Monday, February 9, 2015

চলচ্চিত্র শিল্প- চলচ্চিত্র আমদানি বিতর্ক ও নাবালকের ভয় by ফাহমিদুল হক

ভারতীয় ছবি আমদানি নিয়ে চলচ্চিত্রাঙ্গনে এখন বিতর্ক চলছে। প্রথম দফা এই বিতর্ক শুরু হয় ২০১০ সালে। সেবার তিনটি ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্র আমদানি করে বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়া হয়। আর চলমান বিতর্ক শুরু হয়েছে আমদানি করা চারটি হিন্দি চলচ্চিত্রের একটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়ার প্রেক্ষাপটে। উভয় ক্ষেত্রে আমদানিকারক পক্ষ হলেন চলচ্চিত্রের প্রদর্শকেরা, এঁরা প্রেক্ষাগৃহের মালিক। এর তীব্র বিরোধিতা করছে চলচ্চিত্র ঐক্য পরিষদ। পরিষদে আছেন চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক ও কলাকুশলীরা। তাঁরা মনে করছেন, ভারতীয় চলচ্চিত্র বাণিজ্যিকভাবে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলে বাংলাদেশের রুগ্ণ চলচ্চিত্রশিল্প ধ্বংস হয়ে যাবে। তাঁরা মানববন্ধন করেছেন, প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন, গায়ে কাফন জড়িয়ে মিছিল করেছেন, হলে হলে গিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন, হিন্দি চলচ্চিত্রের ব্যানার ছিঁড়েছেন। এই ডামাডোলে তথ্যমন্ত্রীর দেওয়া প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ঐক্য পরিষদ তাদের আন্দোলন আপাতত স্থগিত করেছে।
বাংলাদেশে কেবল দুটি দেশের চলচ্চিত্র আমদানি নিষিদ্ধ—ভারত ও পাকিস্তান। ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার কয়েক দিন পর পাকিস্তান সরকার ভারতীয় চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ করে। আবার ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার উর্দু বা পাকিস্তানি চলচ্চিত্র নিষিদ্ধ করে। ১৯৬৫ ও ১৯৭২ সালের এই দুই নিষেধাজ্ঞা এখন পর্যন্ত বলবৎ আছে। বাংলাদেশে আমেরিকার ইংরেজি চলচ্চিত্র নিয়মিতই আসছে, তবে তার প্রদর্শনী স্টার সিনেপ্লেক্স ও যমুনা ব্লকবাস্টারের মধ্যে সীমিত থাকে। বলা যায়, হলিউডের চলচ্চিত্রের ব্যাপক দর্শক আমাদের দেশে নেই। এর আগে হংকংয়ের চলচ্চিত্রও এ দেশে আসত, তবে এখন আর আসে না। এই প্রেক্ষাপটে বিদেশি চলচ্চিত্রের এ দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির বিতর্কটি একেবারেই ভারতীয় চলচ্চিত্রকে ঘিরে আবর্তিত।
ঘটনাক্রমে স্পষ্ট যে বর্তমান সরকার ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানির ব্যাপারে উদার। তবে এটা স্পষ্ট নয় যে কোন আইনবলে ইন উইন এন্টারপ্রাইজ (মধুমিতা) ২০১০ সালে তিনটি বাংলাভাষী চলচ্চিত্র আমদানির জন্য ঋণপত্র খুলতে সমর্থ হয়েছিল। আন্দোলনের মুখে সরকার ২০১০ সালের ১৪ জুন ভারতীয় উপমহাদেশীয় চলচ্চিত্র আমদানি করার ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে। আমদানিকারকেরা এরপর আদালতের দ্বারস্থ হন। এই পর্যায়ে তিনটির জায়গায় ১২টি চলচ্চিত্রের ঋণপত্র খোলার কথা শোনা যায় এবং আদালতের আদেশবলে জানুয়ারিতে সেই ১২টির মধ্য থেকে চারটি হিন্দি চলচ্চিত্র আমদানি করে, ওয়ান্টেড চলচ্চিত্রটি ৫০টি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, এ রকম একটি আদেশও আছে যে বাংলাদেশের কোনো আমদানিকারক ভারতীয় চলচ্চিত্র আনতে পারবেন,
সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একটি চলচ্চিত্রকে ভারতে মুক্তি দিতে হবে। এই নিয়মের আওতায় করপোরেট প্রতিষ্ঠান অটবি ভারতীয় চলচ্চিত্র রোর স্টার সিনেপ্লেক্সে মুক্তি দিয়েছিল, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ‘বৈষম্য’ মহারাষ্ট্রের এক প্রত্যন্ত প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি দেওয়ার মাধ্যমে।
পরিস্থিতি এই, প্রদর্শকেরা হিন্দি চলচ্চিত্র আমদানির মাধ্যমে তঁাদের প্রেক্ষাগৃহগুলো রক্ষা করতে উৎসাহী। কারণ, স্থানীয় চলচ্চিত্রশিল্প রুগ্ণ হয়ে পড়ায় প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা ১ হাজার ২০০ থেকে কমে ৩৫০-এ নেমেছে এবং এই কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহ চালু রাখতে যে সংখ্যক ও মানের চলচ্চিত্র প্রয়োজন, তা আর নির্মিত হচ্ছে না। সরকারও নানা ইঙ্গিতে জানাচ্ছে যে ভারতীয় ছবি আমদানির ব্যাপারে তারা ইতিবাচক, তবে এ-সংক্রান্ত যথাযথ আইনকানুন-নীতিমালা গড়ে তুলতে সচেষ্ট নয়। আর এফডিসিকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র নির্মাণপ্রক্রিয়ার সঙ্গে যারা সরাসরি যুক্ত, তারা এর তীব্র বিরোধী। সচেতন মহল এবং এফডিসির বাইরের চলচ্চিত্র চর্চাকারীদের সমর্থনও তারা পাচ্ছে।
আপাতত ভারতীয় চলচ্চিত্র আমদানির ব্যাপারটা স্থগিত হয়ে যাচ্ছে। আমাদের চলচ্চিত্রশিল্প যখন ঘুরে দাঁড়ানোর কষ্টকর কাজটি করছে, সরকার নানা প্রণোদনার মাধ্যমে সহায়তা দেওয়ার চেষ্টা করছে, তখন বড় বাজেটের হিন্দি চলচ্চিত্র এই মুহূর্তে আমদানি করার প্রয়োজন হয়তো নেই। কিন্তু বিষয়টি চিরকালীন সুবিধা প্রদানের মতো হলে চলবে না।
নিজেদের গুছিয়ে নিয়ে, একটা কার্যকর নীতিমালা গঠন করে, একসময় এটা খুলে দিতেই হবে। এই আটকে রাখার বিষয়টির পেছনে খুব বেশি যৌক্তিক কারণও নেই। একজন দর্শকের অধিকার রয়েছে প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে বিভিন্ন ভাষার, বিভিন্ন স্বাদের চলচ্চিত্র আস্বাদনের। সুদূর আমেরিকার চলচ্চিত্র এ দেশে আসতে পারলে প্রতিবেশী দেশের চলচ্চিত্র কেন আসতে পারবে না? ভারতীয় বই আসতে পারলে চলচ্চিত্র কেন আসতে পারবে না? আর এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল পাকিস্তান সরকারপ্রধান আইয়ুব খান। কিন্তু ২০০৬ সাল থেকে পাকিস্তানেই ভারতীয় চলচ্চিত্র চলছে। নেহাত পাকিস্তানের জন্য অবমাননাকর চলচ্চিত্র তারা আটকে দেয়।
একটা যুক্তি আছে যে বড় বাজেটের হিন্দি চলচ্চিত্র এ দেশের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলে আমাদের রুগ্ণ চলচ্চিত্রের যতটুকু অস্তিত্ব রয়েছে, তা-ও ধ্বংস হয়ে যাবে। এটা যে অনিশ্চয়তাজনিত ভীতি, তা পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটটি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হবে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর ২০১৪ সালের ২০ মার্চের একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০০৫ সালে সেখানে মাত্র ২০টি প্রেক্ষাগৃহ ছিল। কিন্তু প্রতিবেদন লেখার সময় প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৪, এবং আরও ১০০টি প্রেক্ষাগৃহ শিগগিরই আসছে। বিভিন্ন বড় শহরে মাল্টিপ্লেক্স তৈরি হচ্ছে। আর স্থানীয় চলচ্চিত্র নির্মাণেও একটা পরিবর্তন এসেছে। ২০১৩ সালে সাতটি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছিল। ২০১৪ সালে নির্মিত হচ্ছিল ২৫টি চলচ্চিত্র। ২০০৬-পরবর্তী সময়েই পাকিস্তান ৫০ বছরের মধ্যে প্রথম অস্কারে পাঠিয়েছে জিন্দা ভাগ (২০১৩) চলচ্চিত্রটি। এই সময়কালেই নির্মিত হয়েছে পাকিস্তানের ইতিহাসে রেকর্ড ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র ওয়ার (২০১৩)। আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত চলচ্চিত্র খুদা কে লিয়ে (২০০৭) কিংবা ব্যতিক্রমী চলচ্চিত্র বোল (২০১১) এই সময়কালেই নির্মিত। বলা যায়, ভারতীয় চলচ্চিত্র পাকিস্তানি চলচ্চিত্রকে ধ্বংস করতে পারেনি, বরং পরিবর্তনে পরোক্ষ ভূমিকা রেখেছে।
আমাদের দেশে চলমান বিতর্ক থেকে এই উপলব্ধিতে আমরা পৌঁছাতে পারছি যে প্রদর্শক-কলাকুশলী-সরকার—তিনটি পক্ষকেই তাদের অবস্থান নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। এটা তো ঠিকই যে প্রেক্ষাগৃহ না বাঁচলে চলচ্চিত্রও বাঁচে না। কিন্তু প্রদর্শকেরা প্রায়ই নিছক বেনিয়াদের মতো আচরণ করেন। তাঁদের মধ্যে চলচ্চিত্র ব্যবসাকে নিজেদের কবজায় রাখার মানসিকতা দেখা যায়। অনেক শিল্পসম্মত ও স্বাধীন চলচ্চিত্রকে তাঁরা নির্দয়ভাবে প্রেক্ষাগৃহ থেকে নামিয়ে দিয়েছেন। এই অভিযোগের পেছনে সত্যতা আছে যে তাঁরা প্রযোজকের প্রাপ্য অর্থ ফেরত দেন না, নানা ফাঁকিতে টিকিট বিক্রির বড় অংশ নিজেদের পকেটস্থ করেন। আবার যখন পরিচালক-কলাকুশলীরা আন্দোলন করছেন, তাঁরা ওঁদের ছবি না চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন। এটা একধরনের পেশিশক্তি প্রদর্শনের মনোভাব। কেবল মারদাঙ্গা হিন্দি চলচ্চিত্র আমদানির মধ্যে সীমিত না থেকে তঁাদের দৃষ্টিকে প্রসারিত করতে হবে। তঁাদের জানা দরকার যে ছোট ছোট ঘটনার পারিবারিক কাহিনির ইরানি চলচ্চিত্র কিংবা কোরীয় থ্রিলার চলচ্চিত্রের দর্শক এ দেশে রয়েছে।
আর পুরো ব্যাপারটি সরকারকে পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করতে হবে। যে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের টেলিভিশন চ্যানেল পশ্চিমবঙ্গে দেখা যায় না, সে ক্ষেত্রে এ রকম একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় দ্বিপক্ষীয় স্বার্থের বিষয়টি সমুন্নত রাখতে হবে। আমদানির ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা থাকতে হবে। চীনে বছরে ২০টি বিদেশি ছবি আমদানি হয়, সেন্সর-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় সেসব ছবিকে। বাংলাদেশেও বিদেশি চলচ্চিত্রের আমদানির ক্ষেত্রে সংখ্যাটি সীমিত রাখতে হবে। আর কোনো প্রেক্ষাগৃহ যেন একচেটিয়াভাবে বিদেশি চলচ্চিত্র না দেখাতে পারে, সে জন্য নীতিমালায় বলা থাকতে হবে, দেশি-বিদেশি চলচ্চিত্রের শতকরা হার কত হবে। আর সব ধরনের চলচ্চিত্রই আসতে দেওয়া উচিত হবে না। অপেক্ষাকৃত উন্নত রুচির ও উন্নত নির্মাণশৈলীর চলচ্চিত্রকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত।
জাতীয় একটি কমিটি থাকতে পারে, যার সদস্যরা সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। করারোপের মধ্য দিয়ে বিদেশি ও দেশি চলচ্চিত্রের টিকিটের মূল্যের একটা ব্যবধানও রাখতে হবে। একজন চলচ্চিত্রামোদীর সেই উত্তেজনাকর সুযোগ পাওয়ার অধিকার আছে যে মুম্বাই ও ঢাকার প্রেক্ষাগৃহে একই দিনে মুক্তি পাবে পিকের মতো চলচ্চিত্র। আজ না হোক, ভবিষ্যতে এই সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। আমরা আশা করতে চাই, তত দিনে স্থানীয় চলচ্চিত্রেরও দৃশ্যপট পাল্টাবে। দশকের পর দশক পূর্ণ প্রটেকশন পেয়ে ‘প্রলম্বিত শৈশব’-এ আটকে থাকা বাংলাদেশের চলচ্চিত্রও ক্রমেই সাবালক হয়ে উঠবে, সে ভারতীয় চলচ্চিত্রের উপস্থিতিকে আর ভয় পাবে না। সে ক্ষেত্রে হিন্দি ও তামিল চলচ্চিত্রের ব্যর্থ অনুকরণ না করে বাস্তবসম্মত ও নিজ ঐতিহ্যনির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণের দিকে মনোযোগ ফেরাতে হবে।
আমাদের মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যবসাসফল চলচ্চিত্র রূপবান (১৯৬৫), বেদের মেয়ে জোসনা (১৯৮৯) ও মনপুরা (২০০৯)। তিনটির কাহিনিতেই দেশ ও মাটির গন্ধ লেপ্টে রয়েছে।
ফাহমিদুল হক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক এবং চলচ্চিত্র গবেষক।

রাতে বাসশূন্য মহাসড়ক

সরকারি নির্দেশনায় রাতে মহাসড়কে দূরপাল্লার বাস চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগের তুলনায় মাত্র ৫ শতাংশ বাস গতকাল রোববার সন্ধ্যার পর বিভিন্ন টার্মিনাল থেকে ছেড়ে গেছে। এদিকে আজ আবারও পরিবহন মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল।
গতকাল রাজধানীর গাবতলী টার্মিনাল থেকে দুুপুর ২টার পর উত্তরবঙ্গের বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুর এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের বরিশাল, খুলনা, যশোরসহ আশপাশের জেলার উদ্দেশে কোনো বাস ছাড়েনি। তবে বিকেল ৫টা পর্যন্ত ঢাকা থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলা ফরিদপুর, মাদারীপুরের বাস ছেড়ে গেছে। মূলত, বিকেল ৫টার পর এই টার্মিনাল থেকে আর কোনো বাস ছাড়েনি বলে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে মহাখালী টার্মিনাল থেকে সন্ধ্যা ৭টার পর আর কোনো বাস ছাড়েনি। সায়েদাবাদ থেকে দুপুর ২টার পর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেটগামী কোনো বাস ছাড়েনি। তবে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কুমিল্লা, চাঁদপুর, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর অঞ্চলের বাস ছেড়ে গেছে। সন্ধ্যা ৬টার পর আর কোনো বাস ছাড়েনি।
রাতে বাস না চালানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের একজন কেন্দ্রীয় নেতা জানান, সরকারি বাধ্যবাধকতা হচ্ছে, ঢাকা থেকেই ছেড়ে যাক বা অন্য কোনো জেলা থেকে ঢাকায় ফিরে আসুক উভয় বাসই রাত ৯টার মধ্যে গন্তব্যে পেঁৗছাতে হবে। এ কারণে রাত ৯টার মধ্যে গন্তব্যে পেঁৗছা যাবে_ এমন সময় হাতে নিয়েই বিভিন্ন রুটের সর্বশেষ বাস ছাড়ছে। তবে বিকেল ৫টার পর গাবতলী টার্মিনাল থেকে এবং সন্ধ্যা ৬টার পর সায়েদাবাদ টার্মিনাল থেকে প্রধান প্রধান রুটের কোনো বাসই ছাড়েনি। ৪ থেকে ৫ শতাংশ মালিক আছেন যারা সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে রাত ৯টার পরও বাস ছেড়েছেন। এ সংখ্যা খুবই নগণ্য এবং তাদের বাসের অবস্থা, সার্ভিস কোনোটাই ভালো নয়।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েতুল্ল্যা সমকালকে জানান, মহাখালী টার্মিনাল থেকে সর্বশেষ বাস ক'টায় ছাড়বে, সে ব্যাপারে রোববার পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। আজ স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর বিষয়টি চূড়ান্ত করা হবে। তবে মহাখালী টার্মিনালে এনা পরিবহনের ম্যানেজার পুলক চন্দ্র দাস সমকালকে জানান, সন্ধ্যা ৭টার পর ঢাকা-ময়মনসিংহ এবং ঢাকা-টাঙ্গাইল রুটে মহাখালী টার্মিনাল থেকে কোনো বাস ছেড়ে যায়নি।
মহাখালী টার্মিনাল কমিটির একজন নেতা জানান, বিকেল ৫টার পর বগুড়া, রংপুর, গাইবান্ধা, নওগাঁর কোনো গাড়ি ছাড়েনি। সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ছাড়ে সিরাজগঞ্জগামী বাস। এই নেতা জানান, এক অর্থে সন্ধ্যার পর মহাসড়কে বাস চলাচল বন্ধই রয়েছে।
স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সমকালকে বলেন, 'অব্যাহত নাশকতার কারণে জানমালের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করেই রাতে বাস চলাচল বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি খুবই সাময়িক ব্যবস্থা। যে কোনো সময় এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হতে পারে।'
গত ৫ জানুয়ারির পর রাতে মহাসড়কে অবরোধ-হরতালকারীদের পেট্রোল বোমায় রংপুরের মিঠাপুকুর, গাইবান্ধা ও কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে ২১ জন দগ্ধ হয়ে প্রাণ হারান। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে অবরোধকারীদের আগুন হামলা রাতেই বেশি হচ্ছে। এ কারণে গত শনিবার থেকে রাত ৯টার পর মহাসড়কে বাস না চালানোর নির্দেশনা দেয় সরকার।

