Wednesday, March 11, 2015

‘বাংলাদেশে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততাকে উৎসাহিত করে যুক্তরাজ্য’

বাংলাদেশের সঙ্গে জাতিসংঘের সম্পৃক্ততাকে অব্যাহতভাবে উৎসাহিত করে যুক্তরাজ্য। বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে বৃটিশ পার্লামেন্টে লর্ড অ্যাভাবুরির এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন ব্যারোনেস অ্যানিলে। তিনি বলেন, দেশব্যাপী সহিংসতা ও উত্তেজনার অবসানে সব দলকে একে অন্যের ওপর আস্থা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উল্লেখ্য, ব্যারোনেস অ্যানিলের পুরো নাম জয়সে অ্যানি অ্যানিলে। তিনি কনজারভেটিভ পার্টির পার্লামেন্টারিয়ান। বর্তমানে ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে হাউস অব লর্ডসে সরকার দলীয় চিফ হুইপ। তার কাছে বাংলাদেশ ইস্যুতে প্রশ্ন করেন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ও ফরেন অ্যান্ড কমনওয়েলথ অফিসের গুরুত্বপূর্ণ অনেকগুলো কমিটির বিভিন্ন পদে থাকা লর্ড অ্যাভাবুরি। গত ২৩শে ফেব্রুয়ারি তিনি জানতে চান, জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের কাছে যুক্তরাজ্য সরকার বাংলাদেশ ইস্যুতে একটি প্রস্তাব দেবে কিনা, যাতে বলা হবে বাংলাদেশের সরকার ও বিরোধী পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একজন মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ দিতে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনকে আমন্ত্রণ জানাতে বলা হবে কিনা, যাতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো একটি সমঝোতায় পৌঁছতে পারে। তাদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য দূর হয়। ব্যারোনেস অ্যানিলে তার প্রশ্নের জবাব দেন ৯ই মার্চ। এতে তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের নেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন চিঠি লিখেছেন। এ খবর পেয়েছি আমরা। এ ধরনের উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। এখানে উল্লেখ্য, লর্ড অ্যাভাবুরি হলেন লিবারেল ডেমোক্রেট দলের পার্লামেন্টারিয়ান। তিনি লিবারেল দলের চিফ হুইপও। অন্যদিকে, বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত মার্কিন লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ হত্যাকাণ্ড নিয়েও আলোচনা হয় পার্লামেন্টে। এ বিষয়ে ৯ই মার্চ প্রশ্ন করেন লিভারপুরের লর্ড অ্যাল্টন। তিনি জানতে চান, ১৯৪৮ সালের মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণার ১৮ অনুচ্ছেদের অধীনে বাংলাদেশের বাধ্যবাধকতার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের কাছে বৃটিশ সরকার তার অবস্থান জানিয়েছে কিনা? এদিনই তার এ প্রশ্নের উত্তর দেন ব্যারোনেস অ্যানিলে। তিনি বলেন, আমরা মানবাধিকারের বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিই। বিশ্বাসযোগ্য কোন অভিযোগ থাকলে বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমরা তা নিয়ে উদ্বেগ উত্থাপন করে আসছি। আমরা আহ্বান জানাই সকল ঘটনা যেন দ্রুত, স্বচ্ছতার সঙ্গে এবং নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হয়। ২০১৩’র ২৯শে এপ্রিল, মানবাধিকার কাউন্সিলে বাংলাদেশের ২য় ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিউয়ে ঝুঁকির মুখে থাকা দলগুলোকে সুরক্ষা করতে আরও বেশি কিছু করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় যুক্তরাজ্য। মার্কিন নিবাসী অভিজিৎ রায়ের হত্যাকাণ্ড এবং তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যার গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় বৃটেনের তরফ থেকে উদ্বেগ ও শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত বৃটিশ হাইকমিশনার। এছাড়া সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশে যেসব সহিংসতা হয়েছে তা নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়েছে।

পাহাড়ী বাঙ্গালী সংঘর্ষ, আহত ১০ : সেনাবাহিনী বিজিবির টহল

বান্দরবানে জাগো পাার্বত্যবাসী সংগঠনের ডাকা টানা ৭২ ঘন্টা হরতালের প্রথম দিনে শহরের বালাঘটা এলাকায় পাহাড়ী বাঙ্গালীদের মধ্যে সংঘর্ষে কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়েছে। পুলিশ আটক করেছে ৩ জনকে। এ ঘটনার পর শহরে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। শহরজুড়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বেলা ১২ টার দিকে জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধী প্রিয় লারমা সন্তু লারমা রাঙ্গামাটি থেকে বান্দরবানে এসে পৌছালে তাকে কড়া নিরাপত্তায় সার্কিট হাউসে পৌছানো হয়। তার আগমনের খবরে হরতাল সমর্থকরা বান্দরবান রাঙ্গামাটি সড়কের বিভিন্ন জায়গায় গাছের গুড়ি ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এছাড়া পুল পাড়াসহ কয়েকটি এলাকায় সড়কের বেইলী ব্রিজের পাতাটনও খুলে ফেলা হয়। পরে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যোগযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করে দেয়। দুপুরে শহরের বালাঘাটা এলাকায় পাহাড়ী বাঙ্গালীদের মধ্যে সংঘর্ষে কমপক্ষে ১০ জন আহত হয়। আহতদের মধ্যে যাদের নাম পাওয়া গেছে তারা হলেন মো: মমতাজ উদ্দিন (৩২), পেঅং প্রু মার্মা (৫৪), পরিমল চাকমা (২৮), লিটন তংচঙ্গা (২৩)।
জনসংহতি সমিতি ও হরতাল সমর্থকরা ইটপাটকেল গুলতি নিয়ে একে অপরের উপর হামলা করে। এ সময় পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের নেতা কর্মী বহনকারী একটি জীপও ভাংচুর করে হরতাল সমর্থকরা। এ ঘটনার পর বালাঘাটা ও ট্রাফিক মোড় এলাকায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। এছাড়া শহরের বিভিন্ন জায়গায় বিজিবি ও দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সন্তু লারমার আগমনকে কেন্দ্র করে শহরে উত্তেজনা বিরাজ করছে। জেলা প্রশাসক মিজানুল হক চৌধুরী ও পুলিশ সুপার দেবদাশ ভট্রাচার্য জানিয়েছেন অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে শহরে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত শহরে সেনাবাহিনী বিজিবির টহল অব্যহত থাকবে বলে তারা জানান।
পাহাড়ে বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনের সন্ত্রাস চাঁদাবাজীর প্রতিবাদে জাগো পার্বত্য বাসী নামের নতুন একটি সংগঠন বান্দরবানে আজ সকাল থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত টনা ৭২ ঘন্টার হরতাল আহবান করে। সংগঠনটির নেতা কর্মীরা সকাল থেকে শহরে পিকেটিং করে। হরতালের কারনে অভ্যন্তরিন সড়ক ও দুরপাল্লার যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় চরম দুর্ভোগের মধ্যে পরেছে সাধারন মানুষ ও স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীরা। আগামী ১৩ মার্চ চিম্বুক পাহাড়ের ফারুক পাড়ায় পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের সম্মেলনে যোগ দিতে জনসংহতি সমিতির সভাপতি সন্তু লারমা দুদিনের সফরে আজ বান্দরবানে এসেছেন।

বিদেশে নারীর কর্মসংস্থান বাড়ছে by শরিফুল হাসান

বাংলাদেশ থেকে পুরুষ কর্মীদের বিদেশে কর্মসংস্থান কমলেও নারীদের বাড়ছে। ১৮টি দেশে কর্মরত আছেন সাড়ে তিন লাখের বেশি নারী। তাঁদের দুই লাখের বেশি গেছেন গত পাঁচ বছরে। তাঁরা আয়ের পুরোটাই দেশে পাঠিয়ে অবদান রাখছেন জাতীয় অর্থনীতিতে।
২০১২ সালের আগে মোট বিদেশগামীদের ৫ শতাংশ ছিলেন নারী। ২০১৪ সালে তা ১৮ শতাংশে এবং চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সৌদি আরবে নারী কর্মী যাওয়া শুরু হলে এই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে মনে করছে সরকার। সৌদি আরব ও বাংলাদেশের মধ্যে নারী কর্মী পাঠানোর চুক্তি হয়েছে। সরকার বলছে, দেশটি বছরে ১ লাখ ২০ হাজার নারী গৃহকর্মী নিতে চায়।
সরকার এবং অভিবাসী নারীদের নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো বিদেশে নারী কর্মীদের এই সংখ্যাকে খুব ইতিবাচক মন্তব্য করে বলছে, এটি নারীর ক্ষমতায়নের একটি বড় পদক্ষেপ। তবে নারী কর্মীরা যেন বিদেশে নির্যাতন, নিপীড়ন ও হয়রানির শিকার না হন, সে জন্য তাঁদের সচেতনতা ও যথাযথ প্রশিক্ষণ জরুরি। নার্সসহ বিভিন্ন খাতেও নারী কর্মী পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব খন্দকার ইফতেখার হায়দার প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত কয়েক বছরে আমাদের নারী কর্মীদের বিদেশে যাওয়া অনেক বেড়েছে। প্রশিক্ষণ নিয়ে মেয়েরা এখন বিদেশে যাওয়ার ব্যাপারে উৎসাহ দেখাচ্ছেন। এটি খুব ইতিবাচক। কেবল গৃহকর্মী নন, ভবিষ্যতে চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে দক্ষ নারী কর্মীদেরও বিদেশে পাঠানোর বিষয়টি সরকার ভাবছে।’ তিনি বলেন, ‘নারীদের অধিকার ও মর্যাদার বিষয়েও আমরা এখন খুব সচেতন। আইএলও, আইওএম—সবাই এসব বিষয়ে সোচ্চার। যে দেশগুলো নারী কর্মী নিচ্ছে, তাদের প্রতিও একধরনের চাপ তৈরি হচ্ছে। ফলে সমস্যা কমে আসছে। আর ভাষার কারণেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হয়। সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানোর আগেই আমরা তাঁদের ভাষার প্রশিক্ষণ দেব।’
বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ সালে ২ হাজার ১৮৯ জন নারী কর্মী বিদেশে যান। ২০১৪ সালে এই সংখ্যা ৭৬ হাজার ৭ জন। গত ৪৪ বছরে এটাই সর্বোচ্চ। গত বছর মোট ৪ লাখ ২৫ হাজার ৬৮৪ জন বিদেশে গেছেন, যার মধ্যে ১৮ শতাংশ নারী। গত দুই মাসে মোট ৬৩ হাজার ৩৯০ জন কর্মী বিদেশে গেছেন, যার মধ্যে ১৩ হাজার ৭৬২ জন অর্থাৎ ২২ শতাংশ নারী।
২০১৩ সালে বিদেশে যাওয়া ৪ লাখ ৯ হাজার ২৫৩ জনের মধ্যে নারী ৫৬ হাজার ৪০০ জন, অর্থাৎ প্রায় ১৪ শতাংশ। অথচ ২০১২ সালে মোট বিদেশগামীদের মধ্যে নারী ছিলেন মাত্র ৬ শতাংশ। এর আগে এই সংখ্যা ছিল ৩ থেকে ৪ শতাংশ। বিএমইটির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯১ থেকে ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৩ লাখ ৬৬ হাজার ৩১ জন নারী কর্মীর বিদেশে কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে ৯৭ হাজার ৫৭৭ জন সংযুক্ত আরব আমিরাতে, ৯৩ হাজার ৩৮২ জন লেবাননে, ৬৮ হাজার ৪৬১ জন জর্ডানে, ৩২ হাজার ২২৪ জন সৌদি আরবে, ২৮ হাজার ২৮২ জন ওমানে, ১৪ হাজার ১২৭ জন মরিশাসে, ৯ হাজার ৮৭২ জন কাতারে, ৭ হাজার ৬৬১ জন কুয়েতে, ৬ হাজার ৫২২ জন মালয়েশিয়ায়, ৩ হাজার ৮৪৯ জন বাহরাইনে, ৯১২ জন সিঙ্গাপুরে, ৮৮২ জন হংকংয়ে, ৫৩১ জন লিবিয়ায়, ৪৬৩ জন ইতালিতে, ১৪৭ জন যুক্তরাজ্যে, ৯১ জন সাইপ্রাসে, ৮৬ জন ব্রুনেইয়ে ও ৪০ জন পাকিস্তানে গেছেন। বাকি ৯২২ জন অন্যান্য দেশে গেছেন।
বাংলাদেশ মহিলা অভিবাসী শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের (বমসা) পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, একজন পুরুষ প্রবাসী কর্মী হয়তো কিছু টাকা বিদেশে খরচ করেন, কিন্তু একজন নারী তাঁর আয়ের পুরোটাই দেশে পাঠান। ফলে বর্তমানে সাড়ে তিন লাখ নারী কর্মীর প্রবাসী-আয়ের পুরোটাই দেশে আসছে। নির্যাতন-নিপীড়নের কিছু ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটি বন্ধে বিদেশে যাওয়ার আগেই একটি মেয়েকে মুঠোফোন দেওয়া উচিত, যাতে তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে পারেন। আর দূতাবাস থেকেও নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া উচিত।’

