নেবে (মানে নিজেদের বাজার অন্যদের জন্য বন্ধ করে দেবে) এবং সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের দিকে যাবে। এতে ভারতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, এশিয়ার নিরাপত্তা কমে যাবে, আর বিশ্বে যে সামান্য উদারনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা আছে, সেটাও দুর্বল হয়ে পড়বে।

তবে ভালো খবর হলো, উন্মুক্ত অর্থনীতির পক্ষে থাকা দৃষ্টিভঙ্গি এখনো প্রাধান্য পাচ্ছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ভারতের যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি হয়েছে, তা শুল্ক কমানো এবং সুরক্ষাবাদী নীতি হ্রাসের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই চুক্তি দেখায়, ভারত এখনো পারস্পরিক সম্মান ও স্বার্থের ভিত্তিতে ওইসিডি দেশগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর করতে আগ্রহী। আশা করা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য চুক্তির আলোচনাও একই ধারা অনুসরণ করবে এবং ভারতের বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্তি আরও দৃঢ় হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতিকে ভারত নিজের জন্য সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করতে পারে। এ ঘটনা ভারতকে স্পষ্টভাবে ভাবতে সাহায্য করবে যে তার ভবিষ্যৎ কৌশল কী হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সুরক্ষাবাদী নীতির জবাবে ভারতের উচিত নয় প্রতিশোধ নেওয়া বা অন্যদের থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলা। বরং ভারতের উচিত সেই সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করা, যারা এখনো সৎ নিয়ম মেনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশ্বাস করে। যদি ভারত যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করে, তাহলে দেশটি তার অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলো নতুনভাবে সাজাতে পারবে। এতে ভারত প্রমাণ করতে পারবে যে বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত থাকা শুধু তার উন্নতির জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের জন্যও জরুরি।

* অজয় শাহ, মুম্বাইভিত্তিক অলাভজনক গবেষণা সংস্থা এক্সকেডিআর ফোরামের সহপ্রতিষ্ঠাতা
- স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

ট্রাম্পের ঘোষিত ৫০ শতাংশ শুল্কের প্রতিবাদে ভারতে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভ
ট্রাম্পের ঘোষিত ৫০ শতাংশ শুল্কের প্রতিবাদে ভারতে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স