Sunday, April 14, 2019

ব্যাংকের আসল ‘ডাকাত’ কারা by শওকত হোসেন

বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি দেশের ব্যাংকগুলোকে ‘ডাকাত’ বলেছেন। তিনি গত বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে বললেন, ‘পৃথিবীর কোথাও ব্যাংকঋণ ও আমানতের সুদের ব্যবধান ২-৩ শতাংশের বেশি নয়। বাংলাদেশেই এ হার কেবল ৫ শতাংশের ওপরে। এটা রীতিমতো ডাকাতি।’
বাণিজ্যমন্ত্রী পোশাক খাতের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি ছিলেন। উচ্চ সুদহারে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগের সমস্যার কথাও তিনি জানেন। তিনি তাঁর বক্তৃতায় সুদের হার ১ অঙ্কে নামিয়ে আনাতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা যে ব্যাংকগুলো মানছে, সে কথাও বলেছেন।
কেবল বাণিজ্যমন্ত্রীর নয়, সুদহার কেন কমছে না—এই প্রশ্ন তো সবার। তবে বাণিজ্যমন্ত্রীর এ বক্তব্যের পর ‘ব্যাংক ডাকাত’দের নিয়ে একটু তত্ত্বতালাশ করা যেতে পারে। ব্যাংকের আসল ‘ডাকাত’ কারা, সেই প্রশ্নেরও উত্তর খোঁজা যায়।
এক বছর আগে ২০১৮ সালের ২০ জুন সরকারের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকস (বিএবি) ঘোষণা দিয়েছিল, ১ জুলাই থেকে আমানত ও ঋণের সুদহার হবে যথাক্রমে ৬ শতাংশ ও ৯ শতাংশ। এর পরের দিন সরকারি ব্যাংকগুলো একযোগে বিজ্ঞাপন দিয়ে এই সিদ্ধান্ত পালনের কথা জানিয়ে দেয়। তখনই এভাবে সুদহার ঠিক করাকে অনেকে ঠাট্টা করে ‘নয়-ছয়’ বলেছিলেন। রসিকতাটা যে ভুল ছিল না, সেই প্রমাণ তো বাণিজ্যমন্ত্রীর কথাতেই আছে।
ব্যাংক খাত কীভাবে চলবে, তার কিছু আন্তর্জাতিক রীতিনীতি আছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক তা অনুসরণ করে। ব্যাংক বিষয়ে যেকোনো নীতি–সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার বাংলাদেশ ব্যাংকেরই। অথচ সুদহার ঠিক করার মতো গুরুত্বপূর্ণ এমন একটি নীতি–সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়াকে তো ‘ডাকাতি’ বলা যায়।
ব্যাংক মালিকদের সুদহার ‘নয়-ছয়’ করার কারণ অবশ্য একটা ছিল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকের করপোরেট কর ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছিলেন অর্থমন্ত্রী। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বেসরকারি ব্যাংকগুলোর নগদ জমার হার (সিআরআর) ১ শতাংশ কমানো এবং টানা ৯ বছর ব্যাংকের পরিচালক থাকা ও এক পরিবারের ৪ জনকে ব্যাংকের পর্ষদে থাকার সুযোগ করে দেয়। সরকারি আমানত রাখার সীমাও ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়। এত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার বিনিময়েই ব্যাংক মালিকেরা সুদের হার কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রতিশ্রুতি না রেখেই সব সুযোগ-সুবিধা ব্যাংক মালিকেরা ঠিকই ভোগ করছেন।
সুদের হার বৃদ্ধির কারণ বিশ্লেষণ না করে কেবল নির্দেশ দিয়ে তা কখনোই কমানো যায় না। আর সুদের হার বাড়ার অনেক কারণ থাকে। বর্তমানে ব্যাংক খাতে আছে তারল্যসংকট। কোনো কোনো ব্যাংক ১০ শতাংশের বেশি সুদে আমানতই সংগ্রহ করছে। এমন ব্যাংকও আছে যাদের ঋণ-আমানতের সুদের হারের পার্থক্য প্রায় ৮ শতাংশ। সুদের হার কমাতে এই তারল্যসংকটের সমাধান করতে হবে। তা ছাড়া, এখন সুদের হার নির্ধারণ করে বাজার, চাহিদা-জোগানের ভিত্তিতে। তবে তারপরও সুদের হার কিছু কমানো সম্ভব। যেমন খেলাপি ঋণ কমাতে পারলে ব্যাংকগুলো আরও ১ থেকে ২ শতাংশ হারে সুদ কমাতে পারত।
এ ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতে আলোচিত ‘ডাকাত’দের কথা বলা যায়। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি মো. শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন গত বছরের ৯ জুন সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন, ‘একশ্রেণির লোক আছেন, যাঁরা ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাংকের টাকা তছরুপ করেছেন, ব্যাংকের টাকা ডাকাতি করেছেন। আমরা তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
সুতরাং খেলাপি ঋণ কমাতে হলে ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। অথচ ঋণখেলাপিদের আরও সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে সরকার। যেমন ঋণের সুদের হার ১২ শতাংশ হলে উদ্যোক্তাকে ফেরত দিতে হবে সব মিলিয়ে ১৩ শতাংশ বা এর চেয়ে বেশি হারে। আর খেলাপি হলে দিতে হবে ৯ শতাংশ হারে, তাও দীর্ঘ সময় ধরে। এই সুবিধা আগামী মে মাস থেকে কার্যকর হবে বলে অর্থমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন। এই যদি অবস্থা হয়, তাহলে ব্যাংকে ঋণ ফেরত দিতে কে আর আসবেন।
এবার বাণিজ্যমন্ত্রী আপনিই বলুন, ব্যাংকের আসল ‘ডাকাত’ কারা।

বুতেফ্লিকা, বশির, এরপর কে?

তিন দশক সুদান শাসনের পর গত বৃহস্পতিবার পতন হয়েছে ওমর আল-বশিরের সরকারের। এর আগে গত সপ্তাহেই আলজেরিয়ায় অবসান ঘটেছে আবদেল আজিজ বুতেফ্লিকার শাসনের। তিনিও ক্ষমতায় ছিলেন দুই দশক। দুজনেরই পতন হয়েছে জীবনমানের উন্নয়নের দাবিতে ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভের মুখে। পার্থক্য শুধু বশিরকে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে আটক করেছে সুদানের সেনাবাহিনী। আর বুতেফ্লিকা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন। তবে এ ক্ষেত্রেও আলজেরিয়ার নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা ছিল। পরপর দুই কর্তৃত্বপরায়ণ রাষ্ট্রনায়কের এমন পতনে প্রশ্ন উঠেছে, এরপর কার পালা?
বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে অবস্থিত অলাভজনক সংগঠনে অতিথি বিশেষজ্ঞ মার্ক পিয়েরিনির মতে, ‘আলজেরিয়া আর সুদানের প্রেক্ষাপটের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। তবে দেশ দুটির ঘটনা থেকে স্বৈরশাসক ও একনায়কদের জন্য শিক্ষণীয় বিষয় হলো ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র আর সবার জন্য সমান সুযোগের ক্ষুধা সর্বজনীন।’ তিউনিসিয়া, লিবিয়া, সিরিয়া, মরক্কো ও তুরস্কে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাবেক এই রাষ্ট্রদূত বলেন, উভয় দেশের ক্ষেত্রেই ক্ষমতার শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ ও অর্থ পকেটে পুরেছেন।
অনেকেই বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় বুতেফ্লিকা ও বশির ছাড়া আরও কয়েকজন একনায়ক রয়েছেন। মরক্কো রাজপ্রথায় পরিচালিত। আর মিসর চলছে সাবেক সেনাপ্রধান প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির নেতৃত্বে। মোহাম্মদ মুরসির সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন সিসি।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের সেন্টার ফর মিডল ইস্ট পলিসির পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো শরন গ্রেওয়াল বলেন, আলজেরিয়া ও সুদানের ঘটনা ২০১০-১১ সালের আরব বসন্তের পুনরুত্থান ঘটাবে কি না, তা ধারণা করা কঠিন। ওই বিক্ষোভ মিসর ও তিউনিসিয়ায় শাসকশ্রেণির পতন ঘটিয়েছে, সিরিয়া ও ইয়েমেনে যুদ্ধের সূচনা ঘটিয়েছে। জীবনমানের উন্নয়ন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আলজেরিয়া ও সুদানে যে বিক্ষোভ, তার ওপর ওই অঞ্চলের বাকি একনায়কেরা সতর্ক দৃষ্টি রাখছেন বলেও দাবি করেন শরন গ্রেওয়াল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল সুদান বা আলজেরিয়ায়ই পরিবর্তন দেখা যায়নি, এই বসন্তে আরেক একনায়ক তাঁর জায়গা ছেড়েছেন। তিনি কাজাখস্তানের প্রেসিডেন্ট নুরসুলতান নাজারবায়েভ।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় আরও বিক্ষোভ দেখা যেতে পারে।

