Sunday, March 8, 2015

কারাগারগুলোতে মানবিক বিপর্যয়- রাস না টানলে ভয়ঙ্কর পরিণতি

সারা দেশে বিরোধী জোটের সাথে সংশ্লিষ্টদের অব্যাহত গ্রেফতারে দেশের কারাগারগুলোতে মানবিক বিপর্যয় দেখা দিতে শুরু করেছে। দেশের প্রায় সব জেলেই রাজনৈতিক বন্দীতে এমনভাবে ভরে ফেলা হয়েছে যে, সেখানে ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক গুণ বেশি বন্দী ঠেসে রাখা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে দেশের চোর-ডাকাত ও দাগি আসামিদের ছেড়ে দিয়ে সেখানে রাজনৈতিক দলের কর্মীদের দিয়ে তা পূরণ করা হচ্ছে। প্রতিদিনই নতুন নতুন বন্দী যোগ করা হচ্ছে। যাকে তাকে ধরে গাড়ি ভাঙচুরের মামলায় নাম ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। আর ঠুনকো অভিযোগ এনে আটক ব্যক্তিদেরও জামিন দেয়া হচ্ছে না আদালত থেকে। অনেক জেলে পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, বন্দীরা রাতে বা দিনে ঘুমোনোর কোনো জায়গাও পাচ্ছেন না। বাথরুমে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন না এক সেলে বহু গুণ বেশি বন্দী রাখার কারণে। অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন দুঃসহ পরিস্থিতির কারণে। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবর ও ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্য থেকে এমন বিপর্যয়কর চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।
বন্দীদের প্রতি কী ধরনের আচরণ করতে হবে, তাদের কী কী ধরনের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে তা নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক আইনে। কিন্তু অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবিতে নতুন করে আন্দোলনের কর্মসূচি শুরু হওয়ার পর সরকার এর কোনো ধার ধারছে না। কোনো কোনো দিন হাজার হাজার লোককে শুধু বিরোধী রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকার জন্য রাষ্ট্রদ্রোহিতা, গাড়ি ভাঙচুরসহ নানা ধরনের মামলায় যুক্ত করে গ্রেফতার করা হচ্ছে। এসব গ্রেফতারের ক্ষেত্রে কেউ কোনো ঘটনার সাথে আদৌ জড়িত কি না তা দেখার প্রয়োজন অনুভব করছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। সরকারি দলের কাছ থেকে বিরোধী জোটের সাথে যুক্তদের নাম নিয়ে রাত-বিরাতে অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হচ্ছে তাদের। এ ধরনের অভিযানের মুুখে দেশের অনেক জেলায় লাখ লাখ মানুষ বাসাবাড়িতে যেতে বা ঘুমোতে পারছেন না। ব্যবসায়-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি করতে না পেরে মানবেতর জীবন যাপন করছেন অনেকে। সরকারের এই দমন-পীড়ন লাইসেন্সের সুযোগ নিচ্ছে এক শ্রেণীর অসাধু পুলিশ। এরা ইচ্ছামতো যখন তখন যাকে তাকে আটক করে গ্রেফতারবাণিজ্য চালাচ্ছে। যাদের কাছ থেকে টাকা পাচ্ছে তাদের ছেড়ে দিচ্ছে। যারা টাকা দিতে পারছে না তাদের চালান দিচ্ছে জেলে। এতে দেশে কত পরিবার যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগের মুখে পড়েছে তার কোনো হিসাব নেই। অন্য দিকে যারা গ্রেফতার হয়ে থানা হাজতে থাকছেন বা জেলে যাচ্ছেন তাদের দুর্দশারও কোনো সীমা থাকছে না। দেশের কোনো আইনেই এ অবস্থা সৃষ্টির সুযোগ সরকারকে দেয়া হয়নি।
আমরা মনে করি, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের স্বার্থে বাংলাদেশের কারাগারগুলোর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা উচিত। প্রয়োজনে এ জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসঙ্ঘ প্রতিনিধিদের পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেয়া যেতে পারে। সরকার যদি অব্যাহতভাবে রাজনৈতিক কারণে কারাগারের ভেতরের অসহায় মানুষের ওপর মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করে রাখে, তাহলে আন্তর্জাতিক তদন্ত অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এর প্রতিকারের ব্যবস্থা নেয়ার বিকল্প নেই। শাসকদেরও মনে রাখা উচিত, আজ বিরোধী রাজনীতিকদের যে পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দেয়া হচ্ছে সেই একই ধরনের অবস্থায় তাদেরও পড়তে হতে পারে। আইনের সব বিধান পালন ও মানবাধিকার বজায় রাখা এ ক্ষেত্রে সবার জন্য সুরক্ষা হিসেবে কাজ করতে পারে।

নারীদের গতিরোধ করছে মৌলবাদীরা: সুলতানা কামাল

আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে এক সমাবেশে বক্তব্য রাখছেন আইন ও
সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল। ছবিটি রোববার বিকেলে
রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তন থেকে তোলা। ছবি: প্রথম আলো
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক সুলতানা কামাল বলেছেন, দেশের সব পর্যায়ে অবদান রাখছেন নারীরা। কিন্তু ধর্মের নামে নারীদের গতিরোধ করছে ধর্মান্ধ জঙ্গি ও মৌলবাদীরা। তাদের প্রতিরোধে তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
আজ রোববার বিকেলে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন। সামাজিক প্রতিরোধ কমিটি ‘সহিংসতামুক্ত মানবিক রাজনীতি চাই, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণীর সকল পর্যায়ে নারী-পুরুষের সম-অংশীদারত্ব চাই’ শীর্ষক এ সমাবেশের আয়োজন করে। সুলতানা কামাল বলেন, দেশের বর্তমান অবস্থা প্রায় মুক্তিযুদ্ধের মতো হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা দেশের বিরোধিতা করেছিল, এখনও তারা সক্রিয় রয়েছে। তাই তাদের বিরুদ্ধে সবাইকে সচেতন হতে হবে। তিনি আরও বলেন, দেশে গণতন্ত্রের চর্চা নেই। তাই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি নারী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। তা হলেই সমাজের উন্নয়নে পরিবর্তন আসবে।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব তারিক-উল-ইসলাম বলেন, রাজনৈতিক সহিংসতায় দেশের নারী ও শিশুরা অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। পেট্রলবোমা থেকে রেহাই পাচ্ছেন না গর্ভবতী নারীরা। তাই এমন সহিংস রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে।
সমাবেশে অবিলম্বে রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে নারী, শিশুসহ মানুষ হত্যা বন্ধ, বর্তমান সংকট উত্তরণে সরকার এবং অন্যান্য গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে দেশে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানানো হয়।
সুলতানা কামালের সভাপত্বিতে সমাবেশে নারী মুক্তি সংসদের সভাপতি হাজেরা সুলতানা, ব্র্যাকের জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভারসিটি পরিচালক শীপা হাফিজা, কর্মজীবী নারীর নির্বাহী সদস্য উম্মে হাসান প্রমুখ বক্তব্য দেন।

সবকিছু খালেদা জিয়া করতে পারলে সরকার আছে কেন : কাদের সিদ্দিকী

কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম বলেছেন, পেট্রলবোমা যেই মারুক, তা প্রতিরোধ করার দায়িত্ব সরকারের। সবকিছু যদি খালেদা জিয়াই করতে পারে তাহলে সরকার আছে কেন? আর্মি, পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব সব আপনাদের হাতে। তাই মানুষকে যদি নিরাপত্তা দিতে না পারেন তাহলে ক্ষমতা ছেড়ে দিন। শান্তির দাবিতে অবস্থান কর্মসূচির ৪০ দিন পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে তিনি একথা বলেন। মতিঝিলের দলীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত এই মতবিনিময় সভায় দলের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান বীর প্রতীক, বঙ্গবীরের সহধর্মিনী নাসরিন সিদ্দিকী, যুগ্ম-সম্পাদক ইকবাল সিদ্দিকী, সাংগঠনিক সম্পাদক শফিকুল ইসলাম দেলোয়ার, আইন সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাহবুব হাসান রানাসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার প্রতিনিধিরা বক্তৃতা করেন।
কাদের সিদিকী বলেন, আমাকে নত করতে পারবেন না। ৪০ দিন ধরে রাস্তায় আছি। প্রয়োজনে আরো ৪০ দিন থাকবো। নয় মাস যুদ্ধশেষে পরাজিত পাকিস্তানীদের সাথেও যদি আমরা আলোচনা করে থাকতে পারি , তাহলে আপনি কেন আলোচনা করতে পারবেন না?
প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের খবর আপনি জানেন না বলেই আপনি আমাকে চেনেন না, আপনার পিতা বঙ্গবন্ধু আমাকে চিনতেন। বঙ্গবন্ধুর পদতলে এক লাখ চার হাজার অস্ত্র দিয়েছিলাম, যে অস্ত্র টাঙ্গাইল থেকে ঢাকা আনতে তিন মাস সময় লেগেছিলো। তাই আমাকে ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ নেই। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে, আপনার পিতার হত্যার প্রতিবাদকারী হিসেবে আবারও অনুরোধ করছি আলোচনা করুন। শান্তির জন্য আলোচনায় কোনো পরাজয় নেই। দলমত নির্বিশেষে সারাদেশে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করার আহবান জানিয়ে তিনি বলেন, যতদিন দেশে শান্তি না আসবে ততদিন আমাদের সংগ্রাম চলবে।
ভারত সরকারের উদ্দেশে কাদের সিদ্দিকী বলেন, একতরফা নির্বাচনে সায় দিয়ে আপনারা বাংলাদেশে যে সরকার বসিয়েছেন সে সরকারকে এখনও সমর্থন করলে ভারত বাংলাদেশের মানুষের হৃদয় থেকে মুছে যাবে। শুধু নরেন্দ্র মোদী নয়, দেশে শান্তি ফিরে না আসা পর্যন্ত বর্তমান জননিন্দিত সরকারের আমন্ত্রণে বিশ্বের কোনো নেতারই এই দেশে আসা ঠিক হবে না।

এফবিআই যেন স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পায়, আলোচনা না করেই চলে গেলেন এফবিআই সদস্যরা

ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায় হত্যার তদন্তে এফবিআইকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে আহ্বান জানিয়েছেন তার পিতা অজয় রায়। তিনি বলেছেন, আমি চাই এ হত্যা রহস্য উদঘাটনে এফবিআই যেন স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পায়। গতকাল নিজ বাসায় তিনি সাংবাদিকদের একথা বলেন। ওদিকে, অভিজিৎ রায়ের হত্যার ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও কিলারদের কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি গোয়েন্দা পুলিশ। উগ্রপন্থি একাধিক জঙ্গি সংগঠনকে সন্দেহে রেখে তদন্ত কাজ করলেও তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এখনও নিশ্চিত হতে পারেননি ঠিক কারা ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। তবে ফেসবুকে যেসব নামে উগ্রপন্থি দলের সদস্যরা অভিজিৎকে আগে থেকেই হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল তাদের একটি তালিকা করেছে গোয়েন্দারা। প্রযুক্তির সহায়তায় এসব হুমকিদাতার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ প্রযুক্তিগত সহায়তা নেয়া হচ্ছে বাংলাদেশে আসা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন-এফবিআইয়ের কাছ থেকে। গতকাল এফবিআই সদস্যরা অভিজিতের পিতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক অজয় রায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেছেন, অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ডিবি তদন্ত করছে। অভিজিতের দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকায় ও ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্তে সহায়তা করছে এফবিআই। ডিএমপি কমিশনার বলেন, আমাদের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এফবিআই আমাদের প্রযুক্তিগত সহায়তা করছে। বিশেষ করে সোশাল মিডিয়া অভিজিৎকে বিভিন্ন সময়ে হত্যার হুমকি দেয়া তথ্যের রেকর্ডও শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত জোরেশোরে চলছে। ডিবির তদন্তের অগ্রগতি সন্তোষজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মামলার তদন্ত সূত্র জানায়, অভিজিৎ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে উগ্রপন্থি একাধিক দলকে সন্দেহে রেখে অনুসন্ধান চলছে। বিশেষ করে আনসারুল্লাহ বাংলা টিমকেই সন্দেহের তালিকায় প্রথমে রাখা হয়েছে। আনসারুল্লাহ প্রধান জসিমউদ্দিন রাহমানী জেলে যাওয়ার পর সংগঠনটি পরিচালনা করে আসছিল ইজাজ ও রানা নামে দুই যুবক। তাদের অবস্থান শনাক্তে ও গ্রেপ্তারে জোর তৎপরতা চলছে। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, প্রযুক্তিগত বিষয় খতিয়ে তারা জানতে পেরেছে অভিজিৎকে বিভিন্ন সময়ে হত্যার হুমকি দেয়া লোকজনের অনেকেই বিদেশে অবস্থান করছেন। এছাড়া বাংলাদেশেও অবস্থানকারী অনেকে অভিজিৎকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এসব হুমকিদাতার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে তাদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। সূত্র জানায়, এরই মধ্যে অভিজিৎকে হত্যার হুমকি দেয়া আলোচিত তরুণ ফারাবীকে গ্রেপ্তারের পর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তবে তার কাছ থেকে হুমকির বাইরে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে তদন্তসংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানায়, তারা বইমেলা থেকে যে ভিডিও ফুটেজ উদ্ধার করেছেন তাতে অভিজিতের অবস্থানই এখনও শনাক্ত করতে পারেননি। হাজার হাজার মানুষের মধ্যে অভিজিৎকে আসলে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে প্রযুক্তির সহায়তায় অভিজিতের অন্য ছবির মাধ্যমে ভিডিও ফুটেজ থেকে অভিজিৎকে শনাক্তের চেষ্টা করছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। একাজে উন্নত প্রযুক্তির সহায়তা করছে এফবিআই সদস্যরা। বইমেলার ফুটেজে অভিজিৎকে পাওয়া গেলে তার সঙ্গে অনুসরণকারী সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করার সম্ভব হবে বলে জানিয়েছে তদন্তসংশ্লিষ্টরা। মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (এসি) হাসান আরাফাত জানান, অনেক বিষয় বিচার-বিশ্লেষণ করে তদন্ত চলছে। তদন্তে সবকিছুই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এদিকে গতকাল অভিজিৎ হত্যার তদন্তে সহযোগিতার জন্য আসা এফবিআই প্রতিনিধি দল অভিজিতের পিতা অজয় রায়ের সঙ্গে কথা বলেছেন। গতকাল সকাল সাড়ে ১১টার দিকে মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে যান। এ সময় তদন্ত সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও এফবিআই সদস্যরা অজয় রায়ের কাছ থেকে অভিজিৎ সম্পর্কে কিছু তথ্য জানতে চান। অজয় রায় তাদের অভিজিতের জীবনযাপন ও হুমকি-ধমকির বিস্তারিত তথ্য তাদের কাছে তুলে ধরেন। দুপুরে বাসায় ফিরে অজয় রায় সাংবাদিকদের বলেন, মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে আমাকে যেতে বলেছিল। তারা আমার সঙ্গে কথা বলেছে। আমি তাদের অনুরোধ করেছি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যেন অপরাধীদের খুঁজে বের করা হয়। তিনি জানান, জঙ্গি ও মৌলবাদীরা অভিজিৎকে হত্যা করেছে বলে তাদের ধারণা। ৩-৪ বছর পর অভিজিৎ দেশে এসেছিল। কারও হুমকির কারণে সে ভীত বা আতঙ্কিত ছিল না। বরং পরিবারের সদস্যরাই তাকে সতর্ক হয়ে চলাফেরা করতে পরামর্শ দিয়েছিলেন। অজয় রায় বলেন, আমার ধারণা ছিল, কেউ তাকে মারধর বা ধমক দিতে পারে। কিন্তু একেবারে মেরে ফেলবে এটা ভাবিনি। তিনি হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার জন্য আসা এফবিআই প্রতিনিধি দলকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে সুযোগ দেয়ার অনুরোধ জানান।
আলোচনা না করেই চলে গেলেন এফবিআই সদস্যরা
ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ হত্যার তদন্ত নিয়ে আলোচনা না করেই মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ কার্যালয় থেকে ফিরে গেলেন এফবিআই প্রতিনিধিদলের সদস্যরা। রোববার বেলা ১১টা ৩৮ মিনিটে এফবিআই প্রতিনিধিদলের চার সদস্য গোয়েন্দা কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। ১৪ মিনিট অবস্থানের পর ১১টা ৫২ মিনিটে বেরিয়ে যান তারা। আজ অভিজিৎ হত্যাকান্ড নিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম-কমিশনার মনিরুল ইসলাম, মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের দক্ষিণের ডিসি কৃষ্ণপদ রায়সহ ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে তাদের বৈঠক করার কথা ছিল। কিন্তু আলোচনা না করেই তারা কেন বেরিয়ে গেলেন তা জানা যায়নি।

