Monday, October 12, 2009

মন্দা থেকে বেরিয়ে আসবে ব্রিটেনের অর্থনীতি- টেলিগ্রাফে সাক্ষাত্কারে ব্রাউন

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী গর্ডন ব্রাউন বলেছেন, আশাতীত প্রবৃদ্ধিসহ অর্থনৈতিক মন্দা থেকে বেরিয়ে আসবে ব্রিটেনের অর্থনীতি। আগামী বছরের মধ্যেই ব্রিটেন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ফিরবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। গতকাল শনিবার ডেইলি টেলিগ্রাফকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি এ কথা বলেন।
ব্রিটেনের আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে নিজেকে আশাবাদী হিসেবে চিত্রিত করার চেষ্টা করছেন গর্ডন ব্রাউন। তিনি বলেন, মানুষ যা আশা করছে আগামী বছর তার চেয়েও বেশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হবে ব্রিটেন। ভবিষ্যতে আরও বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা বলছি যে আগামী বছর অর্থনীতিতে অতিরিক্ত দেড় শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে। কয়েক মাসের মধ্যে মানুষ অর্থনীতিতে যা দেখবে, তাতে আরও অনেক মানুষ আমাদের পক্ষে চলে আসবে।’

এবার বাঘের পরিচয়পত্র!

মানুষের মতো এবার ভারতের ব্যাঘ্রকুলকেও দেওয়া হবে পরিচয়পত্র। ওই পরিচয়পত্রে থাকবে ভারতের এ-জাতীয় পশুর সংক্ষিপ্ত পরিচয়। থাকবে বাঘের ছবি, চামড়ার প্রতিচ্ছবি, পশুটির বিশেষ গুণাবলি, শিকারসংখ্যা, রেডিও কলারের তথ্যসহ অন্যান্য তথ্য। এর ফলে ভারতের প্রতিটি বাঘের ওপর নজর রাখতে পারবে সরকার। বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে ‘ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটি’র (এনটিটিএ) সম্পাদক রাজেশ গোপাল সাংবাদিকদের এ তথ্য দেন।
তিনি আরও বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমরা ভারতের ১৭টি রাজ্যকে এ পরিচয় দেওয়ার কথা বলেছি। দেশের ৩৭টি অভয়ারণ্যকে এ প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে। সরকারি হিসাবে গোটা দেশে এক হাজার ৪০০ বাঘ রয়েছে। এ বছরে এখন পর্যন্ত ৫৬টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৪টি মারা পড়েছে চোরা শিকারিদের হাতে।’

ভারতে মাওবাদীদের মোকাবিলায় নতুন কৌশল

মাওবাদী বিদ্রোহীদের মোকাবিলায় একটি নতুন কৌশলের ব্যাপারে সম্মত হয়েছে ভারত সরকার। কর্মকর্তারা জানান, মাওবাদী বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত সমন্বিত অভিযানে নেতৃত্ব দেবে রাজ্য পুলিশ। তাদের সহায়তা দেবে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা।
পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য মহারাষ্ট্রে মাওবাদী বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াইয়ে ১৭ পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার পর অভিযান চালানোর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। ভারত সরকার বলেছে, মাওবাদী বিদ্রোহীরা সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা-হুমকির সৃষ্টি করছে।
ভারতের ২০টি রাজ্যে সক্রিয় মাওবাদী বিদ্রোহীরা। দেশটির ৬০০টি জেলার মধ্যে ২২৩টিতেই বিদ্রোহীদের তত্পরতা রয়েছে।
বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানে মোতায়েন করা হবে কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনীর প্রায় ৭০ হাজার সদস্য। তাঁদের সঙ্গে থাকছে কমান্ডো ও বিশেষ বাহিনী। অভিযানে সহায়তা দেবে সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার।
সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, বিদ্রোহীদের শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মূল এবং বিদ্রোহীদের কবল থেকে প্রায় ৪০ হাজার বর্গকিলোমিটার ভূমি মুক্ত করতে আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরু হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, এ পর্যন্ত মাওবাদী বিদ্রোহীদের পলিটব্যুরোর সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ফিলিপাইনে বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৮৪

উত্তর ফিলিপাইনের প্রধান দ্বীপ লুজনের পার্বত্য এলাকায় মাটিচাপা পড়ে থাকা আরও লাশ গতকাল শনিবার উদ্ধার করা হয়েছে। এতে দেশটির ওই অঞ্চলে গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণের ফলে সৃষ্ট বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮৪। ওই দ্বীপের প্রধান প্রধান রাস্তাঘাট পরিষ্কার করতে ও কাদা সরাতে উদ্ধারকর্মীদের পাশাপাশি কাজ করার জন্য সেনাবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট গ্লোরিয়া ম্যাকাপাগাল অ্যারোইয়ো।
গত দুই সপ্তাহে প্রবল বর্ষণ, বন্যা ও ঝড়ে ফিলিপাইনের উত্তরাঞ্চলের তিনটি এলাকা ভয়াবহ রকম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লুজনের কৃষিজমিগুলো পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষি অধিদপ্তর শুক্রবার জানিয়েছে, ওই এলাকায় অন্তত ছয় কোটি ৯০ লাখ ডলারের শস্যের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
এক বিবৃতিতে প্রেসিডেন্ট গ্লোরিয়া ম্যাকাপাগাল অ্যারোইয়ো বলেন, ‘উদ্ধার-তত্পরতায় কাজ করার জন্য আমি বাগুইয়ো শহরের সেনা একাডেমিকে নির্দেশ দিয়েছি।’
রাজধানী ম্যানিলা থেকে প্রায় আড়াই শ কিলোমিটার দূরের বাগুইয়ো পার্বত্য শহরটি এখনো যোগাযোগ-বিচ্ছিন্ন রয়েছে। ৪ অক্টোবর দেশটির উত্তরাঞ্চলে টাইফুন পারমা আঘাত হানে। এর প্রভাবে সেখানে প্রবল বর্ষণজনিত বন্যায় ধান ও সবজিরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। তলিয়ে গেছে হাজার হাজার ঘরবাড়ি। এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে সামুদ্রিক ঝড় ক্যাটসানার আঘাতে ম্যানিলার আশপাশে প্রবল বর্ষণ হয়। বন্যা ও ভূমিধসে তখন অন্তত ৩৩৭ জনের মৃত্যু হয়। কয়েক লাখ লোক আশ্রয় হারায়। এ দুই ঝড়ে অন্তত চার লাখ ৭৮ হাজার টন শস্যের ক্ষতি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে রাজি পিয়ংইয়ং- তিন জাতির বৈঠক শেষে ওয়েন জিয়াবাও

উত্তর কোরিয়া অবস্থান পাল্টাতে শুরু করেছে। দেশটি এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই নয়, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কোন্নয়নে রাজি। এ কথা জানিয়েছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও। বেইজিংয়ে তিন জাতির শীর্ষ বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান।
উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু কর্মসূচি থেকে ফিরিয়ে আনা ও পূর্ব এশীয় প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহযোগিতা বাড়াতে করণীয় ঠিক করতে গতকাল শনিবার বেইজিংয়ে বৈঠক করেন চীনের প্রধানমন্ত্রী ওয়েন জিয়াবাও, জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী ইউকি হাতোইয়ামা ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি মাইয়ুং।
বৈঠক শেষে এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ‘কোরীয় উপদ্বীপকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত রাখতে আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আলোচনার মাধ্যমে আমরা এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে চাই। আমরা সমঝোতার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ উপায়ে পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়াতে চাই।’ বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা ও শান্তি নিশ্চিত করতে ছয় জাতির আলোচনা ফের শিগগির শুরু করার চেষ্টা চালানো হবে।
ওয়েন জিয়াবাও গত সপ্তাহের রোববার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত উত্তর কোরিয়া সফর করেন। তিনি গতকাল বলেন, পিয়ংইয়ং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে রাজি। সেই সঙ্গে জাপান ও প্রতিবেশী দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গেও দূরত্ব ঘোচাতে চায়। তিনি বলেন, ‘উত্তর কোরিয়াকে পরমাণু কর্মসূচি থেকে বিরত রাখার এখনই সময়। এই সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেলে আবারও আমাদের গলদঘর্ম হতে হবে। সব চেষ্টাই বৃথা যাবে।’
বৈঠকে তিন নেতা আঞ্চলিক অর্থনৈতিক অবস্থা আরও উন্নত করার লক্ষ্যে যৌথভাবে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। তাঁরা এমনকি ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন’ ধরনের ব্লক গড়ে তোলারও আশাবাদ ব্যক্ত করেন। চলমান বৈশ্বিক মন্দা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ অন্যান্য সমস্যা মোকাবিলায় চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া যৌথভাবে উদ্যোগ নেওয়ারও শপথ নেয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, পূর্ব এশিয়ার এই তিন দেশই দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নে দৃঢ়প্রত্যয়ী।
উত্তর কোরিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহযোগিতা দেওয়া হবে কি না, এ বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানানো হয়নি। বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন, এশিয়ার এই তিন দেশের শক্তিশালী জোট উত্তর কোরিয়াকে ছয় জাতির আলোচনা টেবিলে ফিরিয়ে আনতে চাপ সৃষ্টি করবে।
গত মে মাসে উত্তর কোরিয়া পরমাণু অস্ত্রের ও দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালানোর পর কোরীয় উপদ্বীপে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। এর পর যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়ে পিয়ংইয়ং। তারা দাবি করে আসছিল, ছয় জাতির আলোচনায় নয়, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় রাজি। তবে দেশটি অবশেষে ছয় জাতির সঙ্গে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আভাস দিয়েছে।

হাইতিতে জাতিসংঘের বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ১১ জন নিহত

হাইতিতে জাতিসংঘের একটি বিমান বিধ্বস্ত হয়ে ১১ জন নিহত হয়েছেন। গত শুক্রবার ডমিনিকান রিপাবলিক সীমান্তে টহল দেওয়ার সময় পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা লেগে বিমানটি বিধ্বস্ত হয়। হাইতিতে জাতিসংঘ মিশন এ খবর জানায়।
মিনুসতাহ নামে পরিচিত সামরিক মিশনের এক বিবৃতিতে বলা হয়, কাসা-২১২ সামরিক বিমানটি বিধ্বস্ত হয়ে ১১ যাত্রী ও ক্রুর সবাই নিহত হয়েছেন। ঘটনাস্থলে গিয়ে কাউকে জীবিত পাননি উদ্ধারকর্মীরা। বিমানটি মিনুসতাহ মিশনের উরুগুয়ে কন্টিনজেন্টের।
ওই সূত্রকে উদ্ধৃত করে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের মুখপাত্র ভাননিনা মায়েসট্রেসি বলেন, নিহত ব্যক্তিরা মিশনে কর্মরত উরুগুয়ে ও জর্ডানের সেনা কর্মকর্তা। তবে এর চেয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি এই মুখপাত্র।

ওবামাকে নোবেল দেওয়া ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ: ফিদেল কাস্ত্রো

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার ঘটনাকে একটি ‘ইতিবাচক পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন কিউবার বিপ্লবী নেতা ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো। গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা বলেছেন।
এক বিবৃতিতে কাস্ত্রো বলেন, ‘নোবেল কমিটির ওই সিদ্ধান্তের (ওবামাকে পুরস্কৃত করার) মাধ্যমে পূর্ববর্তী মার্কিন শাসকদের গণহত্যার রাজনীতিরই সমালোচনা করা হয়েছে। যদিও আমি সব সময় ওই সংস্থার সিদ্ধান্তের সঙ্গে সহমত হইনি, তবে এবারের শান্তি পুরস্কার সম্পর্কে বলতে পারি, এটা একটা ইতিবাচক পদক্ষেপ।’
অনেকেই ভাবছেন ওবামাকে আগেভাগেই পুরস্কৃত করা হয়েছে—এমনটা মনে করেন না কাস্ত্রো। এ প্রসঙ্গ উল্লেখ করে কাস্ত্রো বলেন, ওই পুরস্কারটিকে শুধু একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের পুরস্কারপ্রাপ্তি হিসেবে দেখতে চান না, বরং এটি পূর্ববর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টদের গণহত্যার রাজনীতির একটি তীব্র সমালোচনা হিসেবেই বিবেচনা করছেন তিনি। এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে সে কারণেই।
গত শুক্রবার চতুর্থ মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান বারাক ওবামা। শান্তির লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক কূটনীতি জোরদার করা এবং মানুষে মানুষে সহযোগিতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে এ পুরস্কার দেওয়া হয়। বিশ্বনেতারা ওবামার ওই পুরস্কার পাওয়ায় স্বাগত জানালেও অনেকেই ওই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন।

ভারতকে পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি বিস্তার করতে দেবেন না ওবামা

শান্তিতে নোবেল জয়ের কয়েক ঘণ্টা আগেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ঘোষণা দিয়েছিলেন, তাঁর প্রশাসন ভারতকে পরমাণু কর্মসূচি বিস্তারের সুযোগ দেবে না। এ লক্ষ্যে বিশ্বের অন্যান্য দেশের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে যাচ্ছে ওয়াশিংটন। মার্কিন কংগ্রেসকে দেওয়া এক চিঠিতে ওবামা তাঁর এই অবস্থানের কথার জানান দেন।
এটি ছিল কংগ্রেসকে লেখা ওবামার নিয়মিত চিঠি। ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বেসামরিক পরমাণু সহযোগিতা আইনের ২০৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতি ছয় মাস পর তাঁকে চিঠি লিখে কংগ্রেসকে তাঁর প্রশাসনের অবস্থান পরিষ্কার করতে হয়। ওই চিঠিতে ওবামা জানান, দুই দেশের বেসামরিক পরমাণু কর্মসূচি সহযোগিতা চুক্তির সুবাদে ভারতকে কোনো অবস্থাতেই পরমাণু অস্ত্র তৈরির সুযোগ দেবে না ওয়াশিংটন। দেশটিকে পরমাণু কর্মসূচি বিস্তার করতে দেওয়া হবে না।
ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পরমাণু চুক্তির পর অনেক সমালোচক মন্তব্য করেছিলেন, এর মধ্য দিয়ে ভারত পরমাণু অস্ত্র তৈরির কর্মসূচির বিস্তার ঘটাবে।

নোবেল না পাওয়া এক ‘নোবেলজয়ী’র গল্প

ভারতের অহিংস আন্দোলনের জনক মহাত্মা গান্ধী নোবেল শান্তি পুরস্কার পাননি। যদিও তিনি পাঁচ-পাঁচবার এ সম্মানজনক পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন, তবে তাঁর অনুসারীরা ঠিকই এ পুরস্কার পেয়েছেন। সর্বশেষ পেলেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৪তম প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। এর আগে গান্ধী-দর্শনে বিশ্বাসী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, নেলসন ম্যান্ডেলা, অং সান সু চি ও দালাই লামা শান্তিতে নোবেল পান।
প্রেসিডেন্ট ওবামা তাঁর রাজনৈতিক জীবনে গান্ধীজির আদর্শ থেকে অনুপ্রেরণা খুঁজেছেন। কিছুদিন আগে তিনি বলেছিলেন, ‘আমার সিনেট অফিসে মহাত্মা গান্ধীর একটি ছবি রয়েছে। এই ছবি দেখে আমি সব সময় বলি, ওয়াশিংটন থেকে চূড়ান্ত বিজয় আসবে না, বিজয় আসবে মানুষের কাছ থেকে।’
নোবেল কমিটির ওয়েবসাইটে ‘মহাত্মা গান্ধী: দ্য মিসিং লরিয়েট’ শীর্ষক এক লেখায় বলা হয়েছে, ১৯৩৭, ১৯৩৮, ১৯৩৯, ১৯৪৭ ও ১৯৪৮ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মহাত্মা গান্ধী মনোনীত হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে দেওয়া হয়নি। পরে নোবেল কমিটির অন্য সদস্যরা অবশ্য এ জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন। ১৯৮৯ সালে দালাই লামাকে যখন পুরস্কৃত করা হয়, তখন নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান বলেছিলেন, ‘মহাত্মা গান্ধীর স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে দালাই লামাকে এই পুরস্কার দেওয়া হলো।’
গান্ধীর একনিষ্ঠ ভক্ত ত্রিদিব সুরাদ বলেন, কোনো সন্দেহ নেই যে গান্ধীর জীবদ্দশায় নোবেল কমিটি সাম্রাজ্যবাদীদের প্রভাবের কারণে তাঁকে শান্তিতে নোবেল দেয়নি। কারণ, গান্ধী ছিলেন সাম্রাজ্যবাদীদের জন্য হুমকি। তবে বাপুজি নোবেল পুরস্কার না পেলেও বড় নোবেল মানুষের ভালোবাসাপেয়েছিলেন।
১৯৪৮ সালের ৩০ জানুয়ারি মহাত্মা গান্ধী নথুরাম গডসে নামের এক উগ্রপন্থীর গুলিতে নিহত হন। এর দুই দিন পরই ১৯৪৮ সালের শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়নের দিন শেষ হয়। ওই বছর নোবেল কমিটি গান্ধীর পক্ষে ছয়টি চিঠি পেয়েছিল। ১৯৪৮ সালের ১৮ নভেম্বর নোবেল কমিটি ঘোষণা করে, এ বছর শান্তিতে নোবেল দেওয়া হবে না। কারণ, ওই পদকের জন্য যথাযোগ্য কোনো প্রার্থী জীবিত নেই।

ওবামা কি পারবেন প্রত্যাশা পূরণ করতে?

