Showing posts with label WikiInterview. Show all posts
Showing posts with label WikiInterview. Show all posts

Saturday, December 19, 2015

গণতন্ত্রই সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সরকারব্যবস্থা -সাক্ষাৎ​কারে : কৌশিক বসু by শওকত হোসেন

কৌশিক বসু, সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও
প্রধান অর্থনীতিবিদ, বিশ্বব্যাংক
বিশ্বব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ কৌশিক বসু বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রশংসা তো করেছেনই, জানিয়েছেন বিশ্বব্যাংকে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতার কথাও। বলেছেন দুর্নীতি, সুশাসন ও সরকারব্যবস্থা নিয়েও। জানিয়েছেন উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্রের প্রয়োজনীয়তার কথা। গণতন্ত্রকে ধরে রাখার পরামর্শও দিলেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন শওকত হোসেন
প্রথম আলো: অর্থনীতিবিদই হতে চেয়েছিলেন?
কৌশিক বসু: অর্থনীতিতে আমার আসাটা অপ্রত্যাশিত ছিল। কারণ, আমার বাবা আইনজীবী ছিলেন এবং ছোটবেলা থেকেই মানুষ হয়েছি যে বড় হয়ে আইনজীবী হব। আমাকে আইন পড়তে ইংল্যান্ডে পাঠানো হয়েছিল। কথা ছিল গোড়ায় একটু অর্থনীতি পড়ে তারপর আইন পড়ব। কিন্তু তখন আমার ওপর বিরাট একটা প্রভাব ফেলল অমর্ত্য সেনের লেকচার। তিনি তখন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে পড়াচ্ছেন। অভূতপূর্ব অমর্ত্যদার লেকচার। সেই লেকচার শুনে এত বেশি উৎসাহ পেলাম যে সিদ্ধান্ত নিলাম অর্থনীতিই পড়ব। সেই থেকে অর্থনীতিতেই আমার ক্যারিয়ার। গোড়ার দিকে দিল্লি স্কুল অব ইকোনমিকসে অনেক বছর। এরপর আমেরিকায় চলে আসি। তারপর আবার ভারতে ফিরে এলাম। তখনকার দিনে কিন্তু পিএইচডি করে তেমন কেউ ফিরত না। আমি সেই স্বল্প কয়েকজনের একজন, দেশে ফিরে এসেছিলাম। এই হচ্ছে আমার অর্থনীতিতে আসার গল্প।
প্রথম আলো: একজন বাঙালি অর্থনীতিবিদ হিসেবে বিশ্বব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে আপনার কাজ করার অভিজ্ঞতাটি কেমন?
কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকে খুবই ভালো অভিজ্ঞতা আমার। তিন বছর ধরে এখানে কাজ করছি। একটা হচ্ছে বৈশ্বিক সংযোগ, যেটা আমি খুব উপভোগ করি। বিভিন্ন দেশে যাওয়া, বিভিন্ন ধরনের মানুষের সঙ্গে কথা বলা। আমি একবার লিখেছিলামও যে আমার ভেতরে অর্থনীতির সঙ্গে নৃতত্ত্বের একটা দ্বন্দ্ব কাজ করে। কারণ, একজন নৃতাত্ত্বিক গ্রামে গিয়ে বসে থাকে। বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। এটা আমার সব সময়ই খুব ভালো লাগে। বিশ্বব্যাংকে এসে সেই অভিজ্ঞতাটি পাচ্ছি। বিভিন্ন দেশে গিয়ে তাদের নীতি নিয়ে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে কথা বলা, গল্প করা—এসব তো মজাই। বাংলাদেশে আসাটা ভিন্ন কিছু না আমার জন্য, কারণ পাশের কলকাতায় মানুষ হয়েছি। কিন্তু মাঝে মাঝে যখন ছোট্ট একটা দ্বীপরাষ্ট্রে চলে যাই, সাব-সাহারান আফ্রিকার কোনো দেশে যাই, সেটা একদম অন্য ধরনের পরিস্থিতি, তখনকার সেই অভিজ্ঞতা অন্য রকম। এর সঙ্গে দৈনন্দিন প্রশাসনিক চাপ তো আছেই। এটা হচ্ছে এসব সুবিধা পাওয়ার একটা মূল্য।
বিশ্বব্যাংকের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. কৌশিক বসু ২০১২ সালে বিশ্বব্যাংকে যোগ দেওয়ার আগ পর্যন্ত ভারত সরকারের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ছিলেন। এর আগে পড়িয়েছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস ও কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে। ১৯৫২ সালে কলকাতায় তাঁর জন্ম।
প্রথম আলো: আপনি যখন অর্থনীতিবিদ ছিলেন, তখন একরকমভাবে বিশ্বব্যাংককে দেখেছেন, হয়তো সমালোচনাও করেছেন। আবার প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করার সময় আরেকভাবে দেখেছেন। এখন আপনি নিজেই বিশ্বব্যাংকে কাজ করছেন। অভিজ্ঞতাগুলো কী রকম?
কৌশিক বসু: আমি জানি, বিশ্বব্যাংক বিশাল একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান। এর ভেতরে তার একটি রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকবে। আমি যখন ভারতে কাজ করি, তখন কিন্তু বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আমার অনেক কথাই হতো। আমি অনেক কিছু জানতে চাইতাম। ব্রাজিলে একটা পরীক্ষা-নিরীক্ষা কীভাবে হয়েছে, সেটা জানতে চাইতাম। এ ব্যাপারে আমার পরিষ্কার ধারণা ছিল যে এটা একটা অনেক বড় কার্যকরী প্রতিষ্ঠান এবং আমি তাদের সঙ্গে সেই সম্পর্কটাই রাখব।
প্রথম আলো: ক্যারিয়ারের শুরুতে কখনো বিশ্বব্যাংকে কাজ করতে চাননি?
কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে কিন্তু আমার প্রথম কথাবার্তা হয়েছিল আরও আগে, যখন আমি পিএইচডি শেষ করি। বিশ্বব্যাংকে ইয়াং প্রফেশনাল নামে একটি কর্মসূচি আছে, সেখানে গেলে সারা জীবনের জন্য চাকরি হয়ে যায়। আমি আবেদন করলাম। ইন্টারভিউতে ডাকল। শেষ রাউন্ডের ইন্টারভিউ হলো প্যারিসে। বিশ্বব্যাংকের চাকরি বলে আমার বাবা-মা খুব উত্তেজনার মধ্যে ছিলেন। আমি যদিও খুব বেশি উত্তেজনার মধ্যে ছিলাম না। পেলে ভালো, না পেলে না। চাকরি কিন্তু পেলাম না। পাস করতে পারলাম না শেষ ইন্টারভিউতে। আমি এখন সত্যি মনে করি, জীবনের কিছু কিছু ব্যর্থতা আশীর্বাদও হয়।
আমি আপাদমস্তক একজন গবেষক। যদি বিশ্বব্যাংকের ওই চাকরিতে চলে যেতাম, তাহলে এটা আর হতো না। তাহলে পুরো চাকরিজীবন আমার আরেক ধরনের হতো। আমি যা করেছি সত্যিই আমি উপভোগ করতাম। আমার কাছে পেপার লেখা বা ক্লাসরুম লেকচার দেওয়া সত্যি দারুণ আনন্দদায়ক। আমি আমার নিজে ছেলেমেয়েদেরও বলি যে আমি ভাগ্যবান। কারণ, আমি যা করতে ভালোবাসি, তা করতে পেরেছি। একটা চাকরি ভাগ্যে পাইনি, আর আইনটা যদি পড়তাম, তাহলে কলকাতাতেই থেকে যেতাম, পৈতৃক আইন পেশারই হয়তো চর্চা করতাম।
প্রথম আলো: একাধিকবার আপনার লেখায়, বক্তৃতায় বলেছেন আপনি গবেষণাকেই বেশি পছন্দ করেন। আর গবেষণা হচ্ছে একটা খেলার মতো, অনেকে হয়তো একই বিষয় নিয়ে কাজ করছে, কিন্তু সবার আগে যিনি কাজটা শেষ করতে পারবেন তিনিই বিজয়ী। এটা কি এখন মিস করেন?
কৌশিক বসু: আমার কাছে গবেষণাটা মনে হয়, এটা একটি লজিক। আমি এতে আগ্রহ পাই। অমর্ত্যদার গোড়ার কাজ ছিল পুরোপুরি লজিকনির্ভর। তিনি গাণিতিক লজিক ব্যবহার করতেন অর্থনীতিতে। এটা আমার প্যাশন। সেটা আমি উপভোগ করতাম এবং এখন মিস করি। তবে ভাগ্য ভালো যে বিশ্বব্যাংকে একটা বড় গবেষণা বিভাগ আছে। তারা আমার অধীনে। যদিও এমন নয় যে আমি তাদের সঙ্গে বসে গবেষণা করতে পারছি। আবার কিছু কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের আমি শ্রদ্ধা করি, তাঁদের সঙ্গে কিন্তু আমি এখন কাজ করতে পারছি। এ জন্য ওয়াশিংটনকে ধন্যবাদ দেব। সম্প্রতি আমি জোসেফ স্টিগলিজের সঙ্গে কাজ করেছি। ইউরো জোন-সংকট কীভাবে ভালোভাবে মোকাবিলা করা যায়, তার একটি অংশ নিয়ে একটা পেপার লিখেছি। এখানেও আমরা আবার ‘গেম থিউরি’ ও গেম থিউরির লজিক ব্যবহার করেছি। তারপরেও বলব, গবেষণাকে আমি অনেক মিস করি এটাই সত্য।
প্রথম আলো: শুনেছি, আপনার কাজ প্রসঙ্গে আপনার মাকে নিয়েএকটা মজাদার স্মৃতি আছে?
কৌশিক বসু: এই অংশটা মজাদার। আমি লিখেছিও। আমার মা মারা যান ৯১ বছর বয়সে। শেষ দুই বছর মা শব্দ একটু গুলিয়ে ফেলতেন। একবার আমি কলকাতায় এসে মাকে বললাম যে একটা কনফারেন্সে যাচ্ছি। আর মাকে যেমন বাড়িয়ে-টাড়িয়ে বলতে হয় সে রকমভাবে খুশি করতে বললাম, সারা বিশ্বের বড় বড় ইকোনমিস্ট আসছেন। আমাকেও যেতে হবে। তারপর শুনি, মা কাকে যেন বলছে আমার ছেলে খুব ভালো করছে, একটা কনফারেন্সে যাচ্ছে, যেখানে সারা পৃথিবীর কমিউনিস্টরা আসবে।
প্রথম আলো: এবার একটু বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আসি। আপনি ২২ বছর পর বাংলাদেশে এলেন। এসে অনেক প্রশংসাও করছেন। আপনার এত প্রশংসার ভিত্তি কী?
কৌশিক বসু: একটা বিষয় আছে যে নিজেদের লোকেরা অনেক বেশি সমালোচনা করেন। ভারতেও সেটা দেখি। এর মাধ্যমে সরকার বা নীতিনির্ধারকেরা কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়তে বাধ্য হন। এটা ভালো। তবে এখানে এসে আমার নিজের যা মনে হয়েছে সেটাই বলেছি। কেবল একজন বাঙালি বলে নয়, আমি ওয়াশিংটনে বসে পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখেছি। আমার ওখানে প্রসপ্রেক্টস গ্রুপ নামে একটি বিভাগ আছে। তাদের ডেকে আমি বাংলাদেশের তথ্য-উপাত্ত ঘাঁটছিলাম। তারাও আমাকে জানাল যে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এখন খুব কম জায়গায়ই হচ্ছে। দক্ষিণ আমেরিকায় প্রবৃদ্ধি এখন ১ শতাংশেরও কম। ব্রাজিলে মাইনাস ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ভেনেজুয়েলাতেও নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি। জাপানে তৃতীয় প্রান্তিকে নেগেটিভ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফিনল্যান্ডে আমি ছিলাম, তারই ভেতরে নেগেটিভ প্রবৃদ্ধির খবর এল। বিশ্বব্যাপী এ রকম এক মন্দার সময়ে সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অবশ্যই উল্লেখ করার মতো। এটা এখানকার লোকদেরও বোঝা দরকার। তাদেরও প্রশংসা করা উচিত। কার জন্য হচ্ছে সেটা জানি না, কিন্তু এটা অবশ্যই বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি।
আমাদের নিজস্ব প্রাক্কলন হচ্ছে আগামীবার বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৭ শতাংশ, যা হবে চীনের প্রবৃদ্ধির সমান। পাঁচ বা সাত বছর আগেও ভাবা যেত না যে প্রবৃদ্ধির দিক থেকে চীনের সঙ্গে পাল্লা দেবে বাংলাদেশ। ভারতের প্রবৃদ্ধি আরও বেশি হবে। বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্র কিন্তু অনেকটাই বদলে যাচ্ছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশের মানুষের আশাবাদী হওয়ার কারণ আছে। আবার একটা কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই আশাবাদটা আমি দিতেও চাই। কারণ, এটা একসঙ্গে কাজ করার অনুপ্রেরণা জোগায়, উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগ্রহ জন্ম দেয়।
প্রথম আলো: বাংলাদেশের অর্থনীতির অগ্রগতির বাধা প্রসঙ্গে আপনি জঙ্গিবাদ নিয়ে সতর্ক থাকতে বলেছেন। রাজনৈতিক কিছু সমস্যার কথাও বলেছেন। একটু ব্যাখ্যা করবেন?
কৌশিক বসু: পৃথিবীর অনেক জায়গাতেই এখন রাজনৈতিক ঝুঁকি দেখা দিচ্ছে। আমরা বিশ্বব্যাংক থেকে ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে দেখছি যে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম আরও কমে গেলে এর কিছু প্রভাব পড়বে। চীনের অর্থনীতির গতি শ্লথ হলে এর ফলাফল হবে। কিন্তু এখন রাজনৈতিক ঝুঁকিটাকেই উচ্চমাত্রায় বিবেচনা করা হচ্ছে। এই ঝুঁকি সব দেশের জন্যই। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে আলাদা কোনো জায়গায় নেই। কিন্তু অবশ্যই অনেক সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) কমে যেতে পারে, যদি সন্ত্রাসবাদের ঝুঁকি থাকে। ভারতকে এ জন্য চিন্তা করতে হবে, বাংলাদেশকেও চিন্তা করতে হবে। সচেতন থাকতে হবে। তবে ভাগ্য ভালো, এখন পর্যন্ত যে পরিস্থিতি তা অত্যন্ত স্থিতিশীল। হ্যাঁ, কিছু ঘটনা তো ঘটেছেই। সব দেশেই তা হয়। তবে অবশ্যই যতটা সম্ভব তা কমানো যায়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। তবে আমি বলব, সাধারণ মানুষদের বুঝতে হবে যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যুদ্ধ কেবল সরকারকে দিয়ে হয় না। সাধারণ মানুষেরা যদি অনুভব করে যে সমাজ আগালেও সন্ত্রাসবাদ তা নষ্ট করে দিতে পারে,তাহলে সাধারণ মানুষদেরও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সেই যুদ্ধে যুক্ত হতে হবে। তাহলেই এর ঝুঁকি কমবে। সাধারণ মানুষের প্রতি আমার এটাই পরামর্শ। আর হ্যাঁ, দুর্নীতির মাত্রা নিয়ে মানুষেরা অনেক রেগে যায়। রাগার কথাও। তাই বলে পুরো দেশটাই যে নষ্ট হয়ে গেছে তা নয়। দুর্নীতিবাজদের ধরতে হবে, ব্যবস্থাও নিতে হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধের যুদ্ধটাও চালিয়ে যেতে হবে।
প্রথম আলো: গণতন্ত্রের সঙ্গে উন্নয়নের সম্পর্কটা তাহলে আপনি কীভাবে দেখেন?
কৌশিক বসু: আমার মতামত অমর্ত্যদার কাছাকাছি, তবে একদমই এক নয়। একনায়ক বা ‘ডিকটেটরিয়াল কন্ট্রোল’ যেসব দেশে আছে, সেখানে অভিজ্ঞতাটা বিভিন্ন রকমের দেখা গেছে। কোনো কোনো দেশ খুবই ভালো করছে, আবার পুরোপুরি বিপর্যয়ও হয়। সুতরাং এ ক্ষেত্রে ঝুঁকি ও বিপদ দুটোই।
এ ক্ষেত্রে প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, আমার এই চাকরির একটা আনন্দ যে অনেক চমকপ্রদ মানুষের সঙ্গে দেখা হয়। নিকারাগুয়ার বিপ্লবী নেতা ও প্রেসিডেন্ট ড্যানিয়েল ওর্তেগার সঙ্গে মানাগুয়াতে দেখা করেছিলাম। আমিই তাঁর সাক্ষাৎ চেয়েছিলাম। বলেছিলাম সামোজা সরকারের বিরুদ্ধে সান্দানিস্তাদের সংগ্রাম নিয়ে ছাত্রজীবনে আমার খুব আগ্রহ ছিল। এ কারণে সান্দানিস্তার সেই বিপ্লবী নেতার সঙ্গে কথা বলতে চাই। তারপর তাঁর সঙ্গে কথা হয়েছিল। নিকারাগুয়ায় একনায়ক সামোজা সরকারের সময়ে কিন্তু বিপর্যয় ঘটেছিল। পুরো দেশ বড় সংকটে পড়ে গিয়েছিল। এ রকম প্রচুর উদাহরণ আছে।
আবার কিছু কিছু দেশ আছে, যাদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত শক্ত এবং তারা ভালো করছে। চীন এ রকম একটি বড় উদাহরণ। তাদের সরকার অনেক শক্তিশালী এবং করছেও অনেক ভালো। আরেকটি উদাহরণ সিঙ্গাপুর। কিন্তু যদি বেছে নিতে বলা হয়, তাহলে বেছে নেওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। সেটা ঠিক হবে না। কারণ, বেশির ভাগ সময় দেখা যায়, গণতন্ত্র ছাড়া শক্ত নিয়ন্ত্রণ পুরো দেশকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যায়। ১৯৬০ পর্যন্ত উত্তর কোরিয়ার প্রবৃদ্ধি মন্দ ছিল না। তারপরে তা বিশ্রী কাণ্ড হয়ে গেল।
