Wednesday, January 29, 2014

বিতর্কিত নির্বাচনের পথে ইংলাক

ইংলাক সিনাওয়াত্রা
থাইল্যান্ডের সরকার আগামী রোববার একটি বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠানের পথেই এগিয়ে যেতে চায়। দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী থুরাপং তোভিচাকচাইকুল গতকাল মঙ্গলবার এ ঘোষণা দেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রার সভাস্থলের কাছাকাছি গুলিতে দুজন আহত হয়েছে। সরকারবিরোধী আন্দোলনকারীরা ইংলাক সরকারঘোষিত নির্বাচন ভন্ডুল করার হুমকি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ইংলাক এ রকম পরিস্থিতিতেই নির্বাচনী কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছেন।
রাজপথে সরকারবিরোধী সহিংসতায় অন্তত ১০ জন নিহত ও শতাধিক আহত হওয়ার পর ওই কর্মকর্তারা এখন নির্বাচন পিছিয়ে দিতে আগ্রহী। নির্বাচন কমিশনের মতে, দেশে এখন নির্বাচন অনুষ্ঠানের মতো স্থিতিশীল অবস্থা নেই। সর্বশেষ গতকাল রাজধানী ব্যাংককের উত্তরাঞ্চলে একটি সামরিক দপ্তরে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক চলাকালে বাইরে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। আহত ব্যক্তিদের একজন সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারী বলে দাবি করা হচ্ছে। অন্যজন হচ্ছে হামলাকারী নিজেই। ইংলাক সিনাওয়াত্রা গত ডিসেম্বরে পার্লামেন্ট ভেঙে নতুন করে নির্বাচনের ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনকারীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তাঁর অধীনে নির্বাচনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন অব্যাহত রাখে ওই বিক্ষোভকারীরা। নির্বাচন কমিশন মনে করছে, আগামী ২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না। এ ছাড়া কয়েকটি নির্বাচনী এলাকায় পার্লামেন্ট নির্বাচনের প্রার্থীরা নিজেদের নাম নিবন্ধন করার জন্যও পর্যাপ্ত সময় পাবেন না।
থাইল্যান্ডে আট বছর ধরে রাজনৈতিক অস্থিরতা চলছে। বর্তমানে দেশটির মধ্যবিত্ত ও রাজতন্ত্রের সমর্থক জনগোষ্ঠী এবং ইংলাক সিনাওয়াত্রার সমর্থক দরিদ্র ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠী পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছে। সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের মতে, প্রধানমন্ত্রী ইংলাক ও তাঁর ভাই সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রার দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের শাসনামলে থাইল্যান্ডের গণতন্ত্র নাজুক রূপ নিয়েছে। এখন নির্বাচনব্যবস্থা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশকে সিনাওয়াত্রা পরিবারের প্রভাবমুক্ত করতে হবে। তিন মাস চলা আন্দোলন কর্মসূচি দমনের লক্ষ্যে গত সপ্তাহে জরুরি অবস্থা জারি করা হলেও সরকার তেমন দমন-পীড়ন শুরু করেনি। তবে শ্রমমন্ত্রী চারের্ম ইউবুমরাং বলেন, সমঝোতা আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন বিক্ষোভের নেতা সুথেপ থগসুবান ও তাঁর সহযোগীরা। আদালত তাঁদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে পারেন। এএফপি ও রয়টার্স।

মিসরের বৈধ প্রেসিডেন্ট আমি, আপনি কে?

মোহাম্মদ মুরসি
মিসরের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসিকে জেল থেকে পালানোর একটি মামলায় গতকাল মঙ্গলবার আদালতে হাজির করা হয়েছে। এ সময় তিনি বিচারকের উদ্দেশে চিৎকার করে বলেন, ‘আপনি কে, আমি মিসরের বৈধ প্রেসিডেন্ট। কেন আমাকে দিনের পর দিন নোংরা জায়গায় বন্দী করে রাখা হচ্ছে?’ মিসরের প্রথম নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসিকে ২০১৩ সালের জুলাইয়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতাচ্যুত করে। এর আগে তাঁর পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনে কয়েকজনের মৃত্যু হয়। ওই মৃত্যুর ঘটনাসহ মোট চারটি ফৌজদারি অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। ২০১১ সালে কারাগার থেকে পালানোর মামলায় মুরসি ছাড়াও অনেককে আসামি করা হয়। গতকাল ওই মামলার আরও ১৩০ জন আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।
তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মুরসির সংগঠন নিষিদ্ধঘোষিত মুসলিম ব্রাদারহুড, ফিলিস্তিনির ইসলামপন্থী সংগঠন হামাস ও লেবাননের শিয়াপন্থী গোষ্ঠী হিজবুল্লার সদস্যরা। কায়রোর উপকণ্ঠে একটি পুলিশ একাডেমিতে অস্থায়ী আদালত বসিয়ে এই বিচার চলছে। কাচঘেরা শব্দপ্রতিরোধক কক্ষে বিচার চলাকালে শুধু মুরসিকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেন আদালত। একপর্যায়ে সাংবাদিকদের আদালতের বিচারকাজ শোনার সুযোগ দেওয়া হয়। এ সময় আসামিরা বলতে শুরু করেন, ‘সামরিক শাসন নিপাত যাক।’ এর পরই বিচারক মাইক বন্ধ করে দেন। প্রেসিডেন্ট পদে সিসিকে সেনাবাহিনীর সমর্থন: মিসরের সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ সংস্থা প্রেসিডেন্ট পদে সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসির প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। তিনি আগামী মধ্য এপ্রিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন বলে অনেক দিন ধরেই জল্পনাকল্পনা চলছিল। পুলিশের জেনারেল গুলিতে নিহত: কায়রোতে গতকাল মোটরসাইকেলে করে বন্দুকধারীরা পুলিশের একজন জেনারেলকে গুলি করে হত্যা করেছে। নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানান, জেনারেল মোহাম্মদ সাইদ সকালে বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় বন্দুকধারীরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এএফপি ও বিবিসি।

জঙ্গিদের মোকাবিলায় জেগে উঠতে হবে রাজনীতিকদের

বিলাওয়াল ভুট্টো
তালেবান জঙ্গিদের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত বেনজির ভুট্টোর ছেলে বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারি। জঙ্গি হামলা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে কী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে, তা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে এই আহ্বান জানান তিনি। সহিংসতা সামাল দেওয়ার উপায় খুঁজে বের করতে পাকিস্তান সরকার জরুরি সংলাপের আয়োজন করেছে। সংলাপের আগ মুহূর্তে বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে পিপলস পার্টির (পিপিপি) চেয়ারম্যান বিলাওয়াল বলেন, তালেবানের মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হুমকি মোকাবিলায় রাজনৈতিক দলগুলোকে অবশ্যই ‘জেগে উঠতে হবে’। ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলেও জানান ২৫ বছর বয়সী বিলাওয়াল। ২০০৭ সাল থেকে তালেবান জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে আসছে পাকিস্তান। বিলাওয়ালের মা বেনজির ভুট্টো ওই বছরের ডিসেম্বরে নিহত হন।
আর ব্যাপক রক্তপাতের মধ্যে চলতি বছর শুরু হয়েছে। বার্তা সংস্থা এএফপির হিসেবে চলতি জানুয়ারি মাসেই এ পর্যন্ত ১১০ জন নিহত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের মুসলিম লিগ (এন) সরকার সহিংসতা মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে বলে সমালোচনা শুরু হয়েছে। সরকার বলে আসছে, তারা তালেবানের সঙ্গে আলোচনায় আগ্রহী। তবে সাক্ষাৎকারে বিলাওয়াল বলেন, জঙ্গিরা কেবল আত্মসমর্পণ করতে চাইলেই তিনি তাদের সঙ্গে আলোচনায় রাজি। বিলাওয়াল বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা সংলাপ নিয়ে ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। সমস্যা সমাধানে সংলাপ সব সময়ই একটা বিকল্প। তবে আমাদের একটা শক্তির স্থান অবশ্যই থাকতে হবে। যুদ্ধক্ষেত্রেই তাদের পরাজিত করতে হবে। এটা কেবল উত্তর ওয়াজিরিস্তানেই সীমাবদ্ধ নয়, তারা করাচিতেও আমাদের আক্রমণ করছে...আমরা এই তালেবানকে পাকিস্তান থেকে মুছে ফেলতে চাই।’ বিবিসি ও এএফপি।