১০ দিনের মধ্যে নাগরিক ফর্মুলা by সিরাজুস সালেকিন

চলমান সঙ্কট নিরসনে নাগরিক সমাজের উদ্যোগ চূড়ান্ত রূপ নিতে যাচ্ছে। সঙ্কটের টেকসই সমাধানের জন্য একটি ফর্মুলা প্রণয়নের কাজ শেষপর্যায়ে আছে। গত ফেব্রুয়ারিতে উদ্বিগ্ন নাগরিকের ব্যানারে একটি কমিটি গঠন করা হয়। সমাধান খুঁজতে প্রায় এক মাস সময় ধরে কাজ করেছেন কমিটির সদস্যরা। আগামী দশ দিনের মধ্যে এই কমিটির তৈরি ফর্মুলা প্রকাশ সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক’দের পক্ষ থেকে গঠিত কমিটির আহ্বায়ক ও সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদা। মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে তিনি বলেন, আমরা এখন নিজেদের মধ্যে বৈঠক করছি। অনেক বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আশা করা যাচ্ছে আগামী দশদিনের মধ্যে আমরা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে একটি ফর্মুলা তুলে ধরতে পারবো। যা অনুসরণ করলে চলমান সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব।
নাগরিক সমাজের এই ফর্মুলার নাম দেয়া হয়েছে জাতীয় রূপরেখা। এই  রূপরেখা অনুসরণ করে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি জাতীয় সনদ প্রণয়ন করা হবে। জাতীয় রূপরেখা তৈরির সঙ্গে জড়িত উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের একজন সদস্য জানান, বর্তমান সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া জরুরি। কিন্তু এই মুহূর্তে নির্বাচনই আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন টেকসই সমাধানের। নাগরিক সমাজের লক্ষ্য হচ্ছে জাতির বৃহত্তর স্বার্থে রাজনীতিবিদদের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে সহায়তা করা। তারা সংলাপে নিয়োজিত হবেন, সমঝোতায় উপনীত হবেন এবং একটি নাগরিক সনদে স্বাক্ষর করবেন। তিনি আরও জানান, এবার নাগরিক সমাজ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে কোন চিঠি বা প্রস্তাব পাঠাবে না। সংবাদ সম্মেলন অথবা গোলটেবিল আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জাতীয় রূপরেখা অনুরসণ করার জন্য আহ্বান জানানো হবে। কোন রাজনৈতিক দলকে ক্ষমতাচ্যুত করা কিংবা কাউকে ক্ষমতায় বসানো নাগরিক সমাজের উদ্দেশ্য নয় বলে দাবি করেন এই বিশিষ্ট নাগরিক।
উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজের একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জাতীয় রূপরেখায় সরকার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব থাকবে। এতে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা এবং কমিটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়নে পরবর্তী সরকারকে উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হবে। সংবিধান সংশোধনের সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো হতে পারে- প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনা। ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ রোধে একই ব্যক্তির একাধারে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলের প্রধান হওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কারের মাধ্যমে একক আঞ্চলিক এলাকাভিত্তিক নির্বাচন এবং আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির সমন্বয়ে একটি মিশ্র নির্বাচন পদ্ধতির প্রবর্তন করা। দুই-কক্ষ বিশিষ্ট সংসদীয় ব্যবস্থার প্রবর্তন করা এবং সংসদের ন্যূনতম এক তৃতীয়াংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত এবং এ সকল আসনে ঘূর্ণায়মান পদ্ধতিতে নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে রাজনীতির অর্থায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা। এ ছাড়া রূপরেখায় সরকারি ও বেসরকারি সকল গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত এবং নাগরিক সমাজের কাজের পরিধি যাতে সঙ্কুচিত না হয় সে ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়ার জন্য আহ্বান জানানো হবে। জাতীয় সংসদকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কথা থাকবে রূপরেখায়। একইসঙ্গে সংসদ সদস্যদের সততা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তাদের জন্য একটি আচরণবিধি প্রণয়ন এবং সংবিধান নির্দেশিত সংসদ ও সংসদ সদস্যদের জন্য একটি বিশেষ অধিকার আইন প্রণয়ন করার কথা থাকছে। রূপরেখায় রাজনৈতিক দলের সংস্কারের মাধ্যমে দলগুলোকে গণতান্ত্রিক, স্বচ্ছ ও দায়বদ্ধ করা এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর সকল স্তরে দলতন্ত্রের অবসানের কথা বলা হবে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ এবং বিচার বিভাগের সত্যিকার পৃথককরণের মাধ্যমে নিম্ন আদালতের নিরপেক্ষতা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। একইসঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকেও রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা প্রত্যাহারের অপসংস্কৃতি বন্ধের আহ্বান থাকবে রূপরেখায়।
চলতি বছরের ৫ই জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একবছর পূর্তিতে সরকার ও বিরোধী জোটের পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে সঙ্কট চরম আকার ধারণ করে। অনির্দিষ্টকালের অবরোধের কবলে পড়ে দেশ। দীর্ঘ একমাসেও দেশের অচলাবস্থার কোন উন্নতি না হওয়ায় নাগরিক সমাজ তৎপর হয়ে ওঠে। গত ৭ই ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সেমিনার হলে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার নাগরিকরা ‘জাতীয় সঙ্কট নিরসনে জাতীয় সংলাপ’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। ওই সভা থেকে প্রেসিডেন্টকে জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছিলেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। এরপর ৯ই ফেব্রুয়ারি দেশে চলমান সঙ্কট নিরসনে প্রেসিডেন্টকে জাতীয় সংলাপের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য লিখিত অনুরোধও জানিয়েছিলেন সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদা। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে সংলাপে বসার অনুরোধ জানিয়ে একই রকম চিঠি দিয়েছিলেন ড. হুদা। ওই চিঠির সঙ্গে কিছু প্রস্তাবনাও উল্লেখ করা হয়। সেই প্রস্তবনারই বিস্তারিত রূপ এই জাতীয় রূপরেখা। বিএনপি এ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও আওয়ামী লীগ নেতারা এর বিরোধিতা করেন। আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের বৈঠক থেকে নাগরিক সমাজের দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হয়। এরপর আবারও ১৩ই ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে সংলাপে সহায়তা দিতে সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলেন ড. এটিএম শামসুল হুদা। ওই দিন ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’ নামে ১৩ সদস্যের একটি নাগরিক কমিটির ঘোষণা দেন তিনি। ড. এটিএম শামসুল হুদা নিজেই কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন। এ কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান, এএসএম শাহজাহান, ড. আকবর আলী খান, সিএম শফি সামী, রাশেদা কে চৌধুরী, রোকেয়া আফজাল রহমান, ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী, ড. শাহদীন মালিক, সৈয়দ আবুল মকসুদ, আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী, ড. আহসান মনসুর, ড. বদিউল আলম মজুমদার।
বৈঠকে ছিলেন না ফজলে হাসান আবেদ
নাগরিক সমাজের বৈঠক নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ করেছে বেসরকারি উন্নয়ন সহযোগী সংগঠন ব্র্যাক। গতকাল গণমাধ্যমে পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ প্রতিবাদ জানানো হয়। রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে জাতীয় রূপরেখা তৈরির উদ্যোগ হিসেবে গত সোমবার নাগরিক সমাজের আটজন বিশিষ্ট ব্যক্তি বৈঠক করেন। বৈঠকে উপস্থিত ব্যক্তিদের মধ্যে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারপারসন স্যার ফজলে হাসান আবেদ-এর নামও উল্লেখ করা হয়েছে। স্যার ফজলে হাসান আবেদ এ ধরনের কোন বৈঠকে অংশ নেননি এবং এ জাতীয় কোন উদ্যোগের সঙ্গে তিনি সম্পৃক্ত নন বলে ব্র্যাকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

বিদ্যুৎ ভবনে দরপত্র নিয়ে সরকার–সমর্থকদের সংঘর্ষ : এত নিরাপত্তা, তবুও মারামারি–গুলি

রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে গতকাল দরপত্র জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে সরকার-
সমর্থক দুই পক্ষের মারামারি হয়। পরে এক পক্ষ দরপত্র জমা দেওয়ার জন্য ওই
ভবনের ভেতরে ঢুকতে চাইলে নিরাপত্তাকর্মীরা বাধা দেন l ছবি: প্রথম আলো
রাজধানীর আবদুল গণি রোডে বিদ্যুৎ ভবনের এক পাশে সচিবালয়। উল্টোদিকে পুলিশ নিয়ন্ত্রণকক্ষ। চারদিকে নিরাপত্তা। এর মাঝেও ঠিকাদারি কাজের দরপত্র জমা দেওয়াকে কেন্দ্র করে গতকাল মঙ্গলবার সকালে সরকার-সমর্থক দুই দলের মধ্যে মারামারি হয়েছে। এ সময় গুলিতে একটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
এই মারামারি ও গুলির ঘটনা ঘটলেও সেখানে কর্মরত নিরাপত্তাকর্মী ও পুলিশ সদস্যদের কোনো তৎপরতা ছিল না। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, দুই দলই সরকার-সমর্থক হওয়ায় পুলিশ তাঁদের ঘাঁটাতে যায়নি। তবে এ ঘটনায় সামান্য আহত হয়ে মামুন নামে এক ব্যক্তি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে পুলিশ তাঁকে আটক করে।
জানতে চাইলে শাহবাগ থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সাইদুল হক ভুঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ঘটনাটি ছিল তাৎক্ষণিক। এ ব্যাপারে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ঘটনায় সামান্য আহত মামুন নামে একজনকে আটকের কথা তিনি নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ঘটনার বিষয়ে কেউ থানায় অভিযোগ করেননি।
ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ডিপিডিসি) প্রধান প্রকৌশলী দিলীপ কুমার সেন প্রথম আলোকে বলেন, ডিপিডিসির তেজগাঁও সাব-স্টেশন ভবন সম্প্রসারণের ৩৩ লাখ টাকার ঠিকাদারি কাজ ও মাদারটেক সাব-স্টেশনের সীমানাদেয়াল নির্মাণের জন্য ৪৪ লাখ টাকার কাজের দরপত্র জমার শেষ দিন ছিল গতকাল। বিদ্যুৎ ভবনের তৃতীয় তলায় দরপত্রের বাক্স রাখা ছিল। সেখানে কোনো গণ্ডগোল হয়নি। তিনি বলেন, ‘তবে আমি শুনেছি, নিচতলায় কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। তা টেন্ডারের কারণে, না অন্য কারণে ঘটেছে বা কারা ঘটিয়েছে, তা আমরা জানি না।’
গতকাল দুপুরে বিদ্যুৎ ভবনে গিয়ে দেখা যায়, নিচতলায় কয়েকটি ফুলের টব ভেঙে পড়ে রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ঠিকাদার রহিম গ্রুপ ও খালিদ গ্রুপের লোকজনের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও মারামারি হয়। আবদুর রহিম ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি। আর খালিদ ভুঁইয়া মহানগর (দক্ষিণ) যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।
আবদুর রহিমের সঙ্গে দরপত্র জমা দিতে আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ছাত্রলীগ কর্মী বলেন, রহিম তাঁর নিজের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘শিকদার কন্সট্রাকশন্স’-এর নামে দরপত্র ফেলে নিচে নামতেই খালিদের লোকজন হামলা চালায়। উজ্জ্বল-তুহিন-সুমনের নেতৃত্বে হামলাকারীরা তাঁদের মারধর করলে তাঁরাও পাল্টা প্রতিরোধ করেন। এ নিয়ে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। এর মধ্যেই গুলির শব্দ শোনা যায়। তবে এ বিষয়ে খালিদ ভুঁইয়াকে ফোন করে তাঁকে পাওয়া যায়নি।
এর আগে গত ১ ফেব্রুয়ারি বিদ্যুৎ ভবনের পাঁচতলা থেকে সচিবালয়ের সীমানার ভেতরে ককটেল ছুড়ে বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। একটি ককটেল বিদ্যুৎ ভবনের পাঁচতলাতেই বিস্ফোরিত হয়। এরপর বিদ্যুৎ ভবনের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। এর মাঝেই গতকাল মারামারি ও গুলির ঘটনা ঘটে।
বিদ্যুৎ ভবনে ছাত্রলীগ-যুবলীগের দুই গ্রুপের গোলাগুলি
পুলিশের উপস্থিতেই বিদ্যুৎ ভবনে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে গুলিবর্ষণ, ককটেল নিক্ষেপ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু সচিবালয়সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনায় কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে আশপাশের লোকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। এতে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন অন্তত তিনজন। আহতদের মধ্যে আল-মামুনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাদেয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ ভবনে টেন্ডার জমা দেয়া নিয়ে গতকাল দুপুরে বিদ্যুৎ ভবনের দোতলায় এ ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) অধীনে তেজগাঁও সাব-স্টেশন ও মাদারটেক সাব-স্টেশনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের জন্য ৭০ লক্ষাধিক টাকার দুটি টেন্ডার জমা দেয়াকে কেন্দ্র করে সকাল থেকেই ওই এলাকায় উত্তেজনা ছিল। মদীনা গ্রুপের পক্ষে টেন্ডার জমা দেয়ার সময় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ পরিচয়দানকারী ১০ থেকে ১২ জন টেন্ডার জমা দিতে বাধা দেয়। তাৎক্ষণিকভাবে মদিনা গ্রুপের পক্ষে কিছু যুবক তাদের প্রতিরোধ করতে এগিয়ে গেলে সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষে একপক্ষে নেতৃত্ব দেন ছাত্রলীগ নেতা পরিচয়দানকারী টোকাই রফিক, রহিম ও মিজান। আর অপর পক্ষে ছিলেন যুবলীগ মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পুলিশের উপস্থিতিতেই সংঘর্ষ চলাকালে ভবনের দ্বিতীয় তলায় এবং নিচে বেশ কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। ভবনের নিচে ও রাস্তায় কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায় সন্ত্রাসীরা। গুলিবর্ষণের সময় বিদ্যুৎ ভবনের দোতলায় পার্কিংয়ের সিঁড়ির কাছে থাকা বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) ড. আহমেদ কায়কাউসের গাড়িতে (ঢাকা মেট্রো-ঘ-১৩-৬২-৩৩) গুলি লেগে গাড়িটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সময় ওই প্রকল্প পরিচালকের গাড়িসহ কয়েকটি গাড়ি ভাঙচুর করে সন্ত্রাসীরা। ওই সময় সচিবালয়ের পরিবহন পুল ভবনের সামনে রাস্তায় এবং সচিবালয়ের ৫নং গেটসংলগ্ন পরিবহন শাখা ভবনের সামনেও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা ফাঁকা গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যায়। গুলিবর্ষণ ও ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় বিদ্যুৎ ভবন, সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও আশপাশের লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে শাহবাগ থানার অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত আল-মামুনকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালে নিয়ে যায়। তবে ঘটনার আগ থেকেই সেখানে উপস্থিত ছিলেন শাহবাগ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মামুনসহ কয়েকজন পুলিশ। এ বিষয়ে এসআই মামুন বলেন, ঘটনার সময় আমি তৃতীয় তলায় ছিলাম। আমরা আসার পরে গুলিবর্ষণ হয়েছে বলে শুনেছি। কিন্তু কে বা কারা গুলিবর্ষণ করেছে এ বিষয়ে পুলিশের কাছে কোন তথ্য নেই বলে জানান তিনি। তবে আহত আল-মামুন ছাত্রলীগকর্মী বলে স্বীকার করেন ওই এসআই। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সংঘর্ষ চলাকালে কয়েকজন গুলিবিদ্ধ হন কিন্তু অতিরিক্ত পুলিশ আসার আগেই পালিয়ে যায় তারা। সূত্র মতে, মদিনা গ্রুপের টেন্ডার জমা দেয়ার আগে ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ন্ত্রণাধীন তানভীর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তানভীর গ্রুপ ও তালুকদার কনস্ট্রাকশনের দুটি এবং মাহবুব আলম কনস্ট্রাকশনের একটি টেন্ডার জমা দেয়া হয়।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) অধীনে তেজগাঁও সাব-স্টেশন ও মাদারটেক সাব-স্টেশনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের দুটি টেন্ডার জমার শেষদিন ছিল গতকাল। এর একটি ৪২ লাখ ও অপরটি ৩১ লাখ টাকার কাজ বলে জানা গেছে।
জানতে চাইলে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির দপ্তর সম্পাদক শেখ রাসেল বলেন, ছাত্রলীগ টেন্ডারবাজিতে বিশ্বাস করে না। বিদ্যুৎ ভবনের ঘটনায় ছাত্রলীগ জড়িত কিনা এ বিষয়ে আমাদের কিছু জানা নেই।

পুলিশ কাছেই ছিল সাহায্য করেনি, এত ভীড়ে এমন হামলা কল্পনার বাইরে: অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী

