Saturday, November 15, 2025
ভোটের আগে যে ‘বিজয়’ দরকার বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির by এ কে এম জাকারিয়া
অন্তর্বর্তী সরকার তারপরও দলগুলোকে ঐকমত্যে আসার জন্য এক সপ্তাহ সময় দিয়েছিল সম্ভবত কৌশলগত কারণে। সরকার এখন অন্তত বলতে পারবে যে তারা রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐকমত্যে আসার সুযোগ দিয়েছিল। আর রাজনৈতিক দলগুলোও নিজেরা এই ‘সুযোগ’ নেয়নি সম্ভবত কৌশলগত বিবেচনা থেকেই।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচনের আগেই একটি ‘বিজয়’ পেতে চায় রাজনৈতিক দলগুলো। এর ওপর ভর করে তারা নির্বাচনের মাঠে নামে। এই পুঁজি ছাড়া দলগুলো ভরসা পায় না।
নব্বইয়ের পরের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা যায়, ভোটে জিতে ক্ষমতায় আসা দলগুলো সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে চায় না, ক্ষমতা ধরে রাখতে তারা নানা ফন্দিফিকির করে। নির্বাচনে কারচুপির কৌশল নেয়। আন্দোলন করে বিরোধী পক্ষকে সুষ্ঠু নির্বাচন আদায় করে নিতে হয়। আর সেই বিজয় নিয়ে মাঠে নামে বিরোধী পক্ষগুলো। ইতিহাস বলে, নির্বাচনের ফলাফল তাদের পক্ষেই গেছে।
২০১৪ থেকে ২০২৪—এই ১০ বছরের ইতিহাস অবশ্য ভিন্ন। কর্তৃত্ববাদ থেকে ফ্যাসিবাদী শাসনের এই সময়ে নির্বাচন বলে কিছুই আর কার্যকর ছিল না। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য এ দেশের জনগণ ও রাজনৈতিক দলগুলোকে আবারও দীর্ঘ সংগ্রাম করতে হয়েছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান অনেক রক্ত দিয়ে ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে। পরাজিত পক্ষ পালিয়েছে এবং তাদের দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থান দেশে একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি করছে এবং সে অনুযায়ী দেশ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরাজিত শক্তির বিপরীতে বিজয়ী পক্ষ অনেকগুলো। এই বিজয়ী পক্ষগুলোই লড়বে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে। ফ্যাসিবাদ বা স্বৈরাচার হটানোর যে ‘বিজয়’, সব প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলই এর অংশীদার। তাই নির্বাচনের আগে দলগুলোর নতুন বিজয় দরকার। রাজনীতিতে এখন যে অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও পাল্টাপাল্টি, তার পেছনে আসলে কাজ করছে নির্বাচনের আগের বিজয় অর্জনের লড়াই।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরের ধারাবাহিকতায় তিনটি দল বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রদের দল এনসিপি। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারও সেভাবেই বিবেচনা করে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট নিয়ে এই রাজনৈতিক দল তিনটি এখন নির্বাচনপূর্ব ‘বিজয়’ এর হিসাব-নিকাশে ব্যস্ত।
বিএনপি চায় জাতীয় নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোট। জুলাই সনদে সংবিধান সংস্কার ইস্যুতে দলটি যেসব ভিন্নমত দিয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারেও তারা অটল থাকতে চায়। জামায়াত চায় জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট। তারা সংসদের দুই কক্ষেই আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক বা পিআর পদ্ধতির দাবি তুলেছে। তবে নিম্নকক্ষে না হলেও উচ্চকক্ষের ক্ষেত্রে তারা কোনোভাবেই পিআরের দাবি ছাড়তে রাজি নয়।
অন্যদিকে গণভোটের তারিখ নিয়ে এনসিপির অবস্থান তেমন কঠোর নয়। তারা জাতীয় নির্বাচনের দিন বা আগে যেকোনো সময়েই গণভোট অনুষ্ঠানে সম্মত আছে। তারাও উচ্চকক্ষে পিআর এবং নোট অব ডিসেন্ট ছাড়াই জুলাই সনদের বাস্তবায়ন চায়। এনসিপি অবশ্য এখনো জুলাই সনদে সই করেনি। তবে দলটির জোরালো দাবি হচ্ছে, সংবিধান সংস্কার-সংক্রান্ত জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ জারি করতে হবে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ইউনূসকে।
জামায়াতসহ আট দল এসব দাবিতে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করছে। আজ এই দলগুলোর ঢাকায় একটি সমাবেশ হওয়ার কথা আছে। বিএনপি নির্বাচনী সমাবেশ ও প্রচার-প্রচারণায় সক্রিয় থাকলেও সম্ভবত তাদের দাবির পক্ষে কর্মসূচি না করার কৌশল নিয়েছে। এনসিপিও এই ইস্যুতে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করছে না। তবে নেতাদের মুখে গরম-গরম কথা থেমে নেই।
সবকিছু মিলিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট নিয়ে ‘গুরুত্বপূর্ণ’ তিনটি দলের এই বিরোধপূর্ণ ও পাল্টাপাল্টি অবস্থান রাজনীতিতে উত্তেজনা তৈরি করেছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়েও অনেকের মধ্যে শঙ্কা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোট প্রশ্নে একমত হওয়ার জন্য যে সাত দিন সময় দিয়েছিল, তা গতকাল শেষ হয়ছে। ঘোষণা অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরা একমত হতে না পারায় অন্তর্বর্তী সরকার নিজেই এখন এসব ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে।
পত্রপত্রিকার খবর অনুযায়ী, ১৫ নভেম্বরের মধ্যে সরকার তার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার কি ‘গুরুত্বপূর্ণ’ এই তিন দলের কোনোটির দাবি একেবারে উপেক্ষা করে কোনো সিদ্ধান্তে আসতে পারবে?
অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক দলগুলোকে সাত দিন সময় দিয়েছিল ঠিকই, তবে সরকার একেবারে হাত গুটিয়ে বসে ছিল, এমন ভাবার কোনো কারণ নেই। আমরা জানি যে সরকারের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টারা অনানুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি নিয়ে দর-কষাকষি ও আলোচনা চালিয়ে গেছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মনোভাব বা কোন দল কোন ক্ষেত্রে কতটুকু ছাড় দিতে চায় বা পারে, তা বিবেচনায় নিয়েই সম্ভবত সরকার তাদের সিদ্ধান্ত নেবে।
আগেই বলেছি, নির্বাচনের আগে এই দলগুলোর কোনো না কোনো ইস্যুতে বিজয় দরকার। সরকারের চ্যালেঞ্জ হচ্ছে তার নেওয়া সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সব দলকেই একসঙ্গে ‘বিজয়ী’ করা। কিন্তু দলগুলোর চাওয়া ও দাবি মধ্যে যেহেতু পরস্পর বিরোধিতা রয়েছে, তাই এক দলের বিজয় মানে আরেক দলের পরাজয় হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। এই বাস্তবতায় গ্রহণযোগ্য পথ হচ্ছে সব দলেরই কিছু মানা এবং কিছু না মানা। এর সঙ্গে জনমত ও সাধারণভাবে যৌক্তিক কিছু বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট করার দাবিটি অবাস্তব ও অযৌক্তিক হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আয়োজনের দিক দিয়ে গণভোট জাতীয় নির্বাচনের মতোই বিস্তৃত। অল্প সময়ের মধ্যে এই গণভোট করার চেষ্টা জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তা ছাড়া অন্য ঝুঁকিও আছে।
সম্প্রতি এক লেখায় লিখেছিলাম, ‘গণভোটে এমনিতেই উপস্থিতির হার খুব কম থাকে, কোনো রাজনৈতিক পক্ষের বর্জনের ডাক পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলতে পারে’ (সংবিধান সংস্কারে জগাখিচুড়ির গণভোট, প্রথম আলো, ৩০ অক্টোবর ২০২৫)। জাতীয় নির্বাচনের আগে কম ভোটারের অংশগ্রহণে যদি কোনো গণভোট হয়, তা এক বড় বিপর্যয় হিসেবেই বিবেচিত হবে।
এই বাস্তবতায় জাতীয় নির্বাচনের দিন একই সঙ্গে গণভোটের আয়োজন হবে যৌক্তিক সিদ্ধান্ত। অন্তর্বর্তী সরকার যদি এমন সিদ্ধান্ত নেয়, তবে তাতে বিএনপির বিজয় হবে, কিন্তু হারবে জামায়াত। জামায়াতকে বিজয়ী করার পথ হচ্ছে উচ্চকক্ষে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা।
বিএনপির উচ্চকক্ষে পিআরের বিরোধিতা করার পেছনে যে দলের সংকীর্ণ স্বার্থ কাজ করছে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। সবচেয়ে বড় কথা, উচ্চকক্ষে পিআর না হলে উচ্চকক্ষ করার কোনো যৌক্তিকতাই থাকে না। সংসদের উচ্চকক্ষে পিআর নিশ্চিত করা গেলে শুধু জামায়াত নয়; এনসিপিকেও ‘বিজয়ী’ করা যাবে। এনসিপি অবশ্য শাপলা কলি প্রতীক আদায় করে এরই মধ্যে একটি ‘বিজয়’ অর্জন করে ফেলেছে। সব পক্ষের একটি মূল দাবি মেনে নিয়ে এভাবেই একটা ‘উইন উইন’ পরিস্থিতি তৈরি করা যায়।
রাজনৈতিক দলগুলো যেহেতু নিজেরা সমঝোতায় আসতে পারেনি, তাই সরকারের সিদ্ধান্তকেই এখন মেনে নিতে হবে। আর সরকারের দায়িত্ব হলো গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও জুলাই সনদ বিবেচনায় নিয়ে এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যা সব অনিশ্চয়তা কাটিয়ে দেশকে নির্বাচনমুখী করে তুলবে।
* এ কে এম জাকারিয়া, প্রথম আলোর উপসম্পাদক
- akmzakaria@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

Monday, September 15, 2025
ডাকসুর কী প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে পড়তে যাচ্ছে by এ কে এম জাকারিয়া
ডাকসু কার দখলে থাকল, জাতীয় রাজনীতিতে তা কোনো প্রভাব ফেলে কিনা তা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক আছে। কিন্তু ‘জাতীয় রাজনীতি’ সব সময়েই ডাকসুকে গুরুত্ব দেয়। এ জন্য জোর জবরদস্তির ঘটনাও ঘটেছে। তা ব্যালট বক্স ছিনতাই (১৯৭৩ সালের নির্বাচন) বা আগে ব্যালট বক্স ভরে রাখাসহ নানা কৌশলে( ২০১৯ সালের নির্বাচন) যেভাবেই হোক না কেন। আবার ক্ষমতাসীন দল যখন মনে করে ডাকসুতে তাদের জেতার সুযোগ নেই তখন তারা নির্বাচনই দেয় না।
এবারের ডাকসু নির্বাচন হয়েছে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এবং একটি রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানের পর বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশেষ পরিস্থিতি নানা সময়ে তৈরি হয়েছে এর কোনোটির মাত্রাগত গভীরতাই জুলাই অভ্যুত্থান বা শেখ হাসিনাকে উৎখাতের সঙ্গে তুলনীয় নয়। সেই ঘটনার এক বছরের মাথায় অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনে আমরা দেখলাম পুরোনো বা প্রচলিত কোনো হিসাব-নিকাশ কাজ করেনি।
বাংলাদেশে সব আমলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবিরের কার্যক্রম ‘নিষিদ্ধ’ ছিল। ছাত্র সংগঠনগুলো মিলে মিশে সিদ্ধান্ত নিয়েই তা ‘কার্যকর’ করেছে। কিন্তু গত ১৫ বছরে কীভাবে কী ঘটেছে তা ছিল আমাদের জানা বোঝার বাইরে। শিবিরের লোকজন যে ‘গুপ্ত শিবির’ হিসেবে ছাত্রলীগে আশ্রয় নিয়ে কাজ করে গেছে তা আমরা জেনেছি গত বছর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আগে-পরে। সেই অর্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র শিবিরে প্রকাশ্য কার্যক্রমের বয়স মাত্র ১ বছর। তাদের এই বিপুল বিজয় অনেকের কাছেই ছিল অপ্রত্যাশিত।
গত ১৫ বছরে দেশে নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংস হয়েছে। একতরফা নির্বাচন ও দিনে-রাতে ব্যালট বাক্স ভরে ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময়ে রাজনৈতিক দলগুলোর জনসমর্থন বা শক্তি-সামর্থ্য মাপার কোনো সুযোগ হয়নি।
এই দলের এত ভাগ ভোট, ওই দলের কম-বেশি এত ভাগ ভোট বা অমুক পন্থীদের ভোট এত ভাগ- এমন একটি হিসাব-নিকাশ যে আমরা করি তার ভিত্তি আসলে ২০০৮ সাল বা এর আগের নির্বাচনগুলো। গত ১৬ বছরে নতুন ভোটার হিসেবে একটি বড় জনগোষ্ঠী যুক্ত হয়েছে এবং তাদের অধিকাংশই কখনো ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি। এই নতুন ভোটারেরা কোনো রাজনৈতিক দল বা শক্তিকে ভোট দেবে তা আমাদের জানা-বোঝার বাইরে।
জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি একসময় নানা মহল থেকে উঠেছিল। কিন্তু এ ব্যাপারে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হতে পারেনি। দেশ এখন জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী বছর ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম ভাগে নির্বাচন হওয়ার কথা। এর আগে শুধু কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ডাকসুর নির্বাচন হয়েছে। জাকসুর নির্বাচন গতকাল হয়েছে। রাকসু ও চাকসুর নির্বাচন বাকি আছে। বলা যায় জাতীয় নির্বাচনের আগে ছোট এবং ভিন্ন পরিসরে হলেও এই চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-সংসদের নির্বাচনই এক অর্থে দলগুলোর সমর্থন ও রাজনৈতিক শক্তি-সামর্থ্য ও সাংগঠনিক ক্ষমতা পরীক্ষার একটি ক্ষেত্র। এর মধ্যে ডাকসুর প্রভাব স্বভাবতই সবচেয়ে বেশি।
প্রথম আলো শিরোনাম করেছে, ‘ডাকসুর ফলাফলে বিএনপি বিব্রত, জামায়াত উচ্ছ্বসিত’। কিন্তু ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল কি শুধু দল দুটির ‘উচ্ছ্বাস’ আর ‘বিব্রত’ হওয়ার মধ্যেই আটকে থাকবে? নাকি জাতীয় রাজনীতিতেও নতুন হিসাব নিকাশের সূচনা ঘটাবে? বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের সময় যখন এগিয়ে আসছে।
আমরা জানি যে গণ-অভ্যুত্থানের পর এক বিশেষ পরিস্থিতিতে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে এই নির্বাচন হতে যাচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তার কথা শোনা যায়। গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রত্যাশিত সংস্কার বা জুলাই সনদ নিয়ে এখনো রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ রয়ে গেছে। ডাকসুর ফলাফল অন্তত বিএনপি ও জামায়াতের কৌশল ও চিন্তা-ভাবনায় কতটা পরিবর্তন আনে সেটাই এখন দেখার বিষয়। এই দল দুটির রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানের যে কোনো পরিবর্তন সামগ্রিক রাজনৈতিক হিসাব নিকাশে পরিবর্তন ঘটাবে।
আগেই বলেছি ডাকসুর নির্বাচনের ফলাফল ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের বড় জয় নিয়ে নানা বিশ্লেষণ হচ্ছে। এর মধ্যে সংগঠনটির কৌশল বদল, প্রার্থী মনোনয়ন থেকে শুরু করে নানা ক্ষেত্রে নিজেদের উদার ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নেওয়া নানা উদ্যোগের বিষয়গুলো আলোচিত হয়েছে।
বলা হচ্ছে, শিবিরের এসব কৌশল কাজে দিয়েছে। এমনকি আমরা দেখলাম ডাকসুর শিবির প্যানেলের নির্বাচিতরা রায়ের বাজারে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে গিয়ে দোয়া-খায়ের করেছেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতও কি এসব কৌশলকে দস্তুর মানবে? মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে, নারী ইস্যুতে জামায়াতের রাজনীতিতে কি কোনো পরিবর্তন আসবে?