আমি এ ব্যাপারে খুবই দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই যে গণতন্ত্রই একমাত্র কাঙ্ক্ষিত বিষয়। উন্নয়নের জন্য সরকার ও মানুষকে অবশ্যই গণতন্ত্রকে ধরে রাখতে হবে। গণতন্ত্রে অনেক সমস্যা আছে। প্রথমত, নীতি সংস্কার ঝটপট করা যায় না। ভারতে কাজ করে দেখেছি, সবারই একটা মতামত আছে। একটা নীতি বদল করতে গেলে চারদিক থেকে বিভিন্ন মতামত আসে। কিন্তু আমি তখন সরকারকে বলতাম, এটা একটা সমস্যা বটে কিন্তু এর মধ্যেই থাকতে হবে। আর মানুষকেও বলা, তাদেরও দায়িত্বপূর্ণ হতে হবে। সবকিছুতে বাধা দিয়ে সরকারকে থামিয়ে দিলে দেশ অচল হয়ে যাবে। গণতন্ত্র এমনই একটা জিনিস, যা আস্তে আস্তে পরিপক্ব হয়। আমি যখন স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর দিকে তাকাই, তখন মনে হয় অনেক দিক থেকেই তাদের গণতন্ত্র অনেক পরিপক্ব। সেখানেও অনেক বিতর্ক হয়, সমালোচনা হয়। কিন্তু তারপরেও পুরো সমাজ তাতে অংশ নেয় এবং এর মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। সুতরাং কোনো প্রশ্নই নেই যে গণতন্ত্রই হচ্ছে বিশ্বের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সরকারব্যবস্থা।
প্রথম আলো: আবার বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রসঙ্গে আসি। আপনি বাংলাদেশের বিনিয়োগ হারের প্রশংসা করেছেন। অথচ দেখছি বেসরকারি বিনিয়োগ ১০ বছর ধরেই এক জায়গায়, ২২ শতাংশে স্থির হয়ে আছে। সরকার নিজের বিনিয়োগ বাড়িয়ে সেটিকে জিডিপির ২৯ শতাংশে নিয়ে গেছে। যদিও এই বিনিয়োগের গুণগত মান নিয়ে বিশ্বব্যাংকেরই বড় ধরনের অভিযোগ আছে।
কৌশিক বসু: দেখুন, সাড়ে ৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি কিন্তু যথেষ্ট ভালো। এটাও সত্যি, বাংলাদেশের পক্ষে ৮ শতাংশে যাওয়া সম্ভব। আমার তো ধারণা, বিনিয়োগের হার ৩২-৩৩ শতাংশে এসে গেলে প্রবৃদ্ধিও বেড়ে যাবে। এর মধ্যে যদিও বিশ্ব অর্থনীতির ওঠানামার সঙ্গে একটা সম্পর্ক থাকবেই। তবে দীর্ঘ মেয়াদে তা বাড়বে। আর সরকারি বিনিয়োগের কথা যা বললেন, ভারতেও কিন্তু তাই হয়েছে। ভারত বিনিয়োগের হার ৩০ শতাংশ অতিক্রম করল ২০০৩ সালে। তার চার-পাঁচ বছর আগ পর্যন্ত তা ২২-২৩ শতাংশে আটকে ছিল। এরপর চরচর করেগোটা কয়েক বছরে তা বেড়ে গেল। তখন সরকার সঞ্চয়ের ভূমিকায় চলে গেল, যা তারা আগে ছিল না। বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা কিন্তু মোটামুটি ভালো হচ্ছে। সরকার সঞ্চয় না করে বিনিয়োগকারীর ভূমিকায়। বেশির ভাগ দেশও তাই করে। তবে এখানে যে জায়গায় মনোযোগ দিতে হবে, তা হচ্ছে বৈদেশিক বিনিয়োগ আরও আনতে হবে। এখন জিডিপির ১ শতাংশ বিদেশি বিনিয়োগ আসছে, তা খুব খারাপ নয়। কিন্তু এই হার আরও বাড়িয়ে ২ বা ৩ শতাংশে আনা যেতে পারে। এ জন্য অবশ্যই অবকাঠামোকে আরও ভালো করতে হবে। বাইরে থেকে যারা আসছে তারা বিদ্যুৎ চায়, রাস্তা চায়, পথটা দিয়ে তাড়াতাড়ি যেতে চায়, ব্যবসার পরিবেশ অনেক ভালো চায়। যাতে আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলো আরও দ্রুত হয়।
আমি যখন ভারতে কাজ করতাম, তখন আগে উপনিবেশ হিসেবে ছিল, এ রকম দেশগুলোর সঙ্গে অনেক কথা বলেছি। মনে আছে অস্ট্রেলিয়ার রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে অনেক সময় কাটাতাম। সবাই উত্তরাধিকারসূত্রে একই ব্যবস্থা পেয়েছি। বাংলাদেশও পেয়েছে। কিন্তু ব্রিটেন নিজে সংস্কার করেছে। ওদের ফাইল চলার গতি অনেক দ্রুত। অস্ট্রেলিয়াও প্রচুর সংস্কার করেছে। অথচ আমরা সেই ঔপনিবেশিক চর্চা বদলাতে পারিনি। সুতরাং আমাদের এদিক থেকে দ্রুত আগাতে হবে, যাতে ফাইল দ্রুত আগায়। নীতি বদল করে এটা করা যায়। আবার আমাদের আমলাদের দিকেও মনোযোগ দিতে হবে, যাতে তারাও দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় শামিল হয়। সুতরাং বলতে পারি, অবকাঠামোর যদি আরও উন্নতি করা যায়, আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে বিনিয়োগ বাড়বে। কারণ, এখানে সস্তা শ্রমের বড় আকর্ষণ আছে। চীনের সেই সুবিধা কিন্তু চলে গেছে। সেখানে মজুরি বেড়ে যাচ্ছে। ভারতে মজুরি বাংলাদেশের চেয়ে কিছু বেশি হলেও ভারত আরও কয়েক বছর এই সুবিধা পেতে থাকবে। চীন যে জায়গাটা ছাড়বে সেটি এত বড় যে ভারত তো খুব ভালোভাবেই পাবে, বাংলাদেশও পাবে। এ ক্ষেত্রে কোনো প্রতিযোগিতা হবে না। দুই দেশই বিশ্বকে দিয়ে যেতে পারবে।
প্রথম আলো: আপনি আমলাতন্ত্র বা দুর্নীতির যে কথা বলছেন তা সুশাসনের অংশ। আগে বিশ্বব্যাংক এ নিয়ে অনেক সোচ্চার ছিল। কিন্তু এখন আর তেমন শোনা যায় না। বিশেষ করে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট বদলের পরে। আপনারা কি নীতির পরিবর্তন এনেছেন?
কৌশিক বসু: আমি তো তিন বছর ধরে বিশ্বব্যাংকে আছি। এমন তো মনে হয় না। আমরা যে ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট তৈরি করি, তার পরেরটা বের হচ্ছে ‘ডিজিটাল টেকনোলজি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’ নামে। এটি বের হবে আগামী জানুয়ারিতে। পরেরটি বের হবে ‘গভর্ন্যান্স অ্যান্ড রুল অব ল’ শিরোনামে। আমরা জানি, এটা নিয়ে রাজনৈতিকভাবে বিতর্ক তৈরি হবে। এখানে দুর্নীতির ওপর আলোচনা থাকবে, সরকার পরিচালনা নিয়ে আলোচনা থাকবে। আর আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা যখন সরকার পরিচালনা ও দুর্নীতি নিয়ে করা হয়, তখন বুঝতে হবে এ নিয়ে যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছি।
প্রথম আলো: বাংলাদেশ উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হতে চায়। ৭ বা ৮ শতাংশে প্রবৃদ্ধি বাড়াতে চায়। এ ক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করা বাংলাদেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
কৌশিক বসু: ভালোভাবে শাসন পরিচালনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আর প্রবৃদ্ধির কথা বলতে পারি, এটা কম-বেশি ‘অটো পাইলটের’ মতো করে চলবে। আর যেটা বললাম, অবকাঠামো আর আমলাতন্ত্র কমালে প্রবৃদ্ধি ৮ শতাংশ হতে পারবে। কিন্তু সুশাসন এমন একটা বিষয়, যেখানে সাধারণ মানুষ অনেক স্বস্তি বোধ করে। কিন্তু কাজটা অত্যন্ত কঠিন। আমরা যে বলি সুশাসন বাড়াও, এটা আসলে খুবই জটিল প্রক্রিয়া। চাইলেও অনেক সময় করা যায় না। আমি যখন ভারতে কাজ করতাম, দেখতাম অনেক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী কাজটা করতে চায়। কিন্তু কোথা থেকে শুরু করবে, সেটাই বুঝতেন না। আমরা আশা করছি, কীভাবে সরকার পরিচালনার মান বাড়ানো যায়, তা নিয়ে আমাদের পরবর্তী রিপোর্টে অনেক আইডিয়া দিতে পারব।
প্রথম আলো: একটু প্রসঙ্গ বদল করি। প্রশ্নটা আঞ্চলিক সহযোগিতা ও ট্রানজিট নিয়ে। এটা আমরা সবাই চাই। কিন্তু একটি সাধারণ ধারণা হচ্ছে, ভারত যা চায় তাই পাচ্ছে, বাংলাদেশের প্রাপ্তি কম। এ ধারণা থেকে সাধারণ মানুষদের বের করার উপায় কী?
কৌশিক বসু: দেখুন, এটা হতে বাধ্য। একটা বড় দেশের সঙ্গে যখন লেনদেন হয়, তখন মনেই হয় যে বড় দেশটিই বেশি পাচ্ছে। ভারত যখন আমেরিকার সঙ্গে কোনো চুক্তি করে, তখন ভারতেও বলা হয় আমেরিকা বড় অংশটাই পেল, ভারত পেল না। একটা কথা অবশ্যই বলব যে নিজের স্বার্থ নিজেকেই দেখতে হবে। যখন আরেক দেশের সঙ্গে একটা ডিল বা চুক্তি করা হয়, তখন সে নিজের স্বার্থ দেখছে, বাংলাদেশ দেখছে তারটা। তবে দুটো দিকই ভুল আছে। লোকেরা ধরে নেয়, যাকে আমরা অর্থনীতির ভাষায় বলি ‘জিরো সাম গেম’, ওর লাভ হওয়া মানে আমার ক্ষতি হচ্ছে। সুতরাং যে-ই দেখা গেল একটা ডিল হওয়ার পর ভারতে সবাই উৎসব করছে, তখন তুলনামূলক আরেকটি ছোট দেশের মনে হবে ওরা উৎসব করছে মানে তাদের ক্ষতি হয়ে গেল। এটা ঠিক নয়। অর্থনীতিতে এমন অনেক ডিল আছে, যা থেকে উভয় দেশই লাভবান হয়েছে। সত্যি কথা বলতে, ভালোভাবে চুক্তি করতে পারলে তা উভয়ের জন্য ভালো হয়। ভারত যখন আরেক দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে যাবে, তখন প্রধানত দেখা হয় কী লাভ হবে। কারণ, কেউ তো চ্যারিটি করতে যায় না। বাংলাদেশও দেখবে তাদের জন্য কী লাভ থাকবে। এই যে আঞ্চলিক সহযোগিতা বা ট্রানজিট—এ থেকে কারোরই ক্ষতি নেই। মেধাভিত্তিক সামর্থ্য দুটো দেশেরই যথেষ্ট আছে। আমি সত্যিই মনে করি, ভারতের সঙ্গে খুব ভালোভাবে আলোচনা করার সক্ষমতা বাংলাদেশের আছে। এই পরামর্শ আমি সবাইকে দিই না, বিশেষ করে যাদের সেই সক্ষমতা নেই। বরং তাদের বলি, বহুজাতিক কারও সঙ্গে ডিল করবে খুব সাবধানে। একটা খারাপ চুক্তি করলে সারা জীবন পস্তাতে হবে। কিন্তু ভারত ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা নয়। দুই দেশেরই সামর্থ্য আছে। আর সম্প্রতি যে চুক্তিগুলো হয়েছে, আমি তো মনে করি, তা থেকে উভয় দেশের জন্যই সুবিধা পাওয়ার অনেক সুযোগ আছে, সুবিধা পাবেও।
প্রথম আলো: পদ্মা সেতুর পুরো ঘটনা নিয়ে বিশ্বব্যাংক কী শিক্ষা পেল?
কৌশিক বসু: কী শিক্ষা পেলাম জানি না। তবে এইটুকু জানি, ইতিহাস যা-ই হোক না কেন, হতে পারে ওই ইতিহাসটির কারণেই ফল যেটা এসেছে, সেটি খুবই ভালো হয়েছে। এই ফল হয়তো হতো না, যদি ওই ঘটনা না ঘটত। আমি বলছি না যে আবার ওই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হোক, তবে নিজে থেকে পদ্মা সেতু করার কথা কিন্তু সাত-আট বছর আগে ভাবাও যেত না। এটা হচ্ছে শেষ পাঁচ-ছয় বছরের ব্যাপার। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার যে রিজার্ভ, ২০০৯-এ ছিল ৮ বিলিয়ন। এখন ২৭ বিলিয়ন। সুতরাং বাংলাদেশ এখন যা পারে, তা সাত-আট বছর আগেও ভাবতে পারত না। আমার কাছে মনে হয়, একটা দেশ করতে পারে এবং করে দেখাচ্ছে। আর আমি আশা করছি, বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও ভালো সংযোগ তৈরি হবে এবং সেটি হবে পার্টনারশিপের ভিত্তিতে। আর আশা করি, আমি অন্তত যত দিন এখানে আছি, আমি সাহায্য করব যাতে পার্টনারশিপ আরও ভালো হয়।
প্রথম আলো: কিন্তু পদ্মা সেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংক যে অভিযোগ তুলেছিল, তার তো সুরাহা হয়নি। দুর্নীতির ইচ্ছার অভিযোগটা থেকেই গেল। এতে কি দেশের ভাবমূর্তির সংকট হবে?
কৌশিক বসু: ভবিষ্যতে ভাবমূর্তির কোনো ক্ষতি আছে বলে আমার মনে হয় না। তবে দুর্নীতি এমনই একটা বিষয়, যা প্রতিটা দেশকেই এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। দুর্নীতি কমানোর পরামর্শ তো আমি সব উন্নয়নশীল দেশকেই দেব।
প্রথম আলো: সব দেশ মিলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজি গ্রহণ করেছে। এর লক্ষ্যগুলো উচ্চাভিলাষী এবং বাস্তবায়নে অর্থায়ন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের কী ভূমিকা থাকবে?
কৌশিক বসু: এটা এখনো একটি ওপেন কোশ্চেন হয়ে আছে। যেটাতে আমাদের সামর্থ্য সেটা হলো, এসডিজির গোটা কতক লক্ষ্য আমরা পরিসংখ্যানের দিক থেকে নিয়মিত নজর রাখব। এই কাজে বিশ্বব্যাংক খুবই ভালো। এই যে দারিদ্র্য বিমোচন নিয়ে আমরা প্রচুর সমালোচনা পাই বটে, কিন্তু বিশ্বব্যাংকের যে গ্রুপ এ নিয়ে কাজ করে, তারা অত্যন্ত দক্ষ। এটা আগে আমি জানতাম না, এখানে এসে দেখি, এ কাজে তারা আসলেই অনেক দক্ষ। কাজটা অত্যন্ত জটিল। এখন সারা পৃথিবীর দারিদ্র্য হার গণনা করা হচ্ছে, যেটাকে আমরা ‘পভক্যালনেট’ বলি, এটা খুব ভালোভাবে করা হয়। আমি আশাবাদী যে এসডিজির বিভিন্ন লক্ষ্যের মধ্যে গোটা কয়েকের ক্ষেত্রে এর তথ্য ও উপাত্ত ব্যবস্থাপনায় বিশ্বব্যাংক কেন্দ্রীয়ভাবে দায়িত্ব নেবে। তবে এটাতে রাজনৈতিক একটা ব্যাপার এসেই যায়। কারণ, কিছু উপাত্ত নিয়ে লোকজন এদিক-সেদিক করতে চায়। আশা করছি বিশ্বব্যাংক একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
আর আমি একটা কমিশন গঠন করেছি। আমাদের যে দারিদ্র্য নিরূপণ হয় সেটিকে আরেক ধাপ এগিয়ে নিতে এই কমিশন। সেটার প্রধান হচ্ছেন খুব বড় একজন অর্থনীতিবিদ, টনি অ্যাটকিনসন। কমিটির উপদেষ্টাদের মধ্যে অমর্ত্য সেন আছেন। আমরা যে এখন কেবল দারিদ্র্য হার পরিমাপ করি, সেখান থেকে আরও বৃহত্তর জায়গা থেকে কী করতে পারি, তা নিয়ে কমিশন আমাদের সুপারিশ করবে। দেখেন, ভারতের দারিদ্র্য হার বাংলাদেশের চেয়ে কম। অথচ অনেক সামাজিক সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে। দারিদ্র্য হার তো শুধু টাকা দিয়ে পরিমাপ করার বিষয় নয়। দারিদ্র্যকে আরও বহুমাত্রিক জায়গা থেকে দেখতে হবে। দারিদ্র্য কেবল ক্রয়ক্ষমতা দিয়ে পরিমাপ করা উচিত নয়। এ কমিশন এসব নিয়েই কাজ করছে। রিপোর্টটি পেতে মে-জুন হয়ে যাবে। রিপোর্টটি পেলে এটা আমরা এসডিজির সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহার করব এবং আমাদের কাজটা কী হবে, তাও ঠিক করব তখন।
প্রথম আলো: বিশ্বব্যাংকে ধনী দেশগুলোর কণ্ঠ অনেক বেশি জোরালো, তাদের ভোটাধিকারও বেশি। আপনি আমাদের মতো একটি দেশ থেকে বিশ্বব্যাংকে আছেন। এ বিষয়ে কিছু কি করার আছে আপনার?
কৌশিক বসু: এটা সত্যি যে ধনী দেশগুলোর কণ্ঠ এখানে অনেক বেশি। কিন্তু যেসব দেশের উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা কিছুটা ভালো, সে দেশের অনেক মানুষ এখন বিশ্বব্যাংকে কাজ করে। এটা ঠিক যে এসব দেশের ভোটের ক্ষমতা খুবই কম। কিন্তু এখন বিশ্বব্যাংকে কাজ করে প্রচুর ভারতীয়, প্রচুর বাংলাদেশি। এদের উপস্থিতির মাধ্যমে কিন্তু ওই দেশগুলো তাদের কণ্ঠ বাড়াতে পারছে। কারণ, তাদের নিজের দেশের প্রতি একধরনের সম্পৃক্ততা কিন্তু তাদের ভেতর থেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করে। এই সুবিধা কিন্তু সাব-সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোর নেই।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
কৌশিক বসু: আপনাকেও ধন্যবাদ।

