Thursday, September 18, 2025

প্রতিরক্ষা চুক্তি সই: পাকিস্তান ও সৌদি আরবের যে কারও ওপর হামলা হলে যৌথভাবে জবাব দেবে দুই দেশ

পাকিস্তান ও সৌদি আরব ‘কৌশলগত যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ সই করেছে। বুধবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে দেশটির যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এ চুক্তি সই করেন। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো একটি দেশ আক্রান্ত হলে সেটাকে দুই দেশের ওপর ‘আগ্রাসন’ হিসেবে দেখবে রিয়াদ ও ইসলামাবাদ।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, রিয়াদের ইয়ামামা প্রাসাদে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে শাহবাজ শরিফের বৈঠক হয়। সেখানে দুই নেতা চুক্তিতে সই করেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং যেকোনো আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যৌথ প্রতিরোধ জোরদার করার লক্ষ্যে দুই দেশের নিরাপত্তা বৃদ্ধি ও নিজেদের সুরক্ষিত করা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি অর্জনের জন্য উভয় দেশের অভিন্ন প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন ঘটেছে এই চুক্তিতে।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ইসলামাবাদ ও রিয়াদের মধ্যে ‘প্রায় আট দশকের ঐতিহাসিক অংশীদারত্ব...ভ্রাতৃত্ব ও ইসলামি সংহতির বন্ধন...অভিন্ন কৌশলগত স্বার্থ এবং ঘনিষ্ঠ প্রতিরক্ষা সহযোগিতার’ ভিত্তিতে এ চুক্তি সই করা হয়েছে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর বলেছে, দু্ই পক্ষ ও তাদের প্রতিনিধিদল উভয় দেশের মধ্যে ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ক পর্যালোচনা করেছে। একই সঙ্গে দুই পক্ষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে পর্যালোচনা করা হয়েছে।

এর আগে সৌদি আরব সফররত শাহবাজ শরিফ ইয়ামামা প্রাসাদে পৌঁছালে তাঁকে অভ্যর্থনা জানান সৌদি যুবরাজ। এ সময় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। পরে সৌদি আরবের যুবরাজের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে বৈঠক করেন তিনি।

চুক্তি সই অনুষ্ঠানে বাঁ থেকে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। সৌদি আরবের রিয়াদে, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫
চুক্তি সই অনুষ্ঠানে বাঁ থেকে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খালিদ বিন সালমান, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ও পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। সৌদি আরবের রিয়াদে, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৫ ছবি: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর

গাজায় ইসরাইলি সেনাদের মানসিক ভাঙন ও যুদ্ধ-অপরাধের সাক্ষ্য

হারেৎজের রিপোর্টঃ ধ্বংসস্তূপের ভেতর দিয়ে হাঁটছে নাহাল ব্রিগেডের একদল সেনা। চারপাশে ভাঙাচোরা বাড়ি। দেয়ালের ধ্বংসাবশেষ। সেখানে একসময় মানুষ বেঁচে ছিল। সেনাদের কাজ হচ্ছে ‘তল্লাশি অভিযান’ চালানো। এরপরই আসবে বুলডোজার। তা ধ্বংসস্তূপের ওপর আরও ধ্বংস চাপিয়ে দেবে। সেনারা ঘিরে দাঁড়ায়। পাহারা দেয়, যেন কেবল ভারী যন্ত্রপাতির নিরাপত্তারক্ষী তারা। ইয়োনি ছদ্মনামের ওই সেনা বলেন, কখনো ভাবিনি আমার সামরিক জীবনে এ কাজ করতে হবে। গাজায় ইসরাইলের চালানো নৃসংসতা নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন এভাবেই তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু গত মে মাসে বেইত লাহিয়ায় ভয়ঙ্কর কিছু ঘটে। ‘সন্ত্রাসী, সন্ত্রাসী’- এক সেনা চিৎকার করতেই ইয়োনি উন্মত্ত হয়ে মেশিনগান থেকে শত শত গুলি ছুড়তে থাকেন। পরে বুঝতে পারেন ভীষণ ভুল হয়েছে। সন্ত্রাসী নয়- দুই শিশু, বয়স হয়তো ৮ বা ১০। ইয়োনি বলেন, সব জায়গায় রক্ত। আমি জানতাম সব আমারই কাজ। বমি করতে ইচ্ছে করছিল। কোম্পানি কমান্ডার এসে ঠাণ্ডা গলায় বলেন, তারা নির্মূল জোনে ঢুকেছে। তাদেরই দোষ, এটাই যুদ্ধ।

ইয়োনি মানসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করে জানতে পারেন, তিনি নৈতিক আঘাতের শিকার। যেখানে নিজ মূল্যবোধের বিপরীতে কাজ করতে হয়। পরবর্তীতে তাকে যুদ্ধ থেকে সরিয়ে সাপোর্ট ভূমিকায় দেয়া হয়। কিন্তু শিশু দু’টির মুখ তাকে তাড়া করে ফিরছে। বিনই ছদ্মনামের আরেক সেনা নাহাল ব্রিগেডের স্নাইপার। প্রতিদিন ভোর থেকে তার কাজ-  উত্তর গাজায় ত্রাণবাহী ট্রাক পাহারা। এক অদৃশ্য রেখা টেনে দেয়া হয়েছে। কেউ সেটা অতিক্রম করলে স্নাইপারের গুলি। তিনি বলেন, প্রতিদিন ৫০-৬০টি গুলি চালাই। গুনে রাখি না। অনেকজনকে মেরেছি। শিশুদেরও। অনেক সময় গুলি করতে না চাইলেও কর্মকর্তারা রেডিওতে চাপ দেন, কেন গুলি করছ না? তারা এগিয়ে আসছে, বিপজ্জনক। তিনি বলেন, আমাকে জোর করে শিশুর ওপরও গুলি চালাতে বাধ্য করেছে। এতে আমার জীবন ক্ষতবিক্ষত হয়ে গেছে। এখন রাতে দুঃস্বপ্নে কাঁপতে কাঁপতে জেগে উঠি। কখনো প্রস্রাব ধরে রাখতে পারেন না, মনে হয় মৃতদেহের গন্ধ পাচ্ছেন।

অ্যারন নামের আরেক সেনা বলেন, বেইত হানুনে এক অভিযানে হঠাৎ বিস্ফোরণে সবাই ভেবেছিল হামলা হয়েছে। অযথাই গুলি চালানো হয়। পরে জানা যায়, সেনাদের নিজেরাই ভুলবশত বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। এরপর বাড়ি ফিরে তিনি বুঝতে পারেন শরীর কাঁপছে, বাজারে শিশুদের চিৎকারেও ভয়ে আঁতকে উঠছেন। কমান্ডারকে মানসিক স্বাস্থ্যকর্মীর কাছে যাওয়ার অনুরোধ করলে অপমান করা হয়, তুমি কি পালাতে চাইছ? তুমি কি বিশ্বাসঘাতক? অনেক টানাপোড়েন শেষে তাকে সাপোর্ট প্লাটুনে বদলি করা হয়।
একই সময়ে গাজায় বহু সেনা মানসিক বিপর্যয়ে পড়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। এক প্লাটুনে তো এক সেনা বন্দুক মুখে দিয়ে বসেছিল। অফিসার কটাক্ষ করে বলেছিল, ট্রিগার টানলে ছুটি কাটা যাবে। সহযোদ্ধারাই অস্ত্র কাড়তে বাধ্য হয়েছিল। পরে ওই সৈন্যকে মানসিক স্বাস্থ্যকর্মী দেখে সেনাবাহিনী থেকে অব্যাহতি দেয়। আরও একজন প্রকৌশলী কর্মকর্তা গত জুলাই মাসে পরিবারকে লিখেছেন, একটা অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে, আমি ঠিক আছি। পরের দিন তিনি নিজেই গ্রেনেড বিস্ফোরণে আত্মহত্যা করেন।
আইডিএফ এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে নেসেটে আলোচনায় প্রকাশিত হয়েছে- যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ১১৩৫ জন সেনা ও রিজার্ভিস্ট পিটিএসডি কারণে ছাড়পত্র পেয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আসল সংখ্যা আরও অনেক বেশি। অনেকেই সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে লজিস্টিক, ড্রাইভার বা রাঁধুনি হতে চাইছে। নাহাল, গিভাতি ও সাঁজোয়া ব্রিগেডে ডজন ডজন সেনা ইতিমধ্যেই কমব্যাট থেকে সরে গেছে।

এক সেনা স্বীকার করেন, তারা ভুলবশত এক নারী ও দুই শিশুকে হত্যা করেছে। তার ভাষায়, আমরা তিনটি অবয়ব দেখেছিলাম। আদেশ মেনে গুলি চালিয়েছি। এর পর তিনজন সহযোদ্ধা পিটিএসডিতে ভেঙে পড়েন। কিন্তু সেনা কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেয়নি। কখনো বন্দুকধারী অফিসার নিজের সেনার পায়ে গুলি চালিয়েছিল মজা করার নামে। আরেকজন বলল, আমি আর পারছি না। অর্থহীন মিশন- সবকিছুর অবসান চাই।

mzamin

বিহারে মুসলিম ও বিজেপিবিরোধী ভোটারদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে

নিউইয়র্ক টাইমসঃ বিহারের ভোটার তালিকা যাচাই–বাছাই নিয়ে সৃষ্ট বিতর্ক নিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস–এ লিখেছেন মুজিব মাশালহরি কুমার। ১৩ সেপ্টেম্বর লেখাটি তাদের অনলাইন সংস্করণে প্রকাশ করা হয়।

ভারতের বিহার রাজ্যের নির্বাচন কর্মকর্তা–কর্মচারীদের এই গ্রীষ্মে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত কঠিন। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রাজ্যের প্রায় ৮ কোটি যোগ্য ভোটারের পরিচয় যাচাই–বাছাই করতে হবে তাঁদের।