সংলাপ নয়, শক্তিতেই সমাধান খুঁজছে সরকার by জাহাঙ্গীর আলম

চলমান পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটাতে সংলাপ-সমঝোতার বিষয়ে দেশি-বিদেশি কোনো আহ্বানই বিবেচনায় নিতে রাজি নয় সরকার। এখনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে শক্তি প্রয়োগেই সমাধান খুঁজছে সরকার।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে এসব কথা জানা গেছে। তাঁরা জানান, ঢাকায় কর্মরত ১৬ বিদেশি কূটনীতিকের সাম্প্রতিক তৎপরতা এবং তারও আগে জাতিসংঘের মহাসচিবের চিঠি—এসবকে সরকার ‘চাপ’ মনে করছে না। তাঁদের কোনো সহযোগিতাও নিতে রাজি নয়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম গতকাল শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা আমাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। আমরা কারও দূতিয়ালি চাই না। কারও সহযোগিতাও প্রত্যাশা করি না। সরকারই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করবে। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।’ তিনি বলেন, ‘কূটনীতিকেরা যদি নতুন কোনো বিষয় নিয়ে কথা বলতে চান, তা হলে কথা বলব। তবে এটাকে সংলাপ বা সমঝোতার উদ্যোগ বলে মনে করার কোনো কারণ নেই।’
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারকেরা মনে করছেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোটের টানা অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচি এখন আর জনজীবনে কোনো প্রভাব ফেলছে না। আর কিছুদিন এভাবে চললে তা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়বে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে সরকারের উচ্চপর্যায়ে জানানো হয়েছে যে, অচিরেই চোরাগোপ্তা হামলা এবং যানবাহনে পেট্রলবোমা ও অগ্নিসংযোগ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসতে তারা সক্ষম হবে। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনে আরও কঠোর পন্থা অবলম্বন করবে।
তবে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে খুব শিগগির গ্রেপ্তারের সম্ভাবনা নেই। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে আদালতের জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা গত ১১ দিনেও সংশ্লিষ্ট থানায় পৌঁছায়নি বলে মনে করা হচ্ছে। এ বিষয়ে পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানিয়েছে। যদিও স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান গতকাল শনিবার এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা আইনের প্রক্রিয়ায় এগোচ্ছে। প্রক্রিয়া শেষে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থানায় যাবে।
এরই মধ্যে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটাও বিরোধীদের আন্দোলন অকার্যকর করার আরেক কৌশল বলে আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো বলছে। নির্বাচনী ডামাডোলে সরকারবিরোধী আন্দোলন আরও স্তিমিত হয়ে পড়বে বলে তাদের ধারণা।
বিদেশি কূটনীতিকদের সাম্প্রতিক তৎপরতা সম্পর্কে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা বলেন, ১ মার্চ পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ আলীর সঙ্গে ১৬ কূটনীতিকের আলোচনার পর তাঁদের পক্ষ থেকে সরকারের সঙ্গে গতকাল পর্যন্ত আর যোগাযোগ করা হয়নি।
এর আগে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি যৌথভাবে ১৬ কূটনীতিক বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ করে দিতে অনুরোধ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে চিঠি দেন। এ বিষয়ে এই উপদেষ্টা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে তাঁদের সাক্ষাৎ দেওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে কূটনীতিকেরা আলোচনা করতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী কথা বলবেন। তাঁকেই এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এখন দেশের বাইরে আছেন। তিনি দু-এক দিনের মধ্যে দেশে ফিরবেন।
সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সংকট উত্তরণে জাতিসংঘের মহাসচিব এবং ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত প্রয়োজনে সহযোগিতা দেওয়ার কথা বললেও সরকার তাঁদের সহযোগিতা চাইবে না। জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকোকে দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার দায়িত্ব দিয়েছিলেন মহাসচিব। তবে তারানকোর বাংলাদেশে আসা অনেকটাই অনিশ্চিত। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারানকোকে মধ্যস্থতার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে না।

‘মঙ্গল গ্রহে পৃথিবীর সুমেরু মহাসাগরের চেয়ে বড় মহাসাগর ছিল’

সুদূর অতীতে ধূলায় ধূসরিত ও রক্তিম গ্রহ মঙ্গলে পৃথিবীর সুমেরু মহাসাগরের চেয়ে বড় মহাসাগর ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার একটি গবেষণাপত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে বার্তা সংস্থা সিনহুয়া বলেছে, সম্ভবত, প্রায় ৪৩০ কোটি বছর আগে মঙ্গলে এতো বিপুল পরিমাণ জলরাশি ছিল যে, তা গ্রহটির সম্পূর্ণ পৃষ্ঠদেশকে ৪৫০ ফুট বা ১৩৭ মিটার গভীর তরলের স্তরে নিমজ্জিত করতে পারতো। নাসার বিবরণে বলা হয়, খুব সম্ভবত, মঙ্গল গ্রহের উত্তর গোলার্ধের প্রায় অর্ধাংশ জুড়ে একটি মহাসাগর সৃষ্টি করেছিল বিপুল এ জলরাশি। এতে আরও বলা হয়, মহাসাগরটির কোন কোন অংশে গভীরতা হয়তো ১ মাইল বা ১ দশমিক ৬ কিলোমিটারের চেয়েও বেশি ছিল। ধারণা অনুযায়ী, সব মিলিয়ে মঙ্গল গ্রহের এ মহাসাগরে ২ কোটি ঘন কিলোমিটার পানি ধারণক্ষমতা ছিল। কিন্তু, এর পর থেকে মহাকাশেই মিলিয়ে গেছে ৮৭ শতাংশ পানি। নতুন এ গবেষণাপত্রটি ছাপা হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘সায়েন্স’ সাময়িকীতে। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা আইএএনএস। দীর্ঘ ৬ বছর নানা পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের পর মঙ্গল গ্রহে সুদূর অতীতে মহাসাগর থাকার দাবি করছেন বিজ্ঞানীরা। মঙ্গল গ্রহের বায়ুম-ল থেকে প্রাপ্ত খানিকটা ভিন্নধর্মী ২ ধরনের পানির অস্তিত্ব নিয়ে গবেষণা করেন নাসার বিজ্ঞানীরা। শক্তিশালী টেলিস্কোপের সাহায্যে তারা ভিন্নধর্মী পানির নমুনা দুটি বিশ্লেষণ করেন। ভারি পানিতে থাকা হাইড্রোডেজেনের স্থায়ী আইসোটোপ ডিউটেরিয়ামের অনুপাতের সঙ্গে সাধারণভাবে প্রকৃতিতে প্রাপ্ত পানির অনুপাতের তুলনামূলক পর্যালোচনা করেন তারা। নানা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিশ্লেষণের পর বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, এ পর্যন্ত মঙ্গল গ্রহ থেকে সাড়ে ৬ গুণ পরিমাণ পানি মহাকাশে মিলিয়ে গেছে। আটলান্টিক মহাসাগর পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশের ১৭ শতাংশ স্থান দখল করে আছে। সেভাবে তুলনা করলে, মঙ্গল গ্রহের প্রাচীন মহাসাগর পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশের ১৯ শতাংশ দখল করতো। নাসার ‘গোডার্ড স্পেস ফাইট সেন্টার’-এর জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ও গবেষণাপত্রের লেখক মাইকেল মুমা বলেন, মঙ্গল থেকে এতো বিপুল পরিমাণ জলরাশি মিলিয়ে যাওয়ার অর্থ, পূর্বের ধারণার তুলনায় গ্রহটি দীর্ঘ সময় আর্দ্র ছিল। তিনি বলেন, মঙ্গল গ্রহ দীর্ঘ সময়ের জন্য বসবাসযোগ্য ছিল, এমন ইঙ্গিতই বহন করছে এ গবেষণা।

ভারতে সাম্প্রদায়িকতার আগুন ছড়াচ্ছে সরকার: সিপিএম

কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে সভায় বক্তারা। ছবি: ভাস্কর মুখার্জি
সিপিএমের সভায় আসা জনতার একাংশ। ছবি: ভাস্কর মুখার্জি
ভারতে সিপিএমের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাত বলেছেন, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে সরকার গঠন করার পর দেশে সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতি শুরু হয়েছে। দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িকতার আগুন ছড়ানো হচ্ছে।
আজ রোববার বিকেলে কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে সিপিএমের উদ্যোগে আয়োজিত এক সমাবেশে প্রকাশ কারাত এসব কথা বলেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও সিপিএমের প্রবীণ নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। প্রকাশ কারাত বলেন, নরেন্দ্র মোদি আসতেই হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িকতার প্রচার শুরু করেছে। শুরু হয়েছে দক্ষিণপন্থী হামলা। আর এসবের মদদ দিচ্ছে কিছু পুঁজিপতি ও সাম্প্রদায়িক শক্তি। এই পুঁজিপতিদের স্বার্থ রক্ষার জন্য একের পর এক অর্ডিন্যান্স জারি করছে মোদি সরকার। পাশাপাশি সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে। জোর করে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। বাড়ছে নারী নির্যাতন ও দ্রব্যমূল্য। এসবের বিরুদ্ধে এবার রুখে দাঁড়ানোর সময় এসে গেছে। প্রকাশ কারাত আরও বলেন, পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল সরকার দুর্নীতির সরকার। এই সরকার এখন রাজ্যজুড়ে লুটপাট চালাচ্ছে। বিজেপিকে জায়গা করে দিচ্ছে এই তৃণমূল সরকার। বিজেপিকে এই রাজ্যে ডেকে এনেছে তৃণমূল। এই সরকারের আমলে বেড়েছে দ্রব্যমূল্য। বেড়েছে নারী নির্যাতন। ধর্ষণ ও শ্লীলতানহানি বেড়েছে রাজ্যজুড়ে। তাই এই সরকারের বিরুদ্ধে এবার রুখে দাঁড়াতে হবে।
সমাবেশে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বলেন, ‘এই রাজ্যে অসভ্য ও অসৎ সরকার চলছে। রাজ্য পরিণত হয়েছে এক নরককুণ্ডে। এই নরককুণ্ড থেকে আমাদের বেরিয়ে আসার জন্য লড়তে হবে।’ সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরি বলেন, লাল ঝান্ডাকে শেষ করা অত সহজ নয়। সারদা ও রোজভ্যালির মতো চিটফান্ডের টাকা লুট করেছেন তৃণমূলের নেতারা। ওঁরা গরিবের টাকা লুট করেছেন। আরও লুট করার জন্য ক্ষমতা চান। সমাবেশে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক ও বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু তৃণমূল সরকারের কড়া সমালোচনা করে বলেন, ‘এ রাজ্যে তৃণমূল সরকার, আর নেই দরকার।’

প্রথম ‘মেম্বারনি’ অনিতা by উজ্জ্বল মেহেদী

ইউপি সদস্য অনিতা পাত্র এক নারীর সঙ্গে কথা বলছেন l প্রথম আলো
টিলার উঁচুনিচু জমিতে ঘরবাড়ি। এক বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল দুই নারীর। কথাবার্তা শেষে টিলা বেয়ে রাস্তায় ওঠার পথে দেখা। কী কথা হচ্ছিল? সিলেটের খাদিমপাড়া ইউনিয়নের দলইপাড়া গ্রামের আদিবাসী নারী পারুল পাত্রের কাছে এভাবেই জানতে চাওয়া।
কথা বলতে যেন রাজ্যের জড়তা বোধ করছিলেন পারুল। মাথায় ঘোমটা টানছিলেন আর বলার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু গুছিয়ে বলতে পারছিলেন না। পরে এক টানেই বলেন, ‘আমরা তো অত কিছু জানতাম না। পয়লা পয়লা মেম্বারনির (ইউপি সদস্য) কাছ থাকি সবতা জানা-শেখা হয়।’ পারুলের সঙ্গের জন হচ্ছেন এই ‘মেম্বারনি’। নাম অনিতা পাত্র। তিনি সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য। আদিবাসী পাত্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রথম নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি। পাত্র নারী-পুরুষের কাছে তাই নিজ নামে নয়, ‘মেম্বারনি’ সম্মোধনে বেশি পরিচিত। গত বুধবার বিকেলে অনিতা পাত্রের সঙ্গে দলইপাড়ার পারুল পাত্রের জীবনে প্রথম ‘জানা’ বিষয়টি ছিল মাতৃত্বকালীন ভাতা। ইউপি থেকে সরকারিভাবে বয়স্ক ভাতা মেলে—শুধু এটুকু জানা ছিল পারুলের। একটু আগে অনিতা পাত্রের মাধ্যমে মাতৃত্বকালীন ভাতা সম্পর্কে প্রথম জানতে পারেন পারুল, স্বগতোক্তির সুরে বলেন, ‘মেম্বারনির যয়বার (যতবার) সাক্ষাৎ হয়, একটা না একটা বিষয় জানা হয়।’
এই ‘জানা’ শুধু একটি বিষয় বা একজন পারুলকে নিয়ে নয়। নিজের ইউনিয়নের সীমানা ছাড়িয়ে যেখানে পাত্র জনগোষ্ঠী, সেখানে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবীর ভূমিকায় সচেতনতার কাজ করেন অনিতা পাত্র। চিকনাগুল ইউপির ঠাকুরেরমাটি, সেনাপতির টিলা, ভুবিরতল, গরান্দার, কালেশ্বরী, কহাইগড় গ্রাম পাত্র-অধ্যুষিত। এসব গ্রামেই যাতায়াত অনিতার।
২০১১ সালে সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন অনিতা। এটা পাত্রদের হয়ে প্রথম কারও সরাসরি ভোটে লড়াই। চারজন প্রতিদ্বন্দ্বীকে হারিয়ে ১ হাজার ২৬১ ভোট পেয়ে জয়ী হন তিনি। নির্বাচিত হওয়ার পর প্যানেল চেয়ারম্যান-১-এর দায়িত্বে রয়েছেন।
বাংলাদেশে আদিবাসী পাত্র জনগোষ্ঠীর বসবাস শুধু সিলেটেই। চতুর্দশ শতাব্দীর আগে থেকেই সিলেট অঞ্চলে তাদের বসবাস। ‘পাত্র সম্প্রদায় কল্যাণ পরিষদ-পাসকপ’ নামের আদিবাসী উন্নয়ন সংগঠনের ‘আর্থসামাজিক অবস্থা-২০১৪’ জরিপে বলা হয়, জেলায় ৩৩টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে পাত্র সম্প্রদায় অন্যতম। পাত্রদের ঐতিহাসিক নাম হচ্ছে ‘লালেং’। কিন্তু পাত্র ভাষায় পাথরকে ‘লালং’ বলা হয়। এ জন্য তারা নিজেদের মধ্যে ‘পাথর জাতি’ নামেও অভিহিত। সিলেটে মোট ১২টি গোত্রে বিভক্ত পাত্ররা।
অনিতার স্বামী ভুবেন্দ্র পাত্র পেশায় ভ্যানচালক। স্বামীর পেশার সুবিধার জন্য প্রায় ১০ বছর আগে দলইপাড়া থেকে স্থানান্তরিত হয়ে পৈতৃক এলাকায় গিয়ে স্থায়ী হন। স্বামী, এক ছেলে ও দুই মেয়ে নিয়ে অনিতার সংসার। বয়স ৪০ ছুঁই ছুঁই।
নির্বাচন করলেন কেন—জানতে চাইলে অনিতা হেসে বলেন, ‘আমি তো করি নাই। আমারে সবাই ধরছিল। কইলাম, আমার তো ইলেকশনে খরচপাতি করার মতো অর্থসম্পদ নাই। সবাই কইল খরচপাতি লাগব না, খাড়াও।’ এক প্রশ্নের জবাবে অনিতা পাত্র বলেন, পাত্র সম্প্রদায়সহ আদিবাসীরা স্বভাবতভাবে না জানার মতো অবস্থার মধ্যে থাকে। নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে প্রায় তিন বছরে তিনি পাঁচ শতাধিক পরিবারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে সচেতন করছেন।
পাত্র সম্প্রদায় কল্যাণ পরিষদের সভাপতি ও আদিবাসী দিবস উদ্যাপন পরিষদের সিলেট বিভাগীয় কমিটির আহ্বায়ক গৌরাঙ্গ পাত্র বলেন, ‘মানুষ ডাকার আগেই অনিতার দেখা পেয়ে যায়। একজন অনিতাকে দেখে আগামীতে আরও অনিতা বের হয়ে আসবে, এটা অনিতারও চাওয়া, আমাদেরও চাওয়া।’

