Friday, May 2, 2014

লোকসভা নির্বাচনে এত সময় লাগে কেন?

ভারতের লোকসভা নির্বাচন শুরু হয়েছে গত ৭ এপ্রিল, চলবে ১২ মে পর্যন্ত। ২৮ রাজ্যবিশিষ্ট দেশটিতে ৫৪৩টি আসনের জন্য মোট নয় পর্বে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। সময় লাগছে এক মাসেরও বেশি অর্থাৎ ৩৬ দিন ধরে। ভারতের এ দীর্ঘ নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশে কি এত প্রলম্বিত নির্বাচন হওয়া কি উচিত? বিবিসি ম্যাগাজিনে আজ শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ প্রশ্নেরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ লোকসভা নির্বাচন পাঁচ পর্বে অনুষ্ঠিত হয়, চলে এক মাস ধরে। দেশটির ইতিহাসের প্রথম নির্বাচন অর্থাৎ ১৯৫১-৫২ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন চলেছিল তিন মাস ধরে। তবে ১৯৬২ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত লোকসভা নির্বাচনের যাবতীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয় চার থেকে ১০ দিনের মধ্যে। এর মধ্যে ১৯৮০ সালের নির্বাচন ছিল ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে স্বল্প সময়ের নির্বাচন, যা চলেছিল মাত্র চারদিন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাওয়িদ লাইকের মতে, ভারতের নির্বাচন 'অন্তহীন' নির্বাচন। তিনি বলেন, নির্বাচন প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হওয়ার ফলে প্রার্থীদের নির্বাচনি প্রচার তিক্ততার পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে। এ ছাড়া এ সময় দেশের উন্নয়ন কাজ থমকে যায়। তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, ইন্দোনেশিয়া কিংবা ব্রাজিলের মতো ঘন বসতিপূর্ণ দেশ যদি একদিনের মধ্যে নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ করতে পারে তবে ভারত কেন পারবে না? বিবিসির প্রতিবেদক সৌতিক বিশ্বাসের মতে, ভারতে নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রলম্বিত হওয়ার অন্যতম কারণ স্থানীয় পুলিশের দলীয়করণ। ভারতে প্রতিটি লোকসভা নির্বাচনে সহিংসতা এবং ভোট জালিয়াতি-দুর্নীতির ঘটনা ঘটে। নির্বাচনি সহিংসতায় অনেকেই প্রাণ হারায়। এসব ক্ষেত্রে প্রায়ই স্থানীয় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে।
সাবেক নির্বাচন কমিশনার এস ওয়াই কোরেশী বলেন, স্থানীয় পুলিশের দলীয়করণের কারণে নির্বাচনের সময় কেন্দ্রীয় পুলিশ ফোর্স নিয়োগ করতে হয়। এ সময় তাঁদের নিজস্ব কাজ থেকে মুক্ত থেকে শান্তি রক্ষায় ট্রেনে-বাসে চড়ে দেশের নানান স্থানে টহল দিতে হয়, বিভিন্ন কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে হয়। এ কারণে নির্বাচনের সময় বেশি লাগে। এবারের নির্বাচনে ভারতজুড়ে মোট এক লাখ ২০ হাজার কেন্দ্রীয় পুলিশ ফোর্স নিয়োগ করা হয়েছে। নির্বাচন প্রলম্বিত করার পেছনে আরেকটি কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এর মধ্য দিয়ে ভোটারদের আচরণ প্রভাবিত করার চেষ্টা চলে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সঞ্জয় কুমারের মতে, প্রলম্বিত নির্বাচনের ক্ষেত্রে জয়ের সম্ভাবনা আছে এমন দল বা প্রার্থীর জিতে যাওয়ার সুযোগ বেড়ে যায়।
কেননা স্বল্প সময়ের নির্বাচনে ভোটাররা বুঝতে পারেন না, কোন প্রার্থী বা দল জিততে যাচ্ছে। কিন্তু নির্বাচন দীর্ঘায়িত হলে, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে জোর আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের মধ্য দিয়ে কোনো দলের পক্ষে-বিপক্ষে প্রচার চালানো যায়। কয়েক পর্বের নির্বাচনে প্রার্থীরা নিজেদের নির্বাচনি প্রচার চালানোরও যথেষ্ট সময় পান। এর ফলে ভোটারদের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করা অনেকটাই সম্ভব হয়। এ দুই কারণ ছাড়াও নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনা করার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব, অর্থের জোগান কম থাকা, যন্ত্রপাতির স্বল্পতা, অপর্যাপ্ত সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ইত্যাদি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে।

সিদ্ধিরগঞ্জে সড়ক অবরোধের চেষ্টা, লাঠিচার্জ