Tuesday, November 3, 2015

চুপচাপ থাকলে চলবে না, মাঠে নামতে হবে -সাক্ষাৎ​কারে : অজয় রায় (অভিজিৎ​ রায়ের বাবা) by শরিফুজ্জামান

দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। একজনের সন্তান লেখক, অপরজনের সন্তান ওই লেখকের বইয়ের প্রকাশক। দুজনের সন্তানকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুষ্কৃতকারীরা। সন্তানহারা এই দুই পিতার সাক্ষাৎ​কার নিয়েছেন প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শরিফুজ্জামান
প্রথম আলো: স্যার, কেমন আছেন? অবসর কীভাবে কাটছে?
অজয় রায়: কেমন আছি বুঝতে পারছি না। গতকাল শেরপুরে গিয়েছিলাম। সেখানে একজন স্থানীয় প্রবীণ ফটোসাংবাদিকের হাতে বিভিন্ন উপায়ে সংগ্রহ করা কিছু অর্থ দিয়ে এলাম। আসার পথে কয়েকজন ফোনে জানাল, দীপনকে মেরে ফেলা হয়েছে। ইশ্‌! একের পর এক ওদের মেরে ফেলা হচ্ছে। আমরা ওদের রক্ষা করতে পারছি না।
প্রথম আলো: আজ কী করবেন?
অজয় রায়: সকাল থেকে বারবার বাইরে যেতে মন চাইছে। কিন্তু পরিবার থেকে আমাকে বের হতে দেওয়া হচ্ছে না। বলা হচ্ছে, বাইরে যাওয়াটা আমার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। আবুল কাসেম ফজলুল হকের সঙ্গে ফোনে কথা বলার চেষ্টা করছি গতকাল থেকে। কিন্তু পাচ্ছি না। কী বা আর বলব? সেও আমার মতো এক হতভাগ্য বাবা। অভিজিতের বই প্রকাশ করার জন্য দীপনকে মরতে হলো। অভিজিতের বইয়ের আরেক প্রকাশক টুটুলও অল্পের জন্য বেঁচে গেছে। ওকেও দেখতে যাওয়া দরকার।
প্রথম আলো: এই পরিস্থিতিতে আমরা কী করব?
অজয় রায়: দেশটা তো রসাতলে চলে গেল। এখন আর চুপচাপ বসে থাকলে চলবে না। উনসত্তরের কথা মনে করতে হবে। ওই রকম গণ-অভ্যুত্থান দরকার। কিন্তু মাওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও মোজাফ্ফর (ন্যাপ) সাহেবের মতো নেতা দরকার। সেই নেতৃত্বের শূন্যতা এখন প্রকট থেকে প্রকটতর হয়েছে। আন্দোলন শুরু হলে নেতা তৈরি হবে।
প্রথম আলো: তত দিন কি সবাই চুপ করেই থাকবে?
অজয় রায়: এমন সংকটময় পরিস্থিতিতে আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতিগুলো এগিয়ে আসত। ছাত্র সংগঠনগুলো নেমে পড়ত। ছাত্র সংগঠনগুলোর এখনকার অবস্থা আর নাইবা বললাম। কিন্তু শিক্ষক সমিতিগুলোও শিক্ষকদের রাজনৈতিক বিভক্তি ও ব্যক্তিস্বার্থের কারণে অনেকটাই অকেজো হয়ে পড়েছে। এখন তরুণদের এগিয়ে আসতে হবে। শুধু ফেসবুকে থাকলে হবে না, প্রতিবাদ করতে রাস্তায় নামতে হবে। শিক্ষকদেরও দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে মাঠে নামতে হবে। যে পরিস্থিতির দিকে দেশ যাচ্ছে, তাতে কেউই এখন আর নিরাপদ নয়।
প্রথম আলো: অভিজিৎ হত্যার বিচার কত দূর?
অজয় রায়: এখন পর্যন্ত তেমন কিছুই হয়েছে বলে মনে হয় না। তবে ১৫-২০ দিন আগে গোয়েন্দা বিভাগে গিয়েছিলাম। সেখানে ঢোকাও কঠিন কাজ। তারপরও গেলাম মামলার অগ্রগতি জানতে। গোয়েন্দারা বললেন, পাঁচজনকে নাকি শনাক্ত করেছে। এদের দুজন হত্যাকারী, একজন অভিজিতের চলাফেরা অনুসরণ করত। বাকি দুজন নিলয় হত্যার সঙ্গে জড়িত।
প্রথম আলো: একের পর এক ব্লগার হত্যাকারীদের সঙ্গে কারা জড়িত বলে মনে করেন?
অজয় রায়: এদের একটি চক্র আছে। ওই চক্রের কিলার সেলে ১৫-২০ জন করে সদস্য আছে বলে মনে হয়। তারা দলনেতার নির্দেশ মেনে চলে। ওদের কী দুঃসাহস ভাবতে পারেন? আগে পথেঘাটে মারত। এখন বাসায় ঢুকে মারে, অফিসে ঢুকে মারার পর দরজা বন্ধ করে রেখে যায়।
প্রথম আলো: সরকারের ভূমিকা কেমন দেখছেন?
অজয় রায়: সরকার তো সবকিছু স্বাভাবিক আছে—এমনটি দেখাতে চায়। আর রাষ্ট্র একটি নিষ্ক্রিয়তার ভাব ধরে আছে। ব্লগারদের বিরুদ্ধে যেভাবে অপপ্রচার হচ্ছে, তাতে অনেকের ধারণা যে, তারা নাস্তিক এবং ধর্মের বিরুদ্ধে। প্রকৃতপক্ষে যারা ব্লগে ও ওয়েবে নিজের মত প্রকাশ করে, তারাই ব্লগার। তারা দেশ বা ধর্মের বিরুদ্ধে কিছু বললে বা লিখলে তো প্রচলিত আইনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, ব্লগার হোক, নন ব্লগার হোক—তাদের প্রাণ রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। কিন্তু আমার প্রশ্ন, সরকার কি প্রাণ রক্ষার সেই দায়িত্ব পালন করতে পারছে? এ প্রসঙ্গে কিছুদিন আগে দেওয়া পুলিশের মহাপরিদর্শকের বক্তব্য উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেছেন, টার্গেটেড কিল হলে তাকে রক্ষা করা যায় না। আমার প্রশ্ন, একজন আইজিপি কি প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য দিতে পারেন? এতে খুনিরাই তো উৎসাহিত হবে। টুটুল তো টার্গেট ছিল। সেও জানত, পুলিশও জানত। থানায় সাধারণ ডায়েরি করেছে। কিন্তু পুলিশ কী ব্যবস্থা নিয়েছে?
প্রথম আলো: কীভাবে এই হত্যাকাণ্ড বন্ধ হতে পারে?
অজয় রায়: আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করা। বিচার না হওয়ায় একটার পর একটা ঘটনা ঘটছে। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না দিলে খুনের এই ধারাবাহিকতা থামবে না। তদন্তের নামে সময়ক্ষেপণ বন্ধ করতে হবে। কত দিনের মধ্যে তদন্ত শেষ করবে, তা নির্দিষ্ট করতে হবে। যদি তদন্তে টুকটাক ভুলও হয়, তা আদালতে শোধরানোর সুযোগ থাকে। কিন্তু অভিযোগ তো গঠন করতে হবে, বিচার তো শুরু করতে হবে। নইলে জঙ্গিরা আশকারা পেতে থাকবে।
প্রথম আলো: সরকার তো জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করার কথা বলেছে। বেশ কিছু গ্রেপ্তার হয়েছে, বিচারও চলছে।
অজয় রায়: সরকার কিছু ব্যবস্থা নিচ্ছে এটা সত্য। কিন্তু সেই ব্যবস্থা যে মোটেও কার্যকর হচ্ছে না, তার প্রমাণ একের পর নৃশংস গুপ্তহত্যা। আসলে আমাদের সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো সবার আগে ভোটের চিন্তা করে। এমনকি আওয়ামী লীগও মনে করে, যদি জামায়াত বা ইসলামি দলের কিছু ভোট পাওয়া যায়। যদিও তাদের একটি ভোটও আওয়ামী লীগ কোনো দিন পাবে না।
প্রথম আলো: আপনার ছেলের বউ কেমন আছেন?
অজয় রায়: রাফিদা শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠছে। কিন্তু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। দেশে আসতে চায়। আমিই না করেছি। কারণ সেও তো তিন নম্বর টার্গেট। সম্প্রতি চাকরি ছেড়ে গবেষণা শুরু করেছে। ওই গবেষণার জন্য দেশে আসার দরকার ছিল। আমি না করায় বলল, তাহলে আমাকেই ওর গবেষণাকাজে সহায়তা করতে হবে। আমি ওকে বললাম, এই মানসিক অবস্থার মধ্যে তুমি গবেষণা করতে পারবে? রাফিদার জবাব, কাজের মধ্যে থাকলে ভালো থাকবে। ওর মেয়েকেও ওকে দেখাশোনা করতে হয়। বুঝলে, একটি মৃত্যু কতজনের জীবনকে কতভাবে প্রভাবিত করে!

Monday, October 12, 2015

দেশে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব নেই -সাক্ষাৎ​কারে : এমাজউদ্দীন আহমদ by এ কে এম জাকারিয়া

এমাজউদ্দীন আহমদ
দুই বিদেশি হত্যায় দেশে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে জঙ্গিদের যোগসূত্র থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. এমাজউদ্দীন আহমদের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলো
প্রথম আলো: দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনায় বিএনপি ও জামায়াত জড়িত থাকতে পারে বলে সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, কোনো প্রমাণ ছাড়াই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এটা করা হয়েছে। আপনার মন্তব্য কী?
এমাজউদ্দীন আহমদ: যে দুটি ঘটনা ঘটেছে, তা জাতির জন্য লজ্জাজনক। আমরা নিজেরা যতই ঝগড়াঝাঁটি করি না কেন, এ ধরনের ঘটনার কোনো নজির আমাদের দেশে নেই। এর সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতকে জড়িত হিসেবে অভিযুক্ত করা আমাদের রাজনীতির বহু পুরোনো ব্লেম গেম সংস্কৃতিরই অংশ। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ ব্যাপারে যা বলেছেন তা অপ্রত্যাশিত। বিষয়টি নিয়ে যেহেতু তদন্ত চলছে, তাই এর আগে এ নিয়ে কথা বলা উচিত হয়নি।
প্রথম আলো: বিদেশি নাগরিক খুনের ঘটনাটিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ: ঘটনাটি আমাদের দেশে বা জাতীয় পর্যায়ে হয়তো ঘটেছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটকেও আমাদের বিবেচনার মধ্যে রাখতে হবে। আইএসের বিরুদ্ধে রাশিয়ার চলমান অভিযান সিরিয়া বিষয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে এক নতুন অবস্থার তৈরি করেছে। এ ব্যাপারে ইরানের ভূমিকা বা যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের অবস্থান—এসব বিবেচনায় নেওয়ার বিষয়। আমি মনে করি, আমাদের দেশে দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার ঘটনা পর্যালোচনার সময় এই আন্তর্জাতিক বাস্তবতাকেও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।
প্রথম আলো: আমাদের দেশে ইসলামি জঙ্গিবাদ বিস্তারের আশঙ্কা কতটুকু?
এমাজউদ্দীন আহমদ: আমি মনে করি আমাদের দেশে ইসলামি জঙ্গিবাদ কখনো বিস্তার লাভ করতে পারেনি। এর অস্তিত্ব নেই, থাকার কারণও নেই। আমাদের দেশের মানুষ জঙ্গিবাদ পছন্দ করে না। এখানকার আবহাওয়া, পরিবেশ, প্রকৃতি ও জনগণের মানসিকতা এর সহায়ক নয়। তবে কোনো কারণে বা কোনোভাবেই জঙ্গিবাদ যাতে এ দেশে বিস্তারের সুযোগ না পায়, সে জন্য জাতীয় স্বার্থে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো জরুরি। দুজন বিদেশি নাগরিক খুন হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়ানো উচিত। আমি বলি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে না লাগিয়ে বরং বিদেশিদের নিরাপত্তার কাজে লাগান।
প্রথম আলো: কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দেশে জঙ্গিদের তৎপরতা নিয়মিতই উদ্‌ঘাটন করছে। অনেক সহিংসতায় যে তারা জড়িত, সেটি তদন্তে বের হয়ে আসছে। জঙ্গিরা ধরাও পড়ছে। আর বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে আমরা আবদুর রহমান বা বাংলা ভাইদের কর্মকাণ্ড দেখেছি।
এমাজউদ্দীন আহমদ: ওটা ছিল, কিন্তু এখন আর অস্তিত্ব নেই। নানা পদক্ষেপ ও ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে তারা নির্মূল হয়েছে। তবে এ ধরনের কিছু যাতে আর কখনো মাথা তুলে না দাঁড়াতে পারে, সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের দেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। তারা জঙ্গিবাদ ঘৃণা করে।
প্রথম আলো: বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের জোটের কারণেই কি তখন জঙ্গি তৎপরতার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল?
এমাজউদ্দীন আহমদ: জামায়াতের সঙ্গে জোট শুধু বিএনপি করেনি। সব দলই কোনো না কোনো সময়ে জামায়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ও সম্পর্ক রেখে চলেছে। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি—সবাই। আসলে আমাদের কারও হাতই পরিষ্কার নয়। সমস্যা হয়েছে যে কিছু একটা হলেই বিএনপি আর জামায়াতকে এক ব্রাকেটে বন্দী করে ফেলা হয়। দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার পরও আমরা দেখলাম কোনো তদন্ত ছাড়াই বিএনপি-জামায়াতকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে।
প্রথম আলো: কোনো দেশে জঙ্গিবাদের বিকাশ ও বিস্তারের সঙ্গে দেশটির রাজনৈতিক পরিবেশ ও পরিস্থিতির সম্পর্ক রয়েছে বলে ধরে নেওয়া হয়। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ: একটি সুস্থ ও স্বচ্ছ রাজনৈতিক পরিস্থিতি জঙ্গিবাদের জন্য সহায়ক হতে পারে না। কিন্তু আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতি দেখুন, রাজনৈতিক দলগুলোর সভা-সমাবেশ, মিটিং-মিছিল বা এ ধরনের কিছু করার সুযোগ নেই। একটা মুক্ত পরিবেশ বজায় থাকলে, প্রতিবাদ করার সুযোগ থাকলে অনেক কিছু লাঘব হয়ে যায়। কিন্তু বর্তমানে দেশে একটা বদ্ধ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ৫ জানুয়ারি যে নির্বাচন হয়েছে তা প্রশ্নবিদ্ধ, এরপর বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে ঢালাওভাবে। এগুলো স্বাভাবিক পরিস্থিতি নয়। জঙ্গিবাদ বিস্তারের ভয় দূর করতে হলে সুস্থ, স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিশ্চিত করা দরকার।
প্রথম আলো: ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ না নেওয়া বিএনপির ভুল বলে মনে করেন কি? বা এর পরে বিএনপি আন্দোলনের যে কৌশল নিয়েছিল?
এমাজউদ্দীন আহমদ: আমি তো মনে করি ৫ জানুয়ারি এভাবে নির্বাচন করাটা সরকারের ভুল ছিল। নির্বাচনটি যাতে সবার অংশগ্রহণে হয়, সেই চেষ্টা তাদের থাকা উচিত ছিল। সরকারের উচিত ছিল এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে সবাই নির্বাচনে অংশ নেয়। অর্ধেকেরও বেশি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা নির্বাচিত হলে সেই নির্বাচনের কোনো গুরুত্ব থাকে না। এরপরও প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে আইনগত বাধ্যবাধকতার কারণে নির্বাচনটি করতে হচ্ছে। এটা ধরে নেওয়া হয়েছিল যে এই বাধ্যবাধকতার নির্বাচনের পর আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু তা আর পরে দেখা গেল না; বরং সরকারি দলের জেদই স্পষ্ট হয়ে উঠতে দেখলাম। বিএনপি আন্দোলন শুরু করেছিল, সেটা ব্যর্থ বা সার্থক হয়েছে কি না, সেটা জরুরি নয়। আসল কথা হচ্ছে, গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে আলাপ-আলোচনা করতে হবে, সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে। এসব ছাড়া গণতন্ত্র হয় না।
প্রথম আলো: বিএনপি কি জামায়াত ছাড়বে?
এমাজউদ্দীন আহমদ: জামায়াত বিএনপির সঙ্গে ২০-দলীয় জোটে রয়েছে। সেখান থেকে দলটিকে বের করা হবে কোন অজুহাতে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার-প্রক্রিয়ার একপর্যায়ে সংগঠন হিসেবে জামায়াতও এই অপরাধে অভিযুক্ত বলে বলা হয়েছে। আমার কথা হচ্ছে, তা হলে দল হিসেবে সরকার জামায়াতকে আগে নিষিদ্ধ করুক। এর আগে বা তেমন কিছু না করে জামায়াতের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার দায়টা বিএনপির ওপর চাপানোর চেষ্টা হচ্ছে। সরকারই তো জামায়াতের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।
প্রথম আলো: আপনি দেশের বর্তমান যে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা বললেন, এমন পরিস্থিতিতে দেশের নাগরিক সমাজ কোনো ভূমিকা পালন করতে পারছে না কেন?
এমাজউদ্দীন আহমদ: বর্তমান পরিস্থিতিতে নাগরিক সমাজের ভূমিকা রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। আমরা শুনতে পাই যে সরকারের সমালোচনা করেন এমন ব্যক্তিদের টিভি টক শোতে অংশগ্রহণের ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। বয়স, সম্মান, ভয়-ভীতি- এসব নানা কিছু মিলিয়ে অনেকে কথা বলতে পারেন না। দিগন্ত টিভি ও আমার দেশ পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
প্রথম আলো: নাগরিক সমাজ দলীয়ভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে বলেই কি এ ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না?
এমাজউদ্দীন আহমদ: আসলে আমাদের সব সামাজিক ও পেশাজীবীদের সংগঠনগুলোই দলীয়ভাবে বিভক্ত হয়ে গেছে। একক নাগরিক সমাজ বলে কিছু নেই। সমাজ এভাবে বিভক্ত হয়ে পড়া খুবই খারাপ লক্ষণ। দলমতধর্ম-নির্বিশেষে আমরা যখনই এক হতে পেরেছি তখনই আমরা কিছু অর্জন করতে পেরেছি। আমাদের ভাষার অধিকার, আমাদের স্বাধীনতা—সবই আমরা এক হয়ে পেয়েছি। আর এখন আমরা বিভক্তির মধ্যে পড়ে হাবুডুবু খাচ্ছি।
প্রথম আলো: বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এখন দেশের বাইরে আছেন। চিকিৎসা এবং পরিবারের লোকজনের সঙ্গে সময় কাটানোই এই সফরের ঘোষিত লক্ষ্য বলে আমরা জানি। কিন্তু এর কি কোনো রাজনৈতিক তাৎপর্য নেই? খালেদা জিয়া দেশে ফেরার পর বিএনপির রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের কোনো সম্ভাবনা দেখেন কি?
এমাজউদ্দীন আহমদ: দীর্ঘদিন পরে বেগম খালেদা জিয়া তাঁর ছেলে ও পরিবারের লোকজনের সঙ্গে সময় কাটাতে গেছেন। নানা কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সাম্প্রতিক সময়গুলো পার করেছেন তিনি। ছোট ছেলে আরাফাত রহমান মারা গেছেন। ব্যক্তিগত শান্তি ও স্বস্তির জন্য তাঁর এই সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের সঙ্গে এই সময়টুকু কাটানো তাঁর জন্য জরুরি হয়ে পড়েছিল। তবে এর নিশ্চয়ই রাজনৈতিক একটি দিকও রয়েছে। সেখানে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা হবে। আমি ধারণা করি, এই সফরের মধ্য দিয়ে একধরনের উদ্দীপনা ও নতুন চিন্তাভাবনা নিয়েই খালেদা জিয়া দেশে ফিরবেন।
এমাজউদ্দীন আহমদ: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Sunday, October 11, 2015