‘অবৈধ সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে’

অবৈধ সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ। গণামধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা জানান।  অবৈধ ক্ষমতা হারানোর ভয়ে প্রধানমন্ত্রী উন্মাদ হয়ে গেছেন মন্তব্য করে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, উচ্চ আদালত কর্তৃক ‘রংহেডেড’ উপাধিপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা অন্যকে উন্মাদ অভিহিত করা রাজনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত ও ‘পাগলের আপন প্রলাপ’ বলে জাতি মনে করে। এ জাতীয় বাক্যবাণ প্রয়োগ থেকে বিরত থাকার জন্য আমরা তাকে সবিনয়ে আহবান জানাই। তিনি বলেন, রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতির দায় সম্পূর্ণভাবে অবৈধ ক্ষমতাসীনদেরকেই নিতে হবে। ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে জবরদস্তি ক্ষমতায় থাকার স্বপ্নসাধ গণআন্দোলনে ধূলিস্যাৎ হয়ে যাবে শিগগিরই। বিএনপির এই যুগ্ম মহাসচিব বলেন, বুদ্ধিবৃত্তিক আলস্য বা প্রতিবন্ধিত্বের কারণে আওয়ামী লীগ নেত্রীর নিজের সৃষ্ট রাজনৈতিক সংকটকে আইনশৃঙ্খলা সমস্যা হিসাবে আখ্যায়িত করাকে জাতি প্রধানমন্ত্রীর মানসিক বৈকল্য ছাড়া আর কিছুই মনে করে না। তিনি ইদানীং প্রায়ই বলে থাকেন, জনগণের জানমালের নিরাপত্তার জন্য যা যা করার দরকার তিনি তাই করবেন। সমগ্র জাতি আজ আপনার ও আপনার সরকারের পদত্যাগ চায়। আপনি দয়া করে এই কাজটি করলেই জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। তিনি বলেন, গণবাহিনীর সাবেক অধিনায়ক হটকারী বিপ্লবী ইনু সাহেবরা মুজিব হত্যার স্বঘোষিত পরিকল্পনাকারী ও মুজিব হত্যার পরবর্তীতে মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে নৃত্য উল্লাস করে বর্তমানে মুজিব ভক্তের খাতায় নাম লিখিয়েছেন। এজাতীয় রাজনৈতিক বারবনিতা ও দানবের কাছে জাতি মানবীয় শবক শুনতে চায় না। আপনার সারমেয় বাক্যবাণ বন্ধ করুন, জাতির কাছে অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করুন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনার গণতন্ত্রে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তমের ফুটপাথেও বসার অধিকার নেই। ভিন্নমত পোষণকারীদের বিরুদ্ধে দলননীতি অবলম্বন করাই আওয়ামী রাজনীতির রোডম্যাপ। জাতির বরেণ্য এবং জ্যেষ্ঠ নাগরিকদেরকে উপুর্যপরি অবজ্ঞা ও অপমান করেছে আওয়ামী লীগ নেত্রী । নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অসম্মান ও অপদস্থ করে বিশ্বের দরবারে দেশকে অপমানিত করা হয়েছে। সম্প্রতি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ বরেণ্য নাগরিক প্রফেসর এমাজউদ্দীন আহমদের বাসায় গুলি বর্ষণের ঘটনায় আমরা তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের আহবান জানাই। সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, সরকার পেট্রল বোমা হামলাসহ বিভিন্ন নাশকতার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনকে কলুষিত করে বিরোধী জোটের নেতা-কর্মীদের ওপর এর দায় চাপিয়ে আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে চায়। সরকার পরিচালিত ও প্রযোজিত একই রকম নাটকের অংশ হিসেবে গতকাল চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকার যুবলীগের কার্যালয় থেকে বিপুল পরিমাণ পেট্রল বোমা উদ্ধার করা হয়েছে। যার সচিত্র প্রতিবেদন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। অথচ সরকারদলীয় কাউকেই গ্রেপ্তার করা হয়নি। সুতরাং জাতির কাছে এটা পরিষ্কার যে, এসব নাশকতার সঙ্গে কারা জড়িত। তিনি বলেন, প্রতিদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কতিপয় দলবাজ কর্মকর্তার নৃশংসতায় আন্দোলনকারী নেতাকর্মীদের লাশের স্তূপ উঁচু হচ্ছে। গুম-খুন-অপহরণ, গণগ্রেপ্তারে সারা দেশের অবস্থা বিস্ফোরন্মুখ। আমি এখনও দলবাজ সেইসব কর্মকর্তাদের আহবান জানাই- অবৈধ সরকারকে টিকিয়ে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করবেন না। অবৈধ সরকারি আদেশ আপনারা মানতে বাধ্য নন। জনগণের বিপক্ষ শক্তি হিসেবে নিজেদের দাঁড় করাবেন না। বিজাতীয় শত্রুর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন না। তিনি বলেন, গণতন্ত্র মুক্তি আন্দোলনের বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত চলমান অনির্দিষ্টকালের শান্তিপূর্ণ অবরোধ কর্মসূচির পাশাপাশি চলমান সর্বাত্মক হরতাল শান্তিপূর্ণভাবে পালন করতে  খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ দেশবাসীকে উদাত্ত আহবান জানাচ্ছি। গণবিরোধী অবৈধ সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত শান্তিপূর্ণ আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।

সংকট এক দিনেই অবসান হতে পারে: খোকা

বিরোধী জোটের সঙ্গে সংলাপে সরকার রাজি হলে দেশে চলমান সংকট এক দিনেই অবসান হতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকা। গতকাল রোববার নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে এ মন্তব্য করেন খোকা।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়া যে সাত দফা প্রস্তাব দিয়েছেন, এর ভিত্তিতে আলোচনা সম্ভব। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপের ব্যাপারে কোনো আগ্রহ প্রকাশ করেননি।
সাদেক হোসেন খোকা বলেন, বিরোধী জোটের সঙ্গে সরকার সংলাপে রাজি হলে চলতি সংকট এক দিনেই অবসান হতে পারে।
সংলাপের প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিএনপির এই নেতা বলেন, শীর্ষ পর্যায়ে আলাপ-আলোচনার আগে বিশেষজ্ঞ পর্যায়ে আলোচনা শুরু হতে পারে। বিরোধী জোটের প্রতিনিধি ছাড়াও ওই আলোচনায় সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গ অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। আলোচনা সরাসরি ও উন্মুক্ত পরিবেশে হতে পারে। তা জাতীয় টেলিভিশনে সম্প্রচার করা যেতে পারে বলেও মত দেন তিনি।
সাদেক হোসেন খোকা বলেন, ‘আমরা যেকোনো আলোচনায় প্রস্তুত আছি। আমরা এ কথা বলি না—কালই হাসিনাকে ক্ষমতা ত্যাগ করতে হবে এবং আমরা অবিলম্বে ক্ষমতা দখল করব। আমরা চাই সুস্থ গণতান্ত্রিক অবস্থা ফিরে আসুক। সেই প্রক্রিয়ায় যদি শেখ হাসিনা অথবা অন্য কোনো শক্তি ক্ষমতায় আসে, আমরা তা মেনে নেব।’
সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন বিএনপির এই নেতা। তাঁর অভিযোগ, পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর উগ্র-দলবাজ সদস্যদের শান্তিপ্রিয় জনগণের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের নাম উল্লেখ করে তাঁদের নিবৃত্ত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘রাষ্টীয় বাহিনীর পোশাক পরিহিত এসব ব্যক্তির ব্যাপারে প্রয়োজনীয় তথ্য জনগণ সংগ্রহ করে রাখছে এবং সময়মতো সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এসএসসি পরীক্ষার মধ্যেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে সাদেক হোসেন খোকা শিক্ষার্থীদের অসুবিধার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, এসব ছাত্রছাত্রীর পরিবারের বড় একটা অংশ বিরোধী দলের আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল।
খোকার ভাষ্য, সরকার এসএসসি পরীক্ষাকে একটি ‘ইনস্ট্রুমেন্ট’ হিসেবে ব্যবহার করছে, যাতে বিরোধী দল বেকায়দায় পড়ে এবং আন্দোলনে ক্ষান্ত দেয়।
বিএনপির এই ভাইস চেয়ারম্যান দাবি করেন, বিশ্ব ইজতেমার সময়ও আন্দোলন অব্যাহত ছিল। সব অসুবিধা সত্ত্বেও ইজতেমার নেতারা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিলেন।
ব্যক্তিগত চিকিৎসার জন্য খোকা বর্তমানে নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। তিনি জানান, নিউইয়র্কের বিখ্যাত ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র স্লোন ক্যাটারিং হাসপাতালে তাঁর ‘ওরালকেমোথেরাপি’ শুরু হয়েছে। কত দিন এই চিকিৎসা চলবে—তা জানাতে পারেননি তিনি।

সংকট উত্তরণের চাবি দুই নেত্রীর হাতে by ইফতেখারুজ্জামান

বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক জোটের টানা অবরোধ, নিয়মিত হরতাল ও সেই সঙ্গে নাশকতা চালিয়ে মানুষ হত্যার ঘটনায় এক চরম অনিশ্চিত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশ। এই পরিস্থিতি উত্তরণের পথ নিয়ে মতামত দিয়েছেন ইফতেখারুজ্জামান। দেশের বিশিষ্ট নাগরিকেরা এই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পরিস্থিতিতে সংকট নিরসনে যে জাতীয় সংলাপের আহ্বান জানিয়েছেন, তা আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। এই উদ্যোগকে স্বাগত জানানো উচিত। একই সঙ্গে যাঁরা এই সংকট নিরসন করতে পারেন, তাঁদেরও এ উদ্যোগকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত। এখন তাঁদের পরীক্ষা দেওয়ার সময় এসেছে, তাঁদের ক্ষমতায় থাকার বা ক্ষমতায় যাওয়ার রাজনীতি আসলে কতটা জনস্বার্থমুখী। সাম্প্রতিক মর্মান্তিক জাতীয় পরিস্থিতিই এই পরীক্ষার তাগিদ সৃষ্টি করে রেখেছে। তবে যত দিন যাচ্ছে, ততই এর প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিষয়টা আমলে নিলে তাঁদের লাভ বৈ ক্ষতি হবে না।
এটা ভালো যে দেশের নাগরিকেরা এই সংকট নিরসনে নাগরিক চাহিদার সৃষ্টি করেছেন। অনেক কথাই তো হচ্ছে—সংলাপ, আলোচনা ও সমঝোতা। কিন্তু কথা হচ্ছে, এই সমস্যার চাবিকাঠি রয়েছে দেশের দুই প্রধান নেত্রীর হাতে। তাঁদের মনে যদি এই উপলব্ধি আসে যে, না অনেক হয়েছে, এখন এই হানাহানির ইতি ঘটানো উচিত। এমন উপলব্ধি এলেই কেবল তাঁরা সংলাপ ও সমঝোতার এসব উপায়ের সদ্ব্যবহার করতে পারবেন।
এবার একটু আবেগের কথা বলি। দেশের ৬৪টি জেলা থেকে ৩২ জন ছাত্র ও ৩২ জন ছাত্রীকে দৈবচয়নের ভিত্তিতে বাচাই করে দুই নেত্রীকে তাঁদের মুখোমুখি করা হোক। এতে তাঁরা দেশের তরুণদের কথা সরাসরি শুনতে পারবেন এবং অবশ্যই বুঝতে পারবেন। সেই প্রক্রিয়ায় কোনো নাগরিক, রাজনীতিবিজ্ঞানী—কারও ভূমিকার প্রয়োজন নেই। তাঁরা নিজেরাই শুনবেন, বুঝবেন এবং সেই অনুসারে ব্যবস্থা নেবেন। জাতির সবচেয়ে নিরীহ ও সজীব অংশের মুখোমুখি হওয়ার সৎ সাহস তাঁদের আছে কি না, সেটাই প্রশ্ন। তবে এটা হলে সবচেয়ে ভালো হতো।
দুই নেত্রীরই এটা মাথায় রাখতে হবে যে এই অবস্থা বেশি দিন চলতে থাকলে রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ তাঁদের বাইরে চলে যেতে পারে। তাঁরা যে অগণতান্ত্রিক পরিবেশের সৃষ্টি করছেন, তাতে দেশে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের জন্ম হতে পারে। সেই কথা ভেবেও তাঁদের অনড় অবস্থান থেকে সরে আসা উচিত। সংকট উত্তরণের চাবিকাঠি তাঁদের হাতেই।
কথা হচ্ছে, বিরোধী দলকে সহিংস পথ থেকে সরে আসতে হবে। তাদের স্বীকার করতে হবে, এই পথ ভুল ছিল। তাদের বলতে হবে, এই সহিংসতার সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসা হোক। আমরা এটা সমর্থন করি না। মোদ্দা কথা, তাদের গঠনমূলক ইতিবাচক রাজনীতিতে ফিরে আসতে হবে। এরপর ছয় মাস তারা আত্মবিশ্লেষণ করবে। এই রাজনীতি ছেড়ে তাদের রাজনীতির মূল পুঁজির দ্বারস্থ হতে হবে। সেটা হচ্ছে জনসমর্থন। তাদের তো জনসমর্থন আছে, এটা ভুলে যাওয়া চলবে না। সেই পুঁজি ভাঙিয়ে তাদের রাজনীতি করা উচিত। সেই পথে যেতে হলে তাদের পরবর্তী নির্বাচনের জন্য কর্মসূচি ঠিক করতে হবে। সেই কর্মসূচি অনুসারে তাদের অগ্রসর হতে হবে। নইলে বর্তমান ধারায় চলতে থাকলে তা আমাদের সবার জন্য আত্মঘাতী হবে।
আর সরকারকে আগামী নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করতে হবে। অন্তত ছয় মাস আগে তা ঘোষণা করতে হবে। এরপর তাদের ওপর আরেকটি গুরুদায়িত্ব বর্তায়। সেটা হচ্ছে, নির্বাচন যাতে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে তাদের। এর জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারও করতে হবে। প্রয়োজন হলে নির্বাচন কমিশনকে আরও শক্তিশালী করতে সংস্কার প্রস্তাব আনা যেতে পারে। নির্বাচনকালীন প্রশাসনিক ব্যবস্থা কেমন হবে, তার রূপরেখা নির্ধারণ করতে আলোচনা হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারকে আরও কিছু বিষয় নিশ্চিত করতে হবে: ১) সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া বিরোধী দলের সব নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা তুলে নিতে হবে। ২) বিচারবহির্ভূত হত্যার বিচার ও সহিংসতায় দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। সরকারকে দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সবাই গেঁা ধরে বসে থাকলে তো হবে না।
তবে এগুলো সব স্বল্পমেয়াদি কর্মসূচি। আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির উত্তরণে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। যেমন: আমাদের রাজনীতিক, নাগরিক সমাজ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সাংবাদিক—সবাইকে নিয়ে একটি জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা যেতে পারে, যে কমিশনের দায়িত্ব হবে জনস্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে কীভাবে রাজনীতি করা যায়, সে পথ খুঁজে বের করা। এতে দেশের নাগরিক সমাজ আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে বলে আমার বিশ্বাস।
কথা হচ্ছে, এই দীর্ঘ মেয়াদে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা আমাদের রাজনীতির জন্য সুখকর নয়। আমাদের প্রধান দুই দল হয়তো মনে করছে, সাময়িকভাবে তারা একে অপরকে ঘায়েল করতে সক্ষম হয়েছে। কিন্তু পেট্রলবোমা, সহিংসতা ও সহনশীলতার অভাব যে শেষমেশ ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে উঠতে পারে, সে বিষয়ে আমাদের গভীরভাবে ভাবতে হবে। কিছুদিন আগে ঢাকায় আইএসের কয়েকজন নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিষয়ে আসলে কী করা হয়েছে, তা আমরা জানি না। এ অবস্থা আরও কিছুদিন চললে আত্মঘাতী বোমা হামলাও হতে পারে। এমন অবস্থা তৈরি করার চক্রান্ত শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও রয়েছে। আমাদের সতর্ক হতে হবে, নিজেদের অস্তিত্বের স্বার্থেই।
ইফতেখারুজ্জামান: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক।

