Saturday, October 16, 2010
নবজাতক শিশুর যত্ন ও পরিচর্যা মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান
সাধারণত সমাজ-জীবনে স্বামী বা পরিবারের অন্য সদস্যদের খাদ্য পরিবেশনের পর স্ত্রী নিজের জন্য প্রয়োজনীয় সুষম খাবার রাখে না। স্ত্রী বা সন্তানের মা যাতে প্রয়োজনীয় পরিমাণে প্রোটিন ও ভিটামিনসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণে যত্নবান হন, এদিকে পরিবারের সদস্যদের দৃষ্টি রাখা অবশ্যকর্তব্য। বিশেষ করে গর্ভকালীন এবং নবজাত শিশুকে মাতৃদুগ্ধ দানকালে এ ব্যাপারে বেশি নজর রাখা দরকার। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা (স্বামীরা) যা খাবে তাদের (নারীদের) তা-ই খেতে দেবে।’
সন্তান যে মুহূর্তে মাতৃগর্ভে আসে ঠিক তখন থেকেই মায়ের যত্ন নিতে হয়। সন্তান গর্ভে এলে মা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে জীবন যাপন করবেন। তা না হলে মা ও শিশু উভয়েরই সমূহ বিপদ হতে পারে। গর্ভবতী মাকে অবশ্যই তাকওয়া বা আল্লাহভীতি অবলম্বন করতে হবে। তাকে খারাপ কাজ, অসদাচরণ ও দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত থাকতে হবে। এ সময় মায়ের ও গর্ভের শিশুর দুজনের খাদ্য প্রয়োজন। তাই গর্ভবতী মাকে বেশি করে পুষ্টিকর ও পরিমিত সুষম খাবার খেতে হবে। এই মর্মে পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহ প্রদত্ত রিজিক থেকে তোমরা উত্তম খাবার খাও।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত-১৭২)
নবজাত শিশুদের সুস্বাস্থ্যের জন্য মায়ের দুধই সেরা। মায়ের দুধ শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস করে। যেসব নবজাতক শিশু পর্যাপ্ত পরিমাণে মায়ের দুধ পান করে, তারা বড় হওয়ার পর স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত হয় কম। মায়ের বুকের দুধ শিশুর সুস্থভাবে বেঁচে থাকার জন্য সেরা খাবারই শুধু নয়, বরং তা নবজাতকের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত একটি হক বা জন্মগত অধিকার। এ বিষয়ে ইসলামের দিকনির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে।’ (সূরা আল-বাকারা, আয়াত-২৩৩)
নবজাতক শিশুর জন্য মায়ের বুকের দুধ আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক বিশেষ নিয়ামত। যদি কোনো মা তাঁর নবজাত শিশুকে দুই বা আড়াই বছর দুধ পান করাতে চান, তাহলে এ সময় মায়ের নতুন করে গর্ভধারণ না করাই বাঞ্ছনীয়। এ ছাড়া জন্মের পরপরই মায়ের দুধ দান করলে মায়ের প্রসবজনিত রক্তক্ষরণ, যা প্রসূতিমৃত্যুর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত, তা রোধ হবে। নবজাতক শিশুকে মায়ের বুকের দুধ পান করানো পবিত্র কোরআনের নির্দেশ। এ জন্য জন্মের পরপরই শিশুকে মায়ের শালদুধ দিতে হয়। অনেক সময় মায়ের বুকের হলুদ রঙের শালদুধ অজ্ঞতাবশত ফেলে দেওয়া হয়। শালদুধ গাঢ় এবং তা স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়—এমন ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে অনেক সময় নবজাতককে মায়ের দুধ পান থেকে বঞ্চিত করা হয়। অথচ জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করলে বিপুলসংখ্যক নবজাতকের জীবন রক্ষা পাবে।
শালদুধে রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা থাকে। তাই একে শিশুর জীবনের প্রাথমিক টিকা বলা যায়। শিশুকে অনেক রোগ-ব্যাধির সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে বলে শালদুধ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর জন্মের ছয় মাস পর্যন্ত মায়ের বুকের দুধই একমাত্র ও বিকল্পহীন খাবার। এরপর সঠিক পরিপূরক খাবারের পাশাপাশি শিশুর দুই বছর পর্যন্ত পবিত্র কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী মায়ের দুধ খাওয়ালে পাঁচ বছর বয়সের নিচে শিশুদের অকালমৃত্যু রোধ করবে।
ইসলামের দৃষ্টিতে শিশুসন্তান মায়ের বুকের দুধ পানের পূর্ণ অধিকার রাখে। দুধ পান ও দুধ দানের মাধ্যমে মা ও নবজাতক শিশুর মধ্যে অপার স্নেহ, মায়া-মমতা ও গভীর ভালোবাসার অটুট বন্ধন তৈরি হয়। ইসলামের বিধান অনুসারে মা তাঁর শিশুকে বুকের দুধ পান করালে সহজে পুনরায় মাতৃগর্ভে সন্তান আসে না। নবজাত শিশুকে বুকের দুধ পান করালে মায়ের সৌন্দর্য লোপ পায় বা নষ্ট হয়ে যায়—এমন সব ভুল ধারণায় অনেকে শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খেতে দেন না। এটা মারাত্মক ভুল এবং বড়ই গুনাহর কাজ।
ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী মানবশিশুকে সুস্থ-সবল, সঠিক যত্ন ও পরিচর্যার মাধ্যমে সুন্দরভাবে গড়ে তোলা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। শিশুর অকালমৃত্যুর হার কমাতে নবজাতক শিশুদের সঠিক যত্ন, পরিচর্যা ও সুচিকিৎসা দিতে হবে। শিশুরা যেসব রোগে আক্রান্ত হয় সেগুলো প্রতিরোধ করতে হলে টিকাদানের কোনো বিকল্প নেই। সময়মতো টিকা দিয়ে কোমলমতি শিশুদের জীবনকে বেশ কয়েকটি প্রাণসংহারী সংক্রামক রোগ থেকে রক্ষা করা যায়। বিষয়টি উপলব্ধি করে অভিভাবকদের উচিত, তাদের শিশুদের জন্মের পর থেকে নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সবগুলো টিকা দিয়ে নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান করা। এ টিকাদান কর্মসূচিকে বেগবান করে শিশুমৃত্যুর হার কমাতে ধর্মীয় নেতা বা মসজিদের ইমামদের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি করতে হবে।
ইসলামে সন্তান প্রসবের সময়ে পবিত্রতা ও সাবধানতা অবলম্বনের ব্যাপারে দিকনির্দেশনা রয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অভিজ্ঞ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তার না থাকায় মায়েরা গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তারের কাছ থেকে ভুল চিকিৎসা নেওয়ার কারণে অনেক মা সন্তান প্রসব করার সময় মৃত্যুকে বরণ করে নেন। এসব মা ও শিশুকে বাঁচাতে হলে প্রতিটি গ্রামে গণসচেতনতামূলক ব্যবস্থাসহ ইসলামের আলোকে পরিবার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ততা প্রয়োজন। ঘন ঘন সন্তান প্রসব থেকে বিরত রাখার জন্য মাঠপর্যায়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের এগিয়ে এসে জনগণকে সচেতন করতে সঠিক পরামর্শ দিতে হবে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমি, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়। পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব হজরত মুহাম্মদ (সা.)।
dr.munimkhan@yahoo.com
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
সপ্তাহের শেষ দিন মূল্যসূচক কমল
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গতকাল সাধারণ মূল্যসূচক আগের দিনের চেয়ে প্রায় ২১ পয়েন্ট কমে সাত হাজার ৪৯৩ পয়েন্টে নেমে এসেছে। লেনদেন হয়েছে এক হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সাধারণ মূল্যসূচক ৬৫ পয়েন্ট কমে ২১ হাজার ৭৯৪ পয়েন্ট হয়েছে। লেনদেন হয়েছে ১৮২ কোটি টাকা।
বড় ধরনের দরপতন দিয়ে গত রোববার সপ্তাহের লেনদেন শুরু হয়েছিল। এর পরের তিন দিন বাজার হয়ে ওঠে পাগলা ঘোড়া, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নতুন করে ভাবিয়ে তোলে। তবে গতকালের পতন সামান্য হলেও তাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সপ্তাহের প্রথম দিন শেয়ারবাজারে দরপতনের পেছনে বড় ভূমিকা রাখে দুই স্টক এক্সচেঞ্জের সম্মিলিত উদ্বেগ এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার করা ঋণসংক্রান্ত বিধানের পক্ষে দেওয়া আদালতের রায়। এই দুই ঘটনার প্রভাবে সপ্তাহের প্রথম দিনে ডিএসইতে বড় ধরনের দরপতন ঘটে। কিন্তু গতকালের দরপতনের পেছনে সে রকম কোনো কারণ ছিল না।
ডিএসইতে গতকাল ২৪১ কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দাম বেড়েছে ১০৭টির, কমেছে ১৩১টির এবং অপরিবর্তিত ছিল তিনটি কোম্পানির শেয়ারের দাম। সিএসইতে ১৮৪টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে। দাম বেড়েছে ৭২টির, কমেছে ১০৯টির ও অপরিবর্তিত ছিল তিনটি কোম্পানির।
উভয় স্টক এক্সচেঞ্জেই গতকাল বিশেষ কোনো খাত এককভাবে নেতৃত্বে ছিল না। সব খাতেই দাম বাড়া-কমায় ছিল মিশ্র প্রবণতা।
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা বিমা জালিয়াতির বড় ঘটনা ফাঁস
অভিযুক্ত ব্যক্তিদের অধিকাংশই আর্মেনিয়ান-আমেরিকান। গত বুধবার সকালে নিউইয়র্ক শহর এবং লস অ্যাঞ্জেলেসে অভিযান চালিয়ে তাঁদের অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া নিউ মেক্সিকো, জর্জিয়া এবং ওহাইয়ো থেকেও কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা ভুয়া ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করে রোগীদের পরিচয় চুরি করে চিকিৎসা বিমার অর্থ দাবি করেন। এভাবে তাঁরা প্রায় তিন কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার তুলে নিয়েছেন।
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
বিশ্ব গণমাধ্যমে ভূয়সী প্রশংসা
ব্রিটেনের প্রভাবশালী দৈনিক টেলিগ্রাফ-এ শ্রমিকদের উদ্ধারের প্রতিবেদনের শিরোনাম করা হয়েছে ‘সান হোসে খনিতে অলৌকিকতা’। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট-এর শিরোনাম ছিল ‘প্রার্থনা, কান্না ও উদ্যাপন’। সঙ্গে উদ্ধার হওয়া শ্রমিক ও তাঁদের স্বজনের আবেগঘন মুহূর্তের ছবি বড় করে প্রকাশ করা হয়েছে।
নিউইয়র্ক টাইমস উদ্ধারের ঘটনাকে ‘সত্যিকার অর্থে হূদয়স্পর্শী ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেছে। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, একেকজন শ্রমিককে উদ্ধারের পর সুড়ঙ্গের কাছে অন্য রকম দৃশ্যের অবতারণা হয়। দীর্ঘদিন পর স্বজনকে কাছে পাওয়ার কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত, শ্রমিকদের ‘নতুন জীবন’ ফিরে পাওয়া, হর্ষধ্বনি—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হওয়া আবেগঘন মুহূর্তগুলোতে অনেক বর্ষীয়ান প্রতিবেদককেও কেঁদে ফেলতে দেখা যায়। টাইমস সাময়িকী লিখেছে, চিলির সরকার সত্যিকার অর্থে এক রিয়েলিটি শো উপস্থাপন করেছে। ডাচ্ পত্রিকা ভোস্ক্রান্ত লিখেছে, এ ঘটনার আগে চিলির সান হোসে খনির নাম কজনই বা শুনেছে। কিন্তু এখন সারা বিশ্বের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু সেই সান হোসে।
‘সান হোসে খনি এলাকায় মনুষ্যত্বের চেতনার শক্তিকে সামনে তুলে এনেছে।’ শ্রমিক উদ্ধারের ঘটনাকে এভাবেই বর্ণনা করা হয়েছে ব্রিটেনের ডেইলি মিরর-এ। জার্মানির ডাই ভেল্ট পত্রিকা লিখেছে, হাজার হাজার মাইল দূরের ঘটনা টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তের মানুষকে নাড়া দেয়, এটা তার অন্যতম উদাহরণ। এতে আরও বলা হয়, ১০০ কোটিরও বেশি মানুষ টেলিভিশন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে এই উদ্ধার-তৎপরতা সরাসরি দেখেছে।
ফরাসি পত্রিকা লিবারেশন-এ উল্লেখ করা হয়, দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে খনি দুর্ঘটনার সফল সমাপ্তি প্রেসিডেন্ট পিনেরার জনপ্রিয়তা বাড়াবে।
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
ওবামা ও পেলিন দূর সম্পর্কের ভাইবোন!
ওয়েবসাইটের বংশগতিবিদদের গবেষণা থেকে জানা গেছে, ওবামা ও পেলিনের অভিন্ন পূর্বপুরুষের নাম ছিল জন স্মিথ। ধর্মযাজক স্মিথ সতেরো শতকে ম্যাসাচুসেটসের বাসিন্দা ছিলেন। ওবামা ও পেলিন দুজনই মায়ের দিক থেকে স্মিথের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
প্রেসিডেন্ট ওবামার একজন কড়া সমালোচক বেতার উপস্থাপক রাশ লিমবাহ। কিন্তু তিনিও নাকি ওবামার আত্মীয়। সতেরো শতকে আমেরিকায় আসা ভূমিমালিক রিচমন্ড টেরেল তাঁদের দুজনের অভিন্ন পূর্বপুরুষ।
অ্যানসেসটরি ডটকম সূত্রে আরও জানা গেছে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের সঙ্গেও ওবামা ও পেলিনের বংশের যোগসূত্র রয়েছে। জন স্মিথের শ্বশুর স্যামুয়েল হিংকলে ওবামা ও বুশের অভিন্ন পূর্বপুরুষ। অন্যদিকে এই হিংকলেই পেলিন ও বুশেরও অভিন্ন পূর্বপুরুষ।
এর আগে এই ওয়েবসাইটটি জানিয়েছে, পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারী ওয়ারেন বাফে ও অভিনেতা ব্র্যাড পিটের সঙ্গেও ওবামার বংশগত সূত্রে আত্মীয়তা রয়েছে। আরও জানা গেছে, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাংকলিন ডি রুজভেল্ট ও প্রয়াত প্রিন্সেস ডায়ানার সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে পেলিনের।
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
খনিশ্রমিকদের আমন্ত্রণ জানাবে তাইওয়ান
তাইওয়ানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী টিমোথি সাংবাদিকদের বলেন, ‘চিলিতে অবস্থিত আমাদের কার্যালয়ের মাধ্যমে আমরা আমাদের ইচ্ছার কথা জানাব। আমরা তাঁদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাব।’
বিরোধীদলীয় এক আইনপ্রণেতা (এমপি) প্রথম এই প্রস্তাব করেন। তিনি পরামর্শ দেন, তাইপেতে অনুষ্ঠেয় আন্তর্জাতিক ফুল প্রদর্শনীতে খনিশ্রমিকদের আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে।
এই প্রদর্শনী আগামী মাসে শুরু হবে। উল্লেখ্য, চিলির সঙ্গে তাইওয়ানের ভালো বাণিজ্যিক যোগাযোগ রয়েছে।
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
সৌভাগ্যের নম্বর ৩৩
ড্রিলার সরবরাহ কোম্পানির ব্যবস্থাপক মিখাইল প্রোয়েস্তাকিস বলেন, ‘শ্রমিকদের কাছে পৌঁছাতে আমাদের ৩৩ দিন লেগেছে। আবার সুড়ঙ্গের ব্যাস ছিল ৬৬ সেন্টিমিটার, যা ৩৩-এর দ্বিগুণ।’ তিনি বলেন, ‘আমি সংখ্যাতত্ত্বে বিশ্বাসী। সংখ্যা মিলে যাওয়ার মধ্যে একটি বিশেষ ব্যাপার আছে। এটি সৌভাগ্যের নম্বর।’
উদ্ধার পাওয়া শ্রমিক ডারিও সেগোভিয়ার বোন মারিয়া সেগোভিয়া বলেন, ‘৩৩-এর মধ্যেই যেন সব কিছু। এটা অলৌকিক ব্যাপার বলে মনে হচ্ছে।’
ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের মতে, ৩৩ বছর বয়সে যিশুখ্রিষ্টকে ক্রুশবিদ্ধ করে হত্যা করা হয়। অনেকেই আবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন, খনি থেকে শ্রমিকদের পাঠানো প্রথম চিরকুটের প্রতি। ওই চিরকুটটি স্প্যানিশ ভাষায় লেখা ছিল। যাতে বলা হয়েছিল, শ্রমিকরা বেঁচে আছেন। ওই বার্তাটিতে ৩৩টি অক্ষর ছিল।
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
৮ হাজার কোটি রুপির বাড়ি!
প্রসিদ্ধ ফোর্বস সাময়িকীর জরিপ অনুযায়ী, মুকেশ এখন বিশ্বের চতুর্থ ধনী ব্যক্তি। দুই হাজার ৯০০ কোটি ডলারের (প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি রুপি) সম্পদ রয়েছে তাঁর। এর আগে বিশ্বের সবচেয়ে বিলাসবহুল বাড়ির মালিক ছিলেন ভারতের অপর শিল্পপতি লক্ষ্মী মিত্তাল। ইংল্যান্ডের লন্ডনের কেনসিংটন প্যালেস গার্ডেনের ওই বাড়িটি তিনি কয়েক বছর আগে ৫৬০ কোটি রুপিতে কিনেছিলেন। আটলান্টিক মহাসাগরের একটি মনোরম দ্বীপের নামানুসারে মুকেশ তাঁর নতুন বাড়ির নাম অ্যান্টালিয়া রেখেছেন। ২৭ তলা বাড়ির মোট আয়তন চার লাখ বর্গফুট, উচ্চতা ৫৭০ ফুট। ২৮ অক্টোবর নতুন বাড়িতে পা রাখবেন মুকেশ ও তাঁর স্ত্রী নীতা আম্বানি। গৃহপ্রবেশ অনুষ্ঠানে ভারতের বিশিষ্ট শিল্পপতি ও বলিউডের তারকারা উপস্থিত থাকবেন।
এই বিলাসবহুল বাড়ির প্রথম ষষ্ঠ তলায় থাকছে গাড়ি রাখার স্থান। ১৬০টি বিলাসবহুল গাড়ি রাখা যাবে এখানে। তাঁর সবচেয়ে কম দামি গাড়িটির মূল্য এক কোটি রুপির ওপর। বাড়ির ছাদে থাকবে তিনটি হেলিপ্যাড। এটি তৈরি করতে সময় লেগেছে সাত বছর। বাড়ির ২৭তম তলায় থাকবেন মুকেশ ও নীতা। একই তলায় পাশের তিনটি কক্ষে থাকবেন তাঁর ছেলেমেয়ে আকাশ, অনন্ত ও ঈশা। বাড়িটিতে রয়েছে টেনিস কোর্ট, সুইমিং পুল, হেলথ ক্লাব, মিনি থিয়েটার, লাউঞ্জ, বলরুম ইত্যাদি। বাড়িতে নয়টি বিশেষ লিফট রয়েছে। মার্সিডিজের মতো গাড়িও তোলা যাবে এই লিফটে। গোটা বাড়ি সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য থাকবেন ৬০০ কর্মী।
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রীকে ‘হত্যার পরিকল্পনা’ ব্যর্থ
ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা আবিদ কাদরি বলেন, বুধবার একটি নিয়মিত তল্লাশির সময় ওই জঙ্গিদের বহনকারী গাড়ি আটকানো হলে তারা গুলি ছোড়ে। গোলাগুলিতে কেউ হতাহত হয়নি। তবে জঙ্গিদের মধ্যে দুজন পালিয়ে যায়। তিনি বলেন, ‘এই সন্ত্রাসীদের আটক করে বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ওপর হামলার পরিকল্পনা ব্যর্থ করেছি আমরা।’
পুলিশ জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের সবাই লস্কর-ই-জংভি গোষ্ঠীর সদস্য। তালেবান ও আল-কায়েদার সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে ওই গোষ্ঠীর। কাদরি বলেন, ধারণা করা হচ্ছে, বুধবার গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের অনেককেই গত বছর মুলতানে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ইন্টার সার্ভিসেস ইন্টেলিজেন্সের (আইএসআই) স্থানীয় দপ্তরে হামলার ঘটনায় জড়িত ছিলেন। ওই হামলায় ১২ জন নিহত হন।
তবে প্রধানমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে হত্যার পরিকল্পনায় তাঁরা কত দূর অগ্রসর হয়েছিলেন, সে ব্যাপারে কিছু বলেননি কাদরি। তিনি আরও জানান, গুরুত্বপূর্ণ বাঁধ, একটি সেতু ও সামরিক স্থাপনায়ও হামলা চালানোর পরিকল্পনা ছিল ওই সন্ত্রাসীদের।
অবশ্য পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ ধরনের হামলার পরিকল্পনার কোনো খবর তাদের জানা নেই। গত তিন বছরে পাকিস্তানে আত্মঘাতী হামলা ও বোমা হামলায় তিন হাজার ৭০০ জনেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। এসব হামলার বেশির ভাগই চালিয়েছে তালেবান ও আল-কায়েদার সদস্যরা।
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
আবেগে উচ্ছ্বাসে চিলি
সফলভাবে উদ্ধারকাজ শেষ করায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিকোলা সারকোজি, ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা ও পোপ ষোড়শ বেনিডিক্টসহ বিশ্বনেতারা চিলিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। শুভেচ্ছা জানিয়েছেন উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদেরও।
গতকাল স্থানীয় সময় রাত নয়টা ৫৫ মিনিটে শেষ ব্যক্তি হিসেবে উরজুয়াকে বের করে আনা হয়। শ্রমিকদের উদ্ধারে বিশেষ খাঁচা ‘ফিনিক্স’ থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধারকর্মীরা তাঁকে জাতীয় পতাকা দিয়ে জড়িয়ে ধরেন। এ সময় সেখানে উপস্থিত শ্রমিকদের স্বজন, উদ্ধারকর্মী, রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা, সাংবাদিকসহ হাজারো মানুষ একসঙ্গে চিলির জাতীয় সংগীত গেয়ে ওঠেন। বেজে ওঠে বিশেষ সাইরেন। আকাশে রংবেরঙের ৩৩টি বেলুন উড়িয়ে সবাই উল্লাস প্রকাশ করেন।
গত বুধবার স্থানীয় সময় মধ্যরাতে খনি থেকে প্রথম ব্যক্তি হিসেবে বের করে আনা হয় ৩১ বছর বয়সী ফ্লোরেনসিও অ্যাভালোসকে। এর প্রায় ২২ ঘণ্টা পর শেষ শ্রমিক হিসেবে ৫৪ বছর বয়সী উরজুয়াকে উদ্ধার করা হয়। উরজুয়া তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, ‘উদ্ধার অভিযানে সংশ্লিষ্টদেরসহ গোটা দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানাই।’ এ সময় সেখানে উপস্থিত চিলির প্রেসিডেন্ট সেবাস্তিয়ান পিনেরা তাঁকে জড়িয়ে ধরেন। তিনি উরজুয়াকে সত্যিকারের অধিনায়ক বলে অভিহিত করে বলেন, আটকে পড়া শ্রমিকেরা সাহস আর বিশ্বাসের উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। পিনেরা বলেন, ‘সারা বিশ্ব যা দেখার জন্য অপেক্ষা করছিল, আমরা সেই কাজটি দারুণভাবে শেষ করতে পেরেছি। চিলি এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ ও শক্তিশালী। বহির্বিশ্বেও আমাদের মর্যাদা বেড়েছে।’
চিলির খনিবিষয়ক মন্ত্রী লরেন্স গোলবর্ন উদ্ধার অভিযানে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, উদ্ধারকর্মীদের দক্ষতার কারণে উদ্ধার অভিযানে সময় অনেকটা কম লেগেছে। একেকজনকে বের করে আনতে এক ঘণ্টারও বেশি সময় লাগার কথা থাকলে গড়ে ৪৫ মিনিটের মতো লাগে। মন্ত্রী বলেন, ‘শুরুতে উদ্ধারকাজ শেষ করতে মোট ৪৮ ঘণ্টা সময় লাগার কথা বলা হলেও আমরা ২১ ঘণ্টা ৪৪ মিনিটে তা সফলভাবে শেষ করতে পেরেছি।’
মন্ত্রী লরেন্স জানান, সবচেয়ে বয়স্ক শ্রমিক মারিও গোমেজকে (৬৩) উদ্ধারে কিছুটা সমস্যায় পড়তে হয়েছে। ফুসফুসে সমস্যা থাকার কারণে তাঁকে বিশেষ সতর্কতায় উদ্ধার করা হয়।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেইমি মানালিস জানান, শ্রমিকদের মধ্যে একজন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন। দুজন দাঁতের সমস্যায় ভুগছেন। তবে উদ্ধার হওয়া প্রথম ২০ জনের মধ্যে ১৭ জনের অবস্থাই প্রত্যাশার চেয়ে অনেক ভালো রয়েছে।
খনিশ্রমিকদের তুলে আনার পর সবাইকে একটি হাসপাতালে রাখা হয়েছে। সেখানে দায়িত্বরত চিকিৎসক গিলার্মো সুইট জানান, দীর্ঘদিন খনির মধ্যে থাকার কারণে এই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শ্রমিকদের কিছুটা সমস্যা হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, এই উদ্ধার তৎপরতায় সারা বিশ্বের মনোযোগ ছিল। উদ্ধারকাজে শুধু উদ্ধারকর্মী বা চিলির সরকারের দৃঢ়প্রতিজ্ঞার বিষয়টিই ফুটে ওঠেনি, এই ঐক্য ও সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টা থেকে বিশ্বের জনগণ অনুপ্রাণিত হতে পারে।
চিলির উত্তরাঞ্চলের সান হোসে সোনা ও তামার খনি ধসে ৩৩ জন শ্রমিক খনির দুই হাজার ৪১ ফুট (৬২২ মিটার) নিচে আটকা পড়েন। গত ৫ আগস্ট ওই দুর্ঘটনা ঘটে।
About: ATM COX
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
গদ্যালোচনা- 'এল ডোর্যাডো সেরাফিনো!' by মীর ওয়ালীউজ্জামান
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
উপন্যাস- 'রৌরব' (চার ও শেষ পর্ব) by লীসা গাজী
ফরিদা টের পেলেন গলার কাছে কিছু একটা দলা পাকিয়ে আছে, ঢোক গিলতে কষ্ট হচ্ছে। গলা পরিষ্কার করতে চেষ্টা করলেন একবার—দ্বিতীয়বার গলা খাকারি দেয়ার শব্দে মুখলেস সাহেব চোখ মেলে তাকালেন। ফরিদাকে চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্কুলের ছাত্রের মতো প্রায় এ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে পড়তে চেষ্টা করলেন। যেন না দাঁড়ালে কড়া হেড মিস্ট্রেস তাকে এক্ষুনি নিল-ডাউন করিয়ে রাখবে। কিন্তু শরীর তাকে সেই অনুমতি দিলো না। তাই কেমন ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলেন।
—চা খাইবা?
