Sunday, October 19, 2014

সোনাক্ষীর ওজন কমানো কারও খুশির জন্য নয়!

২০১০ সালে বলিউড অভিষেকের পর থেকেই সোনাক্ষী সিনহা বহুবার খবরের শিরোনাম হয়েছেন তাঁর শরীরের বাড়তি ওজনের জন্য। বলতে গেলে চলচ্চিত্রে অভিনয় কিংবা অন্যান্য বিষয় যতটা খবর হয়েছে আলোচনা-সমালোচনায় তার চেয়ে বেশি এসেছে সোনাক্ষীর মুটিয়ে যাওয়া শরীর। বছরের পর বছর ধরে নানা কটূক্তি সহ্য করার পর অবশেষে চলতি বছরের শুরুর দিকে বাড়তি ওজন কমানোর যুদ্ধে নামেন সোনাক্ষী। নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যে ওজন অনেকটাই কমিয়ে ফেলেন তিনি। সম্প্রতি সোনাক্ষী জানিয়েছেন, কাউকে খুশি করার জন্য নয়, নিজের তাগিদ থেকেই ওজন কমিয়েছেন তিনি।

এ প্রসঙ্গে সোনাক্ষী বলেন, ‘শরীরের ওজন বেশি থাকাটা কারও জন্যই ভালো কিছু নয়। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই আমি এটা বলতে পারি। সবারই শরীরের ফিটনেস ধরে রাখার চেষ্টা করা উচিত। তবে অবশ্যই তা স্বাস্থ্যকর উপায়ে করতে হবে। একেকজন মানুষের আকার একেক রকম হয়। কাউকেই নির্দিষ্ট একটি দৈহিক অবয়ব ধরে রাখার জন্য জোর করা উচিত নয়।’ সম্প্রতি এক খবরে এমনটিই জানিয়েছে হিন্দুস্তান টাইমস। সোনাক্ষী আরও বলেন, ‘আমি শরীর ফিট রাখার চেষ্টা করি। তবে সাইজ জিরো ফিগার করার কোনো রকম ইচ্ছে আমার নেই। আমার স্বাস্থ্যকর শরীর নিয়ে আমি অনেক খুশি। আমার ভক্ত ও দর্শকরাও খুশি। আমার ক্যারিয়ারের সফলতাই তা প্রমাণ করে। কিন্তু একশ্রেণির মানুষ এতটাই নিচু মনের এবং বাজে মানসিকতার যে অযথাই আমার ওজন নিয়ে এটা-সেটা বলে বেড়ায়।’

এভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণের বিষয়টিকে একদমই সমর্থন করেন না বলেও জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ সোনাক্ষী। এ প্রসঙ্গে তাঁর ভাষ্য, ‘সবকিছুরই একটা সীমা থাকে। দিনের পর দিন আমার ওজন নিয়ে অনেক আজে-বাজে মন্তব্য করা হয়েছে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায়। এমনকি সাংবাদিকতাকেও ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে যা ইচ্ছে তাই বলা হয়েছে আমাকে নিয়ে। এভাবে সীমা লঙ্ঘনের অধিকার কারোরই থাকতে পারে না। সমালোচনা মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণকে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। কেন কেউ আমাকে কিংবা অন্য কাউকে বলে দেবে, আমার শরীরের আকার কেমন হতে হবে!’

ভয়ঙ্কর এক সিরিয়াল কিলার, ৩৯ খুনের স্বীকারোক্তি

ব্রাজিলের ভয়ঙ্কর সিরিয়াল কিলার থিয়াগো হেনরিক গোমেজ দা রোচা (২৬)। গ্রেপ্তার হওয়ার পর পুলিশের কাছে ৩৯টি হত্যাকা-ের স্বীকারোক্তি দিয়েছে সে। সবকিছু আর সবার ওপর ক্রোধ অনুভব করে বিকৃত মস্তিষ্কের থিয়াগো। ক্রোধের বশবর্তী হয়ে হত্যা করেছে ৩৯টি প্রাণ। নারী, সমকামী আর গৃহহীন ব্যক্তিরা ছিল তার টার্গেট। এ খবর দিয়েছে ইন্ডিপেন্ডেন্ট। ব্রাজিলের কেন্দ্রীয় রাজ্য গোইয়াসে এতগুলো হত্যাকা- ঘটিয়েছে থিয়াগো। মঙ্গলবার পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। খুনের স্বীকারোক্তিতে সে বলে, সবকিছুর ওপর তার ক্রোধের কারণে সে এসব খুন করেছে। তার ভাষ্যমতে, শুধু খুন করলেই তার ক্রোধ প্রশমিত হতো। পুলিশ প্রধান ডিউসনি অ্যাপারেসিডো এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ভিকটিমদের সঙ্গে তার কোন যোগসূত্র ছিল না। এলোমেলোভাবে শিকার বেছে নিয়েছে সে। থিয়াগোকে জিজ্ঞাসাবাদে উপস্থিত এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, তার শান্ত প্রকৃতি দেখে আমরা সবাই বিস্মিত। সে যাদের হত্যা করেছে তাদের ১ থেকে ৩৯ পর্যন্ত সংখ্যায় চিহ্নিত করেছে। পুলিশের শীর্ষ গোয়েন্দা জোয়াও গোর্সকি সাংবাদিকদের বলেন, আমার বিশ্বাস সে একজন সিরিয়াল কিলার। শুরুর দিকে যত্রযত্র খুন করা শুরু করে। কিন্তু শেষের দিকে এসে একটি ধরন প্রতিষ্ঠা করে সে। আদালতে উপস্থিত হওয়ার অপেক্ষায় আসে থিয়াগো। তার আইনজীবীর দাবি আক্রমণাত্মক প্রশ্নের মুখে তাকে ওইসব অপরাধ স্বীকার করতে বাধ্য করা হয়েছে যেগুলো সে করেনি। পুলিশ আরও জানিয়েছে, থিয়াগো বৃহস্পতিবার তার সেলে ভাঙা বাল্ব দিয়ে আত্মহত্যা করার চেষ্টা করে। পরে এক নিরাপত্তা রক্ষী তাকে ঠেকাতে সক্ষম হয়। মামলার এক তদন্ত কর্মকর্তা নর্টন ফেরেইরা বলেন, থিয়াগোর বাড়িতে উদ্ধারকৃত একটি সরঞ্জামের সঙ্গে এ বছর হওয়া কমপক্ষে ৬ নারী হত্যাকা-ের যোগসূত্র রয়েছে। এদিকে কমপক্ষে আরও ৩৩টি হত্যাকা-ের স্বীকারোক্তি দিয়েছে সে। এসব ঘটনার শুরু ২০১৩ সালের প্রথম দিক থেকে।

সঙ্কটটা আসলে কোথায়? by মোহাম্মদ আওলাদ হোসেন

নতুন নতুন শিল্পী, প্রযোজক, পরিচালক আসছেন, নতুন নতুন ছবি মুক্তি পাচ্ছে। ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে ছবি নির্মাণ বেড়ে গেছে। তারপরও দর্শক প্রেক্ষাগৃহে প্রত্যাশা অনুযায়ী আসছেন না। এর সঠিক কারণও কেউ খুঁজে পাচ্ছেন না। কেউ বলেন, গল্পের সঙ্কট, কেউ বলেন শিল্পী সঙ্কট, কেউ কেউ আবার বলেন মেধার সঙ্কট। নতুন যারা এখন সিনেমা বানাচ্ছেন তারা নাকি সিনেমার ভাষাটা বোঝেন না। কিন্তু প্রতিষ্ঠিত পুরনো যারা ছবি বানাচ্ছেন তাদের কি হলো? তারা কি সিনেমার ভাষাটা ভুলে গেলেন? তাদের পরিচালিত ছবি কেন দর্শক দেখতে আসেন না? পরিচালক সমিতিতে বসে যারা বড় বড় কথা বলেন, তাদের ছবিগুলোও পর্দায় খুব একটা ঝড় তুলতে পারছে না। ‘একটি ডিজিটাল সিনেমা’ স্লোগান দিয়ে এখন সবাই ছবি বানাচ্ছেন। সঙ্গে প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে একটা দৃষ্টিকটু উদ্দাম নৃত্যের আইটেম গানের তকমা লাগিয়ে দিচ্ছেন। তারা প্রত্যেকেই এখন ব্যর্থ হচ্ছেন দর্শক মনোরঞ্জনে। ’৭০-৮০ দশকে দর্শক একটি ছবিতে যা দেখতে পেতেন এখন তার কিছুই পাচ্ছেন না। সরজমিন দেখা গেছে, সিনেমা দেখতে আসা দর্শকদের বিস্তর অভিযোগ। প্রধান অভিযোগ ছবিতে কোন গল্প খুঁজে পাচ্ছেন না তারা। তাদের অভিযোগ, সবই নকল গল্প। সিনেমার ভাষায় ‘কাট টু কাট’ নকল। দ্বিতীয় অভিযোগ, ডিজিটাল বলা হলেও চিত্রগ্রহণের মান খুবই দুর্বল। সিনেপ্লেক্সগুলো বাদ দিলে বাকি সব প্রেক্ষাগৃহেই থাকে অন্ধকার। ছবি যেন আলো-আঁধারের খেলা। রঙিন ছবিতে রঙের বালাই নেই। প্রেক্ষাগৃহে বসেই দর্শকের প্রশ্ন, ছবিটি সাদাকালো নাকি? ছবির গানগুলো কানে বাজে না। গানের কথা, সুর কিছুই হৃদয় স্পর্শ করে না। আইটেম গানের নামে চলছে নগ্ন দেহের অবাধ প্রদর্শন। রয়েছে অপ্রয়োজনে মারামারি। এমন কি গোলাগুলির মাঝখানে ঢুকে পড়ছে রোমান্টিক গান। বিদেশে শুটিংয়েও একই অবস্থা। যে উদ্দেশ্যে মালয়েশিয়া কিংবা থাইল্যান্ড যাওয়া হয়, দর্শক সেই উদ্দেশ্যের আগা-মাথা বুঝতে পারেন না। আলো স্বল্পতার কারণে কোন দৃশ্যই ঠিকমতো দেখা যায় না। এসব কিছুর সঙ্গে রয়েছে ডিজিটালের নামে প্রজেক্টরে ছবি প্রদর্শন। নিম্নমানের প্রজেক্টর এবং এর প্রদর্শনের যথাযথ পদ্ধতি না জানার কারণে দর্শক প্রদর্শিত ছবি দেখে বিরক্ত হচ্ছেন। তাদের চোখ কষ্ট পায় বলে তারা প্রতিনিয়তই প্রেক্ষাগৃহ বিমুখ হচ্ছেন। এবারের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ৪টি ছবিই কাঙ্ক্ষিত দর্শক পায়নি। ঢাকার একজন আলোচিত প্রেক্ষাগৃহ মালিক হতাশার সুরে বললেন, নতুন ছবি তো চালাচ্ছি। কিন্তু দর্শক তো পাচ্ছি না। মনে হয় দর্শকদের বাসা থেকে ডেকে আনতে হবে। সঙ্কটটা কোথায়- এ বিষয়ে তার মতামত চাওয়া হলে তিনি বলেন, সমস্যা তো অনেক। ছবি যা হচ্ছে তাতে আমি নিজেও হতাশ। কে কি বানাচ্ছেন, একজন ব্যবসায়ী হিসেবে আমি নিজেও বুঝতে পারছি না। তিনি বলেন, যদি কখনও দু-একটা ছবি ব্যবসা করে তাহলে সেটা দ্রুত পাইরেসি হয়ে যায়। আমার মনে হয় সঙ্কটটা সবখানেই এবং এর সমাধানে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। সব সরকারের আমলে বলা হয়, সরকার চলচ্চিত্রের বিষয়ে আন্তরিক। কিন্তু কাজকর্মে সরকারের আন্তরিকতার প্রতিফলন দেখা যায় না তাদের নিয়োজিত ব্যক্তিদের কারণে। নকল ছবি সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পেয়ে যাচ্ছে। ভিডিও পাইরেসি বন্ধ হচ্ছে না। প্রেক্ষাগৃহের পরিবেশ দিন দিন নষ্ট হচ্ছে। সরকার যন্ত্রপাতি কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ দিলেও সেই অর্থ যথাযথভাবে কাজে লাগানো যাচ্ছে না। কেন যাচ্ছে না, এসব তদারকি করার জন্যও সরকারের পক্ষ থেকে কেউ থাকেন না। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। সিনেমার নামে যেমন খুশি তেমন সাজাতে ব্যস্ত সবাই। দোষ দেয়া হচ্ছে আকাশ সংস্কৃতিকে। ভারতীয় ছবিকে। অথচ কেউ নিজেদের অক্ষমতা কিংবা দুর্বলতাকে দেখতে চাইছে না। ফলে দিনে দিনে সঙ্কট আরও ঘনীভূত হচ্ছে। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে চলচ্চিত্র শিল্প। চলচ্চিত্রের পুরনো প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী, কলাকুশলী, বোদ্ধা সবাই জানেন সঙ্কটটা কোথায়? তারপরও তারা না জানার ভান করে থাকেন। যারা জেগে ঘুমান, তাদের জাগানো যে সম্ভব নয়, সেটা চলচ্চিত্রের বর্তমান পরিস্থিতি দেখেই আঁচ পাওয়া যাচ্ছে।

‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বৈঠক করায় পিয়াস করিমকে ধরে নিয়ে যায় পাক বাহিনী’ -আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক

আইনমন্ত্রী এডভোকেট আনিসুল হক বলেছেন, প্রয়াত অধ্যাপক পিয়াস করিমকে ১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তার কুমিল্লার বাসার সামনে থেকে তাকে তারা তুলে নিয়ে যায়। আটকে রাখে কুমিল্লা সার্কিট হাউজে। ওই সময়ে পিয়াস করিম ছিলেন চার বোনের এক ভাই। বাবার একমাত্র ছেলে। এই কারণে তাকে ছাড়ানোর জন্য সব ধরনের চেষ্টাই করা হয়। এর অংশ হিসাবে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গেও যোগাযোগ করা হয়। তখন পিয়াস করিমের বাবা এডভোকেট এম এ করিমকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শর্ত মেনে নিতে হয়। তাদের শর্ত ছিল তারা পিয়াস করিমকে মুক্ত করে দিবে, তবে সে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কোন কাজ করতে পারবে না। কোন বৈঠক করতে পারবে না। দ্বিতীয়ত তাকে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিতে হবে। তাদের পক্ষে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, আমি পিয়াস করিমের ব্যাপারে অনেক কিছুই জানি। যেটা আমি বলছি তা প্রমাণও করতে পারবো। আমি দায়িত্ব নিয়েই বলছি। তিনি বলেন, অনেকেই বলছেন পিয়াস করিমের দাদা ছিলেন রাজাকার। কিন্তু‘ এই কথাটি ঠিক নয়। কারণ তার দাদা ছিলেন ড. আব্দুর রউফ। তিনি ১৯৫৭ কি ১৯৫৮ সালে মারা গেছেন। একজন মৃত মানুষ রাজাকার হন কেমন করে? তার রাজাকার হওয়ার খবরটি যে গণজাগরণ মঞ্চ কিংবা অন্যান্যরা বলছে এটা ঠিক না। তিনি তার দাদা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন, তার নানা লিল মিয়া। বাড়ি বাঞ্ছারামপুর। তিনি যুক্তফন্ট্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। আবার স্বাস্থ্যমন্ত্রীও ছিলেন। তার নানা স্বাধীনতার যুদ্ধের পর মারা গেছেন তবে রাজাকার ছিলেন না। কোথাও রাজাকার হিসাবে তার নামও নেই। তিনি বলেন, আমি এও শুনেছি তিনি নাকি কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের ফাউন্ডার প্রেসিডেন্ট ছিলেন।

যাই হোক এবার আসি পিয়াস করিমের বাবার কথায়। তিনি কুমিল্লার একজন আইনজীবী ছিলেন। সুখ্যাতিও ছিলো। তিনি এডভোকেট এম এ করিম। তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। কুমিল্লা জিলা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা কোষাধ্যক্ষর দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও এখন তিনি গণজাগরণের কাছে রাজাকার। তবে এটা ঠিক তিনি শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন। এর পেছনের কারণ হচ্ছে তার ছেলেকে রক্ষা করা। ১৯৭১ সালে পিয়াস করিম কুমিল্লা জিলা স্কুলে সম্ভবত ক্লাস ফাইভে পড়তেন। ওই সময়ে মুক্তিযুদ্ধের জোয়ার সারা দেশে উত্তাল। তখন তিনিও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই একটি বৈঠক করেছিলেন। ওই বৈঠক করার পর তাকে তার বাসার কাছ থেকে পাকিস্তান বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। পিয়াস ছিল চার বোনের এক ভাই। এই কারণে আদরও ছিল বেশি। এই আদরের কারণেই তাকে মুক্ত করার জন্য পরিবারের সদস্যরা উতলা হয়ে যান। পরে পাকিস্তান আর্মির সঙ্গে কথা বলেন তার বাবা। পাকিস্তান আর্মি তাকে শর্ত দেয়। সেই অনুযায়ী ওই বন্ডেও সাইন করেন। এরপর তিনি মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে এসে শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন। শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হলেও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই ছিলেন। কারণ ওই পদে থেকেও তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেছেন। তাদের জন্য কার্ডেরও ব্যবস্থা করতেন। পরিচয় পত্র দিয়েছিলেন অনেক মুক্তিযোদ্ধাকে। তারপরও তাকে জেলে যেতে হয়েছিল। জেল থেকে তিনি বঙ্গবন্ধুর উদ্যোগেই ছাড়া পেয়েছিলেন। তিনি বলেন, পিয়াস করিমের বোন মিসেস তৌফিকা আমার বাবার জুনিয়র ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যা মামলায় সরকারি পক্ষের কৌশলী হিসাবে কাজ করেছেন। তাই অবাক লাগে পিয়াস করিম কেমন করে রাজাকারের নাতি, ছেলে বা রাজাকার হন। আসলে কেউ কেউ বলেছেন এম এ করিম বীরেন দত্তকে হত্যা করিয়েছেন। কিন্তু বীরেন দত্তকেতো ১৯৭১ সালের ২৭ কি ২৮ মার্চ ধরে নিয়ে গিয়েছিল। তাকেতো এম এ করিম হত্যা করাননি।
আইনমন্ত্রী বলেন, আসলে পিয়াস করিম যে রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন সেটা নিয়ে আমি কিছু বলতে চাই না। বা তিনি তার মত প্রকাশে যে রকম ছিলেন সেটা নিয়ে বলবো না। কারণ ভিন্ন মত মানুষ প্রকাশ করতে পারে। তবে কারও সম্পর্কে বলতে হলে অবশ্যই জেনে শুনে ও সঠিক তথ্য নিয়ে বলতে হবে। পিয়াস করিমকে নিয়ে ছাত্র মৈত্রী ও গণজাগরণ মঞ্চের নেতারা যে সব কথা বলেছেন এই সব অনেক কথার কোন ভিত্তি নেই। আমি যে কথাগুলো বললাম এই সব কথা চির সত্য। কেউ আমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলে তা আমি মিথ্যে প্রমাণ করে দিতে পারবো।
সূত্র: আমাদের সময়.কম

