Monday, September 15, 2014

গণতান্ত্রিক বিচ্ছেদ অথবা জোড়াতালির অখণ্ডতা! by কামাল আহমেদ

বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে বিদেশি কোনো সরকার বা প্রতিষ্ঠানের মতামত বা মন্তব্যের বিষয়ে জাতি হিসেবে আমাদের মর্যাদাবোধটা যে খুব টনটনে, তা প্রায়ই বেশ দৃষ্টিকটুভাবে আমরা প্রকাশ করে থাকি। ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনয়ন পাওয়া মিশেল বার্নিকট কংগ্রেস কমিটিতে তাঁর নিয়োগসম্পর্কিত শুনানিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির যে মূল্যায়ন তুলে ধরেছিলেন, তার প্রতিক্রিয়ায় সরকারের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের অনেকের বক্তব্যই ছিল কূটনৈতিক শালীনতাবিবর্জিত। আবার গণমাধ্যমে সরকার-সমর্থকদের কেউ কেউ যুক্তরাষ্ট্রের বিদায়ী রাষ্ট্রদূত ড্যান মজীনাকে ‘বিএনপির স্থায়ী কমিটির বিদেশি সদস্য’ হিসেবেও অভিহিত করেছেন। তবে বিদেশি কারও প্রশংসা পেলে সেটার জন্য ঢাকঢোল ভাড়া করায় যে তাঁরা কখনো পিছিয়ে থেকেছেন, এমনটি দাবি করারও কোনো সুযোগ নেই। বিদেশিদের কথায় আমাদের সম্পর্কে কোনো সমালোচনা থাকলে আমরা অনেকেই তাকে সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে দেখাতে চাই। যদিও তার কারণটা মূলত রাজনৈতিক।

