Showing posts with label আওয়ামী লীগ. Show all posts
Showing posts with label আওয়ামী লীগ. Show all posts

Sunday, August 9, 2026

দুই বছর পর প্রকাশ্যে শামীম ওসমান, করলেন কর্মীসভা by আবু সাউদ মাসুদ

নারায়ণগঞ্জে ‘খেলা হবে’ স্লোগান দিয়ে রাজনৈতিক মাঠ গরম রাখা সেই শামীম ওসমানকে প্রায় দুই বছর পর আবার প্রকাশ্যে দেখা গেছে। তবে এবার নারায়ণগঞ্জের কোনো মিছিল-মিটিংয়ে নয়, হাজার মাইল দূরে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে আওয়ামী লীগের এক কর্মীসভায়।

প্রতিপক্ষের উদ্দেশে আক্রমণাত্মক বিভিন্ন মন্তব্য ছুড়ে দিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকা এই সাবেক সংসদ সদস্যকে নিউইয়র্কের ওই সভায় বক্তব্য দিতে দেখা যায়।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর প্রকাশ্যে তার অবস্থান নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। দুই বছর পরে অবশেষে তাকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দেখা গেল।

সভায় নিজের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে অনেকটা আত্মসমালোচনার সুরেই কথা বলেন শামীম ওসমান। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যর্থ।’ একই সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

শামীম ওসমানের বক্তব্যে অবশ্য পুরোনো রাজনৈতিক ‘খেলার’ প্রসঙ্গও ফিরে আসে। তিনি বলেন, কে বড় নেতা আর কে ছোট নেতা—এটি গুরুত্বপূর্ণ নয়; এখন প্রয়োজন ঐক্যবদ্ধ হওয়া।

নিজের রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, অনেক আগেই তিনি দেশে কী হতে যাচ্ছে তা বুঝতে পেরেছিলেন। তার দাবি, তিনি ‘ফান্ডামেন্টালিস্ট’ গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডের ওপর নজর রাখতেন। বিএনপিকে নিয়েও মন্তব্য করেন তিনি।

নিউইয়র্কের সভায় শামীম ওসমান দাবি করেন, তার রাজনৈতিক মনোযোগের মূল লক্ষ্য ছিল এমন গোষ্ঠী, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মানে না। এ প্রসঙ্গে তিনি জামায়াতে ইসলামীর সাবেক নেতা গোলাম আজমের নিষিদ্ধ হওয়ার প্রসঙ্গও টেনে আনেন। নিজের কার্যালয়ে দেশের বড় বোমা হামলার ঘটনাও স্মরণ করেন তিনি।

এরপর আসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের উত্তাল সময়ের প্রসঙ্গ। শামীম ওসমানের ভাষ্য অনুযায়ী, ২ আগস্ট রাতে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তখন তিনি সেনাবাহিনীকে মাঠ থেকে সরিয়ে নেওয়া, কারফিউ প্রত্যাহার এবং নারায়ণগঞ্জে বড় ধরনের জনসমাবেশ করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন।

শামীম ওসমান বলেন, নারায়ণগঞ্জে তার দেড় থেকে দুই লাখ মানুষ জড়ো করার সক্ষমতা ছিল। আশপাশের এলাকাতেও খবর পাঠানোর কথা বলেছিলেন তিনি। তার ভাষ্য, আওয়ামী লীগের শক্তির উৎস ছিল জনগণ। তবে সম্ভাব্য গৃহযুদ্ধের আশঙ্কায় শেখ হাসিনা রক্তপাত এড়াতে চেয়েছিলেন।

১৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ ও গুলির ঘটনায় শামীম ওসমানসহ ওসমান পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। ওই সময় সংঘর্ষ ও গুলিতে শিশু রিয়া গোপসহ বেশ কয়েকজন নিহত ও আহত হন। এসব ঘটনায় শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগও ওঠে।

৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নারায়ণগঞ্জের রাজনীতির আলোচিত-সমালোচিত এই নেতাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এরপর তিনি দেশ ছাড়েন এবং পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন সময়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে।

এদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শামীম ওসমানসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের বিরুদ্ধে বিচার চলমান রয়েছে।

তবে নিউইয়র্কের কর্মীসভায় শামীম ওসমানের উপস্থিতি নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। বিশেষ করে, দীর্ঘদিন পর তাকে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে দেখা যাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয়েছে নানা প্রতিক্রিয়া।

দুই বছর পর প্রকাশ্যে শামীম ওসমান, করলেন কর্মীসভা

Thursday, August 6, 2026

হাসিনাকে ভারত এই সুযোগ কেন দিল, প্রশ্ন বিএনপির

বিবিসি বাংলাঃ বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে কথা বলার সুযোগ দেওয়ায় ভারত সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের অনেকে।

দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, ‘শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ কেন দিল—এটি আমাদের প্রশ্ন।’

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিয়ে আছেন। সেই প্রসঙ্গে টেনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ভারত তাকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সেখানে আশ্রয়ে থেকে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন; তাকে সরাসরি গণমাধ্যমে কথা বলা সুযোগ দেওয়া হলো।’

‘বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ড নিয়ে ভারতে থাকা শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার কেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর এই সুযোগ দিলে’—এই প্রশ্নও রাখেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

পাঁচই আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনের পতনের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অডিও কলে যুক্ত হয়ে বক্তব্য দেন শেখ হাসিনা। সেই সংবাদ সম্মেলনে তিনি বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। সরকারি দল বিএনপির নেতৃত্বের মাঝেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে বলে দলটির নেতাদের অনেকে বলছেন।

বাংলাদেশে জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের জন্য শেখ হাসিনা দুঃখপ্রকাশ বা ক্ষমা চাইবেন কি না, নয়াদিল্লির সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের সেই প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন তিনি।

ওই সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত থাকা তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে একপক্ষকে ইনডেমনিটি বা দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে; একপক্ষ দায়মুক্তি পেলে অন্যপক্ষেরও সে অধিকার আছে।

দুই বছর আগে গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দলটির নেতাদের কোনো অনুশোচনা না থাকায় বাংলাদেশে বর্তমানে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে আসছে।

বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) গণহত্যা চালিয়েছে। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেনি বা ক্ষমা চায়নি। এমনকি তাদের কোনো অনুশোচনা নেই।’

‘বরং তারা ভারতে আশ্রয় নিয়ে থেকে বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালাচ্ছে। জনগণ তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ,’ মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

দুই বছর আগে শেখ হাসিনার শাসনের পতন হলে সে সময় গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছিল। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান এনে ওই অধ্যাদেশ যুক্ত করা হয়েছিল।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠনের পর এই সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী প্রস্তাব সংসদে পাস করে। ফলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই থেকে যায়।

নয়া দিল্লির সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা তাদের দলের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান।


সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির ব্যাপারে বিচার হবে। সংশ্লিষ্ট আইনে সেই বিধান যুক্ত করা হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে চায় না। কিন্তু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিয়ে আদালতের সিদ্ধান্তের বিষয়। তারা তো (আওয়ামী লীগ) আদালতে যায়নি। আদালত থেকেই যে সিদ্ধান্ত আসবে, সেভাবেই সরকার কাজ করবে।’

একইসাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য হচ্ছে, ‘জনগণও বিচার করবে। জুলাই আন্দোলনে তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) গণহত্যা চালিয়েছে। তাদের দীর্ঘ শাসনে বিরোধী দল ও মতের মানষকে দমন-পীড়ণ চালিয়েছে; গুম, খুন করেছে। ফলে তাদের প্রতি জনগণের কোনো আস্থা নেই এবং তাদের ব্যাপারে জনগণও বিচার করবে।’

এদিকে, ভারতের নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হতে পারেন, এমন খবর যখন আলোচনায় আসে, তখনই বাংলাদেশের বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

গত সোমবার ঢাকায় ভারতের হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সে সময় পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা দিল্লিতে শেখ হাসিনা যাতে রাজনৈতিক কার্যক্রম না চালায়, সেজন্য ভারত সরকারের সহযোগিতা চান।

একই দিনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ভারত সরকারকে এ বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করতে আহ্বান জানান।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিকে ঘিরে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন, দুই দেশের সম্পর্ককে স্বাভাবিক করার চেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এছাড়া এরপর মঙ্গলবার আদালতের নির্দেশনা তুলে ধরে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য বিবরণীতে শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রচার না করতে অনুরোধ করা হয়।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এ ব্যাপারে সতর্ক করে দিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছিলেন।

যদিও ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংবাদ সম্মেলনটি বেসরকারিভাবে আয়োজন করা হচ্ছে। এরসাথে ভারত সরকারের সম্পর্ক নেই। এবং সেখানে যে বক্তব্য আসবে, তা ভারত সরকার সমর্থন করে না।

কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরও নয়া দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন হয়েছে এবং তাতে শেখ হাসিনা সরাসরি বক্তব্য ও প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন।

বিএনপি সরকারের একাধিক সূত্র বলছে, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে যে বক্তব্যই দেওয়া হোক না কেন, তাদের সমর্থন ছাড়া নয়া দিল্লিতে এ ধরনের সংবাদ সম্মেলন করা সম্ভব নয় বলে তারা মনে করেন।

আর সেকারণে বিএনপি সরকারের পক্ষ থেকে ও দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের মধ্য থেকেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া এসেছে।

হাসিনাকে ভারত এই সুযোগ কেন দিল, প্রশ্ন বিএনপির
সালাহউদ্দিন আহমদ

‘বিএনপি নেতাদের ডাকে যারা আসছিল, ওদের জন্য হাসিনাকে কোনোদিন পালাইতে হয় নাই’

অনলাইন একিক্টভিস্ট সাদিকুর রহমান খান বলেছেন,বিএনপি নেতাদের ডাকে যারা আসছিল, ওদের জন্য হাসিনাকে কোনোদিন পালাইতে হয় নাই।

বুধবার সন্ধ্যায় ফেসবুক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘তারেক রহমানের ডাকে সরকার পড়লে হাসিনা সরকার পড়ার কথা ছিল ২৮ অক্টোবর। তারেক রহমানের ডাকে ১০ লাখ লোক ঢাকা আসলো। পুলিশ বাঁশি বাজানোর সাথে সাথে ১০ মিনিটে ১০ লাখ পালাইয়া গেল। নেতা নাকি কর্মীরা আগে পালাইসিল, সেটা একটা বড় প্রশ্ন। আরও বড় প্রশ্ন, ১০ লাখ লোক কেমনে ১০ মিনিটে পালাইয়া যায়? এরা এসেছিল ক্ষমতার জন্য।

একজন মানুষও তারেক রহমানের ডাকে মরতে রাজি হয় নাই। একজনও না। নেতাও না। কর্মীও না। জুলাই আগস্টে মির্জা ফখরুলকে বারবার বলতে হইছে এই আন্দোলন আমাদের আন্দোলন না। আমরা এর সাথে জড়িত না। কারণ জুলাই বিএনপির আন্দোলন হইলে কোটি কোটি মানুষ এই আন্দোলনে আসতই না।

১৭ বছরে এক দফা কি কম দিসে?

একটা মানুষ পাত্তা দিসে?

দেয় নাই।

মানুষ যাইয়া শুনলো নাহিদ ইসলাম নামের অপরিচিত, অরাজনৈতিক একটা ছেলের কথা। ৩ আগস্ট নাহিদ ইসলামের এক দফাতেই সরকারের নৈতিক পতন হয়ে যায়। হাসিনা পরিবারের সবাই পালাতে শুরু করে ৩ তারিখ থেকেই। আর ৪ আগস্ট আসিফ মাহমুদ ঢাকা দখলের ডাক দেন। ৫ আগস্ট মানুষ লাঠিসোঁটা নিয়ে ঢাকার রাজপথ দখলে নেয়। শহীদ হয় দুইশরও বেশি মানুষ। বিএনপি নেতাদের ডাকে যারা আসছিল, ওদের জন্য হাসিনাকে কোনদিন পালাইতে হয় নাই। কারণ হাসিনা জানত, পুলিশের বাঁশি শুনলেই এরা পালাবে। ১৭ বছর তো তাই পালাইসে।

জুলাইয়ে কারা রাজপথে ছিল, সেটা ডকুমেন্টারিতে দেখানোর কিছু নাই। মানুষ দেখেছে জুলাইয়ে কে লন্ডনে ছিল, কে শিলং এ ছিল আর কে ঢাকায় ছিল। এই জেনারেশনের সাথে তামাশা করে লাভ নাই। জুলাইয়ের নেতা কারা, জুলাইয়ের ইমাম কে, বাংলাদেশের একেবারে প্রত্যন্ত এলাকায় যাইয়া ক্লাস ফাইভের বাচ্চাদের জিজ্ঞেস করেন, যান, ১০ সেকেন্ডে এই দেশের বাচ্চারা সাক্ষ্য দেবে নাহিদ, আসিফ, হাসনাত আর আখতারদের নাম।

জুলাইয়ের ইতিহাসে এই প্রজন্মের অন্তরে লেখা আছে। দুই পয়সার ডকুমেন্টারি দিয়ে সেই লেখা মুছতে পারবেন না। আপনাদের কর্মীরা হইলো ১০ মিনিটে সব রাইখা পালাইয়া যাওয়া বিড়ালের দল,

আর নাহিদের ডাকে যারা আসছিল, তাদের ব্যাপারে হাসিনার শুনতে হয়েছিল, একটা গুলি করি। একটা মরে, ঐ একটাই যায় স্যার। বাকিডি যায় না।

গুলি করে যেই জেনারেশনের সাথে হাসিনা পারে নাই, মিথ্যা ইতিহাস আর মিথ্যা ডকুমেন্টারি দিয়ে সেই জেনারেশনকে মুছে ফেলতে চাওয়ার দু:সাহস কেমনে হয় আপনাদের?’