মুখলেস সাহেবের ঘুমের ঘোর তখনও কাটে নাই। চোখ কচলে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলেন। —চা খাইবা না কি?
—হ্যাঁ খাবো। লাভলি আসছে?
—হ্যাঁ হ্যাঁ, চইলা আসবে। চলো চা খাই মাথাটা ধরা ধরা।
কোনো রকমে লাভলির প্রসঙ্গ ধামাচাপা দিয়ে বারান্দা থেকে বের হলেন। প্রায় সারাটা দিন আজকে তার বারান্দাতে বসেই কাটাতে হয়েছে। বেতের চেয়ারে এক নাগারে বসে থেকে কোমর থেকে শরীরের উপরের অংশে রক্ত চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে তাই একটু তাল হারালেন।
—কী হইছে? মাথা ঘুরে না কি?
—না না, অনেকক্ষণ বইসা ছিলাম…।
ফরিদার পাশ দিয়ে কুণ্ঠিত মুখলেস সাহেব বেরিয়ে গেলেন, ফরিদা তার পিছে পিছে গেল। খাবার টেবিলে চা দেয়া হয়েছে। সিঙ্গারাও হয়তো এক্ষুনি ভাজা হয়েছে কারণ ছয়টা সিঙ্গারা থেকে ছয়টা চিকন ধোঁয়ার সূঁতা সোজাসুজি উপরে উঠে যাচ্ছে। ফরিদা চেয়ার টেনে বসলেন। সিমেন্টের মেঝেতে ছেঁচড়ে আসায় বিশ্রী রকম আওয়াজ হলো। সেই আওয়াজ শুনে মুখলেস সাহেব তার চেয়ারটা সাবধানে টানলেন। টেবিলে সিঙ্গারা দেখে এমনিতেই তার মেজাজ ফুরফুরা হয়ে গেছে।
—দুপুর থিকা ঘুমাইতেছো। যাও, হাত-মুখ ধুইয়া সুন্দরমতো আইসা বসো।
মুখলেস সাহেব কোনো তর্কে গেলেন না। চেয়ার আবার যথাস্থানে রেখে হাত-মুখ ধুতে গেলেন।
—খালাম্মা ছোট আপারে ডাকমু? সিঙ্গারা জুরায় যাবে।
ফরিদা কী যেন ভাবলেন। কোনো রকম শব্দ এখন সহ্য হবে না। ‘ডাকো’ বললেই রাবেয়ার মা বীরবিক্রমে বিউটির দরজার উপর ঝাঁপিয়ে পড়বে।
—থাক, দরকার নাই। ঘুমাইতেছে মনে হয়, একটু পরে নিজেই উইঠা যাবে। আপার জন্য ডাইল বাইটা রাইখো।
—জি, ছোট আপা বলছেন।
মুখলেস সাহেব হাত-মুখ ধুয়ে ফিরে এলেন, যথাসাধ্য চেষ্টা করলেন চেয়ারে শব্দ না করে বসতে। মুখ তখনও ভেজা ভেজা। ফরিদা তার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। তারা দু’জনেই দু’টা করে সিঙ্গারা খেলেন। গ্লাসভর্তি পানি খেলেন। তারপর চায়ে ছোট ছোট চুমুক দিতে লাগলেন। ফরিদা প্রত্যহ যেমন টুকটাক সাংসারিক কথাবার্তা বলেন, আজকেও সেই চেষ্টা করলেন।
—বাড়িতে যাবা কবে ঠিক করছো?
—মিয়াভাই ফোন করলে রওয়ানা দিতে বলছেন। তারা কিনার মানুষ ঠিক কইরা আমারে খবর দিবেন।
—কী কিনার মানুষ ঠিক করবেন?
—দাদা মশাইয়ের কিছু ভালো ধানী জমি আছে সেইগুলা।
—এখনই বিক্রি করবা কেন, রাইখা দেও পরে কাজে লাগবে।
—এতদিন তারা কিছু দিতেই চায় নাই। এখন না গেলে সবই হাতছাড়া হবে। বেশি দিন তো না, চার পাঁচ দিন।
—তাইলে আমরা সবাই মিলাই যাই চলো।
ফরিদার প্রস্তাবে মুখলেস সাহেব বাক্যহারা হলেন। তিনি মুখভরা চা গিলতে ভুলে গেলেন। সকাল থেকে চেনা ফরিদা দ্রুত বদলে যাচ্ছেন। এতটাই দ্রুত যে তার পরিবর্তনের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। এরকম প্রস্তাব তাদের প্রায় বিয়াল্লিশ বছরের বিবাহিত জীবনে তিনি আর শোনেন নাই। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রতিক্রিয়া কেমন হওয়া উচিৎ সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই তার নাই। কোনো রকমে চা গিলে কৃতার্থ হওয়ার মতো একটা ভাব করলেন।
—যাওয়া যাবে? থাকার জায়গা ফায়গা আছে?
—আছে নিশ্চয়ই। দেখি, মিয়াভাই ফোন করলে জিজ্ঞাস কইরা দেখব।
—হ্যাঁ দেইখো।
মেয়ে দু’টাকে নিয়ে কোথাও অদৃশ্য হয়ে যেতে পারলে তাই যেতেন ফরিদা। হঠাৎ করে গ্রামে গিয়ে থাকার ভাবনা তার কাছে সে কারণেই বেশ মনোঃপুত হলো।
* * *
৯ নভেম্বর, শুক্রবার, ২০০৭। দিনটা শীত-দিনের সমস্ত চরিত্র ধারণ করে দ্রুত ১০ নভেম্বরের দিকে যাত্রা শুরু করেছে। সন্ধ্যা নেমেছে ১১৫/৩ মনিপুরি পাড়ার গলির উপর। দূরে কোনো বাসা থেকে কচি বাচ্চার সুতীক্ষè কান্নার শব্দ সন্ধ্যার ফিকে আলো আঁধারির সাথে মিলেমিশে যাচ্ছে। স্পষ্ট করে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না—না আলো, না আঁধারি, না কান্না। শুধু একটা চাপ ধরা অস্বস্তি ফরিদার শিরায় শিরায় অনুভূত হচ্ছে। বেশ অনেকক্ষণ হলো শোবার ঘরের জানালার পাশে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। মাঝে মধ্যে যদিও জানালার পাশের বেতের চেয়ারটায় একটু বসবেন ভাবছেন, কিন্তু বসছেন না। জানালা দিয়ে গলির রাস্তা বেশ অনেক দূর পর্যন্ত দেখা যায়। তিনি তাকিয়ে আছেন। রাত নামছে টের পাচ্ছেন। রাতের যা চরিত্র—সব কিছুকে অন্তত তিনগুণ বাড়িয়ে দেয়। জ্বর বাড়ে রাতে, ব্যথা বাড়ে রাতে, ভয় বাড়ে রাতে, প্রেম বাড়ে রাতে। তার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটছে। ভয়ে কাঁটা হয়ে আছেন। মেয়েটা ফিরবে কি ফিরবে না সেই সম্ভাবনার যন্ত্রণা তাকে ছিঁড়েখুঁড়ে ফেলছে। দোয়া পড়তেও ইচ্ছা করছে না। এক ধরনের বোবাবোধ গিলে ফেলেছে। কিছুই তিনি অনুভব করছেন না আবার করছেনও।
গলি দিয়ে যা-ই যাচ্ছে সেদিকে তার সমস্ত মনোযোগ, দৃষ্টি বিঁধিয়ে দিচ্ছেন। একটা রিকশা যাচ্ছে—তিনি টানটান হয়ে গেলেন, একটা সিএনজি—তার দম বন্ধ হয়ে এলো, আবার একটা রিকশা—তিনি স্থির, একটা কালো ট্যাক্সি—তার পুরো শরীর দু’পায়ের আঙুলে খাড়া।
এভাবে কতক্ষণ কেটেছে কে বলতে পারে। গলির মধ্যে একটা সিএনজি এগিয়ে আসছে, তিনি আশাহীন চোখে তাকিয়ে থাকলেন। সিএনজি তাদের গেট পার হতেই বুকের ভিতরের জমাট শ্বাস ফুস করে বেরিয়ে গেলো। সিএনজিটা অল্প এগিয়েই ঝাঁকিসহ থেমে গেল। ফরিদা সমস্ত সুখ মানত করলেন—খোদা লাভলি যেন হয়, জীবনে আমি আর কিছু চাই না। অনন্তকাল কেউ নামল না। তারপর এক সময় মেয়ের পরিচিত ক্লান্ত অবয়ব চোখে পড়ল, মাথা নুইয়ে সিএনজি থেকে নামল, ধীরে গেইট পযন্ত হেঁটে এল তারপর কোলাপসিবল গেইটের পেটের ছোট গেইট খুলে মাথা নিচু করে বাড়িতে ঢুকলো। মেয়েটা মাথায় শাল জড়িয়ে নিলো। ফরিদা স্পষ্ট দেখতে পেলেন লাভলি মাথা নিচু করে মুহূর্তক্ষণ দাঁড়ালো—এইটুকু দেখে ফরিদা ধীরে চেয়ারে বসে পড়লেন। নিজেকে ধাতস্ত হবার জন্য কিছুটা সময় দরকার। বুকের ভিতরে যে ঘোড়দৌড় চলছে তার লাগাম ধরতে হবে একটু একটু করে। কষে টান দিলে ছিঁড়ে যেতে পারে।
বেল বাজছে, পিচ্চি দৌড়ে তার ঘরের সামনে এল।
—নানি, বড় খালা আসছে।
ফরিদা তখন চেয়ারে বসা, সামলে উঠতে কষ্ট হচ্ছে।
—ভিত্রে আয়।
বহু কসরত করে মাথা উঁচু করলেন। আঁচলের প্রান্ত থেকে চাবির গোছা খুলে দিলেন। পিচ্চি ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল। এখন, এখন কী হবে?
—বড় খালা আসছেন। আমি যে ডরাইছি!
‘আমি’ শব্দটায় লাভলির কান আটকে গেল। তার মানে কি এই যে বাসার অন্য কেউ ভয় পায় নাই। ওর কি এতে নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত। অবশ্য এত শিঘ্রী নিশ্চিন্ত হওয়াটা ঠিক হবে না।
—আম্মা কই?
—বাসাতই।
লাভলির আর কোনো প্রশ্ন মাথায় এলো না—সত্যি কথা বলতে কী, কোনো কিছু সম্পর্কেই ও এই মুহূর্তে বিন্দুমাত্র আগ্রহ বোধ করছে না। তবে এই মুহূর্তে তার বাথরুমে যাওয়াটা জরুরি পর্যায়ে পড়েছে। বাসায় ঢুকে কারও মুখোমুখি হ’তে ইচ্ছা করছে না লাভলির। ও পিচ্চিকে পাশ কাটিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে ঠিক করল, সোজা নিজের ঘরে গিয়ে বাথরুমে ঢুকে যাবে।
—(আপুমনি, উত্তম প্রস্তাব)—।
—তুমারে কেউ জিজ্ঞাস করছে?
মনে মনে মাথার ভিতরের লোকটাকে কড়া দাবড়ানি দিলো। দোতালায় উঠে দেখলো বাসার দরজা হাঁ করে খোলা কিন্তু আলো জ্বলছে না। প্রায়োন্ধকার হয়ে আছে জায়গাটা, এই বেশ সুবিধা হলো লাভলির। কাউকে জানান না দিয়ে বাসায় ঢুকলো। নিজের ঘরের দিকে যেতে গিয়ে মায়ের ঘর পার হলো, ভিতরে আলো জ্বলছে কিন্তু ফরিদার আভাস পাওয়া যাচ্ছে না। আম্মা নিশ্চয়ই জানেন ও এসেছে, তাহলে ঘরের মধ্যে ঘাপটি মেরে আছেন কেন? তার উপর তো এতক্ষণে ঝাঁপিয়ে পড়ার কথা। আর সবাই বা কোথায়—আব্বা, বিউটি। বাড়িটা ঠাণ্ডা, অসাড় হয়ে আছে। লাভলি ডানে বাঁয়ে তাকালো না। মাথা নিচু করে ‘ইয়া নফসি’ ‘ইয়া নফসি’ পড়তে পড়তে ঘরের ভিতর ঢুকে গেল। বিছানার উপর ধপাস করে বসল। যেন তার জ্ঞানহীন শরীরটাকে কেউ বিছানা অব্দি এনে হঠাৎ করে ছেড়ে দিয়েছে। ‘আহ্’ শব্দে ওর সচেতন অস্তিত্ব ছড়িয়ে পড়লো ঘরে। আলো জ্বালালো না, দরজা ভিড়ালো না, বাথরুমে গেল না—বিছানার উপর বসে রইল। যদিও বাথরুমে যেতেই হবে অবস্থা। এক সময় উঠে ঢুকে গেল বাথরুমে, অনেকক্ষণ ধরে মুখ ধুল—পার্কের ধূলা-বালি ঘষে ঘষে পরিষ্কার করল। শেলোয়ারে আটকে রাখা ছুরিটা বের করে খয়েরি কাগজের মোড়ক খুলে ফেলল লাভলি—কী সুন্দর ছুরি! নাহ্, আজকে একা একা বাইরে যাওয়া সার্থক। বিউটি দেখলে খুশিতে ঝিলিক দিবে। খুব বেশি পছন্দ করলে নাহয় বিউটিকে দিয়েই দিবে ছুরিটা। ওদের দু’জনের একজনের কাছে থাকলেই তো হলো। ছুরিটা কোথায় লুকিয়ে রাখা যায় লাভলি সেটাই এখন ভাবছে। বিছানার জাজিমের নিচে রাখা যায়। কিন্তু রাবেয়ার মা বিছানা করতে গিয়ে খুঁজে পেলে তুলকালাম বাঁধাবে। অবশ্য একদম মাঝখানে রাখলে হদিস পাবে না। সেটাই করবে ঠিক করলো লাভলি।
সব শেষে ওযু করে নিলো—এখন দীর্ঘ সময় জায়নামাযে কাটানো যাবে। সারাদিনের নামায একসাথে ক্বাযা পড়তে হবে—সময় তো লাগবেই। ভালোই হবে, আশা করা যায় অন্তত নামাযের সময় ফরিদা তার উপর চড়াও হতে পারবেন না।
বাথরুম থেকে বেরিয়ে ঘরের অন্ধকারে থৈ পেলো না লাভলি। আলো জ্বালিয়ে দেয়া যায় কিন্তু দিতে ইচ্ছা করছে না। ওর জন্য কী ভয়াবহ শাস্তি অপেক্ষা করে আছে তা একমাত্র ফরিদা জানেন আর আল্লাহ জানেন। অন্ধকারের এই আড়ালটাই তাই লাভলির জন্য ভালো মনে হলো। অন্ধকারেই ড্রেসিং টেবিলের প্রথম ড্রয়ার খুলে তার ভিতরের রাজ্যের জঞ্জালের নিচে ছুরিটা আপাতত লুকিয়ে রাখলো। এখন সবচেয়ে নিরাপদ কাজ নামাযে দাঁড়িয়ে যাওয়া। কে যেন কবে বলেছিলো অন্ধকারে নামায পড়া যায় না—কে আর বলবে ফরিদাই বলেছিলেন সম্ভবত, কথাটা মনে পড়তে দোটানায় পড়ে গেলো লাভলি। শেষমেশ আলো জ্বালিয়ে নামাযের জায়গায় দাঁড়ালো। যা হবার হবে, মেরে তো আর ফেলতে পারবে না। মেরে ফেললে অবশ্য এর চেয়ে ভালো ছিল। নামাযে বসে লাভলি সত্যিকার অর্থে খোদার কাছে আত্মসমর্পণ করতে চাইল। নামায পড়তে পড়তেই টের পেল বিউটি ঘরে ঢুকে বিছানার উপর বসেছে। তখনও ওর অনেক রাকাত নামায বাকি। কিন্তু বিউটি ধৈর্যহারা হলো না। সালাম ফিরিয়ে লাভলি খেয়াল করলো বিউটি মাথা নিচু করে ঝিম ধরে বসে আছে। ও যে নামাযের বিছানা থেকে তাকে লক্ষ্য করছে তাও টের পেল না সে।
প্রায় চল্লিশ মিনিট পর লাভলি মোনাজাতে বসলো। হাত তুলে খোদার কাছে ও কিছুই চাইতে পারল না। হঠাৎ বিড় বিড় করে বললো, ‘আল্লাহ আম্মা যেন লাল কাপড়টা পছন্দ করেন’! মিনিট পাঁচেক শূন্য মনে বসে থাকার পর মোনাজাত শেষ করলো। জায়নামাযে বসেই লাভলি বিউটির দিকে মাথা ঘুরিয়ে দেখল, একইভাবে মাথা নিচু করে বসে আছে তখনও।
—আম্মা কই?
কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। মাস কয়েক ধরে মাঝে মধ্যেই বিউটিকে এরকম আনমনা দেখাচ্ছে। আজকে হয়তো বেচারার উপরে অনেক ধকল গেছে। ফরিদা সমস্ত রাগ হয়ত তার উপরেই ঝেড়েছেন।
—আম্মা কই?
দ্বিতীয়বার বলার পর বিউটি মাথা তুলে ওর দিকে তাকাল।
—তুমি কই গেছিলা?
—রমনা পার্কে।
—ইয়ার্কি মারো?
—ইয়ার্কি মারবো কেন, সত্যি।
আসলেই সত্যি কি না শুধু ওকে লক্ষ্য করে নিশ্চিত হতে চাইলো বিউটি। চোখ সরু করে লাভলির দিকে তাকিয়ে রইলো।
—রমনা পার্ক চিনো তুমি? কেমনে যাইতে হয় জানো, আন্দাজে কথা কও যে। আমিই তো চিনি না।
—চিনা লাগবে কেন, সিএনজিরে বলছি নিয়া গেছে।
লাভলি নামায থেকে উঠলো এবং জায়নামায ভাঁজ করে আলনার উপর রাখল। বিউটি বিছানায় বসে চোখের দৃষ্টিতে বোনকে অনুসরণ করছে। বোনের মধ্যে আমূল বদল টের পাচ্ছে, বাইরের হাওয়া মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কি একজনকে এতটা বদলে দিতে পারে? ভীরু, পায়ের নিচের মাটি সব সময় দুলছে এরকম একটা মেয়ে এখন চোখে চোখ রেখে অবলীলায় বলছে ও না কি রমনা পার্ক গেছিল—ওর ধারণা আছে ফরিদা বিষয়টা জানলে কী গতি হবে ওর? চোখে চোখে বোনকে অনুসরণ করছে আর বিউটি ভাবছে—যতই ভাবছে ততই নিজের উপর ঘৃণায় ধিক্কারে মরে যেতে ইচ্ছা করছে—সে তাহলে লাভলির চেয়েও গাড়ল, অপদার্থ—বিউটির চোখ সাদা হয়ে গেল। ছুটে গিয়ে বোনের চোখ-মুখ ফালা ফালা করে দিতে ইচ্ছা করলো।
লাভলি টের পাচ্ছে বোনের দৃষ্টি ওর পিছে পিছে ঘুরছে। বাসায় ফিরেছে ঘণ্টাখানেক তো হবেই কিন্তু ফরিদার পাত্তা পাওয়া যাচ্ছে না—ব্যাপারটায় ও যার পর নাই বিস্মিত হচ্ছে। ধীর পায়ে দরজার কাছে এসে উঁকি দিলো। রান্নাঘরে আলো জ্বলছে, কিন্তু খাবার ঘরে কেউ নাই, মানে কোথাও কেউ নাই—অন্তত লাভলি দেখতে পাচ্ছে না। ভয়ঙ্কর ভূতের কোনো ছবির মতো হয়ত যখন ও সবচাইতে বেশি বেখেয়াল, ঠিক তখন কেউ ঘটাং করে ওর টুটি ঠেসে ধরবে মাটির সাথে এবং ধরেই থাকবে। আশ্চর্য ঘটনা এইসব চিন্তা মনে আনাগোনা করা সত্ত্বেও ওর একটুও ভয় লাগছে না। শুধু কেমন এক ধরনের ‘নাই’ অনুভূতি ওকে আগাপাছতলা মুড়ে রেখেছে।
দরজার কাছ থেকে সরে আসলো লাভলি। ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সময় নিয়ে বেণী খুলতে লাগলো।
—তুমার এত বড় সাহস কেমনে হইল?
বিউটির মুখ থেকে শব্দ না হলকা বের হলো। হলকা লাভলির প্রায় গা ছুঁয়ে গেল—আঁচ লাগলো ঠিকই কিন্তু পোড়াতে পারল না।
—কীসের সাহস?
—সকালে গেলা সন্ধ্যায় ফিরলা।
বিউটির সাথে কথা বলতে একদম ইচ্ছা করছে না লাভলির। বেণী খুলছে স্লো মোশানে, পুরো বাড়িটা দুলছে ওর সামনে স্লো মোশানে। ওর অনুপস্থিতিতে সারাদিন সবার কী দশা গেছে, ফরিদা কেন এখনও ওর খোঁজ করছেন না, কখন থেকে ওকে ঘরবন্দি করা হবে, না কি আজকের অপরাধের জন্য নতুন কোনো শাস্তির বিধান চালু হচ্ছে—এইসব বিষয়ের প্রতি লাভলি দ্রুত আগ্রহ হারিয়ে ফেলল। মনে প্রাণে চাইছে বিউটি যেন এই ঘর থেকে বেরিয়ে যায় এবং এখনই।
—বিউটি, আমার মাথা ব্যথা শুরু হইতেছে—তুই যা, আমি লাইট নিবায়ে শুয়ে থাকবো।
—কী?