কিন্তু বিশ্বায়নের এই যুগে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের ধারণায় যে যুগান্তকারী পরিবর্তন ঘটছে, তার এক নতুন দৃষ্টান্ত হতে পারে যুক্তরাজ্য। স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রশ্নে আগামী বৃহস্পতিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) যে গণভোট অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তাকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে আগ্রহ ও ঔৎসুক্যের সীমা নেই। অনেকে উদ্বিগ্ন—এমনকি খোদ ইংলিশদের চেয়েও বেশি—মূলত এর রেশ যদি সাতসাগরের নানা পাড়ে আছড়ে পড়ে, সেই আশঙ্কায়। সাবেক উপনিবেশগুলোর জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে অনেকেই যে যুক্তরাজ্যের এই সম্ভাব্য ভাঙন বা বিচ্ছেদে কিছুটা পুলকিত হবেন, তাতেও সন্দেহ নেই। তবে সবচেয়ে লক্ষণীয় হচ্ছে স্কটিশদের এই স্বাধীনতার বিতর্কে বিদেশি রাজনীতিকদের নাক গলানোর বিষয়টি। এ ক্ষেত্রে সবার শীর্ষে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বরাক ওবামা। তিনি গত জুনে ব্রাসেলসে খোলাখুলিভাবে বলেছিলেন যে যুক্তরাজ্য ঐক্যবদ্ধ থাকলে বিশ্ব লাভবান হবে (দ্য টেলিগ্রাফ, ৫ জুন, ২০১৪)। অবশ্য জনমত জরিপে স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার সম্ভাবনা জোরদার হওয়ার পর ওবামা প্রশাসনের অবস্থা অপরিবর্তিত রয়েছে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র মেরি হার্প বলেছেন, স্কটল্যান্ডের গণভোট ব্রিটেনের অভ্যন্তরীণ বিষয়।
স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতার বিতর্কে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন অবশ্য যুক্তরাজ্যের কয়েকটি ইউরোপীয় প্রতেবেশী। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষ থেকেও স্কটিশদের স্বাধীনতাকে নিরুৎসাহিত করার একটা সমন্বিত চেষ্টা প্রত্যক্ষ করা গেছে। স্বাধীনতার পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্কের সময় স্কটিশ জাতীয়তাবাদীরা ভবিষ্যতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অংশীদার হওয়ার আকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ করামাত্রই ইংলিশ রাজনীতিকদের যাঁরা ইউরোপীয় সংহতির বিরুদ্ধে, তাঁরাও বলতে শুরু করেন যে স্কটল্যান্ড আপনাআপনি ইইউর সদস্যপদ পাবে না। ওই বক্তব্যের সমর্থনে তখন এগিয়ে আসেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান ম্যানুয়েল বারোসো। তিনি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্কটল্যান্ডের উত্তরাধিকার সূত্রে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ পাওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেন যে দেশটিকে নতুন করে আবেদন করতে হবে এবং সব সদস্যরাষ্ট্র রাজি হলে প্রয়োজনীয় শর্তগুলো পূরণ করেই তাদের ওই জোটের সদস্যপদ পেতে হবে।
ইউরোপীয় নেতাদের মধ্যে স্কটল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে সবচেয়ে বেশি উদ্বিগ্ন সম্ভবত স্পেনের প্রধানমন্ত্রী রাহই। বার্সেলোনার দৈনিক লা ভ্যানগার্ডিয়া ইতিমধ্যে ক্যাটালোনিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলনকে স্কটিশদের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে বলেছে। হাঙ্গেরির বাণিজ্য–সংক্রান্ত অনলাইন পত্রিকা পোর্টফোলিও স্কটিশদের স্বাধীনতার ধাক্কা ইউরোপের বিভিন্ন প্রান্তে আঘাত হানতে পারে বলে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে। পত্রিকাটি বলছে, শুধু ক্যাটালোনিয়া নয়, বাস্কদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার আন্দোলনও প্রাণ ফিরে পাবে।
ইউরোপের বাইরেও এই গণভোট নিয়ে আগ্রহের কোনো কমতি নেই। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ ৮ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে তাঁর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে স্কটিশ গণভোট সম্পর্কিত এক প্রশ্নের উত্তরে ‘ঈশ্বর না করুন’ (গড ফরবিড) বলে মন্তব্য করে কিছুটা বিতর্কের জন্ম দেন। ইউরোপ এবং ইউরোপের বাইরে যেসব দেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের অস্তিত্ব রয়েছে, তাদের জন্য গণতান্ত্রিক বিচ্ছেদের এই প্রক্রিয়া নতুন করে উদ্বেগের মাত্রা যে বাড়িয়ে দেবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
রাশিয়া ও চীন সরকারিভাবে কিছু না বললেও তাদের নেতারা যে কিছুটা পুলকিত অনুভব করছেন, তার ইঙ্গিত মিলছে সেখানকার গণমাধ্যমের মন্তব্যে। রাশিয়ার ইজভেস্তিয়া অনেকটা খোঁচা দিয়ে বলেছে, স্কটল্যান্ড আলাদা হলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত অবসান ঘটবে এবং সম্ভবত উত্তর আয়ারল্যান্ড একই পথ অনুসরণ করবে। চীনা সংবাদপত্রে বলা হয়েছে যে স্কটল্যান্ডহীন ব্রিটেন দ্বিতীয় সারির দেশে পরিণত হবে। বেইজিং ডেইলি অভিযোগ করেছে দ্বৈতনীতি অনুসরণের। পত্রিকাটি বলছে যে নিজের দেশকে তারা ঐক্যবদ্ধ রাখতে চায়, অথচ তিব্বত ও তাইওয়ানের প্রশ্নে তাদের অবস্থান তার উল্টো।
স্কটিশ এই গণভোট এক অর্থে সম্পূর্ণ নতুন এক পরীক্ষা। প্রথমত, এই গণভোট হচ্ছে ব্রিটিশ সরকার ও স্কটিশ প্রাদেশিক সরকারের মধ্যকার এক সমঝোতার আলোকে। এখানে জাতিসংঘ বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো কোনো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কোনো ভূমিকা নেই। দ্বিতীয়ত, ব্রিটিশ সরকার দুই দফায় গণভোট করে স্কটল্যান্ডকে বিভিন্ন মাত্রায় স্বায়ত্তশাসন দেওয়ার পরও তা যে স্কটিশদের সর্ববিষয়ে স্বাধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি, তারই প্রতিফলন ঘটছে এই স্বাধীনতার বিতর্কে। তৃতীয়ত, এই গণভোটে শুধু স্কটিশরাই ভোট দিতে পারবেন। ওয়েলশ, ইংলিশ কিংবা উত্তর আয়ারল্যান্ডের কেউ ভোট দিতে পারবেন না। নতুন এই স্কটিশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের নেতা হলেন স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টির (এসএনপি) নেতা অ্যালেক্স স্যামন্ড। দুই দফায় প্রাদেশিক সরকার পরিচালনা করে তিনি স্কটল্যান্ডের জনগণের মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলতে পেরেছেন, তা রীতিমতো বিস্ময়কর। স্বায়ত্তশাসিত প্রাদেশিক সরকারের বাজেটে তিনি তাঁর নাগরিকদের জন্য এমন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করেছেন, যা ব্রিটেনের বাকি অংশ করতে পারেনি। স্কটল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কটিশ ও ইউরোপীয় ছাত্ররা নিখরচায় অথবা কম পয়সায় পড়ার সুযোগ পেয়ে আসছেন গত কয়েক বছর ধরে। কিন্তু সেই একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রিটিশ ছাত্রদের পড়ার জন্য ফি দিতে হচ্ছে। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও ব্রিটিশদের যেটুকু পয়সা খরচ করতে হয়, স্কটিশদের তা হয় না। এরপর নর্থ সির তেলসম্পদের ওপর একচ্ছত্র মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হলে ভবিষ্যতের স্কটল্যান্ড যে একটি প্রগতিশীল কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে রূপ নেবে, মি. স্যামন্ড সে রকমই এক স্বপ্ন দেখাচ্ছেন স্কটিশদের।
স্কটিশদের স্বশাসনের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা যে তাদের বিচ্ছিন্নতার দিকে ঠেলে দেবে, সেটা সম্ভবত ব্রিটেনের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল কনজারভেটিভ, লেবার ও লিবারেল ডেমোক্র্যাটের নেতারা বুঝতে পারেননি। স্বাধীনতার বিরুদ্ধে প্রচারণার দায়িত্ব তাই তাঁরা ছেড়ে দিয়েছিলেন দ্বিতীয় সারির নেতৃত্বের হাতে। কিন্তু গত সপ্তাহের জনমত জরিপে উঠে আসে ভিন্ন চিত্র। ব্রিটিশ রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র ওয়েস্টমিনস্টারকে গ্রাস করে একধরনের অস্থিরতা। তাঁরা যে কতটা ভয় পেয়েছেন, তা তাঁদের কথায় স্পষ্ট হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা ওয়েস্টমিনস্টারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় সূচি— প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব বাদ দিয়ে একই দিনে ছুটে যান স্কটল্যান্ডে—নিজেরা ভাগ করে নেন গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলো। স্কটল্যান্ড হচ্ছে ঐতিহাসিকভাবে প্রায় কনজারভেটিভমুক্ত এলাকা এবং লেবার পার্টির ঘাঁটি। সুতরাং, প্রধানমন্ত্রী সরল স্বীকারোক্তি দিয়ে বলেন যে কনজারভেটিভদের শিক্ষা দিতে তাঁরা যেন যুক্তরাজ্য থেকে বিচ্ছিন্ন না হন। বিরোধী দল লেবার পার্টি স্কটিশদের ইউনিয়ন ত্যাগ না করার অনুরোধ জানাতে ইংলিশদের প্রতি ইংল্যান্ডজুড়ে স্কটল্যান্ডের পতাকা ওড়ানোর আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরও বিরোধী নেতার ওই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটেও স্কটিশ পতাকা ওড়ায়। ব্রিটিশ রাজনীতিতে সম্প্রতি আলোড়ন সৃষ্টিকারী রাজনীতিক নাইজেল ফারাজ এই বিতর্কে এমনকি রানির হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন। স্পষ্টতই এগুলো ব্রিটিশ রাজনীতিকদের নিজেদের প্রতি আস্থাহীনতারই আলামত।
ব্রিটিশদের জাতীয় পরিচয় এখন রীতিমতো বিলোপ পাওয়ার মুখে। যদি হ্যাঁ ভোট জয়ী হয়, তাহলে বিশ্ব প্রত্যক্ষ করবে একবিংশ শতাব্দীর প্রথম গণতান্ত্রিক বিচ্ছেদ। আর যদি না ভোট জয়ী হয়, তাহলে যুক্তরাজ্যের অখণ্ডতায় আস্থাহীন এক বিশাল জনগোষ্ঠীর মন জয় করার এক কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে সে দেশটির জাতীয় রাজনৈতিক দলগুলো এবং তাদের নেতারা। এর ফলে দেশটির রাজনৈতিক মানচিত্রই যে শুধু বদলাবে তা-ই নয়, আদর্শগত অবস্থানও বদলে যেতে পারে। যুক্তরাজ্যের ভোটের ধরন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে ঐতিহাসিকভাবে বামপন্থী লেবার ও উদারপন্থী সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা স্কটল্যান্ডের ভোটের ওপর নির্ভরশীল আর ডানপন্থী কনজারভেটিভদের শক্ত ভিত হচ্ছে ইংল্যান্ড। ফলে স্কটল্যান্ড আলাদা হয়ে গেলে ভবিষ্যতে লেবার পার্টির এককভাবে ক্ষমতায় আসা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে। সর্বোপরি, স্বাধীনতার বিতর্ককে ঘিরে যে তিক্ততা বা দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, যুক্তরাজ্য টিকে গেলেও মোড়কের নিচে তা আদৌ যুক্ত থাকবে কি না সেটাই হবে প্রধান প্রশ্ন।
কামাল আহমেদ: সাংবাদিক।

