Sunday, September 14, 2025

‘ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো ১০-১৫ মিনিট অন্তর গাজা সিটিতে বোমা ফেলছে’

ইসরায়েলি বাহিনী ফিলিস্তিনের গাজা সিটিতে হামলা জোরদার করেছে। তারা সেখানে জাতিসংঘের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত স্কুলসহ অনেক ভবন গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। গাজা সিটিতে গতকাল শনিবার ইসরায়েলি বাহিনীর হামলায় কমপক্ষে ৪৯ জন নিহত হয়েছেন। এ নিয়ে গতকাল পুরো গাজা উপত্যকায় নিহত মানুষের সংখ্যা ৬২-তে দাঁড়িয়েছে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় জরুরি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান প্যালেস্টিনিয়ান সিভিল ডিফেন্স বলেছে, অবিরাম বোমা হামলা ও অবরুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গাজা সিটির ছয় হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সংস্থার মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেন, গাজা সিটির মানুষ এখন চলমান অবরোধ ও হামলার মধ্যে খুবই কঠিন পরিস্থিতিতে জীবনযাপন করছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেন, গাজা সিটি দখলের জন্য ইসরায়েলি বাহিনী ক্রমাগত শহরটিতে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তারা উড়োজাহাজ থেকে লিফলেট ফেলে ক্ষুধার্ত ও আতঙ্কিত ফিলিস্তিনিদের সতর্ক করছে এবং জীবন রক্ষার জন্য শহর ছেড়ে পালানোর পরামর্শ দিচ্ছে।

গাজা সিটি থেকে আল–জাজিরার সাংবাদিক হানি মাহমুদ বলেন, ইসরায়েলি যুদ্ধবিমানগুলো ‘১০ থেকে ১৫ মিনিট অন্তর’ আবাসিক ভবনসহ সরকারি স্থাপনাগুলোতে বোমা হামলা চালাচ্ছে। অনেক সময় সাধারণ মানুষ নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার মতো যথেষ্ট সময় পান না।

হানি মাহমুদ আরও বলেন, হামলার গতি ও ধরন দেখে একটা জিনিস বোঝা যাচ্ছে, তা হলো ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ইচ্ছাকৃতভাবে ওই সব এলাকায় চরম চাপ দিচ্ছে, যেখানে বহু বাস্তুচ্যুত পরিবারের বসবাস।

এখন এই উদ্বাস্তু মানুষেরা শহরের পশ্চিম অংশে ভিড় করছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর বোমা হামলা চলার মধ্যেও গাজা সিটির অনেক বাসিন্দা এখনো সেখানে থাকছেন। কেউ কেউ আবার দক্ষিণের আল-মাওয়াসি শিবিরে যাওয়ার চেষ্টা করার পর আবার শহরে ফিরে আসছেন। আল-মাওয়াসি শিবিরকে ইসরায়েল প্রায়ই হামলার নিশানা করছে।

গাজা সিটিতে এখনো প্রায় ৯ লাখ মানুষের বসবাস। আল-শিফা হাসপাতালের প্রধান চিকিৎসক মুহাম্মদ আবু সালমিয়া বলেন, স্থানীয় বাসিন্দারা শহরের পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে সরছেন। খুব অল্পসংখ্যক মানুষই দক্ষিণে পৌঁছাতে পারছেন। যাঁরা দক্ষিণে পালাতে সক্ষম হয়েছেন, তাঁদেরও অনেকে থাকার জন্য জায়গা পাচ্ছেন না। কারণ, আল-মাওয়াসি এলাকা মানুষে ভরে গেছে। দেইর আল বালাহ এলাকাতেও মানুষের অতিরিক্ত ভিড় জমেছে। তাই অনেক মানুষ সেখানে আশ্রয় বা মৌলিক পরিষেবা না পেয়ে আবার গাজা সিটিতে ফিরে আসছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ গাজা উপত্যকার সবচেয়ে বড় শহরটি ছেড়ে গেছেন।

গাজা সিটির দক্ষিণাঞ্চল থেকে আল–জাজিরার প্রতিবেদক হিন্দ খোদারি বলেন, পানিসহ প্রয়োজনীয় জিনিস পাওয়ার আশায় উত্তরের এলাকাগুলো থেকে অনেক পরিবার আল-মাওয়াসি শিবিরে আসছে। ইসরায়েলি বাহিনীই এগুলো নিয়ে প্রচার চালাচ্ছে। কারণ, ফিলিস্তিনিদের দক্ষিণাঞ্চলের দিকে আকৃষ্ট করাটা ইসরায়েলের কৌশলের অংশ।

আল-মাওয়াসি এলাকায় ইসরায়েল–সমর্থিত ত্রাণ সংস্থা জিএইচএফের তিনটি বিতরণকেন্দ্র রয়েছে। এসব বিতরণকেন্দ্রের কাছে অনেক মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার পর মানবাধিকার সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের সরকার জিএইচএফের সমালোচনা করেছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বিতরণকেন্দ্রের আশপাশে এখন পর্যন্ত ৮৫০ জনের বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছে।

গাজা সিটিতে ইসরায়েল হামলা শুরু করার আগে থেকেই আল-মাওয়াসি শিবিরে মানুষের ভিড় ছিল। পূর্ব রাফা ও খান ইউনিস অঞ্চল থেকে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখন পরিস্থিতি আরও চরমে পৌঁছেছে। নতুন আসা ব্যক্তিরা তাঁদের তাঁবু স্থাপনের জায়গা পাচ্ছেন না।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-14%2Febjz9flg%2FGaza-City.jpg?rect=0%2C0%2C3600%2C2400&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিরা গাজা সিটি থেকে দক্ষিণের দিকে সরে যাচ্ছেন। ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: এএফপি

কাতারে ইসরায়েলি হামলা আরব বিশ্বের জন্য কঠিন হুমকি by মোহাম্মদ এলমাসরি

পৃথিবীতে যদি কোনো দেশ ভেবেই রাখতে পারত যে ইসরায়েল তার ওপর কখনো হামলা করবে না, তাহলে তা ছিল কাতার। কাতার ছোট একটি দেশ এবং ইসরায়েলের জন্য কোনো হুমকি নয়। এর চেয়ে বড় বিষয় হলো, কাতার যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটি এখানেই রয়েছে।

গত মাসে গাজা যুদ্ধবিরতি আলোচনার জন্য ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের প্রধান দোহায় এসে কাতারি সরকারের আতিথ্য গ্রহণ করেছিলেন। সবকিছু মিলিয়ে মনে হতে পারে, কাতার নিরাপদ। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কাতার কখনোই পুরোপুরি নিরাপদ ছিল না, এবং এটি এই অঞ্চলের ভিন্নধারার কোনো দেশও নয়।

ইসরায়েল আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন মানে না। তারা আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে এবং নিজের জন্য ‘ঈশ্বরপ্রদত্ত অধিকার’ দাবি করে অঞ্চল বিস্তার করতে চায়। যারা তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তারা তাদের শত্রু।

ইসরায়েলকে শুধু আইনভঙ্গকারী রাষ্ট্র বলা ঠিক হবে না। এটি এমন এক দেশ, যা প্রকাশ্যে সব আন্তর্জাতিক নিয়ম ও আইন প্রত্যাখ্যান করেছে। বহু বছর ধরে ইসরায়েলের নেতারা ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ বা ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’-এর স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। তাঁদের সেই স্বপ্নের ইসরায়েলের সীমানা ইরাকের ইউফ্রেতিস থেকে মিসরের নীল নদ পর্যন্ত বিস্তৃত। গত আগস্টে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু টেলিভিশনে এই প্রকল্পের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার প্রকাশ করেছেন।

দুই বছর ধরে ইসরায়েল গাজাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে গেছে। ৬৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি মারা গেছেন। ফিলিস্তিনের বাইরে ইসরায়েল লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন ও ইরানে তার যুদ্ধযন্ত্র ছড়িয়ে দিয়েছে। লেবাননে তারা স্কুল ছুটির সময় ভিড়ভাট্টাপূর্ণ এলাকায় পেজারে বিস্ফোরণ ঘটায়।

এখন কাতারে এসে ইসরায়েল আরেক ধাপ অতিক্রম করেছে। দোহায় হামলায় হামাস কর্মকর্তাদের পরিবারের সদস্য এবং এক কাতারি কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন। কাতার এই হামলাকে ‘কাপুরুষোচিত, অপরাধমূলক আক্রমণ’ এবং ‘শতভাগ বিশ্বাসঘাতকতা’ হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে।

কাতারের ওপর হামলা চালানোর পরও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরব নেতারা মুখ খুলতে পারেননি। এর মূল কারণ আরব ও মুসলিম দেশগুলোর দুর্বলতা। গাজা, পশ্চিম তীর কিংবা পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের অপরাধের বিরুদ্ধে তারা কার্যত কিছুই করেনি। বরং ইসরায়েল শিখেছে—সে যেকোনো সময় যা খুশি করবে, আরব নেতারা প্রতিবাদ করবেন না।

সবচেয়ে শক্তিশালী কিছু আরব দেশ ইসরায়েলের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক আরও বাড়াচ্ছে। তিন সপ্তাহ আগে মিসর ইসরায়েলের সঙ্গে বিশাল একটি গ্যাস চুক্তি করেছে। চুক্তি অনুযায়ী, আগামী ১৫ বছরে তারা ইসরায়েলকে ৩৫ বিলিয়ন ডলার দেবে।

সর্বশেষ এই হামলা কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ঘাঁটি যদি কোনো হামলা রোধ করতে না পারে, তবে এর অস্তিত্বের অর্থ কী?

আরেকটি প্রশ্ন উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে। খবরে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন সরাসরি এই হামলায় অনুমোদন দিয়েছে। তাহলে আরব দেশগুলো কি ওয়াশিংটনের বাইরে তাকাবে? তারা কি রাশিয়া, চীন বা অন্য কারও দিকে ঝুঁকবে?

আরব দেশগুলো এখন বড় এক সংকটে আছে। তারা কি এক হয়ে প্রতিক্রিয়া দেখাবে? তারা কি বুঝবে যে ‘গ্রেটার ইসরায়েল’-এর স্বপ্ন তাদের সবার জন্য হুমকি? তারা কি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে, আমেরিকার ওপর চাপ দেবে কিংবা এমন কোনো জোট বানাবে, যেটা ইসরায়েলকে সামরিকভাবে চ্যালেঞ্জ করতে পারবে? নাকি আগের মতো চুপ করে বসে থাকবে?

