Saturday, February 1, 2014

কেন্দ্রে ব্যালট পেপার সরবরাহ বন্ধে ভবন অবরোধ

থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার নির্বাচন
-পূর্ব দুটি পোস্টারের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন
একজন সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারী। তাঁর পিঠে লাগানো
‘কোনো ভোট নয়’ লেখা স্টিকার। পোস্টারে ইংলাকের
মুখেও সেঁটে দেওয়া হয়েছে একই কথা লেখা স্টিকার।
ব্যাংককে বিক্ষোভকারীরা গতকাল এভাবেই রোববারের
সাধারণ নির্বাচনের প্রতিবাদ জানান। ছবি: রয়টার্স
থাইল্যান্ডে আগামীকাল রোববারের সাধারণ নির্বাচন বানচাল করতে বিরোধীরা মরিয়া হয়ে উঠেছে। ব্যালট পেপার সরবরাহ বন্ধের চেষ্টায় গতকাল শুক্রবার শত শত বিক্ষোভকারী বেশ কয়েকটি সরকারি ভবন অবরুদ্ধ করে। সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গতকাল ব্যাংককের একটি এবং দক্ষিণ থাইল্যান্ডের বেশ কয়েকটি সরকারি ভবন ঘেরাও করে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীরা। ব্যালট পেপার সরবরাহ ঠেকাতে ইতিমধ্যেই সারা দেশে ডাকঘরসহ অন্য অনেক সরকারি ভবন ঘেরাও করে রেখেছে তারা।
একজন নির্বাচন কমিশনার আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, বিক্ষোভকারীদের বাধার কারণে আগামীকাল হয়তো ১০ শতাংশ ভোটকেন্দ্র খোলাই যাবে না। প্রধানবিরোধী দল ডেমোক্র্যাট পার্টি নির্বাচন বয়কট করায় আগামীকাল ভোট গ্রহণ করা হলে ক্ষমতাসীন পুয়ে থাই পার্টি নিশ্চিতভাবে জয় লাভ করবে। বিরোধীরা এ নির্বাচন বানচালে অনড়। তারা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সংস্কার চাইছে। এর অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার পদত্যাগেরও দাবি জানিয়ে আসছে বিরোধীরা। নভেম্বরে গণ-আন্দোলন শুরুর পর একপর্যায়ে আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন ইংলাক। তবে পদত্যাগের দাবি পূরণ সম্ভব নয় বলে উড়িয়ে দেন। জবাবে বিরোধীরা নির্বাচন বয়কট করে। সেই সঙ্গে নির্বাচন বানচালে আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেয়। ২২ জানুয়ারি রাজধানী ও আশপাশের কয়েকটি প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়। তবে বিক্ষোভ দমনে বল প্রয়োগ করা হয়নি। গত বৃহস্পতিবার থেকে বিক্ষোভকারীরা রাজধানীতে নতুন করে সমাবেশ শুরু করে। এ ছাড়া প্রায় এক মাস ধরে ব্যাংককের প্রধান প্রধান সড়ক অবরুদ্ধ করে রেখেছে তারা।
সংবিধানের বাধ্যবাধকতার কথা উল্লেখ করে কালকের ভোট অনুষ্ঠানের পক্ষে কঠোর অবস্থানে আছে সরকার। গত রোববার ব্যাংককে বিক্ষোভকারীদের বাধার মুখে ৫০টি কেন্দ্রের মধ্যে ৪৫টি কেন্দ্রেই আগাম ভোট গ্রহণ স্থগিত করা হয়েছিল। বিক্ষোভকারীরা কাল মূল ভোটের দিনও ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেবে বলে আগেভাগেই হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে। এতে সহিংস ঘটনার আশঙ্কা করা হচ্ছে। গণ-আন্দোলনের নেতা সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী সুথেপ থাগসুবান বৃহস্পতিবার বলেছিলেন, তাঁর সমর্থকেরা ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দেবেন না। গত রোববার আগাম ভোটের আগেও একই ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন থাগসুবান। কিন্তু তাঁর সমর্থকেরা তা আমলে নেয়নি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ভোটের দিন ব্যাংককে ১০ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হবে। এ ছাড়া ইতিমধ্যে পাঁচ হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। এ সংখ্যা আরও বৃদ্ধি করা হবে। জরুরি অবস্থা তদারকির দায়িত্বে থাকা শ্রমমন্ত্রী চালের্ম ইউমবামরুং বলেছেন, সরকারবিরোধীরা সহিংসতায় জড়িয়ে পড়লে তা ঠেকানোর মতো পর্যাপ্ত লোকবল সেনাবাহিনী কিংবা পুলিশের নেই। বিবিসি ও রয়টার্স।

দামেস্ক অস্ত্র ধ্বংসের প্রক্রিয়ায় অচলাবস্থার সৃষ্টি করছে

চাক হেগেল
সিরিয়া তাঁর বিপজ্জনক রাসায়নিক অস্ত্র চুক্তি অনুযায়ী সে দেশ থেকে সরিয়ে নেওয়ায় অচলাবস্থার সৃষ্টি করছে বলে অভিযোগ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংসের বিষয়ে জাতিসংঘের প্রস্তাব মেনে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে সিরিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে দেশটি। এদিকে সিরিয়ায় রক্তপাত বন্ধের পথ খুঁজতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগে আয়োজিত জেনেভা শান্তি সম্মেলন গতকাল শুক্রবার শেষ হয়েছে। এই সম্মেলনে সিরিয়ার সরকার ও বিদ্রোহীদের প্রতিনিধিরা প্রথমবারের মতো সরাসরি আলোচনায় অংশ নেয়। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী চাক হেগেল গত বৃহস্পতিবার পোল্যান্ড সফরের সময় সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংসের প্রক্রিয়ার ধীরগতির জন্য দেশটির সরকারকে দায়ী করে এর সমালোচনা করেন। হেগেল বলেন, তিনি বিষয়টি নিয়ে রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন।
এ ব্যাপারে দামেস্কের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেও রুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। হেগেল বলেন, ‘আমি জানি না, সিরিয়ার সরকারের উদ্দেশ্যটা কী। এটা কি তাদের অদক্ষতার ফল? কেন তারা রাসায়নিক অস্ত্রের উপাদান সরিয়ে ফেলায় পিছিয়ে পড়ছে।’ সিরিয়ার রাসায়নিক অস্ত্র ধ্বংসের কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত অর্গানাইজেশন ফর দ্য প্রহিবিশন অব কেমিক্যাল ওয়েপনসে (ওপিসিডব্লিউ) নিযুক্ত মার্কিন স্থায়ী প্রতিনিধি রবার্ট মিকুলাক এক বিবৃতিতে বলেছেন, রাসায়নিক অস্ত্রের উপাদান সরিয়ে নেওয়ার কাজ ‘অত্যন্ত ধীরগতিতে’ চলছে। এ পর্যন্ত এসব উপাদানের মাত্র চার শতাংশ হস্তান্তর করতে পেরেছে দামেস্ক। মিকুলাক বলেন, সিরিয়াকে জাতিসংঘের প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। বৃহস্পতিবার সিরিয়ার ‘সন্ত্রাসবাদ’ নিয়ে আলোচনা হয়। জাতিসংঘের সিরিয়াবিষয়ক বিশেষ দূত লাখদার ব্রাহিমি বৃহস্পতিবারের আলোচনা শেষে সাংবাদিকদের জানান, তিনি আশা করছেন এই আলোচনা থেকে দুই পক্ষই ‘শিক্ষা নিয়েছে’। বৃহস্পতিবার সন্ত্রাসবাদ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যদিও কীভাবে সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা করা হবে, সে ব্যাপারে দুই পক্ষের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি। বিবিসি ও আল-জাজিরা।