আইএস নেই, জঙ্গি আছে -সাক্ষাৎ​কারে : হারুন-অর-রশিদ by সোহরাব হাসান

হারুন-অর-রশিদ
দুই বিদেশি হত্যায় দেশে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে জঙ্গিদের যোগসূত্র থাকার বিষয়টি সামনে এসেছে। এই প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. হারুন-অর-রশিদের সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলো
প্রথম আলো: দুই বিদেশি নাগরিক হত্যার পরই পাল্টাপাল্টি অভিযোগ। সরকার বলছে, এই হত্যাকাণ্ডে বিএনপি-জামায়াতের হাত আছে। বিএনপি বলছে, জনগণের দৃষ্টি অন্য দিকে ফেরানোর চেষ্টা।
হারুন-অর-রশিদ: এ অভিযোগ নতুন নয়। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই অংশ। তবে প্রধানমন্ত্রী যে দুটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের অর্জন। যারা এই অর্জনকে ভালোভাবে নেয়নি, তাদের দ্বারা এ কাজ হতে পারে। দুই বিদেশি নাগরিককে হত্যা করে তারা দেখাতে চেয়েছে যে বাংলাদেশ বিদেশিদের জন্য নিরাপদ নয়। এ ছাড়া দুজন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের প্রক্রিয়া প্রায় শেষ পর্যায়ে। গত কয়েক মাস দেশের অবস্থা মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। সেটি নষ্ট করাও এর উদ্দেশ্য হতে পারে। হত্যার পেছনে দুটি বিষয়ই পটভূমি হিসেবে কাজ করতে পারে। তবে আমি মনে করি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে।
প্রথম আলো: কিন্তু তদন্তের আগেই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এর সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের হাত থাকতে পারে।
হারুন-অর-রশিদ: এটি তাঁর ধারণা। আর এই ধারণার পেছনে রয়েছে বছরের শুরুতে আন্দোলনের নামে দল দুটির পেট্রলবোমা মেরে বহু মানুষ হত্যার ঘটনা।
প্রথম আলো: বিএনপি বলেছে, প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর তদন্তের দরকার হবে না। সরকার যাদের চাইবে, তাদেরই সাজা দেবে।
হারুন-অর-রশিদ: বিএনপি তাদের ধারণার কথা বলেছে। যদিও এর পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে পারেনি। রাজনীতিতে যদি কোনো পক্ষ খেলার নিয়ম না মেনে চলে, তাহলে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাজনীতি আশা করা যায় না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মতাদর্শগতভাবে পরাস্ত করা আর শারীরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করা নিশ্চয়ই এক নয়। আমরা ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ঘটনায় সেটাই দেখেছি। এর আগেও যতগুলো বোমা-গ্রেনেড হামলা হয়েছে, তারও লক্ষ্যবস্তু ছিল আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী।
প্রথম আলো: সরকার এত দিন বলেছিল, জঙ্গিবাদ নির্মূল হয়েছে। এখন দেখা যাচ্ছে নির্মূল হয়নি।
হারুন-অর-রশিদ: জঙ্গিবাদ কেবল জাতীয় বা আঞ্চলিক সমস্যা নয়। আন্তর্জাতিক সমস্যা। যেসব দেশ বাংলাদেশের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করছে, সেসব দেশেও তো জঙ্গি হামলা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটেই বাংলাদেশের জঙ্গিবাদী তৎপরতাকে দেখতে হবে। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইও নিরন্তর প্রক্রিয়া। অতীতে বাংলাদেশে জঙ্গিরা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও পেয়েছে; এখন সেটি পাচ্ছে না। জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে সরকার অভিযান চালাচ্ছে। অনেকে ধরাও পড়েছে।
প্রথম আলো: কিন্তু তাদের বিচার হচ্ছে কি?
হারুন-অর-রশিদ: বর্তমান সরকারের আমলে অনেক জঙ্গির বিচার হয়েছে। শাস্তি পেয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও চলছে।
প্রথম আলো: নিউইয়র্ক যাওয়ার আগে গার্ডিয়ান-এ সাক্ষাৎকার দিয়ে প্রধানমন্ত্রী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে জঙ্গিবাদের ব্যাপারে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু এখন তো দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশই সতর্ক নয়।
হারুন-অর-রশিদ: দেখুন, ১৬ কোটি মানুষের দেশ। কোনো অপশক্তি যদি টার্গেট করে কারও ওপর আঘাত করে, সেটি বন্ধ করা কঠিন। তার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছে। জঙ্গিদের ব্যাপারে বর্তমান সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণেই সেটি হবে না।
প্রথম আলো: এত দিন সরকারি দলের নেতারা-মন্ত্রীরা বলেছেন, বাংলাদেশে আইএস আছে। এখন বলছেন, আইএস নেই। কোনটি সত্য?
হারুন-অর-রশিদ: আইএস আছে—সরকারের দায়িত্বশীল মহল থেকে এ রকম কিছু বলা হয়েছে বলে আমার জানা নেই। তবে আনসারুল্লাহ বাংলা টিম প্রভৃতি সংগঠনের সদস্যরা বলেছে, তারা আইএসের হয়ে কাজ করছে। আইএসের কোনো শাখা বাংলাদেশে কাজ করছে, এমন প্রমাণ নেই। মার্কিন রাষ্ট্রদূতও বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার কথা বলেছেন।
প্রথম আলো: তাহলে আইএস নেই?
হারুন-অর-রশিদ: আইএস নেই। জঙ্গি আছে। তবে বাংলাদেশের সমাজে কখনোই তারা ঘাঁটি গাড়তে পারবে না। মানুষের সমর্থন পাবে না। যেকোনো দেশে জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হলে ভিত্তি ও আশ্রয় লাগে, সেটি এখানে তারা পাবে না।
প্রথম আলো: বাংলাদেশে যেসব জঙ্গিগোষ্ঠী আছে, তারা কি দেশীয় কাঠামোয় কাজ করে, না আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কে?
হারুন-অর-রশিদ: আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী যে মুজাহিদ বাহিনী গড়ে উঠেছিল, তাতে বাংলাদেশ থেকে অনেকে গিয়েছিল, তারা দেশে ফিরে হরকাতুল জিহাদ, জেএমবিসহ বিভিন্ন সংগঠন গড়ে তুলেছিল। কিন্তু আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের সঙ্গে তাদের শক্ত নেটওয়ার্ক আছে বলে মনে হয় না।
প্রথম আলো: জঙ্গিবাদী সমস্যাটি কি নিছক আইনশৃঙ্খলাজনিত, না রাজনৈতিক?
হারুন-অর-রশিদ: রাজনৈতিক সমস্যা তো বটেই। তবে সেই সমস্যার মূলে হলো একাত্তর ও পঁচাত্তর। একাত্তরে যারা মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছে, যারা পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছে, তাদের সঙ্গে আজকের জঙ্গিদের গভীর যোগসূত্র আছে বলে মনে করি।
প্রথম আলো: অনেকে বলেন, বর্তমান সংকটের মূলে ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন।
হারুন-অর-রশিদ: নির্বাচন তো জনগণের জন্য। জনগণ এটি মেনে নিয়েছে। বরং আমি বলব, ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে না এসে বিএনপি বড় ভুল করেছে। মানুষ আর গৎবাঁধা রাজনীতি পছন্দ করছে না। বিএনপি-জামায়াত পেট্রলবোমা দিয়ে মানুষ হত্যা না করলে হয়তো মানুষ তাদের পক্ষে থাকত। ব্যাপক জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বিএনপি নিজেকেই প্রান্তিক করে ফেলেছে। তারা এখন জনগণ থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন।
প্রথম আলো: বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গে ব্রাকেটবন্দী করা ঠিক হবে না। দুই দলের রাজনীতি ভিন্ন। এই বক্তব্যে কি ইতিবাচক কিছু দেখেন?
হারুন-অর-রশিদ: আমরা তো বিএনপিকে জামায়াতে ইসলামী থেকে বিযুক্ত অবস্থায় দেখতে চাই। কিন্তু তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক একটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই সূচিত হয়েছে, যা প্রায় অবিচ্ছিন্ন। দল দুটি একই রাজনৈতিক ধারাকে ধারণ করে। বিএনপির তরুণ নেতৃত্ব আরও বেশি হতাশ করেছে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রশ্নে তাদের অবস্থানটি দেখুন। বিএনপি যুদ্ধাপরাধী নিজামী-মুজাহিদকে মন্ত্রী করেছে।
প্রথম আলো: কিন্তু আওয়ামী লীগও তো জামায়াতকে নিয়ে আন্দোলন করেছিল?
হারুন-অর-রশিদ: একটি হলো আত্মিক সম্পর্ক; আরেকটি কৌশলগত। বিএনপি জামায়াতের মধ্যে যে যতই বিচ্ছেদ ঘটাতে চান না কেন, তা হবে না।
প্রথম আলো: বিএনপির নীতি ও আদর্শ থেকে সরকারের শরিক জাতীয় পার্টির কোনো ফারাক আছে কি?
হারুন-অর-রশিদ: বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরশাদ বা জাতীয় পার্টি কোনো শক্তিই নয়। এটি একটি আঞ্চলিক দল। ভবিষ্যতেও এর সম্ভাবনা নেই।
প্রথম আলো: গণতন্ত্রে বিরোধী দল বা পক্ষের মতপ্রকাশের অধিকার স্বীকৃত। কিন্তু বর্তমানে তারা সেই অধিকার প্রয়োগ করতে পারছে না।
হারুন-অর-রশিদ: আমরা তো দেখলাম, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের নামে বিএনপি-জামায়াত পেট্রলবোমা মেরে মানুষ হত্যা করল। কোনো উন্নত গণতান্ত্রিক দেশ এসব মেনে নেবে না। নির্বাচন বা আন্দোলন উভয় ক্ষেত্রে একটি ধারাবাহিক নীতি থাকতে হয়। বিএনপি সেটি রক্ষা করতে পারেনি। তারা পাঁচ সিটি নির্বাচনে জয়ী হলো, এরপর জাতীয় নির্বাচন বর্জন করল, আবার তিন সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়েও মাঝপথে সরে দাঁড়াল। বিএনপিতে দিকনির্দেশনার অভাব রয়েছে। সরকার বিএনপির প্রতি কী রকম আচরণ করে, তার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। জনগণের কাছে যেতে হবে।
প্রথম আলো: আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বৈরিতা চলতে থাকলে কি জঙ্গিগোষ্ঠী আরও ভয়ংকর রূপে আবির্ভূত হবে না?
হারুন-অর-রশিদ: বাংলাদেশের মানুষ কখনোই জঙ্গিবাদকে প্রশ্রয় দেবে না। জঙ্গিবাদ প্রসারের সামাজিক পূর্বশর্ত এখানে নেই। তাই, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বৈরিতার সুযোগেও তাদের শক্তি বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখি না। তবে আমি মনে করি, একটি সুস্থ ও স্বাভাবিক রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সবার অংশগ্রহণ থাকা জরুরি। তবে সেটি হতে হবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে। অতীতের ভুল সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে বিএনপি বিরাট ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রথম আলো: এই যে দুই বিদেশি নাগরিককে হত্যা করা হলো। এটা কি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়?
হারুন-অর-রশিদ: আমি তা মনে করি না। এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত কারণেও হামলা হতে পারে। তবে এ জন্য উদ্বিগ্ন হওয়ার কিংবা এটা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি ভাবার কোনো কারণ নেই।
প্রথম আলো: আমাদের নাগরিক সমাজ কেন গণতন্ত্রের সুরক্ষা ও বিকাশে ভূমিকা নিতে পারছে না?
হারুন-অর-রশিদ: এটিও সামাজিক ও রাজনৈতিক বিকাশের যে স্তরে আমরা আছি, তার প্রতিফলন। রাষ্ট্রযন্ত্র ও জনগণের মাঝখানে সংঘবদ্ধ সচেতন জনগোষ্ঠী হলো নাগরিক সমাজ; যার ভিত্তি হবে সংবিধান, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকার। সেগুলো তারা তুলে ধরবে। কিন্তু আমাদের নাগরিক সমাজ হয় আওয়ামী লীগ কিংবা বিএনপির পক্ষে কথা বলে। স্বতন্ত্র ভূমিকা নিতে পারে না। রাজনৈতিক সমীকরণটাই এখানে বড়। আরেকটি বিষয় হলো, রাজনৈতিক সংযোগ ছাড়া কোথাও প্রবেশাধিকার পাওয়া যায় না।
হারুন–অর–রশিদ: উপাচার্য, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।

নাজিবের বিদায় ছাড়া কোনো পথ নেই -‘ডিপ্লোম্যাট’কে বিশেষ সাক্ষাৎকারে মাহাথির মোহাম্মদ