কিছু দেশ হয়তো মনে করছে, কাতারের ওপর হামলা তাদের জন্য ভালো, কারণ তারা নিরাপদ আছে। যেমন সংযুক্ত আরব আমিরাত, যাকে অনেকে ইসরায়েলের উপশহর বলে ডাকে। কিন্তু এই ধারণা মারাত্মক ভুল। কাতারের ওপর হামলা প্রমাণ করেছে—কোনো জোট, কোনো কূটনীতি বা আমেরিকার সুরক্ষা আরব দেশগুলোকে ইসরায়েলের সহিংসতা থেকে বাঁচাতে পারবে না। ইসরায়েলকে থামানো না গেলে, একসময় এই অঞ্চলের প্রতিটি রাজধানীই বুঝবে, তারাও হামলার টার্গেট।

* মোহাম্মদ এলমাসরি, দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক
- মিডল ইস্ট থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনূদিত

ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কাতারের একটি ভবন
ইসরায়েলের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কাতারের একটি ভবন। ছবি: এএফপি

ইসরাইলি হামলায় একদিনে নিহত ৪৯: জিম্মি মুক্তি বিলম্বের জন্য নেতানিয়াহু দায়ী, ভুক্তভোগীদের পরিবার

হামাসের হাতে বন্দি জিম্মিদের মুক্তিতে বিলম্ব হওয়ায় ফের বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে দোষারোপ করলো ভুক্তভোগীদের পরিবার। তারা বলেছেন, জিম্মিদের ঘরে ফেরাতে এবং শান্তি চুক্তিতে পৌঁছাতে একমাত্র বাধা নেতানিয়াহু। জিম্মি ও নিখোঁজ পরিবার ফোরাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানিয়েছে, বন্দিদের ঘরে ফেরাও। আরও বলা হয়েছে, যখনই একটি চুক্তির সম্ভাবনা দেখা দেয় তখনই নেতানিয়াহু সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

এর আগে কাতারের রাজধানী দোহায় হামাস নেতাদেরকে উদ্দেশ্য করে হামলা চালায় ইসরাইল। এতে হামাসের পাঁচ সদস্য ও কাতারের এক নিরাপত্তা কর্মী নিহত হন। ওই হামলার পরই এমন মন্তব্য করেছে গ্রুপটি। শনিবার নেতানিয়াহু জানিয়েছে, কাতার থেকে হামাস নেতাদের নিমূর্লের মাধ্যমে জিম্মি মুক্তি ও যুদ্ধ শেষ করার প্রধান বাধা দূর হবে। তিনি হামাসের বিরুদ্ধে সকল প্রকার যুদ্ধবিরতি প্রচেষ্টায় বাধা দেয়ারও অভিযোগ আনেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও শনিবার ইসরাইল উদ্দেশ্য রওনা করেন। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি নেতানিয়াহুর সঙ্গেও সাক্ষাৎ করবেন। তবে জিম্মিদের পরিবারগুলো তাদেরকে ঘরে ফেরাতে নেতানিয়াহুর ব্যর্থতাকেই দায়ী করেছেন
সূত্র: বিবিসি

গাজা সিটিতে ইসরাইলি হামলায় একদিনে নিহত ৪৯

গাজা সিটিতে ফের হামলা চালিয়েছে ইসরাইল । এতে ৪৯ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া স্কুলসহ কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শনিবার থেকে এ পর্যন্ত ইসরাইলি হামলায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬২। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।এতে বলা হয়েছে, লাগাতার বোমা বর্ষণের ফলে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ৬ হাজার ফিলিস্তিনি। প্যালেস্টেনিয়ান সিভিল ডিফেন্স এজেন্সির এক মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেন, গাজা সিটির বাসিন্দারা অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন।

আল জাজিরার হানি মাহমুদ বলেছেন, ইসরাইলি যুদ্ধবিমানগুলো ১০-১৫ মিনিট পর পরই আবাসিক ভবনগুলোর ওপর হামলা চালায়। তারা বাসিন্দাদের সেখান থেকে নিরাপদে সরে যাওয়ার সময় পর্যন্ত দেয়নি। আরও বলেছেন, ইসরাইল বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় হামলা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, বাস্তুচ্যুত মানুষ এখন শহরের পশ্চিম প্রান্তে কেন্দ্রীভূত। আরও বলেন, ইসরাইলি বাহিনী গাজা সিটিতে হামলা চালালেও অনেক বাসিন্দাই সেখানে থেকে যাচ্ছেন অথবা দক্ষিণে আল মাওয়াসির শিবিরে যাত্রা করার চেষ্টা করছেন। আল শিফা হাসপাতালের প্রধান ড. মুহাম্মদ আবু সালমিয়া বলেন, বাসিন্দারা গাজা সিটির পূর্ব দিক থেকে পশ্চিমে সরে যাচ্ছেন। তবে খুব অল্প সংখ্যক মানুষ দক্ষিণে যেতে পারছেন। কেউ দক্ষিণে যেতে পারলেও তারা সেখানে থাকার কোনো জায়গা পাচ্ছেন না।

mzamin

ইসরায়েলের হুমকি: গাজা ছেড়েছে আরও আড়াই লাখ মানুষ

গাজা নগরী এলাকায় কয়েক সপ্তাহ ধরে তীব্র হামলা চালানোর পর থেকে আড়াই লাখের বেশি মানুষ শহর ছেড়ে গাজার অন্যান্য অংশে চলে গেছে। গতকাল শনিবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এ তথ্য জানিয়েছে। সেনাবাহিনীর আরবি ভাষার মুখপাত্র কর্নেল আভিখাই আদ্রিয়ি এক্সে লিখেছেন, সামরিক বাহিনীর (আইডিএফ) হিসাব অনুযায়ী, গাজা নগরীর ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি বাসিন্দা নিজেদের নিরাপত্তার জন্য শহর ছেড়ে চলে গেছে।

জাতিসংঘের ধারণা অনুযায়ী, গাজা নগরী এবং এর আশপাশে প্রায় ১০ লাখ ফিলিস্তিনি বসবাস করে।

গতকাল শনিবার ইসরায়েলি সেনাবাহিনী পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দাদের তাড়াতাড়ি শহর ছাড়ার জন্য লিফলেট বিতরণ করেছে। একই সময়ে গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থা ব্যাপক বিমান হামলার তথ্য জানিয়েছে।

গাজায় হামলা বন্ধ করে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে রয়েছে ইসরায়েল। তবে ইসরায়েলের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, হামাসকে ধ্বংস করার জন্য তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

গত কয়েক সপ্তাহে ইসরায়েলি বাহিনীর গাজার উঁচু ভবনগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা করছে। তারা বলছে, এসব ভবন হামাস ব্যবহার করছে।

জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আশঙ্কা, গাজায় হামলা সেখানকার মারাত্মক মানবিক পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করবে। জাতিসংঘ ইতিমধ্যে সেখানে দুর্ভিক্ষের ঘোষণা দিয়েছে।

গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল সকালেও ইসরায়েলি হামলায় পাঁচজন নিহত হয়েছেন। শুক্রবার অন্তত ৫০ জন নিহত হন। ২০২৩ সালে ইসরায়েলের হামলার শুরুর পর থেকে গাজায় ৬৪ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

গাজা নগরীর বাসিন্দা উম আনাস আল-আশকার বলেন, ‘আমরা প্রতিটি রাতে ঘুমাতে যাই, জানি না, আমরা জীবিত উঠব কি না, এ কথা ভেবে।’

এদিকে দ্য গার্ডিয়ান–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান হারজি হালেভি বলেছেন, গাজা যুদ্ধে ২ লাখের বেশি ফিলিস্তিনি হতাহত হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেছেন, সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি বা তাঁর অধীনস্থরা যেকোনো আইনি পরামর্শ উপেক্ষা করেছেন।

মিসরে হামাস নেতাদের হত্যাচেষ্টা

মিসরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বরাতে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে, মিসরের রাজধানী কায়রোতে হামাস নেতাদের নিশানা করে ইসরায়েলি হামলার চক্রান্ত রুখে দেওয়া হয়েছে। কায়রো ইসরায়েলকে সতর্ক করে বলেছে, এ ধরনের যেকোনো হামলার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। কাতারের রাজধানী দোহায় গত মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেল চারটার দিকে আবাসিক ভবনে প্রায় ১২টি বিমান হামলা চালায় উগ্রবাদী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ইসরায়েল। হামাস নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়, যা পুরো অঞ্চলে নিন্দার ঝড় তুলেছে।

ফিলিস্তিনে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে হাজারো মানুষের বিক্ষোভ। গতকাল জার্মানির বার্লিনে
ফিলিস্তিনে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলকে অস্ত্র সরবরাহ বন্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে হাজারো মানুষের বিক্ষোভ। গতকাল জার্মানির বার্লিনে। ছবি: রয়টার্স

৯/১১ হামলার ২৪ বছর, মার্কিন সাংবাদিকের দাবি: হামলা সম্পর্কে আগেই জানতেন ইসরায়েলি গোয়েন্দারা

মার্কিন সাংবাদিক টাকার কার্লসন দাবি করেছেন, ইসরায়েলি গোয়েন্দারা যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ হামলার আগেই বিষয়টি সম্পর্কে জানতেন। একটি আসন্ন প্রামাণ্যচিত্র সিরিজে তিনি এ বিষয়সহ দীর্ঘদিন ধরে চাপা থাকা বহু তথ্যই সামনে আনবেন।

কার্লসন গত মঙ্গলবার পিয়ার্স মরগানের অনুষ্ঠান আনসেন্সরড নিউজে অংশ নিয়ে এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ইসরায়েলের নেতৃত্ব কখনোই ৯/১১ হামলা নিয়ে তাদের মনোভাব লুকায়নি। বরং তারা মনে করত, ওই হামলা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করেছে।

টিভি অনুষ্ঠান উপস্থাপক কার্লসন আরও বলেন, ‘আমি তো কখনো বলিনি যে হামলাটা ইহুদিরা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে এমন কথা বলা হলো আসল প্রশ্নগুলো ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা। এতে সত্যিকারের অনুসন্ধানকে দুর্বল করা হয়।’