কতদূর এগুলো নারী?

বছর বিশেক আগে বেইজিংয়ে জড়ো হয়েছিলেন বিশ্ব নেতারা। আলোচনার বিষয় ছিল নারীর অধিকার রক্ষা। সেখানে তারা ঐতিহাসিক এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। তারপর থেকে অনেক কিছুই ঘটেছে। ঘটছে এখনও।
চুক্তিতে ১৯৯টি কর্মপরিকল্পনা ছিল। সবগুলি এখনও বাস্তবায়িত হয়নি স্বভাবতই। তবে অনেক কিছুই কিন্তু বদলেছে। সবচেয়ে বড় অর্জন হলো চিন্তার পরিবর্তন। নারী সম্পর্কে ধারণাটা বদলেছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা 'ইকুয়ালিটি নাও' এর গ্লোবাল নির্বাহী পরিচালক ইয়াসমিন হাসান বললেন, ২০ বছর আগে এটা নিয়ে কেউ ভাবতোই না। কেউ এ সব প্রসঙ্গ ওঠালে তাকে দেখা হতো অন্য দৃষ্টিতে। এতদিনে বদলেছে অনেক কিছু।
হাঁ, এটা সত্য যে সবকিছু পারফেক্ট হয়নি এখনও। বৈষম্যটাও রয়ে গেছে সব ক্ষেত্রেই। তবু প্রথম বড় পদক্ষেপটা আমরা নিতে পেরেছি। বর্তমানে ১৩০টিরও বেশি দেশে নারী সমতা আইন রয়েছে। ১২০টির মতো দেশে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে আইন রয়েছে।
এখানে ছোট্ট একটা তালিকা দেয়া হলো। ২০ বছর আগে যে সব করতে পারতো না নারীরা, আজ পারছে সেগুলি।
ফ্রান্স : রাতে কাজ করতে পারে নারী
২০০৭ সাল পর্যন্ত প্রথাটা ছিল। ধর্ষণকারী ধর্ষিতাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেই ছাড়া পেয়ে যেতো। সেই প্রস্তাবে ধর্ষিতা রাজি থাক আর না থাক, সেটা বিবেচ্য ছিল না। এখন আর সে সুযোগ নেই।
গুয়াতেমালা, পেরু, উরুগুয়ে, ইথিওপিয়া এবং মরক্কোতেও এ ধরণের প্রথা ছিল যেগুলো এখন আর চালু নেই।
রুয়াণ্ডা : সম্পদের উত্তরাধীকারী হতে পারে নারী
১৯৯৯ সালে রুয়াণ্ডা নারীকে সম্পদ উত্তরাধীকারের অধিকারের দেয়। রুয়াণ্ডা এক সময় অনেক বিষয়েই নারী অধিকারের মডেল দেশ হিসেবে বিবেচিত হতো। তবু মাত্র বছর দশেক হলো দেশটিতে জমির মালিকানা ও বিক্রির অধিকার পেয়েছে নারীরা।
জর্ডান : প্রতারক স্বামীকে খুনের দায়ে শাস্তির মাত্রা কমেছে নারীর
জর্ডানে স্ত্রী পরপুরুষে আসক্ত হলে পুরুষরা সুবিধাটা পেতো। স্ত্রীকে খুনের দায়ে অন্য খুনের মতো শাস্তি হতো না পুরুষদের। শাস্তি কমিয়ে দেয়া হতো। কিন্তু স্বামী চরিত্রহীন হলেও এ ধরণের কোন সুবিধা পেতো না নারী। সে অবস্থা এখন বদলেছে। পুরুষের মতো একই সুবিধা পান এখন নারী। ২০০১ সালে এই আইন সংশোধন করে জর্ডান।
মালয়েশিয়া : মহিলারা ধর্ষণের অভিযোগ আনতে পারেন স্বামীর বিরুদ্ধে
বিবাহিত হলেও যৌন সম্পর্ক ধর্ষণের পর্যায়ে যেতে পারে যেটা পৃথিবীর বহু দেশেই উপেক্ষিত। মালয়েশিয়াতে নারীরা তার স্বামীর বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনতে পারেন। নারীর পক্ষে একই ধরণের আইন রয়েছে পাপুয়া নিউ গিনি ও সার্বিয়া অ্যাণ্ড মন্টিনিগ্রোতে।
ভারতে অবশ্য এ বিষয়ে সুস্পষ্ট আইন নেই। ২০১২ সালে নয়াদিল্লীতে এক তরুণী ধর্ষণের শিকার হলে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। ওই ঘটনার পর বিষয়টি আইনের অধীনে আনতে সুপারিশ করে পর্যবেক্ষণ কমিটি।
উগাণ্ডা : অবিশ্বস্ত স্বামীকে তালাক দিতে পারে নারী
স্ত্রী অবিশ্বস্ত হলে তালাক দেয়ার সুযোগ পুরুষের বরাবরই ছিল। ২০০৪ সালে সাংবিধানিক আদালত নারীর জন্যও এ অধিকার নিশ্চিত করেছেন।
ইন্দোনেশিয়া : স্বামী পেটালে তার বিরুদ্ধে মামলা করতে পারেন স্ত্রী
গৃহে নারীর উপর যে কোন ধরণের নির্যাতন অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে ২০০৪ সালের এক আইনে। এ ক্ষেত্র বহু দেশ অবশ্য এখনও পিছিয়ে আছে।
সুরিনাম : সন্তানকে নিজের জাতীয়তা দিতে পারেন মা
স্বামী ও সন্তানের নাগরিকত্ব নিয়ে পৃথিবীর বহু দেশেই নারীকে ভুগতে হয় অনেক। কিন্তু সে দিক থেকে এগিয়েছে সুরিনাম। সেখানে সন্তানকে নিজের নাগরিকত্ব দিতে পারেন মা।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়াতে হবে -বিশিষ্ট নাগরিকদের প্রস্তাব

(রাজধানীর বনানীতে গতকাল গবেষণা সংস্থা পিআরআইয়ের সম্মেলনকক্ষে ‘গণতান্ত্রিকতার পুনর্বিবেচনা: ফলাফলের জন্য ঐকমত্য’ শীর্ষক কর্মশালায় বক্তব্য দেন আকবর আলি খান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান (ডান থেকে তৃতীয়), রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহানসহ দেশের বিশিষ্ট নাগরিকেরা l ছবি: প্রথম আলো) প্রতি পাঁচ বছর পর পর নির্বাচনের আগে ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে দেশে যে সংঘাতের সৃষ্টি হচ্ছে, তার একটি স্থায়ী সমাধান দরকার। আর তা করতে হলে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে হবে। রাষ্ট্রপতির হাতে ক্ষমতা বাড়াতে হবে এবং জনগণের সরাসরি ভোটে তাঁকে নির্বাচিত করতে হবে। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে গণভোটের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
দেশের বিশিষ্ট নাগরিকেরা বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতির দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে এ প্রস্তাব করেছেন। গতকাল শনিবার নীতি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) এবং আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অ্যাসোসিয়েশন (আইপিএসএ) আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিকতার পুনর্বিবেচনা: ফলাফলের জন্য ঐকমত্য’ শীর্ষক এক কর্মশালায় নাগরিকেরা এসব কথা বলেন।
নাগরিকদের কয়েকজন দেশের বর্তমান নির্বাচনী ব্যবস্থার সমালোচনা করে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থা চালু করার সুপারিশ করেন। যাতে কোনো ব্যক্তিকে ভোট না দিয়ে দলকে ভোট দিয়ে পরে ভোটের অনুপাত অনুযায়ী সংসদে প্রতিনিধিত্ব রাখা যায়। সংসদের দুই স্তরে স্থানীয় এবং কেন্দ্রীয়—দুই সরকারের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করার প্রস্তাবও করা হয়।
রাজধানীর বনানীতে সংস্থাটির নিজস্ব কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তিনি বলেন, বর্তমানে ২০-দলীয় জোটের যে হরতাল চলছে, তা নিকৃষ্ট সন্ত্রাস। রাজনৈতিক দলগুলো এতটাই দুর্বল হয়ে গেছে যে তারা আর সাধারণ মানুষকে তাদের কর্মসূচিতে জড়ো করতে পারছে না। উল্টো সাধারণ মানুষের ওপর পেট্রলবোমা মেরে কর্মসূচি পালন করছে।
দেশের আমলাতন্ত্র এমনভাবে দলীয়করণের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যে, কোনোভাবেই সেই ক্ষতি পোষানো কঠিন হয়ে যাবে। এ মন্তব্য করে রেহমান সোবহান বলেন, সাংসদেরা তাঁদের নির্বাচনী এলাকাকে জমিদারি হিসেবে দেখেন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও অগণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এমনভাবে দানা বেঁধেছে যে তারা এ থেকে আর বের হতে পারছে না। দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘এর পরও আমি বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী।’
সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে ঠুঁটো জগন্নাথ করে রাখা হয়েছে বলে মন্তব্য করে সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ টি এম শামসুল হুদা বলেন, প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে হবে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়াতে হবে, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমাতে হবে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন অংশের মধ্যেও ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে সংবিধান সংশোধনের প্রস্তাব করেন তিনি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে একটি নির্বাচন হলেই সমস্যার সমাধান হবে না—এ মন্তব্য করে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান বলেন, দেশের আমলাতন্ত্র ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ—এই দুই দলে ভাগ হয়ে গেছে। ফলে নির্বাচন কমিশন যত ভালোই হোক না কেন, কর্মকর্তারা নিরপেক্ষ না হলে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বমূলক সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে তুললে বর্তমান সমস্যার দীর্ঘ মেয়াদে সমাধান সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আকবর আলি খান মনে করেন, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা একজন সেকশন অফিসারের চেয়েও কম। কেননা, এই কর্মকর্তারা সরকারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে দ্বিমত করে মত দিতে পারেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতির দ্বিমত করার সুযোগ নেই। হরতালের বিকল্প হিসেবে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গণভোটের ব্যবস্থা করারও প্রস্তাব দেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, ‘হঠাৎ করে সবকিছু পরিবর্তন করা কঠিন। তবে সরকারপ্রধান ও রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মধ্যে ভাগাভাগি করা যেতে পারে। কেননা, এর আগে আমরা দেখেছি, সরকারপ্রধানের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি অল্প একটু দ্বিমত করায় তাঁকে রেললাইন দিয়ে দৌড়াতে হয়েছিল।’
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সিপিডির সম্মানিত ফেলো রওনক জাহান বিশেষ অতিথির বক্তব্যে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বশীল ব্যবস্থা ও গণভোটের সমালোচনা করে বলেন, এই ব্যবস্থার কিছু প্রায়োগিক সমস্যা রয়েছে। আইনের বদল, নতুন প্রতিষ্ঠান এবং ব্যবস্থা চালু করা যায়। কিন্তু তার প্রয়োগ সব সময় করা যায় না। কেননা, নীতি ও বাস্তবতার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়ে যায়।
রাজনৈতিক দলগুলো নিয়ে করা নিজের একটি সাম্প্রতিক গবেষণার উদাহরণ টেনে রওনক জাহান বলেন, ওই গবেষণায় দেখা গেছে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্র নেই। দলীয় সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কোনো সাংসদ সংসদে দাঁড়িয়ে দ্বিমত করেন না, যদি পরেরবার মনোনয়ন না পান! তাই সবার আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে গণতন্ত্রায়ণ বেশি জরুরি।
বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, সিপিডির ট্রাস্টি এম সাইদুজ্জামান, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারও বক্তব্য দেন।
কর্মশালায় মূল প্রবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও আইপিএসএর সভাপতি জিল্লুর রহমান খান বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাত ও সংকট মোকাবিলায় দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের মধ্যে সংলাপের পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে দুই স্তরের সংসদীয় ব্যবস্থা চালু করতে হবে। জাতীয় ঐকমত্যের জন্য কোয়ালিশন সরকারব্যবস্থা চালু করারও সুপারিশ করেন তিনি।
কর্মশালা শেষে জিল্লুর রহমান খানের লেখা বঙ্গবন্ধুর সম্মোহনী নেতৃত্ব ও স্বাধীনতা সংগ্রাম বইটির প্রকাশনা অনুষ্ঠান হয়। কর্মশালায় সূচনা বক্তব্য দেন পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর। সঞ্চালনা করেন ইউনিসেফের সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা মনজুর আহমেদ।