কেজরিওয়ালের চোখে রাহুল অসৎ

রাহুল গান্ধী, পি চিদাম্বরম
তাঁর চোখে যাঁরা অসৎ, সেই রাজনীতিকদের একটা প্রাথমিক তালিকা সর্বসমক্ষে পেশ করলেন দিল্লির আম আদমি পার্টির (এএপি) মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তালিকায় আছেন কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধী। তবে নেই বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদির নাম। নেই দিল্লির সদ্য সাবেক মুখ্যমন্ত্রী কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেত্রী শীলা দীক্ষিতের নামও।
কেজরিওয়াল জানিয়েছেন, তালিকার ‘অসৎদের’ বিরুদ্ধে লোকসভার আগামী নির্বাচনে তাঁরা প্রার্থী দেবেন। সেই সঙ্গে তিনি বলেছেন, এএপির লড়াই ক্ষমতা দখলের জন্য নয়। তাঁদের লড়াই দুর্নীতির বিরুদ্ধে। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতিগ্রস্ত ও পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে কাউকে লোকসভায় জিততে না দেওয়া তাঁদের দলের লক্ষ্য। ‘দুর্নীতিগ্রস্তদের’ তালিকা প্রকাশ করার কোনো ইঙ্গিত আগে থেকে কেজরিওয়াল বা তাঁর দলের পক্ষ থেকে কেউ দেননি। ফলে গতকাল শুক্রবার দলের জাতীয় কর্মসমিতির বৈঠকের পর এই তালিকা প্রকাশ একদিক দিয়ে চমকই বলা যায়। বৃহস্পতিবার এএপি নেতারা জানিয়েছিলেন, এবারের লোকসভা ভোটে মোট ৫৪৩টি আসনের মধ্যে তাদের দল ৩৫০ আসনে লড়াই করবে। শুক্রবার বৈঠকের পর কেজরিওয়াল সেই আসনগুলোর মধ্যে কাদের বিরুদ্ধে নিশ্চিত প্রার্থী দেওয়া হবে তা জানান। এবং সেই ঘোষণার মধ্যেই চলে আসে ‘অসৎদের’ নাম। তালিকায় অন্যদের মধ্যে কংগ্রেসের সহসভাপতি রাহুল গান্ধীর নাম থাকলেও কেজরিওয়াল প্রথমে তা বলতে চাননি। ভাষণের শেষ দিকে তিনি বলেন,
‘আমি এই তালিকাটা পেশ করলাম। তাঁদের মধ্যে কাউকে সৎ মনে করলে আপনারা আমাকে বলবেন। তাঁদের সংসদে পাঠানো হবে, না পরাজিত করা হবে, সে বিষয়ে আমি দেশের মানুষের মতামত জানতে চাই।’ কেজরিওয়ালের করা অসৎদের তালিকায় কংগ্রেসের রাহুল গান্ধী ছাড়াও নাম রয়েছে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী কপিল সিবাল, কমলনাথ, ফারুক আবদুল্লা, পি চিদাম্বরম,সুশীল কুমার সিন্ধে, সালমান খুরশিদ, বীরাপ্পা মইলি, পবন বনশাল, সুরেশ কালমাদি ও তরুণ গগৈয়ের। রয়েছেন বিজেপির সাবেক সভাপতি নীতিন গড়কড়ি, কর্ণাটকের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী বি এস ইয়েদুরাপ্পা, অনন্ত কুমার, সমাজবাদী পার্টির মুলায়ম সিং যাদব ও বহুজন সমাজ পার্টির মায়াবতী। কেজরিওয়াল বলেন, তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধেই এএপি এবারের নির্বাচনে প্রার্থী দেবে। তাঁদের সংসদে না পাঠানোর জন্য দল সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। তালিকায় বিজেপির প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদির নাম না থাকলেও কেজরিওয়াল তাঁকে ছেড়ে দেননি। তাঁর কটাক্ষ, মোদি ও রাহুল গান্ধীর ভাবমূর্তি তৈরি করতে দুই দলই ৫০০ কোটি রুপি করে খরচ করছে!

‘সবচেয়ে বয়সী’ ফ্ল্যামিঙ্গোর বিদায়

অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেইড চিড়িয়াখানায়
গ্রেটার নামের সেই ফ্ল্যামিঙ্গো। গতকাল
শুক্রবার গ্রেটারের মৃত্যুর পর চিড়িয়াখানা
কর্তৃপক্ষ ছবিটি প্রকাশ করে। এএফপি
১৯৩৩ সাল থেকে অগণিত দর্শককে আনন্দ দিয়েছে গ্রেটার। এবার বয়সের কাছে হার মানল সে। রোগযন্ত্রণা ও বার্ধক্যজনিত কষ্ট থেকে মুক্তি দিতে চিকিৎসকেরা গতকাল শুক্রবার মানবিকভাবে তাকে চিরনিদ্রায় পাঠান। গ্রেটারের বয়স হয়েছিল ৮৩। অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেইড চিড়িয়াখানার একটি ফ্ল্যামিঙ্গো পাখির নাম গ্রেটার। কর্তৃপক্ষ বলছে, সে ছিল বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক ফ্ল্যামিঙ্গো। মুক্ত পরিবেশে এ বড় আকারের জলচর পাখিটি এর তুলনায় অনেক কম দিন বাঁচে। চিড়িয়াখানার প্রধান নির্বাহী ইলেন বেনস্টেড বলেন, ‘যতদূর জানি, আমাদের চিড়িয়াখানার ফ্ল্যামিঙ্গোটিই ছিল বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে বয়স্ক ফ্ল্যামিঙ্গো। এটির মৃত্যু আমাদের সবার জন্যই বড় এক ক্ষতি। কিন্তু এ ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় ছিল না।’ চিড়িয়াখানায় গ্রেটারের সঙ্গী ছিল আরেকটি ফ্ল্যামিঙ্গো। চিলি দি চিলিয়ান নামে ওই পাখিটির বয়স ৬৫ বছর। ধারণা করা হয়, চিলিই অস্ট্রেলিয়ায় বেঁচে থাকা শেষ ফ্ল্যামিঙ্গো। বিবিসি।

গল্প- পড়া ভূত শোনা ভূত by নাইস নূর

এক ভূতের দেশে ‘পড়া’ ভূত ও ‘শোনা’ ভূত নামে দুই যমজ ভাইবোন বাস করত। তারা দেখতে প্রায় একই রকম। তবে ভাই ‘পড়া’র চেয়ে বোন ‘শোনা’ একটু বেশি সুন্দর।

গল্প- সংবাদ শিরোনাম by সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

পত্রিকায় চোখ রেখে চমকে ওঠার মানুষ মোফাজ্জেল না। অন্তত তার নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনে দেশের-দশের খবর নিয়ে মাথাব্যথার কিছু নেই। কিন্তু রোববার সকালে কমলাপুর স্টেশনে এসে চার টাকা দামের পত্রিকার শিরোনাম দেখে মনে হলো, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে।

গল্প- সংবাদ শিরোনাম by সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

পত্রিকায় চোখ রেখে চমকে ওঠার মানুষ মোফাজ্জেল না। অন্তত তার নিম্নমধ্যবিত্ত জীবনে দেশের-দশের খবর নিয়ে মাথাব্যথার কিছু নেই। কিন্তু রোববার সকালে কমলাপুর স্টেশনে এসে চার টাকা দামের পত্রিকার শিরোনাম দেখে মনে হলো, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবে।