(অমর একুশে বইমেলা থেকে বের হওয়ার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির কাছে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসংলগ্ন ফুটপাতে খুন হন অভিজিৎ রায়। আহত হন তাঁর স্ত্রী রাফিদা আহমেদ। ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে তোলা ছবি।) বাংলাদেশে আততায়ীর হামলায় নিহত লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী রাফিদা বন্যা আহমেদ হামলার ঘটনা নিয়ে এই প্রথম কোনও সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বললেন।
নিরাপদ এক স্থান থেকে বিবিসির সাথে কথা বলেছেন বর্তমানে চিকিৎসাধীন রাফিদা বন্যা আহমেদ।
বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে অভিজিৎ হত্যার সেই দিনটির স্মৃতিচারণ করছিলেন তিনি।
২৬শে ফেব্রুয়ারি একুশে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আততায়ীরা অভিজিৎ রায় ও তার স্ত্রীকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করার পর একজন আলোকচিত্রী যখন সেদিন তাদেরকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন বারবারই জ্ঞান হারাচ্ছিলেন বন্যা।
হাসপাতালে প্রথম জ্ঞান ফিরে এলে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, তার সারা গায়ে রক্ত এবং একটি বুড়ো আঙ্গুল হারিয়েছেন বন্যা।
হাসপাতালে নেবার পর অভিজিৎকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
এ ঘটনার প্রধান সন্দেহভাজন বলে কথিত শফিউর রহমান ফারাবি নামে এক ব্যক্তিকে ইতিমধ্যে পুলিশ গ্রেফতার করেছে।
হামলার আগে অভিজিৎ রায়কে বিভিন্ন সময় হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছিল।
এসব হুমকিকে তারা কতটুকু গুরুত্বের সাথে দেখতেন এমন প্রশ্নে তার স্ত্রী বলছিলেন, হত্যার হুমকি মূলত: ছিল ফারাবি নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঐ ব্যক্তিকে ‘ব্লক’ করার কথাও জানান বন্যা।
তিনি বলেন, এধরনের হুমকি অনেক বুদ্ধিজীবী ও লেখককেই দেয়া হয়েছে যার দু’একটিই এপর্যন্ত কার্যকর করা হয়েছে।
হত্যার হুমকি নিয়ে বাংলাদেশে এসে নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টিও ভেবেছিলেন বলে উল্লেখ করেন অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী।
কিন্তু বই মেলা থেকে টিএসসির মোড় পর্যন্ত এইটুকু পথে এত মানুষের মধ্যে এরকম একটি হামলা হতে পারে বলে এটি তাদের কল্পনার বাইরে ছিল বলেই জানালেন রাফিদা বন্যা আহমেদ।
পুলিশ কাছেই ছিল সাহায্য করেনি
দুষ্কৃতকারীদের হামলার সময় পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ এনেছেন নিহত ব্লগার ও লেখক অভিজিৎ রায়ের স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। এক বিবৃতিতে তিনি জানিয়েছেন, তার ও তার স্বামীর ওপর হামলার সময় তিনি আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা পাননি। তার ভাষায়, আমি ও অভিজিৎ যখন নিষ্ঠুর হামলার শিকার হচ্ছিলাম, স্থানীয় পুলিশ আমাদের খুব কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল। কিন্তু তারা কিছুই করেনি। নিউ ইয়র্ক ভিত্তিক  সংস্থা সেন্টার ফর এনকোয়ারি (সিএফআই) বিবৃতিটি প্রকাশ করে। সেখানে বন্যা লিখেছেন, আমার স্বামী অভিজিৎ রায় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদ নিয়ে লেখালেখি করেছেন। তিনি ধর্মীয় মৌলবাদের সমালোচনাও করেছেন। এর কারণে তাকে হত্যা করা হয়েছে। তার স্ত্রী, সহকর্মী লেখক ও মুক্তমনা হিসেবে আমি এ ভয়াবহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানাই। তিনি বলেন, ওই হামলা কেবল একজন মানুষের ওপরই ছিল না, ছিল সমগ্র মানবতা ও বাকস্বাধীনতার ওপর হামলা। তিনি আরও বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যামপাস ঐতিহাসিকভাবেই প্রগতিশীল আন্দোলনের স্থান। অনেকবার হুমকি পেলেও আমরা কল্পনাও করতে পারিনি, এরকম জায়গায় এমন ঘৃণ্য অপরাধ সংঘটিত হতে পারে। তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছে খুনিদের ধরে বিচারের আওতায় আনতে সরকারের সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগের দাবি জানান। তিনি বলেন, আমি বাংলাদেশ সরকারের প্রতি সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধের আহ্বান জানাই। এখানে লেখকরা নিহত হন, কিন্তু হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় আনা হয় না। আমি পুরো বিশ্বের প্রতি আমাদের বিচারের দাবির সঙ্গে শামিল হওয়ার আহ্বান জানাই।

শেষের খেলা by আলফাজ আনাম

বিরোধী দলের ডাকা অবরোধ ও হরতালের কর্মসূচি দুই মাসের বেশি সময় পার হয়েছে। ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক সঙ্কট নিরসনে কোনো আলোচনার উদ্যোগ নেই। বিরোধী দলের আন্দোলন ধীরে ধীরে মরে যাবে বলে সরকারের মন্ত্রীরা আশা করলেও তা হয়নি। এক সপ্তাহের মধ্যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলা হলেও আট সপ্তাহ চলে গেলেও দেশের পরিস্থিতি মোটেও স্বাভাবিক নয়। অর্থনীতি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। পরীক্ষা পিছিয়ে গেছে। গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করার পরও রহস্যময় কারণে বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত সরকারকে পিছিয়ে আসতে হয়েছে।
মন্ত্রীরা যেমন আগে বলতেন বিএনপির আন্দোলন করার কোনো মুরোদ নেই। এখন আর তেমন কথা বলছেন না। অর্থাৎ বিএনপির আন্দোলনের মুরোদ আছে এটা হয়তো তারা এখন বুঝতে পারছেন। এখন বিএনপিকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা হচ্ছে। বিএনপিকে মধ্যপ্রাচ্যের জঙ্গি সংগঠন আইএসের সাথে তুলনা করে আন্তর্জাতিক মহলে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। পশ্চিমা দেশগুলো সরকারের এই প্রচারণায় হয়তো বিস্মিত। কারণ আইএসের কিভাবে জন্ম আর এর পেছনেই বা কারা আছে, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোর চেয়ে আর কারো ভালো জানার কথা নয়। ফলে এসব প্রচারণা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। উল্টো আমরা দেখছি, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সব পশ্চিমা দেশের রাষ্ট্রদূত একযোগে খালেদা জিয়ার সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।
বিরোধী দলের টানা অবরোধ ও হরতাল শুরু হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে সঙ্কট নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের তৎপরতা যেমন বেড়েছে, তেমনি আন্দোলনের মোড় যেকোনো সময় যেকোনো দিকে ঘুরে যেতে পারে, সাধারণ মানুষের মধ্যে সে বিশ্বাসও গড়ে উঠেছে। বিএনপি নেতারাও হয়তো আশা করেননি টানা দুই মাস আন্দোলন চালিয়ে যেতে পারবেন। সন্দেহ নেই বর্তমানে আন্দোলনে কিছুটা শিথিলতা এসেছে। দৈনন্দিন প্রয়োজনের জন্য মানুষকে বাইরে বের হতে হচ্ছে কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, বিরোধী দলের প্রতি জনসমর্থন কমে গেছে। প্রকৃতপক্ষে সাধারণ মানুষ এই আন্দোলনের ফল চায়। যৌক্তিক পরিণতি দেখতে চায়।
সরকারের কঠোর অবস্থানের কারণে বিরোধী দলকে আন্দোলনের কৌশল যেমন বদলাতে হচ্ছে, তেমনি আন্দোলন দীর্ঘ হচ্ছে। এ যেন টিকে থাকার এক মনস্তাত্ত্বিক লড়াই। যে পক্ষ হাল ছেড়ে দেবে, সেই পক্ষই পরাজিত হবে। এ কারণে আমরা দেখছি বিরোধী দল হরতাল ও অবরোধের কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। অপর দিকে, ক্ষমতাসীনেরাও নিপীড়ন নির্যাতনের সর্বশেষ মাত্রা অতিক্রম করছেন। রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করেই তারা থামছে না। গুম, অপহরণ, বিচারবহির্ভূত হত্যা, পঙ্গু করার মতো চরম অমানবিক পদ্ধতি গ্রহণ করেছে। দেশকে পরিণত করা হয়েছে আক্ষরিক অর্থে একটি পুলিশি রাষ্ট্রে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্ট দেখছে শেষের খেলা হিসেবে। সাময়িকীটি লিখেছে, বাংলাদেশে শেষের খেলা শুরু হয়েছে। খেলা শেষ হতে সময় নেবে।
সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার যেভাবে হরণ করা হয়েছে, তাতে বিরোধী দলের আন্দোলন থামার কোনো সম্ভাবনা নেই। বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা সরকারের চরম নিপীড়নমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে, তার আর ঘরে ফেরার উপায় নেই। হয় জেলে যেতে হবে না হলে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হতে হবে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক আন্দোলনের কর্মীরা আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। রাজপথ তার কাছে বেশি নিরাপদ হয়ে উঠছে। সরকার দমনের পথে গিয়ে তাদের সে দিকে ঠেলে দিয়েছে।
অর্থনৈতিক দিক দিয়ে বিপর্যস্ত, আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থনহীন সরকার মূলত টিকে আছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শক্তির ওপর ভর করে। জনসমর্থন সরকারের কাছে এখন আর বিবেচনার বিষয় নয়। সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। আমরা লক্ষ করছি, স্থানীয় সরকারের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত এমনকি তারা বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হচ্ছেন। নড়াইলের একজন ওয়ার্ড কমিশনার ঢাকায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। রংপুরের মিঠাপুকুরের একজন উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান এক মাসের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। পরিবারের সদস্যরা দাবি করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাকে গুম করেছে। আশ্চর্যজনক ব্যাপার, সরকারের পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য নেই। জনপ্রতিনিধিরা যদি এভাবে গুম বা খুন হন, তাহলে তখন আর বুঝতে বাকি থাকে না গণতান্ত্রিক পরিবেশ এখন দেশে কতটা বিরাজ করছে। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের যেখানে জীবনের নিরাপত্তা নেই, সেখানে সাধারণ মানুষ অসহায় হয়ে পড়ছে।
দেশের পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেছে, পুলিশ সিদ্ধান্ত নিচ্ছে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা থাকবেন কী থাকবেন না। রাজশাহীর মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে বরখাস্ত করার দাবি করেছে পুলিশ। এ জন্য পুলিশ সদর দফতর থেকে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। ২০১৩ সালের জুন মাসে মেয়র নির্বাচিত হন মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল। তিনি পেয়েছিলেন এক লাখ ৩১ হাজার ভোট। পুলিশের অভিযোগ, মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল রাষ্ট্রবিরোধী ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশদাতা ও মদদদাতা। পুলিশের পরামর্শ, তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা প্রয়োজন। এখন আমাদের বিশ^াস করতে হচ্ছে, রাজশাহী মহানগরীর লক্ষাধিক ভোটার একজন রাষ্ট্রবিরোধী ব্যক্তিকে নির্বাচিত করেছেন। এ দেশের মানুষের মনে হয় সত্যিই কোনো কাণ্ডজ্ঞান নেই। মোসাদ্দেক হোসেনকে ভোট দিয়ে এসব ভোটাররাও হয়তো রাষ্ট্রবিরোধী কাজে সমর্থন দিয়েছেন। এদের বিরুদ্ধেও পুলিশের ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন হয়ে পড়বে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।
শুধু মোসাদ্দেক হোসেন নন, ২০১৩ সালের জুন মাসে চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছিলেন। এই চারজনকেই এখন বরখাস্তের প্রক্রিয়া চলছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। এর মধ্যে সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে সাবেক অর্থমন্ত্রী কিবরিয়া হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে কয়েক মাস আগে জেলে পাঠানো হয়েছে। গাজীপুরের মেয়র আব্দুল মান্নানকেও করা হয়েছে জেলবন্দী। তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মামলা দেয়া হয়েছে। সেগুলোর চার্জশিট দেয়া হলে তাকে বরখাস্ত করা হবে। খুলনার মেয়র মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক মামলা। তিনি এক রকম পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। ধারণা করা যায়, তাকেও হয়তো বরখাস্তের প্রক্রিয়া চলছে।
সিটি করপোরেশনের ভোটাররা সাধারণভাবে শিক্ষিত ও সচেতন হিসেবে ধরে নেয়া যায়। তারা বিপুল ভোটে এসব মেয়রকে নির্বাচিত করেছেন। সরকারের চোখে তারা এখন রাষ্ট্রবিরোধী ও সন্ত্রাসী। এখন তাদের কারাগারে পাঠিয়ে আওয়ামী লীগের নেতা প্যানেল মেয়রদের দায়িত্ব দেয়া হবে।
বর্তমান সরকার রাষ্ট্র চালানোর কৌশল হিসেবে জনগণের সমর্থনের বিপরীত চিন্তা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে বিরোধী দলকে দমন করে একদলীয় ও চূড়ান্তভাবে কর্তৃত্ববাদী শাসন কায়েম করা। এ জন্য ভিন্নমতাবলম্বীদের মৌলিক অধিকার হরণ করে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করা। আমরা যদি লক্ষ করি তাহলে দেখব, সরকার এ ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিরোধী দল ও মতের লোকজনের ওপর নিপীড়নের লাইসেন্স দিয়েছে। কোনো লোককে আটক বা সন্দেহজনক গ্রেফতার করা হলেও তার সাথে বিএনপি-জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা থাকলে নিপীড়ন ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকতে হচ্ছে। ভিন্নমতাবলম্বী নাগরিকেরা পুলিশের সাহায্যের কথা কল্পনাও করতে পারেন না। সরকার আবার সব পুলিশের ওপর নির্ভর করছে, তা নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে বিশেষ জেলার সদস্যদের বসানো হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ পদে। বিভিন্ন সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে দলীয় সম্পৃক্ততা প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাষ্ট্র পরিচালিত হচ্ছে সম্পূর্ণ দলীয় ও আঞ্চলিক স্বার্থ বিবেচনার ভিত্তিতে। বাংলাদেশ যেন উত্তর কোরিয়া বা রাশিয়ার মতো একদলীয় শাসনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এসব দেশে বিরোধী দল বা মত বলে কিছু নেই। মাত্র কয়েক দিন আগে রাশিয়ায় একজন ভিন্নমতাবলম্বী নেতাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।
বাংলাদেশে এমন অনেক ঘটনা ঘটলেও তা নিয়ে খুব কমই আলোচনা হচ্ছে। ইলিয়াস আলীর কথা মানুষ ভুলে গেছে। দিনের পর দিন রুহুল কবির রিজভীকে রিমান্ডে রাখা হচ্ছে। মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো নেতাকে ভিলেনে পরিণত করা হয়েছে। ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে বিরোধী দলের যেসব নেতাকর্মী গুম বা খুন হয়েছেন, তাদের বেশির ভাগই স্থানীয় পর্যায়ে যথেষ্ট সাংগঠনিক দক্ষতার অধিকারী। সরকারের কৌশল হচ্ছে বিএনপির বৃদ্ধ, অকর্মণ্য ও আপসকামী কেন্দ্রীয় নেতাদের নিরাপদ রেখে, সাংগঠনিক সক্ষমতা আছে এমন নেতাদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলা। এরাই জেলে যাচ্ছেন, পঙ্গু হচ্ছেন কিংবা অনেকে গুমের শিকার হয়েছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, এভাবে কি একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা সম্ভব হবে? গত দুই মাসের আন্দোলন থেকে স্পষ্ট, এভাবে দেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে না। সরকারের মন্ত্রীদের ভাষায়, ‘বিএনপির দুর্বল সাংগঠনিক শক্তি’ সত্ত্বেও মাসের পর মাস রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সক্ষমতা দলটির আছে তা এবার প্রমাণিত হয়েছে। এই সক্ষমতার মূল উৎস সাধারণ মানুষের সমর্থন। যেকোনো সময় বিএনপি এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে পারবে। এই জনসমর্থনের মূল কারণ হচ্ছে মানুষের মনে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। ভোটাধিকার হারানোর বেদনা। আওয়ামী লীগ মানুষের এই অধিকার হারানোর দুঃখ অনুধাবন করতে পারছে না।
নিপীড়নের মাধ্যমে একদলীয় শাসন কায়েমের এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে আওয়ামী লীগ ’৭২-৭৪ সালেও ব্যর্থ হয়েছে। এবারো সফল হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং সাধারণ মানুষের সাথে দলটির যে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হচ্ছে, তা কাটিয়ে ওঠার জন্য দীর্ঘ সময় লাগবে। এ ধরনের একদলীয় শাসনের বিরুদ্ধে নানাভাবে মানুষের ক্ষোভের প্রকাশ ঘটতে থাকবে। ইকোনমিস্টের ভাষায় যে শেষের খেলা চলছে, তা হয়তো আরো কিছু দিন চলবে। শুধু সময় দীর্ঘ হতে পারে। বাড়বে ক্ষয়ক্ষতি। আরো কিছু মানুষ জীবন হারাবে, পঙ্গু হবে। নিপীড়ন নির্যাতন আর জেলজুলুমের শিকার হবে। ইতিহাস বলে এ দেশে কখনোই বল প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করা সম্ভব হয়নি।

‘এরা বড় দলকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে মাঠে নামে’ -বাংলাদেশকে ভয় পাচ্ছে ভারত?