ক্ষমতা হাতে নেওয়ার পর পরই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিয়েছিলেন বারাক ওবামা। বলেছিলেন, মুসলমানরা যুক্তরাষ্ট্রের শত্রু নয়। তাঁর প্রশাসনের অন্যতম প্রধান কাজ হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে সুসম্পর্ক স্থাপন করা। আরও বলেছিলেন, একটা গ্রহণযোগ্য সমাধানে পৌঁছাতে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনকে নিয়ে একটা কার্যকর আলোচনায়ও বসবেন তিনি। জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলায় তিনি সবার সঙ্গে বসে একটা সুরাহায় পৌঁছার কথাও বলেছিলেন। সবচেয়ে চমক লাগানো ঘোষণাটা দিলেন এর পরই। বললেন, একটি পরমাণু অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার স্বপ্ন দেখেন তিনি। এ জন্য তিনি যথাসাধ্য তা করার চেষ্টা করবেন। ওবামার আগের মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মধ্যে এমন সাহসী উচ্চারণ খুব একটা শোনা যায়নি।
দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরও হয়নি। ওবামা ইতিমধ্যে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে হাঁটা শুরু করেছেন। প্রথমেই কুখ্যাত গুয়ানতানামো বে বন্দিশিবির বন্ধের ঘোষণা দিলেন। আফগানিস্তান থেকে সেনা কমানোর কথা বললেন। জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলায় গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমাতে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেছেন। পরমাণু অস্ত্রমুক্ত বিশ্ব গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে ‘চিরবৈরী’ রাশিয়ার সঙ্গেও তিনি গাঁটছড়া বেঁধেছেন। এসব উদ্যোগের স্বীকৃতি হিসেবেই শুক্রবার নোবেল কমিটি ওবামাকেই এবারের নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য যোগ্য মনে করেছে।
যে লক্ষ্যে ওবামাকে নোবেল দেওয়া হলো, তিনি কি পারবেন সেই স্বপ্নের বন্দরে নোঙর করতে? কারণ, ওবামার সদিচ্ছা থাকলেও বাকি পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলো কি নিজেদের স্বার্থ বাদ দিয়ে একজন ওবামার ডাকে সাড়া দেবে? এমন নানা প্রশ্ন এখন বিশ্লেষকদের মনে।
প্রেসিডেন্ট ওবামা ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ পরমাণু অস্ত্র কমিয়ে একটি সুন্দর বাসযোগ্য বিশ্ব গড়ার চুক্তিতে পৌঁছাতে আলোচনা শুরু করেছেন। ওবামা ইতিমধ্যে ইরাক যুদ্ধের ইতি টানার দিকে যাচ্ছেন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি পাকিস্তান ও সোমালিয়ায় সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান জোরদার করছেন। বুশ-প্রশাসনের ব্যর্থ অভিযানের পর আফগানিস্তানে ফের দ্বিতীয় দফার যুদ্ধ শুরু করেছেন। যদিও আফগান যুদ্ধে ন্যাটো জোটের মিত্ররা এখন আর আগের মতো আগ্রহ দেখাচ্ছে না।
প্রেসিডেন্ট ওবামা ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা চান। কিন্তু এ ব্যাপারে তিনি এই দুপক্ষ থেকে খুব কমই সাড়া পাচ্ছেন। ওবামা-প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের ‘পুরোনো শত্রু’ ইরান, উত্তর কোরিয়া ও কিউবার সঙ্গেও আলোচনা শুরু করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ পদক্ষেপ থেকে উল্লেখযোগ্য কোনো ফল আসেনি।
জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলায় ওবামা অঙ্গীকার করেছেন। কিন্তু ডিসেম্বরে অনুষ্ঠেয় কোপেনহেগেনের জলবায়ু সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র বোধহয় কোনো সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিতে পারছে না। কারণ, এ-সংক্রান্ত একটি খসড়া এখনো কংগ্রেসে ঝুলে আছে।
তাই নোবেল জয়ে আনন্দিত হওয়ার চেয়ে এখন এটি ‘দায়িত্বের গুরুভার’ হয়েই দাঁড়িয়েছে ওবামার জন্য। কারণ, বৈশ্বিক এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে শান্তিময় বিশ্ব গড়ার পথে তাঁকে যে দীর্ঘ বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে, ওই পথ কি তিনি পাড়ি দিতে পারবেন? উত্তরের জন্য বিশ্ববাসীকে আরও অপেক্ষা করতে হবে।

এ পুরস্কার আমার জন্য কাজে নেমে পড়ার ডাক: ওবামা

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা শান্তিতে নোবেল জয়ের পর তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, তিনি এ পুরস্কার পেয়ে বিস্মিত হয়েছেন। একই সঙ্গে নোবেল কমিটির প্রতি তিনি কৃতজ্ঞ। তিনি আরও বলেছেন, একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তিনি এ পুরস্কারকে ‘কাজে নেমে পড়ার ডাক’ হিসেবে বিবেচনা করছেন।
ওবামা বলেছেন, তিনি নিজেকে সম্মানজনক নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য যোগ্য মনে করেন না। কিন্তু বিশ্বের কঠিন চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় তিনি এ পুরস্কারকে কর্মোদ্দীপক হিসেবে বিবেচনা করছেন। এর ফলে তিনি এখন বড় বড় সমস্যা মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিতে সচেষ্ট হবেন।
ওবামা বলেন, ‘এটি আমার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, পুরো যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের অর্জন এটি। এ পুরস্কারের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলা, পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ ও বৈশ্বিক দ্বন্দ্ব নিরসনে আমি বাস্তব পদক্ষেপ নিতে পারব।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ‘আমি যতদূর ইতিহাস জানি, শুধু সুনির্দিষ্ট কোনো কর্মকাণ্ডের জন্যই নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় না। মানুষের সমস্যা মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্যও পুরস্কৃত করা হয়ে থাকে। এবং একমাত্র সে কারণেই আমি এ পুরস্কার নেব। আমি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কাজ করতে চাই।’ বিশ্বের সব রাষ্ট্রকে একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এগিয়ে আসারও আহ্বান জানিয়েছেন ২০০৯ সালের শান্তিতে নোবেলজয়ী এই নেতা।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র রবার্ট গিবস বলেছেন, ১০ ডিসেম্বর প্রেসিডেন্ট ওবামা নোবেল পুরস্কার নেবেন। তিনি পুরস্কারের ১৪ লাখ ডলারই দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করে দেবেন।

বিএসটিএমপিআইএ দ্রুত তেল ও গ্যাস উত্তোলনের দাবি জানিয়েছে

বাংলাদেশ স্পেশালাইজড টেক্সটাইল মিলস অ্যান্ড পাওয়ারলুম ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যাসোসিয়েশন (বিএসটিএমপিআইএ) দ্রুত তেল ও গ্যাস উত্তোলনের দাবি জানিয়েছে। তা না হলে দেশে নতুন বিনিয়োগ হবে না এবং দেশের উন্নয়ন ২০ বছর পিছিয়ে যাবে।
সমিতির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গতকাল শনিবার সংগঠনের সভাপতি শরীফ এম আফজাল হোসেনের সভাপতিত্বে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সমিতির সদস্য লিয়াকত আলী ভূঁইয়া, আবদুস সাত্তার, কাজী রফিকুল আলম, আবু সাঈদ মিয়া, শেখ আবদুল হাকিম, আজিজুল হক, মো. সালাহউদ্দিন আহমেদ, সুলতান আহমেদ, মো. আবদুল্লাহ, মোতাহার হোসেন মোল্লা, মো. ফরহাদ হোসেন, মঞ্জুর আহমেদ প্রমুখ।
সভায় সরকারের তেল ও গ্যাস উত্তোলনের চুক্তিকে স্বাগত জানানো হয়। একই সঙ্গে সভায় সরকার তেল ও গ্যাস উত্তোলনের যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা বাস্তবায়নের অত্যন্ত জরুরি বলে মত প্রকাশ করা হয়।
সমিতি আরও জানিয়েছে, গ্যাস সরবরাহ স্বল্পতার কারণে বিদ্যমান শিল্প ইউনিটগুলো ১০০ শতাংশ উত্পাদন করতে সক্ষম হচ্ছে না এবং দেশে নতুন বিনিয়োগও হচ্ছে না। এতে করে বেকার সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে।

দেশব্যাপী রন্ধনশিল্পী প্রতিযোগিতার আনুষ্ঠানিক সূচনা

দেশের সেরা রন্ধনশিল্পী খুঁজে বের করতে গতকাল শনিবার থেকে শুরু হয়েছে দেশব্যাপী ‘মনিটর-মালয়েশিয়ান পাম অয়েল শেফ অব দি ইয়ার-২০০৯’।
প্রতিযোগিতার আয়োজক দেশের শীর্ষস্থানীয় ভ্রমণবিষয়ক পাক্ষিক দ্য বাংলাদেশ মনিটর। মালয়েশিয়ান পাম অয়েল কাউন্সিল এ প্রতিযোগিতার টাইটেল স্পন্সরের এবং এমিরেটস এয়ারলাইন এ প্রতিযোগিতার প্রিমিয়াম পার্টনার হয়েছে।
প্রতিযোগিতার বিস্তারিত জানাতে রাজধানীর স্থানীয় একটি হোটেলে শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিযোগিতা শুরুর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন মনিটর-এর সম্পাদক ও প্রতিযোগিতার চেয়ারম্যান কাজী ওয়াহিদুল আলম, মালয়েশিয়ান পাম অয়েল কাউন্সিলের বাংলাদেশ, নেপাল ও মায়ানমারের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক এ কে এম ফখরুল আলম, এমিরেটস বাংলাদেশের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক হানিফ জাকারিয়া এবং জুরি কমিটির প্রধান ও বিশিষ্ট পুষ্টিবিদ সিদ্দিকা কবীর।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়,প্রতিযোগীকে বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী একটি মেইন ডিস ও একটি ভেজিটেবল ডিসের রন্ধনপ্রণালী (রেসিপি) পাঠাতে হবে। প্রতিটি রেসিপি ছয়জন প্রাপ্তবয়স্ক লোককে পরিবেশনার ভিত্তিতে হতে হবে। সৃজনশীল রেসিপি অগ্রাধিকার পাবে। তবে একজন একাধিক পাঠাতে পারবেন। ১৫ নভেম্বর ২০০৯ তারিখের মধ্যে সব এন্ট্রি দ্য বাংলাদেশ মনিটর, সিটি হার্ট (১০ম তলা), ৬৭ নয়াপল্টন, ঢাকা-১০০০ ঠিকানায় পাঠাতে হবে।
প্রতিযোগীদের পাঠানো রন্ধনপ্রণালীর ওপর ভিত্তি করে প্রাথমিক পর্যায়ে মোট ১০ জন প্রতিযোগীকে ১৩ ডিসেম্বর ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হবে।
বিভিন্ন বিবেচনায় একজন ‘মনিটর-মালয়েশিয়ান পাম অয়েল শেফ অব দি ইয়ার-২০০৯’ অথবা সেরা রন্ধনশিল্পী-২০০৯ নির্বাচিত হবেন। একজনকে প্রথম রানার আপ ও অন্য একজনকে দ্বিতীয় রানার আপ ঘোষণা করা হবে। বিজয়ী একটি ক্রেস্ট, দুবাইয়ে দুই রাত্রিযাপন ও দুজনের জন্য ঢাকা-দুবাই-ঢাকা এয়ার টিকিট, নগদ ২৫,০০০ টাকাসহ অন্যান্য পুরস্কার পাবেন।

ক্রেতার অভাবে পাটের দাম পড়ে গেছে by সফি খান,

কুড়িগ্রামে কৃষকদের ঘরে ঘরে প্রচুর পরিমাণ পাট পড়ে আছে। বাজারে দাম ও ক্রেতা কম থাকায় কৃষকেরা কাঙ্ক্ষিত দামে পাট বিক্রি করতে পারছেন না। মৌসুমের শুরুতে মানভেদে প্রতি মণ পাট এক হাজার ৩০০ থেকে এক হাজার ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও এখন তা কমে এক হাজার ১০০ টাকা থেকে এক হাজার ২০০ টাকায় নেমে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, কুড়িগ্রাম জেলায় লাইসেন্সধারী পাটের ফড়িয়া-মহাজন রয়েছে ৮৫২ জন। এর মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজন মহাজন দাম বাড়ার আশায় কম দামের সুযোগে পাট কিনছেন।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বড় মোকামগুলোয় পাটের চাহিদা না থাকায় স্থানীয় মহাজনদের অধিকাংশই পাট কিনছেন না।
পাট ব্যবসায়ী বাবলা ব্যানার্জি ও জিয়াউল হক প্রথম আলোকে জানান, বিভিন্ন জুট মিলের কাছে জেলার শতাধিক ফড়িয়া-মহাজনের প্রায় দুই কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এই পাওনা টাকার জন্য বহু তদবির করেও কাজ হয়নি। যে কারণে তাঁরা এখন পাট কিনতে পারছেন না।
এদিকে ব্যবসায়ীরা জানান, চারটি পাটকল কুড়িগ্রাম জেলা শহর, ভূরুঙ্গামারী ও উলিপুরে ক্রয়কেন্দ্র খুলে বাকিতে পাট কিনতে চাইছে। এতে স্থানীয় মহাজন-ফড়িয়ারা সাড়া দিচ্ছেন না। এ ছাড়া অন্যান্য বছর বেড়া, খুলনা, সরিষাবাড়ী, পাবনা, কাশীনাথপুর, দৌলতপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে বড় ব্যবসায়ীরা পাট কিনতে কুড়িগ্রাম এলেও এবার আসেননি।
এ অবস্থায় বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী সম্প্রতি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী ও ভূরুঙ্গামারী উপজেলা সফরকালে বিভিন্ন জুট মিলের কাছে ফড়িয়া-মহাজনদের পাওনা টাকা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেন।
এদিকে জেলা কৃষি সম্প্রসারণ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, কুড়িগ্রামে এবার ১৬ হাজার ৭২৭ হেক্টর জমিতে পাট চাষ হয়েছে। উত্পাদন হয়েছে প্রায় সাড়ে আট লাখ মণ পাট।
পাওয়া হিসাবে দেখা গেছে, কুড়িগ্রামের ক্রিসেন্ট জুট মিলস ১৩ হাজার মণ, প্লাটিনাম জুবলী জুট মিলস ৫০০ মণ, উলিপুরের ইস্টার্ন জুট মিলস চার হাজার মণ এবং ভূরুঙ্গামারী লতিফ বাওয়ানী জুট মিলস ১২ হাজার মণ পাট বাকিতে কিনেছে। এ ছাড়া ফড়িয়া-মহাজনেরা দুই লাখ মণ পাট কিনেছে। এতে অন্তত ছয় লাখ মণেরও বেশি পাট এখন চাষিদের ঘরে পড়ে রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কুড়িগ্রামের মুখ্য পাট পরিদর্শকের কার্যালয় সূত্র জানায়, স্থানীয় ফড়িয়া-মহাজনদের লতিফ বাওয়ানী জুট মিলসের কাছে প্রায় ৭৬ লাখ টাকা, আদমজী জুট মিলসের কাছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা, পিপলস জুট মিলসের কাছে ১৯ লাখ টাকা, প্লাটিনাম জুবলী জুট মিলসের কাছে ২২ লাখ টাকাসহ বিভিন্ন জুট মিলের কাছে প্রায় দুই কোটি টাকা দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া পড়ে আছে।
এ প্রসঙ্গে মুখ্য পাট পরিদর্শক আবদুল কাদের সরকার প্রথম আলোকে বলেন, মৌসুমের শুরুতে পাটের বাজার কিছুটা চাঙা থাকলেও এখন চাষিরা ক্রেতার অভাবে পাট বিক্রি করতে পারছেন না। এ জন্য ক্রয়কেন্দ্রগুলোতে নগদ টাকায় পাট কেনার পাশাপাশি ফড়িয়া-মহাজনদের পাওনা পরিশোধ করাও জরুরি হয়ে পড়েছে।

