Tuesday, September 15, 2020

গল্প- রোহিঙ্গা জাতক by আহমেদ মুনির

কোনো এক বর্ষণমুখর সকাল। শ্রাবন্তী নগরে ঋষি আনন্দের আশ্রমে তরুণ শ্রমণদের ভিড় ঠেলে একজন আগন্তুক সামনে এগিয়ে যেতে চাইল। তার পিঠে দড়ি দিয়ে বাঁধা একটা সোলার প্যানেল, এক হাতে আরএফএল কোম্পানির একটা বালতি, তার ভেতরে কাপড়ে জড়ানো একটা রাজহাঁস। হাঁসটা ভাঙা গলায় গাঁক গাঁক করে উপস্থিতি জানান দিলে আনন্দ ধ্যান ভেঙে তাকান। চোখের ইশারায় শ্রমণদের পথ করে দিতে নির্দেশ দেন তিনি। শ্রমণদের মাঝ দিয়ে যুবকটি এগিয়ে যায়। আনন্দের সামনে এসে দাঁড়ায়।

হাত জোড়া করে সে বলে, ‘হে মহান ঋষি, আঁর নাম মহম্মদ রশিদ, বাড়ি হাসুরাতা গ্রাম, জিলা মংডু, রাখাইন প্রদেশ, বার্মা। মঘেরা আঁর ঘর পোড়া দিয়ে, বউরে লই গিয়ে, ফোয়ারে খাডি ফালাইয়ে, অনে বিচার গরণ…’

আনন্দ হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। অত্যাচারিতের এমন নিস্পৃহ বিবরণে তাঁর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে পড়ে। এই যুবকের সন্তান, স্ত্রী, ঘর – সবই শেষ কিন্তু শোকসন্তপ্ত বা ক্রোধান্বিত হওয়ার মতো মানসিক শক্তিও যেন তার অবশিষ্ট নেই।

তিনি যুবকের মাথায় হাত রাখেন, তাকে বুকে টেনে নেন। পাশে বসিয়ে প্রশ্ন করেন, এমন ঘটনা আর কতজনের সঙ্গে হয়েছে? যুবক আঙুল তুলে দূরের এক ঢেউয়ের দিকে ইশারা করে। এই শুষ্ক প্রান্তরে এমন ঢেউ কখনো কেউ দেখেনি। মহাসাগরের ঢেউয়ের চেয়েও প্রচণ্ড আর প্রকা- এক মানবঢেউ। তাদের প্রত্যেকের হাতে প্লাস্টিকের বালতি, টিনের স্যুটকেস কিংবা কাপড়ের পুঁটলি। না, খালি হাতে কেউ আসেনি। জীবন থেকে কোনো-না-কোনো কিছু নিয়ে আসতে পেরেছে তারা বেঁচে থাকার চিহ্নস্বরূপ।

সাগরের গর্জনের মতো সবার মুখে একই কথা।

ঘর ফোড়া দিয়ে, খাডি ফালাইয়ে, গুলি মারি দিয়ে…’

আনন্দ দাঁড়িয়ে রইলেন সেই জনস্রোতের সামনে, তাঁর বুকে অসহ্য যন্ত্রণা, কিন্তু মুখ দিয়ে কথা সরছে না। কী বলে তিনি শুশ্রূষা দেবেন তাদের। কয়েক সহস্র বছর কেটে যাবে প্রত্যেক মানুষের ক্ষত সারাতে। তবু আনন্দ এগিয়ে গেলেন, আহত মানুষগুলোর মধ্য দিয়ে শুরু হলো তাঁর পথচলা। এক দিগন্ত থেকে আরেক দিগন্ত ছুঁয়েছে সারিবদ্ধ মানুষেরা। যার শুরু নেই, শেষও নেই।

---দুই---

কক্সবাজার লিংক রোড পার হয়ে টেকনাফের রাস্তায় গাড়ি উঠেই দুবার হোঁচট খেয়ে থেমে গেছে। সামনের চাকাটা পাংচার হয়েছে। গাড়ি থেমে যেতেই আনন্দের ভাবনায় ছেদ পড়ল।

যেখানে গাড়িটা খারাপ হয়েছে সেখান থেকে উখিয়া সদর সাত থেকে আট কিলোমিটার। বিরান জায়গাটার দুপাশে বিল। দূরে আবছামতো ঘরবাড়ি জেগে আছে। লিভার লাগিয়ে গাড়িটার ডানপাশ উঁচু করা হয়েছে। দু-একজন ছাড়া সব যাত্রীই নেমে এসেছে। অনেকের ঠোঁটে সিগারেট জ্বলছে। পাশের একজন এগিয়ে এসে প্রশ্ন করল, আপনে ত্রাণ দিতে আসছেন?

আনন্দ দুপাশে মাথা নাড়ল, না।

তবে?

দেখতে।

লোকটা যেন এ-কথায় সন্তুষ্ট হলো না।

কী করেন?