দীপ দাশগুপ্ত, ভারতের সাবেক ক্রিকেটার। পত্রপত্রিকায় নিয়মিত কলাম লেখেন। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের দারুণ জয়ে ছিলেন ‘মনোযোগী সাক্ষী’। অ্যাডিলেডের ম্যাচটি দেখে তাঁর অভিমত, কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশকে সামনে পেলে ভারতকে অনেক বেশি সিরিয়াস হতে হবে। কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় লেখা নিজের কলামে দীপ লিখেছেন, ‘ইংল্যান্ড কোয়ার্টার ফাইনালে সামনে পড়লে যতটা সিরিয়াসভাবে নিতে হতো ধোনিদের, বাংলাদেশকেও ততটাই নিতে হবে। বরং একটু বেশিই নিতে হবে। ’
বাংলাদেশের প্রতি ‘সিরিয়াসনেসে’র ব্যাপারটি কেন বেশি থাকতে হবে, সে ব্যাখ্যাটাও দিয়েছেন দীপ, ‘এরা আর পাঁচটা দলের মতো হবে না। এরা লড়বে। পাল্টা দেবে। বড় দলকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়ে মাঠ ছাড়তে চাইবে। ’
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের আগে বাংলাদেশ দলকে দেখেই মুগ্ধ হয়েছিলেন দীপ দাশগুপ্ত। তাঁর মন নাকি বলেছিল, আজ কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে, ‘দেখছিলাম, মাশরাফি-সাকিবরা আশ্চর্য রকম ফুরফুরে। নিজেদের মধ্যে হাসিঠাট্টা চালাচ্ছে। ইয়ার্কি মারছে। অদ্ভুত মেজাজে টিমটা। দেখে কে বলবে, ঘণ্টা খানেকের মধ্যে ওরা ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নামছে! সাধারণ গ্রুপের ম্যাচ যেটা নয়। গুরুত্ব ধরলে আদতে বিশ্বকাপের প্রি-কোয়ার্টার ফাইনাল। যেখানে হেরে যাওয়া মানে ব্যাগপত্র গুছিয়ে দেশের ফ্লাইট ধরা। এমন একটা ম্যাচে বড় টিম ও রকম মেজাজে থাকতে পারে, তাই বলে বাংলাদেশ! ’
বাংলাদেশের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনাল হলে সেটা ভারতের ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলবে, নিজের কলামে সেটাও উল্লেখ করেছেন দীপ, ‘কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠাটা সাকিবদের কাছে বিশাল কৃতিত্ব, ধোনি-কোহলিদের কাছে নয়। ওদের কাছে ব্যাপারটা প্রত্যাশিত। বাংলাদেশ যদি কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের কাছে হেরেও যায়, তা হলে ওদের দেশে বিক্ষোভ হবে না। বরং ক্রিকেটাররা পিঠ চাপড়ানি পাবে এত দূর আসার জন্য। উল্টোটা হলে কিন্তু ধোনিদের কপালে দুঃখ থাকবে। ’
বাংলাদেশ দল সম্পর্কে দীপ দাশগুপ্তের পর্ববেক্ষণ মুগ্ধতা জাগানিয়া। তিনি বলেছেন, এই দলটা এখন আর একটা-দুটো খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভরশীল কোনো দল নয়, ‘বাংলাদেশের এই টিমটা একটা বা দুটো স্টারের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এই টিমে একটা সাকিব আল হাসানের ততটাই গুরুত্ব যতটা সৌম্য সরকারের। কারণ এটা টিম বাংলাদেশ। এক-আধজনকে ঘিরে ঘুরপাক খাওয়া টিম নয়। যেটা ভারতের সবচেয়ে বড় কাঁটা হতে পারে। ’
কলামের এক পর্যায়ে বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মুর্তজার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছেন দীপ দাশগুপ্ত, ‘মাশরফির হাঁটুর অবস্থা বেশ খারাপ। তা নিয়েই সোমবার পাওয়ার প্লে-তে বল করল। ডাইভ দিয়ে বাউন্ডারি আটকাল। টিমকে বোঝাল, আমি জেতার জন্য জীবন দিয়ে দেব। বাকি ১০ জন তো এ সব দেখে তেতে যাবে। ’
দীপ আরও লিখেছেন, আবেগ, আগুন আর আত্মবিশ্বাস, এই তিনটে ব্যাপার মাশরাফিদের সম্পদ। এরা যেকোনো টিমকে চমকে দিতে পারে। এরা বিশ্বাস করে, হারার আগে হার বলে কিছু হয় না। এদের ক্যাপ্টেন টিমের কাছে নিজেকে তুলে আনে। ভারতের বিরুদ্ধে পড়লে যারা আরও জেদ নিয়ে নামবে। চাইবে, এমন কিছু করে দিতে যাতে অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপ কোনো দিন বাংলাদেশকে ভুলতে না পারে! ’
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে দীপ মুগ্ধ হয়ে দেখেছেন বাংলাদেশের লড়িয়ে মনোভাব। তাঁকে অবাক করেছে কীভাবে একশোর মধ্যে চার উইকেট পড়ে যাওয়ার পর দলটা ঘুরে দাঁড়াল। মাহমুদউল্লাহর সেঞ্চুরি, মুশফিকুর রহিমের ব্যাটিং-সবই উঠে এসেছে তাঁর লেখায়। রুবেল হোসেন সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য, ‘ছেলেটা ঘণ্টায় এ দিন ১৪৫ কিমি. তুলল! তার সঙ্গে রিভার্স সুইং! স্টুয়ার্ট ব্রড কীভাবে বোল্ড হলো দেখেছেন? ১০ বলে ১৬ চাই, দুটো উইকেট তুলতে হবে ওই অবস্থায় ও রকম গতিতে রিভার্স করিয়ে দুটো উইকেট তুলে নেওয়া বোধ হয় একটু কঠিন কাজই!’
বাংলাদেশকে ভয় পাচ্ছে ভারত?
কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের প্রতিপক্ষ হিসেবে কাকে চাইতেন মহেন্দ্র সিং ধোনি? উত্তরটা হয়তো ইংল্যান্ড! অবাক হচ্ছেন? হারতে হারতে তলানিতে ঠেকা ইংলিশদের এ ভঙ্গুর আত্মবিশ্বাসের সুযোগ যেকোনো অধিনায়কই নিতে চাইবেন। ধোনি তার ব্যতিক্রম নন। তবে ভারত অধিনায়ক কী চাইছেন, না জানা গেলেও সুনীল গাভাস্কার তো বলেই দিলেন, বাংলাদেশের চেয়ে ইংল্যান্ডই হতো তাঁদের সহজ প্রতিপক্ষ!
২০০৭ বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে সেই সুখস্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারবে বাংলাদেশ?
অ্যাডিলেডে ইংল্যান্ডকে হারানোর পর ভারতীয় কিংবদন্তি বলেছেন, ‘কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডই ভারতের জন্য সহজ প্রতিপক্ষ হতো।’ ইতিহাস, ঐতিহ্য, ঐশ্বর্য থাকলেও ক্রিকেট-ফুটবলে ইংলিশদের অর্জন সামান্যই। গাভাস্কার তাই ইংল্যান্ডকে দিলেন একটা মোক্ষম খোঁচা, ‘ক্রিকেট, ফুটবল দুটোতেই ইংল্যান্ড একটা ‘‘ওভাররেটেড’’ দল।’
আগেও গাভাস্কারের প্রশংসা পেয়েছেন মুশফিকুর রহিম। এ দফাও পেলেন, ‘বাংলাদেশের এ সাফল্যের অন্যতম কারিগর মুশফিকুর রহিমের ধারাবাহিকতা। অভিষেক থেকে এখন পর্যন্ত তার অবিশ্বাস্য উন্নতি। মূলত তার সহযোগিতায় মাহমুদউল্লাহর ব্যাট থেকে এসেছে শতক।’ বাংলাদেশ সমর্থকদের বরাবরই পছন্দ করেন গাভাস্কার। কদিন আগেও প্রশংসা-বন্যায় ভাসিয়েছিলেন বাংলাদেশি সমর্থকদের। এবারও তা-ই, ‘বাংলাদেশি সমর্থকেরা অসাধারণ। উপমহাদেশের সমর্থকদের আলাদা একটা ধরন আছে। তারা খেলায় উত্তেজনা নিয়ে আসে। বহুদিন ধরে বাংলাদেশি সমর্থকেরা সাফল্যের জন্য অপেক্ষা করছে। চূড়ান্তভাবে এখন দলটা এগিয়েছে।’
আট বছর আগে, ‘ভারতকে ধরে দিবানি’ মন্ত্রে পোর্ট অব স্পেনে গর্জে উঠেছিলেন মাশরাফি বিন মুর্তজা। সেদিন ‘নড়াইল এক্সপ্রেসে’র সামনে রীতিমতো টালমাটাল ছিলেন ভারতীয় ব্যাটসম্যানরা। ৯.৩ ওভারে ৩৮ রানে ৪ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছিলেন মাশরাফি। এ বিশ্বকাপে শেষ আটের যুদ্ধে আবারও বাংলাদেশ-ভারত লড়াই হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। ২০০৭ বিশ্বকাপের স্মৃতি ফিরিয়ে আনতে পারবে মাশরাফির দল?
মানসিকভাবে দারুণ চাঙা বাংলাদেশ অধিনায়ক অবশ্য এখনই ভারতকে নিয়ে ভাবতে চাইছেন না। গতকাল ম্যাচের পর স্টার স্পোর্টসকে বললেন, ‘আমি কেবল একটি স্মৃতিই মনে করতে পারি, ওই ম্যাচে ‘‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’’ হয়েছিলাম। সেটাও অনেক আগের কথা, প্রায় আট বছর তো হবেই। মনে হয় না, ওটা এখন তেমন কোনো সাহায্য করবে। তবে নির্দিষ্ট দিনে যদি আমরা ভালো খেলতে পারি, ভিন্ন কিছুই হবে। তার আগে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে আমাদের ম্যাচ রয়েছে। এ ম্যাচে আমাদের ভালো খেলতে হবে, যেন ভারতের বিপক্ষে দারুণ আত্মবিশ্বাসী হয়ে মাঠে নামতে পারি।’ সূএ: এনডিটিভি

"ভ্যালেন্টাইনস ডে নিষিদ্ধ হলে ভারতে বন্ধ হবে ধর্ষণ" -আইনজীবী এপি সিং

ভ্যালেন্টাইনস ডে পালন নিষিদ্ধ করলে ভারতে ধর্ষণও বন্ধ হবে বলে মন্তব্য করেছেন নির্ভয়া গণধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত বিনয় ও অক্ষয়ের আইনজীবী এপি সিং। তার এই মন্তব্য ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি করেছে ভারতজুড়ে।
বিবিসির তথ্যচিত্র ইন্ডিয়াস ডটারে এই এপি সিংয়ের মন্তব্য ঘিরে এর আগেও সমালোচনা হয়েছে। এরপর আবারও তার এই বক্তব্য ঝড় তুলেছে ভারতের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে।
মেল টুডেতে এপি সিং বলেছেন ''ধর্ষণ আটকাতে গেলে এদেশে আগে নিষিদ্ধ করা উচিত ভ্যালেন্টাইন্ড ডে পালন, নিষিদ্ধ করা উচিৎ 'কিস অফ লভ'-এর মত প্রচার। এ সব কিছুই পশ্চিমা সভ্যতার অন্ধ অনুকরণ। ভারতীয় সংস্কৃতির সঙ্গেও মোটেও এসব খাপ খায় না। ভারতীয় যুবসমাজের মধ্যে ভারতীয় সংস্কৃতির আসলি মূল্যবোধ জাগিয়ে তুলতে ভাইফোঁটা, রাখি বন্ধন, বাবা-মার পুজো সারা দেশ জুড়ে সাড়ম্বরে আরও বেশি করে পালন করা উচিৎ।''
বিবিসি-এর তথ্যচিত্রে নির্ভয়াকে নিয়ে কুরুচিকর মন্তব্য করার জন্য অপরাধী পক্ষের দুই আইনজীবীকে শো কজ নোটিশ ধরিয়েছে বার কাউন্সিল অফ ইন্ডিয়া। তিন সপ্তাহের মধ্যে তাদের জবাবদিহি করার কথা।
ইন্ডিয়াস ডটার-এ এপি সিং মন্তব্য করেছেন ''আমার মেয়ে বা বোন যদি বিয়ের আগেই কোনও সম্পর্কে জড়িয়ে নিজের সম্মান নষ্ট করত, তাহলে আমি তাকে পরিবারের সবার সামন্ব ফার্ম হাউসে নিয়ে গিয়ে গায়ে পেট্রল ঢেলে জ্যান্ত জ্বালিয়ে খুন করতাম।''
এর আগেও অবশ্য সিং মন্তব্য করেছিলেন ধর্ষণের জন্য ছেলেদের থেকে মেয়েরা অনেক বেশি দায়ি।

মিয়ানমারে পুলিশ-শিক্ষার্থী হাতাহাতি

মিয়ানমারের মধ্যাঞ্চলে দাঙ্গা পুলিশের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে। শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তা বাহিনীর বেষ্টনী ভেঙে বিক্ষোভস্থল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারে বিক্ষোভের ডাক দেয়া শিক্ষার্থীদের সেখানে ঘিরে রেখেছে। ঘটনাস্থল থেকে এএফপির এক প্রতিবেদক জানান, দেশটির নয়া শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভস্থল থেকে কাঁটা তারের বেড়া সরিয়ে ফেলে এবং পুলিশের কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ দেশটির প্রধান নগরী ইয়াংগুনে সমাবেশ ভণ্ডুল করে দেয়ার মাত্র কয়েকদিন পর এ ঘটনা ঘটল। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবি জানিয়ে শিক্ষার্থীরা কয়েকমাস ধরে বিক্ষোভ করে এলেও শিক্ষার্থীদের একটি গ্র“প বিক্ষোভ করে ইয়াংগুনে যেতে চাইলে পুলিশ লেতপাদান শহরে তাদের থামিয়ে দেয়।
২ মার্চ থেকে প্রায় ১৫০ শিক্ষার্থীকে পুলিশ সেখানে ঘিরে রেখেছে। বিক্ষোভকারীরা মঙ্গলবার এএফপিকে জানায়, শিক্ষার্থীদের শোভাযাত্রা করার সুযোগ দেয়ার বিষয়ে যে ঐকমত্য হয়েছিল সেখান থেকে তারা সরে আসায় শিক্ষার্থীদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে। শিক্ষার্থী নান্দা সিত অং জানান, ‘ আমাদের যেতে না দিলে তাহলে আমরা এ বাধা ভেঙে ফেলব।’ তিনি জানান, ‘তারা হয় আমাদের গ্রেফতার করবে, না হয় আমাদের যেতে দিতে হবে।’ তিনি আরও জানান, তাদের এই বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে একটি ত্র“টিপূর্ণ শিক্ষাবিল পাস করার পর থেকেই এ আন্দোলন শুরু হয়। পাসকৃত আইন অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ চলে যাবে মন্ত্রিপরিষদের একটি বড় অংশের হাতে। তাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তগ্রহণ-ক্ষমতা খর্ব হবে। যার প্রভাব পড়তে পারে একাডেমিক সিলেবাসসহ খরচসংক্রান্ত নীতিমালায়। আর ছাত্ররা চাইছেন শিক্ষায়তনের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। এএফপি।