‘ঠিক ওই হামলার পরই বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ক্যামেরার সামনে বলেছিলেন, “এটা আসলে ভালো একটা ঘটনা। কারণ, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে, যেটিতে আমরা কয়েক দশক ধরে অস্তিত্বের লড়াই করছি”,’ বলেন কার্লসন।

২০০২ সালে মার্কিন কংগ্রেসে দেওয়া নেতানিয়াহুর সাক্ষ্যকে ঘিরে কার্লসন এ মন্তব্য করেন। কংগ্রেসে নেতানিয়াহু বলেছিলেন, যুদ্ধে যেতে গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে কখনো কখনো ‘বোমা মেরে বাধ্য করতে হয়’। তিনি ৯/১১ হামলার সঙ্গে পার্ল হারবারে জাপানি হামলার তুলনা করেছিলেন।

রক্ষণশীল রাজনৈতিক ভাষ্যকার কার্লসন বহুল আলোচিত ‘ইসরায়েলি আর্ট স্টুডেন্টস’–এর বিষয়ও উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, এ বিষয়ে জনসাধারণ খুব কম জানেন এবং এ–সংক্রান্ত বেশির ভাগ প্রতিবেদন হাওয়া হয়ে গেছে।

টাকার কার্লসন বলেন, ‘আমরা জানি, কিছু “ইসরায়েলি আর্ট স্টুডেন্ট” পরিষ্কারভাবে শিল্পশিক্ষার্থী ছিলেন না; বরং ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের যুক্তরাষ্ট্রে গ্রেপ্তার করে বেশ কিছুদিন আটকে রাখা হয়েছিল। পরে অভিযোগ ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়।’

কার্লসন আরও বলেন, ‘আমরা এটাও জানি, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন, আমি ইন্টারনেট নয়, এফবিআইয়ের নথি থেকে বলছি, ৯/১১ হামলা ভিডিও করেছিলেন এবং দৃশ্যত, আগে থেকেই হামলার খবর জানা ছিল তাঁদের।’

‘ইসরায়েলি আর্ট স্টুডেন্টস’–এর প্রথম খোঁজ পাওয়া যায় ২০০০ সালের শেষ দিকে। তখন তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সামরিক সংস্থার বিভিন্ন ভবনে হাজির হতে শুরু করেন। তাঁরা সেখানে ছবি বিক্রি ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করতেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব ‘শিক্ষার্থী’ বারবার চিহ্নিত করা নেই এমন সব স্থান, গোপন প্রবেশপথ, এমনকি কর্মকর্তাদের বাড়িতেও যেতেন।

ওই সময়কার গণমাধ্যমের খবরে জানা যায়, ২০০১ সালের শুরুর দিক থেকে ৯/১১ হামলার আগপর্যন্ত অন্তত ১৪০ জন ইসরায়েলি নাগরিককে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আটক করা হয়। হামলার পর আরও প্রায় ৬০ জনকে আটক করা হয়। এ ছাড়া অভিযোগ রয়েছে, ওই ‘শিক্ষার্থীদের’ কিছু দল হামলাকারীদের আবাসস্থলের কাছাকাছি বাড়ি ভাড়া নিয়েছিলেন।

উল্লেখ্য, ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ভয়াবহ হামলা হয় যুক্তরাষ্ট্রে। এ হামলা ৯/১১ নামে পরিচিত। ওই দিন আল-কায়েদার সদস্যরা দুটি উড়োজাহাজ ছিনতাই করে নিউইয়র্কের বিশ্ববাণিজ্য কেন্দ্রের সুউচ্চ জোড়া ভবন বা টুইন টাওয়ারে হামলা চালান। আরেকটি উড়োজাহাজ আছড়ে পড়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনে। পেনসিলভানিয়াতেও হামলা হয়।

এসব হামলায় প্রাণ যায় প্রায় ৩ হাজার মানুষের, আহত হন প্রায় ২৫ হাজার। শুধু যুক্তরাষ্ট্রের জন্যই নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই ইতিহাসের অন্যতম প্রাণঘাতী সন্ত্রাসী হামলা এটি।

টুইন টাওয়ারে যখন উড়োজাহাজ হামলা চালানো হয়, তখন ভবনটিতে ১৭ হাজার ৪০০ মানুষ ছিলেন। নর্থ টাওয়ারে যেখানে হামলা হয়, সে স্থানের কেউই বাঁচতে পারেননি; কিন্তু ১৮ জন সাউথ টাওয়ারের ইমপ্যাক্ট জোনের ওপরের মেঝে থেকে বেঁচে যান।

হতাহত মানুষের মধ্যে ৭৭ দেশের নাগরিক ছিলেন। এই হামলায় নিউইয়র্ক নগরের ৪৪১ উদ্ধারকর্মী নিহত হন। হামলার পর হাজারো মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে বিষাক্ত ধ্বংসস্তূপে কাজ করা অনেক অগ্নিনির্বাপণকর্মীও ছিলেন।

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ভয়াবহ হামলার পর জ্বলছে টুইন টাওয়ার। এই হামলায় নিহত হয় প্রায় তিন হাজার মানুষ
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর ভয়াবহ হামলার পর জ্বলছে টুইন টাওয়ার। এই হামলায় নিহত হয় প্রায় তিন হাজার মানুষ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

তারা তোমার অশ্রুর যোগ্য ছিল না, আনাস! by হাসান আবু কামার

‘যাবতীয় যন্ত্রণার মধ্যে ছিল আমার বসবাস এবং বারবার সম্মুখীন হয়েছি বেদনা ও শোকের। তা সত্ত্বেও, সত্যকে বিকৃত বা মিথ্যাচার ছাড়াই তুলে ধরতে আমি কখনো দ্বিধা করিনি। যারা আমাদের ওপর চালানো হত্যাকাণ্ড দেখে নীরব ছিল এবং যারা আমাদের নিশ্বাস বন্ধ করে দিয়েছে, যাদের হৃদয় আমাদের নারী ও শিশুদের ছিন্নভিন্ন দেহ দেখেও বিচলিত হয়নি এবং যারা দেড় বছরের বেশি সময় ধরে আমাদের জনগণের ওপর চলা এই গণহত্যা থামাতে কিছুই করেনি, আল্লাহ তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী থাকুন।’

আনাস আল-শরিফ এ কথাগুলো লিখেছিল তার অসিয়তনামা হিসেবে, শহীদ হওয়ার চার মাস আগে। সে নিহত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এটি পোস্ট করা হয়। গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালের কাছে মিডিয়ার একটি তাঁবুতে ইসরায়েলি হামলায় আনাস, সাংবাদিক মোহাম্মদ কোরইকেহ, ইব্রাহিম জাহের, মোহাম্মদ নওফাল ও মোমেন আলিওয়া শহীদ হয়।

আনাস আল-শরিফ গাজার একজন বীর, সে নিঃসন্দেহে আমাদের সবার হৃদয়ের সবচেয়ে কাছের একজন সাংবাদিক ছিল।

গাজার মানুষ সাধারণত গণমাধ্যমকে ঘৃণা করে। তারা সাংবাদিকদের দুটি ভূমিকায় দেখে: হয় তারা আমাদের অতিরঞ্জিতভাবে এমনভাবে তুলে ধরে—যেন আমরা অতিমানব, যারা অবিরাম বোমা হামলা, খাদ্য ও পানির অভাব এবং প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা সহ্য করতে পারে; অথবা তারা আমাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিত্রিত করে, যা আমাদের পরিবারের হত্যাকাণ্ড এবং আমাদের বাড়িঘর ধ্বংসের ন্যায্যতা দেয়।

আনাস ছিল ভিন্ন প্রকৃতির। সে সত্যকে বিকৃত করেনি। সে ছিল আমাদেরই একজন। আমাদের শরণার্থীশিবিরেই তার বেড়ে ওঠা। বোমার নিচে ও ক্ষুধার্ত অবস্থায় আমাদের সঙ্গে কষ্ট ভোগ করে, প্রিয়জনদের জন্য শোক করে এবং নিজ সম্প্রদায়কে ছেড়ে না গিয়ে সে বেড়ে উঠেছে। সে গাজাতেই থেকে গেছে, জলপাইগাছের মতো দৃঢ়ভাবে, একজন সত্যিকারের ফিলিস্তিনির জীবন্ত উদাহরণ হিসেবে।

গণহত্যা শুরুর পর আনাস আল-শরিফ আল–জাজিরার জন্য রিপোর্টিং শুরু করে এবং দ্রুতই সে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠে। ক্রমাগত হুমকির মুখেও সে ও ইসমাইল আল-ঘুল উত্তর গাজা থেকে সম্প্রচার বন্ধ করেনি। তাদের উষ্ণ বন্ধুত্ব, আনন্দ ও দুঃখের মুহূর্তগুলো দুজনকে আমাদের কাছে আরও বেশি আপন করে তুলেছিল।

গত বছর ইসমাইল ইসরায়েলি হামলায় শহীদ হওয়ার পর (আল্লাহ তার প্রতি রহম করুন) আমরা অনুভব করেছিলাম যে আমরা একজন প্রিয় ভাইকে হারিয়েছি এবং আমাদের কাছে কেবল আনাসই অবশিষ্ট ছিল।

গত মাসে যখন আনাস গাজার ওপর চাপিয়ে দেওয়া অনাহারের ওপর প্রতিবেদন করার সময় ক্যামেরার সামনে বেদনায় ভেঙে পড়েছিল, তখন মানুষ তাকে বলেছিল, ‘এগিয়ে যাও, আনাস। থামবে না, তুমিই আমাদের কণ্ঠস্বর।’ সত্যিই, সে আমাদের কণ্ঠস্বর ছিল। আমরা প্রায়ই কল্পনা করতাম যে এই গণহত্যার সমাপ্তি যখন আসবে, তখন আনাস আল-শরিফের কণ্ঠেই আমরা সেই ঘোষণা শুনব। বিশ্বের কোনো সাংবাদিকই সেই মুহূর্ত ঘোষণা করার জন্য আনাসের চেয়ে বেশি যোগ্য ছিল না।

আমার কাছে আনাস কেবল একজন রিপোর্টার ছিল না, সে ছিল একজন অনুপ্রেরণা। যখনই আমি লিখতে গিয়ে এ পরিস্থিতি পরিবর্তনের আশা হারিয়ে ফেলতাম, তখন আনাসই অনুপ্রেরণা হয়ে হাজির হতো এবং আমি আবার কলম তুলে নিতাম। আমি আনাসকে দেখেছি, অক্লান্তভাবে রিপোর্টিং করে যাচ্ছে—খেয়ে–না খেয়ে, গরমে বা শীতে, মৃত্যুর হুমকির মুখে বা ক্যামেরায় পরিবেষ্টিত অবস্থায়।