নারায়ণগঞ্জে অপহূত ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলামকে উদ্ধারের দাবিতে বেঁধে দেওয়া তিন ঘণ্টা পার হওয়ার পর আজ শুক্রবার এলাকাবাসী সড়ক অবরোধের চেষ্টা করেছেন। তবে পুলিশ শটগানের ফাঁকা গুলি ছুড়ে ও লাঠিপেটা করে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। আজ সন্ধ্যা ছয়টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের সানারপাড় এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। গতকাল বৃহস্পতিবার রাত ১০টার পর থেকে সাইফুলের খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁর পরিবারের দাবি, সাইফুলকে অপহরণ করা হয়েছে। সাইফুলের স্ত্রী আফরিন সুলতানার ভাষ্য, সাইফুল সানারপাড়ের লামিয়া সুপার স্টোর নামের একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মালিক। গতকাল রাতে অপহরণকারীরা ফোন করে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ চেয়েছে। প্রথমে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল বলে জানা গেছে।
সাইফুলের সন্ধানের দাবিতে আজ বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সানারপাড় বাসস্ট্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ী ও তাঁর স্বজনেরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে পড়ে। এ সময় পুলিশ তাঁদের বুঝিয়ে মহাসড়ক থেকে সরাতে গেলে তাঁরা পুলিশকে তিন ঘণ্টার সময় বেঁধে দেন। এর মধ্যে জুমার নামাজের সময় হওয়ায় তাঁরা মহাসড়ক থেকে সরে যান। কিন্তু তিন ঘণ্টার মধ্যে সাইফুলকে উদ্ধার করতে না পারলে তাঁরা আবার মহাসড়ক অবরোধ করবেন বলে ঘোষণা দেন। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) মো. জাকারিয়া বলেন, নিখোঁজ সাইফুলকে উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।
সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মতিন জানান, সাইফুল ইসলাম নামের একজন ব্যবসায়ী নিখোঁজ রয়েছেন। এ নিয়ে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে গত রোববার একসঙ্গে সাত ব্যক্তি অপহূত হন। তাঁরা হলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-২ নজরুল ইসলাম, তাঁর বন্ধু মনিরুজ্জামান স্বপন, তাজুল ইসলাম, লিটন, নজরুলের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম, আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার ও তাঁর ব্যক্তিগত গাড়িচালক ইব্রাহিম। গত বুধবার দুপুরে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ছয়জনের ও গতকাল একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

ফ্রিল্যান্সিংয়ের আদ্যোপান্ত by মো. আমিনুর রহমান @প্রথম আলো

ফ্রিল্যান্সিং করে অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন। অনেকেরই নতুন এই ক্ষেত্রটিতে আগ্রহ রয়েছে। অনেকেই জানতে চান বিষয়টি কী এবং কীভাবে ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করা যায়। পাঠকদের কাছে ফ্রিল্যান্সিংকে সহজভাবে তুলে ধরতেই ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছে ফ্রিল্যান্সিংয়ের আদ্যোপান্ত। আজকে রইলো এর প্রতিবেদনটির প্রথম পর্ব। বর্তমানে ফ্রিল্যান্সিং বা আউটসোর্সিং শব্দ দুটি বাংলাদেশে অনেকের কাছেই পরিচিত। দেশের প্রচুর ওয়েবসাইট ডেভেলপার, গ্রাফিকস ডিজাইনার, রাইটার, মার্কেটার বিভিন্ন অনলাইন মার্কেটপ্লেসে সফলতার সাথে কাজ করছেন, আবার অনেকেই নতুন ফ্রিল্যান্সার হিসেবে মার্কেটে প্রবেশ করার চেষ্টা করছেন। নতুনদের কাছে যে বিষয়টা প্রায়ই শোনা যায় তা হলো এই পেশায় সহজে সাফল্য পাওয়া যায় না। বিষয়টা কিছুটা হলেও সত্যি। যেকোনো একটি নির্দিষ্ট কাজের এবং ইংরেজি মাধ্যমে যোগাযোগের দক্ষতা না থাকলে আসলে এই পেশায় সাফল্য পাওয়া কঠিন। অবশ্য শুধু এই দুইটি যোগ্যতা থাকলেই যে সাফল্যের চূড়ায় যাওয়া যাবে, তাও ঠিক নয়। সাময়িক সাফল্য পাওয়া এবং নিজেকে একটি পেশায় প্রতিষ্ঠিত করা এক কথা নয়। যদি লম্বা ভবিষ্যত্ ঠিক করে এই পেশায় এগিয়ে যেতে চান তাহলে নিজেকে একটি সম্পূর্ণ প্যাকেজ হিসেবে তৈরি করতে হবে, যাতে শুধু কাজের দক্ষতা নয়, অন্যান্য সব দিক দিয়ে নিজেকে আন্তর্জাতিক মানের একজন পেশাজীবী হিসেবে তৈরি করা যায়।
আউটসোর্সিং বিষয়টি কী?
ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন ধরনের কাজ করিয়ে নেয়। নিজ প্রতিষ্ঠানের বাইরে অন্য কাউকে দিয়ে এসব কাজ করানোকে আউটসোর্সিং বলে। যাঁরা আউটসোর্সিংয়ের কাজ করে দেন, তাঁদের ফ্রিল্যান্সার বলে। ফ্রিল্যান্সার মানে হলো মুক্ত বা স্বাধীন পেশাজীবী। আউটসোর্সিং সাইটে যিনি কাজ করেন তাঁকে বলে কনট্রাক্টর (তিনি কনট্রাক্টে কাজ করেন)। আর যিনি কাজ দেন তাঁকে বলে বায়ার/ক্লায়েন্ট (তিনি কনট্রাক্টে কাজ দেন)।
যে ধরনের কাজ পাওয়া যায়
আউটসোর্সিং সাইটের কাজগুলো বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা থাকে। যেমন: ওয়েব ডেভেলপমেন্ট (Web Development), সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট (Software
Development), নেটওয়ার্কিং ও তথ্যব্যবস্থা (Networking & Information Systems), লেখা ও অনুবাদ (Writing & Translation), প্রশাসনিক সহায়তা (Administrative Support), ডিজাইন ও মাল্টিমিডিয়া (Design & Multimedia), গ্রাহকসেবা (Customer Service), বিক্রয় ও বিপণন (Sales & Marketing), ব্যবসা-সেবা (Business Services) ইত্যাদি।
ওয়েব ডেভেলপমেন্ট
এই বিভাগের মধ্যে আছে আবার ওয়েবসাইট ডিজাইন, ওয়েব প্রোগ্রামিং, ই-কমার্স, ইউজার ইন্টারফেস ডিজাইন, ওয়েবসাইট টেস্টিং, ওয়েবসাইট প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি।
সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট
এই বিভাগের মধ্যে আছে ডেস্কটপ অ্যাপ্লিকেশন, গেম ডেভেলপমেন্ট, স্ক্রিপ্ট ও ইউটিলিটি, সফটওয়্যার প্লাগ-ইনস, মোবাইল অ্যাপিস্নকেশন, ইন্টারফেস ডিজাইন, সফ্টওয়্যার প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, সফ্টওয়্যার টেস্টিং, ভিওআইপি ইত্যাদি।
নেটওয়ার্কিং ও ইনফরমেশন সিস্টেম
এর মধ্যে আছে নেটওয়ার্ক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ডিবিএ (ডেটাবেইস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন), সার্ভার অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ইআরপি/সিআরএম ইমপিস্নমেনটেশন ইত্যাদি।
রাইটিং ও ট্রান্সলেশন
এর মধ্যে আছে টেকনিক্যাল রাইটিং,  ওয়েবসাইট কনটেন্ট, বস্নগ ও আর্টিকেল রাইটিং, কপি রাইটিং, অনুবাদ, ক্রিয়েটিভ রাইটিং ইত্যাদি।
অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সাপোর্ট
এর মধ্যে আছে ডেটা এন্ট্রি, পারসোনাল অ্যাসিসট্যান্ট, ওয়েব রিসার্চ, ই-মেইল রেসপন্স হ্যান্ডলিং, ট্রান্সক্রিপশন ইত্যাদি।
ডিজাইন ও মাল্টিমিডিয়া
এর মধ্যে আছে গ্রাফিক্স ডিজাইন, লোগো ডিজাইন, ইলাস্ট্রেশন, প্রিন্ট ডিজাইন, থ্রিডি (3D) মডেলিং, অটোক্যাড, অডিও ও ভিডিও প্রোডাকশন, ভয়েস ট্যালেন্ট, অ্যানিমেশন, প্রেজেন্টেশন, ইঞ্জিনিয়ারিং ও টেকনিক্যাল ডিজাইন ইত্যাদি।
কাস্টমার সার্ভিস
এর মধ্যে আছে কাস্টমার সার্ভিস ও সাপোর্ট, টেকনিক্যাল সাপোর্ট, ফোন সাপোর্ট, অর্ডার প্রসেসিং ইত্যাদি।
সেলস ও মার্কেটিং
এর মধ্যে আছে বিজ্ঞাপন, ই-মেইল মার্কেটিং, এসইও (সার্চ ইঞ্জিন অপ্টিমাইজেশন), এসইএম (সার্চ ইঞ্জিন মার্কেটিং), এসএমএম (সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং), পিআর (পাবলিক রিলেশনস), টেলিমার্কেটিং ও টেলিসেল্স, বিজনেস প্ল্যানিং ও মার্কেটিং, মার্কেট রিসার্চ ও সার্ভে, সেলস ও লিড জেনারেশন ইত্যাদি।
বিজনেস সার্ভিসেস
এর মধ্যে আছে অ্যাকাউন্টিং, বুককিপিং, এইচআর/পে-রোল, ফাইন্যানসিয়াল সার্ভিসেস অ্যান্ড পস্ন্যানিং, পেমেন্ট প্রসেসিং, লিগ্যাল, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট, বিজনেস কনসালটিং, রিক্রুটিং, পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ ইত্যাদি।
কোন কাজের কী যোগ্যতা
ওয়েব ডেভেলপমেন্ট
এই বিভাগের কাজের জন্য আপনাকে ওয়েবসাইট তৈরি করা জানতে হবে। বিভিন্ন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ যেমন এইচটিএমএল, পিএইচপি, জাভা স্ক্রিপ্ট, সিএসএস, ডেটাবেইস (মাইএসকিউএল) ইত্যাদি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে। এই ভাষাগুলোর ওপর দু-একটা টেস্ট দেওয়া থাকলে কাজ পেতে সুবিধা হবে।
সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট
