Showing posts with label শিক্ষাঙ্গন. Show all posts
Showing posts with label শিক্ষাঙ্গন. Show all posts

Tuesday, August 18, 2026

এবার মোদি সরকারের বিরুদ্ধে নতুন লড়াই, উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গ

‘তেলাপোকা’ আন্দোলনে নয়া কর্মসূচির লক্ষ্য সরকারি স্কুলঃ ভারতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে আলোচিত ‘ককরোচ’ বা ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন এবার সরকারি স্কুলগুলোর দুরবস্থা নিয়ে নতুন কর্মসূচি শুরু করেছে। তবে এই কর্মসূচি শুরুর মধ্যেই পশ্চিমবঙ্গে এক আন্দোলনকর্মীর বাবার মৃত্যুর ঘটনায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।

‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা সিজেপি নামের এই চাপসৃষ্টিকারী সংগঠন সম্প্রতি ভারতের শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগে ভূমিকা রাখার দাবি করে। ৩৭ দিনের অবস্থান কর্মসূচির পর দেশজুড়ে সরকারবিরোধী তরুণদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে গত জুলাইয়ে তিনি পদত্যাগ করেন।

এবার সংগঠনটির নতুন কর্মসূচির নাম ‘ফিক্স দ্য স্কুলস’। এর আওতায় সমর্থকদের নিজ নিজ এলাকার সরকারি স্কুল পরিদর্শন করে সেখানকার অবস্থা যাচাই করতে বলা হয়েছে। বিশেষ করে নিরাপদ পানীয় জল, কার্যকর শৌচাগার, বিদ্যুৎ, ব্যবহারযোগ্য শ্রেণিকক্ষ, স্কুলের নিরাপত্তা, মধ্যাহ্নভোজ এবং শিক্ষকদের উপস্থিতির বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

গত ১৩ আগস্ট পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শনে যান ২৬ বছর বয়সী আবদুল হাফিজ। ওই স্কুলেই একসময় পড়াশোনা করেছিলেন তিনি। অভিযোগ রয়েছে, স্কুল পরিদর্শনের কয়েক ঘণ্টা পর স্থানীয় বিজেপি কর্মীরা তার বাড়িতে হামলা চালায়। হামলায় হাফিজ ও তার বাবা মোহাম্মদ মাফিক আহত হন। দুই দিন পর ৫১ বছর বয়সী মাফিক মারা যান।

তবে পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি নেতৃত্ব হামলাকারীদের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছে এবং ঘটনার তদন্তের আশ্বাস দিয়েছে। বাবার মৃত্যুর পরও আবদুল হাফিজ জানিয়েছেন, উন্নত শিক্ষার দাবিতে তাদের আন্দোলন বন্ধ হবে না।

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, শুধু ভালো স্কুলের দাবি জানানোর কারণে মানুষের ওপর হামলা ও হত্যার ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।

এদিকে রাজস্থানের আলওয়ার জেলায় স্কুলে অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার ও পানীয় জলের দাবিতে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন সংগঠনের এক নেতা। স্থানীয় কর্মকর্তারা পরে এসব দাবি মেনে নেওয়ার কথা জানান।

তবে রাজস্থান সরকার সরকারি স্কুলে বহিরাগতদের প্রবেশ এবং ছবি বা ভিডিও ধারণের ওপর নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। শিক্ষার্থীদের গোপনীয়তার কথা উল্লেখ করে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও আন্দোলনকারীরা এটিকে তাদের কর্মসূচি ঠেকানোর চেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

শিক্ষাবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের অনেক সরকারি স্কুলে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও শিক্ষার নিম্নমানের মতো সমস্যা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে ‘তেলাপোকা’ আন্দোলন এসব বিষয়কে নতুন করে জাতীয় আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

তবে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংগঠনটির কর্মীরা রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হওয়ায় তারা হামলা ও সহিংসতার ঝুঁকিতে রয়েছেন। তা সত্ত্বেও সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন, বাধা যতই আসুক সরকারি স্কুলগুলোর জবাবদিহি ও সংস্কারের দাবিতে তাদের আন্দোলন চলবে।

এবার মোদি সরকারের বিরুদ্ধে নতুন লড়াই, উত্তপ্ত পশ্চিমবঙ্গ
ভারতের নয়াদিল্লিতে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে অবস্থান ধর্মঘট চলাকালে ২০২৬ সালের ১৯শে জুলাই তেলাপোকা জনতা পার্টির (সিজেপি) সমর্থকরা স্লোগান দিচ্ছেন এবং ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে মোবাইল ফোন নাড়াচ্ছেন। রয়টার্স

Sunday, May 10, 2026

‘বুলিংয়ের শিকার’ হয়ে মাস্টার্স না করেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়েন তরুণী, কী ঘটেছিল by নাজনীন আখতার

‘ঘটনাগুলো আমাকে এত তাড়া করত, আমি কাঁদতাম। আমার ক্লাসে যেতে ইচ্ছা করত না। যৌন হয়রানি নিয়ে অনেকে কথা বলেন। কিন্তু বুলিং-গসিপের মতো মানসিক হয়রানির ভয়াবহতা ততটা গুরুত্ব পায় না।’

কথাগুলো বলেছিলেন এক তরুণী (২৬)। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাঁর অভিযোগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়ার সময় তিনি কিছু সহপাঠীর মাধ্যমে বুলিংয়ের শিকার হয়েছিলেন। কিন্তু কোনো প্রতিকার পাননি।

তরুণী বলেন, তাঁর অভিজ্ঞতা এতটাই ভীতিকর ছিল যে অনার্সের পর তিনি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করেননি। এর পরিবর্তে চাকরিতে যোগ দেন। প্রায় এক বছর চাকরি করেন। মাস্টার্স করার জন্য গত মাসে তিনি বিদেশে চলে যান।

দেশে থাকাকালে ভুক্তভোগী তরুণী এই প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। তিনি ‘বুলিংয়ের শিকার’ হওয়ার বিবরণ দিয়েছিলেন। বিদেশে যাওয়ার পর সম্প্রতি হোয়াটসঅ্যাপে তাঁর সঙ্গে আবার কথা হয়।

ওই তরুণী বলেন, নারীর প্রতি যৌন হয়রানিকে যতটা গুরুত্ব দেওয়া হয়, এ নিয়ে লোকজনকে যতটা প্রতিবাদী হতে দেখা যায়, বুলিং-গসিপের মতো মানসিক হয়রানি-পীড়নের ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহপাঠীদের বুলিং-গসিপের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলে জানান ওই তরুণী। তিনি বলেন, মনোবিদের কাছে গিয়ে ছয় থেকে সাতটি কাউন্সেলিং সেশন নিতে হয়েছে তাঁর। তবে তাঁর এই মানসিক হয়রানির বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের কাছে গুরুত্ব পায়নি।

তরুণী বলেন, ‘এটা (বুলিং) সেখানে শাস্তিযোগ্য অপরাধ নয়। অথচ বুলিদের (হেনস্তাকারী) কারণে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করতে পারলাম না।’

‘ওদের সঙ্গে আর পড়ব না’

ভুক্তভোগী তরুণী রাজধানীর একটি নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে এসএসসি-এইচএসসি পাস করেন। তাঁর মা–বাবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। ২০১৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তি হন।

তরুণী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভিন্ন ভিন্ন মানসিকতার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি সবার সঙ্গে মেশার চেষ্টা করতেন। তবে কারও সঙ্গেই খুব বেশি ঘনিষ্ঠতা হয়নি। এর মধ্যে একটি গ্রুপ হয়ে ওঠে ‘এলিট’ (প্রভাবশালী)। এই গ্রুপে মূলত ছেলেরাই ছিলেন। তাঁরা পড়াশোনায় ভালো ছিলেন। পারিবারিকভাবে সচ্ছল। তাঁরা উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের সন্তান। তাঁদের সঙ্গে তাঁর মেশা কম হতো।

২০২০ সালে করোনা মহামারিকালে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছোট কয়েকটি গ্রুপ তৈরি হয় বলে জানান তরুণী। তিনি বলেন, তখন কারও কোনো কাজ ছিল না। ফেসবুকে কাউকে না কাউকে নিশানা করে বুলিং করা হতো। কোভিডের পর সরাসরি ক্লাস শুরু হয়। তখনো এসব বুলিং থামেনি। কারও মধ্যে ‘বসিং’ (হুকুমবাজি) প্রবণতা বেশি ছিল। কাকে পশ্চিমা পোশাকে মানায় না, কার পোশাক পরার ধরন ভালো না, কে কোন সহপাঠীদের সঙ্গে প্রেম শুরু করেছে—এসব নিয়ে ক্লাসে গসিপ (পরচর্চা) চলত। সেই সঙ্গে চলত ব্যাকবাইটিং (কারও অনুপস্থিতিতে নিন্দা করা)।

তরুণীর ভাষ্য, তিনি খেয়াল করলেন, যা তিনি বলেননি, তা নিয়ে তাঁকে দোষারোপ করা হচ্ছে। বুলিং করা হচ্ছে। যে গ্রুপটা এলিট ছিল, সেই গ্রুপের ছেলেরা ছিল বুলি টাইপের। তিনজন ছেলে বেশি বুলি ছিলেন। তাঁরা গসিপও করতেন বেশি। তাঁরা নারীবিদ্বেষী মন্তব্য করতেন খুব। বডি শেমিং, স্লাট শেমিং করতেন। একজন ছেলে কথা বলার সময় বাজে দৃষ্টিতে তাকাতেন। একবার একজন শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে স্পর্শ করে ‘বেখেয়ালের’ অজুহাত দিতে ‘সরি’ বলেছিলেন।

বছর দুয়েক পর এই ‘এলিট’ গ্রুপের তুলনামূলক ‘নিরীহ’ একটি ছেলের সঙ্গে ভালো লাগার সম্পর্ক গড়ে ওঠে বলে জানান তরুণী। সম্পর্কটিকে তিনি বর্ণনা করেন ‘সিচুয়েশনশিপ’ হিসেবে। তিনি বলেন, সম্পর্কটিকে দীর্ঘ বা স্থায়ী করার ক্ষেত্রে তাঁরা কেউ কারও প্রতি প্রতিশ্রুতবদ্ধ ছিলেন না। শুরুতে তাঁরা বলেছিলেন, সম্পর্ক ভেঙে গেলে তাঁরা পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন। সম্পর্কের এক বছরের মধ্যে ছেলেটি সাবেক প্রেমিকার সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন। তখন তিনি (তরুণী) সম্পর্কটি ভেঙে দেন।

তরুণীর ভাষ্য, এরপর দেখলেন, তিনি ক্লাসে গেলে অনেকে ফিসফিস করেন। তিনি বুঝতে পারতেন, তাঁকে নিয়েই কিছু বলা হচ্ছে। যাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ভেঙে গেছে, সেই ছেলে, তাঁর বন্ধুসহ কিছু সহপাঠী মিলে তাঁকে নানান ধরনের মন্তব্য করে কোণঠাসা করে ফেলেন। সে সময় তিনি নিজেকে লুকিয়ে রাখতেন। ক্লাসে যেতে ইচ্ছা করত না। পড়াশোনা করতে পারতেন না। পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে তিনি দুশ্চিন্তায় ভুগতে শুরু করেন।

তরুণী বলেন, ‘আমি কতটা অসুস্থ হয়ে যাচ্ছিলাম, বোঝাতে পারব না। মাস্টার্সে ভর্তি হয়ে দুটি ক্লাস করে আর যাইনি। মা–বাবা অবাক হয়েছিলেন। তাঁদের বলেছি, আমি “বুলিড” হয়েছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ওদের সঙ্গে আর পড়ব না।’

শিক্ষক যা বললেন

তরুণীর অভিযোগ নিয়ে কথা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগটির শিক্ষক ও তৎকালীন স্টুডেন্ট কাউন্সেলরের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, যাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তাঁদের ডেকে তিনি কথা বলেছিলেন। অন্য সহপাঠীদের সঙ্গেও কথা বলেছিলেন। তাঁদের কথা ছিল, ‘ব্রেকআপ’ হওয়ার কারণে মেয়েটি বিষণ্ন ছিল।

ওই শিক্ষক বলেন, ‘মেয়েটি যে ধরনের অভিযোগ করেছিল, তা প্রমাণ করা কঠিন। ফলে মেয়েটিকে আমি মানসিকভাবে শক্ত হওয়ার জন্য বুঝিয়েছিলাম। মেয়েটি অন্তর্মুখী। সে তার কষ্টের কথা সেভাবে শেয়ার করতে পারত না।’

বুলিংয়ের মতো হেনস্তার বিরুদ্ধে কি কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সুযোগ নেই—এমন প্রশ্নে ওই শিক্ষক বলেন, ব্যবস্থা আছে। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হতে হবে। শুরুতে তিনি মেয়েটিকে লিখিতভাবে অভিযোগ দিতে বলেছিলেন। পরে মেয়েটি বিভাগের প্রধানের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তখন অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের মাস্টার্স পরীক্ষা হয়ে গেছে।

তরুণী বলেন, অনার্স ও ইন্টার্নশিপ শেষে তিনি প্রথম মৌখিক অভিযোগ করেন। পরে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের মাস্টার্স পরীক্ষার পর লিখিত অভিযোগ দেন। তিনি পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন। এর মধ্যে তিনজনের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি এবং দুজনের বিরুদ্ধে মানসিক ও মৌখিক হয়রানির অভিযোগ দেন। তাঁকে বলা হয়েছিল, একটা কমিটি হয়েছে। মাস্টার্সের ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি। কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হলে এখনো ব্যবস্থা নিতে পারে।

মৌখিক অভিযোগ যখন করেছিলেন, তখন সেটাকে আমলে নেওয়া হয়নি বলে দাবি তরুণীর। তিনি বলেন, ফলে হেনস্তাকারীরা নিজেদের আরও ক্ষমতায়িত বোধ করেছেন। তাঁদের কোনো অনুতাপ হয়নি। তাঁরা নিজেদের অপরাধ ঢাকতে ‘ব্রেকআপ’ বিষয়টিকে সামনে আনেন। এখানে ‘ব্রেকআপ’ কোনো বিষয় ছিল না।

সহপাঠীদের আচরণে হীনম্মন্যতায় ভোগে ৫ শতাংশ

বেসরকারি সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন ২০২২ সালের অক্টোবরে ‘করোনা-পরবর্তী বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর একাডেমিক চাপের প্রভাব এবং তাদের আত্মহত্যার প্রবণতা’ শীর্ষক জরিপের প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, সহপাঠীদের দ্বারা তুচ্ছতাচ্ছিল্যের কারণে হীনম্মন্যতায় ভোগেন প্রায় ৫ শতাংশ শিক্ষার্থী।

জরিপে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসার মোট ১ হাজার ৬৪০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেন। এর মধ্যে নারী শিক্ষার্থী ৫৬ শতাংশ।

একই সংগঠন ২০২২ সালের মার্চে ‘তরুণীদের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট এবং মানসিক স্বাস্থ্যে এর প্রভাব’ শিরোনামে আরেকটি জরিপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে বলা হয়, তরুণীরা তাঁদের দেহের আকৃতি, গঠন ও অবয়ব নিয়ে কথাবার্তায় হেয়প্রতিপন্ন বোধ করেন। বন্ধুবান্ধবের কাছে ‘বডি শেমিং’-এর শিকার হয়েছেন ২২ শতাংশ তরুণী। এই জরিপে এক হাজারের বেশি তরুণী অংশ নিয়েছিলেন।