৩৬ দিনেও খোঁজ মেলেনি ভাইস চেয়ারম্যান মারজানের by সরকার মাজহারুল মান্নান

গত শুক্রবার বিকেল বেলা। মিঠাপুকুর উপজেলা সদরের ডিসির মোড়ে মহাসড়ক লাগোয়া চিথলী দক্ষিণপাড়ায় নিখোঁজ মারজানের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল হৃদয় বিদারক দৃশ্য। ৮-৯ বছরের শিশু চোখের পানি মুছছে আর একজন মধ্যবয়সী নারীর বুকে দুই হাত দিয়ে মারছে। থেমে থেমে বলছে আব্বু কেন আসছে না। আব্বুকে এনে দাও। কেন ওরা আব্বুকে ছেড়ে দিচ্ছে না। আমি আব্বুর কাছে যাবো। মধ্যবয়সী ওই নারী শিশুটিকে বারবার বুকে জাপটে ধরছে আর বলছে ‘তোমার আব্বু আসবে বাবা। ধৈর্য ধর। আল্লাহর কাছে চাও। আল্লাহই তাকে এনে দেবেন। হে আল্লাহ এই শিশুটিকে আমি এখন কি দিয়ে সান্ত্বনা দেবো। কাছে গিয়ে জানলাম শিশুটির নাম হাসিন। চতুর্থ শ্রেণীতে পড়ে। মাঝ বয়সী নারীর নাম রোকাইয়া খানম লুকি। তারা মিঠাপুকুর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল বাছেত মারজানের ছেলে ও স্ত্রী। সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে তারা বলতে থাকলেন মারজানের নিখোঁজ হওয়ার নানা কথা। এখনো খোঁজ মেলেনি রংপুর মিঠাপুকুর উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান ও জামায়াত নেতা আবদুল বাসেত মারজানের। ডিবি পরিচয়ে গ্রেফতর হওয়ার পর থেকে ৩৬ দিন ধরে নিখোঁজ রয়েছেন তিনি। তার স্বজনেরা বাছেতকে ফিরিয়ে দিতে দাবি জানিয়েছেন।
জানা যায়, মিঠাপুকুর উপজেলা সদরের ডিসির মোড় চিথলী দক্ষিণপাড়া এলাকার বাসিন্দা মিঠাপুকুরের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা আব্দুল বারী (৯৪) ও মরহুমা আমিনা খাতুনের ছেলে আবদুল আব্দুল বাছেত মারজান। বর্তমানে তিনি মিঠাপুকুর উপজেলা জামায়াতের যুব ইউনিটের সভাপতি। কর্মজীবনে তিনি ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট। নিজ বাড়িসংলগ্ন ‘বার্ড ইলেকট্রনিক্স’ নামে একটি টিভি ফ্রিজের শোরুমের স্বত্বাধিকারী তিনি। দুর্গাপুর ইউনিয়নের কাশিপুর গ্রামের মৃত আবদুল হাকিম মণ্ডলের সর্ব কনিষ্ঠ মেয়ে রোকাইয়া খানম লুকির সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তার একমাত্র কন্যা ইসমাত ওয়ারা সাবিহা (১৩) মিঠাপুকুর হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণী এবং ছেলে হাসিন তাজমিন (৯) অর্কিড মাল্টিমিডিয়ার চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। ২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি মিঠাপুকুর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। ৭০ হাজার ভোটের ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীকে পরাজিত করে এক লাখ ছয় হাজার ভোটে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২৭ মার্চ ২০১৪ তারিখে শপথ নিতে এসে রংপুর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে তাকে পুলিশ দ্বিতীয় দফা গ্রেফতার করে। জেলখানা থেকেই শপথ নিয়েই পরে কারামুক্ত হয়ে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। এরপর ২০১৪ সালের ২৯ জুন আবারো আদালতে হাজিরা দিতে এসে জেলহাজতে যান। মুক্ত হয়ে আবারো উপজেলা পরিষদের দায়িত্ব পালন করছিলেন। আবারো ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৪ সালে মিছিল থেকে গ্রেফতার হন তিনি। পরে কারামুক্ত হয়ে উপজেলা পরিষদের দায়িত্ব পালন করছিলেন। ৩১ জানুয়ারি ২০১৫ উপজেলা পরিষদের কাজে ঢাকা গিয়ে তিনি নিখোঁজ হন।
আবদুল বাছেদ মারজানের স্ত্রী রোকাইয়া খানম লুকি নয়া দিগন্তকে জানান, আমার স্বামী উপজেলা পরিষদের কাজে ঢাকায় যান। সেখানে গিয়ে আমাদের নিকটাত্মীয় মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডের তাজুল ভাইয়ের বাড়িতে ওঠেন। কাজ শেষ করে তিনি বাড়ি আসার কথা। ৩১ জানুয়ারি ২০১৫ ভোর রাত আনুমানিক সাড়ে ৫টা থেকে ৫টা ৪০ মিনিটের মধ্যে আমি ফোন পাই, সাদা পোশাকের কয়েকজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোক তাকে আটক করে নিয়ে গেছে। তারা উপস্থিত লোকজনদের পরিচয় দিয়েছেন ডিবির লোক।
প্রত্যক্ষদর্শী বাসার মালিক তাজুল ইসলামের স্ত্রী লিউজি বেগম জানান, ৩১ জানুয়ারি ভোরে বাড়ির দারোয়ানকে সাথে নিয়ে পাঁচ-ছয়জন লোক প্রথমে আমার বাসায় নক করে। আমার স্বামী দরজা খুলে দিলে তারা বলে, ‘ আমরা ডিবি পুলিশের লোক। আপনার মেহমান কোথায়? তার নামে মামলা আছে। এরপর তারা মারজানকে তুলে নিয়ে যায়।’
মারজানের স্ত্রী রোকাইয়া খান লুকি নয়া দিগন্তকে আরো জানান, আমার স্বামীকে ডিবি পরিচয়ে নিয়ে যাওয়ার পর আমি প্রশাসনের বিভিন্ন দফতরে গিয়ে আমার স্বামীকে ফিরিয়ে দেয়া কিংবা আদালতে সোপর্দ করার দাবি জানাই। একই দাবিতে আমি ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আমার স্বামীকে আদালতে সোপর্দ করার দাবি জানাই। কিন্তু আজ ৩৬ দিন গত হয়ে গেল। আমি প্রশাসনের তরফ থেকে কোনো খোঁজ পাইনি। তিনি কোথায় আছেন। কেমন আছেন। বেঁচে আছেন। নাকি জীবিত আছেন। তাও জানি না।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে দাবি জানিয়ে লুকি বলেন, ‘ আমি চাই, অবুঝ সন্তান দু’টির দিকে তাকিয়ে, আমার দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মারজানকে আমাদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেবেন।
মারজানের বাবা মাওলানা আবদুল বারির বয়স এখন ৯৪। বুক চাপড়িয়ে কেঁদে বলতে থাকলেন, ‘আমার ছেলেকে যে ডিবি পুলিশ ধরে নিয়ে গেল। তাকে কি আর ফিরিয়ে দেবে না। ওকে কি আমি আর দেখতে পাবো না।
এ দিকে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল বাছেত মারজানের এই নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কে মিঠাপুকুর থানা, রংপুর ডিবি, র‌্যাবসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো পক্ষের কাছেই কোনো তথ্য নেই। তারা এই বিষয়টি অবহিতও নন। এ কারণে তারা কোনো বক্তব্য দিতেও রাজি হননি।

গণতন্ত্র বিকাশে ভিন্নমত ও রাজনৈতিক সংলাপ অপরিহার্য: বার্নিকাট

মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকায় কর্মরত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড ও
তাঁর সহকর্মীদের সই করা ঐতিহাসিক টেলিগ্রাম আজ রোববার দুপুরে মুক্তিযুদ্ধ
জাদুঘরে হস্তান্তর করেন ঢাকায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট। ছবি: প্রথম আলো
ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা স্টিফেনস ব্লুম বার্নিকাট বলেছেন, ভিন্নমতের প্রকাশ ও বিরোধীদের অধিকার চর্চার পর্যাপ্ত ও নিরাপদ সুযোগ এবং রাজনৈতিক সংলাপের মাধ্যমেই গণতন্ত্র পুরোপুরি বিকশিত হতে পারে। আজ রোববার দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তৃতায় এ কথা বলেন মার্শা বার্নিকাট। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকায় কর্মরত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড ও তাঁর সহকর্মীদের সই করা টেলিগ্রাম জাদুঘরে হস্তান্তর করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। টেলিগ্রাম গ্রহণ করেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য সারোয়ার আলী, রবিউল হুসাইন, জিয়াউদ্দীন তারিক আলী ও আক্কু চৌধুরী। অনুষ্ঠানে মার্শা বার্নিকাট বলেন, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এক পবিত্র স্থান। এটি একাত্তরের আখ্যান ও বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতীক। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে বিশ্বাসী অগণিত মানুষের কাছে এ জাদুঘর এক প্রেরণার উৎস। স্বাধীনতার জন্য আপনারা যুদ্ধ করেছিলেন। আর স্বাধীনতা গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
আর্চার কে ব্লাড ও তাঁর সহকর্মীদের সই করা ওই টেলিগ্রামকে ‘বিশেষ উপহার’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। তিনি বলেন, পররাষ্ট্র সার্ভিসের কর্মকর্তাদের সই করা ১৯৭১-এর বিখ্যাত এই টেলিগ্রাম এক সত্যায়িত উপহার। এই টেলিগ্রামে ওই কর্মকর্তারা বাংলাদেশ প্রশ্নে মার্কিন নীতির বিপক্ষে নিজেদের ভিন্নমত তুলে ধরেছিলেন।
মার্শা বার্নিকাট বলেন, পররাষ্ট্র সার্ভিসের প্রত্যেক কর্মকর্তার জন্য টেলিগ্রামটি ঐতিহ্যের স্মারক। বিদ্যমান শক্তি ও প্রশাসনিক অবকাঠামোর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া যে গুরুত্বপূর্ণ, এটি তা সুস্পষ্টভাবে মনে করিয়ে দেয়।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেন, গণতন্ত্র তখনই পুরোপুরি বিকশিত হতে পারে, যখন তা ভিন্নমতের প্রকাশ ও বিরোধীদের অধিকার চর্চার পর্যাপ্ত ও নিরাপদ সুযোগ এবং রাজনৈতিক সংলাপ নিশ্চিত করে।

‘ওসি পায়ে গুলি করে বলে, দৌড় দে’ by মহিউদ্দীন জুয়েল

‘পুলিশের ওসি আজিজুর রহমান আমাকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। এরপর কোমর থেকে পিস্তল বের করে। তারপর ডান পায়ের ঊরুতে গুলি করে। এরপর বলে দৌড় দে। আমি তখন গুলি খেয়ে মাটিতে ছটফট করতে থাকি। একসময় জ্ঞান হারিয়ে দেখি হাসপাতালের বারান্দায়।’ চট্টগ্রামে মো. ইয়াছিন(৩২) নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে কথা হচ্ছিলো হাসপাতালের বারান্দায়। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে যুবদল করার অভিযোগে তাকে গুলি করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে তার পরিবার। আর অভিযোগ আনা হয়েছে নগরীর পাহাড়তলী থানা পুলিশের বিরুদ্ধে।
গতকাল শনিবার সকালে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে পুলিশ প্রহরায় চলছে ইয়াছিনের চিকিৎসা। এই সময় তার সঙ্গে কথা বলতে গেলে বাধা দেন পুলিশ সদস্যরা। বলেন, পরিবারের কাউকেই কথা বলতে দেয়া হচ্ছে না। উপরের নিষেধ আছে। ইয়াছিনের পরিবার অভিযোগ করেন, থানার ওসির নেতৃত্বে তার ওপর হামলা চালানো হয়েছে। ধরে নিয়ে গুলি চালিয়েছে থানার ওসি। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে শহরের পাহাড়তলী বন্দর টোলরোড এলাকায় এই ঘটনা ঘটে।
তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করে থানার ওসি বলেছেন, ইয়াছিন একজন সন্ত্রাসী। সে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের আড়ালে পেট্রল সরবরাহ করতো। তাকে গ্রেপ্তার করতে গেলে বন্দুকযুদ্ধে সে আহত হয়।
ঘটনার দিন রাতে পাহাড়তলীর বন্দর টোলরোড এলাকায় নাশকতা করতে ১০/১২ জন যুবক নিয়ে নাশকতার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো ইয়াছিন। এই সময় খবর পেয়ে পুলিশ তাদের ধাওয়া দেয়। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে যুবকরা লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পুলিশও তাদেরকে লক্ষ্য করে পাল্টা গুলি করে। একপর্যায়ে ইয়াছিন আহত হয়। এই ক্ষেত্রে পুলিশ তাকে গুলি করেনি। ইয়াছিনের সহযোগীরা তাকে গুলি করে পালিয়েছে। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে যুবকরা এমন কাজ করেছে বলে দাবি থানার ওসির।
তবে এই বিষয়ে জানতে চাইলে আহত ইয়াছিন বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে রাস্তায় ফেলে গুলি চালিয়েছে। আমি ওইদিন রাত সাড়ে নয়টায় নগরের দেওয়ানহাট এলাকা থেকে বাসায় ফিরছিলাম। আমাকে সেখান থেকে আটক করে কথা আছে বলে নিয়ে যায়। এরপর টোলরোড এলাকায় নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে গুলি করে ফেলে দেয়।
তিনি আরো বলেন, ডান পায়ে গুলি খেয়ে আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। আমার আর কিছু মনে নেই। জ্ঞান ফিরে দেখি হাসপাতালে। ডাক্তার বলেছে আমার পা কেটে ফেলতে হবে। আমি যুবদল করি সত্যি। কিন্তু কোনদিন নাশকতা করিনি। আমার বিরুদ্ধে পুলিশ ৬টি মামলা দিয়েছে। সবগুলো নাকি নাশকতা সৃষ্টির অভিযোগ।
হাসপাতালের বারান্দায় ইয়াছিনের আত্মীয় শহীদের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ইয়াছিন  পোশাক কারখানার ঝুট কাপড়ের ব্যবসা করে। সামপ্রতিক পরিস্থিতিতে সে প্রকাশ্যে কোন মিছিল- সমাবেশ করেনি। কিন্তু তারপরও এলাকার সরকারদলীয় কিছু নেতার কথায় ওসি সাহেব তার সর্বনাশ করলো। আমরা এই ঘটনার বিচার চাই। শিগগিরই আদালতে মামলা করবো।
ইয়াছিনের বিষয়ে জানতে গতকাল সরজমিন পাহাড়তলীতে গিয়ে জানা যায়, সে যুবদলের একজন সক্রিয় কর্মী। ঘটনার দিন রাতে সে একাই ছিল। তার পরিচয় সে পাহাড়তলী থানার সাগরিকা মুরগির ফার্ম এলাকার রাজা মিয়ার ছেলে। তার বিরুদ্ধে এর আগে থানায় ৬টি নাশকতার মামলা হয়েছে। সবক’টি মামলাই পুলিশের ওপর আক্রমণ ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে।
চমেক হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই পঙ্কজ বড়ুয়া বলেন, বৃহস্পতিবার রাতে পাহাড়তলী  টোলরোড এলাকায় পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে আহত ইয়াছিন নামে এক যুবদলকর্মীকে রাত  দেড়টার দিকে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তিনি শটগানের গুলিতে বিদ্ধ হয়েছেন। তাকে হাসপাতালের পঞ্চম তলায় ২৬ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।
ইয়াছিনের পরিবারের লোকজন জানান, বৃহস্পতিবার রাত ৯টায় দেওয়ান হাট এলাকা  থেকে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে প্রথমে থানায় নিয়ে যায়। এরপর রাত একটা থেকে দেড়টার মধ্যে পুলিশ তাকে হাতকড়া পরিয়ে সাগরিকা টোলরোডে নিয়ে যায়। সেখানেই তার পায়ে গুলি করা হয়। পরে তার কাছ থেকে দুটি পেট্রলবোমা ও দুটি ককটেল উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়ে হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়া হয়।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে পাহাড়তলী থানার ওসি আজিজুর রহমান বলেন, ইয়াছিন যুবদলের একজন সন্ত্রাসী। সে পেট্রল সরবরাহ করে গাড়ি পুড়িয়ে দিতে ওস্তাদ। ঘটনার সময় তাকে আমরা টোলরোড এলাকা থেকে ধরতে গেলে সে গুলি ছোড়ে। আত্মরক্ষার্থে আমরাও গুলি চালাই। কিন্তু তার এক সহযোগী পুলিশের দৃষ্টি ফেরাতে ইয়াছিনকে গুলি করে নিজেরাই পালিয়ে যায়। ওসি আরো বলেন, ইয়াছিনের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলা আছে। খবর নিয়ে জানতে পারবেন সে এলাকায় নানা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য বেশ সমালোচিত। তার বিরুদ্ধে আমরা নাশকতার মামলা করেছি।

