Thursday, August 1, 2024

'কার কাছে বিচার চাইব? আল্লাহর কাছে বিচার দিছি'

বিবিসি বাংলা, “রাতে পাঁচশ পুলিশ বাসা ঘেরাও করে। বাসায় আমরা পাঁচ/ছয়জন মহিলা শুধু। রাত তিনটা বাজে তখন। যে ঘরে শুয়েছিলাম সে ঘরের বারান্দার গ্রিলে লাঠি দিয়ে বাড়ি দিচ্ছিল। এর আগে দুই দিন না ঘুমানোতে তখন আমরা গভীর ঘুমে। অনেকক্ষণ পর যখন বের হই, বলে দরজা খুলেন। আমার সাথে খুবই খারাপ আচরণ করেছে তারা।”

বিবিসি বাংলাকে কথাগুলো বলছিলেন বাংলাদেশে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় নিহত হওয়া ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক তাহির জামান প্রিয়র মা সামছি আরা জামান। যিনি নিজে একজন ক্যান্সারের রোগী।

নিহত প্রিয়র বাড়িতে পুলিশি তল্লাশি

প্রিয় ‘দ্য রিপোর্ট’ নামে একটি অনলাইন সংবাদ মাধ্যমে সবশেষ ভিডিও জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ করেছেন। নতুন আরেকটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগে তিনি বেশ কিছু দিন মায়ের কাছে রংপুরে ছিলেন।

রংপুর থেকে ১০ই জুলাই রাতে ঢাকায় ফিরে আসেন। পরদিনই মায়ের সাথে শেষবারের মতো ভিডিও কলে কথা বলেছেন তিনি।

নিহত প্রিয়র সাথে থাকা সঙ্গীরা মিজ জামানকে জানান, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিকেল পাঁচটা নাগাদ মারা যান তিনি। রাজধানীর সেন্ট্রাল রোডে সংঘর্ষ চলাকালীন তিনি গুলিবিদ্ধ হন।

প্রিয়র মরদেহ ২১শে জুলাই রংপুরে নেওয়া হয়, সেখানেই দাফন করা হয় তাকে।

এরপর ওই দিনই মধ্যরাতে তার বাড়ি ঘেরাও করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তল্লাশি চালায় র‍্যাব ও পুলিশ। বাসার একটি দরজাও ভেঙ্গে ফেলা হয় বলে অভিযোগ করেন মিজ জামান।

রংপুরের জুম্মাপাড়ায় দোতলা একটি বাড়িতে থাকেন মিজ জামান। পুরো বাড়িতে নিজেরাই থাকেন, কোনও ভাড়াটিয়া নেই বলে জানান মিজ জামান।

র‍্যাবের পোশাক পরিহিত অবস্থায় এ তল্লাশি চালানো হয়। যাদের ইউনিফর্ম ছিল না, তাদের হাতে বড় বড় হাতুড়ি ছিল বলে দাবি করেন তিনি। দরজা খুলে দিলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তল্লাশির কোনও কারণ জানায়নি বলে তিনি জানান।

“দরজা খুলতে দেরি হওয়ায় তারা বলে ঢং করেন? আপনি টের পান নাই, ঢং করেন? টের পান নাই আমাকে বিশ্বাস করতে বলেন? কেন দরজা খুলব, এ প্রশ্ন করলেও তারা আমাকে কী কারণে, কেন আসছে বলেনি। চাবি খুঁজতে দেরি হচ্ছিল। তখন সাইডে একটা দরজা ছিল সেটা ভেঙ্গে তারা ছাদে উঠে যায়। পরে হাতুড়ি দিয়ে বড় দরজা ভাঙতে গেলে আমি বলি ভাঙতে হবে না। পরে দরজা খুলি”, জানান মিজ জামান।

মিজ জামানের স্বামী এক সময় রাজনীতিতে জড়িত থাকলেও অনেক বছর আগেই ছেড়ে দিয়েছেন। সে দিন রাতে তল্লাশি হতে পারে এমন আশঙ্কায় ছিলেন না বাড়িতে।

কারণ রংপুর শহরে তখন বাড়ি বাড়ি ঢুকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তল্লাশি করছিল বলে দাবি করেন নিহত প্রিয়র মা।

এখনও আতঙ্কে দিন কাটছে এই পরিবারের। রোববার দুপুরে যখন বিবিসি বাংলার প্রতিবেদকের সাথে কথা হচ্ছিল তখন জানান আবারও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আসতে পারে বলে খবর পেয়েছেন।

মিজ জামান বলেন, “গতকালকে আবার খবর পেলাম তারা আবার আসবে। রাতেও ঘুমাতে পারিনি। সারা রাত জেগে ছিলাম। এতো পুলিশ, এতো র‍্যাব এইভাবে বাসায় হামলা চালায় আমার জানা নেই!”

এমন কী পার্শ্ববর্তী স্বজনদের বাসাতেও তারা প্রবেশ করে দশটি ফ্ল্যাটেই তল্লাশি চালায় বলে তিনি জানান।

‘আল্লাহর কাছে বিচার দিছি’

চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলন চলার সময় ১৯শে জুলাই নিহত হন শিক্ষার্থী মাহমুদুর রহমান সৈকত। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে সৈকত ছিলেন তিন ভাই বোনের মধ্যে সবার ছোট।

সরকারি মোহাম্মদপুর মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন বলে পরিবার থেকে জানানো হয়।

এরই মধ্যে সাতটি কলেজে চান্স পেয়েছেন, তবে সাবজেক্ট চয়েজ দেওয়ার পরে এখনও চূড়ান্ত ফলাফল বেরোয়নি।

ঘটনার দিন দুপুরে সৈকতের বাবা মাহবুবুর রহমান গ্রামের বাড়িতে ছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে সৈকত নিজেদের মোহাম্মদপুরের নূরজাহান রোডের দোকানে বসেছিলেন।

আন্দোলনের এক পর্যায়ে সংঘর্ষ শুরু হলে দোকান বন্ধ করে বাসায় যাওয়ার জন্য বাবা ফোন করে তাকে বলেন বলে সৈকতের বোন সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী জানান। অথচ আর বাসায় ফেরা হয়নি সেবন্তীর ছোট ভাই সৈকতের।

সেবন্তী বিবিসি বাংলাকে বলেন, “ও দোকান থেকে দৌড়ে এসে মাকে বলে আব্বু শাটার বন্ধ করতে বলছে। মা বলে জলদি বন্ধ করে আসো। ও দোকানের শাটার বন্ধ করছে। পরে কী হইছে দেখার জন্য ও একটু আগায় গেছে। ও দেখছে ওর বন্ধুর গায়ে গুলি লাগছে। তো সেই বন্ধুর কাছে গেছে। এরপরে কী হইছে আমরা আসলে জানি না। তার গায়েও গুলি লাগে। তার মাথায় গুলি লাগে।”

ভাইকে ফোনে দ্রুত বাসায় যাওয়ার কথা বললে সৈকত 'যাচ্ছি' বলে জানায়। একই সাথে দোকানের সামনেই রয়েছে বলে জানায়।

ছেলের বাসায় ফিরতে দেরি দেখে নামাজ পড়ে তার মা আর ফুফাতো ভাই খুঁজতে বেরিয়ে যান। এর মধ্যে একবার বোন সেবন্তী ও বাবার সাথে কথা হয়। পরে আর কারও ফোন ধরেননি সৈকত। কিছু দূর এগিয়ে টিয়ারশেল আর গুলির শব্দে বেশি দূর যেতে পারেননি তার মা।

এর মধ্যে সৈকতের বাবা মাহবুবুর রহমান অনবরত গ্রামের বাড়ি থেকে ফোন করছিলেন ছেলের কাছে। এক পর্যায়ে ওই ফোন ধরেন অপরিচিত একজন।

“লোকটা ধরেই বলল আপনার ছেলে মারা গেছে। আব্বু বলে বাবা কী বল এই সব! উনি বলেন আপনারা কান্নাকাটি না করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আসেন, কারণ লাশ পরে যদি না পান! আব্বু ভাইয়াকে (ফুপাতো ভাই) ফোন দিয়ে বলে সৈকত গুলি খাইছে। সোহরাওয়ার্দীতে নিয়ে গেছে”, জানান সেবন্তী।

এরপর দ্রুত সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আসেন তিনি। সেখানে জরুরি বিভাগের মর্গে নিজের ভাইকে চিহ্নিত করেন। তার মাথার পেছনে একটা গুলির চিহ্ন ছিল বলে জানান সেবন্তী।

“১৯ তারিখে ঠিক তিনটা সাইত্রিশ মিনিটে তাকে গুলি করা হয়। আমি একটা ভিডিওতে দেখেছি।”

যাদের গুলিতে নিহত হয়েছেন সৈকত, তাদের কাছেই বিচার চাইতে নারাজ সৈকতের পরিবার।

সাবরিনা আফরোজ সেবন্তী বলেন, “কার কাছে বিচার চাইব? যে আমার ভাই মারছে তার কাছে বিচার চেয়ে লাভ আছে? যে বা যারা আমার ভাইকে মারছে ... আমার ভাইকে তো পুলিশ গুলি করছে। এখন আমি থানায় যেয়ে পুলিশের কাছে বিচার চাইব? যে আপনারা আমার ভাইকে খুন করেছেন, আপনারা বিচার করে দেন?”

এ বছরে ১১ই সেপ্টেম্বর সৈকতের বিশ বছর বয়স পূর্ণ হতো।

“আমরা কোনও মামলায় যাইনি। কারণ পরে বলবে পোস্ট মর্টেম কর, এই কর ওই কর। আমাদের ভাইকে দাফন করে দিছি, কোন পোস্ট মর্টেম করিনি। আল্লাহর কাছে বিচার দিছি। আল্লাহ যা ভালো বুঝে তাই করবে”, বলেন সেবন্তী।

বিবাহবার্ষিকীর দিনেই মৃত্যু

রংপুরে ১৯শে জুলাই সংঘর্ষে নিহত হন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোঃ মেরাজ। স্থানীয় পৌর বাজারে তিনি ভ্যানে করে কলা বিক্রি করতেন।

সেদিন বিবাহবার্ষিকী উপলক্ষে রাতে বাসাতেই ছোট্ট পরিসরে অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিলেন। সকালে বাজারও করেন। পরিবারের অন্যান্য আত্মীয়স্বজনদের আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন।

দুপুরে মসজিদে নামাজ পড়ে মেরাজ বাসায় ফেরেন।

এরপর বিশ্রাম নিয়ে বিকেল পাঁচটা নাগাদ জুম্মাপাড়ার বাসা থেকে বের হন মেরাজ। বাসায় স্ত্রী মোসাম্মত নাজনীন ইসলামকে রাতের অনুষ্ঠানের জন্য তৈরি হতে বলেন।

মিজ ইসলাম বিবিসি বাংলাকে বলেন, “আমার সংসারের ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে ওইদিন। শুধু পৌরবাজারের সামনে ওনার দোকান ঢাকতে গেছিল, মহাজনের টাকা দিয়ে আসবে বলেছিল। আমাকে বলছে ভালো কাপড় পরে রেডি হও। আমি তাড়াতাড়ি চলে আসবো- আমাকে বলে যায়।”

“উনি বাইরে গেছে। মানুষ ছুটাছুটি করতেছিল। একজনের গায়ে গুলি লাগছিল। সেখান থেকে তিনি সরে যাওয়ার সময়ই গুলিটা লাগছিল। পরে বাজারের লোকজন জানাইছে আপনার স্বামীর গুলি লাগছে। মেডিকেলে নিয়ে গেছে।”

সাড়ে পাঁচটায় রংপুর মেডিকেল হাসপাতালে গিয়ে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে স্বামীকে খুঁজেন নাজনীন ইসলাম। পরে একজন পরিচিত ব্যক্তির সাথে দেখা হলে জানায় পাঁচতলার একটা ওয়ার্ডে নেওয়া হয়েছে তাকে।

“ওনার অক্সিজেন মুখে দেওয়া। যখন আমি গেছি- দেখি যেখানে গুলি লাগছে ওই জায়গাটা মুছতেছে একটা ডাক্তার। চেহারার খুব খারাপ অবস্থা। আমারে দেখতে দিবে না, ডাক্তাররা আমাকে বের করে দেয় বলে চিকিৎসা শুরু করতেছি আপা আপনি যান। কিছুক্ষণ পরেই শুনি মারা গেছে”, বলেন মিজ ইসলাম।

নিহত মেরাজের দুই ছেলে। বড় ছেলে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী। ছোট ছেলের বয়স মাত্র তিন বছর। নাজনীন ইসলামের দুশ্চিন্তা এতোদিন কোনও ক্রমে তবু দিন এনে দিন খেতেন, কিন্তু এখন কীভাবে চলবে? ফোনে কথোপকথনের সময় কাঁদতে থাকেন তিনি।

“আমি তো কল্পনা করতেই পারতেছি না। আমি কার কাছে যাব? কাউকে চিনি না। এতোদিন কর্ম করে খাইতে দিত। সন্তুষ্ট থাকতাম আমি। এখন দুই সন্তান, শাশুড়িকে নিয়ে যে কী করব? উপরওয়ালাই জানে, আমি কিছুই বুঝতে পারি না!” বলতে থাকেন মিজ ইসলাম।

নামাজ পড়তে বের হয়ে নিহত

রাজধানী ঢাকার আজিমপুর সরকারি স্টাফ কোয়ার্টারের মসজিদে আসরের নামাজ পড়তে লালবাগের আমলিগোলার বাসা থেকে বের হয়েছিলেন খালিদ হাসান সাইফুল্লাহ। ধানমণ্ডির আইডিয়াল কলেজের ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন তিনি।

ঘটনার দিন ১৮ই জুলাই, বৃহস্পতিবার। বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে ছয়টার মধ্যে নামাজ শেষ করে বাসায় ফিরছিলেন তিনি।

আন্দোলনকারীদের ধাওয়া করে সেই সময় পুলিশও কোয়ার্টারে ঢুকে পড়ে। তারা এ সময় গুলি করে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা বলেছেন।

নিহত খালিদের বাবা কামরুল হাসান বিবিসি বাংলাকে বলেন, “মাকে বলে যায় মসজিদে আসরের নামাজ পড়তে যাচ্ছি। রাতে এগারোটায় চেম্বার শেষ করে বাসায় আসার পর ওর মা বলে নামাজ শেষ করে এখনও বাসায় ফেরে নি সাইফুল্লাহ।”