২০২১ সালে পোল্যান্ডের ম্যানেজমেন্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘কনসিকোয়েন্সেস অব বুলিং অন ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস ইন বাংলাদেশ’ (বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর বুলিংয়ের পরিণতি) শীর্ষক এক গবেষণায় উঠে আসে, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বুলিং হয়। বুলিং প্রতিরোধে শিক্ষার্থীদের তাঁদের অধিকার সম্পর্কে জানা, অভিযোগ করার বিষয়ে আত্মবিশ্বাসী হওয়া, অন্যদের সচেতন করা, পরিবারকে ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষকসহ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে ভুক্তভোগীকে সহায়তা দেওয়াসহ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গবেষণা প্রতিবেদনে জোর দেওয়া হয়।

‘বুলিংয়ের অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ও নাসিরুল্লাহ সাইকোথেরাপি ইউনিটের পরিচালক কামাল চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সেল রয়েছে। যৌন পীড়নের ঘটনায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু বুলিংয়ের বিরুদ্ধে সেভাবে কোনো ব্যবস্থা নিতে দেখা যায় না। বুলিংয়ের মতো ঘটনায় ভুক্তভোগীর মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, ক্লাসে যেতে ভয় পাওয়া, মানসিকভাবে দুর্বল বোধ করা, হীনম্মন্যতা, এমনকি অপরাধবোধে ভোগার মতো প্রবণতা দেখা যায়। কারও কারও ক্ষেত্রে নিজের ক্ষতি করা বা আত্মহত্যায় ঝুঁকতে দেখা যায়। এ কারণে কেউ বুলিংয়ের অভিযোগ করলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে ভুক্তভোগীকে কাউন্সেলিংয়ের মতো মানসিক সহায়তা দেওয়া উচিত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীদের হলে ও ছাত্র–শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) তিনতলায় বিনা মূল্যে মানসিক সহায়তা দেওয়া হয় বলে জানান অধ্যাপক কামাল চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রচার কম থাকায় অনেক শিক্ষার্থী এসব সেবা সম্পর্কে জানেন না। তা ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনে অবস্থিত নাসিরুল্লাহ সাইকোথেরাপি ইউনিটে ফি দিয়ে সেবা নেওয়া যায়।

 প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

Monday, February 9, 2026

বাংলাদেশের ছাত্র সংসদ নির্বাচন আঞ্চলিক রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে

ডেইলি সাবাহ’র প্রতিবেদনঃ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশের প্রধান সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনুষ্ঠিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা দিচ্ছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও তুলনামূলকভাবে হস্তক্ষেপমুক্ত এসব নির্বাচনে রক্ষণশীল ছাত্র প্যানেলগুলোর ব্যাপক বিজয় দীর্ঘদিন ধরে আড়ালে থাকা পছন্দ-অভিরুচিকে সামনে এনেছে।

দীর্ঘদিন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও পূর্বনির্ধারিত ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত ক্যাম্পাসগুলোতে এবার ব্যালট বাক্স ভিন্ন বাস্তবতার ইঙ্গিত দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের আদর্শ হঠাৎ করেই বদলে গেছে- শুধু এ কারণেই এই নির্বাচনগুলো গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে এমন এক পরিসরে, যেখানে দীর্ঘদিন পর রাজনৈতিক পছন্দ তুলনামূলক স্বাধীনভাবে প্রকাশের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশে জাতীয় রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে আঞ্চলিক সমীকরণ, কূটনৈতিক হিসাব ও নিরাপত্তা বিবেচনায় প্রভাবিত। আগের শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার পরই ছাত্র সংসদগুলো ভিন্ন পরিবেশে কার্যক্রম শুরু করে। যেখানে প্রার্থীরা প্রকাশ্যে প্রচার চালাতে পারেন, ভোটাররা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন, এখন আর ক্ষমতাসীন দলের ছায়া ক্যাম্পাস রাজনীতির কোনো পক্ষকে সুরক্ষা দেয় না।

ইতিহাস বলছে, বাংলাদেশে ছাত্র সংসদ কখনোই প্রান্তিক প্রতিষ্ঠান ছিল না। পাকিস্তান আমল থেকে স্বাধীনতা-পরবর্তী দশকগুলোতে ক্যাম্পাস ছিল রাজনৈতিক নেতৃত্ব গঠনের প্রশিক্ষণভূমি। ছাত্র সংসদ কার্যকর থাকলে তা তরুণদের নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও বৈধতার বিষয়ে মূল্যায়নের প্রতিফলন ঘটায়।

সময়ের সঙ্গে সেই ঐতিহ্য ক্ষয়ে যায়। ছাত্র সংগঠনগুলো প্রধান রাজনৈতিক দলের শাখায় পরিণত হয়ে পৃষ্ঠপোষকতা ও অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার কাঠামো অনুকরণ করতে থাকে। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকে অধিকাংশ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন স্থগিত থাকে। ফলে ছাত্র রাজনীতি প্রতিনিধিত্বের বদলে ক্রমে জবরদস্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।

দীর্ঘ প্রায় তিন দশক পর ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও এটিকে পূর্ণাঙ্গ পুনরুদ্ধার নয়, বরং সীমিত পরিসরে নির্বাচন ব্যবস্থার আংশিক প্রত্যাবর্তন হিসেবেই দেখা হয়। অংশগ্রহণ ছিল অসম, বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রার্থীতা ও প্রতিযোগিতার সীমাবদ্ধতার মধ্যেই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন অধিকাংশ পদ দখল করে। নব্বইয়ের দশক থেকে কার্যত নিষিদ্ধ থাকা ইসলামী ছাত্রশিবির তখনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার বাইরে ছিল।

পরবর্তী সময়ের নির্বাচনগুলো সেই ধারা ভেঙে দেয়। কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো সব বড় ছাত্র গোষ্ঠী প্রকাশ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে। ফলাফল ছিল বিস্ময়কর—একাধিক শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভূমিধস বিজয়। বিশেষ করে ডাকসুতে ফলাফল নজর কেড়েছে, যা দীর্ঘদিন বাম ও জাতীয়তাবাদী ধারার শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল।

এই পরিবর্তনের নানা ব্যাখ্যা উঠে এসেছে। কেউ বলছেন, দীর্ঘদিন দমন হওয়া গণতান্ত্রিক চর্চার প্রতিক্রিয়া, কেউ আস্থা সংকট বা সংগঠনিক সক্ষমতার কথা তুলছেন। তবে সবচেয়ে বড় পার্থক্য তৈরি করেছে অংশগ্রহণ। শিক্ষার্থীরা ব্যাপক হারে ভোট দিয়েছেন, কারণ তারা বিশ্বাস করেন ভোটের মূল্য আছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রার্থীদের মূল্যায়ন হয়েছে আচরণ ও সক্ষমতার ভিত্তিতে। চাপের মুখে তারা কেমন ছিলেন, ভয়ভীতি ছাড়াই সংগঠিত হতে পেরেছেন কি না, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করে দৈনন্দিন ছাত্র সমস্যা মোকাবিলা করতে পারবেন কি না, এসব প্রশ্নই মুখ্য হয়ে ওঠে। এক্ষেত্রে ফলাফল ধর্মীয় রাজনীতির উত্থানের চেয়ে বাস্তব আস্থার প্রতিফলন হিসেবেই ধরা পড়ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও এসব নির্বাচন তাৎপর্যপূর্ণ। দক্ষিণ এশিয়ায় যেখানে জাতীয় নির্বাচন নানা নিয়ন্ত্রণ ও দূরবর্তী শক্তির প্রভাবে পরিচালিত হয়, সেখানে ক্যাম্পাস রাজনীতি অনেক সময় পরিবর্তনের আগাম ইঙ্গিত দেয়। মুখোমুখি নেতৃত্বের পরীক্ষা হয়, ব্যর্থতা ঢাকার সুযোগ কম থাকে।

আঞ্চলিক অভিজ্ঞতাও তাই বলে। ভারতে ছাত্র রাজনীতি বহুবার জাতীয় জোট বদলের আগাম সংকেত দিয়েছে। পাকিস্তানে প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে ক্যাম্পাস আন্দোলন আবার মাথাচাড়া দিয়েছে। এসব উদাহরণ দেখায়—মূলধারার রাজনৈতিক পথ সংকুচিত হলে ছাত্র পরিসরেই প্রথম বৈধতার পরীক্ষা হয়।

এতে ধরে নেয়ার কারণ নেই যে ক্যাম্পাসের বিজয় সরাসরি জাতীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে। ছাত্র নির্বাচন সাধারণ নির্বাচনের ক্ষুদ্র সংস্করণ নয়। তবে এগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা উন্মোচন করে- রাষ্ট্রের বাইরে কে সংগঠিত হতে পারে, জবরদস্তি ছাড়া কে আস্থা অর্জন করে, আর নিয়ন্ত্রণ শিথিল হলে কে বৈধতা পায়।

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র সংসদ নির্বাচন ভবিষ্যৎ বলে দেয় না, তবে বর্তমানকে স্পষ্ট করে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির গতিপথ বুঝতে এই বার্তাকে উপেক্ষা করা কঠিন।

https://mzamin.com/uploads/news/main/201938_sdgh.webp

Tuesday, May 27, 2025

ঋতুস্রাবের ছুটি চেয়ে হেনস্তার শিকার এক শিক্ষার্থী

ঋতুস্রাবের ছুটি চেয়ে হেনস্থার শিকার হয়েছেন চীনের এক নারী শিক্ষার্থী। ঘটনাটি বেইজিংয়ের গেংডান ইনস্টিটিউট বিশ্ববিদ্যালয়ের। ঋতুস্রাবের কারণে অসুস্থ হয়ে পড়লে কর্তৃপক্ষের কাছে ছুটির আবেদন করেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী। এতে ওই শিক্ষার্থীকে ট্রাউজার খুলে প্রমাণ দিতে বলেন কর্তৃপক্ষ। তারা প্রমাণ চান আদৌ ওই শিক্ষার্থী অসুস্থ কিনা। এই ঘটনার একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। কর্তৃপক্ষের এমন আচরণে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে সাধারণ মানুষ। ভিডিওতে ওই তরুণীকে কলেজের এক প্রবীণ নারী কর্মীকে প্রশ্ন করতে শোনা যায়, যাদের ঋতুস্রাব হয়েছে তাদের সকলকেই কী ছুটি পাওয়ার জন্য নিজেদের ট্রাউজার খুলে দেখাতে হবে? এছাড়া কী তারা ছুটি পাবেন না? এর পরিপ্রেক্ষিতে তিনি হ্যা সূচক জবাব দেন। বলেন, এটা এখানকার নিয়ম। তবে বিশ্ব্যবিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা ওই শিক্ষার্থী কেউই বিবিসির কাছে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেননি। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ওই ভিডিও অনলাইনে শেয়ার করেন। যদিও পর্ণোগ্রাফি কন্টেন্টের অভিযোগে তা অনলাইন থেকে সরিয়ে ফেলা হয়। তবে নেটিজেনরা এর স্ক্রিনশট নিয়ে রাখেন।

চীনা টিকটক নামে পরিচিত ডুয়িনের এক ব্যবহারী বলেন, ভিডিও শেয়ারের কারণে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর আইডি ৩০ দিনের জন্য সাসপেন্ড করা হয়েছে। ১৬মে এক বিবৃতিতে গেংডান ইনস্টিটিউট বলেছে, অনলাইনে প্রচার করা ওই ভিডিও বিকৃত করা হয়েছে। বলা হয়, যারা অসত্য ভিডিও ছড়িয়েছেন তাদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার অধিকার আছে। ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে এবং শিক্ষার্থীর অনুমতি নিয়েই তার শারীরিক পরীক্ষা করা হয়। এছাড়া এতে কোনো সরঞ্জাম ব্যবহার না করার দাবিও করা হয়।

এদিকে ভিডিওতে দেখা যায়, প্রবীণ ওই নারী কর্মীকে শিক্ষার্থীদের শারীরিক পরিক্ষার বিষয়ে কলেজের লিখিত প্রমাণ দিতে বলছেন ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী। তবে এর কোনো উত্তর না দিয়ে তিনি ওই শিক্ষার্থীকে হাসপাতালে যেতে বলেন। গেংডাম ইনস্টিটিউটের এক কর্মী স্থানীয় সংবাদমাধ্যম দুতে নিউজকে বলেন, প্রতিষ্ঠানটির তরফে ওই নিয়ম তৈরি করা হয়েছে যাতে শিক্ষার্থীরা অসুস্থতার অজুহাত দিয়ে ছুটি নিতে না পারেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা বিষয়টি ভালোভাবে গ্রহণ করেননি। চীনা টুইটার নামে পরিচিত ওয়েইবোর এক ব্যবহারকারী লেখেন, যদি এমন মনে হয় যে, শিক্ষার্থীরা ঋতুস্রাব নিয়ে অজুহাত দিচ্ছে তাহলে কলেজ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে রেকর্ড রাখুক।

উল্লেখ্য, দেশজুড়ে শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণের জন্য সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তালিকায় যোগ হলো গেংডাম ইনস্টিটিউট। গত বছর মে ডে ছুটির মৌসুমে শিক্ষার্থীদের ভ্রমণের বিষয়ে কঠোর নির্দেশিকা জারি করে। এর মধ্যে একা ভ্রমণ, সাইকেলে ভ্রমণের মতো বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।

mzamin

Sunday, September 1, 2024

উচ্চ শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির রক্তক্ষরণ

নতুন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ। সব সেক্টরে চলছে সংস্কার। ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে এসেছে এই সংস্কারের অধ্যায়। এই সংস্কারের অন্যতম রূপকার উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর রীতিমতো প্রতিযোগিতা করে পদত্যাগ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবক ভাইস চ্যান্সেলররা। পূর্বে দাপটের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করা এসব শিক্ষক নীরবেই সরে দাঁড়িয়েছেন। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে কেন সরে দাঁড়াচ্ছেন তারা? ক্যাম্পাসগুলো হয়ে উঠেছিল একপাক্ষিক রাজনৈতিক মঞ্চ, চলেছে বন্দনা। সপাটে চলেছে বিরোধী মতের দমন, গণরুম, নির্যাতন, দুর্নীতি। নিয়োগগুলো হয়েছিল রাজনৈতিক মত ও চর্চার যোগ্যতায়। আওয়ামী লীগের লিটমাস টেস্ট পার করতে পারলেই পেয়েছেন এসব দায়িত্ব। এসব কারণেই পট পরিবর্তনে নিঃস্ব হয়ে ওঠেন তারা। অধিকাংশ ভিসিই আন্দোলন বা দাবির আগেই সরে দাঁড়িয়েছেন এসব পদ থেকে। ২০২২ সালের এক প্রতিবেদনে উঠে আসে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৮ ভিসির ৩৯ জনই আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।

