Showing posts with label ফেনী. Show all posts
Showing posts with label ফেনী. Show all posts

Sunday, April 26, 2026

বানরের উৎপাত থেকে বাঁচাচ্ছে কুকুর! by আবু ইউসুফ মিন্টু

০৭ নভেম্বর ২০২৫ঃ সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লাঠি হাতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে ধানক্ষেতে। মাঝে মাঝে ধর ধর বলে চিৎকার, চেঁচামেচিও করতে হয়। বনের ভেতর ওত পেতে থাকে বানরের পাল। কাউকে না দেখলে দেড় থেকে দুই হাজার বানর একসঙ্গে পাকা ধানে হানা দেয়। নিমেষেই খেয়ে নষ্ট করে ফেলে কৃষকের স্বপ্নের পাকা ধান। এমন ঘটনা ঘটছে ফেনীর পরশুরাম উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয়। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের সত্যনগর, জয়চাঁদপুর, বীরচন্দ্রনগর, মহেশপুষ্করনি ও রাঙামাটি এলাকাগুলোয়। এ ছাড়া উপজেলার বক্সমাহমুদ, চিথলিয়া ও পৌর এলাকার সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোয়ও বানরের উপদ্রব বেড়ে গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

এ উপজেলা ভারত সীমান্তবর্তী এলাকা। ভারতের প্রায় ৯০.৫৫ বর্গকিমি সীমান্ত রয়েছে। ওই এলাকাগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, অসংখ্য কৃষক নিজ নিজ পোষা কুকুরসহ লাঠি হাতে নিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন ধানক্ষেতের আইলে। বনের ভেতরে ও গাছে বাননের উপস্থিতি টের পেলেই চিৎকার, চেঁচামেচি করে কুকুর দিয়ে ধাওয়া করে বানর তাড়াচ্ছে। কৃষকরা জানান, ধানক্ষেতে নামার আগেই বানর তাড়াতে না পারলে নিমেষে শেষ করে দেবে জমির পাকা ধান।

জঙ্গলে খাদ্যের সংকট দেখা দেওয়ায় বানর পালের উপদ্রব বেড়ে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে। এতে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা। এরই মধ্যে কয়েক হেক্টর জমির ধানক্ষেত নষ্ট করে ফেলেছে বানরের পাল।

চলতি বছর আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে বানরের উপদ্রব। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই পাকা ধান তুলবেন কৃষকরা। তার আগেই বানরের উপদ্রব দেখা দিয়েছে। তাই বানর থেকে ধান রক্ষায় দিনরাত লাঠি নিয়ে ক্ষেত পাহারা দিচ্ছেন কৃষকরা।

উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের সত্যনগর গ্রামের কৃষক ফরিদ আহমেদ বলেন, বানর মানুষকে খুব বেশি ভয় পায় না। আক্রমণেরও আশঙ্কা রয়েছে। তাই কুকুর সঙ্গে নিয়ে সারাদিন পাকা ধান পাহারা দিচ্ছি।

ফরিদ আহমেদ আরও বলেন, প্রতিদিন তার ছেলেসহ সময় ভাগাভাগি করে লাঠি হাতে নিয়ে ধানক্ষেতে দাঁড়িয়ে থাকি। তারপরও তার প্রায় পঞ্চাশ শতক জমির পাকা ধান নষ্ট করে ফেলেছে। এক পাশে তাড়ালে বানরের পাল আরেক পাশ দিয়ে ধানক্ষেতে নেমে ধান খেয়ে ফেলে। তারা মানুষের মতো লুকোচুরি খেলে। বানর জঙ্গলের ভেতর ওত পেতে থাকে। কাউকে না দেখলে মুহূর্তেই পাকা ধান খেয়ে ফেলে এবং নষ্ট করে দেয়।

আরেক কৃষক জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আমি চলতি আমন মৌসুমে ৬০ শতক জমিতে চাষাবাদ করেছি। কয়েকদিনের মধ্যে তার ধান কাটা শুরু করার কথা রয়েছে। কিন্তু বানরের পাল তার ২০ শতক জমির পাকা ধান খেয়ে ফেলেছে। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। জাহাঙ্গীর আরও বলেন, শ্রমিকের মজুরি, জমি চাষাবাদের খরচ ও সার ও কীটনাশকের দাম বেড়ে যাওয়ায় এমনিতেই প্রতি মৌসুমি লোকসান গুনতে হয়, এবার বানরের আক্রমণের কারণে সর্বস্বান্ত হয়ে যাচ্ছি।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি আমন মৌসুমে পরশুরামের প্রায় ৬ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষাবাদ করা হয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে একাধিক বন্যায় কৃষকরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, যেহেতু বানরের বিষয়টি বন বিভাগ ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরে তারপরও পাকা ধানে বানরের উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় কৃষকদের সতর্কতা সঙ্গে পাহারা দিয়ে পাকা ধান রক্ষার পরামর্শ দিচ্ছি। তিনি আরও বলেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই ধান কাটা শুরু হয়ে যাবে, এ মুহূর্তে ধানক্ষেতে বানরের আক্রমণে কৃষকরা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

পরশুরাম উপজেলা বন কর্মকর্তা আবু নাসের জিয়াউর রহমান বলেন, চলতি বছরে বানরের উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। জঙ্গলে খাবারের সংকটের কারণে বানরের পাল খাবারের সন্ধানে পাকা ধানে হানা দিচ্ছে। আমরা আমাদের বন বিভাগের দায়িত্বরত ফরেস্টর, বনমালীদের টহল জোরদার করেছি। একই সঙ্গে কৃষকদেরও পরামর্শ দিয়েছি, তারা তাদের পাকা ধান রক্ষার্থে যেন নিয়মিতভাবে পাহারা দেয়। বন্যপ্রাণীসহ বানর হত্যা না করতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

বন কর্মকর্তা আরও বলেন, পাকা ধান ঘরে তোলার সময় বানরের হাত থেকে ফসল রক্ষা করতে না পারলে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এখানকার অসংখ্য কৃষক।

বানরের উৎপাত থেকে বাঁচাচ্ছে কুকুর!
বানরের উৎপাত থেকে বাঁচাচ্ছে কুকুর!


Friday, January 30, 2026

রাজার ছেলে রাজা হবে, সেই সংস্কৃতি আমরা পাল্টে দিতে চাই: জামায়াত আমির

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘রাজার ছেলে রাজা হবে, মন্ত্রীর ছেলে মন্ত্রী হবে, সেই সংস্কৃতির ধারা আমরা পাল্টে দিতে চাই।’ আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফেনীতে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। জেলা শহরের ফেনী সরকারি পাইলট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে এ জনসভা অনুষ্ঠিত হয়।

জামায়াতের আমির বলেন, ‘অতীতের বস্তাপচা রাজনীতি ফ্যাসিবাদ উপহার দিয়েছে, একনায়কতন্ত্র উপহার দিয়েছে, দুর্নীতিতে দেশকে চ্যাম্পিয়ন করেছে। ওই রাজনীতিকে আমরা লাল কার্ড দেখাতে চাই। আমাদের কাছে হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান সবাই সমান। আমরা তাদের সবার অধিকার নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। ইনশা আল্লাহ এই কাজে কেউ বাধা দিয়ে আমাদের আটকাতে পারবে না।’

দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সহিংসতার দিকে ইঙ্গিত করে জনসভায় জামায়াতের আমির বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় আমরা মাথা গরম দেখতে পাচ্ছি। শীতের দিনে মাথা গরম করলে, চৈত্র মাসে কী করবেন? একটু মাথাটা ঠান্ডা রাখেন। একটু জুলাই যোদ্ধাদের সম্মান করেন, এতগুলো শহীদের প্রতি একটু শ্রদ্ধা প্রদর্শন করুন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গুলির সামনে যাঁরা বুক পেতে দিয়েছিল, তাদের সম্মান করুন। সেই সম্মানটা করলে মাথা গরমের কোনো সুযোগ নেই।’

নারীদের ওপর হামলা করা হচ্ছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘কিছু কিছু জায়গায় মা-বোনদের ওপর হাত তোলা হচ্ছে। আমরা তাদের অতি বিনয়ের সঙ্গে আহ্বান জানাব, মা-বোন আপনাদেরও রয়েছে। নিজেদের মা-বোনকে সম্মান করুন, তাহলে বাংলার সবগুলা মা ও বোনকে আপনি সম্মান করতে পারবেন।’

১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের পক্ষে ভোট চেয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘দাঁড়িপাল্লার মার্কা হচ্ছে স্বাধীনতা রক্ষার মার্কা, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার মার্কা। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মার্কা। এর পক্ষে গোটা দেশে একদম চাষ করে ফেলতে হবে। একটা মানুষও বাদ যাবে না।’

জামায়াতের আমিরের আগমন উপলক্ষে সকাল থেকেই স্লোগানে স্লোগানে মুখর হয় জনসভাস্থল। বেলা ১১টায় তিনি মঞ্চে ওঠেন। এ সময় তিনি গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেন। বেলা ১১টা ১২ মিনিটে তিনি বক্তব্য শুরু করেন। ১১টা ৩৫ মিনিটে বক্তব্য শেষ করে ফেনীর তিনটি আসনের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা ও ঈগল প্রতীক তুলে দেন।

সমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটির পরিচালক এ টি এম মাসুম। তিনি বলেন, ‘আমরা কেমন বাংলাদেশ গড়ে তুলব এর ফয়সালা হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি। বৈষম্যমুক্ত, সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত সমাজ গড়তে হলে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থীদের ভোটে জয়ী করতে হবে।’

সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদের ভিপি সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, গত ৫৪ বছরে বাংলাদেশের কোনো পরিবর্তন আসেনি। গুম-খুনের শাসনের কারণে জুলাই আন্দোলনের প্রয়োজন হয়েছিল। গত দেড় বছরে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনসাফের পক্ষে রায় দিয়েছেন তরুণেরা।

এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বিএনপির উদ্দেশে বলেন, ‘ফ্যামিলি কার্ড না দিয়ে চাঁদাবাজি থেকে বেঁচে থাকার কার্ড দেবেন। ইভটিজিং ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম বন্ধের কার্ড দেবেন। তাহলে মানুষের কাজে লাগবে। রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব কার্ড দেওয়া নয়। এটি ইউনিয়ন পরিষদ ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের কাজ। নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা শুরু হলে আরেকটি ৫ আগস্ট ফেনী থেকে শুরু হবে।’

সমাবেশে জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সভাপতি রাশেদ প্রধান বলেন, ‘ফেনীর মেয়ে খালেদা জিয়া, সেই খালেদার আসনে বিএনপি আর নেই। শহীদ জিয়ার বিএনপি আর নেই। বিএনপি এখন চাঁদাবাজের দল। বিএনপির সঙ্গে জোটের সাবেক নেতারা আর কেউ নেই। জোটের সব নেতা বিএনপি ত্যাগ করেছে। বিএনপি এখন অনিবন্ধিত দল নিয়ে জোট গঠন করেছে। কয়েকটি দলের প্রধান বিএনপির হয়ে ভোট করছে৷’

জামায়াতের জেলা শাখার সেক্রেটারি মাওলানা আবদুর রহিমের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন সাবেক জেলা আমির এ কে এম শামসুদ্দিন, ফেনী-৩ (দাগনভূঞা ও সোনাগাজী) আসনে জামায়াতের প্রার্থী ফখরুদ্দিন মানিক, ফেনী-১ (ফুলগাজী, পরশুরাম ও ছাগলনাইয়া) আসনের প্রার্থী এস এম কামাল উদ্দিন, জাতীয় শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহসভাপতি কবির আহম্মদ প্রমুখ।

ফেনীতে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে
ফেনীতে নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। আজ শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে। ছবি: প্রথম আলো

Saturday, June 14, 2025

ভাইয়ের ‘প্রতারণায়’ নিঃস্ব প্রবাসফেরত তমিজ

দীর্ঘ ৩৪ বছরের প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরে এসেছেন ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের বাসিন্দা তমিজ উদ্দিন। ১৯৯০ সালে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমান তিনি। তবে প্রবাসে কাটানো জীবনের বড় একটি সময় (২৫ বছর) তিনি কুয়েতের কারাগারে কাটিয়েছেন। সব কিছু উপেক্ষা করে দেশে ফিরে নতুন জীবন শুরুর আশায় ছিলেন তিনি।

কিন্তু দেশে ফিরে দেখেন স্ত্রী, সন্তান, পৈতৃক ভিটেমাটি, জমিজমা, কোনো কিছুই আর তার নেই। এ ঘটনায় এলাকাজুড়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, তমিজ উদ্দিনের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে আপন ছোট ভাই আলাউদ্দিন দখল করে নিয়েছেন পৈতৃক সব সম্পত্তি। আর স্ত্রী-সন্তানরাও অন্যত্র চলে গিয়েছেন। শেষ বয়সে সব হারিয়ে এখন মাথা গোঁজার ঠাঁইও নেই। এখানে সেখানে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সর্বশেষ এক বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি জানেন না সম্পত্তি আদৌ ফিরে পাবেন কি না? এ জন্য প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তমিজ উদ্দিন বলেন, এক ভারতীয় নাগরিক হত্যার ঘটনায় কুয়েত পুলিশ আমাকে জেলে নিয়ে যায়। কিন্তু আমি হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিলাম না। পরে তারা আমাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়। আমি ভেঙে পড়িনি, আপিল করেছি। পরে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়। খালাসের জন্য কয়েক দফা আবেদন করি, অবশেষে ২৫ বছর সাজা ভোগ করার পর মুক্তি পাই।

তিনি বলেন, ভেবেছিলাম দেশে ফিরে অন্তত একটা ছায়া পাব। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করব। কিন্তু এসে দেখি, নিজের ভিটেতেই আমি অনাহূত। স্ত্রী-সন্তান মৃত্যুদণ্ডের খবর শুনে নিউজিল্যান্ডে পাড়ি জমায়। আমার আপন ভাই সব সম্পত্তি কেড়ে নিয়েছে। আমি সরকারের কাছে প্রতিকার দাবি করছি।

তমিজ উদ্দিনের ভাই জহির উদ্দিন জানান, এ ঘটনায় স্থানীয়ভাবে একাধিকবার সালিশ হলেও আলাউদ্দিন কোনো প্রকার মীমাংসায় রাজি হননি। উল্টো প্রবাসী তমিজ উদ্দিনকে হুমকি-ধমকিও দেওয়া হচ্ছে। এর আগে তমিজ উদ্দিনকে মাদক মামলায় জড়িয়ে দিয়েছিল। পরে আদালত তাকে মামলা থেকে খালাস দিয়েছেন।

অভিযোগ অস্বীকার করে মো. আলাউদ্দিন বলেন, আমি কারও সম্পত্তি দখল করিনি। পৈতৃক সম্পত্তি যতটুকু পেয়েছি, ততটুকই ভোগদখল করছি। তার (তমিজ উদ্দিন) সম্পত্তি কোথায় আছে, কার দখলে আছে জানি না।

স্থানীয় বাসিন্দা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হাশেম বাহাদুর কালবেলাকে বলেন, এমন অনেক প্রবাসী আছেন, যারা বছরের পর বছর কষ্ট করে দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠালেও দেশে ফিরে ভিটেমাটি খুঁজে পান না। সরকারের কাছে আবেদন, প্রবাসীদের পাশে দাঁড়ান। নইলে একের পর এক তমিজ উদ্দিনরা নিঃস্ব হয়ে যাবে।

জানতে চাইলে দাগনভুঞা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) স ম আজহারুল ইসলাম কালবেলাকে বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। 

ভুক্তভোগী প্রবাসফেরত তমিজ উদ্দিন। ছবি : কালবেলা
ভুক্তভোগী প্রবাসফেরত তমিজ উদ্দিন। ছবি : কালবেলা

Thursday, October 17, 2024

ফেনীতে গুলিবিদ্ধ সাহেদুল হারিয়েছে চোখ, অর্থ সংকটে বন্ধ চিকিৎসা

ফেনীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশ নিয়ে বাম চোখ হারিয়েছে তরুণ সাহেদুল ইসলাম। মাথা, মুখ ও বুক সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে অন্তত তিন শতাধিক ছররা গুলি লেগেছিল। ৫ই আগস্টের পর বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা নিলেও বের করা হয়নি একটি গুলিও। সমপ্রতি চিকিৎসক সাহেদুলকে দেশের বাইরে নিয়ে চিকিৎসা করাতে বললে সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছে তার পরিবার। আহত সাহেদুল ইসলাম ফেনীর ছাগলনাইয়া পৌরসভার দক্ষিণ যশপুর মির্জাপাড়ার নুর আলমের ছেলে। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সাহেদুল সবার ছোট। বাবা নুর আলম হৃদরোগ ও অ্যাজমা আক্রান্ত হয়ে প্রবাস থেকে দেশে ফিরে অসুস্থ অবস্থায় বেকার জীবনযাপন করছেন। বড় ভাই তৌহিদুল ইসলামের আয়ে কোনোরকম সংসার চলছে সাহেদুলের। আহত সাহেদুলের বোন ফাহিমা আক্তার বলেন, গত ৫ই আগস্ট ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার পৌর শহরে আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার সঙ্গে অংশ নেয় সাহেদুল ইসলাম। একপর্যায়ে সংঘর্ষ বেঁধে গেলে ছুটোছুটির সময় মাটিতে পড়ে যায় সাহেদুল। মাটি থেকে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সময় চোখ, মুখ, মাথা ও বুক সহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে কয়েক শতাধিক ছররা গুলি লাগে। এরপর দ্রুত তাকে ছাগলনাইয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসক ফেনী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে প্রেরণ করে। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এরপর পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতাল, রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নিউরোসায়েন্সেস হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে চিকিৎসা দেয়া হয় সাহেদুলের। সাহেদুলের বোন ফাহিমা আক্তার আরও বলেন, পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতালে অপারেশনে বাম চোখ নষ্ট হওয়ার কথা জানালেও চিকিৎসকরা গুলি বের করতে পারেননি। তার বাম চোখে এখনো দু’টি গুলি রয়েছে। এ ছাড়া মাথায় ১৯৪টি, দুই হাতে শতাধিক, বুকে তিন-চারটা সহ তিন শতাধিক গুলি রয়ে গেছে। সিএমএইচ থেকে এক সপ্তাহের ছুটি দেয়ায় সাহেদুলকে বাড়ি নিয়ে এসেছি। এরপর পূজা ও নানা কারণে বিগত ১৫ দিনেও সাহেদুলকে পুনরায় সিএমএইচে নেয়া হয়নি।

চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে বাবা নুর আলম বলেন, দেশে চিকিৎসা অনুযায়ী তার শরীর থেকে গুলি বের করতে গেলে ব্রেন এমনকি জীবনের ঝুঁকি রয়েছে। তার সুচিকিৎসার জন্য তাকে দ্রুত থাইল্যান্ড নেয়া প্রয়োজন। সরকারিভাবে জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ১ লাখ টাকা সহায়তা পেলেও ইতিমধ্যে ধারদেনা করে আড়াই লাখ টাকা খরচ করে চিকিৎসা চালানো হয়েছে। বাকি চিকিৎসা কীভাবে চলবে এনিয়ে আমরা দিশাহারা। এখন চিকিৎসা করানোর জন্য অনেক টাকা প্রয়োজন। সরকারি সহযোগিতা পেলে দেশের বাইরে নিয়ে ছেলের উন্নত চিকিৎসা করানো যেত।

mzamin

Monday, October 7, 2024

আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়েও আসামি

ফেনীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরও মামলার আসামি হয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন ফেনী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ সাজিদ সিয়াম (২৬)। গ্রেপ্তারের পর সহপাঠীদের থানা ও আদালতে ধরনা দিয়ে সিয়াম ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে আসামি হয়েছে। আদালত বিষয়টি অনুধাবন করে পরদিনই তাকে জামিন দিয়েছেন বলে জানান আইনজীবী মাসুদুর রহমান।

সিয়াম সদর উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের মঠবাড়িয়া গ্রামের খুরশিদের ছেলে। তিনি ফেনী ইউনিভার্সিটির বিবিএ ডিপার্টমেন্টের ২৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী। সিয়ামের আইনজীবী মাসুদুর রহমান বলেন, সিয়াম বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের ছোড়া গুলিতে গুলিবিদ্ধ হন। কিন্তু গত ১৮ই সেপ্টেম্বর ছাত্র আন্দোলনে হামলার ঘটনায় কুমিল্লার নাঙ্গলকোটের নিশ্চিন্তপুর গ্রামের বাসিন্দা জনৈক মো. আবদুল হান্নান (৩২) বাদী হয়ে ফেনী মডেল থানায় দায়ের করা একটি মামলায় তাকে আসামি করা হয়। মামলার এজাহারে সিয়ামকে ৭৭ নম্বর আসামি হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ওই মামলায় ৪ঠা অক্টোবর শুক্রবার ফেনী সদর উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের মঠবাড়িয়া থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ফেনী মডেল থানায় হস্তান্তর করে র?্যাব-৭। পরে রাতভর ফেনী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিরা তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। শনিবার বিকালের দিকে তাকে আদালতে নিলে সেখানেও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ফটকে অবস্থান নিয়ে চলাচলের রাস্তা বন্ধ করে দেয়। এ সময় আদালতে সিয়ামের জামিন চায় আইনজীবী। আদালতের বিচারক সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা লোকমান সিয়ামের ৭ দিনের জামিন মঞ্জুর করেন। সন্ধ্যায় সিয়ামের জামিন আদেশের পরে তাকে নিয়ে আদালত প্রাঙ্গণে সমাবেশ করে শিক্ষার্থীরা। পরে তাকে নিয়ে আদালত চত্বর ত্যাগ করেন সহপাঠীরা।
আইনজীবী বলেন, জমি সংক্রান্ত বিরোধের কারণে সিয়ামকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। আগামী ৭ দিনের মধ্যে সিয়ামের মেডিকেল সার্টিফিকেটের তথ্য আদালতে উপস্থাপন করতে আদেশ দিয়েছেন বিচারক। জামিন শুনানিকালে আদালত প্রাঙ্গণে ফেনী ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রার অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদের বিভাগীয় প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক কাজী মনিরুল ইসলাম, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান আলি আকবর সিয়ামসহ ইউনিভার্সিটির বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। মামলার বাদী আবদুল হান্নান বলেন, এ মামলার ব্যাপারে আমি তেমন কিছু জানি না। মামলায় কারা আসামি হয়েছে তাও জানি না। এজাহারে শুধু স্বাক্ষর দিয়েছি। আমি সিয়াম নামে কাউকে কখনো দেখিনি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফেনীর সমন্বয়ক আব্দুল কাইয়ুম সোহাগ বলেন, সিয়াম আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেও ষড়যন্ত্রমূলক এ মামলার আসামি হয়েছেন। এভাবে যেন আর কাউকে মিথ্যা মামলায় হয়রানি করা না হয় সেদিকে সবার নজর রাখতে হবে।

mzamin

Sunday, October 6, 2024

‘মহিপালে গুলি চালাতে ৮ জনকে অস্ত্র দেয় যুবলীগ সভাপতি-সেক্রেটারি’

ফেনীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ৪ঠা আগস্ট শহরের মহিপালে ছাত্র-জনতাকে গণহত্যায় দুইজন আসামি গতকাল সন্ধ্যায় আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞে অংশ নেয়া র‌্যাব’র হাতে গ্রেপ্তার হওয়া সদর উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়ন যুবলীগের অর্থ বিষয়ক সম্পাদক মুরাদ হোসেন বাবু ও পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ড ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক ওসমান গনি লিটন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

আইনজীবী মেসবাহ উদ্দিন ভূঞা জানান, শহীদ মাহবুবুল হাসান মাসুম হত্যা মামলায় ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা লোকমানের আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন আসামি মুরাদ। শহীদ ওয়াকিল আহম্মদ শিহাব হত্যা মামলায় ফেনীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্র্রেট সাইয়েদ মো. শাফায়াতের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন আসামি ওসমান।

আদালত ও মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, জবানবন্দিতে ওসমান আদালতকে জানিয়েছে- ৪ঠা আগস্ট সকালে সে সহ ৮জন পৌরসভায় যায়। সেখানে আরও ৩শ’ থেকে ৪শ’ মানুষ উপস্থিত ছিল। জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি নিজাম উদ্দিন হাজারী ওইস্থানে উপস্থিত সবার উদ্দেশ্যে বক্তব্যে রাখেন। তার বক্তব্যে যেকোনো মূল্যে ছাত্র-জনতাকে প্রতিহত করার জন্য উপস্থিত নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দেন। এ সময় তার পাশে ছিলেন- সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক শুসেন চন্দ্র শীল ও পৌর সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম স্বপন মিয়াজী। এরপর মাস্টারপাড়া নিজাম হাজারীর বাড়ির এলাকা থেকে সাদা প্রাইভেটকারের মাধ্যমে ব্যাডমিন্টন ব্যাগে করে শর্টগান আনা হয়। পৌরসভার লিবার্টি সুপার মার্কেটের নিচতলায় কৃষকলীগের অফিস কক্ষে ওসমানসহ ৮জনকে ডেকে নিয়ে ৮টি শর্টগান ও ১০ রাউন্ড করে কার্তুজ (গুলি) দেয় পৌর যুবলীগ সভাপতি রফিকুল ইসলাম ভূঞা ও সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন বাবলু। সূত্র আরও জানায়, মহিপালে হামলার সময় জেলা আওয়ামী লীগ সদস্য মজিবুল হক রিপন ও ফুলগাজী উপজেলা সাধারণ সম্পাদক হারুন মজুমদারকে অনুসরণ করতে অস্ত্রধারীদের নির্দেশ দেয়া হয়। হামলায় অংশ নিতে ৪০-৫০জন বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র ও ১শ’ থেকে ২শ’ জন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে মহিপালের দিকে যায়। ৫ ঘণ্টাব্যাপী জবানবন্দিতে অস্ত্রধারী ও অস্ত্র ছিল না এমন বেশ কয়েকজন ব্যক্তির নাম আদালতকে জানায় লিটন। মহিপালে ছাত্র-জনতাকে লক্ষ্য  করে গুলি করার সময় চৌধুরীবাড়ীর মুখে অবস্থান করায় উপরের দিকে ৮ রাউন্ড গুলি ছোড়ে লিটন। সংঘর্ষ শেষে সন্ধ্যা ৭টার দিকে কৃষকলীগের অফিসে গিয়ে যুবলীগ নেতা রফিক-বাবলুর কাছে অস্ত্র জমা দেয় তারা। এ সময় ব্যবহার না হওয়া ২ রাউন্ড গুলিও ফেরত দেয় লিটন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফেনী মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. মোতাহের হোসেন জানান, গত ১লা অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজধানী ঢাকার বাড্ডা এলাকা থেকে র?্যাব’র একটি দল লিটনকে গ্রেপ্তার করে। জবানবন্দিতে লিটনের দেয়া তথ্য অনুযায়ী তদন্ত চলছে।
এদিকে ৪ঠা আগস্ট ফেনীর মহিপালে গণহত্যায় জড়িত বালিগাঁও ইউনিয়ন যুবলীগের অর্থ-বিষয়ক সম্পাদক মুরাদ হোসেন বাবু ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। কলেজছাত্র মাহবুবুল হাসান মাসুম হত্যা মামলায় সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট  ফারহানা লোকমান ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন। জবানবন্দিতে গণহত্যায় জড়িতদের বিরুদ্ধে চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন আসামি। এর আগে ৩রা অক্টোবর বৃহস্পতিবার বিকালে সদর উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়নের মিয়ার বাজার এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব-৭)। বাবু বালিগাঁও ইউনিয়ন যুবলীগের অর্থ সম্পাদক ও ওই এলাকার রসুল আমিনের ছেলে। মাহবুবুল হাসান মাসুম হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি হওয়ার পর থেকে সে পলাতক ছিল।

mzamin

Monday, September 23, 2024

ভারতের সঙ্গে নীরবতার দিন শেষ

নদীর পানি কেবলমাত্র রাজনীতি না, এটি কূটনীতি, অর্থনীতিও। সরকারের চশমা নয়, জনগণের চশমা দিয়ে দেখতে এখানে এসেছি। ভারতের সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে অতীতের সরকারের যদি নীরবতা বা নিষ্ক্রিয়তা থেকে থাকে সেদিন শেষ হয়ে গেছে। বন্যার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ভারত ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানাতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

গতকাল দুপুরে ফেনীর পরশুরাম উপজেলার নিজ কালিকাপুর এলাকায় মুহুরী নদীর বাঁধের ভাঙনকবলিত বল্লামুখা অংশ পরিদর্শনে এসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এমন কথা বলেন। পানিসম্পদ উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘উজানের দেশ ভারতের সঙ্গে শুধুমাত্র একটি নদী কেন্দ্রিক সমস্যা এমন নয়, প্রায় সবগুলো নদী নিয়েই সমস্যা। আমাদের ৫৪ বা ৫৭টি অভিন্ন নদী রয়েছে। কিন্তু আমরা এখনো চুক্তি স্বাক্ষর করতে পারিনি। তিস্তা নিয়েও তা পারিনি। বন্যায় অভ্যস্ত না হওয়ার কারণে আপনাদের কাছে এটি অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। কিন্তু তিস্তা পাড়ের মানুষের এমন বন্যায় প্রতি বছর দুঃখ করতে হয়। সম্প্রতি বন্যায় আমরা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনতে পারতাম, ফেনীর ২৯ জন মানুষের প্রাণহানি কমাতে পারতাম সেসব বিষয় উজানের দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বলতে হবে।’

আন্তর্জাতিক আইনে বাংলাদেশ ও ভারতের স্বাক্ষর করার সুফল তুলে ধরে রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘দুই দেশেরই আর কিছু না হোক মানবিক কারণে পানি ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে এক জায়গায় বসতে হবে। এ বিষয়ে আমাদের দেশে রূপরেখা নির্ধারণ ও বিশেষজ্ঞ মহলে আলোচনা চলছে। আমরা যদি স্বাক্ষর করি, তাহলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে কথা বলা অনেক বেশি সহজ হবে। এ বিষয়ে সরকারের সব মহল ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে আমরা সিদ্ধান্ত নেবো। ভবিষ্যতে চুক্তির বিষয়ে দুই দেশকে স্বাক্ষর করতে হবে।’ পানিসম্পদ উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘তিস্তা চুক্তির খসড়া হওয়ার পরেও তারা (ভারত) স্বাক্ষর করেনি। তিস্তা নদী নিয়ে কী হচ্ছে সেই বিষয়ে এতদিন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জানতো না। দীর্ঘদিনের সমস্যা নিরসনে সরকারিভাবে মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করা হয়েছে। বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক কনভেনশনে তুলে ধরা সহজ হবে। আগামীতে জাতিসংঘে নদীর বিষয়গুলো পৌঁছে দেয়া হবে। নদীর বাঁধের ভাঙন পরিদর্শনের সময় পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব নাজমুল আহসান, জেলা প্রশাসক মুছাম্মৎ শাহীনা আক্তার, পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান, বিজিবি’র ফেনী ব্যাটালিয়ন (৪ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মোশারফ হোসেন, পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদ শাহরিয়ার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফরোজা হাবিব শাপলাসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও প্রশাসনিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে বন্যায় ভাঙনকবলিত স্থান পরিদর্শন শেষে  পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জেলার সোনাগাজী মুহুরী রেগুলেটর পরিদর্শন করেন। পরে বিকালে তিনি ফেনী জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে সাম্প্রতিক বন্যায় ভাঙন ও করণীয় বিষয়ে আয়োজিত গণশুনানিতে অংশগ্রহণ করেন।

mzamin


Saturday, September 21, 2024

পার্বত্য চট্টগ্রামে ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়নি -উপদেষ্টা নাহিদ

পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকার কোথাও সরকারিভাবে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, ‘সেখানে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি জায়গায় সমস্যা হয়েছিল’। শনিবার সকালে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার আন্ধারমানিক এলাকায় বন্যায় ক্ষয়ক্ষতি পরিদর্শন করে তিনি এ কথা বলেন।

উপদেষ্টা বলেন, ‘সরকারিভাবে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ করার বিষয়টি সত্য নয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম বা কোনো এলাকায় দীর্ঘ সময় ইন্টারনেট বন্ধ ছিল, এমন প্রমাণও কেউ দেখাতে পারবে না। একটি পক্ষ থেকে অতিরঞ্জিত করে বলা হচ্ছে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।’

তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে পার্বত্য জেলাগুলোতে বহুমুখী ষড়যন্ত্র হচ্ছে। আমাদের অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো অভ্যন্তরীণভাবে সমাধান করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে দেশের মানুষ সতর্ক ও রাষ্ট্র গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি দেখছে।’

ফেনীতে বন্যা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘ভারতের উজানের পানিতে ফেনীতে বন্যা হয়েছে। এখন কীভাবে ক্ষতি কমিয়ে আনতে পারি, বাঁধগুলো স্থায়ীভাবে করা যায় কিনা সেটিও ভাবতে হবে। বন্যা পরবর্তী এখন পুনর্বাসন কার্যক্রম কীভাবে দ্রুত সম্পন্ন করা যায় সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রাথমিকভাবে গৃহ নির্মাণের চাহিদা এবং শিক্ষা উপকরণের ক্ষতির তথ্য নিশ্চিত করে দ্রুত সরবরাহ করতে হবে। আশা করছি সবাই ঘর পাবেন, কেউ গৃহহীন থাকবেন না।’

পরে উপদেষ্টা বন্যাকবলিত ফুলগাজী উপজেলার জগতপুর এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় ফেনী জেলা প্রশাসক মুসাম্মৎ শাহীনা আক্তার, পুলিশ সুপার হাবিবুর রহমান ও ফুলগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানিয়া ভূঁইয়াসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে তথ্য উপদেষ্টা ফুলগাজীর আনন্দপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত ইস্তিয়াক আহমেদ শ্রাবনের কবর জিয়ারত করেন। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ফেনীর নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

mzamin

Sunday, September 1, 2024

ফেনীতে বন্যায় তছনছ বাড়িঘর-সড়ক by নাজমুল হক শামীম

ফেনীতে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ৪ উপজেলা থেকে পানি নামলেও ফেনী সদর ও দাগনভূঞা উপজেলার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন এখনো। এসব গ্রামের মানুষজন এখনো আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। যেসব উপজেলায় পানি নেমেছে সেসব উপজেলার শিশু ও বয়োবৃদ্ধ পানিবাহিত রোগ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছেন।