দুষ্কৃতকারীরা অবৈধ অর্থের মাধ্যমে দেশে দেশে সন্ত্রাস চালায়

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী বলেছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সন্ত্রাস বাড়ছে। সন্ত্রাসী তত্পরতা বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে মানি লন্ডারিং।
তিনি আরও বলেছেন, জাতীয় অর্থনীতিতেও মানি লন্ডারিং নেতিবাচক ভূমিকা রাখে। তাই ব্যাংকে সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়ে ব্যাংকারদের সতর্ক থাকতে হবে। পাশাপাশি অ্যান্টি মানি লন্ডারিং আইনেরও যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
কক্সবাজার শহরের একটি অভিজাত হোটেলে বেসরকারি এবি ব্যাংক আয়োজিত অ্যান্টি মানি লন্ডারিং-বিষয়ক দিনব্যাপী এক কর্মশালার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে গতকাল শনিবার তিনি এসব কথা বলেন।
জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী বলেন, দুষ্কৃতকারীরা অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থের মাধ্যমে সন্ত্রাস চালায় এবং চোরাকারবার ও কালোবাজারি করে।
এই জাতীয় নানা কাজে অর্থ লেনদেনের জন্য সন্ত্রাসীরা ব্যবহার করে ব্যাংকিং চ্যানেল। এ বিষয়ে যদি ব্যাংকাররা সচেতন হন, তাহলে সন্ত্রাসী তত্পরতা থেকে অনেকটা নিরাপদে থাকা সম্ভব বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এবি ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাইজার এ চৌধুরী কর্মশালায় সভাপতিত্ব করেন।
এতে বক্তৃতা করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যান্টি মানি লন্ডারিং বিভাগের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মাহফুজুর রহমান, এবি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক শামীম আহমদ চৌধুরী, জনতা ব্যাংকের সহকারী মহাব্যবস্থাপক নিজামউদ্দিন প্রমুখ।
কর্মশালায় কক্সবাজারের ২৭টি ব্যাংকের ৫০ জন কর্মকর্তা অংশ নেন।

দুই মাসে এডিপির মাত্র ৪ শতাংশ বাস্তবায়িত

বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে সরকার কোনো গতি আনতে পারেনি। চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে মোট বরাদ্দের মাত্র ৪ শতাংশ অর্থ ব্যয় করা হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০০৯-১০ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়কালে এডিপি বাবদ এক হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
অবশ্য গত অর্থবছরের একই সময়ে ব্যয় করা হয়েছিল এক হাজার ৬৮ কোটি টাকা। সে হিসাবে এডিপির টাকা খরচ বাড়লেও প্রকৃতপক্ষে তা অপরিবর্তিত রয়েছে। কারণ, ২০০৮-০৯ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেও এডিপির মোট বরাদ্দের ৪ শতাংশ ব্যয় হয়েছিল।
অবশ্য চলতি অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এডিপি বরাদ্দের ১৯ শতাংশ অর্থ ছাড় করা হয়েছে, যার পরিমাণ তিন হাজার ২৯৩ কোটি টাকা।
চলতি ২০০৯-১০ অর্থবছরের জন্য এডিপির মোট বরাদ্দ ৩০ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এ প্রসঙ্গে বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছিলেন, ‘আমাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন হার আশাব্যঞ্জক নয়।...আমি নিশ্চিত যে, পরিবীক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হলে বাস্তবায়ন হার আরও বৃদ্ধি পেত। প্রস্তাবিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি যথেষ্ট উচ্চাভিলাষী হলেও আমরা মনে করি যথাযথ পরিবীক্ষণ নিশ্চিত করতে পারলে তা বাস্তবায়ন করতে পারব।’
বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, অর্থবছরের প্রথম দিকে এডিপি বাস্তবায়নের হার গতানুগতিক ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। ২০০৬-০৭ ও ২০০৭-০৮ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল যথাক্রমে ৪ শতাংশ ও ৩ শতাংশ।
অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় বিশ্বমন্দা মোকাবিলায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির ওপর জোর দিয়েছিলেন। আর অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে সরকারের ব্যয় বাড়ানোর বিষয়টি অনিবার্যভাবে চলে আসে।
বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সরকার ব্যয় বাড়ানো তো দূরের কথা ঠিকমতো অর্থ ব্যয় করতে পারছে না। ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকার কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না।
প্রাপ্ত পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, দুই মাসে মাত্র ২৮টি প্রকল্পের পেছনে ছাড়কৃত অর্থ থেকে ব্যয় শুরু হয়েছে। তবে কোনো প্রকল্পই শেষ হয়নি।
চলতি অর্থবছর এডিপিতে মোট ৮৮৯টি উন্নয়ন প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে নতুন প্রকল্পের সংখ্যা ৩৫।
আর গত অর্থবছরে মোট উন্নয়ন প্রকল্পের সংখ্যা ছিল ৯০৪টি, যার মধ্যে আবার নতুন প্রকল্প ছিল ১০৪টি।

স্থানীয় প্রস্তুতকারকদের সুযোগ দিতে দরপত্রের শর্ত শিথিল করার দাবি

বিদ্যুত্সাশ্রয়ী বাতি কেনার ক্ষেত্রে সরকারকে দরপত্রের শর্ত শিথিল করার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ এফিশিয়েন্ট লাইটিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (বেলমা)। তা না হলে দেশীয় বিদ্যুত্সাশ্রয়ী বাতি প্রস্তুতকারক শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো দরপত্র দাখিলের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে।
গতকাল শনিবার সমিতির এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানানো হয়। রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) কার্যালয়ে আয়োজিত এ সংবাদ সম্মেলনে সমিতির সভাপতি কাজী মাহবুবুর রহমান ফিরোজ, সহসভাপতি নুরুল আকতার, সদস্যসচিব হারুন-অর-রশীদ, কোষাধ্যক্ষ হাবিবুর রহমান, সদস্য এ কাদের খান, জাহাঙ্গীর আলম, মীর টি আই ফারুক রিজভী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বর্তমান সরকার বিদ্যুত্সাশ্রয়ী বাতি সরবরাহের মাধ্যমে দেশের বিদ্যুত্ ঘাটতি সমস্যার দ্রুত সমাধানের যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা যেমন সময়োচিত তেমনি বাস্তবোচিত। এ লক্ষ্যে পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড এক কোটি পাঁচ লাখ বাতি কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে। কিন্তু দরপত্রের যে শর্ত দেওয়া হয়েছে, তাতে দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ নিতে পারবে না।
সমিতির সভাপতি কাজী মাহবুবুর রহমান জানান, দরপত্রের অন্যতম শর্ত হলো, ‘দেশি-বিদেশি যেসব প্রতিষ্ঠানের আগে ২০ লাখ বাতি সরবরাহের অভিজ্ঞতা রয়েছে, কেবল ওই সব প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নিতে পারবে।’ কিন্তু বাংলাদেশে এর আগে সর্বোচ্চ ৮০ হাজার বাতি কেনার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। ফলে শর্ত শিথিল করা না হলে বাংলাদেশের বিদ্যুত্সাশ্রয়ী বাতি (এনার্জি সেভিং ল্যাম্প) উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কেউই এতে অংশ নিতে পারবে না।
সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, দরপত্র যেভাবে আহ্বান করা হয়েছে তাতে কেবল চীনের প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নিতে পারবে। তবে চীনের তৈরি বাতির গুণগতমান ও স্থায়িত্ব নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। কারণ, স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বাতির মান যাচাই করার জন্য পরীক্ষাগার থাকলেও আমদানি করা বাতি পরীক্ষার জন্য তা নেই।
সমিতির সহসভাপতি নুরুল আকতার বলেন, ১০ বছর আগে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো বিদ্যুত্সাশ্রয়ী বাতি তৈরি শুরু করে। বর্তমানে স্থানীয়ভাবে উত্পাদিত বাতি আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়েছে। সরকারি সহায়তা পেলে রপ্তানি আয়ের দিক থেকে বিদ্যুত্সাশ্রয়ী বাতি খাত আগামী তিন বছরের মধ্যে তৈরি পোশাকের বিকল্প খাত হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।
অনুষ্ঠানে জানানো হয়, দেশের আট-নয়টি প্রতিষ্ঠান বিদ্যুত্সাশ্রয়ী বাতি উত্পাদন করে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক উত্পাদনক্ষমতা তিন কোটি পিস বাতি। তবে তিন-চার মাস সময় পেলে এসব কারখানার উত্পাদনক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে। দেশে প্রতি মাসে আট-নয় লাখ বাতির চাহিদা রয়েছে।
সমিতি জানায়, এক কোটি পাঁচ লাখ বাতির পুরোটায় বিদেশি কোম্পানিগুলো সরবরাহ করলে স্থানীয় কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ, সরকার বাতি সরবরাহ করায় স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের উত্পাদিত বাতির চাহিদা কমে যাবে।
সমিতির নেতারা বলেন, স্থানীয় শিল্পের স্বার্থ সংরক্ষণে সরকারি নীতির সঙ্গে সংগতি রেখে দেশীয় বাতি নির্মাতা কারখানাগুলোর জন্য একটা কোটা সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তাঁরা স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ৪০ শতাংশ কোটা রাখার দাবি জানান। এ ছাড়া দরপত্রে দেশি-বিদেশি সব প্রতিষ্ঠানের সরবরাহ করা বাতির জন্য এক বছরের নিশ্চয়তা প্রদানের শর্ত দরপত্রে উল্লেখ রাখার প্রস্তাব করা হয়।

পুটিকের সেঞ্চুরিতে সুপার এইটে কোবরারা

প্রথম ম্যাচে জয়ের পর দেশ থেকে ফোন করেছিলেন গ্রায়েম স্মিথ। মূল অধিনায়কের অভিনন্দন দারুণভাবে উদ্বুদ্ধ করল ভারপ্রাপ্ত অধিনায়ক অ্যান্ড্রু পুটিককে। চ্যাম্পিয়নস লিগের প্রথম সেঞ্চুরিতে কাল ওটাগো ভল্টসের বিপক্ষে কেপ কোবরাসকে জেতালেন ৫৪ রানে। টানা দ্বিতীয় জয়ে প্রথম দল হিসেবে সুপার এইটও নিশ্চিত হলো দক্ষিণ আফ্রিকার টি-টোয়েন্টি চ্যাম্পিয়নদের।
আগের ম্যাচে টি-টোয়েন্টিতে ১৩তম শূন্যের পর কাল ১ রান করেছেন দলের সবচেয়ে বড় তারকা হার্শেল গিবস। তবে তার পরও কোবরাস ৪ উইকেটে ১৯৩ রান তোলে অধিনায়কের ৬২ বলে ১০৪ ও জাস্টিন অনটংয়ের ১৪ বলে ৩৯ রানের অপরাজিত দুটি ইনিংসে। ম্যাচ-সেরা পুটিকের ইনিংসে ছিল ১২টি চার ও ৩টি ছয়, অনটংয়ের ২টি চার ও ৪টি ছয়। ভল্টসের সফলতম বোলার ইংলিশ অলরাউন্ডার দিমিত্রি মাসকারেনহাস (২/২০)।
ক্লেইনভেল্ট (৩/২৪) ও দুমিনির (২/১০) দুর্দান্ত বোলিংয়ে ১৭.১ ওভারে ১৩৯ রানেই গুটিয়ে যায় ভল্টস। সর্বোচ্চ ৩৮ রান নাথান ম্যাককালামের, ছোট ভাই ব্রেন্ডন করেছে ২১। সাবেক কিউই ব্যাটসম্যান কেন রাদারফোর্ডের ছেলে হামিশ রাদারফোর্ড করেছেন ৯।
আগের দিন ‘ডি’ গ্রুপের প্রথম ম্যাচে ভিক্টোরিয়া বুশরেঞ্জার্স ৭ উইকেটে হারিয়েছে দিল্লি ডেয়ারডেভিলসকে। পুরো ২০ ওভার ব্যাট করেও ডেয়ারডেভিলস করেছিল ৮ উইকেটে মাত্র ৯৮। সর্বোচ্চ ২৫ রান মিঠুন মানহাসের, দীর্ঘদিন পর মাঠে নামা বীরেন্দর শেবাগ করেছেন ২১। ম্যাচ-সেরা ক্লিন্ট ম্যাকে নেন ৩ উইকেট, ২টি করে শেন হারউড ও অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ড। সহজ লক্ষ্যে ব্যাটিংয়ে নেমে রব কুইনি (৪০) ও ব্র্যাড হজের (৯) ৫৫ রানের উদ্বোধনী জুটিতেই নিশ্চিত হয়ে যায় ম্যাচের ভাগ্য। এর পর অধিনায়ক ক্যামেরন হোয়াইটের অপরাজিত ২৫ রানে বুশরেঞ্জার্স জয় পায় ২০ বল হাতে রেখেই।

৪-৩ ফল দেখছেন স্টিভ ওয়াহ

ভারতে গেছেন মানবসেবার কাজে। কিন্তু মানুষটির নাম যখন স্টিভ ওয়াহ, তখন ক্রিকেট নিয়ে কথা না বলে তো আর উপায় নেই! স্টিভ ওয়াহর মতে ভারত-অস্ট্রেলিয়া ওয়ানডে সিরিজে কোনো দলই পরিষ্কার ফেবারিট নয়। ‘স্টিভ ওয়াহ ফাউন্ডেশন’-এর তহবিল সংগ্রহের জন্য সাবেক অস্ট্রেলিয়া অধিনায়ক এখন আছেন রাজধানী নয়াদিল্লিতে। ২৫ অক্টোবর ভদোদরার (বরোদা) ম্যাচ দিয়ে শুরু হচ্ছে সাত ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজ।
চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ব্যর্থতা অস্ট্রেলিয়া সিরিজেই মুছে ফেলতে চাইবে ভারত। ওয়াহ যমজের বড় স্টিভের মতে, ওয়ানডে সিরিজে হবে তাই জোর লড়াই, ‘ক্রিকেটের জন্য সময়টা হতে যাচ্ছে দারুণ উত্তেজনাপূর্ণ। আমরা সম্প্রতি বিদেশের মাটিতে ভালো করছি। ভারত চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে ব্যর্থ হয়েছে, কিন্তু ওয়ানডেতে পরিবর্তনটা খুব দ্রুত হয়। ভারতের দলটি ভালো এবং লড়াই হবে সমানে সমান। আমি বলতে পারব না কে জিতবে, তবে আমার মনে হচ্ছে, সিরিজের ফলাফল হবে ৪-৩।’ স্টিভ ওয়াহর বক্তব্যকে সমর্থন দিচ্ছে আইসিসি ওয়ানডে র্যাঙ্কিংও। ১২৮ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে আছে চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা, ১২৪ পয়েন্ট নিয়ে পরের জায়গাটিতেই আছে ১৯৮৩-র বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।
‘স্টিভ ওয়াহ ফাউন্ডেশন’ দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত শিশুদের এবং তাদের অসহায় পরিবারকে সাহায্যে কাজ করছে। এ ছাড়া এই ফাউন্ডেশন দুরারোগ্য ব্যাধি নিয়ে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা সৃষ্টিতেও কাজ করবে। স্টিভ মনে করেন, ক্রীড়াবিদদের জনহিতকর কাজে আরও বেশি করে এগিয়ে আসা উচিত, ‘ক্রীড়াবিদদের ক্ষমতা অনেক, কারণ তারা প্রভাব ফেলতে পারে। তারা তহবিল সংগ্রহ করতে পারে, কারণ অনেক লোকই ক্রীড়াতারকার দিকে তাকিয়ে থাকে। সমাজসেবার মাধ্যমে তারা ভালো উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে।’