‘বিএনপি নেতাদের ডাকে যারা আসছিল, ওদের জন্য হাসিনাকে কোনোদিন পালাইতে হয় নাই’

Wednesday, July 15, 2026

শেখ হাসিনার আপিলের সুযোগ নেই, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হবে: নাহিদ

গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেও তাঁর মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, দেশে ফেরা মাত্রই তাঁকে গ্রেপ্তার করে রায় কার্যকর করা হবে।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে আজ বুধবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের মোজাফ্‌ফর আহমেদ চৌধুরী অডিটোরিয়ামে ‘স্মরণগাথায় জুলাই বিপ্লবের দিনগুলো’ শীর্ষক আলোচনা সভায় নাহিদ ইসলাম এ কথাগুলো বলেন। এই আলোচনা সভার আয়োজন করে এনসিপির ছাত্রসংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা।

আলোচনা সভায় এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘শেখ হাসিনার মামলার রায় যখন হয়েছে, আপিল করার সুযোগ ছিল ৩০ দিন। সেই ৩০ দিনে শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে কেউ আপিল করে নাই। ফলে শেখ হাসিনার মামলার রায়ে কোনো আপিলের সুযোগ নাই।’

আন্তর্জাতিক একটি গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার দেওয়া সাক্ষাৎকার প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘আমরা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার একটি সাক্ষাৎকার দেখেছি, যেখানে বলেছেন ডিসেম্বরে দেশে আসবেন, আত্মসমর্পণ করবেন। আমরা জানি, ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের মাস; ডিসেম্বরেই সবাই আত্মসমর্পণ করে। তো শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে আসবেন কি না, কবে আসবেন—এটা বাংলাদেশ সরকারকে নির্ধারণ করতে হবে।’

বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, গতকাল সরকারের জায়গা থেকেও স্পষ্ট করা হয়েছে, যে শেখ হাসিনার আত্মসমর্পণের আসলে কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘তিনি (শেখ হাসিনা) আসবেন এবং তাঁকে আসা মাত্রই এয়ারপোর্ট থেকে গ্রেপ্তার করা হবে এবং তাঁর রায় কার্যকর করা হবে।’

এ বিষয়ে সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে নাহিদ ইসলাম বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলার সময় উনার স্বভাবসুলভ একটা নোক্তা রেখেছেন, একটা ফাঁক রেখেছেন। সেটা হলো আপিল করা যাবে কি না, সেটা আইন দেখবে। তিনি বলেন, আপিল করা যাবে না।

এ সময় ২০২৪ সালের ১৫ জুলাইয়ের ঘটনাবলির প্রসঙ্গ টেনে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ বলেন, ওই দিনের হামলাকারীদের তালিকা প্রকাশ এবং তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে হবে। একই সঙ্গে যেসব শিক্ষক ওই হামলাকে সমর্থন বা বৈধতা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

‘অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রতারণা করেছে সরকার’

সংস্কার প্রসঙ্গে এনসিপির আহ্বায়ক বলেন, বর্তমান সরকার গণভোটের রায় বাস্তবায়ন না করে গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে প্রতারণা করেছে। তাঁর অভিযোগ, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত সে বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

নাহিদ ইসলাম বলেন, গুমবিরোধী অধ্যাদেশ, পুলিশ সংস্কার, বিচার বিভাগের পৃথক সচিবালয়সহ বিভিন্ন সংস্কারমূলক উদ্যোগ বাতিল করা হয়েছে। নতুন সংবিধান বা সাংবিধানিক পুনর্গঠনের দাবিকেও সংশোধনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।

এ সময় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে রাজনীতি হতে হবে বলেও মন্তব্য করেন এনসিপির আহ্বায়ক। তিনি বলেন, ‘জুলাই নিয়ে অবশ্যই রাজনীতি করতে হবে। কারণ, নতুন বাংলাদেশের রাজনীতি হচ্ছে জুলাইয়ের রাজনীতি। আমরা আর স্বৈরতন্ত্রে ফেরত যাব না, আমরা গণতন্ত্রের দিকে যাব। আমরা বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ চাই। আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ চাই; স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ চাই।’

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন, জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান ও সাধারণ সম্পাদক আবু বাকের মজুমদার। অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শৃঙ্খলা বিভাগের প্রধান ও সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন, এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক আলী আহসান জুনায়েদ, জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তরিকুল ইসলাম প্রমুখ।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিশুদের জন্য একটি চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। আলোচনা সভা শেষে বিজয়ী শিশুদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।

 ‘স্মরণগাথায় জুলাই বিপ্লবের দিনগুলো’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ১৫ জুলাই ২০২৬
‘স্মরণগাথায় জুলাই বিপ্লবের দিনগুলো’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; ১৫ জুলাই ২০২৬ ছবি: নোমান ছিদ্দিক

Saturday, July 11, 2026

বিয়ে বিচ্ছেদ করে বিপুল সম্পদের মালিক পুতুল

ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। দীর্ঘ ২৫ বছর সংসারে করে দাম্পত্য জীবনের ইতি টানেন তিনি। স্বামী খন্দকার মাশরুর হোসেনের সঙ্গে ২০২১ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ের একটি আদালতে তার বিবাহবিচ্ছেদ ঘটে। যদিও বিষয়টি সে সময় সামনে আসেনি, সম্প্রতি আদালতের নথি ও যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি সম্পত্তির রেকর্ডে বিচ্ছেদ-সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।

প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, বিচ্ছেদ চুক্তির অংশ হিসেবে খন্দকার মাশরুর হোসেন সায়মা ওয়াজেদকে নগদ আড়াই লাখ মার্কিন ডলার দিয়েছেন। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এর মূল্য তিন কোটি টাকারও বেশি। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে তাদের যৌথ মালিকানাধীন দুটি বাড়ির মালিকানাও তার কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাড়ি দুটির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে নগদ অর্থ ও সম্পত্তির মূল্য প্রায় ১৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা সমান।

দুবাই আদালতের ফ্যামিলি গাইডেন্স অ্যান্ড রিফর্মেশন বিভাগে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে, ফ্লোরিডার সেন্ট জনস কাউন্টির ফ্রুট কোভ এলাকার ৪৫৬ বে পয়েন্ট ওয়ে এবং মেইটল্যান্ডের ৮৪৫ ইয়র্ক ওয়ে-এ অবস্থিত দুটি বাড়ি ‘নেভা ইনকরপোরেটেড’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করা হবে। ওই প্রতিষ্ঠানের একমাত্র আইনি মালিক ও সুবিধাভোগী সায়মা ওয়াজেদ পুতুল।

চুক্তিতে আরো বলা হয়েছে, বিয়ের সময় পাওয়া উপহার, ব্যক্তিগত আসবাবপত্র, পোশাক, অলঙ্কার ও অন্যান্য স্মারকও পুতুলকে ফিরিয়ে দিতে হবে। তিনি যেখানে নির্দেশ দেবেন, সেখানে এসব সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্বও থাকবে খন্দকার মাশরুরের।

সরকারি সম্পত্তি রেকর্ড অনুযায়ী, সেন্ট জনস কাউন্টির বাড়িটি ২০০৫ সালের ১ নভেম্বর যৌথ নামে ২ লাখ ৪৫ হাজার ডলারে কেনা হয়েছিল। বর্তমানে এর বাজারমূল্য প্রায় ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪৪০ ডলার। অন্যদিকে মেইটল্যান্ডের চার শয়নকক্ষ ও দুই বাথরুমবিশিষ্ট একতলা বাড়িটির বর্তমান মূল্য প্রায় ৪ লাখ ৮৪ হাজার থেকে ৫ লাখ ডলারের মধ্যে।

পুতুল ও মাশরুরের চার সন্তান। বিচ্ছেদের চুক্তিতে, অপ্রাপ্তবয়স্ক দুই সন্তানের আইনগত অভিভাবক থাকবেন খন্দকার মাশরুর, তবে তাদের কাস্টডি বা জিম্মায় থাকবেন সায়মা ওয়াজেদ। সন্তানদের শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ জীবনযাপনের সব ব্যয় বহন করবেন মাশরুর।

খন্দকার মাশরুর হোসেন আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ছেলে। ১৯৯৫ সালে ঢাকায় পুতুল ও মাশরুরের বিয়ে হয়। সে সময় শেখ হাসিনা ছিলেন বিরোধীদলীয় নেত্রী। দুজনই কানাডার নাগরিক ছিলেন।

পরিবারের এই সম্পর্কের পরই খন্দকার মোশাররফ হোসেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৯৬ সালে ফরিদপুর-৩ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেলেও নির্বাচিত হতে পারেননি। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০০৯ সালে মন্ত্রিসভায় স্থান পান। প্রথমে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী এবং পরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন।

নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের পর থেকে পুতুল ও মাশরুরের দাম্পত্য জীবনে টানাপোড়েন শুরু হয়। একই সময়ে খন্দকার মোশাররফের রাজনৈতিক প্রভাবও কমে আসতে শুরু করে। তিনি মন্ত্রিসভা থেকে বাদ পড়েন এবং পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পদও হারান। ২০২১ সালে পুতুল ও মাশরুরের বিবাহবিচ্ছেদের পর খন্দকার মোশাররফের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, টেন্ডারবাজি ও দখলবাজির অভিযোগ তুলে অভিযান শুরু হয়। ২০২২ সালে তার ভাই খন্দকার মোহতেশাম হোসেন বাবর গ্রেপ্তার হন। পরে খন্দকার মোশাররফ দেশ ছেড়ে সুইজারল্যান্ডে চলে যান।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনয়নে সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক নির্বাচিত হন এবং ভারতের দিল্লিতে দায়িত্ব পালন করেন। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের আপত্তির মুখে তিনি অনির্দিষ্টকালের ছুটিতে রয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। প্রতিবেদনে আরো দাবি করা হয়েছে, বর্তমানে তিনি কানাডার পাসপোর্ট ব্যবহার করে দুবাইয়ে সন্তানদের কাছে এবং দিল্লিতে মায়ের কাছে যাতায়াত করেন।

বিয়ে বিচ্ছেদ করে বিপুল সম্পদের মালিক পুতুল

Friday, July 10, 2026

ডিসেম্বরে দেশে ফিরে নেতাকর্মীসহ ‘আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা’ হাসিনার

ভারতে নির্বাসিত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানিয়েছেন, তিনি এবং তার দল আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা আগামী ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনা করছেন। তবে দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি হত্যার শিকারও হতে পারেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তিনি।

রয়টার্সকে দেওয়া প্রায় এক ঘণ্টার এক বিশেষ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি দেশে ফিরলে তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি হত্যাও করতে পারে। তার পরও আমাকে ফিরতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমার দলের নেতাকর্মীরা ভয়াবহ নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন। যদি মৃত্যুই আসে, তবে আমি চাই সেটি আমার নিজের মাটিতে আসুক, যেখানে আমার বাবা-মা সমাহিত আছেন এবং যেখানে তাদের রক্ত ঝরেছে।’

২০২৪ সালে গণবিক্ষোভের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারত চলে যান। গত নভেম্বরে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান দমনে প্রাণঘাতী অভিযান পরিচালনার অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

রয়টার্সকে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ও আওয়ামী লীগের নেতারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। এর মাধ্যমে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দলের প্রতি বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা কীভাবে আচরণ করে, তা দেখা যাবে।

তিনি জানান, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ আওয়ামী লীগের নির্বাসিত আরও কয়েকজন নেতাও তার সঙ্গে দেশে ফিরবেন। তাদের বিরুদ্ধেও মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে। তবে তিনি কবে দেশে ফিরবেন, কোন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন বা সুনির্দিষ্ট তারিখ কী হবে, তা জানাননি।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘সরকার আমাকে ফিরিয়ে নিতে চায়। তারা বারবার ভারতকে চিঠি দিয়ে আমাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ করছে; কিন্তু আমি নিজেই দেশে ফিরব।’

তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে তিনি কোনো বিদেশি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি।

‘গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার এবং বিচার এসব গোপন আলোচনার বিষয় নয়,’ বলে মন্তব্য করেন তিনি।

শেখ হাসিনা দাবি করেন, আওয়ামী লীগের প্রায় সব নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে এবং অনেকেই আত্মগোপনে রয়েছেন। তাই তিনি তাদের বলেছেন, ‘এবার আমি দেশে ফিরছি। একদিন তোমরাও সবাই ফিরে আসবে। আমরা সবাই একসঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব।’

তিনি বলেন, তিনি কারাবাস নিয়ে উদ্বিগ্ন নন। অতীতেও একাধিকবার তাকে গ্রেপ্তার হতে হয়েছে।

নিজের রাজনৈতিক জীবনের প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, ১৯৮১ সালে নির্বাসন শেষে দেশে ফেরার পর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে তাকে একাধিকবার আটক করা হয়েছিল। পরে ২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতির মামলায় কারাবন্দি হন। মুক্তি পাওয়ার পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার ক্ষমতায় ফেরেন।

২০২৪ সালে দেশ ছাড়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তার বাসভবনের দিকে জনতা এগিয়ে আসছিল এবং তার জীবনের ওপর হুমকি তৈরি হয়েছিল।

শেখ হাসিনা বলেন, ‘কোনো সরকার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকলে ভুল হতে পারে। কোনো সরকারই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়। কিন্তু একটি সরকারের ভালো-মন্দ বিচার করার অধিকার জনগণের। সেই বিচার আমি জনগণের ওপরই ছেড়ে দিচ্ছি।’

তিনি জানান, আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ১২৫টিতে অনলাইন বৈঠক করেছেন।

আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়ে থাকতে পারে এবং আমি হয়তো নির্বাচনে অংশ নিতে পারব না। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কেন নিষিদ্ধ করা হবে? যদি আমরা খারাপ কাজ করে থাকি, তাহলে সেই রায় জনগণই দিক।’

ছবি : সংগৃহীত
ছবি : সংগৃহীত

Sunday, June 28, 2026

এ বছরই দেশে ফিরব: এনডিটিভিকে শেখ হাসিনা

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রায় দুই বছর ধরে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে এবং তার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) দেশজুড়ে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও আওয়ামী লীগ তাদের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করে। এ সময় কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলটির বহু নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ পরিস্থিতিতে ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে ভারতে নির্বাসিত শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমি এ বছরই দেশে ফিরব।’ তার ভাষায়, আওয়ামী লীগ কেবল একটি রাজনৈতিক দল নয়, এটি একটি ‘শক্তি’। তিনি আরও বলেন, সংখ্যালঘুদের ওপর যেকোনো হামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার ওপর আঘাত।

প্রশ্ন: আপনি একাধিকবার ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং আপনার সমর্থকেরাও আশাবাদী যে, আপনি শিগগিরই বাংলাদেশে ফিরবেন। এমনকি দলের কয়েকজন নেতা বলেছেন, আপনি এ বছরের মধ্যেই বাংলাদেশে ফিরতে পারেন। কিন্তু আপনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে এটি কতটা বাস্তবসম্মত?

শেখ হাসিনা: আমার দেশে ফেরা ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার কোন বিষয় নয়। এটি বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন এবং আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সম্পর্কিত। আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। আমি রাজনীতি করি বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণের জন্য এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তোলার জন্য।

আমার বিরুদ্ধে যে রায় দেওয়া হয়েছে, তা ন্যায়বিচার নয়। এটি একটি অবৈধ, অসাংবিধানিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ার অংশ। আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। অতীতেও এ ধরনের চেষ্টা হয়েছে। তখনও তারা ব্যর্থ হয়েছে, এবারও ব্যর্থ হবে।

আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। ১৯৭৫ সালে আমি আমার বাবা-মা, ভাই এবং পরিবারের প্রায় সবাইকে হারিয়েছি। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাধ্যমে আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে অসংখ্য ষড়যন্ত্র হয়েছে। কিন্তু সব ষড়যন্ত্র ভেদ করে আমি বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। বাংলাদেশের জনগণের ভোটে আমি পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছি এবং দেশের নজিরবিহীন উন্নয়নে কাজ করেছি।

আমার জীবনের প্রায় পুরোটা জুড়েই রয়েছে বাংলাদেশের মানুষ, আওয়ামী লীগ, গণতান্ত্রিক আন্দোলন এবং দেশের উন্নয়ন। তাই আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই। সব বাধা ও ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে আমি এ বছরই আমার দেশে ফিরব।

প্রশ্ন: অনেকের মতে, আওয়ামী লীগ আবার জনসমর্থন ফিরে পাচ্ছে। এই সমর্থনকে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপ দেওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি কি বর্তমানে আওয়ামী লীগের রয়েছে?

শেখ হাসিনা
: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কোন কাগুজে সংগঠন নয়। এটি বাংলার মাটি, বাংলার মানুষ, বাংলার ইতিহাস এবং বাঙালি জাতির পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি রাজনৈতিক শক্তি। ৭৭ বছরের পথচলায় আওয়ামী লীগ বহুবার হামলার শিকার হয়েছে, বহুবার রক্ত দিয়েছে, বহুবার নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই জনগণের শক্তিতে আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন অন্য কারও ব্যর্থতা বা দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে না। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই আওয়ামী লীগ নিজের পথ তৈরি করে। জনগণের সমর্থন সবসময় আমাদের সঙ্গে ছিল। সেই শক্তি নিয়েই সরকারে থেকে আমরা মানুষের উন্নয়নে নিরলস কাজ করেছি।

বাংলাদেশবিরোধী শক্তি জনগণের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করে পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরিয়েছে। কিন্তু সব চেষ্টা করেও তারা মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ, অসাংবিধানিক ও দখলদার অন্তর্বর্তী সরকারের পর এখন সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের অধীনে মানুষ বাস্তবতা নিজের চোখে দেখছে। দেশে গণতন্ত্র নেই, আইনের শাসন নেই, নিরাপত্তা নেই। অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে। সংখ্যালঘুরা হামলার শিকার হচ্ছে। উগ্রবাদ ছড়িয়ে পড়ছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অকল্পনীয় রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছেন।

মানুষ তুলনা করতে জানে। তারা বোঝে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলে দেশে স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা থাকে।

সাংগঠনিক শক্তির প্রশ্নে বলতে চাই, বাংলাদেশের রাজনীতির অলিগলি আওয়ামী লীগ হাতের তালুর মতো চেনে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বেই এই দল বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ। জনগণের সমর্থন ও আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার সক্ষমতা আওয়ামী লীগের রক্তে মিশে আছে।

আগুনে যেমন সোনা আরও খাঁটি হয়, তেমনি শাসকের নিপীড়ন ও নির্যাতন আওয়ামী লীগকে প্রতিদিন আরও শক্তিশালী করছে।

দলের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের প্রতি আমার বার্তা খুবই সহজ। ঐক্যবদ্ধ থাকুন এবং মানুষের পাশে দাঁড়ান। প্রতিটি গ্রাম, মহল্লা, ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করুন। নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়ান। সংখ্যালঘু, নারী, শিশু, শ্রমজীবী, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে আপস করবেন না।

আওয়ামী লীগের রাজনীতি প্রতিশোধের রাজনীতি নয়। এটি অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও উন্নয়নের রাজনীতি। আওয়ামী লীগ মানুষের সঙ্গে ছিল, আছে এবং থাকবে। জনগণের শক্তিতেই আওয়ামী লীগ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।

প্রশ্ন: আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল রয়েছে এবং দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হাজারো মামলা হয়েছে বলে খবর রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অদূর ভবিষ্যতে দলটির রাজনৈতিক পুনরুত্থান কতটা সম্ভব?