দাঙ্গায় মোদির ভূমিকা নিয়ে মন্তব্য, ক্ষুব্ধ বিজেপি

রাহুল গান্ধী
ভারতের কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর ১০ বছরের রাজনৈতিক জীবনের প্রথম টেলিভিশন সাক্ষাৎকার কংগ্রেস-বিজেপি দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করে তুলেছে। গত সোমবার রাতে এক বেসরকারি টেলিভিশনে দীর্ঘ ওই সাক্ষাৎকারে রাহুল ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার সময় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয় থাকার অভিযোগ আনেন। তুলনা টেনে ১৯৮৪ সালের শিখ-দাঙ্গা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দিল্লিতে তৎকালীন সরকার দাঙ্গা থামাতে সচেষ্ট ছিল। সাক্ষাৎকারে রাহুলের এমন মন্তব্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে বিজেপি। দলটি তাঁর এই মন্তব্যকে ‘সত্যের বিকৃত উপস্থাপনা’ বলে উল্লেখ করে বলেছে, কোনো বিষয়ে জ্ঞান না থাকলে যা হয়, এ ক্ষেত্রেও তা দেখা গেল। লোকসভার আগামী নির্বাচন ধর্মনিরপেক্ষ বনাম সাম্প্রদায়িকতার লড়াই হতে যাচ্ছে বলে যাঁরা মনে করছেন, এই সাক্ষাৎকার ও বিতর্ক সেই ধারণাকে আরও দৃঢ় করবে। নরেন্দ্র মোদি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং তাঁর শেষ সংবাদ সম্মেলনে যে মন্তব্য করেছিলেন, তার সঙ্গে তিনি একমত কি না,
রাহুল এমন প্রশ্ন দুবার এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি বলেন, ‘১৯৮৪ সালে দিল্লি ও ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গায় নিরীহ, নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। দুটোই ভয়াবহ ব্যাপার। পার্থক্য হলো, ’৮৪ সালে সরকার দাঙ্গা থামানোর সব রকম চেষ্টা করেছিল, গুজরাটে হয়েছিল ঠিক উল্টোটা। গুজরাট সরকার দাঙ্গাকে আরও উসকে দিতে প্ররোচনা জুগিয়েছিল।’ এই মন্তব্যের পিঠাপিঠিই তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, দিল্লির দাঙ্গায় কংগ্রেসের কারও হাত ছিল কি না। রাহুল অভিযোগ স্বীকার করে বলেন, এ জন্য কংগ্রেসের কোনো কোনো নেতাকে শাস্তিও দেওয়া হয়েছে। লোকসভা নির্বাচনের আগে গুজরাট দাঙ্গা ও প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী নরেন্দ্র মোদি সম্পর্কে এই মন্তব্য কংগ্রেস-বিজেপি দ্বৈরথকে ক্ষুরধার করে তুলেছে। বিজেপির একাধিক নেতা গতকাল মঙ্গলবার রাহুলের মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করেন। বিজেপি নেতা অরুণ জেটলির মন্তব্য, ‘কোনো বিষয়েই রাহুলের যে কোনো জ্ঞান নেই, তা বোঝা গেল। দিল্লির দাঙ্গায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের আজও সাজা হয়নি। আর গুজরাটের দাঙ্গায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত মোদিকে ক্লিন চিট দিয়েছে। দিল্লিতে পুলিশের গুলিতে একজন দাঙ্গাবাজও মরেনি।
অথচ গুজরাটে পুলিশের গুলিতে ৩০০ জন মারা গেছে।’ রবিশংকর প্রসাদ বলেন, ‘রাহুলের বাবা রাজীব গান্ধীই বরং দিল্লি-দাঙ্গাকে সমর্থন করে বলেছিলেন, মহিরুহের পতন ঘটলে ধরিত্রী কেঁপে ওঠে।’ বিজেপির সহযোগী শিরোমনি অকালি দল নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দর কুমার গুজরালের ছেলে নরেশ গুজরাল রাহুলের সমালোচনা করে বলেন, ‘দিল্লিতে তিন দিন ধরে যা ঘটেছিল, তাকে দাঙ্গা বলা যাবে না। সেটি ছিল শিখদের একতরফা হত্যা। প্রায় তিন হাজার শিখ নারী-পুরুষকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছিল। সেনা নামানো হয়েছিল তিন দিন পর। অথচ গুজরাটে ১২ ঘণ্টার মধ্যে সেনা নেমেছিল।’ রাহুলের সাক্ষাৎকার প্রচারের পর শিখ সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা কংগ্রেসের সমালোচনাই শুধু করেননি, দোষী ব্যক্তিদের আড়াল করতে কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্বের সমালোচনাও তাঁরা করেন। বিজেপি ও তাদের সহযোগী দলগুলোর দাবি, দিল্লির দাঙ্গার জন্য কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী কিংবা প্রয়াত রাজীব গান্ধী ক্ষমা চাননি। সাক্ষাৎকারে রাহুলও ক্ষমা চাইলেন না। কংগ্রেসের শীর্ষ নেত্রী অম্বিকা সোনি দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং পার্লামেন্টের উভয় কক্ষেই ক্ষমা চেয়েছেন।

মার্কিন লোকসংগীতশিল্পী পিট সিগার আর নেই

পিট সিগার
যুক্তরাষ্ট্রের লোকসংগীতশিল্পী ও প্রতিবাদী রাজনৈতিক কর্মী পিট সিগার আর নেই। দীর্ঘ ছয় দশক ধরে সংগীতাঙ্গনে বিচরণ করা এই শিল্পী গত সোমবার ৯৪ বছর বয়সে নিউইয়র্কের একটি হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পিট সিগার নিউইয়র্কের লোকগানের দল দ্য উয়েভার্সের (১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত) সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। দলটি বিশ্বজুড়ে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে বেড়াত। ওই দলে থেকেই তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। ‘ইফ আই হ্যাড এ হ্যামার’, ‘টার্ন! টার্ন! টার্ন!’, ‘হ্যোয়ার হ্যাভ অল দ্য ফ্লাওয়ার গন’ ইত্যাদি গানের গীতিকারও তিনি। তাঁর গান ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ সারা দুনিয়ায় মুক্তিকামী মানুষের মুখে মুখে ফিরবে চিরজীবন। লোকসংগীতের পাশাশাশি প্রতিবাদী গানের জন্যও তিনি বিখ্যাত। বিশ্বের প্রতিবাদী মানুষের কণ্ঠে তাঁর সব গান বেঁচে থাকবে সারা জীবন।
বামপন্থী রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে পিট সিগার ১৯৫০ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কালো তালিকাভুক্ত হন। ১৯৫৫ সালে তাঁর বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট আন্দোলনকারীদের সমাবেশে গান গাওয়ার অভিযোগ ওঠে, যা তিনি স্বীকারও করেন। ১৯৬০ সালে টেলিভিশনে তাঁর ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী গানের প্রচার বন্ধ করে সরকার। পরমাণবিক অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ আন্দোলন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক (২০১১ সাল) যুক্তরাষ্ট্রের ‘অকুপাই ওয়ালস্ট্রিট’ অন্দোলন পর্যন্ত সব আন্দোলনেই ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। দীর্ঘ সংগীতজীবনে পিট সিগার গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডসহ অনেক পুরস্কার জিতেছেন। ১৯৯৭ সালেই স্থান করে নিয়েছেন রক অ্যান্ড রোলের হল অব ফেমে। বিবিসি।