ছাত্রদলের পরাজয়ের বিভিন্ন কারণের মধ্যে তাঁদের প্রস্তুতিহীনতা ও সাংগঠনিক দক্ষতার অভাব যেমন আলোচিত হয়েছে তেমনি সংগঠনটির ভাবমূর্তির সমস্যার বিষয়টিও অনেকের আলোচনায় পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতিতে চরিত্রগত বিবেচনায় ছাত্রলীগ ও ছাত্রদল একই সঙ্গে উচ্চারিত দুটি নাম। তবে গত ১৫ বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের অপকর্ম ও অত্যাচার-নির্যাতন সব মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছিল। সেই দুঃসহ সময় ক্যাম্পাসে ফিরে আসুক তা শিক্ষার্থীরা কোনো ভাবেই চাইবে না।
কিন্তু এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীরা সম্ভবত ছাত্রদলের ওপর ভরসা করতে পারেনি। কারণ ছাত্রদলের ইতিহাসও এ ক্ষেত্রে খুব ভালো নয়। তা ছাড়া ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ছাত্রদলসহ বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের বিরুদ্ধে দখলদারি ও চাঁদাবাজির যত অভিযোগ উঠেছে সেটাও শিক্ষার্থীদের ছাত্রদল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার কারণ বলে অনেকে মনে করেন। এসব নানা বিবেচনায় ডাকসু নির্বাচনে শিক্ষার্থীরা বিকল্প হিসেবে ছাত্র শিবিরকে বেছে নিয়েছে।
জাতীয় রাজনীতিতে যদি একই হিসাব-নিকাশ কাজ করে তবে দল হিসেবে বিএনপির জন্য তা বিপদের বিষয়। নির্বাচনের আর ৫ মাসের মতো সময় আছে। এই সময়ের মধ্যে তারা নিজেদের কতটা বদলাতে পারবে? দলটির স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের নানা অপকর্ম সম্ভাব্য ভোটারদের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেখে গেছে দৃশ্যমান উদ্যোগ থাকলেও গত ১ বছরে বিএনপি এই নেতা-কর্মীদের ঠেকাতে বা থামাতে পারেনি। ডাকসু নির্বাচনের ফলাফলের পর এটা বলা যায় যে, বড় দল হিসেবে বিএনপি আগামী নির্বাচনে জয়ী হবেই— এমন আত্মবিশ্বাসও দলটির জন্য আত্মঘাতী হতে পারে।
রাজনৈতিকভাবে যারা জামায়াত ও শিবিরের ঘোরতর বিরোধী তাদের অনেকে মনে করেন ডাকসুতে শিবিরের জয় ঠেকাতে শিবির বিরোধী সংগঠনগুলোর জোট গড়ে মাঠে নামা উচিত ছিল। জাতীয় নির্বাচনে জোট গড়ার ক্ষেত্রে ডাকসুর এই অভিজ্ঞতা প্রভাব ফেলতে পারে। নির্বাচনী জোট নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো মধ্যে যে অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ ও আলোচনা চলছিল ডাকসু নির্বাচনের পর সেই আলোচনা নিশ্চিতভাবেই ভিন্ন মাত্রা পাবে। ডাকসুতে এনসিপির ছাত্র সংগঠনের খারাপ ফল জাতীয় রাজনীতিতেও তার দর-কষাকষির ক্ষমতা কমাতে পারে।
ডাকসুতে শিবিরের জয়ের সুবিধা জাতীয় বা নির্বাচনী রাজনীতি জামায়াত পেতে পারে বা নাও পেতে পারে। কারণ তা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে সতর্ক হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। বিএনপির মতো বড় দল এখন আর জামায়াতের শক্তিকে খাটো দেখবে বলে মনে হয় না। তারা এখন নিশ্চয়ই হিসাব-নিকাশ করেই জামায়াতকে মোকাবিলার কৌশল নেবে। বোঝা যাচ্ছে, সামনের জাতীয় নির্বাচনে ডাকসুর ফলাফল প্রভাব হতে পারে নানামুখী।
* এ কে এম জাকারিয়া, প্রথম আলোর উপসম্পাদক
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ভোট দেওয়ার পর শিক্ষার্থীদের উল্লাস। রাজু ভাস্কর্যের সামনে, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: প্রথম আলো |
Friday, September 12, 2025
অভ্যুত্থানের নৈতিক ভিত্তি প্রশ্নের মুখে ফেলছে কারা by এ কে এম জাকারিয়া
একটি রক্তাক্ত গণ-অভ্যুত্থানও ভূমিকম্পের মতোই অনেক পরাঘাতের জন্ম দেয়। এগুলো গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে ভূমিকা রাখে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর বছর পার হয়েছে, স্বাভাবিকভাবে এত দিনে পরাঘাতের হার কমতে কমতে মিলিয়ে যাওয়ার কথা।
কিন্তু দেশের রাজনীতিতে যা ঘটছে, তাতে তেমন মনে হচ্ছে না। বোঝা যায়, অস্বাভাবিকভাবে হলেও কোনো কোনো পক্ষ বা রাজনৈতিক শক্তি পরাঘাত অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারা মনে হয় এটা বুঝতে পারছে না যে গণ-অভ্যুত্থান ও তার পরের পরিস্থিতিতে যা বৈধ ও গ্রহণযোগ্য ছিল, এক বছর পর এখন আর তা নয়।
বলা হয়, প্রেম ও যুদ্ধ বা বিপ্লবে সবই ন্যায্য। কিন্তু এরপরও কোথায় বা কখন থামতে হয়, তার একটা সীমা থাকে। জার্মান-আমেরিকান রাষ্ট্রচিন্তাবিদ হার্বার্ট মার্কুয়েস মনে করেন, যেকোনো সহিংস বিপ্লব ন্যায্য হতে পারে, কিন্তু যদি তা দ্রুত শেষ না হয়, তবে বিপ্লব তার নৈতিক ভিত্তি হারাতে পারে।
বাংলাদেশে ৫ আগস্ট কোনো বিপ্লব হয়নি, সহিংস পথে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দমনের চেষ্টা করেছিল উল্টো হাসিনার স্বৈরাচারী সরকার। এর বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার যেকোনো প্রতিরোধই ছিল ন্যায্য। সেটাই গড়ে তুলেছিল ছাত্র-জনতা। গণ-অভ্যুত্থানের পর সবচেয়ে জরুরি কাজটি ছিল দ্রুত সব ধরনের সহিংসতা, সংঘাত ও বিরোধের অবসান ঘটানো। কিন্তু তা হয়নি, বরং এটা এখন অনেকটাই স্পষ্ট যে কোনো কোনো পক্ষ ইচ্ছা করেই তা জিইয়ে রাখতে চাইছে।
এসব কারণে বাংলাদেশের গণ-অভ্যুত্থানের নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানের পতিত ও পরাজিত শক্তি এবং তাদের সমর্থকেরা এরই মধ্যে সেই প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হাসিনার মতো দীর্ঘ সময় ধরে গেড়ে বসা এক স্বৈরশাসককে উৎখাত করেছে। একই সঙ্গে তা রাষ্ট্রকাঠামোর গভীরে ঢুকে পড়া স্বৈরাচারের শিকড় ধরেও টান দিয়েছে।
গণ-অভ্যুত্থানকে সফল পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে এগুলো উপড়ে ফেলা জরুরি ছিল। রাষ্ট্রকাঠামোয় বিস্তৃত স্বৈরাচারী সরকারে শিকড়-বাকড় ওপড়ানোর কাজটি তাই গণ-অভ্যুত্থানেরই অংশ। এগুলোই ছিল গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী একধরনের আফটার শক বা পরাঘাত। এগুলো ঘটেছে ছাত্র-জনতার শক্তিতে।
অন্যদিকে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী দুর্বল রাষ্ট্রকাঠামোর সুযোগে কিছু উগ্র, হঠকারী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীও নিজেদের আদর্শিক শক্তি দেখাতে মাঠে নেমে পড়ে। এই কাজে ‘মব’ হয়ে ওঠে তাদের প্রধান হাতিয়ার।
মব তৈরি করে তারা মাজার, পীর-ফকিরদের আস্তানা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপাসনালয়ে হামলা এবং সংস্কৃতি-স্থাপনা ও শিল্পকর্ম গুঁড়িয়ে দিতে শুরু করে। সংবাদমাধ্যমও এসব মব হামলার শিকার হয়েছে। এই ঘটনাগুলোও ছিল গণ-অভ্যুত্থানের পর আরেক ধরনের পরাঘাত।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে মব-নির্ভর এই পরাঘাতও অব্যাহতভাবে ঘটে চলেছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক হচ্ছে কিছু রাজনৈতিক শক্তি তাদের যৌক্তিক বা অযৌক্তিক যেকোনো দাবি আদায়ের জন্য এখন পুরোপুরি মব-নির্ভর হয়ে পড়েছে। কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচি বা সেখানে দেওয়া বক্তব্যকেও ‘মব’ কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ আছে।
’২৪–এর গণ-অভ্যুত্থান বিভিন্ন মত, পথ ও আদর্শের রাজনৈতিক দল, শক্তি ও মানুষকে হাসিনা উৎখাতের লক্ষ্যে এক করেছিল। অভ্যুত্থান শেষে কোনো রাজনৈতিক দলই পরিস্থিতির ওপর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের সব রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়ে একটি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করেছে ঠিকই কিন্তু ক্ষমতাকাঠামোয় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা থেকেই গেছে। দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলো এক বছর ধরে রাষ্ট্র, সরকার ও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে যেভাবে পেরেছে, নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে। তা সরকারে, প্রশাসনে, শিক্ষাঙ্গনে বা রাজনীতির মাঠে যেখানেই হোক না কেন। এই কাজে তারা সফলও হয়েছে। কিন্তু এই আধিপত্য আংশিক, কোনো পক্ষেরই একক নিয়ন্ত্রণ নয়। এই অবস্থাটি বেশ বিপজ্জনক।
গ্রিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক স্ট্যাথিস ক্যালাভাস তাঁর দ্য লজিক অব ভায়োলেন্স ইন সিভিল ওয়ার বইয়ে এমন পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করে লিখেছেন, যেখানে কোনো পক্ষ আংশিক আধিপত্য বিস্তার করে কিন্তু পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পায় না, সেখানে টার্গেটেড ভায়োলেন্স বা নিশানানির্ভর সহিংসতার পরিস্থিতি তৈরি হয়। নিজেদের শক্তি-সামর্থ্যের প্রমাণ, আধিপত্য ধরে রাখা বা বিস্তারের জন্য সহিংসতার ঘটনাগুলো ঘটে বা ঘটানো হয়।
সাম্প্রতিক নানা সহিংস ঘটনা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ সম্ভবত এখন এমনই একটি সময় পার করছে। এখানে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের শক্তি-সামর্থ্য অনুযায়ী বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজদের আংশিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে এবং তা ধরে রাখা ও বাড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে।
গত এক বছরে সরকারের পারফরম্যান্স বা যোগ্যতা-দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে কিন্তু বিভিন্ন দলের এই আংশিক আধিপত্য যে সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে কাজ করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। দেখা যাচ্ছে, স্রেফ নিজেদের শক্তি দেখানো বা আধিপত্য ধরে রাখতেই রাজনৈতিক শক্তিগুলো মব সৃষ্টি করে সহিংসতা করছে। গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষ শক্তির তরফেই এসব ঘটছে, তাই অন্তর্বর্তী সরকার কঠোর কোনো ব্যবস্থাও নিতে পারছে না।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শক্তির আংশিক আধিপত্যনির্ভর এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন সহিংসতার পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে, তেমনি অন্তর্বর্তী সরকারের মধ্যেও এসব শক্তির প্রভাব ও বিভক্তি ঠিকভাবে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান ও এর পরবর্তী সময়ে সরকার গঠন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর অস্বস্তিকর সম্পর্কের বিষয়টি এখন নানা মহলে আলোচিত। এসব আলোচনা দেশের রাজনীতি ও জনমনে প্রভাব ফেলছে।
তা ছাড়া গণ-অভ্যুত্থানের পর নানা ক্ষেত্রে সংস্কারের যত আশা জেগেছিল, সেটাও বেশ ফিকে হয়ে এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এ নিয়ে মতবিরোধ বেড়েছে। যেগুলোতে তারা একমত হয়েছে, এর বাইরে খুব বেশি সংস্কার সুযোগ বা সময় কোনোটাই নেই। ফলে নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরই একটি বাস্তব চাহিদায় পরিণত হয়েছে। সরকার নিশ্চিতভাবেই তা বুঝতে পেরেছে এবং শুরুতে যে ধারণা দেওয়া হয়েছিল, তার আগেই নির্বাচনের সময় ঘোষণা করেছে।
কিন্তু কিছু রাজনৈতিক দলের বক্তব্য ও নেতাদের কথাবার্তায় নির্বাচনবিরোধী সুর পাওয়া যাচ্ছে। খুব বেশি সংস্কারের যখন আর সুযোগ নেই এবং রাজনৈতিক দল ও শক্তিগুলোর নানামুখী চাপে সরকারও ব্যতিব্যস্ত, তখন সংস্কারের দাবিতে অটল থাকার অর্থ স্পষ্টতই নির্বাচনের বিরোধিতা করা। এটা রাজনীতিকে একটা অনিশ্চয়তা ও অচলাবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। রাজনীতিতে অচলাবস্থা মানে সহিংসতা টিকিয়ে রাখার ঝুঁকি তৈরি করা। কোনো কোনো পক্ষ সম্ভবত এমনটাই চাইছে। এমন একটি পরিস্থিতি গণ-অভ্যুত্থানের পরাজিত শক্তিকে সংগঠিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।
স্লোভাক দার্শনিক স্লাভো জিজেকের একটি কথা আছে, ‘সামটাইমস ডুইং নাথিং ইজ মোস্ট ভায়োলেন্স থিং টু ডু’ মানে কখনো কিছু না করাই সবচেয়ে বড় সহিংস কাজ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী সক্রিয় আক্রমণ ছাড়াও সহিংসতা সম্ভব। এখন নির্বাচন করতে না চাওয়া, সমঝোতার পথ না ধরা বা নিষ্ক্রিয়তার মাধ্যমে অচলাবস্থা তৈরি করাকেও সেই অর্থে একধরনের ‘সহিংসতা’ হিসেবে বিবেচনা করা যায়। দেখা যাচ্ছে সক্রিয় আক্রমণের সহিংসতা এবং কিছু না করার সহিংসতা—বাংলাদেশ এখন দুই ধরনের সহিংসতার কবলে পড়েছে।
গণ-অভ্যুত্থানের পরের বাংলাদেশে এই দ্বিমুখী সহিংসতা অব্যাহত থাকলে দেশের সংকট গভীর থেকে গভীরতর হবে। গণ-অভ্যুত্থানের পক্ষের সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। বর্তমান অচলাবস্থা কাটাতে, গণ-অভ্যুত্থানের নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে না চাইলে এবং পরাজিত শক্তির ফিরে আসার পথ বন্ধ করতে হলে ফেব্রুয়ারির প্রথম ভাগে নির্ধারিত নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনো বিকল্প নেই।
● এ কে এম জাকারিয়া, প্রথম আলোর উপসম্পাদক
- akmzakaria@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

Friday, July 18, 2025
গোপালগঞ্জের ঘটনাকে আমরা কীভাবে দেখব by এ কে এম জাকারিয়া
আওয়ামী লীগ সমর্থক হামলাকারীদের ঠেকাতে পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বেগ পেতে হয়েছে। হামলাকারীরা ছিল দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ও যথেষ্ট সংগঠিত। দলটির অনেক সমর্থক ও নেতা-কর্মী এনসিপিকে ঠেকাতে আশপাশের গ্রাম থেকে এসে গোপালগঞ্জ শহরের বিভিন্ন অলিগলিতে অবস্থান নিয়েছিলেন।
তাঁরা শহরজুড়ে দফায় দফায় বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়েছেন, আগুন লাগিয়েছেন, ককটেল ফুটিয়েছেন। আক্রান্ত হয়েছে পুলিশ ও ইউএনওর গাড়ি। শেষ পর্যন্ত চড়াও হয়েছেন এনসিপির সমাবেশে ও গাড়িবহরে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে গুলি করতে হয়েছে। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৫ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন অনেকে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সূচনাপর্বের বর্ষপূর্তিতে গোপালগঞ্জে বুধবার যা ঘটল, তাকে আমরা কীভাবে দেখব? এই রক্তপাত কি এড়ানো যেত না? রাজনীতিতে এর প্রভাবই-বা কী?
এনসিপি ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে কর্মসূচি পালন করবে, সমাবেশ হবে—এটা আগেই ঠিক করা ছিল। বিভিন্ন জেলায় তারা ধারাবাহিকভাবে ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচি পালন করে আসছে। তবে সব জেলা আর গোপালগঞ্জ এক নয়, এটা আওয়ামী লীগের কবজায় থাকা একটি অঞ্চল। অনেক দেশেই রাজনৈতিক নেতাদের জন্মস্থান বা নিজের এমন এলাকা থাকে, যেখানে তাঁদের প্রতি থাকে অন্ধ সমর্থন, তা তিনি উৎপীড়ক বা স্বৈরশাসক যা-ই হন না কেন। গোপালগঞ্জের ব্যাপারটিও পুরোপুরি তা-ই।
গণ-অভ্যুত্থানের পর তার কিছু আলামত আমরা সেখানে দেখেছি। তখন সেনাবাহিনীর ওপর হামলা হয়েছে, স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা খুন হয়েছেন আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের হাতে।
এনসিপির গোপালগঞ্জে কর্মসূচি ঘিরে যে হাঙ্গামা হতে পারে, তা আগে থেকেই আলোচনায় ছিল। কিন্তু পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা যাঁদের দায়িত্ব, তাঁরা যে বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে নেননি তা এখন প্রকাশ পাচ্ছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, তাঁদের কাছে গোয়েন্দা তথ্য ছিল, কিন্তু এই মাত্রায় হবে, তা তাঁরা বুঝতে পারেননি। এর মানে গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হয় তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেনি অথবা গোয়েন্দা প্রতিবেদনের গুরুত্ব বুঝতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা তার উপদেষ্টা ব্যর্থ হয়েছেন।
গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকেরা কী করতে পারেন, তা আমাদের কারও জানা-বোঝার বাইরে নয়। এটা নানা মহলেই অনেক দিন ধরে আলোচিত যে দেশের মধ্যে ওই অঞ্চলটি এখন নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পালিয়ে থাকার একটি নিরাপদ জায়গা। বিষয়টি সরকার জানে না, তা কী হয়!
