Showing posts with label অমর সাহা. Show all posts
Showing posts with label অমর সাহা. Show all posts

Sunday, March 22, 2026

কলকাতার মুসলিম এলাকায় জমজমাট ইফতারির বাজার by অমর সাহা

পবিত্র রমজান মাস চলছে। রোজা ঘিরে এখন কলকাতায় বিশেষ করে মুসলিম এলাকায় ইফতারির বাজার জমে উঠেছে। ঐতিহ্যবাহী নানা বাহারি খাবার আর ফলমূল থাকছে কলকাতার ইফতারির বাজারে।

কলকাতার মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় বরাবরই ইফতারির বাজার জমজমাট থাকে। তবে দুই বছর ধরে দুই দেশের মধ্যে ভিসা ইস্যু এক রকম বন্ধ থাকায় বাংলাদেশ থেকে কলকাতায় পর্যটক আসা একদম কমে গেছে। এতে কলকাতা ইফতারির বাজারে কিছুটা ভাটার টান চলছে।

অবশ্য কলকাতার মুসলিম এলাকার ব্যবসায়ীরা আশায় আছেন, এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে। পার্ক সার্কাস এলাকার ইফতারির দোকানদার আফতাব আহমেদ বলেছেন, এটা সাময়িক। বাংলাদেশি পর্যটকদের আসা শুরু হলে আবার ভিড় জমবে কলকাতার ইফতারির বাজারে।

এখন মেডিক্যাল ভিসায় আসা হাতেগোনা কিছু পর্যটকের দেখা মিলছে। গতকাল শুক্রবার বিকেলে নিউমার্কেটে এক বাংলাদেশি পর্যটক আশা প্রকাশ করে বলছিলেন, ভিসা সমস্যা অচিরেই কেটে যাবে। আবার চলবে দুই দেশের মধ্যে ট্রেন ও বাস পরিষেবা। ফিরে আসবে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সুদিন।

তবে কলকাতার বাংলাদেশি ক্রেতাদের পছন্দের জায়গা হিসেবে পরিচিত এলাকাগুলো এখন অনেকটাই ফাঁকা। প্রতিবছরই বহু বাংলাদেশি ঈদের কেনাকাটা করতে কলকাতায় আসেন। থাকেন কলকাতার বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে। কলকাতার ইফতারির বাজার থেকে নানা ইফতারি কেনেন। অনেকে বিভিন্ন হোটেলে গিয়ে ইফতার করেন। বাংলাদেশি পর্যটক না থাকায় ওইসব এলাকায় ইফতারির বাজারের জৌলুশ অনেকটা কমে গেছে।

কলকাতার নিউমার্কেট, সদর স্ট্রিট, মার্কুইস স্ট্রিট, কলিন স্ট্রিট, এসএন ব্যানার্জি রোড, রফি আহমেদ কিদোয়াই রোড, বড়বাজার—এসব এলাকায় পবিত্র রমজানে ইফতারির বাজার জমজমাট থাকে। এবারও ব্যতিক্রম নয়। নিউমার্কেট, জাকারিয়া স্ট্রিটের নাখোদা মসজিদ–সংলগ্ন ইফতারির বাজার, ধর্মতলার টিপু সুলতান মসজিদ–সংলগ্ন ইফতারির বাজার আর জাকারিয়া স্ট্রিট, পার্ক সার্কাসের ইফতারির বাজার বেশ জমজমাট। গ্রাহকেরা কিনে নিচ্ছেন হরেক রকম ইফতারি।

ইফতারির বাজারে ব্যবসায়ীরা ফলমূল থেকে মাংসের নানা পদ, পেঁয়াজু, জিলাপিসহ নানা ঐতিহ্যবাহী খাবারের পসরা সাজিয়েছেন। এখানে মিলছে ইফতারির নানা ঐতিহ্যবাহী খাবার। বাড়িতে রান্নার ঝামেলা না করে অনেকেই কিনে নিচ্ছেন বাজার থেকে ইফতারির নানা পদ।

সবকিছুর পরও বাংলাদেশি পর্যটকদের নিয়ে আফসোসটা রয়েই যাচ্ছে কলকাতার ব্যবসায়ীদের। ধর্মতলার টিপু সুলতান মসজিদ–সংলগ্ন ইফতারির বাজারের ব্যবসায়ী মুক্তার খান বলছিলেন, ‘এখন বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠন হয়েছে। আমরা আশা করি, এই সরকারের আমলে ফের কলকাতার সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আবার পূর্বাবস্থায় ফিরে আসবে। ইফতারির বাজার জমজমাট হবে।’

নিউমার্কেটের ফুটপাতের ব্যবসায়ী আজাদ বলেছেন, ‘আমরা নতুন করে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছি। মনে করছি, আবার জমজমাট হবে কলকাতার ঈদ ও ইফতারির বাজার।’

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ইফতারির পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, জাকারিয়া স্ট্রিট
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় ইফতারির পসরা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা। ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, জাকারিয়া স্ট্রিট। ছবি: ভাস্কর মুখার্জি

Tuesday, October 22, 2019

ভারতে গিয়ে কষ্টে সাবেক ছিটমহলবাসী by অমর সাহা

বাংলাদেশ থেকে ভারতে আসা সাবেক ভারতীয় ছিটমহলের বাসিন্দারা সুখে নেই। তাঁরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কলকাতার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (মাসুম) এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানিয়েছে।

সাবেক ছিটমহল–বাসিন্দারা কেমন আছেন, তার খোঁজ নিতে মাসুমের কর্মকর্তা ও মানবাধিকার কর্মীরা ছুটে গিয়েছিলেন বিভিন্ন ক্যাম্পে। তাঁরা কথা বলেন সেখানকার অধিবাসীদের সঙ্গে। পরিদর্শন শেষে গতকাল রোববার মাসুমের উদ্যোগে কোচবিহারে সংবাদ সম্মেলন করা হয়। এ সময় সাবেক ছিটমহলবাসীরা ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, এর চেয়ে তাঁরা বাংলাদেশেই ভালো ছিলেন। এখন তাঁদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে।

২০১৫ সালের ৩১ জুলাই ভারত ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা উভয় দেশের ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় হয়। ভারতের ভূখণ্ডে বাংলাদেশের ৫১টি আর বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ভারতের ১১১টি ছিটমহল ছিল। এই ছিটমহল বিনিময়ের জন্য উভয় দেশে তীব্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। পরে দুই দেশের সরকার আইন বলে এই ছিটমহল বিনিময় করে। ফলে ভারতের অভ্যন্তরে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়। আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল অন্তর্ভুক্ত হয় বাংলাদেশের সঙ্গে।

ভারতে থাকা বাংলাদেশের ছিটমহলের ১৪ হাজার ২১৫ জন বাসিন্দা সেদিন বাংলাদেশে ফিরে না গেলেও বাংলাদেশ থেকে ৯২৭ জন ফিরে এসেছিলেন ভারতে। বাংলাদেশে তখন ভারতীয় ছিটমহলের বাসিন্দা ছিল ৩৭ হাজার ৩৩৪ জন। ফিরে আসা ৯২৭ জন ভারতীয়কে ঠাঁই দেওয়া হয় কোচবিহার জেলার দিনহাটা, মেখলিগঞ্জ ও হলদিবাড়ির অস্থায়ী ক্যাম্পে।

মাসুমের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি শনি ও রোববার পরিদর্শন করেন কোচবিহারের করলা-২, পশ্চিম বাকালির ছড়া ও ব্যাত্রীগাছি ছিটমহল। তাঁরা পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ থেকে আসা ভারতীয় ছিটমহলবাসীদের ঠাঁই দেওয়া দিনহাটা আশ্রয়শিবিরও। প্রতিনিধিদলে ছিলেন মাসুমের সম্পাদক কিরীটি রায়, মানবাধিকার নেত্রী অপর্ণা সেন, বোলান গঙ্গোপাধ্যায়, মুদার পাথেরিয়া প্রমুখ।

সাবেক ছিটমহলবাসীরা প্রতিনিধিদলের কাছে বলেন, তাঁদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। তাঁদের কাজ নেই, চাকরি নেই, পর্যাপ্ত রেশনের ব্যবস্থা নেই। পয়োনিষ্কাশন-ব্যবস্থা শোচনীয়। পানীয় জল ও চিকিৎসার অভাবে তাঁদের কষ্টে বাঁচতে হচ্ছে।

গতকাল সংবাদ সম্মেলনে মাসুমের নেতারা অভিযোগের সুরে বলেন, সাবেক ছিটমহলবাসী সুখে নেই। তাঁরা মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাঁদের কাজ নেই। পর্যাপ্ত রেশন নেই। বিদ্যুৎ নেই। চিকিৎসা নেই। শৌচাগার ও পয়ঃপ্রণালির অভাব। সব মিলিয়ে তাঁদের মানবেতর জীবন যাপন করতে হচ্ছে। ইতিমধ্যে বিনা চিকিৎসায় ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।

মাসুমের নেতারা জানান, সম্প্রতি মারা গেছেন পূর্তি বর্মণ নামে ২০ বছরের এক নারী। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা না পেয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।

মাসুমের নেতারা আরও জানান, দাসিয়াছড়া ছিটমহলের রশিদুল ইসলাম কাজ না পেয়ে কাজের জন্য দিল্লিতে ছুটে গিয়েছিলেন। কিন্তু দিল্লিতে গিয়ে ধরা পড়েন অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে।

সাবেক ছিটমহলবাসীর অভিযোগ, তাঁরা যে আশা নিয়ে ভারতে নিজ দেশে ফিরে এসেছিলেন, তাঁদের সেই আশা পূর্ণ হয়নি। তাঁরা চাইছেন তাঁদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম ব্যবস্থা গ্রহণ করুক প্রশাসন। কাজ দিক, বেকারত্ব জীবনের অবসান ঘটাক। তাঁদের দেওয়া জমির অধিকার নিশ্চিত করুক প্রশাসন।
সাবেক ছিটমহলবাসীদের সঙ্গে আলোচনায় অপর্ণা সেন। ছবি: মাসুম থেকে পাওয়া

Tuesday, August 6, 2019

জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা রদের বিরুদ্ধে কলকাতায় প্রতিবাদ by অমর সাহা

জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কলকাতায় প্রতিবাদী বিক্ষোভ, মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে। রাজনীতিসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল অঙ্গনের নেতারা এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের পর গতকাল সোমবার বিকেলে কলকাতা প্রেসক্লাবের সামনে প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করে কলকাতার ভাষা ও চেতনা সমিতি। সমাবেশে বিক্ষোভও দেখানো হয়।
জম্মু ও কাশ্মীরকে বিশেষ সুবিধা দেওয়াসংক্রান্ত ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা গতকাল বাতিল করা হয়। একই সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীরকে আলাদা করা হয়।
কলকাতা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র বিকাশ ভট্টাচার্য, ভাষা ও চেতনা সমিতির সম্পাদক ইমানুল হক, হকার সংগ্রাম কমিটির সভাপতি শক্তিমান ঘোষ প্রমুখ কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানান।
বিকাশ ভট্টাচার্য বলেন, সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে বিজেপি সরকার ভারতের গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে।
অধ্যাপক ইমানুল হক বলেন, এভাবে গণতন্ত্রকে হত্যা করা যায় না। এটা বিজেপি সরকারের সংবিধানের ওপর ন্যক্কারজনক হামলা।
৩৭০ ধারা বাতিলের প্রতিবাদ করেছে সিপিএম ও কংগ্রেস। গতকাল বিকেলে সিপিএম ধর্মতলা থেকে একটি প্রতিবাদ মিছিল বের করে। মিছিলে যোগ দেন বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু, সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র, পলিটব্যুরো সদস্য সাবেক সাংসদ মহম্মদ সেলিম প্রমুখ।
ভাষা ও চেতনা সমিতির বিক্ষোভ সমাবেশ। ছবি: ভাস্কর মুখার্জি
এদিন দিল্লিতেও বামফ্রন্ট প্রতিবাদ মিছিল বের করে। মিছিলে ছিলেন সিপিএমের কেন্দ্রীয় সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি, প্রকাশ কারাত, বৃন্দা কারাত, হান্নান মোল্লা, ডি রাজা প্রমুখ।
কলকাতায় ফরোয়ার্ড ব্লকও প্রতিবাদ মিছিল করেছে। প্রতিবাদ মিছিল বের করে এসইউসিআই ও সিপিআই এমএল-লিবারেশন।
বামেরা ঘোষণা দিয়েছে, ৭ থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত তারা রাজ্যব্যাপী প্রতিবাদ সমাবেশ ও মিছিল করবে। দাবি তুলবে ভারতের অখণ্ডতা রক্ষার।
গতকাল কলকাতার মহাজাতি সদনে কমরেড মুজাফফর আহমেদের (কাকাবাবু) ১৩১তম জন্মদিনে আয়োজিত সমাবেশের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায় জম্মু ও কাশ্মীর। সেখানে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র বলেন, ‘কাশ্মীরে যা করল বিজেপি সরকার, যেকোনো দিন বাংলাকে ভেঙে দিতে তাদের কত সময় লাগবে?’
সূর্যকান্ত মিশ্র বলেন, ‘গণতন্ত্র, সংবিধান ও যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে রক্ষা করতে আমাদের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হবে। এটা সংবিধান ও গণতন্ত্রের ওপর হামলা। এই সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ বেআইনি। রাজনৈতিক স্বার্থে বিজেপি এই পদক্ষেপ নিয়েছে। সংসদে নতুন বিল আনতে গেলে দুদিন আগে সবার কাছে বিলের প্রতিলিপি দিতে হয়। কিন্তু এই সরকার সেটা দেয়নি। এতে বিজেপি সরকার কাশ্মীর পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলল।’
সিপিএম নেতা মহম্মদ সেলিম বলেছেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করতে। কিন্তু মোদি সরকারের হঠকারী সিদ্ধান্তে কাশ্মীর আরও অশান্ত হলো।’
কলকাতায় সিপিএমের প্রতিবাদ মিছিল। ছবি: ভাস্কর মুখার্জি
বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু বলেছেন, ‘এই ঘটনা ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর ভয়ংকর আক্রমণ। এর কারণে দেশের ঐক্য ও নিরাপত্তা প্রশ্নের মুখে পড়বে।’
কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি সোমেন মিত্র বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ধ্বংস করে মোদি সরকার নির্বাচিত রাজ্য সরকারগুলোর ক্ষমতা দখল করতে চাইছে। তাঁর প্রশ্ন, ‘সাংবিধানিক ক্ষমতার অপপ্রয়োগ করে আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের অখণ্ডতার ওপরে মোদি সরকার কি আঘাত হানতে চলেছে?’
কাশ্মীর প্রসঙ্গে তৃণমূলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, তাঁরা এখন এই বিষয়ে মন্তব্য করতে চান না।
সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিলের ঘোষণার পর গতকাল বিকেলে দক্ষিণ কলকাতার হাজরায় বিজেপি বিজয় সমাবেশ করে। সেখানে বিজেপির কর্মী–সমর্থকেরা আবির মেখে আনন্দ-উৎসব করে। মিষ্টি বিতরণ করে। বিজয় মিছিল হয় দুর্গাপুর, পুরুলিয়া, শিলিগুড়ি, হাওড়াসহ রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে।