শেখ হাসিনা: আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনরুত্থান কোনো সরকারের দয়ার ওপর নির্ভর করে না। এটি জনগণের ওপর নির্ভর করে।

অবৈধ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তারা হয়তো আওয়ামী লীগকে একটি সাজানো নির্বাচন থেকে দূরে রেখেছে। দলের কার্যালয় বন্ধ করেছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সাময়িকভাবে দমন করেছে। কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি। সে কারণেই আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্যেও দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও এলাকায় প্রতিদিন আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিল হচ্ছে। শুধু নেতা-কর্মীরাই নয়, সাধারণ মানুষও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব কর্মসূচিতে যোগ দিচ্ছেন। মায়েরা তাদের সন্তানদের সাহস জোগাচ্ছেন। এগুলোই আওয়ামী লীগের পুনর্জাগরণের লক্ষণ।

বর্তমান সরকারের আচরণই প্রমাণ করে, তারা আওয়ামী লীগের শক্তিকে ভয় পায়। সে কারণেই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি ঠেকাতে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এটি তাদের দুর্বলতার প্রমাণ।

আওয়ামী লীগকে শক্তি প্রয়োগ করে দমন করা যাবে না। যে দল জনগণের জাগরণ সৃষ্টি করতে পারে, তাকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে থামানো যায় না। ইতিহাস বলে, আওয়ামী লীগ কখনো শাসকের রক্তচক্ষুকে ভয় পায়নি। বরং সেই রক্তচক্ষুকে অগ্রাহ্য করেই বিজয়ের পতাকা উড়িয়েছে।

বাংলাদেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আওয়ামী লীগের ওপর অবৈধ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দিতে হবে। শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

কিন্তু যারা এখন ক্ষমতা দখল করে আছে, তারা যদি এই ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পথও বন্ধ রাখে, তাহলে মানুষের জমে থাকা ক্ষোভ, বেদনা ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাই আওয়ামী লীগের জন্য নতুন পথ তৈরি করবে।

প্রশ্ন: আপনি বলেছেন, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ তার বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে এবং পাকিস্তানের মতো একটি মডেলের দিকে এগিয়ে গেছে। এই পরিবর্তন বলতে আপনি ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন?

শেখ হাসিনা: আমি কখনোই কোনো দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কের বিরোধিতা করিনি। জনগণের কল্যাণের স্বার্থে বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি সবসময়ই পরিষ্কার ছিল, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ তবে সেই সম্পর্ক অবশ্যই রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অক্ষুণ্ন রেখে বজায় রাখতে হবে।

বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে সামরিক শাসন, বৈষম্য, নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িকতা এবং গণতন্ত্র অস্বীকারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা যে রাষ্ট্র গড়ে তুলেছিলাম, তার ভিত্তি ছিল জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। সেই ভিত্তিকে দুর্বল করা মানেই বাংলাদেশের মৌলিক পরিচয়ের ওপর আঘাত হানা।

৫ আগস্টের পর আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর সর্বাত্মক আক্রমণ দেখেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। সারা দেশে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ভাঙচুর করা হয়েছে। ‘জয় বাংলা’ স্লোগানকে অপরাধ হিসেবে দেখানো হয়েছে। জাতির পিতার বাসভবনে বারবার হামলা চালানো হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণ হয়েছে। মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে। সুফি দরগা ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম দুর্বল করে উগ্রবাদ বিস্তারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এক কথায়, বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আমরা একটি স্থিতিশীল, আত্মবিশ্বাসী এবং উন্নয়নশীল বাংলাদেশ গড়ে তুলেছিলাম। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় পৌঁছেছিল ২ হাজার ৭৯৩ মার্কিন ডলারে। ২৯ ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৫তম বৃহৎ অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছিল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৬ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হার দাঁড়িয়েছিল ৩২ দশমিক ০৫ শতাংশ। প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ পাঁচ গুণ বেড়ে ৩ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছিল।

আমরা দারিদ্র্যের হার কমিয়ে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নামিয়ে এনেছিলাম। খাদ্যশস্য উৎপাদন চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। শিশুমৃত্যুর হার চার গুণ কমেছিল। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা আট গুণ বেড়েছিল এবং শতভাগ মানুষ বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় এসেছিল। সাক্ষরতার হার বেড়ে হয়েছিল ৭৮ দশমিক ৫ শতাংশ। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৪৩ দশমিক ৪৪ শতাংশে। মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে আমরা ১৪ হাজার ৯৮৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছি।

আমরা ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলোকে মর্যাদার সঙ্গে পুনর্বাসন করেছি। প্রায় ৪২ লাখ ৮০ হাজার ১১৫ জনকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দুই শতক জমিসহ বাড়ির মালিকানা দিয়েছি। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে, ডিজিটাল বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো মেগা প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশকে উন্নয়নের বৈশ্বিক রোল মডেলে পরিণত করেছি। আমরা প্রমাণ করেছি, সুযোগ, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং সৎ নেতৃত্ব পেলে বাঙালি জাতি নিজ শক্তিতেই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।

৫ আগস্টের পর বাংলাদেশের উন্নয়নের ধারা ধ্বংস করা হয়েছে। দেশে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। সেই পরিস্থিতি থেকে একমাত্র আওয়ামী লীগই দেশকে মুক্ত করতে পারে। জনগণ তা বুঝতে পেরেছে। অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগই বিজয়ী হবে। ইউনূস এবং বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোও এটি খুব ভালোভাবে জানে। এ কারণেই অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে, দলটিকে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রেখেছে এবং দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারাকে ধ্বংস করেছে। ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের মডেল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

প্রশ্ন: এমন একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আপনার জন্য ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে আপনার পর্দার আড়ালে আলোচনা হয়েছে। এসব দাবির কোনো সত্যতা আছে কি?

শেখ হাসিনা: জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য ষড়যন্ত্রকারীরা প্রায়ই ইচ্ছাকৃতভাবে এ ধরনের প্রচারণা চালায়। এ বিষয়ে আমার অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার, জনগণের ভোটাধিকার এবং ন্যায়বিচার এসব কোনো গোপন দরকষাকষির বিষয় নয়। এগুলো দেশের মানুষের সাংবিধানিক অধিকার।

আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়, এটি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম শর্ত। একইভাবে ন্যায়বিচারও কোনো দান বা করুণা নয়, এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। কোনো নাগরিক, রাজনৈতিক নেতা বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে মামলা থাকলে তা অবশ্যই স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মত বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হতে হবে। রাজনৈতিক নির্দেশনায় পরিচালিত ট্রাইব্যুনাল, সাজানো মামলা, ভয়ভীতি দেখিয়ে আদায় করা সাক্ষ্য কিংবা বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করে কখনো ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায় না।

আমি সবসময় রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে। তবে সেই সমাধান হতে হবে প্রকাশ্য, নীতিনিষ্ঠ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার ভিত্তিতে। গোপন সমঝোতার ভিত্তিতে নয়। আওয়ামী লীগ কারও রাজনৈতিক দয়া বা অনুগ্রহ চায় না। আওয়ামী লীগ সংবিধানপ্রদত্ত অধিকার, জনগণের সমর্থন এবং মানুষের শক্তির ভিত্তিতেই রাজনীতি করবে।

প্রশ্ন: সম্প্রতি মন্দির ও হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনা, পাশাপাশি কিছু ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর বিক্ষোভ ও হুমকির খবর প্রকাশিত হয়েছে। এসব ঘটনাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?

শেখ হাসিনা: বিষয়টি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং গভীরভাবে উদ্বেগজনক। দুঃখজনক হলেও এটি বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। বাংলাদেশে যখনই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দুর্বল হয়েছে, যখনই সাম্প্রদায়িক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে বা রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রভাব বিস্তার করেছে, তখনই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন নেমে এসেছে। তাদের বাড়িঘর, উপাসনালয়, ব্যবসা, জীবন ও মর্যাদা সবই হুমকির মুখে পড়েছে।

৫ আগস্টের পর থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী, আহমদিয়া সম্প্রদায় এবং সুফি সংশ্লিষ্ট কেউই নিরাপদ নন। মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে। প্রতিমা ভেঙে ফেলা হয়েছে। বাড়িঘরে লুটপাট হয়েছে। চাঁদাবাজি, নারীর প্রতি সহিংসতা এবং ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনে বাধা অব্যাহত রয়েছে।

সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে কথা বলার কারণে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস এখনও একটি মিথ্যা মামলায় কারাগারে রয়েছেন। এটিই প্রমাণ করে, সরকার পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, সংখ্যালঘুরা কোনো ভোটব্যাংক নয়, তারা বাংলাদেশের সমমর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ ধর্ম, বর্ণ ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করবে। সেই বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন ও উগ্রবাদের জিম্মি হতে দেওয়া যায় না।

যারা সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা চালায়, মন্দির ভাঙচুর করে কিংবা ধর্মের নামে মানুষকে হুমকি দেয়, তারা শুধু একটি সম্প্রদায়ের শত্রু নয়। তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার শত্রু। যখন কোনো নাগরিক তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভয়ে থাকে, তখন রাষ্ট্র ব্যর্থ হয়। আজ অনেক সংখ্যালঘু পরিবার সেই ভয়ের মধ্যেই দিন কাটাচ্ছে। নিরাপত্তার দাবিতে তাদের রাস্তায় নামতে হচ্ছে। এটি স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য লজ্জাজনক।

সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মন্দির ও উপাসনালয়ে হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর হুমকির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। যারা শান্তিপূর্ণভাবে সংখ্যালঘুদের অধিকারের পক্ষে কথা বলেন, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা বা হয়রানি করা চলবে না বরং তাদের কথা শুনতে হবে। ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমঅধিকার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের জন্যও উদ্বেগের বিষয়।

প্রশ্ন: আপনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। ব্যক্তিগতভাবে এই সময়টা আপনি কীভাবে কাটাচ্ছেন? আপনার মেয়ের সঙ্গে নিয়মিত দেখা হচ্ছে, নাকি নির্বাসিত জীবন বেশ সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে?

শেখ হাসিনা: দীর্ঘ সময় ধরেই আমার জীবনে ব্যক্তিগত বলে আলাদা কিছু নেই। আমি আমার জীবন বাংলাদেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি। ১৯৭৫ সালে আমি সবকিছু হারিয়েছি। তারপরও আমাকে দীর্ঘ সময় নির্বাসনে থাকতে হয়েছে। পরে দেশে ফিরে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে লড়াই করেছি। আজ আবার বাংলাদেশ একটি কঠিন সময় পার করছে। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে আমি সেখানে থাকতে পারছি না এটাই আমাকে গভীরভাবে কষ্ট দেয়। আমাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি।

আমার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বাভাবিক যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু আমার মন পড়ে আছে বাংলাদেশে। যে মাটিতে আমার বাবা শায়িত, যে দেশের মাটির সঙ্গে আমার পরিবারের রক্ত মিশে আছে, যে দেশের মানুষের জন্য আমি সারাজীবন কাজ করেছি। নিজের দেশের মানুষের থেকে দূরে থাকা, নিজের মাটির গন্ধ থেকে দূরে থাকা, এবং প্রতিদিন আমার নেতা-কর্মীদের কষ্টের খবর শোনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

আজ আমার ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে অনেক বড় বিষয় হলো বাংলাদেশের মানুষের অধিকার। দূর থেকেও আমি প্রতিদিন দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি। আমাদের নেতা-কর্মীদের খোঁজখবর নিই। নির্যাতিত পরিবারের গল্প শুনি। বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার চেষ্টা করি। আমার সংগ্রাম থেমে নেই।

আমার শক্তি বাংলাদেশের মানুষ, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী এবং জাতির পিতার আদর্শ। বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে আমি প্রতিদিন কাজ করে যাচ্ছি । আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষ আবার গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে। জনগণের শক্তিতে আওয়ামী লীগ আবারও ঘুরে দাঁড়াবে। আমি সেই সংগ্রামের সঙ্গেই আছি এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত থাকব।

বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ছবি: সংগৃহীত

Tuesday, June 23, 2026

আওয়ামী লীগের সামনে চারটি পথ, বেছে নেবে কোনটি by আনোয়ার হোসেন

আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এমন এক সময়ে এসেছে, যখন দলটি গভীর সংকটের মধ্যে রয়েছে। দীর্ঘ সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা দলটি আজ ক্ষমতার বাইরে, সাংগঠনিকভাবে বিপর্যস্ত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ এবং রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চয়তার মুখে। শীর্ষ নেতাদের অনেকেই কারাগারে, আত্মগোপনে কিংবা দেশের বাইরে।

টানা দেড় দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা দলটির সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—আওয়ামী লীগ কি আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরতে পারবে?