এ ঘটনার দায় তাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, তার উপদেষ্টা এবং সেই সূত্রে সরকারের।
এনসিপির জেলায় জেলায় জুলাই পদযাত্রা নানা মহলে প্রশংসিত হয়েছে। তাদের জনসমাবেশগুলোতেও লোকজনের জমায়েত বাড়ছে। যদিও কিছুদিন আগেও তাদের জমায়েতক্ষমতা নিয়ে অনেকে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন।
ভারতের রাজনীতিতে রীতিমতো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠার জোগাড় হয়েছিল কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর। ভারতজুড়ে তাঁর ‘ভারত জোড়ো’ নামের পদযাত্রা কর্মসূচি সেই পরিস্থিতি আমূল পাল্টে দিয়েছে। এনসিপির ‘জুলাই পদযাত্রা’ দলটির জন্য তেমনই একটি কার্যকর রাজনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পদযাত্রা এমন একটি শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি, যা জনগণের কাছে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়। সেই কর্মসূচি যে সহিংসতার মধ্যে পড়ল, তার দায় কি কিছুটা হলেও এনসিপির নেই?
‘জুলাই পদযাত্রা’ গোপালগঞ্জের ক্ষেত্রে কেন ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’ হয়ে গেল? দুই দিন ধরে এনসিপির নেতারা এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেন মাঠ গরম করলেন? দেশের বাইরে থেকে গুজব ছড়ানো পতিত শক্তির জন্য আরও বেশি সুযোগ করে দিলেন না তাঁরা?
পতিত স্বৈরাচারী দলের কর্মী-সমর্থকদের মোকাবিলা ও বিরোধিতাকে একটি অঞ্চল বা জেলার বিরোধিতার দিকে ঠেলে দেওয়া কি জরুরি ছিল? ‘মুজিববাদ’ বলে যদি আদৌ কিছু থেকে থাকে, তার ‘কবর’ দেওয়ার ঘোষণা যেকোনো জেলা থেকেই দেওয়া যেতে পারে। এসব জনতুষ্টিবাদী বা মাঠ গরম করার কৌশল আর যাই হোক রাজনৈতিক পরিপক্বতার প্রমাণ দেয় না।
রাজনীতিতে নানা কৌশল নিতে হয়। অনেকে বলছেন, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে এনসিপি রাজনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে, আলোচনায় থাকতে পারছে। আওয়ামী লীগের হামলার শিকার হয়ে তারা জন-সহানুভূতি পেয়েছে। কিন্তু কিসের বিনিময়ে?
রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের দিক থেকে উল্টোভাবে বরং এনসিপির লাভবান হওয়ার সুযোগ ছিল বেশি। যদি এনসিপি ‘জুলাই পদযাত্রা’র অংশ হিসেবেই গোপালগঞ্জ আসত, এ নিয়ে আগেভাগে কোনো মাঠ গরম না করত এবং এরপরও যদি আওয়ামী সন্ত্রাসীরা একই কাজ করত, তা হলে রাজনৈতিক লাভটি হতো আরও বেশি।
রাজনীতি একটা দীর্ঘ যাত্রা, এনসিপি সেই যাত্রা শুরু করেছে মাত্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের মধ্যে একটি চরম ‘বর্তমান বিশ্বাসী’ ধারণা গেঁথে দিয়েছে। এখন বা এই মুহূর্ত ছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘ভবিষ্যৎ’ বলে কিছু নেই। অথচ রাজনৈতিক দলের মূল শক্তি হচ্ছে তার ভবিষ্যৎ দেখতে পারার ও বিবেচনা করার সক্ষমতা। এনসিপির ‘গোপালগঞ্জ কৌশল’ প্রমাণ করে তারা সম্ভবত এই তাৎক্ষণিকতার ফাঁদে পড়েছে।
গোপালগঞ্জের ঘটনা শুধু পাঁচটি প্রাণই কেড়ে নেয়নি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় অন্তর্বর্তী সরকারের যোগ্যতা ও সামর্থ্যকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। পরাজিত ও পতিত দলটির রাজনৈতিক শক্তি অর্জনের পথ তৈরি করছে। ফেব্রুয়ারি বা এপ্রিলে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তাও দেখছেন নাগরিক সমাজের কেউ কেউ। নির্বাচন পেছানোর পক্ষে থাকা রাজনৈতিক শক্তির কাছে অবশ্য এ ঘটনা আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এ ঘটনা যে রাজনীতিতে নতুন করে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা তৈরি করতে যাচ্ছে, তা নিশ্চিত।
* এ কে এম জাকারিয়া, প্রথম আলোর উপসম্পাদক। ই-মেইল: akmzakaria@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব
![]() |
| গোপালগঞ্জ শহরের পৌর পার্কে সমাবেশ শেষে এনসিপির নেতা–কর্মীদের ওপর হামলা চালান আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী ও সমর্থকেরা। ফাইল ছবি |
Sunday, March 6, 2016
‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা’র নির্বাচন! by এ কে এম জাকারিয়া
গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার পর্যায়ের নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক পরিচয় ও মনোনয়নে হতে শুরু করেছে। এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন রাজনৈতিক মনোনয়নে প্রথমবারের মতো নির্বাচন—এ বিষয়টিকে ছাপিয়ে যা গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে হাজির হতে যাচ্ছে তা হচ্ছে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিপুলসংখ্যক ইউপি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা। স্থানীয় সরকারের এই স্তরে এ ধরনের নজির আগে কখনো দেখা যায়নি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ঢেউ বা ধারা কি তবে দেশের সব পর্যায়ের নির্বাচনী ব্যবস্থায় পাকা জায়গা করে নিতে যাচ্ছে?
নির্বাচন মানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। এর সঙ্গে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ বিষয়টি যায় না। নির্বাচনী ব্যবস্থায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি ব্যতিক্রম হিসেবেই বিবেচিত হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে যে অবিশ্বাস্যসংখ্যক প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন, তাতে বিষয়টি আর ‘ব্যতিক্রম’-এর মধ্যে আটকে থাকেনি। কিন্তু এটা পুরো নির্বাচনটিকেই একটি ‘ব্যতিক্রমী’ নির্বাচনে পরিণত করছে। এমন একটি নির্বাচনের দায় বিএনপির ওপর চাপিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে সুবিধাজনক। এবং তা নিরাপদও বটে। ধরে নিচ্ছি, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে যত সমালোচনা, এর দায় সবই বিএনপির। সরকারি দলের সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলতে পারি, বিএনপি ও তাদের সহযোগীরা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত করার অবস্থান নেওয়ার কারণেই এমন একটি ব্যতিক্রমী নির্বাচনের পরিস্থিতি তৈরি ও তা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু কৌতূহলের সঙ্গে আমরা দেখছি, সেই ব্যতিক্রমই যেন এখন নিয়ম ও রীতিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। অথবা এর লক্ষণ দিনে দিনে পরিষ্কার হচ্ছে।
২০১৪ সালের জাতীয় ও ‘রাজনৈতিক’ নির্বাচনে জাতীয় সংসদের অর্ধেকের বেশি সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৫ সালে প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক পরিচয়ে অনুষ্ঠিত পৌরসভা নির্বাচনে দেখা গেল যে ২৩৪ জন পৌরসভা চেয়ারম্যানের মধ্যে ৭ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। স্বাভাবিকভাবেই তাঁরা সবাই সরকারি দলের প্রার্থী। পৌরসভার এর আগের নির্বাচনটির (২০১১ সালে অনুষ্ঠিত) যেসব তথ্য নির্বাচন কমিশন এবং নির্বাচন পর্যালোচনা ও পর্যবেক্ষণকারী নাগরিক প্রতিষ্ঠান সুজনের সূত্রে পাওয়া যায়, সেখানে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত বলে কিছুর উল্লেখ দেখা যায়নি। ধরে নিতে পারি ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের ‘মৃদু’ প্রভাব পড়েছিল পৌরসভা নির্বাচনে।
কিন্তু ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের প্রভাব সম্ভবত ‘মৃদু’ থেকে দিনে দিনে ‘শক্তিশালী’ হতে শুরু করেছে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম পর্যায়ে এখন পর্যন্ত যে আলামত দেখা যাচ্ছে, তাতে ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টি বেশ পোক্তভাবেই জেঁকে বসেছে। সরকারি দল আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ সম্ভবত সে কারণে আগেভাগেই এ নিয়ে কথা বলা শুরু করে দিয়েছেন। ‘ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে আমাদের কিছু প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। এটা হতেই পারে। বর্তমান সরকার শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত সাত বছরে যে উন্নয়ন করেছে, তাতে মানুষের আস্থা সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন হয়েছে।’ আসলেই তো, কিছু প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতেই পারেন! ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের উদাহরণ তো আমাদের সামনে রয়েছে। সেই নির্বাচনে যদি অর্ধেকের বেশি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হতে পারেন, তবে ইউপিতে ‘কিছু প্রার্থী’ এভাবে নির্বাচিত হতে সমস্যা কী! তবে ‘উন্নয়ন’-এর সঙ্গে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচনের সম্পর্কটা কোথায়, হানিফের বক্তব্যে তা অবশ্য পরিষ্কার হলো না।
প্রথম দফায় যে ৭৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেখানে এরই মধ্যে অন্তত ২৫ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে গেছেন। এঁরা সবাই আওয়ামী লীগের। আরও প্রায় ২৬টি ইউনিয়নেও একই ঘটনা ঘটতে পারে। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিল হওয়ার কারণে এই ইউনিয়নগুলোতে এখন শুধু আওয়ামী লীগের একক প্রার্থীরা রয়েছেন। যাঁদের মনোনয়ন বাতিল হয়েছে, তাঁদের আপিল ও আপত্তির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি ঝুলে থাকবে।
মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের সময়সীমা ছিল গতকাল ২ মার্চ। এই পর্ব শেষ হলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিতের সংখ্যা কোথায় গিয়ে ঠেকবে কে জানে! আগের দুটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কেউ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন এমন নজির কোথাও উল্লেখ নেই। নির্বাচন কমিশনের কাগজপত্রেও পাওয়া যায়নি, সুজনও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
বিএনপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচনে ১১৪টি আসনে দলটির কোনো প্রার্থী নেই। বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, তারা ৭৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে ২০টিতে নানা কারণে প্রার্থী মনোনয়ন দিতে পারেনি। তাদের অভিযোগ, বাধা দেওয়ার কারণে ৮৩টি ইউনিয়ন পরিষদে তাদের প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি। নির্বাচন কমিশন অবশ্য এ অভিযোগ মেনে নেয়নি। কমিশন বলেছে, এ ধরনের অভিযোগের কোনো সত্যতা তারা পায়নি।
আমাদের বেয়াড়া ও কৌতূহলী মনে প্রশ্ন জাগে, নির্বাচন কমিশন কি আসলেই এসব অভিযোগের সত্যতা খোঁজার চেষ্টা করেছিল? যে ৮৩ জন বিএনপির প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিতে পারেননি, তাঁরা সবাই দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সই করা কাগজ পেয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ বা বিএনপিতে যেখানে দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন পাওয়াই একটা বড় ঘটনা, সেখানে মনোনয়ন পাওয়ার পরও বিএনপির এতসংখ্যক মনোনয়নপত্র দাখিল করা থেকে বিরত থাকবে, এটা কতটা বিশ্বাসযোগ্য? কোনো কারণ ছাড়া কি এমনটি ঘটতে পারে? নির্বাচন কমিশন কি ভেবে দেখেছে যে কী এমন কারণ ঘটল, যাতে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েও প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র জমা দিলেন না? নির্বাচন কমিশন তাদের ব্যাখ্যা দিয়ে যাচ্ছে, কেউ বিশ্বাস করুক বা না করুক তাতে কী আসে যায়!
বিএনপির আশঙ্কা, যে ধরনের চাপ ও কৌশল সরকারের তরফে অব্যাহত রাখা হয়েছে, তাতে বিএনপির প্রার্থীর সংখ্যা আরও কমতে পারে। ফলে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যানের সংখ্যা আরও বাড়বে। প্রথম দফা ইউপি নির্বাচনের এই নজির পরের দফাগুলোতে আরও জোরেশোরে পড়ার আশঙ্কাকেই জোরদার করছে। সবকিছু দেখেশুনে মনে হচ্ছে, নির্বাচনের উদ্যোগ–আয়োজন, মনোনয়নপত্র দাখিলসহ নানা কর্মকাণ্ড ঠিক রেখে শেষ পর্যন্ত বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ‘নির্বাচিত’ হওয়ার প্রথাটি দিনে দিনে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। প্রার্থীদের চাওয়াটিও যেন অনেকটাই এ রকম যে নির্বাচনে অংশ নেবেন ঠিকই, কিন্তু কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী থাকবে না। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখোমুখি না হয়ে যদি নির্বাচিত হওয়া যায়, তবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে কে চায়!
প্রথম দফায় যে ৭৩৮টি ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেখানে অর্ধেকেরও বেশি আসনে এখনো আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। পত্রপত্রিকার খবর বলছে, ৪১২টি ইউনিয়নে মনোনয়ন পাওয়া আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে এক বা একাধিক প্রার্থী রয়েছেন। এ অবস্থায় ১১৪টি আসনে বিএনপির প্রার্থী না থাকলেও আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা খুব স্বস্তিতে আছেন বলে মনে হয় না। নিজ দলের বিদ্রোহীরা তাঁদের ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছেন। ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত হওয়ার আশায় ছিলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত যে প্রার্থীরা, তাঁদের অনেকেরই আশার গুড়ে বালি ঢেলে দিয়েছেন এই বিদ্রোহী প্রার্থীরা। বিএনপিকে সামলানো বা কোণঠাসা করার কাজটি আওয়ামী লীগের জন্য যতটা সহজ, নিজ দলের বিদ্রোহীদের জন্য ততটা নয় বলেই তো মনে হচ্ছে।
ইউনিয়ন পরিষদ জনগণের সবচেয়ে দোরগোড়ার সরকার। এই নির্বাচন নিয়ে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ সব সময়ই উৎসাহ ও উদ্দীপনায় মেতেছে। ব্যাপক অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাই এই নির্বাচনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। দলীয় ভিত্তিতে হওয়ার পর ইউপি নির্বাচন কি তবে সেই সৌন্দর্য হারানোর দিকে যাচ্ছে? নাকি ‘নির্বাচন’-এর অর্থ বা সংজ্ঞা স্থায়ীভাবে পরিবর্তনের উদ্যোগ–আয়োজন চলছে?
তবে মনে হচ্ছে, এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন কিছুটা হলেও ‘নির্বাচন’ হয়ে উঠবে বা নির্বাচন বলতে যে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতা’ বোঝায় তার স্বাদ হয়তো মিলবে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীদের কল্যাণে। হোক না আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ, তা-ও তো প্রতিদ্বন্দ্বিতা! ভাগ্যিস আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা রয়েছেন!