এশিয়ার গণতন্ত্রে কালো দাগ by শশী থারুর

এশিয়ায় গণতন্ত্র যতটা কঠিন ভাবা হয়েছিল, তার চেয়ে একটু বেশি কঠিনই মনে হচ্ছে। তবে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার সমাজ বৃহৎ ও বিভক্ত হলেও তারা একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল ঘটাতে পেরেছে। কিন্তু এশিয়ার অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশ যেমন পাকিস্তান ও থাইল্যান্ড পথচ্যুত হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
ভারতে ব্যালটের মাধ্যমে সরকার পরিবর্তনের ইতিহাস দীর্ঘ, ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা প্রাপ্তির পর এ বছরের ১৬তম সাধারণ নির্বাচনেও এর কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। ভারতীয় নির্বাচন দুনিয়ার সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক চর্চা, এবারের নির্বাচনে দেশটির ভোটাররা ইউপিএ জোট বর্জন করেছেন, এর বদলে তাঁরা নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ভারতীয় জনতা পার্টিকে বেছে নিয়েছেন।
অনুরূপ ঘটনা ইন্দোনেশিয়ায়ও ঘটেছে। এটা দুনিয়ার দ্বিতীয় বৃহৎ গণতান্ত্রিক চর্চা। দেশটির তৃতীয় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটাররা সাবেক জেনারেল প্রাবোও সুবিয়ানতোর বদলে জনপ্রিয় মেয়র জোকো উইডোডোকে বেছে নেন। তবে এ দেশের মানুষের কঠোর সেনাশাসন ও দুর্বল বেসামরিক শাসন উভয়ই প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তানেও প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হয়েছে, গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা হস্তান্তরের এটাই প্রথম নজির স্থাপন করল দেশটি। নির্বাচনে আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ পরাজিত হয়েছেন, তিনি নির্বাচনে বিজয়ী আশরাফ গনির বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন। তবে এই বিরোধ এখনো সহিংস রূপ লাভ করেনি। উভয় দলই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় একটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠনের বিষয়ে আলোচনা করছে।
এসব দেশ শেষমেশ বুঝতে পেরেছে, নির্বাচনের ফলাফল আর যে তরিকায় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাদের বোঝাপড়ায় তারতম্য রয়েছে। নির্বাচন হচ্ছে শাসক ও শাসিতের মধ্যকার সম্পর্কের আশা, প্রতিশ্রুতি বা বোঝাপড়া সবকিছুরই প্রতিফলন। তাই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়াটাও গণতন্ত্রের একটি অপরিহার্য অংশ। জেতার জন্য আপনি যুদ্ধ করবেন, আবার হেরে গেলে সেটাও মর্যাদার সঙ্গে মেনে নেওয়া শিখতে হবে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে এশিয়ায় এই ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা দেখা যায় না। থাইল্যান্ডের রাজা ভূমিবল আদুলিয়াদেজ একটি নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধানের অনুমোদন দিয়ে আদতে থাই গণতন্ত্র গলা টিপে হত্যা করেছেন। ১৯৩২ সালের পর এটা নাকি সে দেশের ১৮তম সংবিধান, এতে ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর পিস অ্যান্ড অর্ডারের হাতে সব ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সেনাপ্রধান জেনারেল প্রাইউথ শান–ওশার নেতৃত্বে সামরিক জান্তা। প্রাইউথ এখন চাইলে ‘শান্তি ও শৃঙ্খলা ধ্বংস করতে পারে এমন যেকোনো পদক্ষেপ প্রতিরোধ, মুলতবি ও দমন করতে পারবেন। জাতীয় শৃঙ্খলা ও রাজতন্ত্র, দেশের অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থা ধ্বংস করতে পারে, এমন যেকোনো কিছুর ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য হবে।’
সামরিক জান্তা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আগামী বছর নির্বাচন হবে, তবে তা অবাধ ও সুষ্ঠু হবে, এমন সম্ভাবনা কম। থাইল্যান্ডে গত ৮২ বছরে ডজনেরও বেশি সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে, সে দেশে এখন একটি সংবিধান থাকলেও সেটা আদতে সামরিক শাসন চিরস্থায়ী করার একটি সনদ ছাড়া আর কিছু নয়।
এদিকে নওয়াজ শরিফ ও তাঁর সমালোচকদের মধ্যকার বিবাদ দীর্ঘায়িত হওয়ার কারণে পাকিস্তান পঙ্গু হওয়ার পথে। সাবেক ক্রিকেট তারকা ইমরান খান ও কানাডাভিত্তিক ধর্মীয় নেতা তাহিরুল কাদরিও গণ-আন্দোলন শুরু করেছেন, তাতে ইসলামাবাদ অচল হয়ে পড়েছে। নওয়াজ শরিফ পদত্যাগ না করা পর্যন্ত তাঁরা এটা চালিয়ে যাবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। অথচ গত বছরের নির্বাচনে ইমরানের দল তেহরিক-ই-ইনসাফ তৃতীয় স্থান লাভ করে।
এ অবস্থায় প্রধান বিরোধী দল পিপিপি সাড়া দিলেই সুড়ঙ্গের শেষ মাথায় আলো দেখার সম্ভাবনা রয়েছে। নওয়াজ শরিফ নির্বাচনের মাধ্যমে পিপিপিকে সরিয়ে ক্ষমতায় এলেও পিপিপি নওয়াজ শরিফের অবস্থানের প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করেছে। শরিফ বলেছেন, তিনি অসাংবিধানিক পন্থায় ক্ষমতা ছাড়বেন না।
কিন্তু থাইল্যান্ডের মতো পাকিস্তানের মাথায়ও সামরিক বাহিনীর ভূত জেঁকে বসেছে। পাকিস্তানের সেনাবাহিনী দেশটির ইতিহাসের অর্ধেক সময় সরাসরি শাসন করেছে, বাকি অর্ধেক সময় পরোক্ষভাবে দেশটি শাসন করেছে। এখন পর্যন্ত দেশটির সেনাবাহিনী এই সংকটে প্রত্যক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করেনি। তার মানে বোঝা যায়, এই বিদ্রোহের প্রতি সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সমর্থন রয়েছে।
আসলে দেশ দুটির সেনাবাহিনীর সঙ্গে সেখানকার গণতন্ত্রের সম্পর্কে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে, পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সেটা শুভ ইঙ্গিত বহন করছে। পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠানের ওপর দেশটির সামরিক বাহিনীর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ফলে তারা চাইলে নির্বাচিত সরকারকে তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে কিছু করা থেকে বিরত রাখতে পারে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যেভাবেই হোক না কেন।
সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকতে অনিচ্ছুক শরিফ তাদের কর্তৃত্বের পরীক্ষা নিতে চাওয়ায় এই বিদ্রোহের সৃষ্টি হয়েছে, এটা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। তিনি যদি সেনাবাহিনীকে ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দেন তাঁর বস কে তিনি তা জানেন এবং তাঁর জন্য যে সীমাই টেনে দেওয়া হোক না কেন তিনি তা মেনে চলবেন, তাহলে সেনাবাহিনী এই বিদ্রোহীদের পিটিয়ে রাস্তা থেকে ঘরে ফেরত পাঠাবে। নওয়াজের উৎখাত হওয়ার আশঙ্কাও আর থাকবে না।
ফলে পাকিস্তানের গণতন্ত্রের মৃত্যু ঘোষণা করার সময় এখনো আসেনি, সেখানে অন্তত আগামী কিছুদিনের জন্য একরকম ‘নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র’ ধরনের কিছু চলবে। কিন্তু এটাকেও টিকিয়ে রাখতে বা সংহত করতে হলে পাকিস্তানের রাজনৈতিক দলগুলোকে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন ও তার ফল মেনে নেওয়ার সংস্কৃতি আয়ত্ত করতে হবে।
ইমরান খানের কাছ থেকে এখন ঠিক এটাই প্রত্যাশা করছে পাকিস্তান, গত নির্বাচনে তাঁর দল মাত্র ৩৫টি আসন পেয়েছিল, পিপিপি পেয়েছিল ৪৫টি আসন আর নওয়াজের পাকিস্তান মুসলিম লিগ পেয়েছিল ১৬৬ আসন। তাঁর মতো ক্রিকেটারের এটা বোঝা উচিত, এই ফলাফলে তাঁর পক্ষে ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার পাওয়া সম্ভব নয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ইমরান একজন খাকি পোশাকের আম্পায়ারের প্রতীক্ষায় আছেন, যিনি খেলার মোড় তাঁর দিকে ঘুরিয়ে দেবেন।
বিগত কয়েক বছরে এশিয়ার গণতন্ত্রের অর্জন নেহাত কম নয়। এই এক প্রজন্ম আগেই এশিয়ার অর্ধেক দেশে জোর করে ক্ষমতায় আসার নজির দেখা গেছে আর আজ দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন ও বাংলাদেশে জোর করে ক্ষমতায় বসে যাওয়াটা সহজ কাজ নয়। এমনকি মিয়ানমার শত সমস্যা সত্ত্বেও নিশ্চিতভাবে কর্তৃত্ববাদী ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছে। কিন্তু থাইল্যান্ড ও পাকিস্তানের গণতন্ত্রের পথে যাত্রা করাটা খুব একটা সুখকর হবে না, সে পথ বন্ধুর।
ইংরেজি থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
শশী থারুর: ভারতের সাবেক মানবসম্পদ উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী।