এই বিভাগের কাজের জন্য আপনাকে সফ্টওয়্যার তৈরি করা জানতে হবে। বিভিন্ন প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ যেমন জাভা, সি-শার্প, ভিজুয়্যাল বেসিক, ডেটাবেইস (মাইএসকিউএল, ওরাকল, এমএস এসকিউএল সার্ভার) ইত্যাদি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে। এই ল্যাঙ্গুয়েজগুলোর ওপরও এক-দুইটা টেস্ট দেওয়া থাকলে কাজ পেতে সুবিধা হবে।
নেটওয়ার্কিং ও ইনফরমেশন সিস্টেম
এই বিভাগের কাজের জন্য ডেটাবেজ, নেটওয়ার্কিং ইত্যাদি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে।
লেখা ও অনুবাদ (রাইটিং ও ট্রান্সলেশন)
এই বিভাগের কাজের জন্য আপনাকে ইংরেজিতে দক্ষ হতে হবে, কারিগরি জ্ঞান থাকতে হবে, ওয়েবসাইট, ব্লগ, ইন্টারনেট সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে। লেখালেখির অভ্যাস থাকলে ভালো হয়।
অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সাপোর্ট
এই বিভাগের কাজগুলো তুলনামূলকভাবে অনেক সহজ। মূলত কপি পেস্টের কাজ। কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ওয়েবসাইট, বস্নগ, ই-মেইল, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং (ফেসবুক, গুগলপ্লাস, টুইটার) ইত্যাদি সাইটগুলো সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে।
ডিজাইন ও মাল্টিমিডিয়া
এই বিভাগের কাজের জন্য আপনাকে গ্রাফিক্সের কাজ জানতে হবে। ফটোশপ, ইলাস্ট্রেটর, ফ্লাশ ইত্যাদি জানা থাকলে লোগো ডিজাইন, গ্রাফিক্স ডিজাইনের কাজ খুব সহজেই করা যায়। অডিও, ভিডিও এডিটিংয়ের ওপরও অনেক কাজ পাওয়া যায়।
কাস্টমার সার্ভিস
এই বিভাগের কাজের জন্য আপনাকে ইংরেজিতে দক্ষ হতে হবে। দ্রুত ইংরেজি লেখা এবং বলা দুটোতেই দক্ষ হতে হবে।
সেলস ও মার্কেটিং
এই বিভাগের কাজের জন্য আপনার ই-কমার্স সাইটগুলো সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে। ই-কমার্স ওয়েবসাইট, ব্লগ, ই-মেইল, সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং (ফেসবুক, গুগলপ্লাস, টুইটার), মার্কেটিং, এসইও (সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন) ইত্যাদি সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে।
বিজনেস সার্ভিসেস
এই বিভাগের কাজের জন্য আপনার ব্যবসায়িক জ্ঞান থাকতে হবে। লেনদেনের বিভিন্ন মাধ্যম (পেমেন্ট মেথড) সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হবে।
কাজ পাবেন যেখানে
আউটসোর্সিংয়ের কাজ পাওয়া যায় এমন অনেক ওয়েবসাইট আছে। আবার অনেক ভুয়া সাইটও বের হয়েছে। ফলে সতর্ক হয়েই কাজ শুরু করা ভালো। আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত এবং নির্ভরযোগ্য কয়েকটি সাইটের ঠিকানা হলো-
www.odesk.com
www.freelancer.com
www.elance.com


মার্কেটপ্লেসের প্রোফাইল
বর্তমানে ৪-৫টি আন্ত্মর্জাতিক মানের ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস রয়েছে, যেখানে কাজ করে বড় ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। এই মার্কেটপ্লেসগুলোর প্রতিটিতেই একটি বিষয় কমন থাকে আর সেটা হলো একটি ভালো প্রোফাইল তৈরি করা। সাধারণ কাজে যেমন সিভি দেখে চাকরি দেয়া না দেয়ার বিষয়টি নির্ধারণ হয় তেমনি অনলাইন মার্কেটপ্লেসেও আপনার প্রোফাইল দেখেই ক্লায়েন্ট বিবেচনা করবে আপনি কাজ পাওয়ার যোগ্য কি না। এর জন্য প্রোফাইলকে যতটুকু সম্ভব আকর্ষণীয় করে তৈরি করুন। প্রোফাইলে যেগুলো না থাকলেই নয়-
হাসিমুখে তোলা একটি ছবি যেখানে আপনার চেহারা পরিষ্কারভাবে বোঝা যাবে।
স্কিল টেস্ট দেয়া থাকলে ভালো। ইল্যান্স.কমে ফ্রিতেই প্রচুর স্কিল টেস্ট দেয়া যায়। স্কিল টেস্ট দেয়া থাকলে ক্লায়েন্ট বুঝবে যে আপনি ফ্রিল্যান্সার হিসেবে নতুন অথবা অভিজ্ঞ যা-ই হোন না কেন সেই স্কিলে আপনার যথেষ্ট তাত্ত্বিক জ্ঞান আছে।
পোর্টফলিও আইটেম যোগ করা উচিত। পোর্টফলিও আইটেম হিসেবে নিজের তৈরি লোগো, নিজের বানানো ওয়েবসাইটের স্ক্রিনশট, ইউনিভার্সিটিতে তৈরি করা কোনো প্রেজেন্টেশন, কোনো সার্টিফিকেটের স্ক্যান করা ইমেজ ইত্যাদি দেয়া যেতে পারে। এর সাথে যদি স্কিল টেস্ট থাকে, তাহলে ক্লায়েন্ট জেনে যাবে যে আপনার শুধু তাত্ত্বিক জ্ঞান আছে তাই নয়, তার সাথে প্র্যাকটিক্যাল কাজ করার অভিজ্ঞতাও আছে।