যে কৌশলে পার পেতেন অধ্যক্ষ সিরাজ by জিয়া চৌধুরী

সোনাগাজী সিনিয়র ইসলামিয়া ফাজিল মাদরাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার মূল হোতা অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দৌলার যৌন হয়রানি ও নানা অপকর্মের কথা জানতেন মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও স্থানীয়রা। তবে টাকার দাপটে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক চক্রকে ম্যানেজ করে চলতেন সিরাজ।
এই চক্রের ভয়ে তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পেতেন না শিক্ষক ও অভিভাবকরা। নানা সময়ে অভিযোগ করলেও ম্যানেজ হয়ে যেত প্রশাসন, উল্টো বিপদে পড়তেন অভিযোগকারীারা। গত কয়েক দিনে মাদরাসা শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, পরিচালনা পর্ষদের একাধিক সদস্য ও স্থানীয় জনগণের সাথে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে। মাদরাসার তিন তলা মার্কেট, পুকুর, নানা অনুদান-তহবিল এবং ওয়াজ মাহফিল থেকে বছরে প্রায় কোটি টাকা হাতিয়ে ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন অধ্যক্ষ। অস্বচ্ছল শিক্ষার্থীদের সুবিধার লোভ দেখিয়ে ভেড়াতেন নিজের দলে।
২০০১ সালে শতবর্ষী এই মাদ্রাসায় উপাধ্যক্ষ পদে যোগ দেবার পর থেকে নানা সময়ে জেলা প্রশাসনের কাছে যৌন হয়রানি, অর্থ আত্মসাৎ ও হত্যার হুমকির মতো অভিযোগ জমা হয় তার বিরুদ্ধে।
তবে, মাদরাসার তহবিলের টাকা নয়ছয় করে অর্থের জোরে ক্ষমতাসীন রাজনীতিবিদ ও স্থানীয় প্রশাসনকে ম্যানেজ করে ফেলতেন সিরাজ উদ দৌলা। সবশেষ গত ২৭ই মার্চ নুসরাতকে যৌন হয়রানি এবং ৬ই এপ্রিল আগুনে পোড়ানোর পরও চলেছে সেই টাকার খেলা।
যে কারণে শুরুর দিকে যৌন হয়রানির ঘটনাটিতে ষড়যন্ত্র ও আগুনে পোড়ানোকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে চেয়েছিল স্থানীয় প্রভাবশালী মহল। এমনকি সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনও শুরুতে ঘটনাকে আত্মহত্যা বলেই উল্লেখ করেন। প্রায় দুই দশক ধরে যৌন হয়রানি, মাদ্রাসার টাকা আত্মসাৎ ও হত্যার হুমকির মতো অপরাধে অর্থের জোরে পার পেয়ে যায় সিরাজ উদ দৌলা। গত বছরের ৩রা অক্টোবর নুসরাতের আরেক বান্ধবীকে যৌন হয়রানি করেন সিরাজ। ওই ঘটনায়ও মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আক্তার উন নেছা শিউলির কাছে অভিযোগ দেয়া হয়। তবে নারী শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানির মতো ওই ঘটনায় শুধু একটি নোটিশ পাঠিয়ে দায় সারে জেলা প্রশাসন।
অভিযুক্ত মাদরাসার অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন। ওই শিক্ষার্থীর বাবা পূর্বধলী মদিনাতুল উলুম দাখিল মাদরাসার অধ্যক্ষ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মানবজমিনকে বলেন, ঘটনার পর মেয়ে আমাদের কিছু জানায়নি। পরে বিষয়টি জানতে পেরে পরিচালনা পর্ষদের একজন সদস্যকে বিষয়টি জানাই। ভয়ে আর জেলা প্রশাসনে কোন অভিযোগ দেইনি। তবে এর মধ্যে তার নামে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট বরাবর একটি অভিযোগ জমা দেয়া হয়।
অভিযোগের পর অধ্যক্ষ সিরাজকে শোকজ করা হলে তিনি ক্ষেপে যান। অভিযোগের কারণে তিনজন শিক্ষককে উল্টো হেনস্তা করেন সিরাজ। তাদের ডেকে নিয়ে হুমকি দেয়া হয় এবং অপমান করা হয়। পরে আর জেলা প্রশাসন কোন পদক্ষেপ না নেয়ায় আমরাও বিষয়টি নিয়ে বাড়াবাড়ি করিনি। শুনেছি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ওই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করায় প্রশাসন আর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। এদিকে, ২০১৬ সালে মাদরাসার তহবিলের অডিটে গরমিল ও টাকা আত্মসাতের অভিযোগ এনে পরের বছর অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি কে এনামুল করিমকে লিখিতভাবে জানান স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সদস্য শেখ আবদুল হালিম মামুন।
ওই বছর মাদরাসার বেশ কিছু তহবিল থেকে অধ্যক্ষ প্রায় ৫৬ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ করেন শেখ মামুন। সেখানে দেখা যায়, ক্যাশ থেকে ৬ হাজার ২৬৫ টাকা ব্যাংকে জমা না দেয়া, মাদ্রাসার মার্কেটের দোকান ভাড়া ৪১ হাজার ১০০ টাকা, মাহফিলের অপ্রদর্শিত ১ লাখ ১১ হাজার ৬৯৩ টাকা, ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত ১ লাখ ৮৬ হাজার ৭২৫ টাকা ব্যাংকে জমা না দেয়া, ক্যাশের ৯০ হাজার ২৯২ টাকা ব্যাংকে জমা না দেয়া, পরের মাসে ৬ লাখ ২৭ হাজার ৮০৩ টাকা জমা না দেয়া, তহবিলের ৮৩ হাজার ২০০ টাকা ব্যাংকে জমা না রাখা, অভ্যন্তরীণ আয় ১ লাখ ১৮ হাজার ২৯৮ টাকা আত্মসাৎ করা, ছাত্র ফির ৬৮ হাজার ৭৫০ টাকা ব্যাংকে জমা না দেয়া, বছরের শেষের দিকে ক্যাশ থেকে আরো প্রায় ৫০ হাজার টাকাসহ মোট ২২ লাখ ৫২ হাজার ১০০ টাকা আত্মসাতের করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন শেখ মামুন। এসব প্রমাণ ছাড়ানো আরো কয়েকটি খাত থেকে ২০১৬ সালে সর্বমোট প্রায় ৫৬ লাখ টাকা অধ্যক্ষ সিরাজ নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেন বলেও অভিযোগ ছিল শেখ মামুনের। তবে, এমন অভিযোগের পর তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পি কে এনামুল করিম অধ্যক্ষকে শুধু নোটিশ দিয়েই দায় সারেন।
অভিযোগের পর উল্টো পরের বছর পরিচালনা পর্ষদ থেকে সরিয়ে দেয়া হয় শেখ আবদুল হালিম মামুনকে। তিনি মানবজমিনকে বলেন, মাদরাসার তহবিলের টাকা আত্মসাৎ করার সুস্পষ্ট প্রমাণসহ অভিযোগ করলেও প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নেয়নি। পরের বছর বরং আমাকে পরিচালনা পর্ষদ থেকে ষড়যন্ত্র করে বাদ দিয়ে দেয়া হয়। শেখ মামুন বলেন, স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল এসব টাকার ভাগ পেতেন। যারা অধ্যক্ষের হয়ে প্রশাসনের কাছে তদবির করতো। এদিকে সোনাগাজী পৌরসভার মেয়র রফিকুল ইসলাম খোকন মানবজমিনকে বলেন, আর্থিক সুবিধা দিয়ে অধ্যক্ষ স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতেন। অনেক অস্বচ্ছল ও গরিব শিক্ষার্থীদের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করতেন। পরে এদের নিজের দলে ভিড়িয়ে গড়ে তোলেন ক্যাডার বাহিনী।
এছাড়া, মাদরাসায় দুপুর ও রাতে লঙ্গরখানার মতো খানাপিনার আয়োজন করতেন অধ্যক্ষ। অনেকেই তার কাছ থেকে এসব সুবিধা নিতেন। এদিকে, ফেনী জেলা প্রশাসনের একজন সাবেক কর্মকর্তা মানবজমিনকে জানান, ক্ষমতাসীন স্থানীয় রাজনীতিবিদদের প্রভাবে অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাহর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারেনি জেলা প্রশাসন। অভিযোগের বিষয়ে কেন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি পি কে এনামুল করিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার সময়ে অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ আসেনি। তবে এডিএম আক্তারুন্নেছা শিউলির সময় একটি অভিযোগের কথা স্মরণ করেন। ওই শিক্ষার্থী ও তার পরিবারকে ডাকা হলে তারা বিষয়টি অস্বীকার করে বলে দাবি করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক।
এছাড়া, অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি করা হয় বলেও জানান এনামুল করিম। কিন্তু সেই তদন্তে অর্থ আত্মসাতের কোন প্রমাণ মিলেনি বলেও দাবি করেন জেলা প্রশাসনের এই কর্মকর্তা। তবে, পি কে এনামুল করিমের এমন বক্তব্যকে চ্যালেঞ্জ করে অভিযোগকারী শেখ আবদুল হালিম মামুন বলেন, অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি এমন কোন লিখিত কাগজ বা প্রমাণ আমাদের দেয়া হয়নি। মূলত তদন্ত না করেই অধ্যক্ষ সিরাজকে বাঁচিয়ে দিতে এমন ভূমিকা নেয়া হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একই সাথে ২০১৮ সালে মাদরাসা থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের নামে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সই জাল করে একটি চেক ইস্যু করা হয় বলেও মানবজমিনকে জানান শেখ মামুন। এই ঘটনায় উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি বলেও জানান তিনি। মাদরাসা পরিচালনা পর্ষদের সদস্য থাকাকালীন ২০১৭ সালে পুরো মাদরাসা এলাকা ক্লোজসার্কিট ক্যামেরার আওতায় আনার দাবি তুলতে তা পর্ষদে পাস হয় বলে জানান শেখ মামুন। তবে, নিজের অপকর্ম ঢাকতে পরিচালনা পর্ষদকে ম্যানেজ করে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসাতে দেননি অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলাহ। ওই বছর পর্ষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিসিটিভি ক্যামেরা বসালে নুসরাতের মতো আর কেউ যৌন হয়রানির শিকার বা আগুনে পুড়ে মারা যেতো না বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা।
রহস্যের  উদঘাটনে সন্তুষ্ট পরিবার, অপেক্ষা বিচারের: নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনার রহস্য উন্মোচন, মূল পরিকল্পনাকারী শনাক্ত ও আসামিদের গ্রেপ্তার করায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে নুসরাতের পরিবারের সদস্যরা। পুরো কিলিং মিশন নিয়ে ধোঁয়াশা পরিষ্কার করায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) ধন্যবাদ জানান নুসরাতের বাবা এ কে এম মূসা। গতকাল শনিবার দুপুরে নিহত নুসরাতের বাসায় গেলে তার বাবা মানবজমিনকে বলেন, সকলের প্রচেষ্টায় ঘটনার রহস্য উন্মোচন হয়েছে। আর বাকি আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করার তাগিদ দেন নুসরাতের বাবা।
একই সঙ্গে দ্রুত সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেয়ার জন্যও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। পিবিআই কম সময়ের মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার ও হত্যার রহস্য উন্মোচন করায় তাদের ধন্যবাদ দেন নুসরাতের ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান। তিনি বলেন, আমি শুরু থেকেই বলেছি নূর উদ্দিনকে গ্রেপ্তার করলে সব ঘটনা জানা যাবে। তবে শুরুর দিকে সোনাগাজী থানার ওসি ও প্রভাবশালী মহল আগুনে পোড়ানোর ঘটনাকে ভিন্ন অবস্থানে নেয়ায় তাদেরও শাস্তির দাবি করেন নুসরাতের ভাই। এদিকে, মামলার আরো দুই আসামি শাহাদাত হোসেন শামীম ও জাবেদ হোসেনকে গতকাল ময়মনসিংহ ও ফেনী থেকে গ্রেপ্তার করে পিবিআই। গতকাল বিকালে এজাহারভূক্ত আসামি জাবেদ হোসেনকে ফেনী আদালতে হাজির করে দশ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। পরে তার বিরুদ্ধে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন মঞ্জুর করেন বিচারক জাকির হোসাইন।