“আমি ওর মোবাইলে ফোন করি। অপরিচিত একজন ফোন ধরে আমাকে আমলিগোলা মক্কা হোটেলের সামনে যেতে বলে। সেখানে গেলে ছেলের মোবাইল হাতে দেয় আমাকে। এমন কী আমার ছেলের নামও ওরা জানত না। ওরা আমাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যায়।”

পরে তাকে মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়, যেখানে অনেকগুলো একই বয়সী ছেলের লাশ দেখতে পান তিনি। সেখানেই নিজের ছেলের দেহ শনাক্ত করেন মি. হাসান।

শটগানের অন্তত ৭১টি ছররা গুলির চিহ্ন ছিল খালিদের শরীরে।

“অনেকগুলো লাশ একই বয়সের। ১৬ থেকে ১৮ বছরের অনেকগুলা লাশ। আমার ধারণা প্রায় ১৮/১৯টা লাশ ছিল ছোট্ট একটা রুমে গাদাগাদি করে। একপাশে ওর লাশটাকে খুঁজে পেলাম। ছেলের গায়ে খয়েরি পাঞ্জাবি ও সাদা পায়জামা পরা ছিল। টুপি ছিল, কেউ খুলে নেয়নি”, বলেন মি. হাসান।

পরে ডেথ সার্টিফিকেট দিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ থানায় বিষয়টি অবহিত করতে পরামর্শ দেয় খালিদের বাবাকে। কারণ পুলিশি ক্লিয়ারেন্স ছাড়া ময়না তদন্ত করে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

লালবাগ থানা থেকে এই ক্লিয়ারেন্স পেতে বৃহস্পতিবার গভীর রাত আড়াইটায় সেখানে যান মি. হাসান। শুধু পুলিশি এই ক্লিয়ারেন্স পেতেই প্রায় তিন দিন সময় লেগেছে।

একই সাথে চরম ভোগান্তিও পোহাতে হয়েছে নিহতের পরিবারকে। থানা থেকে অসহযোগিতার অভিযোগ করেন মি. হাসান।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, “তারা ওই তিন দিনে বারবারই বলে হাসপাতালে লোক পাঠাচ্ছি। কিন্তু তারা কাউকে পাঠায় নাই। হাসপাতাল বলে ওনারা না আসলে হবে না। এরকম করে শুধু ১৯ তারিখই থানা টু মর্গ, মর্গ টু থানা আট/দশবার যাওয়া আসা করি!”

সবশেষ রোববার ময়না তদন্ত শেষ করে বিকাল সাড়ে চারটায় খালিদের লাশ দেওয়া হয় বলে জানান মি. হাসান। পরে ফরিদপুরে গ্রামের বাড়িতে দাফন করা হয় খালিদকে।

তিনি বলেন, “কোনও বিক্ষোভে যায় নাই আমার ছেলে। নামাজ পড়তে গিয়ে লাশ হয়।”

গুলিতে মারা যান জিসান, শোকে আত্মহত্যা স্ত্রীর by ফাহিমা আক্তার সুমি

আঠারো বছর বয়সী আব্দুর রহমান জিসান। ১৪ মাস আগে ভালোবেসে বিয়ে করেন রাবেয়া মিষ্টিকে। দোকানে দোকানে পানি সরবরাহের কাজ করতেন। তার বাবা একজন প্রবাসী। জিসানের মা-স্ত্রী ও একমাত্র বোনকে নিয়ে ভাড়া থাকতেন যাত্রাবাড়ী থানার রায়েরবাগ এলাকায়। গত ২০শে জুলাই চলমান কোটা বিরোধী আন্দোলনকে ঘিরে সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান তিনি। ছেলের মৃত্যুর খবর পেয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দেশে আসেন বাবা বাবুল সরদার। তবে পরিবারটিতে এক মৃত্যুর শোক কাটতে না কাটতেই নেমে আসে আরেকটি শোক। জিসানের মৃত্যুতে ভেঙে পড়েন তার স্ত্রী মিষ্টি। শোক সইতে না পেরে স্বামীর মৃত্যুর ৯ দিনের মাথায় আত্মহত্যা করেন মিষ্টি।একসঙ্গে ২ জনকে হারিয়ে শোকে স্তব্ধ পরিবারটি।

জিসানের মা জেসমিন বেগম মানবজমিনকে বলেন, ২০শে জুলাই বিকালে রায়েরবাগ ২ নম্বর গলিতে শ্বশুরবাড়ির সামনেই গুলিবিদ্ধ হন জিসান। আমার দুই ছেলেমেয়ে। জিসান পরিবারের ছোট। ওরা আমার বাচ্চাটাকে গুলি করে মেরে ফেলছে। সে পানি সরবরাহের কাজ করতো। গুলিবিদ্ধ হওয়ার কতোক্ষণ আগেও ৭টা পানি দিয়েছে। চারিদিকে যখন এই গোলাগুলির শব্দ তখন অনেকে আতঙ্কে বের হয়ে দেখতে যায়। এমনই আমার ছেলেও গলির মধ্যে বের হয়। ও যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল জায়গাটা তার শ্বশুরবাড়ির ছাদ থেকে দেখা যায়। গুলিটা এক চোখ হয়ে মাথার পেছন দিয়ে বের হয়। গুলি খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবা বাবা বলে পড়ে যায় জিসান। পরে আশপাশে থাকা পরিচিতরা তাকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়, সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেলে নিলে কিছুক্ষণ পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। আামি খবর পেয়ে ঢাকা মেডিকেলে গেলে জিসানকে মৃত দেখতে পাই। পরেরদিন মেডিকেলের মর্গ থেকে তার মরদেহ দেয় আমাদের। লাশ আনতেও অনেক যুদ্ধ করতে হয়েছে।

রায়েরবাগে জিসানের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার মা ছেলে ও পুত্রবধূর ব্যবহার করা জিনিসপত্র ধরে আহাজারি করছেন। একমাত্র বোনটিও ঘরের কোণে কাঁদছে। তার বোনের দুই শিশুসন্তানও রয়েছে। পুরো ঘরটি যেন স্তব্ধ। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তার মা বলেন, আমরা কারও কাছে বিচার চাই না, আমরা বিচার চাই আল্লাহর কাছে। জিসানের বাবা বিদেশে ছিল। ছেলের মুখটা শেষবারের মতো দেখার জন্য একরাত একদিন ছেলের মরদেহ ফ্রিজিং গাড়িতে রেখে দিয়েছিলাম। সে সোমবার সন্ধ্যার আগে দেশে এসে পৌঁছায়। নেট না থাকায় তাকে খবর পাঠানোরও কোনো উপায় ছিল না। পরে মানুষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে মোবাইলে রিচার্জ করে তাকে খবর জানানো হয়। জিসানের কোনো সন্তান নেই। তিনি বলেন, ওদের দু’জনের মধ্যে অনেক ভালোবাসা ছিল। তাদের সম্পর্ক করে বিয়ে হয়। বউ তার স্বামীর মৃত্যুটা কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। জিসান মারা যাওয়ার পর তার ব্যবহৃত পোশাক নিয়ে বুকে জড়িয়ে রাখতো। কোনো খাবার খাওয়াতে পারিনি। স্বামীর শোকে ২৯ তারিখ দুপুরের দিকে ওর বাবার বাড়িতে ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস দেয়। আমার ছেলের বউ তার বাবার বাড়িতে যাওয়ার সময় আমাকে বলে, আম্মু তুমি অসুস্থ মেডিকেলে যাও। আমি তাকে বুঝিয়েছি অনেক। সে যতদিন বাঁচবে মেয়ের মতো আগলে রাখবো। আশপাশে কোনো মানুষের কোনো কথায় কান দিবা না। পাগলামি করতো, দরজা আটকায় দিতো। আমার ছেলে মারা যাওয়ার পর থেকেই বউ মারা যাওয়ার কথা বলতো সবসময়। আর বলতো তার স্বামীর পাশে তাকে যেন দাফন করা হয়। ছেলেকে মাতুয়াইল কবরস্থানে দাফন করা হয় আর বউকে তার বাবার বাড়ি রংপুরে দাফন করা হয়। এই বাসায় মার্চের দিকে ভাড়া ওঠি। জিসানের জন্ম এই এলাকাতে ৩৮ বছর ধরে আমরা ঢাকায় থাকি। ছেলেমেয়ে নিয়ে আমরা সবাই মিলেমিশে একসঙ্গে থাকতাম। আমাদের পরিবারে অনেক শান্তি ছিল। কী হয়ে গেল আমার? ছেলে পানি দিতো দোকানে দোকানে সেখান থেকে ১৫-১৬ হাজার টাকা বেতন পেতো। ঘটনার দিন সকালে ওর স্ত্রীকে নিয়ে বাজারে যায় প্রয়োজনীয় বাজার করে দিয়ে আবার বাইরে যায়। আমার ছেলে কোনো রাজনীতি করতো না। ওর মনমানসিকতা শিশুদের মতো ছিল। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করে আর করেনি। ওর ইচ্ছে ছিল একটা পানির লাইন কিনে ও ভবিষ্যতে আরও ভালো কিছু করবে। এই ঘরে আর থাকতে পারছি না, দম বন্ধ হয়ে আসছে, বাসা ছেড়ে দিয়েছি।

জিসানের বাবা বাবুল সরদার বলেন, এমন ঘটনা ঘটবে আমি কখনো ভাবিনি। পাঁচ মাস হলো বিদেশ গিয়েছি। আট বছর ধরে বিদেশ থাকি। আমি একজন রেমিট্যান্স যোদ্ধা। আমার দেশ আমার সন্তানের লাশ উপহার দিলো। ঘটনার দিন সকাল থেকে আমার কেমন যেন অস্থির লাগছিল। পরে বাড়িতে অনলাইন-অফলাইন কল দিয়ে কোনোভাবে সংযোগ করতে পারছিলাম না। আমরা দুই জনের আয়ে আমাদের সুন্দর একটা সংসার ছিল। আমার ছেলেকে তার শখের মোটরসাইকেল কিনে দেইনি এক্সিডেন্টের ভয়ে। আর সেই ছেলেকে আজ গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিলো।

হানিয়া হত্যাকাণ্ডে ইরানের জনমানসে নানা প্রশ্ন!

হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান ইসমাইল হানিয়াকে কে বা কারা হত্যা করেছে এ বিষয়টি এখনও নিশ্চিত নয়। তবে তিনি যে হত্যার স্বীকার হয়েছেন এ বিষয়টি নিশ্চিত। কিন্তু ইরানের মাটিতে একজন মিত্রের এমন মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে দেশটির বিপ্লবী গার্ডের শক্তিমত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইরানের সাধারণ জনগণের মনে বিপ্লবী গার্ডের ব্যর্থ হওয়া নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। কীভাবে একজন অতিথিকে ইরানের ভিতরেই হত্যার সুযোগ পেল দুর্বৃত্তরা, সে বিষয়ে প্রশ্ন করছেন দেশটির রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। বলা হচ্ছে এতে দেশটির পররাষ্ট্র বিভাগ বেশ চাপে পড়তে যাচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক গণমাধ্যম মিডেলইস্ট আইয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হানিয়াকে হত্যার মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। এরপর এভাবে চোরাগোপ্তা হামলায় কিভাবে এমন একজন উচ্চপদস্থ নেতাকে হত্যা করতে পারে দুর্বৃত্তরা, এখন জনমনে শুধু এসব প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। যেখানে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা জোরদার করতে বিপ্লবী গার্ডের মতো চৌকস একটি দল রয়েছে।

এভাবে ইরানের অভ্যন্তরে ঘনিষ্ঠ মিত্রের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার বিষয়টিতে হতবাক হয়েছে ইরানের জনগণ। হামাস এবং ইরানের দাবি ইসরাইল এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত। এখন প্রশ্ন হচ্ছে ইরানে কী এখনও ইসরাইলি গোয়েন্দা বাহিনীর নেটওয়ার্ক শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে? মাত্র কয়েকদিন আগেই ইরানের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী এসমেইল খতিব গর্ব করে বলেছিলেন যে, তারা ইরানে মোসাদের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করেছে।
কিন্তু হানিয়া হত্যার মধ্য দিয়ে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তায় দুর্বলতাই যেন প্রকাশ পেল আরেকবার। ইরানের পার্লামেন্টের সদস্য হোসেইন-আলি হাজি ডেলিগানি বলেছেন, ইসমাইল হানিয়া হত্যাকাণ্ডে অনুপ্রবেশকারীদের উপস্থিতি অস্বীকার করা যায় না। ইসরাইলকে প্রতিশ্রুতির চেয়ে কঠোর জবাব দেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ওই নেতা।

ইরানের সাবেক সংসদ সদস্য আলী মোতাহারী বলেছেন, ইরানিরা প্রশ্ন তুলেছে জায়নবাদীরা কীভাবে তেহরানে তাদের অতিথি হানিয়ার অবস্থান নিশ্চিত করতে পেরেছে? মানুষের মনে সন্দেহ জেগেছে মে মাসে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় নিহত ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইব্রাহীম রাইসির মৃত্যু কি স্বাভাবিক ছিল নাকি তিনিও মোসাদের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন?