দিল্লি নির্বাচন : নজরে ১৯ ভিআইপি প্রার্থীর জয়-পরাজয়

ভারতের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ হবে আগামীকাল ১০ ফেব্রুয়ারি। ৭০ আসনের বিধানসভায় ইতোমধ্যেই নির্বাচনের পরে বুথ ফেরত জরিপে আম আদমি পার্টি (আপ) সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসবে বলে আভাস দেয়া হয়েছে।
ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপিকে এখানে পরাজয়ের মুখ দেখতে হবে বলে মনে করা হচ্ছে। আপ ৪৩টি, বিজেপি ২৬ এবং কংগ্রেস ১টি আসন পাবে বলে এবিপি হিন্দি নিউজ টিভি চ্যানেল জরিপে বলা হচ্ছে।  যেসব বিশিষ্ট ব্যক্তিরা নির্বাচনে লড়ছেন তাদের মধ্যে ১৯ জনের জয়-পরাজয় নিয়ে আভাস দেয়া হয়েছে বুথ ফেরত জরিপে।
এবিপি নিউজ এবং নিয়েলসন-এর জরিপে বলা হয়েছে, ভিআইপি প্রার্থীদের মধ্যে আম আদমি পার্টির নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল এবং বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী কিরণ বেদি জয়লাভ করবেন। অরবিন্দ কেজরিওয়াল দাঁড়িয়েছেন নয়াদিল্লি আসন থেকে। অন্যদিকে কিরণ বেদি প্রার্থী হয়েছেন দিল্লির কৃষ্ণনগর কেন্দ্র থেকে।
কংগ্রেস নেতা অজয় মাকেন কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রচারের নেতৃত্বে ছিলেন। দিল্লির সদর বাজার থেকে তিনি প্রার্থী হয়েছিলেন। কগ্রেসের এই বড় নেতা হেরে যাবেন বলে ধারণা করা হয়েছে। এখানে আপ প্রার্থী সোম দত্ত জিতবেন বলে জরিপে বলা হয়েছে।
ভারতের প্রেসিডেন্টের মেয়ে শর্মিষ্ঠা মুখার্জী হারতে চলেছেন। গ্রেটার কৈলাস থেকে কংগ্রেস দলের প্রাথী হয়েছিলেন তিনি। এই কেন্দ্রে আপ প্রার্থী সৌরভ ভরদ্বাজ জিততে চলেছেন।
মঙ্গলপুরী থেকে জিততে যাচ্ছেন আপ প্রার্থী রাখী বিড়লা।
জনকপুরী আসন থেকে বিজেপি নেতা জগদীশ মুখীর সঙ্গে আপ প্রার্থী রাজেশ ঋষির মধ্যে। এই দু’জন প্রার্থীর জোর লড়াই হলেও পাল্লা ভারি আপ প্রার্থী রাজেশ ঋষির পক্ষে।
রোহিণী কেন্দ্র থেকে বিজেপি প্রার্থী ও দলের দিল্লি শাখার সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং জাতীয়  নির্বাহী পরিষদের সদস্য বিজেন্দ্র গুপ্তা’র  বিপদ রয়েছে। এখানে আপ প্রার্থী সিএল গুপ্তা’র সঙ্গে তার জোর লড়াই হবে। 
মুসলিম জনসংখ্যা অধ্যুষিত দিল্লির সীলামপুরে কংগ্রেস প্রার্থী মতিন আহমেদ হেরে যাচ্ছেন। এখানে আপ প্রার্থী মুহাম্মদ ইশারাক জিততে চলেছেন।  
দ্বারকা কেন্দ্রের বিখ্যাত কংগ্রেস প্রার্থী মহাবল মিশ্র হারতে চলেছেন। এখানে লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর নাতি আপ প্রার্থী আদর্শ শাস্ত্রী জিতছেন।
বল্লীমারন কেন্দ্রে কংগ্রেসের বড় নেতা হারুন ইউসুফ হারতে চলেছেন। এখানে আপ প্রার্থী ইমরান হুসেন জিতছেন।
প্যাটেল নগর থেকে বিজেপি প্রার্থী হয়েছিলেন কৃষ্ণা তীরথ। তিনি নির্বাচনের আগে কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু তার জয়ের আশা নেই। এখানে আপ প্রার্থী হাজারিলাল চৌহান জিতছেন।
মাটিয়ামহলে ১৯৯৩ সাল থেকে একটানা জিতে চলেছেন, শোয়েব ইকবাল। এর আগে তিনি অন্য দলেও ছিলেন, এবার কংগ্রেসের টিকিটে লড়ে হারতে চলেছেন। এখানে আপ প্রার্থী ওয়াসিী আহমদ খান জিতছেন।
পটপড়গঞ্জ কেন্দ্রে আপ থেকে  বিদ্রোহ করে বিজেপির প্রার্থী হয়ে হারতে চলেছেন, বিনোদ বিন্নী। এখানে আপ প্রার্থী মনীষ সিসোদিয়া জিতিতে পারেন।
জঙ্গপুরা থেকে বিজেপি প্রার্থী এসএস ধীর হেরে যাচ্ছেন। তিনি সাবেক কেজরিওয়াল সরকারের আমলে দিল্লি বিধানসভার স্পিকার ছিলেন। এখানে জিততে চলেছেন আপ প্রার্থী প্রবীণ কুমার।
অন্যদিকে তিমারপুর থেকে বিজেপি প্রার্থী রজনী অ্যাবি হারতে চলেছেন। এখানে জিতছেন আপ প্রার্থী পঙ্কজ পুস্কর।
আর কে পুরম থেকে আপ প্রার্থী প্রমীলা টোকস জিতছেন।
তিলক নগরে বিজেপি’র রাজীব বব্বরের সঙ্গে আপ প্রার্থী জার্নেল সিং টক্কর দিচ্ছেন। তবে পাল্লা ভারী জার্নেল সিংয়ের পক্ষে।  
চাঁদনী চকে আপ প্রার্থী অলকা লাম্বা’র সঙ্গে কংগ্রেসের প্রহাদ সিং সাহানির জোর  লড়াই হবে। এখানে কংগ্রেস প্রার্থী  প্রহাদ সিং সাহানির পাল্লা ভারী।
মালবীয় নগরে জিততে চলেছেন, আপ নেতা সোমনাথ ভারতী।
এসব মিডিয়া জরিপে এভাবে সাম্ভাব্য ফলাফলের কথা বলা হলেও আগামীকাল ১০ ফেব্রুয়ারি সরকারিভাবে ভোট গণনা শেষেই প্রকৃত ফল সামনে আসবে।
সূত্র : রেডিও তেহরান।

মিসরে ফুটবলে সহিংসতা, নিহত ২২

মিসরের কায়রো ফুটবল স্টেডিয়ামে গতকাল রোববার
ফুটবল খেলায় সহিংস ঘটনায় ২২ জন নিহত হয়েছে।
নিহতের স্বজনের আহাজারি। ছবি: এএফপি
মিসরের কায়রো ফুটবল স্টেডিয়ামে গতকাল রোববার ফুটবল খেলায় সহিংস ঘটনায় ২২ জন নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে অন্তত ২৫ জন। আজ সোমবার বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে এ কথা জানানো হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে খবরে জানানো হয়, খেলা দেখতে হাজারো ফুটবল সমর্থক জোর করে স্টেডিয়ামে ঢুকতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সমর্থকদের জটলার উদ্দেশে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এ সময় হুড়োহহুড়িতে ভিড়ের মধ্যে পদদলিত হয়ে অনেকে মারা গেছে।
দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, প্রত্যক্ষদর্শী ও চিকিৎসা প্রতিবেদনের তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, ভিড়ের মধ্যে পদদলিত হয়ে হতাহতের ঘটনা বেশি ঘটেছে। অনেকে ঘাড়ে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছে। ওই ঘটনায় কমপক্ষে ২৫ জন আহত হয়।
সমর্থকদের মধ্যে সহিংসতা আরও ছড়াতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে মাঠের খেলা অব্যাহত রাখা হয়। তবে এ ঘটনার পর মিসরের প্রিমিয়ার লিগ স্থগিত করা হয়েছে বলে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
মিসরের জামালেক ও ইনবির মধ্যে ম্যাচ চলাকালে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। তবে ফুটবল খেলা ঘিরে সহিংসতার ঘটনা মিসরে নতুন কিছু নয়। ২০১২ সালে পোর্টের মাঠে ফুটবল খেলাকে ঘিরে দাঙ্গায় ৭০ জনের বেশি লোক নিহত হয়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গতকালকের খেলার সময় দর্শকের সংখ্যা ১০ হাজার নির্ধারণ করে দেয়। দ্রুতই সব টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। তখন হাজার হাজার ভক্ত বিনা টিকিটে স্টেডিয়ামের দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে খেলা দেখার চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ তাদের সরিয়ে দিতে যায়।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছে, জামালেক সমর্থকেরা পুলিশকে লক্ষ্য করে আতাশবাজি পোড়াচ্ছিল। পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে ও ফাঁকা গুলি চালায়।
মোস্তফা ইব্রাহিম নামের এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ছোট একটু জায়গায় অবস্থান করা বিশালসংখ্যক সমর্থককে লক্ষ্য করে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে। লোকজন তখন হুড়োহুড়ি করে বেরোতে চাইলে হতাহতের ঘটনা ঘটে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, নিহত ১৯ জনের প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা গেছে তাদের কেউ গুলিতে মারা যায়নি। পদদলিত ও ঘাড় ভেঙে বেশির ভাগের মৃত্যু হয়েছে।

জাতপাত ও ধর্মের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করায় ধন্যবাদ -দিল্লিবাসীকে কেজরিওয়াল

দিল্লির ভোটাররা ‘জাতপাত ও ধর্মের রাজনীতিকে’ প্রত্যাখ্যান করায় তাদের ধন্যবাদ দিয়েছেন ভারতের আম আদমি পার্টির (এএপি) নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল। তবে কেন্দ্রফেরত জরিপে হারের স্পষ্ট ইঙ্গিত থাকলেও পরাজয় মানতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। খবর হিন্দুস্তান টাইমস ও এনডিটিভির।
কেন্দ্রফেরত সাতটি জরিপের গড় ফলাফলে দেখা গেছে, এএপি ৪২টি আসন পেতে যাচ্ছে। এ জরিপে বিজেপির আসনসংখ্যা আগের জরিপগুলো থেকে আরও কমে ২৬-এ পৌঁছে। বিপুল বিজয়ের ইঙ্গিতে উল্লসিত এএপি সমর্থকেরা। তবে জরিপের ফলকে আমলে না নিয়ে ভারতীয় জনতা পার্টি বলছে, নির্বাচনে বিজয়ী হবে তারাই। অন্যদিকে দৃশ্যত শোচনীয় ফল করতে যাচ্ছে কংগ্রেস। দু-একটি কেন্দ্রফেরত জরিপের ফলাফলে দেখা গেছে, তারা একটিও আসন পাবে না।
গত শনিবার অনুষ্ঠিত ৭০ আসনের দিল্লি বিধানসভার নির্বাচনের ফল ঘোষণা করা হবে আগামীকাল মঙ্গলবার। নির্বাচনের আগেও একাধিক জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছিল, এএপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে। তাদের পাওয়া আসনের সংখ্যা ৩৬ থেকে ৩৮-এর মধ্যে ঘোরাফেরা করেছে। ওই সব জরিপে বলা হয়, কেন্দ্রীয় সরকারে থাকা বিজেপি ২৯টির বেশি আসন পাবে না। জরিপগুলো তখন কংগ্রেসকে চারটির বেশি আসন দেয়নি।
উল্লসিত এএপি শিবির দলটির প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে দিল্লির পরবর্তী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দেখতে ব্যগ্র হয়ে আছে। এই বিজয়কে তারা লোকসভার নির্বাচনে পরাজয়ের প্রতিশোধ হিসেবেও দেখছে। কেজরিওয়াল ওই নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে বারানসি আসনে দাঁড়িয়ে বিপুল ভোটে হেরে গিয়েছিলেন।
কেন্দ্রফেরত জরিপের ফল দেখার পর কেজরিওয়াল টুইটারে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘এএপির নিঃস্বার্থ প্রতিটি কর্মীকে আমার ধন্যবাদ ও অভিনন্দন। তাঁরা রাত-দিন কঠোর পরিশ্রম করেছেন। দিল্লিবাসীর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা। আপনারা সত্যিই অসাধারণ। আপনারা জাতপাত ও ধর্মের রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। আশা করছি কেন্দ্রফেরত জরিপের ফলই চূড়ান্ত ফল হবে।’
এখনো আশাবাদী বিজেপি: কেন্দ্রফেরত জরিপে নিশ্চিত পরাজয়ের আভাসেও বিজেপি শিবির হাল ছাড়ছে না। নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিজেপির সভাপতি অমিত শাহর সঙ্গে বৈঠক করেন। দলটি এখনো দিল্লিতে সরকার গঠনে আস্থাশীল। বিজেপির কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনন্ত কুমার গতকাল বলেন, ‘কেন্দ্রফেরত জরিপ হয়েছে। তবে আমরা মাঠের বাস্তবতা জানি। আমাদের কর্মীরা সারা দিন খেটেছেন। মানুষ দল বেঁধে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। ১০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। বিজেপি জিতবে এবং সরকার গঠন করবে। বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে।’
বিজেপির দিল্লি রাজ্য কমিটির সভাপতি সতীশ উপাধ্যায়ও বলেন, ‘যে হারে মানুষের ঢল দেখেছি, তাতে বিজয় বিজেপিরই হবে।’
তবে বিজেপির পুরোনো নেতারা যা-ই বলুন, দিল্লি নির্বাচনে দলটির মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থী কিরণ বেদীর কথায় আস্থার অভাব স্পষ্ট। ভোট হয়ে যাওয়ার পর শনিবার এক সংবাদ সম্মেলনে রাজনীতিতে নবাগত কিরণ বলেন, তিনি যেকোনো ধরনের ফলাফল মেনে নেবেন। এবং ফলাফল যা-ই হোক দায় তাঁর।
জরিপ অনুযায়ী হাতে গোনা কয়েকটি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা কংগ্রেসের। তবে দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা এর পরও আশা করছেন, ২০১৩ সালের চেয়ে তাঁরা এবার ভালো ফল করবেন। দিল্লি বিধানসভার গত নির্বাচনে কংগ্রেস আটটি আসন পেয়েছিল।

সংকটে দেশীয় সিরামিক শিল্প- হরতাল-অবরোধে ক্ষয়ক্ষতির চিত্র by আবুল হাসনাত

চলমান টানা রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশের সিরামিক খাতে প্রতিদিন ১০ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। সে হিসাবে গত ৩০ দিনে এই শিল্পের ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০০ কোটি টাকা।
এ তথ্য বাংলাদেশ সিরামিক ওয়্যারস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের। সংগঠনটি বলছে, তাদের উৎপাদিত পণ্যের বিক্রি এবং সারা দেশে সরবরাহ বেশ কমে গেছে। এ ছাড়া পণ্য পরিবহনে তিন-চার গুণ বেশি ভাড়া গুনতে হচ্ছে তাদের। আবার বিক্রি না হওয়ায় কারখানায় পণ্য জমে গেছে। ফলে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সিরামিক প্রস্তুতকারক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইরফান উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের ক্ষতিটা হচ্ছে কয়েকভাবে। প্রথমত আমরা চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কাঁচামাল কারখানায় আনতে পারছি না। আবার রপ্তানির জন্য সিরামিক পণ্য বন্দরে পৌঁছাতে পারছি না। আবার উৎপাদিত পণ্য সারা দেশে পৌঁছাতে পারছি না। পরিবহন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সব ক্ষেত্রেই আমাদের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে।’
কারখানায় পণ্যের প্রচুর মজুত জমেছে মন্তব্য করে ইরফান উদ্দিন বলেন, ‘আমরা কিন্তু চুল্লি বন্ধ রাখতে পারি না। গ্যাস কিন্তু ঠিকই পুড়ছে। ফলে আমাদের উৎপাদন চালিয়ে যেতেই হয়। আগে যেখানে ৭০ হাজার ইউনিট পণ্য উৎপাদন হতো, এখন হচ্ছে ৪০ হাজার ইউনিট।’
দেশে বর্তমানে ৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান সিরামিক পণ্য প্রস্তুত করে। এ খাতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৫ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবছর সিরামিক পণ্য রপ্তানি করে আয় হয় প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। আর দেশে এই পণ্যের বাজার আনুমানিক আড়াই হাজার কোটি টাকার। সিরামিকশিল্পে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
সিরামিক প্রস্তুতকারক সমিতির তথ্য অনুযায়ী, হরতাল-অবরোধে বেশির ভাগ দোকানই বন্ধ থাকে, খোলা থাকলেও ক্রেতা থাকে না। আবার দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বাভাবিকভাবে পণ্য পৌঁছানো যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে সিরামিক পণ্যের বিক্রি ও সরবরাহ কমে গেছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। এর আনুমানিক মূল্য ৩ কোটি টাকা। আবার আমদানি করা কাঁচামাল ও উৎপাদিত পণ্য পরিবহনে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে তিন-চার গুণ অতিরিক্ত ব্যয় গুনতে হচ্ছে। এতে পণ্য পরিবহনে দৈনিক লোকসান হচ্ছে গড়ে ২০ লাখ টাকা। এসব কারণে উৎপাদন ও আনুষঙ্গিক ব্যয় বেড়েছে ১০-১৫ শতাংশ।
অন্যদিকে অনেক কারখানাই এখন কাঁচামালের সংকটে পড়েছে। একদিকে ট্রাকের সংকট, অন্যদিকে পরিবহন ব্যয় অনেক বেড়ে যাওয়ায় আমদানি করা কাঁচামাল বন্দর থেকে আনা যাচ্ছে না। ফলে অনেক কারখানায় কাঁচামালের মজুত শেষ হয়ে গেছে। আবার সিরামিক পণ্যের বিক্রি কমে যাওয়ায় কারখানাগুলোতে প্রস্তুত পণ্যের মজুত জমে গেছে। এসব পণ্য এখন রাখাও যাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে অনেক প্রতিষ্ঠান।
সমিতির তথ্য অনুযায়ী, উৎপাদিত পণ্যের মজুত জমে যাওয়ায় এবং কাঁচামালের ঘাটতির কারণে এরই মাধ্যে ১৫-২০ শতাংশ উৎপাদন কম হচ্ছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় কারখানার পুরো উৎপাদন বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
সংগঠনটি বলছে, রাজনৈতিক অস্থিরতায় বিদেশি ক্রেতারা দেশে আসছে না। সে কারণে রপ্তানির নতুন কাজও পাওয়া যাচ্ছে না। যতটুকু রপ্তানির কাজ আছে, পরিবহন সমস্যার কারণে তা-ও সময়মতো রপ্তানি করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতারা এ দেশি পণ্য কেনার বিষয়ে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। এসব কারণে কিছু কাজ এরই মধ্যে বাতিল হয়ে গেছে। এতে সামনের দিনগুলোতে সিরামিক পণ্যের রপ্তানি দ্রুত কমে যাবে। সিরামিক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সংকটের দিকে যাচ্ছে।
সমিতির নেতারা বলছেন, চলমান অস্থিরতায় পণ্য বিক্রি না হলেও কারখানার ব্যয় কমেনি। শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দিতে হচ্ছে। একই সঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে সুদসহ ব্যাংকঋণের কিস্তির টাকা। ফলে উৎপাদন চালিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এখন ঋণখেলাপি হওয়ার পথে।
সে কারণেই সংগঠনটির নেতারা এখন ব্যাংকঋণের বিপরীতে আগামী ছয় মাস পর্যন্ত সুদ মওকুফ এবং আগামী এক বছর পর্যন্ত ডাউন পেমেন্ট ছাড়া ঋণ নবায়ন করার সুযোগ দেওয়ার জন্য তফসিলি ব্যাংকগুলোর প্রতি নির্দেশনা জারি করার দাবি করছেন।

আবার মুখ্যমন্ত্রী কেজরিওয়াল?