সে প্রশ্নের জবাব লিখছেন মওদুদ by সাজেদুল হক

প্রশ্নটি আগেও ছিল। সাংবাদিক নূরুল কবীর তা আবার নতুন করে তুলেছেন। সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের লেখা নতুন বই ‘বাংলাদেশ: ইমারজেন্সি অ্যান্ড দি আফটারম্যাথ: ২০০৭-০৮’-এর প্রকাশনা অনুষ্ঠানেই তিনি এ প্রশ্ন তোলেন। বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের জন্য অনেকে সংবিধানের একটি সংশোধনীকে দায়ী করেন। ওই সংশোধনীতে বিচারপতিদের বয়স বাড়ানো হয়েছিল। মওদুদ আহমদ তখন আইনমন্ত্রী ছিলেন। কি উদ্দেশ্যে সংবিধানের সে সংশোধনী আনা হয়েছিল মওদুদ আহমদের উচিত ছিল এ ব্যাপারে বইতে ব্যাখ্যা করা।’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ গতকাল মানবজমিনকে বলেছেন, সে প্রশ্নের জবাব তিনি দেবেন। তিনি বলেন, আমি তখন আইনমন্ত্রী ছিলাম। এ কারণে আমাকে দায়িত্ব নিতে হয়েছে। কিন্তু কোন ব্যাকগ্রাউন্ডে সে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে তা আমি এরই মধ্যে লিখে শেষ করেছি। আরও কিছু কাজ শেষে সে বই প্রকাশিত হবে। ওই বইতে আমি এ ব্যাপারে খোলাখুলিভাবেই বলবো। আমার আরও কিছু ব্যর্থতা ছিল। যেমন সে সময় বিচার বিভাগ পৃথক্‌করণ হয়নি, মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। কেন এসব ক্ষেত্রে আমি ব্যর্থ হয়েছি তা-ও বলবো। রাজনীতিবিদ মওদুদ আহমদ লেখক হিসেবেও বিপুল আলোচিত। তার সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ: ইমারজেন্সি অ্যান্ড দি আফটারম্যাথ: ২০০৭-০৮’ নিয়ে এরই মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। ১/১১-এর পর কারাবন্দি মওদুদ আহমদ এ গ্রন্থে বয়ান করেছেন সে সময়কার ঘটনাপ্রবাহ। তিনি লিখেছেন, রাজনীতিবিদ, বিএনপি চেয়ারপারসন অথবা লাখ লাখ মানুষের নেত্রীর চেয়েও একজন মা হিসেবে খালেদা জিয়া তার নিজের ভাগ্য অপেক্ষা তার ছেলেদের মুক্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি তাদের মুক্তি ও চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠাতে চেয়েছিলেন। তার এ দুর্বলতার কথা জানা থাকায় সামরিক মধ্যস্থতাকারীরা কঠোর দর কষাকষিতে লিপ্ত হন। ছায়া সামরিক সরকারের সঙ্গে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সমঝোতা প্রক্রিয়া প্রসঙ্গে মওদুদ আহমদ লিখেছেন, প্রচণ্ড আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খালেদা জিয়া তার মাথা উঁচু করে রেখেছিলেন। হাঁটুতে তার গুরুতর সমস্যা থাকলেও তিনি দেশ ছাড়ার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি দেশেই চিকিৎসা নিতে চেয়েছিলেন। যে কোন ধরনের প্যারোলেও অনিচ্ছুক ছিলেন তিনি। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চারটি দুর্নীতির মামলা ছিল। কিন্তু তার কোনটিতেই বিচারকাজ শুরু হয়নি। সে কারণে খালেদা জিয়া আশা করেছিলেন যথাযথ আইনি প্রক্রিয়াতেই তিনি মুক্তি পাবেন। শেখ হাসিনার মতো সরকার থেকে কোন ধরনের সুবিধা নেয়ার পক্ষপাতী তিনি ছিলেন না। খালেদা জিয়া যখন কারাগারে বন্দি তখন সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য তাকে নানা প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল- (১) দেশত্যাগ না হয় বিচারের মুখোমুখি হওয়া; (২) নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না তবে তাকে সব সুযোগ-সুবিধাসহ জাতীয় নেতার মর্যাদা দেয়া; (৩) প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতা কাঠামোর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় সংবিধানের সংশোধন। অন্য কথায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা কমিয়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা এমনভাবে করা যাতে ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেনাবাহিনী নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। (৪) নির্বাচনে মনোনয়নের ক্ষেত্রে দু’টি তালিকা ছিল। কাদের মনোনয়ন দিয়ে পুরস্কৃত করতে হবে আর কাদের মনোনয়ন দেয়া যাবে না। আলোচনার ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালের ৩রা সেপ্টেম্বর তারেক রহমান মুক্তি পান। এর আগে খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকেও বিদেশ পাঠানো হয়। তারেক রহমানকে বিদেশ পাঠানোর ব্যাপারে খালেদা জিয়া ও মধ্যস্থতাকারীদের মধ্যে আলোচনা অব্যাহত ছিল। শেষ পর্যন্ত তারেক রহমানকেও বিদেশ যাওয়ার অনুমতি দেয়া হয়। সরকার ও খালেদা জিয়ার মধ্যে ঠিক কি কি বিষয়ে সমঝোতা হয়েছিল তা বলা কঠিন। কারণ হাসিনার মতো খালেদা কখনও এসব আলোচনার বিষয় প্রকাশ করেননি। তবে ধারণা করা হয় খালেদা জিয়া হয়তো নির্বাচনে অংশ নেয়ার শর্তটি মেনে নিয়েছিলেন। ওই সময়ের পরিস্থিতিতে নির্বাচন বর্জন করাই খালেদা জিয়ার জন্য যৌক্তিক ছিল। জনগণকে বোঝানোর মতো যথার্থ কারণও তার কাছে ছিল। কিন্তু আরও কিছু বিষয় খালেদা জিয়াকে সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেছিল। ১. বিএনপির নির্বাচন বর্জন দেশকে আবারও বিশৃঙ্খলা ও ধ্বংসের দিকে নিয়ে যেতে পারতো। যাতে দেশে ২০০৭-এর আগের পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তির সুযোগ ছিল। যাতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সামরিক বাহিনী আবারও প্রশাসনে সরাসরি হস্তক্ষেপ করার সুযোগ পেতে পারে এবং দেশকে আবারও তাদের পরিকল্পিত পথে নিয়ে যেতে পারতো। যার জন্য ইতিহাস খালেদা জিয়াকে দায়ী করতে পারতো। ২. এ অবস্থায় তার দলের নেতাকর্মীরা আবার নির্যাতন ও নিগ্রহের শিকার হতে পারতেন। তারেক রহমান ও কোকোকেও কোন ছাড় না দেয়ার আশঙ্কা ছিল। ৩. নির্বাচনে অংশ নেয়ার পক্ষে জামায়াতে ইসলামী শক্ত অবস্থান নিয়েছিল। দলটি খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য চাপ দিয়ে আসছিল। খালেদা জিয়ার আশঙ্কা ছিল বিএনপি নির্বাচনে অংশ না নিলে তাদের অনুপস্থিতিতে জামায়াত বিকল্প শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। এতে চারদলীয় জোট শুধু অকার্যকরই হবে না, বিএনপি মূলধারার ইসলামপন্থি রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতো। ৪. ধারণা ছিল যদি বিএনপি নির্বাচনে না-ও জেতে- অন্তত ১০০ আসনে জয়ী হবে। এ ক্ষেত্রে শক্তিশালী বিরোধী দলের ভূমিকা রাখার সুযোগ ছিল। নির্বাচনে ভরাডুবির কারণও নিজের মতো করে চিহ্নিত করেছেন মওদুদ আহমদ। তিনি লিখেছেন, বিএনপি সরকারের অপশাসন, বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ, যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত জামায়াতের সঙ্গে মিত্রতা, বিএনপি সরকারের কিছু মন্ত্রীর সম্পৃক্ততায় জঙ্গিবাদের উত্থান, প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের নামে হাওয়া ভবনের ক্ষমতা, প্রভাব ও দুর্নীতি প্রভৃতি কারণে বিএনপির কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন ভোটাররা।