হানিয়ার হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার পারদ যেন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। এদিকে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ইতোমধ্যেই ইসরাইলে হামলা করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে তেহরানের সর্বশেষ বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেশটির নিরাপত্তার ব্যর্থতা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে বার বার। 

সহিংস দমনপীড়ন বন্ধে আন্তর্জাতিক তীব্র চাপে বাংলাদেশ: ভয়েস অব আমেরিকার রিপোর্ট

কোটা আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সহিংস দমনপীড়ন বন্ধে বাংলাদেশের ওপর তীব্র হচ্ছে আন্তর্জাতিক চাপ। গত সপ্তাহে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে সরাসরি গুলি করে পুলিশ, সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক বাহিনী। এসব ঘটনার ভিডিও ক্লিপ ও ফটো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর এই চাপ তীব্র হচ্ছে। অনলাইন ভয়েস অব আমেরিকায় প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ফেসেস গ্রোয়িং ক্রিটিসিজম ফর ভায়োলেন্ট ক্র্যাকডাউন অন স্টুডেন্টস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়। এতে সাংবাদিক শেখ আজিজুর রহমান লিখেছেন, শিক্ষার্থীদের প্রতি নমনীয় হওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সহ অনেকে। ১লা জুলাই সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল করে হাইকোর্ট। এরপর শুরু হয় শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ। তাদের এই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা সাধারণ জনগণের কাছ থেকে ব্যাপক সমর্থন পাচ্ছেন। বাংলাদেশে বেকারত্বের হার অনেক বেশি। যে দেশ এই উচ্চ বেকারত্ব মোকাবিলা করছে সেখানে সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে শতকরা ৩০ ভাগ কোটা সংরক্ষিত রাখা হয় মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতিদের জন্য।
তারা এই কোটা সংশোধন করে চাকরিক্ষেত্রে মেধাভিত্তিক ব্যবস্থার দাবি জানাতে থাকেন। তাদের এই আন্দোলন শান্তিপূর্ণ ছিল। কিন্তু নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ বুলেট, ছররা গুলি এবং কাঁদানে গ্যাস ছোড়ার পর তা সহিংস হয়ে ওঠে। পুলিশ এবং হাসপাতালের তথ্যমতে, ১৬ থেকে ২২শে জুলাইয়ের মধ্যে সহিংসতায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ২০০ মানুষ। বহু মৃত্যুর তথ্য নিবন্ধিত হয়নি। কারণ, এসব নিহতের দেহ হাসপাতাল বা পুলিশ স্টেশনে যায়নি। বেসরকারি তথ্যে বলা হচ্ছে নিহতের সংখ্যা ৩০০ থেকে ৫০০’র মধ্যে।

এই অস্থিরতার জন্য গত সপ্তাহে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’কে দায়ী করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য তিনি পুলিশ, আধা-সামরিক বাহিনী এবং সেনাবাহিনীকে মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি বিক্ষোভকারীদের জঙ্গি (মিলিট্যান্ট) বলে অভিহিত করেন। ২০০৯ সাল থেকে ক্ষমতায় আছেন প্রধানমন্ত্রী। কর্তৃত্ববাদী এবং দুর্নীতির জন্য তাকে অভিযুক্ত করা হয়। গত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে জালিয়াতির অভিযোগ আছে তার দলের বিরুদ্ধে। তবে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে তার দল।

২১শে জুলাই বেশির ভাগ কোটা বাতিল করে দেন সুপ্রিম কোর্ট। কোর্ট রায়ে বলেন, সরকারি চাকরিতে শতকরা ৯৩ ভাগ নিয়োগ দিতে হবে মেধার ভিত্তিতে। এর মধ্যদিয়ে বিক্ষোভকারীদের গুরুত্বপূর্ণ একটি দাবি পূরণ হয়েছে। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা বলছেন, তাদের সর্বশেষ দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিবাদ অব্যাহত থাকবে। সোমবার তারা এক বিবৃতিতে বলেছেন- স্বরাষ্ট্র ও আইনমন্ত্রীসহ চারজন মন্ত্রীকে মন্ত্রিসভা থেকে সরিয়ে দিতে হবে। তারা আরও দাবি করেছেন রাজপথে শিক্ষার্থীদের দিকে যেসব পুলিশ এবং ক্ষমতাসীন দলের ‘গুণ্ডারা’ গুলি করেছে, তাদেরকে গ্রেপ্তার করতে হবে এবং নিরস্ত্র প্রতিবাদীদের হত্যা করার জন্য তাদের বিচার করতে হবে।

এর জবাবে ছাত্রনেতা এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার শুরু করে সরকার। ঢাকাভিত্তিক একটি মানবাধিকার গ্রুপ বলেছে- কয়েকদিনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কমপক্ষে ১০ হাজার মানুষকে। এর বেশির ভাগই শিক্ষার্থী। ছাত্রদের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এমন কমপক্ষে ৫০ জন সমন্বয়কের মধ্যে কমপক্ষে ১০ জনকে এরই মধ্যে আটক করেছে পুলিশ। এর মধ্যে একজন সমন্বয়ককে পুলিশ হেফাজত থেকে অল্প সময়ের জন্য ছেড়ে দেয়ার পর আবার আটক করা হয়েছে। তিনি বলেছেন, নিরাপত্তা হেফাজতে তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে। তাদেরকে চাপ দেয়া হয়েছে আন্দোলন বন্ধ করতে। মঙ্গলবার বেশ কিছু ছাত্রনেতা এবং অধিকারকর্মী বলেছেন, সারা দেশে সেনা ও আধা-সামরিক বাহিনীর সহায়তায় তল্লাশি অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। তারা আটক করছে শিক্ষার্থীদের। তারা আরও বলছেন, ছাত্রদের মনোবল নষ্ট করতে এবং তাদের আন্দোলনের বিরুদ্ধে স্যাবোটাজ করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছে সরকার। বাংলাদেশভিত্তিক একজন অধিকারকর্মী বলেন, প্রতি রাতেই তারা বাড়ি বাড়ি তল্লাশি করছে। সেখান থেকে শিক্ষার্থী এবং তরুণ যুবকদের তুলে নিচ্ছে আন্দোলনে যোগ দেয়ার অভিযোগে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রতিশোধ নেয়ার ভয়ে এই অধিকারকর্মী নিজের নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। তিনি আরও বলেছেন, যাদের এভাবে তুলে নেয়া হয়েছে তাদের অনেককেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এর অর্থ হলো তারা জোরপূর্বক গুমের শিকার হয়ে থাকতে পারেন। রিমান্ডের নামে আটক কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। তিনি বলেন, এসব শিক্ষার্থী এবং তরুণ অধিকারকর্মীদের জামিন বাতিল করে এবং তাদেরকে রিমান্ডে পাঠানোর মাধ্যমে নির্যাতনে সহযোগিতা করছে বিচার বিভাগ।

হাজার হাজার শিক্ষার্থী এবং বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের গণগ্রেপ্তারের বিষয়ে সোমবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তনিও গুতেরাঁ। তার মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক বলেছেন- বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন গুতেরাঁ। ডুজাররিক আরও বলেছেন, রাজধানী ঢাকা এবং নিউ ইয়র্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আমরা কর্তৃপক্ষকে আমাদের উদ্বেগ জানিয়ে দিয়েছি। জাতিসংঘে শান্তিরক্ষা মিশনে শীর্ষ স্থানীয় সেনা পাঠানো দেশ বাংলাদেশ। তারা মানবাধিকারকে সম্মান জানাবে এবং সমুন্নত রাখবে এটা আমরা দেখতে চাই।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক আঞ্চলিক পরিচালক স্মৃতি সিং  সোমবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, সরকারকে চ্যালেঞ্জ জানানোর সাহস যে-ই দেখাবে তার কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিতে কর্তৃপক্ষ ডাইনিবিদ্যা (উইচহান্ট) ব্যবহার করছে। এরই অংশ হিসেবে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে গণগ্রেপ্তার এবং খেয়ালখুশিমতো আটক চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন, মানবাধিকার চর্চার প্রতিশোধ নিতে এসব গ্রেপ্তার পুরোটাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

আন্তর্জাতিক সমালোচনার বিষয়ে বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে ভয়েস অব আমেরিকা। কিন্তু এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রফেসর এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক আলী রীয়াজ বলেন, এবারের এই অভ্যুত্থানের কারণ হলো জনগণের মধ্যে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সহ ভোটাধিকার হীনতার অনুভূতি। তিনি ভয়েস অব আমেরিকাকে বলেন, বিপুল পরিমাণ মানুষ অর্থনৈতিক করুণ দশার মুখোমুখি। অন্যদিকে শাকসগোষ্ঠীর সঙ্গে যাদের যোগ আছে তারা লুটপাট করছে এবং অন্য দেশগুলোতে অর্থ পাচার করছে। রাজনৈতিক দিক থেকে পর পর তিনটি জালিয়াতির নির্বাচন তাদেরকে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে অংশ নেয়ার কোনো সুযোগই দেয়নি। এই অসন্তোষই বিস্ফোরিত হয়েছে, যা রূপ নিয়েছে আন্দোলনে।

সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্তে বাংলাদেশ সরকারকে চাপ দেয়ার আহ্বান দুই এমপির: বৃটিশ পার্লামেন্টে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ by আরিফ মাহফুজ

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জেরে সৃষ্ট বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার আলোচনায় সরব ছিল বৃটিশ পার্লামেন্ট অধিবেশন। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির দুই এমপি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রূপা হক ও আপসানা বেগম অধিবেশন চলাকালীন সময়ে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ নিয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আলোচনা করেন। বাংলাদেশের গত তিন সপ্তাহের অবস্থা পুনঃবিশ্লেষণ করে সরকারের পদক্ষেপ জানতে চান। এ সময় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘিরে সৃষ্ট সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্তের জন্য বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে যুক্তরাজ্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান আপসানা বেগম ও রুপা হক। তাদের উত্থাপিত এই দাবিতে হাত চাপড়ে সমর্থন করেন হাউজে উপস্থিত অনেক এমপি।

রূপা হক স্পিকারের উদ্দেশ্যে বলেন, আপনি ও আমি দুজনেই চীনের তিয়েন আনমেন স্কয়ারের ঘটনা মনে রাখার মতো বয়সী। বাংলাদেশে কোটা আন্দোলনকারীদের ওপর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগকে আমাদের সরকার যথাযথভাবে নিন্দা করেছে। এই ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্তের চাপ তৈরির জন্য আমি কি অনুরোধ করতে পারি?

রূপা হক স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, কীভাবে আমরা তাদের  তদন্তের ওপর আস্থা রাখতে পারি? যারা সব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং বহির্বিশ্বের সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করে যেখানে আন্তর্জাতিক উপাদান রয়েছে।

রূপা হকের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পার্লামেন্টারি আন্ডার সেক্রেটারি ক্যাথেরিন ওয়েস্ট বলেন, আমরা বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার প্রকৃতিসহ কয়েকটি বিষয় উত্থাপন করেছি, যা বাংলাদেশ সরকার গ্রহণ করছে।
এ বিষয়ে আমাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর অবস্থান খুবই স্পষ্ট আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে অধিবেশনে বলেন, বাংলাদেশে কোটা আন্দোলনকারীদের গণগ্রেপ্তার, জোরপূর্বক গুম, নির্যাতন, বেআইনি হত্যা ও ভিন্নমতের বিরুদ্ধে সরকারের দমন–পীড়ন আরও তীব্র হয়েছে।

আপসানা বেগম মন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন বলেন, আমাদের মন্ত্রী কি আমার সঙ্গে একমত, বাংলাদেশিদের অবশ্যই প্রতিবাদ করার অধিকারসহ তাদের মৌলিক মানবাধিকার প্রয়োগের অধিকার রয়েছে? তিনি কি বাংলাদেশে এবং সারা বিশ্বে দমন–পীড়নের মুখোমুখি বাংলাদেশিদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতে আমার সঙ্গে একত্র হবেন?

আফসানার প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী ক্যাথরিন আপসানার প্রশংসা করেন এবং একটি স্বাধীন নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা হবে বলে জানান।

সরাসরি গুলির দৃশ্য দেখেছি, অনুরোধ করলে সবচেয়ে উত্তম পন্থায় তদন্ত করবে জাতিসংঘ: ব্রিফিংয়ে স্টিফেন ডুজাররিক

বাংলাদেশে কোটা  বিরোধী ছাত্রদের আন্দোলনকে ঘিরে এক প্রশ্নের জবাবে জাতিসংঘ বলেছে, যেকোনো দেশ তদন্ত করার জন্য অনুরোধ করলে সবচেয়ে উত্তম পন্থায় তা করার চেষ্টা করবে জাতিসংঘ। যদি জাতিসংঘ নিজস্বভাবে তদন্ত করতে চায় তাহলে সংস্থাটির লেজিসলেটিভ বোর্ডের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল আনসারির এক প্রশ্নের জবাবে  বুধবার এ কথা বলেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরাঁর মুখপাত্র স্টিফেন ডুজাররিক। এদিন  ব্রিফিংয়ে তিনি বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে সংক্ষিপ্ত বিবৃতি দেন। তাতে বলেন রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সহিংসতা সত্ত্বেও বাংলাদেশে মানবিক সঙ্কট চলমান। ডুজাররিক বলেন, আমি আপনাদের বলতে পারি রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং সহিংসতা সত্ত্বেও আমরা দেখতে পেয়েছি এবং এটা সবার জন্য গুরুত্বপূর্ণ যে, বাংলাদেশে মানবিক সংকট চলমান। ঘূর্ণিঝড় রেমাল সহ বেশ কিছু জরুরি অবস্থার শিকার মানুষদের অব্যাহতভাবে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছি আমরা এবং আমাদের অংশীদাররা। এ বছর ঘূর্ণিঝড় রেমালে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এক কোটি ৩০ লাখ মানুষ। ইন্টারনেট বন্ধ, ব্যাংক বন্ধ এবং কারফিউয়ের মতো অপারেশন চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও আমাদের অংশীদাররা তাদের কাজ অব্যাহত রেখেছে। গত মাসে ১২ লাখ মানুষকে হিউম্যানিটারিয়ান রেসপন্স প্লানের অধীনে ৮ কোটি ডলারের তহবিল চালু করেছি আমরা এবং আমাদের অংশীদাররা।