এদিকে বানভাসি মানুষেরা ত্রাণের পাশাপাশি বাড়িঘর পুনঃনির্মাণে সহায়তা চেয়েছেন। ফুলগাজী উপজেলার পঞ্চাশোর্ধ্ব হালিমা খাতুন। তার মাটির ঘরটি ভেঙে মাটিতে লেগেছে টিনের চাল। তার সঙ্গে কথা বলার পুরো সময়টাই তিনি কাঁদছিলেন। এ সময় একটি সংগঠনের পক্ষে স্বেচ্ছাসেবকরা তাকে ত্রাণ দিচ্ছিলেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘হাইল্লা তোয়াই হাইয়ের না চাইল দি কিয়া করমু?’ (পাতিল খুঁজে পাচ্ছি না, চাল দিয়ে কি করবো?) সদর উপজেলার শর্শদি ইউনিয়নের আবুপুর গ্রামের বাসিন্দা যতন শীল বলেন, বন্যায় তার বাড়ির টিনশেডের ঘরটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘরের সকল মালামাল নষ্ট হয়েছে। নতুন করে কীভাবে এসব মালামাল যোগাবো সেই চিন্তায় দু’চেখে ঘুম আসছে না।

ফেনী শহরের দক্ষিণ সহদেপুরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মন্দিরা বিশ্বাস বলেন, জীবনের যত অর্জন এক বন্যায় সব ভাসিয়ে নিয়ে যায়। স্কুলের চাকরির কাগজপত্র, শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ, বিগত সময়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অর্জিত সবকিছু নষ্ট হয়েছে পানিতে। কান্না করলেও তো আর এসব ফিরে পাবো না। পরশুরাম উপজেলার মির্জানগর ইউনিয়নের কাউতলী গ্রামের বাসিন্দা শরিফা খাতুন বলেন, বন্যায় ঘরভিটার সব মাটি ধসে গেছে। ভেসে গেছে আসবাবপত্র। শুধু ঘরের টিনগুলো রয়েছে। এ ঘর আবার কীভাবে ঠিক করবে জানেন না তিনি। একই অবস্থা পরশুরাম ও ফুলগাজী উপজেলার কমবেশি সকল ইউনিয়নের। পানি নামার পর সকল বাসিন্দার চোখে-মুখে ঘুরে দাঁড়ানোর ব্যাকুলতা। সকলেই চেয়েছেন সরকারি-বেসরকারি সহায়তা।

বেড়েছে ডায়রিয়া রোগী
বন্যা পরবর্তী ফেনীর প্রতিটি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও চিকিৎসা সেবাকেন্দ্রে বেড়েছে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা। প্রতিদিন উপচে পড়া রোগী সামলাচ্ছে চিকিৎসক ও সেবিকারা। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের পাশাপাশি বন্যা দুর্গত এলাকায় নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন সেনাবাহিনীর বিশেষ মেডিকেল টিম ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মেডিকেল টিম। ডায়রিয়াজনিত কারণে ফেনী ডায়াবেটিক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন সত্তরোর্ধ্ব বীর মুক্তিযোদ্ধা আবু তাহের। তিনি বলেন, গত দু’দিন আগে ডায়রিয়া আক্রান্ত হলে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনব্যাগ স্যালাইন তার শরীরে দিতে হয়েছে। এখন তিনি কিছুটা সুস্থ বোধ করছেন। ফেনী ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ডায়রিয়া ওয়ার্ডে রোগীর চাপ সামলাতে বেগ পেতে হচ্ছে ডাক্তার ও নার্সদের। জেনারেল হাসপাতালে শুধু শিশু ও বৃদ্ধরা নয় সেবা দেয়া নার্সরাও আক্রান্ত হয়েছেন ডায়রিয়ায়। গতকাল হাসপাতালে ডায়রিয়াসহ মোট রোগী ছিল ৪৬৮ জন। জেনারেল হাসপাতালের বাইরে বিভিন্ন উপজেলা হাসপাতালে ডায়রিয়া নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ১২২ জন ভর্তি হয়েছেন। আক্রান্ত রোগীর ৯০ ভাগই শিশু বলে জানান চিকিৎসকেরা।

সেতুর মাটি দেবে সংযোগ সড়কে বিশাল গর্ত, যান চলাচল বন্ধ
ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার ছোট ফেনী নদীর উপর নির্মিত সাহেবের ঘাট সেতুর সংযোগ সড়কে মাটি দেবে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল গর্ত। এতে সড়কটি দিয়ে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে। যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় সোনাগাজী উপজেলার সঙ্গে নোয়াখালীর সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়ায় দুর্ভোগে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা। গতকাল দুপুরে সরজমিন ঘুরে দেখা যায়, সাহেবের ঘাট সেতুর পশ্চিম অংশে সংযোগ সড়কের মাঝখানে তৈরি হয়েছে বিশাল গর্তটি। স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল হক বলেন, গত ২১শে আগস্ট ফেনীর সোনাগাজীতে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার পানির চাপে সোনাগাজী-নোয়াখালী সড়কের সাহেবের ঘাট সেতুর পশ্চিম অংশে সেতুর নিচ থেকে দুই পাশের গার্ডার ব্লক ও মাটি সরে গেছে। একপর্যায়ে সেতুর সংযোগ সড়কেও ভাঙন দেখা দিলে স্থানীয় লোকজন স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে বালুভর্তি বস্তা দিয়ে ভাঙন রোধের চেষ্টা করেন। সোনাগাজী উপজেলার চর চান্দিয়া ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান সামছুদ্দিন খোকন বলেন, স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে পার্শ্ববর্তী নোয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তারাও তাদের সঙ্গে সেতুটি রক্ষায় কাজে যোগ দেন। গত বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বালুভর্তি বস্তা ফেলে কিছুটা রক্ষার চেষ্টা করা হয়। তবে রাত থেকে আবারো ভাঙন শুরু হলে শুক্রবার বিকালে সংযোগ সড়কে ভাঙন দেখা দেয়।

সওজ’র নির্বাহী প্রকৌশলী আরও বলেন, বন্যার পানির চাপে সাহেবের ঘাট সেতুর সংযোগ সড়ক ভেঙে পড়ার তথ্য পেয়ে তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। ঢাকা থেকে প্রতিষ্ঠানের উচ্চ পর্যায়ের একটি বিশেষজ্ঞ দল এসে সেতু এলাকা পরিদর্শন করে করণীয় বিষয়ে মতামত দেবেন। তাদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হবে। এর আগে গত ২৬শে আগস্ট সকালে বন্যার প্রবল পানির চাপে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের ২৩ গেট বিশিষ্ট মুছাপুর রেগুলেটর (স্লুইসগেট) নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এটি পুনর্নির্মাণ এবং সাহেবের ঘাট সেতু সংস্কারের দাবিতে গত শুক্রবার বিকালে সোনাগাজী ও কোম্পানীগঞ্জে কয়েকশ’ মানুষ মানববন্ধন করেন।

Saturday, August 31, 2024

‘নাতিগারে কেউ কদ্দুরা দুধ দেয়ন আন্নে লইদে না বায়াজি’ by নাজমুল হক শামীম

‘বায়াজি নাতিকে কিছু খাইতে ফারে না, কদ্দুরা দুধের লাই কতোজনের কইলাম কেউ দিলো না। পাগল কই বেকে তারাই দিলো, আন্নে আরে কদ্দুরা দুধ লই দেন না, দোয়া করমু বায়াজি।’ নিজের নাতির জন্য দুধ চেয়ে না পেয়ে এভাবেই আক্ষেপ করে জানাচ্ছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব জাহানারা বেগম। ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের বারোয়ানী গ্রামের স্বামী পরিত্যক্তা জাহানারা বেগম। পানি ঢোকার পর থেকে গত ১০ দিন ধরে তিনি তার মানসিক প্রতিবন্ধী মেয়ে জামিলা ও চার বছরের এক নাতনিকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছেন এলাহীগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয়কেন্দ্রে। বলেন, মেয়ে ও নাতনিকে নিয়ে অভাবের সংসার। ছোট যে ঘরটিতে তারা থাকতেন তা পানির নিচে। ঘর থেকে কিছুই বের করতে পারেননি। যেখানে আশ্রয় নিয়েছেন সেই স্কুল আঙিনায় বুক সমান পানি। আশপাশের মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যে খাবার দিয়ে যাচ্ছেন তা দিয়ে তাদের কোনোরকম জীবন কাটছে। তিনি বলেন, ত্রাণের গাড়ি দেখলেই ছুটে যাই। নাতিনের দুধের প্রয়োজন। কেউ দুধ দিচ্ছে কিনা খোঁজ নিতে। আজ একটি চিকিৎসক প্রতিষ্ঠান ওষুধের সঙ্গে শিশুদের দুধ দিচ্ছিলো। আমি অনেকবার চেষ্টা করেছি, সবাই পাগল বলে তাড়িয়ে দিয়েছে। আপনি সাংবাদিক আমাকে একটু দুধ নিয়ে দেন।

জাহানারা গ্রামের মতো আশপাশের আরও তিনটি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রাম বিগত ১০ দিনের বেশি সময় ধরে পানিবন্দি। মানবেতর জীবনযাপন করছেন এসকল গ্রামের বাসিন্দারা। ফেনী সদর উপজেলার শর্শদা ইউনিয়নের দক্ষিণ আবুপুর, উত্তর আবুপুর, কুমিরা, নতুনবাড়ী, পিয়ার আলী মসজিদ, সদর  উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের জগরগাঁও, এলাহীগঞ্জ, ধলিয়া  বারোয়ানী, উত্তর ডোমুরিয়া, দক্ষিণ ডোমুরিয়া, দাগনভূঞা উপজেলার সিন্দুরপুর ইউনিয়নের কৈখালী, ছোট কৈখালী, গৌতম খালিতে কোথাও হাঁটু সমান পানি তো কোথাও কোমর সমান পানি। এলাহীগঞ্জ বাজারে কথা হয় আব্দুল মতিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, তিনটি ইউনিয়নের সংযোগস্থল এই এলাহীগঞ্জ বাজার। আশপাশের সকল গ্রাম পানিতে ডুবে থাকায় এলাহীগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও এলাহীগঞ্জ মমতাজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় ১৫০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। বানভাসি এ মানুষগুলোর চোখে মুখে শুধু হতাশার ছাপ।
ছোট ধলিয়া গ্রামের খামারপাড়ার বৃদ্ধ হারিস মিয়া জানান, ১০ দিন ধরে পানিবন্দি থাকায় পাশের একটি মার্কেটের ছাদে আশ্রয় নিয়েছেন। পাঁচ ছেলে, ছেলের বউ, নাতি-নাতিনদের নিয়ে ছাদে ত্রিপল দিয়ে রাত যাপন করছেন। ছেলে হুমায়ুন, পেয়ার আহমেদ, সালেহ আহমেদের বেশ কয়েকটি মাছের খামার ও পোল্ট্রি ফার্ম পানিতে ভেসে গেছে। ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকার মতো ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। তার পরিবারটি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছে। স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র আব্দুল কাদের জিলানী ও তার ছোট ভাই মাদ্রাসা পড়ুয়া তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র আব্দুর রহমান সৈকত বলেন, ঘরে এখনো হাঁটু সমান পানি। পড়ার সকল বই ভিজে নষ্ট হয়ে গেছে। কিছুদূর এগুতেই বাজারের একটি দোকানে দেখা গেল জেনারেটর দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় মোবাইলে চার্জ দিচ্ছেন স্থানীয়রা। কথা হয় আব্দুল্লাহ আলিফ নামে এক যুবকের সঙ্গে। তিনি বলেন ১০ দিনের উপরে এলাকায় কারেন্ট নেই। কারও মোবাইলেই চার্জ নেই। বাজারে যে দোকানটিতে জেনারেটর দিয়ে মোবাইল চার্জ দেয়া হচ্ছে দোকান মালিক প্রতি মোবাইল চার্জ দিতে ৪০ টাকা করে রাখছেন।

এলাহীগঞ্জ বাজারের একটি দোকানে বানভাসি মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন ঢাকা থেকে আগত ‘বাংলাদেশ সচেতন নাগরিক সমাজ ফোরাম’ নামে একটি সংগঠন। ওই সংগঠনের চিকিৎসক সাব্বির আহমেদ জানান, তাদের দলে ৮ জন চিকিৎসক রয়েছেন। চিকিৎসা পত্রের পাশাপাশি পানিবাহিত রোগ ও প্রাথমিক চিকিৎসার সকল ওষুধ বিনামূল্যে রোগীদের মাঝে বিতরণ করা হচ্ছে। দিনব্যাপী তারা ৪ শতাধিক রোগীকে সেবা দিতে পেরেছেন।

নদী থেকে গলিত লাশ উদ্ধার: গতকাল বিকালে ফেনী সদর উপজেলার লেমুয়া এলাকায় নদী থেকে এক ব্যক্তির অর্ধগলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ফেনী জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মোরশেদ আলম মিলন বলেন, ফেনী নদীর লেমুয়া ব্রিজের নিচে এক নারীর মরদেহ ভাসতে দেখে স্থানীয় এক নেতা তাকে কল করে বিষয়টি জানায়। পরে তিনি ‘আল মারকাজুল ইসলাম’ নামে লাশ দাফনের সংগঠনকে অবগত করলে তারা তাদের পিকাআপ নিয়ে মরদেহটি উদ্ধার করে। পরে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি ফেনী জেনারেল হাসপাতালে প্রেরণ করে। মিলন আরও বলেন, বৃদ্ধ মহিলার বয়স সত্তরোর্ধ্ব। মাথার চুলগুলো সাদা। পরনে লাল রঙের ম্যক্সি ছিল।

বাড়ছে মৃতের সংখ্যা: ফেনীতে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় প্রতিদিনই যোগ হচ্ছে নতুন নতুন মৃতদের সংখ্যা। শুক্রবার বিকালে জেলা প্রশাসন থেকে প্রেরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, জেলায় বন্যায় এ পর্যন্ত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলা প্রশাসক মোসাম্মৎ শাহীনা আক্তার জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার (ডিএসবি) বরাতে বলেন, শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত বন্যায় ফেনী সদর উপজেলায় ৩ জন, পরশুরাম উপজেলায় ২ জন, ফুলগাজী উপজেলায় ৭ জন, ছাগলনাইয়ায় ৩ জন, দাগনভূঞা উপজেলায় ২ জন ও সোনাগাজী উপজেলায় ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

Friday, August 30, 2024

ত্রাণ কেউ পাচ্ছে কেউ পাচ্ছে না by মারুফ কিবরিয়া ও নাজমুল হক শামীম

উজান থেকে আসা ঢলে ভেসে গেছে ফেনী। ছয়টি উপজেলার কোনোটিই রক্ষা পায়নি। গত কয়েকদিনে উন্নতি হয়েছে পরিস্থিতি। রাস্তাঘাট শুকিয়েছে। প্রধান সড়কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানের কার্যক্রমও স্বাভাবিক হয়েছে। তবে বন্যাকবলিত অনেক এলাকার মানুষ এখনও পানিবন্দি। এসব এলাকায় ত্রাণ না পাওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন অনেকে। গতকাল সকালে ফেনী সদরের পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের বিরলী, রতনপুর, জয় নারায়ণপুর, রামচন্দ্রপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সমন্বয়য়ের অভাবেই সর্বত্র ত্রাণ মিলছে না। যদিও জেলা প্রশাসন সমন্বয়হীনতার কোনো অভিযোগ নেই বলেই জানিয়েছে।

ফেনী সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের বিরুলী গ্রামের বাসিন্দা বিবি কুলসুম জানান, নয়দিন ধরে ঘরে পানিবন্দি থাকায় পার্শ্ববর্তী একটি দোতলা ভবনে আশ্রয় নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তিনি মানবজমিনকে বলেন আধা কেজি চিড়া ও আধা কেজি মুড়ি ছাড়া কোনো কিছু পাইনি।
একই কথা বলেছেন গ্রামের নৌকাঘাট এলাকার তোফাজ্জল হোসেন, আনোয়ার হোসেন, লাইলী বেগম, আবুল খায়ের ও বিবি মরিয়ম । কমবেশি সবার ঘরেই এখনো হাঁটু সমান পানি।  আশ্রয় নিয়েছেন বিরলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে।

রওশন আরা নামে পঞ্চাশোর্ধ এক নারী বলেন, দুপুরে রান্না করা খাবার একবেলা দিয়ে যায়। আশ্রয়কেন্দ্রে থেকে বাকি দুই বেলা চিড়া মুড়ি খেয়ে থাকতে হচ্ছে । পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানি না থাকায় বুক পরিমাণ পানিতে ডুবে উঁচুস্থানের একটি কল থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। বিরলী গ্রামের নৌকাঘাট এলাকার পপি আক্তার বলেন,  বন্যার পর থেকে গত আটদিনে ছয়টি মোমবাতিও ৫ লিটারের এক বোতল পানি পেয়েছি। এ ছাড়া এর মধ্যে আর কোনো সামগ্রী পাইনি। ঘরে যা শুকনো খাবার ছিল তা খেয়েছি। খাবার শেষ হওয়ার পর পার্শ্ববর্তী দোকান থেকে মুড়ি বিস্কুট কিনে কয়েকদিন ধরে খেয়েছি। রান্নার চুলা পানিতে ডুবে থাকায় এখনো ভাত রান্না করতে পারেননি বলেও জানান তিনি। একই কথা বলেছেন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান নেয়া আছিয়া খাতুন। চিড়া মুড়ি খেয়ে কয়দিন থাকা যায় আমাদের কেউ চাল ডাল সহযোগিতা করেনি এখনো। এ গ্রামে চাল ডাল নিয়ে বিভিন্ন সংগঠনকে আসার জন্য অনুরোধ করেছেন ।