দেশের অন্যতম পুরোনো রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন জন্ম। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে দলটি। সবচেয়ে বেশি সময় দেশের ক্ষমতায় থাকার স্বাদ নিয়েছে। দলের প্রধান শেখ হাসিনা সবচেয়ে বেশি সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। এত এত সাফল্যের গল্প সবই ঢাকা পড়েছে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে।

এ অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতাই হারায়নি; দেড় দশকের অপশাসন, তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা—সব সামনে নিয়ে এসেছে। ফলে আওয়ামী লীগের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ—একদিকে টিকে থাকা, অন্যদিকে জনসমর্থন ফিরে পাওয়া। ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে দলটির অতীতের গৌরবের চেয়ে তাই বেশি আলোচিত হচ্ছে এর ভবিষ্যৎ। পুরোনো ও প্রভাবশালী এই রাজনৈতিক দল কীভাবে এ সংকট অতিক্রম করবে, সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম বড় প্রশ্ন।

বর্তমান কৌশল কতটা কার্যকর

ক্ষমতা হারানোর পর ২০২৫ সালের মে মাসে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। দলটির ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগও নিষিদ্ধ। ফলে দলটির কার্যক্রম পুরোপুরিই ভার্চ্যুয়াল মাধ্যমে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। মাঝেমধ্যে ঝটিকা মিছিল, হরতালের ডাকও এসেছে। তবে সেটা সরকারকে বেকায়দায় ফেলার মতো কিছু নয়। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছে, তবে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধই রয়েছে।

এবার ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কয়েক দিন ধরে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ঝটিকা মিছিল করছিল আওয়ামী লীগ। আজ মঙ্গলবার তা সারা দেশেই করার ঘোষণা দিয়েছেন দলটির আত্মগোপনে থাকা নেতারা।

এ পরিস্থিতিতে রাজধানী ঢাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পুলিশ বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং যেকোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ১৮ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন থাকবে। এর বাইরে সেনা মোতায়েনের জন্য চিঠি দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির আশঙ্কা থেকেই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আওয়ামী লীগের দলীয় সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগের তৎপরতা ঘিরে সরকার যে প্রস্তুতি নিয়েছে, সেটাই তাদের সাফল্য। কারণ, ঝটিকা মিছিল করে সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দেওয়া যাবে না। কিন্তু দেশে এবং দেশের বাইরে এ নিয়ে যে আলোচনা হোক—এটাই চাইছে আওয়ামী লীগ।

তবে আওয়ামী লীগের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগের এসব কর্মসূচি তেমন ফল বয়ে আনবে না; বরং দেশে থাকা যেসব নেতা-কর্মী জামিনে মুক্ত হয়েছেন, তাঁরা পুনরায় গ্রেপ্তার হতে পারেন।

ওই নেতা আরও বলেন, ছয় মাসের একটি সরকারের ওপর এভাবে চাপ দিতে গেলে হিতে বিপরীত হবে; বরং নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর থাকা নিষেধাজ্ঞা ওঠানো এবং মামলা-মোকদ্দমা মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়া উচিত; পাশাপাশি দলের ভেতর সংস্কার দরকার।

ইতিহাসের শক্তি, বর্তমানের দুর্বলতা

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার টিকাটুলীর রোজ গার্ডেনে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ হিসেবে যাত্রা শুরু, পরে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দিয়ে অসাম্প্রদায়িক সংগঠন হিসেবে আওয়ামী লীগের প্রসার ঘটে।

আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বড় শক্তি সব সময়ই ছিল ইতিহাসের বিভিন্ন কালপর্বে দলটির ভূমিকা। পাকিস্তানি শাসনামলে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা আন্দোলন, গণ-অভ্যুত্থান এবং মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি বড় রাজনৈতিক বাঁকে আওয়ামী লীগ ছিল কেন্দ্রীয় শক্তি।

১৯৬৬ সালে ছয় দফাভিত্তিক বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন এবং ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পরিণত হয় দলটি। ১৯৭১ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র যুদ্ধের পর ওই বছরের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। এসব অর্জন আওয়ামী লীগকে দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ১৬০টি আসন লাভ ছিল বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালের নির্বাচনেও দলটি বিপুল বিজয় অর্জন করে; যদিও ওই নির্বাচন নিয়ে উঠেছিল প্রশ্ন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার পর পাল্টে যায় দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট। দীর্ঘ ২১ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের পর ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফিরে আসে। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে পরাজয় এবং ২০০৭-এর ১১ জানুয়ারির পর আরেক দফা বিপর্যয় কাটিয়ে দলটি ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে তিন-চতুর্থাংশ আসনে বিজয়ী হয়। এরপর ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে পতনের আগপর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ।

ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের স্থায়ী সম্পদ নয় বা পক্ষে থাকবে না—এটা হয়তো ভুলেই গিয়েছিল আওয়ামী লীগ। ইতিহাস আওয়ামী লীগকে সমৃদ্ধ করেছে। কিন্তু গত এক দশকে আওয়ামী লীগের শাসনামল দলটির জন্য সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করেছে।

২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দল। এই সময়ে পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও সামাজিক উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকেও অগ্রগতির দাবি করেছে দলটি। কিন্তু দীর্ঘ ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে বিরোধীদের ওপর দমন–পীড়ন আওয়ামী লীগকে আগ্রাসী রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত করে। দেশে–বিদেশে জোটে কর্তৃত্ববাদী শাসনের তকমা। দীর্ঘ সময় গুম-খুনের পর গণ-অভ্যুত্থানে নির্বিচার গুলি করে হত্যা—অপশাসনের চরম সীমায় নিয়ে যায় আওয়ামী লীগকে।

২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে বিতর্ক আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বৈধতার ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে। বিরোধী দলগুলোর বর্জন এবং দেশে–বিদেশ নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নের কারণে ভোটারদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমে আসে। একসময় যে দল গণভিত্তিক আন্দোলনে সুনাম অর্জন করেছিল, তারাই অগণতান্ত্রিক পথে দেশ চালাতে থাকে।

শেখ হাসিনাতে পুনরুত্থান, শেখ হাসিনাতেই পতন

স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব আওয়ামী লীগ মাত্র সাড়ে তিন বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল। এরপর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পাঁচ মেয়াদে ২০ বছরের বেশি দেশ শাসন করেছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি চার যুগের কাছাকাছি সময় ধরে শেখ হাসিনা সভাপতি পদে আছেন।

ফলে আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক ইতিহাস মূলত শেখ হাসিনার ইতিহাস। ১৯৮১ সালে বিদেশে থাকা অবস্থায় আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পান শেখ হাসিনা। এরপর এই পদে তাঁর আর কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই তৈরি হয়নি দলে। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে যখন দলের দায়িত্ব নেন, তখন আওয়ামী লীগ ছিল বিভক্ত ও নেতৃত্বসংকটে আক্রান্ত একটি দল। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর দলটি বহু উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। সেই অবস্থায় শেখ হাসিনা দলকে পুনর্গঠিত করেন এবং ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র নেতা হয়ে ওঠেন।

১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা, ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয় এবং পরবর্তী প্রায় দেড় দশক ক্ষমতা ধরে রাখা শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই। ফলে দলটির ভেতরে বিকল্প নেতৃত্বের বিকাশ কার্যত থেমে যায়।

এখানেই আওয়ামী লীগের বর্তমান সংকটের অন্যতম উৎস। দীর্ঘ সময় ধরে দলটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক সংগঠনের চেয়ে নেতাকেন্দ্রিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে। নীতিনির্ধারণ, সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত, রাজনৈতিক অবস্থান—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেন শেখ হাসিনা। ফলে তাঁর অনুপস্থিতিতে দলটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বের সক্ষমতা দৃশ্যমানভাবে দুর্বল হয়ে পড়ে।

১৯৯০ সালে আন্দোলনের মাধ্যমে সামরিক শাসক এইচ এম এরশাদের পতন হয়। তিনি কারাগারে যান। আমৃত্যু তিনি দেশে ছিলেন এবং রাজনীতিতে সক্রিয় থাকেন। একমাত্র শেখ হাসিনাই বাংলাদেশে প্রথম প্রধানমন্ত্রী ও নেতা যিনি ক্ষমতা ছাড়ার পর দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। বেশির ভাগ মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, দলের শীর্ষ নেতা, এমনকি সহযোগী সংগঠনের নেতারাও দেশ ছাড়েন, যা বাংলাদেশে বিরল।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় শেখ হাসিনার প্রতি ব্যাপক ক্ষোভ দৃশ্যমান ছিল। ফলে আওয়ামী লীগের এই করুণ পরিণতির মূল দায়ভার শেখ হাসিনারই বলে মনে করেন দলটির অনেক নেতা ও শুভাকাঙ্ক্ষী।

সাংগঠনিক শক্তি কোথায় হারাল

আওয়ামী লীগ সব সময় দাবি করে এসেছে যে তাদের কোটি কোটি সমর্থক রয়েছে। ক্ষমতায় থাকার দীর্ঘ সময়ে আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় সুবিধাভোগী কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে দলীয় সংগঠন ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মধ্যে পার্থক্য ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে যায়। ক্ষমতা হারানোর পর দেখা যায়, সাংগঠনিক শক্তির বড় অংশও কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।

আওয়ামী লীগের অনেক নেতার মতে, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আওয়ামী লীগের এতটা দুরবস্থা হয়নি। জেল হত্যাকাণ্ড, অনেক নেতাকে কারাগারে প্রেরণের পরও দেশে অনেক নেতা ছিলেন। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি, সহযোগী সংগঠনের সব শীর্ষ নেতা বিদেশে আত্মগোপনে চলে গেছেন। অন্যরা কারাগারে চলে গেছেন। ফলে দেশে দলটি অনেকটাই নেতৃত্বশূন্য। বিদেশে থাকা নেতাদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগই মূল ভরসা, যা রাজপথ কিংবা ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য যথেষ্ট নয়।

বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের সামনে মূলত চারটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে বলে মনে করেন রাজনীতি–বিশ্লেষকেরা।

প্রথমত, দলটি দীর্ঘ সময় রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা অবস্থায় থাকতে পারে। নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মামলা, সাংগঠনিক নিষ্ক্রিয়তা এবং জনসমর্থনের সংকট মিলিয়ে দলটির পুনর্গঠন দীর্ঘায়িত হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগের ভেতরে নতুন নেতৃত্বের উত্থান ঘটতে পারে। দলটি যদি শেখ হাসিনানির্ভর কাঠামো থেকে বের হয়ে নতুন প্রজন্মের নেতৃত্বকে সামনে আনে এবং অতীতের ভুল নিয়ে আত্মসমালোচনা করে, তাহলে পুনর্গঠনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তৃতীয়ত, দলটি বিভক্ত হওয়ার ঝুঁকিতেও রয়েছে। ইতিহাস বলে, আওয়ামী লীগ অতীতেও একাধিকবার ভাঙনের মুখে পড়েছে। বর্তমান সংকট দীর্ঘ হলে নেতৃত্ব ও কৌশলগত প্রশ্নে নতুন বিভাজন সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

চতুর্থত, রাজপথে শক্তি দেখিয়ে আবার ফিরে আসা। অর্থাৎ বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি ভুল করবে। বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপি সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ হবে। প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়বে। এমন একটা সুযোগে আওয়ামী লীগ আবার রাজনীতিতে ফিরে আসবে। দৃশ্যত আওয়ামী লীগ এখনো এই পথেই হাঁটছে বলে মনে দলটির সূত্র জানিয়েছে। তবে অনেকেই এটাকে ভুল নীতি হিসেবে বিবেচনা করছেন।

৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আওয়ামী লীগ তাই এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দলটি কি আত্মসমালোচনা ও সংস্কারের পথ বেছে নিয়ে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের পুনর্গঠন করবে, নাকি অতীতের গৌরবের স্মৃতির ওপর নির্ভর করেই দীর্ঘ রাজনৈতিক অন্ধকারে পথ খুঁজবে—সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয় যাওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এভাবে ঘৃণা প্রকাশ করা হয়েছিল শেখ হাসিনাকে নিয়ে
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয় যাওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এভাবে ঘৃণা প্রকাশ করা হয়েছিল শেখ হাসিনাকে নিয়ে। ফাইল ছবি: প্রথম আলো

Saturday, June 20, 2026

সমাবেশে লোক ভাড়া করে বেশি মাথা দেখানো কী ফল দেয় by সালেহ উদ্দিন আহমদ

রাজধানীতে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সভা হয়ে গেল। এখনো হচ্ছে। বড় বড় রাজনৈতিক দল থেকে শুরু করে জুলাই আন্দোলনের ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন ‘সদ্যোজাত’ দল—সবাই, এই আন্দোলন মাসে সভা করেছে।

সরকারও পিছিয়ে নেই, তারাও জুলাই সনদ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সভা করেছে সংসদ ভবনের সামনে। এই মাসটাতে প্রতিটি সভাই জাতির জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ—বিভিন্ন অঙ্গীকার ও তথ্যে ভরপুর।

যাঁরা সভাগুলোয় যোগ দিয়েছেন বা যাঁরা অন্যভাবে সভাগুলোর প্রতি নজর রেখেছেন, তাঁদের জন্য এতসব গুরুগম্ভীর তথ্য সম্ভবত মনে রাখা খুব সহজ নয়। তবে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা, সবার জন্য সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং জুলাই সনদ নিয়ে নেতারা যা যা বলেছেন, সেগুলো মোটাদাগে সবাই স্মরণ করবেন।

তবে একটা জিনিস সবাই মনে রাখবেন। সেটা হলো ‘হেড কাউন্ট’। কোন দলের সভায় কত লোক হলো, কাদের সভায় রাস্তা কতটুকু উপচে উঠেছিল এবং যানবাহন কতক্ষণ বন্ধ ছিল—এই জিনিসগুলো আলোচনায় এসেছে।

আমাদের রাজনীতিবিদদের দরকার হেড কাউন্ট বা মাথার হিসাব। কারা সভায় কত মাথা আনতে পারলেন, তা দিয়ে জনপ্রিয়তা মাপা হয়ে থাকে। সমাবেশে যত বেশি হেড কাউন্ট, টিভি সংবাদ ও পত্রিকায় জনসভার ছবিও তত ভালো দেখাবে।

তবে জনসভার হেড কাউন্ট দল বিচারে বা জনপ্রিয়তার দৌড়ে যে খুব প্রভাব ফেলে, তা নিশ্চিত করে বলা যাবে না। বিগত সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের প্রতিটি জনসভায় উপচে পড়া ‘মাথা’ থাকত। কিন্তু জনতার স্বতঃস্ফূর্ত হেড কাউন্টের কাছে তারা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেনি।

জনসভায় হেড কাউন্ট জিনিসটা আমাদের রাজনীতিতে অনেক দিন ধরে চলে আসছে। একাত্তরের আগে দেখেছি, রাজনৈতিক দলগুলো বাস পাঠিয়ে ডেমরা, তেজগাঁও থেকে শ্রমিকদের নিয়ে আসত। প্রয়োজন হলে কাঁটাবন বস্তি থেকেও লোক আসত। তাতেই ভরে যেত পল্টন ময়দান। ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শেখ মুজিবের সভা ভরাতে বাস-ট্রেনের প্রয়োজন হয়নি, মানুষ নিজেদের উদ্যোগে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসেছিল।

মাওলানা ভাসানী যখন পল্টনে সভা করতেন, তখন অন্য দলের লোকজনও ওখানে যেত। কারণ, তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা সব সময়ে তুঙ্গে ছিল। তাঁর সভায় ডান দিকে টুপি মাথায় তাঁর ভক্ত ও মুরিদেরা থাকতেন, বাম দিকে লাল ঝান্ডা হাতে বা লাল পট্টি কপালে বেঁধে তাঁর রাজনৈতিক অনুসারীরা বসতেন। দক্ষিণপন্থী-বামপন্থী কোনো হাঙ্গামা হতো না। সবাই মন দিয়ে তাঁর সাম্যের বাণী শুনতেন। মাওলানা ভাসানী হেড কাউন্ট নিয়ে কখনো খুব মাথা ঘামাতেন না, যা ভাবতেন তাই বলতেন, আর যা বলতেন তা-ই করতেন।

এখন সময় পাল্টে গেছে। সবকিছু এখন ফাইভ স্টারভিত্তিক। দলের কাজকর্ম সব এখন ফাইভ স্টার ভবনে। রাজনৈতিক দলের ইফতার হবে ফাইভ স্টার হোটেলে। নেতাদের গাড়িবহর হবে ১০০টি গাড়িতে। দলের জনসভায় লোক আনানো হবে রেলগাড়িতে।

জনসভার জন্যও কোনো সীমারেখা নেই। মাঠ-ময়দান, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল চত্বর সবই বৈধ। রাজনৈতিক দলগুলোর অঢেল টাকা। তার কিছুটা সভা-সমিতিতে হেড কাউন্ট বাড়াতে খরচ হবে, সেটাই স্বাভাবিক।

১৯ জুলাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহাসমাবেশ উপলক্ষে বাইরে থেকে সমর্থকদের ঢাকায় আনার জন্য চার জোড়া বিশেষ ট্রেন ভাড়া করা হয়েছিল। ইসলামী আন্দোলনও গাড়ি ও লঞ্চ ভাড়া করে বাইরে থেকে লোক এনে ইদানীং ঢাকায় সভা করেছে। আমির আগেই ঘোষণা দিয়েছিলেন, ‘সারা দেশ থেকে কয়েক হাজার গাড়ি রিজার্ভ করা হয়েছে।’

আগে ছাত্ররা সভা করত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায়। বটতলায় সমাবেশ করাটাই ছিল তাদের গর্ব। একুশে যেত শহীদ মিনারে। এখন ছাত্রদের দলগুলো রাজনৈতিক দলগুলোকে পাল্লা দিচ্ছে। বাস-ট্রেন ভাড়া করে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ‘ছাত্র’ আনছে তাদের ‘ছাত্রসভায়’ যোগ দিতে।

জনসমর্থন দেখাতে রাজধানীতে ৩ জুলাই ছাত্রদল ও এনসিপির পৃথক সমাবেশ হয়েছে। পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পেয়েছে, জনসভায় হেড কাউন্ট বাড়াতে ছাত্রদল চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা পর্যন্ত ২০ বগির বিশেষ ট্রেন ভাড়া করেছে।

প্রথম আলোর খবরে প্রকাশ, ঐতিহাসিক জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ অনুষ্ঠানে সারা দেশ থেকে ছাত্র-জনতা আনতে আট জোড়া ট্রেন ভাড়া করেছে সরকার। এসব ট্রেনে করে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ছাত্র-জনতাকে ৫ আগস্ট ঢাকায় নিয়ে আসার কর্মসূচি নেওয়া হয়। আট জোড়া ট্রেনের জন্য প্রায় ৩০ লাখ ৪৬ হাজার টাকা ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। যদিও দেশের সব টিভি চ্যানেলে এই অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে, তবু বাইরের থেকে লোক আনতে হয়েছে। কারণ, সরকারের প্রয়োজন হেড কাউন্ট।

রাজনীতির আরেকটা হেড কাউন্টের বর্ণনা আশা করি এখানে অপ্রাসঙ্গিক হবে না। কিছু রাজনৈতিক দলের সভায় এই হেড কাউন্ট সবার চোখে পড়বে—স্টেজের ব্যানারে একটা ফ্যামিলি ট্রি-এর ছবি। বিএনপির ব্যানারে হেড কাউন্ট থাকে তিন—জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান। আওয়ামী লীগের ব্যানারে হেড কাউন্ট দুই—শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনা; তৃতীয়জন তারা এখনো ঠিক করে উঠতে পারেনি।

এক শ বছর পরে, এই দল দুটির ব্যানারে ফ্যামিলি ট্রি আরও বড় হবে, হেড কাউন্টও স্বভাবত আরও অনেক বাড়বে!