নয়াদিল্লির একটি কেন্দ্রে গতকাল ভোট দেওয়ার জন্য দিল্লিবাসীর
দীর্ঘ সারি। এবারের দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে রেকর্ডসংখ্যক
ভোট পড়েছে যা গতবারের চেয়ে এক শতাংশ বেশি। রয়টার্স
ভোটারদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ও কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ভারতের আলোচিত দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গ্রহণ হয়েছে গতকাল শনিবার। দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ‘আমজনতার নেতা’ অরবিন্দ কেজরিওয়াল এ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আবার ক্ষমতাসীন হওয়ার প্রত্যাশা করছেন। কেন্দ্রফেরত ভোটারদের ওপর চালানো চারটি জরিপের ফল সমন্বয়ের মাধ্যমে এনডিটিভি গতকাল সন্ধ্যায় জানায়, কেজরিওয়ালের আম আদমি পার্টি (এএপি) ৩৮টি আসন পাবে, যা সরকার গঠন করার জন্য যথেষ্ট। আর বিজেপি এবং আকালি দলের জোট পাবে ২৯টি আসন। মাত্র তিনটি আসন নিয়ে অনেক দূরবর্তী তৃতীয় স্থান পাচ্ছে কংগ্রেস। খবর এনডিটিভি, এএফপি ও বিবিসির। সর্বশেষ জনমত জরিপেও এএপির সাফল্যের ইঙ্গিত ছিল। এ নির্বাচনকে প্রায় এক বছর আগে কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জনপ্রিয়তা যাচাইয়ের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময় সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত ৬৭ শতাংশ ভোট পড়ে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এ হার দিল্লি বিধানসভার জন্য একটি রেকর্ড। গতবারের চেয়ে তা ১ শতাংশ বেশি। বিধানসভার ৭০টি আসনের জন্য লড়াই করেন ৬৭৬ জন প্রার্থী। প্রধান দুই দল বিজেপি এবং আম আদমি পার্টির (এএপি) মধ্যে জোর লড়াইয়ের আভাস মিলেছে। ভোটার সংখ্যা ছিল ১ কোটি ৩০ লাখেরও বেশি। নির্বাচন উপলক্ষে কড়া নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্তত ৫৫ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ফলাফল জানা যাবে আগামী মঙ্গলবার।
সাবেক ডাকসাইটে পুলিশ কর্মকর্তা কিরণ বেদীকে মোদির রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) মুখ্যমন্ত্রী প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের কর্মী আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়ালের কাছে কিরণ হেরে যেতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। সর্বশেষ কেন্দ্রীয় নির্বাচনে মোদির দল বিজেপি নিরঙ্কুশ জয় পেলেও সম্প্রতি তাঁর জনপ্রিয়তায় কিছুটা ভাটা পড়েছে বলে ধারণা করা হয়। কেজরিওয়ালের এএপি গত বছর দিল্লিতে সরকার গঠন করেছিল। কিন্তু দুর্নীতিবিরোধী একটি বিল আটকে যাওয়ায় তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র ৪৯ দিন পরই মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন। তার পর থেকে দিল্লি সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনে শাসিত হচ্ছে। প্রচারণায় এএপি দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের অভাব এবং দুর্নীতির মতো বিষয়গুলোকে সামনে তুলে ধরে মূলত শ্রমিকশ্রেণির ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে। আর বিজেপি প্রধানত প্রধানমন্ত্রী মোদির সহজাত নেতৃত্বের গুণাবলি, বিজয়ী ভাবমূর্তি এবং অর্থনৈতিক সংস্কার ও বিদেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিকে কাজে লাগিয়ে সফল হওয়ার চেষ্টা করে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিজেপি অন্যান্য রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে সাফল্য পেলেও দিল্লিতে জয়ী হওয়া তাদের জন্য কঠিন হবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছিলেন। সাম্প্রতিক ছয়টি জনমত জরিপের ফলাফল একত্র করে এনডিটিভি কয়েক দিন আগে জানায়, এএপি ৩৬টি আসন পেতে পারে। ৭০ আসনের দিল্লি বিধানসভায় সরকার গঠনের জন্য ঠিক এই সংখ্যাটিই দরকার। তখন বলা হয়েছিল বিজেপি ও তাদের সহযোগী আকালি দল পেতে পারে ৩০টি আসন। আর কংগ্রেস পাবে মাত্র চারটি। অথচ দিল্লিতে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১৫ বছর ক্ষমতায় ছিল দল কংগ্রেস। দিল্লিতে কেজরিওয়ালের এএপি জয়ী হলে মোদির সঙ্গে ভোটারদের ইতিমধ্যে তৈরি হওয়া দূরত্ব আরও বড় হয়ে প্রকাশ পাবে। পাশাপাশি রাজধানীতে সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ এবং প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ চালু করার মতো বড় সংস্কারের বিভিন্ন উদ্যোগ এএপি সরকারের বাধার মুখে পড়তে পারে।

দালাই লামার ওবামার পাশে বসাই সহিষ্ণুতার উদাহরণ

অরুণ জেটলি
ভারতে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মন্তব্যের জবাব দিল দেশটির সরকার। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বলেছেন, দালাই লামার বারাক ওবামার পাশে বসাটাই ভারতে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার সেরা উদাহরণ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা গত বৃহস্পতিবার রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে আয়োজিত বার্ষিক ‘ন্যাশনাল প্রেয়ার ব্রেকফাস্ট’ অনুষ্ঠানে বলেন, ভারতের সাম্প্রতিক ধর্মীয় ‘অসহিষ্ণুতার’ ঘটনাগুলো দেখলে দেশটির স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা মহাত্মা গান্ধী আঘাত পেতেন। ওয়াশিংটনের ওই অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে কয়েক হাজার ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব অংশ নেন। গত মাসে ভারত সফর করা ওবামা এখানে বলেন, ‘দেশটি অবিশ্বাস্য,
সুন্দর এবং অসামান্য বৈচিত্র্যে ভরপুর। কিন্তু সেখানে গত কয়েক বছরে সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ই কখনো কখনো ভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী মানুষের আক্রমণের শিকার হয়েছে।...এগুলো অসহিষ্ণু কার্যকলাপ, যা ভারতের স্বাধীনতায় অবদান রাখা গান্ধীজিকে আহত করত।’ ওবামার বক্তব্যের জবাবে অরুণ জেটলি গতকাল শনিবার বলেন, ভারতের ধর্মীয় সহিষ্ণুতার বিশাল ইতিহাস রয়েছে। এর কোনো বিচ্ছিন্ন বিচ্যুতিতে এ ইতিহাস পাল্টে যাবে না। প্রার্থনা অনুষ্ঠানে তিব্বতের আধ্যাত্মিক নেতা দালাই লামা ওবামার কাছাকাছি একটি টেবিলে বসেছিলেন। ওবামা তাঁর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করলেও সরাসরি কথা বলেননি। দৃশ্যত চীনের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া এর পেছনে কাজ করেছে। দালাই লামা ‘ধর্মীয় ছদ্মবেশের’ আড়ালে চীনবিরোধী বিচ্ছিন্নতাবাদী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত বলে চীন অভিযোগ করে থাকে। পঞ্চাশের দশকে স্বশাসিত এলাকা তিব্বতে চীন সামরিক অভিযান চালালে দালাই লামা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন। তখন থেকে তিনি উত্তর ভারতের ধর্মশালা শহরে থাকেন। বিজেপি গত বছর ভারতের ক্ষমতায় আসার পর থেকে দেশটিতে তাদের কট্টর হিন্দুত্ববাদী মিত্রদের নানা বিতর্কিত কার্যকলাপে দেশে-বিদেশে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জোর করে বা প্রলোভনের মাধ্যমে ধর্মান্তর ও গির্জায় একের পর এক হামলার মতো ঘটনা।

‘রাজনীতি কম’ by মিজানুর রহমান খান

সমস্যা চিহ্নিত। কিন্তু আমরা বের হতে পারি না। বাংলাদেশের মানুষ কি সত্যি রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে? যদি নিত তাহলে যার মুখে যা সাজে না, সেসব কথা বলা সম্ভব হয় কী করে? (প্রথম আলো, ৪ ও ৭ ফেব্রুয়ারি, পৃ. ১) দেশের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তার মুখেও বিনা বিচারে হত্যার বোল ফুটল। এটা গণতন্ত্রের ঘাটতি, নাকি রাজনীতির ঘাটতি?
ওয়াশিংটনভিত্তিক পিউ গবেষণাকেন্দ্রের ‘২০১৪ বৈশ্বিক আচরণ সমীক্ষা’ অনুযায়ী রাজনীতি-সংশ্লিষ্টতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ৩৩টি উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে প্রথম স্থান দখল করেছে। এটা সুসংবাদ হলে আমাদের কেন এত দৈন্য? আমরা কিছুকালের বিরতিতে কেন পুনঃপুন খাদের কিনারে পৌঁছে যাই? পিউ প্রতিটি দেশে কমবেশি এক হাজার লোকের ওপর এই সমীক্ষা চালায়। ফলাফলটা বিস্ময়কর। অঞ্চল হিসেবে গণতন্ত্রে পিছিয়ে থাকা মধ্যপ্রাচ্য ৫৩ ও আফ্রিকা ৪৪ পেয়ে রাজনীতিতে শীর্ষ অংশগ্রহণকারী অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। রাজনীতিতে লাতিন আমেরিকা ৩১ ও এশীয়দের অংশগ্রহণ সবচেয়ে কম (২৪ শতাংশ)। এর মধ্যে দেশ হিসেবে ৬৫ শতাংশ পেয়ে বাংলাদেশিরাই শ্রেষ্ঠ রাজনীতিসচেতন ব্যক্তির মর্যাদা পেয়েছে। এটা প্রমাণ করে যে ভোট দেখলেই পড়িমরি ভোটকেন্দ্রে ছুটে যাওয়া, প্রতিবাদ কর্মসূচিতে, ধর্মঘটে অংশ নিতে জানা আর গণতান্ত্রিক সমাজের বাসিন্দা হতে পারা এক নয়। তাই এই শীর্ষ হতে পারাটা সুসংবাদ নাকি দুসংবাদ, সেটা ভাবতে হচ্ছে।
সচিব থেকে শিক্ষাবিদ হওয়া একজন বিদগ্ধ নাগরিক আমাকে এই লেখাটির রসদ জুগিয়েছেন। তাঁর রসবোধ প্রখর। তিনি পিউ-র সমীক্ষার ফল দেখে অমিতাভ বচ্চনের চিনি কম-এর আদলে এই লেখার শিরোনাম ‘রাজনীতি কম’ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। কীভাবে চিনি কম, সে কথায় পরে আসছি।
র্যাবের মহাপরিচালকের পদে এসে হঠাৎ উচ্চকিত বেনজীর আহমেদের ‘হত্যাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিশোধ’ এবং পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি শফিকুল ইসলামের ‘একটি লাশ পড়লে দুটি লাশ ফেলা’ ইত্যাদি ধরনের মন্তব্য, যা সরকারি কর্মকর্তাদের আচরণবিধির সরাসরি লঙ্ঘন, সেসব তাঁকে বিচলিত করেছে। ‘নিজ অধিক্ষেত্রের বিষয়’ নয় বলে তিনি নিজে না লিখে আমাকে তাঁর ভাবনা ধার দিয়েছেন। আর এটা নির্দেশ করে যে দেশের বিরাজমান জরুরি পরিস্থিতি নিতান্ত রাজনীতি নিরাসক্ত মানুষকেও স্পর্শ করছে। তাঁরা আর নিস্পৃহ থাকতে পারছেন না।
ওই শিক্ষাবিদের প্রশ্ন যথার্থ যে এমন একটি রাজনীতিসচেতন চ্যাম্পিয়ন দেশে ‘ভোটারবিহীন’ নির্বাচন হয় কীভাবে? সংখ্যাগরিষ্ঠ ১৫৪ জন সাংসদ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন কীভাবে? বিএনপি কী করে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ভীতিকর অবরোধ, হরতাল ডেকে নাগরিক জীবন বিষিয়ে তুলতে পারে? জীবন্ত দগ্ধ ও পীড়িতের আহাজারি এদের কারোরই কানে কেন পৌঁছাচ্ছে না? তবে কি অতিমাত্রায় রাজনীতিসচেতনতাই আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে?