এই আপিলে বর্তমানে শতকরা মাত্র ১৮ ভাগ তহবিল এসেছে। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা দেয়ার জন্য ৫ই জুন সেন্ট্রাল ইমার্জেন্সি রেসপন্স ফান্ড থেকে ৭৫ লাখ ডলার সহায়তা দেয়া হয়েছে।
অন্যদিকে সেন্ট্রাল ইমার্জেন্সি রেসপন্স ফান্ড থেকে আরও ৬২ লাখ ডলার অবমুক্ত করা হয়েছে ৪ঠা জুলাই। যমুনা অববাহিকায় বসবাসরত সম্প্রদায়কে নগদ অর্থ দেয়ার জন্য এটা দেয়া হয়েছে। কক্সবাজারে মিয়ানমারের শরণার্থীদের বড় রকমের মানবিক কর্মকাণ্ড চলছে। তাদেরকে সহায়তা দেয়া হচ্ছে। ডুজাররিকের এ বক্তব্যের পর সাংবাদিক মুশফিক জানতে চান- বাংলাদেশের বিভিন্ন অংশে প্রতিবাদী শিক্ষার্থীদের ওপর দমনপীড়ন চলছে। সেখানে ক্ষমতাসীন কর্তৃপক্ষ কি  রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানের তদন্তে জাতিসংঘের সহায়তা চেয়েছে এবং তাদের এই তদন্তে জাতিসংঘ কি কোনো সহায়তা দেবে? কারণ তাদের এই তদন্তে নিরপেক্ষতার ঘাটতি থাকে। এ প্রশ্নের জবাবে স্টিফেন ডুজাররিক বলেন, আপনার প্রশ্নের ভিতরে বেশ কয়েকটি বিষয় আছে। যেকোনো সরকার যদি বিভিন্ন ইস্যুতে আমাদের সহায়তা চায় তাহলে সবসময় তাদেরকে সহায়তা করতে প্রস্তুত আমরা এবং সেই তদন্ত আমরা সর্বোত্তম উপায়ে করি। স্বাধীন তদন্তের জন্য এসব বিষয়ে এই সংস্থার লেজিসলেটিভ বডির অনুমোদন প্রয়োজন। এর পরই মুশফিক তার কাছে জানতে চান- আপনি গাজায় নিহত সাংবাদিকের বিষয়ে কথা বলেছেন। সম্প্রতি বাংলাদেশে তিনজন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কেউ জানেন না তাদেরকে কোথায় রাখা হয়েছে। সাঈদ খান নামে আমার একজন সহকর্মী আছেন তার মধ্যে। কেউ জানেন না, তিনি কোথায় আছেন। ডুজাররিক বলেন, বাংলাদেশে সরকারের গুলির যে দৃশ্য আমরা দেখেছি, তাতে নিন্দা জানাই। সরকারগুলো, সেটা হোক বাংলাদেশ বা অন্য যেকোনো স্থানের তাদের উচিত জনগণকে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ বিক্ষোভ করার অধিকারকে সুরক্ষিত রাখা। সাংবাদিকরা যাতে অবাধে তাদের কাজ করতে পারেন সেজন্য তাদের অধিকার সুরক্ষিত রাখা উচিত।


রেমিট্যান্স কম আসলে দেশের অর্থনীতি ‘অসুস্থ’ হবে: মানবজমিনকে বিরূপাক্ষ পাল by সিদ্দিকুর রহমান সুমন

রেমিট্যান্স কমে আসলে অর্থনীতি ‘অসুস্থ’ হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউইয়র্কের অর্থনীতির অধ্যাপক প্রফেসর ড. বিরূপাক্ষ পাল। দৈনিক মানবজমিনের সঙ্গে আলাপচারিতায় তিনি জানান, কোটা আন্দোলন বেকারত্বের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার বিস্ফোরণ, আর সেই আন্দোলন থামাতে গিয়ে হামলা-গুলি ও ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ না।

তিনি বলেন, কোনো আন্দোলনই ইন্টারনেটে শুরু হয়নি, আবার ইন্টারনেটের কারণে শেষ হয়নি বরং এর কারণে বহুমুখী কুপ্রভাব পড়বে। বিশেষ করে অর্থনীতিতে ভয়ংকর অবস্থা হতে পারে। শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষের প্রাণহানি প্রবাসীদের মাঝে দাগ কেটেছে, তাদের বেশি অংশই শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেছে । তিনি এই আন্দোলনের পক্ষে ২০১৮ সালে কলাম লিখেছেন মন্তব্য করে তাকেও রাজাকার উপাধি দেওয়া হয় কি না সে ব্যাপারেও আশংকা প্রকাশ করেন।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, যারা পরিবার-পরিজনের জন্য দেশে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠান তারাও এখন বিকল্প পথ খুঁজতে পারেন। এমনিতেই দেশের ব্যাংকিং সেক্টরের বিভিন্ন অনিয়ম আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন আছে, প্রশ্ন আছে আইএমএফসহ বিভিন্ন সংস্থার শর্ত নিয়েও। এর মধ্যে যদি প্রবাসীরা মনঃক্ষুণ্ন হয়ে তাদের কষ্টের টাকা ব্যাংকিং চ্যানেলে না পাঠিয়ে অন্য পন্থা অবলম্বন করেন তাহলে আমাদের কপালে দুঃখ আছে। যে রিজার্ভ নিয়ে আমাদের এত পরিকল্পনা তার অন্যতম প্রধান উৎস কিন্তু রেমিট্যান্স। রেমিট্যান্স শক্তিশালী হলে রিজার্ভও শক্ত হয়, সুস্থ থাকে। কিন্তু এভাবে রেমিট্যান্স কমে আসলে দেশের অর্থনীতি ‘অসুস্থ’ হয়ে যাবে।

রিজার্ভ কমে গেলে আমদানি-রপ্তানির ওপর প্রভাব পড়বে। দেশে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি থামানো কষ্টসাধ্য হবে । যার প্রভাব পড়বে দেশের অন্য সেক্টরগুলোতে ।

তিনি বলেন, এটা অস্বীকার করার পথ নাই প্রবাসীরা দেশের আর্থিক চাকা সচল রাখতে অবদান রাখছেন। তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করলে তারাতো ক্ষুব্ধ হবেই, প্রবাসীরা ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠানো বন্ধ রাখায় একদিকে যেমন হুন্ডিতে লেনদেন বাড়বে তেমনি ব্যাংকিং চ্যানেলে না পাঠানোর কারণে দেশের আর্থিক খাতেও এর প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করেন তিনি ।

ড. বিরূপক্ষ পাল যত দ্রুত সম্ভব পরিস্থিতি স্থিতিশীল এবং দেশে বৈধ উপায়ে আরও বেশি রেমিট্যান্স পাঠানোর কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান ।

প্রসঙ্গত, রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষত আমদানি নির্ভর রপ্তানি খাত (যেমন তৈরি পোশাক) প্রয়োজনীয় কাঁচামালের অভাবে উৎপাদন চালু রাখতে হিমশিম খাবে। সাময়িকভাবে সরকার বন্ধুপ্রতিম দেশের মুদ্রায় ঋণ নিয়ে তা দিয়ে রপ্তানি খাতকে সাহায্য করতে চেষ্টা করলেও দীর্ঘ এমনকি মধ্যম মেয়াদেও তা টেকসই হবে না, কারণ বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের কাঁচামালের উৎস একক কোনো দেশ না বরং একাধিক এবং বৈচিত্র্যপূর্ণ। শ্রমঘণ রপ্তানিখাতে এমন যেকোনো সংকট দেশে দারিদ্র্যের হার এবং সামাজিক অস্থিরতা জ্যামিতিক হারে বাড়াবে।

চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের ২৭ দিনে ব্যাংকিং চ্যানেলে ১৫৬ কোটি ৭৫ লাখ (১.৫৭ বিলিয়ন) ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।

ব্যাংকাররা বলছেন, কোটা আন্দোলনের কারণে ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় রেমিট্যান্স কমেছে। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে দেশজুড়ে সহিংসতা, মৃত্যু, ইন্টারনেট বন্ধ, কারফিউ, মামলা, গ্রেপ্তার ও প্রবাসীদের উৎকণ্ঠার প্রেক্ষাপটে রেমিট্যান্স প্রবাহে আরও পতন দেখা দিয়েছে।

হাইস্কুলের শিক্ষার্থী থেকে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া, সবাই আওয়ামী লীগের বিপক্ষে কেন: প্রশ্ন সুজনের

২০০৯ সালে তরুণ সমাজের সমর্থনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় পেয়েছিল উল্লেখ করে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, এখন হাইস্কুলের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া, সবাই আওয়ামী লীগের বিপক্ষে। কেন এমন ঘটল, কী ঘটল। আজ ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট অচলাবস্থা নিরসনের দাবিতে এই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে সুজন।

কোটা আন্দোলনকে রোগের উপসর্গ উল্লেখ করে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, রোগটা আরও গুরুতর। জটিল ও ভয়াবহ রোগটা হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের কাছের না হলে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। ভোটাধিকার, আইনের শাসনের মতো মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হচ্ছে। এই অধিকারগুলো সমন্বিত। একটা বঞ্চিত হলে আরেকটা থেকেও বঞ্চিত হতে হয়। এসব অধিকার প্রতিষ্ঠা না হলে রোগের উপসর্গের চিকিৎসা হবে না, রোগ সারবে না উল্লেখ করে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, এটা এখন অধিকার আদায়ের আন্দোলন।

সংকট নিরসনে আন্তরিক বা কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না উল্লেখ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, সরকার একটা প্রলেপ দেয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু যে ক্ষত জাতির হৃদয়ে হয়েছে সেটা গভীর।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে ঘিরে যে ঘটনা, তা পুরো সমাজকেই প্রভাবিত করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে দিয়ে জনগণকে স্বস্তির জায়গায় আনা যাবে না।

তিনি বলেন, এত মানুষের প্রাণ নেওয়ার ঘটনাকে ক্ষমা করার সুযোগ নেই। এবার বিচার না পেলে বাংলাদেশ থেকে বিচার শব্দটা একেবারে উঠে যাবে। এবার যার যার অবস্থান থেকে বিচারের দাবি জানিয়ে যেতে হবে। স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায়, আন্তর্জাতিক মহলকে যুক্ত করে, জাতিসংঘের সংশ্লিষ্টতা নিশ্চিত করে বিচার না হওয়া পর্যন্ত চুপ হয়ে যাওয়ার বা শান্ত হওয়ার সুযোগ নেই।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, এই আন্দোলনে সরকারের নৈতিক ও রাজনৈতিক পরাজয় হয়েছে। ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ৬১ জন মারা গিয়েছিল। তার চার গুণ বেশি মানুষ মারা গেছে ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানে। এবারের গণ-অভ্যুত্থানে নারী, শিশু, চিকিৎসক, শিক্ষক—সব পেশার মানুষের সর্বজনীন উপস্থিতি ছিল। কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে সৃষ্ট ঘটনাকে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ জানিয়ে রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, একসময় বলতাম এরশাদের হাতে শিক্ষার্থীদের রক্ত ইতিহাস বলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ব্যর্থ হয় না। এবারের আন্দোলনও ব্যর্থ হবে না। টগবগে তরুণদের প্রাণ গেছে। রোবায়েত ফেরদৌস আরও বলেন, অনেকে দ্বিধায় ভোগেন আওয়ামী লীগ চলে গেলে কি বিএনপি-জামায়াত আসবে? আওয়ামী লীগ ব্যর্থ হয়েছে, বিএনপিকেও দেখেছি। জামায়াত-জাতীয় পার্টিকেও দেখেছি। সব রাজনৈতিক দল গণধিকৃত হয়, তাহলে সবাইকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে। নতুন সংবিধান লিখতে হবে। রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে নিজ দলের নেতা-কর্মীদের ভুয়া ভুয়া স্লোগানের মুখে পড়তে হয়েছে। মতবিনিময় ডেকে কথা বলতে না দেয়ায় এমন পরিস্থিতি হয়েছে। তার মানে আপনি নিজ দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সংলাপেই তিনি অসৎ, ধূর্ততার পরিচয় দেন। কীভাবে বিরোধীদের সঙ্গে সংলাপ করবেন? ছাত্রদের দাবির সঙ্গে সংলাপে কীভাবে সৎ হবেন?

নাগরিক উদ্যোগের জাকির হোসেন বলেন, আমাদের যারা শাসন করে, তাদের শাসন করার ন্যূনতম যোগ্যতা দরকার, সেটা ব্যর্থ হয়েছে। যে প্রশাসন চালাচ্ছে সেটার নৈতিক ভিত্তি নেই। তারা গত তিনটি নির্বাচন তারা উদ্ভাবনী ব্যবস্থায় করেছে, দেশের সংবিধান লঙ্ঘন করেছে। শ্বাসরোধ অবস্থার মধ্যে আছে জনগণ। পদে পদে নাগরিকেরা অপমানিত হচ্ছেন। জাকির হোসেন বলেন, পুলিশ বলছে তারা কাউকে মারেনি, সন্ত্রাসীরা মেরেছে। আমরা তো ছবি, ভিডিও দেখেছি। এসব পুলিশি তদন্ত করে লাভ হবে না। সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানে আসতে হবে।

মিথ্যাচার নির্ভর রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে সরে আসতে হবে: ইফতেখারুজ্জামান

মিথ্যাচার নির্ভর রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর মিন্টু রোডে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ের সামনে এক মানববন্ধনে এ আহ্বান জানান তিনি। ডিবি ‘হেফাজতে’ আটক থাকা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ৬ সমন্বয়কারী ও সকল শিক্ষার্থীর মুক্তি চেয়ে এই মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়। যদিও মানববন্ধন শুরু হওয়ার আগে ৬ সমন্বয়কারীকে ছেড়ে দেয় ডিবি। মানববন্ধনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নাগরিক সমাজ ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।

চলমান কোটা আন্দোলন প্রসঙ্গে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘শুধুমাত্র এই ৬ জন আটকের বিষয় নয়, সার্বিকভাবে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে এই সংস্থাগুলো, তার পেছনে মূল বিষয় হলো দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের মধ্যে একটা সম্পূর্ণ ভুল ধারণা হয়েছে। সেই ধারণা হচ্ছে-তারা বিচারহীনতা উপভোগ করতে পারবে চিরদিন। যদি তাই হয়, তাহলে আপনি কেন মিথ্যা কথা বলছেন। বন্ধ করুন মিথ্যা কথা। আপনি বলুন-আমি নির্বিচারে গুলি করেছি। ছাত্রদের হত্যা করেছি।
এই মিথ্যাচার নির্ভর সরকার ও রাষ্ট্র পরিচালনা থেকে সরে আসতে হবে। কারণ দেশবাসী জেনে গেছে, এটা মিথ্যাচারের কারাগার।’