নির্বাচনী কর্মীদের কাজ বিভিন্ন কারণে আরও জটিল হয়ে উঠেছিল। ওই সময় ছিল রাজ্যে ফসল কাটার সময়, তা ছাড়া তখন রাজ্যে চলছিল প্রবল বন্যা। ভারতের অন্যতম দরিদ্র রাজ্য বিহারের লাখ লাখ মানুষ কাজের সন্ধানে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাচ্ছিলেন।

ভারতের নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ নিয়েও ছিল বিভ্রান্তি। এই পুরো প্রক্রিয়াটি আইনি ও রাজনৈতিক লড়াইয়ের বিষয়ে পরিণত হওয়ায় নির্বাচন কর্মীদের ওপর আরও চাপ তৈরি হয়।

এত সমস্যা থাকার পরও নির্বাচন কমিশন সময়মতো একটি খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করে। ওই তালিকায় রাজ্যের ৬৫ লাখ মানুষের নাম বাদ দেওয়া হয়। কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, তাঁদের মধ্যে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মৃত এবং বাকিরা অন্য কোথাও চলে গেছেন বা তাঁদের নাম একাধিকবার তালিকায় ছিল।

কিন্তু নির্বাচন কমিশন মৃত বলে বাদ দেওয়া কিছু মানুষ দিব্যি বেঁচে আছেন বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। ভারতের বিরোধী দলগুলো ওই সব ব্যক্তির কয়েকজনকে রাজধানী নয়াদিল্লিতে এনে হাজির করেছিল। তারা এটিকে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করে বোঝাতে চেয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নির্বাচনকে প্রভাবিত করার কৌশলের অংশ হিসেবেই এই পরিচয় যাচাই–বাছাইয়ের প্রক্রিয়াটি চালাচ্ছে।

কিছু দিন আগে নয়াদিল্লিতে ভারতের কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী মৃত হিসেবে বিহারের ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়া প্রায় অর্ধডজন ভোটারকে ঠাট্টা করে বলেন, ‘আমি তো শুনলাম আপনারা বেঁচে নেই?’

রাহুল গান্ধী এবং অন্যান্য বিরোধী নেতারা তাড়াহুড়া করে চালানো এই যাচাই–বাছাই প্রক্রিয়ার ওপর ভিত্তি করে ভারতের ভোট ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ভারতে গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা সংকুচিত হলেও এতদিন পর্যন্ত ভোটব্যবস্থায় অন্তত স্বচ্ছতা ছিল।

১৩ কোটি মানুষের একটি রাজ্য বিহারে গত বছর মোদির জোটের দুই ডজনের বেশি সদস্য লোকসভায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর ফলেই প্রধানমন্ত্রী হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের জাতীয় নির্বাচনে তৃতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসতে সক্ষম হন। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে নির্ধারিত হবে, বিহারে কে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে।

বিরোধী নেতাদের মতে, এত দ্রুত ও ব্যাপকভাবে ভোটার তালিকা সংশোধন করার অর্থ হলো, বিগত দুটি নির্বাচনের কোনোটিই বিশ্বাসযোগ্য নয়। গত নির্বাচন হয় ত্রুটিপূর্ণ ভোটার তালিকার ওপর ভিত্তি করে হয়েছিল, নতুবা ক্ষমতাসীন দল আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কিছু ভোটারকে বাদ দিয়ে ফলাফল নিজেদের পক্ষে আনার চেষ্টা করছে।

বিরোধীরা মোদির দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে, দলটি মুসলিম ও এমন সব গোষ্ঠীকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করছে, যাঁরা নির্বাচনে তাদের সমর্থন করবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। মোদির দল গত বছরের জাতীয় নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালেও জোটের প্রধান হিসেবে ক্ষমতায় টিকে আছে।

এই প্রক্রিয়ায় বর্তমান ভোটারদের নিজেদের পরিচয় প্রমাণ করার জন্য এমন সব শর্ত দেওয়া হয়েছে, বিশেষজ্ঞরা এটিকে ১৯০০-এর দশকের প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যখন সাক্ষরতা পরীক্ষা ও জটিলतনথিপত্রের মাধ্যমে কৃষ্ণাঙ্গদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো।

এই বিতর্ক ভারতের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছে। এটি এখন তীব্র রাজনৈতিক কাদা ছোড়াছুড়ির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ফলস্বরূপ এক দীর্ঘস্থায়ী জটিলতার সৃষ্টি হয়েছে।

দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে আলাপকালে নির্বাচনী কর্মী, ভোটার ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পুরো প্রক্রিয়াটি নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত নিয়ম মেনে সম্পন্ন হয়নি। ফলে আরও নির্ভরযোগ্য ভোটার তালিকা তৈরির আশা ম্লান হয়ে গেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, কীভাবে কমিশন মাত্র কয়েক মাস আগে নিয়মিত তালিকা সংশোধনের সময় ২২ লাখ মৃত মানুষের নাম বাদ দিতে ব্যর্থ হলো।

নির্বাচন কর্মকর্তারা এই প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধীদের তোলা লাখ লাখ অভিযোগ এবং সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের কঠোর সমালোচনার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তাঁরা জানিয়েছেন, প্রক্রিয়াটি এগিয়ে চলেছে এবং শিগগিরই শেষ হবে।

মোদির দল বিরোধীদের দাবিকে উড়িয়ে দিয়ে বলেছে, বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের দেশে নির্বাচনে পরাজিত দলগুলোই ভারতের গণতন্ত্রকে ছোট করার চেষ্টা করছে। তারা এই ভোটার যাচাই–বাছাই প্রক্রিয়াকে দেশব্যাপী ‘অনুপ্রবেশকারী’ খুঁজে বের করার অভিযানের সূচনা হিসেবে বর্ণনা করেছে। এই শব্দটি দিয়ে দৃশ্যত বাংলাদেশি অভিবাসীদের বোঝানো হলেও মোদির দলের সমর্থকেরা প্রায়শই মুসলিমদের বিরুদ্ধে এসব বৈষম্যমূলক শব্দ ব্যবহার করে থাকে।

বিরোধীদের দাবির জবাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বিজেপির নেতা অনুরাগ ঠাকুর ভোটের অনিয়ম নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেন। তিনি দাবি করেন, ভারতের কয়েকটি বিরোধীশাসিত রাজ্যের মধ্যে অন্যতম পশ্চিমবঙ্গে ‘ব্যাপক হারে’ অতিরিক্ত ভোটারের নাম তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে। বিরোধী নেতারা যেসব অঞ্চলে জিতেছেন, সেখানে হাজার হাজার সন্দেহজনক ও ভুয়া ভোটার রয়েছে।

অনুরাগ ঠাকুর বলেন, বিরোধীরা তাদের অনুপ্রবেশকারীদের ভোটব্যাংক বাঁচাতে চায়।

রাহুল গান্ধী বলেছেন, বেশ কয়েকটি নির্বাচনে তাঁর জোটের শরিকরা ফলাফল দেখে হতবাক হয়েছেন। কারণ, জনমত জরিপে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস থাকলেও তারা বিপুল ভোটে হেরে গেছেন। তারা মহারাষ্ট্র ও কর্ণাটকের সাম্প্রতিক নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ সংগ্রহ করা শুরু করেছেন। তাঁরা নিজেরাই প্রমাণ সংগ্রহ করছেন। কারণ, নির্বাচন কমিশন তাঁদের সঙ্গে তথ্য ভাগ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার বিরোধীদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, বিরোধী নেতাদের হয় শপথ নিয়ে অভিযোগ করতে হবে, নতুবা ক্ষমা চাইতে হবে। তবে তিনি অনুরাগ ঠাকুরের করা নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রশ্ন তুলে বলেন, নির্বাচন কমিশন কি কারও মা, বোন বা পুত্রবধূর সিসিটিভি ভিডিও শেয়ার করবে?

কোন ধরনের নথিপত্র পরিচয়পত্র হিসেবে গণ্য হবে—সেই প্রশ্নটি বিহারের এই সন্দেহ–উদ্বেগের মূলে রয়েছে।

নির্বাচন কমিশন রাজ্যের সব ভোটারকে একটি ফর্ম পূরণ করে এবং তালিকাভুক্ত ১১টি নথির মধ্যে যেকোনো একটি জমা দিয়ে তাদের ভোটাধিকার প্রমাণ করতে বলেছিল। কিন্তু এই তালিকায় সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পরিচয়পত্রগুলোই বাদ দেওয়া হয়েছিল, যার মধ্যে নির্বাচন কমিশনের দেওয়া ভোটার আইডি কার্ড এবং আধার কার্ডও ছিল।

অথচ গত দশকে মোদি সরকার ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা থেকে শুরু করে মোবাইল সিম কেনা পর্যন্ত—সবকিছুর জন্য আধার কার্ডকে অপরিহার্য করে তুলেছে।

আরও বিভ্রান্তিকর বিষয় হলো—অনুমোদিত ১১টি নথির মধ্যে অনেকগুলোই আধার কার্ডের ভিত্তিতে তৈরি হয়।

বিহারের একটি নাগরিক সমাজ গোষ্ঠী ‘দলিত বিকাশ অভিযান সমিতি’–এর নির্বাহী পরিচালক ধর্মেন্দ্র কুমার সরকারের প্রতি প্রশ্ন তুলে বলেছেন, ‘আপনারা সবকিছুর জন্য আধারকে জরুরি করেছেন; মানুষকে লাইনে দাঁড় করিয়ে আধার কার্ড করিয়েছেন। তাহলে এখন কেন এটি ব্যবহার করা হচ্ছে না?’