সুদানের আল বশিরের পতনের নেপথ্যে এক নারী

সাধারণ জনতার বিক্ষোভের মুখে বৃহষ্পতিবার এক সামরিক অভুত্থানে প্রায় ৩০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট ওমর আল-বশিরকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে সুদানের সেনাবাহিনী। তবে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করলেও আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নেতৃত্ব দিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন সুদানের ‘অগ্নি কন্যা’ আল-সালাহ। বিক্ষোভের নেপথ্যে থেকে জনগণকে দারুণভাবে আন্দোলিত করেছেন ২২ বছরের এই নারী।
সালাহকে বিশ্ব মিডিয়ায় জায়গা করিয়ে দিয়েছে একটি ছবি। ছবিটি তুলে লানা হারোন নামের এক ব্যক্তি বিশ্ব মিডিয়ায় শেয়ার করার পর এটি ভাইরাল হয়ে যায়। সেখানে দেখা যায়, সাদা পোশাক পরে গাড়ির ওপরে দাঁড়িয়ে জ্বালাময়ী বক্তব্য রাখছেন সালাহ। চারপাশে হাজার হাজার জনতা দাড়িয়ে তার বক্তব্য শুনছেন।
সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে আলা সালাহ বলেন, ‘আমি প্রত্যক সুদানিকে আশা জাগানোর চেষ্টা করেছি, তাদের ইতিবাচকভাবে আন্দোলিত করেছি এবং আমি অবশেষে তাদের দিয়ে উপযুক্ত কাজটি (আল বশিরের পতন) করতে সক্ষম হয়েছি।’
ছবিটির আলোকচিত্রী লানা হারোন বলেন, ‘সুদানের প্রতিটি নারী ও তরুণীর প্রতিনিধিত্ব করেছেন সালাহ এবং তাদের বিশেষভাবে অনুপ্রাণিত করেছেন। তিনি সুদানি নারীদের অধিকারের কথা বলেছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন।’
সুদানের রাজধানী খার্তুমে বিক্ষোভ চলাকালে গত সোমবার ছবিটি তোলা হয়। এ প্রসঙ্গে সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানে দেয়া সাক্ষাতকারে সালাহ বলেন, ‘ছবিটি তোলায় আমি দারুণভাবে খুশি হয়েছি। যেদিন ছবিটি তোলা হয় সেদিন আমি অন্তত ১০টি সমাবেশে যোগ দিই এবং উপস্থিতিদের বিপ্লবী কবিতা পড়ে শোনাই। এটা আন্দোলনকারীদের উদ্যমী করে তোলে। এ সময় আমি আরো ছয়জন নারীকে সাথে নিয়ে বিপ্লবী গান গাইতে থাকি। এটা তাৎক্ষণিকভাবে ফলও পাওয়া গেল। দেখলাম তারাও আমারে সঙ্গে গাইতে শুরু করেছে এবং জমায়েত ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকল।’
স্থাপত্যের ছাত্রী সালাহ কোনো রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেননি। তবে তিনি কবিতা আবৃত্তি ও গান গেয়ে সুদানিদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কথা বলতে উৎসাহ জুগিয়েছেন। আর এসব কবিতা ও গান-সবই তার স্কুলজীবনে শেখা।
বিক্ষোভ সমাবেশে সালাহ বলতে থাকেন, ‘আমাদের এ দেশ কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের না। এ দেশে কোনো সাম্প্রদায়িকতা স্থান পাবে না। আমার চলমান সংগ্রামের উদ্দেশ্য হলো জনগণকে অপেক্ষাকৃত ভালো সুদান উপহার দেয়া। কারণ আমার বাবা-মা আমাকে দেশকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে, দেশকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে রাখতে শিখিয়েছে।’
তার বিপ্লবী কবিতার কয়েকটি লাইন এমন, ‘বুলেট কখনো মানুষকে হত্যা করতে পারে না। যা পারে তা হলো এটি মানুষের দীর্ঘদিনের নিরবতা ভেঙে দিতে পারে।’ তার এ লাইনটি বিক্ষোভকারীদের মধ্যে চমৎকারভাবে রেখাপাত করে। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বিক্ষোভে বিক্ষোভকারীদের এ পঙক্তিটি উচ্চারণ করতে দেখা গেছে। সূত্র: সিএনএন, দ্য গার্ডিয়ান।

জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের শতবর্ষ, এখনো ক্ষমা চায়নি ব্রিটেন



১৩ এপ্রিল, ১৯১৯। থেকে ১০০ বছর আগে জালিয়ানওয়ালাবাগে ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস এক হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। এতে নিহত হয়েছিলেন ৪০০ নিরস্ত্র মুক্তিকামী ভারতীয় নাগরিক, মতান্তরে সংখ্যাটি হাজারের কাছাকাছি। গত বুধবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডকে ভারতে ব্রিটিশ ইতিহাসের একটি 'লজ্জাজনক ক্ষত' বলে উল্লেখ করেছেন।
ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া ‘জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড’ ঘটে জালিয়ানওয়ালাবাগ নামের একটি বাগানে। ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের অমৃতসরের ৬-৭ হেক্টর এলাকাজুড়ে রয়েছে জালিয়ানওয়ালাবাগ বাগানটি।
জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে কয়েক শ নিরীহ মানুষ প্রাণ হারানোর পর শতবর্ষ পেরিয়ে গেলেও এখনো ক্ষমা চায়নি ব্রিটেন। আগের বিতর্কের জের ধরে সংসদে সংক্ষেপে একটি আনুষ্ঠানিক ক্ষমাপ্রার্থনার প্রস্তাব নাকচ করে দেন থেরেসা মে।
জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের ১০০ বছর পর একে ট্র্যাজেডি হিসেবে অভিহিত করে থেরেসা মে বলেন, ১৯৯৭ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ সফরে গিয়েছিলেন ইংল্যান্ডের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। সেখানে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন ভারতের সঙ্গে আমাদের অতীত ইতিহাস খুব একটা সুখকর ছিল না।
কী ঘটেছিল সেদিন?
১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল জালিয়ানওয়ালাবাগে জড়ো হন প্রায় ১৫-২০ হাজার ভারতীয়। তাঁদের অধিকাংশই শিখ সম্প্রদায়ের। ভারতীয়রা সেখানে একত্র হয়েছিলেন পাঞ্জাবি নববর্ষ উদযাপন করতে। পাঞ্জাবের নবান্ন উৎসব পালনের পাশাপাশি তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল দমন-নিপীড়নমূলক রাওলাত আইনের বিপক্ষে প্রতিবাদ জানানো। এই আইনের ফলে খর্ব হয়েছিল গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, শুরু হয় বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার এবং অনির্দিষ্ট সাজার অন্যায্য সুযোগ। ফলে সাধারণ মানুষ এককাট্টা হয়ে নির্বিচারে গ্রেপ্তারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এ ছাড়া জাতীয় দুই নেতা সত্য পাল এবং ড. সাইফুদ্দিন কিশ্লের নির্বাসন আদেশ প্রত্যাহার করার দাবি জানান তাঁরা। বৈশাখী উৎসব পালন করতে আসা জনতা তখনো জানে না কী অপেক্ষা করছে তাদের জন্য।
হঠাৎ করেই বাগানে ঢুকে পড়েন ৫০ জন ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাসদস্য। কর্নেল রেজিনাল্ড ডায়ারের নির্দেশে সাধারণ নাগরিকদের বাগান থেকে বের হওয়ার সব পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তার আদেশে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়তে শুরু করে সৈনিকেরা। টানা ১০ মিনিটে প্রায় ১৬৫০ রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে তারা। কী হচ্ছে তা বুঝে ওঠার আগেই প্রাণ হারায় উপস্থিত জনতার একাংশ। পালানোর পথ না পেয়ে দেয়াল বেয়ে ওপরে উঠে অন্য পাশে যাওয়ার চেষ্টা করে অনেকে। কেউ সফল হয়ে কোনোমতে প্রাণ নিয়ে বেঁচে যান, কেউ ব্যর্থ হয়ে প্রাণটা হারান। বুলেটের আঘাত থেকে বাঁচতে অনেকে কুয়ায় ঝাঁপ দেওয়াকেই শ্রেয় মনে করেন।
ব্রিটিশদের হিসাবে এই হত্যাকাণ্ডে নিহত হয় ৪০০ জন। কিন্তু ভারতীয়দের হিসাবে তা ১ হাজারের কাছাকাছি। উপমহাদেশে ঔপনিবেশিকতার দিনগুলো কতটা নির্মম ছিল তা বুঝতে এই একটি ঘটনাই যথেষ্ট।
ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দ এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আলাদা আলাদা বার্তায় জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের শতবর্ষপূর্তিতে শহীদদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