আমার বিশ্বাস ছিল, এই যে আমরা গণহত্যার বিষয়টি নথিভুক্ত করছি, তা গাজার বাইরে কাউকে প্রভাবিত করছে না। আনাসের দৃঢ়তা আমাকে এই বিশ্বাস থেকে সরে আসতে বাধ্য করে। আনাস আমাকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিল যে আমাদের গল্পগুলো আমাদের সীমানা অতিক্রম করে সমুদ্রের পর সমুদ্র পেরিয়ে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছাতে পারে। আর তার প্রতিদিন, প্রতিমুহূর্তে কাজ করার অদম্য শক্তি আমাকে আশাবাদী হতে বাধ্য করেছিল...এই আশায় যে যদি আমরা কথা বলতে থাকি, তবে হয়তো কেউ একজন শুনবে।

আজ আনাস আর নেই, আর আমার মনে হচ্ছে, আমি আশা করে ভুল করেছিলাম, এই পৃথিবীর ন্যায়বিচারের ওপর বিশ্বাস রেখে ভুল করেছিলাম। অশ্রুসিক্ত চোখ নিয়ে বিশ্ববিবেকের কাছে আবেদন জানিয়েছিল। কিন্তু প্রমাণিত হলো, তারা কতটা সংকীর্ণ এবং কতটা পক্ষপাতদুষ্ট।

তারা তোমার অশ্রুর যোগ্য ছিল না, আনাস! আমাদের গল্প তাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য তোমার আত্মত্যাগেরও তারা যোগ্য ছিল না। তারা শোনে না। কারণ, তারা শুনতে চায় না।

তুমি তোমার কণ্ঠ তুলে ধরেছিলে, আনাস। কিন্তু তুমি আসলে চিৎকার করেছিলে বিবেকহীনদের কাছে।

আমি চেয়েছিলাম, তোমার শহীদ হওয়ার আগেই যুদ্ধটা শেষ হোক, যাতে আমি গাজায় তোমাকে খুঁজে বের করে বলতে পারতাম যে আমাদের কণ্ঠস্বর সফল হয়েছে, সেগুলো বাইরের বিশ্বে পৌঁছেছে এবং পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। আমি তোমাকে বলতাম যে তুমি ছিলে আমার আদর্শ এবং তোমার কাজই আমাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। আর সেই মুহূর্তে যদি তুমি হেসে আমাকে বলতে, ‘আমি তোমার সহকর্মী’, আমি আনন্দে কেঁদে ফেলতাম।

আনাস, তোমার রিপোর্টিং শেষ হয়েছে, কিন্তু এই গণহত্যা বন্ধ হয়নি। আজ আমরা অসহায়ভাবে দেখছি সেই ঘৃণ্য দখলদারিকে, যারা সারা বিশ্বের সামনে তোমাকে হামলার করা নিয়ে গর্ব করছে—সেই একই বিশ্বের সামনে, যাদের কাছে তুমি তোমার শেষনিশ্বাস পর্যন্ত আবেদন করেছিলে। সেই দেশগুলো এখনো নীরব; কারণ তাদের কাছে অর্থনৈতিক চুক্তি এবং রাজনৈতিক স্বার্থ মানবজীবনের চেয়ে মূল্যবান।

তবু দখলদারি শক্তি আমাদের নীরব করতে পারবে না, আনাস। তারা চায়, আমরা কণ্ঠস্বর ছাড়াই মারা যাই। কারণ, আমরা যখন যন্ত্রণায় কাতরাই এবং সবকিছু হারিয়ে কান্না করি, তখন আমাদের সেই কণ্ঠ তাদের বিরক্ত করে, তাদের গণহত্যার উন্মত্ততাকে বাধা দেয়।

গাজা তোমার মতো আরেকজন আনাসের জন্ম দেবে না, জন্ম দেবে না লেখক ও কবি রিফাত আল-আরিরের মতো কাউকে কিংবা হাসপাতাল পরিচালক মারওয়ান আল-সুলতানের মতো কাউকে। দখলদারি শক্তি বেছে বেছে সেরা ও উজ্জ্বলতম মানুষদের টার্গেট করছে—যারা তাদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরেছে এবং বিশ্বকে দেখিয়েছে যে মর্যাদা ও সততার অধিকারী ফিলিস্তিনিরা কী করতে পারে।

কিন্তু এই হিংসাত্মক হত্যাকাণ্ডের পর আমরা চুপ থাকব না। বিশ্ব শুনবে না, সেটি জানা সত্ত্বেও আমরা কথা বলতে থাকব। কারণ, এটিই আমাদের নিয়তি এবং এটিই আমাদের কর্তব্য। এই গণহত্যা থেকে আমরা যারা এখনো বেঁচে আছি, আমাদের শহীদদের উত্তরাধিকার বহন করতে হবে। আমার জন্য এর অর্থ হলো কথা বলা, লেখা এবং এই রক্তাক্ত ও বর্বরতার দখলদারির অপরাধগুলো প্রকাশ করে যাওয়া...সেই কাজ করে যেতে হবে, যতক্ষণ না তোমার স্বপ্নের সেই দিন আসে, আনাস আর সেটি হবে আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এই গণহত্যার সমাপ্তির দিন। যেদিন তুমি আল-মাজদালের তোমার পূর্বপুরুষের বাড়িতে ফিরে যাবে এবং আমি ফিরে যাব আমার গ্রাম ইয়াবনাতে।

* হাসান আবু কামার, গাজার লেখক ও সাংবাদিক
- আলজাজিরা থেকে নেওয়া। ইংরেজি থেকে অনুবাদ: রাফসান গালিব

গাজায় ধ্বংসস্তূপের সামনে আনাস আল–শরিফ
গাজায় ধ্বংসস্তূপের সামনে আনাস আল–শরিফ। ছবি: এএফপি

কাতারে থাকা হামাস নেতারাই যুদ্ধবিরতির পথে প্রধান বাধা, বললেন নেতানিয়াহু

কাতারে অবস্থানরত হামাসের শীর্ষ নেতাদের সরিয়ে দেওয়া গেলে গাজার সব জিম্মি মুক্তি ও যুদ্ধ শেষ করার পথে প্রধান বাধা দূর হবে বলে মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। গতকাল শনিবার তিনি এ মন্তব্য করেন।

ইসরায়েল সম্প্রতি কাতারের রাজধানী দোহায় ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের নেতৃত্বকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে কাতার। দেশটি গাজা যুদ্ধবিরতি আলোচনার অন্যতম মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে।

হামাস জানিয়েছে, এ হামলায় তাদের পাঁচ সদস্য নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন নির্বাসিত গাজা নেতা খালিল আল–হায়ার ছেলে। তবে হামাসের শীর্ষ নেতৃত্ব ও আলোচক দলের সদস্যরা বেঁচে গেছেন। কাতার বলেছে, তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর একজন সদস্যও নিহত হয়েছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক পোস্টে নেতানিয়াহু লিখেছেন, ‘কাতারে থাকা হামাসের “সন্ত্রাসী” নেতারা গাজার জনগণের প্রতি কোনো তোয়াক্কা করেন না। তাঁরা সব যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টা আটকে দিয়েছেন; যেন যুদ্ধকে অনন্তকাল টেনে নেওয়া যায়।’

অন্যদিকে হামাস বলেছে, দোহায় হামলা চালিয়ে যুদ্ধবিরতি আলোচনা ভেস্তে দিতে চাইছে ইসরায়েল। তবে এতে গাজা যুদ্ধ শেষ করার শর্তে কোনো পরিবর্তন আসবে না।

ইসরায়েল দাবি করেছে, যুদ্ধ শেষ করতে হলে হামাসকে অবশ্যই গাজায় আটক সব জিম্মিকে মুক্তি দিতে ও অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে। কিন্তু হামাস বলছে, ইসরায়েলের যুদ্ধ শেষ করার চুক্তি ছাড়া তারা সব জিম্মি মুক্তি দেবে না; পাশাপাশি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তারা অস্ত্র ছাড়বে না।

জেরুজালেমে নিউজম্যাক্স আয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের সংবর্ধনায় যোগ দেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ১৩ আগস্ট ২০২৫
জেরুজালেমে নিউজম্যাক্স আয়োজিত যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবসের সংবর্ধনায় যোগ দেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। ১৩ আগস্ট ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

কাতার বোমা হামলা: ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কে টানাপোড়েন

চার মাস আগে কাতারের আমিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। দোহা’র ঝলমলে প্রাসাদে তাকে বিমুগ্ধ দেখা যায়। তখন উপসাগরীয় এই মিত্রের সঙ্গে এক বিস্তৃত প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সামরিক ঘাঁটির স্থাপনের অনুমতি দেয় কাতার। মূলত এখান থেকেই ইরাকের প্রয়াত নেতা সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতে হামলা চালানো হয়। এ ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যে সামরিক তৎপরতা তা এই ঘাঁটিকে কেন্দ্র করেই। কিন্তু মঙ্গলবার হঠাৎ করে হামাস নেতাদের লক্ষ্য করে দোহায় ইসরাইলের চালানো বিমান হামলা সেই সম্পর্ককে নাড়া দিয়েছে। এ ঘটনায় দৃশ্যত ক্ষুব্ধ হন ট্রাম্প। দোহা ও পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকেও তীব্র নিন্দার ঝড় উঠেছে। ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্দেশে চালানো ওই হামলায় ফিলিস্তিনি সংগঠনের রাজনৈতিক কার্যালয়কে টার্গেট করা হয়। এতে এক কাতারি নিরাপত্তাকর্মীসহ ছয়জন নিহত হলেও হামাস নেতারা বেঁচে যান।

ট্রাম্প বলেন, তিনি এ হামলার ‘প্রত্যেক দিক নিয়েই অত্যন্ত অসন্তুষ্ট’। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা ও বিশ্লেষকদের মতে, এই ক্ষোভের পরও ট্রাম্পের ইসরাইল নীতিতে বড় কোনো পরিবর্তন আসছে না। বরং হামলাটি ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্কের শীতল হিসাব-নিকাশকেই স্পষ্ট করেছে। এই সম্পর্ককে বিশ্লেষণ করে এমনটাই লিখেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইসরাইল দেখিয়েছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে তোয়াক্কা না করেই পদক্ষেপ নিতে পারে। মঙ্গলবারের অভিযানের আগে ওয়াশিংটনকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সতর্কবার্তা দেয়নি নেতানিয়াহু প্রশাসন।