রিকশাচালক শাহ আলম বলেন , ঘরে এখনো হাঁটু পরিমাণ পানি । উঠানে বুক পরিমাণ পানিতে ডুবে আছে উপার্জনের একমাত্র বাহন রিকশাটি । ৮-৯ দিন রিকশা চালাতে না পারায় উপার্জন বন্ধ রয়েছে । ওই বাড়ি পেরিয়ে একটু সামনে এগোতে হাতে বালিশ কাঁথা নিয়ে হাঁটছিলেন বৃদ্ধ আমিনুল ইসলাম । তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে তার বাড়িতে হাঁটু পরিমাণ পানি থাকলেও বর্তমানে মেঝেতে পানি রয়েছে। এ সময় ঠিকমতো খাবার না পাওয়ার অভিযোগ করেন তিনি। এদিকে পার্শ্ববর্তী রতনপুর গ্রামে ঘুরে দেখা যায় গ্রামের গ্রামীণ সড়কগুলোতে এখনো হাঁটু পরিমাণ পানি। পানিবন্দি মানুষগুলো ছোট ডিঙ্গি নৌকা ব্যবহার করে যাতায়াত করছে। গ্রামের বাসিন্দা মো. বেলাল হোসেন বলেন, আটদিন ধরে তারা পানিবন্দি রয়েছেন। বাড়িতে থাকা ফ্রিজ টিভিসহ মূল্যবান আসবাব নষ্ট হয়ে গেছে।

স্থানীয় মাদ্রাসা শিক্ষক শাহজালাল ভূঁইয়া বলেন, গত বুধবার থেকে টানা নয়দিন এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। বাজারে কিছু কিছু জায়গায় জেনারেটর দিয়ে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ায় গ্রামবাসী টাকা দিয়ে লাইন ধরে বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে মোবাইলে চার্জ দিচ্ছেন। বন্যাকবলিত এই পরিস্থিতি পার্শ্ববর্তী বক্তারপুর, জয় নারায়ণপুর, রামচন্দ্রপুর, নুরুল্লাহপুর, রাজাপুর ঘোনাসহ আশপাশের গ্রামগুলোতেও বিরাজ করছে।

ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়ের অভাব:
ফেনীতে বন্যা শুরুর পর থেকে সারা দেশ থেকে সরকারি বেসরকারিভাবে ত্রাণ আসা শুরু হয়। কিন্তু জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় না থাকায় অনেক জায়গায় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছাচ্ছে না।  ফেনী জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ত্রাণ শাখায় দায়িত্বরত এক স্বেচ্ছাসেবক জানান, গত শুক্রবার থেকে টানা ৫দিন ত্রাণ শাখার দায়িত্বে ছিলেন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্রাকে করে আসা ত্রাণগুলো জেলা প্রশাসকের কার্যালয় মজুত হলেও সরকারিভাবে বিতরণের সমন্বয়হীনতার কারণে অনেকে ত্রাণ পায়নি। গত বুধবার থেকে প্রতিটি উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে ত্রাণ বিতরণের জন্য নির্দেশনা প্রদান করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ত্রাণ কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়।

টিম ইজিলাইফ’র স্বেচ্ছাসেবক শহিদুল মিশু বলেন, বন্যাদুর্গত এলাকায় রান্না করা খাবার পাঠিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে সাহায্য করা হচ্ছে। বন্যা পরবর্তী সময় মোকাবিলা করার জন্য চাল,ডাল, তেল বিতরণ করে যাচ্ছে। আমরা চেষ্টা করছি যারা সরকারিভাবে সাহায্য-সহযোগিতা পায়নি তাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের একজন মহিউদ্দিন রনি বলেন, ফেনীতে ভয়াবহ বন্যার তথ্য পেয়ে আমিসহ আমাদের টিমের বেশ কয়েকজন ফেনীতে যাই কার্যক্রম পরিচালনা করতে। রাজনৈতিক দলের স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কয়েক দফা আমাদের বিরোধ হয়। পরবর্তীতে ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহর অসুস্থতার খবর পেয়ে আমরা টিমসহ ঢাকায় চলে আসি। আমি আবার যাবো ফেনীতে। তবে কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সমস্যা হলে সেটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ওপর দায় দেয়া যাবে না।

অবশ্য মহিউদ্দিন রনি গত কয়েকদিনে ত্রাণ কার্যক্রমে এসে ফেসবুক লাইভে বিতরণ করতে গিয়ে বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। স্বেচ্ছাসেবকদের কাছ থেকে ত্রাণ ছিনিয়ে নেয়ার অভিযোগও করেন সেই লাইভে। এ বিষয়ে ফেনী জেলা প্রশাসক মোছা. শাহিনা আক্তার মানবজমিনকে বলেন, জেলা প্রশাসন ত্রাণ বিতরণে তৎপর রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রাপ্ত ত্রাণ ৮৮ হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় হেলিকপ্টার, সড়ক ও নৌপথে আরও সাত হাজার প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে ।  বৈষমবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ,  সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও বিভিন্ন সংস্থা নিয়মিত ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রেখেছেন। জেলা প্রশাসনে ত্রাণ বিতরণে সমন্বয়ের কোনো অভাব নেই।

Thursday, August 29, 2024

এক কাপড়ে বেরিয়েছি সব শেষ by মারুফ কিবরিয়া ও নাজমুল হক শামীম

‘কিছু নাই। সব শেষ হই গেছে। মাডির লগে মিশি গেছে। আবার কবে এই ঘর জোড়ামু জানি না।’ কথাগুলো বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার রাধারনগর ইউনিয়নের দক্ষিণ আন্দারমানিক গ্রামের বাসিন্দা প্রিয়রঞ্জন। গত সপ্তাহের বুধবার গভীর রাতে আচমকা উজান থেকে আসা ঢলে ভেঙে পড়ে তার ঘর। স্ত্রী সন্তান নিয়ে কোনোমতে এক কাপড়ে বেরিয়ে পড়েন প্রিয়রঞ্জন। আশ্রয় নেন পাশের একটি দোতলা ভবনের ছাদের উপর। সঙ্গে স্ত্রী ও তিন সন্তান ছিল। বানের স্রোত এতটাই তীব্র ছিল কিছুই বের করতে পারেনি পরিবারটি। পেশায় কুমার এই পরিবারের মাথাগোঁজার ঠাঁই কবে হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা কাটছে না। প্রিয়রঞ্জন মানবজমিনকে বলেন, মাটির কাজ করে খাই। আঙ্গো আর কিছু করার নাই। এই ঘর বানাইতে আবার ঋণ নিতে হইবো। তিনি জানান, বুধবার রাতে ঘরে  কোমর সমান পানি ছিল। ভোরবেলায় বন্যার পানির স্রোত আরও বাড়ে। তখনই ঘর ছেড়ে পাশের বাড়িতে গিয়ে উঠেন তারা। তিনদিন পর এসে দেখেন নিজের ঘরটি মাটির নিচে দেবে যায়। আসবাবপত্রও তলিয়ে যায়। ফেনীর ইতিহাসে এবারই এত বন্যার পানি দেখতে পেলেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তাদের চোখে-মুখে এখনো বুধবারের সেই ভয় আতঙ্ক বিরাজ করছে। ছাগলনাইয়ার রাধানগর ইউনিয়নের নিজ পানুয়া গ্রামের বাসিন্দা জোহরা বেগমের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার কাঁচা ঘরটি ভেঙে গেছে। বুধবার দুপুরে সরজমিন দেখা গেছে, চল্লিশোর্ধ্ব এই নারী মাটির নিচে চাপা পড়া ঘর থেকে নষ্ট হয়ে যাওয়া আসবাবপত্র বের করেছেন। জোহরা বেগম বলেন, আর কিছু নাই। সব মাটির নিচে মিশে গেছে। বন্যা হইতে দেখছি। এত বন্যা আর ঘর বিরানা (নষ্ট) হয় নাই কোনো কালে। আমার দুই বাচ্চা লই সাঁতার কাটি এক আত্মীয়ের বাড়ি চলি গেছি। বাচ্চাগুলা এত পানি দেখি ভয় পাই গেছে। একই ইউনিয়নের রাজিব চন্দ্র পাল বলেন, তিনি ও তার ছোট ভাই নিপুচন্দ্র পাল বুধবার রাতে যখন পানি উঠছিল তখন পরিবার নিয়ে এক কাপড়ে তারা ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। পানি নামার পর ঘরে এসে দেখেন মাটির ঘরটি পুরোটাই দেবে গেছে। ঘরের সকল আসবাবপত্র মাটির নিচে চাপা পড়ে আছে। নিপুচন্দ্র পাল বলেন, কুমারের কাজ করে পরিবার চালাতেন তিনি। তৈরি সকল তেজসপত্র পানিতে ভেসে গেছে। বন্যার পানিতে ঘর গেছে তৈরীকৃত পণ্য গেছে এখন সামনের দিনগুলো কেমনে চলবে? ভেঙে যাওয়া ঘর থেকে মালপত্র সরাতে দেখা গেল পঞ্চাশোর্ধ্ব সন্ধ্যা রানী পাল, বন্যার পানি নামলেও তিন মেয়ে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। ঘর নেই, খাবার নেই, পরনের একাধিক শুকনো কাপড়ও নেই। ছোট ছোট তিন মেয়ে নিয়ে কীভাবে সামনের সময় পার করবো? স্থানীয় ইলেকট্রিক দোকানদার পঙ্কজ কর্মকার বলেন, বন্যার পানিতে শুধু তার ঘরেই ক্ষয়ক্ষতি হয়নি উপার্জনের একমাত্র দোকানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দোকানে থাকা প্রায় তিন লাখ টাকার মালামাল নষ্ট হওয়ায় না খেয়ে থাকার উপক্রম হয়েছে। তাদের ঘরগুলো পার হয়ে সামনে এগুতেই চোখে পড়ে কলেজ শিক্ষার্থী মোবারক হোসেনের সঙ্গে। বাবা নেই। তিন ভাইও মা নিয়ে তাদের সংসার। মাটির ঘরটি ভেঙে পুরো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘর থেকে বের করা যায়নি কোনো আসবাবপত্র। শুধুমাত্র গবাদিপশু রক্ষা করে উচ্চস্থানে রেখেছেন। গ্রামটিতে বসবাস করা সত্তরোর্ধ্ব আব্দুর রহমান বলেন, তার জন্ম তো পরে তার বাবার কিংবা দাদার জন্মেও এ সকল গ্রামগুলোতে এত পানি কখনো দেখেননি। বন্যার কারণে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে মাটির ঘর ও টিনের ঘরগুলোতে। ছাগলনাইয়া উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের পশ্চিম বক্সমাহমুদ গ্রামের মোহাম্মদ মুসা মিয়া বলেন, পশ্চিম বক্সমাহমুদ গ্রামটি নদীর পাড়ে হওয়ায় এ গ্রামের যত মাটির ঘরবাড়ি আছে সব ভেঙে সর্বস্ব হারিয়েছেন ওই সকল ঘরের বাসিন্দারা। ছাগলনাইয়া উপজেলার পাঠাননগর ইউনিয়নের বাংলাবাজার গ্রামের ওয়াহিদের রহমান জানান, গত দুদিন আগে বন্যার পানিতে ভেলায় ভাসতে থাকা একটি লাশ দেখেছেন। চারিদিকে পানি থাকায় হয়তো মৃত ব্যক্তিটির দাফন করতে পারেননি স্বজনরা। ছাগলনাইয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম কমল বলেন, উপজেলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এটি নিরূপণে কাজ করা হচ্ছে। প্রতিটি বিভাগকে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে তালিকা দ্রুত তার কার্যালয়ে পাঠাতে বলা হয়েছে। তিনি আরও জানান, উপজেলায় কতোজন নিহত হয়েছে তার তথ্য এখনো নিরূপণ করা হয়নি। এই উপজেলায় ত্রাণ কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এদিকে ফেনী সদর উপজেলার কাজিরবাগ ইউনিয়নের মধ্যম কাজিরবাগ গ্রাম ঘুরে দেখা যায় গ্রামের অন্তত ত্রিশটিরও বেশি মাটির ঘর বন্যার পানিতে একেবারে ভেঙে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্রামের কালু চন্দ্র পাল জানান বন্যায় তার থাকার ঘর রান্নাঘর একেবারে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। তিনি একটি ওষুধের দোকানে কাজ করে পরিবার চালাতেন। থাকার সহায়সম্বল হারিয়ে তিনি এখনো অনেকটা নিঃস্ব। ফেনী জেলা প্রশাসক মোছাম্মৎ শাহিনা আক্তার বুধবার রাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানান, জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখার তথ্য অনুযায়ী বন্যায় জেলায় ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।

Wednesday, August 28, 2024

ফেনীতে বন্যা: দুর্গত এলাকায় মিলছে না চিকিৎসাসেবা by সুজয় চৌধুরী

মো. আলমগীরের তিন সন্তান দুই দিন ধরে জ্বর, সর্দি ও কাশিতে আক্রান্ত। পানিতে ভেজার কারণে এমনটা হয়েছে বলে ধারণা তাঁর। সাত দিন আগে তাঁরা সবাই আশ্রয় নেন ফেনী সদরের লেমুয়া ইউনিয়নের নেয়ামতপুর গ্রামের একটি বিদ্যালয়ে।

ওই বিদ্যালয়ের আশপাশ ও রাস্তায় আজ মঙ্গলবারও বুকসমান পানি ছিল। কোথাও হাঁটুপানি। তাই সন্তানদের নিয়ে বের হননি আলমগীর। চল্লিশোর্ধ্ব এই অটোরিকশাচালক বছর পাঁচেক আগে সড়ক দুর্ঘটনায় এক পা হারান। তাই পানি মাড়িয়ে দূরে গিয়ে ওষুধ আনার ব্যবস্থাও নেই।

আলমগীর প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের স্কুলে আরও ১০ পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। শিশু আছে ৫–৬ জন। কমবেশি সবাই অসুস্থ। কিন্তু কোনো চিকিৎসাসেবা তারা পায়নি। কমিউনিটি হাসপাতালও পানিতে ডুবে গেছে। ওষুধপত্র নষ্ট হয়েছে।

আক্ষেপ করে আলমগীর বলেন, তাঁর দুই পা সচল থাকলে পানিতে সাঁতার কেটে হলেও ওষুধ নিয়ে আসতেন। কিন্তু সে সুযোগও নেই। পা কেটে ফেলতে হয়েছে অনেক আগেই।

শুধু আলমগীর নন, দুর্গম গ্রামের বিভিন্ন স্থায়ী-অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে ঠাঁই নেওয়া দুর্গত মানুষ চিকিৎসাসেবা পাচ্ছে না। পানির কারণে গ্রামে গ্রামে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন ফেনী জেলার সিভিল সার্জন শিহাব উদ্দিন। তিনি প্রথম আলোকে বলেছেন, পানি বেশি হওয়ার কারণে গ্রামে গ্রামে চিকিৎসাসেবা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। তবে ইতিমধ্যে ছয় উপজেলায় ছয়টি জরুরি দল গঠন করা হয়েছে। ক্যাম্পের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বেসরকারি হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে বিশেষজ্ঞ দল ফেনীতে এসেছে। পানি নেমে গেলে স্থায়ী ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে গিয়ে সেবা দেওয়া হবে।

অন্যদিকে ফেনী সদর হাসপাতালে সেবা দেওয়া হচ্ছে। পরশুরাম, ছাগলনাইয়া ও সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে পানি নেমে যাওয়ার পর সেবা চালু হয়েছে। কিন্তু গ্রামগুলোতে কোনো চিকিৎসক দল যায়নি।

গত দুই দিন ফেনী সদরের ফাজিলপুর, লেমুয়া এলাকার চারটি অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র ঘুরে দেখা গেছে, বেশ কিছু শিশু জ্বর ও সর্দি-কাশিতে আক্রান্ত হয়েছে।

ফাজিলপুর ইউনিয়নের পুর্বালী গ্রামের একটি মাদ্রাসায় আশ্রয় নেন ফারজানা আক্তার ও তাঁর তিন সন্তান। তাঁর পানিতে ভিজে ১৩ মাস বয়সী ছেলে মোহাম্মদ আপ্পানের দুই দিন ধরে জ্বর। সাড়ে চার বছরের মেয়ে সাদিয়া আক্তারের সর্দি। আশ্রয়কেন্দ্রের চারপাশে বুকসমান পানি হওয়ায় বেরই হতে পারেননি তাঁরা। চিকিৎসকের পরামর্শও পাননি।

ফারজানা বলেন, কোনো জামা-কাপড় বের করতে পারেননি। এক কাপড়ে বের হতে হয়েছে। ভেজা কাপড় গায়ে থাকায় দুই সন্তান জ্বর-সর্দিতে আক্রান্ত হয়েছে।

সদর উপজেলার ১০ নম্বর ছনুয়া ইউনিয়নের উত্তর টংগিরপাড় হাজী বাড়ি মসজিদ এলাকার বাসিন্দা তানিয়া আক্তার জীবন বাঁচাতে স্থানীয় একটি মসজিদে আশ্রয় নেন এক সপ্তাহ আগে। তাঁর চার বছরের শিশুও জ্বর–সর্দিতে আক্রান্ত। তানিয়া জানান, গ্রামের রাস্তাঘাট এখনো পানিতে তলিয়ে আছে। এ কারণে কোনো স্বাস্থ্যকর্মী গ্রামে যাননি। সেবাও পাননি।