যুক্তরাষ্ট্রে খোদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও তাঁর রিপাবলিকান পার্টির প্রতিষ্ঠাতা কে, তা বলতে পারবেন কি না, সন্দেহ আছে। কারণ, ওদের ব্যানারে কোনো ফ্যামিলি ট্রি নেই।

একক হেড কাউন্টের বিষয়টাও এখন বলা যেতে পারে। শেখ হাসিনার সময় টিভি স্ক্রিনের ওপরের বাঁ দিকের কোনায় শেখ মুজিবের একটা মাথার ছবি প্রায়ই দেখা যেত বছরের প্রায় দশটা মাস। স্বাধীনতা দিবস, ৭ মার্চ, মৃত্যুদিবস, জন্মদিবস, বিজয় দিবস, পাকিস্তান থেকে প্রত্যাগমন দিবস ইত্যাদি সব দিবসে মাসব্যাপী অনুষ্ঠান থাকত। এই একক হেড কাউন্টটা শেখ মুজিবের মর্যাদা বাড়াতে কোনো সাহায্য করেনি।

এখন ইন্টারনেট-যুগে আমাদের শহরে গ্রামে প্রায় প্রতিটি জায়গায় ইন্টারনেট সংযোগ আছে। আমাদের জাতীয় দলের একজন বড় নেতা লন্ডনে বসে প্রায় প্রতিদিন বাংলাদেশে তাঁর সমর্থক ও দলীয় নেতাদের সঙ্গে ভার্চ্যুয়ালি কথা বলছেন। ঢাকার জনসভায়ও তিনি ভার্চ্যুয়ালি যোগ দিয়েছেন।

সুতরাং সশরীর হাজির হয়ে দলের হেড কাউন্ট বাড়াতে হবে, এই যুগে এ ধারণাটা অচল। হেড কাউন্ট বাড়াতে সভাস্থল থেকে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ভার্চ্যুয়াল যোগাযোগ স্থাপন করা যেতে পারে। যার যত সংযোগ এবং প্রতি সংযোগের স্ক্রিনে যত লোক দেখছেন, তার তত হেড কাউন্ট।

রাজনৈতিক দলগুলো ভাড়া করা গাড়িতে বাইরের থেকে লোকজন নিয়ে এসে আরও বড় প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারেন। যদি কোনো অর্বাচীন প্রশ্ন করে বসেন—বাইরের থাকে আনা লোকগুলোও কি ভাড়াটে? আড়াই কোটি লোকের শহরে হেড কাউন্ট দেখাতে, তাদের শহরের বাইরের থেকে লোক আনতে হবে কেন?

আজকাল আমাদের রাজনীতি ও রাজনৈতিক নেতারা প্রায় সবাই পুরোমাত্রায় ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে গেছেন। নেতাদের আগের দিনের মতো ঢাকার বাইরে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে সভা-সমিতি করতে দেখা যায় না। সেটাও একটা কারণ হতে পারে ঢাকার সভার হেড কাউন্ট বাড়ানোর। নেতারা যাবেন কেন জনগণের কাছে, জনগণকেই আসতে হবে তাঁদের কাছে! জনগণ হলো রাজনৈতিক দলের হেড কাউন্ট।

* সালেহ উদ্দিন আহমদ, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
- ই-মেইল: salehpublic711@gmail.com
- মতামত লেখকের নিজস্ব

রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে একটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশ
রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে একটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশ। প্রতীকী ছবি

Friday, March 27, 2026

জুলাই হত্যাকাণ্ড ও আওয়ামী এমপি: কাঠগড়ায় কি ভুল মানুষ? by ডেভিড বার্গম্যান

ডেভিড বার্গম্যানের বিশ্লেষণঃ বাংলাদেশে সবাই রংপুরে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই আবু সাঈদকে গুলি করে হত্যার ঘটনাটি জানেন। ছাত্র আন্দোলনের সময় এটি ছিল প্রথম দিকের প্রাণঘাতী ঘটনা; এরপর একে একে শত শত মানুষ মারা যান। ঘটনার ভিডিও ধারণ করা হয়েছিল এবং হাত প্রসারিত অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা এক তরুণ ছাত্রকে পুলিশের গুলি করার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত, তিন সপ্তাহের মাথায় শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে।

তবে ১৬ জুলাই শুধু আবু সাঈদই নিহত হননি। ওই দিনই চট্টগ্রাম শহরে আরও তিনজন নিহত হন। তাঁরা হলেন—ফয়সাল আহমেদ শান্ত, ওয়াসিম আকরাম ও মো. ফারুক। রংপুরের ঘটনার মতো এখানে পুলিশের ভূমিকা মুখ্য ছিল না। চট্টগ্রামে গুলির ঘটনায় জড়িত ছিলেন আওয়ামী লীগের কর্মী ও তাঁদের রাজনৈতিক নেতারা।

ঘটনার ছয় দিন পর, স্বাধীন সংবাদমাধ্যম নেত্র নিউজ চট্টগ্রামের এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে একটি বিস্তারিত অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তারা ঘটনাস্থলের ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে এবং একই সময়ের মাঠপর্যায়ের তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে। অনুসন্ধানে যাঁদের গুলি করতে দেখা যায়, তাঁরা সবাই আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের কর্মী বলে শনাক্ত হন।

নেত্র নিউজ জানায়, এই শুটাররা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও নুরুল আজিম রনির পরিচিত ও প্রমানিত অনুসারী। অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, বাবর নিজে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এবং আওয়ামী লীগের কর্মীদের একটি মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন। ভিডিও ও অন্যান্য প্রমাণে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, গুলিতে ব্যবহৃত অস্ত্রগুলো বাবরের এক সহযোগীর মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছিল।

এই লেখার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো—নেত্র নিউজের অনুসন্ধানে বলা হয়, হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও নুরুল আজিম রনি ছিলেন মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের ‘সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ তৃণমূল সহযোগীদের’ মধ্যে দুজন। সে সময় নওফেল ছিলেন দেশের শিক্ষামন্ত্রী এবং যে আসনে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে, তিনি ছিলেন সেই এলাকার সংসদ সদস্য।

নেত্র নিউজ জানায়, তারা নওফেল ও বাবরের একসঙ্গে রাজনৈতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার প্রায় এক শটি ছবি সংগ্রহ করেছে। পাশাপাশি, নওফেল যে বহুবার বাবরের বাড়িতে গিয়েছেন—এমন ছবিও তাদের কাছে আছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, রনিকে চট্টগ্রাম শহর ও আশপাশের এলাকায় নওফেলপন্থী ছাত্রলীগের প্রকৃত নেতা হিসেবে ধরা হতো।

নেত্র নিউজের এই অনুসন্ধান অবশ্যই চট্টগ্রামের ১৬ জুলাইয়ের ঘটনার জন্য কারও অপরাধ শত ভাগ প্রমাণ করে না। কিন্তু এটি তদন্তের জন্য একটি স্পষ্ট ও বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেয়। বাংলাদেশ পুলিশ হোক বা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারীরা—এই প্রতিবেদন থেকে তাঁরা জানতে পারেন কারা গুলি চালিয়েছে বলে অভিযোগ, অস্ত্রের উৎস কোথা থেকে এসেছে, বাবর ও রনি কীভাবে শুটারদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক ছিলেন, এবং সেই সঙ্গে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের তথ্যও এতে উঠে এসেছে।

ফজলে করিম চৌধুরীর গ্রেপ্তার

এসব তথ্য থাকার পরও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) কৌঁসুলিরা চট্টগ্রামের হত্যাকাণ্ডের জন্য প্রথমে নেত্র নিউজ যাঁদের চিহ্নিত করেছিল, তাঁদের কাউকে নিয়েই তদন্ত করেননি। বরং তাঁরা সম্পূর্ণ ভিন্ন এক সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যকে অভিযুক্ত করেন। ২০২৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের রাউজান আসনের সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরীকে আইসিটির বিচারকদের সামনে হাজির করা হয়। কৌঁসুলি আবদুল্লাহ নোমানের আবেদনের পর তাঁকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আটক রাখা হয়।

সেই সময় স্পষ্ট ছিল না, ঠিক কোন অপরাধের জন্য ফজলে করিমকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের আটকাদেশে কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার উল্লেখ ছিল না। সেখানে শুধু খুব সাধারণভাবে বলা হয়—সাম্প্রতিক জুলাই-আগস্টের ছাত্র–জনতার আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ, সহায়তা, উসকানি ও নির্দেশনার মাধ্যমে হত্যা, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধসহ নানা অপরাধ সংঘটিত করেছেন বলে কৌঁসুলি অভিযোগ করেছেন।

এরপর আইসিটির কৌঁসুলিরা ফজলে করিমের আইনজীবীদের একটি এক পৃষ্ঠার নোট দেন, যেখানে তাঁর আটকের কারণ ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করা হয়। ওই নোটে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই চট্টগ্রাম শহরে সংঘটিত তিনটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁকে যুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়, ওই দিন ফজলে করিম অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে মিলে দলীয় কর্মীদের ছাত্র-জনতার বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দমনে পরিকল্পিতভাবে আক্রমণ’ চালান এবং তারই ফলস্রুতিতে তিনজন নিহত হন।

তবে এই অভিযোগের পক্ষে ওই নোটে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি। সে সময় পর্যন্ত এই তিনটি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় একমাত্র ফজলে করিম চৌধুরীকেই আটক বা গ্রেপ্তারের আবেদন করেছিল আইসিটি।

অনেকের কাছেই এই আটক অযৌক্তিক বলে মনে হয়েছে। কারণ, ভিডিও ফুটেজ ও অন্যান্য যে প্রমাণ পাওয়া গেছে; বিশেষ করে নেত্র নিউজের অনুসন্ধানে যেগুলো উঠে এসেছে—সেগুলোতে চট্টগ্রামের হত্যাকাণ্ডে সম্পূর্ণ ভিন্ন আওয়ামী লীগ নেতাদের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তা ছাড়া ফজলে করিমের নিজ নির্বাচনী এলাকা রাউজানে (যা চট্টগ্রাম শহর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে) জুলাইয়ের অস্থিরতার সময় কোনো গুলির ঘটনা ঘটেনি, কেউ গুরুতর আহত হননি, এমনকি কোনো আন্দোলনকারী নিহতও হয়নি।

পুরোনো শত্রুতার নিষ্পত্তি?

এই প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর খুঁজতে গেলে দুজন ব্যক্তির পরিচয়ের দিকে নজর দিতে হয়। ফজলে করিম চৌধুরীর আটকাদেশ দেওয়ার কয়েক মিনিট পরই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বাইরে এক তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে তাঁরা দাবি করেন, তাঁদের ‘অভিযোগের’ ভিত্তিতেই আইসিটি ফজলে করিমকে গ্রেপ্তার করেছে। এই দুজন ব্যক্তি বলেন যে হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর ও নুরুল আজিম রনি শিক্ষামন্ত্রী নওফেলের লোক না। তাদের দাবী হলো বাবর ও রনি আসলে ফজলে করিম চৌধুরীর লোক। উল্লেখ্য, ১৬ জুলাইয়ের ঘটনায় এই বাবর ও রনিকেই মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল নেত্র নিউজের অনুসন্ধানি প্রতিবেদন।

সংবাদ সম্মেলনে কথা বলা এই দুই ব্যক্তি হলো আবদুল্লাহ আল মামুন ও জুবায়ের আহমেদ। তারা ফজলে করিমের সাবেক নির্বাচনী এলাকা রাউজানকেন্দ্রিক একটি ধর্মীয় গোষ্ঠী মুনিরিয়া যুব তাবলিগ-এর সঙ্গে যুক্ত। কেউ কেউ এই সংগঠনটিকে একটি স্বাভাবিক ধর্মীয় সংগঠন হিসেবে দেখেন। আবার অনেকের মতে এটি চরমপন্থী এবং ভূমি দখলসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। মুনিরিয়ার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ কতটা সত্য, তা আলাদা বিষয়। তবে এটুকু স্পষ্ট যে রাউজানের সংসদ সদস্য থাকাকালে ফজলে করিম ও মুনিরিয়া যুব তাবলিগের মধ্যে প্রায়ই পরষ্পর বিরোধিতা হয়েছে। ফজলে করিমের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি তাদের অপরাধমূলক তৎপরতা দমনে চেষ্টা করেছিলেন।

ফজলে করিমের পরিবার মনে করে, এই দ্বন্দ্বই তাঁর দীর্ঘ আটক থাকার মূল কারণ। তাদের দাবি—এখন প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে মুনিরিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা চাপ সৃষ্টি করছে, আর সেই চাপের ফলেই তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও বিচারপ্রক্রিয়া এগোচ্ছে।

এটা নিশ্চিতভাবেই দেখা যাচ্ছে যে মুনিরিয়ার সঙ্গে যুক্ত এবং নতুন কিছু ছাত্রগোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা বারবার ফজলে করিমের আটক, বিচার, এমনকি মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার জন্য সক্রিয়ভাবে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ফজলে করিম গ্রেফতার হবার আগে, ২০২৪ সালের অক্টোবরে, মুনিরিয়ার এক সদস্য সম্রাট রোবায়েত (যিনি পরবর্তীতে আইসিটিতে দেওয়া মূল অভিযোগটি লেখার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন) চট্টগ্রামের একটি আদালতের সামনে এক সমাবেশের নেতৃত্ব দেন। সেখানে একটি ব্যানারে ফজলে করিমের গলায় ফাঁসের ছবি দেখিয়ে প্রকাশ্যেই তাঁর ‘ফাঁসি’ দাবি করা হয়।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একদল ছাত্র (যাদের মধ্যে অন্তত একজন মুনিরিয়া যুব তাবলিগের সঙ্গে যুক্ত) অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই সাক্ষাৎ নিয়ে ফেসবুকে দেওয়া একটি পোস্টে বলা হয়, এটি ছিল—‘বিচার ব্যাবস্থা ও আওমী সন্ত্রাসীদের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োগ ও রাউজানের শীর্ষ সন্ত্রাসী ফজলে করিমের সর্বোচ্চ শাস্তি সহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মাননীয় প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রাফাত আহমেদ এর সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ।’ ‘সর্বোচ্চ শাস্তি’ বলতে সাধারণভাবে মৃত্যুদণ্ডকেই বোঝানো হয়।

এরপর ২০২৬ সালের ১২ জানুয়ারি ফজলে করিমের গুরুতর স্বাস্থ্যগত অবস্থার কারণে পরিবার তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার আবেদন করলে রোবায়েতসহ অন্যান্য লোকজন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে ঘেরাও কর্মসূচি পালন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল—ফজলে করিম যেন কোনোভাবেই, তাদের ভাষায়, ‘জামিন’ না পান। ওই কর্মসূচিতে বক্তব্য দিতে গিয়ে রোবায়েত বলেন, ‘চট্টগ্রামের অন্যতম গণহত্যাকারী এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, তাঁকে জামিন দেয়ার নাকি…চক্রান্ত চালাচ্ছে একটি নির্দিষ্ট চক্র…আমরা চাই এইসব হত্যাকারি যাতে কোনভাবেই জামিন না পায়।’