মাহাথির মোহাম্মদ। মালয়েশিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী। তিনি ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন চিকিৎসক হিসেবে। পরে রাজনীতিতে যোগ দেন। দীর্ঘ ২২ বছর (১৯৮১-২০০৩) প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনিই দেশটির সবচেয়ে বেশি সময় ওই দায়িত্বে ছিলেন। তিনি প্রধানমন্ত্রী ছাড়া ক্ষমতাসীন জোটের প্রধান দল ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশনের (আমনো) সভাপতিও ছিলেন।
সম্প্রতি তিনি এক সাক্ষাৎকারে মালয়েশিয়ার বর্তমান অবস্থা নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। তার আমল এবং বর্তমান সময়ের তুলনা করেছেন। তার আমলে নির্মিত মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রজায়ায় সাক্ষাৎকারটি ডিপ্লোম্যাটের পক্ষ থেকে নিয়েছেন জয়েস লি। ৭ অক্টোবর সাক্ষাৎকারটি প্রকাশিত হয়েছে। নয়া দিগন্তের জন্য সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ হাসান শরীফ
প্রশ্ন : আমি শুরু করতে চাই আপনার প্রধানমন্ত্রিত্বের শেষ সময়ে আলোচিত মালয়েশিয়ার জাতিগত উত্তেজনা (রেসিক্যাল টেনশন) নিয়ে। ১৯৭০-এর দশকে আপনি জাতিসঙ্ঘে এক বক্তৃতায় মালয়েশিয়াকে ‘ঔপনিবেশিক সময় থেকে বহুজাতিক টাইম বোমা’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। আপনার মেয়াদ শেষকালে আপনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন, জাতিগত উত্তেজনা বেড়ে চলেছে। জাতিগত উত্তেজনার ব্যাপারে আপনার নীতি কী ছিল? বর্তমানে এর প্রভাব কী?
মাহাথির : মালয়েশিয়া মিশ্র জনসংখ্যার দেশ। এই দেশে যারা বাস করে, তারা একে অন্যের থেকে ব্যাপকভাবে ভিন্ন। জাতিগতভাবে ভিন্ন। সংস্কৃতি, ভাষা, অর্থনৈতিক অবস্থানের দিক থেকেও ভিন্ন। পার্থক্য খুবই বড়। সাধারণত পার্থক্যের কারণে লোকজন একে অন্যের সাথে লড়াই করে, একে অন্যকে অপছন্দ করে, একে অন্যের বিরুদ্ধে এটাকে ব্যবহার করে। ফলে মালয়েশিয়া এমন একটি দেশ, যেখানে জাতিগত যুদ্ধের আশঙ্কা খুবই সাধারণ ব্যাপার।
আমি যেটা মনে করি তা হলো, আমার ২২ বছরের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে জাতিগত সঙ্ঘাত এত মারাত্মক ছিল না, যা সংঘর্ষের পর্যায়ে উপনীত হয়। তখন কোনো সংঘর্ষ ছিল না। সব সম্প্রদায় আমাকে পছন্দ করত। আর এ কারণেই আমি নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতাম। এখনো জাতিগত উত্তেজনা রয়েছে। তবে আমি মনে করি, আমার প্রধানমন্ত্রিত্বের ২২ বছর সময়কালের চেয়ে তা কম।
তবে অন্যরা এ সমস্যাটি ভালোভাবে মোকাবেলা করতে পারছে না। তারা মনে করে, উদার হয়ে তারা সব জাতিগোষ্ঠীকে খুশি করতে পারবে। কিন্তু তা হয়নি। আপনি উদার হলে চরমপন্থীরা সুযোগ নেবে। প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর চরমপন্থীরা জাতিগত ইস্যুকে সামনে আনার জন্য উদারবাদের সুযোগ গ্রহণ করেছে। কারণ, উদার দৃষ্টিভঙ্গি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কারণে এখন আপনি আলোচনা করতে পারেন, আপনার পছন্দের কথা বলতে পারেন। ফলে তারা লোকজনকে তাদের পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন করতে পারে, তারা এসব চরমপন্থী লোকদের পেছনে শামিল হতে শুরু করে। এ কারণেই আবারো জাতিগত উত্তেজনা সামনে এসে পড়েছে।
প্রশ্ন : জাতিগত উত্তেজনা প্রশমন যদি আপনার সবচেয়ে বড় অর্জন হয়ে থাকে, তবে আপনার সবচেয়ে বড় অতৃপ্তি কী?
মাহাথির : এখন আমার অন্যতম অতৃপ্তি হলো প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর জন্য অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে না পারা। আমি চেয়েছিলাম প্রত্যেকের জন্য সমান মর্যাদা সৃষ্টি করতে। অবশ্যই ধনী চীনা, ধনী ভারতীয়, ধনী মালয় থাকার পাশাপাশি গরিব চীনা, গরিব ভারতীয়, গরিব মালয় থাকবে। ফলে এমন কোনো ভাবাবেগ থাকবে না যে, মালয়রা গরিব আর পশ্চাৎপদ অথচ চীনারা ধনী ও উন্নত, তারা থাকে নগরীগুলোতে। এটা আসলেই একটা খারাপ পরিস্থিতি, এটা সংঘর্ষ সৃষ্টি করবে। আমাদের উচিত হবে সবাইকে নগরীতে আনা, সুশিক্ষিত করা, আরো ভালো অবস্থায় নিয়ে আসা। তা ছাড়া মালয়রা ব্যবসায় বেশ দুর্বল হওয়ায় তাদেরকে বেশি সুযোগ দিতে হবে। নিতে হবে দৃঢ় পদক্ষেপ।
প্রশ্ন : মালয়রা অলস বলে গত বছর আপনি যে মন্তব্য করেছিলেন, এটা কি তার সাথে সম্পর্কিত?
মাহাথির : এটা কিছুটা বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, বিশেষ করে ২০০৯ সালে বিজ্ঞান ও গণিত শিক্ষায় ইংরেজি ভাষা বন্ধ করে দেয়ার বর্তমান প্রশাসনের সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে।
আমি সত্য কথা বলেছিলাম। মালয়রা আসলেই অলস। আমরা তাদের সুযোগ দিয়েছিলাম। তারা সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি। তবে শিক্ষার ব্যাপারে যেটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, আমি বিজ্ঞান আর গণিত শেখার জন্য ইংরেজি ব্যবহার করতে চেয়েছিলাম। বর্তমান প্রশাসন সেটা থেকে সরে এসেছে। তারা বিজ্ঞান আর ইংরেজি মালয় ভাষায় শেখাতে চায়। অথচ মালয় বিজ্ঞানের ভাষা নয়। অন্যান্য বিষয় স্থির, কিন্তু বিজ্ঞান গতিশীল।
প্রশ্ন : অর্থাৎ এতে মনে হয় অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জাতিগত সম্পর্ক পরস্পরের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটা আপনার অন্যতম কৃতিত্ব, ২০২০ সালের মধ্যে মালয়েশিয়াকে পুরোপুরি শিল্পোন্নত করার জন্য নীতিনির্ধারক ‘ভিশন ২০২০’-কে কি প্রশ্নবিদ্ধ করেছে?
মাহাথির : আমার সময়ে বেশির ভাগ সময় দেশ এগিয়ে চলেছিল। পশ্চাৎযাত্রাও ছিল। কিন্তু অনুপযুক্ত নেতৃত্বের কারণে এখন দেশ স্থবির হয়ে পড়েছে। কারণ, এখনকার ফোকাস আর অর্থনৈতিক উন্নয়ন নয়, বরং রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা। প্রত্যেক প্রধানমন্ত্রীই টিকে থাকতে চান। তারা মনে করেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে মনোযোগী হওয়ার বদলে অন্যান্য ইস্যু কাজে লাগিয়ে টিকে থাকতে পারবেন। এ কারণে প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়েছে। সেই সাথে যদি জাতিগত উত্তেজনা, মন্দ প্রশাসন, দুর্নীতি ইত্যাদি থাকে; তবে অর্থনীতি সঙ্কুচিত হয়ে পড়ে। ফলে পুরোপুরি উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার ভিশন ২০২০ আমরা অর্জন করতে পারব না। আমরা কোনোভাবেই তা পারব না। আপনি দেখছেন, মুদ্রার মান পড়ে গেছে, স্টক মার্কেটের অবস্থা খারাপ, লোকজন সাধারণভাবে অখুশি।
প্রশ্ন : প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের বিদায় দেখার ইচ্ছাটা প্রকাশ করতে আপনি রাখঢাক করেননি। গত আগস্টে আপনার ব্লগে লিখেছিলেন, গণতন্ত্র মরে গেছে। এতে গত জুলাই মাসে মন্ত্রিসভা পরিবর্তন, মালয়েশিয়া সরকারের বিশেষ উন্নয়ন ব্যাংক (এটা সাধারণভাবে ১এমডিবি নামে পরিচিত) থেকে বিপুল অর্থ খোয়া যাওয়া তথা তহবিল তসফপের বিষয়টি তদন্ত করতে অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের ঢিলেমি, পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির সদস্য মনোনয়ন নেয়ার মতো বিষয়ে বিশ্লেষণ ছিল। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর আপনি প্রধানমন্ত্রীর অপসারণ দাবি করে বারসি ৪.০ আন্দোলনে শামিল হয়েছেন। গণতন্ত্র মারা গেছে, আপনার এই মন্তব্যের আলোকে বিক্ষোভে শামিল হওয়ার বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন কি?
মাহাথির : হ্যাঁ, এটাই ছিল শেষ পথ। আমার মনে হয়েছে, আমার মতটি প্রকাশ করা দরকার। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর অপসারণের ব্যাপারে আমি বারসির দৃষ্টিভঙ্গির সাথে একমত। তাই আমি গিয়েছিলাম। এটা কোনো জাতিগত ব্যাপার ছিল না। বারসির সদস্যরা সব সম্প্রদায় থেকে এসেছে। এটা মালয় সরকারের বিরুদ্ধে চীনা বিক্ষোভ ছিল না। এটা কোনোভাবেই জাতিগত বিষয় নয়। তারা যা দাবি করেছিল, আমি সে ব্যাপারে আমার সমর্থন প্রকাশ করেছি।
প্রশ্ন : এর মধ্যে বারসির অন্যান্য দাবি; যেমনÑ নির্বাচন সংস্কার, বিক্ষোভের অধিকার, আরো স্বচ্ছতা ইত্যাদিও কি অন্তর্ভুক্ত ছিল?
মাহাথির : আমি এসবের বিরুদ্ধে নই। আমার সময়কালে কোনো বিক্ষোভ ছিল না। তখন কোনো বারসি ছিল না। লোকজন নির্বাচনে অংশ নেয়ার ব্যাপারে খুশি ছিল। তারা নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিতর্ক করেনি। আমার সরে যাওয়ার পরই কেবল বারসির সমর্থকেরা বিক্ষোভ করছে, এসব দাবি তুলছে। আমার পদত্যাগ করার পর এসব কিছু ঘটছে। আমার আমলে জনগণ নির্বাচনের ব্যাপারে কোনো অভিযোগ তোলেনি। সব সময় অভিযোগ জানায়, এমন বহিরাগত লোক থাকতে পারে। তবে এ ধরনের ব্যাপক বিক্ষোভ তখন ছিলই না।
প্রশ্ন : বারসি ৪.০-এর পর পাল্টা সমাবেশের ব্যাপারে আপনার অভিমত কী, যেটা সেপ্টেম্বরে ‘রেড-শার্ট র‌্যালি’ নামে পরিচিত?
মাহাথির : সেটা সরকার আয়োজন করেছিল। সেটা বারসি বিক্ষোভকে জাতিগত তথা মালয়দের বিরুদ্ধে চীনা বিক্ষোভ হিসেবে তুলে ধরেছে, যা আদৌ তা নয়। তারা এমনটি করেছে ব্যাংক থেকে খোয়া যাওয়া অর্থ নিয়ে বারসি যে অভিযোগ করেছে, তা থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিতে। তারা জাতিগত উত্তেজনাকে ইস্যুতে পরিণত করেছে। এটা খুবই বিপজ্জনক। কিন্তু সরকার নিজের প্রতি সমর্থন দেখাতে লোকজনকে সমবেত করতে চাচ্ছে।
প্রশ্ন : মুডিতে মালয়েশিয়ার ক্রেডিট রেটিং এখনো এ৩। কিন্তু আপনি উল্লেখ করেছেন, রিঙ্গিতের মান দ্রুত পড়ে যাচ্ছে, ঋণের পরিমাণ অত্যন্ত উচ্চ। আর ১এমডিবি কেলেঙ্কারি দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করেছে। আপনি কি ক্রেডিট রেটিংয়ে বড় ধরনের পতন আশঙ্কা করছেন?
মাহাথির : হতে পারে। যেভাবে চলছে, তেমনটি ঘটতেই পারে। কারণ, এখন ঋণ শোধ করতে বিশেষ করে মার্কিন ডলারে আরো বেশি রিঙ্গিত দিতে হবে। আবার বেশি রিঙ্গিত পেতে হলে অর্থনীতিকে আরো ভালো করতে হবে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতির অবস্থা ভালো নয়। আমরা দ্রুত এগোতে পারছি না। আমরা আরো ধনী হচ্ছি না। আমরা আসলে আরো গরিব হচ্ছি।
প্রশ্ন : মালয়েশিয়ায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা সৃষ্টি করতে হলে কী করতে হবে?
মাহাথির : এই মুহূর্তে আমি মনে করি, নাজিব প্রধানমন্ত্রী না থাকলে আস্থা ফিরে আসবে।
প্রশ্ন : এটা কি এতই সহজ হবে? তিনি যদি পদত্যাগ করেন, তবে আইনি জটিলতার সুরাহা কিভাবে হবে? আর ভবিষ্যতে এ ধরনের কেলেঙ্কারি যাতে না ঘটে, সেটা কিভাবে করা যেতে পারে?
মাহাথির : সব কিছুই করা সম্ভব হবে যদি নাজিব প্রধানমন্ত্রী না থাকেন।
প্রশ্ন : এ ধরনের ফলাফল হবে বলে কি আপনি মনে করেন, নাকি মনে করেন হবে না?
মাহাথির : আমি খুবই হতাশ হয়ে পড়েছি। মনে হচ্ছে, রাজনৈতিক স্থবিরতার সৃষ্টি হয়েছে। আর কোনো গণবিক্ষোভ হওয়ার অশঙ্কা নেই। অনাস্থা ভোটের ব্যবস্থা থাকা দরকার ছিল। তবে এর সবটাই নির্ভর করে পার্লামেন্ট সদস্যরা তাদের দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন কি না তার ওপর। পার্লামেন্ট সদস্যরা কোনো না কোনো কারণে এবং কোনো না কোনোভাবে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি দায়বদ্ধ, অনুগত। ফলে তারা তা করতে পারছেন না।
প্রশ্ন : এর পর জনগণের সামনে আর কোনো পথ খোলা আছে?
মাহাথির : পরবর্তী নির্বাচন। পরবর্তী নির্বাচন হতে তিন বছর বাকি আছে। কিন্তু তখনো যে হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ, জনগণের মন বদলানোর জন্য টাকাকড়ি অনেক পথ পাড়ি দেবে। আর প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ লোকজনের হাতে টাকা নেই, প্রধানমন্ত্রীর কাছে আছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা। তিনি নিজেও তেমনটি স্বীকার করেছেন।
প্রতিটি নাগরিক চায়, তার দেশ সমৃদ্ধ হোক, যাতে সে নিজে তার জীবনকে উপভোগ করতে পারে। কেউ কেউ কিছু করতে সক্ষম হয়, অন্যরা কিছুই করতে পারে না। তবে আমি নিজে কিছু করার মতো অবস্থায় ছিলাম। আর সে কারণে আমি বিখ্যাত হয়েছি। তারপর থেকে আমি যা বলি সেগুলোর অনেক কিছু লোকজন গ্রহণ করে বলে মনে হয়। এ জন্যই বেশির ভাগ সাধারণ মানুষের চেয়ে আমার বেশি কিছু করার সুযোগ রয়েছে। আমি সাধারণ নাগরিক, তবে কিছু করার জন্য আমার কাছে সুযোগ অনেক বেশি আছে।
প্রশ্ন : কেমন ধরনের নেতৃত্ব আপনি দেখতে চান?
মাহাথির : নেতাকে অবশ্যই তার দেশ নিয়ে ভাবতে হবে, নিজেকে নিয়ে নয়। একটা নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত আপনাকে আপনার অবস্থান ধরে রাখতে হবে, তবে সেটা এ জন্য যে- আপনি দেশের জন্য যাতে ভালো কিছু করতে সক্ষম হন।
প্রশ্ন : পরবর্তী নেতা হিসেবে কারো কথা কি আপনার মনে রয়েছে?
মাহাথির : হ্যাঁ, আমি সাধারণভাবে মনে করি, তিনি হতে পারেন আমনোর সাবেক সহসভাপতি। তবে এখন অবশ্যই বিষয়টি খুবই উন্মুক্ত।
প্রশ্ন : আর তাই বিশেষ কারো নাম বলবেন না?
মাহাথির : হয়তো সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী।
প্রশ্ন : আপনি যদি ১৯৮৬ সালে আপনার লেখা দি চ্যালেঞ্জ মালয়েশিয়ার বর্তমান সমস্যাবলি সমাধানের জন্য নতুন করে প্রকাশ করতে চান, তবে তাতে কী বলা হবে?
মাহাথির : আমি সব সময়ই ভাবি, নেতৃত্বের প্রধান কাজই হবে নেতার দায়িত্ব পালন করা। তবে আমি এখন দেখতে পাচ্ছি, কেবল নেতা হওয়াই যথেষ্ট নয়। নেতার দায়িত্ব হবে নিজের দিকে নয়, দেশের দিকে নজর দেয়া। এখন আমি দেখছি, যে কেউই নেতা হতে পারে না। এমন কাউকে দরকার, যিনি দেশের জন্য নিবেদিতপ্রাণ।
প্রশ্ন : আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে মালয়েশিয়ার অবস্থান নিয়ে কিছু জানতে চাচ্ছি। বিশেষ করে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ট্রান্স-প্যাসিফিক পার্টনারশিপ (টিপিপি) এবং চীনা সমর্থিত রিজিওনাল কমপ্রেহেনসিভ ইকনোমিক পার্টনারশিপ নিয়ে। এসব ব্যাপারে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে মালয়েশিয়ার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকা নিয়ে আপনার চিন্তাভাবনা কী?
মাহাথির : আমার সময়ে পররাষ্ট্রনীতির মূলকথা ছিল সব দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রক্ষা করা। আমরা সাউথ সাউথ সংস্থা সূচনা করি। মার্কিন নীতির কারণে আমি সব সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি সমালোচনামুখর ছিলাম। প্রতিটি দেশের ব্যাপারে নাক গলানোর অভ্যাস যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে। তারা এলেই সমস্যা হবে। আপনি মধ্যপ্রাচ্য এবং অন্যান্য স্থানের দিকে দেখুন। তারা মালয়েশিয়ায়ও আসতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাখ্যান করেছিলাম।
এখন তারা টিপিপি প্রস্তাব করেছে। টিপিপি হলো তাদের একটা হাতিয়ার, তাদের মঙ্গলের জন্যই এর উদ্ভাবন। তারা সব জায়গায় উন্মুক্ত বাজার চায়, যাতে তারা প্রবেশ করতে পারে। এর বিপরীত কথাটা হলো, ‘তুমি আমাদের দেশে আসতে পারো,’ তবে তোমাদের দেশে যাওয়ার মতো শক্তি আমাদের নেই। সেখানে বিক্রির মতো পণ্য আমাদের নেই, অথচ তাদের হাতে সব কিছুই আছে। তাদের আছে মূলধন, তাদের আছে জানাশোনা, তারা এখানকার ছোট-বড় কোম্পানি কিনে নিতে পারে। আর এসবের মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত তারা সব ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করবে। এর অর্থ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণও।
প্রশ্ন : অনেকে মনে করেন, নাজিবের প্রশাসন টিপিপি অনুমোদন করবে। আপনি কি এর সাথে একমত?
মাহাথির : তিনি এর লাভ-ক্ষতি ভালোভাবে খতিয়ে দেখেননি। তিনি তা করলেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার সম্পর্ক হতো বন্ধুত্বপূর্ণ। তিনি জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে আমেরিকার সাথে বন্ধুত্ব এবং আমেরিকার আদর্শ অনুসারে কাজ করতে আগ্রহী।
প্রশ্ন : চীনা প্রসঙ্গে আমি মনে করি, ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে আপনার দেয়া ইস্ট এশিয়ান ইকনোমিক ককাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা স্নায়ুযুদ্ধকালের সাউথইস্ট এশিয়া এবং নর্থইস্ট এশিয়ার ধারণা থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে ইস্ট এশিয়া ধারণার জন্ম দিয়েছে। এখন এশিয়ার ধারণায় চীন প্রাধান্য পাচ্ছে। চীনের ব্যাপারে মালয়েশিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি কী হওয়া উচিত?
মাহাথির : দেখুন, ইএইসি (ইস্ট এশিয়ান ইকনোমিক ককাস বা কমিউনিটি) ধারণাটি এসেছিল গ্যাটের (জেনারেল এগ্রিমেন্ট অন টেরিফস অ্যান্ড ট্রেড) ব্যর্থতা থেকে। ওই ব্যর্থতার কারণে আমরা অন্যান্য দেশ, পাশ্চাত্যের অর্থনীতির সাথে সঙ্ঘাতময় অবস্থায় নিজেদের দেখতে পাই। তবে ইউরোপ একত্র হয়ে, উত্তর আমেরিকা একত্র হয়ে তাদের শক্তি বাড়িয়ে নেয়। মালয়েশিয়াকে তাদের মোকাবেলা করতে হলে আমাদেরও শক্তিশালী হতে হবে। আমাদের দরকার বৃহত্তর ব্লক। আর সেই বৃহত্তর ব্লক হতে পারে পূর্ব এশিয়া। কেবল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া দিয়ে হবে না, কারণ সেটা খুবই ছোট, খুবই দুর্বল।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং সেই সাথে পূর্ব এশিয়া খুবই শক্তিশালী। তখন আমরা যেকোনো সভায় গিয়ে একবাক্যে জোরালোভাবে আমাদের কথা বলতে পারব। কিন্তু আমেরিকা এই পরিকল্পনা নস্যাৎ করার জন্য জাপান, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও ইন্দোনেশিয়াকে কাজে লাগায়। আমেরিকা চায় না অন্য কেউ তার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামুক। ফলে আমরা ওই পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারিনি।
তারপর চীন খুবই শক্তিশালী অর্থনীতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। আমাদের নীতি হলোÑ আমরা সব দেশের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ থাকব, তবে আমেরিকার মোকাবেলায় ভারসাম্য রক্ষার জন্য চীনের কথা আমরা ভাবতে পারি। এ কারণে চীনের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ একটা নীতি আমাদের তৈরি করতে হবে। চীন ও মালয়েশিয়ার মধ্যে খুবই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
প্রশ্ন : দক্ষিণ চীন সাগর সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?
মাহাথির : জি, ওটা একটা সমস্যা। আমরা সেটার সুরাহা করার চেষ্টা করছি।
প্রশ্ন : আপনি কি ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড এবং এখন ভিয়েতনামের মতো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ান দেশগুলোর নতুন ‘টাইগার অর্থনীতি’ নিয়ে উদ্বিগ্ন?
মাহাথির : না। আমাদের নীতিতে বলা হয়েছেÑ আমরা ‘প্রতিবেশীর সমৃদ্ধি’ চাই। আমরা বিশ্বাস করি, প্রতিবেশী সমৃদ্ধ হলে আমাদের সমস্যা কম হবে। তারা গরিব হলে তারা আমাদের দেশে আসতে চাইবে, নানা ধরনের সমস্যা, সঙ্ঘাত সৃষ্টি করবে। তারা সমৃদ্ধ হলে আমরা সেখানে রফতানি করে, বাণিজ্য করে লাভবান হবো। আমি মনে করি, আমাদের কিছু সুবিধা আছে। কারণ আমরা শুরু করেছি আগে। এত প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আমরা ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের চেয়ে বেশি শিল্পায়িত।
তবে প্রশাসন অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে মনোযোগী না হওয়ায় আমরা পেছনে পড়ে যাচ্ছি। আমরা ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন বা ভিয়েতনামের মতো এত দ্রুতগতিতে এগোতে পারছি না। এটাই সরকারের ভুল। কারণ তারা মোটেই জানে না বা দেশের কী হচ্ছে সে সম্পর্কে বেপরোয়া। ফলে আমাদের প্রতিবেশীরা যখন সমৃদ্ধ হয়ে যাবে, তখন আমরা আমাদের প্রতিযোগিতা করার সামর্থ্যরে অভাবে সুবিধা নিতে ব্যর্থ হবো।
প্রশ্ন : মালয়েশিয়ার সুনাম, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ব্যাপারে আপনাকে আজ বেশ হতাশ মনে হচ্ছে। মালয়েশিয়ার সামনে আশাবাদী হওয়ার মতো কিছু আছে কি?
মাহাথির : জনগণ খুবই ভালো। মালয়েশিয়ানরা খ্বুই সহিষ্ণু। এখানকার মতো জাতিগত, সংস্কৃতিগত ও অর্থনীতিগত বিভাজন অন্য কোনো দেশে থাকলে সেখানে সঙ্ঘাত, সহিংসতা ব্যাপকভাবে হতো। কিন্তু এখানে আমাদের মধ্যে জাতিগত উত্তেজনা থাকলেও তা সহিংসতা বাড়ার কারণ নয়।
প্রশ্ন : আপনার কি এই বিশ্বাস আছে যে জাতিগত উত্তেজনা থাকলেও সহিংসতা হবে না?
মাহাথির : যদি না কেউ ভুল কিছু করে বসে। মনে রাখতে হবে, অতীতে সহিংসতার মাধ্যমে সরকারকে উৎখাতের জন্য একটা কমিউনিস্ট আন্দোলন হয়েছিল। এটা আগে ঘটেছে। ১৯৬৯ সালে জাতিগত সহিংসতা হয়েছে। তবে সাধারণভাবে মালয়েশিয়ার জনগণ বেশ শান্তিপ্রিয়।