যত্রতত্র মূত্র ঠেকাতে নিউটনের ৩য় সূত্র

উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশগুলোতে যত্রতত্র মূত্রত্যাগ একটা সমস্যা বটে। একদিকে পরিবেশের নাভিঃশ্বাস উঠছে, আরেকদিকে বাড়ছে রোগ জীবাণু। সচেতনতা চালানো হলেও কাজে আসছে না কোনো উদ্যোগই। তবে এবার তার সমাধান দেখালো জার্মানি। মূত্রকাণ্ড ঠেকাতে রীতিমতো নিউটনের তৃতীয় সূত্রের শরণাপন্ন হয়েছে দেশটি। হামবুর্গের দেয়ালগুলোতে স্প্রে করা হয়েছে ‘আলট্রা এভার ড্রাই লিকুইড’। এটাকে বলে ‘হাইড্রোফোবিক কোটিং’। এতে করে দেয়ালের উপরিভাগটা কাজ করবে স্প্রিংয়ের মতো। দেয়ালে প্রসাব করলেই নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী ওই প্রস াব ছুটে আসবে ব্যক্তির দিকে। হামবুর্গ শহরের সেন্ট পাওলি জার্মানির বিখ্যাত রেড লাইট অঞ্চলগুলোর একটি। বছরে প্রায় ২ কোটি পর্যটকের আনাগোনা এখানে। যত্রতত্র মূত্রত্যাগ করে পুরো এলাকাটিকে তারা বানিয়ে ফেলেছিল প্রস াবখানা।
ক্ষণে ক্ষণেই নাক ঢাকতে হয় সভ্য পর্যটকদের। সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নিয়েও ঠেকানো যায়নি এ কর্ম। সেজন্যই এলো এ প্রযুক্তি। নতুন এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভালো ফল পাচ্ছে সেন্ট পাওলি প্রশাসন। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, ‘যে ব্যক্তি দেওয়ালে একবার প্রস াব করেছে, দ্বিতীয়বার সে ভুল করেও আর ওই দেয়ালের দিকে যাচ্ছে না। কারণ তা ছিটকে এসে নষ্ট করে দিচ্ছে তার পোশাক।’ হাফিংটন পোস্ট।

ইংরেজ এজেন্ট ছিলেন গান্ধী

ভারতের সুপ্রিমকোর্টের সাবেক বিচারপতি মার্কন্ডেয় কাটজু মহাত্মা গান্ধীকে ব্রিটিশদের এজেন্ট বলে দাবি করেছেন। তার মতে, ভারতের বহু ক্ষতি করেছেন গান্ধী। কাটজুর ব্লগে লেখা এক মন্তব্য উদ্ধৃত করে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের খবরে বলা হয়েছে, ‘আমার মতে মহাত্মা গান্ধী ব্রিটিশদের এজেন্ট ছিলেন, যিনি দেশের বহু ক্ষতি করেছেন।’ নিজের এ দাবির পেছনে তিনটি কারণ দেখিয়েছেন কাটজু। তিনি বলেন, ‘ভারতে চিরকালই ধর্ম, জাতি, বর্ণ, ভাষার বিপুল বৈচিত্র্য রয়েছে। ব্রিটিশরা চিরকালই এদেশে ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসি চালাতে চেয়েছে। ব্রিটিশদের উদ্দেশ্য জেনেও দশকের পর দশক ধরে ইচ্ছাকৃতভাবে ধর্মকে রাজনীতির মধ্যে টেনে এনে গান্ধী আসলে ইংরেজদের পলিসি স্বার্থক করতে চেয়েছিলেন। ১৯১৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে এদেশ ফিরে আসার পর থেকে ১৯৪৮ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত গান্ধী তার প্রতিটি বক্তব্যে প্রতিটি লেখায় হিন্দু ধর্মের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। হিন্দু ধর্মীয় ভাবনা যেমন রামরাজ্য, গোরক্ষা, ব্রহ্মচর্য, বর্ণাশ্রম ইত্যাদিকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন। ‘১৯২১ সালে ইয়ং ইন্ডিয়াতে গান্ধী লিখে ছিলেন, ‘আমি একজন সনাতনী হিন্দু।
আমি বর্ণাশ্রম ধর্মে বিশ্বাস করি। গো মাতাকে রক্ষা করা উচিত বলে আমি মনে করি।’ গান্ধীর যে কোনো জনসভায় চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ‘রঘুপতি রাঘব রাজা রাম’ গাওয়া হতো। গান্ধীর এ কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে কাটজু বলেন, ‘একজন গোঁড়া মুসলিমের মনে এ ধরনের মন্তব্য কী প্রতিক্রিয়া ফেলেছিল সেই সম্পর্কে কি কোনো ধারণা আছে? এ ধরনের মন্তব্য তাকে মুসলিম লীগের মতো ধর্মীয় সংগঠনের দিকেই ঠেলে দিয়েছিল। ইংরেজদের কি এটাই উদ্দেশ্য ছিল না? রাজনীতির সঙ্গে ধর্মকে মিশিয়ে দিয়ে গান্ধী কি ব্রিটিশদের এজেন্ট হিসেবে কাজ করেননি?’ দ্বিতীয় কারণ হিসেবে সাবেক এ বিচারপতি বলেছেন, ‘অনুশীলন সমিতি, যুগান্তরের মতো সংগঠনগুলোর পাশাপাশি সূর্য সেন, রামপ্রসাদ বিসমিল, চন্দ্র শেখর আজাদ, আসফাকুল্লা, ভগৎ সিং, রাজগুরুর মতো বিপ্লবীরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদমুক্ত দেশ গড়ার জন্য নিরলস আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। গান্ধী সাফল্যের সঙ্গে সত্যাগ্রহের নামে সেই স্বাধীনতা সংগ্রামের অভিমুখ অর্থহীন এক দিকে চালিত করেছিলেন। যাতে আখেরে লাভবান হয়েছিল ইংরেজরাই।’ তৃতীয় কারণ হিসেবে কাটজু বলেন, ‘দিনের পর দিন জনমানসে রাজনীতির মোড়কে ধর্মীয় ভাবনা প্রচার করে তিনি (গান্ধী) আসলে ধর্মীয় ভাবনা প্রচার করেছেন। তার বক্তব্য ধর্মের ভিত্তিতে ভারতীয়দের মধ্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করেছিল।

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ-সম্মেলনে উঠে এলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিকে ১১ কংগ্রেস সদস্যের লেখা একটি চিঠি প্রসঙ্গ। একই সঙ্গে ব্লগার ও লেখক অভিজিত রায়ের বিচার প্রসঙ্গে প্রশ্নকর্তা বাংলাদেশে এফবিআইয়ের তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চেয়েছিলেন মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জেন সাকির কাছে। সংবাদ-সম্মেলনে বাংলাদেশ অংশটুকু প্রশ্নোত্তর আকারে এখানে তুলে ধরা হলো:
প্রশ্ন: আমার প্রশ্ন বাংলাদেশ ইস্যুতে। আমি শুনেছি, বাংলাদেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে কংগ্রেসের (মার্কিন) ১১ সদস্য মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরিকে চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু, তা সত্ত্বেও একটি অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশ সরকার বিরোধী দলের সঙ্গে কোন সংলাপে বসার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করছে। আমার দ্বিতীয় প্রশ্নটি গত মাসে হত্যার শিকার অভিজিতের (ব্লগার ও লেখক) বিচারকে কেন্দ্র করে। পুরো বিষয়টি তদন্তে এফবিআই বাংলাদেশ সফর করেছিল। এ ব্যাপারে আপনার কাছে নতুন কোন তথ্য আছে কি?
মুখপাত্র: আমার কাছে নতুন কোন তথ্য নেই। আমি আপনার প্রশ্ন সানন্দে গ্রহণ করছি। আপনি বলছিলেন কর্মকর্তারা পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেরিকে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। আমি দেখবো, আমাদের দলে কেউ আছেন কিনা, যিনি চিঠিটির ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতে পারেন। কিংবা আমাকে আরেকবার বলুন কারা এটি পাঠিয়েছেন।
প্রশ্ন: দুটি প্রশ্ন। প্রথমটি হচ্ছে-
মুখপাত্র: হ্যাঁ, প্রথমটি চিঠির বিষয়ে। চিঠিটি কে পাঠিয়েছেন?
প্রশ্ন: কংগ্রেসের ১১ সদস্য...
মুখপাত্র: ১১ কংগ্রেস সদস্য। আমি দুঃখিত।
প্রশ্ন: ...পররাষ্ট্রমন্ত্রী কেরিকে চিঠি লিখেছিলেন।
মুখপাত্র: ঠিক আছে।
প্রশ্ন: এবং দ্বিতীয় প্রশ্নটি ছিল অভিজিত হত্যার বিচারকে কেন্দ্র করে। বাংলাদেশ সফর (তদন্তের স্বার্থে) করেছে এফবিআই...
মুখপাত্র: নিশ্চয়ই। আমি আপনার প্রশ্নগুলো সাদরে গ্রহণ করলাম এবং আপনাকে জানানোর জন্য এ দুটি বিষয়েই খোঁজ-খবর নেবো।

ধর্ষণ দৃষ্টান্তে নেতৃত্ব দিচ্ছে ভারত -ভারতকন্যা নির্মাতা উডউইনের সাক্ষাৎকার

লেসলি উডউইন
লেসলি উডউইন। একজন ব্রিটিশ প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা। সম্প্রতি ভারতের মেডিকেল ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা নিয়ে ভারতকন্যা নির্মাণ করেছেন। যা ভারত সরকার নিষিদ্ধ করেছে। সোমবার ওই প্রামাণ্যচিত্র নিউইয়র্কসহ বিশ্বজুড়ে মুক্তি পাওয়ার কথা। লন্ডন থেকে দ্য হিন্দুর প্রতিবেদক পার্বতী মেননকে এক সাক্ষাৎকারে সাম্প্রতিক বিতর্ক নিয়ে কথা বলেছেন।
আপনার প্রামাণ্যচিত্র ‘ইন্ডিয়াস ডটার’ ভারতে নিষিদ্ধ হয়েছে। অভিযোগ, আপনি একজন অভিযুক্ত ধর্ষকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। ভারতের দুর্নাম প্রচার করছেন। এ ব্যাপারে আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
ভারতকন্যা নিষিদ্ধ করার ব্যাপারটা আমার বোধগম্য নয়। আমি তো তা-ই প্রকাশ করেছি, যা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রায়ই বলেন। তিনি লিঙ্গসাম্য, নারীশিক্ষার কথা বলেন। ভারতের নৈতিক কাঁটা পুনর্নির্ণয়ের কথা বলেন। আমি সেগুলো অর্জনের কথাই বলেছি। তার উপায় খুঁজেছি। আমি বিশ্বকে জানাতে চেয়েছি, ‘ধর্ষণ দৃষ্টান্তে ভারত নেতৃত্ব দিচ্ছে। এখন আপনারাও ভারতের নেতৃত্ব অনুসরণ করুন। ধর্ষণের বিরুদ্ধে ভারতীয়দের অবস্থানও একটি নতুন দৃষ্টান্ত।’ এটাই আমার প্রামাণ্যচিত্রের মূলকথা।
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে আপনি সরাসরি মোদির কাছে আর্জি জানিয়েছেন। তার কাছে কোনো আশ্বাস পেলেন?
আমরা এখনও এমন কোনো আশ্বাস পাইনি। সরকার বিশ্বকে বলতে চায়, এটা ভারতের দিকে আঙুল তোলা। গণতন্ত্র ও সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এই প্রামাণ্যচিত্রের ফলে ভারত যদি তার মানসিকতার পরিবর্তন করে, তবেই মাথা উঁচু করে বলতে পারে আমরা নারী অধিকার ও লিঙ্গসাম্যের জন্য তারা কাজ করছে, যা একটা বৈশ্বিক ইস্যু। আর তারা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করলে এটাই প্রমাণ হবে, ভারত লিঙ্গবৈষম্য রোধে আন্তরিক নয়।
লিঙ্গবৈষম্য যেখানে বৈশ্বিক ইস্যু, সেখানে ভারতকে কেন হাইলাইট করছেন?
এটা শুধু একটা ভয়ংকর ধরনের মামুলি ধর্ষণ নয়, যার জন্য আমি ছুটে এসেছি। আমার মনে হয়েছে, আরে! ভারতের এসব মানুষ তো আমার অধিকার রক্ষার কথা বলছে। আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। কারণ, আমি নিজেই ধর্ষণের শিকার। এটা আজ আশ্চর্য নয় যে, বিশ্বব্যাপী এক-পঞ্চমাংশ নারী ধর্ষিত হচ্ছে। আমি সেই ২০ শতাংশের একজন।
প্রামাণ্যচিত্র তৈরিতে আইন লংঘনের অভিযোগ উঠেছে
দেখুন, আমি কোনো আনাড়ি পরিচালক নই। ২০ বছর ধরে অধ্যবসায়ের সঙ্গে কাজ করছি। নিয়ম মতো সব অনুমতি নিয়েছি ও আইন মেনেছি। আইনজীবীদের পরামর্শ নিয়েছি। দু’জন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের সঙ্গেও কথা বলেছি।
সরকার থেকে কোনো হুমকি পেয়েছেন?
গত মঙ্গলবার দিল্লিতে একজন সিনিয়র সাংবাদিক ছুটে এসে আমাকে বলেছিলেন, আপনার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের হয়েছে। আমি তখন আমার পরিচিত ৭ জন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলি। তারা সবাই আমাকে দ্রুত ভারত ছেড়ে ইংল্যান্ডে ফেরার পরামর্শ দেন। নয়তো আমার আর ফেরা নাও হতে পারে।
অভিযোগ আছে, আপনি বাণিজ্যিক স্বার্থে এটি বানিয়েছেন। মুকেশ সিংকে টাকা দিয়েছেন। তার অজ্ঞাতে ভিডিও করেছেন...
এই অভিযোগ আমি কখনোই মানব না। যাদের সাক্ষাৎকার নিয়েছি, তাদের কাউকে টাকা দিইনি। আমি সম্পূর্ণ নিজে টাকা জোগাড় করে এই কাজ করেছি। শেষ দিকে বিবিসি ৯০ হাজার পাউন্ড দিয়েছে। মোট ব্যয় হয়েছে ২ লাখ ১০ হাজার পাউন্ড।
নির্ভয়ার পিতামাতা আপনার পক্ষে রয়েছেন?
অবশ্যই। দু’দিন আগেও তারা আমাকে মেসেজ পাঠিয়েছে, সত্য পথে হাঁটলে অনেক বাধা। আমি এই মেসেজ পড়ে অনেক কেঁদেছি। নির্ভয়ার বাবা বলেছে, আমি লজ্জিত নই। এ লজ্জা ধর্ষকের। বিশ্বব্যাপী আপনি নির্ভয়ার আসল নাম প্রচার করবেন।