দীর্ঘদিন থেকেই শিক্ষক, ব্যবসায়ী, আইনজীবী, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সাংবাদিক নির্বিশেষে সবাই নিজের পেশায় থেকে রাজনীতি করেন—সাদা দল, নীল দল, স্বাচিপ, ড্যাব, অ্যাব, সাংবাদিক ইউনিয়ন, প্রেসক্লাব, আইনজীবী, উলামা সমিতি—সবাই আজ অপরাজনীতির পরিচয়ে দ্বিধাবিভক্ত। কে কোন পদে থাকবেন বা থাকবেন না, সেটা আজ আর পেশাজীবীর হাতে নেই। সার্বিকভাবে আমাদের সমাজ আজ অভিভাবকহীন। আগে তবু কিছু দল-বিবর্জিত পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী ছিলেন। সংকটে জাতি তাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকত। দুর্দিনের সময় যাওয়ার মতো আমাদের জন্য কোনো জায়গা অবশিষ্ট নেই। আমরাই তা রাখিনি। প্রত্যেকের ললাটে একটা সিল মেরে দিতে আমরা ইতিমধ্যে নিপুণ হন্তারক হয়ে উঠেছি। শ্রদ্ধাভাজন সাবেক প্রধান বিচারপতিসহ এমন অনেকেই আছেন, যাঁরা স্বেচ্ছা গৃহবন্দিত্বকে শ্রেয় মনে করছেন। তাঁরা আমাদের আলোকিত সমাবেশগুলোতে অস্পৃশ্য হিসেবে অনুপস্থিত।
পেশাজীবীরা উর্বর মস্তিষ্ক হওয়া সত্ত্বেও এটা ঘটে কেন? জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞানী দীপঙ্কর গুপ্তের মতে, ‘মগজধারীরা দুই ধরনের হয়ে থাকেন—বড় এবং ছোট। ছোট মগজধারীরা ভাবাদর্শিক হন, তাঁরা রাজনীতি করে বাঁচেন এবং সব সময়ই মঞ্চের কেন্দ্রে অবস্থানের আকাঙ্ক্ষা পোষণ করেন। বড় মগজধারীরা বুদ্ধিজীবী, তাঁরা সমাজের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে
থাকেন, কিন্তু রাজনীতির চৌহদ্দির বাইরে অবস্থান নেন। প্রকৃত বুদ্ধিজীবীর কাছে দলীয় রাজনীতি সেই নিষিদ্ধ আপেল, যাতে তিনি কখনোই কামড় দেন না।’ রাজনৈতিক বুদ্ধিজীবী এডওয়ার্ড সাঈদ অত্যন্ত আবেগের সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের দাবি তুলে ধরেছেন। কিন্তু পিএলওতে যোগদানের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে তিনি বলেন, ‘ফিলিস্তিনিদের সপক্ষে অবিচল আছি। কিন্তু তাই বলে দলীয় সদস্যপদ গ্রহণ কখনোই নয়।’ নোয়াম চমস্কির বেশির ভাগ লেখাই রাজনীতি নিয়ে। কিন্তু তিনি কোনো দলের নন। আমরা সম্ভবত পণ করেছি, এ রকম কাউকে হতে দেব না। বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা যাঁর থাকবে, আমরা তাঁকে কালির পোঁচ দিতে ওত পেতে থাকব।
পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের পক্ষপাত ইতিমধ্যে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। দলীয় সহিংসতার চেয়ে এর ক্ষতিকর প্রভাব কম ভয়ংকর নয়। বিএনপি জনতার মঞ্চের কুশীলবদের বিচার করতে ইচ্ছা করে ব্যর্থ থেকেছে, কারণ তারও মনের গহিনে পাপ বাসা বেঁধেছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার রাজনৈতিক বক্তব্যে তাই সত্যিই বিস্ময়ের কিছু নেই। সরকারি ও বেসরকারি মহলের দূরত্ব ঘুচে যাচ্ছে। আবারও দীপঙ্কর গুপ্তের শরণাপন্ন হতে হয়: ‘একজন সেনাপ্রধান দলীয় প্রচারবিদ হবেন, এটা কেউ আশা করেন না, তেমনটি আশা করা যায় না একজন পুলিশ, বিচারক কিংবা ধর্মগুরুর কাছে। এর কারণ হচ্ছে, তাঁদের পেশাগুলো যতটা না ব্যক্তিস্বার্থনির্ভর, তারচেয়ে বেশি সামাজিক দায়সম্পন্ন।’ কিন্তু কি সরকারি আর কি বেসরকারি, কোনো পেশাজীবীর ‘সামাজিক দায়বোধ’ হয়তো আর সামান্যই অবশিষ্ট আছে।
দলীয় রাজনীতি আজ আর দেশের ভূখণ্ডে সীমিত নেই। সিডনি অমুক দল, ফিনল্যান্ড তমুক লীগ—এসব দলাদলি তো আছেই। এখন তাঁরা বিজেপি সভাপতির কথিত ফোনে স্বাস্থ্যকুশল জানা বড় মুখ করে বলে দেশের মুখ ছোট করেন, কেউ মার্কিন রাজনীতিকদের নামে ভুয়া বিবৃতি প্রচার করেন; আবার কেউ জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের নামে বিদেশে রাস্তার নামকরণের প্রতিবাদে কোর্ট-কাছারি করেন। দেশের রাষ্ট্রদূতও এতে যোগ দেন! বিদেশে কর্মরত আমাদের কূটনীতিকদের এসব লীগ ও দলের মন জুগিয়ে চলতে হয় বলে শোনা যায়। ব্রিটেনের সাউদাম্পটনে একদল প্রবাসী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমেছেন। পিউ-র সমীক্ষায় সেরা রাজনীতিসচেতন দেশ বলে বিশ্বে আমরাই হয়তো একমাত্র প্রবাসী, যারা হিংসাশ্রয়ী দলাদলির জীবাণু রপ্তানি করতে পেরেছি। ভাগ্যিস ভিনদেশি কেউ আজতক আক্রান্ত হননি!
অথচ, ভারতীয় প্রবাসীদের কথাই ধরুন। তাঁরা জগৎসেরা পুরস্কার ও স্বীকৃতি পাচ্ছেন। ঝুম্পা লাহিড়ী ও সিদ্ধার্থ মুখার্জি তো পুলিৎজারজয়ী। মার্কিন সিনেট, প্রতিনিধি পরিষদ, গভর্নর, প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসালয়, মহাকাশ গবেষণা, কোথায় তাঁরা নেই? ববি জিন্দাল লুইজিয়ানার গভর্নর, সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট, ভাইস প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী! দলীয় রাজনীতি না করেও প্রবাসী ভারতীয়রা তাঁদের প্রভাবের কারণে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিকে ভারতের অনুকূলে আনতে সক্ষম হয়েছেন। প্রবাসী বাংলাদেশিরাও কি তাঁদের মেধা ও শ্রম দিয়ে দেশের জন্য এ ধরনের অবদান রাখতে পারেন না?
সুপারস্টার অমিতাভ বচ্চন অভিনীত একটি ব্যবসাসফল ছবির নাম চিনি কম। অসম বয়সী প্রেমের কাহিনিসংবলিত এ ছবির নায়িকা টাবু ছবিতে মালিক ও শেফ অমিতাভের লন্ডনের রেস্টুরেন্টে হায়দরাবাদী জাফরানি পোলাও খেতে ইচ্ছা পোষণ করেন। কিন্তু মনমতো না হওয়ায় অভুক্ত থেকে খাবার ফেরত দেন। এতে গর্বিত শেফ অমিতাভের আঁতে লাগে। খাবারের কী সমস্যা জানতে চাইলে টাবু বলেন, ‘হায়দরাবাদী জাফরানি পোলাও’ এতটা মিষ্টি হওয়ার কথা নয়। অমিতাভ রান্নাঘরে গিয়ে দেখতে পান যে দেশে পরিবারের চিন্তায় অন্যমনস্ক পাচক লবণের বদলে পুনরায় চিনি দেয়। বিপত্তি ঘটে এ কারণেই। তারপর যথারীতি বলিউডের কায়দায় প্রেম, প্রতিবন্ধকতা ও শুভমিলন। এ থেকেই ছবির নাম চিনি কম। আজ আমাদের রাজনীতিও অতিমাত্রার কারণে, গৌরবময় ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও, চিনি কম ছবির হায়দরাবাদী জাফরানি পোলাওয়ের মতো অখাদ্যে পরিণত হয়েছে।
সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্ট শিমন পেরেজ ‘রাজনীতি কম’-এর প্রবক্তা। তাঁর কথায় রাজনীতি বিষয়ে আমাদের মিতব্যয়ী হতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার সঙ্গে তুলনা করলে অনেকে রাগ করেন। কিন্তু দেখুন ওই চারটি অঞ্চলের মধ্যে এশিয়ায় ‘রাজনীতি কম’ বলে এখানেই তুলনামূলক গণতন্ত্র বেশি। সমাজসেবক জর্জ সোরোসের সঙ্গে সংলাপে শিমন পেরেজ বলেছিলেন, ‘যখন কোনো জাতি রাজনীতি নিয়ে পড়ে না থেকে রাজনীতি থেকে অর্থনৈতিক যাত্রায় শরিক হয়, তখন তারা আসলে বৈরিতা থেকে শান্তির পথে যায়। শেষ যুদ্ধের পরে ইউরোপে তা-ই ঘটেছে। তারা শান্তি পেয়েছে, কারণ কমবেশি তারা জাতীয় রাজনীতিকে পেছনে ঠেলতে পেরেছে। (লস অ্যাঞ্জেলস টাইমস, ৯ মে ১৯৯৮)
পিউ সমীক্ষা বলছে, এশিয়ায় ভারতসহ সাত দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি নেতাদের ভাষণ শোনেন (৪৮ শতাংশ), সর্বাধিক মানুষ সক্রিয় দলীয় কর্মী (৩২ শতাংশ)। সেরা হরতালকারীর আসনটিও (৩১ শতাংশ) শুধু আমাদেরই করায়ত্ত, এমনকি ৩৩ দেশের মধ্যে হরতাল পালনে আমাদের ওপরে কেবল মিসর আছে। তাই পরিশেষে, অমিতাভ অভিনীত ছবির নাম চিনি কম অথবা বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ শিমন পেরেজের রাজনীতি বিষয়ে মিতব্যয়ী হওয়ার আহ্বানের অনুকরণে বলি, ‘রাজনীতি কম’।
রাজনীতি আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। কিন্তু অতিমাত্রায় রাজনীতির কারণে, আজ এসব অর্জন হুমকির সম্মুখীন। আমরা বিরাজনীতিকরণের কথা বলছি না। কেবল দলীয় রাজনীতিকে রাজনীতিবিদদের হাতেই রাখতে বলছি। দলীয় রাজনীতি দেশের ভূখণ্ডে সীমিত রাখার বিষয়ে বলছি। পেশাজীবীদের দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে অথচ সমাজমনস্ক থাকার কথা বলছি; দেশের দুর্দিনে জাতির আশ্রয় হওয়ার কথা বলছি। সর্বত্র, সবার দলীয় রাজনীতি করার কোনো প্রয়োজন নেই।
মিজানুর রহমান খান: সাংবাদিক৷
mrkhanbd@gmail.com

বার্ন ইউনিট থেকে কুতুবদিয়া চ্যানেল by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

‘এই ঘটনার জন্য কাকে দায়ী করেন আপনি?’
জানি, আগুনে দগ্ধ যন্ত্রণাকাতর একটি মানুষের কাছে বা তাঁর অসহায় বেদনার্ত নিকটজনের কাছে এসব প্রশ্ন করাটাও একধরনের নির্মমতা। কিন্তু পেশাগত দায়িত্ব থেকেই হয়তো সতীর্থ একজন সাংবাদিক এই প্রশ্নটি করেছেন আজিজুর রহমানের স্ত্রীকে। শিল্পী বেগমের বয়স ২২ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। আগের রাতে (২৭ জানুয়ারি) পেট্রলবোমায় ট্রাকচালক স্বামীর অগ্নিদগ্ধ হওয়ার সংবাদ শুনে একা এক কাপড়ে সুদূর যশোর থেকে ছুটে এসেছেন সম্পূর্ণ অপরিচিত চট্টগ্রাম শহরে। যে বাসটিতে চেপে সারা রাতের ভ্রমণ শেষে এখানে এসেছেন, সেই বাসেও হামলা হতে পারত, স্বামীর মতো একই পরিণতি হতে পারত তাঁরও। কিন্তু সেসব দুশ্চিন্তা করার ফুরসত মেলেনি তাঁর। অনিদ্র রাত কেটেছে স্বামীটি বেঁচে আছে কি না, থাকলে কী অবস্থায় আছেন, দুটি ছোট মেয়েকে নিয়ে এখন কী করে কাটবে জীবন? এ রকম মীমাংসাহীন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর খঁুজতে খঁুজতে। এখন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে দাঁড়িয়ে সাংবাদিকের প্রশ্নের মুখে বিভ্রান্ত শিল্পী বেগম। পাশে শয্যায় কাতরাচ্ছেন আজিজ (৩৫)। সারা শরীরে ব্যান্ডেজ, সারা মুখ ক্ষতবিক্ষত। সেই মুখের দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠবে যেকোনো অপরিচিত লোকও, শিল্পীর অবস্থা তো সহজেই অনুমেয়।
স্ত্রীর কাছে প্রশ্নের উত্তর না পেয়ে আজিজুর রহমানের মুখের কাছে ঝঁুকে সাংবাদিক একই প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করলেন, ‘এই ঘটনার জন্য...?’
কথা বলার মতো অবস্থা নয় আজিজের, অস্পষ্ট উচ্চারণে বললেন, ‘কাউরে দায়ী করি না...।’ বলতে গিয়ে শরীরটা কেঁপে উঠল, গভীর অভিমানে চোখ থেকে গড়িয়ে নামল পানি।
কাকে দায়ী করবেন আজিজ? অবরোধ আহ্বানকারীরা শান্তিপূর্ণ অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। সেই শান্তির নমুনা তো প্রতিদিনই সংবাদপত্রের পাতায়, টিভির পর্দায় দেখছে মানুষ। আর সরকার বলেছে, নিরাপত্তা দেওয়া হবে। সেই নিরাপত্তাও তো দেখা হলো।
বার্ন ইউনিটে দেখলাম আজিজের পাশের শয্যাগুলোতে শুয়ে কাতরাচ্ছেন আরও কয়েকজন। সবাই শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষ। তাজুল ইসলাম (৫০) নামের একজন এখানে ভর্তি হয়েছিলেন ১১ জানুয়ারি। তিনিও ট্রাকচালক। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বারো আউলিয়ায় তাঁর বাড়ি। তাজুল জানালেন, ১১ দিন বেকার বসে ছিলেন সাতক্ষীরায়। হাতে টাকাপয়সা নেই, নিজেরই খাবার জোটে না, বাড়িতে সংসার খরচের টাকা কী করে পাঠাবেন—এই দুশ্চিন্তা থেকেই ঝঁুকিটা নিয়েছিলেন। সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর থেকে চালবোঝাই ট্রাক নিয়ে রওনা দিয়েছিলেন চট্টগ্রামের দিকে। বিপদ বুঝে যাত্রাবিরতি দিয়ে পাঁচ দিন খুলনায় ছিলেন। কিন্তু বিপদ পিছু ছাড়ল না তাজুলের। পাঁচ দিন পর যাত্রা শুরু করে ১০ জানুয়ারি কুমিল্লার কাছাকাছি এসে হামলার শিকার হলেন। গাড়িতে বসেই দেখতে পেয়েছিলেন অন্ধকারের ভেতর থেকে মৃত্যুদূতের মতো এগিয়ে আসছে তিনটি তরুণ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পেট্রলবোমা ছুড়ে দিয়েছিল তারা। দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল শরীরের সব কাপড়চোপড়ে। লাফ দিয়ে গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে রাস্তার পাশের বিলের মধ্যে ছুটতে শুরু করেছিলেন। ভাগ্যক্রমে সেখানে পেয়ে গিয়েছিলেন ছোট একটি জলাশয়। লাফিয়ে পড়েছিলেন সেখানে। কিন্তু পানি থেকে উঠে দেখেন আবার শরীরের নানা জায়গায় জ্বলে উঠেছে আগুন। এর মধ্যে এলাকার লোকজন জড়ো হয়েছে সেখানে। প্রথমে কুমিল্লা হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। সেখানে আগুনে দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ধারকর্জ করে সাত হাজার টাকায় একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়েছে তাঁকে। দুই হাত, বুক আর ঊরু পুড়ে গেছে তাজুলের। আর কখনো স্টিয়ারিং ধরতে পারবেন কি না জানেন না। স্ত্রী তাহেরা বেগমের চোখে অমানিশার অন্ধকার। তিন মেয়ে তানজু, তানিশা ও মায়মুনাকে রেখে এসেছেন ননদের কাছে। স্কুলে যাওয়া বন্ধ। কখন ফিরে যেতে পারবেন বাড়িতে জানেন না। আমরাও জানি না এই পরিবারটি আর কখনোই ফিরে যেতে পারবে কি না আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে।
বার্ন ইউনিটের প্রতিটি শয্যা ঘিরেই এখন এ রকম একেকটি গল্প। প্রতিদিন সারা দেশেই এ রকম নির্মমতার গল্প রচিত হচ্ছে। এর শেষ কোথায়?
এবার অন্য একটি প্রসঙ্গে আসি। গত ২৯ জানুয়ারি বঙ্গোপসাগরের কুতুবদিয়া চ্যানেলে শতাধিক যাত্রী নিয়ে ডুবে গেছে ‘এফবি ইদ্রিস’ নামের একটি ট্রলার। কোস্টগার্ড ৪৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করতে পেরেছে, লাশ মিলেছে সাতজনের। নিখোঁজ যাত্রীদের অনেকেরই যে সলিলসমাধি ঘটেছে এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ট্রলারের গন্তব্য ছিল মালয়েশিয়া। ঝুঁকি নিয়ে অবৈধভাবে এই যাত্রীরা মালয়েশিয়া যাচ্ছিলেন চাকরির আশায়। একশ্রেণির দালালের সহযোগিতায় সমুদ্রপথে অবৈধ উপায়ে মালয়েশিয়া (কখনো বা থাইল্যান্ড) যাওয়ার চেষ্টা নতুন ঘটনা নয়। গত তিন বছরে পাঁচটি ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটেছে বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার ও সেন্ট মার্টিন এলাকায়। এসব ট্রলারের ছয় শতাধিক যাত্রীর মধ্যে লাশ উদ্ধার হয়েছে মাত্র ৭০ জনের। বাকি নিখোঁজ যাত্রীদের কপালে কী ঘটেছে সহজেই অনুমেয়। এই চেষ্টায় যাঁরা সফল হয়েছেন, তাঁরা সেখানে যে সোনার হরিণের (চাকরি) সন্ধানে গিয়েছিলেন তা আদৌ পেয়েছেন কি না, আমরা জানি না। তবে তাঁদের আত্মীয়-পরিজনের সূত্রে নানা সময়ে যেসব প্রতারণার কথা জানতে পেরেছি, তা মোটেও সুখকর নয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জমিজমা বিক্রির টাকা দালাল চক্রের হাতে তুলে দিয়েও বৈধ কাগজপত্রের অভাবে সেখানে তাঁদের কাটাতে হচ্ছে মানবেতর জীবন। দুঃসহ অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরেও এসেছেন অনেকে। এখন প্রশ্ন উঠছে, জীবন তুচ্ছ করে কেন এই দুর্গম পথ পাড়ি দিতে চায় চাকরিপ্রত্যাশী যুবকেরা?
রাজনৈতিক সহিংসতায় মৃত্যু বা বার্ন ইউনিটের শয্যায় অগ্নিদগ্ধের কাতরতার সঙ্গে কুতুবদিয়া চ্যানেলের ট্রলারডুবির ঘটনার আপাত কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু যে দেশে রিকশা বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালিয়ে মাসে ৭ থেকে ১০-১২ হাজার টাকা আয় করতে পারেন চালক, ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করতে পারেন বাস বা ট্রাকচালক, এমনকি শহুরে বাজারে মাছ কাটার কাজ করেও দৈনিক ২০০ থেকে ৪০০ টাকা আয় করা সম্ভব যে দেশে, সেখানকার মানুষ কেন সর্বস্ব বাজি রেখে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে বিদেশে সস্তায় শ্রম বিক্রি করতে যেতে চায়, সে কথাটা ভেবে দেখা দরকার।
দেশের রাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে গরিব-ধনী-মধ্যবিত্ত সবারই জীবনে আজ অনিশ্চয়তা আর অস্থিরতা। শিল্পোদ্যোক্তা, ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ চাকরিজীবী কারোরই জীবন নির্বিঘ্ন নয়। তবু বিত্তবানরা কেউ কেউ আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়ায় ফ্ল্যাট কিনছেন, সন্তানদের সে দেশে পড়াশোনা করতে পাঠিয়ে রাজনৈতিক সহিংসতার আঁচ থেকে রক্ষা করতে চাইছেন। কিন্তু দরিদ্র কৃষক, রিকশা বা ট্রাকচালক, হকার বা ক্ষুদ্র দোকানদার কোথায় যাবেন? অর্থোপার্জনের জন্য বিদেশ যেতে চাইলে পদে পদে প্রতারণার ফাঁদ, আর দেশে ওত পেতে আছে পেট্রলবোমা। হয় বার্ন ইউনিট, নয় কুতুবদিয়া চ্যানেল—এই কী তার অনিবার্য গন্তব্য?
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwabd@yahoo.com