গড়াইয়া নাচে বাহারি বৈসুর by জয়ন্তী দেওয়ান

ফাইখালে, ফাইখালে, গড়াইয়া ফাইখালে...(এসেছে এসেছে গড়াইয়া নাচের দল)। পাহাড়ের ত্রিপুরা গ্রামগুলোয় এখন এই শব্দগুলো ভেসে বেড়াচ্ছে। এসব শব্দ লাগছে পাহাড়ের গায়ে। তাতে দোল খাচ্ছে শেষ বসন্তে ফোটা বাহারী ফুল, গাছপালা। পাহাড় মেতেছে উৎসবে। চাকমাদের বিজু, মারামাদের সাংগ্রাই আর ত্রিপুরাদের বৈসু উৎসবে।
বৈসুর অপরিহার্য অনুষঙ্গ গড়াইয়া নাচের দুটি দলের দেখা মিলল খাগড়াছড়ি শহরের ভাইবোনছড়া ও খাগড়াপুর এলাকায়।
যে গৃহস্থের বাড়ির উঠান বড় অথবা যেখানে লোকসমাগম বেশি, সেখানে থামছিল তারা। সুসজ্জিত এই দল গোল হয়ে কিছুক্ষণ নাচ পরিবেশন করে আবার ঢোল আর বাঁশি বাজাতে বাজাতে পাহাড়ি পথ ধরে নাচের ভঙ্গিতে এগিয়ে যাচ্ছে পাহাড়ের গায়ে কোনো গৃহস্থের উঠানে। দলের সদস্যদের পরনে সাদা ধুতি এবং একই রঙের জামা। কোমর, মাথা ও হাতে রিসা নামে একটি লম্বা ঝুলের কাপড়।
নববর্ষ অর্থাৎ ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বৈসু উৎসবের সপ্তাহখানেক আগে থেকে পুরোনো বছরের বিদায় ও নতুন বছরকে স্বাগত জানাতে ত্রিপুরা গ্রামগুলোয় শুরু হয় গড়াইয়া নাচ। ত্রিপুরাদের বিশ্বাস, নাচের মধ্য দিয়ে তুষ্ট হন গড়াইয়া দেব। এতে পরিবার, এলাকাবাসীর ও সমাজের সুখ-সমৃদ্ধি অটুট থাকে।
গড়াইয়া নাচে অংশগ্রহণকারীদের ‘খেয়েবাই’ বলা হয়ে থাকে। একজন আচাই বা ওঝা ও একজন দেওয়াই (দলনেতা) এই নাচ পরিচালনা করেন। গড়াইয়া নাচে রয়েছে ২২টি তাল ও মুদ্রা। এই ২২টি মুদ্রায় মানবজীবনের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সব ক্রিয়াকলাপ প্রদর্শিত হয়ে থাকে। এই নাচে কেউ একবার অংশ নিলে তাকে পরপর তিনবার অংশ নিতে হয়। কেউ যদি কোনো কারণে অংশ নিতে না পারে, তবে ক্ষমা চাইতে হয় গড়াইয়া দেবের কাছ থেকে।
ভাইবোনছড়া এলাকার গড়াইয়া নাচের দলের আচাই রবিধন ত্রিপুরা (৬৯)। তিনি বললেন, গড়াইয়ার দলের সদস্যরা গৃহস্থের উঠানে ২২টি মুদ্রা প্রদর্শন শেষে শুরু হয় বাড়ির কর্তা ও নারীদের নানা বায়না। নাচের মুদ্রায় কেউ দেখতে চান যুবক-যুবতীর প্রেম-বিরহ, স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া।
রবিধন ত্রিপুরাদের দলটি নাচ শেষে পানীয়, টাকা, চালসহ নানা ফলমূল পেল গৃহস্থের কাছে থেকে। তারপর এ দল চলল আরেক বাড়িতে।
যেকোনো মাঙ্গলিক উৎসবেই গড়াইয়া নাচের প্রচলন আছে ত্রিপুরা সমাজে। একসময় যুদ্ধযাত্রার আগেও এ নাচ হতো।
ঠিক বর্ষবিদায় ও বরণের এই সময়ে গড়াইয়া নাচের উদ্দেশ্য ওই মঙ্গল কামনা—এমনটাই মনে করেন পার্বত্য চট্টগ্রামের সমাজ ও সংস্কৃতির গবেষক অরুনেন্দু ত্রিপুরা। তাঁর মতে, পাহাড়ে এই সময় গড়াইয়া নাচের মধ্যে একটি আর্থসামাজিক তাৎপর্য আছে। জুমনির্ভর গ্রামীণ পাহাড়ি সমাজের সঙ্গে আছে সাযুজ্য। চৈত্র শেষের এই সময়ে জুমের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়ে গেছে। বর্ষার জল পাওয়া মাত্রই জুমে বীজ বপন হবে। গড়াইয়ায় গৃহস্থের মঙ্গল কামনা করা হয়। তাঁর ধনসম্পদ বৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করা হয়। ফসল ভালো না হলে গৃহস্থের মঙ্গল হবে কীভাবে। তাই তো ইষ্ট দেবতার কাছে প্রার্থনা হয় নাচের মাধ্যমে।
সমাজের সহজাত পরিবর্তনের সঙ্গে অনেক কিছুরই পরিবর্তন হয়। পাহাড়ের আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক নানা দিকের নানা পরিবর্তন হয়েছে, হচ্ছে। গ্রামনির্ভর পুরো বাংলাদেশে নগরায়ণ হচ্ছে দ্রুত। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি গ্রামীণ সমাজেও এসেছে পরিবর্তন।
স্থানীয় উন্নয়কর্মী মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা মনে করেন, এসব পরিবর্তনের অনিবার্য অভিঘাত পড়ছে পাহাড়ের সংস্কৃতিতে। মথুরা ত্রিপুরা বলছিলেন, ‘আগে সাত দিন সাত রাত গড়াইয়া নাচ নাচা হতো। এখন শুধু নিয়ম পালনের জন্যই এর চর্চা। সেই জমজমাট পরিবেশটা এখন নেই।’

কে এই নতুন রোনালদো?

রিয়াল মাদ্রিদ। বার্সেলোনা। বায়ার্ন মিউনিখ। লিভারপুল। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। ম্যানচেস্টার সিটি। জুভেন্টাস।
তাঁর নামের সঙ্গে এই ক্লাবগুলোর কোনো একটি অথবা কয়েকটিকে একসঙ্গে জড়িয়ে গুঞ্জন বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে, সে-ও মাস কয়েক হলো। ‘নতুন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো’ নাম পেয়েছেন আরও অনেক আগেই। তাঁর প্রতিভা আর ইউরোপের শীর্ষ সব ক্লাবের আগ্রহ দেখেই তাঁর ক্লাব বেনফিকা চুক্তির ‘রিলিজ ক্লজ’ বাড়িয়ে করেছে ১২ কোটি টাকা! মাত্র ১৯ বছর বয়সী এক ফরোয়ার্ডের জন্য এত দাম!
কিন্তু কেন এত দাম, সেটি পরশু রাতেই হয়তো প্রমাণ দিলেন জোয়াও ফেলিক্স। ইউরোপা লিগের কোয়ার্টার ফাইনালের প্রথম লেগে নিজেদের মাঠে জার্মানির এইনট্রাখট ফ্রাঙ্কফুর্টকে ৪-২ গোলে হারিয়েছে বেনফিকা, তাতে ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক ফেলিক্সের। রেকর্ডও হয়েছে—পরশু তাঁর বয়স ছিল ১৯ বছর ১৫২ দিন, ইউরোপা লিগে এর চেয়ে কম বয়সে কারও হ্যাটট্রিক নেই। ইউরোপা লিগের গণ্ডি ছাড়িয়ে ইউরোপিয়ান টুর্নামেন্টে পর্তুগিজদের মধ্যে সবচেয়ে কম বয়সে হ্যাটট্রিকের রেকর্ডও হয়েছে। সেটি এত দিন কার দখলে ছিল? পর্তুগাল কিংবদন্তি ইউসেবিওর (২০ বছর ৩০১ দিন)।
২১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে প্রথম গোল, ৫৪ মিনিটে হ্যাটট্রিক পূর্ণ। মাঝখানে ৪৩ মিনিটে ২০ গজ দূর থেকে জোরালো শটে যে গোলটি করেছেন, সেটি চোখে লেগে থাকার মতো। দলের অন্য গোলটিতেও শেষ পাস তাঁরই। ম্যাচ শেষে ধারাভাষ্যকার বলছিলেন, ‘এই সেই রাত, যে রাতে ও বিশ্বের কাছে নিজেকে চিনিয়েছে।’
পরশু গ্যালারিতে বসেছিলেন ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর অনেক ‘স্কাউট’ও। সবাই তাঁকেই দেখতে এসেছেন এমন নিশ্চিত করে বলা যায় না, ফ্রাঙ্কফুর্টের লুকা ইয়োভিচের দিকেও নজর হয়তো ছিল। এই মৌসুমে ইউরোপে চমক দেখানো ইয়োভিচও একটা গোল করেছেন। তা যাঁকেই দেখতে আসুন, ইউরোপের বড় ক্লাবগুলোর স্কাউটদের ডায়েরিতে একটা নাম নিয়েই গবেষণা আরও বেড়েছে পরশু রাতের পর—জোয়াও ফেলিক্স!
চারদিকে ফেলিক্স-বন্দনা হওয়াই স্বাভাবিক, তবে বেনফিকা কোচ ব্রুনু লাজের তা সম্ভবত পছন্দ হচ্ছে না। উচ্ছ্বাসে রাশ টানছেন পর্তুগিজ কোচ, ‘ও আজ গোল করতে না পারলে সবাই বলত ওর ফর্ম খারাপ যাচ্ছে। কিন্তু ৩ গোল করায় সবাই বলছে, ও উড়ছে! আসুন, সবকিছু সহজভাবেই নিই আমরা। ওকে আরও উন্নতি করতে দিন, উপভোগ করতে দিন। একদিন হয়তো ও ৩ গোল করল, অন্য দিন একটাও করতে পারবে না। স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠতে দিন ওকে।’
এই স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে দেওয়ার আকুতি করাই স্বাভাবিক। এখনই রোনালদোর সঙ্গে মিলিয়ে ফেললে যে অন্তহীন চাপ তৈরি হয়ে যাবে, সেটা সামলাতে পারবেন তো এই তরুণ?
রোনালদোর সঙ্গে অবশ্য তাঁর মিলের চেয়ে অমিলই বেশি। রোনালদো শুরুটা করেছিলেন স্পোর্টিং দিয়ে, ফেলিক্স মূলত পোর্তোর আবিষ্কার, যদিও পেশাদার ফুটবলে যাত্রা শুরুর আগেই ভিড়ে গিয়েছিলেন বেনফিকায়।
মূলত তিনি অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবেই যাত্রা শুরু করেছিলেন। কিন্তু স্ট্রাইকার বা উইঙ্গার পজিশনেও খেলতে পারেন অনায়াসে। এবারের পর্তুগিজ প্রিমিয়ার লিগে ২০ ম্যাচে করেছেন ১০ গোল। এর সঙ্গে ইউরোপা লিগে হ্যাটট্রিক মিলিয়ে গোলসংখ্যা মোট ১৫। তাঁর ওপর চোখ তো পড়বেই। সবচেয়ে আগ্রহী নাকি রিয়াল মাদ্রিদ আর বার্সেলোনা!