বিষয়টি অনেকটা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করার মতো। একদম খালি একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট দিয়ে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠালে যেমন কেউ আপনাকে সহজে অ্যাড করবে না, ঠিক তেমনি একদম খালি, অনাকর্ষণীয় একটি ফ্রিল্যান্স প্রোফাইল তৈরি করে কাজে আবেদন করলে ক্লায়েন্টরাও সাড়া দেবে না।

অন্য রানা প্লাজা

ভয় হয়, রানা প্লাজার সহস্রাধিক শ্রমিকের মৃত্যু না বৃথা যায়
১০৩ বছর আগের ঘটনা, তারিখ ২৫ মার্চ, ১৯১১। নিউইয়র্ক শহরের গ্রিনিচ ভিলেজে, আজকের ওয়াশিংটন স্কয়ার পার্কের কোলঘেঁষে ১০ তলা এশ ভবন। তার শেষ তিনটি তলায় অর্থাৎ আট, নয় ও দশতলায় ম্যাক্স ব্লাঙ্ক ও আইজাক হ্যারিস কোম্পানির পোশাক তৈরির কারখানা। অধিকাংশ শ্রমিকই মেয়ে, নানা বয়সের; তবে বেশির ভাগই কিশোরী-তরুণী। প্রায় সবাই নানা দেশ থেকে আসা ইহুদি অভিবাসী। শনিবার বিকেলে সবাই কাজ গুছিয়ে যাওয়ার জন্য উসখুস করছেন। দুপুরের শিফট শেষ হতে ঘণ্টা খানেক বাকি।
তখনই হঠাৎ আগুন। প্রথমে আটতলায়, সেখান থেকে দেখতে দেখতে নয়তলা ছাড়িয়ে দশতলায় দাউ দাউ করে সে আগুন ছড়িয়ে পড়ল। মালিকের কড়া নির্দেশ ছিল শিফট শেষ হওয়ার আগে মূল দরজা খোলা যাবে না। যুক্তি ছিল, দরজা খোলা থাকলে চুরি হতে পারে। প্রতিটি শ্রমিকের হাতের পুঁটলি তন্নতন্ন করে খুঁজে তবে তাঁদের যেতে দেওয়া হতো। দাউ দাউ আগুন, চোখ আঁধার করা ধোঁয়া, মাথার ওপর ভেঙে পড়া ছাদের কাঠ-পাথর। পালাবেন কোথায়, কীভাবে? কেউ কেউ সেই আট-দশতলা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন, নিশ্চিত মৃত্যু তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে, সে কথা জেনেও। সর্বমোট ১৪৬ জন শ্রমিক, তাঁদের মধ্যে ১২৩ জন নারী, সেদিন আগুনে দগ্ধ হলেন। আগুন নেভানোর পর শবদেহগুলো উদ্ধার করা হলো বটে, কিন্তু কারও কারও শরীর এমন পোড়া কয়লা হয়ে গেছে যে তাঁদের চেনার পর্যন্ত উপায় ছিল না। এক এক করে সবাইকে তাঁদের দগ্ধ-গলিত দেহ নিয়ে রাখা হলো ম্যানহাটনের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ইস্ট রিভারের একটি জেটিতে। শোকাভিভূত নিকটাত্মীয়রা এসে তাঁদের চিহ্নিত করলেন। করা গেল না মাত্র ছয়জনকে, প্রায় এক শ বছর পর, নানা ফরেনসিক পরীক্ষা শেষে তাঁদেরও চিহ্নিত করা সম্ভব হয়। নিউইয়র্কের সেই ‘ট্রায়াঙ্গল ওয়েস্টশার্ট অগ্নিকাণ্ডের’ ঠিক এক শ বছর পর বাংলাদেশের সাভারে রানা প্লাজার অভাবিত অগ্নিকাণ্ড। এখানে মোট নিহতের সংখ্যা তার ১০ গুণ—১১৩৫। প্রায় সবাই মহিলা, কারও কারও বয়স ১৫-১৬। গ্রাম থেকে উঠে আসা এসব মেয়ের স্বপ্ন ছিল নিজেদের ভাগ্য ফেরাবে, পরিবারের ভাগ্য ফেরাবে। ঠিক যে স্বপ্ন এশ ভবনের ইহুদি কিশোরীরা দেখেছিল।
আগুনের ধ্বংসস্তূপের নিচে ট্রায়াঙ্গল স্কয়ার ও রানা প্লাজা একাকার হয়ে যায়। ২৪ এপ্রিল, রানা প্লাজা অগ্নিকাণ্ডের প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আমরা জড়ো হয়েছিলাম সেই গ্রিনিচ ভিলেজের এশ ভবনের কয়েক গজের ভেতর অবস্থিত ইউনিয়ন স্কয়ারে। শুধু বাঙালি নয়, নানা দেশের নানা ভাষার মানুষ। এদিন নিউইয়র্কে সকাল থেকে চলেছে বিভিন্ন সভা-মিছিল-পিকেটিং। ইউনিয়ন স্কয়ারের কাছে তৈরি পোশাকের অভিজাত বিপণি চিলড্রেনস প্লেস। সকাল থেকেই সেখানে ধরনা বসেছে, রানা প্লাজার হতাহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ চাই, এই প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে। হাতে হাতে বিলি হয়েছে প্রচারপত্র। কথা ছিল চিলড্রেনস প্লেস আট মিলিয়ন ডলার ক্ষতি পূরণ দেবে, সে অর্থ দিতে তারা এখন গড়িমসি করছে। অথচ চিলড্রেনস প্লেসের প্রধান নির্বাহী জিন এলর্ফাস গত বছর বেতন-বোনাস মিলে একাই আয় করছেন ১৭ মিলিয়ন ডলার। একটি অল্প বয়সী মেয়ে সে প্রচারপত্রের কয়েকটি কপি আমাদের মধ্যে বিলি করে গেল। প্রায় একই সময়ে ডজন খানেক ছাত্রসংগঠন ও শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্যদের উদ্যোগে ওয়াশিংটন স্কয়ারে—ঠিক যেখানে ১০৩ বছর আগে পোশাক কারখানায় আগুন ধরেছিল—নানা দেশের মানুষ জড়ো হয়েছিলেন রানা প্লাজার শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণের দাবি নিয়ে। তাঁদের কেউ কেউ এই জমায়েতেও এলেন সংহতি জানাতে। একজন এসেই স্লোগান ধরলেন, ‘পে-আপ নাও’। বিলম্ব নয়, এখনই ক্ষতিপূরণ চাই। একটি মেয়ে দীর্ঘ একটি ব্যানার মেলে ধরল, তাতেও সেই একই কথা, ‘অবিলম্বে রানা প্লাজা শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ চাই।’ ‘ট্রায়াঙ্গল অগ্নিকাণ্ডকে ভুলো না’—এই নামের একটি জোটের দুজন কর্মী এসেছিলেন একটি রঙিন প্রচারপত্র নিয়ে। ‘বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ও ট্রায়াঙ্গল মেমোরিয়াল কুইল্ট’ উভয়কে একই সঙ্গে যুক্ত করে তারা একটি কাঁথা বানিয়েছেন। ২৮ এপ্রিল এই শহরের সবচেয়ে বড় গির্জা সেইন্ট জন দ্য ডিভাইন-এ দীর্ঘ সেই কাঁথা উদ্বোধন হবে,