বাংলাদেশের জাতিতত্ত্ব ও সাম্প্রতিক প্রসঙ্গ by ড. মাহফুজ পারভেজ

বাংলাদেশের জাতিসত্তাগত বিভেদের বিষয়টি ক্রমেই রাজনীতির মূল আলোচনার জায়গায় চলে আসছে। শাহবাগ বনাম শাপলার কিংবা বাঙালি বনাম বাংলাদেশী জাতীয়তার দ্বন্দ্ব থেমে থেমে উস্কেও উঠছে। সর্বশেষে ড. পিয়াস করিমের মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে তার মরদেহ নিয়ে যে উত্তেজনা দেখা দেয়, তাতে সবকিছু ছাপিয়ে আদর্শিক দ্বন্দ্ব-সংঘাতের বিষয়টিই প্রাধান্য পেয়েছে বলে মনে হয়। কারণ জীবিত পিয়াস করিমের মতো তার মরদেহকেও গতিরুদ্ধ করা হয়েছে। যদিও ধর্মনিরপেক্ষ, উদার, গণতন্ত্রী পিয়াস করিম ও তার পরিবার জাতীয় সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থল শহীদ মিনার হয়ে ধর্মীয় বিধানের স্থল বায়তুল মোকাররমে মরদেহ নিয়ে চেয়েছিলেন। কিন্তু শহীদ মিনারে বাধার দুর্গ গড়ে সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশে বিদ্যমান দূরত্ব ও মতপার্থক্য সামান্য বা মিটিয়ে ফেলার মতো নয়। যদি হতো, তাহলে মৃত্যুর পর যখন সব দেনা-পাওনা শেষ হয়, তখনই সেটা হতো। হয়নি। বরং পিয়াস করিমের মরদেহের সঙ্গে জীবিত মানুষদের ব্র্যাকেট বন্দি করে একটি রাজনৈতিক, দার্শনিক ও আদশিক মেরুকরণের সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতিরই একটি পূর্বাভাস জানানো হয়েছে। আর ড. পিয়াম করিমের মরদেহ বাংলাদেশের জাতিসত্তা ও জাতিতত্ত্বের প্রসঙ্গে বেশ কিছু প্রশ্ন উত্থাপ করে গেছে। শিগগিরই এসব বিষয়ে মীমাংসা হবে বলে মনে হয় না। বরং, এটা মনে করাই সঙ্গত, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও সংঘাত তলে তলে আদর্শিক ও দার্শনিক লড়াইয়ের পথে চলে যাচ্ছে। আমরা জানি, একটি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন, দর্শন, চিন্তা-ভাবনা এবং পরিচিতির একটি তাত্ত্বিক ভিত্তি থাকে। ইহুদি জাতির তত্ত্বগত দিকের সঙ্গে জার্মান জাতিসত্তার তত্ত্বগত দিক একেবারেই মিলবে না। বরং, একটি আরেকটিকে মারতে চায়। যেমন হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে। বাংলাদেশের জাতিতত্ত্বের প্রসঙ্গে বলা যায়, দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের পাক-ভারত-বাংলাদেশ ভিত্তিক উপমহাদেশের জাতিগত পরিচয় ও তাত্ত্বিক দিক বিকাশ লাভ করে ঔপনিবেশিক আমলে; ইউরোপীয় জ্ঞানকাণ্ডের সংস্পর্শে এসে। তখন জাতিগতভাবে সবাই ছিলেন বৃটিশ-ভারতীয় বা বৃটিশ-ইন্ডিয়ান। বিংশ শতকের শুরুতে বঙ্গভঙ্গ, বঙ্গভঙ্গ রদ (১৯০৫-১৯১১) ইত্যাদি ঘটনাপ্রবাহে হিন্দু ধর্মভিত্তিক স্বাদেশিকতা তীব্র ও সশস্ত্র রূপ লাভ করে। প্রতিক্রিয়ায় সৃষ্টি হয় মুসলিম পরিচিতি। ১৯৪৭ সালে সে কারণেই দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে উপমহাদেশ ভারত ও পাকিস্তানে বিভক্ত হয়। পাকিস্তানে পূর্ব বাংলার মানুষ বাঙালি পরিচিতির জন্য লড়াই করে এবং পশ্চিমাদের সঙ্গে আর্থিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ে লিপ্ত হন। এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের রাজনৈতিক বিজয় সূচিত হয়। এ বাঙালিত্ব কিন্তু একেবারেই বাংলাদেশের সীমানা ও রাজনৈতিক চৌহদ্দিভিত্তিক। ভারতের বাঙালিদের এ জাতীয়তার তত্ত্ব আলোড়িত তো দূরে থাকুক, স্পর্শও করতে পারেনি। তারা বরং হিন্দুত্ব-বাঙালিত্ব-ভারতীয়ত্ব ভিত্তিক একটি ত্রিভুজ রচনা করতে সক্ষম হয়েছেন। এটা করেছেন কলকাতা কেন্দ্রিক চিন্তা-দর্শন-জাতীয়তার ভিত্তিতে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বাঙালিত্ব রাজনৈতিক জাতীয়তায় বাংলাদেশীতে পর্যবসিত হয়েছে। আর এখন সে পরিচিতির মধ্যে প্রো-আওয়ামী বনাম অ্যান্টি আওয়ামী; কিংবা প্রো-সেক্যুলার বনাম অ্যান্টি-সেকুল্যার ইত্যাদি বিভাজন হয়েছে। দু’টি চিন্তা ও দর্শন কেন্দ্র তো স্পষ্ট- শাহবাগ আর শাপলা। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার ঘটেছে মাঝখানের নিরপেক্ষদের নিয়ে। শাহবাগের বিপক্ষে বা সমালোচনা বা ভিন্নমত দিলে সে শাপলার হেফাজতি। কিন্তু হেফাজতের বিরুদ্ধে বললেই শাহবাগী ব্লগার, নাস্তিক। এ চরম মেরুকরণ ও বিপরীতমুখীর মধ্যে জীবিত ড. পিয়াস করিম পড়েছিলেন। তিনি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে সেসব আন্দোলনের ভালো-মন্দ দিক তুলে ধরে ছিলেন। তার ব্যক্তিগত মতের স্বাধীনতা গুরুত্ব ও সম্মান পায়নি। তার কোন বক্তব্য সম্পর্কে শাহবাগের কোন ভিন্নমত ও ব্যাখ্যাও দেয়া হয়নি। তাকে ঠেলে বিপক্ষে পাঠিয়ে দেয়া হলো। যদিও তিনি শাপলার হেফাজতিদেরও অনেক সমালোচনা করেছেন। কিংবা বিশেষ কয়েকটি পক্ষ মৃত্যুর পরেও তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালো। অনেক সাংবাদিক-সম্পাদক, যারা টক শোতে মত দেন, ভিন্নমত দেন, তাদেরও এক কাতারভুক্ত করা হয়েছে। যারা উপস্থাপক হিসেবে আলোচকদের মত শোনা ছাড়া নিজের কোনো মতামত দেন না, তাদেরও প্রতিপক্ষ বানানো হয়েছে, যার মধ্যে এমন একজন আছেন, যিনি স্বয়ং মুক্তিযোদ্ধা, ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতা, বৃহত্তর সিলেটের একটি বিখ্যাত কলেজ সংসদের নির্বাচিত নেতা (ছাত্রলীগের প্রার্থীরূপে), বাম প্রগতিশীল পত্রিকা ‘সংবাদ’ ও স্বাধীনতা তথা আওয়ামী লীগ বা বাঙালি জাতীয়তাবাদের মুখপত্র ‘ইত্তেফাক’-এর সাবেক সাংবাদিক, বাক-স্বাধীনতার জন্য স্বৈরশাসনামলে আক্রান্ত, নিগৃহীত ও কারা নির্যাতিত এবং এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত একজন নিরপেক্ষ সম্পাদক। ফলে মেরুকরণ কেবল আদর্শের নামেই হচ্ছে না; অজ্ঞতা ও উগ্রতার ভিত্তিতেও হচ্ছে। একেবারেই হিংসার বশবর্তী বা শত্রুতার কারণেও করা হচ্ছে। মহল বিশেষের এসব উৎকেন্দ্রিকতা বাংলাদেশের জাতিতত্ত্ব ও জাতিসত্তাকে কোন বিপদে ফেলে দেয়, কে জানে? মনে হয়, গোপনে কারা যেন আমাদের চারপাশে হিংসা আর ধ্বংসের বীজ বপন করছে। নইলে এমন লোকদেরও আক্রমণ করা হচ্ছে কেন, যারা বাক-ব্যক্তি-গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পরীক্ষিত বন্ধু? 

গুচ্ছপদ্ধতিতে পরীক্ষা হোক by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আগামী বছর থেকে ভর্তি পরীক্ষার নতুন পদ্ধতি চালুর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার পক্ষে–বিপক্ষে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে কর্তৃপক্ষ আসন খালি থাকার দোহাই দিচ্ছে। আর শিক্ষার্থীদের একাংশ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ করছে। সবার জন্য গ্রহণযোগ্য ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি কী হতে পারে, সে সম্পর্কে লিখেছেন শিক্ষাবিদ সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম
আমি নীতিগতভাবে বিশ্বাস করি, যেকোনো শিক্ষার্থীরই সবচেয়ে ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ থাকা উচিত। পৃথিবীর অনেক দেশেই সে সুযোগ আছে। আমাদের দেশেও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই সুযোগ আছে। অনেক দিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও উন্মুক্ত ছিল। কিন্তু এখন আমাদের বাস্তবতা, বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস্তবতা জটিল আকার ধারণ করেছে। বেশির ভাগ অভিভাবকই চান, সন্তান এখানে পড়ুক। তাই এক আসনের জন্য ৪০-৫০ জন প্রতিযোগিতা করে। এটা ভয়ানক চাপ। সেই চাপ কমাতে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ রহিত করা হয়েছে।
পরিসংখ্যান বললে সমস্যার রূপটা বোঝা যাবে। প্রতিবছর ৫০ শতাংশ ভর্তি-ইচ্ছুক থাকে, যারা আগের বছরে পাস করেছে। এ বছর যারা পরীক্ষা দিয়েছে, তাতে নতুন ৫০ শতাংশ, পুরোনো ৫০ শতাংশ। অনেকে প্রথমবার তাদের পছন্দমতো ভালো বিভাগ না পেলে যা পেয়েছে তাতে ভর্তি হয়ে থেকে পরের বছরে আবার সুযোগ নিতে চায়। যারা সুযোগই পায়নি, তারা অন্য জায়গায় ভর্তি হয়ে থেকে পরের বছর আবার চেষ্টা করে। এতে করে দুটি সমস্যা বড় হয়ে দেখা দেয়।
প্রথমত, নতুন ও পুরোনোদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা হয়। যেমন এবার যারা পাস করে ভর্তি পরীক্ষায় বসেছে, তারা সময় পেয়েছে দুই মাসেরও কম। কিন্তু আগের বছরের যারা, তারা কিন্তু প্রস্তুতির জন্য পেয়েছে এক বছরের বেশি সময়। এই দুই গ্রুপের ভর্তি-ইচ্ছুকদের প্রতিযোগিতা অসম।
দ্বিতীয় সমস্যা হলো আসনশূন্যতা। গতবার ভর্তি হয়ে এবার পছন্দের বিভাগে সুযোগ পেয়ে অনেকে যখন চলে যায়, তখন আসনশূন্যতা দেখা দেয়। এ রকম আসনস্বল্পতার মধ্যে সাড়ে তিন শ আসন মাস্টার্স পর্যন্ত শূন্য থাকা বিরাট অপচয়। এই আসনগুলো যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি নতুন বছরের আসনের ওপর পুরোনো বছরের ভর্তি-ইচ্ছুকেরা ভাগ বসাচ্ছে।
তৃতীয়ত, দেখা গেছে যে ভর্তি পরীক্ষায় ডিজিটাল জালিয়াতি তথা মোবাইল ফোনে প্রশ্ন বলে দেওয়া, নকল ইত্যাদি যারা করে, তাদের বেশির ভাগই গত বছরে পাস করেছে। সারা বছর ধরে কোচিং করার জন্য কোচিং-বাণিজ্যও রমরমা হয়। এবার যে কোচিং-বাণিজ্য কম হয়েছে, তার কারণ পরীক্ষার আগে সময় কম ছিল। এ ছাড়া একটি শ্রেণিতে সিনিয়রের সঙ্গে জুনিয়রদের ক্লাস করার ক্ষেত্রেও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাও দেখা দেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা পাস-ফেলের বিষয় নয়। ভর্তি-প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মেধাবীদের মধ্য থেকে বাছাই করে নেওয়া হয়। এ ক্ষেত্রে মানের প্রশ্নটা বড়। এসব কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, আগামী বছর থেকে দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে না। তবে আমি মনে করি, ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের একটি দাবি মানা যায় যে সিদ্ধান্তটা আগামীবারের পরেরবার অর্থাৎ ২০১৬ থেকে কার্যকর করা হবে। কিন্তু একসময় না একসময় এটা করতেই হবে। আমাদের বরং মনোযোগ দেওয়া উচিত সব বিশ্ববিদ্যালয়কে মানসম্পন্ন করার দিকে; যাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর চাপ কমে। সব বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি মানসম্পন্ন করা যায়, তাহলে সিলেটের ছাত্র সিলেটের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েই খুশি থাকবে, পটুয়াখালীর শিক্ষার্থী পটুয়াখালীতে পড়বে। ভালো শিক্ষকেরা যাতে ঢাকার বাইরে থাকতে রাজি হন, সে জন্য তাঁদের বিশেষ বোনাস ও অন্যান্য সুবিধা দিতে হবে। শিক্ষকদের বেতন বাড়াতে হবে। ঢাকার বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকদের আবাসিক সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোকে যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের পর্যায়ে উন্নীত করি, সবগুলো না হলেও সেখানে যদি কিছু বিষয়ে মাস্টার্স
করার সুযোগ থাকে, তাহলে উচ্চশিক্ষা ছড়িয়ে পড়বে। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় থাকে বিশেষ উচ্চতায়। বাকিগুলো সব এক স্তরে। আমাদের এখানেও তেমনটা হতে অসুবিধা কোথায়? আমি মেডিকেলের মতো গুচ্ছপদ্ধতির ভর্তি-প্রক্রিয়ার পক্ষে। সারা দেশের পরীক্ষার্থীরা যদি এক দিনে পরীক্ষা দেয় এবং মেধাক্রম অনুসারে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে একজনকে সাত-আট জায়গায় পরীক্ষার দুর্ভোগে পড়তে হয় না, নকলের সুযোগও কমে। হতে পারে যে একেকটি অনুষদের জন্য একেক গুচ্ছপরীক্ষা। সে ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদেরও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষার জন্য দৌড়ঝাঁপ করতে হবে না।
সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম: কথাসাহিত্যিক। অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রয়োজন সম্মিলিত সিদ্ধান্ত by নজরুল ইসলাম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আগামী বছর থেকে ভর্তি পরীক্ষার নতুন পদ্ধতি চালুর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার পক্ষে–বিপক্ষে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে কর্তৃপক্ষ আসন খালি থাকার দোহাই দিচ্ছে। আর শিক্ষার্থীদের একাংশ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ করছে। সবার জন্য গ্রহণযোগ্য ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি কী হতে পারে, সে সম্পর্কে লিখেছেন শিক্ষাবিদ নজরুল ইসলাম
সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভর্তি পরীক্ষার ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেটা আমি সমর্থন করি। দ্বিতীয়বার যারা ভর্তি পরীক্ষা দেয়, তারা প্রথমবার মনমতো বিভাগে ভর্তি হতে না পেরে ভালো বিভাগে ভর্তি হওয়ার জন্য পুনরায় প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। ফলে দেখা যায়, প্রথমবার তারা ঠিকমতো ক্লাস করে না, দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নেয়। তারা দ্বিতীয়বার পরীক্ষা দিয়ে পছন্দের বিভাগে ভর্তি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের অনেক আসন খালি হয়ে যায়, যেটা আর কোনোভাবে পূরণ করাও সম্ভব নয়। তবে কেউ যদি অনিবার্য কারণে প্রথমবার পরীক্ষা দিতে না পারে, তাহলে সেটা বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সেটার সত্যতা নিরূপণ করা খুব কঠিন। আর যারা প্রথমবার কোথাও ভর্তি হতে পারেনি, তারা সাধারণত দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে থাকে। এতে দেখা যায়, দ্বিতীয়বার অংশগ্রহণকারীরা এক বছরের অধিক সময় ধরে প্রস্তুতি নিতে পারে আর প্রথমবার অংশগ্রহণকারীরা প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ পায় কয়েক মাস। এটা অসম প্রতিযোগিতা।
দ্বিতীয়বার অংশগ্রহণের সুযোগ বহাল রেখে আরেকটি কাজ করা যেতে পারে: যারা দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেয়, তাদের প্রাপ্ত নম্বর থেকে কিছু নম্বর কেটে নেওয়া যায়। তবে বাস্তবে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা যাবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। উল্লেখ্য, এ ধরনের একটি ব্যবস্থা সম্ভবত মেডিকেল কলেজে ভর্তির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। আমি যখন ইউজিসির চেয়ারম্যান ছিলাম, তখন শিক্ষামন্ত্রী ও সব বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিদের নিয়ে ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতি নিয়ে একাধিকবার আমরা আলোচনা করেছিলাম। ভর্তি পরীক্ষার প্রয়োজনীয়তা আছে কি না, সে ব্যাপারেও চিন্তার অবকাশ আছে বলে আমি মনে করি। তবে এ কথাও ঠিক যে ভর্তি পরীক্ষা উঠিয়ে দিতে গেলে আমাদের মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার মান আরও উন্নত করতে হবে। পরীক্ষাপদ্ধতি আরও কার্যকর করতে হবে, সেটা করতে পারলে আমরা আবার সেই পুরোনো ব্যবস্থায় ফিরে যেতে পারব। অর্থাৎ ১০০০ নম্বরের মধ্যে প্রাপ্ত নম্বর অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা মেধানুসারে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে। কিন্তু আমাদের দেশে পরীক্ষার ফলাফল গ্রেডিংয়ের মাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ায় এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাই করা কঠিন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ঠিকই বলেছেন, বাংলাদেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আলাদা আলাদা আইনে পরিচালিত হয়। তারা কীভাবে ভর্তি পরীক্ষা নেবে নাকি আদৌ ভর্তি পরীক্ষা নেবে কি না, সে সিদ্ধান্ত তাদের। এ ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়েরও কিছু বলার নেই, এটা একটা সমস্যাই বটে। কিন্তু জাতীয় স্বার্থে আমাদের দেশের সব উপাচার্য একত্রে বসে ভর্তির প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যেমন, এ ক্ষেত্রে আমি শ্রীলঙ্কার নজির দেখাতে চাই। সে দেশে ইউজিসি কেন্দ্রীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। সেখানে উচ্চমাধ্যমিক (তাদের ক্ষেত্রে এ লেভেল) পরীক্ষার ফলাফলের মাধ্যমেই ভর্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। সেখানে মেধার ভিত্তিতে প্রথম ১০ শতাংশ শিক্ষার্থী শ্রীলঙ্কার যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ইচ্ছা প্রকাশ করতে পারে। আর বাকি ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী কোথায় ভর্তি হবে, তা ঠিক করে দেয় ইউজিসি। এটা একধরনের আঞ্চলিক সীমাবদ্ধতা, যদি এটাকে আমরা কোটা না বলি। যেমন, এই ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের এলাকায় অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়, যা ঠিক করে দেয় ইউজিসি। আমাদের দেশেও (আন্তর্জাতিক পদ্ধতির) একটি অভিন্ন ভর্তি পরীক্ষা আয়োজনের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। যেমন, স্যাট পরীক্ষার মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যায়। আর সে পরীক্ষা বিশ্বের যেকোনো জায়গা থেকেই দেওয়া যাচ্ছে। এখন আমাদের শিক্ষার্থীরা দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য ছোটাছুটি করে নানাভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে। তাদের অভিভাবকদেরও নানা রকম ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে, এর আর্থিক দিক তো আছেই। এই অভিন্ন পরীক্ষা অনলাইনে নেওয়া যেতে পারে। অথবা দেশের প্রতিটি উপজেলা কেন্দ্রে এই পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ইদানীং এমন একটা ব্যবস্থার বিষয়ে অনেকেই কথা বলছেন।
কথা হচ্ছে, সরকারের উচিত সব অংশীজনদের নিয়ে বসে একটি বাস্তব ও গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করা, যাতে সবাই উপকৃত হয় এবং একই সঙ্গে শিক্ষার মানও নিশ্চিত হয়। ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনলাইনে ভর্তি পরীক্ষার ফরম পূরণ করা যাচ্ছে, এটা নিঃসন্দেহে একটি কাজের কাজ হয়েছে। মুহম্মদ জাফর ইকবালকে সে জন্য ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তির প্রক্রিয়া ও পদ্ধতি নিয়ে সম্মিলিত চিন্তা-ভাবনার প্রয়োজন জরুরি বলে আমি মনে করি।
অধ্যাপক নজরুল ইসলাম: সাবেক চেয়ারম্যান, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন।