এমনকি এর কয়েক সপ্তাহ আগেই রাউজানে এক সভায় আরেকজন ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়—যদি ‘তাকে ট্রাইব্যুনাল থেকে তাঁকে মুক্ত দেয়ার যে পাঁয়তারা যে গল্প আপনারা সাজাচ্ছেন তা আমাদের জানা…যদি সত্য হয়’, চট্টগ্রামের মানুষ তথা রাউজানের মানুষ প্রত্যেকটা মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আপনাদের ট্রাইব্যুনাল ভেঙ্গে দেব।

আইসিটির জবাব

এই মামলার দায়িত্বে থাকা আইসিটির কৌঁসুলি আবদুল্লাহ নোমান স্বীকার করেছেন, ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনার জন্য ট্রাইব্যুনালের ওপর বাইরের কিছু গোষ্ঠী চাপ সৃষ্টি করেছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, কৌঁসুলিরা এমন চাপের কাছে নতি স্বীকার করছেন না।

নোমান বলেন, ‘এটা ঠিক যে মুনিরিয়া কোনোভাবে বিচারপ্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করছে এবং ফজলে করিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিশ্চিত করতে জনতার চাপ তৈরি করতে চাইছে। কিন্তু আমরা আইসিটির কৌঁসুলি হিসেবে; এবং এই মামলার দায়িত্বপ্রাপ্ত কৌঁসুলি হিসেবে যতক্ষণ না পর্যন্ত চূড়ান্তভাবে প্রাথমিকভাবে (প্রাইমা ফেসি) অভিযোগের ভিত্তি পাই, ততক্ষণ কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছি না। সে কারণেই মামলাটি এখনো তদন্তাধীন রয়েছে।’

নোমান আরও স্বীকার করেন, ফজলে করিমের বিরুদ্ধে মামলা করার ক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘যে আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, সেই এলাকায় কোনো নৃশংস ঘটনা ঘটেনি বা সংঘটিত হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম শহরে, অর্থাৎ যেখানে ওই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে, সেখানে ফজলে করিমের কোনো সাংগঠনিক দায়িত্ব ছিল না; তিনি আওয়ামী লীগ, যুবলীগ বা ছাত্রলীগের কোনো পদে ছিলেন না।

তবে নোমান উল্লেখ করেন, মুনিরিয়ার পক্ষ থেকে দেওয়া মূল অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, জুলাইয়ের আন্দোলনের সময় ফজলে করিম ছাত্রদের হত্যার উদ্দেশ্যে অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবরাহ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘এই অভিযোগটি আমরা এখনো তদন্ত করে দেখছি।’

এর ফলে আটক হওয়ার এক বছর পরও ফজলে করিম ও তাঁর পরিবারকে তাঁর ভবিষ্যৎ কী হবে—তা জানার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এদিকে চট্টগ্রাম শহর আওয়ামী লীগ বা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যুক্ত বিভিন্ন ব্যক্তিকে এখন গ্রেফতার করা হয়েছে বা তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়েছে এই হত্যাগুলোর মামলায়। এর মধ্যে রয়েছেন সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও।

এই পরিস্থিতির আলোকে ফজলে করিম চৌধুরীর গ্রেফতার নিয়ে উদ্বেগ হলো তাঁকে যে এখনো অন্তরীন রাখা হয়ছে তা কি আদৌ কোন প্রমানের ভিত্তিতে হচ্ছে কিনা। বরং বাস্তবতা হলো—মুনিরিয়া যুব তাবলিগ ও তাদের সঙ্গে যুক্ত কিছু ছাত্রগোষ্ঠীর সংগঠিত প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় আইসিটির কৌঁসুলিরা কার্যত একজন সাবেক আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্যকে মুক্তি দিতে সাহস পাচ্ছেন না, যদিও তাঁর বিরুদ্ধে আনা মূল অভিযোগগুলোর পক্ষে কোনো শক্ত প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

* ডেভিড বার্গম্যান, সাংবাদিক। ফেসবুক অ্যাকাউন্ট: david.bergman.77377
- ইংরেজি থেকে অনূদিত। মতামত লেখকের নিজস্ব।

গত বছরের ১৬ জুলাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নগরের মুরাদপুর এলাকায় হামলা করেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা
গত বছরের ১৬ জুলাই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নগরের মুরাদপুর এলাকায় হামলা করেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা। ছবি: জুয়েল শীল

Wednesday, February 18, 2026

নোয়াখালীতে তালা ভেঙে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা, দিলেন স্লোগান

প্রায় ১৭ মাস ধরে তালাবদ্ধ ছিল নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়। আজ বুধবার সকাল সাতটার দিকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ৩০ থেকে ৩৫ জন নেতা-কর্মী তালা ভেঙে সেই কার্যালয়ে ঢোকেন। এরপর ‘জয় বাংলা’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে কার্যালয়টিতে একটি ব্যানার টাঙিয়ে সটকে পড়েন তাঁরা।

জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়টি নোয়াখালী শহরের টাউন হল মোড়ে অবস্থিত। কার্যালয় খোলার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশের একটি দল। এ সময় সন্দেহভাজন পাঁচজনকে আটক করা হয়।

সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সরেজমিনে দেখা যায়, কার্যালয়ের সামনে বেশ কিছু পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। কার্যালয়ের পাশে পুলিশের একটি গাড়িতে আটক পাঁচজনকে রাখা হয়েছে। আশপাশের দোকানিসহ কিছু উৎসুক জনতা ঘটনাস্থলে ভিড় করেছেন।

তালা ভেঙে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে ঢোকা এবং স্লোগান দেওয়ার একটি ভিডিও ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেখা যায়, ‘নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়’ লেখা একটি ব্যানার হাতে নিয়ে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গে বয়স্ক এক ব্যক্তিকেও দেখা গেছে। ব্যানারটি টাঙিয়ে দিয়ে সবাই সটকে পড়েন।

জানতে চাইলে সুধারাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. তৌহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ভোরে দলীয় কার্যালয়ের তালা ভেঙেছেন। এ ঘটনায় পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। জড়িত বাকি ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার জন্য অভিযান চলছে।

২০২৪ সালের ৩ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ার জেরে জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালানো হয়। বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা এই ভাঙচুর চালান। এ সময় কার্যালয়টিতে আগুনও দেওয়া হয়। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে কার্যালয়টির প্রধান ফটকে তালা ঝোলানো ছিল।

ব্যানার হাতে নিয়ে ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীদের স্লোগান। আজ সকালে নোয়াখালীর মাইজদীর টাউন হল মোড়ে অবস্থিত জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে
ব্যানার হাতে নিয়ে ছাত্রলীগের নেতা–কর্মীদের স্লোগান। আজ সকালে নোয়াখালীর মাইজদীর টাউন হল মোড়ে অবস্থিত জেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে। ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

Tuesday, February 17, 2026

আগে নৌকার জন্য ভোট চাওয়ার ব্যাখ্যা দিলেন রবি চৌধুরী

প্রকাশ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ঃ ‘আমাকে দালাল বানাবেন না, আমি দালাল না’—গতকাল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির হয়ে ঢাকা-১৭ আসনে ভোট চাইতে গিয়ে গণমাধ্যমের সামনে কথাটি বলেন সংগীতশিল্পী রবি চৌধুরী। এ আসনে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের জন্য ভোট চাইতে পুলিশ প্লাজা থেকে গুলশান গার্ডেন ও এর আশপাশের এলাকায় গণসংযোগ করেন সমর্থক শিল্পীদের একটি অংশ। সেখানে উপস্থিত ছিলেন অভিনেত্রী রিনা খান, সংগীতশিল্পী মনির খান, চিত্রনায়িকা সামসুন নাহার সিমলা, অভিনেতা শাহেদ শরীফ খান প্রমুখ। বিএনপিপন্থী শিল্পীরা প্রচারে গিয়ে সাধারণ পথচারী, রিকশাচালক থেকে শুরু করে স্থানীয় লোকজনের কাছে দোয়া ও ভোট চান।

বিএনপির চেয়ারম্যানকে জয়যুক্ত করার জন্যও অনুরোধ করেন তাঁরা। প্রচারের একপর্যায়ে উপস্থিত সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন শিল্পীরা। ভোট নিয়ে দলটির প্রতিশ্রুতিও তুলে ধরেন মনির খান ও রিনা খানরা। এরপর সাংবাদিকদের উদ্দেশে অনেকটা আক্ষেপ নিয়ে সংগীতশিল্পী রবি চৌধুরী বলেন, ‘এখন ফেসবুক তো গরম হয়ে গেছে। সম্প্রতি আমি ও মনির খান ঠাকুরগাঁও জেলায় বিএনপির জন্য ভোট চাইতে গিয়েছিলাম। সেখানে অনেকেই প্রশ্ন তোলে আমাকে নিয়ে যে আমি নৌকার জন্য ভোট চেয়েছিলাম।’

এরপর রবি বলেন, ‘আমাকে দালাল বানাবেন না, আমি দালাল না। আমি কি কাজ করি, আমার এলাকায় গিয়ে দেখেন। গায়িকা মমতাজ আমাকে দাওয়াত দিয়েছিল। সে আমার সহশিল্পী। তার অনুরোধে তার মার্কার জন্য আমি ভোট চেয়েছি। এখানে আমি কারও দালালি করিনি। আমি গান গাইতে গিয়েছি। যেখানে টাকা দেবে, সেখানেই গান গাইব, সেটা যেই হোক।’

এ বিষয়ে প্রথম আলো আজ মঙ্গলবার দুপুরে কথা বলে রবি চৌধুরীর সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমি ২০০৩ সালে খালেদা জিয়ার সফরসঙ্গী ছিলাম। মিয়ানমারে তখন আমি আর শাকিলা জাফর “কইলজার ভিতর গাঁথি রাইক্কুম তোঁয়ারে” গানটি গেয়েছি। তারেক রহমান সাহেবও সেই অনুষ্ঠানে ছিলেন। তাঁকে আমি ব্যক্তিগতভাবেও চিনি। জানাশোনাও ভালো। মানুষের সঙ্গে মিশলে মানুষ সম্পর্কে জানা যায়। মেশার পর জেনেছি, তিনি ভদ্রলোক। আমি কিন্তু একটা সময় জাসাসের অনেক অনুষ্ঠানও করেছি। দলীয়ভাবে যদিও আমি কোনো পদপদবি নিইনি। তবে ওরা চেয়েছিল আমাকে বিএনপিতে রাখতে। গাজী মাজহারুল আনোয়ার ভাই ও হেলাল খানও আমাকে বারবার চেয়েছিলেন। বলেছি, দল করব না কিন্তু আপনাদের সমর্থনে আছি। আমি কিন্তু আওয়ামী লীগের কোনো কমিটিতে ছিলাম না। নৌকার জন্য যে ভোট চেয়েছি, তা মমতাজ আমার সহকর্মী—সে অনুরোধ করেছে, সেখানে গিয়ে আমি তাঁর ভোট চেয়েছি। এখানে যদি মনির খানও বলে—আমি তার জন্যও ভোট চাইতে যাব। আমার অঙ্গনের অন্য কোনো সহকর্মী এক্স, ওয়াই জেড—যে–ই বলুক, তার জন্যও নামব। এখন চাই, জাতীয়তাবাদী দল ধানের শীষ বিজয়ী হোক।’

বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণায় রবি চৌধুরী, সঙ্গে মনির খানও
বিএনপির নির্বাচনী প্রচারণায় রবি চৌধুরী, সঙ্গে মনির খানও। ছবি : শিল্পীর ফেসবুক থেকে

মানুষ রাজনীতি করে কেন, সুবিধা নেওয়ার জন্য তো? এমপি হওয়ার জন্য, মন্ত্রী হওয়ার জন্য—কিন্তু আমার এ ধরনের কোনো লোভ নেই—উল্লেখ করে রবি চৌধুরী বলেন, ‘কোনো সুবিধা নেওয়ার জন্য ধানের শীষের প্রচারণা করছি না। আগের সরকারের আমলেও করিনি, এই সরকারের আমলেও না। শুধু দেশ বাঁচানোর জন্য ধানের শীষের জন্য প্রচারে নেমেছি।’

আগে নৌকার জন্য ভোট চেয়েছেন—এমন প্রসঙ্গ উঠতেই রবি চৌধুরী বললেন, ‘আগেই বলেছি, মমতাজ আমার দীর্ঘদিনের সহকর্মী, এটা একান্তই তার অনুরোধে। আওয়ামী লীগের কোনো মিছিল–মিটিংয়ে গেছি কি না, সেটা কেউ আমাকে দেখাক। আমার সঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে নানান কথা লেখা হচ্ছে! তাদের বলতে চাই, একজন শিল্পী হিসেবে দেশের প্রধানমন্ত্রী যখন শিল্পী হিসেবে আমাকে দাওয়াত দেন, যাওয়াটা আমারও দায়িত্ব। শিল্পী হিসেবে অন্যদের যেমন দাওয়াত দিয়েছেন, আমাকেও তাই। ওই দাওয়াতের কিছু ছবি এখন মির্জা ফখরুল ইসলাম সাহেব এবং তারেক রহমান সাহেবের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে ভিউ পাওয়ার জন্য একটা গ্রুপ খবর ছড়াচ্ছে। এসব করছে ভিউ ব্যবসায়ীরা। স্পষ্টভাবে বলতে চাই, শিল্পী হিসেবে আমার দেশে যিনি প্রধানমন্ত্রী থাকবেন, তিনি যখন আমাকে সম্মান দিয়ে ডাকবেন—আমি অবশ্যই যাব। এই যাওয়াটা আমার দেশের প্রধানমন্ত্রীকেও সম্মান দেখানো।’

টাকার জন্য শিল্পীরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গান করে থাকেন। মমতাজের নির্বাচনী প্রচারণার অনুষ্ঠানেও টাকা পেয়েছেন বলে গান করেছেন রবি চৌধুরী—এমনটাই জানালেন। আর সেই অনুষ্ঠানে মমতাজের জন্য সবার কাছে ভোট চেয়েছেন তিনি।

রবি চৌধুরী বলেন, ‘মমতাজের অনুষ্ঠানে আমাকে টাকার বিনিময়ে নিয়ে গেছে। আমি সেখানে গান গেয়েছি। যারাই আমাকে টাকা দেবে, তাদের সঙ্গে যদি অন্যান্য শর্ত মেলে, তাহলে অবশ্যই গান গাইব। তা ছাড়া মমতাজ তো আমাদের বন্ধু, এটা তো অস্বীকার করতে পারব না। সে আমাদের খুব কাছের, আপনজন। আমরা সবাই তো তার বাসায় আড্ডা দিতাম। মনির খান, ওমর সানি, অপু বিশ্বাস থেকে শুরু করে অনেকে মমতাজের বাসায় দিনের পর দিন আড্ডা দিয়েছি। কারণ, আমরা শিল্পী পরিবার। এই পরিবারের কেউ যদি আওয়ামী লীগ করে, তাঁকে তো আমি ফেলে দিতে পারব না, অস্বীকার করতে পারব না। সে–ও এই দেশের নাগরিক, শিল্পী পরিবার—শিল্পী রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকবে, কিন্তু সরকারে যেই–ই থাকুক—শিল্পীর শিল্পকর্মটাই সরকারের বিবেচনায় রাখা উচিত।’

মমতাজের সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় রবি চৌধুরী
মমতাজের সঙ্গে নির্বাচনী প্রচারণায় রবি চৌধুরী। ছবি : সংগৃহীত

Saturday, February 14, 2026

পঞ্চগড়ে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের তালা খোলা বিএনপি নেতা বললেন, সেটি গুদামঘর