সরকার নেই সরকারে by ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী

কখনো কখনো বুঝতে খুব অসুবিধা হয় সরকার আসলে কে চালায়? মন্ত্রণালয়গুলো চলে কার নির্দেশে? সেগুলো কি সংশ্লিষ্ট বিভাগের মন্ত্রী চালান নাকি মন্ত্রণালয় আমার, কাজকর্ম চলে অপরের নির্র্দেশে? কোনো কিছুতেই কোনো খেই পাওয়া যাচ্ছে না। মন্ত্রীদের মধ্যে নিজ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পালন করেন দুই-একজন। বাকিদের কাজকর্মে বুঝতে আসলে কষ্ট হয় যে, কোন মন্ত্রণালয় কে চালাচ্ছেন? অর্থাৎ এক মহা তালগোলে আছে শেখ হাসিনার বর্তমান মেয়াদের সরকার। আর তিনিও যে কখন কার মাধ্যমে প্রভাবিত হচ্ছেন সেটিও দিশ করা সম্ভব হয় না। মন্ত্রণালয়ের মধ্যেই কেউ কেউ আওয়ামী লীগের হাইব্রিডদের কঠোর সমালোচনা করছেন। টিটকারি দিচ্ছেন। আওয়ামী লীগের যারা অরিজিনাল, তারা এক এগারোর পর সত্য বলতে গিয়ে ঘোর বিপাকে পড়েছিলেন। সেখান থেকে পাঁচ বছর পর খাবি খেতে খেতে উঠে দাঁড়ালেও এখন একেবারেই ‘জো হুকুমে’ পৌঁছে গেছেন। ফলে এদের মনের ভেতরে ভিন্নমত থাকলেও প্রকাশ করতে পারছেন না। এরাও যেন গড্ডলিকা প্রবাহে ভেসে ‘দে গরুর গা ধুইয়ে’ ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছেন। শেখ হাসিনার কাছে যারা মন্ত্রী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়, তারা কেউ আওয়ামী লীগার নন। আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারী। এই অনুপ্রবেশকারীরাই ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে ভুল পরামর্শ দিয়ে গণতন্ত্র হত্যা করিয়েছিল। গঠন করিয়েছিল একদলীয় বাকশাল, যা কোনো অবস্থাতেই এ দেশের মানুষের আকাক্সক্ষার সাথে সম্পৃক্ত ছিল না।
এমনকি সে সময় যারা শেখ মুজিবুর রহমানকে উৎখাতের জন্য গণবাহিনী গঠন করে আওয়ামী এমপি নেতাদের খুন করতে কসুর করেননি, যারা শেখ মুজিবুর রহমানের চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বাজাতে চেয়েছিলেন তারা এখন সরকারে খুব প্রভাবশালী, পোপের চেয়েও বড় খ্রিষ্টান। তারাই শেখ হাসিনার কাছে সব চেয়ে বিশ্বস্ত। প্রথম দিকে তোফায়েল আহমেদরা আফসোস করেছেন এই বলে যে, এত বছর আওয়ামী লীগ করার পর ছাত্র ইউনিয়নের মতিয়া-লেনিনদের অধীনে রাজনীতি করতে হবে! কিন্তু উপায় নেই। মন্ত্রিত্ব রাখতে শুধু মতিয়া-লেনিনের অধীনে নয়, শেখ মুজিবুর রহমানকে উৎখাতের জন্য যুদ্ধ ঘোষণাকারীদের অধীনেও তাদের রাজনীতি করতে হচ্ছে।
রাজনীতির বোধ করি এটাই নিয়ম। এখানে স্থায়ী কোনো ‘বেড-পার্টনার’ নেই। ফলে শেখ হাসিনাকে কখনো জামায়াতের সাথে যেতে হয়, কখনো বিভ্রান্তকারী সিপিবির সাথে যেতে হয়। কখনো বা শেখ মুজিবুর রহমানের ঘাতকদের সাথে নিয়েও তাকে সরকার পরিচালনা করতে হয়। কে জানে, রাজনীতির অন্ধি-সন্ধি সম্ভবত এ রকমই। কিন্তু এতে নিজস্ব রাজনীতির ওপর সুদূরপ্রসারী কী প্রভাব পড়ে তা-ও ভেবে দেখার বিষয়।
বর্তমান সরকারের অনেক পদক্ষেপই হঠকারী। কিন্তু সে পদক্ষেপগুলো কে যে নিচ্ছে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। ছোটখাটো অনেক উদাহরণ দেয়া সম্ভব। ধরা যাক, গত ৩ জানুয়ারি থেকে সারা দেশে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তার সার সংক্ষেপ কী? প্রথম দিকে শুরু হলো সংবিধান অনুযায়ী সব ব্যবস্থা। কথাটা মন্দ নয়। কিন্তু সেই সংবিধান কে সংশোধন করে একেবারে জন-আকাক্সক্ষার বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দিলো, কেন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী করতে হলো, সেটিও তলিয়ে দেখা দরকার। পঞ্চদশ সংশোধনীর পেছনে কাজ করেছে জন-আকাক্সক্ষার বিপরীতে দাঁড়িয়ে চিরদিনের জন্য ক্ষমতায় থাকার লিপ্সা। জনগণকে সরকারের এত ভয় যে, তারা আদালতের মাধ্যমে আলোচিত-সমালোচিত প্রধান বিচারপতিকে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করিয়ে দিলেন। যদিও ওই প্রধান বিচারপতি এ কথা উল্লেখ করেছিলেন যে, পরবর্তী অন্তত দুইটি নির্বাচন করা যেতে পারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার অধীনে।
কিন্তু বাতিলের রায়টি শেখ হাসিনার সরকারের কাছে বড় বেশি প্রিয় হয়ে উঠেছিল। পরবর্তী দুইটি নির্বাচন তারা আর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অধীনে করতে চাননি। এই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি শেখ হাসিনা সরকার নির্বাচনের নামে যে প্রহসন করলেন, তাতে দেশবাসী শুধু নয়, সারা পৃথিবী হেসেছে। এখনো হাসছে। মতিয়া-মেনন-ইনু-শাজাহান-লেনিনরা এখন ক্ষমতার মালিক-মোখতার। অথচ এরা সবাই উচ্ছিষ্টভোগী। আওয়ামী লীগকে এত বড় রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে দাঁড় করানোর ক্ষেত্রে এদের কোনো অবদানই নেই বরং এরা উইপোকার মতো ভেতর থেকে আওয়ামী লীগকে ক্রমেই আরো অনেক বেশি জনবিচ্ছিন্ন করে ফেলছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেটি টের পান কি না বলা মুশকিল। কারণ এখন মনে হচ্ছে তিনি যা বলছেন, সবাই হুক্কাহুয়া রবে সেই কথা বলছে এমন নয়। অনেক সময় মনে হয়, আওয়ামী লীগে আসা ঘুণপোকারা যা বলছে, তিনি তারই প্রতিধ্বনি করছেন। এটি যে ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগের জন্য অস্তিত্বের সঙ্কট সৃষ্টি করবে সেটি শেখ হাসিনা উপলব্ধি করেন কি না বলতে পারি না। কিংবা এমনো হতে পারে যে, তারপর তার আওয়ামী লীগ থাকল কি থাকল না সেটি বোধ করি তিনি পরোয়াও করছেন না।
সরকার যে সরকারে নেই, তার অসংখ্য উদাহরণ আছে। দুই একটি উল্লেখ করা যেতে পারে। গত ৩ জানুয়ারি রাত থেকে বিশ দলীয় জোট নেত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে তার কার্যালয়ে গেটে তালা দিয়ে, ইট-বালুর ট্রাক এনে সরকার অবরুদ্ধ করে ফেলে যেন তিনি কার্যালয় থেকে বেরই না হতে পারেন। ৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ উপলক্ষে নিজ কার্যালয় থেকে নয়াপল্টনে আসার উদ্যোগ নিলে তাকে কার্যালয় থেকে বের হতে দেয়নি পুলিশ। উল্টো তার ওপর নিষিদ্ধ ঘোষিত বিষাক্ত পেপার ¯েপ্র করেছে পুলিশ। এতে তিনি এবং সেখানে উপস্থিত বিএনপি নেতানেত্রীরা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর সরকার যে অবরোধ জারি করেছিল তিনি তার ধারাবাহিকতায় সেই অবরোধ কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন এবং দেশবাসী এই কর্মসূচিতে বিগত দুই মাস ধরে অব্যাহত সমর্থন জুগিয়ে আসছে।
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে এমনকি পাকিস্তান পর্বের রাজনৈতিক ইতিহাসেও কখনোই এমন ঘটনা ঘটেনি যে, দেশের প্রধান বিরোধী দলের নেত্রীকে এইভাবে হেনস্তা করা হয়। শেখ মুজিব জেলে ছিলেন বটে, কিন্তু যখন তিনি সুনির্দিষ্ট দাবিতে অনশন শুরু করেন তখন সরকার তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। এইটুকু রাজনীতিক ভব্যতা এবং শিষ্টাচার আইয়ূব খান সরকারেরও ছিল। শেখ হাসিনা সরকারে এই ভব্যতা অন্তর্হিত।
৫ জানুয়ারি যখন বেগম খালেদা জিয়াকে তার কার্যালয় থেকে বের হতে দেয়া হলো না, তখন তিনি পরবর্তী কর্মসূচি হিসেবে দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেন। সে অবরোধ চলছে। এই সমস্যাকে রাজনৈতিকভাবে সমাধানের উদ্যোগ না নিয়ে সরকার বলদর্পী মনোভাব নিয়ে চলতে শুরু করল। নানান ইতর কটূক্তি তার বিরুদ্ধে সরকারের তরফ থেকে চলতে থাকল। অরিজিনাল আওয়ামী লীগাররা যত না বললেন, তার চেয়ে অধিক বললেন হাইব্রিডেরা। এলাকায় যাদের কল্কি জোটে না এবং এসব হাইব্রিড এমন নির্লজ্জ দুর্নীতি করেছেন বর্তমান দুর্নীতিবান্ধব সরকার পর্যন্ত তাদের আর মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দেয়নি। ঠাঁই পাওয়ার আশায় তাদের যে লম্ফ-ঝম্ফ সেটা দেখার মতো বিষয়।
বেগম খালেদা জিয়া একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের অবরোধের ডাক দেয়ায় সে অবরোধ চলতে থাকল। বিএনপিসহ বিশ দলীয় জোটের সব শীর্ষ নেতা কারাগারে। ওয়ার্ডপর্যায়ের কোনো নেতাও বাইরে নেই। স্থানীয় সরকারে যারা বিশ দলীয় জোট থেকে জিতেছিলেন, তারাও কারাগারে এবং তাদের নির্বাচন বাতিলের যাবতীয় আয়োজন সরকার করছে। সরকার যেমন অনির্বাচিত তেমনি অনির্বাচিতদের দিয়ে জনগণের রায় ভণ্ডুল করে স্থানীয় সরকার পরিচালনা করতে চাইছে। কার বুদ্ধিতে, কার চিন্তায় বলতে পারি না।
এর মধ্যে কতকগুল তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটে গেল। তার একটি হলো গত ৩১ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সংযোগ, ডিস লাইন, ইন্টারনেট ব্যবস্থা সব কিছু ‘থানার নির্দেশে’ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হলো। বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হলো তার অফিসের টিঅ্যান্ডটি সংযোগও। অর্থাৎ তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, দুইবারের বিরোধীদলীয় নেত্রীকে বিনা কারণে নিজ কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে সারা পৃথিবী থেকে, দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার চেষ্টা করা হলো। কিন্তু আশ্চর্য ঘটনা এই যে, কেউই এর দায়িত্ব নিতে চাইল না। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বললেন, আমি তো জানি না। হয়তো বিদ্যুৎ বিল বাকি আছে, সে জন্য লাইন কেটে দিয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মীরা বললেন, থানা থেকে আমাদের সংযোগটি বিচ্ছিন্ন করতে বলা হয়েছে। তাই আমরা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছি। থানা বলল, তারা এসব বিষয়ে কিছুই জানে না। হাইব্রিড জাসদ এবং শেখ হাসিনা সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতা নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বললেন, বিদ্যুৎ বিভাগের শ্রমিক-কর্মচারীরা বেগম খালেদা জিয়ার ওপর ঘৃণাবশত ওই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। অর্থাৎ এক মগের মুল্লুক বাংলাদেশে চালু হয়েছে। এখানে কার নির্দেশে কখন যে কী হয় তো কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারে না। যার যখন যেখানে যা খুশি তাই করতে পারে। কার মন্ত্রণালয় কে চালায় সেটাও নিশ্চিত করে বলা দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর আগে বিজিবি-পুলিশ-র‌্যাব বাহিনীর প্রধানেরা যে ভাষায় কথা বলছিলেন তাতে মনে হচ্ছিল ক্ষমতা বোধ করি তারাই দখল করে নিয়েছেন। কবে নির্বাচন হবে, বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে না হবে, এর সব কিছুই বলতে শুরু করেছিলেন এসব বাহিনী প্রধান। এরপর পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে শেখ ফজলুল করিম সেলিম তো বলেই বসলেন যে, যেসব কূটনীতিক বেগম খালেদা জিয়ার সাথে কথা বলতে গেছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। এখন সারা দুনিয়া চিৎকার করে বলছে, সংলাপে বসতে হবে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধ করতে হবে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা চলবে না। ফলে বিষয়টিকে একেবারে এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না। এখন দেখি সরকার বোধ করি খানিকটা খামোশই।
আওয়ামী নেতাদের মুখে শুনছি আওয়ামী লীগ নির্বাচনে ভয় পায় না। সে কারণেই তারা নাকি সিটি করপোরেশন নির্বাচন দিচ্ছে। এর চেয়ে মজার ব্যাপার আর কিছুই হয় না। সিটি করপোরেশন নির্বাচন কোন কবুরে অবস্থা আওয়ামী লীগ দিচ্ছে, তা কারো কাছে অজানা নেই। বিরোধী দল থেকে মেয়র তো পরের কথা, এমনকি একজন ওয়ার্ড কমিশনার পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কেউ হাজির নেই। এই লেভেলের লোকদের বিরুদ্ধে শত শত মামলা দিয়ে হয় তাদের গ্রেফতার করে জেলে পোরা হয়েছে অথবা দৌড়ের ওপর রাখা হয়েছে। নির্বাচন হয়তো হবে, কিন্তু বিরোধী দল থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কে করবে তার কোনো হদিস নেই।
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন ডাকসুর সাবেক ছাত্রনেতা, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না। তিনি এখন রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলায় জেলে আছেন। তা ছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিরোধী দল থেকে যারা জিতেছিলেন সরকার তাদের ধারাবাহিকভাবে আটক করে কারাগারে নিক্ষেপ করছে। তাদের জায়গায় নিজ দলীয় লোকদের বসিয়ে দিচ্ছে। এমনই এক নিকৃষ্ট গণতন্ত্রের নজির বাংলাদেশে স্থাপিত হতে চলেছে। এখানে যে কিছুতেই একদলীয় সরকার স্থাপন করা যাবে না, সে সত্য যদি সরকার উপলব্ধি করত তাহলে দেশ জাতির যেমন কল্যাণ হতো, তেমনি তারা নিজেরাও জনতার রুদ্ররোষ থেকে রক্ষা পেতে পারত।
সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com