Friday, July 19, 2019

ভারতের হোমে আটক ৩ সন্তানকে পেতে ব্যাকুল মা-বাবা by অমর সাহা

নান্টু ফরাজির তিন সন্তান
মা–বাবার মুক্তি মিললেও প্রায় ছয় মাস ধরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সরকারি হোমে বন্দী এক দম্পতির তিন শিশুসন্তান। বাংলাদেশের পিরোজপুরের ইন্দুরকানি উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে তাঁদের বাড়ি। সন্তানদের জন্য এখন দিশেহারা বাবা নান্টু ফরাজি ও মা লাকি বেগম।
জানা যায়, স্ত্রী ও তিন শিশুসন্তানকে (তানিয়া, হেনা ও রায়হান) নিয়ে ইন্দুরকানির রামচন্দ্রপুর গ্রামে বাস করছিলেন নান্টু ফরাজি। সংসারে অভাব–অনটন লেগেই থাকত। ছয় বছর আগে দালালদের খপ্পরে পড়ে পরিবার নিয়ে ভারতের উদ্দেশে পাড়ি জমান তিনি। এখানকার ভিটেমাটি সব বিক্রি করে দেন। বাংলাদেশের সীমান্ত অবৈধভাবে পেরিয়ে চলে যান দিল্লিতে। একটা বস্তিতে ওঠেন। হোটেলে কাজ নেন। স্ত্রী লাকি বেগমের জোটে পরিচারিকার কাজ। কিছুটা স্থায়ী হন তাঁরা। সবাই বেশ ভালো হিন্দি ভাষাও শিখে যান। স্কুলে ভর্তি হয় সন্তানেরা।
গত বছর দিল্লিতে বাংলাভাষীদের তাড়াতে উদ্যোগী হয় পুলিশ। আসামেও বাংলাদেশিদের তাড়ানো হচ্ছে—এমন খবর পান তিনি। আতঙ্কিত হয়ে পড়েন নান্টু ফরাজি। ভারতে বসবাসের কোনো বৈধ কাগজ নেই তাঁদের হাতে। পুলিশের হাতে ধরা পড়ার চেয়ে দেশে ফিরে আসাই শ্রেয় বলে মনে করেন তিনি।
২০১৮ সালের নভেম্বরে দালাল ধরে দেশে আসার পথ খুঁজে পান নান্টু। দিল্লি থেকে ট্রেনে করে কলকাতায় যান। এরপর উত্তর ২৪ পরগনার গোপালনগর থানার সীমান্তপথে বেআইনিভাবে বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার উদ্যোগ নেন। গোপালনগর যাওয়ার জন্য বাসে ওঠেন তাঁরা। চাকদার সড়কপথে পুলিশ গোপন সূত্রে খবর পেয়ে আটকায় তাঁদের বাস। ওই বাসে আরও কয়েকজন বাংলাদেশি ছিলেন। লাকি বেগমের এক ভাইও ছিলেন। তাঁদেরও বাংলাদেশের ফেরার উদ্দেশ্য ছিল। গ্রেপ্তার হন সবাই। গোপালনগর থানায় তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। আদালতে তোলা হয় নান্টু ফরাজির পরিবারের সদস্যদের। আদালত সবাইকে দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠিয়ে দেন। তাঁদের চার মাসের কারাদণ্ড হয়। নান্টু ফরাজির তিন শিশুসন্তানকে পাঠানো হয় পশ্চিমবঙ্গে সরকারি হোমে। ওদের বিচার হয় জুভেনাইল কোর্টে। সন্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যান নান্টু ফরাজি দম্পতি।
কারাভোগ করে এ বছরের ১৯ মার্চ মুক্তি পান নান্টু ও তাঁর স্ত্রী। এরপর পুশব্যাক করে তাঁদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। তবে ভারত ছাড়ার আগে সন্তানদের খোঁজ নিতে পারেননি তিনি। তারা কোন সরকারি হোমে আছে, তা–ও জানতে পারেননি।
পিরোজপুরে ফিরে সেখানকার সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন নান্টু। তিনি তাঁদের বলেন, ‘আমি জানি না আমার তিন সন্তান এখন কোথায় রয়েছে। কোন হোমে রয়েছে তারা। আপনারা তাদের খুঁজে দিন, দেশে এনে দিন।’ তাঁর বড় মেয়ে তানিয়া আখতারের বয়স ১৩ বছর, ছোট মেয়ে হেনা আখতারের বয়স ১১ বছর ও ছেলে রায়হানের বয়স ৭ বছর।
এই খবর প্রচার হওয়ার পর তাঁদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন ঢাকার মানবাধিকার খবর পত্রিকার সম্পাদক মো. রিয়াজ উদ্দিন। তিনি কলকাতায় যান। কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। কিছুদিন পর ওই তিন শিশুর খোঁজ পান। নান্টু ফরাজির ছেলে রায়হান আছে কলকাতা শহরের উপকণ্ঠ বারাসাতের ‘কিশলয়’ হোমে এবং দুই মেয়ে আছে সল্টলেকের ‘সুকন্যা’ হোমে। রিয়াজ উদ্দিন দুই হোমে গিয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছেন।
রিয়াজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, হোম কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশন থেকে এই শিশুদের ফেরত পাঠানোর চিঠি পেলে এদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এরপর এ বিষয়ে রিয়াজ উদ্দিন কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশনের হেড অব চ্যান্সারি বি এম জামাল হোসেনের সঙ্গে কথা বলেন। তিনিও কথা দিয়েছেন, এই তিন শিশুকে অবিলম্বে বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবেন।

Monday, June 24, 2019

‘জয় বাংলা’ কেন বলা যাবে না, প্রশ্ন মমতার by অমর সাহা

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনির বিপরীতে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিকে প্রতিষ্ঠিত করতে আদাজল খেয়ে লেগেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জয় বাংলা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান—বিরোধীদের এমন যুক্তির বিরুদ্ধে আবার মুখ খুলেছেন মমতা। গতকাল শুক্রবার নদীয়ায় দলীয় নেতাদের উদ্দেশে দেওয়া মমতা বলেছেন, ‘জয় বাংলা বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্লোগান। বাংলাদেশে এ স্লোগান ব্যবহার হলে আমরা বলতে পারব না কেন?’
সদ্য শেষ হওয়া লোকসভা নির্বাচনকে ঘিরে বিজেপি শুরু করেছিল জয় শ্রীরাম ধ্বনি বা স্লোগান। তৃণমূল কংগ্রেস সেই স্লোগানের পাল্টা জয় হিন্দ স্লোগানও দেওয়া শুরু করে। নির্বাচনের পর তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভাটপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় এসে ঘোষণা দেন, তৃণমূলকে জয় হিন্দ এবং জয় বাংলা স্লোগান দিতে হবে। শুধু তা-ই নয়, ফোনালাপেও বলতে হবে জয় বাংলা।
এই ঘোষণার পর অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, ‘কেন মমতা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের মূল মন্ত্র জয় বাংলা স্লোগান দেবে? এ কথায় অবশ্য কান দেননি মমতা। বরং মমতা দলীয় নেতা-কর্মীদের জয় বাংলা স্লোগান দিতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। এদিকে মেঘালয়ের রাজ্যপাল তথাগত রায়ও মমতার জয় বাংলা স্লোগানের সমালোচনা করেছেন। তথাগত রায় বলেছেন, স্লোগানটি বাংলাদেশের সঙ্গে জড়িত। এতে প্রাদেশিকতাকে উসকে দেওয়া হচ্ছে।
মমতা এসব কথা উড়িয়ে গতকাল তৃণমূল ভবনে নদীয়া জেলার নেতাদের নিয়ে আয়োজিত এক বৈঠকে প্রশ্ন তুলেছেন, ‘জয় বাংলা কেন বলা যাবে না? এটা আমরা বলব। বাংলাদেশ বলতে পারলে আমরা কেন বলতে পারব না?’
মমতা গতকাল বলেছেন, ‘আমাদের রাজ্যের নাম তো “বাংলা” করে সেই প্রস্তাব বিধানসভায় সর্বসম্মতভাবে পাস করে অনুমোদনের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। এই রাজ্যের নাম বাংলা হলে আমরা আরও জোরে জয় বাংলা বলতে পারব। জয় বাংলা ধ্বনি কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।’

Tuesday, June 11, 2019

বিজেপির লাশের রাজনীতিতে পুলিশের বাধা by অমর সাহা

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলায় তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে সংঘর্ষে নিহত দুই বিজেপি কর্মীর লাশ কলকাতায় রাজ্য দপ্তরে এনে সম্মান জানাতে চেয়েছিল দলটি। বিজেপির সেই উদ্যোগকে সফল হতে দেয়নি পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ। গতকাল রোববার জেলার সন্দেশখালীর ন্যাজাটের হাটগাছি থেকে দুজনের লাশ কলকাতায় আনার পথে তিনবার আটকে দেয় পুলিশ।
লাশ নিয়ে রাজ্য রাজনীতি উত্তাল হতে পারে, সেই আশঙ্কায় পুলিশ এই লাশ আসতে বাধা দেয়। শেষ পর্যন্ত এই লাশ ফিরিয়ে নেওয়া হয় মৃত ব্যক্তিদের গ্রামের বাড়িতে। সেখানেই দাহ করা হয়।
পশ্চিমবঙ্গে এই লাশের রাজনীতি বিজেপি শিখেছে তৃণমূলের কাছ থেকেই। বামফ্রন্ট শাসনের শেষের দিকে তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যজুড়ে বামফ্রন্টবিরোধী আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। ওই আন্দোলনের সময় তৃণমূলের কোনো নেতা-কর্মী-সমর্থক মারা গেলে তাঁদের লাশ কলকাতায় এনে প্রতিবাদ মিছিল করত তৃণমূল। কলকাতার বাইরে কোনো তৃণমূল কর্মীর মৃত্যু হলেও সেই কর্মীর লাশ কলকাতায় এনে মিছিল করেছেন মমতা। বামফ্রন্টবিরোধী এই আন্দোলনে সফলও হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০১১ সালে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল। মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা।
ওই পথ ধরে গতকাল বিকেলে বিজেপির দুই কর্মীর লাশ নিয়ে পথে নামে দলটি। লক্ষ্য ছিল কলকাতায় রাজ্য দপ্তরে এনে তাঁদের সম্মান জানানোর। এরপর একটি শোক মিছিল বের করে কলকাতার নিমতলা মহাশ্মশানে দাহ করার। কিন্তু সেই উদ্যোগকে আর সফল হতে দেয়নি পশ্চিমবঙ্গের পুলিশ। কলকাতায় আনার পথে বারবার আটকে দেওয়া হয়। উত্তর ২৪ পরগনার মালঞ্চ বাজার এবং মিনাখায় পুলিশ আটকে দেয়। পুলিশের আশঙ্কা, এতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। পরে ওই কর্মীদের লাশ সন্দেশখালীতে তাঁদের গ্রামের বাড়িতেই দাহ করা হয়।
গত শনিবার দলীয় পতাকা সরানোকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার সন্দেশখালীর ন্যাজাটের হাটগাছিতে বিজেপি-তৃণমূল সমর্থকদের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। এতে বিজেপির তিন কর্মী ও তৃণমূলের একজন কর্মী নিহত হন। বিজেপির নিহত তিন কর্মী হলেন সুকান্ত মণ্ডল, প্রদীপ মণ্ডল ও তপন মণ্ডল। নিহত তৃণমূল কর্মী হলেন কাইয়ুম মোল্লা।
সুকান্ত মণ্ডল ও প্রদীপ মণ্ডলের লাশ গতকাল বিকেলে কলকাতায় আনার উদ্যোগ নেয় বিজেপি। তাদের লক্ষ্য ছিল ওই দুই কর্মীর লাশ কলকাতার রাজ্য দপ্তরে এনে সম্মান প্রদর্শন করার। তবে দুবার পুলিশের বাধায় বিজেপি কর্মীরা মিনাখায় সড়কের ওপর প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। তাঁরা রাস্তাতেই মরদেহ সৎকারের উদ্যোগ নেন। এ সময় পুলিশ বাধা দেয়। পরে বিজেপি কর্মীরা পিছু হটেন। তাঁরা বিবাদে না গিয়ে লাশ নিয়ে সন্দেশখালীতে ফিরে যান।
এ সময় বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতা রাহুল সিনহা এই ঘটনার প্রতিবাদে আজ সোমবার উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাট মহকুমায় ১২ ঘণ্টার বন্‌ধ্‌ পালনের ঘোষণা দেন। এ ছাড়া আগামীকাল মঙ্গলবার রাজ্যজুড়ে ‘কালা দিবস’ পালনের ঘোষণা দেন তিনি। এ ছাড়া ১২ জুন কলকাতায় এই ঘটনার প্রতিবাদে বিজেপির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হবে ‘মহাধিক্কার’ মিছিল। ওই মিছিল কলকাতার লালবাজারে পুলিশ হেডকোয়ার্টার পর্যন্ত যাবে।
বসিরহাটে তৃণমূলের হামলার প্রতিবাদে গতকাল রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় পথ অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন বিজেপির কর্মী-সমর্থকেরা। পূর্ব মেদিনীপুর, উত্তর ২৪ পরগনা, বাঁকুড়া, শ্রীরামপুর, ডানকুনি, করিমপুর, তেহট্ট, কৃষ্ণনগর, নবদ্বীপ, কল্যাণী, হরিণঘাটাসহ রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় অবরোধ করেন বিজেপির কর্মীরা। কলকাতার বিভিন্ন এলাকায়তেও প্রতিবাদ মিছিল করে বিজেপি। উত্তর কলকাতার সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ এবং দক্ষিণ কলকাতার হাজরাতে বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা মুখ্যমন্ত্রীর কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। এ সময় বিজেপি কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ এই দুই এলাকা থেকে ৭৯ বিজেপি কর্মী-সমর্থককে গ্রেপ্তার করে।
বসিরহাটে গত শনিবারের ঘটনার পর ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে আহত বিজেপি কর্মীদের দেখতে যায় বিজেপির একটি প্রতিনিধিদল। প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি ও সাংসদ দিলীপ ঘোষ। প্রতিনিধিদলে আরও ছিলেন সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায়, অর্জুন সিং, জগন্নাথ সরকার, শান্তনু ঠাকুর, কেন্দ্রীয় নেতা রাহুল সিনহা, বিধায়ক দুলাল বর এবং বিজেপির রাজ্য সাধারণ সম্পাদক সায়ন্তন বসু প্রমুখ। তবে এখন পর্যন্ত তৃণমূল সাংসদ নুসরাত জাহান ওই এলাকা পরিদর্শন করেননি। তিনি কেবল একটি বিবৃতি দিয়ে প্রার্থনা করেছেন, এলাকার মানুষ যেন শান্তিতে থাকেন।
নিহত দুই বিজেপি কর্মীর লাশ বসিরহাট হাসপাতাল থেকে বের করার সময় পুলিশ পুরো হাসপাতাল চত্বর ঘিরে রাখে। ছবি: সংগৃহীত