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিন পঞ্চগড়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দলীয় কার্যালয়ের তালা খোলা–সংক্রান্ত ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধান। গতকাল শুক্রবার রাত ১১টার দিকে জেলা শহরের পুরাতন ক্যাম্প এলাকায় সংবাদ সম্মেলন করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে আবু দাউদ প্রধান দাবি করেন, ঘটনাস্থলটি চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কার্যালয় ছিল না। বরং তিনি সেটিকে একটি গুদামঘর হিসেবেই জানতেন। তাঁর রাজনৈতিক ক্যারিয়ার নষ্ট করা এবং সামাজিকভাবে হেয় করার উদ্দেশ্যে ভিডিওটি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

আবু দাউদ প্রধান বলেন, তিনি পঞ্চগড় সদর উপজেলার চাকলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) তিনবারের সাবেক চেয়ারম্যান। গতকাল সকালে গ্রামের বাড়ি থেকে শহরে আসার পথে চাকলাহাট বাজারে লোকজনের জটলা দেখে সেখানে যান। স্থানীয়দের কাছ থেকে জানতে পারেন, জামায়াতে ইসলামীর এক কর্মী একটি গুদামঘরের তালার চাবি দিচ্ছিলেন না। পরে তিনি ওই কর্মীকে চাবি দিতে বললে তালা খুলে দেওয়া হয় এবং চাবিটি বাজার বণিক সমিতির সভাপতির কাছে জমা রাখা হয়।

স্থানীয় বিএনপির এই নেতার ভাষ্য, ‘এ সময় আমি ঘরটি গুদামঘর বলেই জানতাম। সেখানে কোনো চেয়ার, টেবিল বা কোনো রাজনৈতিক দলের সাইনবোর্ড ছিল না। ঘটনার সময় আমি লোকজনকে সামলাতে গিয়ে আমার পাশে দাঁড়িয়ে কে কী বক্তব্য দিয়েছেন—তা আমি বুঝে উঠতে পারিনি। পরে শুনেছি সেখানকার ভিডিও আওয়ামী লীগ অফিস খুলে দেওয়া হয়েছে বলে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’

এর আগে গতকাল দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে বক্তব্য দিচ্ছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান বুলেট। সেখানে উপস্থিত ছিলেন আবু দাউদ প্রধান, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য ও সাবেক ইউপি সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আনিসুজ্জামান স্বপনসহ আরও অনেকে। আওয়ামী লীগ কার্যালয় খুলে দেওয়ায় আবু দাউদ প্রধানকে ধন্যবাদ জানাতে দেখা যায়।

সংবাদ সম্মেলন করে বক্তব্য দেন পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধান। গতকাল শুক্রবার রাতে পঞ্চগড় জেলা শহরের পুরাতন ক্যাম্প এলাকায়
সংবাদ সম্মেলন করে বক্তব্য দেন পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধান। গতকাল শুক্রবার রাতে পঞ্চগড় জেলা শহরের পুরাতন ক্যাম্প এলাকায়। ছবি: প্রথম আলো

পঞ্চগড়ে বিএনপি নেতার উপস্থিতিতে খুলে দেওয়া হলো আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের তালা

পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধানের উপস্থিতিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের চাকলাহাট ইউনিয়ন কার্যালয়ের তালা খুলে দেওয়া হয়েছে। আজ শুক্রবার সকালে উপজেলার চাকলাহাট বাজারে এ ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।

আবু দাউদ প্রধান চাকলাহাট ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি ওই ইউনিয়নের মেহেরপাড়া এলাকার বাসিন্দা। এ বিষয়ে আবু দাউদ প্রধান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজ সকালে চাকলা বাজারে যাওয়া পর কয়েকজন আমাকে এসে বললেন, “আওয়ামী লীগ অফিসে যে তালা লাগায় রাখছে, এটা নিয়ে সেখানে উত্তেজনা বিরাজ করছে।” তখন আমি বললাম, উত্তেজনা তৈরি করা যাবে না। যে যে অবস্থানে আছেন, শান্তিপূর্ণভাবে থাকেন। আমরা এক এলাকার মানুষ সবাই সহাবস্থানে থাকব। কেন তালা দেবে? পরে তালা খুলে দিতে বলি। জামায়াতের লোকজন তালা লাগিয়ে দিয়েছিল, তারাই আবার তালা খুলে দিয়েছে। এটা মূলত এলাকার শান্তিশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য, এখানে কোনো দলীয় সিদ্ধান্ত নেই। এটা নিয়ে এখন অনেকে ষড়যন্ত্র করে ভিডিও ছড়িয়ে দিচ্ছে।’

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া ১ মিনিট ৩৫ সেকেন্ডের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান (বুলেট)। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে আছেন পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধান। তাঁর পাশে চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য ও ইউপির সাবেক সদস্য আবুল হোসেন ও পঞ্চগড় জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনিসুজ্জামান (স্বপন)। তাঁদের সামনের দিকে অন্তত ৩০ জনের বেশি মানুষ।

ভিডিওতে কামরুজ্জামান বলেন, ‘বিএনপি বিপুল আসনে সারা বাংলাদেশে সরকার গঠনের পথে, এই প্রথম মুহূর্তে পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সংগ্রামী সভাপতি, চাকলাহাট ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান জননেতা জনাব আবু দাউদ প্রধান; তিনি প্রথমেই যে কাজটি করেছেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রতি, তথা আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতা–কর্মীদের প্রাণের যে সংগঠন, আমাদের চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগকে তিনি আজকে তালামুক্ত-অবমুক্ত করেছেন।’

কামরুজ্জামান আরও বলেন, ‘যারা এই দেশটাকে পাকিস্তান বানাতে চেয়েছিল, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষের প্রতিটি দলকে নিশ্চিহ্ন করার চিন্তাভাবনা করে বাড়িতে-অফিসে হামলা করে বন্ধ করে রেখেছিল, সেই অফিস আজকে প্রথমে তিনি চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ অফিস অবমুক্ত করলেন। আমরা চাকলাহাট ইউনিয়ন আওয়ামী লীগসহ সব অঙ্গ–সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে তিনার কাছে আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।’

ফেসবুকে ওই ঘটনার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনা শুরু হয়েছে। পঞ্চগড়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা ও জাসাস নেতা ইউনুস শেখ তাঁর কমেন্টে লিখেছেন, ‘পঞ্চগড় সদর থানার সভাপতিকে কে দায়িত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন করার জন্য, আমার বোধগম্য হলো না।’

উল্লেখ্য, সদর, তেঁতুলিয়া এবং আটোয়ারী উপজেলা নিয়ে গঠিত পঞ্চগড় -১ আসনে বেসরকারি ফলাফলে বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী মুহম্মদ নওশাদ জমির। তিনি ধানের শীষ প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৭৬ হাজার ১৬৯ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এনসিপির প্রার্থী সারজিস আলম শাপলা কলি প্রতীকে পেয়েছেন ১ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯ ভোট।

পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধানের উপস্থিতিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের চাকলাহাট ইউনিয়ন কার্যালয়ের তালা খুলে দেওয়া হয়েছে। আজ শুক্রবার সকালে উপজেলার চাকলাহাট বাজারে
পঞ্চগড় সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবু দাউদ প্রধানের উপস্থিতিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের চাকলাহাট ইউনিয়ন কার্যালয়ের তালা খুলে দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার সকালে উপজেলার চাকলাহাট বাজারে। ছবি : ভিডিও থেকে নেওয়া

Wednesday, February 11, 2026

ভোটে না থেকেও যেভাবে ‘ভোটে’ থাকবে আওয়ামী লীগ by সোহরাব হাসান

অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় দেশের অন্যতম প্রধান দল আওয়ামী লীগ ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছে না। অতীতে অনেক সরকার অনেক দলকে নিষিদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত দমিয়ে রাখতে পারেনি।

শেখ হাসিনা সরকারের অন্তিম সময়ে জামায়াতে ইসলামীকে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। অথচ দলটি এবারের নির্বাচনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। জিয়াউর রহমানের আমলে ডেমোক্রেটিক লীগ ও কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

প্রশ্ন উঠেছে, আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাধারণ কর্মী-সমর্থকেরা কী করবেন? বিদেশে নিরাপদে থাকা আওয়ামী লীগ নেতারা একের পর এক হুকুম দিয়ে চলেছেন। কিন্তু তাঁদের সে হুকুম দেশে থাকা নেতা-কর্মীদের কতটা বিপদে ফেলছে, তাঁরা একবারও ভাবেননি।

গত বছর বেশ কিছু অঘটন ঘটেছে নেতাদের উসকানিমূলক বিবৃতির কারণে। তাঁরা ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের অনুসরণে শাটডাউন ও কমপ্লিট শাটডাউনের আওয়াজ তুলেও জনগণের সাড়া পাননি। বরং মিছিল করতে গিয়ে সাধারণ কর্মীরা জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন।

আওয়ামী লীগের নেতারা এখন বলছেন, ‘যেই নির্বাচনে নৌকা নেই, সেই নির্বাচন কখনো গ্রহণযোগ্য হবে না।’ আওয়ামী লীগের বর্তমান নেতৃত্ব এখন সব দলকে নিয়ে নির্বাচন করার জোর দাবি জানাচ্ছেন। কিন্তু ক্ষমতায় থাকতে তাঁরা বিরোধী দলকে বাদ দিয়ে একের পর এক জবরদস্তির নির্বাচন করেছেন।

গত ১৭ মাসে দেশে থাকা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা দুঃসহ বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। একসময়ের রাজনৈতিক ‘শত্রুদের’ কৃপা নিয়েও অনেকে বেঁচে আছেন। কেউবা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন।

এ অবস্থায় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পক্ষে আনুষ্ঠানিক ভোট বর্জন মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অর্থাৎ সবাই না হলেও আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি বড় অংশ ভোটকেন্দ্রে যাবেন এবং ভোটও দেবেন।

প্রশ্ন হলো, নৌকাবিহীন ব্যালটে তাঁরা কাকে বেছে নেবেন? এ ক্ষেত্রে বিকল্প হতে পারত বাম দলগুলো। কিন্তু তারা নির্বাচনকে নিয়েছে প্রতীকী আয়োজন হিসেবে। অনেক বড় নেতা ভরাডুবির ভয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাই করছেন না। দ্বিতীয় বিকল্প হলো বিএনপি বা তাদের সমমনা দলগুলো। বিএনপির নেতাদের একাত্তরকেন্দ্রিক সাম্প্রতিক বক্তৃতা-বিবৃতিতে আওয়ামী লীগের প্রতিধ্বনি মেলে। তৃতীয় বিকল্প হবে স্থানীয়ভাবে জয়ের সম্ভাবনা আছে, এমন প্রার্থীকে ভোট দেওয়া।

বেসরকারি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটির পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে (পেপস) কিছুটা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের মনোভাব তুলে ধরেছে। আগের আওয়ামী লীগ ভোটারদের ৩২ দশমিক ৯ শতাংশ বিএনপিকে ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা প্রকাশ করেছেন। ১৩ দশমিক ২ শতাংশ জামায়াতকে ভোট দিতে পারেন বলে জানিয়েছেন। আর ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ এখনো সিদ্ধান্তহীন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, আগে যাঁরা সিদ্ধান্তহীন ছিলেন বা পছন্দ প্রকাশ করেননি, তাঁদের মধ্য থেকে জামায়াতের তুলনায় বেশি ভোট পেয়েছে বিএনপি। বিএনপির সম্ভাব্য ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ ভোটের মধ্যে ২৬ দশমিক ৬ শতাংশ এসেছে আগে সিদ্ধান্তহীন ও অনির্ধারিত ভোটারদের কাছ থেকে। জামায়াতের সম্ভাব্য ৩১ শতাংশ ভোটের মধ্যে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ এসেছে একই গোষ্ঠী থেকে। সে ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের একাংশ বিএনপির দিকেই ঝুঁকছেন বলে ধারণা করি।

এরই প্রতিধ্বনি পাওয়া গেল মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনের একটি নির্বাচনী সভায়। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় শিবচর পৌরসভার খান বাড়িতে বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তারের উঠান বৈঠকে উপস্থিত হন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের আলোচিত অন্তত ২০ জন নেতা-কর্মী। তাঁরা সবাই ধানের শীষের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন। একজন পুরোনো অভ্যাস বশে ‘জয় বাংলা’ স্লোগানও দিয়েছেন।

স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের দাবি, তাঁরা সাবেক চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী লিটনের নির্দেশে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারে সমর্থন জানাচ্ছেন। এর অর্থ আওয়ামী লীগের নির্বাসিত নেতারা প্রকাশ্যে নির্বাচন বর্জনের আহ্বান জানালেও স্থানীয়ভাবে যাঁদের দ্বারা বিপদ কম হবে মনে করেন, তাঁদের ভোট দিতে বলছেন।

কেবল বিএনপি নয়, অন্যান্য দলও আওয়ামী লীগের সমর্থকদের পক্ষে টানতে নানা কৌশল অবলম্বন করছে। বিভিন্নভাবে প্রলোভন দেখানো হচ্ছে, কেউ কেউ সহানুভূতিও প্রকাশ করছেন। ফলে নৌকাবিহীন এবারের নির্বাচনে দলটির ভোট সহানুভূতিশীল প্রার্থীর বাক্সেই যে বেশি পড়বে, সেটা নিঃসন্দেহে বলা যায়।

গত ২৮ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে প্রচারে গিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এবার তো নৌকা নেই। নৌকা পালিয়েছে। মাঝখানে তাদের যেসব সমর্থক আছেন, তাঁদের বিপদে ফেলে গেছে। আমরা সেই বিপদে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছি।’ জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ঘোষণা দিয়েছেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হয়রানি করা হবে না।

গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর তাঁর নির্বাচনী এলাকায় বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের দায়িত্ব আমি নিলাম। আপনাদের একজনেরও বিন্দুমাত্র ক্ষতি হবে না।’

১৯৯১ সালের পর যে কটি নির্বাচন হয়েছে, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ছাড়া সব কটিতে অংশ নিয়েছে আওয়ামী লীগ। কোনোটিতে তারা জয়ী হয়ে সরকার গঠন করেছে। কোনোটিতে বিরোধী দলে বসেছে। তিনটি বিতর্কিত নির্বাচন করেছে তারা। এসব নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সর্বনিম্ন ৩০ শতাংশ ও সর্বোচ্চ ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পেয়েছে।

একটানা ১৫ বছরের শাসন ও তিনটি প্রহসনমূলক নির্বাচনের কারণে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কমেছে সত্য। কিন্তু ভূমিধস হয়নি। আওয়ামী লীগের জনসমর্থন যদি সর্বনিম্ন স্তরেও এসে থাকে, তারপরও তারা নির্বাচনের ফলাফলকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। আওয়ামী লীগের কর্মী-সমর্থকদের অর্ধেক ভোটারও যদি কেন্দ্রে উপস্থিত থাকেন, তাঁরা যে দল ও প্রার্থীর জয়-পরাজয়ে মুখ্য ভূমিকা রাখবেন, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এ কারণেই বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ প্রায় সব দল আওয়ামী ভোটারদের কাছে ধরনা দিচ্ছে।

* সোহরাব হাসান, সাংবাদিক ও কবি
- মতামত লেখকের নিজস্ব

জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ছবি: রয়টার্স

Wednesday, February 4, 2026

ভারতে বসে বাংলাদেশে রাজনীতিতে ফেরার ছক কষছেন নির্বাসিত আওয়ামী লীগের সদস্যরা

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনঃ বাংলাদেশে তাঁরা অপরাধী ও পলাতক হিসেবে বিবেচিত। তাঁদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ বা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু কলকাতার শপিং মলের জনাকীর্ণ ফুড কোর্টে আরাম করে ব্ল্যাক কফি আর ভারতীয় ফাস্ট ফুড খেতে খেতে আওয়ামী লীগের নির্বাসিত রাজনীতিবিদেরা রাজনীতিতে ফেরার ছক কষছেন।

১৬ মাসের বেশি সময় আগে বাংলাদেশের কর্তৃত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এক অভ্যুত্থান তাঁকে নাটকীয়ভাবে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীদের প্রবল স্রোত তাঁর বাসভবনের দিকে এগিয়ে আসতে থাকায় তিনি ভারতের উদ্দেশে হেলিকপ্টারে উঠে পড়েন। যেসব রাস্তা তিনি পেছনে ফেলে গিয়েছিলেন, সেগুলো ছিল রক্তে রঞ্জিত।