পাকিস্তানে মালালার বইয়ের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বাতিল

মালালা ইউসুফজাই
পাকিস্তানের পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীশিক্ষা আন্দোলনের কর্মী মালালা ইউসুফজাইয়ের আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার আয়োজক ও সরকারি কর্মকর্তারা জানান, প্রাদেশিক সরকারের চাপে তাঁরা অনুষ্ঠান বাতিলে বাধ্য হন। আই অ্যাম মালালা নামের গ্রন্থটি সোমবার পেশোয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক গবেষণাকেন্দ্রে উদ্বোধন করার কথা ছিল। তবে সেখানে মালালার উপস্থিত থাকার কথা ছিল না। এর পরও নিরাপত্তা দিতে অস্বীকৃতি জানায় পুলিশ। কেন্দ্রের পরিচালক সরফরাজ খান বলেন, 
প্রাদেশিক দুজন মন্ত্রী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর ফোন করে অনুষ্ঠান বাতিলের জন্য আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন। তাঁদের চাপের মুখেই অনুষ্ঠানটি বাতিল করতে বাধ্য হই।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই বেআইনি চাপ উপেক্ষা করে অনুষ্ঠান করার চেষ্টা চালাই। কিন্তু পরে পুলিশও আমাদের নিরাপত্তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়।’ ২০১২ সালে তালেবান জঙ্গিরা পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় মালালাকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করে। প্রথমে নিজ দেশে এবং পরে যুক্তরাজ্যে চিকিৎসার পর সেরে ওঠে মালালা। এএফপি।

বিরোধী দলবিহীন সংসদ

বাংলাদেশে যে অভূতপূর্ব সংসদীয় ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছে এবং ২৯ জানুয়ারি যার অভিষেক হতে চলেছে, তাতে বিরোধী দলের কোনো অস্তিত্ব নেই। জেনারেল এরশাদ বা রওশন এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টিকে গেজেট প্রকাশ করে বিরোধী দলের আসনে অভিষিক্ত করার পরেও একে সরকারি-বিরোধী দল বা বিরোধী-সরকারি দল বলেই আমরা জানব। কবি হলে জাতীয় পার্টির অবস্থানকে আমরা ‘ধর্মেও আছি, জিরাফেও আছি’ বলে বর্ণনা করতে পারতাম। সংসদীয় ব্যবস্থার ইতিহাসে বহুদলীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের অনুপস্থিতির কোনো ইতিহাস না থাকলেও আমরা এখন এক নির্বাচনের মধ্য দিয়েই তার আবির্ভাব দেখতে পাচ্ছি। তার পরিণতি কী হতে পারে, সে বিষয়ে আমরা কতটুকু জ্ঞাত এবং চিন্তিত?
১৯৯০ সালের স্বৈরশাসনের অবসানের পর ১৯৯১ সালে গঠিত পঞ্চম সংসদে সব দলের সম্মতিতে সংবিধান সংশোধন করে সংসদীয় ব্যবস্থার পুনঃপ্রবর্তনের যে সিদ্ধান্ত হয়েছিল এবং একটি গণভোটের মধ্যে যাতে নাগরিকদের সম্মতি নেওয়া হয়েছিল, তার মর্মবাণীই কি এখন ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে? এই বিষয়টি আরও বেশি করে বিবেচনার দাবি করে এই কারণে যে আজকে বিকাশমান এই অবস্থায় তৎকালীন স্বৈরশাসকের ছায়া নয়, তাঁর এবং তাঁর দলের প্রত্যক্ষ উপস্থিতি দেখতে পাই। প্রশ্নবিদ্ধ একটি নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত একটি সংসদ, যাতে অধিকাংশ নাগরিকের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ ছিল না, তার গঠনই এখন সংসদের মূল দায়িত্ব থেকে সরে এসে কী ধরনের রাজনৈতিক পরিবেশের সূচনা করতে চলেছে, তার প্রতিক্রিয়া কী, সেটা গভীরভাবে ভাবা দরকার। এই নতুন পরিস্থিতিতে যাঁরা ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে সমর্থন করেছেন, তাঁদের অনেকে এই কথা বলার চেষ্টা করছেন যে যেহেতু গত পাঁচ বছরে সংসদীয় বিরোধী দল বিএনপি কার্যত কোনো ভূমিকা পালন করেনি, সে ক্ষেত্রে বিরোধী দল থাকা না-থাকায় আদৌ কিছু যায়-আসে না। তাঁদের এই কথার পেছনে তাঁরা যে তথ্যগুলো হাজির করেন, সেটা অবশ্যই আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। নবম জাতীয় সংসদে বিরোধী দল বিএনপি ৭৪ শতাংশ অধিবেশন বর্জন করেছে এবং কার্যত কোনো ধরনের বিতর্কে অংশ নেয়নি।
বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া ৪১৮টি বৈঠকের মাত্র ১০টিতে উপস্থিত ছিলেন। এটি দল হিসেবে বিএনপির এবং সাংসদ হিসেবে খালেদা জিয়ার দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ব্যর্থতা বললে সামান্যই বলা হবে। যাঁরা এখন সংসদে বিরোধী দলের না থাকাকে বড় কিছু নয় মনে করছেন, তাঁরা এখানেই আলোচনাটি শেষ করতে চাইবেন। কিন্তু এই তথ্য আমরা কি অতীতে, ১৯৯১ সালে থেকে যত সংসদ বহাল থেকেছে, তার থেকে আলাদা করে বিবেচনা করব? প্রথমেই যেটা স্মরণ করা দরকার তা হলো ১৯৯৬ সাল থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি যে সংসদে বিরোধী দলের আকার ছোট হয়ে আসছে। ১৯৯১ সালে সংসদে বিরোধী দলের আসন ছিল ১৩৯টি, ১৯৯৬ সালে তা হয় ১২০টি, ২০০১ সালে ৭৮টি এবং ২০০৮ সালে ৩৪টি। যদিও এসব আসনসংখ্যা সরকারি ও বিরোধী দলের প্রাপ্ত ভোটের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ ছিল না কিন্তু বিরাজমান নির্বাচনী ব্যবস্থার কারণে বাংলাদেশের জনগণ সেটাকে অনিবার্য বলেই ধরে নিয়েছে। এর সঙ্গে সঙ্গে আমাদের এও মনে রাখা দরকার, ১৯৯১-৯৬ সালে বিরোধী দল অনুপস্থিত থেকেছে ৩৪ শতাংশ অধিবেশন, ১৯৯৬-২০০১ সালে এই অনুপস্থিতির হার ছিল ৪৩ শতাংশ এবং ২০০১-০৬ সালে ছিল ৬০ শতাংশ। বিরোধীদলীয় নেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা ১৯৯১-৯৬ সালে ৪০০ বৈঠকের ১৩৫টিতে যোগ দেন, ১৯৯৬-২০০১ সালে খালেদা জিয়া যোগ দেন ৩৮২ বৈঠকের ২৮টিতে, ২০০১-২০০৬ সালে শেখ হাসিনা যোগ দেন ৩৭৩ বৈঠকের ৪৫টিতে। এই তথ্যগুলো আমাদের কাছে স্পষ্ট করে দেয় বাংলাদেশের দুই প্রধান দল, যারা পালাক্রমে সরকার ও বিরোধী দলের আসনে বসেছে, তারা সরকার চালাতে যতটা উৎসাহী হয়েছে, বিরোধী দল হিসেবে ভূমিকা পালনে ততটাই অনুৎসাহী হয়েছে।
শুধু তা-ই নয়, সংসদে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই যে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ক্রমাগতভাবে কমেছে। খুব সোজা ভাষায় বললে বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দল হিসেবে সব দলই ব্যর্থ হয়েছে। কিন্তু এই প্রবণতার সঙ্গে ক্রমহ্রাসমাণ বিরোধী দলের আসনের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না এবং সরকারি দলের আকার বিরোধী দলের প্রতি তাদের আচরণকে প্রভাবিত করেছে কি না, সেটা বাংলাদেশের রাজনীতির গবেষকেরা খুব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন বলে চোখে পড়েনি। এই যোগসূত্র খোঁজার বদলে, তার কারণ অনুসন্ধানের বদলে আমরা কি এই শিক্ষা নেব যে বিরোধী দলেরই দরকার নেই? আমরা কি তাহলে ধরে নিচ্ছি যে আজকে যারা ক্ষমতাসীন, তাদের আর কখনোই বিরোধীদের আসনে বসতে হবে না? এই রকম ধারণার ইঙ্গিতই দেশে একদলীয় ব্যবস্থার আশঙ্কাকে সামনে নিয়ে আসছে। বিরোধী দলের দরকার নেই এই কথা মাথাব্যথার কারণে মাথা কেটে ফেলার পরামর্শের মতোই শোনায়। মাথাব্যথার কারণে মাথা কেটে ফেলার সমাধান যত সহজ শোনায় তার পরিণতি ততটাই ভয়াবহ। বরং আমাদের এখন বিবেচনা করা উচিত যে বাংলাদেশে সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দল কেন তার ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয় এবং এই বৃত্তচক্র ভাঙার পথ কী হতে পারে? সমাধান এটা হতে পারে না যে বিরোধী দলের ধারণাকেই সম্পূর্ণভাবে বাদ দিয়ে দিতে হবে। ২০০১ সালে বিএনপি যদি এই যুক্তি হাজির করত, তা যেমন অগ্রহণযোগ্য হতো, আজকে যাঁরা এই কথাকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সমর্থন করছেন, তাঁদের বক্তব্যও ততটাই অগ্রহণীয়। সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দলের প্রয়োজন কেন, সেটা আমাদের বুঝতে হবে সংসদীয় ব্যবস্থার এবং
সুস্থ রাজনীতির ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে এবং সংসদ এবং রাজনীতিতে দলের ভূমিকার কথা মাথায় রেখে।
আগামীকাল: কেন বিরোধী দল জরুরি
আলী রীয়াজ: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, রাজনীতি ও সরকার বিভাগ, ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র।