Friday, April 19, 2019

ক্ষুদ্র জাতিসত্তার চার প্রার্থীর লড়াই by অমর সাহা

পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ি জেলা দার্জিলিং। আর জঙ্গলের জেলা ঝাড়গ্রাম। সাবেক পশ্চিম মেদিনীপুর জেলা ভেঙে ২০১৭ সালে গঠিত হয়েছিল এই পৃথক ঝাড়গ্রাম জেলা। পশ্চিমবঙ্গের জঙ্গলমহলে এই ঝাড়গ্রাম জেলার অবস্থান। জেলাজুড়ে বনাঞ্চল। বড় বৈশিষ্ট্য, এই জেলা মাওবাদী–অধ্যুষিত। এখানে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, তফসিলি জাতি আর সাঁওতালি সম্প্রদায়ের বাস। ঝাড়গ্রাম জেলার একমাত্র লোকসভা আসন ঝাড়গ্রাম। এটি তফসিলিদের জন্য সংরক্ষিত। এই আসনে মূলত লড়াই করেন এই সম্প্রদায়ের প্রার্থীরাই। এবারও তাঁর ব্যতিক্রম হয়নি।
ঝাড়গ্রামের মাঝ দিয়ে বয়ে চলেছে কংসাবতী ও সুবর্ণরেখা নদী। এখানে রয়েছে ঐতিহাসিক মন্দির, রাজবাড়ি। পশ্চিমবঙ্গের নামকরা পর্যটনকেন্দ্র ঝাড়গ্রাম। আছে ডিয়ার পার্ক, আদিবাসী জাদুঘর, ইকোপার্ক, ঐতিহাসিক সাবিত্রী ও কনক দুর্গামন্দির। ঐতিহাসিক কোকড়াঝাড় জঙ্গলও এখানে।
ঝাড়গ্রাম একসময় ছিল বামপন্থী কমিউনিস্ট পার্টির দখলে। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার লোকজন ও তফসিলিদের এখানে প্রাধান্য দেওয়া হয়। পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলমহলে ঝাড়গ্রামের অবস্থান। মেদিনীপুরে ছিল তিনটি লোকসভার আসন। ঘাটাল, ঝাড়গ্রাম আর মেদিনীপুর। এই তিনটি আসনই ছিল বামপন্থীদের দখলে। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে ঝাড়গ্রামে সাংসদ হয়েছিলেন সিপিএম নেতা পুলিন বিহারি বাস্কে, ঘাটালে হয়েছিলেন সিপিআইয়ের গুরুদাস দাশগুপ্ত আর মেদিনীপুরে হয়েছিলেন সিপিআইয়ের প্রবোধ পাণ্ড।
২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতায় আসার পর জঙ্গল মহলের বামপন্থী দুর্গকে ভেঙেচুরে দেয়। ২০১৪ সালে এই তিনটি আসনই দখল করে তৃণমূল। এবার ২০১৯ সালে নির্বাচনী ময়দানে নেমেছে বামপন্থী দল সিপিএম, তৃণমূল, বিজেপি ও কংগ্রেস। এই চার দলই এবার ঝাড়গ্রাম আসনে প্রার্থী করেছে চার ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও তফসিলি নেতাকে।
শাসক দল তৃণমূল প্রার্থী করেছে সাঁওতালি সম্প্রদায়ের নেত্রী ও স্কুলশিক্ষিকা বীরবাহা সরেন টুডুকে। তিনি এখন স্থানীয় রোহিণী বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। স্বামী সাঁওতালিদের সামাজিক সংগঠন ‘ভারত জাকাত মাঝি পারগানা মহল’ কমিটির নেতা। তিনি এই প্রথম এলেন তৃণমূলের রাজনীতিতে। পেলেন টিকিট।
বাম দল সিপিএম প্রার্থী করেছে আরেক ক্ষুদ্র জাতিসত্তার নেত্রীকে। তিনি দেবলীনা হেমব্রম। তিনি সিপিএমের রাজ্য কমিটির সদস্য। তিনবার তিনি সিপিএমের টিকিটে রানিবাঁধ আসন থেকে বিধায়ক হয়েছেন। এ ছাড়া তিনি সিপিএমের গড়া ‘আদিবাসী অধিকার রাষ্ট্রীয় মঞ্চের’ কেন্দ্রীয় কমিটিরও নেতা।
বিজেপি প্রার্থী করেছে প্রকৌশলী কুনার হেমব্রমকে। কুনার হেমব্রম বিজেপির ঝাড়গ্রাম জেলার সভাপতি। আর কংগ্রেস প্রার্থী করেছে যজ্ঞেশ্বর হেমব্রমকে। তিনি একজন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত।
২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই আসনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থী উমা সরেন বিপুল ভোটে জিতেছিলেন। সিপিএমের প্রার্থী ও তৎকালীন সাংসদ পুলিন বিহারি বাস্কেকে ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৮৮৩ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। এই পুলিন বিহারী পেয়েছিলেন ৩ লাখ ২৬ হাজার ৬২১ ভোট। বিজেপির বিকাশ মুদি পেয়েছিলেন ১ লাখ ২২ হাজার ৪৫৯ ভোট। আর কংগ্রেস প্রার্থী অনিতা হাঁসদা পেয়েছিলেন ৪০ হাজার ৫১৩ ভোট।
এবার এই ঝাড়গ্রাম আসনে লড়ছেন চার ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও তফসিল সম্প্রদায়ের প্রার্থী। এবার মূলত লড়াই হবে ত্রিমুখী। তৃণমূল, সিপিএম ও বিজেপি প্রার্থীর মধ্যেই।
সিপিএম প্রার্থী দেবলীনা হেমব্রম বলেছেন, গত বছরের পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূলের ভোটে অনেকটা ভাটার টান দেখা গেছে। এলাকাটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও তফসিলি উপজাতিদের সংরক্ষিত থাকলেও এটি দীর্ঘদিন ধরে সিপিএমের দখলে ছিল। এবার এই জঙ্গলমহলের মানুষ আবার এক হচ্ছে। তাঁরা বুঝেছে, এই জঙ্গল মহলে উন্নয়নের চাবিকাঠি বাম দল। তাই এবার মানুষ ঝুঁকছে সিপিএম প্রার্থীর দিকে।
সিপিএম প্রার্থী দেবলীনা আরও বলেছেন, ‘এবার আমরা জয় করব—এই প্রত্যয় নিয়ে মাঠে নেমেছি। আমরা মনে করি, আমরা এবার উদ্ধার করতে পারব আমাদের এই আসনকে।’
সিপিএমের জেলা সভাপতি পুলিন বিহারী বাস্কে বলেছেন, ‘আমরা জিতব বলেই এবার প্রার্থী করেছি দেবলীনা হেমব্রমকে। আজ জঙ্গলমহলের মানুষ তৃণমূলের ওপর বিরক্ত। বিজেপিকে বিশ্বাস করে না। চাইছে ফের সিপিএমকে।’
তৃণমূল কংগ্রেসের ঝাড়খন্ড জেলা সভাপতি সুকুমার হাঁসদা বলেছেন, সিপিএমের অত্যাচারের কথা মানুষ ভোলেনি। তাই এবারও তারা ভোট দেবে তৃণমূলকে। মানুষ জানে মমতাই পারে এই জঙ্গলমহলের উন্নয়ন করতে।
বিজেপির জেলা সভাপতি কুনার হেমব্রম বলেছেন, এখানে তো সিপিএম ও তৃণমূল মুদ্রার এপিঠ–ওপিঠ। তাদের দুর্নীতি আর অত্যাচারে কথা জঙ্গলমহলের মানুষ জানেন। তাই তো এবার মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তৃণমূলও নয়, সিপিএমও নয়, তাঁরা ভোট দেবেন বিজেপিকে। তার ছবি তো গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে ফুটে উঠেছে।
এই ঝাড়গ্রাম আসনের নির্বাচন হবে আগামী ১২ মে ষষ্ঠ দফায়।

Thursday, April 4, 2019

উত্তর কলকাতায় জোর লড়াই হবে by অমর সাহা

ভারতের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গের ৪২টি আসনের মধ্যে ২টি আসন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। একটি কলকাতা উত্তর, অন্যটি কলকাতা দক্ষিণ। এই দুই আসনের মধ্যে উত্তর কলকাতায় জোর লড়াইয়ের আভাস মিলছে।
তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাস দক্ষিণ কলকাতায়। রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি সোমেন মিত্র ও বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসুর বাস উত্তর কলকাতায়।
কংগ্রেস, বিজেপি, সিপিএম, সিপিআই, ফরোয়ার্ড ব্লক, আরএসপি, এসইউসিআইসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের দপ্তর উত্তর কলকাতায়।
গুরুত্বপূর্ণ শিয়ালদহ, বড় বাজার, ধর্মতলার অবস্থান উত্তর কলকাতায়। কবিগুরুর জন্মভিটে জোড়াসাঁকো উত্তর কলকাতায়। এখানে রয়েছে অধিকাংশ হাসপাতাল, বাজারঘাট। ফলে দক্ষিণ কলকাতার চেয়ে এখনো গুরুত্ব বেশি উত্তর কলকাতার।
উত্তর কলকাতা আসনে ভোট হচ্ছে একবারে শেষ বা সপ্তম দফায় ১৯ মে। লোকসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখানে জোর লড়াই শুরু হয়েছে। প্রার্থীও রয়েছেন ওজনদাররা।
আসনটিতে তৃণমূলের প্রার্থী সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি তৃণমূলের একনিষ্ঠ নেতা। আগে কংগ্রেস করতেন। তৃণমূলের জন্মের পর তৃণমূল করেন। তিনি তিনবার সাংসদ হয়েছেন। চারবার বিধায়ক হয়েছেন। এবার চতুর্থবারের জন্য নির্বাচন করছেন।
স্বচ্ছ ভাবমূর্তির নেতা হলেও সুদীপ আটকে গেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের চাঞ্চল্যকর ১৭ হাজার কোটি রুপির রোজভ্যালি আর্থিক দুর্নীতি মামলায়। এই মামলার জেরে ২০১৭ সালে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই তাঁকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যায় ওডিশার রাজধানী ভূবনেশ্বরে। সেখানের তাঁকে কারাগারে থাকতে হয় বেশ কিছুদিন। একই বছরের মে মাসে ওডিশা হাইকোর্ট সুদীপের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে তাঁকে জমিনে মুক্তি দেন। সুদীপের স্ত্রী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়ও তৃণমূলের বিধায়ক। তিনি একসময় চলচ্চিত্র অভিনেত্রী ছিলেন।
কলকাতা উত্তরে তৃণমূলের সুদীপের বিরুদ্ধে ভোটযুদ্ধে নেমেছেন বিজেপির রাহুল সিনহা। তিনিও বড় মাপের যোদ্ধা। রাহুল সিনহা ছয় বছর ছিলেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি। ২০১৫ সালে হয়েছেন বিজেপির জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক।
২০১৪ সালের নির্বাচনে রাহুল সিনহা একই আসনে লড়ে যথেষ্ট বেগ দিয়েছিলেন তৃণমূলের সুদীপকে। সুদীপ সেদিন বুঝেছিলেন, রাহুল সিনহার শক্তি উত্তর কলকাতায় একবারেই কম নয়। গত নির্বাচনে সুদীপ পেয়েছিলেন ৩ লাখ ৪৩ হাজার ৬৮৭ ভোট। আর রাহুল সিনহা পেয়েছিলেন ২ লাখ ৪৭ হাজার ৪৬১ ভোট। সিপিএম প্রার্থী রূপা বাগচি পেয়েছিলেন ১ লাখ ৯৬ হাজার ৫৩টি ভোট। কংগ্রেসের প্রার্থী বর্তমান রাজ্য সভাপতি সোমেন মিত্র পেয়েছিলেন ১ লাখ ৩০ হাজার ৭৮৩ ভোট।
এবার অবশ্য এই আসনে বামফ্রন্ট প্রার্থী করেছে সিপিএমের নারী নেত্রী কনীনিকা ঘোষকে। পেশায় স্কুলশিক্ষিকা এই নারী নেত্রী ইতিমধ্যে ভোটের মাঠে নেমে পড়েছেন। তিনি মনে করেন, এবার আর মানুষ অতটা ঝুঁকবেন না বিজেপি বা তৃণমূলের দিকে। ফলে ত্রিমুখী লড়াইয়ে তাঁর জয়ের পথ খুলে যেতে পারে।
তবে এই যুক্তি মানছেন না বিজেপির প্রার্থী রাহুল সিনহা। তিনি এবার দারুণ আশাবাদী। বলেছেন, মানুষ ভোট দিতে পারলে এবার তাঁর জয় আর আটকে রাখা যাবে না। মানুষ দেখেছে তৃণমূলের শাসন, দুর্নীতি। দুর্নীতির মামলায় জড়ানোর ঘটনা। সুতরাং অবাধ নির্বাচন হলে তিনিই এবার জিতবেন।
উত্তর কলকাতায় প্রচুর অবাঙালি মানুষের বাস। তাঁরা সাধারণত বিজেপির দিকে ঝুঁকে থাকে। ভোটের বাজারে তাই বাড়তি সুযোগ পেতে পারে বিজেপি।
সুদীপ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, রাজ্যে নেতা বলতে এখনো মমতাই। তাঁর উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে গেছে রাজ্য। তাই কলকাতাবাসী এবারও তাঁকে বিপুল ভোটে জয়ী করবেন।
উত্তর কলকাতার এই আসন নিয়ে জোর লড়াই শুরু হয়েছে। কংগ্রেস এখনো এই আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। ঘোষণা করলে এবার এই আসনে চতুর্মুখী লড়াই হবে। কারণ, এখনো কলকাতায় বহু কংগ্রেস সমর্থক রয়েছেন। তাঁরা নিশ্চয়ই কংগ্রেসকে বিমুখ করবে না।
সব মিলিয়ে বলতে হয়, উত্তর কলকাতায় ভোটের মহারণ শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু কে জিতবে, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে ২৩ মে পর্যন্ত। ওই দিনই বের হবে ফলাফল।