তুলাবাড়িয়া উচ্চবিদ্যালয়ে ১৫৫ পরিবারের কয়েক শ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। নৌকাযোগে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, চারতলা ও দোতলার দুটি ভবনে গাদাগাদি করে মানুষ থাকছে। মেঝেতে চাটাই বিছিয়ে শুয়ে ছিল একাদশের ছাত্রী অর্পিতা দাশ। গত দুই দিন তার জ্বর ওঠানামা করছে। আজ জ্বর ১০২ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠে যায়। পাশে মা প্রিয়াঙ্কা রানি দাশ বসে মেয়েকে জলপট্টি দিচ্ছিলেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, স্কুলের আশপাশে পানি আর পানি। মেয়েকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। জ্বরের কারণে সে মাথা তুলতে পারছে না। সাত দিন ধরে তাঁরা আছেন সেখানে।

ত্রাণ কেউ পাচ্ছেন, কেউ পাচ্ছেন না

ফেনী জেলার ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী, পরশুরাম, ফেনী সদর, দাগনভূঞা, সোনাগাজী—এই ছয় উপজেলা পুরোপুরি বন্যাকবলিত। পাঁচ দিন ধরে গ্রামগুলো পানিতে তলিয়ে ছিল। গত দুই দিনে পানি কিছুটা সরেছে। বুকসমান পানি নেমে এখন হাঁটুতে। জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যায় আট লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে দেড় লাখ মানুষ জেলার বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেয়। আবার অনেকেই প্রতিবেশীর দোতলা ও তিনতলার বাড়িতে গিয়ে উঠেছে। এসব জায়গায় দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ত্রাণ এসেছে। কিন্তু সমন্বয়হীনতার কারণে দুর্গত সবার কাছে ত্রাণ পৌঁছায়নি।

জানা গেছে, গত পাঁচ দিনে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৬২ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা হেলিকপ্টারে ৩৮ হাজার খাবার প্যাকেট বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দিয়েছেন। আবার স্বেচ্ছাসেবকেরাও ট্রাকে ট্রাকে ত্রাণ এনেছেন।

গত পাঁচ দিন সরেজমিন ঘুরে, স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ফেনী সদরের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক লাগোয়া গ্রামগুলোতে বেশি পরিমাণে ত্রাণ গেছে। কিন্তু ভেতরের দুর্গম গ্রামে ত্রাণ গেছে খুব কম। নৌকার অভাবে ত্রাণ নিয়ে ভেতরে যেতে পারেননি স্বেচ্ছাসেবকেরা। লালপোল, বড় বাজার, কসকা, খাইয়ারা রাস্তার মাথা, ফাজিলপুর, মুহুরীগঞ্জ, নতুন মুহুরী গঞ্জ, নিজকুনজরা, ধুমঘাট সেতু এলাকার অনেকেই কয়েকবার করে ত্রাণ পেয়েছেন। আবার কেউ কেউ একবারও পাননি।

মহাসড়ক লাগোয়া ছনুয়া গ্রামের বাসিন্দা আবদুল্লাহ আল বাছিম প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের গ্রামে পাঁচ-ছয় ট্রাক ত্রাণ গেছে। কিন্তু ভেতরের লস্করহাটের দিকে এক–দুই ট্রাকের বেশি যায়নি।

লেমুয়া ইউনিয়নের নেয়ামতপুর গ্রামে গিয়ে কথা হয় বয়োবৃদ্ধ কালাম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি দাবি করেন, তাঁদের গ্রামে দুই দিন ত্রাণ পৌঁছেছে। তবে সবাই পাননি। কেউ কেউ দুবার পেয়েছেন।

জেলা প্রশাসক মোছাম্মৎ শাহীন আক্তার প্রথম আলোকে বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাধ্যমে তালিকা করে সরকারি ত্রাণ সহযোগিতা দেওয়া হবে। অনেক স্বেচ্ছাসেবককে জেলা প্রশাসন সহযোগীতা করেছে। কিন্তু অসংখ্য মানুষ নিজেদের মতো করে ত্রাণ দিচ্ছেন।

পানি নামছে ধীরে

ছাগলনাইয়া, ফেনী সদর, সোনাগাজী, পরশুরামের বেশির ভাগ গ্রাম থেকে পানি নামতে শুরু করেছে। গত দুই দিনে বুকসমান পানি নেমে এখন হাঁটুপানিতে। কোথাও কোথাও সড়কের ওপর থেকে পানি পুরোপুরি সরে গেছে।

অবশ্য বন্যার পানি নামতে দেরি হচ্ছে। ভারী বৃষ্টি ও ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে এক সপ্তাহ ধরে কহুয়া, মুহুরী ও সিলোনিয়া নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর পানি উপচে গ্রামে গ্রামে ঢুকে পড়েছিল।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহরিয়ার হাসান প্রথম আলোকে বলেন, নদী ও খাল পানিতে টইটম্বুর। এ কারণে পানি নামতে দেরি হচ্ছে।

সরজমিন ফেনী: ত্রাণের অপেক্ষায় by মারুফ কিবরিয়া

লিজু আক্তার। ফেনীর পরশুরাম উপজেলার চিথুলিয়ায় বাড়ি। সাতদিন আগে গভীর রাতে ভয়াবহ পানির স্রোতে ঘরবাড়ি সবই হারান। উজান থেকে আসা ঢলে সব হারিয়ে সাঁতরে আশ্রয় নেন চিথুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। গত সাতদিন এখানেই বাস করছেন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে লিজু বললেন, ‘বাড়িত কিছুই নাই। আঁর বা‌ড়ির টি‌নের চালও নাই। বেক হা‌নি‌তে ভা‌সি গে‌ছে।’

চ‌ল্লি‌শোর্ধ্ব এই নারী গত বুধবার রাতে আচমকা পানির তো‌ড়ে সর্বস্ব হা‌রি‌য়ে চলে আসেন আশ্রয়কেন্দ্রে। ভয়াবহ সেই রা‌তের স্মৃ‌তি ম‌নে পড়লেই অ‌ঝো‌রে কাঁ‌দেন তি‌নি। লিজু আরও জ‌ানান, এক বা‌ড়িতে তারা ১৫ সদ‌স্যের প‌রিবার। তারা সবাই একস‌ঙ্গে বা‌ড়ি ছা‌ড়েন। শুধু লিজু আক্তার নয়, চিথু‌লিয়া গ্রা‌মের এমন শতা‌ধিক মানুষ সেই রা‌তে স্কুলে স্থা‌পিত আশ্রয়‌কে‌ন্দ্রে এসে ও‌ঠেন।

চিথু‌লিয়ার রিকশাচালক সুমন মিয়া। তি‌নিও দুই ছেলে তিন মে‌য়ে নি‌য়ে আশ্রয়‌কে‌ন্দ্রে আসেন। বুধবার রাতের বা‌নের স্রো‌তে বা‌ড়ি ছা‌ড়েন। জী‌বিকার একমাত্র সম্বল রিকশাটাও হা‌রি‌য়ে ফে‌লেন সুমন মিয়া। তি‌নি ব‌লেন, সংসার চল‌তো রিকশা চালি‌য়ে। এখন সেটাও নাই। কীভা‌বে চলবো বুঝ‌তে পার‌ছি না। আবার কবে রিকশা পা‌বো। ক‌বে বউ বাচ্চার পেটে ভাত দি‌বে‌া।
চিথু‌লিয়া সরকা‌রি প্রাথ‌মিক বিদ‌্যালয় আশ্রয়কে‌ন্দ্রে সাত দিন ধরে অবস্থান কর‌ছেন হোস‌নে আরা বেগম না‌মের আরেক না‌রী। দুই বছ‌রের শিশু‌কে ঘা‌ড়ে তু‌লে বৃহস্পতিবার ভোরে দুই কি‌লো‌মিটার পথ সাঁ‌তরে আসেন তি‌নি।

হোস‌নে আরা ব‌লেন, আমা‌দের এদি‌কে পা‌নি আসে প্রতি বছর। কিন্তু ঘর ত‌লি‌য়ে যায় না কখনো। এবার যেটা হইছে আমার দাদার বাবাও দে‌খে‌নি। এই বন্যায় সব চ‌লে গে‌ছে। কিছুই নাই আমার। কো‌নো ম‌তে বাচ্চাটা নি‌য়ে বের হইছি।
পশুরাম উপ‌জেলার আরেক আশ্রয়‌কেন্দ্র পশুরাম মডেল সরকারি উচ্চ বিদ‌্যালয়। বন‌্যার শুরুর দি‌কে এখা‌নে অন্তত ৪শ’ মানুষ আশ্রয় নেন। পা‌নি কমায় এখন অ‌নে‌কে ফি‌রে গে‌ছেন। ত‌বে যা‌দের বা‌ড়িঘ‌রে এখনো পা‌নি আছে তারা আশ্রয়‌কে‌ন্দ্রেই অবস্থান করছেন।
সেখা‌নে গত ছয়‌ দিন ধ‌রে আছেন রিকশাচালক হানিফ। তি‌নি ব‌লেন, এখা‌নে ম‌নে হ‌চ্ছে জে‌লের মধ্যে আছি। বা‌ড়িতে তো সব ভা‌সি‌য়ে নি‌ছে। আমার ঘ‌রের টিনগু‌লো কই আছে জা‌নি না। এখন টিন পাবো কই?

আরেক নারী শরীফা খাতুন ব‌লেন, আমার মে‌য়েটার বয়স সাত বছর। ভোররা‌তে ঘু‌মের ম‌ধ্যেই ঘ‌রে গলা সমান পা‌নি। মে‌য়েটা তো ডু‌বেই গে‌ছিলো। প‌রে খুঁজে বের ক‌রে সব ফে‌লে চ‌লে আস‌ছি। এত ভয় কখনো পাইনি।
বন্যার পানির তীব্র স্রোতের বিপরীতে তিনদিন টিকে থাকার লড়াইয়ের কথা বলতে গিয়ে পরশুরামের সাতকুচিয়া গ্রামের ষা‌টোর্ধ্ব নারী আসমা বেগম। চোখে মুখে তার এখনো আতঙ্ক।
তিনি জানান, প্রচণ্ড ক্ষুধার জ্বালায় মাছের খাবারের ড্রামে করে ভাসতে ভাসতে তারা ওঠেন পরশুরাম পাইলট হাইস্কুলের আশ্রয়কেন্দ্রে। সেখানে যাওয়ার পর খাবার পান।

শুক‌নো খাবা‌রে কাটছে দিন:
আশ্রয়‌কে‌ন্দ্রে আসা মানুষগু‌লো গত সাত দিন ধ‌রেই কাটা‌চ্ছেন দু‌র্বিষহ জীবন। শুক‌নো খাবা‌র ছাড়া ভাতের দেখা পা‌চ্ছেন না। কেউ ব‌্যক্তি উদ্যো‌গে রান্না করা খিচু‌ড়ি দি‌লে ত‌বেই এক‌বেলা খে‌তে পার‌ছেন।
পশুরা‌মের চিথু‌লিয়ার আশ্রয়‌কে‌ন্দ্রে আশ্রয় নেয়া বন্যাক‌বলিত‌রা জানান, সবাই চিঁড়া-মু‌ড়ি দি‌য়ে যায়। কেউ চাল-ডাল দি‌লে রান্না ক‌রে খে‌তে পার‌তেন।

সীমা রানী না‌মের এক নারী জানান, আমা‌দের এখানে শুধু চিঁড়া-মু‌ড়ি আসে। প্রতি‌দিন প্রতি বেলায় এসব খাওয়া যায়? য‌দি চাল-ডাল দি‌তো তাহ‌লে রান্নার ব‌্যবস্থা করতাম। বা‌ড়ি‌তে পা‌নি কতো‌দি‌নে কমবে কে জা‌নে!
আলাউদ্দিন না‌সিম চৌধুরী ক‌লে‌জে আশ্রয় নেয়া শাকেরা বেগম ব‌লেন, চিঁড়া-গুড় দি‌য়ে তিন বেলা খাওয়া কষ্ট। আল্লাহ খাওয়াইতে‌ছে খাইতে‌ছি। বাড়িতে তো ঘরটা আবার ক‌বে তুল‌বো কে তু‌লে দিবো জা‌নি না। সব অন্ধকার লা‌গে।
একই আশ্রয়‌কে‌ন্দ্রের সাইফু‌ল ইসলাম ব‌লেন, এই জেল থে‌কে ক‌বে মু‌ক্তি পাবো জা‌নি না। বা‌ড়ির পা‌নি এখনো কোমর সমান। শুকনা খাবার আর কতো ভালো লা‌গে।

ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার পুরনো মুন্সির হাটের উত্তর শ্রীপুরে পাটোয়ারী টাওয়ারে আশ্রয় নিয়েছেন নারী-শিশুসহ আড়াইশরও বেশি মানুষ। তাদের অনেকে জানান, যারা খাবার দি‌চ্ছেন বে‌শির ভাগই শুক‌নো। চাল-ডালসহ মু‌দি পণ‌্য দি‌লে নি‌জে‌রা রান্নার ব‌্যবস্থা কর‌তে পার‌তেন।

পথে প‌থে খাবার পে‌তে হাত তুল‌ছেন শত মানুষ:
ফেনীর ফুলগাজীর আনন্দপুর থে‌কে পশুরাম সদর পর্যন্ত পু‌রো সড়ক‌টি প্রায় ২০ কি‌লো‌মি‌টার। এই সড়কের উপর শত শত মানুষ দাঁ‌ড়ি‌য়ে থা‌কেন খাবারের জন‌্য। নারী পুরুষ শিশু বৃদ্ধ সবাই ত্রা‌ণের গা‌ড়ি দেখ‌লেই থামা‌চ্ছেন। স্বেচ্ছা‌সেবীরা গাড়ি থামিয়ে বিতরণ কর‌ছেন খাবার। ত‌বে অ‌নেক গা‌ড়িই থামে না। তারা জানায় নি‌র্দিষ্ট আশ্রয়কে‌ন্দ্রে গে‌লে মিল‌বে খাবার।

Tuesday, August 27, 2024

গ্রামে গ্রামে খাবারের অপেক্ষা by মারুফ কিবরিয়া

গতকাল সকাল সাড়ে ১১টা। ফেনীর মহিপালে একটি বড় ত্রাণবাহী মিনি ট্রাক এসে থামলো। স্থানীয় কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবক ট্রাকটি ঘিরে ধরলেন। তাদের দাবি, ফেনী সদর উপজেলায় অনেক মানুষ খাবার পাচ্ছে না। বন্যাকবলিত মানুষগুলোর জন্য খাবার লাগবে। কিন্তু ট্রাকের দায়িত্বে থাকা স্বেচ্ছাসেবক জানান, আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর দেয়া হবে। হতাশা নিয়ে স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক সাইদুজ্জামান বলেন, ফেনীতে যে বন্যা হয়েছে সেটা ইতিহাসে কখনো হয়নি। আমরা কয়েকজন বিভিন্ন জায়গা থেকে তহবিল সংগ্রহ করে মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করছি। কিন্তু সেটা পর্যাপ্ত না। ফেনীর ফাজিলপুর, রামপুরসহ বেশ কয়েক জায়গায় মানুষ খাবার পায়নি। আশ্রয়কেন্দ্রে যায়নি। তাই তাদের খাবারের ব্যবস্থা স্থানীয়রাই  করে যাচ্ছে। কিন্তু ফেনীর বাইরে থেকে অঢেল ত্রাণসামগ্রী এলেও সেটা আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়া কোথাও দেয়া হচ্ছে না।

আরেক স্বেচ্ছাসেবক সাদ্দাম হোসেন বলেন, ত্রাণসামগ্রী আসছে অনেক। কিন্তু বাসাবাড়িতে অনেক মানুষ সেটা পাচ্ছেন না। মানুষ খাবারের কষ্ট করছে অনেক। আর বেশি পানি যেখানে সেখানে সেনাবাহিনী ও সরকারি সংস্থা ছাড়া কেউ যেতে পারছে না।
সরজমিন ফেনীর মাস্টারপাড়া, চাঁড়িপুর বিরিঞ্চি এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এসব সড়কে পানি বেশি থাকায় অনেকেই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। দোতলায় অবস্থান করছেন অনেকে। তবে কমবেশি সবাই বিশুদ্ধ পানি ও খাবার সংকটে ভুগছেন। স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবীরা খাবার নিয়ে দুই একবার এলেও তা পর্যাপ্ত নয়।
বিরিঞ্চি এলাকার বাসিন্দা মো. ওমর ফারুক বলেন, শুনছি সারা দেশ থেকে খাবার আসছে। কিন্তু আমাদের লোকাল ভাইয়েরা যতটুকু পারছে করছে। এটা দিয়ে হয়না।

