Thursday, October 24, 2013

কিভাবে গঠিত হবে নির্বাচনকালীন সরকার by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

সরকারি দল ও বিরোধী দল যখন ক্ষমতার রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত, তখন সাধারণ মানুষ শংকিত দেশের আইন-শৃংখলা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে। এর মধ্যেও মানুষ আশা করছে, শেষ মুহূর্তে একটি আপসরফা হবে। ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রী পৃথকভাবে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা তুলে ধরেছেন। প্রশ্ন হল, যেখানে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে একবিন্দু আস্থা নেই, সেখানে উভয়ের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে কিভাবে একটি নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে? ইতিপূর্বে যতগুলো তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়েছে, সেগুলোর উপদেষ্টাদের কীভাবে উভয়ের সম্মতিতে বাছাই করা হয়েছে, সে সম্পর্কে সাধারণ মানুষের কোনো ধারণা নেই। খুব ভালো হতো যদি গোটা প্রক্রিয়াটি সাধারণ মানুষের সামনে স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হতো, তাদের সম্পৃক্ততা থাকত। তাহলে কোনো দলই নির্বাচনকালীন সরকার তথা নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতে পারত না। আমার এরকম একটি প্রস্তাব একাধিকবার গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও তা সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়নি। দেশের এই সন্ধিক্ষণে আবার বিষয়গুলো বলার সাধ জাগল। এ নিয়ে আলোচনা করলে হয়তো অনেক বেশি সুচিন্তিত ও গ্রহণযোগ্য একটি পদ্ধতি আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
১.
বিগত চারটি নির্বাচনে সাধারণ মানুষ সব সময় সরকারি দলকে প্রত্যাখ্যান করেছে। নিশ্চয়ই আমাদের দেশের রাজনীতিকরা বিষয়টি লক্ষ্য করেছেন এবং এর থেকে আমাদের দলগুলো এখনও যে শিক্ষা গ্রহণ করেনি তার বড় প্রমাণ এই ধারা বেশ কিছুদিন ধরে অব্যাহত রয়েছে। বিগত নির্বাচনে ৭-৮ বছর ক্ষমতায় না থাকা, কোনরকম উন্নয়নমূলক কাজ করতে না পারা, টেন্ডার দিতে না পারা আওয়ামী লীগকে মানুষ জয়যুক্ত করেছিল। এবার আবার পাঁচ বছর এমনকি সংসদ অধিবেশনে না যাওয়া, ক্ষমতায় না থাকা বিএনপিকে নির্বাচিত করলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। সুতরাং নির্বাচনে জেতার জন্য ভালো মানুষ হওয়ার প্রয়োজন নেই, স্রোতের অনুকূলে থাকতে পারাটাই গুরুত্বপূর্ণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বড় দুটি দলে গণতন্ত্রের চর্চাও লক্ষণীয় নয়। এর ফলে নতুন নেতৃত্বও তৈরি হচ্ছে না। তাই বড় দুটি দলে গণতন্ত্রের চর্চা আবশ্যক। দেশের সাধারণ মানুষের যারা প্রতিনিধিত্ব করবেন, সেই সংসদ সদস্যরা যদি ভাবেন তারা তো কিছুই নন- দলই সব, তাহলে প্রতিনিধিত্ব যোগ্য হবে না। আবার গত কয়েকটি নির্বাচনে এ-ও দেখা গেছে, এই বড় দল দুটি যত ভোট পেয়েছে, সেই অনুপাতে সংসদে তারা আসন পায়নি। ভোটের ব্যবধান ৫-৬ শতাংশ হলেও আসনের ব্যবধান ৮-৯ গুণ, যা কিনা একটি নির্বাচন ব্যবস্থার অগ্রহণযোগ্য ত্র“টি হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। আজ সংসদে বিরোধী দলের আসন সংখ্যা যদি ১৩০-১৪০ হতো, নিশ্চয়ই তাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা যেত না। তাই আমার প্রস্তাব হল দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ তৈরি করা। একজন ভোটার দুটি ভোট দেবে- একটি দলকে আরেকটি স্থানীয় সংসদ আসনের প্রার্থীকে। সংসদ নির্বাচনে যারা দাঁড়াবে, তারা দলের প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে না, তবে আমাদের সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মতো নানা দল তাদের পক্ষ নিতে পারবে। দলের প্রতীক না নিয়ে যদি কেউ নির্বাচনে জয়ী হতে পারে, তাহলে তার নিজের প্রতি আস্থা ও আত্মমর্যাদাবোধ বেশি হবে। এই সংসদ সদস্যরা ইচ্ছা করলেই ফ্লোরক্রসও করতে পারবেন। এর ফলে তারা দলের অন্ধ আজ্ঞাবহে পরিণত হবেন না। দলের সিদ্ধান্তে তারা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবেন। এর ফলে দলের সিদ্ধান্তের গুণগত মানও বাড়বে। আর প্রতিটি রাজনৈতিক দল যে ভোট পাবে, সেই অনুপাতে তারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত করতে পারবে। আমরা যদি ধরি, আমাদের ৩০০ জন সংসদ সদস্য ভোটারদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবেন, আর ৩০০ জন দলীয়ভাবে। তাহলে ৩০০ আসন রাজনৈতিক দলগুলোকে আনুপাতিক হারে বণ্টন করা হবে। আমরা জানি, অনেক ছোট দলের সারা দেশভিত্তিক ভোট থাকা সত্ত্বেও কোনো আসন থেকেই তারা বিজয়ী হতে পারে না, যদিও তাদের মোট প্রাপ্ত ভোট একাধিক সংসদ সদস্যের প্রাপ্ত ভোটের চেয়ে বেশি হতে পারে। সুতরাং তাদের এই জনপ্রিয়তা দৃশ্যমান হওয়া প্রয়োজন। স্থানীয় সংসদ সদস্যরা এলাকার উন্নয়নমূলক কাজে যৌক্তিক মাত্রায় অংশগ্রহণ করবেন। সংসদ সদস্যরা একাধারে ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হওয়ার ফলে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালনে স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় বলে সংসদ এ বিষয়ে পরিষ্কার নীতি গ্রহণ করতে পারে। এছাড়াও বিগত কয়েকটি সরকারে বিরোধী দলের সংসদ বর্জন অথচ সংসদ সদস্য হিসেবে সব সুযোগ-সুবিধা কড়ায়গণ্ডায় ভোগ করা থেকে সাধারণ মানুষের ধারণা জšে§ছে যে, আমাদের প্রতিনিধি নেতারা চিন্তা-চেতনা-ত্যাগে আমাদের প্রত্যাশাকে কোনোভাবেই স্পর্শ করতে পারছেন না। সুতরাং তাদের নিজেদের কর্মকাণ্ডের যথাযথ মূল্যায়নের জন্য ‘না ভোট’ দানের সুযোগ থাকা উচিত।
২.
বর্তমানে প্রধান দুটি দলের মধ্যে পরস্পরের প্রতি আস্থাহীনতা দেশের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর ও লজ্জাজনক। এ অবস্থায় সমঝোতার মাধ্যমে যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া তত সহজ হওয়ার কথা নয়। নির্বাচনকালীন সরকার, তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্দলীয় সরকার কিংবা নির্বাচন কমিশন বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে দুটি দল একমত হবে এটা কল্পনা করতেও কষ্ট হয়। এজন্য সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যে বিষয়েই সমঝোতা হওয়া প্রয়োজন, সে বিষয়েই নিচের পদ্ধতি অনুসরণ করা যেতে পারে।
মনে করি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান ও অন্য সদস্যদের নির্বাচনে উভয় দলকে সমঝোতায় আসতে হবে। নির্বাচন কমিশন মধ্যস্থতাকারী হিসেবে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে উভয় দলকে আমন্ত্রণ জানাবে। জনসাধারণও জানবে এ অনুষ্ঠানে অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের জন্য দুই দলের মধ্যে সমঝোতা হবে। সারাদেশের মানুষ ওই অনুষ্ঠান উপভোগ করবে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকা পেনড্রাইভে নিয়ে উভয় দলের প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানে উপস্থিত হবেন। এর ফলে তালিকাগুলোর গোপনীয়তা বজায় রাখাও সহজ হবে। এবার প্রতিটি তালিকার প্রথম ১০টি নামের মধ্যে (সংখ্যাটি ১০-এর পরিবর্তে অন্য কিছুও হতে পারে) প্রথম মিল খোঁজা হবে (প্রথম মিলকেও আমরা প্রয়োজন অনুসারে সংজ্ঞায়িত করতে পারি)। না পেলে প্রথম ২০, প্রথম ৪০- এভাবে মিল খোঁজা হবে। তালিকার নামগুলোতে যাতে কোনো অস্পষ্টতা না থাকে সেজন্য তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করা যেতে পারে। এক বা একাধিক সুযোগ্য উপস্থাপকের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানটি যেমন হতে পারে চিত্তাকর্ষক, তেমনি বিশ্বাসযোগ্য। সাধারণ মানুষের সামনে ঘটে যাওয়া এই সমঝোতা নিয়ে সন্দেহ কিংবা অনাস্থা জ্ঞাপন করা কোনো দলের জন্যই সহজ হবে না। সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকা যাতে খুব বড় না হয়, সেজন্য উভয় দলের কাছে গ্রহণযোগ্য শর্ত দিয়ে এর দৈর্ঘ্য সীমিত রাখাও সম্ভব। তাছাড়া যেহেতু উভয় দলই জানছে যে নামটি অন্য তালিকায় থাকতে হবে, সুতরাং তাদের পছন্দের তালিকা যৌক্তিক হবে। যতক্ষণ উভয় তালিকায় একই নাম পাওয়া না যায়, ততক্ষণ টেলিভিশন অনুষ্ঠানটি চলতে থাকবে।
শুধু অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ও অন্যান্য সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে নয়, অন্য যে কোনো বিষয়েই সমঝোতায় পৌঁছতে এ ধরনের নৈর্ব্যক্তিক, স্বচ্ছ পদ্ধতি সাধারণ মানুষের সামনে উপস্থাপন করে তাদেরও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। জাতীয় সংসদের স্পিকার যেমন নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের ভোটে নির্বাচিত হন, এক্ষেত্রেও জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দলগুলো তাদের পছন্দের মানুষ নির্বাচন করবে। তাই অনির্বাচিতদের দিয়ে সরকার চালানোর সমালোচনা এখানে প্রযোজ্য হবে না। উল্লেখ করা যেতে পারে, তত্ত্বাবধায়ক, নির্দলীয়, সর্বদলীয়, নির্বাচনকালীন সরকার কিংবা নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি নির্বাচনসহ যে কোনো বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যদি সমঝোতার প্রয়োজন হয়, তা এ পদ্ধতির মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে জনগণের সামনে করা যাবে।
৩.
আরেকটি বিষয় নিয়েও গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে। একসময় আমরা কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া কিংবা থাইল্যান্ডের তুলনায় পিছিয়ে ছিলাম না। উন্নতির মাপকাঠিতে এখন আমরা অনেক পেছনে। এ উদাহরণগুলো বিবেচনায় নিলে মনে হয়, পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি আমাদের দেশে কোনো সুফল বয়ে আনেনি। প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য অন্যান্য দেশে যে নানারকম শর্ত রয়েছে, তা আমাদের দেশেও আরোপ করা উচিত। এর ফলে যারা প্রধানমন্ত্রী হবেন, তারা যথেষ্ট বিচক্ষণতা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে দেশ পরিচালনা করবেন, যাতে করে সরকারের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পরও তারা যথাযথ সম্মানের সঙ্গে দেশেই বসবাস করতে পারেন। শুধু তাই নয়, দেশের জ্যেষ্ঠ, প্রাজ্ঞ, দেশ চালনায় অভিজ্ঞ, সম্মানিত নাগরিক হিসেবে তারা পরবর্তী নেতাদের মূল্যবান উপদেশ দিয়ে দেশ পরিচালনায় সহায়তা করতে পারেন। এই পদে সর্বোচ্চ এক মেয়াদ থাকার নিয়ম করা যায় কিনা, তা ভেবে দেখা প্রয়োজন। কোনো নেতা যদি যোগ্য নেতা তৈরি করতে ব্যর্থ হন, তাকে নেতা হিসেবে সফল ভাবা যায় না। ১৬ কোটি মানুষের দেশে মাত্র দু-একজন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার যোগ্য হলে আমাদের দেশে গণতন্ত্র সফলভাবে বিকশিত হবে, এমনটি ভাবার কোনো কারণ নেই।
আমি আশা করি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান কিংবা সমাজবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞরা এবং আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো এ বিষয়ে গবেষণা করে আমাদের দেশকে যথাসম্ভব ত্র“টিমুক্ত একটি ব্যবস্থা উপহার দিয়ে দেশবাসীকে অনিশ্চয়তা ও শংকা থেকে রক্ষা করবেন।
ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ : অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