ইংল্যান্ডকেই ভালো লাগে আনচেলত্তির

মাত্র তিন মাসই হয়েছে ইংলিশ ফুটবলের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন কার্লো আনচেলত্তি। এর মধ্যেই ইংলিশ ফুটবলের মহাভক্ত বনে গেছেন চেলসির ইতালিয়ান কোচ। ইংল্যান্ড-মুগ্ধতা জানাতে গিয়ে নিজের দেশ ইতালিকে দেখিয়েছেন একটু খাটো করেই।
ইতালির বাইরে এই প্রথম কোচ হয়ে গেলেন সাবেক এসি মিলান ও জুভেন্টাস কোচ। ইংল্যান্ডের সবকিছুই তাঁর কাছে আলাদা লাগবে, নতুন লাগবে; এটা স্বাভাবিক। তবে আনচেলত্তি শুধু এ কারণেই ইংলিশদের ক্রীড়ামোদি হিসেবে অ্যাখ্যা দেননি। ‘প্রথম ব্যাপার হলো স্টেডিয়াম। ইংল্যান্ডের স্টেডিয়ামগুলো আকর্ষণীয়, আরামদায়ক এবং মানানসই। আর ইতালিতে তা নয়। আর এখানে সমর্থকেরা যায় খেলা উপভোগ করতে, রেফারি কিংবা প্রতিপক্ষের প্রতি চড়াও হতে নয়’—আনচেলত্তি ইংলিশ ফুটবলের সঙ্গে ইতালির ফুটবলের তফাত্ দেখছেন এভাবেই। ইংল্যান্ডকে বেশি ক্রীড়া-ঘনিষ্ঠ দেশ বলেও মনে করছেন চেলসির নতুন কোচ, ‘এটা বেশি ক্রীড়া-ঘনিষ্ঠ, এখানে সংস্কৃতি ভিন্ন। বলতে গেলে ক্রীড়া সংস্কৃতিই এখানকার সংস্কৃতি।’
সবকিছু ভালো লাগলেও আনচেলত্তির কাছে সবচেয়ে কঠিন মনে হচ্ছে ভাষা। ইংরেজিতে একদমই কাঁচা এই ইতালিয়ান। ধীরে ধীরে অবশ্য রপ্ত করে নিচ্ছেন, ‘উন্নতি হচ্ছে। খুব কঠিন, কিন্তু আমি খুব চেষ্টা করে যাচ্ছি। আপনি ইংরেজি স্কুলে পড়েননি কেন—এই প্রশ্নটা মানুষ আমাকে কতবার যে জিজ্ঞেস করেছে, তা আমি মনে করতে পারব না। পঞ্চাশে এসে নতুন একটা ভাষা শিখতে শুরু করা সহজ নয়। (রে) উইলকিনস আমাকে সাহায্য করছে। তবে এখন আমাকে সবাই বুঝতে পারে। খুব রেগে গেলে ইতালিয়ান ভাষায় কথা বলে ফেলি। তবে সেগুলো সাধারণ কথা এবং সবাই বোঝে।’
আনচেলত্তির কথ্য ইংরেজির উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু তিনি যে দলটি ছেড়ে বিদেশ-বিভুঁইয়ে গেছেন, সেই এসি মিলান কিন্তু চরম অবনতির দিকেই যাচ্ছে। প্রায় আট বছর যে দলটির কোচ ছিলেন, সেই দলটির এই অবস্থা দেখে কেমন লাগছে আনচেলত্তির? তাঁর উত্তর, ‘এটাকে নাটক বানিয়ে ফেলবেন না। কাকাকে বিক্রি করে দেওয়ার কারণে একটা কঠিন সময় যাচ্ছে তাদের। কিন্তু এ অবস্থা থেকে উত্তরণের রসদ তাদের আছে।’
আর শুরুতেই সমালোচনার তীরে বিদ্ধ হতে শুরু করা এসি মিলানের নতুন কোচ লিওনার্দোও শিগগিরই সবকিছু থেকে সামলে উঠতে পারবেন বলে বিশ্বাস আনচেলত্তির।
আর স্টামফোর্ড ব্রিজে আনচেলত্তির কী অবস্থা? ভালোই আছেন তিনি। তবে স্টামফোর্ড ব্রিজের মরিনহো-প্রীতিটা এখনো আগের মতোই আছে। ‘এখানে সবারই তাঁর (হোসে মরিনহো) প্রতি ভালোবাসা আছে। সে এখানে দারুণ কিছু করেছে এবং সবাই, এমনকি খেলোয়াড়েরাও তাঁকে এখনো ভালোবাসে। একজন কোচের জন্য এটা বড় তৃপ্তির বিষয়।’

কোয়ার্টার ফাইনাল শুরু আজ থেকে

৫ দিনের বৃষ্টিবিরতি শেষ, সিটিসেল ফেডারেশন কাপ আবার ফিরছে মাঠে। কিছুটা বিশ্রাম পাওয়ায় বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের মাঠটা আগের চেয়ে কিছুটা ভালো।
আজ থেকে টুর্নামেন্টের নকআউট পর্ব অর্থাত্ কোয়ার্টার ফাইনাল। এই পর্বের প্রথম দিনে গতবারের চ্যাম্পিয়ন মোহামেডানের সামনে নারায়ণগঞ্জ শুকতারা। কাল রহমতগঞ্জ-ফেনী সকার ম্যাচ। পরশু সিলেট বিয়ানীবাজার-চট্টগ্রাম আবাহনী। পরদিন সর্বশেষ ম্যাচে আবাহনী সামনে পাবে শেখ রাসেল ক্রীড়াচক্রকে। সবকটি ম্যাচই বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে শুরু হবে বিকেল পাঁচটায়।
সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে আবাহনীর চেয়ে মোহামেডান সুবিধাজনক অবস্থানে। তুলনামূলক সহজ তাদের প্রতিপক্ষ। অন্য দুটি কোয়ার্টার ফাইনালে দেখা যাবে সমশক্তির লড়াই। এবার বি-লিগের নতুন তিনটি দলই কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছে, এদে

ওয়ানডেতেও অধিনায়ক আফ্রিদি!

পাকিস্তান টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদিকে এবার দেখা যেতে পারে ওয়ানডে দলের নেতৃত্বেও। সেটা হলে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ও দুবাইয়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আগামী মাসে অনুষ্ঠেয় তিন ওয়ানডের সিরিজেই নেতৃত্বে দেখা যাবে আফ্রিদিকে।
পাকিস্তান ওয়ানডে দলের নেতৃত্বে এই পরিবর্তনের কারণ কী? পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) এক সূত্র বলছে, আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে আঙুলে চোট পাওয়ায় সিরিজে অনিশ্চিত ইউনুস খান। তাঁর বিকল্প হিসেবেই আফ্রিদির কথা ভাবছে বোর্ড, ‘আঙুলের চোট কাটিয়ে ওঠার জন্য লড়ছে ইউনুস। ব্যথানাশক ইনজেকশন নিয়ে খেলেছে বলে ওর অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে।’ গত পরশু পিসিবি চেয়ারম্যান ইজাজ বাট শহীদ আফ্রিদিকে আভাস দেন যে, তাঁকেই করা হচ্ছে নিউজিল্যান্ড সিরিজের অধিনায়ক। আফ্রিদির দাবি, ইউনুস ইনজুরি থেকে সেরে উঠছেন, ‘ভালোভাবেই সে ইনজুরি কাটিয়ে উঠছে। সুস্থ হয়েই সে পাকিস্তান দলকে নেতৃত্ব দিতে পারবে বলে মনে করি আমি।’ পাকিস্তানের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় পেশাদার টি-টোয়েন্টি খেলতে যাচ্ছেন আফ্রিদি। তার সঙ্গে চুক্তি করেছে নাসুয়া ডলফিনস। দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলার সুযোগ পাওয়ায় উচ্ছ্বসিত এই পাকিস্তানি অলরাউন্ডার।
ইউনুসের ইনজুরি নিয়ে পিসিবি ও আফ্রিদির দুই রকম কথায় কেউ কেউ অন্য কিছুরও গন্ধ পাচ্ছেন। চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে পাকিস্তান পাতানো ম্যাচ খেলেছে বলে সে দেশের ক্রীড়াবিষয়ক সিনেট কমিটি সন্দেহের যে তীর দেগেছে তাদের দিকে তার কড়া সমালোচনা করেছেন ইউনুস। প্রয়োজনে নেতৃত্ব ছেড়ে দিতেও রাজি পেশোয়ারের পাঠান ব্যাটসম্যান। এসবের জের ধরেই কি ওয়ানডের নেতৃত্ব হারাতে যাচ্ছেন ইউনুস? উত্তরটা সময়ই ভালো দিতে পারবে।

বিশ্বকাপ ২০১১ সূচি চূড়ান্ত হবে ৯ নভেম্বর

রুপ পর্বের ছয়টি ম্যাচ ও দুটি কোয়ার্টার ফাইনাল—২০১১ বিশ্বকাপে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হবে এই আটটি ম্যাচ। ‘বি’ গ্রুপে বাংলাদেশের ছয়টি ম্যাচের মধ্যে পাঁচটিই হওয়ার কথা এখানে। অনিশ্চয়তা কেবল ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি নিয়ে। বাংলাদেশ দল সেটিও নিজেদের মাটিতেই খেলবে কি না, তা নির্ভর করছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) মর্জির ওপর। আগামী ৯ নভেম্বর মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠেয় কেন্দ্রীয় আয়োজক কমিটির সভায় বিশ্বকাপ সূচি চূড়ান্ত হওয়ার কথা।
তবে বাংলাদেশের ইচ্ছায় বাদ সাধতে পারে পাকিস্তান। ২০১১ বিশ্বকাপে ভারতে কোনো ম্যাচ খেলতে চায় না তারা। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) তাদের ম্যাচগুলো বিশ্বকাপের অন্য দুই আয়োজক বাংলাদেশ বা শ্রীলঙ্কায় নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে আইসিসির কাছে। পাকিস্তানের দৈনিক দ্য নেশন-এর খবর, আইসিসির সাম্প্রতিক বোর্ড সভায় এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন পিসিবি প্রধান ইজাজ বাট। দ্য নেশন লিখেছে, ‘দুই দেশের শীতল সম্পর্কের ব্যাপারে আইসিসিও সতর্ক এবং তারা কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না। পাকিস্তান এ রকম আভাসও দিয়েছে যে, ভারতের চেয়ে বাংলাদেশ আর শ্রীলঙ্কাতে খেলতেই বেশি স্বস্তি বোধ করবে তারা।’
কিন্তু পাকিস্তান ‘এ’ গ্রুপে বলে তাদের ম্যাচ বাংলাদেশে হওয়া মানে তো বাংলাদেশের ম্যাচ হবে ভারত বা শ্রীলঙ্কায়! বিসিবির সিনিয়র সহসভাপতি ও সিওসির সম্পাদক মাহবুবল আনাম অবশ্য বলছেন, ‘৯ নভেম্বর ফিকশ্চার ঘোষণার আগে কিছুই চূড়ান্ত নয়।’

বাফুফের মাঠ কমিটিই তো নেই! by মাসুদ আলম

সবাই শুধু বলছেন, ফুটবলের জন্য মাঠ দরকার। মাঠের অভাবে নিচের দিকের লিগগুলো বন্ধ হয়ে আছে। এটা ঠিক, ঢাকা নগরের সব মাঠের মালিক জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ অথবা ঢাকা সিটি করপোরেশন। ফুটবল খেলার জন্য এই দুই কর্তৃপক্ষেরই উচিত ফুটবলকে মাঠের ব্যবস্থা করে দেওয়া। তার পরও ফুটবল পরিচালনা করছে যে প্রতিষ্ঠান, সেই বাফুফের কি কোনো দায় নেই? কী করছে তারা?
প্রথম প্রশ্নের উত্তর, বাফুফে কোনোভাবেই দায় এড়াতে পারে না। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরটা শেষ করা যায় একবাক্যে—নতুন মাঠ পাওয়া বা মাঠ খোঁজার ব্যাপারে বাফুফের কোনো উদ্যোগই দৃশ্যমান নয়।
অবাক করা ব্যাপার, সালাউদ্দিন জমানায় অনেক কিছু হলেও বাফুফের কোনো মাঠ কমিটিই গঠন করা হয়নি গত দেড় বছরে! এনএসসির দায় তো আছেই, তার ওপর মাঠ কমিটি করার ব্যাপারে বাফুফের আশ্চর্য নীরবতা সংকট বাড়িয়ে তুলছে। বাফুফের গঠনতন্ত্রে মাঠ কমিটি করার কথা নেই, কিন্তু গঠনতন্ত্রের বাইরেও প্রয়োজনের তাগিদে অনেক কমিটিই করা হয়েছে। শুধু মাঠ কমিটিটাই তাহলে গুরত্ব হারাল?
এ কারণেই মাঠের ব্যাপারে বাফুফেতে কেউ দায়িত্ব নিয়ে কাজ করেন না। বাফুফের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর পরই কাজী সালাউদ্দিন বলেছিলেন, ঢাকা শহরে ঘুরে ঘুরে মাঠ খোঁজা হবে। প্রয়োজনে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে কথা বলে মাঠ নেওয়া হবে। দরকার হলে সেই মাঠ বাফুফে সংস্কার করে খেলা চালাবে। সেই পরিকল্পনা থেকে একদিন সাংবাদিকদের সামনেই বাফুফের এক সদস্যকে মাঠের দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন সালাউদ্দিন। সেই সদস্য নানা রকম সমস্যা দেখিয়ে দায়িত্ব নিতে অপারগতা জানান তত্ক্ষণাত্। তারপর আর এ ব্যাপারে কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
কাল সালাউদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে মাঠের ব্যাপারে কিছুই বলতে রাজি হননি তিনি। গত দেড় বছরে বাফুফে কী উদ্যোগ নিয়েছে সে প্রশ্নে শুধু বললেন, ‘কাল (আজ) বলব।’ তবে বাফুফের অন্য কর্মকর্তারা বলছেন, বাফুফের উচিত আরও সক্রিয় হয়ে ঢাকা শহরে মাঠ খুঁজে অচিরেই জুনিয়র ডিভিশন লিগগুলো শুরু করা। নইলে সালাউদ্দিনের লক্ষ্য পূরণ হবে না।
কথা বলার লোক আছে বাফুফেতে, কাজের লোকের অভাব। সালাউদ্দিন একা কী করবেন, সেটাও যুক্তিসংগত প্রশ্ন। তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, মাঠ কমিটি নেই কেন? এটা করতে সমস্যা কোথায়? বাফুফের সহসভাপতি কাজী নাবিল আহমেদ বললেন, ‘বাফুফের মাঠ কমিটি বলে কিছু নেই। এটা হওয়া দরকার অচিরেই। এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা কারণে বেশি দূর এগোনো যায়নি।’
বাফুফের হাতে এখন আছে শুধু বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম। কমলাপুর স্টেডিয়াম ছয় মাস আগে সংস্কারের জন্য নেওয়া হলেও সেটি কবে নাগাদ পাওয়া যাবে ঠিক নেই। কাজের গতি খুবই ধীর। কাজ দ্রুত করার জন্য বাফুফে চিঠি দিয়েছে এনএসসিকে। কিন্তু ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান কী কাজ করছে, কী মাটি ফেলছে, এসব কখনো দেখতেও যাননি বাফুফের কর্তারা!
জুনিয়র ডিভিশন লিগগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সমস্যায় পড়েছে ঢাকা মহানগরী লিগ কমিটি। এই কমিটির সমন্বয়কারী আজফার-উজ জামান সোহরাব এ জন্য বাফুফের দায়টাকে বড় করে দেখছেন, ‘মাঠ নিয়ে বাফুফে কোনো চিন্তাভাবনা করে বলে মনেই হয় না। শুধু এনএসসিকে চিঠি দেয়। এনএসসি সেই চিঠির গুরুত্ব দেয় না। নিচের দিকে সব লিগ বন্ধ হয়ে আছে। ফুটবল এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছি আমরা, কিন্তু এভাবে এগোবে? অসম্ভব।’
সাবেক ফুটবলার মোহাম্মদ মহসিনকে একবার মৌখিকভাবে বলা হয়েছিল ঢাকা শহরে মাঠ দেখার জন্য। এর পর কী হয়েছে? কাল মহসিনের কাছে জানতে চাইলে বললেন, ‘আমাকে চিঠি দিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। দায়িত্ব না পেলে তো আর আমি কাজ করতে পারি না।’
গত বছর গাজীপুরে ফেডারেশন কাপ আর নরসিংদীতে বি-লিগের কয়েকটি খেলা চালিয়েছে বি-লিগ কমিটি। চাইলে ঢাকার আশপাশেও মাঠ পাওয়া অসম্ভব কিছু নয়, এটা প্রমাণিত। বাফুফে একটা মাঠ কমিটি করে দিলে তারা নিশ্চয়ই এত দিনে বিকল্প কিছু মাঠ খুঁজে খেলার জন্য তৈরি করতে পারত। ঢাকার বাইরের ক্লাবগুলো ফেডারেশন কাপে খেলতে এসে মাঠ পাচ্ছে না অনুশীলনের জন্য। তাদের অনুশীলনের ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বাফুফেরই। সেটা দূরে থাক, মাঠ কমিটিই নেই যে ফেডারেশনের, তাদের কাছে ‘মাঠ সমস্যা’ তো প্রকট হয়ে উঠবেই!