মেধা বিকাশের সুযোগ কি আমরা পাব না? আবদুল্লাহ আল মামুন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আগামী বছর থেকে ভর্তি পরীক্ষার নতুন পদ্ধতি চালুর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার পক্ষে–বিপক্ষে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার পক্ষে কর্তৃপক্ষ আসন খালি থাকার দোহাই দিচ্ছে। আর শিক্ষার্থীদের একাংশ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ করছে। সবার জন্য গ্রহণযোগ্য ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি কী হতে পারে, সে সম্পর্কে লিখেছেন শিক্ষার্থী আবদুল্লাহ আল মামুন
আমি গ্রামের একটি স্কুল থেকে এসএসসি পাস করার পর পাবনা শহরের একটি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হই। সেখান থেকে ২০১৪ সালে এইচএসসি পাস করার পর জীবনে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করি। আমি যখন এই চিঠি লিখছি, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তারা দ্বিতীয়বার কোনো শিক্ষার্থীকে ভর্তি পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দেবে না। কলেজে ভর্তি হয়ে শহরে থাকার সৌভাগ্য আমার হয়নি। বাড়ি থেকে সপ্তাহে দুদিন কলেজে যেতাম। প্রথম তিন মাস পর দেখি আর ক্লাস হয় না। সবাই শিক্ষকদের বাসায় প্রাইভেট পড়ে। কিন্তু সে সৌভাগ্য আমার হলো না। তাই বাধ্য হয়ে কলেজের আশা ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে বসে পড়াশোনা শুরু করলাম। তারপর সেখান থেকে প্রতিটি পরীক্ষা আমি কেন্দ্রে এসে দিয়ে চলে যেতাম এবং পরীক্ষার পর শুনতাম, এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছিল। এইচএসসি পরীক্ষা দিয়ে দেখি, সবাই কোচিং করার জন্য শহরে আসছে। কিন্তু প্রথমেই সে সুযোগ আমার হয়নি। অনেক কষ্ট করে বাড়ির সবাইকে বুঝিয়ে রেজাল্টের ১৭ দিন আগে আমি পাবনার একটি কোচিংয়ে ভর্তি হই। সেখান থেকেই আমি প্রথম মেডিকেল, বুয়েট আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া ছাত্রদের সঙ্গে পরিচিত হই। তাঁদের মুখে নানা রকম গল্প শুনে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। সেখান থেকে ফরম পূরণ করে প্রথমবারের মতো ঢাকায় আসি পরীক্ষা দিতে। পরীক্ষা দিতে গিয়ে দেখি আমার করুণ অবস্থা। সবাই একাধিক জায়গায় কোচিং করেছেন। কেউ কেউ আবার মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকা দিয়ে আলাদাভাবে ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রাইভেট পড়েছেন। সবাই ঢাকার স্বনামধন্য স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। এবার পরীক্ষা দিচ্ছেন প্রায় ৮০ হাজার ছাত্রছাত্রী। এসব দেখে আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার আশা দূর হয়ে গেল।
তারপর পরীক্ষা দিয়ে গ্রামে চলে আসি। এক সপ্তাহ পর রেজাল্ট। শুনলাম মাত্র ২১ হাজার ছাত্রছাত্রী পাস করেছেন। এর মধ্যে আমার ক্রমিক হয় নয় হাজার ৫৪৭, যা দুর্ভাগ্য, না সৌভাগ্য, বুঝতে পারলাম না। তবে আমার পক্ষে যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পাওয়া সম্ভব, তা পরিষ্কার হয়ে গেল। তারপর বাড়িতে এসে আমি আবার পড়াশোনা শুরু করলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ব বলে আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম পূরণ করিনি। এবারে ক্রমিকে না টিকলে পরেরবার ভর্তি হতে পারব, এটাই প্রত্যাশা। তিন মাস ধরে আমি নিয়মিত পত্রিকা পড়ি, টিভিতে খবর শুনি। জীবনে বড় হওয়ার জন্য কী কী প্রয়োজন, তা কিছুটা বুঝতে শিখেছি। এসব বোঝার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর যেকোনো বিষয়ের প্রতি শ্রদ্ধায় আমার মাথা নুইয়ে আসে। প্রায় রাতে আমি স্বপ্ন দেখি, আমি কার্জন হলে ক্লাস করছি, ক্যাম্পাসে হেঁটে বেড়াচ্ছি। এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যে সিদ্ধান্ত নিল, সেটি জানার পর আমার মতো হাজার হাজার শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ কী হবে, তা তারা একবারও ভেবে দেখল না। কয়েক দিন আগে দেশ টিভির একটি টক শোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বলেছিলেন, তাঁরা মেধাবী শিক্ষার্থী চান। তাঁরা যদি তা-ই চাইবেন, তাহলে একজন ছাত্র কোন বছর এইচএসসি পাস করছেন, তা বিবেচ্য হবে কেন। তিনি আরও বলেছেন, ভর্তি পরীক্ষায় জালিয়াতি বন্ধের জন্য পরীক্ষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে নেবেন এবং নতুন ছাত্রছাত্রীদের জন্য অধিক সুযোগ করে দেবেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষায় এত দিন যদি কোনো জালিয়াতি না হয়ে থাকে, তাহলে এখন হবে কেন। আজকে উপাচার্য মহোদয় আমাদের কথা চিন্তা করলেন না। অথচ তিনি গত ৭ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোকে বলেছেন, ‘যাঁরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবেন, তাঁদের অগ্রিম অভিনন্দন। যাঁরা পারবেন না, তাঁদের আরেকবার সুযোগ থাকবে।’
এই হতাশা আমার মতো হাজারো শিক্ষার্থীর। আমাদের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার মতো সামর্থ্য নেই। বড় হওয়ার জন্য যেকোনো পন্থা অবলম্বন করার ক্ষমতা নেই। আমাদের আছে সামান্য মেধা। এই মেধাটুকু বিকশিত করার সুযোগ কি আমরা পাব না? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আজ যে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, তা কখনো সমর্থনযোগ্য নয়। এ রকম একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হলে তা অনেক আগে থেকেই নেওয়া উচিত বলে আমি মনে করি।
আবদুল্লাহ আল মামুন: শিক্ষার্থী।

স্যাটেলাইট টাউন নিয়ে ভাবনা ও আশঙ্কা

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের আর্থিক সহায়তায় এলজিইডি গৃহীত সিটি রিজিয়ন ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের আওতায় রিজিয়নাল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান প্রকল্প হাতে নিয়েছে রাজউক। এই প্রকল্পের তিনটি উদ্দেশ্যের অন্যতম হলো ঢাকার জন্য স্যাটেলাইট টাউনের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং একটি স্যাটেলাইট টাউনের জন্য মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা। প্রকল্পের উল্লিখিত উদ্দেশ্য সামনে রেখেই আজকের এই লেখা। ‘স্যাটেলাইট টাউন’ ধারণাটির সূত্রপাত ঘটেছিল ১৯৪৬ সালের ‘ইউকে নিউ টাউনস অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে। নগরের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জনসংখ্যার সঙ্গে সমানতালে বাড়তে না পারা নাগরিক সুযোগ-সুবিধার অভাব ইত্যাদি বিষয় সামনে রেখে বড় শহরের বিবর্ধন ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে স্যাটেলাইট টাউন গড়ে তোলার ধারণাটি আবির্ভূত হয়। আভিধানিক সংজ্ঞায় আমরা পাই, স্যাটেলাইট টাউন হলো ছোট বা মাঝারি আকারের শহর, যা একটি বড় শহর থেকে এমন দূরত্বে থাকবে, যাতে বড় শহরটির বিবর্ধন তাকে গ্রাস করতে না পারে। শহর দুটির মধ্যে অবস্থিত নদী, বিস্তৃত সবুজ ভূখণ্ড, কৃষিজমি অথবা গ্রামীণ বসতি শহর দুটির অবস্থানগত পৃথক্করণের কাজটি সহজ করে। স্যাটেলাইট টাউন ধারণাটির সূত্রপাত যে শহরে, সেই লন্ডন শহরের বিবর্ধন ব্যবস্থাপনায় ২০ থেকে ৩০ মাইল (৩০ থেকে ৪৮ কিলোমিটার) দূরত্বে যে ছোট শহরগুলোর পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছিল, সেগুলোকে মূল শহর থেকে পৃথক করা হয়েছিল সবুজ বেষ্টনীর মাধ্যমে। এ ছাড়া স্যাটেলাইট শহরগুলো সাধারণত নিজস্ব অর্থনৈতিক কাঠামো এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনার সুবাদে অনেকটাই স্বনির্ভর হয়ে গড়ে ওঠে। শুধু বৃহৎ পরিসরের সুবিধার (বিশেষায়িত স্বাস্থ্য, শিক্ষা, যোগাযোগ, ব্যবসা ইত্যাদি) জন্য মূল শহরের ওপর তার নির্ভরতা থাকে। এসব বৈশিষ্ট্য সামনে রেখে বড় শহর ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে স্যাটেলাইট টাউন তৈরির নজির পৃথিবীর উন্নত ও উন্নয়নশীল অনেক দেশেই রয়েছে। এশিয়ার মধ্যে বোধ করি জাপানই প্রথম স্যাটেলাইট টাউন ধারণাটির প্রয়োগ করেছিল এর সর্ববৃহৎ শহর টোকিওর অনিয়ন্ত্রিত ও অপ্রয়োজনীয় বৃদ্ধি ঠেকাতে। এ ছাড়া হংকং, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভারতসহ আরও অনেক দেশেও এমনটা করা হয়েছে।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশে স্যাটেলাইট টাউনের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা থেকে উঠে এসেছে বিভিন্ন বিষয়। যেমন হংকং ও সিঙ্গাপুরে প্রধানত নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের জন্য নির্মিত নতুন শহর সফল হয়েছিল সরকার কর্তৃক মূল শহরটির সঙ্গে এসব স্যাটেলাইট টাউনের গণপরিবহনভিত্তিক কার্যকর যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিতকরণের মাধ্যমে। অন্যদিকে, ষাটের দশকের শেষ ভাগে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলের বিকেন্দ্রীকরণের উদ্দেশ্যে এর ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণে যে স্যাটেলাইট টাউন চিন্তা করা হয়েছিল, তা সফলতার মুখ দেখেনি। কারণ, অধিবাসীদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা না থাকায় জনগণ আবার মূল শহরেই ফিরে এসেছিল। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও বেশ কয়েকটি বড় শহরের বিবর্ধন ব্যবস্থাপনার জন্য স্যাটেলাইট টাউন তৈরি করে। কলকাতায় এ ধারণার প্রয়োগ আংশিকভাবে সফল হলেও মেট্রোপলিটন মুম্বাইয়ের ক্ষেত্রে তার স্থানিক নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠীর (যেমন: শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী এবং সর্বোপরি সমাজের শিক্ষিত-সংগঠিত মধ্যবিত্ত অংশ) পরস্পরবিরোধী অবস্থান এবং স্থানীয় নীতিনির্ধারকদের প্রতিবন্ধকতার কারণে তা বাস্তবায়ন করা যায়নি।
বাংলাদেশে স্যাটেলাইট টাউন তৈরির চিন্তা বোধ করি প্রথম করা হয় ১৯৬০-এর দশকে, ঢাকা থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে উত্তরায় টাউনশিপ গড়ে তোলার প্রকল্প হাতে নেওয়ার মাধ্যমে। শুরুতে এই প্রকল্পের নাম ছিল ‘নর্থ স্যাটেলাইট টাউন’। ১৯৮০ সালে তৎকালীন ডিআইটির (বর্তমান রাজউক) বোর্ড সভায় এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘উত্তরা রেসিডেনসিয়াল মডেল টাউন’। ডিআইটির তত্ত্বাবধানে ১৯৬৬ সালে শুরু হওয়া এই আবাসন প্রকল্প পূর্ণতা পেতে সময় লেগে গেছে ৩০ থেকে ৪০ বছর। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উত্তরার সঙ্গে মূল ঢাকার অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক ভিত্তি বা কর্মসংস্থানসহ দৈনন্দিন সুযোগ-সুবিধা তৈরি না করেই কেবল আবাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টার কারণে এর বাস্তবায়নে এতটা সময় লেগেছে। ফলে, ‘উত্তরা মডেল টাউন’ আবাসনসমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখলেও ঢাকার বিবর্ধন ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং একসময় ঢাকা থেকে দূরে অবস্থিত উত্তরা নিজেই এখন ঢাকার, তথা সিটি করপোরেশনের অংশে পরিণত হয়েছে, যা সর্বতোভাবে স্যাটেলাইট শহরের মূল উদ্দেশ্য ও কার্যকর নগর পরিকল্পনার পরিপন্থী।
এসব অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও রাজউক নতুন করে রিজিয়নাল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান প্রকল্পের আওতায় স্যাটেলাইট টাউন নির্মাণের কথা ভাবছে। উল্লেখ্য, ১৯৯৫-২০১৫ সময়সীমার জন্য প্রণীত ঢাকার স্ট্রাকচার প্ল্যানে ঢাকার বিবর্ধন ব্যবস্থাপনার জন্য স্যাটেলাইট টাউনকে অপ্রয়োজনীয় ও অকার্যকর আখ্যা দেওয়া হয়েছে। তার পরও নতুন প্রকল্পের মধ্যে স্যাটেলাইট টাউন ধারণাকে যেভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা লক্ষণীয়। বলা হচ্ছে, প্রকল্পের একটি উদ্দেশ্য: ‘ঢাকার জন্য স্যাটেলাইট শহরের সম্ভাব্যতা যাচাই এবং একটি স্যাটেলাইট শহরের জন্য মাস্টারপ্ল্যান তৈরি করা’। একই প্রকল্পে একদিকে স্যাটেলাইট শহরের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথা বলা হচ্ছে এবং অন্যদিকে তার মাস্টারপ্ল্যান তৈরির কথাও বলা হচ্ছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, যেকোনো মূল্যে স্যাটেলাইট টাউন তৈরি করতে হবে এমনটি ভেবেই প্রকল্পের কর্তাব্যক্তিরা অগ্রসর হচ্ছেন। বিষয়টির কারিগরি বৈধতা দেওয়ার জন্যই সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রসঙ্গ এসেছে। আগেভাগে স্যাটেলাইট টাউন তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়ে তাতে পরবর্তী সময়ে কারিগরি বৈধতা দেওয়ার সংস্কৃতি কেবল রাজউকের প্রাতিষ্ঠানিক দায়বদ্ধতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে না, বরং নগর পরিকল্পনা পেশার সুস্থ বিকাশকেও বাধাগ্রস্ত করবে।
আমাদের আশঙ্কা বাস্তব ভিত্তি পায়, যখন আমরা দেখি, স্যাটেলাইট টাউন তৈরির উদ্দেশ্য সামনে রেখে রাজউক তিনটি অঞ্চলের (সাভার, গাজীপুর ও ইস্টার্ন ফ্রিঞ্জ) মধ্য থেকে সিটি করপোরেশন-সংলগ্ন ইস্টার্ন ফ্রিঞ্জকে সম্ভাব্য স্থান হিসেবে নির্বাচন করে। বাংলাদেশের বড় শহরগুলোর আয়তন ও জনসংখ্যা ঘনত্বের তুলনামূলক বিবেচনায় রাজধানী ঢাকার যে অবস্থান, তাতে এর বিবর্ধন ব্যবস্থাপনায় স্যাটেলাইট টাউন যদি মেট্রোপলিটন ঢাকার সীমার মধ্যে তৈরি করা হয়, তা আত্মঘাতী হবে বলে আমাদের কাছে প্রতীয়মান হয়। কারণ, এ ক্ষেত্রে শহরের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থা, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা প্রদানের অবকাঠামো, অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে শহর ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়বে। এমতাবস্থায় যখন দেখি রাজউক পরিকল্পনা প্রণয়নের নামে দুর্যোগপ্রবণ (বন্যা ও ভূমিকম্প) অঞ্চল বলে চিহ্নিত বালু নদের পশ্চিম পার্শ্বে উত্তরে পূর্বাচল রোড থেকে দক্ষিণে ঢাকা-ডেমরা রোড পর্যন্ত বিস্তৃত ইস্টার্ন ফ্রিঞ্জের ডুমনি, বেরাইদ, কায়েতপাড়া ও আমুলিয়ার পাঁচ হাজার ৩৪৫ একর জায়গাকেই স্যাটেলাইট টাউন তৈরির সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা হিসেবে গ্রহণ করার কথা বলছে (সূত্র: ২৮ জানুয়ারি, ২০১৪ তারিখে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স মিলনায়তনে উপস্থাপিত আরডিপি প্রকল্পের কার্যপরিধি), তখন আমরা ভবিষ্যৎ ঢাকার বসবাসযোগ্যতা নিয়ে আতঙ্কিত হই। স্পষ্টতই মনে হয়, শুধু গোঁজামিল দিয়েই এ ধরনের জনস্বার্থবিরোধী সিদ্ধান্তের বৈধতা দেওয়া সম্ভব।
এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো ইস্টার্ন ফ্রিঞ্জ এলাকায় ভূমির মালিকানা এবং ব্যবহারের ধরন। একটু কষ্ট করে গুগল ম্যাপের মাধ্যমে হিসাব করলে দেখা যায়, প্রস্তাবিত স্যাটেলাইট শহর ও এর আশপাশের এলাকার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ নিচু জমি ইতিমধ্যেই বালু দিয়ে ভরাট করা হয়ে গেছে। বুঝতে কষ্ট হয় না, এসব জমি কার আয়ত্তে রয়েছে। রাজউক কি তবে আবাসনসমস্যার সমাধানকল্পে প্রস্তাবিত স্যাটেলাইট টাউন তৈরির জন্য ক্ষমতাবান ভূমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জমি অধিগ্রহণ করবে? নাকি গ্যাস, পানি, রাস্তাঘাটের মতো নাগরিক সুযোগ-সুবিধা দিয়ে রাজউক আসলে কতিপয় ভূমি ব্যবসায়ীর স্বার্থ রক্ষা করবে? এই আচরণ দেখে ভাবতে বাধ্য হচ্ছি, যেখানে বিদ্যমান নগরের মূল অংশে সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা অপ্রতুল, সেখানে সংকট তীব্রতর হতে দিয়ে নতুন শহর তৈরি করার মাধ্যমে জমির মুনাফাসর্বস্ব ব্যবসায় জনগণের অর্থে ভর্তুকি দিতে রাজউকের এত উৎসাহ কেন?
ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপ কমানোর লক্ষ্যে স্যাটেলাইট টাউন নির্মাণই একমাত্র উপায় কি না, এ প্রশ্ন যেমন বিবেচনাসাপেক্ষ, তেমনি এমন ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে এর পরিকল্পনা হতে হবে বৃহৎ কলেবরের গবেষণা ও পর্যালোচনানির্ভর। এ ক্ষেত্রে ভুল হলে তা কেবল ঢাকা নয়, সারা বাংলাদেশের নগরায়ণের জন্য নেতিবাচক ও আত্মঘাতী হবে। পরিকল্পনার বাতাবরণে নগরের বাসযোগ্যতার অবনতির বৈধতা দেওয়া সুস্থ প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার নজির নয়। আমাদের আশঙ্কা অতীতেও রাজউকের (উত্তরা) স্যাটেলাইট শহর যেভাবে তার লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে, চলমান প্রকল্পের আলোকে নির্মিতব্য শহর একই ভাগ্য বরণ করতে যাচ্ছে এবং সেই সঙ্গে ঢাকাবাসী ও ঢাকার বর্তমান অতিব্যবহৃত অবকাঠামোর ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকার ভেতরে এ ধরনের নগরায়ণ কৃষিজমি ও জলাশয় হ্রাসসহ ভূমির উপযুক্ত ব্যবহার নিশ্চিত করতেও ব্যর্থ হবে। নগর পরিকল্পনাবিদ ও গবেষক হিসেবে আমাদের পেশাগত জ্ঞানের আলোকে স্যাটেলাইট টাউন তৈরির প্রস্তাবিত স্থান নির্বাচনে রাজউক কর্তৃক গৃহীত পরিকল্পনার গুরুতর ত্রুটিগুলো তুলে ধরলাম। রাজউক আমাদের আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করে দ্রুতই এ তৎপরতা থেকে সরে আসবে; সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিদেশি ঋণের টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত হবে—এটাই প্রত্যাশা।
সারওয়ার জাহান, মোহাম্মদ শাকিল আখতার আফসানা হক, অনিন্দ্য কিশোর দেবনাথ দীপিতা হোসেন, তানজীব আহমেদ, লেখকেরা নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, বুয়েটের শিক্ষক।

রুচিশীল প্রকাশনার পথিকৃৎ by মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর

বাংলাদেশের বিশিষ্ট প্রকাশক ও মুদ্রাকর সৈয়দ মোহাম্মদ শফী অনেক দিন রোগভোগের পর সম্প্রতি পরলোকগমন করেছেন। এখনকার প্রকাশনাজগতের অনেক তরুণ হয়তো তাঁকে চেনেন না। তাই তাঁর অবদানও খুব প্রচারিত হয় না। তা ছাড়া, তাঁর কর্মস্থল ছিল চট্টগ্রামে। বাংলাদেশের প্রকাশনাশিল্প স্বাধীনতার আগেই যাঁদের হাতে পেশাদারত্ব অর্জন করেছিল, সৈয়দ শফী তাঁদের একজন। তাঁর প্রকাশনা সংস্থা ‘বইঘর’ ষাটের দশকেই একটি সম্ভ্রান্ত ও আধুনিক প্রকাশনা সংস্থা হিসেবে পূর্ব বাংলা ও পশ্চিম বাংলায় পরিচিত ছিল। বইঘরের বই মানেই নির্বাচিত বই। বইয়ের গুণে, প্রচ্ছদে, মুদ্রণ সৌকর্যে বইঘরের বই ছিল এক নম্বর। জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র সেকালে শ্রেষ্ঠ বুক প্রোডাকশন ও প্রচ্ছদের জন্য পুরস্কার দিত। প্রায় প্রতিবছরই বেশির ভাগ পুরস্কার নিয়ে যেত বইঘরের বই। বইঘরের সোনালি সময় ছিল ষাট ও সত্তরের দশক। স্বাধীনতার আগে ঢাকা এত একচেটিয়া ছিল না। চট্টগ্রাম ছিল তখন পাকিস্তানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। সেই চট্টগ্রামে বসে সৈয়দ শফী প্রকাশনা ব্যবসায় প্রায় নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ঢাকায়ও তখন কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা সুনামের সঙ্গে বই প্রকাশ করেছে। যেমন: নওরোজ কিতাবিস্তান, ওসমানিয়া বুক ডিপো, স্টুডেন্ট ওয়েজ, মাওলা ব্রাদার্স, খান ব্রাদার্স ইত্যাদি। কিন্তু চট্টগ্রামের বইঘর ছিল শীর্ষে।
এ রকম একটি রুচিশীল ও মননশীল প্রকাশনা সংস্থা পরিচালনা করা কম কৃতিত্বের বিষয় নয়। এখনকার মতো কম্পিউটার কম্পোজ, ফটোশপ, গ্রাফিকস, ইন্টারনেট ইত্যাদি কিছুই ছিল না। আধুনিক প্রযুক্তির মধ্যে ছিল শুধু অফসেট মেশিন। বাকি সব সেকেলে ও প্রাচীন। এত সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই সৈয়দ শফী তাঁর আর্ট প্রেসে এমন সব দৃষ্টিনন্দন বই প্রকাশ করেছিলেন। অবশ্য বই প্রকাশনায় তাঁর ডান হাত ছিলেন দুজন কৃতবিদ্য ব্যক্তি। শিশুসাহিত্যিক এখলাসউদ্দীন আহমদ ও শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী। বলাবাহুল্য, এই দুজন গুণী ব্যক্তির সক্রিয় সহযোগিতা ছাড়া সৈয়দ শফীর পক্ষে ‘বইঘর’ গড়ে তোলা সম্ভব হতো না। আমার ধারণা, কাইয়ুম চৌধুরীর প্রচ্ছদ শিল্পীজীবনের শ্রেষ্ঠ কাজগুলো হয়েছে ষাট ও সত্তর দশকে বইঘরের মাধ্যমে। শুধু প্রথাগত বই নয়, বইয়ের সাইজ পরিবর্তন করে, প্যাকেটের ভেতরে বই দিয়ে ব্যতিক্রর্মী প্রকাশনাও বইঘরের অবদান। শামসুর রাহমানের বিধ্বস্ত নীলিমা, সৈয়দ আলী আহসানের সহসা সচকিত ও আল মাহমুদের কালের কলস-এর সেই ব্যতিক্রর্মী প্রকাশনা কি সহজে ভোলা যায়? কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, অনুবাদ, স্মৃতিকথা, আত্মজীবনী, ইতিহাস, শিশুসাহিত্য, কী না প্রকাশ করেছে বইঘর। শিশুসাহিত্যের প্রসারের জন্য তিনি ‘শিশুসাহিত্য বিতান’ নামে একটি পৃথক প্রকাশনা সংস্থা গঠন করেছিলেন। সেখান থেকে প্রকাশিত হয়েছিল অনেক শিশু-কিশোর সাহিত্য। তবে শিশুসাহিত্য বিতানের সবচেয়ে বড় অবদান হলো: ষাটের দশকে কিশোর মাসিক টাপুর টুপুর-এর প্রকাশনা। এর প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক ছিলেন সৈয়দ মোহাম্মদ শফী আর সম্পাদক ছিলেন এখলাসউদ্দীন আহমদ। শিশু-কিশোরদের উপযোগী এত সুন্দর পত্রিকা সেকালে খুব বেশি ছিল না। রোকনুজ্জামান খান (দাদাভাই) সম্পাদিত কচি ও কাঁচা ছিল আরেকটি সুন্দর পত্রিকা। এই দুটি পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর এ দেশে বহুদিন উন্নত মানের শিশু-কিশোর পত্রিকা প্রকাশিত হয়নি। বহু বছর পর প্রথম আলো থেকে প্রকাশিত ‘কিআ’ শিশু-কিশোরদের একটা বড় অভাব পূরণ করতে পেরেছে। টাপুর টুপুর সেকালের শিশু-কিশোরদের মধ্যে দেশপ্রেম, মানবিকতা, সুরুচি, সাহিত্যবোধ, ইতিহাসবোধ তৈরি করতে বিরাট ভূমিকা পালন করেছিল।
সৈয়দ শফী প্রকাশ করেছিলেন একটি বিনোদন পত্রিকা—অন্তরঙ্গ। মূল সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ শামসুল হক।
বই ও মননশীল সাময়িকী প্রকাশ লাভযোগ্য ব্যবসা বলে সেকালে বিবেচিত হতো না। তবু দেশের প্রতি, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার জন্য সৈয়দ শফী মননশীল বই ও ম্যাগাজিন প্রকাশে দ্বিধা করেননি। তাঁর মূল ব্যবসা ছিল মুদ্রণের ব্যবসা। তাঁদের ‘আর্ট প্রেস’ পূর্ব পাকিস্তানের একটি আধুনিক ও উল্লেখযোগ্য প্রেস বলে বিবেচিত হয়েছে। তখন ঢাকায়ও আধুনিক মুদ্রণ প্রযুক্তির তেমন প্রসার ঘটেনি। সেই ষাটের দশকে আর্ট প্রেসে অপসেট মেশিনে ছাপা হতো। এখন ঢাকার অলিতে গলিতে অপসেট মুদ্রণ দেখা গেলেও ষাটের দশকের চিত্র তা ছিল না। সৈয়দ শফী এ দেশে আধুনিক মুদ্রণব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পেছনেও বড় ভূমিকা পালন করেছিলেন। রাজধানীর বাইরে থাকলে ও দল না করলে যা হয়, সৈয়দ শফীর অবদান তাই কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পায়নি। অতি সজ্জন, মিতভাষী, বন্ধুবৎসল ও অতিথিপরায়ণ ব্যক্তি হিসেবে তিনি সবার প্রিয় ছিলেন। এ দেশের মুদ্রণ, বই প্রকাশনা, সাময়িকী প্রকাশনায় অনন্য অবদানের জন্য সৈয়দ মোহাম্মদ শফী স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।
মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর: গণমাধ্যমকর্মী।

তরুণদের স্বপ্ন ধ্বংস করে যে রাজনীতি by সোহরাব হাসান

দৃশ্যপট: এক
পুলিশ গত বুধবার ভোরে মিরপুর এলাকায় ছিনতাইকারী সন্দেহে খোরশেদ আলম রুবেল নামের ২৩ বছরের এক যুবককে গ্রেপ্তার করে। পরে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, রুবেল ছিনতাইকারী নন, জেএমবি নামের জঙ্গি সংগঠনটির সদস্য। তিনি সহযোগীদের নিয়ে মিরপুরে যাচ্ছিলেন তাঁর ভাষায় দুজন ‘নাস্তিক’ কলেজশিক্ষককে হত্যা করতে। চেকপোস্টে পুলিশ সন্দেহবশত তাঁদের বহন করা সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি থামালে রুবেল ও তাঁর সহযোগীরা তাঁদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। পুলিশ পাল্টা গুলি ছুড়লে রুবেল আহত হন। তাঁর কাছ থেকে একটি পিস্তল ও দুই বোতল বিষ উদ্ধার করা হয়। পুলিশের অভিযানে রুবেল গ্রেপ্তার হলেও তাঁর সহযোগীরা পালিয়ে যান। পুলিশের মতে, রুবেল জেএমবির স্লিপার শেল বা কিলার গ্রুপের সদস্য।
দৃশ্যপট-দুই
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ের সামনে ককটেল ফাটিয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছেন সংগঠনটির পদবঞ্চিত নেতা–কর্মীরা। তাঁদের দাবি, ‘অযোগ্যদের দিয়ে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে।’ নয়াপল্টনে ককটেল নিক্ষেপকালে তিনজন কর্মী আটক হন পুলিশের হাতে। একই দিন মহানগর বিএনপির কমিটি পুনর্গঠনকে কেন্দ্র করে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের গাড়িবহরে যাঁরা হামলা চালিয়েছেন, তাঁরাও দলের তরুণ সমর্থক। তাঁরা মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক আবু সাইদ খান খোকনের মাইক্রোবাসসহ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে আগুন দেন বলে পত্রিকায় খবর এসেছে।
দৃশ্যপট-তিন
জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগে দুদকের করা মামলায় কক্সবাজার-৪ আসনের সাংসদ আবদুর রহমান বদিকে গত রোববার কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন ঢাকা মহানগর আদালত। এর প্রতিবাদে ওই দিন দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত উখিয়া-টেকনাফ সড়কের অন্তত ২০টি স্থান অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন বদির সমর্থক স্থানীয় নেতা-কর্মীরা, যাঁদের বেশির ভাগ তরুণ। তাঁরা সেখানে অঘোষিত হরতাল পালনে জনগণকে বাধ্য করেন। এর আগে দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ ফরহাদ হোসেনকে লাঞ্ছিত করেন স্থানীয় ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীরা। তিনি উপজেলার দায়িত্ব নেওয়ার আগে দপ্তরি ও নৈশপ্রহরী পদে লোক নিয়োগের নামে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা মোটা অঙ্কের উৎকোচ নেন। পদায়িত ব্যক্তিরা বেতন না পাওয়ায় যুবলীগ ও ছাত্রলীগের কর্মীরা এখন ইউএনওর ওপর চড়াও হয়েছেন। তিনটি ঘটনায়ই হীন রাজনৈতিক ও গোষ্ঠী স্বার্থে তরুণদের ব্যবহার করা হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব তাঁদের বিপথে চালিত করছেন, ধ্বংসাত্মক কাজে নিয়োজিত রাখছেন। কেউ তাগুতি শাসন অবসানের নামে, কেউ দলের ভেতরে কোটারি তৈরির নামে, কেউ বা দলীয় অপকর্ম আড়াল করতে। এখানে মৌলবাদী, জাতীয়তাবাদী ও সেক্যুলার রাজনীতির মধ্যে ফারাক খুব কম।
প্রথম ঘটনায় আমরা দেখি মিরপুরের একটি নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষকে হত্যা করতে এই তরুণকে পাঠানো হয়েছিল। ওই শিক্ষকদ্বয় যদি কোনো অন্যায় করে থাকেন, আইনানুগভাবেই তার প্রতিকার ও প্রতিবাদ করা যেত। কিন্তু তা না করে তাঁদের হত্যার উদ্দেশ্যে বিষের বোতল ও পিস্তল নিয়ে লোক পাঠানো? এটি কিসের আলামত? সরকারের মন্ত্রীরা জোরগলায় বলেন, আওয়ামী লীগ আমলে জঙ্গিরা নির্মূল হয়েছে। নির্মূল যে হয়নি মিরপুরের ঘটনা, এর আগে পুলিশভ্যানে আসামি ছিনতাইয়ের ঘটনাই তার প্রমাণ। পত্রিকায় খবর বের হয়েছে, সম্প্রতি বর্ধমানে যে দুই তরুণ বোমা বানাতে গিয়ে মারা যান, তাঁরাও জেএমবির সদস্য। বাংলাদেশ থেকে অনেক আগে তাঁরা চলে গেছেন। সেখানে বিয়ে করেছেন, ভোটার হয়েছেন।
আশির দশকে আফগানিস্তানে সোভিয়েতবিরোধী লড়াইয়েও বহু বাংলাদেশি তরুণকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তাঁদেরই একজন মুফতি আবদুল হান্নান, বাংলাদেশে সব বোমা ও গ্রেনেড হামলার মূল হোতা। এই তরুণদের কীভাবে, কারা রিক্রুট করেছে, বিদেশে কারা অর্থ জুগিয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। ক্ষমতায় থাকতে বিএনপি রাজনৈতিক স্বার্থে জঙ্গিদের আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছে। আর এখন আওয়ামী লীগ ভিন্ন মতের সবাইকে জঙ্গি বানাতে তৎপর রয়েছে। এতে জঙ্গিদেরই পোয়াবারো হয়েছে। এই ধর্মান্ধ ও পশ্চাৎপদ ধ্যানধারণা সমাজ থেকে সমূলে উচ্ছেদ করতে যে উন্নত রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রয়োজন, কথিত গণতান্ত্রিক দলগুলো কখনোই তার ধার ধারেনি। দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ তরুণ। কবি হেলাল হাফিজের ভাষায়: ‘এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’ এই শ্রেষ্ঠ সময়ে আমরা তাঁদের সঠিক পথ দেখাতে পারিনি বলেই তাঁদের কেউ রাজনৈতিক দলের মারামারিতে লিপ্ত হচ্ছেন, কেউ জঙ্গিবাদে দীক্ষা নিচ্ছেন। এ জন্য এই অমিত সম্ভাবনাময় তরুণদের দায়ী করা যায় না। দায়ী হলো আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্ব। তারা ভুলে যান যে এই তরুণেরাই দেশের ভবিষ্যৎ। এই তরুণদের দিকেই তাকিয়ে আছেন তাঁদের বাবা-মা, সমাজ ও রাষ্ট্র। ন্যায়যুদ্ধের বদলে আমরা তাঁদের অন্যায় যুদ্ধে ধাবিত করছি। একসময় কড়া বামপন্থীরা যেমন নিজেদের সন্তানদের ইউরোপ-আমেরিকায় (প্রখ্যাত বামপন্থী নেতা আবদুল হকের ছেলে আমেরিকায় পড়াশোনা করে সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা হয়েছেন) পাঠিয়ে কৃষক পরিবারের সন্তানদের গলাকাটা রাজনীতিতে নামিয়েছিলেন, তেমনি মৌলবাদী-জঙ্গিবাদী রাজনীতির প্রবক্তারাও নিরাপদ দূরত্বে থেকে গরিব ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলেদের হাতে জিহাদের নামে আগ্নেয়াস্ত্র ও বোমা তুলে দিচ্ছেন। এই তরুণদের কেউ বোমা বানাতে গিয়ে, কেউ বা মারতে গিয়ে জীবন দিচ্ছেন।
২৩ বছর বয়সের যে তরুণের কোনো উচ্চশিক্ষালয়ে বা কর্মস্থলে থাকার কথা, সেই তরুণ কেন দুজন শিক্ষককে মারতে গেলেন? এর দায় আমাদের রাজনীতি, রাষ্ট্র ও সমাজ কেউ এড়াতে পারে না। এই ঘটনা আমাদের গত বছরে মিরপুরেই গণজাগরণ মঞ্চের কর্মী রাজীব হায়দার হত্যার কথা মনে করিয়ে দেয়। সেই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিলেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া কতিপয় তরুণ। কিন্তু তাঁদের পেছনে যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্র আছে, তাদের নাম-পরিচয় সম্ভবত কখনোই জানা যাবে না। দ্বিতীয় দৃশ্যপটে আমরা দেখি, ছাত্রদলের কমিটি নিয়ে সংগঠনটির একাংশ প্রতিবাদ জানাচ্ছে। এই প্রতিবাদ শান্তিপূর্ণ হতে পারত। উত্তম হতো ছাত্রদলের কমিটি যদি ছাত্রদলের কর্মীরা সম্মেলন ডেকে ভোটাভুটির মাধ্যমে নির্বাচিত করতে পারতেন। তখন অযোগ্যদের দিয়ে কমিটি হয়েছে—নেতৃত্বকে এই অপবাদ শুনতে হতো না। এখন হয়তো বিএনপির নেতারা দলের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে বিবৃতি দিয়ে বলবেন, সরকারের এজেন্টরাই এসব করেছেন। জিয়াউর রহমানের আদর্শে বিশ্বাসী কোনো কর্মী এ ধরনের ঘৃণ্য কাজ করতে পারেন না। আওয়ামী লীগের বা ছাত্রলীগের কমিটি নিয়ে এ রকম বোমাবাজি হলে তাদের নেতারাও সব দায় বিএনপি-জামায়াতের ওপর চাপানোর চেষ্টা করতেন।
বিএনপির নগর কমিটির পদ যাঁরা পেয়েছেন, আর যাঁরা পাননি, তাঁদের কারও বয়স ৫০-৬০ বছরের নিচে নয়। তাহলে কেন তরুণদের নামানো হয়েছে গাড়ি পোড়াতে ও ভাঙচুর করতে? আর ছাত্রদলের কমিটিই গঠিত হয়েছে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে। জাতীয় রাজনীতিতে বিএনপি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করলেও দলের বা সহযোগী সংগঠনের কোনো পর্যায়েই তারা নির্বাচন করতে আগ্রহী নয়। দলটির গঠনতন্ত্র এমনভাবে করা হয়েছে যে ঈশ্বরের পরই চেয়ারপারসনের স্থান। মাঝেও কেউ নেই, শেষেও না। তৃতীয় দৃশ্যপটটি আরও বিপজ্জনক। আওয়ামী লীগের একজন দুর্নীতিবাজ সাংসদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিবাদে রাস্তা অবরোধ করার কাজে তরুণদের নামিয়েছে কক্সবাজার আওয়ামী লীগ। তৃতীয় ঘটনায় নিয়মবহির্ভূতভাবে উৎকোচের বিনিময়ে চাকরি দিয়ে এখন বেতন দিতে না পারায় ইউএনওকে লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত করেছে ক্ষমতাসীন দলটি। আর এ কাজে তারাও ব্যবহার করেছে তরুণদেরই। যে তরুণেরা সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে পারত, সেই তরুণদের আমরা লাঠালাঠির কাজে ব্যবহার করছি। তাঁদের হাতে বোমা ও ককটেল তুলে দিচ্ছি। গত ৪৩ বছরে বাংলাদেশ কৃষি, শিক্ষা, অর্থনীতি, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভূত উন্নতি করেছে। এই উন্নতিটা আরও অনেক অনেক বেশি হতে পারত যদি আমাদের রাজনীতিটা একটু সুস্থ হতো। একটু নিয়মকানুনের ধার ধারত। নেতা–নেত্রীরা ভুলে যান যে তাঁদের বিভেদ ও বিদ্বেষের চোরাগলিতেই মৌলবাদী জঙ্গিবাদী রাজনীতি শিকড় গাড়ার সুযোগ পায়।
শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের আমলে তরুণদের, বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে আত্মঘাতী কর্মকাণ্ড দেখে দেখে বীতশ্রদ্ধ হয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ ছাত্ররাজনীতি সাময়িক বন্ধ করার কথা বলেছিলেন। আর সবাই গেল গেল বলে রব তুললেন। এখন বোধ হয় সময় এসেছে তাঁর সেই বক্তব্যের পক্ষেই কঠোর অবস্থান নেওয়ার। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ না করুন, অন্তত ছাত্র-তরুণদের দলীয় মাস্তান হিসেবে ব্যবহারের বদভ্যাসটা ত্যাগ করুন। গত ১৫ বছরে দেশের ছাত্ররাজনীতি এক পা এগোয়নি। বরং ছাত্ররাজনীতির নামে অনেক তরুণ তাজা প্রাণ ঝরে গেছে, অনেক বাবা-মায়ের কোল খালি হয়েছে। নেতা-নেত্রীরা যদি আর কোনো বাবা-মায়ের কোল খালি করতে না চান, তাহলে এখন ক্ষান্ত দিন। ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থে তরুণদের ব্যবহার করবেন না। যে রাজনীতি তরুণদের স্বপ্ন ও সম্ভাবনা ধ্বংস করে, সেই রাজনীতি পরিহার করুন।
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrabo3@dhaka.net