হাসিনা-খালেদা নিজেই নিজের সঙ্গে সংলাপ করুন! by সোহরাব হাসান

বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের সহিংস অবরোধ সদর্পে দুই মাস পার হলেও চলমান রাজনৈতিক সংকট অবসানের আলামত দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু উদ্বেগজনক হলো, সরকার এখন পর্যন্ত একে সংকট বলে স্বীকারই করছে না। সরকারদলীয় নেতা-মন্ত্রীদের হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে, ১৬ কোটি মানুষের দেশে ১১৫ জনের প্রাণহানি, ১ হাজার ৩১৭টি যানবাহনে আগুন-ভাঙচুর, ১৫ লাখ এসএসসি পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা কিংবা লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষের রুটি-রুজি বন্ধ হওয়া আর এমন কি! জাতির বৃহত্তর স্বার্থে এই সামান্য ক্ষতি মেনে নিতেই হবে। আর হরতাল-অবরোধ আহ্বানকারীরা মনে করছেন, প্রতিদিন দু-চারটি বাসে পেট্রলবোমা-ককটেল ছুড়ে একটি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়াই বড় কথা। কত মানুষ মরল, কত বাস-ট্রাক জ্বলল, তা নিয়ে ভাবার সময় এখন নয়। ইতিমধ্যে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহ উদ্দিন আহমদ জানিয়ে দিয়েছেন, এ আন্দোলনে যাঁরা মরবেন, তাঁরা শহীদ ও জাতীয় বীর হিসেবে গণ্য হবেন। সম্ভবত সে কারণেই তাঁরা শহীদ ও গাজীর সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছেন। আর সরকারই বা কম যাবে কেন? তারা বাড়িয়ে চলেছে কারাবন্দীর সংখ্যা। আমাদের নেতা-নেত্রীরা মানুষ নিয়ে ভাবেন না, ভাবেন সংখ্যা নিয়ে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগে একটি কথা বেশ জোর দিয়েই বলতেন, একমাত্র আওয়ামী লীগই মেয়াদ শেষে শান্তিপূর্ণ উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছে। তিনি ২০০১ সালে সেটি করে দেখিয়েছেন। কিন্তু তার পরই সব ওলট-পালট হয়ে গেল। খালেদা জিয়ার ক্ষমতা হস্তান্তরের সময় যেমন দুর্যোগ নেমে এসেছিল, তেমনি দুর্যোগ দেখেছি ২০১৪ সালেও। এই দুর্যোগের জন্য কে বেশি, কে কম দায়ী, সেই বিতর্কে না গিয়েও বলা যায়, আমরা যোগ্য গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব বেছে নিতে ব্যর্থ হয়েছি। ২০১৪ সালের ঘটনাবলি যদি দুর্যোগ হয়ে থাকে, দেশে এখন মহাদুর্যোগ চলছে। কিন্তু সেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় যে ধীরস্থির ও বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তা সম্ভবত আওয়ামী লীগের নেতা-নেত্রীদের জানা নেই। কেননা, অতীতে তাঁরা শক্ত হাতে বিরোধী দলকে মোকাবিলা করলেও তেমন শক্ত বিরোধী দলের মুখোমুখি হননি।
এখানে বলা প্রয়োজন যে ৫ জানুয়ারির পর বিএনপি-জামায়াত জোট আন্দোলনের নামে যে সহিংস তাণ্ডব চালাচ্ছে, আমরা তার বিরোধিতা করি, নিন্দা জানাই। দাবি ন্যায়সংগত হলেও আন্দোলনের নামে সহিংসতা তথা মানুষ পুড়িয়ে মারা চলতে পারে না। কিন্তু ৫ জানুয়ারির আগে কেন সরকার বিরোধী দলের সভা-সমাবেশ করতে দেয়নি, কেন খালেদা জিয়ার অফিস অবরোধ করে রেখেছিল, সেই প্রশ্নের জবাব মেলে না। আওয়ামী লীগের দাবি, বিএনপি-জামায়াত জোট আন্দোলনের নামে দেশ ধ্বংসের তৎপরতায় লিপ্ত। নির্বাচন তাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। মৌলবাদ ও জঙ্গিবাদের পুনরুত্থান ঘটিয়ে তারা বাংলাদেশকে একটি তালেবানি রাষ্ট্র বানাতে চায়।
যুক্তির খাতিরে যদি ধরেও নিই যে বিএনপি-জামায়াত জোটের আন্দোলনের পেছনে এ ধরনের কোনো বদ মতলব আছে, তাহলেও বলব, তা মোকাবিলায় এটি সঠিক রাস্তা নয়। বিরোধী দলের কণ্ঠরোধ করে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করা গেলেও গণতন্ত্রের যুদ্ধে জেতা যায় না। এতে করে সরকার যে জঙ্গিবাদের ভয় দেখাচ্ছে বা দেখছে, তার হাতই শক্তিশালী হচ্ছে। কোনো পশ্চাৎপদ রাজনৈতিক দর্শনকে পরাস্ত করতে হয় উন্নত রাজনৈতিক দর্শন বা আদর্শ দিয়ে, গায়ের জোরে পরাস্ত করতে চাইলে তার ফল কারও জন্য ভালো হয় না। বর্তমান ইরাক ও আফগানিস্তানই তার প্রমাণ।
বিএনপি-জামায়াত জোটের অবরোধের সীমা যত বাড়ছে, সাধারণ মানুষের কষ্ট-দুর্দশা ততই প্রকট হচ্ছে। নিরীহ ও খেটে খাওয়া মানুষ পেট্রলবোমার আগুনে পুড়ে মরছে, হাসপাতালে কাতরাচ্ছে। আবার সন্ত্রাস দমনের নামে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে অনেক নিরপরাধ লোক মারা যাচ্ছে। দুই মাসের অবরোধে ও দফায় দফায় হরতালে সারা দেশে জনজীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। পরিবহনব্যবস্থা বিপর্যস্ত। বিনিয়োগ বন্ধ। শিল্প-কারখানার উৎপাদন কমে গেছে। বছরের দুটি মাস চলে গেলেও শিক্ষার্থীরা স্কুলে যেতে পারছে না। এত কিছুর পরও যদি সরকার ‘সবকিছু ঠিক হ্যায়’ বলে উড়িয়ে দেয়, তাহলে বুঝতে হবে, এই দুঃখী বাংলাদেশের কপালে আরও দুঃখ আছে। সরকারের মন্ত্রীরা, সরকারি দলের নেতারা জোরগলায় বলে বেড়াচ্ছেন, সমস্যাটি বিরোধী দল তথা বিএনপি-জামায়াতের সৃষ্টি। বিএনপির নেতারা বলছেন, সরকারই সবকিছুর জন্য দায়ী। কিন্তু দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের কী দোষ? তারা কেন পুড়ে মরছে? তারা কেন বন্দুকযুদ্ধের শিকার হচ্ছে?
আন্দোলনের যেমন দুটি ধরন (সহিংস ও অহিংস) আছে, তেমনি সেই আন্দোলন নিবৃত্ত করারও দুটি উপায় আছে বলে মনে করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা। একটি আলোচনা, দ্বিতীয়টি বলপ্রয়োগ। বাংলাদেশের পূর্বাপার সরকারগুলো দ্বিতীয়টিকেই একমাত্র সমাধান ভাবে। তাই বাস্তবে সরকারের দমনতন্ত্র কিংবা বিরোধী দলের আগুনতন্ত্র কোনো সুফল দেয় না। প্রতিদিন এত বক্তৃতা, এত গ্রেপ্তার, এত মামলা, এত বালুর ট্রাক, এত শান্তি মিছিল, এত মানববন্ধন, এত হুঁশিয়ারি—কোনো কিছুই যখন কাজে লাগছে না, তখন সরকারকে বিকল্প পথই খুঁজে বের করা উচিত।
কী সেই বিকল্প? আলাপ-আলোচনা। জাতিসংঘের মহাসচিব সংলাপের কথা বলছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রধানেরা সংলাপের কথা বলছেন। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের প্রধান সংলাপের কথা বলছেন। বিদেশি রাষ্ট্রদূতেরা সংলাপের কথা বলছেন। দেশের সাধারণ মানুষও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান চাইছে। এমনকি সরকারের অংশীদার জাতীয় পার্টিও জাতীয় কনভেনশন ডাকার প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু সরকার গোঁ ধরে বসেছে, তারা বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় বসবে না। আলোচনায় বসলেই নাকি আগুন-বোমাবাজদের কাছে আত্মসমর্পণ করা হবে! অন্যদিকে বিরোধী দলও হরতাল-অবরোধের নামে সন্ত্রাসী ও সহিংস কর্মকাণ্ড দিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছে যে দাবি পূরণের আগে তারা ঘরে ফিরে যাবে না। অতএব, আমরা অচিরেই এর কোনো সমাধান দেখছি না।
দুই দলই যখন একে অপরকে আস্থায় আনছে না, সরকার প্রতিপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হচ্ছে না, তখন নেতানেত্রীদের প্রতি আমাদের অনুরোধ থাকবে, অন্যের সঙ্গে না হলেও অন্তত নিজের সঙ্গে একটি সংলাপ করুন। আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজের সঙ্গে সংলাপ করতে পারেন। নিজের সঙ্গে সংলাপ করা মানে কী করেছি, কী করছি, কী করার কথা ছিল, সেটি বুঝে নেওয়া। নিজের সঙ্গে সংলাপ করা মানে জনগণের কাছে যে ওয়াদা, তার কতটুকু পূরণ করেছেন সে কথাটি জানা। নিজের সঙ্গে সংলাপ করা মানে বিবেক বা অন্তরাত্মার কাছে প্রশ্ন করা।
বিএনপি ৫ জানুয়ারির নির্বাচন মানে না। তাই আমরা তাদের ২০০৮ সালের নির্বাচন উপলক্ষে ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহারটি পড়ে নিতে বলছি। তাদের মূল স্লোগান ছিল ‘দেশ বাঁচাও মানুষ বাঁচাও’। তারা বলেছিল, দরিদ্র মানুষের জীবনমান বাড়াবে। এখন সেই দরিদ্র মানুষই পেট্রলবোমায় মারা যাচ্ছে। তারা বলেছিল, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দেবে। এখন অবরোধ-হরতালই তাদের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বলেছিল, উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি করে। এখন তাদের ধ্বংসাত্মক কর্মসূচিতে দুটিই বন্ধ। তারা বলেছিল, শিক্ষাকে আধুনিক ও যুগোপযোগী করবে। এখন চার কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনই অনিশ্চিত। বিএনপির নেত্রী নিজেকে প্রশ্ন করলেই জানতে পারবেন, দুই মাস ধরে চলা তাঁদের কর্মসূচিগুলো মানুষকে না বাঁচিয়ে তাদের সর্বনাশ ঘটাচ্ছে। দেশকে পিছিয়ে দিচ্ছে।
আওয়ামী লীগও ২০০৮ সালে দিন বদলের সনদের নামে জনগণের ভোট নিয়েছিল। বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে তারা সরকার গঠন করেছিল। কিন্তু জনগণের দিন তেমন বদল না হলেও আওয়ামী লীগের নেতাদের দিন ঠিকই বদলেছে। তারা বলেছিল, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। হ্যাঁ, কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তবে সরকারি দলের নেতাদের বাদ দিয়ে। তারা বলেছিল, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করবে। কিন্তু ছয় বছর পরও আমাদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চলছে। তারা বলেছিল, জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। এখন জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সরকারি দলের সাংসদেরাই বেশি গরহাজির থাকেন। তারা বলেছিল, মন্ত্রিসভার সদস্যদের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস জনসম্মুখে জানাবে। কিন্তু কারও সম্পদের হিসাবই জানানো হয়নি। তারা বলেছিল, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শিষ্টাচার ও সহিষ্ণুতা গড়ে তোলা হবে। এখন সেই শিষ্টাচার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে একে অপরকে গালাগাল না দিয়ে কথা বলে না। তারা বলেছিল, দলীয়করণমুক্ত অরাজনৈতিক গণমুখী প্রশাসন গড়ে তোলা হবে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোকে রাজনীতির প্রভাবমুক্ত করা হবে। এখন দুটিই পুরোপুরি দলনির্ভর প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ছয় বছর পর শেখ হাসিনা নিজেকে জিজ্ঞেস করে দেখুন, তিনি দিন বদল করতে পেরেছেন কি না।
আমি হলফ করে বলতে পারি, দিন বদলের সনদ সত্যি সত্যি বাস্তবায়িত হলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াও ২০১৪ সালে সবার অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন করা যেত এবং দেশবাসী এই মহাদুর্যোগ থেকে রেহাই পেত। কিন্তু ডিজিটাল বাংলাদেশের রাজনীতি অ্যানালগের দিকেই চলতে পছন্দ করে।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০3@dhaka.net

রাজনীতিকরা আর কত ঘুমাবেন? by আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী

দেশের রাজনীতিকদের এ বড় অদ্ভুত ঘুম। চলছে তো চলছেই। চারদিকে গোঙানি, কান্না, ধিক্কার, গগনবিদারী আর্তনাদ। অথচ তারা কুম্ভকর্ণ। চারপাশে লাশের মিছিল, ঝলসানো মুখ-দেহ। অথচ তাদের মনোভাবটা যেন কুছ পরটা নেহি। রাজনীতির নামে কী আশ্চর্য প্রতিহিংসায় তারা মেতে আছেন মাসের পর মাস, বছরের পর বছর! সহিংস রাজনীতির জন্য কোনো নোবেল থাকলে বাংলাদেশ নির্ঘাৎ প্রতি বছর পুরস্কার পেত! সহিংস রাজনীতির গন্গনে আগুনে দুনেত্রী জাগেন না বটে, তবে গোটা বিশ্ব জাগ্রত। তটস্থ। দেখুন তার চালচিত্র। ১৮ ফেব্রুয়ারি সংলাপে বসার আহ্বান জানিয়ে লেখা বান কি মুনের চিঠি প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য : খুনিদের সঙ্গে কোনো সংলাপ নয়। তথ্যমন্ত্রীর ভাষ্য : সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের সঙ্গে কোনো আলোচনা নয়। একই বিষয়ে পরদিন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রীর বক্তব্য : সন্ত্রাস-নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের সঙ্গে আলোচনা নয়।
১৭ ফেব্রুয়ারি মার্কিন রাষ্ট্রদূত চলমান সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে সংকট সমাধানে সবার দায়িত্ব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। ওই দিন খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করে ইউরোপীয় পার্লামেন্টের প্রতিনিধি দল। একই দিন এসএসসি পরীক্ষা সত্ত্বেও বিএনপি অতিরিক্ত ৬০ ঘণ্টা হরতালের ঘোষণা দেয়।
১৬ ফেব্রুয়ারি মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে গণতন্ত্র অব্যাহত দেখতে চায় এবং কানাডার রাষ্ট্রদূত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে চলমান সহিংসতা বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলবে বলে মন্তব্য করেন। একই দিন সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলোচনা করে কী লাভ?
১২ ফেব্রুয়ারি নিউইয়র্ক টাইমস সরকারকে অবশ্যই বিরোধীদের আলোচনায় ডাকতে হবে শিরোনামে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। সেদিনই প্রধানমন্ত্রী দানবের কাছে মানুষ হারতে পারে না বলে মন্তব্য করেন।
১১ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত এবং পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে কানাডার রাষ্ট্রদূত দেখা করে চলমান সন্ত্রাসের নিন্দা ও সংলাপের আহবান জানান। অন্যদিকে সন্ধ্যায় খালেদা জিয়ার সঙ্গে ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট গিবসন ১ ঘণ্টা বৈঠক করে সব পক্ষকে কর্মের পরিণতি সম্পর্কে ভাবা ও চলমান অচলাবস্থা নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলেন। ওই দিন বিকালে জাতিসংঘ চলমান সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। তিন রাষ্ট্রদূতের প্রায় অভিন্ন অনুরোধ ও জাতিসংঘের গভীর উদ্বেগের বিপরীতে সরকারের অবস্থান : কার সঙ্গে আলোচনা করব? খুনির সঙ্গে? আর বিএনপির বিবৃতি : দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত দুর্বার আন্দোলন।
একই বিষয়ে ১০ ফেব্রুয়ারি মার্কিন রাষ্ট্রদূত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ১ ঘণ্টা বৈঠক করেন। চলমান সহিংসতাকে নিঃসন্দেহে বিয়োগান্তক ঘটনা আখ্যায়িত করে তিনি তা বন্ধে প্রত্যেকের দায়িত্ব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। একই দিন তথ্যমন্ত্রী খুনিদের সঙ্গে সংলাপ নয় এবং বাণিজ্যমন্ত্রী সংলাপের প্রস্তাব অবাস্তব, অগ্রহণযোগ্য বলে বক্তব্য দেন। বিপরীতে বিএনপির বিবৃতি : সরকার অচিরেই দিনেও সরকারি অফিস বন্ধ করতে বাধ্য হবে।
৯ ফেব্রুয়ারি ব্রাসেলসভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ (আইসিজি) সরকারকে সংলাপ শুরু এবং বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার আহ্বান জানায়। ভারতীয় হাইকমিশনার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি বলে মত দেন। আর সেদিনই জাতীয় শ্রমিক লীগ খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের ৩৫ গজ দূরে জমায়েত হয়ে তাকে অবরুদ্ধ রাখার হুমকি দেয়।
৮ ফেব্রুয়ারি তথ্যমন্ত্রী দানবের সঙ্গে মানবের সংলাপ হয় না এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী নির্বাচন হবে ২০১৯ সালে, সংলাপও হবে ২০১৯ সালে, তবে তা হবে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে, অন্য কারও সঙ্গে নয় বলে বক্তব্য দেন। একই দিন মৈত্রী ট্রেনে বোমা হামলা হয়।
৭ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সহিংসতা বন্ধে সব পক্ষের সহযোগিতা করা উচিত মর্মে বিবৃতি দেয়। সেদিনই প্রধানমন্ত্রীর মন্তব্য : জঙ্গিদের কাছে নতি স্বীকার করব না। আর ওই দিনই নাশকতায় নিহত হয় ১০ জন।
এভাবে ৬ ফেব্রুয়ারি মার্কিন পররাষ্ট্র দফতর বাংলাদেশে সহিংসতা বন্ধ হওয়া উচিত বলে বিবৃতি দেয়। ৫ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ বাংলাদেশের চলমান সহিংসতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। এর আগে চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ১৩ জানুয়ারি ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশী কূটনীতিকরা প্রথমবারের মতো উদ্বেগ জানান। ওই দিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নও নিন্দা জানায়। ১৫ জানুয়ারি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশন সব দলকে সংঘাত থামানোর আহ্বান জানায়। ১৯ জানুয়ারি যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্স বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনায় বসতে অনুরোধ করে। তাতে বোধোদয় দূরে থাক, ১৯ জানুয়ারি অবরুদ্ধ দশা থেকে মুক্ত হয়েই খালেদা জিয়া বলেন, অবরোধ চলবে। ২২ জানুয়ারি জাতিসংঘ চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে গোলযোগপূর্ণ আখ্যায়িত করে বিরোধী নেতাদের নির্বিচারে গ্রেফতার না করার আহবান জানায়। বিপরীতে সরকারের হুংকার- দেখামাত্র গুলি।
সম্প্রতি দি ইকোনমিস্টের (৭-১৩ ফেব্রুয়ারি সংখ্যা) এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে খাদের কিনারে দাঁড়ানো এক রাষ্ট্র (A country on the brink) এবং বাংলাদেশের দুই নেত্রীকে যুদ্ধরত বেগম (battling begums) হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। বলা হয়, বাংলাদেশ দুই দলে বৃত্তবন্দি একটি অকার্যকর ব্যবস্থায় ধুঁকছে, যেখানে যুদ্ধরত বেগমগণ রাষ্ট্রীয় অর্থে পরস্পরের বিরুদ্ধে বংশানুক্রমিকভাবে প্রতিহিংসা চরিতার্থে লিপ্ত।
বিদেশীদের উদ্বেগ-নিন্দা-আহ্বান এদেশে নতুন কিছু নয়। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থায়ও ইউরোপীয় পার্লামেন্ট, চীন, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত, হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। ওই সময় জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো তিনবার বাংলাদেশ সফর করেন। প্রতিবার দফায় দফায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন। শেষবার তো চারদিনে ২২টি বৈঠক করেন। তার মধ্যে খালেদা ও সিইসির সঙ্গে বসেছেন দুবার। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রতিনিধিদের সঙ্গে একত্রে বসেছেন দুবার। ইতিবাচক অগ্রগতির স্বস্তি নিয়ে দেশ ছাড়লেও দুই দলই পরে আগের অবস্থানে ফিরে যায়। একই উদ্দেশ্যে ২০১২ সালের ৬-৭ মে বাংলাদেশ সফরে আসেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও ফার্স্ট লেডি হিলারি ক্লিনটন। এরপর আসে বান কি মুনের ফোন। ২৭ নভেম্বর ২০১৩ আসে তার চিঠি। মাঝখানে একই উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই আসেন। ২০ নভেম্বর ২০১৩ প্রভাবশালী মার্কিন দৈনিক নিউইয়র্ক টাইমস নিষেধাজ্ঞাসহ নানা চাপে পড়তে পারে বাংলাদেশ মর্মে সম্পাদকীয় ছাপে। ৪ ডিসেম্বর ২০১৩ বিখ্যাত দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ প্রধান বিরোধী দল ছাড়া নির্বাচন বৈধতা হারাবে শিরোনামে সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। পত্রিকাটি ১৯৮৮ ও ১৯৯৬ সালে বিরোধী দলবিহীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের পরিণতিও সরকারকে স্মরণ করিয়ে দেয়। সর্বশেষ ১১ ডিসেম্বর ২০১৩ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি শেখ হাসিনাকে ফোন দেন। কিন্তু ফলাফল শূন্য। এর আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ইস্যুতে ১৯৯৪ সালের শেষদিকে বাংলাদেশে আসেন কমনওয়েলথ মহাসচিবের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টিফেন। ২০০১ সালের সংকটে আসেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার। ২০০৬ সালের সংকটে ওই দায়িত্ব নেন দেশে অবস্থানরত বিদেশী কূটনীতিকরা। কিন্তু প্রতিবারই দুদলের একই মনোভাব- বিচার মানি, কিন্তু তালগাছটা আমার।
বাংলাদেশের সর্বত্র এখন একটাই রব- শান্তি চাই, শান্তি। তারপরও দুনেত্রী অনড়। ২৪ জানুয়ারি আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যুতে মানুষ ভেবেছিল, খালেদা জিয়া শোকে অন্তত হরতাল-অবরোধ প্রত্যাহার করবেন। শেখ হাসিনা খালেদাকে সান্ত্বনা দিতে যাচ্ছেন শুনে মানুষ সমঝোতার আশায় বুক বেঁধেছিল। কিন্তু সব গুড়ে বালি। উল্টো খালেদার দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা- অবরোধ চলবেই। শেখ হাসিনাকে বাড়িতে ঢুকতে পর্যন্ত দেয়া হলো না। কী নষ্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের! বাস্তবতা হল- দেশী-বিদেশী কোনো উদ্যোগ, সংলাপ-আলোচনা এ পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সংকটে দুনেত্রীকে এক করতে পারেনি। কবে পারবে? তাদের ঘুম ভাঙার যে কোনো লক্ষণই দেখি না! তাদের ব্যাটল থামার চিহ্নও তো চোখে পড়ে না!
আফতাব উদ্দিন ছিদ্দিকী : আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট
aftabragib@yahoo.com

কান ব্যথা সারাবে পেঁয়াজ

প্রায়শ’ই ছোট-বড় অনেকের কান ব্যথা করার কথা শোনা যায়? সমস্যা নেই আপনার রান্নাঘরেই রয়েছে এর সমাধান৷ অ্যান্টিবায়োটিক ছাড়াই এই ব্যথা সারাতে পারে পেঁয়াজের গরম ভাঁপ দিয়ে৷ চলুন জানা যাক কীভাবে৷
কী কী কারণে কান ব্যথা হয়?
বাইরের কোনো সংক্রমণ থেকে কানের ভেতরে ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস জন্মালে কানে ব্যথা হতে পারে৷ যেমন সাতাঁর কাটা, ঠাণ্ডা লাগা, কানের পর্দায় আঘাত লাগা বা কোনো ধরনের অ্যালার্জি, কানে ময়লা বা খৈল জমা, এমনকি দাঁত বা চোয়ালের সমস্যা থেকেও কানে ব্যথা হতে পারে৷ তবে কার কী কারণে কান ব্যথা হচ্ছে, তা ডাক্তারের কাছ থেকেই জেনে নেয়া উচিত৷
কানব্যথা এড়িয়ে চলতে কী করবেন?
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, গাড়ি, বাস বা ট্রেনে যাতায়াতের সময় অবশ্যই মাথা এবং কান ঢেকে রাখবেন। বন্ধ করে দেবেন জানালা৷ কারণ দুই দিকের জানালা খোলা থাকলে ঠাণ্ডা বাতাস এবং ধুলোবালি কানে লাগে এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা থেকেই কান ব্যথা বা কানে সংক্রমণ হয়৷’ এই সাবধানবাণী জার্মানির নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ ডা. মিশায়েল বনডর্ফের৷
সাবধান হতে বাথক্যাপ পরে নিন
ডাক্তারের আরো পরামর্শ, সাঁতার কাটার সময় অবশ্যই বাথক্যাপ পরে নেবেন৷ কারণ গোসল করা বা সাঁতার কাটার সময় কানে পানি ঢুকে গেলেও কানে সংক্রমণ হতে পারে৷ তাই সাঁতার বা গোসলের পর ভালো করে
কান মুছে ‘হেয়ায়ড্রায়ার’ দিয়ে চুল শুকিয়ে নেয়াও ভালো৷ ডা. বনডর্ফ জানান, সাধারণত কানে পানি ঢুকে ‘ইনফেশন’ হয় গ্রীষ্মকালে৷
ব্যথা সারাতে পেঁয়াজের পুটলি
পেঁয়াজে রয়েছে সংক্রমণ দমনকারী এক পদার্থ, যা কানের ব্যথা বা সংক্রমণে বেশ উপকারী৷ কীভাবে করবেন? প্রথমে একটি বা দুটি পেঁয়াজ ছোট ছোট করে কেটে নিন, তারপর গরম করুন এবং গরম পেঁয়াজের
টুকরোগুলো একটি পরিষ্কার কাপড়ে ঢেলে পুটলি করে নিন৷ লক্ষ্য রাখবেন পেঁয়াজ যেন অতিরিক্ত গরম না হয়৷ পুটলিটাকে যেখানে ব্যথা বা ফোলা সেখানে আধঘণ্টা ধরে রাখুন৷
কানের ব্যথায় অলিভ ওয়েল
আরো একটি উপায় হচ্ছে, কানে ব্যাথা হলে গরম অলিভ ওয়েলে একটি ছোট নরম কাপড় ভিজিয়ে সেটা কানের ঠিক পেছনে কয়েক মিনিট চাপ দিয়ে রাখুন৷ দেখবেন এতে অনেক আরাম বোধ করছেন এবং ব্যথাও
কমে গেছে৷
সাথে জ্বর হলে পেপারমিন্ট বা মেন্থল
কানব্যথা সারাতে পেপারমিন্ট বা মেন্থল যুগ যুগ ধরে ব্যবহার হয়ে আসছে৷ তবে কান ব্যথার সাথে যদি জ্বরও থাকে, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত৷ তাছাড়া ‘ভেষজ ওষুধে যাঁরা বিশ্বাসী নন, তাদের ডাক্তারের পরমর্শ না নিয়ে তা ব্যবহার করাও বুদ্ধিমানের কাজ নয়’– এ কথা বলেন জার্মানির ড্যুসেলডর্ফ শহরের নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ ডা. বনডর্ফ৷
নিজে কান পরিষ্কার না করাই ভালো
‘অনেকে নিজে কান পরিষ্কার করতে গিয়ে হিতে বিপরীত হয়ে থাকে’ – নিজের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন ডা. বনডর্ফ৷ এছাড়াও তার বিশেষ পরামর্শ, ‘দিনে দুই থেকে তিন লিটার পানি পান করুন৷ কারণ
এতে কানের ত্বক বা পর্দার ভেতরে লুকিয়ে থাকা জীবাণুগুলো বেরিয়ে পরিষ্কার হয়ে যায়৷’
সূত্র : ডয়চে ভেল