বিলেতে উচ্চশিক্ষা -স্বপ্ন আর বাস্তবতা! by তানভীর আহমেদ

ব্রিটেনে বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত ১০ বছরের তুলনায় এবার দ্বিগুণ হয়েছে বলে খবর ছেপেছে শীর্ষস্থানীয় দৈনিক দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ (২৪ সেপ্টেম্বর)। পত্রিকাটি বলেছে, এ সংখ্যা বাড়ার কারণ ইউরোপের বাইরের দেশগুলো থেকে শিক্ষার্থীদের প্রবেশ। ৪১ হাজার শিক্ষার্থী এসেছেন শুধু চীন থেকে, বাংলাদেশ থেকে চলতি বছরে শিক্ষার্থী এসেছেন ৩৫ হাজারের মতো। ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড কলেজ অ্যাডমিশন সার্ভিস (ইউকাস) তাদের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করেছে, ইন্টারন্যাশনাল শিক্ষার্থীদের চাপে চলতি বছর ৫০ হাজার ব্রিটিশ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ হারাচ্ছেন।
তাহলে কথা হলো, খোদ ব্রিটিশ শিক্ষার্থীরা যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন না, সেখানে কেন ইন্টারন্যাশনাল শিক্ষার্থীদের এভাবে অধিক সংখ্যায় ভিসা দেওয়া হচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তরও টেলিগ্রাফের ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা আছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেহেতু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের কাছ থেকে হোম স্টুডেন্টদের তুলনায় প্রায় তিনগুণ টিউশন ফি আদায় করছে, তাই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশি শিক্ষার্থীদের প্রতি বেশি ঝুঁকছে। প্রতিটি গ্র্যাজুয়েটের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গড়ে প্রায় ২৮ হাজার ৫০০ পাউন্ড নিচ্ছে।
যেসব শিক্ষার্থী প্রকৃত অর্থে ব্রিটেনে পড়তে আসেন না, তাঁদের কেউ কেউ এমন ধারণা পোষণ করেন যে এখানে আসতে পারলে বস্তা ভরে পাউন্ড কামানো যাবে। ঢাকা শহরে যেমন শপিং সেন্টারের মধ্যে এক-দুই কক্ষবিশিষ্ট কিছু কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় আছে, লন্ডনে বাঙালিদের মালিকানাধীন এ ধরনের অসংখ্য কলেজ আছে, কলেজগুলোকে বলা হয় ভিসা কলেজ। এসব কলেজ থেকে নেওয়া সনদ বস্তুত কোনো কাজেই আসে না। দেশজুড়ে কিছু এজেন্ট রয়েছে, যারা শিক্ষার্থীদের ব্রিটেন সম্পর্কে ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করছে বলে উল্লেখ করেছেন সাম্প্রতিক সময়ে আসা অনেক শিক্ষার্থী। ব্রিটেনে এসে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার পাশাপাশি প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারবেন বলে ধারণা দিয়েছে এসব কলেজের এজেন্টরা।
একজন শিক্ষার্থীর ব্রিটেনে প্রতিমাসে থাকা-খাওয়া বাবদ ন্যূনতম ৪০০-৫০০ পাউন্ড খরচ হবে। কম মূল্যের কলেজের টিউশন ফি বাবদ বছরে কম করে হলেও গুনতে হবে তিন হাজার পাউন্ড। তাহলে প্রতি মাসে একজন ছাত্রের প্রয়োজন ৭০০-৮০০ পাউন্ড। যদি কোনো ভাগ্যবান ছাত্র সপ্তাহে ২০ ঘণ্টার কাজ পেয়েই যান, তবে তাঁর মাসিক আয় ৫০০ পাউন্ড। এখন কথা হলো, থাকা-খাওয়ার খরচ না হয় জুটে গেল, বাকি খরচ আসবে কোথা থেকে? মন্দা অর্থনীতির কারণে শিক্ষার্থীরা এখন ২০ ঘণ্টার কাজও পাচ্ছেন না। আসদা, টেসকো সেইন্সবারির মতো রিটেইল শপগুলো সেলফ চেক আউট পদ্ধতি চালু করে কর্মী সংখ্যা ৫০ ভাগ কমিয়ে ফেলেছে। আর কর্মী ছাঁটাইয়ের সর্বশেষ দৃষ্টান্ত ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ। ৭ অক্টোবর এক হাজার ৭০০ কর্মী ছাঁটাই করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
যেসব শিক্ষার্থী গাঁটের পয়সা খরচ করে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসছেন, তাঁদের জন্য কোনো পরামর্শ নেই, তাঁরা জেনে-বুঝেই পড়তে আসছেন। কারণ তাঁদের আর্থিক সংগতি রয়েছে। আর সঠিক পরামর্শের জন্য সবার ইউকে বর্ডার এজেন্সির ওয়েবসাইট দেখা উচিত।
(http://www.bia.homeoffice.gov.uk/news-and-updates/?area=Studying)
আর যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি অর্থ উপার্জন করবেন, কিংবা অর্থ উপার্জন করে টিউশন ফি জোগাড় করবেন বলে ভাবছেন অথবা টিউশন ফি জোগাড় করে পড়াশোনার খরচ মিটিয়ে কিছু টাকা দেশে পাঠাবেন কিংবা সঞ্চয় করবেন, তাঁদের জন্য পরামর্শ—আপাতত স্বপ্ন দেখা বন্ধ করুন। কারণ, ভাবনার জগত্ আর বাস্তবতার মধ্যে অনেক পার্থক্য। ভাবনার জগতের ধারণা নিয়ে ব্রিটেনে এসে তিন থেকে ছয় মাস কর্মহীন রয়েছেন অনেকেই। অর্থকষ্টে কেউ কেউ মসজিদে রাত যাপন করছেন। তাঁদের মধ্যে আবার কেউ কেউ ফিরে গেছেন বাংলাদেশে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, আগামী বছরের শেষ নাগাদ ব্রিটেন অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে। এ ছাড়া ২০১০ সালে নির্বাচনের আগে হয়তো লেবার সরকার ভোটের হিসাব-নিকাশের জন্য অভিবাসন নীতিতে পরিবর্তন করতে পারে। সেই সঙ্গে ২০১২ সালের অলিম্পিককে কেন্দ্র করে ২০১০ সালের শেষের দিকে কিছু কাজের নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। তাই ২০১০ সালের শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি বিবেচনা করে ব্রিটেনে আসা হবে সঠিক সিদ্ধান্ত।
এ পরিস্থিতিতে সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখতে পারে, স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে যাঁরা ব্রিটেনে আসতে চান তাঁদের কোনো তৃতীয় পক্ষ মিথ্যা পরামর্শ দিচ্ছে কি না অথবা শিক্ষার্থীরা কোনোভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছেন কি না। কোনো অনিয়ম হলে এজেন্সিগুলোকেও একটা নিয়মনীতির মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী জানিয়েছেন, তাঁরা এজেন্সিগুলোর কাছ থেকে ব্রিটেন সম্বন্ধে উঁচু ধারণা পেয়েছেন। ব্রিটেনে যেসব শিক্ষার্থী বর্তমানে কাজ না পেয়ে নিদারুণ কষ্টে দিনযাপন করছেন, না খেয়ে পার্কে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, বাংলাদেশ হাইকমিশন লন্ডন, বাংলাদেশ সেন্টার ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের সহায়তায় তাঁদের সাময়িকভাবে সহায়তা দেওয়ার কথা ভাবতে পারে সরকার।
তানভীর আহমেদ: প্রথম আলোর লন্ডন প্রতিনিধি।

একটি মৃত্যু ও কিছু ভাবনা -সময়ের প্রেক্ষিত by মনজুরুল হক

মৃত্যুর সঙ্গে আমাদের অন্তরঙ্গ বসবাস। মৃত্যুর এই নিকট সান্নিধ্য সত্ত্বেও মানুষের মৃত্যুতে আমরা হই ব্যথিত। আর সেই মৃত্যু যদি হয় পরিচিত কিংবা আপন কারও মৃত্যু, বেদনার ভার সেখানে সংগত কারণেই হয়ে থাকে আরও অনেক বেশি। কিছুদিন আগে আমার এক সহকর্মী নারীকে নীরবে চোখের জল ফেলতে দেখে আমি জানতে চেয়েছিলাম, কেন তাঁর সেই কান্না। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, আট বছর ধরে বাড়িতে বসবাস করা বিড়ালের মৃত্যুতে বিষণ্নতায় তিনি আক্রান্ত এবং নীরব কান্না তাঁর জন্য হচ্ছে সেই বেদনার বোঝা লাঘবের জুতসই পথ। বিড়ালের মৃত্যুতে কান্না অদ্ভুত শোনালেও সেই কান্নাও তো হচ্ছে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেখা দেওয়া বিচ্ছেদে বেদনাহত হওয়ার প্রকাশ। জন্মালে মরতে হবে—শৈশবের সেই বোধোদয়ের সময় থেকেই কথাটা জানা থাকলেও মৃত্যুভয়ে অনেকেই আমরা তাড়িত এবং আপনজনের মৃত্যুকে সহজভাবে গ্রহণ করতে আমরা অপারগ। পরিচিত সবার মৃত্যুই যে আবার আমাদের মনকে বিষণ্নতায় ভরিয়ে দেয়, তা তো নয়। এমন মৃত্যুও তো আছে, যে মৃত্যুসংবাদে আমরা হাঁফ ছেড়ে বাঁচি, মনে হয় ভারী এক পাথর বুঝি গড়িয়ে নেমে গেছে অতলে, আর আমাদের তা করে দিয়ে গেছে ভারমুক্ত।
বাঙালি জাতিসত্তার এ-যুগের কলঙ্কিত মোশতাক আহমদের মৃত্যুর বিষয়টি একবার ভেবে দেখুন, তাহলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে মৃত্যু কখনো কখনো আমাদের শঙ্কামুক্তও করে থাকে। বিড়ালের মৃত্যুতে অঝোর ধারায় চোখের জল ফেলা আর একজন মানুষের মৃত্যুতে ভারমুক্ত বোধ করা—এ যেন আমাদের বৈচিত্র্যভরা মানবজীবনেরই চমত্কার প্রতিফলন। এর পরও বলতে হয়, সব মানুষই ইতিহাসের খলনায়কের মতো তেমন দুর্ভাগা নয়। আর তাই মানুষের চলে যাওয়ায় বেদনাহত হওয়াটাই মানবের সহজাত ধর্ম। তবে যে প্রশ্ন থেকে যায় তা হলো, মৃত্যুতে মনোবেদনায় ভরিয়ে তোলার মতো কাছের মানুষ হয়ে উঠতে ঠিক কতটা সময়ের দরকার? সাম্প্রতিক একটি মৃত্যুর ঘটনায় প্রশ্নটি আবারও আমার মনে দেখা দিয়েছে এবং প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাইনি।

দুই.
স্যাম নোদা নামের মানুষটি কিছুটা খাটো হলেও ছিলেন বিশাল দেহী। আগে বার কয়েক প্রেসক্লাবে দেখা-সাক্ষাত্ হলেও আলাপ মোটেও হয়নি, আর তাই আমার অপরিচিতই তিনি থেকে গিয়েছিলেন। তবে প্রেসক্লাবের নির্বাচনে সভাপতি পদে আমি জয়লাভ করার কিছুদিন পর তিনি কাছে এসে আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছিলেন, সময় আর সুযোগ হলে আমি যেন তাঁর সঙ্গে একদিন কথা বলি। প্রথম সেই আলাপের আন্তরিকতাতেই আমার বুঝতে অসুবিধা হয়নি, বিশাল দেহের সেই মানুষটির ভেতর রয়ে গেছে খুবই বিনয়ী আর কোমল এক ব্যক্তিত্ব। সে রাতে বাড়ি ফিরে তাঁর ই-মেইল আমি পাই, যেখানে আবারও তিনি বলতে ভোলেননি যে, আমার সঙ্গে তাঁর কিছু কথা আছে। ফলে ই-মেইল আদান-প্রদানে সাক্ষাতের একটি সময় আমরা অচিরেই ঠিক করে ফেলি।
আমার ধারণা ছিল, ক্লাবের অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর ব্যক্তিগত রেষারেষি থেকে দেখা দেওয়া ছোটখাটো কিছু সমস্যার সমাধানে পথনির্দেশিকা তিনি হয়তো আমাকে দেখিয়ে দেবেন। তিনি যে তিন দশকের বেশি সময় ধরে ক্লাবের সদস্য, তা আমি আগেই জানতে পেরেছি। অন্যদিকে আমার নিজের ক্লাব-জীবনের স্থায়িত্ব হচ্ছে এর মাত্র এক-তৃতীয়াংশ।
নির্দিষ্ট দিনে ক্লাবে আমাদের পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাতের শুরুতেই তিনি বলেছিলেন, প্রায় আট বছর আগে জাপানের এশিয়াটিক সোসাইটির বার্ষিক সংকলনে আমার যে লেখা ছাপা হয়েছিল, সেটা তিনি পড়েছেন এবং জাপানের সঙ্গে বঙ্গভূমির সম্পর্কের অতীত ইতিহাসের অনেক কিছু এর মধ্য দিয়ে তিনি জানতে পেরেছেন। আলাপচারিতার শুরুতেই এ-রকম এক প্রশংসাসূচক অভিমত শুনে যতটা না আনন্দিত হয়েছিলাম, বরং সেটা তার চেয়ে বেশি আমাকে অবাক করে দিয়েছিল। আমার সেই আট বছর আগের রচনায় যে এমন এক গুণমুগ্ধ পাঠক থেকে থাকতে পারে, সেই চিন্তা আমার মাথায় একেবারেই ছিল না। আর সে-কারণেই আমার অবাক হওয়া।
সেদিনের সেই প্রথম দীর্ঘ আলাপে অনেক কথা আমরা বলে থাকলেও ক্লাব প্রসঙ্গে কোনো রকম মন্তব্য নোদা সাহেব একেবারেই করেননি। বরং আরও তিনি যা বলেছিলেন তা হলো, তাঁর এক স্কুল সহপাঠী বর্তমানে প্রামাণ্য ছবি তৈরিতে জড়িত এবং ছবি তৈরির কাজে বাংলাদেশে সেই নারী একাধিকবার গেছেন। ফলে আমি যেন সেই নারীর সঙ্গে অবশ্যই যোগাযোগ করি। কেননা সুন্দরবনের ওপর যে চমত্কার ছবি তিনি তৈরি করেছেন, সেটা আমার অবশ্যই দেখা উচিত।
সেদিনের সেই সাক্ষাতের পর দৈনন্দিন জীবনের কর্মব্যস্ততায় আমি আবারও জড়িয়ে পড়ি। যথারীতি ভুলে গিয়েছিলাম নোদা সাহেবের দেওয়া ঠিকানায় বাংলাদেশের ওপর ছবি তৈরি করা নারীর সঙ্গে ই-মেইলে যোগাযোগ করতে। তবে আমি ভুলে গেলেও হঠাত্ পরিচয়ে আমার বন্ধু হয়ে ওঠা জাপানি ভদ্রলোক কিন্তু ভুলে যাননি তাঁর দায়িত্ববোধের কথা।
কিসের যেন এক তাড়া স্যাম নোদা অনুভব করেছিলেন, যা বুঝে ওঠার সাধ্য আমার ছিল না। আমি কেবল অবাক হয়ে দেখছিলাম, কতটা আপনজনের মতো আমাকে খুশি করায় তিনি ব্যস্ত—কোনো রকম প্রতিদানের বিনিময়ে তা নয়, বরং স্রেফ নতুন হয়ে যাওয়া বন্ধুত্বের খাতিরে। এ ছাড়া প্রতিদান দেওয়ার মতো অবস্থানে আমি তো মোটেও নেই। স্যাম নোদা দীর্ঘদিন জাপানের নেতৃস্থানীয় একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে ঊর্ধ্বতন নির্বাহী পদে চাকরি করেছেন, চাকরিসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়েছেন জীবনের বড় একটা সময় এবং সেখানে একটি অঙ্গরাজ্যের গভর্নরের উপদেষ্টা পদেও নিয়োজিত ছিলেন। ফলে আমার কাছ থেকে প্রাপ্তির কোনো প্রত্যাশা তাঁর থাকার কথা নয় এবং তা ছিলও না।
এর মধ্যেই এক রাতে তাঁর পাঠানো ই-মেইলে আমি জানতে পারি, স্কুলের সেই সহপাঠী বন্ধুকে তিনি আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য ক্লাবে আসতে রাজি করিয়েছেন এবং ক্যানসারের চিকিত্সার জন্য সামনের কয়েকটি দিন তাঁকে হাসপাতালে কাটাতে হবে বলে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েই বন্ধুকে নিয়ে তিনি ক্লাবে আসবেন। সেই প্রথম আমার জানার সুযোগ হয় যে, ক্যানসারের মতো মারাত্মক এক অসুখে তিনি ভুগছেন। অথচ সব সময় মুখে হাসি লেগে থাকা অত্যন্ত বিনয়ী ও অমায়িক সেই মানুষটি দেখে কিন্তু বুঝে ওঠার কোনোই উপায় নেই যে, মরণ এক ব্যাধি তাঁর দেহে বাসা বেঁধে বসে আছে।
হাসপাতাল থেকেই আরেকটি ই-মেইল কয়েক দিন পর তিনি আমাকে পাঠান। যেখানে উল্লেখ ছিল, সেপ্টেম্বর মাসের ১৫ তারিখে হাসপাতাল থেকে তিনি ছাড়া পাচ্ছেন এবং আমার সময় হলে ১৭ তারিখ দুপুরে বন্ধুকে নিয়ে তিনি ক্লাবে আসবেন। এবার অবশ্য দেরি না করে তাঁকে আমি জানিয়ে দিয়েছিলাম, সময় আমার হবে এবং টোকিওতে অবস্থানরত বাংলাদেশি চলচ্চিত্রনির্মাতা তানভীর মোকাম্মেলকেও আমি ওই নারীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে আগ্রহী। আমার সেই প্রস্তাবে খুবই খুশি হয়েছিলেন স্যাম নোদা। এরপর কথামতো সেপ্টেম্বর মাসের ১৭ তারিখ দুপুরে আমরা আলোচনায় বসি।
স্যাম নোদা সেদিন কিছুটা আগেই চলে এসেছিলেন এবং আমাদের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনায় বসেছিলেন। নানা রকম কথাবার্তায় তাঁর বিচিত্র জীবন সম্পর্কেই কেবল আমরা জানতে পারিনি, শারীরিক অসুস্থতার বিষয়টিও তিনি উল্লেখ করেছেন। এবং বলেছিলেন, চিকিত্সা-প্রক্রিয়া ভালোভাবেই এগিয়ে চলেছে, যদিও খাওয়া-দাওয়ার আগ্রহ তিনি একেবারেই হারিয়ে ফেলছেন। একইভাবে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন যে ক্ষুধার অনীহা দেহের ওজন হ্রাসে অবশ্যই সহায়ক হবে বলে খুব একটা উদ্বিগ্ন এতে তিনি নন। আমাদের আলাপ চলতে থাকার মুখে যথাসময়ে সেখানে এসে উপস্থিত হন স্যাম নোদার স্কুলজীবনের সহপাঠী, প্রামাণ্য ছায়াছবির নির্মাতা ইওকো মিউরা। সঙ্গে তিনি নিয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশের ওপর তৈরি তাঁর দুটি ছবির ডিভিডি। আমাদের হাতে সেই ডিভিডি তুলে দেওয়ার সময় তৃপ্তির এক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়েছিল স্যাম নোদার মুখজুড়ে। তানভীর মোকাম্মেল সুন্দরবনের ওপর তাঁর নিজের তৈরি প্রামাণ্য ছবির একটি কপি জাপানি চলচ্চিত্রনির্মাতাকে দিয়ে স্যাম নোদাকেও সেই ছবি দেখার অনুরোধ করেছিলেন। নোদা সাহেব বলেছিলেন, ছবিটি যে তিনি কেবল দেখবেন তা-ই নয়, সময় হলে আর শরীরে কুলালে অচিরেই বাংলাদেশ ভ্রমণেও তিনি যাবেন। ইওকো মিউরা যখন তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে বলছিলেন বাংলাদেশের মানুষের আন্তরিকতার কথা, তা শুনে স্যাম নোদার বাংলাদেশ ভ্রমণের ইচ্ছা তখন যেন আরও প্রবল হয়ে ওঠে, যা আমরা লক্ষ করি।
স্যাম নোদাকে পছন্দ হয়েছিল তানভীর মোকাম্মেলেরও। আর তাই বিদায় নেওয়ার আগে তানভীর বলেছিলেন, আগে থেকে সময় ঠিক করে নিয়ে সামনের কোনো একদিন দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে তিনি আগ্রহী। নোদা সাহেবও খুশি হয়েছিলেন সেই প্রস্তাবে। আমাদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আবারও সাক্ষাতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এরপর ধীরে বার থেকে বের হয়ে যান বিশাল দেহের নরম মনের সেই মানুষটি।