এর আগে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে ইসরাইলের হামলার ঘটনাও অনুরূপ ছিল। তখন হাজারো যোদ্ধাকে ফাঁদ পাতা পেজারের মাধ্যমে জখম করেছিল তারা, অথচ তখনকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে কিছুই জানায়নি। ট্রাম্পও মাঝে মাঝে নেতানিয়াহুর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তবে তার প্রশাসন হামাস দুর্বল করার ইসরাইলি অভিযানের প্রতি জোরালো সমর্থন দিয়েছে এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মূলত ইসরাইলকেই নেতৃত্ব নিতে দিয়েছে। কার্নেগি এনডাউমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিসের সিনিয়র ফেলো ও সাবেক মার্কিন শান্তি আলোচক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প নেতানিয়াহুর কৌশল নিয়ে বিরক্ত। তবে তার স্বভাবতই ধারণা হলো- হামাসকে শুধু সামরিকভাবে খোলস ছাড়ানো যথেষ্ট নয়, একে মূল থেকে দুর্বল করতে হবে।

হোয়াইট হাউস এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে অস্বীকার করে এবং ট্রাম্পের ট্রুথ সোশ্যালে মঙ্গলবার রাতের পোস্টের প্রতি ইঙ্গিত দেয়। সেখানে ট্রাম্প লিখেছেন, হামলা যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরাইলের স্বার্থ অগ্রসর করেনি। তবে, হামাসকে নির্মূল করা- যারা গাজার মানুষের দুর্দশা থেকে লাভবান হয়েছে, তা একটি যথার্থ লক্ষ্য। ওয়াশিংটনে ইসরাইলি দূতাবাস এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। কিছু বিশ্লেষক অবশ্য বলছেন, যদি নেতানিয়াহু আবার হঠাৎ ওয়াশিংটনকে অন্ধকারে রেখে অভিযান চালায়, তবে ট্রাম্পের ধৈর্য ফুরোতে পারে। বাস্তবে এর মানে হতে পারে গাজার চলমান আক্রমণে ইসরাইলের জন্য রাজনৈতিক আড়াল প্রত্যাহার করে নেয়া- যা ইউরোপ ও আরব দেশগুলোতে ক্ষোভ ছড়াচ্ছে, বিশেষ করে দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে।

গাজার বিরুদ্ধে ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুরু হয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের দক্ষিণ ইসরাইলে অভিযানকে কেন্দ্র করে। মার্কিন সাবেক কূটনীতিক ডেনিস রস বলেন, আরব মিত্ররা এখন ইসরাইলের কার্যক্রম নিয়ে ট্রাম্পের কাছে অভিযোগ করছে। তখন ট্রাম্প হয়তো বলবেন, আমাকে গাজার জন্য একটি বাস্তবসম্মত পরবর্তী পরিকল্পনা দাও- হামাস ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প প্রশাসন প্রস্তাব করো। তাহলে আমি নেতানিয়াহুকে বলব যথেষ্ট হয়েছে। তবে কাতার হামলার পর ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় আরব দেশগুলোকে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসে আনার আশায় ধাক্কা লাগতে পারে। তবুও, সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করেন ইসরাইলের সাবেক যুক্তরাষ্ট্রদূত মাইকেল ওরেন। তার মতে, ট্রাম্প শক্তি ও যুদ্ধের অবসান ঘটাতে পারে এমন লেনদেন- দুটোই পছন্দ করেন।

তিনি বলেন, নেতানিয়াহু যদি এ দুই দিকেই ট্রাম্পকে আকৃষ্ট করতে পারেন, তবে সম্পর্ক নিয়ে আমি চিন্তিত নই। ট্রাম্প-নেতানিয়াহু সম্পর্ক সবসময় ওঠা-নামার মধ্য দিয়ে গেছে। হোয়াইট হাউসের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, প্রচারণা থেকেই সম্পর্কটা গরম-ঠাণ্ডা চলছে। প্রথম বড় বিদেশ সফরে ট্রাম্প সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে যান। কিন্তু ইসরাইল এড়িয়ে যান- যা অনেক বিশ্লেষকের কাছে ইসরাইলের প্রতি এক ধরনের উপেক্ষা হিসেবে ধরা পড়ে। তবে জানুয়ারিতে পুনর্নির্বাচিত হয়ে তিনি ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন। ওই সফরে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের চাপে ট্রাম্প সিরিয়ার নতুন সরকারের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। এতে ইসরাইলি কর্মকর্তারা ক্ষুব্ধ হন, কারণ নতুন প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা ছিলেন একসময়ের আল-কায়েদা কমান্ডার। তবু এক মাসের মধ্যেই সম্পর্ক আবার ঘনিষ্ঠ হয়। ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইল বিমান হামলা শুরু করলে ট্রাম্প বিস্ময়করভাবে বি-২ বোমারু পাঠিয়ে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলো আংশিক ধ্বংস করেন। যদিও তিনি প্রচারণায় বিদেশি সংঘাত এড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু এই পদক্ষেপ ট্রাম্পের কূটনীতিতে স্বল্পমেয়াদে উপকার আনেনি। কয়েকদিন পরই তিনি প্রকাশ্যে ইরান ও ইসরাইলকে গালাগালি করেন যুক্তরাষ্ট্র-মধ্যস্থ অস্ত্রবিরতি ভাঙার জন্য।

জুলাই মাসে দামেস্কে ইসরাইলি হামলা নিয়ে ওয়াশিংটনও প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানায়। মঙ্গলবার কাতারে হামলার আগে ইসরাইল ওয়াশিংটনকে খুব অল্প সময়ের নোটিশ দিলেও কোনো সমন্বয় বা অনুমোদন নেয়নি, জানিয়েছেন দুই মার্কিন কর্মকর্তা। মার্কিন সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জনাথন প্যানিকফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে উৎসাহিত বা চাপ দিতে পারে। কিন্তু নেতানিয়াহু এমনভাবেই কাজ চালিয়ে যাবেন, যা তিনি কেবল ইসরাইলের স্বার্থেই সঠিক মনে করেন।

https://mzamin.com/uploads/news/main/179572_trumps.webp

আম্বানি পরিবারের চিড়িয়াখানার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ, তদন্তের নির্দেশ

এশিয়ার শীর্ষ ধনি ভারতীয় আম্বানি পরিবারের ব্যক্তিগত চিড়িয়াখানায় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী কেনা, রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা, অর্থ পাচার এবং অনিয়মের অভিযোগে এ তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। ভান্তারা নামের ব্যক্তিগত ওই বিশাল চিড়িয়াখানাটির মালিক মুকেশ আম্বানির ছেলে অনন্ত আম্বানি। এ খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি।

এতে বলা হয়, ব্যক্তিগত ওই চিড়িয়াখানায় বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত সম্ভাব্য আইনভঙ্গের পাশাপাশি আর্থিক অনিয়ম এবং অর্থ পাচারের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে। ভারতের সর্বোচ্চ আদালত বলছে, যদিও এখন পর্যন্ত অভিযোগের বিষয়ে কোনো প্রমাণ নেই তবে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তাদের দায়িত্বপালনে অবহেলার অভিযোগ রয়েছে।

চিড়িয়াখানাটিতে হাতি থেকে শুরু করে বাঘসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী রয়েছে। হাতির সংখ্যা কয়েকশ। তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। তাদের তরফে বলা হয়েছে, ভান্তারার স্বচ্ছতা, সহানুভূতি এবং আইনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে। চিড়িয়াখানায় থাকা সকল প্রাণীর যত্ন, পুনর্বাসন এবং রক্ষণাবেক্ষণই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।


প্রায় ৩৫০০ একর জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল ওই চিড়িয়াখানা। যেখানে প্রায় ২০০০ প্রজাতির প্রাণী রয়েছে। ভান্তারার দাবি, এটিই পৃথিবীর সর্ববৃহৎ বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্র। অনন্ত আম্বানির বিয়ের সময় ভান্তারাকে বেশ জাঁকজমকভাবে সাজানো হয়। যা নিয়ে বিশ্বে সাড়া পরে যায়।

বিশাল এই চিড়িয়াখানাটি ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য গুজরাটের জামনগরে অবস্থিত। মুকেশ আম্বানির বৃহৎ তেল পরিশোধনাগারের খুব কাছেই এর অবস্থান।

এ বছরের মার্চে ভান্তারা উদ্বোধন করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেসময় তিনি চিড়িয়াখানাটির বেশ প্রশংসা করেন। বলেন, এমন উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসনীয়। এক্স হ্যান্ডেলে এ বিষয়ে পোস্টও করেন মোদি।

তবে মজার বিষয় হচ্ছে- এমন চিত্তাকর্ষক বন্যপ্রাণীর পুনর্বাসনকেন্দ্রটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করেনি আম্বানি পরিবার। যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বন্যপ্রাণী অধিকার কর্মীরা সমালোচনা করছেন। সুপ্রিম কোর্ট জনস্বার্থের ওপর জোর দিয়েছে। বলেছে, এসব অভিযোগ অসমর্থনযোগ্য। তবে সংবিধিবদ্ধ কর্তৃপক্ষ বা আদালত তাদের আদেশ পালনে অনিচ্ছুক বিধায় স্বাধীন তদন্তকে যথাযথ বলে মনে করছে সুপ্রিম কোর্ট।

বন্যপ্রাণীর বিশাল এক সম্ভারের নাম ভান্তারা। কি নেই সেখানে। হাতি, বাঘ, চিতা, সিংহ থেকে শুরু করে তৃণভোজী প্রাণীর কোনো কিছু বাদ নেই। চিড়িয়াখানাটিতে হাতির সংখ্যা ২০০টি। চিতা, সিংহ এবং বাঘসহ বিভিন্ন প্রজাতির বনবিড়ালের সংখ্যা প্রায় ৩০০টি। তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যাও ৩০০টি। আর সরীসৃপ আছে প্রায় ১২০০ প্রজাতির।