অর্থনীতি নয়, সমস্যা রাজনীতি by প্রতীক বর্ধন

চরম রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্য দিয়ে ঘোষিত হলো বছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতি। এ পরিস্থিতিতে যা হওয়ার কথা, তা-ই হলো। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহে কোনো উচ্চাভিলাষ নেই এ মুদ্রানীতিতে। দেশের এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীরা অধিক বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না, সেটাই স্বাভাবিক। এতে আমরা যে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলছি, তা অর্জন করা আদৌ সম্ভব হবে না। কারণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্যমতে, ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে বিনিয়োগ-জিডিপির অনুপাত ৩৫ শতাংশ হওয়া বাঞ্ছনীয়। বর্তমানে যার পরিমাণ ২৯ শতাংশ। এদিকে চলমান অবরোধে ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের অবস্থা তথৈবচ। বাজারে ভয়াবহ মন্দা, অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী দিনে হিসাবের খাতাও খুলতে পারছেন না বলে জানা গেছে। আর সামনে আসছে সরকারের নবম পে–স্কেল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বিগত তিনটি পে–স্কেল ঘোষণার পর দেশে মুদ্রাস্ফীতি হয়েছে। এবার পে–স্কেল ঘোষণার পর আরেক দফা মূল্যস্ফীতি হবে বলেই ধারণা করছেন অনেকে। ফলে সব মিলিয়ে আমাদের জন্য সুসময় অপেক্ষা করছে বলে মনে হয় না।
তার পরও দেশের প্রবৃদ্ধির হার ৬-এর কোটায় রয়েছে। এমনকি ২০১৩ সালে ও রকম টালমাটাল পরিস্থিতিতেও প্রবৃদ্ধির হার ৬-এর ঘরে ছিল। এটা আমাদের অর্থনীতির রেজিলিয়েন্স বা ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও যদি হয়, তাহলে এই সক্ষমতা কত ঘাত সহ্য করতে পারবে, সেটাও ভেবে দেখার বিষয়। ব্যবসায়ীরা এ নিয়ে ইতিমধ্যে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। দেশের বড় বড় ব্যবসায়ীর ঋণ পুনঃ তফসিল করা হয়। কিছুদিন আগেও এক দফা তা করা হয়েছে। কিন্তু ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের অবস্থা তো ত্রাহি মধুসূদন, আগেও যা বলেছি। ফলে বৈষম্য ব্যাপক পরিমাণেই আছে। কৃষকদের অবস্থা তো বলার মতো নয়। টানা অবরোধ-হরতালে তাঁরা এবার সবজির দাম পাননি। তাঁরা সাধারণত সবজি বিক্রির টাকাই বোরো ধানে বিনিয়োগ করেন। ফলে স্বাভাবিকভাবে স্থানীয় পর্যায়ে ঋণ নিয়ে তাঁদের এবার বোরো চাষে নামতে হচ্ছে। গত কয়েক বছরের মতো যদি এবারও তাঁরা ধানের যথাযথ দাম না পান, তাহলে তা হবে মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা–এর মতো। কিন্তু এই কৃষকদের বারবার ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি পরিকল্পনায় নেই। তবে জানুয়ারিতে কৃষিঋণের সুদের হার ২ শতাংশ কমিয়ে ১১ শতাংশ করা হয়েছে। এটা ইতিবাচক, তবে কৃষিঋণের সুদের হার ৫ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়।
অনেকেই বলছেন, ২০০৯-১১ সালের মুদ্রানীতির কারণে শেয়ার ও জমির দাম ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। বিনিময় হারে ব্যাপক চাপ পড়ে। আর ২০১২ সাল থেকে মুদ্রানীতিতে সংশোধন আনার ফলে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। কিন্তু ব্যাপারটি কি এতটা সহজ-সরল? দেশের ব্যাংকব্যবস্থায় হল-মার্ক/বিসমিল্লাহর মতো বড় বড় দুর্নীতি হওয়ায় ব্যাংকগুলো তাদের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে স্বাভাবিকভাবেই সুদের হার বাড়িয়ে দেয়। এমনকি সরকারকে বেইল আউটও করতে হয়েছে। জনগণের করের টাকায় এ বেইল আউট হয়েছে। ব্যাংকগুলো মুনাফা কমাতে নারাজ। স্প্রেডের নির্ধারিত হারও কেউ মানেনি সে সময়। শিল্পঋণের সুদের হার ২০ শতাংশের কাছাকাছি চলে যায়। পরিণামে ব্যবসায়ীরা স্বল্প সুদে বিদেশি ঋণের প্রতি ঝুঁকেছেন। লিবরসহ এই ঋণের সুদের হার পাঁচ শতাংশের মতো। ডলারের বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকলে তা ঋণগ্রহীতাদের জন্য আরও সুবিধাজনক হয়। কথা হচ্ছে, সরকার এখন পর্যন্ত এই ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচার করতে পারেনি। সোনালী ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হলেও কোনো পরিচালককে গ্রেপ্তার করা হয়নি। ফলে সমস্যাটা যত না অর্থনৈতিক, তার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক।
শেয়ারের দাম বাড়ার জন্য যত না দায়ী মুদ্রানীতি, তার চেয়ে বেশি দায়ী বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেটগুলো, এটা তো এখন উন্মুক্ত রহস্য। জমির দাম বাড়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। সরকারের যদি বাজার নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা না থাকে, তাহলে মূল্যস্ফীতি বাড়তেই থাকবে। এটার সঙ্গে যেমন মুদ্রানীতির সম্পর্ক আছে, সেটা ঠিক। বাজারে চাহিদা সৃষ্টির পেছনে মুদ্রানীতির বড় ভূমিকা থাকে। যেমন একসময় ফ্ল্যাট কেনায় ব্যাংকগুলো প্রচুর পরিমাণে ঋণ দিত। এতে ফ্ল্যাটের চাহিদা বেড়ে যায়, ফলে তার দামও বাড়ে। দুনিয়ার অনেক দেশেই মুদ্রানীতির কারণে সম্পদমূল্যের বুদ্বুদ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু বাজার নিয়ন্ত্রণকারী সিন্ডিকেটগুলোই মূলত এর জন্য দায়ী। সেই মানুষেরা আবার রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত, নানাভাবেই। তাদের রোখার কেউ নেই। ফলে এই মূল্যবৃদ্ধি যতটা না অর্থনৈতিক শর্তের কারণে ঘটেছে, তার চেয়ে বেশি ঘটেছে রাজনৈতিক কারণে। নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ জোসেফ ই স্টিগলিৎজের কথা এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য: ধনীদের হাতে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হলেও শ্রমিকের মজুরি বাড়ছে না। এটা বাজার অর্থনীতির সাধারণ সূত্রও নয়। বাজার কীভাবে কাজ করে বা কীভাবে কাজ করা উচিত, সেটা কোনো সমস্যা নয়। সমস্যা রয়েছে আমাদের রাজনৈতিক ব্যবস্থায়, এই ব্যবস্থা প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করতে পারেনি। উল্টো এমন নিয়ম করে রাখা হয়েছে, যা এই বিকৃত বাজারব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখছে, যে বাজারে করপোরেশন ও ধনী মানুষেরা সবাইকে শোষণ করছে। টমাস পিকেটি তাঁর সাড়াজাগানো গ্রন্থ ক্যাপিটাল ইন দ্য টোয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরিতে এই বৈষম্যের ব্যাপারটি আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক শুধু প্রবৃদ্ধিতে নজর না দিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিতে নজর দেওয়ার কথা বলছে, এটা ভালো কথা। একই সঙ্গে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে অর্থায়নের কথা বলছে।
অন্যদিকে দেশে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (ফরেন ডিরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট—এফডিআই) আকৃষ্ট করার মতো আইন থাকলেও গ্যাস-বিদ্যুৎসহ অন্যান্য অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারায় দেশে এফডিআইয়ের পরিমাণ উত্তরোত্তর কমছে। দেশি বিনিয়োগ না বাড়ার পেছনে এগুলো অনুঘটকের কাজ করে। সঙ্গে আছে লাগামহীন চাঁদাবাজি। এ বস্তুটি ছাড়া এ দেশে কিছু হয় না!
আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনের (আইএলও) তথ্যমতে, বর্তমানে বাংলাদেশে বেকারের সংখ্যা প্রায় তিন কোটি। বেকারত্বের এই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০১৫ সালে মোট বেকারের সংখ্যা ছয় কোটিতে দাঁড়াবে। শিক্ষাব্যবস্থা যুগোপযোগী না হওয়াও এর অন্যতম কারণ। তবে সামগ্রিকভাবে বেকারত্ব হ্রাসের জন্য সামষ্টিক অর্থনীতির সম্প্রসারণের বিকল্প নেই। তার জন্য দরকার বিনিয়োগ। আর সেই বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে পারে যথাযথ মুদ্রানীতি। সংকোচনমুখী মুদ্রানীতি দিয়ে হয়তো মূল্যস্ফীতিতে লাগাম দেওয়া যাবে। ব্যাংক সুদের হার কমানো যাবে। কিন্তু পণ্যের কোনো চাহিদা না থাকলে সুদের নিম্ন হারের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগে উৎসাহী হবে না। মানুষ ব্যক্তিপর্যায়ে ধার করেও ক্রয়ে উৎসাহী হবে না, যদি তারা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হয় (যেটা তাদের হওয়া উচিত)। রাজনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরণ না ঘটলে এই উদ্বেগ কাটবে না, সেটা স্বাভাবিক। ফলে এই সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির কারণ শুধু অর্থনৈতিক নয়, এর কারণ রাজনৈতিক। স্টিগলিৎজ যথার্থই বলেছেন, আমাদের মূল সমস্যা ‘নির্বোধ রাজনীতি’। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের ভাষ্যমতে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর কারণে প্রবৃদ্ধির হার ৬ শতাংশ বজায় রয়েছে।
প্রতীক বর্ধন: সাংবাদিক ও অনুবাদক।
bardhanprotik@gmail.com

ভয় দেখিয়ে কাউকে পিছপা করা যাবে না -ড. কামাল

সংবিধানের অন্যতম প্রণেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেছেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণ থেকে শিক্ষা নিয়ে চলমান সঙ্কটের সমাধান খুঁজতে হবে। গুম, হত্যার ভয় দেখিয়ে কাউকে পিছপা করা যাবে না। বাঙালি এসবে ভয় পায় না। জনগণের অধিকারের ব্যাপারে কোন আপোষ নয়। নাগরিক অধিকার রক্ষা করতে হলে গুম- হত্যার ভয়ে বসে থাকলে চলবে না। গতকাল রাজধানীর আরামবাগে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে মহানগর নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় শেষে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন। ড. কামাল আরও বলেন, দেশে আইনের শাসন থাকবে না, জবাবদিহিমূলক বিচার ব্যবস্থা থাকবে না- এজন্য  তো বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন করেননি। জনগণ ক্ষমতার মালিক। তারাই অন্যায়ের প্রতিরোধ করবে। পাকিস্তান আমলে তারা মার্শাল ল’কে ভয় করেনি। আমরা বঙ্গবন্ধুর কর্মী হিসেবে কাজ করেছি। তাই আমরা কাউকে ভয় পাই না। আজ লক্ষ্যে পৌঁছাতে বাধা দিলে সেই শক্তি নিয়ে মোকাবিলা করবো। আমরা মুক্তিযোদ্ধাদের উত্তরসূরি।
ঐক্যবদ্ধভাবে জনগণের দাবি আদায় করতে হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, পাকিস্তান আমলেও আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালানো হয়েছে। গুলি চালানোর পেছনে যারা ছিল আজকে তরুণরা তাদের নাম জানে না। কেউ নাম জানলেও তা স্মরণ করে না। ষাটের দশকে সরকার আমাদের অস্ত্রের ভাষায় শেষ করে দিতে চেয়েছিল। পঞ্চাশের দশকে তারা অহংকারের ভাষায় কথা বলেছিল। মুক্তিযুদ্ধে সবাই ঐক্যবদ্ধ ছিল বলেই আমরা তাদের পরাজিত করতে পেরেছিলাম। যে রাজনীতি আমাদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছে সেই রাজনীতি থেকে আমাদের সুস্থ রাজনীতিতে ফিরতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বন্দুক দিয়ে পাকিস্তানিরা সাড়ে সাত কোটি মানুষকে মারতে পারেনি। এখন তো ষোল কোটি মানুষকে মেরে ফেলা সম্ভব না। পেট্রলবোমা মেরে, বিচারবহির্ভূত হত্যা করে মানুষ মেরে শেষ করা যাবে না। মানুষ সুস্থ রাজনীতি চায়। অন্যায়ের সামনে তারা মাথা নত করে না।
দেশে অসুস্থ রাজনীতির চর্চা হচ্ছে দাবি করে ড. কামাল বলেন, বর্তমানে রুগ্‌ণ রাজনীতির বড় আলামত হচ্ছে টাকার ব্যবহার। এটা সুস্থ রাজনীতিতে, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে থাকতে পারে না। জনগণের প্রতিনিধিত্ব করতে হলে কোটি কোটি টাকা নিয়ে নামতে হয়। নির্বাচন বাণিজ্য, মনোনয়ন বাণিজ্য, আইনপ্রয়োগ বাণিজ্য এগুলো অসুস্থ রাজনীতির অবদান। এগুলো থেকে মুক্ত হতে মানুষ চাচ্ছে সুস্থ রাজনীতির জন্য সংগঠিত হতে।
আসন্ন ঢাকা সিটি করপোরেশনের শিডিউলের আগেই বিভিন্ন স্থানে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নামে কিভাবে বিলবোর্ডে টাঙানো হয়েছে সে ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনের কাছে ব্যাখ্যা দাবি করেন ড. কামাল। তিনি বলেন, এসব কাজ বেআইনি। সুষ্ঠু নির্বাচনের পুরোপুরি পরিপন্থি। এটা নির্বাচনী লেবেল প্লেয়িং ফিল্ডের মধ্যে পড়ে না। ড. কামাল এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, কেন কিসের জন্য নির্বাচন কমিশন বিলবোর্ডের ব্যাপারে না দেখার ভান করছে, কেন মুখ বুঝে আছে তা বোধগম্য নয়। নির্বাচন কমিশন যেন অন্ধ হয়ে না থাকে। বিলবোর্ডের টাকার হিসাব হওয়া উচিত। একই সঙ্গে সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে সভা-সমাবেশের সুযোগ দাবি করেন। তিনি বলেন, পুলিশের অনুমতি নিয়ে সভা-সমাবেশ করার অধিকারের নাম সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। দুইজন অসাধারণ সুবিধা পাবে আর বাকিরা পাবে না- তা হতে পারে না। মতবিনিময় সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু, প্রেসিডিয়াম সদস্য এডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক মোশতাক আহমেদ প্রমুখ।