প্রতিদিন সকাল আটটায় স্টেশনে আসে মোফাজ্জেল। যমুনা এক্সপ্রেস ট্রেন পৌঁছায় সকাল নয়টার মধ্যে। এই সময়ে স্টেশনের চেহারাই বদলে যায়। পিলপিল করে গেট দিয়ে মানুষ বের হতে শুরু করে। তাদের ব্যাগ নেওয়ার জন্য পিছে পিছে ঘোরে কুলিরা। তখন রিকশা-সিএনজিচালিত অটোরিকশার দরদামও শুরু হয়। মোফাজ্জেল এই ট্রিপটা মিস করতে চায় না। এ সময় যাত্রীরা গন্তব্যে পৌঁছার জন্য মরিয়া থাকে। এক শ টাকার ভাড়া ঝগড়াঝাঁটি না করেই দুই শ টাকাতেও উঠে যায়। তবে স্টেশনে দিনে আরও কয়েক দফা ট্রেন এলেও তখন এদিক থেকে ট্রিপ নেয় না মোফাজ্জেল। দাঁড়ালেই প্রতিবার ১০ টাকা ফি, তার ওপর ইঞ্জিন স্টার্ট দিতে দুই মিনিট দেরি হলো তো পাহারাদার বদমাশগুলো এমনভাবে হাতের ডান্ডা দিয়ে অটোরিকশায় বাড়ি দেয়, মনে হয় পুরো কলকবজাই খুলে পড়বে। অটোরিকশার কেমন লাগে জানে না কিন্তু তার নিজের বুকে কষ্ট লাগে। পৈতৃক সম্পত্তির শেষটুকু বিক্রি করে এই অটোরিকশা রাস্তায় নামিয়েছে। প্রতিদিন ফেরার সময় চাল-ডালের বরাদ্দ, মুগদাপাড়ার ঘর ভাড়া, আজিজের স্কুলের বেতন—সবকিছুর জোগানদার এই বাহন। তাই লাঠির বাড়ি পড়লে মনে হয়, নিজের শরীরেই লাগছে। এরপর যদি জানত টাকাটা সিটি করপোরেশনে যাচ্ছে, কথা ছিল না। কিন্তু এখানকার সব ড্রাইভারই জানে টাকা যায় কোথায়। শাহজাহানপুরের শহীদ গ্রুপ দেখে কমলাপুরের এরিয়া। এত কষ্টের টাকা যায় গ্রুপের প্রধান শহীদের পকেটে। সে ভাগ-বাঁটোয়ারা করে নানা মাপের দল রাখে হাতে। নিশ্চয়ই সেই টাকা দিয়ে রাতে নরকগুলজারের মতো কোনো আসর বসে। এসব ভাবলে মনটাই খারাপ হয় মোফাজ্জেলের। তার ওপর এই ঠিকাদারগুলোর ব্যবহার অন্য জায়গার তুলনায় বেশি খারাপ। টাকা ভাংতি না থাকলে ২০ টাকার নোটটা ভাঁজ করে পকেটে চালান করে। পান খাওয়া দাঁতের ভেতর কাঠি দিয়ে খোঁচাতে খোঁচাতে বলে, ‘কাইল নিস।’ অথচ সেই কাল আর কখনো হয় না। শহীদকে ধরতে হুলিয়া জারি করেছে পুলিশ। তার নামে দুটো মার্ডার কেস, অবৈধ অস্ত্রের মামলাও আছে। অবাক লাগে মোফাজ্জেলের। রাস্তায় পুলিশরা গাড়ির চাকা ঘোরা দেখেই বলে দেয়, কোনটার লাইসেন্স নেই। সঙ্গে সঙ্গে আটকে ৮০০ টাকার কেস ঠুকে দেয়। আর সেই পুলিশই হাতের নাগালের একটা মানুষকে ধরতে পারছে না বছরের পর বছর! তবু স্টেশনে ট্রিপ নেওয়া ড্রাইভারগুলো এ জায়গার এক নেশায় পড়ে যায়। একে ভাড়া বেশি, তার ওপর সারা রাত ধরে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা মানুষেরা বেশ অন্য রকম হয়। কেউ কেউ গন্তব্যের জায়গার নাম ছাড়া কিছুই চেনে না, ঘুরতেই থাকে অটোরিকশা নিয়ে। এই তো গতকালও ট্রেন থেকে নেমে এক লোক উঠল তার গাড়িতে। বোকা-বোকা দেখতে মানুষ, গরমের ভেতরও ফুলহাতা শার্ট পরা। হাতল-ছেঁড়া কাপড়ের একটা কালো ব্যাগ হাতে। গ্রাম্য টানে বলল, ‘ভাইসাব, অনেকগুলা কাজ। সব জায়গায় এক মিনিট, দুই মিনিট। ঘণ্টা চুক্তিতে ভাড়ায় যাবেন?’
‘পয়সা দিলে যামু না ক্যান?’
ঘণ্টাপ্রতি দুই শ টাকা চুক্তিতে অটোরিকশায় উঠেই লোকটা প্রথমে গেল মতিঝিলের এক অফিসে। প্রায় ২০ মিনিট দেরি করে ফিরে বলে, ‘বেশি দেরি করলাম?’ মোফাজ্জেল হেসে ফেলল এ কথায়, ‘কিয়ের দেরি, আপনি তো ঘণ্টায় টাকা দিবেন।’ তারপর আবার মুগদাপাড়ার দিকে কোনো অফিসে যাওয়ার মাঝপথে থেমে বলল, ‘ভাইসাব, চলেন, দুজন নাশতা করি।’ ততক্ষণে মোফাজ্জেল বেশ আগ্রহ পেয়েছে। ঢাকার বাইরে থেকে আসা মানুষগুলোর ভেতরে এখনো মাটির ঘ্রাণ পাওয়া যায়। এরা মানুষ ভালোবাসে, তমিজ করে কথা বলে। নয়তো এই লোক তাকে দাঁড় করিয়ে রেখেই একা একা নাশতা করতে পারত অথবা বেশি চালাক হলে কিছু একটা কিনে সিএনজিতে বসেই খেতে পারত। এমন অনেক ঘটেছে এই গাড়িতেই। পিচ্চি পিচ্চি পোলাপান, তুই-তোকারিও করে মাঝেমাঝে। বেতড়িপাত পোলাপান আদব শিখে নাই! সেই তুলনায় গ্রাম থেকে আসা এই যাত্রী বেশ সরল। মানুষটা তার চেয়ে বয়সে কত ছোট, তাও আগ্রহ নিয়েই জিজ্ঞেস করল, ‘ভাইসাবের পরিবার কি ঢাকায় থাকে?’
‘জি।’
‘সদস্য কয়জন?’
‘আল্লায় দিলে দুই ছেলে মেয়ে আর আমার স্ত্রী।’
‘সিএনজি দিয়ে খরচ চলে?’
‘গরিব মানুষের প্রয়োজনও গরিব। তাই ঠেইকা থাকে না।’
‘ভালোই বলছেন। তা শাদি কি একটাই করেছিলেন?’
যাত্রীর রসিকতায় হেসে ওঠে মোফাজ্জেল। বাঁ পাশের আয়নায় দেখল, লোকটাও হাসছে। পুরুষ মানুষের হাসিতে দেখার কিছু নাই কিন্তু এই লোকের হাসি সুন্দর। মতিঝিলের শাপলা চত্বরের পাশ কেটে যাওয়ার সময় মোফাজ্জেল জিজ্ঞেস করে, ‘আপনে কোন অঞ্চল থেকা আসছেন?’
‘বাড়ি ভাই, উত্তরবঙ্গ। তবে আপনাদের এই ঝকমারি শহরে আসার জন্য দিনাজপুর থেকে রওনা হয়েছি।’
‘এইভাবে বললেন?’
‘কষ্ট থেকে বলছি। সারা রাত ট্রেনে ঝিমিয়ে সকালে দুই জায়গায় গেলাম, একটারও কাজ হলো না। এই শহরের মানুষ স্মৃতিশক্তিহীন।’
সবুজবাগের দিকে অটোরিকশা ঘুরিয়ে নিতে নিতে মোফাজ্জেল জিজ্ঞেস করল, ‘চাকরির জন্য আসছেন?’
‘জি, চাকরি একটা হওয়ার কথা কিন্তু ইন্টারভিউ বিকালে। সকালে দুইজনের সাথে দেখা করার কথা ছিল জমি-জিরাতের বিষয়ে। তারা আমায় ঠিক মনে করতে পারছে না।’
‘মন খারাপ কইরেন না। ইন্টারভিউর জন্য মন শক্ত রাখেন।’
মোফাজ্জেল আবার যাত্রীকে নিয়ে গেল বাসাবোর দিকে। এখানে যদিও লোকটা তাকে একটু বিরক্ত করেছে। ১০ মিনিটের কথা বলে ঢুকেছে এক বাসায়। মাছি মারতে মারতে সকালের পেপার মুখস্থ করে ফেলল মোফাজ্জেল, তবু লোকটার আসার নাম নেই। বাসার উল্টো দিকে একটা গাছের নিচে অটোরিকশা রেখে পাশের দোকানে গেল ফোন করতে। বউয়ের সঙ্গে দুই মিনিট কথা বলে মেয়ের খবর নিল। এই এক সমস্যা তাদের, একটাই মোবাইল। মেয়েটার শরীর ভালো না, তাই ফোনটা বউয়ের হাতে দিয়ে আসা। কথা বলে ফিরতে ফিরতে দেখে, লোকটা তাকে খুঁজছে। হেসে বলল, ‘রাগ করেছেন? একটু বেশি দেরি করে ফেললাম। আপনি ভাড়া নিয়ে ভাববেন না।’ মোফাজ্জেল নিশ্চিন্ত হয়ে বলল, ‘অসুবিধা নাই। তয় তিন ঘণ্টা তো অনেক আগেই শেষ। প্রায় সাড়ে বারোটা বাজে।’
‘গাড়ি জমা দিবেন?’
‘তা না, আমার মেয়েটার অসুখ তো। ভাইঙ্গা ভাইঙ্গা ট্রিপ দিলে ভাড়া বেশি পাই।’
‘মেয়ের কী হয়েছে?’
‘কথা শুনে না, রোইদে রোইদে ঘুরে জ্বর বাঁধাইছে।’
‘বয়স কত?’
‘সাত।’
‘মাশাল্লাহ। দুশ্চিন্তা করবেন না। সুস্থ হয়ে যাবে আর ভাড়া বাড়িয়ে দেব। আর একটা কাজ শেষ করতে ঘণ্টা খানেক লাগবে। যাবেন?’