কিছু না, তেমন কিছু না।

ও, সাংবাদিক, রিপোর্ট করবেন, তাই বলেন…

লোকটা আবিষ্কারের আনন্দে ঝলমল করে ওঠে। তবে আনন্দ তাঁর উৎসাহে আবারো পানি ঢেলে দিয়ে বলে, রিপোর্ট করতে নয়, দেখতে। কেবলই দেখতে।

আনন্দ যে আসলেই নিউজ কাভার করতে কিংবা ত্রাণ দিতে আসেনি এটা আশপাশের মানুষকে বোঝানোর তেমন গরজ অনুভব করে না। সময় পরিভ্রমণ করে এতদূর এসেছে সে কেবল সত্য জানার জন্য।

আধঘণ্টার মধ্যে চাকা লেগে গেল। ভোরের নরম আলো মাড়িয়ে গাড়ি চলতে লাগল টেকনাফের দিকে। দুপাশে ছোট ছোট টিলা। তার পুরোটাই ঢেকে আছে পলিথিনের তাঁবুতে। এক ইঞ্চি পরিমাণ খালি জায়গা নেই কোথাও। হালকা বৃষ্টির মধ্যে ভিজে যাচ্ছে তাঁবুগুলো। পলিথিন পুড়িয়ে আগুন জ্বালানো হয়েছে এক জায়গায়, সেই আগুনের দিকে একমনে তাকিয়ে আছে এক কিশোরী। চোখ বন্ধ হয়ে আসে তার। এই দৃশ্য দেখা সম্ভব নয়। চোখ খুলে সে আরো দূরে তাকাতে চেষ্টা করে। রাস্তার ওপর পাশে টেকনাফ রিজার্ভ ফরেস্টের পাহাড়সারির দিকে চোখ যায়। চোখের শুশ্রূষা হয়। এবার বাঁয়ে আর ক্যাম্পগুলো চোখে পড়ছে না। কেবল দু-এক জায়গায় বিচ্ছিন্ন কিছু বসতি, কয়েকটা সাইনবোর্ড, ইউএনএইচসিআর, ফাও, আশা এসব সংস্থার।

সড়কের পাশ দিয়ে রিলিফের বস্তা মাথায় নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে রোহিঙ্গারা। তাদের চোখ-মুখে ত্রস্ত ভাব নেই। বরং একটা রুটিন কাজের ভঙ্গি যেন ফুটে ওঠে।

বাঁদিকে হঠাৎই এসে পড়ে নাফ নদ। তার নীল জলরাশির ওপারে মেঘসমান উঁচু পাহাড়। সেখানে মেঘ আর আগুনের ধোঁয়া দুইয়ের রংই সাদা।

----তিন----

ঋষি আনন্দ এখন নিজেকে যেখানে হাজির করেছেন, সেখানে তাঁর নাম পালটায়নি বটে কিন্তু ঠিকুজি, কুলজি, বংশপরিচয় – সব বদলে গেছে। এখানে তাঁর দাদার নাম নতুন করে পড়তে হবে হাজি আসমত উল্লাহ। আর তাঁর দাদার বাবা শরিয়ত উল্লাহ সওদাগর। শরিয়ত উল্লাহ সওদাগর রেঙ্গুনে আরেকটা বিয়ে করে সংসার পেতেছিলেন। সে ব্রিটিশ আমলের কথা। সতেরো বছরের তরুণী স্ত্রী ফুলবানু আর এক মাসের শিশুসন্তানকে ঘরে রেখে এক বর্ষণমুখর সকালে চাক্তাইঘাট থেকে নৌকায় উঠে রেঙ্গুন পাড়ি দিয়েছিলেন তিনি। এরপর আর কখনো বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। পরিবারের সবাই সওদাগরের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করে একসময় হাল ছেড়ে দিয়েছিল। কেবল ফুলবানু তার ছেলে আসমত উল্লাহর বেয়াড়াপনায় লাগাম টানতে গিয়ে প্রায় সময় বলত, ‘তোর বাফে আইলে ব্যাক খইউম, ফিডর সাল তুলি ফালাইব, বুঝিবি মজা।’

কিন্তু পিঠের ছাল-চামড়া তোলার জন্য শরিয়ত উল্লাহ আর কখনো এমুখো হননি। আসমত শুনেছে এক মগ নারী নাকি তাঁর বাবাকে জাদু করে রেখেছে। বাড়ির নাম-ঠিকানাও ভুলে বসে আছে লোকটি। রেঙ্গুন কি আকিয়াব নিয়মিত যাতায়াত করেন এমনসব লোকজন তাঁর বাবাকে দেখেছে। কিন্তু শরিয়ত তাদের সঙ্গে খুব একটা আলাপ-সালাপে যায়নি। সওদাগরদের বর্মি স্ত্রী থাকবে সেটা দোষের কিছু নয়। লোকে বলে নৌকার সঙ্গে নৌকা জোড়া দিয়ে টেকনাফ থেকে মংডু যাতায়াত করা যত সহজ তার চেয়ে সহজ বার্মায় আরেকটা সংসার করা। কিন্তু তাই বলে বাড়ির কথা ভুলে যেতে হবে?

হাজি আসমত উল্লাহর বাবা শরিয়ত উল্লাহ সওদাগরকে একসময় সবাই ভুলে গিয়েছিল। এখানকার লোকজনের রেঙ্গুন যাওয়া-আসাও তখন বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তবু গ্রামের বাজারে যখন আসর জমিয়ে কেউ গাইত, ‘বানুরে, কী? ও বানু, কী, কী, কী? আই যাইয়ুম রেঙ্গুন শহর তোর লাই আইন্নুম কী?’ তখন আসমত উল্লাহর মনে হতো, তাঁর মা ফুলবানুকে নিয়ে সস্তা রসিকতা করতেই কেউ এমন গান বেঁধেছে।

আসমত উল্লাহ তবু ফিরিঙ্গিবাজারে বার্মা-রাজুর হোটেলে বসে সেই গান শুনত আর ভাবত শরিয়ত উল্লাহর বর্মি ছেলেরা দেখতে কি তার মতোই হয়েছে? তাদের নাক হয়তো একটু চাপা, গায়ের রং হলুদে কমলায় মাখানো। সেই বর্মি ভাইদের জন্য মন উচাটন হয়ে উঠত তাঁর। হোটেলবয় এসে তাঁর চিন্তায় ছেদ ঘটাত। ‘আজিয়া কি দিউম চাচা? খৈতরের রোস্ট খাইবা না?’ হোটেল বালকের কথায় অনিচ্ছায় সায় দিতে হতো তাকে। প্লেটভর্তি কবুতরের রোস্ট নিয়ে উদাস হয়ে বসে থাকত সে। মাঝে মাঝে ছিঁড়ে ছিঁড়ে দু-এক টুকরো মুখে পুরত।