—আমি লাইট নিবায়ে শুবো, তুই যা।
বিউটি ওর স্পর্ধায় স্তম্ভিত হয়ে গেল। কতোক্ষণ তাকিয়ে ছিল জানে না। হঠাৎ ক্ষোভে দিশাহারা হয়ে গেল, কাণ্ডজ্ঞান সম্পূর্ণ লুপ্ত হল তার। খাট থেকে নেমে ঘোড়ার মত মাটিতে পা ঠুকতে লাগল আর চীৎকার করতে লাগল।
—তুমি কই গেছিলা একক্ষণ বলবা। একক্ষণ। আমি কুনোদিন কুথাও যাই নাই। সারা শহর তুমি ঢ্যাং ঢ্যাং কইরা ঘুরবা। মগের মুল্লুক পাইছো? আম্মা এখনও তুমারে কিচ্ছু বলেন নাই, কেন বলেন নাই?—আম্মাই তুমারে পাঠাইছিলো, কই পাঠাইছিলো বলো?
চুল হেলাফেলা করে আঁচড়ালো লাভলি, তারপর বোনের তাণ্ডব নৃত্য আগ্রহহীন চোখে দেখল, একটা হাইও তুলল আর এই হাই তোলাতেই কাল হলো। তাণ্ডব দশা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ল। ঘরজুড়ে দাপিয়ে বেড়াতে লাগল বিউটি—মাঝে মধ্যে থামে কিছু বলে, দাপায়, ফোঁসে আবার কিছু বলে।
—লাগে যেমুন, দুনিয়া উদ্ধার কইরা আসছো। আমার আলাপে তুমার হাই আসে… তুমার ফুটানি আজকে বার হবে। তেল কমানো হবে আজকে… সবাই একটা মজা পাইয়া গেছে… দেখাইতেছি, আমিও দেখাইতেছি।
দাপানো বন্ধ করে বিউটি ওর উপর এক রকম হুমড়ি খেয়ে পড়লো। লাভলি ড্রেসিং টেবিলের সামনে—তাড়া খাওয়া বাঘের মতো বিউটিকে ওর দিকে ছুটে আসতে দেখে ঘুরে দাঁড়ালো। আয়নায় ওর আঁচড়ানো চুলের ঢল পিঠ ছাপিয়ে পড়েছে তারই পাশে বিউটির সাদাটে চোখের হিংস্রতা, তেড়ে আসার জন্য সিংহের মতো ফুলে থাকা চুল আর দু’হাতের মারমুখী উগ্রতা—আয়নায় চকিতে নিজের এই রূপ চোখে পড়লো বিউটির, মুহূর্তে থমকে দাঁড়ালো, চুপচাপ ঘর থেকে বের হয়ে গেলো।
বিউটির চীৎকারে রান্নাঘরের দরজার কাছে রাবেয়ার মা এসে দাঁড়ালো। হাতে রুটি বেলার বেলুন। বারান্দা থেকে পিচ্চি দৌড়ে আসলো মজা দেখার জন্য। কিন্তু ফরিদা বা মুখলেস সাহেব দু’জনের কেউই সামনে এলেন না। যদিও ফরিদা তার ঘর থেকে বিউটির আস্ফালন, চেঁচামেচি সবই শুনছিলেন, কিন্তু এক ইঞ্চি নড়লেন না। সেই যে বেতের চেয়ারটায় বসেছিলেন, বসেই থাকলেন। দুই মেয়ের কারুরই মুখোমুখি হবার শক্তি তার নাই। তিনি টের পাচ্ছেন বিউটি এবার তার দিকে তেড়ে আসছে। ইচ্ছা করলেই উঠে দরজাটা বন্ধ করে দিতে পারেন—ইচ্ছাটাই করল না।
—আম্মা, আমি জানতে চাই বাসায় কী হইতেছে? আপা আসছে এক ঘণ্টার উপরে, সারাদিন উধাও থাইকা এখন আরামসে বইসা আছে, চুল আঁচড়াইতেছে, মুখে ক্রিম মাখতেছে—আর আপনে ঘরের মধ্যে ঘাপটি মাইরা বইসা আছেন! কেন? আপারে জিজ্ঞাস করবেন না—এতক্ষণ কই ছিলো, কী কইরা আসছে? না কি আপনে কুথাও পাঠাইছিলেন তারে? কই পাঠাইছিলেন?
—ঘর থিকা তুই যা। একক্ষণ যাবি।
—না যাব না। কী করবেন? ন্যায্য কথা জিজ্ঞাস কইরা দোষ কইরা ফেলছি। আরেক মেয়ে যে আল্লায় মালুম কী কইরা বাসায় ফিরছে ওরে কিছু বলবেন না, আমার উপরে যতো চোটপাট। কেন বলবেন না আমি সেইটাই জানতে চাই।
—আমার ইচ্ছা আমি বলমু না। তোরে কৈফিয়ত দিতে হবে? আমি যা করছি, করছি—তার জন্য আমার আল্লারেও কৈফিয়ত দিতে হবে না। আমি সবার কৈফিয়ত নিবো। বান্দির বাচ্চা বান্দি, আমারে জিগাইতে আসে। দাপরানি দেখো তার, শয়তান—বাড়িতে যাত্রা শুরু করছে। … তোরা মরছ না কেন?… বার হ ঘর থিকা, বার হ…
নদীর কুল ছাপানো পানির মত কথার তোড় ফরিদার অন্তরাত্মা ছিঁড়ে বেরিয়ে এলো। যতটা না জোরে তার চেয়ে হাজারগুণ বেশি ক্ষোভে আর ক্রোধে। সেই মুহূর্তে পুরো বাড়িটা জমে ঠাণ্ডা মেরে গেল—বিউটিও পাল্টা ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য প্রস্তুত ছিল কিন্তু ফরিদার মুখের দিকে তাকিয়ে গুটিয়ে গেল, ঘর থেকে বেরিয়ে এল ফুসতে ফুসতে। ফরিদা দরজা লাগিয়ে দিলেন।
মায়ের ঘর থেকে বের হয়ে খাবার ঘরে এসে বিউটি জোরে জোরে শ্বাস ফেলতে লাগলো আর তার মনে হলো সে বিশাল একটা মাঠের মাঝখানে বান্ধবহীন দাঁড়িয়ে আছে। মাঠটা ধীরে কিন্তু টের পাবার মতো দ্রুততায় চারপাশ থেকে তার দিকে এগিয়ে আসছে এবং সে খুব শীঘ্রী মাঠে, ঘাসে, হাওয়ায় বিলীন হয়ে যাবে। সে মরিয়া হয়ে এদিক ওদিক তাকাতে গিয়ে দেখলো বারান্দার দরজার আড়ালে মুখলেস সাহেব দাঁড়িয়ে তাকে দেখছেন।—এবং নিশ্চিত করে বলা যায় মুখলেস সাহেবের পাশে পিচ্চি দাঁড়িয়ে আছে। সে টের পেলো বিভিন্ন ঘর থেকে সবাই তাকে দেখছে। আপার ঘর আলতো ভিড়ানো, কিন্তু সে হলফ করে বলতে পারে ওর যাবতীয় মনোযোগ এখন সে কী করছে সেইদিকে। কিন্তু বিউটির সব রাগ গিয়ে পড়লো মুখলেস সাহেবের উপর। এই মেনীমুখো লোকটা কি আসলেই তার বাবা। এত তেলতেলা পিচ্ছিল একটা লোক—বিউটির গা গুলিয়ে ওঠে।
—আপনে দরজার চিপায় কী করেন? কুনু কাজে-কামে নাই, কিন্তু সবখানে নাক দিয়া বইসা থাকবে। আস্তা ইয়া…
—বিউটি থাপড়ায়া তোর আমি দাঁত ভাঙবো। বাপের সাথে কেমনে কথা বলতে হয় তাও শিখে নাই। ইবলিশের বাচ্চা।
ফরিদা ঘরের ভিতর থেকে চীৎকার করে উঠলেন। বিউটি একদম চুপ মেরে গেল শুধু বারান্দার দরজার পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা মুখলেস সাহেবের দিকে পলকহীন তাকিয়ে রইল, বিউটির চোখ দু’টা ধ্বকধ্বক করছিলো। সে যেখানে দাঁড়িয়েছিল সেখান থেকে মুখলেস সাহেবের মুখ দেখা যাচ্ছে না, শুধু গায়ের চাদর দুলতে দেখা গেল। এক সময় মুখলেস সাহেব নড়ে উঠলেন, চাদরসহ অদৃশ্য হলেন। বিউটিও নিজের ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল। কিন্তু স্বভাবসুলভ বিকটা শব্দ তুলল না—দড়াম করে দরজা লাগাল না কিংবা ঠাস করে কপাট ফেলল না। পা টিপে টিপে যথেষ্ট সাবধানতা মেনে নিঃশব্দে ছিটকিনি তুলল। যেন এই বাড়িতে মৃত্যুপথযাত্রী কোনো রোগী ঘুমিয়ে আছেন, এতটুকু নড়াচড়ায় তার ঘুম ভেঙে যাবে আর বেঁচে থাকার জন্য এই ঘুমটুকুর খুব বেশি দরকার। রাবেয়ার মার খুব ভয় লাগছে। খালুজানের জন্য আটার রুটি চার পাঁচটা বেলে রেখেছে, খেতে বসলে গরম গরম সেঁকে দেবে। আপাতত হাতে আর কোনো কাজ নাই। সারা বাড়ি কবরের মতো ঠাণ্ডা মেরে গেছে। এতটাই ঠাণ্ডা যে বারান্দা থেকে একটানা ঝিঁঝির ডাক রান্নাঘর থেকেও শোনা যাচ্ছে। মাঝে মধ্যে ছেদ পড়ছে আবার শুরু হচ্ছে। বারান্দার দরজা বন্ধ করে আসা দরকার। মুখলেস সাহেব কিছুক্ষণ আগে বসার ঘরে গিয়ে বসেছেন। বারান্দায় মনে হয় ঠাণ্ডা লাগছিল। গরম চাদরে গা মাথা জড়িয়ে রেখেছেন। বারান্দার দরজা খোলা দেখলে ফরিদা নির্ঘাত খেঁকিয়ে উঠবেন। কিন্তু রাবেয়ার মা প্রাণে ধরে যেতে পারছে না। আজকে কী যেন হচ্ছে, বদ বুঁ ঘিরে ধরেছে বাসাটা আর থেকে থেকে শরীরে কাঁপুনি ধরছে। পিচ্চিও রাবেয়ার মার পাশে চুপ করে বসে আছে। তার শীত করছে, হাত-পা হীম হয়ে যাচ্ছে আর মনে হচ্ছে কেউ না কেউ তাকে ধরে বেদম ধোলাই দিবে।
টেবিলে খাবার দিবে কি না রাবেয়ার মা বুঝতে পারছে না। গরম করতেও তো সময় লাগবে। রুটিগুল সেঁকে ফেলা দরকার। সে ভীষণ একটা পেরেশানির মধ্যে পড়েছে।
—পিচ্চি উঠ, টেবিল লাগা গিয়া।
—আইজকা কেউ খাইতো না।
—খাইতো না?
—খাইতো না।
—আমরা কী করতাম? আমার পেট ভুক লাগছে।
—আমারও।
দু’জন মানুষ পেটে ক্ষুধা নিয়ে রান্নাঘরে বসে রইল এক সময় দু’জনেরই ঝিমুনি এল। এর মধ্যে কতটা সময় পেরিয়ে গেছে কেউই জানে না। তবে রাত গভীর হচ্ছে এটা বোঝা যায়। শীতের রাত, কুয়াশার আড়ালে চলে গেল।
প্রথম ফরিদার ঘরের দরজা হাট করে খুলে গেল। অন্য দিনের মতো নিজেকে স্বাভাবিক রাখলেন, রান্নাঘরে ঢুকে দেখলেন পিচ্চি আর রাবেয়ার মা ঝিমাচ্ছে। রাবেয়ার মা’র মাথা দেয়ালে ঠেস দেয়া আর পিচ্চি দুই হাঁটুতে দুই হাত লম্বা করে রেখে মাঝখানে মাথাটা ছেড়ে দিয়েছে। দু’জনের দিকে ফরিদা মুহূর্তক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন তারপর সজাগ করলেন।
—রাবেয়ার মা টেবিলে ভাত বাড়ো।
রাবেয়ার মা’র মাথাটা কেঁপে উঠল, ধড়মর করে উঠে বসল। পিচ্চি হাত দু’টা গুটিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল।
—টেবিল লাগা, পানি দে। জলদি কর, যা—অনেক রাত হইছে।
পিচ্চির মধ্যে কোনো তাড়া দেখা গেল না। কিন্তু রাবেয়ার মা তড়িঘড়ি শুরু করে দিল। ঘুম ঘুম চোখে সে চুলা জ্বালিয়ে তাওয়া বসাল রুটি সেঁকবার জন্য। তার হঠাৎ ভীষণ শীত করছে। গায়ের চাদর ভাল করে জড়িয়ে নিল। শীতে দুই কাঁধ বুকের দিকে চেপে আসছে, সে একটু পর পর তাওয়ার উপর হাত মেলে ধরছে আবার হাতে হাত ঘষছে। রাবেয়ার মা’র সাথে ফরিদাও হাত লাগালেন। পাশের চুলা জ্বালিয়ে তরকারি গরম বসালেন। রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে থেকে তিনি তদারকি করলেন, হুকুম দিয়ে বেরিয়ে গেলেন না।
—রাবেয়ার মা লেবু কাইটা দিও। পিচ্চি, এই পিচ্চি।
—জি নানি?
—কাটা ফেলবার প্লেট দিস। আল্লাহ’র তিরিশটা দিন মনে করায় দিতে হয়।
পিচ্চি মাথা নেড়ে খাবার ঘরে ফিরে গেল। ফরিদা রান্নাঘর থেকেই পিচ্চিকে বললেন মুখলেস সাহেবকে ডাকতে। নিজের হাতে হাঁসের মাংস আর ইলিশ পোলাও গরম করে বাটিতে বাড়লেন। রাবেয়ার মা টেবিলে দিয়ে আসল। ফরিদা টক দইয়ের সাথে শসাকুচি মিশিয়ে চট করে রাইতা বানালেন। সবকিছু শেষ করে খাবার ঘরে এসে দেখলেন মুখলেস সাহেব চুপ করে তার চেয়ারে বসে আছেন। দু’জনের একবার চোখাচোখি হল, কেউ কিছুই বললেন না। ফরিদা প্রথমে লাভলির ঘরের দরজায় হালকা টোকা দিলেন তারপর বিউটির দরজায়।
—লাভলি খেতে আয়। বিউটি খাবি না? —আয়।
ফরিদা টোকা দিয়ে দরজার কাছ থেকে সরে আসার সাথে সাথেই দুই মেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ওরা যেন এতক্ষণ দরজায় পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়েছিল, ডাকতেই দরজা খুলে বেরিয়ে এসেছে। ওদের কারও চেহারা দেখে ভিতরে কী ঘটছে বোঝার জো নাই। প্রতিদিনের মত যার যার চেয়ারে গিয়ে বসল। লাভলি বাসায় ফেরার পর এই প্রথম ফরিদার মুখোমুখি হল। কিন্তু ফরিদা বা লাভলি কেউই তা নিয়ে একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। সবাই স্বাভাবিক থাকল। লাভলির মাথা আসলে একেবারেই কাজ করছিল না—নইলে ভয়ে ওর হাত-পা এতক্ষণে পেটের ভিতরে ঢুকে যাওয়ার কথা। ওর যে অপরাধী মুখ করে থাকা উচিৎ সেটাও বেমালুম ভুলে গেছে। ক্ষুধা আর পানির পিপাসায় ওর অবস্থা খারাপ। খাওয়া শুরু হতেই লাভলি পোলাওয়ের উপর একরকম হুমড়ি খেয়ে পড়ল। খাবার সময় কোনো কাথাবার্তা হল না। ফরিদা সাংসারিক যা দু’একটা টুকটাক কথাবার্তা খেতে বসে বলেন এখন সেই চেষ্টাও করলেন না। চার চেয়ারে চার জন ক্লান্ত মানুষ মাথা নিচু করে গোগ্রাসে খাচ্ছে।
এই মুহূর্তে মুখলেস সাহেবের খাবার এবং খাওয়ার পরে বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে পড়ার চিন্তা ছাড়া আর কিছুই মাথায় ঘুরছে না। দুপুর থেকে বারান্দায় বসে থাকতে থাকতে হাড়ের ভিতর পর্যন্ত ঠাণ্ডা ঢুকে গেছে। আজকে সারাদিন তিনি মানসিকভাবে ভীষণ নড়বড়ে অবস্থায় ছিলেন, নিজেকে কেঁচোর কাছাকাছি কোনো জীব বলে মনে হয়েছে।
বিউটি মাছের কাটা বাছছে পূর্ণ মনোযোগে, এখন যদি পৃথিবী রসাতলেও যায় তার কিছু যাবে আসবে না।
ফরিদা খাচ্ছেন ঠিকই কিন্তু কোনো কিছুর স্বাদ পাচ্ছেন না—লাভলি ফিরে আসার পরে উনি একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, সিদ্ধান্তটা পুরোপুরি নিয়ে নেয়ার পর হালকা বোধ করছেন। ঠিক করেছেন আবদুুল বশির সাহেবের ব্যাপারটা মেয়েদেরকে খুলে বলবেন। লাভলি তো জানেই, তবুও দুই মেয়েকে একসাথে বসিয়ে বলবেন। তার আগে মেয়েদের কঠিন নিষেধ করবেন বলার সময় কেউ যেন কথার উপর কথা না বলে বা অহেতুক প্রশ্ন না করে। কথা শেষ হওয়ার পরে তাদের যদি কিছু বলার থাকে তিনি তা শুনবেন। তবে আজকে রাতে না—নিজেদের গুছিয়ে নেয়ার জন্য সবারই আজকের রাতটা দরকার।
লাভলি খাচ্ছে ঠিকই কিন্তু আশেপাশে যা হচ্ছে বা ঘটছে সব কিছু ওর কাছে ঝাপসা লাগছে। যেন প্রচণ্ড গতিতে ছুটে চলা ট্রেনের খোলা জানালার পাশে লাভলি বসে আছে আর বাইরের দৃশ্য ক্রমাগত ওকে ফেলে দূরে সরে যাচ্ছে। বাইরের জগতের ঝাপট লাগছে, কিন্তু ঠাহর হচ্ছে না।
রাতের খাওয়া শেষ হয়েছে, এক এক করে সবাই যার যার ঘরে গিয়ে দরজা লাগিয়ে দিল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াবার সময় প্রত্যেকেই আরেকটু নুব্জ হল—কাঁধের উপর অসহ্য চাপ ওদের মাথা, ঘাড় মাটির কাছে নিয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করল। ওদের এই মানসিক অবস্থা সংক্রমিত হল বাড়িটার মধ্যেও।
মনিপুরি পাড়া ১১৫/৩। রাত এখন প্রায় সোয়া বারোটা। মহল্লার গলি ঘুঁপচিতে লেপটে থাকা কুয়াশা ক্রমশ ঘন হচ্ছে। ঘন হতে হতে চতুর্দিক থেকে এক সময় বাড়িটাকে নাই করে দিল। শীত রাতের চাঁদ তীব্র সার্চ লাইট ফেলেও বাড়িটাকে খুঁজে পেল না। ঠিক সেই সময় লাভলি ড্রয়ার থেকে ছুরিটা বের করল। বিছানার তোশকের নিচে রাখতে হবে—কিন্তু রাখবার আগে আরেকবার শানিয়ে নিতে চায়। মুগ্ধ হয়ে ছুরির ধার পরখ করল। ডান হাতের তর্জনি দিয়ে স্টেনলেস স্টিলের পাতের উপর আলতো বুলিয়ে গেল আঙুল।
—(আপুমনি, আপনের মতলব কী?) —
—কই ছিলা এতক্ষণ?
—(ঘুমায়ছিলাম। আপনে কার জন্য বইসা আছেন।) —
—বিউটির জন্য।
—(ছোটো আপু আসবে না ঘুমায় পড়ছে।) —
—আসবে।
—(আসলে কী করবেন?) —
—খেলবো।
—(আমি কই কী আজকে খেলাধূলা বাদ দেন। রেস্ট নেন। ধকল গেছে না।) —
লাভলি ভীষণ মজা পেল। মাথার ভিতরের লোকটা ওকে ভয় পাচ্ছে। এরকম অভিজ্ঞতা লাভলির এই প্রথম যেখানে ওর হাতে কলকাঠি—যেভাবে নাড়বে সেভাবে নড়বে।
দরজায় টোকা পড়ল। কান পেতে না রাখলে শোনা যাওয়ার কথা না, এতটা আস্তে। প্রথম টোকাতেই লাভলি সচেতন হল। দরজা খুলবার জন্য চেয়ার ছেড়ে উঠল। টেবিলের উপর ছুরিটা রেখেও হাতে তুলে নিল। দরজার কাছে যাওয়ার আগে বালিশের নিচে রাখল।
—(আপুমনি, দরজা খুইলেন না। আজকে চলেন শুইয়া শুইয়া মজা করি। যে আসছে সে কিছুক্ষণ দাঁড়ায়ে চলে যাবে।) —
লাভলি অবিচল হেঁটে গিয়ে দরজা খুলে দিল। বিউটি দাঁড়িয়ে আছে, ঘরের আলো লাভলির ডান কাঁধের ফাঁক দিয়ে গলে গিয়ে বিউটির মুখের একপাশ আলোকিত করেছে, অন্যপাশ অন্ধকারে ডুবে আছে। দু’জন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রইল। কেউ কারও জন্য এক চুল নড়ল না।
—আপা, সরো ঘরে যাইতে দাও।
—কেন?
—(ঠিকই বলছেন এতোরাতে ঘরে কী?) —
—ঝগড়া করবো না, বিদ্যা।
অবিকল ছোটবেলার মতো করে বিউটি বলল। লাভলি সরল না। বিউটি একটু সরে গিয়ে ওর শরীর ঘেঁষে ঘরে ঢুকল। লাভলি দরজা ফিরে লাগাল না, বিছানায় গিয়ে বসল। এক হাত আলতো করে বালিশের উপর রাখল। মনস্থির করতে পারছে না, ছুরিটা বিউটিকে দেখাবে কি না।
—ঘুমাবি না?
—ঘুম আসতেছে না। আপা, খেলবা?
—না।
প্রত্যাখ্যানে বিউটি জ্বলে উঠল। “কেন খেলবা না।”
—সারাদিন হাঁটাহাঁটি করছি, ঘুম আসছে।
বিউটি কড়া চোখে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। লাভলি আরেকটু সঙ্কুচিত হল। বালিশের আরও কাছ ঘেঁষে বসল।
—ঘুম তোমার আসে নাই।
বিউটির কথায় ও কেঁপে উঠল। বালিশের উপর ওর ডান হাতের পাঁচ আঙুল ভীষণ অবাধ্য হয়ে উঠল।
—বালিশের নিচে কী?
—(সারছে!) —
—বালিশের নিচে কী আপা?
লাভলি উত্তর দিতে গিয়ে টের পেল গলা শুকিয়ে আসছে। শব্দ করে গলা পরিষ্কার করল।
—কিছু না, একটা ছুরি। আজকে নিউ মার্কেট থিকা কিনছি।
লাভলি বিছানা থেকে উঠে খাবার ঘরে এল। টেবিলের উপর ঢেকে রাখা জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালল, তারপর পুরো এক গ্লাস পানি ঢকঢক করে খেয়ে নিল।
—(আপুমনি, আমার তরফ থেকে আরেক গ্লাস খান, শীতল হই।) —
—তুমি ঘুমাইতেছো না কেন?