‘চলেন।’
অটোরিকশা এবার এল নিউমার্কেটের দিকে। মোফাজ্জেল এক পাশে দাঁড়াল। লোকটা বেশ কিছু বইপত্র কিনেছে। কাগজের প্যাকেটে এক কেজি আপেলও। প্যাকেটটা মোফাজ্জেলের কাছে দিয়ে বলল, ‘সকাল থেকে অনেক কষ্ট দিলাম। এটা মেয়েকে দিয়েন।’
তখন আকাশ থেকে পড়ার অবস্থা মোফাজ্জেলের। এই লোক পাগল নাকি! কথাবার্তায় শান্ত হলেও সকাল থেকে যেভাবে রাস্তায় ঘুরছে, খুবই অস্থির লাগছে। তাই বলে দেড় শ টাকা কেজি আপেল কিনে ফেলল! আবার ভয় হলো, আপেল দিয়ে লোকটা ভাড়ার টাকা কমাবে না তো! অবশ্য অমন হলে নিউমার্কেটে ঢুকে নাও বের হতে পারত অথবা উল্টো দিকের গেট দিয়ে বেরিয়ে গেলে তার বাবারও সাধ্য নেই খুঁজে বের করার। সংশয় নিয়ে পরবর্তী গন্তব্য জিজ্ঞেস করল সে,
‘আপনি তো কমলাপুরের দিকেই যাইবেন, তাই না?’
‘জি।’
‘দুপুর তো হয়ে গেল, চলেন নীলক্ষেতে খাওয়াটা সেরে নেই।’
এবার মোফাজ্জেল মনে মনে প্রমাদ গুনল। এই লোকের মনে হয় সত্যিই মাথায় ঝামেলা আছে, ‘ভাই, আপনার না ইন্টারভিউ?’
‘জি, সেটা তো বিকেলে।’
‘এইখানে আত্মীয়স্বজন কেউ নাই?’
‘না, সে রকম কেউ নেই। অনেকগুলো কাজ নিয়ে এসেছি। তার দু-একটাই সারলাম। ইন্টারভিউ দিয়েই আবার রাতের ট্রেনে উঠব।’
অচেনা যাত্রীর জন্য মায়া লাগছে মোফাজ্জেলের। বোঝাই যায় বেচারার পকেটে টাকাকড়ি আছে কিছু। নয়তো অটোরিকশা ভাড়া করে দিনভর কাজ সারত না। কিন্তু এই শহরে একটাও আপন মানুষ নাই, যার কাছে গিয়ে একটু কাপড়চোপড় বদলে বিশ্রাম নিতে পারে। মোফাজ্জেল নীলক্ষেতের দিকে অটোরিকশা ঘোরাতে ঘোরাতে বলল,‘চাকরি হবে কোথায়?’
‘মাদারটেক হাইস্কুলে হেডমাস্টারের পোস্টের জন্য বিজ্ঞাপন দিয়েছে পত্রিকায়। যদিও এভাবে হয় না, তবু অ্যাপ্লাই করায় ডেকেছে দেখে আসলাম।’
‘হাতে বইপত্র দেইখাই বুঝছি, আপনি শিক্ষক হইবেন।’
হো হো করে হেসে উঠল লোকটা, ‘বইপত্র থাকলেই মানুষ শিক্ষক হয়?’
‘আপনি খুব সহবৎওয়ালা মানুষ।’
লোকটা আবারও হাসছে—কী সুন্দর হাসি! নীলক্ষেতের তেলের স্টেশনের পাশে গাড়ি সাইড করতে করতে আবারও সিএনজির ছোট আয়নায় চুরি করে হাসি দেখে নিল মোফাজ্জেল। তার বাড়ির অবস্থা একটু ভালো হলে নিয়ে যেতে পারত। গ্রাম থেকে আসা একটা মানুষ যদি গায়ে পানি ঢেলে একটু বিশ্রাম নিয়ে ইন্টারভিউ দিতে পারত, তার নিজেরও স্বস্তি হতো। কিন্তু অসুস্থ মানুষ ঘরে, আবার প্রস্তাব শুনে লোকটাই বা কী মনে করে ভাবতে ভাবতে বলল, ‘ভাই, কমলাপুরের দিকে গেলে ওই দিকে যেয়েই না-হয় খাইয়েন।’
বায়তুল মোকাররমের সামনে হঠাৎ গাড়ির স্টার্ট বন্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগেই গ্যাস নিয়েছে। নিশ্চয়ই তাহলে ইঞ্জিনে কোথাও গোলমাল। স্টার্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিব্রত হয়ে গেল মোফাজ্জেল। আবার মনে মনে ভয়ও হচ্ছে ভাড়া নিয়ে। প্রায় মিনিট পনেরো চেষ্টার পর লোকটা অস্থির হয়ে উঠেছে। কী এক জরুরি কাজের কথা মনে পড়ায় সে খুব হুড়োহুড়ি করে নেমে গেল। যদিও ভদ্র ভাষায় বলল, ‘ভাই সাহেব, ভেবেছিলাম বিকেল পর্যন্ত আপনার সিএনজি দিয়েই কাজ সারব, কিন্তু অপেক্ষা করা সম্ভব না। ভাড়া কত দিব?’
মোফাজ্জেল হিসাব করে বলল, ‘বারো শ টাকা।’
লোকটা অবাক করে তাকে এক হাজার টাকার দুটো নোট বের করে দিয়েছে।
‘ভাংতি হবে না, ভাই।’
‘ফেরত চাইনি।’
মোফাজ্জেল এবার থ। এত অদ্ভুত যাত্রী সে আগে পায়নি। লোকটার দিকে পরম মমতা নিয়ে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার ইন্টারভিউ তো আমাগো ওই দিকেই। জায়গাটা নিরাপদ না। সাবধানে থাইকেন।’
হাসি দিয়ে বিদায় নিয়েছে অচেনা যাত্রী। পাশের এক গ্যারেজে ঠেলে ঠেলে গাড়ি নিয়ে ঠিক করাল মোফাজ্জেল। বাড়ি ফিরে আপেল দিল মেয়েকে। নোট দুটো এখনই খরচ করতে ইচ্ছে করছে না। এক হাজার টাকার একটা নোট ভাংতি করলেই শেষ। রাতেও অনেকবার মনে মনে মানুষটার কথা ভেবেছে সে। মানুষটার চাকরিটা হলে কত ভালো হতো। কয়েক দিন পর ওই স্কুলে গিয়ে একবার ঢুঁ মেরে দেখবে, খোঁজ পাওয়া যায় কি না। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে জ্বরের মেয়েটাকে কোলের ভেতর নিয়ে ঘুমিয়েই পড়েছে সে। মেয়ে একটা আপেল খেয়ে বাকিটা রেখে দিতে বলেছে। সে আরও পাঁচ দিন খেতে পারবে। হিসাব শুনে মোফাজ্জেল বলেছে, ‘আম্মা, আপনার আব্বা কি কোনো দিন আপেল কিনে খাওয়ায় না?’ মেয়ে কী সুন্দর হাসি হেসেছে, ‘খাওয়ায়, শুধু অসুখ হইলে। আর সেইগুলা তো লাল আপেল, স্বাদ এত মিঠা না।’
মেয়ের জন্য মায়া লেগেছে মোফাজ্জেলের। যাক, পকেটে এখনো টাকা আছে, সে আবার এক কেজি সবুজ আপেল কিনবে। সকালে নতুন ক্ষ্যাপ মারলে আর এখনই নোট ভাঙাতে হবে না ভেবে খুশিমনে আজও স্টেশনেই দাঁড়িয়ে ছিল মোফাজ্জেল। কিন্তু পত্রিকার শিরোনামটা দেখার পরই সব তোলপাড় হয়ে গেল। যার কথা বলা হয়েছে, এই লোক তাদের আয়-রোজগারের ভাগীদার। এই এলাকার ফুটপাতের কাগজ বিক্রেতারাও বখরা না দিলে বসতে পারে না। অটোরিকশার পেছনে যখন বখাটে ঠিকাদারগুলা বাড়ি দিয়ে খিস্তিখেউড় করে, প্রায়ই মনে হয় স্টেশনের সব অটোরিকশার ড্রাইভারকে বলে, ‘চলেন, গুন্ডাডারে আচ্ছা ধোলাই দেই।’ সেই শীর্ষ সন্ত্রাসী শহীদ ক্রসফায়ারে নিহত। এতে তার একটু হলেও স্বস্তি পাওয়ার কথা। কিন্তু শিরোনামের নিচে যে বীভৎস ছবি, তা বড় মর্মান্তিক। লোকটা উপুড় হয়ে পড়ে আছে হাত-পা ছড়িয়ে। মাথার নিচ থেকে রক্ত এসে ভাসিয়ে নিচ্ছে কাগজের ঠোঙা, টুকরো ইট। ছবিটা বোধ হয় মৃত্যুর অনেক পর তোলা। রক্ত জমাট বেঁধে কালচে আর মাছি দেখা যাচ্ছে। কিন্তু শার্ট-প্যান্ট পরিচিত লাগছে! পায়ের জুতা জোড়া, বাঁ হাতে ঘড়ির বেল্টও দেখা যাচ্ছে। এই ঘড়িটাই উল্টে কি বলেছিল, ‘ভাইসাব, দুপুর হয়ে গেছে। চলেন একসাথে...।’ লাশের পাশে বক্স করে ছাপানো কালো ব্যাগের ছবি। তার পাশে কতগুলো বিদেশি পিস্তল। এই ব্যাগটাই কি দেখেছে সে! ঝাপসা চোখে অটোরিকশার ড্রাইভার মোফাজ্জেল খবরের অক্ষরগুলোর ওপর চোখ রাখছে, ‘কিছুদিন আত্মগোপনে থেকে গতকাল ভোরে কমলাপুর স্টেশনে নামে শীর্ষ সন্ত্রাসী শহীদ। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বিকেলে পল্টনে...।’
মোফাজ্জেলের বুকের ভেতর এখন একটা শিরোনাম হুহু করছে।