Friday, October 2, 2015

জঙ্গিরা আস্তানা গাড়তে পারবে না -সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল

অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট দলের সফর স্থগিত এবং ইতালির নাগরিক হত্যার ঘটনায় বাংলাদেশে জঙ্গি তৎপরতার বিষয়টি ফের জনগণকে উদ্বিগ্ন করেছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গার্ডিয়ান-এ সাক্ষাৎকার দিয়ে ব্রিটিশ জিহাদিদের ব্যাপারেও সতর্ক করেছিলেন। সম্প্রতি ব্যাংককে মন্দিরে হামলার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযুক্ত চীনা নাগরিক আইজান বাংলাদেশেও এসেছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হলো...
আসাদুজ্জামান খান কামাল, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
প্রথম আলো: ইতালির ত্রাণকর্মী হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বলুন।
আসাদুজ্জামান খান কামাল: খাদ্যনিরাপত্তাবিষয়ক একটি সংস্থার সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন। নেদারল্যান্ডসের অর্থায়নে পরিচালিত এই সংস্থায় তিনি গত মে মাস থেকে কর্মরত ছিলেন। তিনি নিহত হওয়ার আগে আমেরিকান স্কুলের সুইমিং পুল ব্যবহার করে ফিরছিলেন। এই হত্যাকাণ্ডের ভেতরের কী কারণ, তা আমাদের গোয়েন্দারা খতিয়ে দেখছে। চারটি গোয়েন্দা টিম সেখানে কাজ করছে। পুলিশ, ডিবি, র্যাব ও অন্যান্য গোয়েন্দা কাজ করছে। হত্যার পেছনে যে মোটিভ রয়েছে, সেটাকেই বের করতে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
আশা করি, এই হত্যাকাণ্ডের মোটিভ আমরা খুব শিগগির বের করতে পারব। এটা একটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। ইতালি আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ। তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হয়েছেন। এর কিছুক্ষণ পরই একটি আমেরিকান ওয়েবসাইটের মাধ্যমে একটা খবর পাঠিয়েছে যে আইএস নাকি এর দায়দায়িত্ব স্বীকার করেছে। আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত প্রমাণসহ কোনো তথ্য আসেনি। আমাদের দেশের মানুষ জঙ্গিদের পছন্দ করে না এবং জঙ্গিদের তারা কখনো সহযোগিতা করে না। আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি, আইএস নামের কোনো সংগঠন আমাদের দেশে নেই। তারপরও দাবি যখন করা হচ্ছে, তখন আমরা এটা খতিয়ে দেখব। আমরা এই এনজিওর কার্যক্রমও খতিয়ে দেখছি, তাদের কার্যক্রমে কেউ কেউ ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন কি না কিংবা নিহতের ব্যক্তিগত বা পারিবারিক কোনো কারণ আছে কি না।
প্রথম আলো: ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরার (সিসিটিভি) সাহায্য মিলবে কি?
আসাদুজ্জামান: সৌদি দূতাবাসের কাছে ক্যামেরা রয়েছে। আততায়ীরা গুলি করে মোটরসাইকেলযোগে ওই দূতাবাসের পাশ দিয়ে চলে গেছে। আমরা মনে করি দূতাবাসের সিসিটিভিতে ফুটেজ পেতে পারি। আমরা সেগুলো সংগ্রহ করার চেষ্টা করছি। গুলশান এলাকায় আমাদেরও সিসিটিভি রয়েছে। আমরা আগে নিশ্চিত হই, তারপর সবকিছু প্রকাশ করব।
প্রথম আলো: অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট টিমের ঢাকা সফর স্থগিত হলো, এরপর অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের নাগরিকদের জন্য অ্যালার্ট জারি করল। এর মধ্যে ইতালির নাগরিক নিহত হলেন। এর মধ্যে কোনো যোগসূত্র আছে কি?
আসাদুজ্জামান: আমি তো বললাম, কোনো প্রমাণ না পেয়ে কোনো কিছু বলব না। দেখুন, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে আমাদের একটি ভালো যোগসূত্র রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেল পুলিশ আমাদের সব সময় তথ্য দিয়ে থাকে। এবার সেখানে অস্ট্রেলীয় ফেডারেল পুলিশ কিন্তু আমাদের কিছুই জানায়নি।
প্রথম আলো: মিয়ানমার সীমান্তে সম্প্রতি কী ধরনের অভিযান আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী চালিয়েছে? এর ফলাফল কী?
আসাদুজ্জামান: আমি দৃঢ়তার সঙ্গে বলছি, আমরা মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক অব্যাহতভাবে জোরদার করে চলেছি। তাদের সঙ্গে সম্পর্ক শক্তিশালী করা হলে আমাদের অনেক সমস্যা, যেমন মাদক, আমরা সমাধান করতে পারব। মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন আরাকান লিবারেশন আর্মি মাঝেমধ্যে আমাদের সীমান্তে ঢুকে পড়ে। কারণ, ওই এলাকাটি অত্যন্ত দুর্গম। আমাদের এক বিওপি থেকে আরেক বিওপিতে যেতে অনেক সময় দু-তিন দিন লেগে যায়। কখনো হেঁটে যেতে হয়। হেলিকপ্টার ছাড়া সেখানে যাওয়া যায় না। আমাদের বিওপির ওপর সম্প্রতি তারা যে একটি আক্রমণ চালিয়েছে, তার কারণ হচ্ছে, তাদের কিছু রসদ আমরা ধরে ফেলেছিলাম। পরে যৌথ অভিযান চালিয়ে দেশ থেকে তাদের বিতাড়িত করেছি।
প্রথম আলো: মিয়ানমার কি কোনো তালিকা দিয়েছে?
আসাদুজ্জামান: মাঝেমধ্যে তারা অনেক কিছুই বলে। যেমন রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন এখানে-ওখানে ক্যাম্প করছে। তাদের সেই তালিকা অনুযায়ী মাঝেমধ্যেই আমরা যৌথ অভিযান পরিচালনা করে থাকি। কোনো সময় সত্যতা পাইনি।
প্রথম আলো: মেজর জেনারেল (অব.) মুনিরুজ্জামানের থিংক ট্যাংকের এক রিপোর্টে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে আইএস তাদের এলাকার বাইরেও নজর দিতে শুরু করেছে। চেচনিয়ায় তারা একজন গভর্নর নিযুক্ত করেছে। সুতরাং তাদের আশঙ্কা হলো, মিয়ানমার সীমান্তে বিশেষ কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে আইএস সেখানে অনুরূপ হস্তক্ষেপ করতে পারে।
আসাদুজ্জামান: আমরা মনে করি না যে আমাদের দেশে এসে তারা আস্তানা গাড়তে পারবে। আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী সর্বদা সজাগ রয়েছে। আমাদের সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী ও কোস্টগার্ড সতর্ক রয়েছে। সবাই সজাগ আছি। এ ধরনের জঙ্গি সংগঠন বাংলাদেশের মাটিতে মাথাচাড়া দেবে, তার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।
প্রথম আলো: আইএসের বিষয়ে মিডিয়ায় মাঝেমধ্যে নানা খবর ছাপা হয়।
আসাদুজ্জামান: এটা মিডিয়ায় আসছে এবং আমাদের পুলিশও দু-একটি ক্ষেত্রে সন্দেহভাজন সদস্য ধরেছে বলে উল্লেখ করেছে। এক ব্রিটিশ নাগরিক নাকি এসেছিলেন, তিনি নাকি আইএসের সদস্য সংগ্রহ করবেন। সেটা যখন জনতা জানতে পেরেছে, তখন তারা পুলিশকে ধরিয়ে দিয়েছে। তাই বলছিলাম, যাঁরাই এ ধরনের অপকর্ম করার চেষ্টা করেন, আমাদের গোয়েন্দা বাহিনী তাঁদের ধরে ফেলছে।
প্রথম আলো: কিন্তু তা সত্ত্বেও আমরা বাংলা ভাইয়ের উত্থান দেখেছি।
আসাদুজ্জামান: তাদের তো বাংলাদেশের মানুষ ধরিয়ে দিয়েছে। অন্য কাউকে এসে ধরিয়ে দিতে হয়নি। আমাদের এখানে যারা অত্যাচার করেছিল, সেখানে অবশ্যই সরকারের সহযোগিতা ছিল। সেটা আপনারা জানেন, আর সেটা তো এখন নেই।
প্রথম আলো: সেটা নেই, তা সত্ত্বেও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অনেকেই উদ্বিগ্ন যে যদিও রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ে রাজনৈতিক সদিচ্ছার কমতি নেই, জনগণও এসব চায় না, কিন্তু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার তৃণমূলে কিংবা মধ্যম পর্যায়ে দক্ষতা কমে যাওয়ার কারণে একটা আশঙ্কা থেকে যায় কি না?
আসাদুজ্জামান: আমাদের আগের সরকারগুলোর সময় এগুলো ঘটেছিল। আপনারা মিডিয়ায় যখন বলেছিলেন, তখন বলা হয়েছিল এসব মিডিয়ার সৃষ্টি। এভাবে তাদের সহযোগিতা দেওয়া হতো। কিন্তু আমাদের সরকার তাদের সহযোগিতা করে না, আমরা কোনো পৃষ্ঠপোষকতা করি না। আমাদের দেশের ভূখণ্ড থেকে ভারতসহ কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতাবাদ চালানোর প্রতিও আমাদের কোনো সমর্থন নেই।
প্রথম আলো: সাম্প্রতিক ঘটনাবলির পর ভারতের দিক থেকে কি কিছু বলা হয়েছে?
আসাদুজ্জামান: ভারতের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খুবই ভালো। তাদের সঙ্গে সর্বদাই আমাদের সংবাদ আদান-প্রদান হয়। কেবল দ্বিপক্ষীয় নয়, অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বিষয়াদি নিয়েও মতবিনিময় চলে, তথ্যের যাচাই-বাছাই করেই আমরা কাজ করি। ভারত এ বিষয়ে কোনো তথ্য জানায়নি। তারা কোনো আশঙ্কাও প্রকাশ করেনি।
প্রথম আলো: সম্প্রতি গার্ডিয়ান-এর রিপোর্টে ইরাক ও সিরিয়ায় বিদেশি যোদ্ধা হিসেবে ৩০ জন বাংলাদেশি যোগদান করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিষয়টি কি যাচাই করা সম্ভব হয়েছে?
আসাদুজ্জামান: এ বিষয়ে এই মুহূর্তে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই। আমরা যেটা শুনেছি, সেটা যাচাই না করে কিছু বলতে পারব না। সিরিয়ায় কখন কারা কীভাবে গেছে, সেটাও জানা নেই। আমাদের দেশ থেকে, নাকি আমাদের বংশোদ্ভূত কেউ অন্য দেশ থেকে গেছে, এটা আমাদের জানা নেই।
প্রথম আলো: বিদেশ সফররত প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে কি কোনো নতুন নির্দেশনা পেয়েছেন?
আসাদুজ্জামান: মঙ্গলবার রাতেও তাঁর সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। তিনি সবকিছুই জানেন এবং তদারক করছেন। তিনি যা যা নির্দেশনা দিচ্ছেন, সে অনুযায়ীই কাজ হচ্ছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবকিছুর ব্যাপারে খবর রাখছেন।
প্রথম আলো: একজন জার্মান বিশেষজ্ঞ আমাদের এক সাক্ষাৎকারে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে বাংলাদেশ জঙ্গিবাদের একটি ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। থাইল্যান্ডে বিস্ফোরণের অন্যতম পরিকল্পনাকারী ঢাকায় এসেছিলেন। আবার গার্ডিয়ানও লিখেছে, এখন যে একটা আপাত শান্ত অবস্থা যাচ্ছে, এটা দ্রুত উল্টে যেতে পারে।
আসাদুজ্জামান: আমাদের কাছে তো দেশের এবং বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থারও প্রতিবেদন রয়েছে। আপনি যে চীনা জঙ্গির কথা বলছেন, তিনি ঢাকায় এসে অনেক আগেই চলে গেছেন। আমি বারবার আপনাদের আশ্বস্ত করছি যে বাংলাদেশে কোনো জঙ্গির স্থান নেই এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না। শেখ হাসিনার সরকার যত দিন ক্ষমতায় থাকবে, তত দিন ভয়ের কিছু নেই।
প্রথম আলো: কিন্তু অনেকের মতে, দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে যদি তারা মাথাচাড়া দেয়!
আসাদুজ্জামান: আমরা এটাকে কখনোই রাজনৈতিক অচলাবস্থা বলব না। একটি নির্বাচন হয়েছে। একটি নির্বাচিত সরকার এসেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের মতো দেশে কত শতাংশ মানুষ ভোট দেন? আমরা যেটা বলেছি, তারা ট্রেন মিস করেছে। আবার ট্রেন যখন আসবে, তখন তারা ট্রেনে উঠবে।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
আসাদুজ্জামান: ধন্যবাদ।