—(আপনে না ঘুমাইলে কেমনে ঘুমাই।) —
—না ঘুমাইলে চুপ থাকো।
লাভলি আরেক গ্লাস পানি ঢেলে নিয়ে ঘরে ফিরে এল। বিউটি ছুরি হাতে বসে আছে—লাভলিকে ঘরে ঢুকতে দেখে কামড়ে ধরা ঠোঁট হাসি হাসি হল। লাভলি এক হাতে দরজা বন্ধ করে ছিটকানি লাগাল। পানি এনে ঘরের ছোট টেবিলের ঠিক মাঝখানে রাখল। অন্য কোনো দিকে তাকাল না। যথাসাধ্য চেষ্টা করল শব্দ না করে চেয়ার টেনে বসতে, ইশারায় বিউটিকেও উল্টাদিকের চেয়ারে এসে বসতে বলল।
—আজকে আসল ছুরি দিয়ে খেলব, না আপা?
কিশোরী-গলায় কথা বলে উঠল বিউটি। হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়া তার খুশি খুশি লাগছে। আপাকেও ভাল লাগছে। লাভলির উল্টা দিকের চেয়ারে এসে ধপ করে বসল সে। ছুরিটা পানির গ্লাসে ঠেস দিয়ে রাখল।
—হুম…।
—(আপুমনি, আপনের অবস্থা কিন্তু কেরাসিন। খেললে ধরা খাবেন।) —
“আম্মা তুমারে কোথায় পাঠাইছিল? বলতেই হবে।” ছুরির উপর থেকে চোখ সরাল না বিউটি, মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল।
—আমারে কেউ কোথাও পাঠায় নাই। বললাম তো গাউছিয়া থিকা রমনা পার্কে গেছিলাম।
—যে মানুষ জন্মে একা বাড়ির বাইর হয় নাই, সে বলা নাই কওয়া নাই রমনা পার্কে চইলা যাবে—তুমি বললা আর আমি বিশ্বাস করলাম।
—বিশ্বাস না করলে নাই। যা হইছে তাই বললাম। ঐখানে একটা লোকের সাথে পরিচয় হইল, সে বাসা পর্যন্ত দিয়া গেছে।
লাভলির কথা শুনে বিউটি বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মধ্যে দুলতে থাকে। হয়তো সত্যিই রমনা পার্কে গেছিল। তবে শেষের কথাটা একেবারেই ফালতু।
—আম্মা যদি তোমারে না পাঠায়ে থাকে, তাইলে তুমি যে এত দেরি করে বাসায় ফিরলা আম্মার তো তোমারে খায়ে ফেলার কথা। আমারে বলো আপা, সত্যি বলতেছি আমি কাউরে বলবো না।
কথা শেষ করতে পারল না তার আগেই চাপা গলায় খিক খিক করে হাসতে লাগল বিউটি। লাভলি চমকে তাকাল কিন্তু কিছু বলল না।
—আমাদের দু’জনেরই মাথা আওলা হইছে। আরে, আমি বলবটা কারে, বলার মানুষ আছে। তুমার সাথে কার পরিচয় হইছে—একটা লোকের? সে আবার বাসা পর্যন্ত আইসা পৌঁছায় দিয়া গেছে।— এ্যাহ্—।
তাচ্ছিল্যের চোটে ঠোঁটসহ গলার স্বর বেঁকে গেল বিউটির। কাশির দমকের মতো খিক খিক হাসি নিয়ন্ত্রণহীন ফিরে এল। লাভলি অনেকক্ষণ বিউটির দিকে তাকিয়ে থাকল। কেন, ওর সাথে কি কোনো মানুষের দেখা বা পরিচয় হতে পারে না? বিউটি কি ভুলে গেছে রিয়াজ ওকেই পছন্দ করেছিল, ওকে।
—(আপুমনি এই সব পুরান প্যাঁচাল ফালায় থোন। একটা কথা কিন্তু ছোটো আপা খাপে খাপ বলছে, সন্ধ্যা কইরা বাসায় আসলাম তারপরও আমরা দুইজনেই বহাল তবিয়তে আছি, রহস্যটা কী?) —
এই ধাঁধার জবাব বাসায় ফেরার পর থেকে লাভলিও খুঁজছে। একটাবার ফরিদা জিজ্ঞেস তো করলেনই না ও কোথায় ছিল উল্টা তিনিই যেন পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। চোখে চোখে তাকান নাই পর্যন্ত। তার মানে কী এই ও এখন থেকে ইচ্ছা মতো চলতে ফিরতে পারবে, কাউকে পরোয়া করতে হবে না। সবই আকাশ কুসুম ভাবনা তারপরও নিজের ভিতর আশ্চর্য রকম জোর অনুভব করল লাভলি। বিউটির দিকে তাকিয়ে দেখল গলা এখনও বেঁকে আছে আর বিশ্রী হাসিটা লালার মতো ঠোঁটের প্রান্তে লেপটে আছে। কঠিন শিক্ষা পাওনা হয়েছে বিউটির।
—(আবার ছোটো আপারে নিয়া পড়লেন, খালাম্মা কেন আপনেরে ধরতেছে না সেইটা নিয়া ভাবেন। এর মধ্যে একটা কিন্তু আছে।) —
—এই কিন্তুরে দুই পয়সা দিয়া পুছি না।
মনে মনে লোকটাকে জবাব দিয়ে লাভলি ছুরিটা হাতে তুলে নিল। হাতের মুঠির ভিতর স্টেনলেস স্টিলের ঠাণ্ডা পাত ওর শরীরে শিহরণ জাগাল। মুঠি আলগা করতে গিয়ে আরও শক্ত করে চেপে ধরল।
—আপা খেলবা?
—না।
—আমিও খেলতে চাই না।
—আজকে আমি আম্মা হবো তুই আমি।
—বললাম তো খেলতে চাই না।
—দেরি করে ফিরছি, আম্মা এখন ভিতরের কথা বার করবে তারপর ঘর বন্ধ করবে—না, না ঘরবন্ধ না একদম জানে মাইরা ফেলবে।
—আমি আম্মা হবো আর তুমি তুমিই থাকবা। দেখি…।
বিউটি ছোঁ মেরে ছুরিটা হাতে নিতে চেষ্টা করল কিন্তু লাভলি শক্ত মুঠিতে ধরে রইল। বিউটির পক্ষে ওর সাথে জোরাজুরিতে টেকা সম্ভব হল না।
—না, আমি আম্মা।—এতক্ষণ কই ছিলি?
লাভলি অবিকল ফরিদার গলায় ধমকে উঠল। ধমকের দাপটে বিউটি কেঁপে উঠল, কিন্তু খেলার খেই হারাল না। প্রায় সাথে সাথে নিজেকে সামলে নিয়ে লাভলির মতো করে নরম-গলায় উত্তর দিল।
—গাউছিয়া গেছিলাম।
—তোরে বললাম না গাউছিয়া যাই নাই রমনা পার্কে গেছিলাম। খেললে ঠিক মতো খেল… না খেললে নাই।
—রমনা পার্কে কেন গেছিলা?
—তুই জিজ্ঞাস করতেছিস কেন? প্রশ্নটা আমি তোকে করবো।
আজকে লাভলি অন্য মানুষ। আজকে সবাই যা না তাই। সবাই খোলস ছেড়ে বেরিয়েছে।
—রমনা পার্কে কেন গেছিলি?
—জানি না, ঘুরতে।
বিউটি মনোযোগ দিল খেলায়। খেলার নিয়মকানুন মাথা থেকে ছুটে যাচ্ছে, আর ভুল করা যাবে না।
—ঘুরতে? কার সঙ্গে গেছিলি? আজকে তোরে জানে শেষ করবো। ছিনালি বার করবো আমি তোর।
লাভলির ভ্রƒ ভীষণ রকম কুঁচকে গেল। দাঁতে দাঁত চেপে কথাগুলি বেরিয়ে এল।
—কারও সঙ্গে যাই নাই। কার সঙ্গে যাবো?
—হারামজাদী তোদের দুইজনরে এমন শায়েস্তা করবো যে জন্মের মতো লুলা হইয়া ঘরে বইসা থাকবি।
—আমরা তো লুলাই।
কথাটা বলেই বিউটি লাভলির হাত থেকে ছুরিটা ছিনিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। ব্যাপারটা এতটাই অতর্কিতে ঘটল যে এর জন্য ও মোটেও তৈরি ছিল না। বিউটি বিপজ্জনক ভঙ্গিতে ছুরিসহ হাতটা লাভলির চোখের উপর দোলাতে লাগল।
—এখন কে কারে শায়েস্তা করবে? লুলা বানায় রাখবে, শখ কতো!
ছুরির গুঁতা থেকে বাঁচবার জন্য লাভলি ওর মাথা পিছনে সরিয়ে নিল আর একই সাথে মেঝেতে দু’পা ঘষটে চেয়ারটাও সরাবার চেষ্টা করল।
—মনে রাইখো আমি সব জানি। সবার সব কীর্তি আমার জানা। আমার নাকের ডগার সামনে দিয়া চুমাচুমি বার করতেছি। কত্তো বড় শয়তান আমি চুমা দিলে চুমা নেয় না। কেন, আমার ছ্যাপে কি বিষ না কি, তোমারটায় মধু, মধু।
এক ঝটকায় লাভলি চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়ল। বিউটি লাভলির উপর ছুরি নিয়ে প্রায় অর্ধ চাঁদের মতো বেঁকে ছিল, হঠাৎ করে উঠে পড়ায় লাভলির খালি চেয়ারটায় হেলে পড়ল সে এবং হাত থেকে ছুরি খসে পড়ে গেল পাকা মেঝেতে। সিমেন্টের মেঝেতে স্টেনলেস স্টিল ঝন ঝন করে উঠল। চেয়ারের পিঠ ধরে বিউটি নিজেকে সামাল দিল, তারপর মেঝে থেকে ছুরিটা তুলে টেবিলের উপর রাখল।
দুই বোনই হাঁ করে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল। দু’জনেরই বাতাসের অভাব অনুভূত হল। বিউটি চেয়ারে বসল, হাত-পা বশে ছিল না। পানির গ্লাসটা মুখে তুলতে গিয়ে বেশ খানিকটা ছলকে পড়ল।
—নিজের পানি নিজে নিয়া আয় বিউটি। এই পানি আমি আমার জন্য আনছি।
বিউটি ওকে পাত্তা না দিয়ে প্রায় পুরোটা পানি ঢকঢক করে খেয়ে নিল এবং তৃপ্ত হয়ে বোনের দিকে তাকিয়ে হাসল। সহজ স্বাভাবিক হাসি। তলানিতে পড়ে থাকা পানিসহ গ্লাসটা বোনের দিকে বাড়িয়ে দিল। বাড়িয়ে ধরা হাতের দিকে ভ্রূক্ষেপ করল না লাভলি। অন্য চেয়ারটা এক হাতে টেনে বিউটির খুব কাছে নিয়ে এল, তারপর চুপ করে সেটায় বসল। পানির গ্লাসটা বিউটি ছুরির পাশে হেলাফেলা করে রাখল।
—রিয়াজের কথা তুই আম্মারে বলছিলি। আমি ভাবলাম কাদের।
বিউটি ফিক করে হেসে ফেলল। লাভলি একবারও তার দিকে তাকাল না। অলস দৃষ্টিতে গ্লাস আর গ্লাসের নিচে পড়ে থাকা পানির দিকে মাথা ঈষৎ নিচু করে তাকিয়ে থাকল।
ঠিক কতক্ষণ লাভলি তাকিয়েছিল আমরা জানি না। শুধু এইটুকু জানি শান্ত পুকুরে বড় মাছের আতকা ঘাই যেমন দুর্দান্ত আলোড়ন তোলে তেমনি লাভলির শরীরের গভীরে অদেখা কেউ আচমকা ঘাই মারল—সময়ের চেয়ে ধীর গতিতে লাভলি টেবিল থেকে ছুরিটা হাতে তুলে নিল, তুলে নেয়ার সময় কুঁচকে থাকা টেবিল ক্লথের অংশ উঠে এল হাতে—হাত অপ্রস্তুত হয়ে টেবিল ক্লথটা ছেড়ে দেয়, ছুরিটা দ্বিধান্বিত কেঁপে ওঠে আঙুলের ফাঁকে। এক মুহূর্তের দশ ভাগের এক ভাগ সময়ের জন্য ছুরিটা সম্পূর্ণভাবে পাঁচ আঙুলের আওতা থেকে শূন্যে বেরিয়ে এসেই আবার পাঁচ আঙুলের কড়াল মুঠিতে বন্দি হয়ে যায়। এই আন্দোলনে গ্লাসটা কাঁৎ হয়ে পড়ে। তলানির পানি প্লাস্টিকের টেবিল ক্লথের উপর দিয়ে কাঁচের মার্বেলের মতো গড়িয়ে একেবারে প্রান্তে গিয়ে টুপ টাপ ঝরে পড়ে। লাভলির পাঁচ আঙুল চেপে বসে ছুরির বাটে, আঙুলের চাপে হাতের তালু রক্তহীন ফ্যাকাশে হয়ে যায়, নীল শিরা ফুটে বের হয়। দু’জনের বোধের সীমানা ছাড়িয়ে বিউটির দুই পাঁজরের ঠিক নিচে স্টেনলেস স্টিল ছুরি আমূল ঢুকে যায়। বিউটির প্রায় বুজে আসা চোখ আর ফিক ফিক হাসি থমকে যায়, দুই চোখের পাতা প্রথমে পুরোপুরি বুজে যায়, তারপর বড় হতে থাকে—নদীর চরের সাদা, অর্ধ চাঁদের জ্যোতি, অনন্ত দাঁড়িয়ে থাকা রাতের রেলগাড়ির হেডলাইটের আলোর মতো তীব্র কিন্তু স্থির।
শীতের রাতের ঝিম ধরা নৈঃশব্দ ওদের গিলে খাচ্ছে। বিউটির এক হাত বাতাসে ঝুলতে থাকে, আরেক হাত টেবিলের ওপর এলানো; মাথাটা তার ওপর এলোমেলো পড়ে আছে। এত যতেœর কালো চুলের বন্যা চেয়ারের পিঠ ছাপিয়ে ঢেউ তুলছে। ঠোঁটের কোণায় এক চিলতে হাসির আভাস দেখা গেল কি গেল না। এত জোরে চীৎকার দেয়ায় তাকে একটু লজ্জিত দেখাচ্ছে। চোখ দু’টিতে বিস্ময় না কি বোনের কীর্তিতে মুগ্ধতা বোঝা গেল না।
বন্ধ দরোজায় প্রচণ্ড জোরে বাড়ি পড়ছে। সেই শব্দ লাভলির কান ভেদ করে, মস্তিষ্ক ভেদ করে, বুক ভেদ করে তবুও ভিতর পযন্ত পৌঁছায় না। দরজা উড়িয়ে নিয়ে যাবে এমন, ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে এমন। তারপর এক সময় সমস্ত ঝড় ঝাপ্টা থেমে যায়। শান্তি! লাভলি দুই পায়ের গোড়ালি দিয়ে চেয়ারটা কিঞ্চিৎ পিছনে ঠেলে দেয়। কাজের কাজ কিছুই হয় না চেয়ারটা একদিকে শুধু সূঁতাখানেক সরে যায় আর বিউটির চুল ওর কনুইয়ে এসে লাগে। নরম মসৃণ চুল। সান সিল্কের ভালো বিজ্ঞাপন হতে পারতো, ভাবে লাভলি। একবারও বিউটির দিকে পূর্ণ দৃষ্টি দেয় না। এক সময় টের পায় মাথার পিছনে টিউব লাইটের হলদে আলো অসহ্য তীব্রতায় গলে গলে পড়ছে—দেয়াল চুঁইয়ে চটচটা গলন্ত আলো চুল পোড়া গন্ধে লাভলির দিকে গড়িয়ে আসে। লাভলি অনেকক্ষণ বুঝতেই পারে না পায়ের নিচে চটচট করছে কী। বাম পায়ের বুড়া আঙুলে ঠাণ্ডা ধাতব-তরল স্পর্শের সাথে সাথে গা গুলিয়ে ওঠে ওর। সেই তরল দারুণ নিষ্ঠায় দুই পায়ের পাতা ছুঁয়ে থাকে। গা ঘিনঘিন করে ওঠে ওর, নাকের ডগা ইষৎ কুঁচকে যায়—কেমন অসহায় লাগে লাভলির। এই মুহূর্তে পানির খুব দরকার ছিলো। বিউটির দিকে তাকিয়ে থাকে অল্পক্ষণ অথবা বহুক্ষণ। বাতাসে ঝুলতে থাকা বিউটির হাত আলগোছে টেবিলের উপর রাখে। ডাল বাটার গুণাগুণ টের পায়। কী শান্ত ভঙ্গিতে টেবিলের উপর মাথা রেখে শুয়ে আছে। খুব আদর লাগে লাভলির।
যথেষ্ট পারঙ্গমতার সাথে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। মাথা একটুও টলে না, হাত দু’টা নিয়ে অবশ্য মুশকিলে পড়ে যায়। শুরুতে শরীরের দুই পাশে লম্বালম্বি ঝুলতে থাকে, পরক্ষণেই ডান হাত বুকের কাছে উঠে আসে। ডান হাতের দেখাদেখি বাম হাত একই কাজ করতে গিয়ে বিপদে পড়ে যায়। বুকের ধড়ফড়ানি এমন হাস্যকর রকম বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে বেচারা হাত দু’টা সেখানে স্বস্তি পায় না। লাভলি ভাবে এই দু’টাকে কোমড়ের উপর রাখবে। তাহলে বেশ একটা সটান ভাবও আসবে, এই মুহূর্তে ভাবটাই জরুরি। কিন্তু কিছুতেই পারা যাচ্ছে না—হাত দু’টা কোমড়ের উপর রাখছে আর পিছলে পড়ে যাচ্ছে। চারবারের মাথায় হাল ছেড়ে দেয় ও, শেষমেশ দুই হাত পিছনে নিয়ে ডান হাতের মুঠিতে বাম হাতের তর্জনি এবং মধ্যমা শক্ত করে ধরে থাকে। পরবর্তী চুয়ান্ন মিনিট একইভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে লাভলি; আর ওর সমগ্র বেঁচে থাকা চুয়ান্ন মিনিট ধরে ওকে ঘিরে পাক খায়। পাকটা পায়ের পাতা থেকে চক্রাকারে মাথার দিকে ধাবিত হয় কিন্তু তালু পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না, গলার কাছে এসে চেপে ধরে। দমটা যখন প্রায় বেরিয়ে যাবে যাবে অবস্থা ঠিক তখনই বেমক্কা ছেড়ে দেয় তারপর পাক খেতে খেতে আবার নিচে নামতে থাকে। তারপর আবার উপরে তারপর নিচে তারপর উপরে, নিচে, উপরে…
চুয়ান্ন মিনিটে লাভলির জন্ম হয়, ওর তিন বছর বয়সে এক মাথা চুল নিয়ে বিউটির জন্ম। কী ফর্সা! সকাল বেলা পর্দা টানা অন্ধকার ঘরে হঠাৎ রোদের আলো যেমন বেআরাম, তেমনটা। ঘরের বাইরে ফরিদা খানমের চাবি ঘুরাবার শব্দ, বিউটির চুলে ডিমের গন্ধ, দরজা খুলে হুড়মুড় করে ছাদে ঢোকা, গানের তালে মুখলেস সাহেবের হালকা দুলুনি ‘কাভি কাভি মেরা দিল মে খায়াল আতা হ্যয়…।’ আর রিয়াজ, আর লাল মাফলার আর মাথার ভিতরের লোকটা।
মাথার ভিতরের লোকটাকে লাভলি ওর পুরা শরীরে আতিপাতি করে খোঁজে, একবার ফিসফিস করে ডাকেও, ‘আপনে আছেন, শুনতেছেন?’ লোকটাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। একদিন যেমন স্বেচ্ছায় এসেছিলো তেমনি স্বেচ্ছায় চলে গেছে। প্রথম ধাক্কায় খুব মন খারাপ লাগে পরে একটু বিরক্তই হয়—আজকের রাতটা অন্তত থেকে যেতে পারতো!
লাভলি আর দাঁড়িয়ে থাকে না, ঘরের দরজা খুলে বাইরে আসে। দরজার ফাঁক গলে যা একটু আলো খাবার ঘরে এসে জুটেছে নইলে জায়গাটা বেশ অন্ধকার। জিরো পাওয়ারের বাতি অবশ্য একটা জ্বলছে। দরজার মুখে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকায়। নিজের ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে ভালো লাগে, অন্যরকম একটা ভরসা হয়, নাহ্ ভয়ের কিছু নাই! খুব সতর্কতার সাথে লাভলি ওর শোবার ঘরের দরজাটা ভিড়িয়ে দেয় তারপর ফরিদার ঘরের দিকে ফেরে। এক কী দু’পা এগিয়েও যায় আবার ফিরে আসে, রান্নাঘরের দরজার কাছে কান খাড়া করে দাঁড়িয়ে থাকে, বাইরে থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দেয়।
এখন লাভলি ফরিদা খানমের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে খুব আস্তে টোকা দিচ্ছে, একটা নির্দিষ্ট ছন্দ অনুসরণ করছে। টকটক টকটকটক টকটক।
খুট করে দরজা খুলে যায়। ফরিদার ঘরেও জিরো পাওয়ারের আলো জ্বলছে। কারো মুখই ঠাহর হয় না। ফরিদা প্রথমে বুঝতে পারেন না কে, কথা বলতে গিয়ে আবিষ্কার করেন গলা দিয়ে যথেষ্ট স্বর বের হচ্ছে না।
—কে? কী? এতো রাতে কী লাভলি?… ঘুমাইতে যা।
—আজকে রাতরে আর ঘুম হবে না আম্মা।
—না হইলেও শুয়ে থাক। যা।
—বাগানের কোদালটা কী সিঁড়ি ঘরে আছে? চাবিটা দেন।
—হ্যাঁ?
—বিউটিরে মাইরা ফেলসি আম্মা। আপনের আসতে লাগবে না, আমি একাই পারবো।
(শেষ)
রচনাকাল: ২০০৮, লন্ডন
লেখকঃ লীসা গাজী
অলঙ্করণ: রনি আহম্মেদ
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
উপন্যাস- 'রৌরব' (পর্ব-তিন) by লীসা গাজী
সিনেমার বদল হয়েছে। বিউটি আধশোয়া হয়ে এখন ‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’ দেখার ভাণ করছে। যদিও এই সিনেমা তার অন্তত দশবার দেখা আছে। ফরিদাকে ঘরে ঢুকতে দেখে বিউটি হাসবে, নাকি পাত্তা না দিয়ে টিভির দিকে তাকিয়ে থাকবে মনস্থির করতে পারলো না। শেষ পর্যন্ত মায়ের দিকে তাকালো।
— উঠ্, সিনেমা বন্ধ কর।
— কেন?
— কাজ নাই, কাম নাই শুধু সিনেমা! ফাজিলের বাচ্চা ফাজিল।
— কী কাজ করবো?
— কুনো কাজ না থাকলে হাঁটাহাঁটি কর। শুইয়া থাকতে থাকতে মাজা ব্যথা করে না?
— না করে না।
তর্ক করার কোনো ইচ্ছা এই মুহূর্তে বিউটির ছিল না, বাড়িতে এত লোক থাকতে ফরিদা যখন তার উপরেই চড়াও হলেন তখন আবার শিরায় শিরায় রাগ অনুভব করলো সে।
— সামনে থিকা সরেন, আপনের জন্য সিনেমা দেখতে পারতেছি না।
এবার ফরিদা একাই কঠিন চোখে তাকিয়ে রইলেন বিউটির দিকে, বিউটি ভ্রূক্ষেপ করলো না। কী একটা সংলাপে জোরে শব্দ করে হাসলো। ফরিদা যথারীতি স্বাভাবিক হয়ে গেলেন।
— অনেকবার দেখছস না, এখনও হাসি আসে? বেকুবের বেকুব।
— হাসির সিনেমা হাসবো না তো কি মুখ গোঁজ কইরা বইসা থাকবো।
আলনার উপরের এলোমেলো কাপড় ফরিদা গুছিয়ে রাখছিলেন। মায়ের দিকে আড়চোখে একবার দেখে নিলো বিউটি। ছাদের ব্যাপারটা মাথা থেকে তাড়াতে পারছে না। অথচ ফরিদাকে এখন দেখে বুঝবার জো নাই অল্প আগে তার কী বেদিশা অবস্থা গেছে।
— তোর আব্বা বাড়িতে যাবে?