উজান স্রোতে আওয়ামী নৌকা by জি. মুনীর

স্বীকার না করে উপায় নেই, দেশ আজ চরম সঙ্কটে নিপতিত। এ সঙ্কট রাজনৈতিক। এ রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণে প্রতিদিন মানুষ শিকার হচ্ছে হত্যা, নির্যাতন ও নিপীড়নের। এর শিকার যেমন রাজনৈতিক নেতাকর্মী, তেমনি রাজনৈতিক বলয়ের বাইরের সাধারণ মানুষ। পথেঘাটে মানুষ পুড়ে মরছে। কেউ যাচ্ছে বার্ন ইউনিটে। অপর দিকে খুন, গুম, অপহরণ, ক্রসফায়ার রাজনৈতিক নেতাকর্মী দমনপীড়ন চলছে সমান্তরালভাবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয় দিয়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বাড়ি থেকে ধরে নেয়া হচ্ছে। কোনো কোনোটির দায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অস্বীকার করছে। ফলে কেউ ফিরছেন কথিত বন্দুকযুদ্ধের শিকার হয়ে লাশ হিসেবে, কেউ থাকছেন নিখোঁজ। বর্তমানে চলছে ২০ দলের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি। সাথে সাথে থেমে থেমে হরতাল কর্মসূচিও। এর ফলে সারা দেশে চলছে চরম এক বিশৃঙ্খলা। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে সব শ্রেণীপেশার মানুষ এখন দিন কাটাচ্ছে চরম এক নিরাপত্তাহীনতার মাঝে। ব্যবসায়-বাণিজ্য স্থবির। অর্থনীতির চাকা অচল। অস্থিরতার আগুনে পুড়ছে সারা দেশ। চার দিকে হাহাকার! সবার এক কথা, এভাবে একটি দেশ চলতে পারে না। এর একটা সুরাহা দরকার।
রাজনৈতিক স্বার্থান্ধ হয়ে আমরা স্বীকার করি বা না করি, এর বাস্তব একটা প্রেক্ষাপট আছে। আজকের চলমান উত্তপ্তাবস্থা সৃষ্টির কারণ আমাদের সবার জানা। এ দেশের প্রতিটি মানুষ জানে, আজকের এই সঙ্কটের মূলে রয়েছে বহুলালোচিত ও বহুল বিতর্কিত ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন অগণতান্ত্রিক একটি নির্বাচন। সেখানে দেশের দুই-তৃতীয়াংশ রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি। ৩০০ নির্বাচনী আসনের ১৫৩টিতে এমপি নির্বাচিত বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায়। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ছিল না বলে বলতে গেলে বিশ্বের প্রায় সব দেশই এ নির্বাচনে কোনো পর্যবেক্ষকদল পাঠায়নি। খুব সম্ভব ভারত ও ভুটান ছাড়া আর কোনো দেশই পর্যবেক্ষকদল পাঠায়নি। নির্বাচনের পর থেকে প্রতিটি দেশ বলে আসছে, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন কোনোমতেই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছিল না। অতএব, যথাসম্ভব দ্রুত সবার অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। এমনকি ৫ জানুয়ারির বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষপর্যায়ের নেতানেত্রীরা ওই সময় বলেছিলেন, ওই নির্বাচন নিয়ম রক্ষার নির্বাচন এবং সংবিধান রক্ষার নির্বাচন। এ নির্বাচনের পর সবার অংশগ্রহণে একটি নির্বাচনের আয়োজন করা হবে। কিন্তু নির্বাচনের পরপরই সরকার গঠন করেই সরকার সুর পাল্টে দিলো। বলতে শুরু করল, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনসূত্রে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকার ২০১৯ সাল পর্যন্ত পুরো ৫ বছর ক্ষমতায় থাকবে। বিএনপি ও এর নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নির্বাচনী ট্রেন ফেল করেছে। অতএব, তাদেরকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত পরবর্তী সংসদ নির্বাচনের অপেক্ষায় থাকতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই সরকারের এ অবস্থান কেউ মেনে নেয়নি। ২০ দলীয় জোট ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল অবিলম্বে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের দাবিই সরকারের কাছে জানাতে থাকে। দেশের বাইরে থেকেও শুধু ভারত ছাড়া সব দেশই একই কথা বারবার বলতে থাকে। সবার কথাÑ ৫ জানুয়ারির নির্বাচন গ্রহণযোগ্য ছিল না। অতএব, সরকারকে দ্রুত সবার অংশগ্রহণে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। দেশের সরকারবিরোধী দল ও জোট গোটা ২০১৪ সাল কাটায় এই বলে, দ্রুত সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনের ব্যবস্থা না করলে এরা আন্দোলনে নামবে। অপর দিকে ২০ দলীয় জোট যাতে এ ব্যাপারে কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে না পারে, সে জন্য গোটা ২০১৪ সালে সরকার বিরোধী দল ও জোটের নেতানেত্রীদের ওপর হামলা-মামলা, দমনপীড়ন চালায় সীমাহীনভাবে। অপর দিকে বিরোধী জোটের সভা-সমাবেশ ও মিছিল-মিটিংয়ের ওপর অগণতান্ত্রিক নিষেধাজ্ঞার মাত্রাও পৌঁছে চরমে। বিরোধী দল ও জোটের অফিস বন্ধ করে দেয়া, অফিসে সাধারণ নেতাকর্মীদের যেতে বাধা দেয়া, যখন-তখন গ্রেফতার, মামলা-হামলা ইত্যাদি চলে অবাধে।
এমনই একটি প্রেক্ষাপটে বেগম জিয়াকে কী পরিস্থিতির মধ্যে আজকের চলমান অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করতে হয়েছে এবং এ কর্মসূচি ঘোষণার পর থেকে তাকে কী ধরনের প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়েছে ও হচ্ছে, তা দেশবাসী সবারই জানা। তা ছাড়া কোন দাবিতে তার এই অবরোধ কর্মসূচি ঘোষিত হয়েছে তাও আমাদের জানা। তার দাবি জনগণের ভোটের অধিকার। সবার অংশগ্রহণে সমসুযোগের ভিত্তিতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকার প্রতিষ্ঠা। আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকারের পতন হলো, আর ২০ দলীয় জোটনেত্রী বেগম জিয়া ক্ষমতায় বসে গেলেন, ব্যাপারটি তেমন নয়; বরং বর্তমান সরকারকে সবার অংশগ্রহণে সমসুযোগের ভিত্তিতে একটি নির্বাচনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, সেটাই আজকের ২০ দলীয় জোটসহ সরকারের বাইরে থাকা সব রাজনৈতিক দলের দাবি। আর তেমনটি করতে হলে প্রয়োজন রাজনৈতিক সংলাপের। সে সংলাপে বসতে বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কোনো আপত্তি নেই। সরকারের বাইরে থাকা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোরও সংলাপ আপত্তি নেই, এমনকি ১৪ দলীয় সরকারি জোটের প্রায় অর্ধেকসংখ্যক দলও সংলাপে বসতে রাজি আছে বলে গণমাধ্যমসূত্রে আমরা জানতে পেরেছি। অতএব, এখন আওয়ামী লীগ নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংলাপে বসলেই একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ হয়তো জাতি খুঁজে পেতে পারে। কিন্তু তিনি সে পথে যেতে রাজি নন কেন, তা সাধারণ মানুষের বোধগম্য নয়।
সবার এক কথা, সংলাপেই বর্তমান সঙ্কটের একমাত্র পথ। এ সঙ্কটের শান্তিপূর্ণ সমাধান। গত পরশু জাতীয় ঐক্যপ্রক্রিয়ার আয়োজনে রাজধানীতে বর্তমান জাতীয় সঙ্কট নিরসনে জাতীয় সংলাপ তথা গোলটেবিল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও সবাই একসুরে বলেছেন, বর্তমান সঙ্কট নিরসনে ‘সংলাপের কোনো বিকল্প নেই’। গোলটেবিল আলোচনায় দেশের চলমান সঙ্কটে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। সঙ্কট সমাধানে সংলাপের পক্ষে মত দিয়েছেন তারা। বলেছেন, একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক দেশে সংলাপ ছাড়া সঙ্কট নিরসনের কোনো বিকল্প নেই। সংলাপ হতে হবে দেশের সব সক্রিয় রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের কার্যকর অংশগ্রহণের মাধ্যমে। তারা বলেছেন, বাংলাদেশে এক দল আরেক দলকে নির্মূল করতে চায়; কিন্তু তা কখনো হবে না। কেউ কাউকে নির্মূল করতে পারবে না। নাগরিক সমাজের কেউ কেউ বলেছেন, দেশের অভিবাবক হিসেবে প্রেসিডেন্ট এগিয়ে আসতে পারেন। সবার কাছে গ্রহণযোগ্য তিন থেকে পাঁচজন নাগরিকের কমিটি করে দুই পক্ষের সাথে আলোচনা করে সংলাপ শুরু করার পক্ষেও মত আসে।
শুধু নাগরিক সমাজ নয়, দেশের ভেতরে-বাইরের সবাই চাইছেন সংলাপের মাধ্যমে বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমাদের সরকারপক্ষকে নিয়ে। সরকার বলছে, দেশে কোনো রাজনৈতিক সঙ্কট ও সমস্যা নেই। সব ঠিকঠাক আছে। ঠিকমতো দেশ চলছে। জ্ঞানীগুণীরা বলেন, কোথাও কোনো সঙ্কট বা সমস্যা থাকলে এর প্রথম কাজ হচ্ছে সঙ্কট বা সমস্যাটি কী, তা চিহ্নিত করা। কিন্তু সরকারপক্ষ যখন বলছে, বর্তমানে বাংলাদেশে কোনো রাজনৈতিক সঙ্কট বা সমস্যা নেই। অতএব তা চিহ্নিত করার কোনো প্রশ্নই আসে না। সমাধানের উদ্যোগ নেয়া তো পরের কথা। অতএব কোনো সংলাপ নয়। আরো ভয়াবহ দিক হলো, সরকারের যাবতীয় প্রচারণা হচ্ছে বিএনপি একটি সন্ত্রাসী দল। জঙ্গি দল। বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া সন্ত্রাসের নেত্রী। তারা আরো বলেন, বিএনপি স্বাধীনতাবিরোধী দল। বিএনপি বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে চায়। বিএনপি নেত্রী ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশ পাকিস্তান হয়ে যাবে। তার সাথে কোনো সংলাপ নয়। অতএব, সমস্যার সমাধান বিএনপিকে নির্মূল করার মধ্য দিয়ে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচটি ইমামসহ অন্যান্য নেতানেত্রী প্রকাশ্যেই বলছেন, বিএনপিকে নির্মূল করতে হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, বেগম খালেদা জিয়া এ দেশে তিন-তিনবার নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তার শাসনামলে বাংলাদেশ পাকিস্তান হয়নি, বাংলাদেশই ছিল। অতএব বেগম জিয়া বাংলাদেশকে পাকিস্তান বানাতে চান, এসব বলে কোনো লাভ নেই। তা ছাড়া যারা বলেন, বিএনপিকে নির্মূল করতে হবে, তাদের জানা উচিত তাহলে এ দেশের কমপক্ষে ৪০ শতাংশ মানুষকে মেরে ফেলতে হবে। তবেই যদি বাংলাদেশ থেকে বিএনপি নির্মূল হয়। তবে আরেকটি রাজনৈতিক বাস্তবতা হচ্ছে, কোনো গণসংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলকে নির্মূল করা যায় না। বিএনপির বেলায় এটি যেমন সত্য, তেমনি তা আওয়ামী লীগের বেলায়ও সত্য। তবে বিএনপির কাউকে বলতে শোনা যায়নি, আওয়ামী লীগকে নির্মূল করার কথা। কিন্তু বিএনপিকে নির্মূল করার কথা আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগ জোটের নেতানেত্রীদের মুখে হর-হামেশাই শোনা যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর লোকেদের মুখ থেকে একই ধরনের অনাকাক্সিত কথা উচ্চারিত হচ্ছে।
সম্প্রতি এইচটি ইমাম বলেছেন, বিএনপিকে নির্মূল করতে হবে। তিনি এটাও বলছেন, অবরোধ তুললেই সংলাপের গ্যারান্টি নেই। প্রধানমন্ত্রীতনয় ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা নয়, মোকাবেলা করা হবে অস্ত্র দিয়ে। জাসদের এমপি মাঈন্ুিদ্দন খান বাদল কুমিল্লায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বলেছেন, প্রয়োজনে সরাসরি বুকে গুলি করতে হবে। তার মুখ থেকেই আমরা শুনেছিলাম ‘সংলাপে লাথি মারো’। ডিআইজি এসএম মাহফুজুল হক নূরুজ্জামান অবরোধকারীদের উদ্দেশে বলেছেন, আমি হুকুম দিয়ে গেলাম, নাশকতাকারীদের বংশধর পর্যন্ত ধ্বংস করে দিতে হবে। আর এর সব দায়দায়িত্ব তার। আমাদের প্রধানমন্ত্রীও কয়দিন আগে আইনশৃংখলা বাহিনীকে একই ধরনের নির্দেশ দিয়েছিলেনÑ যে করেই হোক এদের দমন করতে হবে, এ জন্য সব দায়দায়িত্ব তার। আজকের বিরোধী আন্দোলন দমনে বিজিবি, পুলিশ ও র‌্যাব বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা যেভাবে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন, তা সব মহলে সমালোচনার মুখে পড়ে।
আসলে দেশের অবস্থা ভালো নয়। চরম বিপর্যস্ত। এ কথা সরকারি দলের কেউ স্বীকার করতে চান না। তাদের কথা শুনলে মনে হয়, সব ঠিকঠাক। তবে গত শনিবার আমরা সরকারের দু’জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কাছ থেকে শুনলাম দেশের অবস্থা আসলে ভালো নেই। এদের একজন অর্থমন্ত্রী। অপরজন পুলিশের আইজি, যিনি রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে এরই মধ্যে বিভিন্ন মহলে সমালোচিত হয়েছেন।
আমাদের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ‘হরতাল-অবরোধের ফলে ঢাকায় হয়তো কিছু বোঝা যায় না; কিন্তু রাজধানীর বাইরের জেলাগুলোতে পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করেছে।’ তবে এই পরিস্থিতির উত্তরণ কবে হবে তার উত্তরে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, ‘নোবডি নোউজ’। অপর দিকে গাইবান্ধায় শনিবার পরিবহন মালিকদের সাথে বৈঠকে পুলিশের আইজি শহিদুল হক তাদেরকে রাত নয়টার পর দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস না চালানোর অনুরোধ জানান।
সরকার এই-সেই বলে বিএনপিকে সন্ত্রাসী দল বলে পরিচিত করার অপপ্রচার চালিয়ে সংলাপ এড়িয়ে পার পেয়ে যাওয়ার যে ভুল সড়কপথে হাঁটছে, তা সঠিক পথ নয়। সজীব ওয়াজেদ জয়কে সম্প্রতি বলতে শুনলাম, এখন নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ জয় পাবে। সরকারপক্ষের আরেকজন নেতার মুখে বলতে শোনা গেছে, তারেক জিয়ার বক্তব্যের কারণে বিএনপির জনপ্রিয়তা শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। যদি তা-ই হয়, তবে আওয়ামী লীগের একটি নির্বাচন দিতে কেন এতটা অনীহা। একটা নির্বাচন দেয়ার কথা ঘোষণা দিলেই তো আন্দোলন থেমে যায়। সরকারবিরোধীদের দাবি তো একটাইÑ অবিলম্বে সবার অংশগ্রহণে সব দলের জন্য সমসুযোগের ভিত্তিতে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আয়োজন করা। আর সেটি করার জন্য তো দরকার দেশে সক্রিয় সব রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা। একমাত্র রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপের মাধ্যমেই সে সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভবÑ এ কথা বুঝতে কারো বিশেষজ্ঞ হওয়ার প্রয়োজন নেই। সাধারণ মানুষ তা বুঝতে সক্ষম। কিন্তু বুঝে আসে না আমাদের সরকারি দলের নেতানেত্রীদের। কারণ, তাদের মাথায় এখন ভিন্ন চিন্তাÑ কিভাবে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতা আঁকড়ে থাকা যায় এবং কী করে বিএনপিকে নির্মূল করা যায়। সেই চিন্তা আওয়ামী লীগ নেতাদের মাথায় থেকে যত দ্রুত দূর হয়, ততই মঙ্গল। এ মঙ্গল সবার। নইলে দুর্ভোগ সবারÑ দেশ ও জাতির। সেই পথ ছেড়ে কেন যে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব উজান স্রোতে নৌকা চালানোর ধনুকভাঙা পণ করে বসেছে, এর উত্তর নেই।

কঠিন সময় চিরকাল থাকে না

রোদ-বৃষ্টি-ঝড়-তুষার ঠেলে দৈনিক ২১ মাইল হেঁটে অফিস করার প্রতিদান পেলেন সেই পরিশ্রমী জেমস রবার্টসন। টানা ১০ বছরে সেই কষ্ট অবশেষে লাঘব হল উপহার পাওয়া নতুন গাড়িতে। ছোটবেলায় বাবার কাছে শেখা নীতিকথার প্রতিফলন পেলেন বাস্তব জীবনে। বাবা বলেছিলেন, কঠিন সময় চিরকাল থাকে না কিন্তু চিরকাল থেকে যান কঠিন ধাতের মানুষরা। জেমসের রোজনামচা জানাজানি হওয়ার পরই কঠিন সময় কাটার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে তার। খবর প্রকাশের মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে জেমসের জন্য সাহায্য উঠেছে ৩৫ হাজার ডলার। সেইসঙ্গে উপহার পেয়েছেন একটি ঝকঝকে নতুন ফোর্ড গাড়ি। জেমসের আসল উপকারটা করেছেন বন্ধু ব্লেক পোলাক।
তিনিই বিভিন্ন গণমাধ্যমের সামনে নিয়ে আসেন জেমসের হেঁটে অফিস যাওয়া সংগ্রামকে। এরপর তাদের সঙ্গে যোগ দেন কলেজছাত্র ইভান লিডি। তিনিই জেমসের নামে খোলেন ইন্টারনেট পেজ ‘গো ফাউন্ড মি’। এরপরই ক্রমাগত আসতে থাকে জেমসের পক্ষে সমর্থন ও সাহায্য। ২০০৫ সালে জেমসের গাড়িটা নষ্ট হয়ে যায়। তখন নতুন গাড়ি কিনবেন, সেই টাকাও নেই। কিন্তু পেটের দায় যে বড় দায়। তাই পায়ের ভরসাতেই পথে নেমেছেন জেমস। ডেট্রয়েট থেকে রচেস্টার হিলসের যে এলাকায় তার অফিস, সেখানে সরাসরি কোনো বাস বা ট্রেন যায় না। দীর্ঘ ২১ মাইল হেঁটে অফিস করতেন তিনি। অফিস কামাই করার স্বভাবও তার নেই। সাম্প্রতিক তুষারঝড়ে আমেরিকার উত্তর-পূর্বাংশ যখন বরফে ঢেকে যায় তখনও পায়ে স্নো বুট পরে নির্দিষ্ট সময়েই অফিসে করেছেন তিনি। সিএনএন।