বন্যা পরিস্থিতি এখন যেমন: ফেনী শহর ও আশপাশের অনেক এলাকায় বানের পানি রয়ে গেছে। কমলেও তা ধীরগতি। অনেক স্থানেই বিদ্যুৎ ও মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক না থাকায় কেউ কারওর খোঁজ নিতে পারছেন না। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নৌকা, স্পিডবোট নিয়ে এলেও প্রবল স্রোত ও রাস্তাঘাট চেনাজানা না থাকায় উদ্ধার কাজ চলছে ধীরগতিতে। তবে সেনাবাহিনী, বিজিবি হেলিকপ্টারের মাধ্যমে উদ্ধার অব্যাহত রেখেছে।
গতকাল সকালে দেখা যায়, শহরের এসএসকে সড়ক, ট্রাংক রোড, মিজান রোড থেকে পানি নেমে গেছে। পুরাতন জেল রোড, কলেজ রোড, ক্যাডেট কলেজ রোড, ডাক্তারপাড়া, মাস্টারপাড়া, রামপুর, পুরাতন পুলিশ কোয়ার্টার, শাহীন একাডেমি এলাকা, চাঁড়িপুর, বিরিঞ্চি, বনানীপাড়াসহ প্রায় সব এলাকা পানিতে তলিয়ে রয়েছে। সদরের ১২ ইউনিয়নের ১০৮টি ওয়ার্ডের সব এলাকা পুরোপুরি বন্যাকবলিত।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পরশুরাম, ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী উপজেলায় পানি কমলেও রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়ায় পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছানো যাচ্ছে না। দাগনভূঞা ও সোনাগাজী উপজেলার বেশিরভাগ এলাকা ডুবে গেছে। সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়াও লাখ লাখ মানুষ স্কুল-কলেজ, মসজিদ, মাদ্রাসা বা উঁচু ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, সীমান্তবর্তী পরশুরাম পৌরসভার সীমান্ত এলাকা বাউরপাথর, সলিয়া, অনন্তপুর, চিথলিয়া ইউনিয়নের চিথলিয়া, অলকা, নোয়াপুর, ধনিকুণ্ডা, দুর্গাপুর, মির্জানগর ইউনিয়নের কাউতলী, চম্পকনগর, বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের সাতকুচিয়া গ্রামে জলাবদ্ধতার পর থেকে খাবার পাচ্ছেন না বাসিন্দারা।

একইভাবে ফেনী সদর উপজেলার মোটবী ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর, বাঘাইয়া, সাতসতি, ইজ্জতপুর, মোটবী, গঙ্গানগর, ফাজিলপুর ইউনিয়নের শিবপুর, বটতলি এলাকায় কোনো ধরনের খাবার পৌঁছেনি।
জেলা প্রশাসক মোছাম্মৎ শাহীনা আক্তার বলেন, কিছু এলাকায় পানি নামতে শুরু করলেও সেনাবাহিনী, কোস্টগার্ড, ফায়ার সার্ভিস এবং ছাত্র-জনতার সমন্বয়ে উদ্ধার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এরইমধ্যে এক হাজার ৬০০ প্যাকেট শুকনা খাবার বিতরণ করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ফেনীতে সাড়ে ৫০০ টন চাল এবং ১০ লাখ টাকা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় হতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।
আশ্রয়কেন্দ্রে ত্রাণের অপেক্ষা: ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার জয়লস্কর ইউনিয়নের জয়লস্কর উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে মাঠ প্লাবিত। স্কুলটির নিচতলায়ও পানি ঢুকে গেছে। সরজমিন গতকাল গিয়ে দেখা যায়, সেখানে আশ্রয় নিয়েছেন কয়েকশ’ পরিবার। বানের জলে বাড়িঘর ডুবে যাওয়ায় আশ্রয় নিয়েছেন স্কুলে। তবে সবারই অপেক্ষা ত্রাণের গাড়ির। গাড়ি আসা মাত্রই স্কুলে আশ্রয়কেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা প্রতিনিধিরা হাজির হচ্ছেন। আশ্রয় নেয়া রোকসানা বেগম মানবজমিনকে বলেন, অনেকেই খাবার ব্যবস্থা করছে। বিজিবি’র গাড়ি থেকে দেয়া হয়। আবার ঢাকা থেকেও অনেকে এসে খাবার দিচ্ছে। কিন্তু বাথরুমের অসুবিধা বেশি হচ্ছে। মহিলাদের জন্য ব্যবস্থা থাকলেও অনেক মানুষ একসঙ্গে হওয়ায় কষ্ট বেশি হচ্ছে।
আশ্রয় নেয়া কুতুব উদ্দিন মোল্লা বলেন, আমাদের এখানে খাবার আসে। কিন্তু আশপাশের অনেক গ্রামের মানুষ বাড়ি থেকে আসেনি। তারা খাবারের কষ্ট করতেছে। আমাদের এখানে হাইওয়ের পাশে হওয়ায় মানুষ বেশি ত্রাণ দিচ্ছে।
জয়লস্কর থেকে এক কিলোমিটার দূরে সিলোনীয়া হাইস্কুল। এখানেও আশপাশের গ্রাম থেকে এসে আশ্রয় নিয়েছেন কয়েকশ’ পরিবার। আশ্রয় নেয়া কয়েকজন জানান, ত্রাণসামগ্রী এলেও পানি ও ওষুধের সংকট আছে। সবাই খাবার দিচ্ছে কিন্তু সে অনুযায়ী বিশুদ্ধ পানি দেয়া হচ্ছে না।
সরজমিন দাগনভূঞার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চল ঘুরে দেখা যায় গতকাল বিকাল পর্যন্ত এসব এলাকায় বন্যার পানি বাড়ছিল। ফলে এসব এলাকার বাড়িঘরে অবস্থান করা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছিল। উপজেলার নয়নপুর এলাকার ৫০ বছর বয়সী মোজাম্মেল হক বলেন, এত বন্যা এদিকে কখনো হয় নাই। গতকাল থেকে পানি বাড়তেছে। আমরা এখনো বাড়িতে আছি। ঘরের সামনে দুই ফুট পানি।

সেকান্দারপুর এলাকার বাসিন্দা নুরুল আমিন বলেন, বাড়ির ভেতরে পানি আছে। আজ রাতে মনে হয় ঘরে ঢুকবে। বাচ্চাদের নিয়ে চিন্তায় আছি।
উপজেলার প্রতাপপুর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, ওই এলাকার সব রাস্তাঘাট বাড়িঘর তলিয়ে গেছে। সেখানে প্রতাপপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের তিনটি ক্যাম্পে অবস্থান নিয়েছেন ১৮০টি পরিবার। বিকাল ৫টার দিকে দাগনভূঞা উপজেলার আতাতুর্ক স্কুলের ১৯৯৬ সালের এসএসসি ব্যাচের সাবেক শিক্ষার্থীরা রান্না করা খাবার ও পানি বিতরণ করেন। সেখানে ৮০০ মানুষের জন্য খাবার দেয়া হয়। এ সময় আজমল হক সুমন বলেন, আমরা দাগনভূঞার বিভিন্ন স্থানে গত কয়েকদিন ধরে খাবার বিতরণ করছি। ব্যাচভিত্তিক বন্ধুরে উদ্যোগে এই কাজটির মাধ্যমে মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছি।
এ ছাড়াও দাগনভূঞার পাশাগ্রুপ, ব্রিকফিল মালিক সমিতিসহ অনেকে রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন বন্যার্তদের পাশে দাঁড়িয়েছে।
বন্যার সার্বিক অবস্থা প্রসঙ্গে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিবেদিতা চাকমা মানবজমিনকে বলেন, প্রায় সত্তর হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী আশ্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানো হচ্ছে। তবে বিক্ষিপ্তভাবে অনেকে বাসাবাড়িতে থাকায় তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়ে ওঠে না।

Thursday, August 22, 2024

স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে ফেনী

মানবজমিনঃ ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিতে কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী ও মৌলভীবাজার জেলায় বন্যা সৃষ্টি হয়েছে। এরমধ্যে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে ফেনী জেলা। ফেনীর রামগর পয়েন্টে পানি বিপৎসীমার ২১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

ফেনীর অধিকাংশ বাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। এরমধ্যে ছাগলনাইয়া, ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলায় বন্যা পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি খারাপ। উপজেলাগুলোর পৌর শহরগুলোও এখন পানির নিচে। এতে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

সড়কগুলো পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় দ্রুত স্পিডবোট ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে বন্যা দুর্গতদের উদ্ধারের আবেদন জানিয়েছেন বাসিন্দারা। ইতিমধ্যে সহযোগিতার জন্য সেখানে সেনাবাহিনী ও কোস্টগার্ড পৌঁছেছে।

বন্যা পরিস্থিতির অবনতির কারণে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে অনেকের মোবাইল ফোনের চার্জ শেষ হয়ে যাওয়ার পর আর যোগাযোগ করতে পারছেন না। এজন্য জেলার বাইরে থাকা বিভিন্ন মানুষ তাদের পরিবার ও আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। এদিকে কিছু মোবাইল টাওয়ার বিকল্প উপায়ে চালানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু নেটওয়ার্কে সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

পাহাড়ি ঢল ও বন্যার কবল থেকে রক্ষা করতে সোনাগাজী উপজেলার বড় ফেনী নদীর ওপর নির্মিত মুহুরী রেগুলেটরের ৪০টি গেট খুলে দেওয়া হয়েছে।
এদিকে ফেনী থেকে ফাজিলপুর পর্যন্ত রেললাইন পানিতে ডুবে গেছে। এজন্য চট্টগ্রামের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ফেনীতে রেললাইন ও রেলসেতুর ওপর দিয়ে বন্যার পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এই অবস্থায় ট্রেন চালানো সম্ভব নয়। তাই আপাতত ট্রেন চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে।’

পানি উন্নয়নের বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা পার্থ প্রতীম বড়ুয়া বলেন, ফেনীর রামগর পয়েন্টে গত ২৪ ঘণ্টায় ১৮৬ সেন্টিমিটার পানি বেড়েছে। পানি বিপৎসীমার ২১৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারি বৃষ্টিতে বন্যাকবলিত ৬ জেলার ৪৩ উপজেলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ১৭ লাখ ৯৬ হাজার ২৪৮ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ১ লাখ ৯০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ওই জেলাগুলো হলো-কুমিল্লা, ফেনী, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী ও মৌলভীবাজার।

Tuesday, August 20, 2024

‘বন্ধুরা যখন ক্লাসে, তখন শরীরে বুলেট নিয়ে কাতরাচ্ছি’ by নাজমুল হক শামীম

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ফেনীতে আওয়ামী লীগ কর্মীদের চালানো গুলিতে চোখ হারিয়েছেন ছাগলনাইয়া সরকারি কলেজের ডিগ্রি প্রথম বর্ষের ছাত্র মো. নাহিদুর রহমান (২০)। গুলিবিদ্ধ হয়ে বিছানায় কাতরাচ্ছেন ফেনী সিটি কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্র মো. রিদোয়ান হোসেন (১৭)।

চোখ হারানো নাহিদের বাবা মো. বাহার মিয়া বলেন, ৪ঠা আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে নিরীহ ছাত্র-জনতার ওপর আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা নির্বিচারে গুলি চালায়। এ সময় নাহিদ ফেনীর মহিপালে সার্কিট হাউজ রোডে ৪ জনকে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। নাহিদ সেসময় আহত অসংখ্য ছাত্রকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়। পরদিন দুপুরে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে পালিয়ে গেছে শুনে বিজয় মিছিল নিয়ে শহরের দিকে যায় নাহিদ। এখানে সবার আগেই গুলিবিদ্ধ হন নাহিদ।

আহত নাহিদ বলেন, আমি মিছিলের সামনে ছিলাম। আমার হাতে একটি পতাকা ছিল। হঠাৎ করে হেলমেট পরা ৩০-৩৫ জন সন্ত্রাসী গুলি চালানো শুরু করে। প্রথম গুলিটা আমার চোখে লাগে। আমি কিছু দেখছিলাম না। আমি চোখে হাত দিয়ে বসে পড়ি। তখন তারা আমার সারা গায়ে গুলি করে। আমরা আন্দোলন শুরু করেছি। আমরা এই বাংলাদেশে বৈষম্য চাই না। এই স্বৈরাচারের পতন হয়েছে। আমার অন্তরে সুখ আছে। কিন্তু আমার চোখ দিয়ে আমি আমার সুন্দর দেশটাকে দেখতে পাচ্ছি না। আমার ভেতরের অনেক কষ্ট থেকে বলছি যে, ফ্যাসিবাদের পতন হয়েছে। যেদিন আমি সুখ করবো, আনন্দ করবো ওইদিন আমাকে এম্বুলেন্স নিয়ে দৌঁড়াতে হয়েছে চট্টগ্রামে।

নাহিদ বলেন, আমি পরিবারের বড় ছেলে। আমার ওপর অনেক দায়িত্ব। আমার স্বপ্ন ছিল সরকারি চাকরি করবো। কিন্তু আমি এক চোখ দিয়ে কিছু করতে পারবো কিনা জানি না। এমন স্বৈরাচার সরকার আর কখনো চাই না। বেসরকারি চাকরিজীবী বাবা ছেলের চিকিৎসার ব্যায় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। এ অবস্থায় চরমভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন নাহিদের বাবা মো. বাহার মিয়া। যেকোনো মূল্যে নাহিদ তার চোখ ফিরে পাবে এটাই পরিবারের চাওয়া।
এদিকে আন্দোলনে অংশ নিয়ে গুলিতে আহত হয়ে কাতরাচ্ছে একাদশ শ্রেণির ছাত্র মো. রিদোয়ান হোসেন। সে ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার চরচান্দিয়া ইউনিয়নের উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের হাসান হুজুর বাড়ির দিনমজুর মো. ইব্রাহিমের ছেলে। ইব্রাহিম বলেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য গত ৪ঠা আগস্ট বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মহিপাল এলাকায় অবস্থান নেয় রিদোয়ান। মহিপাল সিক্সলেন ফ্লাইওভারের পশ্চিম অংশে হীরা কনফেকশনারির সামনে সকাল থেকে অবস্থান নিয়ে দুপুরে বন্ধুদের সঙ্গে জোহরের নামাজ পড়ে। নামাজ পড়া শেষ হতে না হতেই গুলিতে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে সে। পরে সহপাঠীরা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাকে বাড়িতে নিয়ে আসি।

তিনি বলেন, আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনীর গুলিতে আজ রিদোয়ান বিছানায় কষ্টে দিন পার করছে। আমার একমাত্র ছেলেকে যারা গুলি করেছে সরকারের কাছে তাদের বিচার দাবি করছি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ফেনীর সমন্বয়ক মুহাইমিন তাজিম জানান, গত ৪ঠা আগস্ট ছাত্র-জনতার অবস্থান কর্মসূচিতে ফেনীতে আওয়ামী সন্ত্রাসী বাহিনী নির্বিচারে গুলি চালালে ঘটনাস্থলে ৮ জন ও চিকিৎসাধীন অবস্থয় আরও একজনের মৃত্যু হয়েছে। গুলিবিদ্ধ হয়েছেন অন্তত শতাধিক ছাত্র-জনতা ও সাংবাদিক। পরদিন ৫ই আগস্ট বিকালে বিজয় মিছিলে ফের গুলি চালালে সেখানেও বিপুলসংখ্যক ছাত্র-জনতা গুলিবিদ্ধ হয়। ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ দীন মোহাম্মদ বলেন, ফেনীতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গুলিতে হত্যার ঘটনায় রোববার পর্যন্ত থানায় ৫টি মামলা হয়েছে। প্রতিটি মামলায় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সদর আসনের সদ্য সাবেক সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারীকে প্রধান আসামি করা হয়েছে। এসব মামলায় ৭শ’ এজাহার নামীয় আসামিসহ ১ হাজার ৬২৩ জন আসামি হয়েছে। এদের মধ্যে সংসদ সদস্যের পিএস পরিচয় দেয়া মানিক নামে একজন গ্রেপ্তার হয়েছে।

Tuesday, July 30, 2024

গুলিতে ইকরামের মগজ ছিটকে পড়ে রাস্তায় by নাজমুল হক শামীম

কোটা বৈষম্য আন্দোলনকে কেন্দ্র করে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ঢাকা কবি নজরুল কলেজের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ইকরাম হোসেন কাউছার। গত ১৭ ও ১৮ই জুলাই দু’দিন ধরে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মেসগুলোতে রান্না বন্ধ ছিল। দু’দিন কিছু খেতে না পেরে কাউছার খাবারের জন্য ১৮ই জুলাই শুক্রবার দুপুরে মেস থেকে বের হন। জুমার নামাজ শেষে সড়কের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক ঠেলাওয়ালার দোকান থেকে চেয়ে ভাত খায় ইকরাম। পরে ঠেলাওয়ালা সেধে একরামকে রাতের খাবারের জন্য একটি বিস্কুটের প্যাকেট ধরিয়ে দেন। ইকরাম বিস্কুটের প্যাকেটটি নিয়ে সড়ক পার হতে হতে প্যাকেটটি ছিঁড়ে একটি বিস্কুট মুখে দেন। এমন সময় পিছন থেকে মাথায় গুলি করে পুলিশ। মুহূর্তেই ইকরামের মগজ ছিটকে সড়কে পড়ে যায়। দূর থেকে দেখে সেই ঠেলাওয়ালা দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মগজগুলো পলিথিনে ভরে। পরে তাকে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেলে পাঠানো হয়।