নতুন সিল্ক রোড নির্মাণের পথে চীন by শশী থারুর

‘সিল্ক রোড’ শব্দবন্ধটি এক রোমান্টিক চিত্রকল্পের অবতারণা করে। এর অর্ধেক ইতিহাস আর অর্ধেক রূপকথা। দৃশ্যটা এ রকম: উটের কাফেলা কেন্দ্রীয় এশিয়ার পথহীন মরুভূমির মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে যাচ্ছে। কিন্তু এই সিল্ক রোড শুধু পৌরাণিক অতীতের অংশ নয়, এটা চীনের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। স্থল ও সমুদ্রপথ উভয়ই এই ঐতিহাসিক সিল্ক রোডের অংশ। এর মাধ্যমে দক্ষিণ ও পূর্ব এশীয় পণ্য ও চিন্তা ইউরোপে চালান হয়েছে, এর মধ্যে রয়েছে চীনা চা, কাগজ, গানপাউডার ও কম্পাস। আবার বৌদ্ধদের ধর্মগ্রন্থ ও ভারতীয় সংগীতের মতো সাংস্কৃতিক পণ্যও চালান হয়েছে এ পথে। একইভাবে এই সিল্ক রোডের মাধ্যমে ভারতীয় জ্যোতির্বিদ্যা, উদ্ভিদ ও হারবাল ওষুধের সঙ্গে চীনাদের পরিচয় ঘটেছে। চীনারা আবার এসব জিনিস বৌদ্ধ ও ইসলামি সংস্কৃতিতে চালু করেছে। এই সিল্ক রোড ছিল মূলত স্থলপথ, এটা আরবের মধ্য দিয়ে ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরুতে চীনের অ্যাডমিরাল ঝেং হের নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ভারত মহাসাগরে সাতবার চক্কর দিয়েছে। এরপর দেখা যায়, চীনা বাসনকোসন ভারতের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রদেশ কেরালার নারীদের প্রিয় জিনিসে পরিণত হয়। চীনা মাছ ধরার জাল এখনো কোচিতে ব্যবহৃত হয়।
১৪১১ সালে ঝেং শ্রীলঙ্কার উপকূলীয় শহর গলের কাছে একটি পাথরের ফলক নির্মাণ করেন। এতে চীনা, ফারসি ও তামিল ভাষায় লেখা ছিল। আসলে ওই ফলকে হিন্দু দেবতার কাছে প্রার্থনা করা হয়েছিল, যাতে ঝে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে একটি দুনিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে পারে। ৬০০ বছর পর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং একই পথে হাঁটছেন। তবে তিনি তাঁর লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য শুধু ইউরোপ ও এশিয়ার রাজনৈতিক নেতাদের কাছে আবেদন করছেন। এই সেপ্টেম্বর মাসে শি কাজাখস্তানের নজরবায়েভ বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বক্তব্যে তথাকথিত ‘সিল্ক রোড ইকোনমিক বেল্ট’ শীর্ষক এক নতুন পররাষ্ট্রনীতির ঘোষণা দিয়েছেন। এর লক্ষ্য হচ্ছে, ইউরেশিয়াজুড়ে আন্তর্জাতিক সহায়তা ও যৌথ উন্নয়ন নিশ্চিত করা। এ প্রচেষ্টায় সফল হতে শি পাঁচটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন: অর্থনৈতিক উন্নয়ন জোরদার, সড়ক যোগাযোগ উন্নতকরণ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি, মুদ্রা রূপান্তর সহজীকরণ, জনগণ-জনগণ পর্যায়ে যোগাযোগ সংহতকরণ।
তার পরের মাসে শি ইন্দোনেশীয় পার্লামেন্টে এক বক্তব্যে বলেন, পুরোনো সমুদ্র নেটওয়ার্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। যেটার নামকরণ তিনি করেন একুশ শতকের ‘সমুদ্র সিল্ক রোড’; এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ, বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশগত গবেষণা ও মৎস্য শিকারের কার্যক্রম ত্বরান্বিত হবে। চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কেছিয়াং এশিয়া প্যাসিফিক ইকোনমিক কো-অপারেশনের সম্মেলন ও তারপর ইস্ট এশিয়া সামিটে তা পুনর্ব্যক্ত করেন। তখন থেকেই এই স্থল ও সমুদ্রপথের সিল্ক রোড প্রতিষ্ঠা চীনা সরকারের পররাষ্ট্রনীতির অংশে পরিণত হয়। কমিউনিস্ট পার্টি ও ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস তা অনুমোদন করেছে। শি জোর দিয়ে বলেছেন, এই সিল্ক রোডকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে এই বিশ্বায়নের যুগে সেই পুরোনো সম্পর্কের নবায়ন হবে। কিন্তু নিঃসন্দেহে তাঁর মধ্যে একটি অভ্যন্তরীণ অভিপ্রায়ও রয়েছে। কারণ, পূর্ব ও পশ্চিম চীনের মধ্যে সম্পদের পার্থক্য ক্রমেই বাড়ছে।
চীনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম এর পূর্বাঞ্চলের শহর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। ফলে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও পরিবেশগত নানা রকম চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত হতে হলে অর্থনীতির যে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপ লাভ করা প্রয়োজন, সে লক্ষ্যে এসব ব্যাপার নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। চীনা সরকার আশা করছে, এই সিল্ক রোড তৎপরতার মাধ্যমে চীনের পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল আগামী দিনে দেশটির অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে। তথাপি এই উদ্যোগের আন্তর্জাতিক মাত্রাই এর সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে, আবার একই সঙ্গে তা জটিলও বটে। এর প্রভাব চূড়ান্তভাবে অনুভূত হওয়ার জন্য চীনা কূটনীতিকেরা কয়েকটি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁরা বলছেন, এ লক্ষ্যে কার্যসাধন-পদ্ধতি ও মঞ্চ গড়ে তোলা বা সেগুলো আরও সংহত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন, বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার করিডর, চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডর, চঙকিঙ থেকে জার্মানি পর্যন্ত (পরে উত্তর ইউরোপীয় বন্দর পর্যন্ত) চীন নির্মিত ইয়ুক্সিনাও রেলওয়ে এবং চীন, কেন্দ্রীয় এশিয়া ও মিয়ানমারের মধ্যে নতুন শুরু হওয়া জ্বালানি করিডর।
তদুপরি, চীন সমভাবাপন্ন কয়েকটি দেশ নিয়ে ব্রিকস নামক নতুন একটি উন্নয়ন ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছে। দেশগুলো হচ্ছে ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকা। আবার চীন এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ব্যাংক গঠন করেছে। চীনের হাতে বিনিয়োগ করার মতো প্রচুর অর্থ রয়েছে। ফলে এটিও খুব রমরমা হয়ে উঠবে বলে আশা করা যায়। উভয় ক্ষেত্রে চীন প্রধান ভূমিকায় আছে, ফলে সিল্ক রোড-সংক্রান্ত উদ্যোগে অর্থায়নে কোনো সমস্যা হবে না। অর্থায়নে কোনো সমস্যা না হলেও চীন রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে পারে, বিশেষ করে সমুদ্রপথবিষয়ক সমস্যা চীনের মোকাবিলা করতে হতে পারে। যখন দক্ষিণ ও পূর্ব চীন সাগরে চীনের দৃঢ়প্রত্যয়ী অবস্থান তার প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করছে, তখন এই সিল্ক রোড উদ্যোগ ভূরাজনৈতিক আশঙ্কা সৃষ্টি করেছে।
বস্তুত এসব আশঙ্কার ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। ঝেঙের অভিযানে সামরিক শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। আজকের ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, শ্রীলঙ্কা ও ভারতে সামরিক বল প্রয়োগ করে বন্ধুত্বপূর্ণ সরকার ক্ষমতায় বসায় তারা ভারত মহসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও ঝেং নিরাপত্তা পাহারা বসিয়েছিলেন। তিনি শ্রীলঙ্কা ও ইন্দোনেশিয়ার রাজতান্ত্রিক রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করেছেন, এমনকি স্থানীয় শাসকদের অপহরণ করে তাঁদের হত্যাও করেছেন। তিনি গৌতম বুদ্ধের দাঁতের পবিত্র স্মৃতিচিহ্ন দখল করেছিলেন, এটা ছিল শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের নিদর্শন। ঝের সেই অভিযানের তোপে যে দেশগুলো পড়েছিল, তারা সেটা শুধু বাণিজ্যিক উদ্যোগ হিসেবে গণ্য করে না, বরং সেটাকে তারা নিজেদের দেশে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ হিসেবে গণ্য করেছে। চীনা সম্রাটের নেতৃত্বে দুনিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করার অজুহাতে এটা করা হয়েছে। এই দেশগুলোকে সেই বেদনার্ত অতীতের কথা মনে করিয়ে দেওয়াটা শুধু চীনের স্বার্থে করা হয়েছে বলে মনে হয় না।
এটা বলছি না যে এই আধুনিক সিল্ক রোড শুধু চীনের উপকারে আসবে। এর বিপরীতে স্থল ও সমুদ্রপথের সমন্বয়ে গঠিত এই এই সিল্ক রোড তৎপরতায় অংশগ্রহণকারী দেশগুলোতে চীনের বিনিয়োগের সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। আর চীনের হাতে বিনিয়োগ করার মতো প্রচুর টাকা আছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটা এক প্রাচীন চীনা ধারণার পুনঃপ্রবর্তনও করতে পারে, যেটা তিয়ানশিয়া নামে পরিচিত। এতে চীনা সম্রাট সারা দুনিয়া শাসনের জন্য ঐশ্বরিকভাবে নির্বাচিত বলে বিবেচনা করা হতো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ও আগে জাপান বল প্রয়োগের মাধ্যমে নিজ নেতৃত্বে একটি ব্লক গড়ে তোলার চেষ্টার কথা নিশ্চয়ই অনেকের স্মরণে আছে। চীনও কি একই পথে হাঁটছে, একটু রাখঢাক করে?
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
শশী থারুর: ভারতের মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী।

গবেষণা- হাইডেলবার্গের লরেট ফোরাম by মোহাম্মদ কায়কোবাদ

প্রোগ্রামিংয়ের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ শেষে রাশিয়ার ইকেটেরিনবার্গ শহরের একটি কমদামি হোটেলে বসে ই-মেইল দেখছি। ইদানীং অপরিচিত জায়গা থেকে প্রচুর ই-মেইল আসছে। আন্দ্রিয়াস রয়টার নামে কম্পিউটার বিজ্ঞানী আমাকে আমন্ত্রণ করেছেন হাইডেলবার্গের লরেট ফোরামে, যেখানে গণিতের ফিল্ডস মেডাল ও আবেল পুরস্কার বিজয়ী এবং কম্পিউটারের টুরিং এবং নেভানলিনা পুরস্কার বিজয়ীদের সঙ্গে উঠতি বয়সী গবেষকদের সমন্বয়ে একটি মিলনমেলা হবে। গণিত ও কম্পিউটার বিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার না থাকলেও উল্লিখিত পুরস্কারগুলো সমমানের পুরস্কার বলে গণ্য হয়। যা হোক, আমন্ত্রণ পাওয়ার পর চিন্তাভাবনা না করেই যথেষ্ট ধন্যবাদসহ সম্মতি জানিয়ে দিলাম, যাতে ভুলক্রমে হলেও আর আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ না থাকে। এবারসহ দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠানটি হচ্ছে। খোদ নোবেল পুরস্কার বিজয়ীদের নিয়ে যে লিন্ডাও কনফারেন্স, তা-ও জার্মানিতেই হয় এবং আমাদের দেশের তরুণ শিক্ষার্থীদের সেখানে অংশ নেওয়ার সুযোগ হচ্ছে কয়েক বছর ধরে। এমনকি এবারের ফিল্ডস মেডাল বিজয়ী মার্টিন হেয়ারার ও মঞ্জুল ভার্গাভাও এতে যোগ দেবেন, বয়স্কদের মধ্যে ১৯৬৬ সালের ফিল্ডস মেডালিস্ট ও ২০০৪ সালের আবেল বিজয়ী স্যার মাইকেল ফ্রান্সিস আতিয়াহ। মনে মনে বলি, বিদেশভ্রমণের কথায় এমনিতেই আমার এক পা দরজার বাইরে থাকে৷ তার মধ্যে এমন নামী-দামি একজন মানুষ থাকলে তো কথাই নেই। বিমানের টিকিট কিংবা ভ্রমণবিমা—সবই আয়োজক কর্তৃপক্ষ করল। আমাদের মেধাবী ছাত্র এবং বর্তমানে শিক্ষক হিমেল দেবও যাবেন। হিমেলকে তাঁর আন্ডারগ্র্যাজুয়েট থিসিসের জন্য এবার আয়ারল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট স্বয়ং পুরস্কার দেবেন৷ তা ছাড়া তাঁর একাধিক পেপার নামী-দামি কনফারেন্সে গৃহীত হওয়ায় তিনি এখন রীতিমতো একজন আত্মবিশ্বাসী গবেষক।
ফ্রাঙ্কফুর্ট পৌঁছালে বন্ধুবর মোশারফ বুলেট ট্রেনে কোলন যাওয়ার টিকিট কেটে দিল। ট্রেনে না উঠলে বুঝতেই পারতাম না যে ট্রেনটি ৩০০ কিলোমিটার বেগে চলে। সেখানে আমি কোলন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক মাইকেল জুঙ্গের ও পেত্রা মুতজেলের আমন্ত্রণক্রমে একটি সেমিনার দিয়ে ফেললাম। তবে ফোরামের উপস্থাপনা ছাড়াও হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারটি অবশ্য হোটেল থেকেই দিয়েছি। দেখলাম, সেখানেও ট্রেন দেরিতে ছাড়ে। কয়েকটি ট্রেন মিস করে রাত সাড়ে নয়টায় যখন হাইডেলবার্গে পৌঁছে রেলস্টেশনে ড. জুলিয়াসকে পেলাম—যাঁর জন্মই হয়েছে সমাজকে সেবাদানের জন্য। ২০০৫ সালে যখন কিছুদিন কোরিয়ায় ছিলাম, তখন জুলিয়াস সেখানে পড়াশোনা করতেন। ২০১২ সালে যখন ছয় সদস্যের ইনফরমেটিকস দল নিয়ে এসেছি, তখন জুলিয়াস ফুসলিয়ে গোটা দলটিকেই নিজের বাসায় উঠিয়েছিলেন। পরে জানলাম, আতিথেয়তা করতে করতে জানলাম জুলিয়াসের সহধর্মিণী হাসপাতালে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন।
ভারতের খড়্গপুর আইআইটির পিএইচডি গবেষক তন্বী জানালেন, দেশের টাকায় ভ্রমণ, তাই তাঁকে এয়ার ইন্ডিয়ায় যাওয়ার জন্য কলকাতা থেকে ঢাকা হয়ে দিল্লি যেতে হয়েছে। এটাই নিয়ম, সরকারি টাকায় ভ্রমণ হবে তাঁদের দেশের জাতীয় পতাকাবাহী বিমানে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের দেশে এমন নিয়ম নেই। যা হোক হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেন্যুতে গিয়ে দেখি কম্পিউটার বিজ্ঞান ও গণিতের রথী–মহারথীদের আগমনে জায়গাটি আলোকিত। কার্নেগি মেলনের নামজাদা টুরিং বিজয়ী অধ্যাপক ম্যানুয়েল ব্লুম যেমন এসেছেন, তেমনি এসেছেন কুইকসর্টের আবিষ্কারক স্যার এন্থনি হোর, উইলিয়াম কাহান, ল্যাম্পোর্ট, পিটার নাউর, ইভান সাদারল্যান্ড, রবার্ট টারজান এবং কম্পিউটেশনাল কমপ্লেক্সিটির জনক স্টেফেন কুক—যাঁর আবিষ্কার ছাড়া আমার পিএইচডি করাই হতো না। আবার গণিতের শ্রেষ্ঠ পুরস্কার ফিল্ডস মেডাল ও আবেল পুরস্কার বিজয়ীদের মধ্যে দেখা হলো স্যার ফ্রান্সিস আতিয়াহ, ভিয়েতনামের নগ বাও চাও, জন টেট, ভারতীয় বংশোদ্ভূত শ্রীনিভাস ভারাধন, মঞ্জুল ভার্গাভা, ভ্লাদিমির ভায়েভুদস্কি, ওয়েন্ডিন ওয়ের্নের এবং মার্টিন হেয়ারার সঙ্গে।
এটা অনেকটা একই আসরে পেলে, বেকেনবাওয়ার, মুলার, ম্যারাডোনা, পাওলো রসি, প্লাতিনি, মেসি, রোনালদোদের সঙ্গে সাক্ষাৎ! অথবা গাভাস্কার, হ্যাডলি, ইমরান খান, মুরালিধরন, শেন ওয়ার্ন, অ্যালান বর্ডার, ভিভ রিচার্ডস, সোবার্স, টেন্ডুলকার আর লারার সঙ্গে একই মাঠে সাক্ষাৎ! এ ছাড়া রয়েছে ইন্টারন্যাশনাল ম্যাথমেটিকস ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট ইনগ্রিড দোবেচি, আবেল পুরস্কার কমিটির প্রেসিডেন্ট, এসিএমএর প্রেসিডেন্ট। তাঁদের সঙ্গে ছয় দিন কথা বলার সুযোগ পাবে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা শ দুয়েক তরুণ ছাত্র ও গবেষক, যার ১৭ থেকে ১৮ জনই ভারতের—তাও আবার অনেকের ক্ষেত্রেই ব্যয় বহন করছে ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মেধাবী মানুষদের সঙ্গে মিশে ভারতের তরুণ মেধাবী গবেষকেরা একদিকে যেমন উৎসাহের বারুদ নিয়ে দেশে ফিরবেন, অন্যদিকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মেধাবী মানুষদের মধ্যে ভারতীয়দের জ্ঞানপিপাসা সম্পর্কে শ্রেয়তর ধারণা প্রতিষ্ঠিত হবে। আমাদের সবেধন নীলমণি হিমেল দেবের সব খরচ আয়োজকেরা না দিলে তাঁর নিশ্চয়ই আর অংশগ্রহণ হতো না, পৃথিবীর ২ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষের কোনো প্রতিনিধিত্ব থাকত না।
টুরিং ও নেভানলিনা পদক বিজয়ী রবার্ট টারজানের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ হলো। পারস্পরিক সম–আগ্রহের বিষয়ে তিনি যে আন্তরিকতার সঙ্গে আলাপ করলেন, তার কোনো তুলনা নেই, উৎসাহ জোগাতেও তিনি সিদ্ধহস্ত। আমাদের দেশের প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা, অলিম্পিয়াড কার্যক্রমগুলো সবারই নজর কেড়েছে। এই নামী-দামি মেধাবী মানুষেরা সবার সঙ্গেই আলাপ করছেন, সাহস দিচ্ছেন, উৎসাহ দিচ্ছেন অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে।
এ পর্যন্ত যতগুলো উপস্থাপনা হলো, সবই অত্যন্ত উপভোগ্য ছিল। এই মহামেধাবী মানুষেরা শুধু জ্ঞানের গভীরতায়ই নয়, রসবোধের সূক্ষ্মতায়ও তাঁরা অনন্য। পুরস্কার বিজয়ীদের যাতায়াতের জন্য বিশেষ ধরনের যানবাহন ব্যবহার করা হলো, তাঁদের নানাভাবে সম্মানিত করা হলো। এই আসরে ভারত, চীন, জাপান, ইরান কিংবা ভিয়েতনামের প্রতিনিধিরা রয়েছেন, পুরস্কার বিজয়ীদের মধ্যে নেই শুধু বাংলাদেশের কেউ—তিনি দেশে বসবাসরত বা প্রবাসী—যা–ই হোন না কেন। সব আনন্দের মধ্যেও এই নিরানন্দ নিয়েই দেশে ফিরতে হবে। এই অনুভূতি নিয়ে যদি হিমেলরা দেশে ফেরেন এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন, তাহলে নিশ্চয়ই আগামী দিনগুলোয় আমাদের অংশগ্রহণ অধিকতর সম্মানজনক হবে৷
মোহাম্মদ কায়কোবাদ: অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) ও ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেস।