Saturday, March 30, 2019

তৃণমূলের ৪২ কত দূর? by অমর সাহা

ভারতের ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা দিয়েছিলেন, তিনি পশ্চিমবঙ্গের ৪২ আসনেরই প্রার্থী। যেখানেই ঘাসফুল, সেখানেই তিনি। তাঁর অবস্থান এই জোড়া ফুল আর ঘাসফুল জুড়ে।
এবার ২০১৯ সালে এসে মমতা একটু ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু ৪২ আসন ছাড়ছেন না। ৪২ আসনই তাঁর চাই বলে স্লোগান দিচ্ছেন। মমতা চান, এবার তৃণমূলকে এই ৪২ আসনেই জয়ী হতে হবে। মমতা মনে করেন, পশ্চিমবঙ্গ মানে মমতার ঘাসফুল বা জোড়া ফুল। তাঁর দলের ৪২ আসনের সঙ্গে কোনো সমঝোতা নেই। আপসও নেই। মমতা নির্দেশও দিয়েছেন, তিনি কোনো অজুহাত শুনবেন না। তাঁর দলকে ৪২ আসনেই জিততে হবে।
লোকসভার নির্বাচন হচ্ছে ৫৪৩টি আসনে। এর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গে রয়েছে ৪২টি আসন। ২০১৪ সালে মমতা একাই ৩৪টি আসনে জিতেছিলেন। কংগ্রেস নিয়েছিল ৪টি আসন। আর বাম দল ও বিজেপির ভাগ্যে জুটেছিল ২টি করে আসন। এবার মমতা অতীতের সব কথা ভুলে একেবারে নতুনভাবে মাঠে নেমেছেন। দাবি তুলেছেন ৪২–এ ৪২ চাই। তিনি এ কথাও বলেছেন, এই রাজ্যে আর বিরোধী দল থাকতে পারবে না। শুধু তৃণমূল থাকবে। তৃণমূল জিতবে। তাই এবার ৪২ আসনই পাচ্ছেন তিনি।
পাশাপাশি মমতা আরও একটি স্লোগান তুলেছেন। সেটি হলো, ‘মোদি হটাও দেশ বাঁচাও’। মমতার লক্ষ্য, দিল্লির গদি থেকে মোদিকে হটিয়ে নতুন ধর্মনিরপেক্ষ প্রধানমন্ত্রী বসানো। কে হবেন সেই পদের দাবিদার? তা স্পষ্ট করেননি মমতা।
ভারতে তিনটি রাজনৈতিক জোট রয়েছে। এগুলো হলো বিজেপির নেতৃত্বাধীন জাতীয় গণতান্ত্রিক জোট বা এনডিএ, কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত প্রগতিশীল জোট বা ইউপিএ এবং কংগ্রেস-বিজেপিবিরোধী ২৩ দলের আরেকটি জোট ইউনাইটেড ইন্ডিয়া। নেতা এখনো ঘোষিত না হলেও মমতা এই জোটের প্রধান হিসেবে রয়েছেন।
কংগ্রেস জোটে (ইউপিএ) রয়েছে ২৮টি রাজনৈতিক দল আর বিজেপি জোটে (এনডিএ) রয়েছে ২৯টি রাজনৈতিক দল। বিজেপি জোট জিতলে প্রধানমন্ত্রী হবেন নরেন্দ্র মোদি। কংগ্রেস জোট জিতলে রাহুল গান্ধীর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। মমতার তৃতীয় শক্তির জোট ইউনাইটেড ইন্ডিয়া জিতলে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, তা নিয়ে জট এখনো কাটেনি। কোনো ঘোষণাও আসেনি। এই জোটের প্রধানমন্ত্রীর দৌড়ে ১ নম্বরে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর রয়েছেন তেলেগু দেশম পার্টির নেতা চন্দ্রবাবু নাইডু, বহুজন সমাজ পার্টির নেত্রী মায়াবতী, সমাজবাদী পার্টির মুলায়ম সিং যাদব প্রমুখ। এই জোটের আরও অনেকে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। বিজেপি বাদে ইউপিএ এবং ইউনাইটেড ইন্ডিয়া জোট সরকার গড়তে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।
ভারতের কোনো জনমত সমীক্ষায় এখনো আশার কথা শোনা যায়নি। প্রতিটি জনমত সমীক্ষায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি বা এনডিএ এবার আর একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গড়তে পারছে না। ভারতের লোকসভায় রয়েছে ৫৪৩টি আসন। সরকার গড়তে প্রয়োজন ২৭২টি আসন। সর্বশেষ জনমত সমীক্ষায়ও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, বিজেপি সরকার গড়ার জন্য ৮টি আসন থেকে দূরে থাকছে। পেতে পারে ২৬৪টি আসন। গত সপ্তাহে এবিপি নিউজ এবং সি-ভোরের ওই যৌথ সমীক্ষায় বলা হয়েছে, এনডিএ টেনেটুনে সরকার গড়তে সক্ষম হতে পারে। সে ক্ষেত্রে কংগ্রেস বা মমতার জোটের পৃথকভাবে সরকার গড়ার সম্ভাবনা কম। ইউপিএ পেতে পারে ১৪১টি আসন আর মমতার ইউনাইটেড ইন্ডিয়া পেতে পারে ১৩৮টি আসন। তবে ইউপিএ এবং মমতার ইউনাইটেড ইন্ডিয়া জোট যদি ঐক্যবদ্ধ হয়, সে ক্ষেত্রে তাদের সরকার গড়ার একটা সুযোগ এসে যেতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, ৪২ আসনের মধ্যে তৃণমূল পেতে পারে ৩৪টি আসন। ৮টি যেতে পারে বিজেপির ঝুলিতে। কংগ্রেস এবং বাম দলের থলেতে কোনো আসন ঢুকতে না–ও পারে। তবে বাম দল ও কংগ্রেস এই হিসাব মানছে না। তারা বলছে, গতবারের থেকে এবার বেশি আসন পাবে।
এসব হিসাব–নিকাশের মধ্যে বিরোধীরা একটুও হাল ছাড়ছে না। তারা নিশ্চিত, এবার মোদি আর ফিরছেন না। সামনের দিনগুলোতে ভোটের চেহারা আরও বদলাবে। কমে যাবে মোদির ভোট। দেশে আসবে নতুন সরকার, নতুন প্রধানমন্ত্রী। আর এই লক্ষ্য নিয়ে রাজনৈতিক ময়দান চষে বেড়াচ্ছে বিজেপিবিরোধীরা।
মমতার লক্ষ্য, পশ্চিমবঙ্গের ৪২–এ ৪২ আসন। মমতা এই রাজ্যের ৪২ আসনে একাই প্রার্থী দিয়েছেন। মমতার ধারণা, নির্বাচনে জাতীয় কংগ্রেসের পরেই তৃণমূলের শক্তি থাকবে। কারণ, ভারতের বৃহত্তম রাজ্য উত্তর প্রদেশের ৮০ আসনে মায়াবতী, অখিলেশ যাদবরা আসন ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। মহারাষ্ট্র আসনসংখ্যার দিক থেকে ভারতের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজ্য। এখানে রয়েছে লোকসভার ৪৮টি আসন। এখানেও আসন রফা হয়েছে কংগ্রেসের সঙ্গে শারদ পাওয়ারের জাতীয়তাবাদী কংগ্রেস পার্টি বা এনসিপির। এরপরের অবস্থান মমতার তৃণমূলের। এই রাজ্যে ৪২টি আসন ভাগ করেননি তিনি। লড়ছেন একাই। চতুর্থ স্থানে আছে বিহার। আসনসংখ্যা ৪০। এখানেও আসন ভাগ হয়েছে বিজেপিবিরোধী দলের মধ্যে। পঞ্চম স্থানে রয়েছে তামিলনাড়ু। এখানে রয়েছে ৩৯টি আসন। এখানেও ডিএমকের সঙ্গে আসন রফা হয়েছে কংগ্রেসের। এরপরেই রয়েছে দেশের অন্যান্য রাজ্য। দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গ বাদে অন্যান্য রাজ্যে বিরোধীদের আসন সমঝোতা হলেও সেখানে কংগ্রেস ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দলের ৪২ আসন পাওয়ার মতো শক্তি নেই। কারণ, তারা এককভাবে মমতার মতো ৪২টি আসনে প্রার্থীই দিতে পারেনি। ফলে মমতার স্বপ্ন, নির্বাচনে আসনসংখ্যার দিক থেকে তারাই কংগ্রেসের পরে থাকবে। আর ইউনাইটেড ইন্ডিয়া জোটের শীর্ষে থাকবে মমতার তৃণমূল। আর তখন যদি দেখা যায় বিজেপির ভরাডুবি আর সম্মিলিত বিরোধীদের আসনসংখ্যা সরকার গড়ার মতো অবস্থানে রয়েছে, সে ক্ষেত্রে মমতাই হবেন রাহুল গান্ধীর পর প্রথম প্রধানমন্ত্রী পদের দাবিদার। এসব অঙ্ক কষেই এগোচ্ছেন মমতা। এই লক্ষ্যে কাউকে কোনো একটি আসন না দিয়ে বরং একাই ৪২ আসনে প্রার্থী দিয়ে জয়ের স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নও দেখা শুরু করেছেন মমতা।
রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরদার হচ্ছে মমতা কি সত্যিই ৪২ আসনেই জিততে পারবেন? বিরোধী দলগুলো কি একটি আসনও পাবে না? রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা অবশ্য মমতার ৪২ আসনে একতরফাভাবে জয়ের দাবি মানতে পারছেন না। তাঁরাও বলেছেন, এটা মমতার অলীক স্বপ্ন। মানুষকে বিভ্রান্ত করার প্রয়াস। এত দিন ধরে দেশের বিভিন্ন নামীদামি জনমত সংস্থার রিপোর্টে এ কথা এখনো তুলে ধরা হয়নি যে মমতা একাই ৪২ আসন পাচ্ছেন। জনমত সমীক্ষায় সর্বশেষ যে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, তাতেও বলা হয়েছে, খুব একটা বিপ্লব ঘটে না গেলে মমতার সেই ৩৪ আসনই জিততে হবে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি জনমত সংস্থা বলেছে, দ্বিতীয় শক্তি হিসেবে উঠে আসবে বিজেপি। তারাও তৃণমূলের মতো ঘোষণা দিয়ে বসেছে, তারা এবার ২৩টি আসনে জিততে চলেছে। যদিও বামফ্রন্ট এবং কংগ্রেস এখনো ঘোষণা দেয়নি তারা কয়টি আসনে জিততে চলেছে। তাই রাজনৈতিক মহলে এই প্রশ্ন জোরদার হচ্ছে, মমতার ৪২ আসন জেতার পথ কত দূরে? সত্যিই কি মমতা ৪২ আসনে একাই জিততে চলেছেন, নাকি নির্বাচনের প্রচারে চমক দিচ্ছেন মমতা? নাকি মমতা যেভাবেই হোক সব আসনে জেতার ছক নিয়ে এগোচ্ছেন?

Thursday, March 14, 2019

বাবুল সুপ্রিয়কে ‘আনকালচারড’ বললেন মমতা by অমর সাহা

ভারতের জনপ্রিয় প্লেব্যাক শিল্পী ও পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি সাংসদ বাবুল সুপ্রিয়কে ‘আনকালচারড’ বলেছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দেশটির আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে বাবুলের আসনে মমতা দলের প্রার্থী করেছেন অভিনেত্রী মুনমুন সেনকে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাবুলের এক ‘সরস’ মন্তব্যের জবাব দিতে এ কথা বলেন মমতা।
২০১৪ সালে এই বাবুল সুপ্রিয়কে বিজেপি মনোনয়ন দেয় পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের আসানসোল কেন্দ্রে। নির্বাচনে তিনি তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূলের দোলা সেনকে ৭০ হাজার ভোটে পরাজিত করে সাংসদ হন। ওই বছর পশ্চিমবঙ্গে বিজয়ী দুই বিজেপি সাংসদের মধ্যে তিনি একজন। আর অন্যজন হলেন দার্জিলিং কেন্দ্রের প্রার্থী সুরিন্দর সিং আলুওয়ালিয়া। বিজেপির জয়ী এই দুই সাংসদ এখন অবশ্য ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিমন্ত্রী। এবারও বাবুল সুপ্রিয় এই আসানসোল আসনে বিজেপির মনোনয়ন পাচ্ছেন।
গত মঙ্গলবার মমতার ঘোষিত তৃণমূলের প্রার্থী তালিকায় আসানসোলে আসনে রয়েছে মুনমুন সেনের নাম।
মুনমুন সেন ২০১৪ সালের নির্বাচনে বাঁকুড়া কেন্দ্র থেকে জয়ী হন। এই কেন্দ্রের সিপিএমের হেভিওয়েট প্রার্থী বাসুদেব আচারিয়াকে তিনি ৯৮ হাজার ৫০৬ ভোটে পরাস্ত করেন। আর বাঁকুড়া কেন্দ্রে প্রার্থী করেছেন রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী সুব্রত মুখার্জিকে।
আসানসোলে মুনমুন সেনকে প্রার্থী করায় বাবুল সুপ্রিয় এক টুইটবার্তায় কিছুটা খোঁচা মেরে মন্তব্য করেন, ‘মমতাজি সব সময় আমার বিরুদ্ধে আসানসোলে “সেন-সেশনাল” প্রতিদ্বন্দ্বী উপহার দেন। ২০১৪ সালে দিয়েছিলেন দোলা সেনকে আর এবার ২০১৯ সালে দিলেন মুনমুন সেনকে। এ জন্য মমতাজিকে ধন্যবাদ।’
তবে বিজেপি সাংসদ বাবুল সুপ্রিয়র এই রসিকতা যে মমতার আদৌ পছন্দ হয়নি, তা তিনি গতকাল বুধবার সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মমতা বলেন, ‘বাবুল সুপ্রিয় মুনমুনকে ভয় পাচ্ছে। তাই “সেনসেশনাল” টুইট করেছে।’ পাশাপাশি তিনি বাবুল সুপ্রিয়কে একজন ‘আনকালচারড মানুষ’ বলেন।
গতকাল বুধবার পশ্চিম বর্ধমানের অন্ডালে বাবুল সুপ্রিয় আরও বলেছেন, ‘মুনমুন সেনের সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। আসানসোলের ভোটে তাঁকে স্বাগত জানাই। তবে লড়াই লড়াইয়ের মতো হবে। দুই লাখ ভোটে এবার জিতব।’
ভোটার তালিকা থেকে গুরুং-রোশনের নাম বাদ
পশ্চিমবঙ্গের পাহাড়ি জেলা দার্জিলিংয়ের গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সভাপতি বিমল গুরুং এবং সাধারণ সম্পাদক রোশন গিরির নাম বাদ দেওয়া হয়েছে ভোটার তালিকা থেকে। এ কারণে তাঁরা আর আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারছেন না। যদি নির্বাচন কমিশনে আবেদনের পর নির্বাচন কমিশন তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেয়, সে ক্ষেত্রে হয়তো ভোটাধিকারের সুযোগ পেতে পারেন এই দুই নেতা।
দার্জিলিংয়ে পৃথক রাজ্যের দাবিতে ২০১৭ সালের ১২ জুন থেকে উত্তাল হয়ে ওঠে পাহাড়ি জেলা দার্জিলিং। তখন এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই দুই নেতা। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দার্জিলিংয়ের এই পৃথক রাজ্যের আন্দোলন স্তব্ধ করার জন্য গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার নেতা ও বিমল গুরুংয়ের ডান হাত বিনয় তামাংকে বাগিয়ে আনেন। বিনয় তামাং রাজ্য সরকারের সঙ্গে হাত মেলালে স্তব্ধ হয়ে যায় পৃথক গোর্খাল্যান্ড রাজ্য গড়ার আন্দোলন। আর এই আন্দোলনকে ঘিরে সে সময় অশান্ত হয়ে পড়ে দার্জিলিং। মিছিল, মিটিং, জ্বালাও–পোড়াও ও খুন–জখমের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে এই আন্দোলন। এই আন্দোলনকে ঘিরে রাজ্য সরকার বিমল গুরুং, রোশন গিরিসহ গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার বহু নেতার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলে ওই সব নেতা গা–ঢাকা দেন। আর এরই পরিপ্রেক্ষিতে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকায় ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হয়। যদিও ২০১৭ সালের অক্টোবর মাসে বিমল গুরুং ও রোশন গিরিকে ‘প্রোক্লেমড অফেন্ডার’ হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন আদালত। এখনো অবশ্য বিমল গুরুং-রোশন গিরিরা আত্মগোপন করে আছেন। অন্যদিকে, বিমল গুরুংয়ের ডান হাত বিনয় তামাং এখন রাজ্য সরকারের সঙ্গে মিশে শাসন করছে গোর্খা টেরিটরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা জিটিএ। জিটিএর চেয়ারম্যান পদে বসানো হয়েছে বিমল গুরুংয়ের প্রতিপক্ষ সেই বিনয় তামাংকে; যদিও ২ মাস ২১ দিন পর দার্জিলিংয়ে সেই একটানা বন্‌ধ্‌ প্রত্যাহার করা হয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকে।