চলবে মাস দুই। আমাদের সবাইকে তারা আমন্ত্রণ জানালেন তাতে যোগ দিতে। ‘দ্য গোস্ট অব রানা প্লাজা’ নামে রানা প্লাজায় হতাহত শ্রমিকদের ছবিসংবলিত পোস্ট কার্ড বিলি করা হলো। আমি দুটি সংগ্রহ করলাম, একটিতে রফিকুল নামের এক যুবকের ছবি, আঁধারভরা তাঁর চোখ দুটিই সেখানে দেখি। অন্যটি পাখি নামের এক বালিকার, গোড়ালি থেকে তার দুটি পা কেটে ফেলা হয়েছে, মেয়েটি হাত দিয়ে চোখের জল মুছছে, তার মুখ বা চোখ কিছুই দেখা হয় না। পুলিৎজার সেন্টারের হয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করছেন জেইসন মটলাঘ, এসব ছবি তাঁরই তোলা। আমি জমায়েতে আসা এসব অচেনা বিদেশিকে দেখছিলাম। তাঁরা প্রায় সবাই আমাদের অপরিচিত, নানা ভাষার নানা দেশের, অথচ মনে হয় সবাই যেন আত্মার আত্মীয়। রানা প্লাজায় যে এগারো শর বেশি শ্রমিক নিহত হন, তাঁদের প্রত্যেকের স্মৃতি আগলে রাখতে এঁরা আমাদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছেন। যাঁরা নিহত হন, তাঁদের প্রত্যেকের নাম আছে, নামের পেছনে অকালে ঝরে যাওয়া জীবন আছে, আছে অসম্পূর্ণ স্বপ্ন। ট্রায়াঙ্গল মেমোরিয়াল কোয়ালিশন ইতিমধ্যে ১৯০৩ সালের অগ্নিকাণ্ডে নিহত প্রতিটি শ্রমিকের নাম খোদাই করে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করেছে। সে কোয়ালিশনের একজন সদস্য রানা প্লাজায় নিহত দুজনের নাম আলাদা করে লিখে কাঁথা বুনে এনেছিলেন। যে কাঁথাটি তাঁরা বুনেছেন, যত নিহত শ্রমিকের নাম তাঁরা সংগ্রহ করতে পারবেন, সুতোর কালিতে তাঁদের প্রত্যেকের নাম গেঁথে রাখা হবে। আমার চোখে জল এসে যায়।
বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে এর আগে আরেকবার, সেই একাত্তরে, এই রকম স্বতঃস্ফূর্তভাবে পৃথিবীর মানুষ তাদের সংহতি জানিয়েছিল। আমি জানি না, যেখানে এসব হতভাগ্য নারী নিহত হলেন, সেই বাংলাদেশে তাঁদের স্মৃতি জাগিয়ে রাখতে ঠিক কী করা হচ্ছে। এমন ঘটনা যাতে আর না ঘটে, সে কথা নিত্যদিন স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যই প্রয়োজন স্মৃতি সরণির। ২৪ এপ্রিলকে ঘোষণা করা উচিত সেই ট্র্যাজেডির স্মারণিক দিবস হিসেবে। তেমন কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে শুনিনি। কিন্তু এ তো শুধু আনুষ্ঠানিকতা। যাঁরা নিহত হলেন, তাঁদের স্মৃতি ধরে রাখার শ্রেষ্ঠ উপায় শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা আদায় করা ও তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নিউইয়র্কে দিনভর মিটিং-মিছিলের ভেতর দিয়ে সে দাবির কথাই উঠেছে। কিন্তু এই কাজটি সম্পন্ন করতে হলে ব্যবস্থা নিতে হবে বাংলাদেশে। শুধু আন্তর্জাতিক সংহতি অথবা ঢাকার রাস্তায় স্মরণসভা করে সে দাবি অর্জিত হবে না। চিলড্রেনস প্লেসের প্রধান নির্বাহীর মতো আমাদের তৈরি পোশাকশিল্পের মালিকেরাও বোঝেন মুনাফা। সরকারের ভেতর মালিকদের লোকই বেশি, ফলে তাদের ওপর রাজনৈতিক চাপ কম। যা চাপ তার প্রায় সবই আসছে বিদেশ থেকে। ইউরোপে ও আমেরিকায় বাংলাদেশের শ্রমিকের ক্ষতিপূরণ ও ন্যায্য মজুরির দাবিতে বিভিন্ন অভিজাত ডিপার্টমেন্ট স্টোর বয়কটের ডাক উঠেছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের পোশাক খাতের সংস্কার ও শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা শুরু হয়েছে। খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি গবেষণাপত্র রানা প্লাজার বর্ষপূর্তি উপলক্ষে প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টার্ন স্কুল অব বিজনেস।