পাক ক্রিকেটারের টুইট- রুবেলকে ক্রিমিনাল বলায় প্রতিবাদ হ্যাপির

ক্রিকেটার রুবেল হোসেনকে নিয়ে টুইটারে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন পাকিস্তানি ক্রিকেটার নাসির জামশেদ। তিনি রুবেলকে ফুল টাইম ক্রিমিনাল, আর পার্ট টাইম ক্রিকেটার হিসেবে আখ্যাই টুইট করেছেন। পাশাপাশি রুবেলের বিরুদ্ধে ধর্ষণ মামলা চলছে বলেও মন্তব্য করে এই পাকিস্তানি ওপেনার। নাসির জামশেদের এমন মন্তব্যে বেজায় চটেছেন রুবেলের সাবেক প্রেমিকা চিত্র নায়িকা নাজনিন আক্তার হ্যাপি। ‘বাংলাদেশ ও রুবেলকে নিয়ে পাকিস্তানি ওই ক্রিকেটারের কথা বলার কোনও অধিকার নেই। আর রুবেল বিষয়ে আমি যেহেতু জড়িত, তাই বলব এটা একদমই ভুল বলেন- তিনি।’ হ্যাপি তার মামলা ও রুবেল প্রসঙ্গে বলেন, ‘আইনত শারীরিক সম্পর্ক তৈরির পরে কেউ যদি প্রতিশ্রুতি না রাখে, তাহলে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হয়। আমার মামলায় তাই ধর্ষণ বিষয়টি এসেছে। এর অর্থ এই নয়, রুবেল ধর্ষণ করে বেড়ায়। কিন্তু পাকিস্তানি ওই ক্রিকেটার কথাটা বাজেভাবে বলেছেন।’ হ্যাপি জানিয়েছেন, মামলাটি তিনি চালিয়ে নিতে আর আগ্রহী নন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রুবেল আমার সঙ্গে প্রতারণা করেছে, এটা সত্য। একজন নারী হিসেবে তাই আদালত পর্যন্ত গিয়েছি। আমি এখনও তাকে ভালোবাসি। তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর মামলাটি পরিচালনা করবো না। আর ইচ্ছে করলেও এ ধরনের মামলা তুলে নেয়া যায় না। তবে আমার অনাগ্রহের কারণে একটা সময় এটা বন্ধ হয়ে যাবে।’ উল্লেখ্য হ্যাপির মতো হ্যাপির আইনজীবী কুমার দেবুল দেও মামলাটা পরিচালনা করতে আগ্রহী নন। এদিকে ক্রিকেটার রুবেলের বিরুদ্ধে ‘প্রতারণার অভিযোগ আনা হ্যাপি বলেছিলেন রুবেল রাজি হলেও তাকে বিয়ে করবেন না তিনি। এখন বলছেন, রুবেল যদি সত্যি আমার জীবনে আবার ফিরে আসে, তবে তাকে বিয়ে করবো। আমি তার জন্য সারা জীবন অপেক্ষা করতে রাজি। আমি যদি বিয়ে করি তবে শুধু রুবেলকেই বিয়ে করবো, অন্য কাউকে নয়।’ পরশু বিশ্বকাপ ক্রিকেটে রুবেলের বিধ্বংসী বোলিংয়ে ইংল্যান্ডকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনাল নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। ওই ম্যাচে চার উইকেট নিয়েছিলেন রুবেল। এটা দেখেই নাসির জামশেদ টুইটারে রুবেলকে ‘ফুল টাইম ক্রিমিনাল’ বলে গালি দেন। জামশেদ পোস্টে লিখেছেন, ‘রুবেল হোসেনের বোলিংয়ে ইংল্যান্ড ধ্বংস হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একটি ধর্ষণ মামলা চলমান। এই ছেলে একজন ফুল টাইম ক্রিমিনাল, পার্ট টাইম ক্রিকেটার।’ আরেকটি টুইটে তিনি লিখেন,, ‘বাংলাদেশীরা এমনভাবে উল্লাস করছে ঠিক যেভাবে তারা ১৯৭১ সালে যুদ্ধে জিতার উল্লাস করেছিল। কিন্তু এবার তারা ভারতের সহায়তা ছাড়াই জয় পেয়েছে।’

দেশ থাকতেও পরিচয়হীন যে শিশুরা

লেবাননের একটি শরণার্থী শিবিরে খেলায় মেতেছে সিরীয় শিশুরা। ছবি: এএফপি
দেশ আছে, তবু তারা দেশে নেই। জন্ম-পরিচয় আছে, কিন্তু পরিচয় দেওয়ার মতো সনদ নেই। এমন এক পরিস্থিতিতে বিদেশের মাটিতে জন্ম নিচ্ছে সিরিয়ার অনেক শিশু। প্রতিবেশী কোনো দেশের শরণার্থী শিবিরে পরের দয়ায় বড় হচ্ছে তারা। এমন এক শিশু ইসরা। লেবাননের একটি হাসপাতালে তার জন্ম। কিন্তু শরণার্থী বলে আইনি পরিচয় নেই। এ নিয়ে চিন্তিত তার মা ইয়াসমিন খালাফ। বার্তা সংস্থা এএফপির খবরে জানানো হয়, গোলাপি কম্বলে জড়ানো ইসরার মতো প্রায় ১০ হাজার সিরিয়ার শরণার্থী শিশু লেবাননে জন্মগ্রহণ করেছে। জন্মনিবন্ধনের নানা প্রতিবন্ধকতায় তারা রাষ্ট্রহীন হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংগঠন ইউএনএইচসিআরের তথ্যমতে, সিরিয়ায় ২০১১ সালের মার্চে গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ৪২ হাজার শরণার্থী শিশুর মধ্যে ৭০ শতাংশের জন্ম লেবাননে। তাদের কোনো জন্মসনদ নেই।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী শরণার্থী কর্মী বলেন, বাস্তবিক অর্থে ওই শিশুদের কোনো অস্তিত্ব নেই। প্রামাণিক দলিল ছাড়া ওই শিশুরা হাসপাতালে যেতে পারবে না এবং পড়াশোনা করতে পারবে না। তাদের কোনো ধরনের অধিকার থাকবে না।
সিরিয়ার শরণার্থীরা বৈরুতের দূতাবাসে তাঁদের নবজাতকদের নাম নিবন্ধন করতে পারেন। কিন্তু অনেকে সেখানে যেতে ভয় পাচ্ছেন। কারণ তাঁরা বিরোধী এলাকা সামরিক বাহিনী থেকে কিংবা গ্রেপ্তার আতঙ্কে পালিয়ে এসেছেন। শরণার্থীরা লেবানন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে শিশুদের নাম নিবন্ধন করতে পারেন। কিন্তু যুদ্ধচলাকালে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের জন্য সে পদ্ধতিটি অনেক জটিল।
শিশুদের রাষ্ট্রহীন হওয়ার ওপর জোর দিয়ে অ্যানা পোলার্ড নামের ইউএনএইচসিআরের এক কর্মকর্তা জানান, সব পদ্ধতিতেই বাধা রয়েছে। আমলাতান্ত্রিক বিভিন্ন পদ্ধতিতে কাজ করতে হলে এ ব্যাপারে জন্মসনদ লাগবে। চিকিৎসকদের কাছ থেকে সেটি সংগ্রহ করতে হবে। তাদের অবশ্যই পরিচয় নিশ্চিতকরণ পরিচয়পত্র, তাঁদের বিবাহের সনদ ও আবাসিক অবস্থার কাগজপত্র থাকতে হবে।
এ কারণে পদ্ধতিটি আরও জটিল হয়েছে। কিন্তু পালিয়ে আসার সময় অনেকেই বিয়ের কাগজপত্র আনতে পারেননি। তাঁদের অনেকে অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করেছেন। অনেকের আবার আবাসনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে।
এদিকে চার বছরে গড়িয়েছে সিরিয়ার যুদ্ধ। অনেক সিরীয় শরণার্থী লেবাননের লোকজনের সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছে।
পোলার্ড বলেন, ‘লেবাননে একটি বিয়েনিবন্ধন জন্মনিবন্ধনের চেয়েও কঠিন। অনেক শরণার্থী ও সন্তানদের জন্য তাঁরা কোনো নিবন্ধন সংগ্রহ করতে পারেননি।
অন্যদিকে শিশু জন্মের এক বছরের মধ্যে জন্মসনদ সংগ্রহ করতে না পারলে কেবল আদালতই জন্মসনদ দিতে পারবেন। যে পদ্ধতি আরও সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল।
জামাল হালাবির ছেলে আইহাম গত বছর জন্মগ্রহণ করে। সে-ই জানে জন্মসনদ সংগ্রহ করতে তাঁকে কী ভোগান্তিটাই পোহাতে হয়েছে। হালাবি সিরিয়ার লাটাকিয়া প্রদেশ থেকে ২০১৩ সালে বাধ্যতামূলক সেনাদলে থেকে বাঁচতে স্ত্রী ও তিন মাসের সন্তান আহমদকে নিয়ে লেবাননে পালিয়ে আসেন।
কিন্তু ২০১৪ সালে যখন তাঁর দ্বিতীয় ছেলে আইহাম জন্ম নেয়। আইহামের জন্মসনদ সংগ্রহ করতে গেলে সিরিয়া দূতাবাস সামরিক বাহিনীতে চাকরি করায় কোনো প্রশ্ন করেনি। এরপর আবাসিক বৈধতার কাগজের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় তিনি আইহামের জন্মনিবন্ধন করতে পারেননি। আট মাস পরে মেয়াদ বাড়ানোর পরই কেবল তিনি সন্তানের জন্মনিবন্ধন সনদ সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি যেকোনোভাবে এটি করতে চেয়েছি। ওর একটি পরিচয় থাকা দরকার‍। ও আমার সন্তান। আমি দেখাতে চাই আমার থেকেই ও এসেছে। ওর নার্সারি ও বিদ্যালয়ে যাওয়া নিশ্চিত করতে চেয়েছি।’ শিশুদের জন্মনিবন্ধনের প্রতি উৎসাহিত করতে ইউএনএইচসিআর ও তাদের মিত্ররা অভিভাবকদের উৎসাহিত করছে। একই সঙ্গে আশ্রয় দেওয়া দেশকে এ পদ্ধতিটি সহজ করার আহ্বান জানিয়েছে।
কর্তৃপক্ষ স্বীকার করেছে প্রায় ১১ লাখ সিরীয় নাগরিক লেবাননে আশ্রয় নিয়েছেন। ভয়ানক পরিস্থিতির মধ্যে তাঁরা বসবাস করছেন। শিশুদের জন্মনিবন্ধন তাঁদের কাছে গুরুত্ব পাওয়ার মতো ব্যাপার নয়।
এক শরণার্থী কর্মী জানান, কেউ কেউ আবার সিরিয়ায় শিশুদের জন্মনিবন্ধন করতে সীমান্তে দালাল ধরে টাকা দিচ্ছেন। কিন্তু এটি একটি বড় সমস্যা। কারণ শিশুরা সিরিয়ায় জন্মগ্রহণ করেনি।
যখন তাঁরা সীমান্তে আসেন, সিরিয়ায় জন্ম নেওয়া নিবন্ধিত একটি শিশু কীভাবে লেবাননে পৌঁছতে পারে, তা লেবাননের সীমান্ত কর্তৃপক্ষ তাঁদের কাছে জানতে চান। এসব কারণে সঠিক কাগজ সংগ্রহ কষ্টসাধ্য বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
হাসাকেহ প্রদেশের ইউসেফ সালাহের মেয়ে মিলার জন্মের পর থেকেই তার জন্মনিবন্ধনের পদ্ধতি শুরু করেন তিনি। তিনি বলেন, আমরা যখন সিরিয়ার বাড়িতে ফিরব, তখন কাগজপত্র ছাড়া সে সীমান্ত পার হতে পারবে না। জন্ম-সংক্রান্ত কাগজে স্বাক্ষর করতে চিকিৎসক ১০ হাজার লেবানিজ পাউন্ড দাবি করেছেন বলে জানান ইউসেফ। তিনি বলেন, ‘আমার কাছে টাকা ছিল না। বাসে যাওয়ার মতো টাকা না থাকায় সমস্ত পথ হেঁটেই আমি হাসপাতালে গেছি।’
অবশেষে চিকিৎসক নমনীয় হতে পারেন। মিলার কাগজপত্রের কাজ এগিয়ে চলছে। কিন্তু এত কিছুর পরও শেষ পর্যন্ত কর্তৃপক্ষ জন্মনিবন্ধন অনুমোদন করবে কি না, এর নিশ্চয়তা নেই।

স্বামী হুমায়ুন প্রথম শ্রেণির বন্দীর মর্যাদা পাচ্ছেন by রোজিনা ইসলাম

হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতালের শিক্ষানবিশ চিকিৎসক শামারুখ মাহজাবিন হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি ও তাঁর স্বামী হুমায়ুন সুলতান সাদাবকে প্রথম শ্রেণির বন্দীর মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে।
আসামি হুমায়ুন উচ্চশিক্ষিত, তাঁর মা-বাবা সমাজে প্রতিষ্ঠিত এবং উন্নত পারিবারিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত—এসব বিবেচনায় নিয়ে তাঁকে প্রথম শ্রেণির বন্দীর মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে এ-সংক্রান্ত আবেদনে অনুমোদন দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রসচিব। হুমায়ুন সুলতান যশোর-৫ আসনের সরকারদলীয় সাবেক সাংসদ খান টিপু সুলতানের ছেলে।
এদিকে গত সোমবার চিকিৎসক শামারুখ মাহজাবিন হত্যা মামলায় তাঁর স্বামী হুমায়ুন সুলতানের জামিন মঞ্জুর করে দেওয়া আদেশ স্থগিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। রাষ্ট্রপক্ষকে ১ এপ্রিলের মধ্যে নিয়মিত লিভ টু আপিল করতে বলা হয়েছে।
গত ১৩ নভেম্বর খান টিপু সুলতানের ধানমন্ডির বাসায় চিকিৎসক শামারুখ মাহজাবিনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়। ওই দিন রাতে শামারুখের বাবা প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম বাদী হয়ে খান টিপু সুলতান, তাঁর স্ত্রী অধ্যাপক জেসমিন আরা ও তাঁদের ছেলে হুমায়ুন সুলতানকে আসামি করে থানায় হত্যা মামলা করেন।
মামলায় বলা হয়, পরস্পর যোগসাজশে পরিকল্পিতভাবে শামারুখকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া হুমায়ুন সুলতান কারাগারে আছেন। আর খান টিপু ও তাঁর স্ত্রী আগাম জামিনে আছেন। শামারুখ ২০১৩ সালে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন।
হুমায়ুন সুলতানকে প্রথম শ্রেণির বন্দীর মর্যাদা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মোজাম্মেল হক খান প্রথম আলোকে জানান, প্রথম শ্রেণির মর্যাদা চেয়ে যে কারও আবেদন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে জেলকোড অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলা হয়ে থাকে। তাঁর সামাজিক অবস্থা বিবেচনা ও জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় তাঁকে এই মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে। তিনি দীর্ঘদিন হাজতে আছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এ-সংক্রান্ত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সাবেক সাংসদ টিপু সুলতানের ছেলে হুমায়ুন স্ত্রীর মৃত্যুর কারণে গ্রেপ্তার হয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে সাধারণ বন্দী হিসেবে অন্তরীণ রয়েছেন। তিনি উন্নত পারিবারিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত থাকায় কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। তিনি কখনো কোনো ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত ছিলেন না। তিনি উচ্চশিক্ষিত, নিয়মিত আয়কর দেন, মা-বাবা উচ্চশিক্ষিত সমাজে প্রতিষ্ঠিত। উন্নত পারিবারিক জীবনে অভ্যস্ত বলে তাঁকে কারাগারে প্রথম শ্রেণির হাজতির মর্যাদা দেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রসচিব বরাবর দুবার আবেদন করা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তে তীব্র ক্ষোভ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছে শামারুখের পরিবার। তাঁর বাবা প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘কীভাবে তাঁকে প্রথম শ্রেণির বন্দীর মর্যাদা দেওয়া হচ্ছে। সরকার কীভাবে এ বিবেচনা করল! শুধু সাবেক সাংসদের সন্তান—এই বিবেচনা করে এই মর্যাদা দেওয়া হলে, তা অন্যায় হবে।’ তিনি বলেন, হুমায়ুনের কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই, তাঁর এলএলবি সনদ ভুয়া। ব্যবসারও কোনো লাইসেন্স নেই।
শামারুখের বাবা জানান, প্রথম ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব উপসর্গ দেখা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে আত্মহত্যা। দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ঘটনা হত্যা না আত্মহত্যা, সে ব্যাপারে নিশ্চিত কোনো মতামত দেওয়া গেল না।
জেলকোড অনুযায়ী কারাবন্দীদের দুই ধরনের মর্যাদা দেওয়া হয়। প্রথমত সামাজিক অবস্থা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, জীবনযাপনের অভ্যাস ও সেই অনুযায়ী উচ্চতর জীবনযাপন এবং দ্বিতীয়ত, কোনো রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হলে প্রথম শ্রেণির বন্দীর মর্যাদা দেওয়া হয়।
প্রথম শ্রেণির মর্যাদাপ্রাপ্ত বন্দীদের আলাদা কক্ষ, বিছানা, টিভি, খাট, তোশক, মশারি, পত্রিকা প্রভৃতি সুবিধা দেওয়া হয়। খাবারও দেওয়া হয় উন্নতমানের।