ষাটের দশকে নে উইন যখন বাঙালি তাড়ানো শুরু করল, তখন আসমত আশায় বুক বেঁধেছিল। ভেবেছিল বৃদ্ধ বাবা হয়তো এবার দেশে ফিরবেন। কিন্তু এককাপড়ে অনেক বাঙালি সওদাগর ব্যবসাপাতি-দোকান আর ঘর ফেলে চলে এলেও শরিয়ত উল্লাহ আসেননি। এদেশের চেয়ে তিনগুণ বড় দেশটাকে নিজের দেশ মনে করে থেকে গিয়েছিলেন।

----চার----

শরিয়ত উল্লাহর এভাবে হারিয়ে যাওয়ার কাহিনি আনন্দ শুনেছিল তার দাদি বিলকিস বেগমের কাছ থেকে। ছোটবেলায় বেশ কিছুদিন ম্যালেরিয়া জ্বরে আক্রান্ত হয়ে রেলওয়ে হাসপাতালে থাকতে হয়েছিল আনন্দকে। বাবা কামাল উদ্দিন রেলওয়ে হাসপাতালের ডাক্তার ছিলেন বলে সিআরবিতে তাদের কোয়ার্টারের পাশের হাসপাতালেই তাকে ভর্তি করা হয়েছিল। ফেলসিফেরাম ম্যালেরিয়ায় জীবনহানির আশঙ্কা থেকেও তখন বড় হয়ে উঠেছিল কুইনাইনের তেতো অবসাদ আর দুর্বলতা। সে-সময় দাদি বিলকিস ছিলেন তার সঙ্গী। দাদির গল্পে সেই তেতো ভাব আর অবসাদ থেকে মুক্তি মিলত। বার্লি আর সাগুদানা মুখে তুলে দিতে দিতে দাদি গল্প বলতেন। স্বামী আসমত উল্লাহ আর তাঁর শ্বশুর শরিয়ত উল্লাহর গল্প। দুজনের একজনকেও দেখেনি আনন্দ। তবু শুনে শুনে আনন্দের মনে হতো আসমত উল্লাহ রোগা-পাতলা আর রুক্ষ মেজাজের মানুষ। তবে শরিয়ত উল্লাহর পেটানো শক্তপোক্ত শরীর, লম্বা দাঁড়ি নেমে এসেছে বুক পর্যন্ত।

শরিয়ত উল্লাহ কেন বার্মাতেই থেকে গেল দাদির কাছে সে-প্রশ্ন করেও কোনো উত্তর পায়নি সে। দাদি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলতেন, হয়তো লোকের কথাই ঠিক, বর্মি মেয়েরা বান-টোনা জানে। আসলে শরিয়ত উল্লাহর বংশেই নাকি এমন ধারা চলেছে। তার দাদাও নাকি বার্মা গিয়ে আর ফিরে আসেনি।

হাসপাতালের কেবিনের জানালা দিয়ে কাঠবাদাম গাছের কচি লাল পাতার দিকে তাকিয়ে দাদি বলে যান, সেই শাহ সুজার বার্মা যাওয়ার আগে থেকে তার পরদাদা, পরদাদার পরদাদাও নাকি বার্মা যেত-আসত। সে রাজা নরমিখলার আমল থেকে। দাদি সুর করে বলতেন :

কর্ণফুলী নদী পূর্বে আছে এক পুরী

রোসাঙ্গ নগরী নাম স্বর্গ অবতারী

‘সেই রোসাঙ্গ, জিন-পরিদের রাজ্য আছিল। সে বরাবরই মায়া নগর। এক হাতে মাইনষেরে ডাকে, অইন্য হাতে নিষেধ করে। কিন্তু যেবার জাপান-ব্রিটিশ যুদ্ধ লাগল, সেবার যে হাতে ডাকে, সেই হাতটা ভাইঙা গেল জাপানিগো বোমায়। আরাকানের সামনে গভীর সাগরে সেই মূর্তিআছে। এরপর থেইকা খালি মানা করে। রোসাঙ্গে যাওয়ার বিষয়ে

সবাইরে নিষেধ করে। কিন্তু লোকে তবু যায়। যেখানে নিষেধ, সেখানে যাওয়াই তো মাইনষের নিশা, কী কও ভাই!’

সেই চাঁদপুরের লদুয়া গ্রাম থেকে তেরো বছর বয়সে চট্টগ্রামে এসেও দাদি চট্টগ্রামের বুলি রপ্ত করেননি। দাদা নাকি তাঁকে ঠাট্টা করে বলত দারাইল্যা। দাদি বলতেন, ‘চট্টগ্রাম আসলে আরাকানের মইধ্যে আছিল। চাঁটগাইয়াদের আমরা তাই মগ বলতাম। তাদের বউ-ঝিরাও আরাকানিদের মতো থামি-ব্লাউজ পরত। আর আমরা পরতাম শাড়ি।’