Monday, September 28, 2015

ভারতের আজ্ঞাবহ হবো না : - পুষ্প কমল দাহাল প্রচন্দ

পুষ্প কমল দাহাল প্রচন্দ
ইউনাইটেড কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (এম)-ইউএনপিএন মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে বেশি পরিচিত। দলটির প্রধান পুষ্প কমল দাহাল প্রচন্দ নেপালের একজন আলোচিত রাজনীতিবিদ। রাজতন্ত্র অবসানের পর প্রথম গণপরিষদ নির্বাচনে তিনি হন নেপালের প্রধানমন্ত্রী। প্রেসিডেন্ট ও সেনাবাহিনীর সাথে বিরোধকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক টানাপড়েনে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন। পরে একপর্যায়ে তারই ডেপুটি বাবু রাম ভট্টরাই দেশটির প্রধানমন্ত্রী হন। ভারতপন্থী হিসেবে পরিচিত মাওবাদী নেতা ভট্টরাইয়ের সাথে তার রাজনৈতিক মতপার্থক্য একেবারে অপ্রকাশ্য ছিল না। বিবিসি নেপালি সার্ভিসের রবীন্দ্র মিশ্রের সাথে পুষ্প কমল দাহাল প্রচন্দের এই সাক্ষাৎকারে নেপালের নতুন সংবিধান গ্রহণ ছাড়াও ভট্টরাইয়ের বিষয়ও উঠে এসেছে। এই সাক্ষাৎকার যখন প্রকাশ হচ্ছে তখন ভট্টরাই মাওবাদী দলের সাথে তার সম্পর্ক ছেদ করেছেন। তিনি নতুন রাজনৈতিক শক্তির পত্তন ঘটাতে চান। কতটা এ ক্ষেত্রে সফল হবেন এ ব্যাপারে সংশয় রয়েছে প্রচন্দের। মাওবাদী নেতা প্রচন্দের এই সাক্ষাৎকার খুব বড় পরিসরের না হলেও নেপালের সঙ্কটময় পরিস্থিতি বোঝার জন্য এটির রয়েছে বিশেষ তাৎপর্য। নয়া দিগন্তের পাঠকদের জন্য নেপালি টাইমস পত্রিকা থেকে সাক্ষাৎকারটির অনুবাদ করেছেন মাসুমুর রহমান খলিলী
বাবু রাম ভট্টরাই
বিবিসি নেপালি সার্ভিস : আপনি দেশকে প্রজাতন্ত্র করা, গণপরিষদের মাধ্যমে সংবিধান প্রণয়ন, ফেডারেল ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা তৈরির মতো যুদ্ধের প্রায় সব উদ্দেশ্য অর্জন করেছেন। এরপর আপনার জন্য কী কাজ বাকি আছে বলে মনে করছেন?
পুষ্প কমল দাহাল : গণপরিষদে যখন নতুন সংবিধান গৃহীত হয় তখন আমি খুবই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। সেই রাতে আমি যখন বাড়ি পৌঁছি তখন আমার নিরাপত্তা কর্মকর্তা সিংহ দরবার, বালুওয়াটার ও ব্যানশোর বা এ ধরনের কোথাও যাওয়ার ব্যাপারে আমাকে সতর্ক করে দেন। কিন্তু আমি তাকে বলি এখন মৃত্যুকে আমার আর কোনো ভয় নেই। আমি এখন শান্তিতে বিশ্রাম করতে পারি, কারণ নেপাল একটি প্রজাতন্ত্র হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিকতা লাভ করেছে এবং নতুন অভিযাত্রা শুরু করেছে আমাদের প্রিয় দেশটি।
মিশ্র : নেপালের রাজনৈতিক রূপান্তরের একটি পর্ব হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু এটি এখনো একটি অনুন্নত দেশই রয়ে গেছে। আপনার মিশন কি সত্যিই শেষ হয়ে গেছে?
দাহাল : কিন্তু এই রাজনৈতিক রূপান্তর অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি আবশ্যিক পূর্বশর্ত ছিল।
মিশ্র : আপনি আমাদের সম্প্রতি বলেছেন, অন্তত সাত-আট বছর ধরে আপনি সক্রিয় রাজনীতিতে থাকতে চান। এই সময়ে আপনি নেপালে কী হিসেবে অবদান রাখতে চান?
দাহাল : হ্যাঁ, আমি মনে করি অন্তত আরো সাত-আট বছর ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে হবে আমাকে। আমি পরবর্তী নির্বাচনে জিততে চাই যাতে সংবিধানের ফেডারেল প্রদেশের সৃষ্টি এবং এর বাস্তবায়নে যে ব্যবস্থা রয়েছে সেই রাজনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার বিষয়টিতে তত্ত্বাবধান করতে পারি।
মিশ্র : এসব কাজ করার প্রয়োজনে কি আপনাকে প্রধানমন্ত্রী হতে হবে না?
দাহাল : আমি এই মুহূর্তে কোনো পদ নিয়ে চিন্তা করছি না। কিন্তু আমি এটা স্পষ্ট করতে চাই যে, আমাদের দলকে আগামী জোট সরকারের অংশীদার হতে হবে।
মিশ্র : তাহলে বাবুরাম ভট্টরাই শিগগিরই পার্টির সভাপতি হওয়ার কোনো সুযোগ পাচ্ছেন না?
দাহাল : আমি পার্টির নেতত্বে হস্তান্তর করার ওপর একটি প্রস্তাব প্রস্তুত করেছি। আমার সক্রিয় রাজনীতিতে থাকার জন্য পার্টির সভাপতি থাকতেই হবে এমন নয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, আমি এক্ষুনি পদত্যাগের জন্য তৈরি হয়ে আছি।
মিশ্র : ভট্টরাই একটি নতুন রাজনৈতিক শক্তি গঠনের প্রতিজ্ঞার কথা বলেছেন। তিনি আপনাকে তার পার্টি ছাড়ার ব্যাপারে কিছু বলেছেন কি?
দাহাল : তার নতুন রাজনৈতিক শক্তি তৈরির বিষয়টি একটি পুরনো গল্প এবং আমি মনে করি না তিনি দল থেকে বিদায় নেবেন। আমি বিস্মিত হই যখন দেখি তার পর্যায়ের একজন নেতা নতুন সংবিধানের বিরুদ্ধে জনসমক্ষে কথা বলছেন এবং লিখছেন। এটা আমার কাছে একেবারে অস্বাভাবিক মনে হয়।
মিশ্র : এটি সম্ভবত এ কারণে হচ্ছে যে, তিনি দল থেকে পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন?
দাহাল : যদি তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেন, তাহলে তিনি কিংবা দেশ কেউই তার কাজ থেকে উপকার পাবে না। আমি ৩০ বছর ধরে তাকে সাথে নিয়ে কাজ করছি। আমার চেয়ে কেউ তার অধিক ঘনিষ্ঠ নেই। তার অনেক গুণ আছে কিন্তু তিনি এক জটিল চরিত্রের ব্যক্তি।
মিশ্র : আপনি প্রকাশ্যে বলেন, ভারত যদি আমাদের সম্মান চায় তাহলে আমাদেরকেও তাদের সম্মান করতে হবে। কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে ভারতীয় বিশেষ দূত এস জয়শঙ্করকে আপনি কী বলেছেন?
দাহাল : আমি সম্প্রতি যখন নয়া দিল্লি যাই তখন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে বলেছি আমরা ভারতের ভালো বন্ধু হতে চাই, ইয়েস ম্যান বা আজ্ঞাবহ নয়। আমরা আমাদের দেশকে ভালোবাসি এবং সেভাবে যাতে তারা কাজ করে। নয়াদিল্লিতে যাদের সাথে কথা হয়েছে তাদের আমি বলেছি নেপাল ভালো প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের উদ্বেগের সুরাহা করতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই আজ্ঞাবহ হিসেবে নয়।
মিশ্র : আসলে আপনি এবং জয়শঙ্করের মধ্যে কী কথা বা বাক্য বিনিময় ঘটেছিল?
দাহাল : তিনি আমাকে স্পষ্টভাবে বলেছেন, সবার সম্মতি না থাকলে ভারত নতুন সংবিধানকে স্বাগত জানাবে না। তিনি আরো বলেছেন, কয়টি দেশ স্বাগত জানাল সেটি কোনো বিষয় নয়, ভারতের স্বীকৃতি ছাড়া নেপালের নতুন সংবিধান একেবারে অর্থহীন হবে। আমি শুধু তাকে বলেছি, আপনার সফরটি বড় অসময়োচিত হয়ে গেছে, আপনার হয় ১৫ দিন আগে অথবা ১৫ দিন পরে নেপালে আসা উচিত ছিল।
মিশ্র : এখন মাধেশি দলগুলোর সাথে কিভাবে আপনি মোকাবেলা করবেন?
দাহাল : আমরা শুধু মাধেশিই নয়, থারু ও জনজাতির ক্ষোভ নিরসনের জন্যও সংবিধান সংশোধনের ব্যবস্থা রেখেছি। এটি আমরা দ্রুত করে ফেলতে চাই। কারণ যেকোনো বিলম্ব এখন যে গতি এসেছে তা নষ্ট করে দিতে পারে। আমি যখন মাধেশি নেতাদের সাথে ওয়ান টু ওয়ান বৈঠকে বসেছি তখন তারা আমাকে বলেছেন তাদের নির্বাচনী এলাকায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া হতে পারে বলে এ সংবিধান অনুমোদন তারা করবেন না। কিন্তু তারা আমাদেরকে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছেন।
মিশ্র : আপনি কি তরাই অঞ্চলে কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছেন?
দাহাল : তরাই অঞ্চলে একদল স্পষ্টভাবে বিচ্ছিন্নতাবাদকে উসকে দিতে চাইছে, কিন্তু এটি মাধেশি জনগণের দৃঢ় কোনো সমর্থন পাবে না। আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, মাধেশি জনগণ নেপাল থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায় না। নেপালি রাষ্ট্রের প্রতি তাদের আনুগত্য অত্যন্ত গভীর ও সুদৃঢ়।
মিশ্র : আপনি কি মনে করেন ভারত তরাই অঞ্চলের রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে উসকানি দেবে?
দাহাল : আমি এ সম্পর্কে একটু চিন্তিত। ভারতীয় বিশেষ দূত জয়শঙ্করের সাথে দেখা হলে তিনি আমাকে বলেন, তরাইয়ের অস্থিরতা বিহার, উত্তর প্রদেশ ও ভারতের পুরো সীমান্তে ছড়িয়ে যেতে পারে। তিনি সীমান্ত শব্দটি উচ্চারণ করেন। আমি তাকে বলি, আপনার উদ্বেগ জেনুইন, কিন্তু ভারতের জন্য বুদ্ধিমানের কাজ হবে ভারতের নিজস্ব সীমানা ছাড়িয়ে ভাবা এবং বৃহত্তর নেপালের বিষয়টি চিন্তা করা।

Thursday, August 20, 2015

‘জামিনের জন্য আমার স্ত্রী মন্ত্রীকে ফোন করেনি’ -জামিনে মুক্তির পর সাংবাদিক প্রবীর সিকদার