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com
Saturday, February 6, 2016
ভূরাজনীতির কবলে বঙ্গোপসাগর by এ কে এম জাকারিয়া
১৯ শতকের মার্কিন নৌকৌশলবিদ আলফ্রেড থায়ার মাহান সমুদ্রবাণিজ্য, নৌপথ, নৌশক্তি, এর নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ—এসব নিয়ে বেশ কিছু প্রবন্ধ লিখেছেন। সেই প্রবন্ধগুলোর সংকলন নিয়ে প্রকাশিত বইটির নাম দ্য ইন্টারেস্ট অব আমেরিকা ইন সি পাওয়ার (১৮৯৭)। সেখানে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, সমুদ্রবাণিজ্য বা নৌশক্তি যেভাবেই হোক, সমুদ্র যার নিয়ন্ত্রণে থাকবে, তার পক্ষে পৃথিবীকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। তার যুক্তি হচ্ছে, স্থলভূমিতে যতই সম্পদ থাকুক না কেন, সমুদ্রপথে সম্পদ বিনিময় বা বাণিজ্য যত সহজ, অন্য কোনো পথে অত সহজ নয়। তিনি লিখেছেন, একটি দেশ যদি দুনিয়ায় বড় শক্তি হতে চায়, তবে তাকে তার আশপাশের জলসীমায় নিয়ন্ত্রণ কায়েম করতে হবে। দেশটিকে এমন এক অঞ্চল তৈরি করতে হবে, যাতে অন্যরা তাকে সমঝে চলে এবং বাইরের শক্তিকে তার আশপাশ থেকে দূরে রাখা যায়।
আলফ্রেড মাহানের এই বক্তব্য যে শত বছরেরও বেশি সময় পর সমান সত্য, তা স্বীকার না করে উপায় নেই। আজকের দুনিয়ায় বিশ্ববাণিজ্যের ৯০ ভাগই হয় সমুদ্রপথে। এবং সমুদ্র যোগাযোগব্যবস্থার ওপর কার্যত একক নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণেই যুক্তরাষ্ট্র সারা দুনিয়ার ওপর নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা এবং ছড়ি ঘুরিয়ে যেতে পারছে। কিন্তু সেখানেই সম্ভবত ভাগ বসানোর চেষ্টা শুরু হয়েছে। এশিয়ার ভূরাজনীতি ও অর্থনীতিবিষয়ক বিশ্লেষক রিচার্ড জাভেদ হেইডেরিয়ান আল-জাজিরায় এক প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘নতুন এক নৌশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক সমুদ্রব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে উল্টে দিচ্ছে। চীন তার মহাদেশীয় প্রতিবেশীদের ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী, তার নৌশক্তিও ক্রমেই বাড়ছে। আবার দেশটির হাতে বিপুল পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র রয়েছে। এই শক্তিতে বলীয়ান হয়ে চীন পূর্ব এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ জলপথে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতিকে সংকুচিত করতে চাইছে। হলুদ সমুদ্র থেকে পূর্ব ও দক্ষিণ চীন সাগরে চীনা সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনী তার আশপাশের সমুদ্রসীমায় যুক্তরাষ্ট্রের নৌ উপস্থিতিকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে।’ (এ সিনো-আমেরিকান নেভাল শোডাউন ইন সাউথ চায়না সি’ ২৯ অক্টোবর ২০১৫)
এটা পরিষ্কার যে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার যেমন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিরোধের আশঙ্কাও। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির আধিপত্য বিস্তার ও বাণিজ্যস্বার্থের এই জটিল হিসাব-নিকাশে বাংলাদেশের কৌশলী অবস্থানের কোনো বিকল্প নেই।
ভৌগোলিক কারণে সাগরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার এই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রের মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। সমুদ্র, সমুদ্রবন্দর বা সমুদ্রবাণিজ্য ও নিরাপত্তা নিয়ে তাই এত নানামুখী তৎপরতা। আলফ্রেড থায়ার মাহান সমুদ্রবাণিজ্য ও সে কারণে এর ওপর নিয়ন্ত্রণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে গেছেন। কিন্তু শত বছরেরও বেশি সময় পর সমুদ্রের গুরুত্ব আরও বেড়েছে এই কারণে যে সমুদ্র এক বড় সম্পদেরও আধার। সমুদ্রপথে বাণিজ্যের বাইরে সমুদ্রের নিচের তেল ও গ্যাসের মতো মূল্যবান জ্বালানি ও নানা খনিজ সম্পদ এবং ওপরের মাছের ভান্ডার এক দীর্ঘস্থায়ী সম্পদের ক্ষেত্র। ‘ব্লু ইকোনমি’ বা সমুদ্রকে ঘিরে অর্থনীতি বর্তমান বিশ্বে এক নতুন সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে।
বাংলাদেশের সমুদ্র অঞ্চল ও সমুদ্র সীমানা সংগত কারণেই এখন বৈশ্বিক মনোযোগের মধ্যে রয়েছে। এ বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথম ভাগে বাংলাদেশ সফর করে গেলেন মার্কিন প্যাসিফিক ফ্লিট কমান্ডার স্কট এইচ সুইফট। বাংলাদেশ নৌবাহিনী আয়োজিত ভারত মহাসাগরীয় নৌ সিম্পোজিয়ামে (আইওএনএস) অংশ নিয়েছেন তিনি। তাঁর এই বাংলাদেশ সফর উপলক্ষে একটি লেখাও তিনি লিখেছেন। সেখানে এই অঞ্চলের সমুদ্রের গুরুত্ব, নিরাপত্তার বিষয় এবং বাংলাদেশের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনী বিএনএস সমুদ্র জয় ও বিএনএস সমুদ্র অভিযান নামে যে দুটি সামরিক নৌযান পরিচালনা করছে, তা একসময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ড পরিচালনা করত। মার্কিন নৌবাহিনীর বার্ষিক নৌ অনুশীলন ‘কো-অপারেশন অ্যাফ্লোট রেডিনেস অ্যান্ড ট্রেইনিং’ (ক্যারাট) বাংলাদেশ গত অক্টোবরে চট্টগ্রামের সমুদ্রতীরে শেষ হয়েছে। ক্যারাট চলাকালে আমাদের দুই নৌবাহিনী জলদস্যুবিরোধী, চোরাচালানবিরোধী, সমুদ্রে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও বন্দর নিরাপত্তা বিষয়ে অনুশীলন করে। (প্রথম আলো ১৩ জানুয়ারি, ২০১৬)। তিনি এটাও পরিষ্কার করেছেন যে ‘ইউএস প্যাসিফিক ফ্লিট’ নামের কারণে কেউ যেন এই ভুল না করে যে তারা শুধু মালাক্কা প্রণালির পূর্ব ও সিঙ্গাপুরের ওপর গুরুত্ব দেয়। তারা এই দিকেও নজর রাখে এবং এর ফলে অনেক দেশই উপকৃত হয়েছে।
বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের ৩০ শতাংশ ও বার্ষিক প্রায় ৫ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য শুধু দক্ষিণ-চীন সমুদ্র দিয়েই পরিচালিত হয়। প্রায় এক লাখ জাহাজ এই পণ্য সরবরাহ করে ভারত মহাসাগর থেকে আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত বাণিজ্য পথ ধরে। এখানে নিজেদের কর্তৃত্ব, খবরদারি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা চীনের নিজস্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য খুবই জরুরি। বাংলাদেশ–চীন সম্পর্কের ৪০ বছর উপলক্ষে গত ২৬ জানুয়ারি এক সেমিনার হয়ে গেল। বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে নিযুক্ত সাবেক পাঁচ চীনা রাষ্ট্রদূত এই সেমিনার উপলক্ষে ঢাকায় জড়ো হয়েছিলেন। চীনে নিযুক্ত বাংলাদেশের ছয় রাষ্ট্রদূতও সেই সেমিনারে হাজির ছিলেন। এই সেমিনারটিকে চীনের তরফ থেকে যে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে, তা স্পষ্ট। সেই সেমিনারে দুই দেশের মধ্যে কানেকটিভিটির বিষয়টি যেমন গুরুত্ব পেয়েছে, তেমনি আলোচনায় এসেছে চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টিও। (প্রথম আলো ২৭ জানুয়ারি)
আমাদের মনে আছে যে ২০১৪ সালের জুনে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের সময় সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার সব প্রস্তুতিই নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা হয়নি। বিভিন্ন মহলে এই আলোচনা রয়েছে যে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শক্তিশালী কোনো কোনো দেশের আপত্তির কারণেই সরকার শেষ সময়ে চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর থেকে সরে আসে। চীনের এ অঞ্চলে প্রবেশ নিয়ে এই দেশগুলোর আপত্তি রয়েছে। কিন্তু বোঝা যায়, বাংলাদেশে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের ব্যাপারে চীন এখনো আশা ছাড়েনি এবং বিষয়টি নিয়ে তারা লেগে রয়েছে।
৩১ জানুয়ারি বঙ্গোপসাগরীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা জোট বিমসটেক সচিবালয়ের আয়োজনে প্রথম বিমসটেক ফাউন্ডেশন বক্তৃতার বিষয় ছিল ‘পঞ্চদশ শতাব্দীর পূর্বের বঙ্গোপসাগরীয় সংযোগ স্থাপন’। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বল স্টেট ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের অধ্যাপক দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বিশেষজ্ঞ কেনেথ আর হল সেখানে মূল বক্তব্য দেন। কেনেথ হল মনে করেন, বর্তমানে যে পরিস্থিতি বিরাজ করছে, তাতে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্ভাবনা ও বিরোধের আশঙ্কা দুটোই রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে দক্ষিণ চীন সাগরে বিরোধ দেখা যাচ্ছে। চীনের সম্প্রসারণবাদী নীতির বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে। তবে এরপরও এ অঞ্চলের সম্পদের প্রতি আন্তর্জাতিক দৃষ্টি রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
এটা পরিষ্কার যে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতার যেমন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিরোধের আশঙ্কাও। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক রাজনীতির আধিপত্য বিস্তার ও বাণিজ্যস্বার্থের এই জটিল হিসাব-নিকাশে বাংলাদেশের কৌশলী অবস্থানের কোনো বিকল্প নেই। তবে এ ক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ভুল করার সুযোগ যেমন নেই, তেমনি বিলম্ব বা দীর্ঘসূত্রতার সুযোগও কম। বাংলাদেশের জন্য দরকারি গভীর সমুদ্রবন্দর স্পষ্টতই এই ভূরাজনীতির খপ্পরে পড়েছে।
যে সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে বলতে গেলে চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টি চূড়ান্তই হয়ে গিয়েছিল, সেই সোনাদিয়া নিয়ে এখন আর কোনো কথা নেই। এর ২৫ কিলোমিটার দূরে মহেশখালীর মাতারবাড়ীতে প্রাথমিকভাবে কয়লা আমদানির জন্য একটি গভীর সমুদ্রবন্দর হতে যাচ্ছে জাপানি সাহায্য সংস্থা জাইকার অর্থায়নে। ইঙ্গিত রয়েছে, এটাই পরবর্তী সময়ে সম্প্রসারিত হবে পূর্ণাঙ্গ গভীর সমুদ্রবন্দরে। চীনকে দূরে রাখার কৌশল হিসেবে কি তবে সোনাদিয়া প্রকল্পটি বাদই পড়ছে? চীন তবে কোন সমুদ্রবন্দরের আশায় দিন গুনছে? দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের কর্তৃত্বের সুফল পেতে হলে বঙ্গোপসাগরেও যে তাদের জোরালো উপস্থিতি লাগবে। চীন কীভাবে তা কার্যকর করবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com
Thursday, January 7, 2016
এখন শুধু উন্নয়নের সময়! by এ কে এম জাকারিয়া
‘উন্নয়ন’
শব্দটি এখন যতটা শোনা যায়, ‘গণতন্ত্র’ ততটাই কম। গণতন্ত্র নিয়ে হা-হুতাশ
আমাদের কমে গেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় ধরে ও বহু উচ্চারিত
‘গণতন্ত্র’-এর জায়গা দখল করে নিয়েছে ‘উন্নয়ন’। পদ্মা সেতুর কাজ
আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে, এবং তাও হচ্ছে নিজেদের অর্থে। ঢাকায় মেট্রো
রেলের জন্য খোঁড়াখুঁড়ির কাজ চলছে। যত দেরি আর ঝুটঝামেলাই হোক,
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন হচ্ছে, হচ্ছে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। ঢাকায়
উড়ালসড়ক নির্মাণের কর্মযজ্ঞ চলছে তেজগাঁও, মগবাজার, বাংলামোটর, মৌচাক,
শান্তিনগর, খিলগাঁওজুড়ে। শান্তিনগর থেকে কেরানীগঞ্জের ঝিলমিল প্রকল্প
পর্যন্ত হবে নতুন আরেক উড়ালসড়ক। হচ্ছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। কর্ণফুলী
নদীর নিচ দিয়ে টানেল নির্মাণের উদ্যোগ-আয়োজন চলছে। তিন তিনটি গভীর
সমুদ্রবন্দরের (মাতারবাড়ি, সোনাদিয়া, পায়রা) কথা শোনা যাচ্ছে। এগুলো সবই
সুখবর। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এত উন্নয়নের ভিড়ে গণতন্ত্র কি তবে মার খাচ্ছে?
নাকি বাংলাদেশের অতিমাত্রায় রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী (আমেরিকার গবেষণা প্রতিষ্ঠান
পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপ অনুযায়ী বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ মানুষ উচ্চ
মাত্রায় ও ২৯ শতাংশ মধ্যম মাত্রায় রাজনীতিতে সক্রিয়) রাজনীতি, গণতন্ত্র এসব
বিষয়ে আগ্রহ হারিয়েছে?বাংলাদেশের রাজনীতির সাম্প্রতিক ‘উন্নয়ন’ ও ‘গণতন্ত্র’ প্রসঙ্গ নিয়ে এর আগেও লিখেছি। এই দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে তুলনামূলক রাজনীতিপাঠে আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কের শেষ নেই। ইতিহাস বা তথ্য-উপাত্ত ধরে এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্তে আসা কঠিন। ধনী দেশ ও প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রের মধ্যে একটি সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করেন অনেকে। তবে এটাই স্বতঃসিদ্ধ এমন বলা যাবে না। শুধু প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্র উন্নয়ন দিয়েছে এমনও নয়। গণতন্ত্র বলে কিছু নেই এমন দেশেও উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে। উন্নয়নের সঙ্গে টেকসই গণতন্ত্রের সম্পর্কের একটি দিক সম্ভবত সবচেয়ে পরিষ্কার ও সহজভাবে তুলে ধরেছেন নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক অ্যাডাম প্রোভুস্কি। তিনি তাঁর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট: পলিটিক্যাল ইনস্টিটিউশনস অ্যান্ড ওয়েলবিং ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ১৯৫০-১৯৯০ বইয়ে দেখিয়েছেন, একটি দেশে গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে জনগণের আয় একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় (পেন ওয়ার্ল্ড টেবিলে ডলারে মাথাপিছু আয় ৬ হাজার ৫৫ ডলার) পৌঁছানোর পর গণতান্ত্রিক শাসনের আর কখনোই পতন হয়নি।
প্রোভুস্কির এ সিদ্ধান্তের মূল বিষয়টি হচ্ছে, একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক দেশে যখন মাথাপিছু আয় কোনো একসময়ে সাড়ে ছয় হাজার ডলার ছাড়িয়ে যায়, তখন গণতন্ত্র আর ঝুঁকির মুখে পড়ে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কোনো অগণতান্ত্রিক দেশ বা যে দেশে কার্যকর গণতন্ত্র নেই, সেখানে যদি মাথাপিছু আয় এই মাত্রা ছাড়িয়ে যায়, তাহলে কি সেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে? এমন কোনো নিশ্চয়তা কার্যত নেই। ফলে উন্নয়নের সঙ্গে গণতন্ত্রের এই সম্পর্কটিকে আংশিক হিসেবেই বিবেচনা করতে হচ্ছে। গণতন্ত্রহীন ও কর্তৃত্ববাদী শাসনে মালয়েশিয়া বা সিঙ্গাপুরের মতো দেশের মাথাপিছু আয় বহু আগেই সাড়ে ছয় হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। কিন্তু এই উন্নয়ন সেখানকার জনগণের জন্য গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে পারেনি। প্রোভুস্কির তত্ত্ব অনুযায়ী আমরা ধরে নিতে পারি যে এ ধরনের উচ্চ আয়ের দেশে এখন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পেলে হয়তো তা টেকসই হবে, কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসন যে দেশে চেপে বসে, সেই দেশের শাসকেরা জনগণকে যেচে গণতন্ত্র দিতে যাবে কোন দুঃখে! বরং গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা যাতে জনগণের মধ্যে মাথাচাড়া দিতে না পারে, সে জন্য তারা সব সময়েই সচেষ্ট থাকে।
গণতন্ত্রের পথ থেকে কিছুটা পিছিয়ে এলেও উন্নয়নের পথে ভালোই এগোচ্ছে বাংলাদেশ। নতুন বছর শুরু হয়েছে। স্বীকৃত আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ভবিষ্যদ্বাণী হচ্ছে, এ বছর যে দেশগুলোতে সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হবে, তার মধ্যে ৩ নম্বরে থাকবে বাংলাদেশ (৬ দশমিক ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি)। এ সময় চীনের প্রবৃদ্ধির মাত্রা কমের দিকে থাকবে বলেই বাংলাদেশের কিছুটা সুবিধা হবে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সিএনএন মানির ভবিষ্যদ্বাণী বলছে, ২০২০ সালে গিয়ে মিয়ানমার প্রবৃদ্ধির দিক থেকে বাংলাদেশকে পেছনে ফেলে ৩ নম্বরে চলে আসতে পারে, তবে তখনো বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির প্রায় বর্তমান হারই (৬ দশমিক ৭ শতাংশ) বজায় থাকবে। ফলে সামনের বেশ কয়েক বছর বাংলাদেশের উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকবে এটা নিশ্চিত। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ১ হাজার ৩১৪ ডলার। আমাদের পরিকল্পনামন্ত্রী বিভিন্ন সময়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে ২০২০ সালের মধ্যে এই আয় দুই হাজার ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