চারদিক থেকে ব্যাপক চাপের মুখে পড়ে বড় করপোরেশনগুলো বাংলাদেশের সঙ্গে গার্মেন্টস খাতে নিরাপত্তাসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরে সম্মত হয়েছে। এ ব্যাপারে ইউরোপীয়রা এগিয়ে। সেখান থেকে ক্ষতিপূরণের অর্থও আসা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ সরকারও কিছু কিছু আইন সংস্কার করেছে, ন্যূনতম বেতন বাড়িয়েছে, ইউনিয়ন করার অধিকারও সীমিত আকারে দিতে রাজি হয়েছে। কিন্তু শুধু কাগজ-কলমে প্রতিশ্রুতি দিলে তো হবে না। যে অর্থ আসছে, তা যাতে নিহতের স্বজনেরা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাই নতুন আইনের প্রকৃত বাস্তবায়ন। ১৯০৩ সালের ট্রায়াঙ্গল অগ্নিকাণ্ডের পর আমেরিকায় শ্রমিক আইনের বড় রকম পরিবর্তন হয়। শ্রমিকদের সাংগঠনিক তৎপরতাও বহু গুণে বেড়ে যায়। বাংলাদেশে তেমন কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। শ্রমিকের দাবির পক্ষে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল শ্রমিক সংগঠনগুলোর। কিন্তু বাংলাদেশে প্রকৃত শ্রমিক আন্দোলনের অনেক আগেই মৃত্যু হয়েছে। যেমন মৃত্যু হয়েছে প্রকৃত ছাত্র আন্দোলনের। যাঁরা একসময় নাগরিক অধিকার ও গণতন্ত্রের দাবিতে বুকে গুলি পেতে নিয়েছেন, তাঁরা এখন ব্যস্ত চাঁদাবাজি ও টেন্ডার চালাচালিতে। যাঁরা একসময় টঙ্গীতে শ্রমিকের দাবির সমর্থনে মিছিল করতেন, তাঁদের কেউ কেউ এখন মন্ত্রী। ভয় হয়, রানা প্লাজা ধসে যে সহস্রাধিক শ্রমিক নিহত হয়েছেন, তাঁদের মৃত্যু না বৃথা যায়!
হাসান ফেরদৌস: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক।

শিল্পের বিকাশে চাই শ্রমিকের আস্থা

মহান মে দিবস শ্রমিকশ্রেণীর জন্য সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ দিন। আজ থেকে ১২৭ বছর আগে খোদ মার্কিন মুলুকের হে মার্কেটে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শ্রমিকশ্রেণীর যে বিজয় হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় শ্রমঘণ্টা আট ঘণ্টা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর বিশ্বব্যাপী শ্রমিকেরা এই দিনটিকে বিজয়, উৎসব ও অনুপ্রেরণার দিবস হিসেবে পালন করে আসছেন। কিন্তু বিশ্ব প্রেক্ষাপটে আজ এক ভিন্ন পরিস্থিতি বিরাজ করছে, বিশেষ করে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বে ধস নামার ফলে বিশ্ব পুঁজিবাদের আগ্রাসী ভূমিকায় পৃথিবীব্যাপী শ্রমিকশ্রেণী আক্রমণের সম্মুখীন।
এদিন এখন আবার সংগ্রামের দিবসে পরিণত হয়েছে। বিগত ১২৭ বছরে প্রযুক্তিবিপ্লবের মাধ্যমে পৃথিবীব্যাপী ঘটেছে অভূতপূর্ব বিজয়। মানুষ উন্নত থেকে আরও উন্নততর জীবন যাপন করছে। কিন্তু আমাদের দেশে এই চিত্রটা এখনো উল্টো। এখনো আমাদের শ্রমিক কর্মচারী তাঁর শ্রমের ন্যায্য মজুরি ও ন্যূনতম অধিকার থেকে বঞ্চিত। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের প্রেসক্রিপশনে বিরাষ্ট্রীয়করণের নামে দেশের বৃহৎ কলকারখানাগুলো আজ বন্ধ। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাটকল আদমজী জুট মিল, এশিয়ার বৃহত্তম পেপার মিল খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলসহ বড় বড় রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা বন্ধ করার ফলে দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত খাত একেবারে সংকুচিত হয়ে পড়েছে। বিরাষ্ট্রীয়করণের মাধ্যমে দেশের প্রায় সব কলকারখানা একের পর এক বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে আজ হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন এবং পরিবার-পরিজনসহ বসবাস করছেন এক অনিশ্চয়তায়। আমাদের দেশের শ্রমিকেরা আজও বাঁচার মতো মজুরি, আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮ মোতাবেক অবাধ ট্রেড ইউনিয়ন অধিকারসহ অন্যান্য ন্যায্য অধিকার থেকেও বঞ্চিত। আমাদের দেশের সিংহভাগ নির্মাণ, চাতাল, পরিবহন ও গার্মেন্টসজাতীয় শিল্পে অসংগঠিত শ্রমিকদের দিয়ে নামমাত্র মজুরিতে কাজ করানো হয়। তাঁদের কোনো নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না, তাঁদের কোনো ছুটির বিধান নেই, সমকাজে সমমজুরি দেওয়া হয় না, শহর-উপশহরগুলোতে বাড়িভাড়া দফায় দফায় বৃদ্ধি করার ফলে শ্রমিক-কর্মচারীদের আয়ের একটি বড় অংশ বাড়িভাড়া বাবদ পরিশোধ করতে হয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্য অযৌক্তিকভাবে দফায় দফায় বৃদ্ধি করার ফলে শ্রমিক-কর্মচারীরা আরও বিপাকে। প্রয়োজনীয় ক্যালরি ও পুষ্টির অভাবে ন্যূনতম মানসম্মত খাবার খেতে না পারায় শ্রমিক-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন রোগ ও পুষ্টিহীনতায় ভুগছে।