----পাঁচ---

টেকনাফ বাসস্ট্যান্ডে সকাল ছয়টায় নেমে কোথাও এক কাপ চা পেল না। এত সকালে চায়ের ঝাঁপি খোলে না এখানে। যেখানে বাস দাঁড়িয়েছে তার পাশেই একটা পান-সিগারেটের দোকান। সিগারেট কিনে ধরিয়ে একটা টান দিতেই দেখল কয়েকজন তরম্নণ দলবেঁধে সামনের দিকে যাচ্ছে। তাদের একজন তারই বাসের যাত্রী। চিনতে পেরে এগিয়ে এলো তরুণটি। যে-পথ দিয়ে রোহিঙ্গারা আসছে তারা যাচ্ছে সেখানে। শাহপরীর দ্বীপের ভাঙা রাস্তার মাথায়। ছবি তুলবে। বিবিসি আর সিএনএনে দেখেছে এতদিন, আজ এই মহাঘটনা নিজের চোখে দেখবে।

ভাঙার বেশ খানিকটা আগেই অটো নামিয়ে দিলো তাদের। সারি সারি ত্রাণের গাড়ি আর দেশি-বিদেশি সংবাদমাধ্যমের কার-জিপের লম্বা লাইন। সবাই ভীষণ ব্যস্ত। কারোই কথা বলার সময় নেই। গাড়িবহর পার হয়ে সামনে এগোতেই আস্ত সড়কটাই উধাও। ভাঙতে ভাঙতে সরু বল্লমের ফলার আকার নিয়ে রাস্তাটা সোজা গিয়ে ঢুকেছে সাগরের পেটে। আগে এ-পথ দিয়েই গাড়ি চালিয়ে সোজা শাহপরীর দ্বীপে যাওয়া যেত। এখন ভাঙনে নিশ্চিহ্ন। তাই জায়গাটার নাম হয়েছে ভাঙা। সরু রাস্তাটায় সাগরের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। কিন্তু এর মধ্যেই সরু বল্লমের ফলার মতো জায়গাটায় টিভি ক্যামেরার ভিড়। ক্যামেরা আর তার সামনে ভিকটিমদের অত্যাচারের বয়ান। সব বয়ানই একরকম। আঁরার ঘর ফোড়া দিইয়ে, গুলি মারি দিইয়ে…

২৪ আগস্ট থেকে টেলিভিশনে কথাগুলো প্রচার হচ্ছে। ঘটনাগুলো নৃশংসতার দিক থেকে অনন্য, কিন্তু ভয়ংকর একঘেয়ে আর পুনরাবৃত্তিময়। গ্রামের পর গ্রাম একই কায়দায় জ্বালিয়ে দিয়েছে ওরা। একই কায়দায় শিশুদের আছড়ে ফেলেছে। একই কায়দায় নারীদের ধর্ষণ করেছে। একই কায়দায় পুরুষদের দাঁড় করিয়ে ব্রাশফায়ার করেছে। গুলি শেষ হয়ে গেলে জবাই করেছে। শুনতে শুনতে তার একসময় মনে হয় প্রত্যেকেরই গল্প এক। কারো সঙ্গে কারোর ভেদ রাখা হয়নি।

জোরে বৃষ্টি এলো। বাতাসও শুরু হলো একসঙ্গে। ত্রাণবহরের লোকজন আর সংবাদকর্মীদের মধ্যে হঠাৎই চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। এইমাত্র সীমান্ত অতিক্রম করে কয়েকটা নতুন নৌকা এসে ভিড়েছে। ত্রাণ নিয়ে, ক্যামেরা নিয়ে সবাই সেদিকে ছুটে যায়। জটলা পার হয়ে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত মানুষগুলো আসতে থাকে সারি করে। কেউ একশ টাকা, কেউ পানি, জুস, কলা আর পাউরুটি গুঁজে দেয় হাতে। এসব নেওয়ারও শক্তি নেই অনেকের। বোরকা পরা এক নারী কোলে শিশু, এক হাতে একটা পুঁটলি নিয়ে এগিয়ে যায় সামনে।

স্বামী কোথায়, কে যেন প্রশ্ন করে ভিড়ের ভেতর থেকে।

শিশু কোলে তরুণী মা নির্বিকারভাবে জবাব দেয়, মিলিটারি গুলি মারি দিয়ে…।

আনন্দ যেন হৃদয়হীন এক নির্বিকার জগতের ভেতর দিয়ে এগোচ্ছে। সে কি মনের কোণে ক্ষীণ হলেও একটা আশা জাগিয়ে রেখেছিল? এখানে এসে সে-কারণেই বারবার বৃদ্ধ মানুষের মুখগুলো লক্ষ করছিল সে? কিন্তু তেমনটা ঘটল না। স্বাস্থ্যবান পেটানো শরীরের সাদা দাড়িওয়ালা কোনো বুড়ো মানুষ তার সামনে এসে দাঁড়ায়নি। বলেনি, তার নাম শরিয়ত উল্লাহ। এত বছর পর দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছে।

শরিয়ত উল্লাহর ছেলে হাজি আসমত উল্লাহ বহু বছর আগেই মারা গেছে। কিন্তু এই ভিড়ে তাঁর বর্মি ভাইদের কেউ কি আছে? নাকি তারা বাপ-দাদার নাম-পরিচয় সব বিসর্জন দিয়ে পুরোপুরি বর্মি হয়ে গেছে?

বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে শক্তপোক্ত এক যুবক তার সামনে দিয়ে চলে যাচ্ছিল। চোখের দৃষ্টি কোনোদিকেই নিবদ্ধ নয়। ত্রাণ দিতে চাইলেও সে ফিরে তাকাল না কারো দিকে।

আনন্দ তাঁর সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, আপনার নাম?

ডা. হামিদ হোসেন।

আপনি ডাক্তার?

হ্যাঁ, পল্লি চিকিৎসক।

গ্রাম?

নলবইন্যা, বর্মিরা বলে পন্ডুভিয়ান।

আপনার কি একটা বর্মি নাম আছে?