উন্নয়নের কথা বলে গণতন্ত্রকে ছেঁটেছে যেসব দেশ, সেখানে শেষ পর্যন্ত কর্তৃত্ববাদী শাসনই চেপে বসার নজির রয়েছে। কথিত উন্নয়নের পরও কর্তৃত্ববাদী শাসন থেকে সহজ পথে গণতন্ত্রে আর ফেরা হয় না প্রবৃদ্ধির যে ভবিষ্যদ্বাণী জানা যাচ্ছে তাতে সামনের বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে একধরনের প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। মাথাপিছু আয়ের দিক দিয়েও এই দুটি দেশ বর্তমানে কাছাকাছি (মিয়ানমারের মাথাপিছু আয় ১ হাজার ২০০ ডলারের কিছু বেশি) রয়েছে। উন্নয়ন ও গণতন্ত্র প্রশ্নে এই দুটি দেশের মধ্যে একটি তুলনামূলক আলোচনা আমরা করে দেখতে পারি। গণতন্ত্রের বিবেচনায় বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের বাস্তবতা পুরো উল্টো। দীর্ঘ সামরিক শাসন, রাজনীতিতেও সেনাবাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ও সেনা কর্তৃত্বের এই দেশটিতে এইমাত্র সেদিন একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের হাতে এখনো ক্ষমতা হস্তান্তরের কাজটি সারা হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করলেও সেখানে পার্লামেন্টে সেনাবাহিনীর জন্য ২৫ ভাগ আসন সংরক্ষিত রয়েছে। কার্যকর গণতন্ত্রের দিকে যেতে দেশটিকে আরও বহু পথ পাড়ি দিতে হবে।
অন্যদিকে দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নব্বইয়ে সামরিক ও সেনানিয়ন্ত্রিত শাসনকে বিদায় করেছে বাংলাদেশ। এরপর গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ধারাবাহিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছে। দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে সহিংসতায় মাঝে বছর দুয়েকের জন্য এই যাত্রা ব্যাহত হলেও ২০০৮ সালে আবার একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের পথে নতুন যাত্রা শুরু হয়। সেই যাত্রা হোঁচট খায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। দেশের অন্যতম প্রধান বিরোধী দলের নির্বাচন বর্জন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন এই নির্বাচন দেশের গণতন্ত্রের মানকে নিচে নামিয়ে দিয়েছে। আমরা দেখলাম বাংলাদেশের রাজনীতিতে এরপরই গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নয়ন প্রসঙ্গ বড় হয়ে উঠতে শুরু করে। সরকারের মনোভাবটি অনেকটা এ রকম যে, গণতন্ত্র অনেক হয়েছে, এতে এখন কিছু কাটছাঁট না হয় হোক, আপাতত আমরা উন্নয়নের দিকে মনোযোগী হই।
অন্যদিকে এই নির্বাচনের এক বছরের মাথায় আন্দোলনের নামে নির্বাচন বর্জনকারী দল বিএনপির হঠকারী কর্মসূচি ও আন্দোলনের সময় মানুষ পুড়িয়ে মারার ঘটনা সরকারকে কঠোর হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। চাপের মুখে পড়ে রাজনৈতিক অধিকার, বাক্স্বাধীনতা, নাগরিক সমাজের ভূমিকা ও ভিন্নমত। জোরদার হয় গণতন্ত্রের মানের নিম্নমুখী যাত্রা। কার্যত সবকিছুর ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর সরকারের মুখে এখন কেবলই এক শব্দ, ‘উন্নয়ন’। এই বাস্তবতায় গণতন্ত্রে ছাড় দিয়ে শুধু উন্নয়ন চূড়ান্ত বিচারে কতটুকু ফল দেবে বা উন্নয়ন মানে শুধু অর্থনৈতিক বা অবকাঠামোগত উন্নয়ন কি না—এসব নিয়ে আলোচনা ও তর্কবিতর্ক থেকে আমরা অনেকেই যেন আপাতত দূরে থাকতে চাইছি। গণতন্ত্র, মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, আইনের শাসন, সুশাসন, অধিকতর বাক্স্বাধীনতা—এসবও যে ‘উন্নয়ন’, তা আমরা বিবেচনার বাইরে রাখছি।
আগেই বলেছি, গণতন্ত্রের বিবেচনায় মিয়ানমার বাংলাদেশের সঙ্গে তুলনীয় নয়, উন্নয়নের বিবেচনায়ও বাংলাদেশে অনেক এগিয়ে। ধরে নেওয়া যায় উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধিতে দেশটি সামনের বছরগুলোতে ভালো করবে ও বাংলাদেশের সঙ্গে তাল মেলাতে পারবে। মিয়ানমারের গণতন্ত্রের পথে যাত্রা যদি ধারাবাহিকভাবে সামনের দিকে এগোতে থাকে আর একই সঙ্গে যদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে জনগণের মাথাপিছু আয় নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে, তবে প্রোভুস্কির তত্ত্ব অনুযায়ী সেখানে একটি টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পাবে। তবে শর্ত হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে উন্নয়নের সঙ্গে গণতন্ত্রের তাল মিলিয়ে চলা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ক্ষেত্রে ছন্দপতন বা তাল কেটে গেলেই বিপদ।
মিয়ানমারের চেয়ে ‘গণতন্ত্র’ বা ‘উন্নয়ন’ দুই ক্ষেত্রেই এগিয়ে থাকা বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের তাল মিলিয়ে পথচলা। গণতন্ত্রে এখন ছাড়, এখন শুধু উন্নয়নে সময়—এমন ভাবনা বিপজ্জনক। যে উন্নয়নের পথে বাংলাদেশ হাঁটছে তা আমাদের দীর্ঘদিনের চাওয়া। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তা গণতন্ত্রকে ক্ষুণ্ন করে নয়। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে গণতন্ত্রে কাটছাঁটের মাত্রা বাড়তে থাকলে তাল কেটে যেতে পারে। উন্নয়নের কথা বলে গণতন্ত্রকে ছেঁটেছে যেসব দেশ, সেখানে শেষ পর্যন্ত কর্তৃত্ববাদী শাসনই চেপে বসার নজির রয়েছে। কথিত উন্নয়নের পরও সহজ পথে গণতন্ত্রে আর ফেরা হয় না। যাঁরা উন্নয়নের জন্য গণতন্ত্রে ছাড় দেওয়ার বিষয়টিকে যৌক্তিক মনে করছেন, তাঁদের এই তাল কেটে যাওয়ার বিপদের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com
Saturday, December 26, 2015
বাংলাদেশের তড়িঘড়ি যোগদান কেন? by এ কে এম জাকারিয়া
এমন একটি জোটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ খুব স্বাভাবিক কারণেই আমাদের জন্য আগ্রহ ও কৌতূহলের বিষয়। এ ধরনের জোটে যোগ দিলে বাংলাদেশের বিপদ বাড়বে কি না বা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হুমকির মুখে পড়বে কি না, সেটা এক বাস্তব প্রশ্ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে এমনই একটি প্রশ্ন করেছিলেন সাংবাদিকেরা। তিনি বলেছেন, সৌদি জোটে যোগ দেওয়ার কারণে বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হুমকির আশঙ্কা সৃষ্টি হবে না। তিনি বলেছেন, ‘জঙ্গিবিরোধী অভিযান আমাদের জন্য নতুন কিছু নয়। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।’ (প্রথম আলো, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৫)
সাধারণ যুক্তি ও বুদ্ধি দিয়ে এটা আমরা বুঝতে পারি যে আইএস বা জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কোনো দেশ যখন কোনো জোটভুক্ত হবে, তখন সেই দেশগুলো জঙ্গিদের বাড়তি টার্গেটে পরিণত হবে এবং এটাই স্বাভাবিক। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর হুমকির আশঙ্কার মধ্যে পড়বে না বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যকে তাই যৌক্তিক হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। তবে এই জোটে যোগ না দিলে বা যোগ দেওয়ার আগে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছ থেকে নিরাপদ ছিল, বিষয়টি এমনও নয়। প্রশ্নটি হচ্ছে, এ ধরনের পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার শক্তি বা সক্ষমতা আমাদের আছে কি না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অবশ্য বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘অনেক দেশই জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা বা তাদের মোকাবিলা করতে পারেনি, কিন্তু আমরা পেরেছি।’
সৌদি আরবের উদ্যোগে এ ধরনের একটি জোট গঠনে যে পশ্চিমা দেশগুলোর সায় রয়েছে, তা পরিষ্কার। এই জোট গঠনকে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর পক্ষ থেকে স্বাগত জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের মাত্রাটি বিবেচনায় নিলে এটা ধরে নেওয়া যায় যে পশ্চিমাদের বুদ্ধি-পরামর্শ ছাড়া সৌদি আরব এ কাজ করেনি। আগেই বলেছি, মুসলিম দেশগুলোর এই সামরিক জোট কীভাবে কাজ করবে, তা এখনো পরিষ্কার নয়। সৌদি আরবের ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী মোহামেদ বিন সালমান এই জোটের ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে এই জোট অন্যান্য দেশ ও সংস্থার সঙ্গে কীভাবে কাজ করবে, তা সামনে ঠিক করা হবে।
সৌদি নেতৃত্বের এই জোটের অন্য শক্তিধর মুসলিম দেশগুলো হচ্ছে মিসর ও ন্যাটো জোটভুক্ত একমাত্র মুসলিম দেশ তুরস্ক। আইএসের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্কের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত। তুরস্ক আইএসের কাছ থেকে কম দামে তেল কেনে, কুর্দি বিদ্রোহীদের দমনে তাদের কাজে লাগায় এবং নানাভাবে সহযোগিতা করে—এসব অভিযোগের জোরালো ভিত্তির কথা বিভিন্ন মহল থেকে স্বীকৃত। এই জোটে তুরস্কের অংশগ্রহণ তাই এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে শুরুতেই প্রশ্নের মুখে ফেলে। অন্যদিকে আইএস ইরাকের তিন ভাগের এক ভাগ ভূখণ্ড দখল করে রয়েছে অথচ জোটে রাখা হয়নি ইরাককে। অনেক সমালোচকই বলতে শুরু করেছেন যে সৌদি নেতৃত্বাধীন এই ‘সুন্নি জোটের’ মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া-নিয়ন্ত্রিত ইরানের প্রভাবকে চাপের মধ্যে রাখা। সন্ত্রাস দমন বা সুন্নিপন্থী আইএসের বিরুদ্ধে এ ধরনের একটি জোট গঠনের কথা বলা হলেও এ ধরনের একটি জোট কার্যত মুসলিম দুনিয়ায় শিয়া-সুন্নি বিরোধকে আরও সক্রিয় করে তুলতে পারে।
তুরস্কের ইংরেজি ভাষার দৈনিক টুডে’জ জামান–এ দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তুরস্কের প্রবীণ রাজনীতিক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ফারুক লোঘুঘলু বলেছেন, এই জোটে তুরস্কের যোগদান এ অঞ্চলে গোষ্ঠিগত সহিংসতাকে বাড়িয়ে দেবে। তিনি বলেন, এই জোট সুন্নিপ্রাধান দেশ বা সুন্নি শাসকদের দ্বারা শাসিত দেশগুলোর জোট, এই জোট আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কার্যকর কিছু হবে না।
সৌদি উদ্যোগ প্রথমেই হোঁচট খেয়েছিল পাকিস্তানের বক্তব্যে। সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে ৩৪টি মুসলিম দেশের জোট ঘোষণা দেওয়ার পর পাকিস্তান বলেছে যে এ ধরনের একটি জোটের ব্যাপারে তারা কিছু জানে না। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পাকিস্তানি পত্রিকা দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনকে (ডিসেম্বর ১৬) বলেছেন, ‘আমরা গণমাধ্যমের খবরে বিষয়টি দেখেছি। আমরা সৌদি আরবে আমাদের দূতাবাসকে বিস্তারিত জানতে বলেছি।’ তিনি বলেছেন, সৌদি ঘোষণা ছিল পাকিস্তানের কাছে অপ্রত্যাশিত। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আমরা ভিন্ন তথ্যই পেয়েছি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিবৃতি দিয়ে বলেছে, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অনুরোধে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওই কেন্দ্রে যোগ দিতে রাজি হয়েছেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদন (১৬ ডিসেম্বর, ২০১৫) বলছে, এই আলোচনার পর সৌদি আরব ই-মেইল করে বাংলাদেশকে প্রস্তাবটি পাঠিয়েছে। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে কি তবে সৌদি আরব ভিন্ন আচরণ করেছে?
দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউনকে পাকিস্তান সরকারের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, নীতিগতভাবে পাকিস্তান কখনো জাতিসংঘের সমর্থনের বাইরে কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়নি। যে কারণে ইয়েমেনে সৌদি অভিযানের সময় পাকিস্তান এতে যোগ দেয়নি। তিনি বলেছেন, নতুন কোয়ালিশনে যোগ দিলেও পাকিস্তান কখনো বিদেশের মাটিতে তাদের সৈন্য পাঠাবে না। এই পাকিস্তানি কর্মকর্তা অবশ্য তাঁর নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। মুসলিম দেশগুলোর সামরিক জোটে পাকিস্তানের অংশগ্রহণ নিয়ে বিভ্রান্তি ও রাখঢাকের এক দিন পর অবশ্য পাকিস্তান নিশ্চিত করেছে যে ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে’ তারা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে রয়েছে। বোঝা যায়, সৌদি কোনো উদ্যেগকে চূড়ান্ত বিচারে না করা পাকিস্তান তো বটেই, যেকোনো মুসলিম দেশের জন্যই কঠিন। তবে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক ঘোষণায় বলেছে, কীভাবে পাকিস্তান এতে অংশ নেবে, তা নির্ভর করবে রিয়াদ কীভাবে এই জোটের গঠনকে এগিয়ে নিয়ে যায়, সে ব্যাপারে তথ্য পাওয়ার পর। (ডন, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৫)।
পাকিস্তানের এই অবস্থান ও প্রতিক্রিয়ায় বোঝা গেল যে এ ধরনের একটি জোটে অংশগ্রহণ নিয়ে দেশটির অন্তত আগ-পিছ বিবেচনার একটি ব্যাপার রয়েছে। বিশ্বের প্রায় সব মুসলিম দেশ নিয়ে গঠিত এই সামরিক জোটে না থাকার কথা বলেছে সবচেয়ে বড় মুসলিম দেশ ইন্দোনেশিয়া। সৌদি ঘোষাণায় দেশটির নাম থাকলেও ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছেন, এই জোটের ব্যাপারে তাঁরা বিস্তারিত কিছু জানেন না এবং সে কারণে তাঁরা জোটে নেই। (জাকার্তা পোস্ট, ১৬ ডিসেম্বর, ২০১৫)। ইন্দোনেশিয়া বলেছে, নীতিগতভাবে দেশটি জাতিসংঘের বাইরে অন্য কিছুর অধীনে কোনো সামরিক মিশনে যোগ দেয় না।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে মুসলিম দেশগুলোর বৈশ্বিক লড়াইয়ে বাংলাদেশ নিশ্চয়ই বাইরে থাকতে পারবে না, কিন্তু এর আগ-পিছ বিবেচনা করে দেখা বা কিছু প্রশ্নের উত্তর খুবই জরুরি। শুরুতেই যেটা জানা প্রয়োজন তা হচ্ছে, এটা যেহেতু একটি ‘সামরিক জোট’, তাই সদস্যদেশগুলোকে কি দরকার পড়লে ইরাক বা সিরিয়ার মতো দেশে বা আইএস-নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে সামরিক অভিযানে অংশ নিতে হবে? জোটের সদস্যদেশ হিসেবে বাংলাদেশের এটা জানা জরুরি যে কোন ধরনের সামরিক ভূমিকা দেশটিকে পালন করতে হবে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ফোন ও মেইল করে ‘প্রস্তাব’ পাঠানোর পরই বাংলাদেশ রাজি হয়ে গেল! একটি সামরিক জোটে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে তা খুবই তড়িঘড়ি হয়ে গেল না? বাংলাদেশ সরকার যতই বলুক কোনো সামরিক জোট নয়, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একটি কেন্দ্রে যুক্ত হয়েছে মাত্র—কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সৌদি ঘোষণায় একে পরিষ্কারভাবেই একটি ‘সামরিক জোট’ বলা হয়েছে। এই জোট ঘোষণার দুই দিন পরই আইএসের তরফে প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেছে এবং তারা সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি দিয়েছে।
ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকারের শরিক দল ওয়ার্কার্স পার্টির সাংসদ ফজলে হোসেন বাদশা বলেছেন, সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটে বাংলাদেশের যোগ দেওয়া সংবিধানের পরিপন্থী। তিনি বলেছেন, এটা সংবিধানের ২৫ ধারার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। (প্রথম আলো, ২০ ডিসেম্বর ২০১৫) কী বলছে আমাদের সংবিধানের ২৫ ধারা? ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের ও জাতিসংঘ সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা—এই সকল নীতি হইবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এই সকল নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র (ক) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তি প্রয়োগ পরিহার এবং সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের চেষ্টা করিবেন; (খ) প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করিবেন; এবং (গ) সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ বা বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সংগত সংগ্রামকে সমর্থন করিবেন।’ ফজলে হোসেন বাদশা তাঁর ব্যাখ্যায় বলেছেন, সংবিধানে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের নীতির কথা বলা হয়েছে। যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বা অন্য কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের নীতি আমাদের নেই।
সরকারের শরিক দলের এই ভিন্ন অবস্থানকে ব্যাখ্যার দায়টি সরকার নেবে কি?