পা-হীন লিমন: ন্যায়বিচার কত দূরে! by মশিউল আলম

ঝালকাঠির লিমন হোসেন অবশেষে নিস্তার পেল। আমরা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হলো, কিশোর লিমন ও তার দরিদ্র মা-বাবা, এক ভাই ও এক বোন ‘ক্রিমিনাল’ নয়। গত বৃহস্পতিবার ঝালকাঠির মুখ্য বিচারিক হাকিমের আদালত ‘সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ-সম্পর্কিত’ মামলা থেকে লিমনকে অব্যাহতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হলো, র‌্যাব নামের এলিট ফোর্সের সদস্যদের কর্তব্য পালনে লিমন বাধা দিয়েছিল—র‌্যাবের এই অভিযোগ ডাহা মিথ্যা। কিন্তু এই মিথ্যা মামলা থেকে অব্যাহতি পেতে অসহায় দরিদ্র কিশোরটিকে অপেক্ষা করতে হয়েছে সাড়ে তিন বছরেরও বেশি সময়। হয়রানি, ভয়ভীতি, ক্লেশ ও শঙ্কা-অনিশ্চয়তার মধ্যে পেরিয়ে গেছে তার কৈশোর। দুশ্চিন্তায় ও মানসিক পীড়নে রাতের পর রাত ঘুমাতে পারেননি তার মা হেনোয়ারা বেগম ও বাবা তোফাজ্জেল হোসেন। কারণ শুধু এই ছিল না যে র‌্যাবের গুলিতে তাঁদের কিশোর ছেলেটি একটা পা হারিয়ে চিরতরে ‘পঙ্গু’ হয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে পড়েছে। তাঁদের দুশ্চিন্তা, ভীতি, মানসিক পীড়নের কারণ এও ছিল যে তাঁদের বিরুদ্ধে শত্রুর রূপ নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে খোদ রাষ্ট্র, যে রাষ্ট্র অসহায়ের সহায় হবে, দুর্বলের পাশে দাঁড়াবে বলে প্রত্যাশা করা হয়।
২০১১ সালের ২৩ মার্চ বিকেলে ঝালকাঠির রাজাপুর ইউনিয়নের সাতুরিয়া গ্রামে নিজের বাড়ির অদূরে গরু চরানোর সময় র‌্যাবের একজন উপসহকারী পরিচালকের (ডিএডি) হাতে গুলিবিদ্ধ হয়ে লিমন প্রাণ হারায়নি বটে। কিন্তু র‌্যাবের ‘ক্রসফায়ারে’ যারা মরে গিয়ে বাঁচে, এক অর্থে তাদের থেকে অনেক কঠিন ও দুর্বহ জীবনসংগ্রাম শুরু হয় লিমন ও তার পরিবারের। কারণ, র‌্যাবের সদস্যরা লিমনকে পা-হীন করেই ক্ষান্ত হন না, তার বিরুদ্ধে দুটি মিথ্যা মামলা দায়ের করেন। একটি মামলার অভিযোগ, লিমন দুর্বৃত্ত, একজন অবৈধ অস্ত্রধারী। অন্য মামলায় র‌্যাব অভিযোগ করে, ঘটনার দিন লিমন তাদের সরকারি দায়িত্ব পালনে বাধা দিয়েছিল। শুধু মামলা নয়, র‌্যাব ও সরকারের দায়িত্বশীল নেতারা প্রচারণা চালাতে থাকেন যে লিমন একটা সন্ত্রাসী। এমনকি প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টাও বলেছিলেন, শুধু লিমন নয়, তার গোটা পরিবার সন্ত্রাসী। কিন্তু সেসব মিথ্যা প্রচারণায় কাজ হয়নি। জনসাধারণ র‌্যাব ও সরকারের নেতাদের অবিশ্বাস্য কথাগুলো বিশ্বাস করেনি। মানবাধিকার সংস্থাগুলো ও বৃহত্তর নাগরিক সমাজ প্রবল প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে। তারা ন্যায়বিচারের দাবিতে মানববন্ধন ও সভা-সমাবেশ করেছে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান পঙ্গু হাসপাতালে গিয়ে লিমনের শয্যাপাশে দাঁড়িয়ে কেঁদেছেন। হাইকোর্টের বিচারক স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রুল দিয়ে লিমনকে দেখে বলেছেন, ‘এ তো বাচ্চা ছেলে!’ সংবাদমাধ্যমে দিনের পর দিন লিমনকে নিয়ে প্রতিবেদন, নিবন্ধ, বিবৃতি ছাপা হয়েছে। এসবের ফলে সরকারের ওপর জনমতের যে প্রবল চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা সরকারের পক্ষে সম্ভব হয়নি বলে যদি ধরা যায়, তবে অনেক বিলম্বে হলেও তা খানিকটা স্বস্তি এনে দেয়। কারণ, লিমন ও তার দরিদ্র পরিবারের জন্য র‌্যাবের দায়ের করা মামলা দুটি ছিল বিরাট দুর্ভোগ ও দুশ্চিন্তার বিষয়। র‌্যাবের মতো ক্ষমতাধর ও প্রভাবশালী একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে প্রতিপক্ষ হিসেবে মোকাবিলা করতে হবে, এমনটি তারা কখনো দুঃস্বপ্নেও ভাবেনি। ২০১২ সালে সাতুরিয়া গ্রামে লিমনদের বাড়ি গেলে তার মা হেনোয়ারা বেগম দুশ্চিন্তাক্লিষ্ট দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, র‌্যাবের সঙ্গে কি আমরা পারব?’ কিন্তু তিনি হাল ছেড়ে দেননি।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে লিমনের বিরুদ্ধে র‌্যাবের দায়ের করা দুটি মিথ্যা মামলাই প্রত্যাহার করা হয়েছে। অবৈধ অস্ত্রসংক্রান্ত মামলাটি থেকে লিমনকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এক বছর আগে, দ্বিতীয় মামলাটি থেকে তার অব্যাহতি পেতে এক বছর বিলম্ব হলো সংশ্লিষ্ট আদালতে বিচারকের অভাবে। তবে শেষ পর্যন্ত যে লিমন দুটি মামলা থেকেই অব্যাহতি পেল, সেটা স্বস্তির বিষয়। কিন্তু এই স্বস্তির মধ্য দিয়ে পুরো ঘটনাটির অবসান ঘটছে না। বৃহস্পতিবার শেষ মামলাটি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পর লিমন বিবিসি বাংলাকে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বলেছে, সে খুশি নয়। শুক্রবার দুপুরে মুঠোফোনে আমি যখন তাকে পাই, তখন সে আমাকে বলে, ঝালকাঠির ওই আদালতকক্ষে বিচারক যে মুহূর্তে বললেন যে লিমনকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হলো, তৎক্ষণাৎ তার মনে পড়েছে তার হারানো বাঁ পা’টির কথা। মুঠোফোনে লিমনের কণ্ঠ ভারী শোনাচ্ছিল, সে বলেছিল, ‘সাথে সাথে আমার চোখ চলে গেছে পায়ের দিকে। আমার মনে হচ্ছিল, বিচারক যদি বলতেন, লিমন নির্দোষ, সে তার পা ফিরে পাবে!’ এটুকু বলেই সে থেমে গেল। কিন্তু একজন বিচারক কেন, এ দেশের ১৫ কোটি মানুষও যদি সমস্বরে দাবি জানায়, লিমনকে তার পা’টি ফিরিয়ে দেওয়া হোক, আমাদের এলিট বাহিনী র‌্যাব, তার নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও সর্বময় ক্ষমতাধর সরকারের কি সাধ্য আছে তা করার? নেই যে লিমন তা বোঝে। তার বাঁ পায়ের হাঁটুর নিচ থেকে যে অংশটি ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালের শল্যচিকিৎসকেরা সাড়ে তিন বছর আগে কেটে ফেলে দিয়েছেন, তা যে আর এ জীবনে ফিরে পাওয়ার নয়—এই নিষ্করুণ সত্যের চেয়ে বড় সত্য তার জীবনে আর নেই। তাই আমি যখন তাকে বলি, যা হারিয়ে গেছে তা নিয়ে আর দুঃখ করে কী হবে, তখন সে বলে, ‘তবু তো এটাই সত্য যে রাষ্ট্রের একটা বাহিনী বিনা দোষে আমাকে পঙ্গু করে দিয়েছে।’
এরপর লিমনকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা খোঁজা অর্থহীন।
লিমনের শেষ বাক্যটির ‘বিনা দোষে’ কথাটা লক্ষ করা জরুরি। সে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর থেকে র‌্যাব ও সরকার গোটা জাতিকে বোঝাতে চেয়েছে লিমন সন্ত্রাসী, আর অন্য পক্ষে লিমনের পরিবারের সংগ্রাম ছিল এটা প্রমাণ করা যে সে নিরপরাধ। আমি যখন লিমনের স্কুলে যাই, তখন সে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, আশপাশের দোকানি ও গ্রামের লোকজন বলেন, লিমন ভালো ছেলে। র‌্যাব তাকে গুলি করেছে বিনা দোষে। অর্থাৎ র‌্যাব ও সরকারের পক্ষ থেকে যেমন, তেমনই লিমন, তার পরিবার ও সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকেও এমন একটা দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটে যে কেউ ক্রিমিনাল হলে র‌্যাব বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তাকে গুলি করার মধ্যে খারাপ কিছু নেই। লিমন যেহেতু ক্রিমিনাল নয়, তাই তাকে গুলি করে র‌্যাব অন্যায় করেছে। র‌্যাব ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হাতে ‘ক্রসফায়ার’, ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ইত্যাদি নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে এই সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গিই সবচেয়ে বড় সমস্যা ও বিপদ। বৃহস্পতিবার লিমনের মামলা থেকে অব্যাহতির পর স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বিবিসি বাংলায় মন্তব্য করতে গিয়ে বলেছেন, র‌্যাব একজন সন্ত্রাসীকে ধরতে গিয়ে লিমনকে গুলি করেছিল ভুল করে। অর্থাৎ, র‌্যাবের অপরাধ দমনের এ ব্যবস্থাটির মধ্যেই এমন মারাত্মক বিপদের ঝুঁকি নিহিত আছে যে ১৫ বছরের একটি কিশোর রোদঝলমলে বিকেলে খোলা আকাশের নিচে গরু আনতে গিয়ে গুলিবিদ্ধ হয়। (যদিও লিমন নিজে আমাকে বলেছে, র‌্যাবের সদস্যরা যখন তাকে ধরে বলেন, তুই সন্ত্রাসী, তখন সে তাঁদের একজনের পা চেপে ধরে বলেছিল, স্যার, আমি স্টুডেন্ট। কিন্তু ওই র‌্যাব সদস্য তার কথায় ভ্রুক্ষেপ না করে তাকে টেনে তুলে তার বাঁ পায়ের হাঁটুতে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করেছিল।) আর এ রকম ‘ভুল’ করে র‌্যাব সদস্যরা যদি জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থেকে যেতে পারেন, উপরন্তু ওই রকম ‘ভুল’কারী র‌্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে কেউ অভিযোগ করলে যদি গোটা প্রতিষ্ঠান ও সরকার তাঁদের রক্ষা করার জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই তৎপর হয়, তাহলে বিপদ ক্রমাগত বাড়তেই থাকে। এভাবেই সম্ভবত র‌্যাব সদস্যদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনার মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটনের প্রবণতা সৃষ্টি হতে পেরেছে।
র‌্যাবের মিথ্যা মামলা থেকে লিমনের অব্যাহতি তাকে ও তার পরিবারকে স্বভাবতই খুশি করতে পারেনি। কারণ, তাদের মূল চাওয়া ন্যায়বিচার: লিমন যে অপরাধের শিকার হয়েছে, তার বিরুদ্ধে বিচার ও অপরাধীদের শাস্তি। কিন্তু লিমনের মা র‌্যাবের যে ছয় সদস্যকে আসামি করে মামলা করেছেন, পুলিশ তাঁদের অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছে। এর মানে কী? ওই র‌্যাব সদস্যরা লিমনকে গুলি করেননি? তাহলে লিমন পা হারিয়েছে কীভাবে?
লিমনের মা পুলিশের চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করেছেন। সেটাও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, সরকার আসলে কী চায়। লিমনকে মিথ্যা অভিযোগ থেকে নিষ্কৃতি দিয়ে সরকার যদি মনে করে, একটা মহান কাজ করা হলো, তাহলে ভুল হবে। অথবা সরকার যদি এটা মনে করে যে লিমনকে সব মিথ্যা মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার মধ্য দিয়েই এ অধ্যায়টির পরিসমাপ্তি ঘটবে, তাহলে সেটা হবে অন্যায়। র‌্যাবের অপরাধ দমন ব্যবস্থার মৌলিক ত্রুটি তুলে ধরার ক্ষেত্রে লিমনের ঘটনাটি যেমন দৃষ্টান্তমূলক, তেমনই দৃষ্টান্তমূলক হওয়া উচিত এর আইনি প্রতিকার।
মশিউল আলম: সাংবাদিক।

আসামি বাঁধার পুলিশি দড়ি -শিশুর প্রতি এ নিষ্ঠুরতার বিহিত হোক

শিশুর চোখে জল, হাতে হাতকড়া by মজিবর রহমান খান
পৃথিবী এগোয় আর বাংলাদেশ যেন একই জায়গায় ঘুরপাক খেতে থাকে। পুলিশের অপরাধী বাঁধার দড়ি এখনো বয়স্ক থেকে শিশু—সবাইকেই ‘পশু’র মতো বেঁধে রাখছে। ঠাকুরগাঁয়ে ১৩ বছরের এক শিশুকে হাতে হাতকড়া ও দড়ি বেঁধে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য মানবাধিকারের প্রতি নির্বোধের পরিহাস।

>>সামনে হাতকড়া পরা শিশুটি। পেছনে তার স্বজন। গতকাল বুধবার দুপুরে ঠাকুরগাঁওয়ের আদালত চত্বরে তাকেসহ দুজনকে পুলিশি পাহারায় হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল l ছবি: প্রথম আলো
শিশুটির বিরুদ্ধে যে হত্যা মামলা আছে, সেটি সত্য বা মিথ্যা যা-ই হোক, তাকে কোনোভাবেই হাতকড়া পরানো বা দড়ি দিয়ে বেঁধে রাখা যায় না। ২০১৩ সালের আইনে এটা নিষিদ্ধ। পুলিশের যে উপপরিদর্শক মামলায় নাম পাওয়ামাত্রই শিশুটিকে গ্রেপ্তার করেছেন, তিনি আদালতে তার সাত দিনের রিমান্ডও চেয়েছিলেন। রিমান্ডে কী হয় তা সবারই জানা। স্বস্তির কথা যে আদালত রিমান্ড নামঞ্জুর করে তাদের শিশু-কিশোর সংশোধন কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এর অর্থ, শিশুটি এ অবস্থায় সংশোধনের আওতায়, শাস্তির আওতায় নয়। তাহলে আইনের রক্ষকেরা কি আইন জানে না? হাতকড়া ও দড়ি বেঁধে রাখার জন্য ওই পুলিশের শাস্তি হওয়া প্রয়োজন, নইলে অন্যরা সংশোধন হবে না। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, পুলিশের সংশোধনই বেশি প্রয়োজন।
ঠাকুরগাঁওয়ের শিশুকে জেলখানা থেকে পরিবারের অজ্ঞাতে যশোরের সংশোধনকেন্দ্র পাঠিয়ে দেওয়ার কথাও প্রথম আলোয় প্রকাশিত হয়েছে। ঠাকুরগাঁও থেকে যশোর অনেক দূর। ১৩ বছরের এই শিশুটি আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগেই হাতকড়া ও দড়ি-বাঁধা অবস্থায় মামলার তারিখে তারিখে যশোর-ঠাকুরগাঁও করবে? মধ্য আয়ের দেশ হতে চাওয়া, ডিজিটাল বাংলাদেশ হওয়ার গর্বে গর্বিত বাংলাদেশ কি এ রকম অমানবিক আচরণে গ্লানিবোধ করে না?
আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, আইন ও সংস্কৃতি শিশুবান্ধব তো নয়ই, বরং শিশুর প্রতি উদাসীনতাই এর স্বভাবের অংশ। শিশুর যেখানে বিশেষ যত্ন প্রয়োজন, সেখানে উদাসীনতা বঞ্চনারই শামিল।

ধারাবাহিকে জুটিবদ্ধ হলেন পার্থ-অপর্ণা

এর আগে বিভিন্ন খণ্ড নাটকে পার্থ বড়ুয়া ও অপর্ণা একসঙ্গে কাজ করলেও এবারই প্রথম ধারাবাহিক নাটকে জুটিবদ্ধ হয়ে অভিনয় করেছেন। ইমরাউল রাফাতের রচনা ও পরিচালনায় নাটকের নাম ‘রাব্বু ভাইয়ের বউ’। নাটকে রাব্বু চরিত্রে অভিনয় করেছেন পার্থ বড়ুয়া এবং তার স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন অপর্ণা। এ নাটকে অভিনয় প্রসঙ্গে পার্থ বড়ুয়া বলেন, ‘রাব্বু ভাইয়ের বউ নাটকের মূল কাহিনী কিন্তু অপর্ণাকে ঘিরেই।
আমি মনে করি সবকিছু ঠিকঠাকভাবে চললে এ নাটকটি দিয়েই অপর্ণা তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছতে পারবে।’ অপর্ণা বলেন, ‘পার্থ দা’র সঙ্গে আমার কাজের বোঝাপড়াটা সব সময়ই অনেক ভালো। আমরা দু’জনই চট্টগ্রামের সন্তান বলে এমন হয় কি না আমার জানা নেই। শুটিং চলাকালীন কাজের বাইরেও দাদা সময়টাকে এত উপভোগ করেন যে, সহশিল্পীরাও তাতে অংশ না নিয়ে পারে না। নাটকের গল্প আমাকে ঘিরে হলেও পার্থ দা’রও চমৎকার ভূমিকা রয়েছে এতে।’ আজ থেকে প্রতি শনি, রবি ও সোমবার রাত ৯টায় চ্যানেল নাইনে নাটকটি প্রচার হবে।

যাত্রার শুরুতে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছিল টাইটানিক

বিলাসবহুল টাইটানিক জাহাজের করুণ পরিণতির কথা প্রায় সবারই জানা। ১৯১২ সালের ১০ এপ্রিল ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটন থেকে যাত্রা করার চারদিন পর উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে ডুবে গিয়েছিল জাহাজটি। এতে প্রাণ হারিয়েছিলেন দেড় হাজারেরও বেশি যাত্রী। কিন্তু নতুন তথ্য হলো, সাউদাম্পটন থেকে যাত্রার পর দুটি জাহাজের সাথে ধাক্কা লাগতে গিয়ে অল্পের জন্য রক্ষা পেয়েছিল টাইটানিক।  ১৫ এপ্রিলের ওই মর্মান্তিক ঘটনার ১০২ বছর পর নতুন এ তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। আর তা প্রকাশ হয়েছে একটি চিঠি থেকে। গতকাল শনিবার বিকেলে চিঠিটি নিলামে উঠেছিল। বিক্রি হয়েছে ২৪ হাজার ইউরোয়। (বাংলাদেশী মুদ্রায় ২৩ লাখ ৬৭ হাজার ২৫৩ টাকা প্রায়) টাইটানিকের চিফ ইঞ্জিনিয়ার জোসেফ বেল তার ছেলে ফ্রাঙ্ককে চিঠিটি লিখেছিলেন। ১১ এপ্রিল তিনি চিঠিটি পোস্ট করেন। দুই দিন পর টাইটানিকডুবির ঘটনায় জোসেফও প্রাণ হারান। 

ছেলেকে উদ্দেশ্য করে চিঠিতে জোসেফ লিখেছিলেন-
‘আমরা খুব ভালোভাবেই সাউদাম্পটন থেকে যাত্রা শুরু করেছি। সবকিছু ঠিক আছে। তবে সাউদাম্পটন ছেড়ে আসার সময় দুটি জাহাজের সাথে অল্পের জন্য ধাক্কা লাগেনি। যদি লাগল তবে ভয়াবহ অবস্থার মুখোমুখি হতে হত। তবে কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তোমাকে অনেক অনেক ভালোবাসা।
ইতি
তোমার বাবা জে. বেল’

চিঠিটি নিলামের সময় নিলামদার অ্যান্ড্রু অলরিজ বলেন, যদি টাইটানিক যাত্রার দ্বিতীয় দিনই ওই জাহাজ দুটির সাথে ধাক্কা লাগত তাহলে ইতিহাসটা অন্য রকম হতো। তিনি বলেন, ছয় মাস আগে আমরা ব্রিটেনের এক দম্পতির ফোন পাই। জোসেফ বেল তাদের দুঃসম্পর্কের আত্মীয় বলে জানান। তারা বাড়ির চিলেকোঠায় চিঠিটি পান।

৫ লাখ ডলারের বেশি বিনিয়োগ করলেই নাগরিকত্ব by সৈয়দ সামসুজ্জামান নীপু

অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দেয়া হবে। এক্ষেত্রে পাঁচ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগকারীদের দেয়া হতে পারে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব। আর ৭৫ হাজারের বেশি বিনিয়োগকারীদের দেয়া হবে আবাসিক ভিসা (রেসিডেন্ট ভিসা)। তা ছাড়া বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য দেয়া হবে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কর অবকাশ ও কর মওকুফ সুবিধা। দেয়া হবে কারিগরি জ্ঞান সম্পূর্ণ বিদেশী নাগরিকদের আয়ের পর আয়কর রেয়াত সুবিধাও। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক উচ্চ পর্যায়ের সভায় এ ধরনের প্রণোদনা দেয়ার কথা বলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানিয়েছে।
সূত্র জানায়, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগকারীদের ১০ বছরের ট্যাক্স হলিডে বা কর অবকাশ দেয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে প্রথম ও দ্বিতীয় বছরে ১০০ শতাংশ, তৃতীয় বছরে ৮০ শতাংশ, চতুর্থ বছরে ৭০, পঞ্চম বছরে ৬০, ষষ্ঠ বছরে ৫০, সপ্তম বছরে ৪০, অষ্টম বছরে ৩০, নবম বছরে ২০ ও দশম বছরে ১০ শতাংশ হারে কর মওকুফের প্রস্তাব করা হয়েছে। কর অবকাশের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর প্রাপ্ত লভ্যাংশের (ডিভিডেন্ট) ওপর কর অব্যাহতির বিষয়টিও সরকারের বিবেচনায় রয়েছে। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের রয়্যালিটি, ফ্রি ফো এফডিআই অ্যাকাউন্ট খোলা, এফসি অ্যাকাউন্ট খোলাসহ নানা সুবিধা দেয়ারও প্রস্তাব করা হয়েছে।
জানা গেছে, অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য আমদানিকৃত মূলধনী যন্ত্রপাতির ওপর শুল্ক মওকুফ করারও প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে বাংলাদেশে পাওয়া যায় এমন নির্মাণসামগ্রী ও কাঁচামাল বিদেশ থেকে আনলে সেক্ষেত্রে কোনো শুল্ক রেয়াত পাওয়া যাবে না। অর্থনৈতিক অঞ্চলে শিল্প ইউনিট স্থাপনের পাঁচ বছর পর্যন্ত শুধু কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন বিদেশী নাগরিকের আয়ের ওপর প্রদেয় করের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত রেয়াত দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের বিদেশী ঋণ গ্রহণের সুবিধা দেয়া হবে। বিনিয়োগকারী কোম্পানি কর্তৃক শেয়ার হস্তান্তর থেকে প্রাপ্ত মূলধনী লাভের ওপর কর মওকুফ করার মতো প্রণোদনা দেয়া হবে। বিদেশী শেয়ারহোল্ডার কর্তৃক স্থানীয় শেয়ারহোল্ডার ও বিনিয়োগকারীদের অনুকূলে শেয়ার হস্তান্তরসংক্রান্ত সুবিধা দেয়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেছে সরকার। বিদেশী বিনিয়োগকারী কর্তৃক প্রেরণযোগ্য মুনাফা আবার বিনিয়োগ করলে তা নতুন বৈদেশিক বিনিয়োগ হিসেবে ধরা হবে। কোনো বিনিয়োগকারী যদি পাঁচ লাখ মার্কিন ডলার বা তার বেশি বিনিয়োগ করে তবে তাকে নাগরিকত্ব দেয়া এবং ৭৫ হাজার মার্কিন ডলার বা তার বেশি বিনিয়োগ করলে রেসিডেন্ট ভিসা দেয়ার কথা বিশেষ বিবেচনায় রেখেছে সরকার।
বিদেশী ডেভেলপারদেরও প্রণোদনা দেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ডেভেলপারদের ১০ বছরের কর অবকাশ সুবিধা দেয়া হতে পারে। ১১তম বছরে ৭০ শতাংশ, ১২তম বছরে ৩০ শতাংশ কর অবকাশ সুবিধা মওকুফের চিন্তাভাবনা সরকারের রয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলে ব্যবহারের জন্য যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে বা ক্রয় করবে সে বিদ্যুৎ বিলের ওপর ১০ বছর পর্যন্ত ভ্যাট বা কর মওকুফ করা হতে পারে। ডোমেস্টিক ট্যারিফ এরিয়া (ডিটিএ) থেকে পেট্রলিয়াম দ্রব্যাদি ছাড়া সব ধরনের ক্রয়ের ভ্যাট মওকুফ করা হতে পারে। সেন্ট্রাল ইফুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) স্থাপনের ক্ষেত্রে মোট খরচের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি দেয়ার কথা ভাবা হচ্ছে। এ ছাড়া কাস্টম ডিউটি ও অন্যান্য বিষয়েও বিশেষ প্রণোদনা দেয়া যায় কি না তা ভেবে দেখছে সরকারের নীতিনির্ধারণী মহল।
ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগে জাপান, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ভারত, কোরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগকারীদের আরো আকৃষ্ট করতে সরকার এ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে যাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট এক সূত্র জানায়।