জামায়াতের সংস্কারপন্থিদের নতুন দল গড়ার উদ্যোগ by রুদ্র মিজান

নতুন রাজনৈতিক দল গড়ার উদ্যোগ নিয়েছেন জামায়াতের সংস্কারপন্থিরা। সহসাই এ উদ্যোগ দৃশ্যমান হতে পারে। আসতে পারে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা। এরইমধ্যে তারা নিজেরা একাধিক বৈঠক করেছেন। ঠিক করছেন কলা-কৌশল। ঘরে-বাইরে কী ধরনের বিপত্তির মধ্যে পড়তে হতে পারে সেটাও বিবেচনায় নিচ্ছেন তারা। এ অবস্থায় এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে জামায়াতের মধ্যে। দলীয় নেতাকর্মীদের নানাভাবে সতর্ক করা হচ্ছে।
মহান মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের বিতর্কিত ভূমিকার কারণেই দলটিতে সংষ্কার চেয়েছিলেন অনেকে।
এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে বহিষ্কার হয়েছেন কেউ কেউ। অনেকে স্বেচ্ছায় দলত্যাগ করেছেন। সূত্রমতে, জামায়াত থেকে দূরে থাকা এসব ব্যক্তি ও  বিভিন্ন শ্রেণির পেশাজীবীদের নিয়ে সংগঠিত হচ্ছে এই নতুন দল। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একের পর এক এ বিষয়ে বৈঠক করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ঘোষণাপত্র তৈরির পর আনুষ্ঠানিকভাবে দলটির অভিষেক হবে।
এই দলে যারা থাকছেন তারা সবাই বয়সে তরুণ। মূলত একাত্তর পরবর্তী প্রজন্মের ব্যক্তিদের নিয়ে এই দলটি সংগঠিত করা হচ্ছে। তবে কারা-কারা এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট রয়েছে এ বিষয়ে এখনই মুখ খুলতে চাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টরা। এতে জামায়াত-শিবিরের কারা থাকছেন জানতে চাইলে ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি ও জামায়াত থেকে বহিষ্কৃত মজিবর রহমান মঞ্জু জানান, এই উদ্যোগের বিষয়ে জামায়াতের কাউকে নিয়ে তারা বৈঠক করেননি। তবে তিনি নিজে যেহেতু শিবিরের সাবেক সভাপতি সে হিসেবে শিবিরের অনেকেই থাকতে পারেন। এছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ডাক্তার ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এতে সম্পৃক্ত থাকবেন বলে জানান তিনি।
সূত্রমতে, জামায়াত থেকে পদত্যাগকারী ব্যরিস্টার আব্দুর রাজ্জাকসহ এই দল থেকে দূরে থাকা নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রয়েছে এই প্রক্রিয়ায় জড়িতদের। তবে, মজিবুর রহমান মঞ্জু বলছেন, ব্যারিস্টার রাজ্জাকের সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ নেই। মূলত নতুনদের নিয়ে আমরা সংগঠিত হচ্ছি। তিনি বলেন, ব্যারিস্টার রাজ্জাকের কাছ থেকে আমরা পরামর্শ নিতে পারি। যেহেতু তিনি বিজ্ঞ ব্যক্তি।
নতুন এই উদ্যোগ সামনে আসায় নিজ দলের কর্মীদের সতর্ক করেছে জামায়াত। এ বিষয়ে মজিবর রহমান মঞ্জু বলেন, জামায়াতে অনেকেই সংস্কার চান। আমি জামায়াতের কেউ না। ওই দলের সংস্কার করার দায়িত্ব আমার না। জামায়াতের কেউ যাতে নতুন দলে সম্পৃক্ত হতে না পারেন এজন্য জামায়াত তার নেতাকর্মীদের বাধা দিতেই পারে। আমাদের সম্পর্কে নেগেটিভ ধারণা দিতে পারে। এটা জামায়াতের অধিকার বলে মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশে এখন অধিকারের রাজনীতি প্রয়োজন। দেশে এখন মানুষের অধিকার নেই। মৌলিক অধিকার, কথা বলার অধিকার, ভোটের অধিকার প্রয়োজন। আমরা অধিকার প্রতিষ্ঠার রাজনীতি করবো। সেই দিকে লক্ষ্য রেখেই আমরা ঘোষণাপত্র তৈরি করছি। এখন মূলত এই উদ্যোগ নিয়ে আমরা পরামর্শ করছি। দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আগ্রহীরা আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। সবকিছু ঠিক থাকলে শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন দলের ঘোষণা আসতে পারে বলে জানান তিনি।

কাঠগড়ায় গাভী ও বাছুর

হাস্যকর বিষয় নয়। কার্যত আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে একটি গাভী ও তার বাছুরকে। সরাসরি এই দুটি প্রাণিকে ট্রাকে করে উপস্থাপনা করা হয় আদালতে। আক্ষরিক অর্থে কাঠগড়ায় নয়, তবে আদালতকক্ষের বাইরে বেঁধে রাখা হয়। এরপর শুরু হয় বিচার প্রক্রিয়া। না, গরু দুটির বিচার নয়। আইনি জটিলতা এর মালিকানা নিয়ে। দু’ব্যক্তি দাবি করেছেন এই গাভি ও বাছুরটির মালিক তারা।
এর মধ্যে একজন পুলিশের কনস্টেবল ওম প্রকাশ। অন্যজন শিক্ষক শ্যাম সিং। মালিকানা নিয়ে এই বিরোধ মিটাতেই প্রাণি দুটিকে হাজির করা হয় যৌধপুরের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মদন চৌধুরীর আদালতে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন টাইমস অব ইন্ডিয়া।
ওম প্রকাশ ও শ্যাম সিং দু’জনেই গাভি ও বাছুরটির মালিকানা দাবি করেন। এ নিয়ে শহরের মান্দোর পুলিশ স্টেশনে মামলা হয়েছে। এরই শুনানি চলছে। মামলা গিয়েছে ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। সেই আদালতের বাইরে নিয়ে শুক্রবার বেঁধে রাখা হয় গাভী ও তার বাছুরকে। বেরিয়ে আসেন ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি মালিক দাবি করা দু’ব্যক্তিকে গরু দুটির পাশে দাঁড়াতে বলেন, যাতে তিনি বুঝতে পারেন কার প্রতি গরু দুটির টান বেশি। আর এ থেকে তিনি প্রকৃত মালিক নির্ধারণ করে রায় দিতে পারেন।
তার নির্দেশ মতো ওম প্রকাশ ও শ্যাম সিং গিয়ে দাঁড়ান গরু দুটির পাশে। ম্যাজিস্ট্রেট পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন কিছু সময়। তবে তিনি কোনো রায় দেন নি। তিনি শুধু পর্যবেক্ষণ করেছেন। এখন তিনি মালিকানা দাবি করা দুই ব্যক্তির বক্তব্য দেখবেন। ১৫ই এপ্রিল এ মামলার রায় দেয়ার কথা রয়েছে।
২০১৮ সাল থেকে গরুর মালিকানা নিয়ে এই সঙ্কট। পুলিশ স্টেশনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, তারা এ সমস্যা সমাধানে নিজস্ব পদ্ধতিতে চেষ্টা করেছেন। কিন্তু কোনোই সমাধান হয় নি। আমরাও মালিকানা দাবি করা দুই ব্যক্তিকে গরুর পাশে দাঁড়াতে বলেছি। এরপর গাভীটিকে ছেড়ে দিয়েছি। দেখেছি সে বা তার বাছুরটি তাদের কারো প্রতিই কোনো আকর্ষণ দেখায় না। এরপরই গরু দুটিকে গরুর আশ্রয়ের একটি শিবিরে নিয়ে রাখা হয়, যা সিসিটিভি ক্যামেরা দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। বলা হয়, মালিকানা দাবিদার দুইজনের একজন গোপনে ওই গাভীর দুধ দহন করে নিয়ে যান। এ অভিযোগে এমন স্থানে নিয়ে রাখা হয়।
এ অবস্থায় মামলাটি যায় আদালতে। কিন্তু মেট্রোপলিটন কোর্ট এমন বিচারের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হয়। তখন সুপ্রিম কোর্ট মেট্রোপলিটন কোর্টের প্রতি নির্দেশনা দেয়। শেষ পর্যন্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট বিষয়টি আমলে নেন।