কাতারে ইসরায়েলের হামলা: নামাজে যাওয়ার কারণেই কি হামাস নেতারা বেঁচে গেছেন

কাতারের রাজধানী দোহায় মঙ্গলবার হামাস নেতাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলের চালানো হামলা ব্যর্থ হয়েছে। আরব গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, হামলার আগে নেতারা নামাজ আদায় করতে গিয়েছিলেন। তখন বৈঠকস্থলে তাঁরা মুঠোফোনগুলো রেখে যান। আর এসব ফোনের সংকেত ব্যবহার করেই হামলা চালানো হয়।

সৌদি আরবের মালিকানাধীন সংবাদপত্র আশার্ক আল-আওসাত প্রতিবেদন করেছে, নেতারা হামলার সময় মূল ভবনের (বৈঠকের স্থান) বাইরে অন্য একটি বাড়িতে ছিলেন। মূল ভবন হামলার নিশানা হওয়ায় এবং সেই সময় আলাদা স্থানে অবস্থান করায় তাঁরা বেঁচে গেছেন।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দোহায় হামলাটি হামাসের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার বৈঠককে লক্ষ্য করে চালানো হয়। ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠনটির রাজনৈতিক ব্যুরোর সহসভাপতি খলিল আল-হায়া ছিলেন মূল লক্ষ্য।

পশ্চিম তীরের হামাস নেতা জাহের জাবারিন ও রাজনৈতিক দপ্তরের সদস্য নিজার আওয়াদাল্লাহও প্রাথমিকভাবে নিহত হয়েছেন বলে মনে করা হয়েছিল।

আল-হায়ার পাশাপাশি সহসভাপতি খালেদ মেশালও মূল ভবনে উপস্থিত ছিলেন না। তাঁরা দুজনই জীবিত আছেন।

হামাস দাবি করেছে, তাদের কোনো নেতা নিহত হননি। তবে ফিলিস্তিনি গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়, আল-হায়ার ছেলে হিমাম এবং তাঁর কার্যালয়ের পরিচালক জিহাদ লাবাদ নিহত হয়েছেন।

আল-জাজিরা জানিয়েছে, বৈঠকের মূল উদ্দেশ্য ছিল মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ প্রস্তাবিত সর্বশেষ শান্তিচুক্তি নিয়ে আলোচনা করা। টাইমস অব ইসরায়েলকে একজন অজ্ঞাত কাতারি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বৈঠকের জন্য উপস্থিত নেতারা তুরস্ক থেকে দোহায় এসেছিলেন।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) একজন মুখপাত্র বলেছেন, ‘আইডিএফ এবং আইএসএ (শিন বেত) হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতাদের লক্ষ্য করে সুনির্দিষ্ট একটি হামলা চালিয়েছে।’

‘বছরের পর বছর ধরে এ হামাস নেতারা সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন। তাঁরা ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলার জন্য সরাসরি দায়ী এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

‘কাতারে হামলার আগে, বেসামরিক মানুষের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে, যেমন সঠিক ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার ও অতিরিক্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা।’

‘আইডিএফ এবং আইএসএ দৃঢ়ভাবে হামাসকে পরাজিত করতে কাজ চালিয়ে যাবে।’

ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-এর বারাক রাভিদ বলেন, একজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা তাঁকে নিশ্চিত করেছেন, এ অভিযান ছিল ‘হামাস কর্মকর্তাদের হত্যার চেষ্টা’; যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘সামিট অব ফায়ার’।

একই সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ হামলার ‘সবুজ সংকেত’ দিয়েছেন, যদিও কাতারের সঙ্গে তাঁর প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

এ বিষয়ে ওয়াশিংটন তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।

প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয় এ অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের অভিযোগকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেছে। তারা বলছে, হামাস নেতাদের বিরুদ্ধে আজকের অভিযান ইসরায়েলের সম্পূর্ণ স্বাধীন উদ্যোগ।

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বলেছে, ‘ইসরায়েল এ হামলার উদ্যোগ নিয়েছে, এটি পরিচালনা করেছে এবং এর পূর্ণ দায় নিচ্ছে।’

এদিকে এ হামলার নিন্দা জানিয়েছে কাতার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ‘এ অপরাধমূলক হামলা সব আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এটি কাতারের জনগণ ও কাতারে থাকা লোকজনের নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি।’

মুখপাত্র আরও বলেছেন, ‘এ হামলার আমরা শক্তভাবে নিন্দা জানাই। কাতার কখনোই এ ধরনের বেপরোয়া ইসরায়েলি আচরণ সহ্য করবে না এবং নিজের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কোনো হামলা সহ্য করবে না।’

অবশ্য এ হামলার প্রশংসা করেছেন ইসরায়েলি রাজনীতিবিদেরা। অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এটিকে ‘সঠিক সিদ্ধান্ত’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে স্মোট্রিচ লিখেছেন, ‘‘‘সন্ত্রাসীদের’’ কোনো ছাড় নেই এবং ভবিষ্যতেও হবে না। ইসরায়েলের দীর্ঘ হাত বিশ্বের যেকোনো স্থানে ঘিরে ধরবে তাঁদের।’

ইসরায়েলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার লাপিড বিমানবাহিনী, আইডিএফ, শিন বেত ও ইসরায়েলি সব নিরাপত্তা বাহিনীকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বলেছেন, ‘তারা আমাদের শত্রুকে প্রতিহত করতে অসাধারণ অভিযান চালিয়েছে।’

কাতারের রাজধানী দোহায় হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলের হামলার পর ধোঁয়া উড়ছে। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
কাতারের রাজধানী দোহায় হামাসের জ্যেষ্ঠ নেতাদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলের হামলার পর ধোঁয়া উড়ছে। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: রয়টার্স

জাকসু নির্বাচন: ‘ইনক্লুসিভ’ বিশ্ববিদ্যালয় চান ভিপি, জিএস কাজ করবেন ঐক্যবদ্ধভাবে

সব দল ও মতকে সঙ্গে নিয়ে ‘ইনক্লুসিভ’ বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলতে চান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদের (জাকসু) নবনির্বাচিত সহসভাপতি (ভিপি) আবদুর রশিদ জিতু। অন্যদিকে ভিপি নিজেদের প্যানেলের বাইরে থেকে নির্বাচিত হলেও সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে চান ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেল থেকে নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক (জিএস) মাজহারুল ইসলাম।

শনিবার জাকসু নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় প্রথম আলোকে এ কথাগুলো বলেছেন নবনির্বাচিত ভিপি ও জিএস।

দীর্ঘ ৩৩ বছর ধরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যৌক্তিক অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন উল্লেখ করে ভিপি আবদুর রশিদ বলেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের পর আন্দোলনের পর জাকসু নির্বাচনের মাধ্যমে আমরা সে অধিকার ফিরে পেয়েছি। জাকসুর নেতা বা ভিপি হওয়া আমাদের কখনোই ইচ্ছা ছিল না। আমাদের ইচ্ছা ছিল শিক্ষার্থীরা যে অধিকার থেকে দীর্ঘ ৩৩ বছর বঞ্চিত ছিল, সে অধিকার ফিরিয়ে আনা।’

নির্বাচনে ছাত্রশিবির প্যানেল থেকে বেশি প্রার্থী জয়লাভ করেছেন উল্লেখ করে নবনির্বাচিত ভিপি বলেন, ‘কিন্তু আমাদের প্রথম কাজ হবে সকল দল, মত সাথে নিয়ে একটি ইনক্লুসিভ জাহাঙ্গীরনগর গড়ে তোলা। আমরা যে ইশতেহার দিয়েছিলাম, সেটি এমন কোনো অলৌকিক ইশতেহার নয়, যেটি বাস্তবায়ন করতে পারব না। শিক্ষার্থীদের চাওয়া-পাওয়াই আমাদের ইশতেহার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন যেসব অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল, সেগুলো আদায় করা হবে।’

দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি চর্চা বন্ধ করতে চান উল্লেখ করে আবদুর রশিদ জিতু বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সকল প্রকার দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি চর্চা, সেটি বন্ধ করব ইনশা আল্লাহ। কারণ, আমরা দেখেছি দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি চর্চা কীভাবে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক লাইফ নষ্ট করে। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে যেভাবে কাজ করা দরকার, আমরা সেভাবে কাজ করে যাব।’

এদিকে জাকসুর নবনির্বাচিত জিএস মাজহারুল ইসলাম বলেছেন, ‘নবনির্বাচিত ভিপি আমাদের প্যানেলের বাইরে থেকে নির্বাচিত হলেও আমরা সকলে মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করব। আমাদের প্রথম কাজ হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই আন্দোলনে ছাত্রলীগ যে হামলা চালিয়েছিল, ওই হামলায় যেসব শিক্ষক জড়িত ছিলেন তাঁদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবহন সমস্যা রয়েছে, সেটি সমাধান করা।’

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে নিয়ে একটি সুন্দর, নিরাপদ ক্যাম্পাস গড়ে তুলতে চান উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের দপ্তর ও প্রকাশনা সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের গবেষণামুখী করে গড়ে তোলার জন্য যা কিছু করা প্রয়োজন, আমরা সবকিছু বাস্তবায়নের চেষ্টা করে যাব।’

নবনির্বাচিত এই জিএস বলেন, ‘নির্বাচনে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী ভোট প্রদান করেছেন। সকল প্রার্থী এবং শিক্ষার্থী এই নির্বাচন মেনে নিয়েছেন এবং সুষ্ঠুভাবে ভোট গণনা সম্পন্ন হয়েছে। সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট শিক্ষার্থীদের কাছে যে অঙ্গীকার করেছে এবং শিক্ষার্থীরা যে বিশ্বাস নিয়ে আমাদের নির্বাচিত করেছেন, আমরা সে অঙ্গীকার অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে দায়বদ্ধ।’

শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণে তাঁরা নিরলসভাবে কাজ করে যাবেন উল্লেখ করে শিবিরের এই নেতা বলেন, ‘নারী স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার।’

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-13%2Faoy48sh3%2F50b4ba33-7a75-46e5-b455-9704f6649c55.jfif?rect=0%2C0%2C730%2C487&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
জাকসু নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর নবনির্বাচিত ভিপি আবদুর রশিদ (জিতু) ও জিএস মো. মাজহারুল ইসলাম। ছবি: প্রথম আলো