— কোন বাড়িতে?
— তোর দাদার বাড়িতে। এতদিনে শরিকরা খবর দিছে তোর বাপে নাকি কিছু পাবে। বেশিরভাগই তো মইরা ভূত। আমি কই কী, দরকার নাই। একা একা যাবে, বয়স হইছে, পথে ভালো-মন্দ কিছু হইয়া গেলে তো গেলোই।
— আপনে আপারে কেন একা যাইতে দিলেন?
— আমি নিজেও জানি না।
সকাল থেকে এই প্রথম ফরিদা সত্য কথা বললেন। তিনি আসলেই জানেন না তার কেন এই মতিভ্রম হলো। এটা কি কোনো কিছুর আলামত। একটা ভয়ঙ্কর কিছু ঘটবে তারই ইঙ্গিত!
— এখন যদি আপা আর বাড়িতে ফিরা না আসে।
— এত কুকথা তোর মাথায় আসে কেমনে? বাড়িতে ফিরবো না তো যাইবো কই? যাওনের জায়গা কি আছে, জায়গা থাকলে তুই ঠিকই জানবি, এণ ক’ আছে?
— থাকতেও পারে।
থাবা মেরে বিউটির থুতনি চেপে ধরেন ফরিদা। বিউটির আমোদ লাগে। মায়ের প্রতি যে দুঃখবোধ অল্পণ আগে সে অনুভব করেছিলো তার ছিটেফোঁটাও আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তার চোখ আর হাসি দেখেই বুঝে যান ফরিদা যে মেয়ে তাকে ধাপ্পা দিচ্ছে। হিসহিসিয়ে উঠেন, “শয়তানের শয়তান, তোর দিন ঘনাইছে…!”
— দিন সবারই ঘনাইছে, সবচেয়ে বেশি ঘনাইছে আপনের।
থুতনি ছেড়ে দেন ফরিদা। বিউটি সিনেমা দেখায় মন দেয়, এই জায়গাটা খুব মজার।
ফরিদা বিউটির ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন।
— আম্মা, রাবেয়ার মাকে বলেন ডাইল বাইটা ফ্রিজে রাখতে। ডাইল বাটা আর নাই।
— আচ্ছা, বলবো নে।
ফরিদা আবার ফিরে আসেন।
— কয়টা বাজে? নামায পড়বি না?
নামাযের কথায় বিউটি তড়াক করে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ে। ওযু নাই ওযু করতে হবে। ফরিদাও নিজের ঘরের দিকে গেলেন। নামায পড়ে তারপর ইলিশ-পোলাও বসালেই চলবে।
ফরিদা ঘরে ঢুকে চোখ বন্ধ করে টানটান হয়ে কিছুণ শুয়ে থাকলেন। শুয়ে থেকেই তার মনে হলো, মোবাইল ফোনটা অন করতে হবে। কার ভয়ে ফোন অফ করে রেখেছেন! আলতু ফালতু মানুষের ভয় ফরিদা খানম করেন না। আস্তে ধীরে বিছানা থেকে নেমে ড্রেসিং টেবিলের কাছে আসলেন। নিজের প্রতিচ্ছবি আয়নায় দেখে টের পেলেন কত সুন্দরী ছিলেন তিনি!
সময় আর অবস্থার ফেরে এক সময়ের কাঙ্ক্ষিত মানুষও এক সময় তুচ্ছ হয়ে যায় — সেজন্য কোনো শস্তা অপরাধবোধে ভোগেন না ফরিদা। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ জীবনের মোড়ক দিতে যা করার দরকার তিনি করেছেন। তার মনে কোনো পাপবোধ নাই। কেন থাকবে, তবে এতোদিন পরে এই উপদ্রব উপস্থিত হওয়ায় উৎকণ্ঠা বোধ করছেন।
মোবাইল ফোনের সুইচ অন করলেন। সমস্যাকে এড়িয়ে গেলে সমস্যা আরও জাঁকিয়ে বসবে, সুতরাং মুখোমুখি হওয়াই ভালো। দেখা যাক, কার দৌড় কতো দূর।
মুখলেস সাহেব ঘরে ঢুকলেন, তিনিও নামায পড়বেন। স্ত্রীর থমকানো রূপ দেখে দ্বিতীয়বার তাকালেন। ফরিদাকে বিচলিত দেখাচ্ছে, ভাবলেন কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করতে সাহস পেলেন না। আজকে এমনিতেই অনেক কিছু প্রথমবারের মতো ঘটছে। এখনও বিশ্বাস করতে পারছেন না কিভাবে ফরিদা লাভলিকে একা ছেড়ে দিলেন।
— বশির ফোন করছিলো।
— বশির কে?
— ইয়ার্কি করো না কি? বশির কে তুমি জানো না?
এইসব কী ঘটছে, এতদিন পরে বশির কী চায়? মুখলেস সাহেবের চেহারা ঝুলে পড়লো। তার ঝামেলা ভালো লাগে না। বারান্দায় পা নাচিয়ে হিন্দি গান শুনবেন, দুই একটা সিনেমা দেখবেন, মাঝে মধ্যে বাজার করে আনবেন, ভালো-মন্দ দু’টা খাবেন — এইভাবে জীবন কাটিয়ে দিতে পারলেই তিনি খুশি। এ আবার কী যন্ত্রণা!
— কী চায়?
— আহাদ উথলাইয়া উঠছে। লাভলি, বিউটিরে দেখতে চায়। দেখাইতাছি, খেজুরের কাঁটা দিয়া দুই চোখ যদি না গালাইছি আমার নাম ফরিদা না।
মুখলেস সাহেব ফরিদার এই উগ্র মূর্তির সামনে থাকতে চাইলেন না। সুরুৎ করে বাথরুমে ঢুকে গেলেন, ওযু করতে হবে। তার এর মধ্যে না থাকাই ভালো, ফরিদা ঠিকই সব সামলে নিতে পারবেন। শুধু শুধু তিনি থেকে আরও ঝামেলার সৃষ্টি করবেন। এবং আশ্চর্য মুখলেস সাহেব আর দুশ্চিন্তাও বোধ করছেন না। অবশ্য সেটাও বিপজ্জনক। চিন্তিত চেহারা অন্তত ফরিদার সামনে দু’একদিন ধরে রাখতে হবে।
আধমরা মানুষটাকে কেন যে বলতে গেলাম — ফরিদার নিজের উপর বিরক্ত লাগছে। এখন সে আসলে মনে মনে চাইছে যাতে আবদুল বশির ফোন করে। এসপার-ওসপার একটা হয়ে যাক। লাভলি বিউটিকে দেখে সে কী কচুটা করবে? তার কাছে নিয়ে রাখতে পারবে, তার ছেলেমেয়ে, আত্মীয়-স্বজনদের আসল কিচ্ছা বলতে পারবে? তাহলে ফরিদার ভয়টা কিসের?
— খালাম্মা, রান্না বসাইবেন না?
— আসতাছি, নামায পইড়া আসতাছি; তুমি যাও। বারান্দার ফুলগাছে পিচ্চি পানি দিছে? না দিলে এণ দিতে কও।
ফরিদা মুখলেস সাহেবের জন্য অপো করতে থাকেন। মুখলেস সাহেব বাথরুম থেকে বের হলে এই নিয়ে আর দ্বিতীয় বাক্য বলবেন না বলে মনস্থির করলেন ফরিদা।
* * *
লাভলির জন্ম হলো সকাল আটটা বত্রিশ মিনিটে। দিনণ সব কিছু মুখলেস সাহেব সবুজ মলাটের একটা খাতায় লিখে রেখেছেন। জন্মের দু’তিন দিন পরে বড় ভাবি হাসতে হাসতে বললেন, “আমাগো ফরিদা আর দুলামিয়া দুইজনের গায়ের রঙই তো মাশাল্লাহ পরিষ্কার। এই মাইয়া এতো কালা-কুলা হইলো কোই থিকা?”
মন্তব্য মাটিতে পড়তে পারলো না, তার আগেই ফরিদার আম্মা পয়মন্ত মেঝো বউ বাঘের ক্ষীপ্রতায় কথাটা ধরে ফেললেন।
— না, এত কালা থাকবো না। রঙ খুলবো দেইখো নে। অবশ্য আমার শ্বশুর মশায়ের রঙ আবলুশ কাঠের মতো কালো ছিলো। আম্মার কথার উত্তরে বড় ভাবি লজ্জা পেয়ে জিভ কাটলেন। বেশ আশ্চর্যও হলেন। কারণ এইসব ছোটখাটো কথাবার্তায় আম্মা কখনই অংশগ্রহণ করেন না। এবং এও তিনি জানেন তার দাদা শ্বশুর মোটেও আবলুশ কাঠের মতো কালো ছিলেন না। তাকে তিনি দেখেছেন। তখন কবরে পা দু’টাই দিয়ে রেখেছিলেন যদিও তবুও স্পষ্ট মনে পড়ে তার গায়ের রঙ মোটেও কালো ছিলো না, আর আবলুশ কাঠের মতো তো না-ই। সেই দিনের পর থেকে ফরিদার মা মুখলেস সাহেবের সাথে নবজাত লাভলির চেহারার যে কতো মিল তা প্রমাণ করবার জন্য উঠে পড়ে লাগলেন। তিনি এমনকি হাসি আর চাউনিতেও মিল খুঁজে পেলেন।
* * *
মুখলেস সাহেব বাথরুম থেকে নিঃশব্দে বের হলেন, তারপরও ফরিদার চিন্তায় ছেদ পড়লো, তিনি খুশিই হলেন, আজাইরা চিন্তা যত কম করা যায় ততই ভালো। ফরিদার সাথে চোখাচোখি হবার সমস্ত সম্ভাবনা সমূলে উপড়ে ফেলে সোজা গিয়ে দাঁড়ালেন নামাযের জায়গায়। এই ঘরে দু’টা জায়নামায সব সময় বিছানো থাকে। শুধু সেজদা দেয়ার জায়গাটা একটু মোড়ানো থাকে, পড়বার সময় সোজা করে নেন। মুখলেস সাহেব উবু হয়ে জায়নামায সোজা করলেন, তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে নামায শুরু করলেন। ফরিদা এক মনে মুখলেস সাহেবকে ল্য করছিলেন। এবার তিনিও ওযু করার জন্য বাথরুমে ঢুকলেন। ওযু করতে গিয়ে বারবার তার ভুল হচ্ছিলো। তিন বারের বার ওযু নির্ভুলভাবে শেষ করে ফরিদা বাথরুম থেকে বের হলেন।
নামায শেষ করে মোনাজাতের জন্য হাত তুলে অনেকণ বসে রইলেন। কিন্তু নির্দিষ্ট করে আল্লাহ’র কাছে কিছু চাইলেন না। হঠাৎ নিজেকে খুব ছোট লাগলো, আল্লাহ’র কাছে চাইতেও ছোট লাগলো। কঠিন জিদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো। না, কারও কাছেই কিছু চাইবেন না, খোদাতা’য়ালার কাছেও না। যে জটিল জীবন তিনি পার করেছেন এর চেয়ে জীবন আর কত জটিল হওয়া সম্ভব। হলে হবে, তিনিও দেখে ছাড়বেন।
জায়নামায ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ফরিদা। উবু হয়ে প্রান্তটা একটু মুড়ে রাখলেন। নিজের অজান্তেই তওবা কাটলেন তারপর ওয়াড্রোবের সামনে গিয়ে একদৃষ্টে মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বেশ কয়েক সেকেন্ড কেটে গেলো, ঠোঁটে বাঁকা হাসি নিয়ে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। যেন তার সাথে পাল্লা দিতে গিয়ে কেউ হেরে গেছে।
বিউটি নামায শেষ করে আবার সিনেমা ছাড়লো কিন্তু এবার আর দেখতে ভালো লাগলো না। কাহাতক একই দৃশ্য দেখে হাসা যায়। টিভি, ডিভিডি বন্ধ করে দিলো। ঘড়ির দিকে তাকালো, একটা বেজে পাঁচ। আপার আসতে দেরি নাই। আল্লায় জানে কী হাবিজাবি সব কিনে আনবে। কিছুই যে পছন্দ হবে না এই ব্যাপারে বিউটি নিশ্চিত। লাভলির পছন্দের সাথে বিউটির পছন্দ কখনই মেলে না। লাভলির সব সময় চাপা রঙ পছন্দ, বিউটির পছন্দ চড়া: লাল, ম্যাজেন্টা, হাওয়াই মিঠাই — এইসব। বিউটি চুল ছেড়ে রাখে, কখনও একটা বেণী করে, লাভলির চিরকালীন চুলের স্টাইল দু’পাশে দু’টা লম্বা বেণী। লাভলির কোনো ছিরিছাঁদ নাই। বিউটি সাজে, চিমটা দিয়ে ভ্রূ তোলে, নখে নেল পালিশ দেয়। লাভলির রিয়াজকে ভালো লাগে, বিউটি ভেবেই পায় না রিয়াজের মধ্যে ভালো লাগার কী আছে। রিয়াজকে পছন্দ না করলেও বিউটি এটাও সহ্য করতে পারে না যে রিয়াজ তাকে বাদ দিয়ে লাভলিকে পছন্দ করেছে। তবে হিসাব করলে বিউটির কাউকেই পছন্দ না। তার সবচেয়ে অপছন্দ মুখলেস সাহেবকে। কেন তা সে নিজেও জানে না। নিজের বাবার প্রতি এই তীব্র ঘৃণা তার কীভাবে জন্মালো এই নিয়ে বিউটির কোনো ধারণা নাই। অবশ্য এই খবর বাড়ির কেউ জানে না। কারণ সে যেমন কাউকে পছন্দ করে না তেমনি কাউকে বিশ্বাসও করে না। নিজের ঘরটাই বিউটির সবচেয়ে পছন্দের। ঘরেই থাকতে ভালো লাগে তার। বাইরে বের হওয়া তো দূরের কথা অন্য ঘরে যেতেও বেশি ইচ্ছা করে না। তবে চাইনিজ খাবার ব্যাপারে সে সব সময় এক পায়ে খাড়া। ফরিদা, লাভলি আর বিউটি মাসে অন্তত এক বার চাইনিজ খেতে যায়। সেই সময়টুকু নিজেকে তার খুব সুখী সুখী লাগে।
আজকে আপার সাথে খেলাটা খেলবে, … ভাবছে বিউটি। আজকে খেলাটা একটু পাল্টে দিলে কেমন হয়। আজকে খেলবে আপার ঘরে, আম্মাকে টারগেট না করে আব্বাকে টারগেট করবে। দেখি সে না আপা কে আব্বাকে বাগে পায়। একবার আপা আব্বা হবে, একবার সে নিজে।
খেলার প্রসঙ্গে চিন্তা করতে করতে উত্তেজনাবোধ করলো বিউটি। রান্নাঘর থেকে ইলিশ-পোলাওয়ের অসহ্য গন্ধ নাকে লাগলো। এই জিনিস একটু পরে খেতে হবে ভাবতেই উটকানি এলো। কার জন্মদিনে যে সে প্লাস্টিকের টেবিল কথ টেনে সব খাবার ছত্রখান করবে আল্লায় মালুম। আজকে সে এই বালের পোলাও ছুঁয়েও দেখবে না, হাঁসের মাংস দিয়ে খাবে। খাবারের কথা মাথায় ঢুকতে খিদা পেয়ে গেলো। কিন্তু আপা না আসা পর্যন্ত তো খাওয়া যাবে না; অবশ্য আসতে বেশি দেরিও নাই।
খাবারের গন্ধে গন্ধে বিউটি হালকা পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। পিচ্চি টেবিল লাগাচ্ছে আর গুনগুন করে কী একটা গাইছে। জিনিসটা পিচ্চি এনেছে কি না কে জানে। আজকে না আনলে কপালে দুর্গতি আছে। শয়তান তিন দিন ধরে আজকে না কালকে, কালকে না আজকে করছে। জিনিসটা এমন কোনো সাংঘাতিক কিছুই না, গাঁজার পোটলা। বিউটি মোটেও গাঁজারু না, মাঝে মধ্যে বাথরুমে গিয়ে টানে, ভালো লাগে। পিচ্চি-ই প্রথম এনে দিয়েছিলো — বহুত সেয়ানা। আজ প্রায় বছর খানেক ধরে চলছে এই টানাটানি। এইসব ছাইপাশ ভাবতে ভাবতে তার হঠাৎ মনে পড়লো আপাকে আব্বা নিশ্চয়ই আজকে টাকা দিয়েছেন। অন্তত শ’খানেক টাকা আপার কাছ থেকে উদ্ধার করতে হবে।
প্রতি মাসে ফরিদা লাভলি আর বিউটিকে এক হাজার করে টাকা দেন। লাভলির টাকা লাভলির কোনো কাজেই লাগে না বলতে গেলে। মাঝে মধ্যে কোন্ আইসক্রিম বা ফুচকা আনিয়ে খায়, বাসার সামনের কুপারস-এর পেস্ট্রিও ওর খুব পছন্দ — সে আর কত টাকা, বাকিটা বিউটির পিছনেই খরচ হয়, তবে খাবার-দাবারও বেশিরভাগ বিউটির পেটেই যায়; — আর কুপারস-এর পেস্ট্রি যখন আনা হয় তখন মুখলেস সাহেব পর্যন্ত বিগলিত হয়ে যান। ডায়বিটিসের কারণে মিষ্টি জাতীয় কিছু খাওয়া তার জন্য বিষতুল্য। কিন্তু পেস্ট্রি তাকে দিতেই হয় এবং তা ফরিদাকে লুকিয়ে। তারপরও বিউটির টাকা মাস না পুরাতেই হাওয়া। ডিভিডি কিনে আনে প্রতি সপ্তাহে অন্তত দুই তিনটা। বেশির ভাগ সময় লাভলিই ফরিদার সাথে গিয়ে নিত্য নতুন হিন্দি সিনেমা নিয়ে আসে। এছাড়া বাসায় বিউটি তিনটা সিনে ম্যাগাজিন রাখে, দু’টা বলিউডের একটা দেশি। যদিও সে রাখে পড়ার বেলায় মুখলেস সাহেবও বাদ যান না। অসহ্য!
মুখলেস সাহেব বিউটির কিছু ব্যবহার করলে চামড়ার নিচ পযন্ত চিড়বিড় করতে থাকে তার। অথচ চমৎকার অভিনয়ের কারণে বাড়ির কেউ ব্যাপারটা ধরতে পারে না। এই যেমন পেস্ট্রি যখন আনা হয়, তখন বিউটি তার ভাগের থেকে প্রায় অর্ধেকটা মুখলেস সাহেবকে দিয়ে দেয়। কিছুতেই লাভলিকে দিতে দেয় না।
— থাক আপা, তোমারও পেস্ট্রি পছন্দ আব্বারও, আমার অতো ভালো লাগে না। আমার থিকাই দেই।
এই চরিত্র বহির্ভূত আদরে লাভলির মন ভিজে যায়। মুখে শুধু বড় বড় কথা, ভিতরটা আদতে নরমই — শেষমেশ এই সিদ্ধান্তে পৌঁছায় ও। আর তখন বিউটি ভাবছে, ‘খা বুড়া, খায়া মর। পারলে আস্তো একটা কেক মুখে ঠুইসা দিতাম।’
পিচ্চি আচারের বাটিতে আচার নামাচ্ছে। ইচ্ছা করে একবারও বিউটির দিকে তাকাচ্ছে না।
— এই শয়তান মোমবাতি আনছস? তিনদিন ধইরা মোমবাতি আনতে বলি কানে যায় না?
মোমবাতি হচ্ছে গাঁজার ছদ্মনাম। অনেক ভাবনা চিন্তার পর এই নামটাই সন্দেহাতীত বলে মনে হয়েছে বিউটির। যে হারে ইলেকট্রিসিটি যায় একমাত্র মোমবাতিই ঘন ঘন আনানো যেতে পারে। ফরিদা রান্না শেষ করে খাবার ঘরে ঢুকলেন।
— এখন মোমবাতির কী দরকার? আমার ঘরে আছে, যা নিয়া আয়।
— না, আপনের মোমবাতি নিব কোন দুঃখে। ওরে আনতে বলছি আনছে কি না দেখি। না, আনলে ওর একদিন কী আমার একদিন। এই বদমাইশ আনছস?
— হ আনছি। আপনের ঘরে রাইখা আসছি।
— আমার ঘরে কখন রাইখা আসছিস?
— আপনে যখন ছাদে গেলেন।
— তুই ছাদে কখন গেলি?
— আপনে যখন কাকের পিছে পিছে ঘুরতেছিলেন।
বিউটির উত্তরে ফরিদা মুহূর্তণ থমকে গেলেন, দ্রুতই আবার তা কাটিয়ে উঠলেন।
— তোদের না বলছি আমারে না জিজ্ঞাস কইরা ছাদে যাবি না।
— আপনে তখন ছাদে, আপনেরে জিজ্ঞাস করবো কীভাবে? রাবেয়ার মা বললো আপনে ছাদে, সেইটা শুনে গেলাম।
ফরিদা এই কথার আর উত্তর দিলেন না। কঠিন চোখে একবার তাকিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। তাতে বিউটির কিছু এলো গেলো বলে মনে হলো না। সেও মোমবাতি নামের গাঁজার পোটলার খোঁজে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ঘরে ঢুকলো। ঘরে ঢুকে সে প্রথমে দরজা বন্ধ করলো। তারপর যথারীতি ড্রেসিং টেবিলের আয়নার পিছনে গুঁজে রাখা পোটলা বের করলো, দু’টা ছিলো। একশ’ পঞ্চাশ টাকা দিয়েছিলো, হারামির বাচ্চা হারামি মাত্র দু’টা পোটলা নিয়ে এসেছে। আমার সাথে ফাইজলামি করে। তোর ফাইজলামি বার করতাছি, দাঁড়া — কথাগুলো জোরেই বলে উঠলো বিউটি। আয়নার পিছনে পোটলা দু’টা আবার গুঁজে রাখলো। রাত্রে খাবে মনে মনে ঠিক করলো বিউটি। আর তুণি বসার ঘরের দেয়াল ঘড়ি জানান দিলো দু’টা বাজে। দু’টা বাজে এই উপলব্ধি বিউটিকে অসাড় করে ফেললো। হাতে-পায়ে জোর আসতেই দৌড়ে দরজাটা খুললো। আপা এখনও আসে নাই — দরজা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রইলো কাঠের পুতুলের মতো। ফরিদাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। এক পা দু’পা করে মায়ের ঘরের দিকে এগোলো বিউটি।
অনেকণ ধরেই ভিতরের অস্থিরতা ফরিদার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিলো। মনে মনে তার জানাই ছিলো অন্তত দু’টা বাজার পনেরো মিনিট আগে লাভলি ঠিকই বাসায় ঢুকবে। এখন দু’টা বেজে গেছে, লাভলি ফেরে নাই। সে এখন কী করবে, কোথায় গিয়ে খুঁজবে। — না না, বাইরে তাকে শান্ত থাকতে হবে। ভিতরের তোলপাড় কেউ যেন ঘুণারেও টের না পায়।
বিউটি মায়ের ঘরে ঢুকে দেখলো ফরিদা রাস্তার দিকের জানালার পাশের বেতের চেয়ারে স্থানুর মতো বসে আছেন। নড়চড়হীন। বিউটি যে ঘরে ঢুকেছে এই বোধও আছে বলে মনে হলো না। মুখলেস সাহেবকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। দু’টা বাজার শব্দ শুনেই হয়তো কোথাও ঘাপটি মেরে বসে আছেন। এখন শুধু কেয়ামতের অপো!
এক সময় ফরিদা বিউটির উপস্থিতি টের পেলেন। দু’জন নিঃশব্দে দু’জনের মুখের দিকে খানিকণ তাকিয়ে থাকলো। নীরবতা ভাঙলো বিউটি।
— আম্মা খিদা লাগছে খাবো না?