বাচ্চা হাতিটিকে বাঁচানোর লড়াই by আবদুল কুদ্দুস

টেকনাফের নাফ নদী থেকে উদ্ধার হওয়া বাচ্চা হাতিটিকে সুস্থ করে
তুলতে খাওয়ানো হচ্ছে দিনে ২০ লিটার দুধ l প্রথম আলো
বিজিবির টহল দল দেখে পাচারকারীরা নদীতে ছুড়ে ফেলেছিল বাচ্চা হাতিটিকে। লোনা পানি খেয়ে এবং অভুক্ত থেকে দুর্বল হয়ে পড়েছিল প্রাণীটি। তবে ছয় মাস বয়সী শাবকটি বনকর্মীদের তত্ত্বাবধানে নিবিড় পরিচর্যা পাচ্ছে এখন। দৈনিক ২০ লিটার দুধ খেয়ে সুস্থও হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে।
টেকনাফ সীমান্ত থেকে উদ্ধার করা বাচ্চা হাতিটির নতুন আবাস কক্সবাজারের চকরিয়া বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক। ২ মার্চ বিকেলে নাফ নদীতে পাচারকারী চক্রের কাছ থেকে হাতিটিকে উদ্ধার করেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরা। ওই দিন গভীর রাতে বনকর্মীরা এটিকে টেকনাফ থেকে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে নিয়ে আসেন। তবে উদ্ধার হওয়া হাতিটি সম্পর্কে দুই রকম বক্তব্য পাওয়া গেছে বন বিভাগ ও বিজিবির কাছ থেকে। বন বিভাগের দাবি, হাতিটিকে মিয়ানমার থেকে টেকনাফে পাচার করা হচ্ছিল। অপর দিকে, বিজিবি দাবি করেছে, টেকনাফ থেকে মিয়ানমারে পাচারের সময় হাতিটিকে উদ্ধার করা হয়।
৬ মার্চ চকরিয়ার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কে গিয়ে দেখা গেছে, দুধ খেয়ে ও পরিচর্যা পেয়ে অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছে হাতিটি। প্রতিদিন অন্তত ২০ লিটার দুধ দিতে হচ্ছে খাবার হিসেবে।
কী করে উদ্ধার করা হলো হাতিটিকে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে টেকনাফ ৪২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল আবুজার আল জাহিদ বলেন, নৌকাযোগে নাফ নদী দিয়ে মিয়ানমারে হাতি পাচার করা হচ্ছে—এমন খবরের ভিত্তিতে বিজিবির টহল দল নাফ নদীতে নামে। তাদের দেখে পাচারকারীরা নৌকা থেকে বাচ্চা হাতিটি নদীতে ফেলে পালিয়ে যায়। পরে এটি উদ্ধার করে টেকনাফ বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তবে পরিবেশ অধিদপ্তর এবং বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, বাচ্চা হাতিটিকে মিয়ানমার থেকে পাচার করে টেকনাফে আনা হচ্ছিল। এ বিষয়ে কক্সবাজার (দক্ষিণ) বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবদুল আওয়াল সরকার বলেন, বাচ্চা হাতিটি মিয়ানমার থেকে টেকনাফ পাচার হচ্ছিল । ওই দিন রাত ১১টায় হাতিটি টেকনাফ থেকে গাড়িতে করে ডুলাহাজারা বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে পাঠানো হয়। পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী পরিচালক সরদার শরিফুল ইসলাম দাবি করেন, টেকনাফ থেকে হাতির বাচ্চা পাচারের কোনো সুযোগ নেই। স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা খবর দিলে বিজিবির সদস্যরা সমুদ্র উপকূল থেকে হাতিটি উদ্ধার করেন। বন বিভাগের কর্মকর্তাদের অনুমান, সার্কাসে ব্যবহারের জন্য সম্ভবত এই বাচ্চা হাতিটি আনা হচ্ছিল। বাচ্চা হাতি আটকের ঘটনা এই অঞ্চলে এটাই প্রথম বলে জানান তাঁরা।

আই অ্যাম নট অ্যা সায়েনটিস্ট by আবু এন এম ওয়াহিদ

বিজ্ঞান নয়, আজকের নিবন্ধের বিষয়বস্তু রাজনীতি, খাঁটি রাজনীতি। তবে কেন এমন শিরোনাম, একটু ধৈর্য ধরলেই বিষয়টি খোলাসা হয়ে যাবে আপনাদের কাছে। আমি অনেক দিন ধরে আমেরিকায় থাকি এবং এ দেশেরই একজন ন্যাচারালাইজড সিটিজেন, অথচ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৈনন্দিন রাজনীতি সম্পর্কে খুব একটা খোঁজখবর রাখি না। তবে এর মানে এই নয় যে তাৎপর্যপূর্ণ বড় বড় রাজনৈতিক ঘটনা আমি জানি না বা আমার কানে আসে না। কীভাবে আসে, সে কাহিনী লিখতে গেলে অনেক লম্বা হয়ে যাবে, তাই সেদিকে যাচ্ছি না। আসলে এ দেশের চলমান রাজনীতিকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানা ও বোঝার ব্যাপারে কোনোকালেই আমার তেমন কোনো উৎসাহ জন্মায়নি। তবে মজার ব্যাপার হল, আমেরিকার রাজনীতিতে আমি যতটা গাফেল, বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে আবার ততটাই ওয়াকিবহাল থাকার চেষ্টা করি। আপাত দৃষ্টিতে এটি একটি বৈপরীত্য বৈকি। তবে এরও একটি কারণ আছে। সে কথায় পরে আসছি।
বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতিদিনকার খবর জানতে আমার প্রতিদিন কমসেকম ২ ঘণ্টা সময় লাগে। সকালে ঘুম থেকে ওঠে চা-নাস্তা খাওয়ার আগেই আরটিএনএন, শীর্ষ নিউজ, আমাদের সময় ডটকমসহ ঢাকার প্রধান প্রধান জাতীয় দৈনিকের পাতায় একবার চোখ বোলাতেই হয়। দুপুরের পর থেকে পরদিনের ঢাকার কাগজের আপডেট আসতে শুরু করে। আমিও সুযোগ করে দেখতে থাকি। আবার রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আরেকবার সর্বশেষ খবর দেখে নেই। বিছানায় গিয়ে মনে মনে বলি, হে আল্লাহ্, সকালে উঠে যেন দেশের কোনো খারাপ খবর দেখতে না হয়।
আমি কিংবা আমার কোনো ঘনিষ্ঠজন সরাসরি বাংলাদেশী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নয়। অদূর ভবিষ্যতে তেমন আশাও দেখি না। দেশীয় রাজনীতি থেকে কোনো ধরনের ফায়দা হাসিল করার ইচ্ছাও নেই, সেই সুযোগ-সম্ভাবনাও নেই। তথাপি দেশের রাজনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে এত গভীর আগ্রহ কেন, অনেক চিন্তা করেও এর কোনো হদিস পাইনি। তবে আমেরিকার রাজনীতিতে কেন আমার উৎসাহ নেই তার একটি সম্ভাব্য কারণ হয়তো বা বের করতে পেরেছি। উইক এন্ডের দাওয়াত পার্টিতে এ দেশের চেয়ে বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হয় ঢের বেশি। তাছাড়া অফিস-আদালতে, দোকানপাটে বা অন্য কোথাও আমেরিকার রাজনীতি নিয়ে আলাপের বলতে গেলে কোনো সুযোগই নেই। এ দেশের লোকজন মনে করে ধর্মের মতো রাজনীতি এবং রাজনৈতিক বিশ্বাস নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। এটি পরিচিত কিংবা অপরিচিত কারও সঙ্গে শেয়ার করার বিষয় নয়। জানা ও বোঝার জন্য তারা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে আলোচনার চেয়ে টিভি ও নিউজ মিডিয়াকেই বেশি পছন্দ করে। আর কথায় কথায় রাজনৈতিক বিতর্ক তাদের রক্তের মধ্যেই নেই। অপরিচিত লোকজনের সঙ্গে কোথাও একত্রে বসে অলস সময় কাটাতে হলে তারা রাজনীতি বা ধর্মের মতো স্পর্শকাতর বিষয় সচেতনভাবে এড়িয়ে চলে। বরফ গলানোর জন্য কথা বলে দিনের আবহাওয়া, খেলাধুলা, সিনেমা, সঙ্গীত ইত্যাদি নিয়ে। এগুলোকে বলে সফ্ট টক। এ জ্ঞান আমি কোনো বই-পুস্তকে পাইনি। শিখেছি আমার মেয়ের কাছে, যখন সে ইউনিভার্সিটিতে পড়ত।
অবশ্য এ দেশের ছেলেমেয়েদের এসব জানতে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয় না। স্কুলের চৌহদ্দি পেরোবার আগেই তারা আমেরিকার জীবন-সংস্কৃতি বুঝে ফেলে।
শুরুতে ভাবতে পারিনি আজকের ভূমিকা এতটা লম্বা হয়ে যাবে। কোনো কিছু অপ্রাসঙ্গিক লিখে থাকলে পাঠকরা নিজ গুণে ক্ষমা করে দেবেন। ফিরে আসি শিরোনামের বিষয়ে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট প্রতিবছর জানুয়ারি মাসে দেশের সার্বিক পরিস্থিতির ওপর জাতির উদ্দেশে কংগ্রেসের জয়েন্ট সেশনে প্রাইম টাইমে (রাত ৮টা থেকে ৯টা) একটি দীর্ঘ ও গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দিয়ে থাকেন। প্রধান প্রধান টিভি চ্যানেল বক্তৃতাটি লাইভ ব্রডকাস্ট করে থাকে। এটাকে বলে স্টেইট অব দি ইউনিয়ন অ্যাড্রেস। এটি আমেরিকার রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। আমার যেহেতু ইন্টারেস্ট নেই, তাই বছর বছর জানুয়ারি আসে জানুয়ারি যায়, আমি এর কোনো খোঁজখবর রাখি না। প্রেসিডেন্টের স্টেইট অব দি ইউনিয়ন অ্যাড্রেসও শুনি না। এবার কী মনে করে জানুয়ারির ২০ তারিখ সন্ধ্যায় টিভির সামনে অবসর বসেছিলাম। হঠাৎ মনে পড়ল, ওহ! আজ তো প্রেসিডেন্টের স্টেইট অব দি ইউনিয়ন অ্যাড্রেস, শুনি তো তিনি কী বলেন।
এই ভেবে টিভির রিমোট টিপে শুনতে লাগলাম। বিসমিল্লাহতেই বুঝতে বাকি রইল না, বক্তৃতার প্রথম কয়েক মিনিট আমি এরই মধ্যে মিস করে ফেলেছি। শুনতে গিয়ে বুঝলাম বেশ ভালোই লাগছে। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা অনেক সুন্দর সুন্দর কথা মন্ত্রের মতো বলে যাচ্ছেন। আমেরিকার বিদেশনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, স্বাস্থ্যনীতি, পরিবেশ ইত্যাদি বিষয়ে তিনি একজন নোবেল বিজয়ী প্রফেসর কিংবা বিশ্বনন্দিত দার্শনিকের মতো জ্ঞানগর্ভ ভাষণ দিচ্ছেন। মাঝে মধ্যে তিনি যে ধমক-ধামক দেননি তা নয়। তবে এগুলো যে কথার কথা, পলিটিক্যাল রেটোরিক সেটা যেমন তিনি জানেন তেমনি তার শ্রোতারাও বোঝে। এখানেই রাজনীতিকদের সঙ্গে একজন প্রফেসর বা দার্শনিকের পার্থক্য। তবে আমার বুঝতে একটুও অসুবিধা হয়নি যে, তার মূল বক্তব্যের বাণীগুলো একজন দেশপ্রেমিক রাষ্ট্রনায়কের কথার মতো কানে এসে লাগছে, হৃদয় স্পর্শ করে যাচ্ছে। তিনি প্রফেসর না হলেও নোবেল বিজয়ী তো বটে। আর দার্শনিক না হলে চলবে কী করে। ইংরেজিতে একটি কথা আছে না, অল কিংস মাস্ট বি ফিলোসফারস, অ্যান্ড অল ফিলোসফারস মাস্ট বি কিংস। বারাক ওবামা কিং নন বটে, কিন্তু কমই বা কী!
এবারকার বক্তৃতায় তিনি অনেক তাৎপর্যপূর্ণ, গভীর ও গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব কথা আউড়েছেন, যা কি-না নোট করে রাখার মতো। কিন্তু যে বক্তব্যটি আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে তাই আজকের শিরোনাম। আই অ্যাম নট অ্যা সায়েনটিস্ট...। অবশ্য তিনি শুধু একথা বলেই তার বাক্যটি শেষ করেননি। একটু পোজ দিয়ে যুক্ত করেছেন আরেকটি অংশ। ...বাট আই নো সায়েনটিস্টস। দুই অংশ যোগ করলে পুরো বাক্যটি দাঁড়ায় এরকম- আই অ্যাম নট অ্যা সায়েনটিস্ট, বাট আই নো সায়েনটিস্টস। আমার বিদ্যা-বুদ্ধি যাই থাক, প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কণ্ঠে উচ্চারিত এ বাক্যটি যতই হালকা শোনাক না কেন, এর ব্যাপ্তি ও গভীরতা যে অনেক বিস্তৃত ও সুদূরপ্রসারী, তা বুঝতে আমার একটুও অসুবিধা হয়নি। মনে মনে ভাবলাম, কোথায় তারা আর কোথায় আমরা! অর্থাৎ বারাক ওবামা কী বলেন, আর বাংলাদেশের নেতা-নেত্রীরা কী বলেন! আরও মনে হল, বাংলাদেশ ইদানীং সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকে অনেক দূর এগিয়েছে; কিন্তু যে রাজনীতি সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করে তাকে সংস্কৃত ও পরিশীলিত করতে আমার প্রিয় মাতৃভূমিকে আরও অনেক দূর হাঁটতে হবে, অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে এবং দুঃখজনক হলেও সত্য, সে পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়, বরং নিদারুণ কণ্টকাকীর্ণ।
এবার দেখা যাক বারাক ওবামার কথাটার মানে কী। তিনি বলেছেন, আই অ্যাম নট অ্যা সায়েনটিস্ট, বাট আই নো সায়েনটিস্টস। বারাক ওবামা একজন আইন বিশারদ, তিনি রাজনীতিক, তিনি দেশের প্রেসিডেন্ট, তিনি রাষ্ট্রনায়ক। জাতির কাছে তিনি অকপটে স্বীকার করছেন তিনি বিজ্ঞান জানেন না, তিনি বিজ্ঞানী নন। এখানেই শেষ নয়, তিনি আরও বলছেন, তিনি বিজ্ঞানীদের জানেন, বিজ্ঞানীদের চেনেন। এর মানে কী? এর অর্থ, তিনি বিজ্ঞান বিষয়ে বিজ্ঞানীদের সঙ্গে কথা বলেন, তাদের কাছ থেকে জানেন, তাদের কথা ধৈর্য ধরে শোনেন, তাদের থেকে শেখেন, তাদের বুদ্ধি পরামর্শ নেন। তার চেয়ে বড় কথা, তাদের পরামর্শ মতো তিনি দেশের বিজ্ঞানবিষয়ক নীতিনির্ধারণ করে থাকেন। এটা শুধু মুখের কথা নয়, বাস্তবে এর প্রতিফলন আমরা প্রতিনিয়ত দেখতে পাই। রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে শুধু বিজ্ঞান বিষয়েই নয়, বরং সব বিষয়েই তিনি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে থাকেন এবং সেই মতো কাজও করেন।
পক্ষান্তরে বাংলাদেশে কী হয়, নেত্রী কমিটি করে দেন। কমিটি অলোচনা করে বিতর্ক করে দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ, কোনো কোনো সময় মাসের পর মাস। কমিটি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদেরও পরামর্শ নেয়। সবশেষে রিপোর্ট তৈরি হয়। অনেক সময় সে রিপোর্ট আলোর মুখ দেখে না। যাও বা দু-একটা রিপোর্ট বের হয়, চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত রিপোর্ট অনুযায়ী হয় না, হয় মহাশক্তিধর এক ব্যক্তির গায়েবি হুকুমে। যতদিন গায়েবি হুকুমে দেশ চলবে, ততদিন ভূতের আগুনে দেশ জ্বলবে, পুড়বে মানুষ, ধ্বংস হবে অর্থনীতি, ভেঙে পড়বে যাতায়াত ব্যবস্থা, ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিক্ষা কার্যক্রম, দুর্বল হবে সামাজিক বন্ধন, আরও কতকিছু। প্রতিকারের জন্য দেশবাসী লড়বে ভূতের সঙ্গে, যেন বাংলাদেশের সব অঘটনের জন্য ভূতই দায়ী! আজ দেশে যে আগুন জ্বলছে তার দায় কেউ নিচ্ছে না। যারা প্রতিদিন খুন-গুম হচ্ছে তাদেরও দায় নেয়ার কেউ নেই। যেমন নেই মীমাংসিত নির্বাচন ব্যবস্থাকে অমীমাংসিত করার দায় নেয়ার কেউ। আবু এন এম ওয়াহিদ : অধ্যাপক, টেনেসি স্টেইট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র
wahid2569@gmail.com