রাজনৈতিক অস্থিরতার কবলে শিক্ষা by মোঃ মুজিবুর রহমান

দেশের শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিনিয়ত নানা সমস্যা ও প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে। তবে যেভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি ও অন্যান্য নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণে শিক্ষা কার্যক্রম বিঘ্নিত হচ্ছে তাতে শিক্ষা এগিয়ে চলেছে বললে বোধ করি কিছুটা ভুল হবে। বরং বলা যায়, শিক্ষাব্যবস্থা এখন একরকম স্থবির হয়ে আছে। শিক্ষার্থীদের জন্য শান্তিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা নিশ্চিত করার পরিবর্তে নানা উপায়ে তা বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। স্কুলশিক্ষা থেকে আরম্ভ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থাও নির্বিঘ্ন রাখা যাচ্ছে না। স্কুলে ছাত্রছাত্রীদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নেই, নেই কোনো মিছিল-মিটিং, ঘেরাও-অবরোধ। এমনকি এখানে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাবও নেই। তারপরও স্কুলশিক্ষা কার্যক্রমও বিঘ্নের মুখে পড়ে অস্থিতিশীল রাজনৈতিক কর্মসূচি ও নানামুখী বেআইনি কর্মকাণ্ডের কারণে।
চলতি বছরের শুরুতেই রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে উপর্যুপরি হরতাল আহ্বান করা হয়েছিল। এ কারণে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা পরিচালনায় বিঘ্ন ঘটেছে। হরতাল সামনে রেখে কয়েকটি বিষয়ের পরীক্ষা পিছিয়ে দেয়া হয়েছিল তখন। পরীক্ষার্থীরা চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে পরীক্ষার হলে প্রবেশ করেছে। এমনকি তাদের পরীক্ষার প্রস্তুতিতেও বিঘ্ন ঘটেছে ব্যাপকভাবে। পরীক্ষার সময়টিতে পরীক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে পরীক্ষা দিতে পারবে কিনা তা নিয়ে অভিভাবকদের মনে রাজ্যের দুশ্চিন্তা ভর করেছিল। এর পরও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে পরিপূর্ণ স্থিতিশীলতা আসেনি; শিক্ষা নিয়েও অনিশ্চয়তা কাটেনি। বছরের মাঝামাঝি রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছুটা স্থিতিশীল পরিবেশ বিরাজ করার পর এখন আবার দেখা দিয়েছে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশংকা। সচেতন মহল ধারণা করছে, প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি কোনো সমঝোতা না হয়, তাহলে বছরের শেষভাগেও শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাপক বিঘ্নের মুখে পড়বে।
সামনে নভেম্বর। এ মাসজুড়ে রয়েছে বিভিন্ন স্তরের পরীক্ষার বিস্তৃত কর্মসূচি। মাসের প্রথম দিনেই শুরু হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স কোর্সে ভর্তি পরীক্ষা। মাসের বিভিন্ন দিনে ইউনিটভিত্তিক পরীক্ষার সময়সূচি অনেক আগেই ঘোষণা করা হয়েছে। ভর্তি পরীক্ষা শেষ হবে ২৩ নভেম্বর। নভেম্বরের ৪ তারিখ থেকে আরম্ভ হবে জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট (জেএসসি) এবং জুনিয়র দাখিল সার্টিফিকেট (জেডিসি) পরীক্ষা। এ দুটি পরীক্ষা শেষ হওয়ার কথা রয়েছে ২০ নভেম্বর। এ পরীক্ষায় প্রায় ২০ লাখ পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করার কথা। অন্যদিকে ২০ নভেম্বর থেকে শুরু হবে দেশের সবচেয়ে বড় পাবলিক পরীক্ষা হিসেবে পরিচিত পঞ্চম শ্রেণীর প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী এবং ইবতেদায়ি শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষা। এ পরীক্ষাও চলবে নভেম্বরের ২৮ তারিখ পযন্ত। এতে প্রায় ৩০ লাখ পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করার কথা রয়েছে। ২১ নভেম্বর থেকে দেশের অষ্টম শ্রেণী ছাড়া অন্যান্য শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষা আরম্ভ হওয়ার কথা। এসব পরীক্ষার পরপরই ৭ থেকে ১৮ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রাথমিক স্তরের বার্ষিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হবে নভেম্বর থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে বিভিন্ন কলেজে ১ম বর্ষ অনার্স কোর্সে ভর্তি পরীক্ষাও ওই সময়ে অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। মেডিকেল কলেজ ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় তো প্রায় প্রতি সপ্তাহেই চলে পরীক্ষা। দেশজুড়ে অবস্থিত সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজগুলোয় চলে পুরো বছর ধরে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। এসব কলেজেও নভেম্বর ও ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত হবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নানা রকমের পরীক্ষা ও সমাপনী মূল্যায়ন কার্যক্রম।
আমাদের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন স্তরের পরীক্ষা অনুষ্ঠানের এসব সময়সূচি পর্যালোচনা করে বলা যায়, নভেম্বর ও ডিসেম্বর হল পরীক্ষা অনুষ্ঠানের মাস। স্কুল শিক্ষাবর্ষের সমাপনী মাস হিসেবেও এ দুটি মাস অধিক পরিচিত। কাজেই নভেম্বর ও ডিসেম্বরে যদি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি থাকে এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে যদি অস্থিরতা ও সংঘাত সৃষ্টি হওয়ার আশংকা দেখা দেয়, তাহলে দেশের শিক্ষা কার্যক্রম ও পরীক্ষা উভয়ই চরম বিঘ্নের মুখে পড়বে। বিশৃংখলা দেখা দেবে শিক্ষাক্ষেত্রে। রদবদল করতে হবে বিভিন্ন পরীক্ষার সময়সূচি। সব মিলিয়ে প্রায় ৪ কোটি শিক্ষার্থী সমস্যায় পড়বে। শিক্ষার্থী ও পরীক্ষার্থীদের যে অপূরণীয় ক্ষতি হবে সেটা নির্দ্বিধায় বলা যায়। এসব দিক কি কাউকেই ভাবিয়ে তোলে না?
দেশে যত ধরনের রাজনৈতিক কর্মসূচিই পালিত হোক না কেন, তা যদি শান্তিপূর্ণ হয় তাহলে কারও কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে জনমনে আতংক সৃষ্টি ও শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগের কোনো শেষ থাকে না। আমাদের অভিজ্ঞতা রয়েছে, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নামে যখন নানা ধরনের কর্মসূচি পালন করা হয়, তখন শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় বিঘ্ন ঘটে ব্যাপকভাবে। এমনও দেখা গেছে, স্কুল-কলেজের পাশে স্থাপিত রাজনৈতিক দলের কার্যালয় থেকে মাইক ব্যবহার করে অবিরামভাবে জ্বালাময়ী বক্তৃতা দেয়া হচ্ছে। পড়ালেখার উপযুক্ত সময়, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এর মাত্রা বেড়ে যায়। এমনকি পরীক্ষার সময়েও চলে মাইকের যথেচ্ছ ব্যবহার। আবাসিক এলাকাও বাদ যায় না এ ধরনের শব্দ দূষণের যন্ত্রণা থেকে। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা কিভাবে শ্রেণীকক্ষে কিংবা নিজের ঘরে বসে পড়ালেখায় মনোনিবেশ করবে সেটা ভাবনার বিষয়। নিরুদ্বিগ্ন মনে ও শব্দহীন পরিবেশে তারা পরীক্ষাই বা দেবে কিভাবে সেটাও গুরুত্বের সঙ্গে ভেবে দেখা দরকার। এভাবে তো কোনো সভ্য দেশের শিক্ষাব্যবস্থা পরিচালিত হতে পারে না।
প্রসঙ্গত বলা দরকার, শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি ও প্রচার-প্রচারণার অংশ হিসেবেই যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে মাইকের ব্যবহার করা হয় তা নয়। বরং দেখা যায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে একশ্রেণীর হাতুরে ওষুধ বিক্রেতা নানা রকমের সুর তুলে তাদের ভাষায় সর্বরোগের মহৌষধ(?) বিক্রির ব্যবসা চালিয়ে যায় বাধাহীনভাবে। মাইক বাজিয়ে ফেরি করে এভাবে ওষুধ বিক্রি করা সম্পূর্ণ বেআইনি হওয়া সত্ত্বেও তা অব্যাহত রয়েছে। কেউ কেউ স্কুল-কলেজের প্রধান গেটে দাঁড়িয়ে, কখনও বা মাঠে ঢুকে মাইকে গান প্রচার করে আইসক্রিম বিক্রি করছে। কেউ আবার বিভিন্ন ধরনের খেলনাসামগ্রী বিক্রির জন্য মাইকে শিশুদের ডাকাডাকি করছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে স্থাপিত বাসস্ট্যান্ডে থেমে থাকা বাসের হর্ন কখনও তীব্র আওয়াজ তুলছে, বাসের হেলপাররা যাত্রীদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য উচ্চৈস্বরে হাঁকডাক করছে। কোনো কোনো হেলপার প্রচণ্ডভাবে চিৎকার করে যাত্রীদের ব্যাগ ধরে টানাটানি করছে। প্রতিষ্ঠানের পাশ দিয়ে বিদঘুটে ও কর্কশ শব্দ উৎপাদন করে ট্রাক-বাস চলাচল করছে দ্রুতগতিতে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে ঘটে যাওয়া এসব কর্মকাণ্ড পড়ালেখায় শিক্ষার্থীদের মনোনিবেশে বাধা সৃষ্টি করে। কখনও কখনও মারাত্মক দুর্ঘটনাও ঘটে থাকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে বাস-ট্রাক না থামানো, দ্রুতগতিতে যানবাহন না চালানো ও হর্ন না বাজানোর নিয়ম থাকলেও বেশিরভাগ চালকই তা মানে না। সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে গতি সীমিত, হর্ন বাজানো নিষিদ্ধ ইত্যাদি লেখা সংবলিত সাইনবোর্ড টাঙিয়ে রেখেই দায়িত্ব শেষ করেছে। আজকাল অবশ্য এ ধরনের সাইনবোর্ডও খুব একটা দেখা যায় না। উন্নত দেশে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কথা কল্পনাও করা যায় না। অথচ আমাদের দেশে এসব দিকে কারও কোনো নজর নেই। এমনকি জনগণের শান্তিরক্ষায় নিয়োজিত রাষ্ট্রীয় পুলিশ বাহিনীর সামনেও যখন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশে মাইকের বেআইনি ব্যবহার এবং নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন চলাচল করতে দেখা যায়, তখন আমরা বিস্মিত হই। বেআইনি শব্দ সৃষ্টি ও কোলাহল নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে তেমন কোনো দৃঢ় ভূমিকা নিতে দেখা যায় না সচরাচর। আবার যারা মাইক ব্যবহার করে তাদের ভাবটা যেন এরকম যে, স্বাধীন দেশে যার যা ইচ্ছা তা-ই করা যাবে! তাদের ধারণা, এসব কাজে বাধা দেয়ার সাধ্য কারও নেই! কোনো ভদ্রজন যদি এসব কাজ বন্ধে কিছু বলতে এগিয়ে আসেন, তাহলে তার ওপর চলে সংঘবদ্ধ হামলা।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে কিভাবে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নির্বিঘœ রাখা যাবে? বছরের শেষ সময়ে এসে পরীক্ষা অনুষ্ঠান নির্বিঘœ রাখাই বা যাবে কিভাবে? আমরা শুধু ভাবি, কে আমাদের নিরুদ্বিগ্ন শিক্ষাজীবন উপহার দেবে? জাতীয় উন্নয়নের জন্য এগুলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বলে মনে করি। আমরা জানি না, এসব প্রশ্নের কোনো জবাব পাওয়া যাবে কিনা। তবে ধারণা করি, রাষ্ট্রের নাগরিকদের নিরাপদ জীবনযাপনে এবং শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় বিঘœ ঘটাতে পারে, এমন বিরক্তিকর কর্মকাণ্ড না করার ব্যাপারে দেশের আইনে যতই বিধিনিষেধ থাকুক, এসব নিয়ে পত্রপত্রিকায় যতই লেখালেখি হোক, সচেতন মহল থেকে যতই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করা হোক, তাতে পরিস্থিতির সহসা কোনো উন্নতি হবে বলে মনে হয় না। এটাই আমাদের দুঃখ! কী বিচিত্র এ দেশ! কী বিচিত্র সব কর্মকাণ্ড!
মোঃ মুজিবুর রহমান : সহযোগী অধ্যাপক, সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ

ঐকমত্যের বিকল্প নেই by মোঃ আবু সালেহ সেকেন্দার

নির্বাচনকালীন সরকার কেমন হবে- এ বিষয়ে বিতর্ক বেশ পুরনো। সরকারি দল আদালতের রায়ের অজুহাতে সংবিধান সংশোধন করে এ বিতর্কের সূত্রপাত করে। বিরোধী দলও বর্তমান সরকারের মেয়াদের প্রায় পুরোটা সময় এ ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত থাকে। তবে সরকারবিরোধী আন্দোলন জমিয়ে তোলার জন্য সরকার বহুবার বিরোধী দলের কোর্টে বল পাঠালেও বিরোধী দল কখনও ওই বলে চার-ছক্কা মারা তো দূরের কথা, দু’-এক রান নিতেই হিমশিম খেয়েছে। অথচ বিরোধী দলের হাতে ইস্যুর অভাব ছিল না। পদ্মা সেতু দুর্নীতি, হলমার্কের অর্থ আত্মসাৎ, রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের অর্থ কেলেংকারি, গুম ও হত্যার রাজনীতি, সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক নিরীহ মানুষ হত্যা প্রভৃতি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল। এর যে কোনো একটিই বিরোধী দলের সরকারবিরোধী আন্দোলন বেগবান করার জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু বিরোধী দল এসব জাতীয় ইস্যুকে যথাযথভাবে ব্যবহার করে কোনো জোরালো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। যদিও তারা দু’-একদিন এ বিষয়ে জোরালো প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছে। হরতাল, মানববন্ধন, মিছিল, সভা-সমাবেশ করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত ওই সব রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির আন্দোলনে পরিণত হয়। যদিও ওই আন্দোলনের আওয়াজ এতই ক্ষীণ ছিল যে তা সরকারের কর্ণকুহরে পৌঁছেনি। তাই সরকারের শেষ সময় এসেও বিষয়টির সুরাহা হয়নি।
অতি সম্প্রতি আবারও নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক জমে উঠেছে। তবে এ বিতর্ক বেশ ইতিবাচক। মনে হচ্ছে, সরকারি ও বিরোধী দল উভয়েই সুষ্ঠু সমাধানের পথ খুঁজছে। যদিও এবার এর সূচনা করেছে সরকারি দল। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে প্রদত্ত ভাষণে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা তুলে ধরেছেন। তিনি সংবিধানের দোহাই দিয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি অর্থাৎ সংসদ সদস্যদের নিয়েই নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের কথা বলেছেন এবং এ বিষয়ে বিরোধী দলের পরামর্শ চেয়েছেন। যদিও প্রধানমন্ত্রী তার ভাষণে বলেননি নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান কে হবেন, অথবা তিনি নিজেই নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধান হবেন কি-না। ফলে বিষয়টি এখনও অস্পষ্ট রয়ে গেছে।
অনেকেই বলছেন, প্রধানমন্ত্রী যদিও ইতিপূর্বে বলেছিলেন তিনি একচুলও নড়বেন না, এ ভাষণের মাধ্যমে এখন তিনি বহুচুল নড়েছেন। তবে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, তিনি যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তা সংবিধানের মধ্যে থেকেই। তিনি নির্বাচনকালীন সরকার কী ধরনের হবে সে বিষয়ে কারও কোনো মতামত চাননি। তিনি মতামত চেয়েছেন নির্বাচনকালীন সরকারে কোন কোন সংসদ সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা যায় সে বিষয়ে। অর্থাৎ তিনি এখনও সংবিধান থেকে একচুলও নড়েননি।
প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবের পর বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়াও একটি প্রস্তাব দিয়েছেন। এর সারকথা, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন, তাদের মধ্য থেকে নির্বাচনকালীন সরকার গঠিত হবে এবং সরকারি ও বিরোধী দল থেকেই তাদের নাম প্রস্তাব করা হবে। এ প্রস্তাবও অনেকটা অধুনালুপ্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অনুরূপ। পার্থক্য এখানে এটুকুই যে, ইতিপূর্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টারা অনির্বাচিত ছিলেন; এখন তারা নির্বাচিত হবেন। খালেদা জিয়া তার প্রস্তাবে সংসদ সদস্যদের দ্বারা অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি, স্পিকার অথবা সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্যদের মতো করে এ উপদেষ্টাদের নির্বাচিত করা যেতে পারে বলে অভিমত প্রকাশ করেছেন।
সরকারি ও বিরোধী দলের এই বিপরীতধর্মী প্রস্তাবের মধ্যেও কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ চাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যে ওই আহ্বানে বিরোধীদলীয় নেতা সাড়া দিয়ে নতুন প্রস্তাব রেখেছেন। রাজপথে সংঘাত-সংঘর্ষ নয়, কেবল শান্তিপূর্ণ পথেই সমাধান সম্ভব- তার মধ্যে এমন উপলব্ধি প্রকাশ পেয়েছে। এছাড়া উভয়েই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে তাদের দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। প্রধানমন্ত্রী যেমন নির্বাচনকালীন সর্বদলীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব করেছেন, তেমনি বিরোধীদলীয় নেতাও আগামীতে নির্বাচিত হলে জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠনের কথা বলেছেন। বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি দলের সমালোচনা এবং প্রধানমন্ত্রীর বিরোধী দল সম্পর্কে সমালোচনাও বেশ মজারই বটে। তারা উভয়েই একে অপরকে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের জন্য দায়ী করছেন। এ বিষয়গুলো থেকে স্পষ্ট যে, নির্বাচনকালীন সরকার প্রসঙ্গে উভয়ের মধ্যে যোজন যোজন দূরত্ব পরিলক্ষিত হলেও কয়েকটি বিষয়ে উভয়ের চিন্তা-চেতনা একই ধরনের। এখন পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে যদি নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে উভয়ের চিন্তা-চেতনাকে অন্য চিন্তা-চেতনার মতো একই সূত্রে গাথা যায়, তবে অচিরেই সমস্যার সমাধান হতে পারে। আর এমনটি যদি হয় তা উভয় দল, দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক হবে। অনিশ্চিত গণতন্ত্র নতুন দিশা পাবে। জনমনে স্বতি ফিরে আসবে। উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি হবে।
সরকারি ও বিরোধী দলের গত কয়েক দিনের তৎপরতা থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, তারা উভয়েই নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে সমঝোতায় আগ্রহী। যদিও এখন পর্যন্ত উভয়েই নানাভাবে, ভিন্ন কৌশলে নিজেদের ফর্মুলা বাস্তবায়ন করতে চাইছে। তবে রাজনৈতিক সমঝোতার জন্য যা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তা হল সদিচ্ছা। যদি সদিচ্ছা ও আন্তরিকতা থাকে, তাহলে আলোচনার দরজা উন্মুক্ত হলে সমস্যার সমাধান করা কঠিন হবে না। উভয় দল যদি তাদের মনোভাব নমনীয় করে দেশ ও জনগণের স্বার্থে ছাড় দেয়, তবে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার হবে নাকি সর্বদলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হবে, সে বিষয়টির সমাধান অসম্ভব নয়। শেখ হাসিনা তার ভাষণে যা বলেছেন, তার সারকথাও দেশ ও জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং এ স্বার্থ সংরক্ষণ করতেই তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রূপরেখা প্রণয়ন করেছেন, সংবিধান সংশোধন করেছেন। অন্যদিকে বিরোধী দলের নেতাও তার ভাষণে দেশ ও জনগণের কল্যাণে কাজ করে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। তাই উভয়ে যদি সত্যিকার অর্থে দেশ ও জনগণের কল্যাণের কথা চিন্তা করেন এবং সে অনুযায়ী কাজ করেন, তবে উভয়েই দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের স্বার্থে ছাড় দেবেন, নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে গ্রহণযোগ্য সমাধানে আসবেন বলে আমরা আশা করি।
বর্তমান সংবিধান কোনো ধর্মীয় গ্রন্থ নয় যে, তা পরিবর্তন করা যাবে না। সংবিধানের জন্য দেশ বা জনগণ নয়, দেশ বা জনগণের জন্যই সংবিধান। দেশের মানুষ ও জনগণের জন্য প্রয়োজনবোধে সংবিধান সংশোধন করা যেতে পারে। আর এ জন্য কয়েক মাস, কয়েক বছর বা কয়েক যুগ সময়ের প্রয়োজন নেই। যদি উভয় রাজনৈতিক দল ঐকমত্য পোষণ করে, তবে তা কয়েক সেকেন্ড বা মিনিটে করা সম্ভব। তাই সর্বাগ্রে প্রয়োজন নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যে পৌঁছানো। যদি তারা একমত হতে পারে, তা পর্দার আড়ালেই হোক আর পর্দার বাইরে হোক, সংবিধান তাদের জন্য কখনও অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে না, যেমন দাঁড়ায়নি ১৯৯৬-এ।
আমরা নির্বাচনকালীন সরকার প্রশ্নে সংঘাত-সংঘর্ষের রাজনীতি চাই না। আমরা চাই সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর। রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য সারাবিশ্বে কুখ্যাতি অর্জনকারী পাকিস্তানে যদি সব দলের অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর হতে পারে, তাহলে আমরা কেন পারব না? ৩০ লাখ শহীদের রক্তে রঞ্জিত এ পুণ্যভূমি কারও একগুঁয়েমিতে মিসর, সিরিয়া বা লিবিয়ায় পরিণত হোক, আমরা তা চাই না।
মোঃ আবুসালেহ সেকেন্দার : শিক্ষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় সংসদ অধিবেশন চলতে পারে কি? by ইকতেদার আহমেদ