ঢাকা-থিম্পু ৫ চুক্তি সই: শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার নিয়ে আলোচনা

বাংলাদেশ ও ভুটান পারস্পরিক স্বার্থে দেশীয় বাজারে উভয় দেশের বেশকিছু পণ্যের শুল্ক ও কোটা মুক্ত প্রবেশাধিকার নিয়ে কাজ করার ব্যাপারে ঐকমত্য পোষণ করেছে। দুই দেশের মধ্যে গতকাল আনুষ্ঠানিক আলোচনায় ভুটান বাংলাদেশের বাজারে দেশটির ১৬টি পণ্যের শুল্ক এবং কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার  চেয়েছে আর বাংলাদেশ চেয়েছে তাদের বাজারে ১০টি বাংলাদেশী পণ্যের শুল্ক ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকের পরে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক একথা বলেন। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম ব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষে এবং সফররত ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা.  লোটে শেরিং ভুটানের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভুটানের ১৬টি পণ্যের বাংলাদেশের বাজারে শুল্ক ও  কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছেন। শহীদুল হক বলেন, আজকের দ্বিপাক্ষিক আলোচনাটি খুবই ইতিবাচক হয়েছে এবং আলোচ্য বিষয়ে দীর্ঘ আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ায় এগুলো কার্যকর হবে বলেও আশা করা যায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভুটান সফরের সময়ও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল বলে পররাষ্ট্র সচিব উল্লেখ করেন।
পররাষ্ট্র সচিব বলেন, প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে বলেছেন, বাংলাদেশের ১০টি পণ্যের কোটা ও শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের বিষয়টি নিয়ে শিগগিরই আলোচনা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা মনে করি, দু’দেশই এটি কার্যকরের বিষয়ে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে এখন এটি বাস্তবায়ন পর্যায়ে কাজ করতে হবে। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগ এবং স্বাস্থ্য খাতের বিষয়ে আলোচনায় প্রাধান্য দেয়া হয়। ট্রানজিটের বিষয়ে তিনি বলেন, এই অঞ্চলে বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল (বিবিআইএন) সড়ক এবং রেল  যোগাযোগের বিষয়টি একটি বড় উদ্যোগ। পররাষ্ট্র সচিব বলেন, যদিও সকল দেশই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে তথাপি ভুটানের সংসদে এটি অনুসমর্থিত হয়নি। তবে, ভুটানের নতুন সরকার বলেছে এই উদ্যোগ সংক্রান্ত বিলটি তাদের সিনেটের উচ্চকক্ষে আলোচনার জন্য পুনরুত্থাপিত হবে এবং তারা এটি পাশের বিষয়ে আশাবাদী। ভুটানের সংসদে বিলটি অনুমোদিত হলে আলোচ্য চারটি দেশের মধ্যে  যোগাযোগ আরো শক্তিশালী হবে, বলে তিনি উল্লেখ করেন।
৫ চুক্তি সই: স্বাস্থ্য, কৃষি, জাহাজ চলাচল, পর্যটন ও জনপ্রশাসন প্রশিক্ষণ বিষয়ে সহযোগিতা জোরদারে ঢাকা ও থিম্পুর মধ্যে পাঁচটি চুক্ত সই হয়েছে। গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দু’দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনার পরে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সফররত ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ডা. লোটে শেরিং চুক্তি স্বাক্ষরের সময় উপস্থিত ছিলেন। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে পরিবহন এবং ট্রানজিট কার্গো চলাচলে অভ্যন্তরীণ জলপথ ব্যবহারের বিষয়ে দি স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে।
নৌ পরিবহন সচিব আবদুস সামাদ এবং ভুটানের অর্থ মন্ত্রণালয়ের সচিব দাশো ইয়েসি ভাংদি এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং রাজকীয় ভুটান সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সমঝোতা চুক্তিতে (এমওইউ) স্বাক্ষর করেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব আসাদুল ইসলাম এবং ভুটানের স্বাস্থ্য সচিব উগানদা দফু। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) এবং ভুটানের কৃষি ও বন মন্ত্রণালয়ের অধীন কৃষি বিভাগের মধ্যে সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বিএআরসি’র নির্বাহী পরিচালক কবির ইকরামুল হক ও ঢাকায় ভুটানের রাষ্ট্রদূত সোনম তোপদেন রাবগি। বাংলাদেশ জনপ্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি) এবং ভুটানের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টের (আরআইএম) মধ্যে একটি সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বিপিএটিসি’র রেক্টর ড. এম আসলাম আলম এবং ভুটানের রাষ্ট্রদূত  সোনম তোপদেন রাবগি। পাশাপাশি, দু’দেশের মধ্যে পর্যটন খাতে সহযোগিতা বিষয়ে ভুটানের পর্যটন কাউন্সিল এবং বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন একটি সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান খান কবির এবং ভুটানের রাষ্ট্রদূত সোনম তোপদেন রাবগি নিজ নিজ দেশের পক্ষে সমঝোতা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।