সংবিধান লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘উচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সকল প্রতিষ্ঠানগুলো মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছে। প্রতারণার আশ্রয় নিয়েছে। প্রতিটা বিষয়ে জনগণকে মূর্খ মনে করেছে, অথচ নিজেরা যে মূর্খতার পরিচয় দিয়েছে সেটা তারা ভুলে গেছে। এই মূর্খতা, অন্ধত্ব এবং মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়ে তারা যে কাজগুলো করেছে সেটা সম্পূর্ণভাবে সংবিধান লঙ্ঘন করেছে, আইনের লঙ্ঘন করেছে।’

সরকারি বিভিন্ন সংস্থাকে উদ্দেশ্য করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘জাতীয় ও আন্তর্জাতিক যে পেশাগত উৎকর্ষের কথা তারা বলে থাকেন, যে প্রশিক্ষণ তারা পেয়েছেন সেগুলোকে পদদলিত করে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা ভুলে গেছে তাদের মানদণ্ডে দেশবাসীকে বিচার করার কেনো সুযোগ নেই। দেশবাসী তাদের মতো মূর্খ নয়। তারা যে মিথ্যাচার করেছে, মূর্খতা দেখিয়েছে সেটা দেশবাসী বুঝে গেছে।’

জাতিসংঘের অধীনে তদন্তের আহ্বান জানিয়ে অর্থনীতিবিদ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, গুলি করে শিশুসহ নির্বিচারে মানুষ হত্যার তদন্ত জাতিসংঘের অধীনে করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুল বলেন, এই হত্যার বিচার করতে হবে। হুমকিদাতাদেরও বিচার করতে হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ‘আমরা আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি পুলিশ চাই না। আমরা বাংলাদেশের পুলিশ চাই। আপনার (পুলিশ) জনগণের জন্য কাজ করবেন। বাংলাদেশের পুলিশ হবেন।’

মানববন্ধনে আরও অংশ নেন অর্থনীতিবিদ মোস্তাফিজুর রহমান, অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম ইন বাংলাদেশের (এএলআরডি) নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, মানবাধিকারকর্মী শিরীন হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক গীতি আরা নাসরীন ও সামিনা লুৎফা প্রমুখ।

হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়া ইরানে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে নিহত হয়েছেন

অত্যাধুনিক গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে হামাসের রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়াকে হত্যা করা হয়েছে। সৌদি বার্তা সংস্থা আল হাদাথকে উদ্ধৃত করে এই খবর দিয়েছে অনলাইন বিবিসি। এতে বলা হয়, স্থানীয় সময় রাত দুই টার পর ইসমাইল হানিয়ার ওপর ওই হামলা চালানো হয়। ইরানের বিপ্লবী গার্ডের সাথে সম্পৃক্ত ফারস নিউজ জানিয়েছে, হানিয়া তেহরানের উত্তরাঞ্চলের একটি বাসভবনে অবস্থান করছিলেন এবং তাকে দূর থেকে লক্ষ্যবস্তু করে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তবে এই প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত এখনও বিস্তারিত তথ্য জানা সম্ভব হয়নি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়, ইসমাইল হানিয়া রাজধানী তেহরানে হামলায় নিহত হয়েছেন। একইসঙ্গে তার দেহরক্ষীদের একজনও নিহত হন।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীও হামাসের এ শীর্ষ নেতার নিহত হওয়ার খবর জানিয়েছে। তবে তিনি কীভাবে নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে মঙ্গলবার তেহরানে গিয়েছিলেন হানিয়া। যে ভবনে তারা অবস্থান করছিলেন, সেখানে হামলা চালানো হলে হানিয়া এবং তার একজন দেহরক্ষী নিহত হন।
এর আগে গত জুনে ইসমাইল হানিয়ার পারিবারিক বাসস্থানে ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী বিমান হামলা চালায়। সেই হামলায় তার বোনসহ অন্তত ১০ জন নিহত হন।
গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরাইলের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে নজিরবিহীন হামলা চালায় হামাসের যোদ্ধারা, সেসময় হামাসের এই নেতা সহ সংগঠনটির অন্যান্যদেরও হত্যার হুমকি দেয় ইসরাইল। সেই সূত্রে হত্যাকারীদের বিষয়ে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ইসরাইলকেই সন্দেহের প্রথমে রাখতে চাইছে অনেকে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কে এই ইসমাইল হানিয়া। কিভাবে তিনি মধ্যপ্রাচ্যে বছরের পর বছর ধরে হামাসের নেতৃত্ব দিয়েছেন।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান হিসেবে কাতারে বসবাস করতেন হানিয়া। সেখান থেকেই তিনি হামাসকে পরিচালনা করতেন। ১৯৮০ এর দশকের শেষের দিকে হামাসের র‌্যাডিক্যাল অপারেশনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি।
এছাড়া সেসময় ইসরাইলি বাহিনীর কাছে বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন হামাসের প্রভাবশালী এই নেতা। ১৯৯২ সালে জেল থেকে তাকে হামাসের অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননের একটি জনমানবশূন্য এলাকায় নির্বাসিত করা হয়। এর এক বছর পর তিনি গাজায় ফিরে আসেন। ১৯৯৭ সালে হামাসের আধ্যাত্মিক নেতা এবং প্রতিষ্ঠাতা শেখ ইয়াসিনের অফিসের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পান।

২০০৬ সালে যখন ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ পশ্চিম তীর এবং গাজায় সংসদীয় নির্বাচন করেছিল, তখন হানিয়া হামাসের সংসদীয় নেতা নির্বাচিত হন। সেসময় হামাস নির্বাচনে বিস্ময়করভাবে বিজয় অর্জন করে এবং হানিয়া ‘ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী’ নির্বাচিত হন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের দল ফাতাহ এবং হামাসের মধ্যে এ বিষয়ে মতবিরোধ দেখা দেয় এবং তাদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। ফলে ২০০৭ সালে প্রেসিডেন্ট আব্বাস হামাস সরকার ভেঙ্গে দেন। হানিয়া আব্বাসের ওই সিদ্ধান্ত না মেনে গাজা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখেন। হানিয়া ২০১৭ সালে গাজা থেকে পদত্যাগ করেন। একই বছর হামাসের রাজনৈতিক শাখার প্রধান হিসাবে কাজ শুরু করেন তিনি।
তিনি হামাসের প্রধান হওয়ার ৬ বছরের মাথায় গত বছর ইসরাইলে হামলা করে হামাস। যা ইতিহাসে নজিরবিহীন। মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম দেশগুলোর সাথে হানিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিল অনেক গভীর। মূলত এ বিষয়গুলোকে আমলে নিয়ে ইসরাইল তাকে টার্গেট করে এবং গাজায় ইসরাইলের হামলায় হানিয়ার তিন ছেলে সহ পরিবারের বেশ কয়েক জনকে নিহত হন। কূটনৈতিক নীতিতে হানিয়া ছিলেন মধ্যপন্থী।

২০১৭ সালে গাজা ত্যাগ করার পর ইয়াহিয়া সিনওয়ার হানিয়ার স্থলাভিষিক্ত হন। ইয়াহিয়া একজন কট্টরপন্থী নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি দুই দশকের বেশি সময় ইসরাইলের কারাগারে বন্দী ছিলেন। ২০১১ সালে গাজায় বন্দী বিনিময় চুক্তির মাধ্যমে ইয়াহিয়াকে ইসরাইলের কারাগার থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন হানিয়া। এতে তার কূটনৈতিক প্রখরতার প্রমাণ পাওয়া যায়। কাতার ইউনিভার্সিটির ফিলিস্তিন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আদিব জিয়াদেহ তার মৃত্যুর আগে বলেছিলেন, ‘হানিয়া আরব সরকারগুলোর সঙ্গে হামাসের রাজনৈতিক যুদ্ধের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যাতে তার কূটনৈতিক প্রজ্ঞার বিষয়টি স্পষ্ট হয়।’ হামাসের সামরিক শাখার সফলতার পিছনেও হানিয়ার কূটনৈতিক দূরদর্শীতা বেশ কার্যকর ছিল। এছাড়া হানিয়া গাজায় যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে আরব দেশগুলোর সাথে কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির সঙ্গে দেখা করতে নভেম্বরের শুরুতে তেহরান সফর করেন হানিয়া। এছাড়া তিনি তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের সাথেও সাক্ষাৎ করেছেন।
যুবক বয়স থেকেই গাজার ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন হানিয়া। তিনি গাজার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রকর্মী ছিলেন। ১৯৮৭ সালে প্রথম ফিলিস্তিনের অভ্যুত্থান শুরু হলে তিনি হামাসে যোগ দেন। সেসময় প্রথম তিনি গ্রেপ্তার হন এবং কিছু সময়ের জন্য নির্বাসিত হন। তখন হামাসের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আহমাদ ইয়াসিনের একজন ঘনিষ্ঠজনে পরিণত হন। এছাড়া ইয়াসিনের পরিবারের সাথেও তার ভালো সখ্যতা গড়ে ওঠে। ১৯৯৪ সালে রয়টার্সকে হানিয়া বলেছিলেন, ইয়াসিন তরুণ ফিলিস্তিনিদের জন্য একজন মডেল ছিলেন। আমরা তার কাছ থেকে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা এবং ইসলামের জন্য আত্মত্যাগ শিখেছি এবং দখলদার এবং স্বৈরাচারীদের বিরুদ্ধে লড়াই করা শিখেছি।

২০০৩ সালে তিনি ইয়াসিনের একজন বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে পরিচিতি পান। সেসময় ইয়াসিনের সঙ্গে হানিয়ার একটি ছবিও বেশ আলোচনায় এসেছিল। পরে ২০০৪ সালে হামাসের প্রতিষ্ঠাতাকে হত্যা করে ইসরাইল। হামাসের রাজনৈতিক শাখা গঠনে হানিয়ার ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। ১৯৯৪ সালে হানিয়া বলেছিলেন যে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করা হামাসকে বাধা বিপত্তি মোকাবিলা করতে আরও সক্ষম করে তুলবে। প্রাথমিকভাবে হামাসের তৎকালীন নেতারা হানিয়ার এ প্রস্তাবে রাজি হননি। পরে ২০০৬ সালে ইয়াসিনের মৃত্যুর দুই বছর পর এ বিষয়ে ঐক্যমত হন হামাস নেতারা। এর এক বছর পরই ফিলিস্তিনি সংসদের নির্বাচনে জয়ী হয়ে হানিয়া ফিলিস্তিনের প্রধানমন্ত্রী হন। এরপর ২০০৭ সালে পুরো গাজা দখলে নেয় হামাস। ২০১২ সালে হামাস সশস্ত্র সংগ্রাম পরিত্যাগ করেছে কিনা রয়টার্সের এক সাক্ষাৎকারে হানিয়াকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন, হামাস রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং সামরিক সহ সকল প্রতিরোধ অব্যাহত রাখবে।

সাংবাদিক মেহেদীর ভাইয়ের প্রশ্ন কার বিরুদ্ধে মামলা করবো by মরিয়ম চম্পা

কার বিরুদ্ধে মামলা করবো? রাষ্ট্রের? রাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করে টিকতে পারবো তো। কেউ পেরেছে এখন পর্যন্ত। গণমাধ্যমকর্মীদের জীবনের নিরাপত্তা কে দেবে? আমরা অসহায়। মেহেদীর দুই শিশু কন্যা, তার স্ত্রীর এবং বৃদ্ধ বাবা-মায়ের এখন কী হবে সেটা ভেবেই আমরা চারদিকে অন্ধকার দেখছি। এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন ঢাকা টাইমস-এর নিহত সাংবাদিক হাসান মেহেদীর ছোট ভাই জাহিদ হাসান আশিক। মানবজমিনের সঙ্গে আলাপকালে আশিক বলেন, আমরা তিন ভাই। মেহেদী ছিল সবার বড়। ছোট ভাই সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। বাবাও পেশায় একজন গণমাধ্যমকর্মী ছিলেন। মা গৃহিণী। দীর্ঘদিন চাকরি করার পর আমরা বাবাকে সাংবাদিকতা থেকে অবসর নিতে বলি। হাসান মেহেদীর গ্রামের বাড়ি পটুয়াখালী জেলার বাউফলে। রাজধানীর একটি কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর শেষ করে সাংবাদিকতায় যোগ দেন। আশিক বলেন, ভাইয়া তার স্ত্রী এবং দুই কন্যা সন্তানকে নিয়ে কেরানীগঞ্জের ভাড়া বাসায় থাকতেন। ঘটনার দুই দিন আগে বাসা থেকে অফিসের কথা বলে বেরিয়ে আসেন। ১৮ই জুলাই বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর হঠাৎ একটি ফোন পেয়ে আমরা হাসপাতালে ছুটে আসি। এসে দেখি সব শেষ। ভাইয়ার মরদেহ ঢাকা মেডিকেলের একটি ট্রলিতে পড়ে আছে। তার বুক- পেট-গলা-মাথাসহ পুরো অংশ গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে। তিনি বলেন, আমি পেশায় একজন অভিনেতা। আমি আর ভাইয়ার টাকায় মূলত আমাদের সংসার চলতো। বাবা-মা ছোট ভাইকে নিয়ে গ্রামের বাড়ি থাকেন। ঘটনার পর তারা ঢাকায় এসেছেন। এরপর থেকে তারা দু’জনেই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। বাবার হার্টের সমস্যা রয়েছে। প্রতি সপ্তাহে তাকে অনেক টাকার ওষুধ খেতে হয়। মায়ের শরীর ভালো নেই। ভাইয়ার অবর্তমানে এখন সংসারের পুরো দায়িত্ব আমার কাঁধে। অভিনয় করে তেমন কোনো আয়- রোজগার নেই যেটা দিয়ে তিনটি পরিবারের খরচ চালাবো। তিনি বলেন, মেহেদীর স্ত্রী তার দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে গত রোববার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় ভাবীর হাতে একটি দশ লাখ টাকার চেক ডিপোজিট ও নগদ ৫০ হাজার টাকা তুলে দেয়া হয়।