অং সা থোয়ে, এটুকু বলে লোকটা ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল।

আনন্দ জানে এমন বর্মি নাম প্রত্যেক রোহিঙ্গারই আছে। তবু সে লোকটার পেছন পেছন ছুটল।

কিন্তু ভিড়ের ভেতরে আর খুঁজে পেল না লোকটাকে। সে কি তার বর্মি ভাই? শুশুকের মতো একবার মুখ দেখিয়ে ভিড়ের গভীরে হারিয়ে যাওয়া ওই লোকটা? ওই পল্লি চিকিৎসক? এমন ভাবনায় মন আচ্ছন্ন হলেও তার গলার কাছে কিছু একটা এসে ঠেকল না। চোখটা ঝাপসা হয়ে এলো না। বরং অর্থহীন এক যাত্রায় নিজেকে আরো সামনের দিকে ঠেলে দিলো সে। এখানে সরু বল্লমের ফলার মতো সড়কটা শেষ। এক হাঁটুপানির নিচে ধারালো পাথর। বাঁয়ে মংডুর পাহাড় এসে মিশেছে তাতে, নীলাভ ছায়াময় সেই পাহাড়ের গা-বেয়ে নেমে আসছে মানুষ। এতদূর থেকে তাদের পিঁপড়ের মতো মনে হয়।

----ছয়----

পুরাকালে বোধিসত্ত্ব ব্রহ্মদেশের রোসাঙ্গের মংডু জেলার হাসুরাতা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। পরিণত বয়সে এক রোসাঙ্গি কন্যার সঙ্গে তার বিবাহ হয়। বিবাহের পর তাদের তিন সন্তান হলো। দুই মেয়ে, এক ছেলে। দুই মেয়ে মরিয়ম ও জয়নব আর ছেলে মহম্মদ রশিদকে রেখে বোধিসত্ত্ব অকালে মারা যান। এরপর তাদের পরিবার ভীষণ অভাবে পড়ে যায়। অত্যন্ত দুঃখ-কষ্টে তাদের দিন কাটতে লাগল। বোধিসত্ত্বের স্ত্রী প্রতিবেশীদের বাড়িতে কাজ করে কোনো রকমে দিন কাটাতে লাগল। ঠিক এই সময়ে ব্রহ্মদেশের সরকার নতুন করে নাগরিকত্ব আইন জারি করল। নতুন আইন অনুযায়ী রশিদ, তার দুই বোন ও মা বিদেশি বলে চিহ্নিত হলো। গ্রাম ছেড়ে কোথাও যাওয়ার অনুমতি নেই তাদের। দুই-তিনদিন পরপর তাবেবদের নিয়ে গ্রামে সৈন্যরা আসে। এসে সব ঘরের লোক গণনা করে। আর খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে তাদের দেখে। একবার তারা সঙ্গে করে ওজন মাপার যন্ত্রও নিয়ে আসে। রশিদ, তার দুই বোন ও মায়ের ওজন মাপে তারা। সবার ওজন দেখে তারা বিস্মিত হয়।
গ্রাম ছাড়ার উপায় নেই। ফসলের ক্ষেতে আগুন দেওয়া হয়েছে তবু সবার ওজন সুস্থ মানুষের মতোই। এমন বাড়বাড়ন্ত শরীর কীভাবে হলো?

তাবেব মানে দালালরা সৈন্যদের হয়ে তাদের জেরা করে। জেরার জবাবে তারা বলে, আমরা বোধিসত্ত্বের সন্তান, তিনিই আমাদের রক্ষা করেন। এ-কথা শুনে ব্রহ্মদেশের সৈন্যরা তেলেবেগুনে জ্বলে ওঠে। এমন ফাজলামির উচিত শিক্ষা দিতে তারা বোধিসত্ত্বের ঘর জ্বালিয়ে দেয়। রশিদের বোন আর মাকে ধরে নিয়ে যায় ক্যাম্পে। কীভাবে যেন সেখান থেকে পালিয়ে আসে রশিদ। পালিয়ে আসার সময় নিয়ে আসে একটা সোলার প্যানেল, আরএফএল কোম্পানির একটা বালতি, তার ভেতরে কাপড়ে জড়ানো একটা রাজহাঁস।

এমন কাহিনি বলে ঋষি আনন্দ আবার চোখ বন্ধ করেন। তাঁর পাশে বসা মহম্মদ রশিদকে শ্রমণরা আরেকবার ভালো করে দেখে। উপস্থিত শ্রমণদের একজন হঠাৎ প্রশ্ন করে, ঋষি এই গল্প জাতকে নেই। এই জাতকের নামই-বা কী। আনন্দ চোখ খোলেন। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে ওঠেন, রোহিঙ্গা জাতক।