জাতীয় সংসদ নির্বাচন কখন ও কী পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হবে, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হলে একজন প্রার্থীর কী কী যোগ্যতা থাকতে হবে, নির্বাচন-পরবর্তী সংসদ অধিবেশন কখন বসবে, সংসদের একটি অধিবেশনের সমাপ্তি এবং পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের বিরতির সময়সীমা, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব প্রভৃতি বিষয় সংবিধানে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। সংবিধানের যে কোনো অনুচ্ছেদ বিষয়ে পরিপূর্ণ ধারণা লাভ করতে হলে একাধিক অনুচ্ছেদ অধ্যয়নের আবশ্যকতা রয়েছে। একটি অনুচ্ছেদের খণ্ডিত ও বিচ্ছিন্ন অধ্যয়ন অনুচ্ছেদটির বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা লাভে সহায়ক নয়। একটি অনুচ্ছেদের চেতনা উপলব্ধি করতে হলে এবং অনুচ্ছেদটিতে ভাবার্থগতভাবে কী বোঝানো হয়েছে তা অনুধাবন করতে হলে অবশ্যই পরিপূর্ণ অধ্যয়নের পাশাপাশি কখন এবং কী উদ্দেশ্যে সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান পরিবর্তন করা হয়েছে তা জানা থাকা প্রয়োজন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে পঞ্চদশ সংশোধনী-পরবর্তী প্রবর্তিত বিধানে বলা হয়েছে, সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে- মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে এবং মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধন পূর্ববর্তী দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিষয়ে যে বিধান প্রবর্তন করা হয়েছিল তাতে বলা ছিল- মেয়াদ অবসানের কারণে অথবা মেয়াদ অবসান ব্যতীত অন্য কোনো কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পূর্ববর্তী সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন বিষয়ে ’৭২-এর সংবিধান দ্বারা প্রবর্তিত যে বিধান ছিল তা পঞ্চদশ সংশোধনী দ্বারা প্রবর্তিত বিধানের অনুরূপ।
দেশের প্রথম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত গণপরিষদ ভেঙে দিয়ে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখা হলেও ২য়, ৩য় ও ৪র্থ সংসদ নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রপতি সরকার ব্যবস্থা বহাল ছিল। উপরোক্ত ৪টি সংসদের কোনোটিই মেয়াদ পূর্ণ করতে না পারায় এবং উপরোক্ত সংসদগুলো ভেঙে যাওয়া পরবর্তী রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা বহাল থাকায় মেয়াদ অবসানের আগে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পর নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা নিয়ে কোনো বিতর্ক সৃষ্টির অবকাশ হয়নি। ৫ম সংসদ নির্বাচন তিন দলীয় জোটের রূপরেখায় অস্থায়ী সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ায় এ বিষয়টি উত্থাপনের অবকাশ সৃষ্টি হয়নি। পরবর্তীকালে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলে ৭ম, ৮ম ও ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানকালে নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা বিষয়ে বিতর্কের কোনো অবকাশ ছিল না। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল পরবর্তী মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান প্রবর্তিত হওয়ায় প্রথমবারের মতো আমাদের সাংবিধানিক ইতিহাসে প্রধানমন্ত্রী স্বপদে বহাল থাকাকালীন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের অবকাশ সৃষ্টি হয়েছে।
একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার ক্ষেত্রে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পরবর্তী ৬৬নং অনুচ্ছেদে যে সব যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে তা হল- তাকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে এবং তার বয়স ২৫ বছর পূর্ণ হতে হবে। উপরোক্ত দুটি যোগ্যতার পাশাপাশি একজন ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য হিসেবে থাকার যোগ্য হবেন না যদি- কোনো উপযুক্ত আদালত তাকে অপ্রকৃতিস্থ বলে ঘোষণা করেন; তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর দায় হতে অব্যাহতি লাভ না করে থাকেন; তিনি কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশী রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন; তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন ২ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তার মুক্তি লাভের পর ৫ বছরকাল অতিবাহিত না হয়ে থাকে; তিনি ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ যোগসাজশকারী (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশের অধীন যে কোনো অপরাধের জন্য দণ্ডিত হয়ে থাকেন; আইনের দ্বারা পদধারীকে অযোগ্য ঘোষণা করছে না এমন পদ ব্যতীত তিনি প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকেন অথবা তিনি কোনো আইনের দ্বারা বা অধীন কোনোরূপ নির্বাচনের জন্য অযোগ্য হন।
সংবিধানের বর্তমান বিধান অনুযায়ী একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সংসদের বৈঠক অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংসদের একটি অধিবেশনের সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের বিরতি বিষয়ে পঞ্চদশ সংশোধনী পরবর্তী যে বিধান করা হয়েছে তাতে বলা হয়েছে- ১২৩ অনুচ্ছেদের (৩) দফার (ক) উপ-দফায় উল্লেখিত ৯০ দিন সময় ব্যতীত অন্য সময়ে সংসদের এক অধিবেশনের সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের মধ্যে ৬০ দিনের অতিরিক্ত বিরতি থাকবে না। উল্লেখ্য, অনুচ্ছেদ ১২৩(৩)(ক)তে বলা হয়েছে- মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সংসদের এক অধিবেশনের সমাপ্তি এবং পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের বিরতির ক্ষেত্রে অনুচ্ছেদ ৭২(১)-এর ক্রমবিকাশ পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, এ বিষয়ে ’৭২-এর সংবিধানে বলা ছিল- সংসদের এক অধিবেশনের সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের মধ্যে ৬০ দিনের অতিরিক্ত বিরতি থাকবে না। অতঃপর সংবিধানের ২য় সংশোধনীর মাধ্যমে এ বিরতির সময়সীমা ১২০ দিন পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। এরপর সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে বিরতির বিধানটি রহিত করে বলা হয়, প্রতিবছর সংসদের অন্তত ২টি অধিবেশন হবে। পরবর্তী সময়ে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বিরতি সংক্রান্ত বিষয়ে ’৭২-এর সংবিধানের বিধান পুনঃপ্রবর্তন করে বলা হয়, এক অধিবেশনের সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের মধ্যে ৬০ দিনের অতিরিক্ত বিরতি থাকবে না। সর্বশেষ বিরতি বিষয়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যে বিধান করা হয়েছে তাতে এক অধিবেশনের সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠক পর্যন্ত ৬০ দিনের অতিরিক্ত বিরতি না থাকার বিধান অক্ষুণ্ন রাখা হলেও মেয়াদ অবসানের কারণে সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভেঙে যাওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিন সময়ের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানকালে ৬০ দিনের বিরতি সংক্রান্ত বিধান অকার্যকর করা হয়। সংবিধানের ৭২(১) অনুচ্ছেদে নবসন্নিবেশিত নির্বাচনকালীন ৯০ দিন সময়ের মধ্যে ৬০ দিনের বিরতির সময়সীমা অপ্রযোজ্য হওয়ার বিধান পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয়, নির্বাচনকালীন এ ৯০ দিন সময়সীমার মধ্যে সংসদ অধিবেশন বসবে না- সে বিষয়টিকে বিবেচনায় রেখেই সংশোধনটি আনা হয়েছিল। সংবিধানের ৭২(১) ও ১২৩(৩)(ক) অনুচ্ছেদের সম্মিলিত অধ্যয়নে প্রতীয়মান হয়, অনুচ্ছেদ দুটিতে ভাবার্থগতভাবে (ওসঢ়ষরবফষু) বোঝানো হয়েছে যে, এ সময় সংসদের অধিবেশন বসবে না। উল্লেখ্য, এ বিষয়টির মর্মার্থ অনুধাবন করে যথার্থভাবেই আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে সংসদ সদস্যদের এবং সচিবালয়ে সচিবদের উদ্দেশে বক্তব্য প্রদানের সময় দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেছিলেন- নির্বাচনকালীন ৯০ দিন সময়ের মধ্যে সংসদ বহাল থাকলেও সংসদের অধিবেশন বসবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপরোক্ত বক্তব্য পরবর্তী ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় নেতার নির্বাচনকালীন ৯০ দিন সময়সীমার মধ্যে সংসদের অধিবেশন চালানোর বিষয়ে যে কোনো ধরনের বক্তব্য সংবিধানের এতদসংক্রান্ত বিধানাবলীর চেতনা ও ভাবার্থের পরিপন্থী নয় কি?
সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠান অনুচ্ছেদ নং ১১৯-এর বিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। সাংবিধানিকভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচন কমিশনকে ৯০ দিনের একটি সময়সীমা দেয়া হয়েছে। এ ৯০ দিন সময় গণনার দিন থেকে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালন আবশ্যক হয়ে পড়ে এবং এ ৯০ দিন সময়ের মধ্যে দৈব-দুর্বিপাকের কারণ ব্যতীত নির্বাচন কমিশন নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হলে কমিশন কর্তৃক সংবিধান লংঘনের কারণের উদ্ভব ঘটতে পারে। তাই নির্বাচন কমিশনকে সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি, পরিচালনা ও সম্পন্নের জন্য সংবিধানে বিবৃত ৯০ দিন সময় অবশ্যই প্রদান করতে হবে। এ সময় সংসদ অধিবেশন চালানো প্রচ্ছন্নভাবে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালনের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপ এমন ধারণা পোষণ অমূলক নয়। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তফসিল ঘোষণা পর্যন্ত সংসদ অধিবেশন চলতে পারে মর্মে যে যুক্তি ও ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে, তা অনুচ্ছেদ নং ৭২(১), ১১৯ ও ১২৩ (৩)(ক)-এর চেতনা ও ভাবার্থের আলোকে মনগড়া প্রতীয়মান হয়।
সংবিধানের প্রতিটি সংশোধনীরই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থাকে। নির্বাচনকালীন ৯০ দিন সময়সীমা উপনীত হওয়ার পর সংসদের এক অধিবেশনের সমাপ্তি ও পরবর্তী অধিবেশনের প্রথম বৈঠকের বিরতির নির্ধারিত সর্বোচ্চ ৬০ দিনের সময়সীমার ব্যাঘাতকে অতিক্রম করার জন্যই স্পষ্টত ৭২(১) অনুচ্ছেদে সংশোধনী এনে বলা হয়েছে ১২৩(৩)(ক)-এ উল্লিখিত ৯০ দিন সময়ে ৬০ দিনের বাধ্যবাধকতার কার্যকারিতা থাকবে না। তাছাড়া যেখানে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, নির্বাচনের সময় সংসদ বহাল থাকলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে কোনোভাবেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর জন্য সমসুযোগ সংবলিত মাঠের ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়, সেখানে সংসদ অধিবেশন চালানোর ক্ষেত্রে যে কোনো ধরনের যুক্তি উপস্থাপন নির্বাচন কমিশনের পক্ষে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের অন্তরায়। এ ধরনের অন্তরায় নির্বাচনের নিরপেক্ষতাকে যে প্রশ্নবিদ্ধ করবে সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে হলেও এ ৯০ দিন সময়সীমার মধ্যে সংসদ অধিবেশন না চালানোই যৌক্তিক বলে প্রতীয়মান হয়।
ইকতেদার আহমেদ : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক

বেড়েছে শিশু ভিক্ষাবৃত্তি

ছি ছি এত্তা জঞ্জাল!
দারিদ্র আর পর্যাপ্ত সুযোগের অভাবে রাজধানীতে বেড়েছে শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তি। তবে এ নিয়ে নেই সঠিক পরিসংখ্যান। শিশু ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিয়ে, তাদের সামাজিক পুনর্বাসনের কথা বলেছেন বিশেষজ্ঞরা। কামরুল হাসানের রিপোর্ট। দুপুরের প্রখর রোদে কিংবা বৃষ্টিতেও শিশুদের ভিক্ষা করতে দেখা যায় রাজধানীর বিভিন্ন মোড়ে। কম বয়সী এসব শিশুর সঠিক সংখ্যা নিয়ে কোনো পরিসংখ্যান না থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পয়েন্ট ঘুরে দেখা গেছে তা মোট ভিক্ষুকের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। ইচ্ছা না থাকলেও এদের অনেকেই পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে বাধ্য হয় ভিক্ষাবৃত্তিতে। সাধারণ মানুষের সহানুভূতি পেতে অনেক মা-বাবা শিশুদের নামিয়ে দেন রাস্তায়। অনেকে আবার নিজের সাহায্যের জন্য ব্যবহার করেন শিশুদের। শিশুদের ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধ করতে ইকো কো-অপারেশন নামের একটি সংস্থার সহযোগিতায় কাজ করছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র। এ প্রকল্পের অধীনে ১৭০টি শিশুকে সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল। তিনি জানান, মূল্য লক্ষ্য হচ্ছে এসব শিশুদের শিক্ষার মধ্যে নিয়ে আসা। পরে যাতে তারা দেশের প্রচলিত শিক্ষার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভিক্ষাবৃত্তি থেকে শিশুদের নিরুৎসাহিত করতে সরকারি এবং বেসরকারিভাবে বড় ধরণের প্রকল্প গ্রহন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি তাদের অভিভাবকদের সচেতন করে তোলার উপরও জোর দিয়েছেন তারা।

খালেদা জিয়ার প্রস্তাব কি মাঠে মারা গেল?

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বেশ জমজমাট নাটক চলছে। নাটকের সূত্রপাত কে করেছেন, তা নিয়েও নানা রকমের বিতর্ক আছে। নাটকের মূল বিষয়, কার অধীনে হবে আগামী সংসদ নির্বাচন? এটি নাটকের বিষয় হতে পারে না। কারণ, নির্বাচন কীভাবে হবে, তা সংবিধানে বর্ণিত থাকে। বাংলাদেশেও তা-ই আছে এবং সব সময় ছিল। মাঝখানে ছেদ পড়েছিল ১৯৯১ আর ১৯৯৬ সালে। ১৯৯১ সালে ছেদ পড়াটা অস্বাভাবিক ছিল না। কারণ, তখন বাংলাদেশের রাজনীতির সামরিকতন্ত্র থেকে গণতন্ত্রে উত্তরণ ঘটছিল। উত্তরণের সময় অনেক কিছুই ঘটে, যা অন্য সময় সাধারণত ঘটে না। এই উত্তরণ যাদের ফসল, তারা সবাই বসে ঠিক করল—নির্বাচন হতে হবে সংবিধানের বাইরে গিয়ে, একটি নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। কোথায় পাওয়া যাবে এমন সরকার? বাঙালির একটি ঈর্ষা করার মতো উদ্ভাবনী শক্তি আছে। সবাই মিলে ঠিক করা হলো, দেশের কর্মরত প্রধান বিচারপতি হবেন এই সরকারের প্রধান এবং সবাই মিলে ১০ জন নিষ্পাপ সাদা মনের মানুষ আবিষ্কার করবেন, যাঁরা ৯০ দিনের মধ্যে একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করে যে যাঁর ঘরে ফিরে যাবেন। যেই কথা সেই কাজ।
প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ১০ জন নিষ্পাপ সঙ্গী-সাথিকে নিয়ে বসলেন সরকারের শীর্ষ পদে এবং সময়মতো একটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে বাহবা কুড়িয়ে যে যাঁর ঘরে ফিরে গেলেন। যথারীতি চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। দেশের মানুষকে কিছুটা অবাক করে দিয়ে নির্বাচনে খালেদা জিয়া ও তাঁর দল বিজয়ী হয়ে প্রথমবারের মতো দেশ শাসনের দায়িত্ব পেলেন। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি ছিল, দেশ আবার সাংবিধানিক শাসনে ফিরে যাওয়া, যদিও বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে জোর করে ক্ষমতা দখল করে বিভিন্ন সময়ে সামরিক শাসকেরা মূল সংবিধানটির সুবিধামতো ব্যবচ্ছেদ করে ফেলেছেন। তার পরও দীর্ঘ বিরতির পর দেশে একটি সাংবিধানিক সরকার প্রতিষ্ঠা হলো,  তা-ও বা কম কী। কিন্তু সবকিছু আবার বেহুদা তালগোল পাকিয়ে ফেলল মাগুরা আর ঢাকা-১০-এর উপনির্বাচন। মাগুরার নির্বাচনটি এতই তামাশাপূর্ণ ছিল যে খোদ প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি আবদুর রউফকে রাতের অন্ধকারে মাগুরা সার্কিট হাউস ত্যাগ করতে হয়েছিল। এই দুটি নির্বাচনী তামাশা দেখে সব বিরোধী দল একযোগে দাবি তুলল, এর পরের নির্বাচনগুলো অবশ্যই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে হবে। অবশ্য এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় দাবি ছিল, পর পর তিনটি সংসদ নির্বাচন নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে হবে।
কিন্তু ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পরই সবাই সে বিষয়টি ভুলে যায়। হয়তো সবাই মনে করে নিয়েছিল, এরপর দেশ সাংবিধানিকভাবেই চলবে। ১৯৯৬ সালে দাবিটি পুনর্বার উঠলে খালেদা জিয়া জানান, তিনি তা কিছুতেই মানবেন না। বললেন, শিশু আর পাগল ছাড়া দেশে কোনো নিরপেক্ষ ব্যক্তি নেই। তাঁর ওই বক্তব্য তখন সঠিক না হলেও, ২০১৩ সালে তা এক শ ভাগ সঠিক। সব দলের বর্জনের মধ্যেও খালেদা জিয়া সংবিধানের বাধ্যবাধকতার কথা বলে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একতরফা একটি নির্বাচন করলেন এবং সেই নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর অন্যতম খুনি কর্নেল (অব.) আবদুর রশিদকেও পবিত্র জাতীয় সংসদে সাংসদ হিসেবে প্রবেশের সুযোগ দিলেন। বাইরে তখন দেশ কাঁপানো গণবিক্ষোভ এই একতরফা নির্বাচনের বিরুদ্ধে। এসবের কিছুই হতো না, যদি মাগুরা আর ঢাকা-১০ উপনির্বাচনে জোরজবরদস্তির মাধ্যমে বিএনপির প্রার্থীরা জিততে না চাইতেন এবং নির্বাচন কমিশন নপুংসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ না হতো। নির্বাচন ঠিকই সংবিধান অনুযায়ী চলত। গণবিক্ষোভের মুখে একতরফাভাবে নির্বাচিত সেই সংসদ বাধ্য হলো তাড়াহুড়া করে সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে নির্বাচনকালীন একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করতে। সেই সংসদ ভেঙে দিয়ে তিন মাসের মাথায় দেশে আরেকটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে আওয়ামী লীগ জাসদ ও জাতীয় পার্টির সমর্থনে সরকার গঠন করে এবং পাঁচ বছর মেয়াদ শেষ করে ২০০১ সালে শান্তিপূর্ণভাবে আরেকটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা অর্পণ করে। এই কৃতিত্ব শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের প্রাপ্য।
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোট জয়ী হয়ে তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বিএনপি তাদের আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিয়ে কিছুটা চালবাজির মাধ্যমে উচ্চ আদালতের বিচারপতিদের বয়স বাড়িয়ে তাঁদের পছন্দ অনুযায়ী একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বানানোর পরিকল্পনা করে। হয়তো সেই বিচারপতি একজন ভালো প্রধান উপদেষ্টা হতেন, কিন্তু যে পদ্ধতিতে তাঁকে সেই পদে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তা ছিল অত্যন্ত অস্বচ্ছ এবং সবার কাছে অগ্রহণযোগ্য। তার ওপর তিনি আইনজীবী থাকাকালে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন এবং প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় রাষ্ট্রদূত ছিলেন। সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবার সংঘাত, আবার রক্তক্ষয়, আবার অনিশ্চয়তা। এরপর দেশে এল জরুরি অবস্থা, ক্ষমতা গ্রহণ করলেন খালেদা জিয়ার একদা আস্থাভাজন ফখরুদ্দীন আহমদ আর তাঁর পেছনে আরেক আস্থাভাজন সেনাপ্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ। সংবিধান অনুযায়ী থাকার কথা তিন মাস আর জরুরি অবস্থার মেয়াদ সংবিধান অনুযায়ী শেষ করতে হবে ১২০ দিনের মধ্যে। ফখরুদ্দীন সরকার বলল, কোনো কিছুই এখন প্রাসঙ্গিক নয়। মইনুদ্দিন বললেন, গণতন্ত্রের ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়েছে। তাকে আগে লাইনে তুলতে হবে। আমাদের সুশীল সমাজের কেউ কেউ সুযোগ-সুবিধার জন্য একবার ফখরুদ্দীনের দরবারে ছোটেন, তো আরেকবার মইনুদ্দিনের।
আম পাবলিক বিভ্রান্ত। ক্ষমতার চাবি যে কার হাতে, তা বোঝা মুশকিল। কিন্তু ২০০৭ সালে এক ছাত্র বিস্ফোরণে বোঝা গেল, বাংলাদেশের ক্ষমতার চাবি সব সময় জনগণের হাতে। ক্ষমতা দখলকারীরা বললেন, ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। এল ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর, হলো সাধারণ নির্বাচন। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ক্ষমতার এত অপব্যবহার হয়েছিল যে তা দুঃশাসনের এক নতুন মানদণ্ড তৈরি করেছিল এবং নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪-দলীয় জোট আর জাতীয় পার্টি নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। মহাজোট দেশের দায়িত্ব নেওয়ার পর সর্বোচ্চ আদালত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেন। রায়ে আদালত বলেছেন, গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় একমুহূর্তের জন্যও রাষ্ট্রের শাসন অনির্বাচিত কোনো ব্যক্তির হাতে যেতে দেওয়া যায় না। পরবর্তী দুটি সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। তবে সেখান থেকে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের বাদ দিতে হবে এবং শুধু জনগণের নির্বাচিত সাংসদদের দ্বারা গঠিত হতে পারে নতুবা তা হবে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর পরিপন্থী। এ ব্যাপারে যে সিদ্ধান্তই হোক,
তা সংসদের মাধ্যমেই নিতে হবে। ব্যবস্থাটি পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা মানে আদি সংবিধানের অধীনে ফিরে যাওয়া। খালেদা জিয়া আর তাঁর মিত্ররা বললেন, এসব কোনোটিই মানি না। নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই হতে হবে। তারপর বললেন, শেখ হাসিনার অধীনে কোনো নির্বাচন নয়। কেন নয়, তার ব্যাখ্যা নেই। বর্তমান সরকারের অধীনে প্রায় ৬০০ নির্বাচন হয়েছে। বিএনপি অনেকগুলোতে অংশ নিয়েছে এবং জিতেছেও। তার পরও শেখ হাসিনার প্রতি খালেদা জিয়ার অনাস্থা বোধগম্য নয়। এ বিষয়কে কেন্দ্র করে দেশে চরম অশান্তি। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই মানুষ আতঙ্কগ্রস্ত হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী গত শুক্রবার দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে জানিয়ে দিলেন, তিনি সবাইকে নিয়ে সংসদ নির্বাচন করতে চান এবং নির্বাচনকালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হবে একটি সর্বদলীয় সরকার, যেখানে বিরোধী দলের সদস্যদেরও অন্তর্ভুক্ত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাঁর এই ব্যাখ্যা সব মহলে প্রশংসিত হলো। কিন্তু দুই দিন পর খালেদা জিয়া সাংবাদিকদের ডেকে জানিয়ে দিলেন, প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব তিনি মানেন না। বরং তিনি নতুন ফর্মুলা দিয়ে বললেন, এই সরকার হবে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্য থেকে দুই দলের নির্বাচিত ১০ জন উপদেষ্টা এবং তাঁরা মিলে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একজন সুশীল ব্যক্তিকে প্রধান করবেন। প্রশ্ন থেকে যায়, তা হলে খালেদা জিয়ার নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কী হলো?
এঁদের তো দুটি দল বাছাই করবে। দেশে তো অন্য দলও আছে। তদুপরি সমস্যা দেখা দিয়েছে, ওই সময়ে যাঁরা সরকারের সদস্য ছিলেন, তাঁদের মধ্য থেকে চারজন মৃত্যুবরণ করেছেন। পাঁচজন অসুস্থ। কয়েকজন ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা আর বেলতলায় যাবেন না। কেউ কেউ দেশের বাইরে। বাকি থাকল আমাদের নোবেল লরিয়েট ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তদুপরি এমন একটি সরকার সম্পূর্ণ সংবিধানবিরোধী। খালেদা জিয়া বলেছেন, তাঁদের রাষ্ট্রপতি, স্পিকার বা সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদদের মতো নির্বাচিত করে আনা যেতে পারে। বিষয়টি অত্যন্ত জটিল। এই নির্বাচনগুলোর পদ্ধতি সংবিধানে নির্ধারিত। বিশারদেরা বলছেন, সংবিধান সংশোধন করতে হবে। কীভাবে হবে, তার ব্যাখ্যা এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। ইতিমধ্যে ঢাকার সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকা ২৫ অক্টোবর জনগণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে গা ঢাকা দিয়েছেন। তাহলে সমস্যার সমাধান কোথায়? ইতিমধ্যে দুই দলের সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে চিঠি চালাচালি ও ফোনালাপ শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, তিনি বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে কথা বলবেন। এর চেয়ে ভালো উদ্যোগ কিছু হতে পারে না। বাজারে জোর গুজব, জামায়াত নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য এক পায়ে খাড়া। নানামুখী গুজব আরও আছে। প্রথম আলোর সাংবাদিক মিজানুর রহমান খান আমার অত্যন্ত প্রিয় কলাম লেখক। শেখ হাসিনা মুখ থেকে কথা বের করলেই তিনি দাঁড়ি-কমার ভুল ধরতে বেশ তৎপর থাকেন। অপেক্ষায় আছি, তিনি খালেদা জিয়ার প্রস্তাব সম্পর্কে কী বলেন, তা পড়তে। তবে সব কথার শেষ কথা, দেশের মানুষ হানাহানির বদলে শান্তিতে থাকতে চায়। সবার শুভবুদ্ধির উদয় হোক।
আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