ভাইয়ার অফিস থেকে তারা সহায়তা করার চেষ্টা করেছেন। এই অবস্থায় মেহেদীর অসহায় পরিবারের প্রতি কোনো বিত্তবান ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পাশে দাঁড়িয়ে তাদের দায়িত্ব নিলে হয়তো দুই সন্তান এবং স্ত্রী-বাবা-মা তারা মোটামুটি একটি স্বাভাবিক জীবন পেতেন। এবং আমার জন্য উপকার হতো। এর আগে পটুয়াখালীর হোসনাবাদ গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। মেহেদী অনলাইন সংবাদমাধ্যম ঢাকা টাইমসে কর্মরত ছিলেন। ১৮ই জুলাই সন্ধ্যায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে (ঢামেক) হাসপাতালে আনা হলে জরুরি বিভাগের চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন। এ বিষয়ে গণমাধ্যমকর্মী ইমাম হোসেন ইমন জানান, ওইদিন অন্য সাংবাদিকদের সঙ্গে থেকে পুলিশের পাশে দাঁড়িয়েই সংবাদ সংগ্রহ করেন হাসান মেহেদী। বিকালে পুলিশের একটি এপিসি থেকে কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের উদ্দেশ্যে টিয়ারশেল ও গুলি ছোড়া হচ্ছিল। এ সময় হাসান মেহেদী গুলিবিদ্ধ হন। তার মুখ, গলা ও বুক ও শরীরে অসংখ্য ছররা গুলির চিহ্ন দেখা যায়। ঢাকা টাইমসের সিনিয়র রিপোর্টার হাসান মেহেদী দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিটে কর্মরত ছিলেন। ঢাকায় তিনি কেরানীগঞ্জ এলাকায় পরিবারসহ থাকতেন। তার সাত মাস ও চার বছর বয়সী দুই কন্যা শিশু রয়েছে। ঢাকা টাইমস-এর নিউজ এডিটর দিদার মালিকি মানবজমিনকে বলেন, যেহেতু তার বাসা কেরানীগঞ্জে তাই যাত্রাবাড়ী এলাকায় সংঘর্ষ চলাকালে মেহেদী সেখানে ডিউটি করেন। এবং কিছুক্ষণ পরপর অফিসে আপডেট দিচ্ছিলেন। বিকাল ৪টা ৪৩ মিনিট পর্যন্ত তাকে ফোনে পাওয়া যায়। এ সময় সর্বশেষ তিনি জানান, একটি মৃতদেহ রাস্তায় পড়ে আছে। এরপর আর তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি। ফোনটি বারবার বন্ধ দেখাচ্ছিল। পরবর্তীতে আমরা ভেবে নেই হয়তো চার্জ ছিল না। কিন্তু সন্ধ্যার দিকে তার সঙ্গে থাকা এক সাংবাদিক অফিসে বিষয়টি জানালে আমরা ছুটে যাই। মেহেদীর নিথর দেহ হাসপাতালে পড়ে থাকতে দেখি। তিনি বলেন, একজন সহকর্মী হিসেবে সে অত্যন্ত কর্মনিষ্ঠ ছিলেন। কিন্তু এরকম একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনা আমারই সহকর্মীর সঙ্গে ঘটবে এমনটা প্রত্যাশা করিনি। বিষয়টি আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনার। আমরা অফিসের পক্ষ থেকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ওর পরিবারের পাশে থাকার চেষ্টা করছি।

‘বন্দুকের গুলি রাজুকে বাসায় ফিরতে দেয়নি’ by বিল্লাল হোসেন রবিন

মোবাইলে স্ত্রীর কল, তুমি কই? আমি বাড়ির সামনেই আছি। সবাই মার্কেটের আগুন দেখতেছে। আমিও সেখানে আছি। তুমি চিন্তা করো না, আমি চলে আসতেছি। কিন্তু বন্দুকের গুলি রাজুকে আর বাসায় ফিরতে দেয়নি। ২১শে জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের পাইনাদী নতুন মহল্লায় ক্যানেলপাড়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান মোটর মেকানিক সৈয়দ গোলাম মোস্তফা রাজু (৩৫)।

বুধবার দুপুরে কথা হয় নিহত রাজুর স্ত্রী আকলিমা আক্তারের সঙ্গে। তিনি জানান, বিকাল সাড়ে তিনটা কি পৌনে ৪টায় দুপুরের খাবার খেতে বাসায় আসে রাজু। কয়েকদিন ধরেই চিটাগাং রোডের অবস্থা ভালো না। খাবার খাওয়ার সময়ই আমাদের বাসার জানালা দিয়ে দেখা যায় একটি মার্কেটে আগুন, হইচই বিকট শব্দ। তখন রাজু খাবার শেষ করে ছাদে যায় দেখতে।
আমরা ভাড়াটিয়ারাও কয়েকবার গিয়েছি ছাদে দেখতে। পরে রাজু ছাদ থেকে দেখেন নিচে অনেক মানুষ দাঁড়িয়ে মার্কেটের আগুন দেখতেছে। তখন সেও আগুন দেখতে যায়। কিছুক্ষণ পরেই এলোপাতাড়ি গুলি শুরু হয়। অনেক মানুষ হতাহত হয়েছে। রাজু আহত একজনকে ধরতে গেছে। এমন সময় তার মাথায় গুলি লাগে। ধরাধরি করে তাকে প্রথমে বাসার সামনে নিয়ে আসে। এলাকার পরিস্থিতি তখন ভয়াবহ। কোনোমতে মহল্লার ভেতর দিয়ে একটি অটোরিকশাযোগে সাইনবোর্ড এলাকায় প্রো-অ্যাকটিভ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হয়। অবস্থা বেগতিক দেখে সেখান থেকে এম্বুলেন্সযোগে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ওইদিনই রাত ১১টায় তার মাথায় অস্ত্রোপচার করার পর বেডে দেয়া হয়। কিন্তু অবস্থার অবনতি ঘটলে রাত ৩টায় আইসিইউতে নেয়া হয়। পরের দিন ২১শে জুলাই রাত দেড়টায় মারা যায় রাজু।

আকলিমা জানান, গুলি খাওয়ার ৫ মিনিট আগে  মোবাইলে রাজু সঙ্গে আমার কথা হয়। আমি বলি তুমি কোথায়। বলে বাড়ির সামনে। সবাই মার্কেটের আগুন দেখতেছে। আমিও সেখানে আছি। তুমি চিন্তা করো না, চলে আসতেছি। এরপরই আমি খবর পাই রাজুর মাথায় গুলি  লেগেছে। আমাকে সামনে যেতে দেয় নাই। আমি কান্নাকাটি করলে যদি তার ক্ষতি হয়। আমার তখন হিতাহিত জ্ঞান ছিল না।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে আকলিমা বলেন, আমার স্বামী অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিল। পাইনাদী নতুন মহল্লায় এবং গ্রামের বাড়িতে দুইটা নামাজে জানাজা হয়েছে। অনেক মানুষ জানাজায় অংশ নিয়েছে। রাজু অনেক পরিশ্রম করতেন। ছোটবেলা থেকেই পরিশ্রমী ছিলেন। সব সময় কাজেকর্মে ব্যস্ত থাকতেন। পরিশ্রমকে অনেক প্রাধান্য দিতেন। বলতেন পরিশ্রম না করলে দুনিয়াতে কোনো কিছু পাওয়া সম্ভব নয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তেন। গ্রামে তার বাড়ি আর আমাদের বাড়ি পাশিপাশি ছিল। আর ভালো মানুষ দেখেই আমি ওনাকে বিয়ে করেছি। আমাদের বিয়ের ১৪ বছর চলছে। নিজের আপন মানুষ মরে গেলে জীবনে যে অন্ধকার নেমে আসে তা আমি এখন বুঝতেছি। চিন্তা করে কোনো কুলকিনারা পাচ্ছি না। কী করবো, কীভাবে দিন চলবে এই তিন ছোট ছেলে-মেয়েকে নিয়ে। মাথায় কিছু কাজ করে না। এভাবে মানুষটাকে গুলি খেয়ে মরতে হবে কোনোভাবেই মানতে পারছি না। তিন সন্তানকে নিয়ে আমি এখন কী করবো। বুঝতে পারছি না। ভাড়াবাসা তো ছাড়তে হবে। মাসে সব মিলিয়ে ১০ হাজার টাকা বাসা ভাড়া। ছেলে-মেয়ের লেখাপড়া ও সংসার খরচ কোথা থেকে দিবো আমি।

নিহত রাজুর বড় মেয়ে সৈয়দা আয়শা সিদ্দিকা (১৩), মেঝ ছেলে সৈয়দ রাইয়ান আবদুল্লাহ (১১) ও ছোট ছেলে সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক (৫) পাইনাদী নতুন মহল্লা ও হিরাঝিল এলাকায় মাদ্রাসায় পড়ছে। চার ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট ছিল রাজু। গ্রামের বাড়ি লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জের ১নং কাঞ্চনপুর এলাকার সৈয়দ আব্দুল করিমের ছেলে সে। পাইনাদী নতুন মহল্লায় জনৈক সোরওয়ার্দীর বাড়িতে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ভাড়ায় বসবাস করছেন। গত ২২ বছর ধরে তিনি ওই এলাকায় থাকেন। মোটর মেকানিকের পাশপাশি পুরাতন গাড়ি ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যবসা করতেন। ভালোই চলছিল তার সংসার।
আকলিমা আক্তার আরও জানান,  রাজু চলে যাওয়ায় এখন আমার পরিবার ও তার ভাইদের পরিবারও চরম আর্থিক সংকটে পড়েছে। গ্রামে তার ভাইদের আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভালো না। রাজু তাদেরও মাঝে মধ্যে আর্থিকভাবে সহায়তা করতেন। আমাদের দুই পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন রাজু। তার মৃত্যুতে সবাই শোকাহত। মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছে তার ভাইয়েরা।

আকলিমা বলেন, আমি রামগঞ্জ সরকারি ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক এবং চাঁদপুর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স কমপ্লিট করেছি। আমার স্বামী আমাকে পড়িয়েছে। আমি চাকরি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে রাজি ছিল না। সে বলে আমি তোমার স্বামী। আমি থাকতে তুমি কেন চাকরি করবা। আমি কষ্ট করে হলেও তোমাদের খাওয়াবো। হেলথে আমার চাকরি হয়েছিল তখনো উনি করতে দেয় নাই। এখন আমি যদি কারও কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাই, সুযোগ পাই, আমাকে একটা চাকরি দিবে, তাহলে আমি চাকরি করে আমার ছেলে-মেয়েকে নিয়ে জীবনটা কাটাতে পারবো। হয়তো বাবা হিসেবে রাজু ছেলে-মেয়েকে যেভাবে রাখছে আমি হয়তো মা হিসেবে সেভাবে পারবো না। তবে দু-মুঠো ভাত তাদের মুখে দিতে পারবো। আমি শুধু আমার তিন সন্তানকে নিয়ে মান সম্মানের সঙ্গে বাকি জীবনটা দুইটা ডাল-ভাত খেয়ে কাটিয়ে দিতে চাই। ওদের লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।

বিশৃঙ্খলাকারীরা শ্রীলঙ্কার মতো তাণ্ডব সৃষ্টি করতে চেয়েছিল: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সাম্প্রতিক কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীরা দেশে শ্রীলঙ্কা টাইপ তাণ্ডব সৃষ্টির চেষ্টা করতে চেয়েছিল এবং তারা সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা করেছিল। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা গতকাল প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একথা বলেন। সাক্ষাৎ শেষে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব মো. নাঈমুল ইসলাম খান সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। শেখ হাসিনা বলেন, কোটা সংস্কারকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক আন্দোলন মোটেও স্বাভাবিক আন্দোলন নয়, বরং এক পর্যায়ে তা প্রায় সন্ত্রাসী হামলায় পরিণত হয়। এটা কোনো সাধারণ আন্দোলন ছিল না। এটা এক পর্যায়ে প্রায় সন্ত্রাসী আক্রমণের মতো হয়ে যায়। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান, অ্যাম্বাসেডর অ্যাট-লার্জ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন এবং মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাম্প্রতিক সহিংসতায় জীবন ও সম্পদহানির কথা দুঃখের সঙ্গে উল্লেখ করেন জানিয়ে প্রেস সচিব বলেন, এ সময় ভারতের হাইকমিশনার বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সহিংসতায় জীবন ও সম্পদহানির ঘটনায় শোক জানান। ধারাবাহিকভাবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসাকে স্বাগত জানান প্রণয় ভার্মা। ভারতের হাইকমিশনার বলেন, ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশী হিসেবে ভারত সব সময় বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের ভিশন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধিকে সমর্থন করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক ভারত সফর প্রসঙ্গে প্রণয় ভার্মা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক সফল সফর অর্থবহ ফলাফল অর্জন করেছে এবং যা অতীতের অর্জনকে সুসংহত করেছে এবং ভবিষ্যতে সহযোগিতার একটা ব্লু-প্রিন্ট সৃষ্টি করেছে। হাইকমিশনার বলেন, দুই দেশের যে জাতীয় ডেভেলপমেন্ট ভিশন- ‘বাংলাদেশের ২০৪১ এবং ভারতের ২০৪৭’ ভিশনের ভিত্তিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক সহযোগিতার একটা নতুন যুগে প্রবেশ করেছে। ডিজিটাল ও গ্রিন অংশীদারিত্ব, স্যাটেলাইটের যৌথ উন্নয়ন, ব্লু ইকোনমি, ওশানোগ্রাফি, ফিনটেকসহ  নতুন নতুন ক্ষেত্রে সহযোগিতা হবে। আঞ্চলিক কানেকটিভিটি প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, চার দেশের (বাংলাদেশ, ইন্ডিয়া, নেপাল ও ভুটান) মধ্যে কানেকটিভিটি জোরালো করার জন্য আমার সব দরজা খোলা।


জানি না অপরাধটা কী ছিল আমার?