শিক্ষার মূল ভিত্তি দুর্বল কেন by অধ্যাপক এ বি এম ফজলুল করিম

সুশিক্ষার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সুপ্ত সুকুমার বৃত্তির বিকাশ ঘটে, জ্ঞানের ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হয়, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি-আচার-আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসে, মানুষের মধ্যে উন্নততর নৈতিক ও মানবিক মূল্যবোধ বিকাশিত হয়, আধ্যাত্মিকতার উন্মেষ ঘটে, মানুষের দক্ষতা ও সক্ষমতা সৃষ্টি হয়, ফলে মানুষ সৎ চরিত্রবান ও নীতি-নৈতিকতার ধারক হিসেবে গড়ে উঠতে পারে এবং মানুষ মানব সম্পদে পরিণত হয়। শিক্ষার্জনের মাধ্যমে একজন মানুষ সমাজের একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ পায় এবং মানুষ প্রকৃত মানুষে পরিণত হয়।
প্রাথমিক বিদ্যালয় হলো শিক্ষার ভিত্তি। এই ভিত যত মজবুত এবং নৈতিক গুণাবলি, মানবিক গুণাবলিসহ আদর্শিক হবে, শিক্ষার মানও ততই শক্তিশালী ও উন্নত হবে। শিক্ষা সুযোগ নয়, অধিকার। রাষ্ট্র শিশুদের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সুশিক্ষা নিশ্চিত করবে, এটি রাষ্ট্রে অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
একটি শিশু যেমন তার মায়ের কাছ থেকে যে ভাষা শেখে, তার জীবনে কথায়-কাজে সেই ভাষাই প্রভাব বিস্তার লাভ করে, ঠিক তেমনি একটি শিশু যখন একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে যে জ্ঞান বা শিক্ষা লাভ করে, পরবর্তী জীবনে সেই শিক্ষার প্রভাব ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের ওপর পড়ে।
১৬ কোটি মানুষের এ দেশে সবচেয়ে হতাশা এবং ক্ষোভের ক্ষেত্র হচ্ছে আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা। বর্তমানে শিক্ষার বিষয়বস্তু সামগ্রিকভাবে একজন সৎ, যোগ্য, সামাজিক ও মানবিক গুণে গুণান্বিত মানুষ সৃষ্টি করতে যখন ব্যর্থ হচ্ছে, তখন সবার মনে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন জাগবেই। নানা অনিয়ম ও অস্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালিত হচ্ছে। ফলে আমাদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়েছে। ভবিষ্যৎ শিশুদের নিয়ে তাদের অভিভাবকেরা গভীর উদ্বিগ্ন।
গত ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ ঢাকায় ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে। রিপোর্টে প্রাথমিক শিক্ষার মান নিয়ে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। এতে বলা হয় পঞ্চম শ্রেণীতে গণিতে পাস ২৫ শতাংশ এবং তৃতীয় শ্রেণীতে বাংলা পড়তে পারে ৩৫ শতাংশ। সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশ তার সব শিশুকে প্রাথমিক স্কুলে নিয়ে আসতে সক্ষম হলেও শিক্ষার গুণগতমান এখন গভীর উদ্বেগের পর্যায়ে রয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মান না থাকায় পরবর্তীকালে চাকরি ক্ষেত্রে সমস্যা হচ্ছে। ওই সমস্যাটি সমাধানের জন্য তিনটি পরামর্শ প্রদান করা হয়। সরকারি-পর্যায়ের দায়িত্বশীলরাও তখন উপস্থিত ছিলেন।
শিক্ষার শুরু থেকেই সব ধর্মের ধর্মীয় শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। এতে কোমলমতি শিশুরা ধর্মীয় শিক্ষার আলোকে সৎ, যোগ্য ও মানবিক গুণাবলি অধিকারী হতে পারে। যাও ছিটেফোঁটা ধর্মীয় শিক্ষা শুরুতে ছিল তাও পর্যায় ক্রমে তুলে দেয়া হচ্ছে। ২০১৯ সালে প্রাথমিক শিক্ষার যে বেহাল দশা, তা থেকে উত্তরণ করতে হলে শিশু শ্রেণী থেকে সব শ্রেণীতে ধর্মীয় শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
ধর্মীয় শিক্ষা হচ্ছে যেখানে শিশুদের মনের বিশুদ্ধ চিন্তার বিকাশ ঘটে এবং একজন শিশু ভবিষ্যৎ জীবনে নীতি নৈতিকতার মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। সব ধর্মই মানুষকে খারাপ ও অন্যায় কাজ পরিহার করার কথা বলে থাকে।
একটি শিশু যখন প্রাথমিকভাবে এ শিক্ষা অর্জন করে থাকে তখন ভবিষ্যৎ জীবন আলোকিত হয়। এর আগে প্রাথমিক শিক্ষা ক্ষেত্রে যতটুকু ধর্মীয় শিক্ষা ছিল তার সাথে আরো যোগ না করে বর্তমানে ধর্মীয় শিক্ষা প্রায় বাদ দেয়া হয়েছে। ফলে ছাত্ররা অন্যায় ও অপকর্মের দিকে ধাবিত হচ্ছে। শিশুদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিয়ে অভিভাবকসহ সব মহল আজ হতাশ। শিশু শ্রেণী থেকেই সব ধর্মীয় শিক্ষা শুরু করতে হবে। প্রয়োজন মোতাবেক সব শ্রেণীতে ধর্মীয় শিক্ষা চালু করতে হবে।
প্রাথমিক শিক্ষা বেহাল দশার আরো একটি কারণ হচ্ছে- যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ না দেয়া। বরং অসৎ উপায়ে নিয়োগ বাণিজ্যের মাধ্যমে অদক্ষ ও নিম্নমানের শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়। যার ফলে কোমলমতি শিশুরা প্রকৃত শিক্ষা থেকে ব্যাপকভাবে বঞ্চিত হচ্ছে। ভবিষ্যৎ জীবন তাদের প্রকৃত শিক্ষার আলো থেকে অন্ধকার জগতের দিকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