দক্ষতা প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা

মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাতারে অনুষ্ঠিত মানি লন্ডারিং-বিষয়ক এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ (এপিজি) এবং মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসী অর্থায়ন দমনে ইউরেশীয় গ্রুপের (ইএজি) উদ্যোগে অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং-বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ শুরু হবে বিকেলের অধিবেশন থেকে। তাই সকালটা কর্মহীন বলে হোটেল ছেড়ে রাস্তা পেরিয়ে চলে যাই সুখবাতার স্কয়ারে। স্কয়ারটির নামকরণ করা হয়েছে মঙ্গোলীয় পিপলস পার্টির প্রতিষ্ঠাতা এবং মঙ্গোলীয় বিপ্লবের জনক হিসেবে পরিচিত দামদিন সুখবাতারের (১৮৯৩-১৯২৩) নামে। সুখবাতারের একটা অশ্বারোহী মূর্তি উঁচু বেদির ওপর বসানো স্কয়ারের দক্ষিণ পাশে। ঘোড়াটির এক পা মাটি থেকে ওঠানো। বলা হয়, যদি ঘোড়ার এক পা ওঠানো থাকে, তাহলে বুঝতে হবে, ওটায় আসীন যোদ্ধাটি আহত হয়েছিল যুদ্ধে, দুই পা ওঠানো থাকলে তার আরোহী যুদ্ধে নিহত, আর চার পা মাটিতে থাকলে তার আরোহী ছিল যুদ্ধে অক্ষত। তবে মূর্তিটির এক পা ওঠানো হলেও সুখবাতার কোনো যুদ্ধাহত সেনা নন। বিশাল স্কয়ারটির উত্তর পাশে ‘সরকারি প্রাসাদ’ নামে পরিচিত দৃষ্টিনন্দন রোমান স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ভবন, উলসিন ইখ খুরাল বা স্টেট গ্রেট অ্যাসেম্বলি, অর্থাৎ মঙ্গোলিয়ার পার্লামেন্ট ভবন। সামনের সিঁড়ির ঠিক মাঝ বরাবর চেঙ্গিস খানের বিশাল ভাস্কর্যমূর্তি, দুই কোনায় আরও দুটি মূর্তি ওগোদে খান ও কুবলাই খানের। ওগোদে খান হচ্ছেন চেঙ্গিস খানের তৃতীয় পুত্র, আর কুবলাই খান হচ্ছেন নাতি।
বেলা ১১টার উজ্জ্বল রোদের মধ্যে দল বেঁধে হেঁটে বেড়াচ্ছে দলে দলে তরুণ-তরুণীরা, দিনের তাপমাত্রাও ১১ ডিগ্রি। বাতাসে শীত শীত ভাব, রোদ থাকলেও হাওয়ার কারণে সে রোদ যেন শরীর থেকে পিছলে নেমে যাচ্ছে। সুখবাতারের ভাস্কর্যটার উঁচু বেদির চারপাশ দোলনার মতো ঝোলানো মোটা লোহার শিকল দিয়ে ঘেরা। সেই শিকলের ওপর বসে রোদ পোহাতে পোহাতে আড্ডা দিচ্ছে তরুণীরা। বেদির নিচের ধাপের ওপর বসা একদল বুড়োবুড়ি গল্পে মশগুল। চারপাশে বেশ একটা উৎসবের রেশ। ভাস্কর্যটার দক্ষিণ পাশের চত্বরে মেলা বসেছে, কিন্তু কিসের মেলা বোঝার উপায় নেই। কিছুক্ষণ পর পর মাইকে আমাদের দেশের বার্ষিক স্পোর্টসের মতো ঘোষণার সুরে মনে হচ্ছে কোনো একটা প্রতিযোগিতা হয়তো। এক পাশে সারি সারি মঙ্গোলীয় ‘গের’ বসানো। গের হচ্ছে মঙ্গোলিয়ার ঐতিহ্যবাহী তাঁবুর মতো ঘর। চামড়া কিংবা উল দিয়ে তৈরি গোলাকার দেয়ালের ওপর শামিয়ানার মতো মাঝখানে সরু হয়ে ওঠা ছাদ। একটিমাত্র নিচু দরজা, ছাদের মাঝ বরাবর কিছুটা অংশ দিয়ে আলো ঢোকানোর ব্যবস্থা থাকে। কারণ, গোল দেয়ালের কোথাও জানালা নেই। মেলার দিকে এগোতেই এক ঢ্যাঙামতো লোক পাকড়াও করে, আপনি সাংবাদিক, তাই না? আমি জবাব দেওয়ার আগেই লোকটি বলে, আমিও ফ্রিল্যান্সিং করি। নাম-পরিচয়ে জানা গেল লোকটির নাম ‘আমার’, হয়তো বাংলা অমর।
তারপর অবধারিত প্রশ্ন, আপনি কোথা থেকে, ইন্ডিয়া? আমি বলি, জি না, বাংলাদেশ। আমার দেশের নাম শোনার পর অমর আচমকা প্রশ্ন করে, নারী-পুরুষের সমতা কেমন আপনাদের দেশে? দুই হাত উঁচু-নিচু করে অসমতা বুঝিয়ে সে বলে, পাকিস্তানে তো এই রকম, আমি কোরিয়ায় কাজ করেছি, সেখানেও অসমতা অনেক বেশি। আমি বলি, আমার দেশের সঙ্গে পাকিস্তানের তুলনা না করাই ভালো। আপনিও সাংবাদিক, খোঁজখবর করে দেখতে পারেন। অমরের অত কথা শোনার সময় নেই, বলে, চলি ভাই, ওই যে সামনে বিল্ডিংটা দেখা যাচ্ছে, ওটা ব্লুমবার্গের অফিস, ওখানে আমার এক বন্ধু কাজ করে, দেখি আড্ডা দিতে দিতে কোনো খবর বের করা যায় কি না। লোকটি এত দ্রুত নিষ্ক্রান্ত হয় যে মেলাটা কী উপলক্ষে, সেটি আর জেনে নেওয়া হয় না। আমিও মেলার ভিড়ের সঙ্গে মিশে গিয়ে উদ্ধার করার চেষ্টা করি উপলক্ষটা। একে-ওকে জিজ্ঞেস করি, স্পিক ইংলিশ? সবারই একই জবাব, নো। একটা গের-এর দরজায় অভ্যর্থনাকারী দুই সুসজ্জিতা তরুণী দাঁড়িয়ে, জিজ্ঞেস করি, স্পিক ইংলিশ? ওরা আমার কথার জবাব না দিয়ে পরস্পরের দিকে তাকিয়ে ‘অ্যাংলো’ বলে হেসে গড়িয়ে পড়ে। আমি আরও কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করি। একজন ইয়েস বলার পর জিজ্ঞেস করি, এখানে কী হচ্ছে?
লোকটি কিছু না বুঝে লাজুক হেসে শুধু বলে, নো নো। আমারও রোখ চেপে যায়, ঘটনাটা কী বের করতেই হবে। সামনে দেখি ‘টিভি ফাইভ’-এর এক রিপোর্টার বুম হাতে ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছে। ক্যামেরার চোখ উপেক্ষা করে ওর কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করি ইংরেজি জানে কি না। ও ‘ইয়েস, লিটল ইংলিশ’ বললে জানতে চাই কী হচ্ছে এখানে। ও খুব কায়দা করে বলে, অ্যা ফেয়ার। বলি, ফেয়ার তো দেখতেই পাচ্ছি, কিসের ফেয়ার? সে অনেক হাতড়েও আর কোনো ইংরেজি শব্দ খুঁজে পায় না। মেলাটা কিসের তার ইংরেজি জবাব জানতে সে এদিক-ওদিক কাউকে খোঁজে। আমি বলি, ইংরেজি জানে এমন কাউকে খুঁজে বের করো। ছেলেটি ক্যামেরার সামনে থেকে বের হয়ে ইংরেজি জানা কাউকে খুঁজতে গিয়ে ভিড়ের ভেতর বেমালুম গায়েব হয়ে যায়। ক্যামেরার পেছনের মেয়েটি অসহায়ের মতো এদিক-সেদিক তাকায়। বুঝতে পারি, ছেলেটি হয় জুতসই কাউকে খুঁজে বের করতে গেছে, অথবা স্রেফ কেটে পড়েছে আপাতত। টিভি ফাইভের ছেলেটি ভেগে যাওয়ার পর ইংরেজি জানা আর কাউকে খুঁজে না পেয়ে অনির্দিষ্টভাবে ঘুরে একটা ঘেরা জায়গার পাশে গিয়ে দাঁড়াই। ঘেরার ভেতরে কয়েক দলে ভাগ হয়ে কিছু ছেলেমেয়ে মিলে আলাদা দেয়াল গাঁথছিল ইট মসলা দিয়ে।