গল্প- পড়া ভূত শোনা ভূত by নাইস নূর

এক ভূতের দেশে ‘পড়া’ ভূত ও ‘শোনা’ ভূত নামে দুই যমজ ভাইবোন বাস করত। তারা দেখতে প্রায় একই রকম। তবে ভাই ‘পড়া’র চেয়ে বোন ‘শোনা’ একটু বেশি সুন্দর।
ভাইবোনের মধ্যে এক-আধটু ঝগড়া তো হতেই পারে, কিন্তু মজার ব্যাপার হলো পড়া ও শোনার কোনো দিনই এ রকম হয় না। তাদের মধ্যে অনেক মিল। একসঙ্গে তারা সব কাজ করে। আর সবাই তাদের দেখে বলে, ‘দেখেছ, পড়া আর শোনা কত ভালো, কত মিষ্টি তাদের ভাইবোনের সম্পর্ক!’

ভূতদের স্কুলে পড়ালেখায় সবচেয়ে ভালো পড়া ও শোনা। শিক্ষকেরা তাই তাদের খুব ভালোবাসত। পড়া আর শোনার কিছু ক্লাসমেট ছিল, যারা লেখাপড়ায় খুব অমনোযোগী। একবার ভূত স্কুলের সব শিক্ষক সিদ্ধান্ত নিল, ক্লাস শেষে পড়া ও শোনা দুজন মিলে সব অমনোযোগী ছাত্রছাত্রীকে পড়াবে। এই মহান দায়িত্ব পেয়ে পড়া ও শোনা তো খুব খুশি! মনে মনে তারা নিজেদের টিচার ভাবতে শুরু করল, আর প্রতিদিন ক্লাস শেষে দুষ্টু বাচ্চা ভূতদের পড়াতে লাগল। প্রথমে কেউ ঠিকমতো পড়তে চাইত না। খুব বিরক্ত করত। কিন্তু কিছুদিন যাওয়ার পর সবাই পড়া ও শোনার ভক্ত হয়ে গেল। একসময় দুষ্টুরাও মনোযোগী ছাত্র হলো। ভূতের স্কুলেরও বেশ নাম হলো। স্বীকৃতিস্বরূপ স্কুল থেকে পড়া ও শোনা পেল গোল্ড মেডেল। আর এই খবর ভূতের দেশের সব পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পেল। ইন্টারনেটের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ল পৃথিবীব্যাপী। খবর পৌঁছে গেল লাল-সবুজের বাংলাদেশেও।
বাংলাদেশের কিছু স্কুল ‘পড়া’ ও ‘শোনা’র কাছে আমন্ত্রণপত্র পাঠাল। পত্রে লিখল, পড়া ও শোনা ভূত রাজি থাকলে এই দেশে এসে কিছু অমনোযোগী ছাত্রকে পড়ালে তারা খুব উপকৃত হবে। পড়া আর শোনা সাদরে গ্রহণ করল সেই আমন্ত্রণপত্র। বাংলাদেশে এসে তারা প্রথম ভর করল প্রান্ত নামে এক দুষ্টু ছাত্রের ওপর। কী যে দুষ্টু প্রান্ত, তা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না!
একদিনের ঘটনা—
প্রান্ত হোমওয়ার্ক না করে বাসায় দুষ্টুমি করছে। আর তখনই পড়া ও শোনা ভূত প্রান্তের মাথায় ভর করল। তবুও প্রান্ত লেখাপড়া শুরু করল না। প্রান্ত উচ্চ স্বরে বলতে লাগল, ‘আমি তোমাদের কথা শুনব না। তোমরা পচা ডিমের মতো। তোমাদের আমার ভালো লাগে না।’
পড়া ভূত বলল, ‘তাহলে কি তুমি সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ হতে চাও না! তোমাকে তো সবাই অশিক্ষিত বলবে!’
‘বলুক, তবু আমি পড়ব না। আর আমি তো মানুষই। আমার চোখ, নাক, মাথা সবই আছে।’
শোনা বলল, ‘না নেই! লেখাপড়া না জানলে সবই অর্থহীন।’
প্রান্ত এবার চমকে উঠল।
পড়া ভূত বলল, ‘তুমি লেখাপড়া না করলে প্রতিদিন দুপুরে তোমাকে আমরা ভয় দেখাব, তোমার খেলনা লুকিয়ে রাখব।’
প্রান্ত এবার কেঁদে দিল। ‘আমার খেলনা লুকাবে না, আমি পড়ব।’
শোনা ভূত বলল, ‘আর যদি লেখাপড়া করো, আমরা তোমাকে অনেক খেলনা ও মজার মজার চকলেট গিফট করব।’
‘কিন্তু আমি তোমাদের দেখা পাব কোথায়? তোমাদের নাম কী?’
‘আমাদের নাম পড়া ও শোনা। তুমি যখন পড়তে বসবে, আমরা তোমার পাশেই থাকব।’
প্রান্ত এসব কথা শুনে খুব মনোযোগী হয়ে হোমওয়ার্ক শেষ করল।
তারপর বলল, ‘পড়াশোনা ভূতেরা আমাকে ভয় দেখিয়ো না।’
আমি তোমাদের বন্ধু হব আর লেখাপড়াও করব।’
এভাবেই অনেক দুষ্টু বাচ্চার মন জয় করল পড়া আর শোনা ভূত।
অভিভাবক ও শিক্ষকরাও খুব খুশি।
সবাই বলতে লাগল, ‘পড়া ও শোনা ভূত সবার বন্ধু হলে কত্ত ভালো হতো’!

১৯৮৪র শিখ দাঙ্গার তদন্ত চায় আম আদমি

১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গার তদন্ত দাবি করেছে দিল্লির ক্ষমতাসীন আম আদমি পার্টি (এএপি)। বুধবার আম আদমি পার্টি দাবি তুলেছে, বিশেষ তদন্তকারী দলকে দিয়ে দিল্লির ১৯৮৪ সালের শিখবিরোধী দাঙ্গার তদন্ত করাতে হবে। সম্প্রতি ‘টাইমস নাউ’ চ্যানেলকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে কংগ্রেস সহ-সভাপতি রাহুল স্বীকার করেন যে, তার দলের কয়েকজন সদস্য ওই দাঙ্গায় জড়িত ছিলেন। তিনি এর জন্য দলের হয়ে ক্ষমা চাইতে চান কি না জিজ্ঞাসা করা হলে, রাহুল রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘আমি তো ওই সময় দলে ছিলাম না।’ এই মন্তব্যের পর রাহুল তার দলকে বিপদে ফেলেছেন বলে মনে করা হচ্ছে। ১৯৮৪ সালে শিখ দেহরক্ষীদের হাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর দিল্লির কয়েক হাজার শিখ নরনারীকে হত্যা করা হয়।
অভিযোগের আঙুল ওঠে বেশ কয়েকজন কংগ্রেস নেতাকর্মীদের দিকে। তদন্তের দাবি নিয়ে দিল্লির লে. গভর্নর নাজিব জংয়ের সঙ্গে দেখা করেন রাজ্যের আম আদমি পার্টির (এএপি) সরকারের মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল। এক সরকারি কর্মকর্তা জানান, প্রায় আধঘণ্টা ধরে নাজিবের সঙ্গে কথা বলেন কেজরিওয়াল। তার দাবি বিবেচনা করে দেখা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন লেফটেন্যান্ট গভর্নর। বৈঠক শেষে কেজরিওয়াল সাংবাদিকদের বলেন, ‘লেফটেন্যান্ট গভর্নর আমার দাবি নিয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছেন। মন্ত্রিসভার আগামী বৈঠকে আমরা প্রস্তাবিত বিশেষ তদন্তকারী সংস্থার গঠন এবং নিয়মাবলী নিয়ে আলোচনা করব।’ দিল্লি দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্তদের হয়ে বহু মামলা লড়েছেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী এইচএস ফুকলা। তিনি জানান, ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গার ক্ষেত্রে সিট-এর তদন্তে কংগ্রেস যদি রাজি থাকতে পারে তাহলে ১৯৮৪-এর দাঙ্গার ক্ষেত্রে তারা মত দিচ্ছে না কেন? সরকার যে ওই দাঙ্গায় জড়িত ছিল, তার এর থেকে জোরালো প্রমাণ আর কি বা হতে পারে? ইান্ডয়া টুডে।

মহাত্মার খুনির শেষ কক্ষ

১৯৪৮ সালের ২৯ জানুয়ারির ভরদুপুরে ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীকে হত্যা করা হয়েছিল। পয়েন্ট ব্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে তাকে গুলি করেন নাথুরাম গডসে। এবার গান্ধির মৃত্যুর এত বছর পর বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য। মহাত্মা গান্ধীকে হত্যার পর খুনি নাথুরামকে যে ঘরে রেখেছিল নিরাপত্তা বাহিনী আজ এত বছর পরে সেই ঘরের সন্ধান পাওয়া গেছে। মুম্বাইয়ের এক হাজার বর্গফুটের এক রুমে রাখা হয় নাথুরামকে। ইতিহাসবিদ দীপক রাওয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এত বছর পর বেরিয়ে এলো গান্ধীর হত্যাকারীকে রাখা এই রুমের বিষয়টি। তৎকালীন মুম্বাই স্পেশাল ব্রাঞ্চের এক কক্ষে আটক করে রাখা হয়েছিল নাথুরামকে।
সে কারণে বিক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে বেঁচে গিয়েছিল এই কুখ্যাত খুনি। অনুসন্ধান থেকে শুরু করে বিচারকার্য সবকিছুতেই দেখা গেছে অন্তরালেই রয়ে গেছে এই কক্ষের বিষয়টি। গডসেকে দিল্লি থেকে মুম্বাইয়ে এনে স্পেশাল ব্রাঞ্চ পুলিশের এক ভবনের নিচতলায় রাখা হয়েছিল। সে সময় ওই ভবনেই ছিলেন স্পেশাল ব্রাঞ্চের উপ-পুলিশ কমিশনার জামসেদ দোরাব নগরবালা। জামসেদ গান্ধী হত্যা মামলা সুরাহার দায়িত্বও দেন দিল্লির এক পুলিশ সুপারিনটেনডেন্টকে। উল্লেখ্য, মহাত্মা হত্যার একবছর পরই ১৯৪৮ সালের ২২ জুন থেকে শুরু হয় নাথুরামের বিচারকার্য। এনিডিটিভি।