এশিয়ায় গণতন্ত্রের সঙ্কট by শশী থারুর

শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হলো যে, অনেকে যেমনটা আশা করেন এশিয়ার গণতন্ত্র তার চেয়ে কঠিন। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দিয়ে ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার মতো বৃহৎ এবং বিভক্ত সমাজে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ক্রান্তিকাল উতরানো সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু থাইল্যান্ড ও পাকিস্তানের মতো কিছু এশীয় গণতন্ত্র মনে হচ্ছে তাদের পথ হারাচ্ছে।
ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে সরকারের পরিবর্তন ঘটানোর ভারতীয়দের বিরাট অভিজ্ঞতা রয়েছে। চলতি বছরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনও সেদিক থেকে কোন ব্যতিক্রম নয়। ভারতেই বিশ্বের বৃহত্তম ভোটাভুটি অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। ভারতীয়রা এবারে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) অনুকূলে ভোট দিলো। আর দু’মেয়াদে নির্বাচিত ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স ইউপিকে প্রত্যাখ্যান করলো। এ ধরনের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভোটাভুটি ঘটে ইন্দোনেশিয়ায়। দেশটির তৃতীয় রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটারগণ সাবেক জেনারেল প্রাবো সুবিয়ানতো’র পরিবর্তে জনপ্রিয় মেয়র জোকো উইডিডোকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন। এমনকি যুদ্ধে বিপর্যস্ত আফগানিস্তান তার প্রথম দফায় গণতান্ত্রিক হাতবদল নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করলো। যদিও এ নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বী আবদুল্লাহ আবদুল্লাহ নির্বাচনী ফলাফলের বৈধতা তীব্রভাবে চ্যালেঞ্জ করেছেন। এর ফলে আশরাফ গনি লাভবান হলেন। এই বিরোধ অবশ্য সহিংস রূপ নেয়নি। উভয় পক্ষ একটি জাতীয় ঐকমত্যের সরকার প্রতিষ্ঠায় মার্কিন মধ্যস্থতায় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এটা আশাব্যঞ্জক যে, গৃহযুদ্ধ ও সন্ত্রাসে বিধ্বস্ত এই ভূখণ্ডের বিবদমান পক্ষের কেউ অস্ত্রশক্তিতে বলীয়ান হওয়ার প্রবণতা দেখাচ্ছে না। প্রতীয়মান হচ্ছে যে, এই দেশগুলো এটা মেনে নিতে শুরু করেছে যে, নির্বাচন অনুষ্ঠানের কার্যকারিতা তার ফলাফল মেনে নেয়ার উপর নির্ভর করে।
একটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আশাবাদ, অঙ্গীকার এবং আপসের মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ ঘটে। আর এ সবই সরকার ও শাসিতের মধ্যকার গঠিত বন্ধন নির্দেশ করে। নির্বাচনের ফল গ্রহণ করা গণতন্ত্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আপনি আপনার পরাজয়কেও ঔদার্যের সঙ্গে গ্রহণ করবেন।  দুর্ভাগ্যবশত এই প্রবণতা এশিয়ার সর্বত্র সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। থাইল্যান্ডের রাজা ভূমিবল একটি নতুন অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান অনুমোদন করার মধ্য দিয়ে থাই-গণতন্ত্রের মৃত্যু সনদে কার্যকরভাবে স্বাক্ষর করেছেন। এক হিসাবে এটা হলো ১৯৩২ সালের পরে ১৮তম অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান, যাতে সেনাপ্রধান জেনারেল প্রেউথ চান-ওচা নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর পিস অ্যান্ড অর্ডারকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। জেনারেল প্রেউথ তার নতুন ক্ষমতাবলে ‘দেশের শাসন বা জাতীয় অর্থনীতি, রাজতন্ত্র, জাতীয় নিরাপত্তা এবং শান্তি-শৃঙ্খলাকে ধ্বংস করতে পারে-এমন সব ধরনের তৎপরতার প্রতিরোধ, স্থগিত এবং দমন করতে পারবেন। ’
 এদিকে পাকিস্তান অচল হয়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের নির্বাচিত সরকার এবং তার সমালোচকদের মধ্যে একটা সংরক্ষিত অচলায়তন গড়ে উঠেছে। ক্যারিশমেটিক সাবেক ক্রিকেট তারকা ইমরান খান, যার দল গত নির্বাচনে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে, তিনি এবং কানাডাভিত্তিক ধর্মীয় নেতা তাহিরুল কাদরি বিক্ষোভ মিছিলে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এর ফলে ইসলামাবাদ স্থবির হয়ে পড়েছে। এটা এমন একটি পরিস্থিতি, যা ইমরান ও কাদরি, নওয়াজের পদত্যাগ না করা পর্যন্ত চালিয়ে যাবেন বলে অঙ্গীকার করেছেন।  আশাবাদের একটি ক্ষীণ রেখা হলো প্রধান বিরোধী দল পিপিপি। এর আগে পিপিপি সরকারকে শরিফ ছাড় দিয়েছিলেন। সরকার বিরোধী বিক্ষোভে যোগ না দিয়ে তারা নওয়াজকে সংবিধানবহির্ভূত উপায়ে চাপ দিয়ে পদত্যাগ করানোর প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছেন। তারা নওয়াজের পেছনে দাঁড়িয়েছেন।
কিন্তু থাইল্যান্ডের মতো পাকিস্তানেও সামরিক বাহিনীর দীর্ঘ ছায়া রয়েছে। সামরিক বাহিনী পাকিস্তানের অস্তিত্বের অর্ধেক সময় সরাসরি শাসন করেছে। যদিও সেনাবাহিনী এখন পর্যন্ত চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ করেনি। মনে করা হচ্ছে, শীর্ষস্থানীয় সামরিক নেতৃবৃন্দের উল্লেখযোগ্য অংশ বিক্ষোভ সমাবেশকে মার্জনা করেছেন।
 সত্যি বলতে কি, থাই ও পাকিস্তানের গণতন্ত্রের সঙ্গে সামরিক বাহিনীর সম্পর্কের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী পরিস্থিতিকে নিজেদের জন্য অনুকূল মনে করে। থাইল্যান্ডে সেটা অনুপস্থিত। কারণ থাইল্যান্ডে সামরিক বাহিনীসহ অভিজাত শ্রেণী একাধিক্রমে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারের বিরোধিতা করে চলেছে। তার কারণ ভোটাররা থাকসিন শিনাওয়াত্রা এবং তার বোন ইংলাকের মতো জনপ্রিয় নেতাদের নির্বাচিত করে থাকেন, যা সামরিক বাহিনীর জন্য সুখকর নয়। নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক ফলাফল নিজেদের অনুকূলে আনার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরে এই শক্তিশালী গোষ্ঠী চূড়ান্তভাবে সিদ্ধান্ত নিলো যে, গণতান্ত্রিক নির্বাচনের খোলসটা আর ধরে রাখার দরকারটা কি। ওটা ফেলে দাও।
পাকিস্তানে, বিপরীতক্রমে বেসামরিক নির্বাচিত সরকার যখন সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ ক্ষমতার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলো, তখনই সমস্যা আরম্ভ হলো। সম্ভবত এটা কোন কাকতালীয় বিষয় নয় যে, শরিফ যখন ক্রমাগতভাবে সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্বকে সীমিত করতে উদ্যোগী হলেন, তখনই বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লো। আসল বস  কে- তিনি যদি সামরিক বাহিনীকে দেখাতে পারেন যে, এটা তার ভালই জানা আছে এবং তার জন্য লাল সীমারেখা যতই টানা হোক না কেন, ততক্ষণ প্রতিবাদকারীদের দ্বারা নওয়াজকে গদিচ্যুত করতে দেয়া হবে না। সেনাবাহিনী বরং দ্রুততার সঙ্গে তাদেরকে রাস্তা থেকে বিদায় করে  দেবে।
সুতরাং পাকিস্তানের গণতন্ত্রের মৃত্যুর জন্য শোক প্রকাশ করা খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাবে। আরো কিছু সময়ের জন্য এটা নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র হিসেবে চলতে পারে। কিন্তু একে শক্তিশালী করতে হলে পাকিস্তানের সকল রাজনৈতিক দলকে অবাধ ও সুষ্ঠু এবং আইনানুগ নির্বাচন অনুষ্ঠানে এবং তার ফল মেনে চলা শিখতে হবে।
ইমরান খানের কাছে পাকিস্তান এখন এটাই আশা করতে পারে। ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে তার দলের মাত্র ৩৫টি আসন, সেটা পিপিপি’র ৪৫ আসনের চেয়ে কম। আর নওয়াজের মুসলিম লীগের ১৬৬ আসন থেকে ঢের দূরে। একজন ক্রিকেটার হিসেবে খানের এটা বোঝা উচিত যে, এই স্কোর দিয়ে তাকে ম্যান অব দ্য ম্যাচ ঘোষণা করা যাবে না। দুর্ভাগ্যবশত উর্দিধারী আম্পায়ারের কাছ থেকে তার আশা, তারা খানের হয়ে খেলায় তাকে জিতিয়ে দেবেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশিয়ায় গণতন্ত্রের বিরাট অগ্রগতি ঘটেছে। এক প্রজন্ম আগেও এশিয়ার প্রায় অর্ধেক দেশে জবরদস্তি ক্ষমতার দখল ঘটেছে। কিন্তু আজকের দিনে দক্ষিণ কোরিয়া এবং ফিলিপাইনে সামরিক শাসন জারি প্রায় অভাবনীয় এবং বাংলাদেশে তা অসম্ভাবনীয় (আনলাইকলি)। এমনকি মিয়ানমারও তার অনেক সমস্যা নিয়েও সামরিক বাহিনীর রাজনৈতিক প্রভাবের শৃঙ্খল নিশ্চিতভাবে ভাঙতে পেরেছে। তবে এশিয়া মহাদেশকে পুরোপুরি সেনাশাসন মুক্ত করতে হলে থাইল্যান্ড ও পাকিস্তানে বিরাট অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে।