— হ্যাঁ, রাবেয়ার মা’কে টেবিলে খাবার দিতে বল। টমেটোর সালাদ করে দিতে বলিস।
— আচ্ছা।
— তোর আব্বা কই দেখ, টেবিলে আসতে বল। তার বেলা করে খাওয়া ঠিক না।
স্বাভাবিক থাকার চেষ্টায় ফরিদার কথাগুলি ভাবলেশহীন কাটা কাটা শোনালো। দু’জনের কেউ লাভলি প্রসঙ্গে একটা কথাও বললো না। যেন এই বাড়ির মেয়েরা নিত্যই একা বাইরে যাচ্ছে আর আসবার সময় পার হয়ে গেলেও ফিরে আসছে না। বিউটি রাবেয়ার মাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে বেরিয়ে গেলো। বেরিয়ে যাওয়ার সময় দরজার চৌকাঠে বাড়ি খেয়ে পড়েই যাচ্ছিলো প্রায়, চকিতে দরজা ধরে নিজেকে সামলে নিলো, তারপর পিছন ফিরে ফরিদার দিকে তাকিয়ে ‘কী যে করি’ টাইপ একটা কুণ্ঠিত হাসি দিলো, আড়ষ্টভাবে মাথা চুলকালো। ফরিদা কিছুই বললেন না। হাসির জবাবে বরং তার চিন্তিত ভ্রূজোড়া আরও ভীষণ রকম বেঁকে গেলো।
তিনি অমঙ্গল চিহ্ন এখন চারিদিকে দেখতে পাচ্ছেন। অলীর একশেষ, হোঁচট খাওয়ার আর সময় পেলো না! ধাড়ি শয়তান। মনে মনে কথাগুলি কয়েক বার আওরালেন। দেয়াল ঘড়ির দিকে আরেকবার অবিশ্বাস নিয়ে তাকালেন। দু’টা সাত বাজে। এটা কী ভাবে সম্ভব।
বিউটি যতোটা পারা যায় নিজেকে সামলে নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে দেখলো রাবেয়ার মা টমেটোর সালাদ বানাচ্ছে। বলার আগে কাজ করাও ফরিদা পছন্দ করেন না, মাতব্বরি তার দু’চোখের বিষ — তাহলে বলার আগেই রাবেয়ার মা সালাদ বানাচ্ছে যে বিষয় কী?
— রাবেয়ার মা কী করো?
— সালাদ কাটি ছোটো আফা, টমেটোর সালাদ।
— সালাদ বানাইতে কি আম্মা তোমারে বলছে?
— না বলেন নাই, কিন্তুক প্রত্যেক বছর আপনেদের জন্মবারে টমেটোর সালাদ বানাই। শসা দেওন যাবে না, শুধু টমেটো।
— নিজে থিকা মাতব্বরি করবা না। না বলা পর্যন্ত কোনো কাজ করবা না। বুঝলা?
— জে। টমেটোর সালাদ খাইতেন না?
— খাবো না কেন খাবো। আলগা মাতব্বরি করবা না এইটাই বললাম। মনে থাকবে?
— হ থাকবো।
— টেবিলে খাবার দাও। পিচ্চি কই?
— বাথরুম ধোয়।
পিচ্চিকে ধরতে হবে, একশো পঞ্চাশ টাকায় ছোট ছোট মাত্র দু’টা পোটলা কেন এর একটা বিহিত করতে হবে। শস্তা নাকি! যার যা খুশি করবে!
হনহন করে বিউটি নিজের ঘরে গেলো। উল্টা দিকের দেয়াল ঘড়ি কটকট করে তাকিয়ে আছে আর যেন তাকেই ব্যঙ্গ করছে। দেখ বিউটি দেখ, এত যে তোমার চোপা অথচ তুমি যা পারো নাই, তাই তোমার চোখের সামনে ‘শান্ত শিষ্ট লেজ বিশিষ্ট’ বোন করে দেখাচ্ছে। তোমার জারিজুরি সব শেষ!
সেই মুহূর্তে বিউটির অসহ্য ক্রোধ হলো নিজের উপর, অসহ্য। সে কি না বাড়িতে বসেই কাটালো এতগুলি বছর। বসে কাটাবে না তো কী, তাকে তো কেউ টেনেও বের করতে পারে না বাড়ি থেকে। তার এতো কীসের ভয়! এই দম আটকানো চার দেয়ালের বাইরে তার অবস্থা কেঁচোর মত কেন। নিজের উপর ঘৃণায় হতাশায় গা রিরি করতে লাগলো। বাড়ির ভিতরেই যত হেন করেঙ্গা তেন করেঙ্গা নইলে বাড়ির বাইরে বাচ্চাদের মতো নিরাপত্তাহীন আর অসহায়। এই সত্য প্রথম উপলব্ধি করে এতটুকু হয়ে গেল সে। পিচ্চিকে দাবড়ানি দেবার ইচ্ছা তার ভিতর থেকে সম্পূর্ণ লোপ পেলো।
পিচ্চি বাথরুম থেকে বের হলো তারপর ছোট আপার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় জানতে চাইলো পোটলা পেয়েছে কি না। পিচ্চির সাহসে বিউটি স্তম্ভিত। দেখা যাচ্ছে এই বাড়িতে সে ছাড়া মোটামুটি কারুরই সাহসের কমতি নাই।
— মাত্র দুইটা পোটলা কেন?
— হাকিম ভাইয়ের কাছে স্টক নাই। নিজের থিকা দিছে। আরও দুইটা পাইবেন।
— পুরা টাকা দিলি কেন তাইলে?
— পুরা টেকা দেই নাই। আমার কাছে আরও দুইটার দাম আছে। আপনেরে ফিরত দেই নাই, কাইল পরশু গিয়া নিয়া আসুম।
— আব্বারে ডাক দে, বল টেবিল লাগানো হইছে।
— বড় আফায় কই গেছে? এখনতরি আসে নাই।
— ফড়ফড় করবি না, শয়তান… যা, এণ এই ঘর থিকা যা।
— না, চিন্তা হইতেছে দেইখা জিগাইলাম।
পিচ্চি ঘর থেকে বের হয়ে যেতেই বিউটির প্রবল ইচ্ছা করলো বাথরুমে ঢুকে গাঁজার কাঠি বানিয়ে বড়সড় একটা টান দিতে। কিন্তু এখন দেয়া যাবে না, যেকোনো মুহূর্তে খেতে যাবার জন্য ডাক পড়বে। শালার জীবন, কিছুই নিজের ইচ্ছা মতো করা গেলো না! ওদের খাবার ঘরটা ছোটোর মধ্যে নিঁখুতভাবে গোছানো। এটাকে ঠিক পরিপূর্ণ কোনো ঘর বলা যাবে না, বিভিন্ন ঘরে যাওয়ার জন্য একটা কমন জায়গা বলা চলে। রান্নাঘর থেকে বের হলেই খাবার জায়গা আবার রান্নাঘরের উল্টা দিকে পাশাপাশি দু’টা দরজা। একটা লাভলির ঘরের দরজা অন্যটা বিউটির। দু’টা ঘর ছাড়িয়ে গেলে ইংরেজি ওয়াই অক্ষরের মাথার মতো আরও দু’টা ঘর শেষ মাথার দুই প্রান্তে। বাঁয়ের ঘরটা বসার ঘর আর ডানেরটা ফরিদা আর মুখলেস সাহেবের শোবার ঘর। এই বাসার সবচেয়ে বড় ঘর সেটাই। বসার আর ফরিদাদের শোবার এই দু’টা ঘরই রাস্তার দিকে মুখ করে। অবশ্য ফরিদার ঘর থেকে যতো স্পষ্টভাবে রাস্তা দেখা যায় ততোটা বসার ঘর থেকে দেখা যায় না। যাই হোক, সেই খাবার জায়গায় একটা ছয়-সিটের ডাইনিং টেবিল বসানো। টেবিলের মাথায় মুখলেস সাহেবের নির্দিষ্ট জায়গা। তার বাঁ দিকে ফরিদা, ফরিদার পাশে লাভলি বসে, বিউটি ফরিদার উল্টা দিকের চেয়ারে বসে। এছাড়া একটা মিটসেফ আছে, ফ্রিজও এখানেই রাখা। বাঁ দিকের দেয়াল জুড়ে একটা আজমির শরিফের ছবি বাঁধানো।
ইতোমধ্যে খাবার দেয়া হয়ে গেছে, বেশ ধোঁয়া বের হচ্ছে। খাবারের ম ম গন্ধে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। বিউটির পক্ষে আর বেশিক্ষণ খিদে আটকে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। সে বেশ মরিয়া হয়ে উঠলো। সে তার নির্দিষ্ট চেয়ারে বসে পড়লো আর সেখান থেকেই জোরে ফরিদাকে ডাকলো। মুখলেস সাহেবকে ডাকার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা না থাকলেও ডাকতে হলো। কারণ তিনি এসে না বসা পর্যন্ত খাওয়া শুরু করা যাবে না। নিঁখুত হতে হবে, সবকিছু নিখুঁত।
— চিল্লাচিল্লি করতেছিস কেন?
—খিদা লাগছে। দুইটা বাজছে অনেক ক্ষণ।
এটা সে কী বললো, এটা কী মনে করিয়ে দেবার মতো কোনো কথা। এই কথার পর মা, মেয়ে দু’জনেই দেয়ালঘড়ির দিকে তাকালো। সেখানে অবশ্য পোনে একটা বেজে ঘড়ির কাঁটা বছর খানিক ধরে দম নিচ্ছে। আল্লাহ’র রহমত! দু’টা বাজার পরেও ঘড়ির কাঁটা ছুটে চলেছে এই দৃশ্য না দেখাই ভালো।
—রাবেয়ার মা, বলছি না খাওয়ার সময় কাছে থাকবা। লাভলির প্লেটটা সরাও।
রাবেয়ার মা ইতস্তত করে লাভলির প্লেট সরালো। ফরিদা বিউটির দিকে তাকিয়ে কারণ ব্যাখ্যা করলেন।
—খালি প্লেট দেখতে ভালো লাগে না।… লাভলি আসলে প্লেট আবার দিয়া যাইও।
শেষের কথাটা রাবেয়ার মা’কে উদ্দেশ্য করে। মিটসেফের ভিতরে প্লেট রাখতে গিয়ে ফরিদার কথা শুনে সে উপরে রাখলো।
—খালুজানরে ডাক দেও।
—পিচ্চি ডাকতে গেছে।
বিউটি তথ্য যোগান দিলো। ফরিদা হাঁসের মাংসের বাটিটা টেনে নিলেন, নাকের কাছে ধরে গন্ধ শুঁকলেন। তাকে সন্তুষ্টই মনে হলো।
—রাবেয়ার মা মাংসের পাতিলটা নিয়া আসো, আর তোমাদের বাটি।
রাবেয়ার মা সঙ্গে সঙ্গে পাতিল আর বাটি হাতে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এলো। মনে হলো এতক্ষণ সে এগুলি হাতে নিয়ে দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলো, বলা মাত্র বান্দা হাজির। এই ক্ষিপ্রতায় ফরিদা খুশি হলেন। গলার হাড় এবং ডানা ছাড়াও দু’জনের জন্য দু’টা আস্ত মাংস আর হাঁসের চামড়া দিলেন ঝোলসহ। মন তার আজকে দরাজ হয়ে গেল নাকি কোনো কারণে অথবা এলোমেলো চিন্তায় এতটাই অন্যমনস্ক যে চাকর-বাকরদের মাংসও দিয়ে দিচ্ছেন অবলীলায়। বাটির দিকে তাকিয়ে রাবেয়ার মা’রও চোখ কপালে উঠলো।
—খালাম্মা এই তরকারী আমার আর পিচ্চির লাইগ্গা।
—কথা কম বলবা, তরকারী দুপুর আর রাত্র মিলা খাবা। এইগুলান নিয়া যাও আর একটা প্লেট নিয়া আসো।
—জে।
—তুমাদের ভাত রান্ধো নাই তো?
—জে না।
‘জে না’ বলতে গিয়ে রাবেয়ার মা’র বত্রিশ পাটির দাঁত বের হয়ে গেলো। মুখলেস সাহেব বিড়ালের মতো নিঃশব্দ পায়ে এসে তার নির্দিষ্ট চেয়ারে বসলেন। বিউটির দিকে তাকিয়ে বোকার মতো হাসলেন আর সাথে সাথে বিউটির মুখ কঠিন হয়ে গেলো। বিউটি যে মুখলেস সাহেবকে দেখতে পারে না এই তথ্য সবার অজানা থাকলেও মুখলেস সাহেবের কাছে তা পানির মতো পরিষ্কার। কিন্তু তিনিও এই বিষয়টাকে কখনও লোকচক্ষের সামনে আসতে দেন নাই। খুব স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিয়েছেন —মেয়ে বাপকে কঠিন অপছন্দ করবে এতে আর আশ্চর্য হবার কী আছে, হরদম ঘটছে —ভাবটা এমন!
দ্বিতীয় দফায়ও ফরিদা রাবেয়ার মা আর পরিবারের দু’জনকে চমকে দিয়ে ইলিশ মাছের সুন্দরমতো দু’টা টুকরা আর গাদাখানিক পোলাও ওদের জন্য প্লেটে বেড়ে দিলেন। আজকে ফরিদার মনটা নরম, আহারে —এই ভেবে মুখলেস সাহেব বুকের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা বড়সড় নিঃশ্বাসটা গিলে ফেলতে গিয়ে বিষম খেলেন। সাথে সাথে এক চুমুক পানি খেয়ে কাশি সামলালেন। এদিকে বিউটি ভাবছে, এতোদিনে আম্মা ভালো ধরা খাইছেন —এই চিন্তা বিউটির মাথায় আসার সাথে সাথে ঠোঁটের বাম কোণায় তীর্যক হাসি দেখা গেলো।
ওরা নিঃশব্দে খাচ্ছে। চপত চপত শব্দে মুখলেস সাহেবের খাওয়া ছাড়া আর বিশেষ কিছু শোনা যাচ্ছে না। আজকের ইলিশ-পোলাও বিউটিকে অবাক করে দিয়ে দুর্দান্ত লাগছে খেতে। টেবিলে বসে গন্ধেই টের পেয়েছিলো বিউটি রান্না হয়েছে ফাটাফাটি। রাবেয়ার মা আর পিচ্চির জন্য ফরিদার বেড়ে দেওয়া শেষ হতে বিউটি এক রকম হুমড়ি খেয়ে পড়লো খাবারের উপর। টেবিলে একটা পদ কম —দই বেগুন দেখা যাচ্ছে না। ফরিদা বেমালুম ভুলে গেছেন।
মুখলেস সাহেবও গভীর আনন্দে খেয়ে চলেছেন। শুধু ফরিদা খেতে খেতে কখনও ঠোঁট কামড়ে ধরলেন, দু’বার কারণ ছাড়াই শিউরে উঠলেন, একবার পানি খেতে গিয়ে ঠোঁটের কাছে গ্লাস আনার আগেই গ্লাস কাৎ করে দিলেন, ফলে বেশ খানিকটা পানি ঠোঁট গড়িয়ে তার শাড়িতে পড়লো। কিঞ্চিৎ অপ্রস্তুত হলেও অসাধারণ দক্ষতায় এইসব ছোটোখাটো ঘটনাগুলি ধামাচাপা দিতে পারলেন অথবা ভাবলেন পেরেছেন। একবার শুধু বিউটি মুখে নলা দিতে গিয়ে থমকে মায়ের দিকে তাকালো। পাছে মায়ের দুরবস্থায় আবারও হাসি আসে এই ভয়ে চটজলদি চোখ সরিয়ে নিলো।
—রাবেয়ার মা, দই আর পায়েসের বাটি ফ্রিজ থিকা বার করো।
সেদিন আর কেউ পায়েস বা দই খেলো না। মুখলেস সাহেবের খাওয়ার ইচ্ছা ছিলো তাকে খেতে দেয়া হলো না। বিউটি গলা পর্যন্ত খেয়েছে, পেটে এক ফোঁটাও জায়গা ছিলো না আর কিছু খাওয়ার। বিকালে খাবে বলে উঠে পড়লো। আর ফরিদার পায়েসের বাটির দিকে তাকাতেই গা গুলিয়ে উঠলো, খাবার তো প্রশ্নই উঠে না।
খাওয়া শেষ হতে যে যার ঘরের দিকে পা বাড়ালো শুধু মুখলেস সাহেব ছাড়া। আজকে উনি ঠিক করেছেন পারতপক্ষে ফরিদার সামনে পড়বেন না। লাভলি ফিরে আসুক তারপর তুলকালাম যা হবার হওয়ার পরে বারান্দা থেকে বের হবেন। যদিও এখন বেশ শীত শীত লাগছে। বারান্দায় গিয়ে শালের উপর কম্বল জড়িয়ে বসবেন ঠিক করলেন। তিনি জানেন এখন ফরিদা বা বিউটি দু’জনের কেউই তাকে সহ্য করতে পারবে না —তার দিকে তাকালেই মেজাজ চড়তে শুরু করবে ওদের। শুধু শুধু ওদের মেজাজ খারাপ করানোর কী দরকার? তিনি চুপচাপ বারান্দায় বসে নিচু ভলিউমে গান শুনবেন —না, আজকে বোধহয় গান শোনা ঠিক হবে না। তাতেও ক্ষতি নাই, নতুন দু’টা সিনেমার পত্রিকা আছে সেগুলি দেখতে দেখতেই ঘণ্টাখানেক আরামে কাটিয়ে দিতে পারবেন। একটু ঘুমিয়েও নিতে পারেন। বারান্দায় গেলেই পিচ্চি বখশিশের লোভে লোভে ঠিকই চলে আসবে, তখন তাকে মাথায় হাত বুলাতে বলবেন বা পাকা চুল বেছে দিতে বলবেন। সে একটা একটা করে চুলের গোড়ায় হালকা টান দিবে আর অনায়াসে তার চোখ বুজে আসবে।
* * *
অনেকক্ষণ থেকে মনিপুরি পাড়ার একশ’ পনেরো বাই তিন বাড়িটার উপরে একটা একটা করে মেঘ জমতে শুরু করেছে। শীতের এই অপরাহ্ণে কালো কালো মেঘের দল কোথা থেকে বিশেষ করে এই বাড়িকে উদ্দেশ্য করে ছুটে আসছে বলা মুশকিল। তবে কাকের কালো মখমল শরীরে ভর করে যে আসছে সেটা বোঝা যাচ্ছে। এই বাড়ির উপর এসে ট্রাক থেকে সশস্ত্র সৈন্য নামার মতো টুপ টুপ করে নেমে পড়ছে। পুরো বাড়িটা যেন উপরে মেঘ আর ভিতরে আটকা-পরা বাসিন্দাদের নিয়ে একটা যতিচিহ্নের সামনে দাঁড়িয়ে পড়েছে।
মেঘ জমতে শুরু করেছে ফরিদার মাথার ভিতরেও। জমাটবাঁধা শক্ত মেঘ। এরা কখনও দুই ভ্রূর ঠিক মাঝখান দিয়ে গণ্ডারের শিংয়ের মতো ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে, আবার কখনও গুড় গুড় শব্দে ডাকছে। বাইরে থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে ফরিদার কপালের ঠিক মাঝখানের জায়গাটুকু একবার ফুলে উঠছে আবার নেতিয়ে পড়ছে, আবার ফুলে উঠছে। মাথায় যন্ত্রণা হচ্ছে কি না তাও ঠাহর করতে পারছেন না তিনি। এতো কিছুর মধ্যেও মুখলেস সাহেবের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধ করলেন, হাজার হোক তাকে একা থাকার সুযোগ করে দিয়েছেন। এখন যদি মুখলেস সাহেব তার মুখের সামনে হ্যাঙ্গারের মতো ঝুলে থাকতেন তাহলে অবধারিত ভাবে ফরিদার সমস্ত বিদ্বেষ, হতাশা, ক্ষোভ তার উপরে গিয়ে পড়তো। আসলে মুখলেস সাহেব মোটেও ফরিদাকে একা থাকার সুযোগ করে দেন নাই বরং নিজেকে রক্ষা করেছেন মাত্র। চাচা আপন প্রাণ বাঁচা!
গত পনেরো মিনিট ধরে ফরিদা শোবার ঘরের এক প্রান্ত থেকে হেঁটে অন্য প্রান্তে যাচ্ছেন আবার ফিরে আসছেন। ঘড়ির দিকে তাকাতে তার ইচ্ছা করছে না। চারটা বাজলেও অবাক হবেন না। চুপ করে বসে যে ভাববেন তাও পারছেন না, কিছুই মাথায় খেলছে না। কী নিয়ে যে ভাববেন সেটাও মাঝে মাঝে মনে থাকছে না। লাভলি এতটা বেপরোয়া হবে তা ফরিদার কল্পনার বাইরে ছিলো। বিউটির কথামতো সত্যি সত্যি যদি আর না ফেরে? কিন্তু যাবে কই? —চল্লিশটা বছর পেলে পুষে বড় করেছেন —সেই মেয়ে কি তার সাথে এতো বড় বেঈমানী করতে পারবে। দুই মেয়ের জন্য লাভলি কী করেন নাই। পরিবারের সাথে সম্পর্ক বলতে কিছু নাই, সামাজিকতার ধার ধারেন না। দুই মেয়ের আরাম আয়েসের জন্য জীবনপাত করেছেন। ওদের চাহিদা, নিরাপত্তার উপর আর কোনো কিছু অগ্রাধিকার পায় নাই। আর কী করতে পারতেন তিনি? ওদের বিয়ে পর্যন্ত দেন নাই। কে জানে বিয়ের পরে কী জীবন অপেক্ষা করছে, এই ভয়ে কোনো পাত্রই ধোপে টেকে নাই।
টেলিফোন বাজছে অনেক ক্ষণ থেকে। অন্তত পাঁচটা রিং হয়ে বন্ধ হয়ে গেলো কিন্তু ফরিদা শুনতে পেলেন না। আবার টেলিফোন বাজতে শুরু করেছে। এবার দৌড়ে টেলিফোনের সামনে গেলেন ঠিকই কিন্তু ধরলেন না, ওয়াড্রোবের পাশে বরফ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। একবার হাত বাড়িয়েও গুটিয়ে নিলেন।
আবার টেলিফোন বাজছে, যে করছে সেও কম যায় না। তুমি তুলবা না তোমার ঘাড়ে তুলবে!
—হ্যালো?
—হ্যালো।
—হ্যাঁ বলেন, বলেন আপনে কী চান ?
—আমি তো কোনো দিনই কিছু চাই নাই ফরিদা।
—ইয়ার্কি মারার সময় এখন না। বিশ/বাইশ বছর পরে আপনে যখন আবার ফোন করা শুরু করছেন, তখন মতলব কিছু আছেই। সেইটা কী তা যত তাড়াতাড়ি খোলাসা করবেন তত আমাদের দুইজনের জন্যই মঙ্গল।
—তুমি একটুও বদলাও নাই ফরিদা। ইস্পাতের মতো শক্ত।
—এইসব ধানাই পানাই দয়া কইরা বাদ দেন।
—মেয়ে দুইটারে একটু দেখতে চাই ফরিদা। আমি কে কী বিত্তান্ত কিছুই বলবো না, শুধু মেয়ে দুইটারে চোখের দেখা দেখতে চাই।
—অসম্ভব।
—আমার কর্তব্য আমি করছি ফরিদা এখন তোমার কর্তব্য তুমি করো। আমাদের দুইজনেরই বয়স হইছে। শরীর আমার খুবই খারাপ, যেকোনো সময় আল্লাহ’র দরবারে ডাক পাইতে পারি, মেয়ে দুইটাকে দেখলে মনে শান্তি পাবো।
—বললাম তো কোনোদিনই সম্ভব না। আর আপনে কারে ভুলান, কী কর্তব্য করছেন? —সময় সময় টাকা পাঠাইছেন এই তো? —আপনে করছেন পাপের প্রায়শ্চিত্ত আর কিছু না। নিজের পুলাপানের সামনে গিয়া কইতে পারবেন লাভলি আর বিউটি কে, পারবেন?
—না, এই বয়সে তাদের এত বড় শোক দিতে চাই না। খোদেজাও মারা গেছে বেশিদিন হয় নাই। আমি কারো ক্ষতি করবো না। শুধু আইসা একটু দেইখা যাবো। ওদের জন্য কিছু টাকা দিয়া যাবো।
—টাকা দিতে চাইলে দিবেন, কিন্তু মেয়েদের সাথে দেখা হবে না।
আসলেই ইস্পাতের মতো ঠাণ্ডা আর কঠিন শোনালো ফরিদার গলা। আবদুুল বশির সাহেব ফরিদার কথার পর কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলেন, তারপর দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
—মেয়ে দুইটারে পাইয়াও তুমি সুখি হইলা না ফরিদা!