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com
Monday, December 21, 2015
গণতন্ত্রে এখন ভাটার টান by এ কে এম জাকারিয়া
আমাদের দেশে এরশাদ বা স্বৈরাচার পতনের ২৫ বছর পূর্তির সময় ‘গণতন্ত্র’ বিষয়টি আবার আলাপ-আলোচনায় এল। স্বৈরাচার পতনের সঙ্গে যে গণতন্ত্রের একটি সম্পর্ক ছিল (গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা, গণতন্ত্র ফিরে পাওয়া বা গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করা), সেটা প্রায় ভুলতে বসার দশা হয়েছিল। এরশাদকে ক্ষমতা থেকে সরাতে শুধু নয় বছর সময়ই লাগেনি, দিতে হয়েছে অসংখ্য জীবন। এর পরের ২৫ বছরে আমরা কী পেলাম—এসব হিসাব-নিকাশের মধ্যে গণতন্ত্রের বর্তমান দশা নিয়ে ক্ষীণ কণ্ঠে হলেও কিছু হায়-আফসোস এবার আমরা শুনতে পেলাম।
হান্টিংটনের বইয়ে ফিরে আসি। তিনি তাঁর বইটিতে লিখেছেন, আধুনিক গণতন্ত্রের যে যাত্রা, তা তিনটি পর্ব বা ঢেউয়ের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে। গণতন্ত্রের প্রথম ঢেউটি ছিল ১৮২৮ থেকে ১৯২৬ পর্যন্ত। প্রায় ১০০ বছরের দীর্ঘ এই জোয়ারের সময় যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্সসহ বিশ্বের ২৯টি দেশ গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করে। এরপর ১৯২০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ২০ বছর ভাটার সময় গেছে গণতন্ত্রে। তখন কোথাও ফ্যাসিজমের বিকাশ হয়েছে, কোথাও কোথাও কমিউনিজম। গণতন্ত্রের দ্বিতীয় জোয়ার শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যৌথ বাহিনীর বিজয়ের পর। বিশ্বে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৬। ১৯৫৮ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত বিশ্ব গণতন্ত্রে আবার চলে ভাটার টান। সাবেক ঔপনিবেশিক দেশগুলোতে জোরদার হয়ে ওঠে কর্তৃত্ববাদী শাসন। গণতন্ত্রের শেষ জোয়ারটি বয়ে গেছে ১৯৭৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত, এ সময়ে দক্ষিণ ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া ও বিভিন্ন কমিউনিস্ট দেশে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে। ১৯৯৪ সাল নাগাদ বিশ্বে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭২।
হান্টিংটনের এই গণতন্ত্রের জোয়ার-ভাটার হিসাব অনুযায়ী, এরশাদ যখন ক্ষমতা দখল করেন, তখন গণতন্ত্রের জোয়ারের পর্ব চলছিল। সম্ভবত সে কারণেই এরশাদের ক্ষমতা দখলের প্রায় শুরু থেকেই এর বিরোধিতা শুরু হয়। বড় ভুল সময়ে ক্ষমতা দখল করেছিলেন তিনি! কিন্তু এরপরও নয় বছর ক্ষমতা দখল করে রাখতে পেরেছিলেন তিনি। তবে গণতন্ত্রের জোয়ার থাকতে থাকতেই তাঁকে হটানো গেছে। আরও বছর দু-এক টিকে গেলে হয়তো তাঁকে সরানো কঠিন হতো। কারণ, হান্টিংটনের মত মেনে নিলে গণতন্ত্রের তৃতীয় ও শেষ জোয়ারটি ছিল ১৯৭৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। ভাটার শুরুটা তবে হয়েছে এরপর থেকেই। এ ধরনের সময়ে স্বৈরশাসকদের সরানো কঠিন হওয়ারই কথা।
গণতন্ত্রের বর্তমান ভাটার সময়টি আগেরগুলোর চেয়ে ভিন্ন। এই যে প্রায় ২৪ বছর ধরে বিশ্ব গণতন্ত্রে ভাটার পর্ব চলছে, এতে কিন্তু আগের মতো গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা কমেনি। বাংলাদেশের কথা যদি বলি, নব্বইয়ে স্বৈরাচারের পতনের পর এই দীর্ঘ সময়ে বাংলাদেশও কিন্তু তার গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পরিচিতি হারায়নি। পরিসংখ্যান বলছে, ২০০৫ সালের পর বিশ্বে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা কমেনি। ২০১৪ সালে বিশ্বে নির্বাচিত গণতন্ত্রের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ ১২৫-এ। প্রশ্নটি এখন সংখ্যার নয়, মানের। এই সময়ের মধ্যে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো সরকারব্যবস্থা হিসেবে গণতন্ত্রের বদলে ভিন্ন কিছু বেছে নেয়নি। কিন্তু মূল সমস্যা হচ্ছে, গণতান্ত্রিক সরকারগুলো কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠছে। সমাজের সবকিছুর ওপর সরকারগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণ কঠোর থেকে কঠোর করতে যাচ্ছে।
এ বছরের শুরুতে (জানুয়ারি মাসে) যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফ্রিডম হাউস যে প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে এটা পরিষ্কার যে দুনিয়াজুড়ে গণতন্ত্রের মান পড়ে যাচ্ছে। ২০১৪ সালের রাজনৈতিক অধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতা-সংক্রান্ত প্রতিবেদনে তারা এ তথ্য দিয়েছে। ফ্রিডম হাউসের হিসাব অনুযায়ী গণতন্ত্রে এই বাজে দশা চলছে সেই ২০০৫ সাল থেকে। আর ২০১৪ সাল ছিল বিশেষ করে সবচেয়ে খারাপ বছর। বিশ্বের ৬১টি দেশে সে বছর গণতন্ত্রের মান পড়েছে। উন্নত হয়েছে মাত্র ৩৩টি দেশে। গত নয় বছরের মধ্যে এই পরিস্থিতি হচ্ছে সবচেয়ে খারাপ।
দুনিয়াজুড়ে গণতন্ত্রের পরিস্থিতি কেন খারাপের দিকে যাচ্ছে? এর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন মার্কিন থিংক ট্যাংক ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের রবার্ট কেগান। ব্রুকিংস জার্নাল অব ডেমোক্রেসিতে প্রকাশিত তাঁর প্রবন্ধ ‘ইজ ডেমোক্রেসি ইন ডিক্লাইন’ প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, মানবাধিকার ও স্বাধীনতার ব্যাপারে একসময় পশ্চিমারা যে সমর্থন দিয়ে গেছে এবং এর পক্ষে যে জোরালো ভূমিকা (আমাদের অনেকের কাছেই হয়তো তা পশ্চিমের নাক গলানো ও মোড়লিপনা) পালন করেছে, সেই অবস্থান থেকে তারা সরে এসেছে। তাঁর মত হচ্ছে, সে জন্যই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা জোরদার হয়েছে। তিনি লিখেছেন, পশ্চিমা গণতান্ত্রিক শক্তিগুলো এখন তাদের পুরোনো চর্চা বন্ধ করেছে অথবা নিজেদের সমস্যা সামাল দিতে ব্যস্ত রয়েছে। চীন ও রশিয়ার মতো কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোর প্রভাব ও ভূমিকার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। এ ধরনের দেশগুলো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে যেমন প্রভাবিত করছে, তেমনি আঞ্চলিকভাবেও প্রভাব সৃষ্টি করছে, যা গণতন্ত্রকে দুর্বল করার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।
তবে এই যে কর্তৃত্ববাদী শাসন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে জেঁকে বসছে, এর নেতারা কিন্তু আগের স্বৈরশাসকদের মতো নন। মার্কিন রাজনৈতিক বিশ্লেষক উইলিয়াম ডবসন তাঁর দ্য ডিক্টেটরস লার্নিং দ্য কার্ভ (২০১২) বইয়ে বলেছেন, বর্তমান কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা অতীতের স্বৈরশাসকদের কাছ থেকে শিখেছেন। আগের স্বৈরশাসকদের জন্য কাজটি খুব সহজ ছিল। তখন কোনো ফেসবুক, ইউটিউব বা টুইটার ছিল না। তিনি লিখেছেন, আজকের দুনিয়ায় একজন স্বৈরশাসক তাঁর কোনো অপকর্ম গোপন রাখার আশা করতে পারেন না। ‘এমনকি আপনি যদি হিমালয় পর্বতের কোনো গিরিপথেও সহিংস অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন, তারপরও জানবেন যে এটা কোনো না কোনো আইফোনে ধরা পড়বে এবং সারা দুনিয়ায় তা প্রচারিত হবে।’ বর্তমান কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা নির্মমতার দিক থেকে পিছিয়ে না থাকলেও তাঁরা অনেক পরিবর্তনকেই গ্রহণ করেছেন। আগের স্বৈরশাসকদের তুলনায় তাঁরা অনেক বেশি ‘পরিশীলিত, বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন ও চটপটে’। ২০ বছর আগের স্বৈরশাসকেরা জানতেন না এনজিও ব্যাপারটি কী। আজ এনজিওগুলো কর্তৃত্ববাদী শাসকদের বড় টার্গেটে পরিণত হয়েছে। বলা যায়, কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা পুরোনো স্বৈরশাসকদের চেয়ে অনেক বেশি পটু হয়ে উঠছেন। তাঁদের এই দক্ষতা বৃদ্ধি গণতন্ত্রকে দুর্বল করছে।
তবে কর্তৃত্ববাদী শাসন বিস্তারের পেছনে আরও অনেক কিছুই রয়েছে। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক ও ভেডোমস্তি পত্রিকার নিয়মিত কলাম লেখক মারিয়া স্নেগোভায়া মস্কো টাইমস পত্রিকায় এক নিবন্ধে মন্তব্য করেছেন, গণতন্ত্রের বর্তমান কর্তৃত্ববাদী মডেল জনগণের একটি অংশের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ‘দ্য পিপল হ্যাভ স্পোকেন: নো মোর ডেমোক্রেসি’ শিরোনামের প্রবন্ধে তিনি মার্কিন সাংবাদিক ক্রিস্টিয়ান ক্যারলকে উদ্ধৃত করে লিখেছেন, অধিকাংশ জনগণের কাছে গণতন্ত্রই শেষ কথা নয়। অনেকেই গণতন্ত্রকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তার উৎস হিসেবে। মারিয়া লিখেছেন, গণতন্ত্র এসব নিশ্চিত করতে না পারলে কী হতে পারে, তার একটি উদাহরণ হচ্ছে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে সরাতে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে থাই জনগণের রাস্তায় নেমে আসা।
মিসরের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। সেখানে বৈধভাবে নির্বাচিত সরকার উৎখাত হয়েছে সামরিক অভ্যুত্থানে এবং সেখানকার জনগণের একটি বড় অংশ তাকে সমর্থন জানিয়েছে। স্যামুয়েল হান্টিংটন এ ধরনের প্রবণতা সম্পর্কে বলেছেন, নতুন গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে কখনো ‘ওপর’ থেকে চাপিয়ে দেওয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং অভিজাতদের চাপেই এমনটা হয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, অনেক দেশই এই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে ধারণ করতে প্রস্তুত নয়।
হান্টিংটন গণতন্ত্রের যে তিনটি জোয়ার পর্বের কথা বলেছেন, তার প্রথমটি প্রায় ১০০ বছর স্থায়ী হয়েছিল। আর পরের দুটির মেয়াদ ছিল প্রায় এক যুগ ও দেড় যুগ। মাঝের দুটি ভাটার সময় গেছে প্রায় ২০ বছর ও ১২ বছর। ’৯১-এর পর যে তৃতীয় ভাটা শুরু হয়েছে, তা কিন্তু এরই মধ্যে প্রায় ২৪ বছর সময় পার করেছে। বলা যায়, গণতন্ত্রে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ভাটা চলছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এই ভাটা কাটবে কবে? বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতিতে এ ব্যাপারে খুব আশাবাদী হওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্রের জোয়ারগুলোর পেছনে পশ্চিমা গণতান্ত্রিক শক্তির অবস্থান ও নজরদারির যে ভূমিকার (অথবা নাক গলানো) কথা বলা হয়, সে ধরনের কিছু নতুন করে জোরদার হবে, এমন কোনো লক্ষণ আমাদের সামনে পরিষ্কার নয়।
আইএস বা নানা ধরনের সন্ত্রাসী হামলা থেকে নিজের দেশ ও জনগণকে বাঁচাতে ব্যস্ত পশ্চিমাদের বিশ্ব গণতন্ত্র নিয়ে ভাবার সময় এখন আদৌ আছে কি? সেখানকার গণতান্ত্রিক চর্চার মধ্যেই বরং কর্তৃত্ববাদ জোরালো হয়ে ওঠার লক্ষণ ফুটে উঠছে। তা না হলে রিপাবলিকান পার্টির শীর্ষস্থানীয় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প কী করে দাবি করতে পারেন যে মুসলিম সন্ত্রাসবাদ নির্মূলের লক্ষ্যে সাময়িকভাবে হলেও যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করতে হবে! প্যারিসে হামলার পর ফ্রান্সের স্থানীয় নির্বাচনে ডানপন্থীদের বিজয়ও একই ইঙ্গিত দেয়।
গণতন্ত্রের এই দীর্ঘতম ভাটা বিশ্বকে সম্ভবত এক নতুন ইতিহাসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com
Friday, December 11, 2015
খুব শিগগির দৃশ্যমান পরিবর্তন চোখে পড়বে -বিশেষ সাক্ষাৎকার: আনিসুল হক by এ কে এম জাকারিয়া
![]() |
| আনিসুল হক |
প্রথম আলো : মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাস ছয়েক হলো। নির্বাচনের আগে আপনি বলেছিলেন সমস্যাগুলো চিহ্নিত, বলেছিলেন এবার সমাধানযাত্রা। এই পথে কতটুকু এগোলেন?
আনিসুল হক : আমাদের অনেক প্রতিশ্রুতি ছিল। পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকা, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর ঢাকা, সচল ঢাকা, মানবিক উন্নয়নের ঢাকা, স্মার্ট ও ডিজিটাল ঢাকা এবং অংশগ্রহণমূলক ও সুশাসিত ঢাকা। বলতে পারেন এই সব কটি ক্ষেত্রেই আমরা কাজ শুরু করেছি। এসবের সুফল আপনারা খুব শিগগির দেখতে পাবেন।
প্রথম আলো : এসব ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ অগ্রগতির কথা জানাবেন কি?
আনিসুল হক : পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ক্ষেত্রে বলতে পারি, রাস্তায় ময়লা জমানো এবং সেখান থেকে তা সরানোর যে পদ্ধতি এত দিন কার্যকর ছিল, তা আর থাকবে না। আমরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বিভিন্ন স্থানে ৭২টি মিড ট্রান্সফার স্টেশন করতে যাচ্ছি, যেখানে স্প্রে ও ওয়াশ করার ব্যবস্থা থাকবে এবং এসব স্টেশন থেকে ময়লা ডাম্পিং স্টেশনে চলে যাবে। ডিসেম্বরের মধ্যে ৪৫টি এবং মার্চ নাগাদ সব কটি স্টেশন হয়ে যাবে বলে আশা করছি। রাস্তাঘাট যাতে নিয়মিত পরিষ্কার হয় সে জন্য ক্লিনারদের সঙ্গে দফায় দফায় বসেছি। ঢাকা শহরকে অপরিকল্পিত বিলবোর্ডমুক্ত করার ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি হয়েছে। ৮৫ শতাংশ বিলবোর্ড সরে গেছে। সবুজ ঢাকার অংশ হিসেবে ফ্লাইওভারগুলো ফুল দিয়ে সুশোভিত করার কাজ শুরু হয়েছে। শাহীন স্কুলের পাশেরটি হয়েছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে বাকিগুলোও হয়ে যাবে। আমরা সবুজায়নের উদ্যোগ নিয়েছি। কয়েকটি পার্ক সবুজ করার উদ্যোগ নিয়েছি। প্রজাপতি পার্ক, কাঠবিড়ালি পার্ক—এসব করার উদ্যোগ নিয়েছি। সব বাড়িতে যাতে গাছ লাগানো হয়, সে জন্য আমরা গাছ সরবরাহ করব। শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতায় আমরা কাজটি করব। সড়ক ও জনপথ বিভাগের সঙ্গে মিলে বিমানবন্দর সড়কের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শুরু হচ্ছে। ১০০-এর বেশি গণশৌচাগার নির্মিত হচ্ছে। এসব দৃশ্যমান হতে কিছু সময় লাগবে।
প্রথম আলো : ঢাকা শহরবাসী যানজটকেই সবচেয়ে বড় সমস্যা বলে মনে করে। আপনিও ঢাকাকে সচল করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। ছয় মাসে কী অগ্রগতি হলো? আর যানজট দূর করার ক্ষেত্রে সিটি করপোরেশনের খুব কিছু করার আছে কি?
আনিসুল হক : আসলে যানজট দূর করতে সরাসরি আমাদের করার কিছু নেই। যানবাহন বলুন বা রাস্তাঘাটের নিয়ন্ত্রণ বলুন, এগুলো আমাদের হাতে নেই। আমরা যা করার চেষ্টা করছি তা হচ্ছে রাস্তাঘাট দখলমুক্ত করা। মহাখালীর সামনের বাস পার্কিং বন্ধ করার উদ্যোগ নিয়েছি। তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড উঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কাজটি খুব সহজ না। আমরা গাজীপুর থেকে হাতিরঝিল পর্যন্ত ২২টি ইউলুপ নির্মাণ করতে যাচ্ছি। এগুলো তৈরি হলে কোনো গাড়ি ক্রসিংয়ে আটকা পড়বে না। এ জন্য দুটি মন্ত্রণালয় থেকে জমি নেওয়ার প্রয়োজন পড়বে। আশা করি তাদের সহযোগিতা পাব। এটা হলে যানজট অনেকটা কমবে। এই প্রকল্প সফল হলে অন্যান্য এলাকাতেও তা করা হবে।
প্রথম আলো : বিশৃঙ্খলার চরমে পৌঁছেছে ঢাকার গণপরিবহনব্যবস্থা। নগরবাসীর জন্য এ ক্ষেত্রে কি সিটি করপোরেশনের কিছু করার নেই?