পরিকল্পনা হয় দু’বছর আগে, চালের বস্তায় টাকা নিয়ে আসা হয়, ব্যাংক কর্মকর্তারাও জড়িত- ব্যাংক লুটের দুর্ধর্ষ কাহিনী by নুরুজ্জামান লাবু

দুর্ধর্ষ এক কাহিনী। যে কাহিনী হার মানিয়েছে কল্পকথার গোয়েন্দা সিরিজকেও। প্রতিদিনই একটু একটু করে খোঁড়া হতো সুড়ঙ্গ। মাটি ফেলা হতো পাশের একটি খালে। সারাদিন সুড়ঙ্গ খোঁড়া শেষে রাতে আরেক বাসায় গিয়ে ঘুমাত হাবিব ওরফে সোহেল (৩৭)। শুক্রবার সেই সুড়ঙ্গ পথ পৌঁছে যায় ব্যাংকের ভল্ট রুমে।
দেখে তো অবাক! টাকা একেবারে হাতের কাছে। ফিল্মি স্টাইলে নিয়ে যায় ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। চালের বস্তার ট্রাকে সেই টাকা নেয়া হয় ঢাকায়। কিশোরগঞ্জে ব্যাংক লুটের ঘটনা ঘটেছে এভাবেই। সামপ্রতিক সময়ে সাড়া  জাগানো এ ঘটনার নায়ক সোহেল ব্যাংক লুটের আদ্যপান্ত বর্ণনা করেছে র‌্যাবের কাছে। এত টাকা পেয়ে নিজেকে টাকার কুমিড় ভেবে বসেছিল সোহেল। যে ট্রাকে করে ঢাকায় আসে সে ট্রাকের হেলপারকে দিয়ে দেয় ৭ লাখ টাকা। দাতা হাতেম তাই সোহেলের শেষ রক্ষা হয়নি। গতকাল বিকালে র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার দল শ্যামপুরের ভাড়া নেয়া বাসায় হানা দিয়ে ধরে ফেলে সোহেলকে। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয় ইদ্রিস নামে তার এক সহযোগীকেও। বাসার খাটের নিচে রাখা ৪টি বস্তায় ভরা টাকাও উদ্ধার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর দুর্ধর্ষ কাহিনী নিজেই খুলে বলে সোহেল।