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বর্তমান সভাপতি বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতা শশী ঠারুর এর আগে ভারতীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন।
(১৩ই সেপ্টেম্বরের আরব নিউজের সৌজন্যে)

সহায়তার আশ্বাসে উৎসাহিত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী

জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হাতে নিহত ব্রিটিশ
ত্রাণকর্মী ডেভিড হেইনস (বাঁয়ে) ও পাশে দাঁড়ানো এক জঙ্গি।
ইসলামিক স্টেটের সরবরাহ করা ভিডিও অনুযায়ী এটি
হেইন্সকে গলা কেটে হত্যার আগমুহূর্তের ছবি। অনলাইনে
সন্ত্রাসবাদী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণকারী সংগঠন
এসআইটিই ইন্টেলিজেন্স গ্রুপের মাধ্যমে ভিডিওটি পাওয়া। রয়টার্স
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, ইসলামিক স্টেটের (আইএস) জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ‘মধ্যপ্রাচ্যের ভেতরে ও বাইরের’ বিভিন্ন দেশ থেকে পাওয়া সামরিক সহায়তার প্রতিশ্রুতিতে তিনি ‘খুবই উৎসাহিত’। কয়েকটি দেশ স্থলসেনা দেওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে বলে জানান তিনি। মধ্যপ্রাচ্য সফর থেকে ফিরে গতকাল রোববার সিবিএস টেলিভিশনের ‘ফেস দ্য নেশন’ অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোটে ৬০০ সেনা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। পাশাপাশি আটটি যুদ্ধবিমান ও দুটি উড়োজাহাজ দেবে দেশটি। খবর এএফপি ও রয়টার্সের। আইএসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে মার্কিন স্থলসেনা পাঠানো হবে না—এ মর্মে প্রেসিডেন্ট ওবামার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে জন কেরি বলেন, ‘কেউ কেউ সেনা দিতে রাজি হয়েছে। তবে আমরা এ মূহূর্তে তা চাইছি না।’ কেরি ওই সব দেশের নাম বলতে রাজি হননি।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, সিরিয়ায় আইএসবিরোধী হামলার ক্ষেত্রে তাঁরা বাশার সরকারের সঙ্গে বিমান হামলার বিষয়টি সমন্বয় করবেন না। তিনি স্বীকার করেন, শুধু বিমান হামলায় আইএসকে পরাস্ত করা সম্ভব না-ও হতে পারে। এদিকে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী টনি অ্যাবট গতকাল জানান, অস্ট্রেলিয়ার বাহিনী সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) মার্কিন ঘাঁটিতে থেকে ইরাকে আইএসের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। আইএসের বিরুদ্ধে লড়তে আন্তর্জাতিক জোট গঠনে যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানের পর অস্ট্রেলিয়াই প্রথম দেশ, যারা সুনির্দিষ্টভাবে অংশগ্রহণের বিষয়টি উল্লেখ করে এমন ঘোষণা দিল। প্রধানমন্ত্রী অ্যাবট ডারউইন শহরে সাংবাদিকদের জানান, তাঁর দেশ আইএসবিরোধী লড়াইয়ের জন্য ৬০০ সেনা পাঠাচ্ছে। বিমানবাহিনীর ৪০০ ও বিশেষ বাহিনীর ২০০ সেনার সমন্বয়ে এই বাহিনী গঠন করা হয়েছে। টনি অ্যাবট জানান,
শুধু সেনাসদস্যই নয়, আটটি যুদ্ধবিমান, আগাম সতর্কসংকেত দেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিমান ও আকাশেই বিমানে জ্বালানি ভরার কাজে ব্যবহৃত একটি বিমানও পাঠানো হবে। অ্যাবট আরও জানান, সেনাসদস্য ও বিমানগুলো শিগগিরই ইউএইতে মার্কিন ঘাঁটিতে অবস্থান নেবে। তবে অ্যাবট জানিয়ে দেন, সিরিয়ায় আইএসবিরোধী অভিযানে অংশ নেওয়ার ইচ্ছা অস্ট্রেলিয়ার নেই। ফ্রান্সের ৯৩০ জন জঙ্গিবাদে জড়িত: ফ্রান্সের নাগরিক কিংবা ফ্রান্সে অবস্থান করা ৯৩০ ব্যক্তি ইরাক-সিরিয়ায় জঙ্গিবাদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত বা সম্পৃক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তাঁদের মধ্যে ৬০ জন নারীও রয়েছেন। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কাজেনিউভি গতকাল ফরাসি একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই ৯৩০ জনের মধ্যে ৬০ জন নারীসহ ৩৫০ জন সরাসরি মাঠে লড়াই করছেন। পশ্চিমা অনেক দেশেরই আশঙ্কা, তাদের নাগরিকেরা জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ত হয়ে ইরাক-সিরিয়ায় লড়াইয়ের পর দেশে ফিরে হত্যাযজ্ঞ চালাবে। সিরিয়ায় বিমান হামলা: সিরিয়ায় আইএসের প্রশিক্ষণকেন্দ্রে বিমান হামলা চালিয়েছে দেশটির বিমানবাহিনী। শনিবার চালানো ওই হামলায় শিশুসহ অন্তত ১৭ জন নিহত হয়েছে।

নীরবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন হিলারি

হিলারি ক্লিনটন
ব্যক্তিগত একজন প্রশিক্ষকের অধীনে নিয়মিত শরীরচর্চা করছেন। চর্চা করছেন যোগব্যায়ামের। আবার বক্তৃতা দিচ্ছেন ‘করপোরেট আমেরিকাকে’ বাদ না দিয়েও কী করে আয়ের বৈষম্য দূর করা যায় তা নিয়ে। আইওয়া অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্রেটিক পার্টির হোমরাচোমরা কারা, তার সুলুকসন্ধান করেছেন। প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থিতার লড়াই যে এই অঙ্গরাজ্য থেকেই শুরু হবে! যুক্তরাষ্ট্রের আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজে প্রার্থী হবেন কি না, হিলারি ক্লিনটন তা এখনো মুখ ফুটে বলেননি। তবে অনেকেই মনে করছেন, তাঁর কর্মকাণ্ড থেকেই স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লড়তে যাচ্ছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী। জনসমক্ষে যদিও বলেছেন, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন আগামী বছর, তলে তলে ঠিকই প্রস্তুতি নিচ্ছেন। গতকাল রোববার আইওয়া ডেমোক্রেটিক পার্টির ৩৭তম বার্ষিক সভা হয় সিনেটর টম হারকিনের নেতৃত্বে। সেখানে হিলারিরও থাকার কথা। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব ছাড়ার পর এটিই হিলারির সবচেয়ে বড় ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যোগ দেওয়া।
এরই মধ্যে ডেমোক্রেিটক পার্টির তহবিল সংগ্রহকারী গোষ্ঠী প্রায়োরিটিজ ইউএসএ বলেছে, হিলারিকে সহযোগিতা দিতে তারা প্রস্তুত। তারা বলছে, শিগগিরই কংগ্রেস নির্বাচনের জন্য তহবিল সংগ্রহ শুরু করা হবে। তবে ২০১৬ সালে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে হিলারির জন্য তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ইতিমধ্যেই দাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে দিয়েছে তারা। হিলারি প্রেসিডেন্ট পদে লড়বেন, তা খোলাখুলিই বলেছেন আইওয়া অঙ্গরাজ্যের ডেমোক্রেটিক পার্টির সাবেক সভাপতি সুয়ে ডিভোরস্কি। ডিভোরস্কি বলেন, ‘তিনি (হিলারি) কী করতে যাচ্ছেন, তা পরিষ্কার। আর তা হলো, আগামী নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা।’ তহবিল সংগ্রহ এবং তৃণমূলের সমর্থন—এ দুটি মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়ার জন্য দুই বড় শর্ত। হিলারির একটা সুবিধার দিক হচ্ছে তাঁর প্রতি তৃণমূলের সমর্থন আছে। দলের অনেক সমর্থক হিলারির প্রতি আগাম শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। জবাবে কিন্তু তিনি শুধু ধন্যবাদ জানিয়েই ক্ষান্ত হন। খুলে বলেননি যে এটি প্রচারণা নয়। কিংবা আগের মতো বলেননি, ‘এখনো সিদ্ধান্ত নিইনি।’ সূত্র: এনডিটিভি।

অর্ধেক পাখিই ঝুঁকিতে!

বাল্ড ইগল। রয়টার্স
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে আছে উত্তর আমেরিকা মহাদেশের অর্ধেক পাখি। এ কারণে তাদের অস্তিত্বও হুমকির মুখে। সাত বছর ধরে চলা এক গবেষণার পর পাখি সংরক্ষণ নিয়ে কাজ করা খ্যাতনামা সংগঠন অডুবন সোসাইটি এই তথ্য দিয়েছে। খবর গার্ডিয়ানের।গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, উত্তর আমেরিকায় ৩১৪ প্রজাতির পাখির সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে এবং বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়তে থাকলে এসব পাখির বিচরণক্ষেত্র হারিয়ে যাবে। যুক্তরাষ্ট্রের ১০টি রাজ্য এবং ওয়াশিংটনের ‘প্রধান’ পাখি এভাবে হারিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করেছেন গবেষকেরা। অডুবন সোসাইটির প্রধান বৈজ্ঞানিক এবং ওই গবেষণার প্রধান গ্যারি ল্যাংহ্যাম বলেন, ‘আমরা হয়তো এসব পাখির কোনো কোনোটি চিরতরে হারিয়ে ফেলব।’ যুক্তরাষ্ট্র সরকার ২০১০ সালে পাখির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব নিয়ে যে প্রতিবেদন দিয়েছিল, অডুবন সোসাইটির প্রতিবেদনে তার চেয়ে বেশি হতাশাজনক চিত্র উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যে ৫৮৮ প্রজাতির পাখির ওপর গবেষণা করা হয়, এই শতকের মাঝামাঝি সময়ে এর মধ্যে ১২৬ প্রজাতির পাখির বিচরণক্ষেত্র অর্ধেকের বেশি হারিয়ে যাবে। কমতে থাকবে পাখির সংখ্যা। ২০৮০ সালের মধ্যে বিচরণক্ষেত্র হারাবে ১৮৮ প্রজাতির পাখি। বাল্ড ইগল পাখির সংরক্ষণে যুক্তরাষ্ট্র বেশ সাফল্য দেখিয়েছে বলে মনে করা হয়। তবে গবেষকেরা বলছেন, এই পাখিটিও ২০৮০ সালের মধ্যে তার বিচরণক্ষেত্রের ৭৫ শতাংশ হারিয়ে ফেলবে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই ধারায় মেরিল্যান্ডের জাতীয় পাখি এবং বেসবল দলের প্রতীক বাল্টিমোর ওরিওল হারিয়ে যাবে। অস্তিত্ব হারাবে লুইজিয়ানার পাখি ব্রাউন পেলিক্যানও। গবেষণাটি চালাতে ৪০ বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের জুওলজিক্যাল সার্ভের নথি পর্যালোচনা করেন গবেষকেরা। জলবায়ু পরিবর্তনের ১৭ ধরনের মডেলও তাঁরা বিশ্লেষণ করেন। অডুবনের প্রধান নির্বাহী ডেভিড ইয়ার্নলড এ গবেষণার তথ্যকে আখ্যায়িত করেন ‘কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান’ হিসেবে।