ঘেরার পাশে দাঁড়িয়ে সাংবাদিক দর্শকদের উদ্দেশে আবারও গলা তুলে জিজ্ঞেস করি, অ্যানিবডি স্পিক ইংলিশ হিয়ার? এবার কাজ হয়, পাশ থেকে এক মঙ্গোলীয় তরুণী এগিয়ে এসে বলে, ইয়েস, আই ক্যান। এখানে মেলাটা কী উপলক্ষে জানতে চাইলে মেয়েটি খোলাসা করে বলে, ২০১৫ সালে ব্রাজিলে অনুষ্ঠিত হবে ‘ওয়ার্ল্ড স্কিলস কম্পিটিশন,’ অর্থাৎ বিশ্ব দক্ষতা প্রতিযোগিতা। সেই প্রতিযোগিতায় মঙ্গোলীয় প্রতিযোগীদের অংশগ্রহণের প্রস্তুতি হিসেবে এখানে চলছে দেশীয় প্রতিযোগিতা। আন্তর্জাতিক এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় দুই বছর পর পর ১৭ থেকে ২২ বছর বয়সী বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষিত এবং শিক্ষার্থী তরুণ-তরুণীদের মধ্যে, যাতে তারা নিজ নিজ পেশাগত দক্ষতা প্রদর্শন করতে পারে। এটির আয়োজক ওয়ার্ল্ড স্কিলস ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি সংস্থা। সংস্থাটির আগের নাম ছিল ইন্টারন্যাশনাল ভোকেশন ট্রেনিং অর্গানাইজেশন। সংস্থাটির বর্তমান সদস্যসংখ্যা ৫০। ১৯৪৬ সালে স্পেনের শ্রমিক সংস্থার তৎকালীন প্রধানের উদ্যোগে স্পেনীয় তরুণদের জন্য পেশাগত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জন এবং প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মেধাবী বৃত্তিজীবীদের খুঁজে বের করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তারই পথ ধরে ওয়ার্ল্ড স্কিলস ইন্টারন্যাশনালের যাত্রা শুরু। সংস্থাটির উদ্দেশ্য সদস্যদেশগুলোর সহযোগিতার মাধ্যমে ব্যক্তিগত ও দেশীয় অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য দক্ষতা এবং উচ্চমানের যোগ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি। সংস্থাটির প্রারম্ভিক উদ্দেশ্য ছিল এসব প্রতিযোগিতার মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণ পেশাজীবীদের মধ্যে অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা বিনিময় করা,
সরকার, শিক্ষা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে উপলব্ধি ঘটানো এবং তরুণ পেশাজীবীদের মধ্যে নিজ নিজ যোগ্যতা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করা। কেবল স্পেনীয় নাগরিকদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে স্পেনের মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত হয়েছিল প্রথম প্রতিযোগিতা। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণের জন্য আন্তর্দেশীয় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। ১৯৫০ সালে স্পেন এবং পর্তুগালের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রথম আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয় মাদ্রিদে। এরপর ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত মাদ্রিদেই অনুষ্ঠিত হয় আরও পাঁচটি প্রতিযোগিতা। ১৯৭০ সাল থেকে সিদ্ধান্ত হয়, প্রতিযোগিতাটি হবে দ্বিবার্ষিক। সে ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের প্রতিযোগিতাটি হয় জার্মানির লাইপজিগে, পরেরটি ব্রাজিলে এবং ২০১৭ সালেরটি হবে আবুধাবিতে। যে মেয়েটি ইংরেজি জানে বলে এগিয়ে এসে প্রতিযোগিতার বিষয়টি খোলাসা করতে পেরেছিল, তার নাম তুমুরবাতার বোলোরমা, মঙ্গোলীয় বিল্ডার্স অ্যাসোসিয়েশনের বৈদেশিক সম্পর্ক বিভাগের প্রধান। বোলোরমার কাছ থেকে বিশ্ব দক্ষতা প্রতিযোগিতা সম্পর্কে এসব অনেক তথ্য জানা গেল। মোট ছয়টি পেশার বিভিন্ন শাখায় দক্ষতার প্রতিযোগিতাটি অনুষ্ঠিত হয়। ইমারত নির্মাণ কৌশলের শাখাগুলোর মধ্যে রয়েছে ইট গাঁথা, কিংবা কাঠের কাজ থেকে শুরু করে উদ্যানতত্ত্ব এবং এয়ারকন্ডিশনিং পর্যন্ত। ক্রিয়েটিভ আর্ট ও ফ্যাশন পেশায় জুয়েলারিও অন্তর্ভুক্ত। তথ্যপ্রযুক্তির মধ্যে রয়েছে মুদ্রণশিল্পসহ সবগুলো বিষয়। উৎপাদন ও প্রকৌশল পেশায় রয়েছে ইলেকট্রনিকস, যন্ত্রকৌশল থেকে ওয়েল্ডিং পর্যন্ত অনেকগুলো শাখা।
সামাজিক ও ব্যক্তিগত পরিষেবায় আছে রন্ধনশিল্প থেকে শুরু করে বিউটি থেরাপি, স্বাস্থ্যসেবা, এমনকি হেয়ার ড্রেসিং পর্যন্ত। পরিবহন এবং লজিস্টিকস বিভাগের মধ্যে গাড়ি রং করা থেকে এয়ারক্রাফট মেরামতি পর্যন্ত সবই আছে। দিনাজপুরে ওয়ার্ল্ড স্কিলস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় একটা স্যানিটেশন প্রকল্প চালু হয়েছে বলে ধারণা করা যায়, সংস্থাটির কাছে বাংলাদেশ কোনো অপরিচিত গন্তব্য নয়। এই সংস্থার সদস্যপদ এবং সহায়তা গ্রহণ করে বাংলাদেশ বৃত্তিমূলক শিক্ষায় আরও বহুদূর এগিয়ে যেতে পারে। আন্তর্জাতিক এই প্রতিযোগিতায়ও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ করা উচিত। কারণ, প্রথমত, বাংলাদেশের জনসংখ্যা এবং কর্মসংস্থানের বাস্তবতায় বৃত্তিমূলক শিক্ষা হতে পারে বেকারত্ব কমানোর এক সফল কৌশল। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্য থেকে বেশি সংখ্যক দক্ষ মানবসম্পদ বের হয়ে আসার সম্ভাবনা মাত্র ২৯ লাখ জনসংখ্যা-অধ্যুষিত মঙ্গোলিয়ার চেয়ে অনেক বেশি। বৈরী পরিবেশ ও প্রতিবেশে বেঁচে থাকার জন্য বাংলাদেশের মানুষের দক্ষতা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতাও অনেকে বেড়েছে। তবে লক্ষ রাখতে হবে, এই প্রতিযোগিতায় যাতে কেবল সত্যিকার যোগ্যরাই অংশগ্রহণ করতে পারে এবং এটি যাতে সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রমোদ ভ্রমণে পর্যবসিত না হয়।
ফারুক মঈনউদ্দীন: ব্যাংকবিষয়ক বিশ্লেষক।
fmainuddin@hotmail.com