—আমি অসুখী এই সংবাদ আপনেরে কে দিছে।
আবারও বেশ কয়েক সেকেন্ড বশির সাহেব চুপ —শুধু ফোনের অন্য প্রান্তে তার ভারি নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। ফরিদার কপালের নিচে জমাট বাঁধা মেঘ আলগা হতে শুরু করেছে। যেকোনো মুহূর্তে প্রবল বিদ্যুতের ঘায়ে বৃষ্টি নামবে অথবা জমাট মেঘপুঞ্জ বাতাসের তোড়ে উড়ে চলে যাবে ফরিদাকে আরও শক্ত আরও কঠিন হবার সুযোগ করে দিয়ে।
—মেয়ে দুইটারে বিয়া দিলা না কেন ফরিদা, এত বড় ক্ষতি কেন করলা? ওদের চিন্তায় রাত্রে ঘুমাইতে পারি না…
আরও কিছু হয়তো তিনি বলে যাচ্ছিলেন কিন্তু সেগুলি শোনার মানসিক শক্তি ফরিদার ছিলো না। ফোন কেটে দিলেন। ওয়াড্রোব-এর উপর দুই হাত রেখে তার উপর মাথা রাখলেন। এক সময় ওয়াড্রোবের গা ঘেঁষে মাটিতে বসে পড়লেন। চোখ থেকে পানি টপ টপ করে পড়ছে, বাধা দিলেন না ফরিদা —যতোটুকু আছে বেরিয়ে যাক!
মেয়ে দু’টাকে কীভাবে তিনি আল্লাহ’র তিরিশটা দিন আগলে রেখেছেন। মুরগি তার ছানাগুলিকে যেভাবে পালকের নিচে রেখে দেয়, তিনি তাই করেছেন। জগতের সব কিছুতেই ফরিদার গা গুলায়, গা ঘিনঘিন করে —মেয়েদেরকে সেগুলির কোনো কিছুর ছায়াও মাড়াতে দেন নাই। মেয়েদেরকে তিনি রক্ষা করেছেন এই কথা কেউ বোঝে না। না বুঝলে নাই, তিনি কারও ধার ধারেন না। মেয়েরা তার ভালো আছে এইটাই সবচেয়ে আসল কথা।
ফরিদার তক্ষুনি মনে পড়লো লাভলি বাসায় নাই। বুকের ভিতর থেকে জানটা এক লাফে গলা দিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইলো। ঠিক সেই সময় ফরিদা নিশ্চিত হলেন লাভলি কোথায়। আবদুুল বশির যতই ফোন করে ভাওতা দিক না কেন, তিনি হলফ করে বলতে পারেন লাভলি এখন আবদুুল বশিরের জিম্মায়।
সে কি তাহলে মেয়েকে সব কথা বলে দিবে। না, এটা সে করবে না। তাহলে সে কী বলবে মেয়েকে?
ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছা করছে ফরিদার। ইচ্ছা করছে বিউটির ঘরে গিয়ে মেয়েটার হাত ধরে চুপ করে বসে থাকতে। কেউ যদি তখন তাদেরকে তালা মেরে রাখে তাহলে আরও ভালো হয়।
লাভলি এখন বশিরের সাথে কোথায় আছে, কী করছে, দুপুরে কি কিছু খেয়েছে? অবশ্যই খেয়েছে —বশির ঠিকই লাভলিকে খাওয়াবে, হয়তো খুব ভালো কোনো রেস্টুরেন্টে খাইয়েছে। বড়লোকী জাহির করতে হবে না! সব কিছু শোনার পর লাভলি যদি আর এই বাড়িতে ফিরে আসতে না চায়, এই মায়ের মুখ যদি আর দেখতে না চায়! না, সেটা কখনও হবে না, ফিরে সে আসবেই, হাজার হোক ও ফরিদার মেয়ে —মায়ের কথার অবাধ্য হতে ওরা দুই বোনের কেউই শেখে নাই।
* * *
নাইওর থেকে ফিরে ফরিদা কমলাপুরে কবি জসিম উদ্দিন রোডের শেষ মাথার প্লটটায় স্বামীর সাথে এসে উঠলেন। মুখলেস সাহেব ধরেই নিয়েছিলেন বিয়ের পরে নতুন বউ যে হতাশা আর গ্লানি নিয়ে বাপের বাড়িতে নাইওর করতে গেলেন, তার ফিরে আসার সম্ভাবনা শূন্য। কিন্তু যখন ফিরে এলেন এবং আপাতদৃষ্টিতে হাসি মুখে ফিরে এলেন তখন মুখলেস সাহেব গভীর ধন্ধে পড়ে গেলেন। এরকম আস্তো একটা সুন্দরী মেয়েকে পাশে নিয়ে বসবাস করা তার জন্য ভয়াবহ।
—আমি সত্যিই বিয়া করতে চাই নাই ফরিদা, তুমি বড় ভাইজানকে জিজ্ঞাস করো।
—শুনো, তুমি আমার স্বামী। তোমার লজ্জা মানে আমার লজ্জা। এই বিষয় নিয়া আমরা আর কোনোদিন কথা বলবো না। এই বিষয়ে কথা বলা আজকেই শেষ, মনে থাকে যেন।
—তুমি জীবন কেমনে পার করবা?
—তোমারে একটা সত্য কাহিনী বলি, আমার আপনা ফুপাতো বোনের কথা, বিয়ার পরের দিন তার স্বামীরে সাপে কাটলো। সে জীবন পার করছে শ্বশুর বাড়িতে, অন্যের ফুট-ফরমাশ খাইটা। সেই তুলনায় আমি তো ভাগ্যবতী। আমার স্বামী জীবিত, সুস্থ। এই নিয়া আর দ্বিতীয় কথা না।
ফরিদা সংসার পাতলেন তিন কামরার টিনের বাড়িতে। বাড়িটা খুব পছন্দ হলো তার। শহরের মধ্যে বাড়ি কিন্তু গ্রাম গ্রাম ভাব। মূল বাড়ির সাথে লাগোয়া আর একটা ছোট ঘরে রান্নার ব্যবস্থা। রান্নাঘর ঘেঁষে এক চিলতে পাকা জায়গায় টিউব অয়েল বসানো। সেখানে বাসন, কোসন ধোয়া, হাত-মুখ ধোয়া। বাড়ির পিছনে অনেকখানি খালি জায়গা। সেখানে তারা সব্জির বাগান করলেন। ছুটির দিনে বাগানে বসে চা খেতেন, টুকটাক গল্প করতেন। খুব সুখি ছিলেন তখন, শুধু মাঝে মধ্যে মাঝরাতে উঠে বসে থাকতেন ফরিদা, এই যা। মুখলেস সাহেবে টের পেতেন ঠিকই কিন্তু কখনও জানতে দেন নাই।
একদিন মুখলেস সাহেব অফিস থেকে ফিরলেন তার গ্রাম সম্পর্কের এক চাচাতো ভাইকে সাথে নিয়ে। ভদ্রলোক মুখলেস সাহেব থেকে অন্তত বছর পাঁচ/ ছয়ের বড়, নাম আবদুুল বশির। বিয়ের পরে স্বামীর দিকের আত্মীয়ের দেখা ফরিদা পান নাই-ই বলা চলে। তাই একেবারে সঙ্গে করে নিয়ে আসায় বেশ অবাক হলেন। সেদিন মুখলেস সাহেবকে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত উৎফুল্ল দেখালো। ফরিদাকে ভালো-মন্দ রান্না করতে বললেন। বাগান থেকে কাঁচা টমেটো নিজে তুলে এনে দিলেন আর চিংড়ি মাছ দিয়ে রাঁধতে বললেন। চিংড়ি মাছ সাথে নিয়েই এসেছিলেন আর একটা মুরগি। বাসায় পিঁয়াজ বেশি নাই বলতেই পিঁয়াজ আনতে ছুটলেন।
—ফরিদা, বশির ভাই আর আমরা পাশাপাশি বাড়িতে থাকতাম। বশির ভাইয়ের আম্মা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। কতো কিছু যে খাওয়াইছেন চাচি-আম্মা, সে তোমারে বইলা শেষ করা যাবে না।
—তোমরা বাগানে বসো, আমি চা কইরা আনতেছি।
—বাগানে কাঁচা টমেটো আছে, না কি সব পাইকা গেছে?
—আছে।
—কয়টা তুইলা আনি। কাঁচা টমেটো দিয়া চিংড়ি মাছ রানবা। চিংড়ি মাছ সাথে নিয়া আসছি। মুরগি আনছি, আলু আর কাঁচামরিচ দিয়া পাতলা ঝোল করবা।
—রানবো যে পিঁয়াজ বেশি নাই ঘরে। দুইটা আছে তাও শুকনা।
—আচ্ছা, তুমি চা বানাও আমি সামনের দুকান থিকা পিঁয়াজ নিয়া আসি।
পিঁয়াজ আনার জন্য মুখলেস সাহেব তড়িঘড়ি বাসা থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়ে আবার ফিরে এলেন।
—বাড়িতে মুড়ি টুড়ি আছে না কি? তাইলে চায়ের সাথে দিতে পারতা। না কি আমি নিয়া আসবো?
—মুড়ি নাই কিন্তু চিড়া আছে, ভাইজা দিবো নে, যাও। তুমি এত অস্থির হইতেছো কেন?
ফরিদার কথায় মুখলেস সাহেব একটু মিইয়ে যান, যেন তার অভিসন্ধি ফরিদা ধরে ফেলেছেন —আমতা আমতা করে কী একটা বলে ঘর থেকে প্রায় পালিয়ে গেলেন।
—না, অস্থির না —ছোট থাকতে উনাদের অনেক খাইছি, আদর পাইছি…
আহারে, নিজের বলতে লোকটার কেউ নাই, কে কবে আদর করেছিলো তার জন্য এখনও কত উতলা —ফরিদা গভীর মায়াবোধ করলেন মুখলেস সাহেবের জন্য।
শোবার ঘর থেকে রান্নাঘরে যাবার সময় সেই প্রথম ফরিদা আবদুুল বশির সাহেবকে দেখলেন। খুবই সাধারণ চেহারা, রঙ বেশ কালো, তবে উঁচা-লম্বা। তাকে দেখে নিজের অজান্তেই ফরিদা আঁচল দিয়ে ঘোমটা টানলেন।
—আসসালামালাইকুম।
—ওলাইকুম আসসালাম, ভাবি সাহেব। আপনেদের সংসার দেখতে আসলাম। বাড়ি তো চমৎকার।
—জি, ভালো করছেন। বাগানে বসেন ভাইজান, চা আনতেছি।
—মুখলেস কই গেলো?
—একটু দুকানে গেছেন, এখনি চইলা আসবেন।
ফরিদা রান্নাঘরে গিয়ে চায়ের পানি বসিয়ে ভাবলেন, স্বামী বড় মুখ করে একজন মেহমান নিয়ে এসেছেন, তার যতœ তিনি সাধ্যমতো করবেন। দুই মুঠ বুটের ডাল ভিজালেন, মাংসের মশলা দিয়ে রাঁধবেন —মুখলেস সাহেব খুব পছন্দ করেন।
সেদিন রাতে মেহমান বিদায় হওয়ার পরে মুখলেস সাহেব গল্প করলেন কীভাবে আবদুুল বশিরের পরিবার তার মতো এতিমকে আপন করে নিয়েছিলেন। মায়ের আদর-যতœ কী তার ছোটখোটো নমুনা আবদুল বশিরের মায়ের কাছেই তিনি পান।
এর সপ্তাহখানেক পরের ঘটনা, একদিন মুখলেস সাহেব অফিস ছুটির ঘণ্টাখানেক আগে বাড়িতে ফিরলেন। খাওয়া দাওয়া করলেন তারপর ধীরে সুস্থে কথাটা ফরিদার কাছে ভাঙলেন।
—বশির ভাইয়ের সাথে কালকে দেখা হইছিলো। অফিসে আসছিলেন। তোমার রান্নার স্বাদ না কি এখনও জিব্বায় লাইগা আছে।
—তাই না কি? বলো নাই তো?
—বলি নাই, না? চট্টগ্রামে বশির ভাইয়ের বিরাট এক্সপোর্ট ইমপোর্টের কারবার, বুঝলা? সেই কারবার ঢাকাতেও আনতে চান। সেই কারণেই ঢাকায় আসা, আপাতত হোটেলে উঠছেন। কতোদিন আর হোটেলে থাকা যায়, বুঝলা না?… মানে, আমি উনারে একটা প্রস্তাব দিছি… আমাদের খালি কামরাটায় উনি কয়েক মাস থাকুক। উনারও খাওয়া-দাওয়ার চিন্তা থাকবে না, আমাদেরও বাড়তি কিছু পয়সা সংসারে আসবে। তুমি কী বলো?
বুদ্ধিটা ফরিদার ভালোই মনে হলো। বিশেষ করে বাড়তি পয়সা আসার ব্যাপারটা তো খুবই ভালো। খুশি মনে রাজি হয়ে গেলেন।
—হ্যাঁ, উনি খালি ঘরটায় আরামে থাকতে পারবেন। ওই ঘরে খুব হাওয়া হয়… কত দিবে কিছু বলছে?
—না, তবে খারাপ দিবে না। উনার হাত খুব দরাজ।
দরাজ হাতের নমুনা ফরিদাও পেয়েছেন। নতুন বউয়ের মুখ দেখা উপলক্ষ্যে সেদিন আবদুুল বশির সাহেব বেশ কিছু টাকা তার হাতে গুঁজে দিয়েছিলেন। ফরিদা প্রথমে নিতে চান নাই।
—নেন ভাবি সাহেব, মনে করেন বড় ভাসুর আপনেরে দিচ্ছে, না নিলে বেয়াদবি হবে।
—আরে নাও, নাও… বশির ভাই অতি অবশ্যই বড় ভাসুর।
ফরিদা সেদিন লাজুক হেসে টাকা ক’টা হাতে নিয়েছিলেন। পরে একান্তে গুণতে গিয়ে ওর চোখ প্রায় কপালে উঠে গেছে —১০০ টাকা! এত টাকা এমনি এমনি কেউ কাউকে দেয়! সুতরাং টাকা যে ভালোই পাওয়া যাবে সে বিশ্বাস ফরিদারও হলো —তাই স্বামীর প্রস্তাবে একেবারেই আপত্তি করলেন না, বরং হাসিমুখে অনুমতি দিলেন।
এক মঙ্গলবার সকালে শুধু একটা ছোটো কালো সুটকেস হাতে আবদুুল বশির সাহেব কবি জসিম উদ্দিন রোডের ১১ নম্বর বাড়িটায় উঠে এলেন। ঠিক সেই মুহূর্তটা থেকে ফরিদার জীবন ভয়ানক পাল্টে গেলো। শুরুর দিকে পুরো ব্যাপারটাই ছিলো এক ধরনের খেলা। যেন ফরিদা বিংশ শতাব্দীর দ্রৌপদী, পার্থক্যের মধ্যে তার স্বামী দু’টা। এক স্বামী যুধিষ্ঠিরের মতো ধর্মপ্রাণ অন্য স্বামী অর্জুনের মতো বীর্যবান!
বিয়ের পরে সেই পয়লা মুখলেস সাহেব নিঃশঙ্ক, ভারশূন্য বোধ করলেন। তার ঘাড়ের উপর থেকে বিশাল এক বোঝা তিনি নামিয়ে ফেলতে পেরে সুখী, অনুতাপশূন্য। ফরিদা সেই থেকে ভয়াবহ ভারে নত, পাপ-বোধে গলা পর্যন্ত নিমজ্জিত আর তা ঢাকতে ইস্পাতের মতো শক্ত, ছুরির ফলার মতো ধারালো। তবে জোর করে মাথা উঁচু করতে গিয়ে বুকের পাঁজর নতুন চাঁদের মতো বেঁকে গেলো। আপাত দৃষ্টিতে ওদের সংসারে কোনো খুঁত ছিলো না। সারা দিন ফরিদার কেটে যেতো সরল স্বাভাবিক জীবন নিখুঁতভাবে চালাতে। দিনের বেলা নাস্তা বানানো, নাস্তা খেয়ে মুখলেস সাহেব আর আবদুল বশির সাহেব বেরিয়ে যাওয়ার পরে পনেরো মিনিটে গোসল সারা, সাহেবদের ছেড়ে যাওয়া কাপড় গুছিয়ে রাখা, ঘরবাড়ি সামলানো, কাপড় ধোওয়া তারপর রান্নার যোগাড় করা, রান্না সেরে বাগানে হাঁটাহাঁটি, শখ করে কখনও চা খাওয়া এবং সাহেবদের জন্য অপেক্ষা করা। তারা ফিরলে ভাত বেড়ে দেয়া, যত্ন করে খাওয়ানো, আবার বিকালে চায়ের পানি বসানো, নাস্তা দেয়া, ঘর ঝাঁট দেয়া… সংসারধর্ম পালন। রাতের বেলাও কেটে যেতো সরল স্বভাবিক তালে-বেতালে। শুধু কোনো কোনো রাতের মধ্য প্রহরে, যে সময় পেঁচা একটানা ডাকে আর বাদুরের রক্ত পিপাসা বেড়ে যায়, ফরিদা জ্ঞানশূন্য বিছানা থেকে নেমে পড়েন, ভূতে পাওয়া মানুষের মতো দরজা খোলেন—ক্যাঁচ শব্দে প্রতিবারই ভীষণ চমকে ওঠেন, তারপর উত্তরমুখী ঘরের দিকে অবিচল হেঁটে যান। উত্তরমুখী ঘরের দরজা খোলাই থাকে।
ফরিদা বিছানা ছাড়া মাত্র মুখলেস সাহেব এক ঝটকায় উঠে ঠায় বসে থাকেন। তখন তাকে ঘন ঘন শ্বাস টানতে দেখা যায়। ফরিদা না ফেরা পর্যন্ত প্রবল নিঃশ্বাসের কষ্ট নিয়ে তিনি ঘাড় গুঁজে বসে থাকেন, ঘোড়ার ডাকের মতো শ্বাস টানার তীক্ষ্ণ শব্দ ছাড়া তাকে মৃত মনে হয়। ফিরে আসা ফরিদার পায়ের শব্দ কানে আসা মাত্র মুখলেস সাহেবের মৃত শরীরে প্রাণের সঞ্চার হয়, তিনি লক্ষী বাচ্চার মতো গুটিসুটি মেরে আবার ঘুমিয়ে পড়েন এবং সঙ্গে সঙ্গে গভীর ঘুমে তলিয়ে যান। একটু আগ পর্যন্ত যে তার মরণ দশা চলছিলো সেটা তখন দেখে বোঝার কোনো উপায় থাকে না।
তবে একটা বিষয় ফরিদা নির্দ্বিধায় বলতে পারেন আর তা হলো দিনের বা রাতের জাগ্রত-সময়ে ফরিদা এবং আবদুল বশির সাহেবকে কখনও এক মুহূর্তের জন্যও বেচাল হতে দেখা যায় নাই; নিজেদের মধ্যে প্রগলভ হতে দেখা যায় নাই, এমনকি মুখলেস সাহেবের অনুপস্থিতিতেও না। মুখলেস সাহেবের প্রতি এই সম্মানটুকু তারা সচেতনভাবেই দেখাতেন এবং এই একটা বিষয় মেনে চলার ব্যাপারে ফরিদা যার পর নাই কঠোর ছিলেন।
কতোক্ষণ মাটিতে বসে আছেন ফরিদার হিসাব নাই—এক ঘণ্টা দুই ঘণ্টা? ঘাড় উঁচু করলেই জানা যাবে, কিন্তু ইচ্ছা করলো না। ভাঁজ করে রাখা মিনার সমান কাপড়ের স্তূপের মতো স্মৃতি তার ভিতরে জমাট হয়ে আছে। হঠাৎ কোনো একটা স্মৃতি ভাঁজ ভেঙে খুলে পড়লে মুশকিল—পুরনো গন্ধ, যন্ত্রণা, বিবমিষা বেরিয়ে আসবে আর পুরো শরীর পাক দিয়ে উঠবে। স্মৃতিকে ফরিদা ভয় পান, ধারে কাছে ঘেঁষতে দিতে চান না। আবার কী মনে পড়ে যায়—চোখ মোছেন ফরিদা। কান্নাকাটি অনেক হয়েছে, এভাবে জীবন চলবে না। তাকে আবার পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে, নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। লাভলিকে যদি বশির সব বলেই থাকে তো বলুক। আসুক সব কিছু সামনে। তিনিও দেখবেন উড়ে এসে জুড়ে বসা কেউ তার তিলতিল করে গড়ে তোলা সংসারে চোট লাগাতে পারে কি না? আর যদি পারে তাহলে এমন সংসার থাকলেই কী আর না থাকলেই কী। ভাবলেন বটে কিন্তু এক মনে ‘সুবাহানাল্লাহ’ ‘সুবাহানাল্লাহ’ পড়ে গেলেন। এই মুহূর্তে ফরিদা চাইছেন লাভলি যাতে দেরি করে আসে, তাহলে তিনি সামলে নেবার সময় পাবেন। তাকে নরম দেখালে চলবে না। এই পৃথিবী নরমের যম।
ঘরে ঢুকে আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো বিউটি। গত পরশু দিন সে প্রথম মাথায় পাকা চুলের হদিস পেয়েছে। কানের লতির কাছে একটা নিরাপরাধ সাদা চুল! দৈর্ঘ্য বেশি না। বেশ কিছু সময় সে সাদা চুলের দিকে তাকিয়ে ছিলো। তার মানে সায়াহ্ন প্রায় এসেই গেলো। কোন এক বিচিত্র কারণে তার একটুও মন খারাপ হলো না বরং এক ধরনের স্বস্তিবোধ হলো। সুন্দর-বান্দরে এখন আর কিছু যায় আসে না। দিনের চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে সে যে বত্রিশ ঘণ্টা শুধু রূপচর্চায় কাটায় সেটা নিছক সময় পার করা, আর কিছু না। সময় অবশ্য পার হয়েই যায়। গান শোনা, সিনেমা দেখা, ম্যাগাজিন পরা, রূপচর্চা আর ঘুম… বরং দিনের দৈর্ঘ্য হিসাবে চব্বিশ ঘণ্টা মাঝে মধ্যে কম মনে হয়। তবে আজকে সময় কাটছে না, কিছুতেই না। যা যা সে প্রতিদিন করে তার কিছুই করতে ইচ্ছা করছে না। এই আয়না দিয়ে যদি বাইরের পৃথিবীটা দেখা যেতো—আপা কী করছে, কোথায় আছে, কার সাথে আছে? বিউটি ভেবেই পাচ্ছে না এতটা সময় লাভলির কেন লাগছে। জানা মতে বাইরের পৃথিবীতে সময় কাটাবার মতো ওর কেউ নাই। সত্যিই কী নাই? কারণ লাভলি সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে কিছুই বলা যায় না। অন্তত বিউটি বলতে পারবে না। কারণ দু’ একটা যা বিপজ্জনক কাণ্ড তাদের সংসারে ঘটেছে তার প্রায় সবগুলিই আপাত দৃষ্টিতে এই বোকাসোকা মেয়েটাই করেছে। সুতরাং বাইরের পৃথিবীতে ওর কোনো রসের মানুষ থাকলেও থাকতে পারে। অবশ্য বিউটির মন এতে একেবারেই সায় দিচ্ছে না।… অ্যাকসিডেন্ট হলো না তো? কথাটা শুধু মনে এলো, কিন্তু কোনো দুশ্চিন্তাবোধ করলো না সে। বিউটি সবচেয়ে অবাক হচ্ছে ফরিদার প্রতিক্রিয়ায়। আপা যে এখনও বাসায় ফিরলো না তা নিয়ে কোনো উচ্চাবাচ্য নাই, মাথা কুটাকুটি নাই, শাসানো নাই—কোনো কিন্তু আছে, অবশ্যই এর মধ্যে কোনো কিন্তু আছে! হয়তো আম্মা-ই আপাকে কোথাও পাঠিয়েছে এবং ভালো করেই জানে আপার আসতে দেরি হবে। তাহলে সকালে যে বিউটির ঘর প্রায় ভেঙেই ফেলছিলো যাতে সে লাভলির সাথে যায়। না, কিছুই মেলাতে পারছে না বিউটি। মাথা জট পাকিয়ে যাচ্ছে, পরিষ্কার করা দরকার। এখন অবশ্য নিশ্চিন্ত মনে বাথরুমে ঢুকে গাঞ্জা টানা যায়। সেই বরং ভালো। গাঞ্জা টানবে আর শিস দিবে… সুখচিন্তায় নিজের মনে হাসলো বিউটি।
আবার আয়নার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। এখনও দেখতে খারাপ না, অন্তত আপার চাইতে ঢের ভালো। এই এতদিন পরেও বিউটি বিশ্বাস করতে পারে না রিয়াজ তাকে ফেলে কোন দুঃখে লাভলির জন্য ছোঁক ছোঁক করত। আহারে, কী বেদিশা অবস্থা দু’জনের। রিয়াজ নোট নিয়ে আসতো, ওরা সব সময় বিউটির ঘরের পড়ার টেবিলে বসত। দরজা তখন হাট করে খোলা থাকতো। আম্মা যেকোনো সময় ঢুকে যেতেন। কোনো রকম আগাম জানান দেয়ার তোয়াক্কা করতেন না। ওদের প্রেমাচার সব চলতো টেবিলের নিচে। বিউটি যেদিন প্রথম টের পেলো ভয়ে তার শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে গেল। বিউটির সময়টা স্পষ্ট মনে আছে। দুপুর আড়াইটা। ওরা সবে ভাত খেয়েছে। নোট-ফোট নিয়ে লাভলি আর রিয়াজ বিউটির ঘরে এসে উপস্থিত।
—আমার ঘরে কী? এখন ঘুম দিব। আপা, তুমার ঘরে যাও তো।
—দুইদিন আমি আসতে পারবো না বিউটি। আজকে শুধু দেখায় দিয়া যাই। নোট-টাও যার কাছ থেকে আনছি তারে ফিরত দিতে হবে।
—আজকেই ফিরত নিয়া যাও, আমাদের নোটের দরকার নাই।
—আমার আছে। বেশিক্ষণ লাগবে না, সত্যি। একবার বুইঝা নেই পরে টুইকা রাখবো।
—তুমার ঘরে যাইতেছ না কেন?