Sunday, January 20, 2019

মমতাকে পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির খোঁচা by অমর সাহা

আবার বাগ্‌যুদ্ধে জড়াল তৃণমূল ও বিজেপি। গতকাল শনিবার ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার ঐতিহাসিক ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে সফল মহাসমাবেশ করে তৃণমূল। এতে যোগ দেন ভারতের বিজেপি বিরোধী অন্তত ২২টি রাজনৈতিক দলের ২৩ নেতা।
তৃণমূল নেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই সভা সফল হওয়াকে মেনে নিতে পারেননি রাজ্যের বিজেপি নেতৃবৃন্দ। দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ কটাক্ষ করে বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী বাছতে তো এবার লটারি করতে হবে মমতার। যদিও মমতা গতকাল ব্রিগেড সমাবেশে বলেছিলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর অভাব নেই দেশে। প্রধানমন্ত্রিত্বের দৌড়ে নেই কোনো নেতা। ভাবছেনও না এগুলো নিয়ে। ২২-২৪টি পার্টি এই মঞ্চে এক হয়েছে গণতন্ত্র, অর্থনীতি ও বিজেপির হাত থেকে দেশকে রক্ষা করার দাবি নিয়ে। তাই দেশের প্রধানমন্ত্রী কে হবেন, তা এখন ভাবার দরকার নেই। ভোটে জয়ের পর সেসব ঠিক হবে।’
এসব কথার পরিপ্রেক্ষিতে এক সংবাদ সম্মেলনে দিলীপ ঘোষ বলেন, ‘এতজন নেতা! প্রধানমন্ত্রী বাছতে তো লটারি করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মোদিজির কোনো এক্সপায়ার ডেট হয় না। মোদিজির হাত ধরেই দেশজুড়ে বিজেপির পতাকা উড়বে। চন্দ্রবাবু, অখিলেশদের কটা ভোট? এ রাজ্যের বাইরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়েরই–বা কী আছে? প্রধানমন্ত্রী বাছতে তো তাই লটারি করতে হবে। আমাদের দলের একটিই মুখ—মোদিজি।’ এ সময় তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কটাক্ষ করে বলেন, ‘মমতা নিজেই তো শাড়িপরা হিটলার। আমার নামে এক শ মামলা দিয়ে রেখেছে। বিজেপি কর্মীদের ধরে ধরে ভুয়া মামলা দিচ্ছে। ব্রিগেডে যে সার্কাস দেখলাম, মন ভরে গেল।’
গতকালের সমাবেশের পর ২৩ নেতার সম্মানে চা চক্রের আয়োজন করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে মমতা নিজেই অতিথিদের আপ্যায়ন করান। চা চক্রের পর সংবাদ সম্মেলনে নেতারা জানান, এবার তাঁরা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) পরিবর্তে ব্যালটে ভোট দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন শুরু করছেন। নেতারা বলছেন, ভোটযন্ত্রে কারচুপির শঙ্কা থাকে। নির্বাচন কমিশনে দাবি উপস্থাপনের জন্য চার সদস্যের কমিটিও গঠন করা হয়। তাঁরা হলেন, আম আদমি পার্টির নেতা ও দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, সমাজবাদী পার্টির নেতা ও উত্তর প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অখিলেশ যাদব, কংগ্রেস সাংসদ অভিষেক মনু সিংভি এবং বহুজন সমাজ পার্টির নেতা সতীশ মিশ্র।

Saturday, January 19, 2019

নীচু জাত বলে... by অমর সাহা

জানকি সিংহনিয়া গিয়েছিলেন কুয়ো থেকে পানি তুলতে। কুয়োর মধ্যে বালতিও ফেলেছিলেন তিনি। হঠাৎ কী হলো, কুয়োর পাশে মাথা ঘুরে পড়ে গেলেন, জ্ঞান হারালেন। সেই জ্ঞান আর ফিরল না। চলে গেলেন না–ফেরার দেশে।
ভারতের ওডিশা রাজ্যের ঝাড়সুখুদা জেলার ছোট্ট গ্রাম কারপাবাহালে গত বুধবার ১৭ বছরের এক ছেলে রেখে মারা যান জানকি (৫০)। মায়ের মৃত্যুতে শোকের চেয়ে তাঁর সৎকারের চিন্তায় দিশেহারা ছেলে সরোজ সিংহনিয়া। আগে থেকেই নীচু জাতের বলে জানকিকে একরকম একঘরে করে রেখেছিল গ্রামের মানুষ। মৃত্যুর পরও যেন জাত ভুলতে পারল না তারা। সৎকারে এগিয়ে এল না কেউ। উপায় না দেখে কাপড়ে মুড়ে বাঁশের সঙ্গে বেঁধে মায়ের লাশ সরোজ নিয়ে তুলল সাইকেলে। সাইকেল চালিয়ে ৪-৫ কিলোমিটার দূরের ছাড়িয়া জঙ্গলে গিয়ে মায়ের সৎকার করল সে।
ওডিশার লিপসাপলি গ্রামের নীচু জাতের মনু সিংহনিয়াকে বিয়ের পর থেকেই জাতের ভেদাভেদে পড়ে যান জানকি সিংহনিয়া। দলিত বলে গ্রামে বিধিনিষেধের অন্ত ছিল না। একসময় স্বামীর মৃত্যু হলে সন্তান নিয়ে কঠিন পরীক্ষায় পড়েন জানকি। কোনো রকমে চলতে থাকে জীবন। তাই বলে মায়ের মৃত্যুর পরও যে কেউ এগিয়ে আসবে না তা যেন ভাবতে পারেনি সরোজ। এমনকি মৃতদেহও কেউ ছোঁয়নি। দেখতেও আসেনি কেউ। এই ঘটনা যেন এক ধাক্কায় অনেকটাই বড় করে দিয়েছে তাকে। পরে সে একাই নিয়ে নেয় মায়ের সৎকারের ভার।
সরোজের এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয় দানা মাঝির কথা। ২০১৬ সালের আগস্ট মাসে যক্ষ্মা রোগে মারা যান দানা মাঝির স্ত্রী। হাসপাতালে মারা গেলেও মরদেহ নিজের বাড়িতে অর্থের অভাবে নিয়ে আসতে পারছিলেন না দানা। অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে সাহায্যও করেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। উপায় না দেখে সেই মৃতদেহ বেঁধে মাথায় করে দীর্ঘ ১০ কিলোমিটার পথ বয়ে নিয়ে আসেন দানা মাঝি। পাশে পাশে হাঁটতে থাকে তাঁদের একরত্তি মেয়েটি। সেই দৃশ্য দেখে স্থানীয় মানুষজন মৃতদেহ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে। ঘটনাটি সেদিন দেশজুড়ে সাড়া ফেলেছিল।

Tuesday, January 12, 2016

বাম না তৃণমূল—দোলাচলে কংগ্রেস by অমর সাহা

পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনের ঢাকে কাঠি পড়েছে। মাঠে নেমে পড়েছে সব রাজনৈতিক দল। তবে পশ্চিমবঙ্গের জাতীয় কংগ্রেস এখনো ঠিক করে উঠতে পারেনি এই নির্বাচনে তারা কোন দিকে বা জোটে ঝুঁকবে বা কার সঙ্গে নির্বাচনী জোট গড়বে। এ নিয়ে এখনো কংগ্রেস শিবির সংশয়ের দোলাচলে। আগামী এপ্রিল-মে মাসে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভার ২৯৪ আসনের নির্বাচন।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে জাতীয় কংগ্রেসের একটা ভূমিকা বরাবরই ছিল, এখন অবশ্য কিছুটা কমেছে। ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতায় ছিল এই কংগ্রেস। বলা চলে, একেবারে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত। মাঝে অবশ্য যুক্তফ্রন্টের শাসন। তবু বলা হয়, এই সুদীর্ঘকাল পশ্চিমবঙ্গের কান্ডারি ছিল কংগ্রেস। কংগ্রেস ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে লালিত। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্টের কাছে এই কংগ্রেস ক্ষমতা হারায়। সেই থেকে বামফ্রন্ট ক্ষমতায় থাকে ২০১১ সাল পর্যন্ত। তারপর শুরু হয় সেই কংগ্রেস ভেঙে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গড়া তৃণমূল কংগ্রেসের শাসন। এখনো পশ্চিমবঙ্গে চলছে মমতা বা তৃণমূলের শাসন।
শক্তির বিচারে এখন এই রাজ্যে শীর্ষে রয়েছে তৃণমূল। দ্বিতীয় স্থানে বামফ্রন্ট, তৃতীয় স্থানে জাতীয় কংগ্রেস আর চতুর্থ স্থানে বিজেপি। কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষে থেকে এখনো একদণ্ড শান্তিতে নেই মমতা বা তাঁর দল তৃণমূল কংগ্রেস। কারণ, মমতার এই প্রায় পৌনে পাঁচ বছরের শাসনে তিনি অনেক উন্নয়নের কাজ করলেও তাতে মন গলাতে পারেননি বিরোধীদের; সেই বাম দল থেকে কংগ্রেস বা বিজেপিকে। তাই নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে এখন মমতার ঘুম অনেকটাই চলে গিয়েছে।
কারণ, ২০১১ সালে মমতা ক্ষমতায় আসার পর কার্যত বামফ্রন্টের রাজনৈতিক অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। মুখ থুবড়ে পড়ে সিপিএমসহ বাম দলের শরিকেরা। এই সুযোগে জেগে ওঠেন মমতা। আবার ২০১৪ সালে ভারতের শাসনক্ষমতায় নরেন্দ্র মোদি এলে সেই জোয়ারের পানি এসে পড়ে পশ্চিমবঙ্গেও। ফলে বিজেপি এই রাজ্যে সাঁতার কাটার সুযোগ পেয়ে যায়। সংগঠিতও করে দলকে।
অন্যদিকে নির্বাচন সামনে রেখে দিনে দিনে ফের শক্তিশালী হতে শুরু করে বাম দল। এখন গোটা রাজ্যে ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াইতে নেমে পড়েছে বাম দল। চাঙা হচ্ছে দল। সমর্থনও মিলছে। গত ২৭ ডিসেম্বর কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে এক বিশাল সমাবেশ করে সিপিএম দেখিয়ে দিয়েছে তারা শেষ হয়ে যায়নি, জেগে উঠছে। এদিকে কংগ্রেস এখন অনেকটা একা হয়েই রয়েছে। সংগঠনও আর তেমন শক্তিশালী করে গড়তে পারেনি। বরং তৃণমূল বাগিয়ে নেওয়ার লড়াইয়ে নেমেছে কংগ্রেসের বিধায়কদের। সফল হচ্ছে অনেক ক্ষেত্রে।
গত বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস তৃণমূলের সঙ্গে জোট করে জিতেছিল ৪২টি আসন। তারপর মমতার নেতৃত্বে গড়া সরকারে যোগও দিয়েছিল। মন্ত্রীও হয়েছিলেন কংগ্রেসের পাঁচজন। কিন্তু সেই সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। দুই দলের মধ্যে অন্তঃকলহ শুরু হলে একপর্যায়ে কংগ্রেস বেরিয়ে আসে সরকার থেকে। তারপর থেকে কংগ্রেস একা। সেই কংগ্রেসকে নিয়ে এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি তোলপাড় হচ্ছে। কারণ, কংগ্রেস জানে, এই রাজ্যে এখন বিজেপিও ভোটের বাক্সে ভাগ বসাতে চলেছে। তাদের দলের অনেকেই চলে গেছে অন্য দলে।
আবার বিজেপিও বুঝেছে, তাদের শক্তি বাড়ছে। কংগ্রেস বা তৃণমূলের একটা অংশ, যারা ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে অতটা ভাবে না, তারা হয়তো বিজেপির দিকেই ঝুঁকবে। আর বাম দলের একটা অংশও এখন দলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে দল ছেড়েছে। এদিকে এখন তৃণমূল এবং বাম দলও টানতে শুরু করেছে কংগ্রেসকে, কখনো প্রকাশ্যে আবার কখনো অপ্রকাশ্যে। কংগ্রেস জানে, এখন যে এই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, তাতে তাদের এককভাবে লড়ে পুরোনো আসন টিকিয়ে রাখাই দায় হবে। কংগ্রেসকে জিততে হলে ফের তাদের ভিড়তে হবে হয় তৃণমূলে, নয়তো বাম দলের জোটে। এই দুটোর একটি পথে এগোতে পারলে কংগ্রেস অন্তত নির্বাচনে ভালো আসন পাওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারে। এখন কংগ্রেসের অধিকাংশ নেতা-কর্মী-সমর্থকেরা চাইছেন বাম জোটে থাকতে। তাঁদের যুক্তি, মমতার সঙ্গে থাকা কঠিন। অন্যদিকে বাম দল ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে লালিত। এই বাম দল মনমোহনের নেতৃত্বাধীন প্রথম ইউপিএ সরকারকে সমর্থন জানিয়েছিল। সুতরাং, বাম দলের জোটে যাওয়াই শ্রেয় হবে কংগ্রেসের জন্য।
এই রাজ্যে সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল ২০১১ সালের এপ্রিল-মে মাসে। ওই নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ও জাতীয় কংগ্রেস নির্বাচনী আঁতাত করে আসন সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনে লড়ে বিপুল ভোটে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বামফ্রন্টকে পরাস্ত করে তাদের ৩৪ বছর শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল। ওই নির্বাচনে তৃণমূল জিতেছিল ১৮৮টি আসনে এবং তাদের জোটভুক্ত কংগ্রেস জিতেছিল ৪২টি আসনে আর বাম দল জিতেছিল ৬০টি আসনে।
সম্প্রতি রাজ্য কংগ্রেসের দলীয় নেতাদের এক সভায় দলের নেতারা মমতাকে ঠেকানোর জন্য বাম দলের সঙ্গে নির্বাচনী জোট করার পক্ষে সায়ও দিয়েছেন। এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি অধীর চৌধুরী, কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সি পি যোশীসহ কংগ্রেসের রাজ্য নেতৃবৃন্দ। এই বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের যোশী বলেছিলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ কংগ্রেস কর্মী সিপিএমের সঙ্গে জোট চান। এ-সংক্রান্ত রিপোর্ট আমি তৈরি করে তা পাঠিয়ে দেব রাহুল গান্ধীর কাছে।’
যদিও কংগ্রেসের কিছু নেতা-কর্মী আছেন, যাঁরা এখনো তৃণমূলের সঙ্গে নির্বাচনী জোট গড়তে আগ্রহী। এদিকে সিপিএমের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরিও জানিয়ে দিয়েছেন, বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির স্বার্থে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট গড়া যেতে পারে। পাশাপাশি তিনি এ কথাও বলেছেন, তাঁদের মূল লক্ষ্য পশ্চিমবঙ্গ থেকে মমতাকে সরিয়ে দেওয়া।
কংগ্রেসের সঙ্গে জোট গড়ার পক্ষে সায় দিয়েছেন সিপিএমের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রও। তাই রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন, এ বছরের নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত বাম দলের সঙ্গে কংগ্রেসের জোট হয়েও যেতে পারে। রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কিছু নেই, তাই রাজনৈতিক স্বার্থে এবং বিজেপিকে হটানোর লক্ষ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলের জোট হলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
অমর সাহা: প্রথম আলোর কলকাতা প্রতিনিধি।