এর মধ্যে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের নীলনকশা এবং সরকারের ভ্রান্তনীতির ফলে বিশ্বায়ন-প্রক্রিয়ার জাঁতাকলে আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতি ও শিল্প পরিস্থিতি গুরুতর হুমকির সম্মুখীন। বিশ্বায়ন-প্রক্রিয়ায় জাতীয় শিল্প বিকাশের পরিবর্তে দেশ ক্রমে বি-শিল্পায়ন হচ্ছে। ফরমাল খাতের পরিবর্তে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ইনফরমাল খাত। আমাদের দেশের শ্রমিকেরা তাঁদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের ব্যাপারে আইএলও-স্বীকৃত ৮৭ ও ৯৮ ধারার কনভেনশন এবং প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী সংগঠন করতে চাইলে মালিক এবং সরকারি প্রশাসন মরিয়া হয়ে ওঠে তা ধ্বংস করতে। অথচ ইতিহাস বলে শ্রমজীবী মানুষের অবদানের জন্যই শিল্প ও কৃষিবিপ্লব হয়েছে। এই শ্রমজীবী মানুষ বিভিন্ন সৃষ্টির নির্মাতা হিসেবে যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন, তা আমাদের দেশের লুটেরা ধনিকেরা কোনোভাবেই বুঝতে চায় না। তাই শ্রমিকদের অনাস্থা নয় বরং আস্থায় নিয়েই শিল্পের উন্নয়ন ও বিকাশ সম্ভব। আমাদের দেশের সাধারণ শ্রমিকেরা কাজে দক্ষতা এবং মেধার দিক থেকে অতুলনীয়। শ্রমিকেরা জানেন একটি শিল্পকারখানার সঙ্গে মানুষের রুটি-রুজির সম্পর্ক এক ও অভিন্ন। তাই কলকারখানার ক্ষতি কোনোভাবেই শ্রমিকেরা চান না। হাজারীবাগ ট্যানারিসহ যেখানে দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়ন আছে, সেখানে সেই প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত। জাতির প্রত্যাশা একজন দেশপ্রেমিক শিল্পোদ্যোক্তা অবশ্যই শিল্প, শ্রমিক এবং দেশের স্বার্থ দেখবেন। কিন্তু আমাদের দেশের মালিকেরা এই তিনটির একটির কথা কখনো ভাবেন না। তাঁরা ভাবেন, কীভাবে তাঁরা তাঁদের মুনাফার পাহাড় গড়ে তুলবেন।
তাই আমাদের দেশে শিল্প বিকাশের পরিবর্তে গড়ে উঠেছে বিদেশি পণ্যের বাজার। অবশ্য এ জন্য মালিকদের বৈরী দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি সরকারের ভ্রান্তনীতিও সমভাবে দায়ী। এর পাশাপাশি এটাও ঠিক যে দেশে সুষ্ঠু ও দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়নের পরিবর্তে গড়ে উঠেছে একধরনের দলবাজি ট্রেড ইউনিয়ন। এরা সব সময় মালিক বা সরকারের ছত্রচ্ছায়ায় শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত থাকে। এরা শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত বন্ধু নয়। সাধারণ শ্রমিক ও দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়ন কোনো সময় শিল্প বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে না। তাই শ্রমিক-কর্মচারী তথা ট্রেড ইউনিয়নের ওপর দোষ চাপিয়ে লাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠানসহ রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প ব্যক্তিমালিকানায় ছেড়ে দেওয়ার চেষ্টা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক। প্রতিনিধিত্বমূলক এবং দায়িত্বশীল ট্রেড ইউনিয়ন কোনো সময় শিল্পবিকাশে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করে না। কারণ, তারা জানে, এ শিল্পের ওপর শ্রমিক বা তাঁর পরিবার-পরিজনের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। আমাদের দেশের অর্থনীতি, জাতীয় শিল্প এবং শ্রমশক্তিকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন দেশপ্রেম। দেশে যে জনশক্তি ও সম্পদ রয়েছে, সেটা পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব। যে উন্নয়নে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থরক্ষা হবে সেই কাজে শ্রমজীবী মানুষ তাঁর সর্বস্ব দিয়ে কাজ করতে প্রস্তুত। বিনিময়ে শ্রমিকেরা চান তাঁর ন্যায্য মজুরি, যার মাধ্যমে একজন শ্রমিক তাঁর পরিবার-পরিজন নিয়ে মৌলিক চাহিদা মেটাতে পারেন। শ্রমিকেরা তাঁদের মৌলিক অধিকার ও সামাজিক মূল্যবোধের স্বীকৃতি পান। শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রদানের মাধ্যমে শিল্প বিকাশ এবং উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব এবং এর মাধ্যমেই জাতীয় অর্থনীতি সুদৃঢ় হবে। তবেই শিল্প, শ্রমিক, দেশ ও জাতি সমৃদ্ধতর হবে।
ওয়াজেদুল ইসলাম খান: সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।