তিন.
তানভীর মোকাম্মেল আমাকে বলেছিলেন, দেশে ফিরে যাওয়ার আগে আবারও স্যাম নোদার সাক্ষাতের অপেক্ষায় তিনি থাকবেন। ভদ্রলোক যেন গল্প-উপন্যাসের পাতা থেকে উঠে আসা এক চরিত্র; যাঁর সাহচর্য মনে করিয়ে দেয়, আমাদের এই পৃথিবী এখনো ভালো মানুষহীন হয়ে যায়নি।
কাজের চাপে সাক্ষাতের তারিখ ঠিক করে নেওয়ার বিষয়টি আমি ভুলে গেলেও তানভীর একসময় আমাকে সেটা মনে করিয়ে দিলে নোদা সাহেবকে যে ই-মেইল পাঠাতে হবে, তা আমি টুকে রেখেছিলাম। এর ঠিক পরদিন সকালে ক্লাবে গিয়ে আমার মেইলবক্সে রাখা একটি বার্তা আমি খুঁজে পাই। ইওকো মিউরা নন, অন্য এক নারী এসেছিলেন আমার সঙ্গে দেখা করতে এবং আমাকে না পেয়ে সেই চিরকুট তিনি রেখে যান; যেখানে লেখা ছিল ‘আপনি নিশ্চয় শুনে বেদনাহত হবেন যে এ মাসের ১৯ তারিখে স্যাম নোদা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।’
চোখ আমার সহসাই ভিজে আসছিল এবং আমি ছুটে সেখান থেকে চলে গিয়েছিলাম ঘরের অন্য এক প্রান্তে, যেখানে কেউ দেখবে না আমার চোখের জল ধরে রাখার প্রয়াস। তারিখের হিসাব বলে দেয়, আমাদের সঙ্গে দেখা হওয়ার ঠিক দুই দিন পর সবকিছু ছেড়ে চলে গেছেন স্যাম নোদা। বিদায়ের আঁচ আগে থেকে করতে পেরেছিলেন বলেই কোনো এক তাড়ায় তিনি ভুগছিলেন কি? প্রশ্নের উত্তর জানা নেই আমার। তানভীরকে তখনই আমি ফোনে জানিয়ে দিই সেই দুঃসংবাদ। তানভীরও বাকহীন হয়ে পড়েছিলেন এবং আমার বুঝতে কষ্ট হয়নি, চোখ দুটি তাঁরও ভিজে আসছিল এমন এক সুহূদ-বন্ধুকে স্মরণ করে, যাঁর সঙ্গে আমার নিজের পরিচয় মাস দুয়েকের, আর তানভীরের যাঁর সান্নিধ্যে আসা সাকুল্যে মাত্র একবার।
বন্ধুত্ব গড়ে উঠতে সময় কোনো বন্ধন নয়, যদি সেখানে থাকে আন্তরিকতা আর হূদয়ের উষ্ণতা। সে কথাটাই আবারও আমাদের মনে করিয়ে দিয়ে একরাশ বেদনার বোঝা পেছনে রেখে চলে গেলেন আমাদের সেই নতুন বন্ধু। এখন হয়তো দূরে কোথাও আকাশ থেকে চোখ মেলে তিনি দেখছেন সবুজ চাদরে ঢাকা এক দেশ আর মায়াবী সুন্দরবন—প্রবল ইচ্ছা মনে থেকে যাওয়া সত্ত্বেও যেখানে যাওয়ার সময় তিনি করে উঠতে পারেননি।
টোকিও, ৫ অক্টোবর, ২০০৯
মনজুরুল হক: শিক্ষক, প্রাবন্ধিক।

ব্যক্তিতে ও সমাজে মনেরও চাই যত্ন ও পরিচর্যা -মানসিক স্বাস্থ্য দিবস by মো. গোলাম রব্বানী

২০০৯ সালের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যায় মানসিক স্বাস্থ্য: চিকিত্সা সম্প্রসারণ ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন’। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বসম্পন্ন। গুরুত্ব ব্যাখ্যা করার আগে দেখা যাক বাংলাদেশের মানসিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার বর্তমান হাল। বাংলাদেশে ১৮ বছরের ওপরে মোট জনসংখ্যার মধ্যে ১৬ দশমিক ১ শতাংশ কোনো না কোনো মানসিক রোগে ভুগছেন। এটি প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রাপ্ত হিসাব। আর মোট জনগোষ্ঠীর প্রায় অর্ধেকই শিশু-কিশোর। তাদের মধ্যে মানসিক রোগসংক্রান্ত সমীক্ষা এখনো প্রক্রিয়াধীন। এই বিপুলসংখ্যক মানসিক রোগীর বিপরীতে দেশে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা মাত্র ১২০ জন—অর্থাত্ প্রতি এক লাখ জনসংখ্যার জন্য শূন্য দশমিক ০৭ জন অর্থাত্ প্রায় ১৫ লাখ মানুষের জন্য গড়ে একজনেরও কম, যা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। এর পাশাপাশি সাইকোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কার, অকুপেশনাল থেরাপিস্ট ও সাইকিয়াট্রিক নার্সের সংখ্যাও অতি নগণ্য। সারা দেশে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক অন্তর্বিভাগে মোট শয্যাসংখ্যা মাত্র ৮১৩টি; অর্থাত্ প্রতি এক লাখ জনসংখ্যার জন্য শূন্য দশমিক ৫৮টি শয্যা। অন্যভাবে বলা যায়, এক লাখ ৭২ হাজার ৪১৪ জন মানুষের জন্য সাইকিয়াট্রিক শয্যা রয়েছে মাত্র একটি।
জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যকে বিশেষভাবে গুরুত্ব প্রদান করা দরকার। সরকারি দায়বদ্ধতার পাশাপাশি সাধারণ জনগণ, উন্নয়ন সংস্থা ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও এ বিষয়ে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে।
মানসিক রোগ বিষয়ে যে ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত রয়েছে, তার অবসানকল্পে এবং মানসিক রোগের সঙ্গে সম্পর্কিত সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যে বৈরী সামাজিক আচরণ করা হয়, তার সংশোধনের জন্য জনমত গঠন এবং বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে এ সম্পর্কে পাঠক্রম চালু করা দরকার।
মাঠপর্যায়ে যাঁরা স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে থাকেন, কমিউনিটি ক্লিনিকের চিকিত্সক, মেডিকেল অ্যাসিস্ট্যান্ট, ফার্মাসিস্ট, নার্স, স্বাস্থ্য সহকারী, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিত্সক ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক প্রশিক্ষণ দিলে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যায় এর অন্তর্ভুক্তি সফল ও বাস্তবানুগ হতে পারে।
আমাদের দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থায় মাঠপর্যায়ের কর্মীরা সরকারের নানা কর্মসূচি বাস্তবায়নে নিয়োজিত থাকেন। এসব কাজের পাশাপাশি তাঁদের মানসিক রোগ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে হবে, যাতে তাঁরা অন্যকে সচেতন করতে পারেন এবং সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থার অতি প্রয়োজনীয় উপাদান হিসেবে মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দেন।
বিশেষায়িত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা বর্তমানে ঢাকায় জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে, পাবনায় একটি মানসিক হাসপাতালে, ঢাকায় একটি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে এবং মেডিকেল কলেজগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ। তার ওপর সব মেডিকেল কলেজে নেই অন্তর্বিভাগে ভর্তির সুবিধা এবং কোনো কোনোটিতে নেই প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ ও জনবল। এ ছাড়া দেশের ১৬ দশমিক ১ শতাংশ মানসিক রোগীর একটি বিরাট অংশ মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয় অথবা সামাজিক সংস্কারের কারণে বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিত্সা নিতে আগ্রহী নন। এ অবস্থা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় মানসিক স্বাস্থ্যের অন্তর্ভুক্তির অন্যতম অন্তরায়। এ সমস্যা নিরসনে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে আরও বেশি দক্ষ বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক তৈরি ও তাঁদের পদায়ন এবং সব জেলা হাসপাতালে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
মানসিক রোগের চিকিত্সায় ব্যবহূত ওষুধগুলো সরকারের অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং তা রোগীদের কাছে সহজলভ্য করার ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। মাঠপর্যায়ে এসব ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত না হলে মানসিক রোগের চিকিত্সা থেকে যাবে অসম্পূর্ণ।
মনে রাখতে হবে, কেবল একটি নীতিমালা প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়নের মধ্যেই এটি সীমাবদ্ধ নয়। বরং সময় সময় দেশের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করে এই কার্যক্রমকে যুগোপযোগী ও জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের নীতিমালা পর্যালোচনা করে তার আলোকে বাংলাদেশের উপযোগী করে নিজস্ব সংস্কৃতিভিত্তিক সুসংগঠিত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু করা প্রয়োজন।
মানসিক রোগের চিকিত্সার সম্প্রসারণ এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন আর্থিক বরাদ্দ। ২০০৫ সালে স্বাস্থ্য খাতে মোট ব্যয়ের মাত্র শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ প্রদান করা হয়েছিল মানসিক স্বাস্থ্য খাতে, অথচ মোট জনসংখ্যার ১৬ দশমিক ১ শতাংশ মানুষের মানসিক সহায়তা প্রয়োজন। তাই জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না দিলে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হবে।
বাংলাদেশে মানসিক রোগ, রোগী এমনকি মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের সম্পর্কেও সাধারণ মানুষের ছিল কিছু ভ্রান্ত ধারণা। মানসিক রোগের চিকিত্সায় মানুষ এখনো দ্বারস্থ হচ্ছে বিভিন্ন প্রতারক ও অপচিকিত্সকদের কাছে। কিন্তু আশার কথা, এই যে বিগত দশকের তুলনায় এ অবস্থার অনেক উন্নতি ঘটেছে, বেড়েছে মানুষের সচেতনতা, বাড়ছে সুচিকিত্সার সুযোগ। পাশাপাশি আগের চেয়ে অনেক বেশি মেধাবী তরুণ চিকিত্সকেরা আকৃষ্ট হচ্ছেন মানসিক রোগ বিষয়ে উচ্চতর পড়ালেখা ও গবেষণায়। দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম হয়তো এক দিন সম্পূর্ণভাবে ‘ই-হেলথ’-এর আওতায় চলে আসবে। তখন কেবল মানুষের দোরগোড়ায় নয়, মানুষের হাতের মুঠোয় স্বাস্থ্যসেবাকে পৌঁছে দেওয়ার যে স্বপ্ন বাংলাদেশ দেখে, সেই স্বপ্নের পুরোভাগে থাকতে চায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িত সব চিকিত্সক ও সংশ্লিষ্ট কর্মী।
২০০৯ সালের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে উদ্বোধন হতে যাচ্ছে ৫০ শয্যার অত্যাধুনিক মাদকাসক্তি নিরাময় ইউনিট এবং একই দিনে মানসিক স্বাস্থ্যের গবেষণার উন্নতিকল্পে এই হাসপাতালেই চালু হচ্ছে কেন্দ্রীয় ডিজিটাল লাইব্রেরি। ভবিষ্যতে এই ইনস্টিটিউটের সব সেবাকার্যক্রম ও প্রশাসনকে আধুনিকায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তিসমৃদ্ধ করে ‘ই-মেন্টাল হেলথ’ পরিষেবা চালু করার স্বপ্ন দেখি আমরা। এ বছরের মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও সহজলভ্য, সময়োপযোগী, জনবান্ধব ও বিজ্ঞানভিত্তিক করে গড়ে তোলা এবং সে লক্ষ্যে মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার অন্তর্ভুক্ত করার জন্য যার যার সাধ্য অনুযায়ী মেধা-মনন ও শ্রমের বিনিয়োগ করা। এর জন্য প্রয়োজন সর্বস্তরের জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
অধ্যাপক মো. গোলাম রব্বানী: পরিচালক ও অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট শেরেবাংলা নগর, ঢাকা।