আনিসুল হক : এ ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতির কথা আপনাকে জানাতে চাই। ঢাকার বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসমালিকদের সঙ্গে আমরা বসেছি। সমন্বিতভাবে বিভিন্ন রুটে বাস চালানো যায় কি না, সে ব্যাপারে আমরা কথা বলেছি। প্রাথমিকভাবে পাঁচটি কোম্পানির অধীনে সব মালিক বাস চালাতে রাজি হয়েছেন। পুরোনো বাস উঠিয়ে তিন হাজার বাস নামানোর কথা হয়েছে। তবে তাঁরা আমাকে শর্ত দিয়েছেন যে ৫ থেকে ৬ শতাংশ হারে ঋণ জোগাড় করে দিতে হবে। আমি এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সঙ্গে কথা বলেছি। অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হবে। এটা কার্যকর করা গেলে ঢাকার গণপরিবহনের ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন হবে। নতুন ও আধুনিক বাস চলবে। নির্দিষ্ট স্টপেজে বাস থামবে ও যাত্রীরা ওঠানামা করবে। সব মালিকের বাস পাঁচটি কোম্পানির আওতায় এলে বেপরোয়া বাস চালানোর প্রবণতাও কমবে। দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে কাজটি করা সম্ভব হবে বলে আশা করছি।
প্রথম আলো : নতুন মেয়রদের অধীনেও এবার বর্ষায় ঢাকাবাসী জলাবদ্ধতার পুরোনো রূপই দেখল। কোনো আশার কথা?
আনিসুল হক : এই একটি জায়গায় আমি আপনাদের পরিষ্কার করে বলতে পারছি না যে কী করতে পারব বা পারব না। এটা আমার হাতের বাইরে। খাল বন্ধ, নালা বন্ধ। এসব পরিষ্কার ও খনন করার দায়িত্ব ওয়াসার। আমরা এখন গুলশান ও বনানী এলাকার রাস্তাগুলোকে মানসম্মত ড্রেনসহ নির্মাণ করছি। আগামী দুই বছরের মধ্যে এখানকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নতি হবে। উত্তরাতেও হচ্ছে। কিন্তু মিরপুর ও মোহাম্মদপুরের ক্ষেত্রে ওয়াসার ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম আলো : এ ক্ষেত্রে সমন্বয়ের কোনো সমস্যা হচ্ছে কি?
আনিসুল হক : ঢাকার বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা জড়িত। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছি ওয়াসা ও রাজউকের সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে। বিষয়গুলো বেশ জটিল। এ জন্য সময়ের প্রয়োজন।
প্রথম আলো : মাস ছয়েক দায়িত্ব পালন করে কী অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন?
আনিসুল হক : আমার মনে হয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্বের জোরালো সমর্থন ও তা কাজে লাগানোর আকাঙ্ক্ষা থাকলে অনেক কিছুই করা সম্ভব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। বিলবোর্ড সরিয়ে ফেলা সে কারণেই সম্ভব হয়েছে। সামনে এ ধরনের কাজগুলোও আশা করি সবার সমর্থন নিয়ে করতে পারব।
প্রথম আলো : কারওয়ান বাজারের কাঁচা ও পাইকারি বাজার স্থানান্তরের ক্ষেত্রে অগ্রগতি কতটুকু? এ ব্যাপারে তো সুনির্দিষ্ট কিছু শোনা যাচ্ছে না।
আনিসুল হক : কারওয়ান বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে আমি অন্তত ২০ বার বসেছি। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা হচ্ছে, ৩৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে যে তিনটি আধুনিক কাঁচাবাজার হয়েছে, সেখানে এই বাজার স্থানান্তর করতে হবে। ব্যক্তিগতভাবে অনেক ব্যবসায়ী আমাকে বলেছেন যে তাঁরা যেতে চান, কিন্তু কয়েকজন নেতার হাতে তাঁরা পুতুল হয়ে পড়েছেন। কারওয়ান বাজারে একটি তিনতলা মার্কেট রয়েছে, যেটি যেকোনো সময় ভেঙে পড়তে পারে বলে বুয়েটের মাধ্যমে করা পর্যবেক্ষণে বেরিয়ে এসেছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে এর দায় নেতাদের নিতে হবে। আমি আশা এবং অনুরোধ করছি, যাতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ব্যবসায়ীরা নতুন বাজারগুলোতে চলে যান। এ ব্যাপারে স্থানীয় কাউন্সিলররা খুবই ইতিবাচক ভূমিকা পালন করছেন। মেয়র এবং দীর্ঘদিনের একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমি কোনো কঠোর পথ নিতে চাই না। কিন্তু আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তা না হলে আমরা প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা ও দরকার হলে অধিগ্রহণ করতে বাধ্য হব।
প্রথম আলো : নাগরিক নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। নিরাপত্তাহীনতার বোধ কিন্তু কমেনি। নিরাপত্তা নিশ্চিতে কোনো উদ্যোগ নিয়েছেন কি?
আনিসুল হক : প্রাথমিকভাবে আমরা গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতনকে শক্তিশালী সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছি। কার্যকর হলে অন্ধকারের লোকজন শনাক্ত বা গাড়ির নম্বরপ্লেট পড়া যাবে। টঙ্গী থেকে তেজগাঁও পর্যন্ত সড়কও সিসি ক্যামেরার আওতায় আসবে আগামী জুনের মধ্যে। এ জন্য স্থানীয় সোসাইটিগুলোকে নিয়ে আমরা কাজ করছি। তহবিল জোগাড় হচ্ছে। আমি মেয়র অফিসে এর কন্ট্রোল রুম করার প্রস্তাব দিয়েছি। পুলিশ বিষয়টি দেখবে।
প্রথম আলো : নগরবাসীর সেবা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একজন মেয়র হিসেবে এই ছয় মাসে কোন বিষয়টিকে বড় সমস্যা বা বাধা বলে মনে হচ্ছে?
আনিসুল হক : আমার ছয় মাসের অভিজ্ঞতা বলে ঢাকার জন্য কার্যকর কিছু করতে হলে ও নগরবাসীর সেবা নিশ্চিত করতে হলে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি সমন্বয় সংস্থা দরকার। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে একটি ছাতার নিচে নিয়ে আসা প্রয়োজন। অনেক কিছুই মেয়রদের কাছে থাকা প্রয়োজন। সিটি করপোরেশনের কিছু পুলিশ থাকা দরকার। নানা ধরনের দখল উচ্ছেদে তাদের কাজে লাগানো যাবে। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিষয়টি সমন্বয়ের দায়িত্ব নেওয়ার অনুরোধ করেছি। তিনি বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
আনিসুল হক : আপনাকেও ধন্যবাদ।
কাজ করার ক্ষেত্রে বড় বাধা সমন্বয়হীনতা -বিশেষ সাক্ষাৎকারে: সাঈদ খোকন by এ কে এম জাকারিয়া
প্রথম আলো : মেয়র হওয়ার আগে কিছু প্রতিশ্রুতি ছিল। মাস ছয়েকের মধ্যে কী বা কতটুকু করতে পারবেন তারও ভাবনা নিশ্চয়ই ছিল। তার কতটুকু করতে পারলেন?
সাঈদ খোকন : এই ছয় মাস আমি প্রতিটি দিন কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। খুব কম ছুটির দিনই ব্যক্তিগতভাবে উপভোগ করতে পেরেছি। কোরবানির ঈদের দিনও বাইরে-বাইরে কাটিয়েছি। এসব বলছি এ জন্য, এই সময়ের মধ্যে চেষ্টার কোনো ত্রুটি করিনি। ছয় মাসে অনেক কিছু করে ফেলব, এমন কোনো ম্যাজিক আমার কাছে নেই। এই সময়ের মধ্যে কীভাবে কাজ করব, তার একটি দিকনির্দেশনা ঠিক করার চেষ্টা করেছি।
প্রথম আলো : এই সময়ের মধ্যে কাজ করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ও চ্যালেঞ্জ কোনটি বলে মনে হচ্ছে?
সাঈদ খোকন : বড় সমস্যা হচ্ছে সেবামূলক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় করা। ঢাকা শহরের নাগরিক সেবা ও সুবিধা নিশ্চিত করার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থার সংখ্যা ৫৬টি। একটির সঙ্গে আরেকটির কোনো সমন্বয় নেই। ঢাকার জলাবদ্ধতা নিয়ে আমরা একটি সেমিনার করেছি। সেখানে দেখা গেল ঢাকার ড্রেনেজ ব্যবস্থার সঙ্গে ১৪টি প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে। আমি বলব, সমন্বয়হীনতাই সবচেয়ে বড় সমস্যা কাজ করার ক্ষেত্রে।
প্রথম আলো : এই সমস্যাটি পুরোনো। তবে আপনি কীভাবে কাজ করবেন বা এই সমস্যার সমাধান হবে কীভাবে?
সাঈদ খোকন : আমরা ঢাকার দুই মেয়রই কাজ করতে গিয়ে সমস্যাটির মুখে পড়েছি। এই পরিস্থিতিতে আমরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করার কথা বলেছি। আমরা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে অনুরোধ করেছি, তিনি যাতে এর নেতৃত্ব দেন। তিনি আমাদের সমস্যাটি বুঝতে পেরেছেন এবং বিষয়টি বিবেচনা করার কথা বলেছেন। বিষয়টি এখন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এটা হয়ে গেলে সমন্বয়হীনতার সমস্যা অনেকটাই কেটে যাবে।
প্রথম আলো : আর কোনো বাধা বা চ্যালেঞ্জ?
সাঈদ খোকন : ঢাকা যেভাবে বিভক্ত হয়েছে তাতে দুই সিটি করপোরেশনের মধ্যে আয় ও ব্যয় দুই ক্ষেত্রেই বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনে যে রাজস্ব আয় হতো তার ৬৫ ভাগ এখন পাচ্ছে ঢাকা উত্তর। আর আমার ঢাকা দক্ষিণ পাচ্ছে মাত্র ৩৫ শতাংশ। আবার ঢাকা দক্ষিণে ব্যয় অনেক বেশি। ঢাকা দক্ষিণ অনেকটা প্রশাসনিক রাজধানীর মতো, ফলে এর অপারেটিং কস্ট অনেক বেশি। অবিভক্ত ঢাকায় আগে রাজস্ব আয়ের ৬৫ ভাগ খরচ হতো ঢাকা দক্ষিণে। এখন বিষয়টি উল্টে গেছে। ফলে সাধারণ পরিচালনা কর্মকাণ্ডের বাইরে নিজস্ব অর্থে নতুন কোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা হাতে নেওয়ার কোনো সুযোগই নেই।
প্রথম আলো : ২০০৯ সালের অ্যাক্ট অনুযায়ী নানা খাতে কর আদায়ের সুযোগ সিটি করপোরেশনের রয়েছে। রাজস্ব আয় বাড়াতে এসব দিকে নজর দিতে সমস্যা কোথায়?
সাঈদ খোকন : এটা আমাদের জন্য এক বড় সুযোগ। আইনগত অধিকার থাকলেও এটা কার্যকর করার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। আইন হয়েছে কিন্তু বিধিবিধান হয়নি। সিটি করপোরেশনের মধ্যে নানাভাবে কর ও রাজস্ব আদায় হচ্ছে, যার একটি ভাগ সিটি করপোরেশনের পাওয়ার কথা। আমি অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছি। আমি আইনে দেওয়া অধিকার ও সুযোগের বিষয়টি তাঁর কাছে তুলে ধরেছি। তিনি বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েছেন। এটা করা গেলে আমরা অনেকটাই স্বাবলম্বী হয়ে যাব। সরকারের কাছে থোক বরাদ্দ চাওয়া ও তা অনুমোদন পাওয়া একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়ার ব্যাপার। আমরা নিজেদের অর্থেই নিজেরা চলার পরিস্থিতি তৈরি করার উদ্যোগ নিচ্ছি।
প্রথম আলো : জলাবদ্ধতার সমস্যা দূর করতে তো কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
সাঈদ খোকন : আমরা এ নিয়ে কাজ শুরু করেছি। শান্তিনগরের জলাবদ্ধতার বিষয়টি আমি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে নিয়েছি। বৃষ্টিতে পানি জমে যাওয়ার পর আমি সেখানে গিয়েছি। সমস্যাটির কিছু দিক আমরা চিহ্নিত করতে পেরেছি। আমরা আশা করছি, আগামী বর্ষার আগেই পুরো না হলেও এই সমস্যার অনেকটাই সমাধান করে ফেলা যাবে।
প্রথম আলো : নির্বাচনী ইশতেহারে আপনি কয়েকটি সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পাঁচটি বিষয় আপনি অগ্রাধিকারের তালিকায় রেখেছিলেন। যানজট এর মধ্যে ১ নম্বরে ছিল। এ ক্ষেত্রে তো কোনো অগ্রগতি নেই। পরিস্থিতি তো দিনে দিনে শোচনীয় হচ্ছে।
সাঈদ খোকন : এ ক্ষেত্রেও সেই সমন্বয়হীনতার কথাই বলতে হয়। যানজট দূর করতে এককভাবে সিটি করপোরেশনের পক্ষে কোনো ভূমিকা রাখা কঠিন। দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন সংস্থা যার যার মতো করে প্রকল্প নিচ্ছে। শান্তিনগর থেকে বাবুবাজার পর্যন্ত একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার কিছু আমার সিটি করপোরেশন জানে না। এটা তো হওয়া উচিত না। অথচ একটি কার্যকর পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা রয়েছে। এর জন্য ঢাকা ট্রান্সপোর্ট সমন্বয় বোর্ড রয়েছে। কিন্তু এর বাইরেও নানা সিদ্ধান্ত হয়।
প্রথম আলো : তা হলে তো যানজটের ক্ষেত্রে কোনো আশার কথা শোনা যাচ্ছে না।
সাঈদ খোকন : বিভিন্ন চলমান প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নিশ্চয়ই পরিস্থিতির উন্নতি হবে। তবে উন্নয়ন কার্যক্রম চলার সময় কিছু ভোগান্তিও নিতে হয়। ঢাকায় মেট্রোরেল তৈরির কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। এটা হলে নগরবাসীর গণপরিবহনের ক্ষেত্রে একটা বড় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তবে এর কাজ শুরু হলে জনদুর্ভোগ হবেই। শান্তিনগর থেকে বাবুবাজার পর্যন্ত যে ফ্লাইওভার হবে, তার ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। আমি বুঝতে পারছি যে আগামী তিন-চার বছর একটা বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যাবে।
প্রথম আলো : গুলিস্তান এলাকার বিশৃঙ্খলা, হকারদের রাস্তা দখল, হানিফ ফ্লাইওভারের নিচের রাস্তা বাসের দখলে চলে যাওয়া—এসব দূর করার ক্ষেত্রেও তো কিছু হয়নি।
সাঈদ খোকন : হকারদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আমরা কাজ শুরু করেছি। তালিকা করে পুনর্বাসন করা হবে। গুলিস্তান থেকে বাস স্টপেজ সরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে আমরা মালিকদের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি বলব যে এই নিয়ে হোমওয়ার্ক চলছে। আপনাদের কথা দিচ্ছি, শিগগিরই ক্লিন গুলিস্তানের জন্য কাজ শুরু করব।
প্রথম আলো : আপনার অগ্রাধিকারের মধ্যে আরও একটি বিষয় ছিল ‘দূষণমুক্ত নাব্য ও নিরাপদ বুড়িগঙ্গা’। এ ব্যাপারে কিছু এগোল?
সাঈদ খোকন : আমরা আপাতত বুড়িগঙ্গা নদীর সামনের জায়গা মানে ওয়াটার ফ্রন্ট উন্নয়নের উদ্যোগ নিতে যাচ্ছি। আমরা নদীর পাড় পরিষ্কার করা ও সেখানে নানা কিছু করার পরিকল্পনা নিচ্ছি। নকশা তৈরির কাজ চলছে। অনুমোদনের পর আগামী বছরের শেষে কাজ শুরু করা যাবে বলে আশা করছি। বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পে অর্থায়ন করবে।
প্রথম আলো : পৌরকর নির্ধারণ ও আদায় নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ট্রেড লাইসেন্সসহ এ ধরনের সেবা নিতে পয়সা গুনতে হয় বলেও অভিযোগ আছে। আপনি মেয়র হওয়ার পর পরিস্থিতির উন্নয়নে কী পদক্ষেপ নিয়েছেন?
সাঈদ খোকন : পরিস্থিতির আগের চেয়ে অনেক উন্নতি হয়েছে। তবে এই দাবি করব না যে দুর্নীতি একদম চলে গেছে। আমি নিজে নিয়মিত কার্যালয়গুলোতে যাই। যেকোনো অভিযোগ পাওয়ামাত্র তা বিবেচনায় নিয়ে বোঝার চেষ্টা করি, ব্যবস্থা নিই। দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধে কিছু জিনিস আমরা অনলাইনভিত্তিক করে ফেলার উদ্যোগ নিয়েছি। যেমন: জন্মনিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স—এসব অনলাইনে করা যাবে। হোল্ডিং ট্যাক্সের ক্ষেত্রে স্বনির্ধারণী পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছি এবং তা অনলাইনে করা যাবে। এসব কার্যকর হলে দুর্নীতি আরও কমে আসবে।
প্রথম আলো : নগরবাসীর সেবা নিশ্চিত করার জন্য সামনে আর কী কী উদ্যোগ নিতে যাচ্ছেন?