এতটাই দলকানা ভিসিদের নিয়োগ দেয়া হয়েছিল যে প্রায়শই পড়তেন সমালোচনায়। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ড. মীজানুর রহমান ২০১৯ সালে বেসরকারি একটি টেলিভিশনে বলেছিলেন, যুবলীগের দায়িত্ব পেলে তিনি ভিসির পদ ছেড়ে দেবেন। ভিসিরা শিক্ষার্থীদের অভিভাবক। কিন্তু নিজেদের পদ ধরে রাখতে শিক্ষার্থীদের উপর লাঠিচার্জ কিংবা গুলিবর্ষণের ঘটনার পরও মুখে আঙ্গুল দিয়ে, চেয়ার আঁকড়ে বসেছিলেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ফরিদ উদ্দিন আহমেদ। ২০২২ সালের এই ঘটনার পরও ছিলেন স্বপদে। রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ পাওয়া ফরিদ উদ্দিন আহমেদ শিক্ষক হিসেবে কুড়াতে ব্যর্থ হয়েছেন মর্যাদা। তাইতো সরকার পতনের পরই ছাড়তে হয় পদ। চলতি বছরের মার্চে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনস্থ বটতলায় মাহে রমজানকে স্বাগত জানিয়ে কোরআন তেলাওয়াত আসরের আয়োজন করে আরবি সাহিত্য পরিষদ নামে একটি সংগঠন। এই অনুষ্ঠানে প্রশাসনিকভাবে বাধা দেয়া হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রমজান মাসেই পালিত হয় ‘হোলি উৎসব’। এতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি প্রশাসন। রমজান মাসে কুরআন তিলাওয়াত না হলেও শিক্ষার্থীরা নেচে গেয়ে হোলি উৎসব পালন করায় ব্যাপক সমালোচনা হয়। তবে ওই সময় চলমান বিতর্কের কোনো সুরাহা না করায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তৎকালীন ভিসি এএস এম মাকসুদ কামাল।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক ড. মশিউর রহমান নিয়মিত অংশ নিতেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। তার বক্তব্যের অধিকাংশই থাকতো রাজনৈতিক বয়ান। তিনি এমনভাবে বক্তব্য দিতেন যেকোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিও উষ্মা প্রকাশ করবেন। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনির আস্থাভাজন হওয়ায় নানা দৃষ্টিকটু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। বাংলাদেশ মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)’র নির্দেশনা অমান্য করেই অন ক্যাম্পাস ভর্তি করিয়েছেন। এ ছাড়াও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রো-ভিসি হিসেবে ড. মিজানুর রহমানকে দুপুরে নিয়োগ দিয়ে রাতে সরিয়ে দেয়া হয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জয়নুল হক জানান, গত ১১ই আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম, রেজিস্ট্রার, প্রভোস্টসহ পুরো প্রক্টরিয়াল বডি পদত্যাগ করায় পরে স্থবির হয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের কার্যক্রম সচল ও স্বাভাবিক করতে কাজ করছেন ট্রেজারার অধ্যাপক ড. হুমায়ুন কবীর চৌধুরী।  
ভিসি ও প্রক্টরিয়াল বডির পদত্যাগের পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দখলকৃত ১২টি হল উদ্ধার, নতুন ক্যাম্পাসের কার্যক্রম, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্য থেকে নতুন ভিসি নিয়োগসহ নানা সংস্কারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল, লিফলেট বিতরণ, গণস্বাক্ষর কর্মসূচি ও বহিরাগত ভিসি ঠেকাতে গেট লক কর্মসূচি পালন করেছেন।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি নাঈম আহমদ শুভ জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো ক্লাস পরীক্ষা শুরু হয়নি। আওয়ামী লীগের আমলে ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডই ছিল মুখ্য। আওয়ামী মতাদর্শের না হলে মিলতো না পদ। প্রশাসনিক দায়িত্বে ভিসির পছন্দই ছিল শেষ কথা। বিভিন্ন প্রোগ্রামাদিতে ভিসি প্রোভিসি রাজনীতিবিদদের মতো বক্তব্য দিতেন এবং আওয়ামী লীগের পক্ষে জনমত গঠনের নির্দেশ দিতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের চাটুকারিতা ছিল ব্যাপক। নিজের স্বার্থ আদায় ও টাকা আত্মসাতের বিষয়টি তাদের কাছে ছিল মুখ্য। এই মুহূর্তে যোগ্য ও বিচক্ষণ ব্যক্তিকে প্রশাসনিক বডিতে রাখা, রিসার্চ ডেভেলপমেন্টে কাজ করা, মনিটরিং সেল গঠন, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম উন্নয়ন, একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুসরণ, পরীক্ষার ফলাফল দ্রুত দেয়া ও শিক্ষকদের পাঠদান পদ্ধতির আধুনিকায়ন, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি গঠন, বই পড়ার জন্য আলাদা রিডিং রুম স্থাপন, হলের খাবারের মান উন্নয়ন ইত্যাদি সংস্কার করা প্রয়োজন। এ ছাড়া সর্বক্ষেত্রে সবাইকে জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি শিক্ষার্থীদের।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি সিফাতুল্লাহ আমিন জানান, আওয়ামী সরকারের পতনের পরবর্তীতে রাজধানী ঢাকায় অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়টির বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের পদত্যাগ করার প্রেক্ষিতে অভিভাবকশূন্য হয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা। স্থবির হয়ে পড়া সকল একাডেমিক কার্যক্রম দ্রুত চালুর নিমিত্তে শিক্ষার্থীরা মিছিল ও আন্দোলন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের  রেজিস্ট্রারের সিগনেচারকৃত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয় আগামী রোববার থেকে ক্লাস শুরু হবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয় অভিভাবকশূন্য থাকলেও ক্যাম্পাসে বিভিন্ন সংস্কারমূলক কাজ এগিয়ে চলেছে শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মধ্যদিয়ে। এর ধারাবাহিকতায় ক্যাম্পাসে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা বস্তি উচ্ছেদের উদ্যোগ নিয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। যে বস্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ভূমির এক চতুর্থাংশ জুড়ে বিস্তৃত ছিল। ক্যাম্পাসে বিশ একরের বেশি জমি বস্তি হিসেবে থাকলেও সেই জমি উদ্ধারের বিষয়ে আমাদের তখনকার অভিভাবকরা গুরুত্ব না দিয়ে ক্যাম্পাসের বাইরে সাভার অঞ্চলে জমি খুঁজতে গিয়েছিলেন। যা স্পষ্টতই লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মুতাছিম বিল্লাহ রিয়াদ জানান, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একে একে পদত্যাগ করেছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, প্রো-ভিসি ও ট্রেজারার প্রশাসনের শীর্ষ ১২ কর্তাব্যক্তি। ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। দুর্বল হয়ে পড়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থাও। শীর্ষ পদগুলো শূন্য থাকায় এখনো ক্লাস-পরীক্ষা শুরুর সিদ্ধান্ত হয়নি। ব্যাহত হচ্ছে প্রশাসনিক কার্যক্রমও। বিভিন্ন দপ্তরে জমা হয়েছে ফাইলের স্তূপ। চলমান অচলাবস্থা কাটাতে ভিসিসহ শীর্ষ পদগুলোতে দ্রুত সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আরিফ হোসাইন জানান, আন্দোলনের মুখে ২০শে আগস্ট বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ও প্রক্টরের পদত্যাগের পর পদত্যাগের হিড়িক লেগে যায়। হলগুলোর প্রভোস্টসহ একে একে পদত্যাগ করেন অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ শিক্ষক-কর্মকর্তা। এতে কিছুটা স্থবির হয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস-পরীক্ষাসহ প্রশাসনিক কার্যক্রম। তবে সেদিনই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার মনিরুল ইসলাম ববি প্রেস ক্লাবের মাধ্যমে এক ভিডিও বার্তায় জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ও পরীক্ষা বন্ধ হবে না, যথা নিয়মে চলবে। এতে কিছুটা স্বস্তি পায় শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে ২১শে আগস্ট পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করেন পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক। তবে বাস্তবচিত্রে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কিছু ডিপার্টমেন্টে ক্লাস-পরীক্ষা একটু মন্থর গতিতেই চলছে। বেশিরভাগ ডিপার্টমেন্টই স্থগিত হওয়া ক্লাস-পরীক্ষা হচ্ছে, নতুন রুটিন প্রকাশিত হয়েছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরে একটিমাত্র প্রজেক্টের কাজ হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিতে রয়েছে পর্যাপ্ত ক্লাসরুম, ল্যাবরুম, পরিবহন ও আবাসিক সংকট। বিশ্ববিদ্যালয় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা বঞ্চিত। বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই কোনো জিমনেসিয়াম ও অডিটোরিয়াম। দীর্ঘদিন থেকে এসব সমস্যার সম্মুখীন হয়ে আসলেও দলকানা ভিসিরা এসব নিয়ে মাথা ঘামাতেন না। তারা সবসময় শেখ হাসিনা, বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী সরকারের তোষামদেই ব্যস্ত থাকতেন, তাদের বক্তব্য শুনলে মনে হতো রাজনৈতিক দলের বক্তব্য। তাই শিক্ষার্থীদের চাওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন যোগ্য ভিসি নিয়োগ ও সংকটগুলো নিরসন।
গণবিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি আফসানা মিমি জানান, বিভিন্ন আন্দোলনের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। হাসিনা সরকারের আমলে বেশকিছু নিয়ম তৎকালীন রেজিস্ট্রার তৈরি করেছিল যা ছিল নিয়মবহির্ভূত। ইচ্ছেমতো নিয়োগসহ দুর্নীতি, ছিল চাটুকারিতা। রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও মাঝেমধ্যেই রাজনৈতিক নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হতো বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। এখন সেইসব অনিয়ম দূর করতে বেশকিছুদিন ধরে ক্লাস বর্জন করে আন্দোলন করে যাচ্ছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সাম্প্রতিক কিছু কিছু দাবি প্রশাসন মেনে নিয়েছে, ইতিমধ্যে রেজিস্ট্রার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন এবং সেইসঙ্গে নতুন করে আবারো প্রষ্টরিয়াল বডি তৈরি করা হয়েছে।

Monday, November 18, 2019

বিশ্বের যে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় ভিন্ন কিছু কারণে বিখ্যাত

আপনি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন তার ভবনের স্থাপত্য কলা, শিক্ষাগত অর্জন, কিম্বা ক্যাম্পাসের আনন্দ-মুখর দিনগুলো - এসবই আপনার সারা জীবনের সবচেয়ে স্মরণীয় কিম্বা সুখকর স্মৃতি হয়ে থাকতে পারে।
ওই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে আপনি যে ডিগ্রি নিচ্ছেন সেটা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু একই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাস, পড়াশোনার পরিবেশ এসবও আপনার জীবনের নানা পর্যায়ে প্রভাব ফেলবে।
সবসময় এগুলোর বিশেষ একটি তাৎপর্য আছে আপনার বাকি জীবনে।
কিন্তু কিছু কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আছে যেগুলো বিশেষ কিছু কারণে বিখ্যাত হয়ে আছে। কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে হয়তো রেকর্ড সংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে আবার কোন বিশ্ববিদ্যালয় ভৌগলিকভাবে এমন এক জায়গায় অবস্থিত যা হয়তো একটু কল্পনা করাও কঠিন।
এখানে এরকম কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা তুলে ধরা হলো:

সবচেয়ে প্রাচীন

পৃথিবীতে জ্ঞান চর্চা কবে থেকে শুরু হয়েছিল তার কোন দিন তারিখ উল্লেখ করা সম্ভব নয়। তবে কোথায় কোথায় মানুষ জ্ঞানের ব্যাপারে কৌতূহলী ছিল সেসব জায়গার কথা হয়তো আমরা উল্লেখ করতে পারি।
মরক্কোর উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ফেজ শহরে ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কারুয়েন বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানেও এটি চালু আছে।
বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরির একটি ছবি। ইউরোপের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় এটি
গিনেস রেকর্ড বুকেও এটি এই পৃথিবীর প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃত।
এর ২০০ বছর পর ১০৮৮ সালে ইটালির উত্তরাঞ্চলীয় শহর বোলোনিয়াতে চালু হয়েছিল বোলোনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়। ধারণা করা হয় এটি ইউরোপের সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়।
আর যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে পুরনো বিশ্ববিদ্যালয় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। এটি চালু হয়েছিল ১০৯৬ খ্রিস্টাব্দে।
তবে এটি কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই দিন তারিখ এখনও স্পষ্ট নয়।
এখনও পর্যন্ত ব্রিটেনের ২৮ জন প্রধানমন্ত্রী এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন।
তাদের মধ্যে সবশেষ হলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন। আর অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করা প্রথম প্রধানমন্ত্রী ছিলেন আর্ল অফ উইলমিংটন, ১৭৪২ সালে।

সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী

জনসংখ্যার হিসেবে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ ভারত। লোকসংখ্যা প্রায় ১৩০ কোটি।
এই হিসেবে ভারতের কোন বিশ্ববিদ্যালয়েই যে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী পড়ালেখা করবেন সেটা হয়তো কারো কাছেই বিস্ময়কর মনে হবে না।
ব্রিটেনের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়
এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির নাম ইন্দিরা গান্ধী ন্যাশনাল ওপেন ইউনিভার্সিটি। প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালে।
এর উদ্দেশ্যই হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে সশরীরে উপস্থিত না হয়ে উচ্চ শিক্ষা অর্জন করা যা দূর-শিক্ষণ বলে পরিচিত।
ভারতের একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রীর নামেই এই বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরণ করা হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টির ওয়েবসাইটে যে তথ্য পাওয়া যায় সে অনুসারে ২০১৪ সালে এই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিল ৩০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী। ভারত ছাড়াও সারা বিশ্ব থেকেই শিক্ষার্থীরা এখানে পড়াশোনা করেন।
কেউ কেউ অবশ্য বলে থাকেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৫০ লাখের মতো। কিন্তু এই দাবি সরকারি সূত্র থেকে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
তারপরেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া কমিউনিটি কলেজ যার ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ২১ লাখের মতো।

সবচেয়ে ধনী

যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের সবচেয়ে ধনী বা সমৃদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিবেচিত।
২০০৯ সালের হিসেবে অনুসারে ম্যাসাচুসেটস রাজ্যে এই বিশ্ববিদ্যালয়টির মোট অর্থের পরিমাণ ছিল ২৬০০ কোটি ডলার।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়, সবচেয়ে বেশি অর্থসমৃদ্ধ
সাধারণত ব্যক্তি পর্যায়ে এই পরিমাণ অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়টিকে দান করা হয়েছিল ভবিষ্যৎ প্রকল্প কিম্বা বৃত্তি চালু করার উদ্দেশ্যে।
আন্তর্জাতিক সুনামের কারণে সারা বিশ্ব থেকেই প্রচুর সংখ্যক শিক্ষার্থী হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আগ্রহী।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, জন এফ কেনেডি, ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট ও মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটসও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন।

সবচেয়ে অদ্ভুত স্থানে

এরকম একটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আইসল্যান্ডের বিফ্রস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে।
এটি এমন একটি উপত্যকায় অবস্থিত যেখানে গ্রাব্রক আগ্নেয়গিরি।
বিশ্ববিদ্যালয়টির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, দ্রুত হেঁটে গেলে শিক্ষার্থীরা প্রায় ৪০ মিনিটের মধ্যে এর চূড়ায় উঠে আবার নেমে আসতে পারেন।
এই আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখও সেখানে অবস্থিত যা দেখতে সেখানে দর্শনার্থীরাও যেতে পারেন।
ব্যবসা, আইন ও সমাজ বিজ্ঞান পড়ার জন্যে এই বিশ্ববিদ্যালয়টি পরিচিত। এটি রাজধানী থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে।

সবচেয়ে উঁচুতে

চিলির আতাকামা বিশ্ববিদ্যালয় ওজোস ডেল সালাদো আগ্নেয়গিরির ওপর একটি গবেষণাগার নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
আগ্নেয়গিরির এই জ্বালামুখের কাছে আইস্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়
সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে এটি ৫,১০০ মিটার উঁচুতে। আর্জেন্টিনা সীমান্তের কাছে।
যদি প্রতিষ্ঠিত হয় তাহলে এই পৃথিবীতে এটিই হবে সবচেয়ে উঁচু জায়গায় অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়।
আগ্নেয়গিরিটি একটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি। ফলে ভূতত্ব, জ্যোতির্বিদ্যা এসব বিষয়ে পড়াশোনার জন্যে এটি হবে আদর্শ একটি বিশ্ববিদ্যালয়।
এখানে সবশেষ অগ্নুৎপাত হয়েছিল ৭০০ খ্রিস্টাব্দে।
১৯৯৩ সালেও এখান থেকে গ্যাস ও ছাই নির্গত হয়েছে।
বর্তমানে সবচেয়ে উঁচুতে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়টি নেপালে। নাম পিরামিড ইন্টারন্যাশনাল ল্যাবরেটরি। কিন্তু চিলির গবেষণাগারটি হবে এর চেয়েও ৫০ মিটার উঁচুতে।