—আম্মা তোর ঘরে বসতে বলছেন।
দুপুর বেলার ঘুম মাটি হবে ভেবে বিউটি খুব বিরক্ত হয়েছিলো। গজ গজ করতে করতে সে বাথরুমে ঢুকলো। বাথরুম থেকে বের হবার সময় তার কী মনে হলো সে যতটা সম্ভব নিঃশব্দে বাথরুমের দরজা একটু খুলে তেরছা চোখে ওদেরকে দেখলো। দেখামাত্র তার পা হীম হয়ে গেলো—আপা মাটিতে হাঁটু গেঁড়ে বসা ওর হাতে একটা বলপেন আর রিয়াজ ঝুঁকে সেকেন্ডের মধ্যে আপার ঠোঁটে চুমু খেলো তারপর কোনো শব্দ না করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দরজার কাছে গিয়ে ভালো করে আশপাশ দেখলো। ফিরে এসে দ্বিতীয়বার কঠিন চুমু খেলো আর তারপর বিউটি যা দেখলো সেটা মনে করলে এখনও তার গা গুলিয়ে ওঠে। জঘন্য! দেখলো, রিয়াজের হাত অবলীলায় লাভলির কামিজের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে, আর বেহায়া মেয়েটা তখনও নামাজের ভঙ্গিতে বসা। বিউটির পক্ষে আর বেশিক্ষণ দেখা সম্ভব হয় নাই। সে দরজা লাগিয়ে দিলো, তারপর বেসিনের সামনে গিয়ে একবার, দু’বার, তিনবার ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দিলো মুখে ঘাড়ে। শরীরের মধ্যে কোনো শিহরণ অনুভব করলো না বিউটি, একটা জ্বালা অনুভব করলো, আর ঘৃণা। প্রায় বমি এসে গিয়েছিলো আর কি। বের হয়ে ওদের চেহারার দিকে কীভাবে তাকাবে সেটাই ভেবে পাচ্ছিলো না। অনেকক্ষণ বাথরুমে বসে ছিলো। যখন বেরিয়ে এলো বিউটির নাক বিশ্রীরকম কুঁচকে ছিলো। যেন সে মরা ইঁদুর দেখেছে বা পচে গলে যাওয়া ইঁদুরের গন্ধ কেউ ওর নাকের সামনে ধরে আছে। বাথরুম থেকে বেরিয়ে ওদের দিকে না তাকিয়ে সোজা ঘর থেকে বের হয়ে গেল। কোথায় যাবে, কী করবে ভাবতে গিয়ে বিউটির জিদ উঠে গেলো। আরে ঘরটা আমার, আমি বার হইছি কেন, দরকার হইলে ওই দুইটারে লাত্থি দিয়া বার করব। বদমাইশির একটা সীমা আছে—অবিকল ফরিদার মতো করে ভাবলো বিউটি তারপর বীরদর্পে আবার নিজের ঘরে ফিরে গেলো।
—তোমাদের নোট চালাচালি হইছে?
—এই তো প্রায় শেষ।
রিয়াজ ঢোক গিলে কথা শেষ করলো। লাভলির মাথা নিচু, নোটের দিকে অপলক তাকিয়ে আছে।
—বিউটি এক গ্লাস পানি আইনা দিবি?
—না।
—আচ্ছা, আমি আনতেছি।
রিয়াজ পানি আনতে গেলো। বিউটি শব্দ করে ডান পাশের চেয়ারটায় থপ করে বসলো। চার কোণা টেবিলের তিন দিকে তিনটা চেয়ার। একটা দিক দেয়ালের গায়ে লাগানো। মাঝখানের চেয়ারে রিয়াজ বসেছে। রিয়াজের বাম পাশে লাভলি বসা। সুতরাং লাভলি আর বিউটি তখন মুখোমুখি। ওই সময়ের ভাবনা আর অনুভূতি স্পষ্ট মনে পড়লো তার। দাঁত কিড়মিড় করে শুধু বলেছিলো—কত বড় আস্পর্দা, কত বড় আস্পর্দা। লাভলি এর কিছুই শুনতে পেলো না। ও তখন এই জগতে নাই। ভূতগ্রস্ত মানুষের মতো রিয়াজ এক গ্লাস পানি নিয়ে ঢুকল, আলতো করে লাভলির সামনে রাখলো—রাখার সময় কিছু বললো কি না এখন আর তা মনে পড়ছে না বিউটির, শুধু মনে আছে কাঁপা কাঁপা হাতে গ্লাস তুলতে গিয়ে ওর হাত ফসকে গ্লাস পড়ে ছত্রখান। সেই শব্দে ফরিদা আসলেন, কিছুক্ষণ বকাবকি করলেন এবং আর দিগ্গজ হওয়ার দরকার নাই বলে রিয়াজকে বিদায় করলেন।
তারপর সেই ভয়ঙ্কর খেলা চললো কিছুদিন। টেবিলের নিচে চুমাচুমি, পায়ে-পা ঘষাঘষি, হাতাহাতি—কিছুই বাকি ছিল না। এইসব ঘটনা যেদিন ঘটত সেদিন রাতে বিউটি এক সেকেন্ডও ঘুমাতে পারত না। পিপাসায় গলা কাঠ হয়ে থাকত। ঢোকে ঢোকে পানি খেয়েও সেই পিপাসা মেটে না এমন। বিউটির সবচেয়ে অবাক লাগে ভাবতে যে দুই গর্দভ মনে করত সে কিছুই টের পাচ্ছে না। বিউটি কি কাঠের দরজা না কি ফুল-লতাপাতা আঁকা প্লাস্টিকের টেবিল ক্লথ—বোধবুদ্ধিহীন জড় পদার্থ? এসব ভাবলে তার শুধু অবাকই লাগে না এক ধরনের তীব্র অপমানবোধ হয়। অপমানের জ্বালায় শরীর চিড়বিড় করতে থাকে। তার চেয়ে লাভলি যদি এসে তাকে অকপটে ওদের সম্পর্কের কথা বলতো তাহলে হয়তো এরকম অসহ্য জ্বলুনি হতো না। কিন্তু লাভলি ভান করতে থাকল যেন কিছুই ঘটছে না আবার অন্যদিকে টেবিলের নিচের নাটক চলতে থাকল বহাল তবিয়তে।
একদিনের ঘটনা—প্রেমপর্ব সবে সাঙ্গ হয়েছে। রিয়াজ চলে গেছে। লাভলি নোটের ছদ্মবেশে তার হাতে দিয়ে গেল রসময় গুপ্ত। সেদিন বিউটির মনে হলো তার আপাত ভোলাভালা বোন তার চাইতে কয়েক শ’ গুণ সরেস। তাকে এক ঘাট থেকে কিনে অন্তত চার ঘাটে বিক্রি করতে পারবে। গ্লানি আর হতাশার ভয়ঙ্কর রূপ দেখল সে নিজের মধ্যে। সেদিন সেই মুহূর্তে বিউটি সীদ্ধান্ত নিলো ফরিদাকে রিয়াজ আর লাভলির ঘটনা বলে দিবে এবং সেজন্য তার কোনো রকম অনুতাপ হল না। মনে মনে সে ভেবেও রাখল ফরিদাকে কী বলা হবে। ধানাই পানাইয়ের দরকার নাই কম কথায় কাজ সারা হবে।
সন্ধ্যাবেলা ফরিদা পিছনের বারান্দায় বেতের চেয়ারে বসে চা খাচ্ছিলেন। বুয়া পায়ের আঙুল মটকে দিচ্ছিল। বিউটি দেখে এলো লাভলির ঘর ভেজানো, আলতো করে দরজা খুলে দেখল ও গল্পের বই পড়ছে। ওকে জানান না দিয়ে আবার আস্তে দরজা ভিজিয়ে দিল। সোজা উপস্থিত হলো পিছনের বারান্দায়।
—-আম্মা, আপনেকে একটা কথা বলব। বুয়া, তুমি আমারে এক কাপ চা দেও।
ফরিদা বুঝলেন বুয়াকে বিউটি সরাতে চাইছে। এইসব ব্যাপারে তিনিও যথেষ্ট সচেতন। চাকর-বাকরের সামনে ঘরের কথা যেন কোনো অবস্থাতেই না বের হয় সেদিকে তার দৃষ্টি সজাগ। তিনিও চোখের ইশারায় তাকে চলে যেতে বললেন। বুয়া যথেষ্ট অনিচ্ছা নিয়ে বারান্দা ছাড়ল। বিউটি চট করে দেখে এল সে সত্যিই চলে গেছে না দরজার পিছনে লটকে আছে।
—এত ঢং করতেছিস কেন? কী বলবি?
ইচ্ছাকৃতভাবে কিছুক্ষণ সময় নিল বিউটি। যেন তার বলতে খারাপ লাগছে বা আদৌ বলবে কি না সেই দ্বিধা এখনও ভিতরে কাজ করছে। যদিও বাস্তব মোটেও তা না। বলবার জন্য আসলে সে মরীয়া হয়ে উঠেছে।
—হা কইরা শ্বাস ফেলতেছিস কেন? কী হইছে?
—আম্মা, আপারে দেখলাম…
ফরিদা বেশ আয়েস করে চা খাচ্ছিলেন। তার দু’পা টেবিলে সোজাসুজি রাখা। বিউটির ইতস্তত ভাব দেখে সোজা হয়ে বসলেন আর লাভলির সম্পর্কে কথা বুঝতেই আরও সজাগ হলেন। খরগোশের মতো চকিতে তার কান খাড়া হয়ে গেল।
“আপারে দেখলি, কী দেখলি?” প্রায় হিসহিসিয়ে উঠলেন।
—কালকে আপারে দেখলাম রিয়াজের হাত ধইরা বইসা আছে।
এই কথা বলার পর বিউটি আর এক মুহূর্তও ফরিদার সামনে দাঁড়ালো না। যদিও সে মায়ের মুখের কারুকাজ দেখার জন্য মরে যাচ্ছিলো।
* * *
বিউটি এখনও আয়নার সামনে ঠায় দাঁড়ানো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যে কত কিছু চোখের সামনে ফুটে উঠে মিলিয়ে গেল। মাঝে মাঝে বিউটির মনে হয় সেদিন ফরিদাকে কথাটা না বললেও হত, অন্তত সে না বললেও পারত। যে বেপরোয়া গতিতে এগুচ্ছিল তাতে দু’একদিনের মধ্যে ফরিদা নিজে থেকেই টের পেতেন। সেটাই বরং ভালো হত।
বিউটি নিজেকে এক রকম জোর করেই আয়নার সামনে থেকে সরাল। দিনটা আজকে খাপছাড়া, সকাল থেকেই কী রকম একটা লাগছে। কিছুতেই শান্তি পাওয়া যাচ্ছে না। আবার লাভলির বিষয় মাথায় ঘোরাফেরা করার আগেই একটা ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিল। জাহান্নামে যাক সব। তার কী! মরুক!
বিউটি ধীরেসুস্থে বাথরুমে ঢুকল। আবার কী মনে করে বের হয়ে রান্নাঘরের দিকে রওয়ানা হল। রাবেয়ার মা ঝাঁট দিচ্ছে। ইলিশ মাছের হালকা-পাতলা গন্ধ বাতাসে পাক খাচ্ছে। কিছুক্ষণ আগেই বোধহয় খাওয়া শেষ করেছে ওরা।
—পিচ্চি কই?
—খালুজানের ধারে, ঘাড় টিপে। আজকে হেরে কোনো কামে পাই নাই।
—আম্মা তুমারে ডাইল বাটতে বলছিলেন?
—না, বলেন নাই।
—শেষ হয়ে গেছে। বাইটা রাইখো।
—আইচ্ছা।
বিউটি ঘরে ফিরে গিয়ে দরজার ছিটকিনি লাগাল, আয়নার পিছন থেকে দু’টা পোটলার একটা হাতে নিয়ে সোজা বাথরুমে ঢুকল, কাঠি বানাল তারপর ব্রেসিয়ারের ভিতর থেকে ম্যাচ বের করে ধরালো, আচ্ছাসে দম নিয়ে একটা টান দিলো। সাথে সাথে ঝিম ভাব পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। আহা কী সুখ! কমোডের সিট ফেলে দিয়ে তার উপর আরাম করে বসলো বিউটি। ছোট বড় টানে প্রায় অর্ধেকটা শেষ করে ফেলল। জিনিসটা ভাল। অনেকক্ষণ সিটের উপর নিশ্চুপ বসে রইল।
মুখলেস সাহেবকে অপছন্দ করার কোনো কারণ বিউটির জানা নাই। কিন্তু যতদূর মনে পড়ে সেই ছোটবেলা থেকেই এক ধরনের তীব্র বিতৃষ্ণা সে অনুভব করে। এই বিতৃষ্ণার জন্ম কোথায় সে জানে না। অথচ যে রকমের নির্বিরোধী জীবন মুখলেস সাহেব যাপন করেন সন্তান হিসেবে বিউটির তার প্রতি মায়া হওয়াই স্বাভাবিক। সারাটা জীবন ভদ্রলোক স্ত্রীর আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে কাটিয়ে দিলেন। ঈশ্বরের আদেশ পালনের মতো অন্ধ বিশ্বাসে। প্রশ্নহীন, অভিযোগহীন। হয়তো সে কারণেই এত ঘৃণা। নাকি অন্য কোনো কারণ আছে, জানার বাইরের কোনো কারণ কিন্তু বোধের মধ্যে। কমোডের সিটে বসে বিউটি এই বিপুল প্রশ্নের মুখোমুখি হল আর এই নিয়ে ভাবতে তার খুব ভাল লাগল। মনে হল ভাবতে ভাবতে সে অনায়াসে আরও ঘণ্টাখানেক কাটিয়ে দিতে পারে।
* * *
মাটিতে এক ঠায় বসে থেকে ফরিদার ঝিমুনি এসে গেছে। আসরের নামাযের সময় পার হয়ে গেছে কি না মনে হতেই সচেতন হলেন, ঠেলেঠুলে উঠে দাঁড়ালেন। চা খেতে হবে নইলে মাথা ধরে যাবে—এরকম তুচ্ছ কথাও মনে এল। যথেষ্ট মনোযোগের সাথে ওযু করলেন, নামায পড়লেন। অন্যদিন নামাযে দাঁড়ালেই তার রাজ্যের কথা মনে পড়ে, রাবেয়ার মাকে কাপড় ধোয়ার সাবান বের করে দেয়া হয় নাই, পিচ্চি ডিম কিনে ভাঙতি পয়সা ফেরত দেয় নাই, চড় দিয়ে শয়তানের দাঁত ফেলে দেয়া দরকার, কালকে অনেক রাতে লাভলির ঘরের বাতি জ্বালানো দেখেছেন—বিষয় কী জানতে হবে। এইসব হাবিজাবি কথা জায়নামাযে খেয়াল হয়। আজকে সমস্ত মনোযোগ একাট্টা করে নামায পড়লেন। নামায পড়বার পরও ফরিদার মন শান্ত হলো না।
চায়ের কথা বলতে ঘর থেকে বের হলেন। অভ্যাস বশে ঘড়ির দিকে তাকালেন আর তাকিয়েই রইলেন। পাঁচটা বিশ—কী ভয়ঙ্কর কথা!
—রাবেয়ার মা, চায়ের পানি চড়াও।
—খালাম্মা, পিচ্চি আইজ কুনু কাম করে নাই কইলাম। সারাদিন খালুজানের ধারে।
রাবেয়ার মা’র কথায় ফরিদা কান দিলেন না। তিনি রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে লক্ষ্য করলেন বিউটির ঘর বন্ধ।
—খালুজানরে চা দিছিলা?
—না দেই নাই।
—আমারে না জিজ্ঞাসা কইরা দিবা না। দিনে দুইবারের বেশি চা খাওয়া উনার জন্য ঠিক না।
—জি।
—এখন সবার জন্য বানাও।
ফরিদা ডিপ ফ্রিজ খুলে হাতে বানানো সিঙ্গারা গুনে গুনে ছয়টা বের করলেন।
—চায়ের সাথে এই সিঙ্গারা কয়টা ভাইজা দিও।
—জি।
বিউটির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফরিদা একবার ভাবলেন ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলতে বলবেন, কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ না করেই দরজার সামনে থেকে সরে গেলেন। এখন যদি বিউটি অযথা তর্ক শুরু করে দেয় তিনি মাথা ঠিক রাখতে পারবেন না। সবচেয়ে ভাল কাউকে না ঘাটানো। পিচ্চি আজকেও জানালার গ্রিল মোছে নাই—মনে পড়তে হন হন করে বারান্দার দিকে গেলেন। মুখলেস সাহেব মাথা নিচু করে ঘুমাচ্ছেন। তার থুতনি প্রায় বুকে ঠেকেছে আর পিচ্চি বারান্দার শেষ মাথায় গুটিশুটি মেরে ঘুমাচ্ছে। চেঁচিয়ে উঠতে গিয়েও গলা নামালেন।
—পিচ্চি, পিচ্চি…
ফরিদার ডাক অত্যন্ত চাপা গলায় হলেও পিচ্চি ধড়ফড়িয়ে উঠলো। তিনি ঠোঁটের উপর আঙুল দিয়ে পিচ্চিকে কথা বলতে নিষেধ করলেন। ইশারায় বাইরে আসতে বললেন আর নিজেও বেরিয়ে এলেন।
—সারাদিন কোনো কাজ-কাম নাই, না?
—খালুজানের ধারে ছিলাম খালাম্মা।
—খালুজানও ঘুমাইতেছে, তুইও ঘুমাইতেছিস—নবাব হইছস?
—জি না, ঘুমাইছি না।
—যা, সাবান পানি দিয়া জানালার গ্রিল মুছ গিয়া। কয়বার বলতে হয়?
ফরিদার সামনে থেকে যেতে পেরে পিচ্চি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলো। ফরিদা আবার খেই হারিয়ে ফেললেন। কী কাজে যে ঘর থেকে বের হয়েছিলেন মনে করতে পারলেন না। এক পা দুই পায়ে বারান্দায় গেলেন। মুখলেস সাহেব ঘুমাচ্ছেন। দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে নিজেকে খুব একা লাগলো ফরিদার। আজকে তার জীবনে একটা জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে, কঠিন জটিলতা। তার বড় মেয়ে প্রথম একা বাড়ির বাইরে গিয়ে এমন একজন মানুষের খপ্পরে পড়েছে, যে মানুষ শুধুমাত্র একটা মুখের কথায় এই সংসার ধূলিস্মাৎ করে দিতে পারে। ফরিদা ঠিক করলেন লাভলি যখন ফিরে আসবে তিনি কিছুই বলবেন না বা জিজ্ঞেস করবেন না। অন্তত আজকে তো নাই-ই। আর আল্লাহ করুন লাভলিও যেন তাকে কিছু জিজ্ঞেস না করে। জিজ্ঞেস করলে তিনি কী বলবেন বা বলা উচিৎ এই বিষয়ে ফরিদা আদতেই ভাবার কোনো সময় পান নাই। মুখের উপরে অস্বীকার করা যেতে পারে কিন্তু তাতে জটিলতা আরও বাড়ার সম্ভাবনাই বেশি। কোনো কারণ ছাড়া একটা লোক তো শুধু শুধু এরকম দাবি করতে পারে না। সত্য মিথ্যা মিলিয়ে বিশ্বাসযোগ্য একটা কিছু বলতে হবে, কিন্তু সেটা যে কী সেই বিষয়ে তার কোনো ধারণা নাই। নিজের পরিবারের সামনে তাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে এবং তিনি কারও কাছে এতটুকু সহানুভূতিও প্রত্যাশা করতে পারছেন না।
লেখকঃ লীসা গাজী
অলঙ্করণ: রনি আহম্মেদ
About: Anonymous
a Bengali Online News Magazine by Selected News Article Combination.... একটি বাংলা নিউজ আর্টিকলের আর্কাইভ তৈরীর চেষ্টায় আমাদের এই প্রচেষ্টা, বাছাইকৃত বাংলা নিউজ আর্টিকলের সমন্বয়ে একটি অনলাইন নিউজ ম্যাগাজিন! e-Blog ই-ব্লগ এর নিউজ বা আর্টিকল অনলাইন Sources থেকে সংগ্রহ করে Google Blogger এর Blogspotএ জমা করা একটি সামগ্রিক সংগ্রহশালা বা আর্কাইভ। এটি অনলাইন Sources এর উপর নির্ভরশীল
You may also like...
eCoxs Special
BNM Archive
- ► 2026 (1372)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (128)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
-
▼
2010
(9402)
-
▼
October
(964)
-
▼
Oct 16
(16)
- নবজাতক শিশুর যত্ন ও পরিচর্যা মুহাম্মদ আবদুল মুনিম...
- সপ্তাহের শেষ দিন মূল্যসূচক কমল
- যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসা বিমা জালিয়াতির বড় ঘটনা ফাঁস
- বিশ্ব গণমাধ্যমে ভূয়সী প্রশংসা
- ওবামা ও পেলিন দূর সম্পর্কের ভাইবোন!
- খনিশ্রমিকদের আমন্ত্রণ জানাবে তাইওয়ান
- সৌভাগ্যের নম্বর ৩৩
- ৮ হাজার কোটি রুপির বাড়ি!
- পাকিস্তানে প্রধানমন্ত্রীকে ‘হত্যার পরিকল্পনা’ ব্যর্থ
- আবেগে উচ্ছ্বাসে চিলি
- গদ্যালোচনা- 'এল ডোর্যাডো সেরাফিনো!' by মীর ওয়ালীউ...
- উপন্যাস- 'রৌরব' (চার ও শেষ পর্ব) by লীসা গাজী
- উপন্যাস- 'রৌরব' (পর্ব-তিন) by লীসা গাজী
- উপন্যাস- 'রৌরব' (পর্ব-দুই) by লীসা গাজী
- উপন্যাস- 'রৌরব' (পর্ব-এক) by লীসা গাজী
- উপন্যাস- 'লালঘর' by ইচক দুয়েন্দে
-
▼
Oct 16
(16)
-
▼
October
(964)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...