Monday, October 19, 2015

দুর্গাপূজায় এক টুকরো মশালডাঙ্গা by অমর সাহা

বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব। আর পশ্চিমবঙ্গের প্রধান ধর্মীয় উৎসবও এই দুর্গোৎসব। প্রতিবছরই এই দুর্গোৎসবকে ঘিরে মেতে ওঠে কলকাতাসহ গোটা পশ্চিমবঙ্গ। তৈরি হয় নানা ভাবনার নানা পূজামণ্ডপ, নানা ধাঁচ আর বৈচিত্র্যের প্রতিমা। চলে দুর্গাপ্রতিমা আর পূজামণ্ডপ তৈরিতে থিমের লড়াই। লড়াই চলে সাবেকি পূজার সঙ্গে আধুনিক পূজারও।
প্রতিবছরই এই লড়াইয়ে মেতে ওঠে কলকাতাসহ গোটা পশ্চিমবঙ্গ। শুধু কি তাই, মোটকথা ভারতে যেখানে বাঙালির বাস, সেখানেই দেবীদুর্গার আরাধনা। ত্রিপুরা, ঝাড়খন্ড, বিহার, উত্তর প্রদেশ, দিল্লি, আসাম, মেঘালয়, ছত্তিশগড়, বিহার, মহারাষ্ট্র—সর্বত্রই যেন চলে এই দেবীর আরাধনা। থিমের লড়াই। কারণ, এসব রাজ্যে রয়েছে প্রচুর বাঙালির বাস।
এবার কলকাতার পূজায় দুটি পূজামণ্ডপ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে। এর একটি ভারতের ভূখণ্ডে থাকা বাংলাদেশের সাবেক একটি ছিটমহলের জীবনধারাকে নিয়ে তৈরি করা হয়েছে। আর অন্যটি এবার পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু দুর্গাপ্রতিমা তৈরি করে নতুন ভাবনার সৃষ্টি করেছে। দক্ষিণ কলকাতার কসবার শক্তিসংঘ পল্লীবাসী দুর্গোৎসব কমিটি এবারের পূজামণ্ডপ করেছে কোচবিহারের দিনহাটা মহকুমার মধ্য মশালডাঙ্গা ছিটমহলের আদলে। ভারতের ভূখণ্ডে থাকা এই মধ্য মশালডাঙ্গা ছিটমহল ছিল বাংলাদেশের। গত ৩১ জুলাই মধ্যরাতে ভারত ও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে থাকা ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় হওয়ার পর মশালডাঙ্গা ছিটমহল অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় ভারতের ভূখণ্ডে। আর সেই এক টুকরো মশালডাঙ্গাকে এবার তুলে আনা হয়েছে কসবার শক্তিসংঘের পূজামণ্ডপে। একেবারে মশালডাঙ্গা ছিটমহলই যেন এখানে ঠাঁই পেয়েছে। সেই খড় ও বাঁশের তৈরি বাড়ি। বাঁশঝাড়, কলাবাগান, গোশালা, বাড়ির উঠোন—কী নেই এখানে। রয়েছে ছিটমহলের ঐতিহাসিক শিবমন্দিরও। হঠাৎ এই পূজামণ্ডপে ঢুকলে মনে হবে যেন আমরা চলে এসেছি কোনো একটি ছোট্ট গ্রামে। শুধু কি তাই, উদ্যোক্তারা এখানে লাইট অ্যান্ড সাউন্ডের মাধ্যমে শোনাচ্ছে ছিটমহলবাসীর ৬৮ বছরের নানা জ্বালা-যন্ত্রণার কথা। আর এই এক টুকরো মশালডাঙ্গাকে দেখার জন্য ছুটে আসছে কলকাতার মানুষ।
আর পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ও উঁচু দুর্গাপ্রতিমা গড়ে এবার রেকর্ড গড়েছে দক্ষিণ কলকাতার দেশপ্রিয় পার্কের দুর্গোৎসব কমিটি। বিশাল মাপের দুর্গা। মা দুর্গার মুখমণ্ডলই হলো ১২ ফুট লম্বা। ভাবা যায়! তবে পূজা কমিটির একজন বলেছেন, ৭০ থেকে ৮০ ফুট উঁচু এই দুর্গাপ্রতিমা। পূজা কমিটির সম্পাদক সুদীপ্ত কুমার বলেছেন, মণ্ডপ করা হয়েছে ১৬২ ফুট লম্বা ও ৯০ ফুট চওড়ার। দেবীকে দর্শন করা যাচ্ছে ৫০ ফুট দূর থেকে। এই পূজার সহযোগিতায় রয়েছে একটি সিমেন্ট কোম্পানি।
কসবা বা দেশপ্রিয় পার্কই নয়; এবার নানা ভাবনা আর নানা সৃষ্টিধর্মী মণ্ডপ এবং প্রতিমা তৈরি হয়েছে কলকাতাজুড়ে। দক্ষিণ কলকাতার বেহালার নতুন দল পূজা কমিটি এবার মণ্ডপ করেছে সেই পৌরাণিক কাহিনি সমুদ্র মন্থনের ধাঁচে। দেখানো হয়েছে অমৃতভান্ডের উত্থানকে। নিমতলা সর্বজনীন পূজা কমিটি পূজামণ্ডপে এবার এনেছে শ্রাবণধারা। বৃষ্টি। বৃষ্টিভেজা এক নতুন ভাবনার পূজামণ্ডপ। সোদপুরের শহীদ কলোনির পূজামণ্ডপ তৈরি হয়েছে নেপালের সেই ভূমিকম্পের ধাঁচে। আর সোদপুরের উদয়ন সংঘ মন্দির নির্মাণ করেছে পৌরাণিকের হস্তিনাপুর ও কুরুক্ষেত্রকে কেন্দ্র করে। এখানেই দেখানো হচ্ছে অর্জুনের লক্ষ্যভেদ, দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ, কুরুপাণ্ডবদের পাশা খেলার দৃশ্যও। কলকাতার সন্তোষ মিত্র স্কয়ারে এবার পূজামণ্ডপ তৈরি হয়েছে ঘুরন্ত মণ্ডপের ধাঁচে। কর্মকর্তারা বলেছেন, তাঁদের মণ্ডপ এবার ‘উড়ন্ত চাকি, ঘুরন্ত প্যান্ডেল’। কলকাতার মহম্মদ আলি পার্কের পূজার ভাবনা এবার দক্ষিণ আফ্রিকার জঙ্গল সাফারিকে ঘিরে। আমেরিকার পার্লামেন্ট ভবনের ধাঁচে এবার মণ্ডপ তৈরি হয়েছে শিয়ালদহ অ্যাথলেটিক ক্লাবের, আর কলেজ স্কয়ার সর্বজনীন তাদের মণ্ডপ তৈরি করেছে হাঙ্গেরির পার্লামেন্টের আদলে। বারাসাতের চড়কডাঙ্গা পূজা কমিটি মণ্ডপ তৈরি করেছে থাইল্যান্ডের লোটাস টেম্পলের আদলে। আর্য সমিতি মণ্ডপ তৈরি করেছে বাউলদের বাদ্যযন্ত্র দিয়ে।
সেই গঙ্গা, যমুনা, কৃষ্ণা, গোদাবরী ও সরস্বতী—এই পঞ্চ নদীর সঙ্গম তুলে আনা হয়েছে খিদিরপুর পল্লী সমিতির দুর্গোৎসব। রাজডাঙ্গা নব উদয় সংঘ মন্দির তৈরি করেছে ইস্পাতের প্লেট দিয়ে। সত্যজিৎ রায়ের হীরক রাজার দেশকে ভাবনা করে মণ্ডপ তৈরি করেছে জগৎপুর জ্ঞানেন্দ্র পল্লীর অধিবাসীরা। আর দক্ষিণ কলকাতার সুরুচি সংঘ এবার পূজার থিম করেছে দক্ষিণ ভারতের তামিল স্থাপত্যকে নিয়ে। দাসপাড়া সর্বজনীন পূজার থিম এবার ‘লঙ্কেশ্বরের নরেশ’ বা লঙ্কার রাবণ। উত্তর কলকাতার পাতিপুকুর নতুন পল্লীর পূজামণ্ডপের এবারের ভাবনা তেভাগা আন্দোলন থেকে তেলেঙ্গানা আন্দোলন। আরও একটি আকর্ষণীয় পূজামণ্ডপ তৈরি করেছে গাঙ্গুলীবাগান রবীন্দ্র পল্লী দুর্গোৎসব কমিটি। এখানে বিশ্বের সেই সপ্তাশ্চর্যকে তুলে ধরা হয়েছে। ভারতের তাজমহল থেকে পেরুর ইনকা সভ্যতা, ব্রাজিলের আকাশছোঁয়া যিশু, জর্ডানের পেট্রা, ইতালির কলোসিয়াম, মেক্সিকোর চিচেন ইতজা আর চীনের ঐতিহাসিক প্রাচীর। এক অবিভক্ত বাংলার এক টুকরো ছবি তুলে এনেছে হরিদেবপুর বিবেকানন্দ স্পোর্টিং ক্লাব। অবিভক্ত বাংলার সেই মেলবন্ধনের ছবিকে তুলে ধরেছে উদ্যাপন কমিটি। আবার বৈষ্ণবঘাটায় ট্রামকে ভাবনা নিয়ে মণ্ডপ তৈরি করেছে চিৎপুরের যাত্রা শুরু সংঘ। এখানেই তুলে ধরা হয়েছে চিৎপুরের যাত্রাপালার নানা দৃশ্যকে। উত্তরাখন্ডের সেই ঐতিহাসিক মন্দির কেদারনাথকে দেখা যাবে বারাসাতের কল্যাণকৃত পূজামণ্ডপে। কন্যাভ্রূণ হত্যার বিরুদ্ধে প্রচার চালানোর ভাবনা নিয়ে মেয়েবেলার গল্পকাহিনি নিয়ে মণ্ডপ তৈরি করেছে কলকাতার কাশী বোস লেনের পূজা কমিটি। কলকাতার বাদামতলার আষাঢ় সংঘ মণ্ডপ তৈরি করেছে গুজরাটের সেই ডান্ডিয়া উৎসবকে সঙ্গী করে। আহিরীটোলার মণ্ডপ তৈরি হয়েছে রুটি বেলার বেলন আর বসার পিঁড়ি দিয়ে। আর কলকাতার বিধাননগরের এফ ই বোলোকের মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে দিল্লির বাহাই লোটাস টেম্পলের আদলে।
সত্যি কথা কি, এমন ধরনের নানা ভাবনা আর চিন্তা নিয়ে কলকাতাসহ গোটা ভারতবর্ষের নানা প্রান্তে গড়ে উঠেছে দুর্গামণ্ডপ। বৈচিত্র্য আনা হয়েছে যেমন মণ্ডপ নির্মাণে, ঠিক তেমনি প্রতিমা নির্মাণ ও সাজসজ্জায়ও।
অমর সাহা: প্রথম আলোর কলকাতা প্রতিনিধি।

Friday, July 31, 2015

সন্ধ্যা থেকে উৎসবে মাতবে ছিটমহলবাসী by অমর সাহা

কোচবিহারের বাত্রিগাছ ছিটমহলবাসীর অপেক্ষা। -ভাস্কর মুখার্জি
অপেক্ষার পালা ফুরিয়ে এসেছে ছিটমহলবাসীর। পরিচয়হীনতার গ্লানি নিয়ে বেঁচে থাকার পালা শেষ হচ্ছে অবশেষে। আজ শুক্রবার মধ্যরাতে ভারতের ভেতর থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহল এবং বাংলাদেশের ভেতরে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হবে। এতে বাংলাদেশের ভেতর থাকা ছিটমহলবাসী পাবে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আর ভারতের ভেতর থাকা ছিটমহলবাসীরা পাবে ভারতের নাগরিকত্ব।
আজ সন্ধ্যা থেকে ভারতের ভেতরে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহলে শুরু হবে বিজয় উৎসব। সন্ধ্যায় ছিটমহলের প্রতিটি বাড়িতে জ্বালানো হবে ৬৮টি করে মোমবাতি। রাত ১২টায় ছিটমহলগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তরের ঘোষণা দেওয়ার পর শুরু হবে বিজয় উৎসব। ঢাকঢোল পিটিয়ে, বাজি ফুটিয়ে, শঙ্খ বাজিয়ে, মিছিল করে, ভারতীয় পতাকা হাতে নিয়ে বিজয় উৎসবে মেতে উঠবে গোটা ছিটমহলবাসী। আলোক মালায় সাজবে বাড়িঘর। চলবে মশাল মিছিল। ওড়ানো হবে আকাশপ্রদীপ। মধ্য মশালডাঙ্গা ছিটমহলে দেখানো হবে ছিটমহলবাসীদের ওপর নির্মিত একটি তথ্যচিত্রও। ওই তথ্যচিত্রে থাকবে ছিটমহলবাসীদের সুদীর্ঘ ৬৮ বছরের বঞ্চনা, যন্ত্রণা ও ভিনদেশের ভেতর পরগাছা হয়ে থাকার দুঃসহ দিনগুলোর কথা।
বাংলাদেশ-ভারত ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সহসম্পাদক দীপ্তিমান সেনগুপ্ত প্রথম আলোকে বলেন, এখন ছিটমহলজুড়ে আনন্দের বন্যা বইছে। রাজ্য প্রশাসনও ছিটমহল বিনিময়ের লক্ষ্যে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। ছিটমহলের পাড়ায় পাড়ায় নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করার জন্য বিভিন্ন ছিটমহলে মঞ্চ বানিয়ে ইতিমধ্যে গানবাজনা শুরুও করেছে ছিটমহলের তরুণ-তরুণী আর শিশু-কিশোররা। শুরু করেছে মিষ্টি বিতরণও।
২০১১ সালের দুই দেশের ছিটমহলের যৌথ জনগণনা অনুযায়ী এই ভারতে থাকা বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের জনসংখ্যা ছিল ১৪ হাজার ২১৫ জন। সেই জনসংখ্যা ৬৪১ জন বেড়ে হয়েছে ১৪ হাজার ৮৫৬ জন। বাংলাদেশে থাকা ভারতের ১১১টি ছিটমহলের জনসংখ্যা ছিল ৩৭ হাজার ৩৬৯ জন। এ মাসের ৬ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত দুই দেশের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত জনগণনায় সেই সংখ্যা বেড়ে ৪০ হাজার হয়েছে বলে জানিয়েছেন দীপ্তিমান সেনগুপ্ত। তবে প্রকৃত সংখ্যা কত, তা তিনি জানাতে পারেননি। আজ মধ্য রাতের পর থেকে তাঁরা সবাই পাবেন নিজ নিজ দেশের নাগরিকত্ব।