সন্ধ্যায় র‌্যাব সদর দপ্তরে সোহেল ও তার সহযোগী ইদ্রিসকে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়। এ সময় উদ্ধারকৃত টাকা টেবিলে সাজিয়ে রাখা হয়। সংবাদ সম্মেলনে টাকা উদ্ধারের বর্ণনা করেন র‌্যাবের ডিজি মোখলেসুর রহমান। এ সময় তার সঙ্গে অতিরিক্ত পরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান, গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ ও মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক এটিএম হাবিবুর রহমানও উপস্থিত ছিলেন।
র‌্যাবের ডিজি মোখলেসুর রহমান বলেন, গতকাল বিকালে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখায় সুড়ঙ্গ কেটে লুট করা টাকার মধ্যে ১৬ কোটি ১৯ লাখ ৫৬ হাজার ৬৪ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় হাবিব ওরফে সোহেল ও ইদ্রিস নামে দু’জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। মঙ্গলবার বিকালে রাজধানীর শ্যামপুরের বালুর মাঠের ৯ নম্বর প্লটের তন্ময় ভিলা বাড়ির ছয় তলা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে র‌্যাবের গোয়েন্দা ইউনিট। তিনি বলেন, এ ঘটনার সঙ্গে ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশের তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।
র‌্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান জানান, বিকালে ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে তাদের ৫ বস্তা টাকাসহ গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তাদের র‌্যাব সদর দফতরে আনা হয়। পাঁচটি বস্তায় কি পরিমাণ টাকা রয়েছে তা গণনা করার জন্য একটি বেসরকারি ব্যাংক থেকে টাকা গণনার  তিনটি মেশিন আনা হয়। কিন্তু এত পরিমাণ টাকা গণনা করতে অনেক সময় লাগবে বলে প্রাথমিকভাবে টাকার বান্ডিল ধরে গণনা করা হয়। বান্ডিল হিসেবে সেখানে ১৬ কোটি ১৯ লাখ ৫৬ হাজার ৬৪ টাকা পাওয়া যায়।
দুই বছর আগে করা হয় পরিকল্পনা: ব্যাংক লুটের জন্য পরিকল্পনা করা হয় দুই বছর আগে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যাংকের পাশের ওই বাড়িটি আড়াই হাজার টাকায় ভাড়া নেয় সোহেল। দিনের বেলা সে এই বাড়িতে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ করতো। রাতে গিয়ে পাশের নগুয়া এলাকায় স্ত্রীর সঙ্গে থাকত। সোহেল জানায়, ব্যাংক লুটের পরিকল্পনা ছিল তার মামা শ্বশুর সিরাজের। সে আগে ঢাকায় শাহীন ক্যাবলস নামে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতো। ২০০৮ সালে চলে যায় দুবাইয়ে। সেখানে সে নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। ২০১১ সালে ফিরে আসে ঢাকায়। হাতে নিয়ে আসে ৭ লাখ টাকা। পাঁচ লাখ টাকা ধার নেয় মামা শ্বশুর সিরাজ। সেই টাকা চাইতে গেলে সিরাজই তাকে ব্যাংক লুটের পরিকল্পনার কথা বলে। ওই ব্যাংকে সিরাজের একাউন্ট ছিল বলে সোহেল জানায়। ব্যাংকে অনেক টাকা থাকতো বলে সিরাজ তাকে জানিয়েছেন।
যেভাবে খোঁড়া হয় সুড়ঙ্গ: ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সোহেল বলে, ২০১২ সালের প্রথম দিকে সে দুই কক্ষের ওই বাসাটি ভাড়া নেয়। ভাড়া নেয়ার কিছুদিন পর থেকেই কক্ষের পাশে সুড়ঙ্গ খোঁড়া শুরু করে। এর আগে হ্যামার, ছেনি, কোদালসহ প্রয়োজনীয় সব উপকরণ কেনে। একই সঙ্গে বাড়িতে জড়ো করা হয় কাঠ ও বাঁশ। সোহেল বলে, প্রতিদিন একটু একটু করে সুড়ঙ্গ খুঁড়তো। মাটি নিয়ে ফেলতো বাসার ভেতরেই একটি খালে। এছাড়া ঘরের এক পাশেও মাটি রাখা হতো। মাঝ খানে দুই ভ্যান মাটি বাইরে নিয়ে ফেলা হয়। এতে পাশের বাড়ির মাওলানা আনোয়ার নামে এক ব্যক্তি সন্দেহ করে। পরে তার বাড়িতে কাজ হচ্ছে বলে বিষয়টি সামলে নেন। সোহেল জানান, মাঝে মধ্যে বাসায় তার মামা শ্বশুর সিরাজও গিয়ে তাকে কাজে সহযোগিতা করেছে। এ ছাড়া সুড়ঙ্গ পথে উপরের মাটি আটকে রাখার জন্য কাঠ ও বাঁশ দিয়ে ঠেকা দিতো। এভাবে দুই বছরে তিনি সুড়ঙ্গ খোঁড়া শেষ করেন।
ভুল পথে গিয়েছিল সুড়ঙ্গ: সোহেল জানায়,  বাড়ি থেকে ব্যাংকের ভল্টের মাপজোক নিয়ে খোঁড়ার পরও সুড়ঙ্গটি অন্যদিকে চলে যায়। মাস খানেক আগে সুড়ঙ্গের মাথা ওপরে বের করে দেখেন সেটা ব্যাংকের বারান্দা। ওই বারান্দায় পুরানো চেয়ার-টেবিল রাখা ছিল। ফলে বিষয়টি কেউ টের পায়নি। পরে আবার মাপজোক নিয়ে নতুন পথে সুড়ঙ্গ খোঁড়া হয়। শুক্রবার সন্ধ্যায় সুড়ঙ্গ গিয়ে ঠেকে ব্যাংকের ভল্ট রুমে। এ সময় ওপরে একটি স্টিলের আলমারি ছিল। সোহেল জানায়, জগ দিয়ে আলমারিটি সরানোর ব্যবস্থা করে। পরে শাবল দিয়ে ঠেলে ঠেলে কোনোমতে সে নিজে ভেতরে ঢুকে। এরপর নিজেই আলমারি সরিয়ে যাতায়াতের রাস্তা প্রশস্ত করে।