জর্ডানের বিমান হামলায় মার্কিন জিম্মি নিহত

সিরিয়ার ইসলামিক স্টেটের (আইএস) হাতে বন্দি যুক্তরাষ্ট্রের এক নারী জিম্মি জর্ডানি বোমাবর্ষণে নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছে আইএস। ওই নারীকে বন্দি করে রাখা একটি ভবনে জর্ডানি জঙ্গি বিমানগুলোর চালানো হামলায় তিনি নিহত হয়েছেন বলে শুক্রবার জানিয়েছে আইএস। তবে আইএসের এই দাবির বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে জর্ডান। ওয়াশিংটন পোস্ট অ্যারিজোনার বাসিন্দা ২৬ বছর বয়সী মানবাধিকার কর্মী কাইলা মুয়েলের নিহত হয়েছেন, এমন খবর তারা নিশ্চিত করতে পারছেন না বলে রাজধানী ওয়াশিংটন থেকে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি কর্মকর্তারা। এসআইটিইতে প্রকাশিত বার্তানুযায়ী ইসলামিক স্টেট বলেছে, শুক্রবার জর্ডানি বিমান হামলায় রাক্কা শহরের কাছে একটি ভবন বিধ্বস্ত হয়ে কাইলা নিহত হয়েছেন। বিধ্বস্ত ভবনটিতে জিম্মি কাইলাকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল বলে জানিয়েছে তারা। ‘এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে এই একই এলাকায় বিমান হামলা চালানো হয়।’ কয়েকটি ছবি প্রকাশ করে তা বিধ্বস্ত ওই ভবনটির বলে দাবি করেছে আইএস, কিন্তু এসব ছবির মধ্যে নিহত কাইলার কোনো ছবি নেই। জর্ডান জানিয়েছে, শুক্রবার দ্বিতীয় দিনের মতো তারা আইএসের অবস্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে।
আইএসের দাবির প্রতিক্রিয়ায় দেশটির সরকারি মুখপাত্র মোহাম্মদ মোমানি বলেছেন, ‘আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখছি। তবে আমাদের প্রথম প্রতিক্রিয়ায় এটিকে অযৌক্তিক বলে মনে করছি ও এর বিষয়ে অত্যন্ত সন্দিগ্ধ মনোভাব পোষণ করছি।’ ‘আকাশের অত উপরে থাকা জর্ডানি যুদ্ধবিমানগুলোকে তারা শনাক্ত করল কী করে? যুক্তরাষ্ট্রের একজন নারী একটি অস্ত্রাগারে কী করছিলেন?,’ বলেন তিনি। হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের মুখপাত্র বের্নাদেত্তে মীহান বলেছেন, ‘মুয়েলার নিহত- এমন দুঃসংবাদে যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন। তবে গোষ্ঠীটির দাবি নিশ্চিত করে এমন কোনো প্রমাণ আমরা পাইনি।’ এদিকে শুক্রবার কাইলার পরিবার এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কাইলা জীবিত আছেন বলে তারা মনে করেন এবং আমরা অপেক্ষায় আছি, আইএস অবশ্যই আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করবে। কাইলাকে আইএসের হাতে বন্দি যুক্তরাষ্ট্রের শেষ জিম্মি হিসেবে মনে করা হয়। সাম্প্রতিক কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের তিন জিম্মি নাগরিককে শিরশ্ছেদে হত্যা করেছে গোষ্ঠীটি। এসব নিহতরা মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক ছিলেন। ২০১৩’র আগস্টে সিরিয়ার আলেপ্পো থেকে কাইলাকে ধরে নিয়ে গিয়ে জিম্মি করেছিল আইএস।

বেদি নয় কেজরির প্রতিদ্বন্দ্বী মোদি

দিল্লি বিধানসভা নির্বাচনে দৃশ্যত আম আদমির কেজরিওয়াল লড়ছেন বিজেপির কিরণ বেদির বিরুদ্ধে। কিন্তু ভোট প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কেজরিওয়ালের আসল লড়াইটা চলছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে। মোদিই আসল প্রতিপক্ষ। গত লোকসভা নির্বাচনে মোদি-উন্মাদনার যে ঢেউ উঠেছিল, সেটাকেই কাজে লাগিয়ে পার পেতে চাচ্ছে বিজেপি। কিন্তু সমীকরণটা এত সহজ হচ্ছে না। রাজনীতির গতিপ্রকৃতিকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে দেখলে বোঝা যায়, ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটতে যাচ্ছে এই নির্বাচনী লড়াইয়ে।
১৯৮৮ সালের জুন মাসে রাজীব গান্ধীর বিরুদ্ধে যেভাবে চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন বিশ্বনাথ প্রতাপ সিং (ভিপি সিং), ঠিক সেভাবেই আরেকটা চ্যালেঞ্জ নিয়েছেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। কংগ্রেস থেকে বের হয়ে জন মোর্চা দল গড়েছিলেন ভিপি সিং। এলাহাবাদের আসন শূন্য হলে ভিপি সিংয়ের সেই চ্যালেঞ্জে শেষ পর্যন্ত কংগ্রেস দলের পতন শুরু হয়েছিল। আজ ২৭ বছর পর বিজেপির মোদি ম্যাজিকের রেশ কমাতে দাঁড়িয়েছেন কেজরিওয়াল। কেজরিওয়াল এই লড়াইয়ে সফল হলে ভারতীয় রাজনীতিতে এক নতুন ভারসাম্য সৃষ্টি হবে। তাই এই লড়াইটা ১৯৮৮ সালের মতোই বিজেপি বা কিরণ বেদির বিরুদ্ধে নয়, স্পষ্টতই মোদির বিরুদ্ধে। বেদি এখানে মোদির প্রক্সি। এলাহাবাদে যেমন সুনীল শাস্ত্রী রাজীব গান্ধীর প্রক্সি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। কারণ প্রতিষ্ঠিত দল সব সময় সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে ভুঁইফোঁড় নেতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা আড়াল করতে চায়। এই নির্বাচনেও লড়াইয়ের ধরন একই- শাসক দলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই।
২৭ বছর আগে ভিপি সিং নির্বাচনী প্রচারণায় যাওয়ার সময় পকেটে ম্যাচ রাখতেন। গরিব নিুবিত্তদের বুঝিয়ে বলতেন, কীভাবে চার আনার জিনিসেও সরকার ট্যাক্স আদায় করে, আর সেই টাকায় স্কুল, হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি নিজেদের পকেট ভরে। কেজরিওয়ালও বস্তিবাসীসহ গরিবদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন পুঁজিবাদ বান্ধব সরকার এলে বস্তি গুঁড়িয়ে বড় বড় ইমারত তুলে নিজেদের পকেট ভরার ব্যবস্থা করবেন। তাছাড়া সাদাসিধে মানুষ হিসেবে কেজরিওয়ালের ৪৯ দিনের শাসনে প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্য যেভাবে কমিয়ে রেখেছিলেন, তা এখন পাঁচ গুণের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। নির্বাচন-পূর্ব জরিপে কেজরিওয়াল যেভাবে এগিয়ে আছেন, তাতে অনুমান করাই যায়, কংগ্রেসের পতনের পর রাজধানীতে মোদির বিরুদ্ধে ভারসাম্য রক্ষায় নতুন শক্তির উদ্ভব হতে যাচ্ছে। চূড়ান্ত ফলাফলের জন্য কয়েকটা দিন আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।

সিডনিতে ছুটির মেজাজে টাইগাররা

বাংলাদেশ দল এখন সিডনিতে। আগামীকাল বিশ্বকাপের প্রথম আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। অস্ট্রেলিয়ায় টাইগাররা প্রথম অনুশীলন ক্যাম্প শুরু করে ব্রিসবেনে। সেখানে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচও খেলেছে মাশরাফি বাহিনী। অস্ট্রেলিয়া একাদশের বিপক্ষে দুটি ম্যাচেই হেরেছে বাংলাদেশ। এখন পাকিস্তানের বিপক্ষে মাশরাফিদের আসল পরীক্ষা দেয়ার পালা।
কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে ২৪ জানুয়ারি দেশ ছাড়ে দল। কাল সিডনিতে খোশমেজাজে ঘুরে বেরিয়েছেন ক্রিকেটাররা। সিডনি অপেরা হাউসের সামনে ছবি তুলে পোস্ট করেছেন নাসির হোসেন। এছাড়া মুশফিকুর রহিম, মুমিনুল হক, তাইজুল ইসলাম, সাব্বির রহমানরা বেশ মজা করেই দিনটা কাটিয়েছেন।

অনন্ত আসছেন নতুন রূপে

সম্পূর্ণ নতুন গেটাপে দর্শকদের সামনে আসছেন আলোচিত চিত্রনায়ক অনন্ত জলিল। আপকামিং ছবি ‘দ্য স্পাই’-এ তাকে একেবারে ভিন্ন রূপে দেখা যাবে। এরই মধ্যে ছবিটির স্ক্রিপ্টসহ যাবতীয় প্রাথমিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেই ছবির শুটিং শুরু করবেন বলে তিনি জানিয়েছেন। এ ছবিতে তিনি একজন গোয়েন্দার চরিত্রে অভিনয় করবেন। রাষ্ট্রীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বিদেশী শক্ররা নিয়ে যেতে চাইছে।
এসব শত্র“দের মোকাবিলার দায়িত্ব তাকে দেয়া হয়। একের পর এক দুর্ধর্ষ অভিযানে শত্র“দের ধ্বংস করে দেশকে রক্ষা করেন তিনি। মূলত এমন চরিত্রেই দেখা যাবে তাকে। এ ছবি প্রসঙ্গে অনন্ত বলেন, ‘আমার প্রতিটি ছবির মতো এ ছবিতেও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার থাকবে। তবে আগের চেয়ে আরও বেশি নজর দিয়ে ছবিটি তৈরি করব। কারণ দর্শকদের কাছে আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। তাদের সেরাটা দেয়াই আমার লক্ষ্য। পাশাপাশি বরাবরের মতো কিছু মেসেজও থাকছে ছবিতে। সব মিলিয়ে দর্শকদের আরও একটি উপভোগ্য ছবি আসছে।’ এ ছবিতেও অনন্তর বিপরীতে অভিনয় করবেন চিত্রনায়িকা বর্ষা। থাকছে দেশী-বিদেশী আরও কিছু অভিনেতা।

পর্নো ভিডিও দেখার জেরে স্বামীকে হত্যা...

এক তুর্কি স্ত্রী তার স্বামীর গলা কেটে হত্যার পর পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। জার্মানির পর্নো ভিডিওতে যেসব দৃশ্য দেখেছিলেন স্বামী, সেগুলো স্ত্রী গোনুলকে (৪৯) করতে বলতেন তিনি। স্ত্রী মাঝে-মধ্যে এহেন প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায়, তাকে প্রায়ই মারধর করতেন স্বামী। এভাবে ২০ দিন কেটে যাওয়ার পর পরিস্থিতি চরম আকার ধারণ করলে, একদিন গোনুল তার ৬৭ বছর বয়সী স্বামীকে হত্যা করেন। এ খবর দিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি। আইনজীবীদের কাছে দেয়া জবানবন্দিতে গোনুল বলেছেন, প্রথম ২০ দিন সবকিছুই ছিল ঠিকঠাক। কিন্তু, এরপর ঘরোয়া প্রতিহিংসা শুরু হয়। সকাল হওয়া পর্যন্ত জার্মানির পর্নো ছবি ও ভিডিও দেখতেন স্বামী এবং আমাকেও সেগুলো করতে বলতেন। আমি তা করতে রাজি না হলেই, তিনি আমাকে মারধর করতেন। শেষ পর্যন্ত পুলিশের কাছে অভিযোগ করেন গোনুল এবং সহিংসতার মাত্রা আরও অনেক বেড়ে যায়। এরকমই এক ঘটনায় উত্তপ্ত বাক-বিত-ার মধ্যে ওই ব্যক্তির আরেক পক্ষের স্ত্রীর পুত্র একটি ভোঁতা বস্তু দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন। এ সময় রান্নাঘরের একটি ছুরি দিয়ে স্বামীর গলা কেটে তাকে হত্যা করেন স্ত্রী। এরপর তিনি পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। গোনুলকে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। অচিরেই তার বিচার প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানা গেছে। একসঙ্গে সুখী জীবনযাপনের প্রতিশ্রুতি দেয়ায় গোনুল সংসার জীবনে পা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানান। তুর্কি কর্তৃপক্ষ স্বীকার করছে, দেশটির মূল সমস্যাগুলোর একটি ঘরোয়া সহিংসতা। প্রতি বছর ঘরোয়া প্রতিহিংসার জেরে শ’ শ’ নারী প্রাণ হারান। স্বামী মারধর করার পর খুব অল্প সংখ্যক ঘটনায় স্ত্রী তার স্বামীকে হত্যার পথ বেছে নেন।

বিদেশ যাওয়ার অনুমতি পেলেন না ইংলাক

বিদেশ যাওয়ার অনুমতি পেলেন না থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইংলাক শিনাওয়াত্রা। তার বিরুদ্ধে দেশে বেশ কিছু ফৌজদারি অভিযোগ আছে। সেই অভিযোগে তার বিচার নিশ্চিত করতে দেশটির সামরিক জান্তা তাকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেয় নি। থাই সামরিক জান্তার এক মুখপাত্র গতকাল এ কথা বলেছেন। গত বছর মে মাসে ইংলাককে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে সামরিক বাহিনী। তার পরে নানা চড়াই উৎরাই পেরিয়ে এ পর্যন্ত এলেও গত মাসে তাকে ৫ বছরের জন্য রাজনীতিতে নিষিদ্ধ করা হয়। অভিযোগ, তিনি সরকারের কোটি কোটি ডলার খরচ করে ধান বা চাল কেনার সঙ্গে জড়িত। তাকে আদালতে হাজির হওয়ার জন্য আগামী ১৯শে ফেব্রুয়ারি আবেদন জানাবেন এটর্নি জেনারেল। ইংলাক এর আগেই গতকাল থেকে ২২শে ফেব্রুয়ারি বিদেশে থাকার অনুমতি চান। এর জবাবে এটর্নি জেনারেল বলেছেন, মামলার প্রথম কার্যদিবসে অভিযুক্তকে উপস্থিত থাকতে হবে। তা না হলে এ মামলা চালু করা যাবে না। ইংলাকের আইনজীবী নোরায়িত লালেঙ্গ বলেছেন, আদালতে শুনানির জন্য ইংলাককে সেখানে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামুলক নয়। কারণ, প্রসিকিউটররা মামলাটি দেখাশোনা করছেন এবং তারা বিচারক নিয়োগের প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। সরকার যদি আদালতের কথা বলে ইংলাকের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে তা হবে শুধু অজুহাত। থাইল্যান্ডে রাজনৈতিক উত্তেজনা বিরাজমান। মানবাধিকার খর্ব করা হয়েছে বলে অভিযোগ বিভিন্ন মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থার।

ঢাকায় অবস্থা ভালো বটে! কিন্তু আতঙ্ক তো সবখানেই

অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত স্বীকার করেছেন, ঢাকার পরিস্থিতি ভালো হলেও বাইরের অবস্থা মারাত্মক। ঢাকায় হয়তো হরতাল চলছে না, কিন্তু জেলায় বা আন্তজেলা পরিবহন-যাতায়াতের পরিস্থিতি তো স্বাভাবিক নয়। অবশ্য পুলিশের মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক ঢাকার বাইরের পরিস্থিতি খুব খারাপ বলে মনে করেন না। দু-একটি স্থানে চোরাগোপ্তা হামলা ছাড়া সবখানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক বলে তিনি মনে করেন। যদি তা-ই হবে, তাহলে তিনি কেন আবার রাত নয়টার পর মহাসড়কে যাত্রীবাহী বাস না চালানোর সুপারিশ করেছেন? অবশ্য পরিবহন মালিকেরা রাতেও বাস চালাতে চান। তাঁরা আরও কয়েক দিন পরিস্থিতি দেখে সিদ্ধান্ত নিতে চান।
আসল সত্য হলো, ঢাকায় দোকানপাট, অফিস-আদালত খোলা এবং রাস্তায় গাড়ির ভিড় থাকলেও পেট্রলবোমার ভয় থেকে কারও মুক্তি নেই। আর ঢাকার বাইরে যেহেতু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ কম, তাই সেখানে ভয়ও বেশি। বিভিন্ন জেলায় যাত্রীবাহী বাসে পেট্রলবোমা হামলায় নিরীহ মানুষ পুড়ে মরছে প্রতিদিনই। এমনকি ঢাকায়ও বাসে আগুন দেওয়ার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে দিনের পর দিন।
প্রশ্ন হলো, এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতির অবসানের পথ কী? দীর্ঘদিন ধরে এ রকম অবস্থা চলতে দেওয়া যায় না। মানুষ কি পেট্রলবোমায় পুড়ে মরতেই থাকবে? অর্থনীতির যে ক্ষতি হচ্ছে, সে বিষয়ে কি কারও মাথাব্যথা থাকবে না? ঢাকার বাইরের জেলাগুলোকে সচল রাখার জন্য সরকার শুধু পুলিশ ও প্রশাসনের ওপর নির্ভর করছে। অতিরিক্ত র্যাব, বিজিবি ও পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হচ্ছে। এ কারণে বাড়তি অর্থ বরাদ্দের কথা অর্থমন্ত্রী অকপটে স্বীকার করেছেন। তাহলে কি ধরে নিতে হবে যে সরকার মনে করছে, শুধু র্যাব-পুলিশ দিয়ে সবকিছু ঠান্ডা করা যাবে? তাহলে ভুল হবে। এবং এই ভুলের খেসারত জনগণ দিচ্ছে, সরকারকেও দিতে হবে। জনজীবনের সংকট অস্বীকার না করে বরং সংকট অবসানের রাজনৈতিক উপায় খুঁজে বের করাই এখন সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর প্রধান কাজ। মানুষ শান্তি চায়। সরকারকে এ বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে।