Friday, October 25, 2019

বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যা: ছাত্রলীগ ও যুবলীগে ‘টর্চার সেল’ নিয়ে যে উদ্বেগ by আবুল কালাম আজাদ

বুয়েট ছাত্র আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্রলীগের নির্যাতন এমনকি টর্চার সেল গড়ে তোলার কথা জানা যাচ্ছে। কিছুদিন আগে যুবলীগের নেতাদের কার্যালয়ে অভিযান চালিয়ে পাওয়া গেছে নির্যাতনের জন্য টর্চার সেলের অস্তিত্ব।
ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ছাত্র ও যুব সংগঠনের মধ্যে এই টর্চার সেল বা নির্যাতনের একটা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে বলে চলছে সমালোচনা।
বুয়েটের হলে থাকা এক ছাত্র বিবিসিকে জানিয়েছেন, তাকেও শিবির সন্দেহে রাতভর দফায় দফায় পেটানো হয়েছিল। কিন্তু ভয়ে আতঙ্কে বিষয়টি গোপন করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ছাত্র বলেন নির্মম ভাবে তাকে পেটানো হয়।
টর্চার সেল হিসেবে ব্যবহার করা হতো এমন অভিযোগে সম্প্রতি বুয়েটের ছাত্রাবাসের একাধিক কক্ষ সিলগালা করে দেয়া হয়েছে।
"আমি আমার এলাকার এক নেতার দুর্নীতি আর ব্যাংকের অর্থ চুরির খবর ফেসবুকে দিয়েছিলাম। এটাই ছিল আমার অপরাধ।"
"রাতে রুমে দশ বারোজন এসে আমাকে জেরা করে। বলে আমি শিবির কিনা! প্রথমে চড় মারে। এরপর স্ট্যাম্প দিয়ে মারে। আমার পেছনে মারছিল পায়ে মারছিল। ধরেন রাত ১২টা থেকে ফজরের আজানের আগ পর্যন্ত এভাবে চলেছে।"
ভুক্তভোগী ছাত্ররা বলছেন, সরকারের সমালোচনা, অন্যায়ের প্রতিবাদ বা দুর্নীতি অনিয়মের খবর কেউ ফেসবুকে প্রচার করলেই সে ছাত্রলীগের জেরার নামে নির্যাতনের টার্গেট হয়েছেন।
তুচ্ছ অপরাধেও নানারকম হয়রানি আর নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে বহু ছাত্রকে। এমনকি প্রতিবাদ করলে ছাত্রলীগের হল শাখার নেতারাও আক্রান্ত হয়েছেন।
ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বের অপসারণ এবং আবরার ফাহাদের ঘটনার পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নির্যাতনের শিকার ছাত্রদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে আসছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের পূর্বের কমিটির হল শাখার একজন পদধারী নেতা জানান, ফেসবুকে একটা পোস্টের কারণে তাকে যিনি নির্যাতন করেন তার দখলে থাকা রুমটি সিলগালা করে দিয়েছে হল প্রশাসন।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আবাসিক হলে টর্চার সেল নিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশের একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারিত হয়।
"আমাকে চড়থাপ্পড় মারা হয়। পিস্তল মাথায় ঠেকিয়েছিল। কিন্তু মারে নাই। আমিও অনেক ভয় পেয়েছিলাম। এদের কারণেই ছাত্রলীগের দুর্নাম।"
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র মশিউর রহমান জানান, প্রথম বর্ষেই ছাত্রলীগের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন তিনি। পরে কোটা সংস্কার আন্দোলনের যোগ দেয়ার পর তাকে পিটিয়ে আহত করে পুলিশে দেয়া হয়। এরপর থেকে হল ছাড়া হয়েছেন তিনি।
"আপনি একটু ভিন্নমতের হলে আপনাকে প্রথম যেটা বলা হবে যে আপনি শিবির! এই শিবির বলে নির্যাতন করা হয়। আর শিবির বলার পর আর কেউ কোনো কথা বলার সাহস পায় না।"
শুধু বুয়েট বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্রলীগের হাতে এমন নির্যাতনের একটা সংস্কৃতি তৈরি হয়েছ বলেই অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে শুধু ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনই নয়, নির্যাতন বা টর্চার সেল সংস্কৃতি দেখা যাচ্ছে সরকারি দলের যুব সংগঠনেও।
বুয়েটের হলে থাকা এক ছাত্র বিবিসিকে জানিয়েছেন, তাকেও শিবির সন্দেহে রাতভর দফায় দফায় পেটানো হয়েছিল। কিন্তু ভয়ে আতঙ্কে বিষয়টি গোপন করেছেন
সম্প্রতি ঢাকায় র‍্যাবের অভিযানে যুবলীগ নেতাদের অফিসে অবৈধ অস্ত্র ছাড়াও নির্যাতনের জন্য ব্যবহৃত সরঞ্জামের সঙ্গে ইলেকট্রিক শক দেয়ার মেশিন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে।
অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া যুবলীগের এক নেতার মাধ্যমে একজন ভুক্তভোগী জানান, রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে আইন আদালত, পুলিশ প্রশাসন কিছুই তোয়াক্কা করতেন না যুবলীগের আটক নেতা। বেআইনিভাবে তার সম্পত্তি আরেকজনকে দখল করে দিয়েছেন যুবলীগের আটক নেতা।
যুবলীগ নেতার অফিসে কয়েকবার ডেকে নেয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে এই ভুক্তভোগীর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এ ব্যক্তি জানান, তাকে শারীরিক নির্যাতন না করলেও মানসিক নির্যাতনের শিকার তিনি।
"একাধিকবার আমাকে তার অফিসে ডেকে নিয়ে যায় এবং সরাসরি আমাকে বলে দেয় কোনো কিছু করে কোনো লাভ হবে না।"
"যদি আপনি আইনের আশ্রয় নেন পুলিশের কাছে যান আপনার আরো ভয়ানক পরিস্থিতি হবে। এ এলাকার সর্বেসর্বা বলতে তাকেই বোঝাতো। সেটাকে মাফিয়া নাম দিবেন না ডন নাম দিবেন বা সন্ত্রাসী নাম দিবেন সেটা আপনারাই ভাল বোঝেন"!
র‍্যাবের অভিযানে যুবলীগ নেতাদের অফিসে ইলেকট্রিক শক দেয়ার মেশিন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে।
ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র এবং যুব সংগঠনের সদস্যদের মাধ্যমে এমন নির্যাতনের সংস্কৃতি জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছেন।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক শীপা হাফিজ বলেন বিষয়টি শঙ্কার।
"এই অল্প তরুণ বয়সে তারা কেন এমন নির্দয় নিষ্ঠুর ভূমিকা পালন করবে। আমার মনে হয় আমাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। এটা থেকে পরিত্রাণ পেতেই হবে।"
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে ছাত্রলীগের টর্চার সেল বা নির্যাতনকারীদের অনুপ্রবেশকারী হিসেবে দেখছে ছাত্রলীগ।
আর অভিযানে আটক হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে যুবলীগ তাদের বহিষ্কার করছে।
সরকারি দলের কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন, এসব ঘটনায় বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তৃণমূল আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং ছাত্রলীগের মধ্যে অনেকে এসব নিয়ে বিব্রত।
কিন্তু প্রশ্ন হলো ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় এরা কি প্রশ্রয় পেয়েছে?
বুয়েটে নির্যাতনের কারণে নিহত আবরারের বিচার দাবিতে গ্রাফিতি
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব উল আলম হানিফ বলেন, "যখনই কোনো ছাত্র বা যুবলীগ বা যেকোনো সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেয়েছে, তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আমরা কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেইনি।"
ক্ষমতাসীন দল দায় এড়াতে চাইলেও অনেকের প্রশ্ন তাহলে এই যে নির্যাতন আর টর্চার সেলের সংস্কৃতি কিভাবে গড়ে উঠলো?
শীপা হাফিজ বলেন, দুর্বলের ওপর শক্তিমানের নির্যাতনের ঘটনা সবক্ষেত্রেই বেড়েছে।
"মুখে বলা হচ্ছে আমরা সমর্থন করি না কিন্তু এটা বন্ধ করার জন্য যদি কোনো ব্যবস্থা না দেখি আমরা মনে করি যে সমর্থনই করা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক দেশ এভাবে টিকতে পারে না বাঁচতে পারে না।"
শিপা হাফিজ

Wednesday, October 23, 2019

শেখ বোরহানউদ্দিন কলেজে অনিয়ম দুর্নীতি লুটপাট অভিযোগের পাহাড় by ফরিদ উদ্দিন আহমেদ

অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার প্রতিবাদে রাজধানীর শেখ বোরহানউদ্দিন কলেজের সভাপতি অধ্যাপক হারুনুর রশিদ খানকে গত শনিবার ঘেরাও করেন শিক্ষকরা। ওই দিন গভর্নিং বডির  বৈঠক চলাকালে শিক্ষকরা তাকে ঘেরাও করেন। বৈঠক পণ্ড হয়ে যায়।  পরে ওই বৈঠককে রোববার পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়। কিন্তু এ দিনও কোন সিদ্ধান্ত আসেনি। কলেজের শিক্ষকরা জানান, সভাপতি যোগদানের পর থেকে নানা কায়দায় ও ফন্দি করে টাকা লুটপাট করছিলেন। কোটি কোটি টাকায় তিনি কেরানীগঞ্জের অজপাড়া গায়ে জমি কেনেন। এ ব্যাপারে শিক্ষকদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। জমি কেনার নামে অর্থ লুটের অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া সরকারি ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম ভেঙে ৪৫ জন শিক্ষককে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। নিয়োগ পরীক্ষার উত্তরপত্র তাৎক্ষণিক মূল্যায়ন না করে ১৫ থেকে ২০ দিন পর ফল প্রকাশ করা হয়। ফলে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন আছে। তিনি প্রতি মাসে গড়ে ৬৫ হাজার টাকা কলেজ থেকে নেন। মাসে ২০ থেকে ২২ দিন কলেজে ভূরিভোজ করেন। নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে বেহিসাবে ব্যয়ের অভিযোগ আছে। এমন নানা অভিযোগে শিক্ষকরা ছিলেন ক্ষুব্ধ। এর মধ্যে বানোয়াট অভিযোগে শনিবার স্থায়ী অধ্যক্ষকে ও একজন শিক্ষক কে বরখাস্ত করে নিজের লুটপাটের এক সাক্ষীকে অধ্যক্ষ পদে বসানোর উদ্যোগ নিলে শিক্ষকরা সভাপতিকে অন্য সদস্যদেরসহ ঘেরাও করে। কিন্তু এ সময় সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলে শিক্ষকরা বৈঠকে ঢুকে পড়েন। শুরু হয় বাক-বিতান্ড। একপর্যায়ে অন্য সদস্যদের হস্তক্ষেপে সভাপতি মুক্ত হন। পরে রোববার সকাল পর্যন্ত বৈঠক মুলতবি করা হলে শিক্ষকদের প্রতিবাদে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই গতকাল বৈঠকটি স্থগিত হয়ে যায়। জানতে চাইলে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করেছেন অধ্যক্ষ আবদুর রহমান। তিনি বলেন, শিক্ষকরা অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে। আমার করার কিছু ছিল না।
এদিকে কলেজের শিক্ষকরা তিন শিক্ষক প্রতিনিধির প্রতি অনাস্থা জানিয়ে লিখিত দিয়েছেন। যাতে পুনরায় শিক্ষক প্রতিনিধি নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত কোন মিটিংয়ে তারা অংশগ্রহণ না করতে। এছাড়া অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার  কারণে কলেজের সভাপতি অধ্যাপক হারুনর রশিদকে বাদ দিয়ে নতুন গভর্নির বডি গঠন করার জন্য শিক্ষকরা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে চিঠি দিয়েছেন। শিক্ষকরা কলেজের  অর্থ লুটপাটের সঙ্গে জড়ির প্রকৃত দোষীদের শাস্তিও দাবি করেছেন।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে জিবি সভাপতি অধ্যাপক হারুনুর রশিদ খান বলেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির কাগজ নিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করেন। গত দুই দিনে মিটিং সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করে দ্রত ফোনটি কেটে দেন।
শিক্ষকরা জানান, কারসাজি করে জমি কেনা, নানান ধরনের উন্নয়ন, কেনাকাটা এবং মিটিং-সিটিংয়ের নামে লুট হয়ে যাচ্ছে রাজধানীর শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্রাজুয়েট কলেজের অর্থ। আওয়ামী লীগের ৯ বছরের শাসনামলে তিলে তিলে জমানো প্রতিষ্ঠানটির ৮৬ কোটি টাকার মধ্যে ২২ কোটিই গত দু’বছরে হাওয়া হয়ে গেছে। এর পেছনে প্রতিষ্ঠানটির গভর্নিং বডির (জিবি) সভাপতি এবং তিনজন শিক্ষক প্রতিনিধি মূল ভূমিকা রাখছেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হওয়ায় জিবির সভাপতি বেশি বেপরোয়া বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, শুধু অর্থ লুটেই শেষ নেই অপতৎপরতা। সরকারি নিয়ম ভেঙে শিক্ষক নিয়োগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম ভেঙে প্রতিষ্ঠানে ক্লাস নেয়া, প্রতিষ্ঠান থেকে ৮৪ হাজার টাকা নিয়ে মোবাইল ক্রয়, মোবাইল ফোনের বিল বাবদ মাসে ৪ হাজারসহ নানাভাবে মাসে গড়ে  সাড়ে ৬৫ হাজার  টাকা নিচ্ছেন সভাপতি। শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগও আছে। এছাড়া বিভিন্ন সভার নামে সম্মানী গ্রহণ তার নেশায় পরিণত হয়েছে। এভাবে নিয়ম বহির্ভূতভাবে সভা পরিচালনা ও ব্যয় করা, নিয়ম বহির্ভূতভাবে শিক্ষক পদোন্নতি, বিভিন্ন ব্যাংকে রাখা কলেজের স্থায়ী আমানত ভেঙে মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে আরেক ব্যাংকে রাখার মত কর্মকাণ্ডও পরিচালনা করছেন। দুর্নীতিবাজ কয়েকজন শিক্ষককে নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন সিন্ডিকেট। ওই সিন্ডিকেট সদস্যদের আর্থিকসহ অন্যান্য অপরাধ ও অভিযোগ আমলে নেন না। বিপরীত দিকে তার অন্যায়-অপকর্মের প্রতিবাদ কারীদের শায়েস্তা করতে বানোয়াট অভিযোগ তুলে ‘সাইজ’ করে থাকেন তিনি।
উল্লিখিত সব ঘটনার কথা স্বীকার করেছেন প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ। বর্তমান সভাপতি আসার পর একাডেমিক উন্নয়নের পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানের স্থায়ী গচ্ছিত অর্থ ভেঙে জমি কেনাসহ তথাকথিত উন্নয়ন শুরু হয়। কলেজের পাশের জমি না কিনে কেরানীগঞ্জে বিচ্ছিন্ন এলাকায় জমি কেনা হয়। অথচ কলেজের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস তৈরির কোনো নিয়মই নেই। তাছাড়া খণ্ড জমি কোনো কাজেও আসবেনা।  তিনি বলেন, কমিটি থাকার পরও একই কাজের জন্য সভাপতির ইচ্ছায় বিভিন্ন কমিটি গঠন করা হয়। সর্বশেষ নির্বিচারে জমি কেনা ও নিয়োগের প্রতিবাদ করায় তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ তৈরি করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তার এই কাজে সঙ্গী হয়েছেন বিগত বিএনপি আমলে বিভিন্ন অপকর্মে লিপ্ত কয়েকজন শিক্ষক।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে দায়ের করা অভিযোগে বলা হয়, সভাপতি নিয়ম বর্হিভুতভাবে মোবাইল ফোন সেট কেনার নামে কলেজ থেকে ৮৩ হাজার ৯৬০ টাকা নগদ নিয়েছেন। পাশাপাশি বিধি বহির্ভূতভাবে তিনি টেলিফোন ভাতার নামে মাসে ৪ হাজার করে টাকা নেন। কলেজ থেকে টাকা লুটে নিতে তিনি মিটিং বাণিজ্য করে থাকেন। গত বছরের ১৫ই সেপ্টেম্বর কলেজের স্টাফ   কাউন্সিল   মিটিংয়ে তিনি তথাকথিত শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে আটটি কমিটি গঠনের ঘোষণা দেন। প্রত্যেক কমিটির উপদেষ্টা তিনি। ওইসব কমিটি মূলত করা হয় মিটিং বাণিজ্য করার জন্য। এরপর বিষয়টি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে অবহিত করা হলে তিনি সভাপতির কাছে কৈফিয়ত তলব করেন। তখন ২টি কমানো হয়। কিন্তু প্রত্যেক কমিটির প্রধান থাকেন তিনি এবং ওইসব কমিটিকে মাসে দু’টি বৈঠক করতে বাধ্য করেন। প্রত্যেক মিটিং থেকে তিনি সম্মানি নেন।
এক হিসাবে দেখা গেছে, বিদায়ী অর্থবছরে তিনি মাসে গড়ে ৬৫ হাজার ৬৫৪ টাকা নিয়েছেন। এর মধ্যে নিয়োগ কমিটি বাবদ-২ লাখ ৬৩ হাজারন ৩৫০ টাকা, জিবির মিটিং বাবদ ২ লাখ ২ হাজার ৫০০ টাকা,  ওয়ার্কিং গ্রুপ বাবদ ৮০ হাজার  টাকা, মোবাইল বিল-৪৮ হাজার টাকা, ক্লাস  বাবদ  ২ লাখ টাকা এবং পদোন্নতি কমিটির মিটিং করে ৩০ হাজার টাকা নিয়েছে। 
অভিযোগ আছে,  প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও তিনি কলেজে ৪৫জন শিক্ষক নেন। ওই নিয়োগে একইদিনে একাধিক বিষয়ের পরীক্ষা আয়োজন করা হয়। কিন্তু প্রতি বিষয়ের জন্য পৃথক পৃথক সম্মানী নেন তিনি। তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা উন্নয়নের নামে অর্থ লুটপাট করছেন। যে কক্ষে টাইলস লাগাতে ৬ বস্তা সিমেন্ট দরকার, সেখানে ৫৬ বস্তা সিমেন্টের ভাউচার দেয়া হয়েছে। এব্যাপারে অভিযোগ তিনি আমলে নেননি।
জমি ক্রয়ে আড়াই কোটি টাকা লোপাট: কলেজের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস করার কথা বলে কলেজ থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দুরে গ্রামের মধ্যে প্রায় ৪০০শতক জমি কেনা হয়েছে। এক্ষেত্রে শিক্ষক-কর্মচারীদের কোনো মতামত নেয়া হয়নি। এক বৈঠকে বিষয়টি উত্থাপন করা হলে শিক্ষকদের চাকরিচ্যুতির হুমকি দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেন। জানা গেছে, মোট তিন দফায় জমি কেনা হয়। এরমধ্যে প্রথম দফায় ২৬২ শতাংশ জমি ক্রয়ে ১ কোটি ৩১ লাখ টাকার দুর্নীতি হয়। এখানে  ৯৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকার একটি জাল দলিল হয়।  জমির মালিক চার জন। তারা হলেন মো. সলিমুল্লা,  মো. কালিমুল্লাহ, মো. হাবিবুল্লাহ ও মো. অলিউল্লাহ। তাদের পক্ষ থেকে মো. সাইদুল ইসলাম নামে একজনকে আম মোক্তার সাজিয়ে  দলিল করা হয়। কিন্তু চার ভাই জানান, এ নামে কাউকে তারা আম মোক্তার নিয়োগ করেননি। এ নামে কাউকে তারা চিনেন না। তারা নিজেরাও জমি বিক্রি করেননি। মিনহাজ উদ্দিন নামে একজনের কাছ থেকে ৫৮ লাখ ৫৯ হাজার টাকার জমি কেনা হলেও তিনি ৩৪ লাখ টাকা পেয়েছেন বলে জানান।
এভাবে কলেজ থেকে ৫০০ শতক জমি কেনার নামে ১০ কোটি ৮৫ লাখ টাকা নেয়া হয়েছে। এছাড়া এ জমির রেজিস্ট্রেশন বাবদ ১ কোটি ৪১ লাখ টাকা নেয়া হয়েছে। এরমধ্যে প্রথম দফায় কেনা দলিল হাতে পাওয়া ২৬২ শতক জমির দলিল কলেজে জমা পড়েছে। এ জমি কেনায় রেজিস্ট্রেশন বাবদ ১৭ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়।
দুর্নীতি ও লোপাটের রাস্তা সহজ করতে কলেজের জমি ক্রয় সংক্রান্ত কমিটির আহবায়ক আবু নাঈম মো. রাফীর নিকট আত্মীয়ের রিহ্যাবে অনিবন্ধিত ও ভূঁইফোড় প্রতিষ্ঠান সারা রিয়েল এষ্টেট এন্ড ডেভেলপারের সঙ্গে চুক্তি করা হয়। চুক্তিপত্র অনুযায়ী ওই  জমির বায়নাসূত্রে মালিক প্রতিষ্ঠানটির সত্ত্বাধিকারী শাহ আলম। সে অনুযায়ী জমি ক্রয় করার কথা শাহ আলমের কাছ থেকে। কিন্তু জমি ক্রয় করা হয় সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে। লক্ষ্যনীয় যে, শুধুমাত্র চুক্তিপত্র করার জন্য তাকে টাকা দেয়া হয়েছে ১ কোটি ১৩ লাখ ১৭হাজার ১৬০ টাকা। সবমিলে এই খাতে আড়াই কোটির বেশি টাকা আত্মসাত হয়েছে।
এ সংক্রান্ত দলিল ও নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী জমির মূল্য চেকের মাধ্যমে পরিশোধের কথা থাকলেও অর্থ আত্মসাতের লক্ষ্যে তা নগদে প্রদান করা হয়। ওই জমি মালিক পক্ষের নিকট থেকে সরাসরি ক্রয় করা হলেও অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে বিপুল অংকের টাকা প্রদান করা হয়েছে। টাকা গ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থ গ্রহীতার নাম ও জমি দাতার স্বাক্ষরের কোন মিল নাই। জমির মালিকের নিকট থেকে কম দামে জমি ক্রয় করা হলেও দলিলে বেশি দাম দেখিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্নসাত করেছে। এর ফলে জমি রেজি: খরচ বাবদ সতের লাখ দুইশত সত্তর টাকা কলেজের ক্ষতি হয়েছে।
জানা গেছে, দ্বিতীয় দফায় কলেজের জন্য ৮৫ শতক জমি ক্রয় করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ লেনদেন নগদে সম্পন্ন হয়েছে। অথচ জিবি পে অর্ডার ছাড়া ব্যয় করতে নিষেধ করেছে। নগদে ব্যয় করায় কৃষককে কত টাকা দিয়েছে তা জানা যায়নি। সুতরাং এখানে আরও বেশি দুর্নীতি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তৃতীয় দফায় কেনা জমির কোনো তথ্যই জানা যায়নি।
এফডিআর সংক্রান্ত দুর্নীতি: বিভিন্ন ব্যাংকে স্থায়ী আমানত রেখে সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ আছে। সভাপতি কমিশন নিয়ে ব্র্যাক ব্যাংকে অর্থ গচ্ছিত রাখেন। সাব-স্টেশন সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কলেজের ব্যয় কার্য ও অডিট কার্য সম্পন্ন হয় সিন্ডিকেট দ্বারা। শিক্ষক প্রতিনিধি আবু নাইম মো. রাফি সব ধরনের আর্থিক কাজ করেন। সেটা অডিটের নামে জায়েজ করেন অপর শিক্ষক প্রতিনিধি বাদল চন্দ্র অপু। শিক্ষকদের আপত্তি সত্ত্বেও নিরপেক্ষ কোনো শিক্ষককে অডিটের দায়িত্ব দেয়া হয়নি। সভাপতির নির্দেশে ৩ জন শিক্ষক প্রতিনিধি ও তাদের পছন্দের অভিভাবক প্রতিনিধি দিয়ে কমিটি গঠন করা যাতে অনিয়ম ও দুর্নীতি করা সহজ হয়।
কলেজের সব অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার জিবি সদস্য ঢাকা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক তাসলিমা বেগম এবং এনসিটিবির সাবেক সদস্য অধ্যাপক ড. রতন সিদ্দিকী। বিভিন্ন সভায় এ নিয়ে এই দুই সদস্যের সঙ্গে সভাপতির তর্ক হয়। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অধ্যাপক তাসলিমা বেগম মানবজমিনকে বলেন, সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে জিবিতে আছি। সব সময় চেষ্টা করি সরকারের নিয়ম- কানুনের মধ্যে থাকতে। ফলে জিবির  বৈঠকে কিছু বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। অনেক সময় আমরা (দুইজন) কিছু বিষয়ে নোট অব ডিসেন্টও দিতে চেয়েছি। পরে তা দিতে হয়নি। জমি কেনার সম্মতি থাকলেও লেনদেন ব্যাংকের চেকের মাধ্যমে করতে বলা হয়েছে। কিন্তু নগদ টাকায় জমি কেনা হয়েছে শুনেছি। নগদ দেয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়নি। ওখানে কিছু অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের বিষযে শুনেছেন বলে তিনি স্বীকার করেন।

Sunday, October 20, 2019

র‌্যাগিংয়ের নামে বুয়েটে যেভাবে নির্যাতন হতো by পিয়াস সরকার

আসাদুল হক আসাদ। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)’র দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। থাকেন শের-ই-বাংলা হলে। আর্কিটেকচার বিভাগের এই শিক্ষার্থী হলের প্রথম রাতের কথা বলতে রীতিমতো কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেই রাতে তার মোবাইল ফোন দিয়ে ছোট বোনের ফোন রিসিভ করে অশ্লীল বিভিন্ন কথা বলা হয়। তিনি বলেন, সেই সময় আমার মনে হচ্ছিল। আত্মহত্যা করি। ছোট বোনের সামনে মুখ দেখাবো কী করে? বাবা মাকেই কী বলব।
শুধু আসাদ নন, তার মতো আরও অনেকে বুয়েটে পড়তে এসে ছাত্রলীগের ‘বড় ভাইদের’ হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
পড়তে হয়েছে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে। নানা সময়ে র‌্যাগিং-এর শিকার হয়েছেন এমন অনেকের সঙ্গে কথা হয়েছে মানবজমিন এর। তাদের বয়ানে উঠে এসেছে নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র।

নিজের জীবনের বাজে মুহুর্তের বর্ণনা দিয়ে আসাদ বলেন, আমি গ্রামের ছেলে। লালমনিরহাটের প্রত্যন্ত এলাকায় লেখাপড়া করেছি। বুয়েটে পড়বার সুযোগ মেলায় এলাকায় ‘হিরো’ বনে যাই। ভর্তি হবার পর আমার এলাকার এক ভাইয়ের সঙ্গে হলে থাকতাম। ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, থাকেন জসীম উদ্দিন হলে। সেখানে মাসখানেক থাকবার পর হলে সিট পাই। প্রথম যেদিন হলে উঠি সেদিন আমার মতো আরো ৫ জন শিক্ষার্থী ছিলো। সবাই ছিলো আমার পরিচিত আর আমাদের রাখা হয় একই রুমে। আমাদের রুম গোছানো শেষ হয় প্রায় রাত ৮টায়। রাতের খাবার খেয়ে ঘুমানোর প্রস্তুতি নেবার সময় ডাক পড়ে সকলের। সারাদিনের ব্যস্ততা কাটিয়ে বেশ ক্লান্ত আমরা। প্রথমে বড় ভাইদের রুমে ডেকে নিয়ে যাবার সঙ্গে প্রত্যেককে একটি করে চড় মেরে স্বাগত জানানো হয়। এরপর শেখানো হয় নিয়ম কানুন। তখন রাত প্রায় ১২টা। এরপর শুরু হয় মানসিক নির্যাতন। আমার হাতে ছিলো মোবাইল ফোন। প্রশ্ন করেন, হাতে কী? মোবাইল জবাব দেবার পর বলে এটা ক্যামেরা, এটা স্পিকার, এটা ব্যাটারী কিন্তু মোবাইল কোনটা। এভাবে হেনস্থার একপর্যায়ে আমার ছোট বোন ফোন করে। ফোন ধরে অনিক ভাই (বুয়েট ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, অনিক সরকার। বর্তমানে বহিষ্কৃত। আবরার ফাহাদ হত্যার আসামি, আটক অবস্থায় রয়েছেন) যেসব কথা বলে, সেসব কথা মুখে বলার মতো না। আমি তার পা ধরে অনুরোধ করি এসব কথা না বলতে। এরপর কিছু সময় পর মোবাইল কেটে দেয় বোন। এরপর ফের ফোন দেয়। আমার বোন ফোন না ধরে ও বন্ধ করে রাখে।

আসাদের চোখ তখন বেশ অশ্রুসিক্ত। কথা বলতে যেন গলা আটকে আসছিলো। এরপর তিনি বলেন, একটা বিষয় খেয়াল করি। আমার বোনের সঙ্গে এভাবে কথা বলায় অনেকেই বিব্রত হয়। সেসময় জিওন ভাই (মেফতাহুল ইসলাম জিওন, বহিষ্কৃত হবার আগে ছিলেন বুয়েট ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক। আবরার হত্যার আসামি, তিনিও গ্রেপ্তার) বলেই বসে, বেশি হয়ে গেলো না। এই বলে জিওন ভাই চলে যায় রুম থেকে। আমার কারণে জিওন ভাই রুম থেকে চলে যাওয়ায় আরো ক্ষিপ্ত হয় অনিক ভাই। প্রায় ১০ মিনিট ধরে আমাকে থাপড়াতে থাকে। আমার গাল ফেটে রক্ত বের হবার পর ছেড়ে দেয়। অনিক ভাইও রুম থেকে চলে যায়। এরপরেও বাকীরা ভোর পর্যন্ত আমাদের সকলের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালায়। এরপর আমার বোনকে বলি, মোবাইল চুরি হয়ে গেছে। কে ফোন ধরেছে জানি না। এখন নতুন আরেকটা ফোন নিয়েছি। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের তৃতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী প্রথম বর্ষের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, আমি কাজী নজরুল ইসলাম হলে থাকি। ছাত্রলীগের বড় ভাইয়েরা গভীর রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারে বসে গাজা খাচ্ছিলেন। আর হলের বড় ভাই, ছাত্রলীগের নেতার র‌্যাগিংয়ের অংশ হিসেবেই সেখানে গিয়েছিলাম। কেন সেখানে এত রাতে আমরা। এই নিয়ে শুরু হয় নির্যাতন। আমার সঙ্গে থাকা ২ জনকে নিয়ে যাওয়া হয় তিতুমীর হলে। সেখানে তারা কোন কথা না শুনেই মারতে থাকে। বাঁশের লাঠি ও স্টিলের স্লেল এক করে পেটাতে থাকে।