নৈতিকতার মান এমনভাবে নিচে নেমে গেছে যেন মনে হয়, মিথ্যাই সত্য আর সত্যই মিথ্যায় পরিণত হচ্ছে, যা জাতির জন্য কলঙ্কজনক। তাই মনে হয়, সত্য দুর্বল, আর মিথ্যা কেবল শক্তিশালী হচ্ছে। কবি বলেছিলেন, ‘সত্য সমাগত, মিথ্যা বিতাড়িত’ বর্তমানে তা যেন অবাস্তব পরিণত হচ্ছে।
এ আধুনিকতার বিকাশের যুগে প্রাথমিক শিক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অথচ একটি জরিপে দেখা গেছে যারা নিবন্ধিত সরকারি এবং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ে, আর যারা অন্যান্য প্রাইভেট স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করে, তাদের গুণগত মানের অবস্থা সমান না। বলা চলে, যারা প্রাইভেট স্কুল, কিন্ডারগার্টেন ও ইংরেজি ভার্সন থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন করে, তারা বেশি মেধাবী ও সব ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে। এ অসম অবস্থার পরিবর্তন অপরিহার্য।
প্রাথমিক শিক্ষাকে আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করতে হবে। দেখা যায় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের শিক্ষার জন্য অনেক পুরনো শিক্ষা সরঞ্জাম ও পুরাতন সিলেবাস ও কারিকুলামের মাধ্যমে পাঠদান করা হয়ে থাকে। বর্তমানে মাল্টিমিডিয়ার মাধ্যমে ও আধুনিক শিক্ষা সরঞ্জামাদির মাধ্যমে প্রথমিক শিক্ষাকে ঢেলে সাজাতে হবে। দেখা গেছে, প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারি বাজেট কম, আর যতটুকু বরাদ্দ হয় তা দুর্নীতির দরুন যথাযথ ব্যবহার হয় না। তা ছাড়া এখন অনেক শিক্ষক মানবেতর জীবনযাপন করছেন, তারা যে বেতন পান তা দিয়ে তাদের সংসার চালানো কঠিন। এ কারণে তাদের আয়ের বিকল্প ব্যবস্থা করতে হয়।
শিক্ষা ক্ষেত্রে তাদের যথাযথ মেধা খাটাতে পারে না। প্রাথমিক শিক্ষার সবপর্যায়ে সরকারিভাবে বাজেট বাড়াতে হবে এবং বাজেটের সঠিক ব্যবহার করতে হবে। শিক্ষা বাজেটে যেন দুর্নীতি স্থান না পায়।
প্রাথমিক বিদ্যালয় নিয়ে যেসব কারণে জাতি আজ গভীর সংশয়ের মুখে, তার মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ হচ্ছে- অর্ধশিক্ষিত ও অযোগ্য শিক্ষক এবং দলীয়ভাবে ম্যানেজিং কমিটি নিয়োগ দেয়া।
অভিভাবকসহ সুশীলসমাজ এ ব্যাপারে একমত। তাদের মতে, বিদ্যালয় পরিচালনা করার জন্য দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে ম্যানেজিং কমিটির সদস্যদের সৎ, যোগ্য এবং শিক্ষার একটি ন্যূনতম যোগ্যতা থাকতে হবে এবং বিদ্যালয়ের গুণগতমান ধরে রাখার জন্য কার্যকর নিয়মাবলি থাকবে, যা প্রাথমিক শিক্ষাকে আরো উন্নত করবে।
তাই দুর্বল ও অনৈতিক শিক্ষাকে বাদ দিতে হবে। তাহলে প্রাথমিক শিক্ষার মাধ্যমে সৎ, যোগ্য, মানবিক গুণে গুণান্বিত ছাত্রছাত্রী গড়ে উঠতে পারবে। তার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয় পাঠ্যসূচি, শিক্ষকমণ্ডলী, অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীদের কতকগুলো বাস্তবসম্মত শিক্ষা কর্মসূচি গ্রহণ করা জরুরি। ১. আদর্শিক বিষয় সম্মিলিত পাঠ্যবই সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত করা। ২. ছাত্রছাত্রীদের যার যার ধর্মীয় শিক্ষা মানসম্মতভাবে পাঠ্যসূচিতে থাকা। ৩. উচ্চশিক্ষিত, যোগ্য ও প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিয়োগ। ৪. শিক্ষকদের আলাদা ব্যবস্থাপনায় বেতন প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করা।
৫. শিক্ষকেরা মানসম্মত শিক্ষা দিতে পারছেন কি না, তা দেখার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। ৬. প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই বাংলা, আরবি ও ইংরেজি ভাষায় শিক্ষা লাভ করার ব্যবস্থা। ৭. শিক্ষার ঘর, বইসহ উপায় ও উপকরণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা। ৮. প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা বিভিন্ন স্তর থেকে পরিবর্তন করে এক স্তরে আনা। ৯ . শিক্ষার জন্য অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো এবং নতুন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৈরি করা। ১০. এনজিওদের প্রাথমিক শিক্ষার মনিটরিংসহ সব দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা। পরিশেষে বলা যায়, প্রাথমিক শিক্ষার দুরবস্থা দূর করতে আমাদের উচিত এসব ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ঘাড়ের সমস্যা বাড়ায় স্মার্টফোন