এভাবেই বড় ভাইয়ের মৃত্যুর ঘটনাটি প্রতিবেদককে জানান ছোট ভাই ইমরান হোসেন ফারুক। তিনি বলেন, মৃত্যুর ২০ মিনিট আগেও বড় ভাই ইকরাম হোসেন কাউছার বাড়িতে ফোন করেছিলেন। কবি নজরুল কলেজ সংলগ্ন লক্ষ্মীবাজার এলাকায় ভাই যে জায়গায় থাকতেন সেখানে বিদ্যুৎ না থাকায় তার মোবাইলে চার্জ ছিল না। যেই ঠেলাওয়ালা ভাইকে ভাত খাইয়েছিলেন সেই ঠেলাওয়ালার ফোন থেকে বাড়িতে ফোন করেন ইকরাম। সেই ঠেলাওয়ালাই ভাইয়ের মৃত্যুর সংবাদটি প্রথম বাড়িতে জানান।
ইমরান আরও বলেন, ভাইয়ার ফোন কলটি ছিল বাবার সঙ্গে শেষ কথা। বাবাকে তিনি বলেছিলেন তিনি ভালো আছেন। তার জন্য দোয়া করতে। আমাকে দেখে রাখতে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাড়ি ফিরে আসবেন। নিহত ইকরাম হোসেন কাউছার ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলার রাজসপুর গ্রামের হাজীবাড়ির স্কুলশিক্ষক আনোয়ার হোসেনের ছেলে। তিন সন্তানের মধ্যে ইকরাম ছিলেন মেজো সন্তান।
ইকরামের বাবা আনোয়ার হোসেন বলেন,  সামান্য স্কুলশিক্ষক হয়ে তিনি তিন সন্তানকে পড়ালেখা করিয়ে যাচ্ছিলেন। তার বড় ছেলে ইকরাম এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন। তিনি মেধাবী হওয়ায় ঢাকা কবি নজরুল কলেজ থেকে অনার্স শেষ করে মাস্টার্স পড়ছিলেন। জমি বিক্রি করে ছেলের পড়ালেখার খরচ চালাচ্ছিলেন। ছেলের স্বপ্ন ছিল মাস্টার্স শেষ করে সে বিসিএস এ অংশগ্রহণ করবে। পুলিশের গুলিতে তার স্বপ্ন অঙ্কুরে বিনষ্ট হলো। এ হত্যার দায় কে নেবে? ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর শুনে শুক্রবার রাতেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন তার মা-বাবা। পরদিন ময়নাতদন্ত শেষে তার লাশ নিয়ে এসে রাতেই নিজ এলাকায় দাফন করা হয়।
ইকরামের একমাত্র বোন জান্নাতুল ফেরদৌস জানান, আমাদের পরিবার খুবই গরিব। পড়ালেখা শেষ করে ইকরাম পরিবারে হাল ধরবেন আমাদের দুঃখ ঘুচবে এমনটাই আশা করেছিলাম। এখন আমার ভাই নেই, আমাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। আমরা আশা করবো সমাজের বিত্তবানরা আমাদের পাশে এসে দাঁড়াবেন।

Monday, March 8, 2021

ফেনীর প্রাচীন ঐতিহ্যের নিদর্শন বিজয় সিংহ দীঘি by নাকিবুল আহসান নিশাদ

বিজয় সিংহ দীঘি
হাজার বছরের পুরনো ঐতিহাসিক জনপদের মধ্যে ফেনী অন্যতম। এখানে গৌরবগাঁথা অজস্র নিদর্শন ছড়িয়ে আছে। এগুলোরই একটি বিজয় সিংহ দীঘি। শহরের দুই কিলোমিটার পশ্চিমে সার্কিট হাউসের পাশে বিজয় সিংহ গ্রামে এটি অবস্থিত। এর তিন দিকে উঁচু পাহাড়ের মতো সবুজ বৃক্ষ ও লতাপাতায় ঘেরা। সমতলে একপাশে গোসল ও ওজু করার ঘাট, মানুষের বসার জায়গা আর সরকারি সার্কিট হাউস।
ফেনী জেলা প্রশাসনের মালিকানাধীন বিজয় সিংহ দীঘির আয়তন ৩৭ দশমিক ৫৭ একর। এখানে হেঁটে হেঁটে প্রকৃতির সান্নিধ্যে ডুবে থাকা যায়। রোজ বিকেলে প্রশান্তির খোঁজে ভ্রমণপিপাসুরা হাজির হন বিজয় সিংহ দীঘির পাড়ে। এ সময় জমে ওঠে আড্ডা ও বিভিন্ন দ্রব্যসামগ্রীর কেনাবেচা। রাতে আলোর মেলায় এক নৈসর্গিক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
দীঘির পাড়ে বিভিন্ন দিবসে ভ্রমণপ্রেমীদের ভিড় বাড়ে। উৎসবগুলোতে পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকে বেড়াতে আসেন এখানে। তরুণ-তরুণীরা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছবি আর সেলফি তোলায় মগ্ন থাকে। তখন মেলাও বসে।
শত বছরের প্রাচীন রূপকথার ইতিহাস ও ঐতিহ্য বহন করছে বিজয় সিংহ দীঘি। তবে এ নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। অনেকেই এই দীঘিকে প্রাচীন বাংলার বিখ্যাত সেন বংশের অমর কীর্তি মনে করেন। তাদের মতে, ৫০০-৭০০ বছর আগে সেন বংশের প্রতিষ্ঠাতা বিজয় সেন এটি খনন করেন। আবার অনেকে মনে করেন, দীঘিটি খনন করেন স্থানীয় রাজা বিজয় সিংহ। তার নামানুসারেই এর নামকরণ হয়।

কথিত আছে, মাকে খুশি করার জন্য এই সুদীর্ঘ দীঘিটি খনন করেন রাজা বিজয় সিংহ। এতে একসময় সোনা ও রূপার থালা ভেসে উঠতো! একদিন এক ভিখারিনী একটি থালা চুরি করে। তারপর থেকে আর থালা ভেসে ওঠে না। আরও জনশ্রুতি আছে, দীঘিতে অনেক বড় বড় মাছ পাওয়া যেতো, সেগুলোর একেকটির ওজন ৮০-১০০ কেজি পর্যন্ত হতো।
ফেনীর কৃতি সন্তান প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক জহির রায়হান ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসে কমলা সুন্দরীকে জিন দীঘিতে নামিয়ে ফেলার কথা উল্লেখ করেন। অনেকে মনে করেন, এই দীঘির কথাই রয়েছে উপন্যাসটিতে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এখন পর্যন্ত দীঘিটি পুরোপুরিভাবে সেচ করা সম্ভব হয়নি।
এখনও দূর-দূরান্ত থেকে অনেক বিজয় সিংহ দীঘিতে গোসল করতে ও পানি পানের জন্য আসেন। ১৯৯৫ সালে এর চারপাশে বৃক্ষরোপণ করে এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করা হয়। গত বছর দীঘির পাড়ে হাঁটাপথ, আরসিসি গ্যালারি, লাইটিং, সীমানা প্রাচীর ও শৌচাগার নির্মাণ করা হয়। ফলে এখানকার সৌন্দর্য বেড়েছে।

যেভাবে যাবেন
ঢাকার সায়দাবাদ বা টিটিপাড়া থেকে স্টার লাইন, এনা অথবা লোকাল বাসে চড়ে ফেনী মহিপাল নামতে হবে। ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ২৫০-৩০০ টাকা। মহিপাল থেকে রিকশা অথবা পায়ে হেঁটে সার্কিট হাউস রোড দিয়ে বিজয় সিংহ দীঘি যাওয়া যায়। রিকশায় গেলে ১০-১৫ টাকা। হেঁটে গেলে লাগবে ১০ মিনিট।
কোথায় খাবেন
ফেনীর মহিপালে ভালো মানের বেশকিছু রেস্তোরাঁ আছে। এগুলোতে স্বল্পমূল্যে খাওয়া যায়। যেমন ফাইভ স্টার হোটেল, শাহিন হোটেল, ফুড পার্ক রেস্তোরাঁ, আলমাস হোটেল ইত্যাদি।
কোথায় থাকবেন
বিজয় সিংহ দীঘির কাছে গড়ে তোলা হয়েছে ফেনী সার্কিট হাউস। আর দীঘি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে মিজান রোডে অবস্থিত ফেনী জেলা পরিষদের ডাকবাংলো। এছাড়া এলজিইডি রেস্টহাউস, পানি উন্নয়ন বোর্ডের রেস্টহাউস ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির রেস্টহাউসে রাতে থাকা যায়। ফেনী শহরে আবাসিক হোটেলের মধ্যে হোটেল মিডনাইট ও হোটেল গাজী ইন্টরন্যাশনাল তুলনামূলকভাবে ভালো।

>>ছবি: লেখক

Friday, October 25, 2019

দৃষ্টান্তমূলক রায় by নাজমুল হক শামীম

চাঞ্চল্যকর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার মামলায় ১৬ আসামির মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন আদালত। বৃহস্পতিবার ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ এ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি প্রত্যেক আসামিকে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে। তদন্ত প্রক্রিয়ায় আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডে ১৬ জনের জড়িত থাকার তথ্য উঠে আসে। রায়ে এদের সবাইকে সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া হয়েছে। মাত্র ৬১ কার্য দিবসে মামলার কার্যক্রম শেষ করে দেয়া এই রায় বিচার বিভাগের জন্য একটি মাইলফলক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে রাফির পরিবার। দ্রুত রায় কার্যকর ও নিরাপত্তা দাবি করা হয়েছে তাদের পক্ষ থেকে।
হত্যাকাণ্ডের পর আসামিদের শাস্তির আওতায় আনার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকারও প্রশংসা করেন আদালত। আসামি পক্ষের আইনজীবীরা জানিয়েছেন, তারা সন্তুষ্ট নন, রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করা হবে। নিয়ম অনুযায়ী সাত কার্য দিবসের মধ্যে তারা আপিল করতে পারবেন। গত ৬ই এপ্রিল আলিম পরীক্ষার হল থেকে ছাদে নিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ১০ই এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাতের মৃত্যু হয়। হত্যাকাণ্ডের প্রায় সাত মাসের মাথায় গতকাল রায় ঘোষণার দিনে জনাকীর্ণ ছিল আদালত প্রাঙ্গণ। ভিকটিম ও আসামিদের স্বজন এবং সাধারণ মানুষ আদালতে উপস্থিত হয়েছিলেন রায় শুনতে।

কড়া নিরাপত্তার মধ্যে প্রিজনভ্যানে করে ফেনী জেলা কারাগার থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে মামলার ১৬ আসামিকে আদালতে আনা হয়। আদালতে আসামিদের তোলার সময় হাসতে হাসতে বিচারকের এজলাসে প্রবেশ করেন অধ্যক্ষ সিরাজ। ১১টা ৭ মিনিটে বিচারক আদালতে প্রবেশ করেন। এ সময় ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ আলোচিত এ মামলার বিচারকাজ চলার সময় উপস্থিত আইনজীবী, পুলিশ, পিবিআই, সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। ১১টা ৯ মিনিটে রায় পড়া শুরু করেন বিচারক। মূল রায়ের সারসংক্ষেপ (তিনপৃষ্ঠা) পড়ে শোনান তিনি। রায় পড়তে বিচারক সময় নেন ১২ মিনিট ৪০ সেকেন্ড।

মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা হলো: সানাগাজীর চরকৃষ্ণজয়ের কলিম উল্যাহ সওদাগার বাড়ির কলিম উল্যার ছেলে এসএম সিরাজ-উদ-দৌলা (৫৭), চরচান্দিয়া ইউনিয়নের উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের মো. আহসান উল্যাহর ছেলে ও মাদ্রাসা ছাত্রদলের কথিত সভাপতি নুর উদ্দিন (২০), চরচান্দিয়া ইউনিয়নের ভূঁইয়া বাজারে এলাকার নবাব আলী টেন্ডল বাড়ির মো. আব্দুর রাজ্জাকের ছেলে ও মাদ্রাসা ছাত্রলীগের কথিক সভাপতি শাহাদাত হোসেন শামীম (২০), পৌরসভার ৪নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর, পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (সদ্য সাবেক) ও চরগণেশ গ্রামের পাণ্ডব বাড়ির আহসান উল্যাহ ছেলে মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ আল কাউন্সিলর (৫০), উপজেলার পূর্ব তুলাতলী গ্রামের খায়েজ আহাম্মদ মোল্লা বাড়ির আবুল বাশারের সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের (২১), উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের সৈয়দ সালেহ আহাম্মদের বাড়ির রহমত উল্যাহ ছেলে জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ (১৯), সফরপুর গ্রামের খান বাড়ির আবুল কাশেমের ছেলে হাফেজ আব্দুল কাদের (২৫), সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক ও উত্তর চারচান্দিয়া গ্রামের সওদাগর বাড়ির ইবাদুল হকের ছেলে আবছার উদ্দিন (৩৩), চরগণেশ গ্রামের আজিজ বিডিআর বাড়ির আব্দুল আজিজের (পালক বাবা) মেয়ে কামরুন নাহার মনি (১৯), লক্ষ্মীপুর গ্রামের সফর আলী সর্দার বাড়ির শহিদুল ইসলামের মেয়ে ও মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ-উদ-দৌলার ভাগ্নি উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে শম্পা ওরফে চম্পা (১৯), পূর্ব চরচান্দিয়া গ্রামের সোজা মিয়া চৌকিদার বাড়ির আব্দুল শুক্কুরের ছেলে আব্দুর রহিম শরীফ (২০), চরগণেশ গ্রামের হাজি ইমান আলীর বাড়ি ওরফে মালশা বাড়ির জামাল উদ্দিন জামালের ছেলে ইফতেখার উদ্দিন রানা (২২), চরগণেশ গ্রামের এনামুল হকের নতুন বাড়ির এনামুল হক ওরফে মফিজুল হকের ছেলে ইমরান হোসেন ওরফে মামুন (২২), তুলাতলী গ্রামের আলী জমাদ্দার বাড়ির সফি উল্যাহ ছেলে মোহাম্মদ শামীম (২০), সোনাগাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও চরচান্দিয়া গ্রামের ভূঁইয়া বাজার এলাকার কোরবান আলী বাড়ির কোরবান আলীর ছেলে রুহুল আমিন (৫৫), উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের বোর্ড অফিস সংলগ্ন রুহুল আমিনের নতুন বাড়ির মো. রুহুল আমিনের ছেলে মহিউদ্দিন শাকিল (২০)।

আদালতের বক্তব্য: রায় ঘোষণার সময় আদালত পর্যবেক্ষণে বলেন, ‘সোনাগাজী ইসলিামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসা ফেনী জেলার অন্যতম বৃহৎ বিদ্যাপীঠ। দুই হাজারেরও অধিক ছাত্র-ছাত্রী তথায় অধ্যয়নরত। এলাকার শিক্ষা সম্প্রসারণে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার আলোকোজ্জ্বল ভূমিকায় কালিমালিপ্তকারী এ ঘটনা বিশ্ব বিবেককে নাড়া দিয়েছে। নারীত্বের মর্যাদা রক্ষায় ভিকটিম নুসরাত জাহার রাফি তেজদীপ্ত আত্মত্যাগ তাকে ইতিমধ্যে অমরত্ব দিয়েছে। তার এ অমরত্ব চিরকালে অনুপ্রেরণা। পাশাপাশি আসামিদের ঔদ্ধত্য কালান্তরে মানবতাকে লজ্জিত করবে নিশ্চয়। বিধায়, দৃষ্টান্তমূলক কঠোরতম শাস্তিই আসামিদের প্রাপ্য। এরই প্রেক্ষিতে বিচার্য বিষয়ত্রয়ে রাষ্ট্রপক্ষের অনুকূলে সিদ্ধান্ত গ্রহণপূর্বক, আসামিবৃন্দকে পূর্বপরিকল্পিতভাবে অত্র মামলায় ভিকটিম নুসরাত জাহান রাফিকে বিগত ০৬/০৪/২০১৯ সকাল ৯.৪৫-৯.৫০ মিনিটের মধ্যে ফেনীস্থ সোনাগাজী ইসলিামিয়া ফাজিল ডিগ্রি মাদ্রাসার সাইক্লোন শেল্টারের ৩য় তলার ছাদে ডেকে নিয়ে নুসরাতের ওড়না দিয়ে হাত-পা বেঁধে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন লাগিয়ে তাকে পুড়িয়ে হত্যা করায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত/০৩) এর ৪ (১)/৩০ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে সকল আসামিকে সর্বোচ্চ সাজা প্রদান করা হয়েছে।

রায়ে আরো বলা হয়, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা ও জরিমানার অর্থ আইন মোতাবেক আদায় করে ভিকটিমের বাবা-মা বরাবরে প্রদান করতে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ফেনীকে নির্দেশ প্রদান করা হয়। মামলার জব্দকৃত সকল আলামত রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। আলামত হিসেবে জব্দকৃত জেলখানার দর্শনার্থী রেজিস্ট্রার ফেনী জেলখানায় প্রেরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়। জব্দকৃত আলামত ছাই বিধি মোতাবেক ধ্বংস করা হোক। মৃত্যুদণ্ডাদেশের অনুমোদনের জন্য মামলার যাবতীয় কার্যক্রম হাইকোর্ট বিভাগে সত্বর প্রেরণ কার নির্দেশ দেয়া হয়। আসামিদের সাজা পরোয়ানা ইস্যু করার পাশাপাশি রায়ের অনুলিপি চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেল সুপারকে প্রেরণ করার জন্য বলা হয়েছে।

রায় পরবর্তী প্রতিক্রিয়া: রায় ঘোষণা শেষে ১১টা ৩০ মিনিট থেকে একে একে আসামিদের এজলাস থেকে বের করা হয়। এ সময় কান্নায় ভেঙে পড়ে আসামিরা। কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করে। ১১টা ৪৫ মিনিট সকল আসামিকে প্রিজনভ্যানে তুলে কারাগারে দিকে যাওয়ার চেষ্টা করে প্রিজনভ্যান। এ সময় ভ্যানের দু’পাশে আসামিদের স্বজনরা কথা বলার চেষ্টা করে। অনেক স্বজনকে ভ্যানের পাশে ঝুলতেও দেখা যায়। একপর্যায়ে প্রিজনভ্যানটি চলা শুরু করলে আসামির স্বজনরা ভ্যানের পেছন পেছন ছুটতে থাকে।