আমারা বারবার বড় ভাইদের নির্দেশেই গিয়েছিলাম বললেও কোন কথার জবাব দেয়না তারা। আমাদের ৪ জন ধরে নিয়ে যাবার পর সেই রুমে মোট ৯ জন উপস্থিত হন। এরপর তারা ৯ জন আর আমরা ৩ জন। এই নিয়ে ৩’র ঘরের নামতা পড়তে পড়তে পিঠানো শুরু। প্রথমে একজন ৩ টি আঘাত, এরপরজন ৬টি এভাবে শেষজন একাই মারেন ২৭টি। এভাবে চলতে থাকায় ব্যথায় কাতরাচ্ছিলাম। একজন মার সহ্য করতে না পেরে বমি করে দেয়। বমি করায় তার ওপর নেমে আসে অবর্ননীয় নির্যাতন। সেখানে সেই অবস্থায় তাকে দিয়ে পরিষ্কার করিয়ে নেয়া হয়। এরই মাঝে মাথা ঘুরে পড়ে যায় সে। এরপর তারাই একটি সিএনজি ডেকে আনে। আর তাতে আমাদের তুলে দিয়ে পাঠিয়ে দেয় ঢাকা মেডিকেলে। আমাদের হাতে দেয় ৫শ’ টাকা। সেখানে আমার বন্ধু চিকিৎসাধীন থাকে ৮দিন। এরপর সে আর হলে উঠে নি। মেসে থেকে লেখাপড়া করছে।

তিতুমীর হলে থাকেন মিনার মাহমুদ। তিনি চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। এটি তার প্রথম বর্ষের শেষের দিকের ঘটনা। প্রথম বর্ষ প্রায় শেষ হওয়ায় র‌্যাগিংও প্রায় শেষ। এইসময় একদিন ক্যান্টিনে খেতে গিয়েছিলেন মিনার। হলের বড় ভাইয়ের একটি দল সেখানে খেতে আসে। তার কানে হেডফোন থাকায় বড় ভাইয়েরা উঠতে বলেছিলেন তা শুনতে পাননি। মিনার বলেন, খাওয়া অবস্থায় আমাকে প্রথমে লাথি মেরে ফেলে দেয়া হয়। এরপর সোজা চড়, কিল, ঘুষি মারতে মারতে নিয়ে যায় একটি রুমে। সেখানে উলঙ্গ করে মারতে থাকে। প্রায় ঘণ্টাখানেক মারার পর পানি খেতে চাই। তখন তারা বলে, পানি খাবি। আয় তোরে পানি খাওয়াই। এই বলে নিয়ে যাওয়া হয় বাথরুমে। সেখানে নিয়ে আটকে রাখে ৬ ঘণ্টা। আর কিছু সময় পর পর তারা এসে গান গাওয়ার জন্য বলে। উচ্চ শব্দে গান গাইতে হয়। হেড ফোন লাগিয়ে গান শুনছিলাম এই অপরাধেই গান গাইতে হয় আমাকে। আর মাঝে মধ্যে দরজা খুলে মারতে থাকে তারা।

ব্রিটেনের বেশিরভাগ প্রধানমন্ত্রীই কেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রাজুয়েট

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়
ব্রিটেনে কনজারভেটিভ পার্টির নেতা হওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং সেই সুবাদে ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে বিজয়ী কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠানই: অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়।
ব্রিটেনের অভিজাত শাসক গোষ্ঠীর এক বিরাট অংশ অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। এটি কোন কাকতালীয় ঘটনা নয়।
গত ২৪ জুলাই ২০১৯ নতুন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন বরিস জনসন। তিনি পড়েছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে। তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরেমি হান্ট। সেই পররাষ্ট্রমন্ত্রীও অক্সফোর্ডের গ্রাজুয়েট।
নতুন প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য কনজারভেটিভ পার্টিতে শেষ যে চারজনের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছিল, তাদের তিনজনও ছিলেন অক্সফোর্ডের ছাত্র। শুরুতে যে ১১ জন প্রার্থী হয়েছিলেন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা হওয়ার জন্য, তাদের মধ্যেও ৮ জন অক্সফোর্ডে পড়েছেন। পাঁচ জন তো ছিলেন একই বিষয়ের ছাত্র।
ব্রিটেনে স্যার উইনস্টন চার্চিলের সময় থেকে এ পর্যন্ত যে ১২ জন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন, তাদের মধ্যে নয়জনই অক্সফোর্ডের গ্রাজুয়েট।
ব্রিটেনের বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী টেরিজা মে অক্সফোর্ডে পড়েছেন। তার স্বামীও সেখানকার ছাত্র। আর তাদের দুজনের মধ্যে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন অক্সফোর্ডেরই আরেক ছাত্রী বেনজির ভুট্টো। যিনি পরে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন।
অক্সফোর্ড ইউনিয়ন ডিবের্টিং সোসাইটি
সত্তরের দশকে বেনজির ভুট্টো ছিলেন অক্সফোর্ড ইউনিয়ন ডিবেটিং সোসাইটির প্রধান। এটি ব্রিটেনের সবচেয়ে বিখ্যাত ডিবেটিং সোসাইটিগুলোর একটি।
ব্রিটিশ এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিখ্যাত লোকজনের পদচারণা এই ক্লাবে।
যারা রাজনীতিতে বড় কিছু হওয়ার উচ্চাভিলাষ রাখেন, এই ক্লাবে যোগ দেয়া তাদের জন্য অবশ্য কর্তব্য বলে বিবেচনা করা হয়।
টেরিজা মে-ও এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন না। তার জায়গায় এখন যারা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য লড়ছেন, তাদের ক্ষেত্রেও তাই।
ব্রিটিশ রাজনীতিতে শ্রেণী, বৈষম্য এবং রাজনীতি বিষয়ে গবেষণা করেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জিওফ্রে ইভান্স। তার মতে অক্সফোর্ডের এত গুরুত্ব আসলে একটি কারণে, এটি আসলে যোগাযোগ এবং সম্পর্ক তৈরির এক খুবই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
"যদি আপনি অক্সফোর্ডে পড়াশোনার সুযোগ পান এবং ডিবেটিং ক্লাবে নিজের সম্পর্কে একটা ভালো ধারণা প্রতিষ্ঠা করতে পারেন, তাহলে কিন্তু আপনি এমন সব মানুষের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পাবেন, যা আপনাকে রাজনীতিতে ভালো ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগ করে দেবে।"
দর্শন, রাজনীতি এবং অর্থনীতি
১৯২০ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ফিলজফি, পলিটিক্স এন্ড ইকনোমিক্স (পিপিই) নামে একটি কোর্স চালু করে। এই কোর্সটি খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠে ভবিষ্যতের রাষ্ট্রনায়কদের কাছে। গত একশ বছরে অক্সফোর্ডের এই পিপিই কোর্স যারা করেছেন তাদের মধ্যে আছেন:
*তিনজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী (এডওয়ার্ড হীথ, হ্যারল্ড উইলসন এবং ডেভিড ক্যামেরন)
*তিনজন অস্ট্রেলিয়ান প্রধানমন্ত্রী (টনি অ্যাবট, ম্যালকম ফ্রেজার এবং বব হক)
*পাকিস্তানের চারজন প্রধানমন্ত্রী এবং একজন প্রেসিডেন্ট (লিয়াকত আলী খান, জুলফিকার আলী ভুট্টো, বেনজির ভুট্টো, ইমরান খান এবং ফারুক লেঘারি)।
*ঘানার দুজন প্রেসিডেন্ট (কফি আব্রেফা বুসিয়া এবং জন কুফোর)
*থাইল্যান্ডের দুজন প্রধানমন্ত্রী (কুক্রিট প্রামোজ এবং অভিষিট ভেজাজিভা)
*পেরুর একজন প্রধানমন্ত্রী (পেড্রো পাবলো কুসজিনস্কি)
*এবং মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সেলর (আং সান সুচী)
তবে এরা হচ্ছেন অক্সফোর্ডের বিখ্যাত গ্রাজুয়েটদের গুটিকয় মাত্র, যারা একেবারে ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেছিলেন।
নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী পাকিস্তানি মালালা ইউসুফজাই এখন অক্সফোর্ডে এই একই বিষয়েই পড়াশোনা করছেন।
সুবিধাভোগী অভিজাত শ্রেণী
ব্রিটেনে এবং অন্যান্য দেশে অভিজাত শাসকশ্রেণীর মধ্যে অক্সফোর্ডের গ্রাজুয়েটদের এই যে প্রাধান্য, এর শুরু কিন্তু অনেক আগে।
"অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থার শীর্ষে, যেখানে আপনাকে ঢুকতেই দেয়া হবে না - যদি আপনি সঠিক পটভূমি থেকে না আসেন বা আপনার যদি ভালো যোগাযোগ না থাকে", বলছেন অধ্যাপক ইভান্স।
তার মতে, অক্সফোর্ডে কারা যেতে পারবেন আর কারা পারবেন না, সেই বাছাই প্রক্রিয়া শুরু হয়ে যায় অনেক আগে, একেবারে অল্প বয়স থেকেই। শিক্ষা ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকে।
বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি হিসেবে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় সবচেয়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের নিতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু ব্রিটেনে আবার এটাও সত্য, এখানে যে নামী-দামী প্রাইভেট স্কুলগুলো আছে, সেখান থেকে প্রচুর ভালো রেজাল্ট করা ছেলে-মেয়ে বের হয়। এই স্কুলগুলোতে পড়ার খরচ খুবই বেশি।
এই বৈষম্য বা অসাম্য ঠিক করার জন্য কিছু ব্যবস্থা গ্রহণের অঙ্গীকার করেছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, যাতে করে সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের ছেলে-মেয়েরা অত ভালো রেজাল্ট না করেও যেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে।
এর ফলে যেটা হচ্ছে, যারা অভিজাত পরিবার থেকে আসে না, যাদের সঠিক যোগাযোগ নেই বা আর্থিক সঙ্গতি নেই, তাদের জন্য রাজনীতিতে সফল হওয়া খুব কঠিন।
ব্রিটেনে যে ধরণের নির্বাচনী ব্যবস্থা, সেখানে বিদ্যমান কাঠামোর বাইরে থেকে এসে কারও পক্ষে নতুন একটি দল তৈরি করা এবং পার্লামেন্টে যথেষ্ট আসন জেতা কঠিন।
এর মানে হচ্ছে, রাজনৈতিক আকাঙ্খা আছে এমন যে কাউকে প্রতিষ্ঠিত দুটি দলের একটিতে যোগ দিয়ে সুবিধাভোগী অভিজাতদের বিরুদ্ধেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে।
এভাবে সফল হওয়া একেবারে যে অসম্ভব তা নয়। যেমন ধরা যাক মার্গারেট থ্যাচার বা টেরিজা মে'র কথা। তারা দুজনই সাধারণ পরিবার থেকে এসেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার শীর্ষে যেতে সক্ষম হয়েছেন।
ব্রিটেনে কনজারভেটিভ পার্টির নেতা হওয়ার লড়াইয়ে অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করেননি এমন গুটিকয় প্রতিদ্বন্দ্বীর একজন ছিলেন সাজিদ জাভিদ। তিনি একজন অভিবাসী বাস ড্রাইভারের ছেলে। তবে কনজারভেটিভ পার্টিতে তার উত্থানও সহজ ছিল না। আগে তাকে ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে সফল হয়ে অভিজাত শ্রেণীর কাতারে উঠে আসতে হয়েছে। তারপরই তিনি কনজারভেটিভ পার্টির সামনের কাতারে জায়গা পেয়েছেন।
এটা বাস্তব যে ব্রিটেনের অভিজাত শাসক শ্রেণীর মধ্যে আসলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর অবস্থার প্রতিফলন নেই। তবে এটাও সত্য, যারা শেষ পর্যন্ত শীর্ষ সারিতে পৌঁছাতে পেরেছেন তারা সবাই শিক্ষায়-দীক্ষায় এগিয়ে।
এই যে শাসক শ্রেণীর মধ্যে একই ধরণের পটভূমি থেকে আসা লোকজনের এত প্রাধান্য, সেটা সমাজের জন্য ভালো না খারাপ - তা বিচার করার কোন সুনির্দিষ্ট উপায় নেই। তবে যেটা প্রায় নিশ্চিত, তা হলো একজন অক্সফোর্ড গ্রাজুয়েটই হয়তো ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন।
এদের সবাই পড়েছেন অক্সফোর্ডে। সেকারণেই কি ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেছিলেন?