একাধিপত্যের যুগ -বারাক ওবামা by নোয়াম চমস্কি

সব শক্তিশালী রাষ্ট্রে কিছু বিশেষজ্ঞ থাকে যাঁদের কাজ হলো, ক্ষমতাবানদের কাজকে মহত্ ও ন্যায্য আর ক্ষমতাহীনদের দুর্দশাকে তাদের ভুল হিসেবে দেখানো। পশ্চিমে এসব বিশেষজ্ঞকে ‘বুদ্ধিজীবী’ বলে ডাকা হয়। অল্পবিস্তর ব্যতিক্রম ছাড়া তাঁরা তাঁদের কাজ দক্ষতা ও ন্যায়নিষ্ঠার সাথে সম্পাদন করেন। এ কথা শুনতে যতটা অদ্ভুতই মনে হোক না কেন, লিখিত ইতিহাসের শুরু থেকেই এমন চর্চার দেখা মেলে।
এই পটভূমিতে আমরা এখন তথাকথিত একাধিপত্যের যুগের দিকে দৃষ্টি ফেরাব। ২০ বছর আগে বার্লিন দেয়ালের পতনের মধ্য দিয়ে এ যুগের লক্ষণ ফুটে ওঠে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে এক মেরু বিশ্ব তৈরি হয়। যুক্তরাষ্ট্র আগের প্রাথমিক পরাশক্তি থেকে বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তিতে পরিণত হয়।
কয়েক মাসের মধ্যে জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন গতিপথের রূপরেখা তৈরি করে: সবকিছুই মোটামুটি আগের মতো থাকবে, তবে হেতু হবে ভিন্ন। এখনো দরকার বিশাল সামরিকব্যবস্থা, তবে নতুন কারণে। তৃতীয় বিশ্বের শক্তিগুলোর ‘প্রযুক্তিগত সূক্ষ্মতা’ এই নতুন কারণ।
জ্বালানি-সমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে হস্তক্ষেপ করার লক্ষ্যে বাহিনী প্রস্তুত রাখতে হবে।
এসবই ঘটেছে নীরবে, সংবাদ হয়েছে কালেভদ্রে। কিন্তু যাঁরা দুনিয়াকে বুঝতে চান, তাঁদের জন্য অনেক শিক্ষামূলক বিষয় আছে এতে।
জর্জ ডব্লিউ বুশের প্রশাসন আগ্রাসী সামরিকবাদ ও অন্যকে অশ্রদ্ধার চরমে পৌঁছে গিয়েছিল। বুশের শাসনের দ্বিতীয় পর্যায় কিছুটা সংযত ছিল। ডোনাল্ড রামসফেল্ড, পল উলফোভিত্স, ডগলাস ফেইথের মতো কট্টরদের সরিয়ে দেওয়া হয়। উপ-রাষ্ট্রপতি ডিক চেনিকে সরানো যায়নি। কারণ, তিনিই ছিলেন প্রশাসনের মূল ব্যক্তি।
বারাক ওবামা দায়িত্ব গ্রহণের পরপর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কন্ডোলিত্সা রাইস ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ওবামা বুশের দ্বিতীয় পর্যায়ের নীতিগুলো অনুসরণ করবেন। হয়েছেও তাই। শুধু বদলেছে বলার ভঙ্গি। আর তাতেই দুনিয়া মন্ত্রমুগ্ধ। বেশ আগের, কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের চূড়ান্ত পর্যায়ে কেনেডি প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টার কথা ব্যবহার করে বুশ ও ওবামার মৌখিক পার্থক্য বেশ ভালোভাবে প্রকাশ করা যায়। কেনেডির পরিকল্পনাবিদরা এমন কথা ভাবছিলেন, যা ব্রিটেনকে ধ্বংস করে ফেলত, অথচ এ বিষয়ে তাঁরা ব্রিটেনকে কিছু জানাননি। সেই উপদেষ্টা ব্রিটেনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিশেষ সম্পর্ক’কে তখন ‘আমাদের লেফটেন্যান্ট, যা চলতি ভাষায় ‘সহকারি’ বলে আখ্যায়িত করেন।
বুশ ও তাঁর সঙ্গীরা দুনিয়াকে মনে করেছেন, ‘আমাদের লেফটেন্যান্ট’। তাই ইরাক আক্রমণের ঘোষণাকালে জাতিসংঘকে বলা হয় যুক্তরাষ্ট্রের হুকুম তামিল করতে, নয়তো ‘অপ্রাসঙ্গিক’ হয়ে যেতে। এমন নির্লজ্জ ঔদ্ধত্য স্বভাবিকভাবেই বৈরিতা বৃদ্ধি করে। ওবামা নিয়েছেন নতুন গতিপথ। তিনি দুনিয়ার নেতাদের ও জনগণকে পরিশীলিতভাবে ‘অংশীদার’ হিসেবে সম্ভাষণ জানান কিন্তু মনে মনে তাঁদের ‘লেফটেন্যান্ট’ই মনে করেন।
বিদেশি নেতারা এই ভঙ্গিমা পছন্দ করেন। আর জনতা তো অনেক সময় এতে অভিভূত হয়ে পড়ে। কিন্তু মিষ্টি মিষ্টি কথা ও সুখকর আচার-আচরণ নয়, কাজে প্রমাণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
সামরিক শক্তির দিক দিয়ে বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা একাধিপত্যবাদীই রয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র একার সামরিক ব্যয়বাদবাকীদুনিয়ার সমান। বিধ্বংসী প্রযুক্তিতে অন্যদের থেকে যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে।
একমাত্র যুক্তরাষ্ট্রেরই বিদেশে শত শত সামরিক ঘাঁটি আছে। দুটি প্রধানজ্বালানি উত্পাদক দেশ দেশ এর দখলে।
স্নায়ুযুদ্ধের হাতিয়ার ন্যাটোকে ওবামা এ কাজে ব্যবহার করতে পারেন। একাধিপত্যের যুগ শুরু হওয়ার সময় ন্যাটোর ভবিষ্যতের প্রশ্ন সামনে আসে। একসময় সোভিয়েত আগ্রাসন থেকে প্রতিরক্ষাকে ন্যাটোর বৈধতার যুক্তি বলা হতো। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর এই ছুতো অচল। ন্যাটোকে তখন বিভিন্ন দেশে হস্তক্ষেপের বাহিনী হিসেবে পুনর্বিন্যস্ত করা হয়। চালকের ভূমিকায় থাকে যুক্তরাষ্ট্র। বিদেশে হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচনা ছিল জ্বালানির ওপর নিয়ন্ত্রণ।
স্নায়ুযুদ্ধোত্তর সময়ে ন্যাটোকে পূর্ব ও দক্ষিণে বাড়ানো হয়েছে। ওবামা এই বিস্তৃতি ঘটানো অব্যাহত রাখতে আগ্রহী বলেই মনে হয়। রাশিয়ায় ওবামার প্রথম সফরের আগে আগে জাতীয় নিরাপত্তা এবং এশিয়া ও ইউরেশিয়া বিষয়ক ওবামার বিশেষ সহকারী মাইকেল ম্যাকফাউল গণমাধ্যমকে জানান, ‘ন্যাটোর বিস্তার বা ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা বিষয়ে রুশদের সঙ্গে আমরা কোনো লেনদেন করতে যাব না।’ পূর্ব ইওরোপে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা কার্যক্রম এবং রাশিয়ার প্রতিবেশী ইউক্রেন ও জর্জিয়াকে ন্যাটোর সদস্যপদ দেওয়া রাশিয়ার নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি এবং তা উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সম্ভাবনা প্রায় শূণ্য। ইরানের ক্ষমতাসীন ধর্মীয় নেতারা আত্মহত্যার জন্য মরিয়া না হয়ে উঠলে ইরানের আক্রমণ করার কোনো কারণ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রের এই ক্ষেপণাস্ত্র-বিধ্বংসী ব্যবস্থা কখনো সক্রিয় হলে, এর মূল কাজ হবে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের আক্রমণের জবাবে ইরানের পাল্টা আক্রমণের পথ বন্ধ করে দেয়া। অর্থাত্ ইরানের প্রতিরক্ষা ধ্বংস করা। ক্ষেপণাস্ত্রবিরোধী ব্যবস্থা তাই আগাম আক্রমণের সহায়ক হিসেবে কাজ করে। এটা সবার জানা। কিন্তু এ সত্যটি আড়ালে পড়ে থাকে। ওবামার নতুন পরিকল্পনা রাশিয়ার কাছে উসকানিমূলক মনে হতে পারে। তবে ইউরোপের প্রতিরক্ষা প্রশ্নে এটি অপ্রাসঙ্গিক।
ইরানের সঙ্গে পারমানবিক বিরোধ স্নায়ুযুদ্ধের বিভীষিকা ও ভণ্ডামি মনে করিয়ে দেয়। ইরান বিষয়ে শোরগোলের মধ্যে উপেক্ষিত হয় যে, ভারতকে দেওয়া ওবামা প্রশাসনের এই নিশ্চয়তা যে ভারত-মার্কিন পারমাণবিক চুক্তি জাতিসংঘে সদ্য পাস হওয়া পারমানবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) সিদ্ধান্তের বাইরে থাকবে। ভারত বলেছে, বিশ্বের প্রধান পারমাণবিক দেশগুলোর সমান বিধ্বংসী ক্ষমতাসম্পন্ন পারমাণবিক অস্ত্র এখন তারাও তৈরি করতে পারবে। একই ছাড় ও দম্ভ ইসরায়েলও উপভোগ করে।
সামরিক দিক থেকে এককেন্দ্রিক হলেও অর্থনৈতিকভাবে এর কেন্দ্র উত্তর আমেরিকা, ইউরোপ ও উত্তর-পূর্ব এশিয়াতে অবস্থিত। বিশ্ব অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য বাড়ছে। একমাত্র পরাশক্তির প্রতিরোধ সত্ত্বেও রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে দুনিয়া বহু মেরুর হয়ে উঠছে। এটি ইতিহাসের প্রগতিশীল পরিবর্তনের নিদর্শন।
ইন দিজ টাইমস থেকে নেওয়া. ইংরেজি থেকে অনুবাদ আহসান হাবীব
নোয়াম চমস্কি: মার্কিন বুদ্ধিজীবী ও ভাষাদার্শনিক।

শিক্ষা কখনো সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পায়নি -প্রস্তাবিত শিক্ষানীতি by এমাজউদ্দীন আহমদ

আমাদের দুর্ভাগ্য, দেশে শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছে সেই অতীতে, ব্রিটিশ আমলে, ব্রিটিশ আমলের পরে পাকিস্তান আমলে, এমনকি বাংলাদেশের জন্মের পরও, তার সমাপ্তি যেন হতে চায় না। পরীক্ষা-নিরীক্ষার এই গতি অব্যাহত রয়েছে প্রায় ২০০ বছর ধরে। তখনো যেসব বিষয়ে বিতর্কের সূচনা হয়েছিল, এখনো তা প্রাণবন্ত রয়েছে।
১৭৯২ সালের চার্লস গ্র্যান্টের শিক্ষাসংক্রান্ত সুপারিশমালা থেকে যার শুরু ১৮১৩ সালের কোম্পানি সনদে শিক্ষাবিষয়ক সুপারিশ, ১৮৩৫ সালের লর্ড মেকলে কমিটি, ১৮৫৪ সালের চার্লস উডের শিক্ষাবিষয়ক ডেসপ্যাচ, ১৮৮২ সালের হান্টার কমিশন, ১৯৩৪ সালের সাপ্রু কমিটি, ১৯৪৪ সালের সার্জেন্ট কমিটিতে তার সমাপ্তি ঘটেনি। পাকিস্তান আমলেও দেশের শিক্ষাব্যবস্থার রকমফের ও প্রকৃতি নিয়ে এ ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা অব্যাহত রইল। ১৯৪৯ সালের পূর্ববঙ্গ শিক্ষা পুনর্গঠন কমিটি, ১৯৫২ সালের মওলানা আকরম খাঁ কমিটি, ১৯৫৭ সালের আতাউর রহমান খানের এডুকেশন রিফর্ম কমিশন, ১৯৫৯ সালের নূর খান কমিশনের প্রতিবেদন—এই অব্যাহত ধারার কিছু খণ্ডচিত্র।
একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এক উজ্জ্বল স্বপ্ন নিয়ে মাথা উঁচু করলেও এ ক্ষেত্রে কোনো সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হয়নি। আজ পর্যন্ত পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধারা কিন্তু অব্যাহত রয়েছে। ১৯৭৪ সালের ড. কুদরত-এ-খুদা শিক্ষানীতি, ১৯৭৭ সালের কাজী জাফর আহমদ শিক্ষা কমিটি, ১৯৮৩ সালের মজিদ খান কমিশন, ১৯৮৭ সালের মফিজউদ্দীন আহমদ শিক্ষা কমিশন, ১৯৯৭ সালের শামসুল হক শিক্ষা কমিটির প্রতিবেদন, ২০০০ সালের শিক্ষানীতি, ২০০২ সালের শিক্ষা সংস্কার কমিটি এবং ২০০৩ সালের মনিরুজ্জামান শিক্ষা কমিশনের প্রতিবেদন এই ধারাবাহিকতার অংশ। সবশেষে প্রকাশিত হলো জাতীয় শিক্ষানীতি-২০০৯।
এ প্রসঙ্গে কয়েকটি কথা উল্লেখযোগ্য। এক. উল্লিখিত কমিটি বা কমিশনে যাঁরা নেতৃত্ব দিয়েছেন তাঁদের অধিকাংশই অভিজ্ঞ, প্রবীণ ও বহুদর্শী। তাঁদের অনেকেই জনপ্রিয় এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকও। শিক্ষার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। কিন্তু তাঁদের নেতৃত্বে পরিচালিত কমিশনগুলো দেশের শিক্ষাব্যবস্থা সম্পর্কে যেসব সুপারিশ করেছে তা জীবনকে, তা ব্যক্তিগত হোক আর সামষ্টিক হোক, কীভাবে পরিপূর্ণ করে তুলতে পারে, কীভাবে সাবলীল, সক্ষম ও সৃষ্টিশীল হতে সহায়তা করতে পারে, বিশেষ করে ব্যক্তিগত উত্কর্ষের ঊর্ধ্বে উঠে সামগ্রিকতার আশীর্বাদ লাভ করে সুষ্ঠু জীবনবোধের অধিকারী করে তুলতে পারে, তার পূর্ণ প্রকাশ কোনোটিতে ঘটেনি। দুই. এসব কমিটি বা কমিশনের প্রতিবেদনে যেসব সুপারিশ লিপিবদ্ধ হয়েছে খণ্ডিতরূপে, তা পর্যালোচনা করলে আশাবাদী হওয়ার সুযোগ ঘটে। কিন্তু সার্বিকভাবে কোনোটিতে জীবনঘনিষ্ঠ, ঐক্যবদ্ধ, সুসমন্বিত ব্যবস্থার ছবি উপস্থাপিত হয়নি। সুপারিশগুলোর কোনো কোনোটি উত্তম হলেও একটির সঙ্গে আর একটির আত্মিক যোগসূত্র লক্ষ করা যায় না। তাছাড়া বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে সাযুজ্য রক্ষা করতে গিয়ে এমন কিছু সুপারিশ উপস্থাপিত হয়েছে বা অনেকটা অ্যাডহক টাইপের, রাজনৈতিক স্লোগানসর্বস্ব। দীর্ঘকালীন পরিসরে জাতীয় জীবনকে এক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালিত করার জন্য সুসমন্বিত কোনো ব্যবস্থার অনুপস্থিতি খুব পীড়াদায়ক। এর কারণও অবশ্য সুস্পষ্ট। যখনই নতুন কোনো রাজনৈতিক দল ক্ষমতাসীন হয়, তখন রাজনৈতিক ইতিহাসে নাম লেখাতে কিছু বরেণ্য ব্যক্তির সঙ্গে বেশ কিছু অনুগত চেনা মুখের সমাহার ঘটিয়ে নিজেদের উচ্চারণগুলোকে বা কমিশনের প্রতিবেদনও গ্রন্থাগারের এক কোণে স্থান লাভ করে, এ দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাসে এক ছোট্ট ফুটনোট রূপে।

দুই.
বেশ কয় বছর আগে জাপান ফাউন্ডেশনের আমন্ত্রণে সপ্তাহ দুয়েকের জন্য জাপানের কিছু সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের জন্য জাপান গিয়েছিলাম। যাওয়ার আগে এক ব্রিফিং অনুষ্ঠানে জাপানি রাষ্ট্রদূত অনেকটা আত্মতুষ্টির সঙ্গে বলেছিলেন, ‘জাপানে আমরা ক্যামব্রিজ, অক্সফোর্ড কিংবা হার্ভার্ড, স্ট্যানফোর্ডের মতো বিশ্বখ্যাত শিক্ষাঙ্গন সৃষ্টি করতে পারিনি বটে, কিন্তু আমাদের প্রাথমিক শিক্ষাঙ্গনগুলো অতুলনীয়। বিশ্বের সমতুল্য প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে তা শ্রেষ্ঠতর। আমারও অভিজ্ঞতা ঠিক তেমনি। টোকিও, কিয়োটো এবং আরও কয়েকটি মহানগরের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে একটি মাধ্যমিক এবং একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠক্রম দেখে, ওই সব প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী এবং শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে, বিশেষ করে প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা দেখে আমার এই প্রতীতি দৃঢ় হয়েছে যে জাপানের প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক শিক্ষা সত্যই অত্যন্ত উন্নতমানের। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে সচেতন, সত্, আত্মপ্রত্যয়ী, সৃজনশীল নাগরিক সৃষ্টির জন্য এই বয়সের কিশোর-কিশোরীদের যা জানা দরকার, যা শেখা দরকার এবং জীবনব্যাপী যা চর্চা করা দরকার, তার প্রায় সবই জাপানের প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যায়তনে সরবরাহ করা হয়।
তারপরও ভেবে অবাক হই, ২০০০ সালের ২২ ডিসেম্বর জাপানের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের জন্য গঠিত একটি কমিশন সে দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে গতানুগতিক চিহ্নিত করে তার আমূল সংস্কারের জন্য একগুচ্ছ সুপারিশ পেশ করে। কোনো দলীয় কর্মী বা দলের অনুগতদের দ্বারা নয়, বরং ২৬ জন শিক্ষা বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে গঠিত কমিটির সভাপতি ছিলেন পদার্থবিদ্যায় নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক আর ইসাকি। এই কমিশনের সুপারিশমালা দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে রচিত হয়। এক. জাপানের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তি খাতের সৃজনশীলতা ধারণ করতে সক্ষম নয়। দুই. বর্তমান যুগের দ্রুত প্রসারমাণ কিশোর অপরাধের এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ের গতিরোধে অক্ষম। এই দুটি প্রধান সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কমিশনের সুপারিশ ছিল: এক. বর্তমান যুগের চাহিদা মেটাতে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন প্রত্যেক শিক্ষার্থীর সৃজনশীল মন বিনির্মাণ। দুই. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর শিক্ষাব্যবস্থায় শুধু তীব্র প্রতিযোগিতায় প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে শত্রু নিধনের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। সবার সঙ্গে সহযোগিতার বন্ধন প্রতিষ্ঠা করে বন্ধুত্বের সুখদ পরিবেশ সৃষ্টির কোনো শিক্ষা দেওয়া হয়নি। তাই নতুন শিক্ষাব্যবস্থার সুপারিশে নীতি-নৈতিকতা শিক্ষাদানের ওপর অত্যধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধোত্তর জাপানি শিক্ষাব্যবস্থায় শিল্পোন্নত দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য দক্ষ জনশক্তি গঠন ছিল মূল লক্ষ্য। তাই শিক্ষার্থীরা সব তথ্য মুখস্থ করে, বিদ্যমান প্রযুক্তির সবটুকু আয়ত্তে এনে, বর্তমানের সবকিছু নিয়ন্ত্রণে নিয়ে, সবার ওপর মাথা উঁচু করার শিক্ষা লাভ করেছিল। ফলে যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপান তার দক্ষ, সক্ষম ও সচেতন কর্মীদের মাধ্যমে বিশ্বে এক অর্থনৈতিক পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু শিক্ষা কমিশনের সংশয় হলো—আজকের জন্য এই শিক্ষাব্যবস্থা ফলপ্রসূ বটে, কিন্তু আগামীকাল এর পরিণতি কী? বিদ্যমান প্রযুক্তির প্রেক্ষাপটে উপযোগী হলেও নতুন নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে এর উপযোগিতা কতটুকু? যে ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে শত্রু হিসেবে গ্রহণ করা হয়, সে ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা উপযোগী হলেও যে ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করার প্রয়োজন হবে, সে ক্ষেত্রে এর ব্যর্থতা প্রকট নয় কি?