এবার দিল্লি চলো দেশ গড়

কলকাতার ব্রিগেডের বিশাল জনসভায় দাঁড়িয়ে আসন্ন সংসদীয় ভোটে দিল্লিতেও পরিবর্তনের ডাক দিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। কয়েক লাখ মানুষের জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে মমতার আহ্বান, ‘আসন্ন লোকসভা ভোটে কংগ্রেস, বিজেপি ও সিপিএমকে একটি আসনও জিততে দেয়া যাবে না। তৃণমূল কংগ্রেসই সারা দেশের বিকল্প পথ। আজ বাংলা যা ভাবছে, কাল ভারতও তাই ভাববে।’ দেশের পরবর্তী সম্ভাব্য দুই প্রধানমন্ত্রী রাহুল গান্ধী ও নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে তাদের নাম উল্লেখ না করে তোপ দেগে মমতা বলেন, ‘দিল্লিতে রাজতন্ত্র চাই না, চাই না দাঙ্গাবাজের সরকার। ‘দাঙ্গার মুখ’ হিসেবে পরিচিত এমন কাউকে দেশের দায়িত্বে আনা যাবে না।’ গুজরাট দাঙ্গা নিয়ে মোদি এবং গান্ধী পরিবারের উত্তরসূরি হিসেবে রাহুলই যে তার টার্গেট তা এদিন বুঝিয়ে দিয়েছেন মমতা। তিনি বলেছেন, ‘প্রতিহিংসা নয়, প্রতিকার চাই, দাঙ্গা নয়, সংহতির সরকার চাই। দুর্নীতি হঠাও, দেশ বাঁচাও। আগামী লোকসভা ভোট পর্যন্ত প্রত্যেক তৃণমূল কর্মী-সমর্থককে সতর্ক ভূমিকা নিয়ে সজাগ থাকার নির্দেশ দেন তিনি। মমতার আগে বক্তব্য দেন একাডেমি পুরস্কারজয়ী প্রবীণ সাহিত্যিক মহাশ্বেতাদেবী। দেশের দায়িত্ব নেয়ার জন্য মমতাই যে যোগ্যতম ব্যক্তিত্ব তা উল্লেখ করে মহাশ্বেতাদেবী বলেন,
‘মমতাই আগামী দিনের ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী। মমতাই আমাদের প্রেরণা। মমতাই সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী। তার নির্দেশেই মমতা পরে ঘোষণা করেন, প্রত্যেককে ব্রিগেড থেকে ফিরে গিয়ে দশজনকে বোঝানো ও সই সংগ্রহ করতে হবে দিল্লিতে সরকার গড়ার লক্ষ্যে। মাত্র ১১ দিনের মধ্যে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে পর পর তিনটি সমাবেশ। প্রথমটি ছিল শাসকদল তৃণমূলের। দ্বিতীয়টি ৫ ফেব্র“য়ারি বিজেপির নরেন্দ্র মোদির এবং শেষটি সিপিএমের ৯ ফেব্র“য়ারি। তিনটি সভাই সংসদীয় ভোটের টার্গেট নিয়ে। প্রথম সভা করে মমতা যে এক ধাপ এগিয়ে গেলেন তা এদিন সমাবেশের ভিড়ই বলে দিয়েছে। মমতা দাবি করেছেন, দলের নেতাদের রিপোর্ট থেকে তিনি জেনেছেন ২৫ লাখ লোক এসেছে মাঠে। তবে সরাসরি না বললেও তিনিই যে দেশের প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিতে প্রস্তুত বলে ডাক দিয়েছেন, এবার দিল্লি চলো, দেশ গড়ো। কংগ্রেসের বিকল্প বিজেপি নয়, সিপিএম নয়, একমাত্র বিকল্প তৃণমূল কংগ্রেস। দেশের সবাইকে নিয়ে ফেডারেল ফ্রন্ট গড়ার ডাক দিয়েছেন তিনি। বাংলা থেকে যে লড়াই শুরু হয়েছে তা গোটা দেশে ছড়িয়ে পড়বে।

অভিনয় করব এটা কখনও ভাবিনি

*কোন কোন নাটকে অভিনয় করছেন?
**ধারাবাহিক টিট ফর ট্যাট, নির্বিকার মানুষ, চুপ কথাসহ বেশ কয়েকটি নাটকে অভিনয় করছি। প্রতিটি নাটকই বিভিন্ন চ্যানেলে প্রচার হচ্ছে।
*সামনে দুটি বিশেষ দিবস আছে। এ উপলক্ষে কোন নাটকে অভিনয় করেছেন?
**বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে ‘নুনতা চা’ নামে একটি নাটক প্রচার হবে। ২১ ফেব্র“য়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা উপলক্ষে প্রচার হবে ‘আলো আঁধারে যাই’ নাটক।
*দর্শকদের মতে নাটকের মান কমছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
**যেটি সত্য, সেটি তো সবাই বলবেই। দিন দিন আমাদের নাটকের মান কমছে।
*আপনার মতে কেন নাটকের মান কমছে?
**আমাদের দেশে অনেক মেধাবী পরিচালক আছে। কিন্তু তারা কোনো কাজ করতে পারছেন না। নাটকের বাজেট এত কম, একদিনে একটি খণ্ড নাটক শেষ করতে পারলে ভালো। এ অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে মান কমবে না তো বাড়বে?
*কে বাজেট কমিয়ে দিচ্ছে, প্রযোজক না টিভি চ্যানেল?
**আমি সঠিকটা পরিষ্কার করে বলতে পারব না। প্রযোজক একটি নাটকে খুব কম লাভ করেন এটা সত্যি। আরও একটা বিষয় লক্ষণীয়, আমাদের দেশীয় পণ্যের বিজ্ঞাপন বিদেশী চ্যানেলে প্রচার হয়। অথচ আমাদের নাটক ভালো বাজেট পাচ্ছে না।
*উপস্থাপনায় ব্যস্ততা কেমন?
**আমি যে অভিনয় করব এটা কখনও ভাবিনি। উপস্থাপনা করছি, সারা জীবন করতে চাই।
*আপনার কোন গুণটা হারিয়ে যাচ্ছে?
**আমি নাচতে পারতাম। নাচ শিখেছি, নাচ করে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছি। এখন সেই নাচ হারিয়ে যেতে বসেছি।
বিএম ইমরান