টেবিলেই পেয়ে যায় টাকা: সোহেল জানায়, তার ধারণা ছিল ভল্ট রুমের আলমারি ভেঙ্গে টাকা বের করতে হবে তাকে। কিন্তু ভল্ট রুমে ঢুকে টেবিলের ওপরই থরে থরে টাকা বিছিয়ে রাখা দেখতে পান। এতে খুশিতে আত্মহারা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন। সোহেল জানায়, সুড়ঙ্গ দিয়ে বৈদ্যুতিক লাইন নিয়ে ভেতরে লাইটও জালিয়েছিল। ওই রুমের কোনো জানালা না থাকায় বাইরে থেকে সে আলো বোঝা যায়নি। রাত সাড়ে ৮টার দিকে ভল্ট রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। পরে ৭-৮টি প্লাস্টিকের বস্তা নিয়ে আবারো সুড়ঙ্গ পথে ভল্ট রুমে ঢোকেন। টাকাগুলো বস্তায় ভরে নিয়ে আসে নিজের বাসায়। রাত দুইটার দিকে সব টাকা নিয়ে নিজের বাসায় ফেরত আসে। পরে বাইরে থেকে আনা চটের বস্তায় ভরে টাকাগুলো। এক হাজার টাকার বান্ডিলগুলো দিয়ে তিনটি বস্তা ভরে ফেলে। পাঁচ শ’ টাকার বান্ডিল হয় দুই বস্তা। টাকা আলাদা করতেই করতেই তার সকাল হয়ে যায়।
চালের বস্তার ট্রাকে টাকা আনে ঢাকায়: সোহেল জানায়, সকালে তিন বস্তা টাকা নিয়ে একটি রিকশায় করে পাশের একটি চালের আড়তে যায়। চালের আড়ত ছিল বন্ধ। রিকশা নিয়ে সকাল নয়টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিলো আড়তের সামনে। পরে ওই আড়ত থেকে ৫ লাখ টাকা দিয়ে ২শ’ বস্তা চাল কেনে। ১২ হাজার টাকায় ঢাকা পর্যন্ত ঠিক করে একটি ট্রাক। শ্রমিকদের মাধ্যমে ওই চাল তোলে  ট্রাকে। এর আগে দুই ধাপে বাসা থেকে আনা টাকার বস্তাগুলো চালের বস্তার নিচে রাখে। নিজের কাছে রাখে ১৮-১৯ লাখ টাকা। শনিবার সকাল ১১টার দিকে চালের বস্তার সঙ্গে টাকা নিয়ে ঢাকায় রওয়ানা হয় সোহেল। পথে নরসিংদীতে ট্রাকের চাকা পাংচার হয়। এ সময় ট্রাক হেল্পার সন্দেহ করে তার বস্তার ভেতরে অবৈধ কিছু আছে। গাঁজা ও ভারতীয় শাড়ি আছে বলে সন্দেহ করে হেল্পার। একটি বস্তা সে নিজেই চায়। পরে সোহেল ওই হেল্পারকে ১৪টি ৫শ’ টাকার নোটের বান্ডিল দিয়ে তার মুখ বন্ধ করে।
চাল ফরিদপুরে, টাকা খাটের নিচে: সোহেল জানায়, ঢাকায় আনার পর শ্যামপুরে লাল মসজিদের পাশে ট্রাকটি দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এসময় সে হন্যে হয়ে বাসা খুঁজতে থাকে। আগে শাহীন ক্যাবলস নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজের সুবাদে শ্যামপুরে থাকতো সোহেল। বালুর মাঠের পাশে তন্ময় ভিলায় সাড়ে ৮ হাজার টাকায় ষষ্ঠ তলায় একটি বাসা ভাড়া করে। পরে আরেকটি কাভার্ড ভ্যান ভাড়া করে চালগুলো পাঠিয়ে দেয় ফরিদপুরের এক ওরস শরীফে। টাকার পাঁচটি বস্তা ও ৮ বস্তা চাল নিয়ে যায় ওই বাসায়। ভ্যানচালক ও শ্রমিকদের দিয়ে চালগুলো ষষ্ঠ তলায় তোলে। এরপর ডেকে আনে এক সময়ের পুরোনো সহকর্মী ইদ্রিসকে। রোববার খাটসহ ঘরের প্রয়োজনীয় আরো কিছু জিনিসপত্র কিনে। খাটের নিচে লুকিয়ে রাখে টাকার বস্তাগুলো। ইদ্রিসকে বলে, এগুলো ইন্ডিয়ান শাড়ি। বস্তার ভেতরে বিশেষ কায়দায় লেপের কভার ও কম্বল দিয়ে রাখার কারণে বাইরে থেকে টাকার বিষয়টি বোঝারও কোন উপায় নেই। নিশ্চিন্ত মনে ওই বাসাতেই অবস্থান করতে থাকে সোহেল।
যেভাবে গ্রেপ্তার সোহেল: র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংক লুট হওয়ার পর থেকেই তারা গুরুত্ব দিয়ে মামলাটির ছায়া তদন্ত শুরু করেন। তারা সুড়ঙ্গ খোঁড়া কক্ষের বাসিন্দা সোহেলের বিস্তারিত তথ্য উদ্ধারের চেষ্টা করতে থাকেন। পরে এক পর্যায়ে তারা প্রযুক্তির সহায়তায় সোহেলের অবস্থান শনাক্ত করেন। থার্ড পার্টির মাধ্যমে সোহেলের ভাড়া নেয়া বাসাটিও চিহ্নিত করে ফেলেন র‌্যাব কর্মকর্তারা। পরে গতকাল দুপুর ২টা থেকে শ্যামপুর এলাকায় অভিযান শুরু হয়। র‌্যাবের গোয়েন্দা সদস্যরা ছদ্মবেশে শ্যামপুরে বালুর মাঠের ওই বাসার চার পাশে অবস্থান নেন। বিকাল ৩টার দিকে তারা ওই বাসার ভেতরে প্রবেশ করেন। এসময় ষষ্ঠ তলার বাসার ভেতরে সোহেল ও ইদ্রিসকে পেয়ে যান। পরে খাটের নিচে লুকানো অবস্থায় পাওয়া যায় পাঁচ বস্তা টাকা। টাকা উদ্ধার করে সহযোগীসহ সোহেলকে গ্রেপ্তার করে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় র‌্যাব সদর দপ্তরে। পরে সেখানে এক সংবাদ সম্মেলনে তাকে হাজির করা হয়। র‌্যাবের গোয়েন্দা ইউনিটের পরিচালক লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ জানান, দুর্ধর্ষভাবে ব্যাংক লুট করলেও গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তির সহায়তায় তারা সোহেলকে ধরে ফেলেন। তবে তার মামা শ্বশুর সিরাজ পলাতক রয়েছে। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে। খুব শিগগিরই তাকেও গ্রেপ্তার করা হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, গ্রেপ্তারকৃত সোহেলের বাড়ি পটুয়াখালীতে। তার বাবার নাম সিরাজউদ্দিন। কিশোরগঞ্জের সাদিয়া আক্তার নামে এক মেয়েকে বিয়ে করেছিল। কয়েক মাস আগে স্ত্রী তাকে তালাক দিয়ে চলে গেছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে।
গত শনিবার কিশোরগঞ্জে সোনালী ব্যাংকের প্রধান শাখায় প্রায় ১শ’ ফুট সুড়ঙ্গ খুঁড়ে ব্যাংকের ভল্টে ঢুকে ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা লুট করে। ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গত রোববার ব্যাংকে গিয়ে সুড়ঙ্গ কেটে টাকা লুটের বিষয়টি বুঝতে পারেন। এ ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে পুলিশের আট সদস্যকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়। এছাড়া, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ব্যাংকের ১৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও গ্রেপ্তার করা হয়।