ভারতের সুপ্রিম কোর্ট নির্বাচন কমিশনকে আধারকে বৈধ পরিচয়পত্র হিসেবে যুক্ত করতে নির্দেশনা দিলেও কমিশন বারবার গড়িমসি করেছে এবং নথি জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ার পর এটি মানতে রাজি হয়েছে।

তবে বিহারের মাঠপর্যায়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনেক স্থানীয় নির্বাচন কর্মী বলেছেন, প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই তাঁদের আধার কার্ডকে পরিচয়পত্র হিসেবে গ্রহণ করা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। কারণ, এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল, বহু মানুষের কাছে তালিকাভুক্ত অন্য কোনো নথি ছিল না।

এই কাজ শেষ করতে না পারলে বরখাস্ত হওয়া বা বেতন কেটে নেওয়ার হুমকির মুখে পড়ে কিছু নির্বাচন কর্মী অনুমানের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। যেমন—কর্মীরা পারিবারিক বৃক্ষ তৈরি করে সেটির ছবিকে পরিচয়পত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তারা ধরে নিয়েছেন, যদি কারও বাবা বা মা আগের ভোটার তালিকায় থাকেন, তাহলে তাদের সন্তানেরাও ভোট দেওয়ার যোগ্য।

সমালোচকরা বলছেন, এই যাচাই–বাছাইয়ে ভোটারদের জন্য ছিল চরম বিভ্রান্তি এবং কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে ছিল স্বচ্ছতার অভাব—যা একটি স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরির আশাকে নষ্ট করে দিয়েছে।

নির্বাচন কমিশন বলেছে, আগস্টের শেষ নাগাদ এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী ৭ কোটি ২০ লাখ ভোটারের ৯৮ শতাংশ তাদের নথি জমা দিয়েছেন। তবে, যাচাই–বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কোন কোন পরিচয়পত্র গ্রহণ করা হয়েছে, সে সম্পর্কিত তথ্যের বিষয়ে ই–মেইলে করা প্রশ্নের কোনো উত্তর কমিশনের কর্মকর্তারা দেননি।

বিহারের বিরোধী নেতা তেজস্বী যাদব অভিযোগ করেছেন, সংশোধিত খসড়া তালিকার ওপর ভিত্তি করে কেবল নির্বাচন কর্মীদের অনুমান অনুযায়ী প্রতিটি বিধানসভা আসনে ২৫ থেকে ৩০ হাজার ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। নিরপেক্ষ মূল্যায়ন থেকে দেখা গেছে, রাজ্যের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে গত নির্বাচনের জয়ের ব্যবধানের চেয়েও গড়ে বেশিসংখ্যক নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে।

তেজস্বী যাদব বলেন, ‘আপনি কল্পনা করতে পারেন, জয়ের ব্যবধান খুবই কম ছিল।’

সুপ্রিম কোর্ট কমিশনকে অভিযোগের নিষ্পত্তি চালিয়ে যেতে বলেছে এবং নভেম্বরে প্রত্যাশিত বিধানসভা ভোটের আগে শুনানি প্রক্রিয়া চলতে থাকবে। তবে যাঁরা কাজের জন্য রাজ্যের বাইরে থাকেন বা যাঁদের ডিজিটাল জ্ঞান কম বা ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ নেই, তাঁদের জন্য অভিযোগ দায়ের করা সহজ নয়।

পাটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার বলেন, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই তাঁর স্ত্রীর নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি একজন নির্বাচন কর্মীর সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। আশা করছেন, তিনি এই ভুল ঠিক করতে পারবেন। কিন্তু তিনি অন্যদের নিয়ে চিন্তিত।

অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার বলেন, ‘কেবল অগ্রসর শ্রেণির শ্রেণির মানুষই এসব ভুল সংশোধন করতে পারবেন।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-15%2Fld9hxemp%2Fbihar-protest.jpg?rect=0%2C0%2C686%2C457&w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
বিহার রাজ্যে নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ভোটার তালিকা যাচাই–বাছাই নিয়ে নয়াদিল্লিতে গত মাসে বিরোধী সংসদ সদস্যদের বিক্ষোভ। ছবি: রয়টার্স

অনেক কাজ করেছি, যা দেশের ইতিহাসে হয়নি: আসিফ নজরুল

আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অল্প সময়ে তিনি এমন অনেক কাজ করেছেন, যা দেশের ইতিহাসে হয়নি।

বুধবার বিকেলে সিলেটের একটি হোটেলের হলরুমে ‘জারিকৃত আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) অধ্যাদেশ-২০২৫: মামলাপূর্ব মধ্যস্থতার বাধ্যতামূলক বিধান’ কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার জবাবে আসিফ নজরুল বলেন, ‘সবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম রয়েছে, যার যা ইচ্ছা, লিখে দেওয়া যায়। আমি প্রায়ই শুনি, “আপনি কী করেছেন? শহীদের রক্তের ওপর দিয়ে বসেছেন, আমরা আপনাকে বসিয়েছি, আপনি কী করেছেন?” আমি বুঝতে পারি না, আনসারটা কী হবে। আমি ফুটবল প্লেয়ার নই, কিংবা মঞ্চনাটকের অভিনেতাও নই, আমি যেটা করব, আপনি দেখতে পারবেন।’

আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘আজকে লিগ্যাল এইডের কথা বললাম। এর আগে অনেক কাজ করেছি, যা কোনো দিন বাংলাদেশের ইতিহাসে হয়নি। আমরা সিভিল আদালত, ক্রিমিনাল আদালত পৃথক করেছি, যাতে সিভিল আদালতের নিষ্পত্তি বাড়ে, যাতে মামলার নিষ্পত্তি দ্রুতগামী হয়। আগে কোনো দিন বাংলাদেশে এটা করা হয়নি। আমরা বিচারিক পদ সৃজনের ক্ষমতা সেটা আগে পলিটিক্যাল মন্ত্রীদের হাতে ছিল, এটা চিফ জাস্টিসের কাছে নিয়ে গেছি। যে ফাইল নিজের হাতে নিয়ে চিফ অ্যাডভাইজারের কাছে সাইন করিয়েছি। পিয়নের মতো করে গিয়ে ওনার হাত থেকে সাইন করে নিয়েছি। সে রকম প্রায় সোয়া দুই শ বিচারকের পদ এক দিনে সৃষ্টি হয়েছে। আমরা এমন একটা ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট করেছি, যার জন্য বাংলাদেশে সমালোচনা হয়নি। দেওয়ানি কার্যবিধি আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধি আইনে ব্যাপক সংস্কার করা হয়েছে, যেটা আগে হয় নাই।’

আসিফ নজরুল দাবি করেন, তাঁর মন্ত্রণালয়ে সারা বাংলাদেশ থেকে খুঁজে সবচেয়ে সৎ, সবচেয়ে যোগ্য অফিসারদের নিয়ে এসেছেন। তাঁরা দিনে–রাতে কাজ করছেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, তাঁরা যে পরিবর্তনগুলো করে দিয়েছেন, যে সংস্কার এনেছেন, তা রাজনৈতিক সরকার ধরে রাখলে ন্যায়বিচার বৃদ্ধি পাবে। দরিদ্র, অসহায় মানুষের আইনগত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ অবারিত হবে। বিনা খরচে দ্রুততম সময়ে আইনগত সহায়তা পাবেন তাঁরা।

জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার আয়োজনে আইনগত সহায়তা প্রদান কার্যক্রমকে সম্প্রসারণ এবং অধিকতর গতিশীল, জনবাবন্ধব ও সহজলভ্য করতে গত ১ জুলাই আইনগত সহায়তা প্রদান (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ জারি করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়নে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে এই অধ্যাদেশের তফসিলভুক্ত বিষয়গুলোতে (পারিবারিক বিরোধ, পিতা-মাতার ভরণপোষণ, বাড়িভাড়া, যৌতুক ইত্যাদি) সিলেটসহ ১২টি জেলায় মামলাপূর্ব মধ্যস্থতার বাধ্যতামূলক বিধান বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর করা হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে আসিফ নজরুল বলেন, ‘লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে যে বিরোধ নিষ্পত্তি হয়, সেটা প্রচলিত আদালতের বিরোধ নিষ্পত্তির চেয়ে ১০ ভাগের ১ ভাগ কম সময় লাগে। প্রচলিত আদালতে যদি পাঁচ বছর লাগে, লিগ্যাল এইডে সেটি নিষ্পত্তি করতে তিন থেকে ছয় মাস সময় লাগে, এত পার্থক্য। লিগ্যাল এইড অফিসে যে নিষ্পত্তিগুলো হয়, সেখানে ৯০ শতাংশ মানুষ সেটিসফায়েড থাকে। অর্থাৎ লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে যে সলিউশনটা পায়, পরে তারা কোর্টে যায় না। ১০০ জনের মধ্যে ৯০ জন্যই আর কোর্টে যায় না। অথচ প্রচলিত আদালতে যে মামলা হয়, দেখবেন বিচারিক আদালতে রায় হওয়ার পরও কেউ উচ্চতর আদালতে যায় আপিল করার জন্য। কাজেই দেখলাম যে লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে সন্তুষ্ট লোকের সংখ্যাও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সন্তুষ্ট লোকের চাইতে অনেক বেশি। এটা এমন একটা বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা যেখানে কম সময় লাগে, অনেক কম টাকা লাগে, অনেক কম ভোগান্তি হয়, অনেক বেশি মানুষ সন্তুষ্ট থাকে।’

লিগ্যাল এইড আগে বাধ্যতামূলক ছিল না মন্তব্য করে আইন উপদেষ্টা বলেন, ‘এবার আমরা মামলার জট কমাতে বাধ্যতামূলক করেছি। আপনাকে প্রথমে লিগ্যাল এইডে যেতে হবে। সেখানে যাওয়ার পর অসন্তুষ্টি থাকলে আদালতে যেতে পারবেন। কিন্তু প্রথমে লিগ্যাল এইডে যেতে হবে। এটা আমরা করেছি ১ নম্বর পরিবর্তন। আমাদের একটা ইচ্ছা ও বিশ্বাস আছে, এটা ঠিকমতো করতে পারলে মামলার জট কমে যাবে। মানুষের হয়রানি কমে যাবে, বিশেষ করে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য অপূর্ব অভাবনীয় সুযোগ তৈরি হয়েছে ন্যায়বিচার পাওয়ার জন্য।’