৩৫০০০ শিক্ষকের কান্না by নুর মোহাম্মদ

সারা জীবন তারা শিক্ষার আলো ছড়িয়েছেন। জীবন সায়াহ্নে এসে অর্থকষ্টে হাবুডুবু খাচ্ছেন। চাকরি শেষে অবসর ভাতা পেতে কান্না ঝরছে হাজারো বেসরকারি শিক্ষকের। ভাতা পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করলেও কোন সুখবর পাচ্ছেন না। চাকরি ছাড়ার পর অর্থ-সঙ্কটে দিন কাটাচ্ছেন অনেক শিক্ষক। তারা ভাতা পেতে অবসর বোর্ডে এসে বারবার তাগাদা দিলেও অর্থ সংস্থান না থাকায় তিন বছর আগের করা আবেদনও নিষ্পত্তি করতে পারছে না বোর্ড। রাজধানীর নীলক্ষেতে অবস্থিত অবসর বোর্ডে অবস্থান করে জানা গেছে ভাতা প্রত্যাশী শিক্ষকদের দুর্ভোগ-দুর্দশার কথা। মঙ্গলবার অবসর বোর্ডে ঢুকতেই দেখা গেল বস্তাভর্তি কাগজের মধ্যে বসে আছেন ষাটোর্ধ্ব হালিমা খাতুন। দুই মাস আগে তার স্বামী ক্যানসারে মারা গেছেন। তিন সন্তান রেখে যাওয়া ওই শিক্ষক অবসর সুবিধার টাকার আবেদন করেছিলেন ২০১১ সালের আগস্ট মাসে। হালিমা আক্ষেপ করে বলেন, আমার স্বামী সারাজীবন মানুষকে শিক্ষা দিয়ে গেছেন। অথচ শেষ জীবনে তিনি টাকার অভাবে সঠিক চিকিৎসা নিতে পারেননি। আমিও মনে হয় এখন সংসার চালাতে পারবো না। যশোর আটলিয়া আলিমুল কোরআন দাখিল মাদরাসা শিক্ষক আবদুল হক। তিনি ২০১০ সালে জুলাই মাসে অবসরে যান। আর অবসর ভাতার জন্য আবেদন করেন ২০১২ সালের জুন মাসে। আজ অবধি তার টাকা পাওয়ার কোন লক্ষণ নেই। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে বছরের পর বছর অপেক্ষা এই শিক্ষকদের চোখে ঝরছে কান্না। তাদের বোবা কান্নায় নীলক্ষেত ব্যানবেইস ভবন ভারি হচ্ছে প্রতিদিন।
২৫ বছর শিক্ষার প্রদীপ জ্বালিয়ে অবসর নিয়েছেন সাতক্ষীরা শিক্ষক হালিম উদ্দিন। ২০১১ সালে ফেব্রুয়ারি মাসে আবেদন করে এখন পর্যন্ত এগারোবার ঢাকা এসেও এর কোন কিনারা পাচ্ছেন না। তিনি বলেন, তিন বছরের বেশি সময় ধরে অপেক্ষায় আছি। কবে পাবো জানি না। আজ খোঁজ নিতে এসেছি। অফিস থেকে আমাকে বলা হয়েছে, আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। এই শিক্ষক বলেন, যতদিন চাকরি ছিল বেতন পেয়েছি। আশা ছিল অবসর সুবিধার টাকা পেয়ে সংসারটা সামলানো যাবে। কিন্তু তিন বছর খুব খারাপ কাটছে। টাকা ঋণ নিয়ে সংসারের খরচ চালাচ্ছি। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে এমন অপেক্ষা আর ভাল লাগে না। হালিম উদ্দিনের মতো একই অবস্থা সারা দেশে প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর।

অবসর বোর্ডের সর্বশেষ তথ্যনুযায়ী, ৩০শে জুলাই ২০১৪ পর্যন্ত অবসর বোর্ডে আবেদন জমা পড়েছে ৩৪ হাজার ৬৯৭টি- যা নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজন ১২২২ কোটি টাকার বেশি। প্রয়োজনীয় ঘাটতি পূরণে অর্থ মন্ত্রণালয়কে বারবার চিঠি দিয়েও কোন সুফল পাচ্ছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখানে মূল সমস্যাই অর্থ। চলতি অর্থবছরে বাজেটে ৫০০ কোটি টাকা চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করলেও সাড়া দেননি অর্থমন্ত্রী। বোর্ডের কর্মকর্তা বলছেন, সর্বশেষ ২০১১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আবেদন করা শিক্ষক-কর্মচারীদের চেক দেয়া হয়েছে। একই বছরের মার্চ মাসের আবেদন যাচাই-বাছাই হচ্ছে। মে-জুন-জুলাই মাসে টাকা বোর্ডের ৩৯তম সভায় অনুমোদন হয়েছে। টাকা পেলেই তা ছাড় করা হবে। তবে কবে লাগাদ ছাড়া করা হবে জানতে চাইলে এর কোন সদুত্তর দিতে পারেনি অবসর বোর্ডের কর্মকর্তারা।
তীব্র অর্থ সঙ্কট: অবসর সুবিধা বোর্ডের সহকারী পরিচালক ড. আবু হানিফা বলেন, আমাদের মূল সমস্যা অর্থ সঙ্কট। প্রতি বছর শিক্ষকদের আবেদন বাড়ছে। এর সঙ্গে তাদের টাকার পরিমাণও বাড়ছে। সরকার গত আট বছর আর কোন টাকা দেয়নি। বোর্ডের হিসাবে, প্রতি মাসে গড়ে সারা দেশের এক হাজার এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী অবসরে যান। এরাই সবাই অবসর ভাতার জন্য আবেদন করেন। আবেদন নিষ্পত্তি করতে মাসে প্রয়োজন ৫৬ কোটি টাকা। শিক্ষকদের কাছ থেকে আদায় করা ৪% হারে চাঁদা আর ব্যাংকের ডিপোজিটের সুদ থেকে বোর্ডের প্রতি মাসে আয় হয় ১৭ কোটি টাকা। সে হিসেবে প্রতি মাসে ঘাটতি ৩৮ কোটি টাকা। বছরে ঘাটতি ৪৫৬ কোটি টাকা। এ কারণে শিক্ষকরা আবেদন করে বছরের পর বছর ঘুরছেন, টাকা পাচ্ছেন না। আবু হানিফ বলেন, সরকার যদি অন্য কোন উৎস থেকে এই ঘাটতি পূরণ করার উদ্যোগ নেয় তাহলে আমরা দুই মাসের মধ্যে সব আবেদন নিষ্পত্তি  করে দেবো। এ মুহূর্তে সারা দেশের প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী অবসর ভাতার আবেদন করে অপেক্ষা করছেন। অবসর বোর্ডের সদস্য সচিব আসাদুল হক বলেন, আমাদের এই ঘাটতি পূরণ করতে হলে সরকারকে প্রতি বছর ৪৬৮ কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দিতে হবে। ইতিমধ্যে তিন বছরের আবেদন জমা পড়ে আছে। সব আবেদন নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজন প্রায় ১৩শ’ কোটি টাকা। এই টাকা দিলে প্রতি মাসে আবেদন  নিষ্পত্তি করা সম্ভব। বর্তমানে সারা দেশের সাড়ে ৫ লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন থেকে ৪% হারে প্রতি মাসে ১৭ কোটি টাকা আয় হয় অবসর বোর্ডের। আর্থিক ঘাটতি মেটাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একজন যুগ্ম সচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠিত হয় ২০১২ সালে। ওই কমিটি শিক্ষকদের বেতন থেকে ৮ শতাংশ হারে অর্থ কেটে রাখা অথবা দুই কোটি মাধ্যমিক শিক্ষার্থীর স্কুলে ভর্তির সময় এ খাত বাবদ ৫০ টাকা করে আদায় করার প্রস্তাব করে। এ ব্যাপারে আজ অবধি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। গেল সংসদ অধিবেশনে শিক্ষামন্ত্রী সংসদকে জানান, অবসর ভাতার জন্য ৩২ হাজার ৫৩টি আবেদন অবসর সুবিধা বোর্ডে জমা পড়েছে। এই আবেদন নিষ্পত্তি করতে প্রয়োজন ১ হাজার ১২২ কোটি ৫৭ হাজার ৩৬২ টাকা।
অবসর সুবিধা বোর্ডের বর্তমানে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের ৪ কর্মকর্তাসহ মোট ২৬ জন জনবল রয়েছে। এর মধ্যে একজন সদস্য সচিব ও একজন সহকারী পরিচালক। কর্মকর্তাদের অনেক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এখানে আর ভাল লাগে না। বাবার বয়সের লোকজনকে হয়রানি আর সহ্য হয় না।
সুপারিশের ছড়াছড়ি: দীর্ঘ দিন অপেক্ষা করে কোন কূল কিনার না পেয়ে শিক্ষকরা আসছেন প্রভাবশালীদের সুপারিশ নিয়ে। অনেকেই মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ছাড়াও শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রভাবশালী  কর্মকর্তাদেরও সুপারিশ নিয়ে আসছেন। যশোরের বাঘারপাড়া সিদ্দিকীয়া ফাজিল মাদরাসার শিক্ষক মনজিল মিয়া। তিনি সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেকের সুপারিশ নিয়ে এসেছেন। সুপারিশের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ওই শিক্ষক বলেন, তিন বছর ধরে ঘুরতে ঘুরতে বাধ্য হয়ে আপার (মন্ত্রীর) সুপারিশ নিয়ে এসেছি। এবার আশা করি হয়ে যাবে। কুমিল্লায় বাতিশা উচ্চ বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক শামসুর নাহার রেলমন্ত্রী মজিবুল হকের সুপারিশ নিয়ে আসেন।
হানিফ বলেন, এরকম হাজারো সুপারিশ জমা পড়ে আছে বোর্ডে। এসব সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে হলে সিরিয়াল রক্ষা করা সম্ভব হবে না। সুপারিশ করে আগে টাকা পাওয়া যাবে না। তিনি বলেন, সাধারণ উপায়ে কাজ না হওয়ায় এবং বছরের পর বছর আবেদন ঝুলে থাকায় অনেকে মন্ত্রী-এমপিদের সুপারিশ নিয়েও ছুটে আসছেন। এই তদবির বন্ধ করতে নতুন নিয়ম করেছি। ইদানীং অনেক তদবির কমে এসেছে। মন্ত্রণালয়ে তথ্যানুযায়ী, ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বোর্ড ২০০৫ সাল থেকে অবসরগ্রহণকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধা প্রদানের জন্য শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন থেকে মাসিক ৪ শতাংশ হারে টাকা কেটে রাখা হয়। অবসর শেষে একজন শিক্ষককে এক বছরের জন্য মূল বেতনের তিনগুণ করে অবসর সুবিধা দেয়া হয়। সেই হিসাবে পূর্ণ মেয়াদ চাকরি শেষে একজন সহকারী অধ্যাপক ১৬ লাখ টাকা, প্রধান শিক্ষক ১২ লাখ টাকা এবং সহকারী শিক্ষক ৬ লাখ টাকা অবসর সুবিধা পান। এ ব্যাপারে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, শিক্ষকদের এই ভোগান্তি কমাতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অর্থমন্ত্রণালয়ে বারবার চিঠি দিয়েও বাজেট বাড়াতে পারিনি। টাকা ছাড়া এই সমস্যা সমাধানে বিকল্প কোন পথও নেই বলে জানান মন্ত্রী। পদাধিকার বলে অবসর সুবিধা বোর্ডের চেয়ারম্যান শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম বলেন, এই সঙ্কট দীর্ঘদিনে। শিক্ষক-কর্মচারীদের ভোগান্তি কমিয়ে দ্রুত সময়ে শেষ করার সব ধরনের চেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু অর্থ সঙ্কটের কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না।

উই ওয়ান্ট টু রিপ্লেস বিএনপি : এরশাদ

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, আগামী বছরের মার্চ মাসের মধ্যেই আমরা জাতীয় পার্টি নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত হতে চাই। ১১ জেলার কাউন্সিল হয়েছে। আগামী মার্চ মাসের মধ্যে জেলার সব কাউন্সিল হবে। মার্চ মাসের মধ্যে জাতীয় পার্টি নির্বাচনের জন্য তৈরি হবে এবং দেশ শাসন করবে। আমাদের টার্গেট ১৫১ আসন। মানুষ দুই দলের কাছ থেকে মুক্তি পেতে চায়। আগামী নির্বাচনে আমরা ভালো করতে চাই। বিএনপির আন্দোলন করার শক্তি নাই। নেতৃত্বের কোন্দলের কারণে তারা বিপর্যস্ত। তাদের সেই দুরবস্থার সুযোগ আমরা নিতে চাই। উই ওয়ান্ট টু রিপলেস বিএনপি। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় তিনি রংপুরের বাসভবন পল্লীনিবাসে সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে এ কথা বলেন। দেশের মানুষের এখন নিরাপত্তার অভাব, প্রতিদিন মানুষ খুন জখম হচ্ছে। গণতান্ত্রিক সরকারের বড় দায়িত্ব মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ সরকার ব্যর্থ হয়েছে। বাড়ি দখল হচ্ছে, নদী দখল হচ্ছে। আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা অনেক কমেছে, নানা কারণে, এমন পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশের মানুষ পরিবর্তন চাচ্ছে। এ জন্য আমরা স্লোগান দিয়েছি শান্তির জন্য পরিবর্তন, পরিবর্তনের জন্য জাতীয় পার্টি। আর সে জন্য জাতীয় পার্টির দরকার ১৫১টি আসন। তিনি বলেন, লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে আমরাই প্রতিবাদ করেছিলাম। আমি মুরতাদ দাবি বরে ফাঁসি চেয়েছি। বিএনপি করেনি। সরকার তার ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে আন্দোলনের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। লতিফ সিদ্দিকীর ঘটনা আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তায় আঘাত হেনেছে।
এরশাদ বলেন, দেশের অবস্থা ভালো নয়, মানুষও ভালো নেই। সন্ত্রাস দুর্নীতি ও দলীয়করণে দেশ ছেয়ে গেছে। এর বিপরীতে জনগণের কাছে প্রয়োজন জাতীয় পার্টির। আমরা দলকে সংগঠিত করব। আমরা রংপুরে মিলেমিশে সবাইকে নিয়ে দলকে সংগঠিত করতে চাই। সবাইকে নিয়ে নির্বাচন করতে চাই। তিনি বলেন, বিএনপির কোনো জোরাল আন্দোলন নেই। তারা কথা বলে সময়ক্ষেপণ করছে মাত্র। বিএনপির ওপর মানুষের আস্থা নেই। নির্বাচনের আগে এরশাদ নির্বাচনে না দাঁড়ানোর বিষয়ে বললেও গতকাল তিনি অভিনব তথ্য দিয়ে বলেন, আল্লাহর রহমতে এবার আমি রংপুরের এমপি। এর আগে জেলখানায় ছিলাম। আপনারা দুইবার এমপি করেছেন। আমার ভাই আমার বউকে এমপি করেছিলেন। কিন্তু নানা কারণে কিছুই করা যায়নি। এবার প্রথম আপনারা আমাকে সেই সুযোগ দিয়েছেন। আপনারা সরাসরি আমার ভোটার। আমি আপনাদের ঋণ পরিশোধ করতে চাই। আগামী নির্বাচন হবে আমার শেষ নির্বাচন। সেই নির্বাচনেও আপনারা আমাকে জয়ী করবেন। আমি আপনাদের কাছে এখন প্রতি মাসে সাত দিন থাকব। প্রতি বাড়ি বাড়ি যাবো। আমি আরেকবার সুযোগ চাই।
রংপুর মেডিক্যাল কলেজের সভাপতি হিসেবে দুই দিনের সফরে তিনি রংপুরে আসেন। এ সময় জেলা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক সাবেক এমপি মোফাজ্জল হোসেন মাস্টার, মহানগর আহ্বায়ক সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মোস্তাফিজার রহমান মোস্তফা, জেলা সদস্যসচিব সাবেক এমপি এইচ এম শাহরিয়ার আসিফ, মহানগর সদস্যসচিব এস এম ইয়াসিরসহ এরশাদ অনুমোদিত কমিটির বিপুল নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
মোস্তফা ইয়াসিরকে বাদ না দিলে পদত্যাগ : অপর দিকে বেলা সাড়ে ১১টায় এলজিআরইডি প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা সমর্থিত সাবেক জেলা ও মহানগর কমিটি জাতীয় পার্টি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছে। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বিলুপ্ত জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবুল মাসুদ চৌধুরী নান্টু, মহানগর কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট সালাহ উদ্দিন কাদেরী, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সামসুল ইসলাম, জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক পার্টির সভাপতি শামীম সিদ্দিকী, জাতীয় যুব সংহতির ইউসুফ আহমেদ, শ্রমিক পার্টির সেক্রেটারি রাজু আহমেদ প্রমুখ। এ সময় লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, রংপুরে জাতীয় পার্টিতে স্যারের নেতৃত্ব ও তার পারিবারিক নেতৃত্বকে মেনে নেবো। কিন্তু যারা অতীতে সংবাদ সম্মেলন করে তৃণমূল জাতীয় পার্টি গঠন করেছিল তাদের আমরা মেনে নেবো না। বিশেষ করে মোস্তফা ও ইয়াসিরের নেতৃত্বকে আমরা মানব না। তাদের রাখা হলে আমরা স্যারের কাছে আমাদের পার্টি থেকে অব্যাহতি দেয়ার আবেদন জানাচ্ছি। স্যার যদি না দেন তবে আমরা পদত্যাগ করব।
প্রসঙ্গত, গত ১০ সেপ্টেম্বর এলজিআরইডি প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গাকে প্রেসিডিয়াম পদ থেকে অব্যাহতি দেয়ার পর রংপুর জেলা ও মহানগর কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ওই জেলা ও মহানগর কমিটির সভাপতিও ছিলেন প্রতিমন্ত্রী মসিউর রহমান রাঙ্গা। এ নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষসহ বিভিন্ন ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে আসছে রংপুরে।

কক্সবাজার থেকে থাইল্যান্ড : দাস ব্যবসার নতুন রুট

থাইল্যান্ডের টাকুয়া পা শহরে স্থানীয় সরকারের এক ভবনে এখন আশ্রয় নিয়েছে ৮১ মানুষ। নির্যাতনে ক্ষত-বিক্ষত অনেকের শরীর। তাদের চোখের দৃষ্টিতে শূন্যতা। যে ভয়ঙ্ককর অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে তারা গেছে, সেকথা বলতে গিয়ে গাল বেয়ে নামে চোখের পানি। অনেকেরই ভাবনা জুড়ে বাংলাদেশে ফেলে আসা পরিবার। এদের সবার কাহিনী প্রায় একই রকম। আবদুর রহিমের বয়স ১৮। বন্দী অবস্থায় আরেকটু খাবার চাওয়ায় তার ওপর চড়াও হয়েছিল অপহরণকারীরা। আঘাত সারেনি এখনো, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতে হয় তাকে।