রাষ্ট্রপক্ষের জ্যেষ্ঠ কৌঁসুলি ও যুক্তিতর্কের বিজ্ঞ আইনজীবী আকরামুজ্জামন জানান, রাষ্ট্রপক্ষ প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে, আসামিরা নুসরাতকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে। সবমিলিয়ে আসামিদের অপরাধ প্রমাণ হওয়ায় সাজা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ এ রায়ে সন্তোশ প্রকাশ করছে।

তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বাদীপক্ষের কৌঁসুলি এম শাহজাহান সাজু রায়কে দৃষ্টান্তমূলক উল্লেখ করে বলেন, ৬২ কার্যদিবস শুনানির পর এই রায় দেয়া হয়েছে, যাকে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘নজিরবিহীন’ বলেছেন।
নুসরাতের ভাই মামলার বাদী মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, আসামিরা আদালত চত্বরে প্রকাশ্যে আমাদের হুমকি দিয়েছে। এছাড়াও বিভিন্ন মাধ্যমে তারা আমাদের হুমকি দিচ্ছে। অতীতের মধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন তাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করে সেই দাবিও জানান নোমান। এদিকে রায় ঘোষণার সময় কিংবা রায় ঘোষণার পরও আদালত প্রাঙ্গণে দেখা যায়নি মামলার প্রধান আসামি অধ্যক্ষ সিরাজের পক্ষে মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী ফরিদ উদ্দিন খাঁন নয়নকে।

আসামিদের কার কী ভূমিকা :

১. সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ না নিলেও, তার চেয়েও বেশি করেছেন। নুসরাতের যৌন হয়রানির মামলা তুলে নিতে চাপ প্রয়োগ, তাতে কাজ না হওয়ায় ভয়ভীতি দেখানো এবং পরে নুসরাতকে হত্যার জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়ার অভিযোগ আনা হচ্ছে তার বিরুদ্ধে।

২. নূর উদ্দিন নুসরাত হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিল। নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার আগে রেকি করা ছিল তার দায়িত্ব। আর ভবনের ছাদে আগুন দেয়ার সময় নিচে থেকে পুরো ঘটনার তদারকি করা ছিল তার দায়িত্ব।

৩. শাহাদাত হোসেন শামীম নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল। সেজন্য ছিল তার ক্ষোভ। হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নে কার কী ভূমিকা হবে সেই পরিকল্পনা সাজান শামীম। কাউন্সিলর মাকসুদের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নিয়ে তিনি তার বোরখা ও কেরোসিন কেনার ব্যবস্থা করেন। নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার সময় তিনি হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরেন। তার জবানবন্দির ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বোরখা ও কেরোসিন ঢালতে ব্যবহৃত গ্লাসটি উদ্ধার করে পিবিআই।

৪. সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা গ্রেপ্তার হলে ২৮শে মার্চ তার মুক্তির দাবিতে মানববন্ধনে অংশ নেন। বোরখা ও কেরোসিন কেনার জন্য তিনিই ১০ হাজার টাকা দেন। পিবিআই বলছে, পুরো ঘটনার আগাগোড়াই তিনি জানতেন।

৫. সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের বোরখা ও হাতমোজা পরে সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় জোবায়ের। নুসরাতের ওড়না ছিঁড়ে দুই ভাগ করে পা বাঁধা এবং কেরোসিন ঢালার পর ম্যাচ দিয়ে আগুন ধরানোর কাজটি সে করে।

৬. জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ বোরখা পরে হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয়। পা বাঁধা হলে পলিথিন থেকে কেরোসিন গ্লাসে ঢেলে সে নুসরাতের গায়ে ছিটিয়ে দেয়। সব কাজ শেষে বোরখা খুলে পরীক্ষার হলে ঢুকে যায়।

৭. হাফেজ আব্দুল কাদের নুসরাতের ভাই নোমানের বন্ধু কাদের সেদিন মাদ্রাসার মূল ফটকে পাহারায় ছিল। নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়া হলে দুই মিনিট পরে সে ফোন করে নোমানকে বলে, তার বোন গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে।

৮. আবছার উদ্দিন ঘটনার সময় গেটে পাহারায় ছিল। মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়াও তার দায়িত্ব ছিল।

৯. কামরুন নাহার মনি আসামি শামীমের দূর সম্পর্কের ভাগ্নি। মনি ২ হাজার টাকা নিয়ে দুটি বোরকা ও হাতমোজা কেনে। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেয়। ছাদের ওপর নুসরাতের হাত বাঁধা হলে তাকে শুইয়ে ফেলে বুকের ওপর চেপে ধরে মনি। আগুন দেয়া হলে নিচে নেমে এসে আলিম পরীক্ষায় বসে।

১০. উম্মে সুলতানা ওরফে পপি অধ্যক্ষ সিরাজের ভাগ্নি। সেদিন নুসরাতকে ডেকে ছাদে নিয়ে যায়। পরে মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। তাতে রাজি না হওয়ায় নুসরাতের ওড়না দিয়ে তার হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলে। নুসরাতকে ছাদে শুইয়ে চেপে ধরেন পা। নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়া হয়ে গেলে পপিও নিচে নেমে পরীক্ষার হলে বসে।

১১. আবদুর রহিম শরীফ ঘটনার সময় মাদ্রাসার ফটকে পাহারায় ছিল। পরে ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে প্রচার চালায়।

১২. ইফতেখার উদ্দিন রানা মাদ্রাসার মূল গেটের পাশে পাহারায় ছিল।

১৩. ইমরান হোসেন ওরফে মামুন  মাদ্রাসার মূল গেটের পাশে পাহারায় ছিলো।

১৪. মোহাম্মদ শামীম সাইক্লোন সেন্টারের সিঁড়ির সামনে পাহারায় ছিল।

১৫. মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সহ-সভাপতি রুহুল আমীন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা।  রুহুল আমীন শুরু থেকেই এ হত্যা পরিকল্পনায় ছিল। ঘটনার পর পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল সে। ঘটনার পর শামীমের সঙ্গে তার ফোনে কথা হয়। ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালানোর চেষ্টাতেও তার ভূমিকা ছিল।

১৬. মহিউদ্দিন শাকিল ঘটনার সময় সাইক্লোন সেন্টারের সিঁড়ির সামনে পাহারায় ছিল।

সেদিন যা ঘটেছিল: অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নুসরাতের শ্লীলতাহানির মামলায় মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ গ্রেপ্তার হলে তার অনুগত লোকজন ক্ষিপ্ত হয়। ১লা এপ্রিল শাহাদাত হোসেন শামীম, নূরু উদ্দিন, ইমরান, হাফেজ আবদুল কাদের ও রানা জেলখানায় গিয়ে সিরাজের সঙ্গে দেখা করে। তখনই অধ্যক্ষ সিরাজ তার মুক্তির চেষ্টা চালাতে এবং মামলা তুলে নিতে নুসরাতের পরিবারকে চাপ দিতে বলে।

হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের পরও মামলা না তোলায় আসামিরা আলোচনা করে ‘প্রয়োজনে যে কোনো কিছু’ করার পরিকল্পনা করে। কাউন্সিলর মাকসুদ এ কাজে শাহাদাত হোসেনকে ১০ হাজার টাকা দেয়। এর মধ্যে দুই হাজার টাকা দিয়ে মনি দুটি বোরকা ও চার জোড়া হাতমোজা কেনে।

৩রা এপ্রিল শামীম, নূর উদ্দিন, আবদুল কাদেরসহ কয়েকজন কারাগারে গিয়ে অধ্যক্ষ সিরাজের সঙ্গে দেখা করে। সিরাজ তখন নুসরাতকে ভয়ভীতি দেখানো এবং প্রয়োজনে পুড়িয়ে হত্যার নির্দেশ দেয় এবং ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালানোর নির্দেশ দেয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩রা এপ্রিল বিকালে মাদ্রাসার পাশে টিনশেড কক্ষে শাহাদাত হোসেন শামীম, নূর উদ্দিন, জোবায়ের, জাবেদ, পপি ও মনিসহ কয়েকজন বৈঠক করে। সেখানে নুসরাতকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

৪ঠা এপ্রিল রাতে মাদ্রাসার ছাত্র হোস্টেলে বসে আবারো পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করে আসামিরা। পরদিন ভূঁইয়া বাজার থেকে এক লিটার কেরোসিন কিনে নিজের কাছে রেখে দেয় শাহাদাত হোসেন শামীম।
৬ই এপ্রিল সকাল ৭টার পর মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে চলে যায় শাহাদাত হোসেন শামীম, নূর উদ্দিন ও হাফেজ আবদুল কাদের। সোয়া ৯টার মধ্যে আসামিরা পরিকল্পনা অনুযায়ী যার যার অবস্থানে চলে যায়। শাহাদাত হোসেন শামীম পলিথিনে করে আনা কেরোসিন অধ্যক্ষের কক্ষের সামনে থেকে একটি কাচের গ্লাস নিয়ে ছাদের বাথরুমের পাশে রেখে দেয়। মনির কেনা দুটি এবং বাড়ি থেকে নিয়ে আসা একটি বোরকা এবং চার জোড়া হাতমোজা নিয়ে সাইক্লোন সেন্টারের তৃতীয় তলায় রাখা হয়। শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ ও জোবায়ের সাড়ে ৯টার দিকে বোরকা ও হাতমোজা পরে তৃতীয় তলায় অবস্থান নেয়। নুসরাত পরীক্ষা দিতে এলে পরিকল্পনা অনুযায়ী উম্মে সুলতানা পপি তাকে মিথ্যা কথা বলে ছাদে নিয়ে আসে। নুসরাত ছাদে যাওয়ার সময় পপি তাকে ‘হুজুরের’ বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিতে চাপ দেয়। নুসরাত তাতে রাজি না হয়ে ছাদে উঠে যায়। মনি, শাহাদাত হোসেন শামীম, জোবায়ের, ও জাবেদও তখন নুসরাতের পিছু পিছু ছাদে যায়।

ছাদে তারা নুসরাতকে মামলা তুলে নিতে হুমকি দেয় এবং কয়েকটি কাগজে স্বাক্ষর দিতে বলে। নুসরাত স্বাক্ষর দিতে অস্বীকৃতি জানালে শামীম বাঁ হাত দিয়ে নুসরাতের মুখ চেপে ধরে এবং ডান হাত দিয়ে নুসরাতের হাত পেছনে নিয়ে আসে। উম্মে সুলতানা পপি তখন নুসরাতের ওড়না খুলে জোবায়েরকে দেন। জোবায়ের ওড়না দুই ভাগ করে ফেলে। পপি ও মনি এক অংশ দিয়ে নুসরাতের হাত পেছন দিকে বেঁধে ফেলে। অন্য অংশ দিয়ে নুসরাতের পা বেঁধে ফেলে জোবায়ের। জাবেদ পায়ে গিঁট দেয়। সবাই মিলে নুসরাতকে ছাদের ওপর শুইয়ে ফেলে। শাহাদাত তখন নুসরাতের মুখ ও গলা চেপে রাখে। নুসরাতের বুকের ওপর চাপ দিয়ে ধরে মনি। পপি ও জোবায়ের পা চেপে ধরে। জাবেদ বাথরুমে লুকানো গ্লাস নিয়ে এসে কেরোসিন ঢেলে দেয় নুসরাতের গায়ে। শাহাদাতের ইশারায় জোবায়ের ম্যাচ জ্বেলে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। আগুন ধরানোর পর প্রথমে ছাদ থেকে নামে জোবায়ের। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী মনি ‘ওরফে চম্পা/শম্পা’ বলে ডেকে পপিকে নিচে নিয়ে যায়। তারা নিচে নেমে পরীক্ষার হলে ঢুকে যায়। জাবেদ ও শাহাদাত হোসেন শামীম সাইক্লোন সেন্টারের তৃতীয় তলায় গিয়ে বোরকা খুলে ফেলে। তারপর জাবেদও পরীক্ষার হলে ঢুকে যায়। শাহাদাত হোসেন শামীম তার বোরকা ফেলে দেয় মাদ্রাসার পুকুরে। জোবায়ের মাদ্রাসার মূল গেট দিয়ে বের হয়ে যায় এবং বোরকা ও হাতমোজা ফেলে দেয় সোনাগাজী কলেজের ডাঙ্গি খালে।

এদিকে অগ্নিদগ্ধ নুসরাত জীবন বাঁচাতে দৌড়ে নিচে নেমে এলে কর্তব্যরত পুলিশ কনস্টেবল ও নাইটগার্ড তার গায়ের আগুন নেভায়। নূর উদ্দিনও ওই সময় নুসরাতের গায়ে পানি দেয়। আর হাফেজ আবদুল কাদের ফোন করে নুসরাতের ভাই নোমানকে বলে, তার বোন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতাল পরে ঢাকা মেডিকেলে আনা হয়। সেখানে চার দিন চিকিৎসা নিয়ে ১০ই এপ্রিল মারা যান নুসরাত। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুকালীন জবানবন্দি দেন নুসরাত। সেখানেও গায়ে আগুন দেয়ার ঘটনা তিনি একইভাবে বর্ণনা করেন বলে অভিযোগপত্রে তুলে ধরা হয়েছে।

নুসরাত হত্যা হামলার কার্যক্রম: গত ৮ই এপ্রিল নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান ৮ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ৪-৫ জনকে আসামি করে হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। নুসরাতের মৃত্যুর পর এটি হত্যা মামলায় পরিণত নেয়। এর আগে গত ৭ই এপ্রিল দগ্ধ নুসরাত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসকদের কাছে মৃত্যুকালীন জবানবন্দি (ডায়িং ডিক্লেরেশন) দেন। নুসরাত হত্যার মামলাটি তদন্ত প্রথমে করছিলেন সোনাগাজী থানার পরিদর্শক কামাল হোসেন। কিন্তু ওই থানার ওসিসহ পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নুসরাত হত্যাকাণ্ডের সময় গাফিলতির অভিযোগ উঠলে তদন্তভার আসে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ওপর। ১০ই এপ্রিল মামলাটির তদন্তভার পিবিআই গ্রহণ করে। ঘটনার পর সোনাগাজী মডেল থানা পুলিশ ও দায়িত্ব পাওয়ার পর পিবিআই বিভিন্ন সময় দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মামলায় এজাহার নামীয় ৮ জনসহ ২১ জনকে গ্রেপ্তার করে।

পিবিআই মামলা তদন্তের দায়িত্ব নেয়ার ৩৩ কার্যদিবস শেষে (মোট ৫০ দিনের মধ্যে) গত ২৯শে মে ফেনীর সিনিয়র বিচারিক হাকিম (আমলী আদালত সোনাগাজী) মো. জাকির হোসেনের আদালতে মোট ১৬ জনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও পিবিআই পরিদর্শক মো. শাহ আলম। ৮০৮ পৃষ্ঠার ওই অভিযোগপত্রে ‘হুকুমদাতা’ হিসেবে সোনাগাজীর ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে ১ নম্বর আসামি করা হয়। অভিযুক্ত ১৬ জন আসামির মধ্যে ১২ জন আসামি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিল। অভিযোগপত্রে সাক্ষী করা হয় ৯২ জনকে। এদের মধ্যে কার্যবিধির ১৬১ ধারায় ৬৯ জনকে সাক্ষী করা হয়। ৭ জন সাক্ষী ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিমূলক সাক্ষ্য দিয়েছিলেন। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রের সারমর্ম বিচারকের কাছে তুলে ধরেন। একই সঙ্গে হত্যার পরিকল্পনা, প্রস্তুতি, হত্যার সময়কালীন ঘটনার ডিজিটাল স্কেচও আদালতে তুলে ধরেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। পিবিআই অভিযোগপত্রে ১৬ আসামির সবার সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড চাওয়া হয়েছিল।

গত ৩০শে মে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে মামলাটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। গত ১০ই জুন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মামুনুর রশিদ আলোচিত এ মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ করে চার্জগঠনের জন্য ২০শে জুন ধার্য করে। অভিযোগপত্রে নাম না থাকায় ওই সময় গ্রেপ্তার পাঁচজনকে অব্যাহতি দেয়া হয়। নুসরাত হত্যা মামলার ৭২ দিনের মধ্যে গত ২০শে জুন ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল আদালত ১৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন (চার্জগঠন) করে সাক্ষ্যগ্রহণের জন্য ২৭শে জুন নির্ধারণ করে। গত ২৭শে জুন মামলার বাদী নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমানের সাক্ষ্য নেয়ার মধ্যে দিয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর পর টানা ৩৭ কর্মদিবসে নুসরাত হত্যা মামলায় ৯২ সাক্ষীর মধ্যে আদালতে বাদীসহ ৮৭ জন সাক্ষী সাক্ষ্য প্রদান করে। গত ২৭শে আগস্ট সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হলে গত ১১ই সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হয় যুক্তিতর্ক। রাষ্ট্রপক্ষ, আসামিপক্ষ ও বাদী পক্ষের যুক্তি তর্ক শেষে গত ৩০শে সেপ্টেম্বর বিচারক রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করে। এদিকে, অধ্যক্ষ সিরাজের বিরুদ্ধে প্রথম মামলায় নুসরাতের জবানবন্দি নেয়ার ভিডিও ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেয়ায় সোনাগাজী থানার তৎকালীন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ঢাকার বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালে আলাদা মামলা হয়েছে। এ মামলায় তিনি কারাগারে আছেন। এ ছাড়া ফেনীর তৎকালীন পুলিশ সুপারসহ আরো দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়।