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার নির্বাহী পরিচালক শেখ আশফাকুর রহমান, সিলেট জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হালিম উল্লাহ চৌধুরী এবং বন্ধুরাষ্ট্র ও উন্নয়ন সহযোগীদের পক্ষে দুজন প্রতিনিধি বক্তব্য দেন। এর আগে মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা বিষয়ে নাটক প্রদর্শন করা হয়।

এদিকে সকালে সিলেটে পৌঁছে আইন উপদেষ্টা সিলেটের দক্ষিণ সুরমার আলমপুরে টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টারের (টিটিসি) প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। পরে সিলেটের পর্যটনকেন্দ্র রাতারগুল পরিদর্শনে যান তিনি।

https://media.prothomalo.com/prothomalo-bangla%2F2025-09-17%2Fev3dh6ry%2FSylhetDH048620250917Sylhet-Pic-18.JPG?w=622&auto=format%2Ccompress&fmt=avif
জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থার উদ্যোগে এবং সিলেট জেলা লিগ্যাল এইড কমিটির সহযোগিতায় জেলা পর্যায়ে আইনগত সহায়তা সম্পর্কিত সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। বুধবার বিকেলে গ্র্যান্ড সিলেট হোটেলের মিলনায়তনে। ছবি: প্রথম আলো

‘যুদ্ধ’ নয়, ইসরাইল একটি জনগোষ্ঠীকে ধ্বংস করছে: সাবেক সিআইএ কর্মকর্তার নিবন্ধ by পল আর. পিলার

গাজা উপত্যকায় যুদ্ধবিরতি ও মানবিক বিপর্যয়ের অবসান ঘটানোর সম্ভাবনা আগের মতোই ক্ষীণ। কাতারে হামাসের সঙ্গে কাতারি ও মিশরীয় মধ্যস্থতায় হওয়া আলোচনাসভা থেকে ইসরাইল ও মার্কিন প্রতিনিধিরা বেরিয়ে গেছেন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখন ‘বিকল্প’ উপায়ে গাজায় ইসরাইলের লক্ষ্য অর্জনের কথা বলছেন। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প, যিনি হামাসকে দোষারোপে নেতানিয়াহুর সুরেই কথা বলছেন, দাবি করেছেন, হামাস আসলে চুক্তি করতে চায়নি। আমি মনে করি তারা মরতে চায়। এরপর তিনি বলেন, ‘‘কাজটা শেষ করতে হবে,’ যার ইঙ্গিত ছিল গাজা ও তার বাসিন্দাদের ওপর ইসরাইলের চলমান ধ্বংসযজ্ঞের দিকে।’

আমি বহু বছর ধরেই যুদ্ধবিরতির আলোচনা নিয়ে ভাবছি। প্রায় ৫০ বছর আগে আমি একটি বই লিখেছিলাম— 'নেগোশিয়েটিং পিস: ওয়ার টার্মিনেশন এজ এ বার্গেইনিং প্রসেস’ যেখানে দেখানো হয়েছিল কীভাবে দুই পক্ষ যুদ্ধের মধ্যেই শান্তি প্রতিষ্ঠার কূটনৈতিক ও সামরিক প্রক্রিয়াগুলো অনুসরণ করে। কিন্তু গাজায় এখন যা ঘটছে তা মূলত কোনো যুদ্ধ নয়—যদিও প্রচলিতভাবে একে ‘যুদ্ধ’ বলা হয়। এটি বরং একটি একতরফা হামলা, যা একটি জনগোষ্ঠী ও তাদের জীবনধারণের উপায়গুলোকে ধ্বংস করছে। এটি এমন এক পরিস্থিতি যেখানে একটি পক্ষ—ইসরাইল—ট্রাম্পের ভাষায় ‘সব কার্ড হাতে রেখেছে।’

গাজা থেকে প্রতিদিনই যে খবর আসছে, তা মূলত ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ও হামাস যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘর্ষ নয়। বরং সেগুলো সাধারণত গাজার মানুষের ওপর, বিশেষ করে বেসামরিক জনগণের ওপর, ইসরাইলের চালানো ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের বিবরণ—যা ২০২৩ সালের শেষ ভাগে এই হত্যাযজ্ঞের নতুন পর্যায় শুরু হওয়ার পর থেকে গড়ে প্রতিদিন ১৫০ জন মৃত্যুর হার বজায় রেখেছে। এসব বেসামরিক মানুষদের অনেকে নিহত হচ্ছেন বিমান হামলায়, আবার অনেকেই গুলিবিদ্ধ হচ্ছেন খাবার সংগ্রহের চেষ্টা করার সময়।

গণ-অনাহার এখন গাজার সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিপর্যয়ে পরিণত হয়েছে, যেখানে ইসরাইয়েল আবারও দায় চাপানোর চেষ্টা করছে হামাসের ওপর। ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরেই জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ বন্ধের পক্ষে যুক্তি দিয়ে আসছে এই অভিযোগ তুলে যে হামাস নাকি সংস্থার বিতরণকৃত খাদ্য চুরি করছিল। ট্রাম্পও এই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করেছেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের আগে যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা  ইউএসএইড যে গবেষণা চালায়, তাতে গাজায় মার্কিন ত্রাণ চুরি বা হারিয়ে যাওয়ার যেসব ঘটনা রিপোর্ট হয়েছিল, তার কোথাও হামাসের মাধ্যমে সহায়তা চুরি বা অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার কোনও প্রমাণ মেলেনি। সাম্প্রতিক সংবাদ প্রতিবেদনে এমনকি আইডিএফ নিজেও স্বীকার করেছে, হামাসের ত্রাণ ছিনিয়ে নেয়ার কোনও প্রমাণ তারা পায়নি।

আসলে ইসরাইলের ইউএনআরডব্লিউএ-বিরোধিতা হামাস বা ত্রাণ চুরি নিয়ে নয়। বরং এটা সংস্থাটির মূল পরিচয় নিয়ে—ইউএনআরডব্লিউএ একটি জাতিসংঘ সংস্থা যা সরাসরি ফিলিস্তিনিদের জন্য কাজ করে—যা ফিলিস্তিনিদের ‘একটি জাতি’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দেয় এবং তাদের অনেকেই নিজভূমি থেকে বিতাড়িত শরণার্থী—এটিই ইসরাইল মেনে নিতে চায় না। যখন ইসরাইল ইউএনআরডব্লিউএ-কে কার্যত সরিয়ে দিতে সফল হয়, তখন গাজার মানবিক পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে পড়ে। মার্কিন সমর্থনপুষ্ট এবং ইসরাইলি নিয়ন্ত্রিত ‘বিকল্প’ সহায়তা ব্যবস্থাটি শুধু অপ্রতুল নয়, বরং সেটি পরিকল্পিতভাবে ইসরাইলের জাতিগত নির্মূল অভিযানের অংশ। ত্রাণ বিতরণকে মাত্র কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ রাখার উদ্দেশ্য হচ্ছে জীবিত গাজাবাসীদের জোর করে এক ধরনের ঘেরা শিবিরে পাঠানো—যেটিকে ভবিষ্যতে গাজা উপত্যকা থেকে পুরোপুরি বিতাড়নের প্রস্তুতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সম্প্রতি কিছু ত্রাণ বিমান থেকে গাজায় ফেলা হয়েছে। কিন্তু এই বিমান থেকে ত্রাণ সরবরাহ পদ্ধতি অত্যন্ত অকার্যকর ও অদক্ষ। সরবরাহের পরিমাণ অত্যন্ত সীমিত, যা প্রকৃত চাহিদার সামান্য অংশও পূরণ করতে পারে না। এতে খরচও অনেক বেশি পড়ে। এমনকি পূর্ববর্তী মার্কিন চেষ্টায় দেখা গেছে, কিছু ত্রাণ সামগ্রী সাগরে পড়ে নষ্ট হয়, আর কিছু আবার ত্রাণ ফেলার সময় মানুষের ওপর পড়ে মৃত্যু ঘটায়। তবুও কিছু দাতার কাছে এটি একটি দৃশ্যত মানবিক কিন্তু কার্যত অকার্যকর ‘অন্তরাত্মা শান্ত রাখার’ কৌশল। ইসরাইলের জন্য এটি আরেক ধাপ এগিয়ে প্রকৃত বাস্তবতা থেকে দৃষ্টি ঘোরানোর উপায়—যে গাজার ভেতরে ত্রাণ পৌঁছাতে সবচেয়ে বড় বাধা হচ্ছে ইসরাইলের স্থল অবরোধ। এই ধোঁকা রক্ষা করতে গিয়েই ইসরাইলও এখন বিমান থেকে ত্রাণ ফেলা শুরু করেছে। কিন্তু একই সময়ে, তারা স্থলপথে ত্রাণ প্রবেশ কার্যত বন্ধ রেখেছে—ফলে শত শত ত্রাণবাহী ট্রাক নষ্ট হয়ে পড়ে থাকছে বা আইডিএফ সেগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে।