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কোটা বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশব্যাপী সহিংসতার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছে সহযোগিতা চেয়েছেন। তিনি বলেন, আমরা জাতিসংঘের কাছেও আবেদন করেছি, আন্তর্জাতিকভাবেও বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে দেশে-বিদেশে তাদের কাছেও আমরা সহযোগিতা চাই যে, এই ঘটনার যথাযথ সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং যারা এতে দোষী তাদের সাজার ব্যবস্থা হোক। কারণ, আমি জানি এতে আমার কোনো ঘাটতি ছিল না। গতকাল  রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে ‘জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ-২০২৪’-এর উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন। কোটা বিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে প্রাণহানির ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই ঘটনার তদন্তে আমরা ইতিমধ্যেই বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছি। কারণ, দাবির অপেক্ষা আমি রাখিনি। তার আগেই বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি করে দিয়েছি। শেখ হাসিনা বলেন, আগে একজন বিচারপতি দিয়ে তদন্ত কমিটি করে দিয়েছিলাম। এখন আরও দু’জন লোকবল বৃদ্ধি করে তাদের তদন্তের পরিধি আরও বাড়ানোর জন্য তার নির্দেশ প্রদানের কথাও জানান তিনি। বলেন, সেই সঙ্গে আমরা জাতিসংঘের কাছেও আবেদন করেছি, আন্তর্জাতিকভাবেও বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে দেশে-বিদেশে তাদের কাছেও আমরা সহযোগিতা চাই যে, এই ঘটনার যথাযথ সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং যারা এতে দোষী তাদের সাজার ব্যবস্থা হোক। কারণ আমি জানি এতে আমার কোনো ঘাটতি ছিল না। শেখ হাসিনা বলেন, যারা আলোচনায় বসেছিল (আন্দোলনকারী) তাদের সঙ্গে বার বার আলোচনা করেছি এবং তাদের দাবি মেনে নিয়েছি। দাবি মানবো কী যেটা আমিই বাতিল করে দিয়েছি। এটা তো আমারই (কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন) ইস্যু করা। আপিল করা হয় আপিল বিভাগে এবং সেখানে হাইকোর্টের রায় (কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন বাতিল) স্থগিত করে দিয়ে আপিল বিভাগ পূর্ণাঙ্গ শুনানির তারিখ নির্দিষ্ট করে দেয়। কাজেই কোটা না থাকায় আমার জারি করা প্রজ্ঞাপনটাই আবার কার্যকর হয়। পরে আপিল বিভাগ থেকে সেটার রায়ও দিয়ে দেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই আন্দোলনের নামে যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছে, ধ্বংসাত্মক কাজ করা হয়েছে তাতে অনেকগুলো তাজা প্রাণ ঝরে গেছে। তিনি বলেন, জানি না অপরাধটা কী ছিল আমার? যে ইস্যুটা নেই সেটা নিয়ে আন্দোলনের নামে এই ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ করে দেশের অর্জনকে নষ্ট করা, আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করাতে কে কী অর্জন করলো সেটাই আমার প্রশ্ন? সরকার প্রধান বলেন, তার কাছে ক্ষমতা কোনো ভোগের বস্তু নয়, তিনি তো আরাম আয়েশ করার জন্য ক্ষমতায় আসেন নি। দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন দেশকে একটু উন্নত করতে। যেটা তিনি সফলভাবে করতে পেরেছিলেন। আজকে বাংলাদেশ বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। সেই মর্যাদাকে কেন নষ্ট করা হলো?’ সে প্রশ্ন উত্থাপন করে এর বিচারের ভার তিনি দেশবাসীর কাছে দিয়ে দেন। শেখ হাসিনা দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, একটা ঘটনা ঘটিয়ে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করে দেশকে পেছনে টেনে নেয়ার এই চক্রান্তে যারা জড়িত সেটা আপনাদের খুঁজে বের করা উচিত। তিনি বলেন, ঐ ’৭১-এ যারা পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর ছিল তাদের চক্রান্ত বারবার আমাদের দেশকে পিছিয়ে নিয়ে গেছে। এটা হচ্ছে সব থেকে কষ্টের, সবচেয়ে দুঃখের। জাতির পিতার কন্যা বাকরুদ্ধ কণ্ঠে বলেন, আমি যেহেতু স্বজন হারিয়েছি। স্বজন হারাবার বেদনা আমি বুঝি। তাই যারা আপনজন হারিয়েছেন তাদের প্রতি আমার সহমর্মিতা জানাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ধ্বংস করেছে। স্থাপনা যে ধ্বংস করেছে সেগুলো তো পুনর্গঠন করা যাবে কিন্তু যে প্রাণগুলো ঝরে গেল সেগুলো তো আমরা আর ফিরে পাবো না। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ৭টি ক্যাটাগরিতে ২২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মাঝে ‘জাতীয় মৎস্য পদক-২০২৪’ প্রদান করেন। পুরস্কার হিসেবে ৬টি স্বর্ণ, ৮টি রৌপ্য ও ৮টি ব্রোঞ্জপদক, সম্মাননা স্মারক এবং পুরস্কারের অর্থ প্রদান করা হয়। প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে জেলেদের মধ্যে স্মার্ট আইডি কার্ডও বিতরণ করেন। ২২ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি মৎস্য চাষে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য প্রধানমন্ত্রীকেও অনুষ্ঠানে স্বর্ণপদক প্রদান করা হয়। দেশের মৎস্য খাতের উন্নয়নের ওপর একটি প্রামাণ্য চিত্র অনুষ্ঠানে প্রদর্শন করা হয়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মো. আব্দুর রহমান অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব সাঈদ মাহমুদ বেলাল হায়দার স্বাগত বক্তৃতা করেন। মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ আলমগীর পুরস্কার প্রদান পর্বটি সঞ্চালনা করেন।

কুর্মিটোলা হাসপাতালে প্রধানমন্ত্রী: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশব্যাপী সাম্প্রতিক সহিংসতায় আহতদের দেখতে গতকাল কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। প্রধানমন্ত্রী বিকাল ৫টার পর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে যান। তিনি সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে হামলার শিকার হয়ে সেখানে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের অবস্থার খোঁজখবর নেন। আহতদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেন। আঘাতের তীব্রতা দেখে ও হামলার নৃশংসতার কথা শুনে প্রধানমন্ত্রী আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। তিনি এ সময় তার চোখের পানি সংবরণ করতে পারেননি। কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল পরিদর্শনকালে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদুর রহমান আহতদের চিকিৎসার ব্যবস্থা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। এরপরে তিনি মহাখালীস্থ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ডিজিজেস অব দ্য চেস্ট অ্যান্ড হসপিটালে আহতদের দেখতে যান। মঙ্গলবার বিকালে সহিংসতায় আহতদের দেখতে শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। এর আগে, গত কয়েকদিনে প্রধানমন্ত্রী সহিংসতার শিকার অন্যদের দেখতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতাল, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ট্রমাটোলজি অ্যান্ড অর্থোপেডিক রিহ্যাবিলিটেশন (নিটোর) পরিদর্শন করেন। তিনি আহতদের যথাযথ চিকিৎসার আশ্বাস দেন এবং তাদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। এ ছাড়াও, প্রধানমন্ত্রী মিরপুর ১০-এ ভাঙচুর হওয়া মেট্রোরেল স্টেশন, বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ভবন, সেতু ভবন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ ভবন এবং মহাখালীতে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের টোল প্লাজা পরিদর্শন করেন।

বাংলাদেশের বিরাজমান পরিস্থিতিতে অংশীদারিত্ব চুক্তির আলোচনা স্থগিত করেছে ইইউ

বাংলাদেশের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি ‘অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি-পিসিএ’ নিয়ে পরবর্তী আলোচনা স্থগিত করেছে ২৭ রাষ্ট্রের ওই জোট। বাংলাদেশের বিরাজমান অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আলোচনাটি স্থগিত করা হয় বলে ইইউ’র একজন মুখপাত্র মানবজমিনকে নিশ্চিত করেছেন। আগামী সেপ্টেম্বরে ঢাকায় সেই আলোচনা হওয়ার শিডিউল ছিল। ইইউ’র মুখপাত্র বাংলাদেশ পরিস্থিতি সম্পর্কে ইইউ’র অবস্থান জানতে গত ৩০শে জুলাই হাই-রিপ্রেজেনটেটিভ জোসেপ বোরেলের বিবৃতিকে রেফার করেন। স্মরণ করা যায়, ইইউ-বাংলাদেশ সম্পর্কের মৌলিক বিষয়গুলো অর্থাৎ গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশের এই কঠিন সংকটে সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ঘনিষ্ঠভাবে নজরদারিতে রাখবে বলে বিবৃতিতে স্পষ্ট করেছিলেন ইইউ’র উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি (পররাষ্ট্রমন্ত্রী) জোসেপ বোরেল। বিবৃতিতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের তরফে এই প্রত্যাশাও ব্যক্ত করা হয়েছিল যে বাংলাদেশ সরকার তার প্রতিটি পদক্ষেপে মানবাধিকারের প্রতি সম্পূর্ণভাবে সম্মান প্রদর্শন করবে। সেগুনবাগিচা এবং ব্রাসেলসের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছরের অক্টোবরে ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভনডার লেইন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে পিসিএ সই হয়েছিল।

যার আওতায় প্রথম স্লটেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বিভিন্ন প্রকল্পে বাংলাদেশের ন্যূনতম ৪৭০ মিলিয়ন ইউরো সহযোগিতা পাওয়ার  কথা ছিল। তাছাড়া এটি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার পথকে আরও প্রশস্ত করতো। অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতা চুক্তিটি ঢাকা ও ব্রাসেলসের মধ্যে সই হলেও জোটের সব সদস্যের জন্য এটি মেনে চলার আইনগতভাবে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গোটা ইউরোপের সমর্থন সহযোগিতা পেতে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি। সেই চুক্তির পরবর্তী আলোচনা স্থগিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে সেগুনবাগিচা এটা স্বীকার করেছে যে, বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে খুবই সমালোচনামুখর রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ মানবাধিকার সংবেদনশীল পশ্চিমা বিশ্ব। চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সৃষ্ট উত্তেজক পরিস্থিতিতে প্রকাশ্যে কোনো রকম বিবৃতি না দিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি অনুরোধ করেছিল বাংলাদেশ সরকার। আন্দোলনের শুরুর দিকে তারা এ নিয়ে কোনো বিবৃতি না দিলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তরফে বেপরোয়া গুলি বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের লাশ পড়ে যাওয়ায় পর থেকে কাছের এবং দূরের প্রায় সব রাষ্ট্রেই প্রতিক্রিয়া হয়েছে। ইউরোপের দেশগুলো জোটবদ্ধভাবে এবং ঢাকায় থাকা দেশগুলোর প্রতিনিধিরা  পশ্চিমা অন্য রাষ্ট্র, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা-সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মিলে দফায় দফায় এ নিয়ে উদ্বেগ ব্যক্ত করে চলেছেন। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে সংঘটিত বেআইনি হত্যা ও ঘোষিত ‘শুট অন সাইট পলিসি’ বা দেখামাত্র গুলির ঘোষণায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইইউ’র পররাষ্ট্রমন্ত্রী জোসেপ বোরেল।

তিনি বাংলাদেশে বিক্ষোভ দমনে সরকারি বাহিনীর মাত্রাতিরিক্ত বল প্রয়োগের তীব্র নিন্দা জানান। বিবৃতি দেয়া ছাড়াও গত ২৭শে জুলাই লাওসে আসিয়ানের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের ফাঁকে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতা সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আব্দুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ ব্যক্ত করেন তিনি। জোসেপ বোরেল খোলাসা করেই বলেন, প্রতিবাদকারী শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, শিশুসহ অন্যদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত বল প্রয়োগ এবং প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের প্রতিটি ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করতে হবে। দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে আন্দোলন দমনে হাজার হাজার লোকের বাছ-বিচারহীন গ্রেপ্তার বা আটকে ‘যথাযথ প্রক্রিয়া’ অনুসরণ করতে হবে। আলোচনা স্থগিত করার বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন সন্ধ্যায় গণমাধ্যমকে বলেন, আমরা বিষয়টি নিয়ে ইইউ’র সঙ্গে অ্যাঙ্গেইজ থাকবো। নিশ্চয়ই তারা নতুন শিডিউল দিবে।  উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদার ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন। আমাদের রপ্তানির ২০ শতাংশের বেশি ইইউভুক্ত দেশগুলোতে পাঠানো হয়।
অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে একাধিক বৈঠক স্থগিত: এদিকে উদ্ভূত বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে অস্ট্রেলিয়াও ঢাকার সঙ্গে একাধিক বৈঠক স্থগিত করেছে। গত ২৪ ও ২৫শে জুলাই ফরেন অফিস কনসালটেশন এবং বাণিজ্য বিষয়ক একটি বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। দুটি বৈঠকই শেষ সময়ে এসে স্থগিত করা হয় বলে জানায় সেগুনবাগিচা।

ফের উত্তপ্ত রাজপথ: বিক্ষোভ-সংঘর্ষ-লাঠিচার্জ-টিয়ারশেল

কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে বিক্ষোভ, সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। রাজধানীর হাইকোর্ট এলাকা ও দোয়েল চত্বরে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আইনজীবী ও অভিভাবকরা। এ ছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষ, লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। এতে শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, সাংবাদিকসহ আহত হয়েছেন অনেকে। আটক করা হয়েছে আন্দোলনকারীদের।  এছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আদালত প্রাঙ্গণে হট্টগোলের ঘটনা ঘটে। সিলেট, বরিশাল, গাজীপুর, খুলনা, যশোর, ঠাকুরগাঁওয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। চট্টগ্রামে আদালত প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেন কয়েক হাজার শিক্ষার্থী। সংহতি সমাবেশ হয়েছে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে শিক্ষক কর্মকর্তারা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সংহতি প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী হত্যার বিচার দাবি করেন।

সকাল থেকেই রাজধানীর  হাইকোর্ট এলাকার আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর ব্যাপক পরিমাণ সদস্যের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। এরপর কয়েকজন শিক্ষার্থী আশপাশে অবস্থান নিয়েছিলেন। তাদের সঙ্গে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক। এ সময় পুলিশ কয়েকজন শিক্ষার্থীকে আটক করে। এক শিক্ষার্থীকে আটকের সময় আরেক নারী শিক্ষার্থী আটক ঠেকানোর প্রচেষ্টা চালান। এরপর পুলিশভ্যানে উঠে সেই শিক্ষার্থী বলতে থাকেন, আমাদের আটকিয়ে রাখা যাবে না।