নতুন আশা নতুন স্বপ্ন by কাফি কামাল

‘নিশি অবসান প্রায় ঐ পুরাতন বর্ষ হয় গত/আমি আজি ধূলিতলে জীর্ণ জীবন করিলাম নত/বন্ধু হও শত্রু হও যেখানে যে রও, ক্ষমা কর আজিকার মত/পুরাতন বরষের সাথে পুরাতন অপরাধ যত।’ আজ সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে পর্দা উঠবে নতুন বঙ্গাব্দের। চৈত্রসংক্রান্তির মাধ্যমে গতকাল ১৪২৫ সনকে বিদায় জানিয়ে বাংলা বর্ষপঞ্জিতে আজ যুক্ত হয়েছে নতুন বছর ১৪২৬। স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নিয়েছে   ঘটনাবহুল ১৪২৫। জীর্ণ-পুরাতনকে পেছনে ফেলে সম্ভাবনার নতুন বছরে প্রবেশ করেছে বাঙালি জাতি।
ব্যতিক্রমহীনভাবেই কবিগুরুর গানে নতুন বছরকে জানানো হবে আহ্বান। অনেকটা প্রার্থনাসংগীতের মতোই জরা ও গ্লানির পুরাতন মুছে ঘোষিত হবে মঙ্গলময় আগামী নির্মাণের প্রত্যয়। রমনার বটমূলে ছায়ানটের আয়োজন আর মঙ্গল শোভাযাত্রার মধ্যদিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আজ ১৪২৬ বঙ্গাব্দকে স্বাগত জানানো হবে। শুভ বাংলা নববর্ষ, স্বাগত অভিবাদন।
নববর্ষ আসে নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন, নতুন প্রত্যয় নিয়ে।
সব অশুভ ও অসুন্দরকে পেছনে ফেলে নতুন কেতন উড়িয়ে বৈশাখ আসে। বিপুল বৈভব, সম্ভাবনা, নতুনের আহ্বান, পুরাতন দিনের হতাশা কাটিয়ে নতুন বছরকে স্বাগত জানাবে আজ বাঙালি। পহেলা বৈশাখে বর্ণিল উৎসবে মাতবে দেশ। স্নাত হই বৈশাখের রৌদ্র খরতাপে, দূর করি বৎসরের যত আবর্জনা। গ্লানি মুছিয়ে, জরা ঘুচিয়ে শপথ নিই বিশুদ্ধতার। নতুন বছরে সবার আশা এক বৈষম্যহীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের। যেখানে থাকবে না কোনো ভয়, হতাশা কিংবা অশুভ শক্তির। গণমানুষের অধিকার আদায় আর শান্তি-স্বস্তির স্মারক হয়ে উঠুক আজ। হাজার বছরের বয়ে চলা লোকজ সংস্কৃতি আমাদের নতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করবে। নতুন বছরের নতুন সূর্যোদয়ে নতুন কুঁড়ির মতো আমাদের সমাজ, জীবনে এবং রাষ্ট্রে সম্ভাবনার নতুন নতুন পালক যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা গণমানুষের। বিশ্বকবির ভাষায়, ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুছে যাক জরা, অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ পহেলা বৈশাখে আমরা সুন্দর, সুচি আর চিরমঙ্গলের জয়গান করি।
পয়লা বৈশাখ বাঙালির প্রাণের উৎসব। এ উৎসবের সার্বজনীনতা অসাধারণ। বাঙালি জাতি তার নববর্ষের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে চলেছে, আর এ ধারা চলে আসছে গানে-কবিতায়, লোকাচারের নানা অনুষঙ্গে, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। দেশের বৃহত্তম অসামপ্রদায়িক উৎসব হিসেবে সর্বস্তরের মানুষের কাছে বাংলা নববর্ষ বহুকাল ধরে বরণীয়। পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষের সঙ্গে বাংলার সাহিত্য, বাংলাদেশের সামাজিক-সাংস্কৃতিক সম্পর্ক যেমন নিবিড়, তেমনি অর্থনৈতিক সম্পর্কও তাৎপর্যপূর্ণ। পৃথিবীতে প্রচলিত অধিকাংশ বর্ষপঞ্জির উৎপত্তি কোনো না কোনো ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত, কিন্তু বাংলা নববর্ষের সঙ্গে ধর্মীয় অনুষঙ্গ নেই। কৃষিকাজ ও খাজনা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করেই বাংলা সন গণনার শুরু মোগল সম্রাট আকবরের সময়ে। হিজরি চান্দ্রসন ও বাংলা সৌরসন ভিত্তি করে প্রবর্তন হয় নতুন এই বাংলা সন।
পরে যুক্ত হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যের দেনা-পাওনার হিসাব মেটানো। অমর্ত্য সেন তার আর্গুুমেন্টিভ ইন্ডিয়ানে বলেছেন- ‘আকবর সব ধর্মবিশ্বাসীর সমান উপযোগী একটি বর্ষপঞ্জি তৈরি করতে চেয়েছিলেন।’ আকবরের মন্ত্রী আবুল ফজল ‘আকবরনামা’য় লিখেছেন-  ‘ফসল সংগৃহীত হয় সৌর বর্ষপঞ্জি অনুসারে। তাই হিজরি সালের পাশাপাশি একটি সৌর বর্ষপঞ্জির প্রয়োজন ছিল। দ্বীন-এ-ইলাহির মতো আকবর সেটির নাম দিয়েছিলেন তারিখ-ই-ইলাহি।  বঙ্গাব্দের গণনা শুরু হয় ১৫৫৬ সালে। নক্ষত্রের নাম থেকে নেয়া হয় মাসগুলোর নাম। তারিখ-ই-ইলাহি চালুর পর ১৪টি নতুন উৎসবের কথা ঘোষণা করেন আকবর। এই রকম এক নওরোজেই শাহজাদা খুররমের সঙ্গে দেখা হয়েছিল মমতাজের। এ কারণে অনেকে বলতে চান, পহেলা বৈশাখ না হলে সৃষ্টি হতো না প্রেমের অমর স্মৃতি তাজমহল।
বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। পয়লা বৈশাখ এখন সব বাঙালির সার্বজনীন সাংস্কৃতিক আনন্দ-উৎসব। ধর্ম-সমপ্রদায়নির্বিশেষে বাংলা ভূখণ্ডের সব মানুষের প্রাণের উৎসব। কৃষকসমাজ আজও অনুসরণ করছে বাংলা বর্ষপঞ্জি। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও পরে সংযোগ ঘটে রাজনৈতিক ইতিহাসের। আমাদের পরাধীনতার কালে এই উৎসব আয়োজনে নানা প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী। বাঙালিও সোচ্চার ছিল প্রতিবাদে। ষাটের দশকে রমনা বটমূলে সূচিত ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসব বাঙালির আত্মপরিচয়ের আন্দোলন-সংগ্রামকে করেছে বেগবান। দেশ স্বাধীনের পর বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতীকে পরিণত হয় বাংলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠান। উৎসবের পাশাপাশি স্ব্বৈরাচার-অপশক্তির বিরুদ্ধে প্রতিবাদও এসেছে পয়লা বৈশাখের আয়োজনে। ১৯৮৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে বের হয় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা।
২০১৬ সালের ৩০শে নভেম্বর ইউনেসকো এ শোভাযাত্রাকে দিয়েছে বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মর্যাদা। প্রথমদিকে পয়লা বৈশাখের উৎসব ছিল মূলত গ্রামাঞ্চলকেন্দ্রিক। শহরে-বন্দরেও তা সীমিত ছিল হালখাতায়। বর্তমানে গ্রামাঞ্চলের চেয়ে বর্ণিল, বর্ণাঢ্য আয়োজনে এ উৎসব পালিত হয় রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রতিটি নগর-মহানগরে। ঢাকায় রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণের আদলে প্রায় সর্বত্র আয়োজিত হয় এ অনুষ্ঠান। বাংলা নববর্ষে ব্যবসায়ীদের ‘হালখাতা’ রীতি এখনো এ দেশের নিজস্ব সংস্কৃতির আমেজ নিয়ে উৎসবের পরিধির বিস্তার ঘটিয়েছে। আধুনিক বাঙালি তাদের বাংলা নববর্ষকে সাজিয়ে তুলছে মাতৃভূমির প্রতিটি আঙিনায় আরো বেশি উজ্জ্বলতায়। দেশের পথেঘাটে, মাঠে-মেলায়, অনুষ্ঠানে থাকবে কোটি মানুষের প্রাণের চাঞ্চল্য, আর উৎসবমুখরতার বিহ্বলতা। পয়লা বৈশাখের ভোরে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আয়োজনে মেতে ওঠে সারা দেশ। বর্ণাঢ্য মঙ্গল শোভাযাত্রায় অংশ নেয় বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ। সর্বত্র দেখা যায় নতুন প্রাণের উচ্ছ্বাস। কবির ভাষায়- ‘অনাগত আগামীর অফুরান বাদ্য/নতুনের আবাহনে হয়’।
পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান, রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়ি জেলায় বসবাসকারী ১১টি জাতিসত্তার মধ্যে চাকমা, ত্রিপুরা এবং তঞ্চঙ্গ্যা জনজাতি বছরের হিসাব করে বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী। নববর্ষে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রধান উৎসব বৈসাবি। ত্রিপুরা জনজাতির বৈসু, মারমাদের সাংগ্রাইং, চাকমাদের বিজু মিলিয়ে এ বৈসাবি। বাংলা নববর্ষকে উপলক্ষ্য করে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, বাংলা ভাষাভাষি মুসলমান, হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের সহাবস্থানে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাংশের পাহাড়ি জনপদে এখন উৎসবের অনিন্দ্য আমেজ। শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিও মেতে উঠবে বর্ষবরণের নানা আয়োজনে। নববর্ষে উৎসব-পার্বণে ভোজনপ্রিয় বাঙালির খাদ্যতালিকায় রসগোল্লা, নকশিপিঠা, কদমা-বাতাসা, ভর্তা, আচার, খই, মুড়ি-মুড়কি, পায়েস অনিবার্য। পালা-পার্বণ, সামাজিক কিংবা ধর্মীয় উৎসবে এসব সুস্বাদু খাবার শত বছর ধরে বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। নববর্ষ উপলক্ষে চারদিকে ধুম পড়বে বাঙালির বাংলা খাবার আস্বাদনে।
নববর্ষকে স্বাগত জানিয়ে প্রেসিডেন্ট মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন।
নববর্ষ উপলক্ষে আজ সরকারি ছুটির দিন। জাতীয় সংবাদপত্রগুলো বাংলা নববর্ষের বিশেষ দিক তুলে ধরে ক্রোড়পত্র বের করবে। সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে নববর্ষকে ঘিরে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হবে। বাঙালির এই প্রাণের উৎসবকে ঘিরে রমনা পার্কসহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুরোটাই ঢেকে দেয়া হয়েছে নিরাপত্তা চাদরে। কেবল রাজধানী ঢাকাই নয় এ উপলক্ষে সারাদেশেই নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ ও র‌্যাবের পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থা ও তাদের আধুনিক প্রযুুক্তি ব্যবহার করে যৌথভাবে কাজ করছে সব সংস্থা। র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়ানের (র‌্যাব) ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক (ডিজি) কর্নেল মো. জাহাঙ্গীর আলম শুক্রবার রমনা বটমূলের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ শেষে বলেছেন, পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নগরীর রমনা পার্ক, সোহরওয়ার্দী উদ্যান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নাশকতা ঠেকাতে জোরদার করা হয়েছে র‌্যাবের নিরাপত্তা বলয়।
পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রাজধানীর উৎসবস্থলগুলো সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় থাকবে এবং তা সার্বক্ষনিক মনিটরিং করবে র‌্যাব। নববর্ষকে ঘিরে র‌্যাবের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। যে কোন ধরনের নাশকতা ঠেকাতে প্রস্তুত রয়েছে র‌্যাব। এছাড়া রমনা বটমূলসহ গুরুত্বপূর্ণ সব ভেন্যুতে ডগ স্কোয়াডসহ বোম্ব ডিস্পোজাল ইউনিট সুইপিং করবে। এছাড়া টহল টিম, ফুট পেট্রোল, ওয়াচ টাওয়ার, মোটরসাইকেল পেট্রোল ও অবজারভেশন পোস্ট থাকবে। বড় ভেন্যুগুলো মনিটরিংয়ের জন্য নিয়ন্ত্রণকক্ষ স্থাপন, মোবাইল কোর্টসহ মেডিকেল টিম থাকবে, যাতে দেশের মানুষ নিবিঘ্নে নববর্ষ উদযাপন করতে পারে।
বর্ষ আবাহনে মূল অনুষ্ঠান: বর্ষবরণে আজ রাজধানী জুড়ে বিভিন্ন সংগঠনের নানা আয়োজন থাকবে। প্রতিবছরের মত দিনের প্রথম প্রভাতেই রমনার বটমূলের ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ‘ছায়ানট’ ভোরের সূর্যের আলো দেখার সঙ্গে সঙ্গেই সরোদবাদন দিয়ে শুরু করবে বর্ষবরণের মূল অনুষ্ঠান। পহেলা বৈশাখ সকাল ৯টায় চারুকলা অনুষদ থেকে বের করা হবে মঙ্গল শোভাযাত্রা। বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখ ১৪২৬ উদযাপন উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বর্ণাঢ্য কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। সকালে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বইমেলাসহ বৈশাখী মেলার আয়োজন করেছে বাংলা একাডেমি। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলা একাডেমি, গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তর, আরকাইভস ও গ্রন্থাগার অধিদপ্তর, জাতীয় জাদুঘর, কবি নজরুল ইনস্টিটিউট, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, কপিরাইট অফিস, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র ও বিসিক নববর্ষ মেলা, আলোচনাসভা, প্রদর্শনী, কুইজ, রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ আায়োজন করেছে নানা অনুষ্ঠানমালার। বাংলা নববর্ষের দিন সব কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে (এতিমখানা) উন্নতমানের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার পরিবেশন করা হবে।
শিশু পরিবারের শিশুদের নিয়ে ও কারাবন্দিদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং কয়েদিদের তৈরি বিভিন্ন দ্রব্যাদি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সব জাদুঘর ও প্রত্নস্থান সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা হবে- শিশু-কিশোর, ছাত্র-ছাত্রী, প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিশুদের বিনা টিকিটে প্রবেশ করতে পারবে। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনসমূহ এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। অভিজাত হোটেল ও ক্লাব বিশেষ অনুষ্ঠানমালা ও ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের আয়োজন করবে। বর্ষবরণ উপলক্ষে চ্যানেল আই ও সুরের ধারা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র্র প্রাঙ্গণে আয়োজন করেছে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান। বিকাল তিনটায় নয়াপল্টনে বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বর্ষবরণের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা-জাসাস। জাতীয় প্রেস ক্লাব ও ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি বর্ষবরণে তাদের সদস্য ও পরিবারবর্গের জন্য সকাল থেকেই আয়োজন করেছে খৈ, মুড়ি-মুড়কি, বাতাসা ও বাঙালি খাবার ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের।

নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের ললিপপে ভুলবেন না: অসমে মমতা

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিজেপিশাসিত অসমে এক জনসভায় বলেছেন, আপনারা নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের ললিপপে ভুলবেন না। কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের সমালোচনা করে তৃণমূল নেত্রী বলেন, "ওরা নাগরিকত্ব দেবেন, কীসের নাগরিকত্ব? আমরা কি নাগরিক নই? এদেশে যারা বাস করে আইনত তাঁরা নাগরিক নয়?"   
তিনি শুক্রবার অসমের ধুবড়িতে এক নির্বাচনি জনসভায় ভাষণ দেয়ার সময় ওই মন্তব্য করেন। মমতা এদিন এনআরসি, নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল, ডিটেনশন ক্যাম্প, হিন্দু-মুসলিম বিভাজন ইত্যাদি ইস্যুতে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের তুলোধোনা করেন।  
মমতা বলেন, "অসমে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) থেকে ৪০ লাখ মানুষের নাম বাদ গিয়েছে। মানুষের সেই বিপদের দিনে কেউ পাশে ছিল না। একমাত্র তৃণমূল আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ থেকে অসমে যে প্রতিনিধিদল পাঠানো হয়েছিল, তাদেরকে বিমানবন্দর থেকে বেরোতে দেয়া হয়নি। তাঁদের উপরে অত্যাচার করা হয়েছে। 'এক্সপায়ারি প্রধানমন্ত্রী' মোদি বাবু শুধু মিথ্যে কথা বলে বেড়ান। আর উলোপাল্টা করে বেড়ান। ওনার কোনও কাজ নেই। পাঁচ বছর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, উনি দেশটাকে ধ্বংস করেছেন! পাঁচ বছর পরে আবার গান গাইছে, ‘আমার সাধ না মিটিল, আশা না পুরিল, সকলি ফুরায়ে যায় মা।’ আর একবার দিল্লির গদি দাও মা।"     
তিনি বলেন, ‘এনআরসি হওয়ার পরে কত মানুষ আত্মহত্যা করেছে! মায়ের নাম আছে তো বাচ্চার নাম নেই। বাবার নাম আছে তো মায়ের নাম নেই। স্বামীর নাম আছে তো স্ত্রীর নাম নেই। ৪০ লাখ মানুষের নাম বাদ। তাঁর মধ্যে হিন্দু বাঙালিরাও আছেন। আমি হিন্দু-মুসলিম দেখি না, শুধু একটা কথা বলব ওরা সারা বছর ধরে হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে বিভাজন করে।’
হিন্দু বাঙালিদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, আপনাদের কমপক্ষে ২২ লাখ নাম বাদ গেছে। আপনাদের যদি ওরা ভালবাসত তাহলে আপনাদের নাম বাদ দিত না। প্রায় ২০ লাখ মুসলিম ভাই বোনেদের নামও বাদ গেছে। গোর্খা, কিছু বিহারী, কিছু তামিলনাড়ুর লোকের নাম বাদ গেছে। কেন বাদ গেছে? মানুষ ভয়ে আত্মহত্যা করছে! ডিটেনশন ক্যাম্প। কিসের ডিটেনশন ক্যাম্প? বাচ্চাদের পর্যন্ত অমানবিকভাবে ডিটেনশন ক্যাম্পে রেখে দিয়েছে!’
‘সারদা’ (বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থা) দুর্নীতি প্রসঙ্গে মমতা নথি দেখিয়ে বলেন, এখানকার মন্ত্রী হিমন্ত কুমার বিশ্বশর্মাকে সারদা চিটফান্ডের মালিক ক্যাশে প্রায় তিন কোটি টাকা দিয়েছিল। মোদিবাবু আপনি তাঁকে গ্রেফতার করেছেন? অ্যাকশন নিয়েছেন?’ 
তিনি বলেন, ‘শুধু হিন্দু-মুসলিম বিবাদ বাধানো হচ্ছে? আমরা কারা? আমি কী হিন্দু ধর্মের মেয়ে নই? আমরা হিন্দু ধর্ম করি না? তাই বলে মুসলিমদের কেটে ফেলে দিতে হবে? মুসলিমদের বাদ দিয়ে দিতে হবে?’
মমতা এদিন অসমবাসীদের উদ্দেশ্যে লোকসভা নির্বাচন উপলক্ষে তৃণমূল প্রার্থীদের জয়ী করার আহ্বান জানান।

পহেলা বৈশাখে সিলেটে মোটরসাইকেলে স্বামী-স্ত্রী ছাড়া অন্য আরোহী নয় by ওয়েছ খছরু

পহেলা বৈশাখে সিলেটে কেবল স্বামী ও স্ত্রী দু’জন মোটরসাইকেলে চড়তে পারবেন। এর বাইরে দু’জন চলাচল করতে পারবেন না। সিলেট মহানগর পুলিশের  তরফ থেকে বৈশাখের নিরাপত্তায় এমন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আর এ নিয়ে সিলেটে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও চলছে নানা আলোচনা, সমালোচনা। এমন নির্দেশনা সিলেটে আগে কখনো আসেনি বলে জানান কেউ কেউ। আর এই নির্দেশনাটি গণবিজ্ঞপ্তি আকারে গণমাধ্যমকে দিয়েছে সিলেট মহানগর পুলিশ।
পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে সিলেটের নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ থেকে ১৫টি নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
এই নিদের্শনার মধ্যে পুলিশ জানিয়েছে- ‘মোটরসাইকেলে চালক ব্যতিত অন্য কোনো আরোহী বহন করা যাবে না। তবে স্বামী-স্ত্রী চলাচল করতে পারবেন। একযোগে বা দলগতভাবে মোটরসাইকেল চালিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি বা যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা যাবে না।’ সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত উপ-কমিশনার গণমাধ্যম জেদান আল মুছা এই গণবিজ্ঞপ্তিটি প্রেরণ করেন।
গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে- ‘বাংলা বর্ষবরণ শান্তিপূর্ণ ও উৎসাহ উদ্দীপনার সঙ্গে উদ্‌যাপনের লক্ষ্যে নিম্নেবর্ণিত নির্দেশনাসমূহ অনুসরণের জন্য সকলকে অনুরোধ করা যাচ্ছে।’ এই নির্দেশনার মধ্য রয়েছে- বর্ষবরণের অনুষ্ঠান সম্পর্কে এসএমপি’র সংশ্লিষ্ট থানা এবং পুলিশ কমিশনার এর কার্যালয়কে অবহিত করতে হবে, বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজক কর্তৃপক্ষকে নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক বা নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ করে অনুষ্ঠানস্থলের সার্বিক শৃঙ্খলা ও অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি-বস্তু সম্পর্কে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নিতে হবে, সিলেট মেট্রোপলিটন এলাকায় কোনো ধরনের আতশবাজি, পটকা ফাটিয়ে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা যাবে না, বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে ব্যাগ, থলে, পোঁটলা, সুটকেস, টিফিন ক্যারিয়ার বা এ জাতীয় কোনো বস্তু বহনকে নিরুৎসাহিত করা হলো, খোলা ট্রাকে বাদ্যযন্ত্র বা সাউন্ড বক্স নিয়ে সিলেট  মেট্রোপলিটন এলাকায় প্রবেশ করা যাবে না এবং কোনো ধরনের রঙ ছিটানো যাবে না, অনুমোদিত অনুষ্ঠান আয়োজনকারী কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সিসিটিভি স্থাপন, ভিডিও চিত্র ধারণ এর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের আয়োজনকারী কর্তৃপক্ষকে অনুষ্ঠানের নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদানের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হলো, নির্জন বা জনগণের চলাচল কম এমন স্থান এড়িয়ে চলার পরামর্শ প্রদান করা হলো, সিএনজিতে পূর্ব থেকে অপরিচিত যাত্রী বসা থাকলে তা এড়িয়ে চলুন অথবা পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করুন।
অপরিচিত যাত্রীর দেয়া কোনো কিছু খাওয়া বা পান করা থেকে বিরত থাকুন,  বৈশাখী অনুষ্ঠানে যানজট নিরসনে নির্দিষ্ট পার্কিং এর স্থানে গাড়ি পার্কিং করার জন্য অনুরোধ করা হলো, ব্যক্তিগত প্রয়োজনে চলাচলের রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না করার জন্য অনুরোধ করা হলো, বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের পাশে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রের ব্যবস্থা রাখুন এবং প্রয়োজনে ফায়ার সার্ভিসের কন্ট্রোল রুমের নম্বর ০১৭৩০-৩৩৬৬৪৪ এর সঙ্গে যোগাযোগ করুন, উন্মুক্ত স্থানে নববর্ষের অনুষ্ঠানসমূহ সন্ধা ৬টার মধ্যে অবশ্যই শেষ করতে হবে, সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তি বা বস্তু প্রত্যক্ষ করলে পুলিশকে জানানো জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হয়েছে। সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) জেদান আল মুছা জানিয়েছেন- নগরবাসীর বর্ষবরণ উদ্‌যাপনের এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে ১লা বৈশাখ পর্যন্ত এই আদেশ বহাল থাকবে। তিনি সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে শান্তিশৃংখলা বজায় রেখে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান উপভোগের স্বার্থে নগরবাসীর সর্বাত্মক সহযোগিতা কামনা করেন। এদিকে- গণ বিজ্ঞপ্তি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে আলোচনা।