অদ্ভুত সংসদ, অনিশ্চিত যাত্রা

দশম জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হয়েছে ২৯ জানুয়ারি। এমনিতে সংসদের উদ্বোধনী দিনটিকে ঘিরে থাকে নানা আগ্রহ আর উদ্দীপনা। এ দিন রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দেন। তাঁর ভাষণ নিয়ে বিরোধী দল তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়। পত্রিকায় তা নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিশদ আলোচনা হয়। প্রথম দিনেই বিরোধী দল সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে সাধারণত। ওয়াকআউটের আগে গরম কিছু বাক্যবিনিময় হয় সংসদে। টিভির সামনে এসব দেখে আমরা নানা আলোচনায় জড়িয়ে পড়ি। সংসদের কার্যকারিতার জন্য আসলে কী কী করা দরকার, তা নিয়ে আশাবাদ আর হায়-হুতাশ চলে। সংসদীয় কমিটিগুলো কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়েও চলে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ। এবার তার অনেক কিছু নেই। এই সংসদে প্রকৃত বিরোধী দল নেই, এতে এমনকি প্রকৃত জনপ্রতিনিধি রয়েছেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলার বহু কারণ রয়েছে। সংসদ আইন তৈরি, সংশোধন আর সরকারের কাজের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রতিষ্ঠান।
সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হচ্ছে সংসদ। একমাত্র এর প্রতিনিধিরা হন জনগণ কর্তৃক সরাসরিভাবে নির্বাচিত। সংসদীয় গণতন্ত্রের সবচেয়ে মৌলিক এই বৈশিষ্ট্যই এবার সংসদে অনেকাংশে অনুপস্থিত। এই সংসদে এমন বহু প্রতিনিধি রয়েছেন, যাঁদের জেতার কোনো সম্ভাবনা ছিল না, যাঁদের এলাকার মানুষ চেনে না, কেউ কেউ এলাকায় যান কদাচিৎ। এমন বহু প্রতিনিধিও আছেন, যাঁরা আসলে নির্বাচিতই হয়ে আসেননি। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন ১৫১টি আসনে জয়। একটিমাত্র ভোট পড়ার আগে, নির্বাচনের দিন আসার আগেই দশম সংসদে তার চেয়ে বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হয়ে গেছেন ‘জনপ্রতিনিধিরা’। এই সংসদের আইনগত, নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতা প্রবলভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। এই সংসদ যদি শুধু সংবিধান রক্ষার নির্বাচন হয়ে থাকে, তাহলে এর আয়ু যত কম হবে, তত তা মঙ্গলজনক হবে দেশের জন্য।
২. দশম সংসদ নিয়ে তবু আমাদের অনিশ্চয়তা কাটছে না। এই সংসদ পাঁচ বছরই থাকবে, এমন কথা বলার অনৈতিক ও অযৌক্তিক মনোভাব দেখাচ্ছেন সরকারি দলের কিছু নেতা। ইতিপূর্বে দেশে ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালে এ ধরনের একতরফা নির্বাচন হয়েছিল। আওয়ামী লীগ দুটি নির্বাচনকেই অবৈধ আখ্যায়িত করেছিল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে বিজয়ী সরকারকে অবৈধ ঘোষণা করে তাকে সম্পূর্ণভাবে অমান্য করতে সরকারি কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছিল। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী এরশাদের লাজলজ্জা আর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কম ছিল। তিনি জোর করে দুই বছর পর্যন্ত থাকতে পেরেছিলেন। কিন্তু ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বিএনপির আত্মগ্লানি ছিল। তাই নির্বাচনের আগেই বিএনপি সেটি শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য, এমন ঘোষণা দিয়েছিল। নির্বাচনের দেড় মাসের মাথায় নতুন নির্বাচনের জন্য সংসদ ভেঙে দিয়েছিল। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত সাংসদ এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যার হিসাবে ২০১৪ সালের নির্বাচন ১৯৮৮ এবং ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের চেয়েও বেশি অগ্রহণযোগ্য ও একতরফা। কিন্তু এই নির্বাচনের মাধ্যমে অদ্ভুত ও নজিরবিহীন এক সংসদ গঠন করার পর এটিই পাঁচ বছরের জন্য বিরোধী দল ও জাতিকে মেনে নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে এখন। দশম সংসদের পক্ষের লোকদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন যে এই সংসদের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ। এটি ঠিক যে আমাদের সংবিধান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন নিষেধ করেনি।
কিন্তু অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা সৃষ্টিকেও আমাদের সংবিধান অনুমোদন করেনি। যে দেশে কোনো স্কুলের অভিভাবক সমিতি বা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে একটি আসনে বহু লোক দাঁড়িয়ে যান, সেখানে সংসদ নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে কেউ না দাঁড়ানোই একটি চরম অস্বাভাবিক পরিস্থিতির প্রমাণ। ১৯৯০ সালের পর কোনো নির্বাচনে একটি আসনেও এমন ঘটনা ঘটেনি, শুধু ১৯৯৬ সালে ৪৮টি আসনে এটি ঘটেছিল। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনকে তাই আমরা অস্বাভাবিক ও অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলি, একই বিবেচনায় ২০১৪ সালের নির্বাচন বহুগুণ বেশি অস্বাভাবিক। অস্বাভাবিকতা এক অর্থে বৈধতার সংকটের ইঙ্গিতবাহী। সরকারি কাজে যখন একটিমাত্র টেন্ডার প্রদানের ঘটনা ঘটে, তখন আমরা এটি অস্বাভাবিক বলে ধরে নিই। কোনো সন্ত্রাসী বা মাস্তানের ভয়ে অন্যরা টেন্ডার প্রদানে বিরত থাকে, এমন রিপোর্ট পত্রিকায় বের হয়, টেন্ডার বাতিল করা হয়। তখন কি আমরা বলি, আইনগতভাবে একটি টেন্ডার পড়লে সেটিই বৈধ ধরে নিতে হবে? বলি না। কারণ, আইন মানে অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করে অন্যকে অংশ নিতে বাধা দিয়ে বা নিরুৎসাহিত করে নিজের স্বার্থোদ্ধার নয়। দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন, নতজানু নির্বাচিত কমিশন ও পক্ষপাতদুষ্ট প্রশাসন নির্বাচনের ক্ষেত্রে একই ধরনের অস্বাভাবিক পরিস্থিতি তৈরি করে, তা গত ৩০ বছরে আমরা আওয়ামী লীগসহ বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলকে বলতে শুনেছি। এবারের নির্বাচনে তা জোরালোভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এই নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন আওয়ামী লীগের পক্ষে এমন কিছু নজিরবিহীন কাজ করেছে, যা আইনের চোখেও অবৈধ।
নির্বাচন কমিশন সময় পার হওয়ার পর আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের মনোনয়ন প্রত্যাহার গ্রহণ করেছে, অন্যদিকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও দলের প্রার্থীরা নিজেরা মনোনয়ন প্রত্যাহার করার পরও কমিশন তা গ্রহণ করতে অসম্মতি জানিয়েছে। কমিশন যেভাবে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এরশাদের নিষেধ সত্ত্বেও দলটির প্রার্থীদের লাঙল প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছে, তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদাও, যাঁর ভূয়সী প্রশংসা আওয়ামী লীগ বহু সময়ে করে থাকে। এমন একতরফা নির্বাচনেও ভুয়া ভোট পড়েছে, কেন্দ্র দখল হয়েছে এবং প্রশাসন নির্বাচনের ফলাফল পাল্টে দিয়েছে—এমন সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। নির্বাচনে কারচুপি, সন্ত্রাস ও কেন্দ্র দখলের অভিযোগ করে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যে হারে নির্বাচনের দিনই সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলেন, তা-ও ছিল নজিরবিহীন। দশম সংসদের বৈধতার সংকট রয়েছে আরও বহু ক্ষেত্রে। এই নির্বাচন যে সরকারের অধীনে হয়েছে, তা থেকে জাতীয় পার্টির মন্ত্রীদের পদত্যাগপত্র গ্রহণ না করা, নবম সংসদ থাকা অবস্থায় দশম সংসদের শপথ গ্রহণ, একই সঙ্গে সরকার ও বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টির অবস্থান গ্রহণ বৈধ কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এসব প্রশ্নের যৌক্তিক-অযৌক্তিকতা নিয়ে নানা তর্ক হয়তো তবু সম্ভব। কিন্তু আমরা কি এই নিরেট সত্যকে অস্বীকার করতে পারি যে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে দশম নির্বাচনের ফলাফল এ রকম হতো না? এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এমনকি জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি বা বিএনএফ যেভাবে বিজয়ী হয়েছে, তা কোনোভাবেই সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সম্ভব হতো না।
৩. ২০১৩ সালের স্থানীয় নির্বাচনসমূহ ও দেশি-বিদেশি সব জরিপ অনুযায়ী দশম নির্বাচনে বিরাট ব্যবধানে বিজয়ী হওয়ার কথা ছিল বিএনপির। তারা নির্বাচন বর্জন করায় সমালোচনা রয়েছে সমাজে। কিন্তু নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিএনপির অনুপস্থিতির মধ্যেও সরকার, প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন যে পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা রেখেছে, তাতে নির্বাচনে কারচুপি নিয়ে বিএনপির আশঙ্কা প্রমাণিত হয়েছে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের অগ্রহণযোগ্যতাও তাতে ফুটে উঠেছে। সংসদীয় গণতন্ত্রের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত ইংল্যান্ডের হাউস অব কমন্সকেও তাই আমরা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অবিলম্বে একটি অর্থবহ নির্বাচন অনুষ্ঠানের তাগিদ দিতে দেখেছি এই নির্বাচনের পর। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিরোধকে আমরা ছোট করে এনেছিলাম গত বছরের ডিসেম্বরে তারানকোর সফরকালে। প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমিয়ে নির্বাচনকালে জাতীয় সরকারের একটি মডেল কি আমরা প্রতিষ্ঠিত করতে পারি আগামী নির্বাচনের জন্য? নির্বাচনকালীন সরকার শুধু কেন, পুরো মেয়াদের জন্যই কি প্রধানমন্ত্রীর সর্বগ্রাসী ক্ষমতা কমিয়ে অন্তত ভারতীয় মডেলের একটি ভারসাম্যমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার কথা আমরা ভাবতে পারি?
বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করে অবিলম্বে নতুন নির্বাচনের জন্য সহায়ক সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী আনার উদ্যোগ কি এই সংসদ গ্রহণ করতে পারে না? আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি, ‘জন্ম হোক যথা তথা, কর্ম হোক ভালো’। দশম সংসদের জন্ম যেভাবেই হোক, ভালো কাজ করার সুযোগ তো তার রয়েছে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ দশম সংসদ নির্বাচনে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি বা পেলেও ভোট দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা খুঁজে পায়নি। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের বেদনা, হতাশা, বঞ্চনাবোধ দূর করার আশু পদক্ষেপ এই সংসদকে নিতে হবে। জনসমর্থনহীন ও বৈধতার সংকটে জর্জরিত সরকারকে টিকে থাকতে হয় জনগণকে নিষ্পেষিত করে, চরম অত্যাচার আর অনাচার করে। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা আর লাতিন আমেরিকায় এমন বহু উদাহরণ রয়েছে। আমরা চাই না এমন উদাহরণ বাংলাদেশে তৈরি হোক স্বাধীনতাযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানকারী দল আওয়ামী লীগের হাতে।
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শান্তি ও কল্যাণে বিশ্ব ইজতেমা