স্মার্টফোন, ট্যাব বা এ জাতীয় ডিভাইসে কোনো কিছু অতি মনোযোগ দিয়ে পড়তে আপনি যখন চেষ্টা করছেন, অজ্ঞাতসারে কিন্তু ভুল করে ফেলছেন। মাথা নুইয়ে, ঘাড় বাঁকা করে ‘স্মার্ট ডিভাইস’ ব্যবহার আপনার ঘাড়ের সমস্যার কারণ!
আমরা যখন এ ধরনের ডিভাইসে কোনো কিছু পড়ি বা টেক্সট করি তখন আমাদের ঘাড় অজান্তেই বাঁকা হয়ে যায়। শুধু ঘাড় নয়, এ সময় আমাদের মাথা সামনের দিকে চলে আসে এবং কাঁধ ঝুঁকে পড়ে।
এখন কি তাহলে আপনি ঠিকভাবে বসেছেন?
সামনের দিকে ঝুঁকে টেক্সট পড়া বা লেখার কারণে আপনার ঘাড়ে ব্যথা হয়। থেরাপিস্টর‍া এ ধরনের সমস্যার নাম দিয়েছেন ‘টেক্সট নেক’।
‘টেক্সট নেক’কে টেক্সটিং প্রবলেম, গেমিং প্রবলেম ও ই-মেইলিং প্রবলেম বলে উল্লেখ করেছেন ডিয়ান ফিসম্যান নামে এক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
২০০৮ সালে ১৭ বছর বয়সী এক তরুণীর সমস্যার সূত্র ধরে তিনি এর নামকরণ করে ‘টেক্সট নেক’। মাথাব্যথা ও ঘাড় ব্যথার সমস্যা নিয়ে ওই তরুণী তার কাছে আসেন। ফিসম্যান ওই তরুণীর মায়ের কাছে বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চান।
এ সময় তিনি তরুণীকে চেয়ারের সামনে ঝুঁকে মোবাইল ব্যবহার করতে দেখে বলেন, মনে হচ্ছে আমি কিছু বুঝতে পারছি।
সম্প্রতি প্রকাশিত সার্জিক্যাল টেকনোলজি ইন্টারন্যাশনালের ২৫তম প্রতিবেদনে বলা হয়, ঝুঁকে টেক্সটের কারণে স্মার্টফোন বা ট্যাব ব্যবহারকারীর পিঠ ও ঘাড়ে সমস্যা হয়।
জরিপে অংশগ্রহণকারী নিউইয়র্ক স্পাইন সার্জন বিশেষজ্ঞ কিনেথ সান্সরাজ বলেন, মাথা নুইয়ে মোবাইলে তাকানোর ফলে ঘাড়কে অতিরিক্ত ৬০ পাউন্ড ওজন নিতে হয়।
তিনি বলেন, মোবাইল ব্যবহারের সময় ব্যবহারকারীর ঘাড় ১৫, ৩০, ৪৫ এমনকি ৯০ ডিগ্রি পর্যন্ত বাঁকাতে হয়। এজন্য সঠিকভাবে মোবাইল ব্যবহারের উপদেশ দেন তিনি।
ব্যবহারকারী তার মোবাইল ডিভাইস ব্যবহারে মজা পাবেন বিষয়টি স্বাভাবিক, তবে মাথা ও মোবাইল ডিভাইসের মধ্যে সঠিক দূরত্ব সম্পর্কে জানতে হবে, বলেন হান্সরাজ।
তিনি বলেন, স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহারের সময় আপনার মাথা সোজা রয়েছে, বিষয়টি সর্তকতার সঙ্গে খেয়াল করতে হবে।
সমান্তরাল অবস্থানে একজন মানুষের মাথার গড় ওজন ১০ পাউন্ড। আর প্রতি ইঞ্চি মাথা বাঁকানোর সঙ্গে এই ওজন দ্বিগুণ হয়ে যায়। তাই যখন আপনি মাথা ন‍ুইয়ে মোবাইল ব্যবহার করছেন, তখন আপনার ঘাড়কে ২০ বা ৩০ পাউন্ড ওজন বহন করতে হচ্ছে।
এ ওজন আপনার স্পাইনে অতিরিক্ত চাপ তৈরি করে, যা স্পাইনকে সঠিক অবস্থান থেকে সরিয়ে ফেলে।
আমেরিকান ফিজিক্যাল থেরাপি অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট (প্রাইভেট প্র্যাকটিস বিভাগ) ড. টম ডিঅ্যাঙ্গিলিস বলেন, অনেক সময় ধরে যদি আপনার টিস্যুর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে, তবে এটি সঠিক অবস্থান থেকে সরে যেতে পারে এবং রক্ত জমতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, অতিরিক্ত সময় কত...।
এক জরিপে দেখা যায়, ৮-১৮ বছর বয়সীরা বিনোদনমূলক কাজে দিনে সাড়ে সাত ঘণ্টা সময় ব্যয় করেন। শুধুমাত্র শিশুরা নয়, ২০১০ সালের তুলনায় ২০১১ সালে স্মার্টফোনে ডাটা ব্যবহারের পরিমাণ দ্বিগুণ হয়েছে বলে জরিপে বলা হয়েছে।
সামনের দিকে ঝুঁকে মোবাইল ব্যবহারের ফলে শুধু নার্ভ পেইনই নয়, এটি মেটাবোলিক সমস্যাও তৈরি করে বলে উল্লেখ করেছেন পারফরম্যান্স ফিজিক্যাল থেরাপির চিকিৎসক ড. মিচিল্লি কোলি।
তাহলে স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহকারকারীদের জন্য উপায় কী? প্রথমেই স্বাস্থ্যের বিষয়ে সচেতন হতে বলেন কোলি।
বড় খবর হলো, মাথা সামনে ঝোঁকানোর সমস্যার সমাধানে একটি মোবাইল অ্যাপ তৈরি করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ফিসম্যান। অ্যাপটি ব্যবহারকারীকে মাথা ঝোঁকানোর সময় সর্তক করবে।
তবে স্মার্ট ডিভাইসগুলো একটানা ব্যবহার না করে কিছু সময় পরপর ব্যবহারের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন শরীর বিশেষজ্ঞরা।
তারা পরামর্শ দিয়ে বলেন, প্রতি বিশ মিনিট পরপর দাঁড়ানো উচিত। এতে ব্যবহারকারীর ঘাড়ের রক্ত চলাচল স্বাভাবিক হবে এবং ঘাড় সংক্রান্ত সমস্যা এড়ানো যাবে।