Friday, October 18, 2019

রক্তাক্ত ক্যাম্পাস: সনি থেকে আবরার by মরিয়ম চম্পা

বুয়েট ক্যাম্পাসে সাবিকুন নাহার সনি স্মৃতিফলক ফিরিয়ে নেয় প্রায় দেড় যুগ আগে। বুয়েটে সে সময় ছাত্রদলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে প্রাণ হারান মেধাবী শিক্ষার্থী সাবেকুন নাহার সনি। সনির রক্তমাখা দেহ হয়ে উঠেছিল সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক অনির্বাণ আলোকবর্তিকা। ২০০২ সালের ৮ই জুন টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধের মধ্যে  গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন সনি। কেমিকৌশল বিভাগের ছাত্রী সাবেকুন নাহার সনির মৃত্যুতে সেদিনও জ্বলে উঠেছিল গোটা দেশ। শোকে, বেদনায় স্তব্ধ হয়ে যায় সবাই। এরপর ২০১৩ সালে যন্ত্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আরিফ রায়হান দ্বীপ হত্যার মধ্য দিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসে বুয়েট। আর সম্প্রতি গভীর রাতে বুয়েট ছাত্রলীগের নেতাকর্মী তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যার মধ্যে দিয়ে নতুন করে যুক্ত হলো এক কালো অধ্যায়।
২০০২ সালে সনি হত্যার বিচারের দাবিতে এবং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম করে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা।
দেশের সচেতন মানুষ এই আন্দোলনে সমর্থন জানান। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অবিরাম প্রতিবাদ ও আন্দোলনের একপর্যায়ে গঠিত হয় ‘সন্ত্রাস বিরোধী বুয়েট ছাত্র ঐক্য’। ৬৩ দিন বন্ধ থেকে বুয়েট খোলার পরে শুরু হয় শান্তিপূর্ণ আন্দোলন। একদিকে ধারাবাহিকভাবে মানববন্ধন, মিছিল-মিটিং, সমাবেশ, ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। অন্যদিকে আন্দোলনে পুলিশের বেপরোয়া লাঠিপেটা, ক্লাসে ক্লাসে গিয়ে আন্দোলন না করার জন্য শিক্ষকদের হুমকি, কিছু শিক্ষার্থীর আন্দোলনের বিরোধিতা ছিল প্রকাশ্যে। এতকিছুর পরও সনির হত্যাকারীদের শাস্তি আজও হয়নি। হাইকোর্টে দন্ডপ্রাপ্ত দুই আসামি এখনো রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।  সে সময় টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে বুয়েট ছাত্রদল সভাপতি মোকাম্মেল হায়াত খান মুকিত ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এসএম হলের টগর গ্রুপ। দুই গ্রুপের সংঘর্ষের মধ্যে পড়ে বুয়েটের আহসান উল্লাহ হলের সামনে সাবেকুন নাহার সনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর আসামিদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। নিম্ন আদালতে মুকিত, টগর ও সাগরের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়। ২০০৬ সালের ১০ মার্চ হাইকোর্ট মুকিত, টগর ও সাগরের মৃত্যুদন্ডাদেশ বাতিল করে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেন। এ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদন্ডপ্রাপ্ত এসএম মাসুম বিল্লাহ ও মাসুমকে খালাস দেন হাইকোর্ট। পরবর্তীতে যাবজ্জীবন কারাদন্ডাদেশ প্রাপ্ত মোকাম্মেল হায়াত খান মুকিত পালিয়ে যায় অস্ট্রেলিয়ায়। পলাতক রয়েছেন নুরুল ইসলাম সাগর ওরফে শুটার নুরু। জেলে রয়েছেন টগর।
২০১৩ সালে এক সন্ত্রাসী এলোপাতাড়ি কুপিয়ে গুরুতর আহত করে বুয়েটের শিক্ষার্থী আরিফ রায়হান দ্বীপকে। দ্বীপ বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়তেন। তিনি বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়কও ছিলেন। বুয়েটের নজরুল ইসলাম হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন। তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘদিন হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। দ্বীপের ওপর হামলার ঘটনায় চকবাজার থানায় তার ভাই বাদী হয়ে একটি মামলা করেন। পুলিশ এ ঘটনায় বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মেজবাহকে আটক করে। গ্রেপ্তারের পর থেকে  মেজবাহ কারাগারে আছেন।
সর্বশেষ গত ৬ অক্টোবর গভীর রাতে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। বুয়েটের শেরেবাংলা হলের ২০১১ নম্বর কক্ষের ভেতরে তাকে হত্যা করা হয়। কক্ষটিতে ছাত্রলীগের নেতারা থাকতেন। বুয়েটের শেরেবাংলা হলে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেলের অনুসারী একদল নেতাকর্মী তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে। হল শাখা ছাত্রলীগ সূত্রে জানা গেছে, আবরারকে জেরা ও পেটানোর সময় ওই কক্ষে অমিত সাহা, মুজতাবা রাফিদ, ইফতি মোশারফ ওরফে সকালসহ তৃতীয় বর্ষের আরও কয়েক শিক্ষার্থী ছিলেন। একই কক্ষে এসে দ্বিতীয় দফায় আবরারকে পেটান বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এবং মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী অনিক সরকার, ক্রীড়া সম্পাদক ও নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের একই বর্ষের মেফতাহুল ইসলাম জিয়নসহ অনেকে। ইতোমধ্যে আবরার হত্যার অভিযোগে পুলিশ ১৬ জনকে আটক করেছে।
এ ব্যাপারে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, সত্যিকার অর্থে যারা বুয়েটের মত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র তারা তো অনেক মেধাবী। মেডিকেল ইঞ্চিনিয়ারিং এ ভর্তি হওয়াটা একটি কঠিন ব্যাপার। ভাল ছাত্র না হলে পারে না। সেখানে ভিসি বা অন্যান্য শিক্ষক যারা আছেন তাদের অজান্তে এই ধরনের ঘটনা ঘটে এটা তো দুঃখজনক। আমার মনে হয় আবরার হত্যাকান্ডের বিষয়টি প্রশাসন খুব শক্ত হাতে গ্রহণ করেছেন। যাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের বিচার হবে। সেটা আমরা প্রত্যাশা করছি। এসকল হত্যাকান্ডের ক্ষেত্রে বিচার না হওয়াটাই দুঃখজনক। আমি মন্ত্রী থাকা অবস্থায় একটি পদক্ষেপ নিয়েছিলাম যে, নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে চার্জশিট দিতে হবে। বিচার একবার শুরু হলে কোনো অবস্থায় মূলতবি করা যাবে না। এবং সাক্ষী হাজির করা যার দায়িত্ব তাকে অবস্যই সঠিক সময়ে হাজির করতে হবে। না হলে তার বিরুদ্ধে অ্যাকশন নেয়া হবে। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে। এবং তারাতারি বিচার কাজ শেষ করা হবে। মনে হচ্ছে, তদন্তকারী সংস্থা অতি দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দিয়ে দিবেন। এবং বিচার কার্য শুরু হবে।
অর্থনীতিবিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্ষমতার যে আধিপত্য, সরকারের যে ভূমিকা সেখান থেকেই সমস্যাগুলো তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সরকার সবসময়ই ভয় পায়। এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তরুণ শিক্ষার্থীদের যে শক্তি সেটার যে কোনো ধরনের বিকাশকে তারা সবসময় রুদ্ধ করতে চেষ্টা করে। শিক্ষকদের স্বাধীন মত যেন না থাকে সেটার বিষয়েও তাদের একটি উদ্বেগ থাকে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তারা কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার চেষ্টা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য যে কোনো ক্ষমতাশীল ছাত্র সংগঠনের অনুমোদিত হয়ে থাকে। তার মানে সরকারের ভূমিকাটা হচ্ছে এখানে কেন্দ্রীয়। এক্ষেত্রে সরকারি ছাত্র সংগঠন এবং দুর্নীতিবাজ প্রশাসনের সঙ্গে একটি জোট তৈরি হয়। যেখানে সাধারণ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জিম্মি হয়ে পরে। সমস্ত স্বাধীন তৎপরতা বাধাগ্রস্ত হয়। সেটার কারনে আমরা দেখি আবরার হত্যাকান্ডের আগে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে এই ধরনের নির্যাতন নীপিড়নের অসংখ্য উদাহরণ আছে। যেহেতু সরকার এবং ক্ষমতাবানদের পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এগুলো হয়। তাদের নীরব সম্মতিতে এই ঘটনাগুলো ঘটে। অপরাধিরা যেহেতু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং সরকার থেকে পৃষ্ঠপোষকতা পায় সে কারনে এই হত্যাকান্ডের বিচার হয় না।
সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ বলেন, এটা যেহেতু একটি ক্রিমিনাল কেইস কাজেই সেখানে তো রাজনৈতিক কোনো কিছু কাজ করার কথা না। এক্ষেত্রে সরকারি বা বেসরকারি কোনো দলই মনে হয় না বাধার সৃষ্টি করবে। একটি মামলা ট্রায়ালে উঠলে বিচারিক প্রক্রিয়াটা একটু দীর্ঘমেয়াদি হয়। তবে আবরার হত্যাকান্ডের ঘটনাটি আসলেই দুঃখজনক। এখানে পুলিশ কিংবা তদন্ত কার্যের গাফিলতি হওয়ার কথা না। বা এখানে রাজনৈতিকভাবে কেউ ইন্টারফেয়ার করবে এটা আমার মনে হয় না।

Thursday, October 17, 2019

বুয়েট ছাত্র আবরার হত্যা: ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করাই কি সমাধান? by তাফসীর বাবু

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে গল্প করছিলেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। আলোচনার বিষয় বুয়েটে সংগঠনভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের প্রসঙ্গ।
বুয়েটের পর এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়েও কি একইভাবে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করা উচিত?
এমন প্রশ্নে কিছুটা দ্বিধান্বিত দেখা যায় কয়েকজনকে। একজন সাংবাদিককে প্রকাশ্যে এ বিষয়ে নিজের মত জানাতে ভয় পাচ্ছিলেন তারা।
সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সামনেই কথা হয় আলী নাসের খান নামে আরেকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে। তিনি অবশ্য প্রকাশ্যেই রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের কথা বললেন।
কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের যে 'রাজনীতি', সেটা নিষিদ্ধের পক্ষপাতি নন তিনি। কারণ এতে করে 'নেতৃত্বের বিকাশ ঘটবে না' এবং 'মত প্রকাশের অধিকার ক্ষুন্ন হবে'।
একইরকম মনোভাব আরো কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাওয়া গেলো।
একজন নারী শিক্ষার্থী বলছিলেন, "বুয়েটে শিক্ষার্থীরা যেভাবে আন্দোলনের মাধ্যমে সংগঠনভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করলো, তাদের দাবিগুলো আদায় করলো এটাও তো একটা রাজনীতি। আমরা এই রাজনীতিটাই চাই। এটা বন্ধ হয়ে গেলে তো প্রতিবাদের ভাষা হারিয়ে যাবে।"

দলীয় ছাত্র রাজনীতি'র প্রতি ক্ষোভ কেন?

রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন-ভিত্তিক দলীয় রাজনীতির বিপক্ষে শিক্ষার্থীদের কারো কারো যে একটা অবস্থান দেখা যাচ্ছে তার মূল কারণই হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা মনে করছেন এই রাজনীতি আদতে তাদের কোন কাজে আসে না।
এক্ষেত্রে অবশ্য ঘুরে ফিরে ছাত্রলীগ আর ছাত্রদলের নামই আসছে।
বলা হচ্ছে, গত প্রায় ত্রিশ বছর ধরে দুটি দলই তাদের মূল রাজনৈতিক সংগঠনের এজেন্ডা বাস্তবায়নেই কাজ করেছে।
টিএসসিতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রী বলছিলেন, "এখন যে ছাত্র রাজনীতি আছে সেটা হচ্ছে ছাত্রলীগের লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি। এই লেজুড়বৃত্তি কখনোই ভালো কোন ফল বয়ে আনে না। এটা তো আসলে ক্ষমতাসীনদের তেল দেয়ার রাজনীতি, তাদের স্বার্থসিদ্ধির রাজনীতি। এটা ছাত্রলীগের আমলে হোক আর ছাত্র দলের আমলে হোক। এটা সবসময়ই তাদের মাদার পার্টিকেই সার্ভ করে।"
একদিকে শিক্ষার্থীদের ইস্যু নিয়ে দলগুলোর কথা না বলা অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের উপর নির্যাতন চালানো, দুর্নীতি, হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন কারণে ছাত্র সংগঠনগুলোর উপর আস্থা কমে আসছে শিক্ষার্থীদের।

পরিস্থিতি এরকম হওয়ার দায় কার?

ছাত্রদল বা ছাত্রলীগ কোন সংগঠনই অবশ্য ছাত্র রাজনীতির বর্তমান অবস্থার জন্য দায় নিতে নারাজ।
দুটি সংগঠনই বলছে, দলের ভেতর থেকে যারা বিভিন্ন অপকর্মে জড়িত হয়েছে, এর দায় অপকর্মকারী ব্যক্তির, দলের নয়।
যারা সংগঠনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে দল থেকেই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আল নাহিয়ান খান বলছেন, "দলের ভেতরে কিছু অনুপ্রবেশকারী কিংবা অতিউৎসাহী কেউ কেউ দলের বিভিন্ন অন্যায়ে জড়িত হয়ে পড়ছে। এর দায় তাদের। আমরা এখন সতর্ক আছি, কেউ যেন কোন অপরাধ কিংবা বিশৃংখলার সঙ্গে জড়িয়ে না পড়ে।"
অন্যদিকে ছাত্রদলের সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন বলছেন, তাদের নতুন কমিটি দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে তাদের সব কর্মসূচিই আবর্তিত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের স্বার্থকে ঘিরে।
তবে দলীয় কর্মীদের অপরাধপ্রবণতা আর দলীয় ছত্রছায়ায় আধিপত্য বিস্তারের যে ধারা তার দায় ঐ দলগুলোকেই নিতে হবে বলে মনে করছেন বাম ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সহ সাধারণ সম্পাদক সুমাইয়া সেতু।
"কোন অপরাধ সংঘটিত হলে তারা এখন খুব সহজেই নিজেদের কর্মীদের অস্বীকার করছে। অতীতে ছাত্রদলও একই কাজ করেছে। কিন্তু অস্বীকার করেই কি দায় এড়ানো যায়? তাদের যেসব নেতা-কর্মী নিপীড়ন করছে, খুন করছে, দুর্নীতি করছে সেগুলো তো একদিনে হঠাৎ হয়নি।"
মিজ সেতু বলছেন, "আমি বলবো তাদের দলের মধ্যেই এমন নীতি-কৌশল রয়েছে যার ফলে এ ধরণের নেতা-কর্মী তৈরি হচ্ছে। তারা সবসময়ই বিরুদ্ধ মত ও দলকে কোন স্পেস দেয়নি। ফলে এ ধরণের অবস্থা তৈরি হয়েছে।"।
তার মতে, যেসব দল সন্ত্রাস করছে, অপকর্ম করছে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক। কিন্তু সব রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন নিষিদ্ধ করা হবে আত্মঘাতি।

সমাধান কী?

রাজনীতি বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জোবাইদা নাসরীন বলছেন, ছাত্র রাজনীতি বন্ধ করা কোন সমাধান নয়। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ইস্যু, দেশ ও জাতীয় স্বার্থে কথা বলার জন্যই ছাত্র রাজনীতি থাকতে হবে।
তার মূল্যায়ন হচ্ছে, ছাত্র রাজনীতির যে ঐতিহাসিক গতিধারা অর্থাৎ জাতীয় স্বার্থে এন্টি এস্টাবলিশমেন্ট অবস্থান সেটার বিচ্যুতি ঘটেছে।
ছাত্র সংগঠনগুলো মূল দলের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ করছে, জাতীয় স্বার্থ নয়।
"এখানে প্রায় ত্রিশ বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলো মনে করছে তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে ছাত্র সংগঠনকে ব্যবহার করতে হবে। তারা ক্ষমতা ধরে রাখার হাতিয়ার হিসেবে ছাত্রদের ব্যবহার করছে। ক্যাম্পাসে যে অস্ত্র আসে সেগুলো কোথা থেকে আসে? মূল সংগঠন কিন্তু এগুলো জানে। তাদের সঙ্গে ছাত্রদের যোগসূত্র থেকেই এসব আসে।"
তিনি বলছেন, জাতীয় রাজনীতিতে সবকিছুকেই নিয়ন্ত্রণ এবং সবার উপর আধিপত্য বিস্তারে জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক দলগুলোর যে আকাঙ্খা সেখান থেকেই বেপরোয়া হয়ে উঠছে ছাত্র সংগঠন।
সুতরাং পরিবর্তনটা সবার আগে সেখান থেকেই হতে হবে।
তবে একইসঙ্গে শিক্ষকদেরও দলীয় রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে শিক্ষাঙ্গনে অপরাধ বন্ধে ভূমিকা নিতে হবে বলে মনে করেন মিসেস নাসরীন।
কারণ তার মতে, শিক্ষকদের একটা অংশ এখন রাজনীতিতে এসে ক্ষমতার অংশীদার হতে চায়।
এ প্রবণতা থেকেই ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের অপরাধ আমলে না নেওয়ার প্রবণতা শিক্ষকদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে।
আবরার হত্যার প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছিল বুয়েটসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা

আবরার হত্যা: সেই বড় ভাই কারা

বুয়েট ছাত্রলীগ নেতাদের সংঘবদ্ধ পিটুনিতে মৃত্যু হয় শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদের। ৬ই অক্টোবর রাত  আটটার পর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত শের ই বাংলা হলের ২০১১নম্বর কক্ষে চলে আবরারের ওপর নির্মম নির্যাতন। ঘটনার পর সিসি টিভি ফুটেজ দেখে জড়িতদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হয়। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ১৯ জনকে আসামি করা হলেও পরে প্রমাণ পেয়ে গ্রেপ্তার করা হয় শাখা ছাত্রলীগ নেতা অমিত সাহাকে। গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক ও রিমান্ড জিজ্ঞাসাবাদে শিক্ষার্থীরা আবরারকে পিটিয়ে হত্যার বর্ণনা দিয়েছেন। নিজেরা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলে স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। একইসঙ্গে তারা বলেছেন ছাত্রলীগের বড় ভাইদের নির্দেশে তারা আবরারের ওপর নির্যাতন চালান। তারা বলেন, বুয়েটে এটা প্রথা হয়ে গেছে, বড় ভাইরা নির্দেশ দেন।
জুনিয়ররা তা পালন করেন। আবরার হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের আশ্বাস দেয়া হয়েছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং তদন্ত কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে যাদের নির্দেশে আবরারকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়েছে সেই বড় ভাইদের কী তদন্তের আওতায় আনা হবে? সেই নির্দেশদাতা কারা এটিও প্রকাশ্যে আনার দাবি উঠেছে।
হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দায়ের করা মামলার অন্যতম আসামি মনিরুজ্জামান মনির আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে নির্দেশদাতা বড় ভাইদের কথা বলেছেন। তিনি বলেন, ১৫ ব্যাচের বড় ভাইদের নির্দেশে আবরারকে ডাকা হয়েছিল। ২০১১ নম্বর রুমে নেয়ার পর তাকে জেরা করা হয়। ওই সময়ে অনিক ও সকাল আবরারকে অনেক মারধর করে। মনির নিজেও আবরারকে চড় থাপ্পর দিয়েছেন বলে স্বীকার করেন। এদিকে হত্যাকাণ্ডে জড়িত অমিত সাহা আদালতে উপস্থিত গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, বুয়েটের ট্র্যাডিশনই হচ্ছে উপরের (সিনিয়রদের) অর্ডার আসলে তা মানা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আরেক আসামি মেহেদী হাসান রবিন বলেন, বড় ভাইয়ের নির্দেশ মেনে আবরারকে সেই রাতে বেদম প্রহার করি। বুয়েটের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ১৫তম ব্যাচের ছাত্র রবিন বুয়েট ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। তিনিই প্রথম আবরারকে আঘাত করেন। এদিকে গ্রেপ্তার আরেক শিক্ষার্থী এ এস এম নাজমুস সাদাতকে গতকাল আদালতের মাধ্যমে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।
আদালতে নেয়া হলে সাদাত সাংবাদিকদের জানান, আবরারকে অনিক সরকার, সকাল, মোজাহিদ ও মনিরসহ ১৫ ও ১৬ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা বেশি মারছে। আবরার পানি খাইতে চাইলে পানি দেয়া হয়নি। আমরা ভাইদের বলেছিলাম হাসপাতালে নিয়ে যেতে। তারা নিয়ে যেতে দেয়নি। ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ১০ দিনের রিমান্ডের আবেদন করে নাজমুস সাদাতকে আদালতে হাজির করেন। বিচারক মোর্শেদ আল মামুন ভূইয়া শুনানি শেষে ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। মঙ্গলবার দিনাজপুর জেলার বিরামপুর থানার কাঠলাবাজার এলাকা থেকে রাত সাড়ে ৩টার দিকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের ১৭তম ব্যাচের এই শিক্ষার্থী জয়পুরহাটের কালাই থানার কালাই উত্তরপাড়ার হাফিজুর রহমানের ছেলে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মা ও মেয়ে by নাজনীন আখতার

বিভাগ ভিন্ন হলেও মা ও মেয়ে দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। মা আবেদা সুলতানা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক, আর মেয়ে সাবিহা চৌধুরী ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগের প্রভাষক।
আবেদা সুলতানার বললেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাবা-ছেলে, বাবা-মেয়ে শিক্ষক রয়েছেন। তবে মা-মেয়ে শিক্ষকের সংখ্যা অত্যন্ত কম হওয়ায় তাঁদের ঘিরে সহকর্মীদের আগ্রহ উৎসাহ বেশি। এই আগ্রহ তাঁদের মধ্যে ভালো লাগা সৃষ্টি করে।
আবেদা সুলতানা ১৯৯৬ সালে কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। ২০০১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। তিনি জানান, ১৯৮৫ সালে হলিক্রস কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর সঙ্গে বিয়ে হয়ে চট্টগ্রাম চলে যান। ১৯৮৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতিবিজ্ঞান বিভাগ থেকে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে অনার্স পাস করেন। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনিই প্রথম ব্যক্তি, যিনি প্রথম শ্রেণি পেয়েছিলেন।
আবেদা সুলতানা বলেন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পাওয়ার সময় তিনি রাজধানীর একটি কলেজে শিক্ষকতা করতেন। কুষ্টিয়া যাওয়া নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। মেয়ে সাবিহা তখন ভিকারুননিসা নূন স্কুলে প্রথম শ্রেণিতে পড়ে। স্বামী ব্যবসার প্রয়োজনে ওই সময় সৌদি আরবের জেদ্দায় ছিলেন। নিজ পরিবার আর শ্বশুরবাড়ি বিশেষ করে ছোট্ট সাবিহার উৎসাহে তিনি নিজের মায়ের কাছে মেয়েকে রেখে চলে যান কুষ্টিয়া। আবেদা বলেন, ‘আমার অত ছোট্ট মেয়েটা আমাকে অভয় দিয়ে বলল, আম্মু তুমি যাও, আমি থাকতে পারব। এখন এই সময়ে এসে মনে হয়, ওই দিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ না দিলে ভুল করতাম।’
সাবিহা চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন ২০১৬ সালে। এর আগের এক বছর তিনি ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। সাবিহা জানান, ২০০৮ সালে এইচএসসি পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগে ভর্তি হন। রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে গোল্ড মেডেল ও ডিনস অ্যাওয়ার্ড পাওয়া সাবিহা এ বছরের আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের পারডু বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করতে যাচ্ছেন।
সাবিহা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে আম্মুকে শিক্ষকতা করতে দেখেছি। আম্মুকে সব সময় পরিপাটি হয়ে ক্লাসে যেতে দেখতে ভালো লাগত। তবে মূল অনুপ্রেরণা পেয়েছি নিজের স্কুল-কলেজের শিক্ষকদের দেখে।’
তবে মেয়ে শিক্ষকতায় যোগ দিক—এটা শুরুতে চাননি মা আবেদা। তিনি বললেন, ‘আমি চেয়েছিলাম ও প্রকৌশলী হোক। কিন্তু ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চাইল। আমি ওর ইচ্ছেতে আর বাধা দিইনি।’
সাবিহা বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ক্লাসের সময়ে মিলত না বলে আম্মুর সঙ্গে কখনো যাওয়া হতো না। এখন আমরা একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রায়ই একসঙ্গে আসা-যাওয়া করি।’
মা-মেয়ে দুজনই জানালেন, তাঁদের পছন্দ–অপছন্দে মিলই বেশি। নিয়মিত না হলেও তাঁরা রাঁধতে ভালোবাসেন। দুজনই ঘরে-বাইরে ভিন্ন ধরনের খাবার খেতে পছন্দ করেন। ঘুরতে ভালোবাসেন। আর দুজনেরই পছন্দের পোশাক শাড়ি।
বিভাগ ভিন্ন হলেও মা ও মেয়ে দুজনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। মা আবেদা সুলতানা রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক, আর মেয়ে সাবিহা চৌধুরী ক্লিনিক্যাল ফার্মেসি অ্যান্ড ফার্মাকোলজি বিভাগের প্রভাষক।

Wednesday, October 16, 2019

জাবি’র গণরুম; যেন একেকটি টর্চার সেল by শাহাদাত হোসাইন স্বাধীন

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন শিক্ষার্থীদের প্রায় এক বছরেরও অধিক সময় কাটে অনেকটা টর্চার সেলে। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত আবাসিক হলের গণরুমগুলোই যেন এক একটা টর্চার সেল। মাঝ রাত থেকে ভোর পর্যন্ত নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের।  এদিকে বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরার হত্যাকাণ্ডের পর এখন আলোচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলগুলোতে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের টর্চার সেল। মূলত নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে বিরোধী মতের ছাত্র ও নিজ দলের কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতে নানা ধরনের নির্যাতন চালায় ছাত্রলীগ। প্রতিবছর নতুন ব্যাচ আসার সঙ্গে সঙ্গে গণরুমে শুরু হয় রাতভর র‌্যাগিং দেয়ার নামে নির্যাতন। এই টর্চারে নানা ধরনের গালিগালাজ ও  মানসিক নির্যাতনের পাশাপাশি চলে শারীরিক নির্যাতন। মুরগি হওয়া (বিশেষ প্রক্রিয়ায় শাস্তি), এক পায়ে দাঁড়িয়ে কান ধরে থাকা, জানালার রড ধরে ঝুলে থাকা, বিশেষ ধরনের যৌন বিকৃত আচরণ, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকাসহ নানা ধরনের নির্যাতন চলে গণরুমে থাকা প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের। মূলত হলের গণরুম ও হলের  গেস্ট রুমগুলোতে চলে এই নির্যাতন।
গণরুমে সারা রাত জাগিয়ে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের ম্যানার শেখানোর নামে এই নির্যাতন করে দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা। যাদের সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। গণরুমে কেউ বিশেষ কোনো ভুল করলে তার ডাক পড়ে হলের গেস্টরুমে। সেখানে আরো বেশকিছু সিনিয়রসমেত শুরু হয় ‘ভুলের’ বিচার প্রক্রিয়া।
নাম প্রকাশ না করে তৃতীয় বর্ষের এক ছাত্রলীগ কর্মী বলেন, গেস্টরুমে ছাত্রলীগ কর্মীদের ভুলেরও বিচার করা হয়। একবার অন্য হলের সঙ্গে গ্যাঞ্জামের কারণে আমাদের হলের সিনিয়র (৪২ ব্যাচ) আমাকে মেরে রক্তাক্ত করে। আর গণরুমের অতি ‘পাকনা’দেরও গেস্টরুমে এনে ‘সাইজ’ করা হয়।
র‌্যাগিংয়ের ভয়ে প্রথম বর্ষে কয়েকদিন ক্লাস করার পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তি বাতিল করে চলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এমন একজন শিক্ষার্থী ফুয়াদ খন্দকার বলেন, আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় জেনে জাহাঙ্গীরনগরে ভর্তি হয়েছিলাম। কিন্তু র‌্যাগিংয়ের জন্য হলে থাকতে পারতাম না। ডেমরা থেকে এসে ক্লাস করাও আমার জন্য কষ্টকর ছিল। একসময় হতাশ হয়ে ক্যাম্পাসই ছেড়ে দেই। এদিকে প্রায় এসব নির্যাতনে গুরুতর আহত হয় প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা। গত বছরের ?মার্চে গণরুমে রড ধরে ঝুলার নির্দেশ মানতে গিয়ে কোমর ও পায়ে প্রচণ্ড চোট পেয়ে গুরুতর আহত হন প্রথম বর্ষের ছাত্র আজওয়াদ রহমান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রথম বর্ষের (৪৭তম ব্যাচ) ছাত্র। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে চিকিৎসকের কাছে ‘টয়লেটে পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছে’ বলার নির্দেশও দিয়েছিল কথিত সিনিয়ররা। এই ঘটনার মাসখানেক আগে র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়ে মানসিক ভারসাম্য হারান কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র মো. মিজানুর রহমান। তৎকালীন ২য় বর্ষের শিক্ষার্থীরা মিজানের সহপাঠীদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার নামে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করে। মিজানুর সরল-সোজা হওয়ার কারণে সিনিয়ররা তাকে আলাদাভাবে অকথ্য ভাষায় গালি দেয়াসহ শারীরিক নির্যাতন করে। পরদিন  আবারো বিভাগের সিনিয়ররা হুমকি-ধমকি দেয় মিজানকে। নির্যাতনের মুখে একসময় মিজান অস্বাভাবিক আচরণ করতে থাকে। পরবর্তীতে মিজানের বাবা আসলে তাকেও চিনতে পারেন না মিজান। স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে মিজানকে অনেকদিন ঢাকায় চিকিৎসা নিতে হয়েছে।
চলতি বছরের এপ্রিলে পরিচয় দিতে ভুল করায় রসায়ন বিভাগের প্রথম বর্ষের ছাত্র মোশাররফ হোসেনের কান ফাটান কথিত সিনিয়ররা। ১৭ই এপ্রিল মধ্যরাতের দিকে মওলানা ভাসানী হলের ১১৪ নং রুমে এ ঘটনা ঘটে। জানা যায়, ভাসানী হলের ১১৩ নং ও ১১৪ নং রুম হলো টর্চার সেল। এইসব রুমে নিয়মিত জুনিয়রদের ডেকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়।
একদিন প্রথম বর্ষের (৪৮ আবর্তন) শিক্ষার্থীদের ১১৪ নং রুমে ডাকা হয়। কিন্তু  পরিচয় দিতে ভুল করায়  মোশাররফকে বাংলা বিভাগের ৪৭ ব্যাচের জাহিদ হাসান তুহিন মারধর করেন। মারধরের পর তাকে ১১৩ নং রুমে পাঠানো হয়। এরপর বাংলা বিভাগের ৪৭ ব্যাচের মো. নজরুল তাকে পুনরায় মারধর করেন। এতে তার বাম কান ফেটে রক্ত বের হতে থাকে। পরবর্তীতে তাকে সুস্থ হতে উন্নত চিকিৎসা নিতে হয়।
গত জুলাই মাসের মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধু  হলের গণরুমে প্রথম বর্ষের আরেক শিক্ষার্থীর কান ফাটান কথিত সিনিয়ররা। গণিত বিভাগের প্রথম বর্ষের মো. ফয়সাল আলম নামে এক শিক্ষার্থী এই বর্বরতার শিকার হন।  জানা যায়, রাত ১টার দিকে গণরুমে দ্বিতীয় বর্ষের ৩০/৩৫ জন শিক্ষার্থী গিয়ে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের কাছে পরিচয় জানতে চান।
ঠাণ্ডাজনিত সমস্যার কারণে উচ্চস্বরে পরিচয় দিতে না পারায় ফয়সালকে বিকৃত অঙ্গভঙ্গি করতে বলা হয়। এরপর তাকে আবার জানালার গ্রিল ধরে ঝুলে থাকার নির্দেশ দেন শিহাব নামে দ্বিতীয় বর্ষের এক শিক্ষার্থী। অসুস্থ থাকায় ফয়সাল এতে অস্বীকৃতি জানালে শিহাব তাকে চড়-থাপ্পড় মারেন। এতে ফয়সালের কান ফেটে যায়। পরবর্তীতে ফয়সালকেও দীর্ঘমেয়াদি উন্নত চিকিৎসা নিতে হয়।
তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নির্যাতনের শিকার শিক্ষার্থীরা গণমাধ্যম ও প্রশাসনের কাছে মুখ খুলেন না। অধিকাংশ র‌্যাগিংয়ের ঘটনায় ছাত্রলীগের কর্মীরা জড়িত থাকার খবর আসে। এ ছাড়া নেতাদের নির্দেশে ছাত্রলীগকর্মীরা গণরুমে ‘ম্যানার’ শেখাতে যায় বলে অভিযোগও রয়েছে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল রানা বলেন, ‘আমাদের কোনো কর্মীই র‌্যাগিংয়ের সঙ্গে জড়িত নই। ঢালাওভাবে এধরনের অভিযোগ করা হচ্ছে। এটা আগে ছিল কিন্তু আমরা এই সংস্কৃতিটি বন্ধ করে দিয়েছি। আমরা এ বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছি। কেউ যদি অতি উৎসাহী হয়ে এমন করে তবে আমরা তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবো।
প্রাধ্যক্ষ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক বশির আহমেদ বলেন, ‘অন্যান্য বছরের তুলনায় র‌্যাগিং অনেকটা কমে আসছে। সামনে আরো কমবে বলে আমরা আশাবাদী। র‌্যাগিং বন্ধের জন্য আমরা হলের বিভিন্ন জায়গায় সিসি ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি। আর  কোনো ঘটনা ঘটলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়ে থাকি।
ভিসি অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম বলেন, প্রভোস্ট কমিটির একটা বৈঠক হয়েছে। সেখানে শিক্ষকরা নিজেদের উপস্থিতি ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে র‌্যাগিং নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিভাগের ছাত্র উপদেষ্টাদের এই ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করতে হবে। র‌্যাগিংয়ের ঘটনা কিছু গোপনেও ঘটছে। তবে অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। হলগুলোর করিডোর, কমনরুম ও গণরুমের সামনে দরজায় সিসি ক্যামেরা লাগানোর সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। গণরুমে কে ঢুকছে এসব তথ্য আমরা  নেবো। তবে যারাই প্রথম বর্ষে র‌্যাগিংয়ের শিকার হচ্ছে তারাই দ্বিতীয় বর্ষে এসে র‌্যাগ দিচ্ছে। আশ্চর্য সাইকোলজি। ফলে আমরা কাউন্সেলিংয়ের ব্যাপারেও ভাবছি।