সরকার ও উপদেষ্টারা মাহফুজদের যথেচ্ছ ব্যবহার করে এখন মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে: নাহিদ ইসলাম

লন্ডনে তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ওপর হামলার চেষ্টা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও সাবেক তথ্য উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সরকার ও উপদেষ্টা পরিষদের ভেতরেও মাহফুজ আলমকে অপদস্থ ও হত্যার মৌন সম্মতি তৈরি করা হয়েছে। এই সরকার ও উপদেষ্টারা মাহফুজদের যথেচ্ছ ব্যবহার করে এখন মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।’

লন্ডনের ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (সোয়াস) ক্যাম্পাসে আয়োজিত একটি সেমিনার থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ওপর হামলার চেষ্টা করেছেন সেখানকার আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। লন্ডনের কেন্দ্রস্থলের ব্লুমসবারি এলাকায় সোয়াস ক্যাম্পাসে ওই সেমিনার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যৌথভাবে আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ হাইকমিশন।

লন্ডনের স্থানীয় সময় শুক্রবার সন্ধ্যা সাতটায় সোয়াস ক্যাম্পাসের পেছনের রাস্তা দিয়ে হাইকমিশনের গাড়ি বের হলে গাড়ির ওপর ডিম নিক্ষেপ করেন আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। এ সময় হাইকমিশনের কালো রঙের বিএমডব্লিউ গাড়ির সামনে শুয়ে পড়ার চেষ্টা করেন তাঁদের কয়েকজন। কিন্তু পুলিশের হস্তক্ষেপে তাঁদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হলেও তাঁরা গাড়ির ওপর ডিম নিক্ষেপ করেন।

এ বিষয়ে আজ শনিবার নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে স্ট্যাটাস দেন নাহিদ ইসলাম। তাতে তিনি লিখেছেন, ‘গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র ও অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের ওপর লন্ডনে হামলার চেষ্টা হয়েছে। এর আগে আমেরিকায় হামলা ও অপদস্থ করার চেষ্টা করা হয়েছে। বারবার মাহফুজ আলমের ওপর আওয়ামী ফ্যাসিস্টদের হামলা। কারণ, মাহফুজ আলমই টার্গেট। পরবর্তী ধাপে আমরা প্রত্যেকেই টার্গেট হব। আমরা জানি, আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করে আছে। গোপালগঞ্জে ফ্যাসিস্টদের নৃশংসতা আমরা দেখে আসছি।’

নাহিদ ইসলাম লেখেন, ‘মাহফুজ আলমের ওপর হামলার মৌন সম্মতি যারা তৈরি করছে, তারাও ভুগবে। ফ্যাসিবাদ বিভাজনের রাজনীতি করে। মাহফুজ আলম গণ-অভ্যুত্থানের পরে অন্তর্ভুক্তি এবং দায় ও দরদের রাজনীতির কথা বলছেন। কিন্তু বাংলাদেশ সেই পথে হাঁটে নাই।’ তিনি বলেন, ‘আমরা দেখতে পাইছি, ফ্যাসিবাদ বিরোধিতার নাম করে প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রতিশোধের রাজনীতি শুরু করছে বিভিন্ন গ্রুপ, যা অবশ্যম্ভাবীভাবে ফ্যাসিবাদকে ফিরায়ে আনবে। সময় প্রমাণ করবে, মাহফুজ আলমই সঠিক ছিল, যদি তত দিন উনি বেঁচে থাকার সুযোগ পান।’

নাহিদ ইসলাম আরও লেখেন, ‘মাহফুজ আলমের ওপর হামলার ঘটনায় কোনোবারই অন্তর্বর্তী সরকার কোনো জোরালো পদক্ষেপ নেয়নি। কোনো শক্ত বার্তা দেয়নি। কোনো উপদেষ্টা বা প্রেস সচিব একটা মন্তব্যও কখনো করেনি। সরকার ও উপদেষ্টা পরিষদের ভেতরেও মাহফুজ আলমকে অপদস্থ ও হত্যার মৌন সম্মতি তৈরি করা হয়েছে। এই সরকার ও উপদেষ্টারা মাহফুজদের যথেচ্ছ ব্যবহার করে এখন মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।’ তিনি লেখেন, ‘আমরা এগুলা মনে রাখছি। রাজনৈতিকভাবে এর জবাব দেওয়া হবে।’

নাহিদ ইসলাম
নাহিদ ইসলাম। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

জাকসু নির্বাচনে ২৫ পদের ২০টিতেই জিতল ছাত্রশিবির-সমর্থিত প্যানেল

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জাকসু) নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ পদে বিজয়ী হয়েছেন ইসলামী ছাত্রশিবির–সমর্থিত ‘সমন্বিত শিক্ষার্থী জোট’ প্যানেলের প্রার্থীরা। তাঁরা জাকসুর ২৫টি পদের মধ্যে সাধারণ সম্পাদক (জিএস), দুটি যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকসহ (এজিএস) ২০টি পদে জয় পেয়েছেন।

এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্যানেল থেকে সহসভাপতি (ভিপি) পদ এবং দুটি করে পদে বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্রসংসদ (বাগছাস)–সমর্থিত প্যানেলের প্রার্থী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন।

৩৩ বছর পর ১১ সেপ্টেম্বর জাকসু নির্বাচনের ভোট গ্রহণ করা হয়। এরপর গতকাল শুক্র ও আজ শনিবার দিনভর গণনার পর বিকেলে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়।

ভিপি স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্যানেলের জিতু

নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ফলাফল অনুযায়ী, ভিপি পদে ৩ হাজার ৩৩৪টি ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্যানেল ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলনের’ প্রার্থী আবদুর রশিদ (জিতু)। তিনি বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক। আন্দোলনের আগে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেলের আরিফ উল্লাহ পেয়েছেন ২ হাজার ৩৯২ ভোট।

এ ছাড়া ভিপি পদে বাগছাস–সমর্থিত প্যানেলের আরিফুজ্জামান উজ্জ্বল পেয়েছেন ১ হাজার ২১১ ভোট। ভোটের দিন বিকেল চারটার দিকে নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলে নির্বাচন বর্জন করা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল–সমর্থিত প্যানেলের শেখ সাদী হাসান পেয়েছেন ৬৪৮ ভোট।

জিএস-এজিএসসহ ২০ পদে শিবির জয়ী

জিএস পদে ৩ হাজার ৯৩০ ভোট পেয়ে জয় পেয়েছেন ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেলের মো. মাজহারুল ইসলাম। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের আবু তৌহিদ মো. সিয়াম পেয়েছেন ১ হাজার ২৩৮ ভোট। স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলনের মো. শাকিল আলী পেয়েছেন ৯৫৯ ভোট। নির্বাচন বর্জন করা ছাত্রদলের তানজিলা হোসাইল বৈশাখী পেয়েছেন ৯৪১ ভোট।

এজিএস (পুরুষ) পদে বিজয়ী হয়েছেন ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেলের ফেরদৌস আল হাসান। তিনি ২ হাজার ৩৫৮ ভোট পেয়ে জয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের জিয়া উদ্দিন পেয়েছেন ২ হাজার ১৪ ভোট। স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী সম্মিলনের তৌহিদুল ইসলাম ভূঁঞা পেয়েছেন ৭১৫ ভোট। ছাত্রদলের মো. সাজ্জাদ উল ইসলাম পেয়েছেন ৭০১ ভোট। এজিএস (নারী) পদে ৩ হাজার ৪০২ ভোট পেয়ে জয় পেয়েছেন ছাত্রশিবির–সমর্থিত প্যানেলের আয়েশা সিদ্দিকা মেঘলা। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের মালিহা নামলাহ পেয়েছেন ১ হাজার ৮৩৬ ভোট। ছাত্রদলের আঞ্জুমান আরা ইকরা পেয়েছেন ৭৬৪ ভোট।

শীর্ষ তিন পদের বাইরে ছাত্রশিবিরের প্যানেল থেকে শিক্ষা ও গবেষণা সম্পাদক পদে আবু উবায়দা উসামা (২ হাজার ৪২৮ ভোট), পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণবিষয়ক সম্পাদক পদে সাফায়েত মীর (২ হাজার ৮১১ ভোট), সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে জাহিদুল ইসলাম (১ হাজার ৯০৭ ভোট), সহসাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে মোহাম্মদ রায়হান উদ্দিন (১ হাজার ৯৮৬ ভোট), নাট্য সম্পাদক পদে রুহুল ইসলাম (১ হাজার ৯২৯ ভোট), সহক্রীড়া সম্পাদক পদে মো. মাহাদী হাসান (২ হাজার ১০৫ ভোট), সহক্রীড়া (নারী) সম্পাদক পদে ফারহানা আক্তার (১ হাজার ৯৭৬ ভোট) জয়ী হয়েছেন।

এ ছাড়া তথ্যপ্রযুক্তি ও গ্রন্থাগার সম্পাদক পদে মো. রাশেদুল ইসলাম (২ হাজার ৪৩৬ ভোট), সহসমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক (পুরুষ) পদে তৌহিদ হাসান (২ হাজার ৪৪২ ভোট), সহসমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক (নারী) পদে নিগার সুলতানা (২ হাজার ৯৬৬ ভোট), স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তা সম্পাদক পদে হুসনী মোবারক (২ হাজার ৬৫৩ ভোট), পরিবহন ও যোগাযোগ সম্পাদক পদে তানভীর রহমান (২ হাজার ৫৫৯ ভোট), কার্যকরী সদস্য (নারী) পদে নুসরাত জাহান ইমা (৩ হাজার ১৪ ভোট), ফাবলিহা জাহান নাজিয়া (২ হাজার ৪৭৫ ভোট), নাবিলা বিনতে হারুন (২ হাজার ৭৫০ ভোট) এবং কার্যকরী সদস্য (পুরুষ) পদে হাফেজ তারিকুল ইসলাম (১ হাজার ৭৪৬ ভোট), মো. আবু তালহা (১ হাজার ৮৫৪ ভোট) জয়ী হয়েছেন।