তুমি করো ব্যবসা, আমি দেখি প্রাণ

ওদের যা ব্যবসা, আমাদের তা অক্সিজেন
আজব সুড়ঙ্গপদ্ধতি! ব্যাংকের তলায় সুড়ঙ্গ, আর জাতীয় ক্রিকেট বোর্ডের ভেতরে বিরাট ফোকর। (দুর্বৃত্তের) মুক্তি কোন পথে? উত্তর হবে সুড়ঙ্গপথে। সুড়ঙ্গপথে কিশোরগঞ্জের সোনালী ব্যাংক লুট হয়, আর ক্রিকেট বোর্ডে বাংলাদেশ ক্রিকেটের স্বার্থ চাপা দেওয়ার লোকেরাই সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়। নাকি দেশের প্রতি দরদ আর আনুগত্য কম থাকাই দেশবাসীর প্রাণের তার ছেঁড়ার দায়িত্ব পাওয়ার বড় যোগ্যতা? অর্থহানির দায়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপক ও কর্মকর্তাদের ১২ জনকে এ বাবদ আটক করা হয়েছে। সুড়ঙ্গ দেখা যায়, কিন্তু ব্ল্যাকহোল দেখা যায় না। ক্রিকেটে মর্যাদাহানির পক্ষে যাঁরা ছিলেন, তাঁরা আর তাঁদের ব্ল্যাকহোল অধরা আর অদেখাই থেকে যাবে! ভারতের ক্রিকেট বোর্ড বিসিসিআইয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিরঞ্জন শাহ বলেছেন, ‘বেসবলের বেলায় যেমন আমেরিকা ভাবে না আর কোনো দেশ খেলল কি খেলল না।’ ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তারা ঠিক করেছে, সব খেলা হবে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডে। অর্থাৎ ভারতও কাউকে নিয়ে চিন্তিত নয়। বেশ, গান্ধীর ভারত তাহলে আধিপত্যবাদী অহংকারী আমেরিকার পথ ধরেছে! অথচ এই ভারতে ক্রিকেট আর জাতীয়তাবাদ হাত ধরাধরি করে এগিয়েছিল।
ভারতীয় ক্রিকেটের জন্ম আর ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের সূত্রপাত সালের হিসাবে খুবই কাছাকাছি। আর তা শুরু হয়েছিল এই বাংলা থেকেই। ১৮৮০-এর দশকে পূর্ববাংলার তরুণেরা প্রথম পেশাদার ক্রিকেট দল গঠন করে ইংরেজ টিমকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে হারিয়েছিল। আমির খানের লগন ছবির ঘটনা বাংলাদেশের মাটির এক ভুলে যাওয়া গল্প (ইফতেখার মাহমুদ, প্রথম আলো ১৮-১-২০১৩)। বাংলা সিনেমার নায়কের মাথায় যেমন বাড়ি না পড়লে হারানো স্মৃতি মনে পড়ে না, তেমনি বাড়ি খেয়েই আমাদেরও মনে পড়েছে: ও হ্যাঁ, তাই তো, আমাদেরই এক মফস্বলী যুবক ছিলেন ভারতবর্ষীয় ক্রিকেটের জনক! উপমহাদেশে ক্রিকেট ও জাতীয়তাবাদের রাখিবন্ধন ঘটিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের জমিদারপুত্র সারদারঞ্জন রায়চৌধুরী—সত্যজিৎ রায়ের প্রপিতামহ, সুকুমার রায়ের বাবা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর বড় ভাই। সিপাহি বিদ্রোহ বা প্রথম ভারতীয় স্বাধীনতাযুদ্ধের পরাজয়ের অন্ধকারে ভারতবাসী মুষড়ে পড়েছিল। গায়ের বল তো চূর্ণই, মনের বলও তলানিতে। সে সময় সারদারঞ্জন কিশোরগঞ্জে ক্রিকেট খেলছেন। সেখান থেকে পড়তে এসে ভাইদের নিয়ে বানিয়ে ফেললেন ঢাকা কলেজকেন্দ্রিক স্বদেশি পেশাদার ক্রিকেট দল ঢাকা ক্রিকেট ক্লাব। তাঁর দল বেশ কয়েকবার ব্রিটিশদের হারিয়েছিল। ১৮৫৭-এর পর প্রথম খেলার মাঠেই নতুন বাঙালি মধ্যবিত্ত জাতীয় ঐক্য অনুভব করতে পেরেছিল। ১৯২০-এর দশকে মুম্বাই শহরের পারসিরা এর কিছু পরে ক্রিকেটের প্রচলন ঘটায়। কিন্তু সেটা ছিল সাম্প্রদায়িক ভিত্তিতে; এক ধর্মের লোক অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে খেলত। সারদার দল ছিল অসাম্প্রদায়িক।
তাদের একটাই দোষ, তারা পশ্চিমবঙ্গের ঘটি দলকে হারিয়ে পূর্ববঙ্গীয় বাঙ্গাল পরিচয়ের ডাঁট দেখিয়ে ছাড়ত। আরও পরে, এম এ আজিজের তৈরি করা ফুটবল দল কলকাতায় একই রকম ব্রিটিশবিরোধী জোশ চাঙা করেছিল। খেলা ও জাতীয়তাবাদের যোগাযোগ আবার দেখা গেছে ঢাকার শাহবাগে, তিন মাতব্বরের চক্রান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে। আশীষ নন্দী লিখেছিলেন, ক্রিকেট হলো ব্রিটিশদের দ্বারা দুর্ঘটনাক্রমে আবিষ্কৃত ভারতীয় খেলা। বাংলাদেশের ক্রিকেটপাগল মানুষ কথাটার মানে বদলে দিয়েছে। আমরা এখন বলতে পারি, ইতিহাসের খেয়ালে হারিয়ে ফেলা বাংলাদেশি খেলা হলো ক্রিকেট, যার মালিকানা চলে গেছে অন্যদের হাতে। বেহাত হওয়া সেই মালিকানার দলিল এখন লিখেছে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড। আইসিসির বৈঠকে তাদের প্রস্তাব পাস হলে বাংলাদেশের প্রতারিত বোধ করা উচিত। ভারত এখন নিয়েছে বর্ণবাদী অস্ট্রেলিয়া আর উপনিবেশবাদী ইংল্যান্ডের ভূমিকা। ইংল্যান্ড আর তার দুই সাবেক উপনিবেশ মিলে বিশ্ব ক্রিকেটের মালিক হতে চাইছে। এই তিন দেশের ক্রিকেট বোর্ড মিলে যে প্রস্তাব তৈরি করেছে, তাতে কেবল ক্রিকেটের আয়েই তাদের একচেটিয়াত্ব আসবে না, কে টেস্ট খেলবে, কে কার সঙ্গে খেলতে পারবে বা পারবে না, কীভাবে বিশ্ব ক্রিকেট প্রশাসন চলবে; সবকিছুই চলবে তাদের মর্জিমাফিক। ফলাফল, বাংলাদেশের ক্রিকেটের শুকিয়ে মরা। এর খেসারত ভারতকেও দিতে হবে। ভারতের ক্রিকেট থেকে খেলা উঠে যাবে, বাড়বে আইপিএল,
টি-টোয়েন্টির টাকার কারবার। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের আদলে ক্রিকেটের তিন পরাশক্তির হাতে ভেটো ক্ষমতা আনতে চাইছে যারা, খেলার মধ্যে রাজনীতি আনার দায়ও তাদের। জাতীয়তাবাদী ভারত যে আধিপত্যবাদী হয়ে উঠতে চাইছে, ক্রিকেটের আয়নায় তা স্পষ্টই ধরা পড়ে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদের তিন ভিত্তি বলিউডের ছবি, ক্রিকেট আর রাজনৈতিক মতাদর্শ। ভারতীয় ক্রিকেট টিমের বিজ্ঞাপনগুলোর ভাষা ও প্রতীক দারুণ আগ্রাসী। একসময় ইংল্যান্ড আইসিসিতে মাতব্বরি করত। ভারতসহ এশীয় দেশগুলো তাদের চাপের মুখে ‘সমান’ করে ছেড়েছিল। গত শতকের শুরুর দিকে ইংল্যান্ডের অভিজাতদের দুঃখ ছিল, তাদের কেন গরিবদের সঙ্গে খেলতে হয়! ভারতের ক্রিকেট বোর্ডেরও তেমন ঘোড়ারোগে পেয়েছে। তারাও টেস্ট ম্যাচে বর্ণবাদী নিয়ম চাইছে। বিশ্ব উন্নয়ন সূচকে নামিবিয়ার চেয়ে পিছিয়ে থাকলেও ভারতের ক্রিকেট বোর্ড অঢেল সম্পদের মালিক। সুতরাং বাংলাদেশ যতই উন্নয়নসূচকে ভারতের চেয়ে এগিয়ে থাকুক, ক্রিকেটের বিচারে বাংলাদেশ গরিব। তিন মাতব্বরের বিপক্ষে বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীদের প্রতিবাদ তাই ধনীর আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে গরিবের প্রতিবাদ। বাংলাদেশিদের আশঙ্কাকে নিছক স্ট্যাটাস হারানোর আতঙ্ক বলা যাবে না। কোনো দেশ যখন রাজনৈতিক কারণে ভীত ও দিশাহীন বোধ করে, তখন তারা তাদের বাস্তবের বাইরের কোনো প্রতীকের ওপর ভর করে আত্মবিশ্বাস ও ঐক্য ফিরে পেতে চায়। ক্রিকেট এখন সে রকমই এক জাতীয় প্রতীক।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলোর বিচ্ছিন্ন মানসিকতাকে এক করে আত্মমর্যাদাবান করে তুলেছিল তাদের ক্রিকেটীয় আত্মবিশ্বাস। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়েরা প্রেরণা হয়েউঠেছিল। আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার লড়াইয়ের প্রতীক হয়ে উঠেছিল তাদের ক্রিকেট দল। বাংলাদেশেরও এখন এ রকম ঐক্যসূত্রের দরকার আছে। দক্ষিণ আমেরিকার বিপ্লবী লেখক এদুয়ার্দো গালিয়ানো ফুটবলের মধ্যে সেই মহাদেশের মানুষদের সংগ্রামের মহাকাব্য দেখতে পান বলেই লেখেন ফুটবল আন্ডার দা সানের মতো অসামান্য বই। ত্রিনিদাদের বিপ্লবী তাত্ত্বিক সিএলআর জেমস বিয়ন্ড আ বাউন্ডারির মতো অবিস্মরণীয় বই লিখে জানাতে চান ক্রিকেট শিল্প, ক্রিকেট মহাকাব্য। তাঁর বিখ্যাত উক্তি, তুমি যদি কেবল ক্রিকেটই জানো, তাহলে কীভাবে ক্রিকেটকে জানবে? ক্রিকেটের প্রাণ থাকে বাউন্ডারির বাইরে। আজকের বিপর্যস্ত বাংলাদেশে ক্রিকেট যে সব মত ও পথের মানুষকে এক জায়গায় এনেছে, তা থেকেই প্রমাণ হয় ঐক্যের এই জায়গাটি কত স্পর্শকাতর। তিন বর্ণবাদীর বিরুদ্ধে সাত সাধারণ ক্রিকেট বোর্ডের ঐক্য তাই বাংলাদেশের খুব প্রয়োজন। প্রয়োজন একে বাণিজ্যের গ্রাস থেকে বের করা। স্বাধীন, দেশপ্রেমিক, ক্রিকেটদরদি কর্তৃপক্ষ ছাড়া সেটা সম্ভব নয়। বৃক্ষ কারও কাছে কাঠ, কারও কাছে প্রাণ। খেলা কারও কাছে ব্যবসা, কারও কাছে সম্মান। বাউন্ডারি প্রসারিত করুন, বাংলাদেশের সম্মান রক্ষা করুন।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