Monday, July 13, 2015

কংগ্রেস-সিপিএম কাছাকাছি আসছে? by অমর সাহা

রাজনীতিতে শেষ কথা বলতে কোনো কথা নেই। আজ যে শত্রু, কাল সে বন্ধুও হতে পারে। তারই লক্ষণ দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এখন। কংগ্রেস ও সিপিএম পরস্পর বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে দীর্ঘদিন ধরেই। ২০১১ সালের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভা বা ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে এই দুটি দল পৃথকভাবে নির্বাচন করেছে। তবে কংগ্রেস ও তৃণমূল কংগ্রেস ঐক্যবদ্ধভাবে লড়ে ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়েছিল ২০১১ সালে। সেই বাম দল বা সিপিএম রাজনৈতিক কারণেই এবার কংগ্রেসের দিকে হাত প্রসারিত করেছে। কিন্তু কেন? জাতীয় কংগ্রেস একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। ১৩০ বছরের এই পুরোনো দলটি ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে পর্যুদস্ত হয়েছিল ‘সাম্প্রদায়িক’ আদর্শে লালিত বিজেপির কাছে। ফলে ভারতের মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে বিজেপির মতো একটি সাম্প্রদায়িক দলের উত্থানকে মেনে তিনি পারেনি ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি। কংগ্রেস এখনো অসাম্প্রদায়িক দল। ধর্মনিরপেক্ষতা তাদের আদর্শ। সিপিএমের আদর্শও ধর্মনিরপেক্ষতা।
এই প্রেক্ষাপটে আগামী বছরের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের দিকে তাকিয়ে এই দুটি দল কমাচ্ছে দূরত্ব। নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর অন্যান্য রাজ্যের মতো পশ্চিমবঙ্গেও বিজেপি হালে পানি পেতে শুরু করেছে। আগে রাজ্যে বিজেপির ভোটের হার ছিল মাত্র ৪ শতাংশ, এখন তা বেড়ে হয়েছে ১৮ শতাংশ। বিজেপির এই উত্থানকে মেনে নিতে পারছে না ধর্মনিরপেক্ষ কংগ্রেস এবং বাম দলগুলো। বিশেষ করে সিপিএম। দ্বিতীয়ত, এই রাজ্যের শাসনক্ষমতায় এখন তৃণমূল। তৃণমূলও ক্ষমতায় আসার পর এই রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তেমন উন্নতি হয়নি। শিল্পায়ন হয়নি। সারদা কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়েছে শাসক তৃণমূলের বেশ কয়েকজন নেতা, মন্ত্রী, সাংসদ ও বিধায়ক।
এখনো ক্ষুদ্র সঞ্চয় প্রকল্প বা চিটফান্ডের বিরুদ্ধে রাজ্যজুড়ে চলছে আন্দোলন। জনগণ সরকারি দলের ওপর বিতৃষ্ণ হলেও ২০১৬ সালের নির্বাচনে মমতা ফের ক্ষমতায় আসবেন বলেই মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। কিন্তু এটা মানতে চাইছে না কংগ্রেস, বিজেপি বা বাম দলগুলো। এই তিন দলের এখন লক্ষ্য একটাই, মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করা। কিন্তু এটা যে এককভাবে সম্ভব নয়, সেটা এখন কংগ্রেস, বিজেপি বা সিপিএমের নেতারা উপলব্ধি করতে পেরেছেন। কারণ, এই তিনটি দলের কারোর শক্তি নেই এককভাবে লড়ে তৃণমূলকে হটানোর। বরং তৃণমূলের সঙ্গে এই তিনটি দল বা জোট পৃথকভাবে নির্বাচন করলে আখেরে লাভবান হবে তৃণমূল। ভোটের হিসাবে এগিয়ে যাবে তৃণমূল। আবার কংগ্রেস বা সিপিএম কোনোভাবেই নির্বাচনী জোট করবে না ‘ধর্মান্ধ’ বিজেপির সঙ্গে। তাই একটি মাত্রই পথ এখন খোলা কংগ্রেস এবং সিপিএমের নেতৃত্বাধীন বামজোট যদি আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে একজোট হয়ে লড়তে পারে, সে ক্ষেত্রে হয়তো তৃণমূলকে বিরাট চাপের মধ্যে রাখা যাবে।
রাজ্যের মানুষ এখন চাইছে তৃণমূল রাজ্যপাট থেকে সরে যাক। সে জন্য গণতান্ত্রিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন তাই পশ্চিমবঙ্গ থেকে তৃণমূলকে হটিয়ে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এখন এই দুটি দল বা জোট পরস্পরের কাছাকাছি আসছে। কংগ্রেসও জানে বাম দলের সঙ্গে জোট হলে তৃণমূলকে বেগ দেওয়া যাবে। তাই এখন কংগ্রেসের পক্ষ থেকেও বাম দলের নেতাদের কাছে এই নয়া সমীকরণের বার্তা যেতে শুরু করেছে। বাম দলও জানে, তাদের একার পক্ষে তৃণমূলকে হটানো সম্ভব নয়। হটাতে গেলে সঙ্গী চাই কংগ্রেসকে। আর এসব হিসাব–নিকাশ করেই এই দুটি দল বিপরীত মেরুতে অবস্থান করলেও ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে পরস্পরের কাছাকাছি আসতে শুরু করেছে। আর তারই প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে সিপিএমের কেন্দ্রীয় নেতা গৌতম দেবের কণ্ঠে। ১৯ জুন বারাসাতে এক সংবাদ সম্মেলনে এই দুই দলের নির্বাচনী জোট হওয়ার পক্ষেই ইঙ্গিত দেন তিনি। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বাম দলের নির্বাচনী কৌশল কী হবে—সেই প্রশ্নের জবাবে গৌতম দেব সরাসরি জানিয়ে দেন, কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা হতেই পারে। তবে সেই সম্ভাবনা এখনো তৈরি হয়নি। ভবিষ্যৎই বলবে। এরপর গৌতম দেব ওই দিনই কলকাতার একটি টেলিভিশন চ্যানেলে এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘মোদি-মমতাকে হারাতে বামদের অনেক দূর যেতে হবে। বামেরা যাবে।’
এদিকে তৃণমূলকে হারাতে কংগ্রেসের সঙ্গে কৌশলী নির্বাচনী বোঝাপড়া হওয়া উচিত বলে মনে করছে সিপিএমের একাংশ। গৌতম দেব এ দিন এ কথাও বলেন, কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন প্রথম ইউপিএ সরকারকে বামেরা সাড়ে চার বছর সমর্থন করেছিল। কংগ্রেসের সঙ্গে মৌলিক পার্থক্য থাকলেও বিভিন্ন ইস্যুতে কংগ্রেসের সঙ্গে আন্দোলন করেছে বামেরা। সারদা-কাণ্ডে প্রতারিতদের আন্দোলনে কংগ্রেসের শরিক হয়েছিল তারা। সুপ্রিম কোর্টে সারদা নিয়ে কংগ্রেস নেতা আবদুল মান্নানের দায়ের করা মামলায় লড়েছেন প্রখ্যাত আইনজীবী, কলকাতার সাবেক মেয়র ও সিপিএম নেতা বিকাশ ভট্টাচার্য। গৌতম দেব আরও বলেছেন, ‘আমরা একা লড়াই করে তৃণমূলকে হারাতে পারব না। তাই সিপিআইএমএল (লিবারেশন) এবং এসইউসিআইয়ের সঙ্গে বৃহত্তর ঐক্য গড়েছি। মমতা চরম “কর্তৃত্ববাদী” নেত্রী। মমতা ও নরেন্দ্র মোদিকে সরানোর জন্য আমাদের বাড়তি পথ হাঁটতে হলে আমরা হাঁটব।’
আর এসব আলোচনার মাঝেই কংগ্রেসের প্রবীণ নেতা আবদুল মান্নান জানিয়ে দেন, রাজ্যের মানুষ এখন চাইছে তৃণমূল রাজ্যপাট থেকে সরে যাক। সে জন্য গণতান্ত্রিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। তিনি আরও বলেছেন, এক বছর আগে তিনি কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধীকে একটি চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলেন, বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসকে ঠেকাতে বামদের সঙ্গে হাত মেলানো দরকার। কংগ্রেসের সাবেক রাজ্য সভাপতি সোমেন মিত্রও মনে করেন, জোট ছাড়া গতি নেই। তৃণমূলকে ঠেকাতে রাজ্যে একটি ধর্মনিরপেক্ষ জোটের প্রয়োজন। এটা সম্ভব হলে তৃণমূলকে ঠেকানো যাবে। আর অন্যদিকে সিপিএম নেতা ও কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য শ্যামল চক্রবর্তী এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, জোট হতেই পারে। হাজার দুয়ারির হাজার দরজা রয়েছে। এর মধ্যে যেকোনো একটি দরজা খুলে যেতে পারে। এই নিয়ে দলে আলোচনাও হতে পারে। আর এসব আলোচনার মাঝে তৃণমূল কংগ্রেসের দাবি, বিরোধীরা যা–ই বলুক, আগামী বছরের রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনে তারাই জিতবে।
অমর সাহা: প্রথম আলোর কলকাতা প্রতিনিধি।

Wednesday, July 1, 2015

৩১ জুলাইয়ের প্রহর গুনছে ছিটমহলবাসী by অমর সাহা

কোচবিহারের শিবপ্রসাদ মুশতারি ছিটমহলে একজন জেলা
প্রশাসনের সেই বিজ্ঞপ্তি পড়ছেন। ছবি: ভাস্কর মুখার্জি।
বাংলাদেশ ও ভারতের ভেতরে থাকা উভয় দেশের ১৬২টি ছিটমহল বিনিময়ের চুক্তির পর ছিটমহলে খুশির হাওয়া বইছে। দুই দেশের এই ছিটমহলের বাসিন্দারা এখন ৩১ জুলাইয়ের প্রহর গুনছে। ওই দিনই আনুষ্ঠানিকভাবে এই ছিটমহলগুলো হস্তান্তর করা হবে।
ভারত তাদের ভূখণ্ডে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহলের মালিকানা পেয়ে যাবে। বাংলাদেশ মালিকানা পাবে তাদের ভূখণ্ডে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলের। এই খুশিতে স্থানীয় বাসিন্দারা নতুন স্বপ্নে বিভোর। ৩১ জুলাইয়ের মাহেন্দ্রক্ষণকে স্মরণে রাখার জন্য ওই দিন রাতে ভারতের ছিটমহল মেতে উঠবে এক আনন্দ উৎসবে। পরের দিন ১ আগস্ট ছিটমহলজুড়ে পালন করা হবে বিজয় উৎসব। সে কথা জানালেন ছিটমহলবাসীরাই।
কোচবিহারের জেলা প্রশাসন থেকে ভারতে বসবাসকারী বাংলাদেশের ছিটমহলবাসীর জন্য জারি করা হয়েছে এক বিজ্ঞপ্তি। এতে বলা হয়েছে, ৩১ জুলাই মধ্যরাত থেকে ভারতের ভেতরে থাকা সব বাংলাদেশি ছিটমহল ভারতের ভূখণ্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হবে। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, সব ছিটমহলবাসী এবং একই সঙ্গে ওই জনগণনার পর যেসব শিশু ভূমিষ্ঠ হয়েছে, তারাও ভারতীয় নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে যেসব ছিটমহলবাসী বাংলাদেশের নাগরিকত্ব বহাল রেখে ভারত ছেড়ে বাংলাদেশে ফিরে যেতে চান, তাঁদের ৬ জুলাই থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত সময়ে ফরম পূরণ করে জানাতে হবে। ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে তাদের প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে হবে। এই সময়ের মধ্যেই এক দেশ থেকে অন্য দেশে যেতে ইচ্ছুক ছিটমহলবাসীদের প্রয়োজনীয় ট্রাভেল পাস ইস্যু করা হবে। যেসব ছিটমহলবাসী বাংলাদেশে ফিরে যেতে চান, তাঁরা চিলাহাটি-হলদিবাড়ি, বুড়িমারি-চ্যাংড়াবান্ধা, সাহেবগঞ্জ-বাগবন্দর সীমান্ত পথ দিয়ে বাংলাদেশে ফিরে যেতে পারবেন।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, যাঁরা বাংলাদেশ যাবেন, তাঁরা টাকা-পয়সাসহ অস্থাবর সব সম্পত্তি সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবেন। ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে নিজ নিজ এলাকার জেলা প্রশাসকের অনুমতিক্রমে জমি বিক্রি করা যাবে। সরেজমিনে এই প্রতিনিধি ছিটমহলে দেখেন, ছিটমহলবাসীর হাতে হাতে ফিরছে এই বিজ্ঞপ্তি। কোন্‌ দেশে থাকবেন, কী করা দরকার—এসব নিয়ে চলছে শলাপরামর্শ।

Tuesday, June 30, 2015

পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশে পুরোনো রেলপথে ট্রেন চালুর দাবি by অমর সাহা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের চ্যাংড়াবান্ধা রেলস্টেশন।
কাছেই বাংলাদেশের বুড়িমারি। ছবি: ভাস্কর মুখার্জি
ব্রিটিশ থেকে পাকিস্তান আমল পর্যন্ত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের আটটি রেলপথ ছিল। ভারত ভাগ হয়ে যাওয়া, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ ও বৈরিতার কারণে এসব রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এই পথে ট্রেন চলাচলের দাবি ওঠে।
এই দাবির প্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে ঢাকা ও কলকাতার মধ্যে প্রথম চালু হয় মৈত্রী ট্রেন। এখনো কলকাতা থেকে গেদে ও দর্শনা সীমান্ত পথে সপ্তাহে চার দিন চলছে এই যাত্রীবাহী ট্রেন। পরবর্তী সময়ে বনগাঁ বেনাপোল পথে চালু হয় পণ্যবাহী ট্রেন। দুই দেশের মধ্যে এ ছাড়া আরেকটি পথে, রোহনপুর-সিংঘাবাদ রেলপথে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করে। বাকি সেই পাঁচটি রেলপথে এখনো চালু হয়নি পণ্যবাহী বা যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল।
এই রেলপথগুলোর মধ্যে প্রথমটি হলো, বিরল-রাধিকাপুর। আগে এই পথে পণ্যবাহী ট্রেন চলত। ২০০৫ সালের পর থেকে এটা বন্ধ। শাহবাজপুর-মহিশাসন রেলপথে ১৯৯৬ সাল থেকে কোনো ট্রেন চলছে না। তৃতীয় পথটি হলো চিলাহাটি-হলদিবাড়ি। ১৯৬৫ সাল থেকে এই পথে ট্রেন চলাচল বন্ধ। চতুর্থত বুড়িমারি-চ্যাংড়াবান্ধা রেলপথ। এই পথে দেশভাগের পর থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। পঞ্চম পথ হলো আগরতলা-আখাউড়া রেলপথ। এই রেলপথেও দেশভাগের পর থেকে আর কোনো ট্রেন চলছে না।
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন এলাকা থেকে এই পাঁচটি রেলপথ আবার চালুর দাবি উঠেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার করা এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণে ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ও কোচবিহারের সাবেক বিধায়ক সৌমেন্দ্র নাথ দাস এই পথে আবার ট্রেন চালুর দাবি জানিয়েছেন। প্রথম আলোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক সুগভীর। দুই দেশের পুরোনো এই রেলপথগুলো চালু হলে যাত্রী চলাচলের পাশাপাশি পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করবে। এভাবে দুটি দেশই শিল্পে আরও সমৃদ্ধ হতে পারবে। তিনি দুই দেশের সরকারের কাছেই এই দাবি জানিয়েছেন।