বিজয়ী অন্য যাঁরা

ছাত্রশিবিরের প্যানেলের বাইরে সমাজসেবা ও মানবসম্পদ উন্নয়নবিষয়ক সম্পাদক পদে বাগছাস–সমর্থিত শিক্ষার্থী ঐক্য ফোরামের প্রার্থী আহসান লাবিব (১ হাজার ৬৯০ ভোট), ক্রীড়া সম্পাদক পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. মাহামুদুল হাসান (৫ হাজার ৭৭৮ ভোট), সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে মুহিবুল্লাহ শেখ (২ হাজার ১৮ ভোট) এবং কার্যকরী সদস্য (পুরুষ) মোহাম্মদ আলী চিশতী (২ হাজার ৪১৪ ভোট) পেয়ে জয় পেয়েছেন।

জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্যসচিব অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনে প্রায় ৭০ শতাংশ ভোট পড়েছে। শিক্ষার্থীদের রায়ের প্রতি সবাইকে সম্মান দেখাতে হবে। শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সম্মিলিতভাবে কাজ করবেন, সেই প্রত্যাশা থাকবে। নির্বাচন করার ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতার কিছুটা ঘাটতি থাকলেও শেষ পর্যন্ত তাঁরা নির্বাচনটি সম্পন্ন করতে পেরেছেন। এটি তাঁদের জন্য গৌরবের ব্যাপার।

ফল ঘোষণার আগমুহূর্তে নির্বাচন কমিশনের এক সদস্যের পদত্যাগ

নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগমুহূর্তে জাকসু নির্বাচন কমিশনের সদস্য রেজওয়ানা করিম পদত্যাগ করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ও নির্বাচন কমিশনের সদস্য সচিব অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, ‘নির্বাচনের ফল ঘোষণার আগমুহূর্মুতে তিনি তাঁর বিভাগের একজন স্টাফকে দিয়ে পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন। আমি বিস্মিত হয়েছি, গতকাল পর্যন্ত তিনি আমাদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন। রাতের মধ্যে কি এমন হলো যে তিনি পদত্যাগ করলেন! এটি আমাদের সবাইকে বিস্মিত করেছে।’

অধ্যাপক এ কে এম রাশিদুল আলম আরও বলেন, রেজওয়ানা করিম কয়েকদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু সুস্থ হওয়ার পর তিনি কাজ করেছেন, মিটিং করেছেন। তাঁর কোনো বিষয় আপত্তি থাকলে সেগুলো জানাতে পারতেন। কিন্তু নির্বাচনের পর ফল ঘোষণার আগমুহূর্তে পদত্যাগ করা বিস্ময়কর।

ট্রাম্পের সঙ্গে তিক্ততা, দেশে বিরোধীদের আক্রমণ—নেতৃত্ব রক্ষায় লড়ছেন মোদি

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর ১১ বছরের শাসনকালের সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং সময় পার করছেন আজ। পাকিস্তানের সঙ্গে বিতর্কিত যুদ্ধবিরতি, নিজের বয়স নিয়ে নতুন করে আলোচনা, আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সখ্য থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে তাঁর নেতৃত্বকে এমন পরীক্ষায় ফেলেছে, যা আগে কখনো হয়নি।

এত সব চাপ সামলানোর পাশাপাশি মোদিকে ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে ভোট কারচুপি নিয়ে বিরোধীদের অভিযোগেরও জবাব দিতে হচ্ছে। তাঁকে এসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিহারে এক কঠিন নির্বাচনী লড়াই শুরুর ঠিক আগে। রাজনৈতিকভাবে ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য এটি।

রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে হার হলেও তা মোদির লোকসভার অবস্থানে প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু এক দশকের বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় শক্তভাবে আঁকড়ে থাকা এ নেতার ভাবমূর্তিতে তা বড় ধাক্কা দেবে।

এ সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসন ভারত থেকে আমদানি করা পণ্যে মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক বসানোর ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্বের যেসব দেশের ওপর ট্রাম্প অতি উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছেন, ভারত তার একটি। ফলে দুই দেশের (যুক্তরাষ্ট্র–ভারত) সম্পর্কও তীব্র সংকটে পড়েছে। অথচ মাত্র ছয় মাস আগেও ট্রাম্প ও মোদি একে অপরকে আলিঙ্গন করে ঘনিষ্ঠ বন্ধু বলে বর্ণনা করছিলেন।

নয়াদিল্লিভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক আরতি জেরাথ বলেন, ‘ভারত–মার্কিন সম্পর্ক অনেকটাই ট্রাম্প ও মোদির ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়েছিল। এখন যখন সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে, মোদির হাতে কোনো সুরক্ষা ঢাল নেই। অনেকে হতাশ। কারণ, শক্তিশালী এ নেতা দাবি করলেও তেমন শক্তি ও দৃঢ়তা দেখাতে পারেননি।’

তবে নরেন্দ্র মোদি এখন পাল্টা জবাব দিতে শুরু করেছেন। গত বৃহস্পতিবার তিনি বলেন, দেশ কৃষকদের স্বার্থে যেকোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৃষি ও দুগ্ধ খাত উন্মুক্ত করার চাপের প্রসঙ্গ সরাসরি উল্লেখ করেননি তিনি।

‘ভারত কখনো কৃষক, পশুপালক ও মৎস্যজীবীদের স্বার্থের সঙ্গে আপস করবে না’, এক জনসভায় বলেন মোদি। তিনি আরও বলেন, ‘আমি জানি, এ জন্য আমাকে ব্যক্তিগতভাবে বড় মূল্য দিতে হতে পারে, কিন্তু আমি প্রস্তুত।’

মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শেয়ার করা একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টারে দেখা গেছে, মোদির পিঠে পাথর, ইট ও শুল্কের প্রতীকী ছুরি আঘাত করছে, আর তিনি কাঁধে লাঙলধরা এক কৃষককে আড়াল করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এ শুল্ক লড়াই বিহার নির্বাচনী প্রচারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে, যা আগামী মাসে শুরু হতে পারে। ভোটভাইব এজেন্সির সাম্প্রতিক জরিপে বলা হয়েছে, চাকরির অভাবে মোদির নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোটের (এনডিএ) পক্ষে রাজ্যে ক্ষমতা ধরে রাখা কঠিন হবে।

তবে ভোটভাইবের প্রতিষ্ঠাতা অমিতাভ তিওয়ারি বলেন, ‘ট্রাম্পবিরোধী কোনো জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়া ভোটারদের খুব একটা প্রভাবিত করবে না। কারণ, বিহারের নির্বাচন অত্যন্ত স্থানীয় ইস্যুভিত্তিক। এখানে বেকারত্ব ছাড়া আর কোনো বড় ইস্যু নেই।’

ট্রাম্পের বিরুদ্ধে আরেকটি কূটনৈতিক জবাবে মোদি আগামী সপ্তাহগুলোতে চীন সফরের পরিকল্পনা করছেন। সেখানে প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও দেখা হতে পারে; যা সম্পর্কের নতুন এক বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়।

বৃহস্পতিবার মোদি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দ্য সিলভার সঙ্গেও শুল্ক ইস্যুতে কথা বলেন। ভারত ও ব্রাজিল—দুই দেশই ব্রিকসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। ট্রাম্প এ জোটের সমালোচনা করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এ দুই দেশই। ব্রিকসের অন্য প্রতিষ্ঠাতা সদস্য রাশিয়া, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা।

ডেটা ইন্টেলিজেন্স প্রতিষ্ঠান মর্নিং কনসাল্টের জরিপে দেখা গেছে, ৭৫ শতাংশের বেশি সমর্থন নিয়ে মোদি এখনো বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় সরকারপ্রধান। তবুও তাঁর মূল হিন্দু জাতীয়তাবাদী সমর্থকেরা বিস্মিত হয়েছিলেন মে মাসে মুসলিমপ্রধান পাকিস্তানের সঙ্গে হঠাৎ যুদ্ধবিরতির ঘোষণায়। কয়েক দশকের মধ্যে দুই দেশের সবচেয়ে তীব্র সংঘর্ষের পর এ ঘোষণা আসে।

এই যুদ্ধবিরতি দেশে–বিদেশে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মোদির সরকার বারবারই এ নিয়ে ট্রাম্পের দাবি অস্বীকার করেছে। ট্রাম্প বলেছেন, বাণিজ্য আলোচনার সুবিধা কাজে লাগিয়ে এ যুদ্ধবিরতি তিনিই করিয়েছেন। পরে ট্রাম্প পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও মজবুত করেন। আর পাকিস্তানও প্রকাশ্যে তাঁকে সংঘাত শেষ করার জন্য ধন্যবাদ জানায়। পুরো বিষয়টি ভারতের কূটনৈতিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তোলে।

এরই মধ্যে দেশের ভেতর প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস দাবি করেছে, মোদির বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন ভুয়া ভোটার যুক্ত করে ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচন ‘কারচুপি করে ছিনিয়ে নিয়েছে’, সেটির প্রমাণ আছে।

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন দল মিলে দেশে এক বিশাল অপরাধমূলক প্রতারণা চালাচ্ছে।’

তবে বিজেপি এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, কংগ্রেসের বারবার নির্বাচনে হারার হতাশা থেকেই এ কথা বলা হচ্ছে।

‘রাহুল গান্ধী যখন প্রতারণা করে ক্ষমতায় যেতে পারেন না, তখন তিনি ষড়যন্ত্রের কথা বলেন’, এক্সে লিখেছে বিজেপি। আর নির্বাচন কমিশন রাহুলকে বলেছে, ‘অযৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ও ভারতের নাগরিকদের বিভ্রান্ত করা বন্ধ করুন।’

আগামী মাসে মোদির ৭৫তম জন্মদিন ঘিরেও আলোচনা হচ্ছে। কারণ, এর আগে এ মাইলফলক পেরোলেই অনেক বিজেপি নেতাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে বিজেপি বলছে, নেতাদের জন্য কোনো আনুষ্ঠানিক অবসরের বয়স নেই।

সব মিলিয়ে বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

নয়াদিল্লির গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের অতিথি ফেলো রশীদ কিদওয়াই বলেন, ‘মোদির ব্র্যান্ডমূল্য এখন দ্রুত কমছে। তাঁকে নতুন করে নিজেকে গড়ে তুলতে হবে। বিহার নির্বাচনে হারলে এই জনপ্রিয়তা আরও ফিকে হয়ে যাবে। কারণ, ভারতে নির্বাচনই সবকিছু নির্ধারণ করে।’

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। হোয়াইট হাউস, ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। হোয়াইট হাউস, ওয়াশিংটন ডিসি, যুক্তরাষ্ট্র, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ছবি: রয়টার্স