আমার বহু দশক আগের বইয়ে আমি যুদ্ধ সমাপ্তির একটি বিকল্প রূপ চিহ্নিত করেছিলাম—‘বিনাশ/বিতাড়ন।’ এর অর্থ সামরিকভাবে প্রভাবশালী পক্ষটি তার প্রতিপক্ষকে হয় সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয় অথবা বিতাড়ন করে দেয় বিরোধপূর্ণ অঞ্চল থেকে। গাজায় ইসরাইলের উদ্দেশ্যকে ‘বিনাশ/বিতাড়ন’ বলা একেবারে যথার্থ। গাজার ক্ষেত্রে ইসরাইলের কাছে ‘শত্রু’ বলতে পুরো ফিলিস্তিনি জনগণকেই বোঝানো হয়—এই দৃষ্টিভঙ্গি হামাসের ২০২৩ সালের অক্টোবর হামলার আগেই ডানপন্থী ইসরাইলি রাজনীতিতে গেঁথে ছিল এবং এখন তা আরও গভীর ও ব্যাপক হয়েছে। এখন পর্যন্ত আইডিএফ-এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংঘটিত প্রাণহানিই ইসরাইলের ‘বিনাশ’ লক্ষ্যকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে। আর ‘বিতাড়নের’ দিকটি এতদিন অভ্যন্তরীণ আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলেও সেটি প্রকাশ্যে আসে যখন ট্রাম্প নেতানিয়াহুর সরকারকে ‘গাজায় রিভিয়েরা প্রকল্প’ দিয়ে জাতিগত নির্মূলতায় আনুষ্ঠানিক সমর্থন দেন।

যতটুকু হামাসকে ‘শত্রু’ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে, ততটুকু ইসরাইলের এই বিনাশ পরিকল্পনা আরও খোলামেলা। ট্রাম্প প্রশাসন ইসরাইলের বহুবার ঘোষিত হামাসকে নির্মূল করার লক্ষ্যকে প্রকাশ্য সমর্থন দিয়েছে। ২০২৪ সালে আইডিএফ-কে উদ্দেশ্য করে বক্তৃতায় নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমরা হামাস নেতৃত্বকে হত্যা করব’ এবং এই হত্যা ও গাজা উপত্যকার প্রতিটি প্রান্তে অভিযান চালানোই ‘সম্পূর্ণ বিজয়’-এর অংশ, যা সামরিক অভিযান শেষ হওয়ার আগে অর্জন করতে হবে। এই ‘বিনাশ/বিতাড়ন’-এর লক্ষ্য কোনোভাবেই একটি শান্তিচুক্তিকে সম্ভব করে না। কেউ তার নিজের ধ্বংস নিয়ে কখনো চুক্তি করে না। নেতানিয়াহুর আরও কিছু ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক কারণ রয়েছে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার। এর মধ্যে রয়েছে তার দুর্নীতির মামলার বিচার এড়ানো এবং ডানপন্থী উগ্রবাদী জোটকে টিকিয়ে রাখা—যারা ফিলিস্তিনিদের নির্মূল ও বিতাড়নে সবচেয়ে কট্টর এবং যুদ্ধবিরতির ঘোরতর বিরোধী।

এই সরকারের কাছে ‘যুদ্ধবিরতি’ মানে কখনোই গাজায় শান্তির দিকে অগ্রসর হওয়া নয়। বরং এটি সাময়িক বিরতি—সরবরাহ পুনর্বিন্যাস, কূটনৈতিক চাপ কমানো, অথবা কোনো সুবিধাজনক কৌশলের জন্য। যেমনটা দেখা গেছে এ বছরের শুরুতে যুদ্ধবিরতির সময়—ইসরাইল যখন ইচ্ছা, তখনই তা ভঙ্গ করেছে। হামাস অনেক আগেই যুদ্ধবিরতির পক্ষে ছিল। কেনই বা হবে না? তাদের অনেক নেতাই নিহত হয়েছেন, প্রতিরোধ ক্ষমতাও মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। গাজাবাসীর দুর্ভোগ যত দীর্ঘ হবে, হামাসকে দায়ী করে তাদের সমর্থন ততই হ্রাস পাবে। সংঘাত চলতে থাকলে হামাসের আর কিছুই লাভ নেই, বরং ক্ষতি ছাড়া কিছুই নেই।

২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে যেসব যুদ্ধবিরতি আলোচনা হয়েছে, তাতে মূল দ্বন্দ্ব ছিল এই—হামাস স্থায়ী যুদ্ধশেষ চায়, ইসরাইল চায় আক্রমণ আবার শুরু করার সুযোগ ধরে রাখতে। হামাস চেষ্টা করেছে গাজাবাসীদের জন্য মানবিক সহায়তা, গাজা শহর ও ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার, এবং ইসরাইলে বন্দি কিছু ফিলিস্তিনির মুক্তির মতো দাবিগুলোর মাধ্যমে কিছুটা স্বস্তি আদায় করতে। সাম্প্রতিক কাতারের আলোচনায় অভ্যন্তরীণ নথিপত্রে দেখা যায়—হামাসের আলোচকরা কাতারি ও মিশরীয় মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে অত্যন্ত মনোযোগ ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে। হামাস মধ্যস্থতাকারীদের প্রণীত কাঠামো চুক্তির বেশিরভাগ বিষয়েই সম্মত হয়।

হামাস যে সংশোধন প্রস্তাবগুলো দেয়, সেগুলো মূলত ছিল ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকদের জন্য বেশি সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট ভাষা সংযোজনের উদ্দেশ্যে। যেমন, ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের ক্ষেত্রে জানুয়ারি ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি অনুযায়ী অস্পষ্ট ‘কাছাকাছি অঞ্চল’ শব্দের বদলে তারা চেয়েছিল মানচিত্র অনুযায়ী নির্দিষ্ট রেখা নির্ধারণ। এ জন্য তারা নিজেদের প্রস্তাবনাও দিয়েছিল, যেখানে পার্থক্য ছিল মাত্র ১০০ থেকে ২০০ মিটার। বন্দি বিনিময়ের ক্ষেত্রেও তারা চেয়েছিল নির্দিষ্ট সংখ্যা নির্ধারণ—যেন ইসরাইলি বন্দিদের সংখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকে। ত্রাণের ক্ষেত্রে তারা চাইছিল জাতিসংঘের মাধ্যমে পরিচালনা এবং রাফাহ সীমান্ত আবার খুলে দেয়া। এই সমস্ত বিষয়ে আন্তরিক আলোচনার পর হামাস গভীরভাবে বিস্মিত হয় যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল হঠাৎ করে আলোচনার টেবিল ছেড়ে চলে যায় এবং ট্রাম্প হামাসকে দোষারোপ করেন আলোচনা ভেঙে পড়ার জন্য।

ট্রাম্পের দাবি, ‘হামাস আসলে চুক্তি করতে চায়নি, তারা মরতে চায়,— এটা পুরোপুরি ভিত্তিহীন। কাতারের আলোচনা ভেঙে পড়ে কারণ নেতানিয়াহুর সরকার এই মুহূর্তে কোনো চুক্তি করতে চায়নি। যুক্তরাষ্ট্র বরাবরের মতো নেতানিয়াহুর পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে। গাজায় চলমান বিপর্যয়ের জন্য হামাসকে দোষারোপ করা মানে ফিলিস্তিনিদের প্রতিরোধ আন্দোলনকে—হামাস হোক বা অন্য যেকোনো দল—দায়ী করা, যেন তারাই সহিংসতার উৎস। অথচ প্রকৃত সহিংসতা এসেছে একটি জনগোষ্ঠীর দমন, দখল ও অধিকার হরণ থেকে—যার ফলশ্রুতি এই প্রতিরোধ। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু অতীতে হামাসকে আজকের মতো ‘অশুভ শক্তি’ মনে করেননি। বরং, তিনি হামাসকে কাতারি আর্থিক সহায়তা পৌঁছাতে সহায়তা করেছিলেন, যেন সেটি ফাতাহ-নিয়ন্ত্রিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে একটি পাল্টা শক্তি হিসেবে দাঁড়ায়।

এই কৌশল ছিল ইসরাইলের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার অংশ, ফিলিস্তিনিদের বিভক্ত রাখা, যাতে ইসরাইল সবসময় বলতে পারে ‘আমাদের আলোচনার কোনো সঙ্গী নেই।’ যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের শক্তিশালী লবিও এই বক্তব্য তুলে ধরে। এই পন্থাই প্রমাণ করে ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে শান্তিচুক্তি করতে ইসরাইল আগ্রহী নয়।

(পল আর. পিলার, জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর সিকিউরিটি স্টাডিজের নন-রেসিডেন্ট সিনিয়র ফেলো, কুইন্সি ইনস্টিটিউট ফর রেসপনসিবল  স্ট্যাটক্রাফট-এর ফেলো এবং জেনেভা সেন্টার ফর সিকিউরিটি পলিসির অ্যাসোসিয়েট ফেলো। তিনি ১৯৭৭-২০০৫ পর্যন্ত সিআইএ কর্মকর্তা ছিলেন। নিবন্ধটি রেস্পন্সিবল স্ট্যাটক্রাফট-এ প্রকাশিত তার ‘দিস ইজ নট এ ওয়ার—ইসরাইল ইজ ডেস্ট্রায়িং এ পপ্যুলেশন’ শীর্ষক প্রবন্ধের অনুবাদ।)

mzamin

আমেরিকানদের হাতে সময় আছে মাত্র ৪০০ দিন by টিমোথি গার্টন অ্যাশ

আমি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপে ফিরেছি এক প্রবল উদ্বেগ নিয়ে। ফেরার সময় আমার মনে হয়েছে আমেরিকার গণতন্ত্রপ্রেমীদের হাতে দেশটির গণতন্ত্র বাঁচানোর লড়াই শুরু করার জন্য আর মাত্র ৪০০ দিন হাতে আছে।

আগামী বছরের শরতে যদি এমন এক কংগ্রেস গঠিত হয়, যা ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতার লাগাম টানতে পারবে, তাহলেই নির্বাহী ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের প্রস্তুতির জন্য পরের ৭০০ দিন কাজে লাগানো যাবে। এটাই এই প্রজাতন্ত্রকে রক্ষার একমাত্র পথ। এর নাম দেওয়া যেতে পারে ‘আমেরিকান গণতন্ত্র রক্ষার অভিযান’—প্রথম ধাপ ও দ্বিতীয় ধাপ।