>> আবসার মিয়া : সারাক্ষণ ভাবি কখন বাড়ি ফিরতে পারবো
আবসার মিয়া : সারাক্ষণ ভাবি কখন বাড়ি ফিরতে পারবো
আবসার মিয়া : সারাক্ষণ ভাবি কখন বাড়ি ফিরতে পারবো
আবসার মিয়া : সারাক্ষণ ভাবি কখন বাড়ি ফিরতে পারবো
আবদুর রহিমের বাড়ি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা বগুড়ায়। কাজ খুঁজতে গিয়েছিল ঢাকায়। সেখানে এক লোক তাকে ভালো বেতনে একটা চাকুরির প্রস্তাব দেয়। ঐ লোকের সঙ্গে আবদুর রহিম কক্সবাজার এসে পৌঁছায়। একটা পাহাড়ের উপরে একটা ছোট বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখানে তাকে বেঁধে রাখা হয়। মাদক দিয়ে অজ্ঞান করা হয়। জ্ঞান ফেরার পর আবদুর রহিম নিজেকে আবিস্কার করে এক নৌকায়। সাগরে এই নৌকায় সাত-আটদিন কেটেছে আবদুর রহিমের। তাকে বেদম পেটানো হয়। এরপর তাদের নেয়া হয় থাইল্যান্ডের উপকূলে। সেখানে উপকূলের ম্যানগ্রোভ বনের ভেতর বন্দী শিবিরে আটকে রাখা হয়। আবসারের কাহিনিও একই। তাকেও চাকুরি প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। টেকনাফে এক পাহাড়ের ধারে অপেক্ষা করছিলেন। হঠাৎ তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়। মুখে কাপড় গুঁজে দেয়া হয়। এরপর মারধোর করে নৌকায় তোলা হয়। আইয়ুব ছিলেন চট্টগ্রামের দিনমজুর। কাজ খুঁজতে থাকায় এক লোক তাকে কক্সবাজার যাওয়ার পরামর্শ দেয়। একইভাবে তাকেও সেখানে অপহরণ করে নৌকায় তোলা হয়। নৌকায় আইয়ুব বার বার জানতে চেয়েছেন, তাকে কোথায় নেয়া হচ্ছে। তখন সেখানে অপহরণকারীরা তাকে হুমকি দেয়, মুখবন্ধ না রাখলে তাকে হত্যা করা হবে।
জঙ্গলের বন্দী শিবির
এই লোকগুলো যে শেষ পর্যন্ত থাইল্যান্ডের জঙ্গলের বন্দীশিবির থেকে মুক্তি পেয়েছেন, তার নেপথ্য নায়ক স্থানীয় জেলা প্রশাসনের প্রধান মানিট পিয়ানথিয়ং। থাইল্যান্ডের টাকুয়া পা উপকূলজুড়ে মানবপাচার চক্রের তৎপরতা সম্পর্কে ভালোই জানেন তিনি। মিস্টার পিয়নথিয়ং জানান, এই চক্রকে নির্মূল করার জন্য জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন তারা। এজন্যে স্থানীয়দের সাহায্য চাইছেন তারা। বাংলাদেশিদের এই বড় গ্রুপটির অবস্থান সম্পর্কে স্থানীয়রাই তাকে সতর্ক করেছিল। প্রথম গ্রুপে তারা উদ্ধার করেন ৩৭ জন। গত ১১ই অক্টোবর উদ্ধার করেন ৫৩ জনকে। আর এবার সর্বশেষ অভিযানে উদ্ধার করেছেন ৮১জনকে। যারা এদের আটকে রেখেছিল তাদের দুজনও ধরা পড়েছে। এদের একজনকে মুক্তি পাওয়া বাংলাদেশিরা সবচেয়ে নিষ্ঠুর বলে বর্ণনা করেছেন। তার নাম কেকে। বন্দী এই বাংলাদেশিদের জঙ্গলের ভেতর একটা শিবির থেকে আরেকটা শিবিরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল যাতে তাদের অবস্থান গোপন রাখা যায়। মিস্টার পিয়নথিয়ং এর ধারণা, এদের দাস হিসেবে বিক্রির পরিকল্পনা চলছিল।
একালের ক্রীতদাস
থাইল্যান্ডের আন্দামান উপকূলে গত কয়েক বছর ধরে দেখা গেছে মানুষের নির্যাতন-লাঞ্ছনার ভয়ঙ্কর সব দৃশ্য। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মূলত মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীরাই এর শিকার হয়েছেন। ২০০৯ সালে থাইল্যান্ডের নৌবাহিনী রোহিঙ্গা শরণার্থী বোঝাই নৌকা টেনে নিয়ে ছেড়ে দিয়ে আসছিল সাগরের মাঝখানে। এসব নৌকা স্রোতের টানে ভাসতে ভাসতে চলে গেছে বিভিন্ন দিকে। শত শত মানুষ সাগরে ডুবে মারা গেছেন বলে ধারণা করা হয়। আর অতি সম্প্রতি থাই পুলিশ এবং সামরিক সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে যে তারা থাইল্যান্ডের উপকূলে এসে পৌঁছানো রোহিঙ্গাদের বিক্রি করে দিয়েছে মানব পাচারকারীদের কাছে। থাইল্যান্ডের বিভিন্ন সরকার এই মানব পাচারকারীদের দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিভিন্ন সময়। কিন্তু আন্দামান উপকূলের কাছে থাই জঙ্গলের বন্দী শিবির থেকে ১৭১ জনকে উদ্ধারের ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল এই সমস্যা এখনো কতটা প্রকট। সুযোগ পেয়ে রোহিঙ্গাদের শোষণ-নির্যাতনের মাধ্যমে যার শুরু, তা এখন এক সুসংগঠিত দাস ব্যবসায় রূপ নিয়েছে।
সূত্র : বিবিসি।

ডাস্টবিনে পাওয়া ‘ঐশ্বর্য’ এখন স্কুলে ভর্তির অপেক্ষায় by আমিনুল ইসলাম

২০১০ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা এলিফ্যান্ট রোডের একটি ডাস্টবিন। যেখানে শত মানুষের উৎসুক চোখ কাগজে মোড়ানো একটি পোটলার দিকে। কী আছে এর মধ্যে। পোটলাটি মাঝে মধ্যে নড়েচড়ে উঠছে। হঠাৎ লোকজন দেখাতে পান তার এক কোনায় বেরিয়ে আছে ছোট্ট একটি নবজাতকের মুখ। চোখ দুটো মাঝে মধ্যে মিট মিট করে খুলছে। আবার বন্ধ করে দিচ্ছে। শত মানুষের দৃষ্টি তার দিকে থাকলেও কেউ শিশুটিকে কোলে তুলে নিচ্ছে না। ঠিক ওই সময় নিউ মার্কেট থেকে শপিং করে ফিরছিলেন শওকত আরা মিলকী ওরফে আনা নামের এক গৃহবধূ। অন্যদের মতো তিনিও উঁকি দিলেন ডাস্টবিনের দিকে। দেখলেন কাগজে মোড়ানো একটি পোটলার মধ্যে নবজাতক একটি শিশু ক্ষীণ স্বরে কাঁদছে। শত মানুষের মাঝে তিনি কোলে তুলে নিলেন শিশুটিকে। বাসায় নিয়ে পরম যতেœ লালন পালন করতে শুরু করলেন। নাম দিলেন ‘ঐশ্বর্য’। প্রকৃত বাবা-মায়ের সন্ধান আজো পাওয়া না গেলেও শওকত আরা মিলকী ও তার স্বামী ফজলুল বাসেত খান মিলকী এখন ঐশ্বর্যের বাবা-মা। ডাস্টবিনে কুড়িয়ে পাওয়া সেই ঐশ্বর্য নতুন বাবা-মায়ের সংসারে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠছে। সাড়ে চার বছরের ঐশ্বর্য এখন স্কুলে ভর্তির অপেক্ষায়। তবে কোন স্কুলে ভর্তি হবে ঐশ্বর্যÑ তাই নিয়ে ভাবছে মিলকী পরিবার। ঐশ্বর্যকে কুড়িয়ে পাওয়ার সময় ব্যবসায়ী মিলকী পরিবার যতটা সচ্ছল ছিলেন সময়ের ব্যবধানে সেই সচ্ছলতায় কিছুটা ভাটা পড়েছে। বিশেষ করে শেয়ারবাজারের ক্রামাগত পতনে তার অর্থিক অবস্থা এখন আর আগের মতো নেই। তাই যত দুশ্চিন্তা তার।
ফজলুল বাসেত খান নয়া দিগন্তকে বলেন, ‘ঐশ্বর্যকে অনেক স্বাচ্ছন্দ্যের সাথে বড় করা হয়েছে। অভাব কী জিনিস তাকে বুঝতে দেয়া হয়নি। সে জানে তাকে ঢাকার বড় কোনো স্কুলে ভর্তি করা হবে; কিন্তু বর্তমানে আমার অর্থিক অবস্থা আগের মতো সচ্ছল নয়। যার কারণে নামী-দামি স্কুলে ভর্তি করার জন্য ডোনেশন বা ভর্তি ফি দেয়ার মতো সামর্থ্য এই মুহূর্তে হারিয়ে ফেলেছি’। তিনি বলেন, বিবেকের সাথে অনেক যুদ্ধ করেছি। ভেবেছিলাম, কাউকে কিছু না জানিয়ে যেভাবে পারি মেয়েটিকে বড় করব; কিন্তু সেটা করতে যথেষ্ট কষ্টের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যার কারণে ঐশ্বর্যকে বেড়ে উঠতে সহযোগিতা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

>>এখনকার মা শওকত আরা মিলকীর সাথে ঐশ্বর্য : ফাইল ছবি
ফজলুল বাসেত বলেন, ঐশ্বর্য স্বাভাবিক শিশুদের মতো নয়। সে অনেক ভাগ্যবতী। তাকে এক নজর দেখতে তার খোঁজ-খবর নিতে অনেক হৃদয়বান ব্যক্তি ছুটে এসেছেন। তাকে একটু কোলে তুলে নিতে বাসায় এসেছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও। তিনি ঐশ্বর্যকে কোলে নিয়ে প্রায় ৪৫ মিনিট কথা বলেছেন। ঐশ্বর্যকে নিয়ে একটি জাতীয় পত্রিকায় ‘দেখেছি এক ঐশ্বর্য’ শিরোনামে একটি কলামও লিখেছেন। শিশুটিকে নিয়ে কথা বলেছেন দেশের আরো এক সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানও। মৃত্যুর আগে তিনি ঐশ্বর্যকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে যান। এমন ভাগ্য ক’জন শিশুর কপালে জোটে।
ফজলুল বাসেত বলেন, তারা পুরান ঢাকার বকশীবাজারের ১৮/২ নম্বর বাসায় বাস করছেন। ঐশ্বর্য ছাড়াও তার দুই সন্তান রয়েছে। ঐশ্বর্যকে পাওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে কলেজপড়–য়া বড় মেয়ে ডিবি লটারি পেয়ে আমেরিকা চলে যায়। ছেলেটি আইকম পড়ছে। আর ঐশ্বর্য সাড়ে চার বছর অতিক্রম করে এখন স্কুলে ভর্তির অপেক্ষায়। পুরনো স্মৃতি মনে করে তিনি বলেন, যে দিন ঐশ্বর্যকে পাওয়া যায় সে দিন তিনি ছিলেন ব্যবসায়িক কাজে অফিসে। তার স্ত্রী রাস্তার ওই ডাস্টবিনের কাছে দাঁড়িয়ে তাকে ফোনে বলেন, ‘কারা যেন ফুটফুটে একটি নবজাতক শিশুকে কাগজে মুড়িয়ে ডাস্টবিনে ফেলে গেছে। এখানে অনেক মানুষ শিশুটিকে দেখছে; কিন্তু কেউ তুলে নিচ্ছে না। আমি কি শিশুটিকে বুকে তুলে নিবো?’ আমি খুব বেশি সময় নিইনি। তাকে বলেছিলাম ‘তুমি শিশুটিকে কোলে নিয়ে নিকটস্থ পুলিশের সাথে যোগাযোগ করো।’ তাই করলেন শওকত আরা মিলকী। কিছু সময়ের মধ্যে ফজলুল বাসেত খান মিলকীও থানায় পৌঁছেন। সেখানে লিখিত দিয়ে তার পর শিশুটিকে বাসায় নিয়ে যান। তিনি বলেন, শিশুটিকে নিয়ে বাসায় গেলে তার দুই সন্তান রাগে গাল ফুলিয়ে রাখে। ইউনিভার্সিটিতে পড়া মেয়ে ও স্কুলপড়–য়া ছেলে জানতে চায় ‘একে কী পরিচয় দেবে’? তাদের বললাম আজ থেকে এই শিশুটিও আমার একটি সন্তান। সেই থেকে ঐশ্বর্য তাদের সন্তান হয়ে বড় হচ্ছে। মা-বাবাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না। এমনকি বড় দুই ভাই-বোনের প্রিয় ছোট বোন হয়ে ওঠে ঐশ্বর্য।

ভারত-বাংলাদেশ বন্ধুত্ব প্রাকৃতিক : এ পি জে আবদুল কালাম

বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বকে ন্যাচারাল বা প্রাকৃতিক হিসেবে উল্লেখ করে ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট এ পি জে আবদুল কালাম বলেন, দেশ দুটোকে এগিয়ে যেতে হলে গ্রামীণ অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করতে হবে। ভারত ইতোমধ্যে তা করছে। বাংলাদেশকেও একই রকমের উন্নয়ন ভাবনার পরামর্শ দেন তিনি।  বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে  আবদুল কালাম মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এমসিসিআই) ১১০ বছর উদযাপন অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। এমসিসিআই প্রেসিডেন্ট রোকেয়া আফজাল রহমান এতে সভাপতিত্ব করেন। প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বক্তব্য রাখেন  বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল  আহমেদ ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা গওহর রিজভী। বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্ক প্রাকৃতিক উল্লেখ করে আবদুল কালাম বলেন, এক দেশের সাথে আরেক দেশের মেলবন্ধন পুরনো।  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিংবা কাজী নজরুল ইসলাম  দু’দেশেরই সম্পদ। স্যার জগদীশ চন্দ্র বসুও  অবিভক্ত ভারবর্ষের মুখোজ্জ্বল করেছেন।

ক্ষুদ্রঋণের মাধ্যমে  মানুষকে এগিয়ে নেয়ার শক্তি জোগাচ্ছেন ড. মোহাম্মদ ইউনূস।
তিনি বলেন, সাহিত্য-সঙ্গীতে আমাদের যেরকম মেলবন্ধন রয়েছে তেমনি সংস্কৃতিগত বন্ধনও দৃঢ়।  ‘ট্রাইবাল’রা ভারত ও বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে বৈচিত্র্য এনেছেন। তিনি বলেন, সুন্দরবন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে অবস্থান  করছে। এ  ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট দু’দেশেরই সম্পদ। আছে বঙ্গোপসাগর। দু’দেশের মানুষে মানুষে ভালোবাসাও অনেক পুরনো  বলে জানান আবদুল কালাম। বলেন, আমরা সব সময়ই একে অন্যের সহযোগী, বাংলাদেশের উন্নয়ন হোক; এটা আমার প্রত্যাশা। বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে একের পর এক বন্ধ করে  দেয়া পাটকলই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা ও সম্ভাবনা জাগাতে পারে বলে  মনে করেন আবদুল কালাম। পাটশিল্প বিষয়ে একজন ব্যবসায়ী প্রশ্ন করলে উত্তরে কালাম বলেন, আপনার পরিকল্পনা কি?  পরিকল্পনা না থাকলে অর্থনীতির চাকা ঘুরবে না; সম্ভাবনাও জাগানো যাবে না।
তিনি বলেন, পাটশিল্প বাংলাদেশ ও ভারতের জন্য অপার সম্ভাবনাময় খাত। এ খাতকে আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় অনেক দূর এগিয়ে নেয়া সম্ভব। সন্ত্রাস হটিয়ে শান্তি নিশ্চিতের বিষয়ে সাবেক তথ্যমন্ত্রী আবুল কালাম আজাদের প্রশ্নের জবাবে আবদুল কালাম বলেন,  অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারলে সন্ত্রাস  নিচে নেমে যাবে। অর্থনৈতিক ভারসাম্য নিশ্চিত করতে না পারলে সমাজে অসন্তোষ বাড়ে; বিশ্বজুড়ে অসন্তোষ পর্যালোচনা করলেও এটা  বোঝা যায়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক অসন্তোষ নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে  তিনি বলেন, আপনি জনগণের কাছে ফিরে যান; তাদের প্রত্যাশার সাথে নিজেকে মেলান। তাহলে এর সমাধান হয়ে যাবে। আপনি যদি ঠিক হয়ে যান, তাহলে জগতের সব ঠিক। তবে কিছু সমস্যা আছে যার সমাধান সময়সাপেক্ষ। এ জন্য তিনি ব্রিটিশ শাসনকে ‘দায়’ দিতে চান।
গ্রামীণ অর্থনীতির দিকে সবাইকে ফেরানোর তাগিদ দিয়ে ভারতের এ সাবেক প্রেসিডেন্ট বলেন, তিনটি বিষয়ে সংযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। প্রথমত, অবকাঠামোগত সংযোগ। এ সংযোগ বৃদ্ধিকে আমি সবার ওপরে রাখছি, কারণ গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য বাস, রেল, হাসপাতাল ও শিক্ষা সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। একই সাথে ুদ্রঋণ, মাঝারি শিল্পকে উৎসাহ দিতে হবে। তাহলে তারা এগিয়ে আসতে পারবেন।
দ্বিতীয়ত, ইলেকট্রিক অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল সংযোগ। এর মাধ্যমে গ্রামের মানুষকে মোবাইল নেটওয়ার্ক, ইন্টারনেট সুবিধা, টেলিমেডিসিন, বিদ্যুৎ সুবিধা এবং অন্যান্য জ্বালানি সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। মোবাইল সুবিধা ইতোমধ্যে বাংলাদেশ নিশ্চিত করতে পেরেছে।  তৃতীয়ত,  জ্ঞান সংযোগ।  গ্রাম-উপশহরগুলোতে গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। এ শিক্ষা হবে এমন যা তার জীবনে কাজে লাগে। এ জন্য আমি বলে থাকি একজন লোকের মাস্টার্স পাস করার চেয়ে তার কর্ম সহযোগী একটা ডিপ্লোমার অনেক বেশি গুরুত্ব। চাকরিদাতাদেরও সেটি বিবেচনায় আনতে হবে।
আবদুল কালাম উদাহরণ টেনে বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়ন নিয়ে আমি যে কথা বললাম, সেটি আপনাদের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণও হতে পারে। চলুন আমরা একটা পরিকল্পনা দেখে নিতে পারি। খুলনাকে আমি সে জন্য নির্বাচিত করেছি। খুলনা অঞ্চলের মাছশিল্প ব্যাপক এগিয়েছে। এটা গ্রামীণ অর্থনীতিতে সমৃদ্ধ করেছে। এর সাথে সেখানে পাট ও বাঁশশিল্পকে ঘিরেও অনগ্রসর মানুষ অগ্রসর হতে পারেন। সেখানকার স্থানীয় এ শিল্পকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে পুরনো ধারণা থেকে বের হয়ে এর সাথে প্রযুক্তির সংযোগ ঘটাতে হবে। তাহলে বিশ্ববাজারে এর কদর বাড়বে।  খুলনা অঞ্চলে বিশ্বের বৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট রয়েছে। এটাকে নিয়ে সেখানে ইকো ট্যুরিজমের প্রসার ঘটানো সম্ভব। এ ধরনের  ব্যবসার জন্য উদ্যোক্তা দরকার; যারা  নতুন কিছু করবেন। 
ব্যবসায়ী কিংবা রাজনৈতিক নেতা সবারই ভিশন থাকতে হবে
আবদুল কালাম বলেন, আপনার একটা লক্ষ্য থাকতে হবে- আপনি ব্যবসায়িক নেতা হোন কিংবা রাজনৈতিক নেতা। সবার জন্যই এ কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। আমার বিশ্লেষণে দেখেছি একজন নেতার সাফল্যের জন্য বেশ কয়েকটি গুণ থাকা খুবই জরুরি।
এক. আপনার ভিশন থাকতে হবে সংগঠনকে সংগঠিত করার। দুই. আপনার কর্মীদের মধ্যে ভিশন ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হতে হবে। তিন. আন এক্সপ্লোরড পথে নেতৃত্বের পথযাত্রা। চার. সফলতা ও ব্যর্থতাকে  ব্যবস্থাপনার মতো নেতৃত্ব। পাঁচ. সব ধরনের কাজে স্বচ্ছতা। ছয়.  সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা  এবং সাত. নৈতিকতা ও সততার সাথে সাফল্যের পথে যাত্রা।
আবদুল কালাম বলেন, একজন সফল ব্যবসায়ীর জন্য তার কর্মীরা বড় শক্তি ‘যদি সে কর্মী তার কাজের পরিবেশ পান, তার  কর্মস্থল হয় আনন্দময়’। তার ব্যবসায়িক নেতৃত্ব হয় সৃজনশীল, তাহলে সে প্রতিষ্ঠান এগোবেই। তিনি বলেন, যদি ব্যবসায়িক নেতা সৃজনশীল ও উদ্ভাবনী হয়ে তার কর্মীদের সন্তোষজনক পরিবেশ নিশ্চিত করে, সততার সাথে ব্যবসায় পরিচালনা করে গ্রাহকের জন্য গুণগত মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদন করে আস্থা আনতে পারেন তাহলে তিনি তো সফল হবেন।
বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ
বিজ্ঞানী আবদুল কালাম মনে করেন, বিশ্বের সামনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।  যেগুলো উৎরে যেতে না পারলে সঙ্কট বাড়বে। এর মধ্যে তিনি সবার ওপরে রাখছেন দারিদ্র্যকে। আছে নিরাপত্তা, বৈশ্বিক উষ্ণতা, জলাবায়ুর পরিবর্তন,  নিরাপদ খাবার পানি, গ্রিন এনার্জি নিশ্চিত করা, সম্পদের সুষম বণ্টন এবং  সবার জন্য গুণগত মানসম্পন্ন শিক্ষা ও মূল্যবোধের সুরক্ষা।  এ জন্য তিনি বিশ্বনেতাদের একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এটা কোনো একটি জাতির বা দেশের সমস্যা বা সঙ্কট নয়' সারা দুনিয়ার সঙ্কট।  এ সঙ্কট কাটিয়ে ওঠার জন্য আমাদের সবাইকে একসাথে কাজ করতে হবে। আবদুল কালাম বলেন, বিশেষ করে সার্ক অঞ্চলের মানুষকে একসাথে কাজ করতে হবে। এখানকার ২৫ শতাংশ মানুষ  বয়সে তরুণ।