জামিনে মুক্তি পাওয়া সাংবাদিক প্রবীর সিকদার বলেছেন, তিনি কীভাবে জামিন পেলেন, তা তিনি জানেন না। তবে এ নিয়ে তাঁর স্ত্রী অনিতা সিকদার স্থানীয় সরকারমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে ফোন করেননি। বরং মন্ত্রী উল্টো তাঁকে ফোন করে জামিনের ব্যবস্থা হবে বলে জানিয়েছেন। আর জামিন পেয়েও তিনি নিজেকে নিরাপদ ভাবছেন না। কারণ, এখনো মামলাটি রয়ে গেছে। গতকাল বুধবার জামিন পাওয়ার পর টেলিফোনে প্রবীর সিকদার প্রথম আলোর কাছে দীর্ঘ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। কীভাবে জামিন হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি অনেক কিছু কম বুঝি। হুটহাট করে যা বুঝি তা করে ফেলি। বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থেকে করে ফেলি। আমার বিরুদ্ধে করা মামলাটা কোন ধারায়, তা আমি জানি না। আমার কোনো আগ্রহও নেই। আজই জামিনের প্রক্রিয়ার পর শুনেছি যে তথ্যপ্রযুক্তি (আইসিটি) আইনে করা এই মামলাটি জামিন অযোগ্য। কিন্তু কীভাবে জামিনযোগ্য হলো—এ প্রশ্নের উত্তর আমার কাছে নেই।
‘কালকে আমাকে তিন দিনের রিমান্ডে নিল। জামিন নিয়ে আমার স্ত্রী কখনো মন্ত্রীকে ফোন করেনি। তবে মন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। সকালে আমি যখন কোর্ট দারোগার কাছে বসা, তখন এক পুলিশ কর্মকর্তা আমার স্ত্রীকে ডেকে নিয়ে যান। ওই পুলিশ কর্মকর্তা তাঁকে ডেকে নিয়ে ফোন ধরিয়ে দিয়ে বলেন, বৌদি একটু কথা বলেন। অপর প্রান্ত থেকে এক ভদ্রলোক পরিচয় না দিয়ে বলেন, বউমা কেমন আছেন। প্রবীর কেমন আছে। ফোনে তাকে বলা হয়, আমি জামিনের ব্যবস্থা করছি, জামিন হয়ে যাবে, চিন্তা কোরো না। এ কথার প্রেক্ষিতে আমার স্ত্রী তাঁর প্রতি ধন্যবাদ জানায়। তখন পর্যন্ত আমার স্ত্রী নিশ্চিত না যে সে কার সঙ্গে কথা বলেছে। তবে জামিনের কথা বলায় ধারণা করেছে যে প্রভাবশালী কেউ কথা বলেছেন।’
প্রবীর সিকদার বলেন, ‘মঙ্গলবার রিমান্ড মঞ্জুর হওয়ার পর পুলিশ আমাকে আর থানায় নিয়ে যায়নি। কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। বুধবার সকাল সাতটার দিকে আমি যখন দাঁত মাজছিলাম, তখন আমাকে জানানো হলো, থানা থেকে পুলিশ এসেছে নিয়ে যেতে। আমি বললাম, গোসল না করে যাওয়া সম্ভব নয়। আমি ভেবেছিলাম রিমান্ডে থাকব তিন দিন। এক শার্ট-প্যান্ট পড়ে থাকব। ওখানে গোসল করা হবে না। আমি গোসল শুরু করলে অন্তত ১০ বার আমাকে জেলগেটে যাওয়ার জন্য তাগাদা দেওয়া হয়। আমি সেভ ও নাশতা করতেও পারিনি। জেলগেটে এসে দেখতে পাই আমার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মনির হোসেন বসে আছেন। মনির আমাকে দেখে বলেন, দাদা কী বুঝতেছেন? আমি বলি, আপনি যদি আমাকে খুন করতে চান, তবে খুন করে ফেলুন, কিন্তু টর্চার করবেন না। এসআই মনির আমাকে বলেন, আপনার জামিনের ব্যবস্থা হয়ে যাচ্ছে। আমি তাঁর কথা বিশ্বাস করিনি। কারণ পুলিশ গ্রেপ্তার হওয়ার আগে কেমন আচরণ করে আর গ্রেপ্তার হওয়ার পরে কেমন আচরণ করে, তা তো আমি এই কদিনে টের পেয়েছি।’
জামিনের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রবীর সিকদার বলেন, ‘আজ আমাকে হাতকড়া পরায়নি। অথচ গত কয়েক দিন আমার দুই হাতেই হাতকড়া পরানো হয়েছে। আমি বললাম, আপনি হাতকড়া পরান। কিন্তু তিনি বলেন, মনে করেন আপনার জামিন হয়ে গেছে। তারপরও আমাকে হাতকড়া না পরিয়ে জেলগেট থেকে গাড়িতে ওঠাল এবং ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় ওসির রুমে নিয়ে যায়। আমাকে মনির বলে, দাদা এখন কী করবেন? আমি বলি, আপনিই জানেন আপনি কী করবেন। এসআই মনির বলেন, আমি তো ইন্টারোগেশন শেষ করে ফেলেছি। আমি বলি, কী রকম? তিনি বলেন, আমার কাজ শেষ।
‘এরপর আমাকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁরাই বাদী ও বাদীপক্ষের আইনজীবীদের খবর দিয়ে নিয়ে আসেন। আমার জামিনের আবেদন দেওয়া হলো। বাদীপক্ষের আইনজীবীরা বলেন, দাদা মনে কিছু কইরেন না, সব ব্যবস্থা হচ্ছে। আপনার জামিন হবে। আমরা ম্যাজিস্ট্রেটকে বলে যাচ্ছি। পরে আমি যখন আদালতে যাই, দেখলাম তাঁরা ম্যাজিস্ট্রেটের কক্ষ থেকে বের হয়ে গেলেন। তারপর আমার আইনজীবী জামিনের আবেদন করলেন। কোর্ট দারোগা কোনো আপত্তি করলেন না এবং আমার জামিন হয়ে গেল।’
নিজের নিরাপত্তার বিষয়ে প্রবীর সিকদার বলেন, ‘আমার নিরাপত্তা কে দেবে? এবার তো আমাকে বাঁচিয়েছে জনগণ। পাশাপাশি সরকারের শীর্ষমহলের নিশ্চয়ই হস্তক্ষেপ আছে। তাদের আমি ধন্যবাদ জানাই। তবে গণমানুষের কাছে আমার ঋণ থাকবে। তারা যদি মাঠে না নামত, তাহলে বিষয়টা আরও দীর্ঘায়িত বা আরও ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারত। তারপরেও মামলাটা কিন্তু রয়েই গেল। এর জন্য আমার মনে হচ্ছে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য একটা সাময়িক উপশম করা হয়েছে। কিন্তু মামলা থেকে যাওয়ায় পরে ঝামেলা করা হতে পারে। আমার বিপদ কেটে গেছে, এটা আমি মনে করি না। দেশে-বিদেশে যেভাবে প্রতিক্রিয়া হয়েছে, গণমাধ্যম সোচ্চার ছিল। ফলে সাময়িক পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য হয়তো এটা করা হয়েছে। কিন্তু মামলাটি পুরোপুরি প্রত্যাহার না হওয়া পর্যন্ত আমি নিজেকে নিরাপদ মনে করছি না।’

Monday, August 10, 2015

অযৌক্তিক উন্নয়নের খপ্পরে পড়েছে ঢাকা নগর -বিশেষ সাক্ষাৎকারে: সামছুল হক by এ কে এম জাকারিয়া

সামছুল হক
সামছুল হক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক। যুক্তরাজ্যের সাদাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি পরিবহন বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন। ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিডেটের পরিচালক হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করছেন।
প্রথম আলো: ঢাকা শহরের যানজট ও পরিবহনব্যবস্থা এত শোচনীয় হয়ে পড়ল কেন?
সামছুল হক: আধুনিক একটি নগরের সুষ্ঠু যোগাযোগব্যবস্থা নির্ভর করে যথাযথ অবকাঠামোর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের ওপর। ব্যবস্থাটি হয় বহুমাত্রিক এবং পরিকল্পনাটি হয় সমন্বিত। আর আমরা হেঁটেছি এর উল্টো পথে। এ ক্ষেত্রে আমাদের যে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে, তা ঘটছে অপরিকল্পিতভাবে। এটা আমি স্পষ্ট করেই বলতে চাই যে যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমাদের অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগ অদূরদর্শী। বলা যায়, আমরা এক অযৌক্তিক উন্নয়নের খপ্পরে পড়েছি। এটা সমস্যার টেকসই সমাধানের পথে বড় বাধা। দিনে দিনে পরিস্থিতি এখানে এসে দাঁড়িয়েছে।
প্রথম আলো: শহরে জনসংখ্যার চাপ, যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি, ভূমিসংকট—এসবও তো পরিস্থিতিকে শোচনীয় করে তুলেছে।
সামছুল হক: উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে যানবাহন ও গাড়ির সংখ্যা বাড়বে, মানুষের পরিবহন চাহিদা বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। উন্নয়ন মানে কর্মসংস্থান বাড়বে, শিল্প-কলকারখানা গড়ে উঠবে, উৎপাদন বাড়বে, ভূমির চাহিদা ও ব্যবহার বাড়বে। নগরায়ণের ক্ষেত্রেও এটি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এসব বিবেচনায় নিয়ে ভবিষ্যতে একটি শহরের চাহিদা কী দাঁড়াবে, তার হিসাব-নিকাশ করতে হবে এবং সে অনুযায়ী পরিকল্পনা নিতে হবে। সামনে যে চাহিদা হবে, সে অনুযায়ী আপনাকে জোগান নির্ধারণ করতে হবে। চাহিদা ও জোগানের পার্থক্যই হচ্ছে যানজট। এখন আমাদের গাড়ির সংখ্যা ও পরিবহনের চাহিদা যেখানে এসে দাঁড়িয়েছে, সেই হিসাব-নিকাশটি আগে করে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হলে আজ পরিস্থিতি এখানে এসে দাঁড়াত না। আমরা বর্তমান পরিস্থিতিই সামাল দিতে পারছি না। ভবিষ্যতের অবস্থা কী দাঁড়াবে? এটা তো একটা চলমান প্রক্রিয়া।
প্রথম আলো: বহুমাত্রিক বা সমন্বিত যে পরিকল্পনার কথা বললেন, ঢাকার ক্ষেত্রে তা কী হতে পারে?
সামছুল হক: ঢাকার পরিবহনব্যবস্থা মূলত সড়কনির্ভর। কিন্তু এ রকম একটা জনবহুল মহানগর শুধু সড়কব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে সচল রাখা সম্ভব নয়। ঢাকা এমন একটি অনন্য শহর, যার চারদিকে নদী রয়েছে। সড়কব্যবস্থার সঙ্গে নৌপথ ও নগর রেলব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে বহুমাত্রিক ও সমন্বিত একটি কাঠামো গড়ে তোলা সম্ভব হবে। যোগাযোগের মূল ভিত্তি হতে হবে রেল ও নৌপথ, কিন্তু সেগুলো যেহেতু ডোর টু ডোর সার্ভিস দেবে না, সেটা পূরণ করতে হবে সড়কের মাধ্যমে। স্টেশন থেকে সড়কপথে বিভিন্ন যানবাহন ধরে বা হেঁটে মানুষ তার গন্তব্যে যাবে।
প্রথম আলো: বর্তমানে যেসব পরিকল্পনা ধরে এগোনো হচ্ছে তাতে কি এর কোনো প্রতিফলন নেই?
সামছুল হক: একটি আধুনিক নগরের জন্য দ্রুতগতির বহুমাত্রিক ও পরিকল্পিত যোগাযোগব্যবস্থা বলতে যা বোঝায়, তার কোনো ছাপ দেখা যাচ্ছে না; বরং যেসব প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে বা বাস্তবায়িত হচ্ছে তা সমস্যা তৈরি করবে, যা আমার কাছে এক অশনিসংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রথম আলো: এই যে ফ্লাইওভার তৈরি হচ্ছে, বাস র্যা পিড ট্রানজিট বা বিআরটি, মেট্রোরেল—এগুলো কোনো কাজে দেবে না?
সামছুল হক: একমাত্র মেট্রোরেল পরিস্থিতি পরিবর্তনে কিছু ভূমিকা রাখবে। নগরবাসী দেখবে যে কত সহজে, দ্রুত ও একটি নির্দিষ্ট সময়ে চলাচল করা সম্ভব। এটাই হয়ে উঠবে নগরবাসীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পরিবহন। ঢাকার মতো নগরে আরও আগেই এ ধরনের পরিবহন চালু হওয়া উচিত ছিল। আর বিআরটি যখন হবে, তখন এটা কতটা ভূমিকা রাখতে পারবে, তা বলা কঠিন। প্রতি ঘণ্টায় যাত্রী পরিবহনের যে হিসাব করে এ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যখন এর কাজ শেষ হবে, তখন চাপ বাড়বে বহুগুণ। আরও ২০ বছর আগে এ ধরনের কিছু হলে এখন আমরা সেটাকে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে পারতাম বাসের সংখ্যা বাড়িয়ে, দোতলা বাস দিয়ে বা এই লেন ধরে মেট্রোরেল বানিয়ে।
প্রথম আলো: এখন যুগোপযোগী করার সুযোগ নেই?
সামছুল হক: দেখুন, বিআরটির যে তিনটি রুট ঠিক করা হয়েছে, তার অন্তত দুটি সাংঘর্ষিক হবে মহাখালী ফ্লাইওভার ও নির্মাণাধীন মৌচাক-মালিবাগ ফ্লাইওভারের সঙ্গে। এ দুটি ফ্লাইওভারের কারণে বিআরটির কার্যকারিতা নষ্ট হবে। সমন্বয় আর পরিকল্পনাহীনতাই বড় সমস্যা। বিআরটি হচ্ছে কিন্তু সেখান দিয়ে শেষ পর্যন্ত দ্রুতগতিতে, একটি নির্দিষ্ট লেনে ও কোনো বাধা ছাড়াই বাস চলাচল নিশ্চিত করা যাবে কি না, সেটা বিবেচনায় নেই। এই যে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন করার কাজ চলছে, সেটা শেষ হলে যে এই রাস্তা দিয়ে দ্রুতগতিতে যান চলতে পারবে, তার কি নিশ্চয়তা আছে? দ্রুতগতিতে ট্রেন চালানোর জন্য আমরা ডেমু ট্রেন আনলাম, সেগুলো চলে কিন্তু সেই পুরোনো ট্রেনের গতিতে। কারণ, অন্য বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে কাজটি করা হয়নি।
প্রথম আলো: আপনি মেট্রোরেলকেই সবচেয়ে কার্যকর বলছেন?
সামছুল হক: আধুনিক ও বড় নগরগুলোতে মেট্রোরেল বা শহরাঞ্চলের রেলই সবচেয়ে বড় দাওয়াই। দূরপাল্লার যে রেলওয়ে আছে, তা থেকে এটা ভিন্ন এক নেটওয়ার্ক। এর মাধ্যমেই নগরে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে অনেক যাত্রী পরিবহন সম্ভব। আমাদের মতো দেশে এ ধরনের নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। অথচ দৃশ্যমান যেসব পরিকল্পনা রয়েছে, তাতে এ ধরনের ভাবনা নেই।
প্রথম আলো: ভূমির সংকট ও অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এই নগরে এখন এ ধরনের রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা কতটুকু সম্ভব?
সামছুল হক: পুরো পরিবহনব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনায় নিয়ে যদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়, তবে অবশ্যই সম্ভব। সবচেয়ে বড় কথা, এটা এমনভাবে করতে হবে যাতে নির্বিঘ্ন ও দ্রুতগতিতে ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করা যায়। আগেই বলেছি, আমরা ডেমু ট্রেন এনেছি কিন্তু যে গতিতে এই ট্রেন চলার কথা, সেই গতিতে চালাতে পারছি না। রেললাইনের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, ট্র্যাকে পরিবর্তন আনা হয়েছে, স্লিপার বদলানো হয়েছে, ডুয়েল গেজ করা হয়েছে, কিন্তু দ্রুতগতি নিশ্চিত করা যায়নি। এ জন্য পরিবেশের যে উন্নতি ঘটানো প্রয়োজন সেদিকে নজর দেওয়া হয়নি। লেভেল ক্রসিং নিয়ে ভাবা হয়নি। এটা আমাদের মানতে হবে যে বিআরটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। বিশ্বের বিভিন্ন বড় নগরের অভিজ্ঞতায় এটা অনেকটাই প্রমাণিত ও পরীক্ষিত যে মেট্রো বা নগর রেলই হচ্ছে সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই সমাধান। ঢাকার জন্যও এর কোনো বিকল্প নেই।
প্রথম আলো: আপনি ঢাকার জন্য বহুমাত্রিক বা সমন্বিত যে যোগাযোগব্যবস্থার কথা বলছেন, সেখানে নৌপথের কথাও রয়েছে। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও তো সেটা কার্যকর করা যাচ্ছে না।
সামছুল হক: আমি শুরুতেই বলেছি, এক অযৌক্তিক ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের খপ্পরে আমরা পড়েছি। সে কারণে অর্থ খরচ করে, নানা অবকাঠামো নির্মাণ করেও আমরা এর সুফল পাচ্ছি না। নদীবেষ্টিত ঢাকা মহানগরের পরিবহনব্যবস্থায় নৌপথের ব্যাপক সম্ভাবনার পরও আমরা তা কাজে লাগাতে পারছি না। এই নদীগুলোর ওপর তৈরি করা ১৩টি সেতু একটি কার্যকর নৌপথের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এগুলো এমন নিচু করে বানানো হয়েছে যে এর নিচ দিয়ে অনেক নৌযান চলাচল করতে পারে না। বর্ষার সময়ে তো সব ধরনের নৌযানের জন্যই সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। উন্নয়নের জন্য সেতু বানানো হয়েছে, অথচ এই উন্নয়ন বরং জট বাড়িয়েছে। যদি যথাযথ ও সমন্বিত পরিকল্পনা থাকত, তাহলে সেতুগুলো বানানোর সময় এত নিচু করে বানানো হতো না।
প্রথম আলো: এই নৌপথ কার্যকর হলে ঢাকার ট্রাফিক পরিস্থিতি উন্নয়নে কতটুকু ভূমিকা রাখত বলে আপনি মনে করেন?
সামছুল হক: আমার মনে হয়, ঢাকার ট্রাফিক লোডের ২০ থেকে ৩০ ভাগ নৌপথে নিয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু পরিকল্পনাটি হতে হবে যথাযথ। দেখুন, ঢাকার সদরঘাট নৌ টার্মিনাল বড় হচ্ছে, দৈর্ঘ্যে বাড়ছে। কিন্তু এখানে এসে যে মানুষগুলো নামবে, তারা সেখান থেকে কীভাবে তাদের গন্তব্যে যাবে, তার কোনো যথাযথ ব্যবস্থা নেই। নেমেই কোনো বাস বা গণপরিবহন পাওয়া যাবে এমন পরিস্থিতি নেই। যেসব যাত্রী এখানে আসবে, তাদের গাড়ি রাখার কোনো পার্কিং নেই। সদরঘাট টার্মিনাল ঘিরে আপনি দোকানপাট ছাড়া আর কিছু দেখবেন না।
প্রথম আলো: আপনার পরামর্শ কী?
সামছুল হক: রেল, সড়ক ও নৌপথ মিলিয়ে একটি সমন্বিত ও বহুমাত্রিক যোগাযোগব্যবস্থা বিবেচনায় নিতে হবে, যেখানে ব্যক্তিগত যানবাহনের চেয়ে গণপরিবহনই বেশি প্রধান্য পাবে। রেল, নৌ ও সড়ককাঠামো এমন পরিকল্পিত হতে হবে, যাতে একটি অন্যটির সহায়ক হয়। সামগ্রিক পরিকল্পনাহীনতার কারণে এখন অনেক কিছুই সাংঘর্ষিক ও অকার্যকর হয়ে পড়ছে। চিন্তাভাবনা না করে যেভাবে ফ্লাইওভার বানানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তা গণপরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। যানজটের দোহাই দিয়ে অযৌক্তিক উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া বন্ধ করতে হবে। এগুলো বরং দৃশ্যত মৃত নগরে পরিণত হতে যাওয়া ঢাকার শেষকৃত্যের আয়োজন হিসেবেই বিবেচিত হবে।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
সামছুল হক: ধন্যবাদ।