এটাকে কি বাড়াবাড়ি বা আতঙ্ক ছড়ানো বলা যায়? আমার মনে হয় না। কারণ, গত গ্রীষ্মে সাত সপ্তাহ আমেরিকায় কাটিয়ে আমি দেখেছি ট্রাম্প কী ভয়ানক গতিতে ও নির্মমতায় দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক রীতিনীতিকে ভেঙে দিচ্ছেন। আরও হতাশাজনক ব্যাপার হলো তাঁর বিরুদ্ধে সেখানে প্রতিরোধ প্রায় নেই বললেই চলে।

আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বলে, একবার কোনো উদার গণতন্ত্র ভাঙতে শুরু করলে সেটিকে পুনর্গঠন করা প্রায় অসম্ভব। ধ্বংস করা সহজ, কিন্তু নতুন করে গড়া ভীষণ কঠিন।

তাই দল বা মত যা–ই হোক, সব গণতন্ত্রপন্থীরই এখন কামনা করা উচিত—২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর প্রতিনিধি পরিষদ ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণে ফিরুক। ডেমোক্র্যাটদের নীতি বা নেতৃত্ব নয় (যা নিজেই দুর্বল ও এলোমেলো); বরং গণতন্ত্রের স্বার্থেই তা ফিরুক।

সংবিধান কংগ্রেসকে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার প্রধান নিয়ন্ত্রণকারী করেছে। কিন্তু রিপাবলিকানরা (যাঁরা এখন ট্রাম্পের ভয়ে ও প্রভাবে বন্দী) যতক্ষণ দুই কক্ষই নিয়ন্ত্রণে রাখবে, ততক্ষণ সেই দায়িত্ব পালিত হবে না।

অনেকে এই পরিস্থিতির সঙ্গে তিরিশের দশকের ইউরোপের কর্তৃত্ববাদী উত্থান বা হাঙ্গেরির ভিক্তর অরবানের ক্ষমতা কুক্ষিগত করার কৌশলের তুলনা করছেন। কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠছে আমেরিকার নিজস্ব কিছু বৈশিষ্ট্য। যেমন নির্বাহী শাখার অতিরিক্ত ক্ষমতা, নির্বাচনী সীমানা কারসাজি, রাজনৈতিক সহিংসতার গভীর শিকড়, আর এক স্বৈরশাসককে সহায়তা করে এমন চরম পুঁজিবাদী প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি।

আমেরিকায় প্রেসিডেন্টের অতিরিক্ত ক্ষমতা নিয়ে শঙ্কার বিষয়টি নতুন কিছু নয়। এই রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তা ছিল। বিপ্লবী যুদ্ধের নায়ক প্যাট্রিক হেনরি সংবিধান অনুমোদনের বিরোধিতা করেছিলেন এই আশঙ্কায়, কোনো একদিন কোনো অপরাধী প্রেসিডেন্ট কার্যত ‘আমেরিকার সিংহাসনে’ বসে পড়তে পারেন। পরে ২০ শতকে দুই দলের প্রেসিডেন্টই ধীরে ধীরে সংবিধানের দ্বিতীয় অনুচ্ছেদের অস্পষ্ট ‘নির্বাহী ক্ষমতা’ আরও বাড়াতে থাকেন।

সাম্প্রতিক সময়ে রক্ষণশীল সুপ্রিম কোর্টও এই ক্ষমতার ব্যাপক ব্যাখ্যা দিয়ে ‘ইউনিটারি এক্সিকিউটিভ থিওরি’র পক্ষে দাঁড়িয়েছে। এখন ট্রাম্প প্রশাসন ২০১৭ সালের মতো অপ্রস্তুত নয়। এই বাড়তি ক্ষমতা ও ফাঁকফোকর নির্মমভাবে কাজে লাগাচ্ছে তারা। তারা এখন আইন ভাঙছে, আদালতের রায় মানছে না।

একইভাবে নির্বাচনী সীমানা কারসাজির সমস্যাও বহু পুরোনো। ‘গেরিম্যান্ডারিং’ (নির্বাচনী এলাকার সীমানা এমনভাবে কারসাজি করা, যাতে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা গোষ্ঠী বাড়তি সুবিধা পায়) শব্দটি চালু হয়েছিল ১৮১২ সালে। কিন্তু আজকের বিভক্ত আমেরিকান রাজনীতিতে এটা নতুন মাত্রা পেয়েছে।

২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা দেয়, তারা দলীয় গেরিম্যান্ডারিং ঠেকাতে পারবে না, শুধু বর্ণভিত্তিক কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারবে। এর ফল হলো এখন ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে টেক্সাসে এমনভাবে সীমানা বদলানো হচ্ছে, যাতে রিপাবলিকানরা পাঁচটি অতিরিক্ত আসন পায়।

জবাবে ক্যালিফোর্নিয়া বলছে, তারাও পাল্টা কারসাজি করে ডেমোক্র্যাটদের পাঁচটি আসন বাড়াবে। অর্থাৎ নির্বাচনের মতো মৌলিক প্রক্রিয়াতেও এখন ন্যায্যতার ভান পর্যন্ত নেই।

সহিংসতা যুক্তরাষ্ট্রে এতটাই সাধারণ হয়ে গেছে যে ইউরোপের কোনো দেশ তার সঙ্গে তুলনীয় নয়। প্রায় প্রতিদিনের খবরেই কোনো না কোনো সহিংস অপরাধের খবর থাকে। আর তার সঙ্গে ভয়াবহ স্কুলে গুলিবর্ষণের ঘটনা থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে অস্ত্রের সংখ্যা মানুষের চেয়ে বেশি। ফ্রান্স রাজনৈতিক নাটক উপভোগ করে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নাটক হলো ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটলে জনতার হামলা।

সম্প্রতি আবার ডানপন্থী কর্মী চার্লি কার্ককে গুলি করা হয়েছে। হত্যাকারীর পরিচয় প্রকাশের আগেই ইলন মাস্ক ঘোষণা দিয়েছেন, ‘বামপন্থীরাই হত্যাকারীদের দল’। আর ট্রাম্প দায় চাপালেন ‘চরম বামপন্থীদের ঘৃণা ছড়ানো বক্তৃতা’র ওপর।

এ অবস্থায় যদি দেশটি ষাটের দশকের মতো রাজনৈতিক সহিংসতার নিম্নগামী চক্রে না পড়ে, তবে তা এক অলৌকিক ঘটনাই হবে। অথচ ট্রাম্প চাইলে এটিকে অজুহাত করে ১৮০৭ সালের ইনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট জারি করতে পারেন, যাতে সেনা রাস্তায় নামানো যায় এবং জরুরি অবস্থার নামে আরও ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা যায়।

এসবের মধ্যেই সবচেয়ে হতাশাজনক হলো প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা। বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসায়ী নেতা, আইন সংস্থা, গণমাধ্যম, প্রযুক্তিজগৎ—কারও পক্ষেই সম্মিলিতভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো সম্ভব হয়নি। কেউ চুপ করে থেকেছে, কেউ লজ্জাজনকভাবে মাথা নত করেছে। আবার কেউ কেউ প্রেসিডেন্টকে খুশি করার চেষ্টা করেছে, যেমন মার্ক জাকারবার্গ।

কেন? কারণ, সবাই মুক্তবাজার প্রতিযোগিতার যুক্তিতে চলে এবং প্রতিশোধের ভয়ে থাকে। আমি কখনো ভাবিনি আমেরিকার মতো দেশে ভয় এত দ্রুত এবং এত বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

এখন এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভোটার দমন ও অযোগ্য ঘোষণার চেষ্টা, আর ট্রাম্পের ডাকযোগে ভোট নিষিদ্ধ করার হুমকি। ফলে আগামী বছরের নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু হবে, তা নিয়েই প্রশ্ন। কাজেই সব গণতন্ত্রপন্থীর দায়িত্ব হলো নির্বাচন যতটা সম্ভব সুষ্ঠু করার চেষ্টা করা। আর ডেমোক্র্যাটদের দায়িত্ব হলো এসব বাধা সত্ত্বেও জয়লাভ করা।

২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। কিন্তু আপাতত গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রথম নিয়মই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ মধ্যবর্তী নির্বাচনে গণতন্ত্রীদের জিততেই হবে।

* টিমোথি গার্টন অ্যাশ, দ্য গার্ডিয়ান-এর কলাম লেখক
- দ্য গার্ডিয়ান থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্ত আকারে অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ

‘আমি কখনো ভাবিনি আমেরিকার মতো দেশে ভয় এত দ্রুত এবং এত বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।’
‘আমি কখনো ভাবিনি আমেরিকার মতো দেশে ভয় এত দ্রুত এবং এত বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে।’ ছবি: এএফপি

নির্বাসিত তিব্বতি সাবেক প্রধানমন্ত্রী বললেন নেপালে চীনা দূতাবাসের হস্তক্ষেপ, ভারতের জন্য সতর্কবার্তা

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর স্থানীয় বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে চীনা দূতাবাসের কর্মকর্তারা, বিশেষ করে নেপালে। এমন অভিযোগ তুলেছেন তিব্বতের  নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী লবসাং সাংয়ে। একইসঙ্গে তিনি ভারতকেও বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। ভারতের বার্তা সংস্থা এএনআইয়ের এক পডকাস্টে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে সাংয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন চীনের ‘বিস্তারবাদী’ নীতির বিষয়ে এবং ভারতের প্রভাব খর্ব করার উদ্দেশ্যে চীনের প্রচেষ্টার ব্যাপারে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া। যখন তাকে প্রশ্ন করা হয়, ভারতও কি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশের মতো বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার স্বার্থে তিব্বত প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলে কি না, তখন সাংয়ে বলেন- তিনি মনে করেন না ভারত সেই পথ অনুসরণ করছে।

তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, চীন পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে। যাতে ভারতের প্রভাবকে সীমিত করা যায়। সাংয়ে বলেন, ভারতের চীনের সঙ্গে বড় স্বার্থ জড়িত। শুধু তিব্বত নয়, শুধু সীমান্ত এলাকা নয়। সব প্রতিবেশী দেশেই তাকান। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া হোক বা মধ্য এশিয়া- যেখানেই ভারত প্রভাব বিস্তার করতে চায় বা সম্পর্ক গড়তে চায়, চীন সবসময় সেখানে উপস্থিত থেকে ‘চেকমেট’ করার চেষ্টা করছে।

নেপালের উদাহরণ টেনে তিনি অভিযোগ করেন, চীনা কর্মকর্তারা কাঠমান্ডুতে ‘সবচেয়ে প্রভাবশালী শক্তি’ হয়ে উঠেছেন, ‘সম্ভবত ভারতীয় বা মার্কিন দূতাবাসের চেয়েও বেশি প্রভাবশালী।’ তিনি বলেন, একই ধরনের হস্তক্ষেপ ভুটান, বাংলাদেশ এবং শ্রীলঙ্কাতেও দৃশ্যমান। সাংয়ের ভাষায়, তারা এসে হস্তক্ষেপ করে, প্রভাব খাটায়। আমি বলছি না তারা আপনাকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু তারা আপনার ঘরের ভেতরে প্রবেশ করছে। তিনি বলেন, আপনি যে বড় প্রশ্ন তুললেন- এশিয়ায় কত দেশ তিব্বতের বিষয়ে কথা বলবে, কারণ তারা চীনের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চায় না- এটা একদিকে সত্যি। কিন্তু অন্যদিকে আমরা বলি, তিব্বতে যা ঘটেছে, তা একদিন আপনাদের সঙ্গেও ঘটবে। যদি আপনি তিব্বতের ইতিহাস বুঝতে ও অধ্যয়ন করতে না চান, তাহলে একই ঘটনা আপনার দেশেও ঘটবে।

নেপালের দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ধরা যাক নেপাল- তারা আগে বিশ্বাস করত না, তাই না? এখন হ্যাঁ, চীনা দূতাবাস ও কর্মকর্তারা স্থানীয় বিষয়ে হস্তক্ষেপ করছে। কাঠমান্ডুতে চীনা দূতাবাস সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিশালী- ভারতীয় বা আমেরিকান দূতাবাসের চেয়েও বেশি, অনেকে এমনটাই বলে। সাংয়ে জানান, চীন যেভাবে পুরোপুরি তিব্বতের ওপর ভৌত নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে, সেটাই সবচেয়ে বড় পার্থক্য। কিন্তু অন্যান্য দেশে তাদের রাজনৈতিক প্রভাব এবং দূতাবাসের মাধ্যমে হস্তক্ষেপ এখন সুস্পষ্ট বাস্তবতা। তিনি আরও বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের তিব্বত সফরগুলো আসলে ভারতের জন্য কৌশলগত বার্তা। সীমান্ত ভাগাভাগি ও অঞ্চলে চীনের ব্যাপক সেনা মোতায়েনের দিকটি উল্লেখ করে সাংয়ে বলেন, শি-এর সর্বশেষ সেনাদের উদ্দেশে দেয়া বক্তৃতার প্রতিলিপি প্রকাশিত হয়নি- যেটি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বেইজিং সফরের সঙ্গে মিলে যায়। তবে সাংয়ে দাবি করেন, তিনি ‘নিশ্চিত’ যে এতে ভারতবিরোধী যুদ্ধ বা অনুপ্রবেশের প্রস্তুতির বার্তাই দেয়া হয়েছে।

নিজের অভিজ্ঞতা স্মরণ করে সাংয়ে বলেন, তিব্বতি জনগণ দেশ ছাড়ার পর অস্থায়ী আশ্রয় পেয়েছিল ভারতে। ‘একজন বৌদ্ধ হিসেবে আমরা অস্থায়িত্বে বিশ্বাস করি। একবার দেশ হারালে, আপনি যাযাবর হয়ে যান,’- তিনি বলেন। ভারত হয়ে উঠেছিল তাদের ‘বাসস্থান’, যদিও বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। তিনি আরও বলেন, ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গে তার স্থায়ী বন্ধন রয়েছে। যখনই আমি ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দর দিয়ে বের হই, দিল্লির বাতাসের গন্ধ পেলেই মনটা শান্ত হয়ে যায়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, তিব্বতি ও ভারতীয়দের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ়। যখনই আমি ভারতীয়দের সঙ্গে দেখা করি, সঙ্গে সঙ্গে বলি ‘নমস্কার’... তখনই বন্ধুত্ব হয়ে যায়।
সাংয়ে স্মরণ করেন, তার ২০১১ থেকে ২০২১ মেয়াদে বহুবার ভারত-চীন সম্পর্কের উষ্ণতার সময় চীনের চাপ বেড়েছিল।

২০১৮ সালের ‘থ্যাঙ্ক ইউ ইন্ডিয়া’ অনুষ্ঠান উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ওই সময়ে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ায় ভারত সরকার কর্মকর্তাদের অংশ না নিতে পরামর্শ দিয়েছিল, ফলে অনুষ্ঠান সীমিত আকারে পালিত হয়। তবুও সাংয়ে জোর দিয়ে বলেন, ভারত সবসময় তিব্বতিদের পাশে থেকেছে। কোনো দল বা কোনো ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হোক না কেন, ভারত সবসময় তিব্বতিদের ভালোভাবে দেখেছে। তিব্বতিদের জন্য এর চেয়ে ভালো আতিথেয় আমরা কল্পনা করতে পারি না- তিনি বলেন। তিব্বতি পরিচয়, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রক্ষার পেছনে ভারতের সহায়তাকেই তিনি কৃতিত্ব দেন।

mzamin

ট্রাম্পের আপত্তি সত্ত্বেও রাশিয়ার তেল কিনতে কেন অনড় নরেন্দ্র মোদি

সিএনএনের এক্সপ্লেইনার:- যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার সঙ্গে এক কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছেন নরেন্দ্র মোদি। একদিকে ট্রাম্প ও ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছেন, অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকার চেষ্টা করছেন তিনি। তবে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে ভারতের এ দ্বিমুখী নীতি হতাশার।

মস্কোর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক দেশ নানাভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলেও ভারতের মতো বিশাল অর্থনীতির একটি দেশ রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখায় তাদের সেসব নিষেধাজ্ঞা অনেকটা দুর্বল হয়ে যায় বলে মনে করে তারা। আর এসব নিয়েই চটেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

নয়াদিল্লির এমন নীতি নিয়ে আর ধৈর্য ধরতে পারছেন না প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ফলে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির কাছে তাঁর স্পষ্ট দাবি, ভারতকে নির্দিষ্ট একটি পক্ষ নিতে হবে।

নিজের এ দাবি জোরদার করতে রাশিয়া থেকে ভারতের সস্তায় অপরিশোধিত জ্বালানি তেল কেনার বিষয়টিকে কাজে লাগাচ্ছেন ট্রাম্প। আর এখানে তিনি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন তাঁর বহুল আলোচিত বাণিজ্যনীতি। ফলে এত দিন পরস্পর ‘বন্ধু’ দাবি করে এলেও ধীরে ধীরে মুখোমুখি অবস্থানে চলে যাচ্ছেন ট্রাম্প ও মোদি।

রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে গত বুধবার ভারতের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন ট্রাম্প। ফলে আগের ২৫ শতাংশ পাল্টা শুল্কসহ ভারতীয় পণ্যে মোট ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করল যুক্তরাষ্ট্র। ২১ দিন পর এ নতুন শুল্কহার কার্যকর হবে। এর আগে গতকাল বৃহস্পতিবার থেকে কার্যকর হয়েছে প্রথম দফায় আরোপ করা ২৫ শতাংশ শুল্ক।

বাড়তি শুল্ক আরোপ করার বিষয়ে আগেই ভারতকে হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তখন তাঁর অভিযোগ ছিল, রাশিয়া থেকে তেল কিনে ইউক্রেনে হামলায় মস্কোকে সহায়তা করছে ভারত।

সামাজিক যোগাযাগামাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘শুধু বিপুল পরিমাণে রুশ তেল কিনেই থেমে থাকছে না ভারত। তারা সেই তেলের বড় একটি অংশ খোলাবাজারে বিক্রি করে বিশাল মুনাফা করছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধাস্ত্র কত মানুষকে হত্যা করছে, এ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই।’

এদিকে অন্যান্য দেশ শুল্ক কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে যেখানে উঠেপড়ে লেগেছে, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপকে ‘অন্যায্য, অযৌক্তিক ও অগ্রহণযোগ্য’ আখ্যা দিয়েছে নয়াদিল্লি। কারণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের অনেক দেশ রাশিয়ার কাছ থেকে এখনো সার, রাসায়নিকসহ অন্যান্য পণ্য কিনছে বলে দাবি করেছে ভারত।

রুশ তেলের ওপর ভারতের কেন এ নির্ভরশীলতা

বহুদিন ধরেই রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে আসছে ভারত। দেশটির ১৪০ কোটির জনগণের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই এ তেল আমদানি করা হয়ে থাকে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে নয়াদিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল ব্যবহারকারী দেশ হয়ে উঠেছে ভারত। এমনকি ২০৩০ সালের মধ্যে তেল ব্যবহারে তারা চীনকেও ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।

বাণিজ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা কেপলারের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম ৬ মাসে ভারতের মোট আমদানির ৩৬ শতাংশই হলো রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল।

‘রুশ তেলের বাজার থেকে রাতারাতি বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়’

২০২২ সালে ইউক্রেনে হামলা শুরুর পর ইউরোপের অধিকাংশ দেশ রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করে দেয়। এর পর থেকে রাশিয়ার তেলের প্রধান ক্রেতা হয়ে ওঠে চীন, ভারত ও তুরস্ক।

জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাশিয়া ও মধ্য-এশিয়াবিষয়ক সেন্টারের সহযোগী অধ্যাপক অমিতাভ সিং জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞায় পড়ে তেল বিক্রির ওপর বড় ধরনের ছাড় দেয় রাশিয়া। সেই ছাড়েই তেল কিনছে ভারত। অন্য কোনো দেশ থেকে এত কমে তেল কেনা সম্ভব নয়। এটি পুরোপুরি একটি অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করে ভারত। তবে ইউক্রেন ও তার মিত্ররা এটিকে তীব্র সমালোচনার চোখে দেখছে।

যদিও কয়েক বছর ধরে ভারত অন্যান্য উৎস থেকেও তেল কিনতে শুরু করেছে, তবে রাশিয়া থেকে তেল কেনা পুরোপুরি বন্ধ করে দিলে সেই শূন্যতা সহজে পূরণীয় নয় বলে মনে করেন অমিতাভ সিং।

কেপলারের জ্যেষ্ঠ তেল বিশ্লেষক মুইউ জু বলেন, নিজেদের মোট তেলের চাহিদার ৮০ শতাংশই আমদানি করে থাকে ভারত। বিশ্বের প্রধান তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক কিছু বাড়তি উৎপাদনক্ষমতা রাখলেও রাশিয়া সমুদ্রপথে দৈনিক যে পরিমাণ তেল রপ্তানি করে, সেই পরিমাণ তেল উত্তোলন করাটা তাদের জন্য কঠিন।

এর আগে ইরানের তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা ছিল ভারত। দৈনিক ৪ লাখ ৮০ হাজার ব্যারেল তেল কিনত দেশটি।

অমিতাভ সিং বলেন, ‘আসলে আমাদের হাত এখন বাঁধা। তেলের বাজার পরিচালনার জন্য ভারতের খুব বেশি পরিসর (নিজের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ) অবশিষ্ট নেই।’ তাঁর মতে, অন্তত এখনই ট্রাম্পের দাবির কাছে দিল্লির নত হওয়ার সম্ভাবনা কম। মোদি সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনা চালিয়ে যাবে এবং আগের মতো মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল আমদানির পথ খুঁজবে। তবে রুশ তেলের বাজার থেকে রাতারাতি বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়।

বৈশ্বিক বাজারেও পড়তে পারে প্রভাব

ভারতের অর্থনীতি চলছে রাশিয়ার তেলে। এটি বৈশ্বিক তেল বাজারেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

ভারতের দাবি, রাশিয়া থেকে তেল কেনার কারণে তারা পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের তেলের জন্য প্রতিযোগিতায় নামেনি। এভাবে তারা বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম কম রাখতে সহায়তা করছে। সরকারের এ দাবিকে সমর্থন করেছেন অধ্যাপক অমিতাভ।

অমিতাভ জানান, ভারত যদি অন্য কোনো উৎস থেকে তুলনামূলক বেশি দামে তেল আমদানি শুরু করে, তবে এর প্রভাব মার্কিন ভোক্তারাও টের পাবেন। কারণ, রাশিয়ার অপরিশোধিত তেলের একটি অংশ শোধন করে আবার বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করে ভারত। এটি শুধু ভারত নয়, অন্যান্য তেল আমিদানিকারক দেশের জন্যও সুবিধার।

গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের তথ্যমতে, অপরিশোধিত তেল থেকে উৎপাদিত ভারতীয় পণ্যগুলোর বড় ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে ইউরোপ, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র।

ঐতিহাসিক অংশীদারত্ব ও ভারসাম্যের কূটনীতি

ভারত-রাশিয়ার অংশীদারত্ব শুধু তেলেই সীমাবদ্ধ নয়, বহু দশকজুড়ে এ সম্পর্ক গড়ে উঠেছে।

স্নায়ুযুদ্ধের সময় আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকলেও সত্তরের দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকে পড়ে ভারত। সে সময় ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানকে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। তখন থেকেই ভারতের অন্যতম প্রধান অস্ত্র সরবরাহকারী হয়ে ওঠে রাশিয়া।

তবে গত কয়েক বছরে আবার ওয়াশিংটনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছে ভারত। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ তাদের মিত্র দেশ ফ্রান্স ও ইসরায়েল থেকেও অস্ত্র কেনা বাড়িয়েছে। অবশ্য এখনো রাশিয়ার শীর্ষ অস্ত্র ক্রেতা ভারতই। সেই সঙ্গে শুধু ট্রাম্প নন, পুতিনের সঙ্গেও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে মোদির।

২০১৯ সালে এক জনসভায় মোদির সঙ্গে বন্ধুত্বের প্রশংসা করে ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন যে ‘প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্পের মতো এমন বন্ধু ভারতের আর কখনো ছিল না।’

অধ্যাপক অমিতাভ বলেন, ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পরও আশা করা হয়েছিল, এ বন্ধুত্ব অব্যাহত থাকবে। কিন্তু এবার সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র একদিকে সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান সংঘাতে সমঝোতার কৃতিত্ব দাবি করছে, আবার ভারতের রুশ তেল কেনাকে রাশিয়ার যুদ্ধাস্ত্র টিকিয়ে রাখার জন্য দায়ী করছে। আর এসব বিষয় নিয়ে অসন্তুষ্ট মোদি সরকার।

অন্যদিকে, দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনই ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিলেও এখনো কিছু করতে না পারায় ট্রাম্প নিজেও হতাশ।

গত সপ্তাহে নিজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ক্ষোভ প্রকাশ করে ট্রাম্প লেখেন, ‘ভারত রাশিয়ার সঙ্গে কী করছে, তা আমি পরোয়া করি না। তারা চাইলে একসঙ্গে তাদের মৃতপ্রায় অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে পারে। আমার তাতে কিছু আসে যায় না।’

জাপানের ওসাকায় জি-২০ সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠক করেন ভ্লাদিমির পুতিন, নরেন্দ্র মোদি ও সি চিন পিং। ২৮ জুন ২০১৯
জাপানের ওসাকায় জি-২০ সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠক করেন ভ্লাদিমির পুতিন, নরেন্দ্র মোদি ও সি চিন পিং। ২৮ জুন ২০১৯ ছবি: এএফপি

সাপে কাটার চিকিৎসা: প্রত্যন্ত এলাকায় প্রতিষেধক সহজলভ্য করুন

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গত ৭০ দিনে ৩৫০ জনের বেশি সাপে কাটা রোগী ভর্তি হয়েছেন, যা গত ১৪ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রথম আলোর প্রতিবেদন জানাচ্ছে, রাসেলস ভাইপারের কামড়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়েছে। এই বছর সাতজন আইসিইউতে ভর্তি রোগীর মধ্যে ছয়জনই মারা গেছেন। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক।

বৃষ্টির মৌসুমে গ্রামগঞ্জে সাপের আনাগোনা বৃদ্ধিতে সাপে কাটা রোগীর সংখ্যাও বেড়ে যায়। আর এমন রোগীর জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো দ্রুত চিকিৎসা। দুঃখজনক হচ্ছে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে এমনকি উপজেলা পর্যায়েও অনেক হাসপাতালে প্রতিষেধক পাওয়া যায় না। ফলে বিভাগীয় হাসপাতালে বা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে নিতে রোগীর আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। রাজশাহীতেও রোগীরা দেরিতে হাসপাতালে আসার কারণে মারা যাচ্ছেন।

সাপে কাটা রোগীর মৃত্যুর ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুতর বিষয় হচ্ছে, এখনো গ্রামাঞ্চলে কুসংস্কার আর ওঝার ওপর নির্ভরতার প্রবণতা প্রবল। অনেক ক্ষেত্রে সাপে কাটার পর রোগীকে হাসপাতালে না নিয়ে প্রথমেই ওঝার কাছে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে মূল্যবান ‘গোল্ডেন আওয়ার’ নষ্ট হয়ে যায়। সাপে কাটা রোগীর ক্ষেত্রে গোল্ডেন আওয়ার বলতে সাপের কামড়ের পর থেকে প্রথম ১০০ মিনিটকে বোঝানো হয়। এ সময়ের মধ্যে চিকিৎসা শুরু করলে রোগীর বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে। এ সময়ের মধ্যে অ্যান্টিভেনম বা প্রতিষেধক দেওয়া গেলে সাপের বিষের প্রভাব কমানো যায় এবং রোগীর মৃত্যুঝুঁকি কমে আসে।

এমন পরিস্থিতিতে গণসচেতনতা তৈরি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্কুলশিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি যেমন ইমাম, পুরোহিতদের গণসচেতনতার ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারে। তবে এটি অবশ্যই জরুরি যে নিকটস্থ হাসপাতালে পর্যাপ্তসংখ্যক প্রতিষেধক থাকতে হবে। তখন মানুষের মধ্য সাপে কাটা রোগীদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতাও বাড়বে।

কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের মাঠে কাজ করার ক্ষেত্রে গামবুট পরার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। কিন্তু গামবুট কেনার সামর্থ্য অনেক কৃষকের নেই। এ ক্ষেত্রে সরকার বিনা মূল্যে বা ভর্তুকি দিয়ে কম মূল্যে গামবুট বিতরণ করতে পারে। কৃষকদের মধ্যে সচেতনতাও বাড়ানো প্রয়োজন। সাপে কাটা রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা কমিয়ে আনতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

বাসস্থান ও কৃষিকাজ, শিল্পায়ন, অবকাঠামো নির্মাণ, রাস্তাঘাট তৈরি ইত্যাদি উদ্দেশ্যে মানুষ প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করে চলেছে। ফলে প্রাণীরা কোথাও আশ্রয় না পেয়ে বাধ্য হয়ে লোকালয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। পিটিয়ে সাপ মারার প্রবণতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। অধিকাংশ মানুষ জানেই না, একটি সাধারণ সাপ বা ব্যাঙও পরিবেশের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ রক্ষা ও প্রাণী রক্ষার বিষয়টি নিয়েও গণসচেতনতা তৈরি করতে হবে।