বিশ্ব ইজতেমা মানুষের মধ্যে ব্যাপক ধর্মীয় উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ভাবগাম্ভীর্যময় আবেগ তৈরি করে আধ্যাত্মিক প্রেরণার উন্মেষ ঘটায়। মূলত তাবলিগ জামাতের বার্ষিক সম্মেলন হলেও সর্বস্তরের মুসলমান, যাঁরা বছরের অন্য কোনো সময় দাওয়াতের কাজে ও কাফেলায় অংশ নিতে পারেন না, তাঁরাও স্বতঃস্ফূর্ত জমায়েতে শামিল হন। দ্বীনের দাওয়াত মানুষকে ঘোর অমানিশা থেকে উজ্জ্বল আলোর দিকে, প্রবৃত্তির অন্ধ অনুসরণ থেকে শৃঙ্খলার দিকে, সংকীর্ণতা থেকে উদারতার দিকে ধাবিত করে। লাখো মুসলমানের মহাসমাবেশে এমন অনেক মুসল্লি আসেন, যাঁরা আল্লাহর পথে সম্পূর্ণ নিবেদিতপ্রাণ ও আত্মসমর্পিত। সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি লাভের আশায় কল্যাণের পথে মানুষকে আহ্বানের কাজে অনেকে সারা জীবনের জন্য ইসলাম প্রচারে বেরিয়ে পড়েছেন, যাঁরা স্রষ্টাপ্রেমে মশগুল থেকে ত্যাগ-সাধনার মাধ্যমে পুণ্যবানদের মর্যাদায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।
বিশ্ব ইজতেমায় প্রতি ওয়াক্ত নামাজ শেষে দোয়া ও আখেরি মোনাজাতে এসব পুণ্যবান ব্যক্তি আল্লাহর দরবারে হাত ওঠান। সেসব অচেনা-অজানা নেককার মানুষের সঙ্গে এক জামাতে নামাজ আদায় এবং তাঁদের সঙ্গে পরম করুণাময়ের কাছে ক্ষমা প্র্রার্থনার আশায় মুসলমানমাত্রই আবেগাপ্লুত বোধ করেন। আখেরি মোনাজাতে অংশ নেওয়ার উদ্দেশ্যে ইজতেমা ময়দানের দিকে ছুটে যান লাখো ধর্মপ্রাণ মানুষ। আখেরি মোনাজাতের দিন ইজতেমা ময়দান ছাপিয়ে টঙ্গীর রাজপথের অলিগলি, আনাচ-কানাচ—সবখানে এমনকি বিমানবন্দর এলাকা পর্যন্ত লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে। আল্লাহর নামে মুসল্লিদের জিকিরে-ফিকিরে মুখরিত হয়ে ওঠে তুরাগের তীর। ইজতেমার দিন টঙ্গী পরিণত হয় মুসলমানদের বৃহত্তর জুমার নামাজের জামাত আদায়ের নগরে। নামাজ শেষে যে যেখানে পারেন বসে পড়েন এবং দুই হাত তুলে আল্লাহর দরবারে ‘আমিন’ ‘আমিন’ বলে কায়মনোবাক্যে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। দ্বীনের দাওয়াত ও তাবলিগ মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশে সহায়তা করে এবং মানুষের চিন্তাধারার উৎকর্ষ সাধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বৃহত্তর জমায়েতের অধিকাংশ মানুষ মুসাফির আর মুসাফিরের দোয়া কবুল হয়। তা ছাড়া দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতি ও মজমার সামগ্রিক বিবেচনায় দীর্ঘ আখেরি মোনাজাত করা হয়, যেখানে দেশ-জাতির সার্বিক কল্যাণ ও সমগ্র মুসলিম উম্মাহর শান্তি কামনা করা হয়। সব শ্রেণী-পেশার মানুষ আখেরি মোনাজাতে অংশ নেওয়ায় ইজতেমার গুরুত্ব যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছে। কাজেই বিশ্ব ইজতেমা যে প্রচণ্ড ধর্মীয় ভাবাবেগ তৈরির ক্ষেত্র এবং মুসলমানদের ত্যাগ-সাধনায় অতুলনীয় ও অনন্য, তা বলাই বাহুল্য। এক দিনের জন্য হলেও গোটা দেশকে ইজতেমা অভিমুখী করার একটি প্রতীকী মূল্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসলমানের উপস্থিতিতে টঙ্গীর তুরাগ নদের তীরবর্তী বিস্তীর্ণ প্রান্তর সমবেত মুসল্লিদের ইবাদত-বন্দেগি, জিকির-আসকারে এক পুণ্যভূমির রূপ ধারণ করে। তাই অনেকে আবেগকে চেপে রাখতে না পেরে বিশ্ব ইজতেমাকে হজের সঙ্গে তুলনা করে বসেন, যা কোনো মতেই শোভনীয় নয়। বিশ্ব ইজতেমাকে হজের সঙ্গে তুলনা করা সম্পূর্ণ অন্যায়। কারণ, হজ ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের অন্যতম ফরজ ইবাদত। কিন্তু বিশ্ব ইজতেমা ফরজ বা ওয়াজিব নয়। দুটি বিষয় সম্পূর্ণ ভিন্ন, যার একটির সঙ্গে অন্যটির কখনোই তুলনা করা চলে না।
লোকসমাগম হলেই সেটাকে দ্বিতীয় হজ বলা কোনোমতেই সমীচীন নয়। আদর্শ সমাজ গঠনের ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ ধর্মীয় সমাবেশ বিশ্ব ইজতেমার একটি ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। অন্যায়, অবিচার, জুলুম-নির্যাতন, ছিনতাই, রাহাজানি, সন্ত্রাস, দুর্নীতি, কলহ-বিবাদ প্রতিনিয়ত সমাজ-দেশ-জাতি-রাষ্ট্রকে ধ্বংসের অতল গহ্বরে নিয়ে যাচ্ছে। অবিরাম দাওয়াতি কার্যক্রমই বিপন্ন মানবতাকে মুক্তির সন্ধান দিতে পারে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। যদিও চরিত্র, কর্মসূচি ও বক্তব্যের দিক থেকে তাবলিগ একটি নিছক অরাজনৈতিক ধর্মীয় আন্দোলন, তবু এর প্রভাবে সমাজে ইসলামি চিন্তা-চেতনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইবাদত-বন্দেগির প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। জনগণের মধ্যে ইসলামের প্রাথমিক শিক্ষা প্রসারে তাবলিগের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। আধুনিক শিক্ষিত শ্রেণীর মধ্যে ধর্মের মৌলিক বিধিবিধান পালনের আগ্রহ জোগাতে তাবলিগ জামাতের অবদানকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। ইজতেমার প্রবেশপথে অনেক মানুষ আসেন, অথচ কারও গায়ে একটু ধাক্কা পর্যন্ত লাগতে দেখা যায় না। কোনো শোরগোল ছাড়াই একে অন্যকে চলাচলের সুযোগ করে দেন। সবাই হাঁটেন জিকিরে ফিকিরে। ‘যার যার ডানে চলি ভাই’ বলেন। ঝগড়া-বিবাদ, হিংসা-বিদ্বেষ, সংঘাত-সহিংসতা তো দূরে থাক, কেউ একটু রেগে কথা বলেন—এমন দৃশ্যও কখনো চোখে পড়ে না।
তাবলিগ জামাতের মাধ্যমে পথভোলা বহু মানুষ দ্বীনের দিকে ধাবিত হচ্ছে। ছাত্র-শিক্ষকের মধ্যে দ্বীনের আলো ছড়িয়ে পড়ছে। বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের মানবতা, ভ্রাতৃত্ববোধ, শৃঙ্খলা, ধৈর্য ও মতৈক্য দেখে অভিভূত না হয়ে পারা যায় না। তাঁরা একে অন্যের কষ্টকে ভাগাভাগি করে নেন। কেউ তর্কবিতর্ক বা কটু কথা বলেন না বা গালাগালি করেন না। জামাতের ঘোষণা শুনেই সবাই নামাজের কাতার সোজা করে নেন। ধনী-দরিদ্রের কোনো ভেদাভেদ নেই। বিত্তশালী লোকেরা আরামের বিছানা ছেড়ে সাধারণ মানুষের সঙ্গে চাটাইয়ের বিছানায় রাত যাপন করেন। সবাই একসঙ্গে মিলেমিশে খাবার খান। বিশ্ব ইজতেমার মাধ্যমে সাম্য-মৈত্রীর অনুপম মহড়া ও দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। তাবলিগ জামাতের প্রচেষ্টায় দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে এসে আলোকময় জীবনের অধিকারী হচ্ছেন। এভাবে শান্তি ও কল্যাণকামিতার ধর্ম ইসলামের মর্মবাণীর ব্যাপক বিস্তার লাভ হচ্ছে এবং দ্বীনের দাওয়াত সব দেশেই পৌঁছে যাচ্ছে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক।
dr.munimkhan@yahoo.com