একটি মহৎ কর্ম হবে যদি... by আলী ইদরিস

গত ১০ই সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সংসদে বললেন জনগণ চাইলে এবং সকল সংসদ একমত হলে আইন করে  হরতাল বন্ধ করা যেতে পারে। আবার এ-ও বললেন যে আইন দিয়ে সব কিছু করা যায় না, আইন করে হরতাল বন্ধ হবে কিনা তা দেশের জনগণের ওপর নির্ভর করে। তাই আইন করে হরতাল  বন্ধ করার বিষয়ে এখনই কিছু বলতে পারবো না। এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ যে হরতাল চায় না সেটা নিঃসন্দেহে অনুমান করা যায়। কিন্তু প্রমাণ করতে হলে নিরপেক্ষ জরিপ বা গণভোট দরকার হবে। জনগণ হরতাল চায় না কারণ হরতালের কোন উপকারিতা নেই। জনগণের দাবি আদায়ের নামে প্রকৃতপক্ষে রাজনৈতিক দলের স্বার্থই আদায় হয়। তাছাড়া এখন আর হরতাল দিয়ে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা যায় না। একদিনের হরতালের  দেশের প্রায় ন্যূনতম ১০০০ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। লাগাতার হরতাল হলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। তাছাড়া শিল্প-কারখানা-ব্যবসা ভেঙে পড়ে, দেশী-বিদেশী বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেয়, শ্রমজীবীরা উপোস করে, চিকিৎসা না পেয়ে বাসায়, হাসপাতালে রোগী মারা যায়, মৃত আত্মীয়ের মুখ দেখা যায় না, দাফনে শামিল হওয়া যায় না, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিতে পারে না, চাকরিপ্রার্থীরা চাকরি হারায়, কৃষক থেকে শুরু করে খামারি, ব্যবসায়ী, রপ্তানিকারক সবার বিরাট ক্ষতি হয়, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি পিছিয়ে যায়, আরও বহু ক্ষতি হয়। অতীতেও ক্ষমতায় থাকাকালে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন যে বিরোধী দলে গেলে তিনি হরতাল ডাকবেন না কিন্তু কথা রাখা হয়নি। মহাজোট সরকারের অর্থমন্ত্রীও হঠাৎ হঠাৎ ন্যায্য কথা বলে ফেলেন যা দলের বিরুদ্ধে হলেও দেশের জন্য মঙ্গলজনক। জ্বালানি তেলের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিরোধী দলের ডাকা হরতাল সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, হরতাল নিষিদ্ধ করা উচিত। অর্থনীতির ক্ষতিকারক ও জনগণের ভোগান্তির কারণ হরতাল নিষিদ্ধ করার জন্য ব্যবসায়ীদের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠান এফবিসিসিআই অতীতে বহুবার সরকারের নিকট আহ্বান জানিয়েছে, কিন্তু কোন সরকারই সে আহ্বানে সাড়া দেয়নি। এফবিসিসিআই ছাড়াও সুশীল সমাজ, মানবাধিকার সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সর্বস্তরের জনগণ মনেপ্রাণে চায় ক্ষতিকারক হরতাল বন্ধ হোক। কিন্তু একমাত্র রাজনৈতিক দলগুলো বিরোধী দলে থাকাকালে হরতালকে অস্ত্র হিসেবে সরকারের বিরুদ্ধে প্রয়োগের জন্য জিইয়ে রাখতে চায়। কারণ হরতাল প্রতিবাদের ও দাবি আদায়ের একমাত্র আরামদায়ক এবং কার্যকর অস্ত্র। একবার ঘোষণা করে গণমাধ্যমে ছেড়ে দিলেই হলো, বাকি কাজ জনসাধারণই সম্পন্ন করে। কিন্তু জনসাধারণ তা ভয়ে ভয়েই করে, ভাঙচুরের ভয়ে, বোমাবাজির ভয়ে, জ্বালাও-পোড়াওয়ের ভয়ে, প্রতিহতকারী কর্তৃক আক্রমণের ভয়ে ইত্যাদি। অথচ আহ্বানকারী রাজনৈতিক দলগুলো পরদিন গর্বভরে প্রচার করে যে হরতাল সফল হয়েছে কিন্তু দেশের যে বিরাট অর্থনৈতিক ও জনগণের আর্থ-সামাজিক, মানবিক ক্ষতি হয়েছে তা কেউ উল্লেখ করে না। এখানে রাজনৈতিক দলগুলো দেশের স্বার্থ দেখে না নিজেদের ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে হরতালকে প্রয়োগ করে। তাই সংসদে আইন তৈরি করে হরতালকে নিষিদ্ধ করার পক্ষপাতী কেউ নয়। অথচ নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যেমন করমুক্ত গাড়ি  পাওয়া, সংসদে ৯০ দিনের পরিবর্তে  হাজিরা না দিয়েও বেতন-ভাতা তুলে নেয়া-এ সব ব্যাপারে বিরোধী ও সরকারি কোন রাজনৈতিক দলই কার্যবিধি সংশোধন করতে চায় না। এজন্যই রাজনৈতিক দলগুলো হরতাল নিষিদ্ধ করতে বাধা দেয়, এটা দেশের দুর্ভাগ্য। দক্ষিণ এশিয়ার দু’একটি দেশ ছাড়া পৃথিবীর বাকি অংশে হরতাল নামক কর্মসূচির নাম গন্ধ নেই। একমাত্র বাংলাদেশেই হরতালের মহামারী। হরতাল না হলে দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি আরও ত্বরান্বিত হতো। সময় এসেছে আইনের মাধমে হরতালকে নিষিদ্ধ করা। কোন না কোন ক্ষমতাসীন দলকে উদ্যোগ নিতে হবে এবং নিজেরাও তা মেনে চলার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। যে দলই এ উদ্যোগ নেবেন জনগণ তাদের সাধুবাদ জানাবে। তাই হরতাল নিষিদ্ধ করতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসকে অন্তরিক সাধুবাদ জানাই। সরকারের হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রয়োগ করে হরতাল নিষিদ্ধ করলে একটি মহৎ কর্ম সম্পন্ন করা হবে। তাতে মহাজোট সরকার জনগণের প্রশংসাই পাবেন।