তিন.
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা বেহাল অবস্থায় রয়েছে। এটি না সচেতন, না আধুনিক। বাংলাদেশের শিক্ষায় না আছে ব্যক্তিত্ব গঠনের সূত্র, নেই জাতি গঠনের চিত্শক্তিও। বিভিন্ন কালের সংগৃহীত উপাদানগুলোর আলগা সংযোজনে গড়ে ওঠা কিম্ভূতকিমাকার এক ব্যবস্থা এটি। হিন্দু ভারতের টোল-চতুষ্পাঠীর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে মুসলিম ভারতের মক্তব-মাদ্রাসা এবং তার সঙ্গে আলগাভাবে জড়িত হয়েছে ব্রিটিশ ভারতের সাধারণ শিক্ষা। এই শিক্ষা সবাইকে এক সূত্রে গ্রথিত করে না। সবার জন্য মিলনের ক্ষেত্রও রচে না। বরং সবাই যেন ভিন্ন অবস্থানে অনড় থাকে, তার ব্যবস্থা পাকা করেছে। এই শিক্ষা না উচ্চারণ করে সহযোগিতার মন্ত্র, না সৃজন করে আত্মার বন্ধন। খণ্ডছিন্ন, বিভেদ-সূচক, নিরানন্দ। আমাদের দেশের শিক্ষা একদিকে যেমন প্রাণহীন, অন্যদিকে তেমনি গতিশীল জীবনের জন্য অর্থহীন। তাই উচ্চতর ডিগ্রিধারী এবং অর্ধশিক্ষিতদের কেউ কোনো সৃজনশীল উদ্যোগে এখন পর্যন্ত তেমন সফল হলো না, কেননা এদের কাউকে সৃজনশীলতার জাদু স্পর্শ করতে পারেনি। শিক্ষিত হয়েও অনেকে প্রশিক্ষিত মনের অধিকারী হতে পারেননি।
একুশ শতকে কিন্তু প্রতিযোগিতা হবে মেধার, পেশির নয়। এই প্রতিযোগিতা হবে মননের, সৃজনশীলতার, বাচালতার নয়। এই প্রতিযোগিতায় বিজয়ী হতে হলে প্রয়োজন হবে সৃষ্টিশীল মস্তিষ্কের, বিরাট বপুর নয়। প্রয়োজন হবে উদার অন্তকরণের, বুকভরা হিংসা বা প্রতিহিংসার নয়। আমার মনে হয়েছে, দেশে যে শিক্ষা চালু রয়েছে, বর্তমানের জন্য আংশিকভাবে তা ফলপ্রসূ হলেও ভবিষ্যতের জন্য, বিশেষ করে এই শতকের মহাসমারোহে মর্যাদার সঙ্গে টিকে থাকার জন্য তা মোটেই উপযোগী নয়। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে নির্দিষ্ট পাঠক্রম সাধারণ ভাবনা-চিন্তার দুর্গে প্রবেশ করার জন্য উপযোগী হলেও যে দুর্গ আত্মরক্ষা এবং নিরাপত্তার দুর্ভেদ্য কেন্দ্ররূপে চিহ্নিত, সেখানে প্রবেশাধিকার দান করবে না। এই শিক্ষা শুধু কর্মজীবনের সাধারণ গৃহে প্রবেশে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু যে গৃহ সাফল্যের অন্তঃপুর, যা হাজারো উদ্ভাবনী ক্ষমতাসম্পন্ন, যা ভবিষ্যতের বন্ধুর পথে সাবলীলভাবে পথচলার নির্দেশক এবং উন্নত জীবনের কাঙ্ক্ষিত কেন্দ্র, সেই গৃহে প্রবেশের সাহস বা সামর্থ্য জোগায় না। এ জন্যই শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার অপরিহার্য।
শিক্ষাব্যবস্থার আমূল সংস্কার অপরিহার্য হলেও এবং এ সম্পর্কে সুচিন্তিত পরিকল্পনা প্রণয়ন কিন্তু যথেষ্ট নয়। এ জন্য প্রয়োজন জাতির সার্বিক প্রস্তুতি। প্রয়োজন জাতির রাজনৈতিক দৃঢ় প্রকল্প। ২০০৯ সালের শিক্ষানীতি ঘোষিত হওয়ার আগে যেসব প্রস্তাব এসেছিল তার সবই কি অর্থহীন ছিল? ছিল কি অপ্রাসঙ্গিক? সেগুলোর কোনো অংশ কি গ্রহণযোগ্য ছিল না? সেগুলো গৃহীত হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার কিছুটা হলেও প্রাণ ফিরে আসত। হয়নি, কেননা এ দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমনই যে ক্ষমতাসীন দল শুধু দলীয় ব্যক্তিদের মাধ্যমেই শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় বিষয়ে নীতি প্রণয়ন করতে চায়। অন্যান্য দেশে এই দায়িত্ব দেওয়া হয় বিশেষজ্ঞদের ওপর। তাছাড়া আরও একটি কারণে বাংলাদেশে শিক্ষানীতি কোনো দিন বাস্তবায়িত হয়নি। গত ৩৮ বছরে কোনো সরকার শিক্ষা কার্যক্রমকে কোনো সময়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকাররূপে গ্রহণ করেনি। কয়েকটি দিকে তাকালে তা সুস্পষ্ট হবে। এক. কোনো সরকারের আমলে যথেষ্ট অভিজ্ঞ ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়; কিন্তু সাধারণভাবে দেখা গেছে, কাউকে মন্ত্রী করতে হবে অথচ তাঁর জন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পোর্টফোলিও পাওয়া যাচ্ছে না, তখন তাঁকে শিক্ষামন্ত্রী করা হলো। দুই. বাংলাদেশে শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিযোগ সব সময় হয়েছে অতি অল্প। বেশ কয়েক বছর থেকে একটু বেড়েছে বটে, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য যা প্রয়োজন তার ধারেকাছে কোনো দিন এই বিনিয়োগ আসেনি।
কোনো উন্নত দেশের দিকে না তাকিয়ে যদি আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর দিকে তাকাই, তাহলেই চলবে। যে ক্ষেত্রে ওই সব দেশ মোট জাতীয় উত্পাদনের শতকরা ৪.৫ থেকে ৬ ভাগ শিক্ষাক্ষেত্রে ব্যয় করছে, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যয় করছে শতকরা ২ ভাগের মতো। যে উচ্চশিক্ষা সমগ্র শিক্ষাক্ষেত্রকে প্রণোদিত করে থাকে, সে ক্ষেত্রে বিনিয়োগ একেবারেই অপ্রতুল। তাই বলি, অতীতে প্রণীত শিক্ষানীতি যে বাস্তবায়িত হয়নি তা পীড়াদায়ক নিশ্চয়ই, কিন্তু তা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রও তৈরি হয়নি কোনো সময়। তাছাড়া যখনই কোনো আন্দোলনের সূচনা হয় দেশে, তখন সেই আন্দোলনের প্রথম শিকার হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠন এ ক্ষেত্রে সংযম প্রদর্শন করেনি; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজের মতো চলতে দেয়নি।
আগামীকাল: কয়েকটি বিষয়ে প্রশ্ন
এমাজউদ্দীন আহমদ: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

তাহলে কি সততা শ্রেষ্ঠ পন্থা নয় -ঘুষের প্রতাপ বনাম সততার জ্বালা

উপকথা বলে, কলিযুগে ন্যায় ও অন্যায়ের পার্থক্য ঘুচে যাবে, সত্যের ওপর রাজত্ব করবে মিথ্যা। কলিকাল কবে এল বা গেল তা বলা না গেলেও বর্তমান বাংলাদেশে সত্য আর মিথ্যার ফারাক প্রায় ঘুচেই যাচ্ছে! নইলে ঘুষ নেওয়ার প্রতিবাদ করায় মৌলভীবাজারের এক বনপ্রহরীকে বরখাস্ত হতে হতো না, তাঁর দায়িত্বশীলতার সাহসকে বলা হতো না ‘দুর্ব্যবহার’! সততা একদা চরিত্রের সম্পদ বলে গণ্য হতো। অরক্ষিত সম্পদ যেমন ভোগায়, তেমনি অরক্ষিত সততাও জ্বালা-যন্ত্রণার কারণ হয়। কী মর্মান্তিক, সততা তাহলে আর শ্রেষ্ঠ পন্থা নয়!
কাঠচোরদের ঘুষ নেওয়ার প্রতিবাদ করায় মৌলভীবাজারের কুলাউড়ার বনপ্রহরী ইউসুফ আহমদ চৌধুরীর বরখাস্ত হওয়া সার্বিক অবক্ষয়েরই আলামত। ঘুষ নিলে তিনি ‘সুখেই’ থাকতেন; না নেওয়ায় তিনি শাস্তি পেলেন। সুতরাং দুর্নীতিই হলো ‘নীতি’, আর সততা মানে ‘অযোগ্যতা’। প্রকৃতির মতো সমাজেও ‘যোগ্যতমের জয়’-নীতির জয়জয়কার যখন, তখন সত্ মানুষকে কে বাঁচাবে? ইউসুফের পরাজয় তাই তাঁর ব্যক্তিগত পরাজয় নয়, সততার পরাজয়, সত্ মানুষের পরাজয়।
ভালো আমের সঙ্গে পচা আম থাকলে ভালো আমও পচে যায়। একইভাবে দুর্নীতিগ্রস্তরা সত্ মানুষকে হয় কলুষিত করছে, কিংবা তাঁদের পরাস্ত করছে। এ রকম প্রতিকূলতার মধ্যে সত্ ও সাহসীদের টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। কারণ, অসততা নিজের স্বার্থেই সততাকে কোণঠাসা ও ধ্বংস করে। মুষ্টিমেয় দুর্নীতিবাজেরা এভাবেই গোটা সমাজকে জিম্মি করে রসাতলে টানে। এদের জন্যই দেশ বারবার দুর্নীতির শীর্ষে স্থান পায় আর তার গ্লানি বইতে হয় দেশবাসীকে!
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন যে জগতে যোগ্য মানুষ আছে, কিন্তু তাঁকে দেখানোর যোগ্য মঞ্চ নেই। ইউসুফকে তাই রক্ষা করা দরকার ন্যায়ের স্বার্থে, সুনীতির স্বার্থে। ইউসুফরা একা নন, অজস্র সত্ ও নিষ্ঠাবান মানুষ দেশে আছেন। তাঁদের সততাকে তিরস্কারের বদলে পুরস্কৃত করার পরিবেশ সৃষ্টি হলে তাঁরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। সবার কাজ হলো, তাঁদের টিকে থাকার যোগ্য পরিবেশ সৃষ্টিতে কাজ করা।

দলের লোকের কাছে দেশের লোকের হার - সার বিতরণে ‘অসারপনা’

সার পাওয়ার নিশ্চয়তা অসার হতে বসেছে ডিলার নিয়োগে দলবাজিতে। বোরো মৌসুম আসতে আর ২০-২১ দিন বাকি, অথচ এখনো সাব-ডিলার নিয়োগ সম্পন্ন হয়নি। আবার সেই নিয়োগের টিকচিহ্ন পাচ্ছেন তাঁরাই, যাঁরা দলের লোক। দলের লোকের কাছে দেশের লোকের হার যেন শেষ হওয়ার নয়।
পাঁচ হাজার পাইকারি ডিলারের পরের স্তরে নিয়োজিত হচ্ছেন ৪০ হাজার ১৯৪ জন সাব-ডিলার তথা খুচরা বিক্রেতা। এ নিয়োগ শেষ হওয়ার কথা ৩০ সেপ্টেম্বর। এখন করা হয়েছে ১৫ অক্টোবর। দায়িত্বটি জেলা প্রশাসকের, কিন্তু স্থানীয় সাংসদেরা বানাচ্ছেন তালিকা, দিচ্ছেন চাপ। প্রথমে ইউনিয়নপ্রতি পাঁচজন করে ঠিক হয়েছিল। এখন সেটা সাত থেকে নয়জনে উঠি-উঠি করছে। বেশি বিক্রেতা মানে যেমন বেশি সহজলভ্যতা, তেমনি বিক্রেতার সংখ্যা বাড়লে সুবিধাভোগীর সংখ্যাও বাড়ে। এবং তাঁরা যে সরকারি দলেরই লোক, তা জানাচ্ছে বৃহস্পতিবারের প্রথম আলো। এভাবে পাকে-চক্রে সাব-ডিলার নিয়োগ পেছাচ্ছে ও ফন্দিবাজির ফিকির পাচ্ছে।
কৃষকের চাহিদা নয়, চারা রোপণের মৌসুম ধরা নয়, ঝোঁকটি যেন সরকারি দলের কর্মীদের আর্থিক সুবিধা দেওয়ার দিকে। আগেও হয়েছে, এখনো হচ্ছে। যেখানে দলবাজদের আর্থিক লাভ, সেখানে জনগণের সার্বিক ক্ষতি। দলীয় ক্যাডারদের ‘চাঁদাবাজি’, ‘টেন্ডারবাজি’র প্রকোপ বাড়ার পর এসেছে চাল সংগ্রহে ‘চালবাজি’। সার নিয়ে ‘অসারপনা’ কি এরই নতুন সংযোজন?
শিল্পমন্ত্রী বলেছেন সারের অভাব নেই (৮ অক্টোবর, প্রথম আলো)। এ ধরনের আশ্বাস সরকারের তরফ থেকে সব সময়ই দেওয়া হয়, কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখেছি যে সরবরাহ নির্বিঘ্ন হয়নি। সার থাকলেই হবে না, কৃষক পর্যায়ে তা সঠিক সময়ে ও দরকারমতো পৌঁছাতে হবে। তার জন্য ডিলার ও সাব-ডিলার নিয়োগ হতে হবে স্বচ্ছ ও কার্যকর। আগে ডিলারের পাশাপাশি খুচরা বিক্রেতারা হাটবাজারে কিংবা বাস ও রেলস্টেশনেও সার বিক্রি করতেন। কৃষকেরা তাঁদের কাছ থেকে বাকিতেও সার নিতে পারতেন। বর্তমান ব্যবস্থায় এসব খুচরা বিক্রেতার স্থান নেই। সারের মজুদ ও বিতরণের সমস্যা চিহ্নিত করায় সরকার-নিযুক্ত তদারকি কমিটি আছে। তাদের সর্বাত্মক তত্পরতা ও নজরদারিতে এবার সুরাহা হোক। কাজির গরু কেতাবে আছে, গোয়ালে নেই; এমন পরিহাস আর কাম্য নয়।
বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে সার নিয়ে ‘অসারপনা’ চরমে ওঠে। এমনকি এ নিয়ে কৃষকের প্রাণ দেওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটেছে। বিষয়টি স্বতন্ত্র গুরুত্বের দাবিদার। কারণ এখনো দেশ কৃষিভিত্তিক এবং আগের খাদ্যসংকটের ধাক্কার পাশাপাশি নতুন সংকটের আশঙ্কা জাগ্রত। কৃষক ও কৃষিকে অগ্রাধিকার না দিলে তার ক্ষতি হবে বহুমাত্রিক।
রাজনীতি আয়করি পেশা হওয়ার কথা নয়, কিন্তু লাইসেন্স-পারমিট-টেন্ডারের মতো আয়করি কাজে রাজনীতির কর্তা-কর্ম-কারকদেরই প্রথম সারিতে দেখা যায়। যাঁদের জনসেবা করার কথা, তাঁরা যখন আত্মসেবায় নিয়োজিত হয়ে যান, তখন না থাকে রাজনীতি, না হয় জনসেবা। সার বিতরণে এই রোগ যেহেতু প্রকট, নিরাময় তাই ততই জরুরি।