আরেক শিক্ষার্থীকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় তিনি পুলিশ সদস্যের সঙ্গে স্যার সম্বোধন করে কথা বলতে থাকেন। তিনি বলেন, আমাকে ছেড়ে দেন আমিতো আপনার ভাই। এ সময় পুলিশ  সদস্য বলেন, স্টপ নো মোর টক। এই শিক্ষার্থীর মুখ চেপে ধরে তিনি বলেন, চুপ আর একটা কথাও না। এ সময় আরেক পুলিশ সদস্যকে বলতে শোনা যায়, যারা মারা গেছে তারা  তো ফিরে আসবে না। এখন মিছিল বিক্ষোভ করলে আরও ক্ষতি।

এ সময় গণমাধ্যমে ওই শিক্ষার্থী বলেন, আমরা দাবি-দাওয়া আদায়ের কর্মসূচিতে অংশ নিতে এখানে উপস্থিত হই। পুলিশ সদস্যরা আমাদের সরে যেতে বলেন। আমরা তাদের কথা শুনে গেট থেকে সরেও আসি। কিন্তু আসার সময়ই আমাকে আটক করা হলো। আমরা শুধু আমাদের ন্যায্য হিস্যার কথা জানানোর জন্য এসেছি। কেন আটক করা হবে?  আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আরিফ হোসেন আরিফ বলেন, সবাই আমরা একত্রে ছিলাম। কারণ ছাড়াই আমাকে ধরে নিয়ে আসা হয়েছে।
আরেক শিক্ষার্থীকে আটক করে নিয়ে যাওয়ার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষক শেহরীন আমিন মোনামীকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে পুলিশের বিরুদ্ধে। তিনি আটকের বিরুদ্ধে বাধা হয়ে দাঁড়ান। তখন জোরপূর্বক শারীরিক শক্তি প্রয়োগ করে এবং তাকে হাত মোচড় দিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীকে টেনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে এবং ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। এ সময় তিনি হাঁটুতে এবং পায়ে আঘাত পান।

এ সময় লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. নুসরাত জাহান চৌধুরী বলেন, আমরা কী কোথাও দাঁড়াতেও পারবো না? সে অধিকার আমাদের নেই? আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য আমরা এখন না দাঁড়াতে পারলে ক্লাস নেয়ার জন্য তাদের সামনে কীভাবে দাঁড়াবো?
গতকাল ‘মার্চ ফর জাস্টিস’- কর্মসূচি পালনের জন্য শুরুতে আসা শিক্ষার্থীদের আটক করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়ার চেষ্টা করা হয়। এরপর দোয়েল চত্বর থেকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা একটি মিছিল নিয়ে হাইকোর্টের দিকে আসতে থাকেন। শিশু একাডেমির সামনে পুলিশ সদস্যরা তাদের আটকে দেন। এ সময় শিক্ষকরা উই ওয়ান্ট জাস্টিস বলে স্লোগান দিতে থাকেন। পুলিশ সদস্যদের সঙ্গে চলতে থাকে বাকবিতণ্ডা। এরই মধ্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে এসে উপস্থিত হন। আন্দোলনরতরা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘গভেট গভেট, পুলিশ গভেট’, ‘রক্তের বন্যায়, ভেসে যাবে অন্যায়’ ইত্যাদি স্লোগান দেন। এই সমাবেশে আরেকটি মিছিল নিয়ে যোগ দেন আন্দোলনকারীদের আরেকটি অংশ। পুলিশ সড়ক অবরোধ করায় তারা সেখানেই কিছু সময়ের জন্য বসে পড়েন।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাদা দলের আহ্বায়ক অধ্যাপক লুৎফর রহমান বলেন, আমরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি ‘মার্চ ফর জাস্টিস’-এ সংহতি জানাতে এসেছি। আজকে দেশে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে যে, শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচয় দিতে ভয় পাচ্ছে। তার ভয় যেকোনো সময় তাকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হতে পারে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক কামরুল ইসলাম বলেন, আমরা কোনো দলের দালালি করতে আসি নাই। আমরা শিক্ষার্থীদের পক্ষে। আজকেও শিক্ষার্থীদের আটক করা হয়েছে। এ সময় তিনি দ্রুত শিক্ষার্থীদের ছেড়ে দেয়ার দাবি জানান।

আন্দোলনে বেশ কয়েকজন মা আসেন তাদের সন্তানকে নিয়ে। ফারজানা ইসলামের মেয়ে বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, আমরা ভেবেছিলাম আমরা ঘরের মধ্যে নিরাপদ। কিন্তু নিরাপত্তা কোথায়, আজ ঘরের মধ্যেও গুলি এসে লাগছে। আজ শিক্ষার্থীরা মাঠে নেমেছে কারণ তাদের ভাইয়ের রক্তে রাজপথ লাল হয়েছে। আজ আমরা বাধ্য হয়ে রক্তাক্ত প্রান্তরে এসে দাঁড়িয়েছি। তিনি সকল অভিভাবককে আন্দোলনে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আজ আপনি ভাবছেন আমি নিরাপদ, আমার সন্তান নিরাপদ। কিন্তু না তারা নিরাপদ না। রক্তাক্ত প্রান্তরে এসে প্রতিবাদ জানান। নয়তো বিজয়ের মিছিলে আপনার আসার কোনো অধিকার থাকবে না।

বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে এসেছেন শিখা। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি জানানোর জায়গাটা কোথায়? শিক্ষার্থীদের কথা তো মন্ত্রীরা শুনবেন না। তাহলে তাদের দাবিতো এভাবেই জানাতে হবে। দাবি জানানোর অধিকার সবার আছে। দাবি জানানোর জন্য এতগুলো মায়ের বুক খালি হয়ে গেল। শিক্ষার্থীরা নাকি সন্ত্রাসী। এই শিক্ষার্থীরা সন্ত্রাসী কীভাবে হয়? পুলিশের সন্তানরা কী দেশে পড়াশুনা করে না? কিছু বললেই বলে, জামায়াত-শিবির। তাহলে পুরো দেশটাই জামায়াত-শিবির।

শিক্ষার্থীরা দোয়েল চত্বরে দাবির পক্ষে উত্তপ্ত স্লোগান এবং বক্তব্য দিতে থাকেন। এ সময় শিক্ষকরা নিশ্চিত করে বলেন, আটক দুই শিক্ষার্থীকে ছেড়ে দিয়েছে পুলিশ। এরপর পদযাত্রা করে শহীদ মিনারের উদ্দেশ্যে যান আন্দোলনকারীরা। এ সময় নানা স্লোগান দিতে থাকেন। ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস, আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেবো না’।

শহীদ মিনারে কর্মসূচি শেষ পর্যায়ে আরেক অভিভাবক মিজানুর রহমান আন্দোলনরতদের উদ্দেশ্যে বলেন, আমার তিনটা সন্তান তাদের চোখে তাকাতে পারি না। তাদের চোখের দিকে তাকালেই লেখা দেখি কাপুরুষ। আমি সন্তানদের জন্য এসেছি। সন্তানের নিরাপত্তা না থাকলে বাবা হিসেবে বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই। তিনি এ সময় অভিভাবকদের মাঠে নেমে আসার আহ্বান জানান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, যে ক্ষতি হয়েছে তা আমরা ফিরিয়ে আনতে পারবো না। আমাদের দাবি মানতেই হবে। এই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আমরা মাঠে থাকবো। এই দেশটা আমাদের, এভাবে হত্যা আমরা মেনে নেবো না।  বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সহ-সমন্বয়ক তারেক আদনান বলেন, আমার ভাইয়ের রক্তের বিচার আমরা চাই। তাদের বিচার না হওয়া পর্যন্ত রাজপথ ছাড়বো না। আমরা আমাদের আন্দোলনকে চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যাব।

আন্দোলন শেষে সন্ধ্যায় গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’র নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বৃহস্পতিবার সারা দেশে অনলাইন-অফলাইনে স্মৃতিচারণ ও প্রচারণা চালানো হবে বলে বিজ্ঞপ্তিতে জানান সহ-সমন্বয়ক রিফাত রশিদ। তিনি বলেন, ভয়ানক অন্ধকার পরিস্থিতিতে সারা দেশে ছাত্র-জনতার ওপর গণহত্যা, গণগ্রেপ্তার, হামলা-মামলা, গুম-খুন ও শিক্ষকদের ওপর ন্যক্কারজনক হামলার প্রতিবাদে, জাতিসংঘ কর্তৃক তদন্তপূর্বক বিচারের দাবিতে এবং ছাত্র সমাজের ৯ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আজ (বৃহস্পতিবার) বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন ‘রিমেম্বারিং আওয়ার হিরোস’ কর্মসূচি ঘোষণা করছে।

পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে বিক্ষোভকারীরা:
‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচি নিয়ে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা সমবেত কণ্ঠে গানও পরিবেশন করেন। বুধবার দুপুরে তারা পুলিশ ও বিজিবি’র বাধা অতিক্রম করে শিক্ষার্থীরা হাইকোর্ট মাজার গেটের পশ্চিম পাশের কাঁটাতারের ব্যারিকেড ভেঙে সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে প্রবেশ করেন। এ সময় তারা ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বলে স্লোগান দিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকেন। হাইকোর্ট মাজার গেটের সামনে থেকে দুই শিক্ষার্থীকে আটক করে পুলিশ নিয়ে যেতে চাইলে শিক্ষার্থী ও আইনজীবীদের বাধার মুখে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।  

বেলা সাড়ে ১২টার পরে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগান দিতে দিতে ব্যারিকেড ভেঙে সুপ্রিম কোর্ট আঙিনার ভেতরে ঢুকেন ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচির বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা। এ সময় সুপ্রিম কোর্টের সাধারণ আইনজীবী, পথচারীরাও  শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগ দেন। পরে তারা সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবন ও সুপ্রিম কোর্টের পুরাতন ভবনের মাঝখানে চলাচলের (গ্যাংওয়ে) জায়গায় অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে। প্রায় আধাঘণ্টা তারা সেখানে অবস্থান করে বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা বেলা ২টার দিকে সুপ্রিম কোর্ট আঙিনা থেকে বের হয়ে যান। বের হওয়ার সময় মাজার গেটের মূল ফটক খুলে দেয় পুলিশ। পরে তারা হাইকোর্ট মাজার গেট ও শিক্ষা অধিকার চত্বরে আগে থেকে অবস্থান নেয়া বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে যোগ দেয়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কর্মসূচিতে আইনজীবী, শিক্ষক, অভিভাবক, সংস্কৃতি কর্মীরাও অংশ নেন। এ সময় সুপ্রিম কোর্টের মাজার গেটের ভেতরে-বাইরে বিপুল সংখ্যক সশস্ত্র পুলিশের অবস্থান ছিল। গেটের বাইরে পুলিশের সঙ্গে ছিল বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)’র সদস্যরাও। বিপুলসংখ্যক পুলিশ-বিজিবি’র উপস্থিতিতেই বেলা ৩টা পর্যন্ত শিক্ষা অধিকার চত্বরে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ইডেন ছাড়াও নর্থ সাউথ, ব্র্যাক, গ্রিন ইউনিভার্সির্টি, ঢাকা কলেজ, সিটি কলেজ, শেখ বোরহানুদ্দীন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজ, সবুজবাগ সরকারি কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচিতে অংশ নেন।

ঢাবির শিক্ষার্থী বিন ইয়ামিন মোল্লা বলেন, শিক্ষার্থীদের নামে যেসব মামলা দেয়া হয়েছে, সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। নইলে আমরা রাজপথ ছাড়বো না। আমাদের আন্দোলন চলবে।
কর্মসূচি চলার মধ্যে এতে যোগ দেন আলোকচিত্রী শহিদুল আলম, উন্নয়ন কর্মী শারমিন মুরশিদ, লেখক, অধিকারকর্মী রেহনুমা আহমেদ, সংস্কৃতি কর্মী কৃষ্ণকলি ইসলাম, ওয়ারদা আশরাফুসহ শিক্ষক, অভিভাবকরা। প্রতিবাদী গান গেয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের উদ্বুদ্ধ করতে দেখা যায় সংস্কৃতিকর্মীদের।

আইনজীবীদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, তৈমূর আলম খন্দকার, রুহুল কুদ্দুস কাজল, গাজী কামরুল ইসলাম সজল, মোহাম্মদ আলী, গাজী তৌহিদ, আব্দুল্লাহ আল মাহবুব, মাহবুবুর রহমান খান,  জামিউল হক ফয়সাল, মাহফুজুর রহমান, মাহফুজুর রহমান মিলন, আয়শা আক্তার, মাহবুবা জুঁই, মিনা আক্তার, ব্যারিস্টার ওসমান চৌধুরীসহ বিপুলসংখ্যক আইনজীবী। এদিকে আন্দোলনরত দুই শিক্ষার্থীকে পুলিশ আটক করে নিয়ে যেতে চাইলে ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন, মানজুর-আল-মতিন, আইনুন নাহার সিদ্দিকা, তানভীর আহমেদ ও এডভোকেট আব্দুল্লাহ আবু সাইদ বাধা দেন। পরে পুলিশ তাদের দুইজনকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন।

ঢাকা কোর্টে আইনজীবীদের বিক্ষোভ:
‘মার্চ ফর জাস্টিস’ সমর্থনে ঢাকা কোর্টে আইনজীবীরা বিক্ষোভ করেন। চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ডাকা ‘মার্চ ফর জাস্টিস’ কর্মসূচির সমর্থন জানিয়ে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন ঢাকা জজ কোর্টের আইনজীবীরা। বুধবার দুপুর ১টার দিকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে শতাধিক আইনজীবী এই বিক্ষোভ মিছিলে অংশ নেন। এ সময় চলমান কোটা সংস্কার আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের ডাকা কর্মসূচির সমর্থন জানিয়ে বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিতে থাকেন আইনজীবীরা। বিক্ষোভ মিছিল ঢাকা আইনজীবী সমিতি থেকে শুরু করে চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। এদিকে, কর্মসূচি ঘিরে ঢাকার নিম্ন আদালতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সকাল থেকেই বিজিবি সদস্য ও অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।  
এ বিষয়ে লালবাগ জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ ইমরান হোসেন মোল্লা বলেন, আদালতের নিরাপত্তা যাতে বিঘ্নিত না হয় সে কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বেশ কয়েক স্তরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। নাশকতা ঠেকাতে তল্লাশি করা হচ্ছে।