দাবি একটাই, দেশে মোরা শান্তি চাই by বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর উত্তম

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
গত সোমবার পিতাকে পুত্র ১০০ পর্ব শেষ হয়েছে। নিজের কাছেও কেমন খালি খালি লাগছে। এর মধ্যেই কিছু পাঠক জিজ্ঞেস করেছে, নয়া দিগন্তে কি লেখা শেষ করলেন? এখনো তেমনটা ভাবছি না। আর বেশি দিন লিখতে পারব কি না জানি না। আজ ১৩ দিন মতিঝিলের ফুটপাথে পড়ে আছি। দাবি খুব বেশি কিছু না, দেশের এই ভয়াবহ দুরবস্থার প্রতিকারে প্রধানমন্ত্রী আলোচনায় বসুন। সরাসরি বেগম খালেদা জিয়ার সাথেই আলোচনায় বসতে হবেÑ তেমন বলছি না; সমস্যা সমাধানে যার সাথে আলোচনা করা প্রয়োজন তার সাথেই করুন। মানুষের জানমাল হেফাজতের পদপে নিন। কোনো রাজনৈতিক সমস্যা লাঠিসোটা, কামান-বন্দুক দিয়ে অতীতে সমাধান হয়নি; এখনো হবে নাÑ আমার সারা জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্বাস রেখে বলতে পারি। আর কেউ আমায় জোর করে কোনো কিছু বিশ্বাস করাতে পারবে জীবনের শেষ দিকে এসে, এটা মনে হয় না। কড়কড়ে বাস্তবের সামনে অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে যাচ্ছে। এক মাসের ওপর অবরোধÑ এভাবে এত সময় দেশের গলা টিপে রাখলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাবে, তাতে সমস্ত জাতি এক সময় ধ্বংস হয়ে যাবে। বেগম খালেদা জিয়ার স্বামী জিয়াউর রহমান মুক্তিযুদ্ধে একজন প্রথম কাতারের বীরসেনানি। যে যত গালাগাল করুন, একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে তার অবস্থান সূর্যের কাছাকাছি আলোকময়। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তাকে কলুষিত বা কলঙ্কিত করা মানে মুক্তিযুদ্ধকেই খাটো করার শামিল। যেমনÑ বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা বা অবদানকে অস্বীকার করা স্বীকৃতিহীন সন্তানের জন্মের মতো বেদনাদায়ক। জীবনের শেষ দিকে এসে এমন কড়কড়ে বাস্তব সত্যকে উপলব্ধি করে অবাক হচ্ছি। বঙ্গবন্ধু মনে করেছিলেন, কোনো বাঙালি তার বুকে গুলি চালাতে পারবে না। ষড়যন্ত্র যে তার বিরুদ্ধে হচ্ছিল, এটা তিনি জানতেন এবং মানতেন। কিন্তু তার বিশ্বাস ছিল তাকে হত্যা করতে বাঙালি, বাংলা ভাষাভাষীর বাইরে কাউকে লাগবে; কিন্তু বাস্তবে তা লাগেনি। আমিও অনেক েেত্র হোঁচট খাই, বিদ্যাবুদ্ধি তেমন নেই, তাই যেখানে যখন যা দেখি তা থেকেই শেখার চেষ্টা করি। মতিঝিলের ফুটপাথে শীতের রাতে এভাবে পড়ে না থাকলে আমিও কি এত কিছু বুঝতে পারতাম। বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে জীবনের মায়া ত্যাগ করে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিলাম। হানাদারদের কাছ থেকে ছিনিয়ে আনা অস্ত্র কারো কোনো অনুমতি না নিয়ে পিতার আহ্বানে পায়ের সামনে বিছিয়ে দিয়ে কাঙাল হয়েছিলাম। প্রতি পদে পদে নির্যাতন, বঞ্চনা আর বঞ্চনা। সে যে কী চরিত্র হনন, যে জ্ঞানবুদ্ধি আছে তাতে তেমন বোঝার মতা ছিল না। তার পরও বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সব কিছু ছেড়ে-ছুড়ে এক কাপড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুলেছিলাম। কেন যেন বলেছিলাম, খুনিরা কামাল, জামাল, রাসেলকে হত্যা করতে পারলেও বঙ্গবন্ধুকে নির্বংশ করতে পারেনি। আমি তার চতুর্থ সন্তান। পিতৃহত্যার বদলা আমরা নেবোই নেবো। আমরা ওই সময় প্রতিরোধ গড়ে না তুললে আজকের আওয়ামী লীগ কবরে থাকত। প্রধানমন্ত্রী নিরাপদে দেশে ফিরতে পারতেন না। কিন্তু আমাদের কষ্টের কোনো মূল্য হয়নি। আমাদের কষ্টই যে তার দাঁড়ানোর ভিত রচনা করেছে, তা তারা আজ আর মনে করতে পারেন না। আজ স্তাবকের মাঝে বসে অনেক আওয়ামী নেতার আমাদের পথের কাঁটা মনে হতেই পারে। অত বড় সংগ্রাম করে এরশাদকে হটিয়েও ’৯১ সালে আওয়ামী লীগ মতায় যেতে পারেনি। সকালে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে বিকেলে সিরাজগঞ্জের কাজীপুরে মোহাম্মদ নাসিমের সভায় অংশ নিয়ে পরদিন পিরোজপুরের পাড়েরহাট সভা করেছি। সেই রাতেই ৩টায় টুঙ্গীপাড়ায় বঙ্গবন্ধুর কবর জিয়ারত করে মাওয়ায় এসে সূর্য দেখেছি। জানি, আজ সেসবের কোনো মূল্য বা সম্মান নেই। কিন্তু তার পরও তো কিছু সীমা থাকে। সীমা লঙ্ঘনকারীকে দয়াময় প্রভু পছন্দ করেন না। আজ ১৩ দিন ফুটপাথে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি হিসেবে নয়, একজন রাজনীতিবিদ হিসেবেও নয়; একেবারে নির্ভেজাল মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অবস্থান নিয়েছি। বঙ্গবন্ধুর কন্যার আমলে একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী মুক্তিযোদ্ধার নিরাপদে রাস্তায় থাকার সুযোগ থাকবে না, তা কোনো দিন ভাবতে পারিনি। অনেকেই বলতেন, আপনি একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমাদের সবার কাছে প্রিয়। আমরা আপনার রাজনীতি না করলেও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আপনাকে মাথায় রাখি। কোথায় সে সম্মান? কত বড়গলা করে কত লোক বলছে, শান্তিপূর্ণ রাজনীতিকে আমরা সহায়তা করব। এর চাইতে শান্তিপূর্ণ রাজনীতি বাংলাদেশে অতীতে হয়েছে? আর কখনো হবে? টুঙ্গীপাড়ার আওয়ামী লীগ নেতা শেখ লায়েক আলী বিশ্বাসের ছেলে মতিঝিলের ওসি একেবারে জল্লাদ তস্করের মতো এসে কতবার আমার বাঁশ-কাঠ নিয়ে গেছে, বাতাস ফেরানোর জন্য চটের বেড়া সন্তর্পণে চোরের মতো খুলে নিয়েছে। পুলিশের কাজ চোর ধরা। এখানে দেখছি চোরকে সহায়তা করতে পুলিশি পাহারাÑ এ কেমন দেশ? সভ্য সমাজে আমরা মুখ দেখাতে পারব? স্বাধীনতার পর থেকে একজন গরিব মানুষ লাল মিয়া, সব সময় যার দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস, খুবই অসুস্থ। তাকে মিথ্যে বলে দূরে নিয়ে গাড়িতে তুলে থানায় নিয়ে পরদিন চালান করে দিয়েছে। অভিযোগÑ বাংলার বাণীর সামনে সন্দেহজনক ঘোরাফেরা করা এবং ভালোভাবে কথাবার্তা না বলায় তাকে চালান করা হলোÑ এটা কোন ইনসাফ? গরিব মানুষ ভালোভাবে কিছু বলতে না পারলেই তাকে কারাগারে যেতে হবে? আর যা লেখা হয়েছে তা তো মোটেই সত্য নয়। লাল মিয়া একেবারেই নির্বিবাদী মানুষ। এই ৪৫ বছরে তাকে কোনো দিন ডিউটিতে অনুপস্থিত দেখিনি, কারো সাথে কটুকথা বলেনি। সে জানেই না কটুকথা কাকে বলে। আল্লাহর নিয়ামত কুশিমনি আমাদের বুকে এসে যেমন কাঁদতে শেখেনি, তেমনি লাল মিয়া শক্ত বলতে পারে না। সত্যিই এসব করে লাভ কী? এখানে বসার আগে আমার বিশ্বাস ছিল, যতণ জননেত্রী শেখ হাসিনা সরকারে আছেন ততণ অন্তত রাতের বেলায় আমাকে বিরক্ত করা হবে না। কিন্তু তাই যখন হচ্ছে তখন মনে তো প্রশ্ন জাগেই, যদিও কোনো উত্তর খুঁজে পাই না। ১৬ বছর নির্বাসনে কাটিয়ে ’৯০-এর ১৬ ডিসেম্বর দেশে ফিরেছিলাম, বিমানবন্দরে লাখ লাখ লোক হয়েছিল। বেশি দিন বাইরে থাকতে পারিনি। দেশের অনেক চোর-ডাকাতও যখন মুক্ত তখন ১৭ জানুয়ারি ঝিনাইদহ থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সকালের দিকে যখন শত শত পুলিশ গ্রেফতার করতে আসে, তখন তাদের জিজ্ঞেস করেছিলাম, দেশে সরকার আছে নাকি সামরিক শাসন জারি হয়েছে? তারা বলেছিলেন, সরকার আছে। তাদের বলেছিলাম, আমাকে গ্রেফতার করতে হলে গ্রেফতারি পরোয়ানা দিতে হবে। এখানকার এসপি অথবা ওসিকে আনতে হবে। তাদের আমি চিনি না। তাই আমি যাদের চিনি সেই দলীয় লোকদের আনতে হবে। তারা যখন স্বীকৃতি দেবে যে ইনি ঝিনাইদহের এসপি, ইনি ওসি। তারা বলবেন আপনারা সরকারি লোক তখন অবশ্যই আমাকে গ্রেফতার করতে পারবেন। ঠিক তেমনি সত্যিই যদি পুলিশ আমাদের কোনো জিনিসপত্র জব্দ করতে ইচ্ছে করে আইনানুগভাবে জিনিসপত্র নিয়ে সিজার লিস্ট দিতে পারতেন। মোটেই কোনো চোরের মতো আচরণ করতেন না। বড় খারাপ লাগে, বড় বিস্ময় লাগে।
আজ যদি বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকতেন, আর যদি এমন ঘটনা ঘটত, কোনো দাবি নিয়ে রাস্তায় এভাবে বসতাম, নিশ্চয়ই তিনি বলতেন, আমার কাদের দাবি করেছে আলোচনা করতে। ঠিক আছে ও আমাকে প্রথম অস্ত্র দিয়েছে। দেখি ও কী বলে। বঙ্গবন্ধু যে দিন টাঙ্গাইলে গিয়েছিলেন, সে  দিন টাঙ্গাইল পার্ক ময়দানে প্রায় ১০ লাখ লোকের জনসভায় বলেছিলেন, কাদের পল্টনে চারজনকে গুলি করে শাস্তি দিয়েছে। যারা লুটতরাজ করে, যারা হত্যা করে তাদের আরো এক হাজার জনকে ও যদি শাস্তি দিত তাহলেও আমার ধন্যবাদ পেত। এত মর্যাদা দিতেন বলেই তো তার পায়ের সামনে সমস্ত অস্ত্র বিছিয়ে দিয়েছিলাম। জিয়াউর রহমান বেঁচে থাকলে তিনিও বলতেন কাদের ভাই বলেছেন তার সম্মানে অবরোধ স্থগিত করি। আজ কে শোনে কার কথা? একসময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে ভীষণ যতœ করেছেন। বাইরের বাতাস লাগলে কষ্ট হয়, তার জন্য হাতমোজা, মাফলার থাকার পরও কিনে দিতেন। তার বাড়িতে গেলে কতবার চুন তেল গরম করে দিয়েছেন। ’৯১-এর নির্বাচনের পরে রংপুরের হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছেড়ে দেয়া আসনে উপনির্বাচনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সাথে প্রচারে গিয়েছিলাম। একটানা বেশ কয়েক দিন ছিলাম। রংপুর সার্কিট হাউজের ওপরতলায় ছিলেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, সোজাসুজি নিচে জননেত্রী শেখ হাসিনা। বিরোধী দলের নেত্রীকে খাবার দাওয়াত করেছিলেন। মোসাদ্দেক আলী ফালু প্রধানমন্ত্রীর সাথে খাবারের কথা বলছিলেন, তখন জননেত্রী মোসাদ্দেক আলী ফালুকে বলেছিলেন, বজ্র নির্বাচনী সভায় বাইরে আছে। ও আসার আগে আমি খাবো না। বজ্র কে ফালু জানত না, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও জানতেন না। জননেত্রীর শ্বশুরের নাম আবদুল কাদের মিয়া, তাই তিনি আমায় কাদের নামে না ডেকে বজ্র নামে ডাকেন। সে দিনই হয়তো তারা প্রথম জেনেছিলেন আমার নাম বজ্র, যা প্রকৃতিতে আকাশ থেকে পড়ে। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকতে শীতের রাতে তার অজান্তে প্রতিদিন পুলিশ আমার আশ্রয় ভেঙে দিচ্ছে এটা বিশ্বাস করতে মন সায় দেয় না। সর্বশেষ বিশ্বের সপ্তম আশ্চর্যের চেয়েও বড় আশ্চর্য, শুক্রবার বায়তুল মোকাররমে জুমার নামাজ আদায় করতে গেলে মতিঝিল থানার পুলিশ আমার পায়খানার চটের বেড়াসহ সব কিছু নিয়ে গেছে। হুজুর মওলানা ভাসানীর কাছে বসলে তিনি বলতেন মুসলিম লীগের চোরেরা আমার পেসাব পায়খানার বদনা চুরি করেছে। ভারত পাকিস্তান বিভক্তির পর পর দাঙ্গাকবলিত নোয়াখালীতে মহাত্মা গান্ধীর ছাগল চুরি করে খেয়ে ফেলেছিল। এবার দেখছি আমার চকি-চৌকাঠ, বিছানাপত্র, এমনকি পায়খানার বেড়ার চট চুরি করছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাস্তায় বসে এসব আচরণে মর্মাহত না হয়ে পারি না। কিন্তু এত সবের পরেও যদি নেতা-নেত্রীদের চৈতন্যোদয় হয়, দেশে শান্তি আসে, তাতেই আমার শান্তি। গত ৭ ফেব্রুয়ারি কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের ১৬তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ছিল ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে। দীর্ঘ দিন ধরে রাস্তায় অবস্থানে থাকায় সেখানে যেতে পারিনি। দলের নেতাকর্মীরা অনুষ্ঠানটিকে মতিঝিলের ফুটপাথেই নিয়ে এসেছিল, অভাবনীয় লোক সমাগম হয়েছিল। তাতে প্রধান অতিথি হিসেবে জগদ্বিখ্যাত চিকিৎসক সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী উপস্থিত হয়েছিলেন। বিশেষ অতিথি মানবতার শ্রেষ্ঠসেবক ডাক্তারকুলের গর্ব জাফরুল্লা চৌধুরী ও আমার প্রিয়তম ভাতিজা সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আবুল হাসান চৌধুরী কায়সার উপস্থিত ছিলেন। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও যে তারা উপস্থিত হবেন তা ভাবতে পারিনি। এর আগে যারা সংহতি প্রকাশ করতে এসেছিলেন তাদের কাউকে কাউকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়া সংহতি জানাতে তার দলের দুই নেতা সাবেক এমপি আশরাফ উদ্দিন নিজাম ও নাজিম উদ্দিনকে পাঠিয়েছিলেন। সব শিষ্টাচার লঙ্ঘন করে তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। লোকজন আসতে প্রতিনিয়ত বাধা দেয়া হচ্ছে। তারপরও জনতার বিপুল উৎসাহ আমাদের যারপরনাই উৎসাহিত করেছে। আমার ৩২ বছরের ছায়াসঙ্গী, ব্যক্তিগত সচিব ফরিদ আহমেদ, কম্পিউটার অপারেটর আলমগীর হোসেন, ছাত্রনেতা কাওসার জামান খান, যুবনেতা আবদুর রাজ্জাক, টিপু সুলতান ও রোকনকে গ্রেফতার করে জেলে পোরা হয়েছে। এসব আলামত দেখে কী বুঝব? শান্তিপূর্ণভাবে শান্তির জন্য আন্দোলন করলেও মতাবানদের আপত্তি বড়ই বেদনাদায়ক।
রাস্তার পাশে বসে ভাবা যায় না, লেখা যায় না। বঙ্গবন্ধুকে উপল করে দুই বছর ‘পিতাকে পুত্র’ লিখেছি। বলেছিলাম ভাই-বোন, চাচা-চাচীকে নিয়ে আগামীতে ভাববো। অবস্থানে আছি, দয়াময় প্রভু যদি শান্তি দেন, নিশ্চয় সে দিকে এগোবো।