জাতিসংঘের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বিক্ষোভকারীদের ওপর শেখ হাসিনার সরকারের দমন-পীড়নে আনুমানিক ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হয়েছিলেন। এরপর তাঁর দলের হাজার হাজার সদস্যও পালিয়ে যান। আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা ‘মব ভায়োলেন্স’ এবং শেখ হাসিনার শাসনামলে সংঘটিত অপরাধে সংশ্লিষ্টতার জন্য ফৌজদারি মামলার মুখে পড়েছেন, যার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে।

আওয়ামী লীগের ছয় শর বেশি নেতা-কর্মী বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতের শহর কলকাতায় আশ্রয় নিয়েছেন। সেখানে তাঁরা তখন থেকেই আত্মগোপন করে আছেন। তাঁদের দলীয় কর্মকাণ্ড ও সংগঠনকে চালিয়ে নিতে ভারত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন হয়ে উঠেছে।

গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার জনমতের চাপের কাছে নতি স্বীকার করে আওয়ামী লীগের সব ধরনের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে। এরপর দলটির নিবন্ধন স্থগিত করে নির্বাচন কমিশন। একই সঙ্গে হত্যা, দুর্নীতিসহ নানা অপরাধের ঘটনায় দলটির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার শুরু করে। হাসিনার পতনের পর প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠেয় আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও দলটির প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গত বছরের শেষের দিকে হাসিনাকে তাঁর শাসনামলের শেষ পর্যায়ে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেন। এরপরও নিজের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ইতি দেখা থেকে অনেক দূরে থাকা হাসিনা এই রায়কে ‘মিথ্যা’ বলে নাকচ করেছেন এবং অসংকোচে ভারত থেকে তাঁর প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা করছেন, যার মধ্যে আসন্ন নির্বাচনে বিঘ্ন ঘটাতে হাজার হাজার সমর্থককে সংগঠিত করার বিষয়ও রয়েছে।

ভারতের রাজধানী দিল্লির এক সুরক্ষিত ও গোপন আস্তানা থেকে হাসিনা দিনের বড় একটা সময় বাংলাদেশে থাকা তাঁর কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে দলীয় সভা ও ফোনালাপে ব্যয় করেন। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডগুলো পরিচালিত হয় ভারত সরকারের সতর্ক নজরদারিতে। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল ভারত। তাঁকে প্রত্যর্পণের জন্য বাংলাদেশের অনুরোধও এড়িয়ে গেছে দেশটি।

দলীয় কৌশল নিয়ে শেখ হাসিনার সঙ্গে আলোচনার জন্য গত এক বছরে সাবেক সংসদ সদস্য, মন্ত্রিসভার সদস্যসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়মিত কলকাতা থেকে দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হয়েছে। আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সভাপতি সাদ্দাম হোসেন তাঁদের একজন। তিনি বলেন, ‘আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে আমাদের লোকজনের সঙ্গে—আমাদের কর্মী-সমর্থক, দলের নেতা, তৃণমূল পর্যায়ের নেতা এবং অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। ভবিষ্যতের সংগ্রামের জন্য তিনি দলকে প্রস্তুত করার চেষ্টা করছেন।’

ছাত্রলীগকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করছেন। সাদ্দাম বলেন, ‘তিনি (শেখ হাসিনা) কখনো কখনো দিনে ১৫ বা ১৬ ঘণ্টা ফোন কল ও বৈঠকে ব্যস্ত থাকেন। আমাদের নেত্রী খুবই আশাবাদী, তিনি বাংলাদেশে ফিরবেন। আমরা বিশ্বাস করি, শেখ হাসিনা বীরের বেশে ফিরবেন।’

শেখ হাসিনার অধীনে গত দুটি নির্বাচন ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগে ম্লান হয়ে গিয়েছিল। শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন।

তবে আওয়ামী লীগ বলছে, তাদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে বাধা দেওয়ায় গণতান্ত্রিক বৈধতার সব দাবি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। শেখ হাসিনার বিরাগ ও নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন অধ্যাপক ইউনূস। তাঁকে একজন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করতেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ অধ্যাপক ইউনূসকে তাদের নেত্রীর বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থে লিপ্ত একজন ‘খল চরিত্র’ বলে অভিযোগ করছে। তবে অধ্যাপক ইউনূস এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন।

শেখ হাসিনার সাবেক মন্ত্রীদের একজন জাহাঙ্গীর কবির নানক। তাঁর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেছেন। নানক বলেন, ‘আমরা আমাদের কর্মীদের সব ধরনের নির্বাচনকেন্দ্রিক সংশ্লিষ্টতা থেকে দূরে থাকতে, প্রচার ও ভোট বর্জন করতে এবং মোটের ওপর এই প্রহসনের প্রক্রিয়ার অংশ না হতে বলছি।’

বাংলাদেশে যাঁরা শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ১৫ বছরের স্বৈরতান্ত্রিক ও দুর্নীতিপরায়ণ শাসনের অভিযোগ করেছিলেন, তাঁদের কাছে হঠাৎ করে দলটির গণতন্ত্র, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি প্রবল সন্দেহের সৃষ্টি করেছে।

বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও জাতিসংঘের বছরের পর বছর ধরে সংগ্রহ করা তথ্য অনুযায়ী, হাসিনার সরকার নিয়মিতভাবে তাদের সমালোচক ও বিরোধীদের দমন করেছে। হাজার হাজার মানুষকে গুম, নির্যাতন এবং গোপন কারাগারে হত্যা করা হয়েছে। অনেকেই কেবল হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর প্রকাশ্যে এসেছেন। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে এবং নির্বাচনগুলোকে সাজানো প্রহসনে পরিণত করা হয়েছিল।

তবে অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার দেশকে একটি নতুন গণতান্ত্রিক পথে পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিলেও তাদের বিরুদ্ধেও নির্যাতন-নিপীড়নের পথ বেছে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘুদের অধিকার রক্ষায় ব্যর্থতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি। শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া ট্রাইব্যুনালও আন্তর্জাতিক মান বজায় না রাখার কারণে সমালোচনার মুখে পড়েছে।

মব ভায়োলেন্স (উচ্ছৃঙ্খল জনতার সংঘবদ্ধ সহিংসতা) দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, যাকে শেখ হাসিনার শাসনামলের কর্মকাণ্ডের প্রতিশোধ ও বদলার কথা বলে ন্যায্যতা দেওয়া হয়। আওয়ামী লীগের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তাদের শত শত কর্মীর ওপর হামলা করেছে, হত্যা করেছে বা জামিন ছাড়াই তাঁদের কারাগারে আটকে রাখা হয়েছে। আওয়ামী লীগের অনেক কর্মী-সমর্থক এখনো আত্মগোপনে রয়েছেন। সাদ্দাম হোসেন বলেন, ‘কারাগারে যেতে হবে, সেই ভয়ে কলকাতায় থাকছি তা নয়। আমরা এখানে আছি কারণ দেশে ফিরলে আমাদের হত্যা করা হবে।’

ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন

কলকাতা ও দিল্লিতে আওয়ামী লীগের সক্রিয় উপস্থিতি ভারতের জন্য ক্রমবর্ধমান অস্বস্তিকর প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে ভারতের ভূমি থেকে একটি কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যেতে দেওয়া এবং বাংলাদেশের ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ রাজনৈতিক পলাতকদের নিরাপদ আশ্রয় দেওয়ার বিষয়ে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। হাসিনার পতনের পর থেকে ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। কলকাতায় অবস্থান করা আওয়ামী লীগ নেতারা বলেছেন, ভারত থেকে তাঁদের দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হবে—এ নিয়ে তাঁদের কোনো ভয় নেই।

সম্প্রতি এই ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন তীব্র মাত্রা নেয়, যখন শেখ হাসিনা দিল্লিতে এক জনাকীর্ণ সভায় প্রথম জনসমক্ষে ভাষণ দেন। তাঁর গোপন বাসস্থান থেকে ধারণ করা একটি অডিও বার্তায় তিনি আসন্ন নির্বাচনের নিন্দা জানান। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ করেন।

এ নিয়ে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলে, ‘ভারতের রাজধানীতে এ ধরনের আয়োজনের অনুমতি দেওয়া এবং গণহত্যাকারী হাসিনাকে প্রকাশ্যে বিদ্বেষমূলক ভাষণের সুযোগ করে দেওয়া...এটি বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রতি একটি সুস্পষ্ট অবমাননা।’ ভারত সরকার এর কোনো জবাব দেয়নি।

আওয়ামী লীগের শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সে বিষয়ে কলকাতায় আরামদায়ক বাসভবনে থাকা দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে প্রায় কোনো অনুশোচনা বা অনুতাপ দেখা যায়নি। অধিকাংশ নেতাই তাঁদের ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা আন্দোলনকে একটি জনগণের বিদ্রোহ হিসেবে মেনে নিতে রাজি নন; বরং তাঁরা একে একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র বলে দাবি করছেন।

কলকাতার উপকণ্ঠে কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত এলাকায় একটি বিলাসবহুল ভবনে থাকা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘ওটা কোনো স্বতঃস্ফূর্ত বিপ্লব ছিল না, এটা ছিল আমাদের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করার জন্য সন্ত্রাসীদের ক্ষমতা দখল।’ তিনি যে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন, সে বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে হেসে ফেলেন। তিনি বলেন, ‘মিথ্যা, মিথ্যা, মিথ্যা।’

এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের নির্বাসিত এসব নেতার প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা নির্ভর করছে আসন্ন নির্বাচনের ব্যর্থতার ওপর। তাঁদের দাবি, এই নির্বাচন দেশে কোনো স্থিতিশীলতা বা শান্তি বয়ে আনবে না এবং শেষ পর্যন্ত মানুষ আবার আওয়ামী লীগের দিকেই ফিরবে।

২০২৪ সালের আগস্ট থেকে কলকাতায় বসবাস করছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর শাকিল জয়। দলটির যাঁরা অতীতের ‘ভুল’ স্বীকার করছেন, হাতে গোনা সেই ব্যক্তিদের একজন তিনি। জয় বলেন, ‘আমি স্বীকার করছি যে আমরা সাধু ছিলাম না। আমরা কর্তৃত্ববাদী ছিলাম। আমরা পুরোপুরি গণতান্ত্রিক ছিলাম না। আমি একমত যে ২০১৮ সালের নির্বাচন পুরোপুরি ঠিকমতো হয়নি। আমরা আশা করেছিলাম, সেটি আরও সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ হতে পারত। এটা দুর্ভাগ্যজনক।’

দুর্নীতি ও লুটপাটের বিষয়ে জয়ের স্বীকারোক্তি, ‘অবশ্যই অনিয়ম ছিল। এমন কিছু আর্থিক লেনদেন হয়েছে, যেগুলো হওয়া উচিত ছিল না এবং এর দায় আমাদের নিতে হবে।’ তবে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আনুমানিক ২০০ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।

কলকাতায় অবস্থানরত অন্যদের মতো জয়ও জোর দিয়ে বলেন, ভারতে তাঁর এই নির্বাসন দীর্ঘস্থায়ী হবে না। যদিও তিনি মেনে নিয়েছেন—শেষমেশ দেশে ফিরলে তাঁর জন্য হয়তো কারাগারই অপেক্ষা করছে। তিনি বলেন, ‘এখন আমাদের জন্য সবকিছু খুব খারাপ। কিন্তু মনে করি না যে বেশি দিন এমন থাকবে।’

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের একাংশের স্ক্রিনশট
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনের একাংশের স্ক্রিনশট

Monday, January 26, 2026

জুলাই হত্যায় অনুতপ্ত হাসিনা বললেন, রুপান্তরের নামে চলছে ছদ্মবেশী স্বৈরাচার

ক্ষমতাচ্যুত  সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে গণতন্ত্রে রুপান্তরের নামে ছদ্মবেশী স্বৈরাচার বলে মন্তব্য করেছেন। ভারতের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এই মন্তব্য করেন তিনি। বলেন, একটি স্বাধীন ও সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে বাদ দেয়ার সিদ্ধান্তের সমালোচনাও করেন। বলেন,  বিএনপি বা জামায়াতের পক্ষে ভোট দিতে বাধ্য করতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে হুমকি ও সহিংসতার আশ্রয় নেয়া চলতে পারে না।

২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের দিকে ফিরে তাকিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, এই সহিংসতায়  যে প্রাণগুলো হারিয়েছে সে জন্য তিনি অনুতপ্ত। তবে তিনি একইসঙ্গে সহিংসতা নিয়ে গঠিত বিচারিক তদন্ত সীমিত করে দেয়ার জন্য বাংলাদেশের বর্তমান সরকার প্রধানকে দায়ী করেন। কোটাবিরোধী আন্দোলন হিসেবে শুরু হয়ে পরে হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে রুপ নেয়া এই সহিংসতায় ১৪০০ জনের প্রাণহানী ঘটে। শেখ হাসিনা সাক্ষাৎকারে তার দলের কার্যক্রম স্থগিত করার জন্য ইউনূস প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, দলটিকে নিষিদ্ধ করার কারণে কোটি কোটি বাংলাদেশি কার্যত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। তার মতে, এ ধরনের পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনকে স্বাধীন, সুষ্ঠু বা বৈধ বলা যায় না। ভোটারদের অবশ্যই তাদের পছন্দের দলকে ভোট দেয়ার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকতে হবে। তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।

হাসিনা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার জানে, যদি আমাদের এই নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়া হয় তাহলে আমরা বিপুল জনসমর্থন পাবো। সে কারণেই আমাদের নিষিদ্ধ করা হয়েছে। ভুলে গেলে চলবে না- ইউনূস নিজেই বাংলাদেশের জনগণের কাছ থেকে একটি ভোটও কখনো পাননি। বরং নিজের অবৈধ কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দিতে দেশের আইনকাঠামো নতুন করে সাজিয়েছেন।  শেখ হাসিনা এক পর্যায়ে বলেন, তার সরকারের বিরুদ্ধে যখন আন্দোলন চলছিল তখন তিনি বুঝতেই পারেননি চরমপন্থী উপাদানগুলো আন্দোলন দখল করে নিয়েছে। আমরা সে সময়কার ঘটনা তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছিলাম। কিন্তু প্রফেসর ইউনূস ক্ষমতায় এসে তা বাতিল করে দেন। এই সিদ্ধান্তই হচ্ছে  মূলত আন্দোলনের পেছনের উদ্দেশ্য। এখানে তিনি বিদেশি হস্তক্ষেপের প্রসঙ্গও টেনে আনেন। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে হাসিনা অবিলম্বে সাংবিধানিক শাসনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সব দলের অংশগ্রহণে স্বাধীন ও সুষ্ঠু  নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানান। যাতে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি আর না ঘটে। তার মতে, আমরা যে সহিংসতার সাক্ষী হচ্ছি তা হলো নির্বাচিত নয়, এমন প্রশাসনের সরাসরি ফসল। যার কোনো জনপ্রিয় ম্যান্ডেট নেই। যা কিনা আমাদের রাজনীতিকে চরমপন্থী গোষ্ঠীর হাতে চলে যেতে দিয়েছে। সংস্কার আনার বদলে অন্তর্বর্তী প্রশাসন চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলোকে ক্ষমতাসীন অবস্থানে উন্নীত করেছে। আজকের বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলার কোনো ছায়াই নেই। সরকার নিয়মিতভাবে সহিংসতার বিরুদ্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। হাসিনা বলেন, ধর্ম নিরপেক্ষতা, বহুত্ববাদ এবং গণতান্ত্রিকমূল্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বাংলাদেশ। জামায়াত ইসলামী ও অন্যান্য চরমপন্থী গোষ্ঠীর পুনর্বাসন আমাদের দেশের মূল কাঠামোর জন্য হুমকি। হাসিনা বলেন, এটি কোনো তাত্ত্বিক উদ্বেগ নয়- ইতিমধ্যেই তা দৃশ্যমান। তিনি আবারো উল্লেখ করেন, জামায়াতের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহাসিক সত্যের ইচ্ছাকৃত ক্ষয় হয়েছে।

উল্লেখ্য যে, ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যাল শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করেছে। বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলন দমনে তার সরকারের ভূমিকার কারণে এই সাজা।

mzamin