আমাদের দুর্দিনের বন্ধু

অধ্যাপক ৎসুইয়োশি নারা
১৯৭১ সালে শত্রুকবলিত বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলার সময় জাপানে মুষ্টিমেয় যে কয়েকজন জাপানি নাগরিক আমাদের সমর্থনে স্বেচ্ছায় এগিয়ে এসে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, বিশিষ্ট ভাষাবিদ ও জাপান বাংলা ভাষার শিক্ষক অধ্যাপক ৎসুইয়োশি নারা ছিলেন সেই দলের অগ্রগামী এক সদস্য। সেই সময়ে যে স্বল্পসংখ্যক বাংলাদেশি জাপানে অধ্যয়নরত ছিলেন, আমাদের মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে প্রবাসে জনমত গড়ে তোলায় তাঁরা এগিয়ে এলে অধ্যাপক নারাকে তারা অনুরোধ করেছিলেন তাঁদের সেই দূর প্রবাসের সংগ্রামে সঙ্গে থেকে নেতৃত্ব দিতে। সেই থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে গভীর যে যোগসূত্র জাপানি এই অধ্যাপকের গড়ে উঠেছিল, তা ছিন্ন হয় মাত্র গত সোমবার, ২০ জানুয়ারি, তাঁর প্রয়াণের মধ্য দিয়ে।
বেশ কিছুদিন ধরে ফুসফুসের ক্যানসারে চিকিৎসাধীন থাকার পর ৮১ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেছেন বাংলাদেশের এই বিশিষ্ট জাপানি সুহূদ। অধ্যাপক নারার জন্ম জাপানের আকিতা জেলায় ১৯৩২ সালের ডিসেম্বর মাসে। আকিতা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাপানি সাহিত্যে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি ভর্তি হন এবং সেখানে ভাষাতত্ত্বে স্নাতকোত্তর পর্বের লেখাপড়া শেষ করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি যান পিএইচডি গবেষণার কাজে। বিখ্যাত ভাষাতত্ত্ববিদ অধ্যাপক সুকুমার সেনের অধীনে ইন্দো-আর্য ভাষার ওপর সেখানে তিনি গবেষণা করেন এবং ১৯৬৪ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। জাপানে ফিরে এসে টোকিও বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ের এশিয়া-আফ্রিকার ভাষা ও সংস্কৃতি গবেষণা ইনস্টিটিউটে শিক্ষক হিসেবে তিনি যোগ দিয়েছিলেন। দীর্ঘ ৩০ বছর একই বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার শেষে ১৯৯৫ সালে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তবে এর পরও অধ্যাপক নারা ২০০৩ সাল পর্যন্ত সেইশন মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন।
ভাষাতত্ত্বের শিক্ষকতার পাশাপাশি টোকিও বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষাও তিনি শিখিয়েছেন। বাংলাদেশের সঙ্গে অধ্যাপক নারার যোগসূত্রের সূচনা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলো থেকে, যা অক্ষুণ্ন ছিল তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলো পর্যন্ত। ১৯৭৪ সালে জাপান ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে তিনি গিয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাপানি ভাষা শেখাতে। সেই সময়ে প্রায় বছর খানেক বাংলাদেশে অবস্থান সদ্য স্বাধীনতা অর্জন করা দেশটির প্রতি তাঁর ভালোবাসা আরও বাড়িয়ে দিয়েছিল। ঢাকায় থাকাকালে বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ লাভকে তিনি বরাবর তাঁর জীবনের প্রধান একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলে মনে করতেন, যে সাক্ষাতের স্মৃতিচারণা তিনি একাধিক অনুষ্ঠানে করেছেন। ফলে ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসে বঙ্গবন্ধুর সপরিবারে নিহত হওয়ার ঘটনা তাঁকে গভীরভাবে মর্মাহত করেছিল। কতটা মর্মাহত তিনি হয়েছিলেন তার বর্ণনা আমরা পাই আরেক বঙ্গপ্রেমিক জাপানি নাগরিক, রেডিও জাপানের বাংলা বিভাগের কাজুহিরো ওয়াতানাবের স্মৃতিচারণায়। কাজুহিরো ওয়াতানাবে তখন ছিলেন টোকিও বিদেশি ভাষা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক নারার বাংলা ক্লাসে যোগ দেওয়া ছাত্র। বাংলা তখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ভাষাগুলোর অন্তর্ভুক্ত হয়নি বলে গ্রীষ্মের ছুটিতে বিশেষ ক্লাসের আয়োজন করা হতো।
১৫ আগস্ট সকালে ক্লাসে গিয়ে তিনি দেখেন বেদনাহত, বিষণ্ন চেহারায় বসে আছেন অধ্যাপক নারা। ছাত্রদের তিনি বলেছিলেন সেদিন কিছুক্ষণ আগে ঢাকায় ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক সেই ঘটনার কথা। জাপানে বাংলাদেশিদের বরাবরের সুহূদ ছিলেন অধ্যাপক নারা। প্রবাসীদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে কখনো তিনি কুণ্ঠাবোধ করেননি। সেই সঙ্গে কোনো রকম স্খলন চোখে পড়লে এর সমালোচনা করতেও তিনি পিছপা হননি। বাংলাদেশ বরাবর তাঁকে কাছে টেনেছে এবং সেই টান অনুভব করে অনেকবার তিনি বাংলাদেশ সফরে গেছেন। তাঁর সর্বশেষ বাংলাদেশ ভ্রমণ ছিল ২০১২ সালে মুক্তিযুদ্ধের একজন বিদেশি বন্ধু হিসেবে মৈত্রী সম্মাননা পুরস্কার গ্রহণ করতে। আমাদের সৌভাগ্য যে সঠিক সময়ে আমরা তাঁকে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পুরস্কৃত করতে পেরেছিলাম। শিক্ষাক্ষেত্রে অবদানের জন্য জাপান সরকারও সেই একই বছর তাঁকে অর্ডার অব সেক্রেড ট্রেজার পদকে ভূষিত করে।
টোকিও, ২৫ জানুয়ারি ২০১৪
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

পরিকল্পনা হয় দু’বছর আগে, চালের বস্তায় টাকা নিয়ে আসা হয়, ব্যাংক কর্মকর্তারাও জড়িত- ব্যাংক লুটের দুর্ধর্ষ কাহিনী by নুরুজ্জামান লাবু

দুর্ধর্ষ এক কাহিনী। যে কাহিনী হার মানিয়েছে কল্পকথার গোয়েন্দা সিরিজকেও। প্রতিদিনই একটু একটু করে খোঁড়া হতো সুড়ঙ্গ। মাটি ফেলা হতো পাশের একটি খালে। সারাদিন সুড়ঙ্গ খোঁড়া শেষে রাতে আরেক বাসায় গিয়ে ঘুমাত হাবিব ওরফে সোহেল (৩৭)। শুক্রবার সেই সুড়ঙ্গ পথ পৌঁছে যায় ব্যাংকের ভল্ট রুমে।