আনন্দ কই, বিড়ম্বনাই সার

ঈদ-পূজাপার্বণ শেষ হলো।
মানুষের জীবনে সেই অনাদিকাল থেকেই উৎসব করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। সারা বছর চাষ করে নতুন ধান ঘরে তোলার নবান্নের উৎসবে এখনো গ্রামগঞ্জের মানুষ মেতে ওঠে। উৎসব আসে সাধারণত অনেক কাজের শেষে। মানুষ যখন একটানা কাজ করে ক্লান্ত, তখন চায় একটু বিনোদন, একটু বিশ্রাম। সারা দিন খেতে কাজ করা কৃষকও সন্ধ্যায় দাওয়ায় বসে হুঁকো মুখে খানিক গালগল্পে জিরিয়ে নেন। কবি দার্শনিক মার্ক টোয়েন বলেন, ‘ঘুমানো আর বিশ্রাম নেওয়া ছাড়া আমি অন্য কোনো ব্যায়াম করি না।’ আর নারীরা বলে, ঘুমানো আর বিশ্রাম ছাড়া তাদের অন্য কোনো বিনোদন নেই। উৎসব দেয় আনন্দ, দেয় শক্তি, কাজ করার প্রেরণা, সক্ষমতা, সর্বোপরি পুনরুদ্দীপনা। কিন্তু নারীর সময় কোথায় আনন্দ আর বিশ্রামের? ছোটবেলায় নানি-দাদি-মা-খালাদের দেখেছি, ঈদের দিন খুব ভোরে গোসল সেরে রান্নাঘরে ঢুকতেন। অনেকে মচমচে নতুন শাড়ি কোমরে পেঁচিয়ে এক হাতে ঘোমটা আর এক হাতে সেমাইয়ের হাঁড়ি সামলাতেন। পাশের বাড়ির মাসিমারও ফুরসত ছিল না পূজার দিনগুলোতে। তাঁর পুত্রবধূদের নিয়ে মধ্যরাত অবধি ঠাকুরের প্রসাদ বানাতেন। ‘কাদাখেড়’ বলে পূজার সময় উঠোনে পানি ঢেলে বাড়তি কাদা এনে তার ওপর নাচানাচি করা হতো। সাধারণত পুরুষেরাই নাচত আর একে অন্যকে কাদা মাখাত। ঈদে নারীরা রাত জেগে বিভিন্ন পদের রান্না করে। শুতে শুতে প্রায় ভোর। আবার তাকেই সবার আগে উঠে নামাজে যাওয়ার জন্য পুরুষদের প্রস্তুত করানোর অনুষঙ্গ গুছিয়ে দিতে হয়। কোরবানির পশু কেনা পুরুষদের জন্য বেশ ঝক্কির কাজ বটে। তবে আনন্দও কম নয়।
তারপর কসাই দিয়ে মাংস বানিয়েই মশাইয়ের ছুটি। রান্নাসহ পরবর্তী কষ্টসাধ্য কাজগুলো নারীর ওপর ছেড়ে দিয়ে বাটি ভরে কষা মাংস খাওয়ার জন্য দফায় দফায় তাড়া। নারীর কাজের শেষ নেই। তবু পুরুষেরা বলে, ‘আমার বউ কোনো কাজ করে না’। সেই কৌতুকটা শোনাতে বড় ইচ্ছে হচ্ছে, ‘এক উচ্চপদস্থ চাকুরে। ধরা যাক তার নাম মি. ওয়াই। নয়টা-পাঁচটা চাকরি করে আর বাসায় ফিরে স্ত্রীকে দেখে ঈর্ষান্বিত হয়। কারণ, স্ত্রী কোনো কাজ করে না। কী আরামেই আছে! মি. ওয়াই ঈশ্বরের কাছে কান্নাকাটি করল—‘হে ঈশ্বর, আমি কাজ করতে করতে ক্লান্ত। অন্তত দিন কয়েকের জন্য হলেও আমাকে আমার স্ত্রী করে দাও আর আমার স্ত্রীকে আমি। আমি একটু ঘরে বসে আরাম করতে চাই। আমার স্ত্রীও বুঝুক, আমি কী খাটনিটা করি! তো ঈশ্বরের মায়া হলো। তিনি তা-ই করলেন। মি. ওয়াই সকালে উঠেই দেখতে পেল, বিধাতার বরে সে স্ত্রীতে পরিণত হয়েছে আর তার স্ত্রী হয়েছে তার স্বামী। মহাখুশি মি. ওয়াই বিছানায় শুয়ে শুয়ে চাদরে পা ঘষতে লাগল। ওহ্ কী মুক্তি! সকালে উঠে দাড়ি কামানোর ঝামেলা নেই, গরম চায়ের কাপ মুখে সাততাড়াতাড়ি পেপারে চোখ বোলানো নেই, কেতাদুরস্ত হয়ে অফিসে ছোটা নেই—এই জীবনের কোনো বিকল্প আছে? ভাবতে না-ভাবতেই স্বামীর এক ধমকে গাত্রোত্থান করতে হলো। পাঁচ মিনিটের মধ্যে বাথরুমে গরম পানি সরবরাহসহ নাশতার টেবিল রেডি করার হুকুম হলো। নাশতা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নিখুঁতভাবে পলিশ করে স্বামীর পায়ের কাছে মোজাসহ জুতাজোড়া এগিয়ে দিতে হলো। হট পটে লাঞ্চের জন্য তিন-চার পদের খাবার ভরে দিতে হলো। এরই মধ্যে ছোট ছেলে ঘুমের মধ্যে বিছানা ভিজিয়ে চিলচিৎকারে পাড়া মাথায় করছিল। ওর ন্যাপি বদলাতে গিয়ে চশমা-ঘড়ি হাতের কাছে না পাওয়ায় স্বামীর সে কী আস্ফাালন! স্বামী গজগজ করতে করতে বেরিয়ে গেলে বড় বাচ্চাকে ঘুম থেকে তুলে প্রাতঃক্রিয়াদি সারিয়ে নাশতা গিলিয়ে, টিফিন রেডি করে ঘুমন্ত ছোটটিকে ঘাড়ের ওপর নিয়ে ওকে স্কুলে পৌঁছে দিতে হলো।
স্কুল থেকে ফেরার পথে ছেলে কোলে নিয়েই কাঁচাবাজার সেরে ঘরে ফিরে মুখে চারটে গুঁজে সকালের এঁটো থালাবাসন মাজতে বসল। খাওয়ার পানি ফুটাতে দিয়ে রাজ্যের কাপড় বাথরুমে ডাঁই করে গোসলটা সেরে দুপুরের রান্নার জোগাড় করতে লাগল। ওরই মধ্যে ঘর মোছা, কাপড় কাচার ঠিকে ঝি এসে পড়লে তার কাছে বাচ্চাটাকে রেখে ছুটল বড়টাকে স্কুল থেকে আনার জন্য। স্কুল থেকে এনে তাদের গোসল করিয়ে খাবার টেবিলে বসিয়ে দিয়ে ব্যাংকে দৌড়াতে হলো গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল জমা দিতে, ওই দিনই ছিল জমা দেওয়ার শেষ তারিখ। আসার পথে লন্ড্রি থেকে স্বামীর কাপড় তুলে বিকেলের নাশতার জন্য কনফেকশনারি কিনে বাসায় ফিরল। মিনিট দশেকের মধ্যে স্বামী অফিস থেকে ফিরলে তার ছোটখাটো সেবাসহ চা-নাশতা পরিবেশন করতে হলো। সন্ধ্যায় স্বামী টিভি দেখতে বসলে সে বাচ্চাকে পড়াতে বসাল। খাবার টেবিল লাগিয়ে বাচ্চাদের কাপড় ইস্তিরির জন্য কাপড়ে পানি ছিটিয়ে রেখে দিল। খাওয়ার পর বাসন ধুয়ে কাপড় ইস্তিরি করতে গেলে বাচ্চারা ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার জন্য চিৎকার করতে লাগল। ওদের ঘুম পাড়িয়ে সারা দিনের ক্লান্তির শেষে বিছানায় পিঠ পড়তে না-পড়তেই ঘুমের অতলে তলিয়ে যেতে লাগল স্ত্রীরূপী মি. ওয়াই। ভোর না হতেই ছোট বাচ্চাটির চিৎকারে যখন ঘুম ভাঙল তখন স্ত্রীরূপী মি. ওয়াই ঊর্ধ্বলোকে দুহাত তুলে কান্নায় ভেঙে পড়ল—‘হে ঈশ্বর, খুব শিক্ষা হয়েছে, আমি আমার ইচ্ছে উইড্র করছি। প্রভু, আমাকে আমার আগের রূপে ফিরিয়ে দাও।’ জবাবে ঈশ্বরের দৃঢ় অথচ দয়ার্দ্র কণ্ঠ ভেসে এল—‘বৎস, আমি খুব দুঃখিত। আগামী ১০ মাসের আগে সেটা আমার পক্ষেও সম্ভব নয়। কারণ, তুমি গত রাতে গর্ভধারণ করেছ।’ পাঠক, আর ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে? উৎসব যদি পুনরুদ্দীপনার পূর্বশর্ত হয়, তবে তা কেবল পুরুষ ও শিশু-কিশোরদের জন্য। উৎসব মানে নারীর আরও কাজ, আরও শ্রম, আরও উদ্বেগ। উৎসব নারীকে আরও ক্লান্ত করে। যাঁরা বাইরে কাজ করেন না, সেসব নারীরও অবসর নেই আর যাঁরা করেন, তাঁদের তো শ্যাম-কুল দুটোই সামলে চলতে হয়। এ দেশে ঘরে-বাইরে সমান তালে কাজ করা নারীর অবসরই জোটে না, তার ওপরে পুনরুদ্দীপিত হওয়ার ঈদ-পার্বণ তো মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।
উম্মে মুসলিমা: কথাসাহিত্যিক।

হঠাৎ থেমে গেলেন ওবামা...

রোজ গার্ডেনে এক অন্তঃসত্ত্বা মহিলার জীবন বাঁচালেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। হলভর্তি গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের সামনে হঠাৎ ভাষণ থামিয়ে ওবামা ওই মহিলার সাহায্যে এগিয়ে যান। স্বাস্থ্যবীমার ওপর ওবামার জরুরি ভাষণ হঠাৎ থেমে যাওয়ায় চারদিকে শোরগোল পড়ে যায়। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পেছনে দাঁড়িয়ে অন্যদের মতোই অ্যালিসন নামের ওই মহিলা তার বক্তব্য শুনছিলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন অন্তঃসত্ত্বা। ওবামার ভাষণ চলাকালে হঠাৎ অচেতন হয়ে লুটিয়ে পড়ছিলেন অ্যালিসন।
কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে বারাক ওবামার দৃষ্টি চলে যায় অ্যালিসনের দিকে। ওবামা কারও দিকে না তাকিয়ে ভাষণ থামিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে অ্যালিসনের দিকে হাত বাড়িয়ে দেন এবং তাকে ধরে ফেলেন। আকস্মিকভাবে ওবামার ভাষণ স্থগিত করার কারণ না জানতে পারলেও কিছুক্ষণ পরই উপস্থিত লোকজন বুঝতে পারেন, একজন অন্তঃসত্ত্বাকে দুর্ঘটনা থেকে বাঁচাতেই ছুটে যান বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাংবাদিক ও অতিথিরা মনে করেন, প্রেসিডেন্ট ওবামার কারণেই কোনো ধরনের দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যান ওই অন্তঃসত্ত্বা নারী। ঘটনার পর এক বিবৃতিতে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, অ্যালিসন ডায়বেটিসে (১) আক্রান্ত। তাকে ধরতে গিয়েই তাৎক্ষণিকভাবে ভাষণ স্থগিত করতে হয়েছে প্রেসিডেন্টকে। ওয়াশিংটন পোস্ট, সিএনএন।

ওসামার জন্য ভালোবাসা

সম্প্রতি নাইরোবির ওয়েস্টগেট শপিংমল হামলায় নেতৃত্বদানকারী ব্রিটেনের নারী সন্ত্রাসী সামান্থা লিওথওয়েইট নিহত তালেবান নেতা ওসামা বিন লাদেনকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন। মঙ্গলবার দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকায় এ খবর প্রকশিত হয়েছে। পশ্চিমা সংবাদ মাধ্যমে ‘হোয়াইট উইডো’ (সাদা বিধবা) হিসেবে পরিচিত সামান্থা দীর্ঘ ৩৪ লাইনে লেখা কবিতায় লাদেনকে বাবা আর ভাই বলে সম্বোধন করেন। সামান্থা ২০১১ সালে ডিসেম্বর মাসে কেনিয়ার মোম্বাসা শহরে কম্পিউটারে ওই কবিতাটি লেখেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। টেলিগ্রাফ বলছে, তখন পুলিশের ধাওয়ার মুখে পালিয়ে যাওয়ার কারণে তিনি কবিতাটি মুছে ফেলার সময় পাননি। সম্প্রতি গোয়েন্দা পুলিশ এক কম্পিউটার থেকে সামান্থার ওপর যেসব ফাইল উদ্ধার করে সেগুলোর মধ্যে তার লেখা এ কবিতাটিও ছিল।
স্কাই নিউজের বরাত দিয়ে টেলিগ্রাফ জানায়, তার ল্যাপটপ আর ফ্লাস ড্রাইভ ঘেঁটে তদন্ত কর্মকর্তারা সবমিলিয়ে ২ হাজার ফাইল খুঁজে পান। ‘ওসামার জন্য ভালোবাসা’ (ওড টু ওসামা) শিরোনামের কবিতায় সামান্থা লেখেন, ‘ও শেখ ওসামা, আমার বাবা, আমার ভাই, তুমিই আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ। ও শেখ ওসামা, তুমি তো এ পৃথিবী ছেড়ে বিদায় নিয়েছ। কিন্তু মুসলমান জাতির একদিন ঘুম ভাঙবে, তারা আবার শক্তিশালী হবে।’ কবিতায় বিধর্মীদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে সামান্থা বলেন, ‘তুমি যে কাজ শুরু করেছিলে আমরা তা সম্পূর্ণ করব।