সাঈদ খোকন : আমরা শিগগিরই রাস্তাঘাট সংস্কারের কাজ শুরু করতে যাচ্ছি। আগামী দুই মাসের মধ্যে দেখবেন কাজের ধুম শুরু হয়ে গেছে। পাইলট প্রকল্প হিসেবে আমরা ২৬ নম্বর ওয়ার্ডটিকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনার উদ্যোগ নিয়েছি। পরে তা অন্য ওয়ার্ডগুলোতেও সম্প্রসারণ করার ইচ্ছা রয়েছে। ৫০টি স্থানে ফ্রি ওয়াই-ফাইয়ের ব্যবস্থা হবে। বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। আমরা সেগুলোকে রেজিস্ট্রেশনের আওতায় নিয়ে আসব। সেখানে অভিযোগ বক্স থাকবে। আমরা শক্ত হাতে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করব। আবর্জনা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হচ্ছে।
প্রথম আলো : আপনি ঢাকা দক্ষিণের মেয়র, কিন্তু থাকেন ঢাকা উত্তরে। এতে সমস্যা হয় না। আপনার ভোটারদের এ নিয়ে কোনো অভিযোগ নেই?
সাঈদ খোকন : যানজটের কারণে আসা-যাওয়ায় সমস্যা হয়। আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবছি কী করা যায়। তবে আমার ভোটারদের অভিযোগ নেই। কারণ, আমি অফিসের বাইরেও সপ্তাহে দু-তিন দিন মানুষের সঙ্গে কাটাই।
প্রথম আলো : আপনাকে ধন্যবাদ।
সাঈদ খোকন : আপনাকেও ধন্যবাদ।
Monday, December 7, 2015
ঘোরাঘুরি নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য by এ কে এম জাকারিয়া
সারা দুনিয়ায় পর্যটকের সংখ্যা ১০০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে বলা হচ্ছে, আগামী বছরগুলোতে সবচেয়ে দ্রুত বিকাশ হবে এমন শিল্পের একটি হচ্ছে পর্যটন। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল ও ট্যুরিজম কাউন্সিল ২০১২ সালের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে যে হিসাব দিয়েছে, তাতে দেখা যাচ্ছে যে শিল্প-কলকারখানা, খুচরা ব্যবসা, আর্থিক সেবা ও যোগাযোগ খাতের ব্যবসার তুলনায় পর্যটন খাতের ব্যবসার বিকাশ ছিল দ্রুত। বিশ্ব জিডিপিতে এই খাতের অবদান দাঁড়িয়েছে ৩ শতাংশে। ২০১২ সালে সারা দুনিয়ায় যে ২৬ কোটি কর্মসংস্থান হয়েছে, তার মধ্যে ৫০ লাখই হয়েছে পর্যটনশিল্পে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, প্রতি ১১টি চাকরির মধ্যে একটি কোনো না কোনোভাবে পর্যটনসংশ্লিষ্ট।
পর্যটনশিল্পের সঙ্গে জড়িত আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আমাদিউস অক্সফোর্ডের কিছু অর্থনীতিবিদকে দিয়ে পর্যটনশিল্পের সামনের সম্ভাবনা বিষয়ে একটি প্রতিবেদন তৈরি করিয়েছে। তাঁদের ভবিষ্যদ্বাণী হচ্ছে, আগামী ১০ বছর ধরে প্রতিবছর পর্যটন খাতে প্রবৃদ্ধি হবে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ হারে। এতে দুনিয়াজুড়ে পর্যটনশিল্পে কর্মসংস্থানের বিরাট সুযোগ তৈরি হবে। পর্যটন এমনই এক ব্যতিক্রমী বাণিজ্য, যাতে নিজ দেশে লোক নিয়ে এসে বিদেশি মুদ্রা আয় করা যায়। বিশ্বের অনেক দেশের অর্থনীতির বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি বড় খাত হচ্ছে পর্যটন।
যে শিল্প বিশ্ব অর্থনীতিতে এত বড় জায়গা দখল করে নিয়েছে, সামনে আরও বাড়বে বলে ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে, সেই শিল্পের প্রতি বাড়তি মনোযোগী না হয়ে উপায় নেই। বাংলাদেশ সরকার ২০১৬ সালকে পর্যটনবর্ষ ঘোষণা করেছে। একটি লক্ষ্যও ঠিক হয়েছে। আগামী বছর ১০ লাখ পর্যটক আনতে চায় বাংলাদেশ। দেশে দেশে এ ধরনের পর্যটন বছর ঘোষণার রেওয়াজ রয়েছে। পর্যটক আনতে তখন দেশগুলো বাড়তি অর্থ খরচ করে, তবে যা খরচ হয়, তার বহুগুণ ফিরে আসে। পর্যটন বছরে বাড়তি পর্যটক আনতে তারা কী কী করেছে, কোনগুলো কাজে দিয়েছে, তা আমরা বিবেচনায় নিতে পারি আমাদের পর্যটনবর্ষকে সফল করতে।
পর্যটনশিল্পে বাজার নিতে হলে শুধু একটি বছরকে পর্যটন বছর ঘোষণাই যথেষ্ট নয়। সেই বছরটি নিয়ে কাজের কাজ কিছু হয় এমন পরিকল্পনা ও কৌশল নিতে হবে। যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশে পর্যটক আসার সম্ভাবনা বেশি, সেগুলো চিহ্নিত করে সেখানকার বাংলাদেশ মিশনগুলোকে প্রচার-প্রচারণার মিশনে নামতে হবে পর্যটনশিল্পে আশপাশের দেশগুলোর তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে। বাংলাদেশ পর্যটন বছর ঘোষণা করে যেখানে আগামী বছর ১০ লাখ পর্যটক আনার লক্ষ্য ঠিক করেছে, সেখানে শ্রীলঙ্কার এ বছরের লক্ষ্য ছিল ২০ লাখ পর্যটক নিয়ে আসা। ভারতের কথা বাদ থাক, দীর্ঘদিন অনেকটা নিষিদ্ধ দেশ হিসেবে ছিল যে মিয়ানমার, সেটিও এখন এ অঞ্চলে পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। ২০১৩ সালে প্রায় ৭৬ লাখ পর্যটক ভিয়েতনাম সফর করেছেন। কম্বোডিয়া সফর করেছেন ৪২ লাখের বেশি পর্যটক। এসব পরিসংখ্যান থেকে বাংলাদেশের পর্যটন এবং এই শিল্পের অবস্থা সম্পর্কে একটি ধারণা পাওয়া যায়। দুঃখের বিষয় হচ্ছে, আমাদের দেশে বছরে কত পর্যটক আসেন, তার কোনো বস্তুনিষ্ঠ তথ্য বা পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) পরিচালক তৌফিক রহমানকে দীর্ঘদিন ধরে জানি। বলা ভালো যে তাঁর সংগ্রামের কথা জানি। বিদেশ থেকে নিয়মিত পর্যটক বাংলাদেশে আনতে গিয়ে কত ঝক্কি-ঝামেলায় পড়েন, তা তাঁর মুখে বহুবার শুনেছি।
‘আমাদের দেশে সভা-সেমিনারে অনেক কর্তাব্যক্তির মুখেই লাখ লাখ পর্যটক নিয়ে আসার কথা শুনি। অথচ আমরা নিজেরাই জানি না যে গত পাঁচ বছরে দেশে কী পরিমাণ পর্যটক এসেছেন। সংখ্যার দিক দিয়ে কোন দেশগুলোর পর্যটকেরা প্রথম ১০টি বা ৫টি দেশের মধ্যে রয়েছেন। কী কারণে তাঁরা বাংলাদেশে আসেন, গড়ে কত দিন বাংলাদেশে থাকেন, কত খরচ করেন কিংবা বাংলাদেশে এসে তাঁরা কী কী দেখতে চান—এ ধরনের কোনো গবেষণালব্ধ তথ্য আমাদের কাছে নেই।’ এই আক্ষেপ তাঁর মুখে শুনেছি গত বিশ্ব পর্যটন দিবসের (২৭ সেপ্টেম্বর) আগে। বোঝা যায়, পর্যটনশিল্প এগিয়ে নিতে কাজের কাজ কিছু করার চেয়ে আমরা অনেক পিছিয়ে। প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ব পর্যটন ব্যবসায় জায়গা করে নিতে হলে গবেষণা ও তথ্য-উপাত্ত খুবই জরুরি। এসবের ওপর ভিত্তি করেই কোন কোন ক্ষেত্রে বা কোন কোন দেশের পর্যটকদের প্রতি বাড়তি নজর দেওয়া দরকার অথবা কোথায় কী সম্ভাবনা রয়েছে, তা নির্ধারণ করা সম্ভব।
এই যে আগামী বছর পর্যটন বছর ঘোষণা ও ১০ লাখ পর্যটক আনার লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে, সে ক্ষেত্রে কোন কোন দেশের পর্যটকদের আকর্ষণের চেষ্টা করা হবে বা কিসের ভিত্তিতে তা করা হবে, সে রকম কিছু কি আদৌ ঠিক করা হয়েছে? বাংলাদেশে সাধারণত কোন কোন দেশের পর্যটক আসেন, তার একটি ধারণা পাওয়া যায় সেই বছর আটেক আগে ২০০৭ সালে প্রকাশিত পর্যটন করপোরেশনের একটি পরিসংখ্যানে (ওই বছর ২ লাখ ৯০ হাজারের মতো পর্যটক এসেছিলেন)। ধারাবাহিকভাবে দেশগুলো হচ্ছে ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও চীন। ধারণা করা যায় যে এই দেশগুলোর মধ্যে প্রথম চারটি দেশ থেকে যে পর্যটকেরা এসেছেন, তাঁদের মধ্যে একটি বড় অংশ হচ্ছে বাংলা ভাষাভাষী বা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত লোকজন। সেদিক থেকে দেখলে চীন থেকে আসা ভ্রমণকারীরা বাংলাদেশে আসেন শুধুই ভ্রমণ বা একটি নতুন দেশ দেখা বা অন্য কোনো তাগিদ থেকে। পর্যটনবর্ষে পর্যটক আকর্ষণে চীন হতে পারে আমাদের এক গুরুত্বপূর্ণ টার্গেট।
চীন এখন বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পর্যটক জোগান দেওয়া দেশ। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান আমাদিউসের গবেষণা প্রতিবেদনের কথা আগেই বলেছি। সেই প্রতিবেদন বলছে, ২০২৩ সালের মধ্যে বিশ্বের পর্যটকদের ২০ ভাগই হবে চীনের নাগরিক। কারণ, এই সময়ের মধ্যে অন্তত ২২ কোটি চীনা নাগরিক বছরে দুবারেরও বেশি বিদেশ ভ্রমণ করার মতো অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জন করবেন। চীনের বাইরে রাশিয়া, ব্রাজিল, ভারত, ইন্দোনেশিয়া ও তুরস্কের মতো দেশগুলোর নাগরিকেরাও সম্পদ বৃদ্ধি ও ভোগবাদিতার ধরন পরিবর্তনের কারণে বিদেশ ভ্রমণ ও পর্যটনের দিকে ঝুঁকবে। আগামী ১০ বছরে এসব দেশ থেকে বিদেশে যেতে আগ্রহী পর্যটকের সংখ্যা প্রতিবছর ৫ শতাংশ করে বাড়তে থাকবে।
চীনের পরে পর্যটক জোগান দেওয়ার ক্ষেত্রে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভারত। ২০১৩ সালের পরিসংখ্যান বলছে, ওই বছর দেশটির প্রায় দেড় কোটি পর্যটক বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। বাংলাদেশে পর্যটন ব্যবসায় সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে ভারতীয় পর্যটকদের। স্থলপথে বাংলাদেশে আসার সুযোগ থাকায় খুবই সহজ ও সাশ্রয়ী ভ্রমণেরও সুযোগ নিতে পারেন অনেক ভারতীয় পর্যটক। আবার ভারত একই সঙ্গে সারা দুনিয়া থেকে অসংখ্য পর্যটকও আকর্ষণ করে। ভারতে আসা এই পর্যটকেরাও হতে পারেন সম্ভাব্য বাংলাদেশ ভ্রমণকারী। সে ক্ষেত্রে ভারত ভ্রমণের আগে-পরে সেই পর্যটকেরা যাতে বাংলাদেশ ঘুরে যেতে আগ্রহী হন, সে ধরনের কিছু উদ্যোগ ও কৌশল নেওয়ার বিষয়টি চিন্তাভাবনা করতে হবে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পর্যটক জোগান দেওয়া দুটি দেশই ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের কাছাকাছি—এর চেয়ে বড় সুযোগ আর একটি দেশের পর্যটনশিল্পের জন্য কী হতে পারে!
চীনের বৌদ্ধ ধর্মগুরু, পণ্ডিত ও পরিব্রাজক হিউয়েন সাং সেই সপ্তম শতকে ভারত এমনকি এই বাংলাও সফর করে গেছেন। হিউয়েন সাংয়ের সেই দিন এখন আর নেই। পর্যটকেরা এখন আর এভাবে অজানার পথে বেরিয়ে পড়েন না। তাঁদের নিয়ে আসতে হয়, আকৃষ্ট করতে হয়। এবং সে জন্য নানা অবকাঠামো, সুযোগ-সুবিধা, নীতি ও পর্যটকবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হয়। আবার সেই বিষয়গুলোকে প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে ছড়িয়েও দিতে হয়।
পর্যটনশিল্পে বাজার নিতে হলে শুধু একটি বছরকে পর্যটন বছর ঘোষণাই যথেষ্ট নয়। সেই বছরটি নিয়ে কাজের কাজ কিছু হয় এমন পরিকল্পনা ও কৌশল নিতে হবে। যেসব দেশ থেকে বাংলাদেশে পর্যটক আসার সম্ভাবনা বেশি, সেগুলো চিহ্নিত করে সেখানকার বাংলাদেশ মিশনগুলোকে প্রচার-প্রচারণার মিশনে নামতে হবে। বিশেষ কিছু অনুষ্ঠান হাতে নিতে হবে। পর্যটক বছর শুরুর আগেই পর্যটকবান্ধব কিছু বিধিবিধান ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও নিতে হবে। বিশেষ করে ভিসা-ব্যবস্থা সহজ করা, অনলাইনের মাধ্যমে ভিসা আবেদনের সুযোগ, বিশ্বের যে ৬৩টি দেশের নাগরিকেরা অন-অ্যারাইভাল ভিসা পান, তা স্থলসীমান্তের ক্ষেত্রে কার্যকর করা—এসব বিষয় ভাবা যেতে পারে। তবে এ জন্য পর্যটন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে বসে আলাপ-আলোচনা করলে নানা পরামর্শ পাওয়া যাবে। কারণ, সমস্যা ও বাধাগুলো তাঁরাই সবচেয়ে ভালো জানেন।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaria@gmail.com
BNM Special
BNM Archive
BNM Archive
- ▼ 2026 (2388)
- ► 2025 (3281)
- ► 2024 (2551)
- ► 2021 (129)
- ► 2020 (416)
- ► 2019 (6282)
- ► 2018 (7025)
- ► 2017 (8870)
- ► 2016 (3416)
- ► 2015 (11541)
- ► 2014 (9799)
- ► 2013 (14877)
- ► 2012 (33842)
- ► 2011 (13932)
- ► 2010 (9402)
Recent Posts
Popular Posts
-
শিশুদের বার্নআউট হওয়ার লক্ষণ অনেকেরই চোখ এড়িয়ে যায়। কারণ, বড়দের তুলনায় তাদের চাপকে অনেকেই হালকা মনে করেন। এ ছাড়া অনেকে ভাবেন, শিক্ষাজীবন হলো...
-
প্লেবয় ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদে নিজেকে নগ্নভাবে মেলে ধরে ব্যাপকভাবে সমালোচনায় আসা শার্লিন চোপড়া এবার ভারতীয় চলচ্চিত্রে নগ্নতার বৈধতা চাই...
-
কিডনির রোগকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ, অনেক সময় কোনো লক্ষণ ছাড়াই এটি ধীরে ধীরে শরীরকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। অথচ সামান্য সচেতনতা, নিয়মিত পরীক্ষা এ...
-
‘সেক্স’ ছাড়া এক ঘণ্টার বেশি এক মুহূর্ত থাকতে পারেননা অভিনেত্রী ভূমি পাড়নেকার৷ না, কমেন্ট টা কিন্তু তিনি নিজে করেননি৷ করেছেন তাঁর সহ অভ...
-
ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই নগ্নতার মাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনায় রয়েছেন ভারতীয় মডেল-অভিনেত্রী পুণম পা-ে। ‘ভারত বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হলে নগ্ন হয়ে...
-
প্রতীকি ছবি এখনও কুমারী থাকা ১৬ কলেজছাত্রীকে বৃত্তি দিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকার এক মেয়র। এর মাধ্যমে অন্যদের কুমারিত্ব ধরে রাখার জন্য উৎসা...
-
C onservative groups responding to Occupy Wall Street argue that hard work, not protests, will bring people out of poverty. Is that tr...
-
নাইওর-ফিরতি কনের মতো মন খারাপ করা বিকেলে টুকু বৈদ্যবাড়ি পৌঁছায়—সে আর তার স্বামী। সকালেই যাত্রা করেছিল তারা। দুপুরে দাওয়াত ছিল আমির হোসে...
-
বয়স তখন সবে ৭ বছর। তখনও সাবালিকা হতে অনেক দেরি। তবে সেই শিশু বয়সেই পরিচয় ঘটে জীবনের এক ভয়ঙ্কর দুর্বিসহ ঘটনার সঙ্গে। ৩২ বছর ধরে বুকের এক...
-
বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় ছাত্র সংসদের নিয়মিত নির্বাচন হলে দেশে নেতৃত্বের দেউলিয়াপনা সৃষ্টি হতো না বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট...