Sunday, June 28, 2015

‘আর নয় ছিটবাসী এবার আমরা বাংলাদেশি’ by অমর সাহা ও এ বি সফিউল আলম

তিনবিঘা করিডরে গতকাল ছিটমহল সমন্বয় কমিটির
আয়োজনে কাঁটাতারের বেড়ার দুই পাশে যৌথ সমাবেশে
যোগ দেন দুই দেশের ছিটমহলবাসী l ছবি: প্রথম আলো
লালমনিরহাটের পাটগ্রামে তিনবিঘা করিডর এলাকায় গতকাল শুক্রবার বাংলাদেশ-ভারতের ছিটমহলের বাসিন্দারা আনন্দ মিছিল ও যৌথ সমাবেশ করেছে। এই আয়োজনে আনন্দে মেতেছিল ছিটমহলবাসী। কাঁটাতারের বেড়ার দুপাশে দুই দেশের পতাকা হাতে হাজারো মানুষের স্লোগানে প্রকম্পিত হয় তিনবিঘা করিডরের আকাশ। বাংলাদেশের পাড় থেকে হাজারো কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, ‘আর নয় ছিটবাসী, আমরা এখন বাংলাদেশি’। আবার ভারতের পাড় থেকে ধ্বনিত হয়, ‘আর নয় ছিটবাসী, আমরা এখন ভারতবাসী’। বাংলাদেশ-ভারত স্থলসীমান্ত চুক্তি হওয়ার পর গতকালই প্রথম দুই দেশের ছিটমহলবাসী একত্র হয় তিনবিঘা করিডরে। ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির ভারত ও বাংলাদেশ ইউনিট এই সমাবেশ এবং মিছিলের আয়োজন করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা দুইটায় করিডর এলাকায় যৌথ সমাবেশ শুরু হয়। তার আগে সমন্বয় কমিটির বাংলাদেশ ইউনিটের সভাপতি মইনুল হক ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফার নেতৃত্বে বাংলাদেশের ভেতরের ১১১টি ছিটমহলের হাজারো বাসিন্দা মিছিল নিয়ে করিডরের পূর্ব গেটের কাঁটাতারের বেড়ার পাশে বটতলায় যৌথ সমাবেশে মিলিত হয়।
করিডরের উত্তর দিক থেকে সমন্বয় কমিটির ভারত ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক সৌম্য দাস ও ছিটমহলের অন্যতম সমন্বয়ক দীপ্তিমান সেনগুপ্তের নেতৃত্বে ভারতের ভেতরে থাকা ৫১টি ছিটমহলের হাজারো মানুষ মিছিল নিয়ে সমাবেশে যোগ দেয়।
সীমান্ত চুক্তি করা এবং ছিটমহল বিনিময়ের উদ্যোগ নেওয়ায় উভয় দেশের সরকারপ্রধানসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে বক্তব্য দেন সমন্বয় কমিটির নেতারা। তাঁরা ছিটমহলের মানুষের নাগরিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করার দাবি জানান। দীপ্তিমান সেনগুপ্ত বলেন, এত দিন একটি ভারতের সঙ্গে ১১১টি টুকরা ভারত ছিল, আর একটি বাংলাদেশের সঙ্গে ৫১টি টুকরা বাংলাদেশ ছিল। এখন হয়ে গেল একটি ভারত ও একটি বাংলাদেশ।
সমাবেশে ‘জয় বাংলা, জয় ইন্দিরা-মুজিব’, ‘জয় নরেন্দ্র মোদি-শেখ হাসিনা, জয় মমতা ব্যানার্জি’ বলে স্লোগান দেওয়া হয়।
এই উৎসবে যোগ দেওয়া ভারতের ভেতরে থাকা বাংলাদেশি ছিটমহলের বাসিন্দা আইনুল হক, সালমা বেগম, সুফিয়া বিবিসহ কয়েকজন জানালেন, চুক্তি হয়ে তাঁরা খুশি। তাঁরা বাংলাদেশে যাবেন না। ভারতের মাটিতেই থাকবেন ভারতীয় হিসেবে।
সুলতানা কামালের সংহতি: তিনবিঘা করিডরের যৌথ সমাবেশে সংহতি প্রকাশ করেন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা সুলতানা কামাল। করিডর পরিদর্শন শেষে গতকাল বিকেলে সেখানে এক পথসভায় তিনি বলেন, ‘ছিটমহল সমস্যা সমাধানে দুই দেশের সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। আর মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রশ্নে বিভিন্ন সংগঠন সজাগ রয়েছে। ... কোথাও কোনো সমস্যা হওয়ার সুযোগ নেই।’ তিনি বলেন, ‘আপনাদের বিজয় আপনাদেরই ধরে রাখতে হবে। কোনো দুষ্ট চক্রের কথায় কান দেওয়া যাবে না।’
এর আগে সুলতানা কামাল তিনবিঘা করিডরের ক্রসিং পয়েন্টে উভয় দেশের ছিটমহলের নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

Friday, May 15, 2015

ছিটমহলে সূর্যোদয় by অমর সাহা

কোচবিহারের মশালডাঙ্গা ছিটমহলের বাসিন্দারা
ধীরে ধীরে মেঘ কাটছে। সূর্যের রঙিন আলো এসে পড়েছে ছিটমহলে। আর সেই আলোয় স্নাত হচ্ছে ছিটমহলের হাজারো মানুষ।
কত দিন মেঘে ঢাকা ছিল এই ছিটমহলগুলো। সেই ভারতের ভূখণ্ডে থাকা ৫১টি আর বাংলাদেশের ভূখণ্ডে থাকা ১১১টি ছিটমহল। দীর্ঘদিনের আন্দোলনের পর অবশেষে এই ছিটমহলবাসীর দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে ভারতের আইনসভার দুটি কক্ষ রাজ্যসভা ও লোকসভায় ৬ ও ৭ মে পাস হয়ে যায় ছিটমহল বিনিময়ের লক্ষ্যে ভারতীয় সংবিধান সংশোধনী বিল।
এই বিল পাস হওয়ার পর নব জন্মলাভ করেন ছিটমহলের বাসিন্দারা। এখন তাঁরা নতুন করে জীবন উপভোগের স্বপ্ন দেখা শুরু করেছেন, যা ছিল তাঁদের কাছে একসময় স্বপ্ন; এবার তা বাস্তবের পথে। তাঁরা পাবেন নাগরিকত্ব। ভোটার পরিচয়পত্র, রেশন কার্ড। আর তাঁদের অন্য দেশের বেষ্টনীর মধ্যে পরগাছা হয়ে থাকতে হবে না। পাবেন মুক্ত আকাশ, মুক্ত বিহঙ্গের মতো স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার অধিকার।
১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের পর থেকে এক মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে দুই দেশের ১৬২টি ছিটমহলের বাসিন্দারা নাগরিকত্ব অধিকারহীন একটি স্বাধীন দেশেই বাস করে আসছেন। ইতিমধ্যে ছিটমহলবাসীর পুনর্বাসনের লক্ষ্যে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের দেওয়া ৩ হাজার ৮ কোটি রুপির প্যাকেজ মেনে নেওয়ার কথা বলেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ।
কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে সত্যিই কি দুই দেশের ছিটমহলের সব বাসিন্দা ফিরে যাবেন নিজ নিজ দেশে? কথা হচ্ছিল ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সহসম্পাদক দীপ্তিমান সেনগুপ্তর সঙ্গে। তাঁর দাবি, ভারতের ভূখণ্ডে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহলের বাসিন্দারা কেউই আর ফিরে যাবেন না বাংলাদেশে। এই ৫১টি ছিটমহলে রয়েছে ১৪ হাজার ২১৫ জন বাংলাদেশি মানুষের বাস। অন্যদিকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে থাকা ১১১টি ভারতীয় ছিটমহলে রয়েছে ৩৭ হাজার ৩৬৯ জন ভারতীয় নাগরিকের বাস। তাঁদের মধ্য থেকে মাত্র ১৪৯টি পরিবারের ৭৪৩ জন বাসিন্দা ভারতে এসে বসবাস করতে চান। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ থেকে সব ছিটমহলবাসীও যদি ভারতে এসে থাকতে চান, তবে তাঁদের পুনর্বাসন করবে ভারত সরকার। কিন্তু তাঁরা সম্ভবত আসবেন না। দীর্ঘদিন ধরে ওখানকার মাটির সঙ্গে তাঁদের যে ভালোবাসা গড়ে উঠেছে, সেই মাটির টান ত্যাগ করে এখনই ফিরতে নাও পারেন তাঁরা। তবু ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি বাংলাদেশ থেকে ফিরে আসা ছিটমহলবাসীর পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১০০ একর জমি চিহ্নিত করে রেখেছে। সরকার চাইলে এখানেই পুনর্বাসনের জন্য আবাস তৈরি করে দিতে পারবে।
কথা বলছিলাম, ভারতীয় ভূখণ্ডে থাকা বাংলাদেশের ছিটমহলের বাসিন্দা সাহেব আলী, গোবিন্দ বর্মণ, আলাউদ্দিন মিয়া ও অরুণ কুমার রায়ের সঙ্গে। তাঁরা সবাই এক বাক্যে জানালেন, তাঁরা কাগজ-কলমে বাংলাদেশের নাগরিক হলেও বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবেননি। এই মাটিতেই থাকতে চান তাঁরা। তাঁদের এটুকু শান্তি যে তাঁরা ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন। ভোটার পরিচয়পত্র পাবেন। রেশন কার্ড পাবেন। এবার তাঁরা আর গোপনে নয়, জাল কাগজপত্র দিয়েও নয়, এবার তাঁরা প্রকৃত ভারতীয় নাগরিক হিসেবে এখানকার হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারবেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে পারবেন। বাড়িতে বিদ্যুৎ–সংযোগ নিতে পারবেন। এই আনন্দই তাঁদের নতুন জীবনের স্বপ্নকে আরও উজ্জীবিত করেছে। নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখাচ্ছে।
মূলত ভারতের ভূখণ্ডে থাকা ৫১টি বাংলাদেশি ছিটমহলের অবস্থান পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলায়। এসব ছিটমহলের বাসিন্দাদের যন্ত্রণার কথা স্বাধীনতা-উত্তর কাল থেকে ছিটমহলবাসী নিজেদের হৃদয়ে আঁকড়ে ধরে রাখলেও এই ছিটমহলবাসীর নাগরিকত্ব দেওয়ার দাবিতে মূলত আন্দোলন জোরদার হয় ১৯৯৪ সাল থেকে।
তৎকালীন বিধায়ক প্রয়াত দীপক সেনগুপ্ত ভারত-বাংলাদেশ ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটি গড়ে আন্দোলন জোরদার করেন। ছিটমহলবাসীর কাছ থেকে দাবি ওঠে, দিতে হবে তাঁদের নাগরিকত্ব। যেহেতু এই ১৬২টি ছিটমহলের বাসিন্দারা হয়তো বাংলাদেশের, নয়তো ভারতের নাগরিক। কিন্তু কোনো দেশের সরকারই ছিটমহলবাসীর এই দাবির প্রতি সদয় ছিল না। কিন্তু সমন্বয় কমিটির আন্দোলনের জেরে দুই দেশের সরকার উভয় দেশের ছিটমহলে জরিপ করে। সেই জরিপে উঠে আসে ছিটমহলে উভয় দেশের বাসিন্দাদের তালিকা, তাঁদের চাওয়া-পাওয়া। ভারতের ভূখণ্ডের বেষ্টনীতে থাকা ৫১টি ছিটমহলের বাসিন্দা বাংলাদেশের হলেও তাঁরা যেতে পারেন না তাঁদের নিজ দেশ বাংলাদেশে। একই চিত্র কিন্তু বাংলাদেশের বেষ্টনীর মধ্যে থাকা ভারতীয় ছিটমহলগুলোর বাসিন্দাদেরও। ফলে দুই দেশের ছিটমহলবাসী অন্য দেশে পরগাছা হিসেবেই বাস করছেন দীর্ঘকাল ধরে।
এসব কথা মাথায় রেখেই উভয় দেশ ছিটমহল বিনিময়ের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু এই ডাকে কতজন সাড়া দেবেন, সে ব্যাপারে শঙ্কায় আছেন ছিটমহল আন্দোলনের কর্মকর্তারা। তাঁরাই বলেছেন, এখন ভারতের ভূখণ্ডে থাকা ৫১টি ছিটমহলের বাসিন্দারা বাংলাদেশে ফিরে যেতে চাইছেন না। পাশাপাশি বাংলাদেশের ভূখণ্ডে থাকা ভারতীয়রাও ফিরে আসতে চাইছেন অল্পসংখ্যক।
কিন্তু এই পরিস্থিতিও বদলে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের মতে, পশ্চিমবঙ্গে পুনর্বাসনের প্যাকেজ যদি লোভনীয় হয়, আয়ের পথ যদি সুগম হয়, বেঁচে থাকার গ্যারান্টি যদি জোরালো হয়, চাকরিবাকরি এবং আবাসনের সুযোগ-সুবিধা যদি আকর্ষণীয় হয়, তবে সমন্বয় কমিটির এই হিসাব পাল্টে যেতে পারে। আর পাল্টে যাবে এই ধারণা নিয়ে শরণার্থীদের পুনর্বাসনের প্যাকেজের জন্য খরচ ধরেছে সর্বমোট ৩ হাজার ৮ কোটি ৮৯ লাখ রুপি। এর মধ্যে ৭৭৫ কোটি রুপি ধরা ধরেছে স্থায়ী পরিকাঠামো নির্মাণের জন্য। আর বাকি ২ হাজার ২৩৩ কোটি ৮৯ লাখ রুপি ধরা হয়েছে পরিবর্তনশীল খরচের জন্য।
অর্থাৎ ওপার থেকে মানুষ কম এলে খরচ কম হবে। আর বেশি এলে বেশি খরচ। এখন শুধু অপেক্ষা করে থাকা, কত মানুষ আসছে ওপার থেকে আর কত মানুষ যাচ্ছে এপার থেকে?
অমর সাহা, প্রথম আলোর কলকাতা প্রতিনিধি।