আমাদের নেতারা কি জবাব দেবেন? by হাসান ফেরদৌস

ভিন্ন ফল হবে ভেবে একই কাজ বারবার করার অন্য নাম পাগলামি। বাংলাদেশে গত দুই মাস থেকে ঠিক এই পাগলামিটাই হচ্ছে। লাগাতার অবরোধ ও দফায় দফায় হরতাল, বেপরোয়া পেট্রলবোমা, গাড়ি ও বাসে আগুন। এসবের ফলে নিহত মানুষের সংখ্যা ১১৬ ছাড়িয়ে গেছে। সারা শরীরে আগুনে পোড়া দগদগে ক্ষত নিয়ে কাতরাচ্ছে অনেক মানুষ। আগামীকাল কার কপালে নেমে আসবে এই ভয়াবহ দুর্গতি, আমরা কেউ জানি না। বিরোধী জোটের নেত্রী খালেদা জিয়ার কাছে প্রশ্ন, আর কত দিন চলবে এই লাগাতার অবরোধ আর দফায় দফায় হরতাল? এই প্রশ্ন খালেদা জিয়ার কাছে। কারণ, তিনি চাইলে কালকেই এই সর্বনাশা দুর্গতির অবসান হতে পারে। তিনি যদি স্পষ্টভাবে ঘোষণা দেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন জোট সকল প্রকার সহিংসতার বিরুদ্ধে, অথবা এই কথা বলেন যে, তাঁর দলের কেউ পেট্রলবোমা ছোড়া বা বাসে আগুন দেওয়ার সঙ্গে জড়িত—এ কথা যদি প্রমাণিত হয়, তাহলে তাকে বা তাদের অবিলম্বে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে, তাহলে অবস্থার পরিবর্তন হতে বাধ্য।
আমি বলি না তিনি হরতাল বা অবরোধ তুলে নিন। এটি তাঁর রাজনৈতিক রণকৌশল, এই যুক্তিতে হরতাল নিয়ে তিনি পড়ে থাকতে পারেন, যদিও এক যাত্রায় ভিন্ন ফল হবে, এ কথা ভাবার কোনো কারণ নেই। আমরা শুধু বলি, আপনি সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিজের অবস্থানটি স্পষ্ট করুন। আপনার দেওয়া কর্মসূচির প্রথম দিন থেকেই আপনি দেখেছেন এর ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কারা। সাধারণ মানুষ, যাদের কাজে না গেলে পেটের ভাত জোটে না, বাসে না চড়ে উপায়ন্তর নেই, তারাই এই ভয়ের রাজনীতির শিকার। হরতাল করুন, লোকজনকে ঘরে বসে থাকতে বলুন। শুধু সমর্থকদের বলুন, তারা যেন কেউ বোমাবাজির পক্ষে নয়, তার বিপক্ষে থাকে। পুলিশের কাছে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিন, তারা কাগজে-কলমে প্রমাণ দিক আপনার দলের লোক বা ভাড়াটে সন্ত্রাসী বোমাবাজির সঙ্গে জড়িত।
রাজনৈতিক রণকৌশল সর্বদা এক থাকে না, অবস্থার বিবেচনায় তার পরিবর্তন হয়। গান্ধীর সত্যাগ্রহ আন্দোলনের কথা ভাবুন। লবণ কর আদায়ের বিরুদ্ধে সে আন্দোলন সারা ভারতবর্ষে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। গান্ধী চেয়েছিলেন সম্পূর্ণ অহিংস পথে সে আন্দোলন চলবে। কিন্তু যেই মুহূর্তে তিনি বুঝলেন সত্যাগ্রহ তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে, গান্ধীজি তাঁর অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। তিনি স্বাধীনতার দাবি ত্যাগ করেননি, শুধু সে দাবি আদায়ের পথটি পরিবর্তন করেছিলেন। ইতিহাস সাক্ষী, তাঁর সে সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল।
বিরোধী জোটের তরফে বারবার দাবি করা হয়েছে, নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে, সরকার তাদের জন্য অন্য কোনো পথই আর খোলা রাখেনি। কথাটা যদি সত্য হয়, তাহলেও সন্ত্রাসের পথ অনুসরণের কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। দুই মাস অব্যাহত হরতাল-অবরোধের ফলে দেশের অর্থনীতি কোথায় পৌঁছেছে, সে কথা সবারই জানা। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গত দেড়-দুই দশকের পরিশ্রমের পর যে ইতিবাচক বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে, তার পুরোটাই উল্টে যেতে পারে। ফিচ রেটিংসকে উদ্ধৃত করে ব্লুমবার্গ বিজনেস জানিয়েছে, রাজনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশ থেকে ফিরে যাবেন। গার্মেন্টস খাতের অনেক আগ্রহী ক্রেতা ইতিমধ্যে মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামে পাড়ি জমানো শুরু করেছেন। একবার তাঁরা ফিরে গেলে এসব বিনিয়োগকারীকে আর ফিরিয়ে আনা যাবে না।
এর চেয়েও ভয়ের কথা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ। গত মাসে প্রকাশিত তাদের এক প্রতিবেদনে গ্রুপটি জানিয়েছে, অব্যাহত হানাহানির ফলে যে রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্ম হবে, তাতে সবচেয়ে বেশি ফায়দা লুটবে ধর্মীয় উগ্রবাদীরা। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যদি বিগড়ে যায়, তার ফলে বড় ধরনের অসন্তোষের সৃষ্টি হবে। দেখা দেবে রাজনৈতিক শূন্যতা। আর সেই সুযোগে ঘাপটি মেরে বসে থাকা মৌলবাদীরা সবাই সুড়সুড় করে বেরিয়ে আসবে। এর ফলে যে বিপদ তা শুধু বিরোধী দলগুলোর জন্য নয়, সরকারের জন্যও।
বিরোধী জোটের সঙ্গে কোনো রকম সংলাপ নয়, এই ধনুর্ভঙ্গপণ করে বসে আছে সরকারি মহল। কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি, তাঁরা লাগাতার হরতালের ব্যাপারটাকে ‘পেইন ম্যানেজমেন্ট’-এর মতো একটা বিরক্তিকর অভিজ্ঞতা হিসেবে ধরে নিয়েছেন। এমন অনেক লোক আছেন, যাঁদের পায়ের গোড়ালিতে ব্যথা, জুতো পরতে গেলে চিনচিন করে, কিন্তু পরতে পরতে একসময় অভ্যাস হয়ে যায়। দিনে দু-চারটে বাস পোড়া বা খান কয়েক লাশ পড়া সে রকমই একটা কিছু।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে প্রশ্ন, আপনারা কি ধরে নিয়েছেন বারবার ‘না, নো’ বলে মাথা নাড়লেই একসময় সব ঠান্ডা হয়ে যাবে?
ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষণ যদি সঠিক হয় এবং মৌলবাদীদের উত্থান ঘটে, তার ফলে বিরোধী জোট ও ক্ষমতাসীন মহল উভয়েই তাদের এ কূল-ও কূল দুই কূলই হারাবে। তার চেয়েও বড় কথা, এই অবাস্তব ও ক্ষতিকর রাজনীতির ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে বাংলাদেশের। নেতাদের বিদেশি ব্যাংকে দেদার অর্থ, ছেলেমেয়েদের অধিকাংশই বিদেশে। তাঁদের হারানোর কিছু নেই। কিন্তু বাংলাদেশ ডুবলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়?
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক৷

আদিবাসী নারী শ্রমনির্ভর কাজে বেশি by পার্থ শঙ্কর সাহা

রাজধানীর ফার্মগেটে একটি বিউটি পারলারের মালিক কুহেলি ক্যাটরিনা আজিম। মান্দি বা গারো এই নারী পাঁচ বছর আগে পারলারটি খোলেন। ২০০০ সাল থেকে বিউটি পারলারে কাজ করছেন ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার এই আদিবাসী নারী। মাতৃতান্ত্রিক গারো সমাজে পরিবারের প্রধান ও সম্পদের মালিক নারী। এই সমাজের কুহেলি এতিমদের স্কুলে এসএসসি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জীবনের প্রয়োজন, একই সঙ্গে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার ইচ্ছা—এই দুইয়ে মিলে পারলারে কাজ শুরু করলাম। দেখলাম, কোনো কাজ খারাপ না।’ এখন দাঁড়িয়েছেন নিজের পায়ে। তিনি জানান, এখন ঢাকায় ১২টি বিউটি পারলারের মালিক গারো নারীরা।
বিভিন্ন সূত্রমতে, রাজধানীতে বিউটি পারলারে কাজ করেন প্রায় পাঁচ হাজার গারো মেয়ে। দেশের নানা স্থানের পারলারেও গারো মেয়েরা আছেন। অন্য আদিবাসী নারীরাও আছেন পারলার, তৈরি পোশাকশিল্পসহ শ্রমনির্ভর বিভিন্ন পেশায়। তবে সরকারি চাকরি, বেসরকারি বড় পদ ও উদ্যোক্তা হিসেবে আদিবাসী নারীদের উপস্থিতি হাতে গোনা। আদিবাসী নেতারা বলছেন, এর কারণ শিক্ষায় পিছিয়ে থাকা।
গারো ইনডিজিনাস মিচিক অ্যাসোসিয়েশনের করা ‘বিউটি পারলারে মান্দি মেয়েরা কেমন আছেন?’ শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, ঢাকার বিউটি পারলারে কর্মরত গারো মেয়েদের ৫০ শতাংশের বেশি টাঙ্গাইলের মধুপুর বনের বাসিন্দা। আদিবাসী নেতা সঞ্জীব দ্রং বলেন, ‘একসময় অনন্যোপায় হয়েই গারো মেয়েরা রাজধানীর পথে পা বাড়িয়েছিলেন। তাঁরা আজ নিজেদের অবস্থান করে নিয়েছেন।’
ঢাকায় বিদেশি দূতাবাস, বিদেশি নাগরিকদের গৃহকর্মী, নার্সিং পেশায়ও গারো নারীরা কাজ করছেন। পোশাকশিল্পে কর্মরত আদিবাসী নারীদের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা সম্পর্কে সরকারি বা বেসরকারিভাবে গ্রহণযোগ্য তথ্য নেই।
আদিবাসীদের সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে পোশাকশিল্পে আদিবাসী কর্মীর সংখ্যা অন্তত ২০ হাজার, যাঁদের ৬৫ শতাংশই নারী। তাঁরা মূলত পার্বত্য চট্টগ্রামের। সাভার ইপিজেডে পাহাড়ি আদিবাসীর সংখ্যা বেশি হলেও সমতলের মান্দি, সাঁওতাল, ওঁরাও কর্মীরাও আছেন। সাভার ইপিজেড এলাকায় আদিবাসী কর্মীর সংখ্যা ১৫ হাজারের কম নয়, যাঁদের ৭০ শতাংশই নারী। তাঁদের একজন তাপসী চাকমা। বাড়ি রাঙামাটির শুভলং উপজেলার শিলছড়ি গ্রামে। এসএসসি পাস করে তিনি বছর পাঁচেক আগে পোশাকশিল্পে যোগ দেন। বললেন, ‘যদি এলাকায় কাজের সুযোগ থাকত, তাহলে হয়তো এত দূরে আসতাম না। তবে এসে খারাপও হয়নি।’
তবে বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আদিবাসী নারীরা এখনো বেশ পিছিয়ে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯৯১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ৩ লাখ ৫২ হাজার ২৬৯ জন নারী চাকরি নিয়ে বিদেশে গেছেন। বাংলাদেশের যে চারটি জেলার মানুষ সবচেয়ে কম বিদেশ যায়, তার মধ্যে আছে বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও শেরপুর। রাঙামাটির নারী সংগঠন সিমওয়ান্তির পরিচালক টুকু তালুকদার বলেন, ‘নিরাপত্তাহীনতা ও তথ্যপ্রাপ্তির অভাবই আদিবাসী নারীদের বিদেশে কম যাওয়ার কারণ।’
সরকারি ও বেসরকারি বড় চাকরিতে আদিবাসী নারী এখনো হাতে গোনা। পার্বত্য চট্টগ্রামের ১১টি জাতিসত্তার মধ্যে বম, লুসাই, পাংখো, খিয়াং, খুমি, মুরং, ত্রিপুরা জাতিগোষ্ঠীর কোনো নারী বিসিএস কর্মকর্তা নেই। সমতলের বৃহত্তম আদিবাসী জাতিগোষ্ঠী সাঁওতালদের তিনজন নারী বিসিএস কর্মকর্তা। কোনো নারী বিসিএস কর্মকর্তা নেই সমতলের মুন্ডা, মাহালি, পাহাড়িয়া, মাহাতো জাতিগোষ্ঠীরও।
পার্বত্য তিন জেলায় তিনটি আদালতে পাঁচজন পাহাড়ি নারী আইনজীবী আছেন। খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে দুজন করে। আর বান্দরবানে একজন। রাঙামাটির আইনজীবী সুস্মিতা চাকমা প্রথম আলোকে বলেন, ‘আইন পেশায় পাহাড়ি নারীরা এলেন পার্বত্য চুক্তির পর। পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এই পেশায় আরও নারী আসবেন।’
শিল্পের উদ্যোক্তা হিসেবে পাহাড়ি নারীদের সোনালি অতীত থাকলেও এখন তা ফিকে। মঞ্জুলিকা চাকমা ১৯৬৫ সালে পোশাক তৈরির প্রতিষ্ঠান বেইন টেক্সটাইল প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে রাঙামাটিতে ২০টির মতো পোশাক তৈরির প্রতিষ্ঠান আছে। বেইন বাদে বাকি সবই বাঙালি মালিকানায়। মঞ্জুলিকা চাকমা বলেন, ‘উদ্যোক্তা হিসেবে আদিবাসী নারীদের দাঁড়ানোর পথে প্রধান অন্তরায় পুঁজির অভাব। ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা সুবিধা পান না তেমন।’
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন জানান, পার্বত্য তিন জেলা মিলিয়ে বেসরকারি সাহায্য সংস্থা বা এনজিওর সংখ্যা এখন ১৪০টি। এর মধ্যে নারীপ্রধান হিসেবে থাকা এনজিওর সংখ্যা ১৩টি। উত্তরাঞ্চল, যেখানে ১৬ লাখ আদিবাসীর বাস, সেখানে নারীপ্রধান হিসেবে আছে—এমন এনজিওর সংখ্যা দুটি।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহযোগিতায় পার্বত্য চট্টগ্রামে চলমান ‘চিটাগং হিল ট্রাক্টস ডেভেলপমেন্ট ফ্যাসিলিটি (সিএইচটিডিএফ)’ নামে দাতাদের উন্নয়ন কর্মসূচিতে মোট আদিবাসী কর্মীর ৭০ শতাংশই পুরুষ, নারী ৩০ শতাংশ। সিএইচটিডিএফের জেন্ডার বিশেষজ্ঞ ঝুমা দেওয়ান বলেন, ‘আদিবাসী নারীরা মাঠপর্যায়ে কাজ করলেও ব্যবস্থাপনা বা নীতিনির্ধারণে তাঁরা নেই। এর মূল কারণ, উচ্চশিক্ষিত আদিবাসী নারীর সংখ্যা কম। দারিদ্র্যই এর বড় কারণ।’
দারিদ্র্য ও শিক্ষার কম হারের পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতাকেও আদিবাসী নারীর পিছিয়ে পড়ার কারণ হিসেবে মনে করেন আদিবাসীদের মানবাধিকার সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারপারসন চৈতালী ত্রিপুরা। তিনি বলেন, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দূরে হওয়ার কারণে অনেকেই লেখাপড়া পড়া ছেড়ে দিয়েছে, পার্বত্যাঞ্চলে এমন ঘটনা আছে অনেক। স্কুলে যেতে নিগ্রহের ঘটনা এখনো ঘটছে।’